← লাইব্রেরি

১৯১০

তীর্থরেণু

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯১০

প্রকাশনা-তথ্য

তীর্থরেণু

শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

মূল্য এক টাকা

প্রকাশক

শ্রীমণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়

ইণ্ডিয়ান্ পালিশিং হাউস

২২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

কান্তিক প্রেস

২৩, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

শ্রীহরিচরণ মান্না দ্বারা মুদ্রিত।

ভূমিকা

‘তীর্থরেণুর’ কয়েকটি কবিতা ‘ভারতী’ ও ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত হইয়াছিল, বাকী নূতন।

‘তীর্থসলিলে’র ভূমিকায় যে সমস্ত কথা লেখা হইয়াছিল, ‘তীর্থরেণু সম্বন্ধেও তাহা প্রযােজা; সুতরাং পুনরুক্তির প্রয়ােজন দেখি না।

পরিশেষে, শব্দ-শিল্পী, বর্ণ-তূলিকার বরণীয় কবি, শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় এই গ্রন্থের প্রচ্ছদপটের জন্য তীর্থরেণুর নামটি ফার্সী ছাঁদে লিখিয়া দিয়াছেন, সেজন্য আমি তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞ আছি।

কলিকাতা,

ললিতা সপ্তমী, ১৩১৭

শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

উৎসর্গ

আমার পরমারাধ্য পিতৃদেব

স্বর্গীয় রজনীনাথ দত্ত মহাশয়ের

স্মৃতির উদ্দেশে

এই ক্ষুদ্র গ্রন্থ ভক্তির সহিত উৎসর্গীকৃত

হইল।

সূচী

তান্‌কা · ১

(১)

ফাগুন এ ঠিক,

গগনে আলো না ধরে;

প্রসন্ন দিক্‌,

তবু কেন ফুল ঝরে?

ভাবি আর আঁখি ভরে।

কিনো।

তান্‌কা · ২

(২)

ঝিঁ ঝি ডাকা শীত!

একা জাগি বিছানায়;

কাঁপিতেছে হৃৎ,

কাছে কেহ নাহি, হায়;

ধরণী তুষারে ছায়।

গোকু।

তান্‌কা · ৩

(৩)

দুঃখে কাঁদিনে,

নিয়তির পদে নমি,

ভয় শুধু মনে।

শপথ ভেঙেছ তুমি;

দেবতা কি যাবে ক্ষমি’?

শ্রীমতী ঊকন্‌।

তান্‌কা · ৪

(৪)

মুগ্ধ প্রভাত,

শিশির ঝলকে ঘাসে;

শরতের বাত

উদ্দাম ওই আসে,

সোনার স্বপন নাশে।

আসায়াসু।

তান্‌কা · ৫

(৫)

চপল সে ঠিক

দম্‌কা হাওয়ার মত;

জানি, তার কথা

ভুলিলেই ভাল হ’ত;-

ব্যর্থ যতন যত।

শ্রীমতী দৈনী-নো-সাম্মি

তান্‌কা · ৬

(৬)

কুসুমের শোভা

টুটে সে বৃষ্টিজলে,

রূপ মনোলোভা

তাওতো যেতেছে চলে;

আসা-যাওয়া নিলে।

শ্রীমতী কোমাচী।

তান্‌কা · ৭

(৭)

প্রবল হাওয়ায়

মেঘ ভেঙে চুরে যায়;

জ্যোৎস্না চুঁয়ায়,

চাঁদ ফিরে হেসে চায়,

আঁধার লুকায় কায়।

শাক্যো-নো-তায়ু-আকিসুকে।

তান্‌কা · ৮

(৮)

যামিনী ফুরালে

প্রভাত আসিবে, জানি;

সূর্য্য জাগালে,

তবু বিরক্তি মানি;—

তোমারে বক্ষে টানি।

মিচি-নোবু ফুজিবারা।

তান্‌কা · ৯

(৯)

জেলেদের জাল

দেখা নাহি যায় জলে,

এমনি কুয়াসা;-

দৃষ্টি নাহিক চলে,

‘বেলা হ’ল’ তবু বলে!

সাদায়োরি।

তান্‌কা · ১০

(১০)

রাগ কোরো না গো।

জল দেখি নয়নেতে;—

বঁধু গেছে মোর,

সুনাম বসেছে যেতে;

মন বাঁধি কোন মতে!

শ্রীমতী সাগামি।

তান্‌কা · ১১

(১১)

তার ব্যবহার

বুঝিতে পারি না আর;

প্রভাত বেলায়

জটা বেঁধে গেছে, হায়,

চুলে,—আর চিন্তায়।

শ্রীমতী হোরিকারা।

'অমৃতং বালভাষিতং'

‘অমৃতং বালভাষিতং’

রাজার কথা অটল-সুগম্ভীর,

শাস্ত্র-কথা প্রশান্ত উদার;

ন্যায়ের কথা নিলয় সে যুক্তির,

শিশুর কথা?—পুলক-পারাবার।

ক্যাপ্‌লন্‌।

'কা বার্ত্তা'

‘কা বার্ত্তা'

জগৎ ঘুরিয়া দেখিনু সকল ঠাঁই,

বিস্বাদ হয়ে গিয়েছে বিশ্ব, পাপের অন্ত নাই!

অতি নির্ব্বোধ, অতি গর্ব্বিত নারী সে গর্ভদাসী,

ভালবেসে তার শ্রান্তি না হয় পূজিতে না আসে হাসি!

লালসা-লোলুপ পুরুষ পেটুক, কঠোর, স্বার্থপর,

বাঁদীর বান্দা, নরকের ধারা, পঙ্কে তাহার ঘর।

উচ্ছ্বাসি’ কাঁদে বলি পশুগুলা, কসায়ের বাড়ে খেলা,

শোণিত-গন্ধি হয় উৎসব যত পড়ে আসে বেলা।

নিষ্ঠা আচারে পাগলামি-পূজা করিছে কতই ভেড়া,

ছুটিতে গেলেই নিয়তি নীরবে উঁচু করে দ্যান্‌ বেড়া;

শেষে ঢেকে দ্যান অগাধ আফিমে, সংজ্ঞা থাকে না আর,

এই তো মোদের সারাজগতের সনাতন সমাচার!

হে প্রিয় মরণ! প্রাচীন নাবিক! নৌকা আনহে তীরে;

দুর্ব্বহ মোর হয়েছে জীবন, লও তুলে লও ধীরে।

অজানা অতলে ঝাঁপ দিব আমি, প্রাণ যে নূতন চায়,

স্বর্গ সে হোল্ক অথবা নরক, তাহে কিবা আসে যায়?

বদলেয়ার।

'তাজা-বে-তাজা'

‘তাজা-বে-তাজা’

গাও, কবি! গাও, কর বিরচন

তাজা তাজা গান, কবিতা নূতন;

আঙুরের রসে ভিজে যাক্ মন,

তাজা! তাজা! তাজা! নূতন! নূতন!

পুতলীর মত রূপসীর সাথে,

হাসিমুখে এসে বস গো ছায়াতে;

আদায় করিয়া লহ চুম্বন,

তাজা! তাজা! তাজা! নূতন! নূতন!

‘নমুয়া তনুয়া’ সাকী একেবারে

দাঁড়ায়েছে আসি’ আমারি দুয়ারে,

সে শুধু করিবে সুধা-বিতরণ

তাজা হ’তে তাজা! নূতন! নূতন!

পেয়ালা হেলায় ঠেলিয়া রাখিলে

জীবনে কি কভু আনন্দ মিলে?

পিয়ে দেখ হিয়া মাঝে প্রিয় ধন,

চিরদিন তাজা! নিত্য-নূতন!

মন-কাড়া দেখে বন্ধু কেড়েছি,

তারে ছাড়া আর সকলি ছেড়েছি,

মোরে তুষিবারে করে সে যতন,

ধরে নব রূপ, নিত্য নূতন!

ওগো সমীরণ! তুমি কামচারী,

যাও তুমি সখা মন্দিরে তারি,

চির অনুরাগী, ব’ল’ গো, এজন,

তাজা এ হৃদয়! এ প্রেম নূতন!

'তীর্থের ধূলি মুঠি মুঠি'

তীর্থের ধূলি মুঠি মুঠি তুলি’

করিয়াছি এক ঠাঁই,

বিশ্ব-বীণার তারে তারে তারে

পরশ বুলায়ে যাই;

প্রাচীন দিনের আচিন্‌ জনের

কুড়াই বিভূতি রাশি,

মৃত কবিদের অমৃত অশ্রু

বকুল-সুরভি হাসি!

রোলি, পবিত্রী, ঠুম্‌রা এনেছি,

এনেছি স্বর্ণ-মাখি,

শ্যাম-বিন্দু কি রামরজ,—আমি

কিছুই রাখি নি বাকি;

কাম্য কাজল, সতী সিন্দুর—

এনেছি ভিক্ষা মাগি’,

আশা-পূরী ধূপ এনেছি বঙ্গ

ভাষার পূজার লাগি।

হরি-বিরহিনী ব্রজ গোপিনীর

খিন্ন তনুর শেষ—

এনেছি গো সেই গোপীচন্দন—

জুড়াতে মরম দেশ।

অশ্রু-হাসির অভ্র আবীর

এনেছি যতন ক’রে,

সরস্বতীর চরণ সরোজে

অর্ঘ্য দিবার তরে।

ধরার আঁচলে আঁখিজল কা’রা

মুছেছিল ব্যথা স’য়ে,

অতীত দিনের অশ্রু, হের গো,

রয়েছে অভ্র হ’য়ে!

অতীত ফুলের পুলকে অরুণ

হ’য়েছে আবীর গুলি,

আবীর গভীর পুলকের স্মৃতি,—

হরষ হাসির ধূলি!

বঙ্গবাণীর চরণে নিবেদি

অভ্র-আবীর রাশি,

অঞ্জলি দিই নিখিল কবির

আকুল অশ্রু হাসি;

আমার অশ্রু আমার পুলক

তারি সাথে যায় মিশে,

খুঁজি না, বাছি না, যুঝি না, কেবল

চেয়ে থাকি অনিমিষে।

আমার বীণা সে ধন্য আজিকে

সকল সুরেতে বেজে,

নাড়া পেয়ে তার সকল তন্ত্রী

নিঃশেষে ওঠে নেচে!

নিখিল কবির নিশ্বাসে হের

ভরিয়া উঠেছে বেণু,

ভাব-নগরীর ভাবের ব্যাপারী

বিতরি তীর্থ-রেণু।

'প্রেম'

‘প্রেম’

গানটি ফুরাইলে যদি না মনে লয়

এমন শুনি নাই জীবনে,

সে জন গেলে চলে যদি না মনে হয়।

মানুষ নাই আর ভুবনে,

‘রূপসী’ বলিয়া সে সোহাগ না করিলে

যদি না মানো দীন আপনায়,

যদি না জানো মনে “জীবনে মরণেও”

ব’ল’ না ‘প্রেম’ তবে কভু তায়।

বসিয়া জনতায় তারি সে প্রেমমুখ

ধেয়ানে যদি দিন না কাটে,—

গগন ব্যবধান,— তবুও মনো প্রাণ

না সঁপি’ যদি বুক না ফাটে,

তাহার নিষ্ঠায় রাখিয়া বিশ্বাস

স্বপন ভরে দিন নাহি যায়, —

ভাঙিলে সে স্বপন মরিতে নার যদি

ব’ল’ না ‘প্রেম’ তবে কভু তায়।

এলিজাবেথ্‌ ব্যারেট ব্রাউনিং।

'যোগ্যং যোগ্যেন'

‘যোগ্যং যোগ্যেন’

উজ্জ্বল সোনা, রক্ত প্রবাল,

অমল মুকুতা ফল,—

কাহারো জনম খনির গর্ভে,

কাহারো সিন্ধুজল;

তবু একদিন হয় এক ঠাঁই,

মিলি’ জহুরির ঘরে

পরস্পরের বিচিত্র শোভা

বাড়ায় পরস্পরে।

‘যোগ্যের সাথে মিলিবে যোগ্য’

সনাতন এ বিধান,

কুলমর্য্যাদা কি করিতে পারে?

কিবা করে ব্যবধান?

কণ্ণ গনর।

অঙ্কুর

অঙ্কুর

কহে অঙ্কুর আঁধারে মাটির মাঝে,

“মজবুৎ নই, তবুও লাগিব কাজে!”

এত বলি’ ধীরে আলোকে তুলিল মাথা,

মৃদু বলে খুলি’ দিল একখানি পাতা!

পাতা, নিরখিয়া পরখিয়া চারিধার

ডাকিয়া আনিল ডাটি ভাইটিকে তার;

তার পিছে পিছে কচি পাতা আরো দুটি

কৌতুকে এল বাহিরিয়া গুটি গুটি!

সুরু করি’ কাজ, খাটিয়া সকাল সাঁঝে,

পরিণত হ’ল অঙ্কুর চারা গাছে;

রবি দিল আলো, মেঘ তারে দিল জল,

দিনে দিনে বাড়ি’ লভিল সে ফুল ফল।

যারা ছোট আছ, এস মানুষের মাঝে,

মজবুৎ নও, তবুও লাগিবে কাজে;

আলোকের দিকে ধীরে ধীরে তোল মাথা,

রবি আশিষিবে, মেঘেরা ধরিবে ছাতা।

কর্ম্মের ক্লেশে ললাটে ঝরুক জল,

ফুটাও জগতে অক্ষয় ফুল ফল।

নিগ্রো ডান্‌বার।

অতুলন

অতুলন

(একটি মালাই পান্তুমের হুগো কৃত ফরাসী অনুবাদ হইতে)

প্রজাপতিগুলি খেলিয়া ফিরিছে পাখার ভরে,

শৈল-মেখলা সিন্ধুর কূলে গেল গো তারা!

পঞ্জরতলে মন কাঁদে মোর কাহার তরে,

জন্ম অবধি সারাটা জীবন এমনি ধারা।

শৈল-মেখলা সিন্ধুর কুলে গেল গো তারা!

গৃধ্র উড়িল-চলিল সে বান্তামের পানে;

জনম অবধি সারাটা জীবন এমনি ধারা,

কিশোর মুরতি বড় ভাল লাগে মোর নয়ানে।

গৃধ্র উড়িয়া চলে ওই বান্তামের পানে,

পত্তনপুরে পৌঁছি’ গুটায় পক্ষ দুটি;

কিশোর মুরতি বড় ভাল লাগে মোর নয়নে,

তবু ভাল যারে বাসি তার মত নাইক দুটি।

পত্তনপুরে গৃধ্র গুটায় পক্ষ দু’টি,

যুগল কপোত চলেছে উড়িয়া দেখ গো চাহি;

ভাল যারে বাসি তার মত আর নাইক দু’টি,

মরম-দুয়ার খুঁজে নিতে তার তুল্য নাহি।

অদৃষ্ট ও প্রেম

অদৃষ্ট ও প্রেম

অদৃষ্ট শাসন করে নিখিল ভুবনে,

শাসনে সে রাখে নৃপগণে;

নারীর হৃদয়, প্রাণ, প্রেম চিরদিন

হ’য়ে আছে তাহারি অধীন!

রক্ত হ’তে পারে ক্ষয়, কি ফল তাহায়?

অদৃষ্ট প্রেমের গতি, কে রুধিবে, হায়!

ফর্দ্দূসী।

অনাথ

অনাথ

(মুণ্ডারি)

ও পাড়াটা ঘুরে এলাম কেউ তো নেই,

এ পাড়াটা মরুভূমির মতন;

মাগো আমার নেই গো তুমি নেই গো নেই,

নেইক বাবা কর্ব্বে কে আর যতন?

আজকে যদি বাবা আমার থাক্‌ত গো,

মা যদি মোর আজ্‌কে বেঁচে থাক্‌ত,

পথে পথে খুঁজ্‌ত কত ডাক্‌ত গো,

কোলে পিঠে ক’রে সদাই রাখত।

মা হারিয়ে হারিয়েছি হায় সকলকেই,

কেউ ডাকেনা কেউ করে না খোঁজ;

বাপ গেছে যার জগতে তার কেউ তো নেই

এক্‌লা পথে ঘুরে বেড়াই রোজ।

মা-হারাণো বড় দুখের তুলনা তার নেইকো

বাপ হারাণো জগৎ অন্ধকার,

মা গো আমার, সত্যি তুমি নেই কি, তুমি নেই গো

বাবা আমার সত্যিই নেই আর!

পরের দ্বারে দাঁড়াই স্নেহ পাইনে,

চাক্‌রি স্বীকার এই বয়সেই কর্ব্ব;

ভয়ে কারো মুখের পানে চাইনে,

হয় তো মাগো কেঁদে কেঁদেই মর্ব্ব।

অনুতাপ

অনুতাপ

আমি তারে ভাল বাসি নাই, তবু,

চলে সে গিয়েছে ব’লে

ফাঁকা ফাঁকা যেন ঠেকিছে জীবন,

নয়ন ভরিছে জলে!

কত কথা সে যে আসিত বলিতে

শুনিনি তাহার আধা,

আজ কথা যদি কহে সে আবার

আর দিব না গো বাধা।

ত্রুটি খুঁজিবারে ব্যস্ত ছিলাম

ভাল বাসিব না ব’লে,

জ্বালাতন তারে করেছি কেবল

মরেছি আপনি জ্ব’লে।

প্রণয়ে নিরাশ হইয়া যেজন

মরণ নিয়েছে ডেকে,

তারি তরে মালা রচিব এখন

জীবন-যামিনী জেগে।

ল্যাণ্ডর।

অভিমান

অভিমান

ভাল হ’ত যদি প্রভু কিঙ্কর কিছু না হ’তাম আমি,

ভাল হ’ত যদি জগতের মাঝে জন্ম না হ’ত, স্বামী!

ধূলাই যখন হ’লাম হে প্রভু! না হ’য়ে রূপা কি সোনা,—

ভাল হত হ’লে মরুর বালুকা যেথা নাই আনাগোনা।

ফুটে উঠিলাম তবু ও যখন না হ’লাম শতদল,—

ভাল হ’ত হলে গিরি-শৈবাল অখ্যাত নিষ্ফল।

জীবের মধ্যে গণ্য হ’লাম,-না হ’লাম বুল্বু‌ল্‌!

ভাল হ’ত যদি জন্ম নিতাম যে দেশে ফোটেনা ফুল।

মানুষ হইয়া হ’ল না যখন মানুষের মত মন,

ভাল হ’ত যদি হ’য়ে জড়মতি রহিতাম আমরণ।

তা’ হ’লে যাতনা সহিতে হ’ত না কামনা দিত না ফাঁসী,

বড় ভাল হ’ত অজানা রহিত এই ভালবাসাবাসি।

মরণ এখন শরণ আমার, জীবনের পথে কাঁটা,

জাফর কহিছে, বড় ভাল হয়—হ’য়ে গেলে নাম-কাটা।

জাফরঃ।

অভেদ

অভেদ

আমরা সবাই ভাই,

ধরণীর কোলে জন্ম নিয়েছি স্তন্য তাহারি খাই,

কিবা সে শূদ্র, কিবা ব্রাহ্মণ,

সবারি সমান জন্ম মরণ,

এক মনোপ্রাণ, এক ভগবান, কোনোখানে ভেদ নাই।

কর্ম্মের ফলে কেউ বা ভিখারী,

কেউ ধনবান, কেউ বা মাঝারি;

বড় যারে দেখ সে শুধু মঞ্চে দাঁড়ায়েছে উঠে তাই।

বৃষ্টি বাতাস—নিতি এই দুয়ে

ব্রাহ্মণে ছোঁয় চণ্ডালে ছুঁয়ে!

সকলেরি সাথে কোলাকুলি করে জোছনা সর্বদাই।

আমরা সবাই ভাই!

কেউ কালো, কেউ গোউর বরণ,

লম্বা ও খাটো—সব খাঁটি মন,

দুধ সেই শাদা-কালো হোক চাই ধলোই হউক গাই;

আমরা সবাই ভাই।

কপিলর।

অভ্যর্থনা

অভ্যর্থনা

পদ্মে রচিয়া বন্দন-মালা দ্যায় না তোরণে দোলায়ে,

সম্বল তার আঁখি-পদ্মের দৃষ্টি;

সুরভি অধরে মৃদু হাসি লয়ে বাতায়নে থাকে দাঁড়ায়ে,

পুষ্পদশনা করে না পুষ্পবৃষ্টি!

মঙ্গল ঘট বুকে ক’রে থাকে, শ্রম জলে অভিষিক্ত,

মাটিতে নামায়ে রাখিতে দেখিনি কভু সে,

তরুণীর পতি অভ্যর্থনা বাহির হইতে রিক্ত,

অন্তরে মিঠা অমৃত ছিটায় তবু সে!

রাজা অমরু।

অম্বনালা

অম্বনালা

(মাদাগাস্কার)

চারিদিক দেখে যাও এঁকে বেঁকে

হে নদ অম্বনালা!

অকারণে রেগে দুঃসহ বেগে

যেন ঘটায়োনা জ্বালা।

শীতে তুমি খাটো শাড়ীর মতন

না ঢাকে সকল কায়;

লেপ-চাপা-পড়া শিশু সম হাঁফ্‌

লাগাও হে বরষায়!

ছুটে ছুটে ছুটে মাথা কুটে কুটে

ধূলায় মলিন বেশ,

খেটে খেটে খেটে জন্ম কেটেছে

কর্ম্মের নাহি শেষ!

দিবস যামিনী চলেছ এমনি

ছাড়িয়া পাহাড়-চূড়া,

পাথর নড়ায়ে চলেছ গড়ায়ে

উড়ায়ে সলিল-গুঁড়া।

অলক্ষণ

অলক্ষণ

শুক্র যদি দীপ্ত বেশে সন্ধ্যাকাশে ওঠে,

ধূমকেতুটার ধূমল পুচ্ছ পিছনে তার লোটে,

অজ্ঞাচার্য্য চেঁচিয়ে বলেন “একি! বিষম দায়!

আমারি এই কুটীর ’পরে সবার দৃষ্টি? হায়!

না জানি অদৃষ্টে কত কষ্ট আছে আর।”

এমন সময় বলছে ডেকে প্রতিবেশী তার,

“গ্রহের ফেরে এবার আমি ডুবেছি নির্ঘাত,

বাপের হাঁপ আর সারবে কিসে মায়ের পায়ের বাত?

জ্বরের জ্বালায় ধুঁক্‌ছে থোকা, শান্তি নাইকো চিতে,

ভার্য্যা হ’ল বদমেজাজী গ্রহের কুদৃষ্টিতে!

হপ্তাখানেক বন্ধু ছিল মোদের দ্বন্দ্বরণ,

আবার বেধে যায়;—আকাশে দেখ্‌ছ অলক্ষণ?

লোকের মুখে, কানাঘুষায়, বুঝছি আমি বেশ,

উল্টাবে পৃথিবী এবার হবে কলির শেষ।”

অজ্ঞাচার্য্য বলেন “বন্ধু! তোমার কথাই ঠিক্,

গ্রহতারার গতিক দেখে ভুলেছি আহ্নিক!

চল দেখি ভিন্ন গাঁয়ে তল্পী আমার নিয়ে,

ও গ্রামটাতে গ্রহের দৃষ্টি কেমন? দেখি গিয়ে।”

সেথাও দেখে শুকতারা সে তেম্‌নি চেয়ে আছে,

তেম্‌নি লুটায় ধূম্র পুচ্ছ ধূমকেতুটার পাছে!

ফিরে তখন গেল দোঁহে আপন আপন ঘর,

ধৈর্য্য-ধনে ধনী তারা হল অতঃপর।

গেটে।

অলক্ষ্যে

অলক্ষ্যে

অলক্ষ্যে অচেনা লোক আসে প্রতি ঘরে,

অচেনার মাঝখানে কত খেলা করে!

অলক্ষ্যে চলিয়া যায় শেষে একদিন,

শূন্য নীড় পড়ে থাকে দেহ প্রাণহীন।

‘নাল-আদিয়ার’-গ্রন্থ।

অসাধ্য-সাধন

অসাধ্য-সাধন

দেহ-বিমুক্ত আত্মা দেখিবে?—

এস তবে ত্বরা করি’,

মৌন পূজায়,—ম্বলিত-বসনা

দেখ ঐ সুন্দরী।

নৈলি।

আত্মঘাতিনী

আত্মঘাতিনী

আরেক দুর্ভাগিনী

গেছে সংসার থেকে,

জীবন যাতনা মানি’

মৃত্যু নিয়েছে ডেকে।

ধর্‌ গো আস্তে ধর্‌

সাবধানে তোল্‌, বাছা;

মুখখানি সুন্দর,

বয়েস নেহাৎ কাঁচা।

তবু সে পরেছে আজ

মহাযাত্রার সাজ;

আর্দ্র বসনে, চুলে

অবিরত জল ঝরে;

ঝটিতি নে গো নে তুলে,

ঘৃণা ভুলে, স্নেহভরে।

তুলিস্‌নে হেলা ক’রে,

ব্যথার ব্যথী হ’, ওরে!

দাও নয়নের বারি;

গ্লানি তার ঘুচিয়াছে,

এখন যেটুকু আছে—

সে যে পবিত্র-নারী।

তার সে মতিভ্রমে

ভাবিনে আজ ভ্রমে,—

আর সে অত্যাচারে;

সব কলঙ্ক শেষ,

শুভ-সুন্দর বেশ

মৃত্যু দিয়েছে তারে।

থাক্ তার শত ক্রটি

তবু সে মানুষ, ওরে,

লালাস্রাবী ঠোঁট দুটি

মুছে দে যতন ক’রে।

কবরী পড়েছে খসি’

জড়ায়ে দে চুল মাথায়,

কি নিবিড় কেশরাশি!

বিস্ময়-নীরে ভাসি’-

ঘর ছিল তার কোথায়?

বাপ, মা,—কেহ কি নাই?

নাই কি আপন বোন্?

নাই সহোদর ভাই?

আর কোনো প্রিয় জন?—

প্রিয় যে সবার চেয়ে?

হায়, অভাগিনী মেয়ে!

পর-দুখ-অনুভব

হায় সে কি দুর্লভ!

সংসার সুকঠিন!

থাম-দেওয়া মোটা মোটা

এত বাড়ী, এত কোঠা,—

তবুও সে গৃহহীন!

বাপ, মা, ভায়ের স্নেহ

দিতে পারিলেনা কেহ?

কি বিষম! কি ভীষণ।

প্রেম—গৌরব-হারা,

(প্রমাণ খুঁজিছে কারা?)

দেবতার কৃপাধারা

তাও যে অদর্শন।

কত গৃহে আলো জ্বলে’-

ঝলকে নদীর জলে,

কত উৎসব হয়,

অভাগী আঁধারে থেকে

অবাক নয়নে দেখে,

নিশীথে নিরাশ্রয়!

কন্‌কনে হিম হাওয়ায়

কাঁপিয়ে দেছিল তারে,—

কাঁপাতে পারেনি যাহায়

স্রোতে কি অন্ধকারে;

লাজ অপমান স্মরি’

মরণ নিল সে সরি’,—

পরাণ ছুটিতে চায় রে!

যেথা হোক্‌! যেথা হোক!

এ-জগতের বাইরে!

নদীর খরস্রোতে

গেল সে শীতল হ’তে,—

ঝাঁপ দিল বিহ্বলে;

লুব্ধ পুরুষ! কই?

এসে দেখে যাও, ওই

কর্ম্মের ফল ফলে!-

পার যদি স্নান কোরো,—

পান কোরো ওই জলে।

ধর্‌ গো আস্তে ধর্‌,

সাবধানে তোল্‌, বাছা;

মুখখানি সুন্দর!

বয়েস নেহাৎ কাঁচা।

তনুখানি নমনীয়

থাকিতে থাকিতে, ওরে

যতনে শোয়ায়ে দিয়ো

শেষ শয্যার ‘পরে;

চকিত চোখের পাতা

খোলা যেন থাকে না তা’,—

দিয়ো সে বন্ধ ক’রে।

ভীষণ চাহিয়া আছে

মৃত্যু-হতাশ আঁখি,

ভবিষ্যতের পানে

যেন সে দৃষ্টি হানে

গ্লানির মাঝারে থাকি’।

অমানুষ মানুষের।

গভীর অবজ্ঞায়

এ দশা আজিকে এর,

তাই পাগলের প্রায়

খুঁজেছে সে বিশ্রাম;

শোচনীয় পরিণাম।

দু’টি হাত ধীরে ধীরে

রাখ গো বুকের ‘পরে,

মরণ-নদীর তীরে

যেন ঈশ্বরে স্মরে।

দোষ তার মেনে নিয়ে,

ক্রটি—সে স্বীকার ক’রে,

সঁপে তারে যাও দিয়ে

বিভুর চরণ ‘পরে।

হুড।

আদর্শ যাত্রী

আদর্শ যাত্রী

বিশ্বাস তোমার দণ্ড হে যাত্রী নির্ভীক!

নিদ্বর্ন্দ্ব সে কমণ্ডলু! চলিয়াছ ঠিক

বীরের মতন! কুটির নাহি ভয়;

অবজ্ঞা বিদ্রূপ কিছু গ্রাহ্য নাহি হয়!

আত্মার অপূর্ব্ব জ্যোতি অমল উজ্জ্বল

স্মিতহাস্যে উদ্ভাসিছে ও নেত্র যুগল!

তোমার নাহিক কাজ মোহান্তের বেশে,

তোমারে যে প্রেমচ্ছদ দিয়েছেন হেসে

সৰ্বসাক্ষী; জগতের শ্রেষ্ঠ পরিচ্ছদ;

জয়! জয়! তুমি পেলে পরম সম্পদ!

যাও হে, বিলাও নাম মানুষের হাটে,

নামের মশাল জ্বালি’,—অন্ধকার কাটে

যাহে সব; খ্যাতি তুমি কর না তো আশ,

নক্ষত্র না চাহে দীপ,—সে যে স্বপ্রকাশ।

সেন।

আনন্দ-বাণী

আনন্দ-বাণী

হৃদয়ের সরোবরে নীরবে নিয়ত ভরে

তব প্রেম, হে প্রেম নিলয়!

অমৃতের উৎস তুমি আর্দ্র কর মরুভূমি,

স্বরূপ দেখাও কৃপাময়!

তোমার প্রেমের স্রোত করিয়াছে ওতঃপ্রোত

প্রিয় তব ভকতের প্রাণ,

ছিনু আমি অকিঞ্চন তুমি দেছ সর্ব্বধন,

আমি কিবা দিব প্রতিদান।

সকল ভক্তের পিছে। আছি আমি সব নীচে

হে দেবতা! সত্য সনাতন!

পরম পরশ দিয়া তনু মন গলাইয়া

গ্লানি তাপ কর বিমোচন।

চিন্তার অতীত যাহা চিন্তা কর তুমি তাহা

চিন্তামণি! অমিয়-সাগর!

সর্ব্বকালে-স্বপ্রকাশ! মিনতি করিছে দাস

যোগ্য স্তুতি শিখাও শঙ্কর!

অনন্ত আনন্দ-সুধা! নাহি ক্ষোভ নাহি ক্ষুধা

নাহি ক্ষয়, নাহি নাহি ক্ষতি,

প্রলয় অনল মাঝে মহিমায় স্থানু রাজে,

শূন্যমাঝে পূর্ণ পরিণতি।

বাঁধ্‌ যত অবহেলে ভেঙে ফেলে তুমি এলে

হিয়াতলে বন্যার মতন,

আমাতে করিলে বাস! এর বেশী কোন্ আশ

করিব তোমারে নিবেদন?

ক্ষিতি-জল-অগ্নি-বায়- ব্যোমে বিস্তারিয়া কায়

ভূতের অতীত ভূতনাথ!

তোমারে দেখেছি আজ আমি সর্ব্ব-ভূত-মাঝ

সুপ্রভাত! আজি সুপ্রভাত।

তুমি ধারা চেতনার জীবনের পারাবার,

কে জানে হে তব বিবরণ!

আমার তিমির নাশ করিলে হে স্বপ্রকাশ!

সূর্য্য সম বিতরি’ কিরণ।

রশ্মিময়, পিঙ্গ জট, তুমি হে অনাদি বট,

সূর্য্য, তারা, পৃথ্বী তব ফল;

বারিগর্ভ হুতাশন! কেবা পর? কে আপন?

বল মোরে, নিখিল-সম্বল!

আমারে গ্রহণ করি’ নিজেরে সঁপিলে, মরি;

কে জিতিল? তোমারে সুধাই,

আমারি অন্তরে ঘর বাঁধিলে, হে মহেশ্বর;

কুলাল না ত্রিভুবনে ঠাঁই!

মাণিক্কবাচকর।

আপান-গীতি

আপান-গীতি

(ফরাসী)

রাঙিয়ে স্বচ্ছ কাচের গেলাস!

আয় রে আমার তরল বিলাস!

অপ্সরীদের অধর সুধা! বক্ষ-লোহের দোসর তুমি!

এস মদির-নেত্রী সাকী!

এস, তোমায় সাম্‌নে রাথি,

গ্‌গুল্‌-গুল্‌-গুল্‌, ঢুক্-চুক-ঢুক্, জমিয়ে রাখ আসর তুমি।

নাই জগতে এমনটি সুখ,—

গ্‌গুল্‌-গুল্‌-গুল্‌-গুল্‌! ঢুক্‌-চুক-টুক্‌!

পয়সা তিনে স্বর্গ কিনে স্বপ্ন-পরীর অধর চুমি।

আমার দেবতা

আমার দেবতা

মৃত্তিকা ছানি’ আমার দেবতা গড়েনি কুম্ভকার,

ভাস্কর আসি হানে নাই তাঁরে ছেনি ও হাতুড়ি তার;

অষ্ট ধাতুর নহেসে ঠাকুর সে নহেক পিত্তল,

অম্ল তেঁতুলে দেবতা আমার হয় না গো নির্ম্মল।

এ জীবনে আর করিতে নারিব অন্যের আরাধন,

মরমে পেয়েছি পরশ-মাণিক! সোনা হ’য়ে গেছে মন।

মন জানে আর প্রাণ জানে যোর সে আছে সকল ঘটে,

বচন-অতীত—তবু তরি কথা অচেত-চেতনে রটে!

শাস্ত্রের শ্লোকে আঁধারে আলোকে আছে সে আকাশ ভরি’

জ্ঞানীর জ্ঞেয়ানে ভকতের ধ্যানে আছে দিবা বিভাবরী।

তপন প্রকাশ থাকিতে প্রদীপ জ্বালিতে করিনা আশ,

গ্রাহ্য করিনা অজ্ঞজনের নিন্দা ও পরিহাস।

বুদ্ধি বিচার কিছু নাই যার চীৎকার শুধু করে,—

অকূল সাগরে ডুবায় সে পরে আপনি ডুবিয়া মরে।

ছিল দিন যবে কাঠের ঘোড়ারে আমিও দিয়েছি জল,

অম্ল তেঁতুলে করিতে গিয়েছি দেবতারে নির্ম্মল।

পট্টণত্তু পিল্লাই।

আমি

আমি

আমি ইসলাম, আমিই কাফের,

আমিই ঘোরাই চন্দ্রতারা।

গগনললাটে মেঘের অলক

আমিই বরষা বৃষ্টি-ধারা!

আমিই তড়িত-তন্তু-বিথার,

আমিই বিকট বজ্র-শিখা,

কালকূটে ভরা আমি ভুজঙ্গ,—

রঙ্গে পরাই মৃত্যু-টিকা।

অস্থি-চর্ম্মে গ’ড়ে উঠি আমি

রক্তে মাংসে রহি গো জীয়ে,

অনাদি জ্ঞানের হিন্দোলে দুলি

অনাদি প্রেমের পীযূষ পিয়ে!

ঋতু বসন্তে মর্ত্তে যে আনে,—

হৃদি-মন্দিরে নিবসে যেই,

সম্মত হয় সন্তান হ’তে,—

কিঙ্কর হ’তে আমিই সেই!

মেঘ হ’য়ে যাহা উর্দ্ধে উঠিছে

জল হয়ে যাহা নামিছে নীচে

—আমি সেই—যাহা অন্ধজনের

নাচিছে চোখের সমুখে পিছে!

বিনা ইন্ধনে যে আগুন জ্বলে,—

চকমকি’ উঠে চকমকিতে,—

আমি সেই!—আমি অনেকের প্রভু,—

সেবা করি তবু পুলক চিতে।

কে আছ ব্যথিত চিন্তা মথিত

এস, আমি দিব জুড়াতে ঠাই,

নয়ন-নগরে পরাণের ঘরে

বাহিরের গোল কিছুই নাই!

এত কথা যুনা জানেনা জানেনা,

অনাদি রসনা বলায় তারে;

আদি ও অন্ত একাধারে আমি,

মূঢ় সে যেজন বুঝিতে নারে।

যূনাস।

উচ্চ শিক্ষা

উচ্চ শিক্ষা

পুঁথিতে যা’ আছে লেখা সে তো শুধু

জ্ঞানের বর্ণমালা,

পুঁথির শিক্ষা শেষ ক’রে ধর

প্রকৃতির কথামালা;

পুষ্পের ভাষা শিখিয়া লও গো,

গগন-গ্রন্থ পড়,

বিশ্বমৈত্রী কর অনুভব

বাক্য করনা জড়।

জোয়াকিম্ মিলার।

উড়ো পাখী

উড়ো পাখী

(মাত্রাবৃত্ত অমিত্রাক্ষর)

আপন দুখে আপনি আছি মরম ব্যথায় মর্ম্মে মরি’

কোন দেশের এক উড়োপাখী মন্‌টি নিয়ে গেছে সরি’!

মধুর, মধুর তার মাধুরি!

নিজের লোহে লাল হ’য়েছি নিজের সাথে যুদ্ধ করি,’

জীবন—সে হ’য়েছে ব্যাধি, চিকিৎসা কর সুন্দরী!

চতুর! কেন আর চাতুরী?

নাস্‌পাতি ঢেকেছ বুকে, রেখেছ মুখ মিঠায় ভরি’,

ব্যথা দিয়ে চলে গেছ ওই খেদে, হায়, কেঁদে মরি;

নিঠুর! দেখা দাও গো ফিরি’!

ওগো আমার সাধের স্বপন! চিরদিনের যাদুকরী!

ভিখারী দুয়ারে তোমার আছি দিবা বিভাবরী,

হাজির আছি শুন্‌তে হুকুম,—

মধুর! মধুর যার মাধুরী!

ডুম্‌ মীরণ।

উপদেশ

উপদেশ

কথা শোন্, বুলবুলি!

দিন কিনে নে রে বন্য!

অরুণ এ দিনগুলি

ভালবাসিবারি জন্য।

বিজ্ঞেরা অকারণে

নিলে প্রণয়টিকে,

প্রেমিক জেনেছে মনে

বিজ্ঞ আমোদ ফিঁকে।

স্বপ্ন যদি এ প্রণয়

নিদ্রা বাড়ানো যাক্‌

জাগার বয়েস এ নয়,

সে ভাবনা আজ থাক্।

যদি দেখি সুখ-স্বপন

স্বপনেরি সাথে চুঁয়ায়,

শেষ করা যাবে জীবন

ভুলচুকে ধরা ধুয়ায়।

দে জুয়ি।

ঋণী ঠাকুর

ঋণী ঠাকুর

নারায়ণ দেউলিয়া এইবার!

লক্ষ লোকের কাছে ঋণী প্রভুটি আমার!

প্রভাত হলে দেউল ঘিরে জগৎ ফুকারে,—

‘আমার নিধি দাও হে ঠাকুর ফিরিয়ে আমারে';

তখন মায়ায় হন্ অমনি পাষাণ অবতার।

মরমপাতে খত লিখেছ,—আছে নাম সহি,

চরণ বাঁধা রেখে গেছ,—মাথায় তাই বহি;

এখন ফাঁকি দিবে কি তাই কও না কথা আর?

তুকা বেনে মহাজন আজ ঠাকুর দেনাদার।

তুকারাম।

একা

একা

গোলাপ এখনো রাঙা আগুনের মত!

নৈশ বায়ে বনবীথী দুলিছে মন্থরে;

তৃণশয্যাতলে, হায়, ছিনু নিদ্রাগত,

সহসা উঠেছি জেগে পল্লব-মর্ম্মরে।

ওগো এস! এস একবার!

গভীর এ নিশীথের শোনো হাহাকার!

চাঁদ লুকায়েছে লতা-কুঞ্জের আড়ালে,

জোছনার কুচিগুলি পড়ে হেথাহোথা;

বঞ্জুল-চুম্বিত কালো লহরের তালে,

জেগে ওঠে কবেকার-কোথাকার কথা!

আর্দ্র তৃণে নয়ন লুকাই,

তোমারে এমন চাওয়া কভু চাহি নাই।

আজিকার মত ভাল বাসিনি গো কভু,

খুঁজিনি কখনো বুঝি আজিকার মত!

আঁখি-অধরের খেলা খেলেছি তো তবু,

হাসিমুখে আদর তো করিয়াছি কত।

সুগোপন সুখের আভাস,—

তারো মাঝে, মনে হয়, পড়েছে নিশ্বাস।

তুমি যদি দেখিতে,—ও জোনাকী দু’টিরে,—

দুটি প্রাণী রাত্রি মাঝে একটি আলোক;

চারিদিকে বনচ্ছায়া; নিশীথ তিমিরে

সাঁতারিছে তৃপ্তিহ্রদে তৃপ্তিহীন চোখ!

এস! একা রহিব গো কত;

গোলাপ এখনো রাঙা আগুনের মত!

রিকার্ড ডেহ্মেল।

কবি

কবি

চন্দ্র আমার মনের মানুষ!

বন্ধু সে পারাবার!

গগন আমার ভবনের ছাদ!

প্রভাত আমার দ্বার!

সিন্ধু-শকুনে সঙ্গী করিয়া

চুমি গো গগন-ভালে,

নিজ দেবত্ব লুটাতে না পারি

ধরণীর ধূলিজালে।

চাং চি হো।

করুণার দান

করুণার দান

বড় ভাল বেসেছিনু, ওরে!

বেসেছিনু দীর্ঘ দিন ধ’রে,—

করুণায় তাই ভগবান

কণ্ঠে মোর দিয়েছেন গান।

বিফলে বেসেছি ভাল ব’লে—

কণ্ঠে সুর টুটে পলে পলে,—

করুণায় তাই ভগবান

মৃত্যু মোরে করিছেন দান।

নিগ্রো ডান্‌বার।

কর্ত্তব্য ও পুরস্কার-লোভ

কর্ত্তব্য ও পুরস্কার-লোভ

পুরস্কার-লোভে হায় কর্ত্তব্য কে করে?

মানুষ কি দেছে কবে বর্ষা-জলধরে?

‘কুরাল’-গ্রন্থ।

কামনা

কামনা

কাছে কাছে সদা রহিব তোমার এই শুধু মোর সাধ,

তোমার নিকটে বসিতে পাইব,–-এই মহা আহলাদ!

সারাদিনমান নয়ন ভরিয়া রহিবে মূরতি তব,

নিশার আঁধারে চরণ দু’খানি মাথায় তুলিয়া ল’ব।

গহন ছায়ায় শয়ন বিছায়ে, ও রাঙা অধর হ’তে

মুহুর্মুহু মধু পান করিব হে ভাসিব সুধার স্রোতে!

বিক্ষ ত হিয়া যাবে জুড়াইয়া স্নিগ্ধ প্রলেপে ভিজে,

এর বেশী সুখ চাহি না গো আমি ভাবিতে পারি না নিজে।

ঊষর এ মোর মন-মরুভূমি, তৃষায় চেতনা-হারা,

নব প্রাণ দানি’ কবে উছলিবে তোমার স্নেহের ধারা?

জামি।

কুতার্কিক ও কাঠ্‌ঠোকরা

কুতার্কিক ও কাঠ্‌ঠোকরা

কুতার্কিকের নাহিক প্রভেদ

কাঠ্‌ঠোকরার সঙ্গে,

ঠুকরিয়া পোকা বাহির করে সে

বনস্পতির অঙ্গে;

যোজন জুড়িয়া বিতরে যে জন

ফল ছায়া আপনার,—

নীড় বাঁধি’ সুখে শত শত পাখী

আশ্রয়ে আছে যার,—

অটল যে আছে এতকাল সহি’

কাল-বৈশাখী হাওয়া,—

কাঠঠোকরার মতে সে অসার;

পোকা যে গিয়েছে পাওয়া!

রিকার্ড ডেহ্মেল।

কৃপা-কার্পণ্য

কৃপা-কার্পণ্য

অবগুণ্ঠন কর গো মোচন, নিশার আঁধার

গিয়েছে ক্ষ’য়ে,

বাহির হও গো, তোমারে দেখিতে সূর্য্য এসেছে

বাহির হ’য়ে!

মোর মরমের যতেক তন্তু যত খুসী তুমি।

জটিল কর,

কুসুম-গন্ধি কুন্তল শুধু কুটিল কোরো না,

মিনতি ধর।

যেখানে সেখানে অমন করিয়া চাহনি তোমার

যেয়ো না হানি’,

সারা ধরণীতে হাহাকার ধ্বনি তুলো না, তুলো না,

তুলো না রাণী।

আকাশের তারা গণিয়া গণিয়া আমি যে যামিনী

কাটাই নিতি,

জাগো জাগো মোর প্রভাতের আলো! মৌন ধরার

ফাগুনী গীতি!

ফজুলীর দিন কাতরে কাটিছে;-কারণ তাহার

সুধালে কেহ,-

সরমের কথা কি বলিবে? হায়, একটুও তারে

দাওনি মেহ!

ফজুলী।

কৌশলী

কৌশলী

(প্রাচীন মিশর)

শয্যাগ্রহণ করিয়া রহিব পড়িয়া ঘরে,

পীড়িত জানিয়া পড়শী, আসিবে দেখিতে মোরে;

আমি জানি মনে তাহাদেরি সনে আসিবে প্রিয়া,—

আমারে নীরোগ করিয়া, বৈদ্যে লজ্জা দিয়া!

ক্লান্ত সিপাহী

ক্লান্ত সিপাহী

চির সহিষ্ণু সাহসী সিপাহী

ক্লান্ত চরণ আজ,

বিশ্রাম তরে আশ্রয় নেছে

নিভৃত সমাধি-মাঝ।

মিথ্যা আজিকে তূর্য্য-নিনাদ,

আর সে দিবে না কান;

ছাউনি ফেলেছে মরণের ছায়ে,

যাত্রার অবসান।

বালক বয়সে ছেড়ে এসেছিল

গরীব বাপের ঘর,

ভাগ্য ফিরাতে সৈনিক হ’য়ে

যুঝেছে নিরন্তর;

দুর্গম দেশে সে দুঃসাহসী

ফিরেছে সর্ব্বদাই,

সম্পদ কিবা না ছিল সহায়

না ছিল বন্ধু ভাই।

দুঃখ বিপদ গ্রাহ্য করে নি।

চ’লেছে গাহিয়া গান,

আজি বিশ্রাম পেয়েছে আরাম

ঘূর্ণার অবসান।

ফাল্গুনী মিঠা পুষ্প ছিটায়ে

আবরিয়া শবাধার,

দুঃখ সুখের দোসরেরা তার

মুছে আঁখি শতবার;

কঁদিয়া বেচারী সিপাহীর নারী

চলিয়াছে ম্রিয়মান,

তার সিপাহীর হ’য়ে গেছে রণ

যাত্রার অবসাণ!

অজ্ঞাত।

ক্ষুদ্রগাথা

ক্ষুদ্রগাথা

“ও রাজপুত্র! ও বন্ধু! দেখ চেয়ে!”

“ডাকিছ কি সখা শরের আঘাত পেয়ে?”

“দেখি, দেখি,-বুকে কিসের ও রাঙা দাগ?”

“ওকি দেখিতেছ? ছড় গেছে বুঝি? যাক্।”

“ও রাজপুত্র! ফের, ফের এই বেলা,

খাড়া এ পাহাড়, উপরে শত্রু মেলা!”

“পাথরেতে ঠেকে উছট লেগেছে বুঝি;

ও সিপাহী লোক! বন্দুক ধর! যুঝি!”

হূণ সৈন্যেরা চ’লেছে দর্পভরে;

রাজার পুত্র,সহসা আহত শরে,—

কহিল ফুকারি’ “হোঠোনা সিপাহী লোক!”

আর কথা নাই,-নিবেছে জীবনালোক।

জিউলে।

খেয়ালির প্রেম

খেয়ালির প্রেম

ওগো রাণী! দাস পড়িয়াছে বাঁধা তোমার চুলের

শিকল-জালে,

সকল দাসের আগে চলা তাই দৈবে ঘটেছে

মোর কপালে!

প্রেমের শিবির রচনা করেছি, নিন্দা-নাকাড়া

গিয়েছে বেজে;

গোলাম তোমার আমীর হ’য়েছে, ওই চাহনির

ভূষণে সেজে!

আমার মনের গহন গুহায় পশেছে তোমার।

দস্যু আঁখি;—

হৃদয় পরাণ আতিপাতি করি’ ধরিতে তোমারে

পারিব নাকি?

রাঙা অধরের চুম্বন লোভে রাঙা মদিরার

পাত্র চুমি,

সুরার পাত্র দেখিবা মাত্র মনে হয়, বুঝি,

নিকটে তুমি।

বিধাতার বরে গরীব মেসিহি আপন খেয়ালে

রয়েছে সুখে,

বাদশার চেয়ে বড় হয়ে গেছে তোমার মুরতি

ধরি’ এ বুকে।

মেসিহি।

খোকার আগমনী

খোকার আগমনী

রামধনুকের রঙীন্‌ সাঁকো দিয়ে

নাম্‌ল কে গো সটান্‌ স্বর্গ থেকে!

মুখে মুঠায় সোহাগ-সুধা নিয়ে

উজল চোখে স্নেহের কাজল এঁকে!

এগিয়ে তারে দ্যান্‌ দেবতা কত,—

কতই পরী নাইক লেখাজোখা!

পথ চেয়ে তার রয়েছে লোক যত,

বাছনি! আনন্দ দুলাল! খোকা!

ক্যাপলন্‌।

খোয়ানো ও খোঁজা

খোয়ানো ও খোঁজা

আপন মায়ের খোঁজে গেছে মা আমার,

তার আগে তার মার (ও) অমনি ব্যাপার!

জগৎ সমান ভাবে চলিয়াছে সোজা,

চলেছে সমান ভাবে খোয়ানো ও খোজা!

‘নাল-আদিয়ার’—গ্রন্থ।

গান

গান

নয়নে নয়ন রাখ গো

হাতখানি রাখ হাতে,

অধরে অধর ঢাক গো

ঘন চুম্বন পাতে!

চুম্বন সে যে মধুর মদিরা

প্রেমিকে করে সে পান,

পিয়াও, পিয়াও, কাফ্রি-কুমারী!

চুম্বন কর দান।

কমল—কমলে নেহারি’

ফোটে গো যেমন প্রাতে,

প্রণয় তেমনি দোহারি

বিকশিছে এক সাথে!

শ্যামল তমাল, শ্যামা লতিকায়

কোরো না গো ঠাই ঠাই,

কাফ্রির কালো কাফ্রিণি ভাল,

তুলনা তাহার নাই।

নিগ্রো ডানবার।

গুপ্তপ্রেম

গুপ্তপ্রেম

হিয়ার মাঝারে প্রাণ কাঁদে মোর

খেদে দু’নয়ন ঝুরে;

বঁধুতে আমাতে হ’ল না মিলন,

চিরদিন দুরে দুরে।

মন্দ লোকের সন্দেহে ধিক্‌,

বিধাতা জানেন মন,

চক্ষের দেখা দেখিতে পাবনা

তাই ভাবি অনুখন।

কুরেনবার্গ।

গ্রন্থাগারে

গ্রন্থাগারে

মৃতের সভায় মোর কাটিছে জীবন

দৃষ্টি মম পড়ে গো যেথাই,

সেথাই জাগিছে কোনো মনস্বীর মন;

কোনোদিন মৃত্যু যার নাই।

মৃতের বন্ধুতা কভু হয় নাকো ক্ষীণ,

আলাপ মৃতেরি সাথে করি রাত্রিদিন।

উৎসবে তাদেরি ল’য়ে করি মহোৎসব,

দুর্দ্দিনে সান্ত্বনা ভিক্ষা করি,

কি পেয়েছি, কি যে মোরে দেছে তারা সব,

সে কথা যখনি আমি স্মরি,

তখনি এ অন্তরের কৃতজ্ঞতা ভরে

কপোল বহিয়া মুহু অশ্রুধারা ঝরে।

অতীতে মৃতের দেশে পড়ে আছে প্রাণ,

আমি বাস করি গো অতীতে,

মৃতের ভাবনা ভাবি, গাহি মৃতগান,

মৃত দুখে দুখ পাই চিতে;

তাদের চরিত্রে যাহা আছে শিখিবার

সঞ্চিত করিয়া লই অন্তরে আমার।

তাদের আশায় আশা দিয়েছি মিলায়ে,

পাব ঠাঁই তাদেরি মাঝারে,

চলিব তাদেরি সাথে নিশান উড়ায়ে

শত শত শতাব্দীর পারে!

নাম রেখে যাব আমি জগতে নিশ্চয়,

যে নাম ধূলিতে কভু হবে নাকো লয়।

সাউদী।

গ্রীষ্ম-মধ্যাহ্নে

গ্রীষ্ম-মধ্যাহ্নে

মধ্যাহ্ন; গ্রীষ্মের রাজা, মহোচ্চ সে নীলাকাশে বসি’

নিক্ষেপিল রৌপ্যজাল, বিস্তৃত বিশাল পৃথ্বী পরে;

মৌন বিশ্ব; দহে বায়ু তুষানলে নিশ্বসি’ নিশ্বসি’;

জড়ায়ে অনল-শাড়ী বসুন্ধরা মূরছিয়া পড়ে।

ধূ ধূ করে সারাদেশ; প্রান্তরে ছায়ায় নাহি লেশ;

লুপ্তধারা গ্রাম-নদী; বৎস গাভী পানীয় না পায়;

সুদূর কানন-ভূমি (দেখা যায় যার প্রান্তদেশ)

স্পন্দন-বিহীন আজি; অভিভূত প্রভূত তন্দ্রায়।

গোধূমে সর্ষপে মিলি’ ক্ষেত্রে রচে সুবর্ণ সাগর,

সুপ্তিরে করিয়া হেলা বিলসিছে বিস্তারিছে তারা;

নির্ভয়ে করিছে পান তপনের অবিশ্রান্ত কর,

মাতৃ ক্রোড়ে শান্ত শিশু পিয়ে যথা পীযুষের ধারা।

দীর্ঘনিশ্বাসের মত, সন্তাপিত মর্ম্মতল হতে,

মর্ম্মর উঠিছে কভু আপুষ্ট শস্যের শীষে শীষে;

মন্থর, মহিমাময় মহোচ্ছ্বাস জাগিয়া জগতে,

যেন গো মরিয়া যায় ধূলিময় দিগন্তের শেষে।

অদূরে তরুর ছায়ে শুয়ে শুয়ে শুভ্র গাভীগুলি

লোল গল-কম্বলেরে রহি’ রহি’ করিছে লেহন;

আলসে আয়ত আঁখি স্বপনেতে আছে যেন ভুলি’,

আনমনে দেখে যেন অন্তরের অনন্ত স্বপন।

মানব! চলেছ তুমি তপ্ত মাঠে মধ্যাহ্ন সময়ে,

ও তব হৃদয়-পাত্র দুঃখে কিবা সুখে পরিপূর!

পলাও! শূন্য এ বিশ্ব, সূর্য্য শোষে তৃষামত্ত হয়ে,

দেহ যে ধরেছে হেথা দুঃখে সুখে সেই হবে চূর।

কিন্তু, যদি পার তুমি হাসি আর অশ্রু বিরর্জ্জিতে,

চঞ্চল জগত মাঝে যদি থাকে বিস্মৃতির সাধ,

অভিশাপে বরলাভে তুল্য জান,—ক্ষমায় শান্তিতে,

আস্বাদিতে চাহ যদি মহান্ সে বিষন্ন আহ্লাদ,—

এস! সূর্য্য ডাকে তোমা, শুনাবে সে কাহিনী নূতন;

আপন দুর্জ্জয় তেজে নিঃশেষে তোমারে পান ক’রে,—

শেষে ক্লিন্ন জনপদে লঘু করে করিবে বর্ষণ,

মর্ম্ম তব সিক্ত করি’ সপ্তবার নির্ব্বাণ-সাগরে।

লেকঁৎ-দে-লিল্‌।

ঘুম-ভাঙা

ঘুম-ভাঙা

(তামিল ছড়া)

আহা, আহা ‘আ-ঈ’!

আহা মরে যাই,

কচি আঙুল ঘুরুণি,

বাছ, পরাণ জুড়ুনি,

কে বেড়াবে হামা দিয়ে,

কে বেড়াবে দাওয়ায়,

কে খেল্‌বে ধুলো নিয়ে

ছাঁচতলাটির ছাওয়ায়!

আহা আহা ‘আ-ঈ’

ঘুম ভেঙেছে, মায়ি!

মুক্তো ঘেরা টোপর মাথায়

কে দেয় রে হামা?

চুমু দিয়ে জাগিয়ে দিলেন

মায়ের ভাই মামা।

আহা, আহা ‘আ-ঈ’

আহা মরে যাই,

কিছু ভাল লাগছে নাকো

দুধটি এখন চাই।

রাঙা পলার মালা গলায়,

গায়ে জরির জামা,

দুধ খাওয়াতে জাগিয়ে দিলেন

মায়ের ভাই মামা।

আহা, আহা ‘আ-ঈ’

একটি চুমু খাই,

থোকায় কোলে ক’রে মোরা

নেচে নেচে যাই;

দুধটি থেয়ে কল্‌কলাবি,—

‘বকুম্‌ বকুম্’ বোল্‌;

বড় আমোদ হয়রে তোমার

পেলে মামার কোল।

ঘুমপাড়ানি গান

ঘুমপাড়ানি গান

(কসাক্‌)

ঘুম যায়রে, ঘুম যায়রে, খোকা ঘুম যায়;

চাঁদ দেখ্‌তে চাঁদ উঠেছে নীল আকাশের গায়!

ভয় নেই রে মুদ্‌ব নাকো আমি আঁখির পাত,

চৌকি দিয়ে মানৎ মেনে কাটিয়ে দেব রাত।

আয় ঘুম আয়!

টেরেক্‌ নদী টগ্‌বগিয়ে টাট্টু, ঘোড়ার মত

গণ্ডশিলার উপর দিয়ে ছুটছে অবিরত;

রাখছে ঘাটি ক্রুদ্ধ কসাক্, তলোয়ারে তার হাত,

চৌকি দিয়ে মানৎ মেনে কাটাই আমি রাত।

আয় ঘুম আয়!

খোকা রে তুই বেটাছেলে, বেটাছেলের দল

ছিনিয়ে নিয়ে যাবে তোরে, পড়বে চোখের জল।

ঘোড়ায় চড়ে কোন্ সুদূরে যাবি তাদের সাথ!

মাথা খুঁড়ে মানৎ মেনে কাট্‌বে আমার রাত।

আয় ঘুম আয়!

কসা বংশে জন্ম তোমার, কঠিন তোমার প্রাণ,

মনের মধ্যে তবুও আছে মায়ের প্রতি টান;

লড়াই তবু বাধলে, থোকা, ছুট্‌বি অকস্মাৎ,

মাথা খুড়ে, মানৎ মেনে, কাট্‌বে আমার রাত।

আয় ঘুম আয়!

বিদায় বেলায় যখন আমি কর্ব্ব আশীর্ব্বাদ,

উড়িয়ে নিশান চড়্‌বি ঘোড়ায় হেলিয়ে ডাহিন হাত।

খোকা আমার যুদ্ধে যাবে কঠিন কসাক্ জাত,

মাথা খুঁড়ে মানৎ মেনে কাট্‌বে আমার রাত।

আয় ঘুম আয়!

দলের সঙ্গে থাক্‌বি তবু ঠেক্‌বে ফাঁকা ফাঁকা,

আমায় বাছা, থাক্‌তে হবে এই ঘরেতেই একা;

যেথায় থাকিস্‌ মনে রাখিস্‌ মায়ের আশীর্ব্বাদ,

জানিস্‌ মনে মানৎ মেনে কাটাই আমি রাত।

আয় ঘুম আয়!

প্রসাদী ফুল দেব আমি সঙ্গেতে তোমার,

যুদ্ধে গিয়েও মায়ের কথা ভাবিস্‌ এক একবার।

যেখানে যাস্‌ যেথায় থাকিস্‌ তোর কিছু নেই ভয়,

মানৎ মেনে আপদ বালাই কর্ব্ব আমি ক্ষয়।

আয় ঘুম আয়!

চড়ুই

চড়ুই

ছোটো একটি চড়ুই পাখী,

তার পরণে পোষাক খাকী,

মোর ঘরের বাহিরে থাকি

ওঠে ‘চিপিক্‌’ ‘চিপিক্‌’ ডাকি!

টোকা দ্যায় সে সাসির কাছে,

যেন আসিতে চায় গো কাছে,

যেন শোনাতে চায় সে মোরে

তার গান দিনমান ধ’রে;

আমি কাজ করি আনমনে,

কে বল্ চড়ুয়ের গান শোনে?

পাখী ‘চিপিক্‌’ ‘পিচিক্ ক’রে

উড়ে চ’লে গেল অনাদরে।

আশা, সান্ত্বনা, ভালবাসা,

ওগো, স্বর্গে যাদের বাসা,

তারা পাখীর মতন এসে

এই মানুষেরে ভালবেসে

বসি’ জীবনের বাতায়নে

গান শোনায় গো জনে জনে;

মোরা ডুবে থাকি শত কাজে,

তারা ঘেঁষিতে পায় না কাছে;

মোরা ভুলে থাকি হাসি খুসি,

শুধু, ঠেলাঠেলি ঘুসোঘুসি,

তারা অনাদরে যায় ফিরে,

তখন ভাসি নয়নের নীরে।

নিগ্রো ডান্‌বার।

চাঁদের লোভ

চাঁদের লোভ

অবগুণ্ঠন ঘুচাও, রূপের

আলোকে ভুবন ভরিয়া দাও,

পুরাতন এই ধূলির ধরণী

নিমেষে স্বর্গ করিয়া দাও।

স্বর্গ-নদীর মৃদু-হিল্লোল

হাসিতে তোমার দোলায়ে দাও,

অগুরু-গন্ধে ছেয়ে ফেল দেশ,—

কুঞ্চিত কেশ এলায়ে দাও!

তব কপোলের সুকোমল লোম।

ফার্সী আখরে হুকুম লিখে,

বাতাসের হাতে দিয়ে, বলে দেছে,

“জয় করে এস দিগ্বিদিকে!”

অমৃত কূপের সন্ধান, যদি

বিধাতা না দেন, পায় না কেহ,

হাজার বরষ ঘুরে মর কিবা

মাটি হ’য়ে যাক সোনার দেহ!

জয়নাব! তুমি অ-বলার রীতি

এবারের মত ছাড়িয়া দাও,

নিষ্ঠায় মন দৃঢ় কর, সখী,

আকাশের চাঁদ পাড়িয়া নাও!

জয়নাব।

চিঠি

চিঠি

“প্রণাম শত কোটি,

ঠাকুর! যে খোকাটি

পাঠিয়ে দেছ তুমি মাকে,

সকলি ভাল তার;—

কেবল কাঁদে, আর,

দাঁত তো দাও নাই তাকে!

পারে না খেতে, তাই,

আমার ছোট ভাই;

পাঠিয়ে দিয়ো দাঁত, বাপু?

জানাতে এ কথাটি

লিখিতে হ’ল চিঠি।

ইতি। শ্রী বড় খোকা বাবু।”

রেক্সফোর্ড্‌।

চির বিচিত্র

চির বিচিত্র

জগতের এই নহবৎ-ঘরে বাদ্যকরের দলে,

জনম-নাকাড়া বাজাতে বারেক একে একে সবে চলে!

নিত্য প্রভাতে নুতন সত্য জেগে ওঠে অভিরাম,

গৌরব-ঘটা ঘিরি’ লয়ে চলে নূতন নূতন নাম!

সংসার যদি সমানে চলিত একটানা এক ঘেয়ে,

কত না তত্ত্ব গুমরি’ মরিত প্রকাশের পথ চেয়ে;

তপনের ছটা যদি না ফুরাত ফুরালে দিনের নাট,

তা হলে কি কভু ফুটিত প্রদোষে ফুল্ল তারার হাট?

শিশিরের যদি অন্ত না হ’ত, তবে বনে উপবনে

গোলাপের কলি আঁখি কি মেলিত ফাগুনের চুম্বনে!

জামি।

ছোটো খাটো

ছোটো খাটো

ছোটো খাটো স্নেহের দু’টো কথা,

ছোটো খাটো সহজ উপকার,

পৃথিবীরে স্বর্গ ক’রে তোলে,

ক’রে তোলে পরকে আপনার!

অজ্ঞাত।

জন্মভূমি

জন্মভূমি

শ্রদ্ধা রাখিয়ে সারাটি জীবন স্বদেশের গৌরবে,

হেথা যে তোমার হিন্দোলা ছিল, হেথাই সমাধি হ’বে;

আকাশের তলে তোরে কোল দিতে আছে আর কোন্ দেশ?

দুঃখ কি সুখ যা’ ঘটুক তোর হেথা আদি হেথা শেষ।

তাদের পূর্বব পুরুষের স্মৃতি লেখা আছে এরি বুকে,

কত বরেণ্য এদেশে ধন্য করিয়াছে যুগে যুগে;

‘অর্পাদ-বীর অর্পণ তোরে করে গেছে এই ভিটা,

‘হুনিয়া’ ইহার নামটি ক’রেছে দুনিয়ার মাঝে মিঠা।

ম্যাগিয়ায়! নিজ জন্মভূমিতে ভক্তি রাখিয়ো তবে,

আজন্ম সে যে ক’রেছে লালন অন্তে সে কোলে লবে;

বিপুল জগতে তোরে কোল দিতে আর কোনো দেশ নাই,

মরণ বাঁচুন এইখানে তোর দুখ সুখ এই ঠাঁই।

ভোরোজ্‌মার্টি।

জাতীয় সঙ্গীত

জাতীয় সঙ্গীত

(জাপান)

অযুত যুগ ধরি’ বিরাজো মহারাজ!

রাজ্য হ’ক তব অক্ষয়;

উপল যতদিন না হয় মহীধর;-

প্রভূত শৈবালে শোভাময়।

জিজ্ঞাসা

জিজ্ঞাসা

(বাসুটোল্যাণ্ড)

কে ছুয়েছে দু’টি হাতে আকাশের তারা?

শূন্যে চাঁদ কে রেখেছে ধ’রে?

কেন ছুটে নদী নদ অবিরল ধারা?-

শ্রান্ত হ’লে জুড়াইতে যায় কার ঘরে?

ভেসে ভেসে আসে মেঘ, ভেসে চলে যায়,

তার দেশ কোথায়? কে জানে!

কে বরিষে বৃষ্টি ধারা? সেকি ওঝা? হায়,

তারে কভু দেখিনি তত উঠিতে বিমানে!

জিন্‌

জিন্‌

নিরজন

নিদপুর,—

নিকেতন

মৃত্যুর;

বায়ু, হায়,

মুরছায়,

ঢেউ নাই

সিন্ধুর।

আকাশ জুড়ে

একি আভাষ।

নিশার পড়ে

ঘন নিশাস!

কাহারা ধায়

প্রেতের প্রায়

অনল ভায়

মানি’ তরাস।

ঘোর কলরব।

তন্দ্রা মিলায়;

হ্রস্ব দানব

অশ্ব চালায়।

পলায় যে রড়ে

তারি ’পরে পড়ে,

ঢেউয়ে ঢেউয়ে চড়ে

নৃত্য-লীলায়!

কাছে আসে হুঙ্কার,

ধ্বনিছে প্রতিধ্বনি;

পুণ্যের কারাগার

মঠে কি মন্যু-ফণী?

কিবা ঘন-জনতায়

বজ্র ঘোষণা ধায়,

কভু মৃদু,—মরি’ যায়,

কভু উঠে রণরণি।

কি সর্বনাশ! ফুকারিছে জিন!

তাই হলহলা উঠেছে, ওরে!

পালা যদি চাস বাঁচিতে দু’দিন।

এই বেলা ওই সোপান ধরে'।

গেল,—নিবে গেল প্রদীপ আবার,

কালিমায় ঢেকে গেল চারিধার,

গ্রাসি’ ঘর দ্বার নিকষ আঁধার

বসিল চড়িয়া হর্ম্ম্য ‘পরে।

সাজ ক’রে আজ বেরিয়েছে জিন্ যত,

ঘূর্ণিবাতাসে পড়ে গেছে ‘হুস’ ‘হাস'!

দাব-দহনেতে দীর্ণ তরুর মত

পর্ণ ঝরায়ে ঝাউ ফেলে নিশ্বাস!

ধায় জিন্ যত শূন্যে পাইয়া ছাড়া,

অদ্ভুত-গতি দ্রুত অতি চলে তারা;

সীসার বরণ ভীষণ মেঘের পারা

বজ্র যখন কুক্ষিতে করে বাস।

এল কাছে আরো,–এল ঘিরে এল ক্রমে এ যে!

আগুলি দুয়ার দাঁড়াও, যুঝিব প্রাণপণে;

কি গণ্ডগোল বাহিরে আজিকে ওঠে বেজে!

দৈত্য দানার হানা-দেওয়া ঘোর গর্জ্জনে।

বেঁকে নুয়ে পড়ে বাহাদুরী কড়িকাঠ যত,

জলজ কোমল নমনীয় লতিকার মত!

নাড়া পেয়ে কাঁপে পুরাণো জানালা দ্বার কত

মরিচায় জরা কবচের ক্ষীণ বন্ধনে।

বিমরি’ গুমরি’ গরজিছে এ যে নরকের কলরব!

উত্তর-বায়ু চলেছে তাড়ায়ে পিশাচ প্রেতের পাল!

এবার রক্ষা কর ভগবান! কালো পণ্টন সব

পদ-ভরে ভেঙে ফেলে বুঝি ছাদ! একি হ’ল জঞ্জাল!

প্রাচীর হেলিছে, দুলিছে, টলিছে, সারা গৃহ যেন কাঁদে;

সূর্য্য বুঝি গো কক্ষ ছাড়িয়া প্রলয়-ঝঞ্চা-ফাঁদে

পড়ে গিয়ে আজ কেবলি গড়ায় শুষ্ক পাতার ছাঁদে;

ঘুর্ণি হাওয়ায় টেনে নিয়ে যায়, দাঁড়ায় না ক্ষণকাল।

হজরৎ! আজ বান্দা ঠেকেছে বড় দায়,

নিশাচর পাপ পিশাচের হাতে কর ত্রাণ;

মুণ্ডিত শিরে বার বার নমি তব পায়,

ভয়বিহ্বলে নির্ভয় কর, রাখ প্রাণ।

এই কর প্রভু! কুহকী প্রেতের যত ছল,

ভকতের দ্বারে এসে হয় যেন হতবল;

পক্ষ-লগন নখে আঁচড়িয়া সাসিতল,

আক্রোশে তারা ফিরুক শিকার করি’ ঘ্রাণ।

গেছে, চলে গেছে!—চলে গেছে জিন্ যত;

উড়িয়া পড়িয়া ছুটেছে গগন-পারে!

ছাদে থেমে গেছে নৃত্য সে উদ্ধত,

শত করাঘাত আর পড়িছে না দ্বারে।

শিহরে কানন পলায়ন-বেগ-ভরে,

শিকল বেড়ীর শব্দে আকাশ ভরে,

গ্রামের প্রান্তে সীমাহীন প্রান্তরে

শালতরু যত নুয়ে পড়ে সারে সারে।

ধীরে, ধীরে, ধীরে, দূরে, দূরে, দূরে,

পাখার আওয়াজ মিলায়ে আসে।

মৃদু হ’তে ক্রমে মৃদুতর সুরে

কঁপে সে আসিয়া কানের পাশে!

মনে হয়, শুনি ঝিল্লির ধ্বনি,

স্পন্দিছে সারা নিথর ধরণী,

কিবা শিলাপাতে মৃদু ঠন ঠনি

পুরাণো ছাদের শেহালা-রাশে।

সেই অপরূপ ধ্বনি।

শোনা যায়! শোনা যায়!

শিঙার শব্দ গণি’

বেদুইন্ ফিরে চায়!

তটিনী-তটের তান,

উচ্ছাসে অবসান!

সোনালি স্বপ্ন-খান্

শিশুর নয়ন ছায়।

জিন্ বিভীষণ,—

মৃত্যুর চর,

আঁধারে গোপন,

করে কলেবর;

করে গরজন

গভীর, ভীষণ,

ঢেউয়ের মতন;

রহি’ অগোচর।

ঘুমায়ে পড়ে

মৃদুল স্বর,

ঢেউ কি নড়ে

তটের ‘পর!

প্রেতের লাগি’

মুক্তি মাগি’

জপে কি যোগী

যুক্তকর!

মনে হয়,

কুস্বপন,

কানে কয়

অনুখন!

কে কোথায়!

মিশে যায়!

মূরছায়

গরজন!

ভিক্তর হুগো।

জীবন

জীবন

খাবার জন্যে একমুঠো ভাত, শোবার জন্যে একটি কোণ,

কাঁদতে পূরো একটা বেলা, হাস্‌তে মোটে একটু ক্ষণ;

আনন্দ সে দু’এক পোয়া, দুঃখ কষ্ট দু’এক মণ,

ফুর্ত্তি যত দ্বিগুণ তাহার মৌন বিষাদ-বিলপন;

এই জীবন!

এক্‌টি কোণ আর একমুঠো ভাত-প্রেম থাকেত রাজ্যধন,

কান্না তথন স্বস্তি আনে, একটু হাসিই জুড়ায় মন;

ফুর্ত্তি তখন দ্বিগুণ মিঠে; দুর্ভাবনা কতক্ষণ?

হাসির কাছে আশী রচে পারার মতন উদ্বেজন;

এই জীবন।

নিগ্রো ডান্‌বার।

জ্ঞান পাপী

জ্ঞান পাপী

হৃদয় সে হ’ল দর্পণ আপনার,

অতল-গভীর, তরল-পরিষ্কার!

জ্ঞান-বাপী-জলে সন্ধ্যা নামিল, হায়,

একটি তারার দীপ্তি দুলিছে তায়।

অকারণে আলো করিয়া প্রেতস্থান

মশাল জ্বালিয়া হাসিতেছে শয়তান।

এ এক গর্ব্ব! তৃপ্তি এ অপরূপ!

জেনে শুনে ঘোলা ক’রে ভোলা জ্ঞান-কূপ!

বদ্‌লেয়ার।

তবু

তবু

তবু মোরে হ’ল না প্রত্যয়!

হাজারের মাঝে, ওরে! বেছে যে নিয়েছে তোরে

আমার এ অবোধ হৃদয়।

ছিনু একা, ছিলাম স্বাধীন;

তোমারি লাগিয়া হায়, শিকল পরেছি পায়,

রহিব তোমারি চিরদিন।

ফর্দ্দূসী।

তান্‌কা

তান্‌কা

[‘তান্‌কা’ জাপানী সনেট। ইহা পাঁচ পংক্তিতে সম্পূর্ণ। ইহার প্রথম ও তৃতীয় চরণে পাঁচটি করিয়া এবং দ্বিতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম চরণে সাতটি করিয়া অক্ষর থাকে। তান্‌কা সাধারণতঃ অমিত্রাক্ষর হয়।]

তিনটি কথা

তিনটি কথা

মানুষের মনে আমি সযতনে

লিখে যাব তিন বাণী,

অগ্নি আখরে পরাণের ’পরে

অমর এ লিপিখানি;-

আশা রেখো মনে, দুর্দ্দিনে কভু

নিরাশ হয়োনা, ভাই,

কোনোদিন যাহা পোহবে না, হায়,

তেমন রাত্রি নাই।

রেখে বিশ্বাস, তুফান বাতাসে,

হ’য়ো না গো দিশাহারা,

মানুষের যিনি চালক, তিনিই

চালান চন্দ্র তারা।

রেখো ভালবাসা সবারি লাগিয়া,

ভাই জেনো মানবেরে,

প্রভাতের মত প্রভা দান কোরো

জনে, জনে, ঘরে, ঘরে।

মনে রেখ এই ছোট ক’টি কথা,-

‘আশা’, ‘প্রেম’, ‘বিশ্বাস’,

আঁধারে জ্যোতির দরশন পাবে,

পাবে বল, যাবে ত্রাস।

শিলার।

তুমি

তুমি

তুমি নর, তুমি নারী,—

যুবক, বালক, বালা;

তুমিই আবার লাঠি হাতে ধরি’

বুড়া হ’য়ে হও আলা!

তুমি আছ চারিদিকে,

চারিদিকে তব মুখ;

তুমিই আবার জন্ম লইয়া

জানি কি পাও সুখ!

নীল পতঙ্গ তুমি,

রাঙা-আঁখি তুমি শুক,

বিদ্যুভরা মেঘ তুমি, প্রভু!

সাগর, সমুৎসুক!

অনাদি তোমার নাম,

অন্ত তোমার নাই;

তুমি আছ বলে বিশ্বভুবন

বর্ত্তিয়া আছে তাই।

শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ।

তেলুগু ছড়া

তেলুগু ছড়া

খোকামণি মায়ের গলার মাদুলি!

খোকামণির বৌটি হ’ল কুঁদুলি!

কুঁদুলিকে খোকা সাহেব কোণে দিলেন ঠেসে,

কুঁদুলিকে নিয়ে গেল খ্যাঁক্‌শেয়ালি এসে!

তৈমূর-স্মরণ

তৈমূর-স্মরণ

(তাতার ও তিব্বত-বাসী মোগলদিগের মধ্যে প্রচলিত)

শিবিরে মোদের দৈব পুরুষ

তৈমূর ছিল যবে,

মোগল জাতির বীর্য্য তখন

বিখ্যাত ছিল ভবে;

ধরণী সে হ’ত নিজে অবনত

মোগলের পদভরে,

শুধু কটাক্ষে লক্ষটা জাতি

কাঁপিয়া মরিত ডরে!

তৈমূর! অবিলম্বে তুমি কি

ল’বে না নূতন কায়?

এস, ফিরে এস দৈর পুরুষ

র’য়েছি প্রতীক্ষায়।

মোগল আজিকে শান্ত হ’য়েছে,—

নিরীহ গড্‌ডলিকা,

নিরালয় মাঠ আলয় যাদের

হৃদয়ে বহ্নিশিখা!

কই গো তেমন শিরদার কই?

কোথা সেই সর্দ্দার?

মোগলে যেজন রণপণ্ডিত

করিবে পুনর্ব্বার!

তৈমূর! অবিলম্বে তুমি কি

ল’বে না নূতন কায়?

এস, ফিরে এস দৈব-পুরুষ

র’য়েছি প্রতীক্ষায়।

মোগলের ছেলে বন্য ঘোড়ায়

বাহুবলে বশে আনে,

দৃষ্টি তাহার মরু-বালুকার

লিখন পড়িতে জানে!

তবু সে দৃষ্টি ব্যর্থ এখন

মিছা কাজে আছে ভুলি’;

বৃথা বাহুবল,—বাঁকাতে পারে না

পৈতৃক ধনুগুলি।

তৈমূর অবিলম্বে তুমি কি

ল’বে না নূতন কায়?

এস, ফিরে এস দৈব পুরুষ

রয়েছি প্রতীক্ষায়।

দৈব-পুরুষ তৈমূর পদে

আমরা নোয়াই শির;

সবুজ চায়ের পাতা দিই তরে

পালিত মেষের ক্ষীর।

হৃদয়ে মোদের তৈমূর-কথা

যুগে যুগে জাগরূক,

উৎসাহ ভরে উদ্যত বাহু

মোগল সমুৎসুক।

লামা আমাদের মন্ত্র পড়,

করুন আশীর্ব্বাদ,

শড়্‌কী ও শর হবে খরতর,

পূর্ণ হইবে সাধ।

তৈমুর অবিলম্বে তুমি কি

ল’বে না নূতন কায়?

এস ফিরে এস দৈব-পুরুষ

রয়েছি প্রতীক্ষায়

ত্রিশ্লোকী

ত্রিশ্লোকী

অসীম ব্যোমেরে সূর্য্য কি কথা বলে?

সাগর কি কথা বলে গো হাওয়ার কানে?

কোন কথা চাঁদ বলে চুপে রাত্রিরে?

কোন্ জন তাহা জানে?

ভ্রমর কি ভাবে হেরিয়া কুসুমদলে?

কি ভাবে গো পাখী নিরখি’ নীড়ের পানে?

রৌদ্র কি ভাবে মেঘ দলে চিত্রি’ রে—

কোন জন তাহা জানে?

গোষ্ঠ গোধনে কি কহে গানের ছলে?

কোন্ সুরে মধু মৌমাছি টেনে আনে?

অতল কি গান শোনায় হিমাদ্রিরে?

কে জানে এ তিন গানে?

ফাল্গুন যেই লিপি লেখে চৈত্রেরে,

বৈশাখ যাহা পড়ে গো আখর চিনে,

জ্যৈষ্ঠেরে দিয়ে যায় যে লিখন, শেষে,

তাহার জন্মদিনে;

ঊষার পুলক দিনের প্রকাশ হেরে,

দিনের পুলক বিকশি’ মধ্যদিনে,

গানের পুলক ফেটে গিয়ে নিশ্বাসে

বেসুর করিয়া বীণে;-

কে জানে? কে বুঝে মরণ রহস্যেরে?

কে জানে চাঁদের ক্ষয়, উপচয়, ঋণে?

মানুষের মাঝে নাই কারো হিসাবে সে;

মৃত্যু জানাবে তিনে!

প্রবল ঢেউয়ের কিনারার প্রতি টান,

কিনারার টান ভগ্ন ঢেউয়ের দিকে!

আকাশ-বিদারী জ্বালাময় ভালবাসা,

জাগে যে বজ্রশিখে,—

যাবে না সে বোঝা, যতদিন আছে প্রাণ!

ধ্রুবতারা করি’ মরণের দু’ আঁখিকে

যে অবধি জরি’ না যায় প্রাণের বাসা,—

চেয়ে চেয়ে অনিমিখে;

একটি নিমেষে সমস্যা সমাধান

যতদিন নাহি হয় গো, দিগ্বিদিকে

ঊষার মতন হাসিতে ফুটায়ে আশা

অথবা দ্বিগুণ ম্লান করি’ গোধূলিকে।

সুইন্‌বার্ণ্‌‌।

দর্ব্বেশের ঘূর্ণি নৃত্য

দর্ব্বেশের ঘূর্ণি নৃত্য

দাও ঘুরপাক্ জ্ঞান ঘুচে যাক,

ঘুরুক মাথা,

চোখে মুখে নাকে ছুটুক আগুণ

উঠুক গাথা!

কোথা পায়জামা পাগড়ি কোথায়

যাব তা’ ভুলে,

ঘুরপাক দিয়ে করিব নৃত্য

দু’ বাহু তুলে।

রাঙা সুরা আর রাঙা পেয়ালার

ঘুচিবে ভেদ,

হৃদয়ে প্রণয়ে। হ’বে একাকার

র’বে না খেদ।

কি করেছি আর কি যে বাকী আছে

জানিব না তা’,

সব জানি তবু কিছুই জানিনে

টলিছে মাথা!

শাস্ত্র শুনিবে? পণ্ডিত আছে,

জানিনে অত,

ভাবে বুঁদ হ’য়ে চরণে দলেছি

শাস্ত্র যত!

ঘুরপাক্ দাও আগুন জ্বালাও,

টুটুক বাধা,

ভয়ে সংশয়ে ফুকারি’ মরুক

যতেক গাধা।

কাফের কে আর কে মুসলমান?—

প্রেমের দাস!

প্রেমে সব এক, ওরে দ্যাখ দ্যাখ!

কি উল্লাস!

সুখে আছি বুকে আকাশ আঁকড়ি’

বিভোল প্রাণে,

পায়ের তলায় কে কি বলে, হায়,

পশে না কানে!

ঘুরুক্‌ ভাণ্ড, এ ব্রহ্মাণ্ড

ঘুরুক সাথে,

আমরা প্রেমিক, পরশ মাণিক

পেয়েছি হাতে!

সৈয়দ নিমতুল্লা।

দান-পুণ্য

দান-পুণ্য

ক্ষুধার সৃষ্টি করে নি দেবতা নরের নিধন তরে,

খাদ্য পেয়ের শ্রাদ্ধ যে করে সেও এক দিন মরে।

বিহিত বিধানে দান করি’ দাতা কখনো হয় না দীন,

কৃপণই কেবল পায় না শান্তি চির-আনন্দ-হীন।

ক্ষুধাতুর যবে অন্নের লাগি অনুবানের দ্বারে

হয় উপনীত, তখন যদি সে গৃহের কর্ত্তা তারে

ফিরাইয়া দ্যান্‌ কঠিন হৃদয়ে, কিবা তার আগে ভাগে

নিজের তুষ্টি করেন সাধন, তাঁরে সন্তাপ লাগে।

আতুরে অন্ন দান করে যেই তারে পূজা করে সবে,

দান-যজ্ঞের পুণ্য সে পায় অরির (ও) শ্রদ্ধা লভে;

বন্ধু হয়ে যে বন্ধুজনেরে অন্ন না করে দান,

সে নহে বন্ধু, তার গৃহ নয় মাথা রাখিবার স্থান।

তাহারে ছাড়িয়া সন্ধান কর উদার জনের ঘর,

আপন জনের চেয়ে সে আপন হ’ক সে হাজার পর।

অর্থীজনের দীন প্রার্থনা যে পার পূরণ কর,

সমুখে সরল পথ নিরমল যে পার সে পথ ধর।

ধন বৈভব,—হায় গো সে সব চক্রের মত ঘোরে,

কখনো তোমার, কখনো আমার; স্থির নয় কারো ঘরে।

হীন মন যার,—নহেক উদার অন্ন তাহার কাল,

দেবতা তোষেনা বন্ধু পোষে না ঘরে ভরে জঞ্জাল;

একাকী যে জন ভোগ করে ধন একা সে ভুঞ্জে পাপ,

ধরার অন্ন হরণ করিয়া একা বহে সন্তাপ।

ভিক্ষু ঋষি।

দুঃখ ও সুখ

দুঃখ ও সুখ

হৃদয়ের মাঝে পাশাপাশি আছে

গুপ্ত দু’খানি ঘর,

দুঃখ ও সুখ বাস করে তাহে,—

যমজ দু’ সহোদর।

সুখ জেগে উঠে আপনার মনে

খেলে গো আপন ঘরে,

দুরন্ত ছেলে দুঃখ এখনো

ঘুমাইছে অকাতরে।

ওরে সুখ! তুই চুপি চুপি খেল্‌,

করিস্‌নে কলরব;

এখনি দুঃখ উঠিবে জাগিয়া

করিবে উপদ্রব।

অজ্ঞাত।

দুঃখ কামার

দুঃখ কামার

এক যে আছে কামার

নামটি তার দুঃখ।

হাতুড়ি তার টঙ্ক

চেহারা তার রুক্ষ;

হাপরটা তার মস্ত

আগুন সদাই জ্বল্‌ছে,

হাঁপিয়ে প্রতি নিশ্বাসে

জাঁতাও জোরে চলছে।

দুঃখ নামে কামার

হৃদয় পেটাই কর্চ্চে,

তার হাতুড়ির ঘায়ে

পড়্‌ছে ঝরে মর্চ্চে;

ঘায়ের উপর ঘা দিয়ে

কর্চ্চে এমন টঙ্ক,

ফাট্‌বে না কি চট্‌বে না,

পড়্‌বে নাক’ অঙ্ক।

দুঃখ ভারি শিল্পী

বিশ্বকর্ম্মার অংশ,

কর্চ্ছে হৃদয় মজবুৎ

এম্‌নি,—যে নাই ধ্বংস।

বডম্যান্।

দুঃখলোপী মিলন

দুঃখলোপী মিলন

(রাবেয়া)

প্রভু! আমি কেমনে বুঝাব

আমার সে প্রাণের বেদন?

নয়ন, তোমার আবির্ভাবে,

হয় যে গো উৎসবে মগন!

প্রভাতে উদিলে দিননাথ

মলিন কি রহে শতদল?

পাই যবে তোমার সাক্ষাৎ

আপনি লুকায় আঁখিজল!

দুঃসহ দুঃখ

দুঃসহ দুঃখ

চাঁদের নৌকা ভাসিয়া চলেছে শৈল-শিখর ’পরে

প্রদীপের আলো মরে;

অতীত অযুত বসন্ত আজি বুকে মোর হাহা করে,

আর, আঁখি জলে ভরে!

মরমের ব্যথা বুঝিলে না, বঁধু! এ দুখ রাখিতে ঠাঁই

নাই গো কোথাও নাই।

ওয়াং সেং-জু।

দুপুরে

দুপুরে

দুপুরে,—সোনার করে

ঝাপসা বাতাস ভরে,

কড়ি-পোকাগুলি তায়

ইতি উতি ফর্‌কায়;

চির প্রশান্ত গ্রাম,

ঘটনার নাহি নাম।

তাচিবানে-নো-মাসাতো।

দুয়ো সুয়ো

দুয়ো সুয়ো

সুয়োরাণীর দুলাল! ওরে! খেয়ে মেখে নে,

সদয় বিধি নানান নিধি দিয়েছে এনে!

দুয়োরাণীর দুখের বাছা! ধূলাকাদাতে

বুকে হেঁটে বেড়াস্ যেন জন্ম-হাভাতে।

সুয়োরাণীর দুলাল! তোমার পূজায় ভারি জাঁক,

জুড়িয়ে গেল হোমের ধূমে নবগ্রহের নাক!

দুয়োরাণীর দুখের বাছা! তোমার দুঃখ ক্লেশ,—

এ জীবনে হ’বে কি হায়,—হ’বে কি তার শেষ?

সুয়োরাণীর দুলাল! তোমার বংশ বাড়িছে,

তোমার গোধন রাজ্য জুড়ে শৃঙ্গ নাড়িছে।

দুয়োরাণীর বাছারে! তোর ক্ষুধায়, দুপুরে,

পেটের নাড়ী চিবায় যেন হন্যে কুকুরে।

সুয়োরাণীর দুলাল ওরে ঘুমাও সুখেতে,

আরাম করে বাপের ঘরে হাসি মুখেতে।

দুয়োরাণীর দুখের বাছা! দুধের বাছা রে!

বর্ষা শীতে বেড়াও কেঁদে বনের মাঝারে।

সুয়োরাণীর দুলাল! শেষে, ধূলায় পড়িলে!

রক্ত দিয়ে তপ্ত মাটি পুষ্ট করিলে।

দুয়োরাণীর তনয়! ওগো তোমার মাথার ঘাম

পড়ুক, আরো, ব্যস্ত কাজে থাক অবিশ্রাম।

সুয়োরাণীর দুলাল! তোমার দেমাক্ ছুটেছে,

শূয়োর-মারা শড়্‌কিতে আজ খড়্‌গ টুটেছে!

দুয়োরাণীর দুলাল! কর স্বর্গ অধিকার,

ফিরাও তুমি গ্রহের গতি বিধান বিধাতার।

বদ্‌লেয়ার।

দুর্গম-চারী

দুর্গম-চারী

ফিরে যাও, বল গিয়ে নাবিকের দলে

যে রাজ্যে করেছি পদার্পণ, সে আমার

হ’বে পদানত। যদি কভু দেখা হয়,

আমারে দেখিবে রাজবেশে, নহে দেখা

হ’বেনা জনমে। এখনো বিলম্ব কেন?

ইচ্ছা নাই যেতে? যাও,—যাও, কথা শোনো;

অদ্যাবধি বন্ধু ঘোড়া, ভৃত্য তলোয়ার!

বিদেশী দাসের দলে সেনা করি ল’ব,

আমার আদেশ তারা পালিবে যতনে,—

বর্ব্বরের দল। চঞ্চল সমুদ্র সাথে

সম্পর্ক করিয়া দিমু শেষ। ফিরে যাও।

নয়ন! এখন হ’তে কর অন্বেষণ

কোথা আছে কাপুরুষ, দুর্গ বিরচিয়া।

ঘোড়ার চারিটা ক্ষুর বাজিছে আজিকে

মানবের কঙ্কালে কপালে,—পদে, পদে!

অদৃষ্ট কি বিভীষিকা দেখায় আমারে?—

আমারি পরীক্ষা হেতু?—রাজ্যের তোরণে?

দর্পে চল কাল ঘোড়া বর্ব্বরে দলিয়া,

আমি যা’ ওরা তা’ নয়,—তাই ভূলুণ্ঠিত।

হার্ট লেবেন।

দুর্ব্বোধ

দুর্ব্বোধ

এখনো দুর্ব্বোধ!

জীবন কেটেছে এক সাথে,

দুঃখে সুখে, বসন্তে বর্ষাতে,

একই ঘরে গেছে দিন রাত,

বিবাহে মিলেছে হাতে হাত,

কত লীলা, কত খেলা, কত সে প্রমোদ;

তবু হায়, তবুও দুর্ব্বোধ!

এখনো দুর্ব্বোধ!

শৈশবের স্মৃতি মমতার,

প্রশংসা, সস্নেহ তিরস্কার,

ভুল করা, উপদেশ পাওয়া,

দেশে দেশে সঙ্গে সঙ্গে যাওয়া;

বিমুখ, বিরূপ শেষে—হয় তো বিরোধ

পরস্পর, এমনি দুর্ব্বোধ!

তবু ও দুর্ব্বোধ!

একই কাজে এক যোগে থেকে,

পরস্পরে ‘মিতা’ বলে ডেকে,

দ্বন্দ্ব ক’রে, বুকে টেনে নিয়ে,

অকুষ্টিতে প্রাণ খুলে দিয়ে,

আঁখি আড়ে ছাড়াছাড়ি শেষে জন্মশোধ;

দেখা হলে তখন দুর্ব্বোধ!

তবুও হয়না পরিচয়!

মানুষ কি একান্ত একাকী,—

ভাবি আর স্তব্ধ হয়ে থাকি!

জনে জনে গণ্ডী দিয়ে দিয়ে,

প্রকৃতি গো রেখেছ ঘিরিয়ে;

গণ্ডী শুধু গণ্ডী ছোঁয়, মিলন না হয়;

হয়না যথার্থ পরিচয়।

হাউটন্‌।

ধর্ম্ম

ধর্ম্ম

শাস্ত্রের প্রদীপ নহি, নহি আমি ধর্ম্মের নিশান,

সিদ্ধ মহাপুরুষের সিদ্ধির অপূর্ব্ব অবদান

তুচ্ছ মানি,—সাধারণ দুঃখ কাহিনীর তুলনায়;

মানুষের অশ্রুজলে, মানুষের মৌন শোচনায়

আমারে আকুল করে,—মানুষের প্রার্থনায় চেয়ে।

পুণ্যাত্মা! নালিশ রাখ, নীলাকাশ ফেলিয়ো না ছেয়ে

নাকী সুরে। এই কিহে ভক্ত তুমি? ঈশ্বর নির্ভর—

এরি নাম? এরি অহঙ্কার কর ধার্ম্মিক প্রবর?

মন্দির-কদর ছাড়ি’ এস বন্ধু! এস বাহিরিয়া,

স্বর্গের কামনা ভোলো! প্রব্যথিত মানবের হিয়া

তোমারে খুঁজিছে, ওগো! এস, এস মানুষের মাঝে,

নরলোকে আছে কাজ; স্বর্গে তুমি লাগিবে কি কাজে?

মমতার চক্ষে চাও, দুর্ব্বলেরে তোলো হাত ধরে,

স্বর্গ পাবে মর্ত্তে বসি’,—পুণ্যফলে, দেবতার বরে।

ডান্‌বার।

নববর্ষে

নববর্ষে

দ্বারে দেবদারু-শাখা,—

চিহ্ন অচিন্ পথে;

কারো তরে ফুলে ঢাকা,

কারো—ভিজে অশ্রুতে।

ইকুজু।

নবাব ও গোয়ালিনী

নবাব ও গোয়ালিনী

(গুজ্‌রাটি গাথা)

সহর ছেড়ে সেপাই নিয়ে গুজরাটের এক গাঁয়,

ছাউনি ফেলে, নবাব সাহেব বেরুলেন সন্ধ্যায়;

অলিগলির ভিতর দিয়ে চল্‌তে অকস্মাৎ

দেখ্‌তে পেয়ে গোপের মেয়ে ধর্ত্তে গেলেন হাত!

হাত ছিনিয়ে গোপের মেয়ে কট্‌মটিয়ে চায়,—

ঈষৎ হেসে নবাব সাহেব ডেকে বলেন তায়,—

“নবাব আমি, আমার সাথে নগরে তুই চল্‌,

চাষার হাটে রূপের রাশি করিস্ নে নিস্ফল।”

“চাষার গ্রামই ভাল আমার, নগরে দিই খাক্‌!”

“নবাবকে তুই জবাব করিস্! বড্‌ড যে দেমাক!”

নবাব বলে “হিঁদুর মেয়ে, শোন্‌রে আমার বোল্,

সোনায় দেব অঙ্গ মুড়ে ধুক্‌ড়ি কথা খোল্‌।”

“লজ্জা ঢেকে ধর্ম্ম রেখে সোনায় মারি লাথি!”

“নবাবকে তুই জবাব করিস্! আঃরে হারামজাদি!”

“এক্‌লা পেয়ে মন্দ বল, স্পর্ধা তোমার বড়,

ন’ লাখ আমার গুজরাটি ভাই কর্ব্ব ডেকে জড়;

মারি চাপড়,—পাগ্‌ড়ি উড়াই,—লাল ক’রে দিই মুখ;

নারীর সাথে রঙ্গ করার দেখ্‌বে কেমন সুখ?

হাঁক দিলে মোর ন’ লাখ ভায়ে ভাঙ্‌বে তোমার জাঁক,

লাঠির গুঁতোয় পথের পাঁকে খুঁজতে হবে নাক;

নিলাম ক’রে বেচিয়ে দেব নবাবী তাঞ্জাম,

সান্ত্রী সেপাই, ঢাল তলোয়ার, সকল সরঞ্জাম!

টাকা টাকা বেচ্‌ব টাটু,—দাম্‌ড়িতে দশ উট”—

গতিক দেখে ঘোড়ায় উঠে নবাব দিলেন ছুট!

নব্য অলঙ্কার

নব্য অলঙ্কার

ললিত শব্দের লীলা সকলের আগে কবিতায়;

পয়ার সে বর্জ্জনীয়, বরণীয় ছন্দে বিচিত্রতা;

নিশ্চয় নির্ণয় নাই, গ’লে যেন মিলিবে হাওয়ায়;

ভারে যাহা কাটে শুধু, রবে না এমন কোনো কথা।

যথা অর্থ সংজ্ঞা খুঁজে উদভ্রান্ত না হয় যেন চিত;

নাই ক্ষতি নিভুল শব্দটি যদি নাই পাওয়া যায়;

ব্যক্ত আর অব্যক্তের যুক্তবেণী মদির সঙ্গীত!

তার মত প্রিয় আর নাহি কিছু নাহি এ ধরায়।

সে যেন বিমুগ্ধ আঁখি ওড়নার সূক্ষ্ম অন্তরালে,

স্পন্দহীন মধ্যাহ্ণের সে যেন গো আলোক-স্পন্দন;

সে যেন সন্তাপহারী শরতের সন্ধ্যাকাশ-ভালে

প্রদীপ্ত ও দীপ্তিহীন নক্ষত্রের মৌন সংক্রমণ!

আমরা চাহি গো শুধু লীলায়িত ‘ছায়া-সুষমায়’,

রঙে প্রয়োজন নাই, কি হ’বে রঙীন্ তুলি নিয়ে?

‘ছায়া-সুষমা’ই শুধু বিচিত্রের মিলন ঘটায়,—

বাঁশী আর শিঙারবে,—স্বপনে স্বপনে দেয় বিয়ে।

নিষ্ঠুর বিদ্রূপ আর অশুচি বাচাল পরিহাস,—

পরিহার কর দুই প্রাণঘাতী ছুরির মতন;

রন্ধন-গৃহের যোগা ও যে নীচ রসুনের বাস,

দেবতার (ও) পীড়াকর; তাঁদেরো কাঁদায় অকারণ।

কবিতার কুঞ্জগৃহে বাগ্মিতা প্রবেশ যদি করে,—

বাগ্মিতার গ্রীবা ধরি’ মোচড় লাগায়ো ভাল মতে;

অনুশীলনের লাগি সাধু শ্লোক এনো ভাষান্তরে,—

সে কাজ বরঞ্চ ভাল;—কবিতারে মাঠে মারা হ’তে।

বাণীর লাঞ্ছনা, হায়, বর্ণনা করিতে কেবা পারে,—

অনধিকারীর হাতে কি দুর্দ্দশা, বিড়ম্বনা কত!

হীরা, জিরা মিলাইয়া শিকল সে গেঁথেছে পয়ারে,

নির্জ্জীব, বৈচিত্র্যহীন;—অর্ব্বাচীন অনার্য্যের মত।

শব্দের ললিত লীলা,—সমাদর সর্ব্বযুগে তার;

উড়িয়া চলিবে শ্লোক মুক্তপাখা পাখীর মতন!

পাওয়া যাবে সমাচার প্রয়াণ-চঞ্চল চেতনার,

আরেক নূতন স্বর্গ,ভালবাসা আরেক নূতন!

কবিতা সে হ’বে শুধু সঙ্গীতে সঙ্কেতে উদ্বোধন,—

আভাসের ভাষাখানি,—প্রভাতের মঞ্জিম বাতাস;

দু’পাশে দোলায়ে যাবে গোলপ কমল অগণন!

বাকি যাহা,—সে কেবল পণ্ডশ্রম, পাণ্ডিত্য-প্রয়াস।

পল্ ভার্লেন্‌।

নয়ন জলের জাজিম

নয়ন জলের জাজিম

হাজারটা হাত আড়ষ্ট হিম।

কাজের বিষম গুঁতাতে,

জগৎ-জোড়া বুন্‌ছে জাজিম্‌

নয়ন-জলের সূতাতে!

টানার ’পরে পড়েন পড়ে,

কাজ্‌টা ভারি খাপী গো;

নিত্য নিশায় জাজিম বিছায়

অশ্রু জগৎ-ব্যাপী গো!

পল্‌ ওয়ার্টিমার্‌।

নশ্বর

নশ্বর

(প্রাচীন মিশর)

আপনি আপন সমাধি-ভবন নিরমিল যারা

রাখিতে দেহ,

আজি তাহাদের সে দেহ কোথায়? চিনু খুঁজিয়া

পায় না কেহ!

কোথা তাহাদের কীর্ত্তি-কাহিনী? আজি কোন্ জন

জানে বা তাহা?

কত শ্লোক আজ মুখে মুখে ফিরে, কার সে রচনা

জানি নে, আহা!

ভেঙেছে প্রাচীর রাজ-সমাধির, হায় এন্তেফ!

হায় গো প্রভু!

ভিত্তি তাহার খুঁজে পাওয়া ভার, যেন সে ছিল না,-

হয় নি কভু।

নস্য

নস্য

আমার ডিবায় নস্য আছে ভারি চমৎকার!

তুমি কিন্তু পাচ্ছ নাকো একটি কণাও তার।

যা আছে তা আমার আছে দিচ্ছি নে তা’ অন্যে,

এমন নস্য হয় নি তোদের বোঁচা নাকের জন্যে।

নস্যদানে নস্য আছে কিন্তু সে আমার;

তুমি বাপু পাচ্ছ নাকো একটি কণাও তার।

মুরুব্বিদের মুখে শোনা অনেক দিনের গান,

আধখানা তার শুনেছিলাম, শিখেওছি আধ্‌খান;

সে যা’ হোক্‌, ঐ গানটা শুনে হ’ল কেমন জেদ,

নস্য আমার নিতেই হ’বে, রাখ্‌ব নাকো খেদ।

নস্যদানে নস্য আছে ভারি চমৎকার,

তুমি কিন্তু পাচ্ছ নাকো একটি কণাও তার।

এক যে রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র—অনেক টাকার মালিক,

বাড়ীর দ্বারে সিংহ তাঁহার গাড়ীর দ্বারে শালিক!

তিনি আপন কনিষ্ঠকে বল্লেন ডেকে “ভায়া!

কমণ্ডলু নাওগে, দেখ সংসার শুধুই মায়া;

নস্তদানে নস্য আছে কিন্তু সে আমার,

তুমি ভায়া পাচ্ছ নাকো একটি কণাও তার।”

এক মহাজন,—লোকটি পাকা, অর্থাৎ ঝুনো বেজায়,

ঋণ দিলেন এক দায়গ্রন্তে অহৈতুকী কৃপায়!

সুদের সুদটি শুষে নিয়ে বেচে ভিটেমাটি,

ঋণী জন্‌কে শুনিয়ে দিলেন তত্ত্বকথা খাঁটি,—

“ডিবার মধ্যে নস্য আছে, কিন্তু সে আমার,

তুমি বাপু পাচ্ছ না আর একটি কণাও তার।”

আছেন কত গৃধ্র উকীল, শকুন ব্যারিষ্টার,

বুদ্ধি যোগান্‌ নির্বোধেদের দয়ার অবতার;—

ফন্দী ক’রে খসিয়ে টাকা শূন্য ক’রে থলি

মক্কেল বিদায় করেন তাঁরা এই কথাটি বলি,

“ডিবার মধ্যে নস্য আছে ভারি চমৎকার,

তুমি এখন পাচ্ছ না আর একটি কণাও তার।”

হীরার কণ্ঠী গলায় দিয়ে নাচঘরে যান ক্ষেত্রী,

কন্তীতে তাঁর নেত্র দিলেন একটি অভিনেত্রী;

ক্ষেত্রী কৃপণ মুখ বাঁকিয়ে বল্লে “সোহাগ থাক্‌,

হয় তোমার পদ্মচক্ষু, বাঁশীর মতন নাক,

দেখ ছ, ডিবায় নস্য আছে, কিন্তু সে আমার,

তুমি ডিয়ার! পাচ্ছ নাকো একটি কণাও তার।”

লাতাঞাঁ

নারী

নারী

নারী নিরমলা, নারী সুন্দরী,

নারী মনোরমা স্বর্গের পরী,

নারী সে ভেষজ ব্যথিত মনের,

নারী সে ভূষণ বীর্য্যবানের,

নারী সম্পদ, নারী সম্ভ্রম,

নারী-প্রেমলাভ ভাগ্য পরম।

অল্‌রিচি।

নিশানের মর্য্যাদা

নিশানের মর্য্যাদা

(নাস্‌সান্‌ যুদ্ধের পর একজন মৃত জাপানী সৈনিকের পাগড়ীর মধ্যে প্রাপ্ত)

প্রভু! নিশি অবশানে শিশিরের সনে

হয়ত জীবন ফুরাবে প্রাতে,

তবু নিশানের মান রক্ষা করিব,—

দিব না সে ধন শত্রু হাতে;

কভু ছাড়িব না তাহা; অন্তিমে তারে

পাগড়ী করিয়া বাঁধিব মাথে।

নিস্ফলারম্ভ

নিস্ফলারম্ভ

(মিশর)

মৃণালের লাগি কাঁদিছে মরাল

কাতরে বিদায় কালে,

তুমি তত দিলে না ভালবাসা, শুধু

আমি জড়াইনু জালে;

হৃদি-তন্তুতে পড়েছে গ্রন্থি

কেমনে ছিঁড়িব, হায়,

কেমন করিয়া এড়াব না জানি,

ছাড়াতে জড়ায় পায়!

নিত্য যে আমি সন্ধ্যাবেলায়

নিয়ে যাই পাখী ধ’রে,

পরিজনে যদি সুধায় আজিকে,

কি কহিব উত্তরে?

তোমার প্রেমেরে বন্দী করিতে

আজি পেতেছিনু জাল,

নিলে বেলা ফুরাল আমার

বৃথা কেটে গেল কাল।

নীতি চতুষ্টয়

নীতি চতুষ্টয়

সিংহশাবক ক্ষুদ্র হ’লেও মদ-বিমলিন হাতীরে হানে,

শক্তিমানের প্রকৃতি ইহাই; বিক্রম কভু বয়স মানে?

স্বর্গ হইতে শিবের জটায় সেথা হ’তে পর্ব্বতে,

পর্ব্বত ছাড়ি ধরণী-পৃষ্ঠে, সাগরে ধরণী হ’তে;

এমনি করিয়া গঙ্গা চলেছে অধোগতি অনিবার,

নষ্টমতির নিপাতের লাগি শত দিকে শত দ্বার।

তপ্ত লোহায় সলিল-বিন্দু,-নাম খুঁজে পাওয়া দায়;

পদ্ম-পাতায় সেই পুন রাজে মুকুতার সুষমায়!

স্বাতী হ’তে পড়ি’ শুক্তিতে হয় মুক্তা সে নিরমল!

মন্দ, মাঝারি, ভালো হওয়া,—সব সংসর্গেরি ফল।

আচারনিষ্ঠে ভণ্ড বলে গো, ধীরজনে ভীরু, সরলে মূঢ়;

প্রিয়ভাষীজনে ধনহীন গণে, বীরে নির্দ্দয়, তেজীরে রূঢ়!

শান্তস্বভাবে অক্ষম ভাবে, বাগ্মী পুরুষে বাচাল বলে,

হেন কোনো গুণ নাই মানুষের যাহা দুর্জ্জনে দোষেনি ছলে।

ভর্ত্তৃহরি।

নীরব প্রেম

নীরব প্রেম

পাপিয়ার তান না ফুরাতে, রবি, সহসা যেমন ক’রে

নিষ্প্রভ করি’ দ্যায় রশ্মিতে মন্থর শশধরে,

তেমনি করিয়া, সূর্য্যের মত উজ্জ্বল তব রূপ,

কণ্ঠ আমার করেছে হরণ; গান একেবারে চুপ!

উতলা বাতাস সহসা যেমন দ্রুত পাখাভরে আসি’

জোর ফুঁয়ে ভেঙে ফেলে গো কীচক,—তার সবে-ধন বাঁশী;

তেমনি করিয়া আবেগের ঝড় আমারে করে গো ক্ষীণ,

ভালবাসা মোর অমিত বলিয়া ভালবাসা ভাষাহীন।

নয়ন আমার সে কথা তোমারে জানায়েছে নিশ্চয়;—

কেন যে বাঁশরী নীরব আমার বীণা সে মৌন রয়;

সে কথাটি যদি না পার বুঝিতে বিদায়, বিদায় সাকী,

না-পাওয়া চুমার, না-গাওয়া গানের স্মৃতি লয়ে আমি থাকি।

ওয়াইল্‌ড্‌।

নৃত্য-গীতিকা

নৃত্য-গীতিকা

(মেক্সিকো)

গোটা গোটা উঠল ফুটে জাল্-তু-মোতির ফুল,

পাপড়ি সে পূরন্ত হ’ল বাতাসে দুল্‌দুল্‌;

পাহাড় কোলে কুজ্ঝ্বটিকা ঘুমিয়ে প’ল আজ,

শীষ দিয়ে ঐ নীল পাখীটি ডুবলো পাতার মাঝ!

কঠিন ঠোঁটে গাছের বাকল কোন্ পাখী কাটে,

কাঠ্‌বিড়ালীর ‘চিড়িক্‌’ ‘চিড়িক্‌’ শব্দে কান ফাটে;

কালো বাদুড় মাকুর মতন সাঁঝের জাল বোনে,

ফলন্ত গাছ নুয়ে কথা কয় মাটির সনে!

হাওয়ার কোলে মিলিয়ে গেল এক্‌লা চীলের ডাক,

বৃষ্টি এসে পড়্‌ল ব’লে,—আয় গো নাচা যাক্।

নৃত্য-নিমন্ত্রণ

নৃত্য-নিমন্ত্রণ

(মুণ্ডারি)

আয় গো ক’নে সবাই মোরা নাচ্‌তে যাই,

পাথর তো নই থাক্‌ব পড়ে এক্‌টি ঠাঁই!

আয় গো ক’নে নিমন্ত্রণে যাই সবাই,

গাছের মত শিকড় গেড়ে থাক্‌তে নাই;

জীবন গেলে ক’র্ব্বে দেহ পুড়িয়ে ছাই,

বাঁচার মত বাঁচতে চাই,—নাচ্‌তে যাই।

পতঙ্গ ও প্রদীপ

পতঙ্গ ও প্রদীপ

(হিন্দি)

পতঙ্গ কহিছে ‘দীপ! তুমি দেখ রঙ্গ,

তোমার লাগিয়া জ’লে মরিছে পতঙ্গ।’

দীপ কহে, ‘হায়, বন্ধু, অভিমান মিছে,

আগে হ’তে আমি জলি, তুমি জল পিছে।'

পতিতার প্রতি

পতিতার প্রতি

চঞ্চল হ’য়ে উঠিনে তুই, ওরে,

কেন সঙ্কোচ? কবি আমি একজন;

সূর্য্য যদি না বর্জ্জন করে তোরে,—

আমিও তোমায় করিব না বর্জ্জন।

নদী যতদিন উছলিবে তোরে হেরে,—

বন-পল্লব উঠিবে মর্ম্মরিয়া,—

ততদিন মোর বাণীও ধ্বনিবে যে রে

তোর লাগি,মোর উছলি’ উঠিবে হিয়া।

দেখা হ’বে ফের, কথা দিয়ে গেনু নারী,

যতন করিস্ যোগ্য আমার হ’তে,

ধৈর্য্য ধরিস্‌,—শক্ত সে নয় ভারি,

আসিব আবার ফিরে আমি এই পথে।

কবি আমি শুধু কল্প-ভুবন-চারী,

ব্যভিচারী নই, তবু করি অভিসার;

ভাল হ’য়ে থেক, মনে রেখ মোরে, নারী!

আজিকার মত বিদায়, নমস্কার!

হুইট্‌ম্যান্‌।

পথিক-বধূ

পথিক-বধূ

(মিশর)

দুয়ারের পানে সতত চাহিয়া থাকি,

বঁধু যে আমার আসিবে দুয়ার দিয়া,

পথে পাহারায় রেখেছি দুইটি আঁখি,

কর্ণ সজাগ স্তব্ধ ক’রেছি হিয়া!

স্তব্ধ হৃদয় অসাড় হইয়া আসে,

বন্ধু তোমার সাড়া যে পাইনে তবু;

তব ভালবাসা নিধি সে আমার পাশে,

তা’ বিনা পরাণ তৃপ্ত হ’বেনা কভু!

প্রবাসে বসিয়া পাঠায়েছ সমাচার,

‘বিলম্ব হবে’—জানায়েছ লিপিমুখে,

কেন লিখিলে না ‘ভালবাসি নাকো আর,

মনমত ধন মিলেছে,রয়েছি সুখে।’

চঞ্চল! তুমি কেন এত নির্দ্দয়?

এমনি ক’রে কি বেদনা সঁপিতে হয়।

পল্লব

পল্লব

“বোঁটার বাঁধন টুটে

কোথা চলেছিস্ ছুটে?

ওরে ও শুষ্ক পাতা?”

হায় আমি জানি না তা’!

ছিনু যে বটের শাখে

ঝড় লেগেছিল তাকে,

সে অবধি মোরে, হায়,

বাতাস ফিরায় পায়;—

দখিনে ও উত্তরে,

বনে ও বনান্তরে;

মাঠে, পাহাড়ের কোলে,—

অস্থির করে তোলে!

আমি চলি সেইখানে

বাতাস যে দিকে টানে;

শঙ্কায় নাহি মরি,

অনুযোগ নাহি করি।

আমি চলি সেই দেশে,

যেখানে সকলি মেশে,—

রাঙা গোলাপের দল,—

‘লরেল্‌' সুশ্যামল।

আর্ণৎ।

পহেলি

তীর্থরেণু

পহেলি

নবীনে প্রবীণে নারী নরে মহামেলা!

বাঁশী সিতারের মিলিত সুরের খেলা!

ঝঙ্কারে, তানে, শিঞ্জনে কোলাকুলি,

গােল না বাধায় ঠেকার যে বোল্‌গুলি।

‘সােদর সিনেহ’ সুষমায় ভরে গেহ,

তুষ্ট হৃদয় চির নিরাময় দেহ;

মিলনের আলাে জ্বলিয়াছে মন্দিরে,

শিশু হাসি ঘিরে পুরাতন পৃথিবীরে।

শি-কিং গ্রন্থ।

পিতৃপীঠ

পিতৃপীঠ

ওগো কোথা সেই দেশ, কেমন সে দেশ

কে মোরে বলিবে তাহা?

মোর পরাণের চেয়ে প্রিয় সে, তবুও

চক্ষে দেখিনি, আহা!

তবু সে আমার দেশ, আমারি স্বদেশ,

না জানি দেখিব কবে!

কবে মন্দার-হরিচন্দন-বীথি

নয়নে উদয় হ’বে।

হেথা যত অনশন-ক্লিষ্ট বামন

মিলিয়াছে একঠাই,

হায় ক্ষুদ্রতা আর ক্ষুধা তৃষ্ণার

অবসান হেথা নাই।

হেথা মৃত্যু ফিরিছে দুয়ারে দুয়ারে,—

রাজা প্রজা কাঁপে ত্রাসে;

ওগো নৃত্য-শালায় নূপুরের ধ্বনি

বারে বারে থেমে আসে!

হেথা রাণী কেবা? হায়! দাসী কে হেথায়?

মরণ-অধীন সব!

হায় ধূলি শয্যায় এক হ’য়ে যায়

হাসি-রোদনের রব!

হায় অতুলন রূপ হয় অগোচর,

কুরূপের (ও) মুখ ঢাকে,

ওগো জলের লেখার মতন লুকায়

চিহ্ণ কিছু না থাকে!

যায় আলোক হইতে পুলক হইতে

মলিন ধূলির তলে,

এই উষ্ণ শোণিত হিম হ’য়ে যায়

ধমনীতে নাহি চলে!

হায় এমনি করিয়া লুকায় যেন সে

ছিল না মর্ত্য-লোকে;

ওগো সবার দৃষ্টি এড়ায় মানুষ,—

ভগবান ব্যতিরেকে।

সেই শ্রীপদে যে চির-জীবন-নিঝর,

এতো শুধু ফুৎকার,—

শুধু ক্ষণিকের মায়া,— মরণের ছায়া,—

স্বপনের সঞ্চার।

ওগো, নিখিল শরণ, শঙ্কা হরণ।

সেই শ্রীচরণ চুমি’

আছে ছায়ার মায়ার মরণের পারে

আমার জন্মভূমি।

ক্রিষ্টিনা রসেটি।

পূজার পুষ্প

পূজার পুষ্প

হাত দিয়া তুলিব না, পরশে দূষিত হ’বে ফুল,

থাক তারা আলো করি’ তৃণ লতা বনতরুকুল;

সহজ শুচিতা সহ আমি দিনু সর্ব্ব পুষ্পদলে,

অতীত ও অনাগত বুদ্ধদের চরণকমলে।

রাণী কোমিয়ু।

পূর্ণ-মিলন

পূর্ণ-মিলন‌

চেয়ে থাক, চেয়ে থাক; চেয়ে, চেয়ে, চেয়ে,—

যার পানে চেয়ে আছরি রূপে ছেয়ে

যা তনু মন প্রাণ; হও তন্‌ময়,

‘তোমার’ ‘আমার’ ভেদ হয়ে যাক্ ক্ষয়;—

‘চাওয়া’ হয়ে যাক্ ‘হওয়া’। নিস্পন্দ, নির্ব্বাক্,

ক্ষীরে নীরে মিলি মিশে এক হ’য়ে যাক্।

যে অবধি ‘দুই’ আছে, হায় ততক্ষণ

রয়েছে বিচ্ছেদ ভয়, রয়েছে ক্রন্দন।

পরম প্রেমের পুরে যেই পশিয়াছে,—

সে জানে একের ঠাঁই সেথা শুধু আছে;

দুই মিলে এক হ’লে তবে সে মিলন

সম্পূর্ণ সুন্দর হয়;—সার্থক জীবন।

জামি।

প্রথম সম্ভাষণ

প্রথম সম্ভাষণ

কতবার ভেবেছি গো, ভগবান নিজ করুণায়,

নিভৃতে সৌন্দর্য্য তব দেখাইয়া দিবেন আমায়;

আজিকে আপনা হ’তে তুমি মোরে দিলে দরশন!

অনেক দিনের সাধ-হৃদয়ের-করিলে পূরণ।

চক্ষে দেখিতেছি তোমা, কণ্ঠস্বর শুনিতেছি কানে,

হে সুন্দরী! কহ কথা, আরবার চাহ মোর পানে;

মুগ্ধ এ শ্রবণে তুমি বল যাহা বলিবার আছে,

অন্তরের অভিলাষ অসঙ্কোচে কহ মোর কাছে।

ফর্দ্দূসী।

প্রহরায়

প্রহরায়

প্রহরায় দোহে জেগে বসে আছি,—

আমি আর সংশয়,

ঝড়ের রাত্রে হয়ে কাছাকাছি—

আমি আর সংশয়।

মগ্ন গিরির শঙ্কা করিয়া

তাকাই অন্ধকারে,

ঢেউ চলে যায় তরী লম্বিয়া

ভরে বুক হাহাকারে।

নৌকায় দোহে পায়চারি করি

আমি আর প্রত্যয়,

ঘন ঘটামাঝে মোরা দেহে হেরি

অকূলে অরুণোদয়।

পূবের ঝরোখা খুলি’ যেথা ঊষা

উঁকি দ্যায় শেষ রাতে,—

সংশয় আর প্রত্যয় যেথা

অভেদ আমার সাথে!

হাইন্‌।

প্রাণ দেবতা

প্রাণ দেবতা

নিখিল ভুবন বশে যার সেই প্রাণেরে নমস্কার,

প্রভু যে সবার আধার যে ওগো সবারি প্রতিষ্ঠার।

শদিত প্রাণে নমি আমি আর নমি ক্রন্দিত প্রাণে,

প্রাণ বিদ্যুতে প্রণাম করি গগ প্রণমি বর্ষমানে।

চন্দ্র তপন প্রাণেরি সে নাম, প্রাণ সেই প্রজাপতি,

প্রাণ সে বিরাট প্রাণ সে দ্রষ্টা প্রাণ সে পরম জ্যোতি।

প্রমোদিত করে সকল প্রাণীরে ধারারূপে প্রাণ নেমে,

মহীরে সুরভি করে সে আসিয়া ওষধি লতার প্রেমে।

সত্য-সেবকে উত্তম লোকে প্রাণ শুধু নিয়ে যায়,

মৃত্যু-অভেদ প্রাণের ভজন দেবতা মানবে গায়।

সকল সৃষ্টি, সকল চেষ্টা, সকল নিধির সার,

ব্রহ্মেতে ধীর, তন্দ্রাবিহীন প্রাণেরে নমস্কার।

অথর্ব্ববেদ।

প্রার্থনা (আস্তেক জাতি)

প্রার্থনা

(মেক্সিকোর আস্তেক জাতি)

তুমি মাঝে মাঝে দণ্ড যা’ দাও

দয়াময় প্রভু মোর,

তাহে নিঃশেষে হয় যেন নাশ

মম ভ্রান্তির ঘোর।

প্রার্থনা (কাফ্রি জাতি)

প্রার্থনা

হে প্রভু! আমার চরণ ক্লান্ত

এই পথখানি এসে;

ব্যথিত পান্থ করহে শান্ত,

পরাণ জুড়াও হেসে।

কম্পিত পদে ফিরেছি যে পথে

সেথাই কাঁটার বন;

তীর্থ সুদূর যাত্রী বিধুর,

ব্যবধান ত্রিভুবন।

সন্তাপহর! তোমার অজর

প্রেমের নিঝর পানে

নিয়ে যাও প্রভু! বড় ব্যথা বুকে,

পরশ বুলাও প্রাণে।

নিগ্রো ডান্‌বার।

প্রার্থনা (দ্রাবিড়)

প্রার্থনা

(দ্রাবিড়)

কিসে শুভ কিসে অশুভ আমার কিছুই বুঝিনে প্রভু!

প্রার্থনা করি তবু!

তুমি সব জানো, এইটুকু জেনে আছি আমি আশা ধরি,

তাই প্রার্থনা করি;

যাহা দিতে চাও তাই শুধু দাও,—তাতেই আমার শুভ,

এ কথা জেনেছি ধ্রুব,

তোমার অর্থে সার্থক কর মোর প্রার্থনাচয়,

প্রভু! মঙ্গলময়!

প্রার্থনা (নাভাহো জাতি)

প্রার্থনা

(নাভাহো)

অনন্ত-যৌবন, প্রভু, আকাশের রাজা!

পূজা লও, রাখ মোর দেহ মন তাজা;

চিরদিন রেখ’ মোরে সবল সুন্দর,

সৌন্দর্য্যে পূর্ণতা যেন পায় চরাচর।

প্রার্থনা (মেক্সিকো)

প্রার্থনা

(মেক্সিকো)

মনসা কাঁটার শুভ সুমনস্‌।

আমারে কর গো বুড়া,

কুহকের জাল ছিন্ন কর গো।

মায়াবীর মায়া গুঁড়া;

তেমন বয়স পাই যেন, যাহে

লাঠি হয় সম্বল,

আমার আরতি গ্রহণ কর গো

নিশীথের শতদল!

প্রার্থনা (সিউস্‌ জাতি)

প্রার্থনা

(সিউস্ জাতি)

হে দেবী পৃথিবী, ওগো পিতামহী

দেহ আয়ু, দেহ বল;

বুননা ঘোড়া যেন ধরিতে পারি গো

মারিতে শক্রদল।

শান্তির দিনে অন্তরে যেন

কখনো না পশে রোষ,

নিজ গোত্রের ’পরে যেন কভু

হয় নাকে। আক্রোশ।

প্রিয়তমের প্রতি

প্রিয়তমের প্রতি

ভাবনার ভারে ওগো প্রিয়তম হ’য়েছি কুঁজা,

তব প্রেমময় পরশে আমায় কর হে সোজা।

ওই হাতখানি রাখিলে মাথায় জুড়ায় মাথা,

নিখিল-ভরণ করুণ ও কর, জেনেছি ধাতা!

ছায়া দান করি’ হে প্রভু সে ছায়া নিয়োনা হরি’

ব্যথিত,—ব্যথিত,—ব্যথিত আমি হে কাঁদিয়া মরি।

নয়নে ছলিয়া নয়নের ঘুম গিয়েছে চলি’,

তোমার শপথ তব আশাপথ চাহি কেবলি।

রুমি।

প্রেম নির্ম্মাল্য

প্রেম নির্ম্মাল্য

মধুর মদির মত্ততা এস, এস তুমি ভালবাসা,

এস হৃদয়ের গ্লানি-বিমোচন, সকল দর্প-নাশা।

ধন্বন্তরী তুমি আমাদের, তুমিই পাতঞ্জল,

যোগের সূত্র শিখাও, কর গো নিরাময় নির্মল।

প্রেমের আবেশে পাহাড় টলেছে সাগর উঠেছে দুলে,

প্রেমের মহিমা মর্ত্ত্য-মানুষে নিয়েছে স্বর্গে তুলে।

যদি প্রেমময় ধন্য করেন মোরে চুম্বন দানে,

উচ্ছসি’ হিয়া কঁদিবে ফাটিয়া মুরলি-ললিত-তানে।

রুমি।

প্রেম-তত্ত্ব

প্রেম-তত্ত্ব

এই ভালবাসা, এই সেই প্রেম, স্বর্গের সুখ

মর্ত্তে পাওয়া,

ঘোমটা ঘুচাননা পলকে পলকে, আলোকে পুলকে

উধাও ধাওয়া!

প্রেমের পহেলা সংসার ভোলা, প্রেমের চরম

পক্ষ মেলা,

আঁখির আড়ালে ফেলিয়া জগৎ, আকাশে বাতাসে

মত্ত খেলা!

প্রেমিকের দলে ঢুকেছ যখন, দৃষ্টি বাহিরে

দেখিতে হবে,

হৃদয়-পুরীর অলিগলি যত একে একে সব

চিনিয়া ল’বে।

নিশ্বাস নিতে কোথায় শিখিলি, ওরে মন, তুই

নিস্ তা’ জেনে;

কেন যে হৃদয় স্পন্দিত হয়—তার সমাচার

কে দ্যায় এনে!

রুমি।

প্রেম-পত্রিকা

প্রেম-পত্রিকা

প্রকৃতি-মধুরা, মুখে হাসি ভরা, ভিতরে বাহিরে মধু!

রূপ-দেবতার প্রতিমা তুমি গো, গঠিত অমৃতে শুধু!

সুল্‌তানা! আমি গোলাম তোমার, বাঁধা আছি হাতে গলে,

রাখিতে, মারিতে, বিক্রি করিতে পার গো ইচ্ছা হ’লে।

ওই অধরের সুধা পান করি’ আয়ু হ’ল অক্ষয়,

অমৃত-কূপের সন্ধান জেনে মরণে কি আর ভয়?

স্বাদু ও সরস নাহি চাহি যশ, তুমি রাখ হাতে হাত,

রাজা বিনা কার এমনটা ঘটে? আর কেবা হয় মাত্‌?

কপোতের মত শুভ্র আমার ক্ষুদ্র এ চিঠি খানি,

পাখনা মুড়িয়া চলিল উঠিয়া তোমারি সমীপে, রাণী!

এমন একটা কিছু করা চাই শীঘ্র না ভোলে লোকে,

সাবাস নেজাতি, তোম্‌—তানা-নানা, হাসি যে উছলে চোখে!

নেজাতি।

প্রেমিক ও প্রেমহীন

প্রেমিক ও প্রেমহীন

ভাল যারা বাসে শুধু তারা ভাল থাকে।

প্রেমহীন সারা হয় বহি’ আপনাকে।

‘কুরাল’-গ্রন্থ।

প্রেমের অত্যুক্তি

প্রেমের অত্যুক্তি

(একটি স্পেন দেশীয় কবিতার অনুসরণে)

হাজারটা মন থাকত যদি সব কটা মন দিয়ে,

ভাল তোমায় বাসতাম আমি, প্রিয়ে!

কুবেরের ধন পাই গো যদি পায়ে তা’ অর্পিয়ে

ভাবব,—কিছুই হয়নি দেওয়া, প্রিয়ে।

লক্ষ-লোচন ইন্দ্র হয়ে,তোমার পানে থাকব চেয়ে,

হাজার বাহু দিয়ে তোমায় ধৰ্বব আলিঙ্গিয়ে,—

কার্তবীর্য্য রাজার মত, প্রিয়ে!

কানুর মত শিখব বেণু বৃন্দাবনে গিয়ে,

তোমায় শুধু ক’র্ত্তে খুসী, প্রিয়ে॥

ফাগুন হ’য়ে দিব তোমায় লাবণ্যে ছাপিয়ে,

প্রণয় হ’য়ে সোহাগ দিব, প্রিয়ে!

কবি হ’ব মন গলাতে, রাজা হব সাধ মিটাতে,

নিত্যকালে পেতে তোমায় স্বর্গ হ’ব প্রিয়ে।

সকল সাধন,—সকল পুণ্য দিয়ে।

প্রেমের ঠাকুর

প্রেমের ঠাকুর

নিত্য নাহিলে হরি যদি মিলে

জলজন্তু তো আছে,

ফলমূল খেলে হরি যদি মেলে,—

বানর রয়েছে গাছে।

তৃণ দাঁতে ধরি যদি মিলে হরি

তবে হরি হরিণের,

কামিনী ত্যজিলে হরি যদি মিলে

খোজা তো রয়েছে ঢের।

শুধু দুধ খেলে হরি যদি মেলে,—

কত আছে কচি ছেলে,

কহে মীরাবাই বিনা প্রেম, ভাই,

সে ধন কভু না মেলে।

মীরাবাই।

ফৌজদার

ফৌজদার

বিরক্ত বিব্রত ফৌজদার

আরামের আরাধনা করে,

দুরন্ত গরম যবে, আর,

কাছারিতে লোক নাহি ধরে;

শুনিতে শুনিতে মোকর্দ্দমা

পদে পদে সন্দেহ কেবলি,

রাশি রাশি মিথ্যা হ’য়ে জমা

আসামীরে ফেলে শেষে দলি’!

আরামের লাগি ফেলে শ্বাস,

‘আলো দাও’ বলি’ চাঁদে ডাকে,—

‘ডাকাতে না শান্তি করে নাশ,

চোর যেন কানাচে না থাকে।’

এত খাটে, এত ভেবে মরে,

তবু তার না পূরে আশয়,

চোরেরা তবুও চুরি করে,

নালিশের শেষ নাহি হয়!

কত মতলব হয় মাটি

কত চেষ্টা ব্যর্থ হ’য়ে যায়,

‘দশের হিতের তরে খাটি’

এই ভেবে সব স’য়ে যায়।

বিরক্ত বিব্রত কেন তবে?

অক্ষত শান্তির কেন আশা?

শান্তি লাগি যুদ্ধ হেথা হবে,

পৃথিবী যে মানুষের বাস।

ওয়ারেণ্‌ হেষ্টিংস্।

বন-গীতি

বন-গীতি

তেতে যখন উঠছে কোঠা, যায় না ঘরে টেঁকা, '

তখন উচিত বেরিয়ে পড়া ‘দুই-প্রাণীতে-একা’!

চোরাই সোহাগ বেঁটে নেওয়া নয়কো নেহাৎ মন্দ,

বনের ভিতর ঘনায় যখন অল-বোখারার গন্ধ।

সূয্যি মামার পাইক গুলো বাইরে বিষম খুঁজচে,

পালিয়ে-ফেরা ফেরার দুটোর দুষ্টুমিটা বুঝচে!

ঝোপের খোপে কুলফি হাওয়া দিচ্চে হেথা জুড়িয়ে,

দুষ্টু দুটো পাড়ছে গাছের নিচ্চে তলার কুড়িয়ে।

দিনটা যখন যাচ্চে ভাল যায় সে ঘোড়া ছুটিয়ে,

দীর্ঘ ঘন ঘাসের রাশে পড়ল কে ওই লুটিয়ে?

নুইয়ে-পড়া তৃণ আবার দাঁড়ায় ঘন সার দিয়ে,

কিছু দেখা যায় না গো আর আঁধার বনের ধার দিয়ে।

আল্‌বার্ট গায়্‌গার্‌।

বন্দী

বন্দী

বিকল ভাবে বিরস ভাবে

সারাদিনমান

কারা-গৃহের প্রাচীর ’পরে

উড়িছে নিশান;

বাতাসে তার শব্দ উঠে

বিচিত্র সুরে,

ক্লান্ত হিয়া আমারে, হায়,

অতিষ্ঠ করে!

ছাদের কোলে তীব্র আলো

গবাক্ষে জাগে,

চেয়ে চেয়ে শূন্য নয়ন

নির্বাণে মাগে;

হাতে শিকল, পায়ে বেড়ি,

পরাণ সে অধীর,

কারাবাসীর দুঃখে কালো

পাষাণের প্রাচীর।

পাষাণ প্রাচীর আর্ত্তনাদের

আখরে চৌচির,

নির্যাতনের নিশান ওড়ে

নির্দোষী বন্দীর।

উইলিয়ম মরিস।

বন্দী সারস

বন্দী সারস

বন্দী সারস দাঁড়ায়ে আছে,

পিঞ্জরতলে আঙিনা মাঝে,

উড়ে যেতে তার মন চায়;

সাগর পার যাবে আবার,—

সে আশা এখন মিছে হায়।

এক পায়ে ভর করিয়া রহে,

বোজা চোখ দিয়ে সলিল বহে,

আর পায়ে ফিরে করে ভর;

বদল করে, ভাবিয়া মরে,

হায় অসহ্য অবসর!

কভু মাথা গোঁজে পাখার নীচে,

সুদূরের পানে তাকায়,—মিছে,—

প্রাচীরে ঘিরেছে চারিদিক;

নাহিক ফাঁক, শিলার থাক,

মিছে চেয়ে থাকা অনিমিখ।

আকাশের পানে আঁখি ফিরায়,

দেখে চেয়ে চেয়ে,—উড়িয়া যায়

স্বাধীন সারস দলে দল

দেখিতে দেশ; সে শুধু ক্লেশ

সহিছে, দহিছে অবিরল!

আজো ভুলে আছে মিছে আশায়,

ভাবে,—ফিরে পাখা গজাবে, হায়,

উড়িতে আবার হ’বে বল;

বন অগাধ ভ্রমিতে সাধ,

মন হয়ে উঠে চঞ্চল।

শ্যাম লাবণ্যে শরৎ হাসে,

সারসের দল আর না আসে,

পিঞ্জরে একা আছে সেই;

বন্দী পাখী অন্ধ আঁখি,

রন্ধ নেই একেবারেই।

আকাশের পথে কারা ও যায়!

পাখার শব্দ ধ্বনিছে, হায়,

কে যায় পাখায় করি’ ভর!

পাতিয়া কান শোনে সে তান

উড়ে চলে কোন্ নভচর।

মনের আবেগে উড়িতে চায়,

অক্ষম পাখা,—পড়িয়া যায়,

উঠিতে শকতি নাহি তার,

পাখায় আর সহে না ভার,

বেড়ে ওঠে শুধু হাহাকার।

হায় পাখী! মিছে ভরসা রাখা,

আর কি তোমার হ’বে গো পাখা?

হ’লেও সে,—লাভ নাহি তায়;

যতই হোক,—নিচুর লোক—

বারে বারে কেটে দিবে, হায়।

আরাণী।

বন্ধন-দুঃখ

বন্ধন-দুঃখ

পিঞ্জর গড়ি’ গোলাপের শাখা দিয়ে

বুলবুলে আনি’ যতনে রাখিনু তায়,

তবু কোন্ দুখে মরে গেল সে কাঁদিয়ে?

কাননের পাখী বাঁধন সহে না, হায়।

নৈলি।

বর্ম্মার কবিতা

বর্ম্মার কবিতা

কেমন হ’য়েছে মন,—মনে নাহি সুখ,

হারায়ে শীতের বাস শীতে কাঁপে বুক;

কি হ’ল আমার ওগো সদা ভাবি তাই,

চন্দনের খাটে শুয়ে চোখে ঘুম নাই।

বড়ই দুখিনী আমি বড় অভাগিনী,

বিদেশে রয়েছে বঁধু আমি একাকিনী;

দিন যায় যাতনায় হায় হায় করি,’

রেশ্‌মী বালিশে শুয়ে আমি কেঁদে মরি।

তোমারে জানাই বঁধু তোমারে জানাই,

এ দশায় এ দেশে থাকিতে সাধ নাই;

এস একবার এস সাধি পায়ে ধরি’

ফুল শেযে শুয়ে বঁধু মরি যে গুমরি’।

ঝরণা ঝরার মত আঁখিজল ঝরে,

কেঁদে নদী বয়ে যায় বঁধুয়ার তরে;

কি হ’বে ফুলের শেযে, চন্দনের খাটে,

বঁধু বিনা হাহাকারে সদা বুক ফাটে!

ফিরে এস, ফিরে এস, এস বঁধু মোর,

তুমি এলে শুকাইতে পারে আঁখি-লোর।

বসন্তে অশ্রু

বসন্তে অশ্রু

নব বসন্ত ডাক দিয়ে গেছে।

দুয়ারে দুয়ারে, হায়,

নব বধূ তাই এসে দাঁড়ায়েছে

আধ খোলা জানালায়।

জরিতে জড়িত নীল রেশমের

বসনে ঢেকেছে কায়া,

ললাটে এখনো চিহ্ন পড়েনি

নয়নে পড়েনি ছায়া;

সহসা বাতাস বয়ে নিয়ে এল।

উতলা ফুলের বাস,

সহসা তাহার মন উথলিয়া

পড়িল গো নিশ্বাস!

রণচণ্ডীরে যে ধন সঁপেছে,—

যা’ দিয়েছে কীর্ত্তিরে,—

তাহারি লাগিয়া বিহ্বল হিয়া,—

নয়ন ভরিছে নীরে।

ওয়াং-চাং-লিং।

বসন্তের প্রত্যাবর্ত্তন

বসন্তের প্রত্যাবর্ত্তন

কিরণে ঝলমল অগাধ নীলজল,

নীল কমল তায় ফুটেছে;

বনের পথ ধরি’ চলেছে সুন্দরী,

নীল কমল হেরি’ ছুটেছে।

ঝাপ্‌সা ঝোপে ঝাপে ব্যথিত বায়ু কাঁপে,

পিচের শাখে শাখে পাতার সূচী;

ঝাউয়ের মৃদু ছায়া রচিছে কিযে মায়া

ছড়ায়ে বন পথে সোনার কুচি!

নীল কমল লখি’ চলে কমল-সখী,

বন বিজন, ভিজা ভেষজ ঘ্রাণ;

আবেশে একাকার চলিতে পিছে তার

শুনি গো বারবার পুরাণে তান;—

“নিখিলে আছে মিশে কাহিনী অনাদি সে,—

যা’ ছিল পুরাতন হ’ল সে নব;

কালের বিষে জ্বরা তরুণ হ’ল ধরা

পুরাণো প্রাণে নব প্রেমমাৎসব!”

সুকুন্তু।

বহুরূপ

বহুরূপ‌

অগ্নি যেমন ভুবনে প্রবেশি’

নানারূপ ধরে আধার ভেদে,

নিখিলের প্রাণ তেমনি করিয়া

একা নানা ছাঁদ বেড়ান ছেঁদে!

বাতাস যেমন ভুবনে প্রবেশি’

নানা সুরে গাহে যন্ত্র ভেদে,

নিখিলের প্রাণ এক ভগবান

তেমনি বেড়ান হেসে ও কেঁদে!

তপন যেমন নিখিলের আঁখি,—

কলুষে দূষিত হয় না তবু,

নিখিলের প্রাণ তেমনি গো, তাঁরে

বাহিরের গ্লানি ছোঁয় না কভূ।

সর্ব্বভূতের অন্তরতম,

বহুরূপ তিনি গোপনচারী,

আপনার মাঝে তাঁরে যে দেখেছে।

অক্ষয় সুখ তারি গো তারি।

কঠোপনিষৎ।

বাঁকা

বাঁকা

কুকুরের বাঁকা ল্যাজ সোজা হয় নাকো

বাঁশের চুঙ্গিতে তারে যত ভ’রে রাখ;

কুটিলের বাঁকা মন তাহারি মতন,

তার সাথে তর্ক করা বিফল যতন।

বেমন।

বানর

বানর

একটা বানর বসেছিল সরল গাছের শাথে,

আমি ব’সে ভাবছিলাম ‘সে খায় কি? কোথায় থাকে?’

অলসভাবে ভাব্‌তে এবং চাইতে চাইতে ক্রমে,

কখন চক্ষু পড়্‌ল ঢুলে স্বপ্ন এল জমে।

স্বপ্নে দেখি বছে বানর “ওহে পোষাকধারী!

দেখ্‌ছ? আমার নেইক দর্জ্জি, নেই কোনো দিক্‌দারী,

মাসে মাসে নেই তাগাদা, পরিনে হ্যাট্‌কোট্‌,

নেইক নিত্য সান্ধ্য-সভায় নিমন্ত্রণের চোট।

বেণের ঘরে দিন দুপুরে রসদ কেড়ে খাই,

বেটা তবু বেজায় মোটা, আমি কাহিল, ভাই!

যাইনে কারো গাড়ীর পিছে, ঘরের হোক কি ঠিকে,

দিইনে নজর অন্য কোনো মর্কটের স্ত্রীর দিকে।

খোস্‌ পোষাকী নইকো মোটেই ঢাকিনে গা পর্দ্দায়,

বাংলো-বাড়ী নেইকো আমার ঘুমাই সুখে ফর্দ্দায়;

কিনিনে দস্তানা আংটি, চোখ ঠারিনে মনকে,

সুন্দরীদের জন্য পয়সা দিইনে হ্যামিল্টনকে।

দ্বন্দ করি নিজের মধ্যেই, ভার্য্যা এবং ভর্ত্তা,

বানর-গিন্নি স্পষ্ট জানেন আমিই তাঁহার কর্ত্তা।

ম্যালেরিয়ার ভয় করিনে, নেইক দেনার দায়,

মানুষ জাতটা দেখলে আমার বড্‌ড হাসি পায়।”

হঠাৎ জেগে দেখি আমার মাখন-মাখা রুটি

সংগ্রহ-না-ক’রে বানর যাচ্ছে গাছে উঠি।

মুখখানা তার রক্তবর্ণ গায়েতে লোম কত!

খেতে খেতে চুলকায় মাথা, ঠিক বানরের মত।

শিষ্ট সে নয়, সভ্য সে নয়, নেহাৎ হনুমান,

(তবু) সাদাসিধে বানর হ’তে চাইলে আমার প্রাণ!

বল্লাম তারে “ভদ্র বানর! কর্‌লেন অন্তর্যামী

খোস্ মেজাজী বানর তোমায়, আমায় কর্‌লেন আমি!

বিদায় বন্ধো! শনৈঃ শনৈঃ যাচ্চ আপন ঘরে,

ভুলনা, হায়, তুমি হতে ইচ্ছা করে নরে।”

কিপ্লিং।

বাল-বিধবা

বাল-বিধবা

আমার স্বপন, সুখের স্বপন,

নিমেষে ফুরাল,-এই সে ক্লেশ!

ইন্দ্র ধনুর ভঙ্গুর তনু

অস্ত রবির কিরণে শেষ।

রিক্ত শাখার রক্তিম পাতা,

বাতাসে হুতাশে কাঁপিয়া মরি,

নিঠুর জগতে আছি কোনো মতে,

জানিনা কখন পড়িব ঝরি’!

গঙ্গায় ধারা যতদূর যায়

ওগো দয়াময়! তাহারো পারে

লয়ে যেয়ে এই সুখ-বঞ্চিত

চির-লাঞ্ছিত ভস্ম ভারে।

ডিয়োজিয়ো।

বাসন্তী বর্ষা

বাসন্তী বর্ষা

ক্ষুদে’ বাদলের জয় হোক ওগো, প্রয়োজন বুঝে

দ্যায় সে দ্যাখা,

শস্য-বীজের তৃষ্ণা ঘুচাতে তপ্ত ঋতুতে

সে আসে একা!

বন্ধু হাওয়ার সঙ্গে নিশীথে নীরব চরণে

বেড়ায় সে যে,

তার সেই পুলকাশ্রুতে ভিজে ধরাতল ওঠে

সবুজে সেজে!

কালি সন্ধ্যায় মেঘের ছায়ায় হয়েছিল পথ

দ্বিগুণ কালো,

দূরে নৌকায় উদ্ধার মত জ্বলেছিল শুধু

মশাল-আলো;

আজ প্রাতে তাজা রঙের পরশে হরষে ফাটিয়া

পড়িছে মাটি,

ফিরে পতঙ্গ মুকুতা-উজল তৃণদলে পরি’

সোনালি শাটী।

তু-ফু‌।

বাসন্তী স্বপ্ন

বাসন্তী স্বপ্ন

আমার আঁধার ঘরে,

রাতে এসেছিল হাল্কা বাতাস

ফাল্গুনী লীলাভরে!

আমারে ঘিরিয়া ঘুরে ফিরে শেষে

চুপে চুপে বলে “ওরে!

উড়ু, উড়ু, মন উড়াব আজিকে,—

সাথে নিয়ে যাব তরে।”

সাগরে চলিল ধারা,

জ্যোৎস্না-জড়িত শতেক যোজন

মিলায় স্বপন পারা।

মন-রাখা ওগো মনের রাখাল!

এনু কি তোমারি দেশে?

চান্দা নদীর কিনারে কিনারে

ফাগুনী হাওয়ায় ভেসে?

ক্ষণিক স্বপ্নবেশ

আঁখির পলক পড়িতে টুটিল,—

হ’য়ে গেল নিঃশেষ।

ব্যথিত নয়ন লুকানু যেমন

বিতথ শয্যা-মাঝে,

পরাণ আমার হ’ল উপনীত

অমনি তোমার কাছে!

কোথায় চম্পাপুর!

কোথা আমি, হায়, তুমি বা কোথায়,—

শতেক যোজন দূর!

মাঝে ব্যবধান গিরি, নদী, গ্রাম,

পথে বাধা শত শত,

সুপ্ত মু’খানি ছুঁয়ে এনু তবু,—

চকিতে হাওয়ার মত!

ৎসেন-ৎসান্‌।

বিকাশ-ভিখারী

বিকাশ-ভিখারী

মুকুল যখন ফাটিয়া ফুটিছে ফুলে,—

ভরিছে ভুবন তপ্ত ভানুর করে,—

বিকাশ-ভিখারী অশরীরী কোন্‌ শিশু

মোর হিয়া মাঝে কাঁদে ওগো সকাতরে!

কহে সে “তুমি তো পুলকে ভ্রমিছ একা,

শস্যের ক্ষেতে, গোলাপের উপবনে,

মোর যে এখনো হয়নি জগৎ দেখা,

রেখেছ ক্ষুধিত, সে কথা কি নাই মনে?

মিনতি রাখ গো, ভিখারীর মুখ চাও,

কত আর রব বিকাশের পথ চেয়ে?

প্রসন্ন হও, প্রকাশিত হতে দাও,

তুমিও হরষে—দেখিয়ো—উঠিবে গেয়ে।

নাদুস-নুদুস হাত আমি একখানি,—

স্বপনের ঘোরে খুলী হও যারে চুমি;

পীযুষ-লুব্ধ দুটি কচি ঠোঁট আমি,—

তৃষিত রয়েছি, তৃপ্ত কর গো তুমি।

আমি চাই তোর সঙ্গী দোসর হ’তে,

ছোট হই—বশ ক’রে নিতে জানি মন;

আমার ভাষাটি শিখাব নানান্‌ মতে,

অফুরান্‌ কথা কহিব অনুক্ষণ।

কি দেখিছ, হায়, বাহিরে ফুলের বনে?

দেখ, চেয়ে দেখ ভিতরে কি শূন্যতা!

দেখ গো হৃদয় পূরিছে কি ক্রন্দনে!

বিকাশ-ভিখারী কাঁদিছে! ঘুচাও ব্যথা।”

অ্যাগ্নেস্ মায়্‌গেল্‌।

বিগ্রহ

বিগ্রহ

নিশীথে আমার এই মন্দির-প্রাঙ্গণে

ধাতুময় সপ্ত ধেনু জাগে,

বিচিত্র পাষাণ দীপ জ্বলে সারারাত

মিট্‌ মিট মিট্‌ লাখে লাখে!

আমি লীলাভরে,

গভীর মন্দির গর্ভে বসি গুপ্ত ঘরে,

রত্ন-বেদী ‘পরে!

চন্দনের কড়িকাঠ সারি, সারি, সারি,

সারারাত চেয়ে চেয়ে দেখি;

বসে থাকে তারাগুলি ঘুল্ঘু‌লি জুড়ে,

মিট্‌‌ মিট্‌ মিট্‌ করে আঁখি।

আমি যদি দাঁড়াইয়া উঠি একবার!

গুঁড়া হ’য়ে পড়ে যাবে ছাদ;

ডিম্বাকার হীরকের তৃতীয় নয়ন

ঠেকে ভেঙে ফেটে যাবে চাঁদ।

উঠিবনা,—থাক্‌!

স্থূলদোর পূজারীরা ডাকাইয়া নাক

নিশ্চিন্তে ঘুমাক্‌!

যোগাসনে, তার চেয়ে বসে এক মনে

নিজের নাভিটি ধ্যান করি;

পদ্মরাগ-বিমণ্ডিত নাভিপদ্ম, আহা!

কিবা শোভা! কিবা কারিগরি!

আর্ণো হোল্‌জ।

বিচারপ্রার্থী

বিচারপ্রার্থী

দয়াহীনে দণ্ড দিতে তুমি আছ, হরি!

নালিশ তোমার নামে কার কাছে করি!

কাতরে মিনতি করি নাহি তোলো কানে,

নীরবে বসিয়া থাক,-ব্যথা পাই প্রাণে;

আকুল নয়নে চাই ধরিয়া চরণ,

প্রাণের বেদনা সদা করি নিবেদন;

মনের মোহের ফাঁস কর প্রভু ক্ষয়,

তুকা কয়, আর নয়,—এস দয়াময়!

তুকারাম।

বিচিত্রকর্ম্মা

বিচিত্রকর্ম্মা

কাঁটা গুল্মে যে গুলাব ফুটাতে পারে,

শীতের বাতাসে ছুটায় যে দক্ষিণে,

তার অসাধ্য কিছু নাই সংসারে,

হরষের হাসি ফুটাবে সে দুর্দ্দিনে।

রুমি।

বিদায়

বিদায়

বিদায়! যে দেশে গেলে ফেরে নাকো আর

এবার আমারে যেতে হ’বে সেই দেশে;

বিদায় জন্মের মত বন্ধুরা আমার,—

যদিও তাহাতে কারো যাবে নাকো এসে।

তোমরা হাসিবে বটে শত্রুরা আমার,

এ চির প্রয়াণ-বার্তা,অতি সাধারণ;

সবারে জানিতে তবু হ’লে এর স্বাদ

একদিন; ওগো মিত্র ওগো শত্রুগণ!

একদিন অন্ধ-করা অন্ধকার তীরে

দাঁড়ায়ে আপন কর্ম্ম স্মরিবে যখন,

কখনো দহিবে ক্ষোভে, কভু অসন্তোষে,

পরম কৌতুকে হেসে উঠিবে কখন।

সংসারের রঙ্গগৃহে যখনি যেজন

অভিনয় সাঙ্গ করি’ চলে যেতে চায়,—

উল্লাস-অবজ্ঞা-ভরা বিপুল গর্জন

একবার ফিরাইয়া আনিবেই তায়।

মানুষ দেখেছি ঢের এ দীর্ঘ জীবনে,

দেখেছি অনেকে আমি অন্তিম শয্যায়;—

বৃদ্ধ বিপ্র, বৃদ্ধ বেশ্যা, বৃদ্ধ বিচারক,—

সবারি সমান দশা মৃত্যু যাতনায়।

মিথ্যা প্রায়শ্চিত্ত আর মিথ্যা চান্দ্রায়ণ,

মিথ্যা গঙ্গাযাত্রা, মিছে মৃদঙ্গের রোল,

সফরে চলেছে ওই আত্মারাম বুড়া,—

তার লাগি মিছে অশ্রু, মিছে ‘হরিবোল'।

হাসে শয়তানী হাসি হেটো লোক যত,

জীবনের ভুল ধরি’ পরিহাস করে;

এমনি করিয়া শেষ হয় প্রহসন,—

তাও লোকে ভুলে যায় দিন দুই পরে!

হায়! ক্ষুদ্র পতঙ্গিকা! ক্ষণিকের জীব!

অদৃশ্য সূতায় বাঁধা রঙীন্ পুতুল!

নির্বাণের করতলে ঘাড়-নাড়া বুড়া!

কি তোরা? কোথায় যাস্‌?—চেয়ে জুলজুল!

আজ আমি দাঁড়াইয়া যেই সন্ধিস্থলে,

কে পারে দাঁড়াতে হেথা অব্যাকুল মনে?

যে জানে ভয়ের কিছু নাহি পৃথ্বীতলে,

জীবনে যে খ্যাতিহীন, অজ্ঞাত মরণে।

ভল্‌টেয়ার।

বিদায় ক্ষণে

বিদায় ক্ষণে।

উটের সহিস সাড়া দিয়ে গেল

পড়ে গেল হাঁকাহাঁকি,

এমন সময়ে দেখিনু অদূরে

দাঁড়ায়ে আমার সাকী!

মন্দ লোকের নিন্দার ভয়ে

একটি কথা না বলি’

নিমেষের তরে এসে চলে গেল।

আঁখি এল ছলছলি’।

গোপন কথার শ্রোতা বহু জুটে,

খুঁজিতে হয় না লেশ,

এবারের মত বিদায় বারতা

চোখে চোখে হ’ল শেষ।

বেহায়েদ্দিন জোহির।

বিদেশী

বিদেশী

স্বপনের শেষে আঁখি কচালিয়া কি দেখিনু আহা মরি!

চন্দ্রলোকের কান্তি যেন গো এসেছে মূরতি ধরি’!

ভাগ্য আমার ফলিল কি আজ? লভিনু দৈব বল?

বৃহস্পতি কি এল একাদশে? সখী তোরা মোরে বল্‌।

পরিধানে তার বিদেশীর বেশ, পরিচিত তার মুখ,

প্রেমের রূপের পূর্ণ সুষমা মন করে উৎসুক!

অনিমেষ চোখে পলক পড়িতে অমনি নিরুদ্দেশ!

দেবতার দূত ছলিয়া গেল রে মনে বুঝিলাম বেশ।

মিহির আর মরণ হ’ল না; নিশার তিমির চিরে

সিকন্দরের মত সে গিয়েছে অমৃত-কুপের তীরে।

মিহ্রি।

বিপদের দিনে

বিপদের দিনে

বিপদের দিনে হ’স্‌ নে রে মন হ’স্‌ নেকো ম্রিয়মাণ,

হাসিমুখে থাক্ তোর সে ভাবনা ভাবিছেন ভগবান;

গোলাপে ছিঁড়িয়া কেহ কি পেরেছে হাসি তার কেড়ে নিতে?

ধূলায় প’ড়েও হাসি ফোটে তার পাপ্ড়ি‌তে পাপ্ড়ি‌তে!

রুমি।

বিবাহ-মঙ্গল

বিবাহ-মঙ্গল

(পার্শীজাতি)

‘আজ আমাদের বিয়ে বাড়ী?—কেমন ক’রে জান্‌লি ভাই?

‘গয়লা আসে, ময়রা আসে, স্যাকরা হাসে, জান্‌ছি তাই!’

‘আজ আমাদের বিয়ে বাড়ী!’—কেমন ক’রে জান্‌লি ভাই?

ঘরে দ্বারে উঠান্ ’পরে লোক ধরে না,—জান্‌ছি তাই!’

‘আজ আমাদের আমোদের দিন!’-কেমন ক’রে জান্‌লি ভাই?

‘বাজ্‌ছে বাঁশী, বাজ্‌ছে ন’বৎ, শুন্‌ছি কানে, জান্‌ছি তাই!’

‘মোদের বাড়ী বরের বাড়ী!-কেমন ক’রে জান্‌লি ভাই?

‘ঘোড়ার সারি দাঁড়িয়ে দ্বারে, দেখ্‌ছি চোখে জান্‌ছি তাই!

‘বরের বাড়ী আমোদ ভারী!’—কেমন ক’রে জান্‌লি ভাই?

‘বন্ধু কুটুম! তাক্‌ দুমদুম্! আঙিনায় আর নাইক ঠাঁই!-

জান্‌ছি তাই!’

বিবাহান্তে বিদায়

বিবাহান্তে বিদায়।

(মুণ্ডারি)

ভাই বোনেতে ছিলাম রে এক মায়ের জঠরে,

মায়ের যা’ দুধ সব খেয়েছি আমরা ভাগ ক’রে;

তোমার ভাগ্যে ভাইরে তুমি পেলে বাপের ঘর,

আমার ভাগ্যে ভাই রে আমি হ’লাম দেশান্তর।

মাসেক দু’মাস কাঁদ্‌বে বাপে, সারাজীবন মায়,

দিনেক দু’দিন হয় তোত রে ভাই কাঁদ্‌বে তুমি, হায়;

ভায়ের বধূ কাঁদ্‌বে শুধু বিদায়ের কালে,

পোষা পাখী মুছ্‌বে আঁখি আঁখির আড়ালে।

বিরহী

বিরহী

কেমন উপায় করি ভেটিতে তোমায়,

ভাবিতে ভাবিতে মোর তনু জ্বরি’ যায়।

ত্যজিয়া আপন জন যাই পরদেশ,

তোমায় দেখিতে যদি পাই পরমেশ!

সহিতে না পারি নাথ! সহিতে না পারি,

পুড়ায়ে করিব ছাই এ তনু আমারি;

অলপ আয়ুর কাল,—নিতি ক্ষয় পায়,

বল, আর কবে দেখা দিবে হে আমায়?

বিচারি’ আপনি কর যে হয় বিহিত,

হুকুম শুনিতে তুকা সদা অবহিত।

তুকারাম।

বিরহী (২)

বিরহী

সংসার হ’তে এবার আমার গালিচা গুটায়ে

তুলিব কাঁধে,

তোমার মুখের মাধুরী নিরখি’ মরে যেতে মোর

পরাণ কাঁদে;

সেই উল্লাসে আপনা হারাব, হারাব আমার

যা কিছু আছে,

মিছে ভাবনার কাটনা ভাঙিয়া লুটাবে তোমার

পায়ের কাছে।

মোরে আর তুমি খুঁজিয়া পাবে না, পরাণ তখন

দেহে না রবে,

মোর পরাণের ঠাইটুকু জুড়ে তুমি সে আমার

পরাণ হবে।

নিজের ভাবনা দূর হয়ে যাবে, ধুয়ে মুছে যাবে

হৃদয় মম;

আমারে ভরিয়া তুমি শুধু র’বে—তুমি শুধু র’বে

হে প্রিয়তম!

ধরণীর মণি! স্বরগের সার! আমারে ফেলিয়া

রেখনা একা,

আপনারে আমি ভুলিব, হে সখা, তুমি যদি দাও

যারেক দেখা।

জামি।

বীরের ধর্ম্ম

বীরের ধর্ম্ম

বীরের ধর্ম্মে যা’ বলে করিয়ো,—যে কথা যে কাজ

পুরুষে সাজে;

প্রশংসা যদি হয় প্রয়োজন খুঁজিয়ো আপন

মনের মাঝে।

ধন্য জীবন তাহারি,—যে জন নিজে বিচারিয়া

নিজের তরে

নীতি ও নিয়ম করি’ প্রণয়ন, আমরণ তাহা

পালন করে;

নহিলে কেবল বেঁচে মরে থাকা,—পুতুলের মত

আসা ও যাওয়া,—

একখানি ছায়া,—এক জোড়া চোখ,—এক্‌টা শব্দ,—

এক্‌টু হাওয়া!

কামৈন্স্‌।

বৃক্ষ-বাটিকায়

বৃক্ষ-বাটিকায়

ঘিরেছে গৃহটি মোর পল্লব-সাগরে,—

নহে সে নির্জ্জীব কিবা বৈচিত্র্যবিহীন;

পাণ্ডু শ্যাম তিন্তিলী সে হেথা শোভা করে

ঘন শ্যাম আম্রকুঞ্জে রহিয়া নিলীন;

ধূসর স্তম্ভের মত মাঝে মাঝে তাল;

নীরব ঝিলের তীরে বিপুল শিমুল,—

সুপ্ত দেশে তুরী যেন বাজায় করাল

শ্যামবনে লালে লাল ফুটাইয়া ফুল।

পূর্ব্ব ভাগে বেণু-বন, শোভা তার সাঁঝে,—

ওঠে যবে চারু চাঁদ পত্র-অন্তরালে,

শুভ্র শতদল যবে সরোবর মাঝে

রৌপ্য পাত্রে পরিণত, চারু ইন্দ্রজালে!

মুরছিতে চাহে মন মৌন সুষমায়,

আদিম নন্দন বনে আঁখি ডুবে যায়।

তরু দত্ত।

বেদনার আশ্বাস

বেদনার আশ্বাস

বেদনার মাঝে আছে ওগো আছে

সীমাহীন আশ্বাস,

কঠিন তালের আঁঠিতে লুকানো

রয়েছে কোমল শাঁস!

রুমি।

বৌ-দিদি

“বৌ-দিদি”

বৌ-দিদি চাস্‌? বোন্‌টি আমার,

বৌ-দিদি তোর চাই?

তারার হাটে খুঁজব এবার

দেখব যদি পাই!

তুই যে মোদের পুণ্যপ্রভা,—

ঠাকুর ঘরের দীপ;

তোর মতটিই আন্‌তে হ’বে

পুণ্য হোমের টিপ্‌।

স্বপ্ন-দেবীর পাখা দু’খান্‌

ধার ক’রে-না-নিয়ে,

ঝড়ের রাতে বেরিয়ে যাব

কারেও না জানিয়ে;

ধর্‌ব গিয়ে ঝড়ের বেগে

রামধনুকের ডোর,

রামধনুকের একটি রেখা

বৌ-দি’ হ’বে তোর!

ডুবব সোজা সাগর জলে

সূর্য্যালোকের মত,

প্রবাল-গুহায় অপ্সরীরা

নাইতে যেথায় রত,

পরীরাণীর মুকুটখানি

আন্‌ব সাথে মোর;

সেই মুকুটের মধ্য-মণি

বৌদি’ হবে তোর!

পক্ষীরাজের পিঠেতে সাজ

মুখে লাগাম দিয়ে,

যাদু-জানা পাগল্‌-পানা

কল্পনাকে নিয়ে,

সটান্ গিয়ে কল্প-লোকের

আন্‌ব সে মন্দার,

বৌদি’ তোমার সেই তো হ’বে;

বোন্‌টি গো আমার।

ডিরোজিয়ো।

ব্রহ্মপ্রবেশ

ব্রহ্মপ্রবেশ

নিজ তনু হ’তে তন্তু সৃজিয়া

ঊর্ণনাভের মত,

আপনার জালে আপনি আবৃত

হ’য়েছেন যিনি স্বতঃ,

সাক্ষী, চেতন, পরম পুরুষ

সেই নিখিলের প্রাণ,—

আমাদের সবে ব্রহ্ম-প্রবেশ

সূত্র করুন দান।

শ্বেতাশ্বতরোপনিং।

ব্রাহুই গান

ব্রাহুই গান

মেদুর নয়ন মেষের মতন,

দারুচিনি জিনি দাঁত,

চোখের চাহনি, চাহনি সে নয়,—

লাখ টাকা হাতে হাত!

বোটাতে তোমার জল যদি থাকে

দাও গো না করি’ ছল,

আমার পক্ষে হ’বে ঔষধ

তোমার হাতের জল!

ওগো সুন্দরী ক্লান্ত মনের

পক্ষেতে তুমি তাঁবু,

শর্কর-খাদী বাদ্‌শাজাদী সে

ও রূপের কাছে কাবু!

তুমি যেন কোনো ফুলের গন্ধ,—

কেবল গন্ধটুক্‌!

গোলাম আমারে ক’রেছে তোমার

মশালা-গন্ধি মুখ!

বৎসরান্তে

বৎসরান্তে

সেও তো এমনি এক বিহ্বল শ্রাবণে

নব অনুরাগে ভরি’ উঠেছিল হিয়া!

তব অলকের গন্ধ সন্ধ্যা-সমীরণে

পান আমি ক’রেছিলু, প্রিয়া!

আজিকে মাথার কেশে রচিলে আসন,

দাঁড়ায়ে দেখিব শুধু, গলিবে না মন।

সেও তো এমনি এক শ্রাবণ-দিবসে

মূর্ত্তিমতী দেবী বলি’ পূজেছিনু তোরে,

তুমি যা পবিত্র করি’ দিতে গো পরশে

বুকে তুলে নিছি তা’ আদরে।

আজিকে টুটেছে প্রেম, মন উদাসীন,

যতনে নাহিক ফল, সে যে প্রাণহীন।

লরেন্স্‌ হোপ্‌।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন

ভবিষ্যতের স্বপ্ন

ভবিষ্যতের তিমির-গর্ভে দেখিলাম ডুব দিয়ে

চর্ম্ম চোখেতে বিশ্ব লোকের স্বপ্ন দেখিনু কি এ!

দেখিনু আকাশ ভরিয়া উঠিল বণিকের ব্যোমযানে,

রাঙা গোধূলির নাবিকেরা মণি বোঝাই করিয়া আনে।

ঘোর হুঙ্কার শুনিনু গগনে, বীভৎস হিম পড়ে,

ব্যোম-পথে ব্যোম-বাহিনী লইয়া লক্ষ জাতিতে লড়ে।

সহসা বহিল দখিনা বাতাস ঝঙ্কার মাঝখানে,

‘সাধারণী ধ্বজা তুলিয়াছে শির’ কহিল কে কানে কানে।

‘স্পন্দরহিত রণদুন্দুভি হ’বে ওগো এইবারে,

বিশ্বমানব মিলিবে আসিয়া জগৎ-সন্তাগারে;

দশের সহজ বুদ্ধি মিলিয়া শাসিবে পালিবে ধরা,

সাৰ্বজনীন বিধানে ধরণী প্রশান্ত হ’বে ত্বরা।

টেনিসন।

ভাবান্তর

ভাবান্তর

ভাল রীতি তব ওহে ভালবাসা!

রয়েছ আমারে ভুলে!

তোমার লাগিয়া আমি পথ চাই,

তুমি তো এস না মূলে!

আপন ভাবিয়া নিকটে গেলাম

চ’লে গেলে পায় পায়,

কমল ভাবিয়া ধরিতে ধাইমু,

কাঁটায় বিধিলে হায়!

সাথী সমঝিয়া মুখ চাহিলাম

বিরক্ত হ’লে, বঁধু,

বেজার হইলে, বুকে চাপাইলে

পাষাণের ভার শুধু!

আশা পথ চেয়ে তবুও রহিম,

রহিনু জন্ম ধ’রে,

ছলনা যে হায় ব্যবসায় তব

বুঝিনু তা’ ভাল ক’রে!

শতবার তুমি ক’রেছ ছলনা,—

করেছ শতেক ভাবে,

দুঃখ কেবল এ ব্যাভার তব,—

স্মরণে রহিয়া যাবে।

সুখের লাগিয়া পাহাড়-আড়ালে

লইলাম আশ্রয়,

সুখ দূরে থাক্‌, সিংহ আসিয়া

হিয়া উপাড়িয়া লয়!

তাড়াতাড়ি ক’রে হ’লনা শিঙার

ফেলে এনু ফুল-ডালা,

তাই কি আমায় পরাইলে সখা

বিষম জালার মালা?

শিকারের মত ক্ষত বিক্ষত

করিলে আমারে বাজ!

জোর জবরিতে পরাণে মারিলে,

এই কি উচিত কাজ?

নিম্‌খুন্‌ করি’ কাটারি রুখিলে

পূরে কি মনস্কাম?

ভ্রুকুটি করিয়া যে ছুরি হানিলে

তাহাতেই মরিলাম।

ওগো মনোচোর! মনের মানুষ!

কেন তুমি চঞ্চল?

চিরদিন কি হে নিরাশ করিবে

চিরদিন নিষ্ফল?

স্তম্ভিত হই, নিশ্বাস ফেলি।

পূর্ব্বের কথা স্মরি,

কহে ঝিন্দ, তবু দেখা নাই,

বিরলে ঝুরিয়া মরি।

ঝিন্দন্‌।

ভাবের ব্যাপারী

ভাবের ব্যাপারী

উৎসব-শেষে অতিথির দল গিয়েছে চ’লে,

পানের পেয়ালা ফেলে গেছে হায় হর্ম্ম্যতলে;

আর কেহ নাই জাগায়ে রাখিতে সে কল্লোল,

ওঠ্‌ জামি! তবে পাত্রটা তোর ভরিয়া তোল্‌!

হোক সুরাশেষ কিবা অমৃতের ফেনা,

জুড়ে দেরে ফের রসের সে লেনাদেনা!

কতই গাহিলি কতই নীরবে কাঁদিলি, হা রে,

মুক্তার মালা গাঁথিলি সোনার বীণার তারে।

বরষে বরষে কতই নূতন তুলিলি তান,

জীবন ফুরায় তবু হায় শেষ হ’ল না গান!

তবে শুরু কর রসের সে লেনাদেনা,

হোক সুরা কিবা সুধা-সাগরের ফেনা!

জামি।

ভালবাসার সামগ্রী

ভালবাসার সামগ্রী

ভালবাসি হাসিভরা বসন্ত মধুর,

আর ভালবাসি নব বরষ প্রবেশ;

রসের পূরিয়া ভালবাসি গো আঙুর

ভালবাসি সুখালস প্রেমের আবেশ!

ধরে রাখ, দেখ দেখ, সুখ না পালায়,

পালালে সে এ জীবনে ফিরিবে না হায়।

সম্রাট বাবর।

ভোলামনের প্রতি

ভোলামনের প্রতি

কি রে মন তুই কৃপাময় নাথে রয়েছিস্ নাকি ভুলে,—

বিশাল বিশ্বে তুলে।

শূন্যে যে ধরে’ আছে;—

পীযুষ সৃষ্টি করেছেন যিনি শিশুরে করাতে পান,

মাতা আর সন্তান,

যাঁর করুণায় বাঁচে!

বিষম রৌদ্রে ক্ষুদ্র তৃণের অঙ্কুরে যে বাঁচায়

করুণার ধারা ধায়

জুড়ায় তাপিত প্রাণ;

অনাদি অশেষ অনাথ-শরণ রক্ষা করেন তোরে—

স্মরণে রাখিস্‌, ওরে!

সকলি যে তাঁরি দান।

তিনি যে নিখিল-বিশ্বম্ভর চির-আনন্দ-ধাম,

ভাব তাঁরে, তুকারাম!

কর তাঁরি নাম গান।

তুকারাম।

মণিহারা

মনিহারা

রক্ত আলো মিলিয়ে গেল ইতস্ততঃ ক’রে,

মৌন চাঁদের সুষমাতে রাত্রি ওঠে ভ’রে!

জান্‌লা খুলে বাদ্‌লা হাওয়া নিই গো মাথা পেতে,

কালো চুলের লহর দোলে জ্যোৎস্না-তরঙ্গেতে!

নিশার বায়ু নীল পদ্মের গোপন কথা বলে,

টুপ্‌ টুপিয়ে শিশির পড়ে স্তব্ধ ঝাউয়ের তলে।

ইচ্ছা করে—বাজাই বীণা;—শুবে কে তা’ আর?

মৃতের জগৎ জাগায় এমন শক্তি আছে কার?

এম্‌নি করে স্বপ্ন মিলায় উড়ো পাখীর সাথে!

মনের মাঝে হারামণি পাই গো গভীর রাতে!

মেং-হৌ-জান্।

মন যারে চায়

মন যারে চায়

(মুণ্ডারি)

কাকের ও কোলাহল চাইনে, .

মুখর ঘটক দল চাইনে,

মন যারে চায় আমি তারে শুধু চাই;

ডগমগ চৌদোল চাইনে,

জগঝম্পের বোল চাইনে,

মন যারে চায় আমি তারে শুধু চাই।

দুয়ারে আমের শাখা চাইনে,

কপালে সিঁদূর আঁকা চাইনে,

ভালবাসা যায় যারে তারে শুধু চাই।

মনের মানুষ

মনের মানুষ

(সুইডেন্)

সিন্ধু-শকুন শুভ্র পাখা হেলিয়ে চ’লে যায়

মত্ত তুফান ধ’র্ত্তে আসে,— ভয় করে না তায়!

যে দিকে যাক্ ফিরবে কপোত নীড়েই পুনরায়,

পরাণ আমার অহর্নিশি তোমার পানে ধায়;—

ওগো, মনের মানুষ!

জোয়ারের জল হ’ক সে প্রবল, প্রেমের কাছে নয়,

পণ্যবহা নদীর মত অগাধ সে প্রণয়॥

ঝরণা জলের মতন বিমল অমি নিরাময়;

প্রেমের চোখে তা নাহি সদাই জেগে রয়;—

ওগো, মনের মানুষ!

অতল-তলে নামতে পারি আনতে মুকুতায়,—

যেখানে ঢেউ গুমরে কাঁদে মৌন বেদনায়।

বরফ ফুঁড়ে যে ফুল ফোটে পর্ব্বতের চূড়ায়,

প্রেমের লাগি আনতে পারি-আনতে পারি তায়;—

ওগো, মনের মানুষ!

মনোজ্ঞা

মনোজ্ঞা

(মিশর)

তোমার মনের মতন হইতে কি যে ছিল প্রয়োজন,

সে কথা আমারে দিয়েছিল বলে গোপনে আমারি মন!

তুমি যাহা চাও, চাহিবার আগে, আমি তা করিয়া রাখি,

যেখানে যখন খুঁজিবে বন্ধু সেখানে তখন থাকি।

পাখী মারিবার তীরধনু লই পাখী ধরিবার জাল,

মৃগয়ার মাঠে ছুটে সারা হই, রোদে হয় মুখ লাল;

আরবের পাখী মিশরে আসে গো আতর মাখিয়া পাখে,

টোপের উপর ঠোকর মারিয়া শূন্যে ঘুরিতে থাকে!

গায়ে আরবের ফুলের গন্ধ, পায়ে তার খস্‌খস্‌,

তোমারে বন্ধু মনে পড়ে গেল, আঁখি হ’ল সুখালস;

শুধু কাছাকাছি পেলে তোমা’ বাঁচি অধিক কামনা নাই,

তীব্র মধুর নূতন এ সুর বারেক শুনাতে চাই।

মনোদেবতা

মনোদেবতা

জাগিলে যে দূরে, ঘুমালে নিকটে, স্বপনে ফুটায় চোখ্‌,

অনাদি জ্যোতির দূরগামী রেখা সে আমার শুভ হোক্‌।

যাহারে ছাড়িয়া কোনো ক্রিয়া নাই, অন্তরে যে আলোক,

পরম জ্ঞানের অমৃত যে আনে সে আমার শুভ হোক্।

হ’য়েছে, হ’তেছে, হবে যার গুণে অচেত-চেতন-লোক,

অমৃতের মাঝে ধরেছে যে সব সে আমার শুভ হোক্‌।

যুগে যুগে যেই মনীষি-জনের যজ্ঞের নিয়ামক,

সপ্ত হোতায় মন্ত্র পড়ায়—সে আমার শুভ হোক্‌।

চক্র-নাভিতে অরার মতন ধরে যে নিখিল শ্লোক,

ঋক্, সাম, যজু ধারণ যে করে, সে আমার শুভ হোক্‌।

নিপুণ, প্রবীণ সারথীর মত চালায় যে,—সব লোক,

হৃৎ-প্রতিষ্ঠ সেই বেগবান ইষ্ট আমার হোক।

যজুর্ব্বেদ।

মরণ

মরণ

(মিশর)

মরণ,—জ্বরের দাহ অবসানে

মুক্ত বাতাসে যাওয়া;

নিখিল ব্যাধির ঔষধ সে যে

দৈবে শিয়রে পাওয়া!

মরণ,—সুরভি পূজা ভবনের

ধূপের অন্ধকার,

বাত্যা-তাড়িত তরীতে নিদ্রা,—

লেশ নাই সংজ্ঞার।

সে যে কমলের গূঢ় পরিমল,—

সীমার প্রাপ্তি ভূমা!

মহা নিঝরের বর্ত্ম মরণ,—

অনাদি কালের চুমা!

যুদ্ধের শেষে নৌ-সেনানীর

ফিরে যাওয়া নিজ দেশে,

আকাশ নীলের বিমল বিকাশ

ঘোর ঝঞ্ঝার শেষে;

বন্দী জনের কামনার নিধি

মরণেরে মনে হয়,

বহুবরষের কারা-ক্লেশে যার

জীবন দুঃখময়।

সেই তো দেবতা দেহ-অবসানে

যে গেছে মৃত্যু-লোকে,

মোচন করিয়া দূরে ফেলে দেছে

শোচনার নির্ম্মোকে;

সূর্য্যের কাছে সুখে বসে আছে।

সূর্য্যে নৌকায়,

তর্পণ কালে দেবতার সাথে

বলি-উপহার পায়;

মৃত্যুরে পেয়ে পায় গো না চেয়ে

জ্ঞানীর অধিক জ্ঞান,

জীবিতে যা’ রবি না দ্যান্‌ কখনো

মৃতজনে তাহা দ্যান্‌।

মরু-যাত্রী

মরু-যাত্রী

চলেছে উটের আরোহী চলেছে সীমাহীন প্রান্তরে,

বিঘ্ন বিপদ পদে পদে তার চিত্ত সজাগ করে।

গগনের পারে প্রভাতের তারা করে তারে আহ্বান,

মরুবালুকায় লিখে লিখে যায় ধৈর্য্যের অবদান।

সে যে পিপাসায় জল নাহি চায় ক্ষুধাকালে খর্জুর,

উষ্ট্র তাহার বাঁচিয়া থাকুক সুখ-দিন নহে দূর।

মরুর কষ্টে ক্লেশ গণে না সে,—সে যে কীর্তির পথ,

তপ্ত ধুলার পরপারে আছে গৌরব সুমহৎ!

রাঙা সিরাজীর গুণ গাহে সেই গাহে সিরাজের গান,

দৈব-সুরায় পরাণ-পাত্র ভরিয়া করে সে পান!

হাফেজের তান ধ্বনিছে আজিকে সঙ্গীত মাঝে তার,

ফৈজী কহিছে,—কবিরে ভ্রান্ত করিতে সাধ্য কার।

ফৈজী।

মল্লদেব

মল্লদেব

(একটি ফরাসী গাথার অনুসরণে)

যুদ্ধে গেছেন মল্লদেব!

ঝনন্‌-ঝন্! ঝনন্‌-ঝন্! ঝনন্‌-ঝন্!

কবে ফিরিবেন জানি নে গো,

কবে হ’বে তাঁর শুভাগমন!

ফিরে আসিবেন ফাল্গুনে,

রণন্‌-রন্! রণন্‌-রন্! রণন্‌-রন্!

সাধের ফাগুয়া-উৎসবে,—

যবে আনন্দে দেশ মগন।

ফান এল, ফুরাল গো,

রণ্‌-রণন্‌! রণ্‌-রণন্‌! রণ্‌-রণন্‌!

ফিরে না এলেন মল্লদেব,

জানি কোথায় হায় সেজন!

রাণী উঠিলেন দুর্গেতে;

রণ্‌-রণন্‌! রণ্‌-রণন্‌!! রণ্‌-রণন্‌!

দুর্গম সেই দুর্গ-চূড়া,—

পুষ্প-পেলব তাঁর চরণ।

দূরে দেখিলেন সৈনিকে!

ঝন্‌-রণন্‌! ঝন্-রণন্‌! ঝন্‌-রণন্‌!

মলিন তাহার মূর্ত্তি গো!

অশ্ব তাহার ধীর গমন!

‘ওরে বাছা! ওরে ঘোড়-সওয়ার!

ঝন্-রণন্‌! ঝন্‌-রণন্‌! ঝন্-রণন্‌!

কোন্ সমাচার আন্‌লি তুই?

বল্ আমায়,—বল্ এখন।’

‘এম্‌নি খবর আমার গো,—

ঝন্‌-ঝনন্! ঝন্‌-ঝনন্! ঝন্‌-ঝনন্!

ভর্‌বে জলে ভাস্‌বে গো

প্রফুল্ল ওই দুই নয়ন।

‘রঙীন বসন ছাড়বে গো!

ঝন্‌-রণন্‌! ঝন্-রণন্‌! ঝন্-রণন্‌!

হাতের কাঁকণ কাড়্‌বে গো!

ছাড়্‌বে গো সব ভূষণ।

‘স্বর্গে গেছেন মল্লদেব;

ঝনন্‌-রন্! ঝনন্‌-রন্! ঝনন্‌-রন্!

ক’রে এলাম ভস্মশেষ,

চিহ্নমাত্র নাই এখন!—নাই এখন!’

মহাদেব

মহাদেব

আমি জ্বলন্ত, আমি জীবন্ত, আমি দেখা দিই

অগ্নিরূপে,

পঞ্চভূতেরে নিত্য নুতন মুখোস্ পরাই

আমিই চুপে!

আমি মহাকাল, আমিই মরণ, আমি কামনার

বহ্নিজ্বালা,

সৃষ্টি লয়ের ঘূর্ণিবাতাসে ছিঁড়ি গাঁথি গ্রহ-

তারার মালা।

আমি জগতের জনমের হেতু, আমি বিচিত্র

অস্থিলতা,

বাহির দেউলে কামের মেখলা ভিতরে শান্ত

আমি দেবতা!

আমি ভৈরব, আমি আনন্দ, আমিই বিঘ্ন,

আমিই শিব,

হৃৎপিণ্ডের শোণিত-প্রবাহ নিয়মিত করি’

বাঁচাই জীব।

পরশে চেতনা এনে দিই জড়ে, পুনঃ কটাক্ষে

ধ্বংস করি,

নিশ্বাসে আর প্রশ্বাসে মম জীবন মরণ

পড়িছে ঝরি’!

জন্ম-তোরণে মৃত্যু-মুরতি আমি প্রবৃত্তি

সকল কাজে,

এ মহা দ্বন্দ্ব, ইহা আনন্দ, আমারি ডমরু

ইহাতে বাজে॥

আল্‌ফ্রেড্‌ লায়াল্‌।

মহানগর

মহানগর

মহানগর-মহাসাগর, তরঙ্গ তায় কত,

লোকের মেলা, লোকের ঠেলা ঢেউয়ের খেলার মত;

উঠছে ভেসে যাচ্ছে ডুবে, কে কার পানে চায়?

ডুগ্‌ডুগি তার বাজিয়ে বাউল আপন মনে গায়।

যাচ্ছে ভেসে চোখের উপর ডুবছে একে একে,

বিস্মরণের ঘূর্ণি জলে সাধ্য কি যে টেঁকে?

যে মুখখানি এই দেখিলাম,আর সে নাহি, হায়!

ডুগ্‌ডুগি তার বাজিয়ে বাউল আপন মনে গায়।

শ্মশান-মুখো যাচ্ছে কারা?—কান্না গেল শোনা!

বন্ধ তবু হয় না হেথা লোকের আনাগোনা!

ডুব্‌ছ তুমি, ডুব্‌ছি আমি, কে কার পানে চায়?

ডুগ্‌ডুগি তার বাজিয়ে বাউল আপন মনে গায়।

লিলিইয়েঙ্ক্রন্‌।

মহাশঙ্খ

মহাশঙ্খ

নিতান্ত হিম, অতি নির্জীব, কপাল-অস্থি ওরে,

মাের হাতে তুমি হ’য়েছ পরিস্কৃত;

ধৌত ধবল অমল তােমায় ক’রেছি যতন ক’রে

ঠায়ে ঠায়ে নাম লিখেছি সঙস্কৃত।

পাঠের বেলার সঙ্গী আমার! ওরে বিষন্ন! তােরে

কোণে ফেলে আমি রাখিতে কি পারি্‌, বল্‌,

সময় কাটে না, কাছে আয় তুই ভুলায়ে রাখিবি মােরে,

কথা বল্ ওরে বাড়িছে কৌতূহল।

বল্ মােরে আজ বল্ কতবার এই তাের মুখখানি

চুম্বন-লােভে সঁপিয়াছে আপনায়?

বল্ মােরে বল্ মিলন-বেলায় সে কোন্ মধুর বাণী

ব্যক্ত ক’রেছে মৃদু কল-বেদনায়?

নিথর! পারনা উত্তর দিতে, বাছারে, ক্ষমতা নাই,

জন্মের মত বন্ধ হ’য়েছে মুখ;

পথে যেতে যেতে মৃত্যু আপন অস্ত্র হেনেছে, তাই

জীবনের সাথী টুটেছে মাধুরীটুক্‌।

একি গাে দারুণ বারতা জানালে, মােরা যে রেখেছি ভেবে

জীবন টিঁকিতে পারে অনন্ত দিন;

এই সুখ, এই রূপ যৌবন, এও কি ফুরাবে, তবে,

এই ভালবাসা-এও তবে হ’বে ক্ষীণ!

কর্ম্ম-কঠোর দিন শেষে পাঠে ব্যস্ত র’য়েছি যবে,

একেলা নীরবে নির্জ্জন এই ঘরে,

পরাণ আমার গুরু ভাবনার ভাষাহীন গৌরবে

ধীরে ধীরে ধীরে এমনি করিয়া ভরে।

তোর পানে চেয়ে কেটে যায় বেলা নিয়তির কথা ভেবে,

বাহিরে আঁধার, নয়নে স্বপ্নঘোর;

সহসা ও তোর ললাটের লেখা দেখে ভয়ে উঠি কেঁপে,-

“মর্ত্ত মানুষ! সময় আসিছে তোর!”

লেবিয়ে।

মায়া

মায়া

প্রেমিক মরেছে, মরে গেছে প্রিয়া তার

তাদের প্রেমের চিহুটি নাই আর!

ওগো ভগবান! একি অপরূপ মেলা!

ছায়ায় ছায়ায় ভালবাসাবাসি খেলা।

মন যাহা নহে তাই হ’ল উন্মনা,

এ লীলা বুঝিবে বুঝাইবে কোন্ জনা!

রুমি।

মিলনানন্দ

মিলনানন্দ

(মিশর)

যখনি তাহারে আসিতে দেখিতে পাই,

হৃৎ-পিণ্ডটা দ্রুত তালে উঠে দুলে;

দু’বাহু বাড়ায়ে বাহুতে বাঁধিতে চাই,

অসীম পুলক উথলে হৃদয়-কূলে!

ভূজ-বন্ধনে বন্দী যদি সে করে,

তনু আরবের আতরে তিতিয়া উঠে;

চুমে যদি হাসি-বিকচ-বিম্বাধরে,

বিনা মদিরায় সংজ্ঞা আমার টুটে!

মিশর-মহিমা

মিশর-মহিমা

মিশরে পুরুষ রণপণ্ডিত, রমণী ধনুর্দ্ধর!

স্তনন্ধয় যে শিশু তারে মাতা ধরান্ ধনুঃশর!

মার কাছে ছেলে সত্য বলিতে সত্য পালিতে শেখে,

সহজ সাহসে দুঃখ সহিতে শেখে শৈশব থেকে।

ভয়ে সে কাঁপে না, কষ্টে কাঁদেনা, লোহার বাঁটুল ছেলে,

দু’দণ্ডে বশ করিতে সে পারে দুরন্ত ঘোড়া পেলে।

পিতা হাতে তার দ্যান্‌ হাতিয়ার শেখান্ অস্ত্রখেলা,

বেড়ে ওঠে বুক শড়্‌কী ধনুক লয়ে ফিরে সারা বেলা।

ভীমরুল পারা দুর্ম্মদ তারা লড়িতে করে না ভয়,

বিনা ছলে কভু তাদের হঠানো নরের সাধ্য নয়।

মুকুলের গান

মুকুলের গান

আঁধার নিশি সে কখন আসিবে,

আঁধারে আর্দ্র নিশাস ফেলে?

সবুজ ঘোমটা কবে শিথিলিবে?

অনতিশীতল শিশির ঢেলে!

প্রতি সাঁঝে আসে একটি বালিকা

মোরা তারে ভাল বাসি গো বাসি,

মোদেরি ’পরে সে যতনে বরষে

সেচন ঘটের মুকুতা রাশি!

হৃদে তার আধ মায়ের মমতা

পিপাসার মত আকুলি’ উঠে,

চেয়ে ফিরে ফিরে বলে ধীরে ধীরে,—

“আজো একটিও ওঠেনি ফুটে!”

কখন্‌ আসিবে আঁধিয়ার রাতি

আঁধারে আর্দ্র নিশাস ফেলে?

অবগুণ্ঠন ঘুচাবে কখন?

নিশীথ-শীতল শিশির ঢেলে!

আল্‌বার্ট গায়্‌গার্‌।

মুগ্ধ

মুগ্ধ

নীল আকাশের বিমল বিভাতে

তোমারেই শুধু দেখি, কিশোরী!

গিরি নিঝরের রূপালি তুফানে

তুমি দেখা দাও মূরতি ধরি’!

স্পন্দনহীন প্রখর রৌদ্রে

রয়েছ দাঁড়ায়ে হে অপ্সরী!

চঞ্চল শিখা তারায় তারায়

হাসিছ আকুল জোছনা ভরি’!

যে দিকে চাই

দেখি তোমায়!

আঁখি ফিরাই,—

রয়েছ! হায়!

কভু পিছে কভু হাসিছ সমুখে,

হায় নিষ্ঠুরা! একি চাতুরী!

কিস্‌ফালুডি।

মেলার যাত্রী

মেলার যাত্রী

(দাদ্দি স্থান্‌।)

চট্‌পট্ ওঠ ওঠ গো মাম্মু!

ছিরি ছাঁদ আছে মোদেরো মাম্মু!

সূয্যির মত কপাল মাম্মু!

ঝিক্‌মিক্ চোখ্‌ উজল মাম্মু!

দাঁত আমাদের মুক্তো মাম্মু!

দুটি ঠোঁট উদ্‌যুক্ত মাম্মু!

চুল চুল্‌বুল্ হাওয়াতে মাম্মু।

বসে কি ভাবিস্‌ দাওয়াতে মাম্মু!

পশ্‌মী পোষাক পরে নে মাম্মু!

গাঁয়ে আমাদের মেলা যে মাম্মু!

পাগড়ী মাথায় বেঁধে নে মাম্মু!

চাদর খানাও কাঁধে নে মাম্মু!

তাজা ফুলগু লো হাতে নে মাম্মু!

ধোঁ-ধো-দ্রিম্-দ্রিম্!

দ্রিম্-দ্রিম্-ম্‌-ম্‌!

মৌন

মৌন

বচন হারায়ে বসে আছি আমি

বন্ধ ক’রেছি গান,

তুমি কথা কও, কথা কও, ওগো

প্রাণের প্রাণের প্রাণ!

অতুলন যার মধুর মুখের

মদিরায় মাতোয়ারা

গান গেয়ে ওঠে অনু পরমাণু

গুঞ্জরে গ্রহরা।

রুমি‌।

যোদ্ধৃ জননী

যোদ্ধৃ জননী

এস বাছা, এস বাপা! দুলাল রে আমার

বিদায় দিয়ে তোরে,

ভাবছি এখন শূন্য ঘরে শূন্য হৃদয় নিয়ে

থাকব কেমন ক’রে।

ডাক এল আর চলে গেলি দুরন্ত যুদ্ধেতে,

বাপের মৃত্যু ভুলে,

অভাগী এই বিধবাকেই আবার দিতে হ’ল

বুকের পাঁজর খুলে,—

দিতে হ’ল প্রাণের চেয়ে যে জিনিষটি প্রিয়,—

পরের হাতে তুলে।

বাছা আমার ভাবে কেবল গৌরবেরই কথা,

জয়ের স্বপন দেখে;

আমার হিয়া অমঙ্গলের মিথ্যা ভয়ে কেঁপে

উঠছে থেকে থেকে।

হয়তো বাছা হ’বি জয়ী, জয়ের মালা সবাই

দেবে তোমার গলে,

আমি সে আর দেখবনাকো, দুঃখে ও আহলাদে

ভেসে নয়ন জলে;

আমি তাহার আগেই যাব,—আগেই মিশে যাব

বসুমাতার কোলে।

অল্প দিনেই যায় রে ভুলে ছেড়ে যাওয়ার ব্যথা

অল্পবয়সীরা,

বুড়া হাড়ে দুর্ভাবনা ঘুণের মত ধরে,

কেবলি দ্যায় পীড়া!

আর যারা তোর পথ চাহে আজ, বয়স তাদের কম,

হয় তো, তারা তোরে

দেখতে পাবে, খুসী হ’বে; ভালয় ভালয় যদি

ফিরে আসিস, ওরে!

দেখতে শুধু পাবেনাকো দুঃখিনী তোর মা,

সে অভাগী আগেই যাবে মরে।

বেইলি।

রণচণ্ডীর গান

রণচণ্ডীর গান

(আইস্‌ল্যাণ্ড)

পড়্‌ল টানা যমের তাঁতে

পড়্‌বে কেরে পড়্‌বে কে!

রক্তে রাঙা শক্ত মাকু

মরবে কে আজ মরবে রে!

ঘন বুনন্ চল্‌ছে বেড়ে

নাইক ছাড়ান্‌-ছিড়েন্‌ যে,

নাড়ীর মত নীল টানা, আর

রক্ত-রাঙা ‘পড়েন্‌’ সে!

সকল টানার মাথায় মাথায়

চাপিয়ে নরমুণ্ড ভার,

ঠেল্‌ছি মাকু রক্তমাখা

কাটার, টাঙি, খড়গ আর!

শড়্‌কি গুলো চর্‌কি আমার

কামাই নেই একদণ্ড তার,

আগাগোড়া লোহায় গড়া

তাঁতখানা খুব চমৎকার!

ভদ্রা নেছে গুটিয়ে লাটাই,

রিক্তা নলী এলায় রে!

বর্ম্ম চিবায়, চর্ম্ম চিবায়,

জীবন নিবায় হেলায় সে।

মরণ ঝড়ের মধ্যিখানে

বাঁচবে কে আর বাঁচবে কে?

প্রাণের আশা নেই কাহায়ো,

রিক্তা এখন নাচবে যে!

নন্দা, জয়া, দিগ্বিজয়ীর

কর্ণে জপে জয়ের গান;

রিক্তা এসে কঠোর হেসে

হরণ করে বীরের প্রাণ!

নগ্ন ভীষণ অঙ্গ হাতে

ঘোড়ায় তবু চড়্‌বি কে?

অগম দেশে চল্‌বি ধেয়ে।

ফিরবি নে আর মরবি রে!

রণমৃত্যু

রণমৃত্যু

বীরের মত ম’র্তে পেলে চাইনে কিছু আর,

সব কলঙ্ক ফেবে ধুয়ে বুকের রক্তধার!

তপ্ত গোল—বক্ষ ’পরে ধর্ব্ব লুফে তায়,

মুক্ত মাঠে খোল হাওয়ায় জীবন যেন যায়।

শত্রু যদি হয় সাহসী—হয় সে বীর্যবান-

বীরের মৃত্যু আমায় তবে দ্যায় সে যেন দান।

স্বদেশ কিবা বিদেশ ’পরে মর্তে ক্ষতি নাই,

চাইনে নাম; বীরের মত ম’র্তে যদি পাই।

মৃত্যুতে মোর যে বংশটির দীপ হ’বে নির্ব্বাণ,

মৃত্যু স্বীকার,-মর্য্যাদা তার কর্ব্বনাক ম্লান।

মৃত্যুতে মোর জয়ের ধ্বজা নাই তুলিল শির,

শত্রু মিত্র রবে তবু ‘পতন হ’ল বীর’।

ফিজবল।

রহস্য কুঞ্চিকা

রহস্য—কুঞ্চিকা।

অমরু—খৃষ্টীয় নবম শতাব্দীর পূর্ব্বে প্রাদুর্ভূত হন। কথিত আছে, যে শঙ্করাচার্য অমরু নামক একজন রাজার মৃতদেহে প্রবিষ্ট হইয়া, মণ্ডন মিশ্রের পত্নী শারদাদেবীর প্রশ্নের উত্তর স্বরূপ অমরু-শতক রচনা করেন। শঙ্কর—দিগ্বিজয়ে, কিন্তু, এ কথার উল্লেখ নাই।

অলরিচি—প্রাচীন রােমাণ্টিক যুগের কবি, জন্মভূমি জর্ম্মনি।

আরাণী—(১৮১৭-১৮৮২) হাঙ্গেরির কবি; গাথা রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

আর্ণৎ—(১৭৬৬-১৮৩৮) ইনি নেপােলিয়নের পরম ভক্ত ছিলেন; পৃথ্বীরাজের যেমন চাঁদ কবি, নেপােলিয়নের তেমনি আর্ণৎ।

আসায়াসু—জাপানের কবি। ইহাঁর পিতা য়াসুহিদে ও কবি ছিলেন। খৃষ্টীয় নবম শতাব্দীর শেষভাগে জন্মগ্রহণ করেন।

ইকুজু—ইনি জাপানী কবি। তান্‌কা রচনার জন্য প্রসিদ্ধ।

ঊকন্—ইনি একজন স্ত্রী—কবি; জন্মভূমি জাপান।

ওয়াইল্ড্—(অস্কার) ইহাঁর রচনা সৌন্দর্য্য ও মাধুর্যের জন্য বিখ্যাত। জন্মভূমি ইংলণ্ড।

ওয়াং-চাং-লিং—চীন দেশের কবি ও সাহিত্যিক; লুশানের বিদ্রোহের পর, রাজপুরুষের সন্দেহে ধৃত ও নিহত হন।

ওয়াং-সেং-জু—চীন দেশের কবি; জন্ম, খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে।

ওয়াট্‌সন্—ইংলণ্ডের কবি; ইনি জীবিত।

ওয়ার্টিমার—জর্ম্মনির কবি; জন্ম ১৮৭৪ খ্রীষ্টাব্দে।

কণ্ণ গনর—দাক্ষিণাত্যের কবি।

কপিলর—দ্রাবিড় কবি; বেদব্যাসের মত ইহাঁর পিতা ব্রাহ্মণ এবং মাতা দাসজাতীয়া ছিলেন।

কামৈন্স—পাের্ত্তুগালের কবি; প্রধান রচনা ‘লুসিয়াড’।

কিনাে—জাপানের বিখ্যাত বীর উচিশকুনির পৌত্র। জন্ম খৃষ্টীয় নবম শতাব্দীতে।

কিপ্লিং—ইনি জাতিতে ইংরাজ; জন্ম, পঞ্জাবের রাধিয়ার হ্রদের নিকট; হইয়াছেন মার্কিনবাসী। ইহাঁর রচনায় সহৃদয়তার একান্ত অভাব পরিলক্ষিত হয়।

কিস্‌ফালুডি—(১৭৭২-১৮৪৪) হাঙ্গেরির কবি; ইহাঁর ভাইও কবি ছিলেন।

‘কুরাল’-গ্রন্থ—‘কুরু’ অর্থাৎ ‘ক্ষুদ্র’, ক্ষুদ্র কবিতার সমষ্টি কুরাল; কপিলর নামক দ্রাবিড় কবির সহােদর তিরু বল্লুবর কুরাল-গ্রন্থের রচয়িতা। জন্ম মাদ্রাজের নিকটস্থ মাইলাপুরে।

কুরেনবার্গ—ইনি জর্ম্মনির প্রাচীন যুগের কবি।

কোমাচি—(৮৩৪-৮৮০) ইহাঁকে জাপানের স্যাফো বলা যায়। ইনি সুকবি এবং সুন্দরীও ছিলেন।

কোমিয়ু—ইনি জাপানের রাণী ছিলেন; কবিতা ও লিখিতেন।

ক্যাপলন্—শিশু-জগতের কবি; জন্ম ইংলণ্ডে।

গায়গার—নব্য জর্ম্মনির কবি; জন্ম ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে। মনস্তত্ত্বের রহস্যবিদ্।

গেটে—(১৭৪৯-১৮৩২) ইনি কবি, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, ঔপন্যাসিক ও রসজ্ঞ সমালােচক। জন্ম জর্ম্মনিতে।

গােকু—জাপানের বিখ্যাত ফুজিবারা বংশের সন্তান; জন্ম খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে।

ঘোষ (অরবিন্দ)—ইনি “স্বদেশ-আত্মার বাণী মূর্ত্তি” নামে অভিহিত হইয়াছেন।

চাং-চি-হো—(৭০০-৭৫০) কবি ও ‘তও’-পন্থী; ইনি “কুজ্ঝটিকার প্রবীণ ধীবর” নামে বিখ্যাত।

জয়নাব—ইনি তুরস্কের একজন স্ত্রী-কবি; স্বামীর হুকুমে ইহাকে কাব্যালোচনা বন্ধ করিতে হইয়াছিল।

জাফর—ইনি তুরস্কের কবি ও দ্বিতীয় বায়াজিদের একজন অমাত্য ছিলেন। রাজভৃত্যদিগের ষড়যন্ত্রে ইনি হারুণ-অল্-রসীদের মন্ত্রী জাফরের মত প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন।

জামি—(১৪১৪-১৪৯২) পারস্যের স্বনাম ধন্য কবি ও সুফি। ইহার পূরা নাম নূরদ্দিন্‌ আব্দর রহমন্ জামি। ইনি নির্লোভ ছিলেন; একবার তুরস্কের সুল্‌তান্ পাঁচ হাজার মোহর পাঠাইয়াছিলেন ইনি তাহা স্পর্শ করেন নাই।

জিউলে—হাঙ্গেরির কবি; ক্ষুদ্র গাথার প্রবর্ত্তক।

জুম্ সুলতান্—(১৪৫৯-১৪৯৫) ইনি তুরস্কের সুলতান দ্বিতীয় বায়াজিদের কনিষ্ঠ। পিতার মৃত্যুর পর ইনি অর্দ্ধেক রাজ্য দাবী করেন। কিন্তু সফলকাম হইতে পারেন নাই। মহম্মদীয় শাস্ত্রানুসারে কন্যারাও পুত্রের মত পিতৃ-ধনের অংশ পায়; কিন্তু রাজপুত্রেরা এই ব্যবস্থার সুফল ভোগ করিতে পান্‌ না। ঔরঙ্গজেবের ভ্রাতৃ-বিরোধের মূল এইখানে, জুম্ সুলতানের যুদ্ধের কারণও এইখানে। পক্ষপাতহীন মহম্মদীয় আইনের নির্দেশ, বোধ হয়, সাম্যবাদের দিকে; ইহার স্বাভাবিক পরিণতি, সম্ভবতঃ, Democracyতে।

ঝিন্দন—পাঞ্জাবের কবি।

টেনিসন্—(১৮০৯-১৮৯২) ইনি মহারাণী ভিক্টোরিয়ার সভাকবি ছিলেন।

ডান্‌বার—কাফ্রি কবি; ইহার পিতা ক্রীতদাস ছিলেন; কানাডায় পলাইয়া নিষ্কৃতি লাভ করেন। অনেকের বিশ্বাস কাফ্রিরা সৌন্দর্য্য বোধে ও বুদ্ধির প্রাখর্য্যে অন্যান্য জাতি অপেক্ষা হীন; ডান্‌বারের কবিতা এই মতের অসারতা প্রমাণিত করিতেছে।

ডিরোজিয়ো—(১৮০৯—১৮৩১) ইহাকে লোকে “ইউরেশিয় বায়রণ” বলিয়া থাকে; কলিকাতায় মৌলা আলির দর্‌গার নিকট ইঁহার জন্ম হয়। ইনি হিন্দু কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। পিয়ারীচাঁদ মিত্র, রামগোপাল ঘোষ প্রভৃতি ইহার ছাত্র।

ডুম্ মীরণ—আফগানিস্থানের কবি। আমরা ডোম বলিয়া যাহাদিগকে ঘৃণা করিয়া থাকি ইহার পূর্ব্বপুরুষেরা সেই ডোম ছিলেন। ডোমেরা সঙ্গীতানুরাগের জন্য চিরপ্রসিদ্ধ। য়ুরোপের জিপ্‌সি, পারস্যের লুরি, আফগানিস্থানের ডুম্ এবং ভারতের ডোম এক।

ডেহ্মেল (রিকার্ড)— শিলারের সঙ্গে গেটের যে সম্বন্ধ, ডেহ্মেলের সঙ্গে লিলিয়েঙ্ক্রনের সেই সম্বন্ধ; বর্ত্তমান যুগে, জন্মনির কাব্য জগতে ইঁহারা দুই জনই নেতা। জন্ম ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দে। ইনি পল্ ভার্লেনের শিষ্য।

ৎসেন্-ৎসান্—চীন দেশের কবি; মহাকবি তু-ফু ইঁহার বন্ধু ছিলেন। ছন্দের অনেক নূতন নিয়ম ইনি আবিষ্কার করিয়া যান।

তরু দত্ত—(১৮৫৬—১৮৭৭) ইনি রামবাগানের স্বর্গীয় গোবিন্দচন্দ্র দত্তের কন্যা। ইনি ইংরাজীতে কবিতা এবং ফরাসীভাষায় উপন্যাস লিখিয়াছিলেন। তরু একুশ বছর ছয় মাস ছাব্বিশ দিন মাত্র জীবিত ছিলেন।

তাচিবানে-নো-মাসাতো—‘তান্‌কা’ ও ‘হোক্কু’ রচনার জন্য বিখ্যাত; জন্মভূমি জাপান।

তুকারাম—মহারাষ্ট্রীয় সাধু ও ভজন-রচয়িতা; পঞ্জাবের যেমন নানক্, বারাণসীর যেমন কবীর মহারাষ্ট্রের তেমনি তুকারাম। ইঁহার রচনা ‘অভঙ্গ’ নামে বিখ্যাত।

তু-ফু—(৭১২—৭৭০) চীনবাসীরা ইহাকে “কাব্যের দেবতা” নামে অভিহিত করেন। ইনি সাত বৎসর বয়সে কবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন। কাব্যালোচনার খাতিরে ইনি রাজদরবারের চাকরী ছাড়িয়া দেন। শেষে অশেষ দুর্দ্দশা ভোগ করিয়া অনশনে প্রাণত্যাগ করেন। “হায় মা ভারতী!”

দু-ফ্রেনি—(১৬৪৮—১৭২৪) কবি ও উদ্যান-শিল্পী; ইঁহার রচিত কমেডিগুলি হাস্যরসে উৎপূর্ণ। জন্মভূমি ফ্রান্স্‌।

দূদেতোৎ (মাদাম্)— ইনি ফরাসী দেশের একজন মহিলা কবি। জন্ম উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমে।

দে-জুয়ি—(১৭৬৪—১৮৪৬) ইনি ফরাসী দেশের কবি। অ্যাডিসনের ‘স্পেক্টেটরের’ অনুকরণে ইনি অনেক সন্দর্ভ রচনা করেন।

দে-মুসে—(১৮১০—১৮৫৭) ফরাসী কবি ও নাট্যকার; ইনি অলঙ্কার শাস্ত্রকে অবজ্ঞার চক্ষে দেখিতেন; এবং তৎসত্ত্বেও সুকবি।

দৈনী-নো-সাম্মি—বিখ্যাত মহিলা ঔপ্যাসিক মুরাসাকি শিকিবুর কন্যা; জন্মভূমি জাপান।

‘নাল-আদিয়ার’-গ্রন্থ—দাক্ষিণাত্যের জৈন কবির রচিত কোষ-কাব্য। এই গ্রন্থে একাধিক কবির রচনা আছে।

নিমতুল্লা—ইনি সৈয়দবংশ সম্ভৃত এবং কবি।

নেজাতি—ইনি তুরস্কের কবি; ক্রীতদাসের পুত্র হইয়াও চরিত্রগুণে সুলতান্ বায়াজিদের পুত্রগণের শিক্ষকপদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। তুরস্কের সমালোচকেরা বলেন “সিদ্ধপুরুষ ও ঐন্দ্রজালিকে যে তফাৎ নেজাতি ও তাঁহার সমসাময়িক কবিদের মধ্যেও ঠিক সেইরূপ প্রভেদ।”

নৈলি—(১৬৭৩—১৭৩৮) তুরস্কের কবি। ইঁহার পিতা কষ্টাণ্টিনোপলের হাকিম ছিলেন। ইনি স্মর্ণা, কাইরো ও শেষে মক্কার মোল্লা হইয়াছিলেন।

পট্টণত্তু পিল্লাই—দাক্ষিণাত্যের কবি; ইনি শিবের উপাসক ছিলেন, কিন্তু, গোঁড়ামি সহ্য করিতে পারিতেন না। জন্ম খ্রীষ্টীয় দশম শতাব্দীতে।

পাউণ্ড—ইংলণ্ডের উদীয়মান কবি; জাতিতে ইহুদী।

ফজুলী—ইনি তুর্কী, আরবি ও ফার্সী ভাষায় কবিতা লিখিতেন; বোগ্দাদ নগরে ইঁহার জীবনের অধিকাংশ অতিবাহিত হয়। ১৫৫৫ খ্রীষ্টাব্দে প্লেগে মারা যান। ইনি “হৃদয়ের কবি” নামে অভিহিত হইয়াছেন।

ফর্দ্দসী—ইঁহার প্রকৃত নাম আবুল কাসিম মন্‌সুর; ইঁহার প্রধান রচনা “শাহ-নামা”; ত্রিশ বৎসরে এই মহাকাব্য সম্পূর্ণ হইয়াছিল। সুলতান্ মামুদের কৃপণতায় ক্রুদ্ধ হইয়া ইনি এক ব্যঙ্গকাব্য রচনা করেন।

ফিজ্‌বল্—ইনি একজন ইংরাজ কবি।

ফৈজী —আকবরের সভাকবি ও আবুল ফজলের সহোদর; ইঁহার কতকগুলি রচনা “মস্ক্‌-গজল্” বা কস্তুরী-কবিতা নামে প্রসিদ্ধ। বেদমর্ম্ম জানিবার জন্য সম্রাট আকবর ইঁহাকে এক ব্রাহ্মণের গৃহে রাখিয়া দেন। এই কাহিনী অবলম্বনে স্বর্গীয় কবি সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার ‘সবিতা-সুদর্শন’ নামক কাব্য রচনা করেন।

বড্‌ম্যান—নব্য জর্ম্মনির কবি; জন্ম ১৮৭৪ খ্রীষ্টাব্দে; ইনি একজন ব্যারন্‌।

বদ্‌লেয়ার—(১৮২১-১৮৬৭) ফরাসী কবি; ইনি ‘সুন্দরকে মন্দ’ দেখিতেন না, কিন্তু ‘মন্দকে সুন্দর’ দেখিতেন। ইহাকে বীভৎস রসের কবি বলা যাইতে পারে।

বাবর (সম্রাট)—সম্রাট আকবরের পিতামহ; ইনি কবিতাও লিখিতেন।

বায়ের্‌বম্—(১৮৬৫) জর্ম্মনির বর্তমান যুগের কবি।

ব্রাউনিং (এলিজাবেথ)—(১৮০৬-১৮৬১) সাত বৎসর বয়সে কবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন। নারীর হৃদয়, পণ্ডিতের বুদ্ধি এবং কবির প্রাণ একাধারে ইঁহাতে সম্মিলিত ছিল। ইনি রবার্ট ব্রাউনিঙের পত্নী।

ব্রাউনিং (রবার্ট)—(১৮১২-১৮৮৯) ইহার রচনা স্থল বিশেষে অস্পষ্ট এবং শ্রুতি কটু হইলেও ইনি প্রকৃত কবি ছিলেন। মানব-হৃদয়ের ভাব বৈচিত্র্যের সঙ্গে এরূপ গভীর পরিচয় অল্প কবিরই দেখা যায়।

বেইলি—ইংলণ্ডের সৈনিকদিগের প্রিয় কবি।

বেমন—তেলুগু কবি; রচিত গ্রন্থের নাম ‘পদ্যমুলু’।

ভর্ত্তৃহরি—রাজা ও কবি, প্রধান রচনা বৈরাগ্যশতক ও নীতিশতক।

ভল্‌তেয়ার—(১৬৯৪-১৭৭৮) ফ্রান্সের সাহিত্য-সম্রাট। হাস্য-বিদ্রূপে অদ্বিতীয়।

ভার্লেন্ (পল্)—(১৮৪৪-১৮৯৬) ইহাঁর কবিতা ভাব-সঙ্কেতে অতুলনীয়; জন্ম ফ্রান্সে।

ভিক্ষু—ইনি একজন ঋগ্বেদের মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি।

ভোরোজমার্টি—(১৮০০-১৮৫৫) ইনি হাঙ্গেরির কাব্যের ভাষার চেহারা বদ্‌লাইয়া দ্যান্। ইঁহার পূর্ব্ববর্ত্তী ও পরবর্ত্তী কবিদের ভাষায় আকাশ পাতাল প্রভেদ!

মরিস্ (উইলিয়ম্)—সাম্যবাদের কবি; জন্ম ইংলণ্ডে।

মাণিক্য-বাচকর—দাক্ষিণাত্যের কবি; খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রধান রচনা ‘তিরু বাচকম্’ অর্থাৎ আনন্দবাণী।

মামুদ শাবিস্তারী—ইনি একজন সুফি ছিলেন।

মায়গেল্ (অ্যাগ্নেস্)—নব্য জর্ম্মনির মহিলা কবি; ইহার মৌলিকতা উল্লেখ যোগ্য; জন্ম ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে।

মিচি-নোবু-ফুজ়িবারা—কবি ও রাজমন্ত্রী; জন্মভূমি জাপান।

মিলার—ইনি আমেরিকার কবি।

মিহ্রি—ইহার পূরা নাম ‘মিহ্র-মাহ্’ বা ‘সূর্য্য শশী’; ইনি তুরস্কের কবি নেজাতির শিষ্যা। ইনি রসিকা এবং স্বভাবতঃ প্রেমশীলা হইয়াও চরিত্র নির্ম্মল রাখিতে পারিয়াছিলেন। মিহ্রি চিরকুমারী ছিলেন।

মীরাবাই—ইনি রাণা কুম্ভের পত্নী এবং পরম বৈষ্ণবী। ইঁহার ভক্তিমূলক সঙ্গীত সমূহ অতীব মধুর।

মেং-হৌ-জান্—(৬৮৯-৭৪০) ইঁহার রচনা ‘অনুশোচনার অশ্রুর মত মনোজ্ঞ।’ ইনি চিরজীবন সাহিত্য-সাধনায় নিরত ছিলেন। জন্ম চীনদেশে।

মেসিহি—(১৪৬০-১৫১২) ইনি তুরস্কের কাব্যে নবজীবন সঞ্চার করেন, সেইজন্য ইহাকে মেসিহি বা মেসায়া বলা হয়; ইহার প্রধান রচনা ‘গুল্-ই-শদ্‌বর্গ’ ‘শহর-এঙ্গিজ্‌’ প্রভৃতি। “শায়ের শহরের শাহ” নামেও ইনি পরিচিত।

যজুর্ব্বেদ—চতুর্ব্বেদের অন্যতম; ইহা তৈত্তিরীয় সংহিতা ও বাজসনেয়ী সংহিতায় বিভক্ত; এই দুই বিভাগকে সাধারণতঃ কৃষ্ণ ও শুক্ল যজুর্ব্বেদ বলা হয়।

যূনাস্—ইনি তপ্‌দুখ্‌ নামক মহাপুরুষের শিষ্য; যূনাস্ গুরুর জন্য যে ইন্ধন আনিতেন তাহার মধ্যে একখানিও বাঁকা থাকিত না, গুরু এ সম্বন্ধে প্রশ্ন করায় তিনি বলিয়াছিলেন “স্বর্গে মর্ত্ত্যে কোথাও যাহার আদর নাই তাহা তোমার ঘরে কেমন করিয়া আনিব?” যূনাস্ নিরক্ষর, কিন্তু কবি।

রসেটি (ক্রিষ্টিনা)--(১৮৩০-১৮৯৪) ইংলণ্ডের স্ত্রী-কবি।

রাবেয়া—বস্রা-বাসিনী স্ত্রী কবি ও ধর্ম্মিষ্ঠা সুফি। ইনি চিরকুমারী ছিলেন। ৭৫৩ খৃষ্টাব্দে জেরুসালেমে ইঁহার মৃত্যু হয়।

রুমি (জালালুদ্দিন্)— (১২০৭-১২৭৩) ইনি পারশ্যের একজন প্রধান কবি; জন্মভূমি বাল্‌খ্‌। ইঁহার চরিত্র অতি মধুর ছিল, ইনি পথ দিয়া যাইবার সময় শিশুদিগকেও অভিবাদন করিতেন।

রেক্সফোর্ড্‌—ইনি আমেরিকার কবি।

লাওয়েল—ইনি আমেরিকার কবি; হুইট্‌ম্যানের পরে ইঁহার নাম উল্লেখ যোগ্য।

লাতাঞাঁ।—ফ্রান্সের কবি, হাসির গানের জন্য বিখ্যাত।

লায়াল্ (আলফ্রেড্‌)— সিভিলিয়ান কবি। জন্মভূমি ইংলণ্ড।

লি-পো— (৭০২-৭৬২) চীনদেশের কবি ও যোদ্ধা; ইঁহার কবিতা বিচিত্রতার জন্য প্রসিদ্ধ।

লিলিয়েঙ্ক্রন-(১৮৪৪-১৯০৯) জর্ম্মনির কবি ও সৈনিক পুরুষ; চল্লিশ বৎসর বয়সে প্রথম কবিতা রচনা করেন। ইহাকে ‘মুক্ত বায়ুর কবি’ বলে।

লী-হাণ্ট—(১৭৮৪-১৮৫৯) ইংলণ্ডের কবি; ইঁহার গদ্য রচনা ও সুখপাঠ্য।

লেকঁৎ-দে-লিল্—(১৮২০-১৮৯৪) ‘কীর্ত্তি ভবন যাত্রী’ নামক ফরাসী কবিদিগের অগ্রণী; জন্মভূমি রি-ইউনিয়ন্‌ দ্বীপ।

লেবিয়ে—ডাক্তার, কাব্য-রচয়িতা ও নারীহন্তা; জন্মভূমি ফ্রান্স।

লেবেন্ (হার্ট)—(১৮৬৪-১৯০৫) জর্ম্মনির কবি।

ল্যাণ্ডর—(১৭৭৫-১৮৬৪) ইংলণ্ডের কবি; ইঁহার শ্রেষ্ঠ রচনা “Imaginery Conversations” বা “কাল্পনিক কথাবার্ত্তা।”

শাক্যো-নো-তায়ু-আকিসুকে— জাপানের কবি; ‘শ্রাব্য-চিত্র’ রচনায় অদ্বিতীয়। খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন।

‘শি-কিং’-গ্রন্থ—কং ফুশিয়ো বা প্রভুপাদ কং কর্ত্তৃক সংগৃহীত প্রাচীন চীনদেশীয় কবিতার চয়ন-গ্রন্থ।

শিলার—(১৭৫৯-১৮০৫) কবি ও নাট্যকার; ইঁহার নাটকগুলি, সাধারণতঃ, উদ্দেশ্য মূলক হইলেও কাব্য হিসাবে নিকৃষ্ট নহে। জন্মভূমি জর্ম্মনি।

শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ—একশত পঞ্চাশখানি উপনিষদের অন্যতম।

সাউদী—(১৭৭৪-১৮৪৩) ইংলণ্ডের কবি; ইনি আমাদের নবীনচন্দ্রের মত অনেকগুলি মহাকাব্য লিখিয়াছিলেন।

সাগামি—ইনি একজন স্ত্রী কবি; জন্মভূমি জাপান।

সাদায়োরি—জাপানের কবি; ইহাঁর পিতাও কবি ছিলেন।

সুইবার্ণ—(১৮৩৭-১৯০৮) ইঁহার কবিতা সমূহ্ সৌন্দর্য্যের খনি। ইনি অনূঢ় ছিলেন।

সুকুম্ভ-—(৮৩৪-৯০৮) কবি ও দার্শনিক; ইঁহার কাব্য সৌন্দর্য্যে মাধুর্য্যে ও আধ্যাত্মিকতায় অতুলনীয়। জন্ম চীন দেশে।

সেন (দেবেন্দ্রনাথ)—‘অশোকগুচ্ছে’র কবি। ইনি গদ্য রচনাতেও সুনিপুণ। ইংরাজীতেও কবিতা লিখিয়া থাকেন।

হাইন্—(১৭৯৯-১৮৫৬) ইনি ‘ছোট ছোট ফুলে মালা’ গাঁথিতেন; সে গুলি প্রফুল্ল মল্লিকার মত চিরসুরভি; ইনি জাতিতে ইহুদী। জন্মভূমি জর্ম্মনি।

হাউটন্ (লর্ড) (১৮০৯-১৮৮৫) ইঁহার পূর্ব্ব নাম রিচার্ড মংটন্ মিল্‌নেজ্‌; ইংলণ্ডের কবি।

হাতিফি-—নূরুদ্দিন জামির ভাগিনেয়; খোরাসানের অন্তর্গত জাম নামক স্থানে ইঁহার জন্ম। ইঁহার ‘লয়লা-মজনু’ কাব্যের প্রথম শ্লোক জামির রচিত।

হুইটম্যান্—আমেরিকার কবি; বাতাসের মত ইঁহার ছন্দ কাহারও বশে আসিতে চায় না। আমেরিকায় ইনি বিশ্বপ্রেমের অগ্রদূত।

হুগো (ভিক্তর)—(১৮০২-১৮৮৫) ইঁহার কবিতা বিশ্ব-সাহিত্যের অলঙ্কার; ইঁহার উপন্যাস ফরাসী দেশের মহাভারত। টেনিসন্ ইঁহাকে ‘হাসি ও অশ্রুর সম্রাট’ নামে অভিহিত করিয়াছেন।

হূড—(১৭৯৮-১৮৪৫) ইংলণ্ডের কবি; হাস্য-রসাত্মক কবিতা রচনার জন্য বিখ্যাত।

হেষ্টিংস্ (ওয়ারেন্)— বঙ্গের গবর্ণর; ইনি কবিতা লিখিতে পারিতেন।

হোপ্—অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান্‌ কবি।

হোরিকায়া—মন্ত্রীকন্যা ও রাজমাতার সহচরী; জন্মভূমি জাপান; খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন।

হোল্‌জ্‌ (আর্ণো)—নব্য জর্ম্মনির কবি; জন্ম ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দে।

ছায়া-সুষমা—ভারতীয় চিত্র-শিল্পীরা, ইংরাজীতে যাহাকে Shading বলে, তাহাকে ‘সায়া-সুস্‌মা’ বা ছায়া-সুষমা বলিয়া থাকেন।

পান্তুম্—ইতালির যেমন সনেট্, মলয় উপদ্বীপের তেমনি পান্তুম্। পান্তুম্ অর্থে গান বা গীতি কবিতা। পান্তুমের প্রতি শ্লোকের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ চরণ পরবর্ত্তী শ্লোকের প্রথম এবং তৃতীয় চরণ-রূপে ব্যবহৃত হয়। প্রত্যেক শ্লোকে চারি চরণ থাকা আবশ্যক, এবং সাধারণতঃ চারি শ্লোকে একটি পান্তুম্ সম্পূর্ণ হয়। তদ্ভিন্ন প্রতি শ্লোকের প্রথম ও দ্বিতীয় পংক্তিগুলির সঙ্গে তৃতীয় ও চতুর্থ পংক্তিগুলির বর্ণিতব্য বিষয়ের, সঙ্গম স্থলে গঙ্গা যমুনার মত একেবারে পাশাপাশি থাকা সত্ত্বেও, সম্পূর্ণ পার্থক্য থাকাই নিয়ম। মাইকেল মধুসূদন যেমন বঙ্গভাষায় প্রথম সনেট লেখেন, ভিক্তর হুগো তেমনি ফরাসী ভাষায় প্রথম পান্তুমের অনুবাদ করেন। হুগো মৌলিক পান্তুম্ রচনা না করিলেও তৎকৃত অনুবাদ প্রকাশিত হইবার পর হইতে ফরাসী সাহিত্যে পান্তুমের প্রভাব ক্রমশঃ বিস্তৃতিলাভ করিয়া আসিয়াছে। পরবর্ত্তী অনেক কবি অনেকগুলি সুন্দর সুন্দর মৌলিক পান্তুম্ রচনা করিয়া স্বদেশের ছন্দোবিদ্যা ও কাব্য-সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করিয়াছেন।

বোটা—মরুযাত্রীরা জল রাখিবার জন্য যে চামড়ার বোতল ব্যবহার করে তাহাকে বোটা বলে। ইংরাজী bottle শব্দ, বোধ হয় এই বোটা হইতে উৎপন্ন।

লম্ব—মাদাগাস্কার বাসীরা কম্বলকে লম্ব বলে! সংস্কৃত, ভদ্রবেশধারী, “লম্বশাট পটাবৃতের” ভিতর হইতে ঐ মাদাগাস্কারী পরিচ্ছদটা দেখা যাইতেছে না তো! ‘জুজু’টা তো ঐ দিকেরই আম্‌দানী।

রহস্যময়

রহস্যময়

তোমার আলোকে সৃষ্টি দেখেছি,

তোমারেই শুধু দেখিনি কভু,

অন্তরযামী গোপনে কোথায়

লুকায়ে রয়েছ, হে মোর প্রভু!

দ্যুলোক দুলিছে আলোকে তোমার,

দুলিছে দুলিছে তপনশশী,

রসের ফোয়ারা হয়ে মাতোয়ারা

নির্ঝর ধারা পড়িছে খসি’!

পবনের মত তুমি ভগবন্!

আমরা পবন-ধূনিত ধূলি,

পবনেরে কেহ চক্ষে দেখে না,

দেখে চঞ্চল কণিকাগুলি।

তুমি ঋতুরাজ বিরাজিছ তাই

আমরা এসেছি পুষ্পপাতা,

ঋতুরাজে কেহ চক্ষে দেখে না,

দান দেখে লোক, দেখে না দাতা!

নিগূঢ় গোপন আত্মা তুমি হে,

হস্ত চরণ আমরা সবে,

তুমি চালাইলে তবে চলি মোরা

তুমি বলাইলে বলি সে তবে!

আমরা রসনা, পশ্চাতে তার

তুমি সে প্রজ্ঞা ঋতন্তরা,

তোমারি বিভায় আকাশ আকুল

তোমারি প্রভায় ভুবন ভরা।

তুমি সমুদ্র আমরা তুফান,

তুমি আনন্দ আমরা হাসি;

স্বরূপ গোপন ক’রেছ, হে প্রভু!

লুকাতে পার নি করুণারাশি।

সৃষ্টির কাজে দেখিয়া ফেলেছি,

করুণার মাঝে পেয়েছি দেখা,

কর্ম্মে বচনে অনন্তদেব!

নিশিদিন তুমি জাগিছ একা।

রুমি।

লয়লার প্রতি

লয়লার প্রতি

তুমি যেথা নাই সে দেশে কেমনে থাকি?

স্বপনে যে আজো তোমারি মূরতি আঁকি।

নিরখি’ স্বপনে আঁখি ভরে আসে জলে,

জেগে দেখি আছি একাকী এ শিলাতলে!

মরুর মরীচি বিস্তারে শুধু মায়া,

ধরিবারে ধাই,—সুদূরে মিলায় ছায়া!

ভাবনার জ্বালা জ্বলিছে অনুক্ষণ,

মরণ-সাগরে ডুবিলে জুড়ায় মন।

আকাশের পাখী ধরিতে করি সাধ,

ধরিনু যখন নিয়তি সাধিল বাদ;

চোখের উপরে কেড়ে নিয়ে গেল তারে,

বক্ষে চাপিয়া ধরিলাম—নিরাশারে।

মায়াবীর রাজা খিজিরে করিনু সাথী,

অমৃতের কূপে পৌঁছিনু রাতারাতি;

তীরে গিয়ে দেখি শুকায়ে গিয়েছে জল,

সকল যতন হ’য়ে গেল নিস্ফল!

লয়লা আমার কর তুমি হাহাকার,

নিঠুর নিয়তি, নিস্তার নাহি আর।

মজ্‌নু! গুমরি’ গুমরি’ কাঁদ্‌রে তুই,

তোর অশ্রুতে ফুটিবে মরুতে শুভ্র সুরভি জুঁই।

হাতিফি।

লুব্ধা

লুব্ধা

আহা রাই আমাদের শক্ত মেয়ে,

ও সে ছাড়েনা দাঁও হাতে পেলে;

রাই দশটা চাঁপা আদায় ক’রে

মোটে একটি চুমা শ্যামকে দিলে!

তার পরদিনেই এক নূতন কাণ্ড,

হঠাৎ শ্যামের বরাত গেল খুলে;

রাই দশটা চুমা দিলে সেদিন

মোটে একটি কদম্বের বদলে!

ওগো তার পরের দিন রাই আমাদের

যেন চাইতে কিছু গেল ভুলে;

আহা শ্যামকে শুধু রাখ্‌তে খুসী

আপন অধরখানি ধর্‌লে তুলে!

হায়, তার পরের দিন মূর্খ মেয়ে

নিজের সবই শ্যামের পায়ে থুলে;

কারণ, সন্দেহ তার চন্দ্রাকে শ্যাম

চুমা দিয়েছে গো বিনিমুলে।

দ্যু-ফ্রেণি।

শিকারীর গান

শিকারীর গান

মহুয়া গাছের তলে হরিণ চরে,

আরে, ঘাসের ‘পরে;

গুড়িগুড়ি বাঁকা পথে শিকারী চলে;

আহা, কতই ছলে!

মহুয়ায় হরিণের মন হরিল,

সারা বন ভরিল;

তীর বেগে হয়ে খাড়া ধনুকধারী

তীর হানে শিকারী।

মহুয়া গাছের ছায়ে হরিণ পড়ে;

লোহ লাগে শিকড়ে;

আহলাদে ফুকারিয়া চলে শিকারী,

আজি, আমোদ ভারি।

আরে! ধনুকধারী!

শির্ণি

শির্ণি‌

কবি মনীষীর বন্দনা গীতি,

সাধু সন্তের ভাষা,

মিলে মিশে গিয়ে একটি পাত্রে

শির্ণি হ’য়েছে খাসা!

সকল সলিল সাগরে এসেছে,

আঁখি মেলে তোরা দ্যাখ্‌।

যার বন্দনা গেয়েছে সবাই,

সে যে এক! সে যে এক!

পাপ্‌ড়ি—প্রচুর প্রকাশ পেয়েছে

বেড়িয়া বৃন্তখানি,

একের পরম জ্যোতিরে ঘিরেছে

বিশ্বজনের বাণী।

শিশির যাপন

শিশির যাপন

চোটো না ভাই বরফ আজো নড়্‌ছে নাকো দেখে,

হাত পা ভেঙে গিয়েছে তার প’ড়ে আকাশ থেকে!

সকল বাড়ীর দুয়ারে সে দিয়ে গেছে হানা,

জলে হাওয়ায় ছোরাছুরি, বাহির হওয়া মানা!

মস্‌জিদে লোক যায় না শীতে, ঘিরেছে উনান্‌,

দেখছি এবার অগ্নি পূজা ধলে মুসলমান!

আয় মেসিহি! শীতের ক’ দিন ঘুমিয়ে কাটাই আয়,

বসন্তে সব ফুলের সনে জাগ্‌ব পুনরায়।

শিশিরের গান

শিশিরের গান

কাঁদন আজি হায়,

ধ্বনিছে বেহালায়

শিশিরের;—

উদাস করি’ প্রাণ,

যেন গো অবসান

নাহি এর!

রুধিয়া নিশ্বাস

ফিরিছে হা-হুতাশ

অবিরল,

অতীত দিন স্মরি’

পড়িছে ঝরি’ ঝরি’

আঁখিজল।

সমীর মোরে, হায়,

টানিয়া নিতে চায়

করি’ জোর,

উড়ায় হেথা হোথা,

যেন গো ঝরা পাতা

তনু মোর!

পল্‌ ভার্লেন।

শীত-সন্ধ্যা

শীত-সন্ধ্যা

আঁধার করিয়া হ্রদ গৃধ্র সম ধূসর পাখায়,

রাত্রি আসে, হায়!

দিবসের শবদেহ তাম্রনখে সবলে পাকড়ি’

চলিল সে উড়ি;

পশ্চিম গগন জুড়ি’ ছড়াইয়া পড়ে রক্তধার,

পশ্চাতে তাহার।

বিস্ময়ে চাহিয়া আছে সূক্ষ্ম পল্লবের পক্ষ্ম তুলি’

ঝাউ-তরুগুলি!

শত শত কৃষ্ণ ছায়া ছুটিয়াছে দস্যুর পিছনে,

ত্বরিত গননে।

আকাশ হইতে বীরে পউষের হিমার্দ্রবাতাসে,

চিন্তা নেমে আসে;

নির্বিশেষে সর্ব্ব জীব নীরব চরণে চলে, হায়!

বিস্মৃতি-গুহায়।

বায়ের্‌বম্।

শুক্ল নিশীথে

শুক্ল নিশীথে

শুক্লা যামিনী প্রসন্ন হ’ল

লভিয়া তোমার জ্যোতি,

দেহ-নিরুদ্ধ আত্মারে তাই

দিল সে অব্যাহতি;

ছিঁড়িল শিকল হ’ল সে উজল

স্ফটিক মালার মত।

প্রভু ভৃত্যের ভেদ ঘুচে গেল,

ভুবন স্বপ্নহত!

বন্দ্বী ভুলিল বন্ধন, রাজা

রাজ্য ভুলিল ঘুমে

পুণ্য যামিনী সাম্য আনিল

বিষম মর্ত্ত্য ভূমে।

রুমি।

শুভ যাত্রা

শুভ যাত্রা

প্রভুরে তোর স্মরণ ক’রে

যাত্রা করিস্ মন!

প্রভুর নামে রিক্তাতিথি

মিলায় কাম্য ধন;

মাহেন্দ্র যোগ ঐ যে তোমার,

ক্ষতি-ক্ষয়ের ভয় কোথা আর?

তুকা কয় প্রভুর সেবায়

সদাই শুভক্ষণ।

তুকারাম।

শ্রেষ্ঠ ভক্ত

শ্রেষ্ঠ ভক্ত

মিঞা আবু বিন্ আদম্‌,—(তাঁহার বংশ বিশাল হোক্‌,)

নিশীথে জাগিয়া দেখিলেন ঘরে উছলে চন্দ্রালোক!

রূপে উদ্ভাসি’ জোছনার রাশি পদ্মফুলের মত,—

দেবদূত এক,—সোনালি পুঁথিতে লিখিতে আছেন রত;

চিত্তে মিঞার ছিল না বিকার, তাই সাহসের ভরে

সুধালেন তিনি “কি লিখ আপনি পুঁথির পাতার ‘পরে?”

আঁখি তুলি’ ধীরে স্বপন-মূরতি কানে কহিলেন তার,

“বিশ্ববাজারে যারা ভালবাসে নাম লিখি তা’ সবার!”

“আমার নাম কি লিখেছেন?” আবু সুধালেন মৃদুভাষে,

“লিখি নাই” শুধু কহি সংক্ষেপে দেবতার দূত হাসে!

বিনয় বচনে কহিলেন আবু “লিখো তবে অন্তত;—

আবু ভালবাসে সর্ব্বভূতেরে ঠিক আপনারি মত।”

কি লিখি’ পুঁথিতে অলখিতে হায় দেবতা গেলেন চলি’,

পরদিন রাতে এলেন বিভাতে ভুবন সমুজ্জ্বলি’,

সোনালি পুঁথিটি খুলি’ ধরিলেন আবুর আঁখির আগে,

নিখিল ভকত জনের শীর্ষে আবুর নামটি জাগে।

লী হাণ্ট।

সঙ্কেত গীতিকা

সঙ্কেত গীতিকা

ভোর হ’য়ে গেছে, এখনো দুয়ার বন্ধ তোর!

সুন্দরী! তুমি কত ঘুম যাও? স্বজনী!

গোলাপ জেগেছে, এখনো তোমার নয়নে ঘোর?

টুটিল না ঘুম? দেখ চেয়ে,নাই রজনী।

প্রিয়া আমার,

শোনো, চপল!

গাহে কে! আর

কাঁদে কেবল!

. নিখিল ভুবন করে করাঘাত দুয়ারে তোর,

পাখী ডেকে বলে ‘আমি সঙ্গীত-সুষমা’;

উষা বলে ‘আমি দিনের আলোেক, কনক-ডোর,

হিয়া মোর বলে ‘আমি প্রেম, অয়ি সুরমা!’

প্রিয়া! কোথায়?

শোনো, চপল!

বঁধুয়া গায়,—

নয়নে জল।

ভালবাসি নারী! পূজা করি, দেবী! মুরতি তোর,

বিধি তোরে দিয়ে পূর্ণ ক’রেছে আমারে;

প্রেম দেছে শুধু তোরি তরে বিধি হৃদয়ে মোর,

নয়ন দিয়েছে দেখিতে কেবল তোমারে!

প্রিয়া আমার,

শোনো, চপল!

গাহিতে গান

কাঁদি কেবল!

ভিক্তর হুগো।

সঙ্কোচ

সঙ্কোচ

ভালবাসি তারে প্রাণপণ ভালবাসা,

তাহারি বিরহে মরিয়া যেতেছি দুখে;

সে নাম শুনিতে কেহ যদি কর আশা,

বলিব না, হায়, আনিতে নারিব মুখে!

মিলন জনমে যদি নাই ঘটে, হায়,—

আশা যদি শুধু উঠিয়া মিলায় বুকে,—

অশরণ হিয়া ফাটিয়া টুটিয়া যায়,—

তবুও সে নাম বলিতে নারিব মুখে!

গোপন সে নাম বাহির করিতে কেহ

ছুরি ল’য়ে যদি আসে মোর সম্মুখে,—

চিরে চিরে করে চিরুণীর মত দেহ,—

তবু বলিব না,—আনিব না তাহা মুখে!

যার কেশজালে হৃদয় পড়েছে ধরা,—

যেখানে সেখানে যখন তখন

সে নাম কি যায় করা।

জাফর।

সঙ্গীত-মিস্ত্রির নিবেদন

সঙ্গীত-মিস্ত্রির নিবেদন

(মাত্রাবৃত্ত অমিত্রাক্ষর)

ইংলণ্ড্‌! ইংলণ্ড্‌!

সিন্ধুর প্রহরী!

রাষ্ট্রের স্রষ্টা!

মানুষের ধাত্রী!

সঙ্গীত শুনিবার

অবসর আছে কি?—

সঙ্গীত-মিস্ত্রির

অপরূপ কীর্ত্তি?

গোলমাল দিনরাত,

কেমনে বা শুনিবে?

নানা দলে কলহের

চীৎকার তুলিছে;—

ভিক্ষুক ক্ষুধিত,

খনিজীবি খুসী নয়,

‘শ্রম’ নামে রাক্ষস

বন্ধনে অস্থির।

তবু, কবি-কর্ম্ম

কারেদের নেহায়ে

পড়িতেছে হাতুড়ি,—

গড়িতেছে ছন্দ;—

তন্ময় মুখ সব,

উজ্জল, রক্তিম,

হাপরের তাপে, হায়,

ঝলসায় চক্ষু!

সত্য কি?—শুনিছ?

তুমি সব দেখিছ?

তবে বুঝি নয় ইহা

পণ্ড ও নিষ্ফল।

ওগো এই সঙ্গীত-

অনুরাগ, মানবের

স্বভাবেতে, শাশ্বত

রহিয়াছে লগ্ন,—

জীবনের খাদ্যে

প্রণয়ের পানীয়ে

পুষ্ট সে, হৃষ্ট সে

মৃত্যুর অতীত।

বিশ্বের সুগভীর।

মর্ম্মেতে ভিত্তি,

যমজ সে নিখিলের

সকলের সঙ্গে;

শুধু তাই? কিবা এই

প্রকৃতির তত্ত্ব?

ছন্দে সে প্রকাশের

নিরবধি চেষ্টা!

তরুলতা-পুষ্পে,

তারা—উদয়ান্তে,

নদী—ভাঁটা জোয়ারে

সঙ্গীতে বেপমান!

রাজরাজ ব্রহ্মণ

কবিদের জ্যেষ্ঠ,

তাঁরি মহাছন্দে

চরাচর চলিছে।

তাই কহি, বিদ্রুপ

কবিতারে করো না,

মা আমার! মা আমার!

মানবের ধাত্রী!

ধনজন, বৈভব,

সবই ক্ষণভঙ্গুর,

ছেড়ে যায় লক্ষ্মী,

ধ্রুব শুধু বাণী গো!

গান ঘিরে রাখে সব,

গান কভু মরে না,

মানুষ রচিবে গান

শুনিবে তা’ মানুষে।

সৃষ্টির একতান

সঙ্গীত যতদিন

ঝরি’ ঝরি’ অবিরাম

নাহি হয় নিঃশেষ,

ততদিন আমরাও

তারি সাথে গাহিব;

যে গানের ছন্দে

নর্ত্তিত বিশ্ব!

তবে, কবি-কর্ম্ম-

কার দিক্ কবিতায়

উপহার তোরে গো!

মানবের ধাত্রী!

বয়সের চিহ্ন

মুখে তোর পড়িছে,

স্বপ্নের মত ছায়

সময়ের ছায়া গো।

গান সেই ঔষধ—

যাহে ফিরে যৌবন,

উৎস সে নবতার,

প্রভাতের নির্ঝর।

তাঁতশালে জগতের

ভাগ্য তো বুনিছ;—

শ্রম লঘু হয় কিসে

গান নাহি গাহিলে?

ভেবেছ কি দুনিয়ায়

সার শুধু খাটুনি?

পূজিবার,—বুঝিবার

আছে শোভা, হর্ষ;

কবি নহে তুচ্ছ,

হীন নহে কবিতা,

মা আমার! মা আমার!

মানবের ধাত্রী।

ওয়াট্‌সন্‌।

সন্ধ্যার পূর্ব্বে

সন্ধ্যার পূর্ব্বে

ওগো! দিনের নাবাল ভুয়ে,

আর রজনীর এই পারে,

কিছু ধরিয়া পাইনে ছুঁয়ে

আঁখি ডুবে যায় একেবারে;

ছায়া মোলায়েম, আলো মৃদু,

পড়ে পথে ঘাটে নুয়ে নুয়ে;—

রবি ছড়িয়ে গেছে যে সীধু,

বাদল যে ফুল গিয়েছে থুয়ে।

এই নিভৃত নিমেষ গুলি

সে কি বৃথাই বহিয়া যাবে?

মরণ আছে যে নয়ন তুলি’,—

শেষে প্রেমের অযশ গা’বে?

তবে ফুলেরা দেখুকু, অয়ি!

এই ভরা প্রেম নিমেষের,

ওগো ভালবাসা হ’ক জয়ী

আজ মরণের ’পরে ফের।

সুইনবার্ণ।

সন্ধ্যার সুর

সন্ধ্যার সুর

ওই গো সন্ধ্যা আসিছে আবার, স্পন্দিত-সচেতন

বৃন্তে বৃন্তে ধূপাধার সম ফুলগুলি ফেলে শ্বাস;

ধ্বনিতে গন্ধে ঘূর্ণি লেগেছে, বায়ু করে হাহুতাশ,

সান্দ্র ফেনিল মূর্চ্ছা-শিথিল নৃত্য-আবর্ত্তন!

বৃন্তে বৃন্তে ধূপাধার সম ফুলগুলি ফেলে শ্বাস,

শিহরি’ গুমরি’ বাজিছে বেহালা যেন সে ব্যথিত মন;

সান্দ্র-ফেনিল মূর্চ্ছা-শিথিল নৃত্য-আবর্ত্তন!

সুন্দর-ম্লান, বেদী, সুমহান্ সীমাহীন নীলাকাশ।

শিহরি’ গুমরি’ বাজিছে বেহালা যেন সে ব্যথিত মন,

অগাধ আঁধার নির্ব্বাণ-মাঝে নাহি পাই আশ্বাস;

সুন্দর-ম্লান বেদী সুমহান্ সীমাহীন নীলাকাশ,

ঘনীভূত নিজ শোণিতে সূর্য্য হ’য়েছে অদর্শন!

অগাধ আধার নির্ব্বাণ মাঝে নাহি পাই আশ্বাস,

ধরার পৃষ্ঠে মুছে গেছে শেষ আলোকের লক্ষণ;

ঘনীভূত নিজ শোণিতে সূর্য্য হয়েছে অদর্শন,

স্মৃতিটি তোমার জাগিছে হৃদয়ে, পড়িছে আকুল শ্বাস।

বদ্‌লেয়ার।

সাঁওতালি গান

সাওতালি গান

সোনার সাজনি দিছি কিনিয়ে,

রূপার সাজনি দিছি তায়;

‘আসিব’ বলিয়ে গেছে চলিয়ে,

তবে সে এলনা কেন, হায়!

সাকীর প্রতি

সাকীর প্রতি

বিষন্ন হ’য়োনা সাকী হ’য়োনা মলিন,

এ দিন যে আনন্দের দিন;

যুদ্ধদিনে প্রাণপণে করেছি লড়াই,

এস, আজ জীবন জুড়াই।

আনন্দের পাত্র তুলে লও হাসিমুখে,

কাঁপে চুনি আঁখির সমুখে!

ভাবনার বিষে মন ডুবায়োনা, হায়,

ধৌত তারে কর মদিরায়।

ফর্দ্দূসী।

সাগরের প্রতি

সাগরের প্রতি

হে পিঙ্গল মত্ত পারাবার,

মোর তরে মন্দ্রভাষী তুমি এনেছ এনেছ সমাচার।

বিপুল বিস্তৃত পৃষ্ঠ তুলি’

চলেছে তরঙ্গ-ভঙ্গ তব; মাঝে মাঝে ক্রোড়-সন্ধিগুলি।

অতল পাতাল-গুহা প্রায়,

তারি ’পরে অস্পষ্ট সুদুর তরী চলে স্পন্দিত পাখায়।

শুনি আমি গর্জ্জন তোমার,—

কহ তুমি, “তীরে বসি’ বিলম্ব করিছ কেন মিছে আর?

“ফেন-ধৌত আকাশ পরশি’

নাচিছে উত্তাল ঢেউ যত, এস্ত চোখে তাই দেখ বসি’?

“ক্ষুদ্র এই তরী স্বল্পপ্রাণ,-

সাহসে পশেছে সেও তরঙ্গ-সঙ্গাতে, আছে ভাসমান।

“বিনাশ যদ্যপি ঘটে তার,-

তাহে কিবা? নাহি কি তাহারি মত আরো হাজার হাজার?

“দর্পভরে হও আগুয়ান,

সহজ আরামে মাটি থেক না আঁকড়ি’ ভীরুর সমান;

“নেমে এস, যাও জেনে লয়ে

কি বিহ্বল পুলক বিপদে, কি আনন্দ ভাগ্যবিপর্যয়ে।”

বটে গো প্রমত্ত পারাবার,

আমি যে তোমার চেয়ে বলী, মহত্তর উচ্ছ্বাস আমার।

উঠি তব তরঙ্গ-চূড়াতে,

সে কেবল কৌশল আমার খেলিবারে আকাশের সাথে;

আবার তলায়ে ডুবে যাই,

কোলাহল-কল্লোলের তল কোথা আছে জানিবারে তাই।

নিরাপদে তীরে সারাবেলা

খেলা, সে যে বিধাতার মহা-অভিপ্রায় ব্যর্থ ক’রে ফেলা;

এ খেলা যে সাজে না আত্মার,

মৃত্যুহীন পরম পুরুষ চিরজনমের লক্ষ্য যার।

সিন্ধু সম বিঘ্ন ও বিপদে

বিশ্বজনে ঘিরেছেন তাই ভগবান; তাই পদে পদে

সৃজিয়া বেদনা ব্যর্থতায়

বিষম জটিল ফাঁদ দেছেন জড়ায়ে আমাদের পায়;

বজ্রে ‘ওতঃপ্রোত করি’ মেঘ,

বিপর্যস্ত করিছেন তাই——পাশমুক্ত করি ঝজ্ঞঝাবেগ;—

যাহে নর হয় দুঃখজয়ী,

পরাজয়ে মাতে জয়োল্লাসে যাতনার নির্যাতন সহি’,

আপনার অজেয় আত্মায়,

প্রতিকূল নিয়তির সমকক্ষ করি’ আপ্ত ক্ষমতায়।

লও মোরে হে সিন্ধু মহান,

হও মা আনন্দের হেতু, হও তুমি স্বর্গের সোপান।

হে সমুদ্র, দুরন্ত কেশরী,

তোমারে আনিব নিজ বশে হেলায় কেশর-গুচ্ছ ধরি’;

নহে ডুবে যাব একেবারে

লবণা গভীর গহ্বরে অন্ধকার অতল পাথারে।

সুবিপুল ও বপুর ভার।

ধরিব নিজের পরে, করিব নিরোধ ভাগ্যেরে আমার।

হে স্বাধীন, হে মহাসাগর!

অমেয় আত্মার বল পরখিতে আজ আমি অগ্রসর।

ঘোষ‌।

সাধ

সাধ

(মিশর)

তোমার দুয়ারে দ্বারী হ’তে পেলে আমি তো ভাই,

কিছু না চাই,

বাঁচিয়া যাই!

ভৎসনা-বাণী কম্পিত মনে শুনি গো কত,

শিশুর মত,

নয়ন নত।

আমি যদি হায় হ’তাম তোমার হাব্‌সী দাসী,

রূপের রাশি,

নিকটে আসি’

অবাধে দু’চোখ ভরি’ দেখিতাম; সরম ভরে

যেতে না স’রে,

ঘোম্‌টা পরে!

হ’তাম যদি ও করে অঙ্গুরী, কণ্ঠে মালা,—

হৃদয় আলা!

রূপসী বালা!

মালারি মতন দুলিতাম তবে হৃদয় তলে,

নানান্‌ ছলে

বেড়িয়া গলে;

এক হ’য়ে যেত অঙ্গুলি আর অঙ্গুরীতে,—

অতি নিভৃতে,—

দুইটি চিতে।

সাধু

সাধু

অন্তর নিরমল, বচন রসাল,

থাক আর নাই থাক তুলসীর মাল;

সংযম-নিয়মিত বিমল চরিত চিত,

থাক আর নাই থাক শিরে জটাজাল;

কামনা কামের ফাঁস যে জন করেছে নাশ,

ছাই মাখা হ’ক কিবা না হ’ক কপাল;

অন্ধ যে পরধনে, বধির যে কুবচনে,

তুকা জানে সেই সাধু বাকী জঞ্জাল।

তুকারাম।

সাযুজ্য-সাধনা

সাযুজ্য-সাধনা।

মনোমন্দির প্রাণেশের লাগি’

কর সম্মার্জন,

তাহার বাসের যোগ্য করিতে

কর ওগো প্রাণপণ;

আপনার কাছে বিদায় লও গো

দেরি করিয়ো না আর,

তুমি-হীন ওই তোমারি ভিতরে

ফুটিবে মহিমা তাঁর।

মামুদ্‌ শবিস্তারী।

সুপ্রভাত

সুপ্রভাত

স্বজনী! আমার কাননের ফুল!

তেম্‌নিটি তুমি আছ কি আজো?

ধূলা পায়ে তোরে দেখিতে এসেছি,

এস বাহিরিয়া যেমন আছো।

ভুবন ভ্রমিয়া আজিকে এসেছি,

শোলোক রচেছি, ভালও বেসেছি;—

তবে, সে কাহিনী তোর কাছে কিছু নয়!

(তবু) দুয়ারে যখন এসেছি হঠাৎ,—

দুয়ার খুলিতে হয়;

স্বজনী! সুপ্রভাত।

পদ্মের দিনে দেখেছিনু তোরে,—

হৃদয়-পদ্ম খুলেছি সবে,—

তুমি বলেছিলে “আর কারো প্রেম

চাহিনা, চাহিনা, চাহিনা ভবে!”

ত্বরিতে গিয়ে যে এল দেরী করে,

আঁখি আড়ে তার কি করিলি? ওরে।

সে কথায়, হায়, কাজ কি আমার আর?

(তবু) এই পথে আজ এসেছি,হঠাৎ,

খোলো জাল জালানার!

স্বজনী! সুপ্রভাত!

দে ম্যুসে।

সুল্‌তানের প্রেম

সুল্‌তানের প্রেম

ছিন্ন কলিজা পলিতা হ’য়েছে,

হাসির আগুন লাগায়ে দাও,

বিধাতার বরে আলো হ’বে ঘর

মোর দীপখানি জাগায়ে দাও!

আঁখি জলে মোর হয়েছে সাগর,

এ তো দু’দিনের বন্যা নহে,

কত ঝ’রে গেছে কতই ঝরিছে

কেবা নির্ণয় করিয়া কহে?

স্নান সন্ধ্যার অরুণ শিঙার,—

সে আমারি রাঙা চোখের ছায়া,

আঁধার গগনে তাই তো লেগেছে

পদ্মরাগের রঙীন্ মায়া।

তুমি সুষমার কাব্য মহান,—

গোলাপ তো তার একটি পাতা;

তব কপোলের মৃদু-লোম-লেখা

ফাশী আখরে লিখেছে গাথা!

আমি বলেছিনু “জুম্ সুলতান্

তোমার চুমার একটি মাগে”

মনে পড়ে? তুমি হেসে বলেছিলে,

“দাবী আছে বটে বিধির আগে।”

জুম সুলতান।

সে

সে

বনে, প্রান্তরে, শৈলশিখরে সে আছে সীমার পারে,

সে রয়েছে লোক-লোচনের অগোচরে;

লুপ্ত-আলাপ বিশ্ব রাগিণী লিপ্ত করিছে তারে,

পান্থ-পাখীর সাথী হ’য়ে সে বিহরে।

নিভাজ নিবিড় পর্দা দোলায়ে বাতাস যেমন ক’রে

যায় গো জানায়ে আপন আবির্ভাব,—

বাঁশের বাঁশীতে পশিয়া যেমন নিশ্বাস ধরা পড়ে’

ফুকারি’ প্রকাশে গোপন গভীর ভাব,—

তেমনি করিয়া মাঝে মাঝে সে যে ধরা দিতে কাছে আসে,

ধরিতে গেলেই পলায়ে পায়ে ফিরে,

নিতি নব বেশ, বিন্যাস নব, নিতি নব হাসি হাসে,

বিহরে লীলায় অকূলের তীরে তীরে!

সুকুন্তু।

সৈনিকের গান

সৈনিকের গান

(গ্রীস্‌)

শড়্‌কির মুখে কর্ষণ করি

আমরা এমন চাষা!

কাতার নাহিক, কর্ত্তন করি

খড়েগ ফসল খাসা!

নিরস্ত্র করি শত্রু সকলে

নিরস্ত হই তবে,

পদতলে পড়ি’ ‘হুজুর’ ‘জনাব’

বলি’ তারা কাঁদে সবে।

আপনার ’পরে আপনি কর্ত্তা

কর্ত্তা আপন ঘরে,

সাধ্য কি কেউ আমাদের আগে

সমরে অস্ত্র ধরে।

স্ত্রী ও পুরুষ

স্ত্রী ও পুরুষ

(মাদাগাস্কার)

স্ত্রী। নিত্যই তুমি বল, ‘ভালবাসি’

আজিকে সুধাই তাই,—

কিসের মতন ভালবাস মোরে?—

আমি তা’ শুনিতে চাই।

পুরুষ। অন্নের মত ভালবাসি তোমা’,—

অন্নগত এ প্রাণ,—

যা’ নহিলে চোখ দেখিতে না পায়,

শুনিতে না পায় কান।

স্ত্রী। ক্ষুধার তাড়না না থাকে যখন

অন্ন তখন কিবা?

এই ভালবাসা? ইহারি গর্ব্ব

কর তুমি নিশি দিবা!

পুরুষ। স্নিগ্ধ বিমল নির্ঝর জল।

সম তোমা’ ভালবাসি,

কর্ম্মক্লান্ত, সমুদভ্রান্ত,—

তাই কাছে ছুটে আসি।

স্ত্রী। গুম্ফে ও চুলে ধূলা যবে ঝুলে

লোকে হেসে বলে ‘চাষা’

তখনি কেবল প্রয়োজন জল;

এই তব ভালবাসা?

পুরুষ। শীতে সম্বল “লম্বে”র মত

তুমি গো আমার পক্ষে,

তাই সাথে নিয়ে ফিরি চিরকাল,

বাঁধিবারে চাই বক্ষে।

স্ত্রী। হ’লে পুরাতন ফুরায় যতন

দূরে পড়ে থাকে “লম্ব”,

এই পুরুষের ভালবাসা বুঝি?

এই নিয়ে এত দন্ত!

পুরুষ। মধু চক্রের মতন তোমায়

ভালবাসি প্রাণ ভ’রে,

হরষে যে ধন লুটিয়া এনেছি

যতনে রেখেছি ঘরে!

স্ত্রী। মধুচক্রের সব নহে মধু, .

সব(ই) নহে পরিপাটি;

অনেক তাহাতে আছে জঞ্জাল,

ঢের আছে মলামাটি।

পুরুষ। রাজার মতন ভালবাসি তোরে,

ভালবাসি গরিমায়,

যাহার আদেশে ওঠে বসে লোক,

যার গুণ সবে গায়।

স্ত্রী। রাজার সঙ্গে প্রেমের তুলনা

কোরো তুমি চিরদিন,

যার কটাক্ষে নত হয়ে আসে

নয়ন লজ্জাহীন;—

পুরুষ। যার কটাক্ষে কলঙ্কী হিয়া

সরমে মরিয়া যায়,

যার ইঙ্গিতে সব সঙ্কোচ

নিঃশেষে লয় পায়।

স্নেহের নিরিখ্‌

স্নেহের নিরিখ্‌

কাঁটায় তুলে তৌল্‌ করে মহাজনের মাল,

নিখ্‌তি ক’রে সোনার ওজন জানে;

ব্যাভারে পাপ ঢুকলে পরে, দেখছি চিরকাল,

আইন বহির নিরিখ্, লোকে মানে।

কিন্তু তোরা জানিস, কিগো? বল্‌তে পারিস্‌ মোরে?

পেয়ে কোলে প্রথম ছেলে (ম’রে আবার বেঁচে)

মা-হওয়ায় যে নূতন সুখে মায়ের পরাণ ভরে,—

সে ধন ওজন করার নিরিখ্‌ নিখ্‌তি কোথায় আছে?

ক্যাপ্‌লন্‌।

স্বদেশ

স্বদেশ

সাঁচ্চা লোকের স্বদেশ কোথা? কোথায় গো তার দেশ?

যেখানে তার জন্ম ঘটে?—সীমার মাঝে শেষ?

চিহ্ন-করা গণ্ডী-ঘেরা ক্ষুদ্র সীমার মাঝে

মন কখনো বসতে পারে?—পরাণ কভু বাঁচে?

তাই তো! তবে?...সচ্চা লোকের স্বদেশ হ’বে ঠিক

নীল আকাশের মতন বিশাল, মুক্ত চতুর্দিক!

যে দেশেতে অব্যাহত স্বাধীনতার তান?

মানুষ যেথাষ মানুষ এবং মান্য ভগবান?

সাঁচ্চা লোকের সেই কি স্বদেশ? প্রবাসী আত্মার

আরো বিশাল ক্ষেত্র কি গো হয় নাকো দরকার?

তাই তো! তবে?•••সাঁচ্চা লোকের স্বদেশ হ’বে ঠিক

নীল আকাশের মতন বিশাল, মুক্ত চতুর্দিক।

যেথায় যেথায় পরছে ওগো মানুষ বারম্বার,

দুঃখ শোকের শিকল বেড়ী, সুখের পুষ্পহার;—

আত্মা যেথায় তপশ্চরণ ক’রে নিরন্তর

সত্য ও সুন্দরের দিকে হচ্ছে অগ্রসর,

সাঁচ্চা লোকের জন্মভূমি সেই খানেতেই, ঠিক

জগৎ-জোড়া স্বদেশ তাহার মুক্ত চতুর্দিক।

একটিও, হায়, মানুষ যেথায় কঁদছে সকাতরে,

মোদের স্বদেশ সেই যেন হয় ভগবানের বরে;

যেখানটিতে একখানি হাত মুছায় দুটি চোখ,

জগৎ মাঝে সেইটুকু ঠাই তোমার আমার হোক;

সাঁচ্চা লোকের জন্মভূমি সেখানটিতেই ঠিক,

বিশ্বজোড়া বিশাল স্বদেশ মুক্ত চতুর্দিক।

লাওয়েল।

স্বপ্নাতীত

স্বপ্নাতীত

দুলেছিল অচিন্‌ পাখী এই ডালের এই ফেঁক্‌ড়িতে,

পরশে ফুল ধরিয়েছিল তায় গো!

তখনো তার হয়নি বাসা আগ্‌ডালের ঐ বাঁকটিতে

একেবারে নীল আকাশের গায় গো!

ফেঁক্‌ড়ি কাঙাল,—স্বপ্নাতীত, হায় গো, .

তারেই কিনা গান শোনানো! বেছে নেওয়া তায় গো!

থুয়েছিল রাজার মেয়ে মাথাটি তার এই বুকে,

শুভক্ষণে ক্ষণিক প্রেমের উচ্ছ্বাসে,

তখনো সে তাহার যোগ্য উচ্চ প্রেমের রাজসুখে

পায়নিক, হায়, যায়নি মেতে উচ্চাশে!

কাঙাল হৃদয়-হর্ষে বুঝি টুট্‌বে সে,

তারেও কিনা প্রেম দেওয়া গো জমিয়ে রেখে উদ্দেশে!

রবার্ট ব্রাউনিং।

স্বর্ণমৃগ

স্বর্ণমৃগ

দেখিয়াছি তারে মেঘের মাঝারে,

পাহাড়ের জঙ্গলে,

দুঃখে গলে না স্নেহে সে ভোলে না,

কেবলি নাচিয়া চলে!

তবু তার সেই চাহনিটি যেন

পূর্ব্বরাগের চাওয়া,

দোলাইয়া যেন যায় বনে বনে

প্রভাত-শুভ্র হাওয়া!

চিরকামনার স্বর্ণ মৃগ সে,

কীর্ত্তি তাহার নাম;

শিকারী এবং কুক্কুরদলে

দ্যায় না সে বিশ্রাম।

পাউণ্ড।

স্মৃতি

স্মৃতি

যৌবন আমি ভালবাসিতাম

সুখাবেশে সুমধুর,

হউক ক্ষুদ্র তবু সে পাত্র

প্রেমে শুধু পরিপূর!

হ’লাম সেয়ানা হ’ল বিবেচনা,

গেল নাবালক নাম,

আমার বুদ্ধি কহিল আমারে,-

“ভালবেসো অবিরাম।”

তার পর চলি’ গেল যৌবন,

উড়িয়া পলাল সুখ;

তবু ভাল আজো আছে যে জাগিয়া

মনে আনন্দটুক্;

সে শুধু এখনো ভালবাসি ব’লে,-

খুসী আছি ভালবেসে

প্রেমের অভাব পূরাইতে কিছু

নাই মানুষের দেশে।

মাদাম দুদেতোৎ।

স্রোতে

স্রোতে

কালিকার আলো ধরিয়া রাখিতে নারি;

আজিকার মেঘ কেমনে বা অপসারি?

আজিকে আবার শরৎ আসিছে মেঘের চতুর্দ্দোলে,

শত হংসের পক্ষ-তাড়নে উড়ো-কাঁদনের রোলে!

পাত্র ভরিয়া প্রাসাদ-চূড়ায় চল,

প্রাচীন দিনের কবিদের কথা বল;—

শ্লোকে শ্লোকে সেই পরম গরিমা, চরম সুষমা গানে,

ছত্রে ছত্রে অনলের সাথে জ্যোৎস্না পরাণে আনে।

পাখীর আকুতি আমিও জেনেছি কিছু,

পিঞ্জরে তবু আছি করি’ মাথা নীচু;

কল্প-লোকের তারায় তারায় ফিরিতে তবুও হারি,

পায়ের ধূলার মত ধরণীরে ঝেড়ে ফেলে দিতে নারি।

স্রোতের সলিলে মিছে হানি তরবারি,

মিছে এ মদিরা শোক সে ভুলিতে নারি!

নিয়তির সাথে দ্বন্দ্ব বাধায়ে মিথ্যা জয়ের আশা,

তুলে দিয়ে পাল, হাল ছেড়ে শুধু স্রোতে ও বাতাসে ভাসা!

লি-পাে।