কড়ি ও কোমল (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৮৮৬)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৮৬
প্রকাশনা-তথ্য
কড়ি ও কোমল।
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
শ্রী আশুতোষ চৌধুরী কর্ত্তৃক
সম্পাদিত।
৭৮ নং কলেজষ্ট্রীট্, পীপ্ল্স লাইব্রেরি হইতে
প্রকাশিত।
মূল্য এক টাকা।
কলিকাতা
আদি ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে
শ্রীকালিদাস চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত।
৫৫ নং অপর চিৎপুর রোড।
সন ১২৯৩।
উৎসর্গ।
শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
দাদা মহাশয়
কর কমলেষু
সূচি পত্র।
অক্ষমতা
অক্ষমতা।
এ যেন রে অভিশপ্ত প্রেতের পিপাসা,
সলিল রয়েছে পড়ে শুধু দেহ নাই!
এ কেবল হৃদয়ের দুর্ব্বল দুরাশা
সাধের বস্তুর মাঝে করে চাই চাই!
দুটি চরণেতে বেঁধে ফুলের শৃঙ্খল
কেবল পথের পানে চেয়ে বসে থাকা,
মানব জীবন যেন সকলি নিস্ফল,
বিশ্ব যেন চিত্রপট, আমি যেন আঁকা।
চিরদিন বুভুক্ষিত প্রাণ হুতাশন
আমারে করিছে ছাই প্রতি পলে পলে;
মহত্ত্বের আশা শুধু ভারের মতন
আমারে ডুবায়ে দেয় জড়ত্বের তলে!
কোথা সংসারের কাজে জাগ্রত হৃদয়!
কোথারে সাহস মোর অস্থি মজ্জাময়!
অঞ্চলের বাতাস
অঞ্চলের বাতাস।
পাশ দিয়ে গেল চলি চকিতের প্রায়,
অঞ্চলের প্রান্তখানি ঠেকে গেল গায়,
শুধু দেখা গেল তার আধখানি পাশ,
শিহরি পরশি গেল অঞ্চলের বায়।
অজানা হৃদয়-বনে উঠেছে উচ্ছাস,
অঞ্চলে বহিয়া এল দক্ষিণে বাতাস,
সেথা যে বেজেছে বাঁশি তাই শুনা যায়
সেথায় উঠিছে কেঁদে ফুলের সুবাস।
কার প্রাণখানি হ’তে করি হায় হায়
বাতাসে উড়িয়া এল পরশ আভাষ!
ওগো কার তনুখানি হয়েছে উদাস!
ওগো কে জানাতে চাহে মরম বারতা!
দিয়ে গেল সর্ব্বাঙ্গের আকুল নিশ্বাস,
বলে গেল সর্ব্বাঙ্গের কাণে কাণে কথা!
অস্তমান রবি
অস্তমান রবি।
আজ কি তপন তুমি যাবে অস্তাচলে
না শুনে আমার মুখে একটিও গান!
দাঁড়াও গো, বিদায়ের দুটো কথা বলে
আজিকার দিন আমি করি অবসান!
থাম ওই সমুদ্রের প্রান্ত-রেখা পরে,
মুখে মোর রাখ তব একমাত্র আঁখি!
দিবসের শেষ পলে নিমেষের তরে
তুমি চেয়ে থাক আর আমি চেয়ে থাকি!
দুজনের আঁখি পরে সায়াহ্ন আঁধার
আঁখির পাতার মত আসুক মুদিয়া,
গভীর তিমির-স্নিগ্ধ শান্তির পাথার
নিবায়ে ফেলুক আজি দুটি দীপ্ত হিয়া!
শেষ গান সাঙ্গ করে থেমে গেছে পাখী,
আমার এ গানখানি ছিল শুধু বাকী!
অস্তাচলের পরপারে
অস্তাচলের পরপারে।
(সন্ধ্যা সূর্য্যের প্রতি।)
আমার এ গান তুমি যাও সাথে করে
নূতন সাগর তীরে দিবসের পানে!
সায়াহ্ণের কূল হতে যদি ঘুমঘোরে
এ গান উষার কূলে পশে কারো কানে!
সারারাত্রি নিশীথের সাগর বাহিয়া
স্বপনের পরপারে যদি ভেসে যায়!
প্রভাত পাখীরা যবে উঠিবে গাহিয়া
আমার এ গান তারা যদি খুঁজে পায়!
গোধূলির তীরে বসে কেঁদেছে যে জন
ফেলেছে আকাশে চেয়ে অশ্রু জল কত,
তার অশ্রু পড়িবে কি হইয়া নূতন
নব প্রভাতের মাঝে শিশিরের মত!
সায়াহ্ণের কুঁড়িগুলি আপনা টুটিয়া
প্রভাতে কি ফুল হয়ে উঠে না ফুটিয়া!
আকাঙ্ক্ষা
আকাঙ্ক্ষা।
যোগিয়া বিভাস—একতালা।
আজি শরত তপনে প্রভাত স্বপনে
কি জানি পরাণ কি যে চায়!
ওই শেফালির শাখে কি বলিয়া ডাকে
বিহগ বিহগী কি যে গায়!
আজি মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে
রহে না আবাসে মন হায়!
কোন্ কুসুমের আশে, কোন্ ফুল বাসে
সুনীল আকাশে মন ধায়!
আজি কে যেন গো নাই এ প্রভাতে তাই
জীবন বিফল হয় গো!
তাই চারিদিকে চায় মন কেঁদে গায়
“এ নহে, এ হে, নয় গো!”
কোন্ স্বপনের দেশে আছে এলোকেশে,
কোন্ ছায়াময়ী অমরায়।
মাজি কোন্ উপবনে বিরহ বেদনে
আমারি কারণে কেঁদে যায়!
আমি যদি গাঁথি গান অথির পরাণ
সে গান শুনাব কারে আর!
আমি যদি গাঁথি মালা লয়ে ফুল ডালা
কাহারে পরাব ফুলহার!
আমি আমার এ প্রাণ যদি করি দান
দিব প্রাণ তবে কার পায়।
সদা ভয় হয় মনে পাছে অযতনে
মনে মনে কেই ব্যথা পায়!
আকুল আহ্বান
আকুল আহ্বান।
অভিমান ক’রে কোথায় গেলি,
আয় মা ফিরে, আয় মা ফিরে আয়!
দিন রাত কেঁদে কেঁদে ডাকি
আয় মা ফিরে, আয় মা, ফিরে আয়!
সন্ধে হল, গৃহ অন্ধকার,
মাগো, হেথায় প্রদীপ জ্বলে না!
একে একে সবাই ঘরে এল,
আমায় যে, মা, মা কেউ বলে না!
সময় হ’ল বেঁধে দেব চুল,
পরিয়ে দেব রাঙা কাপড় খানি।
সাঁজের তারা সাঁজের গগনে—
কোথায় গেল, রাণী আমার রাণী!
(ওমা) রাত হ’ল, আঁধার করে আসে
ঘরে ঘরে প্রদীপ নিবে যায়।
আমার ঘরে ঘুম নেইক শুধু—
শূন্য শেজ শূন্যপানে চায়।
কোথায় দুটি নয়ন ঘুমে ভরা,
(সেই) নেতিয়ে-পড়া ঘুমিয়ে পড়া মেয়ে!
শ্রান্ত দেহ ঢুলে ঢুলে পড়ে
(তবু) মায়ের তরে আছে বুঝি চেয়ে!
আঁধার রাতে চলে গেলি তুই,
আঁধার রাতে চুপি চুপি আয়।
কেউ ত তোরে দেখ্তে পাবে না,
তারা শুধু তারার পানে চায়।
পথে কোথাও জন প্রাণী নেই,
ঘরে ঘরে সবাই ঘুমিয়ে আছে।
মা তোর শুধু এক্লা দ্ধারে বসে,
চুপি চুপি আয় মা মায়ের কাছে।
এ জগৎ কঠিন—কঠিন—
কঠিন, শুধু মায়ের প্রাণ ছাড়া,
সেইখানে তুই আয় মা ফিরে আয়,
এত ডাকি দিবিনে কি সাড়া?
আত্ম অপমান
আত্ম অপমান।
মোছ তবে অশ্রুজল, চাও হাসি মুখে
বিচিত্র এ জগতের সকলের পানে!
মানে আর অপমানে সুখে আর দুখে
নিখিলেরে ডেকে লও প্রসন্ন পরাণে!
কেহ ভাল বাসে কেহ নাহি ভাল বাসে
কেহ দূরে যায় কেহ কাছে চলে আসে,
আপনার মাঝে গৃহ পেতে চাও যদি
আপনারে ভুলে তবে থাক নিরবধি।
ধনীর সন্তান আমি, নহি গো ভিখারী,
হৃদয়ে লুকানো আছে প্রেমের ভাণ্ডার
আমি ইচ্ছা করি যদি বিলাইতে পারি
গভীর সুখের উৎস হৃদয় আমার।
দুয়ারে দুয়ারে ফিরি মাগি অন্নপান
কেন আমি করি তবে আত্ম অপমান!
আত্মাভিমান
আত্মাভিমান।
আপনি কণ্টক আমি, আপনি জর্জ্জর।
আপনার মাঝে আমি শুধু ব্যথা পাই।
সকলের কাছে কেন যাচিগো নির্ভর,
গৃহ নাই, গৃহ নাই, মোর গৃহ নাই!
অতি তীক্ষ্ণ অতি ক্ষুদ্র আত্ম-অভিমান
সহিতে পারে না হায় তিল অসম্মান!
আগে ভাগে সকলের পায়ে ফুটে যায়
ক্ষুদ্র বলে পাছে কেহ জানিতে না পায়!
বরঞ্চ আঁধারে রব ধূলায় মলিন
চাহিনা চাহিনা এই দীন অহঙ্কার—
আপন দারিদ্র্যে আমি রহিব বিলীন,
বেড়াবনা চেয়ে চেয়ে প্রসাদ সবার!
আপনার মাঝে যদি শান্তি পায় মন
বিনীত ধূলার শয্যা সুখের শয়ন।
আশীর্ব্বাদ
আশীর্ব্বাদ।
ইহাদের কর আশীর্ব্বাদ।
ধরায় উঠেছে ফুটি শুভ্র প্রাণ গুলি,
নন্দনের এনেছে সম্বাদ,
ইহাদের কর আশীর্ব্বাদ।
ছোট ছোট হাসি মুখ
জানে না ধরার দুখ,
হেসে আসে তােমাদের দ্বারে
নবীন নয়ন তুলি
কৌতুকেতে দুলি দুলি
চেয়ে চেয়ে দেখে চারিধারে।
সােনার রবির আলাে
কত তার লাগে ভালাে,
ভাল লাগে মায়ের বদন।
হেথায় এসেছে ভূলি,
ধুলিরে জানে না ধুলি,
সবই তার আপনার ধন।
কোলে তুলে লও এলে,
এ যেন কেঁদে না ফেরে,
হরষেতে না ঘটে বিষাদ,
বুকের মাঝারে নিয়ে
পরিপূর্ণ প্রাণ দিয়ে
ইহাদের কর আশীর্ব্বাদ।
তােমার কোলের কাছে
কত সাধে আসিয়াছে,
তােমা-পরে কতনা বিশ্বাস।
ওই কোল হতে খ’সে
এ যেন গাে পথে ব’সে
একদিন না ফেলে নিশ্বাস।
নতুন প্রবাসে এসে
সহস্র পথের দেশে
নীরবে চাহিছে চারিভিতে,
এত শত লোেক আছে।
এসেছে তােমারি কাছে
সংসারের পথ শুধাইতে
যেথা তুমি লয়ে যাবে
কথাটি না ক’য়ে যাবে,
সাথে যাবে ছায়ার মতন,
তাই বলি—দেখাে দেখাে
এ বিশ্বাস রেখাে রেখাে,
পাথারে দিওনা বিসর্জ্জন।
ক্ষুদ্র ও মাথার পর
রাথ গাে করুণকর,
ইহারে কোনাে না অবহেলা
এ ঘাের সংসার মাঝে
এসেছে কঠিন কাজে,
আসেনি করিতে শুধু খেলা!
দেখে মুখ শতদল
চোখে মাের আসে জল,
মনে হয় বাঁচিবে না বুঝি,
পাছে, সুকুমার প্রাণ
ছিড়ে হয় খান্ খান্,
জীবনের পিরবারে যুঝি!
এই হাসিমুখগুলি
হাসি পাছে যায় ভুলি,
পাছে ঘেরে আঁধার প্রমাদ!
উহাদের কাছে ডেকে
বুকে রেখে, কোকে রেখে
তােমরা কর গাে আশীর্ব্বাদ।
বল, “সুখে যাও চোলে
ভবের তরঙ্গ দলে,
স্বর্গ হতে আসু বাতাস,—
সুখ দুঃখ কোরো হেলা
সে কেবল ঢেউ-খেলা
নাচিকে তােদের চারিপাশ।”
আহ্বান গীত
২৫৩
আহ্বান গীত।
পৃথিবী জুড়িয়া বেজেছে বিষাণ,
শুনিতে পেয়েছি ওই—
সবাই এসেছে লইয়া নিশান,
কইরে বাঙ্গালী কই!
সুগভীর স্বর কাঁদিয়া বেড়ায়
বঙ্গসাগরের তীরে,
“বাঙ্গালীর ঘরে কে আছিস্ আয়”
ডাকিতেছে ফিরে ফিরে!
ঘরে ঘরে কেন দুয়ার ভেজানাে,
পথে কেন নাই লােক,
সারা দেশ ব্যাপি মরেছে কে যেন,
বেঁচে আছে শুধু শােক।
গঙ্গা বহে শুধু আপনার মনে
চেয়ে থাকে হিমগিরি,
রবিশশি উঠে অনন্ত গগণে
আসে যায় ফিরি ফিরি।
কত না সংকট, কত না সন্তাপ
মানব শিশুর তরে,
কত না বিবাদ কত না বিলাপ
মানব শিশুর ঘরে!
কত ভায়ে ভায়ে নাহি যে বিশ্বাস,
কেহ কারে নাহি মানে,
ঈর্ষা নিশাচরী ফেলিছে নিশ্বাস
হৃদয়ের মাঝখানে।
হৃদয়ে লুকানাে হৃদয় বেদনা,
সংশয় আঁধারে যুঝে,
কে কাহারে আজি দিবে গাে সান্তনা,
কে দিবে আলয় খুঁজে!
মিটাতে হইবে শােক তাপ ত্রাস,
করিতে হইবে রণ,
পৃথিবী হইতে উঠেছে উচ্ছ্বাস—
শােন শােন সৈন্যগণ।
পৃথিবী ডাকিছে আপন সন্তানে,
বাতাস ছুটেছে তাই—
গৃহ তেয়াগিয়া ভায়ের সন্ধানে
চলিয়াছে কত ভাই!
বঙ্গের কুটীরে এসেছে বারতা,
শুনেছে কি তাহা সবে?
জেগেছে কি কবি শুনাতে সে কথা
জলদ-গম্ভীর রবে?
হৃদয় কি কারো উঠেছে উথলি?
আঁখি খুলেছে কি কেহ?
ভেঙ্গেছে কি কেহ সাধের পুতলি?
ছেড়েছে খেলার গেহ?
কেন কানাকানি, কেনরে সংশয়?
কেন মর’ ভয়ে লাজে?
খুলে ফেল দ্বার ভেঙ্গে ফেল ভয়,
চল পৃথিবীর মাঝে।
ধরা-প্রান্তভাগে ধূলিতে লুটায়ে,
জড়িমা-জড়িত তনু,
আপনার মাঝে আপনি গুটায়ে,
ঘুমায় কীটের অণু!
চারিদিকে তার আপন উল্লাসে
জগৎ ধাইছে কাজে,
চারিদিকে তার অনন্ত আকাশে
স্বরগ সঙ্গীত বাজে1
চারিদিকে তার মানব মহিমা
উঠিছে গগণ পানে,
খুঁজিছে মানব আপনার সীমা,
অসীমের মাঝ খানে।
সে কিছুই তার করে না বিশ্বাস,
আপনারে জানে বড়,
আপনি গণিছে আপন নিশ্বাস,
ধূলা করিতেছে জড়!
সুখ দুঃখ লয়ে অনন্ত সংগ্রাম,
জগতের রঙ্গভূমি—
হেথায় কে চায় ভীরুর বিশ্রাম,
কেনগাে ঘুমাও তুমি!
ডুবিছ ভাসিছ অশ্রুর হিল্লোলে,
শুনিতেছ হাহাকার—
তীর কোথা আছে দেখ মুখ তুলে,
এ সমুদ্র কর পার।
মহা কলরবে সেতু বাঁধে সবে,
তুমি এস, দাও যােগ—
বাধার মতন জড়াও চরণ—
একিরে করম ভােগ!
তা যদি না পার’ সর’ তবে সর,
ছেড়ে দেও তবে স্থান,
ধূলায় পড়িয়া মর’ তবে মর’—
কেন এ বিলাপ গান!
ওরে চেয়ে দেখ্ মুখ আপনার,
ভেবে দেখ্ তােরা কারা?
মানবের মত ধরিয়া আকার,
কেনরে কীটের পারা?
আছে ইতিহাস আছে কুলমান,
আছে মহত্বের খণি,
পিতৃপিতামহ গেয়েছে যে গান,
শােন্ তার প্রতিধ্বনি!
খুঁজেছেন তারা চাহিয়া আকাশে
গ্রহতারকার পথ—
জগৎ ছাড়ায়ে অসীমের আশে
উড়াতেন মনােরথ।
চাতকের মত সত্যের লাগিয়া
তৃষিত আকুল প্রাণে,
দিবস রজনী ছিলেন জাগিয়া
চাহিয়া বিশ্বের পানে।
তবে কেন সবে বধির হেথায়,
কেন অচেতন প্রাণ,
বিফল উচ্ছাসে কেন ফিরে যায়
বিশ্বের আহ্বান গান।
মহত্বের গাথা পশিতেছে কানে,
কেনরে বুঝিনে ভাষা?
তীর্থযাত্রী যত পথিকের গানে,
কেন রে জাগে না আশা?
উন্নতির ধ্বজা উড়িছে বাতাসে,
কেনরে নাচেনা প্রাণ,
নবীন কিরণ ফুটেছে আকাশে
কেনরে জাগেনা গান?
কেন আছি শুয়ে, কেন আছি চেয়ে,
পড়ে আছি মুখোমুখি,
মানবের হােত চলে গান গেয়ে,
জগতের সুখে সুখী!
চল দিবালােকে, চল লােকালয়ে,
চল জন কোলাহলে—
মিশাব হৃদয় মানব হৃদয়ে
অসীম আকাশ তলে!
তরঙ্গ তুলিব তরঙ্গের পরে,
নৃত্য গীত নব নব,
বিশ্বের কাহিনী কোটি কণ্ঠ স্বরে
এক-কণ্ঠ হ’য়ে কব!
মানবের সুখ মানবের আশা
বাজিবে আমার প্রাণে,
শত লক্ষকোটি মানবের ভাষা
ফুটিবে আমার গানে!
মানবের কাজে মানবের মাঝে
আমরা পাইব ঠাঁই—
বঙ্গের দুয়ারে তাই শৃঙ্গ বাজে—
শুনিতে পেয়েছি ভাই।
মুছে ফেল ধূলা, মুছ অশ্রুজল,
ফেল ভিখারীর চীর—
পর’ নব সাজ, ধর’ নব বল,
তোল’ তোল’ নত শির!
তোমাদের কাছে আজি আসিয়াছে
জগতের নিমন্ত্রণ—
দীনহীন বেশ ফেলে যেও পাছে—
দাসত্বের আভরণ।
সভার মাঝারে দাঁড়াবে যখন
হাসিয়া চাহিবে ধীরে—
পূরব রবির হিরণ কিরণ
পড়িবে তোমার শিরে!
বাঁধন টুটিয়া উঠিবে ফুটিয়া
হৃদয়ের শতদল,
জগত মাঝারে যাইবে লুটিয়া
প্রভাতের পরিমল।
!উঠ বঙ্গ কবি, মায়ের ভাষায়
মুমূর্ষুরে দাও প্রাণ—
জগতের লোক সুধার আশায়
সে ভাষা করিবে পান
চাহিবে মোদের মায়ের বদনে,
ভাসিবে নয়ন জলে,
বাঁধিবে জগৎ গানের বাঁধনে
মায়ের চরণ তলে।
বিশ্বের মাঝারে ঠাঁই নাই ব’লে,
কাঁদিতেছে বঙ্গভূমি,
গান গেয়ে কবি জগতের তলে
স্থান কিনে দাও তুমি।
একবার কবি মায়ের ভাষায়
গাও জগতের গান—
সকল জগৎ ভাই হয়ে যায়—
ঘুচে যায় অপমান।
উপকথা
উপকথা।
মেঘের আড়ালে বেলা কখন্ যে যায়,
বৃষ্টি পড়ে সারাদিন থামিতে না চায়।
আর্দ্র-পাখা পাখীগুলি
গীতগান গেছে ভুলি,
নিস্তন্ধে ভিজিছে তরুলতা।
বসিয়া আঁধার ঘরে
বরষার ঝরঝরে
মনে পড়ে কত উপকথা!
কভু মনে লয় হেন
এ সব কাহিনী যেন
সত্য ছিল নবীন জগতে।
উড়ন্ত মেঘের মত
ঘটনা ঘটিত কত,
সংসার উড়িত মনোরথে।
রাজপুত্র অবহেলে
কোন্ দেশে যেত চলে,
কত নদী কত সিন্ধু পার!
সরোবর ঘাট আলা
মণি হাতে নাগবালা
বসিয়া বাঁধিত কেশ ভার।
সিন্ধুতীরে কতদূরে
কোন্ রাক্ষসের পুরে
ঘুমাইত রাজার ঝিয়ারি।
হাসি তার মণিকণা
কেহ তাহা দেখিত না,
মুকুতা ঢালিত অশ্রুবারি।
সাত ভাই একত্তরে
চাঁপা হয়ে ফুটিত রে
এক বোন ফুটিত পারুল।
সম্ভব কি অসম্ভব
একত্রে আছিল সব
দুটি ভাই সত্য আর ভুল।
বিশ্ব নাহি ছিল বাঁধা
না ছিল কঠিন বাধা
নাহি ছিল বিধির বিধান,
হাসি কান্না লঘুকায়া
শরতের আলো ছায়া
কেবল সে ছুঁয়ে যেত প্রাণ।
আজি ফুরায়েছে বেলা,
জগতের ছেলেখেলা,
গেছে আলো-আঁধারের দিন।
আর ত নাইরে ছুটি,
মেঘ রাজ্য গেছে টুটি,
পদে পদে নিয়ম-অধীন।
মধ্যাহ্নে রবির দাপে
বাহিরে কে রবে তাপে
আলয় গড়িতে সবে চায়।
যবে হায় প্রাণপণ
করে তাহা সমাপন
খেলারই মতন ভেঙ্গে যায়!
কবির অহঙ্কার
কবির অহঙ্কার।
গান গাহি বলে কেন অহঙ্কার করা!
শুধু গাহি বলে কেন কাঁদি না সরমে!
খাঁচার পাখীর মত গান গেয়ে মরা,
এই কি মা আদি অন্ত মানব জনমে!
সুখ নাই—সুখ নাই—শুধু মর্ম্ম ব্যথা—
মরীচিকা-পানে শুধু মরি পিপাসায়,
কে দেখালে প্রলোভন, শূন্য অমরতা;
প্রাণে ম’রে গানে কিরে বেঁচে থাকা যায়!
কে আছ মলিন হেথা, কে আছ দুর্ব্বল,
মোরে তোমাদের মাঝে কর গো আহ্বান,
বারেক একত্রে বসে ফেলি অশ্রু জল,
দূর করি হীন গর্ব্ব, শূন্য অভিমান!
তার পরে একসাথে এস কাজ করি,
কেবলি বিলাপ গান দূরে পরিহরি।
কল্পনা-মধুপ
কল্পনা-মধুপ।
প্রতিদিন প্রাতে শুধু গুণ্ গুণ্ গান,
লালসে অলস-পাখা অলির মতন।
বিকল হৃদয় লয়ে পাগল পরাণ
কোথায় করিতে যায় মধু অন্বেষণ!
বেলা ব’হে যায় চলে—শ্রান্ত দিনমান
তরুতলে ক্লান্ত ছায়া করিছে শয়ন,
মূরছিয়া পড়িতেছে বাঁশরীর তান,
সেঁউতি শিথিল-বৃন্ত মুদিছে নয়ন।
কুসুম দলের বেড়া, তারি মাঝে ছায়া,
সেথা ব’সে করি আমি ফুল মধু পান;
বিজনে সৌরভময়ী মধুময়ী মায়া
তাহারি কুহকে আমি করি আত্মদান;
রেণুমাথা পাখা লয়ে ঘরে ফিরে আসি
আপন সৌরভে থাকি আপনি উদাসী!
কল্পনার সাথী
কল্পনার সাথী।
যখন কুসুম বনে ফির একাকিনী,
ধরায় লুটায়ে পড়ে পূর্ণিমা যামিনী,
দক্ষিণে বাতাসে আর তটিনীর গানে
শোন যবে আপনার প্রাণের কাহিনী;—
যখন শিউলি ফুলে কোলখানি ভরি,
দুটি পা ছড়িয়ে দিয়ে আনত বয়ানে
ফুলের মতন দুটি অঙ্গুলিতে ধরি
মালা গাঁথ’ সন্ধেবেলা গুন্গুন্ তানে;—
মধ্যাহ্নে একেলা যবে বাতায়নে বসে,
নয়নে মিলাতে চায় সুদূর আকাশ,
কখন্ আঁচল খানি পড়ে যায় খ’সে,
কখন হৃদয় হতে উঠে দীর্ঘশ্বাস,
কখন্ অশ্রুটি কাঁপে নয়নের পাতে,
তখন আমি কি সখি থাকি তব সাথে!
কাঙালিনী
কাঙালিনী।
আনন্দময়ীর আগমনে,
আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে।
ছের ওই ধনীর দুয়ারে
দাঁড়াইয়া কাঙালিনী মেয়ে!
উৎসবের হাসি-কোলাহল
শুনিতে পেয়েছে ভোর বেলা,
নিরানন্দ গৃহ তেয়াগিয়া
তাই আজ বাহির হইয়া
আসিয়াছে ধনীর দুয়ারে
দেখিবারে আনন্দের খেলা।
বাজিতেছে উৎসবে বাঁশী
কানে তাই পশিতেছে আসি,
মান চোখে তাই ভাসিতেছে
দুরাশার সুখের স্বপন;
চারি দিকে্ প্রভাতের আলো
নয়নে লেগেছে বড় ভালো,
আকাশেতে মেঘের মাঝারে
শরতের কনক তপন!
কত কে যে আসে, কত যায়,
কেহ হাসে, কেহ গান গায়,
কত বরণের বেশ ভূষা—
ঝলকিছে কাঞ্চন-রতন,—
কত পরিজন দাস দাসী,
পুষ্প পাতা কত রাশি রাশি,
চোখের উপরে পড়িতেছে
মরীচিকা-ছবির মতন।
হের তাই রহিয়াছে চেয়ে
শূন্যমনা কাঙালিনী মেয়ে।
শুনেছে সে, মা এসেছে ঘরে,
তাই বিশ্ব আনন্দে ভেসেছে,
মার মায়া পায়নি কখনো,
মা কেমন দেখিতে এসেছে!
তাই বুঝি আঁখি ছলছল,
বাষ্পে ঢাকা নয়নের তারা!
চেয়ে যেন মার মুখ পানে
বালিকা কাতর অভিমানে
বলে,—“মা গো এ কেমন ধারা!
এত বাঁশী, এত হাসিরাশি,
এত তোর রতন-ভূষণ,
তুই যদি আমার জননী,
মোর কেন মলিন বসন!”
ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলি
ভাই বোন করি গলাগলি,
অঙ্গনেতে নাচিতেছে ওই;
বালিকা দুয়ারে হাত দিয়ে,
তাদের হেরিছে দাঁড়াইয়ে,
ভাবিতেছে নিশ্বাস ফেলিয়ে
আমি ত ওদের কেহ নই!
স্নেহ ক’রে আমার জননী
পরায়ে ত দেয়নি বসন,
প্রভাতে কোলেতে ক’রে নিয়ে
মুছায়ে ত দেয়নি নয়ন!”
আপনার ভাই নেই ব’লে
ওরে কিরে ডাকিবে না কেহ!
আর কারো জননী আসিয়া
ওরে কি রে করিবে না স্নেহ!
ওকি শুধু দুয়ার ধরিয়া
উৎসবের পানে রবে চেয়ে,
শূন্যমনা কাঙালিনী মেয়ে!
ওর প্রাণ আঁধার যখন
করুণ শুনায় বড় বাঁশী,
দুয়ারেতে সজল নয়ন
এ বড় নিষ্ঠুর হাসিরাশি!
আজি এই উৎসবের দিনে
কত লোক ফেলে অশ্রুধার,
গেহ নেই, স্নেহ নেই, আহা,
সংসারেতে কেহ নেই তার!
শূন্যহাতে গৃহে যায় কেহ
ছেলেরা ছুটিয়া আসে কাছে,
কি দিবে কিছুই নেই তার
চোখে শুধু অশ্রু-জল আছে!
অনাথা ছেলেরে কোলে নিবি
জননীরা আয় তোরা সব,
মাতৃহারা মা যদি না পায়
তবে আজ কিসের উৎসব!
দ্বারে যদি থাকে দাঁড়াইয়া
ম্লানমুখ বিষাদে বিরস,—
তবে মিছে সহকার শাখা
তবে মিছে মঙ্গল কলস!
কেন
কেন?
কেন গো এমন স্বরে বাজে তবে বাঁশি,
মধুর সুন্দর রূপে কেঁদে ওঠে হিয়া,
রাঙা অধরের কোণে হেরি মধু হাসি
পুলকে যৌবন কেন উঠে বিকশিয়া!
কেন তনু বাহু ডোরে ধরা দিতে চায়,
ধায় প্রাণ, ছুটি কালো আঁখির উদ্দেশে,
হায় যদি এত লাজ কথায় কথায়,
হায় যদি এত শ্রান্তি নিমেষে নিমেষে!
কেন কাছে ডাকে যদি মাঝে অন্তরাল,
কেন রে কাঁদায় প্রাণ সবি যদি ছায়া,
আজ হাতে তুলে নিয়ে ফেলে দিবে কাল
এরি তরে এত তৃষ্ণা, এ কাহার মায়া!
মানব হৃদয় নিয়ে এত অবহেলা,
খেলা যদি, কেন হেন মর্ম্মভেদী খেলা!
কো তুঁহু
( ১৮৮ )
কো তুঁহু!
কো তুঁহু বােলবি মােয়!
হৃদয় মাহ মঝু জাগসি অনুখন,
আঁখ উপর তুঁহু রচলহি আসন,
অরুণ-নয়ন তব মরম সঙে মম
নিমিখ ন অন্তর হােয়।
কো তুঁহু বােলবি মােয়!
হৃদয়-কমল, তব চরণে টলমল,
নয়ন যুগল মম উছলে ছলছল,
প্রেমপূর্ণ তনু পুলকে ঢলটল
চাহে মিলাইতে ভােয়।
কো তুঁহু বােলবি মােয়!
বাঁশরি-ধ্বনি তুহ অমিয়-গরলরে,
হৃদয় বিদারয়ি হৃদয় হরলরে,
আকুল-কাকলি ভুবন ভরলরে,
উতুল প্রাণ উতরােয়।
কো তুঁহু বােলবি মােয়!
হেরি হাসি তব মধুঋতু ধাওল,
শুনয়ি বাঁশি তব পিককুল গাওল,
বিকল ভ্রমর সম ত্রিভুবন আওল,
চরণ-কমল যুগ ছোঁয়।
কো তুঁহু বােলবি মােয়!
গােপবধূজন বিকশিত যৌবন,
পুলকিত যমুনা, মুকুলিত উপবন,
নীল নীর পর ধীর সমীরণ,
পলকে প্রাণমন খােয়।
কো তুঁহু বোলবি মােয়!
তৃষিত আঁখি, তব মুখপর বিহরই,
মধুর পরশ তব, রাধা শিহরই,
প্রেম-রতন ভরি হৃদয় প্রাণ লই
পদতলে অপনা থােয়।
কো তুঁহু বােলবি মােয়!
কো তুঁহু কোঁ তুঁহু সব জন পুছয়ি,
অনুদিন সঘন নয়ন জল মুছয়ি,
যাচে ভানু, সব সংশয় ঘুচয়ি
জনম চরণপর গোয়।
কো তুঁহু বোলবি মোয়!
কোথায়
কোথায়!
হায়, কোথা যাবে!
অনন্ত অজানা দেশ, নিতান্ত যে একা তুমি,
পথ কোথা পাবে!
হায়, কোথা যাবে।
কঠিন বিপুল এ জগৎ,
খুঁজে নেয় যে যাহার পথ।
স্নেহের পুতলি তুমি সহসা অসীমে গিয়ে
কার মুখে চাবে!
হায় কোথা যাবে!
মোরা কেহ সাথে রহিব না,
মোরা কেহ কথা কহিব না।
নিমেষ যেমনি যাবে, আমাদের ভালবাসা
আর নাহি পাবে।
হায় কোথা যাবে!
মোরা বসে কাঁদিব হেথায়,
শূন্যে চেয়ে ডাকিব তোমায়;
মহা সে বিজন মাঝে হয় ত বিলাপধ্বনি
মাঝে মাঝে শুনিবারে পাবে,
হায়, কোথা যাবে।
দেখ, এই ফুটিয়াছে ফুল,
বসন্তেরে করিছে আকুল;
পুরান’ সুখের স্মৃতি বাতাস আনিছে নিতি
কত স্নেহ ভাবে,
হায়, কোথা যাবে!
খেলা ধুলা পড়ে না কি মনে,
কত কথা স্নেহের স্মরণে!
সুখে দুখে শত ফেরে সে কথা জড়িত যে রে,
সেও কি ফুরাবে!
হায়, কোথা যাবে!
চির দিন তরে হবে পর!
এ ঘর রবে না তব ঘর!
যারা ওই কোলে যেত, তারাও,পরের মত!
বারেক ফিরেও নাহি চাবে!
হায় কোথা যাবে!
হায় কোথা যাবে!
যাবে যদি, যাও যাও, অশ্রু তবে মুছে যাও,
এইখানে দুঃখ রেখে যাও!
যে বিশ্রাম চেয়েছিলে, তাই যেন সেথা মিলে,
আরামে ঘুমাও!
যাবে যদি, যাও!
ক্ষণিক মিলন
( ১৯৪ )
ক্ষণিক মিলন।
আকাশের দুইদিক হ’তে দুই খানি মেঘ এল ভেসে,
দুই খানি দিশাহারা মেঘ— কে জানে এসেছে কোথা হতে।
সহসা থামিল থমকিয়া আকাশের মাঝখানে এসে।
দোঁহাপানে চাহিল দুজনে চতুর্থীর চাদের আলােতে।
ক্ষীণাললাকে বুঝি মনে পড়ে দুই অচেনা চেনা-শােনা,
মনে পড়ে কোন্ ছায়া-দ্বীপে, কোন্ কুহেলিকা-ঘেরা দেশে,
কোন্ সন্ধ্যা-সাগরের কুলে দুজনের ছিল আনাগােনা!
মেলে দোঁহে তবুও মেলে না তিলেক বিরহ রহে মাঝে,
চেনা ব’লে মিলিবারে চায়, অচেনা বলিয়া মরে লাজে।
মিলনের বাসনার মাঝে আধখানি চাদের বিকাশ,—
দুটী চুম্বনের ছোঁয়াছুঁয়ি মাঝে যেন সরমের হাস,
দুখানি অলস আঁখি-পাতা, মাঝে সুখ-স্বপন আভাস!
দোঁহার পরশ ল’য়ে দোঁহে ভেসে গেল, কহিল না কথা,
বলে গেল সন্ধ্যার কাহিনী, ল’য়ে গেল উষার বারতা।
ক্ষুদ্র অনন্ত
ক্ষুদ্র অনন্ত।
অনন্ত দিবস রাত্রি কালের উচ্ছাস
তারি মাঝখানে শুধু একটী নিমেষ,
একটী মধুর সন্ধ্যা, একটু বাতাস—
মৃদু আলো আঁধারের মিলন আবেশ—
তারি মাঝখানে শুধু একটুকু জুঁই,—
একটুকু হাসি মাথা সৌরভের লেশ—
একটু অধর তার ছুঁই কি না ছুঁই—
আপন আনন্দ ল’য়ে উঠিতেছে ফুটে,
আপন আনন্দ ল’য়ে পড়িতেছে টুটে!
সমগ্র অনন্ত ঐ নিমেষের মাঝে
একটী বনের প্রান্তে জুঁই হয়ে উঠে।
পলকের মাঝখানে অনন্ত বিরাজে।
যেমনি পলক টুটে ফুল ঝরে যায়
অনন্ত আপনা মাঝে আপনি মিলায়!
ক্ষুদ্র আমি
ক্ষুদ্র আমি।
বুঝেছি বুঝেছি সখা, কেন হাহাকার,
আপনার পরে মোর কেন সদা রোষ!
বুঝেছি বিফল কেন জীবন আমার,
আমি আছি তুমি নাই তাই অসন্তোষ!
সকল কাজের মাঝে আমারেই হেরি—
ক্ষুদ্র আমি জেগে আছে ক্ষুধা লয়ে তার,
শীর্ণ বাহু আলিঙ্গনে আমারেই ঘেরি
করিছে আমার হায় অস্থিচর্ম্ম সার!
কোথা নাথ কোথা তব সুন্দর বদন,
কোথায় তোমার নাথ বিশ্ব-ঘেরা হাসি!
আমারে কাড়িয়া লও, করগো গোপন,
আমারে তোমার মাঝে করগো উদাসী!
ক্ষুদ্র জামি করিতেছে বড় অহঙ্কার,
ভাঙ্গ নাথ, ভাঙ্গ নাথ অভিমান তার!
খেলা
খেলা।
পথের ধারে অশথ্-তলে
মেয়েটি খেলা করে;
আপন মনে আপনি আছে
সারাটি দিন ধ’রে।
উপর পানে আকাশ শুধু,
সমুখ পানে মাঠ,
শরৎকালে রোদ্ পড়েছে
মধুর পথ ঘাট।
দুটি একটি পথিক চলে
গল্প করে, হাসে।
লজ্জাবতী বধুটি গেল।
ছায়াটি নিয়ে পাশে।
আকাশ-ঘেরা মাঠের ধারে
বিশাল খেলা-ঘরে,
এক্টি মেয়ে আপন মনে
কতই খেলা করে।
মাথার পরে ছায়া পড়েছে
খোদ পড়েছে কোলে,
পায়ের কাছে এক্টি লতা
বাতাস পেয়ে দোলে?
মাঠের থেকে বাছুর আসে
দেখে নতুন লোক,
ঘাড় বেঁকিয়ে চেয়ে থাকে
ড্যাবা ড্যাবা চোক।
কাঠবিড়ালী উসুখুসু।
আশে পাশে ছোটে,
শব্দ পেলে লেজটি তুলে
চম্ক খেয়ে ওঠে।
মেয়েটি তাই চেয়ে দেখে
কত যে সাধ যায়,
কোমল গায়ে হাত বুলায়ে
চুমো খেতে চায়!
সাধ যেতেছে কাঠবিড়ালী
তুলে নিয়ে বুকে,
ভেঙ্গে ভেঙ্গে টুকু টুকু
খাবার দেবে মুখে।
মিষ্টি নামে ডাকবে তারে
গালের কাছে রেখে,
বুকের মধ্যে রেখে দেবে
আঁচল দিয়ে ঢেকে।
“আয় আয়” ডাকে তাই
করুণ স্বরে কয়,
“আমি কিছু বলব না ত
আমায় কেন ভয়!”
মাথা তুলে চেয়ে থাকে
উঁচু ডালের পানে,
কাঠবিড়ালী ছুটে যায়
ব্যথা পায় প্রাণে!
রাখালের বাঁশি বাজে
সুদূর তরুছায়,
খেল্তে খেল্তে মেয়েটি তাই
খেলা ভুলে যায়।
তরুর মূলে মাথা রেখে
চেয়ে থাকে পথে,
জানি কোন্ পরীর দেশে
ধায় সে মনোরথে।
এক্লা কোথায় ঘুরে বেড়ায়
মায়া দ্বীপে গিয়ে;—
হেনকালে চাষী আসে
দুটি গরু নিয়ে।
শব্দ শুনে কেঁপে ওঠে,
চমক্ ভেঙ্গে চায়।
আঁখি হতে মিলায় মায়া,
স্বপন টুটে যায়।
গান
গান।
মিশ্র কালাংড়া। আড়খেমটা।
(ও গো) কে যায় বাঁশরী বাজায়ে!
আমার ঘরে কেহ নাই যে!
(তারে) মনে পড়ে যারে চাই যে!
(তার) আকুল পরাণ বিরহের গান
বাঁশি বুঝি গেল জানায়ে!
(আমি) আমার কথা তারে জানাব কি করে,
প্রাণ কাঁদে মোর তাই যে!
কুসুমের মালা গাঁথা হল না,
ধুলিতে প’ড়ে শুকায় রে,
নিশি হয় ভোর, রজনীর চাদ
মলিন মুখ লুকায় রে!
সারা বিভাবরী কার পূজা করি
যৌবন-ডালা সাজায়ে,
(ওই) বাঁশিস্বরে হায় প্রাণ নিয়ে যায়
আমি কেন থাকি হায় রে!
গান রচনা
গান রচনা।
এ শুধু অলস মায়া, এ শুধু মেঘের খেলা!
এ শুধু মনের সাধ বাতাসেতে বিসর্জ্জন;
এ শুধু আপন মনে মালা গেঁথে ছিঁড়ে ফেলা,
নিমেষের হাসিকান্না গান গেয়ে সমাপন।
শ্যামল পল্লব পাতে রবিকরে সারাবেলা
আপনার ছায়া লয়ে খেলা করে ফুলগুলি,
এও সেই ছায়া-খেলা বসন্তের সমীরণে!
কুহকের দেশে যেন সাধ ক’রে পথ ভুলি
হেথা হোথা ঘুরি ফিরি সারাদিন আনমনে!
কারে যেন দেব’ ব’লে কোথা যেন ফুল তুলি,
সন্ধ্যায় মলিন ফুল উড়ে যায় বনে বনে!
এ খেলা খেলিবে হায় খেলার সাথী কে আছে?
ভুলে ভুলে গান গাই—কে শোনে, কে নাই শো
যদি কিছু মনে পড়ে, যদি কেহ আসে কাছে!
গীতোচ্ছাস
( ১৯৫ )
গীতােচ্ছাস।
নীরব বাঁশরী খানি বেজেছে আবার!
প্রিয়ার বারতা বুঝি এসেছে আমার
বসন্ত কানন মাঝে বসন্ত সমীরে!
তাই বুঝি মনে পড়ে ভােলা গান যত!
তাই বুঝি ফুলবনে জাহ্নবীর তীরে
পুরাতন হাসি গুলি ফুটে শত শত!
তাই বুঝি হৃদয়ের বিস্মৃত বাসনা
জাগিছে নবীন হ’য়ে পল্লবের মত!
জগত কমল বনে কমল-আসনা
কত দিন পরে বুঝি তাই এল ফিরে!
সে এলনা এল তার মধুর মিলন,
বসন্তের গান হ’য়ে এল তার স্বর,
দৃষ্টি তার ফিরে এল—কাথা সে নয়ন?
চুম্বন এসেছে তার—কোথা সে অধর?
চরণ
চরণ।
দুখানি চরণ পড়ে ধরণীর গায়।
দুখানি অলস রাঙা কোমল চরণ।
শত বসন্তের স্মৃতি জাগিছে ধরায়,
শতলক্ষ কুসুমের পরশ-স্বপন!
শত বসন্তের যেন ফুটন্ত অশোক
ঝরিয়া মিলিয়া গেছে দুটি রাঙা পায়!
প্রভাতের প্রদোষের দুটি সূর্য্যলোক
অস্ত গেছে যেন দুটি চরণ ছায়ায়!
যৌবন সঙ্গীত পথে যেতেছে ছড়ায়ে,
নূপুর কাঁদিয়া মরে চরণ জড়ায়ে,
নৃত্য সদা বাঁধা যেন মধুর মায়ায়।
হোথা যে নিঠুর মাটি, শুষ্ক ধরাতল,—
এস গো হৃদয়ে এস, ঝুরিছে হেথায়
লাজ-রক্ত লালসার রাঙা শতদল।
চিঠি
চিঠি।
শ্রীমতী ইন্দিরা। প্রাণাধিকাসু।
ষ্টীমার “রাজহংস।” গঙ্গা।
চিঠি লিখ্ব কথা ছিল,
দেখ্চি সেটা ভারি শক্ত।
তেমন যদি খবর থাকে
লিখ্তে, পারি তক্ত তক্ত।
খবর বয়ে বেড়ায় ঘুরে
খবরওয়ালা ঝাকা-মুটে।
আমি বাপু ভাবের ভক্ত
বেড়াইনাকো খবর খুঁটে।
এত ধুলল, এত খবর
কল্কাতাটার গলিতে!
নাকে চোকে খবর ঢেকে
দু-চার কদম চলিতে।
এত খবর সয়না আমার
মরি আমি হাঁপােষে!
ঘরে এসেই খবর গুলো
মুছে ফেলি পাপোষে।
আমাকেত জানই বাছা!
আমি একজন খেয়ালি।
কথাগুলো যা’ বলি, তার
অধিকাংশই হেঁয়ালি।
আমার যত খবর আসে
ভোরের বেলা পূব দিয়ে।
পেটের কথা তুলি আমি
পেটের মধ্যে ডুব দিয়ে।
আকাশ ঘিরে জাল ফেলে।
তারা ধরাই ব্যবসা।
থাক্গে তোমার পাটের হাটে
মধুর কুণ্ডু শিবু সা।
কল্পতরুর তলায় থাকি
নইগো আমি খবুরে।
হাঁ করিয়ে চেয়ে আছি
মেওয়া ফলে সবুরে।
তবে যদি নেহাৎ কর
খবর নিয়ে টানাটানি।
আমি বাপু এক্টি কেবল
দুষ্ট মেয়ের খবর জানি!
দুষ্টমি তার শোন যদি,
অবাক হবে সত্যি!
এত বড় বড় কথা তার
মুখখানি একরত্তি।
মনে মনে জানেন তিনি।
ভারি মস্ত লোকটা।
লোকের সঙ্গে না-হক কেবল
ঝগড়া কর্বার ঝোঁকটা।
আমার সঙ্গেই যত বিবাদ
কথায় কথায় আড়ি।
এর নাম কি ভদ্র ব্যাভার!
বড্ড বাড়াবাড়ি।
মনে করেছি তার সঙ্গে
কথাবার্ত্তা বন্দ করি।
প্রতিজ্ঞা থাকে না পাছে
সেইটে ভারি সন্দ করি।
সে না হলে সকাল বেলায়
চামেলি কি ফুটবে!
সে নৈলে কি সন্ধে বেলায়
সন্ধে তারা উঠবে।
সে না হলে দিনটা ফাঁকি
আগাগোড়াই মস্করা।
পোড়ারমুখী জানে সেটা
তাই এত তার আস্কারা।
চুড়ি-পরা হাত দুখানি
কতই জানে ফন্দি।
কোন মতে তার সাথে তাই
করে আছি সন্ধি।
নাম যদি তার জিগেস কর
নামটি বলা হবে না।
কি জানি সে শােনে যদি
প্রাণটি আমার রবে না।
নামের খবর কে রাখে তার
ডাকি তারে যা খুসি।
দুষ্ট, বল দস্যি বল
পােড়ারমুখি রাক্ষুসী!
বাপ মায়ে যে নাম দিয়েছে
বাপ মায়েরি থাক্সে।
ছিষ্টি খুঁজে মিষ্টি নামটি
তুলে রাখুন্ বাক্সে!
এক জনেতে নাম রাখ্বে
অন্নপ্রাশনে।
বিশ্ব সুদ্ধ সে নাম নেবে
বিষম শাসন এ!
নিজের মনের মত সবাই
করুক নামকরণ।
বাবা ডাকুন্ “চন্দ্রকুমার”
খুড়াে “রামচরণ”!
ধার-করা নাম নেব আমি
হবে না ত সিটি।
জানই আমার সকল কাজে
ঘরের মেয়ে তার কি সাজে
সঙস্কৃত নাম।
এতে কেবল বেড়ে ওঠে
অভিধানের দাম।
আমি বাপু ডেকে বসি
যেটা মুখে আসে,
যারে ডাকি সেই তা বােঝে
আর সকলে হাসে!
দুষ্ট মেয়ের দুষ্টমি—তার
কোথায় দেব দাঁড়ি।
অকুল পাথার দেখে শেষে
কলমের হাল ছাড়ি!
শােন বাছা, সত্যি কথা
বলি তােমার কাছে—
ত্রিজগতে তেমন মেয়ে,
একটি কেবল আছে!
বর্ণিমেটা কারাে সঙ্গে
মিলে পাছে যায়—
তুমুল ব্যাপার উঠ্বে বেধে
হবে বিষম দায়!
হপ্তাখানেক বকাবকি
ঝগ্ড়াঝাটির পালা,
এক্টু চিঠি লিখে, শেষে
প্রাণটা ঝালাফালা।
আমি বাপু ভালমানুষ
মুখে নেইক রা।
ঘরের কোণে বসে বসে
গোঁফে দিচ্চি তা।
আমিই যত গােলে পড়ি
শুনি নানান্ বাক্যি।
খোঁড়ার পা যে পানায় পড়ে
আমিই তাহার সাক্ষি।
আমি কারো নাম করিনি
তবু ভয়ে মরি।
তুই পাছে নিস্ গায়ে পেতে
সেইটে বড় ডরি!
কথা এক্টা উঠ্লে মনে
ভারি তোরা জ্বালাস্।
আমি বাপু আগে থাক্তে
বলে হলুম খালাস্।
চিত্রপটে নিদ্রিতা রমণীর চিত্র
চিত্রপটে নিদ্রিতা রমণীর চিত্র।
মায়ায় রয়েছে বাঁধা প্রদোষ আঁধার
চিত্রপটে সন্ধ্যাতারা অস্ত নাহি যায়!
এলাইয়া ছড়াইয়া গুচ্ছ কেশভার
বাহুতে মাথাটী রেখে রমণী ঘুমায়!
চারিদিকে পৃথিবীতে চির জাগরণ
কে ওরে পাড়ালে ঘুম তারি মাঝখানে!
কোথা হ’তে আহরিয়া নীরব গুঞ্জন
চিরদিন রেখে গেছে ওরি কাণে কাণে।
ছবির আড়ালে কোথা অনন্ত নির্ঝর
নীরব ঝর্ঝর গানে পড়িছে ঝরিয়া।
চিরদিন কাননের নীরব মর্ম্মর।
লজ্জা চিরদিন আছে দাঁড়ায়ে সমুখে,
যেমনি ভাঙ্গিবে ঘুম মরমে মরিয়া
বুকের বসনখানি তুলে দিবে বুকে?
চিরদিন
চিরদিন।
(১)
কোথা রাত্রি, কোথা দিন, কোথা ফুটে চন্দ্র সূর্য্য তারা,
কেবা আসে কেবা যায়, কোথা সে জীবনের মেলা,
কেবা হাসে কেবা গায়, কোথা খেলে হৃদয়ের খেলা,
কোথা পথ, কোথা গৃহ, কোথা পান্থ, কোথা পথহারা!
কোথা খসে পড়ে পত্র জগতের মহাবৃক্ষ হতে,
উড়ে উড়ে ঘুরে মরে, অসীমেতে না পায় কিনারা,
বহে যায় কাল বায়ু অবিশ্রাম আকাশের পথে,
ঝর ঝর মর মর শুষ্ক পত্র শ্যাম পত্রে মিলে!
এত ভাঙ্গা, এত গড়া, আনাগােনা জীবন্ত নিখিলে,
এত গান এত তান এত কান্না এত কলরব-
কোথা কে—কোথা সিন্ধু —কোথা উর্ম্মি— কোথা তার
ৰেলা;—
গভীর অসীম গর্তে নিৰ্বসিত নির্বাপিত সব!
জনপূর্ণ সুবিজনে, জ্যোতির্বিন্ধ আঁধারে বিলীন
আকাশ-গম্বুজে শুধু বসে আছে এক চিরদিন”।
(২)
কি লাগিয়া বসে আছ, চাহিয়া রয়েছ কার লাগি!
প্রলয়ের পর-পারে নেহারিছ কার আগমন!
কার দূর পদধ্বনি চিরদিন করিছ শ্রবণ!
চির-বিরহীর মত চির-রাত্রি রহিয়াছ জাগি।
অসীম অতৃপ্তি লয়ে মাঝে মাঝে ফেলিছ নিশ্বাস,
আকাশ-প্রান্তরে তাই কেঁদে উঠে প্রলয়-বাতাস,
জগতের উর্পাজাল ছিঁড়ে টুটে কোথা যায় ভাগি!
অনন্ত আঁধার মাঝে কেহ তব নাহিক দোসর,
পশে না তােমার প্রাণে আমাদের হৃদয়ের আশ,
পশে না তােমার কানে আমাদের পাখীদের স্বর—
সহস্র জগতে মিলি রচে তব বিজন প্রবাস,
সহস্র শবদে মিলি বাঁধে তব নিঃশকের ঘর,
হাসি, কাদি, ভালবাসি, নাই তব, হাসি, কান্না, মায়া,
আসি থাকি চলে যাই কত ছায়া কত উপছায়া!
(৩)
তাই কি? সকলি ছায়া? আসে, থাকে, আর মিলে যায়?
তুমি শুধু একা আছ, আর সব আছে আর নাই?
যুগ যুগান্তর ধ’রে ফুল ফুটে, ফুল ঝরে তাই?
প্রাণ পেয়ে প্রাণ দিই সে কি শুধু মরণের পায়?
এ ফুল চাহে না কেহ? লহে না এ পুজা-উপহার?
এ প্রাণ, প্রাণের আশা, টুটে কি অসীম শুন্যতায়।
বিশ্বের উঠিছে গান, বধিরতা বসি সিংহাসনে?
বিশ্বের কাঁদিছে প্রাণ, শূন্যে ঝরে অশ্রুবারি ধার?
যুগ যুগান্তের প্রেম কে লইবে, নাই ত্রিভুবনে?
চরাচর মগ্ন আছে নিশিদিন আশার স্বপনে—
বাঁশী শুনে চলিয়াছে, সে কি হায় বৃথা অভিসার!
বােলাে না সকলি স্বপ্ন, সকলি এ মায়ার ছলন,
বিশ্ব যদি স্বপ্ন দেখে সে স্বপন কাহার স্বপন।
সে কি এই প্রাণহীন প্রেমহীন অন্ধ অন্ধকার?
(৪)
ধ্বনি খুজে প্রতিধ্বনি, প্রাণ খুঁজে মরে প্রতিপ্রাণ।
জগৎ আপনা দিয়ে খুজিছে তাহার প্রতিদান।
অসীমে উঠিছে প্রেম, শুধিবারে অসীমের ঋণ—
যত দেয় তত পায়, কিছুতে না হয় অবসান।
যত ফুল দেয় ধরা তত ফুল পায় প্রতি দিন—
যত প্রাণ ফুটাইছে ততই বাড়িয়া উঠে প্রাণ।
যাহা আছে তাই দিয়ে ধনী হয়ে উঠে দীন হীন,
অসীমে জগতে এ কি পিরীতির আদান প্রদান!
কাহারে পুজিছে ধরা শ্যামল যৌবন উপহারে,
নিমেষে নিমেষে তাই ফিরে পায় নবীন যৌবন।
প্রেমে টেনে আনে প্রেম, সে প্রেমর পাথার কোথারে।
প্রাণ দিলে প্রাণ আসে,—কোথা সেই অনন্ত জীবন!
কুদ্র আপনারে দিলে, কোথা পাই অসীম আপন,
সে কি ওই প্রাণহীন প্রেমহীন অন্ধ অন্ধকারে!
চুম্বন
চুম্বন।
অধরের কাণে যেন অধরের ভাষা।
দোঁহার হৃদয় যেন দোঁহে পান করে।
গৃহ ছেড়ে নিরুদ্দেশ দুটী ভালবাসা
তীর্থযাত্রা করিয়াছে অধর-সঙ্গমে!
দুইটি তরঙ্গ উঠি প্রেমের নিয়মে
ভাঙ্গিয়া মিলিয়া যায় দুইটী অধরে।
ব্যাকুল বাসনা দুটী চাহে পরষ্পরে
দেহের সীমায় আসি দুজনের দেখা!
প্রেম লিখিতেছে গান কোমল আখরে
অধরতে থরে থরে চুম্বনের লেখা।
দুখানি অধর হ’তে কুসুম চয়ন,
মালিকা গাঁথিবে বুঝি ফিরে গিয়ে ঘরে?
দুটি অধরের এই মধুর মিলন
দুইটি হাসির রাঙা বাসর শয়ন॥
ছোট ফুল
ছোট ফুল।
আমি শুধু মালা গাঁথি ছোট ছোট ফুলে,
সে ফুল শুকায়ে যায় কথায় কথায়,
তাই যদি, তাই হোক্, দুঃখ নাহি তায়,
তুলিব কুসুম আমি অনন্তের কূলে!
যারা থাকে অন্ধকারে, পাষাণ কারায়,
আমার এ মালা যদি লহে গলে তুলে,
নিমেষের তরে তারা যদি সুখ পায়,
নিঠুর বন্ধন-ব্যথা যদি যায় ভূলে!
ক্ষুদ্র ফুল, আপনার সৌরভের সনে
নিয়ে আসে স্বাধীনতা,—গভীর আশ্বাস—
মনে আনে রবিকর নিমেষ-স্বপনে,
মনে আনে সমুদ্রের উদার বাতাস।
ক্ষুদ্র ফুল দেখে যদি কারো পড়ে মনে
বৃহৎ জগৎ, আর বৃহৎ আকাশ!
জন্মতিথির উপহার
জন্মতিথির উপহার।
(একটি কাঠের বাক্স)
শ্রীমতী ইন্দিরা। প্রাণাধিকাসু
স্নেহ-উপহার এনেছিরে দিতে
লিখেও এনেছি দু-তিন ছত্তর।
দিতে কত কিযে সাধ যায় তােরে
দেবার মত নেই জিনিষ-পত্তর!
টাকাকড়ি গুলাে ট্যাঁকশালে আছে
ব্যাঙ্কে আছে সব জমা,
ট্যাঁকে আছে খালি গােটা দুত্তিন
এবার কর বাছা ক্ষমা!
হীরে জহরৎ যত ছিল মাের
পোঁতা ছিল সৰ মাটিতে,
জহরী যে যেত সন্ধান পেয়ে
নে গেছে যে যার বাটিতে!
দুনিয়া সহর জমিদারী মাের,
পাঁচ ভূতে করে কাড়াকাড়ি,
হাতের কাছেতে যা-কিছু পেলুম,
নিয়ে এনু তাই তাড়াতাড়ি!
স্নেহ যদি কাছে রেখে যাওয়া যেত
চোখে যদি দেখা যেতরে,
বাজারে-জিনিষ কিনে নিয়ে এসে
বল্ দেখি দিত কে তোরে!
জিনিষটা অতি যৎসামান্য
রাখিস্ ঘরের কোণে,
বাক্সখানি ভোরে স্নেহ দিনু তোরে
এইটে থাকে যেন মনে!
বড়সড় হবি ফাঁকি দিয়ে যাবি,
কোন্খেনে র’বি লুকিয়ে,
কাকা ফাকা সব ধুয়ে-মুছে ফেলে
দিবি একেবারে চুকিয়ে,
তখন্ যদিরে এই কাঠ-খানা
মনে একটুকু তোলে ঢেউ—
একবার যদি মনে পড়ে তোর
“বুজি” বলে বুঝি ছিল কেউ!
এই যে সংসারে আছি মোরা সবে
এ বড় বিষম দেশটা!
ফাঁকিফুঁকি দিয়ে দুরে চ’লে মেতে
ভুলে যেতে সবার চেষ্টা!
ভয়ে ভয়ে তাই সবারে সবাই
কত কি যে এনে দিচ্চে,
এটা-ওটা দিয়ে স্মরণ জাগিয়ে
বেঁধে রাখিবার ইচ্ছে!
রাখ্তে যে মেলাই কাঠ খড় চাই,
ভূলে যাবার ভারি সুবিধে,
ভালবাস যা’রে কাছে রাখ্ তারে
যাহা পাস্ তারে খুবি দে!
বুঝে কাজ নেই এত শত কথা,
ফিলজফি হোক্ ছাই!
বেঁচে থাক তুমি সুখে থাক বাছা
বালাই নিয়ে ম’রে যাই।
জাগিবার চেষ্টা
জাগিবার চেষ্টা।
মা কেহ কি আছ মোর, কাছে এস তবে,
পাশে ব’সে স্নেহ ক’রে জাগাও আমায়!
স্বপ্নের সমাধি মাঝে বাঁচিয়া কি হবে,
যুঝিতেছি জাগিবারে,—আঁখি রুদ্ধ হায়!
ডেকো না ডেকো না মোরে ক্ষুদ্রতার মাঝে,
স্নেহময় আলস্যেতে রেখোনা বাঁধিয়া,
আশীর্ব্বাদ ক’রে মোরে পাঠাও গো কাজে,
পিছনে ডেকোনা আর কাতরে কাঁদিয়া!
মোর বলে কাহারেও দেব না কি বল!
মোর প্রাণে পাবে নাকি কেহ নব প্রাণ!
করুণা কি শুধু ফেলে নয়নের জল,
প্রেম কি ঘরের কোণে গাহে শুধু গান!
তবেই ঘুচিবে মোর জীবনের লাজ
যদি মা করিতে পারি কারো কোন কাজ!
তনু
তনু।
ওই তনুখানি তব আমি ভালবাসি।
এ প্রাণ তোমার দেহে হয়েছে উদাসী।
শিশিরেতে টলমল ঢল ঢল ফুল
টুটে পড়ে থরে থরে যৌবন বিকাশি।
চারিদিকে গুঞ্জরিছে জগত আকুল
সারা নিশি সারা দিন ভ্রমর পিপাসী।
ভালবেসে বায়ু এসে দুলাইছে দুল,
মুখে পড়ে মোহ ভরে পূর্ণিমার হাসি।
পূর্ণ দেহখানি হতে উঠিছে সুবাস।
মরি মরি কোথা সেই নিভৃত নিলয়,
কোমল শয়নে যেথা ফেলিছে নিশ্বাস
তনু-ঢাকা মধুমাখা বিজন হৃদয়!
ওই দেহখানি বুকে তুলে নেব, বালা,
চতুর্দ্দশ বসন্তের একগাছি মালা!
তুমি
তুমি।
মিশ্র বারোয়াঁ। আড়াখেমটা।
তুমি কোন্ কাননের ফুল,
তুমি কোন্ গগনের তারা!
তোমায় কোথায় দেখেছি
যেন কোন্ স্বপনের পারা।
কবে তুমি গেয়েছিলে,
আঁখির পানে চেয়েছিলে
ভূলে গিয়েছি!
শুধু মনের মধ্যে জেগে আছে,
ঐ নয়নের তারা!
তুমি কথা কোয়ো না,
তুমি, চেয়ে চলে যাও!
এই চাঁদের আলোতে
তুমি হেসে গলে যাও!
আমি ঘুমের ঘোরে চাঁদের পানে
চেয়ে থাকি মধুর প্রাণে,
তােমার আঁখির মতন দুটি তারা
ঢালু্ক্ কিরণ-ধারা!
দেহের মিলন
দেহের মিলন।
প্রতি অঙ্গ কাঁদে তব প্রতি অঙ্গ তরে।
প্রাণের মিলন মাগে দেহের মিলন।
হৃদয়ে আচ্ছন্ন দেহ হৃদয়ের ভরে
মূরছি পড়িতে চায় তব দেহ পরে!
তোমার নয়ন পানে ধাইছে নয়ন,
অধর মরিতে চায় তোমার অধরে!
তৃষিত পরাণ আজি কাঁদিছে কাতরে
তোমারে সর্ব্বাঙ্গ দিয়ে করিতে দর্শন।
হৃদয় লুকান আছে দেহের সায়রে
চির দিন তীরে বসি করি গো ক্রন্দন,
সর্ব্বাঙ্গ ঢালিয়া আজি আকুল অন্তরে
দেহের রহস্য মাঝে হইব মগন।
আমার এ দেহ মন চির রাত্রি দিন
তোমার সর্ব্বাঙ্গে যাবে হইয়া বিলীন।
নূতন
নূতন।
হেথাও ত পশে সূর্য্যকর!
ঘোর ঝটিকার রাতে
দারুণ অশণি পাতে
বিদীরিল যে গিরি-শিখর—
বিশাল পর্ব্বত কেটে,
পাষাণ-হৃদয় ফেটে,
প্রকাশিল যে ঘোর গহ্বর—
প্রভাতে পুলকে ভাসি,
বহিয়া নবীন হাসি,
হেথাও ত পশে সূর্য্যকর!
দুয়ারেতে উঁকি মেরে
ফিরে ত যায় না সে রে,
শিহরি উঠে না আশঙ্কায়,
ভাঙ্গা পাষাণের বুকে
খেলা করে কোন্ সুখে,
হেসে আসে, হেসে চলে যায়!
হের হের, হায়, হায়,
যত প্রতিদিন যায়—
কে গাঁথিয়া দেয় তৃণ জাল!
লতাগুলি লতাইয়া,
বাহুগুলি বিথাইয়া
ঢেকে ফেলে বিদীর্ণ কঙ্কাল।
বজ্রদগ্ধ অতীতের—
নিরাশার অতিথের—
ঘোর স্তব্ধ সমাধি আবাস,—
ফুল এসে, পাতা এসে
কেড়ে নেয় হেসে হেসে,
অন্ধকারে করে পরিহাস!
এরা সব কোথা ছিল!
কেই বা সংবাদ দিল!
গৃহ-হারা আনন্দের দল—
বিশ্বে তিল শূন্য হলে,
অনাহুত আসে চলে,
বাসা বাঁধে করি কোলাহল।
আনে হাসি, আনে গান,
আনেরে নূতন প্রাণ,
সঙ্গে করে আনে রবিকর,
অশোক শিশুর প্রায়
এত হাসে এত গায়
কাঁদিতে দেয় না অবসর।
বিষাদ বিশাল কায়া
ফেলেছে আঁধার ছায়া
তারে এরা করে না ত ভয়,
চারি দিক হতে তারে
ছোট ছোট হাসি মারে,
অবশেষে করে পরাজয়।
এই যে রে মরুস্থল,
দাব-দগ্ধ ধরাতল,
এই খানে ছিল “পুরাতন,”
এক দিন ছিল তার
শ্যামল-যৌবন ভার,
ছিল তার দক্ষিণ-পবন।
যদি রে সে চলে গেল,
সঙ্গে যদি নিয়ে গেল
গাত গান হাসি ফুল ফল,
শুষ্ক-স্মৃতি কেন মিছে
রেখে তবে গেল পিছে,
শুষ্ক শাখা শুষ্ক ফুলদল!
সে কি চায় শুষ্ক বনে
গাহিবে বিহঙ্গগণে
আগে তারা গাহিত যেমন?
আগেকার মত ক’রে
স্নেহ তার নাম ধ’রে
উচ্ছসিবে বসন্ত পবন?
নহে নহে, সে কি হয়!
সংসার জীবনময়,
নাহি হেথা মরণের স্থান।
আয়রে, নূতন, আয়,
সঙ্গে করে নিয়ে আয়,
তোর সুখ, তোর হাসি গান।
ফোটা’ নব ফুল চর,
ওঠা’ নব কিশলয়,
নবীন বসন্ত আয় নিয়ে।
যে যায় সে চলে যাক্,
সব তার নিয়ে যাক্,
নাম তার যাক্ মুছে দিয়ে।
এ কি ঢেউ-খেলা হয়,
এক আসে, আর যায়,
কাঁদিতে কাঁদিতে আসে হাসি,
বিলাপের শেষ তান
না হইতে অবসান
কোথা হতে বেজে ওঠে বাঁশি!
আয়রে কাঁদিয়া লই,
শুকাবে দু দিন বই
এ পবিত্র অশ্রুবারি ধারা।
সংসারে ফিরিব ভূলি,
ছোট ছোট সুখগুলি
রচি দিবে আনন্দের কারা।
না রে, করিব না শোক,
এসেছে নূতন লোক,
তারে কে করিবে অবহেলা!
সেও চলে যাবে কবে,
গীত গাম সাঙ্গ হবে,
ফুরাইবে দুদিনের খেলা।
পত্র ১
পত্র।
শ্রীমতী ইন্দিরা। প্রাণাধিকা।
ষ্টীমার। খুলনা।
মাগাে আমার লক্ষ্মী,
মনিষ্যি না পক্ষী!
এই ছিলেম তরীতে,
কোথায় এ ত্বরিতে!
কাল ছিলেম খুলনায়,
তাতে ত আর ভুল নাই,
কল্কাতায় এসেছি সদ্য,
বসে বসে লিখ্চি পদ্য।
তােদের ফেলে সারাটা দিন
আছি অমনি এক্-রকম্,
খােপে বসে পায়রা যেন
কর্চি কেবল বক্বকম্।
বৃষ্টি পড়ে টুপুর্ টুপুর্
মেঘ করেছে আকাশে,
উধার রাঙা মুখখানি গো
কেমন যেন ফ্যাকাসে!
বাড়িতে যে কেউ কোথা নেই
দুওর গুলো ভ্যাজানো,
ঘরে ঘরে খুঁজে বেড়াই
ঘরে আছে কে যেন!
পক্ষীটি সেই ঝুপ্সি হয়ে
ঝিমচ্চেরে খাঁচাতে,
ভুলে গেছে নেচে নেচে
পুচ্ছটি তার নাচাতে!
ঘরের কোণে আপন মনে
শূন্য পোড়ে বিছেনা,
কাহার তরে কেঁদে মরে
সে কথাটা মিছে না!
বইগুলো সব ছড়িয়ে পোড়ে,
নাম লেখা যায় কার গো!
এম্নি তারা রবে কি রে
খুলবে না কেউ আর গো!
এটা আছে সেটা আছে
অভাব কিছু নেই
স্মরণ ক’রে দেয়রে যারে
থাকেনাক সেই ত!
বাগানে ঐ দুটো গাছে
ফুল ফুটেছে রাশি রাশি,
ফুলের গন্ধে মনে পড়ে
যা’রে যা’রে ভালবাসি।
ফুলের গন্ধে মনে পড়ে।
ফুল কে আমায় দিত মেলা,
বিছেনায় কার মুখটি দেখে
সকাল হত সকালবেলা!
জল থেকে তুই আসবি কবে
মাটির লক্ষ্মী মাটিতে
ঠাকুর বাবুর ছয় নম্বর
যোড়াসাঁকোর বাটিতে!
ইষ্টিম্ ঐ রে ফুরিয়ে এল
নোঙর তবে ফেলি অদ্য।
অবিদিত নেইত তোমার
রবিকাকা কুঁড়ের হদ্দ!
আজ্কে না কি মেঘ করেছে
ঠেক্চে কেমন ফাঁকা-ফাঁকা,
তাই খানিকটা ফোঁসফোঁসিয়ে
বিদায় হল—
রবি কাকা!
কলিকাতা।
পত্র ২
পত্র।
শ্রীমতী ইন্দিরা। প্রাণাধিকাসু।
ষ্টীমার খুলনা।
বসে বসে লিখ্লেম চিঠি,
পূরিয়ে দিলে চারটে পিঠ-ই,
পেলেম না তার জবাব-ই,
এম্নি তােমার নবাবী!
দুটো ছৰ লিখ্বি পত্র
এক্লা তােমার “রব্-কা” যে!
পােড়ার মুখী তাও হবে না
আলিস্যি তাের সব কাজে!
ঝগড়াটে নয় স্বভাব আমার
নইলে দেখতে কারখানা,
গলার চোটে আকাশ ফেটে
হয়ে যেত চায়খানা,
বাছা আমার, দেখ্তে পেতে
এই কলমের ধার খানা!
তোমার মত এমন মা ত
দেখিনি এ বঙ্গে গো,
মায়া দয়া যা-কিছু সে
য দিন থাকি সঙ্গে গো!
চোখের আড়াল প্রাণের আড়াল
কেমন তর ঢং এ গো!
তোমার প্রাণ যে পাষাণ সম
জানি সেটা long ago!
সংসারে যে সবি মায়া
সেটা নেহাৎ গল্প না!
বাইরেতে এক ভিতরে এক
এ যেন কার খল-পনা!
সত্যি বলে যেটা দেখি
সেটা আমার কল্পনা!
ভেবে একবার দেখ বাছা
ফিলজফি অল্প না!
মস্ত এক্টা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ
কে রেখেছে সাজিয়ে,
যা করি তা’ কেবল “থোড়া
জমির বাস্তে কাজিয়ে!”
বৃষ্টি পড়ে চিঠি না পাই,
মনটা নিয়ে ততই হাঁপাই,
শূন্য চেয়ে ততই ভাবি
সকলি ভোজ-বাজি এ!
ফিলজফি মনের মধ্যে
ততই ওঠে গাঁজিয়ে!
দূর হোক্ গে, এত কথা
কেনই বলি তোমাকে!
ভরা নায়ে পা দিয়েছ,
আছ তুমি দেমাকে!
তোমার সঙ্গে আর কথা না,
তুমি এখন লোকটা মস্ত,
কাজ কি বাপু, এই খেনেতেই
রবীন্দ্রনাথ হলেন অস্ত।
পত্র ৩
পত্র।
সুহৃদ্বর যুক্ত প্রিঃ—
স্থলচর বরেষু।
জলে বাসা বেঁধেছিলেম,
ডাঙ্গায় বড় কিচিমিচি।
সবাই গলা জাহির করে,
চেঁচায় কেবল মিছিমিছি।
সস্তা লেখক কোকিয়ে মরে,
ঢাক নিয়ে সে খালি পিটোয়,
ভদ্রলােকের গায়ে পড়ে
কলম নেড়ে কালি ছিটোয়।
এখেনে যে বাস করা দায়,
ভন্ভনানির বাজারে।
প্রাণের মধ্যে গুলিয়ে উঠে
হট্টগােলের মাঝারে।
কানে যখন তালা ধরে
উঠি যখন হাঁপিয়ে।
কোথায় পালাই—কোথায় পালাই—
জলে পড়ি ঝাঁপিয়ে।
গঙ্গা প্রাপ্তির আশা কোরে
গঙ্গা যাত্রা করেছিলেন।
তােমাদের না বলে কয়ে
আস্তে আস্তে সরেছিলেম।
দুনিয়ার এ মজ্লিষেতে
এসেছিলেম গান শুন্তে;
আপন মনে গুন্গুনিয়ে .
রাগ রাগিণীর জাল বুন্তে।
গান শশানে সে কাহার সাধ্যি,
ছোঁড়াগুলাে বাজায় বাদ্যি,
বিদ্যেখানা ফাটিয়ে ফেলে
থাকে তারা তুলাে ধুনতে।
ডেকে বলে, হেঁকে বলে,
তঙ্গী ক’রে বেঁকে বলে—
“আমার কথা শােন সবাই
গান শােন আর নাই শােন।
গান যে কা’কে বলে সেইটে
বুঝিয়ে দেব, তাই শােন।”
টীকে করেন ব্যাখ্যা করেন,
জেঁকে ওঠে বক্তিমে,
কে দেখে তার হাত পা-নাড়া,
চক্ষু দুটোর রক্তিমে!
চন্দ্র সূর্য্য জ্বল্চে মিছে
আকাশ খানার চালাতে—
তিনি বলেন “আমিই আছি
জ্বাল্তে এবং জ্বালাতে।”
কুঞ্জবনের তানপুরােতে
সুর বেঁধেছে বসন্ত,
সেটা শুনে নাড়েন কর্ণ
হয়নাক তাঁর পছন্দ।
তাঁরি সুরে গাক্ না সবাই
টপ্পা খেয়াল ধুরবােদ,—
গান না যে কেউ—আসল কথা
নাইক কারো সুর বােধ!
কাগজ ওয়ালা সারি সারি
নাড়চে কাগজ হাতে নিয়ে—
বাঙ্গলা থেকে শান্তি বিদায়
তিনশো কুলাের বাতাস দিয়ে!
কাগজ দিয়ে নৌকা বানায়
বেকার যত ছেলেপিলে,—
কর্ণ ধ’রে পার করবেন
দু-এক পয়সা খেয়া দিলে।
সস্তা শুনে ছুটে আসে
যত দীর্ঘকর্ণ গুলাে—
বঙ্গদেশের চতুর্দ্দিকে
তাই উড়েছে এত ধূলাে!
ক্ষুদে ক্ষুদে “আর্য্য” গুলাে
ঘাসের মত গজিয়ে ওঠে,
ছঁচোলাে সব জিবের ডগা
কাঁঁটার মত পায়ে ফোটে।
তারা বলেন “আমিই কল্কি”
গাঁজার কল্কি হবে বুঝি!
অবতারে ভরে গেল
যত রাজ্যের গলি ঘুঁজি।
পাড়ায় এখন কত আছে
কত কব’ তার,
বঙ্গদেশে মেলাই এল
বরা’ অবতার!
দাঁতের জোরে হিন্দু শাস্ত্র
তুল্ বে তারা পাঁকের থেকে।,
দাঁত কপাটি লাগে, তাদের
দাঁত খিঁচুনীর ভঙ্গী দেখে!
আগাগোড়াই মিথ্যে কথা,
মিথ্যেবাদীর কোলাহল,
জিৰ নাচিয়ে বেড়ায় যত
জিহবা-ওয়ালা সঙের দল।
বাক্য-বন্যা ফেনিয়ে আসে
ভাসিয়ে নে যায় তােড়ে,
কোন ক্রমে রক্ষে পেলেম
মা-গঙ্গার ক্রোড়ে।
হেথায় কিবা শান্তি-ঢালা
কুলুকুলু তান।
সাগর পানে ব’হে নে যায়
গিরিরাজের গান।
ধরি ধরি বাতাসটি, দেয়
জলের গায়ে কাঁটা।
আকাশেতে আলাে আঁধার
খেলে জোয়ার ভাটা।
তীরে তীরে গাছের সারি
পল্পবেরি ঢেউ।
সারাদিন হেলে দোলে
দেখে না ত’ কেউ।
পূর্ব্বতীরে তরু শিরে
অরু হেসে চায়—
পশ্চিমেতে কুঞ্জমাঝে
সন্ধ্যা নেমে যায়।
তীরে ওঠে শঙ্খ ধ্বনি
ধীরে আসে কানে,
সন্ধ্যা তারা চেয়ে থাকে
ধরণীর পানে।
ঝাউবনের আড়ালেতে
চাঁদ ওঠে ধীরে,
ফোটে সন্ধ্যা দীপগুলি
অন্ধকার তীরে।
এই শান্তি সলিলেতে
দিয়েছিলেম ডুব,
হট্টগোেলটা ভুলেছিলেম
সুখে ছিলেম খুব!
জান ত ভাই আমি হচ্চি
জলচরের জাত।
আপন মনে সাঁৎরে বেড়াই—
ভাসি দিন রাত!
রােদ পােহাতে ডাঙ্গায় উঠি,
হাওয়াটি খাই চোখ্ বুজে।
ভয়ে ভয়ে কাছে এগােই
তেমন তেমন লােক বুঝে!
গতিক মন্দ দেখ্লে আবার
ডুবি অগাধ জলে।
এম্নি করেই দিনটা কাটাই
লুকোচুরির ছলে!
তুমি কেন ছিপ ফেলেছ
শুক্নাে ডাঙ্গায় বসে?
বুকের কাছে বিদ্ধ করে
টান মেরেচ কসে!
আমি তােমায় জলে টানি
তুমি ডাঙ্গায় টান’।
অটল হয়ে বসে আছ
হার ত নাহি মান।
আমারি নয় হার হয়েচে
তোমারি নয় জিৎ—
খাবি খাচ্চি ডাঙ্গায় পড়ে
হয়ে পড়েচি চিৎ।
আর কেন ভাই, ঘরে চল,
ছিপ গুটিয়ে নাও—
রবীন্দ্রনাথ ধরা পড়েছে
ঢাক পিটিয়ে দাও।
(নৌকা যাত্রা হইতে ফিরিয়া আসিয়া লিখিত।)
পত্র ৪
পত্র।
শ্রীমান্ দামু বসু এবং চামু বসু
* * * সম্পাদক সমীপেষু।
দামু বােস্ আর চামু বােসে
কাগজ বেনিয়েছে,
বিদ্যে খানা বড় ফেনিয়েছে।
(আমার দামু আমার চামু!)
কোথায় গেল বাবা তােমার
মা জননী কই!
সাত-রাজার-ধন মাণিক ছেলের
মুখে ফুটচে খই।
(আমার দামু আমার চামু!)
দামু ছিল এক-রত্তি
চামু তথৈবচ,
কোথা থেকে এল শিখে
এতই খচমচ।
(আমার দামু আমার চামু।)
সামু বলেন “দাদা আমার”
চামু বলেন “ভাই,”
আমাদের দোঁহাকার মত
ত্রিভুবনে নাই!
(আমার দামু আমার চামু!)
গায়ে পড়ে গাল পাড়চে
বাজার সর্গরম,
মেছুনি-সংহিতায় ব্যাখ্যা
হিঁদুর ধরম!
(দামু আমার চামু!)
দামুচন্দ্র অতি হিঁদু
আরাে হিঁদু চামু
সঙ্গে সঙ্গে গজায় হিঁদু
রামু বামু শামু—
(দামু আমার চামু!)
রব উঠেছে ভারত ভূমে
হিঁদু মেলা ভার,
দামু চামু দেখা দিয়েছেন
ভয় নেইক আর।
(ওরে দামু, ওরে চামু!)
নাই বটে গােতম অত্রি
যে যার গেছে স’রে,
হিঁদু দামু চামু এলেন
কাগজ হাতে করে!
(আহা দামু আহা চামু!)
লিখ্চে দোঁহে হিন্দুশাস্ত্র
এডিটোরিয়াল,
দামু বল্চে মিথ্যে কথা
চামু দিচ্চে গাল।
(হায় দামু হায় চামু!)
এমন হিঁদু মিল্বে নারে
সকল হিঁদুর সেরা,
বােস্ বংশ আর্য্যবংশ
সেই বংশের এঁরা।
(বােস্ দামু বােস্ চামু!)
কলির শেষে প্রজাপতি
তুলেছিলেন হাই,
সুড়্সুড়িয়ে বেরিয়ে এলেন
আর্য্য দুটি ভাই;
(আর্য্য দামু চাম!)
দন্ত দিয়ে খুঁড়ে তুল্চে
হিঁদু শাস্ত্রের মুল,
মেলাই কচুর আমদানিতে
বাজার হুলুস্থুল।
(দামু চামু অবতার!)
মনু বলেন “মনু আমি”
বেদের হল ভেদ,
দামু চামু শাস্ত্র ছাড়ে,
রৈল মনে খেদ!
(ওরে দাম ওরে চামু!)
মেড়ার মত লড়াই করে
লেজের দিক্টা মােটা,
দাপে কাঁপে থরথর
হিঁদুয়ানির খোঁটা!
(আমার হিঁদু দামু চামু!)
দামু চামু কেঁদে আকুল
কোথায় হিঁদুয়ানি!
ট্যাকে আছে, গোঁজ’ যেথায়
শিকি দুয়ানি।
(থােলের মধ্যে হিন্দুয়ানি!)
দামু চামু ফুলে উঠ্ল
হিঁদুয়ানি বেচে,
হামাগুড়ি ছেড়ে এখন
বেড়ায় নেচে নেচে!
(বেটের বাছা দামু চামু!)
আদর পেয়ে নাদুস্ নুদুস্
আহার করচে ক’সে,
তরিবৎটা শিখ্লেনাক
বাপের শিক্ষা দেবে।!
(ওরে দামু চামু!)
এস বাপু, কানটি নিয়ে,
শিখ্রে সদাচার,
কানের যদি অভাব থাকে
তবেই নাচার!
(হায় দামু হায় চামু!)
পড়াশুনাে কর, ছাড়’
শাস্ত্র আষাঢ়ে,
মেজে ঘােষে তােল্রে বাপু
স্বভাব চাষাড়ে।
(ও দামু ও চামু।)
ভদ্রলােকের মান রেখে চল্
ভদ্র বলবে তােকে,
মুখ ছুটোলে কুলশীলটা
জেনে ফেল্বে লােকে!
(হায় দামু হায় চামু!)
পয়সা চাও ত পয়সা দেব
থাক সাধু পথে,
তাবচ্চ শােভতে কেউ কেউ
যাবৎ ন’ভাষতে!
(হে দামু হে চামু!)
পত্র ৫
পত্র।
শ্রীমতী ইন্দিরা। প্রাণাধিকাসু।
নাসিক।
এত বড় এ ধরণী মহাসিন্ধু-ঘেরা,
দুলিতেছে আকাশ সাগরে,—
দিন-দুই হেথা রহি মােরা মানবেরা
শুধু কি মা যাব খেলা করে!
তাই কি ধাইছে গঙ্গা ছাড়ি হিমগিরি,
অরণ্য বহিছে ফুল ফল,—
শত কোটি রবি তারা আমাদের ঘিরি
গণিতেছে প্রতি দণ্ড পল!
শুধু কি মা হাসি খেলা প্রতি দিন রাত,
দিবসের প্রত্যেক প্রহর!
প্রভাতের পরে আসি নূতন প্রভাত
লিখিছে কি, একই অক্ষর!
কানাকানি হাসাহাসি কোণেতে গুটায়ে,
অলস নয়ন নির্মীলন,
দণ্ড-দুই ধরণীর ধূলিতে লুটায়ে
ধুলি হয়ে ধূলিতে শয়ন!
নাই কি, মা, মানবের গভীর ভাবনা,
হৃদয়ের সীমাহীন আশা!
জেগে নাই অন্তরেতে অনন্ত চেতনা,
জীবনের অনন্ত পিপাসা!
হৃদয়েতে শুষ্ক কি, মা, উৎস করুণার,
শুনি না কি দুখীর ক্রন্দন!
জগৎ শুধু কি মা গো তোমার আমার
ঘুমাবার কুসুম-আসন!
শুনো না কাহারা ওই করে কানাকানি
অতি তুচ্ছ ছোট ছোট কথা!
পরের হৃদয় লয়ে করে টানাটানি
শকুনির মত নির্ম্মমতা!
শুনো না করিছে কারা কথা-কাটাকাটি
মাতিয়া জ্ঞানের অভিমানে,
রসনায় রসনায় ঘোর লাঠালাঠি,
আপনার বুদ্ধিরে বাখানে!
তুমি এস দুরে এস, পবিত্র নিভৃতে,
ক্ষুদ্র অভিমান যাও ভূলি।
সযতনে ঝেড়ে ফেল বসন হইতে
প্রতি নিমেষের যত ধূলি!
নিমেষের ক্ষুদ্র কথা, ক্ষুদ্র রেণু জাল
আচ্ছন্ন করিছে মানবেরে,
উদার অনন্ত তাই হতেছে আড়াল
তিল তিল ক্ষুদ্রতার ঘেরে!
আছে, মা, তোমার মুখে স্বর্গের কিরণ,
হৃদয়েতে উষার আভাস,
খুঁজিছে সরল পথ ব্যাকুল নয়ন,
চারিদিকে মর্ত্ত্যের-প্রবাস।
আপনার ছায়া ফেলি আমরা সকলে
পথ তোর অন্ধকারে ঢাকি,
ক্ষুদ্র কথা, ক্ষুদ্র কাজে, ক্ষুদ্র শত ছলে,
কেন তোরে ভুলাইয়া রাখি!
কেন, মা, তোমারে কেহ চাহে না জানাতে
মানবের উচ্চ কুলশীল,
অনন্ত জগত ব্যাপী ঈশ্বরের সাথে
তোমার যে সুগভীর মিল!
কেন কেহ দেখায় না, চারিদিকে তব
ঈশ্বরের বাহুর বিস্তার!
ঘেরি তোরে, ভোগ-সুখ ঢালি নব নব
গৃহ বলি রচে কারাগার।
অনন্তের মাঝখানে দাঁড়াও মা আসি,
চেয়ে দেখ আকাশের পানে,
পড়ুক বিমল-বিভা, পূর্ণ রূপরাশি
স্বর্গমুখী কমল-নয়ানে!
আনন্দে ফুটিয়া ওঠ শুভ্র সূর্য্যোদয়ে
প্রভাতের কুসুমের মত,
দাঁড়াও সায়াহ্ণ মাঝে পবিত্র হৃদয়ে
মাথাখানি করিয়া আনত!
শোন শোন উঠিতেছে সুগম্ভীর বাণী
ধ্বনিতেছে আকাশ পাতাল।
বিশ্ব চরাচর গাহে কাহারে বাখানি
আদিহীন অন্তহীন কাল!
যাত্রী সবে ছুটিয়াছে শূন্যপথ দিয়া,
উঠেছে সঙ্গীত কোলাহল,
ওই নিখিলের সাথে কণ্ঠ মিলাইয়া
মা আমরা যাত্রা করি চল্!
যাত্রা করি বৃথা যত অহঙ্কার হতে,
যাত্রা করি ছাড়ি হিংসা দ্বেষ,
যাত্রা করি স্বর্ণময়ী করুণার পথে,
শিরে ধরি সত্যের আদেশ!
যাত্রা করি মানবের হৃদয়ের মাঝে
প্রাণে লয়ে প্রেমের আলোক,
আয় মাগো যাত্রা করি জগতের কাজে
তুচ্ছ করি নিজ দুঃখ শোক!
জেনো মা ও সুখে-দুঃখে-আকুল সংসারে
মেটে না সকল তুচ্ছ আশ,
তা বলিয়া অভিমানে অনন্ত তাঁহারে
কোরোনা কোরোনা অবিশ্বাস!
সুখ বলে যাহা চাই সুখ তাহা নয়,
কি যে চাই জানি না আপনি,
আঁধারে জ্বলিছে ওই, ওরে কোনো ভয়,
ভুজঙ্গের মাথার ও মণি!
ক্ষুদ্র সুখ ভেঙ্গে যায় না সহে নিঃশ্বাস,
ভাঙ্গে বালুকায় খেলাঘর,
ভেঙ্গে গিয়ে বলে দেয়, এ নহে আবাস,
জীবনের এ নহে নির্ভর!
সকলে শিশুর মত কত আবদার
আনিছে তাঁহার সন্নিধান,
পূর্ণ যদি নাহি হল, অমনি তাহার
ঈশ্বরে করি্ছে অপমান!
কিছুই চাবনা মাগো আপনার তরে,
পেয়েছি যা’ শুধিব সে ঋণ,
পেয়েছি যে প্রেমসুধা হৃদয় ভিতরে,
ঢালিয়া তা’ দিব নিশিদিন!
সুখ শুধু পাওয়া যায় সুখ না চাহিলে,
প্রেম দিলে প্রেমে পূরে প্রাণ,
নিশিদিসি আপনার ক্রন্দন গাহিলে
ক্রন্দনের নাহি অবসান।
মধুপাত্রে হতপ্রাণ পিপীলির মত
ভোগ সুখে জীর্ণ হয়ে থাকা,
ঝুলে থাকা বাদুড়ের মত শির নত
আঁকড়িয়া সংসারের শাখা,
জগতের হিসাবেতে শূন্য হয়ে হায়
আপনারে আপনি ভক্ষণ,
ফুলে উঠে ফেটে যাওয়া জলবিম্ব প্রায়
এই কিরে সুখের লক্ষণ!
এই অহিফেন-সুখ কে চায় ইহাকে
মানবত্ব এ নয় এ নয়।
রাহুর মতন সুখ গ্রাস করে রাখে
মানবের মানব-হৃদয়!
মানবেরে বল দেয় সহস্র বিপদ,
প্রাণ দেয় সহস্র ভাবনা,
দারিদ্র্যে খুঁজিয়া পাই মনের সম্পদ,
শোকে পাই অনন্ত সান্তনা!
চির দিবসের সুখ রয়েছে গোপন
আপনার আত্মার মাঝার।
চারি দিকে সুখ খুঁজে শ্রান্ত প্রাণ মন,
হেথা আছে, কোথা নেই আর!
বাহিরের সুখ সে, সুখের মরীচিকা,
বাহিরেতে নিয়ে যায় ছোলে,
যখন মিলায়ে যায় মায়া কুহেলিকা,
কেন কাঁদি সুখ নেই বলে!
দাঁড়াও সে অন্তরের শান্তি-নিকেতনে
চিরজ্যোতি চির ছায়াময়!
ঝড়হীন রৌদ্রহীন নিভৃত নিলয়ে
জীবনের অনন্ত আলয়।
পুণ্য-জ্যোতি মুখে লয়ে পুণ্য হাসি খানি,
অন্নপূর্ণা জননী সমান,
মহা সুখে সুখ দুঃখ কিছু নাহি মানি
কর সবে সুখ শান্তিদান।
মা, আমার এই জেনো হৃদয়ের সাধ
তুমি হও লক্ষ্মীর প্রতিমা;
মানবেরে জ্যোতি দাও, কর’ আশীর্ব্বাদ
অকলঙ্ক মুর্ত্তি মধুরিমা!
কাছে থেকে এত কথা বলা নাহি হয়,
হেসে খেলে দিন যায় কেটে,
দূরে ভয় হয় পাছে না পাই সময়,
বলিবার সাধ নাহি মেটে।
কত কথা বলিবারে চাহি প্রাণপণে
কিছুতে মা বলিতে না পারি,
স্নেহ মুখখানি তোর পড়ে মোর মনে,
নয়নে উথলে অশ্রুবারি।
সুন্দর মুখেতে তোর মগ্ন আছে ঘুমে
একখানি পবিত্র জীবন।
ফলুক সুন্দর ফল সুন্দর কুসুমে
আশীর্ব্বাদ কর মা গ্রহণ।
বান্দোরা।
পত্র ৬
পত্র।
শ্রীমতী ইন্দিরা। প্রাণাধিকাসু।
নাসিক।
চারিদিকে তর্ক উঠে সাঙ্গ নাহি হয়,
কথায় কথায় বাড়ে কথা!
সংশয়ের উপরেতে চাপিছে সংশয়
কেবলি বাড়িছে ব্যাকুলতা!
ফেনার উপরে ফেনা, ঢেউ পরে ঢেউ,
গরজনে বধির শ্রবণ,
তীর কোন্ দিকে আছে নাহি জানে কেউ
হা হা করে আকুল পবন।
এই কল্লোলের মাঝে নিয়ে এস কে
পরিপূর্ণ একটি জীবন,
নীরবে মিটিয়া যাবে সকল সন্দেহ,
থেমে যাবে সহস্র বচন।
তোমার চরণে আসি মাগিবে মরণ
লক্ষ্যহারা শত শত মত,
যে দিকে ফিরাবে তুমি দুখানি নয়ন
সে দিকে হেরিবে সবে পথ!
অন্ধকার নাহি যায় বিবাদ করিলে,
মানে না বাহুর আক্রমণ!
একটি আলোক শিখা সমুখে ধরিলে
নীরবে করে সে পলায়ন।
এস মা উষার আলো, অকলঙ্ক প্রাণ,
দাঁড়াও এ সংসার আঁধারে।
জাগাও জাগ্রত-হৃদে আনন্দের গান,
কূল দাও নিদ্রার পাথারে!
চারিদিকে নৃশংসতা করে হানাহানি,
মানবের পাষাণ পরাণ!
শানিত ছুরীর মত বিঁধাইয়া বাণী,
হৃদয়ের রক্ত করে পান।
তৃষিত কাতর প্রাণী মাগিতেছে জল
উল্কাধারা করিছে বর্ষণ,
শ্যামল আশার ক্ষেত্র করিয়া বিফল
স্বার্থ দিয়ে করিছে কর্ষণ।
শুধু এসে একবার দাঁড়াও কাতরে
মেলি দুটি সকরুণ চোক,
পড়ুক দু ফোঁটা অশ্রু জগতের পরে
যেন দুটি বাল্মীকির শ্লোক!
ব্যথিত, করুক্ স্নান তোমার নয়নে,
করুণার অমৃত নির্ঝরে,
তোমারে কাতর হেরি, মানবের মনে
দয়া হবে মানবের পরে!
সমুদয় মানবের সৌন্দর্য্যে ডুবিয়া
হও তুমি অক্ষয় সুন্দর।
ক্ষুদ্র রূপ কোথা যায় বাতাসে উবিয়া
দুই চারি পলকের পর!
তোমার সৌন্দর্য্যে হোক্ মানব সুন্দর,
প্রেমে তব বিশ্ব হোক আলো।
তোমারে হেরিয়া যেন মুগুধ অন্তর
মানুষে মানুষ বাসে ভাল!
বান্দোর।
পত্র ৭
পত্র।
শ্রীমতী ইন্দিরা। প্রাণাধিকাসু।
নাসিক।
আমার এ গান, মাগাে, শুধু কি, নিমেষে
মিলাইবে হৃদয়ের কাছাকাছি এসে?
আমার প্রাণের কথা
নিদ্রাহীন আকুলতা
শুধু নিশ্বাসের মত যাবে কি মা ভেসে!
এ গান তােমারে সদা ঘিরে যেন রাখে,
সত্যের পথের পরে নাম ধ’রে ডাকে।
সংসারের সুখে দুখে
চেয়ে থাকে তাের মুখে,
চির আশীর্ব্বাদ সম কাছে কাছে থাকে।
বিজনে সঙ্গীর মত করে যেন বাস!
অনুক্ষণ শোনে তাের হৃদয়ের আশ।
পড়িয়া সংসার ঘোরে
কাঁদিতে হেরিলে তােরে
ভাগ করে নেয় যেন দুখের নিশ্বাস!
সংসারের প্রলােভন যবে আসি হানে
মধুমাখা বিষবাণী দুর্ব্বল পরাণে,
এ গান আপন সুরে
মন তাের রাখে পূরে,
ইষ্টমন্ত্র সম সদা বাজে তাের কানে!
আমার এ গান যদি সুদীর্ঘ জীবন
তােমার বসন হয় তােমার ভূষণ!
পৃথিবীর ধূলিজাল
করে দেয় অন্তরাল,
তােমারে করিয়া রাখে সুন্দর শােভন!
আমার এ গান যদি নাহি মানে মানা
উদার বাতাস হ’য়ে এলাইয়া ডানা
সৌরভের মত তােরে
নিয়ে যায় চুরি কোরে,
খুঁজিয়া দেখাতে যায় স্বর্গের সীমানা!
এ গান যদিরে হয় তাের ধ্রুব তারা,
অন্ধকারে অনিমেষে নিশি করে সারা!
তােমার মুখের পরে
জেগে থাকে স্নেহভরে
অকূলে নয়ন মেলি দেখায় কিনারা!
আমার এ গান যদি পশি তাের কানে
মিলায়ে মিশায়ে যায় সমস্ত পরাণে।
তপ্ত শােণিতের মত
বহে শিরে অবিরত,
অনন্দে নাচিয়া উঠে মহত্বে গানে!
এ গান বাঁচিয়া থাকে যদি তাের মাঝে!
আঁখিতারা হয়ে তাের আঁখিতে বিরাজে!
এ যেনরে করে দান
সতত নূতন প্রাণ,
এ যেন জীবন পায় জীবনের কাজে!
যদি যাই, মৃত্যু যদি নিয়ে যায় ডাকি,
এই গানে রেখে যাব মোর স্নেহ আঁখি।
যবে হায় সব গান
হয়ে যাবে অবসান,
এ গানের মাঝে আমি যদি বেঁচে থাকি!
পবিত্র জীবন
পবিত্র জীবন।
মিছে হাসি, মিছে বাঁশি, মিছে এ যৌবন,
মিছে এই দরশের পরশের খেলা!
চেয়ে দেখ, পবিত্র এ মানব জীবন,
কে ইহারে অকাতরে করে অবহেলা!
ভেসে ভেসে এই মহা চরাচর স্রোতে
কে জানে গো আসিয়াছে কোন্খান হতে,
কোথা হতে নিয়ে এল প্রেমের আভাস,
কোন্ অন্ধকার ভেদি উঠিল আলোতে!
এ নহে খেলার ধন, যৌবনের আশ,
বোলো না ইহার কানে আবেশের বাণী,
নহে নহে এ তোমার বাসনার দাস,
তোমার ক্ষুধার মাঝে আনিও না টানি!
এ তোমার ঈশ্বরের মঙ্গল আশ্বাস,
স্বর্গের আলোক তব এই মুখখানি!
পবিত্র প্রেম
পবিত্র প্রেম।
ছুঁয়োনো, ছুঁয়োনো ও’রে, দাঁড়াও সরিয়া।
ম্লান করিয়ো না আর মলিন পরশে!
ওই দেখ তিলে তিলে যেতেছে মরিয়া,
বাসনা-নিশ্বাস তব গরল বরষে!
জান না কি হৃদিমাঝে ফুটেছে যে ফুল,
ধুলায় ফেলিলে তারে ফুটিবে না আর!
জান না কি সংসারের পাথার অকূল,
জান না কি জীবনের পথ অন্ধকার!
আপনি উঠেছে ওই তব ধ্রুব তারা,
আপনি ফুটেছে ফুল বিধির কৃপায়;
সাধ করে কে আজিরে হবে পথহারা!
সাধ করে এ কুসুম কে দলিবে পায়!
যে প্রদীপ আলো দেবে তাহে ফেল শ্বাস,
যারে ভালবাস’ তারে করিছ বিনাশ!
পাখীর পালক
পাখীর পালক।
খেলাধুলো সব রহিল পড়িয়া
ছুটে চলে আসে মেয়ে—
বলে তাড়াতাড়ি—“ওমা দেখ্ দেখ্,
কি এনেছি দেখ্ চেয়ে!”
আঁখির পাতায় হাসি চমকায়,
ঠোঁটে নেচে ওঠে হাসি,
হয়ে যায় ভুল বাঁধেনাকো চুল,
খুলে পড়ে কেশ রাশি!
দুটি হাত তার ঘিরিয়া ঘিরিয়া
রাঙা চুড়ি কয়-গাছি,
করতালি পেয়ে বেজে ওঠে তারা
কেঁপে ওঠে তারা নাচি।
মায়ের গলায় বাহু দুটি বেঁধে
কোলে এসে বসে মেয়ে।
বলে তাড়াতাড়ি-“ওমা দেখ্ দেখ্
কি এনেছি দেখ্ চেয়ে!
সোনালি রঙের পাখীর পালক
ধোয়া সে সোনার স্রোতে,
খসে এল যেন তরুণ আলোক
অরুণের পাখা হতে;
নয়ন-ঢুলানো কোমল পরশ
ঘুমের পরশ যথা,
মাখা যেন তায় মেঘের কাহিনী
নীল আকাশের কথা!
ছোট খাট নীড়, শাবকের ভীড়
কতমত কলরব,
প্রভাতের সুখ, উড়িবার আশা
মনে পড়ে যেন সব।
লয়ে সে পালক কপোল বুলায়,
আঁখিতে বুলায় মেয়ে,
বলে হেসে হেসে “ওমা দেখ্ দেখ্
কি এনেছি দেখ্ চেয়ে।”
মা দেখিল চেয়ে, কহিল হাসিয়ে
“কিবা জিনিষের ছিরি?”
ভূমিতে ফেলিয়া যাইল চলিয়া
আর না চাহিল ফিরি?
মেয়েটির মুখে কথা না ফুটিল
মাটিতে রহিল বসি।
শূন্য হতে যেন পাখীর পালক
ভূতলে পড়িল খসি!
খেলাধূলো তার হলো নাকো আর,
হাসি মিলাইল মুখে,
ধীরে ধীরে শেষে দুটি ফোঁটা জল
দেখা দিল দুটি চোখে।
পালকটি লয়ে রাখিল লুকায়ে
গোপনের ধন তার,
আপনি খেলিত আপনি তুলিত
দেখাত না ক’রে আর!
পাষাণী মা
পাষাণী মা।
হে ধরণী, জীবের জননী,
শুনেছি যে মা তোমায় বলে,
তবে কেন তোর কোলে সবে
কেঁদে আসে কেঁদে যায় চোলে!
তবে কেন তোর কোলে এসে
সন্তানের মেটে না পিপাসা!
কেন চায়—কেন কাঁদে সবে,
কেন কেঁদে পায় না ভালবাসা!
কেন হেথা পাষাণ পরাণ,
কেন সবে নীরস নিষ্ঠুর!
কেঁদে কেঁদে দুয়ারে যে আসে
কেন তারে করে দেয় দূর!
কাঁদিয়া যে ফিরে চলে যায়,
তার তরে কাঁদিস্নে কেহ!
এই কি, মা, জননীর প্রাণ,
এই কি, মা, জননীর স্নেহ!
পুরাতন
পুরাতন।
হেথা হতে যাও, পুরাতন!
হেথায় নূতন খেলা আরম্ভ হয়েছে
আবার বাজিছে বাঁশি,
আবার উঠেছে হাসি,
বসন্তের বাতাস বয়েছে।
সুনীল আকাশ পরে
শুভ্র মেঘ থরে থরে
শ্রান্ত যেন রবির আলোকে—
পাখীরা ঝাড়িছে পাখা,
কাঁপিছে তরুর শাখা,
খেলাইছে বালিকা বালকে।
সমুখের সরোবরে
আলো ঝিকিমিকি করে—
ছায়া কাঁপিতেছে থরথর,—
জলের পানেতে চেয়ে
ঘাটে বসে আছে মেয়ে—
শুনিছে পাতার মরমর!
কি জামি কত কি আশে
চলিয়াছে চারি পাশে
কত লোক কত সুখে দুখে!
সবাই ত ভুলে আছে—
কেহ হাসে কেহ নাচে,
—তুমি কেন দাঁড়াও সমুখে!
বাতাস যেতেছে বহি
তুমি কেন রহি রহি
তারি মাঝে ফেল দীর্ঘশ্বাস।
সুদূরে বাজিছে বাঁশি,
তুমি কেন ঢাল’ আসি
তারি মাঝে বিলাপ উচ্ছ্বাস।
উঠেছে প্রভাত রবি,
আঁকিছে সোনার ছবি,
তুমি কেন ফেল তাহে ছায়া!
বারেক যে চলে যায়,
তারেত কেহ না চায়,
তবু তার কেন এত মায়া!
তবু কেন সন্ধ্যাকালে
জলদের অন্তরালে
লুকায়ে, ধরার পানে চায়—
নিশীথের অন্ধকারে
পুরাণো ঘরের দ্বারে
কেন এসে পুন ফিরে যায়!
কি দেখিতে আসিয়াছ!
যাহা কিছু ফেলে গেছ
কে তাদের করিবে যতন!
স্মরণের চিহ্ন যত
ছিল পড়ে দিন-কত
ঝ’রে-পড়া পাতার মতন!
আজি বসন্তের বায়
একেকটি করে হায়
উড়ায়ে ফেলিছে প্রতি দিন;
ধূলিতে মাটিতে রহি
হাসির কিরণে দহি
ক্ষণে ক্ষণে হতেছে মলিন।
ঢাক তবে ঢাক মুখ
নিয়ে যাও সুখ দুখ
চেয়ো না চেয়ো না ফিরে ফিরে।
হেথায় আলয় নাহি;
অনন্তের পানে চাহি
আঁধারে মিলাও ধীরে ধীরে!
পুরোনো বট
পুরোনো বট।
লুটিয়ে পড়ে জটিল জটা,
ঘন পাতার গহন ঘটা,
হেথা হোথায় রবির ছটা,
পুকুর ধারে বট।
দশ দিকেতে ছড়িয়ে শাখা,
কঠিন বাহু আঁকাবাঁকা,
স্তব্ধ যেন আছ আঁকা,
শিরে আকাশ পট।
নেবে নেবে গেছে জলে
শিকড় গুলো দলে দলে,
সাপের মত রসাতলে,
আলয় খুঁজে মরে।
শতেক শাখা বাহু তুলি,
বায়ুর সাথে কোলাকুলি,
আনন্দেতে দোলাদুলি,
গভীর প্রেমভরে।
ঝড়ের তালে নড়ে মাথা,
কাঁপে লক্ষকোটি পাতা,
আপনমনে গাও গাথা
দুলাও মহাকায়া।
তড়িৎ পাশে উঠে হেসে,
ঝড়ের মেঘ ঝটিৎ এসে
দাঁড়িয়ে থাকে এলো কেশে,
তলে গভীর ছায়া।
ঝটিকা আসে তোমার কোলে,
তোমার বাহু পরে দোলে,
গান গাহে সে উতরোলে,
ঘুমোলে তবে থামে।
পাতার ফাঁকে তারা ফুটে,
পাতার কোলে বাতাস লুটে,
ডাইনে তব প্রভাত উঠে,
সন্ধ্যা টুটে বামে।
নিশি-দিসি দাঁড়িয়ে আছ
মাথায় লয়ে জট,
ছােট ছেলেটি মনে কি পড়ে
ওগাে প্রাচীন বট?
কতই শাখী তােমার সাথে
বসে যে চলে গেছে,
ছােট ছেলেরে তাদেরি মত
ভুলে কি যেতে আছে?
তােমার মাঝে হৃদয় তারি
বেঁধে ছিল যে নীড়।
তামার) ভালেপালায় সাধগুলি তার
কত করেছে ভিড়।
মনে কি নেই সারাটা দিন
বসিয়ে বাতায়নে,
তােমার পানে মইত চেয়ে
অবক দুনয়নে?
তােমার তলে মধুর ছায়া
তােমার তলে ছুটি,
তােমার তলে নাচ্ত বসে
শালিখ পাখি দুটি।
ভাঙ্গা ঘাটে নাইত কারা
তুল্ত কারা জল,
পুকুরেতে ছায়া তােমার
কত টলমল।
জলের উপর রোদ প’ড়েছে
সােণামাখা মায়া,
ভেসে বেড়ায় দুটি হাঁস
দুটি হাঁসের ছায়া।
ছােট ছেলে রইত চেয়ে
বাসনা অগাধ,
মনের মধ্যে খেলাত তার
কত খেলার সাধ।
(যদি) বাযুর মত খেল্তে পেত
তােমার চারি ভিতে,
(যদি) ছায়ার মত শুতে পেত
তােমার ছায়াটিতে,
যদি) পাখীর মত উড়ে যেত
উড়ে আস্ত ফিরে,
যদি) হাঁসের মত ভেসে যেত
তােমার তীরে তীরে।
নাইচে যারা তাদের মত
নাইতে যেত যদি,
জল আন্তে যেত পথে
কোথায় গঙ্গা নদী!
খেল্ত যেসব ছেলেগুলি
ডাক্ত যদি তারে।
তাদের সাথে খেল্ত সুখে
তাদের ঘরে দ্বারে।
মনে হ’ত তােমার ছায়ে
কতই কিযে আছে,
কাদের যেন ঘুম পাড়াতে
ঘুঘু ডাক্ত গাছে।
মনে হ’ত তােমার মায়ে
কাদের যেন ঘর।
আমি যদি তাদের হতেম!
কেন হলেম পর?
(তারা) ছায়ার মত ছায়ায় থাকে
পাতার ঝর ঝরে,
গুন্গুনিয়ে সবাই মিলে
কতই যে গান করে!
দূরে বাজে মূলতান
পড়ে আসে বেলা,
(তারা) ঘাসে বসে দেখে জলে
আলাে ছায়ার খেলা।
সন্ধে হলে চুল বাঁধে
তাদের মেয়েগুলি,
ছেলেরা সব দোলায় বসে
খেলায় দুলি দুলি।
গহিন খাতে দখিন বাতে,
নিঝুম চারি ভিত,
চাঁদের আলোের শুভ্রতনু—
ঝিমি ঝিমি গীত!
ওখানেতে পাঠশালা নেই,
পণ্ডিত মশাই,
বেত হাতে নাইক বসে
মাধব গোঁসাই।
সারাটা দিন ছুটি কেবল,
সারাটা দিন খেলা,
পুকুর ধারে আঁধার-করা
বট গাছের তলা।
আজকে কেন নাইক তারা?
আছে আর সকলে,
তারা তাদের বাসা ভেঙ্গে
কোথায় গেছে চলে!
ছায়ার মধ্যে মায়া ছিল
ভেঙ্গে দিল কে?
ছায়া কেবল রৈল পড়ে,
কোথায় গেল সে?
ডালে বসে পাখীরা আজ
প্রাণেতে ডাকে?
রবির আলাে কাদের খোঁজে
পাতার ফাঁকে ফাঁকে?
গল্প কত ছিল যেন
তােমার খােপে ধাপে,
পাখীর সঙ্গে মিলে মিশে
ছিল চুপেচাপে,—
দুপুর বেলা নূপুর তাদের
বাজ্ত অনুক্ষণ,
(শুনে) ছােট দুটি ভাই ভগিনীর
আকুল হ’ত মন।
(আহা) ছেলেবেলায় ছিল তারা,
কোথায় গেল শেষে!
(তারা) গেছে বুঝি ঘুমপাড়ানি
মাসি পিসির দেশে!
পূর্ণ মিলন
পূর্ণ মিলন।
নিশিদিন কাঁদি সখি মিলনের তরে,
যে মিলন ক্ষুধাতুর মৃত্যুর মতন!
লও লও বেঁধে লও কেড়ে লও মোরে,
লও লজ্জা লও বস্ত্র লও আবরণ।
এ তরুণ তনুখানি লহ চুরি করে,
আঁখি হতে লও ঘুম, ঘুমের স্বপন।
জাগ্রত বিপুল বিশ্ব লও তুমি হরে
অনন্তকালের মোর জীবন মরণ!
বিজন বিশ্বের মাঝে, মিলন শ্মশানে,
নির্ব্বাপিত সূর্য্যালোক লুপ্ত চরাচর,
লাজমুক্ত বাসমুক্ত দুটি নগ্ন প্রাণে,
তোমাতে আমাতে হই অসীম সুন্দর!
এ কি দুরাশার স্বপ্ন হায় গো ঈশ্বর,
তোমা ছাড়া এ মিলন আছে কোন্খানে!
প্রত্যাশা
প্রত্যাশা।
সকলে আমার কাছে যত কিছু চায়
সকলেরে আমি তাহা পেরেছি কি দিতে!
আমি কি দিইনি ফাঁকি কত জনে হায়,
রেখেছি কত না ঋণ এই পৃথিবীতে!
আমি তবে কেন বকি সহস্র প্রলাপ,
সকলের কাছে চাই ভিক্ষা কুড়াইতে!
এক তিল না পাইলে দিই অভিশাপ
অমনি কেনরে বসি কাতরে কাঁদিতে!
হা ঈশ্বর, আমি কিছু চাহিনাক আর,
ঘুচাও আমার এই ভিক্ষার বাসনা!
মাথায় বহিয়া লয়ে চির ঋণভার
“পাইনি” “পাইনি” বলে আর কাঁদিব না!
তোমারেও মাগিব না, অলস কাঁদনি!
আপনারে দিলে তুমি আসিবে আপনি!
প্রাণ
প্রাণ।
মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
এই সূর্য্য করে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয় মাঝে যদি স্থান পাই!
ধরায় প্রাণের খেলা চির তরঙ্গিত,
বিরহ মিলন কত হাসি অশ্রুময়,—
মানবের সুখে দুঃখে গাঁথিয়া সঙ্গীত
যদি গো রচিতে পারি অমর আলয়!
তা যদি না পারি তবে বাঁচি যত কাল
তোমাদেরি মাঝখানে লভি যেন ঠাঁই,
তোমরা তুলিবে বলে সকাল বিকাল
নব নব সঙ্গীতের কুসুম ফুটাই!
হাসি মুখে নিও ফুল, তার পরে হায়
ফেলে দিও ফুল, যদি সে ফুল শুকায়!
প্রার্থনা
প্রার্থনা।
তুমি কাছে নাই ব’লে হের সখা তাই
“আমি বড়” “আমি বড়” করিছে সবাই!
সকলেই উচুঁ হয়ে দাঁড়ায়ে সমুখে
বলিতেছে “এ জগতে আর কিছু নাই!”
নাথ তুমি একবার এস হাসি মুখে
এরা সবে ম্লান হয়ে লুকাক্ লজ্জায়—
সুখ দুঃখ টুটে যাক্ তব মহা সুখে,
যাক্ আলো অন্ধকার তোমার প্রভায়!
নহিলে ডুবেছি আমি, মরেছি হেথায়,
নহিলে ঘুচেনা আর মর্ম্মের ক্রন্দন,
শুষ্ক ধুলি তুলি শুধু সুধা-পিপাসার
প্রেম ব’লে পরিয়াছি মরণ বন্ধন!
কভু পড়ি কভু উঠি, হাসি আর কাঁদি—
খেলা ঘর ভেঙ্গে পড়ে রচিবে সমাধি।
বঙ্গবাসীর প্রতি
বঙ্গবাসীর প্রতি।
মিশ্র সিন্ধু। কাওয়ালি।
আমায় বোলো না গাহিতে বােলাে না!
এ কি শুধু হাসি খেলা প্রমােদের মেলা,
শুধু মিছে কথা ছলনা!
আমায় বােলাে না গাহিতে বােলাে না!
এ যে নয়নের জল, হতাশের শ্বাস,
কলঙ্কের কথা, দরিদ্রের আশ,
এ যে বুকফাটা দুখে গুমরিছে বুকে
গভীর মরম বেদনা!
এ কি শুধু হাসি খেলা, প্রমােদের মেলা,
শুধু মিছে কথা ছলনা!
আমায় বােলাে না গাহিতে বােলা না।
এসেছি কি হেথা যশের কাঙালি,
কথা গেঁথে গেঁথে নিতে করতালি,
মিছে কথা কয়ে মিছে যশ লয়ে
মিছে কাযে নিশি যাপনা!
কে জাগিবে আজ, কে করিবে কাজ,
কে ঘুচাতে চাহে জননীর লাজ,
কাতরে কাঁদিবে, মায়ের পায়ে দিবে
সকল প্রাণের কামনা।
এ কি শুধু হাসি খেলা, প্রমােদের মেলা,
শুধু মিছে কথা, ছলনা!
আমায় বােলাে না গাহিতে বােলাে না!
বঙ্গভূমির প্রতি
বঙ্গভূমির প্রতি।
কাফি। কাওয়ালি।
কেন চেয়ে আছ গাে মা মুখপানে!
এরা চাহে না তােমারে চাহে না যে,
আপন মায়েরে নাহি জানে!
এরা তােমায় কিছু দেবে না দেবে না
মিথ্যা কহে শুধু কত কি ভানে!
তুমিত দিতেছ মা যা আছে তােমারি
স্বর্ণ শস্য তব, জাহ্নবীবারি,
জ্ঞান ধর্ম্ম কত পুণ্য কাহিনী,
এরা কি দেবে তােরে, কিছু না কিছু না
মিথ্যা কবে শুধু হীন পরাণে!
মনের বেদনা রাখ মা মনে,
নয়ন বারি নিবার’ নয়নে,
মুখ লুকাও মা ধুলি শয়নে,
ভুলে থাক যত হীন সন্তানে।
শূন্যপানে চেয়ে প্রহর গণি গণি
দেখ কাটে কি না দীর্ঘ রজনী,
দুঃখ জানায়ে কি হবে জননী,
নির্ম্মম চেতনহীন পাষাণে!
বনের ছায়া
বনের ছায়া।
কোথারে তরুর ছায়া,
বনের শ্যামল স্নেহ!
তট-তরু কোলে কোলে
সারাদিন কল রোলে
স্রোতস্বিনী যায় চোলে
সুদূরে সাধের গেহ;
কোথারে তরুর ছায়া
বনের শ্যামল স্নেহ!
কোথারে সুনীল দিশে
বনাস্ত রয়েছে মিশে,
অনন্তের অনিমিষে
নয়ন নিমেষ-হারা!
দূর হতে বায়ু এসে
চলে যায় দূৱ-দেশে,
গীত গান যায় ভেসে
কোন্ দেশে যায় তারা
হাসি, বাঁশি, পরিহাস,
বিমল সুখের শ্বাস,
মেলা-মেশা বারো মাস
নদীর শ্যামল তীরে;
কেহ খেলে, কেহ দোলে,
ঘুমায় ছায়ার কোলে,
বেলা শুধু যায় চোলে
কুলু কুলু নদী নীরে।
বকুল কুড়োয় কেহ
কেহ গাঁথে মালাখানি;
ছায়াতে ছায়ার প্রায়
বসে বসে গান গায়,
করিতেছে কে কোথায়
চুপি চুপি কানাকানি!
খুলে গেছে চুলগুলি,
বাঁধিতে গিয়েছে ভুলি,
আঙ্গুলে ধরেছে তুলি
আঁখি পাছে ডেকে যায়,
কাঁকন খসিয়া গেছে
খুঁজিছে গাছের ছায়!
বনের মর্ম্মের মাঝে
বিজনে বাঁশারী বাজে,
তারি সুরে মাঝে মাঝে
ঘুঘু দুটি গান গায়।
ঝুরু ঝুরু কত পাতা
গাহিছে বনের গাথা,
কত না মনের কথা
তারি সাথে মিশে যায়!
লতা পাতা কতশত
খেলে কাঁপে কত মত,
ছোট ছোট আলোছায়া
ঝিকিমিকি বন ছেয়ে,
তারি সাথে তারি মত
খেলে কত ছেলে মেয়ে!
কোথায় সে গুন্ গুন্
ঝর ঝর মরমর,
কোথা সে মাথার পরে
লতাপাতা থরথর!
কোথায় সে ছায়া আলো,
ছেলে মেয়ে, খেলাধূলি,
কোথা সে ফুলের মাঝে
এলোচুলে হাসিগুলি!
কোথারে সরল প্রাণ,
গভীর আনন্দ গান,
অসীম শান্তির মাঝে
প্রাণের সাধের গেহ,
তরুর শীতল ছায়া
বনের শ্যামল স্নেহ!
বন্দী
বন্দী।
দাও খুলে দাও সখি ওই বাহু পাশ!
চুম্বন মদিরা আর করায়োনা পান!
কুসুমের কারাগারে রুদ্ধ এ বাতাস,
ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও বদ্ধ এ পরাণ!
কোথায় উষার আলো কোথায় আকাশ!
এ চির পূর্ণিমা রাত্রি হোক্ অবসান!
আমারে ঢেকেছে তব মুক্ত কেশপাশ,
তোমার মাঝারে আমি নাহি দেখি ত্রাণ!
আকুল অঙ্গুলি গুলি করি কোলাকুলি
গাঁথিছে সর্ব্বাঙ্গে মোর পরশের ফাঁদ।
ঘুমঘোরে শূন্য পানে দেখি মুখ তুলি
শুধু অবিশ্রাম-হাসি একখানি চাঁদ!
স্বাধীন করিয়া দাও বেধনা আমায়
স্বাধীন হৃদয়খানি দিব তব পায়!
বসন্ত অবসান
বসন্ত অবসান।
সিন্ধু ভৈরবী। আড়াঠেকা
কখন্ বসন্ত গেল,
এবার হল না গান!
কখন্ বকুল-ফুল
ছেয়েছিল ঝরা ফুল,
কখন্ যে ফুল-ফোটা
হয়ে গেল অবসান!
কখন্ বসন্ত গেল
এবার হল না গান!
এবার বসন্তে কিরে
যুঁথীগুলি জাগে নিয়ে!
অলিকুল গুঞ্জরিয়া,
করে নি কি মধুপান!
এবার কি সমীরণ
জাগায় নি ফুলবন!
সাড়া দিয়ে গেল না ত,
চলে গেল ম্রিয়মাণ!
কখন্ বসন্ত গেল,
এবার হল না গান!
যতগুলি পাখী ছিল
গেয়ে বুঝি চলে গেল,
সমীরণে মিলে গেল
বনের বিলাপ তান।
ভেঙ্গেছে ফুলের মেলা,
চলে গেছে হাসি-খেলা,
এতক্ষণে সন্ধে-বেলা
জাগিয়া চাহিল প্রাণ!
কখন্ বসন্ত গেল
এবার হলনা গান!
বসন্তের শেষ রাতে
এসেছিরে শূন্য হাতে,
এবার গাঁথিনি মালা
কি তোমারে করি দান!
কাঁদিছে নীরব বাঁশি,
অধরে মিলায় হাসি,
তোমার নয়নে ভাসে।
ছল ছল অভিমান!
এবার বসন্ত গেল,
হলনা, হলনা গান!
বাঁশি
বাঁশি।
বেহাগ - আড়াখেমটা।
ওগাে শােন কে বাজায়!
বনফুলের মালার গন্ধ
বাঁশির তানে মিশে যায়।
অধর ছুঁয়ে বাঁশি খানি
চুরি করে হাসি খানি,
বঁধুর হাসি মধুর গানে
প্রাণের পানে ভেসে যায়!
ওগো শােন কে বাজায়!
কুঞ্জবনের ভ্রমর বুঝি
বাঁশির মাঝে গুঞ্জরে,
বকুল গুলি আকুল হয়ে
বাঁশির গানে মুঞ্জরে।
যমুনারি কলতান
কানে আসে,কাঁদে প্রাণ,
আকাশে ঐ মধুর বিধু
কাহার পানে হেসে চায়!
ওগো শোন কে বাজায়!
বাকি
বাকি।
কুসুমের গিয়েছে সৌরভ,
জীবনের গিয়েছে গৌরব!
এখন যা-কিছু সব ফাঁকি,
ঝরিতে মরিতে শুধু বাকি!
বাসনার ফাঁদ
বাসনার ফাঁদ।
যারে চাই, তার কাছে আমি দিই ধরা,
সে আমার না হইতে আমি হই তার!
পেয়েছি বলিয়ে মিছে অভিমান করা,
অন্যেরে বাঁধিতে গিয়ে বন্ধন আমার!
নিরখিয়া দ্বার মুক্ত সাধের ভাণ্ডার
দুই হাতে লুটে নিই রত্ন ভূরি ভূরি,
নিয়ে যাব মনে করি, ভারে চলা ভার,
চোরা দ্রব্য বোঝা হয়ে চোরে করে চুরি
চিরদিন ধরণীর কাছে ঋণ চাই,
পথের সম্বল বলে জমাইয়া রাখি,
আপনারে বাঁধা রাখি সেটা ভূলে যাই,
পাথেয় লইয়া শেষে কারাগারে থাকি!
বাসনার বোঝা নিয়ে ডোবে-ডোবে তরী,
ফেলিতে সরে না মন উপায় কি করি!
বাহু
বাহু।
কাহারে জড়াতে চাহে দুটি বাহু লতা।
কাহারে কাঁদিয়া বলে যেওনা যেওনা।
কেমনে প্রকাশ করে ব্যাকুল বাসনা,
কে শুনেছে বাহুর নীরব আকুলতা!
কোথা হতে নিয়ে আসে হৃদয়ের কথা
গায়ে লিখে দিয়ে যায় পুলক অক্ষরে!
পরশে বহিয়া আনে মরম বারতা
মোহ মেথে রেখে যায় প্রাণের ভিতরে!
কণ্ঠ হ’তে উতারিয়া যৌবনের মালা
দুইটি আঙ্গুলে ধরি তুলি দেয় গলে।
দুটি বাহু বহি আনে হৃদয়ের ডালা
রেখে দিয়ে যায় যেন চরণের তলে!
লতায়ে থাকুক বুকে চির আলিঙ্গন,
ছিঁড়োনা ছিঁড়োনা দুটি বাহুর বন্ধন!
বিজনে
বিজনে!
আমারে ডেকোনা আজি এ নহে সময়,
একাকী রয়েছি হেথা গভীর বিজন,
রুধিয়া রেখেছি আমি অশান্ত হৃদয়,
দুরন্ত হৃদয় মোর করিব শাসন!
মানবের মাঝে গেলে এ যে ছাড়া পায়,
সহস্রের কোলাহলে হয় পথহারা,
লুব্ধ মুষ্টি যাহা পায় আঁকড়িতে চায়,
চিরদিন চিররাত্রি কেঁদে কেঁদে সারা!
ভর্ৎসনা করিব তারে বিজনে বিরলে,
এক্টুকু ঘুমাক্ সে কাঁদিয়া কাঁদিয়া,
শ্যামল বিপুল কোলে আকাশ অঞ্চলে
প্রকৃতি জননী তারে রাখুন্ বাঁধিয়া!
শান্ত স্নেহ কোলে বসে শিখুক্ সে স্নেহ
আমারে আজিকে তোরা ডাকিস্নে কেহ
বিদেশী ফুলের গুচ্ছ
বিদেশী ফুলের গুচ্ছ।
মধুর সূর্য্যের আলো, আকাশ বিমল,
সঘনে উঠিছে নাচি তরঙ্গ উজ্জল।
মধ্যাহ্লের স্বচ্ছ করে
সাজিয়াছে থরে থরে
ক্ষুদ্র নীল দ্বীপগুলি, গুঞ্জ-শৈল-শির;
কাননে কুঁড়িরে ঘিরি,
পড়িতেছে ধীরি ধীরি
পৃথিবীর অতি মৃদু নিঃশ্বাস সমীর।
একই আননো যেন গায় শত প্রাণ;
বাতাসের গান আর পার্থীদের গান,
সাগরের জলরব
নগরের কলরব
এসেছে কোমল হ’য়ে স্তব্ধতার সঙ্গীত সমান।
আমি দেখিতেছি চেয়ে সমুদ্রের জলে
শৈবাল বিচিত্র বর্ণ ভাসে দলে দলে।
আমি দেখিতেছি চেয়ে,
উপকুল পানে ধেয়ে
মুঠি মুঠি তারাবৃষ্টি করে ঢেউগুলি!
বিরলে বালুকা তীরে
একা বসে রয়েছি রে,
চারিদিকে চকিছে জলের বিজুলী!
তালে তালে ঢেউগুলি করিছে উত্থান,
তাই হতে উঠিতেছে কি একটি তান!
মধুর ভাবের ভরে
হৃদয় কেমন করে
আমার সে ভাব আজি বুঝিবে কি আর কোন প্রাণ
হায় মাের নাই আশা, নাইক আরাম,
ভিতরে নাইক শান্তি বাহিরে বিরাম।
নাই সে সন্তোষ ধন-
জ্ঞানী ঋষি মােগীগণ,
ধ্যান সাধনায় যাহা পায় করতলে;
আনন্দ মগন মন
করে তারা বিচরণ
বিমল মহিমালােক অন্তরেতে জ্বলে।
নাই যশ, নাই প্রেম, নাই অবসর;
পূর্ণ করে আছে এরা সকলেরি ঘর,
সুখে তারা হাসে খেলে,
সুখের জীবন বলে,
আমার কপালে বিধি লিখিয়াছে আরেক অক্ষর।
কিন্তু নিরাশাও শান্ত হয়েছে এমন,
যেমন বাতাস এই, সলিল যেমন।
মনে হয় মাথা থুয়ে
এইখানে থাকি শুয়ে
অতিশয় শ্রান্তকায় শিশুটির মত,
কাঁদিয়া দুঃখের প্রাণ
ক’রে দিই অবসান,
যে দুঃখ বহিতে হবে বহিয়াছি কত!
আসিবে ঘুমের মত মরণের কোল,
ধীরে ধীরে হিম হয়ে আসিবে কপোল।
মুমুর্ষ শ্রবণ তলে
মিশাইবে পলে পলে
সাগরের অবিরাম একতান অন্তিম কল্লোল!
সারাদিন গিয়েছিনু বনে,
ফুলগুলি তুলেছি যতনে।
প্রাতে মধুপানে রত
মুগ্ধ মধুপের মত
গান গাহিয়াছি আনমনে!
এখন চাহিয়া দেখি, হায়,
ফুলগুলি শুকায় শুকায়!
যত চাপিলাম মুঠি
পাপড়িগুলি গেল টুটি,
কান্না ওঠে, গান থেমে যায়।
কি বলিছ সখা হে আমার,
ফুল নিতে যাব কি আবার!
থাক্ বঁধু, থাক্ থাক্,
আর কেহ যায় যাক্,
আমি ত যাবনা কভু আর!
শান্ত এ হৃদয় অতি দীন,
পরাণ হয়েছে বলহীন।
ফুলগুলি মুঠা ভরি
মুঠায় রহিবে মরি,
আমি না মরিব যত দিন!
আমায় রেখ না ধ’রে আর,
আর হেথা ফুল নাহি ফুটে।
হেমন্তের পত্নিছে নীহার,
আমায় রেখন। ধ’রে অরো ৷
যাই হেথা হতে যাই উঠে,
আমার স্বপন গেছে টুটে!
কঠিন পাষাণ পথে
যেতে হবে কোন মতে
পা দিয়েছি যবে!
একটি বসন্ত রাতে
ছিলে তুমি মোর সাথে,
পোহাল ত, চলে যাও তবে!
প্রভাতে একটি দীর্ঘশ্বাস;
একটি বিরল অশ্রুবারি
ধীরে ওঠে, ধীরে ঝ’রে যায়;
শুনিলে তােমার নাম আজ,
কেবল একটুখানি লাজ—
এই শুধু বাকি আছে হায়!
আর সব পেয়েছে বিনাশ!
এককালে ছিল যে আমারি,
গেছে আজ করি পরিহাস!
গোলাপ হাসিয়া বলে, “আগে বৃষ্টি যাক্ চ’লে,
দিক্ দেখা তরুণ তপন,
তখন ফুটাব এ যৌবন!”
গেল মেঘ, এল উষা, আকাশের আঁখি হতে
মুছে দিল বৃষ্টি বারি কণা।
সেত রহিল না!
কোকিল ভাবিছে মনে, “শীত যাবে কতক্ষণে,
গাছপালা ছাইবে মুকুলে,
তখন গাহিব মন খুলে!”
কুয়াশা কাটিয়া যায়—বসন্ত হাসিয়া চায়,
কানন কুসুমে ভ’রে গেল।
সে যে ম’রে গেল!
এত শীঘ্র ফুটলি কেনরে!
ফুটিলে পড়িতে হয় ঝ’রে;
মুকুলের দিন আছে তবু,
ফোটা ফুল ফোটেনাত আর!
বড় শীঘ্র গেলি মধুমাস,
দুদিনেই ফুরাল নিশ্বাস!
বসন্ত আবার আসে বটে,
গেল যে সে ফেরে না আবার!
হাসির সময় বড় নেই,
দুদণ্ডের তরে গান গাওয়া;
নিমেষের মাঝে চুম খেয়ে
মুহূর্তে ফুরাবে চুম খাওয়া!
বেলা নাই শেষ করিবারে
অসম্পূর্ণ প্রেমের মন্ত্রনা;
সুখস্বপ্ন পলকে ফুরায়,
তার পরে,জাগ্রত যন্ত্রণা!
কিছুক্ষণ কথা ক’য়ে লও,
তাড়াতাড়ি দেখে লও মুখ;
দুদণ্ডের খোঁজ দেখাশুনা,
ফুরাইবে খুজিবার সুখ।
বেলা নাই কথা কহিবারে
যে কথা কহিতে ফাটে প্রাণ!
দেবতারে দুট কথা বলে
প্রজার সময় অবসান।
কাঁদিতে রয়েছে দীর্ঘদিন,
জীবন করিতে মরুময়,
ভাবিতে রয়েছে চিরকাল,
ঘুমাইতে অনন্ত সময়।
বেঁচেছিল, হেসে হেসে,
খেলা করে বেড়াত সে,
হে প্রকৃতি, তারে নিয়ে কি হ’ল’ তােমার!
শত রঙ্-করা পাখী
তাের কাছে ছিল নাকি!
কত তারা, বন, সিন্ধু, আকাশ অপার!
জননীর কোল হতে কেন তবে কেড়ে নিলি!
লুকায়ে ধরার কোলে ফুল দিয়ে ঢেকে দিলি!
শত-তারা-পুষ্পময়ি!
মহতী প্রকৃতি অয়ি,
-না হয় একটি শিশু নিলি চুরি ক’রে-
অসীম ঐশ্বর্য্য তব
তাহে কি বাড়িল নব!
নূতন আনন্দ কণা মিলিল কি ওরে!
অথচ তােমারি মত বিশাল মায়ের হিয়া,
লব শূন্য হয়ে গেল একটি সে শিশু গিয়া।
নিদাঘের শেষ গোলাপ কুসুম
এক বন আলো করিয়া;
রূপসী তাহার সহচরীগণ
শুকায়ে পড়েছে ঝরিয়া।
একাকিনী আহা, চারিদিকে তার
কোন ফুল নাহি বিকাশে,
হাসিতে তাহার মিশাইতে হাসি
নিশাস তাহার নিশাসে।
বোঁটার উপরে শুকাইতে তোরে
রাখিব না একা ফেলিয়া,
সবাই ঘুমায়, তুইও ঘুমা’গে’
তাহাদের সাথে মিলিয়।
ছড়ায়ে দিলাম দলগুলি তোর
কুসুম-সমাধি-শয়নে,
যেথা তোর বন-সখীরা সবাই
ঘুমায় মুদিত নয়নে।
তেমনি আমার সখারা যখন
যেতেছেন মােরে ফেলিয়া,
প্রেমহার হতে একটি একটি
রতন পড়িছে খুলিয়া,
প্রণয়ী হৃদয় গেল গাে শুকায়ে
প্রিয়জন গেল চলিয়া,
তবে এ আঁধার আঁধার জগতে
রহিব বল কি বলিয়া!
ওই আদরের নামে ডেকো সখা মােরে,
ছেলে বেলা ওই নামে আমায় ডাকিত,
তাড়াতাড়ি খেলাধূলাে সব ত্যাগ করে
অমনি যেতেম ছুটে
কোলে পড়িতাম লুটে,
রাশি-করা ফুলগুলি পড়িয়া থাকিত।
নীরব হইয়া গেছে সে স্নেহের স্বর,
কেবল স্তব্ধতা রাজে।
আজি এ শ্মশান মাঝে,
কেবল ডাকি গাে আমি ঈশ্বর—ঈশ্বর—।
মৃত কণ্ঠে আর যাহা শুনিতে না পাই,
সে নাম তােমারি মুখে শুনিবারে চাই।
হাঁ সখা, ডাকিও তুমি সেই নাম ধোরে,
ডাকিলেই সাড়া পাবে,
;কিছু না বিলম্ব হবে,
তখনি কাছেতে যাব সব ত্যাগ কোরে!
কেমনে কি হল পারিনে বলিতে
এইটুকু শুধু জানি—
নবীন কিরণে ভাসিছে সে দিন
প্রভাতের তনুখানি।
বসন্ত তখনাে কিশাের কুমার,
কুঁড়ি উঠে নাই ফুটি,
শাখায় শাখায় বিহগ বিহগী
বসে আছে দুটি দুটি।
কিযে হয়ে গেল পারিনে বলিতে,
এই টুকু শুধু জানি—
বসন্তও গেল তাও চলে গেল
একটি না করে বাণী।
যা-কিছু মধুর সব ফুরাইল,
সেও হল অবসান,
আমারেই শুধু ফেলে রেখে গেল
সুখহীন ম্রিয়মান।
রবির কিরণ হতে আড়াল করিয়া রেখে
মনটি আমার আমি গােলাপে রাখিনু ঢেকে;
সে বিছানা সুকোমল, বিমল নীহার চেয়ে,
তারি মাঝে মন খানি রাখিলাম লুকাইয়ে!
একটি ফুল না নড়ে, একটি পাতা না পড়ে,
তবু কেন ঘুমায় না, চমকি চমকি চায়?
ঘুম কেন পাখা নেড়ে উড়িয়ে পালিয়ে যায়?
আর কিছু নয়, শুধু গােপনে একটি পাখী
কোথা হতে মাঝে মাঝে উঠিতেছে ডাকি ডাকি!
ঘুমা তুই, ওই দেখ বাতাস মুদেছে পাখা,
রবির কিরণ হতে পাতায় আছি ঢাকা;
ঘুমা তুই, ওই দেখ, তাে চেয়ে দুরন্ত বায়
ঘুমেতে সাগর পরে চুলে পড়ে পায় পায়;
দুখের কাঁটায় কিরে বিঁধিতেছে কলেবর?
বিষাদের বিষদাতে কমিছে কি জরজর?
কেন তবে ঘুম তাের ছাড়িয়া গিয়াছে আঁখি?
কে জানে গােপনে কোথা ডাকিছে একটি পাখী।
শ্যামল কানন এই মােহমন্ত্র জালে ঢাকা,
অমৃত-মধুর ফল ভরিয়ে রয়েছে শাখা;
স্বপনের পাখীগুলি চঞ্চল ডানাটি তুলি
উড়িয়া চলিয়া যায় আঁধার প্রান্তর পরে;
গাছের শিখর হতে ঘুমের সঙ্গীত ঝরে।
নিভৃত কানন পর শুনিনা ব্যাধের স্বর
তবে কেন এ হরিণী চমকায় থাকি থাকি!
কে জানে, গােপনে কোথা ডাকিছে একটি পাখী।
দেখিনু যে এক আশার স্বপন
শুধু তা স্বপন, স্বপনময়,
স্বপন বই সে কিছুই নয়!
অবশ হৃদয় অবসাদময়
হারাইয়া সুখ শ্রান্ত অতিশয়
আজিকে উঠি জাগি
কেবল একটি স্বপন লাগি!
বীণাটি আমার নীরব হইয়া
গেছে গীত গান ভূলি,
ছিঁড়িয়া টুটিয়া ফেলেছি তাহার
একে একে তারগুলি।
নীরব হইয়া রয়েছে পড়িয়া
সুদুর শ্মশান পরে,
কেবল একটি স্বপন তরে!
থাম্ থাম্ ওরে হৃদয় আমার,
থাম্ থাম্ একেবারে,
নিতান্তই যদি টুটিয়া পড়িবি
একেবারে ভেঙ্গে যা’রে—
এই তোর কাছে মাগি!
আমার জগৎ, আমার হৃদয়
আগে যাহা ছিল এখন্ তা নয়
কেবল একটি স্বপন লাগি!
নহে নহে, এ নহে মরণ!
সহসা এ প্রাণপূর্ণ নিশ্বাস বাতাস
নীরবে করে যে পলায়ন,
আলোতে ফুটায় আলো এই আঁখি তারা
নিবে যায় একদা নিশীথে,
বহেনা রুধির নদী,—সুকোমল তনু
ধূলায় মিলায় ধরণীতে,
ভাবনা মিলায় শূন্যে, মৃত্তিকার তলে
রুদ্ধ হয় অমর হৃদয়—
এই মৃত্যু? এ ত মৃত্যু নয়।
কিন্তু রে পবিত্র শোক যায় না যে দিন
পিরিতির স্মিরিতি মন্দিরে,
উপেক্ষিত অতীতের সমাধির পরে
তৃণরাজি দোলে ধীরে ধীরে।
মরণ-অতীত চির-নূতন পরাণ
স্মরণে করে না বিচরণ,
সেই বটে সেই ত মরণ!
(কোন জাপানী কবিতার ইংরাজী অনুবাদ হইতে)
বাতাসে অশথ পাতা পড়িছে খসিয়া,
বাতাসেতে দেবদারু উঠিছে শ্বসিয়া।
দিবসের পরে বসি রাত্রি মুদে আঁখি,
নীড়েতে বসিয়া যেন পাহাড়ের পাখী।
শ্রান্ত পদে ভ্রমি আমি নগরে নগরে,
বিজন অরণ্য,দিয়া পর্ব্বতে সাগরে;
উড়িয়া গিয়াছে সেই পার্থীটি আমার,
খুঁজিয়া বেড়াই তারে সকল সংসার!
দিন রাত্রি চলিয়াছি—শুধু চলিয়াছি—
ভূলে যেতে ভূলিয়া গিয়াছি!
আমি যত চলিতেছি রৌদ্র বৃষ্টি বায়ে
হৃদয় আমার অত পড়িছে পিছায়ে!
হৃদয় রে ছাড়াছাড়ি হল তোর সাথে,
একভাব রহিল না তোমাতে আমাতে।
নীড় বেঁধেছিনু যেথা যা’ রে সেইখানে,
একবার ডাক্ গিয়ে আকুল পরাণে।
কে জানে, হতেও পারে, সে নীড়ের কাছে
হয়ত পাখীটি মোর লুকাইয়ে আছে!
কেঁদে কেঁদে বৃষ্টি জলে আমি ভ্রমিতেছি,
ভুলে যেতে ভূলিয়ে গিয়েছি!
দেশের সবাই জানে কাহিনী আমার;
বলে তারা “এত প্রেম আছে বা কাহার!
পাখী সে পালায়ে গেছে কথাটি না বলে,
এমন ত সব পাখী উড়ে যায় চলে;
চিরদিন তারা কভু থাকে না সমান,
এমন ত কত শত রয়েছে প্রমাণ।
ডাকে, আর গায়, আর উড়ে যায় পরে,
এ ছাড়া বল ত তা’র আর কিবা করে?
পার্থী গেল যার, তার এক দুঃখ আছে—
ভূলে যেতে ভুলে সৈ গিয়াছে!”
সারাদিন দেখি আমি উড়িতেছে কাক,
সারারাত শুনি আমি পেচকের ডাক।
চন্দ্র উঠে অস্ত যায় পশ্চিম সাগরে;
পূরবে তপন উঠে জলদের স্তরে;
পাতা ঝরে, শুভ্র রেণু উড়ে চারিধার,
বসন্ত মুকুল এ কি? অথবা তুষার?
হৃদয় বিদায় লই এবে তাের কাছে—
বিলম্ব হইয়া গেল—সময় কি আছে?
শান্ত হরে—এক দিন সুখী হবি তবু,
মরণ সে ভূলে যেতে ভােলে না ত কভু!
বিবসনা
বিবসনা।
ফেল গো বসন ফেল—ঘুচাও অঞ্চল।
পর শুধু সৌন্দর্য্যের নগ্ন আবরণ
সুর বালিকার বেশ কিরণ বসন।
পরিপূর্ণ তনুখানি—বিকচ কমল,
জীবনের যৌবনের লাবণ্যের মেলা!
বিচিত্র বিশ্বের মাঝে দাঁড়াও একেলা!
সর্ব্বাঙ্গে পড়ুক তব চাঁদের কিরণ
সর্ব্বাঙ্গে মলয় বায়ু করুক সে খেলা।
অসীম নীলিমা মাঝে হও নিমগন
তারাময়ী বিবসনা প্রকৃতির মত।
অতনু ঢাকুক মুখ বসনের কোণে
তমুর বিকাশ হেরি লাজে শির নত।
আসুক্ বিমল উষা মানব ভবনে,
লাজহীনা পবিত্রতা—শুভ্র বিরসনে।
বিরহ
বিরহ।
ভৈরবী। একতালা।
আমি নিশি নিশি কত রচিব শয়ন
আকুল নয়নরে!
কত নিতি নিতি বনে করিব যতনে
কুসুম চরন রে!
কত শরদ যামিনী হইবে বিফল,
বসন্ত যাবে চলিয়া!
কত উদিবে তপন আশার স্বপন
প্রভাতে যাইবে ছলিয়া!
এই যৌবন কত রাখিব বাঁধিয়া,
মরিব কাদিয়া রে!
সেই চরণ পাইলে মরণ মাগিব
সাধিয়া সাধিয়া রে!
আমি কার পথ চাহি এ জনম বাহি
কার দরশন যাচিরে!
যেন আসিবে বলিয়া কে গেছে চলিয়া
তাই আমি বসে আছিরে!
তাই মালাটি গাঁথিয়া পরেছি মাথায়
নীলবাসে তনু ঢাকিয়া,
তাই বিজন-আলয়ে প্রদীপ জ্বালায়ে
একেলা রয়েছি জাগিয়া!
ওগাে তাই কত নিশি চাঁদ ওঠে হাসি,
তাই কেঁদে যায় প্রভাতে।
ওগাে তাই ফুল-বনে মধু-সমীরণে
ফুটে ফুল কত শােভাতে!
ওই বাঁশি স্বর তার আসে বারবার
সেই শুধু কেন আসে না!
এই হৃদয়-আসন শূন্য পড়ে থাকে
কেঁদে মরে শুধু বাসনা!
মিছে পরশিয়া কায় বায়ু বহে যায়
বহে যমুনার লহরী,
কেন কুহু কুহ পিক কুহরিয়া ওঠে
যামিনী যে ওঠে শিহরি!
ওগাে যদি নিশি-শেষে আসে হেসে হেসে,
মাের হাসি আর রবে কি!
এই জাগরণে ক্ষীণ বদন মলিন
আমারে হেরিয়া কবে কি!
আমি সারা রজনীর গাঁথা ফুল মালা
প্রভাতে চরণে ঝরিব,
ওগাে আছে সুশীতল যমুনার জল
দেখে তারে আমি মরিব।
বিরহীর পত্র
বিরহীর পত্র।
হয় কি না হয় দেখা, ফিরি কি না ফিরি,
দূরে গেলে এই মনে হয়;
দুজনার মাঝখানে অন্ধকারে ঘিরি
জেগে থাকে সতত সংশয়।
এত লোক, এত জন, এত পথ, গলি,
এমন বিপুল এ সংসার,
ভয়ে ভয়ে হাতে হাতে বেঁধে বেঁধে চলি
ছাড়া পেলে কে আর কাহার।
তারায় তারায় সদা থাকে চোকে চোকে
অন্ধকারে অসীম গগনে।
ভয়ে ভয়ে অনিমেষে কম্পিত আলোকে
বাঁধা থাকে নয়নে নয়নে।
চৌদিকে অটল স্তব্ধ সুগভীর রাত্রি,
তরুহীন মরুময় ব্যোম,
মুখে মুখে চেয়ে তাই চলে যত যাত্রী
চলে গ্রহ রবি রা সোম।
নিমেষের অন্তরালে কি আছে কে জানে,
নিমেষে অসীম পড়ে ঢাকা—
অন্ধ কাল-তুরঙ্গম রাশ নাহি মানে
বেগে ধায় অদৃষ্টের চাকা।
কাছে কাছে পাছে পাছে চলিবারে চাই
জেগে জেগে দিতেছি পাহারা,
একটু এসেছে ঘুম—চমকি তাকাই
গেছে চলে কোথায় কাহারা!
ছাড়িয়া চলিয়া গেলে কাঁদি তাই একা
বিরহের সমুদ্রের তীরে।
অনন্তের মাঝখানে দুদণ্ডের দেখা
তাও কেন রাহু এসে ঘিরে।
মৃত্যু যেন মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে যায়
পাঠায় সে বিরহের চর।
সকলেই চলে যাবে পড়ে’ রবে হায়
ধরণীর শুন্য খেলাঘর!
গ্রহ তারা ধুমকেতু কত রবি শশী
শূন্য-ঘেরি জগতের ভীড়,
তারি মাঝে যদি ভাঙ্গে, যদি যায় খসি
আমাদের দুদণ্ডের নীড়,—
কোথায় কে হারাইব—কোন্ রাত্রি বেলা
কে কোথায় হইব অতিথি!
তখন কি মনে রবে দুদিনের খেলা
দরশের পরশের স্মৃতি!
তাই মনে ক’রে কিরে চোকে জল আসে
একটুকু চোকের আড়ালে!
প্রাণ যারে প্রাণের অধিক ভাল বাসে
সেও কি রবে না এক কালে!
আশা নিয়ে এ কি শুধু খেলাই কেবল—
সুখ দুঃখ মনের বিকার।
ভালবাসা কাঁদে, হাসে, মোছে অশ্রুজল,
চার, পায়, হারায় আবার।
বিলাপ
বিলাপ।
ঝিঁঝিট্। একতালা।
ওগো এত প্রেম আশা প্রাণের তিয়াষা
কেমনে আছে সে পাশরি!
তবে সেথা কি হাসে না চাঁদিনী যামিনী,
সেথা কি বাজেনা বাঁশরী!
সখি হেথা সমীরণ লুঠে ফুলবন
সেথা কি পবন বহে না!
সে যে তার কথা মোরে কহে অনুক্ষণ
মোর কথা তারে কহেনা!
যদি আমারে আজি সে ভুলিবে সজনি,
আমারে ভুলালে কেন সে!
ওগো এ চির জীবন করিব রোদন
এই ছিল তার মানসে!
যবে কুসুম শয়নে নয়নে নয়নে
কেটে ছিল সুখ রাতিরে,
তবে কে জানিত তার বিরহ আমার
হবে জীবনের সাথীরে!
যদি মনে নাহি রাখে সুখে যদি থাকে
তোরা একবার দেখে আয়,
এই নয়নের তৃষা পরাণের আশা
চরণের তলে রেখে আয়।
আর নিয়ে যা’ রাধার বিরহের ভার
কত আর ঢেকে রাখি বল্!
আর পারি যদি ত আনিস্ হরিয়ে
এক ফোঁটা তার আঁখি জল!
না না এত প্রেম সখি ভুলিতে যে পারে
তারে আর কেহ সেধ না।
আমি কথা নাহি কব, দুখ লয়ে রব,
মনে মনে সব’ বেদনা।
ওগো মিছে, মিছে সখি, মিছে এই প্রেম,
মিছে পরাণের বাসনা!
ওগো সুখ দিন হায় যবে চলে যায়
আর ফিরে আর আসেনা!
বিষ্টি পড়ে টাপুর্ টুপুর্ নদী এল বাণ
বিষ্টি পড়ে টাপুর্ টুপুর্ নদী
এল বাণ।
দিনের আলো নিবে এল,
সুয্যি ডোবে ডোবে।
আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে
চাঁদের লোভে লোভে।
মেঘের উপর মেঘ করেছে,
রঙের উপর রঙ।
মন্দিরেতে কাঁশর ঘণ্টা
বাজ্ল ঠং ঠং।
ও পারেতে বিষ্টি এল।
ঝাপ্সা গাছপালা।
এ পারেতে মেঘের মাথায়
এক্শো মাণিক জালা।
বাদ্লা হাওয়ায় মনে পড়ে
ছেলেবেলার গান—
“বিষ্ট পড়ে দুপুর টুপুর
নদী এল বাণ।”
আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা
কোথায় বা সীমানা!
দেশে দেশে খেলে বেড়ায়
কেউ করে না মানা।
কত নতুন ফুলের বনে
বিষ্টি দিয়ে যায়!
পলে পলে নতুন খেলা
কোথায় ভেবে পায়!
মেঘের খেলা দেখে কত
খেলা পড়ে মনে!
কত দিনের মুকোচুরী
কত ঘরের কোণে!
তারি সঙ্গে মনে পড়ে
ছেলেবেলার গান—
“বিষ্টি পড়ে টাপুর্ টুপু্র,
নদী এল বাণ।”
মনে পড়ে ঘরটি আলো
মায়ের হাসিমুখ,
মনে পড়ে মেঘের ডাকে
গুরুগুরু বুক।
বিছানাটির একটি পাশে
ঘুমিয়ে আছে খোকা,
মায়ের পরে দৌরাত্মি, সে
না যায় লেখাজোকা।
ঘরেতে দুরন্ত ছেলে
করে দাপাদাপি,
বাইরেতে মেঘ ডেকে ওঠে
সৃষ্ট ওঠে কাঁপি।
মনে পড়ে মায়ের মুখে
শুনেছিলেম গান
“বিষ্টি পড়ে টাপুর্ টুপুর্
নদী এল বাণ।”
এ মনে পড়ে সুয়োরাণী
দুয়োরাণীর কথা,
মনে পড়ে অভিমানী
কঙ্কাবতীর ব্যথা,
মনে পড়ে ঘরের কোণে
মিটিমিটি আলো,
চারিদিকে দেয়ালেতে
ছায়া কালো কালো।
বাইরে কেবল জলের শব্দ
ঝুপ্ ঝুপ্ ঝুপ্—
দস্যি ছেলে গপ্প শোনে
একেবারে চুপ্।
তারি সঙ্গে মনে পড়ে
মেঘ্লা দিনের গান
“বিষ্টি পড়ে টাপুর্ টুপুর্
নদী এল বাণ।”
কবে বিষ্টি পড়েছিল,
বাণ এল সে কোথা!
শিবঠাকুরের বিয়ে হল
কবেকার সে কথা;
সে দিনো কি এম্নিতর
মেঘের ঘটা খানা?
থেকে থেকে বিজুলী কি
দিতেছিল হানা?
তিন কন্যে বিয়ে ক’রে
কি হল তার শেষে!
না জানি কোন্ নদীর ধারে,
না জানি কোন্ দেশে,
কোন্ ছেলেরে ঘুম পাড়াতে
কে গাহিল গান—
“বিষ্টি পড়ে টাপুর্ টুপুর্
নদী এল বাণ।
বৈতরণী
বৈতরণী।
অশ্রু স্রোতে স্ফীত হয়ে বহে বৈতরণী;
চৌদিকে চাপিয়া আছে আঁধার রজনী।
পূর্ব্বতীর হ’তে হুহু আসিছে নিশ্বাস
যাত্রী লয়ে পশ্চিমেতে চলেছে তরণী!
মাঝে মাঝে দেখা দেয় বিদ্যুত বিকাশ,
কেহ কারে নাহি চেনে ব’সে নত শিরে।
গলে ছিল বিদায়ের অশ্রু-কণা হার
ছিন্ন হ’য়ে একে একে ঝরে পড়ে নীরে।
ঐ বুঝি দেখা যায় ছায়া পর পার,
অন্ধকারে মিটি মিটি তারা দীপ জ্বলে!
হোথায় কি বিস্মরণ, নিঃস্বপ্ন নিদ্রার
শয়ন রচিয়া দিবে ঝরা ফুল দলে!
অথবা অকূলে শুধু অনন্ত রজনী
ভেসে চলে কর্ণধার-বিহীন তরণী!
ভবিষ্যতের রঙ্গভূমি
ভবিষ্যতের রঙ্গভূমি।
সম্মুখে র’য়েছে পড়ি যুগ-যুগান্তর।
অসীম নীলিমে লুটে
ধরণী বাইরে ছুটে,
প্রতিদিন আসিবে, যাইবে রবিকর।
প্রতিদিন প্রভাতে জাগিবে নরনারী,
প্রতি সন্ধ্যা শ্রান্ত দেহে
ফিরিয়া আসিবে গেহে,
প্রতিরাত্রে তারকা ফুটিবে সারি সারি।
কত আনন্দের ছবি, কত সুখ আশা,
আসিবে যাইবে, হায়,
সুখ-স্বপনের প্রায়
কত প্রাণে জাগিবে, মিলাবে ভালবাসা।
তখনো ফুটিবে হেসে কুসুম কানন,
তখনো রে কত লোকে
কত স্নিগ্ধ চন্দ্রালোকে
আঁকিবে আকাশ-পটে সুখের স্বপন
নিবিলে দিনের আলাে, সন্ধ্যা হলে, নিতি
বিরহী নদীর ধারে
না-জানি ভাবিবে কা’রে!
না-জানি সে কি কাহিনী— কি সুখ—কি স্মৃতি
দূর হতে আসিতেছে—শুন কান পেতে—
কত গান, সেই মহা-বঙ্গভূমি হতে!
কত যৌবনের হাসি,
কত উৎসবের বাঁশী,
তরঙ্গের কলধ্বনি প্রমােদের স্রোতে!
কত মিলনের গীত, বিরহের শ্বাস,
তুলেছে মর্ম্মর তান বসন্ত-বাতাস,
সংসারের কোলাহল
ভেদ করি অবিরল
লক্ষ নব কবি ঢালে প্রাণের উচ্ছ্বাস?
ওই দুর খেলাঘরে খেলাই’ছ কারা?
উঠেছে মাথার পরে আমাদেরি তারা।
আমাদেরি ফুলগুলি
সেথাও নাচি’ছে দুলি,
আমাদেরি পাখীগুলি গেয়ে হল সারা!
ওই দুর খেলাঘরে করে আনাগোনা,
হাসে কাঁদে কত কে যে নাহি যায় গণা!
আমাদের পানে, হায়,
ভুলেও ত নাহি চায়,
মোদের ওরা ত কেউ ভাই বলিবে না।
ওই সব মধুমুখ অমৃত-সদন,
না জানি রে আর কা’রা করিবে চুম্বন!
সরমময়ীর পাশে
বিজড়িত আধ-ভাষে
আমরা ত শুনাব না প্রাণের বেদন!
আমাদের খেলাঘরে কা’রা খেলাইছ!
সাঙ্গ না হইতে খেলা
চলে এনু সন্ধে বেলা,
ধূলির সে ঘর ভেঙ্গে কোথা ফেলাইছ!
হোথা, যেথা বসিতাম মোরা দুই জন,
হাসিয়া কাঁদিয়া হত মধুর মিলন,
মাটীতে কাটিয়া রেখা
কত লিখিতাম লেখা,
কে তোরা মুছিলি সেই সাধের লিখন!
সুধাময়ী মেয়েটি সে হোথায় লুটিত,
চুমো খেলে হাসিটুকু ফুটিয়া উঠিত!
তাই রে মাধবীলতা
মাথা তুলেছিল হোথা;
ভেবেছিনু চিরদিন রবে মুকুলিত।
কোথায় রে—কে তাহারে করিলি দলিত!
ওই যে শুকান ফুল ছুঁড়ে ফেলে দিলে,
উহার মরম কথা বুঝিতে নারিলে।
ও যে দিন ফুটেছিল,
নব রবি উঠেছিল,
কানন মাতিয়াছিল বসন্ত অনিলে!
ওই যে শুকায় চাঁপা প’ড়ে একাকিনী,
তোমরা ত জানিবে না উহার কাহিনী!
কবে কোন্ সন্ধেবেলা
ওরে তুলেছিল বালা,
ওরি মাঝে বাজে কোন্ পূরবী রাগিণী!
যা’রে দিয়েছিল ওই ফুল উপহার,
কোথায় সে গেছে, চ’লে, সেত নেই আর!
একটু কুসুমকণা
তা ও নিতে পারিল না,
ফেলে রেখে যেতে হল মরণের পার!
কত সুখ, কত ব্যথা,
সুখের দুখের কথা
মিশিছে ধূলির সাথে ফুলের মাঝার!
মিছে শোক, মিছে এই বিলাপ কাতর,
সম্মুখে রয়েছে প’ড়ে যুগ যুগান্তর!
ভুল
( ১৮৬ )
ভুল।
কানাড়া। যৎ।
বিদায় করেছ যারে
নয়ন জলে,
এখন ফিরাবে তারে
কিসের ছলে!
আজি মধু-সমীরণে
নিশীথে কুসুম-বনে,
তাহারে পড়েছে মনে
বকুল তলে!
এখন্ ফিরাবে তারে,
কিসের ছলে!
সেদিনাে ত মধুনিশি
প্রাণে গিয়েছিল মিশি,
মুকুলিত দশদিশি
কুসুম-দলে;
দুটি সােহাগের বাণী
যদি হত কানাকানী,
যদি ওই মালাখানি
পরাতে গলে!
এখন ফিরাবে আর
কিসের ছলে!
মধুরাতি পূর্ণিমার
ফিরে আসে বারবার,
সে জন ফেরে না আর
যে গেছে চ’লে!
ছিল তিথি অনুকুল,
শুধু নিমেষের ভুল,
চিরদিন তৃষাকুল
পরাণ জলে!
এখন ফিরাবে তারে
কিসের ছলে!
মথুরায়
মথুরায়।
মিশ্রকাফি— একতালা।
বাঁশরী বাজাতে চাহি
বাঁশরী বাজিল কই?
বিহরিছে সমীরণ,
কুহরিছে পিকগণ,
মথুরার উপবন
কুসুমে সাজিল ওই।
বাঁশরী বাজাতে চাহি
বাঁশরী বাজিল কই?
বিকচ বকুল ফুল
দেখে যে হতেছে ভুল,
কোথাকার অলিকুল
গুঞ্জরে কোথায়!
এ নহে কি বৃন্দাবন?
কোথা সেই চন্দ্রানন,
ওই কি নূপুর-ধ্বনি
বন-পথে শুনা যায়?
একা আছি বনে বসি,
পীতধড়া পড়ে খসি,
সােঙরি সে মুখ-শশী
পরাণ মজিল, সই!
বাঁশরী বাজাতে চাহি
বাঁশরী বাজিল কই?
একবার রাধে রাধে
ডাক্ বাঁশী মনােসাধে,
আজি এ মধুর চাঁদে
মধুর যামিনী ভায়।
কোথা সে বিধুরা বালা,
মলিন মালতী-মালা,
হৃদয়ে বিরহ-জ্বালা
এ নিশি পােহায়, হায়!
কবি যে হল আকুল,
এ কি রে বিধির ভুল!
মথুরায় কেন ফুল
ফুটেছে আজি লাে সই!
বাঁশরী বাজাতে গিয়ে
বাঁশরী বাজিল কই?
মরীচিকা
মরীচিকা।
এস, ছেড়ে এস, সখি, কুসুম শয়ন!
বাজুক্ কঠিন মাটি চরণের তলে।
কত আর করিবে গো বসিয়া বিরলে
আকাশ-কুসুমবনে স্বপন চয়ন!
দেখ ওই দূর হতে আসিছে ঝটিকা,
স্বপ্নরাজ্য ভেসে যাবে খর অশ্রু জলে!
দেবতার বিদ্যুতের অভিশাপ শিখা
দহিবে আঁধার নিদ্রা বিমল অনলে।
চল গিয়ে থাকি দোঁহে মানবের সাথে,
সুখ দুঃখ লয়ে সবে গাঁথিছে আলয়,
হাসি কান্না ভাগ করি ধরি হাতে হাতে
সংসার সংশয় রাত্রি রহিব নির্ভয়।
সুখ-রৌদ্র-মরীচিকা নহে বাসস্থান,
মিলায় মিলায় বলি ভয়ে কাঁপে প্রাণ!
মা লক্ষ্মী
মা লক্ষ্মী।
কার্ পানে, মা, চেয়ে আছ
মেলি দুটি করুণ আঁখি!
কে ছিঁড়েছে ফুলের পাতা,
কে ধরেছে বনের পাখী!
কে কারে কি বলেছে গো,
কার প্রাণে বেজেছে ব্যথা,
করুণায় যে ভরে এল
দুখানি তোর আঁখির পাতা!
খেতে খেতে মায়ের আমার
আর বুঝি হল না খেলা!
ফুলের গুচ্ছ কোলে প’ড়ে
কেন মা এ হেলাফেলা!
অনেক দুঃখ আছে হেথায়,
এ জগৎ যে দুঃখে ভরা,
তোমার দুটি আঁখির সুধায়
জুড়িয়ে গেল নিখিল ধরা!
লক্ষ্মী আমার বল্ দেখি মা
লুকিয়ে ছিলি কোন্ সাগরে!
সহসা আজ কাহার পুণ্যে
উদয় হলি মোদের ঘরে!
সঙ্গে ক’রে নিয়ে এলি
হৃদয়-ভরা মেহের সুধা,
হৃদয় চেলে মিটিয়ে যাবি
এ জগতের প্রেমের ক্ষুধা।
থামো, থামো, ওর কাছেতে
কয়োনা কেউ কঠোর কথা,
করুণ আঁখির বালাই নিয়ে
কেউ কারে দিওনা ব্যথা!
সইতে যদি না পারে ও,
কেঁদে যদি চলে যায়—
এ ধরণীর পাষাণ প্রাণে
ফুলের মত ঝরে যায়!
ওযে আমার শিশির কণা,
ওরে আমার সাজেঁর তারা।
কবে এল, কবে যাবে,
এই ভয়েতে হইরে সারা!
মানব-হৃদয়ের বাসনা
মানব-হৃদয়ের বাসনা।
নিশীথে রয়েছি জেগে; দেখি অনিমিখে,
লক্ষ হৃদয়ের সাধ শূন্যে উড়ে যায়।
কত দিক হ’তে তারা ধায় কত দিকে।
কত না অদৃশ্য-কায়া ছায়া-আলিঙ্গন
বিশ্বময় কারে চাহে করে হায় হায়!
কত স্মৃতি খুঁজিতেছে শ্মশান শয়ন;
অন্ধকারে হের শত তৃষিত নয়ন
ছায়াময় পাখী হ’য়ে কার পানে ধায়!
ক্ষীণশ্বাস মুমূর্ষুর অতৃপ্ত বাসনা
ধরণীর কূলে কুলে ঘুরিয়া বেড়ায়!
উদ্দেশে ঝরিছে কত অশ্রুবারি কণা
চরণ খুঁজিয়া তারা মরিবারে চায়!
কে শুনিছে শত কোটি হৃদয়ের ডাক!
নিশীথিনী স্তব্ধ হ’য়ে রয়েছে অবাক!
মায়ের আশা
মায়ের আশা।
ফুলের দিনে সে যে চলে গেল,
ফুল-ফোটা সে দেখে গেল না,
ফুলে ফুলে ভরে গেল বন
এক্টি সে ত পর্তে পেল না।
ফুল ফোটে, ফুল ঝ’রে যায়—
ফুল নিয়ে আর সবাই পরে,
ফিরে এসে যে যদি দাঁড়ায়,
এক্টিও রবে না তার তরে!
তার তরে মা কেবল আছে,
আছে শুধু জননীর স্নেহ,
আছে শুধু মা’র অশ্রজল,
কিছু নাই—নাই আর কেহ!
খেল্ত যারা তারা খেল্তে গেছে,
হাস্ত যারা তারা আজো হাসে,
তার তরে কেহ ব’সে নেই
মা শুধু রয়েছে তারি আশে!
হায়, বিধি, এ কি ব্যর্থ হবে!
ব্যর্থ হবে মার ভালবাসা।
কত জনের কত আশা পূরে,
ব্যর্থ হবে মার প্রাণের আশা?
মোহ
মোহ।
এ মোহ ক দিন থাকে, এ মায়া মিলায়!
কিছুতে পারে না আর বাঁধিয়া রাখিতে।
কোমল বাহুর ডোর ছিন্ন হয়ে যায়,
মদিরা উথলে নাকো মদির-আঁখিতে!
কেহ কারে নাহি চিনে আঁধার নিশায়।
ফুল ফোটা সাঙ্গ হলে গাছে না পাখীতে।
কোথা সেই হাসিপ্রান্ত চুম্বন-তৃষিত
রাঙা পুষ্পটুকু যেন প্রস্ফুট অধর!
কোথা কুসুমিত তনু পূর্ণ বিকশিত
কম্পিত পুলক ভরে, যৌবন কাতর!
তখন কি মনে পড়ে সেই ব্যাকুলতা,
সেই চির পিপাসিত যৌবনের কথা,
সেই প্রাণ-পরিপূর্ণ মরণ অনল,
মনে পোড়ে হাসি আসে? চোখে আসে জল?
যোগিয়া
যোগিয়া।
বহুদিন পরে আজি মেঘ গেছে চ’লে,
রবির কিরণ সুধা আকাশে উথলে।
স্নিগ্ধ শ্যাম পত্রপুটে
আলোক ঝলকি উঠে,
পুলক নাচিছে গাছে গাছে।
নবীন যৌবন যেন
প্রেমের মিলনে কাঁপে,
আনন্দ বিদ্যুৎ-আলো নাচে।
জুঁই সরোবর তীরে
নিশ্বাস ফেলিয়া ধীরে
ঝরিয়া পড়িতে চায় ভূঁয়ে,
অতি মৃদু হাসি তার;
বরষার বৃষ্টিধার
গন্ধটুকু নিয়ে গেছে ধুয়ে।
আজিকে আপন প্রাণে
না জানি বা কোন্ খানে
যোগিয়া রাগিণী গায় কেরে।
ধীরে ধীরে সুর তার
মিলাইছে চারি ধার
আচ্ছন্ন করিছে প্রভাতেরে।
গাছপালা চারি ভিতে
সঙ্গীতের মাধুরীতে
মগ্ন হ’য়ে ধরে স্বপ্নছবি!
এ প্রভাত মনে হয়
আরেক প্রভাতময়,
রবি যেন আর কোন রবি!
ভাবিতেছি মনে মনে
কোথা কোন উপবনে
কি ভাবে সে গাইছে না জানি,
চোখে তার অশ্রু রেখা,
একটু দেছে কি দেখা,
ছড়ায়েছে চরণ দুখানি!
তাঁর কি পায়ের কাছে
বাঁশিটি পড়িয়া আছে—
আলো ছায়া পড়েছে কপোলে।
মলিন মালাটি তুলি
ছিঁড়ি ছিঁড়ি পাতাগুলি
ভাসাইছে সরসীর জলে!
বিষাদ কাহিনী তার
সাধ যায় শুনিবার,
কোন্ খানে তাহার ভবন!
তাহার আঁখির কাছে
যার মুখ জেগে আছে
তাহারে বা দেখিতে কেমন।
একিরে আকুল ভাষা!
প্রাণের নিরাশ আশা
পল্লবের মর্ম্মরে মিশালো।
না-জানি কাহারে চায়
তার দেখা নাহি পায়
ম্লান তাই প্রভাতের আলো।
এমন কতনা প্রাতে
চাহিয়া আকাশ পাতে
কত লোক ফেলেছে নিঃশ্বাস,
সে সব প্রভাত গেছে
তা’রা তার সাথে গেছে
লয়ে গেছে হৃদয়-হুতাশ।
এমন কত না আশা
কত ম্লান ভালবাসা
প্রতিদিন পড়িছে ঝরিয়া,
তাদের হৃদয় ব্যথা
তাদের মরণ-গাথা
কে গাইছে একত্র করিয়া।
পরস্পর পরস্পরে
ডাকিতেছে নাম ধরে
কেহ তাহা শুনিতে না পায়।
কাছে আসে বসে পাশে,
তবুও কথা মা ভাষে
অশ্রুজলে ফিরে ফিরে যায়।
চায় তবু নাহি পায়
অবশেষে নাহি চায়,
অবশেষে নাহি গায় গান,
ধীরে ধীরে শূন্য হিয়া
বনের ছায়ায় গিয়া
মুছে আসে সজল নয়ান।
যৌবন স্বপ্ন
যৌবন স্বপ্ন।
আমার যৌবন-স্বপ্নে যেন ছেয়ে আছে বিশ্বের আকাশ।
ফুলগুলি গায়ে এসে পড়ে রূপসীর পরশের মত।
পরাণে পুলক বিকাশিয়া বহে কেন দক্ষিণা বাতাস
যেথা ছিল যত বিরহিণী সকলের কুড়ায়ে নিশ্বাস!
বসন্তের কুসুম কাননে গোলাপের আঁখি কেন নত?
জগতের যত লাজময়ী যেন মোর আখির সকাশ
কাঁপিছে গোলাপ হয়ে এসে, মরমের সরমে বিব্রত।
প্রতি নিশি ঘুমাই যখন’ পাশে এসে বসে যেন কেহ
সচকিত স্বপনের মত জাগরণে পলায় সাজে।
যেন কার অচলের বায় উষায় পরশি যায় দেহ।
শত নূপুরের রুনুঝুনু বনে যেন গুঞ্জরিয়া বাজে।
মদির প্রাণের ব্যাকুলতা ফুটে ফুটে বকুল মুকুলে;
কে আমারে করেছে পাগল— শূন্যে কেন চাই আঁখি তুলে,
যেন কোন্ উর্বশীর আঁখি চেয়ে আছে আকাশের মাঝে।
রাত্রি
রাত্রি।
জগতেরে জড়াইয়া শতপাকে যামিনী-নাগিনী,
আকাশ পাতাল জুড়ি ছিল প’ড়ে নিদ্রায় মগনা,
আপনার হিম দেহে আপনি বিলীনা একাকিনী।
মিটি মিটি তার কায় জ্বলে তার অন্ধকার ফণা!
উষা আসি মন্ত্র পড়ি বাজাইলা ললিত রাগিণী
রাঙা আঁখি পাকালিয়া সাপিনী উঠিল তাই জাগি,
একে একে খুলে পাক, আঁকি বাকি কোথা যায় ভ
পশ্চিম সাগর তলে আছে বুঝি বিরাট গহ্বর,
সেথায় ঘুমাবে ব’লে ডুবিতেছে বাসুকি-ভগিনী,
মাথায় বহিয়া তার শত লক্ষ রতনের কণা;
শিয়রেতে সারাদিন জেগে রবে বিপুল সাগর,
নিভৃতে, স্তিমিত দীপে চুপি চুপি কহিয়া কাহিনী
মিলি কত নাগবালা স্বপ্নমালা করিবে রচনা।
শরতের শুকতারা
শরতের শুকতারা।
একাদশী রজনী
পােহায় ধীরে ধীরে;—
রাঙা মেঘ দাড়ায়
উষারে ঘিরে ঘিরে।
ক্ষীণচাঁদ নভের
আড়ালে যেতে চায়,—
মাঝখানে দাঁড়ায়ে
কিনারা নাহি পায়।
বড় মান হয়েছে
চাঁদের মুখখানি,
আপনাতে আপনি
মিশাবে অনুমানি।
হের দেখ কে ওই
এসেছে তার কাছে,—
শুকতারা চাঁদের
মুখেতে চেয়ে আছে।
মরি মরি কে তুমি
এক্টুখানি প্রাণ,
কি না-জানি এনেছ
করিতে ওরে দান!
চেয়ে দেখ আকাশে
আর ত কেহ নাই,
তারা যত গিয়েছে
যে যার নিজ ঠাঁই।
সাথীহারা চন্দ্রমা
হেরিছে চারিধার,
শূন্য আহা নিশির
বাসর ঘর তার!
শরতের প্রভাতে
বিমল মুখ নিয়ে
তুমি শুধু রয়েছ
শিয়রে দাঁড়াইয়ে।
ও হয়ত দেখিতে
পেলে না মুখ তাের!
ও হয়ত আপন
স্বপনে আছে ভাের!
ও হয়ত তারার
খেলার গান গায়,
ও হয়ত বিরাগে
উদাসী হতে চায়!
ও কেবল নিশির
হাসির অবশেষ!
ও কেবল অতীত
সুখের স্মৃতিলেশ!
দ্রুতপদে তাহারা
কোথায় চলে গেছে—
সাথে যেতে পারেনি
পিছনে পড়ে আছে!
কত দিন উঠেছ
নিশির শেষাশেষি,
দেখিয়াছ চাঁদেতে
তারাতে মেশামেশি।
দুই দণ্ড চাহিয়া
আবার চলে যেতে,
মুখখানি লুকাতে
উষার আঁচলেতে।
পুরবের একান্তে
এক্টু দিয়ে দেখা,
কি ভাবিয়া তখনি
ফিরিতে একা একা।
আজ তুমি দেখেছ
চাঁদের কেহ নাই,
স্নেহময়ি, আপনি
এসেছ তুমি তাই!
দেহখানি মিলায়
মিলায় বুঝি তার!
হাসিটুকু রহে না
রহে না বুঝি আর!
দুই দণ্ড পরে ত
রবে না কিছু হায়!
কোথা তুমি, কোথায়
চাঁদের ক্ষীণকায়!
কোলাহল তুলিয়া
গরবে আসে দিন,
দুটি ছােট প্রাণের
লিখন হবে লীন।
সুখ শ্রমে মলিন
চাঁদের একসনে
নবপ্রেম মিলাবে
কাহার রবে মনে!
শান্তি
শান্তি।
থাক্ থাক্ চুপ কর্ তোরা,
ও আমার ঘুমিয়ে পড়েছে!
আবার্ যদি জেগে ওঠে বাছ
কান্না দেখে কান্না পাবে যে!
কত হাসি হেসে গেছে ও,
মুছে গেছে কত অশ্রধার,
হেসে কেঁদে আজ ঘুমোলো,
ওরে তোরা কাঁদাস্নে আর!
কত রাত গিয়েছিল হায়,
বয়েছিল বসন্তের বায়,
পুবের জানালা খানি দিয়ে
চন্দ্রালোক পড়েছিল গায়;
কত রাত গিয়েছিল হায়,
দূর হতে বেজেছিল বাঁশি,
সুরগুলি কেঁদে ফিরেছিল
বিছানার কাছে কাছে আসি!
কত রাত গিয়েছিল হায়
কোলেতে শুকান’ ফুলমালা
নত মুখে উলটি পালটি
চেয়ে চেয়ে কেঁদেছিল বালা!
কতদিন ভোরে, শুকতারা
উঠেছিল ওর আঁখি পরে,
সুমুখের কুসুম কাননে
ফুল ফুটেছিল থরে থরে।
এক্টি ছেলের কোলে নিয়ে
বলেছিল সোহাগের ভাষা,
কারেও বা ভালবেসেছিল,
পেয়েছিল কারো ভালবাসা!
হেসে হেসে গলাগলি করে
থেলেছিল যাহাদের নিয়ে,
আজো তারা ওই খেলা করে,
ওর খেলা গিয়েছে ফুরিয়ে!
সেই রবি উঠেছে সকালে,
ফুটেছে স্বমুখে সেই ফুল,
ও কখন্ খেলাতে খেলাতে
মাঝখানে ঘুমিয়ে আকুল!
শ্রাস্ত দেহ, নিষ্পন্দ নয়ন,
ভুলে গেছে হৃদয় বেদনা।
চুপ করে চেয়ে দেখ ওরে—
থাম’ থাম’ হেস না, কেঁদ না।
শেষ কথা
শেষ কথা।
মনে হয় কি একটি শেষ কথা আছে,
সে কথা হইলে বলা সব বলা হয়!
কল্পনা কাঁদিয়া ফিরে তারি পাছে পাছে,
তারি তরে চেয়ে আছে সমস্ত হৃদয়!
শত গান উঠিতেছে তারি অন্বেষণে,
পাখীর মতন ধায় চরাচরময়।
শত গান মরে গিয়ে, নূতন জীবনে
একটি কথায় চাহে হইতে বিলয়!
সে কথা হইলে বলা নীরব বাঁশরী,
আর বাজাব না বীণা চিরদিন তরে,
সে কথা শুনিতে সবে আছে আশা করি,
মানব এখনো তাই ফিরিছে না ঘরে।
সে কথায় আপনারে পাইব জানিতে,
আপনি কৃতার্থ হব আপন বাণীতে!
শ্রান্তি
শ্রান্তি।
সুখশ্রমে আমি সখি শ্রান্ত অতিশয়;
পড়েছে শিথিল হ’য়ে শিরার বন্ধন।
অসহ্য কোমল ঠেকে কুসুম শয়ন,
কুসুম রেণুর সাথে হয়ে যাই লয়।
স্বপনের জালে যেন পড়েছি জড়ায়ে!
যেন কোন অস্তাচলে সন্ধ্যা-স্বপ্নময়
রবির ছবির মত যেতেছি গড়ায়ে;
সুদূরে মিলিয়া যায় নিখিল-নিলয়।
ডুবিতে ডুবিতে যেন সুখের সাগরে
কোথাও না পাই ঠাঁই, শ্বাসরুদ্ধ হয়,
পরাণ কাঁদিতে থাকে মৃত্তিকার তরে।
এ যে সৌরভের বেড়া, পাষাণের নয়;
কেমনে ভাঙ্গিতে হবে ভাবিয়া না পাই,
অসীম নিদ্রার ভারে পড়ে আছি তাই।
সত্য (১)
সত্য।
(১)
ভয়ে ভয়ে ভ্রমিতেছি মানবের মাঝে
হৃদয়ের আলোটুকু নিবে গেছে বলে;
কে কি বলে তাই শুনে মরিতেছি লাজে,
কি হয় কি হয় ভেবে ভয়ে প্রাণ দোলে!
“আলো” “আলো” খুঁজে মরি পরের নয়নে,
“আলো” “আলো” খুঁজে খুঁজে কাঁদি পথে পথে,
অবশেষে শুয়ে পড়ি ধূলির শয়নে
ভয় হয় এক পদ অগ্রসর হতে!
বজ্রের আলোক দিয়ে ভাঙ্গ অন্ধকার,
হৃদি যদি ভেঙ্গে যায় সেও তবু ভাল,
যে গৃহে জানালা নাই সে ত কারাগার,
ভেঙ্গে ফেল, আসিবেক স্বরগের আলো!
হায় হায় কোথা সেই অখিলের জ্যোতি!
চলিব সরল পথে অশঙ্কিত গতি!
সত্য (২)
সত্য।
(২)
জ্বালায়ে আঁধার শূন্যে কোটি রবি শশি
দাড়ায়ে রয়েছ একা অসীম সুন্দর।
সুগভীর শান্ত নেত্র রয়েছে বিকশি,
চির স্থির শুভ্র হাসি, প্রসন্ন অধর।
আননে আঁধার মরে চরণ পরশি,
লাজ ভয় লাজে ভয়ে মিলাইয়া যায়,
আপন মহিমায় হেরি আপনি হরষি
চরাচর শির তুলি তােমা পানে চায়!
আমার হৃদয় দীপ আঁধার হেথায়,
ধূলি হতে তুলি এরে দাও জ্বালাইয়া,
ওই ধ্রুব তারাখানি রেখেছ যেথায়
সেই গগনের প্রান্তে রাখ ঝুলাইয়া।
চিরদিন জেগে rবে, নিবিবে না আর,
চিরদিন দেখাইবে আঁধারের পার।
সন্ধ্যার বিদায়
সন্ধ্যার বিদায়।
সন্ধ্যা যায়, সন্ধ্যা ফিরে চায়, শিথিল কবরী পড়ে খুলে,—
যেতে যেতে কনক আঁচল বেধে যায় বকুল-কাননে,
চরণের পরশ-রাঙিমা রেখে যায় যমুনার কূলে;—
নীরবে-বিদায়-চাওয়া-চোখে, গ্রন্থি-বাধা রক্তিম দুকূলে
আঁধারের ম্লান-বধু যায় বিষাদের বাসর-শয়নে।
সন্ধ্যাতারা পিছনে দাঁড়ায়ে চেয়ে থাকে আকুল-নয়নে।
যমুনা কাঁদিতে চাহে বুঝি কেনরে কাঁদেনা কণ্ঠ তুলে,
বিস্ফারিত হৃদয় বহিয়া চলে যায় আপনার মনে।
মাঝে মাঝে ঝাউবন হতে গভীর নিশ্বাষ ফেলে ধরা।
সপ্ত ঋষি দাঁড়াইল আসি নন্দনের সুরতরুমূলে,
চেয়ে থাকে পশ্চিমের পথে ভুলে যায় আশীর্বাদ করা’।
নিশীথিনী রহিল জাগিয়া বদন ঢাকিয়া এলোচুলে।
কেহ আর কহিল না কথা, একটিও বহিল না শ্বাস।
আপনার সমাধি মাঝারে নিরাশা নীরবে করে বাস॥
সমুদ্র
সমুদ্র।
কিসের অশান্তি এই মহা পারাবারে!
সতত ছিঁড়িতে চাহে কিসের বন্ধন!
অব্যক্ত অস্ফুটবাণী ব্যক্ত করিবারে
শিশুর মতন সিন্ধু করিছে ক্রন্দন!
যুগযুগান্তর ধরি যোজন যোজন
ফুলিয়া ফুলিয়া উঠে উত্তাল উচ্ছ্বাস;
অশান্ত বিপুল প্রাণ করিছে গর্জ্জন,
নীরবে শুনিছে তাই প্রশান্ত আকাশ।
আছাড়ি চূর্ণিতে চাহে সমগ্র হৃদয়
কঠিন পাষাণময় ধরণীর তীরে,
জোয়ারে সাধিতে চায় আপন প্রলয়,
ভাঁটায় মিলাতে চায় আপনার নীরে!
অন্ধ প্রকৃতির হৃদে মৃত্তিকায় বাঁধা
সতত দুলিছে ওই অশ্রুর পাথার,
উন্মুখী বাসনা পায় পদে পদে বাধা,
কাঁদিয়া ভাসাতে চাহে জগৎ সংসার।
সাগরের কণ্ঠ হতে কেড়ে নিয়ে কথা
সাধ যায় ব্যক্ত করি মানব ভাষায়;
শান্ত করে দিই ওই চির ব্যাকুলতা,
সমুদ্র বায়ুর ওই চির হায় হায়!
একটি সঙ্গীতে মোর দিবস রজনী
ধ্বনিবে পৃথিবী-ঘেরা সঙ্গীতের ধ্বনি!
সাত ভাই চম্পা
সাত ভাই চম্পা।
সাতটি চাঁপা সাতটি গাছে,
সাতটি চাঁপা ভাই।
রাঙ্গা-বসন পারুল দিদি,
তুলনা তার নাই।
সাতটি সোনা চাঁপার মধ্যে
সাতটি সোনা মুখ,
পারুল দিদির কচি মুখটি
কর্ত্তেছে টুক্টুক্!
ঘুমটি ভাঙ্গে পাখির ডাকে
রাতটি যে পোহালো,
ভোরর বেলা চাঁপার পড়ে
চাঁপার মত আলো।
শিশির দিয়ে মুখটি মেজে
মুখখানি বের কোরে,
কি দেখ্চে সাত ভায়েতে
সারা সকাল ধ’রে।
দেখ্চে চেয়ে ফুলের বনে
গোলাপ ফোটে ফোটে,
পাতায় পাতায় খোদ পড়েছে,
চিক্চিকিয়ে ওঠে।
দোলা দিয়ে বাতাস পালায়
দুষ্টু ছেলের মত,
লতায় পাতায় হেলাদোলা
কোলাকুলি কত!
গাছটি কাঁপে নদীর ধারে
ছায়াটি কাঁপে জলে,
ফুলগুলি সব কেঁদে পড়ে
শিউলি গাছের তলে।
ফুলের থেকে মুখ বাড়িয়ে
দেখ্চে ভাই বোন্,
দুখিনী এক মায়ের তরে
আকুল হল মন।
সারাটা দিন কেঁপে কেঁপে
পাতার ঝুরু ঝুরু,
মনের সুখে বনের যেন
বুকের দুরু দুরু!
কেবল শুনি কুলুকুলু
এ কি ঢেউয়ের খেলা!
বনের মধ্যে ডাকে ঘুঘু
সারা দুপুর বেলা।
মৌমাছি সে গুনগুনিয়ে
খুঁজে বেড়ায় কা’কে,
ঘাসের মধ্যে ঝিঁঝিঁ করে
ঝিঁঝিঁ পোক ডাকে।
ফুলের পাতায় মাথা রেখে
শুন্চে ভাই বোন,
মায়ের কথা মনে পড়ে
আকুল করে মন।
মেঘের পানে চেয়ে দেখে
মেঘ চলেছে ভেসে,
পাখীগুলি উড়ে উড়ে
চলেছে কোন্ দেশে!
প্রজাপতির বাড়ি কোথায়
জানে না ত কেউ।
সমস্ত দিন কোথায় চলে
লক্ষ হাজার ঢেউ!
দুপুর বেলা থেকে থেকে
উদাস হল বায়,
শুক্নো পাতা খসে পড়ে
কোথায় উড়ে যায়!
ফুলের মাঝে গালে হাত
দেখ্চে ভাই বোন,
মায়ের কথা পড়চে মনে
কাঁদচে প্রাণমন।
সন্ধে হলে জোনাই জ্বলে
পাতায় পাতায়,
অশথ গাছে দুটি তারা
গাছের মাথায়।
বাতাস বওয়া বন্ধ হল,
স্তব্ধ পাখীর ডাক,
থেকে থেকে করচে কা কা
দুটো একটা কাক!
পশ্চিমেতে ঝিকিমিকি,
পূবে আঁধার করে,
সাতটি ভায়ে গুটিসুটি
চাঁপা ফুলের ঘরে।
“গল্প বল পারুল দিদি”
সাতটি চাঁপা ডাকে,
পাল দিদির গল্প শুনে
মনে পড়ে মাকে।
প্রহর বাজে, রাত হয়েছে,
ঝাঁঝাঁ করে বন,
ফুলের মাঝে ঘুমিয়ে প’ল
আট্টি ভাই বোন।
সাতটি তারা চেয়ে আছে
সাতটি চাঁপার বাগে,
চাঁদের আলো সাতটি ভায়ের
মুখের পরে লাগে।
ফুলের গন্ধ ঘিরে আছে
সাতটি ভায়ের তনু—
কোমল শয্যা কে পেতেছে
সাতটি ফুলের রেণু।
ফুলের মধ্যে সাত ভায়েতে
স্বপন দেখে মাকে;
সকাল বেলা “জাগো জাগো”
পারুল দিদি ডাকে।
সারাবেলা
সারাবেলা।
মিশ্র ভৈরবী। আড়াখেম্টা।
হেলাফেলা সারা বেলা
একি খেলা আপন সনে!
এই বাতাসে ফুলের বাসে
এমুখখানি কার পড়ে মনে!
আঁখির কাছে বেড়ায় ভাসি
কে জানে গাে কাহার হাসি!
দুটি ফোঁটা নয়ন সলিল
এরেখে যায় এই নয়ন-কোণে!
কোন্ ছায়াতে কোন্ উদাসী
দূরে বাজায় অলস বাঁশি,
মনে হয় কার মনের বেদন
কেঁদে বেড়ায় বাঁশির গানে!
সারা দিন গাঁথি গান
কারে চাহে গাহে প্রাণ,
তরুতলের ছায়ার মতন
বসে আছি ফুল বনে।
সিন্ধু গর্ভ
সিন্ধু গর্ভ।
উপরে স্রোতের ভরে ভাসে চরাচর,
নীল সমুদ্রের পরে নৃত্য ক’রে সারা।
কোথা হ’তে ঝরে যেন অনন্ত নির্ঝর
ঝরে আলোকের কণা রবি শশি তারা!
ঝরে প্রাণ, ঝরে গান, ঝরে প্রেমধারা
পূর্ণ করিবারে চায় আকাশ সাগর!
সহসা কে ডুবে যায় জলবিম্ব পারা,
দুয়েকটি আলো রেখা যায় মিলাইয়া,
তখন ভাবিতে বসি কোথায় কিনারা,
কোন্ অতলের পানে ধাই তলাইয়া!
নিম্নে জাগে সিন্ধুগর্ভ স্তব্ধ অন্ধকার।
কোথা নিবে যায় আলো, থেমে যায় গীত,
কোথা চিরদিন তরে অসীম আড়াল!
কোথায় ডুবিয়া গেছে অনন্ত অতীত!
সিন্ধুতীরে
সিন্ধুতীরে।
হেথা নাই ক্ষুদ্র কথা, তুচ্ছ কানাকানি,
ধ্বনিত হতেছে চির-দিবসের বাণী।
চির দিবসের রবি ওঠে অস্ত যায়,
চির দিবসের কবি গাহিছে হেথায়!
ধরণীর চারিদিকে সীমাশূন্য গানে
সিন্ধু শত তটিনীরে করিছে আহ্বান,
হেথায় দেখিলে চেয়ে আপনার পানে
দুই চোখে জল আসে, কেঁদে ওঠে প্রাণ!
শত যুগ হেথা বসে মুখপানে চায়।
বিশাল আকাশে পাই হৃদয়ের সাড়া।
তীব্র বক্র ক্ষুদ্র হাসি পায় যদি ছাড়া
রবির কিরণে এসে মরে সে লজ্জায়!
সবারে আনিতে বুকে বুক বেড়ে যায়,
সবারে করিতে ক্ষমা আপনারে ছাড়া!
স্তন (১)
(১৯৬ )
স্তন।
(১)
নারীর প্রাণের প্রেম মধুর কোমল,
বিকশিত যৌবনের বসন্ত সমীরে
কুসুমিত হয়ে ওই ফুটেছে বাহিরে,
সৌরভ সুধায় করে পরাণ পাগল।
মরমের কোমলতা তরঙ্গ তরল
উথলি উঠেছে যেন হৃদয়ের তীরে!
কি যেন বাঁশীর ডাকে জগতের প্রেমে
বাহিরিয়া আসিতেছে সলাজ হৃদয়,
সহসা আলােতে এসে গেছে যেন থেমে
সরমে মরিতে চায় অঞ্চল আড়ালে।
প্রেমের সঙ্গীত যেন বিকশিয়া রয়,
উঠিছে পড়িছে ধীরে হৃদয়ের তালে!
হেরগাে কমলাসন জননী লক্ষ্মীর―
হের নারী-হৃদয়ের পবিত্র মন্দির।
স্তন (২)
(১৯৭)
স্তন।
(২)
পবিত্র সুমেরু বটে এই সে হেথায়,
দেবতা-বিহার-ভূমি কনক-অচল।
উন্নত সতীর স্তন স্বরগ-প্রভায়
মানবের মর্ত্ত্যভূমি করেছে উজ্জ্বল!
শিশু-রবি হােথা হতে ওঠে সুপ্রভাতে,
শ্রান্ত-রবি সন্ধ্যাবেলা হােথা অস্ত যায়।
দেবতার আঁখিতারা জেগে থাকে রাতে
বিমল পবিত্র দুটী বিজন শিখরে।
চিরস্নেহ-উৎস-ধারে অমৃত নিঝরে
সিক্ত করি তুলিতেছে বিশ্বের অধর!
জাগে সদা সুখ-সুপ্ত ধরণীর পরে,
অসহায় জগতের অমীম নির্ভর।
ধরুণীর মাঝে কি স্বর্গ আছে চুমি,
দেব-শিশু মানবের ঐ মাতৃভূমি।
স্বপ্নরুদ্ধ
স্বপ্নরুদ্ধ।
পারি না করিতে আমি সংসারের কাজ,
লোক মাঝে আঁখি তুলে পারি না চাহিতে!
ভাসায়ে জীবন তরী সাগরের মাঝ
তরঙ্গ লঙ্ঘন করি পারি না বাহিতে!
পুরুষের মত যত মানবের সাথে
যোগ দিতে পারিনাক লয়ে নিজ বল,
সহস্র সঙ্কল্প শুধু ভরা দুই হাতে
বিফলে শুকায় যেন লক্ষ্মণের ফল!
আমি গাঁথি আপনার চারিদিক ঘিরে
সূক্ষ্ম রেশমের জাল কীটের মতন।
মগ্ন থাকি আপনার মধুর তিমিরে,
দেখি না এ জগতের প্রকাণ্ড জীবন!
কেন আমি আপনার অন্তরালে থাকি!
মুদ্রিত পাতার মারে কাঁদে অন্ধ আঁখি।
স্মৃতি
স্মৃতি।
ওই দেহ পানে চেয়ে পড়ে মোর মনে
যেন কত শত পূর্ব্ব জনমের স্মৃতি।
সহস্র হারান’ সুখ আছে ও নয়নে,
জন্ম জন্মান্তের যেন বসন্তের গীতি!
যেন গো আমারি তুমি আত্ম-বিস্মরণ,
অনন্ত কালের মোর সুখ দুঃখ শোক;
কত নব জগতের কুসুম কানন,
কত নব আকাশের চাঁদের আলোক;
কত দিবসের তুমি বিরহের ব্যথা,
কত রজনীর তুমি প্রণয়ের লাজ,
সেই হাসি সেই অশ্রু সেই সব কথা
মধুর মুরতি ধরি দেখা দিল আজ!
তোমার মুখেতে চেয়ে তাই নিশি দিন
জীবন সুদূরে যেন হতেছে বিলীন!
হাসি
হাসি।
সুদূর প্রবাসে আজি কেনরে কি জানি
কেবলি পড়িছে মনে তার হাসিখানি।
কখন্ নামিয়া গেল সন্ধ্যার তপন,
কখন্ থামিয়া গেল সাগরের বাণী!
কোথায় ধরার ধারে বিরহ-বিজন
একটি মাধবী লতা আপন ছায়াতে
দুটি অধরের রাঙা কিশলয়-পাতে
হাসিটি রেখেছে ঢেকে কুঁড়ির মতন!
সারারাত নয়নের সলিল সিঞ্চিয়া
রেখেছে কাহার তরে যতনে সঞ্চিয়া!
সে হাসিটি কে আসিয়া করিবে চয়ন,
লুব্ধ এই জগতের সবারে বঞ্চিয়া!
তখন দুখানি হাসি মরিয়া বাঁচিয়া
তুলিবে অমর করি একটি চুম্বন!
হাসিরাশি
হাসিরাশি।
তার নাম রেখেছি বাব্লা রাণী,
একরত্তি মেয়ে।
হাসিখুসি চাঁদের আলাে
মুখটি আছে ছেয়ে।
ফুটফুটে তার দাঁত ক’থানি
পুটপুটে তার ঠোঁট।
মুখের মধ্যে কথাগুলি সব্
উলােট পালােট্।
কচি কচি হাত দুখানি,
কচি কচি মুঠি,
মুখুনেড়ে কেউ কথা ক’লে
হেসেই কুটি কুটি।
তাই তাই তাই তালি দিয়ে
দুলে-দুলে নড়ে,
চুলগুলি সব কালাে কালাে
মুখ এসে পড়ে।
“চলি— চলি— পা— পা—
টলি টলি যায়,
গরবিণী হেসে হেসে
আড়ে আড়ে চায়।
হাতটি তুলে চুড়ি দু-গাছি
দেখায় যাকে তাকে,
হাসির সঙ্গে নেচে নেচে
নােলক দোলে নাকে।
রাঙা দুটি ঠোঁটের কাছে
মুক্ত’ আছে ফোলে’,
মায়ের চুমােখানি যেন
মুক্ত হয়ে দোলে!
আকাশেতে চাঁদ দেখেছে
দুহাত তুলে চায়,
মায়ের কোলে দুলে দুলে
ডাকে আয়, আয়।
চাঁদের আঁখি জুড়িয়ে গেল
তারমুখেতে চেয়ে,
চাঁদ ভাবে কোথেকে এল
চাঁদের মত মেয়ে!
কটি প্রাণের হাসিখানি
চাঁদের পানে হােটে,
চাঁদের মুখের হাসি, আরাে
বেশী ফুটে ওঠে।
এমন সাধের ডাক শুনে চাঁদ
কেমন ক’রে আছে,
তারাগুলি ফেলে বুঝি
নেমে আসবে কাছে!
সুধা মুখের হাসিখানি
চুরি করে নিয়ে,
রাতারাতি পালিয়ে যাবে
মেঘের আড়াল দিয়ে।
আমরা তারে খুব ধ’রে
রাণীর পাশেতে।
হাসি রাশি বাঁধা মৰে
হাসি রাশিতে।
হৃদয় আকাশ
হৃদয় আকাশ।
আমি ধরা দিয়েছি গো আকাশের পাখী,
নয়নে দেখেছি তব নূতন আকাশ!
দুখানি আঁখির পাতে কি রেখেছ ঢাকি
হাসিলে ফুটিয়া পড়ে উষার আভাস!
হৃদয় উড়িতে চায় হোথায় একাকী
আঁখি-তারকার দেশে করিবারে বাস।
ঐ গগনেতে চেয়ে উঠিয়াছে ডাকি
হোথায় হারাতে চায় এ গীত-উচ্ছাস!
তোমার হৃদয়াকাশ অসীম বিজন—
বিমলা নীলিমা তার শান্ত সুকুমারী,
ঐ শূন্য মাঝে যদি নিয়ে যেতে পারি
আমার দুখানি পাখা কনক বরণ!
হৃদয় চাতক হ’য়ে চাবে অশ্রবারি,
হৃদয় চকোর চাবে হাসির কিরণ!
হৃদয়-আসন
হৃদয়-আসন।
কোমল দুখানি বাহু সরমে লতায়ে
বিকশিত স্তন দুটি আগুলিয়া রয়,
তারি মাঝখানে কিরে রয়েছে লুকায়ে
অতিশয় সযতন গোপন হৃদয়!
সেই নিরালায়, সেই কোমল আসনে,
দুইখানি স্নেহস্ফুট স্তনের ছায়ায়,
কিশোর প্রেমের মৃদু প্রদোষ কিরণে
আনত আঁখির তলে রাখিবে আমায়!
কতনা মধুর আশা ফুটিছে সেথায়—
গভীর নিশীথে কত বিজন কল্পনা,
উদাস নিশ্বাস বায়ু বসন্ত সন্ধ্যায়,
গোপনে চাঁদিনী রাতে দুটি অশ্রু কণা!
তারি মাঝে আমারে কি রাখিবে যতনে
হৃদয়ের সুমধুর স্বপন-শয়নে!
হৃদয়ের ভাষা
হৃদয়ের ভাষা।
হৃদয়, কেন গো মোরে ছলিছ সতত,
আপনার ভাষা তুমি শিখাও আমায়!
প্রত্যহ আকুল কণ্ঠে গাহিতেছি কত,
ভগ্ন বাঁশরীতে শ্বাস করে হায় হায়!
সন্ধ্যাকালে নেমে যায় নীরব তপন
সুনীল আকাশ হতে সুনীল সাগরে।
আমার মনের কথা, প্রাণের স্বপন
ভাসিয়া উঠিছে যেন আকাশের পরে।
ধ্বনিছে সন্ধ্যার মাঝে কার শান্ত বাণী,
ও কিরে আমারি গান? ভাবিতেছি তাই
প্রাণের যে কথাগুলি আমি নাহি জানি,
সে কথা কেমন করে জেনেছে সবাই!
মোর হৃদয়ের গান সকলেই গায়,
গাহিতে পারিনে তাহা আমি শুধু হায়!