← লাইব্রেরি

১৯১৯

সটীক মেঘনাদবধ কাব্য

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯১৯

প্রকাশনা-তথ্য

সটীক

মেঘনাদবধ কাব্য

“মধুহীন কর নাগো তব মনঃ কোকনদে।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রণীত

সম্রাট্ জর্জ্জ, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, ঠাকুর রামকৃষ্ণ

প্রভৃতি রচয়িতা

শ্রীদেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য-সম্পাদিত

দ্বিতীয় সংস্করণ

ভট্টাচার্য্য এণ্ড সন্

কলিকাতা ও ময়মনসিংহ।

১৩২৬

অষ্টম সর্গ

অষ্টম সর্গ

রাজকাজ সাধি যথা, বিরাম-মন্দিরে,

প্রবেশি, রাজেন্দ্র খুলি রাখেন যতনে

কিরীট; রাখিলা খুলি অস্তাচল—চূড়ে

দিনান্তে শিরের রত্ন তমোহা মিহিরে

দিনদেব। তারাদলে আইলা রজনী;

আইলা রজনীকান্ত শান্ত সুধানিধি।

শত শত অগ্নিরাশি জ্বলিল চৌদিকে

রণক্ষেত্রে। ভূপতিত যথায় সুরথী

সৌমিত্রি, বৈদেহীনাথ ভূপতিত তথা

নীরবে। নয়নজল, অবিরল বহি,

ভ্রাতৃলোহ সহ মিশি, তিতিছে মহীরে,

গিরিদেহে বহি যথা, মিশ্রিত গৈরিকে,

পড়ে তলে প্রস্রবণ। শূন্যমনাঃ খেদে

রঘুসৈন্য,—বিভীষণ বিভষণ রণে,

কুমুদ, অঙ্গদ, হনূ, নল, নীল, বলী,

শরভ, সুমালী, বীরকেশরী সুবাহু,

সুগ্রীব, বিষণ্ণ সবে প্রভুর বিষাদে।

চেতন পাইয়া নাথ কহিলা কাতরে;—

“রাজ্য ত্যজি, বনবাসে নিবাসিনু যবে,

লক্ষ্মণ, কুটীর—দ্বারে, আইলে যামিনী,

ধনু-করে হে সুধম্বি! জাগিতে সতত

রক্ষিতে আমায় তুমি; আজি রক্ষঃপুরে—

আজি এই রক্ষঃপুরে অরি মাঝে আমি,

বিপদ-সলিলে মগ্ন, তবুও ভুলিয়া

আমায়, হে মহাবাহো! লভিছ ভূতলে

বিরাম? রাখিবে আজি কে, কহ আমারে?

উঠ, বলি! করে তুমি বিরত পালিতে

ভ্রাতৃ-আজ্ঞা? তবে যদি মম ভাগ্যদোষে—

চিরভাগ্যহীন আমি— ত্যজিলা আমারে,

প্রাণাধিক, কহ শুনি, কোন্ অপরাধে

অপরাধী তব কাছে অভাগী-জানকী?

দেবর-লক্ষ্মণে স্মরি রক্ষঃকারাগারে

কাঁদিছে সে দিবানিশি। কেমনে ভুলিলে—

হে ভাই, কেমনে তুমি ভুলিলে হে আজি,

মাতৃসম নিত্য যারে সেবিতে আদরে?

হে রাঘবকুল-চূড়া! তব কুলবধূ,

রাখে বাঁধি পৌলস্ত্যেয়? না শান্তি সংগ্রামে

হেন দুষ্টমতি চোরে, উচিত কি তব

এ শয়ন—বীরবীর্য্যে সর্ব্বভুক্‌সম

দুর্ব্বার সংগ্রামে তুমি? উঠ ভীমবাহু,

রঘুকুলজয়কেতু! অসহায় আমি

তোমা বিনা, যথা রথী শূন্যচক্র রথে।

তোমার শয়নে হনূ বলহীন, বলি!

গুণহীন ধনু যথা; বিলাপে বিষাদে

অঙ্গদ; বিষণ্ণ মিতা সুগ্রীব সুমতি,

অধীর কর্ব্বুরোত্তম বিভীষণ রথী,

ব্যাকুল এ বলিদল। উঠ ত্বরা করি,

জুড়াও নয়ন, ভাই, নয়ন উন্মীলি!

“কিন্তু ক্লান্ত যদি তুমি এ দুরন্ত রণে,

ধনুর্দ্ধর! চল ফিরি যাই বনবাসে।

নাহি কাজ, প্রিয়তম, সীতায় উদ্ধারি,

অভাগিনী। নাহি কাজ বিনাশি রাক্ষসে

তনয়-বৎসলা যথা সুমিত্রা-জননী

কাঁদেন সরযূতীরে, কেমনে দেখাব

এ মুখ, লক্ষ্মণ! আমি, তুমি না ফিরিলে

সঙ্গে মোর? কি কহিব, সুধিবেন যবে

মাতা,—‘কোথা, রামভদ্র, নয়নের মণি

আমার, অনুজ তোর? কি ব’লে বুঝাব

ঊর্ম্মিলা বধূরে আমি, পুরবাসী জনে?

উঠ, বৎস! আজি কেন বিমুখ হে তুমি

সে ভ্রাতার অনুরোধে, যার প্রেমবশে,

রাজ্যভোগ ত্যজি তুমি পশিলা কাননে?

সমদুঃখে সদা তুমি কাঁদিতে হেরিলে

অশ্রুময় এ নয়ন; মুছিতে যতনে

অশ্রুধারা; তিতি এবে নয়নের জলে

আমি, তবু নাহি তুমি চাহ মোর পানে,

প্রাণাধিক? হে লক্ষ্মণ! এ আচার কভু

(সুভ্রাতৃবৎসল তুমি বিদিত জগতে!)

সাজে কি তোমারে, ভাই? চিরানন্দ তুমি

আমার। আজন্ম আমি ধর্ম্মে লক্ষ্য করি,

পূজিনু দেবতাকুলে,—দিলা কি দেবতা

এই ফল? হে রজনি! দয়াময়ী তুমি;

শিশির-আসারে নিত্য সরস কুসুমে,

নিদাঘার্ত্ত; প্রাণদান দেহ এ প্রসূনে!

সুধানিধি তুমি, দেব সুধাংশু! বিতর

জীবনদায়িনী সুধা, বাঁচাও লক্ষ্মণে—

বাঁচাও, করুণাময়! ভিখারী রাঘবে।”

এইরূপে বিলাপিলা রক্ষঃকুলরিপু

রণক্ষেত্রে, কোলে করি প্রিয়তমানুজে;

উচ্ছ্বাসিলা বীরবৃন্দ বিষাদে চৌদিকে,

মহীরুহব্যূহ যথা উচ্ছ্বাসে নিশীথে,

বহে যবে সমীরণ গহন-বিপিনে।

নিরানন্দ শৈলসুতা কৈলাস-আলয়ে

রঘুনন্দনের দুঃখে উৎসঙ্গ—প্রদেশে,

ধূর্জ্জটীর পাদপদ্মে পড়িছে সঘনে

অশ্রুবারি, শতদলে শিশির যেমতি

প্রত্যূষে! সুধিলা প্রভু;—“কি হেতু সুন্দরি!

কাতরা তুমি হে আজি, কহ তা আমারে?”

“কি না তুমি জান দেব?” উত্তরিলা দেবী

গৌরী;— “লক্ষ্মণের শোকে, স্বর্ণলঙ্কাপুরে,

আক্ষেপিছে রামচন্দ্র, শুন, সকরুণে!

অধীর হৃদয় মম রামের বিলাপে!

কে আর, হে বিশ্বনাথ! পূজিবে দাসীরে

এ বিশ্বে? বিষম লজ্জা দিলে, নাথ, আজি

আমায়; ডুবালে নাম কলঙ্ক-সলিলে।

তপোভঙ্গ-দোষে দাসী দোষী তব পদে,

তাপসেন্দ্র! তেঁই বুঝি, দণ্ডিলা এরূপে?

কুক্ষণে আইল ইন্দ্র আমার নিকটে।

কুক্ষণে মৈথিলীপতি পূজিল আমারে।”

নীরবিলা মহাদেবী কাঁদি অভিমানে।

হাসি উত্তরিলা শম্ভু,—“এ অল্প-বিষয়ে,

কেন নিরানন্দ তুমি, নগেন্দ্রনন্দিনি?

প্রের রাঘবেন্দ্র-শূরে কৃতান্তনগরে

মায়াসহ; সশরীরে, আমার প্রসাদে,

প্রবেশিবে প্রেতদেশে দাশরথি—রথী।

পিতা রাজা দশরথ দিবে তারে ক’য়ে

কি উপায়ে ভাই তার জীবন লভিবে,

আবার; এ নিরানন্দ ত্যজ চন্দ্রাননে!

দেহ এ ত্রিশূল মম মায়ায় সুন্দরি!

তমোময় যমদেশে অগ্নিস্তম্ভসম

জ্বলি উজ্জ্বলিবে দেশ; পূজিবে ইহারে

প্রেতকুল; রাজদণ্ডে প্রজাকুল যথা।”

কৈলাসসদনে দুর্গা স্মরিলা মায়ারে।

অবিলম্বে কুহকিনী আসি প্রণমিলা

অম্বিকায়; মৃদুস্বরে কহিলা পার্ব্বতী;—

“যাও তুমি লঙ্কাধামে, বিশ্ববিমোহিনি!

কাঁদিছে মৈথিলীপতি সৌমিত্রির শোকে

আকুল; সম্বোধি তারে সুমধুরভাষে,

লহ সঙ্গে প্রেতপুরে; দশরথ পিতা,

আদেশিবে কি উপায়ে লভিবে সুমতি

সৌমিত্রি জীবন পুনঃ, আর যোধ যত,

হত এ নশ্বর-রণে! ধর পদ্মকরে

ত্রিশূলীর শূল, সতি! অগ্নিস্তম্ভসম

তমোময় যমদেশে জ্বলি উজ্জ্বলিবে

অস্ত্রবর।” প্রণমিয়া উমায় চলিলা

মায়া। ছায়াপথে ছায়া পলাইলা দূরে

রূপের ছটায় যেন মলিন! হাসিল

তারাবলী—মণিকুল সৌরকরে যথা।

পশ্চাতে খমুখে রাখি আলোকের রেখা,

সিন্ধুনীরে তরী যথা, চলিলা রূপসী

লঙ্কাপানে। কতক্ষণে উতরিলা দেবী

যথায় সসৈন্যে ক্ষুণ্ণ-রঘুকুলমণি।

পূরিল কনকলঙ্কা স্বর্গীয় সৌরভে।

রাঘবের কর্ণমূলে কহিলা জননী;—

“মুছ অশ্রুবারিধারা, দাশরথি রথি!

বাঁচিবে প্রাণের ভাই; সিন্ধুতীর্থজলে

করি স্নান, শীঘ্র তুমি চল মোর সাথে

যমালয়ে; সশরীরে পশিবে, সুমতি!

তুমি প্রেতপুরে আজি শিবের প্রসাদে।

পিতা দশরথ তব দিবেন কহিয়া,

কি উপায়ে সুলক্ষণ লক্ষ্মণ লভিবে

জীবন। হে ভীমবাহো! চল শীঘ্র করি।

সৃজিব সুরঙ্গ-পথ; নির্ভয়ে সুরথি!

পশ তাহে; যাব আমি পথ দেখাইয়া

তবাগ্রে। সুগ্রীব আদি নেতৃপতি যত,

কহ সবে, রক্ষা তারা করুক লক্ষ্মণে।”

সবিস্ময়ে রাঘবেন্দ্র সাবধানি যত

নেতৃনাথে সিন্ধুতীরে, চলিলা সুমতি—

মহাতীর্থ। অবগাহি পূতস্রোতে দেহ,

মহাভাগ, তুষি দেব-পিতৃলোক আদি

তর্পণে, শিবিরদ্বারে উতরিলা ত্বরা

একাকী। উজ্জ্বল এবে দেখিলা নৃমণি

দেবতেজঃপুঞ্জে গৃহ। কৃতাঞ্জলিপুটে,

পুষ্পাঞ্জলি দিয়া রথী পূজিলা দেবীরে।

ভূষিয়া, ভীষণ তনু সুবীর-ভূষণে

বীরেশ, সুড়ঙ্গপথে পশিলা সাহসে—

কি ভয় তাহারে, দেব সুপ্রসন্ন যারে?

চলিলা রাঘবশ্রেষ্ঠ, তিমির কানন—

পথে পথী চলে যথা, যবে নিশাভাগে

সুধাংশুর অংশু পশি হাসে সে কাননে।

আগে আগে মায়াদেবী চলিলা নীরবে।

কতক্ষণে রঘুবর শুনিলা চমকি

কল্লোল, সহস্র শত সাগর উথলি

রোষে কল্লোলিছে যেন! দেখিলা সভয়ে

অদূরে ভীষণ-পুরী, চিরনিশাবৃত;

বহিছে পরিখারূপে বৈতরণী-নদী

বজ্রনাদে;—রহি রহি উথলিছে বেগে

তরঙ্গ, উথলে যথা তপ্ত-পাত্রে পয়ঃ

উচ্ছ্বাসিয়া ধূমপুঞ্জ, ত্রস্ত অগ্নিতেজে!

নাহি শোভে দিনমণি সে আকাশদেশে;

কিম্বা চন্দ্র, কিম্বা তারা; ঘন ঘনাবলী,

উগরি পাবকরাশি, ভ্রমে শূন্যপথে

বাতগর্ভ, গর্জ্জি উচ্চে, প্রলয়ে যেমতি

পিনাকী, পিনাকে ইষু বসাইয়া রোষে।

সবিস্ময়ে রঘুনাথ নদীর উপরে

হেরিলা অদ্ভুত সেতু, অগ্নিময় কভু,

কভু ঘন-ধূমাবৃত, সুন্দর কভু বা

সুবর্ণে নির্ম্মিত যেন! ধাইছে সতত

সে সেতুর পানে প্রাণী লক্ষ লক্ষ কোটি—

হাহাকার নাদে কেহ; কেহ বা উল্লাসে!

সুধিলা বৈদেহীনাথ;—“কহ কৃপাময়ি!

কেন নানা—বেশ সেতু ধরিছে সতত?

কেন বা অগণ্য প্রাণী (অগ্নিশিখা হেরি

পতঙ্গের কুল যথা) ধায় সেতু পানে?”

উত্তরিলা মায়াদেবী;— “কামরূপী সেতু,

সীতানাথ; পাপীপক্ষে অগ্নিময় তেজে,

ধূমাবৃত; কিন্তু যবে আসে পুণ্যপ্রাণী,

প্রশস্ত, সুন্দর, স্বর্গের স্বর্ণপথ যথা।

ওই যে অগণ্য আত্মা দেখিছ নৃমণি,

ত্যজি দেহ ভবধামে, আসিছে সকলে

প্রেতপুরে, কর্ম্মফল ভুঞ্জিতে এ দেশে

ধর্ম্মপথগামী যারা যায় সেতুপথে

উত্তর, পশ্চিম, পূর্ব্বদ্বারে; পাপী যারা

সাঁতারিয়া নদী পার হয় দিবানিশি

মহাক্লেশে; যমদূত পীড়য়ে পুলিনে,

জলে জ্বলে পাপ-প্রাণ, তপ্ত তৈলে যেন!

চল মোর সাথে তুমি; হেরিবে সত্বরে

নরচক্ষু কভু নাহি হেরিয়াছে যাহা!”

ধীরে ধীরে রঘুবর চলিলা পশ্চাতে,

সুবর্ণ দেউটি সম অগ্রে কুহকিনী

উজ্জ্বলি বিকট দেশ। সেতুর নিকটে

সভয়ে হেরিলা রাম বিরাট-মূরতি

যমদূত দণ্ডপাণি। গর্জ্জি বজ্রনাদে

সুধিল কৃতান্তচর,—“কে তুমি? কি বলে,

সশরীরে, হে সাহসি! পশিলা এ দেশে

আত্মময়? কহ ত্বরা, নতুবা নাশিব

দণ্ডাঘাতে মুহূর্ত্তেকে।” হাসি মায়াদেবী

শিবের ত্রিশূল মাতা দেখাইলা দূতে।

নতভাবে নমি দূত কহিলা সতীরে;—

“কি সাধ্য আমার, সাধ্বি! রোধি আমি গতি

তোমার? আপনি সেতু স্বর্ণময় দেখ

উল্লাসে, আকাশ যথা ঊষার মিলনে!”

বৈতরণী-নদী পার হইলা উভয়ে।

লৌহময় পুরীদ্বার দেখিলা সম্মুখে

রঘুপতি; চক্রাকৃতি অগ্নি রাশি রাশি

ঘোরে অবিরামগতি চৌদিক উজলি!

আগ্নেয় অক্ষরে লেখা দেখিলা নৃমণি

ভীষণ তোরণ-মুখে;—“এই পথ দিয়া

যায় পাপী দুঃখদেশে চির-দুঃখ-ভোগে;—

হে প্রবেশি, ত্যজি স্পৃহা, প্রবেশ এ দেশে।”

অস্থিচর্ম্মসার দ্বারে দেখিলা সুরথী

জ্বর-রোগ। কভু শীতে কাঁপে ক্ষীণতনু

থর-থরি; ঘোর দাহে কভু বা দহিছে,

বাড়বাগ্নিতেজ যথা জলদলপতি।

পিত্ত, শ্লেষ্মা, বায়ু, বলে কভু আক্রমিছে

অপহরি, জ্ঞান তার। সে রোগের পাশে

বিশাল-উদর বসে উদরপরতা—

অজীর্ণ ভোজনদ্রব্য উগরি দুর্ম্মতি,

পুনঃ পুনঃ দুই হস্তে তুলিয়া গিলিছে

সুখাদ্য। তাহার পাশে প্রমত্তত্ব হাসে

ঢুলু ঢুলু ঢুলু আঁখি। নাচিছে, গাইছে

কভু, বিবাদিছে কভু, কাঁদিছে কভু বা।

সদা জ্ঞানশূন্য মূঢ়, জ্ঞানহর সদা!

তার পাশে দুষ্ট কাম, বিগলিত-দেহ

শব যথা, তবু পাপী রত গো সুরতে—

দহে হিয়া অহরহঃ কামানলতাপে।

তার পাশে বসি যক্ষ্মা শোণিত উগরে,

কাশি কাশি দিবানিশি; হাঁপায় হাঁপানি—

মহাপীড়া! বিসূচিকা, গতজ্যোতিঃ আঁখি;

মুখমলদ্বারে বহে লোহের লহরী

শুভ্রজলরয়রূপে। তৃষ্ণারূপে রিপু

আক্রমিছে মুহুর্ম্মুহুঃ; অঙ্গগ্রহ নামে

ভয়ঙ্কর যমচর গ্রহিছে প্রবলে

ক্ষীণ অঙ্গ, যথা ব্যাঘ্র, নাশি জীব বনে,

রহিয়া রহিয়া পড়ি কামড়ায় তারে

কৌতুকে। অদূরে বসে সে রোগের পাশে

উন্মত্তা— উগ্র কভু, আহুতি পাইলে

উগ্র অগ্নিশিখা যথা; কভু হীনবলা!

বিবিধ ভূষণে কভু ভূষিত; কভু বা

উলঙ্গ, সমর-রঙ্গে হরপ্রিয়া যথা

কালী। কভু গায় গীত করতালি দিয়া

উন্মদা; কভু বা কাঁদে; কভু হাসিরাশি

বিকট অধরে; কভু কাটে নিজ গলা

তীক্ষ্ণ-অস্ত্রে; গিলে বিষ; ডুবে জলাশয়ে;

গলে দড়ি। কভু, ধিক্! হাব-ভাব-আদি

বিভ্রমবিলাসে বামা আহ্বানে কামীরে

কামাতুরা। মল, মূত্র, না বিচারি কিছু,

অন্নসহ মাখি, হায়, খায় অনায়াসে।

কভু বা শৃঙ্খলাবদ্ধা, কভু ধীরা যথা

স্রোতোহীন প্রবাহিণী— পবন-বিহনে!

আর আর রোগ যত কে পারে বর্ণিতে?

দেখিলা রাঘব-রথী অগ্নিবর্ণ-রথে

(বসন শোণিতে আর্দ্র, খর অসি করে,)

রণে। রথমুখে বসে ক্রোধ সূতবেশে;

নরমুণ্ডমালা গলে, নরদেহরাশি

সন্মুখে। দেখিলা হত্যা, ভীম-খড়্গপাণি;—

ঊর্দ্ধবাহু সদা, হায়, নিধনসাধনে।

বৃক্ষশাখে গলে রজ্জু দুলিছে নীরবে

আত্মহত্যা, লোলজিহ্বা উন্মীলিত আঁখি

ভয়ঙ্কর! রাঘবেন্দ্র সম্ভাষি সুভাষে

কহিলেন মায়াদেবী;—“এই যে দেখিছ

বিকট-শমনদূত যত, রঘুরথি!

নানাবেশে এ সকলে ভ্রমে ভূমণ্ডলে

অবিশ্রাম, ঘোর-বনে কিরাত যেমতি

মৃগয়ার্থে। পশ তুমি কৃতান্তনগরে,

সীতাকান্ত! দেখাইব আজি হে তোমারে

কি দশায় আত্মকুল জীবে আত্মদেশে।

দক্ষিণ দুয়ার এই; চৌরাশী নরক—

কুণ্ড আছে এই দেশে। চল ত্বরা করি।”

পশিলা কৃতান্তপুরে সীতাকান্ত বলী,

দাবদগ্ধ-বনে, মরি, ঋতুরাজ যেন

বসন্ত, অমৃত কিম্বা জীবশূন্য-দেহে।

অন্ধকারময়-পুরী, উঠিছে চৌদিকে

আর্ত্তনাদ; ভূকম্পনে কাঁপিছে সঘনে

জল, স্থল; মেঘাবলী উগরিছে রোষে

কালাগ্নি; দুর্গন্ধময় সমীর বহিছে,

লক্ষ লক্ষ শব যেন পুড়িছে শ্মশানে।

কতক্ষণে রঘুশ্রেষ্ঠ দেখিলা সম্মুখে

মহাহ্রদ; জলরূপে বহিছে কল্লোলে

কালাগ্নি। ভাসিছে তাহে কোটি কোটি প্রাণী

ছটফটি হাহাকারে! “হায় রে বিধাতঃ

নির্দ্দয়! সৃজিলি কি রে, আমা সবাকারে

এই হেতু? হা দারুণ! কেন না মরিনু

জঠর-অনলে মোরা মায়ের উদরে?

কোথা তুমি দিনমণি? তুমি, নিশাপতি

সুধাংশু? আর কি কভু জুড়াইব আঁখি

হেরি তোমাদোঁহে, দেব? কোথা সুত, দারা,

আত্মবর্গ? কোথা, হায়, অর্থ, যার হেতু

বিবিধ কুপথে রত ছিনু রে সতত—

করিনু কুকর্ম্ম, ধর্ম্মে দিয়া জলাঞ্জলি?”

এইরূপে পাপিপ্রাণ বিলাপে সে হ্রদে

মুহুর্মুহুঃ। শূন্যদেশে অমনি উত্তরে

শূন্যদেশভবা বাণী ভৈরব-নিনাদে;—

“বৃথা কেন মূঢ়মতি! নিন্দিস্ বিধিরে

তোরা? স্বকরম-ফল ভুঞ্জিস্ এ দেশে!

পাপের ছলনে ধর্ম্মে ভুলিলি কি হেতু?

সুবিধি বিধির বিধি বিদিত জগতে!”

নীরবিলে দৈববাণী, ভীষণ-মূরতি

যমদূত হানে দণ্ড মস্তক—প্রদেশে;

কাটে কৃমি; বজ্রনখা, মাংসাহারী পাখী

উড়ি পড়ি ছায়াদেহে ছিঁড়ে নাড়ীভুঁড়ি

হুহুঙ্কারে। আর্ত্তনাদে পুরে দেশ পাপী!

কহিলা বিষাদে মায়া রাঘবে সম্ভাষি

“রৌরব এ হ্রদ-নাম, শুন, রঘুমণি!

অগ্নিময়; পরধন হরে যে দুর্ম্মতি,

তার চিরবাস হেথা; বিচারী যদ্যপি

অবিচারে রত, সেও পড়ে এই হ্রদে;

আর আর প্রাণী যত, মহাপাপে পাপী।

না নিবে পাবক হেথা, সদা কীট কাটে।

নহে সাধারণ অগ্নি কহিনু তোমারে,

জ্বলে যাহে প্রেতকুল এ ঘোর-নরকে,

রঘুবর! অগ্নিরূপে বিধিরোষ হেথা

জ্বলে নিত্য। চল রথি, চল দেখাইব

কুম্ভীপাকে; তপ্ত-তৈলে যমদূতে ভাজে

পাপীবৃন্দে যে নরকে। ওই শুন, বলি!

অদূরে ক্রন্দনধ্বনি। মায়াবলে আমি

রোধিয়াছি নাসাপথ তোমার, নহিলে

নারিতে তিষ্ঠিতে হেথা, রঘুশ্রেষ্ঠ–রথি।

কিম্বা চল যাই, যথা অন্ধতমকূপে

কাঁদিছে আত্মহা পাপী হাহাকার-রবে

চিরবন্দী।” করপুটে কহিলা নৃপতি;—

“ক্ষম ক্ষেমঙ্করি, দাসে। মরিব এখনি

পরদুঃখে, আর যদি দেখি দুঃখ আমি

এইরূপ। হায়, মাতঃ! এ ভবমণ্ডলে

স্বেচ্ছায় কে গ্রহে জন্ম, এই দশা যদি

পরে? অসহায় নর; কলুষকুহকে

পারে কি গো নিবারিতে?” উত্তরিলা মায়া;—

“নাহি বিষ, মহেশ্বাস এ বিপুল-ভবে,

না দমে ঔষধে যারে। তবে যদি কেহ

অবহেলে সে ঔষধে, কে বাঁচায় তারে?

কর্ম্মক্ষেত্রে পাপসহ রণে যে সুমতি,

দেবকুল অনুকূল তার প্রতি সদা;—

অভেদ্য-কবচে ধর্ম্ম আবরেন তারে।

এ সকল দণ্ডস্থল দেখিতে যদ্যপি,

হে রথি! বিরত তুমি, চল এই পথে।”

কতদূরে সীতাকান্ত পশিলা কান্তারে—

নীরব, অসীম, দীর্ঘ; নাহি ডাকে পাখী

নাহি বহে সমীরণ সে ভীষণ বনে,

না ফোটে কুসুমাবলী—বন-সুশোভিনী।

স্থানে স্থানে পত্রপুঞ্জে ছেদি প্রবেশিছে

রশ্মি, তেজোহীন কিন্তু রোগিহাস্য যথা।

লক্ষ লক্ষ লক্ষ প্রাণী সহসা বেড়িল

সবিস্ময়ে রঘুনাথে, মধুভাণ্ডে যথা

মক্ষিকা। সুধিলা কেহ সকরুণ–স্বরে;—

“কে তুমি শরীরি? কহ, কি গুণে আইলা

এ স্থলে? দেব কি নর, কহ শীঘ্র করি?

কহ কথা; আমা সবে তোষ, গুণনিধি,

বাক্য-সুধা-বরিষণে। যে দিন হরিল

পাপপ্রাণ যমদূত, সে দিন অবধি

রসনা-জনিত ধ্বনি বঞ্চিত আমরা।

জুড়াল নয়ন হেরি অঙ্গ তব, রথি,

বরাঙ্গ, এ কর্ণদ্বয়ে জুড়াও বচনে।”

উত্তরিলা রক্ষোরিপু;—“রঘুকুলোদ্ভব

এ দাস, হে প্রেতকুল! দশরথ রথী

পিতা, পাটেশ্বরী দেবী কৌশল্যা জননী;

রামনাম ধরে দাস; হায়, বনবাসী

ভাগ্যদোষে! ত্রিশূলীর আদেশে ভেটিব

পিতায়, তেঁই গো আজি এ কৃতান্তপুরে।”

উত্তরিলা প্রেত এক; “জানি আমি তোমা

শূরেন্দ্র! তোমার শরে শরীর ত্যজিনু

পঞ্চবটী বনে আমি।” দেখিলা নৃমণি

চমকি মারীচ রক্ষে—দেহহীন এবে!

জিজ্ঞাসিলা রামচন্দ্র; “কি পাপে আইলা

এ ভীষণ-বনে, রক্ষঃ, কহ তা আমারে?”

“এ শাস্তির হেতু, হায়,পৌলস্ত্য়-দুর্ম্মতি,

রঘুরাজ।” উত্তরিলা শূন্যদেহ-প্রাণী;—

“সাধিতে তাহার কার্য্য বঞ্চিনু তোমারে,

তেঁই এ দুর্গতি মম।” আইল দূষণ–

সহ খর (খর যথা তীক্ষ্ণতর অসি

সমরে, সজীব যবে) হেরি রঘুনাথে,

রোষে, অভিমানে দোঁহে চলি গেলা দূরে,

বিষদন্ত-হীন অহি হেরিলে নকুলে

বিষাদে লুকায় যথা। সহসা পূরিল

ভৈরব-আরবে বন, পলাইল রড়ে

ভূতকুল শুষ্ক পত্র উড়ি যায় যথা,

বহিলে প্রবল ঝড়। কহিলা শূরেশে

মায়া;—“প্রেতকুল শুন রঘুমণি!

নানাকুণ্ডে করে বাস, কভু কভু আসি

ভ্রমে এ বিলাপ-বনে, বিলাপি নীরবে।

ওই দেখ যমদূত খেদাইছে রোষে

নিজ নিজ স্থানে সবে।” দেখিলা বৈদেহী—

হৃদয়কমলরবি, ভূত পালে পালে,

পশ্চাতে ভীষণ-মূর্ত্তি যমদূত; বেগে

ধাইছে নিনাদি ভূত, মৃগপাল যথা

ধায় বেগে ক্ষুধাতুর সিংহের তাড়নে

ঊর্দ্ধশ্বাস! মায়া সহ চলিলা বিষাদে,

দয়াসিন্ধু রামচন্দ্র সজল-নয়নে।

কতক্ষণে আর্ত্তনাদ শুনিলা সুরথী

শিহরি। দেখিলা দূরে লক্ষ লক্ষ নারী,

আভাহীন, দিবাভাগে শশিকলা যথা

আকাশে। কেহ বা ছিঁড়ি দীর্ঘ-কেশাবলী

কহিছে;—“চিকণি তোরে বাঁধিতাম সদা,

বাঁধিতে কামীর মন, ধর্ম্ম-কর্ম্ম ভুলি,

উন্মদা যৌবনমদে!” কেহ বিদরিছে

নখে বক্ষঃ, কহি;— “হায়, হীরা-মুক্তা-ফলে

বিফলে কাটানু দিন সাজাইয়া তোরে;

কি ফল ফলিল পরে!” কোন নারী খেদে

কুড়িছে নয়নদ্বয়, (নির্দ্দয় শকুনি

মৃতজীব-আঁখি যথা) কহিয়া, “অঞ্জনে

রঞ্জি তোরে, পাপচক্ষু, হানিতাম হাসি

চৌদিকে কটাক্ষশর; সুদর্পণে হেরি

বিভা তোর, ঘৃণিতাম কুরঙ্গনয়নে।

গরিমার পুরস্কার এই কি রে শেষে?”

চলি গেলা বামাদল কাঁদিয়া কাঁদিয়া।

পশ্চাতে কৃতান্তদূতী কুন্তল প্রদেশে

স্বনিছে ভীষণ সর্প; নথ অসিসম;

রক্তাক্ত অধর ওষ্ঠ; দুলিছে সঘনে

কদাকার স্তনযুগ ঝুলি নাভিতলে;

নাসাপথে অগ্নিশিখা জ্বলি বাহিরিছে

ধক্‌ধকি; নয়নাগ্নি মিশিছে তা সহ।

সম্ভাষি রাঘবে মায়া কহিলা,—“এই যে

নারীকুল, রঘুমণি! দেখিছ সম্মুখে,

বেশভূষাসক্তা সবে ছিল মহীতলে।

সাজিত সতত দুষ্টা, বসন্তে যেমতি

বনস্থলী, কামিমন মজাতে বিভ্রমে

কামাতুরা। এবে কোথা সে রূপমাধুরী,

সে যৌবনধন, হায়!” অমনি বাজিল

প্রতিধ্বনি;—“এবে কোথা সে রূপমাধুরী,

সে যৌবনধন, হায়!” কাঁদি ঘোর-রোলে,

চলি গেলা বামাকুল যে যার নরকে।

আবার কহিলা মায়া;—“পুনঃ দেখ চেয়ে

সম্মুখে, হে রক্ষোরিপু!” দেখিলা নৃমণি

আর এক বামাদল সম্মোহনরূপে।

পরিমলময় ফুলে মণ্ডিত-কবরী,

কামাগ্নির তেজোরাশি কুরঙ্গ-নয়নে,

মিষ্টতর সুধা-রসমধুর অধরে।

দেবরাজ-কম্বুসম মণ্ডিত রতনে

গ্রীবাদেশ; সূক্ষ্ম স্বর্ণসূতার কাঁচলী

আচ্ছাদন-ছলে ঢাকে কেবল দেখাতে

কুচ-রুচি, কাম-ক্ষুধা বাড়য়ে হৃদয়ে

কামীর! সুক্ষীণ কটি; নীল পট্টবাসে,

(সূক্ষ্ম অতি) গুরু ঊরু যেন ঘৃণা করি

আবরণ, রম্ভা-কান্তি দেখায় কৌতুকে,

উলঙ্গ বরাঙ্গ যথা মানসের জলে

অপ্সরীর, জল—কেলি করে তারা যবে।

বাজিছে নূপুর পায়ে, নিতম্বে মেখলা;

মৃদঙ্গের রঙ্গে, বীণা, রবাব, মন্দিরা

আনন্দে সারঙ্গ সবে মন্দে মিলাইছে।

সঙ্গীত তরঙ্গে রঙ্গে ভাসিছে অঙ্গনা।

রূপস-পুরুষদল আর এক পাশে

বাহিরিল মৃদু হাসি; সুন্দর যেমতি

কৃত্তিকাবল্লভ দেব- কার্ত্তিকেয় বলী,

কিম্বা, রতি! মনমথ-মনোরথ তব।

হেরি সে পুরুষ দলে কামমদে মাতি

কপটে কটাক্ষ-শর হানিলা রমণী,—

কঙ্কণ বাজিল হাতে শিঞ্জিনীর বোলে!

তপ্ত-শ্বাসে উড়ি রজঃ কুসুমের দামে

ধূলারূপে জ্ঞান-রবি আশু আবরিল।

হারিল পুরুষ রণে; হেন রণে কোথা

জিনিতে পুরুষদলে আছে হে শকতি?

বিহঙ্গ-বিহঙ্গী যথা প্রেম-রঙ্গে মজি

করে কেলি যথা তথা—রসিক-নাগরে

ধরি, পশে বন-মাঝে রসিকা নাগরী—

কি মানসে নয়ন তা কহিল নয়নে।

সহসা পূরিল বন হাহাকার-রবে।

বিস্ময়ে দেখিলা রাম করি জড়াজড়ি,

গড়াইছে ভূমিতলে নাগর-নাগরী

কামড়ি আঁচড়ি, মারি হস্ত-পদাঘাতে,

ছিঁড়ি চুল, কুড়ি আঁখি, নাক-মুখ চিরি

বজ্রনখে। রক্তস্রোতে তিতিলা ধরণী।

যুঝিল উভয়ে ঘোরে, যুঝিল যেমতি

কীচকের সহ ভীম নারী–বেশ ধরি

বিরাটে। উতরি তথা যমদূত যত

লৌহের মুদ্গর মারি আশু তাড়াইলা

দুই দলে। মৃদুভাষে কহিলা সুন্দরী

মায়া, রঘুকুলানন্দ রাঘবনন্দনে;—

জীবনে কামের দাস, শুন, বাছা, ছিল

পুরুষ; কামের দাসী রমণী-মণ্ডলী।

কাম-ক্ষুধা পূরাইল দোঁহে অবিরামে

বিসর্জ্জি ধর্ম্মেরে, হায়, অধর্ম্মের জলে,

বিসর্জ্জি লজ্জা;—দণ্ড এবে এই যমপুরে!

ছলে যথা মরীচিকা তৃষাতুর-জনে,

মরুভূমে: স্বর্ণকান্তি-মাখাল যেমতি

মোহে ক্ষুধাতুর প্রাণে; সেই দশা ঘটে

এ সঙ্গমে; মনোরথ বৃথা দুই দলে।

আর কি কহিব, বাছা! বুঝি দেখ তুমি।

এ দুর্ভোগ হে সুভগ! ভোগে বহু পাপী

মরুভূমে নরকাগ্রে; বিধির এ বিধি—

যৌবনে অন্যায় ব্যয় বয়সে কাঙ্গালী।

অনির্ব্বেয় কামানল পোড়ায় হৃদয়ে;

অনির্ব্বেয় বিধি-রোষ কামানল-রূপে

দহে দেহ, মহাবাহো! কহিনু তোমারে—

এ পাপি-দলের এই পুরস্কার শেষে!”

মায়ার চরণে নমি কহিলা নৃমণি;—

“কত যে অদ্ভুত-কাণ্ড দেখিনু এ পুরে,

তোমার প্রসাদে, মাতঃ! কে পারে বর্ণিতে?

কিন্তু কোথা রাজ-ঋষি? লইব মাগিয়া

কিশোর লক্ষ্মণে ভিক্ষা তাঁহার চরণে—

লহ দাসে সে সুধামে, এ মম মিনতি।”

হাসিয়া কহিলা মায়া;— “অসীম এ পুরী

রাঘব! কিঞ্চিৎ মাত্র দেখানু তোমারে।

দ্বাদশ বৎসর যদি নিরন্তর ভ্রমি

কৃতান্ত-নগরে, শূর! আমা দোঁহে, তবু

না হেরিব সর্ব্বভাগ। পূর্ব্বদ্বারে সুখে

পতিসহ করে বাস পতিপরায়ণা

সাধ্বীকুল; স্বর্গে, মর্ত্যে অতুল এ পুরী

সে ভাগে; সুরম্য হর্ম্ম সুকানন-মাঝে,

সুসরসী সুকমলে পরিপূর্ণ সদা,

বসন্ত-সমীর চির বহিছে সুস্বনে,

গাহিছে সুপিকপুঞ্জ সদা পঞ্চস্বরে।

আপনি বাজিছে বীণা, আপনি বাজিছে

মুরজ, মন্দিরা, বাঁশী, মধু সপ্তস্বরা;

দধি, দুগ্ধ, ঘৃত উৎসে উথলিছে সদা

চৌদিকে, অমৃতফল ফলিছে কাননে;

প্রদানেন পরমান্ন আপনি অন্নদা।

চর্ব্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়, যা কিছু যে চাহে,

অমনি পায় সে তারে কামধুকে যথা

কামলতা, মহেষ্বাস, সদ্যফলবতী!

নাহি কাজ যাই তথা; উত্তর-দুয়ারে

চল, বলি! ক্ষণকাল ভ্রম সে সুদেশে।

অবিলম্বে পিতৃ-পদ হেরিবে, নৃমণি!”

উত্তরাভিমুখে দোঁহে চলিলা সত্বরে।

দেখিলা বৈদেহীনাথ গিরি শত শত

বন্ধ্য, দগ্ধ আহা, যেন দেবরোষানলে!

তুঙ্গশৃঙ্গশিরে কেহ ধরে রাশি রাশি

তুষার; কেহ বা গর্জ্জি উগরিছে মুহুঃ

অগ্নি, দ্রবি শিলাকুলে অগ্নিময় স্রোতে,

আবরি গগন ভস্মে, পূরি কোলাহলে

চৌদিক্! দেখিলা প্রভু মরুক্ষেত্র শত

অসীম, উত্তপ্ত বায়ু বহি নিরবধি

তাড়াইছে বালিবৃন্দে ঊর্ম্মিদলে যেন!

দেখিলা তড়াগ বলী সাগর-সদৃশ

অকূল; কোথায় ঝড়ে হুঙ্কারি উথলে

তরঙ্গ পর্ব্বতাকৃতি; কোথায় পচিছে

গতিহীন জলরাশি; করে কেলি তাহে

ভীষণ-মূরতি ভেক, চীৎকারি গম্ভীরে!

ভাসে মহোরগবৃন্দ, অশেষ-শরীরী

শেষ যথা; হলাহল জ্বলে কোন স্থলে;

(সাগর-মন্থনকালে সাগরে যেমতি)।

এ সকল দেশে পাপী ভ্রমে, হাহারবে

বিলাপি! দংশিছে সর্প, বৃশ্চিক কামড়ে,

ভীষণদশন কীট। আগুন ভূতলে,

শূন্যদেশে ঘোর শীত! হায় রে, কে কবে

লভয়ে বিরাম ক্ষণ এ উত্তর-দ্বারে?

দ্রুতগতি মায়াসহ চলিলা সুরথী।

নিকটয়ে তট যবে, যতনে কাণ্ডারী

দিয়া পাড়ী জলারণ্যে, আশু ভেটে তারে

কুসুমবনজনিত পরিমলসখা

সমীর; জুড়ায় কাণ শুনি বহুদিনে

পিককুল-কলরব, জনরব-সহ—

ভাসে সে কাণ্ডারী এবে আনন্দ-সলিলে।

সেইরূপে রঘুবর শুনিল অদূরে

বাদ্যধ্বনি! চারিদিকে হেরিলা সুমতি

সবিস্ময়ে স্বর্ণসৌধ, সুকাননরাজী

কনক-প্রসূন-পূর্ণ;—সুদীর্ঘ সরসী,

নবকুবলয়ধাম! কহিলা সুস্বরে

মায়া;—“এই দ্বারে, বীর! সম্মুখসংগ্রামে

পড়ি, চিরসুখ ভুঞ্জে মহারথী যত।

অশেষ, হে মহাভাগ! সম্ভোগ এ ভাগে

সুখের। কানন-পথে চল ভীমবাহো!

দেখিবে যশস্বীজনে, সঞ্জীবনী-পুরী

যা সবার যশে পূর্ণ, নিকুঞ্জ যেমতি

সৌরভে। এ পুণ্যভূমে বিধাতার হাসি

চন্দ্র-সূর্য্য-তারারূপে দীপে, অহরহঃ

উজ্জ্বলে!” কৌতুকে রথী চলিলা সত্বরে,

অগ্রে শূলহস্তে মায়া। কতক্ষণে বলী

দেখিলা সম্মুখে ক্ষেত্র—রঙ্গভূমিরূপে

কোন স্থলে শূলকুল শালবন যথা

বিশাল; কোথায় হ্রেষে তুরঙ্গমরাজী

মণ্ডিত রণভূষণে; কোথায় গরজে

গজেন্দ্র। খেলিছে চর্ম্মী অসি চর্ম্ম ধরি;

কোথায় যুঝিছে মল্ল ক্ষিতি টলমলি;

উড়িছে পতাকাচয় রণানন্দে যেন।

কুসুম-আসনে বসি, স্বর্ণ-বীণা-করে;

কোথায় গাইছে কবি, মোহি শ্রোতাকুলে

বীরকুলসংকীর্ত্তনে। মাতি সে সঙ্গীতে,

হুঙ্কারিছে বীরদল; বর্ষিছে চৌদিকে,

না জানি কে, পারিজাতফুল রাশি রাশি,

সুসৌরভে পূরি দেশ। নাচিছে অপ্সরা;

গাইছে কিন্নরকুল, ত্রিদিবে যেমতি।

কহিলা রাঘবে মায়া;— “সত্যযুগ-রণে

সম্মুখ–সমরে হত রথীশ্বর যত,

দেখ, এই ক্ষেত্রে আজি, ক্ষত্ত্র-চূড়ামণি!

কাঞ্চনশরীর যথা হেমকূট, দেখ

নিশুম্ভে; কিরীট-আভা উঠিছে গগনে—

মহাবীর্য্যবান্ রথী। দেবতেজোদ্ভবা

চণ্ডী ঘোরতর রণে নাশিলা শূরেশে।

দেখ শুম্ভে,শূলীশম্ভুনিভ পরাক্রমে;

ভীষণ মহিষাসুরে, তুরঙ্গমদমী;

ত্রিপুরারি-অরি শূর সুরথী ত্রিপুরে;

বৃত্র-আদি দৈত্য যত, বিখ্যাত জগতে।

সুন্দ উপসুন্দ দেখ, আনন্দে ভাসিছে

ভ্রাতৃ-প্রেম-নীরে পুনঃ।” সুধিলা সুমতি

রাঘব;— “কেন না হেরি, কহ দয়াময়ি!

কুম্ভকর্ণ, অতিকায়, নরান্তক (রণে

নরান্তক) ইন্দ্রজিৎ আদি রক্ষঃশূরে?”

উত্তরিলা কুহকিনী;— “অন্ত্যেষ্টিব্যতীত

নাহি গতি এ নগরে, হে বৈদেহীপতি!

নগর-বাহিরে দেশ, ভ্রমে তথা প্রাণী,

যতদিন প্রেতক্রিয়া না সাধে বান্ধবে

যতনে;—বিধির বিধি কহিনু তোমারে।

চেয়ে দেখ, বীরবর! আসিছে এ দিকে

সুবীর; অদৃশ্যভাবে থাকিব, নৃমণি!

তব সঙ্গে; মিষ্টালাপ কর রঙ্গে তুমি।”

এতেক কহিয়া মাতা অদৃশ্য হইলা।

সবিস্ময়ে রঘুবর দেখিলা বীরেশে

তেজস্বী; কিরীট চূড়ে খেলে সৌদামিনী,

ঝল ঝলে মহাকাশে, নয়ন ঝলসি,

আভরণ! করে শূল, গজপতিগতি।

অগ্রসরি শূরেশ্বর সম্ভাষি রামেরে,

সুধিলা; “কি হেতু হেথা সশরীরে আজি,

রঘুকুলচূড়ামণি? অন্যায়, সমরে

সংহারিলে মোরে তুমি তুষিতে সুগ্রীবে;

কিন্তু দূর কর ভয়; এ কৃতান্তপুরে

নাহি জানি ক্রোধ মোরা, জিতেন্দ্রিয় সবে।

মানব-জীবন-স্রোতঃ পৃথিবী-মণ্ডলে,

পঙ্কিল, বিমল র’য়ে বহে সে এ দেশে।

আমি বালি।” সলজ্জায় চিনিলা নৃমণি

রথীন্দ্র কিষ্কিন্ধ্যানাথে। কহিলা হাসিয়া

বালি;—“চল মোর সাথে, দাশরথি রথি!

ওই যে উদ্যান, দেব! দেখিছ অদূরে

সুবর্ণ কুসুমময়, বিহারেন সদা

ও বনে জটায়ু-রথী পিতৃসখা তব।

পরম পীরিতি রথী, পাইবেন হেরি

তোমায়! জীবনদান দিলা মহামতি

ধর্মকর্ম্মে—সতী–নারী রাখিতে বিপদে;

অসীম গৌরব তেঁই! চল ত্বরা করি।”

জিজ্ঞাসিলা রক্ষোরিপু;—“কহ কৃপা করি,

হে সুরথি! সমসুখী এ দেশে কি তোমা

সকলে?” “খনির গর্ভে” উত্তরিলা বালি,—

“জনমে সহস্র মণি রাঘব; কিরণে

নহে সমতুল সবে, কহিনু তোমারে;

তবু আভাহীন কেবা, কহ রঘুমণি?

এইরূপে মিষ্টালাপে চলিলা দুজনে।

রম্যবনে বহে যথা পীযূষসলিলা

নদী সদা কলকলে, দেখিলা নৃমণি,

জটায়ু গরুড়পুত্ত্রে, দেবাকৃতি রথী,

দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত, বিবিধ রতনে

খচিত আসনাসীন! উথলে চৌদিকে

বীণাধ্বনি। পদ্মপর্ণবর্ণ বিভারাশি

উজ্জ্বলে সে বনরাজী, চন্দ্রাতপে ভেদি

সৌরকরপুঞ্জ যথা উৎসব আলয়ে!

চিরপরিমলময় সমীর বহিছে

বসন্ত! আদরে বীর কহিলা রাঘবে;—

“জুড়ালে নয়ন আজি, নরকুলমণি

মিত্র পুত্ত্র; ধন্য তুমি! ধরিলা তোমারে

শুভক্ষণে গর্ভ, শুভ, তোমার জননী।

ধন্য দশরথ সখা, জন্মদাতা তব।

দেবকুলপ্রিয় তুমি, তেঁই সে আইলে

সশরীরে এ নগরে। কহ, বৎস! শুনি,

রণ-বার্ত্তা। প’ড়েছে কি সমরে দুর্ম্মতি

রাবণ?” প্রণমি প্রভু কহিলা সুস্বরে;—

“ও পদ-প্রসাদে তাত! তুমুল-সংগ্রামে

বিনাশিনু বহু-রক্ষে; রক্ষঃকুলপতি

রাবণ একাকী বীর এবে রক্ষঃপুরে।

তার শরে হতজীব লক্ষ্মণ-সুমতি

অনুজ; আইল দাস এ দুর্গম দেশে,

শিবের আদেশে আজি। কহ, কৃপা করি,

কহ দাসে কোথা পিতা, সখা তব, রথি?”

কহিলা জটায়ু বলী—পশ্চিম-দুয়ারে

বিরাজেন রাজ-ঋষি রাজ-ঋষিদলে।

নাহি মানা মোর প্রতি ভ্রমিতে সে দেশে;

যাইব তোমার সঙ্গে, চল রিপুদমি।”

বহুবিধ রম্যদেশ দেখিলা সুমতি,

বহু স্বর্ণ-অট্টালিকা; দেবাকৃতি বহু

রথী; সরোবর-কূলে, কুসুমকাননে,

কেলিছে হরষে প্রাণী, মধুকালে যথা

গুঞ্জরে ভ্রমরকুল সুনিকুঞ্জ বনে;

কিম্বা নিশাভাগে যথা খাদ্যোৎ, উজলি

দশদিশ। দ্রুতগতি চলিলা দুজনে।

লক্ষ লক্ষ লক্ষ প্রাণী বেড়িল রাঘবে।

কহিলা জটায়ু-বলী;—“রঘুকুলোদ্ভব

এ সুরথী! সশরীরে শিবের আদেশে,

আইলা এ প্রেতপুরে, দরশন-হেতু

পিতৃপদ; আশীর্ব্বাদি যাহ সবে চলি

নিজস্থানে, প্রাণিদল।” গেলা চলি সবে

আশীর্ব্বাদি। মহানন্দে চলিলা দুজনে।

কোথায় হেমাঙ্গগিরি উঠিছে আকাশে

বৃক্ষচূড়, জটাচূড় যথা জটাধারী

কপর্দ্দী। বহিছে কলে প্রবাহিণী ঝরি।

হীরা, মণি, মুক্তাফল ফলে স্বচ্ছ-জলে।

কোথায় বা নীচ দেশে শোভিছে কুসুমে

শ্যাম-ভূমি; তাহে সরঃ, খচিত কমলে।

নিরন্তর পিকবর কুহরিছে বনে।

বিনতানন্দনাত্মজ কহিলা সম্ভাষি

রাঘবে;— “পশ্চিমদ্বার দেখ রঘুমণি!

হিরণ্ময়; এ সুদেশে হীরক নির্ম্মিত

গৃহাবলী। দেখ চেয়ে, স্বর্ণবৃক্ষমূলে,

মরকতপত্রছত্র দীর্ঘশিরোপরি,

কনক-আসনে বসি দিলীপ-নৃমণি,

সঙ্গে সুদক্ষিণা সাধ্বী। পূজ ভক্তিভাবে

বংশের নিদান তব। বসেন এ দেশে

অগণ্য রাজর্ষিগণ;—ইক্ষ্বাকু, মান্ধাতা,

নহুষ প্রভৃতি সবে বিখ্যাত জগতে।

অগ্রসরি পিতামহে পূজ, মহাবাহো!

অগ্রসরি রথীশ্বর সাষ্টাঙ্গে নমিলা

দম্পতির পদতলে; সুধিলা আশীষি

দিলীপ;—“কে তুমি? কহ, কেমনে আইলা

সশরীরে প্রেতদেশে, দেখাকৃতি রথি?

তব চন্দ্রানন হেরি আনন্দ-সলিলে

ভাসিল হৃদয় মম।” কহিলা সুস্বরে

সুদক্ষিণা;—“হে সুভগ, কহ ত্বরা করি,

কে তুমি? বিদেশে যথা স্বদেশীয় জনে

হেরিলে জুড়ায় আঁখি, তেমনি জুড়াল

আঁখি মম, হেরি তোমা। কোন্ সাধ্বী নারী

শুভক্ষণে গর্ভে তোমা ধরিল, সুমতি?

দেবকুলোদ্ভব যদি, দেবাকৃতি তুমি,

কেন বন্দ আমা দোঁহে? দেব যদি নহ,

কোন্ কুল উজ্জ্বলিলা নরদেবরূপে?”

উত্তরিলা দাশরথি কৃতাঞ্জলিপুটে;—

“ভুবনবিখ্যাত পুত্ত্র রঘুনামে তব

রাজর্ষি! ভুবন যিনি জিনিলা স্ববলে

দিগ্বিজয়ী, অজ নামে তাঁর জনমিলা

তনয়—বসুধাপাল; বরিলা অজেরে

ইন্দুমতি; তাঁর গর্ভে জনম লভিলা

দশরথ মহামতি; তাঁর পাটেশ্বরী

কৌশল্যা; দাসের জন্ম তাঁহার উদরে।

সুমিত্রা-জননীপুত্ত্র লক্ষ্মণ-কেশরী,

শত্রুঘ্ন—শত্রুঘ্নরণে! কৈকেয়ী-জননী

ভরত ভ্রাতারে, প্রভু, ধরিলা গরভে।”

উত্তরিলা রাজ-ঋষি;—“রামচন্দ্র তুমি,

ইক্ষ্বাকুকুলশেখর, আশীষি তোমারে।

নিত্য নিত্য কীর্ত্তি তব ঘোষিবে জগতে,

যতদিন চন্দ্র সূর্য্য উদিবে আকাশে,

কীর্ত্তিমান্! বংশ মম উজ্জ্বল ভূতলে

তব গুণে, গুণিশ্রেষ্ঠ! ওই যে দেখিছ

স্বর্ণগিরি, তার কাছে বিখ্যাত এ পুরে,

অক্ষয় নামেতে বট বৈতরণী-তটে।

বৃক্ষমূলে পিতা তব পূজেন সতত

ধর্ম্মরাজে, তব হেতু; যাও মহাবাহু,

রঘুকুল-অলঙ্কার! তাঁহার সমীপে।

কাতর তোমার দুঃখে দশরথ রথী।”

বন্দি চরণারবিন্দ আনন্দে নৃমণি

বিদায়ি জটায়ু-শূরে, চলিলা একাকী

(অন্তরীক্ষে সঙ্গে মায়া) স্বর্ণগিরি–দেশে

সুরম্য, অক্ষয়-বৃক্ষে হেরিলা সুরথী

বৈতরণী নদীতীরে পীযূষ-সলিলা

এ ভূমে; সুবর্ণ-শাখা, মরকত-পাতা, ·

ফল, হায়, ফলছটা কে পারে বর্ণিতে?

দেবারাধ্য তরুরাজ, মুকতিপ্রদায়ী।

হেরি দূরে পুত্ত্র বরে রাজর্ষি, প্রসারি

বাহুযুগ, (বক্ষঃস্থল আর্দ্র অশ্রুজলে)

কহিলা;—“আইলি কি রে এ দুর্গম দেশে

এতদিনে, প্রাণাধিক, দেবের প্রসাদে,

জুড়াতে এ চক্ষুর্দ্বয়? পাইনু কি আজি

তোরে, হারাধান মোর? হায় রে, কত যে

সহিনু বিহনে তোর, কহিব কেমনে

রামভদ্র? লৌহ যথা গলে অগ্নিতেজে,

তোর শোকে দেহত্যাগ করিনু অকালে।

মুদিনু নয়ন, হায়, হৃদয়-জ্বলনে।

নিদারুণ বিধি, বৎস! মম কর্ম্মদোষে

লিখিলা আয়াস, মরি, তোর ও কপালে,

ধর্ম্মপথগামী তুই। তেঁই সে ঘটিল

এ ঘটনা! তেঁই, হায় দলিলা কৈকেয়ী

জীবন-কানন-শোভা আশালতা মম

মত্তমাতঙ্গিনীরূপে।” বিলাপিলা বলী

দশরথ; দাশরথি কাঁদিলা নীরবে।

কহিলা রাঘবশ্রেষ্ঠ;—“অকূল-সাগরে

ভাসে দাস, তাত, এবে; কে তারে রক্ষিবে

এ বিপদে? এ নগরে বিদিত যদ্যপি

ঘটে যা ভমণ্ডলে, তবে ও চরণে

অবিদিত নহে, কেন অইল এ দেশে

কিঙ্কর! অকালে, হায়, ঘোরতর রণে,

হত প্রিয়ানুজ আজি!— না পাইলে তারে,

আর না ফিরিব, যথা শোভে দিনমণি,

চন্দ্র, তারা। আজ্ঞা দেহ এখনি মরিব,

হে তাত, চরণতলে। না পারি ধরিতে

তাহার বিরহে প্রাণ।” কাঁদিলা নৃমণি

পিতৃপদে; পুত্ত্রদুঃখে কাতর, কহিলা

দশরথ -“জানি আমি কি কারণে তুমি

আইলে এ পুরে, পুত্ত্র! সদা আমি পূজি

ধর্ম্মরাজে, জলাঞ্জলি দিয়া সুখভোগে,

তোমার মঙ্গলহেতু। পাইবে লক্ষ্মণে,

সুলক্ষণ! প্রাণ তার এখনও দেহে

বদ্ধ, ভগ্ন-কারাগারে বদ্ধ বন্দী যথা।

সুগন্ধমাদন গিরি, তার শৃঙ্গদেশে

ফলে মহৌষধ, বৎস! বিশল্যকরণী,

হেমলতা; আনি তাহা বাঁচাও অনুজে।

আপনি প্রসন্নভাবে যমরাজ আজি

দিলা এ উপায় কহি। অনুচর তব

আশুগতি পুত্ত্র হনূ, আশুগতি-গতি;

প্রের তারে; মুহূর্ত্তেকে আনিবে ঔষধে

ভীম-পরাক্রম বলী প্রভঞ্জন-সম।

নাশিবে সমরে তুমি বিষম-সংগ্রামে

রাবণে; সবংশে নষ্ট হবে দুষ্টমতি

তব শরে; রঘুকুললক্ষ্মী পুত্ত্রবধূ,

রঘুগৃহ পুনঃ মাতা ফিরি উজ্জ্বলিবে,—

কিন্তু সুখভোগ ভাগ্যে নাহি, বৎস! তব।

পুড়ি ধূপদানে, হায়, গন্ধরস যথা

সুগন্ধে আমোদে দেশ, বহুক্লেশ সহি,

পূরিবে ভারত-ভূমি, যশস্বি! সুযশে।

মম পাপহেতু বিধি দণ্ডিলা তোমারে;—

স্ব-পাপে মরিনু আমি তোমার বিচ্ছেদে।

“অর্দ্ধগত নিশামাত্র এবে ভূমণ্ডলে

দেববলে বলী তুমি; যাও শীঘ্র ফিরি

লঙ্কাধামে; প্রের ত্বরা বীর হনূমানে;

আনি মহৌষধ, বৎস! বাঁচাও অনুজে;

রজনী থাকিতে যেন আনে সে ঔষধে!”

আশীষিলা, দশরথ দাশরথি-শূরে।

পিতৃ-পদধূলি পুত্ত্র লইবার আশে,

অর্পিলা চরণপদ্মে করপদ্ম; বৃথা!

নারিল স্পর্শিতে পদ। কহিলা সুস্বরে

রঘুজ-অজ-অঙ্গজ দশরথাত্মজে;—

“নহে ভূতপূর্ব্ব দেহ, এবে যা দেখিছ,

প্রাণাধিক! ছায়ামাত্র! কেমনে ছুঁইবে

এ ছায়া, শরীরী তুমি? দর্পণে যেমতি

প্রতিবিম্ব, কিম্বা জলে, এ শরীর মম।—

অবিলম্বে, প্রিয়তম! যাও লঙ্কাধামে।”

প্রণমি বিস্ময়ে পদে চলিলা সুমতি,

সঙ্গে মায়া! কতক্ষণে উতরিলা বলী

যথায় পতিত ক্ষেত্রে লক্ষ্মণ সুরথী;

চারিদিকে বীরবৃন্দ নিদ্রাহীন শোকে।

ইতি শ্রীমেঘনাদবধ কাব্যে প্রেতপুরী নাম অষ্টমঃ সর্গঃ।

অষ্টম সর্গ।

তমোহা—the destructor or dissipator of dark ness. মিহির—the sun.

গৈরিক—red chalk. The blood of Lakshmana has the colour of the red chalk.

প্রস্রবণ—trickling water. The tears of Rama are the trickling water on the hill-side.

পৌলস্ত্যেয়—Ravana the son of পুলস্ত।

সরস—সরস করিয়া থাক, make juicy.

এ প্রসূন—i.e. Lakshmana who is like a flower.

উচ্ছ্বাসিলা—sighed. উৎসঙ্গ—lap.

সঘনে—frequently. রাজদণ্ড—sceptre.

খমুখে—আকাশ মুখে, আকাশে; towards the sky.

সিন্ধুতীর্থজলে—in the holy water of the sea.

পরিখা—ditch. পাবকরাশি—mass of fire.

বাতগর্ভ—having winds within them (clouds).

পিনাক—is the bow of Siva. ইষু—arrow.

কামরূপী—one who can assume any form at will. পুলিন—bank, shore.

প্রবেশি—one who enters.

উদরপরতা—gluttony; greediness.

প্রমত্তত্ব—drunkenness. শুভ্রজলরয়রূপে—like a current or flow of white water.

তৃষ্ণা—thirst is an attendant of cholera.

অঙ্গগ্রহ—spasms of the limbs are also the companions, as it were, of cholera.

উন্মত্তা—a mad woman.

বিভ্রমবিলাস—coquetry and wantonness, বিভ্রম and বিলাস mean the same thing.

কামী—one possessed with a carnal desire.

কামাতুরা—one afflicted with carnality.

রণে—রণকরে; fights. সূতবেশে—like a charioteer.

আত্মকুল—the numbers of souls. জীবে—live

আত্মদেশে—in the land of the souls.

শূন্যদেশভবা বাণী—words issuing from the sky; আকাশবাণী, দৈববাণী।

সুবিধি বিধির বিধি—the laws of the God are good. নিবে—is extinguished.

আত্মহা―one who commits suicide.

গ্রহে—গ্রহণ করে; takes.

পরে—in the after life; in the life beyond.

কলুষকুহকে—the illusions of vices.

রণে—যুদ্ধ করে; fights.

আবরেন—protects; covers; shields.

কান্তার—inaccessible forest.

রোগিহাস্য যথা—as there is no lustre in the smiles of a patient, so there was no lustre in the rays coming through the leaves.

তোষ—তুষ্টকর; satisfy; gratify.

রসনা-জনিত-ধ্বনি—sound born from the tongue, i.e. the sound of a human being.

এ শাস্তির হেতু—the cause of this punishment. খর—is the name of a Rakshasa. খর and দূষণ are compared to snakes devoid of fangs and Rama is compared to a mongoose.

বৈদেহীহৃদয়-কমলরবি—Rama who is, as it were, the sun in relation to the lotus of the heart of Sita.

কিড়িছে—is tearing away or uprooting.

নির্দ্দয় শকুনি মৃতজীব-আঁখি যথা—as the merciless vulture draws out the eyes of the dead. রক্তাক্ত—blood-stained.

সূক্ষ্ম স্বর্ণসূতার কাঁচলী—a covering for the breast, made of fine gold threads.

কুচরুচি—the beauty of the female breasts.

গুরু ঊরু—great thighs; plump thighs.

রম্ভা-কান্তি—the beauty of a banana fruit. The beauty of the thighs is often compared to that of a banana fruit.

উলঙ্গ বরাঙ্গ—naked, beautiful limbs.

মানসের জলে—in the water of the Manasa. sarowar.

কিম্বা, রতি! মনমথ-মনোরথ তব—or, O goddess, as beautiful as Manmatha, the object of your desire.

তপ্তশ্বাসে উড়ি...... আশু আবরিল—the heated breaths of the women maddened with desire blew away the pollens of the flowers of garlands. These pollens darkened the good sense of the men and women, as dusts darken the sun. These pollens made them mad with carnal desires.

কি মানসে ......নয়নে—the eyes of the males told the eyes of the females with what object in view they entered into the woods.

সঙ্গম—cohabitation. মনোরথ—object in view.

মনোরথ বৃথা দুই দলে—the punishment of these males and females consists in the fact that each of the parties is unable to gratify the carnal desire of the other. Both the parties are beautiful and charming to look at. Their beauty excites their carnality. But, alas, they are impotent to satisfy the desire.

মরুভূমে—i.e. on the earth.

ভোগে বহু—suffers much.

নরকাগ্রে—before they come to hell.

যৌবনে অন্যায়......কাঙ্গালী—the excesses in the youth make a person impotent in an advanced age.

অনির্ব্বেয়—that cannot be extinguished or satisfied. কামধুক—Heaven, which satisfies all good desires.

কামলতা—a creeper which gives fruits at any time at pleasure. বন্ধ্য—barren.

তড়াগ—Lake.

মহোরগবৃন্দ—numbers of big snakes.

অশেষ-শরীরী——having a limitless body.

শেষ—Ananta; Basuki.

ভীষণদশন—having fierce teeth.

কে কবে লভয়ে—who ever gains.

কাণ্ডারী—boatman.

দিয়া পাড়ী—crossing. জলারণো—watery forest; a wilderness of water.

কুসুমবনজনিত পরিমলসখা সমীর—the air, companion of fragrance, proceeding from a flower garden.

নবকুবলয়ধাম—numbers of blue water lilies.

রঙ্গভূমি—an arena; a battle-field.

তুরঙ্গমদমী—controlling a horse.

ত্রিপুরারি-অরি ত্রিপুরে—রুদ্রশত্রু ত্রিপুর দৈত্যকে।

আন্ত্যেষ্টি—funeral ceremony.

বয়—current, flow.

পীযূষসলিলা—full of water like Ambrosia.

চন্দ্রাতপ—a canopy.

সৌরকরপুঞ্জ—mass of the rays of the sun.

জটাচূড়—having knotted hair on the head.

কলে—with a murmurring sound.

খচিত—adorned.

মরকতপত্রছত্র—having an umbrella of the emerald leaves (of the tree.)

শত্রুঘ্নরণে—killing the enemy in battle.

এ ভূমে—in this land.

মরকত-পাতা—emerald leaves.

মুকতিপ্রদায়ী—giving salvation.

আশুগতি-পুত্ত্র—the son of Pavana.

আশুগতি—one who has a swift course, i.e. the god, Pavana.

আশুগতি-গতি—having the speed of the wind.

গন্ধরস—myrrh.

চতুর্থ সর্গ

চতুর্থ সর্গ

নমি আমি, কবি-গুরু, তব পদাম্বুজে,

বাল্মীকি! হে ভারতের শিরঃচূড়ামণি,

তব অনুগামী দাস, রাজেন্দ্র-সঙ্গমে

দীন যথা যায় দূর তীর্থ-দরশনে!

তব পদচিহ্ন ধ্যান করি দিবানিশি,

পশিয়াছে কত যাত্রী যশের মন্দিরে,

দমনিয়া ভব-দম দুরন্ত শমনে—

অমর! শ্রীভর্ত্তৃহরি; সুরী ভবভূতি

শ্রীকণ্ঠ; ভারতে খ্যাত বরপুত্ত্র যিনি

ভারতীর, কালিদাস—সুমধুরভাষী;

মুরারি-মুরলীধ্বনি-সদৃশ মুরারি

মনোহর; কীর্ত্তিবাস কীর্ত্তিবাস কবি,

এ বঙ্গের অলঙ্কার! হে পিতঃ, কেমনে,

কবিতা-রসের সরে রাজহংস-কুলে

মিলি করি কেলি আমি, না শিখালে তুমি?

গাঁথিব নূতন মালা, তুলি সযতনে

তব কাব্যোদ্যানে ফুল; ইচ্ছা সাজাইতে

বিবিধ ভূষণে ভাষা; কিন্তু কোথা পাব

(দীন আমি!) রত্নরাজী, তুমি নাহি দিলে,

রত্নাকর? কৃপা, প্রভু, কর অকিঞ্চনে।

ভাসিছে কনক-লঙ্কা আনন্দের নীরে,

সুবর্ণ-দীপ-মালিনী, রাজেন্দ্রাণী যথা

রত্নহারা! ঘরে ঘরে বাজিছে বাজনা;

নাচিছে নর্ত্তকী-বৃন্দ, গাইছে সুতানে

গায়ক; নায়কে লয়ে কেলিছে নায়কী,

খল খল খল হাসি মধুর অধরে!

কেহ বা সুরতে রত, কেহ শীধু পানে।

দ্বারে দ্বারে ঝোলে মালা গাঁথা ফল-ফুলে;

গৃহাগ্রে উড়িছে ধ্বজ; বাতায়নে বাতি;

জনস্রোতঃ রাজপথে বহিছে কল্লোলে,

যথা মহোৎসবে, যবে মাতে পুরবাসী।

রাশি রাশি পুষ্প-বৃষ্টি হইছে চৌদিকে—

সৌরভে পূরিয়া পুরী। জাগে লঙ্কা আজি

নিশীথে, ফিরেন নিদ্রা দুয়ারে দুয়ারে,

কেহ নাহি সাধে তাঁরে পশিতে আলয়ে,

বিরাম বর প্রার্থনে!—“মারিবে বীরেন্দ্র

ইন্দ্রজিৎ, কালি রামে; মারিবে লক্ষ্মণে;

সিংহনাদে খেদাইবে শৃগাল-সদৃশ

বৈরি-দলে সিন্ধুপারে; আনিবে বাঁধিয়া

বিভীষণে; পলাইবে ছাড়িয়া চাঁদেরে

রাহু; জগতের আঁখি জুড়াবে দেখিয়া

পুনঃ সে সুধাংশু-ধনে;” আশা মায়াবিনী,

পথে, ঘাটে, ঘরে, দ্বারে, কাননে,

গাইছে গো এই গীত আজি রক্ষঃপুরে—

কেননা ভাসিবে রক্ষঃ আহ্লাদ-সলিলে?

একাকিনী শোকাকুলা, অশোক কাননে,

কাঁদেন রাঘব-বাঞ্ছা, আঁধার-কুটীরে

নীরবে! দুরন্ত চেড়ী, সতীরে ছাড়িয়া,

ফেরে দুরে মত্ত সবে উৎসব-কৌতুকে—

হীন-প্রাণা হরিণীরে রাখিয়া বাঘিনী

নির্ভয়-হৃদয়ে যথা ফেরে দূর বনে!

মলিন বদনা দেবী, হায় রে, যেমতি

খনির তিমির-গর্ভে (না পারে পশিতে

সৌর-কর-রাশি যথা।) সূর্য্যকান্ত মণি;

কিম্বা বিম্বাধরা রমা অম্বুরাশি তলে।

স্বনিছে পবন, দূরে রহিয়া রহিয়া,

উচ্ছ্বাসে বিলাপী যথা। নড়িছে বিষাদে

মর্ম্মরিয়া পাতাকুল। বসেছে অরবে

শাখে পাখী। রাশি রাশি কুসুম পড়েছে

তরুমূলে; যেন তরু, তাপি মনস্তাপে,

ফেলিয়াছে খুলি সাজ! দূরে প্রবাহিণী,

উচ্চ-বীচি-রবে কাঁদি, চলিছে সাগরে,

কহিতে বারিশে যেন এ দুঃখ-কাহিনী!

না পশে সুধাংশু-অংশু সে ঘোর বিপিনে;

ফোটে কি কমল কভু সমল-সলিলে?

তবুও উজ্জ্বল বন ও অপূর্ব্ব-রূপে!

একাকিনী বসি দেবী, প্রভা-আভাময়ী

তমোময় ধামে যেন! হেন কালে তথা,

সরমাসুন্দরী আসি, বসিলা কাঁদিয়া

সতীর চরণ-তলে; সরমা-সুন্দরী—

রক্ষঃকুল-রাজলক্ষ্মী রক্ষোবধূ-বেশে!

কতক্ষণে চক্ষুজল মুছি সুলোচনা

কহিলা মধুর স্বরে;—“দুরন্ত-চেড়ীরা,

তোমারে ছাড়িয়া, দেবি, ফিরিছে নগরে,

মহোৎসবে রত সবে আজি নিশাকালে;

এই কথা শুনি আমি আইনু পূজিতে

পা-দুখানি! আনিয়াছি কৌটায় ভরিয়া

সিন্দুর; করিলে আজ্ঞা, সুন্দর ললাটে

দিব ফোঁটা। এয়ো তুমি, তোমার কি সাজে

এ বেশ? নিষ্ঠুর, হায়, দুষ্ট লঙ্কাপতি!

কে ছেঁড়ে পদ্মের পর্ণ? কেমনে হরিল

ও বরাঙ্গ-অলঙ্কার, বুঝিতে না পারি!”

কৌটা খুলি, রক্ষোবধূ যত্নে দিলা ফোঁটা

সীমন্তে! সিন্দুর বিন্দু শোভিল ললাটে,

গোধুলি-ললাটে, আহা! তারা-রত্ন যথা।

দিয়া ফোঁটা, পদধূলি লইলা সরমা।

“ক্ষম লক্ষ্মি! ছুঁইনু ও দেব-আকাঙ্ক্ষিত

তনু; কিন্তু চিরদাসী দাসী ও চরণে!”

এতেক কহিয়া পুনঃ বসিলা যুবতী

পদতলে; আহা মরি, সুবর্ণ-দেউটী

তুলসীর মূলে যেন জ্বলিল, উজলি

দশ দিশ। মৃদুস্বরে কহিলা মৈথিলী;—

“বৃথা গঞ্জ দশাননে তুমি, বিধুমুখি!

আপনি খুলিয়া আমি ফেলাইনু দূরে

আভরণ, যবে পাপী আমারে ধরিল

বনাশ্রমে। ছড়াইনু পথে সে সকলে,

চিহ্নহেতু। সেই সেতু আনিয়াছে হেথা—

এ কনক-লঙ্কাপুরে—ধীর রঘুনাথে।

মণি, মুক্তা, রতন, কি আছে লো জগতে,

যাহে নাহি অবহেলি লভিতে সে ধনে?”

কহিলা সরমা; “দেবি! শুনিয়াছে দাসী

তব স্বয়ম্বর কথা তব সুধা-মুখে;

কেন বা আইলা বনে রঘুকুল-মণি।

কহ এবে দয়া করি, কেমনে হরিল

তোমারে রক্ষেন্দ্র, সতি! এই ভিক্ষা করি,—

দাসীর এ তৃষা তোষ সুধা-বরিষণে।

দূরে দুষ্ট চেড়ীদল; এই অবসরে

কহ মোরে বিবরিয়া, শুনি সে কাহিনী।

কি ছলে ছলিল রামে, ঠাকুর-লক্ষ্মণে

এ চোর? কি মায়াবলে রাঘবের ঘরে

প্রবেশি, করিল চুরি—হেন রতনে?”

যথা গোমুখীর মুখ হইতে সুস্বনে

ঝরে পূত বারিধারা, কহিলা জানকী,

মধুরভাষিণী সতী, আদরে সম্ভাষি

সরমারে;—“হিতৈষিণী সীতার পরমা

তুমি, সখি! পূর্ব্বকথা শুনিবারে যদি

ইচ্ছা তব, কহি আমি, শুন মন দিয়া;—

“ছিনু মোরা, সুলোচনে! গোদাবরী-তীরে,

কপোত-কপোতী যথা উচ্চ-বৃক্ষ-চূড়ে

বাঁধি নীড় থাকে সুখে! ছিনু ঘোর বনে,

নাম পঞ্চবটী; মর্ত্ত্যে সুর-বন সম।

সদা করিতেন সেবা লক্ষ্মণ সুমতি।

দণ্ডক ভাণ্ডার যার, ভাবি দেখ মনে,

কিসের অভাব তার? যোগাতেন আনি

নিত্য ফল-মূল বীর-সৌমিত্রি; মৃগয়া

করিতেন কভু প্রভু; কিন্তু জীবনাশে

সতত বিরত, সখি, রাঘবেন্দ্র বলী,—

দয়ার সাগর নাথ, বিদিত জগতে।

“ভুলিনু পূর্ব্বের সুখ; রাজার নন্দিনী,

রঘুকুলবধূ আমি; কিন্তু এ কাননে,

পাইনু, সরমা সই, পরম পিরীতি!

কুটীরের চারিদিকে কত যে ফুটিত

ফুলকুল নিত্য নিত্য, কহিব কেমনে?

পঞ্চবটী-বনচর মধু নিরবধি!

জাগা’ত প্রভাতে মোরে, কুহরি সুস্বরে

পিকরাজ! কোন্ রাণী, কহ, শশিমুখি!

হেন চিত্ত-বিনোদন বৈতালিক-গীতে

খোলে আঁখি? শিখীসহ, শিখিনী সুখিনী

নাচিত দুয়ারে মোর। নর্ত্তক-নর্ত্তকী,

এ দোঁহার সম, রামা, আছে কি জগতে?

অতিথি আসিত নিত্য করভ, করভী,

মৃগশিশু, বিহঙ্গম, স্বর্ণ-অঙ্গ কেহ,

কেহ শুভ্র, কেহ কাল, কেহ বা চিত্রিত,

যথা বাসবের ধনু ঘনবর-শিরে;

অহিংসক জীব যত। সেবিতাম সবে

মহাদরে, পালিতাম পরম যতনে,

মরুভূমে স্রোতস্বতী তৃষাতুরে যথা,

আপনি সুজলবতী বারিদ-প্রসাদে।

সরসী আরসী মোর! তুলি কুবলয়ে,

(অতুল রতনসম) পরিতাম কেশে;

সাজিতাম ফুলসাজে; হাসিতেন প্রভু,

বনদেবী বলি মোরে সম্ভাষি কৌতুকে।

হায়, সখি, আর কি লো পাব প্রাণনাথে?

আর কি এ পোড়া আঁখি এ ছার জনমে

দেখিবে সে পা-দুখানি—আশার সরসে

রাজীব, নয়ন-মণি? হে দারুণ-বিধি!

কি পাপে পাপী এ দাসী তোমার সমীপে?”

এতেক কহিয়া দেবী কাঁদিলা নীরবে!

কাঁদিলা সরমা-সতী তিতি অশ্রুনীরে।

কতক্ষণে চক্ষু-জল মুছি রক্ষোবধূ

সরমা, কহিলা সতী সীতার চরণে;—

“স্মরিলে পূর্ব্বের কথা ব্যথা মনে যদি

পাও, দেবি, থাক্ তবে; কি কাজ স্মরিয়া?—

হেরি তব অশ্রুবারি ইচ্ছি মরিবারে!”

উত্তরিলা প্রিয়ম্বদা (কাদম্বা যেমতি

মধু-স্বরা)—“এ অভাগী, হায় লো সুভগে!

যদি না কাঁদিবে, তবে কে আর কাঁদিবে

এ জগতে? কহি, শুন, পূর্ব্বের কাহিনী।

বরিষার কালে, সখি, প্লাবন-পীড়নে

কাতর প্রবাহ, ঢালে, তীর অতিক্রমি,

বারিরাশি দুই পাশে; তেমতি যে মনঃ

দুঃখিত, দুঃখের কথা কহে সে অপরে।

তেঁই আমি কহি, তুমি শুন লো সরমে!

কে আছে সীতার আর এ অররু-পুরে?

“পঞ্চবটী বনে মোরা গোদাবরী-তটে

ছিনু সুখে। হায়, সখি, কেমনে বর্ণিব

সে কান্তার-কান্তি আমি? সতত স্বপনে

শুনিতাম বন-বীণা বন-দেবী-করে;

সৌরকর রাশি-বেশে সুরবালা-কেলি

পদ্মবনে; কভু সাধ্বী-ঋষিবংশবধূ

সুহাসিনী, আসিতেন দাসীর কুটীরে,

সুধাংশুর অংশু যেন অন্ধকার ধামে।

অজিন (রঞ্জিত, আহা, কত শত রঙে!)

পাতি বসিতাম কভু দীর্ঘ তরু-মূলে,

সখী ভাবে সম্ভাষিয়া ছায়ায়; কভু বা

কুরঙ্গিণী-সঙ্গে রঙ্গে নাচিতাম বনে;

গাইতাম গীত, শুনি কোকিলের ধ্বনি।

নব-লতিকার, সতি, দিতাম বিবাহ

তরুসহ; চুম্বিতাম, মঞ্জরিত যবে

দম্পতি, মঞ্জরীবৃন্দে, আনন্দে সম্ভাষি

নাতিনী বলিয়া সবে! গুঞ্জরিলে অলি,

নাতিনী-জামাই বলি বরিতাম তারে।

কভু বা প্রভুর সহ ভ্রমিতাম সুখে

নদীতটে; দেখিতাম তরল-সলিলে

নূতন গগন যেন, নব তারাবলী,

নব নিশাকান্ত-কান্তি! কভু বা উঠিয়া

পর্ব্বত-উপরে, সখি, বসিতাম আমি

নাথের চরণ তলে, ব্রততী যেমতি

বিশাল রসাল-মূলে; কত যে আদরে

তুষিতেন প্রভু মোরে, বরষি বচন-

সুধা, হায়, কব কারে? কর বা কেমনে?

শুনেছি কৈলাসপুরে কৈলাস-নিবাসী

ব্যোমকেশ, স্বর্ণাসনে বসি গৌরী-সনে,

আগম, পুরাণ, বেদ, পঞ্চতন্ত্র কথা

পঞ্চমুখে পঞ্চমুখ কহেন উমারে;

শুনিতাম সেইরূপে আমিও, রূপসি,

নানা কথা! এখনও এ বিজন বনে,

ভাবি, আমি শুনি যেন সে মধুর বাণী!

সাঙ্গ কি দাসীর পক্ষে, হে নিষ্ঠুর বিধি!

সে সঙ্গীত?” নীরবিলা আয়ত-লোচনা

বিষাদে। কহিলা তবে সরমা সুন্দরী;—

“শুনিলে তোমার কথা, রাঘব-রমণি,

ঘৃণা জন্মে রাজ-ভোগে! ইচ্ছা করে, ত্যজি

রাজ্যসুখ, যাই চলি হেন বনবাসে!

কিন্তু ভেবে দেখি যদি, ভয় হয় মনে।

রবিকর যবে, দেবি, পশে বনস্থলে

তমোময়, নিজগুণে আলো করে বনে

সে কিরণ; নিশি যবে যায় কোন দেশে,

মলিন বদন সবে তার সমাগমে!

যথা পদার্পণ তুমি কর, মধুমতি!

কেন না হইবে সুখী সর্ব্বজন তথা,

জগৎ-আনন্দ তুমি, ভুবনমোহিনী!

কহ দেবি, কি কৌশলে হরিল তোমারে

রক্ষঃপতি? শুনিয়াছে বীণা-ধ্বনি দাসী,

পিকবর-রব নব-পল্লব-মাঝারে

সরস মধুর মাসে; কিন্তু নাহি শুনি

হেন মধুমাখা কথা কভু এ জগতে!

দেখ চেয়ে, নীলাম্বরে শশী, যাঁর আভা

মলিন তোমার রূপে, পিইছেন হাসি

তব বাক্য-সুধা, দেবি, দেব-সুধানিধি!

নীরব কোকিল এবে আর পাখী যত,

শুনিবারে ও কাহিনী, কহিনু তোমারে।

এ সবার সাধ, সাধ্বি, মিটাও কহিয়া।”

কহিলা রাঘর-প্রিয়া;—“এইরূপে সখি,

কাটাইনু কত কাল পঞ্চবটী বনে

সুখে। ননদিনী তব, দুষ্টা শূর্পণখা,

বিষম জঞ্জাল আসি ঘটাইল শেষে!

শরমে, সরমা সই, মরি লো স্মরিলে

তার কথা। ধিক্‌ তারে! নারী কুল-কালি।

চাহিল, মারিয়া মোরে, বরিতে বাঘিনী,

রঘুবরে। ঘোর রোষে সৌমিত্রি-কেশরী

খেদাইলা দূরে তারে, আইল ধাইয়া

রাক্ষস, তুমুল রণ বাজিল কাননে।

সভয়ে পশিনু আমি কুটীর-মাঝারে।

কোদণ্ড-টঙ্কারে, সখি, কত যে কাঁদিনু,

কব কারে? মুদি আঁখি, কৃতাঞ্জলি-পুটে

ডাকি দেবতাকুলে রক্ষিতে রাঘবে!

আর্ত্তনাদ, সিংহনাদ উঠিল গগনে।

অজ্ঞান হইয়া আমি পড়িনু ভূতলে।

“কতক্ষণ এ দশায় ছিনু যে স্বজনি,

নাহি জানি; জাগাইলা পরশি দাসীরে

রঘুশ্রেষ্ঠ। মৃদুস্বরে (হায় লো, যেমতি

স্বনে মন্দ সমীরণ কুসুমকাননে

বসন্তে!) কহিলা কান্ত,—‘উঠ, প্রাণেশ্বরি,

রঘুনন্দনের ধন! রঘুরাজ-গৃহ-

আনন্দ! এই কি শয্যা সাজে হে তোমারে

হেমাঙ্গি!’ সরমা সখি, আর কি শুনিব

সে মধুর ধ্বনি আমি?” সহসা পড়িলা

মূর্চ্ছিত হইয়া সতী; ধরিলা সরমা।

যথা যবে ঘোর-বনে নিষাদ, শুনিয়া

পাখীর ললিত গীত বৃক্ষশাখে, হানে

স্বর লক্ষ্য করি শর; বিষম আঘাতে

ছটফটি পড়ে ভূমে বিহঙ্গী, তেমতি

সহসা পড়িলা সতী সরমার কোলে!

কতক্ষণে চেতন পাইলা সুলোচনা।

কহিলা সরমা কাঁদি;—“ক্ষম দোষ মম,

মৈথিলি! এ ক্লেশ আজি দিনু অকারণে,

হায়, জ্ঞানহীন আমি!” উত্তর করিলা

মৃদুস্বরে সুকেশিনী রাঘব-বাসনা;—

“কি দোষ, তোমার, সখি! শুন মন দিয়া,

কহি পুনঃ পূর্ব্ব-কথা। মারীচ কি ছলে

(মরুভূমে মরীচিকা ছলয়ে যেমতি!)

ছলিল, শুনেছ তুমি শূর্পণখা-মুখে।

হায় লো, কুলগ্নে, সখি, মগ্ন লোভ-মদে,

মাগিনু কুরঙ্গে আমি। ধনুর্ব্বাণ ধরি,

বাহিরিলা রঘুপতি, দেবর লক্ষ্মণে

রক্ষাহেতু রাখি ঘরে! বিদ্যুৎ-আকৃতি

পলাইল মায়া-মৃগ, কানন উজলি,

বারণারি-গতি নাথ ধাইলা পশ্চাতে—

হারানু নয়ন-তারা আমি অভাগিনী!

“সহসা শুনিনু, সখি, আর্ত্তনাদ দূরে—

‘কোথা রে লক্ষ্মণ ভাই, এ বিপত্তিকালে?

মরি আমি!’ চমকিলা সৌমিত্রি-কেশরী।

চমকি ধরিয়া হাত, করিনু মিনতি;—

‘যাও বীর বায়ুগতি পশ এ কাননে;

দেখ, কে ডাকিছে তোমা? কাঁদিয়া উঠিল

শুনি এ নিনাদ, প্রাণ! যাও ত্বরা করি—

বুঝি রঘুনাথ তোমা ডাকিছেন, রথি!’

কহিলা সৌমিত্রি; ‘দেবি! কেমনে পালিব

আজ্ঞা তব? একাকিনী কেমনে রহিবে

এ বিজন বনে তুমি? কত যে মায়াবী

রাক্ষস ভ্রমিছে হেথা, কে পারে কহিতে?

কাহারে ডরাও তুমি, কে পারে হিংসিতে

রঘুবংশ-অবতংসে এ তিন ভুবনে,

ভৃগুরাম-গুরু বলে?’—আবার শুনিনু

অর্ত্তনাদ;—‘মরি আমি! এ বিপত্তিকালে

কোথা রে লক্ষ্মণ ভাই? কোথায় জানকি?’

ধৈরয ধরিতে আর নারিনু, স্বজনি!

ছাড়ি লক্ষ্মণের হাত, কহিনু কুক্ষণে;—

‘সুমিত্রা শাশুড়ী মোর বড় দয়াবতী;

কে বলে ধরিয়াছিলা গর্ভে তিনি তোরে,

নিষ্ঠুর? পাষাণ দিয়া গড়িলা বিধাতা

হিয়া তোর! ঘোর বনে নির্দ্দয় বাঘিনী

জন্ম দিয়া পালে তোরে, বুঝিনু, দুর্ম্মতি!

রে ভীরু, রে বীর-কুলগ্লানি, যাব আমি,

দেখিব করুণ-স্বরে কে স্মরে আমারে

দূর-বনে?’—ক্রোধভরে আরক্ত-নয়নে

বীরমণি, ধরি ধনু, বাঁধিয়া নিমিষে

পৃষ্ঠে তূণ, মোর পানে চাহিয়া কহিলা;—

‘মাতৃ-সম মানি তোমা, জনকনন্দিনি!

মাতৃ-সম! তেঁই সহি এ বৃথা গঞ্জনা।

যাই আমি; গৃহমধ্যে থাক সাবধানে।

কে জানে কি ঘটে আজি? নহে দোষ মম;

তোমার আদেশে আমি ছাড়িনু তোমারে।’

এতেক কহিয়া শূর পশিলা কাননে।

“কত যে ভাবিনু আমি বসিয়া বিরলে,

প্রিয়সখি, কহিব তা, কি আর তোমারে?

বাড়িতে লাগিল বেলা; আহ্লাদে নিনাদি,

কুরঙ্গ, বিহঙ্গ আদি মৃগশিশু যত,

সদাব্রত-ফলাহারী, করভ করভী

আসি উতরিলা সবে। তা সবার মাঝে

চমকি দেখিনু যোগী, বৈশ্বানর-সম

তেজস্বী, বিভূতি অঙ্গে, কমণ্ডলু করে,

শিরে জটা। হায়, সখি, জানিতাম যদি

ফুলরাশি মাঝে দুষ্ট কালসর্প-বেশে,

বিমল সলিলে বিষ, তা হ’লে কি কভু

ভূমে লুটাইয়া শিরঃ নমিতাম তারে?

কহিল মায়াবী;—‘ভিক্ষা দেহ, রঘুবধূ!

(অন্নদা এ বনে তুমি!) ক্ষুধার্ত্ত অতিথে!’

“আবরি বদন আমি ঘোমটায়, সখি!

করপুটে কহিনু;—অজিনাসনে বসি,

বিশ্রাম লভুন প্রভু তরুমূলে; অতি

ত্বরায় আসিবে ফিরি রাঘবেন্দ্র যিনি,

সৌমিত্রি ভ্রাতার সহ। কহিল দুর্ম্মতি;—

(প্রতারিত রোষ আমি নারিনু বুঝিতে)

‘ক্ষুধার্ত্ত অতিথি আমি, কহিনু তোমারে।

দেহ ভিক্ষা; নহে কহ, যাই অন্য স্থলে।

অতিথি-সেবায় তুমি বিরত কি আজি,

জানকি! রঘুর বংশে চাহ কি ঢালিতে

এ কলঙ্ক কালি, তুমি, রঘু-বধূ! কহ,

কি গৌরবে অবহেলা কর ব্রহ্মশাপে?

দেহ ভিক্ষা; শাপ দিয়া নহে যাই চলি।

দুরন্ত রাক্ষস এবে সীতাকান্ত-অরি—

মোর শাপে।’—লজ্জা ত্যজি, হায় লো স্বজনি,

ভিক্ষা-দ্রব্য লয়ে আমি বাহিরিনু ভয়ে,—

না বুঝে পা দিনু ফাঁদে; অমনি ধরিল

হাসিয়া ভাসুর তব আমায় তখনি।

“একদা, বিধুবদনে, রাঘবের সাথে

ভ্রমিতেছিনু কাননে; দূর গুল্ম-পাশে

চরিতেছিল হরিণী। সহসা শুনিনু

ঘোর-নাদ; ভয়াকুলা দেখিনু চাহিয়া

ইরম্মদাকৃতি বাঘ ধরিল মৃগীরে!

‘রক্ষ, নাথ,’ বলি আমি পড়িনু চরণে।

শরানলে শূরশ্রেষ্ঠ ভস্মিলা শার্দ্দূলে,

মুহূর্ত্তে। যতনে তুলি বাঁচাইনু আমি

বন-সুন্দরীরে সখি! রক্ষঃকুল-পতি,

সেই শার্দ্দূলের রূপে, ধরিল আমারে!

কিন্তু কেহ না আইল বাঁচাইতে, ধনি!

এ অভাগী-হরিণীরে এ বিপত্তি-কালে!

পূরিনু কানন আমি হাহাকার রবে।

শুনিনু ক্রন্দন-ধ্বনি; বনদেবী বুঝি,

দাসীর দশায় মাতা কাতরা, কাঁদিলা!

কিন্তু বৃথা সে ক্রন্দন! হুতাশন তেজে

গলে লৌহ; বারি-ধারা দমে কি তাহারে?

অশ্রুবিন্দু মানে কি লো কঠিন যে হিয়া?

“দূরে গেল জটাজূট; কমণ্ডলু দূরে!

রাজরথি-বেশে মূঢ় আমায় তুলিল

স্বর্ণ-রথে। কহিল যে কত দুষ্টমতি,

কভু রোষে গর্জ্জি, কভু সুমধুর স্বরে,

‘স্মরিলে, শরমে ইচ্ছি মরিতে, সরমা!

“চালাইল রথ রথী। কালসর্প-মুখে

কাঁদে যথা ভেকী, আমি কাঁদিনু, সুভগে,

বৃথা। স্বর্ণ-রথচক্র, ঘর্ঘরি নির্ঘোষে,

পূরিল কানন-রাজী, হায়, ডুবাইয়া

অভাগীর আর্ত্তনাদ! প্রভঞ্জন-বলে

ত্রস্ত তরুকুল, যবে নড়ে মড়মড়ে,

কে পায় শুনিতে যদি কুহরে কপোতী?

ফাঁপর হইয়া, সখি, খুলিনু সত্বরে,

কঙ্কণ, বলয়, হার, সিঁথি, কণ্ঠমালা,

কুণ্ডল, নূপুর, কাঞ্চী; ছড়াইনু পথে;

তেঁই লো এ পোড়া দেহে নাহি, রক্ষোবধু,

আভরণ। বৃথা তুমি গঞ্জ দশাননে।”

নিরবিলা শশিমুখী। কহিলা সরমা;—

“এখনও তৃষাতুরা এ দাসী, মৈথিলি;

দেহ সুধা-দান তারে। সফল করিলা

শ্রবণ-কুহর আজি আমার।” সুস্বরে

পুনঃ আরম্ভিলা তবে ইন্দু-নিভাননা;—

“শুনিতে লালসা যদি, শুন লো, ললনে!

বৈদেহীর দুঃখ-কথা কে আর শুনিবে?—

“আনন্দে নিষাদ যথা ধরি ফাঁদে পাখী

যায় ঘরে, চালাইল রথ লঙ্কাপতি;

হায় লো, সে পাখী যথা কাঁদে ছটফটি

ভাঙ্গিতে শৃঙ্খল-তার কাঁদিনু সুন্দরি।

হে আকাশ, শুনিয়াছি তুমি শব্দবহ,

(আরাধিনু মনে মনে) এ দাসীর দশা

ঘোর-রবে কহ যথা রঘুচূড়ামণি,

দেবর লক্ষ্মণ মোর, ভুবন-বিজয়ী।

হে সমীর! গন্ধবহ তুমি; দূত-পদে

বরিনু তোমায় আমি, যাও ত্বরা করি,

যথায় ভ্রমেন প্রভু। হে বারিদ! তুমি

ভীমনাদী, ডাক নাথে গম্ভীর নিনাদে।

হে ভ্রমর! মধুলোভি, ছাড়ি ফুলকুলে

গুঞ্জর নিকুঞ্জে, যথা রাখবেন্দ্র বলী,

সীতার বারতা তুমি; গাও পঞ্চস্বরে

সীতার দুঃখের গীত, তুমি মধু-সখা

কোকিল! শুনিবে প্রভু, তুমি হে গাইলে

এইরূপে বিলাপিনু, কেহ না শুনিল।

“চলিল কনক-রথ; এড়াইয়া দ্রুতে

অভ্রভেদী গিরিচূড়া, বন, নদ, নদী,

নানাদেশ। স্ব-নয়নে দেখেছ, সরমা!

পুষ্পকের গতি তুমি; কি কাজ বর্ণিয়া?

“কতক্ষণে সিংহনাদ শুনিনু সম্মুখে

ভয়ঙ্কর। থরথরি আতঙ্কে কাঁপিল

বাজিরাজি, স্বর্ণ-রখ চলিল অস্থিরে।

দেখিনু মেলিয়া আঁখি, ভৈরব-মূরতি

গিরি-পৃষ্ঠে বীর, যেন প্রলয়ের কালে

কালমেঘ! ‘চিনি তোরে’, কহিলা গম্ভীরে

বীরবর,—চোর তুই, লঙ্কার রাবণ।

কোন্ কুলবধূ আজি হরিলি দুর্ম্মতি?

কার ঘর আঁধারিলি, নিবাইয়া এবে

প্রেদ-দ্বীপ? এই তোর নিত্যকর্ম্ম, জানি।

অস্ত্রিদল-অপবাদ ঘুচাইব আজি

বধি তোরে তীক্ষ্ণ শরে! আয় মুঢ়মতি!

ধিক্ তোরে, রক্ষোরাজ! নির্লজ্জ পামর

আছে কি রে তোর সম এ ব্রহ্ম-মণ্ডলে?’

“এতেক কহিয়া, সখি, গর্জ্জিলা শূরেন্দ্র।

অচেতন হ’য়ে আমি পড়িনু স্যন্দনে।

“পাইয়া চেতন পুনঃ দেখিনু, র’য়েছি

ভুতলে। গমনমার্গে রথে রক্ষোরথী

যুঝিছে সে বীর-সঙ্গে হুহুঙ্কার-নাদে।

অবলা রসনা, ধনি, পারে কি বর্ণিতে

সে রণে? সভয়ে আমি মুদিনু নয়নে।

সাধিনু দেবতাকুলে, কাঁদিয়া কাঁদিয়া,

সে বীরের পক্ষ হয়ে নাশিতে রাক্ষসে

অরি মোর; উদ্ধারিতে বিষম-সঙ্কটে

দাসীরে। উঠিনু ভাবি পশিব বিপিনে,

আছাড় খাইয়া, যেন ঘোর ভূকম্পনে।

আরাধিনু বসুধারে,—‘এ বিজন দেশে,

মা আমার, হয়ে দ্বিধা, তর বক্ষঃস্থলে

লহ অভাগীরে, সাধ্বি! কেমনে সহিছ

দুঃখিনী মেয়ের জ্বালা? এস শীঘ্র করি।

ফিরিয়া আসিবে দুষ্ট; হায় মা, যেমতি

তস্কর আইসে ফিরি, ঘোর নিশাকালে,

পুতি যথা রত্নরাশি রাখে সে গোপনে—

পরধন। আসি মোরে তরাও, জননি!’

“বাজিল তুমুল যুদ্ধ গগনে, সুন্দরি!

কাঁপিলা বসুধা; দেশ পূরিল আরবে।

অচেতন হৈনু পুনঃ। শুন, লো ললনে!

মন দিয়া শুন, সই, অপূর্ব্ব-কাহিনী।—

দেখিনু স্বপনে আমি,বসুন্ধরা সতী

মা আমার! দাসী-পাশে আসি দয়াময়ী

কহিলা, লইয়া কোলে, সুমধুর বাণী;

‘বিধির ইচ্ছায়, বাছা, হরিছে গো তোরে

রক্ষোরাজ! তোর হেতু সবংশে মজিবে

অধম! এ ভার আমি সহিতে না পারি,

ধরি গো গর্ভে তোরে লঙ্কা বিনাশিতে!

যে কুক্ষণে তোর তনু ছুঁইল দুর্ম্মতি

রাবণ, জানিনু আমি, সুপ্রসন্ন বিধি

এত দিনে মোর প্রতি! আশীষিনু তোরে,

জননীর জ্বালা দূর করিলি, মৈথিলি!

ভবিতব্য-দ্বার আমি খুলি; দেখ্ চেয়ে!’—

“দেখিনু সম্মুখে, সখি, অভ্রভেদী-গিরি;

পঞ্চ জন বীর তথা নিমগ্ন সকলে

দুঃখের সলিলে যেন। হেন কালে আসি

উতরিলা রঘুপতি লক্ষ্মণের সাথে।

বিরস-বদন নাথে হেরি, লো স্বজনি!

উতলা হইনু কত, কত যে কাঁদিনু,

কি আর কহিব তার? বীর পঞ্চজনে

পূজিল রাঘব-রাজে, পূজিল অনুজে,

একত্র পশিলা সবে সুন্দর নগরে।

“মারি সে দেশের রাজা তুমুল-সংগ্রামে

রঘুবীর, বসাইলা রাজ সিংহাসনে,

শ্রেষ্ঠ যে পুরুষবর পঞ্চজন মাঝে।

ধাইল চৌদিকে দূত; আইল ধাইয়া

লক্ষ লক্ষ বীরসিংহ ঘোর কোলাহলে!

কাঁপিল বসুধা, সখি, বীর-পদভরে।

সভয়ে মুদিনু আঁখি! কহিলা হাসিয়া

মা আমার,—‘কারে ভয় করিস্ জানকি?

সাজিছে সুগ্রীব রাজা উদ্ধারিতে তোরে,

মিত্রবর। বধিল যে শূরে তোর স্বামী,

বালি নাম ধরে রাজা বিখ্যাত জগতে।

কিষ্কিন্ধ্যা নগর ওই। ইন্দ্রতুল্য বলি-

বৃন্দ চেয়ে দেখ্ সাজে।’ দেখিনু চাহিয়া

চলিছে বীরেন্দ্রদল, জলস্রোতঃ যথা

বরিষায়, হুহুঙ্কারি! ঘোর মড়মড়ে

ভাঙ্গিল নিবিড় বন; শুকাইল নদী;

ভয়াকুল বনজীব পলাইল দূরে;

পূরিল জগৎ, সখি, গম্ভীর নির্ঘোষে।

“উতরিলা সৈন্যদল সাগরের তীরে।

দেখিনু, সরমা সখি, ভাসিল সলিলে

শিলা। শৃঙ্গধরে ধরি, ভীম পরাক্রমে

উপাড়ি ফেলিল জলে, বীর শত শত।

বাঁধিল অপূর্ব্ব সেতু শিল্পিকুল মিলি।

আপনি বারীশ পাশী, প্রভুর আদেশে,

পরিলা শৃঙ্খল পায়ে! অলঙ্ঘ্য সাগরে

লঙ্ঘি, বীরমদে পার হইল কটক।

টলিল এ স্বর্ণপুরী বৈরী পদ চাপে,—

‘জয় রঘুপতি, জয়!’ ধ্বনিল সকলে।

কাঁদিনু হরষে, সখি! সুবর্ণ-মন্দিরে

দেখিনু সুবর্ণাসনে রক্ষঃকুল-পতি।

আছিলা সে সভাতলে ধীর ধর্ম্মসম

বীর এক; কহিল সে, ‘পূজ রঘুবরে;

বৈদেহীরে দেহ ফিরি; নতুবা মরিবে

সবংশে!’ সংসার মদে মত্ত রাঘবারি,

পদাঘাত করি তারে কহিল কুবাণী।

অভিমানে গেলা চলি সে বীর-কুঞ্জর

যথা প্রাণনাথ মোর।” কহিলা সরমা;—

“হে দেবি, তোমার দুঃখে কত যে দুঃখিত

রক্ষোরাজানুজ বলী, কি আর কহিব?

দুজনে আমরা, সতি, কত যে কেঁদেছি

ভাবিয়া তোমার কথা, কে পারে কহিতে?”

“জানি আমি,” উত্তরিলা মৈথিলী রূপসী;

“জানি আমি বিভীষণ উপকারী মম

পরম। সরমা সখি, তুমিও তেমতি!

আছে যে বাঁচিয়া হেথা অভাগিনী সীতা,

সে কেবল, দয়াবতি, তব দয়াগুণে।

কিন্তু কহি, শুন মোর অপূর্ব্ব স্বপন!—

“সাজিল রাক্ষসবৃন্দ বুঝিবার আশে।

বাজিল রাক্ষস-বাদ্য; উঠিল গগনে

নিনাদ। কাঁপিনু, সখি, দেখি বীরদলে,

তেজে হুতাশন সম, বিক্রমে কেশরী।

কত যে হইল রণ, কহিব কেমনে?

বহিল শোণিত-নদী! পর্ব্বত-আকারে

দেখিনু শবের রাশি, মহাভয়ঙ্কর!

আইল কবন্ধ, ভূত, পিশাচ, দানব,

শকুনি, গৃধিনী আদি যত মাংসাহারী

বিহঙ্গম; পালে পালে শৃগাল; আইল

অসংখ্য কুক্কুর; লঙ্কা পূরিল ভৈরবে।

“দেখিনু কর্ব্বুর-নাথে পুনঃ সভাতলে,

মলিন-বদন এবে, অশ্রুময় আঁখি,

শোকাকুল; ঘোর রণে রাঘব-বিক্রমে

লাঘব-গরব, সই; কহিল বিষাদে

রক্ষোরাজ—‘হায় বিধি, এই কি রে ছিল

তোর মনে?—যাও সবে, জাগাও যতনে

শূলী শম্ভুসম ভাই কুম্ভকর্ণে মম।

কে রাখিবে রক্ষঃকুলে সে যদি না পারে?’

“ধাইল রাক্ষস দল; বাজিল বাজনা

ঘোর রোলে; নারীদল দিল হুলাহুলি।

বিরাট-মূরতি-ধর পশিল কটকে

রক্ষোরথী। প্রভু মোর, তীক্ষ্ণতর শরে,

(হেন বিচক্ষণ শিক্ষা কার লো জগতে?)

কাটিলা তাহার শিরঃ; মরিল অকালে

জাগি, সে দুরন্ত শূর। ‘জয় রাম ধ্বনি’

শুনিনু হরষে, সই! কাঁদিল রাবণ।

কাঁদিল কনক-লঙ্কা হাহাকার-রবে।

“চঞ্চল হইনু, সখি, শুনিয়া চৌদিকে

ক্রন্দন। কহিনু মায়ে, ধরি পা-দুখানি,—

রক্ষঃকুল-দুঃখে বুক ফাটে, মা, আমার,

পরেরে কাতর দেখি সতত কাতরা

এ দাসী; ক্ষম, মা, মোরে। হাসিয়া কহিলা

বসুধা,—‘লো রঘুবধু, সত্য যা দেখিলি!

লণ্ডভণ্ড করি লঙ্কা দণ্ডিবে রাবণে

পতি তোর! দেখ্‌ পুনঃ নয়ন মেলিয়া।’

“দেখিনু, সরমা সখি, সুরবালাদলে,

নানা আভরণ হাতে মন্দারের মালা,

পট্টবস্ত্র! হাসি তারা বেড়িল আমারে।

কেহ কহে,—‘উঠ, সতি, হত এত দিনে

দুরন্ত রাবণ রণে।’ কেহ কহে,—‘উঠ,

রঘুনন্দনের ধন, উঠ, ত্বরা করি,

অবগাহ দেহ, দেবি, সুবাসিত জলে,

পর নানা আভরণ। দেবেন্দ্রাণী শচী

দিবেন সীতায় দান আজি সীতানাথে।’

“কহিনু, সরমা সখি, করপুটে আমি;

কি কাজ, হে সুরবালা, এ বেশ-ভূষণে

দাসীর? যাইব আমি যথা কান্ত মম

এ দশায়, দেহ আজ্ঞা; কাঙ্গালিনী সীতা,

কাঙ্গালিনীবেশে তারে দেখুন নৃমণি।’

“উত্তরিলা সুরবালা;—‘শুন লো মৈথিলি!

সমল খনির গর্ভে মণি; কিন্তু তারে

পরিষ্কারি রাজ-হস্তে দান করে দাতা!’

“কাঁদিয়া, হাসিয়া, সই, সাজিনু সত্বরে।

হেরিনু অদূরে নাথে, হায় লো, যেমতি

কনক-উদয়াচলে দেব অংশুমালী!

পাগলিনী প্রায় আমি ধাই ধরিতে

পদযুগ, সুবদনে!—জাগিনু অমনি!—

সহসা, স্বজনি, যথা নিবিলে দেউটী,

ঘোর অন্ধকার ঘর; ঘটিল সে দশা

আমার,—আঁধার বিশ্ব দেখিনু চৌদিকে

হে বিধি, কেননা আমি মরিনু তখনি?

কি সাধে এ পোড়া প্রাণ রহিল এ দেহে?”

নীরবিলা বিধুমুখী, নীরবে যেমতি

বীণা, ছিঁড়ে তার যদি। কাঁদিয়া সরমা

(রক্ষঃকুল-রাজলক্ষ্মী রক্ষোবধূরূপে)

কহিলা;—“পাইবে নাথে,জনক-নন্দিনি!

সত্য এ স্বপন তব, কহিনু তোমারে।

ভাসিছে সলিলে শিলা, পড়েছে সংগ্রামে

দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস কুম্ভকর্ণ বলী

সেবিছেন বিভীষণ জিষ্ণু রঘুনাথে

লক্ষ লক্ষ বীরসহ। মরিবে পৌলস্ত্য

যথোচিত শাস্তি পাই; মজিবে দুর্ম্মতি

সবংশে। এখন কহ, কি ঘটিল পরে।

অসীম লালসা মোর শুনিতে কাহিনী।”

আরম্ভিলা পুনঃ সতী সুমধুর স্বরে;—

“মিলি আঁখি, শশিমুখি, দেখিনু সম্মুখে

রাবণে, ভূতলে হায়, সে বীর কেশরী,

তুঙ্গ-শৈলশৃঙ্গ যেন চূর্ণ বজ্রাঘাতে!

“কহিল রাঘব-রিপু,—‘ইন্দীবর-আঁখি

উন্মীলি, দেখ লো চেয়ে, ইন্দু নিভাননে!

রাবণের পরাক্রম। জগৎ-বিখ্যাত

জটায়ু হীনায়ু আজি মোর ভুজ-বলে!

নিজ দোষে মরে মূঢ় গরুড়-নন্দন।

কে কহিল মোর সাথে যুঝিতে বর্ব্বরে?’

‘ধর্ম্ম কর্ম্ম সাধিবারে মরিনু সংগ্রামে,

রাবণ’;—কহিলা শূর অতি মৃদু স্বরে—

‘সম্মুখ সমরে পড়ি যাই দেবালয়ে!

কি দশা ঘটিবে তোর, দেখ্ রে ভাবিয়া!

শৃগাল হইয়া, লোভি, লোভিলি সিংহীরে!

কে তোরে রক্ষিবে, রক্ষঃ! পড়িলি সঙ্কটে,

লঙ্কানাথ, করি চুরি এ নারী-রতনে।”

“এতেক কহিয়া বীর নীরব হইলা;

তুলিল আমায় পুনঃ রথে লঙ্কাপতি।

“কৃতাঞ্জলি-পুটে কাঁদি কহিনু স্বজনি,

বীরবরে;—‘সীতা নাম, জনকদুহিতা,

রঘুবধূ দাসী, দেব! শূন্য ঘরে পেয়ে

আমায়, হরিয়াছে পাপী; কহিও এ কথা

দেখা যদি হয়, প্রভু রাঘবের সাথে।’

“উঠিল গগনে রথ গম্ভীর নির্ঘোষে।

শুনিনু ভৈরব রব; দেখিনু সম্মুখে

সাগর নীলোর্ম্মিময়। বহিছে কল্লোলে

অতল, অকূল জল, অবিরাম গতি;

ঝাঁপ দিয়া জলে, সখি, চাহিনু ডুবিতে;

নিবারিল দুষ্ট মোরে! ডাকিনু বারীশে,

জলচরে মনে মনে, কেহ না শুনিল,

অবহেলি অভাগীরে! অনম্বর-পথে

চলিল কনক-রথ মনোরথ-গতি।

“অবিলম্বে লঙ্কাপুরী শোভিল সম্মুখে।

সাগরের ভালে, সখি, এ কনক-পুরী,

রঞ্জনের রেখা! কিন্তু কারাগার যদি

সুবর্ণ-গঠিত, তবু বন্দীর নয়নে

কমনীয় কভু কি লো শোভে তার আভা?

সুবর্ণ-পিঞ্জর বলি হয় কি লো সুখী

সে পিঞ্জরে বন্ধ পাখী! দুঃখিনী সতত

যে পিঞ্জরে রাখ তুমি কুঞ্জ-বিহারিণী।

কুক্ষণে জনম মম, সরমা সুন্দরি!

কে কবে শুনেছে, সখি, কহ, হেন কথা?

রাজার নন্দিনী আমি, রাজ-কুল-বধূ,

তবু বদ্ধ কারাগারে।”—কাঁদিলা রূপসী,

সরমার গলা ধরি; কাঁদিলা সরমা।

কতক্ষণে চক্ষুজল মুছি সুলোচনা

সরমা কহিলা; “দেবি, কে পারে খণ্ডিতে

বিধির নির্ব্বন্ধ? কিন্তু সত্য যা কহিলা

বসুধা। বিধির ইচ্ছা, তেঁই লঙ্কাপতি

আনিয়াছে হরি তোমা। সবংশে মরিবে

দুষ্টমতি। বীর আর কে আছে এ পুরে

বীরযোনি? কোথা, সতি, ত্রিভুবন-জয়ী

যোধ যত? দেখ চেয়ে, সাগরের কূলে,

শবাহারী জন্তুপুঞ্জ ভুঞ্জিছে উল্লাসে

শবরাশি। কাণ দিয়া শুন, ঘরে ঘরে

কাঁদিছে বিধবা-বধূ! আশু পোহাইবে

এ দুঃখ-শর্ব্বরী তব। ফলিবে, কহিনু,

স্বপ্ন! বিদ্যাধরী-দল মন্দারের দামে

ও বরাঙ্গ, রঙ্গে আসি আশু সাজাইবে।

ভেটিবে রাঘবে তুমি, বসুধা-কামিনী,

সরস বসন্তে যথা ভেটেন মধুরে!

ভুলো না দাসীরে, সাধ্বি! যত দিন বাঁচি,

এ মনোমন্দিরে রাখি, আনন্দে পূজিব

ও প্রতিমা, নিত্য যথা, আইলে রজনী,

সরসী হরষে পূজে কৌমুদিনী-ধনে।

বহু ক্লেশ, সুকেশিনি, পাইলে এ দেশে।

কিন্তু নহে দোষী দাসী।” কহিলা সুস্বরে

মৈথিলী;—“সরমা সখি, মম হিতৈষিণী

তোমা সম আর কি লো আছে এ জগতে?

মরুভূমে প্রবাহিণী মোর পক্ষে তুমি,

রক্ষোবধু! সুশীতল ছায়ারূপ ধরি,

তপন-তাপিতা আমি, জুড়ালে আমারে।

মূর্ত্তিমতী দয়া তুমি এ নির্দ্দয় দেশে।

এ পঙ্কিল জলে পদ্ম! ভুজঙ্গিনী-রূপী

এ কাল-কনক-লঙ্কা-শিরে শিরোমণি।

আর কি কহিব, সখি! কাঙ্গালিনী সীতা,

তুমি লো মহার্হ রত্ন! দরিদ্র, পাইলে

রতন, কভু কি তারে অযতনে, ধনি!”

নমিয়া সতীর পদে, কহিলা সরমা;—

“বিদায় দাসীরে এবে দেহ, দয়াময়ি!

না চাহে পরাণ মম ছাড়িতে তোমারে,

রঘুকুল-কমলিনি! কিন্তু প্রাণপতি

আমার, রাঘব-দাস; তোমার চরণে

আসি কথা কই আমি, এ কথা শুনিলে

রুষিবে লঙ্কার নাথ, পড়িব সঙ্কটে।”

কহিলা মৈথিলী;—“সখি! যাও ত্বরা করি,

নিজালয়ে; শুনি আমি দূর-পদধ্বনি;

ফিরি বুঝি চেড়ীদল আসিছে এ বনে।”

আতঙ্কে কুরঙ্গী যথা, গেলা দ্রুতগামী

সরমা; রহিলা দেবী সে বিজন-বনে,

একটি কুসুম মাত্র অরণ্যে যেমতি।

ইতি শ্রীমেঘনাদবধ কাব্যে অশোকবনং নাম

চতুর্থঃ সর্গঃ।

চতুর্থ সর্গ।

পদাম্বুজ—lotus-like foot.

রাজেন্দ্রসঙ্গমে—with the great king.

ভব-দম—the subduer of the earth.

সূরী—learned.

ভবভূতি—author of Vir Charita and other poems. বরপুত্র—blessed son.

ভারতীর বরপুত্র—favourite of Saraswati.

মুরারি-মুরলীধ্বনি-সদৃশ মুরারি—the poet Murari whose poetry was like the music of the flute of Krishna. The poet Murari is the author of অনর্ঘ রাঘব।

কৃত্তিবাস—author of the Bengalee Ramayana.

কীর্ত্তিবাস—whose বাস, residence is in কীর্ত্তি or fame; or, whose বাস or cloth is কীর্ত্তি or fame.

কবিতারসের সরে রাজহংস-কুল—the assembly of geese in the lake of the water of poetry. The great poets are here called the geese.

রত্নাকর—the name of Valmiki was Ratnakar. The word is happily used here as it also means the sea, the reservoir of gems and jewels. সুবর্ণদীপমালিনী—wearing the garland of golden lamps.

রত্নহারা—wearing a হার or necklace of jewels.

সুরত—coition; copulation.

শীধু—wine; liquor. কল্লোল—noise.

ছাড়িয়া চাঁদেরে রাহু—Lanka is the moon, and the army of Rama is the Rahu.

রাঘব-বাঞ্ছা—Sita. চেড়ী—maid-servants.

তিমির-গর্ভ—dark pit. বিম্বাধরা রমা—Rama or Lakshmi with lips beautifully red as the bimba fruit.

অম্বুরাশি তলে—at the bottom of the sea.

স্বনিছে—is making a sound.

উচ্ছ্বাসে—sighs. বিলাপী—mourner.

অরবে—silently.

উচ্চবীচি-রবে—with the sound of high waves; or, with the loud sound of waves.

বারীশ—the sea.

সুধাংশু-অংশু—the rays of the moon.

সমল-সলিল—dirty water.

ও অপূর্ব্বরূপ—that wonderful beauty of Sita.

প্রভা-আভাময়ী—আভাময়ী প্রভা—brilliant light; splendid light.

তমোময়—full of darkness.

এয়ো—a married woman who has her husband alive and who is therefore to be honoured with gifts before certain ceremonies.

পর্ণ—leaf; petal.

পদ্মের পর্ণ—Sita is a পদ্ম, and her ornaments are the petals of the পদ্ম।

বরাঙ্গ-অলঙ্কার—the ornaments of the beautiful body. সীমন্ত—the line of the parting of hair.

গোধূলি-ললাট—the forehead of twilight. Twilight is compared to a woman, The evening star is poetically said to be on the forehead of twilight, as the vermilion spot on the forehead of a woman.

চিরদাসী—for-ever a servant.

সেই সেতু... রঘুনাথে—Sita speaks of her ornaments as forming a bridge which has brought Rama across the sea to Lanka.

স্বয়ম্বর—a system of marriage in which the bride chooses the bridegroom. Sita's marriage was not a স্বয়ম্বরভin the true sense of the term.

সুধামুখ—mouth full of nectar.

তোষ—তুষ্ট কর; satisfy.

গোমুখী—is a peak in the Himalavas.

পূত—adj. sacred. হিতৈষিণী—well-wisher.

সুরবন—the garden of the gods; Nandan kanana. দণ্ডক ভাণ্ডার যাঁর—whose storehouse is the forest of Dandaka.

পঞ্চবটী-বনচর মধু নিরবধি—Spring is the constant companion of the Panchabati forest.

চিত্ত-বিনোদন—charming the mind.

বৈতালিক-গীত—the song of the court-bard.

করভ—the young of an elephant.

ঘনবর-শিরে—on the top of a great cloud.

তৃষাতুর—one afflicted with thirst.

আপনি সুজলবতী বারিদ-প্রসাদে—which is full of good water through the grace of clouds. Sita means to say she was full of affection through the grace of Ramachandra.

সরসী—feminine form of সরঃ; lake. আরসী—mirror.

আশার সরসে রাজীব—a lotus blooming in the lake of hope. Sita’s hope to see Ramachandra was, as it were, a lake, and the feet of Ramachandra were, as it were, lotuses in that lake. কাদম্বা—a goose.

মধুস্বরা—sweet-voiced. প্লাবন-পীড়নে—owing to the oppressions of the flood.

প্রবাহ—stream. অতিক্রমি—overflowing.

প্লাবন-পীড়নে etc.—the stream overflows its banks with water through the pressure of flood. So a mind afflicted with sorrows gives over its sorrows to another sympathetic mind. The mind is the stream. The flood of water is the flood of sorrows. The banks are sympathetic minds or persons.

অবরুপুর—the abode of the Rakshasas.

কান্তার-কান্তি—the beauty of the forest.

কান্তার—বন, forest. বনবীণা—the forest-flute.

সৌরকর-রাশি-বেশে—in the disguise of the rays of the sun. সুরবালা-কেলি—the merrymakings of the daughters of gods.

অজিন—skin; hide. মঞ্জরিত—with buds or blossoms newly put forth; blooming.

মঞ্জরী—a flower-spike. নাতিনী—grand-daughter.

রসাল—a mango tree.

পঞ্চমুখ—Siva who has five heads.

সাঙ্গ—at an end. আয়ত-লোচন—wide-eyed.

মধুমতি—having a sweet disposition.

পিইছেন—is drinking. দেব-সুধানিধি—the Moon.

মিটাও—satisfy.

নারীকুল-কালি—the dirt of the race of women.

রঘুরাজ-গৃহ-আনন্দ—the joy of the home of the king of Raghu’s dynasty.

হেমাঙ্গি—having a body bright as gold.

নিষাদ—a hunter. ললিত—sweet.

যথা যবে ঘোর-বনে etc.—the hunter is the grief of Sita. The bird is Sita herself. The sweet song of the bird is the sweet speech of Sita.

মরীচিকা—a mirrage; the vapour which at a distance appears like a sheet of water.

বিদ্যুৎ-আকৃতি—like a lightning.

বারণ—an elephant. বারণারি—is a lion.

বায়ুগতি—having the speed of the wind.

অবতংস—ornament.

ভৃগুরাম-গুরু—the teacher of Bhriguram.

বলে—in strength; as regards strength, i.e. superior to Bhriguram.

বীর-কুলগ্লানি—the slander of the race of heroes.

করুণস্বরে—in a plaintive tone.

সদাব্রত-ফলাহারী—constantly devoted to a vow and living on fruits.

বৈশ্বানর—God of fire.

বিভূতি—(১) ashes, (২) splendour, magnificence.

ফুলরাশি মাঝে দুষ্ট কালসর্প-বেশে বিমল সলিলে বিষ—there is poison in the transparent water like a wicked and deadly snake in a mass of flowers. The deadly snake or poison is Ravana in his own appearance, and the mass of flowers or the transparent water is the guise of a sannyasi.

প্রতারিত—pretended.

অবহেলা কর—disregard; do not fear.

ব্রহ্মশাপ—the curse of a Brahmin.

ভিক্ষাদ্রব্য—alms. গুল্ম-পাশে—beside a bush.

ইরাম্মদাকৃতি-বজ্রাগ্নির ন্যায়, like a flash of lightning. দমে—subdues; quenches.

অশ্রুবিন্দু মানে কিলো কঠিন যে হিয়া?—does a heart that is hard has any regard for tears.

জটাজুট—mass of knotted hair.

রাজরথি-বেশে—in the guise of royal chariot-fighter.

ফাঁপর—helpless. শ্রবণ-কুহর—ear-hole.

শব্দবহ—sound-carrier.

দূতপদ—the post of a messenger.

মধুসখা—the companion of spring.

ভৈরব-মূরতি—with a dreadful appearance.

প্রেমদীপ—the light of love.

অস্ত্রিদল—the class of the bearer of weapons; the class of fighters.

সান্দন—chariot.

পুতি—burying. আরব—sound, noise.

ভবিতব্য-দ্বার—the gate of future events.

বলিবৃন্দ—the strong, the heroic.

বারীশ পাশী—Varuna, the sea god whose weapon is a noose.

ধীর ধর্ম্মসম বীর এক—referring to Bibhisana.

সংসার-মদ—worldy pride. কবন্ধ—headless trunk.

বিহঙ্গম—wanderer of the sky, i.e. bird.

ভৈরবে—ভীষণতায়। In fearfulness.

কর্ব্বুর-নাথ—the Lord of the Rakshasas.

লাঘব-গরব—with the pride humbled down.

বিরাট-মূরতি-ধর—wearing a dreadful look.

রক্ষোরথী—i.e.Kumbhakarna.

মন্দার—one of the live trees of the Heaven.

অবগাহ—bathe. সমল—dirty.

পরিষ্কারি—cleaning.

ছিঁড়ে তার যদি—if the wire is torn asunder.

দেবদৈত্য-নরত্রাস—the dread of gods, Daityas and men. জিষ্ণু—victorious

পৌলস্ত্য—the grandson of Pulasta sage, i.e. Ravana.

ইন্দীবর-আঁখি—eyes like blue lotuses.

হীনায়—where life is cut short.

নীলোর্ম্মিময়—full of blue waves.

অতল—bottomless.

মনোরথগতি—having the speed of the mind, swift like imagination.

রঞ্জন—is red sandal.

বিধির নির্ব্বন্ধ—what is ordained by God, the Maker of all Law.

এ পুরে বীরযোনি—এ বীরযোনি পুরে—in this city of Lanka who is the producer of heroes. Lanka is, as it were, a mother of heroes.

মন্দারের দামে—with the garlands of Mandara or Parijat flowers.

বসুধা-কামিনী—the Earth is likened to a woman. She is adorned with various flowers during spring.

ও প্রতিমা—i.e. Sita herself.

প্রবাহিণী—stream; river.

এ পঙ্কিল জলে পদ্ম—a lotus in this dirty water. Sarama is the lotus, and sinful Lanka is dirty water.

ভুজঙ্গিনী-রূপী এ কাল-কনক-লঙ্কা-শিরে শিরোমণি — এই ভুজঙ্গিনী-রূপী কাল-কনক লঙ্কা-শিরে শিরোমণি—a jewel on the head of this snake-like, deadly golden Lanka. Sarama is the jewel. অযতনে—অযতন করে, neglects.

কুরঙ্গী—the-deer.

তৃতীয় সর্গ

তৃতীয় সর্গ

প্রমোদ-উদ্যানে কাঁদে দানব-নন্দিনী

প্রমীলা, পতি-বিরহে কাতরা যুবতী।

অশ্রু-আঁখি বিধুমুখী ভ্রমে ফুলবনে

কভু, ব্রজ-কুঞ্জ-বনে, হায় রে, যেমতি

ব্রজবালা, নাহি হেরি কদম্বের মূলে

পীতধড়া পীতাম্বরে, অধরে মুরলী।

কভু বা মন্দিরে পশি, বাহিরায় পুনঃ

বিরহিণী, শূন্য-নীড়ে কপোতী যেমতি

বিবশা! কভু বা উঠি উচ্চ-গৃহ-চূড়ে,

একদৃষ্টে চাহে বামা দূর লঙ্কাপানে,

অবিরল চক্ষুঃজল মুছিয়া আঁচলে!—

নীরব বাঁশরী, বীণা, মুরজ, মন্দিরা,

গীত-ধ্বনি। চারিদিকে সখী-দল যত

বিরস-বদন, মরি, সুন্দরীর শোকে!

কে না জানে ফুলকুল বিরস-বদনা,

মধুর বিরহে যবে তাপে বনস্থলী?

উতরিলা নিশা-দেবী প্রমোদ-উদ্যানে

শিহরি প্রমীলা-সতী, মৃদু কল-স্বরে,

তার গলা ধরি কাঁদি, কহিতে লাগিলা;—

“ওই দেখ, আইল লো তিমির-যামিনী,

কাল-ভুজঙ্গিনী-রূপে দংশিতে আমারে,

বাসন্তি! কোথায়, সখি, রক্ষঃ-কুল-পতি,

অরিন্দম ইন্দ্রজিৎ, এ বিপত্তি-কালে?

এখনি আসিব বলি, গেলা চলি বলী;

কি কাজে এ ব্যাজ আমি বুঝিতে না পারি

তুমি যদি পার সই, কহ লো আমারে।”

কহিলা বাসন্তী সখী, বসন্তে যেমতি

কুহরে বসন্তসখা;—“কেমনে কহিব,

কেন প্রাণনাথ তব বিলম্বেন আজি?

কিন্তু চিন্তা দূর তুমি কর, সীমন্তিনি!

ত্বরায় আসিবে শূর নাশিয়া রাঘবে।

কি ভয় তোমার সখি? সুরাসুর শরে

অভেদ্য শরীর যাঁর, কে তাঁরে আঁটিবে

বিগ্রহে? আইস, মোরা যাই কুঞ্জবনে।

সরস-কুসুম তুলি, চিকণিয়া গাঁথি

ফুলমালা। দোলাইও হাসি প্রিয়-গলে

সে দামে, বিজয়ী রথ-চুড়ায় যেমতি

বিজয়-পতাকা লোক উড়ায় কৌতুকে।”

এতেক কহিয়া দোঁহে পশিলা কাননে,

যথায় সরসীসহ খেলিছে কৌমুদী

হাসাইয়া কুমুদেরে; গাইছে ভ্রমরী;

কুহরিছে পিকবর; কুসুম ফুটিছে;

শোভিছে আনন্দময়ী বনরাজী-ভালে

(মণিময় সিঁথিরূপে) জোনাকের পাঁতি;

বহিছে মলয়ানিল, মর্ম্মরিছে পাতা।

আঁচল ভরিয়া ফুল তুলিলা দুজনে।

কত যে ফুলের দলে প্রমীলার আঁখি

মুক্তিল শিশির-নীরে, কে পারে কহিতে?

কতদূরে হেরি বামা, সূর্য্যমুখী দুঃখী,

মলিন বদনা, মরি, মিহির-বিরহে,

দাঁড়াইয়া তার কাছে কহিলা সুশ্বরে;—

“তোর লো যে দশা এই ঘোর নিশাকালে,

ভানুপ্রিয়ে! আমিও লো সহি সে যাতনা!

আঁধার সংসার এবে এ পোড়া নয়নে!

এ পরাণ দহিছে লো বিচ্ছেদ-অনলে!

যে রবির ছবি-পানে চাহি বাঁচি আমি

অহরহঃ, অস্তাচলে আচ্ছন্ন লো তিনি।

আর কি পাইব আমি (ঊষার প্রসাদে

পাইবি যেমতি, সতি, তুই) প্রাণেশ্বরে?”

অবচয়ি ফুলচয়ে সে নিকুঞ্জ-বনে,

বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, সখীরে সম্ভাষি

কহিলা প্রমীলা সতী;—“এই ত তুলিনু

ফুলরাশি, চিকণিয়া গাঁথিনু স্বজনি,

ফুলমালা; কিন্তু কোথা পাব সে চরণে,

পুষ্পাঞ্জলি দিয়া যাহে চাহি পূজিবারে?

কে বাঁধিল মৃগরাজে বুঝিতে না পারি।

চল, সখি, লঙ্কাপুরে যাই মোরা সবে।”

কহিলা বাসন্তী সখী;—“কেমনে পশিবে,

লঙ্কাপুরে আজি তুমি? অলঙ্ঘ্য-সাগর-

সম রাঘবীয় চমু বেড়িছে তাহারে!

লক্ষ লক্ষ রক্ষঃ-অরি ফিরিছে চৌদিকে

অস্ত্রপাণি, দণ্ডপাণি দণ্ডধর যথা।”

রুষিলা দানববালা, প্রমীলা-রূপসী।—

“কি কহিলি বাসন্তি! পর্ব্বত-গৃহ ছাড়ি

বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে,

কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি?

দানবনন্দিনী আমি; রক্ষঃ-কুলবধূ;

রাবণ শ্বশুর মম; মেঘনাদ স্বামী;—

আমি কি ডরাই সখি, ভিখারী রাঘবে?

পশিব লঙ্কায় আজি নিজ ভুজবলে;

দেখিব কেমনে মোরে নিবারে নৃমণি?”

এতেক কহিয়া সতী, গজ-পতি-গতি,

রোষাবেশে প্রবেশিলা সুবর্ণ-মন্দিরে।

যথা যবে পরন্তপ পার্থ মহারথী,

যজ্ঞের তুরঙ্গ সঙ্গে আসি, উতরিলা

নারী-দেশে; দেবদত্ত শঙ্খনাদে রুষি,

রণরঙ্গে বীরাঙ্গনা সাজিল কৌতুকে;—

উথলিল চারিদিকে দুন্দুভির ধ্বনি;

বাহিরিলা বামাদল বীরমদে মাতি,

উলঙ্গিয়া অসিরাশি, কার্ম্মুক টঙ্কারি,

আস্ফালি ফলকপুঞ্জে! ঝক্ ঝক্‌ ঝকি

কাঞ্চন-কঞ্চুক-বিভা উজলিল পুরী।

মন্দুরায় হ্রেষে অশ্ব, ঊর্দ্ধ-কর্ণে শুনি

নূপুরের ঝন্ ঝনি, কিঙ্কিণীর বোলী,

ডমরুর রবে যথা নাচে কাল ফণী।

বারিমাঝে নাদে গজ শ্রবণ বিদরি,

গম্ভীর নির্ঘোষে যথা ঘোষে ঘনপতি

দূরে! রঙ্গে গিরিশৃঙ্গে, কাননে, কন্দরে,

নিদ্রা ত্যজি প্রতিধ্বনি জাগিলা অমনি;—

সহসা পূরিল দেশ ঘোর-কোলাহলে।

নৃ-মুণ্ড-মালিনীনামে উগ্রচণ্ডা ধনী,

সাজাইয়া শত বাজী বিবিধ সাজনে,

মন্দুরা হইতে আনে অলিন্দের কাছে

আনন্দে। চড়িলা ঘোড়া এক শত চেড়ী।

অশ্ব-পার্শ্বে কোষে অসি বাজিল ঝন্‌ঝনি।

নাচিল শীর্ষক চূড়া; দুলিল কৌতকে

পৃষ্ঠে মণিময় বেণী তৃণীরের সাথে।

হাতে শূল, কমলে কণ্টকময় যথা

মৃণাল। হ্রেষিল অশ্ব মগন হরষে,

দানব দলনী-পদ্ম-পদ-যুগ ধরি

বক্ষে, বিরূপাক্ষ সুখে নাদেন যেমতি!

বাজিল সমর-বাদ্য; চমকিলা দিবে

অমর, পাতালে নাগ, নর নরলোকে।

রোষে লাজ ভয় ত্যজি, সাজে তেজস্বিনী

প্রমীলা। কিরীটছটা কবরী-উপরি,

হায় রে, শোভিল যথা কাদম্বিনী-শিরে

ইন্দ্রচাপ! লেখা ভালে অঞ্জনের রেখা,

ভৈরবীর ভালে যথা নয়নরঞ্জিকা

শশিকলা! উচ্চ-কুচ আবরি কবচে

সুলোচনা, কটিদেশ যতনে আঁটিলা

বিবিধ রতনময় স্বর্ণ-সারসনে।

নিষঙ্গের সঙ্গে পৃষ্ঠে ফলক দুলিল,

রবির পরিধি হেন ধাঁধিয়া নয়নে!

ঝক্‌ঝকি ঊরুদেশে (হায় রে, বর্ত্তুল

যথা রম্ভা-বন-আভা!) হৈমময় কোষে

শোভে খরশাণ অসি; দীর্ঘ শূল করে;

ঝলমলি ঝলে অঙ্গে নানা আভরণ!

সাজিলা দানববালা, হৈমবতী যথা

নাশিতে মহিষাসুরে ঘোরতর রণে,

কিম্বা শুম্ভ-নিশুম্ভ, উন্মাদ বীর-মদে।

ডাকিনী-যোগিনী-সম বেড়িলা সতীরে

অশ্বারূঢ়া চেড়ীবৃন্দ! চড়িলা সুন্দরী

বড়বানামেতে বামী—বাড়বাগ্নি-শিখা!

গম্ভীরে অম্বরে যথা নাদে কাদম্বিনী,

উচ্চৈঃস্বরে নিতম্বিনী কহিলা সম্ভাষি

সখীবৃন্দে;—“লঙ্কাপুরে, শুন লো দানবি!

অরিন্দম ইন্দ্রজিৎ বন্দী-সম এবে!

কেন যে দাসীরে ভুলি বিলম্বেন তথা

প্রাণনাথ, কিছু আমি না পারি বুঝিতে!

যাইব তাঁহার পাশে; পশিব নগরে

বিকট কটক কাটি, জিনি ভুজবলে

রঘুশ্রেষ্ঠে;—এ প্রতিজ্ঞা, বীরাঙ্গনা মম;

নতুবা মরিব রণে—যা থাকে কপালে!

দানব-কুল-সম্ভবা আমরা, দানবি!—

দানবকুলের বিধি বধিতে সমরে,

দ্বিষৎ-শোণিত-নদে, নতুবা ডুবিতে!

অধরে ধরি লো মধু, গরল লোচনে

আমরা; নাহি কি বল এ ভুজ-মৃণালে?

চল সবে, রাখবের হেরি বীরপণা।

দেখিব, যে রূপ দেখি শূর্পণখা পিসী

মাতিল মদন-মদে পঞ্চবটী বনে;

দেখিব লক্ষ্মণ-শূরে; নাগপাশ দিয়া

বাঁধি লব বিভীষণে—রক্ষঃকুলাঙ্গারে!

দলিব বিপক্ষ-দলে, মাতঙ্গিনী যথা

নলবন। তোমরা লো বিদ্যুৎ-আকৃতি,

বিদ্যুতের গতি চল, পড়ি অরি মাঝে!”

নাদিল দানব-বালা হুহুঙ্কার-রবে,

মাতঙ্গিনীযূথ যথা মত্ত মধু-কালে!

যথা রায়ু সখা সহ দাবানলগতি

দুর্ব্বার, চলিলা সতী পতির উদ্দেশে।

টলিল কনক-লঙ্কা, গর্জ্জিল জলধি;

ঘনঘনাকারে রেণু উড়িল চৌদিকে;—

কিন্তু নিশাকালে কবে ধূমপুঞ্জ পারে

আবরিতে অগ্নিশিখা? অগ্নিশিখা তেজে

চলিলা প্রমীলা দেবী বামা-বল-দলে!

কতক্ষণে উতরিলা পশ্চিম দুয়ারে

বিধুমুখী। একেবারে শত শঙ্খ ধরি

ধ্বনিলা, টঙ্কারি রোষে শত ভীম-ধনু,

স্ত্রীবৃন্দ! কাঁপিল লঙ্কা আতঙ্কে; কাঁপিল

মাতঙ্গে নিষাদী; রথে রথী; তুরঙ্গমে

সাদীবর; সিংহাসনে রাজা; অবরোধে

কুলবধূ; বিহঙ্গম কাঁপিল কুলায়ে;

পর্ব্বত-গহ্বরে সিংহ; বনহস্তী বনে;

ডুবিল অতল-জলে জলচর যত।

পবননন্দন হনু ভীষণ-দর্শন,

রোষে অগ্রসরি শূর গরজি কহিলা;—

“কে তোরা এ নিশাকালে আইলি মরিতে?

জাগে এ দুয়ারে হনু, যার নাম শুনি

থরথরি রক্ষোনাথ কাঁপে সিংহাসনে!

আপনি জাগেন প্রভু রঘুকুলমণি,

সহ মিত্র বিভীষণ, সৌমিত্রি কেশরী,

শত শত বীর আর—দুর্দ্ধর্ষ সমরে।

কি রঙ্গে অঙ্গনাবেশ ধরিলি দুর্ম্মতি?

জানি আমি নিশাচর পরম মায়াবী।

কিন্তু মায়াবল আমি টুটি বাহুবলে,—

যথা পাই মারি অরি ভীম-প্রহরণে।”

নৃ-মুণ্ডমালিনী-সখী (উগ্রচণ্ডা ধনী)

কোদণ্ড টঙ্কারি রোষে কহিলা হুঙ্কারে;—

“শীঘ্র ডাকি আন্ হেথা, তোর সীতানাথে,

বর্ব্বর! কে চাহে তোরে, তুই ক্ষুদ্রজীবী!

নাহি মারি অস্ত্র মোরা তোর সম জনে

ইচ্ছায়। শৃগালসহ সিংহী কি বিবাদে?

দিনু ছাড়ি; প্রাণ ল’য়ে পালা বনবাসি

কি ফল বধিলে তোরে অবোধ! যা চলি,

ডাক্ সীতানাথে হেথা, লক্ষ্মণ-ঠাকুরে,

রাক্ষস-কুল-কলঙ্ক ডাক্‌ বিভীষণে!

অরিন্দম ইন্দ্রজিৎ—প্রমীলা-সুন্দরী

পত্নী তাঁর, বাহুবলে প্রবেশিবে এবে

লঙ্কাপুরে, পতিপদ পূজিতে যুবতী।

কোন্ যোধ সাধ্য, মূঢ়, রোধিতে তাঁহারে?”

প্রবল পবন-বলে বলীন্দ্র পাবনি

হনু, অগ্রসরি শূর, দেখিলা সভয়ে

বীরাঙ্গনা-মাঝে রঙ্গে প্রমীলা দানবী।

ক্ষণপ্রভা-সম বিভা খেলিছে কিরীটে;

শোভিছে বরাঙ্গে বর্ম্ম, সৌর-অংশু-রাশি,

মণি-আভা-সহ মিশি, শোভয়ে যেমতি!

বিস্ময় মানিয়া হনু ভাবে মনে মনে;—

“অলঙ্ঘ্য সাগর লঙ্ঘি, উতরিনু যবে

লঙ্কাপুরে, ভয়ঙ্করী হেরিনু ভীমারে,

প্রচণ্ডা, খর্পর খণ্ডা হাতে মুণ্ডমালী।

দানব-নন্দিনী যত মন্দোদরী আদি

রাবণের প্রণয়িনী, দেখি তা সবে।

রক্ষঃকুল-বালাদলে, রক্ষঃ-কুল-বধূ,

(শশিকলা-সম-রূপে) ঘোর নিশাকালে,

দেখিনু সকলে একা ফিরি ঘরে ঘরে।

দেখিনু অশোকবনে (হায় শোকাকুলা)

রঘুকুল-কমলেরে;—কিন্তু নাহি হেরি

এ হেন রূপ-মাধুরী কভু এ ভুবনে!

ধন্য বীর মেঘনাদ, যে মেঘের পাশে

প্রেম-পাশে বাঁধা সদা, হেন সৌদামিনী!”

এতেক ভাবিয়া মনে অঞ্জনা-নন্দন

(প্রভঞ্জন স্বনে যথা) কহিলা গম্ভীরে;—

“বন্দীসম শিলাবন্ধে বাঁধিয়া সিন্ধুরে,

হে সুন্দরি! প্রভু মম, রবি-কুল-রবি,

লক্ষ লক্ষ বীর সহ আইলা এ পুরে।

রক্ষোরাজ বৈরী তাঁর; তোমরা অবলা,

কহ, কি লাগিয়া হেথা আইলা অকালে?

নির্ভয়-হৃদয়ে কহ; হনুমান আমি

রঘুদাস; দয়া-সিন্ধু রঘু-কুল-নিধি।

তব সাথে কি বিবাদ তাঁর, সুলোচনে!

কি প্রসাদ মাগ তুমি, কহ ত্বরা করি,

কি হেতু আইলা হেথা? কহ, জানাইব

তব আবেদন, দেবি, রাঘবের পদে।”

উত্তর করিলা সতী,—হায় রে, সে বাণী

ধ্বনিল হনুর কাণে বীণাবাণী যথা

মধুমাখা!—“রঘুবর, পতি-বৈরী মম;

কিন্তু তা বলিয়া আমি কভু না বিবাদি

তাঁর সঙ্গে! পতি মম বীরেন্দ্র-কেশরী,

নিজ-ভুজবলে তিনি ভুবন-বিজয়ী;

কি কাজ আমার যুঝি তাঁর রিপুসহ?

অবলা, কুলের বালা, আমরা সকলে।

কিন্তু ভেবে দেখ, বীর, যে বিদ্যুৎ-ছটা

রমে আঁখি, মরে নর, তাহার পরশে।

লও সঙ্গে, শূর, তুমি, ওই মোর দূতী।

কি যাচ্ঞা করি আমি রামের সমীপে,

বিবরিয়া কবে রামা, যাও ত্বরা করি।”

নৃ-মুণ্ড-মালিনী দূতী, নৃ-মুণ্ডমালিনী

আকৃতি, পশিলা ধনী অরি-দলমাঝে

নির্ভয়ে, চলিলা যথা গরুত্মতী তরী,

তরঙ্গ-নিকরে রঙ্গে করি অবহেলা,

অকূল-সাগর জলে ভাসে একাকিনী।

আগে আগে চলে হনূ পথ দেখাইয়া।

চমকিলা বীরবৃন্দ, হেরিয়া বামারে;

চমকে গৃহস্থ যথা ঘোর নিশাকালে

হেরি অগ্নিশিখা ঘরে! হাসিলা ভামিনী

মনে মনে। একদৃষ্টে চাহে বীর যত

দড়ে রড়ে, জড় সবে হ’য়ে স্থানে স্থানে।

বাজিল নূপুর পায়ে, কাঞ্চী কটিদেশে।

ভীমাকার শূল করে, চলে নিতম্বিনী

জরজরি সর্ব্বজনে কটাক্ষের শরে

তীক্ষ্ণতর। শিরোপরি শীর্ষকের চূড়া,

চন্দ্রক-কলাপময়, নাচে কুতূহলে;

ধক্‌ধকে রত্নাবলী কুচযুগমাঝে

পীবর! দুলিছে পৃষ্ঠে মণিময় বেণী,

কামের পতাকা যথা উড়ে মধুকালে।

নব মাতঙ্গিনী-গতি চলিলা রঙ্গিণী,

আলো করি দশদিশ, কৌমুদী যেমতি,

কুমুদিনী-সখী, ঝলে বিমল-সলিলে

কিম্বা ঊষা, অংশুময়ী গিরিশৃঙ্গ-মাঝে!

শিবিরে বসেন প্রভু রঘুচূড়ামণি;

করপুটে শূরসিংহ লক্ষ্মণ সম্মুখে,

পাশে বিভীষণ সখা, আর বীর যত,

রুদ্রকুল-সম তেজঃ, ভৈরব-মূরতি।

দেব-দত্ত অস্ত্রপুঞ্জ শোভে পিঠোপরি,

রঞ্জিত রঞ্জন রাগে, কুসুম-অঞ্জলি

আবৃত; পুড়িছে ধূপ ধূমি ধূপদানে;

সারি সারি চারিদিকে জ্বলিছে দেউটী।

বিস্ময়ে চাহেন সবে দেব-অস্ত্রপানে।

কেহ বাখানেন খড়্গ; চর্ম্ম-বর কেহ,

সুবর্ণ-মণ্ডিত যথা দিবা-অবসানে

রবির প্রসাদে মেঘ; তূণীর কেহ বা,

কেহ বর্ম্ম তেজোরাশি। আপনি সুমতি

ধরি ধনু-বরে করে, কহিলা রাঘব;—

“বৈদেহীর স্বপ্নস্বরে ভাঙিনু পিণাকে

বাহুবলে; এ ধনুকে নারি গুণ দিতে!

কেমনে লক্ষ্মণ ভাই, নোয়াইবে এরে?”

সহসা নাদিল ঠাট; জয়রাম ধ্বনি

উঠিল আকাশ-দেশে ঘোর-কোলাহলে,

সাগর-কল্লোল যথা; ত্রস্তে রক্ষোরথী,

দাশরথি পানে চাহি, কহিলা কেশরী;—

“চেয়ে দেখ, রাঘবেন্দ্র, শিবির-বাহিরে।

নিশীথে কি ঊষা আসি উত্তরিলা হেথা?”

বিস্ময়ে চাহিলা সবে শিবির-বাহিরে।

“ভৈরবীরূপিণী বামা” কহিলা নৃমণি;—

“দেবী কি দানবী, সখে, দেখ নিরখিয়া।

মায়াময় লঙ্কাধাম; পূর্ণ ইন্দ্রজালে;

কামরূপী তবাগ্রজ। দেখ ভাল করি;

এ কুহক তব কাছে অবিদিত নহে।

শুভক্ষণে রক্ষোবর, পাইনু তোমারে

আমি! তোমা বিনা, মিত্র, কে আর রাখিবে

এ দুর্ব্বল বলে, কহ, এ বিপত্তিকালে?

রামের চির-রক্ষণ তুমি রক্ষঃপুরে!”

হেনকালে হনূ সহ উত্তরিলা দূতী

শিবিরে। প্রণমি বামা কৃতাঞ্জলিপুটে,

(ছত্রিশ রাগিণী যেন মিলি একতানে)

কহিলা;—“প্রণমি আমি রাঘবের পদে,

আর যত গুরুজনে;—নৃ-মুণ্ডমালিনী

নাম মম; দৈত্যবালা প্রমীলা-সুন্দরী,

বীরেন্দ্রকেশরী ইন্দ্রজিতের কামিনী,

তাঁর দাসী।” আশীষিয়া, বীর দাশরথি

সুধিলা,—“কি হেতু দূতি! গতি, হেথা তব?

বিশেষিয়া কহ মোরে, কি কাজে তুষিব

তোমার ভর্ত্রিনী শুভে! কহ শীঘ্র করি।”

উত্তরিলা ভীমারূপী;—“বীরশ্রেষ্ঠ তুমি

রঘুনাথ; আসি যুদ্ধ কর তাঁর সাথে;

নতুবা ছাড়হ পথ; পশিবে রূপসী

স্বর্ণ-লঙ্কাপুরে আজি পূজিতে পতিরে।

বধেছ অনেক রক্ষঃ নিজ ভুজবলে;

রক্ষোবধূ মাগে রণ, দেহ রণ তারে,

বীরেন্দ্র! রমণী শত মোরা যাহে চাহ,

যুঝিবে সে একাকিনী। ধনুর্ব্বান ধর,

ইচ্ছা যদি নরবর; নহে চর্ম্ম অসি,

কিম্বা গদা; মল্লযুদ্ধে সদা মোরা রত।

যথারুচি কর দেব; বিলম্ব না সহে।

তব অনুরোধে সতী রোধে সখীদলে,

চিত্রবাঘিনীরে যেথা রোধে কিরাতিনী,

মাতে যবে ভয়ঙ্করী—হেরি মৃগপালে।”

এতেক কহিয়া রামা শিরঃ নোয়াইলা,

প্রফুল্ল কুসুম যথা (শিশির-মণ্ডিত)

বন্দে নোয়াইয়া শিরঃ মন্দ সমীরণে।

উত্তবিলা রঘুপতি;—শুন সুকেশিনি,

বিবাদ না করি আমি কভু অকারণে।

অরি মম রক্ষঃপতি; তোমরা সকলে

কুলবালা কুলবধূ, কোন্ অপরাধে

বৈরিভাব আচরিব তোমাদের সাথে?

আনন্দে প্রবেশ লঙ্কা নিঃশঙ্ক হৃদয়ে।

জনম রামের রামা, রঘুরাজকুলে

বীরেশ্বর; বীরপত্নী, হে সুনেত্রা দূতি!

তব ভর্ত্রী, বীরাঙ্গনা সখী তাঁর যত।

কহ তাঁরে, শতমুখে বাখানি ললনে,

তাঁর পতিভক্তি আমি, শক্তি, বীরপণা—

বিনা রণে পরিহার মাগি তাঁর কাছে।

ধন্য ইন্দ্রজিৎ! ধন্য প্রমীলা-সুন্দরি!

ভিখারী রাঘব, দূতি, বিদিত জগতে;

বনবাসী, ধনহীন বিধি-বিড়ম্বনে;

কি প্রসাদ, সুবদনে, (সাজে যা তোমারে)

দিব আজি? সুখে থাক আশীর্ব্বাদ করি!”

এতেক কহিয়া প্রভু কহিলা হনূরে;—

“দেহ ছাড়ি পথ, বলি! অতি সাবধানে,

শিষ্ট-আচরণে তুষ্ট কর বামাদলে।”

প্রণমিয়া সীতানাথে বাহিরিলা দূতী।

হাসিয়া কহিলা মিত্র বিভীষণ;—“দেখ,

প্রমীলার পরাক্রম, দেখ বাহিরিয়া

রঘুপতি! দেখ, দেব, অপূর্ব্ব কৌতুক!

না জানি এ বামাদলে কে আঁটে সমরে,

ভীমারূপী বীর্য্যবতী চামুণ্ডা যেমতি—

রক্তবীজ-কুল অরি?” কহিলা রাঘব;—

“দূতীর আকৃতি দেখি ডরিনু হৃদয়ে,

রক্ষোবর! যুদ্ধ-সাধ ত্যজিনু তখনি।

মূঢ় যে ঘাঁটায়, সখে, হেন বাঘিনীরে

চল, মিত্র, দেখি তব ভ্রাতৃ-পুত্ত্রবধূ।”

যথা দূর দাবানল পশিলে কাননে,

অগ্নিময় দশদিশ; দেখিলা সম্মুখে

রাঘবেন্দ্র, বিভারাশি নির্ধূম আকাশে,

সুবর্ণি বারিদ-পুঞ্জে! শুনিলা চমকি

কোদণ্ড, ঘর্ঘর ঘোর, ঘোড়া দড়বড়ি,

হুহুঙ্কার, কোষে বদ্ধ অসির ঝন্‌ঝনি।

সে রোলের সহ মিশি বাজিছে বাজনা,

ঝড় সঙ্গে বহে যেন কাকলি-লহরী!

উড়িছে পতাকা—রত্ন-সঙ্কলিত আভা;

মন্দগতি আস্কন্দিতে নাচে বাজি-রাজী;

বোলিছে যুঙ্ঘুরাবলী ঘুনু ঘুনু বোলে।

গিরি-চূড়াকৃতি ঠাট দাঁড়ায় দুপাশে

অটল, চলিছে মধ্যে বামাকুলদল।

উপত্যকাপথে যথা মাতঙ্গিনী-যূথ,

গরজে পূরিয়া দেশ, ক্ষিতি টলমলি।

সর্ব্ব-অগ্রে উগ্রচণ্ডা নৃমুণ্ড-মালিনী,

কৃষ্ণ-হয়ারূঢ়া ধনী, ধ্বজদণ্ড করে

হৈমময়; তার পাছে চলে বাদ্যকরী,

বিদ্যাধরী দল যথা, হায় রে ভূতলে

অতুলিত! বীণা, বাঁশী, মৃদঙ্গ, মন্দিরা-

আদি যন্ত্র বাজে মিলি মধুর নিক্কণে!

তার পাছে শূলপাণি বীরাঙ্গনা-মাঝে

প্রমীলা, তারার দলে শশিকলা যথা!

পরাক্রমে ভীমা বামা। খেলিছে চৌদিকে

রতন-সম্ভবা বিভা ক্ষণপ্রভা-সম।

অন্তরীক্ষে সঙ্গে রঙ্গে চলে রতিপতি

ধরিয়া কুসুম-ধনু, মুহুর্ম্মুহুঃ হানি

অব্যর্থ কুসুম-শরে! সিংহপৃষ্ঠে যথা

মহিষমর্দ্দিনী দুর্গা; ঐরারতে শচী

ইন্দ্রাণী; খগেন্দ্র রমা, উপেন্দ্র-রমণী,

শোভে বীর্য্যবর্তী সতী বড়বার পিঠে—

বড়বা, বামী-ঈশ্বরী, মণ্ডিত রতনে।

ধীরে ধীরে, বৈরিদলে যেন অবহেলি,

চলি গেলা বামাকুল। কেহ টঙ্কারিলা

শিঞ্জিনী; হুঙ্কারি কেহ উলঙ্গিলা অসি;

আস্ফালিলা শূলে কেহ; হাসিলা কেহ বা

অট্টহাসে টিট্‌কারি; কেহ বা নাদিলা,

গহন বিপিনে যথা নাদে কেশরিণী,

বীরমদে, কামমদে উন্মাদ ভৈরবী।

লক্ষ্য করি রক্ষোবরে, কহিলা রাঘব;—

“কি আশ্চর্য্য, নৈকষেয়! কভু নাহি দেখি,

কভু নাহি শুনি হেন, এ তিন ভুবনে!

নিশার স্বপন আজি দেখিনু কি জাগি?

সত্য করি কহ মোরে, মিত্র-রত্নোত্তম!

না পারি বুঝিতে কিছু; চঞ্চল হইনু

এ প্রপঞ্চ দেখি, সখে! বঞ্চোনা আমারে।

চিত্ররথ-রথিমুখে শুনিনু বারতা,

উরিবেন মায়াদেবী দাসের সহায়ে,

পাতিয়া এ ছল সতী পশিলা কি আসি

লঙ্কাপুরে? কহ বুধ, কার এ ছলনা?”

উত্তরিলা বিভীষণ;—"নিশার স্বপন

নহে এ, বৈদেহীনাথ, কহিনু তোমারে।

কালনেমী নামে দৈত্য বিখ্যাত জগতে

সুরারি, তনয়া তাঁর প্রমীলা সুন্দরী।

মহাশক্তি-অংশে দেব, জনম বামার,

মহাশক্তি-সম তেজে! কার সাধ্য আঁটে

বিক্রমে এ দানবীরে? দম্ভোলি নিক্ষেপী

সহস্রাক্ষে যে হর্য্যক্ষ বিমুখে সংগ্রামে,

সে রক্ষেন্দ্রে, রাঘবেন্দ্র, রাখে পদতলে

বিমোহিনী, দিগম্বরী যথা দিগম্বরে!

জগতের রক্ষা হেতু গড়িলা বিধাতা

এ নিগড়ে, যাহে বাঁধা মেঘনাদ বলী

মদকল কাল-হস্তী! যথা বারিধারা

নিবারে কানন-বৈরী ঘোর দাবানলে,

নিবারে সতত সতী প্রেম আলাপনে

এ কালাগ্নি! যমুনার সুবাসিত জলে,

ডুবি থাকে কাল-ফণী দুরম্ভ দংশক।

সুখে বসে বিশ্ববাসী, ত্রিদিবে দেবতা,

অতল পাতালে নাগ, নর নরলোকে।”

কহিলেন রঘুপতি;—“সত্য যা কহিলে,

মিত্রবর, রথিশ্রেষ্ঠ মেঘনাদ রথী।

না দেখি এ হেন শিক্ষা এ তিন ভুবনে!

দেখিয়াছি ভৃগুরামে, ভৃগুমান্ গিরি-

সদৃশ অটল যুদ্ধে। কিন্তু শুভক্ষণে

তব ভ্রাতৃপুত্ত্র, মিত্র, ধনুর্ব্বাণ ধরে!

এবে কি করিব, কহ, রক্ষঃকুলমণি!

সিংহ সহ সিংহী আসি মিলিল বিপিনে;

কে রাখে এ মৃগপালে? দেখ হে চাহিয়া,

উথলিছে চারিদিকে ঘোর কোলাহলে

হলাহল-সহ সিন্ধু! নীলকণ্ঠ যথা

(নিস্তারিণী-মনোহর) নিস্তারিলা ভবে,

নিস্তার এ বলে, সখে, তোমারি রক্ষিত।

ভেবে দেখ মনে, শূর, কালসর্প তেজে

তবাগ্রজ, বিষদন্ত তার মহাবলী

ইন্দ্রজিৎ। যদি পারি ভাঙ্গিতে প্রকারে

এ দন্তে, সফল তবে মনোরথ হবে।

নতুবা এসেছি মিছে সাগরে বাঁধিয়া,

এ কনক লঙ্কাপুরে, কহিনু তোমারে।”

কহিলা সৌমিত্রি-শূর শিরঃ নোয়াইয়া

ভ্রাতৃপদে;—“কেন আর ডরিব রাক্ষসে

রঘুপতি! সুরনাথ সহায় যাহার,

কি ভয় তাহার, প্রভু, এ ভবমণ্ডলে?

অবশ্য হইবে ধ্বংস কালি মোর হাতে

রাবণি। অধর্ম্ম কোথা কবে জয়লাভে?

অধর্ম্ম-আচারী এই রক্ষঃকুলপতি;

তার পাপে হতবল হবে রণভূমে

মেঘনাদ; মরে পুত্র জনকের পাপে।

লঙ্কার পঙ্কজ-রবি যাবে অস্তাচলে

কালি, কহিলেন চিত্ররথ সুররথী।

তবে এ ভাবনা, দেব, কর কি কারণে?”

উত্তরিলা বিভীষণ,— “সত্য যা কহিলে,

হে বীরকুঞ্জর! যথা ধর্ম্ম জয় তথা।

নিজ পাপে মজে, হায়, রক্ষঃকুলপতি!

মরিবে তোমার শরে স্বরীশ্বর-অরি

মেঘনাদ, কিন্তু তবু থাক সাবধানে।

মহাবীর্য্যবতী এই প্রমীলা-দানবী;

নৃমুণ্ড-মালিনী, যথা নৃ-মুণ্ড-মালিনী

রণপ্রিয়া! কালসিংহী পশে যে বিপিনে,

তার পাশে বাস যার, সতর্ক সতত

উচিত থাকিতে তার। কখন, কে জানে,

আসি আক্রমিবে ভীমা, কোথায় কাহারে!

নিশায় পাইলে রক্ষা, মারিব প্রভাতে।”

কহিলেন রঘুমণি মিত্র বিভীষণে;—

“কৃপা করি, রক্ষোবর, লক্ষ্মণেরে ল’য়ে,

দুয়ারে দুয়ারে সখে, দেখ সেনাগণে;

কোথায় কে জাগে আজি? মহাক্লান্ত সবে

বীরবাহু সহ রণে! দেখ চারিদিকে—

কি করে অঙ্গদ, কোথা নীল মহাবলী;

কোথা বা সুগ্রীব মিতা? এ পশ্চিম-দ্বারে

আপনি জাগিব আমি ধনুর্ব্বাণ হাতে!”

“যে আজ্ঞা” বলিয়া শূর বাহিরিলা লয়ে

ঊর্ম্মিলা-বিলাসী শূরে, সুরপতি-সহ

তারক সূদন যেন শোভিলা দুজনে,

কিম্বা ত্বিষাম্পতি সহ ইন্দু সুধানিধি!

লঙ্কার কনকদ্বারে উতরিলা সতী

প্রমীলা। বাজিল শিঙ্গা, বাজিল দুন্দুভি

ঘোর রবে। গরজিল ভীষণ রাক্ষস,

প্রলয়ের মেঘ কিম্বা করিযূথ যথা।

রোষে বিরূপাক্ষ রক্ষঃ প্রক্ষ্বেড়ন করে,

তালজঙ্ঘা—তাল-সম-দীর্ঘ গদাধারী,

ভীমমূর্ত্তি প্রমত্ত! হ্রেষিল অশ্বাবলী।

নাদে গজ, রথচক্র ঘুরিল ঘর্ঘরে,

দুরন্ত কৌন্তিককুল কুম্ভে আস্ফালিল;

উড়িল নারাচ, আচ্ছাদিয়া নিশানাথে।

অগ্নিময় আকাশ পূরিল কোলাহলে;

যথা যবে ভূকম্পনে, ঘোর বজ্রনাদে,

উগরে আগ্নেয়-গিরি, অগ্নি-স্রোতোরাশি

নিশীথে! আতঙ্কে লঙ্কা উঠিলা কাঁপিয়া।

উচ্চৈঃস্বরে কহে চণ্ডা নৃ-মুণ্ডমালিনী,

“কাহারে হানিস্ অস্ত্র, ভীরু! এ আঁধারে?

নহি রক্ষোরিপু মোরা, রক্ষঃকুলবধূ,

খুলি চক্ষু দেখ চেয়ে।” অমনি দুয়ারী

টানিল হুড়কা ধরি হড়হড়হড়ে!

বজ্রশব্দে খুলে দ্বার। পশিলা সুন্দরী

আনন্দে কনকলঙ্কা জয় জয় রবে।

যথা অগ্নিশিখা দেখি পতঙ্গ-আবলী

ধায় রঙ্গে, চারিদিকে আইল ধাইয়া

পৌরজন, কুলবধূ দিলা হুলাহুলি,

বরষি কুসুমাসারে; যন্ত্রধ্বনি করি

আনন্দে বন্দিলা বন্দী। চলিলা অঙ্গন

আগ্নেয় তরঙ্গ যথা নিবিড় কাননে।

বাজাইল বীণা, বাঁশী, মুরজ, মন্দিরা

বাদ্যকরী বিদ্যাধরী, হ্রেষি আস্কন্দিল

হয়বৃন্দ; ঝন্‌ঝনিল কৃপাণ পিধানে।

জননীর কোলে শিশু জাগিল চমকি।

খুলিয়া গবাক্ষ কত রাক্ষস-যুবতী,

নিরখিয়া দেখি সবে মুখে বাখানিলা

প্রমীলার বীরপণা। কত ক্ষণে বামা,

উতরিলা প্রেমানন্দে পতির মন্দিরে—

মণিহারা ফণী যেন পাইল সে ধনে!

অরিন্দম ইন্দ্রজিৎ কহিলা কৌতুকে;—

“রক্তবীজে বধি বুঝি, এবে, বিধুমুখি!

আইলা কৈলাসধামে? যদি আজ্ঞা কর,

পড়ি পদতলে তবে; চিরদাস আমি,

তোমার, চামুণ্ডে!” হাসি, কহিলা ললনা;—

“ও পদ-প্রসাদে নাথ, ভব-বিজয়িনী

দাসী, কিন্তু মনমথে না পারি জিনিতে।

অবহেলি শরানলে; বিরহ অনলে

(দুরূহ) ডরাই সদা, তেঁই সে আইনু,

নিত্য নিত্য মন যারে চাহে, তাঁর কাছে।

পশিল সাগরে আসি রঙ্গে তরঙ্গিণী।”

এতেক কহিয়া সতী, প্রবেশি মন্দিরে,

ত্যজিলা বীর-ভূষণে; পরিলা দুকূলে

রতনময় আঁচল, আঁটিয়া কাঁচলি

পীন-স্তনী; শ্রোণিদেশে ভাতিল মেখলা।

দুলিল হীরার হার, মুকুতা-আবলী

উরসে; জ্বলিল ভালে তারা গাঁথা সিঁথি,

অলকে মণির আভা, কুণ্ডল শ্রবণে।

পরি নানা আভরণ সাজিলা রূপসী।

ভাসিলা আনন্দনীরে রক্ষঃ-চূড়ামণি

মেঘনাদ; স্বর্ণাসনে বসিলা দম্পতী।

গাইল গায়ক-দল; নাচিল নর্তকী;

বিদ্যাধর বিদ্যাধরী ত্রিদশ-আলয়ে

যথা; ভুলি নিজ দুঃখ, পিঞ্জর মাঝারে,

গায় পাখী; উথলিল উৎস কলকলে,

সুধাংশুর অংশু-স্পর্শে যথা অম্বুরাশি।

বহিল বসন্তানিল মধুর সুস্বনে,

যথা যবে ঋতুরাজ, বনস্থলী সহ,

বিরলে করেন কেলি, মধু মধুকালে।

হেথা বিভীষণসহ সৌমিত্রি কেশরী,

চলিল উত্তরদ্বারে; সুগ্রীব সুমতি

জাগেন আপনি তথা, বীরদলসাথে,

বিন্ধ্য-শৃঙ্গ-বৃন্দ যথা—অটল সংগ্রামে!

পূরব দুয়ারে নীল, ভৈরব-মূরতি;

বৃথা নিদ্রাদেবী তথা সাধিছেন তারে।

দক্ষিণ দুয়ারে ফিরে কুমার অঙ্গদ,

ক্ষুধাতুর হরি যথা আহার সন্ধানে,

কিম্বা নন্দী শূলপাণি কৈলাস-শিখরে।

শত শত অগ্নিরাশি জ্বলিছে চৌদিকে

ধূমশূন্য; মধ্যে লঙ্কা, শশাঙ্ক যেমনি

নক্ষত্রমণ্ডল-মাঝে স্বচ্ছ নভঃস্থলে।

চারি দ্বারে বীরব্যূহ জাগে; যথা যবে

বারিদ প্রসাদে পুষ্ট শস্যকুল বাড়ে

দিন দিন, উচ্চ মঞ্চ গড়ি ক্ষেত্রপাশে,

তাহার উপরে কৃষী জাগে সাবধানে,

খেদাইয়া মৃগযূথে, ভীষণ মহিষে,

আর তৃণজীবি জীবে। জাগে বীরব্যূহ,

রাক্ষসকুলের ত্রাস, লঙ্কার চৌদিকে।

হৃষ্টমতি দুইজন চলিলা ফিরিয়া,

যথায় শিবিরে বীর ধীর দাশরথি।

হাসিয়া কৈলাসে উমা কহিলা সম্ভাষি

বিজয়ারে;—“লঙ্কাপানে দেখ লো চাহিয়া

বিধুমুখি! বীরবেশে পশিছে নগরে

প্রমীলা, সঙ্গিনীদল সঙ্গে বরাঙ্গনা।

সুবর্ণ-কুঞ্চুক-বিভা উঠিছে আকাশে!

সবিস্ময়ে, দেখ, ওই দাঁড়ায়ে নৃমণি

রাঘব, সৌমিত্রি, মিত্র বিভীষণ আদি

বীর যত! হেন রূপ কার নর-লোকে?

সাজিনু এ বেশে আমি নাশিতে দানবে

সত্যযুগে। ওই শোন ভয়ঙ্কর ধ্বনি!

শিঞ্জিনী আকর্ষি রোষে টঙ্কারিছে বামা

হুঙ্কারে। বিকট ঠাট কাঁপিছে চৌদিকে!

দেখ লো নাচিছে চূড়া কবরী-বন্ধনে।

তুরঙ্গম আস্কন্দিতে উঠিছে পড়িছে

গৌরাঙ্গী, হায় রে, মরি, তরঙ্গ হিল্লোলে

কনক-কমল যেন মানস-সরসে!”

উত্তরে বিজয়া সখী;—“সত্য যা কহিলে

হৈমবতি! হেন রূপ কার নরলোকে?

জানি আমি বীর্য্যবতী দানবনন্দিনী

প্রমীলা, তোমার দাসী; কিন্তু ভাব মনে,

কিরূপে আপন কথা রাখিবে ভবানি?

একাকী জগৎ-জয়ী ইন্দ্রজিৎ তেজে;

তা সহ মিলিল আসি প্রমীলা; মিলিল

বায়ুসখী অগ্নিশিক্ষা সে বায়ুর সহ!

কেমনে রক্ষিবে রামে কহ, কাত্যায়নি!

কেমনে লক্ষ্মণ-শূর নাশিবে রাক্ষসে?”

ক্ষণকাল চিত্তি তবে কহিলা শঙ্করী;—

“মম অংশে জন্ম ধরে প্রমীলা রূপসী,

বিজয়ে! হরিব তেজঃ কালি তার আমি।

রবিচ্ছবি-করস্পর্শে উজ্জ্বল যে মণি,

আভাহীন হয় সে লো, দিবা-অবসানে;

তেমনি নিস্তেজা কালি করিব বামারে।

অবশ্য লক্ষ্মণ-শূর নাশিবে সংগ্রামে

মেঘনাদে! পতিসহ আসিবে প্রমীলা

এ পুরে; শিবের সেবা করিবে রাবণি;

সখী করি প্রমীলারে তুষিব আমরা।”

এতেক কহিয়া সতী পশিলা মন্দিরে।

মৃদুপদে নিদ্রাদেবী আইলা কৈলাসে;

লভিলা কৈলাসবাসী কুসুম-শয়নে

বিরাম; ভবের ভালে দীপি শশিকলা,

উজলিল সুখধাম রজোময় তেজে।

ইতি শ্রীমেঘনাদবধ কাব্যে সমাগমো নাম

তৃতীয়ঃ সর্গঃ।

তৃতীয় সর্গ।

পতিবিরহে ইত্যাদি—প্রথম সর্গে মেঘনাদ প্রমীলার নিকট হইতে বিদায় লইয়া লঙ্কায় গমন করেন এবং রাবণ কর্ত্তৃক সেনাপতিত্বে অভিষিক্ত হইয়া ফিরিয়া আসিতে পারিলেন না। প্রমীলা পতির বিরহে উতলা হইয়া উঠিলেন।

প্রমোদ উদ্যান—Pleasure garden.

অশ্রু-আঁখি—with eyes full of tears.

অধরে মুরলী—with a flute in the mouth.

কে না জানে......... তাপে বনস্থলী—The attendants pale with sorrow for their mistress Pramila afflicted with separation from her husband Maghanada are compared to the pale, flowers in a garden scorched with sun at the end of the spring season. The spring season stands for Meghanada, the garden for Pramila, and the flowers for the companions of Pramila.

বসন্তসৌরভা—having the fragrance of the spring season.

তিমির যামিনী—dark night. ব্যাজ—delay.

বসন্তসখা—friend or companion of spring.

সীমন্তিনী—one who has the partition of the hair of the head; i.e. a woman who has her hair always parted.

সীমন্তিনি—case of address.

অভেদ্য—Impenetrable.

তাঁরে আঁটিবে—will cope with him.

সরস কুসুম—Juicy flowers: Flowers of vigorous growth. চিকণিয়া—making fine.

প্রিয়গলে—round the neck of the husband.

দাম—wreath; garland.

বিজয়ী রথচূড়ায়—on the top of the chariot of a conqueror.

পাঁতি—row line; series.

মর্ম্মরিছে—are making a murmuring sound.

মুক্তিল—মুক্তাফল দিয়া অলঙ্কৃত করিল; adorned, as it were, with pearl beads.

শিশির নীরে—with dew water. The drops of tears are compared to drops of dews.

মিহিরবিরহে—owing to separation from the sun.

পোড়ানয়নে—to these miserable eyes.

অবচয়ি—plucking

স্বজনী—Feminine form of স্বজন।

স্বজন—friend; relative.

অলঙ্ঘ্য সাগরসম—like a sea which cannot be crossed.

চমূ—Army.

গজপতিগতি—having the gait of the lord of elephants. রোষাবেশে—out of anger.

দেবদত্ত—is the name of Arjuna’s conch.

উলঙ্গিয়া—making naked; unsheathing; drawring out of the sheath.

কার্ম্মুক টঙ্কারি—sounding the bow string with a twang.

আস্ফালি—parading. কঞ্চুক—armour.

ঊর্ধ্বকর্ণে—with ears erect.

ঘনপতি—The lord of clouds. অলিন্দ—Verandah.

কমলে কণ্টকময় যথা মৃণাল—A lotus is very soft, beautiful and charming, but its stalk is full of thorns. So Pramila and her followers are tender, beautiful and charming, but their hands are armed with dreadful weapons.

দানবদলনীপদ্মপদযুগ—the pair of the lotus-like feet of the destroyer of the Danavas: the pair of the lotus-like feet of Kali.

দিবে—in the Heaven.

কাদম্বিনী—a long line of clouds.

অঞ্জন—eye-paint; collyrium.

নয়নরঞ্জিকা—charming to the eyes; gratifying to the eyes.

নিষঙ্গ—quiver of arrows.

হায় রে, বর্ত্তুল যথা রম্ভাবন আভা—The thighs of the female soldiers were charmingly round; and they looked like the trunks of plantain trees. The place where the female soldiers were, looked like a beautiful garden of plantain trees.

হৈমময় কোষ—Sheath made of gold.

উন্মাদ—haughty; insolent.

বড়বা—means a mare. But here it is a proper name.

বামী—a mare.

বাড়বাগ্নি-শিখা—the flame of a submarine fire.

বিকট—Dreadful. কটক—army.

দানবকুলসম্ভবা—born of the Danava family.

দ্বিষৎশোণিতনদ—the stream of the blood of enemies.

ভুজ-মৃণাল—hands looking like lotus stalks.

বীরপণা—heroism; bravery.

যথা বায়ুসখাসহ দাবানলগতি দুর্ব্বার, চলিলা সতী পতির উদ্দেশে—The devoted wife with the force of the irresistible forest-fire went in search of her husband accompanied, as it were, by the comrade, wind.

ধূমপুঞ্জ—masses of smoke. The masses of dust surrounding Pramila are compared to masses of smoke surrounding the flame of fire. Pramila is compared to the flame of fire.

দুর্দ্ধর্ষ—Irresistible. ময়াবী—Juggler, magician.

কোন যোধ সাধা—কোন্ যোধের সাধ্য; what fighter is able.

বলীন্দ্র—বলিশ্রেষ্ঠ; the best among the strong.

পাবনি—the son of Pavana Deva.

খর্পর—a pot to receive the blood of the victim at a sacrifice.
খণ্ডা―a sword.

মুণ্ডমালী—The goddess Kali, wearing the মালা or garland of cut-off heads.

শশিকলাসমরূপে—like the phase of the moon in beauty.

প্রেমপাশে—with the tie of love.

সৌদামিনী—lightning.

অঞ্জনানন্দন—Hanuman, the son of Anjana.

শিলাবন্ধে—with the embankment made of stones.

যে বিদ্যুৎ ছটা... তাহার পরশে—Man dies of the contact with that lightning, the flash of which charms the eye. Pramila reminds Hanuman that they were indeed charming to the eyes, and yet destructive, like the flash of lightning.

নৃমুণ্ডমালিনী দূতী—The name of the female was Nrimundamalini.

নৃমুণ্ডমালিনী আকৃতি—whose appearance is like that of the goddess Kali wearing the garland of human heads.

গরুত্মতী—winged when applied to তরী (boat) it means “with sails spread.”

তরঙ্গনিকর—the series of waves.

ভামিনী—a passionate woman.

কাঞ্চী—a woman’s girdle or zone with tinkling bells. কটাক্ষের শর—the arrows of sideglances.

চন্দ্রক—the eye in a pea-cock’s tail.

কলাপ—assemblage; multitude. The use of the word is appropriate here as it also means a pea-cock’s tail.

চন্দ্রকলাপময়—adorned with an assemblage of the eyes in a pea-cock’s tail.

কুচযুগ মাঝে পীবর—পীবর কুচযুগ মাঝে—in the midst of the plump and prominent breasts.

কুমুদিনীসখী—moon light which is spoken of as the companion of the water-lily.

অংশুময়ী—full of rays; brilliant.

রুদ্রকুলসমতেজঃ—having the vigour of the race of the Rudras.

ভৈরবমূরতি—having a dreadful appearance.

দেবদত্ত—granted by gods.

রঞ্জনরাগে—with the dye of red sandal.

দেউটী—lamps. পিষ্ঠ—altar.

সুবর্ণমণ্ডিত...মেঘ—adorned with gold like clouds adorned with the light of the sun towards the close of day. প্রসাদ—light.

পিনাক—the bow of Siva. ঠাট—army.

ত্রস্তে—in a hurry. রক্ষোরথী—is here Bibhisana.

কামরূপী—able to assume any shape at will.

চিররক্ষণ—protector for ever.

বিশেষিয়া—giving details; in detail.

ভর্ত্রিণী—mistress. শুভে—সম্বোধন পদ; from the base শুভা; Oh blessed. চিত্রবাঘিনী—striped tigress; dappled tigress.

কিরাতিনী—huntress.

বামা—woman. সুকেশিনি—beautilul-haired; the base is সুকেশিনী।

রঘুরাজকুলে বীরেশ্বর—বীরেশ্বর রঘুরাজকুলে; in the family of King Raghu, the greatest of the heroes. সুনেত্রা—charming-eyed.

বাখানি—praise. পরিহার—averting (a danger).

বিধি-বিড়ম্বনে—through the disfavour of the God.

প্রসাদ—food offered to a god; food offered to any superior. Hence any offering.

ঘাঁটায়—excites; pokes. নির্ধূম—smokeless.

সুবর্ণি বারিদপুঞ্জে—dyeing the masses of clouds with the colour of gold.

কোদণ্ড—bow-stick.

কাকলি-লহরী—the waves of the music of birds.

রত্নসঙ্কলিত আভা—splendour acquired from gem.

মন্দগতি—adj. qualifying “বাজিরাজী”; moving slowly. আস্কন্দিতে—to fight.

আস্কন্দন—means “fighting”.

কৃষ্ণহয়ারুঢ়া—mounted on a black horse.

হৈমময়—হেমময়; made of gold. It qualifies the noun “ধ্বজদণ্ড”।

রতনসম্ভবা বিভা ক্ষণ প্রভাসম—the splendour issuing out of jewels, like lightning.

মহিষমর্দ্দিনী—the killer of Mahisasura.

খগেন্দ্র—the king of birds, i.e. Garuda.

বামী-ঈশ্বরী—the mistress among the mares.

শিঞ্জিনী—a bow-string.

ভৈরবী—dreadful. It qualifies “কেশরিণী”.

প্রপঞ্চ—(1) phenomenon, দৃশ্য; (2) illusions, মায়া; (3) opposition, বৈপরীত্য; (4) বঞ্চনা, deception.

উরিবেন মায়াদেবী দাসের সহায়ে—the goddess Maya will come down in aid of her servant. বুধ—wise man.

হর্য্যক্ষ—lion.

রক্ষেন্দ্রে—the greatest Rakshasa, i.e. Meghanada. বিমোহিনী—charming.

রাখে পদতলে—(In the case of Digambari) keeps under her feet. (In the case of Pramila) keeps under control.

Digambari—Kali whose অম্বর or cloth is দিক্‌ or quarters; i.e. who is naked.

নিগড়—chain. Pramila is so called.

মদকল—speaking inarticulately like a drunken person. কাল-হস্তী—deadly elephant.

কাননবৈরী—enemy of forests. Forest fire (দাবানল) is so called.

ভৃগুমান্—having a precipice; precipitous.

নীলকণ্ঠ—Siva.

রক্ষিত—one protected or sheltered by you

কালসর্প তেজে তবাগ্রজ—your elder brother like a deadly snake in vigour.

বিষদন্ত—fang; poisonous tooth.

প্রকারে—some how.

জয়লাভে—জয় লাভ করে, gains victory.

হতবল—(destitute of strength.

স্বরীশ্বর অরি—the অরি or enemy of the ঈশ্বর or lord of স্বর or Heaven—Indrajit who is the enemy of Indra.

দুয়ারে দুয়ারে—from door to door.

তারক-সূদন—Karttikeya, the killer of Tarakasura.

ত্বিষাম্পতি—the sun.

সুধানিধি—the sea or the Reservoir of nectar.

রোষে—is angry. বিরূপাক্ষ রক্ষঃ—the Rakshasa named Birupaksha.

প্রক্ষ্বেড়ন—a kind of iron arrow called নারাচ।

তালজঙ্ঘা—adj. qualifying রক্ষঃ। Having a জঙ্ঘা (shank, the leg below the knee) like a palm. তালসমদীর্ঘ গদাধারী—armed with a weapon as tall as the palm tree.

ভীমমূর্ত্তি—Whose appearance is fierce.

প্রমত্ত—excited; maddened.

কৌন্তিক—a soldier armed with a কুন্ত or শূল (spear). চণ্ডী—dreadful.

হুলাহুলি—is perhaps the inarticulate sound উলু।

বন্দী—court musician, আগ্নেয় তরঙ্গ—fiery Waves; waves of fire.

হ্রেষি—neighing

আস্কন্দিল—danced. পিধান—sheath.

অরিন্দম—the subduer of enemies.

মনমথ—Manatha, or Madan

শরানল—the fire of arrows.

বিরহ-অনল—the fire of separation.

রতনময় আঁচল—adj. qualifying দুকুল, having the skirts adorned with jewels.

কাঁচলি—Bodice or short jacket for women.

পীনস্তনী—having plump and prominent breasts.

শ্রোণি—নিতম্ব, buttocks. মেখলা—girdle.

অলক—a curl of hair; a ringlet.

কুণ্ডল—ear-ring. শ্রবণ—ear.

উৎস—fountain; spring.

কলকলে—with a babbling sound.

মধু মধুকাল—sweet spring.

বিন্ধ্যশৃঙ্গ-বৃন্দ—the group of the summits of the Vindhyas.

হরি—lion.

শূলপাণি—who has শূল in his hands.

তৃণজীবিজীব—animals living on grass.

বীরব্যূহ—the circle of heroes.

সঙ্গিনীদল সঙ্গে বরাঙ্গনা—বরাঙ্গনা সঙ্গিনীদল সঙ্গে—with very beautiful women as her companions.

হেন রূপ কার নর-লোকে—who has got such a beauty in the world of men as Pramila has?

কবরী-বন্ধনে—on the chignon.

গৌরাঙ্গী—having a body of fair complexion.

কনক-কমল—golden lotus.

মানস সরসে—in the Manasarwar.

রবিচ্ছবিকরস্পর্শ—the touch of the ray of sun light. ছবি—means ‘brightness’ Here it means ‘light’

দীপি—shining. উজলিল—brightened.

সুখধাম—in Kailas

রজোময়—is it রজতময়, silvery?

দ্বিতীয় সর্গ

দ্বিতীয় সর্গ

অস্তে গেলা দিনমণি; আইলা গোধুলি,—

একটী রতন ভালে। ফুটিলা কুমুদী;

মুদিলা সরসে আঁখি বিরসবদনা

নলিনী; কূজনি পাখী পশিল কূলায়ে।

গোষ্ঠ-গৃহে গাভীবৃন্দ ধায় হাম্বা রবে।

আইলা সুচারু-তারা শশীসহ হাসি,

শর্ব্বরী; সুগন্ধবহ বহিল চৌদিকে,

সুস্বনে সবার কাছে কহিয়া বিলাসী,

কোন্ কোন্ ফুল চুম্বি কি ধন পাইলা।

আইলেন নিদ্রা দেবী, ক্লান্ত শিশুকুল

জননীর ক্রোড়-নীড়ে লভয়ে যেমতি

বিরাম, ভূচরসহ জলচর-আদি

দেবীর চরণাশ্রমে বিশ্রাম লভিলা।

উতরিলা শশিপ্রিয়া ত্রিদশ-আলয়ে।

বসিলেন দেবপতি দেবসভা-মাঝে,

হৈমাসনে; বামে দেবী পুলোম-নন্দিনী

চারুনেত্রা। রাজছত্র, মণিময় আভা,

শোভিল দেবেন্দ্র-শিরে। রতনে খচিত

চামর যতনে ধরি, ঢুলায় চামরী।

আইলা সুসমীরণ, নন্দন কানন-

গন্ধ-মধু বহি রঙ্গে। বাজিল চৌদিকে

ত্রিদিব-বাদিত্র। ছয় রাগ, মুর্ত্তিমতী

ছত্রিশ রাগিণী সহ, আসি আরম্ভিলা

সঙ্গীত। উর্ব্বশী, রম্ভা সুচারুহাসিনী,

চিত্রলেখা, সুকেশিনী মিশ্রকেশী, আসি

নাচিলা, শিঞ্জিতে রঞ্জি দেব-কুল-মন!

যোগায় গন্ধর্ব্ব স্বর্ণ পাত্রে সুধারসে!

কেহ বা দেব-ওদন; কুঙ্কুম, কস্তুরী,

কেশর বহিছে কেহ; চন্দন কেহ বা;

সুগন্ধ মন্দার-দাম গাঁথি আনে কেহ!

বৈজয়ন্ত-ধামে সুখে ভাসেন বাসব

ত্রিদিব-নিবাসী সহ; হেনকালে তথা,

রূপের আভায় আলো করি সুর-পুরী,

রক্ষঃ-কুল-রাজলক্ষ্মী আসি উতরিলা।

সসম্ভ্রমে প্রণমিলা রমার চরণে

শচীকান্ত। আশীষিয়া হৈমাসনে বসি,

পদ্মাক্ষী পুণ্ডরীকাক্ষ-বক্ষোনিবাসিনী

কহিলা;—“হে সুরপতি, কেন যে আইনু

তোমার সভায় আজি, শুন মন দিয়া।”

উত্তর করিলা ইন্দ্র;—“হে বারীন্দ্রসুতে!

বিশ্বরমে, এ বিশ্বে ও রাঙা পা-দুখানি

বিশ্বের আকাঙ্ক্ষা মা গো! যার প্রতি তুমি,

রূপা করি, কৃপাদৃষ্টি কর, রূপাময়ি,

সফল জনম তার। কোন্ পুণ্যফলে,

লভিল এ সুখ দাস, কহ, মা, দাসেরে?”

কহিলেন পুনঃ রমা;—“বহুকালাবধি

আছি আমি, সুরনিধি, স্বর্ণলঙ্কাধামে।

বহুবিধ রত্নদানে, বহু যত্ন করি,

পূজে মোরে রক্ষোরাজ। হায়, এতদিনে

বাম তার প্রতি বিধি! নিজ কর্ম্ম-দোষে,

মজিছে সবংশে পাপী; তবুও তাহারে

না পারি ছাড়িতে, দেব! বন্দী যে, দেবেন্দ্র,

কারাগার-দ্বার নাহি খুলিলে কি কভু

পারে সে বাহির হ’তে? যতদিন বাঁচে

রাবণ, থাকিব আমি বাঁধা তার ঘরে।

মেঘনাদ নামে পুত্ত্র, হে বৃত্রবিজয়ি,

রাবণের, বিলক্ষণ জান তুমি তারে।

একমাত্র বীর সেই আছে লঙ্কাধামে

এবে, আর যত, হত এ সমরে।

বিক্রম-কেশরী শূর আক্রমিবে কালি

রামচন্দ্রে, পুনঃ তারে সেনাপতি-পদে

বরিয়াছে দশানন। দেব-কুল-প্রিয়

রাঘব; কেমনে তারে রাখিবে, তা দেখ।

নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করি, আরম্ভিলে

যুদ্ধ দম্ভী মেঘনাদ, বিষম সঙ্কটে

ঠেকিবে বৈদেহীনাথ, কহিনু তোমারে।

অজেয় জগতে মন্দোদরীর নন্দন,

দেবেন্দ্র! বিহঙ্গকুলে বৈনতেয় যথা

বল-জ্যেষ্ঠ, রক্ষঃকুলশ্রেষ্ঠ শূরমণি।”

এতেক কহিয়া রমা কেশব-বাসনা

নীরবিলা; আহা মরি, নীরবে যেমতি

বীণা, চিত্ত বিনোদিয়া সুমধুর নাদে,

ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী আদি যত।

শুনি কমলার বাণী, ভুলিলা সকলে

স্বকর্ম্ম; বসন্তকালে পাখীকুল যথা,

মুঞ্জরিত কুঞ্জে, শুনি পিকবর ধ্বনি।

কহিলেন স্বরীশ্বর;—“এ ঘোর বিপদে,

বিশ্বনাথ বিনা, মাতঃ, কে আর রাখিবে

রাঘবে? দুর্ব্বার রণে রাবণ-নন্দন।

পন্নগ-অশনে নাগ নাহি ডরে যত,

ততোধিক ডরি তারে আমি। এ দম্ভোলি,

বৃত্রাসুর শিরঃ চূর্ণ যাহে, বিমুখয়ে

অস্ত্র-বলে মহাবলী; তেঁই এ জগতে

ইন্দ্রজিৎ নাম তার। সর্ব্বশুচি-বরে,

সর্ব্বজয়ী বীরবর। দেহ আজ্ঞা দাসে,

যাই আমি শীঘ্রগতি কৈলাস-সদনে।”

কহিলা উপেন্দ্র-প্রিয়া বারীন্দ্র-নন্দিনী;—

“যাও তবে, সুরনাথ যাও ত্বরা করি।

চন্দ্রশেখরের পদে, কৈলাস শিখরে,

নিবেদন কর, দেব, এ সব বারতা।

কহিও, সতত কাঁদে বসুন্ধরা-সতী,

না পারি সহিতে ভার; কহিও, অনন্ত

ক্লান্ত এবে। না হইলে নির্ম্মূল সমূলে

রক্ষঃপতি, ভবতল রসাতলে যাবে!

বড় ভাল বিরূপাক্ষ বাসেন লক্ষ্মীরে।

কহিও, বৈকুণ্ঠপুরী বহুদিন ছাড়ি

আছয়ে সে লঙ্কাপুরে, কত যে বিরলে

ভাবয়ে সে অবিরল, একবার তিনি,

কি দোষ দেখিয়া, তারে না ভাবেন মনে?

কোন্ পিতা দুহিতারে পতি-গৃহ হ’তে

রাখে দূরে—জিজ্ঞাসিও বিজ্ঞ জটাধরে?

ত্র্যম্বকে না পাও যদি, অম্বিকার পদে

কহিও এসব কথা।” এতেক কহিয়া,

বিদায় হইয়া চলি গেলা শশিমুখী

হরিপ্রিয়া। অনম্বর-পথে সুকেশিনী

কেশব-বাসনা দেবী গেলা অধোদেশে।

সোণার প্রতিমা যথা বিমল-সলিলে

ডুবে তলে, জলরাশি উজলি স্বতেজে।

আনিলা মাতলি রথ; চাহি শচী-পানে

কহিলেন শচীকান্ত মধুর বচনে

একান্তে;—“চলহ, দেবি, মোর সঙ্গে তুমি;

পরিমল সুধাসহ পবন বহিলে,

দ্বিগুণ আদর তার! মৃণালের রুচি

বিকচ কমল গুণে, শুনলো ললনে!”

শুনি প্রণয়ীর বাণী, হাসি নিতম্বিনী,

ধরিয়া পতির কর, আরোহিলা রথে।

স্বর্গ-হৈম দ্বারে রথ উত্তরিল ত্বরা।

আপনি খুলিল দ্বার মধুর নিনাদে

অমনি! বাহিরি বেগে, শোভিল আকাশে

দেবযান; সচকিতে জগৎ জাগিলা,

ভাবি রবিদেব বুঝি উদয়-অচলে

উদিলা। ডাকিল ফিঙা, আর পাখী যত

পূরিল নিকুঞ্জ-পুঞ্জ প্রভাতী সঙ্গীতে।

বাসরে কুসুম-শয্যা ত্যজি লজ্জাশীলা

কুলবধূ, গৃহকার্য্য উঠিলা সাধিতে।

মানস-সকাশে শোভে কৈলাস-শিখরী

আভাময়; তার শিল্পে ভবের ভবন,

শিখি-পুচ্ছ-চূড়া যেন মাধবের শিরে!

সুশ্যামাঙ্গ শূলধর; স্বর্ণ-ফুল-শ্রেণী

শোভে তাহে, আহা মরি পীতধড়া যেন!

নির্ঝর-ঝরিতবারি-রাশি স্থানে স্থানে—

বিশদ চন্দনে যেন চর্চ্চিত সে বপু!

ত্যজি রথ, পদব্রজে, সহ স্বরীশ্বরী,

প্রবেশিলা স্বরীশ্বর আনন্দ-ভবনে।

রাজরাজেশ্বরীরূপে বসেন ঈশ্বরী

স্বর্ণাসনে, ঢুলাইছে চামর বিজয়া;

ধরে রাজচ্ছত্র জয়া। হায় রে, কেমনে,

ভব-ভবনের কবি বর্ণিবে বিভব!

দেখ, হে ভাবুক-জন, ভাবি মনে মনে।

পূজিলা শক্তির পদ মহাভক্তি-ভাবে

মহেন্দ্র ইন্দ্রাণী সহ। আশীষি অম্বিকা

জিজ্ঞাসিলা;—“কহ, দেব, কুশল-বারতা,—

কি কারণে হেথা আজি তোমা দুইজনে?”

করযোড়ে আরম্ভিলা দম্ভোলি-নিক্ষেপী;

“কি না তুমি জান, মাতঃ, অখিল জগতে?

দেবদ্রোহী লঙ্কাপতি, আকুল বিগ্রহে,

বরিয়াছে পুনঃ পুত্ত্র মেঘনাদে আজি

সেনাপতিপদে। কালি প্রভাতে কুমার

পরন্তপ প্রবেশিবে রণে, ইষ্টদেবে

পূজি, মনোনীত বর লভি তাঁর কাছে।

অবিদিত নহে মাতঃ, তার পরাক্রম।

রক্ষঃকুল-রাজলক্ষ্মী, বৈজয়ন্ত-ধামে

আসি, এ সংবাদ দাসে দিলা, ভগবতি!

কহিলেন হরিপ্রিয়া, কাঁদে বসুন্ধরা,

এ অসহ ভার সতী না পারি সহিতে;

ক্লান্ত বিশ্বধর শেষ; তিনিও আপনি

চঞ্চলা সতত এবে ছাড়িতে কনক

লঙ্কাপুরী। তব পদে এ সংবাদ দেবী

আদেশিলা নিবেদিতে দাসেরে, অন্নদে।

দেব-কুল-প্রিয় বীর রঘু-কুলমণি।

কিন্তু দেবকুলে হেন আছে কোন্ রথী,

যুঝিবে যে রণভূমে রাবণির সাথে?

বিশ্বনাশী কুলিশে, মা, নিস্তেজে সমরে

রাক্ষস, জগতে খ্যাত ইন্দ্রজিৎ নামে!

কি উপায়ে কাত্যায়নি, রক্ষিবে রাঘবে,

দেখ ভাবি। তুমি কৃপা না করিলে, কালি

অরাম করিবে তব দুরন্ত রাবণি।”

উত্তরিলা কাত্যায়নী—“শৈব-কুলোত্তম

নৈকষেয়; মহাস্নেহ করেন ত্রিশূলী

তার প্রতি; তার মন্দ, হে সুরেন্দ্র, কভু

সম্ভবে কি মোর হ’তে? তপে মগ্ন এবে

তাপসেন্দ্র, তেঁই, দেব, লঙ্কার এ গতি।”

কৃতাঞ্জলি-পুটে পুনঃ বাসব কহিলা;—

“পরম-অধর্ম্মাচারী নিশাচর-পতি—

দেব-দ্রোহী! আপনি, হে নগেন্দ্র-নন্দিনি!

দেখ বিবেচনা করি। দরিদ্রের ধন

হরে যে দুর্ম্মতি, তব কৃপা তার প্রতি

কভু কি উচিত, মাতঃ! সুশীল রাঘব,

পিতৃ-সত্য-রক্ষা-হেতু, সুখ-ভোগ ত্যজি

পশিল ভিখারী-বেশে নিবিড় কাননে!

একটি রতনমাত্র আছিল তাহার

অমূল্য; যতন কত করিত সে তারে,

কি আর কহিবে দাস? সে রতন, পাতি

মায়াজাল, হরে দুষ্ট! হায়, মা, স্মরিলে

কোপানলে দহে মন! ত্রিশূলীর বরে

বলী রক্ষঃ, তৃণজ্ঞান করে দেবগণে!

পর-ধন, পর-দারলোভে সদা লোভী

পামর। তবে যে কেন (বুঝিতে না পারি)

হেন মূঢ়ে দয়া তুমি কর, দয়াময়ি!”

নীরবিলা স্বরীশ্বর; কহিতে লাগিলা

বীণাবাণী স্বরীশ্বরী মধুর সুস্বরে;—

“বৈদেহীর দুঃখে, দেবি, কার না বিদরে

হৃদয়? অশোক-বনে বসি দিবানিশি,

(কুঞ্জবন-সখী পাখী পিঞ্জরে যেমতি)

কাঁদেন রূপসী শোকে! কি মনোবেদনা

সহেন বিধুবদনা পতির বিহনে,

ও রাঙা-চরণে, মাতঃ, অবিদিত নতে।

আপনি না দিলে দণ্ড, কে দণ্ডিবে, দেবি,

এ পাষণ্ড রক্ষোনাথে? নাশি মেঘনাদে,

দেহ বৈদেহীরে পুনঃ বৈদেহী-রঞ্জনে;

দাসীর কলঙ্ক ভঞ্জ, শশাঙ্কধারিণি!

মরি, মা, শরমে আমি, শুনি লোকমুখে,

ত্রিদিব-ঈশ্বরে রক্ষঃ পরাভবে রণে!”

হাসিয়া কহিলা উমা;—“রাবণের প্রতি

দ্বেষ তব, জিষ্ণু! তুমি, হে মঞ্জুনাশিনী

শচি, তুমি ব্যগ্র ইন্দ্রজিতের নিধনে।

দুই জন অনুরোধ করিছ আমারে

নাশিতে কনক-লঙ্কা। মোর সাধ্য নহে

সাধিতে এ কার্য্য। বিরূপাক্ষের রক্ষিত

রক্ষঃ-কুল; তিনি বিনা তব এ বাসনা,

বাসব, কে পারে, কহ, পূর্ণিতে জগতে?

যোগে মগ্ন, দেবরাজ, বৃষধ্বজ আজি।

যোগাসননামে শৃঙ্গ মহাভয়ঙ্কর,

ঘন ঘনাবৃত, তথা বসেন বিরলে

যোগীন্দ্র, কেমনে যাবে তাঁহার সমীপে?

পক্ষীন্দ্র গরুড় সেথা উড়িতে অক্ষম!”

কহিলা বিনতভাবে অদিতিনন্দন;—

“তোমা বিনা কার শক্তি, হে মুক্তিদায়িনি

জগদম্বে, যায় যে সে যথা ত্রিপুরারি

ভৈরব? বিনাশি, দেবি, রক্ষঃকুল, রাখ

ত্রিভুবন; বৃদ্ধি কর ধর্ম্মের মহিমা;

হ্রাসো বসুধার ভার; বসুন্ধরা-ধর

বাসুকিরে কর স্থির; বাঁচাও রাঘবে।”

এইরূপে দৈত্যরিপু স্তুতিলা সতীরে।

হেনকালে গন্ধামোদে সহসা পূরিল

পুরী; শঙ্খঘণ্টাধ্বনি বাজিল চৌদিকে

মঙ্গল নিক্কণসহ, মৃদু যথা যবে

দূর কুঞ্জবনে গাহে পিক-কুল মিলি।

টলিল কনকাসন। বিজয়া সখীরে

সম্ভাষিয়া মধুস্বরে, ভবেশ-ভাবিনী

সুধিলা;—“লো বিধুমুখি, কহ শীঘ্র করি,

কে কোথা, কিহেতু মোরে পূজিছে অকালে?”

মন্ত্র পড়ি, খড়ি পাতি, গণিয়া গণনে,

নিবেদিলা হাসি সখী;—“হে নগনন্দিনি,

দাশরথি রথী তোমা, পূজে লঙ্কাপুরে।

বারি-সংঘটিত ঘটে, সুসিন্দুরে আঁকি

ও সুন্দর পদযুগ, পূজে রঘুপতি

নীলোৎপলাঞ্জলি দিয়া, দেখিমু গণনে।

অভয় প্রদান তারে কর গো, অভয়ে!

পরম ভকত তব কৌশল্যানন্দন

রঘুশ্রেষ্ঠ; তার তারে বিপদে, তারিণি!”

কাঞ্চন-আসন ত্যজি, রাজরাজেশ্বরী

উঠিয়া, কহিলা পুনঃ বিজয়ারে সতী;—

“দেব-দম্পতিরে তুমি সেব যথাবিধি,

বিজয়ে! যাইব আমি যথা যোগাসনে

(বিকটশিখর!) এবে বসেন ধূর্জ্জটি।

এতেক কহিয়া দুর্গা দ্বিরদ-গামিনী

প্রবেশিলা হৈমগেহে। দেবেন্দ্র বাসবে

ত্রিদিব-মহিষী সহ, সম্ভাষি আদরে,

স্বর্ণাসনে বসাইলা বিজয়া সুন্দরী।

পাইলা প্রসাদ দোঁহে পরম আহ্লাদে।

শচীর গলায় জয়া হাসি দোলাইলা

তারাকারা ফুলমালা; কবরী-বন্ধনে

বসাইলা চিররুচি, চির-বিকসিত

কুসুম-রতন-রাজী, বাজিল চৌদিকে

যন্ত্রদল, বামাদল গাইল নাচিয়া।

মোহিল কৈলাসপুরী; ত্রিলোক মোহিল!

স্বপনে শুনিয়া শিশু সে মধুর ধ্বনি,

হাসিল মায়ের কোলে, মুদিত নয়ন।

নিদ্রাহীন বিরহিণী চমকি উঠিলা,

ভাবি প্রিয়-পদ-শব্দ শুনিলা ললনা

দুয়ারে! কোকিলকুল নীরবিলা বনে।

উঠিলেন যোগিব্রজ, ভাবি ইষ্টদেব,

বর মাগ বলি, আসি দরশন দিলা।

প্রবেশি সুবর্ণ-গেহে, ভবেশ-ভাবিনী

ভাবিলা;—“কি ভাবে আজি ভেটিব ভবেশে?”

ক্ষণকাল চিন্তি সতী চিন্তিলা রতিরে।

যথায় মন্মথ-সাথে, মন্মথ-মোহিনী

বরাননা, কুঞ্জবনে বিহারিতেছিলা,

তথায় উমার ইচ্ছা, পরিমলময়-

বায়ু তরঙ্গিণীরূপে, বহিল নিমিষে।

নাচিল রতির হিয়া, বীণা-তার যথা

অঙ্গুলীর পরশনে। গেলা কামবধূ,

দ্রুতগতি বায়ু-পথে, কৈলাস-শিখরে।

সরসে নিশান্তে যথা ফুটি, সরোজিনী

নমে ত্বিষাম্পতি-দূতী ঊষার চরণে,

নমিলা মদন-প্রিয়া হর-প্রিয়া-পদে।

আশীষি রতিরে, হাসি কহিলা অম্বিকা;—

“যোগাসনে তপে মগ্ন যোগীন্দ্র; কেমনে

কোন্ রঙ্গে, ভঙ্গ করি তাঁহার সমাধি,

কহ মোরে, বিধুমুখি!” উত্তরিলা নমি

সুকেশিনী; “ধর, দেখি, মোহিনী-মূরতি।

দেহ আজ্ঞা, সাজাই ও বর-বপু, আনি

নানা আভরণ; হেরি যে সবে, পিণাকী

ভুলিবেন, ভুলে যথা ঋতুপতি, হেরি

মধুকালে বনস্থলী কুসুম-কুন্তলা।”

এতেক কহিয়া রতি, সুবাসিত তেলে

মাজি চুল, বিনাইলা মনোহর বেণী।

যোগাইলা আনি ধনী বিবিধ ভূষণে,

হীরক-মুকুতা-মণি-খচিত; আনিলা

চন্দন, কেশরসহ কুঙ্কুম কস্তুরী;

রত্ন-সঙ্কলিত-আভা কৌষেয় বসনে।

লাক্ষারসে পা-দুখানি চিত্রিলা হরসে

চারুনেত্রা। ধরি মূর্ত্তি ভুবনমোহিনী,

সাজিলা নগেন্দ্রবালা; রসানে মার্জ্জিত

হেম-কাস্তি-সম কান্তি দ্বিগুণ শোভিল!

হেরিলা দর্পণে দেবী ও চন্দ্র-আননে;

প্রফুল্ল-নলিনী যথা বিমল-সলিলে

নিজ বিকচিত রুচি। হাসিয়া কহিলা,

চাহি স্মর-হর-প্রিয়া স্মর-প্রিয়া পানে;—

“ডাক তব প্রাণনাথে।” অমনি ডাকিল,

(পিককুলেশ্বরী যথা ডাকে ঋতুবরে),

মদনে মদন-বাঞ্ছা। আইলা ধাইয়া

ফুল-ধনু, আসে যথা প্রবাসে প্রবাসী,

স্বদেশ-সঙ্গীত-ধ্বনি শুনি রে উল্লাসে!

কহিলা শৈলেশসুতা;—“চল মোর সাথে,

হে মন্মথ, যাব আমি যথা যোগিপতি

যোগে মগ্ন এবে বাছা; চল ত্বরা করি।”

অভয়ার পদতলে মায়ার নন্দন,

মদন আনন্দময়, উত্তরিলা ভয়ে;—

“হেন আজ্ঞা কেন, দেবি! কর এ দাসেরে?

স্মরিলে পূর্ব্বের কথা, মরি, মা, তরাসে!

মূঢ় দক্ষ-দোষে যবে দেহ ছাড়ি, সতি,

হিমাদ্রির গৃহে জন্ম গ্রহিলা আপনি,

তোমার বিরহ-শোকে বিশ্ব-ভার ত্যজি

বিশ্বনাথ, আরম্ভিলা ধ্যান; দেবপতি

ইন্দ আদেশিলা দাসে, সে ধ্যান ভাঙ্গিতে!

কুলগ্নে গেনু মা! যথা মগ্ন বামদেব

তপে; ধরি ফুল-ধনু, হানিনু কুক্ষণে

ফুল-শর। যথা সিংহ সহসা আক্রমে

গজরাজে, পূরি বন ভীষণ গর্জ্জনে,

গ্রাসিলা দাসেরে আসি রোষে বিভাবসু,

বাস যাঁর, ভবেশ্বরি, ভবেশ্বর-ভালে।

হায়, মা, কত যে জ্বালা সহিনু, কেমনে

নিবেদি ও রাঙ্গা পায়ে? হাহাকার রবে,

ডাকিনু বাসবে, চন্দ্রে, পবনে, তপনে;

কেহ না আইল; ভস্ম হইনু সত্বরে!—

ভয়ে ভগ্নোদ্যম আমি ভাবিয়া ভবেশে;

ক্ষম দাসে, ক্ষেমঙ্করি! এ মিনতি পদে।”

আশ্বাসি মদনে, হাসি, কহিলা শঙ্করী;—

“চল রঙ্গে মোর সঙ্গে নির্ভয় হৃদয়ে

অনঙ্গ! আমার বরে চিরজয়ী তুমি।

যে অগ্নি কুলগ্নে তোমা পাইয়া স্বতেজে

জ্বালাইল, পূজা তব করিবে সে আজি;

ঔষধের গুণ ধরি, প্রাণনাশকারী

বিষ যথা রক্ষে প্রাণ বিদ্যার কৌশলে।”

প্রণমিয়া কাম তবে উমার চরণে,

কহিলা;—“অভয়দান কর যারে তুমি

অভয়ে, কি ভয় তার এ তিন ভুবনে?

কিন্তু নিবেদন করি ও কমল-পদে,—

কেমনে মন্দির হ’তে, নগেন্দ্রনন্দিনি,

বাহিরিবা, কহ দাসে, এ মোহিনীবেশে?

মুহূর্ত্তে মাতিবে, মাতঃ, জগৎ হেরিলে

ও রূপ-মাধুরী; সত্য কহিনু তোমারে।

হিতে বিপরীত, দেবি, সত্বরে ঘটিবে।

সুরাসুরবৃন্দ যবে মথি জলনাথে,

লভিলা অমৃত, দুষ্ট দিতিসুত যত

বিবাদিল দেবসহ সুধামধু-হেতু।

মোহিনী-মূরতি ধরি আইলা শ্রীপতি।

ছদ্মবেশী হৃষীকেশে ত্রিভুবন হেরি,

হারাইলা জ্ঞান সবে; এ দাসের শরে

অধর-অমৃত-আশে, ভুলিলা অমৃত

দেবদৈত্য; নাগদল নম্রশিরঃ লাজে,

হেরি পৃষ্ঠদেশে বেণী; মন্দর আপনি

অচল হইল হেরি উচ্চ কুচযুগে!

স্মরিলে সে কথা, সতি, হাসি আসে মুখে।

মলম্বা-অম্বরে তাম্র এত শোভা যদি

ধরে, দেবি, ভাবি দেখ, বিশুদ্ধ কাঞ্চন-

কান্তি কত মনোহর।” অমনি অম্বিকা,

সুবর্ণ-বরণ ঘন মায়ায় সৃজিয়া,

মায়াময়ী আবরিলা চারু অবয়বে।

হায় রে, নলিনী যেন দিবা-অবসানে

ঢাকিল বদন-শশী। কিম্বা অগ্নি-শিখা,

ভস্মরাশি-মাঝে পশি, হাসি লুকাইলা।

কিম্বা সুধা-ধন যেন, চক্র-প্রসরণে,

বেড়িলেন দেব-শত্রু সুধাংশুমণ্ডলে।

দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত গৃহদ্বার দিয়া

বাহিরিলা সুহাসিনী, মেঘাবৃতা যেন

ঊষা! সাথে মন্মথ, হাতে ফুল-ধনু,

পৃষ্ঠে তুণ, খরতর ফুল-শরে ভরা—

কণ্টকময় মৃণালে ফুটিল নলিনী।

কৈলাস শিখরি-শিরে ভীষণ শিখর

ভৃগুমান্, যোগাসননামেতে বিখ্যাত

ভুবনে; তথায় দেবী ভুবনমোহিনী

উতরিলা গজগতি। অমনি চৌদিকে

গভীর গহ্বরে বদ্ধ, ভৈরব-নিনাদী

জলদল, নীরবিলা, জল-কান্ত যথা

শান্ত শান্তি-সমাগমে; পলাইল দূরে

মেঘদল, তমঃ যথা ঊষার হসনে!

দেখিলা সম্মুখে দেবী কপর্দ্দী তপস্বী,

বিভূতি ভূষিত দেহ, মুদিত নয়ন,

তপের সাগরে মগ্ন, বাহ্যজ্ঞানহত।

কহিলা মদনে হাসি সুচারুহাসিনী;—

“কি কাজ বিলম্বে আর, হে শঙ্কর-অরি!

হান তব ফুল-শর।” দেবীর আদেশে,

হাঁটু গাড়ি মীনধ্বজ, শিঞ্জিনী টঙ্কারি,

সম্মোহন-শরে শূর বিঁধিলা উমেশে!

শিহরিলা শূলপাণি; নড়িল মস্তকে

জটাজূট, তরুরাজী যথা গিরিশিরে

ঘোর মড় মড় রবে নড়ে ভূকম্পনে।

অধীর হইলা প্রভু! গরজিলা ভালে

চিত্রভানু, ধক্‌ধকি, উজ্জ্বল জ্বলনে!

ভয়াকুল ফুল-ধনু পশিলা অমনি

ভবানীর বক্ষঃস্থলে, পশয়ে যেমতি

কেশরি-কিশোর ত্রাসে, কেশরিণী-কোলে,

গম্ভীর নির্ঘোষে ঘোষে ঘনদল যবে,

বিজলী ঝলসে আঁখি কালানল তেজে!

উন্মীলি নয়ন এবে উঠিলা ধুর্জ্জটি!

মায়া-ঘন-আবরণ ত্যজিলা গিরিজা।

মোহিত মোহিনীরূপে, কহিলা হরষে

পশুপতি;—“কেন হেথা একাকিনী দেখি,

এ বিজন স্থলে, তোমা, গণেন্দ্রজননি?

কোথায় মৃগেন্দ্র তব কিঙ্কর, শঙ্করি?

কোথায় বিজয়া জয়া?” হাসি উত্তরিলা

সুচারুহাসিনী উমা;—“এ দাসীরে ভুলি,

হে যোগীন্দ্র, বহুদিন আছ এ বিরলে;

তেঁই আসিয়াছি, নাথ, দরশন-আশে

পা-দুখানি। যে রমণী পতিপরায়ণা,

সহচরীসহ সে কি যায় পতিপাশে?

একাকী প্রত্যুষে, প্রভু, যায় চক্রবাকী

যথা প্রাণকান্ত তার!” আদরে ঈশান,

ঈষৎ হাসিয়া দেব, অজিন-আসনে

বসাইলা ঈশানীরে। অমনি চৌদিকে

প্রফুল্লিল ফুলকুল; মকরন্দ-লোভে

মাতি শিলীমুখ-বৃন্দ আইল ধাইয়া,

বহিল মলয়-বায়ু; গাইল কোকিল;

নিশার শিশিরে ধৌত কুসুম-আসার

আচ্ছাদিল শৃঙ্গবরে। উমার উরসে

(কি আর আছেরে বাসা সাজে মনসিজে

ইহা হ’তে!) কুসুমেষু, বসি কুতূহলে

হানিলা, কুসুম-ধনু টঙ্কারি কৌতুকে

শর-জাল;—প্রেমামোদে মাতিলা ত্রিশূলী!

লজ্জাবেশে রাহু আসি গ্রাসিল চাঁদেরে,

হাসি ভস্মে লুকাইলা দেব বিভাবসু।

মোহন-মূরতি ধরি, মোহি মোহিনীরে,

কহিলা হাসিয়া দেব;—“জানি আমি, দেবি,

তোমার মনের কথা,—বাসব কি হেতু

শচীসহ আসিয়াছে কৈলাস-সদনে;

কেন বা অকালে তোমা পূজে রঘুমণি?

পরম-ভকত মম নিকষা-নন্দন;

কিন্তু নিজ কর্ম্মফলে মজে দুষ্টমতি।

বিদরে হৃদয় মম স্মরিলে সে কথা,

মহেশ্বরি! হায়, দেবি, দেবে কি মানবে,

কোথা হেন সাধ্য রোধে প্রাক্তনের গতি?

পাঠাও কামেরে, উমা, দেবেন্দ্র-সমীপে।

সত্বরে যাইতে তারে আদেশ, মহেশি!

মায়াদেবী নিকেতনে। মায়ার প্রসাদে,

বধিবে লক্ষ্মণ-শূর, মেঘনাদ-শূরে!”

চলি গেলা মীনধ্বজ, নীড় ছাড়ি উড়ে

বিহঙ্গম-রাজ যথা, মুহুর্মুহুঃ চাহি

সে সুখ-সদন পানে! ঘন রাশি রাশি,

স্বর্ণবর্ণ, সুবাসিত বাস শ্বাসি ঘন,

বরষি প্রসূনাসার—কমল, কুমুদী,

মালতী, সেঁউতি, জাতি, পারিজাত আদি

মন্দ-সমীরণ-প্রিয়া—ঘিরিল চৌদিকে

দেবদেব মহাদেবে মহাদেবীসহ।

দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত হৈমময় দ্বারে

দাঁড়াইলা বিধুমুখী মদনমোহিনী,

অশ্রুময় আঁখি, আহা! পতিয় বিহনে!

হেনকালে মধুসখা উত্তরিলা তথা।

অমনি পসারি বাহু, উল্লাসে মন্মথ

আলিঙ্গন-পাশে বাঁধি তুষিলা ললনে

প্রেমালাপে। শুকাইল অশ্রুবিন্দু, যথা

শিশির-নীরের বিন্দু শতদল-দলে,

দরশন দিলে ভানু উদয়-শিখরে।

পাই প্রাণধনে ধনী, মুখে মুখ দিয়া,

(সরস বসন্তকালে সারী-শুক যথা)

কহিলেন প্রিয়ভাষে;—“বাঁচালে দাসীরে

আশু আসি তার পাশে, হে রতিরঞ্জন!

কত যে ভাবিতেছিনু, কহিব কাহারে?

বামদেবনামে, নাথ, সদা কাঁপি আমি,

স্মরি পূর্ব্বকথা যত! দুরন্ত হিংসক

শূলপাণি! যেয়ো না গো আর তাঁর কাছে,

মোর কিরে প্রাণেশ্বর!” সুমধুর হাসে

উত্তরিলা পঞ্চশর;—“ছায়ার আশ্রমে,

কে কবে ভাস্কর-করে ডরায় সুন্দরি!

চল এবে যাই যথা দেব-কুলপতি।”

সুবর্ণ-আসনে যথা বসেন বাসব,

উতরি মন্মথ তথা, নিবেদিলা নমি

বারতা। আরোহি রথে দেবরাজ রথী

চলি গেলা দ্রুতগতি মায়ার সদনে।

অগ্নিময়তেজঃ বাজী ধাইল অম্বরে,

অকম্প চামর শিরে; গম্ভীর নির্ঘোষে

ঘোষিল রথের চক্র, চূর্ণি মেঘদলে।

কতক্ষণে সহস্রাক্ষ উত্তরিলা বলী

যথা বিরাজেন মায়া। ত্যজি রথবরে,

সুরকুল-রথিবর পশিলা দেউলে।

কত যে দেখিলা দেব কে পারে বর্ণিতে!

সৌর খরতর-কর-জাল সঙ্কলিত-

আভাময় স্বর্ণাসনে বসি, কুহকিনী

শক্তীশ্বরী। করযোড়ে বাসব প্রণমি

কহিলা—“আশীষ দাসে, বিশ্ব-বিমোহিনি!”

আশীষি সুধিলা দেবী;—কহ, কি কারণে

গতি হে আজি তব, অদিতিনন্দন!”

উত্তরিলা দেবপতি;—“শিবের আদেশে,

মহামায়া, অসিয়াছি তোমার সদনে।

কহ দাসে, কি কৌশলে, সৌমিত্রি জিনিবে

দশানন-পুত্ত্রে কালি? তোমার প্রসাদে

(কহিলেন বিরূপাক্ষ) ঘোরতর রণে

নাশিবে লক্ষ্মণ-শূর, মেঘনাদ-শূরে।”

ক্ষণকাল চিন্তি দেবী কহিলা বাসবে;—

“দুরন্ত তারকাসুর, সুর-কুলপতি,

কাড়ি নিল স্বর্গ যবে তোমারে বিমুখি

সমরে; কৃত্তিকাকুল-বল্লভ সেনানী,

পার্ব্বতীর গর্ভে জন্ম লভিলা তৎকালে।

বধিতে দানবরাজে সাজাইলা বীরে

আপনি বৃষধ্বজ, সৃজি রুদ্রতেজে

অস্ত্র। এই দেখ, দেব, ফলক, মণ্ডিত

সুবর্ণে; ওই যে অসি, নিবাসে উহাতে

আপনি কৃতান্ত; ওই দেখ, সুনাসীর!

ভয়ঙ্কর তূণীরে, অক্ষয়, পূর্ণ শরে,

বিষাকর ফণি-পূর্ণ নাগলোক যথা!

ওই দেখ ধনু, দেব!” কহিলা হাসিয়া,

হেরি সে ধনুর কান্তি, শচীকান্ত বলী;—

“কি ছার ইহার কাছে দাসের এ ধনু

রত্নময়। দিবাকর-পরিধি যেমতি,

জ্বলিছে ফলকবর—ধাঁধিয়া নয়নে!

অগ্নিশিখাসম অসি মহাতেজস্কর!

হেন তূণ আর মাতঃ, আছে কি জগতে?

“শুন দেব” (কহিলেন পুনঃ মায়াদেবী)

ওই সব অস্ত্রবলে নাশিলা তারকে

ষড়ানন। ওই সব অস্ত্রবলে, বলি,

মেঘনাদ-মৃত্যু, কহিনু তোমারে।

কিন্তু হেন বীর নাহি এ তিন ভুবনে,

দেব কি মানব, ন্যায়যুদ্ধে যে বধিবে

রাবণিরে। প্রের তুমি অস্ত্র রামানুজে,

আপনি যাইব আমি কালি লঙ্কাপুরে;

রক্ষিব লক্ষ্মণে, দেব, রাক্ষস-সংগ্রামে।

যাও চলি সুরদেশে, সুরদলনিধি!

ফুলকুল-সখী ঊষা যখন খুলিবে

পূর্ব্বাশার হৈমদ্বারে পদ্ম-কর দিয়া

কালি, তব চির-ত্রাস, বীরেন্দ্র-কেশরী,

ইন্দ্রজিৎ-ত্রাসহীন করিবে তোমারে—

লঙ্কার পঙ্কজরবি যাবে অন্তচলে!”

মহানন্দে দেব-ইন্দ্র বন্দিয়া দেরীরে,

অস্ত্র ল’য়ে গেলা চলি ত্রিদশ-আলয়ে।

বসি দেব সভাতলে, কনক আসনে

বাসব, কহিলা শূর, চিত্ররথ শূরে;—

“যতনে লইয়া অস্ত্র যাও মহাবলি!

স্বর্ণ-লঙ্কাধামে তুমি। সৌমিত্রি-কেশরী

মায়ার প্রসাদে কালি বধিবে সমরে

মেঘনাদে। কেমনে, তা দিবেন কহিয়া

মহাদেবী মায়া তারে। কহিও রাঘবে,

হে গন্ধর্ব্ব-কুলপতি, ত্রিদিব-নিবাসী

মঙ্গল-আকাঙ্ক্ষী তার; পার্ব্বতী আপনি

হরপ্রিয়া, সুপ্রসন্ন তার প্রতি আজি।

অভয় প্রদান তারে করিও সুমতি!

মরিলে রাবণি রণে, অবশ্য মরিবে

রাবণ; লভিবে পুনঃ বৈদেহী সতীরে

বৈদেহী-মনোরঞ্জন রঘুকুলমণি।

মোর রথে, রথিবর, আরোহণ করি

যাও চলি। পাছে তোমা হেরি লঙ্কাপুরে,

বাধায় বিবাদ রক্ষঃ; মেঘদলে আমি

আদেশিব আবরিতে গগন; ডাকিয়া

প্রভঞ্জনে দিব আজ্ঞা, ক্ষণ ছাড়ি দিতে

বায়ুকুলে; বাহিরিয়া নাচিবে চপলা;

দম্ভোলি-গম্ভীর-নাদে পূরিব জগতে।”

প্রণমি দেবেন্দ্র পদে, সাবধানে লয়ে

অস্ত্র, চলি গেলা মর্ত্যে চিত্ররথ রথী।

তবে দেবকুলনাথ, ডাকি প্রভঞ্জনে

কহিলা;—“প্রলয় ঝড় উঠাও সত্বরে

লঙ্কাপুরে, বায়ুপতি! শীঘ্র দেহ ছাড়ি

কারাবদ্ধ বায়ুদলে; লহ মেঘদলে;

দ্বন্দ্ব ক্ষণকাল, বৈরী বারিনাথ-সনে

নির্ঘোষে!” উল্লাসে দেব চলিলা অমনি,

ভাঙ্গিলে শৃঙ্খল, লম্ফী কেশরী যেমতি,

যথায় তিমিরাগারে রুদ্ধ বায়ু যত

গিরিগর্ভে। কত দূরে শুনিলা পবন

ঘোর কোলাহলে; গিরি (দেখিলা) নড়িছে

অন্তরিত পরাক্রমে, অসমর্থ যেন

রোধিতে প্রবল বায়ু আপনার বলে।

শিলাময় দ্বার দেব, খুলিলা পরশে।

হুহুঙ্কারি বায়ুকুল বাহিরিল বেগে

যথা অম্বুরাশি, যবে ভাঙ্গে আচম্বিতে

জাঙ্গাল। কাঁপিল মহী; গর্জ্জিল জলধি!

তুঙ্গ-শৃঙ্গধরাকারে তরঙ্গ-আবলী

কল্লোলিল, বায়ুসঙ্গে রণরঙ্গে মাতি!

ধাইল চৌদিকে মন্দ্রে জীমুত; হাসিল

ক্ষণপ্রভা; কড়মড়ে নাদিল দম্ভোলি।

পলাইলা তারানাথ তারাদলে লয়ে।

ছাইল লঙ্কায় মেঘ, পাবক উগারি

রাশি রাশি; বনে বৃক্ষ পড়িল উপাড়ি

মড়মডে, মহাঝড় বহিল আকাশে;

বর্ষিল আসার যেন সৃষ্টি ডুবাইতে

প্রলয়ে। বৃষ্টিল শিলা তড়তড় তড়ে।

পশিল আতঙ্কে রক্ষঃ যে যাহার ঘরে।

যথায় শিবিরমাঝে বিরাজেন বলী

রাঘবেন্দ্র, আচম্বিতে উত্তরিলা রথী

চিত্ররথ, দিবাকর যেন অংশুমালী,

রাজ-আভরণ দেহে! শোভে কটিদেশে

সারসন, রাশিচক্রসম তেজোরাশি,

ঝোলে তাহে অসিবর—ঝল ঝল ঝলে!

কেমনে বর্ণিবে কবি দেবতূণ, ধনু,

চর্ম্ম, বর্ম্ম, শূল, সৌর-কিরীটের আভা

স্বর্ণময়ী! দৈববিভা ধাঁধিল নয়নে;

স্বর্গীয় সৌরভে দেশ পুরিল সহসা।

সসম্ভ্রমে প্রণমিয়া, দেবদূতপদে

রঘুরর, জিজ্ঞাসিলা;— “হে ত্রিদিববাসি!

ত্রিদিব ব্যতীত, আহা, কোন্ দেশ সাজে

এ হেন মহিমা, রূপে?—কেন হেথা আজি

নন্দন কানন ত্যজি, কহ এ দাসেরে?

নাহি স্বর্ণাসন, দেব, কি দিব বসিতে?

তবে যদি কৃপা, প্রভু, থাকে দাসপ্রতি,

পাদ্য, অর্ঘ্য লয়ে বসো এই কুশাসনে।

ভিখারী রাঘব, হায়!” আশীষিয়া রথী

কুশাসনে বসি, তবে কহিলা সুস্বরে;

“চিত্ররথ নাম মম, শুন দাশরথি!

চির-অনুচর আমি সেবি অহরহঃ

দেবেন্দ্রে; গন্ধর্ব্বকুল আমার অধীনে।

আইনু এ পুরে আমি ইন্দ্রের আদেশে।

তোমার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী দেবকুলসহ

দেবেশ। এই যে অস্ত্র দেখিছ নৃমণি!

দিয়াছেন পাঠাইয়া তোমার অনুজে

দেবরাজ। আবির্ভাবি মায়া-মহাদেবী

প্রভাতে, দিবেন কহি, কি কৌশলে কালি

নাশিবে লক্ষ্মণশূর মেঘনাদ-শূরে।

দেবকুলপ্রিয় তুমি, রঘুকুলমণি!

সুপ্রসন্ন তব প্রতি আপনি অভয়া।”

কহিলা রঘুনন্দন;—“আনন্দ সাগরে

ভাসিনু, গন্ধর্ব্বশ্রেষ্ঠ! এ শুভ-সংবাদে।

অজ্ঞ নয় আমি; হায়, কেমনে দেখাব

কৃতজ্ঞতা? এই কথা জিজ্ঞাসি তোমারে।”

হাসিয়া কহিলা দূত;—“শুন, রঘুমণি!

দেব প্রতি কৃতজ্ঞতা, দরিদ্র-পালন,

ইন্দ্রিয়-দমন, ধর্ম্ম-পথে সদা গতি;

নিত্য সত্য-দেবী-সেবা; চন্দন, কুসুম,

নৈবেদ্য, কৌষিক-বস্ত্র আদি বলি যত,

অবহেলা করে দেব, দাতা যে যদ্যপি

অসৎ! এ সার কথা কহিনু তোমারে!”

প্রণমিলা রামচন্দ্র; আশীষিয়া রথী

চিত্ররথ, দেবরথে গেলা দেবপুরে।

থামিল তুমুল ঝড়; শান্তিলা জলধি;

হেরিয়া শশাঙ্কে পুনঃ তারাদল-সহ,

হাসিলা কনকলঙ্কা। তরল-সলিলে

পশি, কৌমুদিনী পুনঃ অবগাহে দেহ

রজোময়, কুমুদিনী হাসিল কৌতুকে।

আইল ধাইয়া পুনঃ রণ-ক্ষেত্রে, শিবা

শবাহারী; পালে পালে গৃধিনী, শকুনি,

পিশাচ! রাক্ষসদল বাহিরিল পুনঃ

ভীম-প্রহরণ-ধারী—মত্ত বীরমদে।

ইতি শ্রীমেঘনাদবধকাব্যে অভিষেকো নাম

দ্বিতীয়ঃ সর্গঃ।

দ্বিতীয় সর্গ।

গোধূলি—twilight.

একটী রতন ভালে—with a gem on the forehead i.e. with the evening star.

কুমুদী—is water lily. The Moon is poetically called the husband of the water lily.

নলিনী—is lotus. The sun is poetically called the husband of the lotus.

কূলায়—a nest.

গোষ্ঠ গৃহে—in the enclosure for cows.

সুচারুতারা—adj. qualifying শর্ব্বরী, with beautiful stars; having beautiful stars. বহুব্রীহি সমাস।

শর্ব্বরী—night.

ত্রিদশ-আলয়; the abode of gods.

ত্রিদশ—is a god.

পুলোমনন্দিনী—The daughter of the sage Pulome i.e. Sachi, the consort of Indra.

চামরী—one who fans a chowry.

নন্দনকানন গন্ধমধু—the fragrance and the honey of the Nandan Garden. ত্রিদিব—Heaven.

বাদিত্র—a musical instrument.

ওদন—an eatable; food.

দেব-ওদন—food for gods.

কুঙ্কুম—saffron. কস্তুরী—musk.

কেশর—the filament of a flower.

পুণ্ডরীকাক্ষ—Vishnu who has lotus-like eyes.

পুণ্ডরীক—a lotus.

বৃত্রবিজয়ী—The conqueror of Vritrasura i.e. Indra.

বিক্রমকেশরী—a lion in courage.

কেশরী—a lion who has a mane.

বৈনতেয়—the son of Vinata i.e. Garuda.

বলজ্যেষ্ঠ—supreme in strength.

শূরমণি—the jewel among the heroes.

কেশববাসনা—The desire of Kesava. Lakshmi is so called.

মুঞ্জুরিত—adorned with buds of flowers.

পিকবর—the best of the cuckoos.

পরগ-অশন—Garuda whose অশন or food is পরগ or snake.

দম্ভোলি—বজ্র; thunder.

সর্ব্বশুচি—The God of fire who purifies everything. সর্ব্বজয়ী—conqueror of all.

চন্দ্রশেখর—Siva who has the moon upon his forehead.

বিরূপাক্ষ—Siva. জটাধর—Siva.

ত্র্যম্বক—Siva who has got three eyes.

অম্বক—means an eyes.

অম্বিকা—is a name of Parvati.

অনম্বরপথ—the path of the sky.

মাতলি—the Charioteer of Indra.

একান্তে—aside. পরিমল—sweet fragrance.

পরিমল সুধা—the nectar of sweet fragrance.

মানস-সকাশে—near the Manasasarwar.

শিখরী—পর্ব্বত; hill or mountain which has a শিখর or peak. তব— i.e. Siva.

শিখি-পুচ্ছ-চূড়া; the top made of a peacock tail.

নির্ঝর-ঝরিত-বারি—water issuing from a fountain. বিভব—wealth.

দম্ভোলিনিক্ষেপী—the thrower of the thunder; Indra.

পরন্তপ—the tormentor of পর or enemy.

অসহ—unbearable. শেষ—অনন্ত, বাসুকি।

শৈব—the worshipper of Siva.

তাপসেন্দ্র—the greatest of the hermits.

বীণাবাণী—having বাণী or words as sweet as the sound of a বীণা or harp.

স্বরীশ্বরী—the ঈশ্বরী or mistress of স্বর্ or Heaven.

কুঞ্জবনসখী—the companion of a grove.

বৈদেহীরঞ্জন—the রঞ্জন or lover of বৈদেহী or Sita.

শশাঙ্কধারিণী—Bearing the moon on the head.

শশাঙ্ক—Moon, having অঙ্ক or spots resembling a শশ or a hare.

শরম—Shame. জিষ্ণু—Indra.

মঞ্জুনাশিনী—the destroyer of the pride of beautiful ladies. মঞ্জু—সুন্দর; beautiful.

বৃষধ্বজ—Siva whose ধ্বজ or symbol is a বৃষ or a bull.

ভৈরর—dreadful. বসুন্ধরাধর—the Bearer of the Earth. নিক্কণ—Sound.

ভবেশভাবিনী—Uma who thinks of Bhabesha.

বারিসংঘটিত—quite filled up with water.

নীলোৎপলাঞ্জলি—the offerings of blue lotuses.

তার—ত্রাণ কর; Save. দ্বিরদগামিনী—having a gait like that of an elephant. দ্বিরদ—is an elephant who has two রদ or tusks.

তারাকারা—Having the shape of stars.

চিররুচি—ever-beautiful.

বিকট শিখর—ভীষণ শৃঙ্গ—the Dreadful Peak. Siva practised Yoga on the Peak. Hence its name was Yogeswara.

যোগিব্রজ—the group of hermits.

ইষ্টদেব—tutelary deity. ভেটিব—shall meet.

নিমিষে—in a moment. হিয়া—Heart.

কামবধূ—The wife of Kama

ত্বিষাপতি—The Lord of light, i.e. the sun.

দূতী—messenger. আশীষি—Blessing.

সমাধি—Meditation.

পিনাকী—Siva who is armed with পিনাক; The

ঋতুপতি—Spring, the lord of the seasons.

মধুকালে—in the spring seasons.

বনস্থলী—woodland.

কুসুমকুন্তলা—adorned with flowers as her lock of hair.

রত্নসঙ্কলিত আভা—having a splendour derived from jewels.

কৌষেয়—silken; made of silk.

লাক্ষারসে—with the red dye. চিত্রিলা—painted.

রসান—paint. বিমল সলিল—transparent water.

বিকচিত—opened. রুচি—beauty.

স্মর—is Kama or Madana.

স্মরহর—is Siva the destroyer of Kama.

স্মররহর-প্রিয়া—is Parvati.

ফুলধনু—Madana armed with a bow of flowers. It is here a proper name.

কুলগ্নে—in an inauspicious hour.

বামদেব—is Siva. হানিনু—cast, threw.

বিভাবসু—the sun or the fire. Here the fire.

ভবেশ্বর-ভালে—on the brow or fore-head of Siva.

ক্ষেমঙ্করি—() Producer of good.

মথি—churning. জলনাথ—the sea.

দিতিসুত—the sons of Diti are the Daityas, and the sons of Aditi are the Adityas আদিত্য।

বিবাদিল—Quarrelled.

শ্রীপতি—The Husband of শ্রী or লক্ষ্মী, viz. Vishnu.

মন্দর আপনি—even the Mandar mountain which became the churning rod মদনদণ্ড at the time of churning the sea.

অচল—motionless.

মলম্বা-অম্বর—an অম্বর or a piece of cloth made of মলম্বা or a gold layer. মলম্বা—is a gold layer on a copper plate.

মলম্বা-অম্বর—is the disguise of a female.

তাম্র—is vishnu who is a male.

বিশুদ্ধ কাঞ্চন—is Parvati who is herself a female.

ঘন—cloud.

মলম্বা অম্বার etc.—If Vishnu who is a male appeared so beautiful, imagine how very beautiful will you who are a female will appear.

দ্বিরদরদনির্ম্মিত—made of the tusk of an elephant.

কণ্টকময় মৃণালে ফুটিল নলিনী—Durga is নলিনী, Madana behind Her is মৃণাল, His arrows are the কণ্টক।

ভৃগুমান—precipitous. ভৃগু—precipice.

গজগতি—having a gait of an elephant.

ভৈরবনিনাদী—making a dreadful thundering sound. জলকান্ত—the sea.

শান্তি সমাগমে—on the arrival of the goddess of peace i.e. on the disappearance of storms and tempests. কপর্দ্দী—Siva.

বিভূতিভূষিত—(1) adorned with ashes. (2) adorned with splendour or majesty.

বাহ্যজ্ঞানহত—destitute of the conciousness of external things; devoid of the powers of the external senses.

শম্বর—the name of a Daitya slain by Madana.

মীনধ্বজ—Madana who is carried by fish.

জটাজূট—the জূট—or cluster of জটা or matted hair. চিত্রভানু—(1) fire (2) the sun; here, the fire.

কেশরিকিশোর—the cub of a lion.

মায়াঘন আবরণ—the cover of the magical cloud.

গণেন্দ্রজননী—the mother of Ganesha.

ঈশান—Siva.

অজিন আসন—the seat made of অজিন or deer-skin. প্রফুল্লিল— bloomed.

মকরন্দ—honey. শিলীমুখ—Bee.

মলয়—is a range of mountains—the Western ghats where sandalwood is abundant.

মলয় বায়ু—a fragrant wind blowing from the Malaya Mountains; Southern wind.

কুসুম-আসার—showers of flowers.

কি আর আছেরে... ইহা হ’তে—what else is the abode that is more suitable for Manasija (Madana) than this?

কুসুমেষু—Madan whose ইষু or arrow is the flower.

লজ্জাবেশে—in the guise of bashfulness. Bashfulness is here compared to রাহু।

লজ্জাবেশে...চাঁদেরে—the Moon on the forehead of Siva was swallowed by the Rahu, bashfulness. The Moon became bashful to see Siva so much captivated with the beauty of Parvati.

হাসি ভস্মে লুকাইল দেব বিভাবসু—The fire on the forehead too smiled and hid himself in the ashes. প্রাক্তন—নিয়তি; fate.

ধন রাশি রাশি— স্বর্ণবর্ণ মেঘপুঞ্জ সুরভিরায়ু স্বরূপ নিশ্বাস ত্যাগ এবং নানাপ্রকার সুগন্ধি পুষ্পবৃষ্টি করিয়া মহাদেবকে ও মহাদেবীকে বেষ্টন করিল—Masses of golden clouds breathing the fragrant air as their breath and casting various flowers as showers of rain surrounded Siva and Sivani.

মন্দ-সমীরণপ্রিয়া—the flowers are spoken of as the wives of the soft breeze.

পঞ্চশর— Madan is so called as he has got five arrow’s. ভাস্কর-কর—the rays of the sun.

বাজী—Horse. অকম্প—firm; unmoved.

চামর—manes.

সহস্রাক্ষ—Indra is so called as he has got thousand eyes. দেউল—temple.

সৌর খরতরকরজাল-সঙ্কলিত আভাময় স্বর্ণাসন—A throne of gold bright with a splendou like that of the mass of the bright ray of the sun. সঙ্কলিত—gathered; acquired.

কৃত্তিকাকুল বল্লভসেনানী—The commander who was dear to the race of nymphs called Krittikas. Karttikeya, son of Durga was brought up by these nymphs. Hence he is said to be dear (বল্লভ) to them. Here বল্লভ does not mean “Husband”. The nymphs were the foster-mothers of Karttikeya, and he was their forster-son.

নিবাসে—lives.

আপনি কৃতান্ত—Yama himself. কৃতান্ত means literally “one by whom অন্ত or end or death is কৃত or brought about or performed.”

সুনাসীর—Indra. ফলক—shield.

বিষাকর—the mine of poison.

দিবাকর-পরিধি—The circle of the sun.

পরিধি—is circumference, but here it is the circle. ধাঁধিয়া—Dazzling.

বলি—case of address from the base বলিন্, one who has strength.

সুরদল-নিধি—the jewel of gods.

ফুলকুল-সখী—the companion of flowers.

পূর্ব্বাশা—পূর্ব্বদিক; The east.

পদ্মকর—lotus-like palm.

চিরত্রাস—The cause of ever lasting fear.

বীরেন্দ্র কেশরী—is Lakshman.

ইন্দ্রজিৎ-ত্রাস হীন করিবে—will free you from the dread of Indrajit.

লঙ্কারপঙ্কজরবি—The sun of the lotuses of Lanka. The lotuses of Lanka are the so many heroes of Lanka. Meghanada was to the heroes of Lanka as the sun is to the lotuses. As there can be no lotus without the sun, so there can be no hero in Lanka in the absence of Meghanada.

সৌমিত্রিকেশরী—the lion-like Soumitri or Lakshmana. চপলা—Lightning.

দ্বন্দ্ব যুদ্ধ কর; light. লম্ফী—Springing.

অন্তরিত-পরাক্রম—পরাক্রমী বায়ুদল তাহার অন্তরে অর্থাৎ গর্ভদেশে আবদ্ধ আছে। এজন্য অন্তরিত পরাক্রম বলা হইতেছে। অন্তরিত-পরাক্রম—Strength or power confined within. আচম্বিতে—Suddenly:

জাঙ্গাল—embankment. তুঙ্গ—high.

শৃঙ্গধর—mountain or hill.

তুঙ্গ শৃঙ্গ ধরাকারে—like high mountains.

তরঙ্গ আবলী—series of waves.

মন্দ্রে—with roars. জীমূত—cloud.

ক্ষণপ্রভা—Lightning.

তারানাথ—The Lord of stars i.e. the Moon.

উগারি—vomiting; expelling from the stomach.

প্রলয়—Destruction.

বৃষ্টিল শিলা—শিলা বৃষ্টি হইল; There was a hail storm.

রাজ আভরণ দেহে—with kingly ornaments on.

সারসন—belt. রাশিচক্র সম—like the zodiac.

সৌর কিরীট—a crown bright as the sun.

দৈববিভা—godly splendour.

হে ত্রিদিববাসি—O dweller in Heaven.

ত্রিদিব ব্যতীত...... রূপে?—ত্রিদিব ব্যতীত কোন্ দেশ এ হেন মহিমায় ও রূপে সাজে? what region other than the Heaven is adorned with such a splendour and beauty?

এ হেন মহিমা, রূপে—এ হেন মহিমায় ও রূপে; with such a splendour and beauty?

পাদ্য—water to wash পাদ or the feet.

অর্ঘ্য—an offer of green grass, rice etc. made in worshipping God or a Brahmin.

দেবপ্রতি কৃতজ্ঞতা...... সত্যসেবী সেবা—দরিদ্রপালন ও ইন্দ্রিয় দমন করিলে, সদা ধর্ম্ম পথে থাকিলে ও সর্ব্বদা সত্য দেবীর সেবা করিলেই দেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা হইল। The protection of the poor, the control of the senses, a constant course in the path of virtue and worship of the goddess of Truth amount to gratitude to gods.

নৈবেদ্য—an ablation; an offering.

বলি—পূজোপহার—offerings made in worshipping a god.

দাতা যে যদ্যপি অসৎ—If the giver of these offerings is dishonest. কৌমুদিনী—is moonlight.

রজোময়—full of flower-dust.

কুমুদিনী—is water lily. শিবা—jackal.

শবাহারী—the eater of dead bodies.

ভীম প্রহরণধারী—armed with dreadful weapons.

বীরমদ—heroic pride.

নবম সর্গ

নবম সর্গ

প্রভাতিল বিভাবরী; জয়রাম নাদে

নাদিল বিকট-ঠাট লঙ্কার চৌদিকে।

কনক-আসন ত্যজি, বিষাদে ভূতলে

বসেন যথায়, হার, রক্ষোদলপতি

রাবণ; ভীষণ স্বন স্বনিল সে স্থলে

সাগর-কল্লোল-সম। বিস্ময়ে সুরথী

সুধিলা সারণে লক্ষি;—“কহ ত্বরা করি,

হে সচিবশ্রেষ্ঠ বুধ, কি হেতু নিনাদে

বৈরিবৃন্দ, নিশাভাগে নিরানন্দ শোকে?

কহ শীঘ্র, প্রাণদান পাইল কি পুনঃ

কপট-সমরী মূঢ় সৌমিত্রি? কে জানে—

অনুকূল দেবকুল তাই বা করিল!

অবিরাম গতি স্রোতে বাঁধিল কৌশলে

যে রাম; ভাসিল শিলা যার মায়াতেজে

জলমুখে; বাঁচিল যে দুইবার মরি

সমরে; অসাধ্য তার কি আছে জগতে?

কহ শুনি, মন্ত্রিবর, কি ঘটিল এবে?”

করপুটি মন্ত্রিবর উত্তরিলা খেদে;—

“কে বুঝে দেবের মায়া এ মায়াসংসারে,

রাজেন্দ্র? গন্ধমাদন, শৈলকুলপতি,

দেবাত্মা আপনি আসি গত নিশাকালে,

মহৌষধিদানে, প্রভু বাঁচাইলা পুনঃ

লক্ষ্মণে; তেঁই সে সৈন্য নাদিছে উল্লাসে।

হিমান্তে দ্বিগুণতেজঃ ভুজঙ্গ যেমতি,

গরজে সৌমিত্রি-শূর—মত্ত বীরমদে;

গরজে সুগ্রীবসহ দাক্ষিণাত্য যত,

যথা করিযূথ, নাথ! শুনি যূথনাদে!”

বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি কহিলা সুরথী

লঙ্কেশ;—“বিধির বিধি কে পারে খণ্ডাতে?

বিমুখি অমর-মরে, সম্মুখ সমরে

বধিনু যে রিপু আমি, বাঁচিল সে পুনঃ

দৈববলে? হে সারণ, মম ভাগ্যদোষে,

ভুলিলা স্বধর্ম্ম আজি কৃতান্ত আপনি।

গ্রাসিলে কুরঙ্গে সিংহ ছাড়ে কি হে কভু

তাহায়? কি কাজ কিন্তু এ বৃথা বিলাপে?

বুঝিনু নিশ্চয় আমি, ডুবিল তিমিরে

কর্ব্বুর-গৌরব-রবি। মরিল সংগ্রামে

শূলিশম্ভুসম ভাই কুম্ভকর্ণ মম,

কুমার বাসবজয়ী, দ্বিতীয় জগতে

শক্তিধর। প্রাণ আমি ধরি কোন্ সাধে?

আর কি এ দোঁহে ফিরি পাব ভবতলে?

যাও তুমি, হে সারণ! যথায় সুরথী

রাখব;—কহিও শূরে—“রক্ষঃকুলনিধি

রাবণ, হে মহাবাহু! এই ভিক্ষা মাগে

তব কাছে,—তিষ্ঠ তুমি সসৈন্যে এ দেশে

সপ্তদিন, বৈরিভাব পরিহরি, রথি!

পুত্ত্রে র সৎক্রিয়া রাজা ইচ্ছেন সাধিতে

যথাবিধি। বীরধর্ম্ম পাল, রঘুপতি!

বিপক্ষ সুবীরে বীর সম্মানে সতত।

তব বাহুবলে, বলি! বীরশূন্য এবে

বীরযোনি স্বর্ণলঙ্কা। ধন্য বীরকুলে

তুমি! শুভক্ষণে ধনু ধরিলা নৃমণি!

অনুকূল তব প্রতি শুভদাতা বিধি;

দৈববশে রক্ষঃপতি পতিত বিপদে;

পর-মনোরথ আজি পূরাও, সুরথি!—

যাও শীঘ্র, মন্ত্রিবর! রামের শিবিরে।”

বন্দি রক্ষঃকুল-ইন্দ্রে, সঙ্গিদল-সহ,

চলিলা সচিবশ্রেষ্ঠ। অমনি খুলিল

ভীষণ নিনাদে দ্বার, দ্বারপাল যত।

ধীরে ধীরে রক্ষোমন্ত্রী চলিলা বিষাদে;

চির-কোলাহলময় পয়োনিধি-তীরে।

শিবিরে বসেন প্রভু রঘুকুলমণি,

আনন্দসাগরে মগ্ন; সম্মুখে সৌমিত্রি

রথীশ্বর, যথা তরু হিমানীবিহনে

নবরস; পূর্ণশশী সুহাস আকাশে

পূর্ণিমায়; কিম্বা পদ্ম, নিশা অবসানে,

প্রফুল্ল। দক্ষিণে রক্ষঃ বিভীষণ বলী

মিত্র, আর নেতৃ যত—দুর্দ্ধর্ষ সংগ্রামে—

দেবেন্দ্রে বেড়িয়া যেন দেবকুলরথী!

কহিল সংক্ষেপে বার্ত্তা বার্ত্তাবহ ত্বরা;—

“রক্ষঃকুলমন্ত্রী, দেব! বিখ্যাত জগতে,

সারণ, শিবিরদ্বারে সঙ্গিদল সহ;—

কি আজ্ঞা তোমার, দাসে কহ নরমণি!”

আদেশিলা রঘুবর;—“আন ত্বরা করি,

বার্ত্তাবহ! মন্ত্রীবরে সাদরে এ স্থলে।

কে না জানে দূতকুল অবধ্য সমরে?”

প্রবেশি শিবিরে তবে সারণ কহিলা;—

(বন্দি রাজপদযুগ) “রক্ষঃকুলনিধি

রাবণ, হে মহাবাহু, এই ভিক্ষা মাগে

তব কাছে,—তিষ্ঠ তুমি সসৈন্যে এ দেশে

সপ্তদিন, বৈরিভাব পরিহরি, রথি!

পুত্ত্রের সৎক্রিয়া রাজা ইচ্ছেন সাধিতে

যথাবিধি! বীরধর্ম্ম পাল রঘুপতি!

বিপক্ষ সুবীরে বীর সম্মানে সতত।

তব রাহুবলে, বলি! বীরশূন্য এবে

বীরযোনি স্বর্ণলঙ্কা। ধন্য বীরকুলে

তুমি! শুভক্ষণে ধনু ধরিলা নৃমণি!

অনুকুল তব প্রতি শুভদাতা বিধি;

দৈববশে রক্ষঃপতি পতিত বিপদে;—

পর-মনোরথ আজি পূরাও সুরথি।”

উত্তরিলা রঘুনাথ;— “পরমারি মম,

হে সারণ, প্রভু তব; তবু তাঁর দুঃখে

পরম দুঃখিত আমি, কহিনু তোমারে।

রাহুগ্রাসে হেরি সূর্য্যে কার না বিদরে

হৃদয়? যে তরুরাজ জ্বলে তাঁর তেজে

অরণ্যে, মলিনমুখ সেও হে সে কালে।

বিপদে অপর পর সম মম কাছে,

মন্ত্রিবর! যাও ফিরি স্বর্ণলঙ্কাধামে

তুমি, না ধরিব অস্ত্র সপ্তদিন আমি

সসৈন্যে। কহিও, বুধ, রক্ষঃকুলনাথে,

ধর্ম্মকর্ম্মে রত জনে কভু না প্রহারে

ধার্ম্মিক।” এতেক কহি নীরবিলা বলী

নতভাবে রক্ষোমন্ত্রী কহিলা উত্তরি;—

“নরকুলোত্তম তুমি রঘুকুলমণি;

বিদ্যা, বুদ্ধি, বাহুবলে অতুল জগতে।

উচিত এ কর্ম্ম তব, শুন মহামতি!

অনুচিত কর্ম্ম কভু করে কি সুজনে?

যথা রক্ষঃদলপতি নৈকষেয় বলী;

নরদলপতি তুমি, রাঘব! কুক্ষণে—

ক্ষম এ আক্ষেপ, রথি! মিনতি ও পদে—

কুক্ষণে ভেটিলে দোঁহা দোঁহে রিপুভাবে!

বিধির নির্ব্বন্ধ কিন্তু কে পারে খণ্ডাতে?

যে বিধি, হে মহাবাহু, সৃজিলা পবনে

সিন্ধু-অরি; মৃগ-ইন্দ্রে গজ-ইন্দ্র-রিপু;

খগেন্দ্র নগেন্দ্র-বৈরী, তাঁর মায়াছলে

রাঘব রাবণ-অরি— দোষিব কাহারে?”

প্রসাদ পাইয়া দূত চলিলা সত্বরে,

যথায় রাক্ষসনাথ বসেন নীরবে,

তিতিয়া বসন, মরি, নয়ন-আসারে,

শোকার্ত্ত। হেথায় আজ্ঞা দিলা নরপতি

নেতৃবৃন্দে; রণসজ্জা ত্যজি কুতূহলে,

বিরাম লভিলা সবে যে যার শিবিরে।

যথায় অশোকবনে বসেন বৈদেহী,—

অতল-জলধিতলে, হায় রে, যেমতি

বিরহে কমলাসতী; আইলা সরমা —

রক্ষঃকুলরাজলক্ষ্মী রক্ষোবধূবেশে।

বন্দি চরণারবিন্দ বসিলা ললনা

পদতলে। মধুস্বরে সুধিলা মৈথিলী;—

“কহ মোরে বিধুমুখি! কেন হাহাকারে

এ দুদিন পুরবাসী? শুনিনু সভয়ে

রণনাদ সারাদিন কালি রণভূমে;

কাঁপিল সঘনে বন, ভূকম্পনে যেন,

দূর বীরপদভরে; দেখিনু আকাশে

অগ্নিশিখাসম শর; দিবা-অবসানে,

জয়নাদে রক্ষঃসৈন্য পশিল নগরে,

বাজিল রাক্ষসবাদ্য গম্ভীর-নিক্কণে।

কে জিনিল? কে হারিল? কহ ত্বরা করি,

সরমে! আকুল মন, হায় লো, না মানে

প্রবোধ। না জানি, হেথা জিজ্ঞাসি কাহারে?

না পাই উত্তর যদি সুধি চেড়ীদলে।

বিকটা ত্রিজটা, সখি, লোহিতলোচনা,

করে খরশাণ অসি, চামুণ্ডারূপিণী,

আইল কাটিতে মোরে গত নিশাকালে,

ক্রোধে অন্ধা! আর চেড়ী রোধিল তাহারে,

বাঁচিল এ পোড়া প্রাণ তেঁই, সুকেশিনি!

এখনও কাঁপে হিয়া স্মরিলে দুষ্টারে।”

কহিলা সরমা—সতী সুমধুর ভাষে;—

“তব ভাগ্যে, ভাগ্যবতি! হতজীব রণে

ইন্দ্রজিৎ। তেঁই লঙ্কা বিলাপে এরূপে

দিবানিশি। এত দিনে গতবল, দেবি!

কর্ব্বুর-ঈশ্বর বলী। কাঁদে মন্দোদরী;

রক্তঃকুলনারীকুল আকুল বিষাদে;

নিরানন্দ রক্ষোরথী। তব পুণ্যবলে,

পদ্মাক্ষি, দেবর তব লক্ষ্মণ সুরথী

দেবের অসাধ্য কর্ম্ম সাধিলা সংগ্রামে,—

বধিলা বাসবজিতে—অজেয় জগতে!”

উত্তরিলা প্রিয়ম্বদা;—“সুবচনী তুমি

মম পক্ষে, রক্ষোবধু! সদা লো এ পুরে।

ধন্য বীর-ইন্দ্র-কুলে সৌমিত্রি-কেশরী।

শুভক্ষণে হেন পুত্ত্রে সুমিত্রা-শাশুড়ী,

ধরিলা সুগর্ভে, সই; এতদিনে বুঝি

কারাগারদ্বার মম খুলিলা বিধাতা

কৃপায়। একাকী এবে রাবণ দুর্ম্মতি

মহারথী লঙ্কাধামে। দেখিব কি ঘটে—

দেখিব আর কি দুঃখ আছে এ কপালে?

কিন্তু শুন কাণ দিয়া! ক্রমশঃ বাড়িছে

হাহাকার–ধ্বনি, সখি।” কহিলা সরমা

সুবচনী;—“কর্ব্বরেন্দ্র রাঘবেন্দ্র-সহ

করি সন্ধি, সিন্ধুতীরে লইছে তনয়ে

প্রেতক্রিয়াহেতু, সতি! সপ্ত দিবানিশি

না ধরিবে অস্ত্র কেহ এ রাক্ষসদেশে

বৈরিভাবে—এ প্রতিজ্ঞা করিলা নৃমণি

রাবণের অনুরোধে; দয়াসিন্ধু, দেবি!

রাঘবেন্দ্র। দৈত্যবালা প্রমীলা-সুন্দরী,

বিদরে হৃদয়, সাধ্বি! স্মরিলে সে কথা,

প্রমীলা-সুন্দরী ত্যজি দেহ দাহস্থলে,

পতির উদ্দেশে সতী, পতিপরায়ণা,

যাবে স্বর্গপুরে আজি। হর-কোপানলে,

হে দেবি! কন্দর্প যবে মরিলা পুড়িয়া,

মরিলা কি রতি-সতী প্রাণনাথে ল’য়ে?

কাঁদিলা রাক্ষসবধূ তিতি অশ্রুনীরে

শোকাকুলা। ভবতলে মূর্ত্তিমতী দয়া

সীতারূপে, পরদুঃখে কাতর সতত,

কহিলা—সজল আঁখি, সম্ভাষি সখীরে;—

“কুক্ষণে জনম মম, সরমা রাক্ষসি!

সুখের প্রদীপ, সখি! নিবাই লো সদা

প্রবেশি যে গৃহে হায়, অমঙ্গলারূপী

আমি। পোড়া ভাগ্যে এই লিখিলা বিধাতা!

নরোত্তম পতি মম, দেখ, বনবাসী,

বনবাসী, সুলক্ষণে! দেবর সুমতি

লক্ষ্মণ! ত্যজিলা প্রাণ পুত্ত্রশোকে, সখি!

শ্বশুর। অযোধ্যাপুরী আঁধার লো এবে,

শূন্য রাজসিংহাসন! মরিলা জটায়ু,

বিকট বিপক্ষ-পক্ষে ভীম-ভুজবলে,

রক্ষিতে দাসীর মান। হ্যাদে দেখ হেথা,—

মরিল বাসবজিৎ অভাগীর দোষে,

আর রক্ষোরথী যত, কে পারে গণিতে?

মরিবে দানব-বালা অতুলা এ ভবে

সৌন্দর্য্যে! বসন্তারম্ভে, হায় লো, শুকাল

হেন ফুল!” “দোষ তব,”— সুধিলা সরমা,

মুছিয়া নয়ন-জল— “কহ কি, রূপসি?

কে ছিঁড়ি আনিল হেথা এ স্বর্ণব্রততী,

বঞ্চিয়া রসালরাজে? কে আনিল তুলি

রাঘব–মানস-পদ্ম এ রাক্ষস-দেশে?

নিজ-কর্ম্মদোষে মজে লঙ্কা অধিপতি!

আর কি কহিবে দাসী?” কাঁদিলা সরমা

শোকে! রক্ষঃকুল-শোকে সে অশোক-বনে

কাঁদিলা রাঘব-বাঞ্ছা— দুঃখী পর-দুঃখে!

খুলিল পশ্চিম-দ্বার অশনি-নিনাদে।

বাহিরিল লক্ষ রক্ষঃ স্বর্ণ-দণ্ড করে,

কৌষিক-পতাকা তাহে উড়িছে আকাশে!

রাজ-পথ-পার্শ্বদ্বয়ে চলে সারি সারি

নীরবে পতাকিকুল। সর্ব্বাগ্রে দুন্দুভি

করিপৃষ্ঠে, পূরে দেশ গম্ভীর-আরবে।

পদব্রজে পদাতিক কাতারে কাতারে;

বাজিরাজী সহ গজ; রথিবৃন্দ রথে

মৃদুগতি, বাজে বাদ্য সকরুণ ক্কণে।

যত দূর চলে দৃষ্টি, চলে সিন্ধুমুখে

নিরানন্দে রক্ষোদল! ঝক ঝক ঝকে

স্বর্ণ-বর্ম্ম ধাঁধি আঁখি! রবি-কর-তেজে

শোভে-হৈমধ্বজদণ্ড; শিরোমণি শিরে;

অসিকোষ সারসনে; দীর্ঘ শূল হাতে;—

বিগলিত অশ্রুধারা, হায় রে, নয়নে!

বাহিরিল বীরাঙ্গনা (প্রমীলার দাসী)

পরাক্রমে ভীমাসমা, রূপে বিদ্যাধরী,

রণ-বেশে—কৃষ্ণ-হয়ে নৃমুণ্ডমালিনী,—

মলিন-বদন, মরি শশিকলাভাবে

নিশা যথা! অবিরল ঝরে অশ্রু-ধারা,

তিতি বস্ত্র, তিতি অশ্ব, তিতি বসুধারে!

উচ্ছ্বাসিছে কোন বামা; কেহ বা কাঁদিছে

নীরবে; চাহিছে কেহ রঘুসৈন্যপানে

অগ্নিময় আঁখি রোষে, বাঘিনী যেমতি

(জালাবৃত) ব্যাধবর্গে হেরিয়া অদূরে!

হায় রে কোথা সে হাসি— সৌদামিনী ছটা,

কোথা সে কটাক্ষ-শর, কামের সমরে

সর্ব্বভেদী? চেড়ীবৃন্দ-মাঝারে বড়বা,

শূন্যপৃষ্ঠ, শোভাশূন্য, কুসুম-বিহনে

বৃন্ত যথা! ঢুলাইছে চামর চৌদিকে

কিঙ্করী, চলিছে সঙ্গে বামাব্রজ কাঁদি

পদব্রজে; কোলাহল উঠিছে গগনে।

প্রমীলার বীর-বেশ শোভে ঝলমলে

বড়বার পৃষ্ঠে—অসি, চর্ম্ম, তৃণ, ধনুঃ;

কিরীট, মণ্ডিত মরি, অমূল্য রতনে!

সারসন মণিময়; কবচ খচিত

সুবর্ণে—মলিন দোঁহে। সারসন স্মরি,

হায় রে, সে সরু কটি! কবচ ভাবিয়া

সে সু-উচ্চ কুচ-যুগে— গিরিশৃঙ্গ সমা!

ছড়াইছে খই, কড়ি, স্বর্ণমুদ্রা-আদি

অর্থ, দাসী; সকরুণে গাইছে গায়কী;

পেশল-উরস হানি কাঁদিছে রাক্ষসী।

বাহিরিল মৃদুগতি রথবৃন্দ-মাঝে

রথবর ঘনবর্ণ, বিজলীর ছটা

চক্রে; ইন্দ্রচাপরূপী ধ্বজ চূড়দেশে;—

কিন্তু কান্তিশূন্য আজি, শূন্যকান্তি যথা

প্রতিমাপঞ্জর, মরি, প্রতিমাবিহনে

বিসর্জ্জন-অন্তে। কাঁদে ঘোর কোলাহলে

রক্ষোরথী, ক্ষণ বক্ষঃ হানি মহাক্ষেপে

হতজ্ঞান! রণমধ্যে শোভে ভীম-ধনুঃ,

তূণীর, ফলক, খড়্গ, শঙ্খ, চক্র, গদা—

আদি অস্ত্র; সুকবচ;সৌরকর-রাশি—

সদৃশ কিরীট; আর বীর-ভূষা যত।

সকরুণ গীতে গীতী গাইছে কাঁদিয়া

রক্ষোদুঃখ! স্বর্ণমুদ্রা ছড়াইছে কেহ,

ছড়ায় কুসুম যথা নড়ি ঘোর ঝড়ে

তরু। সুবাসিত জল ঢালে জলবহ,

দমি উচ্চগামী রেণু, বিরত সহিতে

পদভর। চলে রথ সিন্ধু-তীর-মুখে।

সুবর্ণ-শিবিকাসনে, আবৃত কুসুমে,

বসেন শবের পাশে প্রমীলা-সুন্দরী,—

মর্ত্ত্যে রতি মৃত-কামসহ সহগামী!

ললাটে সিন্দুরবিন্দু, গলে ফুলমালা;

কঙ্কণ মৃণালভুজে; বিবিধ ভূষণে

ভূষিতা রাক্ষসবধূ। ঢুলাইছে কাঁদি

চামরিণী সুচামর; কাঁদি ছড়াইছে

ফুলরাশি বামাবৃন্দ। আকুল বিষাদে,

রক্ষঃকুল-নারীকুল কাঁদে হাহারবে।

হায় রে, কোথা সে জ্যোতিঃ ভাতিত যে সদা

মুখচন্দ্রে? কোথা, মরি, সে সুচারু হাসি,

মধুর অধরে নিত্য শোভিত যে, যথা

দিনকরকররাশি তোর বিম্বাধরে,

পঙ্কজিনি? মৌনব্রতে ব্রতী বিধুমুখী—

পতির উদ্দেশে প্রাণ ও বরাঙ্গ ছাড়ি

গেছে যেন যথা পতি বিরাজেন এবে!

শুকাইলে তরুরাজ, শুকায় রে লতা,

স্বয়ম্বরা বধূ ধনী। কাতারে কাতারে,

চলে রক্ষোরথী সাথে, কোষশূন্য অসি

করে, রবিকর তাহে ঝলে ঝলঝলে,

কাঞ্চন-কঞ্চুকবিভা নয়ন ঝলসে!

উচ্চে উচ্চারয়ে বেদ বেদজ্ঞ চৌদিকে;

বহে হবির্ব্বহ হোত্রী মহামন্ত্র জপি;

বিবিধ ভূষণ, বস্ত্র, চন্দন, কস্তুরী,

কেশর, কুঙ্কুম, পুষ্প বহে রক্ষোবধূ

স্বর্ণপাত্রে; স্বর্ণকুম্ভে পূত অম্ভোরাশি

গাঙ্গেয়; সুবর্ণদীপ দীপে চারিদিকে।

বাজে ঢাক, বাজে ঢোল, কাড়া কড়কড়ে

বাজে করতাল, বাজে মৃদঙ্গ, তুম্বকী;

বাজিছে ঝাঁঝরী, শঙ্খ; দেয় হুলাহুলি

সধবা রাক্ষসনারী আর্দ্র অশ্রুনীরে—

হায় রে, মঙ্গলধ্বনি অমঙ্গল দিনে!

বাহিরিলা পদব্রজে রক্ষঃকুলরাজা

রাবণ;—বিশদ-বস্ত্র, বিশদ-উত্তরী,

ধুতূরার মালা যেন ধূর্জ্জটির গলে;

চারিদিকে মন্ত্রিদল নতভাবে।

নীরব কর্ব্বু র-পতি অশ্রুপূর্ণ-আঁখি,

নীরব সচিববৃন্দ, অধিকারী যত

রক্ষঃশ্রেষ্ঠ। বাহিরিল কাঁদিয়া পশ্চাতে

রক্ষোপুরবাসী রক্ষঃ—আবাল-বনিতা–

বৃদ্ধ; শূন্য করি পুরী, আঁধার রে এবে

গোকুলভবন যথা শ্যামের বিহনে!

ধীরে ধীরে সিন্ধুমুখে, তিতি অশ্রুনীরে,

চলে সবে, পূরি দেশ বিষাদ-নিনাদে!

কহিলা অঙ্গদে প্রভু সুমধুর–স্বরে,—

“দশ শত রথী সঙ্গে যাও মহাবলী

যুবরাজ! রক্ষঃসহ মিত্রভাবে তুমি,

সিন্ধুতীরে। সাবধানে যাও, হে সুরথি!

আকুল পরাণ মম রক্ষঃকুলশোকে!

এ বিপদে পরাপর নাহি ভাবি মনে,

কুমার! লক্ষ্মণশূরে হেরি পাছে রোষে,

পূর্ব্ব-কথা স্মরি মনে কর্ব্বুরাধিপতি,

যাও তুমি, যুবরাজ! রাজচুড়ামণি,

পিতা তব বিমুখিলা সমরে রাক্ষসে,

শিষ্টাচারে, শিষ্টাচার, তোষ তুমি তারে!”

দশ শত রথী সাথে চলিলা সুরথী

অঙ্গদ সাগরমুখে। আইলা আকাশে

দেবকুল;—ঐরাবতে দেবকুলপতি,

সঙ্গে বরাঙ্গনা শচী অনন্তযৌবনা,

শিখিধ্বজে শিখিধ্বজ স্কন্দ তারকারি

সেনানী; চিত্রিত রথে চিত্ররথ রথী;

মৃগে বায়ুকুলরাজ; ভীষণ মহিষে

কৃতান্ত; পুষ্পকে যক্ষ, অলকার পতি;—

আইলা রজনীকান্ত শান্ত সুধানিধি,

মলিন তপনতেজে; আইলা সুহাসী

অশ্বিনীকুমারযুগ, আর দেব যত।

আইলা সুরসুন্দরী, গন্ধর্ব্ব, অপ্সরা,

কিন্নর, কিন্নরী। রঙ্গে বাজিল অম্বরে

দিব্য বাদ্য। দেব-ঋষি আইলা কৌতুকে,

আর আর প্রাণী যত ত্রিদিবনিবাসী।

উতরি সাগরতীরে, রচিলা সত্বরে

যথাবিধি চিতা রক্ষঃ, বহিল বাহকে

সুগন্ধ চন্দনকাষ্ঠ, ঘৃত ভারে ভারে।

মন্দাকিনী-পূত-জলে ধুইয়া যতনে

শবে, সুকৌষিক–বস্ত্র পরাই, থুইল

দাহস্থানে রক্ষোদল; পড়িলা গম্ভীরে

মন্ত্র রক্ষঃ-পুরোহিত। অবগাহি দেহ

মহাতীর্থে সাধ্বী—সতী প্রমীলা—সুন্দরী

খুলি রত্ন-আভরণ, বিতরিলা সবে।

প্রণমিয়া গুরুজনে মধুরভাষিণী,

সম্ভাষি মধুরভাষে দৈত্যবালাদলে,

কহিলা;— “লো সহচরি, এতদিনে আজি

ফুরাইল জীব-লীলা জীবলীলা-স্থলে

আমার! ফিরিয়া সবে যাও দৈত্যদেশে।

কহিও পিতার পদে এ সব বারতা,

বাসন্তি! মায়েরে মোর”—হায় রে, বহিল

সহসা নয়নজল! নীরবিলা সতী;—

কাঁদিল দানববালা হাহাকার রবে!

মুহূর্ত্তে সম্বরি শোক কহিলা সুন্দরী;

“কহিও মায়েরে মোর, এ দাসীর ভালে

লিখিলা বিধাতা যাহা, তাই লো ঘটিল

এত দিনে! যাঁর হাতে সঁপিলা দাসীরে

পিতা মাতা, চলিনু লো আজি তাঁর সাথে;—

পতি বিনা অবলার কি গতি জগতে?

আর কি কহিব, সখি? ভুল না লো তারে—

প্রমীলার এই ভিক্ষা তোমা সবা কাছে।”

চিতায় আরোহি সতী (ফুলাসনে যেন!

বসিলা আনন্দমতি পতি-পদতলে;

প্রফুল্ল–কুসুমদাম কবরী-প্রদেশে।

বাজিল রাক্ষসবাদ্য; উচ্চে উচ্চারিল

বেদ বেদী; রক্ষোনারী দিল হুলাহুলি;

সে রবের সহ মিশি উঠিল আকাশে

হাহারব! পুষ্পবৃষ্টি হইল চৌদিকে।

বিবিধ ভূষণ, বস্ত্র, চন্দন, কস্তুরী,

কেশর, কুঙ্কুম-আদি দিল রক্ষোবালা

যথাবিধি; পশুকুলে নাশি তীক্ষ্ণশরে,

ঘৃতাক্ত করিয়া রক্ষঃ যতনে থুইল

চারিদিকে, যথা মহানবমীর দিনে,

শাক্ত ভক্ত-গৃহে, শক্তি, তব পীঠতলে!

অগ্রসরি রক্ষোরাজ কহিলা কাতরে;—

“ছিল আশা, মেঘনাদ, মুদিব অন্তিমে

এ নয়নদ্বয় আমি তোমার সম্মুখে!—

সঁপি রাজ্যভার, পুত্ত্র, তোমায়, করিব

মহাযাত্রা! কিন্তু বিধি—বুঝিব কেমনে

তাঁর লীলা?—ভাঁড়াইলা সে সুখে আমারে।

ছিল আশা, রক্ষঃকুলরাজসিংহাসনে

জুড়াইব আঁখি, বৎস, দেখিয়া তোমারে,

বামে রক্ষঃকুললক্ষ্মী রক্ষোরাণীরূপে

পুত্ত্রবধূ! বৃথা আশা! পূর্ব্বজন্ম-ফলে

হেরি তোমা দোঁহে আজি এ কাল–আসনে!

কর্ব্বুর-গৌরব-রবি চির রাহুগ্রাসে।

সেবিনু শিবেরে আমি বহু যত্ন করি,

লভিতে কি এই ফল? কেমনে ফিরিব,—

হায় রে, কে কবে মোরে, ফিরিব কেমনে

শূন্য লঙ্কাধামে আর? কি সান্ত্বনা-ছলে

সান্ত্বনিব মায়ে তব, কে কবে আমারে?

‘কোথা পুত্ত্র পুত্ত্রবধূ আমার?’ সুধিবে

যবে রাণী মন্দোদরী,—‘কি সুখে আইলে

রাখি দোঁহে সিন্ধুতীরে, রক্ষঃকুলপতি?’

কি ক’য়ে বুঝাব তারে? হায় রে, কি ক’য়ে?

হা পুত্ত্র! হা বীরশ্রেষ্ঠ! চিরজয়ী রণে।

হা মাতঃ রাক্ষসলক্ষ্মি! কি পাপে লিখিলা

এ পীড়া দারুণ বিধি রাবণের ভালে?

অধীর হইলা শূলী কৈলাস-আলয়ে!

নড়িল মস্তকে জটা; ভীষণ-গর্জ্জনে

গর্জ্জিল ভুজঙ্গবৃন্দ; ধক্‌ ধক্‌ ধকে

জ্বলিল অনল ভালে; ভৈরব-কল্লোলে

কল্লোলিলা ত্রিপথগা, বরিষায় যথা

বেগবতী স্রোতস্বতী পর্ব্বতকন্দরে!

কাঁপিল কৈলাস-গিরি থর থর থরে!

কাঁপিল আতঙ্কে বিশ্ব; সভয়ে অভয়া

কৃতাঞ্জলিপুটে সাধ্বী কহিলা মহেশে—

“কি হেতু সরোষ, প্রভু, কহ তা দাসীরে?

মরিল সমরে রক্ষঃ বিধির বিধানে;

নহে দোষী রঘুরথী! যদি নাশ

অবিচারে তারে, নাথ, কর ভস্ম আগে

আমায়।” চরণযুগ ধরিলা জননী।

সাদরে সতীরে তুলি কহিলা ধূর্জ্জটি;—

“বিদরে হৃদয় মম, নগরাজবালে,

রক্ষোদুঃখে। জান তুমি কত ভালবাসি

নৈকষেয় শূরে আমি! তব অনুরোধে,

ক্ষমিব, হে ক্ষেমঙ্করি, শ্রীরাম-লক্ষ্মণে।”

আদেশিলা অগ্নিদেবে বিষাদে ত্রিশূলী; —

“পবিত্রি, হে সর্ব্বশুচি, তোমার পরশে

আন শীঘ্র এ সুধামে রাক্ষস-দম্পতি।”

ইরম্মদরূপে অগ্নি ধাইলা ভূতলে!

সহসা জ্বলিল চিতা। সচকিতে সবে

দেখিলা আগ্নেয়-রথ; সুবর্ণ-আসনে

সে রথে আসীন বীর বাসববিজয়ী

দিব্যমূর্ত্তি! বামভাগে প্রমীলা-রূপসী,

অনন্ত যৌবনকান্তি শোভে তনুদেশে;

চিরসুখহাসিরাশি মধুর-অধরে!

উঠিল গগন-পথে রথবর বেগে;

বরষিলা পুষ্পাসার দেবকুল মিলি;

পূরিল বিপুল বিশ্ব আনন্দ নিনাদে!

দুগ্ধধারে নিবাইল উজ্জ্বল পাবকে

রাক্ষস। পরম যত্নে কুড়াইয়া সবে

ভস্ম, অম্বুরাশিতলে বিসর্জ্জিলা তাহে।

ধৌত করি দাহস্থল জাহ্নবীর জলে

লক্ষ রক্ষঃশিল্পী আশু নির্ম্মিল মিলিয়া

স্বর্ণ-পাটিকেলে মঠ চিতার উপরে;—

ভেদি অভ্র, মঠচূড়া উঠিল আকাশে।

করি স্নান সিন্ধুনীরে, রক্ষোদল এবে

ফিরিলা লঙ্কার পানে, আর্দ্র অশ্রুনীরে—

বিসর্জ্জি প্রতিমা যেন দশমী-দিবসে!

সপ্ত দিবানিশি লঙ্কা কাঁদিলা বিষাদে।

ইতি গ্রীমেঘনাদবধ কাব্যে সংস্ক্রিয়া নাম নবমঃ সর্গঃ।

নবম সর্গ।

করপুটি—folding the hands.

হিমান্তে—after winter.

দ্বিগুণতেজঃ—having a doubled spirit.

পরমনোরথ—the desire of the enemy.

হিমানীহিনে—in the absence of winter.

নবরস—full of new vigour.

সুহাস—having a charming smile.

পরমারি—a great foe.

যে তরুরাজ জ্বলে...সে কালে—the big tree which burns with his heat in the forest is also pale with sorrow. অপর পর—friend or foe.

খগেন্দ্র—Garuda, the king of birds.

নগেন্দ্র—the king of snakes; great snakes.

সুবচনী—is a goddes. Here it means speaking sweet words.

বিকট বিপক্ষ-পক্ষে—dreadful for the enemy.

ভীমভুজবলে—with the fearful strength of the arms of Ravana.

গম্ভীর-আরবে—with deep sounds.

সকরুণ ক্কণে—with mournful sound.

কৃষ্ণ হয়ে—on a black horse.

শশিকলাভাবে—for want of the digit of the moon. জালাবৃত—Surrounded with a net.

কামের সমরে—in amorous wars.

সর্ব্বভেদী—all-piercing.

বড়বা—is a common name for a horse. It is also the proper name for the horse of Pramila.

শূন্যপৃষ্ঠ—because Pramila did not ride on the back. Only the arms and armours of Pramila were carried by the horse.

মলিন দোঁহে। সারসন স্মরি .........গিরিশৃঙ্গ সমা—both the girdle studded with gems, and the armour made of gold were devoid of lustre. Why? The girdle was pale because it missed the beautiful fine waist of Pramila which lent it its beauty. And the armour was pale as it missed the two plump and prominent breasts, as prominent as the peak of a motintain.

পেশল—soft and smooth. উরস—breast

হানি—striking; beating.

প্রতিমাপঞ্জর—the skeleton of the image of a god or goddess.

মহক্ষেপে—owing to great আক্ষেপ or grief.

গীতী—গায়ক, singer.

জলবহ—water-carrier. দমি উচ্চগামী রেণু—controlling the particles of dust flying upwards.

বিরত সহিতে পদভর—disinclined to bear the weight of feet.

পঙ্কঞ্জিনি—পদ্মিনী, lotus.

স্বয়ম্বরা বধূ ধনী—the creeper is so called as she is supposed to choose her own husband.

উচ্চে উচ্চারয়ে—loudly utters.

হবির্ব্বহ—one who carries to a god an oblation offered to him. Fire is said to do this. Hence means ‘Fire’. হবিঃ—means (1) an oblation, or (2) clarified butter; ঘৃত

হোত্রী—হোম কর্ত্তা, the priest who performs the homa. অম্ভোরাশি— mass of water.

গাঙ্গেয়—of the Ganges বিশদ—white and pure.

অধিকারী—lords; masters. রোষে—is angry.

শিষ্টাচার-one who has good breeding; a polite person. দিব্য বাদ্য—Heavenly music.

মন্দাকিনী-পূত-জল—the holy water of Mundakini.

সুকৌষিক বস্ত্র—good silken cloth.

জীবলীলাস্থলে—in this world.

পীঠতলে—under the seat of the goddess.

মহাযাত্রা—starting for the next life.

ভাঁড়াইলা—has deprived.

ভৈরব-কল্লোল—dreadful noise.

ত্রিপথগা—The Ganges is so called as she flows along three courses through the Heaven, Earth and the Infernal Regions.

নগরাজবালে—case of address from the word নগরাজবালা; O daughter of the lord of mountains.

পবিত্রি—making sacred or holy.

সর্ব্বশুচি—fire who makes everything pure.

দুগ্ধধার—jets or flows of milk.

স্বর্ণপাটিকেল—bricks of gold. মঠ—temple.

পঞ্চম সর্গ

পঞ্চম সর্গ

হাসে নিশি তারাময়ী ত্রিদশ-আলয়ে।

কিন্তু চিন্তাকুল এবে বৈজয়ন্ত-ধামে

মহেন্দ্র; কুসুম-শয্যা ত্যজি মৌনভাবে

বসেন ত্রিদিব-পতি রত্ন-সিংহাসনে;—

সুবর্ণ-মন্দিরে সুপ্ত আর দেব যত।

অভিমানে স্বরীশ্বরী কহিলা সুম্বরে;

“কি দোষে, সুরেশ, দাসী দোষী তব পদে?

শয়ন-আগারে তবে কেন না করিছ

পদার্পণ? চেয়ে দেখ, ক্ষণেক মুদিয়ে,

উন্মীলিছে পুনঃ আঁখি, চমকি তরাসে

মেনকা, ঊর্ব্বশী, দেখ, স্পন্দহীন যেন!

চিত্র-পুত্তলিকা-সম চারু চিত্রলেখা!

তব ডরে ডরি দেবী বিরামদায়িনী

নিদ্রা, নাহি যান, নাথ, তোমার সমীপে,

আর কারে ভয় তাঁর? এ ঘোর নিশীথে,

কে কোথা জাগিছে, বল? দৈত্যদল আসি

ব’সেছে কি থানা দিয়া স্বর্গের দুয়ারে?”

উত্তরিলা অসুরারি; “ভাবিতেছি, দেবি,

কেমনে লক্ষ্মণ-শূর নাশিবে রাক্ষসে?

অজেয় জগতে, বীরেন্দ্র রাবণি!”

“পাইয়াছে অস্ত্র, কান্ত!” কহিলা পৌলোমী

অনন্ত-যৌবনা;—“যাহে বধিলা তারকে

মহাসুর তারকারি; তব ভাগ্য-বলে,

তব পক্ষ বিরূপাক্ষ; আপনি পার্ব্বতী,

দাসীর সাধনে সাধ্বী কহিলা, সুসিদ্ধ

হবে মনোরথ কালি; মায়া দেবীশ্বরী

বধের বিধান কহি দিবেন আপনি;—

তবে এ ভাবনা, নাথ, কহ কি কারণে?”

উত্তরিলা দৈত্যরিপু;—“সত্য যা কহিলে,

দেবেন্দ্রাণি! প্রেরিয়াছি অস্ত্র লঙ্কাপুরে;

কিন্তু কি কৌশলে মায়া রক্ষিবে লক্ষ্মণে

রক্ষোযুদ্ধে, বিশালাক্ষি! না পারি বুঝিতে।

জানি আমি মহাবলী সুমিত্রা-নন্দন;

কিন্তু দন্তী কবে, দেবি, আঁটে মৃগরাজে?

দম্ভোলি-নির্ঘোষ আমি শুনি, সুবদনে!

মেঘের ঘর্ঘর ঘোর; দেখি ইরম্মদে;

বিমানে আমার সদা ঝলে সৌদামিনী;

তবু থরথরি হিয়া কাঁপে, দেবি, যবে

নাদে রুষি মেঘনাদ, ছাড়ে হুহুঙ্কারে

অগ্নিময় শর-জাল বসাইয়া চাপে

মহেষ্বাস; ঐরাবত অস্থির আপনি

তার ভীম-প্রহরণে!” বিষাদে নিশ্বাসি

নীরবিলা সুরনাথ; নিশ্বাসি বিষাদে

(পতি-খেদে সতী-প্রাণ কাঁদে রে সতত!)

বসিলা ত্রিদিব দেবী দেবেন্দ্রের পাশে।

ঊর্ব্বশী, মেনকা, রম্ভা, চারু চিত্রলেখা

দাঁড়াইলা চারিদিকে; সরসে যেমতি

সুধাকর-কর-রাশি বেড়ে নিশাকালে

নীরবে মুদিত পদ্মে। কিম্বা দীপাবলী

অম্বিকার পীঠতলে শারদ-পার্ব্বণে,

হর্ষে মগ্ন বঙ্গ যবে পাইয়া মায়েরে,

চির-বাঞ্ছা। মৌনভাবে বসিলা দম্পতী;

হেনকালে মায়াদেবী উতরিলা তথা।

রতন-সম্ভবা বিভা দ্বিগুণ বাড়িল

দেবালয়ে; বাড়ে যথা রবি-কর-জালে

মন্দার কাঞ্চন-কান্তি নন্দন-কাননে।

সসম্ভ্রমে প্রণমিলা দেব-দেবী দোঁহে

পাদপদ্মে। স্বর্ণাসনে বসিলা আশীষি

মায়া। কৃতাঞ্জলিপুটে সুরকুল-নিধি

সুধিলা; “কি ইচ্ছা, মাতঃ, কহ এ দাসেরে?”

উত্তরিলা মায়াময়ী;—“যাই, আদিতেয়

লঙ্কাপুরে; মনোরথ তোমার পূরিব;

রক্ষঃকুল-চূড়ামণি চূর্ণিব কৌশলে

আজি। চাহি দেখ, ওই পোহাইছে নিশি।

অবিলম্বে, পুরন্দর, ভবানন্দময়ী

ঊষা দেখা দিবে হাসি উদয়-শিখরে;

লঙ্কার পঙ্কজ রবি যাবে অস্তাচলে!

নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লইব লক্ষ্মণে,

অসুরারি! মায়া জালে বেড়িব রাক্ষসে।

নিরস্ত্র, দুর্ব্বল বলী দৈব অস্ত্রাঘাতে,

অসহায় (সিংহ যেন আনায়-মাঝারে)

মরিবে,—বিধির বিধি কে পারে লঙ্ঘিতে?

মরিবে রাবণি রণে; কিন্তু এ বারতা

পাবে ধরে রক্ষঃপতি, কেমনে রক্ষিবে

তুমি রামানুজে, রামে, ধীর বিভীষণে

রঘু-মিত্র? পুত্রশোকে বিকল, দেবেন্দ্র

পশিবে সমরে শূর কৃতান্ত সদৃশ

ভীমবাহু! কার সাধ্য বিমুখিবে তারে?

ভাবি দেখ, সুরনাথ, কহিনু যে কথা!”

উত্তরিলা শচীকান্ত নমুচিসূদন;—

“পড়ে যদি মেঘনাদ সৌমিত্রির শরে

মহামায়া! সুরসৈন্যসহ কালি আমি

রক্ষিব লক্ষ্মণে, পশি রাক্ষস-সংগ্রামে।

না ডরি রাবণে, দেবি! তোমার প্রসাদে।

মার তুমি আগে মাতঃ, মায়াজাল পাতি,

কর্ব্বুর-কুলের গর্ব্ব, দুর্ম্মদ সংগ্রামে,

রাবণি। রাঘবচন্দ্র দেব-কুলপ্রিয়;

সমরিবে প্রাণপণে অমর, জননি!

তার জন্য। যাব আমি আপনি ভূতলে

কালি, দ্রুত ইরম্মদে দগ্ধির কর্ব্বুরে।”

“উচিত এ কর্ম্ম তব, অদিতি-নন্দন

বজ্রি!” কহিলেন মায়া; “পাইনু পিরীতি

তর বাক্যে, সুরশ্রেষ্ঠ! অনুমতি দেহ,

যাই আমি লঙ্কাধামে।” এতেক কহিয়া

চলি গেলা শক্তীশ্বরী আশীষি দোঁহারে।

দেবেন্দ্রের পদে নিদ্রা প্রণমিল আসি।

ইন্দ্রাণীর কর-পদ্ম ধরিয়া কৌতুকে,

প্রবেশিলা মহা-ইন্দ্র শয়ন-মন্দিরে—

সুখালয়! চিত্রলেখা, ঊর্ব্বশী, মেনকা,

রম্ভা, নিজ গৃহে সবে পশিলা সত্বরে।

খুলিলা নূপুর, কাঞ্চী, কঙ্কণ, কিঙ্কিণী

আর যত আভরণ; খুলিলা কাঁচলি;

শুইলা ফুল-শয়নে সৌর-কর-রাশি-

রূপিণী সুর-সুন্দরী। সুস্বনে বহিল

পরিমলময় বায়ু, কভু বা অলকে,

কভু উচ্চ-কুচে, কভু ইন্দু-নিভাননে

করি কেলি, মত্ত যথা মধুকর, যবে

প্রফুল্লিত-ফুলে অলি পায় বনস্থলে!

স্বর্গের কনক-দ্বারে উতরিলা মায়া

মহাদেবী; সুনিনাদে আপনি খুলিল

হৈমদ্বার। বাহিরিয়া বিশ্ব-বিমোহিনী,

স্বপন-দেবীরে স্মরি, কহিলা সুস্বরে;

“যাও তুমি লঙ্কাধামে, যথায় বিরাজে

শিবিরে সৌমিত্রি-শূর। সুমিত্রার বেশে

বসি শিরোদেশে তার, কহিও, রঙ্গিণি,

এই কথা,—‘উঠ, বৎস, পোহাইল রাতি।

লঙ্কার উত্তর-দ্বারে বনরাজী-মাঝে

শোভে সরঃ; কলে তার চণ্ডীর দেউল

স্বর্ণময়; স্নান করি সেই সরোবরে,

তুলিয়া বিবিধ ফুল, পূজ ভক্তিভাবে

দানব দলনী মায়ে। তাঁহার প্রসাদে,

বিনাশিবে অনায়াসে দুর্ম্মদ-রাক্ষসে,

যশস্বি! একাকী বৎস যাইও সে বনে।’

অবিলম্বে, স্বপ্নদেবি, যাও লঙ্কাপুরে।

দেখ, পোহাইছে রাতি, বিলম্ব না সহে!”

চলি গেলা স্বপ্নদেবী, নীল-নভঃস্থল

উজলি, খসিয়া যেন পড়িল ভূতলে

তারা। ত্বরা ঊরি যথা শিবির-মাঝারে

বিরাজেন রামানুজ, সুমিত্রার বেশে

বসি শিরোদেশে তাঁর, কহিলা সুস্বরে

কুহকিনী;—“উঠ, বৎস! পোহাইল রাতি।

লঙ্কার উত্তর-দ্বারে বনরাজী-মাঝে

শোভে সরঃ; কূলে তার চণ্ডীর দেউল

স্বর্ণময়; স্নান করি সেই সরোবরে,

তুলিয়া বিবিধ ফুল, পূজ ভক্তিভাবে

দানব-দলনী মায়ে। তাঁহার প্রসাদে,

বিনাশিবে অনায়াসে দুর্ম্মদ-রাক্ষসে

যশস্বি! একাকী, বৎস, যাইও সে বনে।”

চমকি উঠিয়া বলী চাহিলা চৌদিকে;

হায় রে, নয়নজলে ভিজিল অমনি

বক্ষঃস্থল। “হে জননি!” কহিলা বিষাদে

বীরেন্দ্র;—“দাসের প্রতি কেন বাম এত

তুমি? দেহ দেখা পুনঃ, পূজি পা-দুখানি;

পূরাই মনের সাধ লয়ে পদধূলি,

মা আমার! যবে আমি বিদায় হইনু,

কত যে কাঁদিলে তুমি, স্মরিলে বিদরে

হৃদয়! আর কি, দেবি, এ বৃথা জনমে

হেরিব চরণ-যুগ?” মুছি অশ্রুধারা,

চলিলা বীর-কুঞ্জর কুঞ্জর-গমনে

যথা বিরাজেন প্রভু রঘু-কুল-রাজা।

কহিলা অনুজ, নমি অগ্রজের পদে;—

“দেখিনু অদ্ভুত স্বপ্ন রঘুকুল-পতি!

শিরোদেশে বসি মোর সুমিত্রা জননী

কহিলেন,—‘উঠ, বৎস! পোহাইল রাতি।

লঙ্কার উত্তর-দ্বারে বনরাজী-মাঝে

শোভে সরঃ; কূলে তার চণ্ডীর দেউল

স্বর্ণময়; স্নান করি সেই সরোবরে,

তুলিয়া বিবিধ ফুল, পূজ ভক্তিভাবে

দানব দলনী মায়ে। তাঁহার প্রসাদে,

বিনাশিবে অনায়াসে দুর্ম্মদ রাক্ষসে,

যশস্বি! একাকী, বৎস, যাইও সে বনে।’

এতেক কহিয়া মাতা অদৃশ্য হইলা।

কাঁদিয়া ডাকিনু আমি, কিন্তু না পাইনু

উত্তর। কি আজ্ঞা তব, কহ রঘুমণি?”

জিজ্ঞাসিলা বিভীষণে বৈদেহী-বিলাসী;—

“কি কহ, হে মিত্রবর, তুমি? রক্ষঃপুরে

রাঘব-রক্ষক তুমি বিদিত জগতে।”

উত্তরিলা রক্ষঃশ্রেষ্ঠ,—‘আছে সে কাননে

চণ্ডীর দেউল, দেব! সরোবর-কূলে।

আপনি রাক্ষস-নাথ পূজেন সতীরে।

সে উদ্যানে; আর কেহ নাহি যায় কভু

ভয়ে, ভয়ঙ্কর স্থল! শুনেছি দুয়ারে

আপনি ভ্রমেন শম্ভু—ভীম-শূল-পাণি।

যে পূজে মায়েরে সেথা, জয়ী সে জগতে।

আর কি কহিব আমি? সাহসে যদ্যপি

প্রবেশ করিতে বনে পারেন সৌমিত্রি,

সফল, হে মহারথি, মনোরথ তব।”

“রাঘবের আজ্ঞাবর্ত্তী, রক্ষঃকুলোত্তম!

এ দাস;” কহিলা বলী লক্ষ্মণ;—“যদ্যপি

পাই আজ্ঞা, অনায়াসে পশিব কাননে।

কে রোধিবে গতি মোর?” সুমধুর স্বরে

কহিলা রাঘবেশ্বর।—“কত যে সয়েছ

মোর হেতু, তুমি, বৎস! সে কথা স্মরিলে

না চাহে পরাণ মোর আর আয়াসিতে

তোমায়। কিন্তু কি করি? কেমনে লঙ্ঘিব

দৈবের নির্ব্বন্ধ, ভাই! যাও সাবধানে,—

ধর্ম্ম-বলে মহাবলী! আয়সী-সদৃশ

দেবকুল-আনুকূল্য রক্ষুক তোমারে।”

প্রণমি রাঘব-পদে, বন্দি বিভীষণে

সৌমিত্রি, কৃপাণ-করে, যাত্রা করি বলী

নির্ভয়ে উত্তর-দ্বারে চলিলা সত্বরে!

জাগিছে সুগ্রীর মিত্র বীতি-হোত্র-রূপী

বীর-বর-দলে তথা। শুনি পদধ্বনি,

গম্ভীরে কহিলা শূর;—‘কে তুমি? কি হেতু

ঘোর নিশাকালে হেথা? কহ শীঘ্র করি,

বাঁচিতে বাসনা যদি। নতুবা মারিব

শিলাঘাতে চূর্ণি শিরঃ।” উত্তরিলা হাসি

রামানুজ;—“রক্ষোবংশ ধ্বংস, বীরমণি,

রাঘবের দাস আমি।” আশু অগ্রসরি

সুগ্রীব, বন্দিলা সখা বীরেন্দ্র-লক্ষ্মণে।

মধুর সম্ভাষে তুষি কিষ্কিন্ধ্যা-পতিরে,

চলিলা উত্তর-মুখে ঊর্ম্মিলা-বিলাসী।

কতক্ষণে উতরিয়া উদ্যান-দুয়ারে

ভীমবাহু, সবিস্ময়ে দেখিলা অদূরে

ভীষণ-দর্শনমূর্ত্তি; দীপিছে ললাটে

শশিকলা মহোরগ-ললাটে যেমতি

মণি। জটাজূট শিরে, তাহার মাঝারে

জাহ্নবীর ফেনলেখা, শারদ-নিশাতে

কৌমুদীর রজোরেখা মেঘমুখে যেন।

বিভূতি ভূষিত অঙ্গ; শাল-বৃক্ষ সম

ত্রিশূল দক্ষিণ করে! চিনিলা সৌমিত্রি

ভূতনাথে। নিষ্কোষিয়া তেজস্কর অসি,

কহিলা বীর-কেশরী।—“দশরথ রথী,

রঘুজ-অজ-অঙ্গজ, বিখ্যাত ভুবনে,

তাঁহার তনয় দাস নমে তব পদে,

চন্দ্রচূড়! ছাড় পথ; পূজিব চণ্ডীরে

প্রবেশি কাননে; নহে দেহ রণ দাসে।

সতত অধর্ম্ম-কর্ম্মে রত লঙ্কাপতি;

তবে যদি ইচ্ছ রণ, তার পক্ষ হ’য়ে,

বিরূপাক্ষ! দেহ রণ, বিলম্ব না সহে।

ধর্ম্ম সাক্ষী মানি আমি আহ্বানি তোমারে;

সত্য যদি ধর্ম্ম, তবে অবশ্য জিনিব।”

যথা শুনি বজ্রনাদ, উত্তরে হুঙ্কারি

গিরিরাজ, বৃষধ্বজ কহিলা গম্ভীরে;—

“বাখানি সাহস তোর, শূর-চূড়ামণি

লক্ষ্মণ! কেমনে আমি যুঝি তোর সাথে?

প্রসন্ন প্রসন্নময়ী আজি তোর প্রতি,

ভাগ্যধর!” ছাড়িলা দুয়ার দুয়ারী

কপর্দ্দী; কানন-মাঝে পশিলা সৌমিত্রি।

ঘোর সিংহনাদ বীর শুনিলা চমকি!

কাঁপিল নিবিড় বন মড় মড় রবে

চৌদিকে। আইল ধাই রক্তবর্ণ-আঁখি

হর্য্যক্ষ, আস্ফালি পুচ্ছ, দন্ত কড়মড়ি!

‘জয় রাম’ নাদে রথী উলঙ্গিলা অসি!

পলাইল মায়া-সিংহ, হুতাশন-তেজে

তমঃ যথা। ধীরে ধীরে চলিলা নির্ভয়ে

ধীমান্। সহসা মেঘ আবরিলা চাঁদে

নির্ঘোষে! বহিল বায়ু হুহুঙ্কার স্বনে।

চকমকি ক্ষণপ্রভা শোভিল আকাশে,

দ্বিগুণ আঁধারি দেশ ক্ষণ-প্রভা দানে।

কড়-কড়-কড়ে বজ্র পড়িল ভূতলে

মুহুর্ম্মুহুঃ। বাহু-বলে উপাড়িল তরু,

প্রভঞ্জন। দাবানল পশিল কাননে।

কাঁপিল কনকলঙ্কা, গর্জ্জিল জলধি

দূরে, লক্ষ লক্ষ শঙ্খ রণক্ষেত্রে যথা

কোদণ্ড-টঙ্কার-সহ মিশিয়া ঘর্ঘরে।

অটল অচল যথা দাঁড়াইলা বলী

সে রৌরবে। আচম্বিতে নিবিল দাবাগ্নি;

থামিল তুমুল ঝড়; দেখা দিল পুনঃ

তারাকান্ত; তারাদল শোভিল গগনে।

কুসুম-কুন্তলা-মহী হাসিলা কৌতুকে।

ছুটিল সৌরভ; মন্দ সমীর স্বনিলা।

সবিস্ময়ে ধীরে ধীরে চলিলা সুমতি।

সহসা পূরিল বন মধুর-নিক্বণে।

বাজিল বাঁশরী, বীণা, মৃদঙ্গ, মন্দিরা,

সপ্তস্বরা; উথলিল সে রবের সহ

স্ত্রী-কণ্ঠ-সম্ভব-রব, চিত্ত বিমোহিয়া।

দেখিলা সম্মুখে বলী, কুসুম-কাননে,

বামাদল, তারাদল ভূপতিত যেন!

কেহ অবগাহে দেহ, স্বচ্ছ সরোবরে,

কৌমুদী নিশীতে যথা। দুকূল-কাঁচলি

শোভে কূলে, অবয়ব বিমল সলিলে,

মানস সরসে, মরি, স্বর্ণ-পদ্ম-যথা।

কেহ তুলে পুষ্পরাশি, অলঙ্কারে কেহ

অলক, কাম-নিগড়! কেহ ধরে করে

দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত, মুকুতা-খচিত

কোলম্বক। ঝকঝকে হেম-তার তাহে,

সঙ্গীত-রসের ধাম। কেহ বা নাচিছে

সুখময়ী; কুচযুগ পীবরমাঝারে

দুলিছে রতন-মালা, চরণে বাজিছে,

নূপুর, নিতম্ব-বিম্বে ক্কণিছে রশনা!

মরে নর কালফণী নশ্বর-দংশনে;—

কিন্তু এ সবার পৃষ্ঠে দুলিছে যে ফণী

মণিময়, হেরি তারে কাম-বিষে জ্বলে

পরাণ। হেরিলে ফণী পলায় তরাসে,

যার দৃষ্টিপথে পড়ে কৃতান্তের দূত;

হায় রে, এ ফণী হেরি কে না চাহে এরে

বাঁধিতে গলায়, শিরে উমাকান্ত যথা,

ভুজঙ্গ-ভূষণ শূলী? গাইছে জাগিয়া

তরুশাখে মধুসখা; খেলিছে অদূরে

জলযন্ত্র; সমীরণ বহিছে কৌতুকে,

পরিমল-ধন লুটি কুসুম-আগারে।

অবিলম্বে বামাদল, ঘিরি অরিন্দমে,

গাইল;—“স্বাগত, ওহে রঘুচূড়ামণি!

নহি নিশাচরী মোরা, ত্রিদিব নিবাসী।

নন্দন-কাননে, শূর, সুবর্ণ-মন্দিরে

করি বাস, করি পান অমৃত উল্লাসে

অনন্ত বসন্ত জাগে যৌবন-উদ্যানে;

উরজ কমল-যুগ প্রফুল্ল সতত;

না শুকায় সুধারস অধর সরসে,

অমরী আমরা, দেব! বরিনু তোমারে

আমা সবে; চল, নাথ, আমাদের সাথে।

কঠোর তপস্যা নর করে যুগে যুগে

লভিতে যে সুখভোগ, দিব তা তোমারে,

গুণমণি! রোগ শোক আদি কীট যত

কাটে জীবনের ফুল এ ভবমণ্ডলে,

না পশে যে দেশে, মোরা আনন্দে নিবাসি

চিরদিন।” করপুটে কহিলা সৌমিত্রি;—

“হে সুরসুন্দরীবৃন্দ, ক্ষম এ দাসেরে!

অগ্রজ আমার রথী বিখ্যাত জগতে

রামচন্দ্র, ভার্য্যা তাঁর মৈথিলী; কাননে

একাকিনী পাই, তাঁরে আনিয়াছে হরি

রক্ষোনাথ। উদ্ধারিব, ঘোর যুদ্ধে নাশি

রাক্ষসে, জানকী-সতী; এ প্রতিজ্ঞা মম

সফল হউক, বর দেহ সুরাঙ্গনে!

নর-কুলে জন্ম মোর; মাতৃ হেন মানি

তোমা সবে।” মহাবাহু এতেক কহিয়া

দেখিলা তুলিয়া আঁখি, বিজন সে বন।

চলি গেছে বামাদল স্বপনে যেমতি,

কিম্বা জলবিম্ব যথা সদা সদ্যোজীবী!—

কে বুঝে মায়ার মায়া, এ মায়া সংসারে?

ধীরে ধীরে পুনঃ বলী চলিলা বিস্ময়ে।

কতক্ষণে শূরবর হেরিলা অদূরে

সরোবর, কুলে তার চণ্ডীর দেউল,

সুবর্ণ সোপান শত মণ্ডিত রতনে।

দেখিলা দেউলে বলী দীপিছে প্রদীপ;

পীঠতলে ফুলরাশি; বাজিছে ঝাঁঝরী,

শঙ্খ ঘণ্টা; ঘটে বারি। ধূপ, ধূপদানে

পুড়ি, আমোদিছে দেশ, মিশিয়া সুরভি

কুসুম-বাসের সহ। পশিয়া সলিলে

শূরেন্দ্র, করিলা স্নান; তুলিলা যতনে

নীলোৎপল; দশদিশ পূরিল সৌরভে।

প্রবেশি মন্দিরে তবে বীরেন্দ্র কেশরী

সৌমিত্রি, পূজিলা বলী সিংহবাহিনীরে

যথাবিধি। “হে বরদে!” কহিলা সাষ্টাঙ্গে

প্রণমিয়া রামানুজ,—“দেহ বর দাসে।

নাশি রক্ষঃশূরে, মাতঃ, এই ভিক্ষা মাগি।

মানব-মনের কথা, হে অন্তর্য্যামিনি!

তুমি যত জান, হায়, মানব-রসনা

পারে কি কহিতে তত? যত সাধ মনে,

পূরাও সে সবে, সাধ্বি!” গরজিল দূরে

মেঘ! বজ্রনাদে লঙ্কা উঠিল কাঁপিয়া

সহসা। দুলিল, যেন ঘোর ভূকম্পনে,

কানন, দেউল, সরঃ—থর থর থরে!

সম্মুখে লক্ষ্মণ-বলী দেখিলা কাঞ্চন-

সিংহাসনে মহামায়ে! তেজঃ রাশি রাশি

ধাঁধিল নয়ন ক্ষণ বিজলী ঝলকে।

আঁধার দেউল বলী হেরিলা সভয়ে

চৌদিক! হাসিলা সতী; পলাইল তমঃ

দ্রুতে; দিব্য-চক্ষু লাভ করিলা সুমতি।

মধুর স্বর-তরঙ্গ বহিল আকাশে।

কহিলেন মহামায়া;—“সুপ্রসন্ন আজি,

রে সতী-সুমিত্রা-সুত! দেবদেবী যত

তোর প্রতি। দেব-অস্ত্র প্রেরিয়াছে তোরে

বাসব, আপনি আমি আসিয়াছি হেথা

সাধিতে এ কার্য্য তোর, শিবের আদেশে।

ধরি দেব-অস্ত্র, বলি! বিভীষণে লয়ে,

যা চলি নগর-মাঝে, যথায় রাবণি,

নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে, পূজে বৈশ্বানরে।

সহসা, শার্দ্দূলাক্রমে আক্রমি রাক্ষসে,

নাশ তারে। মোর বরে পশিবি দুজনে

অদৃশ্য; নিকষে যথা অসি, আবরিব

মায়াজালে আমি দোঁহে, নির্ভয় হৃদয়ে,

যা চলি, রে যশস্বি।” প্রণমি শূরমণি

মায়ার চরণ-তলে, চলিলা সত্বরে

যথায় রাঘব শ্রেষ্ঠ! কূজনিল জাগি

পাখিকুল ফুলবনে, যন্ত্রিদল যথা

মহোৎসবে পূরে দেশ মঙ্গল-নিক্বণে।

বৃষ্টিলা কুসুম-রাশি শূরবর-শিরে

তরুরাজী; সমীরণ বহিলা সুস্বনে।

“শুভক্ষণে গর্ভে তোরে লক্ষ্মণ, ধরিল

সুমিত্রা জননী তোর।” কহিলা আকাশে

আকাশ-সম্ভবা বাণী;—“তোর কীর্ত্তি-গানে

পূরিবে ত্রিলোক আজি, কহিনু রে তোরে।

দেবের অসাধ্য কর্ম্ম সাধিলি সৌমিত্রি,

তুই! দেবকুল-তুল্য অমর হইলি!”

নীররিলা সরস্বতী; কূজনিল পাখী

সুমধুরতর-স্বরে সে নিকুঞ্জ-বনে।

কুসুম-শয়নে যথা সুবর্ণ-মন্দিরে

বিরাজে বীরেন্দ্র বলী ইন্দ্রজিৎ, তথা

পশিল কূজন-ধ্বনি সে সুখ-সদনে।

জাগিলা বীর-কুঞ্জর কুঞ্জবন-গীতে।

প্রমীলার করপদ্ম করপদ্মে ধরি

রথীন্দ্র, মধুর স্বরে, হায় রে যেমতি

নলিনীর কাণে অলি কহে গুঞ্জরিয়া

প্রেমের রহস্য-কথা, কহিলা (আদরে

চুম্বি নিমীলিত আঁখি)—“ডাকিছে কূজনে,

হৈমবতী ঊষা তুমি, রূপসি, তোমারে

পাখিকুল। মিল, প্রিয়ে, কমললোচন।

উঠ, চিরানন্দ মোর! সূর্য্যকান্তমণি-

সম এ পরাণ, কান্তে; তুমি রবিচ্ছবি;—

তোজোহীন আমি, তুমি মুদিলে নয়ন।

ভাগ্য-বৃক্ষে ফলোত্তম তুমি হে জগতে

আমার! নয়ন-তারা! মহার্হ রতন।

উঠি দেখ, শশিমুখি, কেমনে ফুটিছে,

চুরি করি কান্তি তব মঞ্জু-কুঞ্জবনে

কুসুম!” চমকি রামা উঠিলা সত্বরে,

গোপিনী-কামিনী যথা বেণুর সুরবে।

আবরিলা অবয়ব সুচারুহাসিনী

সরমে। কহিলা পুনঃ কুমার আদরে;—

“পোহাইল এতক্ষণে তিমির-শর্ব্বরী;

তা না হ’লে ফুটিতে কি তুমি, কমলিনি

জুড়াতে এ চক্ষুর্দ্বয়? চল, প্রিয়ে, এবে

বিদায় হইব নমি জননীর পদে।

পরে যথাবিধি পূজি দেব-বৈশ্বানরে,

ভীষণ অশনি-সম শর-বরিষণে

রামের সংগ্রাম-সাধ মিটাব সংগ্রামে।

সাজিলা রাবণ-বধূ, রাবণ-নন্দন,

অতুল জগতে দোঁহে; বামাকুলোত্তমা

প্রমীলা, পুরুষোত্তম মেঘনাদ বলী।

শয়ন-মন্দির হ’তে বাহিরিলা দোঁহে—

প্রভাতের তারা যথা অরুণের সাথে।

লজ্জায় মলিনমুখী পলাইল দূরে

(নিশির অমৃতভোগ ছাড়ি ফুলদলে)

খদ্যোত; ধাইল অলি পরিমল-আশে;

গাইল কোকিল ডালে মধু পঞ্চস্বরে,

বাজিল রাক্ষস-বাদ্য; নমিল রক্ষক;

‘জয় মেঘনাদ’ নাদ উঠিল গগনে।

রতন-শিবিকাসনে বসিলা হরষে

দম্পতী। বহিল যান যান-বাহ-দলে

মন্দোদরী মহিষীর সুবর্ণ-মন্দিরে।

মহাপ্রভাধর গৃহ; মরকত, হীরা,

দ্বিরদ-রদ-মণ্ডিত, অতুল জগতে!

নয়ন-মনোরঞ্জন যা কিছু সৃজিলা

বিধাতা, শোভে সে গৃহে। ভ্রমিছে দুয়ারে

প্রহরিণী, প্রহরণ কালদণ্ড-সম

করে; অশ্বারূঢ়া কেহ, কেহ বা ভূতলে।

তারাকারা দীপাবলী দীপিছে চৌদিকে।

বহিছে রসন্তানিল, অযুত-কুসুম-

কানন-সৌরভ-বহ। উথলিছে মৃদু

বীণাধ্বনি, মনোহর স্বপনে যেমতি।

প্রবেশিলা অরিন্দম, ইন্দু-নিভাননা

প্রমীলা-সুন্দরী-সহ, সে স্বর্ণ-মন্দিরে।

ত্রিজটা নামে রাক্ষসী আইল ধাইয়া।

কহিলা বীর কেশরী; “শুন লো ত্রিজিটে,

নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করি আমি আজি

যুঝিব রামের সনে পিতার আদেশে,

নাশিব রাক্ষস-রিপু; তেঁই ইচ্ছা করি,

পূজিতে জননী-পদ। যাও বার্ত্তা লয়ে;

কহ, পুত্ত্র পুত্ত্রবধূ দাঁড়ায়ে দুয়ারে

তোমার, হে লঙ্কেশ্বরি!” সাষ্টাঙ্গে প্রণমি,

কহিল শূরে ত্রিজটা—(বিকটা রাক্ষসী),

“শিবের মন্দিরে এবে রাণী মন্দোদরী

যুবরাজ! তোমার মঙ্গল হেতু তিনি,

অনিদ্রায়, অনাহারে পূজেন উমেশে।

তব সম পুত্ত্র, শূর, কার এ জগতে?

কার বা এ হেন মাতা?” এতেক কহিয়া

সৌদামিনী-গতি দূতী ধাইল সত্বরে।

গাইল গায়িকাদল সুযন্ত্র-মিলনে;—

“হে কৃত্তিকে হৈমবতি! শক্তিধর তব

কার্ত্তিকেয়, আসি দেখ, তোমার দুয়ারে

সঙ্গে সেনা সুলোচনা! দেখ আসি সুখে,

রোহিণী-গঞ্জিনী বধূ; পুত্ত্র, যাঁর রূপে

শশাঙ্ক কলঙ্কী মানে। ভাগ্যবতী তুমি!

ভুবন-বিজয়ী শূর ইন্দ্রজিৎ বলী—

ভুবনমোহিনী সতী প্রমীলা সুন্দরী।”

বাহিরিলা লঙ্কেশ্বরী শিবালয় হতে।

প্রণয়ে দম্পতী পদে। হরষে দুজনে

কোলে করি, শিরঃ চুম্বি, কাঁদিলা মহিষী।

হায় রে, মায়ের প্রাণ, প্রেমাগার ভবে

তুই, ফুলকুল যথা সৌরভ-আগার,

শুক্তি মুকুতার ধাম, মণিময় খনি।

শরদিন্দু পুত্ত্র, বধূ শারদ-কৌমুদী;

তারাকিরীটিনী-নিশি-সদৃশী আপনি

রাক্ষসকুল-ঈশ্বরী। অশ্রু-বারিধারা

শিশির, কপোল-পর্ণে পড়িয়া শোভিল!

কহিলা বীরেন্দ্র; “দেবি! আশীষ দাসেরে;

নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করি যথাবিধি,

পশিব সমরে আজি, নাশিব রাঘবে।

শিশু ভাই বীরবাহু; বধিয়াছে তারে

পামর! দেখিব মোরে নিবারে কি বলে?

দেহ পদ-ধূলি, মাতঃ! তোমার প্রসাদে

নির্ব্বিঘ্ন করিব আজি তীক্ষ্ণ শর-জালে

লঙ্কা। বাঁধি দিব আনি তাত বিভীষণে

রাজদ্রোহী! খেদাইব সুগ্রীব অঙ্গদে

সাগর-অতল-জলে।” উত্তরিলা রাণী,

মুছিয়া নয়ন-জল রতন-আঁচলে;—

“কেমনে বিদায় তোরে করি রে বাছনি!

আঁধারি হৃদয়াকাশ, তুই পূর্ণশশী

আমার। দুরন্ত-রণে সীতাকান্ত বলী;

দুরন্ত লক্ষ্মণ-শূর; কাল সর্প-সম

দয়া-শূন্য বিভীষণ! মত্ত লোভ-মদে,

স্ববন্ধু-বান্ধবে মুঢ় নাশে অনায়াসে,

ক্ষুধায় কাতর ব্যাঘ্র গ্রাসয়ে যেমতি

স্ব-শিশু! কুক্ষণে, বাছা! নিকষা-শাশুড়ী

ধরেছিলা গর্ভে দুষ্টে, কহিনু রে তোরে।

এ কনক-লঙ্কা মোর মজালে দুর্ম্মতি।”

হাসিয়া মায়ের পদে উত্তরিলা রথী;—

“কেন, মা ডরাও তুমি রাঘবে লক্ষ্মণে,

রক্ষোবৈরী? দুইবার পিতার আদেশে

তুমুল সংগ্রামে আমি বিমুখিনু দোঁহে

অগ্নিময় শর-জালে। ও পদ-প্রসাদে,

চির-জয়ী দেব-দৈত্য-নরের সমরে

এ দাস। জানেন তাত বিভীষণ, দেবি।

তব পুত্ত্র-পরাক্রম; দম্ভোলি-নিক্ষেপী

সহস্রাক্ষ সহ যত দেব-কুল-রথী;

পাতালে নাগেন্দ্র, মর্ত্ত্যে নরেন্দ্র। কি হেতু

সভয় হইলা আজি, কহ, মা, আমারে?

কি ছার সে রাম, তারে ডরাও আপনি?”

মহাদরে শিরঃ চুম্বি কহিলা মহিষী;—

“মায়াবী মানব, বাছা, এ বৈদেহীপতি,

নতুবা সহায় তার দেবকুল যত!

নাগ-পাশে যবে তুই বাঁধিলি দুজনে,

কে খুলিল সে বন্ধন? কে বা বাঁচাইল,

নিশা-রণে যবে তুই বধিলি রাঘবে

সসৈন্যে? এ সব আমি না পারি বুঝিতে।

শুনেছি মৈথিলীনাথ আদেশিলে, জলে

ভাসে শিলা, নিবে অগ্নি; আসার বরষে!

মায়াবী মানব রাম। কেমনে, বাছনি!

বিদাইব তোরে আমি আবার যুঝিতে

তার সনে? হায়, বিধি, কেন না মরিল

কুলক্ষণা শূর্পণখা মায়ের উদরে।”

এতেক কহিয়া রাণী কাঁদিলা নীরবে।

কহিলা বীর-কুঞ্জর;—“পূর্ব্বকথা স্মরি,

এ বৃদ্ধা বিলাপ, মাতঃ, কর অকারণে।

নগর-তোরণে অরি; কি সুখ ভুঞ্জিব,

যত দিন নাহি তারে সংহারি সংগ্রামে!

আক্রমিলে হুতাশন কে ঘুমায় ঘরে?

বিখ্যাত রাক্ষস-কুল, দেব-দৈত্য-নর-

ত্রাস ত্রিভুবনে, দেবি! হেন কুলে কালি

দিব কি রাঘবে দিতে, আমি, মা, রাবণি

ইন্দ্রজিৎ? কি কহিবে শুনিলে এ কথা,

মাতামহ দনুজেন্দ্র ময়? রথী যত

মাতুল? হাসিবে বিশ্ব। আদেশ দাসেরে,

যাইব সমরে, মাতঃ, নাশিব রাঘবে।

ওই শুন, কূজনিছে বিহঙ্গম বনে।

পোহাইল বিভাবরী। পুজি ইষ্টদেবে,

দুর্দ্ধর্ষ রাক্ষস-দলে পশিব সমরে।

আপন মন্দিরে, দেবি, যাও ফিরি এবে।

ত্বরায় আসিয়া আমি পূজিব যতনে

ও পদ-রাজীব-যুগ, সমর-বিজয়ী!

পাইয়াছি পিতৃ-আজ্ঞা, দেহ আজ্ঞা তুমি।

কে আঁটিবে দাসে, দেবি, তুমি আশীষিলে?”

মুছিয়া নয়ন-জল রতন-আঁচলে,

উত্তরিলা লঙ্কেশ্বরী;—“যাইবি রে যদি,—

রাক্ষস-কুল-রক্ষণ বিরূপাক্ষ তোরে

রক্ষুন এ কাল-রণে। এই ভিক্ষা করি

তাঁর পদযুগে আমি। কি আর কহিব?

নয়নের তারাহারা করি রে থুইলি

আমায় এ ঘরে তুই!” কাঁদিয়া মহিষী

কহিলা চাহিয়া তবে প্রমীলার পানে;

“থাক, মা, আমার সঙ্গে তুমি;—জুড়াইব,

ও বিধুদন হেরি, এ পোড়া পরাণ।

বহুলে তারার করে উজ্জ্বল ধরণী।”

বন্দি জননীর পদ বিদায় হইলা

ভীমবাহু! কাঁদি রাণী, পুত্ত্রবধূ সহ,

প্রবেশিলা পুনঃ গৃহে। শিবিকা ত্যজিয়া,

পদ-ব্রজে যুবরাজ চলিলা কাননে—

ধীরে ধীরে রথিবর চলিলা একাকী

কুসুম-বিবৃত পথে, যজ্ঞশালা-মুখে।

সহসা নূপুর-ধ্বনি ধ্বনিল পশ্চাতে।

চির-পরিচিত, মরি, প্রণয়ীর কাণে

প্রণয়িনী-পদশব্দ। হাসিলা বীরেন্দ্র,

সুখে বাহু-পাশে বাঁধি ইন্দীবরাননা

প্রমীলারে। “হায়! নাথ,” কহিলা সুন্দরী;—

“ভেবেছিনু, যজ্ঞগৃহে যাব তব সাথে,

সাজাইব বীর-সাজে তোমায়। কি করি?

বন্দী করি স্ব-মন্দিরে রাখিলা শাশুড়ী।

রহিতে নারিনু তবু পুনঃ নাহি হেরি

পদযুগ। শুনিয়াছি, শশিকলা না কি

রবি-তেজে সমুজ্জ্বলা; দাসীও তেমতি,

হে রাক্ষস-কুল-রবি! তোমার বিহনে,

আঁধার জগৎ, নাথ, কহিনু তোমারে!”

মুকুতামণ্ডিত বুকে নয়ন বর্ষিল

উজ্জ্বলতর মুকুতা! শতদল-দলে

কি ছার শিশির-বিন্দু ইহার তুলনে?

উত্তরিলা বীরোত্তম;—“এখনি আসিব,

বিনাশি রাঘবে রণে, লঙ্কা সুশোভিনি!

যাও তুমি ফিরি, প্রিয়ে, যথা লঙ্কেশ্বরী।

শশাঙ্কের অগ্রে, সতি, উদে লো রোহিণী।

সৃজিলা কি বিধি, সাধ্বি, ও কমল-আঁখি

কাঁদিতে? আলোকাগারে কেন লো উদিছে

পয়োবহ! অনুমতি দেহ, রূপবতি,—

ভ্রান্তিমদে মত্ত নিশি, তোমারে ভাবিয়া

ঊষা, পলাইছে, দেখ সত্বর গমনে,—

দেহ অনুমতি, সতি, যাই যজ্ঞাগারে।”

যথা যবে কুসুমেষু, ইন্দ্রের আদেশে,

রতিরে ছাড়িয়া শূর, চলিলা কুক্ষণে

ভাঙিতে শিবের ধ্যান; হায়রে তেমতি

চলিলা কন্দর্প-রূপী ইন্দ্রজিৎ বলী,

ছাড়িয়া রতি-প্রতিমা প্রমীলা-সতীরে!

কুলগ্নে করিলা যাত্রা মদন; কুলগ্নে

করি যাত্রা গেলা চলি মেঘনাদ বলী—

রাক্ষস-কুল ভরসা অজেয় জগতে!

প্রাক্তনের গতি, হায়, কার সাধ্য রোধে?

বিলাপিলা যথা রতি, প্রমীলা-যুবতী।

কতক্ষণে চক্ষু-জল মুছি রক্ষোবধূ,

হেরিয়া পতিরে দূরে কহিলা সুস্বরে;—

“জানি আমি কেন তুই গহন কাননে,

ভ্রমিস্ যে গজরাজ! দেখিয়া ও গতি,

কি লজ্জার আর তুই মুখ দেখাইবি,

অভিমানি? সরু মাঝা তোর রে কে বলে,

রাক্ষস-কুল-হর্য্যক্ষে হেরে যার আঁখি,

কেশরি? তুইও তেঁই সদা বনবাসী!

নাশিস্ বারণে তুই; এ বীর-কেশরী

ভীম-প্রহরণে রণে বিমুখে বাসবে,

দৈত্য-কুল-নিত্য-অরি, দেবকুল-পতি।”

এতেক কহিয়া সতী, কৃতাঞ্জলি-পুটে,

আকাশের পানে চাহি আরাধিলা কাঁদি;—

“প্রমীলা, তোমার দাসী, নগেন্দ্র-নন্দিনি!

সাধে তোমা, কৃপা-দৃষ্টি কর লঙ্কাপানে,

কৃপাময়ি! রক্ষঃ-শ্রেষ্ঠে রাখ এ বিগ্রহে।

অভেদ্য কবচ-রূপে আবর শূরেরে।

যে ব্রততী সদা, সতি, তোমারি আশ্রিত,

জীবন তাহার জীবে ওই তরুরাজে!

দেখো, মা, কুঠার যেন না পর্শে উহারে।

আর কি কহিবে দাসী? অন্তর্য্যামী তুমি।

তোমা বিনা, জগদম্বে! কে আর রাখিবে?

বহে যথা সমীরণ পরিমল-ধনে

রাজালয়ে, শব্দবহ আকাশ বহিলা

প্রমীলার আরাধনা কৈলাস-সদনে।

কাঁপিলা সভয়ে ইন্দ্র। তা দেখি, সহসা

বায়ুবেগে বায়ুপতি দূরে উড়াইলা

তাহায়। মুছিয়া আঁখি, গেলা চলি সতী,

যমুনা-পুলিনে যথা, বিদারি মাধবে,

বিরহ-বিধুরা গোপী যায় শূন্যমনে

শূন্যালয়ে, কাঁদি বামা পশিলা মন্দিরে।

ইতি শ্রীমেঘনাদবধ কাব্যে উদ্যোগো নাম পঞ্চমঃ সর্গঃ।

পঞ্চম সর্গ।

চিত্রলেখা—is the mame of a স্বর্গ-বিদ্যাধরী।

সুসিদ্ধ হবে মনোরম কালি—your desire will be fully satisfied to-morrow.

বিশালাক্ষি—Oh big-eyed. দন্তী—an elephant.

মৃগরাজ—পশুরাজ, the king of beasts, i.e. the lion. আঁটে—copes with.

মহেষ্বাস—having a great bow; armed with a great bow.

পীঠতল—the surface of the seat.

শারদ-পার্ব্বণ—the autumn festival.

মন্দার-কাঞ্চন কান্তি—the golden splendour of the Mandara flowers.

ভবানন্দময়ী—pleasant to the worlds.

আনায়—snare.

নমুচিসূদন—the Destructor of Namuchi.

দুর্ম্মদ—maddened.

পরিমলময়—fuil of fragrance; fragrant.

অলক—a curl of hair; a ringlet.

আয়াসিতে—আয়াস অর্থাৎ ক্লেশ দিতে, to trouble.

আয়সী-সদৃশ—like an iron armour.

দেবকুল-আনুকূল্য—the grace of gods.

বীতিহোত্র—fire.

রক্ষোবংশ-ধ্বংস—adj. qualitying “বীরমণি”—the cause of the destruction of the Rakshasas.

মহোরগ—a great serpent.

ফেনলেখা—the line of foam.

শারদনিশাতে কৌমুদীর রজোরেখা মেঘমুখে যেন—like the silvery line of moonlight at the openings in the clouds in an antumn night.

রঘুজ-অঙ্গ-অঙ্গজ—the son of Aja the son of Raghu.

চন্দ্রচূড়—having the moon on the head.

কপদী—Siva. হর্ষাক্ষ—a lion

উলঙ্গিলা—unsheathed.

রৌরব—is a hell of fire; here it means forest fire.

কুসুমকুণ্ডলামহী—the goddess Earth whose lock of hair is, as it were, the flowers.

স্বনিলা—sounded. স্ত্রীকণ্ঠ-সম্ভব-রব—music flowing from the throat of females.

অলঙ্কারে—অলঙ্কৃত করে, adorns.

কাম-নিগড়—the chain or bond of Kama

কোলম্বক—বীণার অঙ্গ বিশেষ। হেমতার—gold wire.

কুচযুগ পীবর মাঝারে — পীবর কুচযুগ মাঝারে—between the plump and prominent breasts.

ক্কণিছে—sounds. রশনা—an ornament for the waist; মেখলা, চন্দ্রহার।

মরে নর কালফণী নশ্বর-দংশনে—নশ্বর (frail; perish able) is an adj. qualifying “নর”। The frail man dies of the biting of the deathlike snake; i.e. he does not die unless he is actually bitten by a snake.

কিন্তু এ সবার পৃষ্ঠে ছলিছে যে ফণী etc.—But the serpents hanging on the back of the heavenly maidens are far more poisonous than “কালফণী”! Their poison is the poison of carnel desire. The locks of hair are the serpents. The jewel on the locks of hair is the jewel on the head of a serpent. Even the very sight of the locks of hair is more dreadful than the actual biting of the deadly snake.

হেরিলে ফণী... বাঁধিতে গলায়—A man runs away out of fear to see a serpent; but every man wishes to put on these snakes (viz. the locks of hair) on their neck.

কৃতান্তের দূত—a snake is, as it were, a messenger of Yama.

ভুঞ্জঙ্গ-ভূষণ—whose ornaments are snakes.

জলযন্ত্র—an artificial fountains to be found in rich gardens.

কুসুম-আগার—the abode of flowers, i.e. the garden.

উরজ কমলযুগ—the pair of lotuses growing on the breast, i.e. the pair of breasts.

জলবিম্ব—a buble of water.

সদ্যোজীবী—transitory; short-lived.

ক্ষণ বিজলী ঝলকে—with a transitory flash of lightning.

নিকষ—a sheath for the sword.

যন্ত্রিদল—musicians playing on various musical instruments.

আকাশ-সম্ভবা—born from the sky. Speech is called the daughter of the sky.

বাণী—the goddess of speech, i.e. Saraswati.

রহস্য-কথা—secrets.

সূর্য্যকান্তমণিসম—like the jewel called সূর্য্যকান্ত (jewel of which the lover is the sun). The jewel is so called because it shines only as long as the sun shines.

রবিচ্ছবি—the light of the sun.

ভাগ্যবৃক্ষ—the tree of Fate.

চুরি করি কান্তি তব—The flowers are spoken of as stealing the beauty of Promila. They could not have got the beauty, if they had not stolen it from Promila.

অরুণ—is supposed to be the charioteer of the sun.

যান-বাহ-দল—the drawers of the conveyance or carriage.

সাষ্টাঙ্গে—অষ্টাঙ্গের সহিত, with the eight members of the body touching the ground; prostrating on the ground.

সুযন্ত্রমিলনে—in harmony with the music of good musical instruments.

রোহিণী-গঞ্জিনী-বধূ—daughter-in-law putting Rohini to shame; daughter-in-law surpassing Rohini in beauty.

মানে—admits.

প্রেমাগার—the house of love; the abode of love.

শরদিন্দু পুত্র—Son like the autmn moon.

বধূ শারদ কৌমুদী—daughter-in-law like the autumn moon light.

তারা কিরিটিনী নিশি সদৃশী আপনি—hersell like the Night crowned with diadem of stars.

অশ্রুবারিধারা শিশির—the drops of tears are, as it were, the drops of dews.

কপোলপণ—petal-like cheeks.

স্ববন্ধু বান্ধবে—his own friends of relatives.

হেন কুলে কালি দিব কি রাঘবে দিতে?—shall I allow Raghaba to stain such a family?

রাক্ষসকুলরক্ষণ বিরুপাক্ষ—Siva, the protector of the Rakhsasa family.

নয়নের তারাহারা—devoid of the apple of the eyes.

বহুলে তারার করে উজ্জ্বল ধরণী—the earth is bright with the light of stars in the dark fortnight. Mandodari is the Earth, Indrajit is the Moon. His absence from the presence of Mandodari is the dark fortnight or বহুল. Pramila is the stars.

কুসুম-বিবৃত—covered over with flowers.

মুকুতামণ্ডিত বুকে নয়ন বর্ষিল উজ্জ্বলতর মুকুতা—the eyes rained brighter pearls on the breast adorned with pearls. The brighter pearls are evidently the drops of tears falling from the eyes of Pramila.

শতদল—a flower with a hundred petals.

দল—a petal.

কি ছার শিরিশ-বিন্দু ইহার তুলনে—insignificant are the dew-drops in comparison with them.

শশাঙ্কের অগ্রে, সতি, উদে লো রোহিণী—The Rohini star rises sooner than the Moon. Indrajit means to say that as Rohini is the favourite consort of Chandra or the Moon, so is Pramila of him; and that as Rohini appears in the sky sooner than her dear husband, so Pramila should appear before Mandodari sooner than Meghanada.

আলোকাগার—the abode of light. The bright eyes of Pramila are meant.

পয়োবহ—a cloud, i.e. the cloud of sorrow.

ভ্রান্তিমদে মত্ত... সত্বর গমনে—the Night is overpowered with an error. She is said to have mistaken Pramila for Dawn and is flying away before her. Meghanada means to say that Pramila is as beautiful as Dawn.

কন্দর্পরূপী—as beautiful as Kandarpa.

জানি আমি কেন...গজরাজ—I know, Oh Lord of elephant, why you roam about in forests. You are proud of five gaits, and you see that the gait of my husband is finer than your. You are therefore ashamed to appear before public view.

সরু মাঝা তোর রে কে বলে—who says that your waist is thin?

পরিমল-ধন—the wealth of fragrance.

শব্দবহ আকাশ—the sky, the carrier of sounds.

আরাধনা—a prayer.

প্রথম সর্গ

মেঘনাদবধ কাব্য

প্রথম সর্গ

সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি

বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে

অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি!

কোন্ বীরবরে বরি সেনাপতি পদে,

পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি

রাঘবারি? কি কৌশলে, রাক্ষস-ভরসা

ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদে—অজেয় জগতে—

উর্ম্মিলাবিলাসী নাশি, ইন্দ্রে নিঃশঙ্কিলা?

বন্দি চরণারবিন্দ, অতি মন্দমতি

আমি, ডাকি আবার তোমায়, শ্বেতভুজে

ভারতি! যেমতি, মাতঃ, বসিলা আসিয়া,

বাল্মীকির রসনায় (পদ্মাসনে যেন)

যবে খরতর শরে, গহন কাননে,

ক্রৌঞ্চবধূসহ ক্রৌঞ্চে নিষাদ বিঁধিলা,

তেমতি দাসেরে, আসি, দয়া কর, সতি!

কে জানে মহিমা তব এ ভবমণ্ডলে?

নরাধম আছিল যে নর নরকুলে

চৌর্য্যে রত, হইল সে তোমার প্রসাদে,

মৃত্যুঞ্জয়, যথা মৃত্যুঞ্জয় উমাপতি!

হে বরদে, তব বরে চোর রত্নাকর

কাব্যরত্নাকর কবি! তোমার পরশে,

সুচন্দন-বৃক্ষশোভা বিষবৃক্ষ ধরে!

হায়, মা, এ হেন পুণ্য আছে কি এ দাসে?

কিন্তু যে গো গুণহীন সন্তানের মাঝে

মুঢ়মতি, জননীর স্নেহ তার প্রতি

সমধিক। ঊর তবে, ঊর দয়াময়ি

বিশ্বরমে! গাইব, মা, বীররসে ভাসি,

মহাগীত; ঊরি, দাসে দেহ পদছায়া।

—তুমিও আইস, দেবি, তুমি মধুকরী

কল্পনা! কবির চিত্ত-ফুলবন-মধু

লয়ে, রচ মধুচক্র, গৌড়জন যাহে

আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।

কনক আসনে বসে দশানন বলী—

হেমকূট-হৈমশিরে শৃঙ্গবর যথা

তেজঃপুঞ্জ। শত শত পাত্রমিত্র আদি

সভাসদ্, নতভাবে বসে চারি দিকে।

ভূতলে অতুল সভা—স্ফটিকে গঠিত;

তাহে শোভে রত্নরাজী, মানস-সরসে

সরস কমলকুল বিকসিত যথা।

শ্বেত, রক্ত, নীল, পীত স্তম্ভ সারি সারি

ধরে উচ্চ স্বর্ণছাদ, ফণীন্দ্র যেমতি

বিস্তারি অযুত ফণা, ধরেন আদরে

ধরারে। ঝুলিছে ঝলি ঝালরে মুকুতা,

পদ্মরাগ, মরকত, হীরা; যথা ঝোলে

(খচিত মুকুলে ফুলে) পল্লবের মালা

ব্রতালয়ে। ক্ষণপ্রভা সম মুহুঃ হাসে

রতনসম্ভবা বিভা—ঝলসি নয়নে।

সুচারু চামর, চারুলোচনা কিঙ্করী

ঢুলায়, মৃণালভুজ আনন্দে আন্দোলি

চন্দ্রাননা। ধরে ছত্র ছত্রধর; আহা,

হরকোপানলে কাম যেন রে না পুড়ি

দাঁড়ান সে সভাতলে ছত্রধররূপে!

ফেরে দ্বারে দৌবারিক, ভীষণ-মূরতি,

পাণ্ডব-শিবির-দ্বারে রুদ্রেশ্বর যথা

শূলপাণি! মন্দে মন্দে বহে গন্ধে বহি,

অনন্ত বসন্ত-বায়ু, রঙ্গে সঙ্গে আনি

কাকলীলহরী, মরি! মনোহর, যথা

বাঁশরীস্বরলহরী গোকুল-বিপিনে!

কি ছার ইহার কাছে, হে দানবপতি

ময়, মণিময় সভা, ইন্দ্রপ্রস্থে যাহা

স্বহস্তে গড়িলা তুমি, তুষিতে পৌরবে?

এ হেন সভায় বসে রক্ষঃকুলপতি,

বাক্যহীন পুত্ত্রশোকে! ঝর ঝর ঝরে

অবিরল অশ্রুধারা—তিতিয়া বসনে,

যথা তরু, তীক্ষ্ণ-শর সরস-শরীরে

বাজিলে, কাঁদে নীরবে। করযোড় করি,

দাঁড়ায়ে সম্মুখে ভগ্নদূত, ধুসরিত

ধূলায়, শোণিতে আর্দ্র সর্ব্ব কলেবর।

বীরবাহুসহ যত যোধ শত শত

ভাসিল রণসাগরে, তা সবার মাঝে

একমাত্র বাঁচে বীর; যে কাল-তরঙ্গ

গ্রাসিল সকলে, রক্ষা করিল রাক্ষসে—

নাম মকরাক্ষ, বলে যক্ষপতিসম।

এ দূতের মুখে শুনি সুতের নিধন,

হায়, শোকাকুল আজি রাজকুলমণি

নৈকষেয়! সভাজন দুঃখী রাজ-দুঃখে।

আঁধার জগৎ, মরি, ঘন আবরিলে

দিননাথে! কতক্ষণে চেতন পাইয়া,

বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি কহিলা রাবণ;—

“নিশার স্বপনসম তোর এ বারতা,

রে দূত! অমরবৃন্দ যার ভুজবলে

কাতর, সে ধনুর্দ্ধরে রাঘব ভিখারী

বধিল সম্মুখ-রণে? ফুলদল দিয়া

কাটিলা কি বিধাতা শাম্মলী-তরুবরে?—

হা পুত্ত্র, হা বীরবাহু, বীর-চূড়ামণি!

কি পাপে হারানু আমি তোমা হেন ধনে?

কি পাপ দেখিয়া মোর, রে দারুণ বিধি,

হরিলি এ ধন তুই? হায় রে, কেমনে

সহি এ যাতনা আমি? কে আর রাখিবে

এ বিপুল কুল-মান এ কাল-সমরে!

বনের মাঝারে যথা শাখাদলে আগে

একে একে কাঠুরিয়া কাটি, অবশেষে

নাশে বৃক্ষে, হে বিধাতঃ, এ দুরন্ত রিপু

তেমতি দুর্ব্বল, দেখ, করিছে আমারে

নিরন্তর! হব আমি নির্ম্মূল সমূলে

এর শরে! তা না হ’লে মরিত কি কভু

শূলীশম্ভুসম ভাই কুম্ভকর্ণ মম,

অকালে আমার দোষে? আর যোধ যত—

রাক্ষস-কুল-রক্ষণ? হায়, শূর্পণখা,

কি কুক্ষণে দেখেছিলি তুই রে অভাগী,

কাল পঞ্চবটীবনে কালকূটে ভরা

পাবক-শিখা-রূপিণী জানকীরে আমি

আনিনু এ হৈম গেহে? হায়, ইচ্ছা করে,

ছাড়িয়া কনকলঙ্কা, নিবিড় কাননে

পশি, এ মনের জ্বালা জুড়াই বিরলে!

কুসুমদাম-সজ্জিত, দীপাবলী-তেজে

উজ্জ্বলিত নাট্যশালাসম রে আছিল

এ মোর সুন্দরী পুরী! কিন্তু একে একে

শুকাইছে ফুল এবে, নিবিছে দেউটী;

নীরব ররাব, বীণা, মুরজ, মুরলী;

তবে কেন আর আমি থাকি রে এখানে?

কার রে বাসনা বাস করিতে আঁধারে?”

এইরূপে বিলাপিলা, আক্ষেপে রাক্ষস-

কুলপতি রাবণ; হায় রে মরি, যথা

হস্তিনার অন্ধরাজ, সঞ্জয়ের মুখে

শুনি, ভীমবাহু ভীমসেনের প্রহারে

হত যত প্রিয়পুত্ত্র কুরুক্ষেত্র-রণে।

তবে মন্ত্রী সারণ (সচিবশ্রেষ্ঠ বুধ)

কৃতাঞ্জলিপুটে উঠি কহিতে লাগিলা

নতভাবে;—“হে রাজন ভুবনবিখ্যাত,

রাক্ষসকুলশেখর, ক্ষম এ দাসেরে!

হেন সাধ্য কার আছে বুঝায় তোমারে

অভ্রভেদী চূড়া যদি যায় গুঁড়া হ’য়ে

বজ্রাঘাতে, কভু নহে ভূধর অধীর

সে পীড়নে। বিশেষতঃ এ ভবমণ্ডল

মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ-সুখ যত।

মোহের ছলনে ভুলে অজ্ঞান যে জন।”

উত্তর করিলা তবে লঙ্কা-অধিপতি;—

“যা কহিলে সত্য, ওহে অমাত্য-প্রধান

সারণ! জানি হে আমি, এ ভব-মণ্ডল

মায়াময়, বৃদ্ধা এর দুঃখ-সুখ যত।

কিন্তু জেনে শুনে তবু কাঁদে এ পরাণ

অবোধ। হৃদয়-বৃন্তে ফুটে যে কুসুম,

তাহারে ছিঁড়িলে কাল, বিকল হৃদয়

ডোবে শোক-সাগরে, মৃণাল যথা জলে,

যবে কুবলয়ধন লয় কেহ হরি।”

এতেক কহিয়া রাজা, দূতপানে চাহি,

আদেশিলা;—“কহ, দূত, কেমনে পড়িল

সমরে অমর-ত্রাস বীরবাহু বলী?”

প্রণমি রাজেন্দ্রপদে, করযুগ যুড়ি,

আরম্ভিলা ভগ্নদূত;—“হায়, লঙ্কাপতি,

কেমনে কহিব আমি অপূর্ব্ব কাহিনী?

কেমনে বর্ণিব রীররাহুর বীরতা?—

পশিল বীরকুঞ্জর অরিদলমাঝে

ধনুর্দ্ধর। এখনও কাঁপে হিয়া মম

থরথরি, স্মরিলে সে ভৈরব হুঙ্কার!

শুনেছি, রাক্ষসপতি, মেঘের গর্জ্জন;

সিংহনাদ; জলধির কল্লোল; দেখেছি

দ্রুত ইরম্মদ, দেব, ছুটিতে পবন-

পথে; কিন্তু কভু নাহি শুনি ত্রিভুবনে,

এ হেন ঘোর ঘর্ঘর কোদণ্ড টঙ্কার!

কভু নাহি দেখি শর হেন ভয়ঙ্কর!—

পশিলা বীরেন্দ্রবৃন্দ বীরবাহুসহ

রণে, যূথনাথসহ গঙ্গযূথ যথা।

ঘন ঘনাকারে ধূলা উঠিল আকাশে,—

মেঘদল আসি যেন আবরিলা রুষি

গগনে; বিদ্যুৎঝলা-সম চকমকি

উড়িল কলম্বকুল অম্বর প্রদেশে

শন্‌শনে!—ধন্য শিক্ষা বীর বীরবাহু!

কত যে মরিল অরি, কে পারে গণিতে?

এইরূপে শত্রুমাঝে যুঝিলা স্বদলে

পুত্ত্র তব, হে রাজন্! কতক্ষণ পরে,

প্রবেশিলা যুদ্ধে আসি নরেন্দ্র রাঘব।

কনক-মুকুট শিরে, করে ভীম ধনুঃ,

বাসবের চাপ যথা বিবিধ রতনে

খচিত,”—এতেক কহি, নীরবে কাঁদিল

ভগ্নদূত, কাঁদে যথা বিলাপী, স্মরিয়া

পূর্ব্বদুঃখ। সভাজন কাঁদিলা নীরবে।

অশ্রুময়-আঁখি পুনঃ কহিলা রাবণ,

মন্দোদরীমনোহর;—“কহ, রে সন্দেশ-

বহ, কহ, শুনি আমি, কেমনে নাশিলা

দশাননাত্মজ শূরে দশরথাত্মজ?”

“কেমনে, হে মহীপতি”, পুনঃ আরম্ভিল

ভগ্নদূত, “কেমনে, হে রক্ষঃকুলনিধি,

কহিব সে কথা আমি, শুনিবে বা তুমি?

অগ্নিময় চক্ষুঃ যথা হর্য্যক্ষ, সরোষে

কড়মড়ি ভীম দন্ত, পড়ে লম্ফ দিয়া

বৃষস্কন্ধে, রামচন্দ্র আক্রমিলা রণে

কুমারে! চৌদিকে এবে সমর-তরঙ্গ

উথলিল, সিন্ধু যথা দ্বন্দ্বি রায়ুসহ

নির্ঘোষে! ভাতিল অসি অগ্নিশিখাসম,

ধূমপুঞ্জসম চর্ম্মাবলীর মাঝারে

অযুত! নাদিল কম্বু অম্বুরাশি-রবে!—

আর কি কহিব, দেব? পূর্ব্বজন্মদোষে

একাকী বাঁচিনু আমি! হায় রে বিধাতঃ,

কি পাপে এ তাপ আজি দিলি তুই মোরে?

কেন না শুই আমি শরশয্যোপরি,

হৈমলঙ্কা-অলঙ্কার বীরবাহুসহ

রণভূমে? কিন্তু নহি নিজদোষে দোষী।

ক্ষত বক্ষঃস্থল মম, দেখ, নৃপমণি,

রিপু-প্রহরণে; পৃষ্ঠে নাহি অস্ত্রলেখা।”

এতেক কহিয়া স্তব্ধ হইল রাক্ষস

মনস্তাপে। লঙ্কাপতি হরষে বিষাদে

কহিলা;—“সাবাসি দূত! তোর কথা শুনি

কোন্ বীর-হিয়া নাহি চাহে রে পশিতে

সংগ্রামে? ডমরু-ধ্বনি শুনি কাল-ফণী,

কভু কি অলসভাবে নিবাসে বিবরে?

ধন্য লঙ্কা, বীরপুত্ত্রধাত্রী! চল, সবে,—

চল যাই, দেখি, ওহে সভাসদ্‌জন,

কেমনে প’ড়েছে রণে বীর-চূড়ামণি

বীরবাহু; চল, দেখি জুড়াই নয়ন।”

উঠিলা রাক্ষসপতি প্রাসাদ-শিখরে,

কনক-উদয়াচলে দিনমণি যেন

অংশুমালী। চারিদিকে শোভিল কাঞ্চন-

সৌধ-কিরীটিনী লঙ্কা—মনোহরা পুরী!—

হেমহুর্ম্ম্য সারি সারি পুষ্পবন-মাঝে;

কমল-আলয় সরঃ; উৎস রজঃছটা;

তরুরাজী; ফুলকুল চক্ষুঃ-বিনোদন,

যুবতীযৌবন কথা; হীরাচুড়াশিরঃ

দেবগৃহ; নানা রাগে রঞ্জিত বিপণি,

বিবিধ রতন-পূর্ণ; এ জগৎ যেন

আনিয়া বিবিধ ধন, পূজার বিধানে,

রেখেছে, রে চারুলঙ্কে, তোর পদতলে,

জগৎ-বাসনা তুই, সুখের সদন।

দেখিলা রাক্ষসেশ্বর উন্নত প্রাচীর—

অটল অচল যথা। তাহার উপরে,

বীরমদে মত্ত, ফেরে অস্ত্রিদল, যথা

শৃঙ্গধরোপরি সিংহ। চারি সিংহদ্বার

(রুদ্ধ এবে) হেরিলা বৈদেহীহর; তথা

জাগে রথ, রথী, গজ, অশ্ব, পদাতিক

অগণ্য। দেখিল রাজা নগর-বাহিরে,

রিপুবৃন্দ, বালিবৃন্দ সিন্ধুতীরে যথা,

নক্ষত্র-মণ্ডল কিম্বা আকাশ-মণ্ডলে।

থানা দিয়া পূর্ব্বদ্বারে, দুর্ব্বার সংগ্রামে,

বসিয়াছে বীর নীল; দক্ষিণ দুয়ারে

অঙ্গদ, করভসম নব-বলে বলী;

কিম্বা বিষধর, যবে বিচিত্র কঞ্চুক-

ভূষিত, হিমান্তে অহি ভ্রমে ঊর্দ্ধ-ফণা—

ত্রিশূলসদৃশ জিহ্বা লুলি অবলেপে!

উত্তর দুয়ারে রাজা সুগ্রীব আপনি

বীরসিংহ। দাশরথি পশ্চিম দুয়ারে—

হায় রে বিষণ্ণ এবে জানকী-বিহনে,

কৌমুদী-বিহনে যথা কুমুদরঞ্জন

শশাঙ্ক! লক্ষ্মণ সঙ্গে, বায়ুপুত্ত্র হনু,

মিত্রবর বিভীষণ। শত প্রসরণে,

বেড়িয়াছে বৈরিদল স্বর্ণ-লঙ্কাপুরী,

গহন কাননে যথা ব্যাধ-দল মিলি,

বেড়ে জালে সাবধানে কেশরি-কামিনী—

নয়ন-রঞ্জিনী-রূপে, পরাক্রমে ভীমা

ভীমাসমা! অদূরে হেরিলা রক্ষঃপতি

রণক্ষেত্র। শিবাকুল, গৃধিনী, শকুনি,

কুক্কুর, পিশাচদল ফেরে কোলাহলে।

কেহ উড়ে; কেহ বসে; কেহ বা বিবাদে

পাকশাট মারি কেহ খেদাইছে দূরে

সমলোভী জীবে; কেহ, গরজি উল্লাসে,

নাশে ক্ষুধা-অগ্নি; কেহ, শোষে রক্তস্রোতে;

প’ড়েছে কুঞ্জরপুঞ্জ ভীষণ-আকৃতি;

ঝড়গতি ঘোড়া, হায়, গতিহীন এবে;

চূর্ণ রথ অগণ্য, নিষাদী, সাদী, শূলী,

রথী, পদাতিক পড়ি যায় গড়াগড়ি

একত্রে! শোভিছে বর্ম্ম, চর্ম্ম, অসি, ধনু,

ভিন্দিপাল, তূণ, শর, মুদ্গর, পরশু,

স্থানে স্থানে, মণিময় কিরীট, শীর্ষক

আর বীর-আভরণ, মহাতেজস্কর।

পড়িয়াছে যন্ত্রিদল যন্ত্রদল মাঝে।

হৈমধ্বজদণ্ড হাতে, যম-দণ্ডাঘাতে,

পড়িয়াছে ধ্বজবহ। হায় রে, যেমতি

স্বর্ণ-চূড় শষ্য ক্ষত কৃষীদলবলে,

পড়ে ক্ষেত্রে, পড়িয়াছে রাক্ষসনিকর,

রবিকুলরবি শূর রাঘবের শরে!

পড়িয়াছে বীরবাহু—বীর-চূড়ামণি,

চাপি রিপুচর বলী, পড়েছিল যথা

হিড়িম্বার স্নেহনীড়ে পালিত গরুড়

ঘটোৎকচ, যবে কর্ণ, কালপৃষ্ঠধারী,

এড়িলা একাঘ্নী বাণ রক্ষিতে কৌরবে।

মহাশোকে শোকাকুল কহিলা রাবণ;—

“যে শয্যায় আজি তুমি শুয়েছ, কুমার

প্রিয়তম, বীরকুলসাধ এ শয়নে

সদা! রিপুদলবলে দলিয়া সমরে,

জন্মভূমি-রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে?

যে ডরে, ভীরু সে মূঢ়; শত ধিক্‌ তারে

তবু, বৎস, যে হৃদয়, মুগ্ধ মোহমদে,

কোমল সে ফুল-সম। এ বজ্র আঘাতে,

কত যে কাতর সে, তা জানেন সে জন,

অন্তর্য্যামী যিনি, আমি কহিতে অক্ষম

হে বিধি, এ ভবভূমি তব লীলাস্থলী,—

পরের যাতনা কিন্তু দেখি কি হে তুমি

হও সুখী? পিতা সদা পুত্ত্রদুঃখে দুঃখী—

তুমি হে জগৎ-পিতা, এ কি রীতি তব?

হা পুত্ত্র, হা বীরবাহু! বীরেন্দ্র-কেশরী!

কেমনে ধরিব প্রাণ তোমার বিহনে?”

এইরূপে আক্ষেপিয়া রাক্ষস-ঈশ্বর

রাবণ, ফিরায়ে আঁখি, দেখিলেন দূরে

সাগর—মকরালয়। মেঘশ্রেণী যেন

অচল, ভাসিছে জলে শিলাকুল, বাঁধা

দৃঢ় বাঁধে। দুই পাশে তরঙ্গ-নিচয়,

ফেনাময়, ফণাময় যথা ফণিবর,

উথলিছে নিরন্তর গম্ভীর নির্ঘোষে।

অপূর্ব্ব-বন্ধন সেতু; রাজপথ-সম

প্রশস্ত; বহিছে জলস্রোতঃ কলরবে,

স্রোতঃ-পথে জল যথা বরিষার কালে।

অভিমানে মহামানী বীরকুলর্ষভ

রাবণ, কহিলা বলী সিন্ধুপানে চাহি;—

“কি সুন্দর মালা আজি পড়িয়াছ গলে,

প্রচেতঃ! হা ধিক্, ওহে জলদলপতি!

এই কি সাজে তোমারে, অলঙ্ঘ্য, অজেয়

তুমি? হায় এই কি তোমার ভূষণ,

রত্নাকর? কোন্ গুণে, কহ, দেব, শুনি,

কোন্ গুণে দাশরথি কিনেছে তোমারে?

প্রভঞ্জন বৈরী তুমি; প্রভঞ্জন-সম

ভীম-পরাক্রম! কহ, এ নিগড় তবে

পর তুমি কোন্ পাপে? অধম ভালুকে

শৃঙ্খলিয়া যাদুকর, খেলে তারে ল’য়ে;

কেশরীর রাজপদ কার সাধ্য বাঁধে

বীতংসে? এই যে লঙ্কা, হৈমবতী পুরী,

শোভে তব বক্ষঃস্থলে, হে নীলাম্বুস্বামি,

কৌস্তুভ-রতন যথা মাধবের বুকে,

কেন হে নির্দ্দয় এবে তুমি এর প্রতি?

উঠ, বলি, বীরবলে এ জাঙাল ভাঙি,

দূর কর অপবাদ; জুড়াও এ জ্বালা,

ডুবায়ে অতল-জলে এ প্রবল রিপু।

রেখো না গো তব ভালে এ কলঙ্ক-রেখা,

হে বারীন্দ্র, তব পদে এ মম মিনতি।”

এতেক কহিয়া রাজরাজেন্দ্র রাবণ,

আসিয়া বসিল পুনঃ কনক-আসনে

সভাতলে; শোকে মগ্ন বসিলা নীরবে

মহামতি; পাত্রমিত্র, সভাসদ-আদি

বসিলা চৌদিকে, আহা, নীরব বিষাদে।

হেনকালে চারিদিকে সহসা ভাসিল

রোদন-নিনাদ মৃদু; তা সহ মিশিয়া

ভাসিল নূপুরধ্বনি, কিঙ্কিণীর বোল

ঘোর রোলে। হেমাঙ্গী সঙ্গিনী দল সাথে,

প্রবেশিলা সভাতলে চিত্রাঙ্গদা দেবী।

আলু থালু, হায়, এবে কবরীবন্ধন!

আভরণহীন দেহ, হিমানীতে যথা

কুসুমরতন-হীন বন-সুশোভিনী

লতা! অশ্রুময় আঁখি, নিশার শিশির-

পূর্ণ পদ্মপর্ণ যেন! বীরবাহু-শোকে

বিবশা রাজমহিষী, বিহঙ্গিনী যথা,

যবে গ্রাসে কালফণী কূলায়ে পশিয়া

শাবকে! শোকের ঝড় বহিল সভাতে!

সুর-সুন্দরীর রূপে শোভিল চৌদিকে

বামাকুল; মুক্তকেশ মেঘমালা; ঘন

নিশ্বাস প্রলয়-বায়ু; অশ্রুবারি-ধারা

আসার; জীমূত-মন্দ্র হাহাকার রব!

চমকিলা লঙ্কাপতি কনক আসনে।

ফেলিল চামর দূরে তিতি নেত্রনীরে

কিঙ্করী; কাঁদিল ফেলি ছত্র ছত্রধর;

ক্ষোভে, রোষে, দৌবারিক নিষ্কোষিল অসি

ভীমরূপী; পাত্র, মিত্র, সভাসদ্ যত,

অধীর, কাঁদিলা সবে ঘোর কোলাহলে

কতক্ষণে মৃদুস্বরে কহিলা মহিষী

চিত্রাঙ্গদা, চাহি সতী রাবণের পানে;—

“একটী রতন মোরে দিয়াছিল বিধি

কৃপাময়; দীন আমি থুয়েছিনু তারে

রক্ষাহেতু তব কাছে, রক্ষঃকুল-মণি,

তরুর কোটরে রাখে শাবকে যেমতি

পাখী। কহ, কোথা তুমি রেখেছ তাহারে,

লঙ্কানাথ? কোথা মম অমুল্য রতন?

দরিদ্র-ধন-রক্ষণ রাজধর্ম্ম; তুমি

রাজকুলেশ্বর; কহ, কেমনে রেখেছ,

কাঙ্গালিনী আমি, রাজা, আমার সে ধনে?”

উত্তর করিলা তবে দশানন বলী;—

“এ বৃথা গঞ্জনা, প্রিয়ে, কেন দেহ মোরে?

গ্রহদোষে দোষী জনে কে নিন্দে, সুন্দরি?

হায়, বিধিবশে, দেবি, সহি এ যাতনা

আমি! বীরপুত্ত্রধাত্রী এ কনকপুরী,

দেখ, বীরশূন্য এবে; নিদাঘে যেমতি

ফুলশূন্য বনস্থলী, জলশূন্য নদী!

বরজে সজারু পশি বারুইর যথা

ছিন্ন-ভিন্ন করে তারে, দশরথাত্মজ

মজাইছে লঙ্কা মোর! আপনি জলধি

পরেন শৃঙ্খল পায়ে তার অনুরোধে!

এক পুত্ত্রশোকে তুমি আকুলা, ললনে!

শত পুত্ত্রশোকে বুক আমার ফাটিছে

দিবানিশি! হায়, দেবি, যথা বনে বায়ু

প্রবল, শিমূলশিম্বী ফুটাইলে বলে,

উড়ি যায় তূলারাশি, এ বিপুল-কুল-

শেখর রাক্ষস যত পড়িছে তেমতি

এ কাল-সমরে। বিধি প্রসারিছে বাহু

বিনাশিতে লঙ্কা মম, কহিনু তোমারে।”

নীরবিলা রক্ষোনাথ; শোকে অধোমুখে

বিধুমুখী চিত্রাঙ্গদা, গন্ধর্ব্বনন্দিনী,

কাঁদিলা,—বিহ্বলা, আহা, স্মরি পুত্ত্রবরে।

কহিতে লাগিলা পুনঃ দাশরথি অরি;—

“এ বিলাপ কভু, দেবি, সাজে কি তোমারে?

দেশবৈরী নাশি রণে পুত্ত্রবর তব

গেছে চলি স্বর্গপুরে; বীরমাতা তুমি;

বীরকর্ম্মে হতপুত্ত্র-হেতু কি উচিত

ক্রন্দন? এ বংশ মম উজ্জ্বল হে আজি

তব পুত্ত্রপরাক্রমে; তবে কেন তুমি

কাঁদ, ইন্দুনিভাননে, তিত অশ্রুনীরে?”

উত্তর করিলা তবে চারুনেত্রা দেবী

চিত্রাঙ্গদা;—“দেশবৈরী নাশে যে সমরে

শুভক্ষণে জন্ম তার; ব’লে মানি

হেন বীরপ্রসূনের প্রসূ ভাগ্যবতী।

কিন্তু ভেবে দেখ, নাথ, কোথা লঙ্কা তব;

কোথা সে অযোধ্যাপুরী? কিসের কারণে,

কোন্ লোভে, কহ, রাজা, এসেছে এ দেশে

রাঘব? এ স্বর্ণলঙ্কা দেবেন্দ্রবাঞ্ছিত,

অতুল ভবমণ্ডলে; ইহার চৌদিকে

রজত-প্রাচীর-সম শোভেন জলধি।

শুনেছি, সরযূতীরে বসতি তাহার—

ক্ষুদ্র নয়। তব হৈমসিংহাসন-আশে

যুঝিছে কি দাশরথি? বামন হইয়া

কে চাহে ধরিতে চাঁদে? তবে দেশরিপু

কেন তারে বল, বলি? কাকোদর সদা

নম্রশিরঃ; কিন্তু তারে প্রহারয়ে যদি

কেহ, ঊর্দ্ধ-ফণা ফণী দংশে প্রহারকে।

কে, কহ, এ কাল-অগ্নি জ্বালিয়াছে আজি

লঙ্কাপুরে? হায়, নাথ, নিজ কর্ম্ম-ফলে,

মজালে রাক্ষসকুল, মজিলা আপনি!”

এতেক কহিয়া বীরবাহুর জননী,

চিত্রাঙ্গদা, কাঁদি সঙ্গে সঙ্গিদলে ল’য়ে,

প্রবেশিলা অন্তঃপুরে। শোকে, অভিমানে,

ত্যজি সুকনকাসন, উঠিলা গর্জ্জিয়া

রাঘবারি। “এতদিনে” (কহিলা ভূপতি)

“বীরশূন্য লঙ্কা মম! এ কাল-সমরে,

আর পাঠাইব কারে? কে আর রাখিবে

রাক্ষসকুলের মান? যাইব আপনি।

সাজ হে বীরেন্দ্রবৃন্দ, লঙ্কার ভূষণ!

দেখিব, কি গুণ ধরে রঘুকুলমণি!

অরাবণ, অরাম বা হবে ভব আজি!”

এতেক কহিলা যদি নিকষানন্দন

শূরসিংহ, সভাতলে বাজিল দুন্দুভি

গম্ভীর জীমূতমন্দ্রে। সে ভৈরব রবে,

সাজিল কর্ব্বুরবৃন্দ বীরমদে মাতি,

দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস। বাহিরিল বেগে

বারী হ’তে (বারিস্রোতঃ-সম পরাক্রমে

দুর্ব্বার) বারণযূথ; মন্দুরা ত্যজিয়া

বাজীরাজী, বক্রগ্রীব, চিবাইয়া রোধে

মুখস্। আইল রড়ে রথ স্বর্ণচূড়,

বিভায় পূরিয়া পুরী। পদাতিকব্রজ,

কনক-শিরস্ক শিরে ভাস্বর-পিধানে

অসিবর, পৃষ্ঠে চর্ম্ম অভেদ্য সমরে,

হস্তে শূল, শালবৃক্ষ অভ্রভেদী যথা,

আয়সী-আবৃত দেহ, আইল কাতারে।

আইল নিষাদী যথা মেঘবরাসনে

বজ্রপাণি; সাদী যথা অশ্বিনী-কুমার,

ধরি ভীমাকার ভিন্দিপাল, বিশ্বনাশী

পরশু,—উঠিল আভা আকাশ-মণ্ডলে,

যথা বনস্থলে যবে পশে দাবানল।

রক্ষঃকুলধ্বজ ধরি, ধ্বজধর বলী

মেলিলা কেতনবর, রতনে খচিত,

বিস্তারিয়া পাখা যেন উড়িলা গরুড়

অম্বরে। গম্ভীর রোলে বাজিল চৌদিকে

রণবাদ্য, হয়ব্যূহ হ্রেষিল উল্লাসে,

গরজিল গজ, শঙ্খ নাদিল ভৈরবে;

কোদণ্ড-টঙ্কার সহ অসির ঝন্‌ঝনি

রোধিল শ্রবণ-পথ মহা-কোলাহলে!

টলিল কনকলঙ্কা বীরপদভরে;—

গর্জ্জিলা বারীশ রোষে! যথা জলতলে

কনক-পঙ্কজ-বনে, প্রবাল আসনে,

বারুণী রূপসী বসি, মুক্তাফল দিয়া

কবরী বাঁধিতেছিলা, পশিল সে স্থলে

আরাব; চমকি সতী চাহিলা চৌদিকে।

কহিলেন বিধুমুখী সখীরে সম্ভাষি

মধুরস্বরে;—“কি কারণে, কহ, লো স্বজনি,

সহসা জলেশ পাশী অস্থির হইলা?

দেখ, থর থর করি কাঁপে মুক্তাময়ী

গৃহচুড়া। পুনঃ বুঝি দুষ্ট রায়ুকুল

যুঝিতে তরঙ্গচর সঙ্গে দিলা দেখা।

ধিক্ দেব প্রভঞ্জনে! কেমনে ভুলিলা

আপন প্রতিজ্ঞা, সখি, এত অল্পদিনে

বায়ুপতি? দেবেন্দ্রের সভায় তাঁহারে

সাধিনু সেদিন আমি বাঁধিতে শৃঙ্খলে

বায়ু-বৃন্দে; কারাগারে রোধিতে সবারে।

হাসিয়া কহিলা দেব; ‘অনুমতি দেহ,

জলেশ্বরি, তরঙ্গিণী বিমলসলিলা

আছে যত ভবতলে কিঙ্করী তোমারি,

তা সবার সহ আমি বিহারি সতত,—

তা হ’লে পালিবে আজ্ঞা’;—তখনি, স্বজনি,

সায় তাহে দিনু আমি। তবে কেন আজি,

আইলা পবন মোরে দিতে এ যাতনা?”

উত্তর করিলা সখী কল কল রবে;—

“বৃথা গঞ্জ প্রভঞ্জনে, বারীন্দ্রমহিষি!

তুমি। এ ত ঝড় নহে; কিন্তু ঝড়াকারে

সাজিছে রাবণ-রাজা স্বর্ণলঙ্কাধামে,

লাঘবিতে রাঘবের বীরগর্ব্বরণে।”

কহিলা বারুণী পুনঃ;—“সত্য, গো স্বজনি,

বৈদেহীর হেতু রাম-রাবণে বিগ্রহ।

রক্ষঃকুল-রাজলক্ষ্মী মম প্রিয়তমা

সখী। যাও শীঘ্র তুমি তাঁহার সদনে;

শুনিতে লালসা মোর রণের বারতা।

এই স্বর্ণ-কমলটী দিও কমলারে।

কহিও, যেখানে তাঁর রাঙা পা-দুখানি

রাখিতেন শশিমুখী বসি পদ্মাসনে,

সেখানে ফোটে এ ফুল, যে অবধি তিনি,

আঁধারি জলধি-গৃহ, গিয়াছেন গৃহে।”

উঠিলা মুরলা সখী, বারুণী আদেশে,

জলতল ত্যজি, যথা উঠয়ে চটুলা

সফরী, দেখাতে ধনী রজত কান্তি-ছটা-

বিভ্রম বিভাবসুরে। উতরিলা দূতী

যথায় কমলালয়ে, কমল-আসনে

বসেন কমলময়ী কেশব-বাসনা

লঙ্কাপুরে। ক্ষণকাল দাঁড়ায়ে দুয়ারে,

জুড়াইলা আঁখি সখী, দেখিয়া সম্মুখে,

যে রূপমাধুরী মোহে মদনমোহনে।

বহিছে বসন্তানিল——চির-অনুচর—

দেবীর কমল-পদ-পরিমল-আশে

সুস্বনে। কুসুম-রাশি শোভিছে চৌদিকে,

ধনদের হৈমাগারে রত্নরাজী যথা।

শত স্বর্ণ-ধূপদানে পুড়িছে অগুরু,

গন্ধরস, গন্ধামোদে আমোদি দেউলে।

স্বর্ণপাত্রে সারি সারি উপহার নানা,

বিবিধ উপকরণ। স্বর্ণ-দীপাবলী

দীপিছে, সুরভি তৈলে পূর্ণ—হীনতেজাঃ

খদ্যোতিকাদ্যোতি যথা পূর্ণ-শশী-তেজে!

ফিরায়ে বদন, ইন্দু-বদনা ইন্দিরা

বসেন বিষাদে দেবী, বসেন যেমতি—

বিজয়া দশমী যবে বিরহের সাথে

প্রভাতয়ে গৌড়গৃহে—উমা চন্দ্রাননা!

করতলে বিন্যাসিয়া কপোল কমলা

তেজস্বিনী, বসি দেবী কমল-আসনে;—

পশে কি গো শোক হেন কুসুম-হৃদয়ে?

প্রবেশিলা মন্দগতি মন্দিরে সুন্দরী

মুরলা; প্রবেশি দূতী, রমার চরণে

প্রণমিলা, নতভাবে। আশীষি ইন্দিরা—

রক্ষঃ-কুল-রাজলক্ষ্মী—কহিতে লাগিলা;—

“কি কারণে হেথা আজি, কহ লো মুরলে,

গতি তব? কোথা দেবী জলদলেশ্বরী,

প্রিয়তমা সখী মম? সদা আমি ভাবি

তাঁর কথা। ছিনু যবে তাঁহার আলয়ে,

কত যে করিলা কৃপা মোর প্রতি সতী

বারুণী, কভু কি আমি পারি তা ভুলিতে?

রমার আশার বাস হরির উরসে;—

হেন হরি হারা হয়ে বাঁচিল যে রমা,

সে কেবল বারুণীর স্নেহৌষধ-গুণে।

ভাল ত আছেন, কহ, প্রিয়সখী মম

বারীন্দ্রাণী?” উত্তরিলা মুরলা রূপসী;

“নিরাপদে জলতলে বসেন বারুণী।

বৈদেহীর হেতু রাম-রাবণে বিগ্রহ;

শুনিতে লালসা তাঁর রণের বারতা।

এই যে পদ্মটী, সতি, ফুটেছিল সুখে

যেখানে রাখিতে তুমি রাঙা পা-দুখানি;

তেঁই পাশি-প্রণয়িনী প্রেরিয়াছে এরে।”

বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি কহিলা কমলা,

বৈকুণ্ঠধামের জ্যোৎস্না;—“হায় লো স্বজনি,

দিন দিন হীন-বীর্য্য রাবণ দুর্ম্মতি,

যাদঃ-পতি-রোধঃ যথা চলোর্ম্মি-আঘাতে!

শুনি চমকিবে তুমি। কুম্ভকর্ণ বলী

ভীমাকৃতি, অকম্পন, রণে ধীর, যথা

ভূধর, পড়েছে সহ অতিকায় রথী।

আর যত রক্ষঃ আমি বর্ণিতে অক্ষম।

মরিয়াছে বীরবাহু—বীর-চূড়ামণি।

ওই যে ক্রন্দন-ধ্বনি শুনিছ, মুরলে!

অন্তঃপুরে, চিত্রাঙ্গদা কাঁদে পুত্রশোকে

বিকলা। চঞ্চলা আমি ছাড়িতে এ পুরী।

বিদরে হৃদয় মম, শুনি, দিবা-নিশি

প্রমদা-কুল-রোদন! প্রতিগৃহে কাঁদে

পুত্ত্রহীনা মাতা, দূতি, পতিহীনা সতী।”

সুধিলা মুরলা;—“কহ, শুনি, মহাদেবি,

কোন্ বীর আজি পুনঃ সাজিছে যুঝিতে

বীরদর্পে?” উত্তরিলা মাধব রমণী;—

“না জানি কে সাজে আজি। চল লো মুরলে,

বাহিরিয়া দেখি মোরা কে যায় সমরে।”

এতেক কহিয়া রমা মুরলার সহ,

রক্ষঃকুল-বালা-রূপে, বাহিরিলা দোঁহে

দুকূল-বসনা। রুণু রুণু মধুবোলে

বাজিল কিঙ্কিণী; করে শোভিল কঙ্কণ;

নয়নরঞ্জন কাঞ্চী কৃশ কটিদেশে।

দেউল দুয়ারে দোঁহে দাঁড়ায়ে দেখিলা,

কাতারে কাতারে সেনা চলে রাজপথে,

সাগর-তরঙ্গ যথা পবন-তাড়নে

দ্রুতগামী। ধায় রথ, ঘুররে ঘর্ঘরে

চক্রনেমি। দৌড়ে ঘোড়া ঘোর ঝড়াকারে।

অধীরিয়া বসুধারে পদভরে, চলে

দন্তী, আস্ফালিয়া শুণ্ড, দণ্ডধর যথা

কাল-দণ্ড। বাজে বাদ্য গভীর নিক্কণে।

রতনে খচিত কেতু উড়ে শত শত

তেজস্কর। দুই পাশে, হৈম নিকেতন

রাতায়নে দাঁড়াইয়া ভুবনমোহিনী

লঙ্কাবধূ বরিষয়ে কুসুম-আসার,

করিয়া মঙ্গলধ্বনি। কহিলা মুরলা,

চাহি ইন্দিরার ইন্দু-বদনের পানে;—

ত্রিদিব-বিভব, দেবি, দেখি ভবতলে

আজি! মনে হয় যেন, বাসব আপনি

স্বরীশ্বর, সুর-বল-দল সঙ্গে করি,

প্রবেশিলা লঙ্কাপুরে। কহ কৃপাময়ি,

কৃপা করি কহ, শুনি, কোন্ কোন্ রথী

রণ-হেতু সাজে এবে মত্ত বীরমদে?”

কহিলা কমলা সতী কমলনয়না;—

“হায়, সখি, বীরশূন্য স্বর্ণ-লঙ্কাপুরী!

মহারথিকুল-ইন্দ্র আছিল যাহারা,

দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস, ক্ষয় এ দুর্জ্জয়

রণে! শুভক্ষণে ধনুঃ ধরে রঘুমণি!

ওই যে দেখিছ রথী স্বর্ণ-চূড়-রথে,

ভীমমূর্ত্তি, বিরূপাক্ষ রক্ষোদল-পতি,

প্রক্ষ্বেড়নধারী বীর, দুর্ব্বার সমরে।

গজপৃষ্ঠে দেখ ওই কালনেমি, বলে

রিপুকুল-কাল বলী, ভিন্দিপালপাণি!

অশ্বারোহী দেখ ওই তালবৃক্ষাকৃতি

তালজঙ্ঘা, হাতে গদা, গদাধর যথা

মুরারি সমর-মদে মত্ত, ওই দেখ

প্রমত্ত, ভীষণ রক্ষঃ, বক্ষঃ শিলাসম

কঠিন! অন্যান্য যত কত আর কব?

শত শত হেন যোধ হত এ সমরে;

যথা যবে প্রবেশয়ে গহন বিপিনে

বৈশ্বানর, তুঙ্গতর মহীরুহব্যূহ

পুড়ি ভস্মরাশি সবে ঘোর দাবানলে।”

সুধিলা মুরলা দূতী;—“কহ, দেবীশ্বরি!

কি কারণে নাহি হেরি মেঘনাদ রথী

ইন্দ্রজিতে—রক্ষঃ কুল-হর্য্যক্ষ বিগ্রহে?

হত কি সে বলী, সতি, এ কাল সমরে?”

উত্তর করিলা রমা সুচারুহাসিনী;—

“প্রমোদ-উদ্যানে বুঝি ভ্রমিছে আমোদে,

যুবরাজ, নাকি জানি হত আজি রণে

বীরবাহু; যাও তুমি বারুণীর পাশে,

মুরলে! কহিও তাঁরে এ কনক-পুরী

ত্যজিয়া, বৈকুণ্ঠ-ধামে ত্বরা যার আমি।

নিজদোষে মজে রাজা লঙ্কা-অধিপতি।

হায়, বরিষার কালে বিমল-সলিলা

সরসী সমলা যথা কর্দ্দম-উদ্গমে,

পাপে পূর্ণ স্বর্ণলঙ্কা! কেমনে এখানে

আর বাস করি আমি? যাও চলি সখি,

প্রবাল-আসনে যথা বসেন বারুণী

মুক্তাময়-নিকেতনে। যাই আমি যথা

ইন্দ্রজিৎ, আনি তারে স্বর্ণ-লঙ্কা-ধামে।

প্রাক্তনের ফল ত্বরা ফলিবে এ পুরে।”

প্রণমি দেবীর পদে, বিদায় হইয়া,

উঠিলা পবন-পথে মুরলা রূপসী

দূতী, যথা শিখণ্ডিনী, আখণ্ডল-ধনুঃ

বিবিধ-রতন-কান্তি আভায় রঞ্জিয়া

নয়ন, উভয়ে ধনী মঞ্জু কুঞ্জবনে!

উতরি জলধি-কূলে, পশিলা সুন্দরী

নীল-অম্বু-রাশি। হেথা কেশব-বাসনা

পদ্মাক্ষী, চলিলা রক্ষঃ-কুল-লক্ষ্মী, দূরে

যথায় বাসব-ত্রাস বসে বীরমণি

মেঘনাদ। শূন্যমার্গে চলিলা ইন্দিরা।

কতক্ষণে উতরিলা হৃষীকেশ-প্রিয়া

সুকেশিনী, যথা বসে চির-রণজয়ী

ইন্দ্রজিৎ। বৈজয়ন্তধাম-সম পুরী,—

অলিন্দে সুন্দর হৈমময় স্তম্ভাবলী

হীরাচূড়; চারিদিকে রম্য বনরাজী

নন্দন কানন যথা। কুহরিছে ডালে

কোকিল; ভ্রমরদল ভ্রমিছে গুঞ্জরি;

বিকশিছে ফুলকুল; মর্ম্মরিছে পাতা;

বহিছে বসন্তানিল; ঝরিছে ঝর্ঝরে

নির্ঝর। প্রবেশি দেবী সুরর্ণ-প্রাসাদে,

দেখিলা সুবর্ণ-দ্বারে ফিরিছে নির্ভয়ে

ভীমরূপী বামাবৃন্দ, শরাসন-করে।

দুলিছে নিষঙ্গ-সঙ্গে বেণী পৃষ্ঠদেশে।

বিজলীর ঝলা সম, বেণীর মাঝারে,

রত্নরাজী, তূণে শর মণিময় ফণী!

উচ্চ কুচ-যুগোপরি সুবর্ণ-কবচ,

রবি-কর-জাল যথা প্রফুল্ল কমলে।

তূণে মহাখর শর; কিন্তু খরতর

আয়ত-লোচনে শর। নবীন-যৌবন-

মদে মত্ত, ফেরে সবে মাতঙ্গিনী যথা

মধুকালে। বাজে কাঞ্চী, মধুর শিঞ্জিতে,

বিশাল নিতম্ববিম্বে, নূপুর চরণে।

বাজে বীণা, সপ্তস্বরা, মুরজ, মুরলী;

সঙ্গীত তরঙ্গ মিশি সে রবের সহ,

উথলিছে চারিদিকে, চিত্ত বিনোদিয়া।

বিহারিছে বীরবর, সঙ্গে বরাঙ্গনা

প্রমদা, রজনীনাথ বিহারেন যথা

দক্ষ-বালা-দলে ল’য়ে; কিম্বা রে যমুনে,

ভানুসুতে, বিহারেন রাখাল যেমতি

নাচিয়া কদম্বমূলে, মুরলী অধরে,

গোপ-বধূ সঙ্গে রঙ্গে তোর চারুকুলে!

মেঘনাদধাত্রী নামে প্রভাষা রাক্ষসী।

তার রূপ ধরি রমা, মাধব-রমণী,

দিলা দেখা, মুষ্টে যষ্টি, বিশদ-বসনা।

কনক আসন ত্যজি, বীরেন্দ্রকেশরী

ইন্দ্রজিৎ, প্রণমিয়া ধাত্রীর চরণে,

কহিল;—“কি হেতু, মাতঃ, গতি তব আজি

এ ভবনে? কহ দাসে লঙ্কার কুশল?”

শিরঃ চুম্বি ছদ্মবেশী অম্বুরাশি-সুতা

উত্তরিলা;—“হায়! পুত্ত্র, কি আর কহিব

কনক-লঙ্কার দশা! ঘোরতর রণে,

হত প্রিয় ভাই তব রীরবাহু বলী!

তার শোকে মহাশোকী রাক্ষসাধিপতি,

সসৈন্যে সাজেন আজি যুঝিতে আপনি।”

জিজ্ঞাসিলা মহাবাহু বিস্ময় মানিয়া;—

“কি কহিলা, ভগবতি! কে বধিল, কবে

প্রিয়ানুজে? নিশা-রণে সংহারিনু আমি

রঘুবরে; খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিনু

বরষি প্রচণ্ড শর বৈরী-দলে; তবে

এ বারতা,—এ অদ্ভুত-বারতা, জননি!

কোথায় পাইলে তুমি, শীঘ্র কহ দাসে?”

রত্নাকর-রত্নোত্তমা ইন্দিরা-সুন্দরী

উত্তরিলা;—“হায়! পুত্ত্র, মায়াবী মানব

সীতাপতি; তব শরে মরিয়া বাঁচিল।

যাও তুমি ত্বরা করি; রক্ষ রক্ষঃকুল-

মান, এ কাল-সমরে, রক্ষঃ-চূড়ামণি!”

ছিঁড়িলা কুসুমদাম রোষে মহাবলী

মেঘনাদ; ফেলাইলা কনক-বলয়

দূরে, পদ-তলে পড়ি শোভিল কুণ্ডল,

যথা অশোকের ফুল অশোকের তলে

আভাময়! “ধিক্ মোরে” কহিলা গম্ভীরে

কুমার;—“হা ধিক্ মোরে। বৈরিদল বেড়ে

স্বর্ণলঙ্কা, হেথা আমি বামাদল-মাঝে?

এই কি সাজে আমারে? দশাননাত্মজ

আমি ইন্দ্রজিৎ; আন রথ ত্বরা করি;

ঘুচাব এ অপবাদ, বধি রিপুকুলে।”

সাজিলা রথীন্দ্রর্ষভ বীর-আভরণে,

হৈমবতীসুত যথা নাশিতে তারকে

মহাসুর; কিম্বা যথা বৃহন্নলারূপী

কিরীটী বিরাটপুত্ত্রসহ উদ্ধারিতে

গোধন, সাজিলা শূর শমীবৃক্ষমূলে।

মেঘবর্ণ রথ; চক্র বিজলীর ছটা;

ধ্বজ ইন্দ্রচাপরূপী; তুরঙ্গম বেগে

আশুগতি। রথে চড়ে বীর-চুড়ামণি

বীরদর্পে, হেনকালে প্রমীলা সুন্দরী,

ধরি পতি-কর-যুগ (হায় রে, যেমতি

হেমলতা আলিঙ্গয়ে তরু-কুলেশ্বরে)

কহিল কাঁদিয়া ধনী;—“কোথা প্রাণসখে,

রাখি এ দাসীরে, কহ, চলিলা আপনি?

কেমনে ধরিবে প্রাণ তোমার বিরহে

এ অভাগী? হায়, নাথ, গহন কাননে,

ব্রততী বাঁধিলে সাধে করি-পদ, যদি

তার রঙ্গরসে মন না দিয়া, মাতঙ্গ

যায় চলি, তবু তারে রাখে পদাশ্রয়ে

যূথনাথ। তবে কেন তুমি, গুণনিধি,

ত্যজ কিঙ্করীরে আজি?” হাসি উত্তরিলা

মেঘনাদ;—“ইন্দ্রজিতে জিতি তুমি, সতি,

বেঁধেছে যে দৃঢ় বাঁধে, কে পারে খুলিতে

সে বাঁধে? ত্বরায় আমি আসিব ফিরিয়া

কল্যাণি! সমরে নাশি তোমার কল্যাণে

রাঘবে। বিদায় এবে দেহ, বিধুমুখি!”

উঠিল পবন-পথে, ঘোরতর রবে,

রথবর, হৈমপাখা বিস্তারিয়া যেন

উড়িলা মৈনাক-শৈল অম্বর উজলি!

শিঞ্জিনী আকর্ষি রোষে টঙ্কারিলা ধনুঃ

বীরেন্দ্র, পক্ষীন্দ্র যথা নাদে মেঘমাঝে

ভৈরবে। কাঁপিলা লঙ্কা, কাঁপিলা জলধি!

সাজিছে রাবণ রাজা, বীরমদে মাতি;—

বাজিছে রণ-বাজনা; গরজিছে গজ;

হ্রেষে অশ্ব; হুঙ্কারিছে পদাতিক, রথী;

উড়িছে কৌশিক-ধ্বজ; উঠিছে আকাশে

কাঞ্চন-কঞ্চুক-বিভা; হেনকালে তথা

দ্রুতগতি উত্তরিলা মেঘনাদ রথী।

নাদিল কর্ব্বুরদল হেরি বীরবরে

মহাগর্ব্বে। নমি পুত্ত্র পিতার চরণে,

করযোড়ে কহিলা;—“হে রক্ষঃকুল-পতি!

শুনেছি, মরিয়া না কি বাঁচিয়াছে পুনঃ

রাঘব? এ মায়া, পিতঃ, বুঝিতে না পারি!

কিন্তু অনুমতি দেহ; সমূলে নির্ম্মূল

করিব পামরে আজি! ঘোর শরানলে

করি ভস্ম, বায়ু-অস্ত্রে উড়াইব তারে;

নতুবা বাঁধিয়া আনি দিব রাজ-পদে।”

আলিঙ্গি কুমারে, চুম্বি শিরঃ, মৃদুস্বরে

উত্তর করিলা এবে স্বর্ণ-লঙ্কাপতি;

“রাক্ষস-কুল-শেখর তুমি, বৎস! তুমি

রাক্ষস-কুল-ভরসা। এ কাল-সমরে

নাহি চাহে প্রাণ মম পাঠাইতে তোমা

বারম্বার! হায়, বিধি বাম মম প্রতি।

কে কবে শুনেছে, পুত্ত্র, ভাসে শিলা জলে,

কে কবে শুনেছে, লোক মরি পুনঃ বাঁচে?”

উত্তরিলা বীরদর্পে অসুরারি-রিপু;—

"কি ছার সে নর, তারে ডরাও আপনি,

রাজেন্দ্র? থাকিতে দাস, যদি যাও রণে

তুমি, এ কলঙ্ক, পিতঃ, ঘুষিবে জগতে।

হাসিবে, মেঘবাহন; রুষিবেন দেব

অগ্নি। দুইবার আমি হারানু রাঘবে;

আর একবার পিতঃ, দেহ আজ্ঞা মোরে,

দেখিব এবার বীর বাঁচে কি ঔষধে!”

কহিলা রাক্ষসপতি;—“কুম্ভকর্ণ বলী

ভাই মম, তায় আমি জাগানু অকালে

ভয়ে; হায়, দেহ তার, দেখ, সিন্ধুতীরে

ভূপতিত, গিরিশৃঙ্গ কিম্বা তরু যথা

বজ্রাঘাতে! তবে যদি একান্ত সমরে

ইচ্ছা তব, বৎস, আগে পূজ ইষ্টদেব,—

নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ কর, বীরমণি!

সেনাপতি-পদে আমি বরিনু তোমারে।

দেখ, অস্তাচলগামী দিননাথ এবে;

প্রভাতে যুঝিও, বৎস, রাখবের সাথে।”

এতেক কহিয়া রাজা, যথাবিধি ল’য়ে

গঙ্গোদক, অভিষেক করিলা কুমারে।

অমনি বন্দিল বন্দী, করি বীণাধ্বনি

আনন্দে; “নয়নে তব, হে রাক্ষস-পুরি,

অশ্রুবিন্দু; মুক্তকেশী শোকাবেশে তুমি!

ভূতলে পড়িয়া, হায়, রতন-মুকুট,

আর রাজ-আভরণ, হে রাজসুন্দরি,

তোমার! উঠ গো, শোক পরিহরি, সতি!

রক্ষঃকুল-রবি ওই উদয় অচলে।

প্রভাত হইল তর দুঃখ বিভাবরী!

উঠ রাণি, দেখ, ওই ভীম বাম করে

কোদণ্ড, টঙ্কারে যার বৈজয়ন্ত ধামে

পাণ্ডুবর্ণ আখণ্ডল। দেখ তূণ, যাহে

পশুপতি-ত্রাস অস্ত্র পাশুপত-সম!

গুণিগণ-শ্রেষ্ঠ গুণী, বীরেন্দ্র-কেশরী,

কামিনীরঞ্জন রূপে, দেখ মেঘনাদে।

ধন্য রাণী মন্দোদরী! ধন্য রক্ষঃপতি

নৈকষেয়! ধন্য লঙ্কা, বীরধাত্রী তুমি!

আকাশ-দুহিতা ওগো শুন প্রতিধ্বনি,

কহ সবে মুক্তকণ্ঠে, সাজে অরিন্দম

ইন্দ্রজিৎ। ভয়াকুল কাঁপুক্ শিবিরে

রঘুপতি, বিভীষণ, রক্ষঃ কুল-কালি,

দণ্ডক-অরণ্যচর ক্ষুদ্র প্রাণী যত।”

বাজিল রাক্ষস-বাদ্য, নাদিল রাক্ষস,—

পূরিল কনক-লঙ্কা জয় জয় রবে।

ইতি শ্রীমেঘনাদবধকাব্যে অভিষেকো নাম

প্রথমঃ সর্গঃ।

প্রথম সর্গ

সম্মুখ সমরে—in a face-to-face battle.

অকালে—at an untimely hour.

বীরবাহু চিত্রসেন নামক গন্ধর্ব্বকন্যা চিত্রাঙ্গদাকে রাবণ হরণ করিয়া আনেন। বীরবাহু তাঁহারই গর্ভজাত পুত্র।

রক্ষঃকুলনিধি রাঘবারি—রাক্ষসবংশশ্রেষ্ঠ রাবণ; Ravana (the enemy of Raghaba i.e. Ramchandra), the greatest of the Rakshasas.

কি কৌশলে—by what strategy.

রাক্ষসভরসা ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদে—Meghanada, the conqueror of Indra, and the hope of the Rakshasas.

অজেয়—unconquerable.

উর্ম্মিলাবিলাসী—the lover of Urmila i.e. Lakshmana. Note the epithets used of Meghanada, and the epithet used of Lakshmana. The poet describes Megha nada as a great hero, and Lakshmana as a lover. It is curious that a lover should conquer a great hero. Hence the question কি কৌশলে etc.

চরণারবিন্দ—চরণ + অরবিন্দ; চরণপদ্ম। Lotus-like feet.

মন্দমতি—of poor intellect.

শ্বেতভুজে ভারতি—Oh Bharati of white arms.

যেমতি মাতঃ ইত্যাদি—পুরাণে লিখিত আছে যে, কবিগুরু বাল্মীকি যৌবনাবস্থায় অতি দুরাচার ও দুর্ব্বৃত্ত ছিলেন। কোনও সময়ে ভগবান্ ব্রহ্মা ঋষিরূপ ধারণ পূর্ব্বক তাঁহাকে অনেক ভর্ৎসনা করাতে, তিনি অসৎ পথ পরিত্যাগ করিয়া কঠোর তপস্যা আরম্ভ করিলেন। একদা তিনি স্নান করিয়া আপন আবাসে প্রত্যাগমন করিতেছেন, এমন সময়ে একজন ব্যাধ কামক্রীড়ামত্ত ক্রৌঞ্চমিথুনের মধ্যে ক্রৌঞ্চকে বাণাঘাতে বধ করিল। এতাদৃশ ক্রূরাচরণ দর্শনে ক্রুদ্ধ হওয়ায় নিম্নলিখিত শ্লোকটী তাঁহার মুখ হইতে নির্গত হইল:—

মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাস্বতীঃ সমাঃ

যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্॥

ওরে নিষাদ! তুই অকারণে ক্রৌঞ্চমিথুনের মধ্যে কামমোহিত ক্রৌঞ্চকে বধ করিলি, অতএর এই পৃথিবীতে তুই কখনই প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারিবি না। সেই শুভক্ষণ অবধি ভারতে কবিতার সৃষ্টি হইল। এস্থলে গ্রন্থকার, সরস্বতীর নিকট এই প্রার্থনা করিতেছেন, যে তিনি যেমন কামাসক্ত ক্রৌঞ্চের নিধনাবসরে বাল্মীকির রসনাগ্রে অধিষ্ঠিতা হইয়াছিলেন, তেমনি যেন এ গ্রন্থকারের প্রতিও সানুকম্পা হন। এই কাব্যখানির অনেক স্থান বাল্মীকিক্বত রামায়ণ অবলম্বন করিয়া রচিত হইয়াছে, এই হেতু কবি বাল্মীকির ভারতীকে আরাধনা করিতেছেন।

ক্রৌঞ্চবধূসহ—অর্থাৎ ক্রৌঞ্চবধূসহবাসী; cohabiting with the she-heron.

নরাধম আছিল ইত্যাদি—যে নরাধম যৌবনকালে দক্ষাবৃত্তি রত ছিল, (অর্থাৎ বাল্মীকি) সে এক্ষণে তোমার প্রসাদে অমর হইয়াছে।

মৃত্যুঞ্জয়—অমর; conqueror of Death.

মৃত্যুঞ্জয় উমাপতি—মহেশ্বর, শিব; Siva, the husband of Uma and the conqueror of Death.

হে বরদে—O Thou, giver of boons.

রত্নাকর—বাল্মীকির পূর্ব্বনাম।

কাব্যরত্নাকর—কাব্যসাগর; ocean of Poetry.

সুচন্দন বৃক্ষপোতা বিষযুক্ষ ধরে—The tree of poison wears the beauty of a good sandal tree.

কিন্তু যে গো......... সমধিক—The mother looks with the greatest affection upon that one child who is the worst of the unworthy children.

উর—আবির্ভূতা হও—appear; come down.

বিশ্বরমে—হে বিশ্বসন্তোষদায়িনি; Oh pleasuregiver of the universe.

মধুকরী কল্পনা—রূপক অলঙ্কার। কবিকল্পনাও যেন একজন দেবী। Imagination, the honeymaker.

কবির চিত্তফুলবনমধু লয়ে—with the honey of the flower garden of the mind of a poet. কবির চিত্ত has been compared to a ফুলবন।

মধুচক্র—honey-comb.

যাহে—যাহাতে, so that.

গৌড়জন—বঙ্গবাসী, The people of Bengal.

হেমকূট—the name of a mountain.

হৈমশিরে—on the golden top; on the top bright with the golden rays of the sun. কনক আসন—is compared with হেমকূটহৈমশির।

শৃঙ্গবর—a great peak. দশানন is compared with the great-peak.

সভা—সভাস্থল, court house.

স্ফটিকে গঠিত—This should be connected with সভা made of crystal.

রত্নরাজী—রত্নসমূহ; groups of jewels.

মানস সরসে—in the lake of Manasar.

সরস—রসযুক্ত, juicy.

স্তম্ভ—লাম, pillars.

স্বর্ণছাদ—Roof of gold.

ফণীন্দ্র—নাগেন্দ্র রাসুকি Vasuki, the lord of serpents.

বিস্তারি অযুত ফণা—expanding ten thousand hoods; with numerous hoods expanded.

ঝলি—ঝল ঝল করিয়া; Dazzling.

ঝালরে—in the fringe.

খচিত মুকুলে ফুলেে—adorned with buds and flowers.

ব্রতালয়েে—In a festive house.

ক্ষণপ্রভা—বিদ্যুৎ; lightning.

রতনসম্ভবা— ত্নজাতা, রত্ন হইতে উৎপন্না—produced by gems and jewels. বিভা—আলোক; light.

ঝলসি নয়নে—dazziling the eyes.

চামর—a chowrie. চারুলোচনা কিঙ্করী—maidservants with charming eyes.

মৃণালভুজ—arm like the stalk of a lotus.

চন্দ্রাননা—having moon-like faces.

হরকোপানলে—in the fire of the anger of Hara or Siva.

কাম—মদন—Cupid. দৌবারিক—দ্বারী gate-keeper.

রুদ্রেশ্বর—রুদ্রপতি; Lord of the Rudras.

শূলপাণি—যাঁহার পাণিতে অর্থাৎ হস্তে শূল; অর্থাৎ শিব।

রঙ্গে—playfuly; merrilly.

কাকলী—দূরাগত মৃদুমধুর ধ্বনি; Sounds mellowed and sweetened by distance.

লহরী—তরঙ্গ; wares.

ময়—ময়নামক দানব একজন বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন। তিনি যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সভাগৃহ নির্মাণ করেন।

তুষিতে পৌরবে—in order to satisfy the Pauravas.

কাল-তরঙ্গ—The waves of Time.

নৈকষেয়— Ravana, the son of Nikasa. Nikasa was the mother of Ravana.

ঘন—মেঘ; clouds. দিননাথ-সূর্য্য; the sun.

নিশার স্বপন সম—like the dream of the night.

ধনুর্দ্ধর—archer.

ফুলদল দিয়া— with the petals of flowers.

কাল-সমরে—In this deadly war.

শূলী শম্ভুসম—ত্রিশূলধারী শিবের ন্যায় প্রতাপশালী; powerful like Siva armed with His trident.

রাক্ষসকুলরক্ষণ—রাক্ষস বংশরক্ষাকারী, the preserver of the family of the Rakshasas.

কাল পঞ্চবটী বনে—in the deadly forest of Panchavati.

কালকূটে ভরা—filled with poison.

ভুজগ—সর্প; snake.

পাবকশিখারূপিণী—অগ্নিশিখা তুল্য, like the flame of Fire.

হৈম গেহ—House of gold.

দাম—(১) সমূহ, collection. (২) রজ্জু, মালা; string; wreath.

নাট্যশালা সম—like a theatre.

দেউটি—প্রদীপ; lamp.

রবাব—বেহালা বিশেষ; a kind of violin.

ভীমবাহু—ভয়ঙ্কর বাহু যাহার; fierce-armed; with dreadful arms.

বুধ—জ্ঞানী; a wise man.

শেখর—(১) চূড়া, crest. (২) মুকুট crown.

রাক্ষসকুলশেখর—the crest or crown of the Rakshasa family; the best of the Rakshasa family.

অভ্রভেদী—আকাশভেদী; penetrating into the sky.

ভূধর—পর্ব্বত; mountain.

মায়াময়—full of illusions; illusive, deceptive.

কুবলয় ধন—the wealth of lotuses.

অমরত্রাস—অমরগণ অর্থাৎ দেবগণ যাহাকে ভর করেন; the dread of the Devas.

মদকল—মদমত্ত; intoxicated with the juice which flows from the temples of an elephant.

বীরকুঞ্জর—বীরশ্রেষ্ঠ; the greatest of heroes.

কুঞ্জর—হস্তী। এখানে কুঞ্জর পদ শ্রেষ্ঠার্থবাচক।

ইরম্মদ—বজ্রাগ্নি; the fire of thunder.

পবনপথ—আকাশ; the sky.

কোদণ্ড—ধনু; bow.

টঙ্কার—twang.

ঘন ঘনাকারে—in the form of dense clouds.

বিদ্যুৎঝলা সম―like the dash of lightning.

চক্‌মকি—চক্‌মক্‌ করিয়া; shining.

কলম্বকুল—তীরসমূহ; flight of arrows.

অম্বরপ্রদেশে—আকাশ প্রদেশে; in the region of the sky.

বাসবের চাপ—ইন্দ্রের ধনু; the bow of Indra the rainbow.

মন্দোদরী-মনোহর—The charmer of the mind of Mandodari; i. e., Ravana the husband of Mandadari.

সন্দেশবহ—সংবাদবাহক; messenger.

হর্য্যক্ষ-সিংহ; lion.

দ্বন্দ্বি—দ্বন্দ্ব বা কলহ করিয়া; যুদ্ধ করিয়া; fighting; quarrelling.

নির্ঘোষে—চীৎকার করে; roars; thunders.

ভাতিল—দীপ্ত হইল; shone.

চর্ম্মাবলী—ঢাল সমূহ; numbers of shields.

কম্বু—শঙ্খ; conch.

অম্বুরাশিরবে—জলরাশির শব্দে; with the roars of the mass of waters.

অস্ত্রলেখা—অস্ত্রের দাগ; marks of weapon.

সাবাসি দূত—Bravo, messenger.

বীরপুত্ত্র ধাত্রী—the foster mother of heroic sons.

দিনমণি—(বিশেষ্য) সূর্য্য; sun.

অংশুমালী (বিশেষণ) কিরণমালাধারী; wearing the wreath of his rays.

কাঞ্চনসৌধ কিরিটীনী—কাঞ্চন অর্থাৎ স্বর্ণ দ্বারা নির্ম্মিত সৌধ অর্থাৎ অট্টালিকা যাহার কিরীট বা মুকুট স্বরূপ; wearing the crown of the palaces of gold.

উৎস—a fountain; a spring. রজঃছটা—রজতছটা; having the ছটা or splendour of রজত or silver; silvery.

হীরাচুড়াশিরঃ—হীরকনির্ম্মিত চূড়া হইতেছে শিরঃ যাহার; of which the summit is a pinnacle of diamond.

দেবগৃহ—মন্দির; temple.

জগৎবাসনা—জগতের আকাঙ্ক্ষিত বস্তু; the desire of the world.

শৃঙ্গধর—পর্ব্বত; যে শৃঙ্গ ধারণ করে; mountain.

বৈদেহীহর—সীতাহরণকারী; the abductor of Vaidehi or Sita.

বালিবৃন্দ সিন্ধুতীরে যথা—বেরূপ সমুদ্রতীরে নগণ্য রালুকারাশি; unnumerable like the sands on the sea-shore.

থানা দিয়া পূর্ব্ব দ্বারে—guarding the eastern gate.

করভ—হস্তিশিশু; the young of an elephant.

বিচিত্র—জমকাল, সুন্দর; gaudy.

কঞ্চুক—সর্পচর্ম্ম; the skin of a snake.

ঊর্দ্ধফণা—with his hood raised up.

লুলি—কাঁপাইয়া; shaking; trembling.

অবলেপে—গর্ব্বে; proudly.

কৌমুদী—moonlight.

কুমুদরঞ্জন—চন্দ্র; চন্দ্রালোকে কুমুদফুল প্রস্ফুটিত হয় বলিয়া কবিগণ চন্দ্রকে কুমুদিনীনায়ক, কুমুদিনীপতি ইত্যাদি আখ্যা প্রদান করেন। কুমুদরঞ্জন—the moon, the lover of the water-lily.

প্রসরণ—প্রাচীর; wall.

কেশরী-কামিনী—সিংহের স্ত্রী অর্থাৎ সিংহী; lioness.

ভীমাসমা—চণ্ডীর ন্যায়; like the fierce-looking goddess Chandi.

সমলোভী—একই প্রকারে লোভযুক্ত; greedy for the same thing.

নিষাদী—গজারোহী; the rider of an elephant; a soldier fightin on elephant-back.

সাদী—অশ্বারোহী; horseman.

শীর্ষক—পাগড়ি; turban.

হৈম ধ্বজদণ্ড—সুবর্ণনির্ম্মিত পতাকার দণ্ড; the stick of the banner of gold.

ধ্বজবহ—পতাকাবাহী; flag-bearer.

স্বর্ণচূড়—স্বর্ণনির্ম্মিত চূড়ার ন্যায় চূড়া বাহার; স্বর্ণনিস্মিত চূড়ার ন্যায় শীষ যাহার; which has ears like tops of gold.

স্নেহনীড়ে—স্নেহপূর্ণ নীড়ে, অর্থাৎ স্নেহময় ক্রোড়ে; in the affectionate arms.

গরুড়—গরুড়ের ন্যায় প্রতাপশালী; powerful like the Gadura.

কালপৃষ্ট—কর্ণের ধনুর নাম; the name of the bow of Karna.

একাঘ্নী—যাহা মাত্র একজনকে বিনাশ করে; the destroyer of only one.

বীরেন্দ্র-কেশরী—বীরেন্দ্রশ্রেষ্ঠ; বীরশ্রেষ্ঠগণের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ; the greatest of the most heroic.

সিংহ, কেশরী, ঋষভ, কুঞ্জর ইত্যাদি শ্রেষ্ঠার্থবাচক।

বীরকুলর্ষভ—the greatest of the class of heroes

প্রচেতঃ—বরুণদেব; Varuna the ocean-god.

প্রভঞ্জন—পবনদেব; Pavana, the god of winds

নিগড়—শৃঙ্খল; chain; bondage.

বীতংস—মৃগপক্ষীদিগের বন্ধনোপকরণ, ফাঁসি; noose to fasten the beasts and birds.

নীলাম্বুস্বামি—হে নীল জলরাশির কর্ত্তা; Oh Lord of the blue ocean.

কৌস্তুভ রতন—the jewel called Kaustava.

বলি—‘বলী’ এই শব্দের সম্বোধন পদ; O powerful being.

জাঙাল—বাঁধ; embankment.

কিঙ্কিণীর বোল—অলঙ্কার সমূহের শব্দ; the sound of the ornaments.

কবরী রন্ধন—চুল বান্ধা; the dressing of hair into a knot.

আলু থালু—উন্মুক্ত; dishevelled; disordered.

পদ্মপর্ণ—পদ্মপত্র, the petals of lotuses.

বিবশা—বলহীনা; অস্থিরা; having no self-control.

সুরসুন্দরী—বিদ্যুৎ; lightning.

প্রলয়বায়ু—ধ্বংসকালীন ঝড়; the storm at the time of destruction

আসার—বৃষ্টি-ধারা; the lines of rain.

জীমূত—মেঘ; cloud.

মন্দ্র— ধ্বনি; sound.

শোকের ঝড়...... হাহাকার রব—A storm of grief blew in the court. The females were, as it were, the lightning; their dishevelled hair was, as it were, the cloud; their tears were, as it were, the rains; and the cries of grief were, as it were, the roars of clouds.

রাজধর্ম্ম—kingly virtue. গঞ্জনা—তিরস্কার; rebuke.

গ্রহদোষে দোষী—গ্রহবৈগুণ্যাধীন; who is under the evil influence of planets.

বরজ—a garden of betel plants.

সজারু—a porcupine. বারুই—betel planter.

শিমুলশিম্বী—শিমূল গাছের শিম্ব অর্থাৎ তুলার পাব্‌ড়া; the kidney bean of the silk cotton tree.

বলে—forcibly.

ইন্দুনিভাননে—‘ইন্দুনিভাননা’ এই শব্দের সম্বোধন পদ। ইন্দু—চন্দ্র। নিভ—ন্যায়। আনন—মুখ। ইন্দুনিভাননে—O thou moon-faced.

বীর প্রসূন—the flower of a hero.

প্রসূ—জননী; mother.

রজত প্রাচীর সম—like a wall made of silver.

কাকোদর—সর্প; snake, serpent.

অরাবণ—রাবণশূন্য; Ravanaless.

অরাম—রামশূন্য; Ramless.

কর্ব্বুর বৃন্দ—রাক্ষস সমূহ; numbers of Rakshasas.

বারী—গজগৃহ; elephant-shed.

বারণযূথ—হস্তিযূথ; crowds of elephants.

মন্দুরা—অশ্বশালা; horse-shed; stable

মুখস লাগায়; bridle.

কনকশিরস্ক—স্বর্ণভূষিত পাগড়ী যাহার—having a turban adorned with gold.

ভাস্বর পিধানে—উজ্জ্বল আবরণে; in a brilliant sheath.

বর্ম্ম ঢাল; shield.

আয়সী—লৌহ আবরণ; সাঁজোয়া; iron-mail.

আয়সী-আবৃতদেহ—with their body protected with iron-mail

হয়ব্যূহ—অশ্ব সমূহ; crowds of horses.

পরশু—কুঠার; axe. শ্রবণপথ—কর্ণ; ears.

বারীশ—জলপতি বরুণ; Varuna, the god of the sea.

প্রবাল আসনে—on the throne made of corals.

বারুণী—wife of Varuna.

জলেশ—same as বারীশ।

পাশী—পাশ অস্ত্রধারী; whose weapon is a noose.

লাঘবিতে—লঘু করিতে to lighten.

গৃহে—অর্থাৎ বৈকুণ্ঠে। চটুলা—চঞ্চলা; restless.

ধনী—যুবতী বালিকা; a young girl.

সফরী is here comparend to a young girl.

রজত—রৌপ্য, silver. কান্তি—শোভা; beauty.

ছটা—আভা; splendour.

বিভ্রম—শোভা; beauty.

রজতকান্তিছটা বিভ্রম—রৌপ্যের শোভার আভারূপ বিভ্রম; the beauty of the splendour of silver.

বিভাবসুরে—বিভাবসুকে, সূর্য্যকে; to the sun.

মদনমোহন—বিষ্ণু; Vishnu.

কমলপদ—পরিমল আশে—with the hope of smelling the fragrance of the lotus of foot. পদ্মের ন্যায় পদের সুগন্ধের আশায়।

ধনদ—কুবের, Kuvera. দেউল—মন্দির, temple.

বিন্যাসিয়া—বিন্যস্ত করিয়া; Placing.

কপোল—গণ্ডস্থল; cheek. উরস্‌—বক্ষঃস্থল; breast.

রমার আশার বাস হরির উরসে—the abode of the hope of Lakshmi is in the breast of Hari.

যাদঃ—ভীষণ সামুদ্রিক প্রাণী; a sea-monster.

যাদঃপতি—Lord of sea monsters, i.e the ocean.

রোধঃ—তট; shore.

চলোর্ম্মি—চঞ্চল তরঙ্গ; restless waves; breakers

যাদঃপতিরোধঃ যথা চলোর্ম্মি আঘাতে—as is the case with the sea-shore being beaten by restless breakers.

অতিকায়—রাবণের পুত্র।

প্রমদাকুল রোদন—the weepings of the females.

দুকূলবসনা—দুকূল অর্থাৎ পট্টবস্ত্র বসন যাহাদের; covered with pieces of cloth.

চক্রনেমি—চক্রের পরিধি; the circumference of the wheel.

দন্তী—দন্তবিশিষ্ট হস্তী; tusker.

দণ্ডধর—Yama is called, দণ্ডধর, as he is armed with a দণ্ড or club.

নিক্কণ—শব্দ; sound.

ত্রিবিদবিভব—স্বর্গসম্পদ; the wealth of the Heaven.

স্বরীশ্বর—স্বর্গপতি; Lord of the kingdom of Heaven.

মহারথিকুল ইন্দ্র—মহারথিগণ মধ্যে শ্রেষ্ঠ; the best among the great chariot-warriors.

মহারথী—অত্যন্ত যুদ্ধ বিশারদ; যে যোদ্ধা একাকী দশ সহস্র ধনুর্দ্ধারীর সহিত যুদ্ধ করিতে পারেন

প্রক্ষ্বেড়ন—লৌহধনুঃ—an iron-bow.

রিপুকুল কাল—the death of the enemies.

বলে রিপুকুলকাল বলী—In respect of strength the strong hero is, as it were, the Yama to the enemies,

বৈশ্বানর—অগ্নিদেব; fire god.

তুঙ্গতর—উচ্চতর; higher taller.

মহীরুহব্যূহ—বৃক্ষসমূহ; number of trees.

বিমলসলিলা—নির্ম্মল জল যাহার; having clear and transparent water.

সমলা—মলাযুক্ত; dirty.

প্রাক্তন—অদৃষ্ট; fate.

শিখণ্ডিনী—ময়ূরিণী; peahen.

আখণ্ডল—ইন্দ্র।

কান্তি—সৌন্দর্য্য।

আখণ্ডলধনুঃ বিবিধ রতনকান্তি আভায়—ইন্দ্রধনুর নানাপ্রকার রত্নের সৌন্দর্য্যের আভা দ্বারা। ইন্দ্রধনু নানা প্রকার রত্নের দ্বারা নির্ম্মিত বলিয়া কবিকল্পনা

রঞ্জিয়া—রঞ্জন করিয়া; প্রীত করিয়া; gratifying.

মঞ্জু—সুন্দর, মনোহর; beautiful.

কুঞ্জবন—grove.

পবনপথে—আকাশে; in the sky.

উঠিলা পবন পথে......ধনী মঞ্জু কুঞ্জবনে—Murala has clothes and ornaments of variegated colours. The peahen has a body of variegated colours. Both of them are gaudy like the rainbow and are pleasing to the eyes. The flight of Murala is compared to the flight of a peahen proceeding to a beautiful grove.

বৈজয়ন্ত ধাম সম—স্বর্গ ধামের ন্যায়; like the Heaven.

অলিন্দ—বারান্দা; veranda.

বসন্তানিল—বসন্তবায়ু; the air of the spring season.

শরাসন—শরের আসন অর্থাৎ ধনু; bow.

নিষঙ্গ—তূণীর; quiver. বেণী—braid of hair.

মণিময় ফণী—serpents with jewels. The arrows with brilliant ends are compared to serpents with jewels on their heads.

কুচযুগ—the pair of breasts. কবচ—সাঁজোয়া; breast-plate; armour for the breast.

মধুকালে—in the spring season.

শিঞ্জিত ধ্বনি; the tingling.

নিতম্ববিম্ব—the disk of the buttocks of a woman.

বরাঙ্গনা—the best of woman.

দক্ষবালাদল—the daughters of Daksha.

ভানুসুতে—হে সূর্য্যতনয়ে, Oh daughter of the sun. The river Jumna is so called.

বিশদবসনা—dressed with white clothes. বিশদ—white.

অম্বুরাশিসুতা—the daughter of the Ocean. Lakshmi is so called.

রত্নাকর রত্নোত্তমা—the best of the jewels of the mine of jewels; the best of the jewels of the sea viz. Lakshmi.

ইন্দিরা—i.e. Lakshmi.

কুণ্ডল—an ear ring. রথীন্দ্রর্ষভ— রথি + ইন্দ্র + ঋষভ। ঋষভ—a bull. Here it is শ্রেষ্ঠার্থবাচক।

বীর-আভরণ—Ornaments worthy of a hero.

হৈমবতীসুত—i.e. Kartikeya, son of Haimabati or Durga.

তারক—the giant named Taraka.

কিরীটী—i.e. Arjuna. মেঘবর্ণ—dark as clouds.

চক্রবিজলীর ছটা—the wheels stand for the flashes of lightning.

ধ্বজ ইন্দ্রচাপরূপী—the banner is like the bow of Indra.

তুরঙ্গম—the horse. বেগে—in respect of speed.

আশুগতি—whose speed is swift; i.e. the wind.

ব্রততী—creeper. করিপদ—the feet of the elephant.

যূথনাথ—the lord of the herd i.e. the greatest of the elephants.

উজলি—Brightening. শিঞ্জিনী—the string of the bow. পক্ষীন্দ্র—i.e. Garuda.

কৌশিক—the name of Indra.

কৌশিকধ্বজ—the banner of Indra.

কাঞ্চনকঞ্চুকবিভা—the brilliance of the armour of gold.

বাম মম প্রতি—unfavourable to me.

অসুরারিরিপু—the enemy of the enemy of the Asuras i.e. the enemy of Indra i.e. Indrajit,

মেঘবাহন—Indra who is borne by clouds.

দেব অগ্নি—The fire was the god whom Indrajit worshipped.

গঙ্গোদক—the sacred water of the Ganges.

অভিষেক করিলা কুমারে—sprinkled his son with water.

বন্দিল—বন্দনা করিল; sang in praise.

বন্দী—স্তুতিপাঠক; a panegyrist, or bard attached to the court of prince.

পাণ্ডুবর্ণ—pale with fear. আখণ্ডল—Indra.

হে রাক্ষসপুরি—Oh the city of Lanka.

ওই ভীম বাম করে—in that dreadful left hand of Meghnada. পশুপতি—Siva.

পশুপতি-ত্রাস—causing fear even to Siva.

পাশুপত-সম—পাশুপত অস্ত্রের ন্যায়; শিবপ্রদত্ত অস্ত্রের ন্যায়, like the weapon given by Pasupati or Siva.

আকাশদুহিতা—Echo is so called. She is called the daughter of the sky.

অরিন্দম—শত্রুদমন, the subduer of enemies.

রক্ষঃকুলকালি—the dirt or stain of the Rakshasa family.

ষষ্ঠ সর্গ

ষষ্ঠ সর্গ

ত্যজি সে উদ্যান, বলী সৌমিত্রী-কেশরী

চলিলা, শিবিরে যথা রিরাজেন প্রভু

রঘু-রাজ; অতি দ্রুতে চলিলা সুমতি,

হেরি মৃগরাজে বনে, ধায় ব্যাধ যথা,

অস্ত্রালয়ে—বাছি বাছি লইতে সত্বরে

তীক্ষ্ণতর প্রহরণ নশ্বর-সংগ্রামে।

কতক্ষণে মহাযশাঃ উত্তরিল যথা,

রঘুরথী। পদযুগে নমি, নমস্কারি

মিত্রবর বিভীষণে, কহিলা সুমতি;—

“কৃতকার্য্য আজি, দেব, তব আশীর্ব্বাদে

চিরদাস! স্মরি পদ, প্রবেশি কাননে,

পূজিনু চামুণ্ডে, প্রভু, সুবর্ণ-দেউলৈ।

ছলিতে দাসেরে সতী কত যে পাতিলা

মায়াজাল, কেমনে তা নিবেদি চরণে,

মূঢ় আমি? চন্দ্রচূড়ে দেখিনু দুয়ারে

রক্ষক; ছাড়িলা পথ বিনা রণে তিনি

তব পুণ্যবলে, দেব, মহোরগ যথা

যায় চলি হতবল মহৌষধ-গুণে।

পশিল কাননে দাস; আইল গর্জ্জিয়া

সিংহ; বিমুখিনু তাহে; ভৈরব-হুঙ্কারে

বহিল তুমুল ঝড়! কালাগ্নি-সদৃশ

দানবাগ্নি বেড়িল দেশ; পুড়িল চৌদিকে

বনরাজী; কতক্ষণে নিবিলা আপনি

বায়ুসখা; রায়ুদেব গেলা চলি দূরে।

সুরবালাদলে এবে দেখিনু সম্মুখে

কুঞ্জবন-বিহারিণী; কৃতাঞ্জলি-পুটে,

পূজি, বর মাগি দেব, বিদাইনু সবে।

অদূরে শোভিল বনে দেউল, উজলি

সুদেশ! সরসে পশি, অবগাহি দেহ,

নীলোৎপলাঞ্জলি দিয়া পুজিনু মায়েরে

ভক্তিভাবে। আবির্ভাবি বর দিলা মায়া

কহিলেন দয়াময়ী;—‘সুপ্রসন্ন আজি

রে সতী-সুমিত্রা-সুত, দেব-দেবী যত

তোর প্রতি। দেব-অস্ত্র প্রেরিয়াছে তোরে

বাসব; আপনি আমি আসিয়াছি হেথা

সাধিতে এ কার্য্য তোর, শিবের আদেশে।

ধরি দেব-অস্ত্র, বলি! বিভীষণে লয়ে,

যা চলি নগর-মাঝে, যথায় রাবণি,

নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে, পূজে বৈশ্বানরে।

সহসা, শার্দ্দূলাক্রমে আক্রমি রাক্ষসে,

নাশ তারে, মোর বরে পশিবি দুজনে

অদৃশ্য; পিধানে যথা অসি, আবরিব

মায়াজালে আমি দোঁহে। নির্ভয়-হৃদয়ে

যা চলি, রে যশস্বি!’—কি ইচ্ছা তব, কহ,

নৃমণি? পোহায় রাতি, বিলম্ব না সহে।

মারি রাবণিরে, দেব, দেহ আজ্ঞা দাসে।”

উত্তরিলা রঘুনাথ; “হায় রে, কেমনে—

যে কৃতান্ত-দূতে দূরে হেরি, ঊর্দ্ধশ্বাসে

ভয়াকুল জীবকুল ধায় বায়ুবেগে

প্রাণ লয়ে; দেব-নর ভস্ম যার বিষে,—

কেমনে পাঠাই তোরে সে সর্প-বিবরে,

প্রাণাধিক? নাহি কাজ সীতায় উদ্ধারি।

বৃথা, হে জলধি! আমি বাঁধিমু তোমারে;

অসংখ্য রাক্ষসগ্রাম বধিনু সংগ্রামে;

আনিনু রাজেন্দ্রদলে এ কনকপুরে

সসৈন্যে; শোণিতস্রোতঃ, হায়, অকারণে,

বরিষার জলসম, আর্দ্রিল মহীরে।

রাজ্য, ধন, পিতা, মাতা, স্ববন্ধুবান্ধবে—

হারাইনু ভাগ্যদোষে; কেবল আছিল

অন্ধকার-ঘরে দীপ মৈথিলী; তাহারে

(হে বিধি, কি দোষে দাস দোষী তব পদে?)

নিবাইল দুরদৃষ্ট! কে আর আছে রে

আমার সংসারে, ভাই, যার মুখ দেখে

রাখি এ পরাণ আমি? থাকি এ সংসারে?

চল ফিরি, পুনঃ মোরা যাই বনবাসে,

লক্ষ্মণ! কুক্ষণে ভুলি আশার ছলনে,

এ রাক্ষসপুরে, ভাই, আইনু আমরা।”

উত্তরিলা বীরদর্পে সৌমিত্রি-কেশরী;

“কি কারণে, রঘুনাথ! সভয় আপনি

এত? দৈববলে বলী যে জন, কাহারে

ডরে সে ত্রিভুবনে? দেব-কুলপতি

সহস্রাক্ষ পক্ষ তব; কৈলাস-নিবাসী

বিরূপাক্ষ; শৈলবালা ধর্ম্ম সহায়িনী।

দেখ চেয়ে লক্ষাপানে; কালমেঘ-সম

দেবক্রোধ আবরিছে স্বর্ণময়ী আভা—

চারিদিকে! দেব-হাস্য উজলিছে, দেখ,

এ তব শিবির, প্রভু! আদেশ দাসেরে,

ধরি দেব-অস্ত্র আমি পশি রক্ষোগৃহে;

অবশ্য নাশিব রক্ষে ও পদ-প্রসাদে।

বিজ্ঞতম তুমি, নাথ! কেন অবহেল

দেব-আজ্ঞা? ধর্ম্মপথে সদা গতি তব,

এ অধর্ম্ম-কার্য্য, আর্য্য, কেন কর আজি?

কে কোথা মঙ্গলঘট ভাঙ্গে পদাঘাতে?”

কহিলা মধুরভাষে বিভীষণ বলী

মিত্র;— “যা কহিলা সত্য, রাঘবেন্দ্র রথী।

দুরন্ত কৃতান্ত-দূত-সম পরাক্রমে

রাবণি, বাসব-ত্রাস অজেয় জগতে।

কিন্তু বৃথা ভয় আজি করি মোরা তারে।

স্বপনে দেখিনু আমি, রঘুকুলমণি!

রক্ষঃকুল-রাজলক্ষ্মী, শিরোদেশে বসি,

উজলি শিবির, দেব, বিমল কিরণে,

কহিলা অধীনে সাধ্বী,—‘হায়! মত্ত মদে

ভাই তোর, বিভীষণ! এ পাপ-সংসারে

কি সাধে করি রে বাস, কলুষদ্বেষিণী

আমি? কমলিনী কভু ফোটে কি সলিলে

পঙ্কিল? জীমূতাবৃত গগনে কে কবে

হেরে তারা? কিন্তু তোর পূর্ব্বকর্ম্মফলে

সুপ্রসন্ন তোর প্রতি অমর! পাইবি

শূন্য রাজ-সিংহাসন, ছত্রদণ্ডসহ,

তুই! রক্ষঃকুলনাথ-পদে আমি তোরে

করি অভিষেক আজি বিধির বিধানে,

যশস্বি! মারিবে কালি সৌমিত্রি-কেশরী

ভ্রাতৃপুত্ত্র মেঘনাদ; সহায় হইবি

তুই তার। দেব-আজ্ঞা পালিস্ যতনে,

রে ভাবী কর্ব্বুররাজ!’ উঠিনু জাগিয়া,—

স্বর্গীয় সৌরভে পূর্ণ শিবির দেখিনু,

স্বর্গীয় বাদিত্র, দূরে শুনিনু গগনে

মৃদু। শিবিরের দ্বারে হেরিনু বিস্ময়ে

মদনমোহনে মোহে যে রূপমাধুরী!

গ্রীবাদেশ আচ্ছাদিছে কাদম্বিনীরূপী

কবরী; ভাতিছে কেশে রত্নরাশি,—মরি

কি ছার তাহার কাছে বিজলীর ছটা

মেঘমালে! আচম্বিতে অদৃশ্য হইলা

জগদম্বা। বহুক্ষণ রহিনু চাহিয়া

সতৃষ্ণ-নয়নে আমি, কিন্তু না ফলিল

মনোরথ; আর মাতা নাহি দিল দেখা।

শুন দাশরথি রথি, এ সকল কথা

মন দিয়া। দেহ আজ্ঞা, সঙ্গে যাই আমি

যথা যজ্ঞাগারে পূজে দেব-বৈশ্বানরে

রাবণি। হে নরপাল, পাল সযতনে

দেবাদেশ! ইষ্টসিদ্ধি অবশ্য হইবে

তোমার, রাঘব-শ্রেষ্ঠ! কহিনু তোমারে।

উত্তরিলা সীতানাথ সজল-নয়নে,—

“স্মরিলে পূর্ব্বের কথা, রক্ষঃকুলোত্তম!

আকুল পরাণ কাঁদে! কেমনে ফেলিব

এ ভ্রাতৃ-রতনে আমি এ অতল জলে?

হায়, সখে, মন্থরার কুপন্থায় যবে

চলিলা কৈকেয়ী-মাতা, মম ভাগ্যদোষে

নির্দ্দয়; ত্যজিনু যবে রাজ্যভোগ আমি

পিতৃসত্য-রক্ষা-হেতু; স্বেচ্ছায় ত্যজিল

রাজ্যভোগ প্রিয়তম ভ্রাতৃ-প্রেম-বশে!

কাঁদিলা সুমিত্রা মাতা উচ্চে; অবরোধে

কাঁদিলা ঊর্ম্মিলা-বধূ; পৌরজন যত—

কত যে সাধিলা সবে, কি আর কহিব?

না মানিল অনুরোধ। আমার পশ্চাতে

(ছায়া যথা) বনে ভাই পশিল হরষে,

জলাঞ্জলি দিয়া সুখে তরুণ-যৌবনে।

কহিলা সুমিত্রা মাতা,— ‘নয়নের মণি

আমার, হরিলি তুই, রাঘব! কে জানে,

কি কুহক-বলে তুই ভুলালি বাছারে?

সঁপিনু এ ধন তোরে। রাখিস্ যতনে

এ মোর রতনে তুই, এই ভিক্ষা মাগি।’

“নাহি কাজ, মিত্রবর! সীতার উদ্ধারি;

ফিরি যাই বনবাসে। দুর্ব্বার সমরে

দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস, রথীন্দ্র রাবণি!

সুগ্রীব বাহুবলেন্দ্র; বিশারদ রণে

অঙ্গদ সু-যুবরাজ; বায়ুপুত্ত্র হনূ

ভীমপরাক্রম পিতা প্রভঞ্জন যথা;

ধূম্রাক্ষ, সমর-ক্ষেত্রে ধূমকেতুসম

অগ্নিরাশি; নল নীল; কেশরী-কেশরী

বিপক্ষের পক্ষে শূর; আর যোধ যত,

দেবাকৃতি, দেববীর্য্য; তুমি মহারথী;—

এ সবার সহকারে নারি নিবারিতে

যে রক্ষে, কেমনে, কহ, লক্ষ্মণ একাকী

যুঝিবে তাহার সঙ্গে? হায়, মায়াবিনী

আশা, তেঁই, কহি, সখে, এ রাক্ষসপুরে,

অলঙ্ঘ্য সাগর লঙ্ঘি, আইনু আমরা।”

সহসা আকাশ-দেশে, আকাশ-সম্ভবা

সরস্বতী নিনাদিলা মধুর-নিনাদে;—

“উচিত কি তব, কহ, হে বৈদেহীপতি!

সংশয়িতে দেববাক্য, দেবকুলপ্রিয়

তুমি? দেবাদেশ, বলি! কেন অবহেল?

দেখ চেয়ে শূণ্যপানে।” দেখিলা বিস্ময়ে

রঘুরাজ, অহিসহ যুঝিছে অম্বরে

শিখী। কেকারব মিশি ফণীর স্বননে,

ভৈরব-আরবে দেশ পূরিছে চৌদিকে!

পক্ষচ্ছায়া আবরিছে, ঘনদল যেন,

গগন, জ্বলিছে মাঝে, কালানল-তেজে

হলাহল! ঘোর-রণে রণিছে উভয়ে।

মুহুর্ম্মুহুঃ ভয়ে মহী কাঁপিলা, ঘোষিল

উথলিয়া জলদল। কতক্ষণ পরে,

গতপ্রাণ শিখিবর পড়িলা ভূতলে;

গরজিলা অজগর - বিজয়ী সংগ্রামে।

কহিলা রাবণানুজ;—“স্বচক্ষে দেখিলা

অদ্ভুত ব্যাপার আজি; নিরর্থ এ নহে,

কহিনু, বৈদেহীনাথ, বুঝ ভাবি মনে।

নহে ছায়াবাজী ইহা; আশু যা ঘটিবে

এ প্রপঞ্চরূপে দেব, দেখালে তোমারে;

নির্বীরিবে লঙ্কা আজি সৌমিত্রি-কেশরী!”

প্রবেশি শিবিরে তবে রঘুকুলমণি,

সাজাইলা প্রিয়ানুজে দেব-অস্ত্রে। আহা,

শোভিলা সুন্দর বীর স্কন্দ তারকারি

সদৃশ। পরিলা বক্ষে কবচ সুমতি

তারাময়; সারসনে ঝল-ঝল-ঝলে

ঝলিল ভাস্বর অসি মণ্ডিত রতনে।

রবির পরিধি–সম দীপে পৃষ্ঠদেশে

ফলক; দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত, কাঞ্চনে

জড়িত, তাহার সঙ্গে নিষঙ্গ দুলিল

শরপূর্ণ। বামহস্তে ধরিলা সাপটি

দেবধনু ধনুর্দ্ধর; ভাতিল মস্তকে

(সৌরকরে গড়া যেন) মুকুট, উজলি

চৌদিক্; মুকুটোপরি নড়িল সঘনে

সুচূড়া, কেশরিপৃষ্ঠে নড়য়ে যেমতি

কেশর! রাঘবানুজ সাজিলা হরষে,

তেজস্বী—মধ্যাহ্নে যথা দেব অংশুমালী!

শিবির হইতে বলী বাহিরিলা বেগে—

ব্যগ্র, তুরঙ্গম যথা শৃঙ্গকুলনাদে,

সমরতরঙ্গ যবে উথলে নির্ঘোষে।

বাহিরিলা বীরবর; বাহিরিলা সাথে

বীরবেশে বিভীষণ, বিভীষণ রণে।

বরষিলা পুষ্প দেব; বাজিল আকাশে

মঙ্গল-বাজনা; শূন্যে নাচিল অপ্সরা,

স্বর্গ, মর্ত্ত্য, পাতাল পূরিল জয়রবে।

আকাশের পানে চাহি, কৃতাঞ্জলিপুটে

আরাধিলা রঘুবর;—“তব পদাম্বুজে,

চায় গো আশ্রয় আজি রাঘব-ভিখারী,

অম্বিকে! ভুলো না, দেবি! এ তব কিঙ্করে।

ধর্ম্মরক্ষা হেতু মাতঃ, কত যে পাইনু

আয়াস, ও রাঙাপদে অবিদিত নহে।

ভুঞ্জাও ধর্ম্মের ফল, মৃত্যুঞ্জয়-প্রিয়ে!

অভাজনে; রক্ষ, সতি, এ রক্ষঃ-সমরে,

প্রাণাধিক ভাই এই কিশোর লক্ষ্মণে!

দুর্দ্দান্ত দানবে দলি, নিস্তারিলা তুমি,

দেবদলে, নিস্তারিণি! নিস্তার অধীনে,

মহিষ-মর্দ্দিনি, মর্দ্দি দুর্ম্মদ-রাক্ষসে।”

এইরূপে রক্ষোরিপু স্তুতিলা সতীরে।

যথা সমীরণ বহে পরিমল-ধনে

রাজালয়ে, শব্দবহ আকাশ বহিলা

রাঘবের আরাধনা কৈলাস-সদনে।

হাসিলা দিবিন্দ্র দিবে; পবন অমনি

চালাইলা আশুতরে সে শব্দবাহকে।

শুনি সে সু-আরাধনা, নগেন্দ্রনন্দিনী,

আনন্দে, তথাস্তু বলি, আশীষিলা মাতা।

হাসি দেখা দিলা ঊষা উদয়-অচলে,

আশা যথা, আহা মরি, আঁধার-হৃদয়ে,

দুঃখ-তমোবিনাশিনী। কূজনিল পাখী

নিকুঞ্জে; গুঞ্জরি অলি, ধাইলা চৌদিকে

মধুজীবী; মৃদুগতি চলিলা শর্ব্বরী,

তারাদলে লয়ে সঙ্গে; ঊষার ললাটে

শোভিল একটী তারা শত-তারা-তেজে!

ফুটিল কুন্তলে ফুল, নব তারাবলী!

লক্ষ্য করি রক্ষোবরে রাঘব কহিলা;—

“সাবধানে যাও, মিত্র! অমূল্য-রতনে

রামের, ভিখারী রাম অর্পিছে তোমারে,

রথিবর! নাহি কাজ বৃথা বাক্যব্যয়ে;—

জীবন মরণ মম আজি তব হাতে।”

আশ্বাসিলা মহেষ্বাসে বিভীষণ বলী;—

“দেবকুলপ্রিয় তুমি, রঘুকুলমণি!

কাহারে ডরাও প্রভু? অবশ্য নাশিবে

সমরে সৌমিত্রি-শূর মেঘনাদ-শূরে।”

বন্দি রাঘবেন্দ্রপদ, চলিলা সৌমিত্রি

সহ মিত্র বিভীষণ। ঘন ঘনাবলী

বেড়িল দোঁহারে, যথা বেড়ে হিমানীতে

কুজ্ঝটিকা গিরিশৃঙ্গে, পোহাইলে রাতি।

চলিলা অদৃশ্যভাবে লঙ্কামুখে দোঁহে।

যথায় কমলাসনে বসেন কমলা—

রক্ষঃকুল-রাজলক্ষ্মী—রক্ষোবধূবেশে,

প্রবেশিলা মায়াদেবী সে স্বর্ণ-দেউলে।

হাসিয়া সুধিলা রমা, কেশব-বাসনা;—

“কি কারণে মহাদেবি! গতি এবে তব

এ পুরে? কহ, কি ইচ্ছা তোমার রঙ্গিণি?

উত্তরিলা মৃদু হাসি মায়া শক্তীশ্বরী;—

“সম্বর নীলাম্বুসুতে, তেজঃ তব আজি;

পশিবে এ স্বর্ণপুরে দেবাকৃতি রথী

সৌমিত্রি; নাশিবে শূর, শিবের আদেশে,

নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে দম্ভী মেঘনাদে।

কালানলসম তেজঃ তব, তেজস্বিনি!

কার সাধ্য বৈরিভাবে পশে এ নগরে?

সুপ্রসন্ন হও, দেবি! করি এ মিনতি,

রাঘবের প্রতি তুমি। তার, বরদানে,

ধর্ম্মপথগামী রামে, মাধব-রমণি!”

বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি কহিলা ইন্দিরা;—

“কার সাধ্য, বিশ্বধ্যেয়া! অবহেলে তব

আজ্ঞা? কিন্তু প্রাণ মম কাঁদে গো স্মরিলে

এ সকল কথা! হায়, কত যে আদরে

পূজে মোরে রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, রাণী মন্দোদরী,

কি আর কহিব তার? কিন্তু নিজ দোষে

মজে রক্ষঃকুলনিধি। সম্বরিব দেবি!

তেজঃ—প্রাক্তনের গতি কার সাধ্য রোধে?

কহ সৌমিত্রিরে তুমি পশিতে নগরে

নির্ভয়ে। সন্তুষ্ট হ’য়ে বর দিনু আমি,

সংহারিবে এ সংসারে সুমিত্রানন্দন

বলী-অরিন্দম মন্দোদরীর নন্দনে।”

চলিলা পশ্চিম-দ্বারে কেশব-বাসনা

সুরমা, প্রফুল্ল ফুল প্রত্যূষে যেমতি

শিশির-আসারে ধৌত। চলিলা রঙ্গিণী,

সঙ্গে মায়া। শুকাইল রম্ভাতরুরাজি;

ভাঙ্গিল মঙ্গলঘট; শুষিলা মেদিনী

বারি। রাঙ্গাপায়ে আসি মিশিল সত্বরে

তেজোরাশি, যথা পশে, নিশা অবসানে,

সুধাকর-কর-জাল রবি-করজালে।

শ্রীভ্রষ্টা হইল লঙ্কা; হারাইলে, মরি,

কুন্তলশোভন মণি ফণিনী যেমতি।

গম্ভীর নির্ঘোষে দূরে ঘোষিলা সহসা

ঘনদল; বৃষ্টি ছলে গগন কাঁদিলা,

কল্লোলিলা জলপতি, কাঁপিলা বসুধা,

আক্ষেপে, রে রক্ষঃপুরি, তোর এ বিপদে,

জগতের অলঙ্কার তুই স্বর্ণময়ি!

প্রাচীরে উঠিয়া দোঁহে হেরিলা অদূরে

দেবাকৃতি সৌমিত্রিরে, কুজ্ঝটিকাবৃত

যেন দেব ত্বিষাম্পতি, কিম্বা বিভাবসু

ধূমপুঞ্জে। সাথে সাথে বিভীষণ রথী—

বায়ুসখাসহ বায়ু—দুর্ব্বার সমরে।

কে আজি রক্ষিবে, হায়, রাক্ষস-ভরসা

রাবণিরে? ঘন বনে, হেরি দূরে যথা

মৃগবরে, চলে ব্যাঘ্র গুল্ম-আবরণে,

সুযোগ-প্রয়াসী; কিম্বা নদীগর্ভে যথা

অবগাহকেরে দূরে নিরখিয়া, বেগে

যমচক্ররূপী নক্র ধায় তার পানে

অদৃশ্যে, লক্ষ্মণ-শূর, বধিতে রাক্ষসে,

সহ মিত্র বিভীষণ, চলিলা সত্বরে।

বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, বিদায়ি মায়ারে,

স্বমন্দিরে গেলা চলি ইন্দিরা-সুন্দরী।

কাঁদিলা মাধবপ্রিয়া! উল্লাসে শুষিলা

অশ্রুবিন্দু বসুন্ধরা— শুষে শুক্তি যথা

যতনে, হে কাদম্বিনি, নয়নাম্বু তব,

অমূল্য মুকুতাফল ফলে যার গুণে,

ভাতে যবে স্বাতী-সতী গগনমণ্ডলে।

প্রবল মায়ার বলে পশিলা নগরে

বীরদ্বয়। সৌমিত্রির পরশে খুলিল

দুয়ার অশনি-নাদে; কিন্তু কার কাণে

পশিল আরাব? হায়! রক্ষোরথী যত

মায়ার ছলনে অন্ধ, কেহ না দেখিলা

দুরন্ত কৃতান্ত-দূতসম রিপুদ্বয়ে,

কুসুমরাশিতে অহি পশিল কৌশলে!

সবিস্ময়ে রামানুজ দেখিলা চৌদিকে

চতুরঙ্গবল দ্বারে;— মাতঙ্গে নিষাদী,

তুরঙ্গমে সাদী-বৃন্দ মহারথী রথে,

ভূতলে শমনদূত পদাতিক যত—

ভীমাকৃতি ভীমবীর্য্য; অজেয় সংগ্রামে।

কালানল-সম বিভা উঠিছে আকাশে।

হেরিলা সভয়ে বলী সর্ব্বভুক্‌রূপী

বিরূপাক্ষ মহারক্ষঃ, প্রক্ষ্বেড়নধারী,

সুবর্ণ স্যন্দনারূঢ়, তালবৃক্ষাকৃতি

দীর্ঘ তালজঙ্ঘা শূর— গদাধর যথা

মুর-অরি; গজপৃষ্ঠে কালনেমী, বলে

রিপুকুলকাল বলী, বিশারদ রণে,

রণপ্রিয়, বীরমদে প্রমত্ত সতত

প্রমত্ত, চিক্ষুর রক্ষঃ যক্ষপতিসম,—

আর আর মহাবলী, দেব-দৈত্য-নর—

চিরত্রাস। ধীরে ধীরে, চলিলা দুজনে;

নীরবে উভয় পার্শ্বে হেরিলা সৌমিত্রি

শত শত হেম-হর্ম্ম্য, দেউল, বিপণি,

উদ্যান, সরসী, উৎস; অশ্ব অশ্বালয়ে,

গজালয়ে গজবৃন্দ; স্যন্দন অগণ্য

অগ্নিবর্ণ, অস্ত্রশালা, চারু নাট্যশালা,

মণ্ডিত রতনে, মরি! যথা সুরপুরে।

লঙ্কার বিভব যত কে পারে বর্ণিতে—

দেবলোভ, দৈত্যকুল-মাৎসর্য্য? কে পারে

গণিতে সাগরে রত্ন, নক্ষত্র আকাশে?

নগরমাঝারে শূর হেরিলা কৌতুকে

রক্ষোরাজ রাজগৃহ। ভাতে সারি সারি

কাঞ্চনহীরকস্তম্ভ; গগন পরশে

গৃহচূড়া, হেমকূটশৃঙ্গাবলী যথা

বিভাময়ী। হস্তিদন্ত স্বর্ণকান্তি-সহ

শোভিছে গবাক্ষে, দ্বারে, চক্ষু বিনোদিয়া,

তুষার-রাশিতে শোভে প্রভাতে যেমতি

সৌরকর! সবিস্ময়ে চাহি মহাযশাঃ

সৌমিত্রি, শূরেন্দ্র মিত্র বিভীষণ-পানে,

কহিলা;—“অগ্রজ তব ধন্য রাজকুলে;

রক্ষোবর, মহিমার অর্ণব জগতে।

এ হেন বিভব, আহা, কার ভবতলে?”

বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি উত্তরিলা বলী

বিভীষণ;—“যা কহিলা সত্য, শূরমণি!

এ হেন বিভব, হায়, কার ভবতলে?

কিন্তু চিরস্থায়ী কিছু নহে এ সংসারে।

এক যায় আর আসে, জগতের রীতি,—

সাগরতরঙ্গ যথা! চল ত্বরা করি,

রথিবর! সাধ কাজ বধি মেঘনাদে;

অমরতা লভ দেব, যশঃসুধা–পানে!”

সত্বরে চলিলা দোঁহে, মায়ার প্রসাদে

অদৃশ্য। রাক্ষসবধূ, মৃগাক্ষিগঞ্জিনী

দেখিলা লক্ষ্মণ-বলী সরোবরকূলে,

সুবর্ণ-কলসী কাঁখে, মধুর অধরে

সুহাসি। কমল-কুল ফোটে জলাশয়ে

প্রভাতে। কোথাও রথী বাহিরিছে বেগে

ভীমকায়; পদাতিক, আয়সী আবৃত,

ত্যজি ফুল-শয্যা; কেহ শৃঙ্গ নিনাদিছে

ভৈরবে নিবারি নিদ্রা; সাজাইছে বাজী

বাজীপাল। গর্জ্জি গজ সাপটে প্রমদে

মুদ্গর; শোভিছে পট্ট-আবরণ পিঠে,

ঝালরে মুকুতাপাতি; তুলিছে যতনে

সারথি বিবিধ অস্ত্র স্বর্ণধ্বজ রথে।

বাজিছে মন্দিরবৃন্দে প্রভাতী বাজনা,

হায় রে সুমনোহর, বঙ্গগৃহে যথা

দেবদলোৎসব বাদ্য, দেবদল যবে,

আবির্ভাবি ভবতলে, পূজেন রমেশে।

অবচয়ি ফুলচয়, চলিছে মালিনী

কোথাও, আমোদি পথ ফুলপরিমলে,

উজলি চৌদিকে রূপে, ফুলকুল-সখী

ঊষা যথা! কোথাও বা দধি দুগ্ধ ভারে

লইয়া ধাইছে ভারী,—ক্রমশঃ বাড়িছে

কল্লোল, জাগিছে পুরে পুরবাসী যত।

কেহ কহে—“চল, ওহে উঠিগে প্রাচীরে।

না পাইব স্থান যদি না যাই সকালে,

হেরিতে অদ্ভুত যুদ্ধ! জুড়াইব আঁখি

দেখি আজ যুবরাজে সমর-সাজনে,

আর বীরশ্রেষ্ঠ সবে।” কেহ উত্তরিছে

প্রগল্‌ভে,—“কি কাজ কহ, প্রাচীর উপরে?

মুহূর্ত্তে নাশিবে রামে, অনুজ লক্ষ্মণে

যুবরাজ, তাঁর শরে কে স্থির জগতে?

দহিবে বিপক্ষদলে; শুষ্ক-তৃণে যথা

দহে বহ্নি, রিপুদমী! প্রচণ্ড আঘাতে

দণ্ডি তাত বিভীষণে, বাঁধিবে অধমে!

রাজপ্রসাদের হেতু অবশ্য আসিবে

রণজয়ী, সভাতলে; চল সভাতলে।”

কত যে শুনিলা বলি, কত যে দেখিলা,

কি আর কহিবে কবি? হাসি মনে মনে,

দেবাকৃতি, দেববীর্য্য, দেব-অস্ত্রধারী

চলিলা যশস্বী, সঙ্গে বিভীষণ রথী,—

নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগার শোভিল অদূরে।

কুশাসনে ইন্দ্রজিৎ পূজে ইষ্টদেবে

নিভৃতে; কৌষিক-বস্ত্র, কৌষিক-উত্তরী,

চন্দনের ফোঁটা ভালে, ফুলমালা গলে।

পুড়ে ধূমদানে ধূপ; জ্বলিছে চৌদিকে

পূতঘৃত রসে দীপ! পুষ্প রাশি রাশি,

গণ্ডারের শৃঙ্গে গড়া কোষা কোষী, ভরা,

হে জাহ্নবি! তব জলে, কলুষনাশিনী

তুমি। পাশে হেমঘণ্টা, উপহার নানা,

হেম-পাত্রে; রুদ্ধ দ্বার,—ব’সেছে একাকী

রথীন্দ্র, নিমগ্ন তপে চন্দ্রচূড় যেন—

যোগীন্দ্র—কৈলাস-গিরি তব উচ্চ-চূড়ে।

যথা ক্ষুধাতুর ব্যাঘ্র পশে গোষ্ঠ-গৃহে

যমদূত, ভীমবাহু লক্ষ্মণ পশিলা

মায়াবলে দেবালয়ে। ঝন্‌ঝনিল অসি

পিধানে, ধ্বনিল বাজী তূণীর ফলকে,

কাঁপিল মন্দির ঘন বীরপদভরে।

চমকি মুদিত-আঁখি মেলিলা রাবণি।

দেখিলা সম্মুখে বলী দেবাকৃতি রথী—

তেজস্বী মধ্যাহ্নে যথা দেব অংশুমালী!

সাষ্টাঙ্গে প্রণমি শূর, কৃতাঞ্জলিপুটে,

কহিলা,—“হে বিভাবসু, শুভক্ষণে আজি

পূজিল তোমারে দাস, তেঁই, প্রভু, তুমি

পবিত্রিলা লঙ্কাপুরী ও পদ-অর্পণে!

কিন্তু কি কারণে, কহ, তেজস্বি! আইলা

রক্ষঃকুলরিপু নর লক্ষ্মণের রূপে

প্রসাদিতে এ অধীনে? এ কি লীলা তব

প্রভাময়?” পুনঃ বলী নমিলা ভূতলে।

উত্তরিলা বীরদর্পে রৌদ্র দাশরথি;—

“নহি বিভাবসু আমি, দেখ নিরখিয়া,

রাবণি! লক্ষ্মণ নাম, জন্ম রঘুকুলে।

সংহারিতে, বীরসিংহ, তোমায় সংগ্রামে

আগমন হেথা মম; দেহ রণ মোরে

অবিলম্বে।” যথা পথে সহসা হেরিলে

ঊর্দ্ধফণা ফণীশ্বরে, ত্রাসে হীনগতি

পথিক, চাহিলা বলী লক্ষ্মণের পানে।

সভয় হইল আজি ভয়শূন্য হিয়া!

প্রচণ্ড উত্তাপে পিণ্ড, হায় রে, গলিল!

গ্রাসিল মিহিরে রাহু, সহসা আঁধারি

তেজঃপুঞ্জ। অম্বুনাথে নিদাঘ শুষিল!

পশিল কৌশলে কলি নলের শরীরে।

বিস্ময়ে কহিলা শূর;—“সত্য যদি তুমি

রামানুজ, কহ, রথি! কি ছলে পশিলা

রক্ষোরাজপুরে আজি? রক্ষঃ শত শত,

যক্ষপতিত্রাস বলে, ভীম-অস্ত্রপাণি

রক্ষিছে নগরদ্বার; শৃঙ্গধরসম

এ পুর-প্রাচীর উচ্চ; প্রাচীর উপরে

ভ্রমিছে অযুত যোধ চক্রাবলী-রূপে,—

কোন্ মায়াবলে, বলি! ভুলালে এ সবে?

মানবকুলসম্ভব দেবকুলোদ্ভবে

কে আছে রথী এ বিশ্বে, বিমুখয়ে রণে

একাকী এ রক্ষোবৃন্দে? এ প্রপঞ্চে তবে

কেন বঞ্চাইছ দাসে, কহ তা দাসেরে,

সর্ব্বভুক্? কি কৌতুক এ তব, কৌতুকি?

নহে নিরাকার দেব, সৌমিত্রি, কেমনে

এ মন্দিরে পশিবে সে? এখনও দেখ

রুদ্ধদ্বার। বর, প্রভু, দেহ এ কিঙ্করে,

নিঃশঙ্ক করিব লঙ্কা বধিয়া রাঘবে

আজি, খেদাইব দূরে কিষ্কিন্ধা- অধীপে,

বাঁধি আনি রাজপদে দিব বিভীষণে

রাজদ্রোহী। ওই শুন, নাদিছে চৌদিকে

শৃঙ্গ-শৃঙ্গনাদিগ্রাম। বিলম্বিলে আমি,

ভগ্নোদ্যম রক্ষঃচমূ বিদাও আমারে!”

উত্তরিলা দেবাকৃতি সৌমিত্রি কেশরী;—

‘কৃতান্ত আমি রে তোর, দুরন্ত রাবণি!

মাটী কাটি দংশে সর্প আয়ুহীন জনে।

মদে মত্ত সদা তুই, দেববলে বলী;

তবু অবহেলা, মূঢ়, করিস্ সতত

দেবকুলে! এত দিনে মজিলি দুর্ম্মতি!

দেবাদেশে রণে আমি আহ্বানি রে তোরে!

এতেক কহিয়া বলী উলঙ্গিলা অসি

ভৈরবে। ঝলসি আঁখি কালানল-তেজে:

ভাতিল কৃপাণবর, শত্রুকরে যথা

ইরম্মদময় বজ্র! কহিলা রাবণি;—

“সত্য যদি রামানুজ তুমি, ভীমবাহু

লক্ষ্মণ; সংগ্রাম-সাধ অবশ্য মিটাব

মহাহবে আমি তব, বিরত কি কভু

রণরঙ্গে ইন্দ্রজিৎ? আতিথেয় সেবা,

তিষ্ঠি লহ, শূরশ্রেষ্ঠ! প্রথমে এ ধামে—

রক্ষোরিপু তুমি, তবু অতিথি হে এবে।

সাজি বীরসাজে আমি। নিরস্ত্র যে অরি,

নহে রথিকুল প্রথা আঘাতিতে তারে।

এ বিধি, হে বীরবর, অবিদিত নহে,

ক্ষত্ত্র তুমি, তব কাছে; কি আর কহিব?”

জলদপ্রতিম-স্বনে কহিলা সৌমিত্রি;—

“আনায় মাঝারে বাঘে পাইলে কি কভু

ছাড়ে রে কিরাত তারে? বধিব এখনি,

অবোধ! তেমতি তোরে। জন্ম রক্ষঃকুলে

তোর, ক্ষত্ত্রধর্ম্ম, পাপি! কি হেতু পালিব

তোর সঙ্গে? মারি অরি, পারি যে কৌশলে।”

কহিলা বাসবজেতা;—(অভিমন্যু যথা

হেরি সপ্ত শূরে শূর তপ্ত-লৌহাকৃতি

রোষে!) “ক্ষত্ত্রকুলগ্নানি, শত–ধিক্ তোরে,

লক্ষ্মণ! নির্লজ্জ তুই। ক্ষত্ত্রিয়-সমাজে

রোধিবে শ্রবণপথ ঘৃণায়, শুনিলে

নাম তোর রথিবৃন্দ! তস্কর যেমতি,

পশিলি এ গৃহে তুই; তস্কর-সদৃশ

শাস্তিয়া নিরস্ত তোরে করিব এখনি।

পশে যদি কাকোদর গরুড়ের নীড়ে,

ফিরি কি সে যায় কভু আপন বিবরে,

পামর? কে তোরে হেথা আনিল দুর্ম্মতি?”

চক্ষের নিমিষে কোষা তুলি ভীমবাহু

নিক্ষেপিলা ঘোরনাদে লক্ষ্মণের শিরে।

পড়িলা ভূতলে বীর ভীম-প্রহরণে,

পড়ে তরুরাজ যথা প্রভঞ্জনবলে

মড়মড়ে! দেব-অস্ত্র বাজিল ঝন্‌ঝনি,

কাঁপিল দেউল যেন ঘোর ভূকম্পনে।

বহিল রুধির-ধারা। ধরিলা সত্বরে

দেব অসি ইন্দ্রজিৎ;— নারিলা তুলিতে

তাহায়। কার্ম্মুক ধরি কর্ষিলা; রহিল

সৌমিত্রির হাতে ধনু! সাপটিলা কোপে

ফলক; বিফল বল, সে কাজ সাধনে।

যথা শুণ্ডধর টানে শুণ্ডে জড়াইয়া

শৃঙ্গধরশৃঙ্গে, বৃথা টানিল তূণীরে

শূরেন্দ্র! মায়ার মায়া কে বুঝে জগতে?

চাহিলা দুয়ার পানে অভিমানে মানী।

সচকিতে বীরবর দেখিলা সম্মুখে

ভীমতম শূল-হস্তে, ধূমকেতুসম

খুল্লতাত বিভীষণে—বিভীষণ রণে।

“এতক্ষণে”— অরিন্দম কহিলা বিষাদে;—

“জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল

রক্ষঃপুরে। হায়, তাত, উচিত কি তব

এ কাজ? নিকষা-সতী তোমার জননী,

সহোদর রক্ষঃশ্রেষ্ঠ! শূলী-শম্ভুনিভ

কুম্ভকর্ণ! ভ্রাতৃপুত্ত্র বাসববিজয়ী!

নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে?

চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?

কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরুজন তুমি

পিতৃতুল্য। ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে,

পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে,

লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে।

উত্তরিল বিভীষণ;— “বৃথা এ সাধনা,

ধীমান্! রাঘবদাস আমি; কি প্রকারে

তাঁহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে

অনুরোধ?” উত্তরিলা কাতরে রাবণি;—

“হে পিতৃব্য! তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে।

রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে

আনিলে এ কথা, তাত, কহ তা দাসেরে!

স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থানুর ললাটে;

পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি

ধূলায়? হে রক্ষোরথি, ভুলিলে কেমনে,

কে তুমি? জনম তব কোন্ মহাকুলে?

কেবা সে অধম রাম? স্বচ্ছ-সরোবরে

করে কেলি রাজহংস, পঙ্কজ কাননে;

যায় কি সে কভু, প্রভু! পঙ্কিল সলিলে,

শৈবালদলের ধাম? মৃগেন্দ্র-কেশরী,

কবে, হে বীরকেশরি, সম্ভাষে শৃগালে

মিত্রভাবে? অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি,

অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে।

ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষ্মণ; নহিলে

অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?

কহ, মহারথি, এ কি মহারথি-প্রথা?

নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে

এ কথা। ছাড়হ পথ, আসিব ফিরিয়া

এখনি। দেখিব আজি, কোন্ দেববলে

বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি।

দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ

রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, পরাক্রম দাসের। কি দেখি

ডরিবে এ দাস হেন দুর্ব্বল মানবে?

নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রগল্‌ভে পশিল

দম্ভী; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে।

তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে

বনবাসী! হে বিধাতঃ নন্দন কাননে

ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্রফুল্ল কমলে

কীটবাস? কহ, তাত, সহিব কেমনে

হেন অপমান আমি, ভ্রাতৃ-পুত্ত্র তব?

তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে?”

মহামন্ত্রবলে যথা নম্রশিরঃ ফণী,

মলিনবদনে লাজে, উত্তরিলা রথী

রাবণ-অনুজ, লক্ষ্যি রাবণ-আত্মজে;—

“নহি দোষী আমি, বৎস! বৃথা ভর্ৎস মোরে

তুমি। নিজ কর্ম্মদোষে, হায়, মজাইলা

এ কনক-লঙ্কা রাজা মজিলা আপনি।

বিরত সতত পাপে দেবকুল; এবে

পাপপূর্ণ লঙ্কাপুরী; প্রলয়ে যেমতি

বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কাল-সলিলে!

রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী

তেঁই আমি। পরদোষে কে চাহে মজিতে?”

রুষিলা বাসবত্রাস। গম্ভীরে যেমতি

নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি,

কহিলা বীরেন্দ্র বলী; —“ধর্ম্মপথগামী,

হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে

তুমি—কোন্ ধর্ম্ম মতে, কহ দাসে, শুনি,

জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি—এ সকলে দিলা

জলাঞ্জলি? শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি

পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি

নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পর পর সদা।

এ শিক্ষা, হে রক্ষোবর! কোথায় শিখিলে?

কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা। হেন সহবাসে

হে পিতৃব্য, বর্ব্বরতা কেন না শিখিবে?

গতি যার নীচসহ নীচ সে দুর্ম্মতি।”

হেথায় চেতনা পাই মায়ার যতনে

সৌমিত্রি, হুঙ্কারে ধনু টঙ্কারিলা বলী।

সন্ধানি বিঁধিলা শূর খরতর শরে

অরিন্দম ইন্দ্রজিতে, তারকারি যথা

মহেষ্বাস শরজালে বিঁধেন তারকে।

হায় রে, রুধির-ধারা (ভূধর -শরীরে

বহে বরিষার কালে জলস্রোতঃ যথা)

বহিল, তিতিয়া বস্ত্র, তিতিয়া মেদিনী।

অধীর ব্যাথায় রথী, সাপটি সত্ত্বরে

শঙ্খ, ঘণ্টা, উপহার-পাত্র ছিল যত

যজ্ঞাগারে, একে একে নিক্ষেপিলা কোপে।

যথা অভিমন্যু রথী, নিরস্ত্র সমরে

সপ্তরথী- অস্ত্রবলে, কভু বা হানিলা

রথচূড়া, রথচক্র; কভু ভগ্ন অসি,

ছিন্ন চর্ম্ম, ভিন্ন বর্ম্ম, যা পাইলা হাতে।

কিন্তু মায়াময়ী মায়া, বাহু প্রসারণে,

ফেলাইলা দূরে সবে, জননী যেমতি

খেদান মশকবৃন্দে সুপ্ত-সুত হ’তে

করপদ্ম-সঞ্চালনে। সরোষে রাবণি

ধাইলা লক্ষ্মণপানে গর্জ্জি ভীমনাদে,

প্রহারকে হেরি যথা সম্মুখে কেশরী।

মায়ার মায়ায় বলী হেরিলা চৌদিকে

ভীষণ মহিষারূঢ় ভীম দণ্ডধরে;

শূলহস্তে শূলপাণি; শঙ্খ, চক্র, গদা

চতুর্ভুজে চতুর্ভুজ, হেরিলা সভয়ে

দেবকুল রথিবৃন্দে সুদিব্য বিমানে।

বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি দাঁড়াইলা বলী

নিষ্কল, হায় রে মরি, কলাধর যথা

রাহুগ্রাসে; কিম্বা সিংহ আনায়-মাঝারে!

ত্যজি ধনু, নিষ্কোষিলা অসি মহাতেজাঃ

রামানুজ; ঝলসিলা ফলক-আলোকে

নয়ন। হায় রে, অন্ধ অরিন্দম বলী

ইন্দ্রজিৎ, খড়্গাঘাতে পড়িলা ভূতলে

শোণিতার্দ্র। থরথরি কাঁপিলা বসুধা;

গর্জ্জিলা উথলি সিন্ধু। ভৈরব-আরবে

সহসা পূরিল বিশ্ব। ত্রিদিবে, পাতালে,

মর্ত্যে, মরামর জীব প্রমাদ গণিলা

আতঙ্কে। যথায় বসি হৈম-সিংহাসনে

সভায় কর্ব্বুর-পতি, সহসা পড়িল

কনক-মুকুট খসি, রথচূড়া যথা

রিপুরথী কাটি যবে পড়ে রথতলে।

সশঙ্ক লঙ্কেশ-শূর স্মরিলা শঙ্করে।

প্রমীলার বামেতর নয়ন নাচিল।

আত্মবিস্মৃতিতে, হায়, অকস্মাৎ সতী

মুছিল! সিন্দূরবিন্দু সুন্দর ললাটে।

মূর্চ্ছিলা রাক্ষসেন্দ্রাণী মন্দোদরী-দেবী

আচম্বিতে। মাতৃকোলে নিদ্রায় কাঁদিল

শিশুকুল আর্তনাদে, কাঁদিল যেমতি

বজ্রে বজ্রকুলশিশু, যবে শ্যাম-গুণমণি,

আঁধারি সে ব্রজপুর, গেলা মধুপুরে।

অন্যায় সমরে পড়ি, অসুরারি-রিপু,

রাক্ষসকুল-ভরসা, পরুষ বচনে

কহিলা লক্ষ্মণ-শূরে; —“বীরকুলগ্লানি,

সুমিত্রানন্দন, তুই! শতধিক্ তোরে!

রাবণনন্দন আমি, না ডরি শমনে।

কিন্তু তোর অস্ত্রাঘাতে মরিনু যে আজি;

পামর, এ চিরদুঃখ রহিল রে মনে

দৈত্যকুলদল ইন্দ্রে দমিনু সংগ্রামে

মরিতে কি তোর হাতে? কি তাপে বিধাতা

দিলেন তাপ দাসে, বুঝিব কেমনে?

আর কি কহিব তোরে? এ বারতা যবে

পাইবেন রক্ষোনাথ, কে রক্ষিবে তোরে,

নরাধম? জলধির অতল-সলিলে

ডুবিস্ যদিও তুই, পশিবে সে দেশে

রাজরোষ—বাড়বাগ্নিরাশিসম তেজে।

দাবাগ্নিসদৃশ তোরে দগ্ধিবে কাননে

সে রোষ, কাননে যদি পশিস্, কুমতি!

নারিবে রজনী, মূঢ়, আবরিতে তোরে।

দানব, মানব, দেব, কার সাধ্য হেন

ত্রাণিবে, সৌমিত্রি! তোরে, রাবণ রুষিলে?

কেবা এ কলঙ্ক তোর ভুঞ্জিবে জগতে

কলঙ্কি?” এতেক কহি, বিষাদে সুমতি

মাতৃপিতৃপাদপদ্ম স্মরিলা অন্তিমে।

অধীর হইলা বীর ভাবি প্রমীলারে

চিরানন্দ। লোহসহ মিশি অশ্রুধারা,

অনর্গল বহি, হায়, আর্দ্রিল মহীরে।

লঙ্কার পঙ্কজ-রবি গেলা অস্তাচলে।

নির্ব্বাণ পাবক যথা, কিম্বা ত্বিষাম্পতি

শান্তরশ্মি, মহাবল রহিলা ভূতলে।

কহিলা রাবণানুজ সজল-নয়নে—

“সুপট্ট শয়নশায়ী তুমি, ভীমবাহু!

সদা, কি বিরাগে এবে পড়ি হে ভূতলে?

কি কহিবে রক্ষোরাজ হেরিলে তোমারে

এ শয্যায়? মন্দোদরী, রক্ষঃকুলেন্দ্রাণী?

শরদিন্দুনিভাননা প্রমীলা সুন্দরী?

সুরবালা গ্লানি-রূপে দিতিসুতা যত

কিঙ্করী? নিকষা সতী বৃদ্ধা-পিতামহী?

কি কহিবে রক্ষঃকুল, চূড়ামণি তুমি

সে কুলের? উঠ, বৎস, খুল্লতাত আমি

ডাকি তোমা—বিভীষণ; কেননা শুনিছ,

প্রাণাধিক! উঠ, বৎস, খুলিব এখনি

তব অনুরোধে দ্বার। যাও অস্ত্রালয়ে,

লঙ্কার কলঙ্ক আজি ঘুচাও আহবে।

হে কর্ব্বুরকুলগর্ব্ব! মধ্যাহ্নে কি কভু

যান চলি অস্তাচলে দেব-অংশুমালী,

জগৎ-নয়নানন্দ? তবে কেন তুমি

এ বেশে, যশস্বি! আজি পড়ি হে ভূতলে?

নাদে শৃঙ্গনাদী, শুন, আহ্বানি তোমারে;

গর্জ্জে গজরাজ, অশ্ব হ্রেষিছে ভৈরবে;

সাজে রক্ষঃ-অনীকিনী, উগ্রচণ্ডা রণে।

নগর-দুয়ারে অরি, উঠ অরিন্দম।

এ বিপুল কুলমান রাখ এ সমরে।

এইরূপে বিলাপিলা বিভীষণ-বলী

শোকে। মিত্রশোকে শোকী সৌমিত্রি-কেশরী

কহিলা;—“সম্বর খেদ, রক্ষঃচূড়ামণি!

কি ফল এ বৃথা খেদে? বিধির বিধানে

বধিনু এ যোধে আমি, অপরাধ নহে

তোমার। যাইব, চল, যথায় শিবিরে

চিন্তাকুল চিন্তামণি দাসের বিহনে।

বাজিছে মঙ্গলবাদ্য শুন কাণ দিয়া

ত্রিদশ-আলয়ে, শূর!” শুনিলা সুরথী

ত্রিদিব-বাদিত্র—ধ্বনি স্বপনে যেমতি

মনোহর। বাহিরিলা আশুগতি দোঁহে,

শার্দ্দূলী অবর্ত্তমানে, নাশি শিশু যথা

নিষাদ, পবনবেগে ধায় উর্দ্ধশ্বাসে

প্রাণ ল’য়ে, পাছে ভীমা আক্রমে সহসা,

হেরি গতজীব শিশু বিবশা বিষাদে।

কিম্বা যথা দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা রথী,

মারি সুপ্ত পঞ্চ-শিশু পাণ্ডব-শিবিরে

নিশীথে, বাহিরি গেলা মনোরথগতি,

হরষে তরাসে ব্যগ্র, দুর্য্যোধন যথা

ভগ্ন-ঊরু কুরুরাজ কুরুক্ষেত্র রণে।

মায়ার প্রসাদে দোঁহে অদৃশ্য চলিলা

যথায় শিবিরে শূর মৈথিলীবিলাসী।

প্রণমি চরণাম্বুজে, সৌমিত্রি-কেশরী

নিবেদিলা করপুটে;—ও পদ প্রসাদে,

রঘুবংশ-অবতংস! জয়ী রক্ষোরণে

এ কিঙ্কর। গতজীব মেঘনাদ-বলী

শত্রুজিৎ।” চুম্বি শিরঃ, আলিঙ্গি আদরে

অনুজে, কহিলা প্রভু সজলনয়নে;—

“লভিনু সীতায় তাজি তব বাহুবলে,

হে বাহুবলেন্দ্র! ধন্য বীরকুলে তুমি!

সুমিত্রা-জননী ধন্য! রঘুকুলনিধি

ধন্য পিতা দশরথ, জন্মদাতা তব।

ধন্য আমি তবাগ্রজ। ধন্য জন্মভূমি

অযোধ্যা। এ যশঃ তব ঘোষিবে জগতে

চিরকাল। পূজ কিন্তু বলদাতা দেবে,

প্রিয়তম; নিজবলে দুর্ব্বল সতত

মানব; সুফল ফলে দেবের প্রসাদে।”

মহামিত্র বিভীষণে সম্ভাষি সুস্বরে,

কহিলা বৈদেহীনাথ;—“শুভক্ষণে, সখে!

পাইহু তোমারে আমি এ রাক্ষসপুরে।

রাঘবকুলমঙ্গল তুমি রক্ষোবেশে।

কিনিলে রাঘবকুলে আজি নিজগুণে,

মিত্রকুলরাজ তুমি, কহিনু তোমারে!

চল সবে, পূজি তাঁরে, শুভঙ্করী যিনি

শঙ্করী।” কুসুমাসার বৃষ্টিলা আকাশে

মহানন্দে দেববৃন্দ; উল্লাসে নাদিল,

“জয় সীতাপতি জয়!” কটক চৌদিকে।

আতঙ্কে কনক-লঙ্কা জাগিলা সে রবে।

ইতি শ্রীমেঘনাদবধকাব্যে বধো নাম ষষ্ঠঃ সর্গঃ।

ষষ্ঠ সর্গ।

নশ্বর-সংগ্রাম—fatal fight.

বায়ু-সখা—fire, the friend of the wind.

রাক্ষস-গ্রাম—numbers of Rakshasas.

দুরদৃষ্ট—evil luck. সভয়—full of fears.

সহস্রাক্ষ—Indra. কালমেঘ—deadly cloud.

কলুযদ্বেষিণী—a hater of sins.

জীমূতাবৃত—covered with clouds.

ভারী কর্ব্বুররাজ—future king of the Rakshasas.

কাদম্বিনীরূপী কবরী—locks of hair like the masses of clouds.

মেঘ-মালে—in the successive masses of clouds.

জগদম্বা—the অম্বা or mother of the Universe.

মন্থরার কুপন্থায়—in the evil path shown by Manthara. অবরোধ—the Zenana.

দুর্ব্বার—irresistible. কেশরী কেশরী—lion-like Kesari. Kesari is the name of a monkey-general. অহিসহ—with serpents.

কেকারব—the sound of a pea-cock.

ঘোষিল—sounded, roared. উথলিয়া—swelling.

জলদল—masses of water.

অহিসহ যুঝিছে...গরজিলা অজগর—বিজয়ী সংগ্রামে—the pea-cock is the natural destroyer of the serpent. As a pea-cock is to a serpent, so is Indrajit to Lakshmana. As the pea-cock is quite strangely killed by the serpent, so Indrajit will also be killed by Lakshmana. This is the meaning of the fight between the pea-cock and the serpent.

নিরর্থ—meaningless.

ছায়াবাজী—Bioscope theatre.

প্রপঞ্চরূপ—(1) show of opposition; show of inversion; বৈপরীত্যরূপ i.e. show of what does not usually happen. (2) Detailed manifestation বিস্তারিত রূপ।

নির্বীরিবে—বীরশূন্য করিবে, will inake destitute of heroes. দেব-অস্ত্র—arms given by gods.

স্কন্দ—Karttikeya. তারাময়—starry; studded with stars. সারসন—a belt for the waist.

ঝলিল—shone. ভাস্বর—bright.

পরিধি সম—like the circle.

ফলক—a shield. তুরঙ্গম—horse.

শৃঙ্গকুলনাদে—with the sounds of horns.

বিভীষণ রণ—fearful battle.

মৃত্যুঞ্জয়-প্রিয়া—the dear wife of Siva.

অভাজন—unfortunate man.

দিবিন্দ্র—King of Heaven দিবে—In the Heaven.

আশুতরে—more speedily.

আঁধার-হৃদয়ে—in the heart clouded with sorrow. দুঃখতমো-বিনাশিনী—dissipator of the darkness of sorrows.

শততারা-তেজে— with the brilliance of a hunidred stars.

ফুটিল কুন্তলে ফুল, নব তারাবলী—the new stars appeared as the flowers on the lock of hair of Dawn. হিমানী—Winter.

সম্বর—withdraw.

নীলাম্বু-সুতা—the daughter of the Ocean. Lakshmi is so called, as she came out of the Ocean when it was churned.

তার বরদানে, ধর্ম্মপথগামী রামে—save the virtuous Rama by the gift of boons.

বিশ্বধোয়া—worshipped throughout the universe.

সুরমা-very beautiful. দোঁহে—Lakshimi and maya.
ত্বিষাম্পতি—The Sun.

বিভাবসু—The sun or the Fire. Here the Fire is meant.
গুল্ম-আবরণে—under cover of bushes.

সুযোগ-প্রয়াসী—looking for an apportunity.

অবগাহক—bather. যমচক্ররূপী—looking like the discus of Yama. নক্র—crocodile, alligator.

শুক্তি—a pearl-oyster.

কাদম্বিনী—a long line of clouds.

নয়নাম্বু তব—i.e. rain water.

অমূল্য মুকুতাফল ফলে যার গুণে—by virtue of which precious pearls are produced.

ভাতে—glows; shines. স্বাতী-সতী—স্বাতী is the name of a star—the star Arctarus.

শুষে শুক্তি যথা... .........গগনমগুলে—here is an allusion to the saying that the rain which falls under this star produces pearls. This rain is called in Bengali স্বাতী নক্ষত্রের জল।

চতুরঙ্গবল—an army consisting of four limbs, i.e. of four kinds of soldiers.

মুর-অরি—i.e. Krishna. Mura is the name of a demon slain by Krishna.

দৈত্যকুল-মাৎসর্য্য—an object of the envy of the Daityas.

কাঞ্চনহীরকস্তম্ভ—pillars of gold and diamond.

মহিমার অর্ণব—the ocean of glory.

যশঃসুধা—the nectar of fame.

মৃগাক্ষিগঞ্জিনী—putting the eyes of the dear to shame. বাজীপাল—the keepers of horses.

সাপটে—(verb) catches hold of.

প্রমদ—great excitement. মুদ্গর—a kind of club.

পট্ট-আবরণ—a covering of cloth.

ঝালর—a fringe. মুকুতাপাঁতি—a row of pearls.

প্রগল্ভ—pride, boast.

গোষ্ঠ-গৃহ—an enclosure for the cattle.

বাজী—an arrow. বাজী তুণীর—arrows and quiver.

ফলকে—in contact with the shield.

রৌদ্র—fierce. ঊর্দ্ধফণা—with the hood expanded and raised. পিশু—a mass of iron.

মিহির—the sun. নিদাঘ—the heat of summer.

যক্ষপতিত্রাস বলে—in strength, an object of dread to the lord of the Jakshas

চক্রাবলীরূপে—in circles.

মানবকুলসম্ভব—born in the family of mankind.

দেবকুলোদ্ভব—born in the family of gods.

প্রপঞ্চে—by means of deception.

সর্ব্বভুক—the fire. শৃঙ্গ-শৃঙ্গনাদি গ্রাম—numbers of horns and players on horns.

বিধি—rule. জলদপ্রতিম স্বনে—with a sound like the roar of a cloud. আনায়—net, snare.

তপ্ত-লৌহাকৃতি—resembling heated iron in appearance. কাকোদর—snake; serpent.

শৃঙ্গধরশৃঙ্গে—the peak of a mountain.

শূলী-শম্ভুনিভ—like Siva armed with his trident.

আহবে—in the battle.

বিধুরে—বিধুকে, the moon. স্থাণু—Siva.

স্বচ্ছ-সরোবরে ... ধাম?—the gueese play amidst lotuses in a clear pond. Do they ever go to dirty water, the abode of the masses of moss?

সম্বোধে—challenges. কুমতি—mean-minded.

প্রফুল্ল কমলে কীটবাস—the residence of worms in blooming lotuses.

মহামন্ত্রবলে—with the influence of powerful mantras. নম্রশিরঃ ফণী—a snake with its hood lowered down.

বাসবত্রাস—Indrajit, the object of the dread of Indra. মন্দ্রে—(verb) roars.

জীমূতেন্দ্র—a great cloud. কোপি—being angry.

গুণবান্ যদি...পর সদা—though the enemy is meritorious and the friend is devoid of any merit, the friend is desirable rather than the enemy who is always an enemy.

ভূধর শরীরে—down the body of a mountain.

জননী যেমতি etc.—as the mother drives away mosquitoes with the motion of her lotus-like hand, from her sleeping son.

প্রহারক—one who strikes.

চতুর্ভুজে—in the four hands.

চতুর্ভুজ—i.e. Vishnu. সুদিবা—Heavenly.

নিষ্ফল—(1) (In the case of Meghanada) Devoid of any glow. (2) (In the case of the Moon) Devoid of her কলা or digits.

কলাধর—The Moon.

মরামর জীব—creatures mortal and immortal.

বামেতর নয়ন—the eye different from the left eye, i.e. the right eye.

আত্মনবিস্মৃতিতে—unconsciously; forgetting her self. পরুষ-বচন—harsh word.

রাড়বাগ্নিরাশি সম—like masses of submarine fire.

দাবাগ্নিসদৃশ—like the forest fire.

লোহ—blood. নির্ব্বাণ—extinguished.

শান্তরশ্মি—having its hot rays cooled down.

সুপট্ট শয়নশায়ী—accustomed to lie down upon a bed made of good cloths.

বিরাগ—indifference.

সুরবালা-গ্লানি—the cause of the heart-burning of the daughters of gods.

রূপে—in appearance or beauty.

দিতিসুতা—the daughter of Diti.

কিঙ্করী—maid servant.

রক্ষঃ-অনীকিনী—Rakshasa army.

চিন্তামণি—i.e. Rama. ত্রিদিব বাদিত্র—Heavenly music. শার্দ্দূলী―tigress.

মনোরথগতি—with the speed of the mind.

হরষে তরাসে ব্যগ্র—eager for joy and fear.

অবতংস—ornament.

শুভঙ্করী—the producer of good.

কুসুমাসার—a shower of flowers. কটক—army.

সপ্তম সর্গ

সপ্তম সর্গ

উদিলা আদিত্য এবে উদয়-অচলে,

পদ্মপর্ণে সুপ্ত দেব পদ্মযোনি যেন,

উন্মিলী নয়ন-পদ্ম সুপ্রসন্নভাবে,

চাহিলা মহীর পানে। উল্লাসে হাসিলা

কুসুমকুন্তলা মহী, মুক্তামালা গলে।

উৎসবে মঙ্গলবাদ্য উথলে যেমতি

দেবালয়ে, উথলিল সুস্বরলহরী

নিকুঞ্জে। বিমল জলে শোভিল নলিনী;

নিশার শিশিরে যথা অবগাহে দেহ

কুসুম, প্রমীলা সতী, সুবাসিত জলে

স্নানি, পীনপয়োধরা বিনাইলা বেণী।

শোভিল মুকুতাপাঁতি সে চিকণ-কেশে,

চন্দ্রমার রেখা যথা ঘনাবলী মাঝে

শরদে। রতনময় কঙ্কণ লইলা

ভূষিতে মৃণালভুজ সুমৃণালভুজা;—

বেদনিল বাহু, আহা, দৃঢ় বাঁধে যেন,

কঙ্কণ। কোমল কণ্ঠে স্বর্ণকণ্ঠমালা

ব্যথিল কোমল-কণ্ঠে। সম্ভাষি বিস্ময়ে

বসন্তসৌরভা সখী বাসন্তীরে, সতী

কহিলা,—“কেন লো সই, না পারি পরিতে

অলঙ্কার? লঙ্কাপুরে কেন বা শুনিছি

রোদন-নিনাদ দূরে, হাহাকার ধ্বনি?

বামেতর আঁখি মোর নাচিছে সতত;

কাঁদিয়া উঠিছে প্রাণ, না জানি, স্বজনি!

হায় লো, না জানি আজি পড়ি কি বিপদে?

যজ্ঞাগারে প্রাণনাথ, যাও তাঁর কাছে

বাসন্তি! নিবার, যেন না যান সমরে

এ কুদিনে বীরমণি। কহিও জীবেশে,

অনুরোধে দাসী তাঁর ধরি পা-দুখানি।”

নীরবিলা বীণাবাণী। উত্তরিলা সখী

বাসন্তী;—“বাড়িছে ক্রমে শুন কাণ দিয়া,

আর্ত্তনাদ, সুবদনে! কেমনে কহিব

কেন কাঁদে পুরবাসী? চল আশুগতি

দেবের মন্দিরে যথা দেবী মন্দোদরী

পূজিছেন আশুতোষে! মত্ত রণমদে

রথ, রথী, গজ, অশ্ব চলে রাজপথে;

কেমনে যাইব আমি যজ্ঞাগারে, যথা

সাজিছেন রণবেশে সদা রণজয়ী

কান্ত তব, সীমন্তিনি?” চলিলা দুজনে

চন্দ্রচূড়ালয়ে, যথা রক্ষঃকুলেশ্বরী

আরাধেন চন্দ্রচূড়ে রক্ষিতে নন্দনে—

বৃথা! ব্যগ্রচিত্ত দোঁহে চলিলা সত্বরে।

বিরসবদন এবে কৈলাস-সদনে

গিরিশ। বিষাদে ঘন নিশ্বাসি ধূর্জ্জটি,

হৈমবর্তী-পানে চাহি কহিলা; “হে দেবি!

পূর্ণ মনোরথ তব, হত রথিগতি

ইন্দ্রজিৎ কাল-রণে! যজ্ঞাগারে বলী

সৌমিত্রি, নাশিল তারে মায়ার কৌশলে।

পরম-ভকত মম রক্ষঃকুলনিধি,

বিধুমুখি! তার দুঃখে সদা দুঃখী আমি।

এই যে ত্রিশূল, সতি! হেরিছ এ করে,

ইহার আঘাত হ’তে গুরুতর বাজে

পুত্ত্রশোক! চিরস্থায়ী, হায়, সে বেদনা,—

সর্ব্বহরকাল তাহে না পারে হরিতে।

কি কবে রাবণ, সতি, শুনি হত রণে

পুত্ত্রবর? অকস্মাৎ মরিবে, যদ্যপি

নাহি রক্ষি রক্ষে আমি রুদ্রতেজোদানে।

তুষিনু বাসবে, সাধ্বি! তব অনুরোধে;

দেহ অনুমতি এবে তুষি দশাননে।”

উত্তরিলা কাত্যায়নী; “যাহা ইচ্ছা কর,

ত্রিপুরারি! বাসবের পূরিবে বাসনা,

ছিল ভিক্ষা তব পদে, সফল তা এবে।

দাসীর ভকত প্রভু, দাশরথি-রথী;

এ কথাটি, বিশ্বনাথ! থাকে যেন মনে!

আর কি কহিবে দাসী ও পদ-রাজীবে?”

হাসিয়া স্মরিলা শূলী বীরভদ্রশূরে।

ভীষণ-মূরতি রথী প্রণমিল পদে

সাষ্টাঙ্গে, কহিলা হর; “গতজীব রণে

আজি ইন্দ্রজিৎ, বৎস! পশি যজ্ঞাগারে,

নাশিল সৌমিত্রি তারে উমার প্রসাদে।

ভয়াকুল দূতকুল এ বারতা দিতে

রক্ষোনাথে। বিশেষতঃ, কি কৌশলে বলী

সৌমিত্রি নাশিলা রণে দুর্ম্মদ-রাক্ষসে,

নাহি জানে রক্ষোদূত। দেব ভিন্ন, রথি!

কার সাধ্য দেবমায়া বুঝে এ জগতে?

কনক-লঙ্কায় শীঘ্র যাও, ভীমবাহু!

রক্ষোদূতবেশে তুমি; ভর, রুদ্রতেজে,

নিকষানন্দনে আজি আমার আদেশে।”

চলিলা আকাশ-পথে বীরভদ্র বলী

ভীমাকৃতি; ব্যোমচর নমিলা চৌদিকে

সভয়ে; সৌন্দর্য্যতেজে হীনতেজাঃ রবি,

সুধাংশু নিরংশু যথা সে রবির তেজে।

ভয়ঙ্করী শূলছায়া পড়িল ভূতলে।

গম্ভীর নিনাদে নাদি অম্বুরাশিপতি

পূজিলা ভৈরব-দূতে। উত্তরিলা রথী

রক্ষঃপুরে; পদচাপে থর থর থরি

কাঁপিল কনক-লঙ্কা, বৃক্ষশাখা যথা,

পক্ষীন্দ্র গরুড় বৃক্ষে পড়ে উড়ি যবে।

পশি যজ্ঞাগারে শূর দেখিলা ভূতলে,

বীরেন্দ্র! প্রফুল্ল, হায়, কিংশুক যেমতি

ভূপতিত বনমাঝে প্রভঞ্জনবলে,

সজল-নয়নে বলী হেরিলা কুমারে।

ব্যথিল অমর-হিয়া মর-দুঃখ হেরি।

কনক-আসনে যথা দশানন রথী,

রক্ষঃকুলচুড়ামণি, উতরিল তথা

দূতবেশে বীরভদ্র, ভস্মরাশি-মাঝে

গুপ্ত বিভাবসুসম তেজোহীন এবে!

প্রণামের ছলে বলী আশীষি রাক্ষসে,

দাঁড়াইলা করপুটে, অশ্রুময় আঁখি,

সম্মুখে। বিস্ময়ে রাজা সুধিলা;—“কি হেতু,

হে দূত! রসনা তব বিরত সাধিতে

স্বকর্ম্ম? মানব রাম, নহ ভৃত্য তুমি

রাঘবের, তবে কেন হে সন্দেশবহ,

মলিন বদন তব? দেবদৈত্যজয়ী

লঙ্কার পঙ্কজরবি সাজিছে সমরে

আজি, অমঙ্গল-বার্ত্তা কি মোরে কহিবে?

মরিল রাঘব যদি ভীষণ অশনি-

সম প্রহরণে রণে, কহ সে বারতা,

প্রসাদি তোমারে আমি।” ধীরে উত্তরিলা

ছদ্মবেশী;—“হায়, দেব, কেমনে নিবেদি

অমঙ্গল-বার্ত্তা পদে, ক্ষুদ্র প্রাণী আমি।

অভয় প্রদান অগ্রে, হে কর্ব্বুরপতি,

কর দাসে।” ব্যগ্রচিত্তে উত্তরিলা বলী;—

“কি ভয় তোমার দূত? কহ ত্বরা করি,

শুভাশুভ ঘটে ভবে বিধির বিধানে।

দানিনু অভয়, ত্বরা কহ বার্ত্তা মোরে।”

বিরূপাক্ষচর বলী রক্ষোদূত বেশী

কহিলা;—“হে রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, হত রণে আজি

কর্ব্বুর-কুলের গর্ব্ব মেঘনাদ রথী।”

যথা যবে ঘোর-বনে নিষাদ বিঁধিলে

মৃগেন্দ্রে নশ্বর-শরে, গর্জ্জি ভীমনাদে

পড়ে মহীতলে হরি, পড়িলা ভূপতি

সভায়। সচিববৃন্দ হাহাকার রবে,

বেড়িল চৌদিকে শূরে; কেহ বা আনিল

সুশীতল-বারি পাত্রে, বিউনিল কেহ।

রুদ্রতেজে বীরভদ্র আশু চেতনিলা

রক্ষোবরে। অগ্নিকণা-পরশে যেমতি

বারুদ, উঠিয়া বলী, আদেশিলা দূতে;—

“কহ দূত, কে বধিল চিররণজয়ী

ইন্দ্রজিতে আজি রণে? কহ শীঘ্র করি।”

উত্তরিলা ছদ্মবেশী;—“ছদ্মবেশে পশি

নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে সৌমিত্রি-কেশরী,

রাজেন্দ্র, অন্যায়-যুদ্ধে বধিল কুমতি

বীরেন্দ্রে। প্রফুল্ল, হায়, কিংশুক যেমতি

ভূ-পতিত বনমাঝে প্রভঞ্জন-বলে,

মন্দিরে দেখিনু শূরে। বীরশ্রেষ্ঠ তুমি,

রক্ষোনাথ, বীরকর্ম্মে ভুল শোক আজি।

রক্ষঃকুলাঙ্গনা, দেব, আদ্রিবে মহীরে

চক্ষুঃজলে। পুত্ত্রহানী শত্রু যে দুর্ম্মতি,

ভীম-প্রহরণে তারে সংহারি সংগ্রামে,

তোষ তুমি, মহেষ্বাস, পৌরজনগণে।”

আচম্বিতে দেবদূত অদৃশ্য হইলা,

স্বর্গীয়-সৌরভে সভা পূরিল চৌদিকে!

দেখিলা রাক্ষসনাথ দীর্ঘজটাবলী,

ভীষণ ত্রিশূল-ছায়া! কৃতাঞ্জলিপুটে

প্রণমি, কহিলা শৈব;—“এত দিনে, প্রভু,

ভাগ্যহীন ভৃত্যে এবে পড়িল কি মনে

তোমার? এ মায়া, হায়, কেমনে বুঝিব

মূঢ় আমি, মায়াময়? কিন্তু অগ্রে পালি

আজ্ঞা তব, হে সর্ব্বজ্ঞ! পরে নিবেদিব

যা কিছু আছে এ মনে ও রাজীব-পদে।”

সরোষে—তেজস্বী আজি মহারুদ্রতেজে-

কহিলা রাক্ষসশ্রেষ্ঠ;—“এ কনকপুরে,

ধনুর্দ্ধর আছ যত, সাজ শীঘ্র করি

চতুরঙ্গে! রণরঙ্গে ভুলিব এ জ্বালা—

এ বিষম জ্বালা যদি পারিরে ভুলিতে।”

উথলিল সভাতলে দুন্দুভির ধ্বনি,

শৃঙ্গনিনাদক যেন, প্রলয়ের কালে,

বাজাইলা শৃঙ্গবরে গম্ভীর-নিনাদে।

যথা সে ভৈরব-রবে কৈলাস-শিখরে

সাজে আশু ভূতকুল, সাজিল চৌদিকে

রাক্ষস; টলিল লঙ্কা বীরপদভরে!

বাহিরিল অগ্নিবর্ণ-রথগ্রাম বেগে

স্বর্ণধ্বজ; ধূমবর্ণ-বারণ, আস্ফালি

ভীষণ-মুদ্গর শুণ্ডে; বাহিরিল হ্রেষে

তুরঙ্গম, চতুরঙ্গে আইলা গর্জ্জিয়া

চামর, অমর-ত্রাস; রথিবৃন্দ-সহ

উদগ্র, সমরে উগ্র; গজবৃন্দ-মাঝে

বাস্কল, জীমূতবৃন্দ-মাঝারে যেমতি

জীমূতবাহন বজ্রী ভীম-বজ্র করে!

বাহিরিল হুহুঙ্কারি আসিলোমা বলী

অশ্বপতি; বিড়ালাক্ষ পদাতিকদলে

মহাভয়ঙ্কর রক্ষঃ, দুর্ম্মদ সমরে!

আইল পতাকিদল, উড়িল পতাকা,

ধূমকেতুরাশি যেন উদিল সহসা

আকাশে! রাক্ষসবাদ্য বাজিল চৌদিকে।

যথা দেবতেজে জন্মি দানবনাশিনী

চণ্ডী, দেব অস্ত্রে সতী সাজিলা উল্লাসে

অট্টহাসি, লঙ্কাধামে সাজিলা ভৈরবী

রক্ষঃকুল-অনীকিনী—উগ্রচণ্ডা রণে।

গজরাজতেজঃ ভুজে; অশ্বগতি পদে;

স্বর্ণরথ শিরঃচূড়া; অঞ্চল পতাকা

রত্নময়; ভেরী, তুরী, দুন্দুভি, দামামা

আদি বাদ্য সিংহনাদ! শেল, শক্তি, জাঠি,

তোমর, ভোমর, শূল, মুষল, মুদ্গর,

পট্টিশ, নারাচ, কৌন্ত—শোভে দন্তরূপে।

জনমিল নয়নাগ্নি সাঁজোয়ার তেজে।

থর থর থরে মহী কাঁপিলা সঘনে;

কল্লোলিলা উথলিয়া সভয়ে জলধি;

অধীর ভূধরব্রজ, ভীমার গর্জ্জনে—

পুনঃ যেন জন্মি চণ্ডী নিনাদিলা রোষে।

চমকি শিবিরে শূর রবিকুল-রবি

কহিলা সম্ভাষি মিত্র-বিভীষণে;—“দেখ,

হে সখে, কাঁপিছে লঙ্কা মুহুর্মুহুঃ এবে

ঘোর ভূকম্পনে যেন! ধূমপুঞ্জ উড়ি

আবরিছে দিননাথে ঘন-ঘনরূপে;

উজলিছে নভঃস্থল ভয়ঙ্করী বিভা,

কালাগ্নিসম্ভবা যেন। শুন, কাণ দিয়া,

কল্লোল, জলধি যেন উথলিছে দূরে

লয়িতে প্রলয়ে বিশ্ব।” কহিলা সত্রাসে

পাণ্ডু-গণ্ডদেশ—রক্ষঃ, মিত্র-চূড়ামণি,—

“কি আর কহিব, দেব! কাঁপিছে এ পুরী

রক্ষোবীর পদভরে, নহে ভূকম্পনে।

কালাগ্নিসম্ভবা বিভা নহে যা দেখিছ

গগনে, বৈদেহীনাথ! স্বর্ণ-বর্ম্ম-আভা

অস্ত্রাদির তেজঃ সহ মিশি উজলিছে

দশদিশ। রোধিছে যে কোলাহল, বলি,

শ্রবণকুহর এবে, নহে সিন্ধুধ্বনি;

গরজে রাক্ষসচমু, মাতি বীরমদে।

আকুল পুত্ত্রেন্দ্রশোকে সাজিছে সুরথী

লঙ্কেশ। কেমনে কহ রক্ষিবে লক্ষ্মণে,

আর যত বীরে, বীর! এ ঘোর সঙ্কটে?”

সুস্বরে কহিলা প্রভু;—“যাও ত্বরা করি

মিত্রবর, আন হেথা আহ্বানি সত্বরে

সৈন্যাধ্যক্ষদলে তুমি। দেবাশ্রিত সদা,

এ দাস; দেবতাকুল রক্ষিবে দাসেরে।”

শৃঙ্গ ধরি রক্ষোবর নাদিলা ভৈরবে।

আইলা কিষ্কিন্ধ্যানাথ গজপতি-গতি;

রণবিশারদ শূর অঙ্গদ; আইলা

নল, নীল দেবাকৃতি; প্রভঞ্জনসম

ভীমপরাক্রম হনু; জাম্বুবান বলী;

বীরকুলর্ষভ বীর শরভ; গবাক্ষ,

রক্তাক্ষ, রাক্ষসত্রাস; আর নেতা যত।

সম্ভাষি বীরেন্দ্র দলে যথাবিধি বলী

রাঘব, কহিলা প্রভু;— “পুত্রশোকে আজি

বিকল রাক্ষসপতি সাজিছে সত্বরে

সহ রক্ষঃ-অনীকিনী; সঘনে টলিছে

বীরপদভরে লঙ্কা। তোমরা সকলে

ত্রিভুবনজয়ী রণে; সাজ ত্বরা করি;

রাখ গো রাঘবে আজি এ ঘোর বিপদে।

স্ববন্ধুবান্ধবহীন বনবাসী আমি

ভাগ্যদোষে; তোমরা হে রামের ভরসা,

বিক্রম, প্রতাপ, রণে। একমাত্র রথী

জীবে লঙ্কাপুরে এবে; বধ আজি তারে,

বীরবৃন্দ! তোমাদেরি প্রসাদে বাঁধিনু

সিন্ধু; শূলিশম্ভুনিভ কুম্ভকর্ণ-শূরে

বধিনু তুমুল যুদ্ধে; নাশিল সৌমিত্রি

দেবদৈত্যনরত্রাস ভীম মেঘনাদে।

কুল, মান, প্রাণ মোর রাখ হে উদ্ধারি,

রঘুবন্ধু, রঘুবধূ, বদ্ধা কারাগারে

রক্ষঃ-ছলে। স্নেহপণে কিনিয়াছ রামে

তোমরা; বাঁধ হে আজি কৃতজ্ঞতা পাশে

রঘুবংশে, দাক্ষিণাত্য! দাক্ষিণ্য প্রকাশি।”

নীরবিলা রঘুনাথ সজল-নয়নে।

বারিদপ্রতিম স্বনে স্বনি উত্তরিলা

সুগ্রীব;—“মরিব, নহে মারিব রাবণে,—

এ প্রতিজ্ঞা, শূরশ্রেষ্ঠ, তব পদতলে।

ভুঞ্জি রাজ্যসুখ, নাথ, তোমার প্রসাদে

ধনমানদাতা তুমি, কৃতজ্ঞতা পাশে

চিরবাঁধা, এ অধীন, ও পদপঙ্কজে।

আর কি কহিব শূর? মম সঙ্গিদলে

নাহি বীর, তব কর্ম্ম সাধিতে যে ডরে

কৃতান্তে। সাজুক রক্ষঃ, যুঝিব আমরা

অভয়ে।” গর্জ্জিলা রোষে সৈন্যাধ্যক্ষ যত,

গর্জিলা বিকট ঠাট জয়রাম নাদে।

সে ভৈরব-রবে রুষি, রক্ষ:—অনীকিনী

নিনাদিলা বীরমদে; নিনাদেন যথা

দানবদলনী দুর্গা দানবনিনাদে—

পূরিল কনকলঙ্কা গম্ভীর নির্ঘোষে।

কমল-আসনে যথা বসেন কমলা,

রক্ষঃকুলরাজলক্ষ্মী, পশিল সে স্থলে

আরাব; চমকি সতী উঠিলা সত্বরে।

দেখিলা পদ্মাক্ষী, রক্ষঃ সাজিছে চৌদিকে

ক্রোধান্ধ; রাক্ষসধ্বজ উড়িছে আকাশে,

জীবকুল-কুলক্ষণ! বাজিছে গম্ভীরে

রক্ষোবাদ্য। শূন্যপথে চলিলা ইন্দিরা,—

শরদিন্দুনিভাননা—বৈজয়ন্তধামে।

বাজিছে বিধি-বাদ্য ত্রিদশ আলয়ে।

নাচিছে অপ্সরাবৃন্দ; গাইছে সুতানে

কিন্নর; সুবর্ণাসনে দেবদেবীদলে

দেবরাজ, বামে শচী সুচারুহাসিনী;

অনন্ত বসন্তানিল বহিছে সু-স্বনে;

বর্ষিছে মন্দার-পুঞ্জ গন্ধর্ব্ব চৌদিকে।

পশিলা কেশব-প্রিয়া দেবসভাতলে।

প্রণমি কহিলা ইন্দ্র,—“দেহ পদধুলি,

জননি! নিঃশঙ্ক দাস তোমার প্রসাদে।

গতজীব রণে আজি দুরন্ত রাবণি!

ভুঞ্জিব স্বর্গের সুখ নিরাপদে এবে।

কৃপাদৃষ্টি যার প্রতি কর, কৃপাময়ি,

তুমি, কি অভাব তার?” হাসি উত্তরিলা

রত্নাকর-রত্নোত্তমা ইন্দিরা-সুন্দরী,—

“ভূতলে পতিত এবে, দৈত্যকুলরিপু,

রিপু তব; কিন্তু সাজে রক্ষোবলদলে

লঙ্কেশ, আকুল রাজা প্রতিবিধানিতে

পুত্ত্রবধ! লক্ষ রক্ষঃ সাজে তার সনে।

দিতে এ বারতা, দেব। আইনু এদেশে।

সাধিল তোমার কর্ম্ম সৌমিত্রি-সুমতি;

রক্ষ তারে, আদিতেয়! উপকারী জনে,

মহৎ যে প্রাণ-পণে উদ্ধারে বিপদে।

আর কি কহিব, শত্রু? অবিদিত নহে

রক্ষঃকুলপরাক্রম! দেখ চিন্তা করি,

কি উপায়ে, শচীকান্ত! রাখিবে রাঘবে!”

উত্তরিলা দেবপতি;—“স্বর্গের উত্তরে,

দেখ চেয়ে, জগদম্বে! অম্বর-প্রদেশে;—

সুসজ্জ অমরদল। বাহিরায় যদি

রণ-আশে মহেষ্বাস রক্ষঃকুলপতি,

সমরিব তার সঙ্গে রঙ্গে, দয়াময়ি!—

না ডরি রাবণে, মাতঃ, রাবণি-বিহনে।”

বাসবীয় চমূ রমা দেখিলা চমকি

স্বর্গের উত্তরভাগে। যত দূর চলে

দেবদৃষ্টি, দৃষ্টি-দানে হেরিলা সুন্দরী

রথ, গজ, অশ্ব, সাদী, নিষাদী, সুরথী,

পদাতিক যমজয়ী, বিজয়ী সমরে।

গন্ধর্ব্ব, কিন্নর, দেব, কালাগ্নি-সদৃশ

তেজে; শিখিধ্বজরথে স্কন্দ তারকারি

সেনানী, বিচিত্র রথে চিত্ররথ রথী।

জ্বলিছে অম্বর যথা বন দাবানলে;

ধূমপুঞ্জসম তাহে শোভে গজরাজি;

শিখারূপে শূলগ্রাম ভাতিছে ঝলসি

নয়ন। চলপা যেন অচলা, শোভিছে

পতাকা: রবিপরিধি জিনি তেজোগুণে,

ঝকঝকে চর্ম্ম; বর্ম্ম ঝলে ঝলঝলে।

সুধিলা মাধবপ্রিয়া;—“কহ দেবনিধি

আদিতেয়, কোথা এবে প্রভঞ্জন-আদি

দিক্‌পাল? ত্রিদিবসৈন্য শূন্য কেন হেরি

এ বিরহে? উত্তরিলা শচীকান্ত বলী;—

“নিজ নিজ রাজ্য আজি রক্ষিতে দিক্‌পালে

আদেশিনু, জগদম্বে! দেবরক্ষোরণে,

(দুর্জ্জয় উভয় কুল) কে জানে কি ঘটে?—

হয় ত মজিবে মহী, প্রলয়ে যেমতি,

আজি; এ বিপুল সৃষ্টি যাবে রসাতলে।”

আশীষিয়া সুকেশিনী কেশববাসনা

দেবেশে, লঙ্কায় মাতা সত্বরে ফিরিলা

সুবর্ণ ঘনবাহনে; পশি স্বমন্দিরে,

বিষাদে কমলাসনে বসিলা কমলা,—

আলো করি দশদিশ রূপের কিরণে,

বিরসবদন, মরি, রক্ষঃকুল-দুঃখে।

রণমদে মত্ত, সাজে রক্ষঃকুলপতি;—

হেমকূট-হৈমশৃঙ্গ-সমোজ্জ্বল তেজে

চৌদিকে রথীন্দ্রদল! বাজিছে অদূরে

রণবাদ্য; রক্ষোধ্বজ উড়িছে আকাশে,

অসংখ্য রাক্ষসবৃন্দ নাদিছে হুঙ্কারে

হেনকালে সভাতলে উত্তরিলা রাণী

মন্দোদরী, শিশুশূন্য নীড় হেরি যথা

আকুলা কপোতী, হায়! ধাইছে পশ্চাতে

সখীদল। রাজপদে পড়িলা মহিষী।

যতনে সতীরে তুলি, কহিলা বিষাদে,

রক্ষোরাজ;—“বাম এবে, রক্ষঃকুলেন্দ্রাণি।

আমা দোঁহা প্রতি বিধি! তবে যে বাঁচিছি

এখনও, সে কেবল প্রতিবিধিৎসিতে

মৃত্যু তার! যাও ফিরি শূন্য-ঘরে তুমি;—

রণক্ষেত্রযাত্রী আমি, কেন রোধ মোরে?

বিলাপের কাল, দেবি! চিরকাল পাব!

বৃথা রাজ্যসুখে, সতি! জলাঞ্জলি দিয়া,

বিরলে বসিয়া দোঁহে স্মরিব তাহারে

অহরহঃ। যাও ফিরি; কেন নিবাইবে

এ রোষাগ্নি অশ্রুনীরে, রাণি মন্দোদরি!

বন-সুশোভন শাল ভূপতিত আজি,

চূর্ণ তুঙ্গতম শৃঙ্গ গিরিবর-শিরে;

গগনরতন-শশী চিররাহুগ্রাসে।”

ধরাধরি করি সখী লইলা দেবীরে

অবরোধে। ক্রোধভরে বাহিরি, ভৈরবে

কহিলা রাক্ষসনাথ, সম্বোধি রাক্ষসে;—

“দেব-দৈত্য-নর-রণে যার পরাক্রমে

জয়ী রক্ষঃ-অনীকিনী; যার শরজালে

কাতর দেবেন্দ্রসহ দেবকুলরথী;

অতল-পাতালে নাগ, নর নরলোকে;—

হত সে বীরেশ আজি অন্যায়-সময়ে,

বীরবৃন্দ! চোরবেশে পশি দেবালয়ে,

সৌমিত্রি বধিল পুত্রে নিরস্ত্র সে যবে

নিভৃতে। প্রবাসে যথা মনোদুঃখে মরে

প্রবাসী, আসন্নকালে না হেরি সম্মুখে

স্নেহপাত্র তার যত—পিতা, মাতা, ভ্রাতা,

দয়িতা—মরিল আজি স্বর্ণ-লঙ্কাপুরে,

স্বর্ণলঙ্কা-অলঙ্কার। বহুকালাবধি

পালিয়াছি পুত্ত্রসম তোমা সবে আমি;—

জিজ্ঞাসহ ভূমণ্ডলে, কোন্ বংশখ্যাতি

রক্ষোবংশখ্যাতিসম? কিন্তু দেব-নরে

পরাভবি, কীর্ত্তিবৃক্ষ রোপিনু জগতে

বৃথা। নিদারুণ-বিধি, এতদিনে এবে

বামতম মম প্রতি; তেঁই শুখাইল

জলপূর্ণ আলবাল অকাল-নিদাঘে!

কিন্তু না বিলাপি আমি। কি ফল বিলাপে?

আর কি পাইব তারে? অশ্রুবারিধারা,

হায় রে, দ্রবে কি কভু কৃতান্তের হিয়া

কঠিন? সমরে এবে পশি বিনাশিব

অধর্ম্মী সৌমিত্রি মূঢ়ে, কপট-সমরী;—

বৃথা যদি যত্ন আজি, আর না ফিরিব—

পদার্পণ আর নাহি করিব এ পুরে

এ জন্মে! প্রতিজ্ঞা মম এই, রক্ষোরথি!

দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস তোমরা সমরে,

বিশ্বজয়ী; স্মরি তারে, চল রণস্থলে;—

মেঘনাদ হত রণে, এ বারতা শুনি,

কে চাহে বাঁচিতে আজি এ কর্ব্বুরকুলে,

কর্ব্বুরকুলের গর্ব্ব মেঘনাদ বলী।”

নীরবিলা সহেষ্বাস নিশ্বাসি বিষাদে।

ক্ষোভে রোষে রক্ষঃসৈন্য নাদিলা নির্ঘোষে,

তিতিয়া মহীরে, মরি, নয়ন আসারে।

শুনি সে ভীষণ স্বন নাদিলা গম্ভীরে

রঘুসৈন্য। ত্রিদিবেন্দ্র নাদিলা ত্রিদিবে।

রুষিলা বৈদেহীনাথ, সৌমিত্রি-কেশরী,

সুগ্রীব, অঙ্গদ, হনু, নেতৃনিধি যত

রক্ষোযম; নল, নীল, শরভ সুমতি,—

গর্জ্জিল বিকট ঠাট জয়রাম নাদে।

মন্দ্রিলা জীমূতবৃন্দ আবরি অম্বরে;

ইরম্মদে ধাঁধি বিশ্ব, গর্জ্জিল অশনি;

চামুণ্ডার হাসিরাশি-সদৃশ হাসিল

সৌদামিনী, যবে দেবী হাসি বিনাশিলা

দুর্ম্মদ দানবদলে, মত্ত রণমদে।

ডুবিলা তিমিরপুঞ্জে তিমির-বিনাশী

দিনমণি; বায়ুদল বহিলা চৌদিকে

বৈশ্বানর-শ্বাসরূপে; জ্বলিল কাননে

দাবাগ্নি; প্লাবন নাদি গ্রাসিল সহসা

পুরি পল্লী; ভূকম্পনে পড়িল ভূতলে

অট্টালিকা, তরুরাজী; জীবন ত্যজিল

উচ্চ কাঁদি জীবকুল, প্রলয়ে যেমতি!

মহাভয়ে ভীত মহী কাঁদিয়া চলিলা

বৈকুণ্ঠে। কনকাসনে বিরাজেন যথা

মাধব, প্রণমি সাধ্বী আরাধিলা দেবে;—

“বারে বারে অধিনীরে, দয়াসিন্ধু তুমি,

হে রমেশ! তরাইলা বহু মূর্ত্তি ধরি;—

কুর্ম্মপৃষ্ঠে তিষ্ঠাইলা দাসীরে প্রলয়ে

কূর্ম্মরূপে; বিরাজিনু দশনশিখরে

আমি, (শশাঙ্কের দেহ কলঙ্কের রেখা

সদৃশী) বরাহমূর্ত্তি ধরিলা যে কালে,

দীনবন্ধু! নরসিংহবেশে বিনাশিয়া

হিরণ্যকশিপু দৈত্য, জুড়ালে দাসীরে

খর্ব্বিলা বলির গর্ব্ব খর্ব্বাকারছলে,

বামন! বাঁচিনু, প্রভু, তোমার প্রসাদে।

আর কি কহিব নাথ? পদাশ্রিতা দাসী,

তেঁই পাদপদ্মতলে এ বিপত্তিকালে।”

হাসি সুমধুর স্বরে সুধিলা মুরারি;—

“কি হেতু কাতরা আজি, কহ জগন্মাতঃ

বসুধে? আয়াসে আজি কে, বৎসে, তোমারে?

উত্তরিলা কাঁদি মহী;—“কি না তুমি জান,

সর্ব্বজ্ঞ। লঙ্কার পানে দেখ প্রভু চাহি।

রণে মত্ত রক্ষোরাজ; রণে মত্ত বলী

রাঘবেন্দ্র; রণে মত্ত ত্রিদিবেন্দ্র রথী!

মদকল-করীত্রয় আয়াসে দাসীরে।

দেবাকৃতি রথিপতি সৌমিত্রি-কেশরী

বধিলা সংগ্রামে আজি ভীম মেঘনাদে;

আকুল বিষম-শোকে রক্ষঃকুলনিধি

করিল প্রতিজ্ঞা, রণে মারিবে লক্ষ্মণে;

করিলা প্রতিজ্ঞা ইন্দ্র রক্ষিতে তাহারে

বীরদর্পে;—অবিলম্বে, হায়, আরম্ভিবে

কাল-রণ, পীতাম্বর! স্বর্ণ-লঙ্কাপুরে,

দেব-রক্ষঃ-নর রোষে। কেমনে সহিব

এ ঘোর-যাতনা, নাথ, কহ ত আমারে?”

চাহিলা রমেশ হাসি স্বর্ণলঙ্কা-পানে।

দেখিলা রাক্ষসবল বাহিরিছে দলে

অসংখ্য, প্রতিঘ-অন্ধ, চতুঙ্কন্ধরূপী।

চলিছে প্রতাপ আগে জগত কাঁপায়ে;

পশ্চাতে শবদ চলে শ্রবণ বধিরি;

চলিছে পরাগ পরে দৃষ্টিপথ রোধি

ঘন-ঘনাকাররূপে। টলিছে সঘনে

স্বর্ণলঙ্কা। বহির্ভাগে দেখিলা শ্রীপতি

রঘুসৈন্য; ঊর্ম্মিকুল সিন্ধুমুখে যথা

চির-অরি প্রভঞ্জন দেখা দিলে দূরে।

দেখিলা পুণ্ডরীকাক্ষ, দেবদল বেগে

ধাইছে লঙ্কার পানে, পক্ষিরাজ যথা

গরুড়, হেরিয়া দূরে সদা-ভক্ষ্য ফণী,

হুঙ্কারে! পূরিছে বিশ্ব গম্ভীর নির্ঘোষে!

পলাইছে যোগিকুল যোগ-যাগ ছাড়ি;

কোলে করি শিশুকুলে কাঁদিছে জননী,

ভয়াকুলা; জীবব্রজ ধাইছে চৌদিকে

ছন্নমতি। ক্ষণকাল চিন্তি চিন্তামণি

(যোগীন্দ্র-মানস-হংস) কহিলা মহীরে;—

“বিষম বিপদ, সতি! উপস্থিত দেখি

তব পক্ষে! বিরূপাক্ষ, রুদ্রতেজোদানে,

তেজস্বী করিলা আজি রক্ষঃকুলরাজে।

না হেরি উপায় কিছু; যাহ তাঁর কাছে,

মেদিনি!” পদারবিন্দে কাঁদি উত্তরিলা

বসুন্ধরা;—“হায় প্রভু! দুরন্ত সংহারী

ত্রিশূলী; সতত রত নিধনসাধনে।

নিরন্তর তমোগুণে পূর্ণ ত্রিপুরারি।

কাল-সর্প-সাধ, শৌরি! সদা দগ্ধাইতে,

উগরি বিষাগ্নি, জীবে। দয়াসিন্ধু তুমি,

বিশ্বম্ভর; বিশ্বভার তুমি না বহিলে,

কে আর বহিবে, কহ? বাঁচাও দাসীরে,

হে শ্রীপতি! এ মিনতি ও রাঙ্গা-চরণে!”

উত্তরিলা হাসি বিভু;—“যাও নিজ স্থলে,

বসুধে! সাধিব কার্য্য তোমার, সম্বরি

দেববীর্য্য। না পারিবে রক্ষিতে লক্ষ্মণে

দেবেন্দ্র, রাক্ষস-দুঃখে দুঃখী উমাপতি।”

মহানন্দে বসুন্ধরা গেলা নিজস্থলে।

কহিলা গরুড়ে প্রভু;—“উড়ি নভোদেশে,

গরুত্মান্! দেবতেজঃ হর আজি রণে,

হরে অম্বুরাশি যথা তিমিরারি রবি;

কিম্বা তুমি, বৈনতেয়! হরিলা যেমতি

অমৃত। নিস্তেজ দেবে আমার আদেশে।”

বিস্তারি বিশাল পক্ষ, উড়িলা আকাশে

পক্ষিরাজ; মহাছায়া পড়িল ভূতলে,

আঁধারি অযুত বন, গিরি, নদ, নদী।

যথা গৃহমাঝে বহ্নি জ্বলিলে উত্তেজে,

গবাক্ষ-দুয়ার পথে বাহিরায় বেগে

শিখাপুঞ্জ, বাহিরিল চারিদ্বার দিয়া

রাক্ষস, নিনাদি রোষে; গর্জ্জিল চৌদিকে

রঘুসৈন্য; দেববৃন্দ পশিলা সমরে।

আইলা মাতঙ্গবর ঐরাবত, মাতি

রণরঙ্গে; পৃষ্ঠদেশে দম্ভোলিনিক্ষেপী

সহস্রাক্ষ, দীপ্যমান মেরুশৃঙ্গ যথা

রবি করে, কিম্বা ভানু মধ্যাহ্নে; আইলা

শিখিধ্বজ-রথে রথী স্কন্দ তারকারি

সেনানী; বিচিত্র রথে চিত্ররথ রথী;

কিন্নর, গন্ধর্ব্ব, যক্ষ, বিবিধ বাহনে।

আতঙ্কে শুনিলা লঙ্কা স্বর্গীয়-বাজনা;

কাঁপিল চমকি দেশ অমর-নিনাদে!

সাষ্টাঙ্গে প্রণমি ইন্দ্রে কহিলা নৃমণি;

“দেবকুলদাস দাস, দেবকুলপতি!

কত যে করিনু পুণ্য পূর্ব্বজন্মে আমি,

কি আর কহিব তার? তেঁই সে লভিনু

পদাশ্রয় আজি তব এ বিপত্তি কালে,

বজ্রপাণি! তেঁই আজি চরণ-পরশে

পরিত্রিলা ভূমণ্ডল ত্রিদিবনিবাসী।”

উত্তরিলা স্বরীশ্বর সম্ভাষি রাঘবে;—

“দেবকুলপ্রিয় তুমি, রঘুকুলমণি!

উঠি দেবরথে, রথি! নাশ বাহুবলে

রাক্ষস অধর্ম্মাচারী। নিজ-কর্ম্ম-দোষে

মজে রক্ষঃকুলনিধি; কে রক্ষিবে তারে?

লভিনু অমৃত যথা মথি জলদলে,

লণ্ডভণ্ডি লঙ্কা আজি, দণ্ডি নিশাচরে,

সাধ্বী মৈথিলীরে, শূর, অর্পিবে তোমারে

দেবকুল। কত কাল অতল-সলিলে

বসিবেন আর রমা, আঁধারি জগতে?”

বাজিল তুমুল রণ দেবরক্ষোনরে!

অম্বুরাশিসম কম্বু ঘোষিল চৌদিকে

অযুত; টঙ্কারি ধনুঃ ধনুর্দ্ধর বলী

রোধিলা শ্রবণপথ! গগন ছাইয়া

উড়িল কলম্বকুল, ইরম্মদতেজে

ভেদি, বর্ম্ম, চর্ম্ম, দেহ, বহিল প্লাবনে

শোণিত। পড়িল রক্ষোনরকুলরথী;

পড়িল কুঞ্জরপুঞ্জ, নিকুঞ্জে যেমতি

পত্র প্রভঞ্জনবলে; পড়িল নিনাদি

বাজীরাজী; রণভূমি পূরিল ভৈরবে!

আক্রমিলা সুরবৃন্দে চতুরঙ্গ-বলে

চামর—অমরত্রাস। চিত্ররথ রথী

সৌরতেজঃ রথে শূর পশিলা সংগ্রামে,

বারণারি সিংহ যথা হেরি সে বারণে।

আহ্বানিল ভীমরবে সুগ্রীবে উদগ্র

রথীশ্বর; রথচক্র ঘুরিল ঘর্ঘরে

শতজলস্রোতোনাদে। চালাইলা বেগে

বাস্কল মাতঙ্গযূথে, যুথনাথ যথা

দুর্ব্বার, হেরিয়া দূরে অঙ্গদে; রুষিলা

যুবরাজ, রোষে যথা সিংহশিশু হেরি

মৃগদলে। অসিলোমা, তীক্ষ্ণ-অসি করে,

বাজীরাজী সহ ক্রোধে বেড়িল শরভে

বীরর্ষভ। বিড়ালাক্ষ (বিরূপাক্ষ যথা

সর্ব্বনাশী) হনূ সহ আরম্ভিলা কোপে

সংগ্রাম। পশিলা রণে দিব্যরথে রথী

রাঘব, দ্বিতীয়, আহা, স্বরীশ্বর যথা

বজ্রধর। শিখিধ্বজ স্কন্দ তারকারি,

সুন্দর লক্ষ্মণ-শূরে দেখিলা বিস্ময়ে

নিজ প্রতিমূর্ত্তিমর্ত্যে। উড়িল চৌদিকে

ঘনরূপে রেণুরাশি; টলমল টলে

টলিলা কনক-লঙ্কা; গর্জ্জিলা জলধি।

সৃজিলা অপূর্ব্ব-ব্যূহ শচীকান্ত বলী।

বাহিরিলা রক্ষোরাজ পুষ্পক-আরোহী

ঘর্ঘরিল রথচক্র নির্ঘোষে, উগরি

বিস্ফুলিঙ্গ; তুরঙ্গম হ্রেষিল উল্লাসে।

রতনসম্ভবা বিভা, নয়ন ধাঁধিয়া,

ধায় অগ্রে, ঊষা যথা, একচক্র-রথে

উদেন আদিত্য যবে উদয়-অচলে!

নাদিল গম্ভীরে রক্ষঃ হেরি রক্ষোনাথে।

সম্ভাষি সারথিবরে, কহিলা সুরথী;—

“নাহি যুঝে নর আজি, হে সূত, একাকী,

দেখ চেয়ে। ধূমপুঞ্জে অগ্নিরাশি যথা,

শোভে অসুরারিদল রঘুসৈন্য মাঝে।

আইলা লঙ্কায় ইন্দ্র শুনি হত রণে

ইন্দ্রজিৎ।” স্মরি পুত্ত্রে রক্ষঃকুলনিধি,

সরোষে গর্জ্জিয়া রাজা কহিলা গভীরে;—

“চালাও, হে সূত! রথ, যথা বজ্রপাণি

বাসব।” চলিল রথ মনোরথগতি।

পলাইল রঘুসৈন্য, পলায় যেমনি

মদকল-করীরাজে হেরি উর্দ্ধশ্বাসে

বনবাসী। কিম্বা যথা ভীমাকৃতি-ঘন,

বজ্র-অগ্নিপূর্ণ, যবে উড়ে বায়ুপথে

ঘোরনাদে, পশুপক্ষী পলায় চৌদিকে

আতঙ্কে! টঙ্কারি ধনুঃ, তীক্ষ্ণতর-শরে

মুহূর্ত্তে ভেদিলা ব্যূহ বীরেন্দ্র-কেশরী,

সহজে প্লাবন যথা ভাঙে ভীমাঘাতে

বালিবন্ধ! কিম্বা যথা ব্যাঘ্র নিশাকালে

গোষ্ঠবৃতি। অগ্রসরি শিখিধ্বজ-রথে,

শিঞ্জিনী আকর্ষি রোষে তারকারি বলী

রোধিলা সে রথগতি। কৃতাঞ্জলিপুটে

নমি শূরে, লঙ্কেশ্বর কহিলা গম্ভীরে;—

“শঙ্করী-শঙ্করে, দেব, পূজে দিবানিশি

কিঙ্কর। লঙ্কায় তবে বৈরিদল-মাঝে

কেন আজি হেরি তোমা? নরাধম রামে

হেন আনুকুল্য দান কর কি কারণে,

কুমার? রথীন্দ্র তুমি; অন্যায়-সমরে

মারিল নন্দনে মোর লক্ষ্মণ; মারিব

কপটসমরী মূঢ়ে; দেহ পথ ছাড়ি!”

কহিলা পার্ব্বতীপুত্ত্র; “রক্ষিব লক্ষ্মণে,

রক্ষোরাজ! আজি আমি দেবরাজাদেশে।

বাহুবলে, বাহুবল, বিমুখ আমারে,

নতুবা এ মনোরথ নারিবে পূর্ণিতে!”

সরোষে, তেজস্বী আজি মহারুদ্রতেজে,

হুঙ্কারি হানিল অস্ত্র রক্ষঃকুলনিধি

অগ্নিসম, শরজালে কাতরিয়া রণে

শক্তিধরে! বিজয়ারে সম্ভাষি অভয়া

কহিলা; “দেখ্‌লো সখি! চাহি লঙ্কাপানে,

তীক্ষ্ণ-শরে রক্ষেশ্বর বিঁধিছে কুমারে

নির্দ্দয়; আকাশে দেখ, পক্ষীন্দ্র হরিছে

দেবতেজঃ; যা লো তুই সৌদামিনীগতি,

নিবার্ কুমারে, সই। বিদরিছে হিয়া

আমার, লো সহচরি। হেরি রক্তধারা

বাছার কোমল দেহে। ভকত-বৎসল

সদানন্দ; পুত্রাধিক স্নেহেন ভকতে;

তেঁই সে রাবণ এবে দুর্ব্বার সমরে,

স্বজনি!” চলিলা আশু সৌরকররূপে

নীলাম্বরপথে দূতী। সম্বোধি কুমারে

বিধুমুখী, কর্ণমূলে কহিলা;—“সম্বর

অস্ত্র তব, শক্তিধর, শক্তির আদেশে।

মহারুদ্রতেজে আজি পূর্ণ লঙ্কাপতি।”

ফিরাইলা রথ হাসি স্কন্দ তারকারি

মহাসুর। সিংহনাদে কটক কাটিয়া

অসংখ্য, রাক্ষসনাথ ধাইলা সত্বরে

ঐরাবত-পৃষ্ঠে যথা দেব বজ্রপাণি।

বেড়িল গন্ধর্ব্ব-নর শত প্রসরণে

রক্ষেন্দ্রে; হুঙ্কারি শূর নিরস্তিলা সবে

নিমিষে, কালাগ্নি যথা ভস্মে বনরাজী।

পলাইলা বীরদল জলাঞ্জলি দিয়া

লজ্জায়! আইলা রোষে দৈত্যকুল-অরি,

হেরি পার্থে কর্ণ যথা কুরুক্ষেত্র-রণে।

ভীষণ তোমর রক্ষঃ হানিলা হুঙ্কারি

ঐরাবত-শিরঃ লক্ষ্যি। অর্দ্ধপথে তাহে

শর-বৃষ্টি স্বরীশ্বর কাটিলা সত্বরে।

কহিলা কর্ব্বুরপতি গর্ব্বে সুরনাথে;—

“যার ভয়ে বৈজয়ন্তে, শচীকান্ত বলি!

চির কম্পমান তুমি, হত সে রাবণি,

তোমার কৌশলে, আজি কপট-সংগ্রামে।

তেঁই বুঝি আসিয়াছ লঙ্কাপুরে তুমি,

নির্লজ্জ! অবধ্য তুমি, অমর; নহিলে

দমনে শমন যথা, দমিতাম তোমা

মুহূর্ত্তে। নারিবে তুমি রক্ষিতে লক্ষ্মণে,

এ মম প্রতিজ্ঞা দেব!” ভীম গদা ধরি,

লম্ফ দিয়া রথীশ্বর পড়িলা ভূতলে,

সঘনে কাঁপিলা মহী পদযুগভরে,

ঊরুদেশে কোষে অসি বাজিল ঝন্‌ঝনি।

হুঙ্কারি কুলিশী রোষে ধরিলা কুলিশে!

অমনি হরিল তেজঃ গরুড়; নারিলা

নাড়িতে দম্ভোলি দেব দম্ভোলি নিক্ষেপী!

প্রহারিলা ভীম গদা গজরাজশিরে

রক্ষোরাজ, প্রভঞ্জন যেমতি, উপাড়ি

অভ্রভেদী মহীরুহ, হানে গিরিশিরে

ঝড়ে। ভীমাঘাতে হস্তী নিরস্ত, পড়িলা

হাঁটু গাড়ি। হাসি রক্ষঃ উঠিলা স্বরথে।

যোগাইলা মুহূর্ত্তেকে মাতলি সারথি

সুরথ; ছাড়িলা পথ দিতিসুতরিপু

অভিমানে। হাতে ধনুঃ, ঘোর-সিংহনাদে

দিব্য রথে দাশরথি পশিলা সংগ্রামে।

কহিলা রাক্ষসপতি; “না চাহি তোমারে

আজি হে বৈদেহীনাথ! এ ভবমণ্ডলে

আর এক দিন তুমি জীব নিরাপদে।

কোথা সে অনুজ তব কপট-সমরী

পামর? মারিব তারে; যাও ফিরি তুমি

শিবিরে, রাঘবশ্রেষ্ঠ!” নাদিলা ভৈরবে

মহেষ্বাস, দূরে শূর হেরি রামানুজে।

বৃষপালে সিংহ যথা, নাশিছে রাক্ষসে

শূরেন্দ্র; কভু বা রথে, কভু বা ভূতলে।

চলিল পুষ্পক বেগে ঘর্ঘরি নির্ঘোষে

অগ্নিচক্রসম চক্র বর্ষিল চৌদিকে

অগ্নিরাশি; ধূমকেতু-সদৃশ শোভিল

রথচূড়ে রাজকেতু। যথা হেরি দূরে

কপোত, বিস্তারি পাখা, ধায় বাজপতি

অম্বরে; চলিলা রক্ষঃ, হেরি রণভূমে

পুত্ত্রহা সৌমিত্রি-শূরে; ধাইলা চৌদিকে

হুহুঙ্কারে দেব-নর রক্ষিতে শূরেশে।

ধাইলা রাক্ষসবৃন্দ হেরি রক্ষোনাথে।

বিড়ালাক্ষ রক্ষঃশূরে বিমুখি সংগ্রামে,

আইলা অঞ্জনাপুত্ত্র,—প্রভঞ্জনসম

ভীমপরাক্রম হনূ, গর্জ্জি ভীম-নাদে।

যথা প্রভঞ্জনবলে উড়ে তুলারাশি

চৌদিকে; রাক্ষসবৃন্দ পলাইলা রড়ে

হেরি যমাকৃতি বীরে। রুষি লঙ্কাপতি

চোক্‌ চোক্ শরে শূর অস্থিরিলা শূরে

অধীর হইলা হনূ, ভূধর যেমতি

ভূকম্পনে। পিতৃপদ স্মরিলা বিপদে

বীরেন্দ্র, আনন্দে বায়ু নিজ বল দিলা

নন্দনে, মিহির যথা নিজ করদানে

ভূষেণ কুমুদবাঞ্ছা সুধাংশুনিধিরে।

কিন্তু মহারুদ্রতেজে তেজস্বী সুরথী

নৈকষেয়, নিবারিলা পবনতনয়ে,—

ভঙ্গ দিয়া রণরঙ্গে পলাইলা হনূ।

আইলা কিষ্কিন্ধ্যাপতি, বিনাশি সংগ্রামে

উদগ্রে বিগ্রহপ্রিয়। হাসিয়া কহিলা

লঙ্কানাথ;—“রাজ্যভোগ ত্যজি কি কুক্ষণে,

বর্ব্বর! আইলি তুই এ কনকপুরে!

ভ্রাতৃবধূ তারা তোর তারাকারা রূপে

তারে ছাড়ি কেন হেথা রথিকুল-মাঝে

তুই, রে কিষ্কিন্ধ্যানাথ? ছাড়িনু, যা চলি

স্বদেশে। বিধবাদশা কেন ঘটাইবি

আবার তাহার, মূঢ়? দেবর কে আছে

আর তার?” ভীমরবে উত্তরিলা বলী

সুগ্রীব;—“অধর্ম্মাচারী কে আছে জগতে

তোর্ সম, রক্ষোরাজ? পরদারা লোভে

সবংশে মজিলি, দুষ্ট! রক্ষঃকুলকালি

তুই, রক্ষঃ! মৃত্যু তোর্ আজি মোর হাতে।

উদ্ধারিব মিত্রবধূ বধি আজি তোরে।”

এতেক কহিয়া বলী গর্জ্জি নিক্ষেপিলা

গিরিশৃঙ্গ। অনম্বর আঁধারি ধাইল

শিখর; সুতীক্ষ্ণ শরে কাটিলা সুরথী

রক্ষোরাজ, খান খান করি সে শিখরে।

টঙ্কারি কোদণ্ড পুনঃ রক্ষঃ-চূড়ামণি

তীক্ষ্ণতম শরে শূর বিঁধিলা সুগ্রীবে

হুঙ্কারে। বিষমাঘাতে ব্যথিত সুমতি,

পলাইলা; পলাইলা সত্রাসে চৌদিকে

রঘুসৈন্য, (জল যথা জাঙাল ভাঙিলে

কোলাহলে); দেবদল, তেজোহীন এবে,

পলাইলা নরসহ ধুমসহ যথা

যায় উড়ি অগ্নিকণা বহিলে প্রবলে

পবন সম্মুখে রক্ষঃ হেরিলা লক্ষ্মণে

দেবাকৃতি। বীরমদে দুর্ম্মদ সমরে

রাবণ, নাদিলা বলী হুহুঙ্কার রবে;—

নাদিলা সৌমিত্রি-শূর নির্ভয়-হৃদয়ে,

নাদে যথা মত্তকরী মত্তকরিনাদে!

দেবদত্ত ধনুঃ ধন্বী টঙ্কারিলা রোষে।

“এতক্ষণে, রে লক্ষ্মণ,”—কহিলা সরোষে

রাবণ, “এ রণক্ষেত্রে পাইনু কি তোরে,

নরাধম? কোথা এবে দেব বজ্রপাণি?

শিখিধ্বজ শক্তিধর? রঘুকুলপতি,

ভ্রাতা তোর? কোথা রাজা সুগ্রীব? কে তোরে

রক্ষিবে পামর, আজি? এ আসন্ন-কালে

সুমিত্রা-জননী তোর, কলত্র ঊর্ম্মিলা,

ভাব দোঁহে। মাংস তোর মাংসাহারী জীবে

দিব এবে; রক্তস্রোত শুষিবে ধরণী!

কু-ক্ষণে সাগর পার হইলি, দুর্ম্মতি!

পশিলি রাক্ষসালয়ে চোরবেশ ধরি,

হরিলি রাক্ষস-রত্ন—অমূল্য জগতে।”

গর্জ্জিলা ভৈরবে রাজা বসাইয়া চাপে

অগ্নিশিখাসম শর; ভীম সিংহনাদে

উত্তরিলা ভীমনাদী সৌমিত্রি-কেশরী;—

“ক্ষত্ত্রকুলে জন্ম মম, রক্ষঃকুলপতি!

নাহি ডরি যমে আমি; কেন ডরাইব

তোমায়? আকুল তুমি পুত্ত্রশোকে আজি,

যথাসাধ্য কর, রথি! আশু নিবারিব

শোক তব, প্রেরি তোমা পুত্ত্রবর যথা।”

বাজিল তুমুল রণ; চাহিলা বিস্ময়ে

দেব নর দোঁহা-পানে, কাটিলা সৌমিত্রি

শরজাল মুহুর্মুহুঃ হুহুঙ্কার-রবে!

সবিস্ময়ে রক্ষোরাজ কহিলা;—“বাখানি

বীরপণা তোর আমি, সৌমিত্রি-কেশরী!

শক্তিধরাধিক শক্তি ধরিস্ সুরথি!

তুই; কিন্তু নাহি রক্ষা আজি মোর হাতে।”

স্মরি পুত্ত্রবরে শূর, হানিলা সরোষে

মহাশক্তি। বজ্রনাদে উঠিলা গর্জ্জিয়া,

উজলি অম্বরদেশ সৌদামিনীরূপে

ভীষণরিপুনাশিনী! কাঁপিলা সভয়ে

দেব, নর। ভীমাঘাতে পড়িল ভূতলে

লক্ষ্মণ, নক্ষত্র যথা; বাজিল ঝন্‌ঝনি

দেব-অস্ত্র; রক্তস্রোতে আভাহীন এবে।

সপন্নগ গিরিসম গড়িলা সুমতি।

গহন কাননে যথা বিঁধি মৃগবরে

কিরাত অব্যর্থ শরে, ধায় দ্রুতগতি

তার পানে; রথ ত্যজি রক্ষোরাজ বলী

ধাইলা ধরিতে শবে! উঠিল চৌদিকে

আর্ত্তনাদ! হাহাকারে দেবনররথী

বেড়িলা সৌমিত্রি-শূরে। কৈলাসসদনে

শঙ্করের পদতলে কহিলা শঙ্করী;—

“মারিল লক্ষ্মণে, প্রভু! রক্ষঃকুলপতি

সংগ্রামে। ধূলায় পড়ি যায় গড়াগড়ি

সুমিত্রানন্দন এবে! তুষিলা রাক্ষসে,

ভকত-বৎসল তুমি; লাঘবিলা রণে

বাসবের বীর-গর্ব্ব; কিন্তু ভিক্ষা করি,

বিরূপাক্ষ! রক্ষ, নাথ! লক্ষ্মণের দেহ।”

হাসিয়া কহিলা শূলী বীরভদ্র-শূরে;—

“নিবার লঙ্কেশে, বীর!” মনোরথ-গতি,

রাবণের কর্ণমূলে কহিলা গম্ভীরে

বীরভদ্র;—“যাও ফিরি স্বর্ণলঙ্কাধামে,

রক্ষোরাজ! হত রিপু, কি কাজ সমরে!”

স্বপ্নসম দেবদূত অদৃশ্য হইলা।

সিংহনাদে শূরসিংহ আরোহিলা রথে;

বাজিল রাক্ষস-বাদ্য, নাদিল গম্ভীরে

রাক্ষস; পশিলা পুরে রক্ষ-অনীকিনী—

রণবিজয়িনী ভীমা, চামুণ্ডা যেমতি

রক্তবীজে নাশি দেবী, তাণ্ডবি উল্লাসে,

অট্টহাসি রক্তাধরে, ফিরিলা নিনাদি,

রক্তস্রোতে আর্দ্রদেহ! দেবদল মিলি

স্তুতিলা সতীরে যথা, আনন্দে বন্দিলা

বন্দীবৃন্দে রক্ষঃ-সেনা বিজয়-সঙ্গীতে!

হেথা পরাভূত যুদ্ধে, মহা অভিমানে,

সুরদলে সুরপতি গেলা সুরপুরে।

ইতি শ্রীমেঘনাদবধকাব্যে শক্তিনির্ভেদো নাম সপ্তমঃ সর্গঃ

সপ্তম সর্গ।

পদ্মপর্ণ—a leaf of lotus; a petal of lotus.

পদ্মযোনি—Brahma. নয়ন-পদ্ম—lotus like eyes.

সমপ্রেমাকাঙ্ক্ষী—seeking for the same love. Both the lotus and the Suryamukhi bloom at sunrise. They are therefore poetically said to be the wives of the sun.

হেমসূর্য্যমুখী—Suryamukhi with a golden hue.

পীনপয়োধরা—having plump and prominent breasts. বিনাইলা—dressed.

চিকণ-কেশ—smooth and bright hair.

বেদনিল—pained. জীবেশ—i.e. husband.

অনুরোধে—requests. বীণাবাণী—a person having a voice as sweet as the music of the harp, i.e. Pramila is meant.

সর্ব্বহরকাল—Time, the Destroyer of everything.

রাজীব—lotus.

ভর—fill up. ব্যোমচর—the wanderer of the sky. নিরংশু—devoid of light.

ভৈরব-দূত—the messenger of Siva.

কিংশুক—a kind of beautiful red flower

অমর-হিয়া—the heart of an immortal.

মর-দুঃখ—the grief of a mortal.

ভস্মরাশি-মাঝে—in the mass of ashes.

গুপ্ত বিভাবসুসম—like fire concealed.

করপুটে—with both the hands folded together.

সন্দেশবহ—the carrier of a message; a messenger.

নশ্বরশরে—with a fatal arrow.

বিউনিল fanned. আদ্রিবে—will wet.

পুত্রহানী—the killer of the son.

শৈব—a worshipper of Siva.

চতুরঙ্গে—in four divisions. শৃঙ্গবর—a great horn

অগ্নিবর্ণ-রথগ্রাম—numbers of fiery chariots.

ধূমবর্ণ-বারণ—elephants with a dusky colour.

চামর—the name of a Rakshasa.

উদগ্র—another Rakshasa.

জীমূতবাহন—Indra who is said to be carried on the clouds.

বজ্রী—Indra who is armed with the thunder.

অসিলোমা—is another Rakshasa.

অট্টহাসি—অট্ট অট্ট হাসিয়া, with roars of laughter.

লঙ্কাধামে সাজিলা ভৈরবী ইত্যাদি—the Rakshasa army is compared to the dreadful goddess Chandi. The strength of the elephants in the army is the strength in the fearful arms of Chandi. The speed of the horses in the army is the speed of her fearful march. The golden chariots represent the crown on her head. The flags represent the skirts of her cloth. The sounds of the various musical instruments represent her war-cry. The various weapons of the Rakshasas represent her teeth. The splendour of the armours of the Rakshasas represents the fire in her eyes.

ভূধরব্রজ—groups of mountains.

রবিকুল-রবি—the seion of the solar family, i.e. Ramchandra. ঘন-ঘনরূপে—like thick clouds. লয়িতে—to destroy.

প্রলয়ে—during destruction.

রক্ষোবর—i.e. Bibhisana.

স্নেহপণ—the price of affection,

দাক্ষিণাত্য—people of the Deccan.

দাক্ষিণ্য—mercy; kindness.

আরাব—noise; sound.

জীবকুল-কুলক্ষণ—an evil omen to the animate creatures. প্রতিবিধানিতে পুত্রবধ—to avenge the murder of his son.

উপকারী জনে, মহৎ......বিপদে—the person who saves his benefactor from danger is great.

সমরিব—shall fight.

রাবণি-বিহনে—in the absence of Indrajit.

জ্বলিছে অক্ষর যথা বন দাবানলে ইত্যাদি—the sky shone with the splendour of the army of gods as the forest fire shines in the forest. The elephants in the army represent the masses of smoke issing out of the forest fire. The weapons of the gods represent the flames of the forest fire.

চপলা যেন অচলা, শোভিছে পতাকা—the banners looked like restless flashes of lightning.

ঘনবাহনে—being carried on the clouds.

প্রতিবিধিৎসিতে মৃত্যু তার—to avenge his death.

গগনরতন-শশী চিররাহুগ্রাসে—The Moon, the gem of heaven is once for all in the jaws of Rahu; i.e. Meghanada is now in the jaws of Death.

দয়িতা—wife. বামতম—most unfavourable.

আলবাল—basin of water dug or built round the root of a tree.

অকাল-নিদাঘ—untimely heat of summer.

দ্রবে—melts.

ইরম্মদ—flash of lightning. প্লাবন—flood.

আয়াসে—pains; troubles; harasses.

মদকল-করীত্রয়—the three elephants intoxicated with their liquor.

প্রতিঘ-অন্ধ~~blind with rage.

প্রতাপ—force; strength; power.

শবদ—i.e. শব্দ, sound; noise.

পরাগ—dust raised by the army.

যোগীন্দ্র-মানস-হংস—a goose playing in the lake (Manasasarovara) of the best of yogis.

তমোগুণ—the destructive quality.

কাল-সর্প-সাধ—the desire of a deadly snake.

শৌরি—Vishnu; বিষ্ণু।

সম্বরি—withdrawing.

গরুত্মান্—one who has great wings.

নিস্তেজ-নিস্তেজ কর; make powerless.

কম্বু—a conch. কলম্ব—an arrow.

দেখিলা বিস্ময়ে নিজ প্রতিমূর্ত্তিমর্ত্ত্যে—saw to his great astonishment his own likeness on the earth.

বিস্ফুলিঙ্গ—fire-particles. সূত—charioteer.

বনবাসী—i.e. the beasts and birds of the forest.

ভীমাকৃতি-ঘন—a cloud of dreadful appearance.

বজ্র-অগ্নি-পূর্ণ—full of the fire of thunder.

বালিবন্ধ—an embankment of sand

গোষ্ঠবৃতি—the enclosure for the cattle.

তারকারি—Kartikeya, the killer of the Tarakasura.

শক্তিধর—is Kartikeya. প্রসরণ—বেষ্টন, circle.

কুলিশী—armed with কুলিশ or thunder.

জীব—জীবিত থাক, live.

রাজকেতু—royal banner.

পুত্রহা—the murderer of the son.

অঞ্জনাপুত্র—Hanumana, whose mother was Anjana.

তারাকারা রূপে—like a star in beauty.

অনম্বর—the sky. কলত্র—wife. চাপ—bow.

সপন্নগ—with the snakes. Lakshmana is the mountain, and his weapons are the snakes.

তাণ্ডবি—dancing. অট্টহাসি—laughing loudly.