← লাইব্রেরি

১৮৬৮

বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬৮)

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৬৮

বীরাঙ্গনা কাব্য।

শ্রীমাইকেল মধুসূদন দত্ত

প্রণীত।

তৃতীয়বার মুদ্রিত।

কলিকাতা।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং বহুবাজারস্থ ১৭২ সংখ্যক

ভবনে ষ্ট্যান্‌হোপ্ যন্ত্রে যন্ত্রিত।

সন ১২৭৫ সাল।

মঙ্গলাচরণ।

বঙ্গকুলচুড়া

শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহোদয়ের

চিরস্মরণীয় নাম

এই অভিনব কাব্যশিরে শিরোমণিরূপে

স্থাপিত করিয়া,

কাব্যকার

ইহা

উক্ত মহানুভবের নিকট

যথোচিত সম্মানের সাহিত

উৎসর্গ করিল।

ইতি।

সন ১২৬৮ সাল। ১৬ই ফাল্গুন।

অষ্টম সর্গ

অষ্টম সর্গ।

জয়দ্রথের প্রতি দুঃশলা।

[ অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্রের কন্যা দুঃশলাদেবী সিন্ধুদেশাধিপতি জয়দ্রথের মহিষী। অভিমন্যুর নিধনানন্তর পার্থ যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, তচ্ছ্রবণে দুঃশলাদেবী নিতান্ত ভীতা হইয়া নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি জয়দ্রথের নিকট প্রেরণ করেন। ]

কি যে লিখিয়াছে বিধি এ পোড়া কপালে,

হায়, কে কহিবে মোরে,—জ্ঞানশূন্য আমি!

শুন, নাথ, মনঃ দিয়া;—মধ্যাহ্নে বসিনু

অন্ধ পিতৃপদতলে, সঞ্জয়ের মুখে

শুনিতে রণের বার্ত্তা। কহিলা সুমতি—৫

(না জানি পূর্ব্বের কথা; ছিনু অবরোধে

প্রবোধিতে জননীরে;) কহিলা সুমতি

সঞ্জয়,—‘বেড়িল পুনঃ সপ্ত মহারথী

সুভদ্রানন্দনে, দেব! কি আশ্চর্য্য, দেখ—

অগ্নিময় দশদিশ পুনঃ শরানলে!১০

প্রাণপণে যোঝে যোধ; হেলায় নিবারে

অস্ত্রজালে শূরসিংহ! ধন্য শূরকুলে

অভিমন্যু!’ নীরবিলা এতেক কহিয়া

সঞ্জয়। নীরবে সবে রাজসভাতলে

সঞ্জয়ের মুখপানে রহিলা চাহিয়া।১৫

‘দেখ, কুরুকুলনাথ,’—পুনঃ আরম্ভিলা

দুরদর্শী,—‘ভঙ্গ দিয়া রণরঙ্গে পুনঃ

পালাইছে সপ্তরথী! নাদিছে ভৈরবে

আর্জ্জুনি, পাবক যেন গহন বিপিনে!

পড়িছে অগণ্য রথী, পদাতিক-ব্রজ;২০

গরজি মরিছে গজ বিষম পীড়নে;

সভয়ে হ্রেষিছে অশ্ব! হায়, দেখ চেয়ে,

কাঁদিছেন পুত্ত্র তব দ্রোণগুরুপদে!’

মজিল কৌরব আজি আর্জ্জুনির রণে!’

কাঁদিলা আক্ষেপে পিতা; কাঁদিয়া মুছিনু২৫

অশ্রুধারা। দূরদর্শী আবার কহিলা; —

‘ধাইছে সমরে পুনঃ সপ্ত মহারথী,

কুরুরাজ! লাগে তালি কর্ণমূলে শুনি

কোদণ্ড টংকার, প্রভু! বাজিল নির্ঘোষে

ঘোর রণ! কোন রথী গুণসহ কাটে৩০

ধনু; কেহ রথচূড়, রথচক্র কেহ।

কাটিয়া পাড়িলা দ্রোণ ভীম-অস্ত্রাঘাতে

কবচ; মরিল অশ্ব; মরিল সারথি!

রিক্তহস্ত এবে বীর, তবুও যুঝিছে

মদকল হস্তী যেন মত্ত রণমদে!’—৩৫

নীরবিয়া ক্ষণকাল, কহিলা কাতরে

পুনঃ দূরদর্শী;—‘আহা! চিররাহু-গ্রাসে

এ পৌরব-কুলইন্দু পড়িলা অকালে!

অন্যায় সমরে, নাথ, গতজীব, দেখ,

অর্জ্জুনি! হুঙ্কারে, শুন, সপ্ত জয়ী রথী,৪০

নাদিছে কৌরবকুল জয় জয় রবে!

নিরানন্দে ধর্ম্মরাজ চলিলা শিবিরে।’

হরষে বিষাদে পিতা, শুনি এ বারতা,

কাঁদিলা; কাঁদিনু আমি। সহসা ত্যজিয়া

আসন সঞ্জয় বুধ, কৃতাঞ্জলি পুটে,৪৫

কহিলা সভয়ে,—‘উঠ, কুরুকুলপতি!

পূজ কুলদেবে শীঘ্র জামাতার হেতু!

ওই দেখ কপিধ্বজে ধাইছে ফাল্গুনী

অধীর বিষমশোকে! গরজে গম্ভীরে

হনূ স্বর্ণরথচূড়ে পড়িছে ভূতলে৫০

খেচর; ভূচরকুল পালাইছে দূরে!

ঝকঝকে দিব্য বর্ম্ম; খেলিছে কিরীটে

চপলা; কাঁপিছে ধরা থর থর থরে!

পাণ্ডু-গণ্ড ত্রাসে কুরু; পাণ্ডু-গণ্ড ত্রাসে

আপনি পাণ্ডব, নাথ, গাণ্ডীবীর কোপে!৫৫

মুহুর্মুহুঃ ভীমবাহু টংকারিছে বামে

কোদণ্ড—ব্রহ্মাণ্ডত্রাস! শুন কর্ণ দিয়া,

কহিছে বীরেশ রোষে ভৈরব নিনাদে;—

‘কোথা জয়দ্রথ এবে—রোধিল যে বলে

ব‍্যূহমুখ? শুন, কহি, ক্ষত্ররথী যত;৬০

তুমি, হে বসুধা, শুন; তুমি জলনিধি;

তুমি, স্বর্গ, শুন, তুমি, পাতাল, পাতালে,

চন্দ্র, সূর্য‍্য, গ্রহ, তারা, জীব এ জগতে

আছ যত, শুন সবে! না বিনাশি যদি

কালি জয়দ্রথে রণে, মরিব আপনি!

অগ্নিকুণ্ডে পশি তবে যাব ভূতদেশে,

না ধরিব অস্ত্র আর এ ভব সংসারে!’—

অজ্ঞান হইয়া আমি পিতৃপদতলে

পড়িনু! যতনে মোরে আনিয়াছে হেথা—

এই অন্তঃপুরে—চেড়ী পিতার আদেশে।৭০

কহ এ দাসীরে, নাথ: কহ সত্য করি;

কি দোষে আবার দোষী জিষ্ণুর সকাশে

তুমি? পূর্ব্বকথা স্মরি চাহে কি দণ্ডিতে

তোমায় গাণ্ডীবী পুনঃ? কোথায় রোধিলে

কোন্ ব্যূহমুখ তুমি, কহ তা আমারে?৭৫

কহ শীঘ্র, নহে, দেব, মরিব তরাসে!

কাঁপিছে এ পোড়া হিয়া থরথর করি!

আঁধার নয়ন, হায়, নয়নের জলে!

নাহি সরে কথা, নাথ, রসশূন্য মুখে!

কাল অজাগর-গ্রাসে পড়িলে কি বাঁচে৮০

প্রাণী? ক্ষুধাতুর সিংহ ঘোর সিংহনাদে

ধরে যবে বনচরে, কে তারে তাহারে?

কে কহ, রক্ষিবে তোমা, ফাল্গুনী রুষিলে?

হে বিধাতঃ কি কুক্ষণে, কোন্ পাপদোষে

আনিলে নাথেরে হেথা, এ কাল সমরে৮৫

তুমি? শুনিয়াছি আমি, যে দিন জন্মিলা

জ্যেষ্ঠভ্রাতা, অমঙ্গল ঘটিল সে দিনে!

নাদিল কাতরে শিবা; কুকুর কাঁদিল

কোলাহলে; শূন্যমার্গে গর্জ্জিল ভীষণে

শকুনী গৃধিনীপাল! কহিলা জনকে৯০

বিদুর,—সুমতি তাত! ‘ত্যজ এ নন্দনে,

কুরুরাজ! কুরুবংশ-ধ্বংসরূপে আজি

অবতীর্ণ তব গৃহে!’ না শুনিলা পিতা

সে কথা! তুলিলা, হায়, মোহের ছলনে!

ফলিল সে ফল এবে, নিশ্চয় ফলিল!৯৫

শরশয্যাগত ভীষ্ম, বৃদ্ধ পিতামহ—

পৌরব-পঙ্কজ-রবি চির রাহুগ্রাসে!

বীর্য্যাঙ্কুর অভিমন্যু হতজীব রণে!

কে ফিরে আসিবে বাঁচি এ কাল সমরে?

এস তুমি, এস নাথ, রণ পরিহরি!১০০

ফেলি দূরে বর্ম্ম, চর্ম্ম, অসি, তূণ, ধনু,

ত্যজি রথ, পদব্রজে এস মোর পাশে।

এস, নিশাযোগে দোঁহে যাইব গোপনে

যথায় সুন্দরীপুরী সিন্ধুনদতীরে

হেরে নিজ প্রতিমূর্ত্তি বিমল সলিলে,১০৫

হেরে হাসি সুবদনা সুবদন যথা

দর্পণে! কি কাজ রণে তোমার? কি দোষে

দোষী তব কাছে, কহ, পঞ্চপাণ্ডু রথী?

চাহে কি হে অংশ তারা তব রাজ্যধনে?

তবে যদি কুরুরাজে ভাল বাস তুমি,১১০

মম হেতু, প্রাণনাথ; দেখ ভাবি মনে,

সমপ্রেমপাত্র তব কুন্তীপুত্র বলী।

ভ্রাতা মোর কুরুরাজ; ভ্রাতা পাণ্ডুপতি!

এক জন জন্যে কেন ত্যজ অন্য জনে,

কুটুম্ব উভয় তব?—আর কি কহিব?১১৫

কি ভেদ হে নদদ্বয়ে জন্ম হিমাদ্রিতে?

তবে যদি গুণ দোষ ধর, নরমণি;—

পাপ অক্ষক্রীড়া-ফাঁদ কে পাতিল, কহ?

কে আনিল সভাতলে (কি লজ্জা!) ধরিয়া

রজস্বলা ভ্রাতৃবধূ? দেখাইল তাঁরে১২০

ঊরু? কাড়ি নিতে তাঁর বসন চাহিল—

উলঙ্গিতে অঙ্গ, মরি, কুলাঙ্গনা তিনি?

ভ্রাতার সুকীর্ত্তি যত, জান না কি তুমি?

লিখিতে শরমে, নাথ, না সরে লেখনী!

এস শীঘ্র, প্রাণসখে, রণভূমি ত্যজি!১২৫

নিন্দে যদি বীরবৃন্দ তোমায়, হাসিও

স্বমন্দিরে বসি তুমি! কে না জানে, কহ,

মহারথী রথীকুলে সিন্ধু-অধিপতি?

যুঝেছ অনেক যুদ্ধে; অনেক বধেছ

রিপু; কিন্তু এ কৌন্তেয়, হায়, ভবধামে১৩০

কে আছে প্রহরী, কহ, ইহার সদৃশ?

ক্ষত্রকুল-রথী তুমি, তবু নরযোনি;

কি লাজ তোমার, নাথ, ভঙ্গ যদি দেহ

রণে তুমি হেরি পার্থে, দেবযোনি-জয়ী?

কি করিলা আখণ্ডল খাণ্ডব দাহনে?১৩৫

কি করিলা চিত্রসেন গন্ধর্ব্বাধিপতি?

কি করিলা লক্ষরাজা স্বয়ম্বর কালে?

স্মর, প্রভু! কি করিলা উত্তর গোগৃহে

কুরুসৈন্য নেতা যত পার্থের প্রতাপে?

এ কালাগ্নি কুণ্ডে কহ; কি সাধে পশিবে?১৪০

কি সাধে ডুবিবে হায়, এ অতল জলে?

ভুলে যদি থাক মোরে, ভুলনা নন্দনে

সিন্ধুপতি;—মণিভদ্রে ভুল না, নৃমণি!

নিশার শিশির যথা পালয়ে মুকুলে

রসদানে; পিতৃস্নেহ, হায় রে, শৈশবে১৪৫

শিশুর জীবন, নাথ, কহিনু তোমারে!

জানি আমি কহিতেছে আশা তব কানে—

মায়াবিনী!—‘দ্রোণ গুরু সেনাপতি এবে;

দেখ কর্ণ ধনুর্দ্ধরে; অশ্বত্থামা শূরে;

কৃপাচার্য্যে; দুর্য্যোধনে—ভীম গদাপাণি!১৫০

কাহারে ডরাও তুমি, সিন্ধুদেশপতি?

কে সে পার্থ? কি সামর্থ্য তাহার নাশিতে

তোমায়?’—শুন না, নাথ, ও মোহিনী বাণী!

হায়, মরীচিকা আশা ভব-মরুভূমে!

মুদি আঁখি ভাব,—দাসী পড়ি পদতলে;১৫৫

পদতলে মণিভদ্র কাঁদিছে নীরবে!

ছদ্মবেশে রাজদ্বারে থাকিব দাঁড়ায়ে

নিশীথে; থাকিবে সঙ্গে নিপুণিকা সখী,

লয়ে কোলে মণিভদ্রে। এসো ছদ্মবেশে,

না করে কাহারে কিছু! অবিলম্বে যাব১৬০

এ পাপ নগর ত্যজি সিন্ধুরাজালয়ে!

কপোতমিথুন সম যাব উড়ি নীড়ে!—

ঘটুক যা থাকে ভাগ্যে কুরু পাণ্ডু কুলে!

ইতি শ্রীবীরাঙ্গনাকাব্যে দুঃশলাপত্রিকা নাম

অষ্টম সর্গ!

একাদশ সর্গ

একাদশ সর্গ।

নীলধ্বজের প্রতি জনা

[মাহেশ্বরী পুরীর যুবরাজ প্রবীর অশ্বমেধ-যজ্ঞাশ্ব ধরিলে,—পার্থ তাহাকে রণে নিহত করেন। রাজা নীলধ্বজ রায় পার্থের সহিত বিবাদপরাঙ্মুখ হইয়া সন্ধি করাতে, রাজ্ঞী জনা পুত্ত্রশোকে একান্ত কাতরা হইয়া এই নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি রাজ সমীপে প্রেরণ করেন। পাঠকবর্গ মহাভারতীয় অশ্বমেধ পর্ব্ব পাঠ করিলে উহার সবিশেষ বৃত্তান্ত অবগত হইতে পারিবেন। ]

বাজিছে রাজ-তোরণে রণবাদ্য আজি;

হ্রেষে অশ্ব; গর্জ্জে গজ; উড়িছে আকাশে

রাজকেতু; মুহুর্মুহুঃ হুঙ্কারিছে মাতি

রণমদে রাজসৈন্য;—কিন্তু কোন্ হেতু?

সাজিছ কি, নররাজ, যুঝিতে সদলে—৫

প্রবীর পুত্রের মৃত্যু প্রতিবিধিৎসিতে,—

নিবাইতে এ শোকাগ্নি ফাল্গুনীর লোহে?

এই তো সাজে তোমারে, ক্ষত্রমণি তুমি,

মহাবাহু! যাও বেগে গজরাজ যধা

যমদণ্ডসম শুণ্ড আস্ফালি নিনাদে!১০

টুট কিরীটীর গর্ব্ব আজি রণস্থলে!

খণ্ডমুণ্ড তার আন শূল-দণ্ড-শিরে!

অন্যায় সময়ে মূঢ় নাশিল বালকে;

নাশ, মহেষ্বাস, তারে! ভুলিব এ জ্বালা,

এ বিষম জ্বালা, দেব, ভুলিব সত্বরে!১৫

জন্মে মৃত্যু;—বিধাতার এ বিধি জগতে।

ক্ষত্রকুল-রত্ন পুত্র প্রবীর সুমতি,

সম্মুখসমরে পড়ি, গেছে স্বর্গধামে,—

কি কাজ বিলাপে, প্রভু? পাল, মহীপাল,

ক্ষত্রধর্ম্ম, ক্ষত্রকর্ম্ম সাধ ভুজবলে।২০

হায়, পাগলিনী জনা! তব সভামাঝে

নাচিছে নর্ত্তকী আজি, গায়ক গাইছে,

উথলিছে বীণাধ্বনি! তব সিংহাসনে

বসিছে পুত্রহা রিপু—মিত্রোত্তম এবে!

সেবিছ যতনে তুমি অতিথি-রতনে।—২৫

কি লজ্জা! দুঃখের কথা, হায়, কব কারে?

হতজ্ঞান আজি কি হে পুত্ত্রের বিহনে,

মাহেশ্বরী-পুরীশ্বর নীলধ্বজ রথী?

যে দারুণ বিধি, রাজা, আঁধারিলা আজি

রাজ্য, হরি পুত্ত্রধনে, হরিলা কি তিনি৩০

জ্ঞান তব? তা না হলে, কহ মোরে, কেন

এ পাষণ্ড পাণ্ডুরধী পার্থ তব পুরে

অতিথি? কেমনে তুমি, হায়, মিত্রভাবে

পরশ সে কর, যাহা প্রবীরের লোহে

লোহিত? ক্ষত্রিয়ধর্ম্ম এই কি, নৃমণি?৩৫

কোথা ধনু, কোথা তূণ, কোথা চর্ম্ম, অসি?

না ভেদি রিপুর বক্ষ তীক্ষ্ণতম শরে

রণক্ষেত্রে, মিষ্টালাপে তুষিছ কি তুমি

কর্ণ তার সভাতলে? কি কহিবে, কহ,

যবে দেশ-দেশান্তরে জনরব লবে৪০

এ কাহিনী, কি কহিবে ক্ষত্রপতি যত?

নরনারায়ণ-জ্ঞানে, শুনিনু, পূজিছ

পার্থে রাজা, ভক্তিভাবে;—এ কি ভ্রান্তি তব?

হায়, ভোজবালা কুন্তী—কে না জানে তারে,

স্বৈরিণী? তনয় তার জারজ অর্জ্জুনে৪৫

(কি লজ্জা.) কি গুণে তুমি পূজ, রাজরথি,

নরনারায়ণ-জ্ঞানে? রে দারুণ বিধি,

এ কি লীলাখেলা তোর, বুঝিব কেমনে?

এক মাত্র পুত্ত্র দিয়া নিলি পুনঃ তারে

অকালে! আছিল মান,—তাও কি নাশিলি?৫০

নরনারায়ণ পার্থ? কুলটা যে নারী—

বেশ্যা-গর্ব্ভে তার কি হে জনমিলা আসি

হৃষীকেশ? কোন্ শাস্ত্রে, কোন্ বেদে লেখে—

কি পুরাণে—এ কাহিনী? দ্বৈপায়ন ঋষি

পাণ্ডব-কীর্ত্তন গান গায়েন সতত।৫৫

সত্যবতীসুত ব্যাস বিখ্যাত জগতে:

ধীবরী জননী, পিতা ব্রাহ্মণ! করিলা

কামকেলি লয়ে কোলে ভ্রাতৃবধূদ্বয়ে

ধর্ম্মমতি! কি দেখিয়া, বুঝাও দাসীরে,

গ্রাহ্য কর তাঁর কথা, কুলাচার্য্য তিনি৬০

কু-কুলের? তবে যদি অবতীর্ণ হবে

পার্থরূপে পীতাম্বর, কোথা পদ্মালয়া

ইন্দিরা? দ্রৌপদী বুঝি? আঃ মরি, কি সতী!

শাশুড়ীর যোগ্য বধূ! পৌরব-সরসে

নলিনী! অলির সখী, রবির অধীনী,৬৫

সমীরণ-প্রিয়া। ধিক্! হাসি আসে মুখে,

(হেন দুঃখে) ভাবি যদি পাঞ্চালীর কথা!

লোক-মাতা রমা কি হে এ ভ্রষ্টা রমণী?

জানি আমি কহে লোক রথীকুল-পতি

পার্থ। মিথ্যা কথা, নাথ! বিবেচনা কর,৭০

সুক্ষ্ম বিবেচক তুমি বিখ্যাত জগতে।—

ছদ্মবেশে লক্ষ রাজে ছলিল দুর্ম্মতি

স্বয়ম্বরে। যথাসাধ্য কে যুঝিল, কহ,

ব্রাহ্মণ ভাবিয়া তারে, কোন্ ক্ষত্ররথী,

সে সংগ্রামে? রাজদলে তেঁই সে জিতিল!৭৫

দহিল খাণ্ডব দুষ্ট কৃষ্ণের সহায়ে।

শিখণ্ডীর সহকারে কুরুক্ষেত্র রণে

পৌরব-গৌরব ভীষ্ম বৃদ্ধ পিতামহে

সংহারিল মহাপাপী! দ্রোণাচার্য্য গুরু,—

কি কুছলে নরাধম বধিল তাঁহারে,৮০

দেখ স্মরি? বসুন্ধরা গ্রাসিলা সরোষে

রথচক্র যবে, হায়; যবে ব্রহ্মশাপে

বিকল সমরে, মরি, কর্ণ মহাযশাঃ,

নাশিল বর্ব্বর তাঁরে। কহ মোরে, শুনি,

মহারথী-প্রথা কি হে এই, মহারথি?৮৫

আনায়-মাঝারে আনি মৃগেন্দ্রে কৌশলে

বধে ভীরুচিত ব্যাধ; সে মৃগেন্দ্র যবে

নাশে রিপু, আক্রমে সে নিজ পরাক্রমে!

কি না তুমি জান রাজা? কি কব তোমারে?

জানিয়া শুনিয়া তবে কি ছলনে ভূল৯০

আত্মশ্লাঘা, মহারথি? হায় রে কি পাপে?

রাজ-শিরোমণি রাজা নীলধ্বজ আজি

নতশির,—হে বিধাতা!—পার্থের সমীপে?

কোথা বীরদর্প তব? মানদর্প কোথা?

চণ্ডালের পদধূলি ব্রাহ্মণের ভালে?৯৫

কুরঙ্গীর অশ্রুবারি নিবায় কি কভু

দাবানলে? কোকিলের কাকলী-লহরী

উচ্চনাদী প্রভঞ্জনে নীরবয়ে কবে?

ভীরুতার সাধনা কি মানে বলবাহু?

কিন্তু বৃথা এ গঞ্জনা! গুরুজন তুমি;১০০

পড়িব বিষয় পাপে মঞ্জিলে তোমারে!

কুলনারী আমি, নাথ, বিধির বিধানে

পরাধীনা! নাহি শক্তি মিটাই স্ববলে

এ পোড়া মনের বাঞ্ছা! দুরন্ত ফাল্গুনী

(এ কৌন্তেয় যোধে ধাতা সৃজিলা নাশিতে১০৫

বিশ্বসুখ!) নিঃসন্তানা করিল আমারে!

তুমি পতি, ভাগ্যদোষে বাম মমপ্রতি

তুমি! কোন্ সাধে প্রাণ ধরি ধরাধামে?

হায়রে, এ জনাকীর্ণ ভবস্থল আজি

বিজন জনার পক্ষে! এ পোড়া ললাটে১১০

লিখিলা বিধাতা যাহা, ফলিল তা কালে! —

হা প্রবীর! এই হতু ধরিনু কি তোরে,

দশমাস দশদিন নানা যত্ন সয়ে,

এ উদরে? কোন্ জন্মে, কোন্ পাপে পাপী

তোর কাছে অভাগিনী, তাই দিলি বাছা,১১৫

এ তাপ? আশার লতা তাই রে ছিঁড়িলি?

হা পুত্ত্র! শোধিলি কি রে তুই এই রূপে

মাতৃধার? এই কি রে ছিল তোর মনে?—

কেন বৃথা, পোড়া আঁখি, বরষিস্, আজি

বারিধারা? রে অবোধ্, কে মুছিবে তোরে?১২০

কেন বা জ্বলিস্, মনঃ? কে জুড়াবে আজি

বাক্য সুধারসে তোরে? পাণ্ডবের শরে

খণ্ড শিরোমণি তোর; বিবরে লুকায়ে,

কাঁদি খেদে, মর্, অরে মণিহারা ফণি!—

যাও চলি, মহাবল, যাও কুরুপুরে১২৫

নবমিত্র পার্থ সহ! মহাযাত্রা করি

চলিল অভাগা জনা পুত্ত্রের উদ্দেশে!

ক্ষত্র-কুলবালা আমি; ক্ষত্র-কুল-বধু;

কেমনে এ অপমান সব ধৈর্য্য ধরি?

ছাড়িব এ পোড়া প্রাণ জাহ্নবীর জলে;১৩০

দেখিব বিস্মৃতি যদি কৃতান্তনগরে

লভি অন্তে! যাচি চির বিদায় ও পদে!

ফিরি যবে রাজপুরে প্রবেশিবে আসি,

নরেশ্বর, “কোথা জনা?” বলি ডাক যদি,

উত্তরিবে প্রতিধ্বনি “কোথা জনা?” বলি!১৩৫

ইতিশ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে জনাপত্রিকা নাম

একাদশঃ সর্গঃ।

চতুর্থ সর্গ

চতুর্থ সর্গ।

(দশরথের প্রতি কেকয়ী।)

[ কোন সময়ে রাজর্ষি দশরথ কেকয়ী দেবীর নিকট এই প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, যে তিনি তাঁহার গর্ভজাত-পুত্র ভরতকেই যুবরাজপদে অভিষিক্ত করিবেন। কালক্রমে রাজা স্বসত্য বিস্তৃত হইয়া কৌশল্যানন্দন রামচন্দ্রকে সে পদ-প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করাতে, কেকয়ী দেবী মন্থরা নাম্নী দাসীর মুখে এ সংবাদ পাইয়া, নিম্ন লিখিত পত্রিকাখানি রাজসমীপে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ]

এ কি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে,

রঘুরাজ? কিন্তু দাসী নীচকুলোদ্ভবা,

সত্য মিথ্যা জ্ঞান তার কভু না সম্ভবে!

কহ তুমি;—কেন আজি পুরবাসী যত

আনন্দ-সলিলে মগ্ন? ছড়াইছে কেহ৫

ফুলরাশি রাজপথে; কেহবা গাঁথিছে

মুকুল কুসুম ফল পল্লবের মালা

সাজাইতে গৃহদ্বার—মহোৎসবে যেন?

কেন বা উড়িছে ধ্বজ প্রতি গৃহচূড়ে?

কেন পদাতিক, হয়, গজ, রথ, রথী১০

বাহিরিছে রণবেশে? কেন বা বাজিছে

রণবাদ্য? কেন আজি পুরনারী-ব্রজ

মুহুর্মুহুঃ হুলাহুলি দিতেছে চৌদিকে?

কেন বা নাচিছে নট, গাইছে গায়কী?

কেন এত বীণা-ধ্বনি? কহ, দেব, শুনি,১৫

কৃপা করি কহ মোরে,—কোন্ ব্রতে ব্রতী

আজি রঘু-কুল-শ্রেষ্ঠ? কহ, হে নৃমণি,

কাহার কুশল-হেতু কৌশল্যা মহিষী

বিতরেন ধন-জাল? কেন দেবালয়ে

বাজিছে ঝাঁঝরি, শংখ, ঘণ্টা ঘটারোলে?২০

কেন রঘু-পুরোহিত রত স্বস্ত্যয়নে?

নিরস্ত্র জন-স্রোতঃ কেন বা বহিছে

এ নগর-অভিমুখে? রঘু-কুল-বধূ

বিবিধ ভূষণে আজি কি হেতু সাজিছে—

কোন্ রঙ্গে? অকালে কি আরম্ভিলা, প্রভু,২৫

যজ্ঞ? কি মঙ্গলোৎসব আজি তব পুরে?

কোন্ রিপু হত রণে, রঘু-কুল-রথি?

জন্মিল কি পুত্ত্র আর? কাহার বিবাহ

দিবে আজি? আইবড় আছে কি হে গৃহে

দুহিতা? কৌতুক বড় বাড়িতেছে মনে!৩০

কহ, শুনি, হে রাজন্; এ বয়েসে পুনঃ

পাইলা কি ভাগ্য-বলে—ভাগ্যবান্ তুমি

চিরকাল!—পাইলা কি পুনঃ এ বয়েসে—

রসময়ী নারী-ধনে, কহ, রাজ-ঋষি?

হা ধিক্! কি কবে দাসী—গুরু জন তুমি!৩৫

নতুবা কেকয়ী, দেব, মুক্তকণ্ঠে আজি

কহিত,—‘অসত্য-বাদী রঘু-কুল-পতি!

নির্লজ্জ! প্রতিজ্ঞা তিনি ভাঙ্গেন সহজে!

ধর্ম্ম-শব্দ মুখে,—গতি অধর্ম্মের পথে!’

অযথার্থ কথা যদি বাহিরায় মুখে৪০

কেকয়ীর, মাথা তার কাট তুমি আসি,

নররাজ; কিম্বা দিয়া চূণ কালি গালে

খেদাও গহন বনে! যথার্থ যদ্যপি

অপবাদ, তবে কহ, কেমনে ভঞ্জিবে

এ কলঙ্ক? লোক যাঝে কেমনে দেখাবে৪৫

ও মুখ, রাঘবপত্তি, দেখ ভাবি মনে।

না পড়ি ঢলিয়া আর নিতম্বের ভরে!

নহে গুরু উরু-দ্বয়, বর্ত্তুল কদলী-

সদৃশ! সে কটি, হায়, কর-পদ্মে ধরি

যাহায়, নিন্দিতে তুমি সিংহে প্রেমাদরে৫০

আর নহে সরু, দেব! নম্র-শিরঃ এবে

উচ্চ কুচ! সুধা-হীন অধর! লইল

লুটিয়া কুটিল কাল, যৌবন-ভাণ্ডারে

আছিল রতন যত, হরিল কাননে

নিদাঘ কুসুম-কান্তি, নীরসি কুসুমে!৫৫

কিন্তু পূর্ব্ব-কথা এবে স্মর, নরমণি!—

সেবিনু চরণ যবে তরুণ যৌবনে,

কি সত্য করিলা, প্রভু, ধর্ম্মে সাক্ষী করি,

মোর কাছে? কাম-মদে মাতি যদি তুমি

বৃথা আশা দিয়া মোরে ছলিলা, তা কহ;—৬০

নীরবে এ দুঃখ আমি সহিব তা হলে!

কামীর কুরীতি এই শুনেছি জগতে,

অবলার মনঃ চুরি করে সে সতত

কৌশলে, নির্ভয়ে ধর্ম্মে দিয়া জলাঞ্জলি;—

প্রবঞ্চনা-রূপ ভস্ম মাখে মধুরসে!৬৫

এ কুপথে পথী কি হে সূর্য্য-বংশ-পতি?

তুমিও কলঙ্ক-রেখা লেখ সুললাটে,

(শশাঙ্ক-সদৃশ) এবে, দেব দিনমণি!

ধর্ম্মশীল বলি, দেব, বাখানে তোমারে

দেব নর,—জিতেন্দ্রিয়, নিত্য সত্যপ্রিয়!৭০

তবে কেন, কহ মোরে, তবে কেন শুনি,

যুবরাজ-পদে আজি অভিষেক কর

কৌশল্যা-নন্দন রামে? কোথা পুত্র তব

ভরত,—ভারত-রত্ন, রঘু-চড়ামণি?

পড়ে কি হে মনে এবে পূর্ব্বকথা যত?৭৫

কি দোষে কেকয়ী দাসী দোষী তব পদে?

কোন্ অপরাধে পুত্র, কছ, অপরাধী?

তিন রাণী তব, রাজা! এ তিনের মাঝে,

কি ত্রুটি সেবিতে পদ করিল কেকরী

কোন্ কালে? পুত্র তব চারি, নরমণি!৮০

গুণশীলোত্তম রাম, কহ, কোন্ গুণে?

কি কুহকে, কহ শুনি, কৌশল্যা-মহিষী

ভুলাইলা মনঃ তব? কি বিশিষ্ট গুণ

দেখি রামচন্দ্রে, দেব, ধর্ম্ম নষ্ট কর

অভীষ্ট পূর্ণিতে তার, রঘুশ্রেষ্ঠ তুমি?৮৫

কিন্তু বাক্য ব্যয় আর কেন অকারণে?—

যাহা ইচ্ছা কর, দেব; কার সাধ্য রোধে

তোমায়, নরেন্দ্র তুমি? কে পারে ফিরাতে

প্রবাহে? বিতংসে কেবা বাঁধে কেশরীরে?

চলিল ত্যজিয়া আজি তব পাপ-পুরী৯০

ভিখারিণী-বেশে দাসী! দেশ দেশান্তরে

ফিরিব; যেখানে যাব, কহিব সেখানে

‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘু-কুল-পতি!’

গম্ভীরে অম্বরে যথা নাদে কাদম্বিনী,

এ মোর দুঃখের কথা কব সর্ব্ব জনে!৯৫

পথিকে, গৃহস্থে, রাজে, কাঙালে, তাপসে,—

যেখানে যাহারে পাব, কব তার কাছে—

‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘু-কুল-পতি!’

পুষি সারী শুক, দোঁহে শিখাব যতনে

এ মোর দুঃখের কথা, দিবস রজনী।১০০

শিখিলে এ কথা, তবে দিব দোঁহে ছাড়ি

অরণ্যে। গাইবে তারা বসি বৃক্ষ-শাখে,

‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘু-কুল-পতি!’

শিখি পক্ষীমুখে গীত গাবে প্রতিধ্বনি—

‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘু-কুল-পতি!’১০৫

লিখিব গাছের ছালে, নিবিড় কাননে,

‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘু-কুল-পতি!’

খোদিব এ কথা আমি তুঙ্গ শৃঙ্গদেহে!

রচি গাথা, শিখাইব পল্লী-বাল-দলে।

করতালি দিয়া তারা গাইবে নাচিয়া—১১০

‘পরম অধর্ম্মাচারী রঘুকুল-পতি!’

থাকে যদি ধর্ম্ম, তুমি অবশ্য ভুঞ্জিবে

এ কর্ম্মের প্রতিফল! দিয়া আশা মোরে,

নিরাশ করিলে আজি; দেখিব নয়নে

তব আশা-বৃক্ষে ফলে কি ফল, নৃমণি?১১৫

বাড়ালে যাহার মান, থাক তার সাথে

গৃহে তুমি! বামদেশে কৌশল্যা মহিষী,

(এত যে বয়েস, তবু লজ্জাহীন তুমি!)—

যুবরাজ পুত্র রাম; জনক-নন্দিনী

সীতা প্রিয়তমা বধূ;—এ সবারে লয়ে১২০

কর ঘর, নরবর, যাই চলি আমি!

পিতৃ-মাতৃ-হীন পুত্রে পালিবেন পিতা—

মাতামহালয়ে পাবে আশ্রয় বাছনি।

দিব্য দিয়া মানা তারে করিব খাইতে

তব অন্ন; প্রবেশিতে তব পাপ-পুরে।১২৫

চিরি বক্ষঃ মনোদুঃখে লিখিনু শোণিতে

লেখন। না থাকে যদি পাপ এ শরীরে;

পতি-পদ-গতা যদি পতিব্রতা দাসী;

বিচার করুন ধর্ম্ম ধর্ম্ম-রীতি-মতে!

ইতিশ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে কেকয়ীপত্রিকা নাম

চতুর্থ সর্গ।

তৃতীয় সর্গ

তৃতীয় সর্গ।

(দ্বারকানাথের প্রতি রুক্মিণী।)

[ বিদর্ভাধিপতি ভীষ্মক রাজপুত্ত্রী রুক্মিণী দেবীকে পৌরাণিক ইতিবৃত্তে স্বয়ং লক্ষ্মী-অবতার বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন। সুতরাং তিনি আজন্ম বিষ্ণুপরায়ণা ছিলেন। যৌবনাবস্থায় তাঁহার ভ্রাতা যুবরাজ রূপ চেদীশ্বর শিশুপালের সহিত তাঁহার পরিণয়ার্থে উদ্যোগী হইলে, রুক্মিণী দেবী নিম্ন লিখিত পত্রিকা খানি দ্বারকায় বিষ্ণু-অবতার দ্বারকানাথের সমীপে প্রেরণ করেন। রুক্মিণী-হরণ-বৃত্তান্ত এস্থলে ব‍্যক্ত করা বাহুল্য। ]

শুনি নিত্য ঋষিমুখে, হৃষীকেশ তুমি,

যাদবেন্দ্র, অবতীর্ণ অবনী-মণ্ডলে

খণ্ডিতে ধরার ভার দণ্ডি পাপী-জনে,

চাহে পদাশ্রয়, নমি ও রাজীবপদে,

রুক্মিণী,—ভীষ্মক পুত্রী, চিরদাসী তব;—৫

তার, হে তারক, তারে এ বিপত্তি-কালে!

কেমনে মনের কথা কহিব চরণে,

অবলা কুলের বালা আমি, যদুমণি?

কি সাহসে বাঁধি বুক, দিব জলাঞ্জলি

লজ্জাভয়ে? মুদে আঁখি, হে দেব, শরমে;১০

না পারে আঙুল-কুল ধরিতে লেখনী;

কাঁপে হিয়া থরথরে! না জানি কি করি;

না জানি কাহারে কহি এ দুঃখ-কাহিনী!

শুন তুমি, দয়াসিন্ধু! হায়, তোমা বিনা

নাহি গতি অভাগীর আর এ সংসারে!১৫

নিশার স্বপনে হেরি পুরুষ-রতনে,

কায় মনঃ অভাগিনী সঁপিয়াছে তাঁরে;

দেবে সাক্ষী করি করি দেবনরোত্তমে

বরভাবে! নারী দাসী, নারে উচ্চারিতে

নাম তাঁর, স্বামী তিনি; কিন্তু কহি, শুন,২০

পঞ্চ মূখে পঞ্চমুখ জপেন সতত

সে নাম,—জগত-কর্ণে সুধার লহরী!

কে যে তিনি? জন্ম তাঁর কোন্ মহাকুলে?

অবধান কর, প্রভু, কহিব সংক্ষেপে;

তুলিয়া কুসুম-রাশি, মালিনী যেমতি২৫

গাঁথে মালা, ঋষিমুখ-বাক্যচয় আজি

গাথিব গাথায়, নাথ, দেহ পদ-ছায়া।

গৃহিলা পুরুষোত্তম জন্ম কারাগারে।—

রাজদ্বেষে পিতা মাতা ছিলা বন্দীভাবে,

দীনবন্ধু, তেঁই জন্ম নাথের কুস্থলে!৩০

খনিগর্ভে ফলে মণি; মুক্তা শুক্তিধামে!

হাসিলা উল্লাসে পৃথ্বী সে শুভ নিশীধে

শত শরদের শশী-সদৃশী শোভিল

বিভা! গন্ধামোদে মাতি স্বনিলা সুস্বনে

সমীরণ; নদ নদী কলকলকলে৩৫

সিন্ধুপদে সুসংবাদ দিলা দ্রুতগতি;

কল্লোলিলা জলপতি গম্ভীর নিনাদে!

নাচিল অপ্সরা স্বর্গে; মর্ত্ত‍্যে নর নারী!

সঙ্গীত-তরঙ্গ রঙ্গে বহিল চৌদিকে!

বৃষ্টিলা কুসুম দেব; পাইল দরিদ্র৪০

রতন; জীবন পুনঃ জীবশূন্য জন!

পূরিল অখিল বিশ্ব জয় জয় রবে।

জন্মান্তে জনমদাতা, ঘোর নিশাযোগে,

গোপরাজ-গৃহে লয়ে রাখিলা নন্দনে

মহা যত্নে। মহারত্নে পাইলে যেমতি৪৫

আনন্দ-সলিলে ভাসে দরিদ্র, ভাসিল

গোকুলে গোপ-দম্পতী আনন্দ-সলিলে!

আদরে পালিলা বালে গোপ-কুল-রাণী

পুত্রভাবে। বাল্য কালে বাল্য-খেলা যত

খেলিলা রাখাল রাজ, কে পারে বর্ণিতে?৫০

কে কবে, কি ছলে শিশু নাশিলা মায়াবী

পূতনারে? কাল নাগ কালীয়, কি দেখি,

লইল আশ্রয় নমি পাদ-পদ্ম-তলে?

কে কবে, বাসব যবে রুষি, বরষিলা

জলাসার, কি কৌশলে গোবর্দ্ধনে তুলি,৫৫

রক্ষিলা গোকুল, দেব, প্রলয়-প্লাবনে?

আর আর কীর্ত্তি যত বিদিত জগতে?

যৌবনে করিলা কেলি গোপী-দলে লয়ে

রসরাজ; মজাইলা গোপ-বধূ-ব্রজ

বাজায়ে বাঁশরী, নাচি তমালের তলে!৬০

বিহারিলা গোষ্ঠে প্রভু; যমুনা-পুলিনে!

এই রূপে কত কাল কাটাইলা সুখে

গোপ-ধামে গুণনিধি; পরে বিনাশিয়া

পিতৃ-অরি অরিন্দম, দূর সিন্ধু-তীরে

স্থাপিলা সুন্দরী পুরী। আর কব কত?৬৫

দেখ চিন্তি, চিন্তামণি, চেন যদি তারে!

না পার চিনিতে যদি, দেহ আজ্ঞা তবে,

পীতাম্বর, দেখি যদি পারে হে বর্ণিতে

সে রূপ-মাধুরী দাসী। চিত্রপটে যেন,

চিত্রিত সে মূর্ত্তি চির, হায়, এ হৃদয়ে!৭০

নবীন-নীরদ-বর্ণ; শিখি-পুচ্ছ শিরে;

ত্রিভঙ্গ; সুগল-দেশে বর গুঞ্জমালা;

মধুর অধরে বাঁশী, বাস পীত ধড়া;

ধ্বজবজ্রাঙ্কুশ-চিহ্ন রাজীব-চরণে—

যোগীন্দ্র-মানস-পদ্ম! মোক্ষ-ধাম ভবে!৭৫

যত বার হেরি, দেব, আকাশ-মণ্ডলে,

ঘনবরে, শত্রু-ধনুঃ চূড়ারূপে শিরে;

তড়িৎ সুধড়া অঙ্গে;—পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া,

সাষ্টাঙ্গে প্রণমি, আমি পূজি ভক্তি-ভাবে!

ভ্রান্তিমদে মাতি কহি,—‘প্রাণকান্ত মম৮০

আসিছেন শূন্যপথে তুষিতে দাসীরে!’

উড়ে যদি চাতকিনী, গঞ্জি তারে রাগে!

নাচিলে ময়ূরী, তারে মারি, যদুমণি!

মন্ত্রে যদি ঘনবর, ভাবি, আঁখি মুদি,

গোপ-কুল-বালা আমি; বেণুর সুরবে৮৫

ডাকিছেন সখা মোরে যমুনা-পুলিনে!

কহি শিখীবরে,—‘ধন্য তুই পক্ষীকুলে,

শিখণ্ডি! শিখণ্ড তোর মণ্ডে শিরঃ যাঁর,

পূজেন চরণ তাঁর আপনি ধূর্জ্জটি!’—

আর পরিচয় কত দিব পদযুগে?৯০

শুন এবে দুঃখ-কথা। হৃদয়-মন্দিরে

স্থাপি সে সুশ্যাম মূর্ত্তি, সন্ন্যাসিনী যথা

পূজে নিত্য ইষ্টদেবে গহন বিপিনে,

পূজিতাম আমি নাথে। এবে ভাগ্য দোষে

চেদীশ্বর নরপাল শিশুপাল নামে,৯৫

(শুনি জনরব) নাকি আসিছেন হেধা

বরবেশে বরিবারে, হায়, অভাগীরে!

কি লজ্জা! ভাবিয়া দেখ, হে দ্বারকাপতি!

কেমনে অধর্ম্ম কর্ম্ম করিবে রুক্মিণী?

স্বেচ্ছায় দিয়াছে দাসী, হায়, একজনে১০০

কায় মনঃ; অন্য জনে—ক্ষম, গুণনিধি!—

উড়ে প্রাণ, পোড়া কথা পড়ে যবে মনে!

কি পাপে লিখিলা বিধি এ যাতনা ভালে

আইস গরুড়-ধ্বজে, পাঞ্চজন্য নাদি,

গদাধর! রূপ গুণ থাকিত যদ্যপি১০৫

এ দাসীর,—কহিতাম, ‘আইস, মুরারি,

আইস; বাহন তব বৈনতেয় যথা

হরিল অমৃতরস পশি চন্দ্রলোকে,

হর অভাগীরে তুমি প্রবেশি এ দেশে!’

কিন্তু নাহি রূপ গুণ; কোন্ মুখ দিয়া১১০

অমৃতের সহ দিব আপন তুলনা!

দীন আমি, দীনবন্ধু তুমি, যদুপতি;

দেহ লয়ে রুক্মিণীরে সে পুরুষোত্তমে,

যাঁর দাসী করি বিধি সৃজিলা তাহারে!

রুক্মনামে সহোদর,—দুরন্তু সে অতি;১১৫

বড় প্রিয়পাত্র তার চেদীশ্বর বলী;

শরমে মায়ের পদে নারি নিবেদিতে

এ পোড়া মনের কথা! চন্দ্রকলা সখী,

তার গলা ধরি, দেব, কাঁদি দিবা নিশি,—

নীরবে দুজনে কাঁদি সভয়ে বিরলে!১২০

লইনু শরণ আজি ও রাজীব-পদে;—

বিঘ্ন বিনাশন তুমি, ত্রাণ বিঘ্নে মোরে!

কি ছলে ভুলাই মনঃ; কেমনে যে ধরি

ধৈরয, শুনিবে যদি, কহিব, শ্রীপতি!

বহে প্রবাহিনী এক রাজ-বন-মাঝে;১২৫

‘যমুনা’ বলিয়া তারে সম্বোধি আদরে,

গুণনিধি! কূলে তার কত যে রোপেছি

তমাল, কদম্ব,—তুমি হাসিবে শুনিলে!

পুষিয়াছি সারী শুক, ময়ূর ময়ূরী

কুঞ্জবনে; অলিকুল গুঞ্জরে সতত;১৩০

কুহরে কোকিল ডালে; ফোটে ফুলরাজী।

কিন্তু শোভাহীন বন প্রভুর বিহনে!

কহ কুঞ্জবিহারীরে, হে দ্বারকাপতি,

আসিতে সে কুঞ্জবনে বেণু বাজাইয়া!

কিম্বা মোরে লয়ে, দেব, দেহ তাঁর পদে!১৩৫

আছে বহু গাভী গোষ্ঠে; নিজ কর দিয়া

সেবে দাসী তা সবারে। কহ হে রাখালে

আসিতে সে গোষ্ঠগৃহে, কহ, যদুমণি!

যতনে চিকণি নিত্য গাঁথি ফুলমালা;

যতনে কুড়ায়ে রাখি যদি পাই পড়ি১৪০

শিখীপুচ্ছ ভূমিতলে; কত যে কি করি,

হায়, পাগলিনী আমি! কি কাজ কহিয়া?

আসি উদ্ধারহ মোরে, ধনুর্দ্ধর তুমি,

মুরারি; নাশিলা কংসে, শুনিয়াছে দাসী,

কংসজিত; মধুনামে দৈত্য-কুল-রথী,১৪৫

বধিলা মধুসূদন, হেলায় তাহারে!

কে বর্ণিবে গুণ তব, গুণনিধি তুমি?

কালরূপে শিশুপাল আসিছে সত্বরে;

আইস তাহার অগ্রে। প্রবেশি এ দেশে,

হর মোরে! হরে লয়ে দেহ তাঁর পদে,১৫০

হরিলা এ মনঃ যিনি নিশার স্বপনে!

ইতি শ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে রুক্মিণীপত্রিকা নাম

তৃতীয় সর্গ।

দশম সর্গ

দশম সর্গ।

পুরুরবার প্রতি উর্ব্বশী।

[ চন্দ্রবংশীয় রাজা পুরুরবা কোন সময়ে কেশী নামক দৈত্যের হস্ত হইতে উর্ব্বশীকে উদ্ধার করেন। উর্ব্বশী রাজার রূপলাবণ্যে মোহিত হইয়া তাহাকে এই নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি লিখিয়াছিলেন। পাঠকবর্গ কবি কালিদাসকৃত বিক্রমোর্ব্বশী নামত্রোটক পাঠ করিলে, ইহার সবিশেষ বৃত্তান্ত জানিতে পারিবেন। ]

স্বর্গচ্যুত আজি, রাজা, তব হেতু আমি!—

গত রাত্রে অভিনিনু দেব-নাট্যশালে

লক্ষ্মীস্বয়ম্বর নাম নাটক; বারুণী

সাজিল মেনকা; আমি অম্ভোজা ইন্দিরা।

কহিলা বারুণী,—‘দেখ নিরখি চৌদিকে,৫

বিধুমুখি! দেবদল এই সভাতলে;

বসিয়া কেশব ওই! কহ মোরে, শুনি,

কার প্রতি ধায় মনঃ?’—গুরুশিক্ষা ভুলি,

আপন মনের কথা দিয়া উত্তরিনু—

‘রাজা পুরুরবা প্রতি!’— হাসিলা কৌতুকে১০

মহেন্দ্র ইন্দ্রাণী সহ, আর দেব যত;

চারি দিকে হাস্যধ্বনি উঠিল সভাতে!

সরোষে ভরতঋষি শাপ দিলা মোরে!

শুন, নরকুলনাথ! কহিনু যে কথা

মুক্তকণ্ঠে কালি আমি দেব সভাতলে,১৫

কহিব সে কথা আজি—কি কাজ শরমে? —

কহিব সে কথা আজি তব পদযুগে!

যথা বহে প্রবাহিনী বেগে সিন্ধুনীরে,

অবিরাম; যথা চাহে রবিচ্ছবি পানে

স্থির আঁখি সূর্য্যমুখী; ও চরণে রত২০

এ মনঃ!—উর্ব্বশী, প্রভু, দাসী হে তোমারি!

ঘৃণা যদি কর, দেব, কহ শীঘ্র, শুনি।

অমরা অপ্‌সরা আমি, নারিব ত্যজিতে

কলেবর; ঘোরবনে পশি আরম্ভিব

তপঃ তপস্বিনীবেশে, দিয়া জলাঞ্জলি২৫

সংসারের সুখে, শূর! যদি কৃপা কর,

তাও কহ; যাব উড়ি ও পদ আশ্রয়ে,

পিঞ্জর ভাঙিলে উড়ে বিহঙ্গিনী যথা

নিকুঞ্জে! কি ছার স্বর্গ তোমার বিহনে?

শুভক্ষণে কেশী, নাথ, হরিল আমারে৩০

হেমকুটে! এখনও বসিয়া বিরলে

ভাবি সে সকল কথা! ছিনু পড়ি রথে,

হায় রে, কুরঙ্গী যথা ক্ষত অস্ত্রাঘাতে!

সহসা কাঁপিল গিরি! শুনিনু চমকি

রথচক্রধ্বনি দূরে শতস্রোতঃ সম!৩৫

শুনিনু গম্ভীর নাদ—‘অরে রে দুর্ম্মতি,

মুহূর্ত্তে পাঠাব তোরে শমনভবনে,’—

প্রতিনাদরূপে কেশী নাদিল ভৈরবে!

হারাইনু জ্ঞান আমি সে ভীষণ স্বনে!

পাইনু চেতন যবে, দেখিনু সম্মুখে৪০

চিত্রলেখা সখী সহ ও রূপমাধুরী—

দেবী মানবীর বাঞ্ছা! উজ্জ্বল দেখিনু

দ্বিগুণ হে গুণমণি, তব সমাগমে

হেমকুট হৈমকান্তি—রবিকরে যেন!

রহিনু মুদিয়া আঁখি শরমে, নৃমণি৪৫

কিন্তু এ মনের আঁখি মীলিল হরষে,

দিনান্তে কমলাকান্তে হেরিলে যেমতি

কমল! ভাসিল হিয়া আনন্দ-সলিলে!

চিত্রলেখা পানে তুমি কহিলা চাহিয়া—

‘যথা নিশা, হে রূপসি, শশীর মিলনে৫০

তমোহীনা; রাত্রিকালে অগ্নিশিখা যথা

ছিন্নধূমপুঞ্জ কায়া; দেখ নিরখিয়া,

এ বরাঙ্গ বররুচি রিচ‍্যমান এবে

মোহান্তে! ভাঙিলে পাড়, মলিনসলিলা

হয়ে ক্ষণ, এইরূপে বহেন জাহ্নবী৫৫

আবার প্রসাদে, শুভে!’—আর যা কহিলে,

এখনো পড়িলে মনে বাখানি, নৃমণি,

রসিকতা! নরকুল ধন্য তব গুণে!

এ পোড়া হৃদয় কম্পে কম্পবান দেখি

মন্দারের দাম বক্ষে, মধুচ্ছন্দে তুমি৬০

পড়িলা যে শ্লোক, কবি, পড়ে কি হে মনে?

ম্রিয়মাণ জন যথা শুনে ভক্তিভাবে

জীবনদায়ক যন্ত্র, শুনিল উর্ব্বশী,

হে সুধাংশু-বংশ-চূড়, তোমার সে গাথা!

সুরবালা মনঃ তুমি ভুলালে সহজে,৬৫

নররাজ! কেনই বা না ভুলাবে, কহ? —

সুরপুর-চির-অরি অধীর বিক্রমে

তোমার, বিক্রমাদিত্য! বিধাতার বরে,

বজ্রীর অধিক বীর্য্য তব রণস্থলে!

মলিন মনোজ লাজে ও সৌন্দর্য্য হেরি!৭০

তব রূপগুণে তবে কেন না মজিবে

সুরবালা? শুন, রাজা! তব রাজবনে

স্বয়ম্বরবধূ-লতা ধরে সাধে যথা

রসালে, রসালে বরে তেমতি নন্দনে

স্বয়ম্বরবধূ-লতা! রূপগুণাধীনা৭৫

নারীকুল, নরশ্রেষ্ঠ, কি তবে কি দিবে—

বিধির বিধান এই, কহিনু তোমরে!

কঠোর তপস্যা নর করি যদি লভে

স্বর্গভোগ; সর্ব্ব অগ্রে বাঞ্ছে সে ভুঞ্জিতে

যে স্থির-যৌবন-সুধা—অর্পিব তা পদে!৮০

বিকাইব কায়মনঃ উভয়, নৃমণি,

আসি তুমি কেন দোঁহে প্রেমের বাজারে!

উর্ব্বীধামে উর্ব্বশীরে দেহ স্থান এবে,

উর্ব্বীশ! রাজস্ব দাসী দিবে রাজপদে

প্রজাভাবে নিত্য যত্নে। কি আর লিখিব?৮৫

বিষের ঔষধ বিষ,—শুনি লোকমুখে।

মরিতেছিনু, নৃমণি, জ্বলি কামবিষে,

তেঁই শাপবিষ বুঝি দিয়াছেন ঋষি,

কৃপা করি! বিজ্ঞ তুমি, দেখ হে ভাবিয়া!

দেহ আজ্ঞা, নরেশ্বর, সুরপুর ছাড়ি৯০

পড়ি ও রাজীব-পদে পড়ে বারিধারা

যথা, ছাড়ি মেঘাশ্রয়, সাগর আশ্রয়ে,—

নীলাম্বুরাশির সহ মিশিতে আমোদে!

লিখিনু এ লিপি বসি মন্দাকিনী তীরে

নন্দনে। ভূমিষ্ঠভাবে পূজিয়াছি, প্রভু,৯৫

কল্পতরুবরে, কয়ে মনের বাসনা।

সুপ্রফুল্ল ফুল দেখ পড়িয়াছে শিরে!

বীচিরবে হরপ্রিয়া শ্রবণ কুহরে

আমার কহেন—‘তুই হবি ফলবতী।’

এ সাহসে, মহেষ্বাস, পাঠাই সকাশে১০০

পত্রিকা-বাহিকা সখী চারু-চিত্রলেখা।

থাকিব নিরখি পথ, স্থির-আঁখি হয়ে

উত্তরার্থে, পৃথ্বীনাথ!—নিবেদনমিতি!

ইতি শ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে উর্ব্বশীপত্রিকা নাম

দশমঃ সর্গঃ।

দ্বিতীয় সর্গ

দ্বিতীয় সর্গ।

(সোমের প্রতি তারা।)

[ যৎকালে সোমদেব—অর্থাৎ চন্দ্র—বিদ্যাধ্যয়ন করণাভিলাসে দেবগুরু বৃহষ্পতির আশ্রমে বাস করেন, গুরুপত্নী তারাদেবী তাঁহার অসামান্য সৌন্দর্য্য সন্দর্শনে বিমোহিত হইয়া, তাঁহার প্রতি প্রেমাসক্তা হন। সোমদেব, পাঠ সমাপনান্তে গুরুদক্ষিণা দিয়া বিদায় হইবার বাসনা প্রকাশ করিলে, তারাদেবী আপন মনের ভাব জার প্রচ্ছন্নভাবে রাখিতে পারিলেন না; ও সতীত্বধর্ম্মে জলাঞ্জলি দিয়া সোমদেবকে এই নিম্নলিখিত পত্রখানি লিখেন। সোমদেব যে এতাদৃশী পত্রিকাপাঠে কি করিয়া ছিলেন, এস্থলে তাহার পরিচয় দিবার কোন প্রয়োজন নাই। পুরাণজ্ঞ ব্যক্তিমাত্রেই তাহা অবগত আছেন। ]

কি বলিয়া সম্বোধিবে, হে সুধাংশু নিধি,

তোমারে অভাগী তারা? গুরুপত্নী আমি

তোমার, পুরুষরত্ন; কিন্তু ভাগ্যদোষে,

ইচ্ছা করে দাসী হয়ে সেবি পা দুখানি!—

কি লজ্জা! কেমনে তুই, রে পোড়া লেখনি,৫

লিখিলি এ পাপ কথা,—হায় রে, কেমনে?

কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোরে! হস্তদাসী সদা

তুই; মনোদাস হস্ত; সে মনঃ পুড়িলে

কেন না পুড়িবি তুই? বজ্রাগ্নি যদ্যপি

দহে তরুশিরঃ, মরে পদাশ্রিত লতা!১০

হে স্মৃতি, কুকর্ম্মে রত দুর্গতি যেমতি

নিবায় প্রদীপ, আজি চাহে নিবাইতে

তোমায় পাপিনী তারা! দেহ ভিক্ষা, ভুলি

কে সে মনঃ-চোর মোর, হায়, কেবা আমি!—

ভূমি ভূতপূর্ব্ব কথা,—ভুলি ভবিষ্যতে!১৫

এস তবে, প্রাণসখে; দিনু জলাঞ্জলি

কুলমানে তব জন্যে,—ধর্ম্ম, লজ্জা, ভয়ে!

কুলের পিঞ্জর ভাঙ্গি, কুল-বিহঙ্গিনী

উড়িল পবন-পথে, ধর আসি তারে,

তারানাথ!—তারানাথ? কে তোমারে দিল২০

এ নাম, হে গুণনিধি, কহ তা তারারে!

এ পোড়া মনের কথা জানিল কি ছলে

নামদাতা? ভেবেছিনু, নিশাকালে যথা

মুদিত-কমল-দলে থাকে গুপ্তভাবে

সৌরভ, এ প্রেম, বঁধু, আছিল হৃদয়ে২৫

অন্তরিত; কিন্তু—ধিক্, বৃথা চিন্তা, তোরে!

কে পারে লুকাতে কবে জ্বলন্ত পাবকে?

এস তবে, প্রাণসখে! তারানাথ তুমি;

জুড়াও তারার জ্বালা! নিজ রাজ্য ত্যজি,

ভ্রমে কি বিদেশে রাজা, রাজকাজ ভুলি?৩০

সদর্পে কন্দর্প নামে মীনধ্বজ রথী,

পঞ্চ খর শর তৃণে, পুষ্পধনুঃ হাতে,

আক্রমিছে পরাক্রমি অসহায় পুরী;—

কে তারে রক্ষিবে, সখে, তুমি না রক্ষিলে?

যে দিন,—কুদিন তারা বলিবে কেমনে৩৫

সে দিনে, হে গুণমণি, যে দিন হেরিল

আঁখি তার চন্দ্রমুখ,—অতুল জগতে!—

যে দিন প্রথমে তুমি এ শান্ত আশ্রমে

প্রবেশিলা, নিশাকান্ত, সহসা ফুটিল

নবকুমুদিনীসম এ পরাণ মম৪০

উল্লাসে,—ভাসিল যেন আনন্দ-সলিলে!

এ পোড়া বদন মুহুঃ হেরিনু দর্পণে;

বিনাইনু যত্নে বেণী; তুলি ফুলরাজী,

(বন-রত্ন) রত্নরূপে পরিনু কুন্তলে!

চির পরিধান মম বাকল; ঘৃণিনু৪৫

তাহায়! চাহিনু, কাঁদি বন-দেবী-পদে,

দুকূল, কাঁচলি, সিঁতি, কঙ্কণ, কিঙ্কিণী,

কুণ্ডল, মুকুতাহার, কাঞ্চী কটিদেশে!

ফেলিনু চন্দন দূরে, স্মরি মৃগমদে!

হায় রে, অবোধ আমি! নারিনু বুঝিতে৫০

সহসা এ সাধ কেন জনমিল মনে?

কিন্তু বুঝি এবে, বিধু! পাইলে মধুরে,

সোহাগে বিবিধ সাজে সাজে বনরাজী!—

তারার যৌবন-বন-ঋতুরাজ তুমি!

বিদ্যালাভ-হেতু যবে বসিতে, সুমতি,৫৫

গুরুপদে; গৃহকর্ম্ম ভুলি পাপীয়সী

আমি, অন্তরালে বসি শুনিতাম সুখে

ও মধুর স্বর, সখে, চির-মধু-মাখা!

কি ছার নিগম, তন্ত্র, পুরাণের কথা?

কি ছার মুরজ, বীণা, মুরলী, তুম্বকী?৬০

বর্ষ বাক্যসুধা তুমি! নাচিবে পুলকে

তারা, মেঘনাদে মাতি ময়ূরী যেমতি!

গুরুর আদেশে যবে গাভীবৃন্দ লয়ে,

দূর বনে, সুরমণি, ভ্রমিতে একাকী

বহু দিন; অহরহঃ, বিরহ-দহনে,৬৫

কত যে কাঁদিত তারা, কর তা কাহারে—

অবিরল অশ্রুজল মুছি লজ্জাভয়ে!

গুরুপত্নী বলি যবে প্রণমিতে পদে,

সুধানিধি, মুদি আঁখি, ভাবিতাম মনে,

মানিনী যুবতী আমি, তুমি প্রাণপতি,৭০

যান-ভঙ্গ-আশে নভ দাসীর চরণে!

আশীর্ব্বাদ-ছলে মনে নমিতাম আমি!

গুরুর প্রসাদ-অন্নে সদা ছিলা রত,

তারাকান্ত; ভোজনান্তে আঁচমন-হেতু

যোগাইতে জল যবে গুরুর আদেশে৭৫

বহির্দ্বারে, কত যে কি রাখিতাম পাতে

চুরি করি আনি আমি, পড়ে কি হে মনে?

হরীতকী-স্থলে, সখে, পাইতে কি কভু

তাম্বূল শয়নধানে? কুশাসন-তলে,

হে বিধু, সুরভি ফুল কভু কি দেখিতে?৮০

হায় রে, কাঁদিত প্রাণ হেরি তৃণাসনে;

কোমল কমল-নিন্দা ও বরাঙ্গ তব,

তেঁই, ইন্দু, ফুলশয্যা পাতিত দুঃখিনী!

কত যে উঠিত বাধ, পাড়িতাম যবে

শয়ন, এ পোড়া মনে, পার কি বুঝিতে?৮৫

পূজাহেতু ফুলজাল তুলিবারে যবে

প্রবেশিতে ফুলবনে, পাইতে চৌদিকে

তোলা ফুল। হাসি তুমি কহিতে, সুমতি,

“দয়াময়ী বনদেবী ফুল অবচয়ি,

রেখেছেন নিবারিতে পরিশ্রম মম!"৯০

কিন্তু সত্য কথা এবে কহি, গুণনিধি;—

নিশীথে ত্যজিয়া শয্যা পশিত কাননে

এ কিঙ্করী; ফুলরাশি তুলি চারি দিকে

রাখিত তোমার জন্যে! নীর-বিন্দু যত

দেখিতে কুসুমদলে, হে সুধাংশু-নিধি,৯৫

অভাগীর অশ্রুবিন্দু—কহিনু তোমারে!

কত যে কহিত তারা—হায়, পাগলিনী!—

প্রতিফুলে, কেমনে তা আনিব এ মুখে?

কহিত সে চম্পকেরে,—“বর্ণ তোর হেরি,

রে ফুল, সাদরে তোরে তুলিবেন যবে১০০

ও কর-কমলে, সখা, কহিস তাঁহারে,—

‘এ বর বরণ মম কালি অভিমানে

হেরি যে বর বরণ, হে রোহিণীপতি,

কালি সে বর বরণ তোমার বিহনে!”

কহিত সে কদম্বেরে,—না পারি কহিতে১০৫

কি যে সে কহিত তারে, হে সোম, শরমে!—

রসের সাগর তুমি, ভাবি দেখ মনে!

শুনি লোকমুখে, সখে, চন্দ্রলোকে তুমি

ধর মৃগশিশু কোলে, কত মৃগশিশু

ধরেছি যে কোলে আমি কাঁদিয়া বিরলে,১১০

কি আর কহিব তার? শুনিলে হাসিবে,

হে সুহাসি! নাহি জ্ঞান; না জানি কি লিখি!

ফাটিত এ পোড়া প্রাণ হেরি তারাদলে!

ডাকিতাম মেঘদলে চির আবরিতে

রোহিণীর স্বর্ণকান্তি। ভ্রান্তি মদে মাতি,১১৫

সপত্নী বলিয়া তারে গঞ্জিতাম রোষে!

প্রফুল্ল কুমুদে হ্রদে হেরি নিশাযোগে

তুলি ছিঁড়িতাম রাগে:—আঁধার কুটীরে

পশিতাম বেগে হেরি সরসীর পাশে

তোমায়! ভূতলে পড়ি, তিতি অশ্রুজলে,১২০

কহিতাম অভিমানে,—‘রে দারুণ বিধি

নাহি কি যৌবন মোর,—রূপের মাধুরী?

তবে কেন,——’ কিন্তু বৃথা স্মরি পূর্ব্বকথা!

নিবেদিব, দেবশ্রেষ্ঠ, দিন দেহ যবে!

তুষেছ গুরুর মনঃ সুদক্ষিণা-দানে;১২৫

গুরুপত্নী চাহে ভিক্ষা,—দেহ ভিক্ষা তারে!

দেহ ভিক্ষা—ছায়ারূপে থাকি তব সাথে

দিবা নিশি! দিবা নিশি সেবি দাসীভাবে

ও পদযুগল, নাথ,—হা ধিক্, কি পাপে,

হায় রে, কি পাপে, বিধি, এ তাপ লিখিলি১৩০

এ ভালে? জনম মম মহা ঋষিকুলে,

তবু চণ্ডালিনী আমি? ফলিল কি এবে

পরিমলাকর ফুলে, হায়, হলাহল?

কোকিলের নীড়ে কি রে রাখিলি গোপনে

কাকশিশু? কর্ম্মনাশা—পাপ-প্রবাহিনী!—১৩৫

কেমনে পড়িল বহি জাহ্নবীর জলে?

ক্ষম, সখে!—পোষা পাখী, পিঞ্জর খুলিলে,

চাহে পুনঃ পশিবারে পূর্ব্ব কারাগারে!

এস তুমি; এস শীঘ্র! যাব কুঞ্জ-বনে,

তুমি, হে বিহঙ্গরাজ, তুমি সঙ্গে নিলে!

দেহ পদাশ্রয় আসি,—প্রেম-উদাসিনী

আমি! যথা যাও যাব, করিব যা কর,—

বিকাইব কায় মনঃ তব রাঙা পায়ে!

কলঙ্কী শশাঙ্ক, তোমা বলে সর্ব্ব জনে।

কর আসি কলঙ্কিনী কিঙ্করী তারারে,১৪৫

তারানাথ! নাহি কাজ বৃথা কুলমানে।

এস, হে তারার বাঞ্ছা! পোড়ে বিরহিণী,

পোড়ে যথা বনস্থলী ঘোর দাবানলে!

চকোরী সেবিলে তোমা দেহ সুধা তারে,

সুধাময়; কোন্ দোষে দোষী তব পদে১৫০

অভাগিনী? কুমুদিনী কোন্ তপোবলে

পায় তোমা নিত্য, কহ? আরম্ভি সত্ত্বরে

সে তপঃ, আহার নিদ্রা ত্যজি একাসনে!

কিন্তু যদি থাকে দয়া, এস শীজ করি!

এ নব যৌবন, বিধু, অর্পিব গোপনে১৫৫

তোমায়, গোপনে যথা অর্পেন আনিয়া

সিন্ধুপদে মন্দাকিনী স্বর্ণ, হীরা, মণি!

আর কি লিখিবে দাসী? সুপণ্ডিত তুমি,

ক্ষম ভ্রম; ক্ষম দোষ! কেমনে পড়িব

কি কহিল পোড়া মনঃ, হায়, কি লিখিল১৬০

লেখনী? আইস, নাথ, এ মিনতি পদে!

লিখিনু লেখন বসি একাকিনী বনে,

কাঁপি ভয়ে—কাঁদি খেদে—মরিয়া শরনে!

লয়ে ফুলবৃন্ত, কান্ত, নয়ন-কাজলে

লিখিনু! ক্ষমিও দোষ, দয়াসিন্ধু তুমি!১৬৫

আইলে দাসীর পাশে, বুঝিব ক্ষমিলে

দোষ তার, তারানাথ! কি আর কহিব?

জীবন মরণ মম আজি তব হাতে!

ইতি শ্রী বীরাঙ্গনা কাব্যে তারাপত্রিকা নাম

দ্বিতীয় সর্গ।

নবম সর্গ

নবম সর্গ।

শান্তনুর প্রতি জাহ্ণবী।

[ জাহ্ণবীদেবীর বিরহে রাজা শান্তনু একান্ত কাতর হইয়া রাজ্যাদি পরিত্যাগ পূর্ব্বক বহু দিবস গঙ্গাতীরে উদাসীনভাবে কালাতিপাত করেন। অষ্টম বসু অবতার দেবব্রত (যিনি মহাভারতীয় ইতিবৃত্তে ভীষ্ম পিতামহ নামে প্রথিত) বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে, জাহ্ণবীদেবী নিম্ন-লিখিত পত্রিকা খানির সহিত পুত্রবরকে রাজসন্নিধানে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ]

বৃথা তুমি, নরপতি, ভ্রম মম তীরে,—

বৃথা অশ্রুজল তব, অনর্গল বহি,

মম জলদল সহ মিশে দিবানিশি!

ভুল ভূতপূর্ব্বকথা, ভুলে লোক যথা

স্বপ্ন—নিদ্রা-অবসানে! এ চিরবিচ্ছেদে৫

এই হে ঔষধ মাত্র, কহিনু তোমারে!

হর-শির-নিবাসিনী হরপ্রিয়া আমি

জাহ্নবী। তবে যে কেন নরনারীরূপে

কাটাইনু এত কাল তোমার আলয়ে,

কহি, শুন। ঋষিশ্রেষ্ঠ বশিষ্ঠ সরোষে১০

ভূতলে জন্মিতে শাপ দিলা বসুদলে

যে দিন, পড়িল তারা কাঁদি মোর পদে,

করিয়া মিনতি স্তুতি নিষ্কৃতির আশে।

দিনু বর—‘মানবিনী ভাবে ভবতলে

ধরিব এ গর্ভে আমি তোমা সবাকারে।’১৫

বরিনু তোমারে সাধে, নরবর তুমি,

কৌরব! ঔরসে তব ধরিনু উদরে

অষ্টশিশু,—অষ্টবসু তারা, নরমণি!

ফুটিল এক মৃণালে অষ্ট সরোরুহ!

কত যে পুণ্য হে তব, দেখ ভাবি মনে!২০

সপ্তজন ত‍্যজি দেহ গেছে স্বর্গধামে।

অষ্টম নন্দনে আজি পাঠাই নিকটে;

দেবনররূপী রত্নে গ্রহ যত্নে তুমি,

রাজন্! জাহ্নবীপুত্ত্র দেবব্রত বলী

উজ্জ্বলিবে বংশ তব, চন্দ্রবংশপতি;—২৫

শোভিবে ভারত-ভালে শিরোমণিরূপে,

যথা আদিপিতা তব চন্দ্রচূড়-চুড়ে!

পালিয়াছি পুত্ত্রবরে আদরে, নৃমণি,

তব হেতু। নিরখিয়া চন্দ্রমুখ, ভুল

এ বিচ্ছেদ-দুঃখ তুমি। অখিল জগতে,৩০

নাহি হেন গুণী আর, কহিনু তোমারে!

মহাচল-কুল-পতি হিমাচল যথা;

নদপতি সিন্ধুনদ; বন-কুলপতি

খাণ্ডব; রথীন্দ্রপতি দেবব্রত রথী—

বশিষ্ঠের শিষ্যশ্রেষ্ঠ! আর কব কত?৩৫

আপনি বাগ্‌দেবী, দেব, রসনা-আসনে

আসীনা; হৃদয়ে দয়া, কমলে কমলা;

যমসম বল ভুজে! গহন বিপিনে

যথা সর্ব্বভুক বহ্নি, দুর্ব্বার সমরে!

তর পুণ্যবৃক্ষ ফল এই, নরপতি!৪০

স্নেহের সরসে পদ্ম! আশার আকাশে

পূর্ণশশী! যত দিন ছিনু তব গৃহে,

পাইনু পরম প্রীতি! কৃতজ্ঞতাপাশে

বেঁধেছ আমারে তুমি; অভিজ্ঞানরূপে

দিতেছি এ রত্ন আমি, গ্রহ, শান্তমতি।৪৫

পত্নীভাবে আর তুমি ভেবোনা আমারে!

অসীম মহিমা তব; কুল মান ধনে

নরকুলেশ্বর তুমি এ বিশ্বমণ্ডলে!

তরুণ যৌবন তব;—যাও ফিরি দেশে;—

কাতরা বিরহে তব হস্তিনা নগরী!৫০

যাও ফিরি, নরবর, আন গৃহে বরি

বরাঙ্গী রাজন্দ্রবালে; কর রাজ্য সুখে!

পাল প্রজা; দম রিপু; দণ্ড পাপাচারে—

এই হে সুরাজনীতি;—বাড়াও সতত

সতের আদর সাধি সৎক্রিয়া যতনে!৫৫

বরিও এ পুত্ত্রবরে যুবরাজ পদে

কালে। মহাযশা পুত্ত্র হবে তব সম

যশস্বি; প্রদীপ যথা জ্বলে সমতেজে

সে প্রদীপ সহ, যার তেজে সে তেজস্বী!

কি কাজ অধিক কয়ে? পূর্ব্বকথা ভুলি,৬০

করি ধৌত ভক্তিরসে কামগত মনঃ,

প্রণম সাষ্টাঙ্গে, রাজা! শৈলেন্দ্রনন্দিনী

রুদ্রেন্দ্রগৃহিণী গঙ্গা আশীষে তোমারে

যত দিন ভবধামে রহে এ প্রবাহ,

ঘোষিবে তোমার যশ, গুণ, ভবধামে!৬৫

কহিবে ভারভজন,—ধন্য ক্ষত্রফুলে

শান্তনু, তনয় যাঁর দেবব্রত রথী!

লয়ে সঙ্গে পুত্রধনে যাও রঙ্গে চলি

হস্তিনায়, হস্তিগতি! অন্তরীক্ষে থাকি

তব পুরে, তব সুখে হইব হে সুখী,৭০

তনয়ের বিধুমুখ হেরি দিবানিশি!

ইতি শ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে জাহ্নবীপত্রিকা নাম

নামঃ সর্গঃ।

পঞ্চম সর্গ

পঞ্চম সর্গ।

(লক্ষ্মণের প্রতি সূর্পনখা।)

[ যৎকালে রামচন্দ্র পঞ্চবটী-বনে বাস করেন, লঙ্কাধিপতি রাবণের ভগিনী সূর্পনখা রামানুজের মোহন-রূপে মুগ্ধা হইয়া, তাঁহাকে এই নিম্ন লিখিত পত্রিকাখানি লিখিয়াছিলেন। কবিগুরু বাল্মীকি রাজেন্দ্র রাবণের পরিবারবর্গকে প্রায়ই বীভৎস রস দিয়া বর্ণন করিয়া গিয়াছেন; কিন্তু এ স্থলে সে রসের লেশ মাত্রও নাই। অতএব পাঠকবর্গ সেই বাল্মীকিবর্ণিত বিকটা সূর্পনখাকে স্মরণ পথ হইতে দূরীকৃতা করিবেন। ]

কে তুমি,—বিজনবনে ভ্রম হে একাকী,

বিভূতি ভূষিত অঙ্গ? কি কৌতুকে, কহ,

বৈশ্বানর, লুকাইছ ভস্মের মাঝারে?

মেঘের আড়ালে যেন পূর্ণ শশী আজি?

ফাটে বুক জটাজুট হেরি তব শীরে,৫

মঞ্জুকেশি! স্বর্ণ শয্যা ত্যজি জাগি আমি

বিরাগে, যখন ভারি, নিত্য নিশাযোগে

শয়ন, বরাঙ্গ তব, হায় রে, ভুতলে!

উপাদেয় রাজ-ভোগ যোগাইলে দাসী,

কাঁদি ফিরাইয়া মুখ, পড়ে যবে মনে১০

তোমার আহার নিত্য ফল মূল, বলি!

সুবর্ণ মন্দিরে পশি নিরানন্দ গতি,

কেন না—নিবাস তব বঞ্জুল মঞ্জুলে!

হে সুন্দর, শীঘ্র আসি কহ মোরে শুনি,—

কোন্ দুঃখে ভব-সুখে বিমুখ হইলা১৫

এ নব যৌবনে তুমি? কোন্ অভিমানে

রাজবেশ ত্যজিলা হে উদাসীর বেশে?

হেমাঙ্গ মৈনাক-সম, হে তেজস্বি, কহ,

কার ভয়ে ভ্রম তুমি এ বন-সাগরে

একাকী, আবরি তেজঃ, ক্ষীণ, ক্ষুণ্ণ খেদে?২০

তোমার মনের কথা কহ আসি মোরে।—

যদি পরাভূত তুমি রিপুর বিক্রমে,

কহ শীঘ্র; দিব সেনা ভব-বিজয়িনী,

রথ, গজ, অশ্ব, রথী—অতুল জগতে!

বৈজয়ন্ত-ধামে নিত্য শচীকান্ত বলী২৫

ত্রস্ত অস্ত্র-ভয়ে যায়, হেন ভীম রথী

যুঝিবে তোমার হেতু—আমি আদেশিলে!

চন্দ্রলোকে, সূর্য্যলোকে,—যে লোকে ত্রিলোকে

লুকাইবে অরি তব, বাঁধি আনি তারে

দিব তব পদে, শূর! চামুণ্ডা আপনি,৩০

(ইচ্ছা যদি কর তুমি) দাসীর সাধনে,

(কুলদেবী তিনি, দেব,) ভীমখণ্ডা হাতে,

ধাইবেন হুহুঙ্কারে নাচিতে সংগ্রামে—

দেব-দৈত্য-নর ত্রাস!—যদি অর্থ চাহ,

কহ শীঘ্র;—অলকার ভাণ্ডার খুলিব৩৫

তুষিতে তোমার মনঃ; নতুবা কুহকে

শুষি রত্নাকরে, দুটি দিব রত্ন-জালে!

মণিযোনি খনি যত, দিব হে তোমারে।

প্রেম-উদাসীন যদি তুমি, গুণমণি,

কহ, কোন্ যুবতীর—(আহা, ভাগ্যবতী৪০

বামাকুলে সে রমণী!)—কহ শীঘ্র করি,—

কোন্ যুবতীর নব যৌবনের মধু

বাঞ্ছা তব? অনিমিষে রূপ তার ধরি,

(কামরূপা আমি, নাথ,) সেবিব তোমারে!

আমি পারিজাত ফুল, নিত্য সাজাইব৪৫

শয্যা তব! সঙ্গে মোর সহস্র সঙ্গিনী,

নৃত্য গীত রঙ্গে রত। অপ্‌সরা, কিন্নরী,

বিদ্যাধরী,— ইন্দ্রাণীর কিঙ্করী যেমতি,

তেমতি আমারে সেবে দশ শত দাসী।

সুবর্ণ নির্ম্মিত গৃহে আমার বসতি—৫০

মুক্তাময় মাঝ তার; সোপান খচিত

মরকতে; স্তম্ভে হীরা; পদ্মরাগ মণি;

গবাক্ষে দ্বিরদ-রদ, রতন কপাটে!

সুকল স্বরলহরী উথলে চৌদিকে

দিবানিশি; গায় পাখী সুমধুর স্বরে;৫৫

সুমধুরতর স্বরে গায় বীণাবাণী

বামাকুল! শত শত কুসুম কাননে

লুটি পরিমল, বায়ু অনুক্ষণ বহে!

খেলে উৎস; চলে জল কলকল কলে!

কিন্তু বৃথা এ বর্ণনা। এস, গুণনিধি,৬০

দেখ আসি,—এ মিনতি দাসীর ও পদে!

কায়, মনঃ, প্রাণ আমি সঁপিব তোমারে!

ভুঞ্জ আসি রাজ-ভোগ দাসীর আলয়ে;

নহে কহ, প্রাণেশ্বর! অম্লান বদনে,

এ বেশ ভূষণ ত্যজি, উদাসীনী-বেশে৬৫

সাজি, পূজি, উদাসীন, পাদ-পদ্ম তব!

রতন কাঁচলী খুলি, ফেলি তারে দূরে,

আবরি বাকলে স্তন; ঘুচাইয়া বেণী,

মণ্ডি জটাজুটে শিরঃ; ভুলি রত্নরাজী,

বিপিন-জনিত ফুলে বাঁধি হে কবরী!৭০

মুছিয়া চন্দন, লেপি ভস্ম কলেবরে।

পরি রুদ্রাক্ষের মালা, যুক্তামালা ছিঁড়ি,

গলদেশে! প্রেম-মন্ত্র দিও কর্ণ-মূলে;

গুরুর দক্ষিণা-রূপে প্রেম-গুরু-পদে

দিব এ যৌবন-ধন প্রেম-কুতূহলে!৭৫

প্রেমাধীনা নারীকুল ডরে কি হে দিতে

জলাঞ্জলি, মঞ্জুকেশি, কুল, মান, ধনে

প্রেমলাভ-লোভে কভু?—বিরলে লিখিয়া

লেখন, রাখিনু; সখে, এই তরুতলে।

নিত্য তোমা হেরি হেথা; নিত্য ভ্রম তুমি৮০

এই স্থলে। দেখ চেয়ে; ওই যে শোভিছে

শমী,—লতাবৃতা, মরি, ঘোমটায় যেন,

লজ্জাবতী!—দাঁড়াইয়া উহার আড়ালে,

গতিহীনা লজ্জাভয়ে, কত যে চেয়েছি

তব পানে, নরবর—হায়! সূর্য্যমুখী৮৫

চাহে যথা স্থির-আঁখি সে সূর্য্যের পানে!—

কি আর কহিব তার? যত ক্ষণ তুমি

থাকিতে বসিয়া, নাথ; থাকিত দাঁড়ায়ে

প্রেমের নিগড়ে বদ্ধা এ তোমার দাসী!

গেলে তুমি শূন্যাসনে বসিতাম কাঁদি!৯০

হায় রে, লইয়া ধূলা, সে স্থল হইতে

যথায় রাখিতে পদ, মাখিতাম ভালে,

হব্য-ভস্ম তপস্বিনী মাখে ভালে যথা!

কিন্তু বৃথা কহি কথা! পড়িও, নৃমণি,

পড়িও এ লিপিখানি, এ মিনতি পদে!৯৫

যদিও হৃদয়ে দয়া উদয়ে, যাইও

গোদাবরী-পূর্ব্বকূলে; বসিব সেখানে

মুদিত কুমুদীরূপে আজি সায়ংকালে,

তুষিও দাসীরে আসি শশধর-বেশে!

লয়ে তরি সহচরী থাকিবেক তীরে;১০০

সহজে হইবে পার। নিবিড় সে পারে

কানন, বিজনদেশ। এস, গুণনিধি;

দেখিব প্রেমের স্বপ্ন জাগি হে দুজনে!

যদি আজ্ঞা দেহ, এবে পরিচয় দিব

সংক্ষেপে। বিখ্যাত, নাথ, লঙ্কা, রক্ষঃপুরী১০৫

স্বর্ণময়ী, রাজা তথ্য রাজ-কুল-পতি

রাবণ, ভগিনী তাঁর দাসী, লোকমুখে

যদি না শুনিয়া থাক, নাম সূর্পনখা।

কত যে বয়েস তার; কি রূপ বিধাতা

দিয়াছেন, আগু আসি দেখ, নরমণি!১১০

আইস মলয়-রূপে; গন্ধহীন যদি

এ কুসুম, ফিরে তবে যাইও তখনি!

আইস ভ্রমর-রূপে; না যোগায় যদি

মধু এ যৌবন-ফুল, যাইও উড়িয়া

গুঞ্জরি বিরাগ-রাগে! কি আর কহিব?১১৫

মলয় ভ্রমর, দেব, আসি সাধে দোঁহে

বৃন্তাসনে মালতীরে! এস, সখে, তুমি;—

এই নিবেদন করে সূর্পনখা পদে।

শুন নিবেদন পুনঃ। এত দূর লিখি

লেখন, সখীর মুখে শুনিনু হরষে,১২০

রাজরথী দশরথ অযোধ্যাধিপতি,

পুত্র তুমি, হে কন্দর্প-গর্ব্ব-খর্ব্ব-কারি,

তাঁহার; অগ্রজ সহ পশিয়াছ বনে

পিতৃ-সত্য-রক্ষা-হেতু। কি আশ্চর্য্য! মরি,—

বালাই লইয়া তব, মরি, রঘুমণি,১২৫

দয়ার সাগর তুমি! তা না হলে কভু

রাজ্য-ভোগ ত্যজিতে কি ভ্রাতৃ-প্রেম-বশে?

দয়ার সাগর তুমি। কর দয়া মোরে,

প্রেম-ভিখারিণী আমি তোমার চরণে!

চল শীঘ্র যাই দোঁহে স্বর্ণ লঙ্কাধামে।১৩০

সম পাত্র মানি তোমা, পরম আদরে,

অর্পিবেন শুভ ক্ষণে রক্ষঃ-কুল-পতি

দাসীরে কমল-পদে। কিনিয়া, নৃমণি,

অযোধ্যা-সদৃশ রাজ্য শতেক যৌতুকে,

হবে রাজা; দাসী-ভাবে সেবিবে এ দাসী!১৩৫

এস শীঘ্র, প্রাণেশ্বর; আর কথা যত

নিবেদিব পাদ-পদ্মে বসিয়া বিরলে।

ক্ষম অশ্রু-চিহ্ন পত্রে; আনন্দে বহিছে

অশ্রু ধারা! লিখেছে কি বিধাতা এ ভালে

হেন সুখ, প্রাণসখে? আসি ত্বরা করি,১৪০

প্রশ্নের উত্তর, নাথ, দেহ এ দাসীরে।

ইতি শ্রীবীরাঙ্গনাকাব্যে সূর্পনখা পত্রিকা নাম

পঞ্চম সর্গ।

প্রথম সর্গ

বীরাঙ্গনা কাব্য।

প্রথম সর্গ।

দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা।

[শকুন্তলা বিশ্বামিত্রের ঔরসে ও মেনকানাম্নী অপ্সরার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়া, জনক জননী কর্ত্তৃক শৈশবাবস্থায় পরিত্যক্ত হওয়াতে, কণ্বমুনি তাঁহাকে প্রতিপালন করেন। একদা মুনিবরের অনুপস্থিতিতে রাজা দুষ্মন্ত মৃগয়া প্রসঙ্গে তাঁহার আশ্রমে প্রবেশ করিলে, শকুন্তলা রাজ-অতিথির যথাবিধি অতিথিসৎকার সম্পন্ন করিয়াছিলেন। রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলার অসাধারণ রূপলাবণ্যে বিমোহিত হইয়া, এবং তিনি যে ক্ষত্রকুলোদ্ভবা, এই কথা শুনিয়া, তাঁহার প্রতি প্রেমাসক্ত হন। পরে রাজা তাঁহাকে গুপ্তভাবে গান্ধর্ব্ব বিধানে পরিণয় করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন। রাজা দুষ্মন্ত, স্বরাজ্যে গমনান্তর শকুন্তলার কোন তত্ত্ববিধান না করাতে, শকুন্তলা রাজ সমীপে এই নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি প্রেরণ করিয়াছিলেন।]

বন-নিবাসিনী দাসী নহে রাজপদে,

রাজেন্দ্র! যদিও তুমি ভুলিয়াছ তারে,

ভুলিতে তোমারে কভু পারে কি অভাগী?

হায়, আশামদে মত্ত আমি পাগলিনী!

হেরি যদি ধূলারাশি, হে নাথ, আকাশে;৫

পবন-স্বনন যদি শুনি দূর বনে;

অমনি চমকি ভাবি,—মদকল করী,

বিবিধ রতন অঙ্গে, পশিছে আশ্রমে,

পদাতিক, বাজীরাজী, সুরথ, সারথি,

কিঙ্কর, কিঙ্করী সহ! আশার ছলনে,১০

প্রিয়ম্বদা, অনসূয়া, ডাকি সখীদ্বয়ে;

কহি—‘হ্যাদে দেখ্, সই, এত দিনে আজি

স্মরিলা লো প্রাণেশ্বর এ তাঁর দাসীরে!

ওই দেখ্, ধূলারাশি উঠিছে গগনে!

ওই শোন্ কোলাহল! পুরবাসী যত১৫

আসিছে লইতে মোরে নাথের আদেশে।”

নীরবে ধরিয়া গলা কাঁদে প্রিয়ম্বদা;

কাদে অনুসূয়া সই বিলাপি বিষাদে!

দ্রুতগতি ধাই আমি সে নিকুঞ্জ-বনে,

যথায় হে মহীনাথ, পূজিনু প্রথমে২০

পদযুগ; চারি দিকে চাহি ব্যগ্রভাবে

দেখি প্রফুল্লিত ফুল, মুকুলিত লতা;

শুনি কোকিলের গীত, অলির গুঞ্জর,

স্রোতোনাদ, মরমরে পাতাকুল নাচি;

কুহরে কপোত, সুখে বৃক্ষশাখে বসি,২৫

প্রেমালাপে কপোতীর মুখে মুখ দিয়া।

সুখি গঞ্জি ফুলপুঞ্জে;—‘রে নিকুঞ্জশোভা,

কি সাথে হাসিস্ তোরা? কেন সমীরণে

বিতরিস্ আজি হেথা পরিমল-সুধা?’

কহি পিকে,—‘কেন তুমি, পিককুল-পতি,৩০

এ স্বরলহরী আজি বরিষ এ বনে?

কে করে আনন্দধ্বনি নিরানন্দ কালে?

মদনের দাস মধু; মধুর অধীনে

তুমি; সে মদন মোহে যাঁর রূপ গুণে,

কি সুখে গাও হে তুমি তাঁহার বিরহে?”৩৫

অলির গুঞ্জর শুনি ভাবি—মৃদু স্বরে

কাঁদিছেন বনদেবী দুঃখিনীর দুঃখে!

শুনি স্রোতোনাদ ভাবি—গম্ভীর নিনাদে

নিন্দিছেন বনদেব তোমায়, নৃমণি,—

কাঁপি ভয়ে—পাছে তিনি শাপ দেন রোষে।৪০

কহি পত্রে,—শোন্ পত্র;—সরস দেখিলে

তোরে, সমীরণ আসি নাচে তোরে লয়ে

প্রেমামোদে; কিন্তু যবে শুখাইস্ কালে

তুই, ঘৃণা করি তোরে তাড়ায় সে দূরে;—

তেমতি দাসীরে কি রে ত্যজিলা নৃপতি?৪৫

মুদি পোড়া আঁখি বসি রসালের তলে;

ভ্রান্তিমদে মাতি ভাবি পাইব সত্বরে

পাদপদ্ম! কাঁপে হিয়া দুরুদুক করি

শুনি যদি পদশব্দ! উল্লাসে উম্মীলি

নয়ন, বিষাদে কাঁদি হেরি কুরঙ্গীরে!৫০

গালি দিয়া দূর তারে করি করাঘাতে!

ডাকি উচ্চে অলিরাজে; কহি,—‘ফুলসখে

শিলীমুখ, আমি তুমি আক্রম গুঞ্জরি

এ পোড়া অধর পুনঃ! রক্ষিতে দাসীরে

সহসা দিবেন দেখা পুরু-কুল-নিধি!’৫৫

কিন্তু বৃথা ডাকি, কান্ত। কি লোভে ধাইবে

আর মধুলোভী অলি এ মুখ নিরখি,—

শুখাইলে ফুল, কবে কে আদরে তারে?

কাঁদিয়া প্রবেশি, প্রভু, সে লতামণ্ডপে,

যথায়—ভাবিয়া দেখ, পড়ে যদি মনে,৬০

নরেন্দ্র; যথায় বসি, প্রেমকুতূহলে,

লিখিল কমলদলে গীতিকা অভাগী;—

যথায় সহসা তুমি প্রবেশি, জুড়ালে

বিষম বিরহজ্বালা! পদ্মপর্ণ নিয়া

কত যে কি লিখি নিত্য কব তা কেমনে?৬৫

কভু প্রভঞ্জনে কহি কৃতাঞ্জলি-পুটে;—

‘উড়ায়ে লেখন মোর, বায়ুকুলরাজা,

ফেল রাজ-পদ-তলে যথা রাজালয়ে

বিরাজেন রাজাসনে রাজকুলমণি!’

সম্বোধি কুরঙ্গে কভু কহি শূন্যমনে;—৭০

‘মনোরথ গতি তোরে দিয়াছেন বিধি,

কুরঙ্গ! লেখন লয়ে, যা চলি সত্বরে

যথায় জীবিতনাথ! হায়, মরি আমি

বিরহে! শৈশবে তোরে পালিমু যতনে;

বাঁচা রে এ পোড়া প্রাণ আজি রূপা করি!’৭৫

আর যে কি কই কারে, কি কাজ কহিয়া,

নরেশ্বর? ভাবি দেখ, পড়ে যদি মনে,

অনসূয়া প্রিয়ম্বদা সখীদ্বয় বিনা,

নাহি জন জানে, হায়, এ বিজন বনে

অভাগীর দুঃখ-কথা! এ দুজন যদি৮০

আসে কাছে, মুছি আঁখি অমনি; কেনন।

বিবশা দেখিলে মোরে রোষে ঋষিবালা,

নিন্দে তোষা, হে নরেন্দ্র, মন্দ কথা কয়ে!—

বজ্রসম অপবাদ বাজে পোড়া বুকে!

ফাটি অন্তরিত রাগে—বাক্য নাহি ফোটে!৮৫

আর আর স্থল যত,—কাঁদিয়া কাঁদিয়া

আমি সে সকল স্থলে! যে তরুর মূলে

গান্ধর্ব্ববিবাহচ্ছলে ছলিলে দাসীরে,

যে নিকুঞ্জে ফুলশয্যা সাজাইয়া সাধে

সেবিল চরণ দাসী কানন-বাসরে,—৯০

কি ভাব উদয়ে মনে, দেখ মনে ভাবি,

ধীমান্, যখন পশি সে নিকুঞ্জ-ধামে!—

হে বিধাতঃ, এই কি রে ছিল তোর মনে?

এই কি রে ফলে ফল প্রেমতরু-শাখে?

এই রূপে ভ্রমি নিত্য আমি অনাথিনী,৯৫

প্রাণনাথ! ভাগ্যে বৃদ্ধা গৌতমী তাপসী

পিতৃম্বসা,—মনঃ তাঁর রত তপজপে;

তা না হলে, সর্ব্বনাশ অবশ্য হইত

এত দিনে! নাহি সাধ বাঁধিতে কবরী

ফুলরত্নে আর, দেব! মলিন বাকলে১০০

আবরি মলিন দেহ; নাহি অম্বে রুচি;

না জানি কি কহি কারে, হায়, শূন্যমনে!

বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, পড়ি ভূমিতলে,

হারাই সতত জ্ঞান; চেতন পাইয়া

মিলি যবে আঁখি, দেখি তোমায় সম্মুখে!১০৫

অমনি পসারি বাহু ধাই ধরিবারে

পদযুগ; না পাইয়া কাঁদি হাহারবে!

কে কবে, কি পাপে সহি হেন বিড়ম্বনা!

কি পাপে পীড়েন বিধি, সুধিব তা কারে?

দয়া করি কভু যদি বিরামদায়িনী১১০

নিদ্রা, সুকোমল কোলে, দেন স্থান মোরে,

কত যে স্বপনে দেখি, কব তা কেমনে?

স্বর্ণ-রত্ন-সংঘটিত দেখি অট্টালিকা;

দ্বিরদ-রদ-নির্ম্মিত দুয়ারে দুয়ারী

দ্বিরদ, সুবর্ণাসন দেখি স্থানে স্থানে;১১৫

ফুলশয্যা; বিদ্যাধরী-গঞ্জিনী কিঙ্করী;

কেহ গায়, কেহ নাচে; যোগায় আনিয়া

বিবিধ ভূষণ কেহ; কেহ উপাদেয়

রাজভোগ! দেখি মুক্তা মণি রাশি রাশি,

অলকা সদনে যেন! শুনি বীণা-ধ্বনি;১২০

গন্ধামোদে মাতে মনঃ, নন্দন কাননে—

(শুনেছি এ কথা, নাথ, তাত কণ্বমুখে)

নন্দন কাননান্তরে বসন্তে যেমনি!

তোমায়, নৃমণি, দেখি স্বর্ণ সিংহাসনে!

শিরোপরি রাজছত্র; রাজদণ্ড হাতে,১২৫

মণ্ডিত অমূল-রত্নে; সসাগরা ধরা,

রাজকর করে, নত রাজীব-চরণে!

কত যে জাগিয়া কাঁদি কব তা কাহারে?

জানে দাসী, হে নরেন্দ্র, দেবেন্দ্র-সদৃশ

ঐশ্বর্য্য, মহিমা তব; অতুল জগতে১৩০

কুল মান ধনে তুমি, রাজকুলপতি!

কিন্তু নাহি লোভে দাসী বিভব! সেবিবে

দাসীভাবে পা দুখানি—এই লোভ মনে,—

এই চির-আশা, নাথ, এ পোড়া হৃদয়ে!

বন-নিবাসিনী আমি, বাকল-বসনা,১৩৫

ফলমূলাহারী নিত্য, নিত্য কুশাসনে

শয়ন; কি কাজ, প্রভু, রাজসুখ-ভোগে?

আকাশে করেন কেলি লয়ে কলাঘরে

রোহিণী, কুমুদী তাঁরে পূজে মর্ত্ততলে!

কিঙ্করী করিয়া মোরে রাখ রাজপদে!১৪০

চির-অভাগিনী আমি! জনক জননী

ত্যজিলা শৈশবে মোরে, না জানি, কি পাপে?

পরান্নে বাঁচিল প্রাণ—পরের পালনে!

এ নব যৌবনে এবে ত্যজিলা কি তুমি,

প্রাণপতি? কোন্ দোষে, কহ, কান্ত, শুনি,১৪৫

দাসী শকুন্তলা দোষী ও চরণ-যুগে?

এ মনে যে সুখ-পাখী ছিল বাসা বাঁধি,

কেন ব্যাধবেশে আসি বধিলে তাহারে,

নরাধিপ? শুনিয়াছি রথীশ্রেষ্ঠ তুমি,

বিখ্যাত ভারতক্ষেত্রে ভীম বাহুবলে;১৫০

কি যশঃ লভিলা, কহ, যশস্বি, বিনাশি—

অবলা কুলের বালা আমি—সুখ মম!

আসিবেন তাত কণ্ব ফিরি যবে বনে;

কি কব তাঁহারে, নাথ, কহ, তা দাসীরে?

নিন্দে অনসূয়া যবে মন্দ কথা কয়ে,১৫৫

অপবাদে প্রিয়ম্বদা তোমায়,— কি বল্যে

বুঝাবে এ দোঁহে দাসী, কহ তা দাসীরে?

কহ, কি বলিয়া, দেব, হায়, বুঝাইব

এ পোড়া পরাণ আমি—এ মিনতি পদে!

বনচর চর, নাথ! না জানি কি রূপে১৬০

প্রবেশিবে রাজপুরে, রাজ সভাতলে?

কিন্তু মজ্জমান জন, শুনিয়াছি ধরে

তৃণে, আর কিছু যদি না পায় সম্মুখে!

জীবনের আশা, হায়, কে ত‍্যজে সহজে!

ইতি শ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে শকুন্তলাপত্রিকা নাম

প্রথম সর্গ।

ষষ্ঠ সর্গ

ষষ্ঠ সর্গ।

(অর্জ্জুনের প্রতি দ্রৌপদী।)

[ যৎকালে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির পাশক্রীড়ায় পরাজিত ও রাজচ্যুত হইয়া বনে বাস করেন, বীরবর অর্জ্জুন বৈরনির্যাতনের নিমিত্ত অস্ত্রশিক্ষার্থ সুরপুরে গমন করিয়াছিলেন। পার্থের বিরহে কাতরা হইয়া, দ্রৌপদী দেবী তাঁহাকে নিম্ন-লিখিত পত্রিকাখানি এক ঋষি পুত্ত্রের সহযোগে প্রেরণ করিয়াছিলেন। ]

হে ত্রিদশালয়-বাসি, পড়ে কভু মনে

এ পাপ সংসার আর? কেন বা পড়িবে?

কি অভাব তব, কান্ত, বৈজয়ন্ত-ধামে?

দেব-ভোগ-ভোগী তুমি, দেবসভা মাঝে

আসীন দেবেন্দ্রাসনে! সতত আদরে৫

সেবে তোমা সুরবালা,—পীনপয়োধরা

ঘৃতাচী; সু-ঊরু রম্ভা, নিত্য-প্রভাময়ী

স্বয়ম্প্রভা; মিশ্রকেশী—সুকেশিনী ধনী!

উর্ব্বশী—কলঙ্ক-হীনা শশীকলা দিবে!

নিবিড়-নিতম্বী সহা সহ চিত্রলেখা১০

চারুনেত্রা; সুমধ্যমা তিলোত্তমা বামা;

সুলোচনা সুলোচনা, কেহ গায় সুখে;

কেহ নাচে,—দিব্য বীণা বাজে দিব্য তালে;

মন্দার-মণ্ডিত বেণী দোলে পৃষ্ঠদেশে!

কস্তুরী কেশর ফুল আনে কেহ সাধে!১৫

কেহ বা অধর-মধু যোগায় বিরলে,

সুমৃণাল-ভুজে তোমা বাঁধি, গুণনিধি!

রসিক নাগর তুমি; নিত্য রসবতী

সুরবালা;—শত ফুল প্রফুল্ল যে বনে,

কি সুখে বঞ্চিত, সখে, শিলীমুখ তথা?২০

নন্দন-কাননে তুমি আনন্দে, সুমতি,

ভ্রম নিত্য! শুনিয়াছি ঋতুরাজ না কি

সাজান সে বনরাজী বিরাজি সে বনে

নিরন্তর; নিরন্তর গায় পাখী শাখে;

না শুখায় ফুলকুল; মণি মুক্তা হীরা২৫

স্বর্ণ মরকতে বাঁধা সরোরোধঃ যত!

মন্দ মন্দ সমীরণ বহে দিবা নিশি

গন্ধামোদে পূরি দেশ। কিন্তু এ বর্ণনে

কি কাজ? শুনেছে দাসী কর্ণে মাত্র যাহা,

নিত্য স্বনয়নে তুমি দেখ তা, নৃমণি!৩০

স্বশরীরে স্বর্গভোগ! কার ভাগ্য হেন

তোমা বিনা, ভাগ্যবান্, এ ভব-মণ্ডলে?

ধন্য নর-কুলে তুমি! ধন্য পুণ্য তব!

পড়িলে এ সব কথা মনে, শূরমণি,

কেমনে ভাবিব, হায়, কহ তা আমারে,৩৫

অভাগী দাসীর কথা পড়ে তব মনে?

তবে যদি নিজগুণে, গুণনিধি তুমি,

ভুলিয়া না থাক তারে,—আশীর্ব্বাদ কর,

নমে পদে, ধনঞ্জয়, দ্রুপদ-নন্দিনী—

কৃতাঞ্জলি-পুটে দাসী নমে তব পদে!৪০

হায়, নাথ, রথা জন্ম নারীকুলে মম!

কেন যে লিখিলা বিধি এ পোড়া কপালে

হেন তাপ; কোন্ পাপে দণ্ডিলা দাসীরে

এ রূপে, কে কবে মোরে? সুধিব কাহারে?

রবি-পরায়ণা, মরি, সরোজিনী ধনী,৪৫

তবু নিত্য সমীরণ কহে তার কানে

প্রেমের রহস্য কথা! অবিরল লুটে

পরিমল! শিলীমুখ, গুঞ্জরি সতত,

(কি লজ্জা!) অধর-মধু পান করে সুখে!

সৃজিলা কমলে যিনি, সৃজিলা দাসীরে৫০

সেই নিদারুণ বিধি? কারে নিন্দি, কহ

অরিন্দম? কিন্তু কহি ধর্ম্মে সাক্ষী মানি,

শুন তুমি, প্রাণকান্ত! রবির বিরহে,

নলিনী মলিনী যথা মুদিত বিষাদে;

মুদিত এ পোড়াপ্রাণ তোমার বিহনে!৫৫

সাধে যদি শত অলি গুঞ্জরিয়া পদে;

সহস্র মিনতি যদি করে কর্ণ-মূলে

সমীরণ, ফোটে কি হে কভু পঙ্কজিনী,

কনক-উদয়াচলে না হেরি মিহিরে,

কিরীটি? আঁধার বিশ্ব এ পোড়া নয়নে,৬০

হায়রে, আঁধার নাথ, তোমার বিরহে—

জীবশূন্য, রবশূন্য, মহারণ‍্য যেন!

আর কি কহিব, দেব, ও রাজীবপ-দে?

পাঞ্চালীর চির-বাঞ্ছা, পাঞ্চালীর পতি

ধনঞ্জয়! এই জানি, এই মানি মনে।৬৫

যা ইচ্ছা করুন ধর্ম্ম, পাপ করি যদি

ভালবাসি নৃমণিয়ে,—যা ইচ্ছা, নৃমণি!

হেন সুখ ভুঞ্জি, দুঃখ কে ডরে ভুঞ্জিতে?

যজ্ঞানলে জনমিল দাসী যাজ্ঞসেনী,

জান তুমি, মহাযশা। তরুণ যৌবনে৭০

রূপ গুণ যশে তব, হায় রে, বিবশা,

বরিনু তোমায় মনে! সখীদলে লয়ে

কত যে খেলিনু খেলা, কহিব কেমনে?

বৈদেহীর সুকাহিনী শুনি লোক মুখে

শিবের মন্দিরে পশি পুষ্পাঞ্জলি দিয়া,৭৫

পূজিতাম শিবধনুঃ! কহিতাম সাধে,—

‘ঋষিবেশে স্বপ্ন আশু দেখাও জনকে

(জানি কামরূপ তুমি! } দিতে এ দাসীরে

সে পুরুষোত্তমে, যিনি দুই খণ্ড করি,

হে কোদণ্ড, ভাঙ্গিবেন তোমায় স্ববলে!৮০

তা হলে পাইব নাথে, বলী-শ্রেষ্ঠ তিনি!’

শুনি বৈদর্ভীর কথা, ধরিতাম ফাঁদে

রাজহংসে; দিয়া তারে আহার, পরায়ে

সুবর্ণ ঘুংঘুর পায়ে, কহিতাম কানে,—

‘যমুনার তীরে পুরী বিখ্যাত জগতে৮৫

হস্তিনা;—তথায় তুমি, রাজহংসপতি,

যাও শীঘ্র শূন্য পথে, হেরিবে সে পুরে

নরোত্তমে; তাঁর পদে কহিও, দ্রৌপদী

তোমার বিরহে মরে দ্রুপদ-নগরে!’

এই কথা কয়ে তারে দিতাম ছাড়িয়া।৯০

হেরিলে গগনে মেঘে, কহিতাম নমি;—

‘বাহন যাঁহার তুমি, মেঘ-কুল-পতি,

পুত্রবধূ তাঁর আমি; বহ তুলি মোরে,

বহ যথা বারি-ধারণ, নাথের চরণে!

জল-দানে চাতকীরে তোষ দাতা তুমি,৯৫

তোমার বিরহে, হায়, তৃষাতুরা যথা

সে চাতকী, তৃষাতুরা আমি, ঘনমণি!

মোর সে বারিদ-পদে দেহ মোরে লয়ে!’

আর কি শুনিবে, নাথ? উঠিল যৎকালে

জনরব—‘জতুগৃহে দহি মাতৃ-সহ১০০

ত‍্যজিলা অকালে দেহ পঞ্চ পাণ্ডুরথী’—

কত যে কাঁদিনু আমি, কব তা কাহারে?

কাঁদিনু—বিধবা যেন হইনু যৌবনে!

প্রার্থিনু রতিরে পূজি,—হর-কোপানলে,

হে সতি, পুড়িলা যবে প্রাণ-পতি তব,১০৫

কত যে সহিলা দুঃখ, তাই স্মরি মনে,

বাঁচাও মদনে মোর,—এই ভিক্ষা মাগি!’

পরে স্বয়ম্বরোৎসব। আঁধার দেখিনু

চৌদিক, পশিনু যবে রাজসভা-মাঝে!

সাধিনু মাটিরে ফাটি হইতে দুখানি!১১০

দাঁড়াইয়া লক্ষ্য-তলে কহিনু, ‘খসিয়া

পড় তুমি পোড়া শিরে বজ্রাগ্নি-সদৃশ,

হে লক্ষ্য! জ্বলিয়া আমি যরি তব তাপে,

প্রাণ-পতি জতুগৃহে জ্বলিলা যেমতি!

না চাহি বাঁচিতে আর! বাঁচিব কি সাধে?”১১৫

উঠিল সভায় রব,—‘নারিলা ভেদিতে

এ অলক্ষ্য লক্ষ্যে আজি ক্ষত্ররথী যত।’—

জান তুমি, গুণমণি, কি ঘটিল পরে।

ভস্মরাশি যারে গুপ্ত বৈশ্বানর-রূপে

কি কাজ করিলা তুমি, কে না জানে ভবে,১২০

রথীশ্বর? বজ্রবাদে ভেদিল আকাশে

মৎস্য-চক্ষুঃ তীক্ষ্ণ শর! সহসা ভাসিল

আনন্দ সলিলে প্রাণ; শুনিনু সুবাণী

(স্বপ্নে যেন!) ‘এই তোর পতি, লো পাঞ্চালি!

ফুল-মালা দিয়ে গলে, বর নরবরে!’১২৫

চাহিনু বরিতে, নাথ, নিবারিলা তুমি

অভাগীর ভাগ্য দোষে! তা হলে কি তবে

এ বিষম তাপে, হায়, মরিত এ দাসী?

কিন্তু বৃথা এ বিলাপ!—হুহুঙ্কারি রোষে,

লক্ষ রাজরথী যবে বেড়িল তোমারে;১৩০

অম্বুরাশি-নাদ সম কম্বুরাশি যবে

নাদিল সে স্বয়ম্বরে;—কি কথা কহিয়া

সাহসিলা এ দাসীরে, পড়ে কি হে মনে?

যদি ভুলে থাক তুমি, ভুলিতে কি পারে

দ্রৌপদী? আসন্ন কালে সে সুকথা গুলি১৩৫

জপিয়া মরিব, দেব, মহাযন্ত্র জ্ঞানে!

কহিলে সম্বোধি মোরে সুমধুর স্বরে;—

‘আশারূপে মোর পাশে দাঁড়াও, রূপসি!

দ্বিগুণ বাড়িবে বল চন্দ্রমুখ হেরি,

চন্দ্রমুখি! যত ক্ষণ ফণীন্দ্রের দেহে১৪০

থাকে প্রাণ, কার সাধ্য হরে শিরোমণি?

আমি পার্থ!’—ক্ষম, নাথ, লাগিল তিতিতে

অনর্গল অশ্রুজল এ লিপি! কেন না,—

হায় রে, কেন না আমি মরিনু চরণে

সে দিন!—কি লিখি, হায়, না পাই দেখিতে!১৪৫

আঁধা, বঁধু, অশ্রুনীরে এ তব কিঙ্করী!—

এত দূর লিখি কালি, ফেলাইনু দূরে

লেখনী! আকুল প্রাণ উঠিল কাঁদিয়া

স্মরি পূর্ব্ব-কথা যত। বসি তরু-ফুলে,

হায় রে, ভিভিন্ন, নাথ, নয়ন-আসারে!১৫০

কে মুছিল চক্ষুঃ জল? কে মুছিবে কহ?

কে আছে এ অভাগীর এ ভবমণ্ডলে?

ইচ্ছা করে ত্যজি প্রাণ ডুবি জলাশয়ে;

কিম্বা পান করি বিষ; কিন্তু ভাবি যবে,

প্রাণেশ, ত্যজিলে দেহ আর না পাইব১৫৫

হেরিতে ও পদযুগ,—সান্ত্বনি পরাণে,

ভুলি অপমান, লজ্জা, চাহি বাঁচিবারে!

অগ্নিতাপে তপ্তা সোণা গলে হে সোহাগে,

পায় যদি সোহাগায়! কিন্তু কহ, রথি,

কবে ফিরি আসি দেখা দেবে এ কাননে?১৬০

কহ ত্রিদিবের বার্ত্তা। কবীশ্বর তুমি,

গাঁথি মধুমাখা গাথা পাঠাও দাসীরে।

ইচ্ছা বড়, গুণমণি, পরিতে অলকে

পারিজাত; যদি তুমি আন সঙ্গে করি,

দ্বিগুণ আদরে ফুল পরিব কুন্তলে!১৬৫

শুনেছি কামদা না কি দেবেন্দ্রের পুরী;—

এ দাসীর প্রতি যদি থাকে দয়া হৃদে,

ভুলিতে পার হে যদি সুর-বালা-দলে,

এ কামনা কামধুকে কর দয়া করি

পাও যেন অভাগীরে চরণ কমলে১৭০

ক্ষণ কাল! জুড়াইব নয়ন সুমতি

ও রূপ-মাধুরী হেরি,—ভুলি এ বিচ্ছেদে;

অপ্‌সরা-বল্লভ তুমি; নর-নারী দাসী;

তা বল্যে করো না ঘৃণা—এ মিনতি পদে!

স্বর্গ-অলঙ্কার যারা পরে শিরোদেশে,১৭৫

কণ্ঠে, হস্তে; পরে না কি রজত চরণে?

কি ভাবে কাটাই কাল এ বিকট বনে

আমরা, কহিব এবে, শুন, গুণনিধি।

ধর্ম্ম-কর্ম্ম রত সদ্য ধর্ম্মরাজ-ঋষি;

ধৌম্য পুরোহিত নিত্য ভূষেন রাজনে১৮০

শাস্ত্রালাপে। মৃগয়ায় রত ভ্রাতা তব

মধ্যম; অনুজ-দ্বয়, মহা-ভক্তিভাবে,

সেবেন অগ্রজ-দ্বয়ে; যথা সাধ্য, দাসী

নির্ব্বাহে, হে মহাবাহু, গৃহ-কার্য্য যত।

কিন্তু ক্ষুণ্ণমনা সবে তোমার বিহনে!১৮৫

স্মরি তোমা অশ্রুনীরে তিতেন নৃপতি,

আর তিন ভাই তব। স্মরিয়া তোমারে,

আকুল এ পোড়া প্রাণ, হায়, দিবা নিশি!

পাই যদি অবসর, কুটীর তেয়াগি

স্মৃতি-দূতী সহ, নাথ, ভ্রমি একাকিনী,১৯০

পূর্ব্বের কাহিনী যত শুনি তাঁর মুখে!

পাণ্ডব-কুল-ভরসা, মহেষ্বাস, তুমি;

বিমুখিবে তুমি, সখে, সম্মুখ-সমরে

ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ শূরে; নাশিবে কৌরবে!

বসাইবে রাজাসনে পাণ্ডু-কুল-রাজে;—১৯৫

এই গীত গায় আশা নিত্য এ আশ্রমে

এ সঙ্গীত-ধ্বনি, দেব, শুনি জাগরণে।

শুনি স্বপ্নে নিশাভাগে এ সঙ্গীত-ধ্বনি!

কে শিখায় অস্ত্র তোমা, কহ সুরপুরে,

অস্ত্রী-কুল-গুরু তুমি? এই সুর-দলে২০০

প্রচণ্ড গাণ্ডীব তুমি টঙ্কারি হুংকারে,

দমিলা খাণ্ডব-রণে! জিনিলা একাকী

লক্ষরাজে, রথীরাজ, লক্ষ্য-ভেদ-কালে।

নিপাতিলা ভূমিতলে বলে ছদ্মবেশী

কিরাতেরে! এ ছলনা, কহ, কি কারণে?২০৫

এস ফিরি, নররত্ন! কে ফেরে বিদেশে

যুবতী পত্নীরে ঘরে রাখি একাকিনী;

কিন্তু যদি সুরনারী প্রেম-ফাঁদ পাতি

বেঁধে থাকে মনঃ, বঁধু, স্মর ভ্রাতৃ-ত্রয়ে—

তোমার বিরহ-দুঃখে দুঃখী অহরহ!২১০

আর কি অধিক কব? যদি দয়া থাকে,

আসি দেখ কি দশায় তোমার বিরহে,

কি দশায়, প্রাণেশ্বর, নিবাসি এ দেশে!

পাইয়াছি দৈবে, দেব, এ বিজন বনে

ঋষিপত্নী পুণ্যবতী; পূর্ব্ব পুণ্য-বলে২১৫

স্বেচ্ছাচর পুত্র তাঁর! তেজস্বী সুশিশু

দিবামুখে রবি যেন! বেদ অধ্যয়নে

সদা রত! দয়া করি বহিবেন তিনি,

মাতৃ-অনুরোধে পত্র, দেবেন্দ্র সদনে।

যথাবিধি পূজা তাঁর করিও সুমতি।২২০

লিখিলে উত্তর তিনি আনিবেন হেথা।

কি কহিনু, নরোত্তম? কি কাজ উত্তরে?

পত্রবহ সহ ফিরি আইস এ বনে!

ইতি শ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে দ্রৌপদী-পত্রিকা নাম

ষষ্ঠ সর্গ।

সপ্তম সর্গ

সপ্তম সর্গ।

দুর্য্যোধনের প্রতি ভানুমতী।

[ ভগদত্তপুত্রী ভানুমতী দেবী রাজা দুর্য্যোধনের পত্নী। কুরুশ্রেষ্ঠ দুর্য‍্যোধন পাণ্ডবকুলের সহিত কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে যাত্রা করিলে অল্প দিনের মধ্যে রাজমহিষী ভানুমতী তাঁহার নিকট নিম্নলিখিত পত্রিকাখানি প্রেরণ করিয়াছিলেন। ]

অধীর সতত দাসী, যে অবধি তুমি

করি যাত্রা পশিয়াছ কুরুক্ষেত্র-রণে!

নাহি নিদ্রা; নাহি রুচি, হে নাথ, আহারে!

না পারি দেখিতে চখে খাদ্যদ্রব্য যত।

কভু যাই দেবালয়ে; কভু রাজোদ্যানে;৫

কভু গৃহ-চুড়ে উঠি, দেখি নিরখিয়া

রণ-স্থল! রেণু-রাশি গগন আবরে

ঘন ঘনজালে যেন; জ্বলে শর-রাশি,

বিজলীর ঝলা সম ঝলসি নয়নে!

শুনি দূর সিংহনাদ, দূর শঙ্খ-ধ্বনি,১০

কাঁপে হিয়া থরথরে! যাই পুনঃ ফিরি।

স্তম্ভের আড়ালে, দেব, দাঁড়ায়ে নীরবে,

শুনি সঞ্জয়ের মুখে যুদ্ধের বারতা,

যথা বসি সভাতলে অন্ধ নরপতি!

কি যে শুনি, নাহি বুঝি—আমি পাগলিনী!১৫

মনের জ্বালায় কভু জলাঞ্জলি দিয়া

লজ্জায়, পড়িয়া কাঁদি শাশুড়ীর পদে,

নয়ন-আসারে ধৌত করি পা দুখানি!

নাহি সরে কথা মুখে, কাঁদি মাত্র খেদে!

নারি সান্ত্বনিতে মোরে, কাঁদেন মহিষী;২০

কাঁদে কুরু-বধু যত! কাঁদে উচ্চ-রবে,

মায়ের আঁচল ধরি, কুরু-কুল-শিশু,

তিতি অশ্রুনীরে, হায়, না জানি কি হেতু!

দিবা নিশি এই দশা রাজ-অবরোধে।

কুক্ষণে মাতুল তব—ক্ষম দুঃখিনীরে!—২৫

কুক্ষণে মাতুল তব ক্ষত্র-কুল-গ্লানি,

আইল হস্তিনাপুরে! কুক্ষণে শিখিলা

পাপ অক্ষবিদ্যা, নাথ, সে পাপীর কাছে!

এ বিপুল কুল, মরি, মজালে দুর্ম্মতি,

কাল-কলিরূপে পশি এ বিপুল-কুলে!৩০

ধর্ম্মশীল কর্ম্মক্ষেত্রে ধর্ম্মরাজ-সম

কে আছে, কহ তা, শুনি? দেখ ভীমসেনে,

ভীম পরাক্রমী শূর, দুর্ব্বার সমরে!

দেব-নর-পূজ্য পার্থ—অব্যর্থ প্রহরী!

কত গুণে গুণী, নাথ, নকুল সুমতি,৩৫

সহ শিষ্ট সহদেব, জান না কি তুমি?

মেদিনী-সদনে রমা দ্রুপদ-নন্দিনী!

কার হেতু এ সবারে ত্যজিলা, ভূপতি?

গঙ্গাজল-পূর্ণ ঘটে, হায়, ঠেলি ফেলি,

কেন অবগাহ দেহ কর্ম্মনাশা-জলে?৪০

অবহেলি দ্বিজোত্তমে চণ্ডালে ভকতি?

অম্বু-বিম্ব, নীরবৃন্দ ফুলদূর্ব্বাদলে

নহে মুক্তাফল, দেব! কি আর কহিব?

কি ছলে ভুলিলা তুমি, কে কবে আমারে?

এখনও দেহ ক্ষমা, এই ভিক্ষা মাগি,৪৫

ক্ষত্রমণি! ভাবি দেখ,—চিত্রসেন যবে,

কুরুবধূদলে বাঁধি তব সহ রথে,

চলিল গন্ধর্ব্বদেশে, কে রাখিল আসি

কুলমান প্রাণ তব, কুরুকুলমণি?

বিপদে হেরিলে অরি, আনন্দ-সলিলে৫০

ভাসে লোক; তুমি যার পরমারি, রাজা,

ভাসিল সে অশ্রুনীরে তোমার বিপদে!

হে কৌরবকুলনাথ, তীক্ষ্ণ শরজালে

চাহ কি বধিতে প্রাণ তাহার সংগ্রামে,

প্রাণ, প্রাণাধিক মান রক্ষিল যে তব৫৫

অসহায় যবে তুমি,—হায়, সিংহসম,

আনায় মাঝারে বদ্ধ রিপুর কৌশলে?

—হে দয়া, কি হেতু, মাতঃ, এ পাপ সংসারে

মানব-হৃদয়ে তুমি কর গো বসতি!

কেন গর্ব্বী কর্ণে তুমি কর্ণদান কর,৬০

রাজেন্দ্র? দেবতাকুলে জিনিল যে রণে;

তোমা সহ কুরুসৈন্যে দলিল একাকী

মৎস্যদেশে; আঁটিবে কি রাধেয় তাহারে?

হায়, বৃথা আশা, নাথ! শৃগাল কি কভু

পারে বিমুখিতে, কহ, মৃগেন্দ্র সিংহেরে?৬৫

সূতপুত্র সখা তব? কি লজ্জা, নৃমণি,

তুমি চন্দ্রবংশচূড়, ক্ষত্রবংশপতি?

জানি আমি ভীমবাহু ভীষ্ম পিতামহ;

দেব-নর-ত্রাস বীর্য‍্যে দ্রোণাচার্য্য গুরু।

স্নেহপ্রবাহিনী কিন্তু এ দোঁহার বহে৭০

পাণ্ডব সাগরে, কান্ত, কহিনু তোমারে!

যদিও না হয় তাহা; তবুও কেমনে,

হায় রে প্রবোধি, নাথ, এ পোড়া হৃদয়ে?—

উত্তর-গোগৃহ-রণে জিনিল কিরীটী

একাকী এ বীরদ্বয়ে! সৃজিলা কি, তুমি,৭৫

দাবাগ্নির রূপে, বিধি, জিষ্ণু ফাল্গুনীরে

এ দাসীর আশা-বন নাশিতে অকালে?

শুন, নাথ; নিদ্রা-আশে মুদি যদি কভু

এ পোড়া নয়ন দুটি; দেখি মহাভয়ে

শ্বেতঅশ্ব কপিধ্বজ স্যন্দন সম্মুখে!৮০

রথমধ্যে কালরূপী পার্থ! বাম করে

গাণ্ডীব—কোদণ্ডোত্তম! ইরম্মদ-তেজা

মর্ম্মভেদী দেব-অস্ত্র শোতে হে দক্ষিণে!

কাঁপে হিয়া ভাবি শুনি দেবদত্তধ্বনি!

গরজে বায়ুজ ধ্বজে কাল মেঘ যেন!৮৫

ঘর্ঘরে গম্ভীর রবে চক্র, উগরিয়া

কালাগ্নি। কি কব, দেব, কিরীটের আভা?

আহা, চন্দ্রকলা যেন চন্দ্রচূড়-ভালে!

উজলিয়া দশদিশ, কুরুসৈন্য পানে

ধায় রথবর বেগে! পালায় চৌদিকে৯০

কুরুসৈন্য,—তমঃ-পুঞ্জ রবির দর্শনে

যথা! কিম্বা বিহঙ্গম হেরিলে অদূরে

বজ্রনখ বাজে যথা পালায় কুজনি

ভীতচিত; মিলি আঁখি অমনি কাঁদিয়া!

কি কব ভীমের কথা? মদকল-করী-৯৫

সদৃশ উম্মদ দুষ্ট নিধন-সাধনে!

জবাযুগ-সম আঁখি—রক্তবর্ণ সদা।

মার, মার শব্দ মুখে! ভীম গদা হাতে,

দণ্ডধর হাতে, হায়, কালদণ্ড যথা!

শুনেছি লোকের মুখে, দেব-সমাগমে১০০

ধরিলা দুরন্তে গর্ভে কুন্তী ঠাকুরাণী।

কিন্তু যদি দেব পিতা, যমরাজ তবে—

সর্ব্ব-অন্তকারী যিনি! ব্যাঘ্রী বুঝি দিল

দুগ্ধ দুষ্টে! নর-নারী-স্তন-দুগ্ধ কভু

পালে কি, কহ, হে নাথ, হেন নর-যমে?১০৫

বাড়িতে লাগিল লিপি; তবুও কহিব

কি কুস্বপ্ন, প্রাণনাধ, গত নিশাকালে

দেখিনু;—বুঝিয়া দেখ, বিজ্ঞতম তুমি;

আকুল সতত প্রাণ না পারি বুঝিতে

এ কুহক! গতরাত্রে বসি একাকিনী১১০

শয়নমন্দিরে তব—নিরানন্দ এবে—

কাঁদিনু! সহসা, নাথ, পূরিল সৌরভে

দশদিশ; পূর্ণচন্দ্র-মাতা জিনি আভা

উজ্জ্বলিল চারি দিক; দাসীর সম্মুখে

দাঁড়াইলা দেববালা—অতুলা জগতে!১১৫

চমকি চরণযুগে নমিনু সভয়ে।

মুছিয়া নয়নজল, কহিলা কাতরে

বিধুমুখী,—‘বৃথা খেদ, কুরুকুলবধু,

কেন তুমি কর আর? কে পারে খণ্ডাতে

বিধির বাঁধন, হায়, এ ভবমণ্ডলে?১২০

ওই দেখ যুদ্ধক্ষেত্র!’—দেখিনু তরাসে,

যত দূর চলে দৃষ্টি, ভীম রণভূমি!

বহিছে শোণিত-স্রোত প্রবাহিনী রূপে;

পড়িয়াছে গজরাজি, শৈলশৃঙ্গ যেন

চূর্ণ বজ্রে; হতগতি অশ্ব, রথাবলী১২৫

ভগ্ন; শতশত শব! কেমনে বর্ণিব

কত যে দেখিনু, নাথ, সে কাল মশানে!

দেখিনু রথীন্দ্র এক শরশয্যোপরি!

আর এক মহারথী পণ্ডিত ভূতলে,

কণ্ঠে শূন্যগুণ ধনু;—দাঁড়ায়ে নিকটে,১৩০

আস্ফালিছে অসি অরি মস্তক চ্ছেদিতে!

আর এক বীরবরে দেখিনু শয়নে

ভূশয্যায়! রোষে মহী আসিয়াছে ধরি

রথচক্র; নাহি বক্ষে কবচ; আকাশে

আভাহীন ভানুদেব,—মহাশোকে যেন!১৩৫

অদূরে দেখিনু হ্রদ, সে হ্রদের তীরে

রাজরধী একজন যান গড়াগড়ি

ভগ্ন-ঊরু! কাঁদি উচ্চে, উঠিনু জাগিয়া!

কেন এ কুস্বপ্ন, দেব, দেখাইলা মোরে?

এস তুমি, প্রাণনাথ, রণ পরিহরি!১৪০

পঞ্চখানি গ্রাম মাত্র মাগে পঞ্চরথী।

কি অভাব তব, কহ? তোষ পঞ্চজনে;

তোষ অন্ধ বাপ মায়ে; ভোষ অভাগীরে;—

রক্ষ কুরুকুল, ওহে কুরুকুলমণি!

ইতি শ্রীবীরাঙ্গনা কাব্যে ভানুমতী পত্রিকা নাম

সপ্তম মর্গ।