লাইব্রেরি
১৮৫৪মানসিংহ মানসিংহ ভারতচন্দ্র রায় · ১৮৫৪

মানসিংহ।

নবদ্বীপাধিপতি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের অনুমতি ক্রমে মহাকবি

ভারতচন্দ্র রায় কর্তৃক

বিরচিত।

অনেক স্থানের পুস্তকের সহিত ঐক্য পূর্ব্বক

কলিকাতা।

কবিতা রত্নাকর যন্ত্রে মুদ্রিত হইল।

সাং বটতলার দক্ষিণাংশে দোকানে তত্ত্ব করিলে পাইবেন।

সন ১২৬১ সাল তারিখ ২ শ্রাবণ

মানসিংহ · / ৩৯

বর্দ্ধমান হইতে মানসিংহের প্রস্থান

মানসিংহ।

বর্দ্ধমান হইতে মানসিংহের প্রস্থান।

জয় জয় গঙ্গে জয় গঙ্গে। হরিপদ কমল কমল

কলদঙ্গে॥ টল টল চল ঢল, চল চল ছল ছল,

কল কল তরলত রঙ্গে। পুটকিতশিরজট, বিঘ-

টিত সুবিকট, লট পট কমঠভুজঙ্গে॥ তরুণ

অরুণ বর, কিরণ বরণ কর, বিধি কর নিকর-

রঙ্গ। ভুবন ভবন লয়, ভজন ভবিক ময়, ভারত

ভবভয় ভঙ্গে। ধ্রু॥

সাঙ্গ হৈল বিদ্যাসুন্দরের সমাচার। মজুন্দারে মানসিংহ কৈলা পুরস্কার॥ মজুন্দারে কহিলা করিব গঙ্গান্নান। উত্তিরিলা পূর্বস্থলী নদে সন্নিধান॥ আনন্দে গঙ্গার জলে স্নান দান কৈল। কমক অঞ্জলি দিয়া গঙ্গা পার হৈলা॥ পরম আনন্দে উত্তরিলা নবদ্বীপ। ভারতীর রাজধানী ক্ষিতির প্রদীপ॥ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত লয়ে বিচার শুনিয়া। তুষ্ট কৈলা সকলেরে নানাধন দিয়া॥ মানসিংহ জিজ্ঞাসা করিলা মজুন্দারে॥ কোথায তোমার ঘর দেখাও আমারে॥ মজুন্দার কহিলা সে দুর বাগোয়ান। মানসিংহ কহে চল দেখিব সে স্থান॥ মজুন্দার সঙ্গে রঙ্গে থড়ে পার হয়ে। বাগোেয়ানে মানসিংহ যান সৈন্য লয়ে॥। মজুন্দার ঘরে গেলা বিদায় হইয়া। অন্নপূর্ণা যুক্তি কৈলা বিজয়া লইয়া॥। মানসিংহে আপনার মহিমা জানাই। দুঃখ দিয়া সুখ দিলে তবে পূজা পাই॥ তবে সে জানিবে মোরে পড়িয়া সঙ্কেটে। বিনাভয় প্রীতি নাই জয়া বলে বটে॥ ঝড় বৃষ্টি করিবারে মেঘগণে কও। জল পরিপূর্ণ করি অন্ন হরি লও॥ ভাবাইর ভাণ্ডারেতে দিয়া শুভদৃষ্টি। শেষে পুন অন্ন দিবা মিটাইয়া বৃষ্টি॥ শুনি দেবী আজ্ঞা দিলা যত জলধরে। ঝড় বৃষ্টি কর মানসিংহের লস্করে॥ দেবীর আদেশে ধায় যত জলধর। রচিল ভারত চন্দ্র রায় গুণাকর॥

মানসিংহ · / ৩৯

মানসিংহের সৈন্যে ঝড়বৃষ্টি

মানসিংহের সৈন্যে ঝড় বৃষ্টি।

ঘন ঘন ঘন ঘন গাজে। শিলা পড়ে তড় তড়,

ঝড় বহে ঝড় ঝড়, হড়মড় কড়মড়় বাজে॥ ধ্রু॥

দশদিক আন্ধার করিল মেঘগণ। দুণ হয়ে বহে ঊনপঞ্চাশ পবন॥ ঝঞ্‌ঝনার ঝঞ্‌ঝনী বিদ্যুত চকমকী। হড়মড়ী মেঘের ভেকের মকমকী॥ ঝড়ঝড়ী ঝড়ের জলের ঝরঝরী। চারিদিকে তরঙ্গ জলের তরতরী॥ থরথরা স্থাবর বজ্রের কড়মড়ী। ঘুটঘুট আন্ধার শিলার তড়তড়ী॥ ঝড়ে উড়ে কানাত দেখিয়া উড়ে প্রাণ। কুঁড়ে ঠাট ডুবিল তাম্বুতে এল বান॥ সাঁতারিয়া ফিরে ঘোড়ে ডুবে মরে হাতি। পাঁকে গাড়া গেল গাড়ী উট তার সাতি॥ ফেলিয়া বন্দুক জামা পাগ তলবার। ঢাল বুকে দিয়া দিল দিল সিপাই সাঁতার॥ খাবি খেয়ে মরে লোক হাজার হাজার॥ তল গেল মাল মাত্তা উরুদুবাজার॥ বকরী বকরা মরে কুকড়ী কুকড়া। কুজড়ানী কোলে করি ভাসিল কুজড়া॥ ঘাসের বোঝায় বসি ঘেসেড়ানী ভাসে। ঘেসেড়া মরিল ডুবে তাহার হা ভাষে॥ কান্দি কহে ঘেসেড়ানী হায় রে গোসাঁই। এমন বিপাকে আর কভু ঠেকি নাই॥ বৎসর পনর ষোল বয়স আমার। ক্রমে ক্রমে বদলিনু এগার ভাতার॥ হেদে গোলামের বেটা বিদেশে আনিয়া। অনেকে অনাথ কৈল মোরে ডুবাইয়া॥ ডুবে মরে মৃদঙ্গী মদঙ্গ বুকে করি। কালোয়াত ভাসিল বীণার লাউ ধরি॥ বাপ২ মরি মরি হায় হায় হায়। উভরায় কাঁদে লোকে প্রাণ যায় যায়॥ কাঙ্গাল হইনু সবে বাঙ্গালায় এসে। শির বেচে টাকা করি সেহ্‌ যায় ভেসে॥ এই রূপে লস্করে দুষ্কর হৈল বৃষ্টি। মানসিংহ বলে বিধি মাজাইল সৃষ্টি॥ গাড়ি করি এনেছিল নৌকা বহুতর। প্রধান সকলে বাঁচে তাহে করি ভর॥ নৌকা চড়ি বাঁচিলেন মানসিংহ রায়। মজুন্দার শুনিয়া আইলা চড়ি নায়॥ অন্নপূর্ণা ভগবতী তাহার সহায়। ভাণ্ডারের দ্রব্য তার ব্যয়ে না ফুরায়॥ নায়ে ভরি লয়ে নানাজাতি দ্রব্যজাত। রাজা মানসিংহে গিয়া করিলা সাক্ষাত॥ দেখি মানসিংহ রায় তুষ্ট হৈলা বড়। বাঙ্গালায় মানিলাম তুমি বন্ধু দড়॥ কে কোথা বাহির হয় এমন দুর্যোগে। বাঁচাইলা সকলেরে নানামত ভোগে॥ বাঁচাইয়া বিধি যদি দিল্লী লয়ে যায়। অবশ্য আসিব কিছু তোমার সে বায়॥ এই রূপে মজন্দার সপ্তাহ যাবত। যোগাইলা যত দ্রব্য কি কব তাবত॥ মানসিংহ জিজ্ঞাসিলা কহ মজুন্দার। কি কর্ম্ম করিলে পাব এ বিপদে পার॥ দৈববল কিছু বুঝি আছয়ে তোমার। এত দ্রব্য যোগাইতে শক্তি আছে কার॥ মানসিংহে বিশেষ কহেন মজু- ন্দার। অন্নপূর্ণা বিনা আমি নাহি জানি আর॥ মানসিংহ বলে তার পূজার কি ক্রম। কহিলেন মজন্দার যে কিছু নিয়ম॥ অন্নপূর্ণা পূজা কৈলা মানসিংহ রায়। দূর হৈল ঝড় বৃষ্টি দেবীর কৃপায়॥ মানসিংহ গেলা মজুন্দারের আলয়। দেখিলা গোবিন্দ দেবে মহানন্দময়॥ আসরফী বস্ত্র অলঙ্কার আদি যত। দিলেন গোবিন্দদেবে কব তাহা কত॥ মজুন্দার সে সকল কিছু না লইলা। ব্রাহ্মণ পণ্ডিত গণে বিতরিয়া দিলা॥ ইতঃপর শুন সবে ভারত রচিলা। সৈন্য লয়ে মানসিংহ যশোরে চলিলা॥

মানসিংহ · / ৩৯

মানসিংহের যশোর যাত্রা

মানসিংহের যশোর যাত্রা।

ধাঁ ধাঁ গুড় গুড় বাজে নাগারা। বাজে রবাব

মৃদঙ্গ দোতারা॥ পয়দল কলবল, ভূতল

টলমল, সাজল দলবল অটল সোয়ারা।

দামিনী তক তক, জামকী ধক ধক, ঝক

মক চক মক খর তর বারা॥ ব্রাহ্মণ রজ-

পুত, ক্ষত্রিয় রাহুত, মোগল মাহুত রণ

অনিবারা। ভাঁড় কলাবত, নাচত গায়ত,

ভারত অভিমত গীত সুধারা॥ ধ্রু॥

চলে রাজা মানসিংহ যশোর নগরে। সাজ সাজ বলি ডঙ্কা হইল লস্করে॥ ঘোড়া উট হাতি পিঠে নাগারা নিশান। গাড়িতে কামান চলে বাণ চন্দ্রবান॥ হাতির আমারী ঘরে বসিয়া আমীর। আপন লস্কর লয়ে হইল বাহির॥ আগে চলে লাল পোশ খাসবরদার। সিফাই সকল চলে কাতার কাতার॥ তরকী ধানুকী চালী রায়বেশে মাল। দফাদার জমাদার চলে সদীয়াল আগে আছে হাজারীর হাজার হাজার। নটী নট হরকরা উরুতু বাজার॥ সানাই কর্ণাল বাজে রাগ আলাপিয়া। ভাট পক্ষে রায়বার যশ বর্ণাইয়া॥ ধাঢী গায় কড়খা ভাঁড়াই করে ভাঁড়া মালে করে মালাম চোয়াড়ে লোফে কাঁড়॥ আগে পাছে দুই পাশে দুসারি লস্কর। চলিলেন মানসিংহ যশোর নগর॥ মজুন্দারে সঙ্গে নিলা ঘোড়া চূড়াইয়া। কাছে কাছে অশেষ বিশেষ জিজ্ঞাসিয়া। এই রূপে যশোর নগর উত্তরিয়া। থানা দিলা চারি দিকে মূরুচা করিয়া॥ শিষ্টাচার মত আগে দিলা সমাচার। পাঠাইয়া ফরমান বেড়ী তল বার॥ প্রতাপ আদিত্য রাজা তল বার লয়ে। বেড়ী ফিরা পাঠাইয়া পাঠাইল কয়ে॥ কহ গিয়া অরে চর মানসিংহ রায়ে। বেড়ী দেউক আপনার মনিবের পায়ে॥ লইলাম তলবার কহ গিয়া তারে। যমুনার জলে ধুব এই তলবারে॥ শুনি মানসিংহ সাজে করিতে সমর। রচিলা ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর॥

মানসিংহ · / ৩৯

মানসিংহে ও প্রতাপআদিত্য যুদ্ধ

মানসিংহ ও প্রতাপ আদিত্য যুদ্ধ।

ধূধূ ধুধু ধূ নৌবত বাজে। ঘন ভোরঙ্গ ভম ভম,

দমামা দমদম, ঝনন্ন ঝম ঝম ঝাঁজে॥ কত

নিশান ফরফর, নিনাদ ধরধর, কামান গর গর

গাজে। সব জুবান রজপুত, পাঠান মজবুত,

কামান শরযুত সাজে॥ ধরি অনেক প্রহরণ,

জরীর পহিরণ, সিফাইগণ রণমাঝে। পরি করা-

ইব খতর, পোশাক বহুতর, সুশোভিত শিরপর

তাজে॥ বসি অমারি ঘর পর, আমীর বহুতর,

হুলায় গজবররাজে। পুর যশোর চমকত, নকীব

শতশত, হুঁসার ফুকরত কাজে॥ হয় গজের গর

জন, সেনার তরজন, পয়োধি ভরছন লাজে।

দ্বিজ ভারত কবিবর, বনায় তহি পর, প্রতাপ

দিনকর সাজে॥ ধ্রু॥

যুঝে প্রতাপ আদিত্য, যুঝে প্রতাপ আদিত্য। ভাবিয়া অসার, ডাকে মার মার, সংসার সব অনিত্য॥ শিলাময়ী নামে, ছিলা তার ধামে, অভয়া যশোরেশ্বরী। পাপেতে ফিরিয়া, বসিলা রুষিয়া, তাহারে অকৃপা করি॥ বুঝিয়া অহিত, গুরু পুরাহিত, মিলে মানসিংহরাজে। লস্কর লইয়া, সত্বর হইয়া, প্রতাপ আদিত্য সাজে॥ ধূ ধূ ধম ধম, ঝাঁ ঝাঁ ঝম ঝম, দমামা দমদম বাজে। হুড় হুড় হুড় দুড় দুড় দুড় কামানে গেলো গাজে। সিন্দুর সুন্দর, মণ্ডিত মুদ্গর, ষোড়শ হলকা হাতি। পতাকা নিশান, রবিচন্দ্রবান, অযুতেক ঘোড়া সাতি॥। সুন্দর সুন্দর, নৌকা বহুতর, বায়ান্ন হাজার ঢালী। সমরে পশিয়া, অন্তরে রুষিযা, দুই দলে গালাগালি॥ ঘোড়ায় ঘোড়ায়, যুঝে পায় পায়, গজে গরে শুণ্ডে শুণ্ডে। সোয়ারে সোয়ারে, খরতলবারে, মালে মালে মুণ্ডে মুণ্ডে॥ হান হান হাকে, খেলে উড়া পাকে, পাইকে২ যুঝে। কামানের ধূমে তমঃরণ ভূমে, আত্মপর নাহি শুঝে॥ তীর শন শনি, গুলী ঠনঠনি, খাড়া ঝনঝন ঝাঁকে। মুচড়িয়া গোঁফে শুল শেল লোফে, ক্রোধে হান হান হাঁকে॥ ভালায় ফুটিয়া পড়িছে লুঠিয়া, গুলীতে মরিছে কেহ। গোলায় উড়িছে, আগুণে পুড়িছে, তীরে কেহ ছাড়েদেহ। পাতশাহি ঠাটে, কবে কেবা আঁটে, বিস্তর লস্কর মারে। বিমুখী অভয়া, কে করিবে দয়া, প্রতাপ আদিত্য হারে॥ শেষে ছিল যারা, পলাইল তারা, মানসিংহে জয় হৈল। পিঞ্জর করিয়া, পিঞ্জরে ভরিয়া, প্রতাপ আদিত্যে লৈল॥ দল বল সঙ্গে, পুনরপি রঙ্গে, চলে মানসিংহ রায়। ললিত সুছন্দে, পরম আনন্দে, রায় গুণাকর গায়॥

মানসিংহ · / ৩৯

মানসিংহের ভবানন্দবাটী আগমন

রণজয়ভেরী বাজে রে। ঝাঁগড় ঝাঁগড় ঝাঁ ঝাঁ ঝাঁজে

রে॥ রণজয় করি, মুণ্ডমালা পরি, কালী সাজে রে।

শ্বেত অলি শিব, সে নীলরাজীব, রাজীরাজে রে॥

গাইছে যোগিনী, নাচিছে ডাকিনী, দানা গাজে রে।

মহোৎসব যত, কি কবে ভারত, সেনামাঝে রে॥ ধ্রু॥

প্রতাপ আদিত্য রায়ে পিঁজরা ভরিয়া। চলে রাজা মানসিংহ জয়ডঙ্কা দিয়া। কচুরায় পাইল যশোরজিত নাম। সেই রাজ্যে রাজা হৈল পূর্ণ মনস্কাম॥ মজুন্দারে মানসিংহ কহিলা কিবল। পাতশার হজুরে আমার সঙ্গে চল॥ পাতশার সহিত সাক্ষাত মিলাইব। রাজ্য দিয়া ফরমানী রাজা করাইব॥ অন্নপূর্ণা ভগবতী তোমার সহায়। জয়ী হয়ে যাই আমি তোমার দয়ায়॥ নানামতে অন্নপূর্ণা দেবীরে পূজিয়া। চলিলেন মজুন্দারে সংহতি লইয়া॥ অন্নপূর্ণা দেবীরে পূজিয়া মজুন্দার। মানসিংহ সংহতি চলিলা দরবার॥ মহামায়া মাহেশ্বরী মহিষমর্দ্দিনী। মোহরূপা মহাকালী মহেশমোহিনী॥ কৃপাময়ি কাতর কিঙ্করে কৃপাকর। তোমা বিনা কেবা আর করুণা আকর॥ রাজার মঙ্গল কর রাজ্যের কুশল। যে শুনে এ গীত তার করহ মঙ্গল॥ এত দূরে পালা গীত হৈল সমাপন। ইতঃপর রজনীতে গাব জাগরণ॥ কৃষ্ণচন্দ্র আজ্ঞায় ভারতচন্দ্র গায়। হরি হরি বল সবে পালা হৈল সায়॥

ইতি বৃহস্পতিবারের দিবা পালা।

মানসিংহ · / ৩৯

ভবানন্দের দিল্লী যাত্রা

ভবানন্দের দিল্লীযাত্রা।

দিয়া নানা উপচার, পূজা করি অন্নদার, দিল্লী যাত্রা কৈলা মজুন্দার। জননী তাহার সীতা, রাম সুমার্দ্দার পিতা, সমর্পিল পদে অন্নদার॥ শিরে চীরা হীরা তায়, বিলাতি খেলাত গায়, নানাবস্ত্রে কমর বান্ধিলা। বিল্বপত্র ঘ্রাণ লয়ে, বন্ধুগণে প্রিয় কয়ে, গোবিন্দ দেবেরে প্রণমিলা॥ বাপ মায় প্রণমিয়া, দুইনারী সম্ভাষিয়া, আরোহিলা পালকী উপর। জয় অন্নপূর্ণা কয়ে, চলিলা সত্বর হয়ে, মঙ্গল দেখেন বহুতর॥ ধেনু বৎস একস্থানে, বৃষ খুরে ক্ষিতি টানে, দক্ষিণাতে ব্রাহ্মণ অনল। অশ্ব গজ পতাকায়, রাজা মানসিংহ রায়, আগে আগে সকল মঙ্গল॥ পূর্ণঘট বাম পাশে, রামাগণ যায় বাসে, গণিকারে মালা বেচে মালী। ঘৃত দধি মধু মাসে, রজত লইয়া হাসে, কুজড়ানী দেখাইযা ডালী॥ শুক্লধান্যে গাঁথি হার, কাঞ্চন সুমেরু তার, আশীর্ব্বাদ দিয়াছেন সীতা। নকুল সহিত যান, বাম দিকে ফিরা চান, শিবা রূপে শিবের বনিতা॥ নীলকণ্ঠ উড়ি ফিরে, মণ্ডলী দিলেন শিরে, অন্নপূর্ণা ক্ষেমঙ্করী হয়ে। দেখি যত সুমঙ্গল, মজুন্দারে কুতুহল, চলিলা দেবির গুণ কয়ে॥ শিরে চীরা জামা গায়, কটি আঁটি পটুকায়, দাসু বাসু সঙ্গে দুই দাস। সুতেরে বিদায় দিয়া, সীতাদেবী ঘরে গিয়া, নানা মত ভাবেন হতাশ॥ বাড়ীর নিকটে খড়ে, পার হৈলা নায়ে চড়ে, অগ্রদ্বীপ শেলা কুতুহলে। অঞ্জলি বান্ধিয়া মাথে, প্রণমিয়া গোপীনাথে, স্নান দান কৈল গঙ্গাজলে॥ মনে করি অনভব, গঙ্গারে করিলা স্তব, কৃতাঞ্জলি হয়ে মজুন্দার। ব্রহ্ম কমণ্ডলু বাসি, বিষ্ণুপাদ প্রসূতাসি, শিব জটাজটে অবতার॥ বরমিহ তব তীরে, শরট করট ফিরে, নপুন ভূপতি তব দূরে। রাজ্য লোভে দূরে যাই, তব তীরে রাজ্য পাই, এই মনস্কাম যেন পুরে॥ স্তবে হয়ে তুষ্ট মন, গঙ্গা দিলা দরশন, মজুন্দারে কহেন সরসে। ধন্য তুমি মজুন্দার, ব্রতদাস অন্নদার, আমি ধন্যা তোমার পরশে॥ মহাসুখে দিল্লী যাবে, মনোমতরাজ্য পাবে, মোর তীরে পাবে অধিকার। সন্তান হইবে যত, সবে হবে অনুগত, জনেক হইবে রাজা তার॥ দিয়া এই বরদান, গঙ্গা কৈলা অন্তর্দ্ধান, মজুন্দার হৈলা গঙ্গাপার। কৃষ্ণচন্দ্র নৃপাজ্ঞায়, রায় গুণাকর গায়, অন্নপূর্ণা সহায় যাহার॥

মানসিংহ · / ৩৯

দেশ বিদেশ বর্ণন

দেশ বিদেশ বর্ণন।

চল চল যাই নীলাচলে। রে অরে ভাই। ঘটাইল

বিধি ভাগ্যবলে॥ মহাপ্রভু জগন্নাথ, সুভদ্রা বলা-

ই সাথ, দেখিব অক্ষয় বটতলে। খাইয়া প্রসাদ

ভাত, মাথায় মুছিব হাত, নাচিব গাইব কুতু

হলে॥ ভবসিন্ধু সিন্দু জানি, পার হৈনু হেন

মানি, সাঁতার খেলিব সিন্ধু জলে॥ দেখিয়া সে

চাঁদমুখ, পাইব কৈবল্য সুখ, সুধন্য ভারত

ভূমণ্ডলে॥ ধ্রু॥

গঙ্গা পার হইয়া চলিলা মজুন্দার। ডানি বামে যতগ্রাম কত কব তার॥ জগন্নাথ দেখিতে করিয়া মনোরথ। ধরিলেন মানসিংহ দক্ষিণের পথ॥ গজে মানসিংহ পালকীতে মজুন্দার। ইন্দ্র সঙ্গে যেমন কুবের অবতার॥ এড়ায় মঙ্গল কোট উজানি নগর। খুলনার পুত্র সাধু শ্রীমন্তের ঘর॥ সদাই সরাই ক্রমে গেলা
বর্দ্ধমান। পার হৈলা দামোদর করি স্নান দান॥ রহে চম্পানগর ডাহিনে কত দূর। চাঁদ বেণে ছিল যাহে ধনের ঠাকুর॥ জানু মানু ছিল যাহে মনসার দাস। হাসন হোসনগিয়া যথাকৈল বাস॥ আনিলা মোগল মারি উচালন গিয়া। ক্রমে ক্রমে অনেক সরাই এড়াইয়া॥ মল্লভূমি কর্ণগড় দক্ষিণে রাখিয়া। বঙ্গালার সীমা নেড়া দেউল দেখিয়া॥ এড়ায় মেদিনী পুর নারায়ণ গড়ে। দাঁতন এড়ায়ে জলেশ্বার ডেরা পড়ে॥ রাজঘাট পার হয়ে বস্তায় বিশ্রাম। মহানদ পার হয়ে কটকে মোকাম॥ ডাহিনে ভুবনেশ্বর বামে বালেশ্বর। বালিহন্তা পাছু করি চলিলা সত্বর॥ এস্তায়ে আঠার নালা গেলা নীলাচলে। দেখিলেন জগন্নাথ মহাকুতুহলে॥ দিন দশ বার তথা করিয়া বিশ্রাম। দেখিলা সকল স্থান কত কব নাম॥ কৃতার্থ হইলা মহা প্রসাদ খাইয়া। বিমললোচন হৈলা বিমলা দেখিয়া॥ মানসিংহ জিজ্ঞাসা করিলা মজুন্দারে। ক্ষেত্রের মহিমা কিছু শুনাহ আমারে॥ বিশেষিয়া কহিতে লাগিলা মজুন্দার। রায় গুণাকর কহে সে কথা অপার॥

মানসিংহ · / ৩৯

জগন্নাথ পুরীর বিবরণ

জগন্নাথ পুরীর বিবরণ।

জয় জয় জগন্নাথ, সুভদ্রা বলাই সাত, জয় লক্ষ্মী জয় সুদর্শন। সুধন্য অক্ষয় বট, সুধন্য সিন্ধুর তট, ধন্য নীলাচল তপোধন॥ পূর্ব্বে ছিল অযোধ্যায়, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন রায়, সূর্য্যবংশে সূর্য্যের সমান। কৃষ্ণ দেখিবারে খেদ, স্বপনে পাইলা ভেদ, নীলমাধবের এই স্থান॥ পুরোহিতে পাঠাইল, দেখি গিয়া সে কহিল, নীলমাধবের বিবরণ। মূর্ত্তিমান ভগবান, দেখিলাম অন্ন খান,
সেবা করে ব্যাধ এক জন। করি তার কন্যা বিয়া, তাহার সংহতি গিয়া, দেখিলাম কৃষ্ণের চরণ। রোহিণী কুণ্ডের কথা, কি কব দেখিনু তথা,কাক মরি হৈল নারায়ণ॥ ইন্দ্রদ্যুম্ন এত শুনি, বড় ভাগ্য মনে গুণি, রাজ্য শুদ্ধ এখানে আইল। দশ অশ্বমেধ করি, বৈতরণী জল তরি, বন কাটি আসি প্রবেশিল॥ দেখে সেই পুরী নাই, বালিপূর্ণ সর্ব্বঠাঁই, শত অশ্বমেধ আরম্ভিল। স্বপ্ন হৈল গোবিন্দের, সে পুরী না পাবে টের, আর পুরী গড়িতে হইল॥ ইন্দ্রদ্যুম্ন তুষ্ট হৈল, স্বর্ণময় পুরী কৈল, ব্রহ্মার মুহূর্ত্তে গেল সেই। রূপা তামাময় আর, পুরী কৈল দুইবার, শেষে পুরি পাথরের এই॥ গো দানে গরুর খুরে, মাটি উড়ে যায় দূরে, তাহে এই ইন্দ্রদ্যুম্ন হ্রদ। শ্বেতগঙ্গা মাকণ্ডেয়, স্নান কৈলা যম জেয়, পুনর্জন্ম না হয় আপদ॥ হরি বৃক্ষরূপে আসি, সমুদ্রের জলে ভাসি, চতুঃশাখ হয়ে দেখা দিলা। জগন্নাথ বলরাম, ভদ্রা সুদর্শন নাম, চারি মূর্ত্তি বিশাই গড়িলা॥ দারুব্রহ্ম সর্ব্বাদৃত, বিষ্ণু পঞ্জরেতে কৃত, ইন্দ্রদ্যুম্ন স্থাপিত সম্পন্ন। লক্ষ্মী রান্ধি দেন যাহা, জগন্নাথ খান তাহা, ব্রহ্মরূপ সেই এই অন্ন॥ খাইয়া প্রসাদ ভাত, মাথায় বুলায় হাত, আচার বিচার নাহি তায়। পঞ্চক্রোশ পুরী এই, প্রদক্ষিণ করে যেই, শমন সহিত নাহি দায়॥ শুষ্ক কিবা পিষুষিত, দূরদেশে সমানীত, কুক্কুরের বদন গলিত। এই অন্ন সুধাময়, ভুক্তিমাত্র মুক্তি হয়, উৎকল খণ্ডেতে অবিদিত॥ শুনি মানসিংহ রায়, পুলকে পূরিত কায়, প্রণাম করিল নীলাচলে। কৃষ্ণচন্দ্র নৃপাজ্ঞায়, রায় গুণাকর গায়, জগন্নাথ চরণ কমলে॥

মানসিংহ · / ৩৯

মানসিংহের দিল্লীতে উপস্থিতি

মানসিংহের দিল্লীতে উপস্থিত।

চল চল রে ভাই চল চল। অন্নপূর্ণা অন্ন

পূর্ণা বল বল॥ ধ্রু॥

চলিলেন নীলাচলে হয়ে দণ্ডবত। কত দূরে এড়াইয়া চড়য়া পর্ব্বত॥ স্বর্ণরেখা পার হয়ে গেলা সীতাকোল। কত দূরে সেতু বন্ধ শ্রীরামের পোল॥ কৃষ্ণা আদি নদী নদ কাঞ্চী আদি দেশ। এড়াইলা কৌতুক দেখিয়া সবিশেষ॥ মারহট্ট বরগির দেশএ ড়াইয়া। কত গিরি বন নদ নদী ছাড়াইয়া॥ গুজরাট দেখিয়া সন্তোষ হৈল অতি। কালকেতু যেখানে দেখিলা ভগবতী॥ কত দূরে রহিল মথুরা বৃন্দাবন। নানা স্থানে নানা দেব করি দরশন॥ প্রতাপ আদিত্য রাজা মৈল অনাহারে। ঘৃতে ভাজি মানসিংহ লইল তাহারে॥ কত দিনে দিল্লীতে হইয়া উপনীত। সাক্ষাত করিলা পাতশাহের সহিত॥ ঘৃতে ভাজা প্রতাপ আদিত্যে ভেট দিলা। কব কত যত মত প্রতিষ্ঠা পাইলা॥ পাতশার আজ্ঞামত মানসিংহ রায়। প্রতাপ আদিত্যে ভাসাইলা যমুনায়। মজুন্দারে লয়ে গেলা পাতশার পাশে। ইনাম কি চাহ বলি পাতশা জিজ্ঞাসে॥ মানসিংহ পাতশায় হইল যে বাণী। উচিত যে আরবী পারশী হিন্দুস্থানী॥ পড়িয়াছি সেইমত বর্ণিবারে পারি। কিন্তু সে সকল লোকে বুঝিবারে ভারি॥ না রবে প্রসাদ গুণনা হবে রসাল। অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল॥ প্রাচীন পণ্ডিত গণ গিয়াছেন কয়ে। যে হৌক সে হৌক ভাষা কাব্য রস লয়ে॥ রায় গুণাকর কহে শুন সভাজন। মানসিংহ পাতশায় কথোপ কথন॥

মানসিংহ · ১০ / ৩৯

পাতশার নিকটে বাঙ্গালার বৃত্তান্ত কথন

পাতশার নিকটে বাঙ্গালার বৃত্তান্ত কথন।

কহ মানসিংহ রায়, গিয়াছিলা বাঙ্গালায়, কেমন দেখিলা সেই দেশ। কেমন করিলা রণ, কহ তার বিবরণ, না জানি পাইলা কত ক্লেশ॥ মানসিংহ যোড় হাতে, অঞ্জলি বান্ধিয়া মাথে, কহে জাহাঁপনা সেলামত। রামজীর কুদরতে, মহিম হইল ফতে, কেবল তোমারি কেরামত॥ হকুম শাহন শাহী, আর কিছু নাহি চাহি, জের হৈল নিমক হারাম। গোলাম গোলামী কৈল, গালিম কয়েদ হৈল, বাহাদুরী সাহেবের নাম॥ পাতশা হইল খুশি, কহিতে লাগিলা তুষি, কহ রায় কি চাহ ইনাম। কহে মান সিংহ রায়, গোলাম ইনাম চায়, ইনাম সে যাহে রহে নাম॥ গিয়াছিনু বাঙ্গালায়, ঠেকেছিনু বড় দায়, সাত রোজ দারুণ বাদলে। বিস্তর লস্কর মৈল, অবশেষ যহা রৈল, উপবাসী সহ দলবলে॥ ভবানন্দ মজুন্দার, নাম খুব হশিয়ার, বাঙ্গালি বামণ এইজন। সপ্তাহ খোরাক দিল, সকলেরে বাঁচাইল, ফতে হৈল ইহারি কারণ॥ অন্নপূর্ণা নামে দেবী, তাঁহার চরণ সেবি, কেরামত কামাল ইহার। সে দেবীর পূজা দিয়া, ঝড় বৃষ্টি মিটাইয়া, যোগাইল সকলে আহার॥ রাজ্য দিব কহিয়াছি, সঙ্গে সঙ্গে আনিয়াছি, গোলাম কবুলে পার পায়। স্বদেশে রাজাই পায়, দৌয়া দিয়া ঘরে যায়, ফরমান ফরমাহ তায়॥ দেখা কৈল হজরতে, বজা আনে খেদমতে, গোলামের এ বড়ই নাম। শুনিয়া একথা তার, ক্রোধ হৈল পাতশার, ভারত ভাবিছে পরিণাম॥

মানসিংহ · ১১ / ৩৯

পাতশাহের দেবতা নিন্দা

পাতশাহের দেবতা নিন্দা।

এ ফের বুঝিবে কেবা। তারে শুঝে বুঝে যেবা॥

নিত্য নিরঞ্জন, সত্য সনাতন, মিথ্যা যত দেবী

দেবা। নীরূপ যে ভাবে, স্বরূপ প্রভাবে, বুঝি

কিছু বুঝে সেবা॥ ঈশ্বরের নামে, তরি পরি-

ণামে, কে বা গয়া গঙ্গারেবা। ভারত ভূতলে যে

করে যে বলে, সব ঈশ্বরের সেবা॥ ধ্রু॥

পাতশা কহেন শুন মানসিংহ রায়। গজব করিলা তুমি আজব কথায়॥ লস্করে দু তিন লাখ আদমী তোমার। হাতী ঘোড়া উট গাধা খচর যে আর॥ এ সকলে ঝড় বৃষ্টি হৈতে বাঁচাইয়া। বামণ খোরাক দিল অন্নদা পূজিয়া॥ সয়তান দিল দাগা ভূতের পূজায়। আল চাউল বেড়ে কলা ভুলাইয়া খায়॥ আমারে মালম খুব হিন্দুর ধরম। কহি যদি হিন্দু পতি পাইবে সরম॥ সয়তানে বাজী দিল না পেয়ে কোরাণ। ঝুট মুট পড়ি মরে আগম পুরাণ॥ গোঁসাই মর্দ্দের মুখে হাত বুলাইয়া। আপনার নূর দিলা দাড়ী গোঁফ দিয়া॥ হেন দাড়ী বামণ মুড়ায় কি বিচারে? কি বুঝিয়া দাড়ী গোঁফ সাই দিলা তারে॥ আর দেখ পাঁঠা পাঁঠী না করি জবাই। উভ চোটে কেটে বলে খাইব গোঁসাই॥ হালাল না করি করে নাহক হালাক। যত কাম করে হিন্দু সকলি নাপাক॥ ভাতের কি কব পান পানীর আয়েক। কাজী নাহি মানে পেগম্বরের নায়েক॥ আর দেখ নারীর খসম মরি যায়। নিকা নাহি দিয়া রাঁড় করি রাখে তায়॥ ফল হেতু ফুল তার মাসে মাসে ফুটে। বীজ বিনা নষ্ট হয় সে পাপ কি ছুটে॥ মাটী কাঠপাথরের গড়িয়া মূরুত। জীউ দান দিয়া পূজে নানা মত ভূত॥ আদমীতে বনাইয়া জীউ দেয়মারে। ভাব দেখি সেকি তারে তরাবারে পারে॥ বিশেষে বামণ জাতি বড়দাগাদার আপনারা এক জপে আরে বলে আর॥ পরদারে পাপ বলি বাঁদী রাখে নাই। দুঃখভোগ হেতু হিন্দু করেছে গোঁসাই। বন্দগী করিবে বন্দা জমীনে ঠুকিয়া। করিম দিয়াছে মাথা করম করিয়া॥ মিছা ফাঁদে পড়ি হিন্দু তাহা না বুঝিয়া। যারে তারে সেবা দেই ভূমে মাথা দিয়া॥ যতেক বামণ মিছা পুথি বনাইয়া। কাফর করিল লোকে কোফর পড়িয়া॥ দেবী বলি দেই গাছে যড়ায় সিন্দুর। হায় হায় আখেরে কি হইবে হিন্দুর॥ বাঙ্গালিরে কত ভাল পশ্চিমার ঘরে। পান পানী খানা পিনা আয়েব না করে॥ দাড়ী রাখে বাঁদী রাখে আর জবে খায়। কাণ ফোঁড়ে টিকী রাখে এই মাত্র দায়॥ আমার বাসনা হয় যত হিন্দু পাই। সুন্নত দেওয়াই আর কলমা পড়াই॥ জন কত তোমরা গোঁয়ার আছ জানি মিছা লয়ে ফির বেইমানী হিন্দুয়ানি॥ দেহ জ্বলি যায় মোর বামণ দেখিয়া। বামণেরে রাজ্য দিতে বল কি বুঝিয়া॥ প্রতাপ আদিত্য হিন্দু ছিল বাঙ্গালায়। গালিমী করিল তাহে পাঠানু তোমায়॥ কাফর বাঙ্গালি হিন্দু বেদীল বামণ। তাহারে রাজাই দিতে নাহি লয় মন॥ বুঝিলাম অন্নপূর্ণা ভূত দেখাইয়া। ভুলাইল বামণ তোমারে বাজী দিয়া॥ এমন হিন্দুর ভূত দেখেছি বহুত। মোরে কি ভুলাবে হিন্দু দেখাইয়া ভূত॥ আর কিছু ইনাম মাগিয়া লহ রায়। বামণের বল ভূত দেখাকু আমায়॥ আগু লহ মজুন্দার কহিতে লাগিলা। অন্নদামঙ্গল দ্বিজ ভারত রচিলা॥

মানসিংহ · ১২ / ৩৯

মজুন্দারের প্রতি পাতশাহের উত্তর

পাতশার প্রতি মজুন্দারের উত্তর।

এ কথা কব কেমনে। নর নিন্দে নারায়ণে॥ যেই

নিরাকার, সেই সে সাকার, তারি রূপ ত্রিভূবনে

তেজঃ ভাবে যোগী, দেবী ভাবে ভোগী, কৃষ্ণ

ভাবে ভক্ত জনে॥ ধর্ম্ম অর্থ কাম, মোক্ষের বিশ্রা-

ম, কেবল তরে ভজনে। ভারতের সার, গোবিন্দ

সাকার, নিত্যানন্দ বৃন্দাবনে॥ ধ্রু॥

মজুন্দার কহে জাহাঁপনা সেলামত। দেবতার নিন্দা কেন কর হজরত॥ হিন্দু মুসলমান আদি জীব জন্তু যত। ঈশ্বর সবার এক নহে দুই মত॥ পুরাণের মত ছাড়া কোরাণে কি আছে। ভাবি দেখ আগে হিন্দু মুসলমান পাছে॥ ঈশ্বরের নূর বলি দাড়ীর যতন। টিকি কাটি নেড়া মাথা এ যুক্তি কেমন॥ কর্ণ বেঁধে যদি হয় হিন্দু গুনাগার। সুন্নতের গুনা তবে কত গুণ তার॥ মাটি কাঠ পাথর প্রভৃতি চরাচর। পুরাণে কোরাণে দেখ সকলি ঈশ্বর॥ তাহার মূরতি গড়ি পূজা করে যেই। নিরাকার ঈশ্বর সাকার দেখে সেই॥ সাকার না ভাবিয়া যে ভাবে নিরাকার। সোনা ফেলি কেবল আঁচলে গিরা সার॥ দেব দেবী পূজা বিনা কি হবে রোজায়। স্ত্রী পুরুষ বিনা কোথা সন্তান খোজায়। দেবীপূজা করে হিন্দু বলিদান দিয়া। যবনেরা জবে করে পেটের লাগিয়া॥ দেবী ভাবি হিন্দুরা সিন্দুর দেই গাছে। শূন্য ঘরে নমাজ কি কার তাহে আছে॥ খশম ছাড়িলা যেবা নিকা করে রাঁড়। একে ছাড়ি গাই যেন ধরে আর ষাঁড়॥ ঈশ্বরের বাক্য বেদ আগম পুরাণ। সয়তান বাজী সেই এ যদি প্রমাণ॥ সেই ঈশ্বরের বাক্য কোরাণ যে কয়। সেহ সয়তান বাজী কহিতে কি ভয়॥ হিন্দরে সুন্নত দিয়া কর মুসলমান। কাণে ছেঁদো মুদে যদি তবে সে প্রমাণ॥ কারসাজী বলি কর্ণবেধে বল বাজী। ভেবে দেখ সুন্নত বিষম কারসাজী॥ বেদমন্ত্র না মানিয়া কলমা পড়ায়। তবে জানি সেইক্ষণে সে মন্ত্রে ভুলায়॥ প্রণাম করিতে মাথা দিল সে গোঁসাই। সংসারে যে কিছু মূর্ত্তি তাহা ছাড়া নাই॥ ভেদজ্ঞানী নহে হিন্দু অভেদ ভাবিয়া। যারে তারে সেবা দেয় ভূমে মাথা দিয়া॥ সূর্য্যরূপে ঈশ্বরের পূর্ব্বেতে উদয়। পূর্ব্ব মুখে পূজে হিন্দু জ্ঞানোদয় হয়॥ পশ্চিমে সূর্য্যের অস্ত সে মুখে নমাজ। যত করে মসলমান সকলি অকাজ॥ ব্রহ্মজ্ঞানী ব্রাহ্মণ সে ব্রহ্মার নায়েব। না মানে না করে খানাপিনার আয়েব। বামহস্ত নাপাক তসবী জপে তায়। হিন্দুরে নাপাক বলে এত বড় দায়॥ উত্তম হিন্দুর মত তাহে বুঝে ফের। হায় হায় যবনের কি হবে আখের॥ যবনেরে কত ভাল ফিরিঙ্গির মত। কর্ণবেধ নাহি করে না দেয় সুন্নত॥ শৌচ আচমন নাহি যাহা পায় খায়। কেবল ঈশ্বর আছে বলে এই দায়॥ মজুন্দার কৈলা যদি এসব উত্তর। ক্রদ্ধ হৈলা জাহাগীর দিল্লীর ঈশ্বর॥ নাজিরে কহিলা বন্দী কর রে বামণে। দেখিব হিন্দুর ভূত বাঁচায় কেমনে॥ ক্রুদ্ধ হয়ে মানসিংহ চলিল বাসায়। বিরচিল পাঁচালি ভারত চন্দ্র রায়॥

মানসিংহ · ১৩ / ৩৯

দাসু বাসুর খেদ

দাসু বাসুর খেদ।

পাতশার আজ্ঞা পায়, নাজির সত্বরে ধায়, মজুন্দারে কয়েদ করিল। দিলেক হাবসিখানা, অন্ন জল কৈলা মানা, দ্রব্যজাত লুটিয়া লইল॥ কাহার প্রভৃতি যারা, ছুটিয়া পলায় তারা, দাসু বাসু কান্দে উভরায়। হায় হায় হরি হরি, বিদেশে বিপাকে
মরি, ঠাকুরের কি হইল দায়॥ দাসু বলে বাসু ভাই, পলাইয়া চল যাই, কি হইবে বিদেশে মরিলে। বিস্তর চাকরী পাব, বিস্তর পরিব খাব, কোন রূপে পরাণ থাকিলে॥ যুবতী রমণী আছে, না রয়ে তাহার কাছে, কেন আনু বামণের সাতে। নারী রৈল মুখ চেয়ে, তবু আনু মাটী খেয়ে, তারি ফল পানু হাতে হাতে॥ দিবসে মজুরী করে, রজনীতে গিয়া ঘরে, নারী লয়ে যে থাকে সে সুখী। নারী ছাড়ি ধন আশে, যেই থাকে পরবারে, তারে বড় কেবা আছে দুঃখী॥ কান্দিয়া কহিছে বাসু, উচিত কহিল দাসু, এই দুখে মোর প্রাণ কাঁদে। মরি তাহে দুখ নাই নারী রৈল কোন ঠাঁই, বিধাতা ফেলিল এ কি ফাঁদে॥ কুড়ি টাকা পণ দিয়া, নূতন করিনু বিয়া, এক দিনো শুতে না পাইনু। কাদাখেড়ু হইয়াছে, পুনর্ব্বিয়া বাকি আছে, মাটী খেয়ে বিদেশে আইনু॥ হেদে বামণের ছেলে, আগু পাছু নাই ভেবে দিল্লী আইল রাজাই করিতে। দুধে ভাতে ভাল ছিল, হেন বুদ্ধি কেটা দিল, পাতশার দেয়ানে আনিতে॥ মানসিংহ সঙ্গ পেয়ে, রাজা হৈতে এল ধেয়ে, এখন সে মানসিংহ কই। গাঁজা খোর রজপুত, আফিঙ্গেতে মজবুত, ব্রহ্মহত্যা করিলেক অই। মোগলে রহিল ঘেরি, সদা করে তেরি মেরি, রাঙ্গা আঁখি দেখে ভয় পাই। খোট্টা মোট্টা বুঝি নাই, লুকাইব কোন ঠাই, ছাতি ফাটে জল দে রে খাই। উজ্বর্ক কজল বাসে, ঘেরিয়াছে চারি পাশে, রোহেলাজল্লাদ আদি যত। কামড়ায়ে খেতে যায়, জাতি লৈতে কেহ চায়, কত জনে কহে কতমত॥ অরে রে হিন্দুকে পুত, দেখালাও কঁহা ভূত, নাহি তুবে করুঙ্গা দোটুক ন হোয় সুন্নত দেকে, কলমা পড়াঁও লেকে, জাতি লেউ খেলায়কে থুক॥ ধরিবারে কেহ ধায়, কাটি বারে কেহ চায়, অন্নদা ভাবেন মজুন্দার। অন্ননা ধ্যানের বলে, তেজঃ যেন অগ্নি জ্বলে, ছুঁইতে যোগ্যতা হয় কার॥ স্তুতি পাঠে অন্নদার, বসিলেন মজুন্দার, চৌদিকে যবনে ধূম করে। সিংহ যেন বসি থাকে, চারি দিকে শিবা ডাকে, কাছে যেতে নাহি পারে ডরে॥ ভূরিশিটে মহাকায়, ভূপতি নরেন্দ্র রায়, তাঁর সুত ভারত ব্রাহ্মণ। কৃষ্ণ চন্দ্র নৃপাজ্ঞায়, অন্নদামঙ্গল গায়, নীলমণি প্রথম গায়ন॥

মানসিংহ · ১৪ / ৩৯

মজুন্দারের অন্নদা স্তব

মজুন্দারের অন্নদা স্তব।

প্রসীদ মাতরন্নদে ধরাপ্রদে ধনপ্রদে। পিনাকি

পদ্মপাণি পদ্মযোতি সদ্মসন্মদে॥ করস্থ রত্ন।

দর্ব্বিকা সুপান পাত্র শর্ম্মদে। পুরস্থ ভুক্ত শম্ভু

নর্ত্তনে কটাক্ষদে॥ সুধান্বিত প্রভাত ভানু২

দন্ত কচ্ছদে। স্মিত প্রাকাশিত ক্ষণপ্রভাংশু

মুক্তিকা রদে॥ বিলোললোচনাঞ্চলেন শান্ত

রক্ত পারদে। প্রসীদ ভারতস্য কৃষ্ণ চন্দ্র

ভক্তি সম্পদে॥ ধ্রু॥

মানসিংহ · ১৫ / ৩৯

অন্নদার মজুন্দারে অভয় দান

অন্নদার মজুন্দারে অভয়দান।

স্ততি কৈলা মজুন্দার, স্মৃতি হৈল অন্নদার, আসিয়া দিল্লীতে উত্তরিলা। জয়া বিজয়ারে লয়ে, আকাশ ভারতী কয়ে, মজুন্দাবে অভয় করিলা॥

ভয় কি রে অরে ভবানন্দ। মোর অনুগ্রহ যারে, কে তারে বধিতে পারে, দুঃখ যারে পাইবে আনন্দ॥ পাপী পাতশার
পুত, আমারে কহিল ভূত, ভালমতে ভূত দেখাইব। পাতশাহী সরঞ্জাম, যত আছে ধুমধাম, ভূত দিয়া সব লুটাইব॥ যতেক বেদের মত, সকলি হইল হত, নাহি মানে আগম পুরাণ। মিছা মালা ছিলি মিলি, মিছা জপে ইলি মিলি, মিছা পড়ে কলমা কোরাণ॥ যত দেবতার মঠ, ভাঙ্গি ফেলে করি হঠ, নানামতে করে অনাচার। বামণ পণ্ডিত পায়, থুথু দেয় তার গায়, পৈতা ছেড়ে ফোটা মোছে আর॥ এত বলি মহামায়া, দিয়া তারে পদ ছায়া, রক্ষাহেতু জয়ারে রাখিলা। ডাকিনী যোগিনী ভূত, ভৈরব বেতাল দূত, সঙ্গে লয়ে সহরে চলিলা॥ জয়া নিজগণ লয়ে, রহিল রক্ষক হয়ে, আনন্দে রহিল মজুন্দার। মোগলে ছুইতে যায়, ভূতে ঢেকা মারে তায়, ব্রহ্মদৈত্য করয়ে প্রহার॥ যবনের ধুমধাম, ভূত হাঁকে হুম হাম, মহামারি পড়িল মশানে। কহে রায় গুণাকর, অন্নপূর্ণা দয়া কর, পরীক্ষিত তনু ভগবানে॥

মানসিংহ · ১৬ / ৩৯

অন্নপূর্ণা সৈন্য বর্ণন

অন্নপূর্ণা সৈন্যবর্ণন।

ধূধূ ধম ধম, ঝমক ঝমক ঝমক ঝম, ঘন২

নৌবত বাজে। ঝাঁগড় ঝাঁগড়, গড় গড় গড়

গড়, দগড় রগড় ঘন ঝাঁজে। হান হান

হাঁকা শত শত বাঁকা, বাঁক কটার বিরাজে

কত কত হাজী, কত কত কাজী, ধাইল

ছাড়ি নমাজে॥ বড় বড় দাড়ী চামর

ঝাড়ী, গোঁফ উঠে শির তাজে॥ গোলা

ধম ধম, গোলী ঝম ঝম, গম গম তোপ

আবাজে॥ ঝন ঝন ঝনন, ঠন ঠন ঠনন

বরি খতবরকন্দাজে। পদ নখ হননে,

বধিছে যবনে, খগগণ যেমন বাজে॥ মা-

রিয়া লাথী, বধিছে হাতী, ঘোড়া অনলে

ভাজে। শোণিত পানা, সহিতে দানা চ-

র্ব্বই যেমন লাজে॥ ভৈরব লম্ফে, ধরণী

কম্পে, বাসুকি নতশির লাজে। ভারত

কাতর, কহিছে মুরহর, রিপুবর কর

অব্যাজে॥ ধ্রু॥

মানসিংহ · ১৭ / ৩৯

দিল্লীতে উৎপাত

ডাকিনী যোগিনী, শাঁখিনী পেতনী, গুহ্যক দানব দানা। ভৈরব রাক্ষস, বোক্কস, খোক্কস, সমরে দিলেক হানা॥ লপটে ঝপটে, দপটে রপটে, ঝড় বহে খরতর। লপ লপ লম্ফে, ঝপ ঝপ ঝম্পে, দিল্লী কাঁপে থর থর॥ টাকরে চাপড়ে, আঁচড়ে কামড়ে, মরিছে যবন সেনা। রক্তের পাঁতারে, ভৈরব সাঁতারে গগণে উঠিছে ফেণা॥ তা থই তা থই, হো হো হই হই, ভৈরব ভৈরবী নাচে। অট অট হাসে, কট মট ভাষে, মত্ত পিশাচী পিশাচে॥ তুরঙ্গ ধরিয়া, গণ্ডুষ করিয়া, মাতঙ্গ পুরিয়া গালে। সিপাহী ধরিয়া, ফেলিয়া লুফিয়া, খেলিছে তাল বেতালে॥ রথ রথি সঙ্গে, মুখে পুরি রঙ্গে, দশনে করিছে গুঁড়া। হঙ্কার ছাড়িয়া ফুঁকে উড়াইয়া, খেলিছে আবির উড়া॥ নরশিরমালা, সমর বিশালা, শোণিত তটিনী তীরে। রণজয় তালী, ঘন দিয়া কালী শৃগালী বেষ্টিত ফিরে॥ এই রূপে দানা, গণ দিল হানা, যবনে হইল দায়। ললিত বিধানে, রচিয়া মশানে, রায় গুণাকর গায়॥

এ কি ভূতগত দেশে রে। না জানি কি হবে

শেষে রে॥ উত্তম অধম, না হয় নিয়ম,

কেহ নাহি ধর্ম্ম লেশে রে। দাতা ছিল

যারা, ভিক্ষা মাগে তারা, চোর ফিরে সাধু

বেশে রে॥ যবনে ব্রাহ্মণে, সমভাবে গণে

তুল্য মূল্য গজ মেষে রে। ভারতের মন,

দেখি উচাটন, না দেখিয়া হৃষীকেশে রে॥ ধ্রু॥

এই রূপে দিল্লীতে পড়িল মহামার। যবনের হাহাকার ভূতের হঙ্কার। ঘরে ঘরে সহরে হইল ভূতাগত। মিয়ারে কহিছে বান্দী শুন হজরত॥ বিবীরে পাইল ভূতে প্রলয় পড়িলা। পেশ বাজ ইজার ধমকে ছিঁড়াদিল। চিতপাত হয়ে বিবী হাত পা আছাড়ে। কত দোয়া দবা দিনু তবু নাহি ছাড়ে॥ শুনি মিয়া তসবী কোরাণ ফেলাইয়া। দড় বড় বড় দিলা ওঝারে লইয়া॥ ভূত ছাড়াইতে ওঝা মন্ত্র পড়ে যত। বিবী লয়ে ভূতের আনন্দ বাড়ে তত॥ অরে রে খবিস তোরে ডাকে ব্রহ্মদূত। ও তোর মাতারি তুই উহারি সে পুত। কুপী ভরি গিলাইব হারামের হাড়। ফতমা বিবীর আজ্ঞা ছাড় ছাড় ছাড়॥ ইত্যাদি অনেক মন্ত্র পড়িলেক ওঝা। মিয়া দিলা লিখিয়া তাবিজ বোঝা বোঝা। আর বিবী বান্দীরে ধরিছে আর ভূতে। ওঝারে কিলায় কেহ মুখে মুতে॥ ধূলা ঝাড়ি গুড়ি গুড়ি পলাইল ওঝা। মিয়া হৈল মিয়ানী ওঝার ঘাড়ে বোঝা॥ এই রূপে ভূতাগত হইল সহরে। হা হা কার হুহুঙ্কার প্রতি ঘরে ঘরে। শূন্য পথে সিহরথে অন্নদা রহিলা। সহরের যত অন্ন কটাক্ষে হরিলা॥ পাতশার ভাণ্ডার কি আর আর ঠাঁই। হাট ঘাট বাজারে দোকানে অন্ন নাই॥ ধান চাল মাষ মুগ ছোলা অরহর। মসূরাদি বরবটী বাটুলা মটর॥ দেধীন মাড়ুয়া কোদা চিনা ভূরা যব। জনার প্রভৃতি গম আদি আর সব॥ মৎস্য মাংস কাঁচা পাকা নানা গুড় দ্রব্য। ঘাস পাত ফুল ফল যতমত গব্য॥ কিনিতে বেচিতে কেহ কোথায় নাপায়। সবে বলে আচম্বিতে এ কি হৈল দায়॥ নগর পুড়িল দেবালয় কি এড়ায়। মিশালে বিস্তর হিন্দু ঠেকে গেল দায়॥ উপোষে উপোষে লোক হৈল মৃত প্রায়। থাকুক অন্যের কথা জল নহি পায়॥ বকরা বকরী আদি নানা জন্তু কাটি। খাইবারে সকলেতে মাস লয় বাঁটি॥ নানামতে লোক আহারের চেষ্টা পায়। হাতে হৈতে হরিয়া ভৈরবে লয়ে যায়॥ এইরূপে সপ্তাহ সহরে অন্ন নাই। ছেলে পিলে বুড়া রোগা মৈল কত ঠাঁই॥ পাতশার কাছে গিয়া উজির নাজির। সহরের উপদ্রব করিল জাহির॥ পাতশা কহেন বাবা কি কৈল গোসাঁই। সাত রোজ মোর ঘরে খানা পিনা নাই॥ মামুর হইল মোর বাবরুচি খানা। ঘরে হৈতে নিকলিতে না পারে জনানা॥ গোহাড় ইটাল ইট শূন্য হইতে পড়ে। ভূচালার মত চালা কোটা সব লড়ে॥ আন্ধারে কি কব রোজ রৌশনে আন্ধার। হুপ হাপ দুপ দাপ হুঙ্কার হাঁকার॥ দেখিতে না পাই কেবা করে ধূমধাম। সবো রোজ হাঁকে হুম হাম খুম খাম॥ যুবতী সহেলী বান্দী ধরিয়া পাছাড়ে। বেহোঁশ হইয়া তারা হাত পা আছাড়ে॥ খরিশ পাইল বলি ডাকি আনি ওঝা। লিখে দিনু গলায় তাবিজ বোঝা বোঝা॥ এমন পবিশ আর না শুনি কোথায়। তাবিজ ছিঁড়িয়া ফেলি ওঝারে কিলায়॥ ভারত কহিছে ভূতনাথের এ ভূত। খরিশের খরিশ যমের যমদূত॥

মানসিংহ · ১৮ / ৩৯

পাতশার নিকটে উজীরের নিবেদন

পাতশার নিকটে উজিরের নিবেদন।

ফিরিয়া চাও মা অন্নদা ভবানী। জননী না শুনে

কোথা বালকের বাণী। ধর্ম্ম অর্থ মোক্ষ কাম,

সাধন তোমার নাম, বিধি হরি হর ভাবে ও

পদ দুখানি। তুমি যারে দয়া কর, অন্নে পূর্ণ

তার ঘর, না থাকে আপদ কিছু আমি ইহা

জানি॥ পান পাত্র হাতা হাতে, রতন মুকুট

মাথে, নাচাও ত্রিশূলপাণি দিয়া অন্ন পানি॥

ভারত বিনয় করে, অন্নে পূর্ণ কর ঘরে, হরি

ভক্তি দেহ মোরে তবে দয়া জানি॥ ধ্রু॥

কাজি কহে জাহাপনা কত কব আর। কোরাণ টানিয়া কালী ফেলিল আমার॥ নাহি মানে কোরাণ তাবিজ মজবুত। এ কভু খরিশ নহে হিন্দুর এ ভূত॥ উজির কহিছে আলম্পনা সেলামত। আমি বুঝি সেই বামণের কেরামত॥ মানসিংহ কহিয়াছে দেবী পূজে সেই। যখন যে চাহে তাহে দেবী তাহা দেই॥ তুমি তবে দেবীরে হিন্দুর ভূত কয়ে। ভূত দেখা বলি বন্দী কৈলা ক্রুদ্ধ হয়ে॥ সেই দেবী এত করে মোর মনে লয়। মানাও সে বামণেরে মিটিবে প্রলয়। উজিরের বাক্যে জাহাঙ্গীর জ্ঞান পায়। দড় বড় ডাকাইল মানসিংহ রায়॥ মানসিংহ আসিয়া করিল নিবেদন। ভূত জানে তুমি জান জানে সে বামণ॥ আমি দেখিয়াছি বামণের কেরামত। অন্নপূর্ণা ভবানীর মহিমা যেমত॥ ভাল হেতু
করেছিনু হজুরে আরজ। নহিলে কহিতে মোর কি ছিল গরজ॥ ভূত বলি দেবীরে সাহেব গালি দিলা। সহরে কহর এত আপনি করিলা॥ এখনো সে বামণেরে কর পরিতোষ। তবে বুঝি ভার দেবী মাপ করে রোষ॥ মানসিংহ রায়ের কথার অনুসারে মজুন্দারে। আনিতে কহিলা দরবারে॥ যোড়হাতে কহে নাজিরের লোক জন। বামণের কাছে যাবে কে আছে এমন॥ মশানেতে শ্মশান করিল যত ভূত। হাতী ঘোড়া উট আদি মরিল বহুত॥ মারা গেল কত শত আমীর উমরা। কেবল তক্তের বক্তে বাঁচিলা তোমরা॥ যমুনার লহর লহুত হৈল লাল। এখন বামণে মান মিটুক জঞ্জাল॥ শুনি জাহাঁগির বড় দিলগির হয়ে মশানে চলিলা ভয়ে দস্তবস্ত হয়ে॥ অন্তরযামিনী দেবী অন্তরে জানিয়া। দয়া হৈল জাহাঁগিরে কাতর দেখিয়া॥ ভূত দেখা বলি ভবানন্দে বন্দী কৈল। বাঞ্ছাকল্পতরু আমি দেখা দিতে হৈল॥ শহরের উপদ্রব বারণ করিয়া। দেখা দিলা জাহাঁগিরে মায়া প্রকাশিয়া॥ আজ্ঞা দিলা কৃষ্ণচন্দ্র রাজরাজেশ্বর রচিলা ভারত চন্দ্র রায় গুণাকর।

মানসিংহ · ১৯ / ৩৯

অন্নপূর্ণার মায়া প্রপঞ্চ

অন্নপূর্ণার মায়া প্রপঞ্চ।

কে তোমা চিনিতে পারে গো মা। বেদে

সীমা দিতে নারে গো মা॥ ধ্রু॥

রক্ত শতদল তক্তে পাতশা অভয়া। উজির হইলা জয়া নাজির বিজয়া॥ মহাবিদ্যাগণ যত হৈলা পরিবার। আমীর উমরা হৈল যত অবতার॥ বিশ্ব বাড়ী মূরুচা বুরুজ বার রাশি। গোলন্দাজ নবগ্রহ নক্ষত্র সাতাশি॥ বিষ্ণু বক্‌সী ব্রহ্মা কাজী মুনসী মহেশ
সেনাপতি শাহজাদা কার্ত্তিক গণেশ॥ ব্রহ্মানী বৈষ্ণবী মাহেশ্বরী শিবদূতী। নারসিংহী বারাহী কৌমারী পৌর হুতী॥ আট দিকে আনন্দে নায়িকা আট জন। শিরে ছত্র ধরে করে চামর ব্যজন॥ সক্কা হৈল বরুণ পবন ঝাঁড়ুকশ। চন্দ্র সূর্য্য মশালচী মশাল ওজস॥ মজুন্দারে রাজা করি রাখিলা সম্মুখে।দেবরাজ রাজছত্র ধরিয়াছে সুখে। জাহাঁগীর যেমন এমন কত আর। চারিদিকে মজুন্দারে করে পরিহার॥ কোনখানে মধু কৈটভের মহারণ। কোনখানে মহিষাসুরের নিপাতন॥ কোনখানে সুগ্রীব দূতের রায়বার। কোনখানে ধম্রলোচনের তিরস্কার॥ কোনখানে উগ্রচণ্ডা চণ্ডমুণ্ড কাটি। কোনখানে রক্তবীজ যুদ্ধ পরিপাটী॥ কোনখানে শুম্ভ নিশুম্ভের বিনাশন। কোনখানে সুরথ সমাধি দরশন॥ কোনখানে রাম রাবণের মহারণ। কোনখানে কংসবধ আদি বিবরণ॥ কোনখানে মনসা শীতলা ষষ্ঠী গণ। পুঁড়াশূর ঘাঁটু মহাকাল পঞ্চানন॥ দেবতা তেত্রিশ কোটি রত আছে আর। আশে পাশে অদ্‌ভুত ভূতের বাজার॥ যোগিনী যোগান দেয় পাশরী ডাকিনী। কাঙ্গালি হইয়া মাগে শাখিনী পেতিনী॥ রক্ষক রাক্ষসগণ যক্ষগণ বেণে। সহরের দ্রব্য যত ভূতে দেয় এনে॥ কিনে লয় ব্রহ্মদৈত্য দানা লয় কেড়ে। ভৈরব হৈহৈ রবে লয় ফিরে তেড়ে॥ সিদ্ধগণ দোকানী চারণগণ চোর। প্রেতগণ প্রহরী হাঁকিনী হাকে ঘোর॥ নৃত্য করে গীত গায় বাদ্য বাজায় বাজন। বিদ্যাধর কিন্নর গন্ধর্ব্ব আদি গণ॥ খবিষ গণেরে ধরি আনে যত চণ্ড। যমদূতগণে তারে করে যমদণ্ড॥ শূন্যেতে হইল এক মায়া জল নিধি। হর নৌকা হরি মাঝী পার হন বিবি। তাহাতে কমলদহ অতি সুশোভন। শীতল সুগন্ধ মন্দহ পবন॥ ছয় ঋতু ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী। মধুকর কোকিল শিখণ্ডী শিখণ্ডিনী॥ এক দল দ্বিদল সহস্র লক্ষ দল। অধোমুখে নানাজাতি ফুটিছে কমল॥ একআদি লক্ষ অন্তদন্ত কর্ণ পায়। উর্দ্ধৃপদে হেটপিঠে হাতী নাচে তায়। তার পিঠে অধঃশিখে অনল জ্বলিছে। মোমের পুতলি তাহে সুরতি খেলিছে॥ উর্দ্ধৃপদে হেটমাথে তাহে নাচে নারী। মৃদঙ্গ মন্দিরা বাজে বিনা বাদ্যকারি॥ সেই রামা চন্দ্রসূর্য্য অঞ্জলি করিয়া। অন্নদার পদে দেই অজপা জপিয়া॥ মৃদুহাসে জল হৈতে অনল তুলিয়া। গিলিয়া উগারে পুনঃ অঞ্জলি করিয়া॥ হাসি হাসি হাই ছাড়ে কি কব যে কাণ্ড। একেবারে খেতে পারে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড॥ তার পাশে আর এক কমলে কামিনী। গিলিয়া উগারে গজ গজেন্দ্র গামিনী॥ আর দিকে আর পদ্মে এক মধুকর। ছয় পদে ধরিয়াছে ছয় করিবর॥ আর দিকে আর পদ্মে এক মধুকরী। নর সঙ্গে রতিরঙ্গে প্রসবে কেশরী॥ আরদিকে এক পদ্মে নাগিনী কুমারী। অর্দ্ধ অঙ্গ নাগ তার অর্দ্ধঅঙ্গ নারী॥ একবারে এক জন পাতশারে চায়। সবে দেখে সর্ব্বসুদ্ধ ধরি যেন খায়॥ এক বার বিষদৃষ্টে প্রাণ লয় হরি। আর দৃষ্টে প্রাণ দেয় সুধাবৃষ্টি করি॥ ক্ষণে অচেতন হয় ক্ষণে সচেতন। হাসে কাঁদে উঠেপড়ে নমাজে যেমন॥ প্রেমে ভয়ে মোহস্তব করিবারে চায়। মুখে না নিঃসরে বাণী ভূমে গড়ি যায়॥ ভক্ত হৈলা জাহাঁগীর অন্তরে জানিয়া। যত মায়া মহামায়া হরিলা হাসিয়া॥ জ্ঞান পেয়ে জাহাঁগীর প্রাণ পাইল হেন। মজুন্দারে স্তুতি করে দাসু বাসু যেন॥ আজ্ঞা দিলা কৃষ্ণচন্দ্র রাজরাজেশ্বর। রচিলা ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর।

মানসিংহ · ২০ / ৩৯

ভবানন্দের পাতশার বিনয়

ভবানন্দের পাতশার বিনয়।

জাহাঁগীর কহে শুন বামণ ঠাকুর। না জানি করিনু দোষ রোষ কর দূর। দেবীপুত্র দয়াময় মোরে কর দয়া। তোমার প্রসাদে আমি দেখিন অভয়া॥ অধম যবন আমি তপস্যা কি জানি। অধর্ম্মেরে ধর্ম্ম বলি ধর্ম্ম নাহি মানি। তবে যে আমায় দেখা দিলা মহামায়া। তার মূল কেবল তোমার পদছায়া॥ অধম উত্তম হয় উত্তমের সাথে। পুষ্পসঙ্গে কীট যেন উঠে সুরমাথে॥ তবে যে পাইলে দুঃখ দুঃখ নাহি ইতে। রাহুহ্রন্ত হন চন্দ্র লোকে পুণ্য দিতে॥ ঘৃণা ছাড়ি ছূয়ে শুদ্ধ করহ আমারে। পরশ পরশে লোহা সোণা করিবারে॥ মজুন্দার রূপ কেন এত কথা কও। জাহাঁপনা সামান্যা মানুষ তুমি নও॥ তবে মোরে বড় বল দেবীভক্ত জানি। আমা হৈতে তুমি বড় ভক্ত অনুমানি॥ যে রূপে তোমারে দরশন দিয়া দেবী। এরূপ না দেখি আমি এতদিন সেবি॥ ইথে বুঝি আমাহৈতে তুমি তাঁর প্রিয়। এই নিবেদন করি কৃপাদৃষ্টি দিয়॥ পাতশা কহেন শুন বামণ ঠাকুর। দেবী পূজা করি মোর পাপ কর দূর॥ যে পদ পূজিলে পাব সেই পদে ঠাঁই॥ হায় রে পূজিব কিসে কোন চীজ নাই॥ অন্তর যামিনী দেবী দানা হস্ত দিয়া। পূজার সামগ্রী যত দিলা পাঠাইয়া॥ দেখিয়া সবারে আরো বাড়িল বিস্ময়। সাক্ষাত দেবীর পুত্র মজুন্দারে কয়॥ জাহাঁগীরে কহেন ঠাকুর মোরে বাঁচা। ভাল মতে বুঝিনু তোমার দেবী সাঁচা॥ জাহাঁগীর ঢেড়ী দিলা সকল শহরে। অন্নপূর্ণা পূজা সবে কর
ঘরে ঘরে॥ সেইখানে মজুন্দার মুদিয়া নয়ন। উর্দ্দেশেতে অন্নদারে কৈলা নিবেদন॥ দেশ কাল পাত্র বুঝি পুজার নিয়ম॥ অন্তরযামিনী তুমি জান সব ক্রম॥ পাতশা অধ্যক্ষ দরবার পূজা স্থান। সদস্য কেবল দস্যু মোগল পাঠান॥ কাজী ছাড়ে কলমা কোরাণ ছাড়ে কারী। হুলাহুলি দেই যত যবনের নারী॥ এমন পূজার ঘটা কবে হবে আর॥ নিবেদিনু অন্নপূর্ণা যে ইচ্ছা তোমার॥ অন্নে পূর্ণ করি দিল্লী সকলে বাঁচাও। পাতশা প্রণাম করে কটাক্ষেতে চাও॥ কাজী হাজী কারী আদি যবন রাবত। সর্ব্বশুদ্ধ পাতশা হইলা দণ্ডবত॥ মধুর নৌবত বাজে নাচে রামজনী। মজুন্দার মানসিংহ পড়িলা অবনী॥ পূজা পেয়ে অন্নপূর্ণা দিলা কৃপাদৃষ্টি॥ সকলের উপরে হইল পুষ্প বৃষ্টি। সেই ফুল চালু কলা প্রসাদ বলিয়া। প্রেত ভূতগণ সবে লইল লুটিয়া॥ পূর্ব্বমত অন্নে পূর্ণ হইল সহরে। অন্নপূর্ণা পূজা সবে করে প্রতি ঘরে॥ পূজা লয়ে অন্নপূর্ণা মহাহৃষ্টা হয়ে। কৈলাস শিখরে গেলা নিজগণ লয়ে॥ মহানন্দে জাহাঁগীর গুণাগীর হয়ে। চলিলেন ভবানন্দ মজুন্দারে লয়ে॥ পাতশা বসিলা গিয়া তক্তের উপরে। মানসিংহ বিদায় হইলা নিজঘরে। মজুন্দার রাজাই পাইলা ফরমান। খেলাত কাটার ঘড়ী নাগারা নিশান॥ পাতশার নিকটেতে হইয়া বিদায়। বিস্তর সামগ্রী দিলা মানসিংহ রায়॥ দাসু বাসু আদি যত পলাইয়াছিল। সংবাদ পাইয়া সবে আসিয়া মিলিল॥ দিল্লী হৈতে মজুন্দার দেশেরে চলিলা। ত্রিবেণীর স্নান হেতু প্রায়াগে আইলা॥ করিলেন স্নানদান প্রয়াগের নীরে। দাসু বাসু নিবেদন করে ধীরে২॥ ইহাঁর মহিমা কিছু কহ নিমা সীমা। কার অধিষ্ঠানে এতই হয় মহিমা॥ জ্ঞানবলে তোমরা আন্ধারে দেখ আলা। চক্ষুকর্ণ আছে মোরা তবু কাণা কালা॥ শুন অরে দাসু বাসু কন মজুন্দার।গঙ্গার প্রভাবে এত মহিমা ইহাঁর॥ ভারতেরে দয়া কর গঙ্গা দয়ামই। এই ছলে গঙ্গার মহিমা কিছু কই॥

মানসিংহ · ২১ / ৩৯

গঙ্গা বর্ণন

গঙ্গা বর্ণন।

দাসু বাসু কর অবধান। যেই দেব নিরঞ্জন, চিৎস্বরূপী জনার্দ্দন, এই গঙ্গা সেই ভগবান। মহাদেব এক কালে, পঞ্চম খে পঞ্চতালে, গীতে তুষ্ট কৈলা ভগবানে। নারায়ণ দ্রব হৈলা, বিধি কমণ্ডলে লৈলা, বেদব্যাস বর্ণিলা পুরাণে॥ তার কত দিন পরে, বলি ছলিবার তরে, নারায়ণ বামন হইলা। ত্রিপাদ ঘরণী লয়ে, ত্রিবিক্রম রূপ হয়ে, একপদে স্বর্গ আচ্ছাদিলা॥ বিধি সেই পদতলে, পাদ্যদিলা সেইজলে, শিব দিলা জটাজুটে যে বিমল চপলভঙ্গা, সেই জল এই গঙ্গা, এই হেতু বিষ্ণু পদী নাম ত্রিলোকে ত্রিলোক তারা, তিনি হৈলা তিনধারা, স্বর্গ মর্ত্য পাতাল বিশ্রাম। স্বর্গে মন্দাকিনী মন্দা, ভূতলে অলকনন্দা, পাতালেতে ভোগবতী নাম॥ ইনি সে অলকনন্দা, নর লোকে মহানন্দা, ইহাঁরে আনিল ভগীরথ। সগরসন্তান যত, ব্রহ্মশাপে ছিল হত, এই গঙ্গা দিলা মুক্তি পথ॥ শিবজটা মুক্ত হয়ে, ভাগীরথী নাম লয়ে, এথা আসি ত্রিবেণী হইলা। সরস্বতী যমুনারে, মিলাইয়া দুই ধারে, মধ্য ভাগে আপনি রহিলা॥ ভগীরথে লয়ে সঙ্গে, বারাণসী দেখি রঙ্গে, যান গঙ্গা দক্ষিণের বাটে। জহ্নুমুনি পিয়াছিল, কাণে উগারিয়া দিল, জাহ্নবী
হইলা জহ্নু ঘাটে॥ রাজা ভগীরথ রায়, আগে২ নাচি যায়, সাধু সাধু কহে দেবগণ। পূর্ব্বে গেলা পদ্মা হয়ে, ভাগীরথী নাম লয়ে মোর দেশে দিলা দরশন॥ গিরিয়া মোহনা দিয়া, অগ্রদ্বীপ নিরখিয়া, নবদ্বীপে পশ্চিম বাহিনী। পুনশ্চ ত্রিবেণী হৈলা, দক্ষিণ প্রয়াগ কৈলা, ত্রিবেণীতে ত্রিলোকতারিণী॥ শতমুখী রূপ ধরি, সাগর সঙ্গম করি, মুক্ত কৈলা সগর সন্তানে। বেদ যার বিজ্ঞ নহে, কে তার মহিমা কহে, ভারত কি কবে কিবা জানে॥

মানসিংহ · ২২ / ৩৯

অযোধ্য বর্ণন

অযোধ্যা বর্ণন।

জানকী জীবন রাম। নব দূর্ব্বাদল শ্যাম॥

ভবপারাবারে, পারকরিবারে, তরণি রামের

নাম। চারুজটাজুট, রচিত মুকুট, তাহে

বনফুল দাম॥ হাতে শরাসন, দক্ষিণে

লক্ষ্মণ, ধ্যানে সুখমোক্ষ ধাম। হনুমান সঙ্গে

পুলকিত অঙ্গে, ভারত করে প্রণাম॥ ধ্রু॥

প্রয়াগ হইতে যাত্রা কৈলা মজুন্দার। ডানি বামে যত গ্রাম কত কব তার॥ দাসু বাসু নিবেদয়ে শুনহ ঠাকুর। এথা হইতে অযোধ্যা নগর কত দূর। দেখিব রামের বাড়ী এবড় বাসনা। কৃপা করি মো সবার পূরাহ কামনা॥ কহিলেন মজুন্দার কিছু ফের হয়। যে হৌক সে হৌক তথা যাওন নিশ্চয়॥ দেখে যেই জন রাম জনম ভবন। ধরায় ধরিয়া তনু ধন্য সেই জন॥ জিজ্ঞাসিয়া পথিকে পথের ভেদজানি। উত্তরিলা অযোধ্যা রামের রাজধানী॥ অযোধ্যায় গিয়া দেখিলেন মজুন্দার। যে যেখানে রামচন্দ্র করিলা বিহার॥ অযোধ্যা নিবাসি যত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। মজন্দারে
আসি সবে মিলিলা ত্বরিত॥ নানাধনে মজুন্দার তুষিলা সবারে। সাধু সাধু তারা সবে কহে মজুন্দারে॥ মহানন্দে মজুন্দার নানা কুতুহলে। করিলেন স্নানদান সরযূর জলে॥ দিন কত সেই স্থানে বিশ্রাম করিয়া। অযোধ্যা নিবাসি লোক সংহতি লইয়া, সকল অযোধ্যাপুরী করি দরশন। শুনিলেন বাল্মীকি প্রণীত রামায়ণ॥ দাসু বাসু বিনয়ে কহিছে মজন্দারে। ভাষা করি এই কথা বুঝাও আমারে॥ সাত কাণ্ড রামায়ণ সঙ্খেপ ভাষায়। এই ছলে কহিছে ভারতচন্দ্র রায়॥

মানসিংহ · ২৩ / ৩৯

রামায়ণ কথন

রামায়ণ কথন।

দাসু বাসু শুন মন দিয়া। বাল্মীকিপুরাণ মত, রামের চরিত যত, সঙ্খেপে কহিব বিবরিয়া॥ এই দেশে মহারথ, ছিলা রাজা দশরথ, সূর্য্যবংশে সূর্য্যের সমান। কৌশল্যা প্রথম নারী, কেকয়ী দ্বিতীয়া তারি, তৃতীয়া সুমিত্রা অভিধান॥ হরি চারি অংশ লয়ে, চরুভাগে ভাগ হয়ে, তিন গর্ভে হৈলা চারিজন। কৌশল্যা প্রসবে রাম, কেকয়ী ভরত নাম, সুমিত্রা লক্ষ্মণ শত্রুঘন। লক্ষ্মী মিথিলায় গিয়া, যজ্ঞকুণ্ডে জনমিয়া, জনকের সুতা সীতা হৈলা। সীতাপতি রামে জানি, জনক পরম জ্ঞানি, হরধনুর্ভঙ্গ পণ কৈলা॥ বিশ্বামিত্র যজ্ঞকরে, যজ্ঞ রাখিবার তরে, রাম লক্ষ্মণেরে গেলা লয়ে। শ্রীরামের একশরে, তাড়কা রাক্ষসী মরে, মারীচ পলায় দ্রুত হয়ে॥ যজ্ঞরাখি প্রভুরাম, দিয়া জনকের ধাম, ধনুভাঙ্গি সীতা বিয়া কৈলা। অযোধ্যা যাইতে রঙ্গে, পরশুরামের সঙ্গে, পথে রণে রাম জয়ী হৈলা॥ ঘরে এল সীতারাম, সিদ্ধি হৈল মনস্কাম, দশরথ রাজ্যদিতে চায়।
কেকয়ী হইলবাম, বনবাসে গেলা রাম, শোকে দশরথ ছাড়েকায় জানকী লক্ষ্মণে লয়ে, রাম যান দ্রুত হয়ে, গুহক চণ্ডালে কৈলা সখা। শ্রীরাম দণ্ডকবাসী, তথা উত্তরিলা আসি, রাবণ ভগিনী শূর্পণখা॥ রামেরে ভজিতে চায়, সীতারে লঙ্ঘিতে যায়, লক্ষ্মণ কাটিলা নাক তার। সেই হেতু রামশরে, খর দূষণাদি মরে, শূর্পণখা করে হাহাকার॥ শুনি শূর্পণখা মুখে, রাবণ মনের দুখে বনে গেল মারীচে লইয়া। মায়ামৃগরূপ হয়ে, মারীচ রামেরে লয়ে, দূরে গেল মায়া প্রকাশিয়া॥ রামবাণে হত হয়ে, হায় রে লক্ষ্মণ কয়ে, মায়ামৃগ মারীচ মরিল। লক্ষ্মণ সীতার বোলে, তথা গেলা উত্তরোলে, সীতা হরি রাবণ লইল॥ রাম মায়ামৃগ নাশি, লক্ষ্মণ সহিত আসি, পর্ণশালে না দেখিয়া সীতা। সীতার উদ্দেশে যান, পথে মিলে হনূমান, সুগ্রীব বানর হৈল মিতা॥ সুগ্রীবের পক্ষ হৈলা, সপ্ত তাল ভেদ কৈলা, মহাবলি বালিরে বধিলা। সুগ্রীবেরে রাজ্য দিয়া, হনূমানে পাঠাইয়া, জানকীর সংবাদ জানিলা॥ কপিগণে পাঠাইয়া, শিলা তরু আনাইয়া, সিদ্ধ বাঁধি ভবানী পূজিলা। সিন্ধু পার হৈল রাম, মনে মানি পরিণাম, বিভীষণ আসিয়া মিলিলা॥ অনেক সমর হৈল, কুম্ভকর্ণ আদি মৈল, ইন্দ্রজিত প্রভৃতি মরিল। রাবণ রুষিয়া মনে, যুঝে শ্রীরামের সনে, শক্তিশেলে লক্ষ্মণে বিন্ধিল॥ রাম কন হনূমানে, সে গন্ধমাদন আনে, তাহে ছিল বিশল্যকরণি। পাইয়া তাহার ঘ্রাণ, লক্ষ্মণ পাইলা প্রাণ, দেবগণ করে জয়ধ্বনি॥ রাবণ আইল রণে, রঘুনাথ ক্রোধ মনে, ব্রহ্ম অস্ত্রে তাহারে বধিলা। বিভীষণে দিলা লঙ্কা, ইন্দ্রের ঘুচিল শঙ্কা, পরীক্ষার সীতা উদ্ধারিলা॥ রাক্ষস বানর সঙ্গে, পুষ্পকে চড়িয়া রঙ্গে, রাজা হৈলা অযোধ্যা আসিয়া। সীতা হৈলা গর্ভবতী, লোকবাদে রঘুপতি, বনবাসে দিলা পাঠাইয়া॥ সীতা তপোবনে রৈলা, কুশ লব পুত্র হৈলা, রাম অশ্বমেধ আরম্ভিলা। বাল্মীকির সঙ্গে গিয়া, কুশ লব বিবরিয়া, রামে রামায়ণ শুনাইলা॥ কুশ লব পরিচয়ে, সীতা আনি লিজালয়ে, পরীক্ষা দিবারে পুনঃ চান। সীতা কৈলা ধরা ধ্যান, ধরা কৈলা অধিষ্ঠান, সীতা কৈলা পাতালে প্রয়াণ॥ মুগ্ধ রাম সীতাশোকে, হেনকালে সুরলোকে, যুক্তি করি কাল গেলা তথা। লক্ষণে বর্জ্জিয়া রাম, চলিলা বৈকুণ্ঠ ধাম, ভারতের অসাধ্য সে কথা॥

মানসিংহ · ২৪ / ৩৯

ভবানন্দের কাশী গমন

ভবানন্দের কাশীগমন।

জয়তি জননী অন্নদা। গিরিশ নয়ন নন্মদা

অখিল ভুবন ভক্ত২ ভক্তি মুক্তি শর্ম্মদা॥

কর বিলসিত রত্ন দর্ব্বী পানপাত্র সারদা।

তরুণ কিরণ কমল কোচ নিহিত চরণ চা-

রদা॥ ভব নিপতিত ভারতস্য ভব জল

নিধি পারদা॥ ধ্রু॥

অযোধ্যা হইতে যাত্রা কৈলা মজুন্দার। ডানি বামে যত গ্রাম কত কব তার॥ অন্নপূর্ণা দেখিবারে কৈলা মনোরথ। ধরিলা কাশীর পথ কৈলাসের পথ॥ শোক দুঃখ পাপ তাপ পলাইল॥ শুভক্ষণে প্রবেশিলা বারাণসী পুরে॥ মণিকর্ণিকার জলে করি স্নান দান। দর্শন করিলা বিশ্বেশ্বর ভগবান। এক মাস কাশী মাঝে করিয়া বিশ্রাম। দেখিলা সকল স্থান কত কব নাম॥ অন্নপূর্ণাপুরে অন্নপূর্ণার প্রতিমা। বিশ্বকর্ম্মা নিরমিত অতুল মহিমা॥ শিব কৈলা যার পূজা দেবগণ লয়ে। করিলা তাঁহার পূজা সাবধান হয়ে॥ ষোড়শোপচার উপহার কত আর। পুথিবেড়ে যায় আর কত কব তার॥ ব্রতদাস পূজা কৈলা কাশীতে আসিয়া? সাক্ষাত হইয়া দেবী কহিলা হাসিয়া॥ অরে বাছা ভবানন্দ বরপুত্র তুমি। তোমার পরশ পুণ্যে ধন্য হৈল ভূমি॥ তুমি হৈলা ধরাপতি ধন্য হৈল ধরা। বিলম্ব না কর ঘরে চল করি ত্বরা। চন্দ্রমুখী পদ্মমুখী মোর ব্রতদাসী। তুমি মোর ব্রতদাস বড় ভাল বাসি॥ গোপাল গোবিন্দ আর শ্রীকৃষ্ণ কুমার। তিন জন সদা তিন লোচন আমার॥ সুখে গিয়া রাজ্য কর তা সবারে লয়ে। করিহ আমার পূজা সাবধান হয়ে॥ সেখানে তোমারে দেখা দিব আরবার। সেই কালে কব কথা যত আছে আর॥ এত বলি অন্ন পূর্ণা কৈলা অন্তর্দ্ধান। মূর্চ্ছা হৈল মজুন্দারে পুনঃ হৈল জ্ঞান॥ বিস্তর করিয়া স্তুতি প্রতিমা সম্মুখে। দেশেরে চলিলা অন্নপূর্ণা ভাবি সুখে॥ অন্নপূর্ণা মঙ্গল রচিল করিবর। শ্রীযুত ভারত চন্দ্র রায় গুণাকর॥

মানসিংহ · ২৫ / ৩৯

ভবানন্দের স্বদেশে উপস্থিতি

ভবানন্দের স্বদেশে উপস্থিত।

ভাই চল চল রে ভাই চল চল। ঘরে যাক

অন্নপূর্ণা বল বল॥ ধ্রু॥

কাশী হৈতে প্রস্থান করিলা মজুন্দার। ডানি বামে যত গ্রাম কত কব তার॥ বন পথে চলিলেন পঞ্চকূট দিয়া। নাগপুর কর্ণ দ্বন্দ্ব পশচাৎ করিয়া॥ বৈদ্যসাথে বৈদ্যনাথে করি দরশন। বক্রে শ্বরে দেখিয়া সানন্দ হৈল মন॥ বনভূমি এড়াইয়া রাঢ়ে উপনীত। দেখিয়া দেশের মুখ মহা হরষিত॥ অজয় হইয়া পার করিলা গমন। ডানি বামে যত গ্রাম কে করে গণন। কাটোয়া রহিল বামে গঙ্গার সমীপ। গঙ্গা পার হইয়া পাইলা অগ্রদ্ধীপ॥ গঙ্গা স্নান করিয়া দেখিলা গোপীনাথ। করিলা বিস্তর স্তব করি যোড় হাত॥ সেই খানে নানা সরে ভোজন করিলা। বাড়ীতে সংবাদ দিতে বাসু পাঠাইলা॥ ত্বরা করি আসি বাসু দিল সমাচার। ঠাকুর আইলা জয় করি দরবার॥ রাজাই পাঁইলা ঘড়ী নাগারা নিশান। কি কহিব বিশেষ দেখিবে বিদ্যমান॥ শিরোপ আমারে দেহ যোড় আর শাড়ী। মাথায় বান্ধিয়া আমি আগে যাই বাড়ী॥ শুনি রাম সুমার্দ্দার সীতা ঠাকুরাণী। বাসুরে শিরোপা দিলা যোড় শাড়ী আনি॥ সাধী মাধী দুই দাসী আইল ধাইয়া। সমাচার দিল বাসু নিকটে ডাকিয়া॥ দুই ঠাকুরাণীরে সংবাদ দেহ গিয়া। রাজা হয়ে ঠাকুর আইলা ডঙ্কা দিয়া॥ দুজনার পরিবার দুই শাড়ী লয়ে। আগে আমি ঘরে যাই রাহা চোঙ্গা হয়ে॥ শুভ সমাচার শুনি দুই ঠাকুরাণী। বাসুরে শিরোপা দিলা শাড়ী দুই খানি॥ শাড়ী লয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ী গেল বাসু। দাসুর জননী বলে কোথা মোর দাসু॥ নেচে ফিরে বাসুর রমণী সুখ পেয়ে। চোর হেন দাসুর রমণী রৈল চেয়ে॥ নাগারা নিশান ষড়ী সংযোগ করিয়া। কতগুলি লোক যোগ চাকর রাখিয়া॥ পরদিনে বাসু অগ্রদ্বীপে উত্তরিলা। মজুন্দার নাতবর উকীল রাখিলা॥ লিখাইয়া পঞ্জা ফরমানের নকল। নানামতে সাবধানে রাখিলা আসল। ঢাকায় নবাব তথা পাঠায় উকীল। ডঙ্কা দিয়া বাগোয়ানে হইলা দাখিল। অন্নপূর্ণামঙ্গল রচিলা কবিবর। শ্রীযুত ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর॥

মানসিংহ · ২৬ / ৩৯

ভবানন্দের বাটী উপস্থিতি

ভবানন্দের বাটী উপস্থিতি।

অনন্দ বড় রে। সব ধামে সব গ্রামে সব

যামে॥ জয় শব্দ পড় রে। শ্রুতিসামে অবি

শ্রামে ফুলদামে॥ সব লোক জড় রে॥

শুভ কামে অভিরামে অবিরামে॥ ভারত

দড় রে। পরিণামে হরিনামে পরণামে॥ ধ্রু॥

প্রথমে গোবিন্দদেবে প্রণাম করিলা। জনকের জননীর চরণ বন্দিলা॥ সীতা ঠাকুরাণী যত এয়োগণ লয়ে। পুত্রের নিছনি কৈলা মহাহৃষ্ট হয়ে॥ শঙ্খ ঘণ্টা বাজে বাজে বিবিধ বাজন। হুলু হুলু ধ্বনি করে যত রামাগণ॥ রাজাইর ফরমানে বহিত্র বরণে। বরিয়া লইলা অন্নপূর্ণার ভবনে॥ পাইয়া সিন্দুর তৈল গেল রামাগণ। ভাবিছেন মজুন্দার কি করি এখন। দুই নারী দুই ঘরে কোথা যাব আগে। মনে এই আন্দোল কন্দল পাছে লাগে॥ এত ভাবি জননীর নিকটে বসিলা। বিদেশের দুঃখ যত কহিতে লাগিলা॥ দেখা হেতু বন্ধুবর্গ এসেছিল যারা। ক্রমে২ সকলে বিদায় হৈল তারা॥ দরবেরে কাপড় ছাড়িলা মজুন্দার। দাসু যোগাইল ধূতীযোড় পরিবার॥ সায়ংসন্ধ্যা সমাপিয়া বসি পাণ খান। সাধী দাসী মনে মনে করে অনুমান॥ ছোট মার কাছে পাছে আগে যান জানি। ধেয়ে গেল যথা বসি বড় ঠাকুরাণী। এ সুখে বঞ্চিত কবি রায় গুণাকর। দুই নারী বিনা নাহি পতির আদর॥

মানসিংহ · ২৭ / ৩৯

বড় রাণীর নিকটে সাধীর বাক্য

বড় ঠাকুরাণীর গো। ঠাকুর হইয়া রাজা তুমি রাণী গো॥ যুবা সুয়া বুড়া দুয়া সবে জানি গো। সুয়া যদি হবে শুন মোর বাহী গো। মাধী লয়ে ছোট করে কানাকানি গো। তোমারে না দিবে হেন অনুমানি গো॥ মাধী পাছে পড়ি দেয় পাণ পানি গো॥ কত মন্ত্র তন্ত্র জানে সে নাপানী গো॥ ছোট যুবা প্রভু তাহে যুবজানি গো। আধবুড়া তুমি তাহে অভিমানি গো॥ ছোটর ঘরেতে হবে রাজধানী গো। তারি ঘরে ঠাকুরের আমদানী গো॥ ছোটরে বলিবে লোকে মহারাণী গো। তোমারে বলিবে বুড়া ঠাকুরাণী গো॥ হাত তোলা মত পাবে অন্ন পানি গো। বড়হয়ে ছোট হবে মানহানি গো॥ পুত্রবতী গুণবতী বট জানি গো॥ যৌবনে সে পতিমন লবে টানি গো। রূপেবতী লক্ষ্মী গুণবতী বাণী গো। রূপেতে লক্ষ্মীর বশ চক্রপাণি গো॥ আগে যদি ঠাকুরেরে ডাকি আনি গো। ছোট পাছে পথে করে টানাটানি গো॥ টেনে টুনে বাঁধ ছাঁদ খোঁপাখানি গো। শাড়ী পর চিক২ শ্রীরামখানি গো॥ দেহুড়ীর কাছে থাক হয়ে দানী গো। ঘরে আন ধরে করে টানাটানি গো॥ পতি লয়ে দু সতিনে হানাহানি গো॥

মানসিংহ · ২৮ / ৩৯

ছোট রাণীর নিকটে মাধীর বাক্য

ছোট রাণীর নিকটে মাধীর বাক্য।

সাধীর বচন শুনি, চন্দ্রমুখী মনে গুণি, বটে বটে বলিয়া উঠিলা। মন করে ধড়ফড়, বেশ কৈলা দড়বড়, পতি ভুলাইতে মন দিলা॥ খোঁপা বাঁধি তাড়াতাড়ি, পরিয়া চিকণ শাড়ী, পড়িয়া কাজল চক্ষে দিলা। পড়া তৈল মুখে মাখি, পড়া ফুল চুলে রাখি, নানামন্ত্রে সিন্দূর পরিলা॥ পরি পড়া গন্ধ চুয়া, মুখে
পড়া পাণ গুয়া, ন্যাস বেশ নাপান ঝাঁপান। গলিত হয়েছে কূচ, কেমনে সে হবে উচ, ভাবিয়া উপায় নাহি পান॥ ছেলে কেন্দে উঠে কোলে, তোষেন মধুর বোলে, কন্দানা রে অই তোর বাপা। তোর বাপে আনি গিয়া, থাক বাছা চুপ দিয়া, অই তাকে কাণ কাটা হাঁপা॥ সাধীরে বালক দিয়া, দেহুড়ীর কাছে গিয়া, রহিলা প্রহরী যেন রেতে। প্রভু আসিবেন যেই, ধরে লয়ে যাব তেঁই, না দিব সতার ঘরে যেতে॥ ওথা পদ্মমুখী লয়ে, মাধী রসে মগ্ন হয়ে, নানামতে বেশ করি দিলা। পতি ভুলাবার কলা, জানে নানামত ছলা, ক্রমে ক্রমে সব শিখাইলা॥ সতিনী তোমার যেটা, কোলে তার তিন বেটা, ঘর দ্বার সকলি তাহার। শ্বশুর শাশুড়ী যারা, তাহারি অধীন তারা, এই মাধী কেবল তোমার॥ দরবারে জয় লয়ে, প্রভু আইলা রাজা হয়ে, আগে যদি তার ঘরে যান। মহারাণী হবে সেই, মোর মনে লয় এই, তুমি হবে দাসীর সমান॥ একে তার তিন বেটা, তাহারে আঁটিবে কেটা, আরো যদি রাণী হয় সেই। রাজপাট সব লবে, তোমার কি দশা হবে, আমার ভাবনা বড় এই॥ দুয়ারে দাঁড়ায়ে থাক, আঁখি ঠার দিয়া ডাক, আমি গিয়া ঠাকুরেরে ডাকি। আগে তাঁরে ঘরে আনি, তোমারেত করি রাণী, তবে সে সতিনী পায় ফাকী॥ এত বলি তাড়াতাড়ি, চলিল বাহির বাড়ী, মাধী যেন মাতাল মহিষী। চূড়া ছাঁদে বাঁধা চুল, তাহাতে চাঁপার ফুল, আঁচল লুটায় মাটি মিশি॥ নাপান কাঁপানে যায়, ডানি বামে নাহি চায়, উত্তরিলা যথা মজুন্দার। দাঁড়াইয়া একপাশে, কথা কহে মৃদুহাসে, রায় গুণাকর কহে সার॥

মানসিংহ · ২৯ / ৩৯

ভবানন্দের অন্তঃপুরপ্রবেশ

মার কাছে মজুন্দার বসি পাণ খান। হেনকালে মাধী এল গালভরা পাণ। ছোটমার ঘরে আসি পাণ খেতে হয়। এত বলি ঝারি বাটা অমৃতীটি লয়॥ মাধী যদি ঝারি বাটা অমৃতী লইল। বিধাতা মনের মত সংযোগ করিল॥ রাখিতে কে পারে অরে সাধী দিল টান। ঘাড় ফিরে আড়ে আড়ে মার দিকে চান॥ মায়ের পোয়ের ভাব রহে নাকি ছাপা। সীতা কন ঘরে গিয়া পাণ খাও বাপা। আশা বুঝি বাসু আশু খড়ম যোগায়। হাসি হাসি মাধী দাসী আগে আগে যায়॥ দেহুড়ীর পারমাত্র হৈলা মজুন্দার। সমুখেতে চন্দ্রমুখী কৈলা নমস্কার॥ জিজ্ঞাসিলা মজুন্দার বাড়ীর কুশল। চন্দ্রমখী নিবেদিলা সকলি মঙ্গল॥ এই ঘরে আসি বসি খাউন পাণ জল। দেখিবারে ছেলে পিলে হয়েছে বিকল॥ শুনি মজুন্দার বড় উন্মনা হইলা। কার ঘরে আগে যাব ভাবিতে লাগিলা॥ যাইতে ছোটর ঘরে বড় মনোরথ। বড় কৈলা বাদহাটা আগুলিয়া পথ॥ এক চক্ষু কাতারয়ে ছোট ঘর যায়। আর চক্ষুরাঙ্গা হয়ে বড় জনে চায়॥ সন্ধ্যাকালে চক্রবাক চাহে যেন লক্ষে। এক চক্ষে তরুণী তরণি আর চক্ষে॥ মাধী বলে আগে যাউন ছোট মার ঘরে। তার পরে যাবেন যেখানে মন ধরে॥ সাধী বলে মাধী তোরে সাক্ষী কেবা মানে। ঠাকুর যাবেন বুঝি আপনার স্থানে॥ ঠাকুরাণী ঠাকুরে যখন কথা হয়। দাসী হয়ে কথা কৈস বুকে নাহি ভয়॥ আগে বড় পিছে ছোট বিধির এ কট। তুই কি করিবি তাহে উলট পালট॥ কন্দল লাগায়ে ঘর মজাইবি বুঝি। রামায়ণে ছিল যেন কেকয়ীর কুজী॥ মাধী বলে আলো সাধী চুপ করি থাক। আমি জানি বিস্তর অমন এঁড়ে ডাক॥ সাধী সঙ্গে করিয়া কথার হুটাহুটি। ছোটর নিকটে মাধী গেল ছুটাছুটি॥ কহিছে ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর। দু সতিনা ঘরে দাসী অনর্থের ঘর॥

মানসিংহ · ৩০ / ৩৯

মাধীকৃত সাধীর নিন্দা

মাধীকৃত সাধীর নিন্দা।

কি কর চল তাড়াতাড়ি। গো ছোট মা। তোমার নাম কয়ে, ঠকুরে আনু লয়ে, বড় মা করে কাড়াকাড়ি॥ সে যদি আগে লৈল, সেইত রাণী হৈল, তবেত বড় বাড়াবাড়ি। সে পতিলয়ে রবে, তুমি পাইবে কবে, ঘুচিল শেজি পাড়া পাড়ি। ভুলিয়া তার ভাবে, পতি না তোরে চাবে, কথাওহবে ভাঁড়াভাঁড়ি॥ রান্ধিয়া দিবে ভাত, ফেলাবে আঁটুপাত, ঘুচিল হাত নাড়ানাডি। সাধী হারাম জাদি, এখনি হইল বাদী, করিতে চায় ছাড়াছাড়ি॥ সাধী যে কথা কৈল, মোরে সে শেল রৈল, দিয়াছি খুব ঝাড়াঝাড়ি॥ করিনু যত তন্ত্র, পড়িনু যত মন্ত্র, কন্দলে গেল মাড়া মাড়ি। ঠাকুরে ভুলাইব, তোমারে আনি দিব, আনিয়া গাছ সাঁড়াসাঁড়ি। দু সতিনের ঘর, পতিরে ঘুচে ডর, কন্দলে হয় বাড়াবাড়ি। দুজনে দ্বন্দ্ব করে দাসী আনন্দে চরে, ভারত কহে আড়াআড়ি॥

মানসিংহ · ৩১ / ৩৯

পতি লয়ে দুই সতিনের বঙ্গোক্তি

পতি লয়ে দুই সতিনের ব্যঙ্গোক্তি।

কি হেরিনু অপরূপ রূপের বাজার। রাধা

চন্দ্রাবলী বলে গোবিন্দ সাজার॥ রাধা

পীতধড়া ধরে, চন্দ্রাবলী ধরে করে চৌদি-

গে বেড়িয়া গোপী ষোড়শ হাজার। কে-

হবা মোড়য়ে অঙ্গ, কেহ করে ভুরুভঙ্গ,

হাব অনুভবে ভাব কহে যেবা যার॥ সক-

লে সমান ভাব, সকলে সমান হাব, বিশ্ব-

পতি শ্যামরায় কহে কেবা কার। সব

গোপী এক সাতে, লুটিলেক গোপীনাথে,

ভারত দোহাই দেয় মদন রাজার॥ ধ্রু॥

মাধবী বচনে পদ্মমুখী ত্বরান্বিতা। দেহুড়ীর কাছে গিয়া হৈল উপনীতা॥ গলায় অঞ্চল দিয়া কৈলা নমস্কার। আঁখিঠারে সম্ভাষ করিলা মজুন্দার। পদ্মমুখী তুষ্ট হৈলা ইসারা পাইয়া। হাসিয়া কহেন প্রভু কেন দাঁড়াইয়া॥ বড় দিদী দাঁড়াইয়া কেন দুঃখ পান। উচিত যে উহারি মন্দিরে আগে যান॥ মজুন্দার বুঝিলেন পদ্মামুখী ধীরা। দুজনে সমুখে করি দাড়াইলা ফিরা॥ দুসতিনে কন্দল নহিলে রস নহে। দোষ গুণ বুঝা চাই কে কেমন কহে॥ রসিকের স্থানে হয় রসের বিস্তার। সাধী মাধী দুজনে কহিলা মজুন্দার॥ দুজনার ঘরে গিয়া দুইজনা থাক। ডাকাডাকি না কর সহিতে নারি ডাক॥ কামের করাতে ভাগ করি কলেবরে। সম ভাবে রব গিয়া দুজনার ঘরে॥ দুটায় মরিস কেন ডাকাডাকি করি। তারি কাছে আগে যাব যে লইবে ধরি॥ এত শুনি সাধী মাধী অন্তর হইল। দুজনার ঘরে গিয়া দুজনা রহিল॥ পদ্মমুখী কহে ভাল আজ্ঞা দিলা স্বামী। ধরি লৈতে তোমারেত না পারিব আমি॥ বড়দিদী বড় সুয়া সবকালে বড়। ধরি লৈতে উনি বিনা কেবা হবে দড়। চন্দ্রমুখী কন বুঝি ব্যঙ্গ কৈলা বড়। দড় ছিনু যখন তখনি ছিনু দড়॥ তিন ছেলে কোলে আর দড় হব কবে। আটে পীঠে দড় যেই সেই দড় হবে। দড় বেলা ফিরিয়াছি কত ঠাট করি। ধরিতে না হৈত প্রভু আনিতেন ধরি॥ এখন ধরিতে চাহি ধরা দিলে পারি। ধরাধরি যার সঙ্গে ধরাধরি তারি॥ তোমার যৌবন আছে তুমি আছ সুয়া। হারায়ে যৌবন আমি হইয়াছি দুয়া॥ সুয়া যদি নিম দেয় সেহ হয় চিনি। দুয়া যদি চিনি দেয় নিম হন তিনি॥ চন্দ্রমুখী কথায় বুঝিয়া আবিষ্কার। ধূর্ত্তপনা করিয়া কহেন মজুন্দার॥ চন্দ্রমুখী তব মুখ চন্দ্রের উদয়। পদ্মমুখী পদ্মমুখ প্রকাশ কি হয়॥ ক্ষণেক বদন চন্দ্র ঢাকহ অম্বরে। শুন দেখি পদ্ম মুখী উত্তর কি করে॥ চন্দ্রমুখী কহে প্রভু গিয়াছে সে দিন। এখন পদ্মেরে দেখে চন্দ্রমা মলিন॥ মজুন্দার কন প্রিয়ে এমন কি হয়। চন্দ্র পদ্মে যে সম্বন্ধ কভু মিথ্যা নয়॥ হাসি চন্দ্রমুখী মুখে ঝাপিলা অম্বর। পদ্মমুখী মুখপদ্মে হৈলা মধুকর। ভারত কহিছে ধন্য ধূর্ত্ত মজুন্দার। সমান রাখিলা মান জ্যেষ্ঠা কনিষ্ঠার॥

মানসিংহ · ৩২ / ৩৯

ভবানন্দের উভয় রাণী সম্ভোগ

ভবানন্দের উভয় রাণী সম্ভোগ।

সোহাগে হইয়া সুখী, ঘরে গেলা পদ্মমুখী, মজুন্দার বড় ঘরে গেলা। কোলে লয়ে বড় নারী, করি তার মনোহারি, ক্ষণেক করিলা কাম খেলা॥ ছেলে পিলে নিদ্রা গেলা, চন্দ্রমুখী লয়ে খেলা, রাত্রি হৈল দ্বিতীয় প্রহর। যাইতে ছোটর কাছে, মনের বাসনা আছে, সমাপিলা বড়র বাসর॥ প্রোষিত ভর্তৃকা হয়ে, দুহে ছিলা দুঃখ সয়ে, আমা দেখি বাসসজ্জা হৈলা॥ কার ঘরে যাব আগে, উৎকণ্ঠিতা এই রাগে, দেহুড়ীতে অভিসার কৈলা॥ কারো ঘরে নাহি গিয়া, রহিলাম দাঁড়াইয়া, বিপ্রলব্ধা হইলা দুজনে। এখন ইহারে লয়ে, থাকিলাম সুখী হয়ে, পদ্মমুখী কি
ভাবিছে মনে॥ স্বাধীনভর্তৃকা ইনি, প্রোষিত ভর্তৃকা তিনি, আমি হৈনু অপূর্ব্ব নায়ক। তারে গিয়া হৃদে ধরি, স্বাধীন ভর্তৃকা করি, নহে হব কামিনী ঘাতক॥ রাত্রি শেষে গেলে তথা, ক্রোধে না কহিবে কথা, খণ্ডিতা হইবে পদ্মমুখী। খেদাইবে কটু কয়ে, কলহান্তরিতা হয়ে, কান্দিবেক হয়ে বড় দুঃখী॥ তার কাছে গালি খেয়ে, এখানে আসিব ধেয়ে, ইনি পুনঃ হবেন খণ্ডিতা। সেখানে যাহ কয়ে, খেদাইবে ক্রদ্ধহয়ে, একে দুই কলহান্তরিতা॥ রাত্রি যাবে এইরূপে, ডুবে রব কামকূপে, কেহ নাহি করিবে উদ্ধার। এখনো যদ্যপি যাই, তবে দুই কূল পাই, সম হয় দুহার বিহার। দুই প্রহরের ঘড়ী, গজরের তড়বড়ী, মজুন্দার বাহির হইলা। ওথা ঘরে পদ্মমুখী, ভাবেন অন্তরে দুখী, বুঝি প্রভু আসিতে নারিলা॥ সোহাগেতে ভুলাইয়া, মোরে ঘরে পাঠাইয়া, আনন্দে রহিলা বড় লয়ে। গেল রাত্রি দুই পর, এখনো না এল ঘর, এ দুঃখ কেমনে রব সয়ে॥ ফুল বাণ বাণ ফলে, অঙ্গ দেই ধরাতলে, ঘরবারি করে কতবার।এই অবসর পেয়ে, মন পলাইল ধেয়ে, শরের বুঝিয়া খর ধার॥ হেন কালে মজুন্দার, বেগে ঘরে এল তার, মন আইল বেগ শিখিবারে। মদন প্রহরী ছিল, খর শর ছাড়ি দিল, দুজনে বিন্ধিল এক ধারে॥ কথায় না সহে ভর, দুহে কামে জর জর, কামক্রীড়া করিলা বিস্তর। ভারত করিছে সার, বিস্তর কি কব আর, বর্ণিয়াছি বিদ্যার বাসর॥

মানসিংহ · ৩৩ / ৩৯

মজুন্দারের রাজ্য

মজুন্দারের রাজ্য।

ধূধূ ধূধূ নৌবত বাজে রে। বরপুত্র অন্ন-

দার, ভবানন্দ মজুন্দার, রাজা হৈলা বাগু

য়ান মাঝে রে॥ ভোঁ ভোঁ ভোরঙ্গ বাজে, ধাঁ ধাঁ ধামসাগাজে, ঝাঁঝাঁঝাঁ ঝম ঝমঝাঁজে রে॥ ঘড়ীবাজে ঠন ঠন, ঘণ্টা বাজে রন রন, গন গন গজ ঘণ্টা গাজেরে॥ ভাঁড়াই করিছে ভাঁড়, চোয়াড়ে লুফিছে কাঁড়, সিপাই সমুখে পুর সাজে রে। ভবানী সহায় হাঁকে, নকীব সেলাম ডাকে, দেওয়ান বসিল রাজকাজে রে॥ নব গুণে নব রসে, ভুবন ভরিল যশে, চাঁদের কলঙ্ক হৈল লাজে রে॥ অন্নপূর্ণা মহামায়া, দেহ রাঙ্গাপদ ছায়া, ভারতের কৃষ্ণ চন্দ্র রাজে রে।

পরম আনন্দে ভবানন্দ মজুন্দার। স্নান পূজা করিয়া বাহিরে দিলা বার॥ ঘড়িয়াল ঠন ঠন বাজাইছে ঘড়ী। চোপদার সমুখে দাড়ায় লয়ে ছড়ী। দেওয়ান আমীন বক্‌সী মুনসী দপ্তরী। খাজাঞ্চী নিযুক্ত কৈলা বিবেচনা করি॥ সহবতী হিসাব নিকাশ বাজে দফা। মুহরির রাখিল হিসাব করি রফা। ফরমান মত সব সনন্দ লিখিয়া। মফঃস্বলে নায়েব দিলেন পাঠাইয়া॥ পরগণা পরগণা হইল আমল। দেখা কৈল যত প্রজা গোমস্তা মণ্ডল॥ শিরোপা দিলেন সবে বিবিধ প্রকার। সেলাম দিলেক সবে চতুর্গুণ তার॥ এই রূপে রাজত্বের যে কিছু নিয়ম। ক্রমে ক্রমে করিলা যতেক উপক্রম॥ হায়নের অগ্র অগ্রহায়ণ জানিয়া। শুভদিনে পুণ্যাহ করিলা বিচারিয়া॥ পৌষমাঘ ফাল্‌গুণ বঞ্চিয়া সুখসার। চৈত্রমাসে পূজা আরম্ভিলা অন্নদার॥ আজ্ঞা দিলা কৃষ্ণচন্দ্র ধরণী ঈশ্বর। রচিলা ভারত চন্দ্র রায় গুণাকর॥

মানসিংহ · ৩৪ / ৩৯

অন্নদার এয়োজাত

অন্নদার এয়োজাত।

চল চল সব ব্রজকুমারী। তরূতলে গিয়া ভেটি মুরারি॥ রাধা
রাধা কয়ে মোহন মন্ত্রে, নিমন্ত্রিল শ্যাম মুরলি যন্ত্রে, করে কুটিল কুলের তন্ত্রে, যাইতে হইল রহিতে নারি। ত্বরা পর সবে করহ সাজ, কি করিবে মিছা ঘরের কাজ, সাজিয়া আইল মদন রাজ, তিলেক রহিতে আরনা পারি। কেহ লহ পড়া পঞ্জর শুয়া, কেহ লহ পাণ কর্পুর গুয়া, কেহলহ গন্ধ চন্দন চুয়া, কেহ লহ পাখা জলের ঝারী। সে মোর নাগর চিকণকালা, তারে সাজে ভাল বকুলমালা, আমি বয়ে লব পুরিয়াথালা, ভারতচন্দ্র বলে বলি হারি॥ ধ্রু॥

অন্নপূর্ণা পূজা আরম্ভিলা মজুন্দার। চন্দ্রমুখী পাইলেন এয়োজাত ভার। ঘরে ঘরে সাধী দাসী নিমন্ত্রণ দিল। সারি সারি এয়োগণ আসিয়া মিলিল॥ অপর্ণা অপরাজিতা অম্বিকা অমলা। ইন্দ্রাণী ঈশ্বরী ইন্দমখী ইন্দুকলা॥ সুলোচনা সুমিত্রা সুভদ্রা সুলক্ষণা। যশোদা যমুনা জয়া বিজয়া সুমনা॥ রোহিণী রেবতী রামা রম্ভাবতী রুমা। অরুন্ধতী অরুণী উর্ব্বশী উষ্ণা উমা॥ সরস্বতী শুকী শুভী সাবিত্রী শঙ্করী। মহামায়া মোহিনী মাধবী মাহেশ্বরী॥ তিলোত্তমা তরু তারা ত্রিপূরা তারিণী। কমলা কল্যাণী কৃষ্ণী কালিন্দী কামিনী॥ কৌষিকী কৌশল্যা কালী কিশোরী কুমারী। রাজেশ্বরী ব্রজেশ্বরী শিবেশ্বরী সারী॥ হৈমবতী হরিপ্রিয়া হীরা হারাবতী। পরশী পরমা পদ্মা পরাণী পার্ব্বতী॥ ভাগ্যবতী ভগবতী ভৈরবী ভবানী। রুক্‌মিণী রাধিকা রাণী রমণী রুদ্রাণী। শারদা সুশীলা শামী সুমতি সর্ব্বাণী। বিশালাক্ষী বিনোদিনী বিশ্বেশ্বরী বাণী॥ ললিতা ললনা লক্ষ্মী লীলা লজ্জাবতী। খেমী হেমী চাঁদরাণী সূর্য্যরাণী সতী॥ সোনা রূপা পলা মুক্তীমাণিকী রতনী। মলিকা মালতী চাঁপী ফুলী মূলী ধনী॥ গৌরী গঙ্গা গুণবতী গোপালী গান্ধারী। নিমী তেকী ছকী লকী হেলী ফেলী বারী॥ বিধুমুখী শীধু সাধূ শচী মন্দোদরী। সীতা রামা সত্যভামা মদন মুঞ্জরী॥ সোহাগী সম্পতি শান্তি সয়া সুরধনী। কুঞ্জী কাত্যায়নী কুম্ভী কুড়ানী করুণী॥ দুলালী দ্রৌপদী দুর্গা দয়াময়ী দেবী। ভারতী ভুবনেশ্বরী টিকা টুনী টিকী॥ নারায়ণী নয়নীনর্ম্মদা নন্দরাণী। জয়ন্তী জাহ্নবী জুতী জিতী জাদু জানি॥ কুশলী কনকলতা কুচিলা কাঞ্চনী। অন্নপূর্ণা অভয়া অহল্যা অকিঞ্চনী। আনন্দী আমোদী অম্বী আতুলী আদুরী। সাতা ষাঠী সুধামুখী সর্ব্বশী সুন্দরী॥ চিত্রলেখা মনোরমা মসী মেনবতী। শ্রীমতী নলিনী নীলা ভূতি ভানুমতী॥ শশিমুখী সত্যবতী সুখী সুরেশ্বরী। মধুমতী মায়া দময়ন্তী পারী পরী॥ বিষ্ণপ্রিয়া বিদ্যা বৃন্দা মুদিতা মঙ্গলী। মেনকা কেকয়ী চন্দ্রমুখী চন্দ্রাবলী॥ কার কোলে ছেলে কার ছেলে চলে যায়। কার ছেলে কান্দে কার ছেলে মারি খায়॥ বুড়া আধবুড়া যুবা নবোঢ়া গর্ভিণী। ঘন বাজে ঘুনু ঘুনু কঙ্কণ কিঙ্কিণী॥ কেহ ডাকে এস সই চল সেঙ্গাতিনী। ঠাকুরাণী ঠাকুরঝী নাতিনী মিতিনী॥ বড় মেজ সেজ ছোট নবহু বলিয়া। শাশুড়ী দিছেন ডাক পথে দাঁড়াইয়া॥ কেহ বলে রৈও রৈও পরি আসি শাড়ী। কেহ কান্দে কাপড় থাকিল ধোবাবাড়ী॥ কার বেণী কার খোঁপা কার এলোচুল। কুলি কুলি কলরব শুনি কুলকুল॥ চন্দ্রমুখী কৈলা এয়োজাতের ব্যাপার। দেখিয়া সানন্দ ভরানন্দ মজুন্দার॥ তার মধ্যে কতগুলি কুমারী লইয়া। করিলা কুমারী পূজা বাস ভূষা দিয়া॥ সবাকারে দিলা তৈল সিন্দুর চিরণী। কুতুহলে কোলাহল হুলু হুলুধ্বনি। নিজ বাসে গেলা সবে করি প্রণিপাত। রচিলা ভারত অন্নদার এয়োজাত॥

মানসিংহ · ৩৫ / ৩৯

রন্ধন

রন্ধন।

<poem<বেলা হৈল অন্নপূর্ণা রান্ধ বাড় গিয়া। পরম আনন্দ দেহ পর
মান্ন দিয়া॥ তোমার অন্নের বলে, অদ্যাবধি আছে গলে,
কালরূপি কালকুট অমৃত হইয়া। এক হাতে পানপাত্র, আর
হাতে হাতা মাত্র, দিতেপার চতুর্ব্বর্গ ঈষদ হাসিয়া॥ তুমি
অন্ন দেহ যারে, অমৃত কি মিঠা তারে, সুধাতে কে করে সাদ
এসুধা ছাড়িয়া। পরশিয়া অন্ন সুধা, ভারতের হর ক্ষুধা
মা বিনা বালকে অন্ন কে দেয় ডাকিয়া॥ ধ্রু॥</poem>

ভোগের রন্ধনে ভার লয়ে পদ্মমুখী। রন্ধন করিতে গেলা মনে মহাসুখী॥ স্নান করি করি রামা অন্নদার ধ্যান। অন্নপূর্ণা রন্ধনে করিলা অধিষ্ঠান॥ হাস্যমুখী পদ্মমুখী আরম্ভিলা পাক। শড়শড়ি ঘণ্ট ভাজা নানামত শাক॥ ডালি রান্ধে ঘনতর ছোলা অরহরে। মুগ মাষ বরবটী বাটুলা মটরে॥ বড়া বড়ী কলা মূলা নারিকেল ভাজা। দুধথোড় ডালনা শুক্তনি ঘণ্ট তাজা॥ কাটালের বীজ রান্ধে চিনি রসে বুড়া। তিল পিটালিতে লাউ বার্ত্তাকু কুমুড়া॥ নিরামিষ তেইশ রান্ধিলা অনায়াসে। আরম্ভিলা বিবিধ রন্ধন মৎস্য মাসে॥ কাতলা ভেকুট কই ঝাল ভাজা কোল। সীবপোড়া ঝুরী কাটালের বীজে ঝোল॥ কাল ঝোল ভাজা রান্ধে চিতল ফলই। কই মাগুরের ঝোল ভিন্ন ভাজে কই॥ মায়া সোণা খড়কীর ঝোলভাজা সার। চিঙ্গড়ীর
ষাল বাগা অমৃতের তার॥ কণ্ঠা রান্ধি রান্ধে কই কাতলার মুড়া। তিত দিয়া পচামাছে রান্ধিলেক গুঁড়া॥ আম্র দিয়া শৌলমাহে ঝোল চড়চড়ী। আড়ি রান্ধে আদারসে দিয়া ফুলবড়ী॥ রুই কাতলার তৈলে রান্ধে তৈলশাক। মাছের ডিমের বড়া মৃতে দেয় ডাক॥ বাচার করিলা ঝোল খয়রার ভাজা। অমৃত অধিক বলে অমৃতের রাজা॥ সুমাছ বাছের বাছ আর মাছ যত। ঝাল ঝোল চড়চড়ী ভাজা কৈল কত॥ বড়া কিছু সিদ্ধ কিছু কাছিমের ডিম। গঙ্গাফল তার নাগ অমৃত অসীম॥ কচি ছাগ মৃগ মাংসে ঝাল ঝোল রসা। কালিয়া দোলমা বাগা সেকচী সমসা॥ অন্য মাংস সীকভাজা কাবাব করিয়া। রান্ধিলেন মুড়া আগে মসলা পুরিয়া॥ মৎস্য মাংস সাঙ্গ করি অম্বল রান্ধিলা। মৎস্য মূলা বড়া বড়ী চিনি আদি দিলা॥। আম আমসত্ব আর আমসী আচার। চালিতা তেতুল কুল আমড়া মন্দার॥ অম্বল রান্ধিয়া রামা আরম্ভিলা পিঠা। সুধাবলে এই সঙ্গে আমি হব মিঠা॥ বড়া এলো আসিকা পীযূষী পুরী পুলী। চুষী রুটী রামরোট মুগের সামুলী॥ কলাবড়া ঘিয়ড় পাঁপড় ভাজাপুলী। সুধারুচি মুচমুচি লুচি কতগুলি॥ পিঠা হৈল পরে পরমান্ন আরম্ভিলা। চালু চিনা ভুরা রাজবার চালু দিলা। পরমান্ন পরে খেচরান্ন রান্ধে আর। বিষ্ণুভোগ রান্ধিলা রান্ধনী লক্ষ্মী যার। অতুলিত অগণিত রান্ধিয়া ব্যঞ্জন। অন্ন রান্ধে রাশি রাশি অন্নদামোহন। মোটা সুরু ধান্যের তণ্ডুল তরতমে। আসু বোরা আমন রান্ধিল ক্রমে ক্রমে। দলকচু ওড়কচু ঘিকলা পাতরা। মেঘহাসা কালমানা রায় পানিভরা॥ কালিন্দী কনক চর ছায়াচূর পুদি। শুয়া শালি হরিলেবু গুয়াথুরি সুদী॥ ধিশালী পোয়ালবিড়া কলামোচা আর। কৈজুড়ি খাজুরছরী চিনা ধলবার॥ দাদুশাহি বাঁশফুল ছিলাট করুচি। কেলেজিরা পদ্মরাজ দুদুরাজ লুচি। কাঁটারাঙ্গি কোঁচাই কপিলা ভোজরান্ধে ধুলে বাঁশগজাল ইন্দ্রের মন বান্ধে॥ বাজাল মরীচাশালি ভুরা বেনাফুল। কাজলা শঙ্করচিনা চিনিসমতুল॥ মাকু মেটে মধিলোট শিবজটা পরে। দুধপনা গঙ্গা জল মুনি মন হরে। সুধা দুধকলম খড়ি কামুঠি রান্ধে। বিষ্ণুভোগ গন্ধেশ্বরী গন্ধতার কান্দে। রান্ধিয়া পায়রারস রান্ধে বাঁশমতী। কদমা কুসুমশালি মনোহর অতি॥ রমা লক্ষ্মী আলতা দনার গুঁড়া রান্ধ্রে। জুতী গন্ধমালতী অমৃতে ফেলে বান্ধে॥ লতামউ প্রভৃতি রাঢ়র সরু চালু। রসে গন্ধে অমৃত আপতি আলু থালু॥ অন্নদার রন্ধন ভারত কিবা কয়। মৃত হয় অমৃত অমত মৃত হয়॥

মানসিংহ · ৩৬ / ৩৯

অন্নদা পূজা

অশেষ উপচার, আনিয়া অজুন্দার, পূজেন অন্নদা চরণ। পদ্ধতি সুবিদিত, পণ্ডিত পুরোহিত, পূজয়ে বিধান যেমন। ষোড়শ উপচার, সামগ্রী কত আর, কি কব তাহার বিশেষ। মহিষ মেষ ছাগ, প্রভৃতি বলি ভাগ, বসন ভূষণ সন্দেশ। বাজয়ে বাদ্য কত, নাচয়ে নট যত, গায়ক নটি রামজনী। যতেক রামাগণ, পরম হৃষ্টমন, করয়ে হুলু হুলু ধ্বনি॥ পড়়িয়া সূর্য্য সোম, পূজান্তে অন্নহোম, ভোগের অন্ন আনি দিলা। করিয়া দক্ষিণান্ত, লইয়া দান্ত শান্ত, জাগিয়া নিশা পোহাইলা॥ হইয়া যোড় পাণি, পড়েন স্তুতিবাণী, পরম জ্ঞানী মজুন্দার।কি কব ভাগ্য লেখা, অন্নদা দিলা দেখা, ধরিয়া ধ্যানের আকার॥ দেখিযা অহ
দায়, পুলকে পূর্ণকায়, মোহিত হৈলা মজুন্দার। অন্নদা কন কথা, যে কেহ ছিল তথা, কেহ না দেখে শুনে আর॥ কহেন দেবী সুখী, কোথা লো চন্দ্রমুখী, এস লো পদ্মমুখী রামা। আছিলা স্বর্গবাসি, শাপে ভূতলে আসি, ভুলিয়া নাহি চিন আমা এই যে ভবানন্দ, পাইয়া মহানন্দ, মনে না করে পূর্ব্ব কথা। আমার ইতিহাস, করিল পরকাশ, এখন চল যাই তথা॥ অষ্টাহ গীতকথা, কহেন দেবী তথা, শুনেন ভবানন্দ রায়। অন্নদা পদতলে, বিনয় করি বলে, ভারত অষ্ট মঙ্গলায়॥

মানসিংহ · ৩৭ / ৩৯

অষ্টমঙ্গলা

শুন শুন অরে ভবানন্দ। মোর অষ্টমঙ্গলায়, অমঙ্গল দূরে যায়, শুনিলে না হয় কভু মন্দ। প্রথমে মঙ্গল শুন, সৃষ্টি করি তিনি গুণ, বিধি বিষ্ণু হরে প্রসবিনু। দক্ষের দুহিতা হয়ে, পতি ভাবে হরে লয়ে, দক্ষযজ্ঞে সে তনু ছাড়িনু। শুন শুন অরে ভবা, নন্দ ইত্যাদি। দ্বিতীয়ে হেমন্ত ধামে, জনমিনু উমানামে, মোর বিয়া হেতু কাম মৈল। বিয়া হৈল হর সঙ্গে, হরগৌরী হৈনুরঙ্গে গণেশ কার্ত্তিক পুত্র হৈল। শুন শুন অরে ভবানন্দ ইত্যাদি। তৃতীয়ে শিবের সঙ্গে কন্দল করিয়া রঙ্গে, ভিক্ষা হেতু তারে পাঠাইনু। পান পাত্র হাতে লয়ে, অন্নপূর্ণারূপ হয়ে, অন্ন দিয়া শিবে নাচাইনু॥ কাশী মাঝে ত্রিলোচন, লয়ে যত দেবগণ, বিশ্বকর্ম্ম নির্ম্মিত মন্দিরে। করিয়া তপস্যা ঘোর, পূজা প্রকাশিলা মোর, অন্নে পূর্ণ করিনু ভূমিরে॥ শুন শুন অরে ভবানন্দ ইত্যাদি। চতুর্থেতে বেদব্যাস, নিন্দা কৈলা কৃত্তিবাস, ভুজস্তম্ভ হইয়েছিল তার। শেষে অন্ন নাহি পায়, আমি অন্ন দিনু তায়, কাশীখণ্ডে আছয়ে প্রচার॥ সেই ব্যাস তার পরে, ব্যাস বারাণসী করে,
মোর উপাসনা করে বসি। বুড়ীরূপে আমি গিয়া, বাক্যছলে শাপ দিয়া, করিন গর্দ্দভ বারাণসী। কুবেরের অনুচরে, বসুন্ধরা বসুন্ধরে, শাপ দিয়া ভূতলে আনিনু। হরিহোড় নাম দিয়া, বুড়ীরূপে আমিগিয়া, ঘুটে বেচা ছলে বর দিনু। শুন শুন ইত্যাদি। পঞ্চমে শাপের ছলে, আনিনু ধরণী তলে, নলকুবরে রে এই গামে। ভবানন্দ তুমি সেই, চন্দ্রিণী পদ্মিনী এই, চন্দ্রমুখী পদ্মমুখী নামে॥ পরে হরিহোড়ে ছাড়ি, আইনু তোমার বাড়ী, ঝাঁপী হাতে পার হয়ে নায়। শুনি পাটুনীর মুখে, তুমি নিজ ঘরে সুখে, ঝাঁপীরূপে পাইলা আমায়॥ অসিয়াছি তোর ঘরে, শুন কহি তার পরে, প্রতাপ আদিত্য ধরিমারে, এল মানসিংহ রায়, দেখা হেতু তুমি তায়, বর্দ্ধমানে গেলা আগুসারে॥ মানসিংহ শুনি তথা, বিদ্যাসুন্দরের কথা, জিজ্ঞাসিলা বিশেষ তোমায়। ইতিহাস ছলে সুখে, শুনিনু তোমার মুখে, আদ্যঃ স সুন্দর বিদ্যায়॥ পূজি মোর কালী রূপ, সুকবি সুন্দর ভূপ, উপনীত হৈল বর্দ্ধমান। হীরা নাম মালিনীর, ঘরে উত্তরিল ধীর, শুনিল বিদ্যার রূপ গান। গাঁথিয়া দিলেক মালা, ভুলে বিদ্যা রাজবালা, দুহে দেখা রথের নিকটে। মোর বরে সন্ধি হৈল, গন্ধর্ব্ব বিবাহ কৈল, বাসর বঞ্চিল অকপটে। শুন ইত্যাদি। ষষ্ঠেতে সুন্দর কবি, বিদ্যা পদ্মিনীর রবি, অশেষ চাতুরী প্রকাশিল। কপট সন্ন্যাসী হৈল, রাজায় সাক্ষাত কৈল, নানামতে বিহার করিল॥ বিদ্যা হৈল গর্ব্ভবতী, ক্রুদ্ধ হৈল নরপতি, কোটাল ধরিতে গেলা চোরে। নারী বেশে চোর ধরে, রাজার সাক্ষাত করে, সুন্দর ঠেকিল দায় ঘোরে॥ শুন২ ইত্যাদি সপ্তমেতে আমি গিয়া, কালীরূপে দেখা দিয়া, বাঁচাইনু কুমার সুন্দরে। বীরসিংহ পূজা কৈল, মোর অনুগ্রহ হৈল, বিদ্যা লয়ে কবি গেল ঘরে॥ এই ইতিহাস সুখে, শুনিয়া তোমার মুখে, মানসিংহ এল তোর ঘরে। সপ্তাহ বাদলে তারে, নানামত উপহারে, তত্ব নিলা তুমি মোর বরে॥ ভেদ পেয়ে তোর মূখে, মোর পূজা দিয়া সুখে, মানসিংহ যশোরে আইল। প্রতাপ আদিত্যে ধরি, লইল পিঞ্জরে ভরি, তোমা লয়ে দিল্লীতে চলিল॥ তুমি মোর পূজা দিয়া, কুতুহলে দিল্লী গিয়া, পাতশার ক্রোধে বদ্ধ হৈলা। তুমি পাতশার ডরে, নত হয়ে ভক্তি ভরে, এক মনে মোরে স্ততি কৈলা॥ আমি তোরে তুষ্ট হয়ে, ডাকিনী যোগিনী লয়ে, উপদ্রব করিনু শহরে। পাতশা মানিয়া মোরে, রাজাই দিলেক তোরে, মহাসুখে তুমি এলা ঘরে॥ শুন শুন ইত্যাদি। অষ্টমতে তুমি সেই, মোর পূজা কৈলে এই, আমি অষ্টমঙ্গলা কহিনু। ব্রত হৈল পরকাশ, এবে চল স্বর্গবাস, এই বর পূর্ব্বে দিয়াছিনু। শুন শুন অরে ভবানন্দ। মোর অষ্টমঙ্গলায়, অমঙ্গল দূরে যায়, শুনিলে না হয় কভু মন্দ॥ অন্নদা অষ্টাহ গীত, রচিবারে নিয়োজিত, কৈলা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। বন্দিয়া গোবিন্দ পায়, রায় গুণাকর গায়, পরিপূর্ণ অষ্টমঙ্গলায়॥

মানসিংহ · ৩৮ / ৩৯

রাজার অন্নদার সহিত কথা

রাজার অন্নদার সহিত কথা।

মোরে তরাহ তারিণী। অভয়া ভয়বারিণী। অম্বিকা অন্নদা, শঙ্করী সারদা, জয়ন্তী জয়কারিণী। চামুণ্ডা চণ্ডিকা, করালী কালিকা, ত্রিপুরা শূলধারিণী॥ মহিষমর্দ্দিনী, মহেশ মোহিনা, দুর্গা দৈত্য বিনাশিনী। ভৈরবীভবানী, সর্ব্বাণী রুদ্রাণী, ভারত চিত্তচারিণী

এইরূপে পূর্ব্ব কথা বিশেষ কহিয়া। মহামায়া মায়াজাল দিলা ঘুচাইয়া॥ মোহ গেল জাতিস্মর হৈলা ভিন জন। দেখিতে পাইলা সর্ব্ব পূর্ব্ব বিবরণ॥ মজুন্দার কন আর এথা নাহি কাজ॥ অব্যাজে দেখিবগিয়া বাপ যক্ষরাজ॥ চন্দ্রমখী পদ্মমুখী কান্দে নানাছান্দে। শ্বশুর শাশুড়ী দেখিবারে প্রাণ কান্দে॥ দেবীর চরণে ধরি কান্দে তিন জন। লয়ে চল এথা আর নাহি প্রয়োজন। অন্নদা কহেন চল ব্যাজ নাহি জার। প্রিয়পুত্র যেই তাঁরে দেহ রাজ্যভার॥ মজুন্দার কন আমি কি জানি তাহার। উপযুক্ত বুঝিয়া নিযুক্ত কর তার॥ অন্নদা কহেন তবে ভবিষ্য ত কই। মোর প্রিয় গোপাল ভূপাল হবে অই। সমাদরে মোর ঝাঁপী রাখিবেক এই। যার স্থানে ঝাঁপী রবে রাজা হবে সেই॥ গোপালের পুত্র হবে বড় ভাগ্যধর। রাঘব হইবে নাম রাঘব সো সর॥ দেগাঁয়ে আছিল রাজা দেপাল কুমার। পরশ পাইয়াছিল বিখ্যাত সংসার॥ আমার কপটে তার হয়েছে নিধন। রাঘবেরে দিব আমি তার রাজ্যধন। গ্রাম দীঘী নগর সে করিবে পত্তন। দীঘী কাটি করিবেক শঙ্কর স্থাপন। তার পুত্র হইবেক রাজা রুদ্ররায়। বাড়িবেক অধিকার আমার দয়ায়॥ গঙ্গীতীরে নবদ্বীপে শঙ্কর স্থাপিবে। পথিবীতে কীর্ত্তি রাখি কৈলাসে যাইবে॥ তিন পুত্র রুদ্রের হইবে নিরুপম। রামচন্দ্র বড়রাম জীবন মধ্যম॥ রামকষ্ণ ছোট তার বড় ব্যবহার। রামচন্দ্র নিধনে রাজাই হবে তার॥ জিনিবেক সভাসিংহ আদি রাজরাজী। সোমযাগ করি নাম হবে সোমযাজী॥ এই ঝাঁপী হেলন করিবে অহঙ্কারে। সেই অপরাধে আমি ছাড়িব তাহারে॥ নিধন করিব তারে দরবারে লয়ে। রাজ্য দিব রামজীবনেরে তুষ্ট হয়ে অবিরোধে তার ঘরে থাকিব সচ্ছন্দে। রাজাই করিবে রাম জীবন আনন্দে॥ তিন পুত্র হবে তার প্রথম ভার্য্যার। রাজা রাম কৃষ্ণ রায় রঘুরাম রায়॥ গোপাল গোবিন্দ হবে অপর ভার্য্যায় তার মধ্যে রাজা হবে রঘুরাম রায়। ভূমিদান দয়া দর্পরাজ ধর্ম্ম বলে। রঘুবীর খ্যাত হবে ধরণী মণ্ডলে। তার পুত্র হবে কৃষ্ণচন্দ্র মতিমান। কাশীতে করিবে জ্ঞান বাপীর সোপান॥ বিগ্রহ ব্রহ্মণ্যদেব মূর্ত্তি প্রকাশিয়া। নিবাস করিবে শিবনিবাস করিয়া॥ আমার প্রতিমা পূজা প্রকাশ তাহাতে। কত কব তার যশ বুঝিবা ইহাতে॥ শাকে আগে মাতৃকা যোগিনীগণ শেষে। বরগীর বিভ্রাট হইবে এই দেশে॥ আলিবর্দ্দি কৃষ্ণচন্দ্রে ধরি লয়ে যাবে। নজরানা বলিবার লক্ষ টাকা চাবে॥ বর্দ্ধ করি রাখিবেক মুরশিদাবাদে। মোরে স্তুতি করিবেক পড়িয়া প্রমাদে॥ স্বপ্নে দেখা দিব অন্নপূর্ণারূপ হয়ে। এই গীতে পূজার পদ্ধতি দিব কয়ে॥ সভাসদ তাহার ভারত চন্দ্র রায়। ফুলের মুখটী নৃসিংহের অংশ তায়। ভূরিশিটে ভূপতি নরেন্দ্ররায় সুত। কৃষ্ণচন্দ্র পাশে রবে হয়ে রাজ্যচ্যুত। ব্যাকরণ অভিধান সাহিত্য নাটক। অলঙ্কার সঙ্গীত শাস্ত্রের অধ্যাপক॥ পুরাণ আগমবেত্তা নাগরী পারশী। দয়া করি দিব দিব্যজ্ঞানের আরশী॥ জ্ঞানবান হবে সেই আমার কৃপায়। এই গীত রচিবারে স্বপ্ন কব তায়॥ কৃষ্ণচন্দ্র আমার আজ্ঞার অনুসারে। রায় গুণাকর নাম দিবেক তাহারে॥ সেই এই অষ্ট মঙ্গলার অনুসারে। অষ্টাহ মঙ্গল প্রকাশিবেক সংসারে॥ ডীউসাই নীলমণি কণ্ঠ অভরণ। এই মঙ্গলের হবে প্রথম গায়ন॥ শুনিয়া কহিল ভবানন্দ মজুন্দার। জগতঈশ্বরী তুমি যে ইচ্ছা তোমার॥ যে জান তা করিবে কি কাজ মোরে কয়ে। তিলেক বিলম্ব নাহি চল মোরে লয়ে। বেদ লয়ে ঋষি রসে ব্রহ্ম নিরূপিলা। সেই শকে এই গীত ভারত রচিলা॥

মানসিংহ · ৩৯ / ৩৯

মজুন্দারের স্বর্গযাত্রা

মজুন্দারের স্বর্গযাত্রা।

ভবানন্দ মজুন্দার, সুতে দিয়া রাজ্যভার, বাপ মায় প্রবোধ করিয়া। পূর্ব্বকথা মনে করি, বসিলেন ধ্যান ধরি, স্বর্গে যান শরীর ছাড়িয়া॥ সীতারাম মজুন্দার, করিছেন হাহাকার, প্রজাগণ কান্দিয়া বিকল। অমাত্য অপত্যগণ, সবে শোকে অচেতন, ক্রন্দনে উঠিল কোলাহল॥ চন্দ্রমুখী পদ্মমুখী, স্বর্গে যাইবারে সুখী, সহমৃতা হইল হাসিয়া। চড়িয়া পুষ্পক রথে, চলিলা অলকাপথে, যক্ষগণে বেষ্টিত হইয়া॥ অন্নপূর্ণা আগে আগে, সখীগণ চারি ভাগে, পিছে নলকুবর চলিলা। কুবের যক্ষের পতি, শোকেতে পীড়িত অতি, পুত্র দেখি আনন্দ পাইলা॥ পুত্র পুত্রবধূ লয়ে, কুবের সানন্দ হয়ে, পূজা কৈলা অন্নদাচরণ। কুবেরের পূজা লয়ে, দেবী গেলা তুষ্ট হয়ে, কৈলাসে যেখানে পঞ্চানন॥ অন্নপূর্ণা অজার্চ্চিতা, অপর্ণা অপরাজিতা, অনাদ্যা অনন্তা অম্বা অমা। অবিকারা অনুপমা, অরুন্ধতী অনুত্তমা, অনির্ব্বাচ্যা অরূপা অসমা॥ ক্ষুধাহরা ক্ষামোদরী, ক্ষান্ত ক্ষিতি ক্ষপাকরী, ক্ষুদ্র আমি কি আছে ক্ষমতা। ক্ষিপ্ত আমি ক্ষোভ কত, ক্ষুণ্ণ কহিয়াছি ক্ষত, ক্ষমারূপা ক্ষীণেরে ক্ষমতা॥ কৃষ্ণচন্দ্র নরপতি, করিলেন অনুমতি, সেই মত রচিয়া বিধানে। ভারত যাচয়ে বর, অন্নপূর্ণা দয়া কর, পরীক্ষিত তনু ভগবানে॥ সমাপ্ত।

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৫৪ · ৬৪,১৮৩ অক্ষর