সদ্ভাব কুসুম
রজনীকান্ত সেন
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯১৩
সদ্ভাব কুসুম।
৺রজনীকান্ত সেন
প্রণীত।
এস্, কে, লাহিড়ী এণ্ড কোং
৫৬ নং কলেজ ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
১৯১৩
ভূমিকা।
“কান্ত” কবি বঙ্গের সাহিত্য সমাজে সুপরিচিত, রজনীকান্তের নামই এখন তাঁহার পরিচয়। তাঁহার অপ্রকাশিত রচনাবলী তাঁহার পত্নী এবং পুত্রগণ, তাঁহার এবং ইহাঁদিগের পরম সুহৃদ, পরম হিতৈষী, অতএব ইহাঁদিগের এবং রজনীকান্তের বন্ধুবর্গের পরমপ্রীতি ও ভক্তির পাত্র, শ্রীযুক্ত শরৎকুমার লাহিড়ী মহাশয়ের উদ্যোগে, প্রযত্নে ও সহায়তায় মুদ্রিত করিয়া বাঙ্গালার পাঠক সাধারণের হস্তে অর্পণ করিতেছেন। কবির মৃত্যুর পর এই “সদ্ভাব কুসুম”ই প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। এ গ্রন্থের কোনও ভূমিকার প্রয়োজন করে না। তবে রজনীকান্ত জীবিত থাকিলে গ্রন্থের ভূমিকা সম্ভবতঃ তিনি লিখিতেন তাঁহার অকাল মৃত্যু এবং মৃত্যুকালীন অভিপ্রায়ে সেই ভার আমার উপরে ন্যস্ত হইয়াছে এ কথা ভাবিয়া আমি বিষাদ বোধ করিতেছি। কিন্তু তাঁহার ইচ্ছা পূর্ণ করিয়া তাঁহার স্মৃতির সমাদর প্রদর্শন করিবার সুযোগও তিনি আমার জন্য রাখিয়া গিয়াছেন আমি সে সুযোগ গ্রহণ করিতে পশ্চাৎপদ হইব কেন? বিশেষতঃ যখন যোগ্যতর লোকের দ্বারা এ ভূমিকা লিখিত হইল না, ইহা একটা আলোচনার বিষয় হইবে না।
আমি রজনীকান্তের শিক্ষক ছিলাম। জীবনে শিক্ষকের ব্যবসায় অবলম্বন করিয়াছিলাম, আমার ছাত্র অগণিত। সকল শিক্ষকেরই অগণিত ছাত্র হইয়া থাকে। কিন্তু কয়জনের ভাগ্যে রজনীকান্তের মত ছাত্র মিলে? আমার ভাগ্যেই বা রজনীকান্তের ন্যায় কয়জন ছাত্র মিলিয়াছে? আমি রজনীকান্তের শিক্ষক, ইহা আমার গৌরবের কথা, তাঁহার রচনাবলীর সহিত আমার নাম সংযুক্ত করিয়া আমি সে গৌরব বৃদ্ধি করিবনা কেন?
রজনীকান্তের “অমৃত” যাঁহারা পাঠ করিয়াছেন তাঁহারা এই “সদ্ভাবকুসুম” নামক কবিতাগুলিতে সেই উপদেশ-পূর্ণ লিপিনৈপুন্য দেখিতে পাইবেন। তবে “অমৃত” অষ্টপদী কবিতাগুচ্ছ, “সদ্ভাবকুসুম” রচনায় কবি তাঁহার লেখনীকে সেই সংকীর্ণ গণ্ডিমধ্যে আবদ্ধ রাখেন নাই, বিষয় এবং লিখনপ্রণালী বিবেচনা করিলে, আবদ্ধ রাখা সম্ভব ছিলনা। “অমৃত” এবং “সদ্ভাবকুসুম” উভয়ই বালক বালিকার পক্ষে সদ্গ্রন্থ, সদুপদেশপূর্ণ, বিছালয়ের পাঠ্যরূপে নির্ব্বাচিত হইবার যোগ্য। মৃত কবির সঙ্গতিহীন পরিবারবর্গের উপকারার্থে যাঁহারা এই পুস্তক দুইখানি পাঠ্য নিয়োজিত করাইতে সমর্থ, কার্য্যতঃ তাঁহারা তদ্বিষয়ে যত্নবান হইলে, কবির স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সন্মান প্রদর্শন করা হয় না কি? রজনীকান্তের স্ত্রীপুত্রগণের দুঃখশান্তির জন্য আমরা চেষ্টিত হইলে, তাঁহার আত্মা স্বর্গ হইতে আমাদিগকে আশীবর্বাদ করিবে।
কলিকাতা,
২৫ চৈত্র, ১৩১৯।
শ্রীলোকনাথ চক্রবর্ত্তী।
সূচীপত্র
অশ্ব ও গাভী
অশ্ব ও গাভী।
হরিদত্ত নামে ধনী, নবগ্রামবাসী,
গোশালা ও অশ্বশালা গড়ে পাশাপাশি।
প্রত্যহ সায়াহ্নে সেই ধনীর নন্দন,
অশ্বশালে অশ্ব আনি করিত বন্ধন।
গোশালায় গাভী ছিল পরম যতনে,
বসিয়া থাকিত সাঁঝে, রত রোমন্থনে।
একনিশা দ্বিপ্রহরে অশ্ববর ধীরে,
দুঃখের নিশ্বাস ছাড়ি, কহিছে গাভীরে,―
“শুন গাভী, মম সম দুঃখী কেহ নাই,
কোন্ পাপে অশ্ব হ’য়ে জন্ম, ভাবি তাই।
শতবার দেই আমি অদৃষ্টে ধিক্কার,
লক্ষবার নিন্দি মানবের অবিচার।
ভোরে মোরে জু’ড়ে দেয়, ভারি গাড়ীখানা,
সন্ধ্যায় বিরাম মোর হয় গাড়ী-টানা।
মাঝে মাঝে রাত্রিতেও পাইনে নিস্তার,
অবিরত কষাঘাত শ্রম-পুরস্কার।
শান্তিবশে একটুকু থামি যদি কভু,
কঠিন প্রহার করে নিরদয় প্রভু।
পিঠ ফেটে রক্ত ব’য়ে যায় কত বার,
তবু কষাঘাত করে, কে করে বিচার?
বদনেতে রশ্মি দিয়া টানে এত জোরে,
জিহ্বা কে’টে যায়, তবু টানে তাই ধ’রে।
তথাপি উদর পূ’রে খাইতে না পাই,
পেটে খে’লে পিঠে সয়, তাও মোর নাই।
আমার সহিস প্রভু, মোর ছোলা থেকে,
অর্দ্ধেক সরান, প্রাণ ফেটে যায় দেখে।
আমাদের কথা যদি বুঝিত মানব,
হ’তে পারিত না এত নিঠুর দানব
মাঝে মাঝে কণ্ঠাগত হ’য়ে আসে প্রাণ,
ভাবি, বাঁচি অশ্বলীল। হ’লে অবসান।
তুমি, গাভী, কত সুখে জীবন কাটাও,
বিনাশ্রমে, মহা যত্নে ব’সে ব’সে খাও।
প্রহারের পরিবর্ত্তে পাও মহাদর,
তোমারে দেবতা জ্ঞানে পূজা করে নর।
কত ভক্তি ভরে, প্রভু করে তব সেবা,
পশু মধ্যে তবসম সুখী আছে কেবা?”
শুনি দুঃখে হাসি, গাভী করিছে উত্তর,
“আমার বেদনা শুধু জানেন ঈশ্বর।
তুমি কাঁদিতেছ অশ্ব প্রহার-ব্যথায়,
চিত্তে যদি সুখ থাকে, মা’র সহা যায়।
অনাহার, প্রহার বা অতি পরিশ্রম,
এ হ’তে আমার দুঃখ, দারুণ বিষম!
ঐ দেখ, অশ্ববর, আমারি কুটীরে,
বাঁধিয়া রেখেছে মোর শিশু বৎসটীরে।
আমি আছি তিন হাত মাত্র দূরে বাঁধা,
দিবস যামিনী মোর সার সুধু কাঁদা।
ক্ষুধায় আকুল বাছা, জিজ্ঞাসে না কেহ,
বাঁট-ভরা দুধ মোর, বুক ভরা স্নেহ।
সারা রাত্রি বাছা মোর ‘মা মা’ ব’লে ডাকে,
ক্ষুধায় দুর্ব্বল হয়ে ভূমে প’ড়ে থাকে।
দুজনায় দুজনার মুখ পানে চাই,
বিফল রোদনে অশ্ব, যামিনী পোহাই।
প্রত্যহ প্রভাতে পাই প্রভুর দর্শন,
সে দৃষ্টি এ প্রাণে করে গরল বর্ষণ।
দক্ষিণে দোহন পাত্র, বাম হাতে কেঁ’ড়ে,
আসিয়া বাছারে দেয় একবার ছে’ড়ে।
ক্ষুধায় তৃষ্ণায় বস পাগল হইয়া,
দুধ খে’তে আসে মোর বাঁটে মুখ দিয়া।
দুটী মাত্র টান দিতে, সে পাষাণ প্রাণে
নাহি সহে, বাছার বদন ধ’রে টানে।
তখনি সরায়ে নিয়া, ধ’রে রাখে কাছে,
তা’ দে’খে কি অভাগিনী মার প্রাণ বাঁচে?
সব দুধটুকু মোর টানিয়া দোহায়,
ভাবি, হায় কেন কাল যামিনী পোহায়?
কাছে দাঁড়াইয়া বাছা, ‘হায় হায়’ করে,
‘মা মা’ বলে ডাকে, আর আঁখি জল ঝরে।
নিঠুর যখন দেখে দুধ নাই বাঁটে,
ছেড়ে দেয় তারে, বাছা শুষ্ক বাঁট চাটে
সব চলে যায়, মোরা দুই জনে কাঁদি,
নীরবে সকলি সহি, বিধি প্রতিবাদী।
পূর্ব্বজন্মে কার মাকে দিয়েছিনু ক্লেশ,
তারি এ কঠোর শাস্তি, জেনেছি বিশেষ।”
উপদেশ
উপদেশ।
গুরুবাক্য শিরে ধর,
সজ্জনের সঙ্গ কর,
সদালাপে কাল হর,
অবশ্য কুশল হবে।
নিজ ধর্ম্মে মতি রে’খ,
সাধুর জীবন দেখ,
সে জীবনী পড়ে শেখ,
তোমারেও সাধু কবে।
বিষধর সর্পসম
কুসঙ্গ বর্জ্জন করি,
পুণ্য রিপু প্রবঞ্চনা
পরপীড়া পরিহরি;
বিধাতার প্রেম বলে,
বিশ্বপ্রেমে যাও গ’লে,
বাধা বিঘ্ন পদে দ’লে
“জয় জগদীশ” রবে।
অচলা ভকতি রে’খ
জনক জননী পদে;
পিতামাতা ধ্রুবতারা
কুটিল জীবনপথে;
ভাই বোনে ভাল বেসো,
দুখে কেঁদো, সুখে হেসো,
ভুলনা বিভুর পদ
ধরণীর কলরবে।
সমাপ্ত।
কৃষ্ণদাস ও দেবদূত
কৃষ্ণদাস ও দেবদূত।
পরম বৈষ্ণব এক কৃষ্ণদাস নামে,
বসতি করিত নবকৃষ্ণপুর গ্রামে।
প্রতিদিন ন্যূন-কল্পে একটি অতিথি,
ভোজন করা’ত, তার ছিল চির রীতি।
অভুক্ত রহিত নিজে অতিথি না পে’লে,
নিজে খে’ত, অতিথি আহার ক’রে গেলে।
এই ব্যবহার তার ছিল আজীবন,
ভ্রমেও হবেনা কভু নিয়ম-লঙ্ঘন।
বিধাতার ইচ্ছা কিবা বলা নাহি যায়,
একদিন কৃষ্ণদাস অতিথি না পায়।
যা’রে পথে দেখে, তা’রে কহে কর জোড়ে,
“একবার মম বাসে এস দয়া ক’রে,
দরিদ্রের দু’টী অন্ন মুখে দিয়ে যাও,
অনাহারে আছি আমি, জীবন বাঁচাও।”
এরূপে সমস্ত দিন যাচি’ প্রতিজনে,
সন্ধ্যায়, একাকী গৃহে ফিরে, ক্ষুণ্ণ মনে।
কেহ বলে, ‘কাজ আছে, বড় তাড়াতাড়ী,’
কেহ বলে, ‘নাহি খাই বৈষ্ণবের বাড়ী,’
কেহ বলে, ‘এখনি এলাম ভাত খেয়ে,’
কেহ নিরুত্তর, ব্যস্ত চলিয়াছে ধেয়ে।
সম্মুখে প্রস্তুত অন্ন, ভাবে কৃষ্ণদাস,
‘প্রভু আজ দিয়াছেন মোরে উপবাস।’
রাত্রি দ্বিপ্রহরে যবে নীরব অবনী,
দুয়ারে শুনিল স্পষ্ট করাঘাত-ধ্বনি।
ব্যস্ত হ’য়ে কৃষ্ণদাস খুলে দেয় দ্বার,
ক্ষুধার্ত্ত অতিথি এক মাগিছে আহার।
ভাবে, ‘প্রভু এতক্ষণে ক’রেছেন কৃপা,
জুড়া’য়ে গিয়াছে অন্ন, খাওয়াইব কিবা!’
সমাদরে অতিথিরে বসায়ে আসনে,
অন্ন আনি দিল তারে পরম যতনে।
সম্মুখে যেমন অন্ন রাখে কৃষ্ণদাস,
অতিথি বদনে দেয় বড় বড় গ্রাস।
ইষ্টদেবে নিবেদন করিল না দে’খে,
কৃষ্ণদাস একেবারে অগ্নিশর্ম্মা রে’গে।
বলে “তুই কোথা হ’তে আইলি? আ-মর!
দেখি নাই তোর মত পাষণ্ড পামর।
তোর মত ধর্ম্মহীন, পাতকী, পাগল,
খাওয়াইলে, কিছুমাত্র নাহি হবে ফল।
যার করুণায় এই ক্ষুধার সময়
পাইলি আহার, তারে মনে নাহি হয়?
ওঠ তুই, তোর আর খেয়ে কাজ নাই,
অভুক্ত রহিব আমি, অতিথি না চাই।”
এত কহি, এক চড় মারে তার গালে,
উঠিল অতিথি, ভাত পড়ে র’ল থালে।
অভিমানে চ’লে গেল, ফিরিল না আর,
কৃষ্ণদাস ক্রোধ ভরে রুদ্ধ করে দ্বার।
এমন সময়ে, এক দেব-দূত এসে,
দাঁড়াল সম্মুখে, সাধু-উদাসীন-বেশে।
দূত কহে, “কৃষ্ণদাস, কি করিলে হায়!
ক্ষুধার্ত্তের অন্ন নাকি কেড়ে নে’য়া যায়?
পাঠাইল প্রভু মোরে তোমার সকাশে,
ব’লে দিল, ‘সাবধান কর কৃষ্ণদাসে;
পূর্ব্বকৃত সুবিমল পুণ্য করি’ নাশ,
গভীর পাপের পঙ্কে ডুবে কৃষ্ণদাস।’
যে প্রভুর অন্ন, পাপী করিছে ভোজন,
কোন দিন করে নাই তাঁরে নিবেদন।
তথাপি দয়াল তার আহার যোগান,
দয়া ক’রে চিরকাল ক্ষমা ক’রে যান।
কেন বিপরীত বুদ্ধি হইল তোমার?
এ অন্নে তোমার, বল, কোন্ অধিকার?
তুমি প্রতিনিধি মাত্র দয়াল প্রভুর,
তুমি তাড়াইলে কেন ক্ষুধা-তৃষ্ণাতুর?
দয়ালের অন্ন এ যে তোমার তো নয়;
তাঁর চিরকাল সহে, তোমার না সয়?
চিরকাল ক্ষমা তিনি করিছেন এ’রে;
তুমি দিলে তাড়াইয়া, গালে চড় মে’রে?
তবু তুমি ভৃত্যমাত্র, মালিক তো নহ;
একদিন মাত্র, তাই তোমার দুঃসহ?
শীঘ্র যাও, ক্ষুধিতেরে আন ফিরাইয়া,
আহার করাও তারে আদর করাইয়া,
অসীম দয়াল প্রভু, ক্ষমার নিবাস;
হেরি,’ ক্ষমা শিক্ষা কর, ভ্রান্ত কৃষ্ণদাস!”
লজ্জা পেয়ে, অনুতাপে, কৃষ্ণদাস ধায়;
অতিথি ফিরায়ে এ’নে আহার করায়।
গুরু ও শিষ্য
গুরু ও শিষ্য।
গুরুগৃহে করি শাস্ত্রপাঠ সমাপন,
বন্দিয়া বণিকপুত্র গুরুর চরণ।
ধীরে ধীরে, সবিনয়ে কহে মৃদুভাষে,
“অনুমতি হয় যদি যাই নিজ বাসে;
কিন্তু এক ভিক্ষা আছে, চরণের দাস
সামান্য দক্ষিণা দিতে করে অভিলাষ।”
গুরু হাসি’ কহে, “বৎস দক্ষিণা কি হবে?
আমার অভাব কিছু নাহি এই ভবে।”
শিষ্য বলে, “কান্তি তব কাঞ্চন-সন্নিভ,
দু’গাছি সোণার বালা পরাইয়া দিব।
সোণার শরীরে সোণা মানাইবে ভাল,
রূপের ছটায় হবে তপোবন আলো।”
গুরুদেব বলে, “বৎস, তাই যদি সাধ,
দিয়ে যেয়ো, বাসনায় না সাধিব বাদ।”
কিছুদিন পরে সেই বণিক-নন্দন,
স্বর্ণবালা লয়ে, করে চরণ-বন্দন।
স্বহস্তে গুরুর হাতে দিল পরাইয়া,
হেরিল দেহের শোভা নয়ন ভরিয়া,
শেষে কহে, “গুরুদেব দুগাছি বলয়,
হারাইয়া ফেল যদি, এই মম ভয়।”
গুরু কহে, “বৎস, আমি প্রতিজ্ঞা না করি,
হারাইতে পারে, কেহ নিতে পারে হরি;
তুমি তো সকলি জান, আমি উদাসীন,
সর্ব্ববিধ ধনরত্নে বাসনা-বিহীন।
তথাপি শিষ্যের দান গুরুর নিকটে,
যথাযোগ্য যত্ন, আর আদরের বটে।
সাধ্যমত যত্ন করি’ রাখিব বলয়,
তথাপি জানিও, দৈব কারো বশে নয়।”
আনন্দে বণিকপুত্র প্রণমিয়া পদে,
ফিরি’ গেল নিজগৃহে, কাননের পথে।
কিছুদিন পরে, পুনঃ গুরু-সন্দর্শন―
অভিলাষে, বনে আসে বণিকনন্দন।
চরণে প্রণমি’, দেখে দাঁড়াইয়া কাছে,
এক হাতে বালা নাই, এক হাতে আছে।
বিষাদে কহিল, “প্রভু, বালা কি করিলে?”
গুরু কহে, “প’ড়ে গেছে সরসী-সলিলে।
স্নান-হেতু নেমেছিনু সরোবর জলে,
অকস্মাৎ বালা গাছি প’ড়ে গেল তলে।”
বণিক নন্দন কহে জোড় করি’ কর,
“সুন্দর বলয় সে যে, মূল্যও বিস্তর।
কোন্ স্থানে পড়িয়াছে দেহ দেখাইয়া,
খুঁজে দেখি একবার জেলে নামাইয়া।”
অনুরোধে যান গুরু অনিচ্ছায় ধীরে,
উভয়ে দাঁড়ান গিয়া সরোবর তীরে।
শিষ্য কহে “কোন্ স্থানে পড়েছে বলয়?”
অবশিষ্ট বালাগাছি গুরু খুলে লয়,
“ওই স্থানে পড়িয়াছে” ধীরে গুরু ব’লে,
সে গাছিও ছুঁড়ে ফেলে সরোবর জলে।
দুগাছি বালাই গেল, ভাবে শিষ্য দুখে,
দুগাছি বালাই গেল, গুরু ভাবে সুখে।
চন্দ্র ও সূর্য্য
সদ্ভাব কুসুম।
চন্দ্র ও সূর্য্য।
পূর্ণিমার সন্ধ্যাকালে চাঁদ উঠে পূবে,
পশ্চিমের আকাশেতে সূর্য্য যায় ডুবে।
উঁকি মেরে চাঁদ কয় সূর্য্য পানে চেয়ে,
“ওগো সূয্যি মামা! কোথা চলিয়াছ ধেয়ে?
এতক্ষণ জীবগণে পোড়াইয়া ধীরে,
শরীরের জ্বালা বুঝি নিভাইতে নীরে,
সাগরে ডুবিছ? ভাল, উঠিও না আর,
আমি আসিতেছি, তাপ জুড়াতে ধরার।
আমার শীতল জ্যোৎস্না পেয়ে জীবগণ,
হ’য়ে থাকে অবিরল আনন্দে মগন।
অবোধ সরল শিশু মা’র কোলে থেকে,
‘আর চাঁদ, আয় চাঁদ,’ বলে মোরে ডেকে।
সহস্র চকোর উড়ে মোর দেখা পেয়ে,
কি আনন্দ পায় তারা মোর সুধা খেয়ে।
‘সুধাকর’ নাম মোর, করি সুধাদান;
‘তপন’ তোমার নাম, দগ্ধ কর প্রাণ।
‘শশধর’ নাম মোর কেমন সুন্দর;
‘মার্ত্তণ্ড’ তোমার নাম অতি ভয়ঙ্কর!
তোমারে দেখিলে কেহ, চক্ষু হয় অন্ধ;
আমার শীতল মূর্ত্তি, দর্শনে আনন্দ।
তোমার কিরণ স্পর্শে অবিরত ঘর্ম্ম,
পিপাসায় প্রাণ যায়, দগ্ধ হয় চর্ম্ম।
তোমারে দেখিয়া সবে গৃহেতে লুকায়,
ভাবে, কতক্ষণে এটা অস্ত যাবে, হায়!
যাইতেছ ডু’বে যদি, যাও নমস্কার;―
একেবারে যাও মামা, জ্বালাওনা আর।”
সূর্য্য কহে ধীরে ধীরে রাঙ্গামুখে হেসে,
“এমন পণ্ডিত আর আছে কোন্ দেশে?
আমি আছি, তাই বাঁচে জীবের জীবন,
হাতে হাতে প্রাণ দেয় আমার কিরণ।
পৌষমাসে যৎসামান্য দক্ষিণেতে সরি,
শীতে মৃতপ্রায় জীব,— কম্প থরথরি।
আমার কিরণ পেয়ে বাঁচে যত তরু,
নতুবা এ ধরা হ’ত অনুর্ব্বর মরু।
ফল, ফুল, লতা, গুল্ম, শস্য অগণন,
করি অঙ্কুরিত, করি বর্দ্ধন, পালন।
তাই খেয়ে, তাই পেয়ে, জীবের বড়াই,
আমিই মেঘের জল ধরায় ছড়াই।
গিরি-শিরে অবিরত গলাই তুষার,
তাই প্রাণিগণ পায় শীত জলধার!
আমি না উদিলে, আর নাহি চলে বায়ু,
মুহূর্ত্তে জীবের শেষ হ’য়ে যায় আয়ু।
আরে মূর্খ! কোন্ মুখে মোরে ‘মামা’ কহ?
নাহি জান, আমি যে তোমার পিতামহ?
সে দিনের শিশু তুমি বয়স বা কত,
এরি মধ্যে ধরিয়াছ গুরুনিন্দা ব্রত?
নাম নিয়ে কেন কর এত কথা ব্যয়?
নামের গৌরব বাড়ে গুণ যদি রয়।
শান্ত ছেলেটীকে যদি ‘দুষ্ট’ ব’লে ডাকি,
ডাকিতে ডাকিতে ছেলে মন্দ হয় নাকি?
পণ্ডিতের নাম যদি রাখি ‘বোকারাম’,
মূর্খ হ’য়ে যায় নাকি? পায় না প্রণাম?
বালকের নাম যদি রাখি ‘বৃদ্ধ রায়’,
শৈশবেই চুল তার সাদা হ’য়ে যায়?
অন্ধপুত্রে যদি ডাকি ‘পদ্মনেত্র’ ব’লে,
দৃষ্টি শক্তি পায় সে কি সুধু তারি ফলে?
গায়ের কলঙ্ক বুঝি দেখিতে না চাও?
তাই নিষ্কলঙ্কে নিন্দা ক’রে সুখ পাও?
তুমি না থাকিলে চাঁদ কি বিশেষ ক্ষতি?
আমা ভিন্ন এ ধরার কি হইত গতি?
যে আলোর তুমি এত কর অহঙ্কার,
সে আলো তো মোর কাছে করিয়াছ ধার।
যা’র ধনে ধনী তুমি, তারি নিন্দা কর?
উদিত হ’য়োনা, শিশু, জলে ডু’বে মর।”
ঠাকুরদাদা ও নাতি
ঠাকুরদাদা ও নাতি।
প্রবল-প্রতাপ রাজা ছত্রধর রায়,
ছিলনা দয়ার লেশ,
কৃপণের একশেষ,
কেঁদে মরে দুঃখী প্রজা, বিচার না পায়।
গিরি-উচ্চ অট্টালিকা, শত পুষ্পোদ্যান;
সুনির্ম্মল সরোবর,
শোভিতেছে মনোহর,
চতুর্দ্দিকে স্তরে স্তরে প্রস্তর সোপান।
নৃপতির বৃদ্ধ পিতা হতভাগ্য অতি;
রাজার প্রাসাদে তার,
নাহি ছিল অধিকার,
কুটীরে সরসী-তীরে, করিত বসতি।
রাজ্যপেয়ে, রাজা তারে করে নির্ব্বাসিত;
একটী প্রস্তর-পাত্র,
তারে দিয়াছিল মাত্র,
সেই এক বাটি চাল রোজ তারে দিত।
পেট না ভরিত, বৃদ্ধ কাঁদিত প্রত্যহ;
নীরবে, নির্জ্জনে, একা,
ভাবিত ‘বিধির লেখা,’
কহিতনা কারো কাছে যাতনা দুঃসহ।
রাজার কুমার ছিল নবম বর্ষীয়,
মাঝে মাঝে সে কুটীরে,
আসিয়া বসিত ধীরে,
সুন্দর, তেজস্বী শিশু, পিতামহ প্রিয়।
বসিয়া বৃদ্ধের কোলে, একদা কুমার,
জিজ্ঞাসিল সকৌতুকে,
“বল দাদা, কোন্ দুখে,
কুঁড়ে ঘরে থাক? কেন এ দশা তোমার?
তুমি তো পিতার পিতা, শুনি সবে কয়;
সুন্দর দালানে, খাটে,
আমাদের রাত কাটে,
তোমার ও ছেঁড়া কাঁথা, শুয়ে ঘুম হয়?
দই, দুধ, ক্ষীর, ছানা, মিষ্টান্ন, মিঠাই,
মোরা খাই পেট ভ’রে,
কি হেতু তোমার তরে,
আসেনা সে সব? দাদা, কহ মোর ঠাঁই।”
বৃদ্ধের নয়ন-জল নাহি মানে বাঁধ,
বালকেরে ধরি’ বুকে,
চুমা খায় কচি মুখে,
বলে“রে দয়াল শিশু। করি আশীর্ব্বাদ।
আমার দুঃখের কথা শুধায়োনা ভাই,
নিরদয় পিতা তোর,
এদশা ক’রেছে মোর,
একদিন পেট ভ’রে খাইতে না পাই।
এই পাথরের বাটি দিয়েছে আমায়,
রোজ এই বাটি ভ’রে,
মেপে আধ পোয়া ক’রে,
চাল দেয়, তাতে পেটের ক্ষুধা যায়?
কত পাপ করেছিনু, তারি শাস্তি পাই,
হইয়া রাজার বাপ,
হায়! এত মনস্তাপ,
ভাবি, এত লোক মরে, মোর মৃত্যু নাই?”
শুনিয়া বালক-চিত্ত গলিল দয়ায়;
বৃদ্ধেরে ধরিয়া গলে,
ভাসে নয়নের জলে,
বলে, “দাদা, তোর দুঃখ দেখা নাহি যায়।
আমি ঘুচাইব তোর সকল বেদনা;
কুঁড়ে তোর ঘু’চে যাবে,
পেট ভরে ভাত পাবে,
কথা রাখ, দাদা, আর কখনো কেঁদনা।
আমি আর পিতা, আজ সন্ধ্যার সময়,
এই পুকুরের তীরে,
বেড়াইব ধীরে ধীরে,
বাঁধা ঘাটে তোর সনে যেন দেখা হয়।
পাথরের বাটি হাতে, ব’সে থে’কো তথা
হঠাৎ মোদের দে’খে,
ফে’লে দিও হাত থে’কে,
বাটি যেন ভেঙ্গে যায়, রে’খো মোর কথা।”
বৃদ্ধ বলে, “শিশুবুদ্ধি কত হবে আর?
আমি যদি ভাঙ্গি বাটি,
নিশ্চয় এ মুণ্ড কাটি
ফেলিবে পুকুরে, তোর পিতা দুরাচার।”
শিশু কহে, “না না দাদা, কিছু ভয় নাই;
কিছু না বলিবে কেহ,
হও তুমি নিঃসন্দেহ,
পায়ে ধরি, বালকের কথা রাখ ভাই।”
বলিয়া বালক ত্বরা প্রবেশে প্রাসাদে;
বৃদ্ধ ভাবে, ‘একি দায়,
শিশুর বুদ্ধিতে, হায়,
না জানি, পড়িব কোন্ দারুণ প্রমাদে।’
বহুচিন্তা করি, শেষে স্থির করে মন,
সন্ধ্যায় সোপানোপরি,
বসে ইষ্টদেবে স্মরি,
হাতে পাথরের বাটি, মনে দৃঢ় পণ।
ভ্রমিতেছে পিতাপুত্র, আনন্দ অপার;
যেমন এসেছে কাছে,
আর কি বিলম্ব আছে?
ফে’লে দিল বাটি, ভেঙ্গে হ’ল চূরমার।
হেরি’, ক্রোধে অগ্নিশর্ম্মা হ’ল ছত্রধর;
বলে, “জুড়ে দেরে বাটি,
নতুবা মারিব লাঠি,
পাজি, হতভাগা,—নাই মরণের ডর?
ভে’বেছিস্, ‘ওই বাটি ভাঙ্গা যদি যায়,
বড় বাটি জু’টে যাবে,
পেঠ ভ’রে ভাত খাবে?
ভাল চা’স, ভাঙ্গা বাটি জু’ড়ে নিয়ে আয়।”
হা নিঠুর কর্ম্মফল! হায়রে কপাল!
শুনি’ যার অনুরোধ,
ছিল না কর্ত্তব্য বোধ,
সে শিশুও মারিবারে ধায়, পাড়ে গাল!
রোষে শিশু কহে, “বুড়ো, বাটি জুড়ে আন্;
কাঁদিলে কি হবে আর?
জানিস্, ও বাটি কার?
নিমক্হারাম, পাজি, ধূর্ত্ত, সয়তান!
বুঝিস্নি ক’রেছিস্ কত বড় ক্ষতি;
বৃদ্ধ হ’লে মোর বাপ,
কি দিয়ে হইবে মাপ
তার আহারের চা’ল? পাষণ্ড দুর্ম্মতি!
তোর মত তা’রেও ত রাখিব কুটীরে;
ঐ বাটি মাপা চা’ল,
সেও পাবে চিরকাল,
তুই কেন ভে’ঙ্গে দিলি সেই বাটিটিরে?”
শুনি’ শিহরিল দেহ, পাষণ্ড রাজার;
‘বালক বুঝেছে তথ্য,
নির্ভীক, বলেছে সত্য,
বার্দ্ধক্যে আমিও পাব এই ব্যবহার!’
সেইদিন হ’তে রাজ-অট্টালিকা ’পরে
হইল বৃদ্ধের স্থান,
কত সমাদর, মান,
শিশু কোলে লয়ে, বৃদ্ধ ডাকেন ঈশ্বরে;
বিমল আনন্দ-অশ্রু ঝর ঝর ঝরে!
পিতা ও পুত্র
পিতা ও পুত্র।
রামদাস প্রতিদিন গিয়া পাঠশালে,
পড়া হইতনা ব’লে, চড় খে’ত গালে।
বিশেষতঃ ঠে’কে যে’ত কড়ায় গণ্ডায়,
প্রমাদে পড়িত বড়, অঙ্কের ঘণ্টায়।
নিত্য হারাইত তার অঙ্ক-কসা খাতা;
অঙ্কের সময়, নিত্য ধরে তার মাথা।
শিক্ষকেরে মাঝে মাঝে মিথ্যা কথা ক’য়ে,
ছুটী নিয়ে যেত রাম, প্রহারের ভয়ে।
আজ তার পেট ব্যথা, কাল মাথা ধরা;
ছুতো ধ’রে, কোন মতে চাই সরে পড়া।
স্কুলে যে’তে, পথে যদি কভু বৃষ্টি হয়,
ভিজাইয়া নিত গাত্র-বস্ত্র সমুদয়।
ভিজে বস্ত্র দেখি’ দিত শিক্ষকেরা ছুটী;
বাহিরে আসিয়া রাম হে’সে কুটি কুটি।
কভু বা বলিত, “আজ মার বড় জ্বর,
বলেছেন ছুটী নিয়া যাইতে সত্বর।”
পিতার অসুখ ব’লে, কভু ছুটী নিত;
বাড়ীতে না ফিরি, পথে খেলে বেড়াইত।
কোন দিন, ‘ভাত খেয়ে আসি নাই’ বলে,
ছুটী নিয়ে রামদাস বাড়ী যে’ত চ’লে।
এইরূপে বে’ড়ে গেল ছুটী-নেয়া রোগ;
কিন্তু কয়দিন রয় হেন শুভ-যোগ?
একদিন রামদাস শুষ্ক, নত মুখ,
শিক্ষকেরে কহে, “আজ বাবার অসুখ;
হয়েছেন শয্যাগত ভয়ঙ্কর জ্বরে,
যেতে হবে বৈদ্যবাটী ঔষধের তরে।”
এমন সময় কোন গুরুতর কাজে,
পিতা তার উপনীত পাঠশালা মাঝে।
হেরি ক্রোধভরে কাঁপে গুরুমহাশয়,
রামের গুণের কথা কহে সমুদয়।
গুণ ধর পুত্রে, পিতা ডে’কে লন কাছে;
রাম ভাবে, হায়, আজ অদৃষ্টে কি আছে!
বেত্রগাছি দিয়া পিতা শিক্ষকের হাতে,
বলেন, “মারুন ওরে’ আমার সাক্ষাতে।”
পৃষ্ঠে বেত পড়ে, রাম কাঁদে ভেউ ভেউ;
চিৎকার করিছে, ‘আহা’ বলে নাত কেউ।
সমপাঠিগণ ‘মিথ্যাবাদী’ ব’লে হাসে,
কাণ ধ’রে উঠায় বসায় রামদাসে।
অবশেষে মাথায় গাধার টুপি দিয়া,
পাঠশালে প্রতিঘরে আনে ঘুরাইয়া।
আধমরা রামদাস লাজে অপমানে,
বদন তুলিয়া নাহি চাহে কারো পানে।
পিতা বলে কাছে এ’নে, কান ধ’রে নিজে,
“বল, আর এজীবনে কহিবনা মিছে।”
রামদাস ব’লে কেঁদে, “করহ মার্জ্জনা,
এজীবনে আর কভু মিথ্যা কহিবনা।”
সেই দিন হ’তে রাম পাঠে দিল মন;
মিথ্যা কহিতনা আর ভ্রমেও কখন।
পুরন্দর ও বেচারাম
পুরন্দর ও বেচারাম।
আহম্মদগঞ্জ এক প্রশস্ত বন্দর,
তথায় দোকান করে সাহা পুরন্দর।
কিছুমাত্র মূলধন ছিলনা তাহার;
কেবল সততা মাত্র সম্বল সাহার।
ছিল সে কর্ত্তব্য-নিষ্ঠ, সত্যপরায়ণ,
ধারে তারে টাকা দিত, যত মহাজন।
বাকি ক’রে ধান চা’ল কিনিয়া বেচিত,
চৈত্র মাসে সব টাকা শোধ ক’রে দিত।
কলিকাতা নগরীতে ব্যবসায়িগণ,
পুরন্দরে অবিশ্বাস করে না কখন।
সুখে ও সন্মানে দিন কাটে পুরন্দর,
ব্যবসায়ে লাভ তা’র হইত বিস্তর।
বেচারাম নামে ছিল গঞ্জের দালাল,
মিষ্ট মুখ, প্রাণে বিষ, সুন্দর মাকাল।
দালালী করিয়া দুষ্ট হয়েছিল ধনী;
ঘোর প্রবঞ্চক সেই শঠ শিরোমণি।
একদিন বেচারাম কহে পুরন্দরে,
“তোমার সমান মূর্খ নাহি এ বন্দরে।
তুমি চ’লে যে’তে চাও সততার বলে,
সত্য মিথ্যা না হ’লে কি কারবার চলে?
বিশেষতঃ তোমার নাহিক মূলধন,
ধার ক’রে চালাইবে সমস্ত জীবন?
মূলধন বিনা কভু হয়না উন্নতি;
কি করিবে, একবার হয় যদি ক্ষতি?
কি দিয়ে করিবে শোধ বাজারের ঋণ?
একথা কি ভাবিয়াছ ভ্রমে কোন দিন?
সুখে সুখী সবে, দুখে বলে নাক’ ‘আহা’:
আমার বচন শুন, পুরন্দর সাহা!
এই বার চৈত্রে সব হিসাব মিটায়ে,
বর্ত্তমান কারবার দেও হে উঠায়ে।
বৈশাখের মাঝে গিয়া কলিকাতাধাম,
বাকী ক’রে তুলো আন লক্ষ টাকা দাম।
তুলোর ব্যাপারী মাড়োয়ারি চাঁদমল;
তোমার উপরে তার বিশ্বাস অটল।
বাকীতে তোমারে তুলো দিবে সে নিশ্চয়:
এখানে গুদামে আনি করহ বিক্রয়।
আশী হাজারের তুলো বেচা হয়ে গেলে,
রাত্রিযোগে গুদামে আগুন দাও জ্বে’লে।
কুড়ি হাজারের তুলো যাইবে পুড়িয়।;
বেশ ক’রে ব’সে থাক, পাগল সাজিয়া।
যে যাহা জিজ্ঞাসা করে যখন তোমারে.
কেঁদে, হাত নে’ড়ে, শুধু ‘ভুঃ’ বলিবে তারে।
সম্বাদ পাইয়া, ব্যস্ত হ’য়ে মাড়োয়ারি,
কলিকাতা হইতে আসিবে তাড়াতাড়ি।
জিজ্ঞাসিবে, “কি হয়েছে? কেমনে হইল?
তুলোর গুদামে কবে, কে, আগুন দিল?”
এইরূপে চাঁদমল, যত প্রশ্ন করে,
হাত নে’ড়ে ‘ভুঃ’ বলিবে ক্রন্দনের স্বরে।
সকল প্রশ্নের ওই একই উত্তর;
পাগলের মত ভঙ্গী, পাগলের স্বর।
উন্মাদ হয়েছ দে’খে, হতাশ হইয়া,
মনোদুখে চাঁদমল যাইবে ফিরিয়া।
তার পর কর কিন্তু তৈল ব্যবহার,
রোগ শান্তি হবে, মাথা হবে পরিষ্কার।
আমি এসে দে’খে রাত্রিতে, গোপনে,
নির্জ্জনে বসিয়া যুক্তি করিব দুজনে।
তুলো বিক্রয়ের টাকা সে আশী হাজার,
আধেক লইও তুমি, আধেক আমার।
এইরূপে প্রচুর হইবে মূলধন,
স্বাধীন হইয়া দাও ব্যবসায়ে মন।
বান্ধবের হিত বাক্য ঠেল যদি পায়,
এ জনমে ঘুচিবেনা কভু ঋণ দায়।”
পাপ প্রলোভনে পড়ি’, সাধু পুরন্দর,
অতিশয় বিচলিত হইল অন্তর।
বহুচিন্তা করি’ শেষে কহে, “বেচারাম!
চিরদিন তরে, ভাই, হারাব সুনাম।
তিলার্দ্ধ বিশ্বাস আর কেহ না করিবে;”
বেচারাম কহে, “লোকে কেমনে ধরিবে?
সব তুলো পুড়ে নাই, বুঝিবে কেমনে?
অথচ বিস্তর লাভ হইবে গোপনে।”
উত্তরিল পুরন্দর চিন্তি’ বহুক্ষণ;
“আজ বড় অস্থির হয়েছে মোর মন।
কাল তুমি এস, দিব ইহার উত্তর,”
“বেশ্” ব’লে বেচারাম উঠিল সত্বর।
পুরন্দর সারারাত্রি কাটে অনিদ্রায়;
কি করিলে ভাল হয়, বু’ঝে উঠা দায়।
পাপ-অর্থলোভ, আর বিবেক প্রখর,
মনোমধ্যে আরম্ভিল বিষম সমর।
পরিশেষে পুরন্দর দৃঢ় করে মন,
পরদিন বেচারাম দিল দরশন।
পুরন্দর কহে, “ভাই, পারিবনা আমি;
টাকা হ’তে যশ মোর ঢের বেশী দামী।”
প্রবঞ্চক পুনঃ পুনঃ ফেলে পাপ- জাল;
এইরূপে কে’টে গেল দুই মাস কাল।
দুর্জ্জনের প্রলোভন অতি ভয়ঙ্কর!
বিলম্বে পড়িল জালে সাধু পুরন্দর।
প্রস্তাব করিবা মাত্র, চাঁদমল তারে,
লক্ষ টাকা মূল্য লিখি,’ তুলে দিল ধারে।
বিধি মতে পালিল শঠের উপদেশ;
না রহিল দ্বিধা, কিম্বা অনুতাপ লেশ।
অবশেষে পাগল সাজিল পুরন্দর,
সকল প্রশ্নের এক ‘ভুঃ’ মাত্র উত্তর।
অগ্নি নির্ব্বাণের ছলে শূন্যে দেয় ফুঁ;
যে যাহা জিজ্ঞাসা করে, সুধু কয় ‘ভুঃ’।
কহিতে লাগিল সবে, “হায় কর্ম্মফল!
এমন সজ্জন সাধু, হইল পাগল!”
চাঁদমল পায় যবে দারুণ সংবাদ,
হইল তাহার শিরে অশনি-সম্পাত।
আহাম্মদগঞ্জে আসি’ নামে তাড়াতাড়ি;
পুরন্দর বাসে উপনীত মাড়োয়ারি।
বলে, “ভাই পুরন্দর, কেমনে কি হ’ল?
সব তুলো পু’ড়ে গেছে? শীঘ্র খুলে বল।”
অর্দ্ধক্রন্দনের স্বরে, পাগলের মত,
পুরন্দর, হাতমুখ নে’ড়ে অবিরত,
সুধু বলে, ‘ভুঃ’, সব কথার উত্তর;
ফিরে গেল চাঁদমল শিরে হানি কর।
একদিন রাত্রিযোগে বেচারাম এসে,
“চল্লিশ হাজার মোর দাও,” বলে হে’সে।
আর কোন ভয় নাই, হয়ে গেছ ধনী,
আমার টাকাটি ভাই দাও মোরে গণি।”
হে’সে পুরন্দর হ’ল পাগলের মত,
শঠের সম্মুখে হাত নাড়ে অবিরত;
বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া, সুধু ‘ভু’ ‘ভু’ করে;
দালাল ব্যাকুল হয়ে ধরে পুরন্দরে।
বলে “ভাই, সে কি কথা? আমাকেও ‘ভুঃ’?
হেসে পুরন্দর সাহা শুধু কয় ‘হুঁ’!
রাজপুত্র ও ঋষিপুত্র
রাজপুত্র ও ঋষিপুত্র।
পুরাকালে ছিল এক রাজার নন্দন,
মহিষীর একমাত্র আনন্দবর্দ্ধন।
অতি আদরের ছেলে, শিশুকাল হ’তে,
অঙ্গঢে’লে দিয়েছিল বিলাসের স্রোতে।
কখন ছিলনা কোন সুখের অভাব,
যেমন ঐশ্বর্য্য তার, তেমনি প্রতাপ।
একদা প্রত্যূষে, পরি মৃগয়ার সাজ,
সৈন্য লয়ে মৃগয়ায় যান যুবরাজ।
গহনে মৃগের পিছু ছুটি অনিবার,
পথ হারাইল সাঁজে রাজার কুমার।
পরিশ্রান্ত অতিশয়, তৃষ্ণায় কাতর,
অন্ধকার হ’য়ে আসে ক্রমে গাঢ়তর।
বিষণ্ণ বিহ্বল চিত্ত, নৃপের নন্দন,
দ্রুতপদে করে এক তরু আরোহণ।
অনিদ্রায় অনাহারে পোহাইল রাতি,
প্রভাতে বনের পাখী গাহিল প্রভাতী।
অবরোহি’ তরু হ’তে, পথ-অম্বেষণে,
ভ্রমিতে লাগিল বনে চঞ্চল চরণে।
হেনকালে দেখা এক ঋষিপুত্র সাথে,
সে যায় তুলিতে ফুল, ফুলসাজি হাতে।
রাজপুত্র কহে ডাকি “কে? কোথায় যাও?
প্রাণ যায়, একবিন্দু জল মোরে দাও।
ঋষিপুত্র যত্নে লয়ে যায় যুবরাজে,
সুপবিত্র শান্তিময় তপোবন মাঝে
জল দিয়া যুবরাজে আদরে বসায়,
জিজ্ঞাসে “কি নাম ধর, বসতি কোথায়?”
রাজপুত্র নাহি দেয় কথার উত্তর,
ঋষিদের দশা দেখ ব্যথিত অন্তর।
অবশেষে কহে, ঋষিপুত্রেরে সম্ভাষি,―
“আজ্ঞা পেলে, দুটী কথা তোমারে জিজ্ঞাসি
কি হেতু কঠোর শাস্তি হয়েছে তোমার?
আলে। ভাল নয়? ভাল বনের আঁধার?
গাছের পাতায় ঢাকা একখানি কুঁড়ে,
ঝড়ে উ’ড়ে যেতে পারে, যেতে পারে পুড়ে।
সুখের নাহিক চিহ্ন, আছ কোন সুখে?
পায়স মিষ্টান্ন বুঝি নাহি যায় মুখে?
কটু তিক্ত ফল খেয়ে ক্ষুধা হয় দূর?
ওটা কি? হায়রে দশা! কুশের মাদুর?
ওই শয্যা? পরিধান করেছ বাকল?
বস্ত্র নাহি জুটে? কিম্বা হয়েছ পাগল?
শত-ছিদ্র এ কুটীর; ঘোর বরষায় —
পড়েনা বৃষ্টির ধারা? শুয়ে থাকা যায়?
প্রজ্জ্বলিত অগ্নিমাত্র শীতের সম্বল?
অন্য থাক্, একখানা জোটে না কম্বল?
এত ক্লেশ ক’রে যার কর আরাধনা,
তার কাছে কিছুই কি চাহিতে পারনা?
আরও ভেবে দেখ, যদি মরণের পরে
পরকাল নাহি থাকে? পণ্ডশ্রম ক’রে
মিথ্যা আশা বুকে লয়ে, সাধিতেছ কত
ভয়ানক ক্লেশকর, সুকঠোর ব্রত;
না খেলে মধুর খাদ্য রসনা তোষণ,
না পেলে বিলাসদ্রব্য বসন ভূষণ।
গীত, বাদ্য, রসালাপ লেখেনি ললাটে,
মানুষের জীবন কি এই ভাবে কাটে?
পরকাল না থাকিলে দুঃখ মাত্র সার,
নিষ্ফল জীবনে তব, সহস্র ধিক্কার।
টুক দেখেছে পরকাল? আছে কি বিশ্বাস?
ঘোর অন্ধকার সব, ফুরালে নিশ্বাস।”
ধীরভাবে ঋষিপুত্র শ্লেষবাক্য শুনে
বলে শেষে, “রাজা তুমি কহ কোন্ গুণে?
যৌবনেই যার হেন বুদ্ধি-বিপর্য্যয়,
সুশাসন তার ভাগ্যে নাহিক নিশ্চয়।
যে সব বিলাসদ্রব্য কভু নাহি চাই,
তাহার অপ্রাপ্তি হেতু দুঃখ কিছু নাই।
মানবের সুখ দুঃখ জনমে অন্তরে,
সেই দুঃখী, সদা যে অভাব বোধ করে।
বসন, ভূষণ কিম্বা খাদ্য সুরসাল,
যে না চাহে, তার বল কিসের জঞ্জাল?
আমি যদি সুখী হই বনফল খেয়ে,
কি ফল, এ কানে মিষ্টান্নের গুণ গেয়ে?
পরকাল আছে কিনা দেখে নাই কেহ,
যদি বল সে বিষয়ে বিশেষ সন্দেহ;
নাই যদি থাকে, তা’তে মোর দুঃখ নাই,
যদি থাকে, তোমার কি গতি হবে ভাই?
প্রজার বুকের রক্ত করিয়া শোষণ,
শত শত দরিদ্রেরে করায়ে রোদন,
শত মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, শত অবিচারে,
যে অর্থ তুলিছ তুমি রাজ ধনাগারে,
তাই দিয়া কিনিয়াছ এ ক্ষণিক সুখ,
বৃথা অহঙ্কারে ফু’লে উঠিয়াছে বুক।
যে দিয়াছে এই সুখ, বিলাস, সম্পদ,
ভ্রমে চিন্তা নাহি কর তাঁহার শ্রীপদ।
পরকাল যদি থাকে তবে কোথা যাবে?
সমস্ত পাপের শাস্তি একে একে পাবে।
তাই বলি, নৃপসুত, তুমিই নির্ব্বোধ,
কোথায় তোমার শান্তি, কোথায় প্রবোধ?
পাপে ডু’বে যেই নিজে সুখী মনে করে,
ক্ষণিক বিলাসে ম’জে না ডাকে ঈশ্বরে,
তারে কভু বুদ্ধিমান্ বলা নাহি যায়,
ভাব গিয়া, কি প্রভেদ তোমায় আমায়।”
রাম ও ভূতো
রাম ও ভূতো।
মিথ্যাবাদী ভূতনাথ, সত্যবাদী রাম,
দুই ভাই বসতি করিত বেদগ্রাম।
দুজনা প্রবেশি’ এক মালীর বাগানে,
রাত্রি কালে পাকা আম চুরি ক’রে আনে।
প্রাতে টের পে’য়ে পিতা, ডাকি’ দুজনায়,
জিজ্ঞাসেন, “পাকা আম পাইলি কোথায়?”
ভূতো বলে, “কোথা হ’তে আনিয়াছে রাম,
আমি নাহি জানি, প্রাতে দেখিতেছি আমি।”
রাম বলে, “দু’জনা মালীর গাছে চ’ড়ে,
চুপে চুপে রাত্রিতে এনেছি চুরি ক’রে।”
পিতা ক’ন “রাম, তুমি ক’রেছ স্বীকার;
সাবধান, হেন কাজ করিওনা আর।
চুরির মতন আর নীচ কর্ম্ম নাই;
আর যেন হেন কথা শুনিতে না পাই।”
ভূতোরে বলেন রে’গে, “অতি দুষ্ট তুই,
‘চুরি’ আর ‘মিথ্যা,’—তোর অপরাধ দুই।
প্রহারটা রামের উপর দিয়ে যা’ক্,
এই ভে’বে, সত্য কথা বলা দূরে থাক্,
নিজে বাঁচিবার তরে, রামে অপরাধী
করেছিস, হতভাগা, চোর, মিথ্যাবাদী।”
বলিয়া, ভূতোকে ধরি’ করেন প্রহার,
ভেউ ভেউ কাঁদে ভূতো, বহে অশ্রুধার।
অবশেষে আম গুলি কাপড়ে বাঁধিয়া,
ভূতোর মাথায় তুলি, দেন পাঠাইয়া।
আম পেয়ে মালী বলে, “ভদ্রের সন্তান,
তোমরা করিলে’ চুরি থাকে কি সন্মান?”