← লাইব্রেরি

১৮৮৪

ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৮৪

ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী।

শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্ত্তৃক

প্রকাশিত।

কলিকাতা

আদি ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে

শ্রী কালিদাস চক্রবর্ত্তী দ্বারা

মুদ্রিত।

সন ১২৯১।

উৎসর্গ।

ভানুসিংহের কবিতাগুলি ছাপাইতে তুমি আমাকে অনেকবার অনুরোধ করিয়াছিলে। তখন সে অনুরোধ পালন করি নাই। আজ ছাপাইয়াছি, আজ তুমি আর দেখিতে পাইলে না!

বিজ্ঞাপন।

ভানুসিংহের পদাবলী শৈশব সঙ্গীতের আনুষঙ্গিক স্বরূপে প্রকাশিত হইল। ইহার অধিকাংশই পুরাতন কালের খাতা হইতে সন্ধান করিয়া বাহির করিয়াছি।

প্রকাশক।

সূচীপত্র।

বিষয়

পৃষ্ঠা।

ভানুসিংহের পদাবলী।

(১)

বাহার।

বসন্ত আওল রে!

মধুকর গুন গুন, অমুয়ামঞ্জরী

কানন ছাওল রে।

শুন শুন সজনী হৃদয় প্রাণ মম

হরখে আকুল ভেল,

জর জর রিঝসে দুখ জ্বালা সব

দূর দূর চলি গেল।

মরমে বহই বসন্ত সমীরণ,

মরমে ফূটই ফুল,

মরম কুঞ্জপর বোলই কুহু কুহু

অহরহ কোকিল কুল।

সখিরে উছসত প্রেমভরে অব

ঢলঢল বিহ্বল প্রাণ,

নিখিল জগত জনু হরখ-ভোর ভরি

গাবই প্রেমক গান।

যাও যাও সখি মাধব পাশে

শ্যামক আনহ ডাকি,

কহিও বনময় ফূটল ফুলদল

গাওত শত শত পাখী।

কহিও সারা জগত হরখময়

হাসত উনমদ প্রাণে,

দুখিনী রাধা হাসব হরখে

হেরয়ি তছু মুখপানে।

ভরমিব দুঁহু মিলি সারা বনময়

মোহন যমুনা তীরে,

মাতল মানস আকুল ভইবে

অতি মৃদু মন্দ সমীরে।

নীরব রাতে ধীর ধীর অতি

বাঁশি বজাওবে শ্যাম,

উলসিত ফুলদল পুলকিত যমুনা,

জাগবে কানন ধাম।

ভানু কহত অতি গহন রয়ন অব,

বসন্ত সমীর শ্বাসে

আকুল বিহ্বল রিঝ উনমতল,

নয়ান মূদয়ি আসে।

রিঝসে—হৃদয় হইতে। রিঝ—হৃদয়।

জনু—যেন

রয়ন—রজনী।

(২)

ভৈরবী।

শুনলো শুনলো বালিকা,

রাখ কুসুমমালিকা,

কুঞ্জ কুঞ্জ ফেরনু সখি শ্যামচন্দ্র নাহিরে।

দুলই কুসুম মুঞ্জরী,

ভমর ফিরই গুঞ্জরি,

অলস যমুনা বহয়ি যায় ললিত গীত গাহিরে।

শশি-সনাথ যামিনী,

বিরহ-বিধুর কামিনী,

কুসুমহার ভইল ভার হৃদয় তার দাহিছে।

অধর উঠই কাঁপিয়া,

সখি-করে কর আপিয়া,

কুঞ্জভবনে পাপিয়া কাহে গীত গাহিছে।

মৃদু সমীর সঞ্চলে

হরয়ি শিথিল অঞ্চলে,

বালি হৃদয় চঞ্চলে কানন-পথ চাহিরে;

কুঞ্জপানে হেরিয়া,

অশ্রুবারি ডারিয়া

ভানু গায় শূন্যকুঞ্জ শ্যামচন্দ্র নাহিরে!

৪ বালি-বালিকা

(৩)

ললিত।

হৃদয়ক সাধ মিশাওল হৃদয়ে,

কণ্ঠে শুকাওল মালা।

সখিলো নয়ন জলে বহি গল রয়ণী

তব নহি আওল কালা।

কত সাধে সখি আসনু কুঞ্জে,

পহিরনু নীল নিচোল,

রচয়নু কুসুম শয়ান মনোমত,

মন্দির করনু উজোল।

চল সখি গৃহে চল, মুছহ নয়ন জল,

চল সখি চল গৃহ কাজে,

মালতি মালা রাখহু বালা,

ছিছি সখি মৰু মৰু লাজে।

বুঝনু বুঝনু সখি বিফল বিফল সব

বিফল এ পরিতি লেহা।

বিফলরে এ মঝু জীবন যৌবন,

বিফলরে এ মঝু দেহা!

সখিলো কোন নিদাৰুণ ব্যাধি

জনমিল মরমে মোর,

সখিলো দাৰুণ প্রণয় হলাহল

জীবন করইল ভোর।

তৃষিত প্রাণ মম দিবস যামিনী

শ্যামক দরশন আশে,

আকুল জীবন থেহ ন মানে,

অহরহ জ্বলত হুতাশে।

সত্য কহিলো সখি তোয়,

খোয়ব কব হম শ্যামক প্রেম

সদা ডর লাগয়ে মোয়।

হিয়ে হিয়ে অব রাখত মাধব,

সো দিন আসব সখিরে,

বাত ন বোলবে, বদন ন হেরবে,

মরিব হলাহল ভখিরে!

ঐস বৃথা ভয় না কর বালা,

ভানু নিবেদয় চরণে,

সুজনক পীরিতি নৌতুন নিতি নিতি,

নহি টুটে জীবন মরণে।

লেহা—অনুরাগ।

মঝু—আমার।

থেহ—স্থৈর্য্য।

(৪)

বেহাগড়া।

শ্যামরে, নিপট কঠিন মন তোর।

রোয়ত রোয়ত সজনী রাধা

রজনী করত স ভোর।

একলি বিরল কুটীরে বৈঠত

চাহত যমুনা পানে,—

ছল ছল নয়ন, বচন নহি নিকসত,

পরাণ থেহ ন মানে।

ঘোর গহন নিশি একলি রাধা

যায় কদম তৰুমূলে,

ভূমি শয়ন পর আকুল কুন্তল,

কাঁদই আপন ভূলে।

সহসা চমকয়ি চায় সখী কভু

মগন যখন গৃহ কাজে—

ছূটি আসয়ি বোলে “শুনলো,,

শ্যামক বাঁশরি বাজে।”

আনমনে সো অবলা বালা

বৈসয়ি গুৰুজন মাঝে,

তুয়া নাম বঁধু লিখত ভূমি পর,

চমকি মুছই পুন লাজে।

নিঠুর শ্যামরে, কৈসে অব তুঁহুঁ

রহত দূর মথুরায়—

ঘোর রজনী কৈস গোঁয়ায়সি

কৈস দিবস তব যায়!

কৈস মিটাওসি প্রেম পিপাসা

কঁহা বজাওসি বাঁশি?

পীতবাস তুঁহু কথিরে ছোড়লি,

কথি সো বঙ্কিম হাসি?

কনক হার অব পহিরলি কণ্ঠে,

কথি ফেকলি বন মালা?

গোপী হৃদয় অঁধার করলিরে,

সিংহাসন কর আলা;

এ দুখ চিরদিন রহি গল মনমে,

ভানু কহে, ছি ছি কালা!

ঝটিতি আও তুহুঁ হমারি সাথে,

বিরহ ব্যাকুলা বালা।

কথি—কোথায়।

(৫)

শঙ্করা।

সজনি সজনি রাধিকালো

দেখ অবহুঁ চাহিয়া,

মৃদুল গমন শ্যাম আওয়ে

মৃদুল গান গাহিয়া।

পিনহ ঝটিত কুসুম হার,

পিনহ নীল আঙিয়া।

সুন্দরি সিন্দূর দেকে

সীঁথি করছ রাঙিয়া।

সহচরি সব নাচ নাচ

মধুর গীত গাওরে,

চঞ্চল মঞ্জীর রাব

কুঞ্জ গগন ছাওরে।

সজনি অব উজার মঁদির

কনক দীপ জ্বালিয়া,

সুরভি করছ কুঞ্জ ভবন

গন্ধ সলিল ঢালিয়া।

মল্লিকা চমেলি বেলি

কুসুম তুলহ বালিকা,

গাঁথ যূঁথি, গাঁথ জাতি,

গাঁথ বকুল মালিকা।

তৃষিত-নয়ন ভানুসিংহ

কুঞ্জ-পথম চাছিয়া

মৃদুল গমন শ্যাম আওয়ে,

মৃদুল গান গাহিয়া।

(৬)

ভৈরবী।

বঁধুয়া, হিয়া পর আওরে,

মিঠি মিঠি হাসয়ি, মৃদু মধু ভাষয়ি,

হমার মুখ পর চাওরে!

যুগ যুগ সম কত দিবস বহয়ি গল,

শ্যাম তু আওলি না,

চন্দ-উজর মধু-মধুর কুঞ্জপর

মুরলি বজাওলি না!

লয়ি গলি সাথ বয়ানক হাসরে,

লয়ি গলি নয়ন-আনন্দ!

শূন্য বৃন্দাবন, শূন্য হৃদয় মন,

কঁহি ছিল ও মুখ চন্দ?

ইথি ছিল আকুল গোপ নয়ন জল,

কথি ছিল ও তব হাসি?

ইথি ছিল নীরব বংশীবটতট,

কথি ছিল ও তব বাঁশি!

আওলি যদিরে ঠারলি কাহে,

সরমে মলিন বয়ান!

আপন দুখ কথা কছু নহি বোলব,

নিয়ড় আও তুঁহু কান!

তুঝ মুখ চাহয়ি শত-যুগ-ভর দুখ

নিমিখে ভেল অবসান।

এক হাসি তুঝ দূর করল রে

সকল মান অভিমান!

ধন্য ধন্য রে ভানু গাহিছে

প্রেমক নাহিক ওর।

হরখে পুলকিত জগত চরাচর

দুহুঁক প্রেমরস ভোর।

ইথি-এখানে।

কথি—কোথায়।

নিয়ড়—নিকট

ওর—সীমা

(৭)

বেহাগ।

শুন সখি বাজত বশি।

গভীর রজনী, উজল কুঞ্জপথ,

চাঁদম ডারত হাসি।

দক্ষিণ পবনে কম্পিত তৰুগণ,

স্তম্ভিত যমুনা বারি,

কুসুম সুবাস উদাস ভইল, সখি,

উদাস হৃদয় হমারি।

বিগলিত মরম, চরণ খলিত গতি,

সরম ভরম গয়ি দূর,

নয়ন বারি-ভর, গরগর অন্তর,

হৃদয় পুলক-পরিপূর।

কহ সখি, কহ সখি, মিনতি রাখ সখি,

সো কি হমারই শ্যাম।

মধুর কাননে মধুর বাঁশরী

বজায় হমারি নাম!

কত কত যুগ সখি পুণ্য করমু হম,

দেবত করমু ধেয়ান,

তবত মিলল সখি শ্যাম রতন মম,

শ্যাম হমারই প্রাণ।

শ্যাম রে————

শুনত শুনত তব মোহন বাঁশি

জপত জপত তব নামে,

সাধ ভইল ময় দেহ ডুবায়ব

চাঁদ-উজল যমুনামে!

“চলহ তুরিত গতি শ্যাম চকিত অতি,

ধরহ সখীজন হাত,

নীদ-মগন মহী, ভয় ডর কছু নহি,

ভানু চলে তব সাথ।”

(৮)

ঝিঁঝিট।

গহন কুসুম-কুঞ্জ মাঝে

মৃদুল মধুর বংশি বাজে,

বিসরি ত্রাস লোক লাজে

সজনি, আও আও লো।

পিনহ চাৰু নীল বাস,

হৃদয়ে প্রণয় কুসুম রাশ,

হরিণ নেত্রে বিমল হাস,

কুঞ্জ বনমে আও লো॥

ঢালে কুসুম সুরভ-ভার,

ঢালে বিহগ সুরব-সার,

ঢালে ইন্দু অমৃত-ধার

বিমল রজত ভাতিরে।

মন্দ মন্দ ভৃঙ্গ গুঞ্জে,

অযুত কুমুম কুঞ্জে কুঞ্জে,

ফুটল সজনি পুঞ্জে পুঞ্জে

বকুল যূথি জাতিরে॥

দেখলো সখি শ্যামরায়,

নয়নে প্রেম উথল যায়,

মধুর বদন অমৃত সদন

চন্দ্রমায় নিন্দিছে

আও আও সজনি-বৃন্দ,

হেরব সখি শ্রীগোবিন্দ,

শ্যামকে পদারবিন্দ—

ভানুসিংহ বন্দিছে॥

(৯)

মিশ্র জয়জয়ন্তী।

সতিমির রজনী, সচকিত সজনী

শূন্য নিকুঞ্জ অরণ্য!

কলয়িত মলয়ে, সুবিজন নিলয়ে

বালা বিরহ-বিষণ্ণ!

নীল অকাশে, তারক ভাসে

যমুনা গাওত গান,

পাদপ মরমর, নির্ঝর ঝরঝর

কুসুমিত বল্লি বিতান।

তৃষিত নয়ানে, বন-পথ পানে।

চায় বিয়াকুল বালা,

দেখ ন পাওয়ে, আঁখ ফিরাওয়ে

গাঁথে বন-ফুল মালা।

সহসা রাধা চাহল সচকিত

দূরে খেপল মালা,

কহল “সজনি শুন, বাঁশরি বাজে

কুঞ্জে আওল কালা!”

চমকি গহন নিশি, দূর দূর দিশি

বাজত বাঁশি সুতানে।

কণ্ঠ মিলাওল, ঢলঢল যমুনা

কল কল কল্লোল গানে।

হসিত বয়ানে ফুল্ল নয়ানে

কুঞ্জে আওল কালা,

সঙ্গিনী মেলয়ি, নাচল গাওল

উলসিল রাধিক বালা।

কহতহু ভানু-শুন গো কানু

পিয়াসিত গোপিনী প্রাণ।

তোহার পীরিত বিমল অমৃত রস

হরষে করবে পান।

১০

(১০)

মূলতান।

বজাও রে মোহন বাঁশী!

সারা দিবসক বিরহদহন-দুখ,

মরমক তিয়াষ নাশি।

রিঝ মন-ভেদন বাঁশরি-বাদন

কঁহা শিখলিরে কান?

হানে থির থির, মরম অবশকর

লহু লহু মধুময় বাণ।

ধস ধস করতহ উরহ বিয়াকুলু

ঢুলু ঢুলু অবশ-নয়ান;

কত কত বরষক বাত সোঁয়ারয়

অধীর করয় পরাণ।

কত শত আশা পূরল না বঁধু

ও মুখ করল পয়ান।

পহুগো কত শত পিরীত-যাতন

ছিয়ে বিঁধাওল বাণ।

হৃদয় উদাসয়, নয়ন উছাসয়

দাৰুণ মধুময় গান।

সাধ যায় বঁধু, যমুনা বারিম

ডারিব দগধ-পরাণ।

সাধ যায় পহু, রাখি চরণ তব

হৃদয় মাঝ হৃদয়েশ!

হৃদয়-জুড়াওন বদন-চন্দ্র তব

হেরব জীবন শেষ।

সাধ যায় বঁধু, তোঁহার দেহ

মিলাওব দেহ ম মোর।

মিলন সনে জনু বিরহ মিলব রে

দিবস রাতি ভরি ভোর।

সাধ যায় বঁধু! দুহুঁ দুহুঁ মেলয়ি

ইঁহসে করয়ি পয়ান,

মেঘ মেঘ পর হরখে ভরমিব

দুঁহুঁ মিলি করইব গান।

সাধ যায় ইহ চাঁদম কিরণে,

কুসুমিত কুঞ্জ বিতানে,

বসন্ত বায়ে, প্রাণ মিশায়ব,

বাঁশিক সুমধুর গানে।

প্রাণ ভৈবে মঝু বেণু-গীতময়,

রাধাময় তব বেণু।

জয় জয় মাধব, জয় জয় রাধা,

চরণে প্রণমে ভানু।

রিঝ—হৃদয়

সোঁয়ারয়—স্মরণ করাইয়া দেয়

পহুগো—প্রভু।

বিরহ যেন মিলনের সঙ্গে মিলিয়। থাকিবে।

১১

(১১)

মিশ্র বেহাগ।

আজু সখি মুহু মুহু

গাহে পিক কুহু কুহু,

কুঞ্জবনে দুঁহু দুঁহু

দোঁহার পানে চায়।

যুবন-মদ-বিলসিত,

পুলকে হিয়া উলসিত,

অবশ তনু অলসিত

মূরছি জনু যায়!

আজু মধু চাঁদনী

প্রাণ-উনমাদনী,

শিথিল সব বাঁধনী,

শিথিল ভই লাজ।

বচন মৃদু মরমর,

কাঁপে রিঝ থরথর,

শিহরে তনু জরজর

কুসুম-বন মাঝ!

মলয় মৃদু কলয়িছে,

চরণ নহি চলয়িছে,

বচন মুহু খলয়িছে,

অঞ্চল লুটায়!

আধফুট শতদল,

বায়ুভরে টলমল,

আঁখি জনু ঢলঢল

চাহিতে নাহি চায়!

অলকে ফুল কাঁপয়ি

কপোলে পড়ে ঝাঁপয়ি,

মধু অনলে তাপয়ি

খসয়ি পড়ু পায়!

ঝরই শিরে ফুলদল,

যমুনা বহে কলকল,

হাসে শশি ঢলঢল

ভানু মরি যায়!

১২

(১২)

খাম্বাজ।

গহির নীদমে বিবশ শ্যাম মম,

অধরে বিকশত হাস,

মধুর বদনমে মধুর ভাব অতি

কিয়ে পায় পরকাশ!

চুম্বনু শত শত চন্দ্র বদন রে,

তবহুঁ ন পূরল আশ,

অতি ধীরে ময় হৃদয়ে রাখনু

নহি নহি মিটল তিয়াষ।

শ্যাম, সুখে তুঁহু নীদ যাও পহু

মঝু এ প্রেমময় উরসে,

অনিমিখ নয়নে সারা রজনী

হেরব মুখ তব হরষে।

শ্যাম, মুখে তব মধুর অধরমে

হাস বিকাশত কায়,

কোন্‌ স্বপন অব দেখত মাধব,

কহবে কোন্‌ হমায়!

এ মুখ স্বপনে মৈক কি দেখত

হরষে বিকশত হাসি?

শ্যাম, শ্যাম মম, কৈসে শোধব

তুঁহুক প্রেমঋণ রাশি!

জনম জনম মম প্রাণ পূর্ণ করি

থাক হৃদয় করি আলা,

তুঁহুক পাশ রহি হাসয়ি হাসয়ি

সহব সকল দুখ জ্বালা।

বিহঙ্গ, কাহ তু বোলন লাগলি?

শ্যাম ঘুমায় হমারা,

রহ রহ চন্দ্রম, ঢাল ঢাল, তব

শীতল. জোছন-ধারা!

তারা-মালিনী মধুরা যামিনী

ন যাও ন যাও বালা,

নিরদয় রবি, অব কাহ তু আওলি

আনলি বিরহক জ্বালা!

হমার সারা জীবন জনি ইহ

রজনী রহত সমান,

হেরয়ি হেরয়ি শ্যামমুখচ্ছবি

প্রাণ ভইত অবসান!

ভানু কহত অব “রবি অতি নিষ্ঠুর,

নলিন-মিলন অভিলাষে

কত শত নারীক মিলন টুটাওত,

ডারত বিরহ-হুতাশে!”

গহির নীদ মে—গভীর নিদ্রায়।

মৈক—আমাকে।

১৩

(১৩)

মল্লার।

সজনি গো——

শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা

অঁধার যামিনীরে।

কুঞ্জপথে সখি, কৈসে যাওব

অবলা কামিনীরে।

উন্মদ পবনে যমুনা উথলত

ঘন ঘন গরজত মেহ।

দমকত বিদ্যুত বজ্র নিনাদত,

থরহর কম্পত দেহ।

ঘন ঘন রিম্‌ ঝিম্‌ রিম্‌ ঝিম্‌ রিম্‌ ঝিম্‌,

বরখত নীরদ পুঞ্জ।

ঘোর তমস তৰু তাল তমালে

নিবিড় তিমিরঘন কুঞ্জ।

বোল ত সজনী এ দুৰুযোগে

কুঞ্জে নিরদয় কান

দাৰুণ বাঁশী কাহ বজায়ত

রাধা রাধা নাম।

সজনি—

মোতিম হারে বেশ বনা দে,

সীঁথি লগা দে ভালে।

উরহি বিলোলিত শিথিল চিকুর মম

বাঁধহ মালত মালে।

নয়নে অঞ্জন রঞ্জহ সত্ত্বর

অলত লগা দে পায়।

একল যাওব ষঁহি রে বাঁশী

রাধা রাধা গায়।

হিয়া মাঝ সখি প্রেম দীপতছ

অঁধামে ক্যা হয় ডরলো।

শ্যামক ছোড়য় রাধা কয়সে

একলি রহবে ঘর লো।

গহন রয়নমে ন যাও বালা

নওল কিশোর-ক পাশ।

গরজে ঘন ঘন, বহু ডর খাওব

কহে ভানু তব দাস।

শাঙন—শ্রাবণ

মেহ—মেঘ

বরখত—বর্ষিতেছে

১৪

(১৪)

মল্লার।

বাদর বরখন, নীরদ গরজন,

বিজুলী চমকন ঘোর,

উপেখই কৈছে, আও তু কুঞ্জে

নিতি নিতি মাধব মোর!

ঐছন কুঞ্জে আসিও না তুঁহু,

মিনতি করত হতভাগী,

মাধব কাহ তু পাওব দুখরে,

দুখিনী হমার লাগি?

ঘন ঘন চপলা চমকয় যব পহু

বজর পাত যব হোয়,

তুহুক বাত তব সমরয়ি মাধব

ডর অতি লাগত মোয়!

অঙ্গ-বসন তব, ভীঁখত মাধব

ঘন ঘন বরখত মেহ,

ক্ষুদ্র বালি হম, হমকো লাগয়

কাহ উপেখবি দেহ?

কত জ্বালা দুখ সহলি শ্যাম তুঁহু,

হমার পীরিত লাগি,

সহলিরে গঞ্জন দেশ বিদেশে

ভইলিরে কলঙ্কভাগী!

যাও যাও পহু, মথুরানগরে

মিটবে সব সুখ-আশ।

জনম জনম তুঁহু সিংহাসন পরি

করহ সুখে পহু বাস।

দূরদেশ রহি লোক মুখে হম

শুনইব তুঝ যশগান,

দূরদেশ রহি, মহিমা শুনি তব

ধন্য মানইব প্রাণ!

বিসরো মাধব গোপিনী জনকো

বিসরো ময়কো শ্যাম,

বিসরো মাধব, পীরিতি লীলা

সুখ-বৃন্দাবন ধাম।

ভানু কহে বৃকভানুনন্দিনী

প্রেমসিন্ধু মম কালা

তোঁহার লাগয় প্রেমক লাগয়

সব কছু সহবে জ্বালা!

ভীঁখত—ভিঝিছে।

বালি-বালিকা।

বিসরো—বিস্মৃত হও।

১৫

(১৫)

টোড়ি।

সখিরে—পিরীত বুঝবে কে?

অঁধার হৃদয়ক দুঃখ কাহিনী

বোলব, শুনবে কে?

রাধিকার অতি অন্তর বেদন

কে বুঝবে অয়ি সজনী

কে বুঝবে সখি রোয়ত রাধ

কোন দুখে দিন রজনী?

কলঙ্ক রটায়ব জনি সখি রটাও

কলঙ্ক নাহিক মানি,

সকল তয়াগব লভিতে শ্যামক

একঠো আদর বাণী।

মিনতি করিলো সখি শত শত বার, তু

শ্যামক না দিহ গারি,

শীল মান কুল, অপনি সজনি হম,

চরণে দেয়নু ডারি।

সখিলো——

বৃন্দাবনকো দুৰুজন মানুখ

পিরীত নাহিক জানে,

বৃথাই নিন্দা কাহ রটায়ত

হমার শ্যামক নামে?

কলঙ্কিনী হম রাধা, সখিলো

ঘৃণা করহ জনি মনমে,

ন আসিও তব্‌ কবহু সজনি লো

হমার অঁধা ভবনমে।

কহে ভানু অব—বুঝবে না সখি

কোহি মরমকো বাত,

বিরলে শ্যামক কহিও বেদন,

বক্ষে রাখয়ি মাথ!

রটাও—যদি কলঙ্ক রটাইতে চাও তবে রটাইও।

জনি—যদি

১৬

(১৬)

ভৈরবী।

হম সখি দারিদ নারী!

জনম অবধি হম পীরিতি করনু

মোচনু লোচন-বারি।

রূপ নাহি মম, কছুই নাহি গুণ

দুখিনী আহির জাতি,

নাহি জানি কছু বিলাস-ভঙ্গিম

যৌবন গরবে মাতি।

অবলা রমণী, ক্ষুদ্র হৃদয় ভরি

পীরিত করনে জানি;

এক নিমিখ পল, নিরখি শ্যাম জনি

সোই বহুত করি মানি।

কুঞ্জ পথে যব নিরখি সজনি হম,

শ্যামক চরণক চীনা,

শত শত বেরি ধূলি চুম্বি সখি,

রতন পাই জনু দীনা।

নিঠুর বিধাতা, এ দুখ-জনমে

মাঙব কি তুয়া পাশ!

জনম অভাগী, উপেখিতা হম,

বহুত নাহি করি আশ,—

দুর থাকি হম রূপ হেরইব,

দূরে শুনইব বাঁশি।

দূর দূর রহি সুখে নিরীখিব

শ্যামক মোহন হাসি।

শ্যাম-প্রেয়সি রাধা! সখিলো!

থাক’ সুখে চিরদিন।

তুয়া সুখে হম রোয়ব না সখি

অভাগিনী গুণ হীন।

অপন দুখে সখি, হম রোয়ব লো,

নিভৃতে মুছইব বারি।

কোহি ন জানব, কোন বিষাদে

তন-মন দহে হমারি।

ভানু সিংহ ভনয়ে, শুন কালা

দুখিনী অবলা বালা—

উপেখার অতি তিখিনী বাণে

না দিহ না দিহ জ্বালা।

১৭

(১৭)

বাহার।

মাধব! না কহ আদর বাণী,

না কর প্রেমক নাম।

জানয়ি ময়কো অবলা সরলা

ছলনা না কর শ্যাম!

কপট! কাহ তুঁহু ঝূট বোলসি

পীরিত করসি মোয়?

ভালে ভালে হুম অলপে চিহ্ণনু

না পতিয়াব রে তোয়!

তুঁহু না জানসি প্রেমক ধারা

কঠিন হৃদয় মধুভাষী—

পরশি দেহ মম সাঁচি বোল’ অব

নহ তুঁহুঁ রূপ-পিয়াসী?

যাও শ্যাম তব্‌—মিলবে শত শত

হমসে রূপসি নারী।

তুচ্ছ বালি হম কাহ তু টূটসি

ক্ষুদ্র এ হৃদয় হমারি?

দূর রহয়ি হম রহব তোঁহাঁরই,

সমরিব তোঁহারি বাণী,

চিন্তয়ি চিন্তয়ি তোঁহারি বদন

তয়াগব ক্ষুদ্র পরাণী!

ছিদল-তরী সম কপট-প্রেম পর

ডারনু যব মন প্রাণ,

ডুবনু ডুবনু রে ঘোর সায়রে

অবকুত নাহিক ত্রাণ!

মাধব, কঠোর বাত হমার।

মনে লাগল কি তোর?

নিপট কঠিন দুখ সহয়ি কহনু সব

ক্ষমগো কুবচন মোর!

মাধব! কাহ তু মলিন করলি মুখ?

কুঞ্জে আসহ নাথ!

মধুর হাসি তুঝ হাসহ হাসহ

রাখছ কাতর বাত!

নিদয়-বাত অব কবহুঁ ন বোলব

তুঁহু মম প্রাণক প্রাণ!

অতি অবোধ হুম—ব্যথিনু হিয়া তব

ছোড়য়ি কুবচন-বাণ!

বাত রাখ’ মঝু বেরি বোল’ পহু

হমকো করহ সিনেহ!

বেরি বোল পহু আদর বাণী

চলহ কুঞ্জ বন-গেহ!

মিটল মান অব—ভানু হাসয়ত

হেরই পীরিত-লীলা

কভু অভিমানিনী আদরিণী কভু

পীরিতি-সাগর-বালা!

নিপট—অত্যন্ত।

আমার কথা রাখ একবার বল প্রভু যে তুমি আমাকে ভাল বাস।

১৮

(১৭)

দেশ।

সখিলো, সখিলো, নিকৰুণ মাধব

মথুরাপুর যব যায়,

মনম করল পণ মানিনী রাধা,

রোয়বে না সো না দিবে বাধা,

কঠিন-হিয়া সই, হাসরি হাসয়ি

শ্যামক দিবে বিদায়।

মৃদু মৃদু গমনে আওল মাধা,

বয়ন পান তছু চাহল রাধা,

চাহুয়ি রহল স চাহয়ি রহল,

দণ্ড দণ্ড সখি চাহয়ি রহল,

মন্দ মন্দ সখি নয়নে বহল

বিন্দু বিন্দু জল ধার!

মৃদু মৃদু হাসে বৈঠল পাশে,

কহল শ্যাম কত, মৃদু মৃদু ভাষে,

টুটয়ি গইল পণ, টুটইল মান,

গদ গদ আকুল ব্যাকুল প্রাণ,

ফুকরয়ি কাঁদয়ি উঠইল রাধা,

গদ গদ ভাষ নিকাশল আধা,

শ্যামক চরণে বাহু পসারি

কহল, “শ্যামরে, শ্যাম হমারি,

রহ’ তুঁহু, রহ তুঁহু, নাহ গ, রহ তুঁহু,

অনুখন সাথ সাথ রে রহ পহু

তুঁহু বিনে শ্যাম গ, নাগ গ, পহু গো,

আছয় কোন্‌ হমার!”

পড়ল ভূমি পর শ্যাম চরণ ধরি,

রাখল মুখ তছু শ্যাম চরণ পরি,

উছসি উছসি কত কাঁদয়ি কাঁদয়ি

রজনী করল প্রভাত!

শ্যাম সবৈসল, মৃদু মৃদু হাসল,

কত অশোয়াস বচন মিঠ ভাষল,

ধরইল বালিক হাত!

সখিলো, সখিলো, বোল’ত সখিলো

যত দুখ পাওল রাধা,

নিঠুর শ্যাম কিয়ে আপন মনমে

পাওল সখি তছু আধা?

হাসয়ি হাসয়ি নিকটে আসয়ি

বহুত স প্রবোধ দেল,

হাসয়ি হাসয়ি পলটয়ি চাহয়ি

দূর—দূর চলি গেল!

সখিলো, সখিলো, শ্যাম স হাসল,

শ্যাম স কাঁদল না,

দাৰুণ মন-দুখ পাওল রাধা

তবহুঁ স কাঁদল না!

বসন্ত রাতে হাসয়ি যব্ সখি

রাধা বনমে আসে,

সুনীল অঞ্চল, নয়ন বিচঞ্চল,

তব্‌ স কানু মৃদু হাসে;

হাত ধরয়ি তছু হিয়য়ি ঢাকি মুখ

বালি রহই যব্‌ পাশে,

চুম্বয়ি চুম্বয়ি কপোল চুম্বয়ি

তব্‌ স কানু মৃদু হাসে!

যব্‌ সখি আজ স রাধা কাঁদল,

তব্‌ সখি কাঁদল না!

বেড়ি চরণ তছু তিতল চরণতল

তবহুঁ স কাঁদল না!

অবহুঁ স মথুরাপুরক পন্থমে

ইঁহ যব রোয়ত রাধা,

যাতে যাতে অব মনে শ্যাম কিরে

পায় শোক তিল-আধা?

যাতে যাতে অব পথমে মাধব

সমরণ করয় কি বেরি

তাকর বিরহে আকুল রাধা

কাঁদি কাঁদি পথ হেরি?

বরখি আঁখিজল ভানু কহে “অতি

দুখের জীবন ভাই!

হাসিবার তর সখা মিলে বহু

কাঁদিবার কো নাই।”

১৯

(১৯)

ইমন কল্যাণ।

বার বার সখি বারণ করনু

ন যাও মথুরা ধাম!

বিসরি প্রেম দুখ, রাজভোগ যথি

করত হমারই শ্যাম।

কি কহলি রসন? হমারই শ্যাম সো?

কি বুঝলি পাগল প্রাণ?

অব তক ঘুচল ন ভাঁতি তুয়া মন!

সো কি হমারই শ্যাম?

শত শত দেশ পদানত যিনকো

শত শত মানুখ দাস,

শত শত রাজা রোষ-কটাখে

মনমে মানে তরাস,

দুখিনী গোপিনী, হম অবলা সখি,

সোকি হমারই শ্যাম?

বোল ত সজনি, মথুরা-অধিপতি

সোকি হমারই শ্যাম?

ধনকো শ্যাম সো, মথুরা পুরকো,

রাজ্য মানকো হোয়,

নহ পীরিতিকো, ব্রজ কামিনীকো,

নিচয় কহনু ময় তোয়।

ন যাও সজনী মথুরা নগরে

ভেটইতে সো শ্যাম,

সমরাইও না সখি, শামক মনমে

দুখিনী হমার নাম।

বাত রাখ মঝু নিতান্ত সহিলো

মথুরা পুর জনি যাহ,

দূর সঙে তু পেখিও শ্যামক

কৈছন আছয় নাহ।

জনি সখি দেখ সো, মনকে হরখে

করত মুখে পুর-বাস,

শপতি হমার লো, তব্‌ সখি ন যাও

মথুরা পতিকো পাশ।

জনি দেখো তুঁহুঁ সোবি সহত সখি

দাৰুণ বিরহক জ্বালা,

তব্‌ সখি সঁপিও শ্যামক চরণে

ইহ বন-কুসুমক মালা!

কহিও, রাধা, দুখিনী রাধা—

মথুরা-অধিপতি কান,

দুখজ্বালা তব, বারইতে সব

সঁপবে তন মন প্রাণ।

উরস পাতবে, অবশ মাথ তব

রাখব তছু পরি মাধা,

তোষইতে মন সব কছু করবে

যত কছু জানয় রাধা!

ভানু কহত—অয়ি বিরহ কাতরা

মনমে বাঁধহ থেহ।

মুগুধা বালা, বুঝই বুঝলিনা,

হমার শ্যামক লেহ।

যথি—যেখানে।

অব তক—এখন পর্য্যন্ত।

ভাঁতি—ভ্রান্তি।

যিনকো—যাঁহার।

সমরাইও না—স্মরণ করাইওনা।

মঝু—আমার।

জনি—যদি।

পেখিও শ্যামকে—দূর হইতে তুমি শ্যামকে দেখিও।

আছয় নাই—নাথ কেমন আছেন।

বারইতে—নিবারণ করিতে।

বাঁধহ থেহ—স্থৈর্য্য বাঁধো।

লেহ—ভালবাসা।

২০

(২০)

বেহাগ।

দেখলো সজনী চাঁদনি রজনী,

সমুজল যমুনা গাওত গান,

কানন কানন করত সমীরণ

কুসুমে কুসুমে চুম্বন দান।

কাহ লো যমুনা জোছন-ঢল ঢল

সুহাস সুনীল বারি?

আজু তোঁহারই উজল সলিল পর

নয়ন সলিল দিব ডারি।

কাহ সমীরণ লুটই কুসুম-বন

অলসি পড়সি যমুনায়?’

তোঁহার চম্পক-বাসিত লহরে

মিশাব নিশাস-বায়।

জনম গোঁয়ায়নু রোয়ত রোয়ত

হম তর কোই ত কাঁদল না!

জনম গোঁয়ায়নু সাধত সাধত

হমকো কোইত সাধল না!

সকল তয়াগনু যো ধন আশে

সো বি তয়াগল মোয়

অপন ছোড়ি সব, অপন করনু যোয়

সো বি সজনি পর হোয়!

যমুনে হাস হাস লো হরখে

হম তর রোয়বে কে?

তোঁহারি সুহসিত নীল সলিল পরি

রাধা সঁপবে দে!

এক দিবস যব মাধ হমারা

আসবে কিনার তোর,—

যব সো পেখবে তোঁহার সলিলে

ভাসত তনুয়া মোর—

তব্‌ কি শ্যাম সো মানস পাশে

তিল দুখ পাওবে না?

শ্যামক নয়নে বিন্দু নয়ন জল

তবহুঁ কি আওবে না?

রয়নে কুঞ্জে আসবে যব সখি

শ্যাম হমারই আশে,

ফুকারবে যব্‌ রাধা রাধা

মুরলি ঊরধ-শ্বাসে,

যব সব গোপিনী আসবে ছূটই

যব হম আসব না;

যব সব গোপিনী জাগবে চমকই

যব হম জগব না,

তব কি কুঞ্জপথ হমারি আশে

হেরবে আকুল শ্যাম?

বন বন ফেরই সো কি ফুকারবে

রাধা রাধা নাম?

না যমুনা, সো এক শ্যাম মম

শ্যামক শত শত নারী;

হম যব যাওব শত শত রাধা

চরণে রহবে তারি!

তব সখি যমুনে, যাই নিকুঞ্জে,

কাহ তয়াগব দে?

অভাগীর তর বৃন্দাবনমে

কহ সখি, রোয়ব কে!

ভানু কহে চুপি ‘মান ভরে রহ

আও বনে ব্রজ-নারী,

মিলবে শ্যামক শত শত আদর

শত শত লোচন বারি।

২১

(২১)

বা।

মরণরে,

তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান!

মেঘ বরণ তুঝ, মেঘ জটাজুট,

রক্ত কমল কর, রক্ত অধর-পুট,

তাপ-বিমোচন কৰুণ কোর তব,

মৃত্যু অমৃত করে দান!

তুহু মম শ্যাম সমান।

মরণরে,

শ্যাম তোঁহারই নাম,

চির বিসরল যব্‌, নিরদয় মাধব

তুঁহুঁ ন ভইবি মোয় বাম!

আকুল রাধা রিঝ অতি জরজর,

ঝরই নয়ন দউ অনুখন ঝরঝর,

তুঁহুঁ মম মাধব, তুঁহুঁ মম দোসর,

তুঁহুঁ মম তাপ ঘুচাও,

মরণ তু আওরে আও।

ভুজ পাশে তব লম্ব সম্বোধয়ি,

আঁখিপাত মঝু আসব মোদয়ি,

কোর উপর তুঝ রোদয়ি রোদয়ি

নীদ ভরব সব দেহ।

তুঁহুঁ নহি বিসরবি, তুঁহুঁ নহি ছোড়বি

রাধা-হৃদয় তু কবহুঁ ন তোড়বি,

হিয়-হিয় রাখবি অনুদিন অনুখণ

অতুলন তোঁহার লেহ।

দূর সঙে তুঁহুঁ বাঁশি বজাওসি,

অনুখণ ডাকসি, অনুখণ ডাকসি

রাধা রাধা রাধা,

দিবস ফুরাওল, অবহুঁ ম যাওব,

বিরহ তাপ তব অবহুঁ ঘুচাওব,

কুঞ্জ-বাট পর অবহুঁ ম ধাওব

সব কছু টুটইব বাধা!

গগন সঘন অব, তিমির মগন ভব,

তড়িত চকিত অতি, ঘোর মেঘ রব,

শাল তাল তৰু সভয় তবধ সব,

পন্থ বিজন অতি ঘোর,

একলি যাওব তুঝ অভিসারে,

যা’ক পিয়া তুঁহুঁ কি ভয় তাহারে,

ভয় বাধা সব অভয় মুরতি ধরি,

পন্থ দেখাওব মোর।

ভানু সিংহ কহে, “ছিয়ে ছিয়ে রাধা

চঞ্চল হৃদয় তোহারি,

মাধব পহু মম, প্রিয় স মরণসে

অব তুঁহুঁ দেখ বিচারি!”