কাহিনী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯১২
প্রকাশনা-তথ্য
কাহিনী
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাহিনী
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল্য দশ আনা
প্রকাশক
শ্রীঅপূর্ব্বকৃষ্ণ বসু
ইণ্ডিয়ান পাব্লিশিং হাউস
২২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
কান্তিক প্রেস
২০, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
শ্রীহরিচরণ মান্না দ্বারা মুদ্রিত।
সূচী
কর্ণ-কুন্তী সংবাদ
কর্ণ-কুন্তী সংবাদ
কর্ণ
পুণ্য জাহ্নবীর তীরে সন্ধ্যা-সবিতার
বন্দনায় আছি রত। কর্ণ নাম যার,
অধিরথসূতপুত্র, রাধাগর্ভজাত
সেই আমি,―কহ মােরে তুমি কে গাে মাতঃ!
কুন্তী
বৎস, তাের জীবনের প্রথম প্রভাতে
পরিচয় করায়েছি তােরে বিশ্ব সাথে,
সেই আমি, আসিয়াছি ছাড়ি সর্ব্ব লাজ
তােরে দিতে আপনার পরিচয় আজ।
কর্ণ
দেবী তব নত-নেত্র-কিরণ-সম্পাতে
চিত্ত বিগলিত মাের, সূর্য্যকরঘাতে
শৈল তুষারের মত। তব কণ্ঠস্বর
যেন পূর্ব্বজন্ম হতে পশি কর্ণপর
জাগাইছে অপূর্ব্ব বেদনা। কহ মােরে
জন্ম মাের বাধা আছে কি রহস্য ডােরে
তােমা সাথে হে অপরিচিতা!
কুন্তী
ধৈর্য্য ধর্
ওরে বৎস, ক্ষণকাল। দেব দিবাকর
আগে যাক্ অস্তাচলে। সন্ধার তিমির
আসুক্ নিবিড় হয়ে।―কহি তােরে বীর
কুন্তী আমি।
কর্ণ
তুমি কুন্তী! অর্জ্জুন-জননী!
কুন্তী
অর্জ্জুন-জননী বটে! তাই মনে গণি’
দ্বেষ করিয়ো না বৎস! আজো মনে পড়ে
অস্ত্র পরীক্ষার দিন হস্তিনা নগরে।
তুমি ধীরে প্রবেশিতে তরুণকুমার
রঙ্গস্থলে, নক্ষত্রখচিত পূর্ব্বাশার
প্রান্তদেশে নবােদিত অরুণের মত।
যবনিকা-অন্তরালে নারী ছিল যত
তার মধ্যে বাক্যহীনা কে সে অভাগিনী
অতৃপ্ত স্নেহ-ক্ষুধার সহস্র নাগিনী
জাগায়ে জর্জ্জর বক্ষে; কাহার নয়ন
তোমার সর্ব্বাঙ্গে দিল আশিষ-চুম্বন?
অর্জ্জুন-জননী সে যে! যবে কৃপ আসি
তােমারে পিতার নাম শুধালেন হাসি,
কহিলেন, “রাজকুলে জন্ম নহে যার
অর্জ্জুনের সাথে যুদ্ধে নাহি অধিকার,”―
আরক্ত আনত মুখে না রহিল বাণী,
দাড়ায়ে রহিলে,―সেই লজ্জা-আভাখানি
দহিল যাহার বক্ষ অগ্নিসম তেজে,
কে সে অভাগিনী! অর্জ্জুন-জননী সে যে!
পুত্র দুর্য্যোধন ধন্য, তখনি তােমারে
অঙ্গরাজ্যে কৈল অভিষেক। ধন্য তারে!
মাের দুই নেত্র হতে অশ্রুবারিরাশি
উদ্দেশে তােমারি শিরে উচ্ছসিল আসি
অভিষেক সাথে। হেন কালে করি পথ
রঙ্গমাঝে পশিলেন সূত অধিরথ
আনন্দ বিহ্বল। তখনি সে রাজসাজে
চারিদিকে কুতূহলী জনতার মাঝে
অভিষেকসিক্ত শির লুটায়ে চরণে
সূতবৃদ্ধে প্রণমিলে পিতৃ সম্ভাষণে!
ক্রূর হাস্যে পাণ্ডবের বন্ধুগণ সবে
ধিক্কারিল; সেইক্ষণে পরম গরবে
বীর বলি’ যে তােমারে ওগাে বীরমণি
আশীষিল, আমি সেই অর্জ্জুন-জননী।
কর্ণ
প্রণমি তােমারে আর্য্যে! রাজমাতা তুমি,
কেন হেথা একাকিনী? এ যে রণভূমি,
আমি কুরুসেনাপতি।
কুন্তী
পুত্র, ভিক্ষা আছে,―
বিফল না ফিরি যেন।
কর্ণ
ভিক্ষা, মোর কাছে!
আপন পৌরুষ ছাড়া, ধর্ম্ম ছাড়া আর
যাহা আজ্ঞা কর, দিব চরণে তোমার।
কুন্তী
এসেছি তোমারে নিতে।
কর্ণ
কোথা লবে মোরে?
কুন্তী
তৃষিত বক্ষের মাঝে—লব মাতৃক্রোড়ে।
কর্ণ
পঞ্চপুত্রে ধন্য তুমি, তুমি ভাগ্যবতী,
আমি কুলশীলহীন, ক্ষুদ্র নরপতি,
মোরে কোথা দিবে স্থান?
কুন্তী
সর্ব্ব উচ্চভাগে,
তোমারে বসাব মোর সর্ব্বপুত্র আগে
জ্যেষ্ঠ পুত্র তুমি।
কর্ণ
কোন্ অধিকার মদে
প্রবেশ করিব সেথা? সাম্রাজ্য-সম্পদে
বঞ্চিত হয়েছে যারা, মাতৃস্নেহধনে
তাহাদের পূর্ণ অংশ খণ্ডিব কেমনে
কহ মোরে? দ্যূতপণে না হয় বিক্রয়,
বাহুবলে নাহি হারে মাতার হৃদয়―
সে যে বিধাতার দান!
কুন্তী
পুত্র মোর, ওরে,
বিধাতার অধিকার লয়ে এই ক্রোড়ে
এসেছিলি একদিন—সেই অধিকারে
আয় ফিরে সগৌরবে, আয় নির্ব্বিচারে,
সকল ভ্রাতার মাঝে মাতৃঅঙ্কে মম
লই আপনার স্থান।
কর্ণ
শুনি স্বপ্নসম
হে দেবি তোমার বাণী! হের, অন্ধকার
ব্যাপিয়াছে দিগ্বিদিকে, লুপ্ত চারিধার—
শব্দহীনা ভাগীরথী। গেছ মোরে লয়ে
কোন্ মায়াচ্ছন্ন লোকে, বিস্মৃত আলয়ে,
চেতনা-প্রত্যুষে। পুরাতন সত্যসম
তব বাণী স্পর্শিতেছে মুগ্ধচিত্ত মম।
অস্ফুট শৈশবকাল যেন রে আমার,
যেন মোর জননীর গর্ভের আঁধার
আমারে ঘেরিছে আজি। রাজমাতঃ অয়ি
সত্য হোক্ স্বপ্ন হোক্, এস স্নেহময়ী
তোমার দক্ষিণহস্ত ললাটে চিবুকে
রাখ ক্ষণকাল। শুনিয়াছি লোকমুখে
জননীর পরিত্যক্ত আমি! কতবার
হেরেছি নিশীথস্বপ্নে, জননী আমার
এসেছেন ধীরে ধীরে দেখিতে আমায়,
কাঁদিয়া কহেছি তাঁরে কাতর ব্যথায়
জননী গুণ্ঠন খোল দেখি তব মুখ―
অমনি মিলায় মূর্ত্তি তৃষার্ত্ত উৎসুক
স্বপনেরে ছিন্ন করি। সেই স্বপ্ন আজি
এসেছে কি পাণ্ডব-জননী-রূপে সাজি
সন্ধ্যাকালে, রণক্ষেত্রে, ভাগীরথীতীরে!
হের দেবী পরপারে পাণ্ডব-শিবিরে
জ্বলিয়াছে দীপালোক,—এপারে অদূরে
কৌরবের মন্দুরায় লক্ষ অশ্বখুরে
খর শব্দ উঠিছে বাজিয়া। কালি প্রাতে
আরম্ভ হইবে মহারণ। আজ রাতে
অর্জ্জুন-জননী-কণ্ঠে কেন শুনিলাম
আমার মাতার স্নেহস্বর। মোর নাম
তাঁর মুখে কেন হেন মধুর সঙ্গীতে
উঠিল বাজিয়া―চিত্ত মাের আচম্বিতে
পঞ্চপাণ্ডবের পানে ভাই বলে ধায়।
কুন্তী
তবে চলে আয় বৎস, তবে চলে আয়।
কর্ণ
যাব মাতঃ চলে যাব, কিছু শুধাব না―
না করি সংশয় কিছু না করি ভাবনা!―
দেবি, তুমি মাের মাতা! তােমার আহ্বানে
অন্তরাত্মা জাগিয়াছে—নাহি বাজে কানে
যুদ্ধভেরী জয়শঙ্খ—মিথ্যা মনে হয়
রণহিংসা, বীরখ্যাতি জয়পরাজয়।
কোথা যাব, লয়ে চল।
কুন্তী
ওই পরপারে
যেথা জ্বলিতেছে দীপ স্তব্ধ চন্দ্রাবারে
পাণ্ডুর বালুকাতটে।
কর্ণ
হােথা মাতৃহারা
মা পাইবে চিরদিন! হােথা ধ্রুবতারা
চিররাত্রি রবে জাগি সুন্দর উদার
তােমার নয়নে! দেবি, কহ আরবার
আমি পুত্র তব!
কুন্তী
পুত্র মোর!
কর্ণ
কেন তবে
আমারে ফেলিয়া দিলে দূরে অগৌরবে
কুলশীলমানহীন মাতৃনেত্রহীন
অন্ধ এ অজ্ঞাত বিশ্বে? কেন চিরদিন
ভাসাইয়া দিলে মোরে অবজ্ঞার স্রোতে,
কেন দিলে নির্ব্বাসন ভ্রাতৃকুল হতে?
রাখিলে বিচ্ছিন্ন করি অর্জ্জুনে আমারে,―
তাই শিশুকাল হতে টানিছে দোঁহারে
নিগূঢ় অদৃশ্য পাশ হিংসার আকারে
দুর্নিব্বার আকর্ষণে। মাতঃ, নিরুত্তর?
লজ্জা তব, ভেদ করি অন্ধকার স্তর
পরশ করিছে মোরে সর্ব্বাঙ্গে নীরবে―
মুদিয়া দিতেছে চক্ষু।—থাক্ থাক্ তবে।
কহিয়ো না, কেন তুমি ত্যাজিলে আমারে।
বিধির প্রথম দান এ বিশ্বসংসারে
মাতৃস্নেহ, কেন সেই দেবতার ধন
আপন সন্তান হতে করিলে হরণ
সে কথার দিয়ো না উত্তর। কহ মোরে,
আজি কেন ফিরাইতে আসিয়াছ ক্রোড়ে?
কুন্তী
হে বৎস, ভর্ৎসনা তাের শত বজ্রসম
বিদীর্ণ করিয়া দিক্ এ হৃদয় মম
শত খণ্ড করি। ত্যাগ করেছিনু তােরে
সেই অভিশাপে, পঞ্চপুত্র বক্ষে করে
তবু মাের চিত্ত পুত্রহীন,—তবু হায়
তােরি লাগি বিশ্বমাঝে বাহু মাের ধায়
খুঁজিয়া বেড়ায় তোরে। বঞ্চিত যে ছেলে
তারি তরে চিত্ত মাের দীপ্ত দীপ জ্বেলে
আপনারে দগ্ধ করি করিছে আরতি
বিশ্ব-দেবতার।—আমি আজি ভাগ্যবতী,
পেয়েছি তােমার দেখা।—যবে মুখে তাের
একটি ফুটেনি বাণী, তখন কঠোর
অপরাধ করিয়াছি―বৎস, সেই মুখে
ক্ষমা কর্ কুমাতায়! সেই ক্ষমা, বুকে
ভর্ৎসনার চেয়ে তেজে জ্বালুক্ অনল
পাপ দগ্ধ করে মােরে করুক্ নির্ম্মল।
কর্ণ
মাতঃ দেহ পদধূলি, দেহ পদধূলি,
লই অশ্র মাের।
কুন্তী
তােরে লব বক্ষে তুলি
সে সুখ-আশায় পুত্র আসি নাই দ্বারে।
ফিরাতে এসেছি তােরে নিজ অধিকারে।―
সূতপুত্র নহ তুমি, রাজার সন্তান,
দূর করি দিয়া বৎস সর্ব্ব অপমান
এস চলি যেথা আছে তব পঞ্চ ভ্রাতা।
কর্ণ
মাতঃ সূতপুত্র আমি, রাধা মাের মাতা,
তার চেয়ে নাহি মাের অধিক গৌরব।
পাণ্ডব পাণ্ডব থাক্, কৌরব কৌরব―
ঈর্য্যা নাহি করি কারে।―
কুন্তী
রাজ্য আপনার
বাহুবলে করি লহ হে বৎস উদ্ধার।
দুলাবেন ধবল ব্যজন যুধিষ্ঠির,
ভীম ধরিবেন ছত্র, ধনঞ্জয় বীর
সারথী হবেন রথে,―ধৌম্য পুরােহিত
গাহিবেন বেদমন্ত্র—তুমি শত্রুজিৎ
অখণ্ড প্রতাপে রবে বান্ধবের সনে
নিঃসপত্ন রাজ্যমাঝে রত্ন সিংহাসনে।
কর্ণ
সিংহাসন! যে ফিরাল মাতৃস্নেহ-পাশ―
তাহারে দিতেছ মাতঃ রাজ্যের আশ্বাস!
একদিন যে সম্পদে করেছ বঞ্চিত
সে আর ফিরায়ে দেওয়া তব সাধ্যাতীত।―
মাতা মোর, ভ্রাতা মোর, মোর রাজকুল
এক মুহূর্তেই মাতঃ করেছ নির্ম্মুল
মোর জন্মক্ষণে। সূত-জননীরে ছলি’
আজ যদি রাজ-জননীরে মাতা বলি,—
কুরুপতি কাছে বদ্ধ আছি যে বন্ধনে
ছিন্ন কর’ ধাই যদি রাজসিংহাসনে
তবে ধিক্ মোরে!
কুন্তী
বীর তুমি, পুত্র মোর,
ধন্য তুমি! হায় ধর্ম্ম, একি সুকঠোর
দণ্ড তব! সেইদিন কে জানিত হায়
ত্যজিলাম যে শিশুরে ক্ষুদ্র অসহায়,
সে কখন বলবীর্য্য লভি কোথা হতে
ফিরে আসে একদিন অন্ধকার পথে
আপনার জননীর কোলের সন্তানে
আপন নির্ম্ম হস্তে অস্ত্র আসি হানে।
একি অভিশাপ!
কর্ণ
মাতঃ করিয়ো না ভয়।
কহিলাম, পাণ্ডবের হইবে বিজয়।
আজি এই রজনীর তিমির-ফলকে
প্রত্যক্ষ করিনু পাঠ নক্ষত্র আলোকে
ঘোর যুদ্ধের ফল। এই শান্ত স্তব্ধক্ষণে
অনন্ত আকাশ হতে পশিতেছে মনে
জয়হীন চেষ্টার সঙ্গীত,—আশাহীন
কর্ম্মের উদ্যম, হেরিতেছি শান্তিময়
শূন্য পরিণান। যে পক্ষের পরাজয়
সে পক্ষ ত্যজিতে মোরে কোরো না আহ্বান।
জয়ী হোক্ রাজা হোক্ পাণ্ডব-সন্তান—
আমি রব নিষ্ফলের, হতাশের দলে।
জন্মরাত্রে ফেলে গেছ মোরে ধরাতলে
নামহীন গৃহহীন—আজিও তেমনি
আমারে নির্ম্মম চিত্তে তেয়াগ’ জননী
দীপ্তিহীন কীর্ত্তিহীন পরাভব পরে।
শুধু এই আশীর্ব্বাদ দিয়ে যাও মোরে
জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে, অয়ি,
বীরের সদ্গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।
১৫ই ফাল্গুন, ১৩০৬
গান্ধারীর আবেদন
কাহিনী
গান্ধারীর আবেদন
দুর্য্যোধন
প্রণমি চরণে তাত!
ধৃতরাষ্ট্র
ওরে দুরাশয়
অভীষ্ট হয়েছে সিদ্ধ?
দুর্য্যোধন
লভিয়াছি জয়।
ধৃতরাষ্ট্র
এখন হয়েছ সুখী?
দুর্যোধন
হয়েছি বিজয়ী।
ধৃতরাষ্ট্র
অখণ্ড রাজত্ব জিনি সুখ তোর কই
রে দুর্ম্মতি?
দুর্য্যোধন
সুখ চাহি নাই মহারাজ!
জয়। জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।
ক্ষুদ্র সুখে ভরেনাক ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা
কুরুপতি,—দীপ্তজালা অগ্নিঢালা সুধা
জয়রস—ঈর্ষাসিন্ধু মন্থন সঞ্জাত
সদ্য করিয়াছি পান,—সুখী নহি, তাত,
অদ্য আমি জয়ী। পিতঃ, সুখে ছিনু, যবে
একত্রে আছিনু বদ্ধ পাণ্ডবে কৌরবে,
কলঙ্ক যেমন থাকে শশাঙ্কের বুকে
কর্মহীন গর্বহীন দীপ্তিহীন সুখে।
সুখে ছিনু, পাণ্ডবের গাণ্ডীব টঙ্কারে
শঙ্কাকুল শত্রুদল আসিত না দ্বারে,
সুথে ছিনু, পাণ্ডবেরা জয়দৃপ্ত করে
ধরিত্রী দোহন করি, ভ্রাতৃপ্রতিভরে
দিত অংশ তার—নিত্য নব ভোগসুখে
আছি নিশ্চিন্ত চিত্তে অনন্ত কৌতুকে।
সুখে ছিনু, পাণ্ডবের জয়ধ্বনি যবে
হানিত কৌরব-কর্ণ প্রতিধ্বনিরবে;
পাণ্ডবের যশােবিশ্ব-প্রতিবিম্ব আসি
উজ্জ্বল অঙ্গুলি দিয়া দিত পরকাশি’
মলিন-কৌরবকক্ষ। সুখে ছিনু পিতঃ
আপনার সর্ব্বতেজ করি নির্ব্বাপিত
পাণ্ডব-গৌরবতলে স্নিগ্ধশান্তরূপে
হেমন্তের ভেক যথা জড়ত্বের কুপে।
আজি পাণ্ডুপুত্রগণে পরাভব বহি
বনে যায় চলি,―আজ আমি সুখী নহি,
আজ আমি জয়ী।
ধৃতরাষ্ট্র
ধিক্ তাের ভ্রাতৃদ্রোহ!
পাণ্ডবের কৌরবের এক পিতামহ
সে কি ভুলে গেলি?
দুর্য্যোধন
ভূলিতে পারিনে সে যে,―
এক পিতামহ তবু ধনে মানে তেজে
এক নহি।―যদি হ’ত দূরবর্ত্তী পর
নাহি ছিল ক্ষোভ; শর্ব্বরীর শশধর
মধ্যাহ্নের তপনেরে দ্বেষ নাহি করে,—
কিন্তু প্রাতে এক পূর্ব্ব-উদয়-শিখরে
দুই ভ্রাতৃ সূর্য্যলােক কিছুতে না ধরে।
আজ দ্বন্দ্ব ঘুচিয়াছে, আজি আমিজয়ী,
আজি আমি একা।
ধৃতরাষ্ট্র
ক্ষুদ্র ঈর্ষ্যা! বিষময়ী
ভুজঙ্গিনী।
দুর্য্যোধন
ক্ষুদ্র নহে, ঈর্ষ্যা সুমহতী।
ঈর্ষ্যা বৃহতের ধর্ম্ম। দুই বনস্পতি
মধ্যে রাখে ব্যবধান,―লক্ষ লক্ষ তৃণ
একত্রে মিলিয়া থাকে বক্ষে বক্ষে লীন;
নক্ষত্র অসংখ্য থাকে সৌভ্রাত্র-বন্ধনে,―
এক সূর্য্য এক শশী। মলিন কিরণে
দূর বন-অন্তরালে পাণ্ডু চন্দ্রলেখা
আজি অস্ত গেল,―আজি কুরুসূর্য্য একা,
আজি আমি জয়ী।
ধৃতরাষ্ট
আজি ধর্ম্ম পরাজিত।
দুর্য্যোধন
লােকধর্ম্ম রাজধর্ম্ম এক নহে পিতঃ!
লােকসমাজের মাঝে সমকক্ষজন
সহায় সুহৃদ্রূপে নির্ভর বন্ধন,―
কিন্তু রাজা একেশ্বর, সমকক্ষ তার
মহাশত্রু, চিরবিঘ্ন, স্থান দুশ্চিন্তার,
সম্মুখের অন্তরাল, পশ্চাতের ভয়,
অহর্নিশি যশঃশক্তিগৌরবের ক্ষয়,
ঐশ্বর্য্যের অংশ-অপহারী। ক্ষুদ্রজনে
বলভাগ করে লয়ে বান্ধবের সনে
রহে বলী; রাজদণ্ডে যত খণ্ড হয়
তত তার দুর্ব্বলতা, তত তার ক্ষয়।
একা সকলের ঊর্দ্ধে মস্তক আপন
যদি না রাখিবে রাজা, যদি বহুজন
বহুদূর হতে তাঁর সমুদ্ধত শির
নিত্য না দেখিতে পায় অব্যাহত স্থির,
তবে বহুজন পরে বহুদূরে তাঁর
কেমনে শাসন দৃষ্টি রহিবে প্রচার?
রাজধর্ম্মে ভ্রাতৃধর্ম্ম বন্ধুধর্ম্ম নাই,
শুধু জয়ধর্ম্ম আছে, মহারাজ, তাই
আজি আমি চরিতার্থ, আজি জয়ী আমি,―
সম্মুখের ব্যবধান গেছে আজি নামি’
পাণ্ডব গৌরবগিরি পঞ্চচূড়াময়।
ধৃতরাষ্ট্র
জিনিয়া কপটদ্যূতে তারে কোস্ জয়?
লজ্জাহীন অহঙ্কারী!
দুর্য্যোধন
যার যাহা বল
তাই তার অস্ত্র পিতঃ, যুদ্ধের সম্বল।
ব্যাঘ্রসনে নখেদন্তে নহিক সমান
তাই বলে’ ধনুঃশরে বধি তার প্রাণ
কোন্ নর লজ্জা পায়? মূঢ়ের মতন
ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুমাঝে আত্মসমর্পণ
যুদ্ধ নহে,—জয়লাভ এক লক্ষ্য তার,―
আজি আমি জয়ী পিতঃ, তাই অহঙ্কার।
ধৃতরাষ্ট
আজি তুমি জয়ী তাই তব নিন্দাধ্বনি
পরিপূর্ণ করিয়াছে অম্বর অবনী
সমুচ্চ ধিক্কারে।
দুর্য্যোধন
নিন্দা! আর নাহি ডরি,
নিন্দারে করিব ধ্বংস কণ্ঠরুদ্ধ করি।
নিস্তব্ধ করিয়া দিব মুখরা নগরী
স্পর্দ্ধিত রসনা তার দৃঢ়বলে চাপি
মাের পাদপীঠতলে। “দুর্য্যোধন পাপী”
“দুর্য্যোধন ক্রুরমনা” “দুর্য্যোধন হীন”
নিরুত্তরে শুনিয়া এসেছি এতদিন,
রাজদণ্ড স্পর্শ করি কহি মহারাজ
আপামর জনে আমি কহাইব আজ
“দুর্য্যোধন রাজা!—দুর্য্যোধন নাহি সহে
রাজনিন্দা-আলােচনা, দুর্য্যোধন বহে
নিজহস্তে নিজনাম।”
ধৃতরাষ্ট্র
ওরে বৎস, শােন্!
নিন্দারে রসনা হতে দিলে নির্ব্বাসন
নিম্নমুখে অন্তরের গূঢ় অন্ধকারে
গভীর জটিল মূল সুদূরে প্রসারে,
নিত্য বিষতিক্ত করি রাখে চিত্ততল।
রসনায় নৃত্য করি’ চপল চঞ্চল
নিন্দা শ্রান্ত হয়ে পড়ে,—দিয়ো না তাহারে
নিঃশব্দে আপন শক্তি বৃদ্ধি করিবারে
গােপন হৃদয়দুর্গে। প্রীতিমন্ত্রবলে
শান্ত কর বন্দী কর নিন্দা সর্পদলে
বংশীরবে হাস্য মুখে।—
দুর্য্যোধন
অব্যক্ত নিন্দায়
কোন ক্ষতি নাহি করে রাজ মর্য্যাদায়,
ভ্রূক্ষেপ না করি তাহে। প্রীতি নাহি পাই
তাহে খেদ নাহি—কিন্তু স্পর্দ্ধা নাহি চাই
মহারাজ!—প্রীতিদান স্বেচ্ছার অধীন,—
প্রীতিভিক্ষা দিয়ে থাকে দীনতম দীন,—
সে প্রীতি বিলাক্ তারা পালিত মার্জ্জারে,
দ্বারের কুক্কুরে, আর পাণ্ডবভ্রাতারে,
তাহে মাের নাহি কাজ। আমি চাহি ভয়
সেই মাের রাজপ্রাপ্য,—আমি চাহি জয়
দর্পিতের দর্প নাশি। শুন নিবেদন
পিতৃদেব,―এতকাল তব সিংহাসন
আমার নিন্দুকদল নিত্য ছিল ঘিরে,
কণ্টক তরুর মত নিষ্ঠুর প্রাচীরে
তােমার আমার মধ্যে রচি ব্যবধান;
শুনায়েছে পাণ্ডবের নিত্য গুণগান
আমাদের নিত্য নিন্দা,―এই মতে পিতঃ
পিতৃস্নেহ হতে মােরা চির নির্ব্বাসিত।
এই মতে পিতঃ মােরা শিশুকাল হতে
হীনবল,—উৎসমুখে পিতৃস্নেহস্রোতে
পাষাণের বাধা পড়ি মােরা পরিক্ষীণ
শীর্ণ নদ, নষ্টপ্রাণ, গতিশক্তিহীন,
পদে পদে প্রতিহত; পাণ্ডবেরা স্ফীত
অখণ্ড অবাধগতি;―অদ্য হতে পিতঃ
যদি সে নিন্দুকদলে নাহি কর দূর
সিংহাসনপার্শ্ব হতে, সঞ্জয় বিদুর
ভীষ্ম পিতামহে,—যদি তারা বিজ্ঞবেশে
হিতকথা ধর্ম্মকথা সাধু উপদেশে
নিন্দায় ধিক্কারে তর্কে নিমেষে নিমেষে
ছিন্ন ছিন্ন করি দেয় রাজকর্ম্মডোর,
ভারাক্রান্ত করি রাখে রাজদণ্ড মোর,
পদে পদে দ্বিধা আনে রাজশক্তিমাঝে,
মুকুট মলিন করে অপমানে লাজে,
তবে ক্ষমা দাও পিতৃদেব,―নাহি কাজ
সিংহাসন কণ্টক শয়নে,―মহারাজ
বিনিময় করে লই পাণ্ডবের সনে
রাজ্য দিয়ে বনবাস, যাই নির্ব্বাসনে!
ধৃতরাষ্ট্র
হায় বৎস অভিমানী! পিতৃস্নেহ মাের
কিছু যদি হ্রাস হত শুনি সুকঠোর
সুহৃদের নিন্দাবাক্য,―হইত কল্যাণ।
অধর্ম্মে দিয়েছি যোগ, হারায়েছি জ্ঞান,
এত স্নেহ! করিতেছি সর্ব্বনাশ তাের,
এত স্নেহ! জ্বালাতেছি কালানল ঘোর
পুরাতন কুরুবংশ-মহারণ্যতলে,―
তবু পুত্র দোষ দিস্ স্নেহ নাই বলে!
মণিলােভে কালসর্প করিলি কামনা,
দিনু তােরে নিজহস্তে ধরি তার ফণা
অন্ধ আমি!―অন্ধ আমি অন্তরে বাহিরে
চিরদিন,―তােরে লয়ে প্রলয় তিমিরে
চলিয়াছি,―বন্ধুগণ হাহাকার-রবে
করিছে নিষেধ,―নিশাচর গৃধ্রসবে
করিতেছে অশুভ চিৎকার,—পদে পদে
সঙ্কীর্ণ হতেছে পথ,—আসন্ন বিপদে
কণ্টকিত কলেবর,—তবু দৃঢ় করে
ভয়ঙ্কর স্নেহে বক্ষে বাঁধি লয়ে তােরে
বায়ুবলে অন্ধবেগে বিনাশের গ্রাসে
ছুটিয়া চলেছি মূঢ় মত্ত অট্টহাসে
উল্কার আলােকে,―শুধু তুমি আর আমি,―
আর সঙ্গী বজ্রহস্ত দীপ্ত অন্তর্যামী,―
নাই সন্মুখের দৃষ্টি, নাই নিবারণ
পশ্চাতের, শুধু নিম্নে ঘোর আকর্ষণ
নিদারুণ নিপাতের।―সহসা একদা
চকিতে চেতনা হবে, বিধাতার গদা
মুহূর্ত্তে পড়িবে শিরে,—আসিবে সময়,
ততক্ষণ পিতৃস্নেহে কোরােনা সংশয়,
আলিঙ্গন কোরােনা শিথিল,—ততক্ষণ
দ্রুত হস্তে লুটি লও সর্ব্ব স্বার্থধন,
হও জয়ী, হও সুখী, হও তুমি রাজা
একেশ্বর।―ওরে তােরা জয়বাদ্য বাজা।
জয়ধ্বজা তােল শূন্যে। আজি জয়ােৎসবে
ন্যায় ধর্ম্ম বন্ধু ভ্রাতা কেহ নাহি র’বে,—
না র’বে বিদুর ভীষ্ম, না র’বে সঞ্জয়,
নাহি র’বে লােকনিন্দা লােকলজ্জা ভয়,
কুরুবংশ-রাজলক্ষ্মী নাহি র’বে আর,
শুধু র’বে অন্ধ পিতা, অন্ধ পুত্র তার
আর কালান্তক যম,—শুধু পিতৃস্নেহ
আর বিধাতার শাপ—আর নহে কেহ।
(চরের প্রবেশ)
চর
মহারাজ, অগ্নিহােত্র, দেব উপাসনা,
ত্যাগ করি বিপ্রগণ, ছাড়ি সন্ধ্যার্চ্চনা,
দাঁড়ায়েছে চতুষ্পথে, পাণ্ডবের তরে
প্রতীক্ষিয়া;―পৌরগণ কেহ নাহি ঘরে,
পণ্যশালা রুদ্ধ সব; সন্ধ্যা হল তবু
ভৈরব মন্দির মাঝে নাহি বাজে প্রভু
শঙ্খঘণ্টা সন্ধ্যাভেরী, দীপ নাহি জ্বলে;―
শােকাতুর নরনারী সবে দলে দলে
চলিয়াছে নগরের সিংহদ্বার পানে
দীন বেশে সজল নয়নে।
দুর্য্যোধন
নাহি জানে,
জাগিয়াছে দুর্য্যোধন। মূঢ় ভাগ্যহীন!
ঘনায়ে এসেছে আজি তােদের দুর্দ্দিন।
রাজায় প্রজায় আজি হবে পরিচয়
ঘনিষ্ট কঠিন। দেখি কতদিন রয়
প্রজার পরম স্পর্দ্ধা,—নির্ব্বিষ সর্পের
ব্যর্থ ফণা-আস্ফালন,― নিরস্ত্র দর্পের
হুহুঙ্কার।
(প্রতিহারীর প্রবেশ)
প্রতিহারী
মহারাজ, মহিষী গান্ধারী
দর্শন প্রার্থিনী পদে।
ধৃতরাষ্ট্র
রহিনু তাঁহারি
প্রতীক্ষায়।
দুর্য্যোধন
পিতঃ আমি চলিলাম তবে।
(প্রস্থান)
ধৃতরাষ্ট্র
কর পলায়ন। হায় কেমনে বা সবে
সাধ্বী জননীর দৃষ্টি সমুদ্যত বাজ
ওরে পুণ্যভীত! মােরে তাের নাহি লাজ!
(গান্ধারীর প্রবেশ)
গান্ধারী
নিবেদন আছে শ্রীচরণে। অনুনয়
রক্ষা কর নাথ।
ধৃতরাষ্ট্র
কভু কি অপূর্ণ রয়
প্রিয়ার প্রার্থনা!
গান্ধারী
ত্যাগ কর এইবার—
ধৃতরাষ্ট্র
কারে হে মহিষী!
গান্ধারী
পাপের সংঘর্ষে যার
পড়িছে ভীষণ শানধর্ম্মের কৃপাণে
সেই মুঢ়ে।
ধৃতরাষ্ট্র
কে সে জন? আছে কোন্ খানে?
শুধু কহ নাম তার।
গান্ধারী
পুত্র দুর্য্যোধন।
ধৃতরাষ্ট্র
তাহারে করিব ত্যাগ?}}
গান্ধারী
এই নিবেদন
তব পদে।
ধৃতরাষ্ট্র
দারুণ প্রার্থনা হে গান্ধারী
রাজমাতা!
গান্ধারী
এ প্রার্থনা শুধু কি আমারি
হে কৌরব? কুরুকুল-পিতৃ-পিতামহ
স্বর্গ হতে এ প্রার্থনা করে অহরহ
নরনাথ! ত্যাগ কর ত্যাগ কর তারে―
কৌরব-কল্যাণলক্ষ্মী যার অত্যাচারে
অশ্রুমুখী প্রতীক্ষিছে বিদায়ের ক্ষণ
রাত্রি দিন।
ধৃতরাষ্ট্র
ধর্ম্ম তারে করিবে শাসন
ধর্ম্মেরে যে লঙ্ঘন করেছে,―আমি পিতা―
গান্ধারী
মাতা আমি নহি? গর্ভভার-জর্জ্জরিতা
জাগ্রত হৃৎপিণ্ডতলে বহি নাই তারে?
স্নেহ-বিগলিত চিত্ত শুভ্র দুগ্ধধারে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে নাই দুই স্তন বাহি’
তার সেই অকলঙ্ক শিশুমুখ চাহি?
শাখাবন্ধে ফল যথা, সেই মত করি
বহু বর্ষ ছিল না সে আমারে আঁকড়ি
দুই ক্ষুদ্র বাহুবৃন্ত দিয়ে,—লয়ে টানি
মোর হাসি হতে হাসি, বাণী হতে বাণী
প্রাণ হতে প্রাণ?—তবু কহি, মহারাজ,
সেই পুত্র দুর্য্যোধনে ত্যাগ কর আজ।
ধৃতরাষ্ট্র
কি রাখিব তারে ত্যাগ করি?
গান্ধারী
ধর্ম্ম তব।
ধৃতরাষ্ট্র
কি দিবে তোমারে ধর্ম্ম?
গান্ধারী
দুঃখ নবনব।
পুত্রসুখ রাজ্যসুখ অধর্ম্মের পণে
জিনি লয়ে চিরদিন বহিব কেমনে
দুই কাঁটা বক্ষে আলিঙ্গিয়া?
ধৃতরাষ্ট্র
হায় প্রিয়ে,
ধর্ম্মবশে একবার দিনু ফিরাইয়ে
দ্যূতবদ্ধ পাণ্ডবের হৃত রাজধন।
পরক্ষণে পিতৃস্নেহ করিল গুঞ্জন
শতবার কর্ণে মোর―“কি করিলি ওরে!
এককালে ধর্ম্মাধর্ম্ম দুই তরী পরে
পা দিয়ে বাঁচে না কেহ। বারেক যখন
নেমেছে পাপের স্রোতে কুরুপুত্রগণ
তখন ধর্ম্মের সাথে সন্ধি করা মিছে,
পাপের দুয়ারে পাপ সহায় মাগিছে।
কি করিলি, হতভাগ্য, বৃদ্ধ, বুদ্ধিহত,
দুর্ব্বল দ্বিধায় পড়ি। অপমান-ক্ষত
রাজ্য ফিরে দিলে তবু মিলবে না আর
পাণ্ডবের মনে—শুধু নব কাষ্ঠভার
হুতাশনে দান। অপমানিতের করে
ক্ষমতার অস্ত্র দেওয়া মরিবার তরে।
সক্ষমে দিয়োনা ছাড়ি দিয়ে স্বল্প পীড়া,―
করহ দলন। কোরোনা বিফল ক্রীড়া
পাপের সহিত; যদি ডেকে আন তারে,
বরণ করিয়া তবে লহ একেবারে।”―
এই মত পাপবুদ্ধি পিতৃস্নেহরূপে
বিঁধিতে লাগিল মোর কর্ণে চুপে চুপে।
কত কথা তীক্ষ সূচিসম। পুনরায়
ফিরানু পাণ্ডবগণে,—দ্যূতছলনায়
বিসর্জ্জিনু দীর্ঘ বনবাসে। হায় ধর্ম্ম,
হায় রে প্রবৃত্তিবেগ! কে বুঝিবে মর্ম্ম
সংসারের।
গান্ধারী
ধর্ম্ম নহে সম্পদের হেতু
মহারাজ, নহে সে সুখের ক্ষুদ্র সেতু,―
ধর্ম্মেই ধর্ম্মের শেষ। মূঢ় নারী আমি,
ধর্ম্মকথা তোমারে কি বুঝাইব স্বামী,
জান ত সকলি। পাণ্ডবেরা যাবে বনে
ফিরাইলে ফিরিবে না, বদ্ধ তারা পণে,—
এখন এ মহারাজ্য একাকী তোমার
মহীপতি,―পুত্রে তব ত্যজ এইবার,―
নিষ্পাপেরে দুঃখ দিয়ে নিজে পূর্ণ সুখ
লইয়োনা,―ন্যায়ধর্ম্মে কোরোনা বিমুখ
পৌরব প্রাসাদ হতে,―দুঃখ সুদুঃসহ
আজ হতে ধর্ম্মরাজ লহ তুলি লহ
দেহ তুলি মোর শিরে।
ধৃতরাষ্ট্র
হায় মহারাণী,
সত্য তব উপদেশ, তীব্র তব বাণী।
গান্ধারী
অধর্ম্মের মধুমাখা বিষফল তুলি
আনন্দে নাচিছে পুত্র;―স্নেহমোহে ভুলি
সে ফল দিয়োনা তারে ভোগ করিবারে,
কেড়ে লও, ফেলে দাও, কাঁদাও তাহারে।
ছললব্ধ পাপস্ফীত রাজ্যধনজনে
ফেলে রাখি সেও চলে যাক্ নির্ব্বাসনে,
বঞ্চিত পাণ্ডবদের সমদুঃখভার
করুক্ বহন।
ধৃতরাষ্ট্র
ধর্ম্মবিধি বিধাতার,―
জাগ্রত আছেন তিনি, ধর্ম্মদণ্ড তাঁর
রয়েছে উদ্যত নিত্য,―অয়ি মনস্বিনী,
তাঁর রাজ্যে তাঁর কার্য্য করিবেন তিনি।
আমি পিতা―
গান্ধারী
তুমি রাজা, রাজ-অধিরাজ,
বিধাতার বামহস্ত;―ধর্মরক্ষা কাজ
তােমা পরে সমর্পিত। শুধাই তােমারে
যদি কোন প্রজা তব, সতী অবলারে
পরগৃহ হতে টানি করে অপমান
বিনা দোষে—কি তাহার করিবে বিধান?
ধৃতরাষ্ট্র
নির্ব্বাসন।
গান্ধারী
তবে আজ রাজ-পদতলে
সমস্ত নারীর হয়ে নয়নের জলে
বিচার প্রার্থনা করি। পুত্র দুর্য্যোধন
অপরাধী প্রভু! তুমি আছ, হে রাজন্,
প্রমাণ আপনি। পুরুষে পুরুষে দ্বন্দ্ব
স্বার্থ লয়ে বাধে অহরহ,―ভাল মন্দ
নাহি বুঝি তার,―দণ্ডনীতি, ভেদনীতি,
কূটনীতি কতশত,—পুরুষের রীতি
পুরুষেই জানে। বলের বিরােধে বল,
ছলের বিরােধে কত জেগে উঠে ছল,
কৌশলে কৌশল হানে,—মােরা থাকি দূরে
আপনার গৃহকর্ম্মে শান্ত অন্তঃপুরে।
যে সেথা টানিয়া আনে বিদ্বেষ অনল
বাহিরের দ্বন্দ্ব হতে,—পুরুষেরে ছাড়ি
অন্তঃপুরে প্রবেশিয়া নিরুপায় নারী
গৃহধর্ম্মচারিণীর পুণ্যদেহ পরে
কলুষ-পুরুষ স্পর্শে অসম্মানে করে
হস্তক্ষেপ,—পতি সাথে বাধায়ে বিরােধ
যে নর পত্নীরে হানি লয় তার শােধ
সে শুধু পাষণ্ড নহে, সে যে কাপুরুষ।
মহারাজ, কি তার বিধান! অকলুষ
পুরুবংশে পাপ যদি জন্মলাভ করে
সেও সহে,—কিন্তু প্রভু, মাতৃগর্ব্বভরে
ভেবেছিনু গর্ভে মোর বীরপুত্রগণ
জন্মিয়াছে,—হায় নাথ, সে দিন যখন
অনাথিনী পাঞ্চাণীর আর্ত্তকণ্ঠরব
প্রাসাদ-পাষাণ-ভিত্তি করি দিল দ্রব
লজ্জা ঘৃণা করুণার তাপে,—ছুটি গিয়া
হেরিনু গবাক্ষে, তার বস্তু আকর্ষিয়া
খল খল হাসিতেছে সভামাঝখানে
গান্ধারীর পুত্র পিশাচেরা,―ধর্ম্ম জানে
সে দিন চূর্ণিয়া গেল জন্মের মতন
জননীর শেষ গর্ব্ব। কুরুরাজগণ!
পৌরুষ কোথায় গেছে ছাড়িয়া ভারত।
তােমরা, হে মহারথী জড়মুর্ত্তিবৎ
বসিয়া রহিলে সেথা চাহি মুখে মুখে
কেহ বা হাসিলে, কেহ করিলে কৌতুকে
কানাকানি,―কোষমাঝে নিশ্চল কৃপণ
বজ্র-নিঃশেষিত লুপ্ত বিদ্যুৎ সমান
নিদ্রাগত।―মহারাজ, শুন মহারাজ
এ মিনতি। দূর কর জননীর লাজ,
বীরধর্ম্ম করহ উদ্ধার, পদাহত
সতীত্বের ঘুচাও ক্রন্দন, অবনত
ন্যায়ধর্ম্মে করহ সম্মান,―ত্যাগ কর
দুর্য্যোধনে।
ধৃতরাষ্ট্র
পরিতাপ-দহনে জর্জ্জর
হৃদয়ে করিছ শুধু নিষ্ফল আঘাত
হে মহিষী!
গান্ধারী
শতগুণ বেদনা কি, নাথ,
লাগিছে না মােরে? প্রভু, দণ্ডিতের সাথে
দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে
সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার। যার তরে প্রাণ
কোন ব্যথা নাহি পায় তারে দণ্ডদান
প্রবলের অত্যাচার। যে দণ্ডবেদনা
পুত্রেরে পার না দিতে সে কারে দিয়ােনা,―
যে তোমার পুত্র নহে তারো পিতা আছে,
মহা অপরাধী হবে তুমি তার কাছে।
বিচারক। শুনিয়াছি বিশ্ববিধাতার
সবাই সন্তান মােরা,―পুত্রের বিচার
নিয়ত করেন তিনি আপনার হাতে
নারায়ণ; ব্যথা দেন, ব্যথা পান সাথে,
নতুবা বিচারে তাঁর নাই অধিকার,―
মূঢ় নারী লভিয়াছি অন্তরে আমার
এই শাস্ত্র।—পাপী পুত্রে ক্ষমা কর যদি
নির্ব্বিচারে, মহারাজ, তবে নিরবধি
যত দণ্ড দিলে তুমি যত দোষী জনে
ফিরিয়া লাগিবে আসি দণ্ডদাতা ভূপে,―
ন্যায়ের বিচার তব নির্ম্মমতারূপে
পাপ হয়ে তােমারে দাগিবে। ত্যাগ কর
পাপী দুর্য্যোধনে।
ধৃতরাষ্ট্র
প্রিয়ে, সংহর, সংহর,
তব বাণী। ছিঁড়িতে পারিনে মোহডাের,
ধর্ম্মকথা শুধু আসি হানে সুকঠোর
ব্যর্থ ব্যথা। পাপী পুত্র ত্যাজ্য বিধাতার,
তাই তারে ত্যজিতে না পারি,—আমি তার
একমাত্র; উন্মত্ত তরঙ্গ মাঝখানে
যে পুত্র সঁপেছে অঙ্গ তারে কোন্ প্রাণে
ছাড়ি যাব।—উদ্ধারের আশা ত্যাগ করি,
তবু তারে প্রাণপণে বক্ষে চাপি ধরি,
তারি সাথে এক পাপে ঝাঁপ দিয়া পড়ি,
এক বিনাশের তলে তলাইয়া মরি
অকাতরে,—অংশ লই তার দুর্গতির,
অর্দ্ধ ফল ভােগ করি তার দুর্ম্মতির,―
সেই ত সান্ত্বনা মাের,—এখন ত আর
বিচারের কাল নাই—নাই প্রতিকার,
নাই পথ,—ঘটেছে যা ছিল ঘটিবার,
ফলিবে যা ফলিবার আছে।
(প্রস্থান)
গান্ধারী।
হে আমার
অশান্ত হৃদয়, স্থির হও। নতশিরে
প্রতীক্ষা করিয়া থাক বিধির বিধিরে
ধৈর্য্য ধরি। যে দিন সুদীর্ঘ রাত্রি পরে
সদ্য জেগে উঠে কাল, সংশোধন করে
আপনারে, সেদিন দারুণ দুঃখদিন।
দুঃসহ উত্তাপে যথা স্থির গতিহীন
ঘুমাইয়া পড়ে বায়ু—জাগে ঝঞ্ঝাঝড়ে
অকস্মাৎ, আপনার জড়ত্বের পরে
করে আক্রমণ, অন্ধ বৃশ্চিকের মত
ভীমপুচ্ছে আত্মশিরে হানে অবিরত
দীপ্ত বজ্রশূল, সেই মত কাল যবে
জাগে, তারে সভয়ে অকাল কহে সবে।
লুটাও লুটাও শির, প্রণম, রমণী,
সেই মহাকালে; তার রথচক্রধ্বনি
দূব রুদ্রলােক হতে বজ্র-ঘর্ঘরিত
ওই শুনা যায়। তাের আর্ত্ত জর্জ্জরিত
হৃদয় পাতিয়া রাখ্ তার পথতলে।
ছিন্ন সিক্ত হৃৎপিণ্ডের রক্ত শতদলে
অঞ্জলি রচিয়া থাক্ জাগিয়া নীরবে
চাহিয়া নিমেষহীন।―তার পরে যবে
গগনে উড়িবে ধূলি, কাঁপিবে ধরণী,
সহসা উঠিবে শূন্যে ক্রন্দনের ধ্বনি―
হায় হায় হা রমণী, হায় রে অনাথা,
হায় হায় বীরবধূ, হায় বীরমাতা,
হায় হায় হাহাকার—তখন সুধীরে
ধূলায় পড়িস্ লুটি’ অবনত শিরে
মুদিয়া নয়ন।―তার পরে নমো নমঃ
সুনিশ্চিত পরিণাম, নির্ব্বাক নির্ম্মম
দারুণ করুণ শান্তি; নমো নমাে নমঃ
কল্যাণ কঠোর কান্ত, ক্ষমা স্নিগ্ধতম।
নমো নমো বিদ্বেষের ভীষণা নির্ব্বৃতি।
শ্মশানের ভস্মমাখা পরমা নিষ্কৃতি।
(দুর্য্যোধন-মহিষী ভানুমতীর প্রবেশ)
ভানুমতী
(দাসীগণের প্রতি)
ইন্দুমুখি! পরভৃতে! লহ তুলি শিরে
মাল্যবস্ত্র অলঙ্কার।
গান্ধারী
বৎসে, ধীরে! ধীরে!
পৌরব ভবনে কোন্ মহােৎসব আজি!
কোথা যাও নব বস্ত্রঅলঙ্কারে সাজি
বধূ মাের?
ভানুমতী
শত্রুপরাভব-শুভক্ষণ
সমাগত।
গান্ধারী
শত্রু যার আত্মীয় স্বজন
আত্মা তার নিত্য শত্রু, ধর্ম্ম শত্রু তার,
অজেয় তাহার শত্রু। নব অলঙ্কার
কোথা হতে, হে কল্যাণি!
ভানুমতী
জিনি বসুমতী
ভুজবলে, পাঞ্চালীরে তার পঞ্চপতি
দিয়েছিল যত রত্ন মণি অলঙ্কার,
যজ্ঞদিনে যাহা পরি ভাগ্য-অহঙ্কার
ঠিকরিত’ মাণিক্যের শত সূচীমুখে
দ্রৌপদীর অঙ্গ হতে,—বিদ্ধ হ’ত বুকে
কুরুকুলকামিনীর—সে রত্নভূষণে
আমারে সাজায়ে তারে যেতে হল বনে।
গান্ধারী
হা রে মূঢ়, শিক্ষা তবু হল না তোমার,
সেই রত্ন নিয়ে তবু এত অহঙ্কার।
একি ভয়ঙ্করী কান্তি, প্রলয়ের সাজ।
যুগান্তের উল্কাসম দহিছে না আজ
এ মণি-মঞ্জীর তোরে? রত্ন-ললাটিকা
এ যে তোর সৌভাগ্যের বজ্রানলশিখা।
তোরে হেরি অঙ্গে মোর ত্রাসের স্পন্দন
সঞ্চারিছে,—চিত্তে মোর উঠিছে ক্রন্দন,―
আনিছে শঙ্কিত কর্ণে, তোর অলঙ্কার
উন্মাদিনী শঙ্করীর তাণ্ডব-ঝঙ্কার।
ভানুমতী
মাতঃ মােরা ক্ষত্রনারী! দুর্ভাগ্যের ভয়
নাহি করি। কভু জয়, কভু পরাজয়,―
মধ্যাহ্ন গগনে কভু, কভু অস্তধামে
ক্ষত্রিয়মহিমা সূর্য্য উঠে আর নামে।
ক্ষত্রবীরাঙ্গনা মাতঃ সেই কথা স্মরি
শঙ্কার বক্ষেতে থাকি সঙ্কটে না ডরি
ক্ষণকাল। দুর্দ্দিন-দুর্য্যোগ যদি আসে,
বিমুখ ভাগ্যেরে তবে হানি’ উপহাসে
কেমনে মরিতে হয় জানি তাহা দেবি,
কেমনে বাঁচিতে হয়, শ্রীচরণ সেবি’
সে শিক্ষাও লভিয়াছি।
গান্ধারী।
বৎসে, অমঙ্গল
একেলা তােমার নহে। লয়ে দলবল
সে যবে মিটায় ক্ষুধা, উঠে হাহাকার,
কত বীর-রক্তস্রাতে কত বিধবার
অশ্রুধারা পড়ে আসি―রত্ন অলঙ্কার
বধূহস্ত হতে খসি পড়ে শত শত
চূতলতা-কুঞ্জবনে মঞ্জরীর মত
ঝঞ্চাবাতে। বৎসে, ভাঙিয়োনা বদ্ধ সেতু!
ক্রীড়াচ্ছলে তুলিয়ােনা বিপ্লবের কেতু
গৃহমাঝে। আনন্দের দিন নহে আজি।
স্বজন-দুর্ভাগ্য লয়ে সর্ব্ব অঙ্গে সাজি
গর্ব্ব করিয়ো না মাতঃ! হয়ে সুসংযত
আজ হতে শুদ্ধচিত্তে উপবাসব্রত
কর আচরণ,—বেণী করি উন্মোচন
শান্ত মনে কর বৎসে দেবতা-অর্চ্চন।
এ পাপ-সৌভাগ্য দিনে গর্ব্ব-অহঙ্কারে
প্রতিক্ষণে লজ্জা দিয়ােনাক বিধাতারে।
খুলে ফেল অলঙ্কার, নব রক্তাম্বর,
থামাও উৎসরবাদ্য, রাজআড়ম্বর,
অগ্নিগৃহে যাও, পুত্রি, ডাক পুরােহিতে,
কালেরে প্রতীক্ষা কর শুদ্ধসত্ত্ব চিতে।
(ভানুমতীর প্রস্থান)
(দ্রৌপদীসহ পঞ্চপাণ্ডবের প্রবেশ)
যুধিষ্ঠির
আশীর্বাদ মাগিবারে এসেছি জননী
বিদায়ের কালে।
গান্ধারী
সৌভাগ্যের দিনমণি
দুঃখরাত্রি-অবসানে দ্বিগুণ উজ্জ্বল
উদিবে হে বৎসগণ! বায়ু হতে বল,
সূর্য্য হতে তেজ, পৃথা হতে ধৈর্য্যক্ষমা
কর লাভ, দুঃখব্রত পুত্র মাের! রমা
দৈন্যমাঝে গুপ্ত থাকি দীন ছদ্মরূপে
ফিরুন্ পশ্চাতে তব, সদা চুপে চুপে।
দুঃখ হতে তােমা তরে করুন্ সঞ্চয়
অক্ষয় সম্পদ। নিত্য হউক্ নির্ভয়
নির্ব্বাসনবাস।—বিনা পাপে দুঃখভােগ
অন্তরে জ্বলন্ত তেজ করুক্ সংযােগ―
বহ্নিশিখাদগ্ধ দীপ্ত সুবর্ণের প্রায়।
সেই মহদুঃখ হবে মহৎ সহায়
তােমাদের।—সেই দুঃখে রহিবেন ঋণী
ধর্ম্মরাজ বিধি,—যবে শুধিবেন তিনি
নিজহস্তে আত্মঋণ, তখন জগতে
দেবনর কে দাঁড়াবে তােমাদের পথে।
মাের পুত্র করিয়াছে যত অপরাধ
খণ্ডন করুক্ সব মাের আশীর্ব্বাদ
পুত্রাধিক পুত্রগণ! অন্যায় পীড়ন
গভীর কল্যাণসিন্ধু করুক্ মন্থন।
(দ্রৌপদীকে আলিঙ্গন পূর্ব্বক)
ভূলুণ্ঠিতা স্বর্ণলতা, হে বৎসে আমার,
হে আমার রাহুগ্রস্ত শশি! একবার
তােল শির, বাক্য মাের কর অবধান।
যে তােমারে অবমানে তারি অপমান
জগতে রহিবে নিত্য, কলঙ্ক অক্ষয়।
তব অপমানরাশি বিশ্বজগন্ময়
ভাগ করে লইয়াছে সর্ব্ব কুলাঙ্গনা
কাপুরুষতার হস্তে সতীর লাঞ্ছনা।
যাও বৎসে, পতি সাথে অমলিন মুখ,
অরণ্যেরে কর স্বর্গ, দুঃখে কর সুখ।
বধূ মাের, সুদুঃসহ পতিদুঃখব্যথা
বক্ষে ধরি, সতীত্বের লভ সার্থকতা।
রাজগৃহে আয়ােজন দিবস যামিনী
সহস্র সুখের; বনে তুমি একাকিনী
সর্ব্বসুখ, সর্ব্বসঙ্গ, সর্বৈশ্বর্য্যময়,
সকল সান্ত্বনা একা সকল আশ্রয়,
ক্লান্তির আরাম শান্তি, ব্যাধির শুশ্রূষা,
দুর্দ্দিনের শুভলক্ষ্মী, তামসীর ভূষা
ঊষা মুর্ত্তিমতী। তুমি হবে একাকিনী
সর্ব্বপ্রীতি, সর্ব্বসেবা, জননী, গেহিনী,―
সতীত্বের শ্বেতপদ্ম সম্পূর্ণ সৌরভে
শতদলে প্রস্ফুটিয়া জাগিবে গৌরবে।
নরক বাস
নরক বাস
নেপথ্যে
কোথা যাও মহারাজ!
সােমক
কে ডাকে আমারে
দেবদূত? মেঘলােকে ঘন অন্ধকারে
দেখিতে না পাই কিছু,―হেথা ক্ষণকাল
রাখ তব স্বর্গরথ।
নেপথ্যে
ওগাে নরপাল
নেমে এস! নেমে এস হে স্বর্গ-পথিক!
সোমক
কে তুমি কোথায় আছ?
নেপথ্যে
আমি সে ঋত্বিক
মর্ত্ত্যে তব ছিনু পুরােহিত।
সােমক
ভগবন্,
নিখিলের অশ্রু যেন করেছে সৃজন
বাষ্প হয়ে এই মহা অন্ধকার লােক,―
সূর্য্যচন্দ্রতারাহীন ঘনীভূত শােক
নিঃশব্দে রয়েছে চাপি দুঃস্বপ্ন মতন
নভস্তল,―হেথা কেন তব আগমন?
প্রেতগণ
স্বর্গের পথের পার্শ্বে এ বিষাদ লোক,
এ নরকপুরী। নিত্য নন্দন আলোক
দূর হতে দেখা যায়,―স্বর্গযাত্রীগণে
অহােরাত্রি চলিয়াছে, রথচক্রস্বনে
নিদ্রাতন্দ্রা দূর করি ঈর্ষা-জর্জ্জরিত
আমাদের নেত্র হতে। নিম্নে মর্ম্মরিত
ধরণীর বনভূমি,―সপ্ত পারাবার
চিরদিন করে গান―কলধ্বনি তার
হেথা হতে শুনা যায়।
ঋত্বিক
মহারাজ, নাম’
তব দেবরথ হতে।
প্রেতগণ
ক্ষণকাল থাম
আমাদের মাঝখানে। ক্ষুদ্র এ প্রার্থনা
হতভাগ্যদের! পৃথিবীর অশ্রুকণা
এখনাে জড়ায়ে আছে তােমার শরীর,
সদ্যছিন্ন পুষ্পে যথা বনের শিশির।
মাটির, তৃণের, গন্ধ, ফুলের, পাতার,
শিশুর, নারীর, হায়, বন্ধুর, ভ্রাতার
বহিয়া এনেছ তুমি। ছয়টি ঋতুর
বহুদিনরজনীর বিচিত্র মধুর
সুখের সৌরভ রাশি।
সােমক
গুরুদেব, প্রভো,
এ নরকে কেন তব বাস?
ঋত্বিক
পুত্রে তব
যজ্ঞে দিয়েছিনু বলি—সে পাপে এ গতি
মহারাজ!
প্রেতগণ
কহ সে কাহিনী, নরপতি,
পৃথিবীর কথা! পাতকের ইতিহাস
এখনো হৃদয়ে হানে কৌতুক উল্লাস।
রয়েছে তােমার কণ্ঠে মর্ত্ত্যরাগিণীর
সকল মূর্চ্ছনা, সুখদুঃখকাহিনীর
করুণ কম্পন। কহ তব বিবরণ
মানবভাষায়।
সােমক
হে ছায়া-শরীরীগণ
সোমক আমার নাম, বিদেহ-ভূপতি।
বহু বর্ষ আরাধিয়া দেব দ্বিজ যতী
বহু যাগ যজ্ঞ করি, প্রাচীন বয়সে
এক পুত্র লভেছিনু,―তারি স্নেহবশে
রাত্রিদিন আছিলাম আপনা-বিস্মৃত।
সমস্ত সংসার-সিন্ধু-মথিত-অমৃত
ছিল সে আমার শিশু। মাের বৃন্ত ভরি
একটি সে শ্বেতপদ্ম, সম্পূর্ণ আবরি
ছিল সে আমারে। আমার হৃদয়
ছিল তারি মুখ পরে―সূর্য্য যথা রয়
ধরণীর পানে চেয়ে। হিমবিন্দুটিরে
পদ্মপত্র যত ভয়ে ধরে রাখে শিরে
সেই মত রেখেছিনু তারে। সুকঠোর
ক্ষাত্রধর্ম্ম রাজধর্ম্ম স্নেহপানে মাের
চাহিত সরােষচক্ষে; দেবী বসুন্ধরা
অবহেলা-অবমানে হইত কাতরা,
রাজলক্ষ্মী হত লজ্জামুখী।
সভমাঝে
একদা অমাত্যসাথে ছিনু রাজকাজে
হেনকালে অন্তঃপুরে শিশুর ক্রন্দন
পশিল আমার কর্ণে। ত্যজি সিংহাসন
দ্রুত ছুটে চলে গেনু ফেলি সর্ব্বকাজ।
ঋত্বিক
সে মুহূর্ত্তে প্রবেশিনু রাজসভামাঝ
আশিষ করিতে নৃপে ধান্যদুর্ব্বা করে
আমি রাজপুরোহিত। ব্যগ্রতার ভরে
আমারে ঠেলিয়া রাজা গেলেন চলিয়া,
অর্ঘ্য পড়ি গেল ভূমে। উঠিল জ্বলিয়া
ব্রাহ্মণের অভিমান। ক্ষণকাল পরে
ফিরিয়া আসিলা রাজা লজ্জিত অন্তরে।
আমি শুধালেম তাঁরে, কহ হে রাজন্
কি মহা অনর্থপাত দুর্দ্দৈব ঘটন
ঘটেছিল, যার লাগি ব্রাহ্মণেরে ঠেলি
অন্ধ অবজ্ঞার বশে,―রাজকর্ম্ম ফেলি,
শুনি বিচারপ্রার্থী প্রজাদের যত
আবেদন, পররাষ্ট্র হতে সমাগত
রাজদূতগণে নাহি করি সম্ভাষণ,
সামন্ত রাজন্যগণে না দিয়া আসন,
প্রধান অমাত্য সবে রাজ্যের বারতা
না করি জিজ্ঞাসাবাদ, না করি শিষ্টতা,
অতিথি সজ্জন গুণীজনে―অসময়ে
ছুটি গেল অন্তঃপুরে মত্তপ্রায় হয়ে
শিশুর ক্রন্দন শুনি? ধিক্ মহারাজ,
লজ্জায় আনত শির ক্ষত্রিয় সমাজ
তব মুগ্ধব্যবহারে, শিশু-ভুজপাশে
বন্দী হয়ে আছ পড়ি দেখে সবে হাসে
শত্রুদল দেশে দেশে,―নীরব সঙ্কোচে
বন্ধুগণ সঙ্গোপনে অশ্রুজল মোছে।
সােমক
ব্রাহ্মণের সেই তীব্র তিরস্কার শুনি
অবাক্ হইল সভা।―পাত্রমিত্র গুণী
রাজগণ প্রজাগণ রাজদূত সবে
আমার মুখের পানে চাহিল নীরবে
ভীত কৌতূহলে। রােষাবেশ ক্ষণতরে
উত্তপ্ত করিল রক্ত;―মুহূর্ত্তেক পরে
লজ্জা আসি করি দিল দ্রুত পদাঘাত
দৃপ্ত রােষসর্পশিরে। করি প্রণিপাত
গুরুপদে—কহিলাম বিনম্র বিনয়ে―
ভগবন্, শান্তি নাই এক পুত্র লয়ে,
ভয়ে ভয়ে কাটে কাল। মােহবশে তাই
অপরাধী হইয়াছি—ক্ষমা ভিক্ষা চাই।
সাক্ষী থাক মন্ত্রী সবে, হে রাজন্যগণ
রাজার কর্ত্তব্য কভু করিয়া লঙ্ঘন
খর্ব্ব করিব না আর ক্ষত্রিয় গৌরব।
ঋত্বিক
কুণ্ঠিত আনন্দে সভা রহিল নীরব।
আমি শুধু কহিলাম বিদ্বেষের তাপ
অন্তরে পােষণ করি—এক-পুত্র-শাপ
দুর করিবারে চাও —পন্থা আছে তারো,―
কিন্তু সে কঠিন কাজ, পার কি না পার
ভয় করি। শুনিয়া সগর্ব্বে মহারাজ
কহিলেন—নাহি হেন সুকঠিন কাজ
পারি না করিতে যাহা ক্ষত্রিয় তনয়—
কহিলাম স্পর্শি তব পাদপদ্মদ্বয়।
শুনিয়া কহিনু মৃদু হাসি’,—হে রাজন্
শুন তবে। আমি করি যজ্ঞ-আয়ােজন,
তুমি হােম কর দিয়ে আপন সন্তান।
তারি মেদ-গন্ধ-ধূম করিয়া আঘ্রাণ
মহিষীরা হইবেন শত পুত্রবতী—
কহিনু নিশ্চয়।—শুনি নীরব নৃপতি
রহিলেন নত শিরে। সভাস্থ সকলে
উঠিল ধিক্কার দিয়া উচ্চ কোলাহলে।
কর্ণে হস্ত রুধি কহে যত বিপ্রগণ
ধিক্ পাপ এ প্রস্তাব।—নৃপতি তখন
কহিলেন ধীরস্বরে—তাই হবে প্রভু,
ক্ষত্রিয়ের পণ মিথ্যা হইবে না কভু।
তখন নারীর আর্ত্ত বিলাপে চৌদিক্
কাঁদি উঠে, —প্রজাগণ করে ধিক্ ধিক্,
বিদ্রোহ জাগাতে চায় যত সৈন্যদল
ঘৃণাভরে। নৃপ শুধু রহিলা অটল।
জ্বলিল যজ্ঞের বহ্নি। যজন সময়ে
কেহ নাই,—কে আনিবে রাজার তনয়ে
অন্তঃপুর হতে বহি। রাজভৃত্য সবে
আজ্ঞা মানিল না কেহ। রহিল নীরবে
মন্ত্রীগণ। দ্বাররক্ষী মুছে চক্ষুজল,
অস্ত্র ফেলি চলি গেল যত সৈন্যদল।
আমি ছিন্নমোহপাশ, সর্ব্বশাস্ত্র-জ্ঞানী,
হৃদয়-বন্ধন সব মিথ্যা বলে’ মানি,—
প্রবেশিনু অন্তঃপুরমাঝে। মাতৃগণ
শত-শাখা-অন্তরালে ফুলের মতন
রেখেছেন অতিযত্নে বালকেরে বেরি
কাতর উৎকণ্ঠাভরে। শিশু মােরে হেরি
হাসিতে লাগিল উচ্চে দুই বাহু তুলি;—
জানাইল অর্দ্ধস্ফুট কাকলী আকুলি’—
মাতৃব্যূহ ভেদ করে নিয়ে যাও মােরে।
বহুক্ষণ বন্দী থাকি খেলাবার তরে
ব্যগ্র তার শিশুহিয়া। কহিলাম হাসি
মুক্তি দিব এ নিবিড় স্নেহবন্ধ নাশি,
আয় মাের সাথে। এত বলি বল করি
মাতৃগণ অঙ্ক হতে লইলাম হরি
সহাস্য শিশুরে। পায়ে পড়ি দেবীগণ
পথ রুধি আর্ত্তকণ্ঠে করিল ক্রন্দন—
আমি চলে এনু বেগে। বহ্নি উঠে জ্বলি—
দাঁড়ায়ে রয়েছে রাজা পাষাণ পুত্তলি।
কম্পিত প্রদীপ্ত শিখা হেরি হর্ষ ভরে
কলহাস্যে নৃত্য করি’ প্রসারিত করে
ঝাঁপাইতে চাহে শিশু। অন্তঃপুর হতে
শতকণ্ঠে উঠে আর্ত্তস্বর। রাজপথে
অভিশাপ উচ্চারিয়া যায় বিপ্রগণ
নগর ছাড়িয়া। কহিলাম, হে রাজন্
আমি করি মন্ত্রপাঠ, তুমি এরে লও,
দাও অগ্নিদেবে।
সােমক
ক্ষান্ত হও, ক্ষান্ত হও
কহিয়োনা আর।
প্রেতগণ।
থাম থাম ধিক্ ধিক!
পূর্ণ মােরা বহু পাপে, কিন্তু রে ঋত্বিক
শুধু একা তাের তরে একটি নরক
কেন সৃজে নাই বিধি! খুঁজি যমলোক
তব সহবাসযােগ্য নাহি মিলে পাপী।
দেবদূত
মহারাজ এ নরকে ক্ষণকাল যাপি’
নিষ্পাপে সহিছ কেন পাপীর যন্ত্রণা?
উঠ স্বর্গরথে—থাক্ বৃথা আলােচনা
নিদারুণ ঘটনার।
সােমক
রথ যাও লয়ে
দেবদূত! নাহি যাব বৈকুণ্ঠ আলয়ে।
তব সাথে মাের গতি নরক মাঝারে
হে ব্রাহ্মণ! মত্ত হয়ে ক্ষাত্র-অহঙ্কারে
নিজ কর্ত্তব্যের ত্রুটি করিতে ক্ষালন
নিষ্পাপ শিশুরে মাের করেছি অর্পণ
হুতাশনে, পিতা হয়ে। বীর্য্য আপনার
নিন্দুকসমাজমাঝে করিতে প্রচার
নরধর্ম্ম রাজধর্ম্ম পিতৃধর্ম্ম হায়
অনলে করেছি ভস্ম। সে পাপ জ্বালায়
জ্বলিয়াছি আমরণ,―এখনো সে তাপ
অন্তরে দিতেছে দাগি নিত্য অভিশাপ।
হায় পুত্র, হায় বৎস নবনী-নির্ম্মল,
করুণ কোমল কান্তি, হা মাতৃবৎসল,
একান্ত নির্ভরপর পরম দুর্ব্বল
সরল চঞ্চল শিশু পিতৃ-অভিমানী
অগ্নিরে খেলনাসম পিতৃদান জানি
ধরিলি দু’হাত মেলি বিশ্বাসে নির্ভয়ে।
তার পরে কি ভর্ৎসনা ব্যথিত বিস্ময়ে
ফুটিল কাতর চক্ষে বহ্নিশিখাতলে
অকস্মাৎ। হে নরক, তােমার অনলে
হেন দাহ কোথা আছে যে জিনিতে পারে
এ অন্তরতাপ। আমি যাব স্বর্গদ্বারে।
দেবতা ভুলিতে পারে এ পাপ আমার,
আমি কি ভুলিতে পারি সে দৃষ্টি তাহার,
সে অন্তিম-অভিমান? দগ্ধ হব আমি
নরক অনলমাঝে নিত্য দিনযামী
তবু বৎস তাের সেই নিমেষের ব্যাথা,
আচম্বিত বহ্নিদাহে ভীত কাতরতা
পিতৃ মুখপানে চেয়ে,―পরম বিশ্বাস
চকিত হইয়া ভঙ্গ মহা নিরাশ্বাস,
তার নাহি হবে পরিশােধ।
(ধর্ম্মের প্রবেশ)
ধর্ম্ম
মহারাজ,
স্বর্গ অপেক্ষিয়া আছে তােমা তরে আজ,
চল ত্বরা করি।
সােমক
সেথা মাের নাহি স্থান
ধর্ম্মরাজ। বধিয়াছি আপন সন্তান
বিনা পাপে।
ধর্ম্ম
করিয়াছ প্রায়শ্চিত্ত তার
অন্তর নরকানলে। সে পাপের্য ভার
ভস্ম হয়ে ক্ষয় হয়ে গেছে। যে ব্রাহ্মণ
বিনা চিত্ত-পরিতাপে পরপুত্রধন
স্নেহবন্ধ হতে ছিঁড়ি করেছে বিনাশ
শাস্ত্রজ্ঞান-অভিমানে, তারি হেথা বাস
সমুচিত।
ঋত্বিক
যেয়োনা যেয়ােনা তুমি চলে’
মহারাজ! সর্পশীর্ষ তীব্র ঈর্ষ্যানলে
আমারে ফেলিয়া রাখি যেয়ােনা যেয়ােনা
একাকী অমরলোকে। নূতন বেদনা
বাড়ায়ােনা বেদনায় তীব্র দুর্ব্বিষহ,
সৃজিয়ােনা দ্বিতীয় নরক। রহ রহ
মহারাজ, রহ হেথা।
সােমক
র’ব তব সহ
হে দুর্ভাগা! তুমি আমি মিলি অহরহ
করিব দারুণ হােম, সুদীর্ঘ যজন
বিরাট নরক হুতাশনে। ভগবন্
যতকাল ঋত্বিকের আছে পাপভােগ
ততকাল তার সাথে কর মােরে যােগ—
নরকের সহবাসে দাও অনুমতি।
ধর্ম্ম
মহান্ গৌরবে হেথা রহ মহীপতি।
ভালের তিলক হােক্ দুঃসহ দহন,
নরকাগ্নি হােক্ তব স্বর্গ সিংহাসন।
প্রেতগণ
জয় জয় মহারাজ, পুণ্যফলত্যাগী!
নিষ্পাপ নরকবাসী! হে মহা বৈরাগী!
পাপীর অন্তরে কর গৌরব সঞ্চার
তব সহবাসে। কর নরক উদ্ধার।
বস আসি দীর্ঘ যুগ মহা শত্রু সনে
প্রিয়তম মিত্রসম এক দুঃখাসনে।
অতি উচ্চ বেদনার আগ্নেয় চূড়ায়
জ্বলন্ত মেঘের সাথে দীপ্ত সূর্য্যপ্রায়
দেখা যাবে তােমাদের যুগল মুরতি
নিত্যকাল উদ্ভাসিত অনির্ব্বাণ জ্যোতি।
৭ই অগ্রহায়ণ, ১৩০৪
পতিতা
পতিতা
ধন্য তােমারে হে রাজমন্ত্রী,
চরণপদ্মে নমস্কার।
লও ফিরে তব স্বর্ণমুদ্রা’
লও ফিরে তব পুরস্কার।
ঋষ্যশৃঙ্গ ঋষিরে ভুলাতে
পাঠাইলে বনে যে কয়জনা
সাজায়ে যতনে ভূষণে রতনে,—
আমি তারি এক বারাঙ্গনা।
দেবতা ঘুমালে আমাদের দিন,
দেবতা জাগিলে মােদের রাতি,
ধরার নরক-সিংহদুয়ারে
জ্বালাই আমরা সন্ধ্যাবাতি।
তুমি অমাত্য রাজ-সভাসদ
তােমার ব্যবসা ঘৃণ্যতর,
সিংহাসনের আড়ালে বসিয়া
মানুষের ফাঁদে মানুষ ধর।
আমি কি তােমার গুপ্ত অস্ত্র?
হৃদয় বলিয়া কিছু কি নেই?
ছেড়েছি ধরম, তা বলে ধরম
ছেড়েছে কি মেরে একেবারেই!
নাহিক করম, লজ্জা সরম,
জানিনে জনমে সতীর প্রথা,
তা বলে নারীর নারীত্বটুকু
ভুলে যাওয়া, সে কি কথার কথা!
সে যে তপোবন, স্বচ্ছ পবন,
অদূরে সুনীল শৈলমালা,
কলগান করে পুণ্য তটিনী,
সে কি নগরীর নাট্যশালা!
মনে হল সেথা অন্তর-গ্লানি
বুকের বাহিরে বাহিরি’ আসে।―
ওগো বনভূমি মোরে ঢাক তুমি
নবনির্ম্মল শ্যামল বাসে।
অয়ি উজ্জ্বল উদার আকাশ
লজ্জিত জনে করুণা করে
তোমার সহজ অমলতাখানি
শতপাকে ঘেরি পরাও মোরে।
স্থান আমাদের রুদ্ধ নিলয়ে
প্রদীপের পীত আলোক জ্বালা’,
যেথায় ব্যাকুল বদ্ধ বাতাস
ফেলে নিশ্বাস হুতাশ-ঢালা’।
রতন নিকরে কিরণ ঠিকরে,
মুকুতা ঝলকে অলক পাশে,
মদির-শীকর-সিক্ত আকাশ
ঘন হয়ে যেন ঘেরিয়া আসে।
মােরা গাঁথা মালা প্রমােদ-রাতের,
গেলে প্রভাতের পুষ্পবনে
লাজে ম্লান হয়ে মরে ঝরে যাই,
মিশাবারে চাই মাটির সনে।
তবু তবু ওগো কুসুম-ভগিনী
এবার বুঝিতে পেরেছি মনে
ছিল ঢাকা সেই বনের গন্ধ
অগোচরে কোন্ প্রাণের কোণে।
সেদিন নদীর নিকষে অরুণ
আঁকিল প্রথম সােনার লেখা;
স্নানের লাগিয়া তরুণ তাপস
নদীতীরে ধীরে দিলেন দেখা।
পিঙ্গল জটা ঝলিছে ললাটে
পূর্ব্ব অচলে ঊষার মত,
তনু দেহখানি জ্যোতির লতিকা
জড়িত স্নিগ্ধ তড়িৎ শত।
মনে হল মাের নব-জনমের
উদয়শৈল উজল করি’
শিশির-ধৌত পরম প্রভাত
উদিল নবীন জীবন ভরি’।
তরুণীরা মিলি তরণী বাহিয়া
পঞ্চমসুরে ধরিল গান,
ঋষির কুমার মোহিত চকিত
মৃগশিশুসম পাতিল কান।
সহসা সকলে ঝাঁপ দিয়া জলে
মুনি-বালকেরে ফেলিয়া ফাঁদে
ভুজে ভুজে বাঁধি ঘিরিয়া ঘিরিয়া
নৃত্য করিল বিবিধ ছাঁদে।
নূপুরে নূপুরে দ্রুত তালে তালে
নদী জলতলে বাজিল শিলা,
ভগবান ভানু-রক্ত-নয়নে
হেরিলা নিলাজ নিঠুর লীলা।
প্রথমে চকিত দেবশিশু সম
চাহিলা কুমার কৌতূহলে,―
কোথা হতে যেন অজানা আলোক
পড়িল তাঁহার পথের তলে।
দেখিতে দেখিতে ভক্তি-কিরণ
দীপ্তি সঁপিল শুভ্র ভালে,―
দেবতার কোন্ নূতন প্রকাশ
হেরিলেন আজি প্রভাতকালে।
বিমল বিশাল বিস্মিত চোখে
দুটি শুকতারা উঠিল ফুটি’,
বন্দনা-গান রচিল কুমার
যোড় করি কর-কমল দুটি।
করুণ কিশাের কোকিল কণ্ঠে
সুধার উৎস পড়িল টুটে,
স্থির তপােবন শান্তি মগন
পাতায় পাতায়-শিহরি উঠে।
যে গাথা গাহিলা সে কখনাে আর
হয় নি রচিত নারীর তরে,
সে শুধু শুনেছে নির্মলা ঊষা
নির্জ্জন গিরিশিখর পরে।
সে শুধু শুনেছে নীরব সন্ধ্যা
নীল নির্ব্বাক্ সিন্ধুতলে
শুনে গলে যায় আর্দ্র হৃদয়
শিশির শীতল অশ্রুজলে।
হাসিয়া উঠিল পিশাচীর দল
অঞ্চলতল অধরে চাপি।
ঈষৎ ত্রাসের তড়িৎ-চমক
ঋষর নয়নে উঠিল কাঁপি।
ব্যথিত চিত্তে ত্বরিত চরণে
করযােড়ে পাশে দাঁড়ানু আসি,
কহিনু “হে মাের প্রভু তপােধন
চরণে আগত অধম দাসী।”
তীরে লয়ে তারে, সিক্ত অঙ্গ
মুছানু আপন পট্টবাসে।
জানু পাতি বসি যুগল চরণ
মুছিয়া লইনু এ কেশপাশে।
তার পরে মুখ তুলিয়া চাহিনু
ঊর্দ্ধমুখীন্ ফুলের মত,―
তাপস কুমার চাহিলা, আমার
মুখপানে করি বদন নত।
প্রথম-রমণী-দরশ-মুগ্ধ
সে দুটি সরল নয়ন হেরি
হৃদয়ে আমার নারীর মহিমা
বাজায়ে উঠিল বিজয় তেরী।
ধন্য রে আমি, ধন্য বিধাতা
সৃজেছ আমারে রমণী করি।
তাঁর দেহময় উঠে মাের জয়,
উঠে জয় তাঁর নয়ন ভরি।
জননীর স্নেহ রমণীর দয়া
কুমারীর নব নীরব প্রীতি
আমার হৃদয় বীণার তন্ত্রে
বাজারে তুলিল মিলিত গীতি।
কহিল কুমার চাহি মাের মুখে―
“কোন্ দেব আজি আনিলে দিবা!
তোমার পর অমৃত-সরস,
তােমার নয়নে দিব্য বিভা।”
হেসো না মন্ত্রী হেসো না হেসাে না,
ব্যথায় বিঁধােনা ছুরির ধার
ধূলিলুণ্ঠিতা অবমানিতারে
অবমান তুমি কোরো না আর।
মধুরাতে কত মুগ্ধহৃদয়
স্বর্গ মেনেছে এ দেহখানি,―
তখন শুনেছি বহু চাটুকথা,
শুনিনি এমন সত্যবাণী।
সত্য কথা এ, কহিনু আবার,
স্পর্দ্ধা আমার কভু এ নহে,―
ঋষির নয়ন মিথ্যা হেরে না,
ঋষির রসনা মিছে না কহে।
বৃদ্ধ, বিষয়-বিষ-জর্জ্জর,
হেরিছ বিশ্ব দ্বিধার ভাবে,
নগরীর ধূলি লেগেছে নয়নে,
আমারে কি তুমি দেখিতে পাবে?
আমিও দেবতা, ঋষির আঁখিতে
এনেছি বহিয়া নূতন দিবা,
অমৃত সরস আমার পরশ,
আমার নয়নে দিব্য বিভা।
আমি শুধু নহি সেবার রমণী
মিটাতে তােমার লালসাক্ষুধা।
ভুমি যদি দিতে পূজার অর্ঘ্য
আমি সঁপিতাম স্বর্গসুধা।
দেবতারে মাের কেহ ত চাহেনি,
নিয়ে গেল সবে মাটির ঢেলা,
দূর দুর্গম মনােবনবাসে
পাঠাইল তাঁরে করিয়া হেলা।
সেইখানে এল আমার তাপস,
সেই পথহীন বিজন গেহ,―
স্তব্ধ নীরব গহন গভীর
যেথা কোন দিন আসেনি কেহ।
সাধকবিহীন একক দেবতা
ঘুমাতেছিলেন সাগরকুলে,―
ঋষির বালক পুলকে তাঁহারে
পূজিলা প্রথম পূজার ফুলে।
আনন্দে মোর দেবতা জাগিল,
জাগে আনন্দ ভকত-প্রাণে,―
এ বারতা মোর দেবতা তাপস
দোঁহে ছাড়া আর কেহ না জানে।
কহিলা কুমার চাহি মাের মুখে
“অনিন্দময়ী মুরতি তুমি,
ফুটে আনন্দ বাহুতে তােমার,
ছুটে আনন্দ চরণ চুমি’।
শুনি সে বচন, হেরি সে নয়ন,
দুই চোখে মাের ঝরিল বারি।
নিমেষে ধৌত নির্ম্মল রূপে
বাহিরিয়া এল কুমারী নারী।
বহুদিন মাের প্রমােদ-নিশীতে
যত শত দীপ জ্বলিয়াছিল―
দূর হতে দূরে,―এক নিশ্বাসে
কে যেন সকলি নিবায়ে দিল।
প্রভাত-অরুণ ভা’য়ের মতন
সঁপি দিল কর আমার কেশে
আপনার করি নিল পলকেই
মােরে তপোবন-পবন এসে।
মিথ্যা তােমার জটিল বুদ্ধি,
বৃদ্ধ তােমার হাসিরে ধিক্!
চিত্ত তাহার আপনার কথা
আপন মর্ম্মে ফিরায়ে নিক্।
তােমার পামরী পাপিনীর দল
তারাও অমনি হাসিল হাসি,―
আবেশে বিলাসে ছলনার পাশে
চারিদিক্ হতে ঘেরিল আসি।
বনাঞ্চল লুটায় ভূতলে,
বেণী খমি পড়ে কবরী টুটি’
ফুল ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারিল কুমারে
লীলায়িত করি হস্ত দুটি।
হে মাের অমল কিশাের তাপস
কোথায় তােমারে আড়ালে রাখি!
আমার কাতর অন্তর দিয়ে
ঢাকিবারে চাই তােমার আঁখি।
হে মোর প্রভাত, তােমারে ঘেরিয়া
পারিতাম যদি, দিতাম টানি
ঊষার রক্ত মেঘের মতন
আমার দীপ্ত সরমখানি।
ও আহুতি তুমি নিয়ােনা নিয়ােনা
হে মাের অনল, তপের নিধি,
আমি হয়ে ছাই তোমারে লুকাই
এমন ক্ষমতা দিল না বিধি।
ধিক্ রমণীরে ধিক্ শতবার,
হতলাজ বিধি তােমারে ধিক।
রমণীজাতির ধিক্কার গানে
ধ্বনিয়া উঠিল সকল দিক্।
ব্যাকুল সরমে অসহ ব্যথায়
লুটায়ে ছিন্নালতিকাসমা
কহিনু তাপসে—“পুণ্যচরিত,
পাতকিনীদের করিয়ো ক্ষমা।
আমারে ক্ষমিয়ো, আমারে ক্ষমিয়ো,
আমারে ক্ষমিয়ো করুণানিধি।”
হরিণীর মত ছুটে চলে এনু
সরমের শর মর্ম্মে বিঁধি।
কঁদিয়া কহিনু কাতরকণ্ঠ
“আমারে ক্ষমিয়ো পুণ্যরাশি।”
চপলভঙ্গে লুটায়ে রঙ্গে
পিশাচীরা পিছে উঠিল হাসি।
ফেলি দিল ফুল মাথায় আমার
তপােবন-তরু করুণা মানি,
দূর হতে কানে বাজিতে লাগিল’
বাঁশির মতন মধুর বাণী,—
“আনন্দময়ী মূরতি তােমার,
কোন্ দেব তুমি আনিলে দিবা!
অমৃতসরস তােমার পরশ,
তােমার নয়নে দিব্য বিভা।”
দেবতারে তুমি দেখেছ, তােমার
সরল নয়ন করেনি ভুল।
দাও মাের মাথে, নিয়ে যাই সাথে
তােমার হাতের পূজার ফুল!
তোমার পূজার গন্ধ আমার
মনােমন্দির ভরিয়া রবে—
সেথায় দুয়ার রুধিনু এবার,
যতদিন বেঁচে রহিব ভবে।
মন্ত্রী, আবার সেই বাঁকা হাসি!
না হয় দেবতা আমাতে নাই—
মাটি দিয়ে তবু গড়ে ত প্রতিমা,
সাধকেরা পূজা করে ত তাই।
একদিন তার পূজা হয়ে গেলে
চিরদিন তার বিসর্জ্জন,
খেলার পুতলি করিয়া তাহারে
আর কি পূজিবে পৌরজন?
পূজা যদি মাের হয়ে থাকে শেষ
হয়ে গেছে শেষ আমার খেলা।
দেবতার লীলা করি সমাপন
জলে ঝাঁপ দিবে মাটির ঢেলা।
হাস হাস তুমি হে রাজমন্ত্রী
লয়ে আপনার অহঙ্কার―
ফিরে লও তব স্বর্ণমুদ্রা
ফিরে লও তব পুরস্কার।
বহু কথা বৃথা বলেছি তােমায়
তা লাগি হৃদয় ব্যথিছে মােরে।
অধম নারীর একটি বচন
রেখো হে প্রাজ্ঞ স্মরণ করে,
বুদ্ধির বলে সকলি বুঝেছ,
দুয়েকটি বাকি রয়েছে তবু,
দৈবে যাহারে সহসা বুঝায়
সে ছাড়া সে কেহ বােঝে না কভু।
৯ই কার্তিক, ১৩০৪
ভাষা ও ছন্দ
ভাষা ও ছন্দ
যেদিন হিমাদ্রিশৃঙ্গে নামি আসে আসন্ন আষাঢ়,
মহান ব্রহ্মপুত্র অকস্মাৎ দুর্দ্দাম দুর্ব্বার
দুঃসহ অন্তরবেগে তীরতরু করিয়া উন্মূল
মাতিয়া খুঁজিয়া ফিরে আপনার কূল-উপকূল
তট-অরণ্যের তলে তরঙ্গের ডম্বরু বাজায়ে
ক্ষিপ্ত ধূর্জ্জটীর প্রায়; সেই মত বনানীর ছায়ে
স্বচ্ছ শীর্ণ ক্ষিপ্রগতি স্রোতস্বতী তমসার তীরে
অপূর্ব্ব উদ্বেগভরে সঙ্গীহীন ভ্রমিছেন ফিরে
মহর্ষি বাক্মীকি কবি,—রক্তবেগ-তরঙ্গিত বুকে
গম্ভীর জলদমন্দ্রে বারম্বার আবর্ত্তিয়া মুখে
নব ছন্দ; বেদনায় অন্তর করিয়া বিদারিত
মুহূর্ত্তে নিল যে জন্ম পরিপূর্ণ বাণীর সঙ্গীত,
তারে লয়ে কি করিবে, ভাবে মুনি কি তার উদ্দেশ,―
তরুণ গরুড়সম কি মহৎ ক্ষুধার আবেশ
পীড়ন করিছে তারে, কি তাহার দুরন্ত প্রার্থনা,
অমর বিহঙ্গশিশু কোন্ বিশ্বে করিবে রচনা।
আপন বিরাট্ নীড়।—অলৌকিক আনন্দের ভার
বিধাতা যাহারে দেয়, তার বক্ষে বেদনা অপার,
তার নিত্য জাগরণ; অগ্নিসম দেবতার দান
ঊর্দ্ধশিখা জ্বালি চিত্তে তাহােরাত্র দগ্ধ করে প্রাণ।
অস্তে গেল দিনমণি। দেবর্ষি নারদ সন্ধ্যাকালে
শাখাসুপ্ত পাখীদের সচকিয়া জটারশ্মিজালে,
স্বর্গের নন্দনগন্ধে অসময়ে শান্ত মধুকরে
বিস্মিত ব্যাকুল করি, উত্তরিলা তপােভূমি পরে।
নমস্কার করি কবি, শুধাইলা সঁপিয়া আসন
“কি মহৎ দৈবকার্য্যে, দেব, তব মর্ত্ত্যে আগমন!”
নারদ কহিলা হাসি—“করুণার উৎসমুখে, মুনি,
যে ছন্দ উঠিল ঊর্দ্ধে, ব্রহ্মলােকে ব্রহ্মা তাহা শুনি
আমারে কহিলা ডাকি, যাও তুমি তমসার তীরে,
বাণীর বিদ্যুৎ-দীপ্ত ছন্দোবাণবিদ্ধ বাল্মীকিরে
বারেক শুধায়ে এস,―বোলো তারে, “ওগো ভাগ্যবান্,
এ মহা সঙ্গীতধন কাহারে করিবে তুমি দান।
এই ছন্দে গাঁথি লয়ে কোন্ দেবতার যশঃকথা
স্বর্গের অমর কবি মর্ত্ত্যলােকে দিবে অমরতা।”
কহিলেন শির নাড়ি ভাবােন্মত্ত মহামুনিবর,
“দেবতার সামগীতি গাহিতেছে বিশ্বচরাচর,
ভাষাশূন্য অর্থহারা। বহ্নি ঊর্দ্ধে মেলিয়া অঙ্গুলি
ইঙ্গিতে করিছে স্তব; সমুদ্র তরঙ্গবাহু তুলি
কি কহিছে স্বর্গ জানে; অরণ্য উঠায়ে লক্ষশাখা
মর্ম্মরিছে মহামন্ত্র; ঝটিকা উড়ায়ে রুদ্র পাখা
গাহিছে গর্জ্জন গান; নক্ষত্রের অক্ষৌহিণী হতে
অরণ্যের পতঙ্গ অবধি, মিলাইছে এক স্রোতে
সঙ্গীতের তরঙ্গিণী বৈকুণ্ঠের শান্তিসিন্ধু পারে।
মানুষের ভাষাটুকু অর্থ দিয়ে বন্ধ চারিধারে,
ঘুরে মানুষের চতুর্দ্দিকে। অবিরত রাত্রিদিন
মানবের প্রয়োজনে প্রাণ তার হয়ে আসে ক্ষীণ।
পরিস্ফুট তত্ত্ব তার সীমা নেয় ভাবের চরণে;
ধূলি ছাড়ি একেবারে ঊর্দ্ধমুখে অনন্তগগনে
উড়িতে সে নাহি পারে সঙ্গীতের মতন স্বাধীন
মেলি দিয়া সপ্তসুর সপ্তপক্ষ অর্থভারহীন।
প্রভাতের শুভ্র ভাষা বাক্যহীন প্রত্যক্ষ কিরণ
জগতের মর্ম্মদ্বার মুহূর্ত্তেকে করি উদ্ঘাটন
নির্ব্বারিত করি দেয় ত্রিলোকের গীতের ভাণ্ডার;
যামিনীর শান্তিবাণী ক্ষণমাত্রে অনন্ত সংসার
আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে, বাক্যহীন পরম নিষেধ
বিশ্বকর্ম্ম কোলাহল মন্ত্রবলে করি দিয়া ভেদ
নিমেষে নিবায়ে দেয় সর্ব্ব খেদ সকল প্রয়াস,
জীবলোক মাঝে আনে মরণের বিপুল আভাস;
নক্ষত্রের ধ্রুব ভাষা অনির্ব্বাণ অনলের কণা
জ্যোতিষ্কের সূচিপত্রে আপনার করিছে সূচনা
নিত্যকাল মহাকাশে; দক্ষিণের সমীরের ভাষা
কেবল নিশ্বাসমত্রে নিকুঞ্জে জাগায় নব আশা,
দুর্গম পল্লবদুর্গে অরণ্যের ঘন অন্তঃপুরে
নিমেষে প্রবেশ করে, নিয়ে যায় দূর হতে দূরে
যৌবনের জগয়ান;―সেই মত প্রত্যক্ষ প্রকাশ
কোথা মানবের বাক্যে, কোথা সেই অনন্ত আভাস,
কোথা সেই অর্থভেদী অভ্রভেদী সঙ্গীত উচ্ছ্বাস,
আত্মবিদারণকারী মর্ম্মান্তিক মহান্ নিশ্বাস।
মানবের জীর্ণ বাক্যে মাের ছন্দ দিবে নব সুর,
অর্থের বন্ধন হতে নিয়ে তারে যাবে কিছু দূর
ভাবের স্বাধীন লােকে, পক্ষবান্ অশ্বরাজ সম
উদ্দাম সুন্দর গতি,—সে আশ্বাসে ভাসে চিত্ত মম।
সূর্য্যেরে বহিয়া যথা ধায় বেগে দিব্য অগ্নিতরী
মহাব্যোম-নীলসিন্ধু প্রতিদিন পারাপার করি;
ছন্দ সেই অগ্নিসম বাক্যেরে করিব সমর্পণ
যাবে চলি মর্ত্তসীমা অবাধে করিয়া সন্তরণ,
গুরুভার পৃথিবীরে টানিয়া লইবে ঊর্দ্ধপানে,
কথারে ভাবের স্বর্গে, মানবেরে দেবপীঠস্থানে।
মহাম্বুধি যেইমত ধ্বনিহীন স্তব্ধ ধরণীরে
বাঁধিয়াছে চতুর্দ্দিকে অন্তহীন নৃত্য গীতে ঘিরে,―
তেমনি আমার ছন্দ, ভাষারে ঘেরিয়া আলিঙ্গনে
গাবে যুগে যুগান্তরে সরল গম্ভীর কলস্বনে
দিক্ হতে দিগন্তরে মহামানবের স্তবগান,―
ক্ষণস্থায়ী নরজন্মে মহৎ মর্য্যাদা করি দান।
হে দেবর্ষি, দেবদূত, নিবেদিয়ো পিতামহ-পায়ে
স্বর্গ হতে যাহা এল স্বর্গে তাহা নিয়োনা ফিরায়ে।
দেবতার স্তবগীতে দেবেরে মানব করি আনে,
তুলিব দেবতা করি মানুষের মাের ছন্দে গানে।
ভগবন্, ত্রিভুবন তােমাদের প্রত্যক্ষে বিরাজে
কহ মােরে কার নাম অমর বীণার ছন্দে বাজে।
কহ মােরে বীর্য্য কার ক্ষমারে করে না অতিক্রম,
কাহার চরিত্র ঘেরি সুকঠিন ধর্ম্মের নিয়ম
ধরেছে সুন্দর কান্তি মাণিক্যের অঙ্গদের মত,
মহৈশ্বর্য্যে আছে নম্র, মহা দৈন্য়ে কে হয়নি নত,
সম্পদে কে থাকে ভয়ে, বিপদে কে একান্ত নির্ভীক,
কে পেয়েছে সব চেয়ে, কে দিয়েছে তাহার অধিক,
কে লয়েছে নিজ শিরে রাজভালে মুকুটের সম
সবিনয়ে সগৌরবে ধরামাঝে দুঃখ মহত্তম,―
কহ মােরে সর্ব্বদর্শী হে দেবর্ষি তাঁর পুণ্য নাম।”
নারদ কহিলা ধীরে―“অযােধ্যার রঘুপতি রাম।”
“জানি আমি জানি তাঁরে, শুনেছি তাঁহার কীর্ত্তিকথা,”
কহিলা বাল্মীকি, “তবু নাহি জানি সমগ্র বারতা,
সকল ঘটনা তাঁর―ইতিবৃত্ত রচিব কেমনে।
পাছে সত্যভ্রষ্ট হই, এই ভয় জাগে মাের মনে।”
নারদ কহিলা হাসি, “সেই সত্য, যা’ রচিবে তুমি,
ঘটে যা’ তা’ সব সত্য নহে। কবি, তব মনােভূমি
রামের জনমস্থান, অযােধ্যার চেয়ে সত্য জেনাে।”
এত বলি দেবদূত মিলাইল দিব্য-স্বপ্ন-হেন
সুদূর সপ্তর্ষি লােকে। বাল্মীকি বসিলা ধ্যানাসনে,
তমসা রহিল মৌন, স্তব্ধতা জাগিল তপোবনে।
লক্ষ্মীর পরীক্ষা
লক্ষীর পরীক্ষা
ক্ষীরো
ধনী সুখে করে ধর্ম্মকর্ম্ম
গরীবের পড়ে মাথার ঘর্ম্ম
তুমি রাণী, আছে টাকা শত শত,
খেলাছলে কর দান ধ্যান ব্রত;
তােমার ত শুধু হুকুম মাত্র;
খাটুনি আমারি দিবসরাত্র।
তবুও তােমারি সুযশ, পুণ্য,
আমার কপালে সকলি শূন্য।
নেপথ্যে
ক্ষীরি, ক্ষীরি, ক্ষীরাে!
ক্ষীরাে
কেন ডাকাডাকি,
নাওয়া খাওয়া সব ছেড়ে দেব না কি?
(রাণী কল্যাণীর প্রবেশ)
কল্যাণী
হল কি! তুই যে আছিস্ রেগেই।
ক্ষীরো
কাজ যে পিছনে রয়েছে লেগেই।
কতই বা সয় রক্তমাংসে,
কত কাজ করে একটা মান্ষে।
দিনে দিনে হল শরীর নষ্ট।
কল্যাণী
কেন, এত তাের কিসের কষ্ট!
ক্ষীরাে।
যেথা যত আছে রামী ও বামী
সকলের যেন গোলাম আমি।
হােক্ ব্রাহ্মণ, হোক্ শূদ্দুর,
সেবা করে মরি পাড়াসুদ্ধর।
ঘরেতে কারো ত চড়ে না অন্ন,
তােমারি ভাঁড়ারে নিমন্তন্ন।
হাড় বের হল বাসন মেজে
সৃষ্টির পান তামাক সেজে।
একা একা এত খেটে যে মরি
মায়া দয়া নেই?
কল্যাণী
সে দোষ তােরী।
চাকর দাসী কি টিঁকিতে পারে
তােমার প্রখর মুখের ধারে?
লােক এলে তুই তাড়াবি তাদের
লােক গেলে শেষে আর্ত্তনাদের
ধূম পড়ে যাবে,—এর কি পথ্যি
আছে কোনরূপ?
ক্ষীরাে
সে কথা সত্যি।
সয়না আমার,—তাড়াই সাধে!
অন্যায় দেখে পরাণ কাঁদে।
কোথা থেকে যত ডাকাত জোটে,
টাকাকড়ি সব দুহাতে লোটে।
আমি না তাদের তাড়াই যদি
তােমারে তাড়াত আমারে বধি’।
কল্যাণী
ডাকাত মাধবী, ডাকাত মাধু,
সবাই ডাকাত, তুমিই সাধু!
ক্ষীরো
আমি সাধু! মাগো, এমন মিথ্যে
মুখেও আনিনে, ভাবিনে চিত্তে।
নিই থুই খাই দু’হাত ভরি,
দুবেলা তােমায় আশিষ করি;
কিন্তু তবু সে দু’হাত পরে
দু মুঠোর বেশি কতই ধরে।
ঘরে যত আন মানুষ জনকে
তত বেড়ে যায় হাতের সংখ্যে।
হাত যে সৃজন করেছে বিধি,
নেবার জন্যে, জান ত দিদি!
পাড়াপড়শির দৃষ্টি থেকে
কিছু আপনার রাখ ত ঢেকে,
তার পরে বেশি রহিলে বাকি
চাকর বাকর আনিয়ো ডাকি।
কল্যাণী
একা বটে তুমি! তােমার সাথী
ভাইপো, ভাইঝি, নাতিনী নাতি,
হাট বসে গেছে সােনার চাঁদের,
দুটো করে হাত নেই কি তাঁদের?
তাের কথা শুনে কথা না সরে,
হাসি পায় ফের রাগও ধরে।
ক্ষীর
বেশি রেগে যদি কম হাসি পেত
স্বভাব আমার শুধরিয়ে যেত।
কল্যাণী
মলেও যাবে না স্বভাবখানি
নিশ্চয় জেনাে।
ক্ষীরাে
সে কথা মানি।
তাইত ভরসা মরণ মােরে
নেবে না সহসা সাহস করে।
ঐ যে তােমার দরজা জুড়ে
বসে গেছে যত দেশের কুড়ে।
কারো বা স্বামীর জোটে না খাদ্য,
কারাে বা বেটার মামীর শ্রাদ্ধ।
মিছে কথা ঝুড়ি ভরিয়া আনে,
নিয়ে যায় ঝুড়ি ভরিয়া দানে।
নিতে চায় নিক, কত যে নিচ্চে,
চোখে ধূলো দেবে, সেটা কি ইচ্ছে!
কল্যাণী
কেন তুই মিছে মরিস বকে?
ধূলো দেয়, ধূলো লাগে না চোখে।
বুঝি আমি সব―এটাও জানি
তারা যে গরীব, আমি যে রাণী।
ফাঁকি দিয়ে তারা ঘােচায় অভাব,
আমি দিই, সেটা আমার স্বভাব।
তাদের সুখ সে তারাই জানে,
আমার সুখ সে আমার প্রাণে।
ক্ষীরাে
নুন খেয়ে গুণ গাহিতে কভু,
দিয়ে থুয়ে সুখ হইত তবু।
সাম্নে প্রণাম পদারবিন্দে,
আড়ালে তােমার করে যে নিন্দে!
কল্যাণী
সাম্নে যা পাই তাই যথেষ্ট,
আড়ালে কি ঘটে জানেন কেষ্ট।
সে যাই হোক্গে, শুধাই তোরে
কাল বৈকালে বল্ত মোরে
অতিথি-সেবায় অনেকগুলি
কম পড়েছিল চন্দ্রপুলি,―
কেন বা ছিল না রস্করা!
ক্ষীরো
কেন কর মিছে মস্করা
দিদি ঠাকরুণ! আপন হাতে
গুণে দিয়েছিনু সবার পাতে
দুটো দুটো করে।
কল্যাণী
আপন চোখে
দেখেছি পায়নি সকল লোকে,
খালি পাত―
ক্ষীরো
ওমা তাইত বলি
কোথায় তলিয়ে যায় যে চলি
যত সামগ্রি দিই আনিয়ে।
ভোলা ময়রার সয়তানী এ।
কল্যাণী
এক বাটি করে দুধ বরাদ্দ,
আধ বাটি তাও পাওয়া অসাধ্য।
ক্ষীরো
গয়লা ত নন্ যুধিষ্ঠির।
যত বিষ তব কুদৃষ্টির
পড়েছে আমারি পোড়া অদৃষ্টে,
যত ঝাঁটা সব আমারি পৃষ্ঠে,
হায় হায়―
কল্যাণী
ঢের হয়েছে, আর না,
রেখে দাও তব মিথ্যে কান্না।
ক্ষীরো
সত্যি কান্না কাঁদেন যাঁরা
ঐ আসছেন ঝেঁটিয়ে পাড়া।
(প্রতিবেশিনীগণের প্রবেশ)
প্রতিবেশিনীগণ
জয় জয় রাণী হও চিরজয়ী!
কল্যাণী তুমি কল্যাণময়ী।
ক্ষীরো
ওগো রাণীদিদি, শোন্ ওই শোন্,
পাতে যদি কিছু হ’ত অকুলোন
এত গলা ছেড়ে এত খুলে প্রাণ
উঠিত কি তবে জয় জয় তান?
যদি দু চারটে চন্দ্রপুলি
দৈবগতিকে দিতে না ভুলি
তাহলে কি আর রক্ষে থাক্ত,
হজম করতে বাপকে ডাক্ত।
কল্যাণী
আজ ত খাবার হয় নি কষ্ট?
১মা
কত পাতে পড়ে হয়েছে নষ্ট,―
লক্ষ্মীর ঘরে খাবার ত্রুটি?
কল্যাণী
হ্যাঁগো, কে তোমার সঙ্গে উটি?
আগে ত দেখিনি!―
২য়া
আমার মধু,
তারি উটি হয় নতুন বধূ
এনেছি দেখাতে তোমার চরণে
মা জননী।
ক্ষীরো
সেটা বুঝেছি ধরণে।
২য়া
(বধূর প্রতি) প্রণাম করিবে এস এদিকে
এই যে তােমার রাণী দিদিকে।
কল্যাণী
এস কাছে এস, লজ্জা কাদের?
(আংটি পরাইয়া) আহা মুখখানি দিব্যি ছাঁদের
চেয়ে দেখ্ ক্ষীরি!
ক্ষীরাে
মুখটি ত বেশ,
তা চেয়ে তােমার আংটি সরেশ।
২য়া
শুধু রূপ নিয়ে কি হবে অঙ্গে
সােনা দানা কিছু আনেনি সঙ্গে।
ক্ষীরাে
যাহা এনেছিল সবি সিন্দুকে
রেখেছ যতনে, বলে নিন্দুকে।
কল্যাণী
এস ঘরে এস।
ক্ষীরো
যাও গো ঘরে
সােনা পাবে শুধু বাণীর দরে।
(কল্যাণী ও বধুসহ দ্বিতীয়ার প্রস্থান)
১মা
দেখ্লি মাগীর কাণ্ড এ কি!
ক্ষীরো
কারে বাদ্ দিয়ে কারে বা দেখি।
৩য়া
তা বলে এতটা সহ্য হয় না।
ক্ষীরাে
অন্যের বউ পরলে গয়না
অন্যের তাতে জ্বলে যে অঙ্গ।
৩য়া
মাসী জান তুমি কতই রঙ্গ,
এত ঠাট্টাও আছে তাের পেটে,
হাস্তে হাস্তে নাড়ী যায় ফেটে।
১মা
কিন্তু যা বল, আমাদের মাতা
নাই তাঁর মত এত বড় দাতা।
ক্ষীরাে
অর্থাৎ কি না এত বড় হাবা
জন্ম দেয়নি আর কারো বাবা।
৩য়া
সে কথা মিথ্যে নয় নিতান্ত।
দেখ্ না সেদিন কুশী ও ক্ষান্ত
কি ঠকান্টাই ঠকালে, মাগো!
আহা মাসী তুমি সাধে কি রাগো!
আমাদেরি গায়ে হয় অসহ্য।
৪র্থী
বুড়ো মহারাজা যে ঐশ্বর্য্য
রেখে গেছে সে কি এম্নি ভাবে
পাঁচ ভূতে শুধু ঠকিয়ে খাবে!
১মা
দেখ্লি ত ভাই কানা আন্দি
কত টাকা পেলে।
৩য়া
বুড়ি ঠান্দি
জুড়ে দিলে তার কান্না অস্ত্র
নিয়ে গেল কত শীতের বস্ত্র।
৪র্থী
বুড়ি মাগী তার শীত কি এতই।
কাঁথা হলে চলে নিয়ে গেল লুই।
আছে সেটা শেষে চোরের ভাগ্যে,
এ যে বাড়াবাড়ি।
১মা
সে কথা যাগ্গে।
৪র্থী
না না তাই বলি হয়ােনাকো দাতা,
তা বলে খাবে কি বুদ্ধির মাথা।
যত রাজ্যের দুঃখী কাঙাল
যত উড়ে মেড়া খোট্টা বাঙাল
কানা খোঁড়া নুলাে যে আসে মরতে
বাচ বিচার কি হবে না করতে?
৩য়া
দেখ্না ভাই সে গােপালের মাকে
দু টাকা দিলেই খেয়ে পরে থাকে
পাঁচ টাকা তার মাসে বরাদ্দ
এ যে মিছি মিছি টাকার শ্রাদ্ধ।
৪র্থী
আসল কথা কি, ভাল নয় থাকা
মেয়ে মান্সের এতগুলো টাকা।
৩য়া
কত লােকে কত করে যে রটনা,―
১মা
সেগুলো ত সব মিথ্যে ঘটনা।
৪র্থী
সত্যি মিথ্যে দেবতা জানে
রটেছে ত কথা পাঁচের কানে
সেটা যে ভাল না।
১মা
যা বলিস্ ভাই
এমন মানুষ ভূভারতে নাই।
ছোট বড় বোধ নাইক মনে,
মিষ্টি কথাটি সবার সনে।
ক্ষীরো
টাকা যদি পাই বাক্স ভরে
আমার গলাও গলাবে তোরে।
বাপু বল্লেই মিলবে স্বর্গ,
বাছা বল্লেই বলবি ধর্গো।
মনে ঠিক জেনো আসল মিষ্টি,
কথার সঙ্গে রূপোর বৃষ্টি।
৪র্থী
তাও বলি বাপু, এটা কিছু বেশি,
সবার সঙ্গে এত মেশামেশি।
বড় লোক তুমি ভাগ্যিমন্ত,
সেই মত চাই চাল চলন্ ত?
৩য়া
দেখ্লি সেদিন শশির বাঁ গালে
আপনার হাতে ওষুধ লাগালে!
৪র্থী
বিধু খোঁড়া সেটা নেহাৎ বাঁদর
তারে কেন এত যত্ন আদর?
৩য়া
এত লােক আছে কেদারের মাকে
কেন বল দেখি দিনরাত ডাকে!
গয়লাপাড়ার কেষ্টদাসী
তারি সাথে কত গল্প হাসি,
যেন সে কতই বন্ধু পুরােণাে!
৪র্থী
ওগুলো লােকের আদর কুড়োনো।
ক্ষীরো
এ সংসারের ঐত প্রথা,
দেওয়া নেওয়া ছাড়া নেইক কথা।
ভাত তুলে দেন মােদের মুখে
নাম তুলে নেন পরম সুখে।
ভাত মুখে দিলে তখনি ফুরােয়
নাম চিরদিন কর্ণ জুড়ােয়।
৪র্থী
ঐ বউ নিয়ে ফিরে এল নেকী।
(বধূসহ দ্বিতীয়ার প্রবেশ)
১মা
কি পেলিলো বিধু দেখি দেখি দেখি!
২য়া
শুধু এক জোড়া রতনচক্র।
৩য়া
বিধি আজ তোরে বড়ই বক্র।
এত ঘটা করে নিয়ে গেল ডেকে
ভেবে ছিনু দেবে গয়না গা ঢেকে।
৪র্থী
মেয়ের বিয়েতে পেয়ারী বুড়ি
পেয়েছিল আর তা ছাড়া চুড়ি।
২য়া
আমি যে গরীব নই যথেষ্ট
গরিবীয়ানায় সে মাগী শ্রেষ্ঠ।
অদৃষ্টে যার নেইক গয়না
গরীব হয়ে সে গরীব হয় না।
৪র্থী
বড় মান্ষের বিচার ত নেই।
কারেও বা তাঁর ধরে না মনেই
কেউ বা আবার মাথার ঠাকুর!
১মা
টাকাটা শিকেটা কুম্ড়ো কাঁকুড়
যা পাই সে ভাল, কে দেয় তাই বা!
২য়া
অবিচারে দান দিলেন নাই বা।
মাধাবাঁধা রেখে পায়ের নীচে
ভরি কত সােনা পেলেম মিছে।
ক্ষীরো
মা লক্ষ্মী যদি হতেন সদয়
দেখিয়ে দিতেম দান কারে কয়।
২য়া
আহা তাই হােক্, লক্ষ্মীর বরে
তাের ঘরে যেন টাকা নাহি ধরে।
১মা
ওলাে থাম্ তােরা, রাখ্ বকুনি—
রাণীর পায়ের শব্দ শুনি!
৪র্থী
(উচ্চৈঃস্বরে) আহা জননীর অসীম দয়া।
ভগবতী যেন কমলালয়া।
২য়া
হেন নারী আর হয়নি সৃষ্টি,
সবা পরে তাঁর সমান দৃষ্টি।
৩য়া
আহা মরি, তাঁরি হস্তে আসি
সার্থক হল অর্থরাশি।
(কল্যাণীর প্রবেশ)
কল্যাণী
রাত হল তবু কিসের কমিটি?
ক্ষীরো
সবাই তোমারি যশের জমিটি
নিড়োতেছিলেন, চষ্তেছিলেন,
মই দিয়ে কসে ঘষতেছিলেন,
আমি মাঝে মাঝে বীজ ছিটিয়ে
বুনেছি ফসল আশ মিটিয়ে।
কল্যাণী
রাত হল আজ যাও সবে ঘরে,
এই ক’টি কথা রেখো মনে করে।
আশার অন্ত নাইক বটে,
আর সকলেরি অন্ত ঘটে।
সবার মনের মতন ভিক্ষে
দিতে যদি হত, কল্পবৃক্ষে
ঘুণ ধরে যেত, আমি ত তুচ্ছ।
নিন্দে করলে যাব না মুচ্ছাে,
তবু এ কথাটা ভেবে দেখে দিখি—
ভাল কথা বলা শক্ত বেশি কি?
(প্রস্থান)
৪র্থী
কি বল্ছিলেম ছিল সেই খোঁজে।
ক্ষীরাে
না গাে না তা নয়, এটুকু সে বোঝে—
সাম্নে তােমরা যেটুকু বাড়ালে
সেটুকু কমিয়ে আন্বে আড়ালে।
উপকার যেন মধুর পাত্র,
হজম করতে জ্বলে যে গাত্র,
তাই সাথে চাই ঝালের চাট্নি
নিলে বান্দা কান্না কাট্নি।
যার খেয়ে মশা ওঠেন ফুলে,
জ্বালান্ তারেই গােপন হুলে।
দেবতারে নিয়ে বানাবে দত্যি
কলিকাল তবে হবে ত সত্যি!
৪র্থী
মিথ্যে না ভাই! সাম্লে চলিস্।
যাই মুখে আসে তাই যে বলিস্।
পালন যে করে সে হল মা বাপ,
তাহারি নিন্দে, সে যে মহাপাপ।
এমন লক্ষ্মী এমন সতী
কোথা আছে হেন পুণ্যবতী।
যেমন ধনের কপাল মস্ত
তেমনি দানের দরাজ হস্ত,
যেমন রূপসী তেমনি সাধ্বী,
খুঁত ধরে তাঁর কাহার সাধ্যি।
দিস্নেকো দোষ তাঁহার নামে।
৩য়া
তুমি থাম্লে যে অনেক থামে।
২য়া
আহা কোথা হতে এলেন গুরু,
হিতকথা আর কোরােনা সুরু।
হঠাৎ ধর্ম্মকথার পাঠটা
তােমার মুখে যে শােনায় ঠাট্টা।
ক্ষীরাে
ধর্ম্মও রাখাে, ঝগড়াও থাক্,
গলা ছেড়ে আর বাজিয়ােনা ঢাক।
পেট ভরে খেলে, করলে নিন্দে,
বাড়ি ফিরে গিয়ে ভজ গােবিন্দে।
(প্রতিবেশিনীগণের প্রস্থান)
ওরে বিনি, ওরে কিনি, ওরে কাশি!
(বিনি কিনি কাশীর প্রবেশ)
কাশী
কেন দিদি!
কিনি
কেন খুড়ি!
বিনি
কেন মাসী!
ক্ষীরাে
ওরে খাবি আয়।
বিনি
কিছু নেই ক্ষিধে।
ক্ষীরাে
খেয়ে নিতে হয় পেলেই সুবিধে।
কিনি
রসকরা খেয়ে পেট বড় ভার।
ক্ষীরো
বেশি কিছু নয়, শুধু গোটাচার
ভোলাময়লার চন্দ্রপুলি
দেখ দেখি ঐ ঢাকনা খুলি;―
তাই মুখে দিয়ে, দু’বাটি-খানিক
দুধ খেয়ে শোও লক্ষ্মী মাণিক।
কাশী
কত খাব দিদি সমস্ত দিন?
ক্ষীরো
খাবার ত নয় ক্ষিদের অধীন;
পেটের জ্বালায় কত লোকে ছোটে
খাবার কি তার মুখে এসে জোটে?
দুঃখী গরীব কাঙাল ফতুর
চাষাভূষো মুটে অনাথ অতুর
কারো ত ক্ষিদের অভাব হয় না,
চন্দ্রপুলিটা সবার রয় না।
মনে রেখে দিস যেটার যা’ দর,
খাবার চাইতে ক্ষিদের আদর।
হ্যাঁরে বিনি তোর চিরুণী রূপোর
দেখচিনে কেন খোঁপার উপর?
বিনি
সেটা ওপাড়ার ক্ষেতুর মেয়ে
কেঁদেকেটে কাল নিয়েছে চেয়ে।
ক্ষীরাে
ঐরে, হয়েছে মাথাটি খাওয়া।
তোমারো লেগেছে দাতার হাওয়া।
বিনি
আহা কিছু তার নেই যে মাসী!
ক্ষীরাে
তােমারি কি এত টাকার রাশি?
গরীব লােকের দয়ামায়া রােগ
সেটা যে একটা ভারি দুর্য্যোগ।
না না, যাও তুমি মায়ের বাড়িতে,
হেথাকার হাওয়া সবে না নাড়িতে।
রাণী যত দেয় ফুরােয় না, তাই
দান করে তার কোন ক্ষতি নাই।
তুই যেটা দিলি রইল না তাের
এতেও মনটা হয় না কাতর?
ওরে বােকা মেয়ে আমি আরো তোরে
আনিয়ে নিলেম এই মনে করে
কি করে কুড়োতে হইবে ভিক্ষে
মাের কাছে তাই করবি শিক্ষে।
কে জান্ত তুই পেট না ভরতে
উল্টো বিদ্যা শিখবি মরতে?
―দুধ যে রইল বাটির তলায়
ঐটুকু বুঝি গলেনা গলায়?
আমি মরে গেলে যত মনে আশ
কোরো দান ধ্যান আর উপবাস।
যতদিন আমি রয়েছি বর্ত্তে
দেব না কর্ত্তে আত্মহত্যে।
খাওয়া দাওয়া হল, এখন তবে
রাত ঢের হল শােওগে সবে।
(কিনি বিনি কাশীর প্রস্থান)
(কল্যাণীর প্রবেশ)
ওগো দিদি আমি বাঁচিনে ত আর।
কল্যাণী
সেটা বিশ্বাস হয় না আমার।
তবু কি হয়েছে শুনি ব্যাপারটা।
ক্ষীরো
মাইরি দিদি এ নয়ক ঠাট্টা!
দেশ থেকে চিঠি পেয়েছি মামার
বাঁচে কি না বাঁচে খুড়ীটি আমার,―
শক্ত অসুখ হয়েছে এবার
টাকাকড়ি নেই ওষুধ দেবার।
কল্যাণী
এখনো বছর হয়নি গত,
খুড়ির শ্রাদ্ধে নিলি যে কত।
ক্ষীরো
হাঁ হাঁ বটে বটে মরেছে বেটী,
খুড়ী গেছে তবু আছে ত জ্যেঠী।
আহা রাণী দিদি ধন্য তোরে
এত রেখেছিস্ স্মরণ করে।
এমন বুদ্ধি আর কি আছে!
এড়ায় না কিছু তোমার কাছে?
ফাঁকি দিয়ে খুড়ী বাঁচ্বে আবার
সাধ্য কি আছে সে তাঁর বাবার?
কিন্তু কখনো আমার সে জ্যেঠী
মরেনি পূর্ব্বে মনে রেখো সেটি।
কল্যাণী
মরেওনি বটে জন্মেওনি কভু।
ক্ষীর
এমন বুদ্ধি দিদি তোর, তবু
সে বুদ্ধিখানি কেবলি খেলায়
অনুগত এই আমারি বেলায়?
কল্যাণী
চেয়ে নিতে তোর মুখে ফোটে কাঁটা।
না বল্লে নয় মিথ্যে কথাটা?
ধরা পড় তবু হও না জব্দ?
ক্ষীরো
“দাও দাও” ও ত একটা শব্দ,
ওটা কি নিত্যি শোনায় মিষ্টি?
মাঝে মাঝে তাই নতুন সৃষ্টি
কর্ত্তেই হর খুড়ী জেঠীমার।
জান ত সকলি তবে কেন আর
লজ্জা দিচ্চ?
কল্যাণী
অম্নি চেয়ে কি
পাস্নি কখনো তাই বল্ দেখি?
ক্ষীরাে
মরা পাখীরেও শিকার করে’
তবে ত বিড়াল মুখেতে পােরে।
সহজেই পাই তবু দিয়ে ফাঁকি
স্বভাবটাকে যে শান দিয়ে রাখি।
বিনা প্রয়ােজনে খাটাও যাকে
প্রয়ােজন কালে ঠিক সে থাকে।
সত্যি বলচি মিথ্যে কথায়
তোমারাে কাছেতে ফল পাওয়া যায়।
কল্যাণী
এবার পাবে না।
ক্ষীরাে
আচ্ছা বেশ ত
সেজন্যে আমি নইক ব্যস্ত।
আজ না হয় ত কাল ত হবে,
ততখন মাের সবুব সবে।
গা ছুঁয়ে কিন্তু বলছি তােমার
খুড়ীটার কথা তুল্বনা আর।
(কল্যাণীর হাসিয়া প্রস্থান)
হরি বল মন! পরের কাছে
আদায় করার সুখও আছে,
দুঃখও ঢের! হে মা লক্ষ্মীটি
তােমার বাহন পেঁচা পক্ষীটি
এত ভালবাসে এ বাড়ির হাওয়া,
এত কাছাকাছি করে আসা-যাওয়া
ভুলে কোন দিন আমার পানে
তােমারে যদি সে বহিয়া আনে
মাথায় তাহার পরাই সিঁদুর,
জলপান দিই আশীটা ইদুর,
খেয়ে দেয়ে শেষে পেটের ভারে
পড়ে থাকে বেটা আমারি দ্বারে;
সােনা দিয়ে ডানা বাঁধাই, তবে
ওড়বার পথ বন্ধ হবে।
(লক্ষ্মীর আবির্ভাব)
কে আবার রাতে এসেছ জ্বালাতে,
দেশ ছেড়ে শেষে হবে কি পালাতে?
আর ত পারিনে!
লক্ষী
পালাব তবে কি?
যেতে হবে দূরে।
ক্ষীরো
রোস রোস দেখি!
কি পরেছ ওটা মাথার ওপর,
দেখাচ্ছে যেন হীরেব টোপর।
হাতে কি রয়েছে সোনার বাক্সে
দেখ্তে পারি কি? আচ্ছা, থাক্ সে।
এত হীরে সোনা কারো ত হয় না,―
ও গুলো ত নয় গিল্টি গয়না?
এগুলি ত সব সাঁচ্চা পাথর?
গায়ে কি মেখেছ, কিসের আতর?
ভুর ভুর করে পদ্মগন্ধ;
মনে কত কথা হতেছে সন্ধ।
বস বাছা, কেন এলে এত রাতে?
আমারে ত কেউ আসনি ঠকাতে?
যদি এসে থাক ক্ষীরিকে তা’হলে
চিন্তে পারনি সেটা রাখি বলে।
নাম কি তোমার বল দেখি খাঁটি।
মাথা খাও বোলো সত্য কথাটি।
লক্ষী
একটা ত নয়, অনেক যে নাম।
ক্ষীরো।
হাঁ হাঁ থাকে বটে স্বনাম বেনাম
ব্যবসা যাদের ছলনা করা।
কখনো কোথাও পড়নি ধরা?
লক্ষ্মী
ধরা পড়ি বটে দুই দশ দিন
বাঁধন কাটিয়ে আবার স্বাধীন।
ক্ষীরো
হেঁয়ালিটা ছেড়ে কথা কও সিধে,
অমন কল্লে হবে না সুবিধে।
নামটি তোমার বল অকপটে।
লক্ষ্মী
লক্ষ্মী।
ক্ষীরো
তেম্নি চেহারাও বটে।
লক্ষ্মী ত আছে অনেক গুলি,
তুমি কোথাকার বল ত খুলি!
লক্ষ্মী
সত্যি লক্ষ্মী একের অধিক
নাই ত্রিভুবনে।
ক্ষীরো
ঠিক ঠিক ঠিক!
তাই বল মাগো, তুমিই কি তিনি?
আলাপ ত নেই চিন্তে পারিনি।
চিন্তেম যদি চরণ জোড়া
কপাল হত কি এমন পোড়া?
এস, বস, ঘর কর’সে আলো।
পেঁচা দাদা মোর আছে ত ভালো?
এসেছ যখন, তখন মাতঃ
তাড়াতাড়ি যেতে পারবে না ত!
যোগাড় করচি চরণ সেবার;
সহজ হস্তে পড়নি এবার।
সেয়ানা লোকেরে কর না মায়া
কেন যে জানি তা বিষ্ণুজায়া।
না খেয়ে মরে না বুদ্ধি থাক্লে,
বোকারি বিপদ তুমি না রাখলে।
লক্ষ্মী
প্রতারণা করে পেট্টি ভরাও,
ধর্ম্মেরে তুমি কিছু না ডরাও?
ক্ষীরো
বুদ্ধি দেখ্লে এগোও না গো,
তোর দয়া নেই কাজেই মাগো।
বুদ্ধিমানেরা পেটের দায়
লক্ষ্মীমানেরে ঠকিয়ে খায়।
লক্ষ্মী
সরল বুদ্ধি আমার প্রিয়,
বাঁকা বুদ্ধিরে ধিক্ জানিয়ো
ক্ষীরো
ভাল তলোয়ার যেমন বাঁকা,
তেম্নি বক্র বুদ্ধি পাকা।
ও জিনিষ বেশি সরল হলে
নির্ব্বুদ্ধি ত তারেই বলে।
ভাল মাগো, তুমি দয়া কর যদি,
বোকা হয়ে আমি রব নিরবধি।
লক্ষ্মী
কল্যাণী তোর অমন প্রভু
তারেও দস্যু, ঠকাও তবু।
ক্ষীরো
অদৃষ্টে শেষে এই ছিল মোর
যার লাগি চুরি সেই বলে চোর।
ঠকাতে হয় যে-কপালদোষে
তোরে ভালবাসি বলেই ত সে।
আর ঠকাব না, আরামে ঘুমিয়ো;
আমারে ঠকিয়ে যেও না তুমিও।
লক্ষ্মী
স্বভাব তোমার বড়ই রুক্ষী।
ক্ষীরো
তাহার কারণ আমি যে দুঃখী।
তুমি যদি কর রসের বৃষ্টি
স্বভাবটা হবে আপ্নি মিষ্টি।
লক্ষ্মী
তোরে যদি আমি করি আশ্রয়
যশ পাব কি না সন্দেহ হয়।
ক্ষীরো
যশ না পাও ত কিসের কড়ি।
তবে ত আমার গলায় দড়ি।
দশের মুখেতে দিলেই অন্ন
দশমুখে উঠে ধন্য ধন্য।
লক্ষ্মী
প্রাণ ধরে দিতে পারবি ভিক্ষে?
ক্ষীরো
একবার তুমি কর পরীক্ষে।
পেট ভরে গেলে যা থাকে বাকি
সেটা দিয়ে দিতে শক্তটা কি!
দানের গরবে যিনি গরবিনী
তিনি হোন্ আমি, আমি হই তিনি,
দেখ্বে তখন তাঁহার চালটা,
আমারি বা কত উল্টো পাল্টা।
দাসী আছি, জানি দাসীর যা রীতি,
রাণী কর, পাব রাণীর প্রকৃতি।
তাঁরো যদি হয় মোর অবস্থা
সুযশ হবে না এমন সস্তা।
তাঁর দয়াটুকু পাবে না অন্যে
ব্যয় হবে সেটা নিজেরি জন্যে।
কথার মধ্যে মিষ্টি অংশ
অনেকখানিই হবেক ধ্বংস।
দিতে গেলে, কড়ি কভু না সর্বে,
হাতের তেলোয় কাম্ড়ে ধরবে।
ভিক্ষে করতে ধরতে দু’পায়
নিত্যি নতুন উঠ্বে উপায়।
লক্ষ্মী
তথাস্তু, রাণী করে দিনু তোকে,
দাসী ছিলি তুই ভুলে যাবে লোকে।
কিন্তু সদাই থেকো সাবধান
আমার না যেন হয় অপমান।
দ্বিতীয় দৃশ্য
রাণীবেশে ক্ষীরো ও তাহার পারিষদবর্গ।
ক্ষীরো
বিনি!
বিনি
কেন মাসী!
ক্ষীরো
মাসী কিরে মেয়ে!
দেখিনি ত আমি বোকা তোর চেয়ে।
কাঙাল ভিখিরি কলু মালী চাষী
তারাই মাসীরে বলে শুধু মাসী;
রাণীর বোন্ঝি হয়েছ ভাগ্যে,
জাননা আদব! মালতী,
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
রাণীর বোন্ঝি রাণীরে কি ডাকে
শিখিয়ে দে ঐ বোকা মেয়েটাকে।
মালতী
ছিছি শুধু মাসী বলে কি রাণীকে?
রাণী মাসী বলে রেখে দিয়ো শিখে।
ক্ষীরো
মনে থাক্বে ত? কোথা গেল কাশী!
কাশী
কেন রাণী দিদি।
ক্ষীরো
চার চার দাসী
নেই যে সঙ্গে?
কাশী
এত লোক মিছে
কেন দিনরাত লেগে থাকে পিছে?
ক্ষীরো
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
এই মেয়েটাকে
শিখিয়ে দে কেন এত দাসী থাকে।
মালতী
তোনরা ত নও জেলেনী তাঁতিনী,
তােমরা হও যে রাণীর নাতিনী।
যে নবাববাড়ি এনু আমি ত্যেজি
সেথা বেগমের ছিল পোষা বেজি
তাহারি একটা ছোট বাচ্ছার
পিছনেতে ছিল দাসী চার চার
তা ছাড়া সেপাই।
ক্ষীরো
শুলি ত কাশী!
কাশী
শুনেছি।
ক্ষীর
তাহ’লে ডাক্ তোর দাসী।
কিনি পোড়ামুখী!
কিনি
কেন রাণী খুড়ী?
ক্ষীরো
হাই তুল্লেম দিলিনে যে তুড়ি?
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
শেখাও কায়দা।
মালতী
এত বলি তবু হয় না ফায়দা।
বেগম সাহেব যখন হাঁচেন
তুড়ি ভুল হলে কেহ না বাঁচেন।
তখনি শূলেতে চড়িয়ে তারে
নাকে কাটি দিয়ে হাঁচিয়ে মারে।
ক্ষীরো
সোনার বাটায় পান দে তারিণী!
কোথা গেল মোর চামরধারিণী।
তারিণী
চলে গেছে ছুঁড়ি, সে বলে মাইনে
চেয়ে চেয়ে তবু কিছুতে পাইনে।
ক্ষীরো
ছোট লোক বেটী হারামজাদী
রাণীর ঘরে সে হয়েছে বাঁদি
তবু মনে তার নেই সন্তোষ
মাইনে পায় না বলে দেয় দোষ।
পিঁপ্ড়ের পাখা কেবল মরতে।
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
মাগীরে ধরতে
পাঠাও আমার ছ-ছয় পেয়াদা,
না না যাবে আরো দুজন জেয়েদা।
কি বল মালতী!
মালতী
দস্তুর তাই।
ক্ষীরো
হাতকড়ি দিয়ে বেঁধে আনা চাই।
তারিণী
ওপাড়ার মতি রাণীমাতাজির
চরণে দেখতে হয়েছে হাজির।
ক্ষীরো
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে।
ক্ষীরো
নবাবের ঘরে।
কোন্ কায়দায় লোকে দেখা করে।
মালতী
কুর্ণিস্ করে ঢোকে মাথা নুয়ে,
পিছু হটে যায় মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে।
ক্ষীরাে
নিয়ে এস সাথে, যাও ত মালতী,
কুর্ণিস্ করে আসে যেন মতি।
(মতিকে লইয়া মালতীর পুনঃ প্রবেশ)
মালতী
মাথা নীচু কর। মাটি ছোঁও হাতে,
লাগাও হাতটা নাকের ডগাতে।
তিন পা এগোও, নীচু কর মাথা।
মতি
আর ত পারিনে, ঘাড়ে হল ব্যথা।
মালতী
তিনবার নাকে লাগাও হাতটা।
মতি
টন্ টন্ করে পিঠের বাতটা।
মালতী
তিন পা এগােও, তিনবার ফের
ধূলো তুলে নেও ডগায় নাকের।
মতি
ঘাট হয়েছিল এসেছি এ পথ,
এর চেয়ে সিধে নাকে দেওয়া খৎ।
জয় রাণীমার, একাদশী আজি।
ক্ষীরো
রাণীর জ্যোতিষী শুনিয়েছে পাঁজি।
কবে একাদশী, কবে কোন্ বার
লোক আছে মোর তিথি গোন্বার।
মতি
টাকাটা শিকেটা যদি কিছু পাই
জয় জয় বলে বাড়ি চলে যাই।
ক্ষীরো
যদি নাই পাও তবু যেতে হবে,
কুর্ণিস্ করে’ চলে’ যাও তবে।
মতি
ঘড়া ঘড়া টাকা ঘরে গড়াগড়ি
তবু কড়াকড় দিতে কড়াকড়ি।
ক্ষীরো
ঘরের জিনিস ঘরেরি ঘড়ায়
চিরদিন যেন ঘরেই গড়ায়।
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
এবার মাগীরে
কুর্ণিস করে নিয়ে যাও ফিরে।
মতি
চল্লেম হবে।
মালতী
রােস, ফিরাে নাকো,
তিনবার মাটি তুলে নাকে মাখো।
তিন পা কেবল হটে যাও পিছু,
পােড়ো না উল্টে, মাথা কর নিচু।
মতি
হায়, কোথা এনু, ভরল না পেট,
বারে বারে শুধু মাথা হল হেঁট।
আহা কল্যাণী রাণীর ঘরে
কর্ণ জুড়ােয় মধুর স্বরে,―
কড়ি যদি দেন অমূল্য তাই,―
হেথা হীরে মােতি সেও অতি ছাই।
ক্ষীরো
সে-ছাই পাবার ভরসা কোরাে না।
মালতী
সাবধানে হঠ, উল্টে পােড়ো না।
(মতির প্রস্থান)
ক্ষীরো
বিনি!
বিনি
রাণী মাসী!
ক্ষীরো
একগাছি চুডি
হাত থেকে তোর গেছে না কি চুরি?
বিনি
চুরি ত যায় নি।
ক্ষীরো
গিয়েছে হারিয়ে?
বিনি
হারায় নি।
ক্ষীরো
কেউ নিয়েছে ভাঁড়িয়ে?
বিনি
না গো রাণী মাসী!
ক্ষীরো
এটাতো মানিস্
পাখা নেই তার! একটা জিনিষ
হয় চুরি যায়, নয় ত হারায়,
নয় মারা যায় ঠগের দ্বারায়;
তা না হলে থাকে, এ ছাড়া তাহার
কি যে হতে পারে জানিনে ত আর।
বিনি
দান করেছি সে।
ক্ষীরো
দিয়েছিস্ দানে?
ঠকিয়েছে কেউ, তারি হল মানে।
কে নিয়েছে বল?
বিনি
মল্লিকা দাসী।
এমন গরীব নেই রাণী মাসী।
ঘরে আছে তার সাত ছেলে মেয়ে
মাস পাঁচছয় মাইনে না পেয়ে
খরচ পত্র পাঠাতে পারে না
দিনে দিনে তার বেড়ে যায় দেনা,
কেঁদে কেঁদে মরে, তাই চুড়িগাছি
নুকিয়ে তাহারে দান করিয়াছি।
অনেক ত চুড়ি আছে মোর হাতে
একখানা গেলে কি হবে তাহাতে।
ক্ষীরো
বোকা মেয়েটার শোন ব্যাখ্যানা।
একখানা গেলে গেল একখানা,
সে যে একেবারে ভারি নিশ্চয়।
কে না জানে যেটা রাখ সেটা রয়,
যেটা দিয়ে ফেল সেটা ত রয় না,
এর চেয়ে কথা সহজ হয় না।
অল্পস্বল্প যাদের আছে
দানে যশ পায় লোকের কাছে;
ধনীর দানেতে ফল নাহি ফলে,
যত দেও তত পেট বেড়ে চলে,
কিছুতে ভরে না লোকের স্বার্থ,
ভাবে, আরো ঢের দিতে যে পার্ত।
অতএব বাছা হবি সাবধান,
বেশি আছে বলে করিসনে দান।
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
বোকা মেয়েটি এ,
এরে দুটো কথা দাও সম্জিয়ে।
মালতী
রাণীর বোন্ঝি রাণীর অংশ,
তফাতে থাক্বে উচ্চ বংশ;
দান করা-টরা যত হয় বেশি
গরীবের সাথে তত ঘেঁষাঘেঁষি।
পুরোণো শাস্ত্রে লিখেছে শোলোক,
গরীবের মত নেই ছোটলোক।
ক্ষীরো
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
মল্লিকাটারে
আর ত রাখা না।
মালতী
তাড়াব তাহারে;
ছেলেমেয়েদের দয়ার চর্চ্চা
বেড়ে গেলে, সাথে বাড়বে খরচা।
ক্ষীরো
তাড়াবার বেলা হয়ে আনমনা
বালাটা সুদ্ধ যেন তাড়িয়ো না।
বাহিরের পথে কে বাজায় বাঁশি
দেখে আয় মোর ছয় ছয় দাসী।
(তারিণীর প্রস্থান ও পুনঃ প্রবেশ)
তারিণী
মধুদত্তর পৌত্রের বিয়ে
ধুম করে’ তাই চলে পথ দিয়ে।
ক্ষীরো
রাণীর বাড়ির সাম্নের পথে
বাজিয়ে যাচ্চে কি নিয়ম মতে?
বাঁশির বাজনা রাণী কি সইবে?
মাথা ধরে’ যদি থাক্ত দৈবে?
যদি ঘুমোতেন, কাঁচা ঘুমে জেগে
অসুখ করত যদি রেগেমেগে?
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
নবাবের ঘরে
এমন কাণ্ড ঘট্লে কি করে?
মালতী
যার বিয়ে যায় তারে ধরে আনে,
দুই বাঁশিওয়ালা তার দুই কানে
কেবলি বাজায় দুটো দুটো বাঁশি;
তিন দিন পরে দেয় তারে ফাঁসি।
ক্ষীরো
ডেকে দাও কোথা আছে সর্দ্দার,
নিয়ে যাক্ দশ জুতোবর্দ্দার,
ফি লোকের পিঠে দশঘা চাবুক
সপাসপ্ বেগে সজোরে নাবুক।
মালতী
তবু যদি কারো চেতনা না হয়,
বন্দুক দিলে হবে নিশ্চয়।
১মা
ফাঁসি হল মাপ, বড় গেল বেঁচে,
জয় জয় বলে বাড়ি যাবে নেচে।
২য়া
প্রসন্ন ছিল তাদের গ্রহ,
চাবুক ক’ঘা ত অনুগ্রহ।
৩য়া
বলিস্ কি ভাই ফাঁড়া গেল কেটে,
আহা এত দয়া রাণীমার পেটে!
ক্ষীরো
থাম্ তোরা, শুনে নিজে গুণগান
লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে কান।
বিনি!
বিনি
রাণী মাসী!
ক্ষীরো
স্থির হয়ে র’বি
ছট্ফট্ করা বড় বে-আদবী।
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরাে
মেয়েরা এখনো
শেখেনি আমিরী দস্তুর্ কোনাে।
মালতী
(বিনির প্রতি) রাণীর ঘরের ছেলেমেয়েদের
ছট্ফট্ করা ভারি নিন্দের।
ইতর লোকেরি ছেলেমেয়েগুলো
হেসে খুসে ছুটে করে খেলাধূলো।
রাজা রাণীদের পুত্র কন্য়ে
অধীর হয় না কিছুরি জন্যে।
হাত পা সাম্লে খাড়া হয়ে থাক
রাণীর সাম্নে নোড়ো চোড়ো নাক।
ক্ষীরো
ফের গোলমাল করচে কাহারা?
দরজায় মাের নাই কি পাহারা?
তারিণী
প্রজারা এসেছে নালিশ করতে।
ক্ষীরো
আর কি জায়গা ছিল না মরতে?
মালতী
প্রজার নালিশ শুন্বে রাজ্ঞী
ছোটলোকদের এত কি ভাগ্যি!
১মা
তাই যদি হবে তবে অগণ্য
নোকর চাকর কিসের জন্য?
২য়া
নিজের রাজ্যে রাখতে দৃষ্টি
রাজা রাণীদের হয় নি সৃষ্টি।
তারিণী
প্রজারা বল্চে কর্ম্মচারী
পীড়ন তাদের করচে ভারী।
নাই মায়া দয়া নাইক ধর্ম্ম,
বেচে নিতে চায় গায়ের চর্ম্ম।
বলে তারা, হায় কি করেছি পাপ,
এত ছোট মোরা, এত বড় চাপ।
ক্ষীরো
শর্সেও ছােট, তবু সে ভােগায়,
চাপ না পেলে কি তৈল যােগায়?
টাকা জিনিষটা নয় পাকা ফল,
টুপ্ করে খসে’ ভরে না আঁচল;
ছিঁড়ে নাড়া দিয়ে ঠেঙার বাড়িতে
তবে ও জিনিষ হয় যে পাড়িতে।
তারিণী
সেজন্যে না মা,—তােমার খাজনা
বঞ্চনা করা তাদের কাজ না।
তারা বলে যত আম্লা তােমার
মাইনে না পেয়ে হয়েছে গােঙার।
লুট্ পাট্ করে মারচে প্রজা,
মাইনে পেলেই থাক্বে সােজা।
ক্ষীরো
রাণী বটি, ওবু নইক বােকা,
পারবে না দিতে মিথ্যে ধোঁকা;
করবেই তারা দস্যুবৃত্তি,
মাইনেটা দেওয়া মিথ্যে মিথ্যি।
প্রজাদের ঘরে ডাকাতী করে
তা বলে করবে রাণীরো ঘরে?
তারিণী
তারা বলে রাণী কল্যাণী যে
নিজের রাজ্য দেখেন নিজে।
নালিশ শােনেন নিজের কানেই,
প্রজাদের পরে জুলুমটা নেই।
ক্ষীরো
ছােটমুখে বলে বড় কথাগুলা,
আমার সঙ্গে অন্যের তুলা?
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরাে
কি কর্ত্তব্য?
মালতী
জরিমানা দিক্ যত অসভ্য
একশো একশো।
ক্ষীরো
গরীব ওরা যে,
তাই একেবারে একশাের মাঝে
নব্বই টাকা করে দিনু মাপ।
১মা
আহা গরীবের তুমিই মা বাপ।
২য়া
কার মুখ দেখে উঠেছিল প্রাতে,
নব্বই টাকা পেল হাতে হাতে।
৩য়া
নব্বই কেন, যদি ভেবে দেখে,
আরো ঢের টাকা নিয়ে গেল ট্যাঁকে।
হাজার টাকার নশো নব্বই
চখের পলকে পেল সর্ব্বই।
৪র্থী
একদমে ভাই এত দিয়ে ফেলা,
অন্যে কে পারে, এ ত নয় খেলা!
ক্ষীরো
বলিস নে আর মুখের আগে,
নিজ গুণ শুনে সরম লাগে।
বিনি!
বিনি
রাণী মাসি!
ক্ষীরো
হঠাৎ কি হল!
ফোঁস্ ফোঁস্ করে কাঁদিস্ কেন লো?
দিন রাত আমি বকে বকে খুন,
শিখলিনে কিছু কায়দা কানুন?
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
এই মেয়েটাকে
শিক্ষা না দিলে মান নাহি থাকে।
মালতী
রাণীর বোন্ঝি জগতে মান্য,
বোঝ না এ কথা অতি সামান্য।
সাধারণ যত ইতর লোকেই
সুখে হাসে, কাঁদে দুঃখ শোকেই।
তোমাদেরো যদি তেম্নি হবে,
বড়লোক হয়ে হল কি তবে?
(একজন দাসীর প্রবেশ)
দাসী
মাইনে না পেলে মিথ্যে চাক্রী,
বাঁধা দিয়ে এনু কানের মাক্ড়ি।
ধার করে খেয়ে পরের গোলামী
এমন কখনো শুনিনি ত আমি।
মাইনে চুকিয়ে দাও, তা না হলে
ছুটি দাও আমি ঘরে যাই চলে।
ক্ষীরো
মাইনে চুকোনো নয়ক মন্দ,
তবু ছুটিটাই মোর পছন্দ।
বড় ঝঞ্ঝাট্ মাইনে বাঁটতে,
হিসেব কিতেব হয় যে ঘাঁটতে।
ছুটি দেওয়া যায় অতি সত্বর,
খুল তে হয় না খাতা পত্তর।
ছ-ছয় পেয়াদা ধরে আসি কেশ,
নিমেষ ফেল তে কর্ম্ম নিকেশ।
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
সাথে যাও ওর
ঝেড়ে ঝুড়ে নিয়ো কাপড় চোপড়,
ছুটি দেয় যেন দরোয়ান যত
হিন্দুস্থানী দস্তুর মত।
মালতী
বুঝেছি রাণীজি!
ক্ষীরো
আচ্ছা তাহ’লে
কুর্ণিস্ করে যাক্ বেটী চলে।
(কুর্ণিস্ করাইয়া দাসীকে বিদায়)
দাসী
দুয়ারে রাণী মা দাঁড়িয়ে আছে কে
বড় লোকের ঝি মনে হয় দেখে।
ক্ষীরো
এসেছে কি হাতী কিম্বা রথে?
দাসী
মনে হল যেন হেঁটে এল পথে।
ক্ষীরো
কোথা তবে তার বড়লোকত্ব?
দাসী
রাণীর মতন মুখটি সত্য।
ক্ষীরো
মুখে বড়লোক লেখা নাহি থাকে,
গাড়ি ঘোড়া দেখে চেনা যায় তাকে।
(মালতীর প্রবেশ)
মালতী
রাণী কল্যাণী এসেছেন দ্বারে
রাণীজির সাথে দেখা করিবারে।
ক্ষীরো
হেঁটে এসেছেন?
মালতী
শুন্চি তাইত!
ক্ষীরো
তাহ’লে হেথায় উপায় নাই ত।
সমান আসন কে তাহারে দেয়?
নীচু আসনটা সেও অন্যায়!
এ এক বিষম হল সমিস্যে,
মীমাংসা এর কে করে বিশ্বে?
১মা
মাঝখানে রেখে রাণীজির গদি
তাহার আসন দূরে রাখি যদি!
২য়া
ঘুরায়ে যদি এ আসনখানি
পিছন ফিরিয়া বসেন রাণী!
৩য়া
যদি বলা যায় ফিরে যাও আজ,
ভাল নেই বড় রাণীর মেজাজ।
ক্ষীরো
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে
ক্ষীরো
কি করি উপায়?
মালতী
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যদি সারা যায়
দেখা শোনা, তবে সব গোল মেটে।
ক্ষীরো
এত বুদ্ধিও আছে তোর পেটে!
সেই ভাল। আগে দাঁড়া সার বাঁধি
আমার একশো পঁচিশটে বাঁদী।
ও হল না ঠিক,―পাঁচ পাঁচ করে
দাঁড়া ভাগে ভাগে—তোরা আয় সরে,—
না না এই দিকে,—না না কাজ নেই,
সারি সারি তোরা দাঁড়া সাম্নেই,—
না না তাহ’লে যে মুখ যাবে ঢেকে
কোনাকুনি তোরা দাঁড়া দেখি বেঁকে।
আচ্ছা তাহ’লে ধরে হাতে হাতে
খাড়া থাক্ তোরা একটু তফাতে।
শশি, তুই সাজ ছত্রধারিণী,
চামরটা নিয়ে দোলাও তারিণী!
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
এইবার তারে
ডেকে নিয়ে আয় মোর দরবারে।
(মালতীর প্রস্থান)
কিনি বিনি কাশী স্থির হয়ে থাকো,
খবর্দ্দার্ কেউ নোড়ো চোড়ো নাকো।
মোর দুই পাশে দাঁড়াও সকলে
দুই ভাগ করি।
(কল্যাণী ও মালতীর প্রবেশ)
কল্যাণী
আছ ত কুশলে?
ক্ষীরো
আমার চেষ্টা কুশলেই থাকি,
পরের চেষ্টা দেবে মোরে ফাঁকি,
এই ভাবে চলে জগৎ সুদ্ধ
নিজের সঙ্গে পরের যুদ্ধ।
কল্যাণী
ভাল আছ বিনি?
বিনি
ভালই আছি মা,
স্নান কেন দেখি সোনার প্রতিমা?
ক্ষীরো
বিনি করিস নে মিছে গোলযোগ,
ঘুচল না তোর কথা-কওয়া রোগ?
কল্যাণী
রাণী, যদি কিছু না কর মনে,
কথা আছে কিছু কব গোপনে।
ক্ষীরো
আর কোথা যাব, গোপন এই ত,
তুমি আমি ছাড়া কেহই নেই ত।
এরা সব দাসী, কাজ নেই কিছু,
রাণীর সঙ্গে ফেরে পিছু পিছু।
হেথা হতে যদি করে দিই দূর
হবে না ত সেটা ঠিক দস্তুর।
কি বল মালতী?
মালতী
আজ্ঞে তাইত।
দস্তুর মত চলাই চাই ত।
ক্ষীরো
সোনার বাটাটা কোথায় কে জানে!
খুঁজে দেখ্ দেখি।
দাসী
এই যে এখানে।
ক্ষীরো
ওটা নয়, সেই মুক্তো-বসানো
আরেকটা আছে সেইটেই আনো।
(অন্য বাটা আনয়ন)
খয়েরের দাগ লেগেছে ডালায়,
বাঁচিনে ত আর তোদের জ্বালায়!
তবে নিয়ে আয় চুনীর সে বাটা,
না না নিয়ে আয় পান্না-দেওয়াটা।
কল্যাণী
কথাটা আমার নিই তবে বলে।
পাঠান বাদ্শা অন্যায় ছলে
রাজ্য আমার নিয়েছেন কেড়ে,―
ক্ষীরো
বল কি! তাহ’লে গেছে ফুল্বেড়ে,
গিরিধরপুর, গোপাল নগর,
কানাইগঞ্জ—
কল্যাণী
সব গেছে মোর।
ক্ষীরো
হাতে আছে কিছু নগদ টাকা কি?
কল্যাণী
সব নিয়ে গেছে, কিছু নেই বাকি।
ক্ষীরো
অদৃষ্টে ছিল এত দুখ তাের!
গয়না যা ছিল হীরে মুক্তোর,
সেই বড় বড় নীলার কণ্ঠি
কানবালা যােড়া বেড়ে গড়নটি,
সেই যে চুনীর পাঁচনলীহার
হীরে-দেওয়া সীঁথি লক্ষ টাকার,
সেগুলো নিয়েছে বুঝি লুটে পুটে?
কল্যাণী
সব নিয়ে গেছে সৈন্যেরা জুটে।
ক্ষীরো
আহা তাই বলে ধনজনমান
পদ্মপত্রে জলের সমান।
দামী তৈজস ছিল যা পুরােণো
চিহ্নও তার নেই বুঝি কোনো?
সেকালের সব জিনিষপত্র
আসাসােটাগুলো চামরছত্র
চাঁদোয়া কানাৎ, গেছে বুঝি সব?
শাস্ত্রে যে বলে ধন বৈভব
তড়িৎ সমান, মিথ্যে সে নয়!
এখন তাহ’লে কোথা থাকা হয়?
বাড়িটা ত আছে?
কল্যাণী
ফৌজের দল
প্রাসাদ আমার করেছে দখল।
ক্ষীরো
ওম। ঠিক এ যে শোনায় কাহিনী,
কাল ছিল রাণী আজ ভিখারিণী।
শাস্ত্রে তাই ত বলে সব মায়া,
ধনজন তালবৃক্ষের ছায়া।
কি বল মালতী?
মালতী
তাইত বটেই
বেশি বাড় হলে পতন ঘটেই।
কল্যাণী
কিছু দিন যদি হেথায় তোমার
আশ্রয় পাই, করি উদ্ধার
আবার আমার রাজ্যখানি;
অন্য উপায় নাহিক জানি।
ক্ষীরো
আহা, তুমি রবে আমার হেথায়
এ ত বেশ কথা, সুখেরি কথা এ।
১মা
আহা কত দয়া।
২য়া
মায়ার শরীর।
৩য়া
আহা, দেবী তুমি, নও পৃথিবীর।
৪র্থী
হেথা ফেরেনাক অধম পতিত,
আশ্রয় পায় অনাথ অতিথ।
ক্ষীরো
কিন্তু একটা কথা আছে বোন!
বড় বটে মোর প্রাসাদ ভবন,
তেমনি যে ঢের লোকজন বেশি
কোন মতে তারা আছে ঠেসাঠেসি।
এখানে তোমার জায়গা হবে না
সে একটা মহা বয়েছে ভাবনা।
তবে কিছু দিন যদি ঘর ছেড়ে
বাইরে কোথাও থাকি তাঁবু পেড়ে—
১মা
ওমা সে কি কথা!
২য়া
তাহ’লে রাণীমা
রবে না তোমার কষ্টের সীমা।
৩য়া
যে-সে তাঁবু নয়, তবু সে তাঁবুই,
ঘর থাক্তে কি ভিজবে বাবুই?
৫মী
দয়া করে কত নাব্বে নাবোতে,
রাণী হয়ে কি না থাক বে তাঁবুতে?
৬ষ্ঠী
তোমার সে দশা দেখলে চক্ষে
অধীনগণের বাজবে বক্ষে।
কল্যাণী।
কাজ নেই রাণী সে অসুবিধায়,
আজকের তবে লইনু বিদায়।
ক্ষীরো
যাবে নিতান্ত! কি করব ভাই
ছুঁচ ফেলবার জায়গাটি নাই।
জিনিষপত্র লোক-লস্করে
ঠাসা আছে ঘর—কারে ফস্ করে
বসতে বলি যে তার যোটি নেই।
ভাল কথা! শোন, বলি গোপনেই,―
গয়নাপত্র কৌশলে রাতে
দু দশটা যাহা পেরেছ সরাতে
মোর কাছে দিলে রবে যতনেই।
কল্যাণী
কিছুই আনিনি, শুধু হের এই
হাতে দুটি চুড়ি, পায়েতে নূপুর।
ক্ষীরো
আজ এস তবে বেজেছে দুপুর;―
শরীর ভাল না, তাইতে সকালে
মাথা ধরে যায় অধিক বকালে।
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
জানে না কানাই
স্নানের সময় বাজবে শানাই?
মালতী
বেটারে উচিত করব শাসন।
(কল্যাণীর প্রস্থান)
ক্ষীরো
তুলে রাখ মোর রত্ন আসন,―
আজকের মত হল দরবার।
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
নাম করবার
সুখ ত দেখলি।
মালতী
হেসে নাহি বাঁচি,―
ব্যাং থেকে কেঁচে হলেন ব্যাঙাচি।
ক্ষীরো
আমি দেখ বাছা নাম-করাকরি,
যেখানে সেখানে টাকা-ছড়াছড়ি,
জড় করে’ দল ইতর লোকের
জাঁকজমকের লোক-চমকের
যত রকমের ভণ্ডামি আছে
ঘেঁসিনে কখনো ভুলে তার কাছে।
১মা
রাণীর বুদ্ধি যেমন সারালো,
তেম্নি ক্ষুরের মতন ধারালো।
২য়া
অনেক মুখে করে দান ধ্যান,
কার আছে হেন কাণ্ডজ্ঞান।
৩য়া
রাণীর চক্ষে ধূলো দিয়ে যাবে
হেন লোক হেন ধূলো কোথা পাবে?
ক্ষীরাে
থাম্ থাম্ তােরা রেখে দে বকুনি
লজ্জা করে যে নিজ গুণ শুনি।
মালতী!
মালতী
আজ্ঞে!
ক্ষীরো
ওদের গয়না
ছিল যা এমন কাহারো হয় না।
দুখানি চুড়িতে ঠেকেচে শেষে
দেখে আমি আর বাঁচিনে হেসে।
তবু মাথা যেন নুইতে চায় না,
ভিখ্ নেবে তবু কতই বায়না।
পথে বের হল পথের ভিখারী
ভুল্তে পারে না তবু রাণীগিরি।
নত হয় লোক বিপদে ঠেক্লে
পিত্তি জ্বলে যে দেমাক্ দেখলে।
আবার কিসের শুনি কোলাহল?
মালতী
দুয়ারে এসেছে ভিক্ষুকদল।
আকাল পড়েছে, চালের বস্তা
মনের মতন হয়নি সস্তা,
তাইতে চেঁচিয়ে খাচ্চে কানটা
বেতটি পড়লে হবেন ঠাণ্ডা।
ক্ষীরো
রাণী কল্যাণী আছেন দাতা,
মোর দ্বারে কেন হস্ত পাতা!
বলে দে আমার পাঁড়েজি বেটাকে
ধরে নিয়ে যাক্ সকল কটাকে
দাতা কল্যাণী রাণীর ঘরে,
সেথায় আসুক্ ভিক্ষে করে।
সেখানে যা পাবে এখানে তাহার
আরো পাঁচ গুণ মিল্বে আহার।
১মা
হা হা হা! কি মজা হবেই না জানি।
২য়া
হাসিয়ে হাসিয়ে মারলেন রাণী।
৩য়া
আমাদের রাণী এতও হাসান্।
৪র্থী
দু চোখ চক্ষু জলেতে ভাসান্।
(দাসীর প্রবেশ)
দাসী
ঠাক্রুণ এক এসেছেন দ্বারে
হুকুম পেলেই তাড়াই তাঁহারে।
ক্ষীরো
না না ডেকে দে না! আজ কি জন্য
মন আছে মোর বড় প্রসন্ন।
(ঠাকুরাণীর প্রবেশ)
ঠাকুরাণী
বিপদে পড়েছি তাই এনু চলে।
ক্ষীরো
সে ত জানা কথা! বিপদে না পলে
শুধু যে আমার চাঁদ মুখখানি
দেখতে আসনি সেটা বেশ জানি।
ঠাকুরাণী
চুরি হয়ে গেছে ঘরেতে আমার—
ক্ষীরো
মোর ঘরে বুঝি শোধ নেবে তার!
ঠাকুরাণী
দয়া করে যদি কিছু কর দান
এ যাত্রা তবে বেঁচে যায় প্রাণ।
ক্ষীরো
তোমার যা কিছু নিয়েছে অন্যে
দয়া চাও তুমি তার জন্যে!
আমার যা তুমি নিয়ে যাবে ঘরে
তার তরে দয়া আমায় কে করে?
ঠাকুরাণী
ধনসুখ আছে যার ভাণ্ডারে
দানসুখে তার সুখ আরো বাড়ে।
গ্রহণ যে করে তারি হেঁট মুখ,
দুঃখের পরে ভিক্ষার দুখ।
তুমি সক্ষম আমি নিরুপায়
অনায়াসে পার ঠেলিবারে পায়;
ইচ্ছা না হয় নাই কোরো দান
অপমানিতেরে কেন অপমান?
চলিলাম তবে, বল দয়া করে
বাসনা পূরিবে গেলে কার ঘরে?
ক্ষীরো
রাণী কল্যাণী নাম শোন নাই?
দাতা বলে তাঁর বড় যে বড়াই।
এইবার তুমি যাও তাঁরি ঘরে
ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে এস ভরে,
পথ না জান ত মোর লোকজন
পৌঁছিয়ে দেবে রাণীর ভবন।
ঠাকুরাণী
তবে তথাস্তু! যাই তাঁরি কাছে।
তাঁর ঘর মোর খুব জানা আছে।
আমি সে লক্ষ্মী, তাের ঘরে এসে
অপমান পেয়ে ফিরিলাম শেষে।
এই কথা ক’টি করিয়ো স্মরণ—
ধনে মানুষের বাড়ে নাক মন।
আছে বহু ধনী আছে বহু মানী
সবাই হয় না রাণী কল্যাণী।
ক্ষীরো
যাবে যদি তবে ছেড়ে যাও মােরে
দস্তুরমত কুর্ণিস্ করে।
মালতী! মালতী! কোথায় তারিণী!
কোথা গেল মাের চামরধারিণী!
আমার একশো পঁচিশটে দাসী!
তােরা কোথা গেলি বিনি কিনি কাশী!
(কল্যাণীর প্রবেশ)
কল্যাণী
পাগল হলি কি! হয়েছে কি তাের?
এখনো যে রাত হয়নিক ভাের!
বল্ দেখি কি যে কাণ্ড কল্লি?
ডাকাডাকি করে জাগালি পল্লী?
ক্ষীরাে
ওমা তাইত গা! কি জানি কেমন
সারারাত ধরে দেখেছি স্বপন।
বড় কূস্বপ্ন দিয়েছিল বিধি,
স্বপনটা ভেঙে বাঁচলেম দিদি।
একটু দাঁড়াও, পদধুলি লব;
তুমি রাণী আমি চিরদাসী তব।
২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৩০৪
সতী
সতী
রণক্ষেত্র
অমাবাই ও বিনায়ক রাও
অমাবাই
পিতা!
বিনায়ক রাও
পিতা! আমি তাের পিতা! পাপীয়সি
স্বাতন্ত্র্যচারিণী! যবনের গৃহে পশি
ম্লেচ্ছগলে দিলি মালা কুলকলঙ্কিনী!
আমি তাের পিতা!
অমাবাই।
অন্যায় সমরে জিনি
স্বহস্তে বধিলে তুমি পতিরে আমার,
হায় পিতা, তবু তুমি পিতা! বিধবার
অশ্রুপাতে পাছে লাগে মহা অভিশাপ
তব শিরে, তাই আমি দুঃসহ সন্তাপ
রুদ্ধ করি রাখিয়াছি এ বক্ষ পঞ্জরে।
তুমি পিতা, আমি কন্যা, বহুদিন পরে
হয়েছে সাক্ষাৎ দোঁহে সমর অঙ্গনে
দারুণ নিশিথে। পিতঃ প্রণমি’ চরণে
পদধূলি তুলি শিরে লইব বিদায়।
আজ যদি নাহি পার ক্ষমিতে কন্যায়
আমি তবে ভিক্ষা মাগি বিধাতার ক্ষমা
তােমা লাগি পিতৃদেব!
বিনায়ক রাও
কোথা যাবি অমা!
ধিক্ অশ্রুজল! ওরে দুর্ভাগিনী নারী
যে বৃক্ষে বাঁধিলি নীড় ধর্ম্ম না বিচারি’
সে ত বজ্রাহত দগ্ধ, যাবি কার কাছে
ইহকাল-পরকাল হারা!
অমাবাই
পুত্র আছে—
বিনায়ক রাও
থাক্ পুত্র! ফিরে আর চাস্নে পশ্চাতে
পাতকের ভগ্নশেষ পানে। আজ রাতে
শােণিত-তর্পণে তাের প্রায়শ্চিত্ত শেষ,—
যবনের গৃহে তাের নাহিক প্রবেশ
আর কভু। বল্ তবে কোথা যাবি আজ!
অমাবাই
হে নির্দ্দয়! আছে মৃত্যু, আছে যমরাজ,
পিতা হতে স্নেহময়, মুক্তদ্বারে যাঁর
আশ্রয় মাগিয়া কেহ ফিরে নাই আর।
বিনায়ক রাও
মৃত্যু? বৎসে! হা দুর্বৃত্তে! পরম পাবক
নির্ম্মল উদার মৃত্যু—সকল পাতক
করে গ্রাস—সিন্ধু যথা সকল নদীর
সব পঙ্করাশি। সেই মৃত্যু সুগভীর
তোর মুক্তি গতি। কিন্তু মৃত্যু আজ না সে,
নহে হেথা। চল্ তবে দূর তীর্থবাসে
সলজ্জ স্বজন আর সক্রোধ সমাজ
পরিহরি; বিসর্জ্জি কলঙ্ক ভয় লাজ
জন্মভূমি ধূলিতলে। সেথা গঙ্গাতীরে
নবীন নির্ম্মল বায়ু;—স্বচ্ছ পুণ্যনীরে
তিন সন্ধ্যা স্নান করি’, নির্জ্জন কুটীরে
শিব শিব শিব নাম জপি শান্ত মনে,
সুদূর মন্দির হতে সায়াহ্ন পবনে
শুনিয়া আরতিধ্বনি,―একদিন কবে
আয়ুঃশেষে মৃত্যু তোরে লইবে নীরবে,―
পতিত কুসুমে লয়ে পঙ্ক ধুয়ে তার
গঙ্গা যথা দেয় তারে পূজা উপহার
সাগরের পদে।
অমাবাই।
পুত্র মোর!
বিনায়ক রাও
তার কথা
দূব কর। অতীত-নির্ম্মুক্ত পবিত্রতা
ধৌত করে দিক্ তোরে। সদ্য শিশুসম
আরবার আয় বৎসে পিতৃকোলে মম
বিস্মৃতি মাতার গর্ভ হতে। নব দেশে,
নব তরঙ্গিনীতীরে, শুভ্র হাসি হেসে
নবীন কুটীরে মোর জ্বালাবি আলোক
কন্যার কল্যাণ করে।
অমাবাই
জ্বলে পতিশোক,
বিশ্ব হেরি ছায়াসম; তোমাদের কথা
দূব হতে আনে কানে ক্ষীণ অস্ফুটতা,
পশে না হৃদয়মাঝে। ছেড়ে দাও মোরে,
ছেড়ে দাও! পতিরক্তসিক্ত স্নেহডোরে
বেঁধো না আমায়।
বিনায়ক রাও
কন্যা নহেক পিতার।
শাখাচ্যুত পুষ্প শাখে ফিরেনাক আর।
কিন্তু রে শুধাই তোরে কারে ক’স্ পতি
লজ্জাহীনা! কাড়ি নিল যে ম্লেচ্ছ দুর্ম্মতি
জীবাজির প্রসারিত বরহস্ত হতে
বিবাহের রাত্রে তোরে-বঞ্চিয়া কপােতে
শ্যেন যথা লয়ে যায় কপোত-বধূরে
আপনার ম্লেচ্ছ নীড়ে,—সে দুষ্ট দস্যুরে
পতি ক’স তুই!—সে রাত্রি কি মনে পড়ে?
বিবাহ সভায় সবে উৎসুক অন্তরে
বসে আছি,―শুভলগ্ন হল গত প্রায়,―
জীবাজি আসে না কেন সবাই শুধায়,
চায় পথপানে। দেখা দিল হেনকালে
মশালের রক্তরশ্মি নিশীথের ভালে,
শুনা গেল বাদ্যরব। হর্ষে উচ্ছ্বসিল
অন্তঃপুরে হুলুধ্বনি। দুয়ারে পশিল
শতেক শিবিকা; কোথা জীবাজি কোথায়
শুধাতে না শুধাতেই, ঝটিকার প্রায়
অকস্মাৎ কোলাহলে হতবুদ্ধি করি’
মুহূর্ত্তের মাঝে তােরে বলে অপহরি
কে কোথা মিলাল। ক্ষণপরে নতশিরে
জীবাজি বন্ধনমুক্ত এল ধীরে ধীরে―
শুনিনু কেমনে তারে বন্দী করি পথে,
লয়ে তার দ্বীপমালা, চড়ি তার রথে,
কাড়ি লয়ে পরি তার বর-পরিচ্ছদ
বিজাপুর যবনের রাজসভাসদ্
দস্যুবৃত্তি করি গেল। সে দারুণরাতে
হােমাগ্নি করিয়া স্পর্শ জীবাজির সাথে
প্রতিজ্ঞা করিনু আমি—দস্যুরক্তপাতে
লব এর প্রতিশোধ। বহুদিন পরে
হয়েছি সে পণমুক্ত। নিশীথ সমরে
জীবাজি ত্যজিয়া প্রাণ বীরের সদ্গতি
লভিয়াছে। রে বিধবা, সেই তাের পতি,―
দস্যু সে ত ধর্ম্মনাশী!
অমাবাই
ধিক্ পিতা, ধিক্!
বধেছ পতিরে মাের—আরো মর্ম্মান্তিক
এই মিথ্যা বাক্যশেল। তব ধর্ম্ম কাছে
পতিত হয়েছি, তবু মম ধর্ম্ম আছে।
সমুজ্জ্বল। পত্নী আমি, নহি সেবাদাসী।
বরমাল্যে বরেছিনু তাঁরে ভালবাসি
শ্রদ্ধাভরে; ধরেছিনু পতির সন্তান
গর্ভে মাের,―বলে করি নাই আত্মদান।
মনে আছে দুই পত্র একদিন রাতে
পেয়েছিনু অন্তঃপুরে গুপ্তদূতী হাতে।
তুমি লিখেছিলে শুধু,—“হান তারে ছুরি,”
মাতা লিখেছিল, “পত্রে বিষ দিনু পূরি
কর তাহা পান।” যদি বলে পরাজিত
অসহায় সতীধর্ম্ম কেহ কেড়ে নিত
তা হলে কি এতদিন হত না পালন
তোমাদের সে আদেশ? হৃদয় অর্পণ
করেছিনু বীরপদে। যবন ব্রাহ্মণ
সে ভেদ কাহার ভেদ? ধর্ম্মের সে নয়।
অন্তরের আন্তর্যামী যেথা জেগে রয়
সেথায় সমান দোঁহে। মাঝে মাঝে তবু
সংস্কার উঠিত জাগি;―কোন দিন কভু
নিগূঢ় ঘৃণার বেগ শিরায় অধীর
হানিত বিদ্যুৎকম্প,—অবাধ্য শরীর
সঙ্কোচে কুঞ্চিত হত;―কিন্তু তারো পরে
সতীত্ব হয়েছে জয়ী। পূর্ণ ভক্তিভরে
করেছি পতির পূজা; হয়েছি যবনী
পবিত্র অন্তরে; নহি পতিতা রমণী,―
পরিতাপে অপমানে অবনতশিরে
মোর পতিধর্ম্ম হতে নাহি যাব ফিরে
ধর্ম্মান্তরে অপরাধীসম।—এ কি, এ কি!
নিশীথের উল্কাসম এ কাহারে দেখি
ছুটে আসে মুক্তকেশে!
(রমাবাইয়ের প্রবেশ)
জননী আমার!
কখনো যে দেখা হবে এ জনমে আর
হেন ভাবি নাই মনে। মাগো, মা জননি
দেহ তব পদধূলি।
রমাবাই
ছুঁস্নে যবনী
পাতকিনী!
অমাবাই
কোন পাপ নাই মাের দেহে,―
নির্ম্মল তােমারি মত।
রমাবাই
যবনের গেহে
কার কাছে সমর্পিলি ধর্ম্ম আপনার?
অমাবাই
পতি কাছে।
রমাবাই
পতি! ম্লেচ্ছ, পতি সে তােমার!
জানিস্ কাহারে বলে পতি! নষ্টমতি,
ভ্রষ্টাচার! রমণীর সে যে এক গতি,
একমাত্র ইষ্টদেব। ম্লেচ্ছ মুসলমান,
ব্রাহ্মণ কন্যার পতি! দেবতা সমান!
অমাবাই।
উচ্চ বিপ্রকুলে জন্মি’ তবুও যবনে
ঘৃণা করি নাই আমি, কায়বাক্যেমনে
পূজিয়াছি পতি বলি’; মােরে করে ঘৃণা
এমন কে সতী আছে? নহি আমি হীনা
জননী তােমার চেয়ে,―হবে মাের গতি
সতীস্বর্গলোকে।
রমাবাই
সতী তুমি!
অমাবাই
আমি সতী।
রমাবাই
জানিস্ মরিতে অসঙ্কোচে!
অমাবাই
জানি আমি।
রমাবাই
তবে জ্বাল চিতানল! ওই তাের স্বামী
পড়িয়া সমরভূমে।
অমাবাই
জীবাজি?
রমাবাই
জীবাজি।
বাক্দত্ত পতি তাের। তারি ভস্মে আজি
ভস্ম মিলাইতে হবে। বিবাহ রাত্রির
বিফল হােমাগ্নিশিখা শ্মশানভূমির
ক্ষুধিত চিতাগ্নিরূপে উঠেছে জাগিয়া;
আজি রাত্রে সে রাত্রির অসমাপ্ত ক্রিয়া
হবে সমাপন।
বিনায়ক রাও
যাও বৎসে, যাও ফিরে
তব পুত্র কাছে, তব শোকতপ্ত নীড়ে।
দারুণ কর্ত্তব্য মাের নিঃশেষ করিয়া
করেছি পালন,―যাও তুমি।―অয়ি প্রিয়া
বৃথা করিতেছ ক্ষোভ। যে নব শাখারে
আমাদের বৃক্ষ হতে কঠিন কুঠারে
ছিন্ন করি নিয়ে গেল বনান্তর ছায়ে,
সেথা যদি বিশীর্ণা সে মরিত শুকায়ে
অগ্নিতে দিতাম তারে; সে যে ফলেফুলে
নব প্রাণে বিকশিত, নব নব মূলে
নূতন মৃত্তিকা ছেয়ে। সেথা তার প্রীতি,
সেথাকার ধর্ম্ম তার, সেথাকার রীতি।
অন্তরের যােগসূত্র ছিঁড়েছে যখন
তােমার নিয়মপাশ নির্জ্জীব বন্ধন
ধর্ম্মে বাঁধিছে না তারে, বাঁধিতেছে বলে।
ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও!—যাও বৎসে চলে,
যাও তব গৃহকর্ম্মে ফিরে,―যাও তব
স্নেহপ্রীতিজড়িত সংসারে,—অভিনব
ধর্ম্মক্ষেত্র মাঝে। এস প্রিয়ে, মােরা দোঁহে
চলে যাই তীর্থধামে কাটি মায়ামোহে
সংসারের দুঃখ সুখ চক্র আবর্ত্তন
ত্যাগ করি,’—
রমাবাই
তার আগে করিব ছেদন
আমার সংসার হতে পাপের অঙ্কুর
যতগুলি জন্মিয়াছে। করি যাব দূব
আমার গর্ভের লজ্জা। কন্যার কুযশে
মাতার সতীত্বে যেন কলঙ্ক পরশে।
অনলে অঙ্গারসম সে কলঙ্ক কালী
তুলিব উজ্জ্বল করি চিতানল জ্বালি’।
সতীখ্যাতি রটাইর দুহিতার নামে
সতী মঠ উঠাইব এ শ্মশানধামে
কন্যার ভস্মের পরে।
অমাবাই
ছাড় লােকলাজ
লােকখ্যাতি,—হে জননী এ নহে সমাজ,
এ মহাশ্মশানভূমি। হেথা পুণ্যপাপ
লােকের মুখের বাক্যে করিয়ােনা মাপ,—
সত্যেরে প্রত্যক্ষ কর মৃত্যুর আলোকে,
সতী আমি। ঘৃণা যদি করে মোরে লোকে
তবু সতী আমি। পরপুরুষের সনে
মাতা হয়ে বাঁধ যদি মৃত্যুর মিলনে
নির্দ্দোষ কন্যারে―লােকে তােরে ধন্য কবে―
কিন্তু মাতঃ নিত্যকাল অপরাধী র’বে
শ্মশানের অধীশ্বর পদে।
রমাবাই
জ্বাল চিতা,
সৈন্যগণ! ঘের আসি বন্দিনীরে।
অমাবাই
পিতা!
বিনায়ক রাও
ভয় নাই, ভয় নাই! হায় বৎসে হায়
মাতৃহস্ত হতে আজি রক্ষিতে তােমায়
পিতারে ডাকিতে হল।—যেই হস্তে তােরে
বক্ষে বেঁধে রেখেছিনু, কে জানিত ওরে
ধর্ম্মেরে করিতে রক্ষা, দোষীরে দণ্ডিতে
সেই হস্তে একদিন হইবে খণ্ডিতে
তােমারি সৌভাগ্যসূত্র হে বৎসে আমার!
অমাবাই
পিতা!
বিনায়ক রাও
আয় বৎসে! বৃথা আচার বিচার
পুত্রে লয়ে মাের সাথে আয় মোর মেয়ে
আমার আপন ধন। সমাজের চেয়ে
হৃদয়ের নিত্যধর্ম্ম সত্য চিরদিন।
পিতৃস্নেহ নির্ব্বিচার বিকারবিহীন
দেবতার বৃষ্টিসম,―আমার কন্যারে
সেই শুভ স্নেহ হতে কে বঞ্চিতে পারে
কোন্ শাস্ত্র, কোন্ লােক, কোন্ সমাজের
মিথ্যা বিধি, তুচ্ছ ভয়।
রমাবাই
কোথা যাস! ফের!
রে পাপিষ্ঠে, ওই দেখ্, তাের লাগি প্রাণ
যে দিয়েছে রণভূমে,―তার প্রাণদান
নিস্ফল হবে না,―তােরে লইবে সে সাথে
বরবেশে, ধরি তাের মৃত্যুপূত হাতে
শূরস্বর্গ মাঝে। শুন, যত আছ বীর,
তােমরা সকলে ভক্ত ভৃত্য জীবাজির,―
এই তাঁর বাক্দত্তা বধূ,―চিতানলে
মিলন ঘটায়ে দাও মিলিয়া সকলে
প্রভুকৃত্য শেষ কর।
সৈন্যগণ
ধন্য পুণ্যবতী।
অমাবাই
পিতা!
বিনায়ক রাও
ছাড় তােরা!
সৈন্যগণ
যিনি এ নারীর পতি
তাঁর অভিলাষ মােরা করিব পূরণ।
বিনায়ক রাও
পতি এঁর স্বধর্মী যবন।
সেনাপতি
সৈন্যগণ,
বাঁধ বৃদ্ধ বিনায়কে।
অমাবাই
মাতঃ! পাপীয়সি!
পিশাচিনি!
রমাবাই
মুঢ় তােরা কি করিস্ বসি!
বাজা বাদ্য, কর জয়ধ্বনি।
সৈন্যগণ
জয় জয়।
অমাবাই
নারকিনী!
সৈন্যগণ
জয় জয়।
রমাবাই
রটা বিশ্বময়
সতী অমা।
অমাবাই
জাগ, জাগ, জাগ ধর্ম্মরাজ!
শ্মশানের অধীশ্বর, জাগ তুমি আজ।
হের তব মহারাজ্যে করিছে উৎপাত
ক্ষুদ্র শত্রু,― জাগ,’ তারে কর বজ্রাঘাত
দেবদেব! তব নিত্যধর্ম্মে কর জয়ী।
ক্ষুদ্র ধর্ম্ম হতে।
রমাবাই
বল্ জয় পুণ্যময়ী,
বল্ জয় সতী।
সৈন্যগণ
জয় জয় পুণ্যবতী।
অমাবাই
পিতা, পিতা, পিতা মাের!
সৈন্যগণ
ধন্য ধন্য সতী!
২০ শে কার্ত্তিক, ১৩০৪
মিস্ম্যানিং সম্পাদিত ন্যাশনাল ইণ্ডিয়ান্ অ্যাসোসিয়েশনের পত্রিকায় মারাঠি গাথা
সম্বন্ধে অ্যাকওয়র্থ্ সাহেব-রচিত প্রবন্ধ বিশেষ হইতে বর্ণিত ঘটনা সংগৃহীত।