সন্ধ্যা সঙ্গীত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৮১
প্রকাশনা-তথ্য
সন্ধ্যা সঙ্গীত।
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রণীত।
কলিকাতা
আদি ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে
শ্রীকালীদাস চক্রবর্ত্তী কর্ত্তৃক
মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
সন ১২৮৮।
মূল্য॥ ৪ আনা।
বিজ্ঞাপন।
আমার রচিত কবিতার মধ্যে যেগুলি সন্ধ্যা-সঙ্গীত নামে উক্ত হইতে পারে, সেই গুলিই এই পুস্তকে প্রকাশিত হইল। ইহার অধিকাংশ কবিতাই গত দুই বৎসরের মধ্যে রচিত হইয়াছে, কেবল “বিষ ও সুধা” নামক দীর্ঘ কবিতাটি বাল্য- কালের রচনা।
গ্রন্থকার।
সূচীপত্র।
অনুগ্রহ
অনুগ্রহ।
এই যে জগত হেরি আমি,
মহাশক্তি জগতের স্বামি,
একি হে, তোমার অনুগ্রহ?
হে বিধাতা, কহ মোরে কহ।
ওই যে সমুখে সিন্ধু, একি অনুগ্রহ বিন্দু?
ওই যে আকাশে শোভে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তব অনুগ্রহ!
ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্র এক জন,
আমারে যে করেছ সৃজন,
একি শুধু অনুগ্রহ করে
ঋণ পাশে বাঁধিবারে মোরে?
করিতে করিতে যেন খেলা,
কটাক্ষে করিয়া অবহেলা,
হেসে ক্ষমতার হাসি, অসীম ক্ষমতা হতে
ব্যয় করিয়াছ এক রতি -
অনুগ্রহ করে মাের প্রতি?
শুভ্র শুভ্র যুঁই দুটি ওই যে রয়েছে ফুটি
ওকি তব অতি শুভ্র ভালবাসা নয়?
বল মােরে, মহাশক্তিময়।
ওই যে জ্যোছনা হাসি, ওই যে তারকা রাশি,
আকাশে হাসিয়া ফুটে রয়,
ওকি তব ভালবাসা নয়?
ওকি তব অনুগ্রহ হাসি
কঠোর পাষাণ লৌহ ময়?
তবে হে হৃদয়হীন দেব,
জগতের রাজ অধিরাজ,
হান’ তব হাসিময় বাজ,
মহা অনুগ্রহ হ’তে তব
মুছে তুমি ফেলহ আমারে-
চাহিনা থাকিতে এসংসারে!
কবি হয়ে জন্মেছি ধরায়,
ভালবাসি আপনা ভুলিয়া,
গান গাহি হৃদয় খুলিয়া,
ভক্তি করি পৃথিবীর মত,
স্নেহ করি আকাশের প্রায়।
আপনারে দিয়েছি ফেলিয়া,
আপনারে গিয়েছি ভুলিয়া,
যারে ভাল বাসি তার কাছে
প্রাণ শুধু ভালবাসা চায়।
ধনরত্নময় এ সংসার,
কিছু নাহি চায় প্রাণ আর,
দুঃখ ক্লেশে কিছু না ডরায়,
ধনমান যশ নাহি চায়,
ধনী হতে ধনী সেই জন
তাইতে সে দরিদ্র মতন,
তাইতে চায় না তার প্রাণ
দরিদ্রের ধন ধনমান,
সংসারে রাখে না কোন আশা,
সব সাধ তার মিটে যায়,
একটু পাইলে ভালবাসা,
একটি হৃদয় যদি পায়!
আপনারে বিলাবে যেথায়—
এমন হৃদয় এক চায়!
সাক্ষী আছ তুমি অন্তর্যামী
কত খানি ভালবাসি আমি,
দেখি যবে তার মুখ, হৃদয়ে দারুণ সুখ
ভেঙ্গে ফেলে হৃদয়ের দ্বার-
বলে “এ কি ঘোর কারাগার!” –
প্রাণ বলে “পারিনে সহিতে,
এ দুরন্ত সুখেরে বহিতে!”
আকাশে হেরিলে শশি আনন্দে উথলি উঠি
দেয় যথা মহা পারাবার
অসীম আনন্দ উপহার,
তেমনি সমুদ্র-ভরা আনন্দ তাহারে দিই
হৃদয় যাহারে ভালবাসে,
হৃদয়ের প্রতি ঢেউ উথলি গাহিয়া উঠে
আকাশ ডুবায়ে গীতােচ্ছাসে।
ভেঙ্গে ফেলি উপকূল পৃথিবী ডুবাতে চাহে
আকাশে উঠিতে চায় প্রাণ,
আপনারে ভুলে গিয়ে হৃদয় হইতে চাহে
একটি জগতব্যাপী গান।
তাহারে কবির অশ্রু হাসি
দিয়েছি কত না রাশি রাশি,
তাহারি কিরণে ফুটিতেছে
হৃদয়ের আশা ও ভরসা,
তাহারি হাসি ও অশ্রু জল
এ প্রাণের বসন্ত বরষা।
ভাল বাসি, আর গান গাই-
কবি হয়ে জন্মেছি ধরায়,
রাত্রি এত ভাল নাহি বাসে,
উষা এত গান নাহি গায়!
ভাল বেসে কি পেয়েছি আমি
গান গেয়ে কি পাইনু, স্বামি!
আগ্নেয় পর্ব্বত-ভরা-ব্যথা,
আর দুটি অনুগ্রহ কথা!
পৃথিবীর এ কি হীন দশা!
প্রণয় কি দাসত্ব ব্যবসা?
নয় নয় কখন তা নয়,
ভালবাসা ভিক্ষাবৃত্তি নয়,
ভালবাসা স্বাধীন মহান্,
ভালবাসা পর্ব্বত সমান।
ভিক্ষাবৃত্তি করে না তপন
পৃথিবীরে চাহে সে যখন;
সে চাহে উজ্জ্বল করিবারে,
সে চাহে উর্ব্বর করিবারে;
জীবন করিতে প্রবাহিত
কুসুম করিতে বিকশিত।
চাহে সে বাসিতে শুধু ভাল,
চাহে সে করিতে শুধু আল;
স্বপ্নেও কি ভাবে কভু ধরা,
তপনেরে অনুগ্রহ করা?
যবে আমি যাই তার কাছে
সে কি মনে ভাবে গাে তখন,
অনুগ্রহ ভিক্ষা মাগিবারে
এসেছে ভিক্ষুক এক জন?
জানে না কি অনুগ্রহে তার
বার বার পদাঘাত করি,
ভালবাসা ভক্তিভরে লয়ে
শতবার মস্তকেতে ধরি।
অনুগ্রহ পাষাণ-মমতা,
করুণার কঙ্কাল কেবল,
ভাব হীন বজ্রে গড়া হাসি-
স্ফটিক-কঠিন অশ্রু জল!
অনুগ্রহ বিলাসী গর্ব্বিত,
অনুগ্রহ দয়ালু-কৃপণ -
বহু কষ্টে অশ্রু বিন্দু দেয়
শুক আঁখি করিয়া মন্থন।
নীচ হীন দীন অনুগ্রহ
কাছে যবে আসিবারে চায়,
প্রণয় বিলাপ করি উঠে-
গীত গান ঘৃণায় পলায়।
হে দেবতা, অনুগ্রহ হতে
রক্ষা কর অভাগা কবিরে,
অপযশ, অপমান দাও
দুঃখ জ্বালা বহিব এ শিরে।
সম্পদের স্বর্ণ কারাগারে,
গরবের অন্ধকার মাঝ-
অনুগ্রহ রাজার মতন
চিরকাল করুক্ বিরাজ।
সােণার শৃঙ্খল ঝঙ্কারিয়া,-
গরবের স্ফীত-দেহ লয়ে-
অনুগ্রহ আসেনাক’ যেন
কবিদের স্বাধীন আলয়ে!
গান আসে বোলে গান গাই,
ভাল বাসি বোলে ভাল বাসি,
কেহ যেন মনে নাহি করে
মোরা কারো কৃপার প্রয়াসী!
না হয় শুনোনা মোর গান,
ভালবাসা ঢাকা রবে মনে,
অনুগ্রহ কোরে এই কোরো,
অনুগ্রহ কোরোনা এজনে।
অসহ্য ভালবাসা
অসহ্য ভালবাসা।
বুঝেছি গাে বুঝেছি স্বজনি,
কি ভাব তোমার মনে জাগে,
বুক-ফাটা প্রাণ-ফাটা মাের ভালবাসা
এত বুঝি ভাল নাহি লাগে!
এত ভালবাসা বুঝি পার না সহিতে,
এত বুঝি পার না বহিতে।
যখনি গো নেহারি তােমায়—
মুখ দিয়া, আঁখি দিয়া, বাহিরিতে চায় হিয়া,
শিরার শৃঙ্খল গুলি ছিঁড়িয়া ফেলিতে চায়,
ওই মুখ বুকে ঢাকে, ওই হাতে হাত রাখে,
কি করিবে ভাবিয়া না পায়,
যেন তুমি কোথা আছ খুঁজিয়া না পায়।
যেন তুমি কাছে আছ তবু যেন কাছে নাই,
যেন আমি কাছে আছি, তবু যেন কাছে নাই,
মন মাের পাগলের হেন
প্রাণপণে শুধায় সে যেন
“প্রাণের প্রাণের মাঝে কি করিলে তােমারে গাে পাই,
যে ঠাই র’য়েছে শূন্য, কি করিলে সে শূন্য পূরাই।”
এই রূপে দেহের দুয়ারে
মন যবে থাকে যুঝিবারে,
তুমি চেয়ে দেখ মুখ বাগে।
এত বুঝি ভাল নাহি লাগে।
বুঝি গাে ভাবিয়া নাহি পাও,
হেন ভাব দেখিতে না চাও।
তুমি চাও যবে মাঝে মাঝে
অবসর পাবে তুমি কাজে
আমারে ডাকিবে একবার।
কাছে গিয়া বসিব তােমার।
মৃদু মৃদু সুমধুর বাণী
কব তব কানে কানে রাণী।
তুমিও কহিবে মৃদু ভাষ,
তুমিও হাসিবে মৃদু হাস,
হৃদয়ের মৃদু খেলাখেলি,
ফুলেতে ফুলেতে হেলাহেলি।
বুঝিতে পারি না তুমি অনন্ত এ আদর-পিপাসা,
ভাল নাহি লাগে তব জগত-তেয়াগী ভালবাসা।
চাও তুমি দুখহীন প্রেম,
ছুটে যেথা ফুলের সুবাস,
উঠে যেথা জোছনা-লহরী,
বহে যেথা বসন্ত-বাতাস।
নাহি চাও আত্মহারা প্রেম,
আছে যেথা অনন্ত পিয়াস,
বহে যেথা চোখের সলিল,
উঠে যেথা দুখের নিশ্বাস।
প্রাণ যেথা কথা ভুলে যায়,
আপনারে ভুলে যায় হিয়া,
অচেতন চেতনা যেথায়
চরাচর ফেলে হারাইয়া!
এমন কি কেহ নাই বিশাল- বিশাল ভবে,
এ তুচ্ছ হৃদয় খানা ধূলি হ’তে তুলি লবে!
এমন কি কেহ নাই, বল মােরে, বল আশা,
মার্জ্জনা করিবে মাের অতি-অতি ভালবাসা,
যদি থাকে কোথায় সে একবার দেখে আসি,
জনমের মত তারে একবার ভালবাসি।
দেখি আর ভালবাসি, তার কোলে মাথা রাখি,
একটি কথা না কয়ে অমনি মুদি এ আঁখি।
আবার
আবার?
তুমি কেন আইলে হেথায়
এ আমার সাধের আবাসে?
এ আলয়ে যে নিবাসী থাকে,
এ আলয়ে যে অতিথি আসে,
সবাই আমার সখা, সবাই আমার বঁধু,
সবারেই আমি ভালবাসি,
তারাও আমারে ভালবাসে,
তুমি তবে কেন এলে হেথা
এ আমার সাধের আবাসে?
এ আমার প্রেমের আলয়,
এ মাের স্নেহের নিকেতন,
বেছে বেছে কুসুম তুলিয়া
রচিয়াছি কোমল আসন।
কেহ হেথা নাইক নিষ্ঠুর,
কিছু হেথা নাইক কঠিন,
কবিতা আমার প্রণয়িনী
এইখানে আসে প্রতি দিন!
সমীর কোমল মন, আসে হেথা অনুক্ষণ,
যখনি সে পায় অবকাশ,
যখনি প্রভাত ফুটে, যখনি সে জেগে উঠে,
ছুটিয়া আইসে মাের পাশ;
দুই বাহু প্রসারিয়া, আমারে বুকেতে নিয়া,
কত শত বারতা শুধায়,
সখা মাের প্রভাতের বায়!
আকাশেতে তুলে আঁখি বাতায়নে বসে থাকি
নিশি যবে পােহায় পােহায়;
উষার আলােকে হারা সখী ‘মাের শুকতারা
আমার এ মুখ পানে চায়,
নীরবে চাহিয়া রহে, নীরব নয়নে কহে
“সখা, আজ বিদায়—বিদায়!”
ধীরে ধীরে সন্ধ্যার বাতাস
প্রতিদিন আসে মাের পাশ!
দেখে, আমি বাতায়নে, অশ্রু ঝরে দুনয়নে,
ফেলিতেছি দুখের নিশ্বাস;
অতি ধীরে আলিঙ্গন করে,
কথা কহে সকরুণ স্বরে,
কানে কানে বলে “হায় হায়!”
কোমল কপােল দিয়া কপােল চুম্বন করি
অশ্রু বিন্দু সুধীরে শুখায়।
সবাই আমার মন বুঝে,
সবাই আমার দুঃখ জানে,
সবাই করুণ আঁখি মেলি
চেয়ে থাকে এই মুখ পানে!
যে কেহ আমার ঘরে আসে
সবাই আমারে ভালবাসে,
তবে কেন তুমি এলে হেথা,
এ আমার সাধের আবাসে!
চাহিতে জান না তুমি অশ্রুময় আঁখি তুলি
অশ্রুময় নয়নের পানে;
চিন্তাহীন, ভাবহীন শূন্য হাসিময় মুখে
ওকি দৃষ্টি হান’ এ বয়ানে,
চেয়ে চেয়ে কৌতুক নয়ানে!
র’ ফের”-ও নয়ন ভাবহীন ও বয়ন
আনিও না এ মাের, আলয়ে,
আমরা সখারা মিলি আছি হেথা নিরিবিলি
আপনার মনােদুঃখ লয়ে।
এমনি হয়েছে শান্ত মন,
ঘুচেছে দুঃখের কঠোরতা,
ভাল লাগে বিহঙ্গের গান,
ভাল লাগে তটিনীর কথা।
ভাল লাগে কাননে দেখিতে
বসন্তের কুসুমের মেলা,
ভাল লাগে, সারাদিন ব’সে
দেখিতে মেঘের ছেলেখেলা।
এইরূপে সায়াহ্নের কোলে
রচেছি গােধূলী-নিকেতন,
দিবসের অবসান কালে
পশে হেথা রবির কিরণ।
আসে হেথা অতি দূর হতে
পাখীদের বিরামের তান,
ম্রিয়মাণ সন্ধ্যা বাতাসের
থেকে থেকে মরণের গান।
পরিশান্ত অবশ পরাণে
বসিয়া রয়েছি এই খানে।
কহিয়া নিষ্ঠুর বাণী, কঠোর কটাক্ষ হানি,
আবার ভেঙ্গো না এ আলয়,
হৃদয়েতে কোর না প্রলয়।
প্রতি দিন সাধিয়া সাধিয়া,
পদতলে কাঁদিয়া কাঁদিয়া,
প্রকৃতির সাথে আজি করেছি প্রণয়;
গাছ পালা সরােবর, গিরি নদী নিরঝর,
সকলের সাথে আজি করেছি প্রণয়;
মনে সদা জাগে এই ভয়
আবার হারাতে পাছে হয়!
যাও, মােরে যাও ছেড়ে, নিও না-নিও না কেড়ে,
নিও না, নিও না মন মাের;
সখাদের কাছ হতে ছিনিয়া নিও না মােরে,
ছিঁড়ো না এ সখ্যতার ডোর!
আবার হারাই যদি, এই গিরি, এই নদী,
মেঘ বায়ু কানন নির্ঝর,
আবার স্বপন ছুটে, একেবারে যায় টুটে
এ আমার গােধূলীর ঘর,
আবার আশ্রয় হারা, ঘুরে ঘুরে হই সারা,
ঝটিকার মেঘ খণ্ড সম,
দুঃখের বিদ্যুৎ-ফণা ভীষণ ভুজঙ্গ এক
পোষণ করিয়া বক্ষে মম!
তাহা হলে এ জনমে, নিরাশ্রয় এ জনমে
ভাঙ্গা ঘর আর গড়িবে না,
ভাঙ্গা হৃদি আর জুড়িরে না!
একটি কথা না বোলে, যাও চোলে, যাও চোলে,
কাল সবে গড়েছি আলয়,
কাল সবে জুড়েছি হৃদয়,
আজি তা’ দিও না যেন ভেঙ্গে
রাখ’ তুমি রাখ’ এ বিনয়!
আমি-হারা
আমি-হারা।
পরাণের অন্ধকার অরণ্য মাঝারে
আমি মোর হারাল’ কোথায়?
ভ্রমিতেছি পথে পথে, খুঁজিতেছি তারে-
ডাকিতেছি, আয়, আয়, আয়,
আর কি সে আসিবেনা হায়!
আর কিরে পাবনা’ক তায়?
হৃদয়ের অন্ধকারে গভীর অরণ্য তলে
আমি মোর হারাল’ কোথায়?
দিবস শুধায় মোরে-রজনী শুধায়,
নিতি তারা অশ্রুবারি ফেলে,
শুধায় আকুল হ’য়ে চন্দ্র সূর্য্য তারা
“কোথা তুমি, কোথা তুমি গেলে!’
আঁধার হৃদয় হতে উঠিছে উত্তর
“মোরে কোথা ফেলেছি হারায়ে!”
হৃদয়ের হায় হায় হাহাকার ধ্বনি
ভ্রমিতেছে নিশীথের বায়ে!
হায় হায়!
জীবনের তরুণ বেলায়,
কে ছিলরে হৃদয় মাঝারে,
দুলিতরে অরুণ দোলায়!
হাসি তার ললাটে ফুটিত,
হাসি তার ভাসিত নয়নে,
হাসি তার ঘুমায়ে পড়িত
সুকোমল অধর শয়নে।
হাসি-শিশু আননে তাহার
খেলাইত চপল চরণে,
রবিকর খেলায় যেমন
তটিনীর নয়নে নয়নে।
ঘুমাইলে, নন্দন-বালিকা
গেঁথে দিত স্বপন-মালিকা,
জাগরণে, নয়নে তাহার
জাগরণে, নয়নে তাহার
ছায়াময় স্বপন জাগিত;
আশা তার পাখা প্রসারিয়া
উড়ে যেত উধাও হইয়া,
চাঁদের পায়ের কাছে গিয়ে
জোস্নাময় অমৃত মাগিত।
বনে সে তুলিত শুধু ফুল,
শিশির করিত শুধু পান,
প্রভাতের পাখীটির মত
হরষে করিত শুধু গান!
কে গো সেই, কে গো হায় হায়,
জীবনের তরুণ বেলায়
খেলাইত হৃদয় মাঝারে
দুলিতরে অরুণ-দোলায়?
সচেতন অরুণ কিরণ
কে সে প্রাণে এসেছিল নামি?
সে আমার শৈশবের কুঁড়ি,
সে আমার সুকুমার আমি!
প্রতিদিন বাড়িল আঁধার,
পথ মাঝে উড়িলরে ধূলি,
হৃদয়ের অরণ্য আঁধারে
দুজনে আইনু পথ ভুলি।
নয়নে পড়িছে তার রেণু,
শাখা বাজে সুকুমার কায়,
ঘন ঘন বহিছে নিঃশ্বাস
কাঁটা বিঁধে সুকোমল পায়!
ধূলায় মলিন হ’ল দেহ,
সভয়ে মলিন হ’ল মুখ,
কেঁদে সে চাহিল মুখ পানে
দেখে মোর ফেটে গেল বুক!
কেঁদে সে কহিল মুখ চাহি,
“ওগো মোরে আনিলে কোথায়?
পা’য় পা’য় বাজিতেছে বাধা,
তরু-শাখা লাগিছে মাথায়।
চারি দিকে মলিন, আঁধার,
কিছু হেথা নাহি যে সুন্দর,
কোথা গো শিশির-মাখা ফুল,
কোথা গো প্রভাত-রবিকর?”
কেঁদে কেঁদে সাথে সে চলিল,
কহিল সে সকরুণ স্বর,
“কোথা গো শিশির-মাখা ফুল,
কোথা গো প্রভাত রবি-কর।”
প্রতিদিন বাড়িল আঁধার,
পথ হল পঙ্কিল, মলিন,
মুখে তার কথাটিও নাই,
দেহ তার হ’ল বল হীন।
অবশেষে একদিন, কেমনে, কোথায়, কবে
কিছুই যে জানিনে গো হায়,
হারাইয়া গেল সে কোথায়!
রাখ’ দেব, রাখ’ মোরে রাখ,
তোমার স্নেহেতে মোরে ঢাক’,
আজি চারিদিকে মোর এ কি অন্ধকার ঘোর,
একবার নাম ধ’রে ডাক!
পারি না যে সামালিতে, কাঁদি গো আকুল চিতে,
কত রব’ মৃত্তিকা বহিয়া?
ধূলিময় দেহ মম ধূলায় আনিছে ডাকি
ধূলায় দিতেছে ঢাকি হিয়া!
মলিন দেহের ভারে হৃদয় চলিতে নারে
হৃদয় পড়িছে ভূমে লুটি,
বিমল হৃদয় মাঝে পড়িছে দেহের ছায়া,
দেহের কলঙ্ক উঠে ফুটি।
জড়ের সহিত রণে হারিবে হৃদয় মোর?
মৃত্তিকার দাসত্ব করিবে?
এক মুষ্টি ধূলি লেগে অনন্ত হৃদয় মোর
চিরস্থায়ী কলঙ্ক ধরিবে?
হৃদে লাগে মৃত্তিকার ছাপ,
এ কি নিদারুণ অভিশাপ।
হারায়েছি আমার আমারে,
আজ আমি ভ্রমি অন্ধকারে।
কখন বা সন্ধ্যাবেলা, আমার পুরাণ’ সাথী
মুহুর্ত্তের তরে আসে প্রাণে;
চারিদিক নিরখে নয়নে।
প্রণয়ীর শ্মশানেতে একেলা বিরলে আসি
প্রণয়ী যেমন কেঁদে যায়,
নিজের সমাধি পরে নিজে বসি উপছায়া
যেমন নিঃশ্বাস ফেলে হায়,
কুম শুকায়ে গেলে, যেমন সৌরভ তার
কাছে কাছে কাঁদিয়া বেড়ায়,
মুখ ফুরাইয়া গেলে একটি মলিন হাসি
অধরে বসিয়া কেঁদে চায়,
তেমনি সে আসে প্রাণে চায় চারিদিক পানে,
কাঁদে, আর কেঁদে চলে যায়!
বলে শুধু “কি ছিল, কি হল,
সে সব কোথায় চলে গেল!”
বহু দিন দেখি নাই তারে,
আসে নি এ হৃদয় মাঝারে।
মনে করি মনে আনি তার সেই মুখ খানি,
ভাল করে মনে পড়িছে না,
হৃদয়ে যে ছবি ছিল, ধুলায় মলিন হল,
আর তাহা নাহি যায় চেনা!
ভুলে গেছি কি খেলা খেলিত,
ভুলে গেছি কি কথা বলিত!
যে গান গাহিত সদা, সুর তার মনে আছে,
কথা তার নাহি পড়ে মনে।
যে আশা হৃদয়ে লয়ে উড়িত সে মেঘ চেয়ে
আর তাহা পড়ে না স্মরণে!
শুধু যবে হৃদি মাঝে চাই
মনে পড়ে—কি ছিল, কি নাই!
আশার নৈরাশ্য
আশার নৈরাশ্য।
ওরে আশা, কেন তোর হেন দীন বেশ?
নিরাশারি মত যেন বিষন্ন বদন কেন?
যেন অতি সঙ্গোপনে,
যেন অতি সন্তর্পণে
অতি ভয়ে ভয়ে প্রাণে করিস্ প্রবেশ।
ফিরিবি কি প্রবেশিবি ভাবিয়া না পাস্,
কেন, আশা, কেন, তোর কিসের তরাস!
বহুদিন আসিস্ নি প্রাণের ভিতর,
তাই কি সঙ্কোচ এত তোর?
আজ আসিয়াছ দিতে যে সুখ-আশ্বাস,
নিজে তাহা কর না বিশ্বাস!
তাই মুখ ম্লান অতি, তাই হেন মৃদু-গতি,
তাই উঠিতেছে ধীরে দুখের নিশ্বাস!
বসিয়া মরম-স্থলে কহিছ চখের জলে—
“বুঝি, হেন দিন রহিবে না!
আজ যাবে, কাল আসিবেক,
দুঃখ যাবে ঘুচিবে যাতনা!”
কেন, আশা, মোরে কেন হেন প্রতারণা?
দুঃখ ক্লেশে আমি কি ডরাই?
আমি কি তাদের চিনি নাই?
তারা সবে আমারি কি নয়?
তবে, আশা, কেন এত ভয়?
তবে কেন বসি মোর পাশ
মোরে, আশা, দিতেছ আশ্বাস?
বল, আশা, বসি মোর চিতে,
“আরো দুঃখ হইবে বহিতে,
হৃদয়ের যে প্রদেশ হয়েছিল ভস্ম-শেষ
আর যারে হ’ত না সহিতে,
আবার নূতন প্রাণ পেয়ে
সেও পুন থাকিবে দহিতে!”
আরো কি সহিতে আছে একে একে মোর কাছে
খুলে বল, করিও না ভয়!
দুঃখ জ্বালা আমারি কি নয়?
তবে কেন হেন ম্লান মুখ?
তবে কেন হেন দীন বেশ?
তবে কেন এত ভয়ে ভয়ে
এ হৃদয়ে করিস্ প্রবেশ?
বলিতে কি আসিয়াছ, ফুরায়ে এসেছে
এ জীবন মোর?
জীবনের দীর্ঘ রাত্রি হইতেছে ভোর?
তবে এস, এস আশা,
তবে হাস, হাস আশা,
তবে কেন হেন ম্লান মুখ?
নিরাশার মত দীন বেশ?
তবে কেন এত ভয়ে ভয়ে
এ হৃদয়ে করিস্ প্রবেশ?
সব গেছে কাঁদিতে কাঁদিতে,
বাকি যাহা আছে আর, শুধু, শুধু, অশ্রুধার,
যাবে তাহা হাসিতে হাসিতে।
উপহার
উপহার।
অয়ি সন্ধ্যে,
অনন্ত আকাশ তলে বসি একাকিনী,
কেশ এলাইয়া,
নত করি স্নেহময় মোহময় মুখ
জগতেরে কোলেতে লইয়া,
মৃদু মৃদু ওকি কথা কহিস আপন মনে
মৃদু মৃদু গান গেয়ে গেয়ে,
জগতের মুখ পানে চেয়ে!
প্রতিদিন শুনিয়াছি আজো তোর ওই কথা
নারিনু বুঝিতে!
প্রতিদিন শুনিয়াছি আজো তোর ওই গান
নারিনু শিখিতে!
চোখে শুধু লাগে ঘুমঘোর,
প্রাণ শুধু ভাবে হয় ভোর!
হৃদয়ের অতি দূর-দূর—দূরান্তরে
মিলাইয়া কণ্ঠস্বর তোর কণ্ঠস্বরে
কে জানেরে কোথাকার উদাসী প্রবাসী যেন
তোর সাথে তােরি গান করে।
অয়ি সন্ধ্যা, তােরি যেন স্বদেশের প্রতিবেশী
তােরি যেন আপনার ভাই,
প্রাণের প্রবাসে মাের দিশা হারাইয়া
কেঁদে কেঁদে বেড়ায় সদাই!
যখনি শুনে সে তাের স্বর
শােনে যেন স্বদেশের গান,
সহসা সুদূর হতে অমনি সে দেয় সাড়া,
অমনি সে খুলে দেয় প্রাণ!
চারিদিকে চেয়ে দেখে—আকুল ব্যাকুল হয়ে
খুঁজিয়ে বেড়ায় যেন তােরে
ডাকে যেন তাের নাম ধরে।
যেন তার কতশত পুরাণ সাধের স্মৃতি
জাগিয়া উঠেরে ওই গানে!
ওই তারকার মাঝে যেন তার গৃহ ছিল,
হাসিত কাঁদিত ওই খানে!
বিজন গভীর রাতে ওই তারকার মাঝে
বসিয়া গাহিত যেন গান,
ওই খান হতে যেন জগতের চারিদিক
দেখিত সে মেলিয়া নয়ান!
সেই সব পড়ে বুঝি মনে,
অশ্রুবারি ঝরে দু নয়নে।
কতআশা, কত সখা, প্রাণের প্রেয়সী তার
হােথা বুঝি ফেলে আসিয়াছে,
প্রাণ বুঝি তাহাদের কাছে
আর বার ফিরে যেতে চায়
পথ তবু খুঁজিয়া না পায়!
কত না পুরাণ’ কথা, কত না হারান’ গান,
কত না প্রাণের দীর্ঘশ্বাস,
সরমের আধ হাসি সােহাগের আধ বাণী
প্রণয়ের আধ মৃদু ভাষ
সন্ধ্যা, তাের ওই অন্ধকারে
হারাইয়া গেছে একেবারে!
পূর্ণ করি অন্ধকার তাের
তা’রা সবে ভাসিয়া বেড়ায়,
যুগান্তের প্রশান্ত হৃদয়ে
ভাঙ্গাচোরা জগতের প্রায়!
যবে এই নদী তীরে বসি তোর পদতলে,
তা’রা সবে দলে দলে আসে,
প্রাণেরে ঘেরিয়া চারি পাশে;
হয়ত একটি কথা, একটি আধেক বাণী,
চারিদিক হতে বারে বার
শ্রবণেতে পশে অনিবার।
হয়ত একটি হাসি, একটি আধেক হাসি,
সমুখেতে ভাসিয়া বেড়ায়,
কভু ফোটে, কভুবা মিলায়!
হয়ত একটি ছায়া, একটি মুখের ছায়া
আমার মুখের পানে চায়,
চাহিয়া নীরবে চলে যায়!
অয়ি সন্ধ্যা, স্নেহময়ী, তোর স্বপ্নময় কোলে
তাই আমি আসি নিতি নিতি,
স্নেহের আঁচল দিয়ে প্রাণ মাের দিস ঢেকে,
এনে দিস্ অতীতের স্মৃতি!
আজ আসিয়াছি সন্ধ্যা,-বসি তাের অন্ধকারে
মুদিয়া নয়ান,
সাধ গেছে গাহিবারে-মৃদু স্বরে শুনাবারে
দু চারিটি গান।
সে গান না শোনে কেহ যদি,
যদি তারা হারাইয়া যায়,
সন্ধ্যা, তুই সযতনে গােপনে বিজনে অতি
ঢেকে দিস্ আঁধারের ছায়।
যেথায় পুরাণ’ গান, যেথায় হারান’ হাসি,
যেথা আছে বিস্মৃত স্বপন,
সেই খানে সযতনে রেখে দিস গান গুলি
রচে দিস্ সমাধি-শয়ন!
জানি সন্ধ্যা, জানি তাের স্নেহ,
গোপনে ঢাকিবি তার দেহ,
বসিয়া সমাধি পরে, নিষ্ঠর কৌতুক ভরে
দেখিস হাসে না যেন কেহ!
ধীরে শুধু ঝরিবে শিশির,
মৃদু শ্বাস ফেলিবে সমীর।
স্তব্ধতা কপােল হাত দিয়ে
একা সেথা রহিবে বসিয়া,
মাঝে মাঝে দুয়েকটি তারা
সেথা আসি পড়িবে খসিয়া!
কেন গান গাই
কেন গান গাই।
গুরুভার মন লয়ে, কত বা বেড়াবি ব’য়ে?
এমন কি কেহ তোর নাই,
যাহার হৃদয় পরে মিলিবে মুহূর্ত্ত তরে
হৃদয়টি রাখিবার ঠাঁই?
“কেহ না, কেহ না!”
সংসারে যে দিকে ফিরে চাই
এমন কি কেহ তোর নাই,—
তোর দিন শেষ হ’লে, স্মৃতি খানি ল’য়ে কোলে,
শোয়াইয়া বিষাদের কোমল শয়নে,
বিমল শিশির-মাখা প্রেম ফুলে দিয়ে ঢাকা
চেয়ে রবে আনত নয়নে?
হৃদয়েতে রেখে দিবে তুলে,
প্রতিদিন ঢেকে দিবে ফুলে,
মনোমাঝে প্রবেশিয়ে বিন্দু বিন্দু অশ্রু দিয়ে
বৃন্ত-ছিন্ন প্রেম ফুল গুলি
রাখিবেক জিয়াইয়া তুলি?
এমন কি কেহ তোর নাই?
"কেহ না, কেহ না!”
প্রাণ তুই খুলে দিলি, ভালবাসা বিলাইলি,
কেহ তাহা তুলে না লইল,
ভূমিতলে পড়িয়া রহিল;
ভালবাসা কেন দিলি তবে
কেহ যদি কুড়ায়ে না লবে?
কেন সখা কেন?
“জানি না, জানি না!”
বিজনে বনের মাঝে ফুল এক আছে ফুটে
শুধাইতে গেনু তার কাছে,
“ফুল, তুই এ, আঁধারে পরিমল দিস্ কারে,
এ কাননে কেবা তোর আছে!
যখন পড়িবি তুই ঝ’রে,
শুকাইয়া দলগুলি ধূলিতে হইবে ধূলি,
মনে কি করিবে কেহ তোরে!
তবে কেন পরিমল ঢেলে দিস্ অবিরল
ছোট মনখানি ভ’রে ভ’রে?
কেন, ফুল, কেন?
সেও বলে “জানি না, জানি না।”
সখা, তুমি গান গাও কেন,
কেহ যদি শুনিতে না চায়?
ওই দেখ পথ মাঝে যে যাহার নিজ কাজে
আপনার মনে চলে যায়।
কেহ যদি শুনিতে না চায়
কেন তবে, কেন গাও গান,
আকাশে ঢালিয়া দাও প্রাণ?
গান তব ফু রাইবে যবে,
রাগিণী কারো কি মনে রবে?
বাতাসেতে স্বরধার খেলিয়াছে অনিবার,
বাতাসে সমাধি তার হবে।
কাহারো মনেও নাহি রবে,
কেন সখা গান গাও তবে?
কেন, সখা, কেন?
“জানি না, জানি না।”
বিজন তরুর শাখে একাকী পাখীটি ডাকে,
শুধাইতে গেনু তার কাছে,
“পাখী তুই এ আঁধারে গান শুনাইবি কারে?
এ কাননে কেবা তোর আছে।
যখনি ফুরাবে তোর প্রাণ
যখনি থামিবে তোর গান,
বন ছিল যেমন নীরবে,
তেমনি নীরব পুন হবে।
যেমনি থামিবে গীত, অমনি সে সচকিত
প্রতিধ্বনি আকাশে মিলাবে,
তোর গান তোরি সাথে যাবে।
আকাশে ঢালিয়া দিয়া প্রাণ,
তবে, পাখী, কেন গাস্ গান?
কেন, পাখি, কেন?
সেও বলে “জানি না, জানি না!”
কেন গান শুনাই
কেন গান শুনাই।
এস সখি, এস মোর কাছে,
কথা এক শুধাবার আছে!
চেয়ে তব মুখ পানে ব’সে এই ঠাঁই—
প্রতিদিন যত গান তোমারে শুনাই,
বুঝিতে কি পার’ সখি কেন যে তা গাই?
শুধু কি তা’ পশে কানে? কথা গুলি তার
কোথা হ’তে উঠিতেছে ভাব একবার?
বুঝনা কি হৃদয়ের
কোন্ খানে শেল ফুটে
তবে প্রতি কথা গুলি
আর্ত্তনাদ করি উঠে!’
যখন নয়নে উঠে বিন্দু অশ্রুজল,
তখন কি তাই তুই দেখিস্ কেবল?
দেখ না কি কি-সমুদ্র হৃদয়েতে উথলিছে,
শুধু কণামাত্র তার আঁখি-প্রান্তে বিগলিছে!
যখন একটি শুধু উঠেরে নিশ্বাস,
তখন কি তাই শুধু শুনিবারে পাস্?
শুনিস্ না কি-ঝটিকা হৃদয়ে বেড়ায় ছুটে,
একটি উচ্ছ্বাস শুধু বাহিরেতে ফুটে!
যে কথাটি বলি আমি শোন শুধু তাই?
শোন না কি যত কথা বলা হইল না?
যত কথা বলিবারে চাই?
আমি কি শুনাই গান
ভাল মন্দ করিতে বিচার?
যবে এ নয়ন হ’তে বহে অশ্রুধার-
শুধু কি রে দেখিবি তখন
সে অশ্রু উজ্বল কি না হীরার মতন?
আমার এ গান তোরে যখন শুনাই-
নিন্দা বা প্রশংসা আমি কিছু নাহি চাই-
যে হৃদি দিয়েছি তোরে
তাই তোরে দেখাবারে চাই,
তারি ভাষা বুঝাবারে চাই,
তারি ব্যথা জানাবারে চাই,
আর কিবা চাই?
সেই হৃদি দেখিলি যখন,
তারি ভাষা বুঝিলি যখন,
তারি ব্যথা জানিলি যখন
তখন একটি বিন্দু অশ্রুবারি চাই!
(আর,কিবা চাই!)
আয় সখি কাছে মোর আয়,
কথা এক শুধাব তোমায়-
এত গান শুনালেম এত অনুরাগে
কথা তার বুকে কিলো লাগে?
একটি নিশ্বাস কিলো জাগে?
কথা শুধু শুনিয়া কি যাস্?
ভাল মন্দ বুঝিস্ কেবল?
প্রাণের ভিতর হতে
উঠে না একটি অশ্রুজল?
গান আরম্ভ
গান আরম্ভ।
ডাকি তোরে, আয়রে হেথায়,
সাধের কবিতা তুই আয়!
চারি দিকে খেলিতেছে মেঘ,
বায়ু আসি করিছে চুম্বন,
সীমা-হারা নভস্থল, দুই বাহু পসারিয়া
ভাই বোলে, সখা বোলে,
বুকেতে করিছে আলিঙ্গন।
অনন্ত এ আকাশের কোলে
টলমল মেঘের মাঝার,
এই খানে বাঁধিয়াছি ঘর
তোর তরে, কবিতা আমার।
আহা এ কি নিভৃত নিলয়,
আহা এ কি শান্তি নিকেতন!
অতি দূরে ছায়া-রেখা সম
পৃথিবীর শ্যামল কানন।
হেথা আমি আসিব যখনি
তোরে আমি ডাকিব রমণী।
মেঘেতে মেঘেতে মিলে মিলে
হেলে দুলে বাতাসে বাতাসে,
হাসি হাসি মুখখানি করি
নামিয়া আসিবি মোর পাশে।
বাতাসে উড়িবে তোর বাস,
ছড়ায়ে পড়িবে কেশপাশ,
ঈষৎ মেলিয়া আঁখি পাতা
মৃদু হাসি পড়িবে ফুটিয়া,
হৃদয়ের মৃতুল কিরণ
অধরেতে পড়িবে লুটিয়া।
একখানি জোছনার মত
বাতাসের পথ ছুঁয়ে ছুঁয়ে,
হিল্লোল-আকুল কমলিনী
বাতাসে পড়িবি নুয়ে নুয়ে।
পৃথিবী হইতে অতি দূরে
এই হেথা মেঘময় পুরে,
গলাটি জড়ায়ে ধরি মোর
ব’সে র’বি কোলের উপর।
এলোথেলো কেশপাশ লোয়ে
বসে বসে খেলিব হেথায়,
উষার অলক দুলাইয়া
সমীরণ যেমন খেলায়!
চুমিয়া চুমিয়া ফুটাইব
আধফুটো হাসির কুসুম,
মুখ লোয়ে বুকের মাঝারে
গান গেয়ে পাড়াইব ঘুম!
কৌতুকে করিয়া কোলাকুলি
আসিবে মেঘের শিশুগুলি,
ঘিরিয়া দাঁড়াবে তারা সবে
অবাক্ হইয়া চেয়ে রবে!
তাই তোরে ডাকিতেছি আমি
কবিতা রে, আয় এক বার,
নিরিবিলি দুটিতে মিলিয়া
র’ব’হেথা, বধুটি আমার!
মেঘ হোতে নেমে ধীরে ধীরে
আয়লো কবিতা মোর বামে।
চম্পক অঙ্গুলি দুটি দিয়ে
মেঘরাশি ধীরে সরাইয়ে,
উষাটী যেমন ক’রে নামে।
বায়ু হোতে আয়লো কবিতা,
আসিয়া বসিবি মোর পাশে,
কে জানে বনের কোথা হোতে
ভেসে ভেসে সমীরণ স্রোতে
সৌরভ যেমন কোরে আসে!
হৃদয়ের অন্তঃপুর হোতে
বধু মোর, ধীরে ধীরে আয়।
ভীরু প্রেম যেমন করিয়া
ধীরে উঠে হৃদয় ধরিয়া,
বঁধুর পায়ের কাছে গিয়ে
অমনি মুরছি পড়ে যায়!
পরের হৃদয় হোতে উঠে
আয় তুই কবিতা আমার,
গিরির আঁধার গুহা হোতে
মৃদু মৃদু অতি ক্ষীণ স্রোতে
যেমন করিয়া উথলায়
ছোট এক নির্ঝরের ধার।
তেমনি করিয়া তুই আয়,
আয় তুই কবিতা আমার!
চকিতে করিয়া ছিন্ন ঘন ঘোর মেঘরাশি,
বিদ্যুৎ যেমন নেমে আসে,
হে কবিতা, তেমন করিয়া
এসো না এসে না মোর পাশে!
দূর দূরান্তর হোতে প্রচণ্ড নিশ্বাস ফেলি
ঝটিকা যেমন ছুটে আসে,
দশ দিশি থরহরি ত্রাসে!
আত্মঘাতী পাগলের মত
এলোথেলো মেঘ শত শত
শত শত বিদ্যুতের ছুরি
বার বার হানিতেছে বুকে,
যন্ত্রণায় আর্ত্তনাদ করি,
ছুটিতেছে ঝটিকার মুখে!
এমন ঝটিকা রূপ ধরি,
এলোমেলো উন্মাদিনী বেশে,
এসো না, কবিতা, কভু তুমি
এ আমার বিজন প্রদেশে!
ছিঁড়ে ফেলি লোহার শৃঙ্খল,
ভেঙ্গে ফেলি হৃদি কারাগার,
আঁখি ফেটে অনল নিকলে,
ধ’রে অতি ভীষণ আকার,
পলক না ফেলিতে ফেলিতে
যেমন ছুটিয়া ক্রোধ আসে,
হৃদয়ের অন্তঃপুর হোতে
তেমন এসো না মোর পাশে!
যা’ কিছু সম্মুখে পায়, গলাইয়া জ্বলাইয়া
আগ্নেয়-গিরির প্রাণ হোতে
উঠে যথা অগ্নির নির্ঝর,
কবিতা, আগ্নেয় মুর্ত্তি ধরি
পরের হৃদয় ভেদ করি,
এসো না এ হৃদয়ের পর!
এসে তুমি উষার মতন
এসে তুমি সৌরভের প্রায়,
প্রেম উঠে যেমন করিয়া
নির্ঝর যেমন উথলায়!
অথবা শিথিল কলেবরে
এস তুমি, বস’ মোর পাশে;
শোয়াইয়া তুষার শয়নে,
চুমি চুমি মুদিত নয়নে,
মরণ যেমন করে আসে,
শিশির যেমন করে ঝরে;
পশ্চিমের আঁধার সাগরে
তারাটি যেমন কোরে যায়;
অতি ধীরে মৃদু হেসে, সীঁদুর সীমন্ত দেশে
দিবা সে যেমন করে আসে
মরিবারে স্বামীর চিতায়,
পশ্চিমের জ্বলন্ত শিখায়।
পরবাসী ক্ষীণ আয়ু, একটি মুমুর্ষু বায়ু,
স্বদেশ কানন পানে ধায়
শ্রান্ত পদ উঠিতে না চায়;
যেমনি কাননে পশে, ফুল-বধূটির পাশে,
শেষ কথা বলিতে বলিতে
তখনি অমনি মরে যায়।
তেমনি, তেমনি করে এস,
কবিতা রে, বধূটি আমার,
ম্লান মুখে করুণা বসিয়া,
চোখে ধীরে ঝরে অশ্রু ধার।
দুটি শুধু পড়িবে নিশ্বাস,
দুটি শুধু বাহিরিবে বাণী,
বাহু দুটি হৃদয়ে জড়ায়ে
মরমে রাখিবি মুখখানি!
গান সমাপন
গান সমাপন।
জনমিয়া এ সংসারে কিছুই শিখিনি আর
শুধু গাই গান।
স্নেহময়ী মা’র কাছে শৈশবে শিখিয়াছিনু
দুয়েকটি তান।
শুধু জানি তাই,
দিবানিশি তাই শুধু গাই।
শত ছিদ্র-ময় এই হৃদয়-বাঁশিটি ল’য়ে
বাজাই সতত,
দুঃখের কঠোর স্বর রাগিণী হইয়া যায়
মৃদুল নিঃশ্বাসে পরিণত।
আঁধার জলদ যেন ইন্দ্রধনু হয়ে যায়,
ভুলে যাই সকল যাতনা।
ভাল যদি না লাগে সে গান,
ভাল সখা, তা’ও গাহিব না!
এমন পণ্ডিত কত রয়েছেন শত শত
এ সংসার তলে,
আকাশের দৈত্য-বালা উন্মাদিনী চপলারে
বেঁধে রাখে দাসত্বের লোহার শিকলে।
আকাশ ধরিয়া হাতে নক্ষত্র-অক্ষর দেখি
গ্রন্থ পাঠ করিছেন তাঁরা,
জ্ঞানের বন্ধন যত ছিন্ন করে দিতেছেন,
ভাঙ্গি ফেলি অতীতের কারা।
কেহ বা বসিয়া আছে লক্ষীর পায়ের কাছে,
গণিছে রতন,
মাথার কিরীট হতে ছুটিছে রতন-বিভা,
জগৎ চাহিয়া আছে অবাক্ মতন।
আমি তার কিছুই করি না,
আমি তার কিছুই জানি না!
এমন মহান্ এ সংসারে
জ্ঞান রত্ন রাশির মাঝারে,
আমি দীন শুধু গান গাই,
তোমাদের মুখ পানে চাই;
আর আমি কিছুই জানি না!
ভাল যদি না লাগে সে গান
ভাল সখা, তাও গাহিব না!
বড় ভয় হ’ত, পাছে কেহই না দেখে তারে
যে জন কিছুই শেখে নাই।
ওগো সখা, ভয়ে ভয়ে তাই
যাহা জানি, সেই গান গাই!
তোমাদের মুখ পানে চাই।
শ্রান্ত দেহ হীনবল, নয়নে পড়িছে জল,
রক্ত ঝরে চরণে আমার,
নিশ্বাস বহিছে বেগে, হৃদয় বাঁশিটি মম
বাজে না-বাজে না বুঝি আর!
দিন গেল, সন্ধ্যা গেল, কেহ দেখিলে না চেয়ে
যত গান গাই!
বুঝি কারো অবসর নাই!
বুঝি কারো ভাল নাহি লাগে,
ভাল সখা আর গাহিব না!
কিছুই করি না আমি শুধু আমি গান গাই,
তা’ও আমি গাহিব না আর?
কেমনে কাটিবে দিন, কেমনে কাটিবে রাত,
হৃদয় আমার!
এ ভাঙ্গা বাঁশিটি মোর ধূলায় ফেলিয়া দিব,
একেলা পথের ধারে রহি
দেখিব পথিক যত ফিরিতেছে ইতস্ততঃ
ধনমান যশোভার বহি!
মলিন আমারে দেখি যদি কারো মনে পড়ে,
যদি কেহ ডাকে দয়া ক’রে,
যদি কেহ বলে শেষে, “যে একটি গান জান’
একবার শুনাওত মোরে;
গাহিতে চাহিব যত মনে পড়িবে না তত,
রুদ্ধ-কণ্ঠে আসিবে না গান,
আকুল নয়ন জলে হয়ত থামিতে হবে,
ধূলিতে পড়িব ম্রিয়মাণ।
একটি যা’গান জানি তাহাও যাইব ভূলি,
পথপ্রান্তে ধূলিময় দেহ।
সংসারের কোলাহল বুঝিতে নারিব কিছু
আমি যেন অতীতের কেহ।
ভাল সখা, তাই হোক্ তবে,
আর আমি গান গাহিব না!
সংসারের কেহই না- কিছুই না আমি,—
প্রাণ যবে ত্যজিবে এ দেহ,
কিছুই শিখিনি আমি, কিছু জানিতামনাক’
তা’ বলে কি কাঁদিবে না কেহ?
কেহই কি বলিবে না “একটি জানিত গান
বেড়াইত সেই গান গাহিয়া গাহিয়া,
দ্বারে দ্বারে মমতা চাহিয়া।
সে গান শোনেনি কেই তার,
মুছায়নি দুখ-অশ্রুধার,
মরণ সদয় হয়ে, গেছে তারে ডেকে লয়ে
শুনিতে একটি তার গান,
মুছাইতে সজল নয়ান।”
তারকার আত্মহত্যা
তারকার আত্মহত্যা।
জ্যোতির্ম্ময় তীর হ’তে আঁধার সাগরে
ঝাঁপায়ে পড়িল এক তারা,
একেবারে উন্মাদের পারা!
চৌদিকে অসংখ্য তারা রহিল চাহিয়া
অবাক্ হইয়া—
এই যে জ্যোতির বিন্দু আছিল তাদের মাঝে
মুহূর্ত্তে সে গেল মিশাইয়া!
যে সমুদ্র-তলে
মনোদুঃখে আত্মঘাতী,
চির-নির্ব্বাপিত ভাতি—
শত মৃত তারকার
মৃত-দেহ রয়েছে শয়ান,
সেথায় সে করেছে প্রয়ান!
কেন গো কি হয়েছিল তার?
একবার শুধালে না কেহ?
কি লাগি সে তেয়াগিল দেহ?
যদি কেহ শুধাইত
আমি জানি কি যে সে কহিত!
যত দিন বেঁচে ছিল
আমি জানি কি তারে দহিত!
সে কেবল হাসির যন্ত্রণা,
আর কিছু না!
মনে তার ছিলনাক’ সুখ
মুখে তারে হাসিতে হইত!
প্রতি সন্ধ্যা বেলা
একেলা একেলা—
হাসির রাজ্যের মাঝে একটি বিষাদ শুধু
ম্লান-মনে হাসি-মুখে কেবলি ভ্রমিত!
জ্বলন্ত অঙ্গার-খণ্ড, ঢাকিতে আঁধার হৃদি
অনিবার হাসিতেই রহে,
যত হাসে ততই সে দহে!
তেমনি—তেমনি তারে হাসির অনল
দারুণ উজ্জ্বল—
দহিত—দহিত তারে—দহিত কেবল!
যে গান গাহিতে হ’ত
সে গান তাহার গান নয়,
যে কথা কহিতে হ’ত,
সে কথা তাহার কথা নয়!
জ্যোতির্ম্ময় তারা-পূর্ণ বিজন তেয়াগি,
তাই আজ ছুটেছে সে নিতান্ত মনের ক্লেশে
আঁধারের তারাহীন বিজনের লাগি!
তবে গো তোমরা কেন সহস্র সহস্র তারা
উপহাস করি তারে হাসিছ আমন ধারা?
কহিতেছ—“আমাদের কি হয়েছে ক্ষতি?
যেমন আছিল আগে তেমনি র’য়েছে জ্যোতি!”
হেন কথা বলিও না আর!
সে কি কভু ভেবেছিল মনে—
(এত গর্ব্ব আছিল কি তার?)
আপনারে নিভাইয়া তোমাদের করিবে আঁধার?
নিজের প্রাণের জ্বালা
আঁধারে সে ডুবাতে গিয়াছে।
নিজের মুখের জ্যোতি
আঁধারে সে নিভাতে গিয়েছে!
হৃদয় তাহার
চাহে না হইতে জ্যোতি,
চাহে শুধু হইতে আঁধার!
যেথায় সে ছিল, সেথা রাখে নাই চিহ্ণ লেশ,
থাকে নাই ভস্ম-অবশেষ!
ওই কাব্য-গ্রন্থ হ’তে নিজের অক্ষর
মুছিয়া ফেলেছে একেবারে,
উপহাস করিও না তারে!
গেল, গেল, ডুবে গেল, তারা এক ডুবে গেল,
আঁধার সাগরে—
গভীর নিশীথে,
অতল আকাশে!
হৃদয়, হৃদয় মোর, সাধ কিরে যায় তোর
ঘুমাইতে ওই মৃত তারাটির পাশে?
ওই আঁধার সাগরে!
এই গভীর নিশীথে!
ওই অতল আকাশে!
দুঃখ আবাহন
দুঃখ আবাহন।
আয় দুঃখ, আয় তুই,
তাের তরে পেতেছি আসন!
হৃদয়ের প্রতি শিরা টানি টানি উপাড়িয়া
বিচ্ছিন্ন শিরার মুখে তৃষিত অধর দিয়া
বিন্দু বিন্দু রক্ত তুই করিস্ শোষন;
জননীর স্নেহে তােরে করিব পােষণ!
হৃদয়ে আয়রে তুই হৃদয়ের ধন!
যখনি হইবি শ্রান্ত বুকেতে রাখিস্ মাথা!
সে বিছানা সুকোমল শিরায় শিরায় গাঁথা!
সুখেতে ঘুমাস্ তুই
হৃদয়ের নীড়ে;
অতি গুরুভার তুই-
দুয়েকটি শিরা তাহে যাবে বুঝি ছিঁড়ে,
যাক্ ছিঁড়ে!
জননীর স্নেহে তােরে করিব বহন,
দুর্ব্বল বুকের পরে করিব ধারণ,
একেলা বসিয়া ঘরে অবিরল এক স্বরে
গাব তাের কানে কানে ঘুম পাড়াবার গান!
মুদিয়া আসিবে তাের শ্রান্ত দুনয়ান!
প্রাণের ভিতর হতে উঠিয়া নিশ্বাস
শ্রান্ত কপালেতে তাের করিবে বাতাস,
তুই সুখেতে ঘুমাস্!
আয় দুঃখ আয় তুই!
ব্যাকুল এ হিয়া!
দুই হাতে মুখ চাপি
হৃদয়ের ভূমি পরে
পড়্ আছাড়িয়া।
সমস্ত হৃদয় ব্যাপি
একবার উচ্চস্বরে
অনাথ শিশুর মত ওঠরে কাঁদিয়া!
প্রাণের মর্ম্মের কাছে
একটি যে ভাঙ্গা বাদ্য আছে,
দুই হাতে তুলে নেরে
সবলে বাজায়ে দেরে,
নিতান্ত উন্মাদ সম
ঝন্ ঝন্ ঝন্ ঝন্!
ভাঙ্গেত ভাঙ্গিবে বাদ্য,
ছেঁড়েত ছিঁড়িবে তন্ত্রী,
নেরে তবে তুলে নেরে,
সবলে বাজায়ে দেরে,
নিতান্ত উন্মাদ সম
ঝন্ ঝন্ ঝন্ ঝন্!
দারুণ আহত হয়ে দারুণ শব্দের ঘায়
যত আছে প্রতিধ্বনি
বিষম প্রমাদ গণি
একেবারে সমস্বরে
কাঁদিয়া উঠিবে যন্ত্রণায়,
দুঃখ, তুই, আয় তুই আয়!
নিতান্ত একেলা এ হৃদয়!
কেহ নাই যারে ডেকে দুটি কথা কয়!
আর কিছু নয়,
কাছে আয় একবার, তুলে ধর্ মুখ তার,
মুখে তার আঁখি দুটি রাখ!
এক দৃষ্টে চেয়ে শুধু থাক্!
আর কিছু নয়-
নিরালয় এ হৃদয়
শুধু এক সহচর চায়!
তুই দুঃখ, তুই কাছে আয়!
কহিতে না চাস্ যদি
ব’সে থাক্ নিরবধি
হৃদয়ের পাশে দিন রাতি,
যখনি খেলাতে চাস্, হৃদয়ের কাছে যাস্
হৃদয় আমার চায় খেলাবার সাথী।-
যখনি খেলাতে চাস প্রাণের প্রান্তরে যাস,
সেথায় ভস্মের স্তূপ আছে;
মিলি তােরা দুই ভাই, ফুঁ দিয়ে উড়াস্ ছাই,
সতত থাকিস্ কাছে কাছে।
সহসা দেখিতে যদি পাস্
দগ্ধ-শেষ অস্থি রাশ রাশ,
তাই দিয়ে খেলেনা গড়িস্,
তাই নিয়ে হাসিস্ কাঁদিস্!
প্রাণের যেথায়
অলক্ষ্যেতে শােণিতের ফল্গু ব’হে যায়,
যাস্রে সেথায়,
খুঁড়িস্ বালুকা-রাশি অস্থি খণ্ড দিয়া
শােণিত উঠিবে উথলিয়া!
লয়ে সে শােণিত ধারা মিশায়ে ভস্মের স্তূপে
গড়িস ভস্মের ঘর,
গড়িস ভস্মের নর,
গড়িস্ খেলানা নানারূপে!
তাই নিয়ে ভাঙ্গিস গড়িস,
তাই নিয়ে খেলানা করিস,
অস্থি, আর ভস্ম, আর হৃদয় শােণিত ধার,
তাই নিয়ে খেলানা গড়িস,
দুই ভায়ে সতত খেলিস!
দুঃখ, তুই আয় মাের কাছে!
তুই ছাড়া কে আমার আছে!
প্রমােদে হয়েছি আমি শ্রান্ত অতিশয়,
পারিনে হাসিতে আর কঙ্কালের হাসি,
মাংসহীন অস্থিদন্ত ময়!
শুধু হাসি, শুধু হাসি, আর কিছু নয়!
বেশ ছিনু, বেশ ছিনু আগে,
যৌবনের কুঞ্জবন দহি দহি অনুক্ষণ
শুকায়ে আসিয়াছিল জ্বলন্ত নিদাঘে,
মাঝেতে বহিল কেন বসন্তের বায়
শুষ্ক কুঞ্জবনে?
রাশি রাশি শুষ্ক পাতা শুষ্ক শাখা যত
মাতি উঠি বসন্ত পবনে
ঝর ঝর ঝর ঝরে ভাঙ্গা কণ্ঠ স্বরে
উচ্ছাসিল প্রমােদের গান,
সহসা স্বপন টুটে’ প্রতিধ্বনি এল ছুটে
প্রাণের চৌদিক হতে, দেখিবারে, শুধাইতে
“শুষ্ক কুঞ্জ-বনান্তরে
কত—কত দিন পরে
কে এলরে কে এলরে কে ধরিল তান!”
পাতায় পাতায় মিলি
শাখায় শাখায় মিলি
ধরিয়াছে গান!
সে কি ভাল লাগে?
শুকান’ পাতার স্বর শুকান’ শাখার গান
সে কি ভাল লাগে?
তাই এ হৃদয় ভিক্ষা মাগে
বরষা হওগাে উপনীত।
ঝর ঝর অবিরল ঝরিয়া পড়ুক জল
শুনি ব’সে অশ্রুর সঙ্গীত।
আয় দুঃখ, হৃদয়ের ধন,
এই হেথা পেতেছি আসন!
প্রাণের মর্ম্মের কাছে
এখনাে যা’ রক্ত আছে
তাই তুই করিস্ শোষণ!
দুদিন
দুদিন।
আরম্ভিছে শীতকাল, পড়িছে নীহার জাল,
শীর্ণ বৃক্ষ-শাখা যত ফুল পত্র হীন;
মৃতপ্রায় পৃথিবীর মুখের উপরে
বিষাদে প্রকৃতি মাতা, শুভ্র বাষ্পজালে গাঁথা
কুঝ্ঝটি-বসন খানি দেছেন টানিয়া;
পশ্চিমে গিয়েছে রবি, স্তব্ধ সন্ধ্যা বেলা।
বিদেশে আইনু শ্রান্ত পথিক একেলা!
রহিনু দুদিন।
এখনো রয়েছে শীত বিহঙ্গ গাহে না গীত,
এখনো ঝরিছে পাতা, পড়িছে তুহিন।
বসন্তের প্রাণ-ভরা চুম্বন পরশে
সর্ব্ব অঙ্গ শিহরিয়া পুলকে আকুল হিয়া
মৃত-শয্যা হতে ধরা জাগেনি হরষে।
এক দিন, দুই দিন ফুরাইল শেষে,
আবার উঠিতে হল, চলিনু বিদেশে!
একখানা ভাঙ্গা লঘু মেঘের মতন
কত গিরি হতে গিরি বেড়াতেছি ফিরি ফিরি,
যে দিকে লইয়া যায় অদৃষ্ট পবন।
আসিলাম একবার শুভ-দৈব বলে
ফুলে ফুলে ভরা এক শ্যামল অচলে।
রহিনু দুদিন-
সাঁঝের কিরণ পিয়া-নির্ঝরের জলে গিয়া
ইন্দ্র ধনু নিরমিয়া খেলিলাম কত,
ডুবে গেনু জোছনায়, আঁধার পাখার গায়
বসালেম তারা শত শত।
ফুরালাে দুদিন-
সহসা আরেক দিকে বহিল পবন,
দুদিনের খেলাধূলা ফুরাল আমার,
আবার—আরেক দিকে চলিনু আবার।
এই যে ফিরানু মুখ, চলিনু পূরবে,
আর কিরে এ জীবনে ফিরে আসা হবে?
কত মুখ দেখিয়াছি দেখিব না আর।
ঘটনা ঘটিবে কত, বরষ বরষ শত
জীবনের পর দিয়া হয়ে যাবে পার;
হয়ত বা একদিন অতি দূর দেশে,
আসিয়াছে সন্ধ্যা হয়ে বাতাস যেতেছে বয়ে,
একেলা নদীর ধারে রহিয়াছি বসে,
হুহু করে উঠিবেক সহসা এ হিয়া,
সহসা এ মেঘাচ্ছন্ন স্মৃতি উজলিয়া
একটি অস্ফুট রেখা সহসা দিবে রে দেখা
একটি মুখের ছবি উঠিবে জাগিয়া,
একটি গানের ছত্র পড়িবেক মনে,
দুয়েক্টি সুর তার উদিবে স্মরণে,
অবশেষে একেবারে সহসা সবলে
বিস্মৃতির বাঁধ গুলি ভাঙ্গিয়া চূর্ণিয়া ফেলি
সে দিনের কথাগুলি বন্যার মতন
একেবারে বিপ্লাবিয়া ফেলিবে এ মন।
পাষাণ মানব মনে সহিবে সকলি।
ভুলিব, যতই যাবে বর্ষ বর্ষ চলি-
কিন্তু আহা, দুদিনের তরে হেথা এনু,
একটি কোমল প্রাণ ভেঙ্গে রেখে গেনু।
তার সেই মুখ খানি-কাঁদো কাঁদো মুখ,
এলানো কুন্তল জালে ছাইয়াছে বুক,
বাষ্পময় আঁখি দুটি অনিমিখ আছে ফুটি
আমারি মুখের পানে; অঞ্চল লুটিছে,-
থেকে থেকে উচ্ছসিয়া কাঁদিয়া উঠিছে,
সেই সে মুখানি,-আহা করুণ মুখানি,-
সুকুমার কুসুমটি—জীবন আমার-
বুক চিরে হৃদয়ের হৃদয় মাঝার
শত বর্ষ রাখি যদি দিবস রজনী
মেটে না মেটে না তবু তিয়াষ আমার;-
শত ফুল দলে গড়া সেই মুখ তার,
স্বপনেতে প্রতি নিশি হৃদয়ে উদিবে আসি,
এলানাে আকুল কেশে, আকুল নয়নে।
সেই মুখ সঙ্গী মাের হইবে বিজনে-
নিশীথের অন্ধকার আকাশের পটে
নক্ষত্র তারার মাঝে উঠিবেক ফুটে
ধীরে ধীরে রেখা রেখা সেই মুখ তার,
নিঃশব্দে মুখের পানে চাহিয়া আমার।
চমকি উঠিব জাগি শুনি ঘুম ঘোরে,
“যাবে তবে? যাবে?” সেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে।
সাহারার অগ্নিশ্বাস একটি পবনােচ্ছাস
বহিয়া গেলাম চলি মুহূর্তের তরে
স্নিগ্ধচ্ছায়া সুকুমার ফুল-বন পরে,-
কোমলা যুঁথীর এক পাপড়ি খসিল,
ম্রিয়মাণ বৃন্ত তার নােয়ায়ে পড়িল।
ফুরালো দুদিন-
শরতে যে শাখা হয়েছিল পত্রহীন
এ দুদিনে সে শাখা উঠেনি মুকুলিয়া!
অচল শিখর পরি যে তুষার ছিল পড়ি
এ দুদিনে কণা তার যায়নি গলিয়া,
কিন্তু এ দুদিন মাঝে একটি পরাণে
কি বিপ্লব বাধিয়াছে কেহ নাহি জানে!
ক্ষুদ্র এ দুদিন তার শত বাহু দিয়া
চিরটি জীবন মাের রহিবে বেষ্টিয়া!
দুদিনের পদচিহ্ন চিরদিন তরে
অঙ্কিত রহিবে শত বরষের শিরে!
পরাজয় সঙ্গীত
পরাজয় সঙ্গীত।
ভাল করে যুঝিলিনে, হল তােরি পরাজয়,
কি আর ভাবিতেছিস, ম্রিয়মাণ, হা হৃদয়!
কাঁদ তুই, কাঁদ, হেথা আয়,
একা বসে বিজনে বিদেশে!
জানিতাম জানিতাম হা-রে
এমনি ঘটিবে অবশেষে!
হৃদয়ের পানে চেয়ে কাঁদিয়াছি প্রতিদিন
বিধাতা, কেন গো তারে, সৃজিয়াছ দীন হীন?
হীন-বল, ক্ষীণ-তনু, টলমল পায়ে পায়,
একটু বহিলে বায়ু লুটায়ে পড়িতে চায়,
আশ্রয় চলিয়া গেলে, আর সে আঁখি না মেলে,
অমনি ধূলায় পড়ে, অমনি মরিয়া যায়।
কত কি করিতে সাধ কিছু না করিতে পারে,
তরঙ্গে বায়ুতে মিলি খেলায়ে বেড়ায় তারে!
প্রাণের নিভৃতে পশি, প্রতিদিন বসি, বসি,
মরমের অস্থি দিয়ে একেকটি আশা গড়ে
দুর্বল মনের আশা প্রতি দিন ভেঙ্গে পড়ে,
অতীত, শিয়রে বসি কাঁদিয়া শুনায় গান,
কত সুখ-স্বপনের আরম্ভ ও অবসান।
ফুটিতে পারিত ফুল, না ফুটিয়া ঝ’রে গেল,
গাহিতে পারিত পাখী, না গাহিয়া ম’রে গেল।
জলদ-মূরতিবৎ, অতি দূরে ভবিষ্যৎ
ফুটন্ত আশার ফুল লইয়া দাঁড়ায়ে আছে,
বর্ত্তমান তারি পানে ছুটিছে আকুল প্রাণে
যত যায়—যত যায় কিছুতে পায় না কাছে!
মন, কত দিন ধোরে দেখিয়া আইনু তােরে
বুঝিলাম বিফল প্রয়াস।
সংসার-সমরে ঘাের পরাজয় আছে তাের
অপমান আর উপহাস!
সংসারে যাহারা ছিল সকলেই জয়ী হল
তােরি শুধু হল পরাজয়,
প্রতি রণে প্রতি পদে একে একে ছেড়ে দিলি
জীবনের রাজ্য সমুদয়।
যতবার প্রতিজ্ঞা করিলি
ততবার পড়িল টুটিয়া,
ছিন্ন আশা বাঁধিয়া তুলিলি
বার বার পড়িল লুটিয়া।
যাহা কিছু চাহিলি করিতে
করিতে নারিলি কিছু তার,
কাঁদিলিরে যাহাদের তরে
তারা না কাঁদিল একবার।
সান্ত্বনা সান্ত্বনা করি ফিরি
সান্ত্বনা কি মিলিল রে মন?
জুড়াইতে ক্ষত বক্ষঃস্থল
ছুরিরে করিলি আলিঙ্গন।
ইচ্ছা, সাধ, আশা যাহা ছিল
অদৃষ্ট সকলি লুটে নিল।
মনে হইতেছে আজি, জীবন হারায়ে গেছে
মরণ হারায়ে গেছে হয়,
কে জানে একি এ ভাব? শূন্য পানে চেয়ে আছি
মৃত্যুহীন মরণের প্রায়!
পরাজিত এ হৃদয়, জীবনের দুর্গ মম
মরণে করিল সমর্পণ
তাই আজ জীবনে মরণ!
হৃদয় রে, কি করিলি? সব তুই ছেড়ে এলি
দেখিলিনে কে আছে কোথায়?
প্রিয়জন, পরিজন, শৈশবের সহচর,
ঘরে ঘরে আছে যে সেথায়!
সুখ দুঃখ আশা প্রেম, হাসি আর অশ্রুজল
কবিতা কল্পনা সেথা আছে!
তুই সব ছেড়ে দিলি, তুই পলাইয়া এলি,
তাদের রাখিলি কার কাছে?
হৃদয়, হৃদয় মাের, দেখ্রে সম্মুখে তাের
অনন্ত কিছু-না এক দাঁড়ায়ে রয়েছে ঘাের!
সেথা দাঁড়াবার ঠাঁই এক তিল মাত্র নাই
পড়িবি তাহারাে নাই স্থান।
নেমে যাবি, নেমে যাবি, দিন রাত্রি নেমে যাবি,
দিন-রাত্রি-হীন সেই আঁধার বিমান-
যত যাবি, তত যাবি, নাই পরিমাণ।
জাগ্, জাগ্, জাগ্, ওরে, গ্রাসিতে এসেছে তােরে
নিদারুণ শূন্যতার ছায়া,
আকাশ-গরাসী তার কায়া!
গেল তাের চন্দ্র সূর্য্য, গেল তাের গ্রহ তারা,
গেল তাের আত্ম আর পর,
এইবেলা প্রাণপণ কর।
এই বেলা ফিরে দাঁড়া তুই,
স্রোতোমুখে ভাসিস্নে আর!
যাহা পাস্ আঁকড়িয়া ধর
সম্মুখে অসীম পারাবার।
সম্মুখেতে চির অমানিশি,
সম্মুখেতে মরণ বিনাশ।
গেল, গেল বুঝি নিয়ে গেল,
আবর্ত্ত করিল বুঝি গ্রাস।
ওই দেখ্ সুখ চলে গেল,
ওই দেখ্ দুঃখ চলে যায়,
ওই দেখ্ হাসি মিশাইল,
ওই দেখ্ অশ্রুও শুখায়।
কবিতা, এ হৃদয়ের প্রাণ,
সকলি ত্যজিনু যার লাগি
সকলে ত্যজিয়া গেল যদি,
সেও ওই যেতেছে তেয়াগি।
আর না, আর না রে হৃদয়,
আর ত বিলম্ব ভাল নয়!
কেমনে ভাবিব, ওরে, কল্পনা ত্যেজেছে মােরে,
খুঁজিব সমস্ত হৃদি-ভাব নাই—কথা নাই-
কাঁদিতে ভুলিয়া যাব যতই কাঁদিতে চাই।
মরুময় হৃদয়েতে বহিব কি চির দিন
কঠোর, অচল স্তব্ধ দুঃখের তুষার ভার?
কল্পনা কিরণ দিয়া গলায়ে গলায়ে তারে
সঙ্গীত-নির্ঝর-স্রোতে ঢালিতে নারিব আর?
স্রোত হীন শব্দহীন কঠিন দুঃখের কায়,
কল্পনা করিতে গেলে হৃদয় ফাটিয়া যায়!
হৃদয়রে, ওঠ্ একবার,
সব যাক, সবু যাক আর,
কল্পনারে ডেকে আন্ মনে,
অশ্রু জল থাক্ দুনয়নে!
সেই শুধু শেষ অবশেষ
সুখ দুঃখ আশা ভরসার!
প্রাণপণে রাখ তাহা ধরে
সেও যেন হারাসনে আর!
কাঁদিবার রাখিস্ সম্বল
কল্পনা ও নয়নের জল।
সে যদি হারায়ে যায়, হৃদয়রে হায় হায়
কে সহিবে দুঃখহারা দুখ,
কেমনে দেখিব বল অশ্রুহীন নেত্র মেলি
হৃদি-হীন হৃদয়ের মুখ?
সে যদি হারায়ে যায়, হৃদয় রে হায় হায়
আজ তবে কেঁদে নিই আয়,
শেষ অশ্রুবারি আজি ঢালিরে প্রাণের সাধে,
গেয়ে নিই যত প্রাণ চায়!
বল্ “ওই যায় যায় -সুখ যায়, দুঃখ যায়,
হাসি যায়, অশ্রুজল যায়।”
বল্ “ওই দাঁড়াইয়া, আলিঙ্গন বাড়াইয়া
শূন্যতা, আকাশব্যাপী কায়!”
বল্ “যাহা গেল, তাহা চিরকাল তরে গেল,
পাধনা তা মুহূর্ত্তের তরে।
তবে আয়, অশ্রু আয়, বিদায়ের শেষ দেখা
আর দেখা হবে না ত পরে!”
পরিত্যক্ত
পরিত্যক্ত।
চলে গেল! আর কিছু নাই কহিবার!
চলে গেল! আর কিছু নাই গাহিবার!
শুধু গাহিতেছে আর শুধু কাঁদিতেছে
দীন হীন হৃদয় আমার,
শুধু বলিতেছে
“চলে গেল
সকলেই চলে গেল গো!”
বুক শুধু ভেঙ্গে গেল
দ’লে গেল গো!
সকলি চলিয়া গেলে
শীত কেঁদে কেঁদে বলে—
“ফুল গেল, পাখী গেল,
আমি শুধু রহিলাম, সবি গেল গো।”
দিবস ফুরালে রাতি স্তব্ধ হয়ে রহে,
শুধু কেঁদে কহে—
“দিন গেল, আলো গেল—রবি গেল গো,
কেবল একেলা আমি—সবি গেল গো।”
উত্তর বায়ুর সম
প্রাণের বিজনে মম
কে যেন কাঁদিছে শুধু
“চলে গেল” “চলে গেল”
“সকলেই চলে গেল গো!”
উৎসব ফুরায়ে গেলে ছিন্ন শুষ্ক মালা
পড়ে থাকে হেথায় হোথায়—
তৈলহীন শিখাহীন ভগ্ন দীপগুলি
ধূলায় লুটায়—
একবার ফিরে কেহ দেখেনাক ভুলি
সবে চলে যায়!
পুরানো মলিন ছিন্ন বসনের মত
মোরে ফেলে গেল,
কাতর নয়নে চেয়ে রহিলাম কত
সাথে না লইল।
তাই প্রাণ গাহে শুধু—
কাঁদে শুধু—কহে শুধু—
“মোরে ফেলে গেল—
সকলেই মোরে ফেলে গেল
সকলেই চ’লে গেল গো!”
একবার ফিরে তারা চেয়েছিল কি?
বুঝি চেয়ে ছিল।
একবার ভুলে তারা কেঁদেছিল কি?
বুঝি কেঁদেছিল।
বুঝি ভেবে ছিল—
“লয়ে যাই—
নিতান্ত কি একেলা কাঁদিবে?
না-না কি হইবে লয়ে?
কি কাজে লাগিবে?”
তাই বুঝি ভেবেছিল!
তাই চেয়েছিল।
তার পরে? তার পরে!
তার পরে বুঝি হেসেছিল!
হসিত কপোলে তারি
এক ফোঁটা অশ্রু বারি
মুহূর্ত্তেই শুকাইয়া গেল!
তার পরে? তার পরে!
চলে গেল!
হাসিল, গাহিল,
কহিল’ চাহিল,
হাসিতে হাসিতে গাহিতে গাহিতে
চলে গেল!
তার পরে? তার পরে!
ফুল গেল, পাখী গেল, আলো গেল, রবি গেল-
সবি গেল—সবি গেল গো—
হৃদয় নিঃশ্বাস ছাড়ি কাঁদিয়া কহিল—
“সকলেই চলে গেল গো!”
“আমারেই ফেলে গেল গো!”
পাষাণী
পাষাণী।
ঘৃণা হলাহল যদি পাই
ভালবাসা ক’রে বিনিময়,
বুক ফেটে অশ্রু পড়ে ঝরে,
বৃন্ত টুটে আশা যায় ম’রে,
তবুও তাহাও প্রাণে সয়;
যারে আমি হৃদয়েতে ধরি,
তারে আমি যাহা মনে করি
যদি দেখি সে জন তা’ নয়;
দিন দিন শুভ্র জ্যোতি তার
একটু একটু যায় মিশে,
মুকুট হইতে মোতি তার,
একটি একটি পড়ে খ’সে,
শুকায়ে, টুটিয়া, ঝোরে, সব যায় সোরে সোরে,
অবশেষে দেখিবারে পাই,— '
ভালবেসে এসেছি যাহারে
সেজন সমুখে মোর নাই!
মরীচিকা-মূর্তি সম হৃদি মরু-স্থলে মম
প্রতিদিন তিল তিল কোরে
প্রণয়-প্রতিমা যায় সোরে;
প্রাণ মন ব্যাকুল হইয়া
পিছু পিছু যেতেছে ধাইয়া,
তৃষাতুর হরিণের মত
বহিছে অনলময় শ্বাস,
আগ্রহ-কাতর আঁখি দিয়া
ঠিকরিয়া পড়িছে হুতাশ,
সকাতর চোখের উপরে
পলে পলে তিল তিল করে
সে মূরতি মিশাইয়া যায়,
শূন্য প্রাণ কাতর নয়নে
একবার চারিদিকে চায়,
কাহারেও দেখিতে না পায়!
প্রাণ লয়ে মরীচিকা খেলা!
একি নিদারুণ খেলা হায়!
করুণার উপাসক আমি,
জগতে কি আছে তার চেয়ে!
আহা কি কোমল মুখখানি! -
আহা কি করুণ কচি মেয়ে!
উষার প্রথম হাসি-রেখা
অধরেতে মাখান তাহার,
কোমল বিমল শিশিরেতে
আঁখি দুটি ভাসে অনিবার।
জগতে যা কিছু শোভা আছে
পেয়েছে তা’ করুণার কাছে!
জগতের বাতাস করুণা,
করুণা সে রবি শশিতারা,
জগতের শিশির করুণা,
জগতের বৃষ্টিবারি ধারা!
জননীর স্নেহধারা সম
এই যে জাহ্ণবী বহিতেছে,
মধুরে তটের কানে কানে
আশ্বাস-বচন কহিতেছে,—
এও সেই বিমল করুণা-
হৃদয় ঢালিয়া বোহে যায়,
জগতের তৃষা নিবারিয়া
গান গাহে করুণ ভাষায়!
কাননের ছায়া সে করুণা,
করুণা সে উষার কিরণ,
করুণা সে জননীর আঁখি,
করুণা সে প্রেমিকের মন; -
এমন যে মধুর করুণা,
এমন যে কোমল করুণা,
জগতের হৃদয়-জুড়ানো
এমন যে বিমল করুণা,
দিন দিন বুক ফেটে যায়,
দিন দিন দেখিবারে পাই-
যারে ভালবাসি প্রাণপণে
সে করুণা তার মনে নাই!
পরের নয়ন জলে তার না হৃদয় গলে,
দুখেরে সে করে উপহাস,
দুখেরে সে করে অবিশ্বাস;
দেখিয়া হৃদয় মোর তরাসে শিহরি উঠে,
প্রেমের কোমল প্রাণে শত শত শেল ফুটে,
হৃদয় কাতর হয়ে নয়ন মুদিতে চায়,
কাঁদিয়া সে বলে “হায়! হায়,
এ ত নহে আমার দেবতা,
তবে কেন রয়েছে হেথায়?”
আমি যারে চাই, সে রমণী
করুণা-অমিয়াময় মন,
যেদিকে পড়িবে আঁখি তার
করুণা করিবে বিতরণ!
তুমি নও, সে জন ত নও,
তবে তুমি কোথা হতে এলে?
এলে যদি এস’ তবে কাছে,
এ হৃদয়ে যত অশ্রু আছে
একবার সব দিই ঢেলে,
তোমার সে কঠিন পরাণ
যদি তাহে এক তিল গলে,
কোমল হইয়া আসে মন
সিক্ত হয়ে অশ্রু জলে জলে!
কঁদিবারে শিখাই তোমায়,
পর-দুঃখে ফেলিতে নিশ্বাস,
করুণার সৌন্দর্য অতুল
ও নয়নে করে যেন বাস।
প্রতিদিন দেখিয়াছি আমি
করুণারে করেছ পীড়ন,
প্রতিদিন ওই মুখ হতে
ভেঙ্গে গেছে রূপের মোহন।
কুবলয় আঁখির মাঝারে
সৌন্দর্য্য পাইনা দেখিবারে,
হাসি তব আলোকের প্রায়,
কোমলতা নাহি যেন তায়,
তাই মন প্রতিদিন কহে,
“নহে, নহে, এ জন সে নহে।”
শোন বঁধু শোন, আমি করুণারে ভালবাসি,
সে যদি না থাকে তবে ধূলিময় রূপ রাশি।
তোমায়ে যে পূজা করি, তোমারে যে দিই ফুল,
ভালবাসি বলে যেন কখনো কোরনা ভূল!
যে জন দেবতা মোর কোথা সে আছে না জানি,
তুমিত কেবল তার পাষাণ-প্রতিমা খানি।
তোমার হৃদয় নাই, চোখে নাই অশ্রুধার,
কেবল রয়েছে তব, পাষাণ আকার তার!
তোমারে যখন পূজি কল্পনা করিয়া লই-
তোমারি মাঝারে আছে দেবী সে করুণাময়ী।
তাই এ মন্দির হতে রাখিতে পারিনে দূরে,
এখনো রয়েছ তাই হৃদয়ের সুর-পুরে,
কল্পনা মায়ের কোলে যে বালারে দেখেছিনু,
কল্পনার তুলি দিয়ে যে বালারে এঁকেছিনু,
তারি মত মুখ তব, তেমনি মধুর বাণী
থাক’ তবে থাক’ হেথা পাষাণ প্রতিমা খানি।
বিষ ও সুধা
বিষ ও সুধা।
বিষ ও সুধা।
অস্ত গেল দিনমণি। সন্ধ্যা আসি ধীরে
দিবসের অন্ধকার সমাধির পরে
তারকার ফুলরাশি দিল ছড়াইয়া।
সাবধানে অতি ধীরে নায়ক যেমন
ঘুমন্ত প্রিয়ার মুখ করয়ে চুম্বন
দিন-পরিশ্রমে ক্লান্ত পৃথিবীর দেহ
অতি ধীরে পরশিল সায়াহ্নের বায়ু।
দুরন্ত তরঙ্গ গুলি যমুনার কোলে
সারাদিন খেলা করি পড়েছে ঘুমায়ে।
ভগ্ন দেবালয় খানি যমুনার ধারে,
শিকড়ে শিকড়ে তার ছায়ি জীর্ণ দেহ
বট অশত্থের গাছ জড়াজড়ি করি
আঁধারিয়া রাখিয়াছে ভগন হৃদয়,
দুয়েকটি বায়ুচ্ছ্বাস পথ ভূলি গিয়া
আঁধার আলয়ে তার হয়েছে আটক,
অধীর হইয়া তারা হেথায় হোথায়
হু হু করি বেড়াইছে পথ খুঁজি খুঁজি।
শুন সন্ধ্যে! আবার এসেছি আমি হেথা,
নীরব আঁধারে তব বসিয়া বসিয়া
তটিনীর কলধ্বনি শুনিতে এয়েছি।
হে তটিনী, ওকি গান গাইতেছ তুমি!
দিন নাই, রাত্রি নাই এক তানে শুধু
এক সুরে এক গান গাইছ সতত-
এত মৃদুস্বরে ধীরে, যেন ভয় করি
সন্ধ্যার প্রশান্ত স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় পাছে!
এ নীরব সন্ধ্যাকালে তব মৃদু গান
একতান ধ্বনি তব শুনে মনে হয়
এ হৃদি-গানেরি যেন শুনি প্রতিধ্বনি!
মনে হয় যেন তুমি আমারি মতন
কি এক প্রাণের ধন ফেলেছ হারায়ে।
এস স্মৃতি, এস তুমি এ ভগ্ন হৃদয়ে,—
সায়াহ্ন-রবির মৃদু শেষ রশ্মি-রেখা
যেমন পড়েছে ওই অন্ধকার মেঘে
তেমনি ঢাল এ হৃদে অতীত-স্বপন।
কাঁদিতে হয়েছে সাধ বিরলে বসিয়া,
কাঁদি একবার, দাও সে ক্ষমতা মোরে!
যাহা কিছু মনে পড়ে ছেলেবেলাকার
সমস্ত মালতীময়-মালতী কেবল
শৈশবকালের মোর স্মৃতির প্রতিমা!
দুই ভাই বোনে মোরা আছিনু কেমন!
আমি ছিনু ধীর শান্ত গম্ভীর-প্রকৃতি,
মালতী প্রফুল্ল অতি সদা হাসি হাসি!
ছিল না সে উচ্ছ্বাসিনী নির্ঝরিণী সম
শৈশব-তরঙ্গবেগে চঞ্চলা সুন্দরী,
ছিল না সে লজ্জাবতী লতাটির মত
সরম-সৌন্দর্যভরে ম্রিয়মাণ পারা।
আছিল সে প্রভাতের ফুলের মতন,
প্রশান্ত হরষে সদা মাখানো মুখানি;
সে হাসি গাহিত শুধু উষার সঙ্গীত-
সকলি নবীন আর সকলি বিমল!
মালতীর শান্ত সেই হাসিটির সাথে
হৃদয়ে জাগিত যেন প্রভাত পবন,
নূতন জীবন যেন সঞ্চরিত মনে।
ছেলেবেলাকার যত কবিতা আমার
সে হাসির কিরণেতে উঠেছিল ফুটি!
মালতী ছুঁইত মোর হৃদয়ের তার,
তাইতে শৈশব-গান উঠিত বাজিয়া।
এমনি আসিত সন্ধ্যা, শ্রান্ত জগতেরে
স্নেহময় কোলে তার ঘুম পাড়াইতে।
সুবর্ণ-সলিল-সিক্ত সায়াহ্ন-অম্বরে
গোধূলির অন্ধকার নিঃশব্দ চরণে
ছোট ছোট তারা গুলি দিত ফুটাইয়া,
নন্দন বনের যেন চাঁপা ফুল দিয়ে
ফুলশয্যা সাজাইত সুরবালাদের!
মালতীরে লয়ে পাশে আসিতাম হেথা
সন্ধ্যার সঙ্গীতম্বরে মিলাইয়া স্বর
মৃদুস্বরে শুনাতেম শৈশব-কবিতা!
হর্ষময় গর্ব্বে তার আঁখি উজলিত-
অবাক্ ভক্তির ভাবে ধরি মোর হাত
একদৃষ্টে মুখপানে রহিত চাহিয়া।
তার সে হরষ হেরি আমারো হৃদয়ে
কেমন মধুর গর্ব উঠিত উথলি!
ক্ষুদ্র এক কুটীর অছিল আমাদের,
নিস্তব্ধ-মধ্যাহ্নে আর নীরব সন্ধ্যায়
দূর হতে তটিনীর কলস্বর আসি
শান্ত কুটীরের প্রাণে প্রবেশিয়া ধীরে
করিত সে কুটীরের স্বপন রচনা।
দুই জনে ছিনু মোরা কল্পনার শিশু-
বনে ভ্রমিতাম যবে, সুদুর নির্ঝরে
বনশ্রীর পদধ্বনি পেতাম শুনিতে!
যাহা কিছু দেখিতাম সকলেরি মাঝে
জীবন্ত প্রতিমা যেন পেতেম দেখিতে!
কত জোছনার রাত্রে মিলি দুই জনে
ভ্রমিতাম যমুনার পুলিনে পুলিনে,
মনে হত এ রজনী পোহাতে চাবে না,
সহসা কোকিল রব শুনিয়া উষায়,
সহসা যখনি শ্যামা গাহিয়া উঠিত,
চমকিয়া উঠিতাম, কহিতাম মোরা
“এ কি হল! এরি মধ্যে পোহাল রজনী।”
দেখিতাম পূর্বদিকে উঠেছে ফুটিয়া
শুকতারা, রজনীর বিদায়ের পথে,
প্রভাতের বায়ু ধীরে উঠিছে জাগিয়া
আসিছে মলিন হয়ে আঁধারের মুখ।
তখন আলয়ে দোঁহে আসিতাম ফিরি,
আসিতে আসিতে পথে শুনিতাম মোরা
গাইছে বিজন-কুঞ্জে বউ-কথা-কও।
ক্রমশঃ বালক কাল হল অবসান,
নীরদের প্রেম-দৃষ্টে পড়িল মালতী,
নীরদের সাথে তার হইল বিবাহ।
মাঝে মাঝে যাইতাম তাদের আলয়ে;
দেখিতাম, মালতীর শান্ত সে হাসিতে
কুটীরেতে রাখিয়াছে প্রভাত ফুটায়ে।
সঙ্গীহারা হয়ে আমি ভ্রমিতাম একা,
নিরাশ্রয় এ হৃদয় অশান্ত হইয়া
কাঁদিয়া উঠিত যেন অধীর-উচ্ছ্বাসে!
কোথাও পেতনা যেন আরাম বিশ্রাম!
অনমনে আছি যবে, হৃদয় আমার
সহসা স্বপন ভাঙ্গি উঠিত চমকি!
সহসা পেতনা ভেবে, পেতনা খুঁজিয়া
আগে কি ছিলরে যেন এখন তা নাই!
প্রকৃতির কি-যেন-কি গিয়াছে হারায়ে
মনে তাহা পড়িছে না! ছেলেবেলা হতে
প্রকৃতির যেই ছন্দ এসেছি শুনিয়া
সেই ছন্দোভঙ্গ যেন হয়েছে তাহার,
সেই ছন্দে কি কথার পড়েছে অভাব-
কানেতে সহসা তাই উঠিত বাজিয়া,
হৃদয় সহসা তাই উঠিত চমকি!
জানিনা কিসের তরে, কি মনের দুখে
দুয়েকটি দীর্ঘশ্বাস উঠিত উচ্ছ্বসি!
শিখর হতে শিখরে, বন হতে বনে,
অন্যমনে একেলাই বেড়াতাম ভ্রমি-
সহসা চেতন পেয়ে উঠিয়া চমকি
সবিস্ময়ে ভাবিতাম কেন ভ্রমিতেছি,
কেন ভ্রমিতেছি তাহা পেতেম না ভাবি।
একদিন নবীন বসন্ত সমীরণে
বউ-কথা-কও যবে খুলেছে হৃদয়,
বিষাদে সুখেতে মাখা প্রশান্ত কি ভাব
প্রাণের ভিতরে যবে রয়েছে ঘুমায়ে,
দেখিনু বালিকা এক, নির্ঝরের ধারে
বন ফুল তুলিতেছে আঁচল ভরিয়া!
দুপাশে কুন্তল-জাল পড়েছে এলায়ে,
মুখেতে পড়েছে তার উষার কিরণ।
কাছেতে গেলাম তার কাঁটা বাছি ফেলি
কানন-গোলাপ তারে দিলাম তুলিয়া।
প্রতিদিন সেইখানে আসিত দামিনী,
তুলিয়া দিতাম ফুল, শুনাতেম গান,
কহিতাম বালিকারে কতকি কাহিনী,
শুনি সে হাসিত কভু, শুনিতনা কভু,
আমি ফুল তুলে দিলে ফেলিত ছিঁড়িয়া।
ভৎসনার অভিনয়ে কহিত কতকি।
কভুবা ভ্রূকুটি করি রহিত বসিয়া,
হাসিতে হাসিতে কভু যাইত পলায়ে,
অলীক সরমে কভু হইত অধীর।
কিন্তু তার ভ্রূকুটিতে, সরমে, সঙ্কোচে,
লুকানো প্রেমেরি কথা করিত প্রকাশ!
এইরূপে প্রতি উষা যাইত কাটিয়া।
এক দিন সে বালিকা না আসিত যদি
হৃদয় কেমন যেন হইত বিকল—
প্রভাত কেমন যেন যেতনা কাটিয়া-
দিন যেত অতি ধীরে নিরাশ-চরণে!
বর্ষচক্র আর বার আসিল ফিরিয়া,
নূতন বসন্তে পুনঃ হাসিল ধরণী,
প্রভাতে অলস ভাবে, বসি তরুতলে,
দামিনীরে শুধালেম কথায় কথায়
“দামিনী, তুমি কি মোরে ভালবাস বালা?”
অলীক-সরম-রোষে ভ্রূকুটি করিয়া
ছুটে সে পলায়ে গেল দূর বনান্তরে-
জানি না কি ভাবি পুনঃ ছুটিয়া আসিয়া
“ভালবাসি- ভালবাসি-”কহিয়া অমনি
সরমে-মাখানো মুখ লুকালো এ বুকে!
এইরূপে দিন যেত স্বপ্ন-খেলা খেলি।
কত ক্ষুদ্র অভিমানে কাঁদিত বালিকা
কত ক্ষুদ্র কথা লয়ে হাসিত হরষে-
কিন্তু জানিতাম কি রে এই ভালবাসা
দুদিনের ছেলেখেলা আর কিছু নয়?
কে জানিত প্রভাতের নবীন কিরণে
এমন শতেক ফুল উঠেরে ফুটিয়া
প্রভাতের বায়ু সনে খেলা সাঙ্গ হলে,
আপনি শুকায়ে শেষে ঝরে পড়ে যায়-
ওই ফুলে থুয়েছিনু হৃদয়ের আশা,
ওই কুসুমের সাথে খসে পড়ে গেল!
আর কিছু কাল পরে এই দামিনীরে
যে কথা বলিয়াছিনু আজো মনে আছে।
“দামিনী, মনে কি পড়ে সে দিনের কথা?
বল দেখি কত দিন ওই মুখ খানি
দেখিনি তোমার? তাই দেখিতে এয়েছি!
জোছনার রাত্রে যবে বসেছি কাননে,
দুয়েকটি তারা কভু পড়িছে খসিয়া,
হতবুদ্ধি দুয়েকটি পথহারা মেঘ
অনন্ত আকাশ-রাজ্যে ভ্রমিছে কেবল,
সে নিস্তব্ধ রজনীতে হৃদয়ে যেমন
একে একে সব কথা উঠেগো জাগিয়া,
তেমনি দেখিনু যেই ওই মুখখানি
স্মৃতি-জাগরণ-কারী রাগিণীর মত
ওই মুখখানি তব দেখিনু যেমনি
একে একে পুরাতন সব স্মৃতিগুলি
জীবন্ত হইয়া যেন জাগিল হৃদয়ে।
মনে আছে সেই সখি আর একদিন
এমনি গম্ভীর সন্ধ্যা, এই নদীতীর,
এই খানে এই হাত ধরিয়া তোমার
কাতরে কহেছি আমি নয়নের জলে,
“বিদায় দাওগো এবে চলিনু বিদেশে,
দেখো সখি এত দিন বাসিয়াছ ভাল
দুদিন না দেখে যেন যেওনা ভুলিয়া!
সংসারের কর্ম্ম হতে অবসর লয়ে
আবার ফিরিয়া যবে আসিব দামিনি,
নব-অতিথির মত ভেবোনা আমারে
সম্ভ্রমের অভিনয় কোরোনা বালিকা!”
কিছুই উত্তর তার দিলে না তখন,
শুধু মুখপানে চেয়ে কাতর নয়নে
ভৎসনার অশ্রুজল করিলে বর্ষণ!
যেন এই নিদারুণ সন্দেহের মোর
অশ্রুজল ছাড়া আর নাইক উত্তর!
আবার কহিনু আমি ওই মুখ চেয়ে
“কে জানে মনের মধ্যে কি হয়েছে মোর
আশঙ্কা হতেছে যেন হৃদয়ে আমার
ওই স্নেহ-সুধা-মাখা মুখখানি তোর
এজনমে আর বুঝি পাবনা দেখিতে।”
নীরক গম্ভীর সেই সন্ধ্যার আঁধারে
সমস্ত জগৎ যেন দিল প্রতিধ্বনি
“এজনমে আর বুঝি পাবনা দেখিতে।’
গভীর নিশীথে যথা আধ ঘুম ঘোরে
সুদুর শ্মশান হতে মরণের রব
শুনিলে হৃদয় উঠে কাঁপিয়া কেমন,
তেমনি বিজন সেই তটিনীর তীরে
একাকী আঁধারে যেন শুনিনু কি কথা
সমস্ত হৃদয় যেন উঠিল শিহরি!
আরবার কহিলাম “বিদায়—ভুলোনা।”
তখন কি জানিতাম এই নদীতীরে
এই সন্ধ্যাকালে আর তোমারি সমুখে।
এমনি মনের দুখে হইবে কাঁদিতে?
তখনো আমার এই বাল্য জীবনের
প্রভাত-নীরদ হতে নব-রক্ত-রাগ
যায়নি মিলায়ে সখি, তখনো হৃদয়
মরীচিকা দেখিতেছিল দুর শূন্য-পটে!
নামিনু সংসার-ক্ষেত্রে যুঝিনু একাকী,
যাহা কিছু চাহিলাম পাইনু সকলি!
তখন ভাবিনু যাই প্রেমের ছায়ায়
এতদিনকার শ্রান্তি যাবে দূর হয়ে।
সন্ধ্যাকালে মরুভূমে পথিক যেমন
নিরখিয়া দেখে যবে সম্মুখে পশ্চাতে
সুদূরে দেখিতে পায় প্রান্ত দিগন্তের
সুবর্ণ জলদ জালে মণ্ডিত কেমন,
সে দিকে তারকাগুলি চুম্বিছে প্রান্তর,
সায়াহ্ন-বালার সেথা পূর্ণতম শোভা,
কিন্তু পদতলে তার অসীম বালুকা
সারাদিন জ্বলি জ্বলি তপন কিরণে
ফেলিছে সায়হ্নকালে জ্বলন্ত নিশ্বাস।
তেমনি এ সংসারের পথিক যাহারা
ভবিষ্যত অতীতের দিগন্তের পানে,
চাহি দেখে স্বর্গ সেথা হাসিছে কেবল
পদতলে বর্ত্তমান মরুভূমি সম!
স্মৃতি আর আশা ছাড়া সত্যকার সুখ
মানুষের ভাগ্যে সখি ঘটেনাক বুঝি!
বিদেশ হইতে যবে আইসে ফিরিয়া
অতি হতভাগা যেও সেও ভাবে মনে
যারে যারে ভালবাসে সকলেই বুঝি
রহিয়াছে তার তরে আকুল-হৃদয়ে!
তেমনি কতই সখি করেছিনু আশা,
মনে মনে ভেবেছিনু কত না হরষে
দামিনী আমার বুঝি তৃষিত-নয়নে
পথ পানে চেয়ে আছে আমারি আশায়।
আমি গিয়ে কব তারে হরষে কাঁদিয়া
“মুছ অশ্রুজল সখি, বহু দিন পরে
এসেছে বিদেশ হতে ললিত তোমার”
অমনি দামিনী বুঝি আহ্লাদে উথলি
নীরব অশ্রুর জলে কবে কত কথা!
ফিরিয়া আসিনু যবে-একি হল জ্বালা!
কিছুতে নয়ন জল নারি সামালিতে।
ফের’ ফের’ চাহিও না এ আঁখির পানে,
প্রাণে বাজে অশ্রুজল দেখাতে তোমায়!
জেনো গো রমণি, জেনো, এত দিন পরে
কাঁদিয়া প্রণয় ভিক্ষা করিতে আসিনি,
এ অশ্রু দুঃখের অশ্রু-এ নহে ভিক্ষার!
কখনো কখনো সখি অন্য মনে যবে
সুবিজন বাতায়নে রয়েছ বসিয়া
সম্মুখে যেতেছে দেখা বিজন প্রান্তর
হেথা হোথা দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন কুটীর-
হুহু করি বহিতেছে যমুনার বায়ু-
তখন কি সে দিনের দুয়েকটি কথা
সহসা মনের মধ্যে উঠে না জাগিয়া?
কখন যে জাগি উঠে পার না জানিতে!
দূরতম রাখালের বাঁশিস্বর সম
কভু কভু দুয়েকটি ভাঙ্গা ভাঙ্গা সুর
অতি মৃদু পশিতেছে শ্রবণ বিবরে;
আধ জেগে আধ ঘুমে স্বপ্ন আধ-ভোলা-
তেমনি কি সে দিনের দুয়েকটি কথা
সহসা মনের মধ্যে উঠে না জাগিয়া?
স্মৃতির নির্ঝর হতে অলক্ষ্যে গোপনে;
পথহারা দুয়েকটি অশ্রুবারিধারা
সহসা পড়ে না ঝরি নেত্র প্রান্ত হতে,
পড়িছে কি না পড়িছে পার না জানিতে।
একাকী বিজনে কভু অন্য মনে যবে
বসে থাকি, কত কি যে আইসে ভাবনা,
সহসা মুহূর্ত্ত পরে লভিয়া চেতন
কি কথা ভাবিতে ছিনু নাহি পড়ে মনে
অথচ মনের মধ্যে বিষন্ন কি ভাব
কেমন আঁধার করি রহে যেন চাপি,
হৃদয়ের সেই ভাবে কখন কি সখি
সে দিনের কোন ছায়া পড়ে না স্মরণে?
ছেলেবেলাকার কোন বন্ধুর মরণ
স্মরিলে যেমন লাগে হৃদয়ে আঘাত,
তেমনি কি সখি কভু মনে নাহি হয়
সে সকল দিন কেন গেল গো চলিয়া
যে দিন এ জন্মে আর আসিবে না ফিরি!
পুরাতন বন্ধু তারা, কত কাল আহা
খেলা করিয়াছি মোরা তাহাদের সাথে,
কত সুখে হাসিয়াছি দুঃখে কাঁদিয়াছি
সে সকল, সুখ দুঃখ হাসি কান্না লয়ে
মিশাইয়া গেল তার আঁধার অতীতে!
চলিনু দামিনী পুনঃ চলিনু বিদেশে-
ভাবিলাম একবার দেখিব মুখানি
একবার শুনাইব মরমের ব্যথা,
তাই আসিয়াছি সখি, এ জনমে আর
আসিব না দিতে তব শান্তিতে ব্যাঘাত,
এ জন্মের তরে সখি কহ একবার
একটি স্নেহের বাণী অভাগার পরে
ভ্রমিয়া বেড়াব যবে সুদূর বিদেশে
সে কথার প্রতিধ্বনি বাজিবে হৃদয়ে!”
থাম স্মৃতি-থাম তুমি, থাম এইখানে
সম্মুখে তোমার ওকি দৃশ্য মর্ম্মভেদী?
মালতী আমার সেই প্রাণের ভগিনী,
শৈশব কালের মোর খেলার সাথী,
যৌবন কালের মোর আশ্রয়ের ছায়া,
প্রতি দুঃখ প্রতি সুখ প্রতি মনোভাব
যার কাছে না বলিলে বুক যেত ফেটে,
সেই সে মালতী মোর হয়েছে বিধবা!
আপনার দুঃখে মগ্ন স্বার্থপর আমি
ভাল করে পারি না করিতে সান্ত্বনা!
নিজের চোখের জলে অন্ধ এ নয়নে
পরের চোখের জল পেনুনা দেখিতে!
ছেলেবেলাকার সেই পুরাণো কুটীরে
হাসিতে হাসিতে এল মালতী আমার
সে হাসির চেয়ে ভাল তীব্র অশ্রুজল!
কে জানিত সে হাসির অন্তরে অন্তরে
কাল-রাত্রি অন্ধকার রয়েছে লুকায়ে!
একদিন বলেনি সে কোন দুঃখ কথা,
একদিনো কাঁদেনি সে সমুখে আমার!
জানি জানি মালতী সে স্বর্গের দেবতা!
নিজের প্রাণের বহি করিয়া গোপন,
পরের চোখের জল দিত সে মুছায়ে।
ছেলেবেলাকার সেই হাসিটি তাহার
সমস্ত আনন তার রাখিত উজ্জলি
কত না করিত যত্ন করিত সান্ত্বনা।
হাসিতে হাসিতে কত করিত আদর!
কিন্তু হা শ্মশানে যথা চাঁদের জোছনা
শ্মশানের ভীষণতা বাড়ায় দ্বিগুণ-
মালতীর সেই হাসি দেখিয়া তেমনি
নিজের এ হৃদয়ের ভগ্ন-অবশেষ
দ্বিগুণ পড়িত যেন নয়নে আমার!
তাহার আদর পেয়ে ভুলিনু যাতনা,
কিন্তু হায় দেখি নাই, বিজন-শয্যায়
কত দিন কাঁদিয়াছে মালতী গোপনে!
সে যখন দেখিত, তাহার বাল্যসখা
দিনে দিনে অবসাদে হইছে মলিন,
দিনে দিনে মন তার যেতেছে ভাঙ্গিয়া,
তখন আকুলা ‘বালা রাত্রে একাকিনী
কাঁদিয়া দেবতা কাছে করেছে প্রার্থনা-
বালিকার অশ্রুময় সে প্রার্থনা গুলি
আর কেহ শুনে নাই অন্তর্যামী ছাড়া!
দেখি নাই কত রাত্রি একাকিনী গিয়া
যমুনার তীরে বসি কাঁদিত বিরলে!
একাকিনী কেঁদে কেঁদে হইত প্রভাত,
এলোথেলো কেশপাশে পড়িত শিশির,
চাহিয়া রহিত উষা ম্লান মুখ পানে!
বিষময়, বহ্নিময়, বজ্রময় প্রেম,
এ স্নেহের কাছে তুই ঢাক মুখ ঢাক!
তুই মরণের কীট, জীবনের রাহু,
সৌন্দর্য-কুসুম-বনে তুই দাবানল,
হৃদয়ের রোগ তুই, প্রাণের মাঝারে
সতত রাখিস্ তুই পিপাসা পুষিয়া,
ভুজঙ্গ বাহুর পাকে মর্ম্ম জড়াইয়া
কেবলি ফেলিস তুই বিষাক্ত নিশ্বাস,
আগ্নেয় নিশ্বাসে তোর জ্বলিয়া জ্বলিয়া
হৃদয়ে ফুটিতে থাকে তপ্ত রক্তস্রোত!
জরস্তর কলেবর, আবেশে অসাড়,
শিথিল শিরার গ্রন্থি, অচেতন প্রাণ,
স্খলিত জড়িত বাণী, অবশ নয়ন,
আশা ও নিরাশা পাকে ঘুরিছে হৃদয়,
ঘুরিছে চোখের পরে জগত সংসার।
এই প্রেম, এই বিষ, বজ্র-হুতাশন
কবে রে পৃথিবী হতে যাবে দূর হয়ে!
আয় স্নেহ, আয় তোর স্নিগ্ধ-সুধা ঢালি
এ জ্বলন্ত বহিরাশি দে রে নিবাইয়া!
অগ্নিময় বৃশ্চিকের আলিঙ্গন হতে,
সুধাসিক্ত কোলে-তোর তুলেনে তুলেনে!
প্রেম-ধূমকেতু ওই উঠেছে আকাশে,
ঝুলসি দিতেছে হায় যৌবনের আঁখি,
কোথা তুমি ধ্রুবতারা ওঠ একবার,
ঢাল এ জ্বলন্ত নেত্রে স্নিগ্ধ-মৃদু-জ্যোতি!
তুমি সুধা, তুমি ছায়া, তুমি জ্যোৎস্নাধারা,
তুমি স্রোতস্বিনী, তুমি উষার বাতাস,
তুমি হাসি, তুমি আশা, মৃদুঅশ্রুজল,
এস তুমি এ প্রেমেরে দাও নিভাইয়া!
একটি মালতী যার আছে এ সংসারে
সহস্র দামিনী তার ধূলিমুষ্টি নয়!
ক্রমশঃ হৃদয় মোর এল শান্ত হয়ে
যন্ত্রণা বিষাদে আসি হ’ল পরিণত।
নিস্তরঙ্গ সরসীর প্রশান্ত হৃদয়ে
নিশীথের শান্ত বায়ু ভ্রমেগো যখন,
এত শান্ত এত মৃদু পদক্ষেপ তার
একটি চরণচিহ্ন পড়েনা সরসে,
তেমনি প্রশান্ত হৃদে প্রশান্ত বিষাদ
ফেলিতে লাগিল ধীরে মৃদুল নিঃশ্বাস!
নিরখিয়া নিদারুণ ঝটিকার মাঝে
হাসিময় শান্ত সেই মালতী কুসুমে
ক্রমশঃ হৃদয় মোর এল শান্ত হয়ে।
কিন্তু হায় কে জানিত সেই হাসিময়
সুকুমার ফুলটির মর্ম্মের মাঝারে
মরণের কীট পশি করিতেছে ক্ষয়!
হইল প্রফুল্লতর মুখখানি তার,
হইল প্রশান্ততর হাসিটি তাহার;
দিবা যবে যায় যায়, হাসিময় মেঘে
দূর আঁধারের মুখ করয়ে উজ্জল-
এ হাসি তেমনি হাসি কে জানিত তাহা!
একদা পূর্ণিমারাত্রে নিস্তব্ধ গভীর
মুখ পানে চেয়ে বালা, হাত ধরি মোর
কহিল মৃদুলস্বরে—যাই তবে ভাই!-
কোথা গেলি-কোথা গেলি মালতী আমার
অভাগা ভ্রাতারে তোর রাখিয়া হেথায়!
দুঃখের কণ্টকময় সংসারের পথে
মালতী, কে লয়ে যাবে হাত ধরি মোর?
সংসারের ধ্রুবতারা ডুবিল আমার।
তেমন পূর্ণিমা রাত্রি দেখিনি কখনো,
পৃথিবী ঘুমাইতেছে শান্ত জোছনায়;
কহিনু পাগল হয়ে রাক্ষসী-পৃথিবী
এত রূপ তোরে কভু সাজেনা সাজেনা!
মালতী শুকায়ে গেল, সুবাস তাহার
এখনো রয়েছে কিন্তু ভরিয়া কুটীর।
তাহার মনের ছায়া এখনো যেনরে
সে কুটীরে শান্তিরসে রেখেছে ডুবায়ে!
সে শান্ত প্রতিমা মম মনের মন্দির
রেখেছে পবিত্র করি রেখেছে উজ্বলি!
সমাপ্ত।
শান্তি-গীত
শান্তি-গীত।
ঘুমা’ দুঃখ, হৃদয়ের ধন,
ঘুমা’ তুই, ঘুমারে এখন।
সুখে সারা দিনমান শােণিত করিয়া পান
এখন ত মিটেছে তিয়াস?
দুঃখ তুই সুখেতে ঘুমাস্!
প্রশান্ত যামিনী আজি
কুসুম শয্যার পরে আঁচল পেতেছে,-
আকুল জোছনা,
বসন্ত-হৃদয়া আর ফুলন্ত-স্বপনা
শ্যামল-যৌবনা পৃথিবীর
বুকের উপরে আসি মরিয়া যেতেছে।
তবে ঘুমা দুঃখ ঘুমা!
স্বপনের ঘােরে যেন বেড়ায় ভ্রমিয়া
শিশু-সমীরণ,
কুসুম ছুঁইয়া,
ঘুমে যেন চলে না চরণ-
দুই পা চলিতে যেন পড়িছে শুইয়া
প্রশান্ত সরসী কোলে দেহটি থুইয়া;
দুঃখ তুই ঘুমা!
আজ জোছনার রাত্রে বসন্ত পবনে,
অতীতের পরলােক ত্যজি শুন্য মনে,
বিগত দিবস গুলি শুধু একবার
পুরানাে খেলার ঠাঁই দেখিতে এসেছে
এই হৃদয়ে আমার;-
যবে বেঁচেছিল, তারা এই এ শ্মশানে
দিন গেলে প্রতি দিন পুড়াত’ যেখানে
একেকটি আশা আর একেকটি সুখ,-
সেই খানে আসি তারা বসিয়া রয়েছে
অতি ম্লান মুখ!
সেখানে বসিয়া তারা সকলে মিলিয়া
অতি মৃদু স্বরে
পুরাণো কালের গীতি নয়ন মুদিয়া
ধীরে গান করে।
বাঁশরীর স্বর দিয়া
তারকার কর দিয়া
প্রভাতের স্বপ্ন দিয়া
ইন্দ্রধনু-বাষ্পময় ছবি আঁকিতেছে!
বুকে-ঢেকে রাখিতেছে।
দুঃখ তুই ঘুমা!’
ধীরে-উঠিতেছে গান-
ক্রমে—ছাইতেছে প্রাণ,
নীরবতা ছায় যথা সন্ধ্যার গগন।
গানের প্রাণের মাঝে, তাের তীব্র কণ্ঠস্বর
ছুরীর মতন-
তুই—থাম্ দুঃখ থাম্,
তুই—ঘুমা’ দুঃখ ঘুমা’!
প্রাণের একটি ধারে আছেরে আঁধার ঠাঁই,
শুকানো পাতার পরে ঘুমাস্ সেথাই।
আঁধার গাছের ছায়ে রয়েছে কুয়াশা করি,
শুকানাে ফুলের দল পড়িছে মাথার পরি,
সুমুখে গাহিছে নদী কলকল একতান,
রজনীর চক্রবাকী কাঁদিয়া গাহিছে গান;
ঘুমাস্ সেথাই—
আজ রাত্রে র’ব শুধু চাহিয়া চাঁদের পানে,
আর কিছু নয়—
বহু দিন পরে দেখা মুমূর্যু প্রণয়ী যথা
আঁকড়িয়া ধরে বুক একটি কহে না কথা-
পুরাতন দিবসের যত কথাগুলি
শত গীত ময়-
প্রাণের উপরে আসি রহিবে পড়িয়া
মরমে মরিয়া!
আজ তুই ঘুমা’ –
কাল্ উঠিস্ আবার
খেলিস্ দুরন্ত খেলা হৃদয়ে আমার।
হৃদয়ের শিরাগুলি ছিঁড়ি ছিঁড়ি মাের
তাইতে রচিস্ তন্ত্রী বীণাটির তাের,
সারাদিন বাজাস্ বসিয়া
ধ্বনিয়া হৃদয়।-
আজ রাত্রে র’ব শুধু চাহিয়া চাঁদের পানে
আর কিছু নয়!-
শিশির
শিশির।
শিশির কাঁদিয়া শুধু বলে,
“কেন মোর হেন ক্ষুদ্র প্রাণ?
শিশুটির কল্পনার মত
জনমি অমনি অবসান?
ঘুম-ভাঙা উষা মেয়েটির
একটি সুখের অশ্রু হায়,
হাসি তার ফুরাতে ফুরাতে
এ অশ্রুটি শুকাইয়া যায়!
ফুলটির আঁখি ফুটাইয়া,
মলয়ের প্রাণ জুড়াইয়া,
কাননের শ্যামল কপোলে
অশ্রুময় হাসি বিকাশিয়া,—
প্রভাত না ছুটিতে ছুটিতে,
মালতী না ফুটিকে ফুটিতে,
এই হাসি-বিন্দুটির প্রাণ
কোথায় যে যায় মিলাইয়া!
বিশাল এ জগতের মাঝ,
আর কিছু নাই মাের কাজ?
প্রভাতের জগতের পানে
হেরি শুধু অবাক্ নয়ানে,
হাসিটি ফুটিয়া উঠে মুখে,
ডুবে যাই প্রভাতের সুখে,
দুই দণ্ড হাসিতে ভাসিয়া
হাসির কোলেতে ম’রে যাই।
আর কিছু- কিছু কায নাই?
টুকটুকে মুখখানি নিয়ে
গােলাপ হাসিছে মুচকিয়ে,
বকুল প্রাণের সুধা দিয়ে
বায়ুরে মাতাল করি তুলে;
প্রজাপতি ভাবিয়া না পায়
কাহারে তাহার প্রাণ চায়,
তুলিয়া অলস পাখা দুটি
ভ্রমিতেছে ফুল হতে ফুলে।
সেই হাসি-রাশির মাঝারে
আমি কেন থাকিতে না পাই?
যেমনি নয়ন মেলি, হায়,
সুখের নিমেষটির প্রায়,
অতৃপ্ত হাসিটি মুখে ল’য়ে
অমনি কেন গাে ম’রে যাই?
শুয়ে শুয়ে অশােক পাতায়
মুমূর্ষ শিশির বলে “হায়!
কোন সুখ ফুরায়নি যার
তার কেন জীবন ফুরায়!”
“আমি কেন হইনি শিশির?
কহে কবি নিশ্বাস ফেলিয়া।
“প্রভাতেই যেতেম শুকায়ে
প্রভাতেই নয়ন মেলিয়া!
হে বিধাতা, শিশিরের মত
গড়েছ আমার এই প্রাণ,
শিশিরের মরণটি কেন
আমারে করনি তবে দান?
আমি, দেব, প্রভাতের কবি,
ভালবাসি প্রভাতের রবি,
ভালবাসি প্রভাতের ফুল,
ভালবাসি প্রভাতের বায়!
ওই দেখ, মধ্যাহ্ন আইল,
চারিদিকে ফুল শুকাইল,
জনমেছি যাহাদের সাথে
তাহারা সবাই চ’লে যায়!
হাসি হয়ে জনম লভিনু
অশ্রু হয়ে বেঁচে আছি হায়!
শিশিরে অমর করি যদি
গড়িতে বাসনা ছিল, বিধি,
অমর করনি কেন ফুল?
উষা কেন চ’লে যায় তবে?
উষায় যে লভিল জনম,
উষা গেলে সে কেন রহিবে?
যে দিকেই ফিরাই নয়ন,
দুঃখ শােক মরণ কেবল!
ওহে প্রভু, করুণা আগার,
এ শােকের জগত-মাঝার,
তুমি কি ফেলেছ মােরে, কবি,
তােমার একটি অশ্রু জল?
বহিতে পারি না সখা, আর,
মৃত্যুময় জীবন আমার,
তোমার সে তপন-কিরণে
এ শিশির মিলাইতে চায়।”
তাই কবি কহিল কাঁদিয়া
“শিশির হ’তেম যদি হায়!”
সংগ্রাম-সঙ্গীত
সংগ্রাম-সঙ্গীত।
হৃদয়ের সাথে আজি
করিব রে-করিব সংগ্রাম!
এত দিন কিছু না করিনু,
এত দিন বসে রহিলাম,
আজি এই হৃদয়ের সাথে
একবার করিব সংগ্রাম।
ওই দেখ, ওই আসে, বুঝি চরাচর গ্রাসে
আমার হৃদয় অন্ধকার।
মেলিয়া অলস আঁখি, কেমনে বসিয়া থাকি?
আক্রমিছে জগৎ আমার।
জগৎ করিছে হাহাকার!
বিলাপে পূরিল চারিধার!
কাঁদে রবি, কাঁদে শশি, কেঁদে তারা পড়ে খসি,
কেঁদে উঠে বাযু শত বার!
চেয়ে দেখে দশ দিশি, কাঁদে দিবা, কাঁদে নিশি,
মৌন সন্ধ্যা অমঙ্গল গণি,
দশ দিকে কাদে প্রতিধ্বনি!
ক্রন্দনের কোলাহল আক্রমিছে নভস্থল,
শতমুখী বন্যার মতন,
কোলাহল-সিন্ধু মাঝে জগৎ তরীর মত
করিতেছে উত্থান পতন!
এ আমার বিদ্রোহী হৃদয়
আমারে যে করিয়াছে জয়!
যে দিকে মেলিছে আঁখি জ্বলে তরু মরে পাখী,
সে দিক হতেছে মরুময়!
চরাচরে আগুন লাগায়,
চারিদিকে দুর্ভিক্ষ জাগায়!
পরাণের অন্তঃপুরে কাঁদিছে আকাশ পূরে
স্নেহ প্রেম বিধবার বেশে!
মৃত শিশু লয়ে বুকে আশা বসি ম্লান মুখে,
ভস্মময় শ্মশান-প্রদেশে।
সুখ, অতি সুকুমার, সহিতে নারিল আর,
কেঁদে কেঁদে মরে গেল শোকে!
জল নাই করুণার চোখে,
ফুল নাই কল্পনার বনে,
হাসি নাই স্মৃতির আননে!
বিদ্রোহী এ হৃদয় আমার
জগৎ করিছে ছারখার।
ফেলিয়া আঁধার ছায়া গ্রাসিছে চাঁদের কায়া
সুবিশাল রাহুর আকার।
মেলিয়া আঁধার গ্রাস দিনেরে দিতেছে ত্রাস,
মলিন করিছে মুখ তার!
উষার মুখের হাসি লয়েছে কাড়িয়া,
গভীর বিরামময় সন্ধ্যার প্রাণের মাঝে
দুরন্ত অশান্তি এক দিয়াছে ছাড়িয়া!
প্রাণ হতে মুছিতেছে অরুণের রাগ,
দিতেছে প্রাণের মাঝে কলঙ্কের দাগ!
প্রাণের পাখীর গান দিয়াছে থামায়ে,
বেড়াত’ যে সাধ গুলি মেঘের দোলায় দুলি
তাদের দিয়েছে হায় ভূতলে নামায়ে!
ক্রমশই বিছাইছে অন্ধকার পাখা,
আঁখি হতে সব কিছু পড়িতেছে ঢাকা!
ফুল ফুটে—আমি আর দেখিতে না পাই,
পাখী গাহে, মাের কাছে গাহে না সেআর!
দিন হল, আলাে হল, তবু দিন নাই,
আমি শুধু নেহারি পাখার অন্ধকার!
মিছা ব’সে রহিব না আর
চরাচর হারায় আমার।
রাজ্যহারা ভিখারীর সাজে,
ভস্ম, দগ্ধ, ধ্বংশ পরি ভ্রমিব কি হাহা করি
জগতের মরুভূমি মাঝে?
আজ তবে হৃদয়ের সাথে
এক বার করিব সংগ্রাম!
ফিরে নেব, কেড়ে নেব আমি
জগতের একেকটি গ্রাম!
ফিরে নেব রবি শশি তারা,
ফিরে নেব সন্ধ্যা আর উষা,
পৃথিবীর শ্যামল যৌবন,
কাননের ফুলময় ভূষা!
ফিরে নেব হারান সঙ্গীত,
ফিরে নেব মৃতের জীবন,
জগতের ললাট হইতে
আঁধার করিব প্রক্ষালন!
আমি হব সংগ্রামে বিজয়ী,
হৃদয়ের হবে পরাজয়!
জগতের দূর হবে ভয়!
হৃদয়েরে রেখে দেব বেঁধে,
বিরলে মরিবে কেঁদে কেঁদে!
দুঃখে বিঁধি কষ্টে বিঁধি জর্জর করিব হৃদি
বন্দী হয়ে কাটাবে দিবস,
অবশেষে হইবে সে বশ,
জগতে রটিবে মোর যশ!
বিশ্ব চরাচর ময় উচ্ছ্বসিবে জয় জয়,
উল্লাসে পূরিবে চারিধার,
গাবে রবি, গাবে শশি, গবে তারা শূন্যে বসি
গাবে বায়ু শত শত বার।
চারিদিকে দিবে হুলুধ্বনি,
বরষিবে কুসুম আসার,
বেঁধে দেব বিজয়ের মালা
শান্তিময় ললাটে আমার!
সন্ধ্যা
সন্ধ্যা।
ব্যথা বড় বাজিয়াছে প্রাণে,
সন্ধ্যা তুই ধীরে ধীরে আয়!
কাছে আয়—আরো কাছে আয়—
সঙ্গীহারা হৃদয় আমার
তোর বুকে লুকাইতে চায়।
আমার ব্যথার তুই ব্যথী,
তুই মোর এক মাত্র সাথী,
সন্ধ্যা তুই আমার আলয়,
তোরে আমি বড় ভাল বাসি—
সারাদিন ঘুরে ঘুরে ঘুরে
তোর কোলে ঘুমাইতে আসি,
তোর কাছে ফেলিরে নিশ্বাস,
তোর কাছে কহি মনোকথা,
তোর কাছে করি প্রসারিত
প্রাণের নিভৃত নীরবতা।
তোর গান শুনিতে শুনিতে
তোর তারা গুণিতে গুণিতে,
নয়ন মুদিয়া আসে মোর,
হৃদয় হইয়া আসে ভোর—
স্বপন গোধুলীময় প্রাণ
হারায় প্রাণের মাঝে তোর।
একটি কথাও নাই মুখে,
চেয়ে শুধু রোস্ মুখ পানে
অনিমেষ আনত নয়ানে।
ধীরে শুধু ফেলিস নিশ্বাস,
ধীরে শুধু কানে কানে গাস্
ঘুম পাড়াবার মৃদু গান,
কোমল কমল কর দিয়ে
ঢেকে শুধু দিস্ দুনয়ান,
ভুলে যাই সকল যাতনা
জুড়াইয়া আসে মোর প্রাণ!
তাই তোরে ডাকি একবার,
সঙ্গীহারা হৃদয় আমার
তোর বুকে লুকাইয়া মাথা
তোর কোলে ঘুমাইতে চায়,
সন্ধ্যা তুই ধীরে ধীরে আয়।
আঁধার আঁচল দিয়ে তোর
আমার দুখেরে ঢেকে রাখ্,
বল্ তারে ঘুমাইতে বল্
কপালেতে হাতখানি রাখ্,
জগতেরে ক’রে দে আড়াল,
কোলাহল করিয়া দে দূর—
দুখেরে কোলেতে করে নিয়ে
র’চে দে নিভৃত অন্তঃপুর।
তা হলে সে কাঁদিবে বসিয়া,
কল্পনার খেলেনা গড়িবে,
খেলিয়া আপন মনে, কাঁদিয়া কাঁদিয়া, শেষে
আপনি সে ঘুমায়ে পড়িবে।
আয় সন্ধ্যা ধীরে ধীরে আয়,
হাতে লয়ে স্বপনের ডালা,
গুন্ গুন্ মন্ত্র পড়ি পড়ি
গাঁথিয়া দে স্বপনের মালা,
জড়ায়ে দে আমার মাথায়,
স্নেহ-হস্ত বুলায়ে দে গায়!
স্রোতস্বিনী ঘুম ঘোরে, গাবে কুলু কুলু কোরে
ঘুমেতে জড়িত আধ’ গান,
ঝিল্লিরা ধরিবে একতান,
দিন-শ্রমে শ্রান্ত বায়ু গৃহ মুখে যেতে যেতে
গান গাবে অতি মৃদু স্বরে,
পদ শব্দ শুনি তার তন্দ্রা ভাঙ্গি লতা পাতা
ভর্ৎসনা করিবে মর মরে।
ভাঙ্গা ভাঙ্গা গান গুলি মিলিয়া হৃদয় মাঝে
মিশে যাবে স্বপনের সাথে,
নানাবিধ রূপ ধরি ভ্রমিয়া বেড়াবে তারা
হৃদয়ের গুহাতে গুহাতে!
আয় সন্ধ্যা ধীরে ধীরে আয়,
আন্ তোর স্বর্ণ মেঘ জাল,
পশ্চিমের সুবর্ণ প্রাঙ্গণে
খেলিবি মেঘের ইন্দ্রজাল!
ওই তোর ভাঙ্গা মেঘ গুলি,
হৃদয়ের খেলেনা আমার,
ওই গুলি কোলে কোরে নিয়ে
সাধ যায় খেলি অনিবার।
ওই তোর জলদের পর,
বাঁধি আমি কত শত ঘর!
সাধ যায় হোথায় লুটাই,
অস্তগামী রবির মতন,
লুটায়ে লুটায়ে পড়ি শেষে
সাগরের ওই প্রান্ত দেশে
তরল কনক নিকেতন!
ছোট ছোট ওই তারা গুলি,
ডাকে মোরে আঁখি-পাতা খুলি।
স্নেহময় আঁখি গুলি যেন
আছে শুধু মোর পথ চেয়ে,
সন্ধ্যার আঁধারে বসি বসি
কহে যেন গান গেয়ে গেয়ে,
"কবে তুমি আসিবে হেথায়?
অন্ধকার নিভৃত-নিলয়ে,
জগতের অতি প্রান্ত দেশে
প্রদীপটি রেখেছি জ্বালায়ে!
বিজনেতে রয়েছি বসিয়া
কবে তুমি আসিবে হেথায়!”
সন্ধ্যা হলে মোর মুখ চেয়ে
তারা গুলি এই গান গায়!
আয় সন্ধ্যা ধীরে ধীরে আয়
জগতের নয়ন ঢেকে দে—
আঁধার আঁচল পেতে দিয়ে
কোলেতে মাথাটি রেখে দে!
সমাপন
উপহার।
ভুলে গেছি, কবে তুমি ছেলেবেলা একদিন
মরমের কাছে এয়েছিলে,
স্নেহময়, ছায়াময়, সন্ধ্যায় আঁখি মেলি
একবার শুধু চেয়েছিলে,
স্তরে স্তরেএ হৃদয় হয়ে গেল অনাবৃত,
হৃদয়ের দিশি দিশি হয়ে গেল উঘাটিত,
একে একে শত শত ফুটিতে লাগিল তারা,
তারকা-অরণ্য মাঝে নয়ন হইল হারা!
বুঝি গো সন্ধ্যার কাছে, শিখেছে সন্ধ্যার মায়া
ওই আঁখি দুটি,—
চাহিলে হৃদয় পানে মরমেতে পড়ে ছায়া,
তারা উঠে কুটি!
আগে কে জানিত বল কত কি লুকান’ ছিল
হৃদয়-নিভৃতে,
তোমার নয়ন দিয়া আমার নিজের হিয়া
পাই দেখিতে।
কখনো গাওনি তুমি, কেবল নীরবে রহি
শিখায়েছ গান,
স্বপ্নময় শাস্তিময় পূরবী রাগিণী তানে,
বাঁধিয়াছ প্রাণ।
আকাশের পানে চাই—সেই সুরে গান গাই
একেলা বসিয়া!
একে একে সুর গুলি, অনন্তে হারায়ে যায়
আঁধারে পশিয়া!
বল দেখি কত দিন আসনি এ শূন্য প্রাণে,
বল দেখি কত দিন চাওনি হৃদয় পানে,—
বল দেখি কত দিন শোননি এ মোর গান,
তবে সখি গান-গাওয়া হল বুঝি অবসান!
বল মেরে বল দেখি, এ আমার গান গুলি
কেন আর ভাল নাহি লাগে,
প্রাণের রাগিণী শুনি নয়নে জাগেনা আভা
কেন সখি কিসের বিরাগে?
যে রাগ শিখায়েছিলে সে কি আমি গেছি ভুলে?
তার সাথে মিলিছে না সুর?
তাই কি আসনা প্রাণে, তাই কি শােন না গান,
তাই সখি, রয়েছ কি দূর!
ভাল সখি, আবার শিখাও-,
আর বার মুখপানে চাও,
একবার ফেল অশ্রুজল,
একবার শােন গান গুলি,
তা হলে পুরাণ’ সুর আবার পড়িবে মনে,
আর কভু যাইব না ভূলি!
সেই পুরাতন চোখে মাঝে মাঝে চেয়ে সখি
উজলিয়া স্মৃতির মন্দির,
এই পুরাতন প্রাণে মাঝে মাঝে এসে সখি
শূন্য আছে প্রাণের কুটীর।
নহিলে আধার মেঘ রাশি
হৃদয়ের আলোক নিভাবে,
একে একে ভূলে যাব সুর,
গান গাওয়া সাঙ্গ হয়ে যাবে।
সুখের বিলাপ
সুখের বিলাপ।
অবশ নয়ন নিমীলিয়া,
সুখ কহে নিশ্বাস ফেলিয়া—
“নিতান্ত একেলা আমি,
কেহ—কেহ—কেহ নাই হেথা,
কেহ—কেহ—কেহ নাই মোর!
এমন জোছনা সুমধুর,
বাঁশরী বাজিছে দূর–দূর,
যামিনীর হসিত নয়নে
লেগেছে মৃদুল ঘুম-ঘোর।
নদীতে উঠেছে মৃদু ঢেউ;
গাছেতে নড়িছে মৃদু পাতা;
লতায় ফুটিয়া ফুল দুটি
পাতায় লুকায় তার মাথা;
মলয় সুদূর বন ভূমে
কাঁপায়ে গাছের ছায়া গুলি,
লাজুক ফুলের মুখ হতে
ঘোমটা দিতেছে খুলি খুলি!
এমন মধুর রজনীতে
একেলা রয়েছি বসিয়া,
যামিনীর হৃদয় হইতে
জোছনা পড়িছে খসিয়া!
হৃদয়ে একেলা শুয়ে শুয়ে
সুখ শুধু এই গান গায়—
“নিতান্ত একেলা আমি যে,
কেহ—কেহ—কেহ নাই হায়!”
আমি তারে শুধাইনু গিয়া—
“কেন, সুখ, কার কর আশা?”
সুখ শুধু কাঁদিয়া কহিল—
“ভালবাসা—ভালবাসা গো!
সকলি—সকলি হেথা আছে,
কুসুম ফুটেছে গাছে গাছে,
আকাশে তারকা রাশি রাশি,
জোছনা ঘুমায় হাসি হাসি,
সকলি—সকলি হেথা আছে,
সেই শুধু—সেই শুধু নাই,
ভালবাসা নাই শুধু কাছে!
নিতান্তই একেলা ফেলিয়া
ভালবাসা, গেলি কি চলিয়া?
আবার কি দেখা হবে রে?
আর কি রে ফিরিয়া আসিবি?
আর কি রে হৃদয়ে বসিবি?
উভয়ে উভের মুখ চেয়ে
আবার কাঁদিব কবে রে?
অভিমান ক’রে মোর পরে
দুখেরে কি করিলি বরণ?
তারি বুকে মাথা রেখে করিলি শয়ন?
তারি গলে দিলি মালা?
তারি হাতে দিলি হাত?
সতত ছায়ার মত
রহিলি কি তারি সাথ?
তাই আমি কুসুম-কাননে
নিতান্ত একেলা বসি রে,
জোছনা হাসিয়া কাঁদিতেছে
সুখের নিশির শিশিরে!
অবশ নয়ন নিমীলিয়া
সুখ কহে নিশ্বাস ফেলিয়া—
"এই তটিনীর ধারে, এই শুভ্র জোছনায়,
এই কুসুমিত বনে, এই বসন্তের বায়,
কেহ মোর নাই একেবারে,
তাই সাধ গেছে কাঁদিবারে।
আজি এ গভীর রজনীতে—
জোছনা মগন নীরবতা,
সুদূর বাঁশির মৃদু স্বর,
মলয়ের কানে কানে কথা,
সহসা জাগায়ে দিল মোরে,
চমকি চাহিনু ঘুম-ঘোরে,
ভালবাসা সে আমার নাই,
চারি দিকে শূন্য এই ঠাঁই;
ঘুমায়ে ছিলাম, ভাল ছিনু,
জাগিয়া একি এ নিরখিনু!
দেখিনু, নিতান্ত একা আমি,
কেহ মোর নাই একেবারে!
তাই সাধ গেছে কাঁদিবারে।
তাই সাধ যায় মনে মনে—
মিশাব এ যামিনীর সনে,
কিছুই রবে না আর প্রাতে,
শিশির রহিবে পাতে পাতে।
সাধ যায় মেঘটির মত,
কাঁদিয়া মরিয়া গিয়া আজি
অশ্রুজলে হই পরিণত?”
সুখ বলে—“এ জন্ম ঘুচায়ে
সাধ যায় হইতে বিষাদ।”
“কেন সুখ, কেন হেন সাধ?”
“নিতান্ত একা যে আমি গো—
কেহ যে—কেহ যে—নাই মোর।”
“সুখ কারে চায় প্রাণ তোর?
সুখ, কার করিস্ রে আশা?”
সুখ শুধু কেঁদে কেঁদে বলে
“ভালবাসা—ভালবাসা গো!”
হলাহল
হলাহল।
এমন ক’দিন কাটে আর।
দিনরাত-দিনরাত—অবিরাম—অনিবার।
ললিত গলিত হাস, জাগরণ, দীর্ঘশ্বাস,
সােহাগ, কটাক্ষ, মান, নয়ন-সলিল-ধার,
মৃদু হাসি, মৃদু কথা, আদরের, উপেক্ষার,
এই শুধু-এই শুধু—দিনরাত এই শুধু
এমন ক’দিন কাটে আর!
কটাক্ষে মরিয়া যায়, কটাক্ষে বাঁচিয়া উঠে,
হাসিতে হৃদয় জুড়ে, হাসিতে হৃদয় টুটে,
ভীরুর মতন আসে দাঁড়ায়ে রহে গাে পাশে,
ভয়ে ভয়ে মৃদু হাসে, ভয়ে ভয়ে মুখ ফুটে,
একটু আদর পেলে অমনি চরণে লুটে,
অমনি হাসিটি জাগে মলিন অধর পুটে,
একটু কটাক্ষ হেরি অমনি সরিয়া যায়,
অমনি কাঁদিয়া সারা, মরমে মরিয়া যায়।
অমনি জগত যেন শূন্য মরুভূমি হেন,
অমনি মরণ যেন প্রাণের অধিক ভায়!
চাহে না শুনিতে কথা তবুও প্রাণের ব্যথা
কেঁদে কেঁদে সেধে সেধে তাহারে শুনাতে চায়,
ভুলেও স্বপনে তারে দেখিতে চাহে না হা-রে
তবু সাথে সাথে রহে চরণ ধুলার প্রায়।
দলিতেও যে হৃদয় মনে নাহি পড়ে তার
লয়ে সেই তুচ্ছ মন কেঁদে কেঁদে অনুক্ষণ
ভয়ে ভয়ে পদতলে দিতে যায় উপহার!
দেখুক্ বা না দেখুক্—জানুক্ বা না জানুক্
ভাবুক্ বা না ভাবুক্—সেই পদতল সার।
জানে সে পাষাণময় কিছুতে কিছু না হয়,
সুমুখে দাঁড়ায়ে তারি তবু সাধ কাঁদিবার।
যেন সে কম্পিত-কায় ভিক্ষা মাগিবারে চায়
তুমিও কাঁদ’ গাে প্রভু হেরি এই অশ্রুধার।
এই শুধু—এই শুধু—দিবারাত এই শুধু-
এমন ক’দিন কাটে আর।
প্রণয় অমৃত এ কি? এ যে ঘাের হলাহল-
হৃদয়ের শিরে শিরে প্রবেশিয়া ধীরে ধীরে
অবশ করেছে দেহ শােণিত করেছে জল!
বালিকা-হৃদয় সম ক’রেছে পুরুষ-মন,
পরের মুখেতে চেয়ে কাঁদে শুধু অনুক্ষণ!
কাজ নাই, কর্ম্ম নাই, ব’সে আছে এক ঠাই
হাসি ও কটাক্ষ ল’য়ে খেলেনা গড়িছে যত,
কভু ঢুলে-পড়া আঁখি -কভু অশ্রু-ভারে নত।
দূর কর-দূর কর-বিকৃত এ ভালবাসা—
জীবনদায়িনী নহে, এ যে গাে হৃদয়-নাশা!
কোথায় প্রণয়ে মন যৌবনে ভরিয়া উঠে,
জগতের অধরেতে হাসির জোছনা ফুটে,
চোখেতে সকলি ঠেকে বসন্ত-হিল্লোলময়—
হৃদয়ের শিরে শিরে শােণিত সতেজে বয়—
তা নয়, একি এ হল, একি এ জর্জ্জর মন,
হাসিহীন দু অধর, জ্যোতিহীন দু নয়ন!
দূরে যাও-দূরে যাও—হৃদয় রে দূরে যাও-
ভূলে যাও—ভূলে যাও—ছেলে খেলা ভূলে যাও-
দূর কর’-দূর কর’ বিকৃত এ ভালবাসা
জীবনদায়িনী নহে, এযে গাে হৃদয় নাশা!
হৃদয়ের গীতিধ্বনি
হৃদয়ের গীতিধ্বনি।
ওকি স্বরে গান গাস্ হৃদয় আমার?
শীত নাই, গ্রীষ্ম নাই, বসন্ত, শরত নাই,
দিন নাই, রাত্রি নাই—
অবিরাম, অনিবার—
ওকি সুরে গান গাস্ হৃদয় আমার?
বিরলে বিজন বনে—বসিয়া আপন মনে
ভূমি পানে চেয়ে চেয়ে, এক্-ই গান গেয়ে গেয়ে—
এক্-ই গান গেয়ে গেয়ে
দিন যায়, রাত যায়,
শীত যায়, গ্রীষ্ম যায়,
তবু গান ফুরায় না আর!
মাথায় পড়িছে পাতা, পড়িছে শুকান’ ফুল।
পড়িছে শিশির কণা, পড়িছে রবির কর-
পড়িছে বরষা জল, ঝরঝর ঝরঝর—
কেবলি মাথার পরে, করিতেছে সমস্বরে
বাতাসে শুকান’ পাতা, মরমর মরমর;
বসিয়া বসিয়া সেথা, বিশীর্ণ মলিন প্রাণ
গাহিতেছে এক্-ই গান, এক্-ই গান, এক্-ই গান।
পারিনে শুনিতে আর, এক্-ই গান, এক্-ই গান।
কখন থামিবি তুই, বল্ মোরে -বল্ প্রাণ!
একেলা ঘুমায়ে আছি-
সহসা স্বপন টুটি,
সহসা জাগিয়া উঠি,
সহসা শুনিতে পাই-
হৃদয়ের এক ধারে -
সেই স্বর ফুটিতেছে –
সেই গান উঠিতেছে-
কেহ শুনিছেনা যবে
চারিদিকে স্তব্ধ সবে
সেই স্বর, সেই গান—অবিরাম অবিশ্রাম
অচেতন আঁধারের শিরে শিরে চেতনা সঞ্চারে।
দিবসে মগন কাজে, চারিদিকে দলবল।
চারিদিকে কোলাহল।
সহসা পাতিলে কান, শুনিতে পাই সে গান;
নানা শব্দ ময় সেই জন-কোলাহল
তাহারি প্রাণের মাঝে, এক মাত্র শব্দ বাজে,
এক সুর, এক ধ্বনি, অবিরল—অবিরল—
যেন সে কোলাহলের হৃদয়-স্পন্দন-ধ্বনি-
সমস্ত ভূলিয়া যাই, ব’সে ব’সে তাই গণি!
ঘুমাই বা জেগে থাকি, মনের দ্বারের কাছে
কে যেন বিষণ্ন প্রাণী দিনরাত বসে আছে-
চির দিন করিতেছে বাস,
তারি শুনিতেছি যেন নিশ্বাস প্রশ্বাস।
এ প্রাণের ভাঙ্গা-ভিতে স্তব্ধ দ্বিপ্রহরে,
ঘুঘু এক বসে বসে গায় এক স্বরে,
কে জানে কেন সে গান গায়!
গলি সে কাতর স্বরে
স্তব্ধতা কাঁদিয়া মরে,
প্রতিধ্বনি করে হায় হায়।
পারিনে শুনিতে আর, এক্-ই গান, এক্-ই গান
কখন্ থামিবি তুই—বল্ মােরে—বল্ প্রাণ।
হরষের গান আমি গাহিবারে চাহি যত,
তাের এ বিষন্ন সুর শ্রবণেতে পশে তত-
যে সুরে আরম্ভ করি শেষ নাহি হয় তায়
তােমারি সুরের সাথে অলক্ষ্যে মিলিয়া যায়!
হৃদয়রে! আর কিছু শিখিলিনে তুই,
শুধু ওই গান!
প্রকৃতির শত শত রাগিণীর মাঝে
শুধু ওই তান!
কি গাহিবে আর!
এক আশা, এক সুখ—এক ছিল যার
সেই এক হারায়েছে তার-
কি গাহিবে আর!
এক গান গেয়ে শুধু সমস্ত জগতে ফেরে
“যে এক গিয়েছে মাের তাই ফিরাইয়া দেরে!
আর কিছু চাহিনেরে!”
ভ্রমিতেছে শুধাইয়া সারা জগতের কাছে-
“যে এক আছিল মাের—সে মাের কোথায় আছে।”
বিধাতার কাছে শুধু এক ভিক্ষা মাগিতেছে-
দিন নাই, রাত্রি নাই, এক ভিক্ষা মাগিতেছে-
“দাও গাে ফিরায়ে মােরে, যে এক হারায়ে গেছে!”
তাই এক গান গাহে একেলা বসিয়া
অবিরাম—অনিবার-
কি গাহিবে আর!
তাের গান শুনিবে না কেহ!
নাই বা শুনিল!
তাের গানে কাঁদিবেনা কেহ!
নাই বা কাঁদিল!
তবে থাম্-থাম্ ওরে প্রাণ,
পারিনে শুনিতে আর-এক্-ই গান-এক্-ই গান