ব্যঙ্গকৌতুক
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯৩০
প্রকাশনা-তথ্য
ব্যঙ্গকৌতুক
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিশ্বভারতী-গ্রন্থালয়
২১০ নং কর্ণওয়ালি স্ট্রীট, কলিকাতা।
বিশ্বভারতী-গ্রন্থালয়
২১০ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রকাশ করায়সাহেব শ্রীজগদানন্দ রায়।
ব্যঙ্গকৌতুক
পুনমুদ্রণ ( ১১০০) ফাল্গুন, ১৩৩৭
মূল্য ৷৷৹ আট আনা।
শান্তিনিকেতন প্রেস। শান্তিনিকেতন, (বীরভূম)।
রায়সাহেব শ্রীজগদানন্দ রায় কর্তৃক মুদ্রিত
সূচী
অরসিকের স্বর্গপ্রাপ্তি
অরসিকের স্বর্গপ্রাপ্তি
৺গােকুলনাথ দত্ত। ইন্দ্রলােক।
গোকুলনাথ। (স্বগত) আমি দেখ্চি স্বর্গটি স্বাস্থ্যের পক্ষে দিব্য জায়গা হয়েছে। সে সম্বন্ধে প্রশংসা না ক’রে থাকা যায় না। অনেক উচ্চে থাকার দরুণ অক্সিজেন্ বাষ্পটি বেশ বিশুদ্ধ পাওয়া যায়, এবং রাত্রিকাল না থাকাতে নন্দনবনের তরুলতাগুলি কার্ব্বনিক অ্যাসিড্ গ্যাস পরিত্যাগ করবার সময় পায় না, হাওয়াটি বেশ পরিষ্কার। এদিকে ধূলো নেই, তা’তে ক’রে একেবারে রােগের বীজই নষ্ট হ’য়েছে। কিন্তু এখানে বিদ্যাচর্চার যে রকম অবহেলা দেখ্চি তা’তে আমি সন্দেহ করি ধূলােয় রােগের বীজ উড়ে বেড়ায় এ সংবাদ এখনো এঁদের কানে এসে পৌঁছেচে কি না। এঁরা সেই যে এক সামবেদের গাথা নিয়ে প’ড়েছেন এর বেশি আর ইণ্টেলেকচুয়াল মুভ্মেণ্ট্ অগ্রসর হলো না। পৃথিবী দ্রুতবেগে চ’ল্চে কিন্তু স্বর্গ যেমন ছিল তেমনিই র’য়েচে, কন্সার্ভেটিভ্ যতােদূর হ’তে হয়!
(বৃহস্পতির প্রতি) আচ্ছা, পণ্ডিত মশায়, ঐ যে সামবেদের গান হ’চ্চে, আপনারা তাে ব’সে ব’সে মুগ্ধ হ’য়ে শুন্চেন, কিন্তু কোন্ সময়ে
ওর প্রথম রচনা হয় তা’র কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ সংগ্রহ ক’র্তে পেরেচেন কি?—কী ব’ল্লেন? স্বর্গে আপনাদের ইতিহাস নেই? আপনাদের সমস্তই নিত্য?—সুখের বিষয়! সুরবালকদের তারিখ মুখস্ত ক’র্তে হয় না—কিন্তু বিদ্যাচর্চা ওতে করে কি অনেকটা অসম্পূর্ণ থাকে না? ইতিহাস শিক্ষার উপযােগিতা চার প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত করা যেতে পারে।— প্রথম, ক—
মনােযােগ দিচ্ছেন কি?— (স্বগত) গান শুন্তে মত্ত তা’র আর মন দেবে কী ক’রে? পৃথিবী ছেড়ে অবধি এঁদের কাউকে যদি একটা কথা শােনাতে পেরে থাকি! শুন্চে কি না শুন্চে মুখ দেখে কিছু বােঝ্বার জো নেই—একটা কথা ব’ল্লে কেউ তা’র প্রতিবাদ করে না, এবং কারাে কথার কোনো প্রতিবাদ ক’র্লে তা’র একটা জবাব পাওয়াই যায় না। শুনেচি এইখানেই আমাকে সাড়ে পাঁচ কোটি সাড়ে পনর লক্ষ বৎসর কাটাতে হবে। তা হ’লেই তো গেচি! আত্মহত্যা ক’রে যে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে সে সুবিধাও নেই—এখানকার সাপ্তাহিক মৃত্যু তালিকা অন্বেষণ কর্তে গিয়ে শুন্লুম এখানে মৃত্যু নেই। অশ্বিনীকুমার নামক দুই বৈদ্য যে পদটি পেয়েচেন ওঁদের যদি বাঁধা খােরাক বরাদ্দ না থাক্তো তা হ’লে সমস্ত স্বর্গ ঝেটিয়ে এক পয়সা ভিজিট জুট্তো না। তবে কী ক’র্তে যে ওঁরা এখানে আছেন তা আমাদের মানুষের বুদ্ধিতে বুঝ্তে পারিনে। কাউকে তাে খরচের হিসাব দিতে হয় না, যার যা খুসি তাই হ’চ্চে। থাক্তো একটা ম্যুনিসিপ্যালিটি,এবং নিয়মমত কাজ হ’তো তা হ’লে আমিই তো সর্ব্বাগ্রে ঐ দুইটি হেল্থ অফিসারের পদ উঠিয়ে দেবার জন্যে ল’ড়্তুম। এই যে রােজ সভার মধ্যে অমৃত ছড়াছড়ি যাচ্ছে, তা’র একটা হিসেব কোথাও আছে? সেদিন তাে শচীঠাক্রুণকে স্পষ্টই মুখের উপর জিজ্ঞাসা ক’র্লুম, স্বর্গের সমস্ত ভাঁড়ার তাে আপনার জিম্মায় আছে— পাকা খাতায় হােক খসড়ায় হোক তা’র কোনাে একটা হিসাব রাখেন কী —হাতচিঠা, কি রসিদ, কি কোনাে রকমের একটা নিদর্শন রাখা হয়? শচীঠাক্রুণ বােধ করি মনে মনে রাগ ক’র্লেন—স্বর্গ সৃষ্টি হ’য়ে অবধি এ রকম প্রশ্ন তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসা করে নি। যা পাব্লিকের জিনিষ তা’র একটা রীতিমত জবাবদিহি থাকা চাই, সে বােধটা এদের কারো দেখ্তে পাইনে। অজস্র আছে ব’লেই কি অজস্র খরচ ক’র্তে হবে? যদি আমাকে বেশি দিন এখানে থাক্তেই হয় তা হলে স্বর্গের সমস্ত বন্দোবস্ত আগাগােড়া রিফর্ম্ম না ক’রে আমি ন’ড়চিনে। আমি দেখ্চি, গােড়ায় দরকার অ্যাজিটেশন্—ঐ জিনিষটা স্বর্গে একেবারেই নেই— সব, দেবতাই বেশ সন্তুষ্ট হ’য়ে ব’সে আছেন। এঁদের এই তেত্রিশকোটিকে একবার রীতিমত বিচলিত ক’রে তুল্তে পার্লে কিছু কাজ হয়। এখানকার লােকসংখ্যা দেখেই আমার মনে হ’য়েছিলাে এখানে একটি বড়ো রকমের দৈনিক কিম্বা সাপ্তাহিক খবরের কাগজ বেশ চালানো যেতে পারে। আমি যদি সম্পাদক হই, তা হ’লে আর দুটি উপযুক্ত সাবএডিটার পেলেই কাজ আরম্ভ ক’রে দিতে পারি। প্রথমত নারদকে দিয়ে খুব এক চোট্ বিজ্ঞাপন বিলি ক’র্তে হয়। তা’র পরে বিষ্ণুলােক ব্রহ্মলােক চন্দ্রলােক সূর্য্যলােকে গুটিকতক নিয়মিত সংবাদদাতা নিযুক্ত ক’র্তে হয়—আহা, এই কাজটি যদি আমি ক’রে যেতে পারি তা হ’লে স্বর্গের এ চেহারা আর থাকে না। যাঁরা সব দেবতাদের ঘুষ দিয়ে দিয়ে স্বর্গে আসেন, প্রতি সংখ্যায় তাঁদের যদি একটি করে সংক্ষেপ মর্ত্যজীবনী বের ক’র্তে পারি তা হ’লে আমাদের স্বর্গীয় মহাত্মাদের মধ্যে একটা সেন্সেশন্ প’ড়ে যায়!—একবার ইন্দ্রের কাছে আমার প্রস্তাবগুলাে পেড়ে দেখ্তে হবে!
(ইন্দ্রের নিকট গিয়া) দেখুন মহেন্দ্র, আপনার সঙ্গে আমার গােপনে কিছু (অপ্সরাগণকে দেখিয়া) ও! আমি জান্তুম না এঁরা সব এখানে আছেন—মাপ ক’র্বেন—আমি যাচ্ছি!—এ কি, শচীঠাক্রুণও যে ব’সে আছেন! আর ঐ বুড়ো বুড়ো রাজষি দেবর্ষিগুলােই বা এখানে ব’সে কী দেখ্চে? দেখুন মহেন্দ্র, স্বর্গে স্বায়ত্ত শাসন প্রথা প্রচলিত করেন নি ব’লে এখানকার কাজকর্ম তেমন ভালো রকম ক’রে চ’ল্চে না। আপনি যদি কিছুকাল এই সমস্ত নাচ বাজনা বন্ধ ক’রে দিয়ে আমার সঙ্গে আসেন তা হ’লে আমি আপনাকে হাতে হাতে দেখিয়ে দিতে পারি এখানকার কোনো কাজেরই বিলি ব্যবস্থা নেই। কার ইচ্ছায় কী ক’রে যে কী হ’চ্চে কিছুই দন্তস্ফুট কর্বার জো নেই। কাজ এমনতর পরিষ্কার ভাবে হওয়া উচিত, যে, যন্ত্রের মতো চ’ল্বে এবং চোখ বুলিয়ে দেখ্বামাত্রই বােঝা যাবে। আমি সমস্ত নিয়ম নম্বরওয়ারি ক’রে লিখে নিয়ে এসেচি—আপনার সহস্র চক্ষুর মধ্যে একজোড়া চোখও যদি এদিকে ফেরান্ তা হ’লে—আচ্ছা তবে এখন থাক্, আপনাদের গান বাজ্নাগুলো না হয় হ’য়ে যাক্ তা’র পরে দেখা যাবে।
(ভরত ঋষির প্রতি) আচ্ছা অধিকারী মশায়, শুনেচি গান বাজনায় আপনি ওস্তাদ, একটি প্রশ্ন আপনার কাছে আছে। গানের সম্বন্ধে যে ক-টি প্রধান অঙ্গ আছে অর্থাৎ সপ্ত সুর, তিনগ্রাম, একুশ মূর্চ্ছনা—কী বল্লেন? আপনারা এ সমস্ত মানেন না—আপনারা কেবল আনন্দটুকু জানেন! তাইতো দেখ্চি—এবং যতাে দেখ্চি ততো অবাক হ’য়ে যাচ্চি। (কিয়ৎক্ষণ শুনিয়া) ভরতঠাকুর ঐ যে ভদ্র মহিলাটি—কী ওঁর নাম—রম্ভা? উপাধি কী বলুন? উপাধি বুঝ্চেন না? এই যেমন রম্ভা চাটুয্যে কি রম্ভা ভট্টাচার্য্য—কিম্বা ক্ষত্রিয় যদি হন তাে রম্ভা সিংহ —এখানে আপনাদের ও সব কিছু নেই বুঝি?—আচ্ছা বেশ কথা—তা শ্রীমতী রম্ভা যে গানটি গাইলেন আপনারা তো তা’র যথেষ্ট প্রশংসা কর্লেন—কিন্তু ওর রাগিণীটি আমাকে অনুগ্রহ ক’রে ব’লে দেবেন? একবার তাে দেখ্চি ধৈবত লাগ্চে আবার দেখি কোমল ধৈবতও লাগে —আবার গােড়ার দিকে-ওঃ, বুঝেচি আপনাদের কেবল ভালােই লাগে, কিন্তু ভালো লাগ্বার কোনো নিয়ম নেই। আমাদের ঠিক তা’র উল্টো, ভালাে না লাগ্তে পারে কিন্তু নিয়মটা থাক্বেই। আপনাদের স্বর্গে যেটি আবশ্যক সেটি নেই, যেটা না হ’লেও চলে তা’র অনেক বাহুল্য। সমস্ত সপ্তস্বর্গ খুঁজে কায়ক্লেশে যদি আধখানা নিয়ম পাওয়া যায় তো তখনি তা’র হাজারখানা ব্যতিক্রম বেরিয়ে পড়ে। সকল বিষয়েই তাই দেখ্চি। ঐ দেখুন না ষড়ানন ব’সে আছেন—ওঁর ছ-টার মধ্যে পাঁচটা মুণ্ডুর কোনােই অর্থ পাবার জো নেই। শরীরতত্ত্বের কখও যে জানে সে-ও ব’লে দিতে পারে একটা স্কন্ধের উপরে ছ-টা মুণ্ড নিতান্তই বাহুল্য!-হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! ওঁর ছয় মাতার স্তন পান ক’র্তে ওঁকে ছ-টা মুণ্ড ধারণ ক’র্তে হ’য়েছিলো? ওটা হ’লো মাইথলজি আমি ফিজিয়লজির কথা ব’ল্ছিলুম। ছ-টা যেন মুণ্ডই ধারণ ক’র্লেন— পাকযন্ত্র তাে একটার বেশি ছিল না।—এই দেখুন না, আপনাদের স্বর্গের বন্দোবস্তটা। আপনার শরীর থেকে ছায়াটাকে বাদ দিয়ে দিয়েচেন—কিন্তু সেটা আপনাদের কী অপরাধ ক’রেছিলো? আপনারা স্বর্গের লােক—ব’ল্লে হয়তাে বিশ্বাস করেন না, আমি জন্মকাল থেকে মৃত্যুকাল পর্য্যন্ত ঐ ছায়াটাকে কখনো পশ্চাতে, কখনো সম্মুখে, কখনো দক্ষিণে, কখনো বামে সঙ্গে ক’রে নিয়ে কাটিয়েচি, ওটাকে পুষতে একদিনের জন্যে শিকিপয়সা খরচ ক’র্তে হয়নি এবং অত্যন্ত শ্রান্তির সময়ও বহন ক’র্তে এক তিল ভার বােধ করিনি—ওটাকে আপনারা ছেঁচে দিলেন, কিন্তু ছ-টা মুণ্ড, চারটে হাত, হাজারটা চোখ, এতে খরচও আছে, ভারও আছে—অথচ সেটা সম্বন্ধে একটু ইকনমি কর্বার দিকে নজর নেই। ছায়ার বেলাই টানাটানি কিন্তু কায়ার বেলা মুক্তহস্ত!— সাধুবাদ দিচ্চেন? দেবতাদের মধ্যে আপনিই তা হ’লে আমার কথাটা বুঝেচেন! সাধুবাদ আমাকে দিচ্চেন না? শ্রীমতী রম্ভাকে দিচ্চেন? ওঃ! তা হ’লে আপনি বসুন,আমি কার্তিকের সঙ্গে আলাপ ক’রে আসি।
(কার্ত্তিকের পার্শ্বে বসিয়া) গুহ, আপনি ভালো আছেন তো? আপনাদের এখানকার মিলিটারি ডিপার্টমেণ্ট সম্বন্ধে আমার দুটো একটা খবর নেবার আছে। আপনারা কী রকম নিয়মে—আচ্ছা তা হ’লে এখন থাক্ আগে আপনাদের অভিনয়টা হ’য়ে যাক্? কেবল একটা কথা জিজ্ঞাসা করি—এই যে নাটকটি অভিনয় হ’চ্চে এর নাম তো শুন্চি, চিত্রলেখার বিরহ— এর উদ্দেশ্যটা কী আমাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। উদ্দেশ্য দু-রকমের হ’তে পারে, এক জ্ঞানশিক্ষা, আর এক নীতিশিক্ষা। কবি, হয়, এই গ্রন্থের মধ্যে কোনো একটা জাগতিক নিয়ম আমাদের সহজে বুঝিয়ে দিয়েচেন, নয় স্পষ্ট ক’রে দেখিয়ে দিয়েচেন যে, ভালো ক’র্লে ভালো হয়, মন্দ ক’র্লে মন্দই হ’য়ে থাকে। ভেবে দেখুন, বিবর্ত্তনবাদের নিয়ম অনুসারে পরমাণুপুঞ্জ কী রকম ক’রে ক্রমে ক্রমে বিচিত্র জগতে পরিণত হ’লো—কিম্বা আমাদের ইচ্ছাশক্তি যে অংশে পূর্ব্ববর্তী কর্ম্মের ফল সেই অংশে বদ্ধ এবং যে অংশে পরবর্ত্তী কর্ম্মকে জন্ম দেয় সেই অংশে মুক্ত এই চিরস্থায়ী বিরোধের সামঞ্জস্য কোন্খানে —কাব্যে যখন সেই তত্ত্ব পরিস্ফুট হয় তখন কাব্যের উদ্দেশ্যটি হাতে হাতে পাওয়া যায়! চিত্রলেখার বিরহের মধ্যে এর কোন্টি আছে? আপনি তো বিগলিত প্রায় হ’য়ে এসেচেন; যে রকম দেখচি দেবলোকে যদি ফিজিয়লজির নিয়ম ব’লে একটা কিছু থাক্তো তা হ’লে এখনি আপনার দ্বাদশ চক্ষু থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হ’তো! যাই হোক কার্ত্তিক, এ বড়ো দুঃখের বিষয় স্বর্গে আপনাদের রাশি রাশি কাব্য নাটকের ছড়াছড়ি যাচ্চে কিন্তু যাতে গবেষণা কিম্বা চিন্তাশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় স্বর্গীয় গ্রন্থকারদের হাত থেকে এমন একটা কিছুই বেরোচ্চে না। (ঈষৎ হাস্যসহকারে) দেখচি “চিত্রলেখার বিরহ” নাটকখানা আপনার বড়োই ভালো লেগে গেচে, তা হলে অন্য প্রসঙ্গ থাক্ আপনি ঐটেই দেখুন!
(ইন্দ্রের নিকট গিয়া দেখুন দেবরাজ, স্বর্গে পরস্পরের মতামত আলােচনার একটা স্থান না থাকাতে বড়ােই অভাব বােধ করা যায়। আমার ইচ্ছা, নন্দনকাননের পারিজাতকুঞ্জের মধ্যে যেখানে আপনাদের নৃত্যশালা আছে সেইখানে একটা সভাস্থাপন করি, তা’র নাম দিই, শতক্রতু ডিবেটিংক্লব। তা’তে আপনারও একটা নাম থাক্বে আর স্বর্গেরও অনেক উপকার হবে! না, থাক্, মাপ ক’র্বেন— আমার অভ্যাস নেই—আমি অমৃত খাইনে—রাগ যদি না করেন তো বলি ও অভ্যাসটা আপনাদের ত্যাগ করা উচিত—আমি দেখেচি দেবতাদের মধ্যে পানদোযটা কিছু প্রবল হ’য়েছে। অবশ্য ওটাকে আপনারা সুরা বলেন না, কিন্তু ব’ল্লে কিছু অত্যুক্তি হয় না। পৃথিবীতেও দেখ্তুম অনেকে মদকে ওয়াইন্ বলে কিছু সন্তোষলাভ ক’র্তেন। সুরেন্দ্র, আপনি শ্রীমতী মেনকাকে এই মাত্র যে সম্বােধনটা ক’র্লেন ওটা কি ভালাে শুন্তে হ’লাে? সংস্কৃত কাব্যে নাটকে দেখেচি বটে ঐ সকল সম্বোধন প্রচলিত ছিল, কিন্তু আপনি যদি বিশ্বস্ত সূত্রে খবর নেন তো জান্তে পার্বেন, ওগুলাে এখন নিন্দনীয় ব’লে গণ্য হ’য়েছে! আমরা কী রকম সম্বােধন করি জান্তে চাচ্চেন? আমরা কখনো মাতৃসম্বােধনও ক’রে থাকি কখনাে বা বাছাও বলি—আবার সময়রিশেষে ভালােমানুষের মেয়ে ব’লেও সম্ভাষণ করা যেতে পারে। এর মধ্যে কোনােটিই আপনি এই সকল মহিলাদের প্রতি প্রয়ােগ ক’র্তে ইচ্ছা করেন না? তা না করুন এটা স্বীকার ক’র্তেই হবে আপনারা ওঁদের সম্বন্ধে যে বিশেষণগুলি উচ্চারণ ক’রে থাকেন, তা’তে রুচির পরিচয় পাওয়া যায় না। কী ব’ল্লেন? স্বর্গে সুরুচিও নেই কুরুচিও নেই? প্রথমটি যে নেই সে বিষয়ে সন্দেহ করিনে—দ্বিতীয়টি যে আছে তা এখনি প্রমাণ ক’রে দিতে পারি কিন্তু আপনারা তাে আমার কোনাে আলোচনাতেই কর্ণপাত করেন না।
(শচীর নিকট গিয়া) দেখুন শচি, আপনার কি মনে হয় না, স্বর্গসমাজের ভিতরে যে সমস্ত দোষ প্রবেশ ক’রেচে সেগুলাে দূর কর্বার জন্যে আমাদের বদ্ধপরিকর হওয়া উচিত। আপনারা স্বর্গাঙ্গনারাও যদি এ সকল বিষয়ে শৈথিল্য প্রকাশ ক’র্তে থাকেন তা হ’লে আপনাদের স্বামীদের চরিত্রের অবস্থা ক্রমশই শােচনীয় হ’তে থাক্বে। ওঁদের সম্বন্ধে যে সকল অপযশের কথা প্রচলিত আছে সে আপনাদের অবিদিত নেই— মধ্যে মধ্যে যদি সভা আহ্বান ক’রে এ সকল বিষয়ে আলােচনা হয়—আপনারা যদি সাহায্য করেন তা হ’লে— কোথায় যান? গৃহকর্ম্ম আছে বুঝি? (শচীকে উঠিতে দেখিয়া সকল দেবতার উত্থান এবং অকালে সভাভঙ্গ)। মহা মুস্কিলে পড়া গেল—কাউকে একটা কথা ব’ল্লে কেউ শােনেও না—বুঝ্তেও পারে না; (ইন্দ্রের নিকট গিয়া কাতর স্বরে) ভগবন্ সহস্রলােচন শতক্রতো, আমার সাড়ে পাঁচ কোটি সাড়ে পনর লক্ষ বৎসরের মধ্যে আর কতো দিন বাকি আছে?
ইন্দ্র। (কাতর স্বরে) সাড়ে পাঁচকোটি পনরলক্ষ উনপঞ্চাশ হাজার নয় শ নিরেনব্বই বৎসর।
(গােকুলনাথ এবং তেত্রিশকোটি দেবতার এক সঙ্গে সুগভীর দীর্ঘ নিশ্বাস পতন)
কথামালার নূতন-প্রকাশিত গল্প
কথামালার নূতন-প্রকাশিত গল্প
একদা কয়েকজন কাঠুরিয়া এক পার্ব্বত্য সরল বৃক্ষের শাখাচ্ছেদনে মনোেযােগী হইয়াছিল। শ্রম লাঘব করিবার অভিপ্রায়ে বিস্তর পরামর্শ পূর্ব্বক তাহারা এক নূতন কৌশল অবলম্বন করিল। যে শাখা ছেদনের আবশ্যক, কয়েকজনে মিলিয়া তাহারই উপর চড়িয়া বসিল এবং নিভৃতে বসিয়া সতর্কতার সহিত অস্ত্রচালনা করতে লাগিল।
যথাসময়ে শাখা ছিন্ন হইয়া পড়িল, এবং কাঠুরিয়া কয়েকটিও তৎসঙ্গে ভূতলে পড়িয়া পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল।
কাঠুরিয়ার সর্দ্দার এই সংবাদ শ্রবণে অধীর হইয়া সেই তরু সমীপে উপস্থিত হইল এবং কুঠার আস্ফালন করিয়া কহিল, “তুমি যে অপরাধ করিয়াছ আমি তাহার বিচার করিতে চাহি।”
বনস্পতি সাতিশয় বিস্মিত হইয়া কহিল, “হে জনপুঙ্গব! আমার
স্কন্ধের উপর আরােহণ করিয়া আমারি শাখাচ্ছেদন করিয়াছ, এক্ষণে কে কাহার বিচার করিবে?”
মানব আরক্তলোচনে কহিল, “আমার কয়েকজন কাঠুরিয়া যে অকালে কালগ্রাসে পতিত হইল, তাহার জন্য কেহই দণ্ড পাইবে না, এ কখনো হইতে পারে না।”
বনস্পতি ভীত হইয়া কম্পিত মর্ম্মর স্বরে কহিল, “প্রভু, তাঁহারা সুবুদ্ধি সহকারে মানব চাতুরী অবলম্বন করিয়া যেরূপ কাণ্ড করিয়াছিলেন, আশ্চর্য্য কার্য্যনৈপুণ্যবশত অবিলম্বেই তাহার ফললাভ করিয়াছেন, আমি মূঢ় বৃক্ষ, তাহার প্রতিবিধান করি এমন সাধ্য ছিল না।”
মানব কহিল, “কিন্তু তােমারি শাখা ভাঙিয়া পড়িয়াছিল, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।”
বনস্পতি কহিল, “সে কথা যথার্থ, কারণ আমারি শাখায় তাঁহারা কুঠারাঘাত করিয়াছিলেন এবং প্রকৃতির নিয়ম অনিবার্য্য।”
মানব সুযুক্তি সহকারে কহিল, “অতএব তােমাকেই দণ্ড স্বীকার করিতে হইবে। তােমার যাহা কিছু বক্তব্য আছে বলিতে থাকো আমি এক্ষণে কুঠারে শাণ দিতে চলিলাম।”
তাৎপর্য্য।—অনবধানবশত যদি হুঁচট খাইয়া থাক, চৌকাঠকে পদাঘাত করিবে। সেই জড় পদার্থের পক্ষে এই একমাত্র সুবিচার।
১২৯৮।
ডেঞে পিঁপ্ড়ের মন্তব্য
ডেঞে পিঁপ্ড়ের মন্তব্য
দেখো দেখো, পিঁপ্ড়ে দেখো! ক্ষুদে ক্ষুদে রাঙা রাঙা সরু সরু সব আনাগোনা করিতেছে—ওর সব পিঁপ্ড়ে যা’কে সংস্কৃত ভাষায় বলে পিপীলিকা। আমি হচ্চি ডেঞে, সমুচ্চ ডাঁইবংশসম্ভূত, ঐ পিঁপ্ড়েগুলোকে দেখলে আমার অত্যন্ত হাসি আসে!
হা হা হা, রকম দেখো, চল্চে দেখো, যেন ধূলোর সঙ্গে মিশিয়ে গেচে; আমি যখন দাঁড়াই তখন আমার মাথ আকাশে ঠেকে; সূর্য্য যদি মিছ্রির টুক্রে। হ’তো আমার মনে হয় আমি দাঁড়া বাড়িয়ে ভেঙে ভেঙে এনে আমার বাসায় জমিয়ে রাখ্তে পারতুম। উঃ, আমি এতো বড়ো একটা খড় এতোখানি রাস্তা টেনে এনেচি, আর ওরা দেখে কী ক’রচে—একটা মরা ফড়িং নিয়ে তিন জনে মিলে টানাটানি ক’রচে! আমাদের মধ্যে এতো ভয়ানক তফাৎ! সত্যি ব’ল্চি আমার দেখতে ভারি মজা লাগে!
আমার পা দেখো আর ওদের পা দেখো—যতোদূর চেয়ে দেখি আমার পায়ের আর অন্ত দেখিনে—এতো বড়ো পা। পদ-মর্য্যাদা এর চেয়ে আর কী আশা করা যেতে পারে! কিন্তু পিঁপ্ড়েরা আপনাদের ক্ষুদে ক্ষুদে প। নিয়েই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট আছে! দেখে আশ্চর্য্য বোধ হয়! হাজার হোক, পিঁপ্ড়ে কি না!
ওরা একে ক্ষুদ্র,তাতে আবার আমি বিস্তর উঁচু থেকে দেখি—ওদের সবটা আমার নজরে আসে না্। কিন্তু আমি আমার অতি দীর্ঘ ছ’পায়ের উপরে দাঁড়িয়ে কটাক্ষে দৃকপাত ক’রে আন্দাজে ওদের আগাগোড়াই বুঝে নিয়েচি। কারণ পিঁপ্ড়ে এতো ক্ষুদ্র যে ওদের দেখে ফেল্তে অধিকক্ষণ লাগে না। পিঁপ্ড়েজাতি সম্বন্ধে আমি ডাঁই ভাষায় একটা কেতাব লিখ্বো এবং বক্তৃতাও দেবো।
পিঁপ্ড়ে সমাজ সম্বন্ধে আমার বিস্তর অনুমানলব্ধ অভিজ্ঞতা আছে। ডেঞেদের সন্তানস্নেহ আছে অতএব পিঁপ্ড়েদের তা কখনই থাক্তে পারে না, কারণ তারা পিঁপ্ড়ে, কেবলমাত্র পিঁপ্ড়ে, পিঁপ্ড়ে ব্যতীত আর কিছুই নয়। শােনা যায়, পিঁপড়েরা মাটিতে বাসা বানাতে পারে―স্পষ্টই বােধ হ’চ্চে তা’রা ডেঞে জাতির কাছে থেকে স্থপতি বিদ্যা শিক্ষা ক’রেচে—কারণ তারা পিঁপ্ড়ে—সামান্য পিঁপ্ড়ে, সংস্কৃত ভাষায় যাকে বলে পিপীলিকা।
পিঁপ্ড়েদের দেখে আমার অত্যন্ত মায়া হয়—ওদের উপকার করবার প্রবৃত্তি আমার অত্যন্ত বলবর্তী হ’য়ে উঠে। এমন কি আমার ইচ্ছা করে, সভ্য ডেঞেসমাজ কিছুদিনের জন্য ছেড়ে, দলকে-দল ডেঞে ভ্রাতৃবৃন্দকে নিয়ে পিঁপ্ড়েদের বাসার মধ্যে বাসস্থাপন করি এবং পিঁপ্ড়েসংস্কার কার্য্যে ব্রতী হই—এতদূর পর্যন্ত ত্যাগস্বীকার কর্ত্তে আমি প্রস্তুত আছি। তাদের শর্করকণা গলাধঃকরণ ক’রে এবং তাদের বিবরের মধ্যে হাত পা ছড়িয়ে কোনােক্রমে আমরা জীবনযাপন ক’র্তে রাজি আছি, যদি এতেও তা’রা কিছুমাত্র উন্নত হয়!
তা’রা উন্নতি চায় না—তা’রা নিজের শর্করা নিজে খেতে এবং নিজের বিবরে নিজে বাস ক’র্তে চায়—তা’র কারণ, তা’রা পিঁপ্ড়ে, নিতান্তই পিঁপড়ে! কিন্তু আমরা যখন ডেঞে, তখন আমরা তাদের উন্নতি দেবােই, এবং তাদের শর্করা আমরা খাবো ও তাদের বিবরে আমরা বাস ক’র্বো! আমরা এবং আমাদের ভাইপাে, ভাগ্নে, ভাইঝি ও শ্যালকবৃন্দ।
যদি জিজ্ঞাসা কর তাদের শর্করা আমরা কেন খাবো এবং তাদের বিবরে কেন বাস ক’র্বো। তবে তা’র প্রধান কারণ এই দেখাতে পারি যে তা’রা পিঁপড়ে এবং আমরা ডেঞে। দ্বিতীয়, আমরা নিঃস্বার্থ ভাবে পিঁপড়েদের উন্নতিসাধনে ব্রতী হ’য়েচি, অতএব আমরা তাদের শর্করা খাবো। এবং বিবরেও বাস ক’র্বো। তৃতীয়, আমাদের প্রিয় ডাঁই ভূমি ত্যাগ ক’রে আস্তে হবে, সেইজন্য সেই দুঃখ-নিবারণের জন্য শর্করা কিছু অধিক পরিমাণে খাওয়া আবশ্যক। চতুর্থ, বিদেশে বিজাতির মধ্যে বিচরণ ক’র্তে হবে, নানা রোগ হ’তে পারে—তা’হলে বোধ করি, আমরা বেশি দিন বাঁচ্বো না—হায় আমাদের কী শোচনীয় অবস্থা! অতএব শর্করা পেতেই হবে, এবং বিবরেও যতটা স্থান আছে সমস্ত আমরা এবং আমাদের শ্যালকেরা মিলে ভাগাভাগি ক’রে নেবো।
পিঁপড়েরা যদি আপত্তি করে—তবে তাদের ব’ল্বো অকৃতজ্ঞ। যদি তা’রা শর্করা খেতে এবং বিবরে স্থান পেতে চায় তবে ডাঁই ভাষায় তাদের স্পষ্ট ব’ল্বো তোমরা পিঁপড়ে, ক্ষুদ্র, তোমরা পিপীলিকা। চেয়ে আর প্রবল যুক্তি কী আছে!
তবে পিঁপড়েরা খাবে কী? তা জানিনে। হয়তো আহার এবং বাসস্থানের অকুলান হ’তেও পারে, কিন্তু এটা তাদের ধৈর্য্য ধ’রে বিবেচনা করা উচিত যে, আমাদের দীর্ঘপদস্পর্শে ক্রমে তাদের পদবৃদ্ধি হবার সম্ভাবনা আছে। শৃঙ্খলা এবং শান্তির কিছুমাত্র অভাব থাক্বে না। তা’রা ক্রমিক উন্নতি লাভ করুক্ এবং আমরা ক্রমিক শর্করা খাই, এম্নি এক্টা বন্দোবস্ত থাক্লে তবেই শৃঙ্খলা এবং শান্তিরক্ষা হবে, না হ’লে তুমুল বিবাদের আটক কী? মাথায় গুরুভার প’ড়লে এতোই বিবেচনা ক’রে চল্তে হয়!
শর্করাভাবে এবং অতিরিক্ত শান্তি ও শৃঙ্খলার ভারে যদি পিঁপড়েজাতি মারা পড়ে? তা হলে আমরা অন্যত্র উন্নতি প্রচার কর্তে যাবো—কারণ আমরা ডেঞে জাতি; উচ্চ পদের প্রভাবে অত্যন্ত উন্নত।
নূতন অবতার
নূতন অবতার
প্রথম অঙ্ক
নন্দকৃষ্ণ মুখােপাধ্যায়
(স্বগত) তুমি রুদ্দুর বক্শি ব্রাহ্মণের ব্রহ্মোত্তর পুষ্করিণীটি কেড়ে নিয়ে খিড়কির পুকুর ক’রেচো! আচ্ছা দেখা যাবে তুমি ভােগ করো কেমন ক’রে! ঐ পুকুরে দু-বেলা ছত্রিশ জাতকে স্নান করাবো। তবে
আমি ব্রাহ্মণের ছেলে! (সমাগত প্রতিবেশিবর্গের প্রতি) তা, তােমরা তো সব শুনেচো দেখ্চি! সে স্বপ্নের কথা মনে হ’লে এখনো গা শিউরে উঠে। ভাই, উপ্রি উপ্রি তিন রাত্তির স্বপ্ন দেখ্লুম— মা গঙ্গা মকরের উপর চ’ড়ে আমার শিয়রের কাছে এসে বল্লেন, ওরে বেটা নন্দ, তাের কুবুদ্ধি ধ’রেছিলো তাই তুই রুদ্দুর বক্শির সঙ্গে পুষ্করিণী নিয়ে মামলা ক’র্তে গিয়েছিলি! রুদ্দুর বক্শি কে তা জানিস্? সত্য যুগে যে ছিল ভগীরথ সেই আজ বক্শির ঘরে আবির্ভাব ক’রেচে। হুগ্লি পুলের উপর দিয়ে যেদিন থেকে গাড়ি চ’লেচে সেই দিন থেকে আমিও তােদের ঐ পুষ্করিণীতে এসে অধিষ্ঠান ক’রেচি।—তখন আমার মনে হ’লো, ওরে বাপ রে! কী কাণ্ডই ক’রেচি। যিনি স্বয়ং কলিযুগের ভগীরথ তাঁরই সঙ্গে কি না গঙ্গার দখল নিয়ে আদালতে মকদ্দমা! এমন পাপও করে! এখন বুঝ্তে পারচি মকদ্দমায় কেন হার হ’লো এবং তােমরা পাড়ার সকলেই বা আদালতে হলফ্ নিয়ে কেন পরিষ্কার মিথ্যে সাক্ষী দিয়ে এলে! এ সমস্তই দেবতার কাণ্ড! তােমাদের মুখ দিয়ে অনর্গল মিথ্যে কথা একেবারে যেন গােমুখী থেকে গঙ্গাস্রোতের মতাে বেরােতে লাগ্লো—আমি নিতান্ত মূঢ়মতি পাপিষ্ঠ ব’লে প্রকৃত তত্ত্ব তখনো বুঝ্তে পারলুম না— মায়াতে অন্ধ হ’য়ে রইলুম এবং টাকাগুলাে কেবল উকিলে লুটে খেলে! (অশ্রুবিসর্জ্জন। এবং ভক্তিবিহ্বল নরনারীগণের হরিধ্বনি সহকারে কলিযুগের ভগীরথ দর্শনে গমন।)
দ্বিতীয় অঙ্ক
রুদ্রনারায়ণ বক্শি।
(স্বগত) তাই বটে!—ছেলেবেলা থেকে বরাবর অকারণে কেমন আমার একটা ধারণা ছিল, যে, আমি বড়ো কম লােক নই। এতাে দিনে তা’র কারণটা বােঝা যাচ্চে। আর এ-ও দেখেচি ব্রাহ্মণের ঐ পুষ্করিণীটির প্রতি আমার অনেক দিন থেকে লােভ প’ড়েছিলাে—থেকে থেকে আমার কেবলই মনে হ’তো ও পুকুরটা কোনােমতে ঘিরে না নিতে পার্লে মেয়ে-ছেলেদের ভারি অসুবিধে হ’চ্চে! একেবারে সাফ মনেই ছিল না, যে, আমি ভগীরথ, আর মা গঙ্গা এখনো আমাকে ভুল্তে পারেন নি। উঃ, সে জন্মে যে তপিস্যেটা ক’রেছিলুম এ জন্মেকার মিথ্যে মকদ্দমাগুলাে তা’র কাছে লাগে কোথায়!
(ভক্তমণ্ডলীর প্রতি ঈষৎ সহাস্যে) তা কি আর আমি জান্তেম না? কিন্তু তােমাদের কাছে কিছু ফাঁস করি নি—কী জানি পাছে বিশ্বাস না কর। কলিকালে দেবতা ব্রাহ্মণের প্রতি তাে কারো ভক্তি নেই। তা ভয় নেই, আমি তােমাদের সব অপরাধ মাপ ক’র লুম!—কে গো তুমি? পায়ের ধূলো? তা এই নাও! (পদ প্রসারণ) তুমি কী চাওগা? পদোদক? এসো, এসো! নিয়ে এসো তােমার বাটি—এই নাও—খেয়ে ফেলো! ভােরবেলা থেকে পদোদক দিতে দিতে আমার সর্দ্দি হ’য়ে মাথা ভার হ’য়ে এলো।—বাছা, তােমরা সব এসাে, কিছু ভয় নেই! এতোদিন আমাকে চিন তে পার নি সে তাে আর তােমাদের দোষ নয়। আমি মনে ক’রেছিলুম কথাটা তােমাদের কাছে প্রকাশ ক’র বো না; যেমন চ’ল চে এম নিই চল বে—তােমরা আমাকে তােমাদের মাধব ব শির ছেলে রুদ্দুর বক্শি বলেই জান বে! (ঈষৎ হাস্য) কিন্তু মা গঙ্গা যখন স্বয়ং ফাঁস ক’রে দিলেন তখন আর নুকোতে পার লুম না। কথাটা সর্ব্বত্রই রাষ্ট্র হয়ে গেচে! ও আর কিছুতে ঢাকা রইলাে না। এই দেখো না হিন্দুপ্রকাশে কী লিখেচে। ওরে তিনকড়ে, চট ক’রে সেই কাগজখানা নিয়ে আয় তো! এই দেখাে—“কলিযুগের ভগীরথ এবং ফজুগঞ্জের ভাগীরথী”—লােকটার রচনাশক্তি দিব্য আছে। আর সেই পর্শু দিনকার বঙ্গতােষিণীখানা আন্ দেখি, তা’তেও বড়াে বড়ো দুখানা চিঠি বেরিয়েচে। কী! খুজে পাচ্চিস্ নে? হারিয়েচিস্ বুঝি? হারায় যদি তাে তাের দুখানা হাড় আস্ত রাখ্বো না, তা জানিস্! সেদিন যে তাের হাতে দিয়ে ব’লে দিলুম আল্মারীর ভিতর তুলে রেখে দিস্! পাজি বেটা, নচ্ছার বেটা! হারামজাদা বেটা! কোথায় আমার কাগজ হারালি বের ক’রে দে! দে বের ক’রে! যেখান থেকে পাস্ নিয়ে আয় নইলে তােকে পুঁতে ফেল্বো বেটা!-ওঃ, তাই বটে, আমার ক্যাশবাক্সের ভিতরে তুলে রেখেছিলুম। ওহে হরিভূষণ, পড়ে শুনিয়ে দাও তাে, আমার আবার বাংলা পড়াটা ভালো অভ্যেস নেই।—কে গা? মতি গয়লানী বুঝি? তা এসো এসাে—আমি পায়ের ধূলো দিচ্চি—দুধের দা ম নিতে এসেচো?—এখনো শােনাে নি বুঝি? নন্দ মুখুয্যেকে মা গঙ্গা কী স্বপন দিয়েছেন সে সব খবর রাখো না! বেটি, তুই আমার পুকুরের জল দুধের সঙ্গে মিশিয়ে আমাকে বিক্রি ক’রেচিস্ —সে জলের মাহাত্ম্য জানিস্? কেমন? সবার কাছে কথাটা শুন্লি তো? এখন হিসেবটা রেখে পায়ের ধূলাে নিয়ে আমার খিড়কির ঘাটে চট ক’রে একটা ডুব দিয়ে আয়গে যা!—
এই এখনি যাচ্চি। বেলা হয়েছে সে কি আর জানিনে? ঠাণ্ডা হ’য়ে গেল? তা কী ক’ব্ব বলাে? লােকজন সব অনেক দূর থেকে একটু পায়ের ধূলাের প্রত্যাশায় এসেছে, এরা কি সব নিরাশ হ’য়ে যাবে? আচ্ছ। উঠি। ওরে তিনকড়ে তুই এখানে হাজির থাকিস্— যারা আমাকে দেখতে আস্বে সব বসিয়ে রাখিস্ আমি এলুম ব’লে। খবরদার দেখিস্ যেন কেউ দর্শন না পেয়ে ফিরে না যায়! বলিস্ ভগীরথ ঠাকুরের ভােগ হ’চ্চে। বুঝলি? আমি দুটো ভাত মুখে দিয়েই এলুম ব’লে।
রেধো, তুই যে একেবারে সীধে খাড়া হ’য়ে দাঁড়িয়ে রইলি? তাের কি মাথা নােয় না না কি? তাের তাে ভারি অহঙ্কার দেখচি! বেটা তাের ভক্তির লেশমাত্র নেই! পাজি বেটা তােকে জুতাে মেরে বিদায় ক’রে দেবো তা জানিস্! সবাই আমাকে ভক্তি ক’র্চে আর তুই বেটা এতাে বড়ো খৃষ্টান্ হ’য়েচিস্ যে, আমাকে দেখে প্রণাম করিস্ নে! তাের পরকালের ভয় নেই? বেরাে আমার বাড়ি থেকে!
ছি বাবা উমেশ, তােমার এতো বয়স হ’লো, তবু কার সঙ্গে কী রকম ব্যবহার ক’র্তে হয় শিখ্লে না? যে ভগীরথ মর্ত্ত্যে গঙ্গা এনেছিলেন তাঁর গল্প মহাভারতে প’ড়েচো তো? ভুল ক’র্চো—ঐরাবত নয়, সে ভগীরথ। আমাকে সেই ভগীরথ ব’লে জেনো! বুঝেচো? মনে থাক্বে তো? ভগীরথ,—ঐরাবত নয়। সেই জায়গাটা মাষ্টারের কাছে প’ড়ে নিয়ো! এসো বাবা, তোমার মাথায় পায়ের ধূলাে দিয়ে দিই।
কই! ভাত কই! আমি আর সবুর ক’র্তে পার্চিনে—দেশদেশান্তর থেকে সব লােক আস্চে! কী গাে গিন্নি, এতাে রাগ কিসের? হ’য়েচে কী? খিড়কির পুকুরে লােকজনের ভিড় হ’য়েচে? নাওয়া, কাপড় কাচা, বাসন মাজা, জলতােলা সমস্ত বন্ধ হ’য়েচে? কী ক’র্বাে বলো! আমি স্বয়ং ভগীরথ হ’য়ে গঙ্গা থেকে তাে কাউকে বঞ্চিত ক’র্তে পারিনে। তা হ’লে আমি এতো তপিস্যে ক’রে এতাে কষ্ট করে গঙ্গা আন্লুম কেন? তােমাদের ময়লা কাপড় কাচবার জন্যে—বটে! যখন ব্রাহ্মণের সঙ্গে মকদ্দমা ক’র্ছিলুম তখন তােমরা সেই আশায় ব’সেছিলে, আসল কথাটা কেবল আমি জানতুম আর মা গঙ্গাই জান্তেন! —কী! এতাে বড়ো আস্পর্দ্ধা—তুই বিশ্বাস করিস্নে! জানিস্, তােকে বিয়ে ক’রে তাের চোদ্দপুরুষকে আমি উদ্ধার ক’রেচি! বাপের বাড়ি যাবে! যাও না! মরবার সময় আমার এই গঙ্গায় আস্তে দেবো না! সেটা মনে রেখো? ভাত আর আছে তাে? নেই? আমি যে তােমাকে বেশি ক’রে রাঁধতে ব’লে দিয়েছিলুম! আমার প্রসাদ নিয়ে যাবে ব’লে যে দেশ বিদেশ থেকে লােক এসেচে! যা রেঁধেচো, এর একটা একটা ভাত খুঁটে দিলেও যে কুলবে না! রান্নাঘরে যতো ভাত আছে সব নিয়ে এসো—তােমরা সব চিঁড়ে আন্তে দাও— পুকুর থেকে গঙ্গাজল এনে ভিজিয়ে খেয়ো! কী ক’র্বাে বলো! দূর থেকে নাম শুনে প্রসাদ নিতে এসেচে তাদের ফেরাতে পার্বো না! কী ব’ল্লে? আমার হাতে পড়ে তােমার হাড় জ্বালাতন হ’য়ে গেল? কী ব’ল্বো তুমি মূর্খু মেয়েমানুষ; ঐ কথাটা একবার দেশের ভালো ভালো পণ্ডিতদের কাছে বলো দেখি! তা’রা তখনি মুখের উপর শুনিয়ে দেবে, ষাটহাজার সগরসন্তান জ্ব’লে ভস্ম হয়ে গিয়েছিলো, সেই ভস্মে যিনি প্রাণ দিয়েচেন, তিনি যে তােমার হাড় জ্বালাবেন একথা কোনো শাস্ত্রের সঙ্গেই মিল্চে না! তুমি গাল দাও, আমি আমার ভক্তদের কাছে চল্লুম! (বাহিরে আসিয়া) দেরি হ’য়ে গেল। বাড়ির মধ্যে এঁয়ারা সব আবার কিছুতেই ছাড়েন না, পায়ের ধূলাে নিয়ে পূজো ক’রে বেলা ক’রে দিলেন। আমি বলি, থাক্ থাক্ আর কাজ নেই—তা’রা কি ছাড়ে!—এসাে, তােমরা একে একে এসো—যার যার ধূলো নেবার আছে নিয়ে বাড়ি যাও!-কিহে বিপিন? আজ মকদ্দমার দিন? তা তো যেতে পার্চিনে। দর্শন ক’র্তে সব লােকজন আস্চে। একতরফা ডিক্রি হবে? কী ক’র্বাে বলো! আমি উপস্থিত না থাক্লে এখানেও যে একতরফা হয়। বিপ্নে-! তুই যাবার সময় প্রণাম ক’রে গেলিনে? এম্নি করেই অধঃপাতে যাবে! আয়, এইখানে গড় কর্, এই নে, ধূলাে নে! যা!
তৃতীয় অঙ্ক
ওহে মুখুয্যে, মা গঙ্গা ঠিক আমার এই খিড়কির কাছটায় না এসে আর রসি দুয়েক তফাতে এলেই ভালাে ক’র্তেন। তুমি তাে দাদা স্বপ্ন দেখেই সার্লে, আমাকে যে দিনরাত্তির অসহ্য ভােগ ভুগ্তে হ’চ্ছে। এক তাে, পুকুরের জল দুধে বাতাসায় ডাবে আর পদ্মের পাতায় প’চে দুর্গন্ধ হয়ে উঠেচে―গাছগুলো ম’রে ম’রে উঠ্চে—যেদিন দক্ষিণের বাতাস দেয় সেদিন মনে হয় যেন নরককুণ্ডুর দক্ষিণের জান্লা দরজাগুলো সব কে খুলে দিয়েচে—সাতজন্মের পেটের ভাত উঠে আস্বার জো হয়। ছেলেগুলো যে কটা দিন ছিল কেবল ব্যামােয় ভুগেচে; কলিযুগের ভগীরথ হ’য়ে ডাক্তারের ফি দিতে দিতেই সর্ব্বস্বান্ত হ’তে হলাে—তা’রা সব যমদূত, ভক্তির ধার ধারে না, স্বয়ং মা গঙ্গাকে দেখতে এলে পূরােভিজিট আদায় ক’রে ছাড়ে। সে ও সহ্য হয়—কিন্তু খিড়কির ধারে ঐ যে দেশবিদেশের মড়া পুড়তে আরম্ভ হ’য়েচে ঐটেতে আমাকে কিছু কাবু ক’রেচে। অহর্নিশি চিতা জ্ব’ল্চে—কাছাকাছি যে সমস্ত বসতি ছিল সে সমস্তই উঠে গেচে—রাত্তিরে যখন হরিবােল হরিবােল শব্দ ওঠে এবং শেয়ালগুলো ডাক্তে থাকে তখন রক্ত শুকিয়ে যায়। স্ত্রী তাে বাপের বাড়ি চ’লে গেচেন। বাড়িতে চাকরদাসী টিঁক্তে পারে না। ভূতের ভয়ে দিনে দুপরে দাঁতকপাটি খেয়ে খেয়ে পড়ে। চারটি রেঁধে দেয় এমন লােক পাইনে। রাত্তিরে নিজের পায়ের শব্দ শুন্লে বুকের মধ্যে দুড়দুড় ক’র্তে থাকে—বাড়িতে জনমানব নেই—গঙ্গাযাত্রীর ঘর থেকে কেবল থেকে থেকে তারকব্রহ্ম নাম শুনি, আর গা ছম্ছম্ ক’র্তে থাকে! আবার হ’য়েছে কী—ছেড়েও যেতে পারি নে। আমার ভগীরথ নাম চতুর্দ্দিকেই রাষ্ট্র হ’য়ে গেচে—সকলেরই দর্শন ক’রতে ইচ্ছা হয়—সেদিন পশ্চিম থেকে দু-জন এসেছিলাে তাদের কথাই বুঝতে পারিনে। বেটারা ভক্তি ক’র্লে বটে কিন্তু আমার থালাবাটিগুলো চুরিও ক’রে গেচে! এখান থেকে উঠে গেলে হয় তো ঠিকানা না পেয়ে অনেকে ফিরে যেতে পারে। এদিকে আবার বিষয় কর্ম্ম দেখতে সময় পাচ্চিনে—আমার পত্তনী তালুকটার খাজানা বাকি প’ড়েচে; শুনেচি জমিদার অষ্টম ক’র্বে। শরীর ভয়ে অনিয়মে এবং ব্যামােয় রােজ শুকিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তারে ভয় দেখাচ্চে এ জায়গা না ছাড়লে আমি আর বেশি দিন বাঁচবো না। কী করি বলাে তাে দাদা! রুদ্দুর বক্শি ছিলুম, সুখে ছিলুম, কোনো ল্যাঠাই ছিল না—ভগীরথ হ’য়ে কোনাে দিক সাম্লে উঠতে পার্চিনে—আমার সােনার পুরী একেবারে শ্মশান হ’য়ে গেচে। আবার কাগজগুলো আজকাল আমার সঙ্গে লেগেচে—তা’রা বলে সব মিথ্যে। তাদের নামে লাইবেল আন্বার জন্যে উকিলের পরামর্শ নিতে গিয়েছিলুম—উকিল ব’ল্লে, তুমিই যে ভগীরথ সেটা প্রমাণ ক’র্তে গেলে সত্য যুগ থেকে সাক্ষী তলব ক’র্তে হয়—স্বয়ং ব্যাসদেবের নামে শমন জারি ক’র্তে হয়। শুনে আমার ভরসা হ’লাে না। এখানকার লােকের মনেও ক্রমে সন্দেহ জন্মে গেচে;—মতি গয়লানীর সঙ্গে একরকম ঠিক হ’য়েছিলো আমি পদোদক দেবো আর সে দুধ দেবে—আজ দু-দিন থেকে সে মাগী আবার তা’র হিসেব নিয়ে এসে উপস্থিত হ’য়েচে। ভাবে গতিকে স্পষ্ট বুঝতে পারচি টাকার বদলে আমি তাকে পায়ের ধূলো দিতে গেলে সে-ও আমার উপরে পায়ের ধূলো ঝেড়ে যাবে, ভয়ে কিছু ব’ল্তে পার্চিনে। পুকুরটা তো গেচেই, আমার স্ত্রী পুত্র কন্যারাও ছেড়ে গেচে, চাকর দাসী ও পালিয়েছে, প্রতিবেশীরাও গ্রাম ছেড়ে নতুন বসতি করেচে,আমার ভগীরথ নামটাও টেঁকে কি না সন্দেহ, কেবল কি একা মা গঙ্গা আমাকে কিছুতেই ছাড়বেন না? মা গঙ্গাকে নিয়ে কি আমার সংসার চ’ল্বে? রাস্তায় বেরােলে আজকাল ছেলেগুলো ঠাট্টা ক’র্তে আরম্ভ ক’রেচে যে রুদ্দুর বক্শির গঙ্গাপ্রাপ্তি হ’য়েছে।— এই তো বিপদে পড়া গেচে! দাদা, আবার একবার তােমাকে স্বপন দেখ্তে হচ্চে! দোহাই তােমার, দোহাই মা গঙ্গার, হুগ্লির পুলের নীচে যদি তাঁর বাসের অসুবিধে হয়, দেশে বড়ো বড়ো ঝিল খাল দীঘি র’য়েচে, স্বচ্ছন্দে থাক্তে পার্বেন। আমার ঐ পুকুরের জল যে রকম হ’য়ে এসেচে আর দু-দিন বাদে তাঁর মকরটা তা’র শুঁড়সুদ্ধ ম’রে ভেসে উঠবে; আমার মতাে ভগীরথ ঢের মিল্বে কিন্তু ব্রাহ্মণ কায়স্থের ঘরে অমন বাহন আর পাবেন না। এই নতুন গঙ্গার ধারে তাঁর স্নেহের ভগীরথও যে বেশি দিন টিঁক্বে কোনাে ডাক্তারেই এমন আশা দেয় না। সত্যযুগের নামটার জন্যে মায়া হয় বটে, কিন্তু আমি বেশ ক’রে ভেবে দেখেচি,দাদা, এই কলিযুগের প্রাণটার মায়াও ছাড়্তে পারিনে! তাই স্থির করেচি পুষ্করিণীটি তােমাকেই ফিরিয়ে দেবো, কিন্তু গঙ্গা-মাতাকে এখান থেকে একটু দূরে বসৎ ক’র্তে হবে।
পয়সার লাঞ্ছনা
পয়সার লাঞ্ছনা
আমাদের আপিসের সাহেব বলে, বাঙালীর বেশি প্রয়ােজন নাই। সে স্থির করিয়া রাখিয়াছে ভদ্র বাঙালীর ছেলের পক্ষে মাসিক পঁচিশ টাকা খুব উচ্চ বেতন। আমাদের অবস্থা এবং আমাদের দেশের সম্বন্ধে সাহেবরা যখন একটা মত স্থির করে তখন তাহার উপর আমাদের কোনাে কথা বলা প্রগল্ভতা। কেবল সাহেবের প্রতি একটা অন্তত ঘনিষ্ট কুটুম্বিতাসূচক বিশেষণ প্রয়োগপূর্ব্বক মনের ক্ষোভে আপনা-আপনির মধ্যে বলাবলি করি—সাহেব সবই তো জানেন।
শােনা যায় জগতের হরণ-পূরণের একটা নিয়ম আছে। সে নিয়মের অর্থ এই—যাহার একটার অভাব তাহার আর একটার বাহুল্য প্রায়ই থাকে। আপিসেও তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। আমাদের যেমন বেতন অল্প, তেমনি খাটুনি এবং লাঞ্ছনা অধিক এবং সাহেবের ঠিক তাহার বিপরীত।
কিন্তু জগতের এ নিয়ম কোনো কোনো জগদ্বাসীর পক্ষে যেমনই আনন্দ জনক হৌক আমাদের পক্ষে ঠিক তেমন সুবিধার হয় নাই। কেবল অগত্যা সহিরা ছিলাম, কিন্তু যেদিন আমাদের উপরের স্তরে একটা কর্ম্ম খালি হইল এবং বাহির হইতে একটা কাঁচা ইংরাজের ছেলেকে সেই কর্ম্মে নিযুক্ত করিয়া আমাদের প্রমােশন্ বন্ধ করা হইল, সেদিল আমাদের ক্ষোভের আর সীমা রহিল না। ইচ্ছা হইল তখনি কাজ ফেলিয়া দিয়া চলিয়া যাই, একটা মিউটিনী করি, ইংরাজকে দেশ হইতে দুর করিয়া দিই, পার্লামেণ্টে একটা দরখাস্ত করি, ষ্টেট্স্ম্যান্ কাগজে একটা বেনানী পত্র লিখি। কিন্তু তাহার কোনােটা না করিয়া বাড়িতে চলিয়া গিয়া সেদিন আর জলখাবার খাইলাম না, খোকার সর্দ্দি হইয়াছে বলিয়া স্ত্রীকে যৎপরােনাস্তি লাঞ্ছনা করিলাম, স্ত্রী কাঁদিতে লাগিল, আমি সকাল সকাল শুইয়া পড়িলাম। শুইয়া শুইয়া ভাবিতে লাগিলাম, হায়রে পয়সা তাের জন্য এতে অপমান!
স্ত্রী অভিমান করিয়া আমার কাছে আসিলেন না, কিন্তু নিঃশব্দ চরণে নিদ্রাদেবী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। হঠাৎ কখন্ দেখিতে পাইলাম—আমি একটি পয়সা। কিছু আশ্চর্য্য বােধ হইল না। কবে কোন্ সনাতন টাঁকশাল হইতে বাহির হইয়াছি যেন মনেও নাই। এই পর্য্যন্ত অবগত আছি যে, ব্রহ্মার পা হইতে যেমন শূদ্রের উৎপত্তি সেইরূপ টাঁকশালের অত্যন্ত নিম্নবিভাগেই আমাদের জন্ম।
সেদিন শিকি দু-আনীর একটা মহতী সভা বসিবে কাগজে এইরূপ একটা বিজ্ঞাপন পড়া গিয়াছিল। হাতে কাজ ছিল না, কৌতূহলবশত গড়াইয়া গড়াইয়া সেই সভায় গিয়া উপস্থিত হইলাম, এবং দেয়ালের কাছে একটা কোণে আশ্রয় লইলাম।
সুকুমারী সহধর্ম্মিণী দু-আনীকে সযত্নে বামপার্শ্বে লইয়া শুভ্রকায় চারআনীগুলি দলে দলে আসিয়া সভাগৃহ আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। তাহারা বাস করে কেহ বা কোটের পকেটে, কেহ বা চামড়ার থলিতে, কেহ বা টিনের বাক্সে। কেহ কেহ বা অদৃষ্টগতিকে আমাদের প্রতিবেশীরূপে আমাদের পাড়ায় ট্যাঁকের মধ্যেও বদ্ধ হইয়া দিনযাপন করে।
সেদিনকার আলােচনার বিষয়টা এই যে, “আমরা পয়সার সহিত সর্ব্বতােভাবে পৃথক হইতে চাহি, কারণ, উহারা বড়ােই হীন।” দু-আনীরা সুতীক্ষ্ণ উচ্চস্বরে কহিল “এবং উহারা তাম্রবর্ণ ও উহাদের গন্ধ ভালো নহে।” আমার পাশে একটি দু-আনী ছিল, সে ঈষৎ বাঁকিয়া বসিয়া নাসাগ্র কুঞ্চিত করিল, তাহার পার্শ্ববর্ত্তী চার-আনী আমার দিকে কট্মট্ করিয়া তাকাইল, আমি তো একেবারে সঙ্কোচে শিকি পয়সা হইয়া গেলাম। মনে মনে কহিলাম, আমাদেরই তো আটটা যােলটা হজম করিয়া তােমাদের আজ এতো মূল্য, সে জন্য কি কিছু কৃতজ্ঞতা নাই? মাটির নীচে তাে উভয়ের সমান পদবী ছিল!
সেদিন প্রস্তাব হইল গৌরমুদ্রা এবং তাম্রমুদ্রার জন্য স্বতন্ত্র টাঁকশাল স্থাপিত হৌক। যদিও এক মহারাণীর ছাপ উভয়ের উপর মারা হইয়াছে, তাই বলিয়া কোনােরূপ সাম্য আমরা স্বীকার করিতে চাহি না। আমরা এক ট্যাঁক, এক থলি, এক বাক্সে বাস করিব না, এমন কি শিকি দু-আনী ভাঙাইয়া পরসা করা ও পয়সা ভাঙাইয়া শিকি দু-আনী করা এরূপ অপমানজনক আইন ও আমরা পরিবর্ত্তন করিতে চাহি। সাম্যবাদের গৌরব আমরা অস্বীকার করি না, কিন্তু তাহার একটা সীমা আছে। গিনি মােহরের সহিত সিকি দু-আনি এক সাম্যসীমার অন্তর্গত, কিন্তু তাই বলিয়া শিকি দু-আনীর সহিত পয়সা।
সকলেই চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, “কখনই নহে, কখনই নহে!” দু-আনীর তীব্র কণ্ঠস্বর সর্ব্বোচ্চে শােনা গেল। যে খনিতে আমার আদিম উৎপত্তি সেই খনির মধ্যে প্রবেশ করিবার ইচ্ছায় আমি বসুমতীকে দ্বিধা হইতে অনুরােধ করিলাম, বসুমতী সে অনুরােধ পালন করিল না—দেয়াল ঘেঁষিয়া রক্তবর্ণ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম।
এমন সময়ে এক ঝক্ঝকে নূতন আট-আনী গড়াইয়া এক শিকি-দুআনীর সভার মধ্যে আসিয়া প্রবেশ করিল। সে দেখিলাম সকলকে ছাড়াইয়া উঠিল। সতেজে বক্তৃতা দিতে লাগিল, ঝন্ঝন্ শব্দে চারিদিকে করতালি পড়িল।
কিন্তু আমি ঠাহর করিয়া শুনিলাম, বক্তৃতাটা যেমন হৌক আওয়াজটা ঠিক রূপালি ছাঁদের নহে। মনে বড়ো সন্দেহ হইল। সভা যখন ভঙ্গ হইল, ধীরে ধীরে গড়াইয়া গড়াইয়া বহুসাহসপূর্ব্বক তাহার গায়ের উপর গিয়া পড়িলাম―ঠন্ করিয়া আওয়াজ হইল, সে আওয়াজটা অত্যন্ত দিশি এবং গন্ধটাও দেখিলাম, আমাদের স্বজাতীয়ের মতাে। মহা রাগিয়া উঠিয়া সে কহিল, “তুমি কোথাকার অসভ্য হে!” আমি কহিলাম “বৎস, তুমিও যেখানকার আমিও সেখানকার!”—ছোঁড়াটা আমাদের নিম্নতন কুটুম্ব―আধপয়সা; কোথা হইতে পারা মাখিয়া আসিয়াছে।
তাহার রকম-সকম দেখিয়া হাঃ হাঃ শব্দে হাসিয়া উঠিলাম।
হাসির শব্দে জাগিয়া উঠিয়া দেখি, স্ত্রী পাশে শুইয়া কাঁদিতেছে। তৎক্ষণাৎ তাহার সঙ্গে ভাব করিয়া লইলাম। ঘটনাটা আদ্যোপান্ত বিবৃত করিয়া বলিলাম―বড়ো ধরা পড়িয়াছে! কিন্তু মনে করিতেছি আমিও কাল হইতে পারা মাখিয়া আপিসে যাইব।
আমার স্ত্রী কহিল, তাহার অপেক্ষা পারা খাইয়া মরা ভালো।
১৩০০
প্রত্নতত্ত্ব
প্রত্নতত্ত্ব
প্রাচীন ভারতে গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি ছিল কি না ও
অক্সিজেন বাষ্পের কী নাম ছিল?
বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর সন্দেহ নাই, কিন্তু তাই বলিয়া যে একেবারেই এ সম্বন্ধে কোনো প্রমাণ সংগ্রহ করা যাইতে পারে না, ইহা আমরা স্বীকার করি না। প্রাচীন-ভারতে ইতিহাস ছিল না, এ কথা অশ্রদ্ধেয়। প্রকৃত কথা, আধুনিক ভারতে অনুসন্ধান ও গবেষণার নিতান্ত অভাব। বর্ত্তমান প্রবন্ধ পাঠ করিলেই পাঠকেরা দেখিবেন, আমাদের অনুসন্ধানের ত্রুটি হয় নাই, এবং তাহাতে যথেষ্ট ফললাভও হইয়াছে।
প্রাচীন-ভারতে গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি ছিল কি না ও অক্সিজেন বাষ্পের কী নাম ছিল, তাহার মীমাংসা করিবার পূর্ব্বে কীট্টক ভট্ট ও পুণ্ড্রবর্দ্ধন মিশ্রের জীবিতকাল নির্দ্ধারণ করা বিশেষ আবশ্যক।
প্রথমত, কীট্টক ভট্ট কোন্ রাজার রাজত্বকালে বাস করিতেন, সেইটি নিঃসংশয়রূপে স্থির করা যাউক। এ সম্বন্ধে মতভেদ আছে। কেহ বলেন, তিনি পুরন্দর সেনের মন্ত্রী, অন্য মতে তিনি বিজয়পালের সভাপণ্ডিত ছিলেন। দেখিতে হইবে, পুরন্দর সেন কয় জন ছিলেন, এবং তাঁহাদের মধ্যে কে মিথিলায়, কে উৎকলে এবং কে-ই বা কাশ্মীরে রাজত্ব করিতেন। এবং তাঁহাদের মধ্যে কাহার রাজত্বকাল খ্রীষ্ট শতাব্দীর পাঁচ শত বৎসর পূর্ব্বে, কাহার নয় শত বৎসর পরে কাহারই বা খ্রীষ্ট শতাব্দীর সমসাময়িক কালে। বোধনাচার্য্য তাঁহার রাজাবলী গ্রন্থে লিখিয়াছেন,―“পরম্পারম্প্রথিতপথিকৌ (মধ্যে পুঁথির দুই পাতা পাওয়া যায় নাই। লসত্যসৌ।” এই শ্লোকের অর্থসম্বন্ধে পুরাতত্ত্বকোবিদ্ পণ্ডিতপ্রবর মধুসূদন শাস্ত্রী মহাশয়ের সহিত আমাদের মতের ঐক্য হইতেছে না।
কারণ, নৃপতি-নির্ঘণ্ট গ্রন্থে উতঙ্ক সূরি লিখিতেছেন,—“নিগ··· নন্দ···পরন্ত···ঞ্জং। ইহার মধ্যে যেটুকু অর্থ ছিল, তাহার অধিকাংশই কীটে নিঃশেষপূর্ব্বক পরিপাক করিয়াছে। যতটুকু অবশিষ্ট আছে, তাহা বােধনাচার্য্যের লেখনের কোনাে সমর্থন করিতেছে না, ইহা নিশ্চয়।
কিন্তু উভয়ের লেখার প্রামাণিকতা তুলনা করিতে গেলে, বোধনাচার্য্য ও উতঙ্ক সূরির জন্মকালের পূর্ব্বাপরতা স্থির করিতে হয়।
দেখা যাউক, চীন-পরিব্রাজক নিন্-ফু বােধনাচার্য্য সম্বন্ধে কী বলেন। দুভাগ্যক্রমে কিছুই বলেন না।
আমরা আরব ভ্রমণকারী আল্করীম, পর্টু,গীজ ভ্রমণকারী গঞ্জলিস্ ও গ্রীক-দার্শনিক ম্যাকডীমসের সমস্ত গ্রন্থ অনুসন্ধান করিলাম। প্রথমত ইঁহাদের তিন জনের ভ্রমণকাল নির্ণয় করা ঐতিহাসিকের কর্ত্তব্য। আমরাও তাহাতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু প্রবন্ধ সংক্ষেপের উদ্দেশে তৎপূর্ব্বে বলা আবশ্যক যে, উক্ত তিন ভ্রমণকারীর কোনো রচনায়, বােধনাচার্য্য অথবা উতঙ্ক সূরির কোনাে উল্লেখ নাই। নিন্-ফুর গ্রন্থে “হ্লাও-কো” নামক এক ব্যক্তির নির্দ্দেশ আছে। পুরাতত্ত্ববিদ্মাত্রেই “হ্লাও-কো” নাম বােধনাচার্য্য নামের চৈনিক অপভ্রংশ বলিয়া স্পষ্টই বুঝিতে পারিবেন। কিন্তু “হ্লাও-কো” বােধনাচার্য্যও হইতে পারে, শম্বর দত্ত হইতেও আটক নাই।
অতএব পুরন্দর সেন এক জন ছিলেন, কি অনেক জন ছিলেন, কি ছিলেন না প্রথমত তাহার কোনো প্রমাণ নাই। দ্বিতীয়ত, উক্ত সংশয়াপন্ন পুরন্দর সেনের সহিত কীট্টক ভট্ট অথবা পুণ্ড্রবর্দ্ধন মিশ্রের কোনাে যােগ ছিল কি না ছিল, তাহা নির্ণয় করা কাহারাে সাধ্য নহে।
অতএব, উক্ত কীট্টক ভট্ট ও পুণ্ড্রবর্দ্ধন মিশ্রের রচিত মোহান্তক ও জ্ঞানাঞ্জন নামক গ্রন্থে যদি গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি ও অক্সিজেন বাষ্পের কোনাে উল্লেখ না পাওয়া যায়, তবে তাহা হইতে কী প্রমাণ হয়, বলা শক্ত। শুদ্ধ এই পর্য্যন্ত বলা যায় যে, উক্ত পণ্ডিতদ্বয়ের সময়ে গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি ও অক্সিজেন্ আবিষ্কৃত হয় নাই। কিন্তু সে সময়টা কী, তাহা আমি অনুমান করিলে মধুসূদন শাস্ত্রী মহাশয় প্রতিবাদ করিবেন, এবং তিনি অনুমান করিলে আমি প্রতিবাদ করিব, তাহাতে সন্দেহ নাই।
অতএব, কীট্টক ও পুণ্ড্রবর্দ্ধনের নিকট এইখানে বিদায় লইতে হইল। তাঁহাদের সম্বন্ধে আলােচনা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হইল, এজন্য পাঠকদিগের নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করি। কিন্তু তাঁহাদিগকে বিবেচনা করিয়া দেখিতে হইবে যে, প্রথমত নন্দ, উপনন্দ, আনন্দ, ব্যোমপাল, ক্ষেমপাল, অনঙ্গপাল প্রভৃতি আঠারাে জন নৃপতির কাল ও বংশাবলী নির্ণয়-সম্বন্ধে মধুসূদন শাস্ত্রীর মত খণ্ডন করিয়া সােমদেব, চৌলুকভট্ট, শঙ্কর, কৃপানন্দ, উপমন্য়ু প্রভৃতি পণ্ডিতের জীবিতকাল নির্দ্ধারণ করিতে হইবে; তাহার পর, তাঁহাদের রচিত বােধপ্রদীপ, আনন্দসরিৎ, মুগ্ধ-চৈতন্যলহরী প্রভৃতি পঞ্চান্নখানি গ্রন্থের জীর্ণাবশেষ আলােচনা করিয়া দেখাইব, উহাদের মধ্যে কোনো গ্রন্থেই গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি অথবা অক্সিজেনের নাম গন্ধ নাই। উক্ত গ্রন্থসমূহে ষড়চক্রভেদ, সর্পদংশন মন্ত্র, রক্ষাবীজ আছে এবং একজন পণ্ডিত এমনও মত ব্যক্ত করিয়াছেন যে, স্বপ্নে নিজের লাঙ্গুল দর্শন করিলে ব্রাহ্মণকে ভূমিদান ও কুণ্ডপতনক নামক চাতুর্ম্মাস্য ব্রতপালন আবশ্যক। কিন্তু ব্যাটারি ও বাষ্প বিষয়ে কোনাে বর্ণনা বা বিধান পাওয়া গেল না। আমরা ক্রমশ ইহার বিস্তারিত সমালােচনা করিয়া, ইতিহাসহীনতা সম্বন্ধে ভারতের দুর্নাম দূর করিব;―প্রাচীন গ্রন্থ হইতেই স্পষ্ট প্রমাণ করিয়া দিব যে, পুরাকালে গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি ভারতখণ্ডে ছিল না এবং সংস্কৃত ভাষায় অক্সিজেন্ বাষ্পের কোনাে নাম পাওয়া যায় না।
মধুসূদন শাস্ত্রী মহাশয় কর্ত্তৃক উক্ত প্রবন্ধের প্রতিবাদ
আমাদের ভারত-ইতিহাস-সমুদ্রের পাতিহাঁস, বঙ্গসাহিত্যকুঞ্জের গুঞ্জোন্মত্ত কুঞ্জবিহারী বাবু কলম ধরিয়াছেন; অতএব প্রাচীন ভারত, সাবধান! কোথায় খোঁচা লাগে কী জানি! অপােগণ্ডর যদি কাণ্ডজ্ঞান থাকিবে, তবে নিজের সুধাভাণ্ডে দণ্ডপ্রহার করিতে প্রবৃত্তি হইবে কেন? অথবা বহুদর্শী প্রাচীন ভারতকে সাবধান করা বাহুল্য, উদ্যতলেখনী কুঞ্জবিহারীকে দেখিয়া তিনি পবিত্র উত্তরীয়ে সর্বাঙ্গ আবৃত করিয়া বসিয়া আছেন। তাই আমাদের এই আমড়াতলার দাম্ড়াবাছুরটি প্রাচীন ভারতে গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি এবং অক্সিজেনের সংস্কৃত নাম খুঁজিয়া পাইলেন না। ধন্য তাঁহার স্বদেশ-হিতৈষিতা।
আমাদের দেশে যে এককালে গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি এবং অক্সিজেন বাষ্প আবিষ্কৃত হইয়াছিল, ভাই বাঙ্গালী, এ কথা তুমি বিশ্বাস করিবে কেন? তাহা হইলে তােমার এমন দশা হইবে কেন? আজ যে তুমি লাঞ্ছিত, গঞ্জিত, তিরস্কৃত, পরপদানত, অন্নবস্ত্রহীন দাসানুদাস ভিক্ষুক, জগতে তােমার এমন অবস্থা হয় কেন? কোন্ দিন তুমি এবং তােমাদের সাহিত্য-সংসারের এই সার সং-টি বলিয়া বসিবেন, অসভ্য ভারতের বাতাসে অক্সিজেন্ বাষ্পই ছিল না, এবং বিদ্যুৎ খেলাইতে পারে, ভারতের অশিক্ষিত আকাশ এমন এন্লাইটেণ্ড্ ছিল না।
ভাই বাঙ্গালী, তুমি এন্লাইটেণ্ড্, বাতাসের সঙ্গে তুমি অনেক অক্সিজেন্ বাষ্প টানিয়া থাক এবং তােমার চোখে মুখে বিদ্যুৎ খেলে, আমি মূর্খ―আমি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, তাই, ভাই, আমি বিশ্বাস করি, প্রাচীন ভারতে গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি ছিল এবং অক্সিজেন্ বাষ্পের অস্তিত্বও অবিদিত ছিল না। কেন বিশ্বাস করি? আগে নিষ্ঠার সহিত কুর্ম্ম, কল্কি ও স্কন্দপুরাণ পাঠ করো, গো এবং ব্রাহ্মণের প্রতি ভক্তি স্থাপন করাে, ম্লেচ্ছের অন্ন যদি খাইতে ইচ্ছা হয় তো গােপনে খাইয়া সমাজে অস্বীকার করো, যতটুকু নব্য শিক্ষা হইয়াছে সম্পূর্ণ ভুলিয়া যাও, তবে বুঝিতে পারিবে, কেন বিশ্বাস করি! আজ তােমাকে যাহা বলিব, তুমি হাসিয়া উড়াইয়া দিবে। আমার যুক্তি তােমার কাছে অজ্ঞের প্রলাপ বলিয়া প্রতীয়মান হইবে।
তবু একবার জিজ্ঞাসা করি, কীটে যতটা খাইয়াছে এবং মুসলমানে যতটা ধ্বংস করিয়াছে, তাহার কি একটা হিসাব আছে! যে পাপিষ্ঠ যবন ভারতের পবিত্র স্বাধীনতা নষ্ট করিয়াছে, ভারতের গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারির প্রতি যে তাহারা মমতা প্রদর্শন করিবে, ইহাও কি সম্ভব! যে ম্লেচ্ছগণ শত শত আর্য্যসন্তানের পবিত্র মস্তক উষ্ণীষ ও শিখা সমেত উড়াইয়া দিয়াছিল, তাহারা যে আমাদের পবিত্র দেবভাষা হইতে অক্সিজেন্ বাষ্পটুকু উড়াইয়া দিবে, ইহাতে কিছু বিচিত্র আছে?
এই তাে গেল প্রথম যুক্তি। দ্বিতীয় যুক্তি এই যে, যদি যবনগণের দ্বারাই গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি ও অক্সিজেনের প্রাচীন নাম লােপ না হইবে, তবে তাহা গেল কোথায়—তবে কোথাও তাহার কোনাে চিহ্ন দেখা যায় না কেন? প্রাচীন শাস্ত্রে এতো শত ঋষি মুনির নাম আছে, তন্মধ্যে গল্বন ঋষির নাম বহু গবেষণাতেও পাওয়া যায় না কেন? যে পবিত্র ভারতে দধীচি বজ্রনির্ম্মাণের জন্য নিজ অস্থি ইন্দ্রকে দান করিয়াছেন, ভীমসেন গদাঘাতের দ্বারা জরাসন্ধকে নিহত করিয়াছেন, এবং জহ্নুমুনি গঙ্গাকে এক গণ্ডূষে পান করিয়া জানু দিয়া নিঃসারিত করিয়াছেন, যে ভারতে ঋষিবাক্যপালনের জন্য বিন্ধ্য পর্বত আজিও নতশির, সেই ভারতের সাহিত্য হইতে অক্সিজেন্ বাষ্পের নাম পর্য্যন্ত যে লুপ্ত হইয়াছে, সর্ব্বসংহারক যবনের উপদ্রবই যদি তাহার কারণ না হয়, তবে হে ভাই বাঙ্গালি, তাহার কী কারণ আছে জিজ্ঞাসা করি?
তৃতীয় যুক্তি এই যে, ইতিহাসের দ্বারা সম্পূর্ণ প্রমাণ হইয়া গিয়াছে যে, যবনেরা প্রাচীন ভারতের বহুতর কীর্ত্তি লােপ করিয়াছে। এ কথা আজ কেহই অস্বীকার করিতে পারিবেন না। আজ যে আমরা নিন্দিত অপমানিত ভীত ত্রস্ত ভয়গ্রস্ত রিক্তহস্ত অস্তমিত-মহিমা পরাধীন হইয়াছি, ভারতে যবনাধিকারই তাহার একমাত্র কারণ।― এতটা দূরই যদি স্বীকার করিতে পারিলাম, তবে আমাদের গ্যাল্ভ্যানিক ব্যাটারি ও অক্সিজেনের নামও যে সেই দুরাত্মারাই লােপ করিয়াছে, এটুকু যােগ করিয়া দিতে কুণ্ঠিত হইবার তিলমাত্র কারণ দেখি না।
চতুর্থ যুক্তি—যখন একসময়ে যবন ভারত অধিকার করিয়াছিল এবং নির্ব্বিচারে বহুতর পূত মস্তক ও মন্দিরচূড়া ভগ্ন করিয়াছিল, যখন অনায়াসে যবনের স্কন্ধে সমস্ত দোষারােপ করা যাইতে পারে এবং সে জন্য কেহ লাইবেলের মকদ্দমা আনিবে না, তখন যে ব্যক্তি সভ্যতার কোনো উপকরণ সম্বন্ধে প্রাচীন ভারতের দৈন্য স্বীকার করে, সে পাষণ্ড হৃদয়হীন, বিকৃত-মস্তিষ্ক এবং স্বদেশদ্রোহী। অতএব, তাহার কথায় কোনো মূল্য থাকিতে পারে না; সে যে-সকল প্রমাণ আহরণ করে, কোনো প্রকৃত নিষ্ঠাবান ধর্ম্মপ্রাণ হিন্দুসন্তান তাহাকে প্রমাণ বলিয়া গণ্য করিতেই পারেন না।
এমন যুক্তি আমরা আরাে অনেক দিতে পারি। কিন্তু আমরা হিন্দু, পৃথিবীতে আমাদের মতো উদার, আমাদের মতাে সহিষ্ণু জাতি আর নাই। আমরা পরের মতের উপর কোনো হস্তক্ষেপ করিতে চাহি না। অতএব আমাদের সর্ব্বপ্রধান যুক্তি, বাপান্ত, অর্দ্ধচন্দ্র এবং ধােপা-নাপিত-রােধ।
১২৯৮।
প্রাচীন দেবতার নূতন বিপদ
প্রাচীন দেবতার নূতন বিপদ
মীটিংয়ে প্রায় সকল দেবতাই একযােগে স্ব স্ব কর্ম্মে রিজাইন দিতে উদ্যত হইলেন।
পিতামহ ব্রহ্মা বৈদিক ভাষায় উদাত্ত অনুদাত্ত এবং স্বরিত সংযােগপূর্ব্বক কহিলেন, “ভো ভো দেবগণ শৃণ্বন্তু!”
“আমার কথা স্বতন্ত্র। আমি তো এই বিশ্ব সৃষ্টি এবং বেদ রচনা সমাপ্ত করিয়া সমস্ত কাজকর্ম্ম ছাড়িয়া দিয়া পেন্সন্ লইয়াছি। এমন কি, আমার কাছে আর কোনো প্রত্যাশা নাই বলিয়া সকলে আমার পূজা পর্য্যন্ত বন্ধ করিয়াছে। এবং আমার প্রথম বয়সের বিশ্ব এবং বেদ নামক দুটো রচনা লইয়া লােকে নির্ভয়ে স্ব স্ব ভাষায় অনুবাদ এবং সমালােচনা করিতে আরম্ভ করিয়াছে। কেহ বলে রচনা মন্দ হয় নাই কিন্তু আরাে ঢের ভালাে হইতে পারিত, কেহ বলে আমাদের হাতে যদি প্রুফ, সংশােধনের ভার থাকিত তাহা হইলে ছত্রে ছত্রে এতো মুদ্রাকর প্রমাদ থাকিত না। আমি চুপ করিয়া থাকি, মনে মনে তাহাদের সম্বােধন করিয়া বলি, বাবা, ঐ আমার প্রথম রচনা। তােমরা অবশ্য আমার চেয়ে অনেক পাকা হইয়াছ, কিন্তু তখন যে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না; একেবারে সমস্তই মন হইতে গড়িতে হইয়াছিল। তৎপূর্ব্বে তোমরা যদি একটু মনােযােগ করিয়া জন্মগ্রহণ করিতে তাহা হইলে সমালােচনা শুনিয়া অনেকে জ্ঞানলাভ করিতাম, একটা মস্ত ‘স্ট্যাণ্ডার্ড্’ পাওয়া যাইত। দুর্ভাগ্যক্রমে তােমরা বড়ােই বিলম্বে জন্মিয়াছ। যাহা হউক, যখন দ্বিতীয় সংস্করণ আরম্ভ হইবে তখন তােমাদের কথা স্মরণ রাখিব।
“আবার কেহ কেহ, রচনা দুটো যে আমার তাহা একেবারে অস্বীকার করে। হয় তাে অনায়াসে প্রমাণ করিতে পারিত ওটা তাহাদেরই নিজের, কিন্তু তাহা হইলে তাহাদের কল্পনাশক্তি ও প্রতিভার খর্ব্বতা স্বীকার করা হয় বলিয়া ক্ষান্ত আছে। হরি হরি, এই দীর্ঘ জীবনে ঐ দুটো বই আর কোনাে দুষ্কর্ম্ম করি নাই ইহাতেই এতো কথা শুনিতে হইল!
“যাহা হৌক্ এ তাে গেল আমার আক্ষেপের কথা। কিন্তু তােমরা কী মনোদুঃখে, মর্ত্ত্যলােকের প্রতি কী অভিমানে তােমাদের বহুকালের পদ পরিত্যাগ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছ?”
তখন দেবতারা কেহ বা বৈদিক, কেহ বা পৌরাণিক ভাষায়, কেহ বা ত্রিষ্টুভ্, কেহ বা অনুষ্ঠুভ্, ছন্দে, দন্ত্য ন মূর্দ্ধন্য ণ, অন্তঃস্থ ব বর্গীয় ব এবং তিন সয়ের উচ্চারণ রক্ষা করিয়া বলিলেন―“ভগবন্, সায়ান্স্ নামক একটা দানব অত্যন্ত জুলুম আরম্ভ করিয়াছে। ইহার নিকটে বৃত্র প্রভৃতি প্রাচীন অসুরদিগকে গণ্যই করি না!”
বৃদ্ধ পিতামহ মনে মনে হাসিলেন, ভাবিলেন, কোনো মতে মানে মানে তাহার হাত হইতে উদ্ধার পাইয়াছ এখন তাহাকে গণ্য না করিলেও চলে, কিন্তু তখন যে নাকালটা হইয়াছিলে সে বেশ মনে আছে— কিন্তু, সে কথা আর উত্থাপন না করিয়া গম্ভীরভাবে চারিটি মস্তক নাড়িয়া কহিলেন, “অবশ্য অবশ্য!”
সুরগুরু বৃহস্পতি কহিলেন, “আর্য্য, শত্রুটাকে ততাে ডরাই না, কিন্তু মিত্রদের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হইয়াছি। এতােদিন আমরা ছিলাম মানুষের হৃদয়লােকে বিশ্বাসের স্বর্গধামে; এখন তাহারা সায়ান্সের সহিত গােপনে সন্ধি স্থাপনপূর্ব্বক সেখান হইতে নির্ব্বাসিত করিয়া আমাদিগকে মাথার খুলির এক কোণে অত্যন্ত শুষ্ক সঙ্কীর্ণ জায়গায় একটুখানি স্থান দিতে চায়। সেখানে একফোঁটা বিশ্বাসের অমৃত নাই। বলে, ‘দেখাে, তােমাদের কতো গৌরব বাড়িল! ছিলে অজ্ঞানান্ধ হৃদয়গহ্বরে, এখন উঠিলে মস্তিষ্কঘৃতজ্বালিত জ্ঞানালােকিত মস্তকচূড়ায়! ভাগ্যে আমরা কয়জনা, বুদ্ধিমান ছিলাম, নতুবা স্বর্গে মর্ত্যে কোথাও তােমাদের স্থান হইত না! আমরা সকলের কাছে প্রমাণ করিয়াছি যে, তােমরা আর কোথাও যদি না থাক, নিদেন, আমাদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মধ্যে আছ―প্রতিবাদ করিয়া সেখান হইতে তােমাদিগকে বিচলিত করে এমন বুদ্ধিমান এখনো কেহ জন্মগ্রহণ করে নাই। বিষ্ণুর মীন কূর্ম্ম বরাহ প্রভৃতি অবতারগুলিকে আমরা এভােল্যুশন থিওরি বলিয়া প্রচার করিয়াছি! দেবতাদের উদ্ধারের জন্য আমরা এতো প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছি!
“ভগবন্, যথার্থ আন্তরিক ভক্তি কখনই নিজের দেবতাকে লইয়া এরূপ ছেলে ভুলাইবার চেষ্টা করেন না। দেব চতুরানন, এতোকাল দেবতা ছিলাম, কেবল মাঝে মাঝে দৈত্যদের উপদ্রবে স্বর্গছাড়া হইয়াছি, কিন্তু এ পর্য্যন্ত আমাদিগকে কেহ এভােল্যুশন্ থিওরি করিয়া দেয় নাই। প্রভু, তুমি যদি আমাদিগকে সৃষ্টি করিয়া থাক তুমি জান আমরা কী, কিন্তু আজকাল তােমার অপেক্ষা যাহারা কিঞ্চিৎ বেশি শিখিয়াছে তাহাদের হাত হইতে আমাদিগকে রক্ষা করো! বড়ো আশা দিয়াছিলে তােমার দেবতারা অমর, কিন্তু এই ভাবে যদি কিছুদিন চলে, আমাদের মানববন্ধুরা যদি সাংঘাতিক স্নেহভরে আরাে কিছুকাল আমাদের ব্যাখ্যা করিতে থাকেন, তবে সে আশা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইবে।”
বৃহস্পতির মুখে এই সমস্ত সংবাদ শ্রবণ করিয়া পিতামহ ব্রহ্মা আর উত্তর করিতে পারিলেন না, চারিটি শুভ্র মস্তক নত করিয়া চিন্তিতভাবে বসিয়া রহিলেন।
তখন দেবতাগণ স্ব স্ব পদ সম্বন্ধে পরিবর্ত্তন প্রার্থনা করিলেন। বিজ্ঞ দেবতা প্রজাপতি এবং বালক-দেবতা কন্দর্প সুরসভায় দাঁড়াইয়া কহিলেন, “সকলেই জানেন, বিবাহ-ডিপার্টমেণ্টে বহুকাল আমাদের কিঞ্চিৎ কর্ত্তৃত্ব ছিল; সেজন্য আমাদের কোনােরূপ নিয়মিত নৈবেদ্য অথবা উপ্রি পাওনা ছিল না বটে, কিন্তু কৌতুক যথেষ্ট ছিল। সম্প্রতি টাকা নামক একটা চক্রমুখো হঠাৎদেবতা টঙ্কশালা হইতে নিষ্কলঙ্ক পূর্ণচন্দ্রাকারে আবির্ভূত হইয়া এক প্রকার গায়ের জোরে আমাদের সে কাজ কাড়িয়া লইয়াছে। অতএব উক্ত ডিপার্ট্মেণ্ট হইতে আমাদের নাম কাটিয়া আজ হইতে সেই প্রবল শক্তি নূতন দেবতার নাম বাহাল হৌক্!”
সর্ব্বসম্মতিক্রমে তাহাই স্থির হইল।
তখন যম উঠিয়া কহিলেন,“এতোকাল আমিই নরলোকের সর্ব্বাপেক্ষা ভয়ের কারণ ছিলাম, কিন্তু এখন সেখানে আমা অপেক্ষা ভয় করে এমন সকল প্রাণীর উদ্ভব হইয়াছে। অতএব, পুলিস্ দারোগাকে আমার যমদণ্ড ছাড়িয়া দিয়া আমি অন্য হইতে কাজে ইস্তফা দিতে চাই।”
অধিকাংশ দেবতার মতে যমরাজের প্রস্তাব নিতান্ত অসঙ্গত না হইলেও ব্যাপারটা গুরুতর বিধায় আগামী মীটিংয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আপাতত স্থগিত রহিল।
কার্তিকেয় উঠিয়া কহিলেন, “গুরুদেবের বক্তৃতার পর আমাকে আর অধিক কিছু বলিতে হইবে না। আমি দেবসেনাপতি। কিন্তু দেবগণকে রক্ষা করা আমার অসাধ্য হইয়া উঠিয়াছে, অতএব, হয় আমার পোষ্ট্ এবলিশ্ করিয়া এষ্টাব্লিশ্মেণ্ট্ কমানো হোক্, নয় কোনো সাময়িক পত্রের সম্পাদকের উপর স্বর্গরক্ষাকার্য্যের ভার দেওয়া হৌক্। এমন কি, আমার বহুকালের ময়ুরটিও আমি বিনামূল্যে তাঁহাদিগকে ছাড়িয়া দিতে প্রস্তুত আছি। ইহার পেখম ছড়াইলে তাঁহাদের অনেকটা বিজ্ঞাপনের কাজ হইবে।”
দেবতাদের সম্মতিক্রমে সেনাপতির পোষ্ট্ এবলিশ্ হইল, এখন হইতে ময়ুরের খোরাকী তাঁহার নিজের তহবিল হইতে পড়িবে।
বরুণ উঠিয়া অশ্রুজল বর্ষণ করিয়া কহিলেন—“নরলোকে আমার কি আর কোনো প্রয়োজন আছে? খোলাভঁটিবাহিনী বারুণী আমাকে উচ্ছেদ করিবার সঙ্কল্প করিয়াছে। এই বেলা মানে মানে সময় থাকিতে সরিতে ইচ্ছা করি।”
দেবতাগণ বহুল চিন্তা ও তর্কের পর ষ্ট্যাটিষ্টিক্স্ দেখিয়া অবশেষে স্থির করিলেন, এখনো সময় হয় নাই। কারণ, এখনো সময়ে সময়ে বারুণীর প্রাখর্য্য নিবারণের জন্য দুর্ব্বল মানব বরুণের সহায়তা প্রার্থনা করিয়া থাকে।
তখন ধর্ম্ম বলিলেন, “লোকাচারকে আমার অধীনস্থ কর্ম্মচারী বলিয়া জানিতাম, কিন্তু সে তো আমার সঙ্গে পরামর্শমাত্র না করিয়া আপন ইচ্ছামত যাহা-তাহা করে, তবে সেই ছোঁড়াটাকেই সিংহাসন ছাড়িয়া দিলাম।” বায়ু কহিলেন, “পৃথিবীতে এখন ঊনপঞ্চাশ দিকে ঊনপঞ্চাশ বায়ু বহিতেছে, চাই কি, এখন আমি অবসর লইতে পারি!” আদিত্য কহিলেন, “মানবসমাজে বিস্তর খদ্যোত উঠিয়াছে, তাহারা মনে করিতেছে, সূর্য্য না হইলেও আমরা একলা কাজ চালাইতে পারি, আলোকিত করিবার ভার তাহাদের উপর দিয়া আমি অস্তাচলে বিশ্রাম করিতে ইচ্ছা করি।” ভগবান চন্দ্রমা শুক্লপ্রতিপদের কৃশমূর্ত্তি ধারণ করিয়া কহিলেন, “নরলোকে কবিরা তাঁহাদের প্রেয়সীর পদনখরকে আমা অপেক্ষা দশগুণ প্রাধান্য দিয়া থাকেন, অতএব, যে পর্য্যন্ত কবিরমণীমহলে পাদুকার সম্পূর্ণ প্রচলন না হয়, সে পর্য্যন্ত আমি অন্তঃপুরে যাপন করিতে চাই। এমন কি, ভোলানাথ শিব অর্দ্ধনিমীলিত নেত্রে কহিলেন, “আমা অপেক্ষা বেশি গাঁজা টানে পৃথিবীতে এমন লোকের তো অভাব নাই, সেই সমস্ত সংস্কারকদিগের উপর আমার প্রলয়কার্য্যের ভার দিয়া আমি অনায়াসে নিশ্চিন্ত থাকিতে পারি। এমন কি, আমি নিশ্চয় জানি, আমার ভূতগুলারও কোনো প্রয়োজন হইবে না!”
সর্ব্বশেষে যখন শুভ্রবসনা অমলকমলাসনা সরস্বতী উঠিয়া বীণানিন্দিত মধুরস্বরে দেবসমাজে তাঁহার নিবেদন আরম্ভ করিলেন, তখন দেবগণ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন এবং মহেন্দ্রের সহস্র চক্ষুর পল্লব সিক্ত হইয়া উঠিল।
দেবী কহিলেন,“অন্যান্য নানা কার্য্যের মধ্যে বালকদিগকে শিক্ষাদানের ভার এতোদিন আমার উপর ছিল,কিন্তু সে কার্য্য আমি কিছুতেই চালাইতে পারিব না। আমি রমণী,আমার মাতৃহৃদয়ে শিশুদিগের প্রতি কিছু দয়ামায়া আছে—তাহাদের পাঠের জন্য আজকাল যে সকল পুস্তক নির্ব্বাচিত হয়, সে আমি কিছুতেই পড়াইতে পারিব না। আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়। এবং তাহাদের ক্ষুদ্র শক্তি ভাঙিয়া পড়ে। এ নিষ্ঠুর কার্য্য একজন বলিষ্ঠ পুরুষের প্রতি অর্পিত হইলেই ভালো হয়। অতএব সুরসভায় আমি সানুনয়ে প্রার্থনা করি, যমরাজের প্রতি উক্ত ভার দেওয়া হৌক্।”
যমরাজ তৎক্ষণাৎ উঠিয়া প্রতিবাদ করিলেন, আমাকে কোনাে প্রয়ােজন নাই, কারণ, ইস্কুলের মাষ্টার এবং ইন্স্পেক্টর আছে।
শিশুশিক্ষা বিভাগে যমরাজের বিশেষ নিয়ােগ যে বাহুল্য, এ সম্বন্ধে দেবতাদের কোনাে মতভেদ রহিল না।
বশীকরণ
বশীকরণ
প্রথম অঙ্ক
আশু ও অন্নদা
আশু। আচ্ছা অন্নদা, তুমি যেন ব্রাহ্মই হ’য়েছিলে, কিন্তু তাই ব’লে স্ত্রী-পরিত্যাগ ক’র্তে গেলে কেন? স্ত্রী তো তেত্রিশ কোটির মধ্যে একটিও নয়! ঐটুকু পৌত্তলিকতা—রাখলেও ক্ষতি ছিল না।
অন্নদা। সে তাে ঠিক কথা। স্ত্রী-পরিত্যাগ করা যায়, কিন্তু স্ত্রী-
জাতি তো বিদায় হন না,―স্ত্রীকে ছাড়্লে স্ত্রীজাতি বিশ্বব্যাপী হ’য়ে দেখা দেন— স্ত্রীপূজার মাত্রা মনে মনে বেড়ে ওঠে।
আশু। তবে?
অন্নদা। তবে শােনাে। আমার শাশুড়ী ছিলেন না, শ্বশুর ভয়ঙ্কর হিন্দু ছিলেন। যখন শুনলেন আমি ব্রাহ্ম হ’য়েচি,আমার স্ত্রীকে বিধবার বেশ পরিয়ে ব্রহ্মচারিণী ক’রে কাশীতে গিয়ে বাস ক’র্লেন। তা’র পরে শুন্চি হিন্দুশাস্ত্রের সমস্ত দেবতাতেও তৃপ্তি হয় নি, তা’র উপরে অল্কট্, ব্লাভাট্স্কি, অ্যানি বেসাণ্ট্, সূক্ষ্মশরীর, মহাত্মা, প্লানচেট্, ভূতপ্রেত কিছুই বাদ যায় নি—
আশু। কেবল তুমি ছাড়া।
অন্নদা। আমাকে ব্রহ্মদৈত্য ব’লে বাদ দিলে।
আশু। তুমি তা’র আশা একেবারে ছেড়ে দিয়েচো?
অন্নদা। আশার অপরাধ নেই—তা’র পশ্চাতে এতো বড়ো রেজিমেণ্ট্ লেগেচে, সে আর টিঁক্লো না! শুনেচি আমার শ্বশুর মারা গেচেন, এবং আমার স্ত্রী এখন পতিত উদ্ধার ক’রে বেড়াচ্চেন।
আশু। তুমি একবার চরণে পতিত হওগে না, যদি উদ্ধার করেন।
অন্নদা। ঠিকানাও জানিনে, প্রবৃত্তিও নেই।
আশু! তুমি কি এইরকম উড়ে উড়ে বেড়াবে?
অন্নদা। না হে, সােনার খাঁচার সন্ধানে আছি।
আশু। খাঁচাওয়ালার অভাব নেই,তবে সােনা জিনিষটা দুর্লভ বটে!
অন্নদা। আচ্ছা, আমার আলােচনা পরে হবে, কিন্তু তােমার কী বলাে দেখি? তােমার তাে আইবড়লােক প্রাপ্তির বিধান কোনাে শাস্ত্রেই লেখে না। তা’র বেলা চুপ! থিওসফিতে তােমাকে খেলে! মন্ত্রতন্ত্র, প্রাণায়াম, হঠযােগ, সুষুম্না-ইড়া-পিঙ্গলা এ সমস্তই তােমাকে ছাড়ে, যদি বিবাহ কর!
আশু। তুমি মনে কর, আমি সবই অন্ধভাবে বিশ্বাস করি―তা নয়। এ সমস্ত বিশ্বাসের যােগ্য কি না, তাই আমি পরীক্ষা ক’রে দেখ্তে চাই! অবিশ্বাসকেও তাে প্রমাণের উপর স্থাপন ক’র্তে হবে।
অন্নদা। ব’সে ব’সে তাই করো! মরীচিকা স্থাপনের জন্যে পাথরের ভিত্তি গাঁথো। আমি এখন চ’ল্লেম।
আশু। কোথায় যাচ্চো?
অন্নদা। শবসাধনায় নয়।
আশু। তা তাে জানি।
অন্নদা। একটি সজীবের সন্ধান পেয়েছি।
আশু। তবে যাও! শুভকার্য্যে বাধা দেবাে না!
দ্বিতীয় অঙ্ক
বাড়িওয়ালা ও তাহার স্ত্রী
স্ত্রী। মাতাজি যদি হবে, তবে অমন চেহারা কেন?
বাড়িওয়ালা। দেখ্তে শুন্তে তাড়কা-রাক্ষসীর মতাে না হ’লেই বুঝি আর মাতাজি হয় না!
স্ত্রী। হবে না কেন! কিন্তু তাহ’লে কি এই সমর্থবয়সে স্বামীর ঘরে না থেকে তােমার মতো বােকা ভােলাবার জন্যে মাতাজি-গিরি ক’র্তে বেরােতো? তাহলে কি পিতাজি তােমার মাতাজিকে ছাড়্তো? আর এতাে টাকাই বা পেলে কোথায়?
বাড়িওয়ালা। ওগাে, যারা যােগবিদ্যা জানে, তাদের যদি টাকা না হবে,—চেহারা না হবে, তবে কি তােমার হবে? রােসাে না,—ওঁর কাছে মন্তরটন্তরগুলো শিখে নেওয়া যাক্ না।
স্ত্রী। বুড়ােবয়সে মন্তর শিখে হবে কী শুনি? কা’কে বশ ক’র্বে?
বাড়িওয়ালা। যাঁকে কিছুতেই বশ মানাতে পার্লেম না!
স্ত্রী। তিনি কে?
বাড়িওয়ালা। আগে বশ মানাই, তা’র পরে সাহস ক’রে নাম ব’ল বো!
মাতাজির প্রবেশ
মাতাজি। এ বাড়িতে আমার থাকার সুবিধা হ’চ্চে না। এর চেয়ে বড়ো বাড়ি আমাকে দিতে হবে।
বাড়িওয়ালা। এ বাড়ি ছাড়া আমার আর একটিমাত্র বড়ো বাড়ি আছে। সেটা বড়ো বটে, কিন্তু—
মাতাজি। তা ভাড়া বেশি দেবো, কিন্তু সেই বাড়িতেই আমি কাল যেতে চাই।
বাড়িওয়ালা। সবে পর্শুদিন সেখানে একটি ভাড়াটে এসেচে। একটি কোন্ সদর্আলার বিধবা স্ত্রী,—পশ্চিম থেকে মেয়ের জন্যে পাত্র খুঁজ্তে এসে আমার সেই উনপঞ্চাশ নম্বরের বাড়িতে উঠেছে।
মাতাজি। উনপঞ্চাশ নম্বর! ঠিক আমি যা চাই! তোমার এ বাড়ির নম্বর ভালো নয়!
বাড়িওয়ালা। বাইশ নম্বর ভালো নয় মাতাজি? কারণটা কী বুঝিয়ে বলুন।
মাতাজি। বুঝ্তে পার্চো না—দুয়ের পিঠে দুই—
বাড়িওয়ালা। ঠিক ব’লেচেন মাতাজি, দুয়ের পিঠে দুইই তো বটে! এততদিন ওটা ভাবি নি!
মাতাজি। দুইয়েতে কিছু শেষ হয় না, তিন চাই। দেখো না, আমরা কথায় বলি, দু’ তিন জন—
বাড়িওয়ালা। ঠিক ঠিক, তা তো ব’লেই থাকি।
মাতাজি। যদি দুই ব’ল্লেই চুকে যেতো, তাহ’লে তা’র সঙ্গে আবার তিন ব’ল্বো কেন? বুঝে দেখো!
বাড়িওয়ালা। আমাদের কী বা বুদ্ধি, তাই বুঝ্বো! সবই তো জানতুম, তবু তো বুঝিনি।
মাতাজি। তাই, ঐ দুইয়ের পিঠে দুই ব’লেই আমার মন্ত্র কিছুই সফল হ’চ্চে না!
স্ত্রী। (আত্মগত) বেঁচে থাক্ আমার দুয়ের পিঠে দুই! মন্ত্র সফল হ’য়ে কাজ নেই।
মাতাজি। উনপঞ্চাশের মতো এমন সংখ্যা আর হয় না!
বাড়িওয়ালা। (জনান্তিকে) শুন্লে তো গিন্নি!
স্ত্রী। (জনান্তিকে) শুনে হবে কী! তোমার উনপঞ্চাশ যে অনেককাল হ’লো পেরিয়েচে।
বাড়িওয়ালা। কিন্তু মাতাজিকে কি কালই সে বাড়িতে যেতে হবে?
মাতাজি। কাল ঊনত্রিশ তারিখে মঙ্গলবার প’ড়েচে, এমন দিন আর পাওয়া যাবে না!
বাড়িওয়ালা। ঠিক কথা! কাল ঊনত্রিশেও বটে, আবার মঙ্গলবারও বটে! কী আশ্চর্য্য! তা হ’লে তো কালই যেতে হ’চ্চে বটে! তা-ই ঠিক ক’রে দেবো! (মাতাজির প্রস্থান) এখন আমার সেই নতুন ভাড়াটেদের ওঠাই কী ব’লে। বিদেশ থেকে এসেচে, হঠাৎ তা’রা এখন বাড়িই বা পায় কোথায়?
স্ত্রী। তাদের আপাতত এই বাড়িতে এনে রাখো না! আমরা না হয় কিছুদিন ঝামাপুকুরে জামাইবাড়ি গিয়েই থাক্বো! তোমার ঐ মন্তরজানা মেয়েমানুষকে এখানে রেখে কাজ নেই! বিদায় ক’রে দাও। ছেলেপিলের ঘর, কার্ কখন অপরাধ হয়, বলা যায় কি?
বাড়িওয়ালা। সেই ভালো। তাদের কোনোরকম ক’রে ভুলিয়েভালিয়ে আজকের মধ্যেই উনপঞ্চাশ নম্বর থেকে বাইশ নম্বরে এনে ফেলা যাক্! বলি গে, পাড়ায় প্লেগ্ দেখা দিয়েচে, ঊনপঞ্চাশ নম্বরে প্লেগ্হাসপাতাল ব’স্বে!
তৃতীয় অঙ্ক
আশু ও অন্নদা।
অন্নদা। তােমার ঐ টাট্কা লঙ্কার ধোঁয়ায় নাকের জলে চোখের জলে ক’র্লে যে হে! তােমার ঘরে আসা ছাড়্তে হ’লাে!
আশু। টাট্কা লঙ্কার ধোঁয়া তুমি কোথায় পেলে?
অন্নদা। ঐ যে তোমার তর্কালঙ্কারের বকুনি! লােকটা তো বিস্তর টিকি নাড়্লে, মাথামুণ্ডু কিছু পেলে কি?
আশু। মাথামুণ্ডু নইলে শুধু টিকি ন’ড়্বে কোথায়? কথাগুলাে যদি শ্রদ্ধা ক’রে শুন্তে, তবে বুঝ্তে।
অন্নদা। যদি বুঝ্তেম, তবে শ্রদ্ধা ক’র্তেম! তুমি আশু ফিজিকাল্ সায়ান্সে এম্, এ, দিয়ে এলে—তুমি যে এতো ঘন ঘন টিকিনাড়া বরদাস্ত ক’র্চো, এ যদি দেখ্তে পায়, প্রেসিডেন্সি কলেজের চূমকাম-করা দেওয়ালগুলো বিনি খরচে লজ্জায় লাল হ’য়ে ওঠে। আজ কথাটা কী হ’লো বুঝিয়ে বলো দেখি।
আশু। পণ্ডিতমশায় পরিণয়তত্ত্ব ব্যাখ্যা ক’র্ছিলেন।
অন্নদা। তত্ত্বটা আমার জানা খুব দরকার হ’য়ে প’ড়েচে। তর্কালঙ্কার মশায় ব’ল্ছিলেন, বিবাহের পূর্ব্বে কন্যার সঙ্গে জানাশুনার চেষ্টা না করাই কর্ত্তব্য। যুক্তিটা কী দিচ্চিলেন, ভালাে বােঝা গেল না।
আশু। তিনি বলছিলেন, সকল জিনিষের আরম্ভের মধ্যে একটা গােপনতা আছে। বীজ মাটির নীচে অন্ধকারের মধ্যে থাকে, তা’র পরে অঙ্কুরিত হ’লে তখন সূর্য-চন্দ্র-জল-বাতাসের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই কর্বার সময় আসে। বিবাহের পূর্ব্বে কন্যার হৃদয়কে বিলাতী অনুকরণে বাইরে টানাটানি না ক’রে তাকে আচ্ছন্ন আবৃত রাখাই কর্ত্তব্য। তখন তা’র উপরে তাড়াতাড়ি দৃষ্টিক্ষেপ ক’র্তে যেয়াে না। সে যখন স্বভাবতই নিজে অঙ্কুরিত হ’য়ে তা’র অর্দ্ধমুকুলিত সলজ্জ দৃষ্টিটুকু গােপনে তােমার দিকে অগ্রসর কর্তে থাক্বে, তখনি তােমার অবসর।
অন্নদা। আমার অদৃষ্টে সে পরীক্ষা তাে হ’য়ে গেছে। বিলাতী প্রথামতে, বিবাহের পূর্ব্বে কন্যার হৃদয় নিয়ে টানাহেঁচ্ড়া করিনি;—হৃদয়টা এতো অন্ধকারের মধ্যে ছিল যে, আমি তা’র কোনাে খোঁজ পাইনি, তা’র পরে অঙ্কুরিত হ’লো কি না হ’লো, তা’রো তো কোনো ঠিকানা পেলেম না। এবারে উল্টোরকম পরীক্ষা ক’র্তে চ’লেছি, এবার আগে হৃদয়, তা’র পরে অন্য কথা!
আশু। পরীক্ষার দিন কবে?
অন্নদা। কাল।
আশু। স্থান?
অন্নদা। উনপঞ্চাশ নম্বর রাম বৈরাগীর গলি।
আশু। নম্বরটা তো ভালাে শােনাচ্চে না!
অন্নদা। কেন? উনপঞ্চাশ বায়ুর কথা ভাব্চো? সে আমাকে টলাতে পার্বে না—তুমি হ’লে বিপদ ঘ’ট্তো।
আশু। পাত্র?
অন্নদা। কন্যার বিধবা মা তা’কে পশ্চিম থেকে সঙ্গে ক’রে এনেচে। আমি ঘটককে ব’লে রেখেচি যে ভালো ক’রে মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় ক’রে নিয়ে তবে বিবাহের কথা হবে।
আশু। কিন্তু অন্নদা, শেষকালে বহুবিবাহে প্রবৃত্ত হ’লে।
অন্নদা। তােমাদের মতাে আমি নাম দেখে ভড়্কাই নে। যে বহুবিবাহের মধ্যে আর সমস্ত আছে, কেবল বহুটুকুই নেই, তাকে দেখে চমকাও কেন ভাই।
আশু। তবু একটা প্রিন্সিপল্ আছে তাে―বহুবিবাহকে বহুবিবাহ ব’ল্তেই হবে।
অন্নদা। আমার নামমাত্র স্ত্রী যেখানে আছে, প্রিন্সিপ্লও সেইখানে আছে। সে স্ত্রীও আস্চে না, প্রিন্সিপ্লও রইলো—অতএব এখন আমি ডঙ্কা মেরে বহুবিবাহ ক’র্বো, প্রিন্সিপ্ল্ জুজুকে ডরাবো না!
রাধাচরণের প্রবেশ
রাধা। আশুবাবু!
আশু। কী হে রাধে!
রাধা। সেদিন আপনি আমার সঙ্গে মন্ত্র নিয়ে তর্ক ক’র্লেন—এক একটা শব্দের যে একএক প্রকার বিশেষ ক্ষমতা আছে, আমার বােধ হ’লো আপনি যেন তা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেন না।
অন্নদা। বলো কী রাধে—তা হলে আর অবিশ্বাস কর্বার ক্ষমতা এখনাে সম্পূর্ণ লােপ হয় নি— এখনাে দুটো একটা জায়গায় ঠেক্চে! শব্দের মধ্যে শক্তি আছে, এ কথা বাঙালীর ছেলে বিশ্বাস করো না।
রাধা। বলুন তাে অন্নদাবাবু! তা হ’লে মারণ, উচাটন, বশীকরণ, এগুলাে কি বেবাক্ গাঁজাখুরি!
অন্নদা। তাও কি কখনো হয়? সংসারে কি এতাে গাঁজার চাষ হ’তে পারে!
রাধা। পশ্চিম থেকে একজন যােগসিদ্ধ মাতাজি এসেচেন। শুনেচি তিনি মন্ত্রের বল একেবারে প্রত্যক্ষ দেখিয়ে দিতে পারেন। দেখ্তে গিয়েছিলেম, কিন্তু সকলকে তিনি দেখা দেন না; ব’লেচেন, যােগ্য লােক পেলে তা’কে তিনি তাঁর সমস্ত বিদ্যে দেখিয়ে দেবেন। আশুবাবু, আপনি চেষ্টা ক’র্লে নিশ্চয় বিফল হবেন না।
আশু। তিনি থাকেন কোথায়?
রাধা। বাইশ নম্বর ভেড়াতলায়।
অন্নদা। বাইশ নম্বরটা উনপঞ্চাশের চেয়ে ভালাে হ’তে পারে, কিন্তু জায়গাটা ভালো ঠেক্চে না। একে বশীকরণ-বিদ্যে, তা’র উপরে ভেড়াতলা! মাতাজির কাছে মুণ্ডুজিটি খুইয়ে এসাে না!
আশু। আরে ছি! কী বকো, তা’র ঠিক নেই। তাঁরা হ’লেন সাধু স্ত্রীলােক, সেখানে মুণ্ডুর ভাবনা ভাব্তে হয় না। তুমি বুঝেসুঝে ঊনপঞ্চাশে পা বাড়িয়ো।
অন্নদা। তুমি ভাব্চো বাইশ একেবারেই নির্ব্বিষ! তা নয় হে! বিশের উপরেও দুইমাত্রা চড়িয়ে তবে বাইশ! আপাদমস্তক জর্জ্জর হ’য়ে ফিরবে।
চতুর্থ অঙ্ক
বাইশ নম্বরে কন্যার বিধবা মাতা শ্যামাসুন্দরী
শ্যামা। পেলেগ্ শুনে ভয়ে বাঁচিনে! তাড়াতাড়ি ক’রে পালিয়ে তাে এলুম! কিন্তু অন্নদা ব’লে ছেলেটির আজ যে সেই উনপঞ্চাশ নম্বরে আস্বার কথা আছে, সে কি সেখান থেকে চিনে ঠিক এখানে আস্তে পার্বে? এতে ক’রে খাওয়াদাওয়ার জোগাড় ক’র্লেম, সব মাটি হবে না তো? যে তাড়াটা লাগালে, একবার খবর দেবার সময় দিলে না! ঘটক ব’লেচে, ছেলেটি আমার নিরুপমাকে ভালো ক’রে দেখে-শুনে নিতে চায়, ওর পড়াশুনাে গানবাজ্না সব পরীক্ষা ক’র্বে— তা করুক! কর্ত্তা তো নিরুপমাকে সেই রকম ক’রেই শিখিয়েচেন! বরাবর পশ্চিমে ছিলেন, আমাদের কখনাে তো বন্ধ ক’রে রাখেন নি! তবু ক’ল্কাতার ছেলে কী রকম জানিনে! ভয় হয়! আমাদের ধরণ ধারণ দেখে হয় তাে অভদ্র মনে ক’র্বে! তা’রা মেয়ের সঙ্গে শেক্হ্যাণ্ড করে না কি, কে জানে! হয় তো ইংরাজিতে গুড্মর্ণিং বলে। শুনেচি তাদের নিজের হাতে চুরট জ্বালিয়ে দিতে হয়—এ সব তো পার্বো না! ঘটক ব’ল্লে, ছেলেটি হ্যাট্কোট্ পরে! আমার মেয়ে আবার ফিরিঙ্গির সাজ দু-চক্ষে দেখ্তে পারে না! কী রকম যে হবে, বুঝ্তে পার্চি নে? মন্ত্র পড়ে বিয়ে ক’র্তে রাজি হবে তো?
ভৃত্যের প্রবেশ
ভৃত্য। মা ঠাক্রুণ, একটি বাবু এসেচেন; আমি তাঁকে ব’ল্লেম বাড়িতে পুরুষমানুষ কেউ নেই। তিনি ব’ল্লেন, তিনি মার সঙ্গেই দেখা ক’র্তে এসেচেন।
শ্যামা। তবে ঠিক হ’য়েচে। সেই ছেলেটি এসেচে। ডেকে নিয়ে আয়। (ভৃত্যের প্রস্থান) ভয় হ’চ্চে—ক’ল্কাতার ছেলে, তা’র সঙ্গে কী রকম করে চ’ল্তে হবে! কী জানোয়ারই মনে ক’র্বে।
আশুর প্রবেশ
(শ্যামাসুন্দরীর পায়ের কাছে একটি গিনি রাখিয়া
আশুর ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম।)
শ্যামা। (স্বগত) এ যে প্রণামী দিয়ে প্রণাম ক’র্লে গো! এ তো শেক্হ্যাণ্ড করে না! বাঁচালে! লক্ষ্মী ছেলে! কেমন ধুতিচাদর প’রে এসেচে!
আশু। মাতাজি, আমাকে যে আপনি দর্শন দেবেন, এ আমি আশা করিনি! বড়ো অনুগ্রহ ক’রেচেন।
শ্যামা। (সস্নেহে সপুলকে) কেন বাবা, তুমি আমার ছেলের মতো, তোমাকে দেখা দিতে দোষ কী।
আশু। স্নেহ রাখ্বেন। আশীর্ব্বাদ ক’র্বেন, এই অনুগ্রহ থেকে কখনো বঞ্চিত না হই।
শ্যামা। বাবা, তোমার কথা শুনে আমার কান জুড়ালো—আমি নিশ্চয় অনেক তপস্যা ক’রেছিলেম, তাই—
আশু। মাতাজি, আপনি তপস্যার দ্বারা যে নিরুপম-সম্পদ্ লাভ ক’রেচেন, আমাকে তা’র—
শ্যামা। তোমাকে দেবার জন্যেই তো প্রস্তুত হ’য়ে এসেছি। অনেক সন্ধান ক’রে যোগ্যপাত্র পেয়েচি—এখন দিতে পার্লেই তো নিশ্চিন্ত হই।
আশু। (শ্যামার পদধূলি লইয়া) মাতাজি, আমাকে কৃতার্থ ক’র্লেন—এতো সহজেই যে ফললাভ ক’র্বো, এ আমি স্বপ্নেও জানতুম না।
শ্যামা। বলো কী বাবা, তোমার আগ্রহ যতো, আমার আগ্রহ তা’র চেয়ে বেশি।
আশু। তাহলে যে কামনা ক’রে এসেছিলেম, আজ কি তা’র কিছু পরিচয়—
শ্যামা। পরিচয় হবে বৈ কি বাবা, আমার তা’তে কোনো আপত্তি নেই—
আশু। আপত্তি নেই মাতাজি? শুনে বড়ো আরাম পেলেম—
শ্যামা। দেখাশুনা সমস্তই হবে বাবা, আগে কিছু খেয়ে নাও!
আশু। আবার খাওয়া! আপনি আমাকে যথার্থ জননীর মতোই স্নেহ দেখালেন।
শ্যামা। তুমিও আমাকে মার মতোই দেখ্বে, এই আমার প্রাণের ইচ্ছা—আমার তো ছেলে নেই, তুমিই আমার ছেলের মতো থাক্বে।
আহার্য্য লইয়া ভৃত্যের প্রবেশ
আশু। করেচেন কী? এতো আয়োজন?
শ্যামা। আয়োজন আর কী ক’র্লেম? আজই ঠিক আস্তে পার্বে কি না, মনে একটু সন্দেহ ছিল, তাই―
আশু। সন্দেহ ছিল? আপনি কি জান্তেন, আমি আস্বো?
শ্যামা। তা জান্তেম বৈ কি।
আশু। (আত্মগত) কী আশ্চর্য্য! আমাকে না জেনেই আমার জন্যে পূর্ব্ব হ’তেই অপেক্ষা ক’র্ছিলেন? তবু অন্নদা যােগবলে বিশ্বাস করে না! তাকে ব’ল্লে বােধ হয় ঠাট্টা ক’রেই উড়িয়ে দেবে! (আহারে প্রবৃত্ত)
শ্যামা। (আত্মগত) ছেলেটি সােনার টুক্রাে! যেমন কার্ত্তিকের মতাে দেখ্তে, তেম্নি মধুঢালা কথা! আমাকে প্রথম থেকেই মাতাজি ব’লে ডাক্চে। পশ্চিম থেকে এসেচি কি না, তাই বােধ হয় মা না ব’লে মাতাজি ব’ল্চে। (প্রকাশ্যে) কিছুই খেলে না যে বাবা?
আশু। আমার যা সাধ্য, তা’র চেয়ে বরঞ্চ বেশিই খেয়েচি মাতাজি।
শ্যামা। তা হ’লে একটু ব’সো—আমি ডেকে নিয়ে আসি। (প্রস্থান)
আশু। রাধে ব’লেছিলো বটে, মাতাজি কুমারী কন্যার দ্বারা মন্ত্রের ফল দেখিয়ে থাকেন। বশীকরণ-বিদ্যায় আমার একটু বিশ্বাস জন্মাচ্চে। এরি মধ্যে মাতাজির মাতৃস্নেহে আমার চিত্ত কেমন যেন আর্দ্র হ’য়ে এসেচে। আমার মা নেই, মনে হ’চ্চে যেন মাকে পেলেম! এ কোন্ মন্ত্রবলে কে জানে! মাতাজি স্নিগ্ধ দৃষ্টি দ্বারা আমার সমস্ত শরীর যেন অভিষিক্ত ক’রে দিয়েছেন। প্রথম দেখাতেই উনি যে আমাকে তাঁর পুত্রস্থানীয় ক’রে নিয়েছেন, এ যেন পূর্ব্বজন্মের একটা সম্বন্ধের স্মৃতি।
নিরুপমাকে লইয়া শ্যামার প্রবেশ
আশু। (স্বগত) আহা কী সুন্দর! মাতাজির বশীকরণ-বিদ্যা যেন মূর্ত্তিমতী। এঁর মুখে কোনো মন্ত্রই বিফল হ’তে পারে না।
শ্যামা। যাও, লজ্জা কোরো না মা! উনি যা জিজ্ঞাসা করেন, উত্তর দিয়াে।
আশু। লজ্জা ক’র বেন না! মাতাজি আমার প্রতি যে-রকম অনুগ্রহ প্রকাশ ক’রেচেন, আপনিও আমাকে আপনার লােকের মতােই দেখ বেন। (আত্মগত) মেয়েটি কী লাজুক! আমার কথা শুনে আরো যেন লাল হ’য়ে উঠ লাে।
শ্যামা। বাবা, তােমার ইচ্ছামত ওকে জিজ্ঞাসাপত্র করাে।
আশু। আপনার কোন্ কোন্ বিদ্যায় অধিকার আছে, জান তে উৎসুক হ’য়ে আছি।
শ্যামা। বয়স অল্প, বিদ্যা কতােই বা বেশি হবে—তবে—
আশু। যতো অল্পই হােক্ মাতাজি, আমাদের মতো লােকের পক্ষে যথেষ্ট হবে।
শামা। (আত্মগত) বিদ্যার কোনো পরিচয় না পেয়েই যখন এতো সন্তুষ্ট, তখন মেয়েকে পছন্দ ক’রেচে ব’লেই বােধ হ’চ্চে। বাঁচা গেল, আমার বড়াে ভাবনা ছিল। (প্রকাশ্যে) নিরু, একটি গান শুনিয়ে দাও তো মা!
আশু। গান! এ আমার আশার অতীত। আপনি বােধ হয় পূর্ব্বে থেকেই জানেন, গানের চেয়ে আমি কিছুই ভালােবাসিনে (স্বগত) অন্নদার মতো এতো বড়ো সন্দেহী, সে থাক লে আজ যােগের বল প্রত্যক্ষ ক’র তে পার তো! (প্রকাশ্যে নিরুপমার প্রতি) আপনারা আমাকে একদিনেই চিরঋণী ক’রেচেন-যদি গান করেন, তবে বিক্রীত হ’য়ে থাক বো!
(নিরুপমার গান)
কাফি-ঝাঁপতাল
(আমি) কি ব’লে করিব নিবেদন
আমার হৃদয় প্রাণমন?
চিত্তে এসে দয়া করি’ নিজে লহো অপহরি’
করাে তা’রে আপনার ধন―
আমার হৃদয় প্রাণমন।
শুধু ধূলি শুধু ছাই মূল্য যার কিছু নাই
মূল্য তা’রে করো সমর্পণ
তব স্পর্শে পরশরতন।
তােমার গৌরবে যবে আমার গৌরব হবে
একেবারে দিব বিসর্জ্জন
চরণে হৃদয় প্রাণমন।
আশু। (স্বগত) আর মন্ত্রের দরকার নেই। বশীকরণের আর কী বাকি রইলো! কন্যাটি দেবকন্যা! (প্রকাশ্যে) মাতাজি!
শ্যামা। কী বাবা!
আশু। আমাকে আপনার পুত্র ক’রেই রাখবেন, এমন সুবাসঙ্গীত শােন্বার অধিকার থেকে বঞ্চিত ক’র্বেন না। যা পাওয়া গেল, এই আমি পরম লাভ মনে ক’র্চি। মন্ত্রতন্ত্রের কথা ভুলেই গেচি। এখন বুঝতে পার্চি, মন্ত্রের কোনো দরকারই নেই!
শ্যামা। অমন কথা বােলাে না বাবা! মন্ত্রের দরকার আছে বৈ কি! নইলে শাস্ত্র—
আশু। সে তো ঠিক কথা! মন্ত্র আমি অগ্রাহ্য করি নে। আমি ব’ল্ছিলেম মন্ত্র প’ড়্লেই যে মন বশ হয়, তা নয়, গানের মােহিনী শক্তির কাছে কিছুই লাগে না। (স্বগত) মেয়েটি আবার লজ্জায় লাল হ’য়ে উঠ্লো! ভারি লাজুক!
শ্যামা। (আত্মগত) ছেলেটি খুব ভালো! কিন্তু একটু যেন লজ্জা কম ব’লে বােধ হয়! মন বশ করার কথাগুলাে শাশুড়ীর সাম্নে না ব’ল্লেই ভালাে হ’তো।
আশু। কিন্তু আপনি বিরক্ত হবেন না, আমার যা মনে উদয় হ’চ্চে আমি বলি, তা’র পরে―
শ্যামা। তা বাবা, সে-সব কথা এখন থাক্! আগে—
আশু। আমি ব’ল্ছিলেম, গানে যে মন বশ হয়, সে-ও তো শব্দমাত্র—মনের সঙ্গে তা’র যদি যোগ থাকে, তা হ’লে মন্ত্রের শব্দশক্তিকেই বা না মানি কী ব’লে?
শ্যামা। ঠিক কথা। মন্ত্রটা মানাই ভালো!
আশু। (সোৎসাহে) আপনার কাছে এ-সব কথা বলা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা,কিন্তু শাব্দী শক্তির সঙ্গে আত্মার যে একটি নিগূঢ় যোগ আছে তার স্বরূপ নিরূপণ করা কঠিন,—তর্কালঙ্কারমশায় বলেন,সে অনির্ব্বচনীয়। শাস্ত্রে যে বলে শব্দ ব্রহ্ম তা’র কারণ কী? ব্রহ্মই যে শব্দ বা শব্দই যে ব্রহ্ম, তা নয়—কিন্তু ব্রহ্মের ব্যবহারিক সত্তার মধ্যে শব্দস্বরূপেই ব্রহ্মের প্রকাশ যেন নিকটতম। (নিরুপমার প্রতি) আপনি তো এ সকল বিষয় অনেক আলোচনা ক’রেচেন—আপনার কি মনে হয় না, রূপরসগন্ধ-স্পর্শের চেয়ে শব্দই যেন আমাদের আত্মার অব্যবহিত প্রত্যক্ষের বিষয়। সেই জন্যই এক আত্মার সঙ্গে আর এক আত্মার মিলন-সাধনের প্রধান উপায় শব্দ। আপনি কী বলেন? (স্বগত) মেয়েটি ভারি লাজুক।
শ্যামা। বলো না মা, যা জিজ্ঞাসা ক’র্চেন বলো! এতো বিদ্যে শিখ্লে, এই কথাটার উত্তর দিতে পার্চো না? বাবা, প্রথমদিন কি না, তাই লজ্জা ক’র্চে। ও যে কিছু শেখে নি, তা মনে কোরো না।
আশু। ওঁর বিদ্যার উজ্জ্বলতা মুখশ্রীতেই প্রকাশ পাচ্চে। আমি কিছুমাত্র সন্দেহ ক’র্চিনে।
শ্যামা। নিরু, মা, একবার ও-ঘরে যাও তো। (নিরুপমার প্রস্থান) দেখো বাবা, মেয়েটির বাপ নেই, সকল কথা আমাকেই কইতে হ’চ্চে— তুমি কিছু মনে কোরো না।
আশু। মনে ক’র্বো! বলেন কী? আপনার কথা শুন্তেই তো এসেছিলেম—বাচালের মতো কেবল নিজেই কতকগুলো ব’কে গেলেম। আমাকে মাপ ক’র্বেন।
শ্যামা। তোমার যদি মত থাকে, তাহ’লে একটা দিনস্থির ক’র্তে হ’চ্চে তো?
আশু। (স্বগত) আমি ভেবেছিলেম, আজই সমস্ত হ’য়ে যাবে। কিন্তু আজ বৃহস্পতিবার, তাই বোধ হয় হ’ল না। (প্রকাশ্যে) তা আস্চে রবিবারেই যদি স্থির করেন?
শ্যামা। বলো কী বাবা। আজ বৃহস্পতিবার, মাঝে তো কেবল দুটো দিন আছে!
আশু। এর জন্যে কি অনেক আয়োজনের দরকার হবে?
শ্যামা। তা হবে বৈ কি বাবা—যথাসাধ্য ক’র্তে হবে। ছাড়া, পাঁজি দেখে একটা শুভদিন স্থির ক’র্তে হবে তো।
আশু। তা বটে, শুভদিন দেখ্তে হবে বৈ কি! আসল কথা, যতো শীঘ্র হয়! আমার যে-রকম আগ্রহ, ইচ্ছে হ’চ্চে, এই মুহুর্ত্তেই—
শ্যামা। তা আমি অনর্থক দেরি কর্বো না বাবা। আস্চে অঘ্রাণমাসেই হ’য়ে যাবে। মেয়েটিরও বিবাহযোগ্য বয়স হ’য়ে এসেছে, ওকেও তো আর রাখা যাবে না।
আশু। ওঁর বিবাহ হ’য়ে গেলেই বুঝি—
শ্যামা। তাহ’লেই আবার আমি কাশীতে ফিরে যেতে পারি।
আশু। তাহ’লে তা’র আগেই আমাদের—
শ্যামা। সব ঠিক ক’রে নিতে হবে।
আশু। তবে দিনক্ষণ দেখুন!
শ্যামা। তুমি তো রাজি আছ বাবা!
আশু। বিলক্ষণ! রাজি যদি না থাক্বো তো এখানে এলেম কেন। আপনাকে নিয়ে কি আমি পরিহাস ক’র্চি! আমার সে-রকম স্বভাব নয়। আমি এখনকার ছেলেদের মতো এ সকল বিষয় নিয়ে তামাসা করিনে!
শ্যামা। তোমার আর মত বদ্লাবে না!
আশু। কিছুতেই না! আপনার পদস্পর্শ ক’রে আমি ব’ল্চি, আপনার কাছ থেকে যা গ্রহণ ক’র্তে এসেচি, তা আমি গ্রহণ ক’রে, তবে নিরস্ত হবো।
শ্যামা। দেওয়া থোওয়ার কথা কিছু হ’লো না যে!
আশু। আপনি কী চান্ বলুন্।
শ্যামা। আমি কী চাইবো বাবা! তুমি কী চাও, সেইটে বলো!
আশু। আমি কেবল বিদ্যে চাই, আর কিছু চাই নে!
শ্যামা। (স্বগত) ছেলেটি কিন্তু বেহায়া, তা ব’ল তেই হবে! ছি ছি ছি, বিদ্যেসুন্দরের কথা আমার কাছে পাড়্লে কী ক’রে? আমার নিরুকে বলে কি না বিদ্যে! (প্রকাশ্যে) তাহ’লে পানপাত্রটার কথা কী বলো বাবা!
আশু। (স্বগত) পানপাত্র! এঁর দেখ্চি সমস্তই শাক্তমতে। এদিকে কুমারী কন্যা, তা’র পরে আবার পানপাত্র! এইটে আমার ভালো ঠেক্চে না! (প্রকাশ্যে) তা মাতাজি, আপনি কিছু মনে, ক’র্বেন না—অবশ্য যে কাজের যা অঙ্গ তা ক’র্তেই হয়। কিন্তু ঐ যে পানপাত্রের কথা ব’ল্লেন, ওটা আমার দ্বারা হবে না।
শ্যামা। বাবা তোমরা এ কালের ছেলে, তোমরা ওটাকে অসভ্যতা মনে কর, কিন্তু আমি তো ওতে কোনো দোষ দেখিনে—
আশু। আপনি ওতে কোনো দোষই দেখেন না? বলেন কী মাতাজি?
শ্যামা। তা না হয় পানপাত্র রইলো, ওর জন্যে কিছু আট্কাবে না, এখন বিবাহের কথা তো পাকা?
আশু। কার বিবাহের কথা!
শ্যামা। তুমি আমাকে অবাক্ ক’র্লে বাপু! এতােক্ষণ কথাবার্ত্তার পর জিজ্ঞাসা ক’র্চো কার বিবাহের কথা! তােমারি তো বিবাহের কথা হ’চ্চিলো—কেবল পানপাত্রের কথা শুনে তুমি চম্কে উঠলে। তা পানপাত্র না হয় না-ই হ’লো।
আশু। (হতবুদ্ধিভাবে) ও, হাঁ, তা বুঝেচি, তাই হ’চ্চিলো বটে! (স্বগত) মস্ত একটা কী ভুল হ’য়ে গেচে। না বুঝে একেবারে জড়িয়ে প’ড়েচি। কী করা যায়! (প্রকাশ্যে) কিন্তু এতাে তাড়াতাড়ি কিসের, আর এক দিন এ সব কথা খােলসা ক’রে আলােচনা করা যাবে! কী বলেন?
শ্যামা। খােলসার আর কী বাকি রেখেচো বাবা! আর-এক-দিন এর চেয়ে আর কতাে খােলসা হবে। তাড়াতাড়ি তাে তুমিই ক’র্ছিলে। আস্চে রবিবারেই তুমি দিনস্থির ক’র্তে চেয়েছিলে!
আশু। তা চেয়েছিলুম বটে।
শ্যামা। তুমি দেখাশুনা ক’র্তে চাইলে ব’লেই আমি মেয়েকে তােমার সাক্ষাতে বের ক’র্লুম; তা’র গানও শুন্লে—এখন পানপাত্রের কথা শুনেই যদি বেঁকে দাঁড়াও, তা হ’লে তাে আমার আর মুখ দেখাবার জো থাক্বে না। তােমাকেই বা লােকে কী ব’ল্বে বাবা! ভদ্রলােকের মেয়ের সঙ্গে এমন ব্যবহার কি ভালো? আমার নিরু তােমার কাছে কী দোষ ক’রেছিলাে যে (ক্রন্দন)—
নিরুপমার দ্রুত প্রবেশ
নিরুপমা। মা, কী হয়েছে মা, অমন করে কাঁদ্চো কেন?
আশু। (স্বগত) কী সর্ব্বনাশ! আমাকে এঁরা সবাই কী মনে ক’র্বেন না জানি! (প্রকাশ্যে) কিছু হয় নি, আমি সমস্তই ঠিক ক’রে দিচ্চি। আপনারা কান্নাকাটি ক’র্বেন না। শুভকর্ম্মে ওতে অমঙ্গল হয়। (শ্যামার প্রতি) তা, আপনি একটা দিন স্থির ক’রে দিন্— আমার তা’তে কোনাে আপত্তি নেই।
শ্যামা। তা বাবা যদি ভালাে দিন হয়, তা হলে তুমি যা ব’লেছিলে, আস্চে রবিবারেই হয়ে যাক্। আমার আয়ােজনে কাজ নেই। এই ক-টা দিন তােমার মত স্থির থাক্লে বাঁচি।
আশু। অমন কথা ব’ল্বেন না—আমার মতের কখনাে নড় চড় হয় না।
শ্যামা। আমার পা ছুঁয়ে তো তাই ব’লেওছিলে, কিন্তু দশমিনিট্ না যেতেই এক পানপত্রের কথা শুনেই তােমার মত ব’দ্লে গেল।
আশু। তা বটে। পানপাত্রটা আমি আদবে পছন্দ করি না—
শ্যামা। কেন বলো তো বাবা?
আশু। তা ঠিক্ ব’ল্তে পার্চিনে—ওই আমার কেমন—বােধ হয়, ওটা—কী জানেন,পানপাত্রটা যেন-কে জানে ও কথাটাই কেমন—হঠাৎ শুন্লে কী যেন—তা এই বাড়িটার নম্বর কী বলুন দেখি।
শ্যামা। ওঃ, তাই বুঝি ভাব্চো? আমরা তােমাকে ভাঁড়াচ্চি নে বাবা! আমরাই উনপঞ্চাশ নম্বরে ছিলুম, কাল এই বাইশ নম্বরে উঠে এসেচি। যদি মনে কোনো সন্দেহ থাকে, উনপঞ্চাশ নম্বরে বরঞ্চ একবার খোঁজ করে আস্তে পারে।
আশু। (স্বগত) উঃ, কী ভুলই ক’রেচি! যা হােক্, এখন একটা পরিত্রাণের রাস্তা পাওয়া গেচে। অন্নদাকে এনে দিলেই সমস্ত গােল মিটে যাবে! যা হােক্, অন্নদার অদৃষ্ট ভালো। একএকবার মনে হ’চ্চে ভুলটা শেষ পর্য্যন্ত টেনে নিয়ে গেলে মন্দ হয় না।
শ্যামা। কী বাবা! এতাে ভাবচো কেন? আমরা ভদ্রঘরের মেয়ে—তােমাকে ঠকাবার জন্যে পশ্চিম থেকে এখেনে আসিনি।
আশু। ও কথা ব’ল্বেন না, আমার মনে কোনাে সন্দেহ নেই। এখন আমি যাচ্চি―একঘণ্টার মধ্যে ফিরে আস্বো—আজকের দিনের মধ্যেই একটা সন্তোষজনক বন্দোবস্ত ক’র্বােই, এ আমি আপনার পা ছুঁয়ে শপথ ক’রে যাচ্চি।
শ্যামা। বাবা, ও শপথে কাজ নেই—পা ছুঁয়ে আরাে একবার শপথ ক’রেছিলে—
আশু। আচ্ছা, আমি আমার ইষ্টদেবতার শপথ ক’রে যাচ্চি, আজকের মধ্যেই সমস্ত পাকা ক’রে তবে অন্য কথা।
শ্যামা। (স্বগত) ছেলেটি কথাবার্ত্তায় বেশ, কিন্তু ওকে কিছুই বুঝবার জো নেই! কখনো বা তাড়া দেয়, কখনো বা ঢিল দেয়, অথচ মুখ দেখে ওর প্রতি অবিশ্বাসও হয় না।
আশু। তবে অনুমতি করেন তো এখন আসি!
শ্যামা। তা এসাে বাবা। (প্রণাম করিয়া আশুর প্রস্থান)।
পঞ্চম অঙ্ক
অন্নদা
অন্নদা। ব্যাপারখানা তো কিছুই বুঝতে পারলেম না। ঘটকের কথা শুনে এলেম কন্যা দেখতে। যিনি দেখা দিলেন, তাঁকে তো, বয়স দেখে কোনােমতেই কন্যার মা ব’লে মনে হয় না—চেহারা দেখে বােধ হলো অপ্সরী—যদিচ অপ্সরীর চেহারা কী রকম, পূর্ব্বে কখনাে দেখিনি। শেকহ্যাণ্ড ক’র্তে যেম্নি হাত বাড়িয়ে দিয়েচি, অমনি ফস ক’রে আমার হাতে কড়িবাঁধা একগাছি লাল সুতো বেঁধে দিলে। আর কেউ হ’লে গােলমাল ক’র্তেম—কিন্তু যে সুন্দর চেহারা, গােলমাল কর্বার জো কী। কিন্তু এ সমস্ত কোন্-দেশী দস্তুর, তা তত বুঝতে পার্চিনে।
মাতাজির প্রবেশ
মাতাজি। (স্বগত) অনেক সন্ধান ক’রে তবে পেয়েচি। আগে আমার গুরুদত্ত বশীকরণ মন্ত্রটা খাটাই, তা’র পরে পরিচয় দেবো। (অন্নদার কপালে নরকপাল ঠেকাইয়া) বলো, হুর্লিং।
অন্নদা। হুর্লিং।
মাতাজি। (অন্নদার গলায় জবার মালা পরাইয়া) বলল, কুড়বং কড়বং ক্ড়াং |
অন্নদা। (স্বগত) ছি ছি ভারি হাস্যকর হ’য়ে উঠ্চে। একে আমার কোটের উপর জবার মালা, তা’র উপরে আবার এই অদ্ভুত শব্দগুলো উচ্চারণ!
মাতাজি। চুপ করে রইলে যে!
অন্নদা। ব’ল্চি। কী ব’ল্ছিলেন বলুন!
মাতাজি। কুড়বং কড়বং ক্ড়াং!
অন্নদা। কুড়বং কড়বং ক্ড়াং (স্বগত) রিডিক্লাস।
মাতাজি। মাথাটা নীচু করাে। কপালে সিঁদুর দিতে হবে!
অন্নদা। সিঁদুর! সিঁদুর কি এই বেশে আমাকে ঠিক মানাবে।
মাতাজি। তা জানিনে, কিন্তু ওটা দিতে হবে। (অন্নদার কপালে সিঁদুর লেপন।)
অন্নদা। ইস্, সমস্ত কপালে যে একেবারে লেপে দিলেন!
মাতাজি। বলো বজ্রযােগিন্যৈ নমঃ। (অন্নদার অনুরূপ আবৃত্তি) প্রণাম করাে। (অন্নদাকর্ত্তৃক তথাকৃত) বলাে কুড়বে কড়বে নমঃ। প্রণাম করাে! বলে হুর্লিঙে ঘুর্লিঙে নমঃ! প্রণাম করাে!
অন্নদা। (স্বগত) প্রহসটা ক্রমেই জ’মে উঠচে!
মাতাজি। এইবার মাতা বজ্রযােগিনীর এই প্রসাদী বস্ত্রখণ্ড মাথায় বাঁধো!
অন্নদা। (স্বগত) এই শালুর টুক্রােটা মাথায় বাঁধতে হবে! ক্রমেই যে বাড়াবাড়ি হ’তে চ’ল্ল! (প্রকাশ্যে) দেখুন, এর চেয়ে বরঞ্চ আমি পাগ্ড়ি প’র্তেও রাজি আছি—এমন কি বাঙালিবাবুরা যে টুপি পরে তাও প’র্তে পারি—
মাতাজি। সে সমস্ত পরে হবে, আপাতত এইটে জড়িয়ে দিই!
অন্নদা। দিন!
মাতাজি। এইবারে এই পিঁড়িটাতে বসুন!
অন্নদা। (স্বগত) মুষ্কিলে ফেল্লে! আমি আবার ট্রাউজার প’রে এসেছি। যাই হােক্, কোনােমতে ব’স্তেই হবে! (উপবেশন)
মাতাজি। চোখ বােজো। বলো, খটকারিণী, হঠবারিণী, ঘটসারিণী, নটতারিণী ক্রং! প্রণাম করো। (অন্নদার তথাকরণ) কিছু দেখতে পাচ্চো?
অন্নদা। কিচ্ছু না।
মাতাজি। আচ্ছা, তা হ’লে পূবমুখাে হ’য়ে ব’সাে—ডান কানে হাত দাও। বলাে খটকারিণী, হঠবারিণী, ঘটসারিণী, নটতারিণী ক্রং। প্রণাম করো। এবার কিছু দেখ্তে পাচ্চো?
অন্নদা। কিছু না।
মাতাজি। আচ্ছ। তা হ’লে পিছন ফিরে বসো! দুই কানে দুই হাত দাও! বলো খটকারিণী হঠবারিণী ঘটমারিণী নটতারিণী ক্রং। কিছু দেখ্তে পাচ্চো?
অন্নদা। কী দেখতে পাওয়া উচিত, আগে আমাকে বলুন?
মাতাজি। একটা গর্দ্দভ দেখতে পাচ্চো তো?
অন্নদা। পাচ্চি বৈ কি! অত্যন্ত নিকটে দেখতে পাচ্চি।
মাতাজি। তবে মন্ত্র ফ’লেছে। তা’র পিঠের উপরে—
অন্নদা। হাঁ হাঁ তার পিঠের উপরে একজনকে দেখতে পাচ্চি বৈ কি।
মাতাজি। গর্দ্দভের দুই কান দুই হাতে চেপে ধ’রে—
অন্নদা। ঠিক ব’লেচেন, কোসে চেপে ধ’রেচে—
মাতাজি। একটি সুন্দরী কন্যা—
অন্নদা। পরমা সুন্দরী—
মাতাজি। ঈশানকোণের দিকে চ’লেচেন—
অন্নদা। দিক ভ্রম হয়ে গেচে—কোন্ কোণে যাচ্চেন তা ঠিক ব’ল্তে পার্চিনে! কিন্তু ছুটিয়ে চ’লেচেন বটে! গাধাটার হাঁফ ধ’রে গেল।
মাতাজি। ছুটিয়ে যাচ্চেন না কি? তবে তো আর একবার—
অন্নদা। না, না, ছুটিয়ে যাবেন কেন—কী-রকম যাওয়াটা আপনি স্থির ক’র্চেন বলুন দেখি?
মাতাজি। একবার এগিয়ে যাচ্চেন, আবার পিছু হ’টে পিছিয়ে আস্চেন।
অন্নদা। ঠিক তাই! এগােচ্চেন আর পিচোচ্চেন! গাধাটার জিভ বেরিয়ে প’ড়েছে।
মাতাজি। তা হলে ঠিক হয়েছে। এবার সময় হ’লাে। ওলো মাতঙ্গিনী তােরা সবাই আয়!
হুলুধ্বনি-শঙ্খধ্বনি করিতে করিতে স্ত্রীদলের প্রবেশ
(অন্নদার বামে মাতাজির উপবেশন ও তাহার হস্তে হস্তস্থাপন)
অন্নদা। এটা বেশ লাগচে, কিন্তু ব্যাপারটা কী ঠিক্ বুঝতে পার্চিনে।
রমণীগণের গান
এবার সখি সােনার মৃগ
দেয় বুঝি দেয় ধরা!
আয় গো তােরা পুরাঙ্গনা
আয় সবে আয় ত্বরা!
ছুটেছিলাে পিয়াসভরে
মরীচিকা-বারির তরে,
ধ’রে তা’রে কোমল করে
কঠিন ফাসি পরা’!
দয়ামায়া করিস্নে গাে,
ওদের নয় সে ধারা!
দয়ার দোহাই মান্বে না যে
এক্টু পেলেই ছাড়া!
বাঁধন-কাটা বন্যটাকে
মায়ার ফাঁদে ফেলাও পাকে,
ভুলাও তা’কে বাঁশির ডাকে
বুদ্ধিবিচারহরা!
অন্নদা। বুদ্ধিবিচার একেবারেই যায় নি! অতি সামান্যই বাকি আছে। তা’র থেকে মনে হ’চ্চে, ঐ যে যাকে জন্তু-জানােয়ার বলা হ’লো, সে সৌভাগ্যশালী আমি ছাড়া, উপস্থিত ক্ষেত্রে, আর কেউ হ’তেই পারে না! গানটি ভালো, সুরটিও বেশ, কণ্ঠস্বরও নিন্দা করা যায় না— কিন্তু রূপক ভেঙে সাদাভাষায় একটু স্পষ্ট ক’রে সবটা খুলে বলুন দেখি, —আমার সম্বন্ধে আপনারা কী ক’র্তে চান্! পালাবো এমন আশঙ্কা ক’র্বেন না, আপনারা তাড়া দিলেও নয়। কিন্তু কোথায় এলুম, কেন এলুম, কোথায় যাবাে, এ সকল গুরুতর প্রশ্ন মানবমনে স্বভাবতই উদয় হ’য়ে থাকে।
মাতাজি। তােমার স্ত্রীকে কি মাঝে মাঝে স্মরণ করাে?
অন্নদা। ক’রে লাভ কী, কেবল সময় নষ্ট! তাঁকে স্মরণ ক’রে যেটুকু সুখ, আপনাদের দর্শন ক’রে তা’র চেয়ে ঢের বেশি আনন্দ!
মাতাজি। তােমার স্ত্রী যদি তােমাকে স্মরণ ক’রে সময় নষ্ট করেন?
অন্নদা। তা হ’লে তাঁর প্রতি আমার উপদেশ এই যে, আর অধিক নষ্ট করা উচিত হয় না—হয় বিস্মরণ ক’র্তে আরম্ভ করুন, নয় দর্শন দিন, সময়টা মূল্যবান জিনিষ!
মাতাজি। সেই উপদেশই শিরােধার্য্য। আমিই তােমার সেবিকা শ্রীমতী মহীমােহিনী দেবী।
অন্নদা। বাঁচালে! মনে যে-রকম ভাবােদ্রেক ক’রেছিলে, নিজের স্ত্রী না হ’লে গলায় দড়ি দিতে হ’তাে। কিন্তু নিজের স্বামীর জন্যে এ সমস্ত ব্যাপার কেন?
মাতাজি। গুরুর কাছে যে বশীকরণমন্ত্র শিখেছিলেম, আগে সেইটে প্রয়ােগ ক’রে তবে আত্মপরিচয় দিলেম, এখন আর তােমার নিষ্কৃতি নেই।
অন্নদা। আর কারাে উপর এ মন্ত্রের পরীক্ষা করা হ’য়েচে?
মাতাজি। না তােমার জন্যেই এতোদিন এ মন্ত্র ধারণ ক’রে রেখেছিলেম! আজ এর আশ্চর্য্য প্রত্যক্ষফল পেয়ে গুরুর চরণে মনে মনে শতবার প্রণাম ক’র্চি। অব্যর্থ মন্ত্র! মন্ত্রে তােমার কি বিশ্বাস হ’লাে না?
অন্নদা। বশীকরণের কথা অস্বীকার ক’র্তে পারি নে! এখন তােমাকে এক বার এই মন্ত্রগুলাে পড়িয়ে নিতে পার্লে আমি নিশ্চিন্ত হই।
(দাসীকর্ত্তৃক সম্মুখে আহার্য্য স্থাপন)
অন্নদা। এ-ও বশীকরণের অঙ্গ। বন্যমৃগই হােক্,আর সহুরে গাধাই হােক্, পােষ মানাবার পক্ষে এটা খুব দরকারী। (আহারে প্রবৃত্ত)
আশুর দ্রুত প্রবেশ। মাতাজি প্রভৃতির প্রস্থান
আশু। ওহে অন্নদা, ভারি গােলমাল বেধে গেচে। বাঃ, তুমি যে দিব্যি আহার ক’র্তে ব’সেচো! তােমার এ কী রকমের সাজ! (উচ্চহাস্য) ব্যাপারখানা কী! নরমুণ্ড, খাঁড়া, বাতি, জবার মালা? তােমার বলিদান হবে না কি?
অন্নদা। হ’য়ে গেচে।
আশু। হ’য়ে গেচে কী রকম?
অন্নদা। সে সকল ব্যাখ্যা পরে ক’র্বো। তােমার খবরটা আগে বলো।
আশু। তুমি বিবাহের জন্যে যে কন্যাটিকে দেখবে ব’লে স্থির ক’রেছিলে, তাঁরা হঠাৎ উনপঞ্চাশ নম্বর থেকে বাইশ নম্বরে উঠে গেচেন। আমি কন্যার বিধবা মাকে মাতাজি মনে ক’রে বরাবর এমন নির্ব্বোধের মতো কথাবার্ত্তা ক’য়ে গেচি যে, তাঁরা ঠিক ক’রে নিয়েচেন —আমি মেয়েটিকে বিবাহ ক’র্তে সম্মত হ’য়েচি। এখন তুমি না গেলে তো আর উদ্ধার নেই।
অন্নদা। মেয়েটি দেখতে কেমন?
আশু। দেবকন্যার মতো।
অন্নদা। তা হােক্, বহুবিবাহ আমার মতবিরুদ্ধ।
আশু। বলাে কী? সেদিন এতাে তর্ক ক’র্লে—
অন্নদা। সেদিনকার চেয়ে ঢের ভালো যুক্তি পাওয়া গেচে—
আশু। একেবারে অখণ্ডনীয়?
অন্নদা। অখণ্ডনীয়।
আশু। যুক্তিটা কীরকম দেখা যাক্!
অন্নদা। তবে একটু ব’সাে। (প্রস্থান ও মাতাজিকে লইয়া প্রবেশ) ইনি আমার স্ত্রী শ্রীমতী মহীমােহিনী দেবী।
আশু। অ্যাঁ! ইনি তােমার—আপনি আমাদের অন্নদার—কী আশ্চর্য্য তা হ’লে তাে হ’তে পারে না!
অন্নদা। হতে পারে না কী ব’ল্চো! হ’য়েচে, আবার হ’তে পারে না কি! একবার হ’য়েচে, এই আবার দু-বার হ’লো, তুমি ব’ল্চো হ’তে পারে না!
আশু। আমি তা ব’ল্চিনে। আমি ব’ল্চি, সেই বাইশ নম্বরের কী করা যায়।
অন্নদা। সে আর শক্ত কী! সহজ উপায় আছে।
আশু। কী বলো দেখি!
অন্নদা। বিয়ে করে ফেলো!
আশু। সমস্ত বিসর্জ্জন দেবো—আমার হঠযোগ, প্রাণায়াম, মন্ত্রসাধন—
অন্নদা। ভয় কী, তুমি যেগুলো ছাড়বে, আমি সেগুলো গ্রহণ ক’র্বো। সে যাই হোক, তোমার বশীকরণটা কীরকম হ’লো?
আশু। তা নিতান্ত কম হয় নি। তোমার এই একটা ঠাট্টা কর্বার বিষয় হ’লো!
অন্নদা। আর ঠাট্টা চ’ল্বে না।
আশু। কেন বলো দেখি?
অন্নদা। আমারো বশীকরণ হয়ে গেচে।
আশু। চ’ল্লেম। এক ঘণ্টার মধ্যেই যাবার কথা আছে। কথাটা পাকা ক’রে আসি গে!
বিনিপয়সায় ভোজ
বিনিপয়সায় ভােজ
আপিসের বেশে অক্ষয় বাবু।
(হাসিতে হাসিতে) আজ আচ্ছা জব্দ ক’রেচি। বাবু রােজ আমাদের স্কন্ধে বিনামূল্যে বিনামাশুলে ইয়ার্কি দিয়ে বেড়ান, আর লম্বা চওড়া কথা কন্! মশায়, আজ বছর খানেক ধ’রে রােজ বলে আজ খাওয়াবাে,কাল খাওয়াবাে,খাওয়াবার নাম নেই! যতােখানি আশা দিয়েছে তা’র শিকি পরিমাণ যদি আহার দিত তা হ’লে এতোদিনে তিনটে রাজসূয় যজ্ঞ হ’তে পা’র্তাে। যা হােক্ আজ তো বহু কষ্টে একটা নিমন্ত্রণ আদায় করা গেছে। কিন্তু দুটি ঘণ্টা ব’সে আছি এখনাে তার দেখা নেই।
ফাঁকি দিলে না তাে? (নেপথ্যে চাহিয়া) ওরে কী তাের নাম, ভূতাে, মােধো, না হরে?,
চন্দ্রকান্ত? আচ্ছা বাবু তাই সই। তা ভালাে চন্দ্রকান্ত, তােমার বাবু কখন্ আস্বে বলো দেখি?
কী বল্লি! বাবু হােটেল থেকে খাবার কিনে আন্তে গেচেন? বলিস্ কী রে? আজ তবে তো রীতিমত খানা! ক্ষিদেটিও দিব্যি জ’মে এসেচে! মটনচপের হাড়গুলি একেবারে পালিশ ক’রে হাতির দাঁতের চুষিকাঠির মতাে চক্চকে ক’রে রেখে দেবাে। একটা মুর্গির কারি অবিশ্যি থাক্বে—কিন্তু কতোক্ষণই বা থাক্বে? আর দুরকমের দুটো পুডিং যদি দেয় তা হ’লে চেঁচেপুঁচে চীনের বাসনগুলােকে একেবারে কাঁচের আয়না বানিয়ে দেবো। যদি মনে ক’রে ডজন্দুত্তিন অয়ষ্টার প্যাটি আনে তা হ’লে ভােজনটি বেশ পরিপাটি রকমের হয়। আজ সকাল থেকে ডান চোখ নাচ্চে, বােধ হয় অয়ষ্টার প্যাটি আস্বে! ওহে ও চন্দ্রকান্ত, তােমার বাবু কখন্ গেছেন বলো দেখি?
অনেকক্ষণ গেচেন? তবে আর বিস্তর বিলম্ব নেই। ততােক্ষণ একছিলিম তামাক দাও না। অনেকক্ষণ ধ’রে ব’ল্চি কিন্তু তােমার কোনাে গা দেখ্চিনে!—
তামাক বাইরে নেই? বাবু বন্ধ ক’রে রেখে গেছেন? এমন তো কখনো শুনিনি! এ তাে কোম্পানির কাগজ নয়! কী করা যায়! আমি একটু-আধটু আফিম খাই, তামাক না হ’লে তো আর বাঁচিনে! ওহে মােধো, না না চন্দ্রকান্ত, কোনাে মতে মালিদের কাছ থেকে হােক্ যেখান থেকে হােক্ এক ছিলিম জোগাড় ক’রে দিতে পারো না?
বাজার থেকে কিনে আন্তে হবে? পয়সা চাই? আচ্ছা বাপু তাই সই! এই নাও, এক পয়সার তামাক চট্ ক’রে কিনে নিয়ে এসাে।
এক পয়সায় তামাক হবে না? কেন হবে না? বাপু, আমাকে কি মুচিখােলার নবাব ব’লে হঠাৎ তােমার ভ্রম হয়েছে? যােলাে টাকা ভরির অম্বুরি তামাক না হ’লেও আমার কষ্টেসৃষ্টে চ’লে যায়— এক পয়সাতেই ঢের হবে।
হুঁকো কোল্কেও কিনে আন্তে হবে? সে-ও তােমার বাবু লােহার সিন্দুকে পূরে রেখে গেছেন না কি? বাঙাল ব্যাঙ্কে সেফ্ ডিপজিট করে আসেন নি কেন? ওরে বাস্রে! এ তাে ভালাে জায়গায় এসে পড়া গেচে দেখ্চি! তা নাও, এই ছ’টি পয়সা ট্রামের জন্যে রেখেছিলুম। উদয় ফিরে এলে তার কাছ থেকে সুদসুদ্ধ আদায় ক’রে নিতে হবে!—এই বুঝি বাবুর বাগানবাড়ি, তা হ’লে এঁর ভদ্রাসন বাড়ি কী রকম হবে না জানি! কড়িগুলো মাথায় ভেঙে না প’ড়্লে বাঁচি। এই তাে একখানি ভাঙা চৌকি আস্বাবের মধ্যে! এ আমার ভর সইবে না! সেই অবধি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে পা ব্যথা হ’য়ে গেল—আর তো পারিনে—এই মাটিতেই বসা যাক্!
(কোঁচা দিয়া ধূলা ঝাড়িয়া একটা খবরের কাগজ মাটিতে পাতিয়া উপবেশন ও গুন্ গুন্ স্বরে গান)
যদি জোটে রােজ
এম্নি বিনি পয়সায় ভােজ!
ডিশের পরে ডিশ্
(শুধু) মটন্ কারি ফিশ্,
সঙ্গে তারি হুইস্কি সােডা দুচার রয়াল ডােজ!
পরের তহবীল্
চোকায় উইল্সনের বিল্;
থাকি মনের সুখে হাস্যমুখে কে কার রাখে খোঁজ!—
কইরে! তামাক এলো? ও কী রে! শুধু কোল্কে? হুঁকো কই? এখানে ছ-পয়সায় হুঁকো পাওয়া যায় না? কোল্কেটার দাম দু-আনা! হ্যা দ্যাখ বাপু চন্দ্রকান্ত,বাইরে থেকে আমাকে দেখে যতটা বােকা মনে হয় আমি ততোটা নই! শরীরটা যতো মােটা, বুদ্ধিটা তা’র চেয়ে কিঞ্চিৎ সূক্ষ্ম! তােমার বাবু যে হুঁকোটা কোল্কেটা তামাকটা পর্য্যন্ত আয়রণ্চেষ্টে তুলে রেখে দেন এতােক্ষণে তা’র কারণ বােঝা গেল। কেবল তােমার মতাে রত্নটিকে বাইরে রাখাই তাঁর ভুল হ’য়েছে। বােধ হয় বেশি দিন বাইরে থাক্তেও হবে না! কোম্পানি বাহাদুর একবার খবরটি পেলেই পাহারা বসিয়ে খুব হেপাজতের সঙ্গেই তােমাকে রাখ্বেন! যা হােক্ তামাক না খেয়ে তো আর বাঁচিনে! (কলিকায় মুখ দিয়া তামাক টানিয়া কাশিতে কাশিতে) ওরে বাবা, এ কোথাকার তামাক! এ যে উইল্ ক’রে টান্তে হয়! এর দু-টান টান্লে স্বয়ং বাবা ভােলানাথের মাথার চাঁদি ফট্ ক’রে ফেটে যায়, নন্দীভৃঙ্গীর ভীর্ম্মি লাগে! কাজ নেই বাপু, থাক্! বাবু আগে আসুন! কিন্তু বাবুর আস্বার জন্যে তাে কোনাে রকম তাড়া দেখ্চিনে! সে বােধ হয় প্যাটিগুলো একটি একটি ক’রে শেষ ক’র্চে। এদিকে আমার পেট এমনি জ্ব’লে উঠেচে যে, মনে হ’চ্চে যেন এখনি কোঁচায় আগুন ধ’রে যাবে! তৃষ্ণাও পেয়েচে। কিন্তু জল চাইলেই আমাদের চন্দ্রকান্ত ব’লে ব’স্বেন গেলাস্ কিনে আন্তে হবে, বাবু, বন্ধ ক’রে রেখে গেচেন। কাজ নেই, বাগানের ডাব খাওয়া যাক্।
ওহে বাপু চন্দ্র, একটি কাজ ক’র্তে পারো? বাগান থেকে চট্ ক’রে একটি ডাব পেড়ে আন্তে পারো? বড় তেষ্টা পেয়েচে!—
কেন? ডাব পাওয়া যাবে না কেন? বাগানে তাে ডাব বিস্তর দেখে এলুম?
সব গাছ জমা দেওয়া হ’য়েচে? তা হােক্ না বাপু, একটি ডাবও মিল্বে না?
পয়সা চাই? পয়সা তাে আর নেই! তবে থাক্, বাবু আসুন, তা’র পরে দেখা যাবে!―সঙ্গে মাইনের টাকা আছে কিন্তু ওকে ভাঙাতে দিতে সাহস হয় না। এখনো কোম্পানির মুলুকে যে এতো বড়ো একটি ডাকাত বাইরে ছাড়া আছে তা আমি জান্তুম না!—যাই হোক্ এখন উদয় এলে যে বাঁচি!
ঐ বুঝি আস্চে! পায়ের শব্দ শুন্চি। আঃ বাঁচা গেল। ওহে উদয়, ওহে উদয়! কই, না তো! তুমি কে হে?―
বাবু তোমাকে পাঠিয়ে দিলেন? তা’র চেয়ে নিজে এলেই তো ভালো ক’র্তেন! ক্ষিদেয় যে মারা গেলুম!
হোটেলের বাবু? কেরাণী বাবু? কই, তাঁর সঙ্গে আমার তো কোনো আত্মীয়তা নেই। কিছু খাবার পাঠিয়েচেন ব’ল্তে পারো? অয়ষ্টার প্যাটি?
পাঠান্ নি? বিল্ পাঠিয়েচেন? কৃতার্থ ক’রেচেন আর কি! যে বাবুটির নামে বিল্ তিনি এখানে উপস্থিত নেই!
আরে না রে না! আমি না। এও তো ভালো বিপদে প’ড়্লুম! —আরে মাইরি না! কী গেরো! তোমাকে ঠ’কিয়ে আমার লাভ কী বাপু? আমি নিমন্ত্রণ খেতে এসে তিন ঘণ্টা এখানে ব’সে আছি— তুমি হোটেল থেকে আস্চো, তবু তোমাকে দেখেও অনেকটা তৃপ্তি হ’চ্চে। বোধ হয় তোমার ঐ চাদরখানা সিদ্ধ ক’র্লে ওর থেকে নিদেন—ভয় নেই, আমি তোমার চাদর নেবো না, কিন্তু বিল্টিও চাইনে!
এ তো ভালো মুস্কিল দেখ্চি! ওগো না গো না! আমি উদয় বাবু নই, আমি অক্ষয় বাবু! কী গেরো! আমার নাম আমি জানিনে তুমি জানো? অতো গোলে কাজ কী বাবু, তুমি নীচে গিয়ে একটু বোসো, উদয় বাবু এখনি আস্বেন।
বিধাতা সকাল বেলায় এই জন্যেই কি ডান চোখ নাচিয়েছিলে? হোটেল থেকে ডিনার না এসে বিল এসে উপস্থিত!
“সখি, কি মাের করম ভেল!
পিয়াস লাগিয়া জলদ সেবি, বজর পড়িয়া গেল!”
হে বিধি, তােমারই বিচারে সমুদ্রমন্থনে একজন পেলে সুধা আর একজন পেলে বিষ, হােটেলমন্থনেও কি একজন পাবে মজা আর একজন পাবে তা’র বিল্! বিল্টাও তো কমদিনের নয় দেখ্চি।
তুমি আবার কে হে? বাবু পাঠিয়ে দিলে? বাবুর যথেষ্ট অনুগ্রহ! কিন্তু তিনি কি মনে ক’রেচেন তােমার মুখখানি দেখেই আমার ক্ষুধা—তৃষ্ণা দূর হবে? তােমার বাবু তাে বড়ো ভদ্রলােক দেখ্চি হে?
কী ব’ল্লে? কাপড়ের দাম? কার কাপড়ের দাম?
উদয় বাবু কাপড় কিন্বেন আর অক্ষয় বাবু তা’র দাম দেবে। তােমার তো বিবেচনাশক্তি বেশ দেখ্চি।
সত্যি না কি? কিসে ঠাওরালে আমারই নাম উদয় বাবু? কপালে কি সাইনবাের্ড টাঙিয়ে রেখেচি? আমার অক্ষয় বাবু নামটা কি তােমার পছন্দ হ’লো না?
নাম ব’দ্লেচি? আচ্ছা বাপু শরীরটি তাে বদ্লানো সহজ ব্যাপার নয়। উদয় বাবুর সঙ্গে কোন্খানটা মেলে, বলো দেখি?
উদয় বাবুকে কখনাে চাক্ষুষ দেখােনি?—আচ্ছা একটু সবুর করো, তােমার মনের আক্ষেপ মিটিয়ে দেবো। বিস্তর দেরি হবে না, তিনি এলেন ব’লে।
আরে মােলো! আবার কে আসে? মশায়ের কোত্থেকে আসা হ’লাে? মশায়েরও এখানে নিমন্ত্রণ আছে বুঝি?
বাড়িভাড়া? কোন্ বাড়ির ভাড়া মশায়? এই বাড়ির? ভাড়াটা কতো হিসেবে?
মাসে সতেরো টাকা? তা হলে হিসেব করুন দেখি সাড়ে তিন ঘণ্টায় কতো ভাড়া হয়?
ঠাট্টা ক’র্চিনে মশায়—মনের সে রকম প্রফুল্ল অবস্থা নয়! এ বাড়িতে নিমন্ত্রিত হ’য়ে আমি সাড়ে তিন ঘণ্টা কাল আছি। সে জন্যেও যদি ভাড়া দিতে হয় তো ন্যায্য হিসেব ক’রে নিন্! তামাকটা পর্য্যন্ত পয়সা দিয়ে খেয়েচি।
আজ্ঞে না, আপনি ঠিকটি অনুমান ক’র্তে পারেন নি—আপনার ঈষৎ ভুল হ’য়েছে—আমার নাম উদয় নয়, অক্ষয়। এ রকম সামান্য ভুলে অন্য সময় বড়ো একটা কিছু আসে যায় না কিন্তু বাড়ি ভাড়া আদায়ের সময় বাপ মায়ে যার যে নাম দিয়েচেন সেইটে বাঁচিয়ে কাজ ক’র্লেই সুবিধে হয়!
আমাকে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে ব’ল্চেন? মাপ ক’র্বেন, ঐটি পার্বো না! সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে পেটের জ্বালায় ম’র্চি, ঠিক যেই খাবারটি আস্বার সময় হ’লো অমনি আপনি গাল দিচ্ছেন ব’লেই যে বাড়ি ছেড়ে চ’লে যাবো আমাকে তেমন গর্দ্দভ ঠাওরাবেন না! আপনি ঐখানেই বসুন, যা যা বল্বার অভিপ্রায় আছে ব’লে যান্, আমি আহারান্তে বাড়ি ছেড়ে যাবো!
ব’কে ব’কে আমার গলা শুকিয়ে এলো, আর তো বাঁচিনে! ক্ষিধেয় নাড়িগুলো বেবাক্ হজম হ’য়ে গেল! ঐ যে পায়ের শব্দ! ওহে উদয়, আমার অন্ধের নড়ি, আমার সাগরসেঁচা সাত রাজার ধন মাণিক, একবার উদয় হও হে! আর তো প্রাণ বাঁচে না!
তুমি আবার কে হে? যদি গালমন্দ দেবার থাকে তো ঐখানে ব’সে আরম্ভ ক’রে দাও! দোহার্কি কর্বার অনেকগুলি লোক উপস্থিত আছে!
হরি বাবু আমাকে ডেকে পাঠিয়েচেন? শুনে বড়ো সন্তোষ লাভ ক’র্লুম! তিনি আমাকে খুব ভালোবাসেন সন্দেহ নেই কিন্তু আমার পরমবন্ধু যাঁরা আমাকে নিমন্ত্রণ ক’রে পাঠিয়েছেন তাঁদের কোনো দেখা সাক্ষাৎ নেই আর যাঁদের সঙ্গে আমার কোনো কালে কোনো পরিচয় নেই, তাঁরা যে আজ প্রাতঃকাল থেকে আমাকে এতো ঘন ঘন খাতির ক’র্চেন এর কারণ কী? আচ্ছা মশায়, হরি বাবু নামক কোনো একটি ভদ্রলােক আমাকে কেন এমন অসময়ে স্মরণ ক’র্লেন এবং হঠাৎ এতােই অধৈর্য্য হ’য়ে উঠ্লেন ব’ল তে পারেন কি?
কী! আমি আমার স্ত্রীর বালা গড়াবার জন্যে তাঁর কাছ থেকে নমুনাস্বরূপ গহনা এনে ফিরিয়ে দিচ্চিনে?—দেখো, এ সম্বন্ধে আমার অনেক গুলি কথা বল্বার ছিল কিন্তু আপাতত একটি ব’ল্লেই যথেষ্ট হবে —আমি কারো কাছ থেকে কোনো গহনা আনিনি এবং আমার স্ত্রীই নেই। প্রধান প্রধান কথা আর যা বল্বার ছিল সে আজকের মতাে মাপ ক’র্বেন—গলা শুকিয়ে তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে মর্চি! আপনি আর আধ ঘণ্টা কাল অপেক্ষা করুন, সমস্ত সমাচার অবগত হবেন! (উচ্চৈঃস্বরে) ওরে উদয়, ওরে উদো, ওরে লক্ষ্মীছাড়া হতভাগা পাজি ছুঁচো ড্যাম শুয়ার ইষ্টুপিড্—ওরে পেট যে জ্ব’লে গেল, গলা যে শুকিয়ে যায়, মাথা যে ফেটে যাচ্চে—ওরে নরাধম, কুলাঙ্গার!
আরে না মশায়—আপনাদের সম্ভাষণ ক’র্চিনে! আপনারা হঠাৎ চঞ্চল হবেন না। আমি পেটের জ্বালায় মনের খেদে আমার প্রাণের বন্ধুকে ডাক্চি। আপনারা বসুন!
আর ব’স্তে পার্চেন না? অনেক দেরি হ’য়ে গেচে? সে কথা আর আমাকে ব’ল্তে হবে না! দেরি হ’য়েচে সন্দেহ নাই। তা হ’লে আপনাদের আর পীড়াপীড়ি ক’রে ধ’রে রাখ্তে চাইনে! তবে আজকের মতো আপনারা আসুন! আপনাদের সঙ্গে মিষ্টালাপে এতোক্ষণ সময়টা বেশ সুখে কেটেছিলাে!
কিন্তু এখন যে কথাগুলাে ব’ল্চেন ওগুলাে কিছু অধিক পরিমাণেই ব’ল্চেন! খুব পরম বন্ধুকেও মানুষ ভালােবেসে শ্যালক সম্ভাষণ ক’র্ত্তে হঠাৎ কুণ্ঠিত হয়, কিন্তু আপনাদের সঙ্গে অতি অল্পক্ষণের আলাপেই যে আপনারা এতােটা বেশি ঘনিষ্ঠতা আত্মীয়তা ক’র্চেন সে জন্যে আমি মনে মনে কিছু লজ্জাবােধ ক’র্চি! জান্বেন আপনাদের প্রতি আমার আন্তরিক কোনাে রকম অসদ্ভাব নেই কিন্তু আপনারা আমার কাছে যতােটা প্রত্যাশা ক’র্চেন আমি ততােটা দিতে একেবারে অক্ষম!
মশায়রা আর বাড়াবাড়ি ক’র্বেন না। আপনারা বােধ হয় দু-বেলা নিয়মিত আহার ক’রে থাকেন, ক্ষিদে পেলে মানুষের মেজাজটা কী রকম হয় ঠিক জানেন না, তাই আমাকে এমন অবস্থায় ঘেঁটাতে সাহস ক’র্চেন!
আবার! ফের! দেখাে বাপু, আমার সঙ্গে পার্বে না। শরীরটা দেখেই বুঝ্তে পারচো না! বহু কষ্টে রাগ চেপে আছি, পাছে একটা খুনােখুনি কাণ্ড ক’রে বসি! আচ্ছা, আমাকে রাগাও দেখি! দেখি তােমাদের কতাে ক্ষমতা! কিছুতেই রাগাতে পার্বে না। এই দেখাে আমি খুব গম্ভীর হ’য়ে ঠাণ্ডা হয়ে ব’স্লুম। ও বাবা! এরা যে সবাই মিলে মারধাের কর্বার জোগাড় করে! খালিপেটে ক্ষিদের উপর মারটা সয় না দেখ্চি! আচ্ছা বাপু, তােমরা সবাই বােসো! তােমাদের কার কতো পাওনা আছে বলো। ভাগ্যি মাইনের টাকাটা পকেটে ছিল, নইলে আজ নিতান্তই ধনঞ্জয়কে স্মরণ ক’রে একপেট ক্ষিদে সুদ্ধ দৌড় মার্তে হ’তো! আপাতত প্রাণটা বাঁচাই, তা’রপর টাকাটা উদয়ের কাছ থেকে আদায় ক’রে নিলেই হবে!
তােমার পাঁচ টাকা বই পাওনা নয় কিন্তু তুমি পঞ্চান্ন টাকার গাল পেড়ে নিয়েচো বাপু—এই লও তােমার টাকা!
ওহে বাপু, তােমার হােটেলের বিল এই শুধে দিচ্চি, যদি কখনাে অসময়ে তোমাদের শরণাগত হ’তে হয় তা হ’লে স্মরণ রেখো।
তােমার তিনমাসের বাড়িভাড়া পাওনা? একমাসের টাকাটা আজ দিচ্চি বাকি পরে নিয়ো। তুমি তাে ভাই তােমার গালমন্দ আমাকে ষোল আনাই চুকিয়ে দিয়েচো, তা’তে বােধ করি তােমার মনটা কতকটা খােলসা হ’য়েচে, এখন আশীর্ব্বাদ ক’রে বাড়ি চ’লে যাও!
ওহে বাপু, তােমার গহনা ফিরিয়ে দেওয়া সহজ নয়। যদি আমার স্ত্রী থাক্তেন আর তােমার গহনা তাঁকে দিতুম তা হ’লেও ফিরিয়ে আনা শক্ত হতো; আর যখন তিনি বর্ত্তমান নেই এবং তােমার গহনা তাঁকে দিইনি তখন ফিরিয়ে আনা আরো কতাে কঠিন তা একটুখানি ভেবে দেখ্লে তুমিও হয় তো বুঝ্তে পারবে। তবু যদি পীড়াপীড়ি করো তা হ’লে কাজেই তােমার হরিবাবুর ওখানে আমাকে যেতে হবে, কিন্তু খাবারটা আসে কি না আর একটু না দেখে যেতে পারচিনে!—উঃ! আর তো পারিনে! চন্দ্র, ওহে চন্দ্র! এখানে উদয়ের তো কোনাে সম্পর্ক নেই, এখন তুমি সুদ্ধ অস্ত গেলে আমি যে অন্ধকার দেখি! চন্দ্র! ওহে চন্দ্রকান্ত! এই যে এসেচো! চন্দ্র, তুমি তো তােমার বাবুকে চেনো, সত্য ক’রে বলাে দেখি আজ কাল এবং পরশুর মধ্যে তিনি কি হােটেল থেকে ফিরবেন?
বােধ হয় ফিরবেন না? এতােক্ষণ পরে তােমার এই কথাটি আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস হ’চ্চে। যা হােক্ বড্ডো ক্ষিদে পেয়েচে এখন আর গাল দেবার সময় নেই, এই আধুলিটি নিয়ে যদি চট্ ক’রে কিছু খাবার কিনে আনো, তা হলে প্রাণ রক্ষে হয়।
লােকটা নবাবী ক’রে বেড়ায় অথচ কাজকর্ম্ম কিছু নেই, আমরা ভাব্তুম চালায় কী ক’রে! এখন ব্যাপারটা বুঝ্তে পারচি! কিন্তু প্রত্যহ এতোগুলি গাল হজম ক’রে, এতােগুলি বিল্ ঠেকিয়ে, এতােগুলো লােক খেদিয়ে রাখা তো কম কাণ্ড নয়! এতে মজুরি পােষায় না, এর চেয়ে ঘানি ঠেলেও সুখ আছে!
কী হে! শুধু মুড়ি নিয়ে এলে? আর কিচ্ছু পাওয়া গেল না? পয়সা কিছু ফিরেচে?
না? আচ্ছা, তবে দাও মুড়িই দাও! (আহার)
ওহে চন্দ্র, কী ব’ল্বো, ক্ষুধার চোটে এই বাসি মুড়ি যেন সুধা ব’লে বােধ হ’চ্চে! অনেক নিমন্ত্রণ খেয়েচি কিন্তু এমন সুখ পাইনি! চন্দ্র, তুমিই সুধাকর বটে কিন্তু আজকে কলঙ্কের ভাগটাই কিছু বেশি দেখা গেল! ডাবও একটা এনেচো দেখ্চি, এর জন্যেও স্বতন্ত্র কিছু দিতে হবে না কি?
হবে না? শরীরে দয়ামায়া কিছু আছে বােধ হ’চ্চে, এখন যদি একটি গাড়ি ডেকে দাও তো আস্তে আস্তে বিদায় হই।
গাড়ি এখানে পাওয়া যায় না? তবে তো বড়াে বিপদে ফেল্লে? আমি এখন না খেয়ে কাহিল শরীরে দেড়ক্রোশ রাস্তা হাঁট্তে পারবো না; যখন সম্মুখে আহারের আশা ছিল তখন পেরেছিলুম। কী ক’রবো! বেরিয়ে পড়া যাক্!
কী সর্ব্বনাশ! এই সময়ে আবার হরিবাবুর ওখানে যেতে হবে। চন্দ্র, তুমি আজ আমার বিস্তর উপকার ক’রেচো, এখন আর কিছু ক’র্তে হবে না, এই ভদ্রলােকের ছেলেটিকে বুঝিয়ে দাও আমি উদয় বাবু নই, আমি আহিরিটোলার অক্ষয় বাবু।
ও তােমার কথা বিশ্বাস ক’র্বে না? সেজন্যে ওকে আমি বেশি দোষ দিতে পারিনে, বােধ হয় তােমাকে ও অনেক দিন থেকে চেনে! যা হােক আর ঝগড়া করবার সামর্থ্য নেই, আস্তে আস্তে হরিবাবুর ওখানেই যাওয়া যাক্। বাপু, যে রকম অবস্থা দেখ্চো পথে যদি একটা কিছু ঘটে, দাহ কর্বার ব্যয়টা তােমার স্কন্ধে প’ড়বে—আগে থাকতে বলে রাখ্লুম।
চন্দ্র, তুমি আবার হাত বাড়াও কেন হে? তােমাদের কল্যাণে যে রকম সস্তায় আজ নেমন্তন্ন খেয়ে গেলুম বহুকাল আমার আর ক্ষিদে থাক্বে না! আরাে কী চাও?
ও! বকশিষ! সেটা চুকিয়ে দেওয়াই ভালাে! যখন এতোই ক’র্লেম তখন সর্ব্বশেযে ঐ খুঁৎটুকু আর রাখ্বো না। কিন্তু আমার কাছে আর একটিমাত্র টাকা বাকি আছে। তা’র মধ্যে বারো আনা আমি গাড়ি ভাড়ার জন্যে রেখে দিতে চাই। তােমার কাছে খুচ্রো যদি কিছু থাকে তা হ’লে ভাঙিয়ে—
খুচ্রাে নেই? (পকেট উল্টাইয়া শেষ টাকাটি দিয়া) তবে এই লও বাপু, তােমাদের বাড়ি থেকে বেরােলুম একেবারে “গজভুক্ত কপিত্থবৎ!”
কিন্তু এই যে টাকাগুলি দিলুম, উদয়ের কাছ থেকে ফিরে আদায় কর্বার কী উপায় করা যায়? একটা দামি জিনিষ যদি কিছু পাওয়া যায় তো আটক ক’রে রাখি! দামী জিনিষের মধ্যে তাে দেখ্চি ঐ চন্দ্রকান্ত! কিন্তু যে রকম দেখ্লুম ওঁকে সংগ্রহ করা আমার কর্ম্ম নয়, আমাকে উনি ট্যাঁকে গুঁজে নিতে পারেন।
(কোণে একটা দেরাজ সবলে খুলিয়া) বাঃ, এই তাে ঠিক হ’য়েছে! চেনটিও দিব্যি! তা’ হ’লে ঘড়িসুদ্ধ এইটি দখল করা যাক!
কী হে চন্দ্র, এতো ব্যস্ত কেন?
পুলিস? পুলিস আস্চে?
আমাকে পালাতে হবে? কেন, কী দুষ্কর্ম্ম ক’রেচি? কেবল এক ভদ্রলােকের নিমন্ত্রণ রক্ষা ক’র্তে এসেচি, তা’র যা শাস্তি যথেষ্ট হ’য়েচে।
তাই তাে সত্যিই দেখ্চি! চন্দ্র কোথায় গেল? হরিবাবুর সেই লােকটিকেও যে দেখ্চিনে! সবাই পালিয়েচে।
দেখাে বাপু গায়ে হাত দিয়ো না! ভালো হবে না! আমি ভদ্রলােক। চোর নই জালিয়াৎ নই।
উঃ করো কী! লাগে যে! বাবা আজ সমস্ত দিন কেবল মুড়ি খেয়ে পথ চেয়ে আছি, আজ তােমাদের এ-সব ঠাট্টা আমার ভালাে লাগ্চে না।
পেয়াদা বাবা, বরঞ্চ কিছু জলপানী নাও! (পকেটে হাত দিয়ে) হায় হায় একটি পয়সা নেই! দারােগা সাহেব, যদি চোর ধ’র্তে চাও, চলাে আমি তােমাকে দেখিয়ে দিচ্চি! জেল সৃষ্টি হ’য়ে পর্য্যন্ত এতো বড়ো চোর পৃথিবীতে দেখা দেয় নি।
কী ক’রেচি বলো দেখি? জীবন বাবুর নাম সই ক’রে হ্যামিল্টনের দোকান থেকে ঘড়ি এনেচি? পেয়াদা সাহেব, ভদ্রলােক হ’য়ে ভদ্রলােকের নামে ফস্ ক’রে এতো বড়ো অপবাদটা দিলে?
ও কী ও! ওটা ধরে টেনো না! ও আমার ঘড়ি নয়! শেষকালে যদি চেন্মেন্ ছিঁড়ে যায় তা হ’লে আবার মুষ্কিলে প’ড়্তে হবে।
কী! এই সেই হ্যামিল্টনের ঘড়ি? ও বাবা সত্যি নাকি! তা নিয়ে যাও নিয়ে যাও এখনি নিয়ে যাও! কিন্তু ঘড়ির সঙ্গে আমাকে সুদ্ধ টানাে কেন? আমি তো সােনার চেন নই! আমি সােনার অক্ষয় বটে, কিন্তু সে-ও কেবল বাপ মায়ের কাছে।
তা নিতান্তই যদি না ছাড়তে পারো তো চলো। বাবা, আমাকে সবাই ভালােবাসে, আজ তা’র বিস্তর পরিচয় পেয়েছি, এখন তােমার ম্যাজিষ্ট্রেটের ভালােবাসা কোনাে মতে এড়াতে পার্লে এ যাত্রা রক্ষে পাই।
যদি জোটে রােজ
এম্নি বিনিপয়সায় ভােজ!
মীমাংসা
মীমাংসা
আমাদের বাড়ির পাশেই নবীন ঘোষের বাড়ি। একেবারে সংলগ্ন বলিলেই হয়।
আমি কখনো আমাদের বাড়ির ছাদে উঠি না, জানালায়ও দাঁড়াই না। আপন মনে গৃহকার্য্য করিয়া যাই।
নবীন ঘোষের বড় ছেলে মুকুন্দ ঘোষকে কখনো-চক্ষে দেখি নাই।
কিন্তু, মুকুন্দ ঘোষ কেন বাঁশি বাজায়! সকালে বাজায়, মধ্যাহ্নে বাজায়, সন্ধ্যাবেলায় বাজায়। আমার ঘর হইতে স্পষ্ট শোনা যায়।
আমি কবি নই, মাসিক পত্রিকার সম্পাদক নই, মনের ভাব সম্পূর্ণ ব্যক্ত করিয়া উঠিতে পারি না। কেবল সকালে কাঁদি, মধ্যাহ্নে কাঁদি, সন্ধ্যাবেলায় কাঁদি এবং ইচ্ছা করে ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া যাই।
বুঝিতে পারি রাধিকা কেন তাঁহার সখীকে সম্বোধন করিয়া কাতর স্বরে বলিয়াছিলেন “বারণ কর্লো সই, আর য়েন শ্যামের বাঁশি বাজে না বাজে না।”
বুঝিতে পারি চণ্ডীদাস কেন লিখিয়াছেন,
“যে না দেশে বাঁশির ঘর সেই দেশে যাব,
ডালে মূলে উপাড়িয়া সাগরে ভাসাব।”
কিন্তু পাঠক, আমার এ হৃদয়বেদনা তুমি কি বুবিয়াছ?―
উত্তর।
আমি বুঝিয়াছি। যদিও আমি কুলবধূ নই। কারণ, আমি পুরুষ মানুষ। কিন্তু আমার বাড়ির পাশেও একটি কন্সর্টের দল আছে। তাহার মধ্যে একটি ছোক্রা নূতন বাঁশি অভ্যাস করিতে আরম্ভ করিয়াছে—প্রত্যুষ হইতে অর্দ্ধরাত্রি পর্যন্ত সারিগম্ সাধিতেছে। পূর্ব্বাপেক্ষা অনেকটা সড়গড় হইয়াছে; এখন প্রত্যেক সুর কেবলমাত্র আধসুর শিকিসুর তফাৎ দিয়া যাইতেছে। কিন্তু আমার চিত্ত উদাসীন হইয়া উঠিয়াছে―ঘরে আর কিছুতে মন টেঁকে না। বুঝিতে পারিতেছি রাধিকা কেন বলিয়াছিলেন “বারণ করলো, সই, আর যেন শ্যামের বাঁশি বাজে না বাজে না।” শ্যাম বোধ করি তখন নূতন সারিগম্ সাধিতে ছিলেন। বুঝিতে পারিতেছি চণ্ডীদাস কেন লিখিয়াছিলেন—
“যে না দেশে বাঁশির ঘর সেই দেশে যাব,
ডালে মূলে উপাড়িয়া সাগরে ভাসাব।”
বোধ হয় চণ্ডীদাসের বাসার পাশে কন্সর্টের দল ছিল।
আমার বাড়ির পাশে যে ছোকরা বাঁশি অভ্যাস করে, বোধ হয় তাহারি নাম মুকুন্দ ঘোষ।
শ্রীসঙ্গীতপ্রিয়।
আমার এ কী হইল! এ কী বেদনা! নিদ্রা নাই, আহার নাই, মনে সুখ নাই। থাকিয়া থাকিয়া “চমকি চমকি উঠি”।
কমলপত্র বীজন করিলে অসহ্য বোধ হয়, চন্দনপঙ্ক লেপন করিলে উপশম না হইয়া বিপরীত হয়।
শীতল সমীরণে সমস্ত জগতের তাপ নিবারণ করে, কেবল আমি হতভাগিনী সখীকে ডাকিয়া বলি “উঁহু উঁহু, সখি, দ্বার রােধ করিয়া দাও।”
সখীরা স্নেহভরে দেহ স্পর্শ করিলে চমকিয়া হাত ঠেলিয়া দিই। না জানি কোন্ স্পর্শে আরাম পাইব!
মনােহরা শারদ পূর্ণিমা কাহার না আনন্দদায়িনী—কেবল আমার কষ্ট কেন দ্বিগুণ বাড়াইয়া তােলে!
আমার ন্যায় আর কোনাে হতভাগিনী সম্বন্ধে জয়দেব লিখিয়াছেন,―
“নিন্দতি চন্দনমিন্দুকিরণমনুবিন্দতি খেদমধীরং।
ব্যালনিলয়মিলনেন গরলমিব কলরতি মলয়সমীরং।”
অন্যত্র লিখিয়াছেন “নিশি নিশি রুজমুপযাতি।” আমারো সেই দশা। রাত্রেই বাড়িয়া উঠে।
আমার এ কী হইল?
উত্তর।
তােমার বাত হইয়াছে। অতএব পূবে হাওয়া বহিলে যে দ্বাররােধ করিয়া দাও সেটা ভালােই কর। পরীক্ষাস্বরূপে চন্দনপঙ্ক লেপন না করিলেই উত্তম করিতে। পূর্ণিমার সময় যে বেদনা বাড়ে সে তােমার একলার নহে, রােগটার ঐ এক লক্ষণ। চাঁদের সহিত বিরহ, বাত, পয়ার এবং জোয়ার ভাঁটার একটা যােগ আছে।
রাধিকার ন্যায় রাত্রে তােমার রােগ বৃদ্ধি হয়। কিন্তু রাধিকার সময় ভালো ডাক্তার ছিল না, তােমার সময়ে ডাক্তারের অভাব নাই। অতএব আমার ঠিকানা সম্পাদকের নিকট জানিয়া লইয়া অবিলম্বে চিকিৎসা আরম্ভ করিয়া দিবে।
নূতন উত্তীর্ণ ডাক্তার।
১২৯৮।
রসিকতার ফলাফল
ব্যঙ্গকৌতুক
রসিকতার ফলাফল
আর কিছুই নয়, মাসিকপত্রে একটা ভারি মজার প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম। পড়িয়া অন্তরঙ্গ বন্ধুরা তে হাসিয়াছিলই,আবার শত্রুপক্ষও খুব হাসিতেছে।
অষ্ট্ৰপাইকা, সাপ্টিবারি ও টাঙ্গাইল হইতে তিনজন পাঠক জিজ্ঞাসা করিয়া পঠাইয়াছেন প্রবন্ধটির অর্থ কী? তাঁহাদের মধ্যেএকজন ভদ্রতা করিয়া অনুমান করিয়াছেন ইহাতে ছাপাখানার গলদ্ আছে; আর একজন অনাবশ্যক সহৃদয়তাবশত লেখকের মানসিক অবস্থা সম্বন্ধে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করিয়াছেন; তৃতীয় ব্যক্তি অনুমান এবং আশঙ্কার অতীত অবস্থায় উত্তীর্ণ; বস্তুত আমিষ্ট তাঁহার জন্য উৎকণ্ঠিত।
শ্রীযুক্ত পাচকড়ি পাল হবিগঞ্জ হইতে লিখিতেছেনঃ—“গোবিন্দবাবুর এ প্রবন্ধের উদেশ্ব কী? ইহাতে কি ফরাসডাঙ্গার তাঁতিদের দুঃখ ঘুচিবে? দেশে যে এতো লোককে ক্ষ্যাপা কুকুর কামড়াইতেছে এ প্রবন্ধে কি তাহার কোনো প্রতিকার কল্পিত হইয়াছে?”
অজ্ঞানতিমিরনিবারণী পত্রিকায় উক্ত প্রবন্ধের সমালোচনায় লিখিত হইয়াছেঃ—“গোবিন্দবাবু যদি সত্যই মনে করেন দেশে ধানের ক্ষেতে পাটের আবাদ হইয়া চাষাদের অবস্থার উন্নতি হইতেছে তবে তাঁহার প্রবন্ধের সঙ্গে আমাদের মতের মিল নাই। আর যদি তিনি বলিতে চান পাট ছাড়িয়া ধানের চাষই শ্রেয় তবে সে কথাও সম্পূর্ণ সত্য নহে। কিন্তু কোনটা যে তাঁহার মত, প্রবন্ধ হইতে তাহ নির্ণয় করা দুরূহ।”
দুরূহ সন্দেহ নাই। কারণ, পাটের চাষ সম্বন্ধে কোনো দিন কোনে। কথাই বলি নাই।
জ্ঞানপ্রকাশ বলিতেছেনঃ—“লেখার ভাবে আভাসে বোধ হয় বালবিধবার দুঃখে লেখক আমাদের কাঁদাইবার চেষ্টা করিয়াছেন—কাঁদা দূরে যাক্, প্রথম হইতে শেষ পয্যন্ত আমরা হাস্য সম্বরণ করিতে পারি নাই।”
হাস্য সম্বরণ করিতে না পারার জন্য আমি সম্পূর্ণ দায়ী কিন্তু তিনি অকস্মাৎ আভাসে যাহা বুঝিয়াছিলেন তাহ সম্পূর্ণ নিজগুণে। সম্মার্জনী নামক সাপ্তাহিকপত্রে লিখিয়াছেন:—"হরিহরপুরের ম্যুনিসিপালিটির বিরুদ্ধে গোবিন্দবাবুর যে সুগভীর প্রবন্ধ প্রকাশিত হইয়াছে তাহা প্রাঞ্জল ও ওজস্বী হইয়াছে সন্দেহ নাই কিন্তু একটি বিষয়ে দুঃখিত ও আশ্চর্য্য হইলাম, ইনি পরের ভাব অনায়াসেই নিজের বলিয়া চালাইয়াছেন। এক স্থলে বলিয়াছেন “জন্মিলেই মরিতে হয়”—এই চমৎকার ভাবটি ঘদি গ্রীক পণ্ডিত সক্রেটিসের গ্রন্থ হইতে চুরি না করিতেন তবে লেখকের মৌলিকতার প্রশংসা করিতাম। নিম্নে আমরা কয়েকটি চোরাই মালের নমুনা দিতেছিঃ–গিবন্ বলিয়াছেন ‘রাজ্যে রাজা না থাকিলে সমূহ বিশৃঙ্খলা ঘটে’,—গোবিন্দ লিখিয়াছেন ‘একে অরাজকতা তাহাতে অনাবৃষ্টি— গণ্ডস্যোপরি বিস্ফোটকং।’ সংস্কৃত শ্লোকটিও কালিদাস হইতে চুরি!
রাস্কিনে একটি বর্ণনা আছে ‘আকাশে পূর্ণচন্দ্র উঠিয়াছে—সমুদ্রের জলে তাহার জ্যোৎস্না পড়িয়াছে।’ গোবিন্দবাবু লিখিয়াছেন—‘পঞ্চমীর চাঁদের আলো রামধনবাবুর টাকের উপর চিক্চিক্ করিতেছে।’ কী আশ্চর্য্য চুরি! কী অদ্ভুত প্রতারণা!! কী অপূর্ব্ব দুঃসাহসিকতা!!!
সংবাদসার বলেন “রামধনবাবুধে নেউগিপাড়ার শ্যামাচরণ ত্রিবেদী তাহাতে সন্দেহ নাই! শ্যামাচরণবাবুর টাক নাই বটে কিন্তু আমরা সন্ধান লইয়াছি তাঁহার মধ্যম ভ্রাতুষ্পুত্রের মাথায় অল্প অল্প টাক পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে। এরূপ ব্যক্তিগত উল্লেখ অতিশয় নিন্দনীয়।”
আমার নিজেরই গোলমাল ঠেকিতেছে। আমার প্রবন্ধ যে হরিহরপুর মুনিসিপালিটির বিরুদ্ধে লিখিত তৎসম্বন্ধে “সম্মার্জনীর” যুক্তি একেবারে অকাট্য। হরিহরপুর চব্বিশ পরগণায় না তিব্বতে, ন হাঁসখালি সব্ডিবিজনের অন্তর্গত আমি কিছুই অবগত নহি; সেখানে যে মুনিসিপালিটি আছে বা ছিল, বা ভবিষ্যতে হইবে তাহা আমার স্বপ্নের অগোচর।
অপর পক্ষে, আমার প্রবন্ধে আমি নেউগিপাড়ার শ্যামাচরণ ত্রিবেদী মহাশয়ের প্রতি অন্যায় কটাক্ষপাত করিয়াছি এ সম্বন্ধেও সন্দেহ করা কঠিন। সংবাদসার এমনি নিবিড়ভাবে প্রমাণ প্রয়োগ করিয়াছি যে, তাহার মধ্যে ছুচ চালাইবার জো নাই। আমি একজনকে চিনি বটে কিন্তু সে বেচারা ত্রিবেদী নয়, মজুমদার,—তার বাড়ি নেউগিপাড়ায় নয়, ঝিনিদহে; আর তার ভ্রাতুষ্পুত্রের মাথায় টাক থাকা চুলায় যাক তাহার ভ্রাতুষ্পুত্রই নাই। দুইটি ভাগিনেয় আছে বটে।
যাঁহারা বলেন আমি বরাকরের পাথুরিয়া কয়লার খনির মালেকদের চরিত্রের কালিমার সহিত উক্ত কয়লার তুলনা করিয়াছি তাঁহারা অনুগ্রহ করিয়া, উক্ত খনি আছে কি না এবং কোথায় আছে এবং থাকিলেই বা কী, যদি খোলসা করিয়া সমস্ত আমাকে লিখিয়া পাঠান তবে খনি-রহস্য সম্বন্ধে আমার অজ্ঞতা দূর হইয়া যায়। যিনি বাহাই বলুন “লুনের ট্যাক্স” “বিধবাবিবাহ” কিম্বা “গাওয়। ঘি" সম্বন্ধে যে আমি কিছুই বলি নাই তাহা শপথ করিয়া বলিতে পারি।
এদিকে ঘরেও গোল বাধিয়াছে। গভীর চিন্তাশীলতার পরিচয় স্বরূপ আমি এক জায়গায় লিখিয়াছিলাম “এ জগৎটা পশুশালা।” আমার ধারণা ছিল যে পাঠকেরা হাসিবে। অন্তত তিন জন পাঠক যে হাসেন নাই তাহার প্রমাণ পাইয়াছি। প্রথমত শ্যালক আসিয়া আমাকে গাল পাড়িল —সে কহিল, নিশ্চয়ই আমি তাহাকেই পশু বলিয়াছি;—আমি কহিলাম “বলিলে অপরাধ হয় না, কিন্তু তোমার দিব্য, বলি নাই।” ভ্রাতার অপমানে ব্রাহ্মণী পিতার ঘরে যাইবেন বলিয়া শাসাইতেছেন। জমিদার পশুপতিবাবু থাকিয়া থাকিয়া রাগে তাঁহার গোঁফ জোড়া বিড়ালের ন্যায় ফুলাইয়া তুলিতেছেন। তিনি বলেন, তাঁহাকে শ্যালক সম্বোধন করিয়া অনধিকার চর্চা করিয়াছি এবং লোকসমাজে তিনি আমার সম্বন্ধে যে সকল আলোচনা করিতেছেন তাহা সুশ্রাব্য নয়। এদিকে পাকড়াশি বাড়ির জগৎবাবু চা থাইতে খাইতে আমার প্রবন্ধ পড়িয়া অট্টহাস্যর সঙ্গে মুখভ্রষ্ট চায়ের ও রুটির কণায় বজ্রবিদ্যুদ্বৃষ্টির কৃত্রিম দৃষ্টান্ত রচনা করিতেছিলেন এমন সময় যেমনি, পড়িলেন “জগৎটা পশুশালা” অম্নি হাস্যের বেগ হঠাৎ থামিয়া গিয়া গলায় চা বাধিয়া গেল; লোকে ভাবিল, ডাক্তার ডাকিবার সবুর সহিবে না।
পাড়াসুদ্ধ লোকের ধারণ যে, আমার প্রবন্ধে আমি তাহাদেরই পরমপূজনীয় জ্যাঠা, খুড়শ্বশুর অথবা ভাগ্নিজামাই সম্বন্ধে কোনো-না-কোনো সত্য আভাস দিয়াছি; তাহারাও আমার ক্ষণভঙ্গুর মাথার খুলিটার উপরে লক্ষ্যপাত করিবে এমন কথা প্রকাশ করিতেছে। আমার প্রবন্ধের গভীর অভিপ্রায়টি যে কী তৎসম্বন্ধে আমার কথা তাহার। বিশ্বাস করিতেছে না, কিন্তু আমার প্রতি তাহদের, অভিপ্রায় যে কী তৎসম্বন্ধে তাহাদের কথা অবিশ্বাস করিবার কোনো হেতু আমার পক্ষে নাই। বস্তুত তাহদের ভাষা উত্তরোত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে। মনে করিয়াছি, বাসা বদলাইতে হইবে— আমার রচনার ভাষাও বদলান আবশ্যক। আর যাহাই করি লোককে হাসাইবার চেষ্টা করিব না।
১২৯২
লেখার নমুনা
লেখার নমুনা
সম্পাদক মহাশয় সমীপেষু―
ধৃষ্টতা মার্জনা করিবেন, কিন্তু না বলিয়া থাকিতে পারি না, আপনারা এখনো লিখিতে শিখেন নাই। অমন মৃদুসম্ভাষণে কাজ চলে না। গলায় গামছা দিয়া লােক টানিতে হইবে। কিন্তু উপদেশের অপেক্ষা দৃষ্টান্ত অধিক ফলপ্রদ বলিয়া, আমাদের এজেন্সি আপিস হইতে একটা লেখার নমুনা পাঠাইতেছি। পছন্দ হইলে ছাপাইবেন, দাম দিতে ভুলিবেন না। যিনি লিখিয়াছেন, তিনি সাহিত্যসংসারে একজন সুপরিচিত ব্যক্তি। বাঙ্গালার ভূগােলে সাহিত্য-সংসার কোথায় আছে, ঠিক জানি না; এই পর্য্যন্ত জানি, আমাদের বিখ্যাত লেখককে তাঁহার ঘরের লােক ছাড়া আর কেহই চেনেন না। অতএব অনুমান করা যাইতে পারে, সাহিত্যসংসার বলিতে তিনি, তাঁহার বিধবা পিসি, তাঁহার স্ত্রী এবং দুই বিবাহযােগ্যা কন্যা বুঝায়। এই ক্ষুদ্র সাহিত্যসংসারটির জীবিকা, আমাদের খ্যাতনামা লেখকটির উপরেই সম্পূর্ণ নির্ভর করিতেছে, সুতরাং সকল সময়ে রুচিরক্ষা করিয়া সত্য রক্ষা করিয়া ভদ্রতা রক্ষা করিয়া লিখিলে, ইঁহার কোনো মতে চলে না, অতএব উপযুক্ত লেখক এমন আর পাইবেন না।
তবু কেন বলি?
“দেখিয়া বিস্মিত আশ্চর্য্য এবং চমৎকৃত হইতে হয়, কী বলিব, চক্ষে জল আসে, কান্না পায়, অশ্রু-সলিলে বক্ষ ভাসিয়া যায়, যখন দেখিতে পাই, যখন প্রত্যহ এমন কি প্রতিদিন প্রত্যক্ষ দেখা যায়,—কী দেখা যায়! পােড়া মুখে কেমন করিয়া বলিব, কী দেখা যায়! বলিতে লজ্জা হয়, সরম আসে, মুখ ঢাকিতে ইচ্ছা হয়, উচ্চৈস্বরে ডাক ছাড়িয়া বলিতে ইচ্ছা করে, মাতঃ বসুন্ধরে, জননী, মা, মাগো, একবার দ্বিধা হও মা―একবার দু’খানা হইয়া ভাঙিয়া যা মা, সন্তানের লজ্জা নিবারণ কর্ জননি! ভাই বঙ্গবাসী, বুঝিয়াছ কি, কোন্ কলঙ্কের কথা, কোন্ লাঞ্ছনার কথা, কোন্ দুঃসই লজ্জার কথা বলিতেছি, ব্যক্ত করিতেছি, প্রকাশ করিতে গিয়া কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া যাইতেছে? না, বােঝ নাই, তােমরা বুঝিবে কেন ভাই! তােমরা মিল্ বােঝ, স্পেন্সর বােঝ, তােমরা শেলির আধ-আধ ছায়া-ছায়া ভাঙা-ভাঙা কবিত্ব বােঝ, তােমরা গরিবের কথা বুঝিবে কেন, দরিদ্রের কথা শুনিবে কেন, এ অকিঞ্চনের ভাষা তােমাদের কানে যাইবে কেন?” কিন্তু ভাই একটি প্রশ্ন আছে, একটি কথা জিজ্ঞাসা করিব, গুণমণি, ঐ মুখের একটি উত্তর শুনিতে চাই—আচ্ছা ভাই, পরের কথা বোঝ, আর আপনার লােকের কথা বােঝ না, বাহিরের কথা বােঝ, আর ঘরের কথা বুঝিতে পার না, যে আপনার নয়, তাহার কথা বােঝ, যে আপনার, তাহার কথা বােঝ না? বােঝ না তাহাতেও দুঃখ নাই, তাহাতেও খেদ নাই, তাহাতেও তিলার্দ্ধমাত্র শােকের কারণ নাই, কিন্তু ভাই, কথাটা যে একেবারে হৃদয়ঙ্গমই হয় না, একেবারে যেন অবােধের মতাে বসিয়া থাক। সেই তো আমাদের দুর্দশা, সেই তাে আমাদের দুরদৃষ্ট! ভাই বাঙ্গালি, জিজ্ঞাসা করিতে পার বটে, যে কথা আজিকার দিনে কেহ বুঝিবে না, সে কথা তুলিলে কেন, উত্থাপন করিলে কেন? যে কথা সবাই ভুলিয়াছে, সে কথা মনে করাইয়া দাও কেন? যে দুর্ব্বিষহ বেদনা, যে দুঃসহ ব্যথা, যে অসহ্য যন্ত্রণা নাই, তাহাতে আঘাত দাও কেন? আমিও তাে সেই কথা. বলি ভাই! এই ভাঙা মন্দিরে এই ভাঙা কণ্ঠের প্রতিধ্বনি কেন তুলি! এই শ্মশানের চিতানলে আবার কেন নূতন করিয়া নয়নজল নিক্ষেপ করি! আর্য্য জননীর সমাধিক্ষেত্রে এই ঊনবিংশ শতাব্দীর সভ্যশাসিত সভ্যচালিত নব সভ্যতার দিনে আবার কেন নূতন করিয়া নীরবতার তরঙ্গ উত্থিত করি! কেন করি! তােমরা কী করিয়া বুঝিবে ভাই, কেন করি! তুমি যে ভাই সত্য, তুমি কী করিয়া বুঝিবে কেন করি! তুমি যে ভাই নব সভ্যতার নূতন বিদ্যালয়ে নূতন শিক্ষা লাভ করিয়া নূতন তানে নূতন গান ধরিয়াছ, নূতন রসে নূতন মজিয়া নূতন ভাবে নূতন ভাের হইয়াছ, তুমি কী করিয়া বুঝিবে কেন করি! তুমি যে এ কথা কখনো কিছু শােন নাই এবং আজ সম্পূর্ণ ভুলিয়া গিয়াছ, তুমি যে একথা কখনো কিছু বোঝ নাই এবং আজ একেবারেই বোঝ না, তুমি কী করিয়া বুঝিবে কেন করি! তবু, জিজ্ঞাসা করিবে কেন করি? আমি যে ভাই তােমাদের মিল পড়ি নাই, তােমাদের স্পেন্সর পড়ি নাই, তােমাদের ডারুয়িন্ পড়ি নাই, আমি যে ভাই তােমাদের হক সলি এবং টিণ্ড্যাল্, রাস্কিন এবং কার্লাইল্ পড়ি নাই, এবং পড়িয়া বুঝিতে পারি নাই, আমি যে ভাই কেবলমাত্র ষড়দর্শন এবং অষ্টাঙ্গ বেদ, সংহিতা এবং পুরাণ, আগম এবং নিগম, উপক্রমণিকা এবং ঋজুপাঠ প্রথম ভাগ পড়িয়াছি―ঐ সকল গ্রন্থ এই পতিত ভারতে আমি ছাড়া আর যে কেহ পড়ে নাই এবং বুঝে নাই ভাই! তবু আবার জিজ্ঞাসা করিবে কেন করি! প্রাণের ভাই সকল! আমি যে পাগল, বাতুল, উন্মাদ, বায়ুগ্রস্ত, আমার মাথার ঠিক নাই, বুদ্ধির স্থিরতা নাই, চিত্ত উদভ্রান্ত!
“ভাই বাঙ্গালি, এখন বুঝিলে কী, কেন করি, অবোধ অশ্রু কেন পড়ে, পােড়া চোখের জল কেন বারণ মানে না,কেন মিছে অরণ্যেরােদন,অস্থানে ক্রন্দন করিয়া মরি! নীরব হৃদয়ের জ্বালা ব্যক্ত হইল কী, এই ভস্মীভূত প্রাণের শিখা দেখিতে পাইলে কী, শুষ্ক অশ্রুধারা দুই কপােল বাহিয়া কি প্রবাহিত হইল? যে ধ্বনি কখনো শােন নাই তাহার প্রতিধ্বনি শুনিলে কী, যে আশা কখনাে হৃদয়ে স্থান দাও নাই, তাহার নৈরাশ্য তিলমাত্র অনুভব করিলে কী, যাহা বুঝাইতে গেলে বুঝানাে যায় না এবং যাহা বুঝিতে চেষ্টা করিলে বুঝা উত্তরােত্তর অসাধ্য হইয়া উঠে, তাহা কি আজ তােমাদের এই উনবিংশ শতাব্দীর সভ্যতারুদ্ধ বধির কর্ণকুহরে প্রবেশ করিল?”
সম্পাদক মহাশয়! আজ এই পর্যন্ত প্রকাশ করা গেল। কারণ, ইহার পরের প্যারাগ্রাফেই আমাদের লেখক আরম্ভ করিয়াছেন, “যদি না করিয়া থাকে, তবে আমি ক্ষান্ত হইলাম, নীরব হইলাম, তবে আমি মুখ বন্ধ করিলাম, তবে আমি আর একটি কথাও কহিব না—না, একটিও না!” এই বলিয়া কেন কথা কহিবেন না, শ্মশানক্ষেত্রে কথা বলিলেই বা কিরূপ ফল হয়, এবং সমাধিক্ষেত্রে কথা বলিলেই বা কিরূপ নিষ্ফল হয়, এবং কথা না বলিলেই বা কিরূপ হৃদয় বিদীর্ণ হয়, এবং হৃদয় বিদীর্ণ হইলেই বা কিরূপ কথা বাহির হইতে থাকে, তাহাই ভাই বাঙ্গালীকে পুনরায় বুঝাইতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন এবং কিছুতেই কৃতকার্য্য হইতে পারিতেছেন না। এই অংশটি এতাে দীর্ঘ যে, আপনার কাগজে স্থান হইবে না। পাঠকদিগকে আশ্বাস দেওয়া যাইতেছে, প্রবন্ধটি অবিলম্বে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইবে। মূল্য ৫৸৹ মাত্র, কিন্তু যাঁহারা ডাকমাশুল স্বরূপে উক্ত ৫৸৹ পাঠাইবেন, তাঁহাদিগকে বিনামূল্যে গ্রন্থ উপহার দেওয়া হইবে।
সাহিত্য এজেন্সির কার্য্যাধ্যক্ষ।
সারবান সাহিত্য
সারবান সাহিত্য
নাটক
সম্পাদক মহাশয়,
আজকাল বাঙ্গালা সাহিত্যে রাশি রাশি নাটক নভেলের আমদানী হইতেছে। কিন্তু তাহাতে সার পদার্থ কিছুমাত্র নাই। না আছে তত্ত্বজ্ঞান, না আছে উপদেশ। কী করিলে দেশের ধনবৃদ্ধি হইতে পারে, গো-জাতির রােগ-নিবারণ করিবার কী কী উপায় আছে; দ্বৈত, দ্বৈতাদ্বৈত এবং শুদ্ধাদ্বৈতবাদের মধ্যে কোন্ বাদ শ্রেষ্ঠ; কফ পিত্ত ও বায়ু বৃদ্ধির পক্ষে দিশিকুম্ড়া ও বিলাতী কুম্ড়ার মধ্যে কোনাে প্রভেদ আছে
কি না, অশোক এবং হর্ষবর্ধনের মধ্যে কে আগে কে পরে—আমাদের অগণ্য কাব্যনাটকের মধ্যে এসকল সারগর্ভ বিশ্বহিতকর প্রসঙ্গের কোনো মীমাংসা পাওয়া যায় না। একবার কল্পনা করিয়া দেখুন, যদি কোনো নাটকের পঞ্চমাঙ্কের সর্বশেষভাগে এমন একটি তত্ত্ব পাওয়া যায় যদ্দ্বারা জৈবশক্তি ও দৈবশক্তির অন্যান্য সম্বন্ধ নিরূপিত হয় অথবা সৃষ্টি বিকাশের ক্রম পর্য্যায় নাটকের অঙ্কে অঙ্কে বিভক্ত হইয়া দুর্গম জ্ঞান শিখরের মরকত-সোপান-পরম্পরা রচিত হয়, তবে রসগ্রাহী সহৃদয় পাঠকেরা কিরূপ পুলকিত ও পরিতৃপ্ত হইতে পারেন। এখন যে সকল অসার, ম্লেচ্ছভাবসংস্পর্শ-দূষিত গ্রন্থ বাহির হইতেছে তাহা পাঠ করিয়া বাবুরা সাহেব এবং ঘরের গৃহিণীরা বিবি হইতেছেন। বঙ্গসাহিত্যের এই কলঙ্ক অপনোদন করিবার মানসে আমি নাটক উপন্যাসের ছলে কতকগুলি জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থ প্রণয়ন করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। প্রথম সংখ্যায় পঞ্জিকা নাট্যাকারে বাহির করিব স্থির করিয়াছি। গ্রহ ফলাফলের প্রতি বর্ত্তমান কালের ইংরাজি-শিক্ষিত বাবু-বিবিদিগের বিশ্বাস ক্রমশ হ্রাস হইতেছে। সেই নষ্ট বিশ্বাস উদ্ধার করিবার জন্য আমি এই কৌশল অবলম্বন করিয়াছি। সাধারণের চিত্ত আকর্ষণের অভিপ্রায়ে এই নাটকের কিঞ্চিৎ নমুনা মহাশয়ের জগদ্বিখ্যাত পত্রের এক পার্শ্বে প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করি।
নাটকের পাত্রগণ।
হর।
পার্ব্বতী।
প্রথম অঙ্ক। দৃশ্য কৈলাস পর্ব্বত।
হর পার্ব্বতী।
পার্ব্বতী। নাথ!
হর। কেন প্রিয়ে?
পার্ব্বতী। শ্বেতবরাহ কল্পাব্দ হইতে কয়জন মনুর আবির্ভাব হইয়াছে, সেই মনােহর প্রসঙ্গ শুনিবার জন্য আমার একান্ত বাসনা হইতেছে।
হর। (সহাস্যে) প্রিয়ে, পঞ্জিকার প্রথম সৃষ্টিকাল হইতে আজ পর্য্যন্ত প্রত্যেক বর্ষার দিনে এই পরম জিজ্ঞাস্য প্রশ্নের উত্তরে তােমার কৌতূহল নিবৃত্ত করিয়া আসিতেছি। জীবিতবল্লভে, আজও কি এ সম্বন্ধে তােমার ধারণা জন্মিল না?
পার্ব্বতী। প্রাণনাথ, জানই তো আমরা বুদ্ধিহীন নারীজাতি, বিশেষত আজকালকার বিবিদের মতো ফিমেল ইস্কুলে পড়ি নাই। (বােধ করি সকলে বুঝিতে পারিয়াছেন এইখানে বর্ত্তমান শিক্ষিত মহিলাদের প্রতি তীব্র বিদ্রূপ করা হইল। ইহাতে স্ত্রীশিক্ষা অনেকটা নিবারণ হইবে।―লেখক) হৃদয়নাথ, অহর্নিশি একমাত্র পতিচিন্তা ব্যতীত যাহার আর কোনো চিন্তা নাই তাহার স্মৃতিপটে অতােগুলা মনুর কথা কিরূপে অঙ্কিত হইবে? হাজার হৌক্, তাহারা তো পরপুরুষ বটে! (বর্ত্তমান কালের পাঠিকারা এইস্থল হইতে পতিভক্তির সুন্দর উপদেশ পাইবেন।―লেখক)
হর। প্রিয়তমে, তবে অবহিত হইয়া মনােহর কথা শ্রবণ করো। শ্বেত-বরাহ কল্পাব্দের পর হইতে ছয় জন মনু গত হইয়াছেন। প্রথম স্বায়ম্ভুব মনু। দ্বিতীয় স্বারােচিষ মনু। তৃতীয় ঔত্তমজ মনু। চতুর্থ তামস্ মনু। পঞ্চম রৈবত মনু। ষষ্ঠ চাক্ষুষ মনু। সম্প্রতি সপ্তম মনু বৈবস্বতের অধিকার চলিতেছে। সপ্তবিংশতিযুগ গত হইয়াছে। অষ্টবিংশতি যুগে কলিযুগের প্রারম্ভ। তত্র চতুর্যুগের পরিমাণ বিংশতি সহস্রাধিক ত্রিচত্বারিংশল্লক্ষ পরিমিত বর্ষ।
পার্ব্বতী। (স্বগত) অহো কি শ্রুতিমনােহর! (প্রকাশ্যে) প্রাণেশ্বর! এবার সত্য যুগােৎপত্তির কাল নিরূপণ করিয়া দাসীর কর্ণকুহর সুধাসিক্ত করো।
হর। প্রিয়ে, তবে শ্রবণ করো। বৈশাখ শুক্লপক্ষ অক্ষয় তৃতীয়া রবিবারে সত্যযুগোৎপত্তি। ইত্যাদি।
(এইরূপে কাব্যকৌশল সহকারে প্রথম অঙ্কে একে একে চারিযুগের উৎপত্তি-বিবরণ বর্ণিত হইবে।—লেখক)
দ্বিতীয় অঙ্ক। দৃশ্য কৈলাস।
বৃষস্কন্ধে মহেশ এবং শিলাতলে হৈমবতী আসীনা। নাটকের মধ্যে বৈচিত্র্য সাধনের জন্য হর পার্ব্বতীর নাম পরিবর্তন করা গিয়াছে এবং দ্বিতীয় দৃশ্যে বৃষের অবতারণা করা হইয়াছে। যদি কোনাে রঙ্গভূমিতে এই নাটকের অভিনয় হয় নিশ্চয়ই বৃষ সাজিবার লােকর অভাব হইবে না। বক্ষ্যমাণ অঙ্কে পার্ব্বতী মধুর সম্ভাষণে মহেশ্বরের নিকট হইতে বর্ষফল জানিয়া লইতেছেন। এই অঙ্কে প্রসঙ্গক্রমে সােনার ভারতের দুর্দ্দশায় পার্ব্বতীর বিলাপ এবং রেলগাড়ী প্রচলিত হওয়াতে আর্য্যাবর্তের কী কী অনিষ্ট ঘটিয়াছে, তাহা কৌশলে বর্ণিত হইয়াছে। অবশেষে আঢ়কেশ ফল, কুড়বেশ ফল এবং গােটিকাপাত ফল নামক সুখশ্রাব্য প্রসঙ্গে এই অঙ্কের সমাপ্তি।
তৃতীয় অঙ্ক এবং চতুর্থ অঙ্ক। দৃশ্য কৈলাস।
গজচর্ম্মে এ্যম্বক ও অম্বিকা আসীনা।
নাট্যশালায় গজচর্ম্মের আয়ােজন যদি অসম্ভব হয়, কার্পেট পাতিয়া দিলেই চলিবে। এই দুই অঙ্কে বারবেলা, কালবেলা, পরিঘযােগ, বিষ্কম্ভ যােগ, অসৃক যােগ, বিষ্টিভদ্রা, মহাদগ্ধা, নক্ষত্রফল, রাশিফল, ববকরণ, বালবকরণ, তৈতিলকরণ, কিন্তুঘ্নকরণ, ঘাতচন্দ্র, তারা প্রতিকার, গােচরফল প্রভৃতির বর্ণনা আছে। অভিনেতাদিগের প্রতি লেখকের সবিনয় অনুরােধ, এই দুই অঙ্কে তাঁহারা যথাযথ ভাব রক্ষা করিয়া যেন অভিনয় করেন—কারণ অরিদ্বিদশ এবং মিত্রষড়ষ্টক কথনে যদি অভিনেতার কণ্ঠস্বর ও অঙ্গভঙ্গীতে ভিন্নতা না থাকে, তবে দর্শকগণের চিত্তে কখনই অনুরূপ ভাব উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিবে না।―লেখক।
পঞ্চমাঙ্ক। দৃশ্য কৈলাস।
সিংহের উপর ত্রিপুরারি ও মহাদেবী আসীন।
(সিংহের অভাবে কাঠের চৌকি হইলে ক্ষতি নাই।―লেখক)
মহাদেবী। প্রভু, দেবদেব, তুমি তাে ত্রিকালজ্ঞ, ভূতভবিষ্যৎ বর্ত্তমান তােমার নখদর্পণে; এইবার বলো দেখি ১৮৭৯ সালের এক আইনে কী বলে?
ত্রিপুরারি। মহাদেবি, শুম্ভনিশুম্ভঘাতিনি, তবে অবধান করো। কোনো একটি বিষয়ের অনেকগুলি দলিল হইলে তাহার মধ্যে প্রধান খানিতে নিয়মিত ষ্টাম্প অপরগুলিতে এক টাকা অনুসারে দিতে হয়।
ইহার পর দলিল রেজেষ্টরীর খরচা, তামাদির নিয়ম, উকিল খরচ, খাজনা বিষয়ক আইন, ইন্কম্ট্যাক্স, বাঙ্গিডাক, মণিঅর্ডার; সর্ব্বশেষ সাউথ ইষ্টারণ ষ্টেট্ রেলওয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ভাড়ার কথা বিবৃত করিয়া যবনিকা পতন। এই অঙ্কে যে ব্যক্তি সিংহ সাজিবে তাহার কিঞ্চিৎ আপত্তি থাকিতে পারে,―অতােক্ষণ দুই জনকে স্কন্ধে করিয়া হামাগুড়ির ভঙ্গিতে নিশ্চল দাঁড়াইয়া থাকা কঠিন ব্যাপার। সেই জন্য উকিলখরচা কথনের মধ্যে সিংহ একবার গর্জ্জন করিয়া উঠিবে, “মা, আমার ক্ষুধা পাইয়াছে।” মা বলিবেন “তা যাও বাছা, সাহারা মরুতে তােমার শিকার ধরিয়া খাওগে, আমরা নীচে নামিয়া বসিতেছি।” হামাগুড়ি দিয়া সিংহ নিষ্ক্রান্ত হইবে। এই সুযােগে দর্শকেরা সিংহের আবাসস্থলের পরিচয় পাইবেন।―আমার কোনাে কোনাে নব্যবন্ধু পরামর্শ দিয়াছিলেন ইহার মধ্যে মধ্যে নন্দী ভৃঙ্গীর হাস্যরসের অবতারণা করিলে ভালাে হয়। কিন্তু তাহা হইলে নাটকের গৌরব লাঘব হয়। এই জন্য হাস্য প্রগল্ভতা আমি সযত্নে দূরে পরিহার করিয়াছি। ভবিষ্যতে সুশ্রুত ও চরক সংহিতা নাট্যাকারে রচনা করিবার অভিলাষ আছে এবং উপন্যাসের ন্যায় লঘু সাহিত্যকে কতোদূর পর্য্যন্ত সারবান করিয়া তোলা যাইতে পারে, পাঠকদিগকে তাহারো কিঞ্চিৎ নমুনা দিবার সঙ্কল্প করিয়াছি।
ভবদীয় একান্ত অনুগত শ্রীজনহিতৈষী
সাহিত্য প্রচারক।
১২৯৮।
স্বর্গীয় প্রহসন
স্বর্গীয় প্রহসন
ইন্দ্রসভা
বৃহস্পতি। হে সৌম্য, তেত্রিশকোটি দেবতাতেও কি ইন্দ্রলােক পূর্ণ হয় নাই? আরাে কি নূতন দেবতা আমন্ত্রণের আবশ্যক আছে? হে প্রিয়দর্শন, স্মরণ রাখিয়ো, জন্ম মৃত্যুর দ্বারা মর্ত্ত্যলােকে লােকসংখ্যা নিয়মশাসনে থাকে, কিন্তু স্বর্গলােকে মৃত্যুর অভাবে দেবসংখ্যা হ্রাস
করিবার কোনো উপায় নাই; অতএব সংখ্যা বৃদ্ধি করিবার পূর্ব্বে সবিশেষ বিবেচনা করিয়া দেখা কর্ত্তব্য।
ইন্দ্র। হে সুরগুরো, স্বর্গের পথ দুর্গম করিবার জন্য স্বর্গাধিপতির চেষ্টার ত্রুটি নাই এ কথা সর্ব্বজনবিদিত।
বৃহস্পতি। পাকশাসন নাকপতে, তবে কেন অধুনা দেবলােকে মনসা শীতলা ঘেঁটু নামধারী অজ্ঞাতকুলশীল নব নব দেবতার অভিষেক হইতেছে?
ইন্দ্র। দ্বিজোত্তম, আমরা দেবতাগণ ত্রিভুবনের কর্ত্তৃত্বভার প্রাপ্ত হইয়াছি বটে কিন্তু সে কেবল ত্রিভুবনের সম্মতিক্রমে। এ কথা গুরুদেবের অগােচর নাই, যে, মর্ত্ত্যলােকেই দেবতাদের নির্ব্বাচন হইয়া থাকে। এককালে আর্য্যাবর্তের সমস্ত ব্রাহ্মণ হােতাগণ আমাকেই স্বর্গের প্রধান পদ দিয়াছিলেন এবং তৎকালে সরস্বতী দৃষদ্বতী তীরের প্রত্যেক যজ্ঞ হুতাশনে আমার উদ্দেশে অহরহ যে হবি সমর্পিত হইত তাহার হােমধূমে আমার সহস্রলােচন হইতে নিরন্তর অশ্রু প্রবাহিত হইত। অদ্য নরলােকে হবি ঘৃত কেবল মাত্র জঠরযজ্ঞে ক্ষুধাসুরের উদ্দেশেই উপহৃত হইয়া থাকে এবং শুনিতে পাই সে ঘৃতও বিশুদ্ধ নহে।
বৃহস্পতি। বৃত্রনিসূদন, সেই অপবিত্র বিমিশ্র ঘৃতপানে, শুনিতে পাই, ক্ষুধাসুর মৃতপ্রায় হইয়া আসিয়াছে। হে শক্র, দেবতাদের প্রতি দেবদেবের বিশেষ কৃপা আছে সেই জন্যই নরলােকে হােমাগ্নি নির্ব্বাপিত হইয়াছে, নতুবা নব্য গব্য পরিপাক করিতে হইলে, ভাে পাকশাসন, দেবজঠরের সমস্ত অমৃতরস সুতীব্র অম্লরসে পরিণত হইত, অগ্নিদেবের মন্দাগ্নি এবং বায়ুদেবের বায়ুপরিবর্ত্তন আবশ্যক হইত, এবং সমস্ত দেবতার অমরবক্ষে অসহ্য শূল বেদনা অমর হইয়া বাস করিত।
ইন্দ্র। হে জ্ঞানিশ্রেষ্ঠ, উক্তঘৃতের গুণাগুণ আমার অবিদিত নাই, যেহেতু যমরাজের নিকট সর্ব্বদাই তাহার বিবরণ শুনিতে পাই। অতএব হব্য পদার্থে আমার কিছুমাত্র লােভ নাই, এবং হােমাগ্নির তিরােধান সম্বন্ধেও আমি আক্ষেপ করিতেছি না। আমার বক্তব্য এই যে, যেমন পুষ্প হইতে সৌরভ উত্থিত হয় তেমনি মর্ত্ত্যের ভক্তি হইতেই স্বর্গ ঊর্দ্ধলােকে উদ্বাহিত হইতে থাকে; সেই ভক্তিপুষ্প যদি শুষ্ক হইয়া যায় তবে হে দ্বিজসত্তম, তেত্রিশ কোটি দেবতাও আমার এই পারিজাতমােদিত, নন্দনবনবেষ্টিত স্বর্গলােক রক্ষা করিতে পারিবে না। সেই কারণে, মর্ত্ত্যের সহিত যােগ প্রবাহ রক্ষা করিবার জন্য মাঝে মাঝে নরলােকের নবনির্ব্বাচিত দেবতাগুলিকে সাদরে স্বর্গে আবাহন করিয়া আনিতে হয়। হে ত্রিকালজ্ঞ, স্বর্গের ইতিহাসে এমন ঘটনা ইতিপূর্ব্বেও ঘটিয়াছে।
বৃহস্পতি। মেঘবাহন, সে সমস্ত ইতিহাস আমার অগােচর নাই। কিন্তু ইতিপূর্ব্বে যে-সকল নূতন দেবতা মর্ত্ত্য হইতে স্বর্গলােকে উন্নীত হইয়াছিলেন তাঁহারা অভিজাত দেবগণের সহিত একাসনে বসিবার উপযুক্ত। সম্প্রতি ঘেঁটু প্রমুখ যে সমস্ত দেবতাগণ তােমার নিমন্ত্রণে স্বর্গে আসিয়া আশ্রয় লইয়াছেন তাঁহারা সুরসভার দিব্যজ্যোতি ম্লান করিয়া দিয়াছেন। অদিতিনন্দন, আমার প্রস্তাব এই যে, তাঁহাদের জন্য একটি উপদেবলােক সৃজন করিবার জন্য বিশ্বকর্মার প্রতি বিশেষ ভারার্পণ করা হয়।
ইন্দ্র। বুধপ্রবর, তাহা হইলে সেই উপস্বর্গই স্বর্গ হইয়া দাঁড়াইবে এবং স্বর্গ উপসর্গ হইবে মাত্র। একমাত্র বেদমন্ত্রের উপর আমাদের স্বর্গ প্রতিষ্ঠিত। জম্মনদেশীয় পণ্ডিতগণের বহুল চেষ্টা সত্ত্বেও সে মন্ত্র এবং তাহার অর্থ সকলে বিস্মৃত হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু আমাদের নূতন আমন্ত্রিত দেবদেবীগণ সায়নাচার্য্যের ভাষ্য, পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকদের পুরাতত্ত্ব অথবা তাঁহাদের প্রাচ্যশিষ্যবর্গের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করিতেছেন না, তাঁহারা প্রতিদিনের সদ্য আহরিত পূজা প্রাপ্ত হইয়া উপবাসী পুরাতন দেবতাদের অপেক্ষা অনেক গুণে প্রবল হইয়া উঠিয়াছেন। তাঁহাদিগকে স্বপক্ষে পাইলে আমরা নূতন বললাভ করিতে পারিব। অতএব, গুরুদেব, প্রসন্নচিত্তে তাঁহাদের কণ্ঠে দেবমাল্য অর্পণ করিয়া তাঁহাদিগকে স্বর্গলােকে বরণ করিয়া লউন্!
বৃহস্পতি। অহো দুর্বৃত্তা নিয়তি! মর্ত্ত্যলােকের প্রসাদলাভলালসায় কতাে পুরাতন দেবকুলপ্রদীপ ক্রমশ আপন দেবমর্য্যাদা বিসর্জ্জন দিয়াছেন। দেবসেনাপতি কার্ত্তিকেয় বীরবেশ পরিত্যাগ করিয়া সূক্ষ্মবসন লম্বকচ্ছে কামিনীমনােমােহন নির্লজ্জ নাগরমূর্ত্তি ধারণ করিয়াছেন। গম্ভীরপ্রকৃতি গণপতি কদলী তরুর সহিত গােপন পরিণয়পাশে বদ্ধ হইয়াছেন এবং মহাযােগী মহেশ্বর গঞ্জিকা ধুস্তূর সিদ্ধিপানে উন্মত্ত হইয়া মহাদেবীর সহিত অশ্রাব্য ভাষায় কলহ করিয়া নীচজাতীয় স্ত্রী-পল্লীর মধ্যে আপন বিহার ক্ষেত্র বিস্তার করিয়াছেন। সেই সমস্তই যখন একে একে সহ্য করিতে পারিয়াছি তখন, বােধ করি, দেবাসনে উপদেবতাগণের অধিরােহণ দৃশ্যও এই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ধৈর্য্যকঠিন বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিতে পারিবে না!
চন্দ্রের প্রবেশ
ইন্দ্র। ভগবন্ উড়ুপতে! স্বর্গলােকে তাে কৃষ্ণপক্ষের প্রভাব নাই, তবে অদ্য কেন তােমার সৌম্যসুন্দর প্রফুল্ল মুখচ্ছবি অন্ধকার দেখিতেছি?
চন্দ্র। দেব সহস্রলােচন, স্বর্গে কৃষ্ণপক্ষ থাকিলে অমাবস্যার ছায়ায় আমি আনন্দে আশ্রয় গ্রহণ করিতে পারিতাম। দেবরাজ, দেবী শীতলার প্রসন্নদৃষ্টি হইতে আমাকে নিষ্কৃতি দান করাে! তিনি স্বর্গে পদার্পণ করিয়া অবধি আমার প্রতি যে বিশেষ পক্ষপাত প্রকাশ করিতেছেন, আমি একাকী তাহার যােগ্য নহি। তাঁহার সেই প্রচুর অনুগ্রহ দেবসাধারণের মধ্যে সমভাগে বিভক্ত হইলে কাহারো প্রতি অন্যায় হয় না।
ইন্দ্র। সুধাংশুমালিন্, সুহৃদগণের সহিত ভাগ করিয়া ভােগ করিলে অধিকাংশ আনন্দই বৃদ্ধি পাইয়া থাকে সন্দেহ নাই কিন্তু রমণীর অনুগ্রহ সে জাতীয় নহে।
চন্দ্র। ভগবন্, তবে সে আনন্দ তুমিই সম্পূর্ণ গ্রহণ করো। তুমি সুরশ্রেষ্ঠ, এ সুখাবেগ তুমি ব্যতীত আর কেহ একাকী সম্বরণ করিতে পারিবে না।
ইন্দ্র। প্রিয়সখে, অন্যের নিকট যাহা পাওয়া যায় তাহা বন্ধুকে দান করা কঠিন নহে; কিন্তু প্রেম সেরূপ সামগ্রী নহে; তুমি যাহা পাইয়াছ তাহা তুমি অনাদরে ফেলিয়া দিতে পার কিন্তু প্রিয়তম বন্ধুর অত্যাবশ্যক পূরণ করিবার জন্যও তাহা দান করিতে পার না।
চন্দ্র। যদি ফেলিয়া দিতে পারিতাম, তবে, বিপন্নভাবে তােমার দ্বারস্থ হইতাম না। সুরপতে, অনেক সৌভাগ্য আছে যাহা দূরে নিক্ষেপ করিলেও নিকটে সংলগ্ন হইয়া থাকে।
ইন্দ্র। শশলাঞ্ছন, তুমি কি অপযশের ভয় করিতেছ?
চন্দ্র। সখে, সত্য বলিতেছি কলঙ্কের ভয় আমার নাই।
ইন্দ্র। কলানাথ, তবে কি তুমি তােমার অন্তঃপুরলক্ষ্মী প্রিয়তমার অসূয়া আশঙ্কা করিতেছ?
চন্দ্র। বন্ধো, তােমার অবিদিত নাই, সপ্তবিংশতি নক্ষত্রনারী লইয়া আমার অন্তঃপুর। তাহারা প্রত্যেকেই সমস্ত রাত্রি অনিমেষ নেত্রে জাগ্রত থাকিয়া আমার গতিবিধি নিরীক্ষণ করিয়া থাকে, তথাপি এপর্য্যন্ত নক্ষত্রলােকে কোনােরূপ অশান্তির কারণ ঘটে নাই। সপ্তবিংশতির উপর আর একটি যােগ করিতে আমি ভীত নহি।
ইন্দ্র। সখে, ধন্য তােমার সাহস! তবে তােমার ভয় কিসের?
শশব্যস্ত হইয়া দেবদূতের প্রবেশ
দূত। জয়ােস্তু। দেবরাজ, বাণী বীণাপাণি স্বর্গপরিত্যাগের কল্পনা করিতেছেন।
ইন্দ্র। (সসম্ভ্রমে) কেন? দেবগণ তাঁহার নিকট কী কারণে অপরাধী হইয়াছে?
দূত। মনসা শীতলা মঙ্গলচণ্ডী নাম্নী দেবীগণ সরস্বতীর কমলবনে চিঙ্গটি নামক কর্দ্দমচর ক্ষুদ্র মৎস্যের সন্ধানে গিয়াছিলেন। কৃতকার্য্য না হইয়া কমলকলিকায় অঞ্চলপূর্ণ করিয়া তিন্তিড়ি সংযােগে কটুতৈলে অম্লব্যঞ্জন রন্ধনপূর্ব্বক তীরে বসিয়া প্রচুরপরিমাণে আহার করিয়াছেন, এবং পিত্তলস্থালী সরােবরের জলে মার্জ্জনপূর্ব্বক স্ব স্ব স্থানে ফিরিয়া আসিয়াছেন। এপর্য্যন্ত মানসসরােবরের পদ্মকলিকা দেব দানব কেহই ভক্ষ্যরূপে ব্যবহার করে নাই। (দেবগণের পরস্পর মুখাবলােকন।)
ঘেঁটু মনসা প্রভৃতি দেবদেবীগণের প্রবেশ
ইন্দ্র। (আসন ছাড়িয়া উঠিয়া) দেবগণ, দেবীগণ, স্বাগত। আপনাদের কুশল? স্বর্গলােকে আপনাদের কোনােরূপ অভাব নাই? অনুচরগণ সমাহিত হইয়া সর্ব্বদা আপনাদের আদেশপালনের জন্য অপেক্ষা করিয়া থাকে? সিদ্ধগন্ধর্ব্বগণ নৃত্যশালায় নৃত্যগীতাদির দ্বারা আপনাদের মনােরঞ্জন করে? কামধেনুর দুগ্ধ এবং অমৃতরস যথাকালে আপনাদের সম্মুখে আহরিত হইয়া থাকে? নন্দনবনের সুগন্ধ সমীরণ আপনাদের ইচ্ছানুগামী হইয়া বাতায়নপথে প্রবাহিত হইতে থাকে? আপনাদের লতানিকুঞ্জে পারিজাত সর্ব্বদাই প্রস্ফুটিত থাকিয়া শােভাদান করে?
(দেবীগণের উচ্চহাস্য)
মনসা। (ঘেঁটুর প্রতি) মিন্সে কী ব’ক্চে ভাই?
ঘেঁটু। পুরুঠাকুরের মতো মন্তর প’ড়ে যাচ্ছে। (ইন্দ্রের প্রতি) ওহে, তুমি বুঝি কর্ত্তা! তােমার মন্তর পড়া হ’য়ে গিয়ে থাকে তো গােটাকতক কথা বলি।
ইন্দ্র। হে ঘেঁটো। আপনকার—
ঘেঁটু। ঘেঁটো কী! আমি তােমার বাগানের মালী? বাপের জন্মে এমন অভদ্দর মানুষ তো দেখিনি গা! ঘেঁটো! আমি যদি তােমাকে ইন্দির না ব’লে ইন্দিলে বলি!
মনসা। তা হলেই চিত্তিরে হয়! (দেবীগণের উচ্চহস্য)
ইন্দ্র। (হাস্যে যােগদান করিবার চেষ্টা করিয়া) কুন্দাভদন্তি, বহু তপস্যার দ্বারা স্বর্গলােক লাভ করিয়াছিলাম, কিন্তু কোন্ সুকৃতি ফলে আপনকার সকলের স্মিতদশনময়ূখে স্বর্গলােক অকস্মাৎ অতিমাত্র আলােকিত হইয়া উঠিল এখনো তাহা ধারণা করিতে পারিলাম না!
ঘেঁটু। আরে রাখাে, ওসব বাজে কথা রাখো। তোমার পেয়াদাগুলাে আমাকে সােনার ভাঁড়ে করে কী সব এনে দেয় সে আমি ছুঁতে পারিনে। তােমার শচী গিন্নিকে ব’লে দিয়ো আমার জন্যে রােজ এক থাল গােবরের লাড়ু তৈরি ক’রে পঠিয়ে দেন!
ইন্দ্র। তথাস্তু। স্বর্গে আমাদের কল্পধেনু আছেন। তিনি সকলের সকল কামনাই পূরণ করিয়া থাকেন। বােধ করি আপনার প্রার্থনা পূর্ণ করা তাঁহার পক্ষে দুঃসাধ্য না হইতে পারে?
শীতলা। (চন্দ্রকে এক কোণে গুপ্তপ্রায় দেখিয়া নিকটে গিয়া) মাইরি! তুমি এতাে ছলও জানাে ভাই! আমাকে আচ্ছা ভােগ ভুগিয়েচো যাহােক্! আমি বলি, তুমি বুঝি অন্দর মহলে আছ। ঢুকে দেখি, অশ্লেষা আর মঘা নবাবপুত্রীর মতাে ব’সে আছেন—আমাকে দেখে অবাক্ হ’য়ে রইলেন। আমার সহ্য হ’লো না। আমি ব’ল্লুম, বলি, ও বড়ােমানুষের ঝি, তােমাদের গতর খাটিয়ে খেতে হয় না ব’লে বুঝি দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না! যা ব’ল্তে হয় তা ব’লেচি! ধুন্ধুমার বাধিয়ে দিয়ে এসেছি।
চন্দ্র। (জনান্তিকে ইন্দ্রের প্রতি) সপ্তবিংশতির উপর অষ্টবিংশতিতম যােগ হইলে কিরূপ দুর্য্যোগ উপস্থিত হইতে পারে তাহা, হে শচীপতে, সহজেই অনুভব করিতে পারিবেন। (শীতলার প্রতি) অয়ি অনবদ্যে,— শীতলা। (হাসিয়া অস্থির হইয়া) মা গাে মা, তুমি এতাে হাসাতেও পারো! আদর ক’রে বেশ নামটি দিয়েচো যাহােক্! আনাে বদ্যি! কিন্তু বদ্যিতে ক’র্বে কী ভাই! কতো বদ্যির সাতপুরুষকে আমি সাতঘাটের জল খাইয়ে এসেচি—আমি কি তেম্নি মেয়ে!
ঘেঁটু। (ইন্দ্রের গায়ের কাছে গিয়া তাঁহার পৃষ্ঠে হাত দিয়া) কী গো, ইন্দির দা! মুখে যে রা’টি নেই। রেতের বেলা গিন্নির সঙ্গে বকাবকি চুলােচুলি হ’য়ে গেচে না কি?
ইন্দ্র। (সসঙ্কোচে সরিয়া গিয়া দূরস্থ আসন নির্দেশপূর্ব্বক) দেব, আসন গ্রহণে অনুমতি হৌক্।
ঘেঁটু। এই যে এখানে ঢের জায়গা আছে। (ইন্দ্রের সহিত একাসনে উপবেশন) দাদা, আমার সঙ্গে তুমি নৌকোতা কোরাে না। আজ থেকে তুমি আমার দাদা, আমি তােমার ছােটো ভাই ঘেঁটু। (বাহুদ্বারা ইন্দ্রের গলবেষ্টন এবং ইন্দ্রকর্ত্তৃক অব্যক্ত কাতর ধ্বনি উচ্চারণ)
শীতলা। (চন্দ্রের প্রতি) তুমি যাও কোথায়!
চন্দ্র। মনােজ্ঞে, অন্য অন্তঃপুরে দেবীগণ ভর্ত্তৃপ্রসাদন ব্রতে তাঁহাদের এই সেবকাধমকে স্মরণ করিয়াছেন—অতএব যদি অনুমতি হয় তবে, হে হরিণশালীন নয়নে—
শীতলা। কী ব’ল্লে? শালী? তা ভাই তাই সই! তােমার চাঁদমুখে সবই মিষ্টি লাগে। তা শালী যদি ব’ল্লে তবে কানমলাটিও খাও! (চন্দ্রের পার্শ্বে একাসনে বসিয়া চন্দ্রের কর্ণপীড়ন)
ইন্দ্র। (চন্দ্রের প্রতি) ভগবন্ সিতকিরণমালিন্, তুমিই ধন্য। করুণস্পর্শে তরুণীকরকিসলয়ের অরুণরাগ এখনো তােমার কর্ণমূলে সংলগ্ন হইয়া আছে!
শীতলা। (মনসার প্রতি লক্ষ্য করিয়া স্বগত) ম’লো। ম’লাে। আমাদের মন্সে হিংসেয় ফেটে’ ম’লো! আমি চাঁদের পাশে ব’সেচি এ আর ওঁর গায়ে সইলো না। ঘুর্ ঘুর্ করে বেড়াচ্চে দেখো না! এতোগুলো পুরুষ মানুষের সাম্নে লজ্জাও নেই! মাগী এবার পাড়ায় গিয়ে কতো কানাঘুষোই ক’র্বে! উনিও বড়ো কসুর করেন নি। কার্ত্তিক ঠাকুরটিকে নিয়ে যে রকম নিলজ্জপনা ক’রেচে আমি দেখে লজ্জায় ম’রে যাই আর কি! কাত্তিক কোথায় নুকোবে ভেবে পায় না। এই তো চেহারা—ওই নিয়ে এতো ভঙ্গীও করে! মাগো, মাগো, মাগো! (প্রকাশ্যে) আ মর্ মাগী। চাঁদের সাম্নে দিয়ে অমন বেহায়ার মতো আনাগোনা ক’র্চিস্ কেন? যেন সাপ খেলিয়ে বেড়াচ্চে! কার্ত্তিকের ওখানে ঠাঁই হ’লোনা না কি?
(সুরসভার মধ্যে মনসা ও শীতলার গ্রাম্য ভাষায় তুমুল কলহ)
ইন্দ্র। (শশব্যস্ত হইয়া একবার মনসা ও একবার শীতলার প্রতি) ক্রোধ সম্বরণ করো! ক্রোধ সম্বরণ করো! অয়ি অসূয়তাম্রলোচনে, অয়ি গলদ্বেণীবন্ধে, অয়ি বিগলিতদুকূলবসনে! অয়ি কোকিলজিতকূজিতে, তারতর সপ্তম স্বরকে পঞ্চমস্বরে নম্র করিয়া আনো! অয়ি কোপনে—
ঘেঁটু। (উত্তরীয় ধরিয়া ইন্দ্রকে আসনে বসাইয়া) তুমি এতো ব্যস্ত হও কেন দাদা! ওদের এমন রোজ হ’য়ে থাকে! থাক্তো ওলাবিবি, তাহ’লে আরো জ’ম্তো! তা’র কী খাবার গোল হ’য়েচে তাই সে শচীর সঙ্গে ঝগড়া ক’র্তে গেচে।
ইন্দ্র। (ব্যাকুলভাবে) হা সুরেন্দ্রবক্ষোবিহারিণী দেবী পৌলোমী।
(মনসার দ্রুতবেগে সভা ত্যাগ, এবং শীতলার পুনশ্চ চন্দ্রের পার্শ্বে
উপবেশন)
বীণাপাণির প্রবেশ
বীণা। দেবরাজ, কর্কশ কোলাহলে আমার দেববীণার স্বরস্খলন হইতেছে, আমার কমলবন শূন্যপ্রায়, আমি দেবলোক হইতে বিদায় গ্রহণ করিলাম। (প্রস্থান)
বৃহস্পতি। আমিও জননী বীণার অনুগমন করি! (প্রস্থান)
অশ্লেষা ও মঘার সভাপ্রবেশ
অশ্লেষা ও মঘা (চন্দ্রের একাসনে শীতলাকে দেখিয়া) আজ অপরূপ অভিনব সপ্তদশম কলায় দেব শশধরকে সমধিকতর শোভমান দেখিতেছি!
চন্দ্র। দেবীগণ, এই হতভাগ্যকে অকরুণ পরিহাসে বিড়ম্বিত করিবেন না। পুরুষরাহু আমাকে কেবল ক্ষণমাত্রকাল পরাভব করিতে পারে সেই আক্রোশে ঈর্ষান্বিত ভগবান একটি স্ত্রীরাহু সৃজন করিয়াছেন ইঁহার পূর্ণগ্রাস হইতে আমি বহু চেষ্টায় আপনাকে মুক্ত করিতে পারিতেছি না!
অশ্লেষা। আর্য্যপুত্র, এই ভদ্র ললনা অনতিপূর্ব্বে তোমার অন্তঃপুরে প্রবেশপূর্ব্বক তোমার শ্বশুরকুলকে ঊর্দ্ধতন চতুর্দ্দশ পুরুষ পর্য্যন্ত অশ্রুতপূর্ব্ব কুৎসা দ্বারা লাঞ্ছিত করিয়া আসিয়াছেন। দেবীর সেই আশ্চর্য্য ব্যবহারকে আমরা অধিকারবহির্ভূত উপদ্রব জ্ঞান করিয়া বিস্ময়ান্বিত হইয়াছিলাম এক্ষণে স্পষ্ট বুঝিতে পারিতেছি সৌভাগ্যবতী তোমারই হস্তে সেই অবমাননের অধিকার প্রাপ্ত হইয়াছেন। এখন, আর্য্যপুত্রকে তাঁহার নবতর শ্বশুরকুলে বরণ করিয়া আমরা নক্ষত্রলোক হইতে বিচ্যুতিলাভের জন্য চলিলাম! (শীতলার প্রতি) ভদ্রে, কল্যাণি, তোমার সৌভাগ্য অক্ষয় হৌক্। (প্রস্থান)
শচীর প্রবেশ
ইন্দ্র। (সসম্ভ্রমে আসন ত্যাগ করিয়া) আর্য্যে, শুভ আগমন হৌক্!
ঘেঁটু। (উত্তরীয় ধরিয়া ইন্দ্রকে সবলে আসনে উপবেশন করাইয়া) ঈস্! ভারি খাতির যে! মাইরি; দাদা ঢের ঢের পুরুষ মানুষ দেখেচি কিন্তু তোর মতো এমন স্ত্রৈণ আমি দেখিনি!
(ঘেঁটুকে ইন্দ্রের বামপার্শ্বে শচীর নির্দ্দিষ্ট স্থানে বসিতে দেখিয়া দূরে এক কোণে শচীদেবী কর্ত্তৃক সামান্য এক আসন গ্রহণ।)
ঘেঁটু। (শচীর অনতিদূরে গমন করিয়া সহাস্যে) বৌঠাক্রুণ, আমার দাদাকে কী মন্তর প’ড়ে দিয়েচো বলো দেখি! একেবারে শ্রীচরণের গোলাম ক’রে রেখেচো! তুমি উঠ্লে ওঠে, তুমি ব’স্লে বসে! বলি, একটা কথাই কও! (গান) “কথা কইতে দোষ কি আছে বিধুমুখী!”
ইন্দ্র। দেব ঘেঁটো, কিঞ্চিৎ অবসর দিতে অনুমতি হৌক্! দেবীর নিকট কিছু নিবেদন আছে!
ঘেঁটু। ঈস্ দেখো! দেখো! একটু কাছে এসে ব’সেচি তোমার যে আর গায়ে সইলো না—এতোটা বাড়াবাড়ি কিছু নয়—কথায় বলে অতিভক্তি চোরের লক্ষণ! কাজ নেই ভাই আবার শাপ দেবে। তোমরা দু-জনে বোসো, আমি যাই। (বলপূর্ব্বক ইন্দ্রকে শচীর আসনে বসাইবার চেষ্টা)
ইন্দ্র। (ঘেঁটুকে দূরে অপসারণ করিয়া) দেব, তুমি আত্মবিস্মৃত হইতেছ!
ওলাবিবির প্রবেশ
ওলা। (শচীর প্রতি) তাই বলি যায় কোথায়! অমনি বুঝি সোয়মির কাছে নাগাতে এসেচো! তা নাগাও না! তোমার সোয়ামিকে আমি ডরাইনে!
শচী। (আসন হইতে উঠিয়া ইন্দ্রের প্রতি) দেবরাজ, আমি জয়ন্তকে সঙ্গে লইয়া বিষ্ণুলোকে কিছুকাল লক্ষ্মীদেবীর আলয়ে বাস করিবার সংকল্প করিয়াছি। বহুকাল দেবীদর্শন ঘটে নাই।
ইন্দ্র। আর্য্যে, আমিও দেবীর অনুসরণ করিতেছি। বহুকাল পূজার অনবসরক্রমে চক্রপাণির নিকট অপরাধী হইয়া আছি।
(উভয়ের প্রস্থান)
চন্দ্র। দেব সহস্রলােচন, বিষ্ণুলােকে আমারো বিশেষ আবশ্যক আছে—লক্ষ্মীদেবী।―হায়! বিপৎকালে বান্ধবেরাও ত্যাগ করিয়া যায়!
শীতলা। অমন হাঁড়িপানা মুখ ক’রে আছ কেন? অমন ক’রে থাকো তাে ফের কানমলা খাবে!
চন্দ্র। স্ফুরৎকনকপ্রভে, বিষ্ণুলােকে আমার বিস্তর বিলম্ব হইবে না। যদি অনুমতি করো তাে দাস—
শীতলা। ফের কানমলা খাবে! (কান মলিতে উদ্যত)
(মনসার পুনঃপ্রবেশ। শীতলার সহিত পুনরায়
কলহারম্ভ, ঘেঁটু, ওলা, মঙ্গলচণ্ডী প্রভৃতি
সকলের তাহাতে যোগদান।)
চন্দ্র। আপনারা তবে ততােক্ষণ মিষ্টালাপ করুন, দাস বিষ্ণুলােক অভিমুখে প্রয়াণ করিতে ইচ্ছা করে!
(দ্রুতপদে প্রস্থান।)