← লাইব্রেরি

১৮৭১

হেক্‌টর বধ (১৮৭১)

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৭১

প্রকাশনা-তথ্য

হেক্‌টর-বধ,

অথবা

ঈলিয়াস্ নামক মহাকাব্যের উপাখ্যান-ভাগ!

(গ্রীক হইতে)

শ্রী মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রণীত।

কলিকাতা।

শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং বহুবাজারস্থ ২৪৯ সংখ্যক ভবনে

ইষ্ট্যানহােপ যন্ত্রে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

১৮৭১।

[মূল্য ১৲ টাকা মাত্র।]

হেক্‌টর-বধ,

অথবা

ঈলিয়াস্ নামক মহাকাব্যের উপাখ্যান-ভাগ!

(গ্রীক হইতে)

শ্রী মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রণীত।

কলিকাতা।

শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং বহুবাজারস্থ ২৪৯ সংখ্যক ভবনে

ইষ্ট্যানহােপ যন্ত্রে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

১৮৭১।

মান্যবর শ্রীযুক্ত বাবু ভূদেব মুখােপাধ্যায়

মহাশয় সমীপেষু।

প্রিয়বর―――

প্রায় চারি বৎসর হইল, আমি শারীরিক পীড়িত হইয়া, এমন কি, ৩।৪ মাস স্বকর্মে হস্ত নিক্ষেপ করিতে অশক্ত হইয়াছিলাম; সময়াতিপাতার্থে ঊরূপা খণ্ডের ভগবান কবিগুরুর জগদ্বিখ্যাত ইলিয়াস নামক কাব্য সদা সর্ব্বদা পাঠ করিতাম। পাঠের সময় মনে এইরূপ ভাব উদয় হইল, যে এ অপূর্ব্ব কাব্য খানির ইতিবৃত্ত স্বদেশীয় ইংলণ্ডভাষানভিজ্ঞ-জনগণের গােচরার্থে মাতৃভাষায় লিখি। লিখিত পুস্তক খানি ৪ চারি বৎসর মুদ্রালয়ে পড়িয়াছিল; এমন সময় পাই নাই যে ইহাকে প্রকাশি। একস্থলে কয়েক খানি কাপির কাগজ হারাইয়া গিয়াছে (৪র্থ পরিচ্ছেদের প্রারম্ভে;) সে টুকুও সময়াভাব প্রযুক্ত পুনরায় রচিয়া দিতে পারিলাম না। বােধ হয়, এতদিনের পর জনসমূহ সমীপে আমি হাস্যাস্পদ হইতে চলিলাম। কিন্তু তুমি এবং তােমার সদৃশ বিজ্ঞতম মহােদয়েরা এবং অন্যান্য পাঠকগণ উপরি উক্ত কারণটী মনে করিয়া পুস্তক খানি গ্রহণ করিলে ইহার শোধনার্থে ভবিষ্যতে কোন ত্রুটি হইবে না। এবং অবশিষ্ট অংশও অতি-শীঘ্র প্রকাশ করিতে যত্নবান হইব।

এ বঙ্গদেশে যে তোমার অতি শুভক্ষণে জন্ম, তাহার কোনই সন্দেহ নাই; কেননা, তোমার পরিশ্রমে মাতৃভাষার দিন দিন উন্নতি হইতেছে। পরমেশ্বর তোমাকে দীর্ঘজীবী করুন, এই প্রার্থনা করি। যে শিলায় তুমি, ভাই, কীর্ত্তিস্তম্ভ নির্ম্মিতেছ, তাহা কালও বিনষ্ট করিতে অক্ষম।

মহাকাব্যরচয়িতাকুলের মধ্যে ঈলিয়াস্ রচয়িতা কবি যে সর্ব্বোপরিশ্রেষ্ঠ, ইহা সকলেই জানেন। আমাদিগের রামায়ণ ও মহাভারত রামচন্দ্রের ও পঞ্চ পাণ্ডবের জীবন-চরিত মাত্র; তবে কুমারসম্ভব, শিশুপালবধ, কিরাতার্জ্জুনীয়ম্, ও নৈষধ ইত্যাদি কাব্য উরূপাখণ্ডের অলঙ্কারশাস্ত্রগুরু অরিস্তাতলীসের মতে মহাকাব্য বটে, কিন্তু ঈলিয়াসের নিকট এ সকল কাব্য কোথায়? দুঃখের বিষয় এই যে, এ লেখকের দোযে বঙ্গজনগণ কবিপিতার মহাত্মতা ও দেবোপম শক্তি, বোধ হয়, প্রায় কিছুই বুঝিতে পারিবেন না। যদি আমি মেঘ রূপে এ চন্দ্রিমার বিভারাশি স্থানে স্থানে ও সময়ে সময়ে অজ্ঞতা-তিমিরে গ্রাস করি, তবুও আমার মার্জ্জনার্থে এই একমাত্র কারণ রহিল, যে সুকোমলা মাতৃভাষার প্রতি আমার এত দূর অনুরাগ, যে তাহাকে এ অলঙ্কারখানি না দিয়া থাকিতে পারি না।

কাব্যখানি পাঠ করিলে টের পাইবে, যে আমি কবিগুরুর মহাকাব্যের অবিকল অনুবাদ করি নাই, তাহা করিতে হইলে অনেক পরিশ্রম হইত, এবং সে পরিশ্রমও যে সর্ব্বতোভাবে আনন্দোৎপাদন করিত, এ বিষয়ে আমার সংশয় আছে। স্থানে স্থানে এই গ্রন্থের অনেকাংশ পরিত্যক্ত এবং স্থানে স্থানে অনেকাংশ পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। বিদেশীয় একখানি কাব্য দত্তকপুত্ররূপে গ্রহণ করিয়া আপন গোত্রে আনা বড় সহজ ব্যাপার নহে, কারণ তাহার মানসিক ও শারীরিক ক্ষেত্র হইতে পর বংশের চিহ্ন ও ভাব সমুদায় দূরীভূত করিতে হয়। এ দুরূহ ব্রতে যে আমি কতদুর পর্য্যন্ত কৃতকার্য্য হইয়াছি এবং হইব, তাহা বলিতে পারি না।

৬ নং লাউডন্ স্ট্রীট,

চৌরঙ্গী।

ইং সন ১৮৭১ সাল।

শ্রীমাইকেল মধুসূদন দত্ত।

এই শব্দটী ভ্রান্তি বশতঃ একস্থলে ‘ইউরােপ’ লিখিত হইয়াছে। বঙ্গভাষায় ‘Europe’ লেখা যায় না। ‘Eu’ সদৃশ যুগ্ম স্বর আমাদের নাই। ‘ΕUROPA’ ঊরূপা।

নামাবলী।

বাঙ্গালা।
লাতীন।
ইংরাজী।

জ্যুস্।
Jupiter.
Jove.

প্রিয়াম।
Priamus.
Priam.

অপ্রোদীতী।
Venus.
Venus.

হীরী।
Juno.
Juno.

আথেনী।
Minerva.
Minerva.

ক্রূষা।
Chriseis.
Chriseis.

ব্রীষীশা।
Briseis.
Briseis.

অদিস্যূস।
Ulysses.
Ulysses.

স্কন্দর
Paris.
Paris.

ঈরীষা।
Iris.
Iris.

লব্ধিকা।
Laodicea.
Laodicea.

অত্রী।
Æthra.
Æthra.

ক্লিমেনী।
Clymene.
Clymene.

পণ্ডর্শ।
Pandarus.
Pandarus.

আরেশ।
Mars.
Mars.

সর্পীদন।
Sarpedon.
Sarpedon.

পশ্বেদন।
Neptune.
Neptune.

আয়াস।
Ajax.
Ajax.

উপক্রমণিকা

হেক্‌টর-বধ

অথবা

হোমেরের ঈলিয়াস্‌নামক কাব্যের উপাখ্যান ভাগ।

উপক্রমণিকা।

(১)

পূর্ব্বকালে হেলাস্‌ অর্থাৎ গ্রীশ দেশীয় লোকের পৌত্তলিক ধর্ম্মে আস্থা ও বহুবিধ দেবদেবীর উপর বিশ্বাস ছিল। তাঁহাদিগের দেবকুলের ইন্দ্র জ্যুস্‌ লীড়া নাম্নী এক নরকুলনারীর উপর আসক্ত হওতঃ রাজহংসের রূপ ধারণ করিয়া তাহার সহিত সহবাস করিলে, লীড়া দুইটী অণ্ড প্রসব করেন। একটী অণ্ড হইতে দুইটী সন্তান জন্মে; অপরটী হইতে হেলেনী নাম্নী একটী পরমসুন্দরী কন্যার উৎপত্তি হয়। লাকীডীমন্ দেশের রাজা লীড়ার স্বামী এই তিনটী সন্তানকে দেবের ঔরসজাত জানিয়া অতিপ্রযত্নে প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। যেমন কণ্বঋষির আশ্রমে আমাদের শকুন্তলা সুন্দরী প্রতিপালিত হইয়াছিলেন, সেইরূপ হেলেনী লাকীডীমন্‌ রাজগৃহে দিন২ প্রতিপালিত ও পরিবর্দ্ধিত হইতে লাগিলেন। আমাদিগের শকুন্তলা, দুর্ভাগ্যবশতঃ, খনিগর্ভস্থ মণির ন্যায় প্রতিপালক পিতার আশ্রমে অন্তর্হিতা ছিলেন, কিন্তু হেলেনীর রূপের যশঃসৌরভে হেলাস রাজ্য অতি শীঘ্রই পূর্ণ হইয়া উঠিল। অনেকানেক যুবরাজের এ কন্যারত্ন-লাভ-লোভে লাকীডিমন্‌ রাজনগরে সর্ব্বদা যাতায়াতে তথায় এক প্রকার স্বয়ম্বরের আড়ম্বর হইতে লাগিল। স্বয়ম্বরের প্রথা গ্রীশদেশে প্রচলিত ছিল না, থাকিলে বোধ হয়, মহাসমারোহ হইত।

হেলেনী মানিল্যুস্‌ নামক এক রাজকুমারকে পতিত্বে বরণ করিলে পর, তাহার প্রতিপালয়িতা পিতা অন্যান্য রাজপুরুষদিগকে কহিলেন, হে রাজকুমারেরা! যখন আমার কন্যা স্বেচ্ছায় এই যুবরাজকে মাল্যদান করিল, তখন আপনাদের এ বিষয়ে কোন বিরক্তিভাব প্রকাশ করা উচিত হয় না, বরঞ্চ আপনারা দেবপিতা জ্যুস্‌কে সাক্ষী করিয়া অঙ্গীকার করুন, যে যদি কস্মিন্‌কালে এই নব বর বধূর কোন দুর্ঘটনা ঘটে, তবে আপনারা সকলেই তাহাদের পক্ষ হইয়া তাহাদিগকে বিপজ্জাল হইতে পরিত্রাণ করিবেন।

রাজকুমারেরা রাজ বাক্য শ্রবণে অঙ্গীকারাবদ্ধ হইয়া স্ব২ দেশে প্রত্যাগমন করিলেন। মানিল্যুস্‌ আপন মনোরমা রমণীর সহিত লাকিডীমন্ রাজ্যের যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া পরম সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন।

(২)

আসিয়া খণ্ডের পশ্চিম ভাগের এক ক্ষুদ্র ভাগকে ক্ষুদ্র আসিয়া বলে। পূর্ব্বকালে সেই ভাগে ঈল্যুম অথবা ট্রয়নামে এক মহাপ্রসিদ্ধ নগর ছিল। নগরের রাজার নাম প্রিয়াম। রাণীর নাম হেকাবী। রাণী সসত্ত্বাবস্থায় আমাদিগের কুরুকুল-রাণী গান্ধারীর ন্যায় এই স্বপ্ন দেখিলেন, যে তিনি এমত এক অলাত প্রসবিলেন, যে তদ্দ্বারা রাজপুরী যেন এককালে ভস্মসাৎ হইল। নিদ্রাভঙ্গ হইলে রাণী স্বপ্ন-বিবরণ স্মরণ করিয়া মহাবিষাদে দিনপাত করিতে লাগিলেন। ক্রমে২ রাণীর স্বপ্ন-বৃত্তান্ত সমুদায় নগর মধ্যে আন্দোলিত হইতে লাগিল। যথাকালে রাণীও এক অতীব সুকুমার রাজকুমার প্রসব করিলেন। বিদুর প্রভৃতি কুরুকুল রাজমন্ত্রীর ন্যায় মহারাজ প্রিয়ামের অমাত্য বন্ধু এই সন্তানটীকে ভবিষ্যদ্বিপজ্জনক জানিয়া তাহাকে পরিত্যাগ করিতে পরামর্শ দেওয়াতে রাজা ধৃতরাষ্ট্রের অসদৃশে তাহাই করিলেন। অপত্য-স্নেহ রাজা প্রিয়ামকে স্বরাজ্যের ভাবী হিতার্থে অন্ধ করিতে পারিল না।

সন্তানটী ভূমিষ্ঠ হইবা মাত্রই আরকিলস নামক একজন রাজদাস মহারাজের আদেশের বিপরীত করিল; অর্থাৎ শিশুটীর প্রাণদণ্ড না করিয়া তাহাকে রাজপুরীর সন্নিধানস্থ ঈডানামক এক পর্ব্বতে রাখিয়া আসিল। কোন এক মেষ পালক ঐ পরিত্যক্ত সন্তানকে পরম সুন্দর দেখিয়া আপন বন্ধ্যা স্ত্রীর নিকট তাহাকে সমর্পণ করিল। মেষপালকের স্ত্রী শিশু সন্তানটীকে পরম যত্নে স্বীয় গর্ভজাত পুত্রের ন্যায় প্রতিপালন করিতে লাগিল। আমাদিগের কৃত্তিকাকুলবল্লভ কার্ত্তিকেয়ের তুল্য রাজপুত্র মেষপালকের গৃহে দিন্‌২ রূপে ও বিবিধ গুণে বাড়িতে লাগিলেন। আমাদের দুষ্মন্তপুত্র পুরুর ন্যায় ইনিও অতি অল্প বয়সেই বনচর পশুদিগকে দমন করিতে লাগিলেন।

মেষপালকেরা ইহার বাহুবলে স্বীয়২ মেষপালকে মাংসাহারী জন্তুগণ হইতে রক্ষিত দেখিয়া ইহার নাম স্কন্দর অর্থাৎ রক্ষাকারী রাখিলেন। ঐ ঈডা পর্ব্বত প্রদেশে এনোনী নাম্নী এক ভুবনমোহিনী সুরকামিনী বসতি করিতেন। সুরবালা রাজকুমারের অনুপম রূপ লাবণ্যে বিমোহিত হইয়া তাঁহার প্রতি একান্ত আসক্তা হইলেন, এবং তাঁহাকে বরণ করিয়া ঐ পর্বতময় প্রদেশে পরমাল্লাদে দিন যামিনী যাপন করিতে লাগিলেন।

(৩)

গ্রীশদেশের এক অংশের নাম থেসেলী। সেই রাজ্যের যুবরাজ পিল্যুসের থেটীস্‌ নাম্নী সাগরসম্ভবা এক দেবীর সহিত পরিণয় হয়। থেটীস্‌ দেবযোনি, সুতরাং তাঁহার বিবাহ সমারোহে সকল দেব দেবী নিমন্ত্রিত হইয়া রাজনিকেতনে আবির্ভূত হয়েন। বিবাদদেবী নাম্নী কলহকারিণী এক দেবকন্যা আহূত না হওয়াতে মহারোষাবেশে বিবাদ উপস্থিত করিবার মানসে এক অদ্ভুত কৌশল করেন। অর্থাৎ একটী স্বর্ণফলে, যে রূপে সর্ব্বোৎকৃষ্টা, সেই এ ফলের প্রকৃত অধিকারিণী, এই কয়েকটা কথা লিখিয়া দেবীদলের মধ্যস্থলে নিক্ষেপ করেন। হীরী জ্যুসের পত্নী অর্থাৎ দেবকুলের ইন্দ্রাণী শচী, আথেনী, জ্ঞানদেবী অর্থাৎ স্বরস্বতী এবং অপ্রোদীতী, প্রেমদেবী অর্থাৎ রতি, এই তিন জনের মধ্যে এই ফলোপলক্ষে বিষম বিবাদ ঘটিয়া উঠিলে, তাহারা ঈডাপর্ব্বতে রাজনন্দন স্কন্দরের নিকট উপস্থিত হইলেন, এবং তৎসন্নিধানে আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া তাঁহাকেই এ বিষয়ে নির্ণেতা স্থির করিলেন। হীরী কহিলেন, হে যুবক রাজকুমার! আমি দেবকুলেশ্বরী, তুমি এই ফল আমাকে দিয়া আমার প্রীতিভাজন হইলে আমি তোমাকে অসীম ধন ও গৌরব প্রদান করিব। যদ্যপিও তুমি মেষপালকদলের মধ্যে অবস্থিতি করিতেছ, তত্রাচ আমি ভস্মাবৃত অগ্নির ন্যায় তোমাকে প্রোজ্জ্বল ও শতশিখাশালী করিয়া তুলিব। আথেনী কহিলেন, আমি জ্ঞানদেবী। তুমি আমাকে উপাসনায় পরিতুষ্ট করিতে পারিলে বিদ্যা, বুদ্ধি, ও বলে নরকুলে শ্রেষ্ঠত্ব প্রাপ্ত হইবে। অপ্রোদীতী কহিলেন, আমি প্রেমদেবী, আমাকে প্রসন্ন করিলে, আমি নারীকুলের পরমোত্তমা নারীকে তোমার প্রেমাধিনী করিয়া দিব। যৌবনমদে উন্মত্ত রাজকুমার স্কন্দর কুক্ষণে ঐ ফলটী অপ্রোদীতী দেবীর হস্তে সমর্পণ করিলে অপর দেবীদ্বয় মহাক্রোধে অন্ধ হইয়া ত্রিদিবাভিমুখে গমন করিলেন।

অপ্রোদীতী দেবী পরমহর্ষে ও অতি মৃদুস্বরে কহিলন, হে ছদ্মবেশি! তুমি মেষপালক নও। তুমি ভস্মলুপ্ত বহ্নি। ট্রয় মহানগরের মহারাজ প্রিয়াম্‌ তোমার পিতা। অতএব তুমি তৎসন্নিধানে গিয়া রাজপুত্রের উপযুক্ত পরিচর্য্যা যাচ্‌ঞা কর, আমার এ বর ফলদায়ক করিবার নিমিত্ত যাহা কর্ত্তব্য, পরে আমি তাহা কহিয়া দিব।

রাজকুমার স্কন্দর দেবীর আদেশানুসারে রাজপুরীতে উত্তীর্ণ হইয়া স্বীয় পরিচয় প্রদান করিলে, বৃদ্ধরাজ প্রিয়াম্ তাহার অসামান্য রূপ লাবণ্যে ও বীরকৃতিতে পূর্ব্ব কথা বিস্মৃত হইলেন। কালনির্ব্বাপিত স্নেহাগ্নি পুনরুদ্দীপিত হইয়া উঠিল। সুতরাং রাজা নবপ্রাপ্ত পুত্রকে রাজসংসারে প্রবেশ করিতে আজ্ঞা দিলেন।

কিয়দ্দিন পরে অপ্রোদীতী দেবীর আদেশ মতে রাজকুমার স্কন্দর বহুসংখ্যক সাগরযান নানা ধন ও পণ্য দ্রব্যে পরিপূরিত করিয়া লাকীডিমন্‌ নামক নগরাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তথাকার রাজা মানিল্যুস্‌ অতিসম্মান ও সমাদরের সহিত রাজতনয়কে স্বমন্দিরে আহ্বান করিলেন। কিছুদিনের পর কোন বিশেষ কার্য্যানুরোধে তাহাকে দেশান্তরে যাইতে হইল। রাণী হেলেনী এ রাজ-অতিথির সেবায় নিয়ত নিযুক্ত রহিলেন।

দেবী অপ্রোদীতীর মায়াজালে হতভাগিনী রাণী হেলেনী রাজ-অতিথি স্কন্দরের প্রতি নিতান্ত অনুরাগিণী হইয়া পতিব্রতা ধর্ম্মে জলাঞ্জলি দিয়া স্বপতি গৃহ পরিত্যাগ পূর্ব্বক তাহার অনুগামিনী হইলেন এবং তাঁহার পিতা রাজচুড়ামণি প্রিয়ামের রাজ্যে সেই রাজ্যের কালরূপে প্রবেশ করিলেন। রাজা মানিল্যুস্‌ শূন্যগৃহে পুনরাবর্ত্তন করিয়া স্ত্রীবিরহে একান্ত অধীর ও ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া উঠিলেন।

এই দুর্ঘটনা হেলাস্‌ অর্থাৎ গ্রীশদেশে প্রচারিত হইলে, তদ্দেশীয় রাজাসমূহ পূর্ব্বকৃত অঙ্গীকার স্মরণ পূর্ব্বক সসৈন্যে মানিল্যুসের সাহায্যার্থে উপস্থিত হইলেন, এবং তাহার জ্যেষ্ঠভ্রাতা আর্‌গস্‌ দেশের অধীশ্বর আগেমেম্‌নন্‌কে সৈন্যাধ্যক্ষপদে অভিষিক্ত করিয়া ট্রয়নগর আক্রমণাভিলাষে সাগরপথে যাত্রা করিলেন। বৃদ্ধরাজ প্রিয়াম্‌ স্বীয় পঞ্চাশৎ পুত্রকে যুদ্ধার্থে অনুমতি দিলেন। মহাবীর হেক্‌টর (যাহাকে ট্রয়স্বরূপ লঙ্কার মেঘনাদ বলা যাইতে পারে) দেশ বিদেশীয় বন্ধুগণের এবং স্বীয় রাজসংসারস্থ সৈন্যদলের অধ্যক্ষপদ গ্রহণ করিলেন। দশ বৎসর উভয় দলে তুমুল সংগ্রাম হইল।

যেমন গঙ্গা যমুনা এবং সরস্বতী এই ত্রিপথা নদীত্রয় পবিত্রতীর্থ ত্রিবেণীতে একত্রীভূতা হইয়া একস্রোতে সাগর-সমাগমাভিলাষে গমন করেন, সেইরূপ উপরি উল্লিখিত তিনটী পরিচ্ছেদসংক্রান্ত বৃত্তান্ত এস্থল হইতে একত্রীভূত হইয়া ইউরোপখণ্ডের বাল্মীকি কবিগুরু হোমেরের ঈলিয়াস্ স্বরূপ সঙ্গীত তরঙ্গময় সিন্ধুপানে চলিতে লাগিল।

কবিগুরু হোমেরের জগদ্বিখ্যাত কাব্যে দশম বৎসরের বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে। গ্রীকেরা ট্রয়ের নিকটস্থ এক নগর লুট করে, এবং তত্রস্থ পূজিত সূর্য্যদেবের ক্রীস্‌ নামক পুরোহিতের এক পরমসুন্দরী কুমারী কন্যাকে আপনাদের শিবিরে আনয়ন করে। অপহৃত দ্রব্যজাত বিভাগের সময় সেই অসামান্য রূপবতী যুবতী সৈন্যাধ্যক্ষ রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌ননের অংশে পড়িলে, তিনি তাহাকে পরম প্রযত্নে ও সমাদরে স্বশিবিরে রাখিতেছেন; এমন সময়ে———

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

[হেক্‌টর এবং সুন্দরবীর স্কন্দর রণভূমে ফিরিয়া আইলে ট্রয়দলের মহানন্দ জন্মিল। পরে হেক্‌টর গ্রীকদলস্থ বীরদিগকে দ্বন্দ্বযুদ্ধার্থে আহ্বান করিলে আয়াস্‌নামক এক দেবাত্মজ বীরবর তাহার সহিত ঘোরতর রণ করিলেক, কিন্তু কাহারও পরাজয় হইল না, উভয়দলে অনেক সৈন্য বিনষ্ট হইলে পরে সন্ধি করিয়া উভয় সৈন্য স্ব স্ব শববৃন্দ শোকবিগলিত নয়নাসারে ধৌত করিয়া ক্ষুণ্ণ হৃদয়ে সর্ব্বগ্রাসী বৈশ্বানরকে বলিস্বরূপ প্রদান করিল। গ্রীকেরা শিবির সম্মুখে এক প্রাচীর রচিত করিয়া তৎসন্নিধানে এক গম্ভীর পরিখা খনন করিল।]

রজনীযোগে লেম্‌নস্‌ দ্বীপ হইতে তত্রস্থ লোকপাল ঈশনপুত্র উনীয়স্‌ প্রেরিত এক সুরাপূর্ণ পোত শিবিরসন্নিধানে সাগরতীরে আসিয়া উতরিলে, গ্রীকযোধেরা কেহবা পিতল, কেহবা উজ্জ্বল লৌহ, কেহবা পশুচর্ম্ম, কেহ বৃষভ, কেহবা রণবন্দী এই সকলের বিনিময়ে সুরা ক্রয় করিয়া সকলে আনন্দে পান করিতে লাগিল। ট্রয়নগরেও এইরূপ আনন্দোৎসব হইল। পরে দীর্ঘকেশী অশ্বদমী ট্রয়স্থ যোধসকল যে যাহার স্থানে বিশ্রাম লাভ করিতে লাগিল। দেবকুলপতির ইচ্ছামতে আকাশ-মণ্ডল সমস্ত রাত্রি উজ্জ্বল হইয়া অশনিস্বনে চারিদিক প্রতিধ্বনিত করিতে লাগিল।

রজনী প্রভাতা হইলে ঊষাদেবী পূর্ব্বাশা হইতে ভগবতী বসুমতীর বরাঙ্গ যেন কুসুমময় পরিধানে পরিহিত করিলেন। অমরাবতীতে দেবসভা হইল। দেবকুলনাথ গম্ভীর স্বরে কহিতে লাগিলেন, হে দেবদেবীবৃন্দ! তোমরা আমার দিকে মনোভিনিবেশ কর। আমার এই ইচ্ছা যে, কি দেবী কি দেব কেহই কি গ্রীক্‌ কি ট্রয় সৈন্যদলের এ রণক্রিয়ায় কোন সাহায্য না করেন। যিনি আমার এ আজ্ঞা অবজ্ঞা করিবেন, আমি তাহাকে বিস্তর শাস্তি দিব, আর তাহাকে এ আলোকময় স্বর্গ হইতে তিমিরময় পাতালে আবদ্ধ করিয়া রাখিব, যদি তোমাদের মধ্যে কেহ আমার রণ পরাক্রমের পরীক্ষা করিতে ইচ্ছা কর, তবে আইস, এক সুবর্ণ শৃঙ্খল ত্রিদিবে উদ্বন্ধন করিয়া তোমরা ত্রিদিবনিবাসী সকল এক দিক ধরিয়া আকর্ষণ করিয়া দেখ, তোমাদিগের সর্ব্বপ্রধান জ্যুস্‌কে স্থলযুক্ত করিতে পারক হও কি না। কিন্তু আমি মনে করিলে তোমাদিগকে সসাগরা সদ্বীপা বসুমতীর সহিত উচ্চে তুলিতে পারি। অতএব আমি তোমাদের মধ্যে বলজ্যেষ্ঠ। অন্যান্য দেবদেবী নিকর দেবেশ্বরের এই গম্ভীর বাক্য সসম্ভ্রমে শ্রবণ করিয়া নীরবে রহিলেন। সুনীলকমলাক্ষী দেবী আথেনী কহিলেন, হে দেবপিতঃ! হে পুরুষোত্তম! আমরা বিলক্ষণ জানি, যে তুমি পরাক্রমে দুর্ব্বার। কিন্তু গ্রীক্‌দলের দুঃখে আমার অন্তঃকরণ সদা চঞ্চল! তথাপি তোমার এ আজ্ঞা অবজ্ঞা করিতে কোন মতেই সাহস করিব না। রণকার্য্যে হস্ত নিক্ষেপ করিব না। কিন্তু এই মিনতি করি, যে তাহাদিগকে হিতকর পরামর্শ দিতে আপনি আমাকে অনুমতি দেন। মেঘ-বাহন সহাস বদনে উত্তর করিলেন, হে প্রিয়দুহিতে! তোমার এ মনোরথ সুসিদ্ধ কর, তাহাতে আমার কোন বাধা নাই।

এই কহিয়া দেবকুলপতি ব্যোমযানে আরোহণ করিলেন। এবং পিতলপদ, কুঞ্চিত-কাঞ্চন-কেশর-মণ্ডিত আশুগতি অশ্বসমূহে পৃথিবী ও তারাময় নভস্থলের মধ্যদিয়া অতিদ্রুতে উৎসময়ী বনচরযোনি ঈডানামক গিরিশিরে উত্তীর্ণ হইলেন। সেস্থলে গার্গর নামে দেবপতির এক সুরম্য উপবন ছিল। সেই স্থলে দেবনাথ ব্যোমযান মায়া-মেঘে আবৃত করিয়া আপনি আসীন হইয়া রণক্ষেত্রের প্রতি দৃষ্টি করিতে লাগিলেন।

বিভাবরী প্রভাতা হইলে দীর্ঘকেশী গ্রীক্‌গণ স্ব স্ব শিবিরে প্রাতঃক্রিয়াদি সমাধা করিয়া ভোজনান্তে রণসজ্জা গ্রহণ করিলেন। ও দিকে ট্রয়নগরের রাজতোরণ উদ্ঘাটিত হইলে, রণব্যগ্র রথারূঢ় পদাতিকগণ হুহুঙ্কারে বহির্গত হইল। দুই সৈন্য পরস্পর নিকটবর্ত্তী হইলে ফলকে ফলকাঘাতে কুন্তে কুন্তাঘাতে ভৈরবারব উদ্ভবিতে লাগিল। কতক্ষণ পরে আর্ত্তনাদ ও প্রগল্‌ভতাসূচক নিনাদে চতুর্দ্দিক পরিপূরিত হইল। এবং ক্ষণমাত্রেই ভূতলে শোণিত-স্রোতঃ বহিতে লাগিল। এইরূপে মধ্যাহ্ন পর্যন্ত মহাহব হইতে লাগিল।

রবিদেব আকাশমণ্ডলের মধ্যবর্ত্তী হইলে দেবকুলপতি সহসা ঈডাগিরি চূড়া হইতে ইরম্মদস্রোতঃ বায়ুপথে মুহুর্মুহু বিস্তৃত করিতে লাগিলেন। ও বজ্রগর্জনে জগজ্জনের হৃৎকম্প উপস্থিত হইল। পাণ্ডুগণ্ড শঙ্কা গ্রীক্‌দিগকে সহসা আক্রমণ করিল। এমন কি, রাজকুলচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌ননাদি বীরকুলচূড়ামণিরাও বীরবীর্য্যে জলাঞ্জলি দিয়া শিবিরাভিমুখে ধাবমান হইলেন। কেবল বৃদ্ধরথী নেস্তর রথের অশ্ব সুন্দরবীর কন্দরনিক্ষিপ্তশরে গতিহীন হওয়াতে পলায়ন করিতে সক্ষম হইলেন না। দূরে সামর্থ্যশালী রথী হেক্‌টরের দ্রুত রথ সৈন্যদল হইতে সহসা বহির্গত হইয়া রণক্ষেত্রাভিমুখে ধাইতেছে, এই দেখিয়া রণবিশারদ দ্যোমিদ বীরবর অদিস্যুস্‌কে ভৈরবে সম্বোধিয়া কহিতে লাগিলেন, কি সর্বনাশ! হে বীরকেশরী, তুমিও কি একজন ভীরুজনের ন্যায় পলায়নপরায়ণ হইলে। ঐ দেখ, কৃতান্তরূপে অরিন্দম হেক্‌টর এদিকে আসিতেছে, আইস, আমরা এ বৃদ্ধবীরকে আপনাদের বক্ষরূপ ফলকে আশ্রয় দিয়া এ বিপদ স্রোত হইতে রক্ষা করি।

বীরবরের এই বাক্য ভয়ঙ্কর কোলাহলে প্রলীন হওয়াতে বীরপ্রবর অদিস্যুসের কর্ণগোচর হইতে পারিল না। বীর প্রবীর শিবিরাভিমুখে চলিতে লাগিলেন। এই দেখিয়া রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ বৃদ্ধবীর নেস্তরের রথাগ্রে উগ্রভাবে গিয়া দাঁড়াইলেন এবং কহিলেন, হে নেস্তর, তোমার বাহুযুগলে কি আর যুবজনের বল আছে, যে তুমি ঐ আগন্তুক রিপুকুল, কৃতান্তকে দেখিয়া এখানে রহিয়াছ, তুমি শীঘ আমার রথে আরোহণ কর।

বৃদ্ধ বীরবর আপন রথ রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদের সারথি দ্বারা সসারথি করিয়া দ্যোমিদের রথে আরোহণ পূর্বক রশ্মিগ্রহণ করিয়া স্বয়ং সে বীরবরের সারথ্যক্রিয়া নির্ব্বাহ করিতে লাগিলেন। রথ অতি শীঘ্র বীরকেশরী হেক্‌টরের রথের নিকট উপস্থিত হইল, এবং রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ কৃতান্তদণ্ড স্বরূপ দণ্ডাঘাতে ট্রয়রাজকুলের নিত্য ভরসা স্বরূপ ভাস্বর কিরীটী হেক্টরের সারথিকে মরণপথের পথিক করিলেন। অতিত্বরায় আর একজন সারথি রাজকুমারের রথারোহণ করিলে, বীরকেশরী ক্ষুণ্ণ ও রোষান্বিত চিত্তে জলদপ্রতিম-স্বনে ঘোরনাদ করিয়া উঠিলেন। এবং তদ্দণ্ডে কুলিশনিক্ষেপী কুলিশী বজ্রাঘাতে রণকোবিদ দ্যোমিদের অশ্বদলকে ভয়াতুর করিলেন। অশুগতি অশ্বদল সভয়ে ভূতলশায়ী হইল। এবং মহাতঙ্কে বৃদ্ধ সারথিবর এতাদৃশ বিহ্বলচিত্ত হইলেন, যে অশ্বরশ্মি তাহার হস্ত হইতে চ্যুত হইল। তখন তিনি গদগদ বচনে কহিলেন, হে দ্যোমিদ্‌! তুমি কি দেখিতে পাইতেছ না, যে বিশ্বপিতা দেবেন্দ্র ঐ দুর্দ্ধর্ষ ধন্বীকে অদ্য সমরে দুর্নিবার করিতে অতীব ইচ্ছুক। অতএব ইহার সহিত এ সময়ে রণরঙ্গে প্রবৃত্তি মতিচ্ছন্ন মাত্র। দ্যোমিদ্‌ কহিলেন, হে তাতঃ, এ সত্য কথা বটে; কিন্তু পলায়ন সাধন দ্বারা এ দুরন্ত হেক্‌টরের আত্মশ্লাঘা বৃদ্ধি করা কোন মতেই আমার মনোনীত নহে। বৃদ্ধবর উত্তর করিলেন, হে দ্যোমিদ্‌! তোমার এ কি কথা! তোমার পরাক্রম পরকুলে সর্ব্ববিদিত, যদ্যপি হেক্‌টর তোমাকে ভীরু ভাবিয়া হেয়জ্ঞান করে, তবে ট্রয়নগরে তোমার হস্তে বীরবৃন্দের বিধবা গৃহিণীদলকে দেখিলে তাহার সে ভ্রান্তি দূরীভূত হইবে।

এই কহিয়া বৃদ্ধরথী শিবিরাভিমুখে রথ পরিচালিত করিতে লাগিলেন। হেক্‌টর গম্ভীর নিনাদে কহিলেন, হে দ্যোমিদ্‌! তুমি কি একজন ভীরু কুলবালার ন্যায় বীর ব্রতে ব্রতী হইতে চাহনা? হে বলীজ্যেষ্ঠ! এই কি তোমার রণব্রতের প্রতিষ্ঠা! বীরবরের এই কথা শুনিয়া রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ রণেচ্ছুক হইয়া ফিরিতে চাহিলেন; কিন্তু ঘনঘনঘটার গর্জ্জনে এবং সৌদামিনীর অবিরত স্ফুরণে ভীত হইয়া সে আশা পরিত্যাগ করিলেন। বীরেশ্বর হেক্‌টর উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, হে ট্রয়স্থ বীরবৃন্দ! আইস! আমরা স্বসাহসে গ্রীকদলের রচিত প্রাচীর আক্রমণ করি, আর মূঢ়দিগকে দেখাই, যে আমাদিগের দুর্নিবার্য্য বীরবীর্য্য ওরূপ অবরোধে রুদ্ধ হইবার নহে, আর আমাদিগের বায়ুপদ অশ্বাবলী ওরূপ পরিখা অতি সহজে লম্ফ দিয়া উল্লঙ্ঘন করিতে পারে। চল, আমরা ত্বরায় যাই। আমার বড় ইচ্ছা যে ঐ স্বর্ণ ফলক, যাহার খ্যাতি জগজ্জন বিদিতা, তাহা কাড়িয়া লই; ও রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদের বিশ্বকর্ম্মার বিনির্ম্মিত কবচও আত্মসাৎ করি। হেক্‌টরের এই প্রলম্ভ বাক্যে ভগবতী হীরী সরোষে যেন সিংহাসনোপরি কম্পমানা হইয়া উঠিলেন। মহাগিরি অলিম্‌পুর ও সে আকস্মিক চালনায় থর থর করিয়া অধীর হইয়া উঠিল। দেবরাণী সংক্রোধে নীরেশ পশ্বেদন্‌কে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে মহাকায় ভূকম্পকারী জলদলপতি! গ্রীক্‌ দলের এ অবস্থা দেখিয়া তোমার কি দয়ার লেশমাত্র হয় না। জলরাজ বরুণ উত্তর করিলেন, হে কর্কশভাষিণী হীরী! তুমি ও কি কহিলে? আমি কি দেবকুলেন্দ্রের সহিত দ্বন্দ্ব করিতে সক্ষম?

দেব দেবীতে এই রূপ কথোপকথন হইতেছে, এমন সময়ে ট্রয়দলস্থ অশ্বাবলী ও ফলকধারীদলে সেনানী স্কন্দরূপী অরিন্দম হেক্‌টর প্রাচীর রূপ অবরোধ ভেদ করিয়া গ্রীক্‌ সৈন্যের শিবিরাবলীতে ও তন্নিকটস্থ সাগরযান সমূহে হুহুঙ্কার নিনাদে অগ্নি প্রদান করিতে উদ্যত হইলেন। এ দুর্ঘটনা দেখিয়া গ্রীক্‌দলহিতৈষিণী বিশালনয়নী দেবীহীরী রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌ননের হৃদয়ে সহসা সাহসাগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া দিলেন। সৈন্যাধ্যক্ষ মহোদয় এক পোতের উচ্চ চূড়ায় দাঁড়াইয়া গম্ভীর স্বরে কহিতে লাগিলেন, হে গ্রীক্‌ যোধদল! এ কি লজ্জার বিষয়! তোমাদের বীরতা কি কেবল তোমাদের মধ্যেই দেদীপ্যমান। তোমরা কি হেক্‌টরকে একলা দেখিয়া, রণপরাঙ্মুখ হইতে চাহ। হে প্রজাপতি দেবকুলেন্দ্র! আপনার চিরসেবায় কি আমার এই ফল লাভ হইল! এরূপ লজ্জারূপ তিমিরে কোন দেশে কোন রাজার কোন কালে গৌরবরবি ম্লান হইয়াছে। হে পিতঃ! তুমি অদ্য এ সেনাকে এ বিষম বিপদ হইতে মুক্ত কর! রাজ চক্রবর্ত্তীর এতাদৃশ করুণারসান্বিত স্তুতিবাক্যে দেবকুলপতির হৃদয়ে করুণারসের সঞ্চার হইল। রাজহৃদয় শান্ত করণবাসনায় দেবরাজ পক্ষিরাজ গরুড়কে একটি মৃগশাবক ক্রমদ্বারা আক্রমণ করাইয়া খমুখে উড়াইলেন। এই সুলক্ষণ লক্ষ্য করিয়া গ্রীক্‌যোধসকল বীরপরাক্রমে হুহুঙ্কার ধনি করতঃ আক্রমিত রিপুদলের সহিত যুঝিতে আরম্ভ করিলেন। উভয়দলের অনেকানেক বীরপুরুষ সমরশায়ী হইল। ভাস্বরকিরীটী বীরেশ্বরের বাহুবলে গ্রীক্‌ সৈন্যমণ্ডলী চতুর্দ্দিকে লণ্ডভণ্ড হইতে লাগিল। বীরকেশরী সর্ব্বভুকের ন্যায় সর্ব্বব্যাপী হইলেন।

শ্বেতভুজা দেবীহীরী প্রিয় পক্ষের এদুর্গতিতে নিতান্ত কাতরা হইয়া দেবী আথেনীকে কহিতে লাগিলেন; হে সখি, হে দেবকুলেন্দ্রদুহিতে! আমরা কি গ্রীক্‌দলকে এ বিপজ্জাল হইতে মুক্ত করিতে যথার্থই অশক্ত হইলাম। ঐ দেখ, রিপুকুলান্ত দুর্দ্দান্ত হেক্‌টর এক শরে অদ্য গ্রীক্‌দলের সর্ব্বনাশ করিল। দেবী অথেনী উত্তরিলেন, এত বড় আশ্চর্য্যের বিষয়, যদ্যপি আমার পিতা দেবপতি ও দুরাত্মার সহায় না হইতেন, তবে ও এতক্ষণ কোথায় থাকিত! কিন্তু আইস! তোমার রথে তোমার বায়ুগতি অশ্ব যোজনা কর! আমি ক্ষণমধ্যে দেবধামে প্রবেশ করিয়া রণবেশ ধারণ করিয়া আসি। দেখি, রণক্ষেত্রে আমাকে দেখিয়া ভাস্বর কিরীটী প্রিয়াম্‌পুত্রের হৃদয়ে কি আনন্দভাবের আবির্ভাব হয়। ভগবতী হীরী মনোরঙ্গে ত্বরিতগতিতে আপন তুরঙ্গম-অঙ্গ রণপরিচ্ছদে আচ্ছাদিত করিলেন।

দেবী আথেনী আপন নিত্য অতীব মনোরম বসন পরি ত্যাগ করিয়া কবচাদি রণভূষণে বিভূষিত হইয়া আগ্নেয় রথে আরোহণ করিলেন। যে ভীষণ শূলদ্বারা দেবী রোষপরবশা হইয়া মহা মহা অক্ষৌহিণীকে রণক্ষেত্রে এক মুহূর্ত্তে ক্ষত বিক্ষত করেন, সেই ভয়গর্ভ শূল দেবীর হস্তে শোভিতে লাগিল, শ্বেতভুজা দেবী হীরী সারথ্য কার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। অমরাবতীর কনক তোরণ আপনাআপনি সহজে খুলিল। নভোমণ্ডলে ভীষণ স্বনে ব্যোমযান ভূতলাভিমুখে ধাইতেছে এমন সময়ে ঈড়া নামক শৃঙ্গধরের তুঙ্গতম শৃঙ্গ হইতে মহাদেব দেবীদ্বয়কে দেখিয়া অতিরোষে গরুত্মতী দেবদূতী ঈরীষাকে কহিলেন, তুমি, হে হৈমবতী দেবদূতি! অতিশীঘ্র ঐ দুটী দুষ্টা কলহপ্রিয়া দেবীকে অমরাবতীতে ফিরিয়া যাইতে কহ। নচেৎ আমি এই দণ্ডে প্রচণ্ড আঘাতে উহাদিগের রথ চূর্ণ করিয়া দিব! এবং বাজীব্রজকে খঞ্জ করিয়া ফেলিব। দেবদূতী দেবদেশে বাত্যাগতিতে চলিলেন। এবং দেবীদ্বয়কে অমরাবতীতে ফিরাইয়া দিলেন। কতক্ষণ পরে দেবকুলেন্দ্র আপন সুচক্র ও সুন্দর স্যন্দনে অলিম্পুষের শিরস্থিত নিত্যানন্দ ভবনে পুনরাগমন করিলেন। এবং আপনার উগ্রচণ্ডা পত্নী দেবী হীরীকে কহিলেন। যতদিন পর্যন্ত রাজ চক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌ বীরচক্রবর্ত্তী আকিলীসের রোষাগ্নি নির্ব্বাণ না করে, ততদিন ভাস্বর কিরীটী হেক্‌টরের নাশক পরাক্রমে গ্রীক্‌দলের এই অনির্ব্বচনীয় দুর্ঘটনা ঘটিবে। অমরাবতীতে এইরূপ কথোপকথন হইতেছে, এমন সময়ে দিননাথ জলনাথের নীলজলে যেন নিমগ্ন হইয়া আপন কাঞ্চন কিরণজাল সম্বরণ করিলেন। রজনী সমাগমে গ্রীক্‌দল আনন্দ সাগরে ভাসিলেন। কিন্তু ট্রয়স্থ বীরবরেরা অসন্তুষ্টচিত্তে রণকার্য্যে পরাঙ্মুখ হইলেন। ভীমশূলপাণি হেক্‌টর উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন; হে বীরবৃন্দ! ভাবিয়াছিলাম, যে অদ্য রণে গ্রীক্‌দলের গৌরবরবিকে চির রাহুগ্রাসে নিপতিত করিব; কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বিরামদায়িনী নিশাদেবী, দেখ, আসিয়া উপস্থিত হইলেন, সুতরাং আমাদিগের এক্ষণে বিরাম লাভেই প্রবৃত্ত হওয়া উচিত। কিন্তু অদ্য এই স্থলেই আমাদের অবস্থিতি। কেহ কেহ নগর হইতে সুখাদ্য পিষ্টকাদি দ্রব্য ও সুপেয় সুরাদি পানীয় দ্রব্য আনয়ন কর, এবং নগরবাসী জনগণকে সাবধানে রজনী যোগে নগর রক্ষার্থে কহ, এবং বাজীরাজীর রথবন্ধন নির্ব্বন্ধন কর, এবং তাহাদিগের খাদ্য দ্রব্য সকল তাহাদিগকে প্রদান কর, দেখি, কোন গ্রীক্‌ যোধ আগামী কল্য আমাদিগের পরাক্রম হইতে নিষ্কৃতি পায়।

বীরবরের এই বাক্যে ট্রয়স্থ যোধনিকর মহানন্দে সিংহনাদ করিল। এবং তাহার বাক্যানুসারে কর্ম্ম করিল। অগ্নিকুণ্ড জ্বালাইয়া রণীগণ রণসাজে শ্রেণীবদ্ধ হইয়া রণভূমিতে বসিল, যেমন অভ্রশূন্য নভোমণ্ডলে নক্ষত্রমণ্ডলী নক্ষত্ররাজের চতুষ্পার্শ্বে দেদীপ্যমান হওতঃ তুঙ্গশৃঙ্গ শৈলসকল ও দূরস্থিত বন উপবন আলোক বর্ষণে দৃশ্যমান করায়, এবং মেষপালদলের আনন্দ উৎপাদন করে, সেইরূপ গ্রীক্‌ শিবির ও স্কন্দস্‌ নদ স্রোতের মধ্যস্থলে ট্রয়দলস্থ অগ্নিকুণ্ড সমূহ শোভিতে লাগিল। এক সহস্র অগ্নিকুণ্ড জ্বলিল। প্রতিকুণ্ডের চতুষ্পার্শ্বে পঞ্চাশৎ রণবিশারদ রণী বিরাজ করিতে লাগিলেন। রণযূথের সন্নিধানে অশ্বাবলী ধবল যব ভক্ষণ করিতে লাগিল, এইরূপে সকলে কনক সিংহাসনাসীনা ঊষার অপেক্ষায় সে রণক্ষেত্রে অপেক্ষা করিতে লাগিল।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ সমাপ্ত।

এ স্থলে ৭/৮ পাত হারাইয়া গিয়াছে, এক্ষণে সময়াভাবে গ্রন্থকার পুনরায় লিখিতে সমর্থ হইলেন না।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

গ্রীক্‌সৈন্যদলের মধ্যে দ্যোমিদ্‌ নামে এক মহাবীর পুরুষ ছিলেন। সুনীলকমলাক্ষী দেবী আথেনী সহসা তাঁহার হৃদয়ে রণগৌরবের লাভেচ্ছা উৎপাদিত করিয়া দিলে বীরকেশরী হুহুঙ্কার ধ্বনি করতঃ রিপুদলাভিমুখে ধাবমান হইলেন। যেমন গ্রীষ্মকালে লুদ্ধক নামক নক্ষত্র সাগরপ্রবাহে দেহ অবগাহন করিয়া আকাশমার্গে উদিত হইলে, তাহার ধক্‌ধক্ কিরণজালে চতুর্দ্দিক প্রজ্বলিত হয়; সেইরূপ দ্যোমিদের শিরক্ষ্ন, ফলক, ও বর্ম্মসম্ভূত বিভারাশি অনিবার বহির্গত হইতে লাগিল।

এ দুর্ধর্ষ ধনুর্দ্ধরকে যোধদলের কালস্বরূপ দেখিয়া দেব বিশ্বকর্ম্মার দারেস নামক এক জন নিতান্ত ভক্তজনের দুইজন রণপ্রিয় পুত্র রথে আরোহণ পূর্ব্বক সিংহনাদে বাহির হইল। জ্যেষ্ঠ বীর রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌কে লক্ষ্য করিয়া সুদীর্ঘাকার শূল নিক্ষেপ করিলেন; কিন্তু অস্ত্র ব্যর্থ হইল। বীরর্ষভ দ্যোমিদ্‌ আপন শূল দ্বারা বিপক্ষের বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিলে, বীরবর সে মহাঘাতে সহসা রথ হইতে ভূতলে পতিত হইয়া কালনিকেতনে আতিথ্য গ্রহণ করিলেন। কনিষ্ঠ ভ্রাতা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার এতাদৃশী দুর্ঘটনায় নিতান্ত ভীত ও হতবুদ্ধি হইয়া সেই সুচারুনির্মিত যান পরিত্যাগ পুরঃসর ভূতলে লম্ফপ্রদান করিয়া অতিদ্রুতে পলায়ন-পরায়ণ হইতেছেন, ইহা দেখিয়া দ্যোমিদ্‌ তাহার পশ্চাতে পশ্চাতে ভীষণ নিনাদ করতঃ ধাবমান হইলেন।

দেব বিশ্বকর্মা ভক্তপুত্রের এই দুরবস্থা দূরীকরণার্থে তাহাকে এক মায়ামেঘে আবৃত করিলেন, সুতরাং সে আর কাহারও দৃষ্টিপথে পড়িল না। ইত্যবসরে দেবী আথেনী, দেবকুলসেনানী আরেসকে টয়সৈন্যদলের উৎসাহ বর্দ্ধনার্থে ব্যগ্রতর দেখিয়া দেবযোধবরকে সম্বোধিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন; আরেস্‌ আরেস্‌, হে জনকুলনিধন! হে রক্তাক্ততাবিলাসি! হে নগর-প্রাচীর-প্রভঞ্জক! এ রণক্ষেত্রে ভাই, আমাদের কি প্রয়োজন? চল, আমরা দুজনে এস্থান হইতে প্রস্থান করি। বিশ্বপতি দেবকুলেন্দ্র, যে দলকে তাঁহার ইচ্ছা হয়, জয়ী করুন। এই কহিয়া দেবী দেবযোধবরের হস্তধারণ পূর্বক রণক্ষেত্র নিকটস্থ স্কামন্দর নামক দলশ্যাম তটে বিশ্রাম-লাভ-বাসনায় বসিলেন। রণস্থলে রণতরঙ্গ ভৈরব রবে বহিতে লাগিল। রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌ প্রভৃতি মহাবিক্রমশালী বীরপুরুষেরা বহুসংখ্যক রিপুকে পরাস্ত করিয়া অকালে যমালয়ে প্রেরণ করিলেন। কিন্তু রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ পরাক্রম ও বাহুবলে সর্ব্বোপরি বিরাজমান হইলেন।

যেমন, কোন নদ পর্বতজাত স্রোতসমূহের সহকারে পুষ্ট-কায় হইয়া প্রবল বলে দৃঢনির্ম্মিত সেতুনিকর অধঃপাত করতঃ বহুবিধ কুসুম ও শস্যময় ক্ষেত্রের আবরণ ভঞ্জন করে, এবং সম্মুখ-পতিত বস্তু সকল স্থানান্তরিত করতঃ দুর্বার গতিতে সাগরমুখে বহিতে থাকে। সেইরূপে রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ মহাপরাক্রমশালী জনগণকে সমরশায়ী করিয়া বিপক্ষপক্ষের ব্যুহে অবার বলে প্রবেশ করিলেন। প্রচণ্ড ধন্বী পণ্ডর্শ রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌কে রণমদে প্রমত্ত দেখিয়া, এ দুর্দ্দান্ত শূলীকে দান্ত করিতে নিতান্ত উৎসুক হইলেন। এবং ভীষণ শরাসনে গুণ যোজনা করিয়া এক তীক্ষ্ণতর শর তদুদ্দেশে নিক্ষেপিলেন। ভীষণ অশনি-সদৃশ বাণ রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদের কবচ-চ্ছেদন করতঃ দক্ষিণকক্ষে প্রবিষ্ট হইলে, সহসা শোণিত নিঃসরণে জ্যোতির্ম্ময় বর্ম্ম বিবর্ণ হইয়া উঠিল। পণ্ডর্শ সহর্ষে চীৎকার করিয়া কহিলেন, হে বীরবৃন্দ! তোমরা উল্লাসিত চিত্তে অগ্রসর হও; কেন না, আমি বোধ করি, গ্রীক্‌দলের বলীশ্রেষ্ঠ যে শূর, সে আমার শরে অদ্য হতপ্রায় হইয়াছে। কিন্তু বীরর্ষভ পণ্ডর্শের এ প্রগল্‌ভ-গর্ভ বাক্য পণ্ড হইল। দেবী আথেনীর কৃপায় রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্ সে যাত্রায় নিস্তার পাইয়া পুনঃ যুদ্ধারম্ভ করিলেন। যেমন ক্ষুধাতুর সিংহ মেষপালকের অস্ত্রাঘাতে নিরস্ত না হইয়া ভীমনাদে লম্ফ দিয়া মেষাশ্রমে প্রবেশ করে, এবং সে স্থলস্থ, ভয়ে জড়ীভূত, অগণ্য মেষসমূহের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা, তাহকেই বধ করে; সেইরূপ রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ বৈরীদলকে নাশিতে লাগিলেন।

ট্রয়নগরস্থ বীরকুলচূড়ামণি এনেশ সৈন্য-মণ্ডলীকে লণ্ডভণ্ড দেখিয়া বীরেশ্বর পণ্ডর্শকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, হে বীরকুলতিলক! তুমি আসিয়া অতি ত্বরায় আমার এই রথে আরোহণ কর। চল, আমরা উভয়ে এই রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌কে রণে মর্দ্দন করিয়া চিরযশস্বী হই। পরে বীরদ্বয় এক রথোপরি আরূঢ় হইলে, বীরেশ এনেশ অশ্বরশ্মি ধারণ করতঃ সারথ্যকার্য্য সমাধা করিতে লাগিলেন। বিচিত্র রথ অতিবেগে চলিল। রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদের স্থিনিল্যুস নামক এক প্রিয়সখা কহিলেন, সখে দ্যোমিদ্‌! সাবধান হও। ঐ দেখ, দুই জন দৃঢ়কল্পী বীরবর এক যানে আরূঢ় হইয়া তোমার নিধন-সাধনার্থে আসিতেছেন। এক জনের নাম বীরকুলপতি পণ্ডর্শ। অপর জন সুধন্য বীর আঙ্কিশের ঔরসে হাস্যপ্রিয়া দেবী অপ্রোদীতীর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করিয়া এনেশাখ্যায় বিখ্যাত হইয়াছেন। অতএব, হে সখে, তোমার এখন কি কর্ত্তব্য, তাহা স্থির কর!

সখাবরের এই কথা শুনিয়া রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ উত্তরিলেন, সখে, অন্য আর কি কর্ত্তব্য! বাহুবলে এ বীরদ্বয়কে শমনভবনের অতিথি করাই কর্ত্তব্য।

বিচিত্র রথ নিকটবর্তী হইলে, পণ্ডর্শ সিংহনাদে রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌কে কহিলেন, হে সাহসাকর রণপ্রিয় দ্যোমিদ্‌! আমার বিদ্যুৎগতি শর তোমাকে যমালয়ে প্রেরণ করিতে অক্ষম হইয়াছে বটে; কিন্তু দেখি, এক্ষণে আমার এ শূল তোমার কোন কুলক্ষণ ঘটাইতে পারে কি না? এই কহিয়া বীরসিংহ দীর্ঘ কুন্ত আস্ফালন করতঃ তাহা নিক্ষেপ করিলেন। অস্ত্র দুর্ম্মদ দ্যোমিদের ফলক ভেদ করিয়া কবচ পর্য্যন্ত প্রবেশ করিল। ইহা দেখিয়া পণ্ডর্শ কহিলেন, হে দ্যোমিদ্‌! নিশ্চয় জানিও, যে এইবার তোমার আসন্ন কাল উপস্থিত। কেন না, আমার শূলে তোমার কলেবর ভিন্ন হইয়াছে। রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ কহিলেন, হে সুধন্বি, এ তোমার ভ্রান্তিমাত্র। তোমার লক্ষ্য ব্যর্থ হইয়াছে। এখন যদি তোমার কোন ক্ষমতা থাকে, তবে তুমি আমার এ শূলাঘাত হইতে আত্মরক্ষা করিবার চেষ্টা পাও। এই কহিয়া বীরবর সুদীর্ঘ শূল পরিত্যাগ করিলেন।

দেবী আথেনীর মায়াবলে ভীষণ অস্ত্র প্রচণ্ড কোদণ্ডধারী পণ্ডর্শের চক্ষুর নিম্নভাগ ভেদ করিয়া চক্ষুর নিমিষে বীরবরের প্রাণ হরণ করিল। বীরবর রথ হইতে ভূতলে পড়িলেন। বহুবিধ রঞ্জনে রঞ্জিত তাহার জ্যোতির্ম্ময় বর্ম্ম ঝন্‌ ঝন্ করিয়া বাজিয়া উঠিল। বীর সখা পণ্ডর্শের এই দুরবস্থা সন্দর্শন করিয়া নরেশ্বর এনেশ তাহার মৃতদেহ রক্ষার্থে ফলক ও শূল গ্রহণ পূর্বক ভূতলে লম্ফ দিয়া পড়িলেন। রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ এক প্রশস্ত প্রস্তরখণ্ড, যাহা অধুনাতন দুইজন বলীয়ান্ পুরুষেও স্থানান্তর করিতে পারে না, অতি সহজে উঠাইয়া এনেশকে লক্ষ্য করিয়া নিক্ষেপ করিলেন। এনেশ বিষমাঘাতে ভগ্নোরু হইয়া রণক্ষেত্রে পড়িলেন। এনেশের শেষাবস্থা উপস্থিত হইবার উপক্রম হইতেছে, এমন সময়ে দেবী অপ্রোদীতী প্রিয়পুত্রের এতাদৃশী দুরবস্থা দর্শন করিয়া হাহাকার ধ্বনি করিতে লাগিলেন, এবং আপনার সুকোমল সুশ্বেত বাহুদ্বয় দ্বারা তাহাকে আলিঙ্গন পূর্ব্বক আপনার রশ্মিশালী পরিচ্ছদে তাহার দেহ আচ্ছাদিত করিয়া ক্ষত পুত্রকে রণভূমি হইতে দূরস্থ করিলেন।

রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ দেবী আথেনীর বরে দিব্য চক্ষুঃ পাইয়াছিলেন, সুতরাং তিনি কোমলঙ্গী দেবী অপ্রোদীতীকে দেখিয়া চিনিতে পারিলেন। এবং তাহার পশ্চাতে ২ ধাবমান হইয়া মহারোষভরে তাহার সুকোমল হস্ত তীক্ষ্ণাগ্র শূল দ্বারা বিন্ধন করিলেন, এবং কহিলেন, হে দেবপতি-দুহিতে! তুমি এ রণস্থলে কি নিমিত্ত আসিয়াছিলে? রণরঙ্গ তোমার রঙ্গ নহে। অবলা সরলা বালাকুলকে কুলের বাহির করাই তোমার উপযুক্ত রঙ্গ! অতএব তোমার এ স্থানে আসা ভাল হয় নাই। তুমি এ স্থান হইতে প্রস্থান কর।

বিষমাঘাতে ব্যথিত হইয়া দেবী পুত্রবরকে ভূতলে নিক্ষেপ করিলে, বিভাবসু রবিদেব বীরেশ এনেশকে অসহায় দেখিয়া তাহার প্রাণ রক্ষার্থে তাহাকে এমত এক ঘন ঘন দ্বারা আবৃত করিলেন, যে কেহই তাহাকে দেখিতে পাইল না এবং কোন দ্রুতগামী অশ্বারোহী গ্রীক আসিয়াও তাহার প্রাণ বিনষ্ট করিতে সমর্থ হইল না। দ্রুতগামিনী দেবদূতী ঈরীশা দেবী অপ্রোদীতীর হস্ত ধারণ করিয়া তাহাকে সৈন্যদলের বাহিরে লইয়া গেলেন। সুর-সুন্দরীর নয়ন-রঞ্জন বর্ণ বিবর্ণ হইয়া উঠিল। রণক্ষেত্রের সন্নিধানে দেবকুল-সেনানী আরেস স্কামন্দর নদ-তীরে আপন অশ্ব ও অস্ত্রজাল মায়াঅন্ধকারে অন্ধকারাবৃত করিয়া স্বয়ং সে সুদেশে বসিয়াছিলেন, ক্ষতার্ত্তা দেবী অপ্রোদীতী ভূতলে জানুদ্বয় নিপাতিত করিয়া দেবসেনানীকে কাতর বচনে কহিলেন; হে ভ্রাতঃ! যদি তুমি তোমার এ ক্লিষ্টা ভগিনীকে তোমার ঐ দ্রুতগতি রথ খানি দাও, তাহা হইলে সে তৎসহকারে অতি ত্বরায় অমরাবতীতে উত্তীর্ণ হইতে পারে। দেখ, নিষ্ঠুর দুর্দ্দান্ত রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ শূলাঘাতে আমাকে বিকলা করিয়াছে।

দেবসেনানী ভগিনীর এতাদৃশী প্রার্থনায় প্রার্থনাদ হইলে, দেবদূতী ঈরীশা তৎক্ষণাৎ আস্তে ব্যস্তে ক্ষতা দেবী অপ্রোদীতীকে সঙ্গে লইয়া উভয়ে এক রথারোহণে অমরাবতীতে চলিলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া পরিহাসপ্রিয়া স্বজননী দেবী দ্যোনীর পদতলে কাঁদিয়া কহিলেন, হে জননি! দেখুন, রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ আমাকে কি যন্ত্রণা না দিয়াছে। হায়, মাতঃ! আমি প্রিয়পুত্র এনেশের রক্ষার্থে কুক্ষণে রণক্ষেত্রে পদার্পণ করিয়াছিলাম, তাহা না হইলে আমাকে এ ক্লেশভোগ করিতে হইত না। দেবী দ্যোনী দুহিতার অসহ্য বেদনার উপশম করণ মানসে নানা উপায় করিতে লাগিলেন।

তদনন্তর দেবকুলেন্দ্র হেমাঙ্গিনী অঙ্গনাকুলারাধ্যাকে সুহাস্য বদনে কহিলেন, হে বৎসে! এতাদৃশ কর্ম্ম তোমার শোভা পায় না। রণকর্ম্ম তোমার ধর্ম্ম নহে। স্ত্রীপুরুষকে প্রেমশৃঙ্খলে আবদ্ধ করা, এবং শুভ বিবাহে দম্পতীদলকে সুখসাগরে মগ্ন করা, এই সকল ক্রিয়াই তোমার প্রকৃতক্রিয়া বটে! কিন্তু ক্রূর সগ্রাম-সংক্রান্ত কর্ম্মে তোমার ও কোমল হস্তক্ষেপ করা কখনই উচিত নহে। সে সকল কর্ম্মে সেনানী আরেস ও রণপ্রিয়া আথেনী নিযুক্ত থাকুক। অমরাবতীতে এইরূপ কথোপকথন হইতে লাগিল। মর্ত্তে রণক্ষেত্রে রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ বিভাবসু রবিদেবকে অবহেলা করিয়া বীরেশ এনেশ্‌কে মারিতে চলিলেন। ইহা দেখিয়া দিনপতি পরুষ বচনে কহিলেন, রে মূঢ়! তুই কি অমর মরকে তুল্য জ্ঞান করিস্‌? রণ-দুর্ম্মদ্‌ দ্যোমিদ্‌ রোষপরবশ দেখিয়া শঙ্কাকুলচিত্তে পশ্চাদ্গামী হইলে, গ্রহকুলেন্দ্র জ্ঞানশূন্য এনেশ্‌কে অনতিদূরে স্বমন্দিরে রাখিলেন। তথায় দুই জন দেবী আবিভূর্তা হইয়া বীরেশের শুশ্রূষাদি করিতে লাগিলেন। এদিকে রবিদেব মায়াকুহকে বীরেশ এনেশের রূপ ধারণ করিয়া রণস্থলে রণিতে লাগিলেন। সেনানী আরেসও ট্রয় নগরস্থ সেনাদলকে যুদ্ধার্থে উৎসাহ প্রদানিতে প্রবৃত্ত হইলেন।

ইতিমধ্যে দেবীদ্বয়ের শুশ্রূষায় বীরেশ্বর এনেশ কিঞ্চিৎ সুস্থতা ও সবলতা লাভ করিয়া পুনরায় রণক্ষেত্রে উপস্থিত হইলেন, এবং অনেকানেক বিপক্ষপক্ষ রথীদলকে ভূতলশায়ী করিলেন। বীরচূড়ামণি হেক্টর সর্পীদন নামক বীরের পরামর্শে রণস্থলে পুনঃ দৃশ্যমান হইলেন। ট্রয় নগরস্থ সেনা বীরবরের শুভাগমনে যেন পুনর্জ্জীবন পাইয়া মহাকোলাহলে শত্রুদলকে আক্রমণ করিল। গ্রীক্‌দল রিপুদলপাদোত্থিত ধূলায় ধূষরিত হইয়া উঠিল। বীরচুড়ামণি হেক্টর সিংহনাদ করতঃ সসৈন্যে যুদ্ধারম্ভ করিলেন। সেনানী আরেস্‌ ও উগ্রচণ্ডা দেবী বেলোনা বীরবরের সহায় হইলেন। সেনানী স্কন্দ কখন বা অরিন্দমের অগ্রে কখন বা পশ্চাতে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ বীরচুড়ামণি হেক্টরের পরাক্রমে ভয়াক্রান্ত হইয়া অপসৃত হইলেন। যেমন কোন পথিক তমোময়ী নিশাতে কোন অজ্ঞাত পথে যাইতে যাইতে সহসা শ্রুত, বর্ষার প্রসাদে মহাকায়, কোন নদ্‌স্রোতের গম্ভীর নিনাদে ভীত হইয়া পুরোগতিতে বিরত হয়, দ্যোমিদেরও অবিকল সেই দশা ঘটিয়া উঠিল। তিনি বীরদলকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে বীরপুরুষগণ! আমার বোধ হয়, যে কোন দেব যেন বীরচুড়ামণি হেক্টরের সহকারিতা করিতেছেন, নতুবা বীরবর রণে এরূপ দুর্ব্বার হইয়া উঠিবেন কেন? মরামরে সমর সাম্প্রত নহে। অতএব এই রণে ভঙ্গ দেওয়া আমাদের উচিত।

বীরবরের এই বাক্য শ্রবণে এবং ভাস্বর-কিরীটী বীরেশ্বর হেক্টরের নশ্বরাঘাতে বীরবৃন্দ রণরঙ্গে ভঙ্গ দিতে উদ্যত হইতেছে; এমত সময়ে শ্বেতভুজা ইন্দ্রাণী হীরী দেবী আথেনীকে সম্বোধিয়া কহিলেন, হে সখি! আমরা মহেষ্বাস মানিলুসের সকাশে কি বৃথা অঙ্গীকারে আবদ্ধ হইয়াছি। দেখ, শোণিত-প্রিয় দেব-সেনানী অরিন্দম হেক্টরের সহকারে কত শত গ্রীক্‌ বীরেন্দ্রকে চিরনিদ্রায় নিদ্রিত ও চির-অন্ধকারে অন্ধকারাবৃত করিতেছেন। হে সখি, চল, আমরা দুজনে এই রণস্থলে অবতীর্ণ হইয়া দেখি, যদি আমরা এ দুরন্ত দেবসেনানীকে কোনপ্রকারে শান্ত করিয়া এ নরান্তক হেক্টরের বলের ত্রুটি করিতে পারি।

এই কহিয়া আয়তলোচনা দেবী আপন আশুগতি বাজীরাজিকে স্বর্ণ রণসজ্জায় সজ্জিত করিলেন। দেবকিঙ্করী হীবী হৈমময় দেবযান যোজনা করিয়া দিলেন। দেবীদ্বয় তদুপরি রণবেশে আরূঢ় হইলেন। অমরাবতীর হৈমদ্বার সুমধুর ধ্বনিতে খুলিল। বিমান নভঃস্থল হইতে আশুগতিতে ধরণীর দিকে আসিতে লাগিল। রণস্থলের নিকটবর্তী কোন এক নদতটে দেবযান মায়ামেঘে আবৃত করিয়া ভীমাকৃতি দেবীদ্বয় ভীম সিংহনাদে প্রচণ্ড খণ্ডা আস্ফালন করতঃ রণস্থলে প্রবেশ করিলেন। গ্রীক্‌দলের সাহসাগ্নি পুনর্ব্বার যেন দুর্ব্বার হুতাশন-তেজে প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল। দেবেন্দ্রাণী হীরীও প্রবলভাষী প্রশস্তান্তঃকরণ স্তন্তুরনামক কোন এক জন বীরের প্রতিমূর্ত্তি ধারণ করিয়া হুহুঙ্কার ধ্বনিতে গ্রীকদলের উৎসাহ বৃদ্ধি করিতে লাগিলেন। সুনীলকমলাক্ষী দেবী আথেনী রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদের সারথিকে অপদস্থ করিয়া তৎপদে স্বয়ং আরোহণ করিলেন। মহাভরে চক্রদ্বয় যেন আর্তনাদস্বরূপ ঘোর ঘর্ঘরনাদে ঘুরিতে লাগিল। দেবী স্বয়ং অশ্বরজ্জু ও কশা ধারণ পূর্ব্বক রক্তাক্ত সেনানীর দিকে অতি দ্রুত বেগে রথ পরিচালনা করিলেন। সুরসেনানী দুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌কে আসিতে দেখিয়া আপন রথ ভীষণ বেগে পরিচালিত করতঃ ভীষণ শূল দ্বারা নর-রিপুকে শমনধামে প্রেরণ করিবার জন্যে বাহু প্রসারণ করিয়া ভীষণ শূল দৃঢতররূপে ধারণ করিলেন। কিন্তু মায়াময়ী দেবী আথেনী অদৃশ্যভাবে সে শূলের লক্ষ্য ক্ষণমাত্রে আমোদ করিয়া দিলেন। রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ দুর্দ্ধর্ষ আরেসকে আপন শূল দিয়া আক্রমণ করিলে, দেবী আথেনী স্ববলে ঐ অস্ত্র দ্বারা সুর-সেনানীর উদর তলে ভীমাঘাত করিলেন। দেববীরেন্দ্র বিষম যাতনায় গম্ভীর আর্তনাদ করিলেন। যেমন রণমদে প্রমত্ত নয় কি দশ সহস্র রথীদল একত্রীভূত হইয়া হুহুঙ্কারিলে চতুর্দ্দিকে ভৈরবারবে পরিপূর্ণ হয়, বীরেন্দ্রের আর্তনাদে অবিকল সেইরূপ হইল।

শঙ্কা দেবী সহসা উভয় দলের মধ্যে দর্শন দিলেন। যেমন গ্রীষ্মকালে বাত্যারম্ভে মেঘগ্রামের একত্র সমাগমে আকাশমণ্ডল ঝটিত অন্ধকারময় হয়; সেইরূপ ভয়জনক মালিন্যে মলিন বদন হইয়া নিত্য রণপ্রিয় সুররথী অমরাবতীতে চলিলেন।

দেবেন্দ্রের সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া দেব বীরকেশরী নিবেদিলেন, হে বিশ্বপিতঃ! দেখুন, আপনি কেমন একটী উন্মত্তা ও পাষাণ-হৃদয়া দুহিতার সৃষ্টি করিয়াছেন। দেবী আথেনীর উৎসাহ সহকারে রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ আমার কি দুরবস্থা না করিয়াছে? এই বাক্যে দেবপতি উত্তর করিলেন, রে দুরন্ত নিত্যকলহপ্রিয় দেব কুলাঙ্গার! তুই অন্যের উপর কোন্ মুখ দিয়া অভিযোগ ও দোষারোপ করিস্! তুই তোর গর্ভধারিণী হীরীর খর ও অনমনশীল স্বভাব প্রাপ্ত হইইয়াছিস! সে এত দূর অদমনীয়া, যে আমিও তাহাকে দমন করিতে অক্ষম। সে যাহাহউক, তুই আমার ঔরসজাত, নতুবা আমি উরানুসপুত্র দৈত্যদলের সহিত তোকে এইমুহূর্তেই চিরকালের নিমিত্ত কারাগারে আবদ্ধ করিতাম। এই কহিয়া দেবকুলপতি দেবধন্বন্তরী পায়ন্‌কে যথাবিধি ঔষধে ক্ষত সেনানীকে আরোগ্য করিতে আজ্ঞা দিলেন।

রণস্থল হইতে দেবসেনানীকে পলায়মান দেখিয়া জননী অতীব বীর্য্যবতী দেবী হীরী মহাবলবতী সহকারিণী দেবী আথেনীর সহিত স্বর্গধামে পুনর্গমন করিলেন। তদনন্তর ক্রমে ক্রমে বীরকুলের পরাক্রমাগ্নি রণস্থলে যেন নিস্তেজ হইতে লাগিল। কিন্তু ইতস্ততঃ সে পরাক্রমাগ্নি যৎকিঞ্চিৎ প্রজ্বলিত রহিল।

এমত সময়ে কোন এক ট্রয়স্থ বীরবর দুর্ভাগ্যক্রমে স্কন্দপ্রিয় বীরেশ মানিল্যুসের হস্তে পড়িলেন। ভাগ্যহীন বীরবরের অশ্বদয় সচকিতে রথসহ ধাবমান হইলে পর, রথচক্র পথস্থিত কোন এক বৃক্ষের আঘাতে ভগ্ন হইলে, বীরবর লম্ফ দিয়া ভূতলে পড়িলেন। এ দুরবস্থায় নিরস্ত্র হইয়া ভগ্নরথ রথী কালদণ্ডধারী কালের ন্যায় প্রচণ্ড শূলী রণপ্রিয় বীরসিংহ মানিল্যুস্‌কে সকাশে দণ্ডায়মান দেখিলেন, এবং সভয়ে তাহার জানুদ্বয় গ্রহণ করতঃ বিনীত বচনে কহিলেন, হে বীরকুলহর্ষ্যক্ষ! আপনি আমাকে প্রাণ দান দিউন। আমি যে আপনার বন্দী হইয়া এ মানবলীলাস্থলে জীবিত আছি, আমার ধনাঢ্য পিতা এ সুসম্বাদ পাইলে বহুবিধ ধনে আমার মোচনক্রিয়া সমাধা করিতে সযত্ন হইবেন। রিপুবরের এতাদৃশী কাতরতায় বীরকেশরী মানিল্যুসের হৃদয়ে করুণার সঞ্চার হইল। তিনি তাহার রক্ষার উপায় করিতেছেন, এমত সময়ে রাজচক্রবর্তী আগেমেম্‌নন্‌ আরক্ত নয়নে অগ্রগামী হইয়া পরুষ বচনে কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, হে কোমল-হৃদয়! ট্রয়স্থ লোকদিগের হস্তে তুমি কি এত দূর পর্য্যন্ত উপকৃত হইয়াছ যে, তোমার অন্তঃকরণ এখনও তাহাদিগের প্রতি দয়ার্দ্র। দেখ ভাই! আমার বিবেচনায়, ও পাপনগরের আবাল বৃদ্ধ বনিতা, কি উদরস্থ শিশু, যাহাকে পাও, তাহাকেই যমালয়ে প্রেরণ করা তোমার পক্ষে শ্রেয়। সহোদরের এই ব্যঙ্গরূপ নিদাঘে বীরবর মানিল্যুসের হৃৎসরোবরস্থ করুণারূপ মুকুলিত কমল শুষ্ক হইল। তিনি হতভাগা অদ্রুস্তুস্‌কে ভ্রাতৃ সন্নিধানে ঠেলিয়া ফেলিয়া দিলে, নিষ্ঠুর জ্যেষ্ঠভ্রাতা তাহার উদরদেশ খরশুলে ভিন্ন করিলেন। অদ্রুস্তুস্‌ ভীমার্ত্তনাদে ভুপতিত হইলেন। রাজচক্রবর্তী সৈন্যাধ্যক্ষ মহোদয় তাহার বক্ষঃস্থলে পদ নিক্ষেপ করিয়া স্ববলে শূল টানিয়া বাহির করিলেন। ক্লিব বিভাবরী অভাগা অদ্রুস্তুসের নয়নরশ্মি চিরকালের নিমিত্ত অন্ধকারাবৃত করিল। এবং বীরবরের দেহাগার হইতে অকালমুক্ত আত্মা বিষণ্ণবদনে যমালয়ে চলিল। গ্রীক্‌ সৈন্যদল মধ্যে যেন পুনরুত্তেজিত অগ্নির ন্যায় রণাগ্নি প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদের পরাক্রমে ট্রয়দল রণপরাঙ্মুখতার লক্ষণ প্রদর্শন করাইতে লাগিল। এতদ্দর্শনে রাজকুলপতি প্রিয়ামের সুবিজ্ঞ দৈবজ্ঞ পুত্র হেলেন্যুস্‌ ভাস্বর-কিরীটী বীরেশ্বর হেক্‌টর ও বীরেশ এনেশকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে বীরদ্বয়, তোমরা রণপরাঙ্মুখ সৈন্যদলকে পুনরুৎসাহান্বিত কর। কেন না, তোমরা এ দলের বীরকুলশ্রেষ্ঠ! পরে যোধগণ দৃঢ়চিত্তে ও অধ্যবসায় সহকারে রণারম্ভ করিলে, তুমি, হে ভ্রাতঃ হেক্‌টর, নগরান্তরে প্রবেশ করতঃ আমাদিগের রাজ-জননীর চরণতলে এই নিবেদন করিও, যে তিনি যেন অতি ত্বরায় ট্রয়স্থ বৃদ্ধা কুলবধূ দলের মধ্যে সুকেশিনী মহাদেবী আথেনীর দুর্গশিরস্থিত মন্দিরে উপস্থিত হইয়া বহুবিধ উপহারে তাঁহার আরাধনা করিয়া এই বর মাগেন যে, দেবকুলেন্দ্র-বালা যেন এ রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদের হস্ত হইতে আমাদিগকে রক্ষা করেন। আমার বিবেচনায় এ রথীপতি দেবযোনি আকিলীসের অপেক্ষাও পরাক্রমশালী। ভ্রাতারা এই হিতকর বাক্য শ্রবণে ভাস্বর-কিরীটী বীরেশ্বর হেক্‌টর রথ হইতে লম্ফ দিয়া ভূতলে পড়িলেন। এবং স্বীয় ভীষণ দীর্ঘ-ছায় শত্রুঘ্ন শূল আন্দোলন করতঃ হুহুঙ্কার ধ্বনিতে রণক্ষেত্র পরিপূর্ণ করিলেন। গ্রীক্‌ সৈন্যদল বীরবরের এতাদৃশী অকুতোভয়তা সন্দর্শনে পলায়ন-পরায়ণ হইয়া পরস্পর কহিতে লাগিল, এ রথী কি মানবযোনি না নরমণ্ডলে নক্ষত্রমণ্ডিত আকাশমণ্ডল হইতে দেবতার?

এদিকে অরিন্দম ট্রয়কুলবীরেন্দ্র আপনাদের স্বদলকে পুনরুৎসাহ প্রদান পূর্ব্বক সুন্দর স্যন্দনে আশুগতি অশ্বযোজনা করিয়া নগরাভিমুখে প্রয়াণ করিলেন। কতক্ষণ পরে বীরকেশরী স্কিয়ান্‌-নামক নগর তোরণসম্মুখে উপস্থিত হইলেন। অমনি চতুর্দ্দিক হইতে কুলবালা কুলবধূ ও কুলজননীগণ বহির্গত হইয়া সুমধুর স্বরে, কেহবা ভ্রাতা, কেহবা প্রণয়ী জন, কেহবা স্বামী, কেহবা পুত্র, এই সকলের কুশলবার্ত্তা অতীব বিকল হৃদয়ে জিজ্ঞাসিতে লাগিলেন। কিন্তু বীরপতি তাহাদিগকে এই কহিয়া বিদায় করিলেন, যে তোমরা এ সকল প্রিয়পাত্রের মঙ্গলার্থে মঙ্গলকারী দেবদলের আরাধনা কর। কেননা, অনেকের দুর্ভাগ্য আসন্ন প্রায়, এই কহিয়া রাজপুত্র অতিদ্রুত গমনে রাজ-অট্টালিকার নিকটবর্তী হইলেন। রাজরাণী হেকাবী রাজা প্রিয়ামের রাজহর্ম্ম্য হইতে পুত্রকুলোত্তম বীরবর হেক্‌টরকে দর্শন করিয়া তৎসন্নিধানে উপস্থিত হইলেন, এবং স্নেহার্দ্র হইয়া তাহার করগ্রহণপূর্ব্বক কহিলেন, বৎস! তুই কি নিমিত্ত রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করিয়া নগর মধ্যে আসিয়াছিস্‌। তুই কি এ জঘন্য রিপুদলের জিঘাংসায় দেবপিতা দেবেন্দ্রকে দুর্গস্থিত মন্দিরে বন্দিতে আসিয়াছিস্‌, তুই কিয়ৎকাল এখানে অবস্থিতি কর। এই দেখ, আমি স্বর্ণপাত্রে করিয়া প্রসন্নকারক দ্রাক্ষারস আনিয়াছি। তুই আপনি তার কিঞ্চিদংশ পান কর, কেননা, ক্লান্ত জনের ক্লান্তিহরণার্থে সুধারূপ সুরাই পরম ঔষধ। আর কিঞ্চিদংশ দেবকুলপতির তর্পণার্থে ভূমিতে ঢালিয়া দে, ভাস্বর-কিরীটী রণীকুলেশ্বর হেক্‌টর উত্তর করিলেন, হে জননি! তুমি আমাকে সুরাপান করিতে অনুরোধ করিও না। কেননা, তাহার মাদকতা শক্তি আছে, হয়ত, তাহার তেজে বাহুবলের অনেক অনিষ্ট হইতে পারিবে, আর আমি, হে ভগবতি! এ অপবিত্র রক্তাক্ত হস্ত দিয়া পাত্রগ্রহণ করতঃ দেবেন্দ্রের তর্পণার্থে সুরা ঢালিয়া দি, ইহা কোন মতেই যুক্তিযুক্ত নহে। এই উদ্দেশেই নগর প্রবেশ করি নাই। আমি তোমার নিকট এই যাচ্ঞা করিতেছি, যে তুমি, হে রাজমাতঃ, অবিলম্বে ট্রয়স্থ বৃদ্ধা অতি মাননীয়া কুলবধূদলের সহিত দুর্গশিরস্থ সুকেশিনী মহাদেবী আথেনীর মন্দিরে গিয়া নানাবিধ উপহারে দেবীর পূজা করিয়া এই বর প্রার্থনা কর, যে তিনি যেন রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদের পরিক্রমাগ্নি হইতে আমাদিগকে রক্ষা করেন। আমি ইত্যবসরে একবার স্কন্দরের সুন্দর মন্দিরে যাই, দেখি, যদি সে ভীরু কাপুরুষের হৃদয়ে রণপ্রবৃত্তি জন্মাইতে পারি, হায়, মাতঃ! তুমি যখন এ কুলাঙ্গারকে প্রসব করিয়াছিলে তখন বসুমতী দ্বিধা হইয়া কেন তাহাকে গ্রাস করেন নাই। তাহা হইলে কখনই এ বিপুল রাজকুলের এতাদৃশী দুর্গতি ঘটিত না। রাজ কুলতিলক এই কহিলে, দেবী হেকাবী দ্রুতগতিতে আপন সুগন্ধময় মন্দির হইতে বহুবিধ পূজোপহারের আয়োজন করিলেন। এবং দূতীদ্বারা বৃদ্ধা ও মান্যা কুলবতীদলকে আহ্বান করতঃ মহাদেবীর মন্দিরাভিমুখে চলিলেন। তেয়ানীনাম্নী কিসীশনামক কোন এক মাননীয় ব্যক্তির ইক্ষুনিভাননা দুহিতা, যিনি মহাদেবীর নিত্য সেবিকা ছিলেন, মন্দির-দ্বার উদ্‌ঘাটন করিলে রমণীদল ক্রন্দনধ্বনিতে মন্দির পরিপূর্ণ করিলেন। এবং মনে মনে নানা মানসিক করিয়া এই বর প্রার্থনা করিলেন, যে দেবকুলেন্দ্রবালা রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদের এবং অন্যান্য গ্রীক্‌যোধের বাহুবল দুর্ব্বল করিয়া ট্রয়নগরস্থ কুলবধূ ও শিশুকুলের মান ও প্রাণ রক্ষা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ সুকেশিনী মহাদেবী এ বর প্রদানে বিমুখ হইলেন।

এদিকে অরিন্দম হেক্‌টর সুন্দরবীর স্কন্দরের বিচিত্র পাষাণ-নির্ম্মিত সুন্দর মন্দিরে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, যে বিলাসী আপন সুচারু বর্ম্ম, ফলক, ও অস্ত্র শস্ত্র প্রভৃতি রণপরিচ্ছদ সকল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করিতেছেন। বীরবর হেক্‌টর তাহাকে পরুষ বচনে ভর্ৎসনা করিয়া কহিতে লাগিলেন, রে দুরাচার দুর্ম্মতি! তোর নিমিত্তে শত শত লোক শোণিত প্রবাহে রণভূমি প্লাবিত করিতেছে। আর তুই এখানে এরূপ নিশ্চিন্ত অবস্থায় বিশ্রাম লাভ করিতেছিস্‌। হায়, তোরে ধিক্!

দেবাকৃতি সুন্দরবীর স্কন্দর ভ্রাতার এতাদৃশ বচন বিন্যাসে উত্তরিলেন, হে ভ্রাতঃ! তোমার এ তিরস্কারবাক্য অনুপযুক্ত নহে। সে যাহা হউক, তুমি ক্ষণকাল এখানে অপেক্ষা কর, আমাকে রণসজ্জায় সজ্জিত হইতে দাও। নতুবা তুমি অগ্রগামী হও। আমি অতি ত্বরায় তোমার অনুসরণ করিব। এই কথায় বীরবর হেক্‌টর কোন উত্তর না করাতে হেলেনী রূপসী অতি সুমধুর ভাবে কহিলেন, হে দেবর! এ অভাগিনীর কি কুক্ষণে জন্ম; দেখুন, আমি সতীধর্ম্মে ও কুললজ্জায় জলাঞ্জলি দিয়া কেমন ভীরুচিত্ত জনকে বরণ করিয়াছি। আমার কি দুর্ভাগ্য! কিন্তু ও আক্ষেপ এক্ষণে বৃথা। আপনি অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া আসন পরিগ্রহ পূর্ব্বক কিয়ৎকালের নিমিত্ত বিশ্রাম লাত করুন। হেক্‌টর কহিলেন, হে ভদ্রে! আমার বিরহে দূররণক্ষেত্রে রণীবৃন্দ অতীব কাতর, অতএব আমি এস্থলে আর বিলম্ব করিতে পারি না। কেননা, আমার এই ইচ্ছা, যে আমি পুনঃ রণযাত্রার অগ্রে একবার স্বগৃহে প্রবেশ করিয়া প্রিয়তমা পত্নী, শিশু-সন্তানটী ও তাহাদের সেবানিযুক্ত সেবক-সেবিকাদিগকে দেখিয়া যাই। কে জানে, যে আমি এই রণভুমি হইতে আর পুনরাবর্ত্তন করিতে পারিব কি না। এই বলিয়া ভাস্বর-কিরীটী হেক্‌টর দ্রুত গতিতে স্বধামে চলিলেন। এবং গৃহে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, যে শ্বেতভুজা অন্ধ্রমোকী সে স্থলে অনুপস্থিত, শুনিলেন, যে রণে গ্রীকদলের জয়লাভ হইতেছে, এই সম্বাদে প্রিয়ম্বদা আপন শিশু সন্তানটী লইয়া তাহার সুবেশিনী দাসীর সমভিব্যাহারে রণক্ষেত্র-দর্শনাভিপ্রায়ে যাত্রা করিয়াছেন। এই বার্তা শ্রবণমাত্র বীরকেশরী বাগ্রচিত্তে তদভিমুখে বায়ুবেগে চলিলেন। অনতিদূরে অরিন্দম, চিরানন্দ ভার্য্যার সাক্ষাৎকার লাভ করিলেন, এবং দাসীর ক্রোড়ে আপনার শিশুসন্তানটাকে দেখিয়া ওষ্ঠাধর স্নেহাহ্লাদে সুহাসাবৃত হইয়া উঠিল। কিন্তু অন্ধ্রমোকী স্বামীর স্কন্ধে মস্তক রাখিয়া রোদন করিতে করিতে গদ্গদস্বরে কহিতে লাগিলেন, হায় প্রাণনাথ! আমি দেখিতেছি, এই বীরবীর্য্যই তোমার কাল হইবে, রণমদে উন্মত্ত হইলে এ অভাগিনী কিম্বা তোমার এ অনাথ শিশু-সন্তানটী, আমরা কেহই কি তোমার স্মরণ পথে স্থান পাই না। হায়! তুমি কি জাননা, যে আমাদর কুলরিপুদলের যোধবর্গ তোমার নিধনসাধনে নিরবধি ব্যগ্র? আর যদি তাহাদের এতাদৃশ মনস্কামনা ফলবতী হয়, তবে আমাদের উভয়ের যৎপরোনাস্তি দুর্দশা ঘটিবে। বরঞ্চ ভগবতী বসুমতী এই করুন যে, তিনি যেন এ বিষম বিপদ উপস্থিত হইবার পূর্বেই দ্বিধা হইয়া এ হতভাগিনীকে আশ্রয় দেন। হে নাথ! তোমার অভাবে এ ধরণীতলে এ অভাগিনীর ভাগ্যে কি কোন সুখভোগ সম্ভবে। তোমা ব্যতীত, হে প্রাণেশ্বর! আমার আর কে আছে? জনক, জননী, সহোদর সকলেই এ হতভাগিনীর ভাগ্যদোষে কালগ্রাসে পতিত হইয়াছেন, হে নাথ! তোমা বিহনে আমি যথার্থই অনাথা কাঙ্গালিনী হইব। তুমি আমার জীবন সর্বস্ব! তুমি আমার প্রেমাকর। অতএব আমি তোমাকে এই মিনতি করিতেছি, যে তুমি তোমার এই শিশু-সন্তানটীকে পিতৃহীন, আর এ অভাগিনীকে ভর্ত্তৃহীনা করিও না। রিপুদলের সহিত নগর-তোরণ-সম্মুখে যুদ্ধ কর, তাহা হইলে রণ-পরাজয়কালে পলায়ন করা অতি সহজ হইবে। ভাস্বর কিরীটী মহাবাহু হেক্‌টর উত্তরিলেন, প্রাণেশ্বরি! তুমি কি ভাব, যে এ সকল দুর্ভাবনায় আমারও হৃদয় বিদীর্ণ হয় না। কিন্তু কি করি, যদি আমি কোন ভীরুতার লক্ষণ দেখাই, তাহা হইলে বিপক্ষদলের আর আস্পর্দ্ধার সীমা থাকিবে না। এবং আমাদেরও বিলক্ষণ ব্যাঘাতেরও সম্ভাবনা, তাহা হইলেই এই ট্রয়স্থ পুরুষ ও সুবেশিনী স্ত্রীদের নিকট আমি আর কি করিয়া মুখ দেখাইব। বিশেষতঃ যদি আমি বিপদের সময়ে উপস্থিত না থাকি, তাহা হইলে আমাদের এ বিপুল কুলের গৌরব ও মান কিসে রক্ষা হইবে। প্রিয়ে, আমি বিলক্ষণ জানি, যে রিপুকুল রণজয়ী হইয়া অতি অল্পদিনের মধ্যেই এ উচ্চ প্রাচীর নগর ভস্মসাৎ করিবে, এবং রাজকুলতিলক প্রিয়াম্‌ তাহার রণবিশারদ জনগণের সহিত কালগ্রাসে পতিত হইবেন। কিন্তু রাজকুলেন্দ্র প্রিয়াম্‌ কি রাজকুলেন্দ্রাণী হেকুবা কিম্বা আমার বীরবীর্য্য সহোদরাদিগণ এ সকলের আসন্ন বিপদে আমার মন যত উদ্বিগ্ন হয়, তোমার বিষয়ে, হে প্রেয়সি! আমার সে মন তদপেক্ষা সহস্রগুণ কাতর হইয়া উঠে। হায় প্রিয়ে! বিধাতা কি তোমার কপালে এই লিখেছিলেন, যে অবশেষে তুমি আরগস্‌ নগরীর কোন ভর্ত্রিণীর আদেশে, অশ্রুজলে আর্দ্রা হইয়া নদ নদী হইতে জল বহিবে, এবং ভ্রষ্ট জন সমূহে ইঙ্গিত করিয়া এ উহাকে কহিবে, ওহে, ঐ যে স্ত্রীলোকটা দেখিতেছ, ও ট্রয় নগরস্থ বীরদলের আদমী হেক্‌টরের পত্নী ছিল। এই কথা কহিয়া বীরবর হস্ত প্রসারণ পূর্ব্বক শিশু সন্তানটীকে দাসীর ক্রোড় হইতে লইতে চাহিলেন, কিন্তু জ্ঞানহীন শিশু কিরীটের বিদ্যুতাকৃতি উজ্জ্বলতায় এবং তদুপরিস্থ অশ্বকেশরের লড়নে ডরাইয়া ধাত্রীর বক্ষনীড়ে আশ্রয় লইল। বীরবর সহাস্য বদনে মস্তক হইতে কিরীট খুলিয়া ভূতলে রাখিলেন, এবং প্রিয়তম সন্তানের মুখচুম্বন করিয়া কহিলেন, হে জগদীশ! এ শিশুটিকে ইহার পিতা অপেক্ষাও বীর্য্যবত্তর কর। এই কথা কহিয়া দাসীর ইস্তে শিশুকে পুনরর্পণ করিয়া শিরোদেশে কিরীট পুনরায় দিয়া যুদ্ধক্ষেত্রাভিমুখে যাত্রার্থে প্রেয়সীর নিকট বিদায় লইলেন। সুন্দরী রাজ-অট্টালিকাভিমুখে চলিলেন বটে; কিন্তু মুহুর্মুহু পশ্চাৎভাগে চাহিয়া প্রিয়পতির প্রতি সতৃষ্ণে দৃষ্টিনিক্ষেপ করতঃ মেদিনীকে আশ্রুবারিধারায় আর্দ্র করিতে লাগিলেন।

এ দিকে সুন্দরবীর স্কন্দর দেদীপ্যমান অস্ত্রালঙ্কারে অলঙ্কৃত হইয়া, যেমন বন্ধন-রজ্জুমুক্ত অশ্ব গম্ভীর হ্রেষারব করিয়া উচ্চপুচ্ছে মন্দুরা হইতে বহির্গত হয়, সেইরূপ নগর তোরণ হইতে বাহিরিলেন।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ সমাপ্ত।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

এ দিকে ট্রয় নগরস্থ রাজতোরণ হইতে বীরদল রণসজ্জায় সজ্জিত হইয়া ভাস্বরকিরীটী রিপুকূল-মর্দন বীরেন্দ্র হেক্‌টরকে সেনাপতি-পদে অভিষিক্ত করিয়া হুহুঙ্কার ধ্বনিতে রণক্ষেত্রে উপস্থিত হইল। পদধূলি-রাশি কুজ্ঝটিকারূপে আকাশ মার্গে উত্থিত হইয়া রণস্থল যেন অন্ধকারময় করিল। দুই দল পরস্পর সম্মুখবর্তী হইয়া রণোদ্যোগ করিতেছে, এমন সময়ে দেবাকৃতি সুন্দর বীর স্কন্দর, হস্তে বক্র ধনুঃ, পৃষ্ঠে তৃণ, উরুদেশে লম্বমান অসি, দক্ষিণ হস্তে কুন্ত আস্ফালন করতঃ অগ্রসর হইয়া বীরনাদে বিপক্ষ পক্ষের বীরকুলেন্দ্রকে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধে আহ্বান করিলেন। ক্ষুধাতুর সিংহ দীর্ঘশৃঙ্গী কুরঙ্গী কিম্বা অন্য কোন বনচর অজাদি পশু সন্দর্শনে নিরতিশয় উল্লাস সহকারে বেগে তদভিমুখে ধাবমান হয়, সেইরূপ রণবিশারদ বীরকুলতিলক মানিল্যুস চিরঘৃণিত বৈরীকে দেখিয়া রথ হইতে ভূতলে লম্ফ প্রদান করিলেন। এবং এই মনে ভাবিলেন, যে দেবপ্রসাদে সেই চির-ঈপ্সিত সময় উপস্থিত হইয়াছে, যে সময়ে তিনি এই অকৃতজ্ঞ অতিথির যথাবিধি প্রতিবিধান করিতে পারিবেন। কিন্তু যেমন কোন পথিক সহসা পথপ্রান্তে গুল্মমধ্যে কালসর্পকে দর্শন করিয়া ত্রাসে পুরোগমনে বিরত হয়, সেইরূপ সুন্দর বীর স্কন্দর মানিল্যুসকে দেখিয়া ভয়ে কম্পিতকলেবর হইয়া স্বসৈন্য মধ্যে পুনঃ প্রবেশ করিলেন।

ভ্রাতার এতাদৃশী ভীরুতা ও কাপুষতা সন্দর্শনে মহেষ্বাস হেক্‌টর ক্রোধে আরক্ত-নয়ন হইয়া এই রূপে তাহাকে ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন,—রে পামর! বিধাতা কি তোকে এ সুন্দর বীরকৃতি কেবল স্ত্রীগণের মনোমোহনার্থেই দিয়াছেন। হা ধিক্! তুই যদি ভূমিষ্ঠ হইবা মাত্র কালগ্রাসে পতিত হইতিস্‌, তাহা হইলে, তোর দ্বারা আমাদের এ জগদ্বিখ্যাত পিতৃকুল কখনই সকলঙ্ক হইতে পারিত না। তোর মূর্ত্তি দেখিলে, আপাততঃ বোধ হয়, যে তুই ট্রয়নগরস্থ একজন বীর পুরুষ! কিন্তু তোর ও হৃদয়ে সাহসের লেশ মাত্রও নাই। তোরে ধিক্‌! তুই স্ত্রীলোক অপেক্ষাও অধম ও ভীরু। তোর কি গুণে যে সেই কৃশোদরী রমণী বীরকুলেপ্সিতা বীর পত্নীর মন ভুলিল, তাহা বুঝিতে পারি না। তোর সেই সতত-বাদিত সুমধুর বীণা, যদ্বারা তুই প্রেমদেবীর প্রসাদে প্রমদাকুলের মনঃ হরণ করিস, অতি ত্বরায়ই নীরব হইবে। আর তোর এই নারীকুল-নিগড়-স্বরূপ চূর্ণকুণ্ডল ও তোর এই নারীকুল-নয়নরঞ্জন অবয়ব অচিরে ধূলায় ধূসরিত হইবে। এমন কি, যদি ট্রয়নগরস্থ জনগণের হৃদয় দয়ার্দ্র না হইত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই তাহারা এই দণ্ডেই প্রস্তর-নিক্ষেপণে তোর কঙ্কালজাল চুর্ণ করিত। রে অধম! তোর সদৃশ স্বদেশের অহিতকারী ব্যক্তি কি আর দুটি আছে।

সোদরের এইরূপ তিরস্কারে ও পরুষবচনে দেবাকৃতি সুন্দর বীর স্কন্দর অতি মৃদুভাবে ও নতশিরে উত্তর করিলেন—হে ভ্রাতঃ হেক্‌টর! তোমার এ তিরস্কার ন্যায্য! তন্নিমিত্তই আমি ইহা সহ্য করিতেছি। বিধাতা তোমাকে বলীকুলের কুলপ্রদীপ করিয়াছেন বলিয়া তুমি যে সৌন্দর্য্য প্রভৃতি নারীকুল-মনোহারিণী দেবদত্ত গুণাবলীকে অবহেলা কর, ইহা কি তোমার উচিত? তবে তোমার, ভাই, যদি ইচ্ছা হয়, তুমি উভয়দল মধ্যে এই ঘোষণা করিয়া দাও, যে আমি নারীকুলোত্তমা হেলেনী সুন্দরীর নিমিত্ত মহেষ্বাস মানিল্যুসের সহিত একাকী যুদ্ধ করিতে প্রস্তুত আছি। আমাদের দুই জনের মধ্যে যে জন জয়ী হইবে, সে জন সেই সুন্দরী বামাকে জয়-পতাকা-স্বরূপ লাভ করিবে। আর তোমরা উভয় দলে চিরসন্ধি দ্বারা এ দুরন্ত রণাগ্নি নির্বাণ পূর্ব্বক, যাহারা এদেশনিবাসী, তাহারা ট্রয়নগরে ও যাহারা দ্রুতগ-তুরগযোনি ও কুরঙ্গনয়না অঙ্গনাময় হেলস্-দেশ-নিবাসী, তাহারা সেই সুদেশে প্রত্যাবর্ত্তন করিও।

বীরর্ষভ হেক্‌টর ভ্রাতার এতাদৃশ বচনে পরমাহ্লাদে স্বকুন্তের মধ্যস্থল ধারণ করতঃ উভয়দলের মধ্যগত হইয়া স্ববলদলকে রণকার্য্য হইতে নিবারিলেন। গ্রীক্‌যোধের অরিন্দম হেক্‌টরকে সহায়হীন সন্দর্শনে আস্তে ব্যস্তে শরাসনে শর যোজনা করিতে লাগিল। কেহ বা পাষাণ ও লোষ্ট্র নিক্ষেপণার্থে উদ্যত হইতেছে, এমত সময়ে রাজচক্রবর্ত্তী সৈন্যাধ্যক্ষ রাজা আগেমেম্‌নন্‌ উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, হে যোধদল! এক্ষণে তোমরা ক্ষান্ত হও। তোমরা কি দেখিতে পাইতেছ না, যে ভাস্বর-কিরীটী হেক্‌টর কোন বিশেষ প্রস্তাব করণাভিপ্রায়ে এ স্থলে উপস্থিত হইয়াছেন। রাজার এই কথা শুনিবা মাত্র যোধদল অতিমাত্র ব্যস্ত হইয়া নিরস্ত হইল। হেক্‌টর উচ্চভাষে কহিলেন, হে বীরবৃন্দ, আমার সহোদর দেবাকৃতি সুন্দর বীর স্কন্দর, যিনি এই সাংগ্রামিককুলের নির্ম্মূলকারী এ সংগ্রামের মূলকারণ, আমাদিগকে এই যুদ্ধকার্য্য হইতে বিরত করিবার জন্য এই প্রস্তাব করিতেছেন, যে স্কন্দপ্রিয় বীরেন্দ্র মানিল্যুস্‌ একাকী তাহার সহিত যুদ্ধ করুন, আর আমরা সকলে নিরস্ত্র হইয়া এই আহবকৌতূহল সন্দর্শন করি। এ দ্বন্দ্বযুদ্ধে যিনি জয়ী হইবেন, সেই ভাগ্যধর পুরুষ হেলেনী ললনাকে পুরস্কাররূপে পাইবেন।

ভাস্বর-কিরীটী শূরেন্দ্র হেক্‌টরের এইরূপ কথা শুনিয়া স্কন্দপ্রিয় বীরেন্দ্র মানিল্যুস্‌ কহিলেন, হে বীরবৃন্দ! এ বীরবরের এ বীরপ্রস্তাব অপেক্ষা আর কি শান্তি ও সন্তোষ-জনক প্রস্তাব হইতে পারে? আমার কোন মতেই এমত ইচ্ছা নয়, যে আমার হিতের জন্য প্রাণী সমূহ অকালে শমন-ভবনে গমন করে; কিন্তু তোমরা, হে শূরবর্গ! দেবী বসুমতীর বলির নিমিত্ত একটী শুভ্র মেষশাবক, সূর্য্যদেবের নিমিত্ত একটী কৃষ্ণবর্ণ মেষশাবক, এবং দেবকুলপতির নিমিত্ত আর একটী মেষশাবক, এই তিনটী মেষশাবক আহরণ করিতে চেষ্টা পাও। আর বৃদ্ধ-রাজ প্রিয়ামের আহ্বানার্থে দূত প্রেরণ কর; কেননা, তাহার পুত্রেরা অতি অহঙ্কারী, ও অবিশ্বাসী, এবং বিজ্ঞ জনেরাও বলিয়া থাকেন, যে যৌবনকালে যৌবনমদে যুবজনের মনস্থিরতা অতীব দুর্ল্লভ। কিন্তু প্রাচীন ব্যক্তিসমুহ ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান, এই তিনকাল বিলক্ষণ বিবেচনা না করিয়া কোন কর্ম্মেই হস্তার্পণ করেন না।

বীরবরের এইরূপ কথা শ্রবণে উভয় দল আনন্দার্ণবে মগ্ন হইল; রথী রথাসন, সাদী অশ্বাসন পরিত্যাগ করতঃ ভূতলে নামিয়া বসিল। এবং অস্ত্র শস্ত্র সকল রাশীকৃত করিয়া একত্রে রণক্ষেত্রোপরি রাখিল।

বীরবর হেক্‌টর দুইজন দ্রুতগামী সুচতুর কর্ম্মদক্ষ দূতকে দুইটা মেষশাবক আনিতে ও মহারাজের আহ্বানার্থে নগরাভিমুখে প্রেরণ করিলেন। রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌ স্বদলস্থ একজন দূতকে তৃতীয় মেষশাবক আনিবার জন্য স্বশিবিরে পাঠাইলেন।

দেবকুলালয় হইতে দেবকুলদূতী ঈরীষা সৌদামিনীগতিতে ট্রয়নগরে আবির্ভূতা হইলেন, এবং রাজা প্রিয়ামের দুহিতৃ-কুলোত্তমা লব্ধিকার রূপ ধারণ করিয়া দেবী হেলেনী সুন্দরীর সুন্দর মন্দিরে প্রবেশিয়া দেখিলেন, যে রূপসী সখীদলের মধ্যে শিল্প-কর্ম্মে নিযুক্ত আছেন। ছদ্মবেশিনী পদ্মলোচনাকে ললিত বচনে কহিলেন, সখি হেলেনি! চল, আমরা দুজনে নগর-তোরণ-চূড়ায় আরোহণ করিয়া রণক্ষেত্রের অদ্ভুত ঘটনা অবলোকন করি। এক্ষণে উভয় দল রণক্ষেত্রে রণতরঙ্গ বহাইতে ক্ষান্ত পাইয়াছে; রণনিনাদ শান্ত হইয়াছে; কেবল স্কন্দপ্রিয় মানিল্যুস এবং দেবাকৃতি সুন্দরবীর স্কন্দর, এই দুই বীর পরস্পর দুরন্ত কুণ্ড যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবে। তুমি, সখি, বিজয়ী পুরুষের পুরস্কার।

দেবীর এইরূপ কথা শুনিয়া কৃশোদরী হেলেনীর পূর্ব্ব কথা স্মৃতিপথে আরূঢ় হইল। এবং তিনি পরিত্যক্ত পতি, পরিত্যক্ত দেশ, এবং পরিত্যক্ত জনক জননীকে স্মরণ করিয়া অশ্রুজলে অন্ধপ্রায় হইয়া উঠিলেন। কিঞ্চিৎ পরে শোক সম্বরণ পূর্ব্বক এক শুভ্র ও সুক্ষ্ম অবগুণ্ঠিকা দ্বারা শিরোদেশ আচ্ছাদন করিয়া ননদিনী লব্ধিকার অনুগামিনী হইলেন। সুনেত্রা অত্রী ও বরাননা ক্লিমেনী এই দুইজন পরিচারিকামাত্র পশ্চাতে পশ্চাতে চলিল। উভয়ে স্কিয়ান নামক নগর-তোরণ-চূডায় চড়িলেন! সে স্থলে বৃদ্ধ-রাজ প্রিয়াম্‌ বয়সের আধিক্যে প্রযুক্ত রণকার্য্যাক্ষম বৃদ্ধ মন্ত্রীদলের সহিত আসীন ছিলেন।

শচীববৃন্দ দূর হইতে হেলেনী সুন্দরীকে নিরীক্ষণ করিয়া পরস্পর কহিতে লাগিলেন; এতাদৃশী রূপসী রমণীর জন্য যে বীর পুরুষেরা ভীষণ রণে উন্মত্ত হইবে, এবং শোণিত-স্রোতে দেবী বসুমতীকে প্লাবিত করিবে, এ বড় বিচিত্র নহে। আহা! নরকুলে এরূপ বিশ্ববিমোহনরূপ, বোধ হয়, আর কুত্রাপি দৃষ্টিগোচর হইতে পারে না। তথাপি পরমপিতা পরমেশ্বরের নিকট আমাদের এই প্রার্থনা যে, এ বিশ্বরমা বামা যেন এ নগর হইতে অতি ত্বরায় অন্যত্র চলিয়া যায়। মন্ত্রীদল অতি মৃদুস্বরে বারম্বার এই কথা কহিতে লাগিলেন।

রাজা প্রিয়াম্‌ হেলেনী সুন্দরীকে সম্বোধিয়া সস্নেহ বচনে এই কথা কহিলেন, বৎসে! তুমি আমার নিকটে আইস। আর এই যে রণস্বরূপ বিপজ্জালে এ রাজবংশ পরিবেষ্টিত হইয়াছে, তুমি আপনাকে ইহার মূলকারণ বলিয়া ভাবিও না। এ দুর্ঘটনা আমারই ভাগ্যদোষে ঘটিয়াছে। ইহাতে তোমার অপরাধ কি? তুমি নির্ভয় চিত্তে আমার নিকটে আসিয়া গ্রীক্‌দলস্থ প্রধান প্রধান নেতৃ-দলের পরিচয় প্রদানে আমাকে পরিতুষ্ট কর।

এতাদৃশ বাক্য শ্রবণ করিয়া রাণী হেলেনী রণক্ষেত্রের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতঃ রাজকুলপতি বৃদ্ধরাজ প্রিয়ামের নিকটবর্তিনী হইয়া তাঁহাকে বীরপুরুষদলের পরিচয় দিতেছেন, এমত সময়ে বীরবর হেক্‌টর-প্রেরিত দূতেরা তথায় উপস্থিত হইয়া কহিল, হে নরকুলপতি, হে বাহুবলেন্দ্র, আপনাকে একবার রণস্থলে শুভাগমন করিতে হইবেক। কেননা, উভয় দল এই স্থির করিয়াছে যে, তাহারা পরস্পর রণে প্রবৃত্ত হইবে না। কেবল মহেষ্বাস মানিল্যুস ও আপনার দেবাকৃতি পুত্র সুন্দর বীর স্কন্দর এই দুই জনে দ্বন্দ্ব রণ হইবে। আর এ রণীদ্বয়ের মধ্যে যে রণী বাহুবলে বিজয়ী হইবেন, সেই রণী এ হেলেনী সুন্দরীকে লাভ করিবেন। এক্ষণে তাহাদের এই বাঞ্ছা, যে আপনি এ সন্ধিজনক প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করেন। আর শপথপূর্ব্বক এই বলেন, যে আপনি আপনার এ অঙ্গীকার রক্ষা করিবেন।

বৃদ্ধরাজ প্রিয়াম্‌ প্রিয়তম পুত্র-প্রেরিত দূতের এই কথা শুনিয়া চকিত ও চমৎকৃত হইলেন, এবং রাজরথ সুসজ্জিত করিয়া যুদ্ধক্ষেত্রাভিমুখে যাত্রা করতঃ অতিত্বরায় তথায় উপস্থিত হইলেন। রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌ প্রথমে রাজা প্রিয়ামের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান ও সম্ভ্রম প্রদর্শন করিয়া পরে যথাবিধি দেবপূজার আয়োজন করিলেন। এবং হস্ত তুলিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিলেন, হৈ দেবকুলেন্দ্র! হে অসীম শক্তিশালী বিশ্বপিতঃ! হে সর্ব্বদর্শী গ্রহেন্দ্র রবি! হে নদকুল! হে মাতঃ বসুন্ধরে। হে পাতাল-কৃত-বসতি নরক-শাসক দেবদল! যাহারা পাপাত্মাদিগকে যথাযোগ্য দণ্ড দিয়া থাকেন। হে দেবকুল! তোমরা সকলে সাক্ষী হও, আর আমার এই প্রার্থনা শুন, যে এ দ্বন্দ্ব রণ সম্পর্কে যাহারা কূটাচরণ করিবে, তোমরা পরকালে তাহাদিগকে প্রতারণা-রূপ পাপের যথোচিত দণ্ড দিবে। রাজা এই কহিয়া অসিকোষ হইতে অসি নিষ্কোষ করিয়া পূজা সমাপনান্তে মেষশাবক সকলকে যথাবিধি বলি প্রদান করিলেন। এই রূপে পূজা সমাপ্ত হইল। পরে বৃদ্ধরাজ প্রিয়াম্‌ রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌কে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে রথীকুলশ্রেষ্ঠ! আপনি এ রণস্থলে আর বিলম্ব করিতে আমাকে অনুরোধ করিবেন না। রণরঙ্গে বৃদ্ধ ও দুর্ব্বল জনের কোনই মনোরঙ্গ জন্মে না। এই কহিয়া রাজা স্বযানে আরোহণ পূর্বক নগরাভিমুখে গমন করিলেন।

মহাবীর ভাস্বর-কিরীটী হেক্‌টর ও সুবিজ্ঞ অদিস্যুস্‌ এই দুইজন উভয় জনের রণ করণার্থে রঙ্গভূমিস্বরূপ এক স্থান নির্দিষ্ট করিয়া দিলেন। মহাবাহু সুন্দর বীর স্কন্দর এ কালাহবের নিমিত্ত সুসজ্জ হইলেন। তিনি প্রথমতঃ সুচারু উরুত্রাণ রজত কুড়ুপে বন্ধন করিলেন, উরোদেশে দুর্ভেদ্য উরস্ত্রাণ ধরিলেন, কক্ষদেশে ভীষণ রজতময়-মুষ্টি অসি ঝুলিল। পৃষ্ঠদেশে প্রকাণ্ড ও প্রচণ্ড ফলক শোভা পাইল। মস্তক প্রদেশে সুগঠিত কিরীটোপরি অশ্বকেশনির্মিত চুড়া ভয়ঙ্কররূপে লড়িতে লাগিল। দক্ষিণ হস্তে নিশিত কুন্ত ধৃত হইল। রণপ্রিয় বীর-প্রবীর মানিল্যুসও ঐ রূপে সুসজ্জ হইলেন। কে যে প্রথমে কুন্ত নিক্ষেপ করিবে, এই বিষয়ে গুটিকাপাতে প্রথম গুটিকা সুন্দর বীর স্কন্দরের নামে উঠিল। পরে বীরসিংহদ্বয় পূর্ব্ব নির্দিষ্ট স্থানে উপনীত হইলেন। ভাবী ফল প্রত্যাশায় উভয় দলের রসনাসমূহ নিরুদ্ধ হইল বটে; কিন্তু তত্রাচ নয়ন সকল উন্মীলিত হইয়া রহিল।

দেবাকৃতি সুন্দরবীর স্কন্দর রিপুদেহ লক্ষ্য করিয়া হুহুঙ্কার শব্দে কুন্তনিক্ষেপ করিলেন। অস্ত্র উল্কাগতিতে চতুর্দ্দিক আলোকময় করিয়া বায়ুপথে চলিল; কিন্তু মানিল্যুসের ফলকপ্রতিঘাতে ব্যর্থ হইয়া ভূতলে পড়িল। ফলকের দৃঢ়তা ও কঠিনতায় অস্ত্রের অগ্রভাগ কুণ্ঠিত হইয়া গেল। পরে স্কন্দপ্রিয় বীর কুলেন্দ্র মানিল্যুস স্বকুন্ত দৃঢ়রূপে ধারণ করতঃ মনে মনে এই ভাবিয়া দেবকুলপতির সন্নিধানে প্রার্থনা করিলেন যে, হে বিশ্বপতি! আপনি আমাকে এই প্রসাদ দান করুন যে, আমি যেন এই অধর্মাচারী রিপুকে রণস্থলে সংহার করিতে পারি; তাহা হইলে, হে ধর্ম্মমূল, ভবিষ্যতে আর কখন কোন অধর্ম্মাচারী অতিথি কোন ধর্ম্মপ্রিয় আতিথেয় জনের অনুপকার করিতে সাহস করিবে না। এইরূপ প্রার্থনা করিয়া বীরকেশরী দীর্ঘচ্ছায় স্বকুন্ত নিক্ষেপ করিলেন। অস্ত্র মহাবেগে প্রিয়াম্‌পুত্রের দীপ্তিশালী ফলকোপরি পড়িয়া স্ববলে সে ফলক ও তৎপরে বীরবরের উরস্ত্রাণ ভেদ করিলে তিনি আত্মরক্ষার্থে সহসা এক পার্শ্বে অপসৃত হইয়া দাঁড়াইলেন। পরে মহেষ্বাস মানিল্যুস সরোষে রিপুশিরে প্রচণ্ড খণ্ডাঘাত করিলেন। সুন্দরবীর স্কন্দর ভীমপ্রহারে ভূমিতলে পতিত হইলেন। কিন্তু রণমুকুটের কঠিনতায় খণ্ডা শত খণ্ড হইয়া ভগ্ন হইয়া গেল। বীরশ্রেষ্ঠ পতিত রিপুর কিরীটচূড়া ধরিয়া মহাবলে এমত আকর্ষণ করিলেন, যে চিবুক নিম্নে সুনির্ম্মিত কিরীটবন্ধন চর্ম্ম গলদেশ নিষ্পীড়ন করিতে লাগিল।

এই রূপে জিষ্ণু মানিল্যুস ভূপতিত রিপুকে আকর্ষণ করিতেছেন, ইহা দেখিয়া দেবী অপ্রোদীতী স্বগৌরব বর্দ্ধক জনের কাতরতায় অতীব কাতরা হইয়া সেই বন্ধন মোচন করিলেন। সুতরাং মানিল্যুসের হস্তে কেবল শিরস্ত্রাণ মাত্র অবশিষ্ট রহিল। বীরবর অতি ক্রোধভরে কিরীটটী দূরে নিক্ষেপ করিয়া কুন্তাঘাতে রিপুকে যমালয়ে প্রেরণার্থে ধাবমান হইলেন। দেবী অপ্রোদীতী প্রিয়পাত্রের এ বিষম বিপদ উপস্থিত দেখিবামাত্র তাহাকে এক ঘন মায়াঘনে পরিবেষ্টিত করতঃ বাহুদ্বয়ে ধারণ পূর্ব্বক শূন্যমার্গে উঠিয়া সৌদামিনীগতিতে নগর মধ্যে সুবর্ণ-নির্ম্মিত হর্ম্ম্যে কুসুম-পরিমল-পূর্ণ শয়নাগারে শয্যোপরি প্রিয় বীরকে শয়ন করাইলেন।

এ দিকে ভুবনমোহিনী রাণী হেলেনী তোরণ-চূড়ায় দাঁড়াইয়া রণক্ষেত্রের দিকে নিরীক্ষণ করিয়া রহিয়াছেন, এমত সময়ে দেবী অপ্রোদীতী সুনেত্রার ধাত্রীর রূপ ধারণ করতঃ আপন হস্ত দ্বারা তাঁহার হস্ত স্পর্শিয়া কহিলেন, বৎসে! তোমরা মনোমোহন সুন্দর বীর স্কন্দর তোমার বিরহে অধীর হইয়া তোমার কুসুমময় বাসর ঘরে বরবেশে তোমার অপেক্ষা করিতেছেন। তাঁহাকে দেখিলে, তোমার এরূপ বোধ হইবেনা, যে তিনি রণস্থল হইতে প্রত্যাবৃত্ত। বরঞ্চ তুমি ভাবিবে, যে তিনি যেন বিলাসীবেশে নৃত্যশালায় গমননোন্মুখ হইয়া রহিয়াছেন।

হেলেনী সুন্দরী দেবীর এই কথা শুনিয়া চকিতভাবে কথিকার দিকে দৃষ্টি ক্ষেপণ করিয়া তাহার অলৌকিক রূপ লাবণ্যের বৈলক্ষণ্যে বুঝিতে পারিলেন, যে তিনি কে। পরে সসম্ভ্রমে কহিলেন, দেবি, আপনি কি পুনরায় এ হতভাগিনীকে মায়ায় মুগ্ধ করিয়া নব যন্ত্রণা দিতে মন্ত্রণা করিয়াছেন। আনন্দময়ী অপ্রোদীতী ইন্দীবরাক্ষীর এইরূপ বাক্যে অদৃশ্যভাবে তাহাকে স্কন্দরের সুন্দর মন্দিরে উপনীত করিলেন! বীরবর কুসুমময় কোমল শয্যায় বিশ্রাম লাভ করিতেছেন, এমত সময়ে রাজ্ঞী হেলেনী তৎসন্নিধানে দেবদত্ত আসনে আসীন হইয়া মুখ ফিরাইয়া এই বলিয়া তিরস্কার করিতে লাগিলেন, হে বীর কুলকলঙ্ক! তুমি কেন যুদ্ধস্থল হইতে ফিরিয়া আসিয়াছ? আমার রণপ্রিয় পূর্ব্বপতি মহেষ্বাস মানিল্যুসের হস্তে তোমার মৃত্যু হইলে ভাল হইত। যখন প্রথমে আমাদের এই কুলক্ষণা প্রীতির সঞ্চার হয়, তখন তুমি যে সব আত্মশ্লাঘা করিতে, এখন তোমার সে সব আত্মশ্লাঘা কোথায় গেল? এখন তুমি কি সে সব অহঙ্কারগর্ভ অঙ্গীকার এই রূপে সুসঙ্গত করিতেছ? মহেষ্বাস মানিল্যুসের সহিত তোমার উপমা উপমেয় ভাব কখনই সম্ভব হইতে পারে না।

সুন্দর বীর স্কন্দর প্রাণপ্রিয়াকে এইরূপ রোষপরবশ দেখিয়া সুমধুর ও প্রবোধ-বচনে কহিলেন, বিনোদিনি! তোমার সুধাকর স্বরূপ বদন হইতে কি এ রূপ বিষরূপ গ্লানির উৎপত্তি হওয়া উচিত? দুষ্ট মানিল্যুস এ যাত্রায় বাঁচিল বটে; কিন্তু যাত্রান্তরে কোন না কোন কালে আমার হস্তে যে তাহার মৃত্যু হইবে, তাহার আর কোনই সন্দেহ নাই। এই কহিয়া, বীরবর সোহগে ও সাদরে কৃশোদরীর কোমল করকমল নিজ করকমল দ্বারা গ্রহণ করিলেন।

সমরান্তে দুরন্ত মানিল্যুস বিনষ্টাশন ক্ষুৎক্ষামকণ্ঠ বন পশুর ন্যায় রণস্থলে ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করতঃ সকলকেই জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, হে বীরব্রজ! তোমরা কি জান, যে দুষ্টমতি কাপুরুষ স্কন্দর কোন্‌ স্থানে লুক্কায়িত আছে? কিন্তু কেহই সেই রণস্থল পরিত্যাগীর কোন বার্ত্তাই দিতে পারিল না। পরে রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌ অগ্রসর হইয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, হে বীরদল! তোমরা ত সকলেই স্বচক্ষে দেখিতেছ, যে স্কন্দপ্রিয় মানিল্যুস সমরবিজয়ী হইয়াছেন। অতএব এখন শপথানুসারে মৃগাক্ষী হেলেনী সুন্দরীকে ফিরিয়া দেওয়া বিপক্ষ পক্ষের সর্ব্বতোভাবে কর্তব্য কি না? সৈন্যাধ্যক্ষের এই কথা শ্রবণ মাত্র গ্রীক্‌যোধদল অতিমাত্র উল্লাসে জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল। মর্ত্ত্যে এই রূপ হইতে লাগিল।

অমরাবতীতে দেব-দেবী-দল দেবেন্দ্রের সুবর্ণ অট্টালিকায় রত্নমণ্ডিত সভায় স্বর্ণাসনে বসিলেন। অনন্তযৌবনা দেবী হীরী স্বর্ণপাত্রে করিয়া সকলকেই সুপেয় অমৃত যোগাইতে লাগিলেন। আনন্দময়ী সুধা পান করতঃ সকলেই ট্রয়নগরের দিকে একদৃষ্টে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেছেন, এমত সময়ে দেবকুলেন্দ্রাণী বিশালাক্ষী হীরীকে বিরক্ত করিবার মানসে দেবকুলেন্দ্র এই গ্লানিজনক উক্তি করিলেন, কি আশ্চর্য! এই অমরাবতী-নিবাসিনী দুই জন দেবী যে বীরবর মানিল্যুসের সহকারিতা করিতেছেন, ইহা সর্ব্বত্র বিদিত। কিন্তু আমি দেখিতেছি, যে দূর হইতে রণকৌতূহল দর্শন ভিন্ন তাহারা আর অন্য কিছুই করিতেছেন না। কিন্তু দেখ, সুন্দর বীর স্কন্দরের হিতৈষিণী পরিহাসপ্রিয়া দেবী অপ্রোদীতী আপনার আশ্রিত জনের হিতার্থে কি না করিতেছেন। হে দেব-দেবীবৃন্দ! তোমরা কি দেখিলে না যে, দেবী বহু ক্লেশ স্বীকার করিয়া তাহাকে রণক্ষেত্রে আসন্ন মৃত্যু হইতে রক্ষা করিলেন।

স্কন্দপ্রিয় রথীশ্বর মানিল্যুস যে রণে জয়লাভ করিয়াছেন, তাহার আর অণুমাত্রও সংশয় নাই। অতএব আইস, সম্প্রতি আমরা এই বিষয় বিশেষ অনুধাবন করিয়া দেখি,যে হেলেনী সুন্দরীকে দিয়া এ রণাগ্নি নির্বাণ করা উচিত, কি এ সন্ধি ভঙ্গ করাইয়া, সে রণাগ্নি যাহাতে দ্বিগুণ প্রজ্বলিত হইয়া ট্রয়নগর অকস্মাৎ ভস্মসাৎ করে তাহাই করা কর্তব্য।

উগ্রচণ্ডা দেবকুলেন্দ্রাণী হীরী এই রূপ প্রস্তাবে রোষদগ্ধ প্রায় হইয়া কহিলেন, হে দেবেন্দ্র! তুমি এ কি কহিতেছ? যে জঘন্য নগর বিনষ্ট করিতে আমি এত পরিশ্রম স্বীকার করিয়াছি, তুমি কি তাহা রক্ষা করিতে চাহ? মেঘশাস্তা দেবেন্দ্রও দেবেন্দ্রাণীর বাক্যে ক্রোধান্বিত হইয়া উত্তর করিলেন, রে জিঘাংসাপ্রিয়ে, রাজা প্রিয়াম্‌ ও তাহার পুত্রগণ তোর নিকটে এত কি অপরাধ করিয়াছে, যে তুই তাহাদের নিধনসাধনে এত ব্যগ্র হইয়াছিস? রে দুষ্টে, বোধ করি, রাজা প্রিয়াম্‌ ও তাহার সন্তান সন্ততির রক্ত মাংস পাইলে তুই পরম পরিতুষ্টা হস্! তুই কি জানিস্ না, যে ঐ ট্রয়নগর আমার রক্ষিত? সে যাহা হউক, এ ক্ষুদ্র বিষয় লইয়া তোর সহিত আমার আর বিবাদ বিসম্বাদে প্রয়োজন নাই। তোর যাহা ইচ্ছা, তাহাই কর্‌। কিন্তু যেন এই কথাটা তোর মনে থাকে যে, যদি তোর রক্ষিত কোন নগর আমি কোন না কোন কালে বিনষ্ট করিতে চাই, তখন তোর তৎসম্পর্কীয় কোন আপত্তিই কখন ফলবতী হইবে না। গৌরাঙ্গী দেবমহিষী দেবেন্দ্রের এইরূপ বাক্য শুনিয়া অতি সুমধুর স্বরে কহিলেন, দেবরাজ! আমার অধীনস্থ যে কোন নগর যখন তুমি নষ্ট করিতে ইচ্ছা কর, করিও, আমি তদ্বিষয়ে কোন বাধা দিব না। কিন্তু তুমি এখন এইটী কর, যে যেন ট্রয়নগরের লোকেরা এই সন্ধি ভঙ্গ বিষয়ে প্রথমে হস্ত নিক্ষেপ করে।

দেবপতি দেবকুলেশ্বরীর অনুরোধে সুশীলকমলাক্ষী আথেনীকে হাস্যবদনে কহিলেন, বৎসে! তুমি রণস্থলে গিয়া দেবেদ্রাণীর মনস্কামনা সুসিদ্ধ কর। যেমন অগ্নিময়ী উল্কা বিস্ফুলিঙ্গ উদ্গীরণ করতঃ পবনপথ হইতে অধোমুখে গমন করে, এবং সাগরগামী জনগণ ও রণোন্মত্ত সৈন্যসমূহকে অমঙ্গল ঘটনারূপ বিভীষিকা প্রদর্শনপূর্বক ভূতলে পতিত হয়, দেবী সেইরূপ অতিবেগে ও ভয়জনক আগ্নেয় তেজে রণস্থলে সহসা অবতীর্ণ হইলেন। উভয়দল সভয়ে কাঁপিয়া উঠিল। কোলাহলপূর্ণ স্থলে সহসা যেন শান্তিদেবীর আবির্ভাব হইল। রণরসনা সহসা স্বধর্ম্ম ভুলিয়া গেল। দেবী রাজা প্রিয়ামের পরম রূপবান্ পুত্র লদ্ধকুশের রূপ ধারণ করিয়া ট্রয়দলের মধ্যে প্রবেশ করিলেন। এবং পণ্ডর্শ নামক একজন বীরবরের অন্বেষণে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিয়া দেখিলেন, যে বীরেশ্বর ফলকশালী কুন্তহস্ত যোধদলে পরিবেষ্টিত হইয়া এক প্রান্তভাগে দাঁড়াইয়া আছেন। ছদ্মবেশিনী দেবী কহিলেন, হে বীরর্ষভ পণ্ডর্শ! তোমার যদি অক্ষয় যশোলাভের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে তুমি স্বতূণ হইতে তীক্ষ্ণতম শর বাছিয়া লইয়া স্কন্দপ্রিয় মানিল্যুসকে বিদ্ধ কর।

ছদ্মবেশিনী এই কথা কহিয়া মায়াবলে পণ্ডর্শ বীরর্ষভের মনে এইরূপ ইচ্ছাবীজও রোপিত করিয়া দিলেন। পণ্ডর্শ প্রচণ্ড শরাসনে গুণযোজনা পূর্ব্বক মানিল্যুসকে লক্ষ্য করিয়া এক মহা তেজস্কর শর পরিত্যাগ করিলেন; কিন্তু ছদ্মবেশিনী অদৃশ্যভাবে মানিল্যুসের নিকটবর্তিনী হইয়া, যেমন জননী করপদ্ম সঞ্চালন দ্বারা সুপ্ত সুত হইতে মশক, কিম্বা অন্য কোন বিরক্তিজনক মক্ষিকা নিবারণ করেন, সেইরূপ সেই গরুত্মান্ বাণ দূরীকৃত করিলেন বটে; কিন্তু শরীরের নিম্নভাগে, কিঞ্চিন্মাত্র আঘাত করিতে দিলেন। শোণিত-স্রোতঃ বহিল। রুধির ধারা বীরবরের শুভ্রকায়ে সিন্দুর-মার্জ্জিত দ্বিরদরদের ন্যায় শোভা ধারণ করিল। এ অধর্ম্ম কর্ম্মে রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌ননের রোষাগ্নি প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। তিনি ক্ষত বিক্ষত ভ্রাতাকে সুশিক্ষিত ও সুবিচক্ষণ রাজবৈদ্যের হস্তে ন্যস্ত করিয়া পরে বীরদলকে মহাহবে প্রবৃত্ত হইতে আজ্ঞা দিলেন। রাজযোধদল আস্তে ব্যন্তে বিবিধ অস্ত্র শস্ত্র গ্রহণ করিলেন। পুরোভাগে অশ্ব ও রথারোহী জনসমূহ, পশ্চাতে পদাতিকবৃন্দ এই ত্রি-অঙ্গ সৈন্যদল সমভিব্যাহারে রাজসৈন্যাধ্যক্ষ মহোদয় রণব্রতে ব্রতী হইলেন।

যেমন সাগরমুখে প্রবল বাত্যা বহিতে আরম্ভ করিলে ফেনচূড় তরঙ্গনিকর পর্য্যায়ক্রমে গভীর নিনাদে সাগরতীর আক্রমণ করে, সেইরূপ গ্রীক্‌যোধদল হুহুঙ্কার শব্দ করিয়া রণক্ষেত্রে রিপুদলকে আক্রমণ করিল। তুমুল রণ আরম্ভ হইল। ত্রাস, পলায়ন, কলহ, বধিরকর নিনাদ, দৃষ্টিরোধক ধূলারাশি, এই সকল একত্রীভূত হইয়া ভয়ানক হইয়া উঠিল। এক দিকে দেবকুলসেনানী স্কন্দ, অপর দিকে সুনীলকমলাক্ষী দেবী আথেনী বীর্য্যশালী বীরদলের সাহায্য করিতে লাগিলেন।

বরিদেব নগরের উচ্চতম গৃহচূড়ায় দাঁড়াইয়া উৎসাহ প্রদানহেতু উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিলেন, হে অশ্বদমী ট্রয়নগরস্থ বীরগ্রাম! তোমরা স্বসাহসে নির্ভর করিয়া যুদ্ধ কর। গ্রীক্‌যোধগণের দেহ কিছু পাষাণনির্ম্মিত নহে। আর ও দলের চূড়ামণি বীরকুলেন্দ্র আকেলিসও এ রণস্থলে উপস্থিত নাই। সে সিন্ধুতীরে শিবির মধ্যে অভিমানে স্থিরভাবে আছে। তোমরা নিঃশঙ্ক চিত্তে রণক্রিয়া সমাধা কর।

ট্রয়নগরস্থ বীরদল এইরূপে দেবোৎসাহে উৎসাহান্বিত হইয়া বৈরীবর্গের সম্মুখীন হইলে ভীষণ রণ বাজিয়া উঠিল। ফলকে ফলকাঘাত, করবালে করবালাঘাত, হন্তা ও মুমূর্ষু জনের হুহুঙ্কার ও আর্ত্তনাদ, এই প্রকার ও অন্যান্য প্রকার নিনাদে রণভূমি পরিপূরিত হইয়া উঠিল। যেমন বর্ষাকালে বহু উৎসগর্ভ হইতে বহু জলপ্রবাহ একত্রে মিলিত হইয়া গভীর গিরিগহ্বরে প্রবেশ পূর্ব্বক মহারবে দেশ পরিপূরণ করে। সেইরূপ ভৈরব রবে চতুর্দ্দিক পরিপূর্ণ হইল। ভগবতী বসুমতী রক্তে প্লাবিত হইয়া উঠিলেন।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

রাজকুলেন্দ্র বৃদ্ধ প্রিয়ামনন্দন অরিন্দম হেক্‌টর এইরূপ স্ববলদলে রণক্ষেত্রে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। গ্রীক্‌শিবিরে এক মহাতঙ্ক উপস্থিত হইল। অনেকানেক বলীগণ সভয়ে পলায়ন-তৎপর হইল। সৈন্যের এরূপ সাহসশূন্যতায় নেতামহোদয়েরা ব্যাকুলচিত্ত হইয়া উঠিলেন। যেমন দুই বিপরীত কোণ হইতে বেগবান্ বায়ু বহিতে আরম্ভ করিলে মকর ও মীনাকর সাগরে জলরাশি অশান্তভাবে স্ফুরিতে থাকে, গ্রীক্‌-সেনাপতিদলের মনও সেইরূপ বিকল ও বিহ্বল হইয়া উঠিল।

রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌ অতীব ব্যথিত হৃদয়ে ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন। এবং রাজবন্দীবৃন্দকে অতি মৃদুস্বরে নেতৃবৃন্দকে সভামণ্ডপে আহ্বান করিতে আজ্ঞা করিলেন। সভা হইল, রাজচক্রবর্ত্তী জলপূর্ণ প্রস্রবণের ন্যায় অনর্গল অশ্রুবিন্দু নিপাত ও দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করতঃ কহিলেন, হে বান্ধবদল, হে গ্রীক্‌কুলনাশক, হে অধিপতিগণ! দেখ, নির্দ্দয় দেবকুলপিতা অদ্য আমাকে কি বিপজ্জালে পরিবেষ্টিত করিয়াছেন। যাত্রাকালে তিনি আমাকে যে আশা ভরসা দিয়াছিলেন, তাহা ফলবতী করিতে, বোধ হয়, তিনি নিতান্ত অনিচ্ছুক। হায়! আমরা কেবল বিফলে বহুপ্রাণ হারাইবার জন্য এ কুদেশে কুলগ্নে আসিয়াছিলাম! এক্ষণে চল, আমরা দূর জন্ম-ভূমিতে ফিরিয়া যাই! এ মহানগর ট্রয় পরাভূত করা আমাদের ভাগ্যে নাই। রাজচক্রবর্ত্তীর এই বাক্যে গ্রীক্‌দল স্বশোকে যেন অবাক হইয়া রহিল। কতক্ষণ পরে রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ উঠিয়া কহিতে লাগিলেন, হে রাজচক্রবর্ত্তী সৈন্যাধ্যক্ষ মহোদয়! আমি যাহা কহিতে বাঞ্ছা করি, সে লাঞ্ছনা উক্তিতে আপনি বিরক্ত হইবেন না। দেবকুলপিতার ভয়ে আমরা সকলেই তোমার অধীন বটি; কিন্তু এরূপ পদপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির উপযুক্ত পরাক্রম তোমাতে নাই। তুমি এ কি কহিতেছ? বীরযোনি হেলাসের পুত্র গোত্র কি এতাদৃশ বীর্য্যবিহীন, যে তাহারা স্বদেশে ফিরিয়া যাইবে। যদি তোমার এমত ইচ্ছা হয়, তবে তুমি প্রস্থান কর। তোমার ঐ পথ তোমার সম্মুখে প্রতিবন্ধক বিহীন। আর কেহই এরূপ করিতে বাসনা করে না। আর কেহই ত্রাসে পরবশ হইয়া এরূপ বাসনা করে না। রণবিশারদ দ্যোমিদের এ কথায় সকলেই প্রশংসা করিলেন। বিজ্ঞবর নেস্তর কহিলেন, হে দ্যোমিদ্‌! তুমি যথার্থ কহিয়াছ! এ দেশ পরিত্যাগ করা কোন মতেই যুক্তিসিদ্ধ নহে। কিন্তু এস্থলে এ বিষয়ের আন্দোলন করা ও অনুচিত, অতএব হে রাজচক্রবর্ত্তী! তুমি প্রধান প্রধান নেতামহোদয়গণকে আপন শিবিরে আহ্বান কর, এবং তদগ্রে কতিপয় রণকোবিদ্‌ বাহুবলশালী বীরদলকে পরিখার সন্নিকটে এ শিবিরের রক্ষা কার্য্যে প্রেরণ কর। বিজ্ঞবরের এ আজ্ঞা রাজা শিরোধার্য্য করিলেন। রাজশিবিরে প্রথমে লোকনাথ দলের পরিতোষার্থে উপাদেয় ভোজন পান সামগ্রী দাসদলে আনয়ন করাইলেন। ভোজন পানে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিবারিত হইলে, বৃদ্ধ নেস্তর কহিতে লাগিলেন, হে রাজচক্রবর্ত্তী! আমি যাহা কহিতেছি, আপনি তাহা বিশেষ মনোযোগ করিয়া শ্রবণ করুন। আমার বিবেচনায় বীরকেশরী আকিলীসের সহিত কলহ করা আপনার অতীব অন্যায় হইয়াছে, কেন না, আপনি বিলক্ষণ জানিবেন যে বীরকুলহর্ষ্যক্ষের বাহুবল স্বরূপ আবৃতি ব্যতীত এমন কোন আবরণ নাই, যে তদ্দ্বারা আপনি ঐ ভাস্বর কিরীটী হেক্‌টরের নাশক অস্ত্রাঘাত হইতে এ সৈন্যের রক্ষা করিতে পারেন। বিজ্ঞবরের এই কথায় রাজচক্রবর্ত্তী কহিলেন, হে ভগবন্! হে তাত! আপনি যাহা কহিতেছেন, তাহা যথার্থ। কিন্তু আমি রোষ-পরবশ হইয়া যে দুষ্কর্ম্ম করিয়াছি, এই তাহার সমুচিত দণ্ড বটে! এক্ষণে ভগ্নপ্রীতি শৃঙ্খল পুনর্যুক্ত করিতে আমি সেই অস্পৃষ্টা কুমারী ব্রীষীসা সুন্দরীর সহিত তাহাকে বিবিধ মহার্হ ধন দিতে প্রস্তুত আছি, এমন কি, যদ্যপি ভগবান দেবকুলপিতা আমাদিগকে রণজয়ী করেন, তাহা হইলে আমার রাজপুরে তিনটী পরম সুন্দরী নন্দিনীর মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা করেন, তাহার সহিত বিনাপণে উহার পরিণয় ক্রিয়া সমাধা করিব। আর যৌতুক রূপে জনসমাকীর্ণ সপ্তখানি গ্রাম দিব। যে ব্যক্তি সাধনা করিলে বশবর্ত্তী না হয়, সকলেই তাহাকে ঘৃণা করে, এমন কি, কৃতান্ত দেব দেবকুলোদ্ভব হইয়াও এই দোষে নিখিল জগন্মণ্ডলে ঘৃণাস্পদ হইয়াছেন। বীরকেশরীকে কহিও, যে এই সকল দ্রব্যজাত গ্রহণ করিয়া সে আমার পুনরায় আজ্ঞাকারী হউক! আমি এ সৈন্যদলের অধ্যক্ষ এবং বয়সেও তাহার জ্যেষ্ঠ!

রাজ বাক্যে বিজ্ঞবর নেস্তর মহা সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, হে রাজকুলপতি! এই তোমার উপযুক্ত কর্ম্ম বটে! অতএব এই নেতৃদলের মধ্য হইতে কতিপয় বিজ্ঞতম জনকে এ সুবার্ত্তা বহনার্থে বীরকেশরীর শিবিরে প্রেরণ কর। আমার বিবেচনায়, দেবপ্রিয় ফেনিক্স, মহেষ্বাস আয়াস, ও অভিজ্ঞ আদিস্যুসের সহিত হদ্যুস্‌ ও উরুবাতীস দূতদ্বয়কে এ কার্য্য সাধনার্থে প্রেরণ করিলে ভাল হয়! কিন্তু যাত্রাগ্রে শান্তিজল ইহাদের উপরি সেচন কর, আর তোমরা সকলে মঙ্গলার্থে মঙ্গলদাতা জ্যুসের সকাশে প্রার্থনা কর।

পরে পঞ্চজন ধীরে ধীরে উচ্চবীচীময় সাগরতট পথ দিয়া বীরকেশরী আকিলীসের শিবিরাভিমুখে চলিলেন, এবং বসুধাপরিবেষ্টিত জলদলপতিকে মঙ্গলার্থে স্তুতি করিতে লাগিলেন। বীরকেশরীর শিবির সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন যে তিনি এক সুনির্ম্মিত মধুরধ্বনি বীণা সহকারে বীরকুলের কীর্তি সংকীর্তন করিয়া আপন চিত্তবিনোদন করিতেছেন। সখা পাত্রক্লুস্ নীরবে সম্মুখে বসিয়া রহিয়াছেন। সর্ব্বাগ্রে দেবোপম আদিস্যুস্‌ শিবির দ্বারে উপনীত হইলেন। বীরকেশরী পঞ্চজনের সহসা সন্দর্শনে চমৎকৃত হইয়া আসন পরিত্যাগ করতঃ তাহাদিগের হস্ত আপন হস্ত দ্বারা স্পর্শ করিয়া কহিলেন, হে বীরেন্দ্রবর! আসিতে আজ্ঞা হউক! এই কহিয়া বীরকেশরী অতিথিবর্গকে সুন্দরাসনে বসাইলেন। এবং পাত্রক্লুসকে কহিলেন, হে সখে! তুমি উত্তম পাত্র দ্বারা উত্তম সুরা শীঘ্র আনয়ন কর। কেননা, অদ্য আমার এ বাসস্থলে আমার পরমপ্রিয় মহোদয়গণ শুভাগমন করিয়াছেন। বীর অতিথিবর্গের আতিথ্য ক্রিয়া সুচারুরূপে সমাধা হইলে আদিস্যুস্‌ কহিতে লাগিলেন। হে দেবপুষ্ট ধন্বী! আমরা যে কি হেতু তোমার এ শিবিরে আগমন করিয়াছি, তাহার কারণ শ্রবণ কর। আমাদিগের জীবন মরণ অধুনা তোমারি হস্তে। কেন না, এদলের শঙ্কটকারী হেক্‌টর স্ববলে আমাদিগের শিবির সন্নিকটে অবস্থিতি করিতেছে, এবং তাহার এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা যে, আমাদিগের পোতসকল ভস্মসাৎ করিয়া আমাদিগকে যমালয়ে প্রেরণ করিবে। অতএব তুমি মনোনিকৃন্তনকারী রোষ অন্ত করিয়া পুনরায় স্বকুন্তে আমাদিগকে রক্ষা কর।

রাজচক্রবর্ত্তী অগেমেম্‌নন্‌ তোমার সহিত সন্ধি করিতে অত্যন্ত ব্যগ্র। এবং তোমাকে কৃশোদরী ব্রীষীসার সহিত বহুবিধ ধন দিতে প্রস্তুত। এবং তাহার তিন লাবণ্যবতী দুহিতার মধ্যে, যাহাকে তোমার ইচ্ছা, তাহার সহিত তোমার পরিণয় দিতে সম্মত আছেন, কিন্তু যদ্যপি, হে রিপুসূদন, এ সকল বস্তু গ্রহণে তোমার রুচি না হয়, অথচ রিপুপীড়িত গ্রীক্‌যোধদলের প্রতি তুমি দয়া কর। এবং তাহাদিগের প্রাণদানে তাহাদিগকে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ কর। আর এই সুযোগে নিষ্ঠুর রিপু হেক্‌টরকেও ঘোর রণে বিনষ্ট করিয়া অক্ষয় যশঃ লাভ কর।

বীরকেশরী আকিলীস্‌ উত্তর করিলেন, হে আদিস্যুস্‌, আমি তোমাদিগের নিকট আমার মনের কথা মুক্তকণ্ঠে ব্যক্ত করিব। সে কপট ব্যক্তি নরকদ্বার তুল্য আমার নিকট ঘৃণিত; যে তাহার মনঃভেদবাক্য রসনাকে কহিতে দেয় না। এরূপ ব্যক্তি নরাধম। রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌ননের সহিত আমার ভগ্নপ্রণয় শৃঙ্খল আর কোন মতেই সুশৃঙ্খল হইতে পারে না।

দেখ! যেমন বিহঙ্গী পক্ষবিহীন ও আত্মরক্ষাক্ষম শিশু শাবকগুলির পালনার্থে বহুবিধ আয়াস সহ্য করিয়া বহুবিধ খাদ্যদ্রব্য আনয়ন করে, আপন জীবনাশায় জলাঞ্জলি দিয়া তাহাদিগের রক্ষণাবেক্ষণ করে, সেইরূপ আমি এ সেনার হিতার্থে কি না করিয়াছি? কত শত কৃতান্তসদৃশ রিপুকুলান্তক রিপুর সহিত ঘোরতর সমর করিয়াছি; কিন্তু ইহাতে আমার কি ফল লাভ হইয়াছে। তোমরা সকলে স্বস্থানে ফিরিয়া যাও। কল্য আমি সাগর পথে স্বজন্ম ভূমিতে ফিরিয়া যাইব।

বীরকেশরী এই নিষ্ঠুর বাক্যে মুগ্ধচিত্ত হইয়া তাহাকে বিবিধ প্রবোধ বাক্যে সাধিলেন। কিন্তু তাহাদিগের যত্ন অকর্ম্মণ্য ও বিফল হইল। বীরকেশরী আকিলীসের হৃদয়কুণ্ডে প্রচণ্ড রোষাগ্নি পূর্ব্ববৎ জ্বলিত রহিল। দূতমহোদয়েরা বিষণ্ণবদনে রাজশিবিরে প্রত্যাগমন করিলে রাজচক্রবর্ত্তী জিজ্ঞাসা করিলেন, হে প্রশংসাভাজন আদিস্যুস্‌! হে গ্রীক্‌ কুলের গৌরব! কি সংবাদ। তোমরা কি কৃতকার্য্য হইয়াছ। আদিস্যুস্‌ উত্তর করিলেন, মহারাজ! বীরকেশরী আকিলীস্‌ এসেনার হিতার্থে রণ করিতে নিতান্ত অনভিলাসুক। কল্য প্রত্যুষে তিনি সাগরপথে স্বদেশে ফিরিয়া যাইবেন। এ কুসংবাদে রাজচক্রবর্ত্তীকে নিতান্ত কাতর ও উন্মনা দেখিয়া রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ কহিলেন, মহারাজ, এ দুরন্ত প্রগল্‌ভী মূঢ়ের নিকট আপনার দূত প্রেরণ করা অতীব আশ্চর্য্য হইয়াছে। কেননা আপনার বিনীতভাবে তাহার আত্মশ্লাঘা শত গুণে বৃদ্ধি পাইয়াছে, তাহার যাহা ইচ্ছা সে তাহাই করুক। হয় ত, কালে দেবতা তাহাকে রণোৎসুক করিবেন। এক্ষণে আমাদের সকলের বিশ্রাম লাভ করা আবশ্যক। প্রত্যূষে হৈমবতী ঊষা সন্দর্শন দিলে তুমি আপনি পদাতিক ও বাজীরাজী ও রথগ্রামে পরিবেষ্টিত ইহয়া সমরক্ষেত্রে বীরবীর্য্যে কার্য্য সমাধা কর। দেখ, ভাগ্যদেবী কি করেন। রণবিশারদ দ্যোমিদের এতাদৃশী মন্ত্রণা নেতৃগোত্রে প্রসংশনীয় হইল। পরে সকলে গাত্রোত্থান করতঃ যে যাহার শিবিরে বিরাম লাভার্থে গমন করিলেন।

অন্যান্য নেতৃবৃন্দ স্বস্ব শিবিরে সচ্ছন্দে নিদ্রাদেবীর উৎসঙ্গ প্রদেশে বিরাম লাভ করিতে লাগিলেন। কিন্তু বিরামদায়িনী রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌ননের শিবিরে যেন অভিমানে প্রবেশ করিলেন না, সুতরাং লোকপাল মহোদয় দেবীপ্রসাদে বঞ্চিত হইলেন। যেমন, সুকেশ দেবী হীরীর প্রাণেশ দেবকুলপতি যৎকালে আসার, কি শিলা, কি তুষার বর্ষণেচ্ছুক হন, বাত্যারম্ভে আকাশমণ্ডল এক প্রকার ভৈরব রবে পরিপূর্ণ হয়, অথবা যেমন, কোন দেশে রণরূপ রাক্ষস নরকুলের গ্রাসাভিপ্রায়ে আপন বিকট মুখ ব্যাদান করিবার অগ্রে এক প্রকার ভয়াবহ শব্দ সে দেশে সঞ্চারিত হয়, সেইরূপ রাজ-শয়নাগার মহারাজের হাহাকারপূর্ব্বক আর্ত্তনাদে ও দীর্ঘনিশ্বাসে পূরিয়া উঠিল। যত বার তিনি রণক্ষেত্রবর্ত্তী বিপক্ষ পক্ষের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলেন। অগ্নিকুণ্ড মণ্ডলীর একত্র সংগৃহীত অংসুরাশি দর্শনে তাহার দর্শনেন্দ্রিয় অন্ধ হইয়া উঠিল। অনিলানীত মুরলী ও বেণু প্রভৃতি অন্যান্য বিবিধ সঙ্গীত যন্ত্রের সুমধুর বিশুদ্ধ তানলয়ে মিশ্রিত কোলাহল ধ্বনিতে শ্রবণালয় যেন অবরুদ্ধ হইয়া উঠিল। যত বার তিনি স্বসৈন্যের প্রতি দৃষ্টি পরিচালনা করিলেন, তাহাদিগের নিরানন্দ অবস্থায় তিনি আক্ষেপ ও রোষে কেশ ছিঁড়িতে লাগিলেন। কতক্ষণ পরে যে শয্যাক্ষেত্র দুর্ভাবনা রূপ কৃষীবল তীক্ষ্ণ কণ্টকময় করিয়াছিল, সে শয্যা পরিত্যাগ করিয়া মহারাজ গাত্রোত্থান করিলেন।

প্রথমে বক্ষদেশ সুবর্ণ কবচে আবৃত করিলেন। পরে পদযুগে সুন্দর পাদুকাদ্বয় বাঁধিলেন। এবং পৃষ্ঠদেশে এক প্রশস্ত পিঙ্গল বর্ণ সিংহ চর্ম্ম ধারণ করিয়া দক্ষিণ হস্তে স্বীয় সুদীর্ঘ শূল লইলেন। স্কন্দপ্রিয় বীরকেশরী মানিল্যুসও স্বশিবিরে সৈন্যের দুর্দ্দশাজনিত ব্যাকুলতায় নিদ্রা পরিহরণ করিয়া শয্যা ত্যাগ করিলেন, এবং রণের বেশ বিন্যাস করিয়া স্বীয় রাজভ্রাতার শিবিরাভিমুখে যাত্রা করিতেছেন, এমত সময়ে পথিমধ্যে রথীদ্বয়ের সমাগমন হইল। কণিষ্ঠ কহিলেন, হে বন্দনীয়! আপনি কি নিমিত্ত এ সময়ে এ পরিচ্ছদে শয্যা পরিত্যাগ করিয়াছেন, আপনার কি এই ইচ্ছা যে রিপুদলে কোন গুপ্ত চরকে গুপ্তভাবে প্রেরণ করেন! এ ঘোর তিমিরময় রজনী যোগে এ অসাধ্য-অভীষ্ট সিদ্ধি করিতে কাহার সাধ্য হইবে।

রাজচক্রবর্ত্তী উত্তর করিলেন, হে ভ্রাতঃ! আমি সুমন্ত্রণার্থে বিজ্ঞবর তাত নেস্তরের শিবিরে যাত্রা করিতেছি! আমার বিলক্ষণ বোধ হইতেছে যে দেবকুলপতি প্রিয়ামনন্দন অরিন্দম হেক্‌টরের নিতান্ত পক্ষ হইয়াছেন। নতুবা কোন একেশ্বর নরযোনি বলী এরূপ অদ্ভুত কর্ম্ম করিতে পারে। মনে করিয়া দেখ, গত দিবসে এ দুর্দ্দান্ত অশান্ত ব্যক্তি কি না করিয়াছিল। গ্রীক্‌সেনার স্মৃতিপথ হইতে ইহার অদ্বিতীয় পরাক্রমের উত্তাপ কি শীঘ্র দূরীকৃত হইবে। হে দেবপুষ্ট ভ্রাতঃ! রিপুকুলত্রাস আয়াস্‌ ও অন্যান্য সুহৃজ্জনকে গিয়া ডাকিয়া আন। আমি বিজ্ঞবর তাত নেস্তরের সন্নিকটে যাই। মহারাজ এইরূপে প্রিয় ভ্রাতার নিকট বিদায় লইয়া বিজ্ঞবর নেস্তরের শিবিরে প্রবেশপূর্ব্বক দেখিলেন, প্রাচীন রণসিংহ কোমল শয্যাশায়ী হইয়া রহিয়াছেন। একখানি ফলক দুইটা শূল এবং ভাস্বর শিরষ্ক, এই সকল বিচিত্র পরিচ্ছদ নিকটে শোভিতেছে। মহারাজের পদধ্বনিতে নিদ্রা ভঙ্গ হইলে, বৃদ্ধ যোধপতি কহিলেন; তুমি, এ ঘোর অন্ধকার রাত্রিকালে নিদ্রা পরিহার করিয়া, আমার এ শয়ন মন্দিরে সহসা উপস্থিত হইলে কেন। কারণ কহ! নতুবা নীরবে আমার নিকটবর্ত্তী হইলে তোমার আর নিস্তার থাকিবে না, তুমি কি চাহ। দেখ, যদি স্বরসংযোগে তোমাকে চিনিতে পারি। মহারাজ উত্তর করিলেন, হে তাত! হে গ্রীক্‌বংশের অবতংস! আমি সেই হতভাগা আগেমেম্‌নন্‌! যাহাকে দেবরাজ দুস্তর বিপদার্ণবে মগ্ন করিয়াছেন। এ দুরবস্থা হইতে যে আমি কি প্রকারে নিষ্কৃতি পাই, এই সম্পর্কে তোমার পরামর্শাভিলাষে এরূপ স্থানে আসিয়াছি। আমি দুর্ভাবনায় একবারে যেন জীবন্মৃত ও হতজ্ঞান। হে তাত! দেখ, রণদুর্ব্বার হেক্‌টর স্ববলে আমাদের শিবির দ্বারে থানা দিয়া রহিয়াছে। কে জানে, তাহার কৌশলে অদ্য নিশাকালে আমার কি অনিষ্ট ঘটে। বিজ্ঞবর সস্নেহ বচনে কহিলেন বৎস! আগেমেম্‌নন্‌! আমার বিবেচনায় ত্রিদশাধিপতি হেক্‌টরকে এতদূর আমাদের অপকার করিতে দিবেন না। কিন্তু চল, আমরা উভয়ে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সহিত এ বিষয়ের পরামর্শ করিগে। আমরা যে বিষয়, বিপজ্জালে বেষ্টিত, তাহার কোনই সন্দেহ নাই। এই কহিয়া বৃদ্ধবর আস্তে ব্যস্তে রণশস্ত্র ধারণ করিয়া রাজচক্রবর্ত্তীর সহিত দেবোপম জ্ঞানী আদিস্যুসের শিবিরে গমন করিলেন। আদিস্যুস্‌ অতিশীঘ্র বীরদ্বয়ের আহ্বানে শিবিরের বহির্গত হইলেন। পরে তিন জনে একত্রে রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদের শিবির সন্নিকটে দেখিলেন যে, বীরকেশরী রণসজ্জায় নিদ্রা যাইতেছেন। তাহার চতুষ্পার্শ্বে শূলীদলের চ্যুত শূলাগ্র বিদ্যুতের ন্যায় চক্‌মক্‌ করিতেছে! প্রাচীন রণসিংহ পদস্পর্শনে সুপ্ত রথীর নিদ্রাভঙ্গ করিয়া কহিলেন, হে দ্যোমিদ্‌! এ কাল নিশাকালে কি তোমার সাদৃশ বীরপুরুষের এরূপ শয়ন উচিত। রণবিশারদ দ্যোমিদ্‌ চকিত হইয়া গাত্রোত্থান করিয়া কহিলেন, হে বৃদ্ধ! তোমার সদৃশ ক্লান্তি শূন্য জন কি আর আছে! এ সৈন্যে কি কোন যুবক পুরুষ নাই, যে সে তোমাকে বিরাম সাধনে অবকাশ দান করে। এই কহিয়া চারি জন প্রহরীদিগের দিকে চলিলেন। যেমন বন্যপশুময় বনের নিকটে মাংসাহারী পশুগণের দূরস্থিত ঘোর নিনাদ শ্রবণে সতর্ক হইয়া মেষপাল দলেরা স্ব স্ব মেষপালের রক্ষার্থে বিরামদায়িনী নিদ্রায় জলাঞ্জলি দিয়া অস্ত্র হস্তে জাগিয়া থাকে, বীরবরেরা দেখিলেন, যে প্রহরীদল অবিকল সেইরূপ রহিয়াছে। বৃদ্ধবর সন্তোষোক্তি ও সাহসোত্তেজক বচনে কহিলেন, হে বৎসদল! প্রহরী কার্য্য সমাধা করিতে হইলে বীর বীর্য্যশালী জনগণের এই রূপই উচিত। অতএব তোমরাই ধন্য! এই কহিয়া বীরবরেরা পরিখা পার হইয়া এক শবশূন্যস্থলে বসিয়া নিভৃতে নানা উপায় উদ্ভাবন করিতে লাগিলেন।

বিজ্ঞবর নেস্তর কহিলেন, আমাদের মধ্যে এমত সাহসিক ব্যক্তি কে আছে, যে সে গুপ্তচর কার্য্যে কৃতকার্য হইতে পারে। রণবিশারদ দ্যোমিদ্‌ কহিলেন, আমার সাহসপূর্ণ হৃদয় এ কঠিন কর্ম্মে আমাকে উৎসাহ প্রদান করে, তবে যদি আমি কোন একজন সঙ্গী পাই, তাহা হইলে মনোরঙ্গের আর ও বৃদ্ধি হয়। বীরবরের এই কথা শুনিয়া অনেকেই তাঁহার সঙ্গে যাইবার প্রসঙ্গ করিলেন, কিন্তু তিনি কেবল বিবিধ কৌশলী আদিস্যুসকে সহচর করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। বীরদ্বয় ছদ্মবেশ ধরিলেন। এবং অতি তীক্ষ্ণ অস্ত্র সকল দেহাচ্ছাদন বস্ত্রে গোপনে সঙ্গে লইলেন। উভয়ে যাত্রা করিতেছেন, এমত সময়ে দেবী আথেনী বায়ুপথে একটি বক পক্ষী উড়াইলেন। সুতরাং ঘোর তিমির যোগে বীরযুগল সেই শুভ শকুন দেখিতে পাইলেন না। তথাচ পক্ষ পরিচালনার শব্দে দেবীদত্ত সুলক্ষণ তাহাদিগের বোধগম্য হইল। মহাদেবীর বিবিধ স্তুতি করণান্তে সিংহদ্বয় সে ঘোর অন্ধকারময় রজনীযোগে শবরাশি, ভগ্নঅস্ত্রস্তূপ ও কৃষ্ণবর্ণ শোণিতস্রোতের মধ্য দিয়া নির্ভয় হৃদয়ে রিপুদলাভিমুখে নীরবে চলিলেন।

কতক্ষণ পরে দেবাকৃতি আদিস্যুস কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া সহচরকে অতি মৃদুস্বরে কহিলেন, সখে দ্যোমিদ্‌! বোধ হয়, যেন কোন একজন অরিপক্ষের শিবির দেশ হইতে এ দিকে আসিতেছে। আমি এক আগন্তুক জনের পদধ্বনি শুনিতে পাইতেছি। কিন্তু এ কি কোন গুপ্তচর, না তস্কর মৃতদেহ হইতে বস্ত্রাদি চুরি করণাভিলাষে আসিতেছে, এ নির্ণয় করা দুষ্কর। আইস! আমরা উহাকে আমাদিগের শিবিরাভিমুখে যাইতে দি। পরে পশ্চাদ্ভাগ হইতে উহার পলায়নের পথরুদ্ধ অতি সহজ হইবে। এই কহিয়া বীরদ্বয় মৃতদেহ পুঞ্জমধ্যে ভূতলশায়ী হইলেন। অভাগা আগন্তুক জন অকুতোভয়ে ও দ্রুতগমনে গ্রীক্‌ শিবিরাভিমুখে চলিতে লাগিল। অকস্মাৎ বীরদ্বয় গাত্রোত্থান করিয়া তাহার পশ্চাতে ধাবমান হইলেন। যেমন তীক্ষ্ণদণ্ড শুনকদ্বয় বনপথে আর্ত্তনিনাদী কুরঙ্গ কি শশকের পশ্চাতে ধাবমান হয়, বীরদ্বয় সেইরূপ পলায়নোন্মুখ চরের অভিমুখে ঊর্দ্ধশ্বাসে প্রাণপণে দৌড়িলেন। মহাতঙ্কে অভাগা সহসা গতিহীন হইল। এবং অকাতরে কহিল। “হে বীরদ্বয়! তোমরা আমার প্রাণদণ্ড করি না। আমাকে রণবন্দী করিয়া রাখ, আমার নাম দোলন। আমার পিতা আমাকে মুক্ত করিতে অনেক অর্থ দিবেন, তাহার কোনই সন্দেহ নাই; কেননা, আমি তাহার একমাত্র পুত্র।” প্রিয়ম্বদ আদিস্যুস প্রিয়বচন কহিলেন। “হে দোলন, তোমার ভয় নাই। তোমাকে বধ করিলে আমাদের কি ফল লাভ হইবে। কিন্তু তুমি আমাদের সহিত চাতুরি করিও না, করিলে প্রচুর দণ্ড পাইবে। হেক্‌টর কোথায়? এবং শিবিরের কোন পার্শ্বে সৈন্যদল নিতান্ত ক্লান্ত অবস্থায় নিদ্রার-বশীভূত হইয়া রহিয়াছে?” দোলন রোদন করিতে করিতে কহিল, “হায়! হেক্‌টরই আমার এই বিপদের হেতু! সে আমাকে নানা লোভ দেখাইয়া এই পথের পথিক করিয়াছে। তাহার সহিত নেতৃবৃন্দ দেবযোনি ঈল্যুসের সমাধিমন্দির-সন্নিধানে পরামর্শ করিতেছে। কোন বিচক্ষণ বীর শিবির রক্ষা কর্ম্মে নিযুক্ত নাই। তথাচ স্থানে স্থানে যোধচয় অস্ত্র ধারণ করতঃ অতি সতর্কে আছে, কিন্তু যদি তোমরা শিবিরে প্রবেশ করিতে চাহ, তবে যেদিকে ট্রাকীয়া দেশের নরপতি হ্রীস্যুস্‌ শয়ন করিতেছেন, সেই দিকে যাও। কেননা, নরেন্দ্র কেবল অদ্য সায়ংকালে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন, এবং তাহার সঙ্গীবর্গ পথশ্রান্ত হইয়া নিতান্ত অসাবধানে নিদ্রাদেবীর সেবা করিতেছে। রাজেশ্বর হ্রীস্যুসের অশ্বাবলী ত্রিভুবনে অতুল্য, তাহার রথ সুবর্ণরজতে নির্ম্মিত, এবং তাহার হৈমবর্ম্ম এতাদৃশ অনুপম যে তাহা কেবল দেববীর পুরুষেরই উপযুক্ত। হে রিপু-বিমুখকারী বীরদ্বয়! দেখ, আমি তোমাদের সম্মুখে সত্য ব্যতীত মিথ্যা কহি নাই, অতএব তোমরা আমাকে, হয় ত, রণবন্দী করিয়া শিবিরে প্রেরণ কর, নচেৎ এ স্থলে গাঢ় বন্ধনে বন্ধন করিয়া রাখিয়া যাও।” প্রাণ ভয়ে বিকলাত্মা দোলন এইরূপে রিপুদ্বয়ের নিকট কাকুতি মিনতি করিতেছেন, এমত সময়ে নির্দ্দয়হৃদয় দ্যোমিদ্‌ সহসা তাহার গলদেশে প্রচণ্ড খড়্গাঘাত করিলেন। মস্তক ছিন্ন হইয়া ভূতলে পড়িল।

তৎপরে বীরদ্বয় অতি সাবধানে ট্রাকীয়া দেশস্থ সৈন্যাভিমুখে চলিলেন, এবং সহসা তাহাদিগকে আক্রমণ করিলেন, অনেক বীরপুরুষ শমনাগারে চলিলেন। রাজেশ্বর হ্রীস্যুসও অকালে কালগ্রাসে পড়িলেন, রাজার অণুপমা অশ্বাবলী একত্রে বন্ধন করিয়া বীরদ্বয় শিবিরাভিমুখে অতি দ্রুতবেগে চলিতে লাগিলেন। ট্রয় সৈন্যে সহসা মহা কোলাহলধ্বনি হইয়া উঠিল।

এ দিকে বীরদ্বয় হ্রীস্যুস্‌ রাজেশের অসদৃশ অশ্বাবলী অপহরণ করিয়া আশুগতিতে স্বদলে রণাভিমুখে চলিলেন। যেস্থলে রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌ ও বৃদ্ধ নেস্তরাদি পরিখার সন্নিকটে নিভৃতে বসিয়াছিলেন, সে স্থলে আগন্তুক বীরদ্বয়ের পদধ্বনি শ্রুত হইলে রাজচক্রবর্ত্তী ত্রস্ত ও সোৎকণ্ঠ ভাবে নেস্তরাদি সঙ্গী জনকে কহিলেন, “বোধ হয়, কতিপয় অশ্বারোহী জন পদাতিকদলে অতিদ্রুত গতিতে এ দিকে আসিতেছে। অতএব সকলে সাবধান, একজন কহিলেন, “এ বৈরী নহে, ঐ দেখ বিবিধ কৌশলশালী আদিস্যুস্‌ ও রিপুগর্ব্ব খর্ব্বকারী দ্যোমিদ্‌ কয়েকটী রণতুরঙ্গ সঙ্গে করিয়া আসিতেছে।” রাজা মিত্রদ্বয়কে অমিত্রচ্ছলে দর্শন করিয়া পরমাহ্লাদে কহিলেন, “হে গ্রীক্‌কুল গৌরব রবি আদিস্যুস,” তোমাকে কোন দেব এ দুর্লভ প্রসাদ দান করিয়াছেন, তুমি কি এই অশ্বাবলী অংশুমালীর একচক্র রথ হইতে কৌশল চক্রে অপহরণ করিয়াছ, এরূপ অপরূপ অশ্বাবলী কি আর এ বিশ্বখণ্ডে আছে?

মহেষ্বাস্‌ আদিস্যুস্‌ রাজপ্রবীর হ্রীস্যুসের নিধন ও বাজীরাজীর অপহরণ বৃত্তান্ত সংক্ষেপে বর্ণন করিলে সকলে আনন্দ চিত্তে শিবিরে গমন করিলেন, ক্লান্তু বীরযুগল চলোর্ম্মি সাগরে রক্তার্দ্র দেহ অবগাহন করতঃ সুরভি তৈলে সুবাসিত করিলেন। পরে সুখাদ্য দ্রব্যে ক্ষুধা নিবারণ করিয়া প্রথমে মহাদেবী অথেনীর তর্পনার্থে ভূতলে কিঞ্চিৎ সুরা সিঞ্চন করতঃ অবশিষ্ট ভাগ হৃষ্টহৃদয়ে পান করিতে লাগিলেন।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ সমাপ্ত।

প্রথম পরিচ্ছেদ

প্রথম পরিচ্ছেদ।

দেব পুরোহিত আপন অভীষ্ট দেবের রাজদণ্ড, মুকুট, ও স্বকন্যার মোচনোপযোগী বহুবিধ মহার্হ দ্রব্যজাত হস্তে করিয়া গ্রীক্‌সৈন্যের শিবির সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। এবং সৈন্যাধ্যক্ষ রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন ও তাঁহার ভ্রাতা এবং অন্যান্য নেতৃগণকে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন; হে বীরপুরুষগণ! ত্রিদিবনিবাসী অমরকুল
তোমাদিগকে এই আশীর্ব্বাদ করুন, যে তোমরা অতিত্বরায় রাজা প্রিয়ামের নগর পরাভূত করিয়া নির্ব্বিঘ্নে স্বরাজ্যে পুনরাগমন কর। এই দেখ, আমি আপন দুহিতার মোচনার্থে বহুমূল্য দ্রব্যজাত সঙ্গে আনিয়াছি, অতএব এতদ্দ্বারা তাহাকে মুক্ত করিয়া, যে ভাস্বর দেবের সেবায় আমি নিয়ত নিরত আছি, তাহার মান ও গৌরব রক্ষা কর।

গ্রীক্‌সৈন্যেরা পুরোহিতের এবম্বিধ বচনাবলী আকর্ণন পূর্ব্বক উচ্চৈঃস্বরে একবাক্যে কহিয়া উঠিল, যে এ অবশ্যকর্ত্তব্য কর্ম্মে আমরা কখনই পরাঙ্মুখ হইব না, বরং এই সকল পরিত্রাণ সামগ্রী গ্রহণ পূর্ব্বক এই মুহূর্ত্তেই কন্যাটীর নিষ্কৃতি সাধন করিব। কিন্তু তাহাদের এতাদৃশ বাক্য রাজা আগেমেম্‌ননের মনোনীত হইল না। তিনি মহাক্রোধভরে ও পরুষ বচনে পুরোহিতকে কহিলেন, হে বৃদ্ধ! দেখিও যেন আমি এ শিবিরসন্নিধানে তোমাকে আর কখন দেখিতে না পাই। তাহা হইলে তোমার অভীষ্ট দেবও আমার রোষানল হইতে তোমাকে রক্ষা করিতে সক্ষম হইবেন না! আমি তোমার কন্যাকে কোনক্রমেই ত্যাগ করিব না। সে আমার রাজধানী আর্‌গস্ নগরে আপন জন্মভূমি হইতে দূরে যাবজ্জীবন আমার সেবা করিবে। অতএব যদি তুমি আপন মঙ্গল আকাঙ্ক্ষা কর, তবে অতিত্বরায় এস্থান হইতে প্রস্থান কর।

বৃদ্ধ পুরোহিত রাজার এইরূপ বাক্য শুনিয়া সশঙ্কচিত্তে তদ্দণ্ডে তাহার আদেশ প্রতিপালন করিলেন, এবং মৌনভাবে ও ম্লানবদনে চিরকোলাহলময় সাগরতীর দিয়া স্বধামে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। অশ্রুবারিধারায় আর্দ্রবসন হইয়া স্বীয় অভীষ্টদেবকে সম্বোধিয়া কহিলেন, হে রজতধনুর্দ্ধর! যদি তুমি আমার নিত্য নৈমিত্তিক সেবায় প্রসন্ন হইয়া থাক, তবে শরজাল বর্ষণে দুষ্ট গ্রীক্‌দলকে দলিত করিয়া, তাহারা আমার প্রতি যে দৌরাত্ম্য করিয়াছে, তাহার যথাবিধি প্রতিবিধান কর। পুরোহিতের এই স্তুতিবাক্য দেবকর্ণগোচর হইলে মরীচিমালী রবিদেব মহাক্রুদ্ধ হইয়া স্বর্গ হইতে ভূতলে অবতীর্ণ হইলেন। দেবপৃষ্ঠদেশে লম্বমান তূণীরে শরজাল ভয়ানক শব্দে বাজিতে লাগিল; এবং রোষভরে দেববদন যেন তমোময় হইয়া উঠিল। গ্রীক্‌ শিবিরের অনতিদূর হইতে দিননাথ প্রথমে এক ভীষণ শর নিক্ষেপ করিলেন, এবং ধনুষ্টঙ্কারের ভয়াবহ স্বনে শিবিরস্থ লোক সকলের হৃৎকম্প উপস্থিত হইল। প্রথম শরে অশ্বতর ও ক্ষিপ্রগামী গ্রামসিংহ সকল বিনষ্ট হইল; দ্বিতীয়বার শর নিক্ষেপে সৈন্যদল ছিন্ন ভিন্ন ও হত আহত হওয়াতে মুহুর্মুহুঃ চারিদিকে চিতাচয়ে শবদাহাগ্নি প্রজ্বলিত হইতে লাগিল। অংশুমালীর শরমালায় গ্রীক্‌সৈন্যেরা নয় দিবস পর্য্যন্ত লণ্ডভণ্ড ও ক্ষত বিক্ষত হইল; দশম দিবসে মহাবীর আকিলীস্‌ নেতৃবর্গকে সভামণ্ডপে আহ্বান করিলেন, এবং রাজেন্দ্র আগেমেম্‌নন্‌কে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন, এ রাজন্‌! আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় আমাদিগের উচিত, যে আমরা স্বদেশে পুনরায় ফিরিয়া যাই, কেন না, যে উদ্দেশে আমরা দুস্তর সাগর পার হইয়া আসিয়াছি, তাহা কোনক্রমেই সফল হইল না। মহামারী এবং নশ্বর সমর এই রিপুদ্বয় দ্বারাই গ্রীকেরা পরাজিত হইল। তবে যদ্যপি এস্থলে কোন দেবরহস্যজ্ঞ বিজ্ঞতম হোতা কিম্বা গণক থাকেন; তাহা হইলে তিনি আমাদিগকে বলুন, যে কি কারণে বিভাবসু আমাদের প্রতি এত প্রতিকূল ও ক্রূর হইয়াছেন, আর কি আরাধনাতেই বা দেববরের প্রতিকূলতা ও ক্রূরতা দূরীভূত হইতে পারে।

বীরবরের এই কথা শুনিয়া থেষ্টরের পুত্র মুনীশশ্রেষ্ঠ কাল্‌কষ্‌, যিনি ভুত, ভবিষ্যৎ, বর্ত্তমান,—ত্রিকালজ্ঞ ছিলেন, কহিলেন, হে আকিলীস্‌! হে দেবপ্রিয়রথি! তোমার কি এই ইচ্ছা, যে রবিদেব কি নিমিত্ত তোমাদের প্রতি এত দূর বাম ও বিরক্ত হইয়াছেন, তাহা আমি স্পষ্টরূপে ব্যাখ্যা করি? ভাল, আমি তোমার বাক্যে সম্মত হইলাম। কিন্তু তুমি অগ্রে আমার নিকট এই স্বীকার কর, যে যদ্যপি আমার কথায় রাজ-হৃদয়ে কোন বিরক্তিভাবের উদয় হয়, তবে তুমি সে রাজক্রোধ হইতে আমাকে রক্ষা করিবে।

কাল্‌কষের এই কথা শুনিয়া মহাবাহু আকিলীস্‌ উত্তরিলেন, হে কাল্‌কষ্‌! তুমি নিঃশঙ্কচিত্তে মনের ভাব ব্যক্ত কর। আমি দেবেন্দ্রপ্রিয় অংশুমালী রবিদেবকে সাক্ষী করিয়া শপথ পূর্ব্বক কহিতেছি, যে এ সভায় এমন ব্যক্তিই নাই, যাহাকে আমি তোমার অবমাননা করিতে দিব। অধিক কি বলিব, সৈন্যাধ্যক্ষপদপ্রতিষ্ঠিত রাজা আগেমেম্‌ননেরও এতদূর সাহস হইবে না। অতএব তুমি দৈবশক্তি দ্বারা যাহা বিদিত আছ, মুক্তকণ্ঠে ও অভয়ান্তঃকরণে তাহা প্রচার কর।

এই কথায় কাল্‌কষ্‌ উত্তর দিলেন, হে বীরবর! ভাস্বর রবিদেব যে কি নিমিত্ত এ সৈন্যের প্রতি এতদূর প্রতিকূলাচরণ করিতেছেন, তাহার নিগূঢ় কারণ বলি, শ্রবণ করুন। যখন তোমরা ক্রূষা নগর লুটিয়াছিলে, তৎকালে রবিদেবের কোন এক পুরোহিতের একটী কন্যা অপহরণ করা হইয়াছিল; অপহৃত দ্রব্যজাতের বণ্টনকালে সেই কন্যাটী রাজচক্রবর্ত্তীর অংশে পড়ে। কয়েক দিবস হইল, গ্রহপতির পূজক স্বদেবের রাজদণ্ড, মুকুট, ও বহুবিধ মহার্হ বস্তুসমূহ সঙ্গে লইয়া এ শিবিরদেশে আসিয়াছিলেন, তাহার মনে এই বলবতী প্রতীতি ছিল, যে এ স্থলস্থ বীরব্যুহ বিভাবসুর রাজদণ্ড ও মুকুট দর্শন মাত্রেই তাহার সেবকের যথোচিত সম্মান করিবেন এবং তদানীত বহুবিধ মহার্হ দ্রব্যাদি গ্রহণ পূর্ব্বক দেবদাসের অবরুদ্ধা দুহিতাকে মুক্তি প্রদানিবেন। কিন্তু এই দুই আশার কোন আশাই ফলবতী হইল না। তন্নিমিত্ত তাহার অর্চ্চিত দেব তদবমাননায় রোষাবিষ্টচিত্ত হইয়া এ সৈন্য দলকে এইরূপ প্রচণ্ড দণ্ড দিতে আরম্ভ করিয়াছেন। এক্ষণে দেববরকে প্রসন্ন করিবার কেবল একমাত্র উপায় আছে। সেই পরমরূপবতী যুবতীকে নানা অলঙ্কারে অলঙ্কৃ‌ত করিয়া এবং দেবপূজার্থে বহুবিধ পূজোপহার ও বলি পুরোহিতের গৃহে প্রেরণ করিলে, বোধ করি, আমরা এ বিপজ্জাল হইতে অব্যাহতি পাইতে পারি, নতুবা দশ বৎসরে রিপুকুলের অস্ত্রাগ্নি যতদূর করিতে পারে নাই, অতি অল্প দিনেই দেবক্রোধে ততোধিক ঘটিয়া উঠিবে, সন্দেহ নাই। হে বীরবর! ভগবান্ অশীতরশ্মির ক্রোধে এ শিবিরাবলী অতি ত্বরায় জনশূন্য হইবে। এবং ঐ দ্রুতগামী সাগরযান সমূহও, এ সৈন্যদল যে কি কুক্ষণে স্বদেশ হইতে যাত্রা করিয়াছিল, তাহার অভিজ্ঞানরূপে এই তীরসন্নিধানে সাগরজলে বহুকাল ভাসিতে থাকিবেক।

কালকষের এবম্বিধ বচনবিন্যাস শ্রবণে রাজা অগেমেম্‌নন্‌ ক্রোধে আরক্তনয়ন হইয়া অতি কর্ক্কশ বচনে কহিলেন, রে দুষ্ট প্রতারক! তোর কুরসনা আমার হিতার্থে কখন কোন কথাই কহিতে জানে না; আমার অহিত সংবাদ তোর পক্ষে বড় প্রীতিকর। এক্ষণে যদি তোর কথা সত্য হয়, তবে আমি এ কুমারীটিকে মুক্ত করি নাই বলিয়াই রবিদেব এ সৈন্যদলকে এত কষ্টে ফেলিয়াছেন। আমি যে পুরোহিতদত্ত বহুবিধ ধন গ্রহণ করিয়া তাহার কন্যাকে মুক্ত করি নাই, সে কথা অলীক নহে। এ কুমারীটী অতি সুন্দরী, এবং আমার সহধর্ম্মিণী রাণী ক্লুতিম্নিস্তরা অপেক্ষাও আমার সমধিক নয়নানন্দিনী। এ কুমারী রূপ, গুণ, বিদ্যা, বুদ্ধি, কোন অংশেই রাণী অপেক্ষা নিকৃষ্টা নহে; তথাচ আমি ইহাকে এ সৈন্যদলের হিতার্থে পরিত্যাগ করিতে কুণ্ঠিত হইব না। কেননা, আমি লোকপাল, স্বপালিত লোকের হিতার্থে রাজার কি না করা উচিত? কিন্তু, হে বীরবৃন্দ! যদি আমাকে এ কন্যারত্নে বঞ্চিত হইতে হয়, তবে তোমরা আমাকে অপর একটা পারিতোষিক দিতে সযত্ন ও সচেষ্ট হও। কেননা, তোমাদের মধ্যে আমি যে কেবল পারিতোষিকচ্যুত হই, ইহা কোনমতেই যুক্তিযুক্ত নহে।

রাজার এই বাক্য শ্রবণ করিয়া মহেষ্বাস আকিলীস্‌ সাতিশয় রোষাবেশে কহিলেন, হে আগেমেম্‌নন্! তোমা অপেক্ষা লোভী জন, বোধ হয়, এ বিশ্বে আর দ্বিতীয় নাই! এক্ষণে এ সৈন্যদল কোথা হইতে তোমাকে অন্য কোন পারিতেযিক দিবে? লুটিত দ্রব্য সকল বিভক্ত হইয়া গিয়াছে; এক্ষণে তো আর সাধারণ ধন নাই, যে তাহা হইতে তোমার এ লোভ সম্বরণ হইতে পারে। কিন্তু এক্ষণে তুমি এ কন্যাটীকে বিমুক্ত করিয়া দিলে, এই সকল নেতৃবর্গেরা ভবিষ্যতে তােমাকে এতদপেক্ষায় তিন চারি গুণ অধিক পরিতােষিক দিতে চেষ্টা পাইবে।

রাজা উত্তরিলেন, এ কি আশ্চর্য্য কথা! আমি এ নেতৃদলের অধ্যক্ষ, তুমি কি জাননা, যে এ নেতৃবৃন্দের মধ্যে যিনি যাহা পরিতােষিক রূপে প্রাপ্ত হইয়াছেন, ইচ্ছা করিলে, আমি তত্তাবৎ কাড়িয়া লইতে পারি? আকিলীস্‌ পুনরায় ক্রোধভরে কহিলেন, তুমি কি বিবেচনা কর, এ বীরপুরুষেরা তোমার ক্রীতদাস, যে তুমি তাহাদের সম্মুখে এরূপ আস্পর্দ্ধা করিতেছ। আমরা যে তােমার ভ্রাতার উপকারার্থেই বহু ক্লেশ সহ্য করিয়া অতি দূরদেশ হইতে আসিয়াছি, ইহা তুমি বিস্মৃত হইলে না কি? হে নির্লজ্জ পামর! হে অকৃতজ্ঞ! হে ভীরুশীল! তােমার অধীনে অস্ত্রধারণ করা কি কাপুরুষতার কর্ম! ইচ্ছা হয়, যে এ স্থলে তােমাকে একাকী পরিত্যাগ করিয়া আমরা সসৈন্যে স্বদেশে চলিয়া যাই।

এই বাক্য শ্রবণে নরপতি আগেমেম্‌নন্‌ কহিলেন, তোমার যদি এরূপ ইচ্ছা হইয়া থাকে, তবে তুমি এই মুহূর্ত্তেই এস্থান হইতে প্রস্থান কর। আমি তােমাকে ক্ষণকালের জন্যেও এস্থানে থাকিতে অনুরােধ করিতেছি না। এখানে অন্যান্য অনেকানেক বীরপুরুষ আছে, যাহারা আমার অধীনে অস্ত্র ধারণ করিতে অবমানিত বা লজ্জিত হইবেন না। তুমি আমার চক্ষের বালিস্বরূপ, তােমার অহঙ্কারের ইয়ত্তা নাই। তুমি যাও। রবিদেবের পুরােহিতের নিকট এই সুকুমারী কুমারীটিকে প্রেরণ করিবার অগ্রে তুমি যে ব্রীষীসা নাম্নী কুমারীকে পাইয়াছ, আমি তাহাকে স্ববলে গ্রহণ করিব। দেখি, তুমি আমার কি করিতে পার।

রাজার এই কর্কশ বাণী শ্রবণে মহাবীর আকিলীস্‌ মহাক্রোধে হতজ্ঞান হইয়া তাহার বধার্থে উরুদেশলম্বিত অসিকোষ হইতে নিশিত অসি আকর্ষণ করিতেছেন, এমত সময়ে সুরলোকে সুরকুলেন্দ্রাণী হীরী জ্ঞানদেবী আথেনীকে ব্যাকুলিতচিত্তে কহিলেন, হে সখি! ঐ দেখো, গ্রীক্‌সৈন্যদলের মধ্যে বিষম বিভ্রাট ঘটিয়া উঠিল! দেবযোনি আকিলীস্‌ রাজা আগেমেম্‌ননের প্রতি ক্রুদ্ধ হইয়া তাহার প্রাণদণ্ডে উদ্যত হইতেছেন। অতএব, সখি! তুমি শিবিরে অতি ত্বরায় আবির্ভূতা হইয়া এ কাল কলহাগ্নি নির্বাণ কর।

জ্ঞানদেবী আথেনী তদ্দণ্ডে সৌদামিনীগতিতে সভাতলে উপস্থিত হইয়া বীরবর আকিলীসের পশ্চাদ্ভাগে দাঁড়াইয়া তাহার পিঙ্গলবর্ণ কেশপাশ আকর্ষণ করতঃ কহিলেন, রে বর্বর! তুই এ কি করিতেছিস? এই কথা শুনিবামাত্র বীরকেশরী সচকিতে মুখ ফিরাইয়া দেবীকে নিরীক্ষণ করিয়া কহিলেন, হে দেবকুলেন্দ্রদুহিতে! তুমি কি নিমিত্ত এখানে আসিয়াছ? রাজা আগেমেম্‌নন্‌ যে আমার কত দূর পর্য্যন্ত অবমাননা করিতে পারেন, এবং আমিই বা কত দূর পর্য্যন্ত তাহার প্রগল্‌ভতা সহ্য করিতে পারি, তুমি কি সেই কৌতুক দেখিতে আসিয়াছ?

আয়তলোচনা দেবী আথেনী উত্তর করিলেন, বৎস! তুমি এ সভাতে সৈন্যাধ্যক্ষ বীরবরকে যথোচিত লাঞ্ছনা ও তিরস্কার কর, তাহাতে আমার রোষ বা অসন্তোষ নাই। কিন্তু কোনমতেই উহার শরীরে অস্ত্রাঘাত করিও না। দেবী এই কয়েকটী কথা বীরপ্রবীর আকিলীসের কর্ণকুহরে অতি মৃদুস্বরে কহিয়া অন্তর্হিতা হইলেন। আর তাহাকে কেহই দেখিতে পাইল না।

দেবীর আদেশানুসারে বীর-কুলর্ষভ আকিলীস্‌, রাজ-কুলর্ষভ রাজা আগেমেম্‌নন্‌কে বহুবিধ তিরস্কার করিলে, তিনিও রাগে নিতান্ত অভিভূত হইলেন। এই বিষম বিপদ উপস্থিত দেখিয়া নেস্তর নামক একজন বৃদ্ধ জ্ঞানবান্ পুরুষ গাত্রোত্থান পূর্ব্বক সভাস্থ নেতৃদিগকে সম্বোধিয়া সুমৃদুভাবে কহিতে লাগিলেন, হায়! কি আক্ষেপের বিষয়! অদ্য গ্রীক্‌দলের উপস্থিত বিপদে রাজা প্রিয়াম্ ও তাহার পুত্রগণের যে কতদূর আনন্দলাভ হইবে, তাহা কে বলিতে পারে? কেননা, এই গ্রীক্‌-দলের মধ্যে, যে দুইজন মহাপুরুষ অভিজ্ঞতা ও বাহুবলে সর্বশ্রেষ্ঠ, তাহারাই দুর্ভাগ্যক্রমে অদ্য কলহরত হইলেন। আমি সর্বাপেক্ষা বয়সে জ্যেষ্ঠ, এবং তোমাদের পূর্ব্ব দুই পুরুষের মধ্যে, যে সকল মহোদয়েরা বাহুবলে ও রণ-বিশারদতায় দেবোপম ছিলেন, তাঁহাদের সহিতও আমার সংসর্গ ছিল। তোমরা বলী বট, কিন্তু সে সকল প্রাচীন যোধদলের সহিত উপমায় তোমরা কিছুই নও। সে সকল মহাপুরুষেরাও আমার উপদেশ ও পরামর্শে কখনই অবহেলা বা অমনোযোগ করিতেন না। অতএব তোমরা আমার হিতবাক্য মনোভিনিবেশ পূর্ব্বক শ্রবণ কর। তুমি, আগেমেম্‌নন্‌, রাজকুলশ্রেষ্ঠ। এই হেতু এই সকল মহোদয়েরা তোমাকে সেনাধ্যক্ষপদে অভিষিক্ত করিয়াছেন; তোমার উচিত হয় না, যে এই বীরপুরুষদলের মধ্যে যিনি বীরপুরুষোত্তম, তাহার সহিত তুমি মনান্তর কর। তুমি, আকিলীস্‌, দেবযোনি ও দেবকুলপ্রিয়। বিধাতা তোমাকে বাহুবলে নরকুলতিলকরূপে সৃষ্টি করিয়াছেন। তোমারও উচিত নয়, যে তুমি এ সৈন্যাধ্যক্ষের সহিত বিবাদে প্রবৃত্ত হও। তোমাদের দুইজনের পরস্পর মনান্তর ঘটিলে এ গ্রীক্‌দলের যে বিষম বিপদ উপস্থিত হইবেক, তাহার কোনই সন্দেহ নাই। অতএব হে বীরপুরুষদ্বয়! তোমরা স্ব স্ব রোষানল নির্ব্বাণ করিয়া পরস্পর প্রিয় সম্ভাষণ কর।

বৃদ্ধের এবম্বিধ বচনাবলী শ্রবণ করিয়া রাজা আগেমেম্‌নন্‌ উত্তর করিলেন। হে তাত! এই দুরাত্মার অহঙ্কারে আমি নিয়তই অসন্তুষ্ট! ইহার ইচ্ছা, যে এ সকলেরি উপরি কর্ত্তৃত্ব করে। এতাদৃশী দাম্ভিকতা আমি কি প্রকারে সহ্য করিতে পারি! আকিলীস্‌ কহিলেন, তোমার এতাদৃশ বাক্যে পুনরায় যদ্যপি আমি তোমার অধীনে কর্ম্ম করি, তাহ হইলে আমার নিতান্ত নীচতা ও অপদার্থতা প্রকাশ হইবে। আমি এ সৈন্যদল হইতে আমার নিজ সৈন্যদলকে পৃথক্‌ করিয়া লইব না; কিন্তু আমি স্বয়ং এ যুদ্ধে আর লিপ্ত থাকিব না। বীরবরের এই কথান্তে সভাভঙ্গ হইল।

তদনন্তর বীরপ্রবীর আকিলীস্‌ স্বশিবিরে প্রস্থান করিলেন। সৈন্যাধ্যক্ষ রাজা অগেমেম্‌নন্‌ রবিদেবের পুরোহিতের সুন্দরী কন্যাটিকে নানাবিধ পূজোপহার ও বলির সহিত স্বীয় সাগরযানে আরোহণ করাইয়া এবং সুবিজ্ঞ অদিস্যুস্‌কে নায়কপদে অভিষিক্ত করিয়া ক্রূষানগরাভিমুখে প্রেরণ করিলেন। পরে সৈন্যসকলকে সাগররূপ মহাতীর্থে দেহ অবগাহনপূর্ব্বক পবিত্র হইতে অজ্ঞা দিলেন। অশস্য সাগরতীরে মহাসমারোহে দিবাকরের পূজা সমাধা হইল। ধূপ, দীপ, প্রভৃতি নানা সুরভিদ্রব্যের সৌরভ ধূমসহযোগে আকাশমার্গে উঠিল।

পরে রাজা দুই জন রাজদূতকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, হে দূতদ্বয়! তোমরা উভয়ে বীরবর আকিলীসের শিবিরে গিয়া ব্রীষীসা নাম্নী সুন্দরী কুমারীটিকে আনয়ন কর। যদ্যপি বীরপ্রবর আকিলীস্‌ সে রূপসীকে স্বেচ্ছায় ও অনায়াসে তোমাদের হস্তে সমর্পণ না করেন, তবে তোমরা তাহাকে কহিও, যে আমি স্বয়ং সসৈন্যে তাহার শিবির আক্রমণ করিয়া স্ববলে সেই কৃশোদরীকে লইব; আর তাহা হইলে সেই রাজবিদ্রোহীর নানা প্রকার অমঙ্গলও ঘটিবেক।

দূতদ্বয় রাজাজ্ঞায় একান্ত বাধিত হইয়া অনিচ্ছাক্রমে ধীরে ধীরে বন্ধ্য সিন্ধু তট দিয়া মহাবীর আকিলীসের শিবিরাভিমুখে চলিতে লাগিল। বীরবর দূতদ্বয়কে দূর হইতে নিরীক্ষণ পূর্ব্বক, তাহারা যে কি উদ্দেশে আসিতেছে, ইহা বুঝিতে পারিয়া, উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিলেন, হে দেবমানবকুলের সন্দেহবহ! তোমাদের কুশল ও স্বাগত তো? তোমরা কি নিমিত্ত এত মৌন ভাবে ও বিষণ্ণবদনে আসিতেছ? এ কিছু তোমাদের দোষ নহে, ইহাতে তোমাদের লজ্জা বা চিন্তা কি? ইহাতে আমি কখনই তোমাদের উপর কষ্ট বা অসন্তুষ্ট হইতে পারি না। তবে যাহার সহিত আমার বিবাদ, তোমরা তাহাকে কহিও, যে তিনি কালে আমার পরাক্রমের বিশেষ আবশ্যকতা বুঝিতে পারিবেন।

তদনন্তর বীরবর আপন প্রিয়বন্ধু পাত্রক্লুস্‌কে কহিলেন, সখে, তুমি এই দূতদ্বয়ের হস্তে সুন্দরীকে সমর্পণ কর; পাত্রক্লুস্‌ কন্যাটীকে দূতদ্বয়ের হস্তে সম্প্রদান করিলে, চারুশীলা স্বপ্রিয়বরের শিবির পরিত্যাগ করিতে প্রচুর অরুচি প্রকাশপূর্ব্বক বিষণ্ণবদনে মৃদুপদে তাহাদের সঙ্গে চলিলেন। এতদ্দর্শনে মহাধনুর্দ্ধর ক্রোধভরে অধীরচিত্ত হইয়া দূতদ্বয়কে পুনরাহ্বান করতঃ যেন জীমূতমন্দ্রে কহিলেন; “তোমরা, হে দূতদ্বয়! রাজা আগেমেম্‌নন্‌কে কহিও, যে আমি মরামরকুলকে সাক্ষী করিয়া এই প্রতিজ্ঞা করিতেছি, যে আমি শত্রুদলের বিপরীতে এবং গ্রীক্‌সৈন্যের হিতার্থে আর কখনই অস্ত্র ধারণ করিব না। রাজচক্রবর্ত্তী রোষান্ধ হইয়া ভবিষ্যতে যে গ্রীক্‌দলের ভাগ্যে কি লাঞ্ছনা আছে; এখন তাহা দেখিতে পাইতেছেন না; কিন্তু কালে পাইবেন। দূতদ্বয় বরাঙ্গনাকে সঙ্গে লইয়া চলিয়া গেলে, বীরকেশরী আকিলীস্‌ কৃষ্ণবর্ণ অর্ণবতটে ভাবার্ণবে একান্ত মগ্ন হইয়া বসিয়া রহিলেন। এবং কিয়ৎক্ষণ পরে হস্ত প্রসারণ করতঃ জননী দেবীকে সম্বোধিয়া কহিতে লাগিলেন, হে মাতঃ, তুমি এতাদৃশী অবমাননা সহ্য করিবার, জন্যই কি এ অধীন হতভাগাকে গর্ভে ধারণ করিয়াছিলে? আমি জানি যে কুলিশ-নিক্ষেপী জ্যুস্‌ অমাকে অল্পায়ুঃ করিয়াছেন বটে; কিন্তু তথাচ তিনি যে সে অল্পকাল আমাকে অতি সম্মানের সহিত অতিবাহিত করিতে দিবেন, ইহাতে আমার তিলার্দ্ধমাত্রও সন্দেহ ছিল না। কিন্তু দেখ, এক্ষণে রাজা আগেমেম্‌নন্‌ আমার কি দুরবস্থা না করিল!

যে স্থলে সাগরজলতলে আপন পিতৃসন্নিধানে থিটীস্‌দেবী বসিয়াছিলেন, সে স্থলে পুত্রের এবম্বিধ বিলাপধ্বনি তাহার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিলে, দেবী আস্তে ব্যস্তে কুজ্ঝটিকার ন্যায় জলতল হইতে উত্থিত হইলেন এবং বিলাপী পুত্রের গাত্র করপদ্মে স্পর্শ করিয়া জিজ্ঞাসিলেন, রে বৎস! তুই কি নিমিত্ত এত বিলাপ করিতেছিস্‌? তোর মনের দুঃখ ব্যক্ত করিয়া আমাকে তোর সমদুঃখিনী কর। তাহা হইলে তোর দুঃখভারের অনেক লাঘব হইবে।

বীর-চূড়ামণি আকিলীস্‌ জননী দেবীর এই কথা শুনিয়া দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করতঃ রাজা আগেমেম্‌ননের সহিত আপন বিবাদ বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত তাঁহার চরণে নিবেদন করিলেন। দেবী পুত্রবরের বাক্যাবসানে অতি ক্ষুব্ধচিত্তে উত্তরিলেন, হায় বৎস! আমি যে তোকে অতি কুলগ্নে গর্ভে ধারণ করিয়াছিলাম, তাহার আর কোনই সন্দেহ নাই। বিধাতা তোকে অল্পায়ুঃ করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহার এ কি বিড়ম্বনা! তিনি যে তোকে সে অল্পকাল সুখসম্ভোগে ও সম্মানে অতিপাতিত করিতে দিবেন তাহা তো কোনমতেই বোধ হইতেছে না। বৎস! বিধাতা তোর প্রতি কি নিমিত্ত এত দারুণ! হায়! কি করি, এবিষয়ে আর কাহার প্রতি দোষারোপ করিব! এবং, কাহারই বা শরণ লইব? এক্ষণে কুলিশ-নিক্ষেপী জ্যুস্ পূজাগ্রহণার্থে দেবদলের সহিত এতোপী-দেশে দ্বাদশ দিনের নিমিত্ত প্রয়াণ করিয়াছেন। তিনি দেবনগরে প্রত্যাগমন করিলে এ সকল কথা তাঁহার চরণে নিবেদন করিব; দেখি, তিনি যদি এ বিষয়ের কোন প্রতিবিধান করেন। তুই রাজা আগেমেম্‌ননের সহিত কোনমতেই প্রীতি করিস্‌ না; বরঞ্চ হৃদয়কুণ্ডে রোষাগ্নি নিয়ত প্রজ্বলিত রাখিস্‌! এই কথা কহিয়া দেবী স্বস্থানে প্রস্থানার্থে জলে নিমগ্ন হইলেন।

ওদিকে সুবিজ্ঞ আদিস্যুস পুরোধা-দুহিতাকে এবং বিবিধ পূজোপযোগী উপহার দ্রব্য সঙ্গে লইয়া সাগরপথে ক্রূষানগরে উত্তীর্ণ হইলেন। এবং রবিদেবের পুরোহিতকে অভিবাদন পূর্ব্বক কহিলেন; হে গুরো! গ্রীক্‌সৈন্যাধ্যক্ষ মহারাজ আগেমেম্‌নন্‌ আপনার অতীব সুশীলা কুমারীকে আপনার নিকট প্রেরণ করিয়াছেন। এবং আপনার অর্চ্চিত দেবের অর্চ্চনার্থে বিবিধ দ্রব্যজাতও পাঠাইয়াছেন। আপনি সেই সকল দ্রব্য সামগ্রী গ্রহণ করিয়া গ্রহপতির পূজা করুন, পূজা সমাপনান্তে এই বর প্রার্থনা করিবেন, যে আলোকবর্ষী যেন গ্রীক্‌দলের প্রতি আর কোন বামাচরণ না করেন।

পুরোহিত এবম্বিধ বিনয়াবসানে মহাসমারোহে যথাবিধি দেবপূজা সমাধা করিলেন। এবং গ্রীক্‌যোধেরা দেবপ্রসাদ লাভ করতঃ মহানন্দে সুরাপানে প্রফুল্ল চিত্ত হইয়া সুমধুরস্বরে গ্রহপতি ভাস্করের স্তুতিসঙ্গীত সংকীর্ত্তন করিতে লাগিলেন। গ্রহপতি স্তুতিসঙ্গীতে প্রসন্ন হইয়া পশ্চিমাঞ্চলে চলিলেন। নিশা উপস্থিত হইল। গ্রীক্‌যোধেরা সাগরতীরে শয়ন করিলেন। রাত্রি প্রভাতা হইলে সকলে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক পুনরায় সাগরযানে আরোহণ করিয়া স্বশিবিরে প্রত্যাগত হইলেন। তদবধি বীরকুলর্ষভ আকিলীস্‌ কৃশোদরী প্রণয়িনীর বিরহানলে দগ্ধপ্রায় হইয়া এবং রাজা আগেমেম্‌ননের দৌরাত্ম্যে রোষপরবশ হইয়া কি রাজসভায়, কি রণক্ষেত্রে, কুত্রাপি দৃশ্যমান হইলেন না। কিন্তু গ্রীক্‌সৈন্যেরা মহামারীরূপ রাহুগ্রাস হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন। দ্বাদশ দিবস অতীত হইল। কুলিশাস্ত্রধারী জ্যুস্‌ দেবদলের সহিত অমরাবতী নগরীতে প্রত্যাগত হইলেন। জলধিযোনি বিধুবদনা দেবী থিটীস্‌ স্বর্গারোহণ করিয়া দেখিলেন যে, অশনিধর দেবপতি শৃঙ্গময় অলিম্পুসনামক ধরাধরের তুঙ্গসম শৃঙ্গোপরি নিভৃতে উপবিষ্ট আছেন। দেবী মহাদেবের পদতলে প্রণাম করিয়া অতি মৃদুস্বরে ও অশ্রুপূর্ণলোচনা কহিলেন; হে পিতঃ! যদ্যপি এ দাসীর প্রতি আপনার কিছুমাত্র স্নেহ থাকে, তবে আপনি এই করুন; যে জগতীতলে তাহার ভাগ্যহীন পুত্র অকিলীসের হ্রাসপ্রাপ্ত মানের পুনঃপরিপূরণে যেন তাহার বিপক্ষ গ্রীক্‌সৈন্যাধ্যক্ষ রাজা আগোমেম্‌ননের অবমাননা বিলক্ষণ সম্পাদিত হয়।

দেবীর এই যাচ্ঞা শ্রবণে দেবকুলেন্দ্র কিঞ্চিৎকাল তুষ্টীভাবে রহিলেন। দেবী দেবেন্দ্রের এবম্ভূত ভাবদর্শনে সভয়ে তাঁহার জানুদ্বয়ে হস্ত প্রদান করিয়া সকরুণে কহিলেন, হে পিতঃ! আপনিও কি আমার হতভাগা পুত্রের প্রতি বাম হইলেন! নতুবা কি নিমিত্ত আমার বাক্যের প্রত্যুত্তর দিতেছেন না? দেবনরকুলপিতা শরণাগতার এতাদৃশ বাক্য শ্রবণে উত্তর করিলেন, বৎসে! তুমি আমার উপরে এ একটা মহাভার অর্পণ করিতেছ, কেন না, তোমার আনন্দ সম্পাদন করিতে হইলে উগ্রচণ্ডা হীরীকে বিরক্ত করিতে হয়, এমনিই সে এই বলিয়া আমার প্রতি দোষারোপ করে, যে আমি কেবল সদা সর্বদা ট্রয়নগরীয় সৈন্যদলের প্রতি অনুকূলতা প্রকাশ করিয়া থাকি। সে যাহা হউক, এক্ষণে আমি বিবেচনা করিয়া দেখি, আর তুমিও এবিষয়ে সতর্ক থাকিও, যদ্যপি আমি শিরোধূনন করি, তবে নিশ্চয় জানিও, যে তোমার মনস্কামনা সুসিদ্ধ হইবে। এই বাক্যে দেবী ব্যগ্রভাবে একদৃষ্টে দেবপতির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া রহিলেন। সহসা দেবেন্দ্রের শিরঃ পরিচালিত হইল। শৃঙ্গধর অলিম্পুস্‌ থরথরে লড়িয়া উঠিল। দেবী বুঝিতে পারিলেন, যে এইবারে তাহার অভীষ্ট সিদ্ধি হইয়াছে, কেননা, দেবকুলপতি যে বিষয়ে শিরশ্চালনা করেন, তাহা কখনই ব্যর্থ হয় না। সাগরসম্ভূতা থেটীস্‌ দেবী মহা উল্লাসে জ্যোতির্ম্ময় অলিম্পুস্‌ হইতে গভীর সাগরে লম্ফ প্রদান করিয়া অদৃশ্যা হইলেন! কিন্তু আয়তলোচনা হীরীর দৃষ্টিরোধ হইল না, তিনি পলায়মান সাগরিকাকে স্পষ্টরূপে দেখিতে পাইলেন।

তদনন্তর দেবকুলপতি দেবসভাতে উপস্থিত হইলে, দেবদল সসম্ভ্রমে উঠিয়া দাঁড়াইলেন। দেবকুলেন্দ্র রাজসিংহাসন পরিগ্রহ করিলে দেবকুলেন্দ্রাণী বিশালাক্ষী হীরী অতি কটুভাবে কহিলেন; হে প্রতারক! কোন্ দেবীর সহিত, কোন্‌ বিষয় লইয়া অদ্য তুমি নিভৃতে পরামর্শ করিতেছিলে? আমি নিকটে না থাকিলে, দেখিতেছি, তুমি সর্ব্বদাই এইরূপ করিয়া থাক। তোমার মনের কথা আমার নিকট কখনই স্পষ্টরূপে ব্যক্ত কর না। এই কথায় দেবদেব মেঘবাহন ক্রুদ্ধভাবে উত্তরিলেন, আমার মনের কথা তোমাকে কি কারণে খুলিয়া বলিব? আমার রহস্যমণ্ডলে তুমি কেন প্রবেশ করিতে চাহ? শ্বেতভুজা হীরী কহিলেন, আমি জানি, সাগর-দুহিতা থেটীস্‌ অদ্য তোমার নিকটে আসিয়াছিল, অতএব তুমি কি তাহার অনুরোধে গ্রীক্‌সেনাদলকে দুঃখ দিতে মানস করিতেছ? তুমি কি রাজা আগেমেম্‌ননের মানের হানি করিয়া আকিলীসের সম্ভ্রম বৃদ্ধি করিতে চাহ? দেবেন্দ্রাণীর এতাদৃশ বাক্যে দেবেন্দ্রকে রোষান্বিত দেখিয়া তাহাদের বিশ্ববিখ্যাতপুত্র বিশ্বকর্ম্মা এ কলহাগ্নি নির্ব্বাণার্থে এক স্বর্ণপাত্র অমৃত পূর্ণ করিয়া আপন মাতাকে প্রদান করতঃ কহিলেন, হে মাতঃ! আপনারা দুইজনে বৃথা কলহ করিয়া কি নিমিত্ত সুখময়ী দেবপুরীর সুখসম্ভোগ ভঞ্জন করিতে চাহেন। পুত্রবরের এই বাক্যে আয়তলোচনা দেবেন্দ্রাণী নিরস্ত হইলেন। পরে দেবতারা সকলে একত্র হইয়া সমস্ত দিন দেবোপাদেয় সামগ্রী ভোজন ও অমৃত পান করিয়া কালাতিপাত করিতে লাগিলেন। দেব দিনকর করে স্বর্ণ বীণা গ্রহণ পূর্ব্বক নরগায়িকা দেবীর সুমধুর ধ্বনির মাধুর্য্য বৃদ্ধি করিয়া সকলের মনোরঞ্জনে প্রবৃত্ত হইলেন। এমত সময়ে রজনীদেবীর আবির্ভাব হইল।

সুরলোকে ও নরলোকে সর্ব্বজীবকুল নিদ্রাবৃত হইল। কিন্তু নিদ্রাদেবী দেবকুলপতির নেত্রদ্বয় এক মুহূর্তের নিমিত্তও নিমীলিত করিতে পারিলেন না। কেননা, তিনি কি রূপে আকিলীগের সম্ভ্রম বৃদ্ধি, ও রাজা আগেমেম্‌ননের অধঃপাত সাধন করিবেন, এই ভাবনায় সমস্ত রাত্রি জাগরিত রহিলেন। অনেকক্ষণ পরে দেবরাজ কুহকিনী স্বপ্নদেবীকে আহ্বান করিয়া, কহিলেন, হে কুহকিনি! তুমি দ্রুতগতিতে রাজা আগেমেম্‌ননের শিবিরে যাও, এবং তথায় গিয়া রাজ-শিরোদেশে দণ্ডায়মানা হইয়া এই কহিও যে, হে আগেমেম্‌নন্‌! অলিম্পুসনিবাসী অমরকুল দেবেন্দ্রাণী হীরীর অনুরোধে তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছেন, তুমি সসৈন্যে প্রশস্তপথশালী ট্রয়নগর আক্রমণ করতঃ তাহা পরাজয় কর। দেবেন্দ্রের এই আদেশ পালনার্থে স্বপ্নদেবী অতিবেগে শিবিরপ্রদেশে আবির্ভূতা হইলেন। এবং আগেমেম্‌ননের শিরোদেশে দাঁড়াইয়া কহিলেন, হে বীরকুলসম্ভব রাজন্‌! তুমি কি নিদ্রাবৃত আছ। হে মহারাজ! যে ব্যক্তির উপর এতাদৃশ অগণ্য সৈন্যদলের হিতাহিত বিবেচনার এবং তত্তাবৎ জনগণের রক্ষার ভার সমর্পিত আছে, সে ব্যক্তির কি এরূপ নিশ্চিন্তভাবে সমস্ত রাত্রি নিদ্রায় যাপন করা উচিত? অতএব তুমি অতি ত্বরায় গাত্রোত্থান কর, এবং দেবকুলের অনুকম্পায় বিপক্ষপক্ষকে সমরশায়ী করিয়া জয়লাভ কর। স্বপ্নদেবী এই কথা কহিয়া অন্তর্হিতা হইলেন। পরে রাজা এই বৃথা আশায় মুগ্ধ হইয়া গাত্রোত্থান করতঃ অতি শীঘ্র রাজ-পরিচ্ছদ পরিধান করিলেন, এবং জ্যোতির্ম্ময় অসিমুষ্টি শারসনে বন্ধন পূর্ব্বক স্ববংশীয় অক্ষয় রাজদণ্ড হস্তে গ্রহণ করিয়া বহির্গত হইলেন।

ঊষাদেবী তুঙ্গশৃঙ্গ অলিম্পুসপর্ব্বতোপরি আরোহণ করিয়া দেবকুলপতি এবং অন্যান্য দেবকুলকে দর্শন দিলেন, বিভাবরী প্রভাতা হইল। রাজা আগেমেম্‌নন্‌ উচ্চরব বার্ত্তাবহগণকে সভামণ্ডপে নেতৃবৃন্দের আহ্বানার্থে অনুমতি দিলেন। সভা হইল। রাজা আগেমেম্‌নন্‌ সভাস্থ বীরদলকে সম্বোধন করিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, হে বীরবৃন্দ! গত সুধাময়ী নিশাকালে স্বপ্নদেবী মান্যবর নেস্তরের প্রতিমূর্ত্তি ধারণ করিয়া আমার শিরোদেশে দণ্ডায়মান হইয়া কহিলেন, “হে আগেমেম্‌নন্‌! তুমি কি নিদ্রাবৃত আছ? হে মহারাজ! যে ব্যক্তির উপর এতাদৃশ অগণ্য সৈন্যদলের হিতাহিত বিবেচনার এবং তত্তাবৎ জণগণের রক্ষার ভার সমর্পিত আছে, সে ব্যক্তির কি এরূপ নিশ্চিন্তভাবে সমস্ত রাত্রি নিদ্রায় যাপন করা উচিত? অতএব তুমি অতি ত্বরায় গাত্রোত্থান কর, এবং দেবকুলের অনুকম্পায় বিপক্ষপক্ষকে সমরশায়ী করিয়া জয়লাভ কর।” স্বপ্নদেবী এই কথা বলিয়া অন্তর্হিতা হইলেন।

তদনন্তর আমারও নিদ্রাভঙ্গ হইল। এক্ষণে আমাদের কি করা কর্ত্তব্য, তাহার মীমাংসা কর। আমার বিবেচনায়, চল, আমরা স্বদেশে ফিরিয়া যাই। এই প্রতারণাবাক্যে আমি যোধদলকে স্বদেশে ফিরিয়া যাইতে মন্ত্রণা দি, আর তোমরা কেহ কেহ, তাহা নয়, আইস, আমরা এখানে থাকিয়া যুদ্ধ করি, এই বলিয়া তাহাদিগকে এখানে রাখিতে চেষ্টা পাও, এই রূপ বিপরীত ভাবের আন্দোলনে যোধবৃন্দের মনের প্রকৃত ভাব বিলক্ষণ বুঝা যাইবেক।

রাজার এই কথা শুনিয়া প্রাচীন নেস্তর গাত্রোত্থান করিয়া কহিলেন, হে গ্রীক্‌দেশীয় সৈন্যদলের নেতৃবৃন্দ! যদ্যপি এরূপ কথা আমি আর কাহার মুখ হইতে শুনিতাম, তাহা হইলে ভাবিতাম, যে সে ভীরুচিত্ত জন প্রবঞ্চনা দ্বারা আমাদিগকে লজ্জায় জলাঞ্জলি দিয়া এ দেশ হইতে স্বদেশে কিরিয়া যাইতে প্ররোচনা করিতেছে। কিন্তু যখন রাজা আগেমেম্‌নন্‌ স্বয়ং এ কথার উল্লেখ করিতেছেন, তখন এ আমাদের অণুমাত্রও অবিশ্বাস করা উচিত হয় না। অতএব কিরূপে আমাদের যোধদল এখানে থাকিয়া, যে উদ্দেশে আমরা অকূল দুস্তর সাগর পার হইয়া এ দেশে আসিয়াছি, তাহা সম্পন্ন করিবে, তাহার উপায় চিন্তা কর। সভা ভঙ্গ হইলে রাজদণ্ডধারী নেতা সকল স্ব স্ব শিবিরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। যেমন গিরি-গহ্বরস্থিত মধুচক্র হইতে মধুমক্ষিকাগণ অগণ্য গণনায় বহির্গত হইয়া কতকগুলি বাসন্ত কুসুমসমূহের উপর উড়িয়া বসে, আর কতক গুলি দলবদ্ধ হইয়া বায়ুপথে ইতস্ততঃ পরিভ্রমণ করিতে থাকে, সেইরূপ গ্রীক্‌সৈন্যদল আপন আপন শিবির হইতে বদ্ধশ্রেণী হইয়া বাহির হইল। বহু-রসনা-শালী জনরব বহুবিধ বার্ত্তা বহু দিকে বিস্তৃত করিতে লাগিল। সৈন্যদলে মহা কোলাহল হইয়া উঠিল।

তদনন্তর রাজসন্দেশবহ ঊর্দ্ধবাহু হইয়া, তোমরা সকলে নীরব হও, তোমরা সকলে নীরব হও, এই কথা বলিবা মাত্রেই যে যেখানে ছিল, অমনি বসিয়া পড়িল। সেই মহা কোলাহল-স্থলে অকস্মাৎ যেন শান্তিদেবী পদার্পণ করিলেন। রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌ দক্ষিণ হস্তে রাজদণ্ড ধারণ করতঃ উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিলেন, হে বীরবৃন্দ। দেবকুল-ইন্দ্র যে অঙ্গীকার করিয়া আমাদিগকে এ দূর দেশে আনিয়াছেন, এক্ষণে তিনি সে অঙ্গীকার রক্ষা করিতে বিমুখ। যে কুহকিনী আশার কুহক যেন কোন দৈব ঔষধ স্বরূপ আমাদিগকে এই দুরন্ত রণে ক্লান্ত হইতে দিত না, এবং আমাদের দেহ রক্তশূন্য হইলে পুনরায় তাহা রক্তপূর্ণ করিত, আমাদের বাহু বলশূন্য হইলে পুনরায় তাহা বলাধান করিত, এক্ষণে সে আশায় আমাদিগকে হতাশ হইতে হইল। এ দুর্দ্ধর্ষ রিপুদল যে আমাদের বীরবীর্য্যে ও পরাক্রমে পরাভুত হইবে, এমত আর কোনই আশা বা সম্ভাবনা নাই। এই আদেশ আমি সম্প্রতি দেবেন্দ্রের নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছি। কি লজ্জার বিষয়! আমার বিবেচনায়, আমাদের এ দুঃখের কাহিনী শুনিলে, বর্ত্তমানের কথা দূরে থাকুক; বোধ হয়, ভবিষ্যতের বদনও ব্রীড়ায় অবনত ও মলিন হইবে। কি আক্ষেপের বিষয়! আমরা এমত প্রচণ্ড ও প্রকাণ্ড সৈন্য সহকারে এ ক্ষুদ্র রিপুদলকে দলিত করিতে পারিলাম না? নয় বৎসর পরিশ্রমের পর কি আমাদের এই ফললাভ হইল? দেখ, আমাদের তরীবৃন্দের ফলক সকল ক্ষত হইতেছে, রজ্জুসকল জীর্ণাবস্থা প্রাপ্ত হইতেছে, আর আমাদিগের চিরানন্দ গৃহে পতি-বিরহ-কাতরা কলত্রবৃন্দ, ও পিতৃ-বিরহকাতর শিশুসন্তান সকল আমাদিগের প্রত্যাগমন প্রতীক্ষায় পথ নিরীক্ষণ করিতেছে। এ সকল যন্ত্রণার কি এই ফল? কিন্তু কি করি, বিধাতার নির্ব্বন্ধ কে খণ্ডন করিতে পারে? এক্ষণে আমার এই পরামর্শ, যে যখন ট্রয়নগর অধিকার করা আমাদের ক্ষমতাতীত হইল, তখন চল, আমাদের এ দেশে থাকায় আর কোনই প্রয়োজন নাই।

মহাবাহু সেনানীর এতাদৃশ বাক্যাবলী শ্রবণ করিয়া, যাহারা রাজমন্ত্রণার নিগূঢ় তত্ত্ব না জানিত, তাহাদের মন, যেমন শস্যপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রবল বায়ু বহিলে, শস্যশিরঃ তদ্বহনাভিমুখে পরিণত হয়, সেইরূপ রাজপরামর্শের দিকে প্রবণ হইল। সৈন্যদল আনন্দধ্বনি করতঃ এ উহাকে আহ্বান করিয়া কহিতে লাগিল, ডিঙা সকল ডাঙা হইতে সমুদ্র জলে নামাও। চল, আমরা স্বদেশে ফিরিয়া যাই। এইরূপ কোলাহলময় ধ্বনি অমরাবতীতে প্রতিধ্বনিলে দেবকুলেন্দ্রাণী কৃশোদরী হীরী নীলকমলাক্ষী আথেনীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে সখি, গ্রীক্‌ সৈন্যদল কি এই সকলঙ্ক অবস্থায় স্বদেশে প্রস্থান করিতে উদ্যত হইল? তাহারা কি আপনাদের পরাভবের অভিজ্ঞানরূপে হেলেনী সুন্দরীকে ট্রয়নগরে রাখিয়া চলিল? এই জন্যেই কি এত বীরবৃন্দ এ দূর রণক্ষেত্রে প্রাণ পরিত্যাগ করিল? অতএব তুমি, সখি, অতি দ্রুতগতিতে বর্ম্মধারী যোধদলের মধ্যে অবির্ভূতা হইয়া সুমধুর ও প্ররোচক বচনে তাহাদিগকে সাগরযানসমূহ সাগরমুখে ভাসাইতে নিবারণ কর।

দেবীর বচনানুসারে আথেনী অলিম্পুসনামক দেবগিরি হইতে গ্রীক্‌সৈন্যের শিবির মধ্যে বিদ্যুৎগতিতে আবির্ভূতা হইলেন; এবং দেখিলেন, যে সুকৌশলী অদিস্যুস্‌ ক্ষুণ্ণচিত্তে ও মলিনবদনে স্বপোত-সন্নিধানে দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন। দেবী তাহাকে স্পর্শ করিয়া কহিলেন, বৎস! ও যোধদল কি লজ্জায় জলাঞ্জলি দিয়া স্বদেশে ফিরিয়া চলিল। তোমরা কি কেবল জগন্মণ্ডলে হাস্যাস্পদ হইবার নিমিত্ত এদেশে আসিয়াছিলে। সে যাহা হউক, তুমি সর্ব্বাপেক্ষা বিজ্ঞতম। অতএব তুমি অতি ত্বরায় এই স্বদেশগমনাকাঙ্ক্ষিণী অক্ষৌহিণীর মনঃস্রোতঃ পুনরায় রণসাগরাভিমুখে বহাইতে সচেষ্ট হও। অদিস্যুস্‌ স্বরবৈলক্ষণ্যে জানিতে পারিলেন, যে এ দেববাক্য! এবং দেবীর প্রসাদে দিব্য চক্ষুঃ লাভ করিয়া দেবমূর্ত্তি সম্মুখে উপস্থিতা দেখিলেন। তদ্দর্শনে প্রফুল্লচিত্ত হইয়া রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌ননের রাজদণ্ড রাজানুমতিরূপে চাহিয়া লইয়া অনেককে অনেকানেক প্রবোধবাক্যে শান্ত্বনা করিতে লাগিলেন।

লণ্ডভণ্ড এবং কোলাহলপূর্ণ সৈন্যদলকে শান্তশীল ও শ্রবণোৎসুক দেখিয়া অদিস্যুস্‌ উচ্চৈঃস্বরে কহিয়া উঠিলেন, হে বীরবৃন্দ! তোমরা কি পুর্ব্বকথা সকল বিস্মৃত হইয়া কলঙ্কসাগরে নিমগ্ন হইতে ইচ্ছা করিতেছ? স্মরণ করিয়া দেখ, যখন আমরা এই ট্রয়নগরাভিমুখে যাত্রা করি, তখন দেবতারা কি ছলে, আমাদের অদৃষ্টে ভবিষ্যতে যে কি আছে, তাহা জানাইয়াছিলেন। আমরা যৎকালে যাত্রাগ্রে মহা সমারোহে দেবকুলপতির পূজা করি, তৎকালে পিঠতল হইতে সহসা এক সর্প ফণা বিস্তৃত করিয়া বহির্গত হইল। এবং অনতিদূরে একটী উচ্চ বৃক্ষের উচ্চতম শাখাস্থিত পক্ষীনীড় লক্ষ্য করিয়া তদভিমুখে উঠিতে লাগিল। সেই নীড়মধ্যে জননী পক্ষিণী আট্‌টী অতি শিশু শাবকের উপর পক্ষ বিস্তৃত করিয়া তাহাদিগকে রক্ষা করিতেছিল। কিন্তু সমাগত রিপুর উজ্জ্বল নয়নানলে দগ্ধপ্রায় হইয়া আত্মরক্ষার্থে পবনপথে বৃক্ষের চতুষ্পার্শে আর্ত্তনাদে উড়িতে লাগিল। অহি একে২ আট্‌টী শাবককেই গিলিল। জন্মদায়িনী এই হৃদয়কৃন্তনী ঘটনা সন্দর্শনে শূন্য নীড়ের নিকটবর্ত্তিনী হইয়া উচ্চতর আর্তনাদে দেশ পুরিতেছে, এমত সময়ে সর্প আচম্বিতে লম্বমান হইয়া তাহাকেও ধরিয়া উদরস্থ করিল। উদরস্থ করিবামাত্র সে আপনি তৎক্ষণাৎ পাষাণদেহ হইয়া ভূতলে পড়িল। দেবমনোজ্ঞ কালকষ্‌ তৎকালে এই অদ্ভুত প্রপঞ্চের ব্যঙ্গতা ব্যক্তার্থে মুক্তকণ্ঠে কহিলেন, হে বীরবৃন্দ! তোমরা যে ট্রয়নগর অধিকার করিয়া রাজা প্রিয়ামের গৌরব-রবিকে চিররাহুগ্রাসে নিক্ষেপ করিয়া চিরযশস্বী হইবে, দেবকুল তাহা তোমাদিগকে এই ইঙ্গিতে দেখাইয়াছেন; কিন্তু তন্নিমিত্ত নয় বৎসর কাল তোমাদিগকে দুরন্ত রণক্লান্তি সহ্য করিতে হইবেক। এই কহিয়া অদিস্যুস্‌ পুনরায় কহিতে লাগিলেন, হে বীরকুল! তোমরা সে দেবভেদভেদকের কথা কেন বিস্মৃত হইতেছ? দেখ, নবম বৎসর অতীত হইয়া দশম বৎসর উপস্থিত হইয়াছে। এই বর্ত্তমান বর্ষে যে আমরা কৃতকার্য হইব, তাহার আর কোনই সন্দেহ নাই। তোমর তবে এখন কি বিবেচনায় পরিপকব শস্যপূর্ণ ক্ষেত্রে অগ্নি প্রদান করিতে চাহ। এ কি মৃঢ়তার কর্ম্ম?

বীরবরের এই উৎসাহদায়িনী বচনাবলী জ্ঞানদেবী আথেনীর মায়াবলে শ্রোতৃনিকরের মনোদেশে দৃঢ়রূপে বদ্ধমূল হইল। এবং তাহারা মুক্তকণ্ঠে বীরবরের অভিজ্ঞতা ও বীরতার প্রশংসা করিতে লাগিল। অদিস্যুসের এই বাক্যে প্রাচীন নেস্তর অনুমোদন করিলে রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌ নেতৃদলকে যুদ্ধার্থে সুসজ্জ হইতে আজ্ঞা দিলেন। যোধ সকল স্ব স্ব শিবিরে প্রবেশ পূর্ব্বক ভাবী কাল যুদ্ধ হইতে অব্যাহতি পাইবার জন্য স্ব স্ব ইষ্টদেবের অর্চ্চনা করিলেন।

সৈন্যদল রণসজ্জায় বাহির হইল। যেমন কোন গিরিশিরস্থ বনে দাবানল প্রবেশ করিলে, বিভাবসুর বিভায় চতুর্দ্দিক আলোকময় হয়, সেইরূপ বীরদলের বর্ম্ম-জ্যোতিতে রণক্ষেত্র জ্যোতির্ম্ময় হইল। যেরূপ কালে সারসমালা বদ্ধমালা হইয়া পবন পথ দিয়া ভীষণ স্বনে কোন তড়াগাভিমুখে গমন করে, সেইরূপ শূরদল শূরনিনাদে রিপুসৈন্যাভিমুখে যাত্রা করিল। প্রতিনেতারাও স্ব স্ব যোধদলকে বদ্ধপরিকর হইয়া অস্ত্র শস্ত্র গ্রহণপূর্ব্ববক সমরে প্রবৃত্ত হইতে আজ্ঞা দিলেন। যেমন যূথপতি যূথমধ্যে বিরাজমান হয়, সেইরূপ রাজচক্রবর্ত্তী রাজা আগেমেম্‌নন্‌ও সৈন্যদলমধ্যে শোভমান হইলেন। বীরপদভরে বসুমতী যেন কাঁপিয়া উঠিলেন।

প্রথমপরিচ্ছেদ সমাপ্ত।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

হেমাঙ্গিনী দেবী উষা বরাঙ্গপতি অরুণের শয্যা পরিত্যাগ করিয়া মরামর কুলে আলোক বিতরণার্থে গাত্রোত্থান করিলেন। দেবকুলেন্দ্র বিবাদদেবী নামী কলহকারিণী নিষ্কৃপা দেবীকে রণোৎসাহ প্রদানার্থে গ্রীক্‌শিবিরে প্রেরণ করিলেন। দেবী বিবিধ কৌশলকুশল মহেষ্বাস আদিস্যুসের শিবিরদ্বারে দাঁড়াইয়া ভৈরবে হুহুঙ্কার ধ্বনি করিলেন। এবং স্ব মায়ায় গ্রীক্‌ যোধবৃন্দকে রণানন্দপ্রিয় করিলেন। আর কেহই সাগরপথে জন্মভূমিতে প্রত্যাগমন করিতে তৎপর হইলেন না। রাজচক্রবর্ত্তী উচ্চৈঃস্বরে বীরনিকরকে সমরসজ্জা ধারণ করিতে অনুমতি দিলেন। এবং আপনি বিবিধ বিচিত্র রণপরিচ্ছদে স্বীয় মহাকায় সমাচ্ছাদন করিলেন। হেমবর্ম্মের বিভা নভোমণ্ডল পর্যন্ত ভাতিতে লাগিল। গ্রীককুলহিতৈষিণী দেবকুলরাণী হীরী ও বিজ্ঞকুলারাধ্যা দেবী আথেনী রাজসেনানীর উৎসাহার্থে আকাশে কুলিশনাদ করিলেন। বীররাজী রাজচক্রবর্ত্তীর সহিত পদব্রজে শিবির হইতে রণক্ষেত্রাভিমুখে বহির্গত হইলেন। সারথিবৃন্দ বাজীরাজীর সহিত স্যন্দনবৃন্দ পশ্চাতে পশ্চাতে আনিতে লাগিল। চতুর্দ্দিক বিভীষণ কোলাহলে পরিপূর্ণ হইল।

ওদিকে এক প্রত্যন্ত পর্ব্বতের শিরোদেশে ট্রয় নগরীয় সেনা রণকার্য্যার্থে সুসজ্জ হইল। এনৈশাদি বীরবরেরা অমরাকৃতিতে বীরকেশরী হেক্‌টরের চতুষ্পার্শ্বে দণ্ডায়মান হইলেন। যেমন কোন কুলক্ষণ নক্ষত্র ঘনাচ্ছন্ন আকাশে উদয় হইয়া ক্ষণমাত্র স্বীয় অশুভ বিভায় অমঙ্গল ঘটনার বিভীষিকায় দর্শকজনের অন্তঃকরণে ভয় সঞ্চার করতঃ পুনরায় মেঘবৃত হয়, বীরকেশরী ট্রয় নগরীয় সৈন্য মধ্যে গ্রীক্‌সৈন্যের দর্শনপথে সেইরূপ প্রতীয়মান হইতে লাগিলেন; এবং তাহার বর্ম্ম হইতে যেন এক প্রকার কালাগ্নির তেজ বাহির হইতে লাগিল।

যেমন কোন ধনী জনের শস্য ক্ষেত্রে কৃষীবলের অস্ত্রাঘাতে শস্যশীষ চতুর্দ্দিকে পতিত থাকে, সেইরূপ দুই পক্ষ হইতে বীরবৃন্দ ভূতলশায়ী হইতে লাগিল। নিষ্কৃপা কলহকারিণী বিবাদদেবী হৃদয়ানন্দে উচ্চ চীৎকার প্রকাশ করিতে লাগিলেন। কিন্তু অন্যান্য দেব দেবীরা স্বীয় স্বীয় সুন্দর মন্দির হইতে রণক্ষেত্রের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন।

যে সময়ে আটবিক জন অটবী প্রদেশে নানা বৃক্ষ কাটিতে কাটিতে ক্ষুধার্ত হইয়া ক্ষণকাল নিজ নিত্য ক্রিয়ায় পরাঙ্মুখ হয়, ও আহারাদি ক্রিয়াতে ক্ষুৎপিপাসা নিবারণ করে, সেই কাল উপস্থিত হইল। দিনকর আকাশমণ্ডলের মধ্যস্থলে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। রাজচক্রবর্ত্তী সৈন্যাধ্যক্ষ মহোদয় হর্ষ্যক্ষ পরাক্রমে রিপুব্যুহে প্রবেশ করিলেন। অনেকানেক রণীজন অকালে শমনালয়ে গমন করিতে লাগিলেন। যেমন রক্তদন্ত শোণিতাক্ত ক্রমশালী পরাক্রমী মৃগরাজকে, শাবক বৃন্দ নাশ করিতে দেখিলেও কুরঙ্গ তাহাকে কোন বাধা দেয় না, বরঞ্চ কম্পিত হৃদয়ে ঊর্দ্ধশ্বাসে গহন কানন পথ দিয়া পলায়ন করে। সেইরূপ ট্রয়-দলস্থ কোন নেতার এতাদৃশ সাহস হইল না যে, তিনি রাজচক্রবর্ত্তীর সম্মুখবর্ত্তী হইয়া তাঁহাকে নিবারণ করেন। যেমন ঘোর দাবানল প্রবল বায়ুবলে দুর্ব্বার হইলে চতুর্দ্দিকে বৃক্ষ ও বৃক্ষশাখাবলী তাহার শিখত্রাসে ভস্মসাৎ হইয়া যায়, সেইরূপ রাজচক্রবর্ত্তীর অস্ত্রাঘাতে রিপুদল পড়িতে লাগিল। পদাতিক পদাতিকে ঘোর রণ হইল। সাদীদলের সিংহনিনাদ অশ্বাবলীর হ্রেষা রবে মিশ্রিত হইয়া কোলাহলে রণক্ষেত্র পূর্ণ করিল। উভয় দলে অগণ্য রণীগণ আর্ত্তনাদে প্রাণত্যাগ করিল। এ সময়ে কুলিশ-নিক্ষেপী দেবেন্দ্র অরিন্দম হেক্‌টরকে এস্থল হইতে দূরে রাখিলেন। সুতরাং তাহার বিহনে ট্রয় নগরস্থ সেনা রণরঙ্গে ভঙ্গোৎসাহ হইল, এবং রাজচক্রবর্ত্তীর অনিবার্য্য বীরবীর্য্য সহ্য করিতে অক্ষম হইয়া নগরাভিমুখে ধাবমান হইতে লাগিল। যেমন ক্ষুধাতুর কেশরী ভীষণ নিনাদে কোন মেষ কিম্বা বৃষপাল আক্রমণ করিলে পশুকুল উর্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করে, এবং পশ্চাতে পড়িলে যে সে দুর্দ্দান্ত রিপুর গ্রাসে পড়িবে এই আশঙ্কায় সকলেই পুরঃসর হইবার প্রয়াসে যথাসাধ্য বেগে ধাবমান হয়, এবং সকলেরই এই দৃঢ় অধ্যবসায়ে যূথ মধ্যে এক মহা বিষম গোলোযোগ উপস্থিত হয়, এবং এ উহার পদচাপনে ও শৃঙ্গাঘাতে গতিহীন হইয়া পড়ে, সেইরূপ ট্রয়স্থ সৈন্যদল রণক্ষেত্র হইতে পলায়ন তৎপর হইল। যাহারা যাহারা দুর্ভাগ্যক্রমে সর্ব্ব পশ্চাতে পড়িল, কেশরীর ন্যায় রাজচক্রবর্ত্তী প্রচণ্ডাঘাতে তাহাদিগের প্রাণ দণ্ড করিতে লাগিলেন। অনেকানেক রথী-শূণ্য রথ ঘোর ঘর্ঘরে নগরাভিমুখে ধাইল। কিন্তু সে সকল রথের অলঙ্কার স্বরূপ বীরবরেরা ধরাতলে পড়িয়া গৃহানন্দ, প্রেমানন্দ, স্নেহানন্দ এ সকলে জীবনানন্দের সহিত জলাঞ্জলি দিলেন। এইরূপে রাজচক্রবর্ত্তী প্রায় নগর তোরণ পর্য্যন্ত গমন করিলেন। ইহা দেখিয়া দেবকুলপিতা অমরাবতী হইতে উৎসফেনি ঈডাশিরঃ প্রদেশে উপনীত হইলেন, এবং হৈমবতী দেবদূতী ঈরীষাকে কহিলেন, “হে হেমাঙ্গিনি! তুমি দ্রুতগতিতে বীরকেশরী হেক্‌টরকে গিয়া কহ, যে যতক্ষণ গ্রীক্‌সৈন্যাধ্যক্ষ রাজচক্রবর্ত্তী আগেমেম্‌নন্‌ শূল বা শর নিক্ষেপণে ক্ষতাঙ্গ হইয়া রণে ভঙ্গ না দেন, ততক্ষণ প্রিয়ামপুত্র যেন স্বয়ং রণে প্রবৃত্ত না হন, বরঞ্চ অন্যান্য বীরপুঞ্জকে রণ ক্রিয়া সাধনার্থে উৎসাহ প্রদান করেন।” যেমন বায়ু-তরঙ্গ বায়ুপথে চলে, দেবদূতী সেই গতিতে যেন শূন্যদেশ ভেদ করিয়া বীরকেশরীর কর্ণকুহরে দেবাদেশ প্রকাশ করিল। বীরকেশরী রথ হইতে ভূতলে লম্ফ দিয়া ভয়বিহ্বল যোধদলকে আশ্বাস প্রদান করিলেন। বীরসিংহের সিংহনিনাদে ও তাঁহার বীরাকৃতি সন্দর্শনে সে রণক্ষেত্রে ভীরুতাও যেন একবারে আত্মস্বভাব বিস্মৃত হইয়া বীরকার্য্যোপযোগী হইয়া রাজচক্রবর্ত্তীও অসামান্য পরাক্রমে রিপুদলকে দলিতে লাগিলেন।

ঈপীদুম্ন নামক অন্তেনরের এক পুত্র বীরদর্পে রাজচক্রবর্ত্তীর সম্মুখবর্ত্তী হইল। কিন্তু রাজচক্রবর্ত্তীর ভীষণ শূলাঘাতে ভূতলে পতিত হইয়া আপন নবপরিণীতা বনিতার অপরূপ রূপলাবণ্যাদি দর্শন আশায় চিরকালের নিমিত্ত জলাঞ্জলি দিলেন। কনিষ্ঠ ভ্রাতার এতাদৃশ দুরবস্থা অবলোকনে কয়ন নামে বীরপুরুষ মহা কষ্ট ভাবে তীক্ষ্ণতম কুন্ত দ্বারা লোকান্ত রাজা অগেমেম্‌ননের বাহু ভেদ করিলেন। তত্রাচ রাজচক্রবর্ত্তী রণ রঙ্গে বিরত না হইয়া ভীমপ্রহারী কয়নকে ভীমপ্রহরে যমালয়ে প্রেরণ করিলেন। কিন্তু মুহূর্ত্ত মধ্যে যেমন গর্ভবতী রমণী সহসা প্রসব বেদনায় কাতরা হয়, এবং সে অসহ্য পীড়ায় তাহার কোমলাঙ্গ শিথিল ও অবশ হয়, রাজসার্ব্বভৌমও সেইরূপ বিকল হওতঃ দ্রুতে রথারোহণ করিয়া সারথিকে শিবিরাভিমুখে রথ চালাইতে আজ্ঞা দিলেন। কশাঘাতে অশ্বাবলী এরূপ দ্রুত ধাবনে ঘর্ম্ম জনিত ফেনায় আবৃত হইল। এইরূপে ঘোরতর রণ করিয়া অধিকারী মহোদয় যুদ্ধ কর্ম্মে ভঙ্গ দিলেন। তদ্দর্শনে প্রিয়াম পুত্র কুলচূড়ামণি হেক্‌টরের স্মরণ পথে দেবাদেশ আরূঢ় হইল। যেমন কোন ব্যাধ শুভ্রদন্ত শূনকবৃন্দকে কোন বরাহ কিম্বা সিংহকে আক্রমণ করিতে সাহস প্রদান করে, সেইরূপ রিপুসূদন স্কন্দোপম অরিন্দম হেক্‌টর স্ববলকে অগ্রসর হইতে অনুমতি দিলেন। এবং যেমন প্রচণ্ড ব্যাখ্যা আকাশ মণ্ডল হইতে কোন কোন সময়ে নীলোর্ম্মিময় সাগর আক্রমণ করে, আপনিও সেইরূপে রিপুদলে প্রবেশ করিলেন। ঘোরতর রণ হইল। অনেকানেক বীরবর ভূতলে শয়ন করিলেন। কি নেতা কি নীত ব্যক্তি কেহই তাহার শর সংঘাতে অব্যাহতি পাইল না। যেমন প্রবল বায়ুবলে জলদল আন্দোলিত হইলে তরঙ্গ সমূহ হইতে আকাশ পথে অগণ্য ফেণকণা উড়িয়া পড়িতে থাকে, সেইরূপ প্রকাণ্ড বীরবরের প্রচণ্ড দণ্ডাঘাতে মস্তকমণ্ডল চতুর্দ্দিকে পতিত হইতে লাগিল। এরূপ ভয়াবহ ঘটনা দর্শনে কৌশলশালী আদিস্যুস্‌ রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌কে আহ্বান করিয়া কহিলেন, “সখে, আমরা কি সহসা বীরবীর্য্য রহিত হইলাম?” এই কহিয়া উভয়ে ট্রয়স্থ সৈন্যদল আক্রমণ করিলেন। যেমন ভীষণদন্ত বরাহদ্বয় আক্রমী শ্বচক্রকে আক্রমিয়া লণ্ড ভণ্ড করে, বীরদ্বয় রিপুচয়কে সেইরূপ করিলেন। রিপুমর্দ্দন হেক্‌টর রিপুদ্বয়কে দূর হইতে দেখিয়া তাহাদের অভিমুখে হুহুঙ্কারে ধাবমান হইলেন, সে কাল হুহুঙ্কার শ্রবণে রণবিশারদ দ্যোমিদ্‌ শশঙ্ক চিত্তে সুচতুর আদিস্যুস্‌কে কহিলেন, “সখে, ঐ দেখ, ভয়ঙ্কর হেক্‌টর যেন নিধন তরঙ্গরূপে এ দিকে বহিতেছে, আইস, দেখি, আমাদের ভাগ্যে কি আছে।” এই কহিয়া রণদুর্ম্মদ দ্যোমিদ্‌ আপন শূল আগন্তুক বীরহর্ষ্যক্ষকে লক্ষ্য করিয়া নিক্ষেপ করিলেন। রিপুঘাতী অস্ত্র দেবদত্ত কিরীটে লাগিল।

এক পার্শ্ব হইতে বীর সুন্দর স্কন্দর এক নিশিত শর শরাসনে যোজনা করিয়া রণ-দুর্ম্মদ দ্যোমিদের পদবিন্ধন করিয়া আনন্দরবে কহিলেন “হে পরন্তপ দ্যোমিদ্‌! আমার শর চাপ হইতে বৃথা নিক্ষিপ্ত হয় না। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে, তোমার উদরদেশ ভিন্ন করিয়া তোমাকে চিররণবিরত করিতে পারে নাই।” অকুতোভয় দ্যোমিদ্‌ উত্তর করিলেন, “রে ধন্বী, রে গ্লানিকারক, রে অলকালঙ্কৃত অঙ্গনাকুলপ্রিয় দুর্ম্মতি! তোর অস্ত্রাঘাতে আমার কি হইতে পারে? তোর অস্ত্র নিক্ষেপণ অবলা রমণী ও শিশুর ন্যায়। তোর যদি রণস্পৃহা থাকে, তবে সম্মুখ রণে বিমুখ হইস্‌ কেন?” বিখ্যাত শূলী সখা আদিস্যুস্‌ পরম যত্নে তীর ক্ষতস্থল হইতে টানিয়া বাহির করিলে দ্যোমিদ্‌ বিষম যাতনায় অস্থির হইয়া রণস্থল হইতে শিবিরাভিমুখে রথারোহণে চলিলেন। শূলকুশল আদিস্যুস্‌ একাকী রণক্ষেত্রে রহিলেন, প্রাণ অপেক্ষা মান প্রিয়তর বিবেচনায় প্রাণপণে যুঝিতে লাগিলেন। যেমন গুল্মাবৃত বরাহকে আক্রমণার্থে কিরাতবৃন্দ শুনকবৃন্দ সহকারে গুল্মের চতুষ্পার্শ্বে একত্রীভূত হইয়া অবস্থিতি করে, আর যখন সে রক্তদন্ত কৃতান্তদূত বাহির হয়, তখন সকলে সভয়ে কেবল দূর হইতে অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে থাকে, ট্রয়স্থ যোধের গ্রীক্‌যোধবরকে সেইরূপে আক্রমণ করিল।

সুকস নামক এক মহা বীরপুরুষ সরোষে আদিস্যুসের দৃঢ় ফলকে শূল নিক্ষেপ করিলেন। অস্ত্র দুর্ভেদ্য ফলক ভেদ করিয়া কবচ ছিন্ন ভিন্ন করতঃ চর্ম্ম পর্য্যন্ত ভেদ করিল। কিন্তু সুনীলকমলাক্ষী দেবী আথেনী এ প্রাণসংশয় অস্ত্র বীরেশ্বরের শরীরাভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে দিলেন না। যশস্বী আদিস্যুস্‌ বিষমাঘাতে প্রহারকের প্রাণ সংহার করিলেন। পরে স্বহস্তে শূল টানিয়া বাহির করিলেন। লোহরঞ্জনে বীরদেহ যেন রঞ্জিত হইয়া উঠিল। বীরবরের এই অবস্থা দেখিয়া ট্রয়স্থ যোধদল তাহার প্রতি ধাবমান হইলে তিনি উচ্চে আর্ত্তনাদ করতঃ অপসৃত হইতে লাগিলেন।

স্কন্দপ্রিয় মানিল্যুস রিপুকুলত্রাস আয়াস্‌কে কহিলেন, “সখে, বোধ হইতেছে, যেন মহেষ্বাস আদিস্যুস সমরক্ষেত্রে আর্ত্তনাদ করিতেছে, কে জানে, কৌশলীশ্রেষ্ঠ কি বিপজ্জালে পরিবেষ্টিত হইয়া পড়িয়াছেন।” এই কহিয়া বীরদ্বয় দ্রুত গতিতে স্বর লক্ষ্য করিয়া সমর ক্ষেত্রের দিকে ধাবমান হইলেন। কতক দূর গিয়া দেখিলেন, যে যেমন কোন এক শাখা প্রশাখময় বিষাণ-বিশিষ্ট মৃগ কিরাতের শরাঘাতে ব্যথিত হইয়া রণপথ রক্তাক্ত করতঃ পলায়ন করে, মহেষ্বাস আদিস্যুস সেইরূপ রক্ত কলেবরে ধাবমান হইতেছেন, এবং যেমন সেই মৃগের পশ্চাতে পিঙ্গল শৃগালজাল তৎমাংসাভিলাষে দলবদ্ধ হইয়া তাহার অনুসরণ করে, ট্রয় নগরস্থ যোধদল মহাযশাঃ আদিস্যুসের বিনাশার্থে সেইরূপ হুহুঙ্কার ধ্বনি করতঃ দলে দলে তাঁহার পশ্চাতে চলিতেছে, কিন্তু এতাদৃশ অবস্থায় দীর্ঘকেশর কেশরী সহসা নয়নাকাশে উদিত হইলে যেমন সে শৃগালদল ভয়ে জড়ীভূত হইয়া পলায়ন করে, সেইরূপ বলস্তম্ভস্বরূপ রিপুত্রাস আয়াস্‌কে দেখিয়া রিপুদলের সেই দশাই ঘটিল। এবং, তাহারা প্রাণভয়ে দলভ্রষ্ট হইয়া, যে যে দিকে সুযোগ পাইল সে সেই দিকে পলায়ন করিতে চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু যেমন বারিদ-প্রসাদে মহাকায় নদস্রোতঃ পর্ব্বত হইতে গম্ভীর নিনাদে বহির্গত হইয়া কি বৃক্ষ, কি গুল্ম, কি পাষাণ খণ্ড, যাহা অগ্রে পড়ে, তাহাই অনিবার্য্য বলে বহিয়া লইয়া যায়, সেইরূপ দুর্ভেদ্য ফলকধারী আয়াস অশ্ব, পদাতিক, রথ, প্রচণ্ডাঘাতে লণ্ড ভণ্ড করিতে লাগিলেন। অনেক সেনা ভূতলশায়ী হইল, কিন্তু বীরবর হেক্‌টর এ দুর্ঘটনার বিন্দু বিসর্গও জানিতেন না। কেননা তিনি সৈন্যের বামভাগে স্কমন্দ্র নদ তটে রণব্যাপারে ব্যাপৃত ছিলেন। যে সকল মহামহা বীর সে স্থলে সাহসভরে যুঝিতেছিলেন, তাহারা সকলেই বিমুখ হইলেন, পরে ভাস্বর কিরীটী রথী আয়াসের পরাক্রম প্রকাশে বীর রোষে তদভিমুখে রথ পরিচালিত করিলেন। শত শত মৃত দেহ ও অস্ত্র রাশি রথচক্রে চূর্ণ হইয়া রথ ও রথবাহন বাজীরাজীকে রক্তপ্লাবিত করিল। অরিন্দমের সমাগমে রিপুন্তুদ আয়াসের বীর-হৃদয়ে সহসা যেন ভয় সঞ্চার হইল, এবং তিনি আপন দুর্ভেদ্য ফলক ফেলিয়া আরক্তনয়নে শক্রদলের প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করতঃ শিবিরাভিমুখে চলিলেন। যখন কোন ক্ষুধাতুর সিংহ বৃষপরিপূর্ণ গোষ্ঠ আক্রমণার্থে দেখা দেয়, তখন সে গোষ্ঠ-পরিবেষ্টনকারী রক্ষকদল তীক্ষ্ণদন্ত শুনকব্যূহ সহকারে তাহাকে নিবারণ করিবার জন্য শলাকাবৃষ্টি ও মুহুর্মুহু বৃহদাকার অলাতাবলী প্রোজ্জ্বলিত করিলে, যেমন সে পশুরাজ কৃতকার্য্য না হইয়া বিকট কটাক্ষে নিবারকদলকে অবহেলা করিয়া নিশাবসানে স্বগহ্বরে ফিরিয়া যায়, বীরেশ্বর আয়াস্‌ সেইরূপ অনিচ্ছায় ও প্রাণভয়ে রণরঙ্গে ভঙ্গ দিলেন। রিপুত্রাস আয়াস্‌কে এতদবস্থ দেখিয়া রিপুকুল ত্রাসে জলাঞ্জলি দিয়া তাহার অনুসরণ করিতে আরম্ভ করিলে ঊরিপ্লুস নামক যশস্বী রথী তাহাদিগকে নিবারণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু দেবাকৃতি রথীস্কন্দর তীক্ষ্ণতম শরে তাহার দেহ ক্ষত করাতে তিনিও রণে বিমুখ হইলেন। এইরূপে প্রধান প্রধান নেতৃবৃন্দ রণানন্দে নিরানন্দ হওয়াতে রথ, পদাতিক, বাজীরাজী সকলে মহাকোলাহলে রণভূমি পরিত্যাগপূর্ব্বক শিবিরাভিমুখে দৌড়িয়া চলিল। সৈন্যদলের রণভঙ্গারব বীরকেশরী আকিলীসের শিবিরাভ্যন্তরে যেন প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিল। বীরবর সচকিতে বিশেষ প্রিয়পাত্র পাত্রক্লুসকে আহ্বান করিয়া উভয়ে একত্র বহির্গত হইয়া গ্রীক্‌কদলের দুরবস্থা সন্দর্শনে সহাস্যবদনে কহিলেন, “হে প্রিয়তম! গ্রীকেরা যে দিন আমার পদতলে অবনত হইবে সে দিন আর অধিক দূরবর্ত্তী নহে। ঐ দেখ, দুর্দ্দান্ত হেক্‌টরের কুন্তাস্ফালনে কি ফল হইয়াছে। আমা ব্যতীত দেবনরযোনি কোন্‌ যোধ প্রিয়ামপুকে রণে নিবারণ করিতে পারে। আমারও এ হৃদয় তাহার বীর্য্যে সমরে ভূরি ভূরি কাঁপিয়া উঠে। সে যাহা হউক, তুমি এক্ষণে পিতা নেস্তরের নিকট হইতে রণবার্ত্তা লইয়া আইস!” পাত্রক্লুস্ অমনি দেবোপম সখার আজ্ঞা পালনে প্রবৃত্ত হইলেন।

বৃদ্ধরাজ নেস্তর পাত্রক্লুসকে স্নেহগর্ভ বচনে জিজ্ঞাসা করিলেন, “বৎস! তোমার ও দেবসদৃশ সখার মঙ্গল তো? দেখ তোমার সে প্রিয় বন্ধুর বিহনে আমাদিগের কি দুর্ঘটনা না ঘটিতেছে? তুমি যদি পার, তবে তাহার রোষাগ্নি নির্বাণ করিয়া তাহাকে আমাদিগের সহকারার্থ আন, নচেৎ স্বয়ং তাহার বীর পরিচ্ছদে স্বদেহ আচ্ছাদন করিয়া রণক্ষেত্রে দেখা দেও। দেখি, যদি এ ছলনায় রিপুকুল ভয়াকুল হইয়া আমাদিগকে ক্ষণকাল ক্লান্তি দূরীকরণার্থে অবসর দেয়,” বৃদ্ধ মন্ত্রির এই কুমন্ত্রণায় আয়ুহীন পাত্রক্লুস সখার শিবিরাভিমুখে ব্যগ্রপদে যাইতেছেন, এমত সময়ে ক্ষত কলেবর ঊরিপ্লুসকে কতিপয় যোধ ফলকোপরি বহন করিয়া সেই স্থলে উপস্থিত হইল। সরল-হৃদয় পাত্রক্লুস রাজ বীর ঊরিপ্লুসকে এ হৃদয়কৃন্তনী অবস্থায় দেখিয়া তাহার শুশ্রূষা ক্রিয়ায় সযত্নে রত হইলেন। সুতরাং তদ্দণ্ডে সখার শিবিরে যাইতে পারিলেন না।

রণক্ষেত্রে বিপক্ষদলে ঘোরতর রণ হইতে লাগিল। কিন্তু ট্রয়দল রিপুকুলবিনাশকারী হেক্‌টরের সহকারে নির্ব্বাধে পরিখা পার হইতে লাগিল। যেমন ব্যাধদল শুনকদলে কোন তীক্ষ্ণদন্ত নির্ভীক বন-শূকর অথবা মৃগরাজকে আক্রমণ করিলে বিক্রমশালী পশু ক্ষণ-নিক্ষিপ্ত শলাকামালা অবহেলা করিয়া প্রহারক-দলকে সংহারার্থে ভীষণ গর্জন করতঃ তাহাদিগের প্রতি ধাবমান হয়, বীরসিংহ হেক্‌টর সেই রূপ করিতে লাগিলেন, এবং যেমন যে দলের অভিমুখে সে পশু রোষতাপে তাপিত-চিত্ত হইয়া ধায়, সে দল তদ্দণ্ডে প্রাণভয়ে পলায়নোম্মুখ হয়, সেইরূপে নিধনতরঙ্গরূপ হেক্‌টরের দুর্ব্বার বাহুবলরূপ স্রোতে গ্রীক্‌সেনারা রণে ভঙ্গ দিয়া চতুর্দ্দিকে পলাইতে লাগিল। ট্রয়নগরস্থ পদাতিক দল বীরকেশরীর সহিত সাহসে পরিখা পার হইল। কিন্তু রথারোহী ও অশ্বারোহী বীরদলের পক্ষে সে পরিখাতরণে নানাবিধ বাধা দেখিয়া রিপুদমী পলিদ্যুম্ন উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, “হে বীরবৃন্দ! আমার বিবেচনায় রথ ও অশ্বারোহণে এ পরিখাতরণ ক্রিয়া অতীব অবিবেচনীয়; কেননা, ইহার পথের অপ্রশস্ততা নিবন্ধন প্রত্যাবর্ত্তনকালে রথ অশ্বসমূহের বর্ত্তমানতায় এ অপ্রশস্ত পথ রুদ্ধ হইলে আমাদের বিষম বিপদের সম্ভাবনা।” বীরবরের এই হিতোপদেশ বাক্য সকলেরই মনোনীত হইল। এবং চতুরঙ্গ দলে সকলেই রথ ও তুরঙ্গম হইতে ভূতলে লম্ফ দিয়া পদব্রজে ধাবমান হইলেন। প্রতি সৈন্যদলের পুরোভাগে সুন্দরবীর স্কন্দর মহেষ্বাস এনেশ, রিপুমর্দ্দন সর্পীদন, রিপুবংশধ্বংস গ্লৌকস প্রভৃতি নেতৃবর্গ হুহুঙ্কার নিনাদে পরিখা পার হইলেন। এবং এক এক দ্বার দিয়া শিবিরাভিমুখে চলিলেন। যেমন হেমন্তান্তে বারিদপটলী তুষার কণা বৃষ্টি করে, সেইরূপ উভয়দল হইতে চতুর্দ্দিকে অস্ত্রজাল পড়িতে লাগিল। এবং বীরকুলের শিরস্ত্রাণ নিস্ত্রিংশপুঞ্জে বাজিয়া ঝন্ ঝন্ স্বননে শিবিরদেশ পরিপূর্ণ করিল। দেবদেবী গ্রীক্‌দলের এ দুরবস্থা সন্দর্শনে হৈম হর্ম্ম্যময়ী অমরাবতীতে পরম নিরানন্দ হইলেন। কিন্তু দেবকুলকান্তের ত্রাসে কেহই কিছু করিতে পারিলেন না। যে স্থলে রিপুকুন্তক হেক্‌টর প্রিয়ভ্রাতা রিপুদমন পলিদ্যুম্নের সহকারে মহাহবে প্রবৃত্ত ছিলেন, সে স্থলে তাহারা উভয়ে আকাশমার্গে এক অদ্ভুত শকুন দেখিতে পাইলেন। সহসা এক বিক্রমশালী পক্ষিরাজ রক্তাক্ত ক্রমে এক প্রকাণ্ডকলেবর বিষধর ধারণ করিয়া উড়িতেছে। তীব্র বেদনায় ভুজঙ্গমের অঙ্গ আকুঞ্চিত হইতেছে, তথাচ সে বৈরীনির্যাতনার্থে তাহার গ্রীবাদেশে দংশন করিল। পক্ষিরাজ এ অসহনীয় দংশন পীড়ায় কাকোদরকে ছাড়িয়া দিলে সে ভূতলে সৈন্য মধ্যে পড়িল। পক্ষিরাজ শূন্য ক্রমে সনীড়ে উড়িয়া চলিল। পলিদ্যুম্ন বীর ভ্রাতাকে কহিলেন, “হে হেক্‌টর! এ কি কুলক্ষণ দেখিলাম, এ প্রপঞ্চ ব্যর্থ নহে। আমি বিবেচনা করি, যে বিপক্ষ-দলকে রণক্ষেত্রে বিনষ্ট করা আমাদের ভাগ্যে নাই। এই ক্ষত ভুজঙ্গের ন্যায় বিপক্ষচতুরঙ্গ দল আমাদের সৈন্যের ক্রমপরাক্রমে আক্রান্ত হইয়াও তাহার গলদেশ দংশন করিবে, সন্দেহ নাই। অতএব হে ভ্রাতঃ! আইস আমরা ঐ সকল সাগর যান ভস্মসাৎ করিবার আশায় জলাঞ্জলি দিয়া পরিখার অপর পারে যাই।” ভাস্বর কিরীটী হেক্‌টর ভ্রাতার এইরূপ বাক্যে বিরক্ত হইয়া কহিলেন, “হে পলিদ্যুম্ন! তুমি এ কি কহিতেছ? স্বজন্মভূমির রক্ষাকার্য্য এত দূর পর্য্যন্ত শুভ, ও কর্ত্তব্য কার্য্য, যে তাহা হইতে কোন কুলক্ষণ দর্শনে পরাঙ্মুখ হওয়া উচিত নয়।” বীরদ্বয় এইরূপ কথোপকথন করিতেছেন, এমত সময়ে দেবকুলপতির ঔরসজাত নরদেবাকৃতি রথী সর্পীদন্‌ স্ববলে সিংহনিনাদে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করিলেন। যেমন মৃগেন্দ্র কোন পর্ব্বতকন্দরে বহুদিন অনশনে উন্মত্ত প্রায় হইয়া আহার অন্বেষণে বাহির হইয়া বক্রশৃঙ্গ বৃষপালকে দূর হইতে দেখিতে পাইলে পালদলের ভৈরব রব ও শলাকাবৃন্দে অবহেলা করিয়া বৃষসমূহকে আক্রমণ করে এবং প্রাণান্তেও আহার লাভ লোভে বিরত হয় না। সেইরূপে রিপুকুলমর্দ্দন সর্পীদন রিপুকুলকে আক্রমণ করিলেন, বীরদলের পদ চালনে ধূলারাশি আকাশমার্গে উঠিতে লাগিল।

দেবকুলপতি উৎসযোনি ঈডা পর্ব্বতশৃঙ্গ হইতে গ্রীক্‌দলের প্রতিকূলে এক প্রবল ব্যাত্যা বহাইলেন। অনেকানেক বীরবর অকালে সমরশায়ী হইলেন। মহাযশাঃ হেক্‌টর কালরাত্রিরূপে শত্রুদলের মধ্যে উপস্থিত হইলেন। এবং তাহার বর্ম্ম হইতে কালাগ্নিতেজ বাহির হইতে লাগিল। গ্রীক্‌সেনা সভয়ে পোতাভিমুখে ধাবমান হইল। * * * * * *

ষষ্ঠপরিচ্ছেদ সমাপ্ত।