← লাইব্রেরি

১৮৯৭

সীতার বনবাস (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ১৮৯৭)

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৯৭

প্রকাশনা-তথ্য

সেণ্ট্রাল টেক্‌ষ্ট্‌-বুক কমিটীর অনুমোদিত

সীতার বনবাস।

ঈ শ্ব র চ ন্দ্র বি দ্যা সা গ র স ঙ্ক লি ত।

মূল্য বার আনা।

আইন অনুসারে কাপি-রাইট রেজিষ্ট্রী হইয়াছে।

সীতার বনবাস।

ঈ শ্ব র চ ন্দ্র বি দ্যা সা গ র স ঙ্ক লি ত।

সপ্তবিংশ সংস্করণ

কলিকাতা

আনন্দমঠ প্রেস ৷

সং ব ৎ ১ ৯ ৫ ৪।

বিজ্ঞাপন।

সীতার বনবাস প্রচারিত হইল। এই পুস্তকের প্রথম ও দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের অধিকাংশ ভবভূতিপ্রণীত উত্তরচরিত নাটকের প্রথম অঙ্ক হইতে পরিগৃহীত; অবশিষ্ট পরিচ্ছেদ সকল পুস্তকবিশেষ হইতে পরিগৃহীত নহ, রামায়ণের উত্তর কাণ্ড অবলম্বন পূর্ব্বক সঙ্কলিত হইয়াছে। ঈদৃশ করুণরসােদ্বোধক বিষয় যে রুপে সঙ্কলিত হওয়া উচিত, এই পুস্তকে সেরূপ হওয়া সম্ভাবনীয় নহে; সুতরাং, সহৃদয় লােকে পাঠ করিয়া সন্তোষলাভ করিবেন, এরূপ প্রত্যাশা করিতে পারি না। যদি, সীতার বনবাস, কিঞ্চিৎ অংশেও, পাঠকবর্গের প্রীতিপ্রদ হয়, তাহা হইলেই,আমি চরিতার্থ হইব।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্রশর্ম্মা

কলিকাতা।

১লা বৈশাখ। সংবৎ ১ ৯ ১ ৮।

অষ্টম পরিচ্ছেদ

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

মহর্ষি বাল্মীকি, রামচরিত অবলম্বন করিয়া, অতি অদ্ভুত কাব্যের রচনা করিয়াছেন; তাঁহার দুই কোকিলকণ্ঠ তরুণবয়স্ক শিষ্য, অতি মধুর স্বরে, সেই কাব্যের গান করে; কল্য প্রভাতে, তাহারা রাজসভায় গান করিবে; এই সংবাদ নৈমিষাগত ব্যক্তি মাত্রেই অবগত হইয়াছিলেন। রজনী অবসন্না হইবামাত্র, কি ঋষিগণ, কি নৃপতিগণ, কি অপরাপর নিমন্ত্রিতগণ, সকলেই, সঙ্গীতশ্রবণলালসার বশবর্ত্তী হইয়া, সাতিশয় ব্যগ্রচিত্তে, রাজসভায় উপস্থিত হইতে লাগিলেন। সে দিবসের সভায় সমারোহের সীমা ছিল না। রামচন্দ্র রাজসিংহাসনে উপবেশন করিলেন। ভরত, লক্ষ্মণ, শত্রুঘ্ন, এবং সুগ্রীব, বিভীষণ আদি সুহৃদ্বর্গ, তাঁহার বামে ও দক্ষিণে, যথাযোগ্য আসনে আসীন হইলেন। কৌশল্যা, কেকয়ী, সুমিত্রা, উর্ম্মিলা, মাণ্ডবী, শ্রুতকীর্ত্তি প্রভৃতি রাজপরিবার, অরুন্ধতী প্রভৃতি ঋষিপত্নীগণ সমভিব্যাহারে, পৃথক্ স্থানে অবস্থিত হইলেন।

এই রূপে রাজসভায় সমবেত হইয়া, সমস্ত লোক অভিনব কাব্যের ও সুকুমার গায়কযুগলের কথা লইয়া আন্দোলন ও নিতান্ত উৎসুক চিত্তে তাহাদের আগমন প্রতীক্ষা করিতেছেন; এমন সময়ে, মহর্ষি বাল্মীকি, কুশ ও লব সমভিব্যাহারে, সভাদ্বারে উপস্থিত হইলেন। দেখিবামাত্র, সভামণ্ডলে মহান কোলাহল উত্থিত হইল। যাঁহারা, পূর্ব্ব দিন, কুশ ও লবকে দেখিয়াছিলেন, তাঁহারা, অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া, স্বসমীপে উপবিষ্ট ব্যক্তিদিগকে তাহাদের দুই সহোদরকে দেখাইতে লাগিলেন। বাল্মীকি সভামণ্ডপে প্রবেশ করিবামাত্র, সভাস্ত সমস্ত লোকে, এককালে গাত্রোত্থান করিয়া, তাঁহার সংবর্দ্ধনা করিলেন। মহর্ষি ও তাঁহার দুই শিষ্যের নিমিত্ত পৃথক স্থান স্থিরীকৃত ছিল; তাঁহারা তথায় উপবিষ্ট হইলেন। সকলেই, সঙ্গীত শ্রবণের নিমিত্ত নিতান্ত অধৈর্য্য হইয়া, একান্ত উৎসুক চিত্তে; কখন আরম্ভ হয়, এই প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন।

কিয়ৎ ক্ষণ পরে, বাল্মীকি, সভার সর্ব্বাংশে নয়নসঞ্চারণ করিয়া, রামচন্দ্রকে বলিলেন, মহারাজ; সকলেই শ্রবণের নিমিত্ত উৎসুক হইয়াছেন; অতএব অনুমতি করুন, সঙ্গীতের আরম্ভ হউক। অনন্তর, তদীয় আদেশ অনুসারে, কুশ ও লব বীণাযন্ত্রসহযোগে সঙ্গীতের আরম্ভ করিল। বাল্মীকি পূর্ব্বেই কুশ ও লবকে শিখাইয়া রাখিয়াছিলেন, রামায়ণের যে সকল অংশে রামের ও সীতার পরপর স্নেহ ও অনুরাগ বর্ণিত আছে, তোমরা অদ্য ঐ সকল অংশেরই গান করিবে। তদনুসারে তাহারা কিয়ৎ ক্ষণ গান করিবামাত্র, রামের হৃদয় দ্রবীভূত হইল; তদীয় নয়নযুগল হইতে, প্রবল বেগে, বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। তিনি তাহাদের দুই সহোদরকে যত দেখিতে লাগিলেন, ততই, তাহারা সীতার তনয় বলিয়া, তাঁহার হৃদয়ে দৃঢ় প্রতীতি জন্মিতে লাগিল। ভরত, লক্ষণ, শত্রুঘ্ন ইঁহারাও, তাহাদের কলেবরে রামের ও সীতার সৌসাদৃশ্য প্রত্যক্ষ করিয়া, মনে মনে নানা বিতর্ক করিতে লাগিলেন। ইহা ব্যতিরিক্ত, সভাস্থ সমস্ত লোক, একবাক্য হইয়া, বলিতে লাগিলেন, কি আশ্চর্য্য! এই দুই ঋষিকুমার যেন রামচন্দ্রের প্রতিকৃতিস্বরূপ; যদি বেশে ও বয়সে বৈষম্য না থাকিত, তাহা হইলে, রামে ও এই দুই ঋষিকুমারে কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য লক্ষিত হইত না। বোধ হয়, যেন রাম, কুমারবয়স অবলম্বন পূর্ব্বক দুই মূর্ত্তি ধরিয়া, ঋষিকুমারের বেশপরিগ্রহ করিয়াছেন। এই বয়সে, রামের যেরূপ আকৃতি ও রূপ লাবণ্যের যেরূপ মাধুরী ছিল, ইহাদের অবিকল সেইরূপ লক্ষিত হইতেছে। যাহা হউক, সভাস্থ সমস্ত লোক, মোহিত ও নিস্পন্দ ভাবে অবস্থিত হইয়া, একতান মনে সঙ্গীতশ্রবণ, ও অনিমিষ নয়নে তাহাদের রূপনিরীক্ষণ, করিতে লাগিলেন।

কিয়ৎ ক্ষণ পরে, রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, ইহাদিগকে সহস্র সুবর্ণ পুরস্কার দাও। তাহারা, শ্রবণমাত্র, বিনয়নম্র বচনে বলিল, মহারাজ, আমরা বনবাসী, বিলাসী বা ভোগাভিলাষী নহি; যদৃচ্ছালব্ধ ফল মূল মাত্র আহার ও বল্কল মাত্র পরিধান করিয়া কালযাপন করি, আমাদের সুবর্ণে প্রয়োজন কি। আমরা, অনেক যত্নে, অনেক পরিশ্রমে, আপনকার চরিত কণ্ঠস্থ করিয়াছিলাম; আজ আপনকার সমক্ষে তাহার পরিচয় দিয়া, আমাদের সেই যত্ন ও সেই পরিশ্রম সর্ব্বতোভাবে সার্থক হইল। আপনি শ্রবণ করিয়া যে প্রীত ও প্রসন্ন হইয়াছেন, তাহাতেই আমরা চরিতার্থ হইয়াছি। বালকদিগের এইরূপ প্রবীণতা ও বীতস্পৃহতা দর্শনে, সকলে এককালে চমৎকৃত হইলেন।

কিয়ৎ ক্ষণ অবিচলিত নয়নে নিরীক্ষণ করিয়া, কুশ ও লব সীতার তনয় বলিয়া, কৌশল্যার অন্তঃকরণে দৃঢ় প্রতীতি জন্মিল। তখন তিনি, নিতান্ত অস্থিরচিত্ত হইয়া, দীর্ঘ নিশ্বাস সহকারে, হা বৎসে জানকি! ইহা বলিয়া, ভূতলে পতিত ও মূর্চ্ছিত হইলেন। সকলে, একান্ত বিকলান্তঃকরণ হইয়া, অশেষ যত্নে তাঁহার চৈতন্যসম্পাদন করিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ সঙ্গীত শ্রবণ করিয়া, সকলেরই হৃদয়ে সীতার শোক এত প্রবল ভাবে উদ্ভূত হইয়া উঠিল যে, সকলেই নিতান্ত অস্থির হইলেন, এবং অবিরল ধারায় বাষ্পবারিবিমোচন ও মুহুর্মুহুঃ দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। কৌশল্যা, নিরতিশয় অধীরা হইয়া, উন্মত্তার ন্যায় বলিতে লাগিলেন, ঐ দুই কুমারকে কেহ আমার নিকটে আনিয়া দাও; ক্রোড়ে লইয়া, এক বার আমি উহাদের মুখচুম্বন করিব; আমার জানকীর তনয়; উহাদিগকে দেখিয়া, আমার প্রাণ কেমন করিতেছে; হয় তোমরা উহাদিগকে আমার নিকটে আনিয়া দাও, নয় আমি উহাদের নিকটে যাই; ক্রোড়ে লইয়া, এক বার উহাদের মুখচুম্বন করিলে, আমার জানকীশোকের অনেক নিবারণ হইবে। ঐ দেখ না, উহাদের অবয়বে আমার রামের ও জানকীর সম্পূর্ণ লক্ষণ লক্ষিত হইতেছে। উহারা সভায় প্রবেশ করিবামাত্র, যেন কেহ আমায় বলিয়া দিল, ঐ তোমার রামের দুই বংশধর আসিতেছে; সেই অবধি উহাদের জন্য আমার প্রাণ কাঁদিয়া উঠিতেছে। আমি, বার বৎসরে, সীতাকে একপ্রকার ভুলিয়া গিয়াছিলাম; কিন্তু, উহাদিগকে দেখিয়া, আমার সীতাশোক পুনরায় নূতন হইয়া উঠিয়াছে। হা বৎসে জানকি! তুমি কোথায় রহিয়াছ, তোমার কি অবস্থা ঘটিয়াছে, অদ্যাপি জীবিত আছ, কি এই পাপিষ্ঠ নরলোক হইতে প্রস্থান করিয়াছ; কিছুই জানি না। এই বলিয়া, দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ করিয়া, কৌশল্যা পুনরায় মূর্চ্ছিত হইলেন। সকলে, সযত্ন হইয়া, পুনরায় তাঁহার চৈতন্যসম্পাদন করিলেন। তখন, কৌশল্যা, নিরতিশয় অধৈর্য্য হইয়া, বলিতে লাগিলেন, এখনও তোমরা উহাদিগকে আমার নিকটে আনিয়া দিলে না; না হয় কেহ এক বার, লক্ষ্মণের নিকটে গিয়া, আমার নাম করিয়া বলুক; লক্ষ্মণ এখনই উহাদিগকে আনিয়া আমার ক্রোড়ে দিবে।

কৌশল্যার এইরূপ অস্থিরতা ও কাতরতা দেখিয়া, অরুদ্ধতীর আদেশ অনুসারে, সমীপবর্ত্তিনী প্রতিহারী, লক্ষ্মণের নিকটে গিয়া, সবিশেষ সমস্ত বলিয়া, কৌশল্যার অভিপ্রায় তাঁহার গোচর করিল। লক্ষ্মণ, কৌশলক্রমে, সে দিবস সেই পর্য্যন্ত সঙ্গীতক্রিয়া রহিত করিয়া, সভাভঙ্গ করিলেন; এবং, কুশ ও লবকে সমভিব্যাহারে লইয়া, কৌশল্যার নিকটে উপস্থিত হইলেন। কৌশল্যা, তাহাদের দুই সহোদরকে ক্রোড়ে লইয়া, স্নেহভরে, বারংবার উভয়ের মুখচুম্বন করিলেন, এবং হা বৎসে জানকি! তুমি কোথায় রহিয়াছ; এই বলিয়া, নিতান্ত কাতর হইয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে, সুমিত্রা, উর্ম্মিলা প্রভৃতি সকলেই, সাতিশয় শোকাভিভূত হইয়া, অবিশ্রান্ত অশ্রুপাত, বিলাপ, ও পরিতাপ করিতে আরম্ভ করিলেন। কুশ ও লব, এই সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া, অবাক্ হইয়া রহিল।

কিয়ৎ ক্ষণ পরে, কৌশল্যা, কিঞ্চিৎ অংশে শোকসংবরণ করিয়া, সন্দেহভঞ্জনমানসে, তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের ও তোমাদের জনক জননীর নাম কি? তাহারা, অতি বিনীত ভাবে, স্বস্বনামকীর্ত্তন করিয়া, বলিল, আমাদের পিতা কে, তাহা আমরা জানি না; এ পর্য্যন্ত আমরা তাঁহাকে দেখি নাই; আমাদের জননী আছেন, তিনি তপস্বিনী; কিন্তু, এক দিনও, আমরা তাঁহার নাম শুনি নাই, কেহ আমাদিগকে বলিয়া দেয় নাই; আমরাও তাঁহাকে বা অন্য কাহাকেও কখনও জিজ্ঞাসা করি নাই। আমরা মহর্ষি বাল্মীকির শিষ্য; তাঁহার তপোবনে প্রতিপালিত হইয়াছি, এবং তাঁহারই নিকট বিদ্যাশিক্ষা করিয়াছি; আকুল চিত্তে এই সকল কথা শুনিয়া, অনেক অংশে, কৌশল্যার সংশয়াপনোদন হইল। কিন্তু, সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত না হইয়া, তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের জননীর আকৃতি কিরূপ? কুশ ও লব তদীয় আকৃতির যথাযথ বর্ণনা করিল। তখন, তাহারা সীতার তনয় বলিয়া, এককালে সকলের দৃঢ় নিশ্চয় হইল; এবং কৌশল্যা প্রভৃতি সমস্ত রাজপরিবারের শোকসিন্ধু, অনিবার্য্য বেগে, উথলিয়া উঠিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, কৌশল্যা কুশ ও লবকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের জননী কেমন আছেন? তাহারা বলিল, তাঁহাকে সর্ব্বদাই জীবন্মৃতপ্রায় দেখিতে পাই; বিশেষতঃ, তিনি দিন দিন যেরূপ ক্ষীণ হইতেছেন, তাহাতে বোধ হয়, অধিক দিন বাঁচিবেন না। এই কথা বলিতে বলিতে, তাহাদের দুই সহোদরের নয়নযুগল অশ্রুজলে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল।

কুশ ও লবের এই সকল কথা শুনিয়া, সকলেই যৎপরোনাস্তি বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন। কৌশল্যা, কিঞ্চিৎ ধৈর্য্য অবলম্বন করিয়া, সম্পূর্ণ রূপে সন্দেহভঞ্জন করিবার নিমিত্ত, লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, তুমি এক বার মহর্ষি বাল্মীকিকে এই স্থানে আন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, মহর্ষি বাল্মীকি, লক্ষ্মণ সমভিব্যাহারে, তথায় উপস্থিত হইলে, সকলে, যথোচিত ভক্তিযোগ সহকারে প্রণাম করিয়া, পরম সমাদরে আসনে উপরেশন করাইলেন। অনন্তর, কৌশল্যা কৃতাঞ্জলিপুটে জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবন্, আপনকার এই দুই শিষ্য কে, কৃপা করিয়া সবিশেষ বলুন। বাল্মীকি, যে দিন লক্ষ্মণ সীতাকে বিসর্জন দিয়া আইসেন, সেই অবধি আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত নির্দিষ্ট করিয়া, রামের বিরহে সীতার যাদৃশী অবস্থা ঘটিয়াছে, তাহার যথাযথ বর্ণনা করিলেন। সমুদয় শ্রবণগোচর করিয়া, সকলেরই চক্ষের জলে বক্ষঃস্থল ভাসিয়া যাইতে লাগিল। কৌশল্যা, শোকে একান্ত অভিভূত হইয়া, হা বৎসে জানকি! বিধাতা তোমার কপালে এত দুঃখ লিখিয়াছিলেন, এই বলিয়া বিলাপ করিতে লাগিলেন। যাহা হউক, সীতা অদ্যাপি জীবিত আছেন, এবং কুশ ও লব তাঁহার তনয়, এ বিষয়ে আর অণুমাত্র সংশয় রহিল না।

এত দিনের পর আত্মপরিচয় পাইয়া, কুশ ও লবের অন্তঃকরণে নানা অনির্বচনীয় ভাবের উদয় হইতে লাগিল। বাল্মীকি তাহাদিগকে বলিলেন, বৎস কুশ বৎস লব, পিতামহীদের ও পিতৃব্যপত্নীদিগের চরণবন্দনা কর। তাহারা তৎক্ষণাৎ কৌশল্যা, কেকয়ী, ও সুমিত্রার, এবং ঊর্মিলা, মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্ত্তির চরণে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিল। অনন্তর, মহর্ষি বলিলেন, তোমরা রামায়ণে লক্ষ্মণ নামে যে মহাপুরুষের গুণকীর্ত্তনপাঠ করিয়াছ, তিনি এই; ইনি তোমাদের তৃতীয় পিতৃব্য; এই বলিয়া, লক্ষ্মণকে দেখাইয়া দিলেন। তাহারা, লক্ষ্মণ এই শব্দ কর্ণগোচর হইবামাত্র, বিস্ময়বিস্ফারিত নয়নে, পদ অবধি মস্তক পর্য্যন্ত নিরীক্ষণ করিয়া, দৃঢ়তর ভক্তিযোগ সহকারে, তাঁহার চরণে প্রণাম করিল।

এই রূপে কিয়ৎ ক্ষণ অতীত হইলে, কৌশল্যা লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, তুমি ত্বরায় রামকে ও বশিষ্ঠদেবকে এখানে আন। তদনুসারে, লক্ষ্মণ, অল্প ক্ষণ মধ্যে, রাম ও বশিষ্ঠদেবকে সমভিব্যাহারে লইয়া, তথায় উপস্থিত হইলেন। কৌশল্যা, বাষ্পাকুল লোচনে, শোকাকুল বচনে, তাঁহাদের নিকট, কুশ ও লবের প্রকৃত পরিচয় দিলেন, এবং সীতা যে তৎকাল পর্য্যন্ত জীবিত আছেন, তাহাও বলিলেন। কুশ ও লবের বিষয়ে রামচন্দ্রের অন্তঃকরণে যে সংশয় ছিল, তাহা সম্পূর্ণ রূপে অপসারিত হইল। চক্ষের জলে তাঁহার বক্ষঃস্থল ভাসিয়া গেল। তিনি, অপ্রমেয় বাৎসল্যভরে, নিস্পন্দ নয়নে, কুশ ও লবের মুখনিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। অনন্তর, কৌশল্যা সপুত্ত্রী সীতার পরিগ্রহের প্রস্তাব করিলেন। রামচন্দ্র মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। কৌশল্যা তদীয় মৌনাবস্থানকে সম্মতিদান স্থির করিয়া, সীতার আনয়নের নিমিত্ত বাল্মীকির নিকটে প্রার্থনা করিলেন। বাল্মীকি, অবিলম্বে বাসকুটীরে গমন করিয়া, কৌশল্যার প্রেরিত শিবিকাধান সমভিব্যাহারে, আপন এক শিষ্যকে পাঠাইলেন; বলিয়া দিলেন, তুমি জানকীরে এই যানে আরোহণ করাইয়া, আমার বাসকুটীরে লইয়া আসিবে।

ক্রমে ক্রমে, সমবেত নিমন্ত্রিতগণ অবগত হইলেন, রামায়ণগায়ক বাল্মীকিশিষ্যেরা রাজতনয়; সীতা, পরিত্যাগের পর, বাল্মীকির আশ্রমে তাহাদিগকে প্রসব করিয়াছেন; তিনি অদ্যাপি জীবিত আছেন; রাজা তাঁহারে গৃহে লইবেন; তাঁহার আনয়নের নিমিত্ত লোক প্রেরিত হইয়াছে। এই সংবাদে অনেকেই প্রীতিপ্রাপ্ত হইলেন। কিন্তু কেহ কেহ বলিতে লাগিলেন, আমাদের রাজা অতি অব্যবস্থিতচিত্ত; যদি জানকীরে পুনরায় গৃহে লইবেন, তবে পরিত্যাগ করিবার কি আবশ্যকতা ছিল? তখনও যে জানকী, এখনও সেই জানকী; তখনও যে কারণে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন, এখনও সে কারণ বিদ্যমান রহিয়াছে; বড় লোকের রীতি চরিত্র বুঝা ভার।

সীতার পরিগ্রহ বিষয়ে রাম একপ্রকার স্থিরনিশ্চয় হইয়াছিলেন; কিন্তু, এই সকল কথা কর্ণপরম্পরায় তাঁহার কর্ণগোচর হইলে, পুনরায় চলচিত্ত হইলেন। তিনি মনে করিয়াছিলেন, এক্ষণে জানকীরে গৃহে লইলে, প্রজালোকে আর আপত্তির উত্থাপন করিবে না। কিন্তু, অদ্যাপি তাহাদের হৃদয় হইতে সীতার চরিত্রসংক্রান্ত সংশয় অপনীত হয় নাই দেখিয়া, তিনি বিষাদসাগরে মগ্ন হইলেন; এবং, কিংকর্ত্তব্য বিমূঢ় হইয়া, লক্ষ্মণের সহিত পরামর্শ করিতে লাগিলেন। অনেক বাদানুবাদের পর, ইহাই নির্দ্ধারিত হইল যে, সমবেত সমস্ত লোকের সমক্ষে, সীতা স্বীয় শুদ্ধচারিতা প্রমাণসিদ্ধ করিলে, রাম তাঁহাকে গৃহে লইবেন। রামের আদেশ অনুসারে, লক্ষ্মণ এই কথা বাল্মীকির গোচর করিলেন।

লক্ষ্মণের মুখে সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, বাল্মীকি, অবিলম্বে, রামচন্দ্রের নিকট উপস্থিত হইলেন; এবং, সীতা যে সম্যক্‌ শুদ্ধচারিণী, সে বিষয়ে তাঁহাকে অশেষ প্রকারে বুঝাইতে আরম্ভ করিলেন। রামচন্দ্র বলিলেন, ভগবন্, সীতার শুদ্ধচারিতা বিষয়ে আমার অণুমাত্র সংশয় নাই। কিন্তু আমি, রাজ্যের ভার গ্রহণ করিয়া, নিতান্ত পরায়ত্ত হইয়াছি। আপনারাই উপদেশ দিয়া থাকেন, প্রাণপণে প্রজারঞ্জন করাই রাজার পরম ধর্ম্ম; কোনও কারণে তাহাতে অণুমাত্র উপেক্ষা প্রদর্শন করিলে, ইহ লোকে অকীর্ত্তিভাজন ও পরলোকে নিরয়গামী হইতে হয়। প্রজালোকের অন্তঃকরণে সীতার চরিত্র বিষয়ে বিষম সংশয় জন্মিয়া আছে; সে সংশয় অপসারিত না হইলে, আমি কি রূপে গ্রহণ করি, বলুন। আমি, সীতার পরিত্যাগদিবস অবধি, সকল সুখে জলাঞ্জলি দিয়াছি; কি রূপে এত দিন জীবিত রহিয়াছি, বলিতে পারি না। নিতান্ত অনায়ত্ত হওয়াতেই, আমায় সীতারে নির্বাসিত করিতে হইয়াছে। এক বার মনে করিয়াছিলাম, প্রজালোকে অসন্তুষ্ট হয়, হউক, আমি আর তাহাদের অনুরোধে সীতা গ্রহণে পরাঙ্মুখ হইব না। কিন্তু তাহাতে রাজধর্ম্মের প্রতিপালন হয় না; সুতরাং, সে বিষয়ে সাহস করিতে পারিলাম না। আর বার ভাবিয়াছিলাম, না হয়, ভরতের হস্তে রাজ্যভার সমর্পিত করিয়া, রাজকার্য্য হইতে অবসৃত হইব; তাহা হইলে, আর আমার জানকীপরিগ্রহের কোনও প্রতিবন্ধক থাকিবে না। অবশেষে, অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া সে উপায় অবলম্বন করাও শ্রেয়ঃকল্প বলিয়া বোধ হইল না। আমি জানকীর প্রতি যেরূপ নৃশংস আচরণ করিয়াছি, তাহাতে নিঃসন্দেহ ঘোরতর অধর্ম্মগ্রস্ত হইয়াছি; এ যাত্রা, আমি নিরবচ্ছিন্ন দুঃখভোগে জীবনযাপন করিবার নিমিত্তই জন্মগ্রহণ করিয়াছিলাম। আমি এক্ষণে যে বিষম মানসিক কষ্টে কালহরণ করিতেছি, তাহা আমার অন্তরাত্মাই জানেন। যদি এই মুহূর্ত্তে আমার প্রাণবিয়োগ হয়, তাহা হইলে, আমি পরিত্রাণ বোধ করি।

এই বলিয়া, একান্ত বিকলচিত্ত হইয়া, রাম অনিবার্য্য বেগে বাষ্পবারিবিসর্জন করিতে লাগিলেন; কিয়ৎ ক্ষণ পরে, কিঞ্চিৎ শান্তচিত্ত হইয়া, অঞ্জলিবন্ধ পূর্ব্বক, বিনয়বাক্যে সম্ভাষণ করিয়া, বাল্মীকিকে বলিলেন, ভগবন্, আপনকার নিকটে আমার প্রার্থনা এই, সীতা উপস্থিত হইলে, আপনি তাঁহারে আপন সমভিব্যাহারে সভামণ্ডপে লইয়া যাইবেন, এবং অনুগ্রহ করিয়া, তাঁহার পরিগ্রহ বিষয়ে সকলের সম্মতি জিজ্ঞাসিবেন। যদি তাঁহার পরিগ্রহ সর্বসম্মত হয়, তৎক্ষণাৎ গ্রহণ করিব। সর্বসম্মত না হইলে, তাঁহাকে, কোনও অসন্দিগ্ধ প্রমাণ দ্বারা, প্রজাবর্গের সন্দেহনিরাকরণ করিতে হইবে। বাল্মীকি, অগত্যা সম্মত হইয়া, বিষণ্ণ বদনে বাসসদনে প্রতিগমন করিলেন।

এ দিকে, সীতা, কৌশল্যার প্রেরিত শিবিকাযান উপস্থিত দেখিয়া, এবং মহর্ষির প্রেরিত শিষ্যের মুখে তদীয় আদেশ শুনিয়া, মনে মনে বলিতে লাগিলেন, বুঝি বিধি, সদয় হইয়া, এত দিনের পর, আমার দুঃখের অবসান করিলেন। যখন ঠাকুরাণী শিবিকা পাঠাইয়াছেন, তখন আমি পুনরায় পরিগৃহীতা হইব, সন্দেহ নাই। বোধ হয়, এই জন্যই আজ আমার বাম নয়ন অনবরত স্পন্দিত হইতেছে। আমি আর্য্যপুত্রের স্নেহ, দয়া, ও মমতা জানি; নিতান্ত অনায়ত্ত হওয়াতেই, তিনি আমায় নির্বাসিত করিয়াছিলেন। আমি তাঁহার বিরহে যেমন কাতর, তিনিও আমার বিরহে সেইরূপ কাতর, তাহার কোনও সন্দেহ নাই। যদি আমার প্রতি স্নেহের কোনও অংশে খর্ব্বতা ঘটিত, তাহা হইলে তিনি কখনই পুনরায় দারপরিগ্রহে বিমুখ হইতেন না। তিনি, সহধর্ম্মিণীস্থলে আমার প্রতিকৃতি স্থাপিত করিয়া, স্নেহের পরা কাষ্ঠা দেখাইয়াছেন, এবং আমার সকল শোকের ও সকল ক্ষোভের নিবারণ করিয়াছেন। পুনরায় যে আমার অদৃষ্টে আর্য্যপুত্ত্রের সহবাসসুখ ঘটিবে, তাহা স্বপ্নেও ভাবি নাই।

এইরূপ বলিতে বলিতে, আহ্লাদভরে, জানকীর নয়নযুগল হইতে প্রবল বেগে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। তাঁহার শরীরে শতগুণ বলাধান ও চিত্তে অপরিমিত স্ফুর্ত্তির ও উৎসাহের সঞ্চার হইল। পুনরায় পরিগৃহীতা হইলাম ভাবিয়া, তাঁহার হৃদয়কন্দর অভূতপূর্ব্ব আনন্দপ্রবাহে উচ্ছলিত হইয়া উঠিল। আশার আশ্বাসনী শক্তির ইয়ত্তা নাই। তিনি, আশার উপর নির্ভর করিয়া, মনে মনে কতই কল্পনা করিতে লাগিলেন। রামের সহিত সমাগম হইলে, যে সকল ব্যাপার ঘটিতে পারে, তিনি তৎসমুদয় আপন চিত্তপটে চিত্রিত করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি এক বার বোধ করিলেন, যেন তিনি রামের সম্মুখে নীত হইয়াছেন; রাম লজ্জায় মুখ তুলিয়া তাঁহার সহিত কথা কহিতে পারিতেছেন না; আর বার বোধ করিতে লাগিলেন, যেন রাম, অশ্রুপূর্ণ নয়নে, স্নেহভরে প্রিয় সম্ভাষণ করিতেছেন, তিনি কথা কহিতেছেন না, অভিমানভরে বদন বিরস করিয়া দাঁড়াইয়া আছেন; এক বার বোধ করিলেন, যেন প্রথমসমাগমক্ষণে, উভয়েই জড়প্রায় হইয়া, স্থির নয়নে উভয়ের বদননিরীক্ষণ করিতেছেন, এবং উভয়েরই চক্ষের জলে বক্ষঃস্থল ভাসিয়া যাইতেছে; আর বার বোধ করিতে লাগিলেন, যেন উভয়ে একাসনে উপবেশন করিয়া, পরস্পর দীর্ঘবিরহকালীন দুঃখের বর্ণনা করিতে করিতে, অপরিজ্ঞাত রূপে রজনীর অবসান হইয়া গেল; এক বার বোধ করিলেন, যেন তিনি শ্বশ্রূদিগের সম্মুখে নীত হইয়া তাঁহাদের চরণবন্দনা করিলে, তাঁহারা বাষ্পপূর্ণ নয়নে তাঁহার মুখচুম্বন করিলেন, এবং তাঁহাকে কঙ্কালমাত্র অবশিষ্ট দেখিয়া, শোকভরে কতই পরিতাপ করিতে লাগিলেন; আর বার বোধ করিতে লাগিলেন, যেন তিনি, শ্বশ্রূদিগের নিকটে উপবিষ্ট হইয়া, তাঁহাদের জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেছেন, এমন সময়ে তাঁহার দেবরেরা তথায় উপস্থিত হইলেন, এবং বাষ্পাকুল লোচনে গদ্গদ বচনে, আর্য্যে, প্রণাম করি, ইহা বলিয়া অভিবাদন করিলেন; এক বার বোধ করিলেন, যেন তাঁহার ভগিনীরা আসিয়া প্রণাম আসিয়া করিলেন; এবং, দীর্ঘবিয়োগের পর, পরস্পরসন্দর্শনে শোক প্রবাহ উচ্ছলিত হওয়াতে, সকলে মিলিয়া, গলদশ্রু লোচনে বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন; আর বার বোধ করিতে লাগিলেন, যেন হিরণ্ময়ী প্রতিকৃতি অপসারিত হইয়াছে; তিনি, রামের বামে বসিয়া, যজ্ঞক্ষেত্রে সহধর্ম্মিণীকার্য্য সম্পন্ন করিতেছেন।

এইরূপ অনেকরূপ অনুভব করিতে করিতে, আহ্লাদভরে পুলকিতকলেবরা হইয়া, জানকী শিবিকায় আরোহণ করিলেন; এবং, পর দিবস সায়ং সময়ে, নৈমিষে উপনীতা হইলেন। বাল্মীকি বলিলেন, বৎসে, রাজা রামচন্দ্র তোমার পুনর্গ্রহণে সন্মত হইয়াছেন। কল্য, যৎকালে, তিনি সভামণ্ডপে অবস্থিতি করিবেন, সেই সময়ে, সর্ব্ব সমক্ষে, আমি তোমায় তাঁহার হস্তে সমর্পিত করিব। বাল্মীকির মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আমি সীতার পরিগ্রহ প্রার্থনা করিলে, কোনও ব্যক্তি, সাহস করিয়া, সভামধ্যে অসম্মতিপ্রদর্শন করিতে পারিবে না। এজন্য, তিনি, শুদ্ধচারিতার প্রমাণ প্রদর্শন আবশ্যক হইলেও হইতে পারে, এ কথার উল্লেখ মাত্র করিলেন না। অনন্তর, জানকী, বিরলে বসিয়া, কুশ ও লবের মুখে সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, স্বীয় পরিগ্রহ বিষয়ে সম্পূর্ণ রূপে মুক্তসংশয়া হইলেন; এবং আহ্লাদে অধৈর্য্য হইয়া, প্রতি ক্ষণে প্রভাত প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন; সমস্ত রাত্রি, এক বারও, নয়ন মুদ্রিত করিতে পারিলেন না।

রজনী অবসন্না হইল। মহর্ষি বাল্মীকি, স্নান, আহ্নিক সমাপিত করিয়া, সীতা, কুশ, লব, ও শিষ্যবর্গ সমভিব্যাহারে, সভামণ্ডপে উপস্থিত হইলেন। সীতাকে কঙ্কাল মাত্রে পর্য্যবসিত দেখিয়া, রামের হৃদয় বিদীর্ণ হইবার উপক্রম হইল। অতিকষ্টে তিনি উচ্ছলিত শোকাবেগের সংবরণে সমর্থ হইলেন; এবং, না জানি, আজ প্রজালোকে কিরূপ আচরণ করে, এই চিন্তায় আক্রান্ত হইয়া, একান্ত আকুল হৃদয়ে কালযাপন করিতে লাগিলেন। সীতার অবস্থা দর্শনে অনেকেরই অন্তঃকরণে কারুণ্যরসের সঞ্চার হইল। বাল্মীকি, আসনপরিগ্রহ না করিয়াই, উচ্চৈঃ স্বরে বলিতে লাগিলেন, এই সভায় নানাদেশীয় নরপতিগণ, কোশল রাজ্যের প্রধান প্রধান প্রজাগণ, এবং অপরাপর সহস্র সহস্র পৌরবর্গ ও জানপদগণ সমবেত হইয়াছ; তোমরা সকলেই অবগত আছ, রাজা রামচন্দ্র, অমূলকলোকাপবাদশ্রবণে চলচিত্ত হইয়া, নিতান্ত নিরপরাধে, জানকীরে নির্বাসিত করিয়াছিলেন; এক্ষণে তোমাদের সকলের নিকট আমার অনুরোধ এই, তাঁহার পরিগ্রহ বিষয়ে তোমরা প্রশস্ত মনে অনুমোদন প্রদর্শন কর; জানকী যে সম্পূর্ণ শুদ্ধচারিণী, সে বিষয়ে মনুষ্যমাত্রের অন্তঃকরণে অণুমাত্র সংশয় হইতে পারে না।

ইহা বলিয়া, বাল্মীকি বিরত হইলে, সভামণ্ডপে অতিমহান্ কোলাহল উত্থিত হইল। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, নরপতিগণ ও প্রধান প্রধান প্রজাগণ, দণ্ডায়মান হইয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, আমরা অকপট হৃদয়ে বলিতেছি, রাজা রামচন্দ্র সীতা দেবীর পুনরায় গ্রহণ করিলে, আমরা যার পর নাই পরিতোষলাভ করিব। কিন্তু, তদ্ব্যতিরিক্ত সমস্ত লোক, অবনত বদনে, মৌনাবলম্বন করিয়া রহিল। রাম, এত ক্ষণ, বিষম সংশয়ে কালযাপন করিতেছিলেন; এক্ষণে স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন, সীতার পরিগ্রহ বিষয়ে সর্ব্বসাধারণের সম্মতি নাই। এজন্য তিনি, নিতান্ত ম্লানবদন ও ম্রিয়মাণপ্রায় হইয়া, হতবুদ্ধির ন্যায়, স্থির নয়নে বাল্মিকীর, মুখনিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। বাল্মিকী, অতিমাত্র হতোৎসাহ হইয়া, উপায়ান্তর দেখিতে না পাইয়া, সীতাকে বলিলেন, বৎসে জানকি, তোমার চরিত্র বিষয়ে প্রজালোকের মনে যে সংশয় জন্মিয়া আছে, অদ্যাপি তাহা অপনীত হয় নাই; অতএব তুমি, কোনও বিশিষ্ট প্রমাণ দর্শাইয়া, সকলের অন্তঃকরণ হইতে সেই সংশয়ের অপসারণ কর। সীতা, বাল্মীকির দক্ষিণ পার্শ্বে দণ্ডায়মানা থাকিয়া, নিতান্ত আকুল হৃদয়ে, প্রতি ক্ষণেই পরিগ্রহপ্রতীক্ষা করিতেছিলেন, শ্রবণমাত্র বজ্রাহতার প্রায় গতচেতনা হইয়া, বাতাহতা লতার ন্যায়, ভূতলে পতিতা হইলেন।

জননীর তাদৃশী দশা দেখিয়া, অতিমাত্র কাতর হইয়া, কুশ ও লব উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিয়া উঠিল। রাম, অতিমহতী লোকানুরাগপ্রিয়তার সহায়তায়, এ পর্য্যন্ত ধৈর্য্য অবলম্বন করিয়া ছিলেন; কিন্তু সীতাকে ভূতলশায়িনী দেখিয়া, কুশ ও লবের আর্ত্তনাদ শ্রবণগোচর করিয়া, অতিদীর্ঘনিশ্বাসভারপরিত্যাগ পূর্ব্বক, হা প্রেয়সি! বলিয়া, মূর্চ্ছিত ও সিংহাসন হইতে ধরাতলে পতিত হইলেন। কৌশল্যা, শোকে নিতান্ত বিহ্বল হইয়া, হা বৎসে জানকি? এই বলিয়া মূর্চ্ছিত হইলেন। সীতার ভগিনীরাও, দুঃসহ শোকভরে অভিভূত হইয়া, হায়! কি হইল বলিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে আরম্ভ করিলেন। এই সকল ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিয়া, সভাস্থ সমস্ত লোক, স্তব্ধ ও হতবুদ্ধি হইয়া, চিত্রার্পিতপ্রায় উপবিষ্ট রহিলেন। ভরত, লক্ষ্মণ, ও শত্রুঘ্ন, শোকে একান্ত অভিভূত হইয়াও, ধৈর্য্য অবলম্বন পূর্ব্বক, রামচন্দ্রের চৈতন্যসম্পাদনে তৎপর হইলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, তাঁহার চৈতন্যলাভ হইল। বাল্মীকিও, সীতার চৈতন্যসম্পাদনের নিমিত্ত, অশেষপ্রকারে প্রয়াস পাইলেন। কিন্তু তাঁহার সমস্ত প্রয়াস বিফল হইল। তিনি, কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, বুঝিতে পারিলেন, সীতা মানবলীলার সংবরণ করিয়াছেন।

সীতা নিতান্ত সুশীলা ও একান্ত সরলহৃদয়া ছিলেন; তাঁহার তুল্য পতিপরায়ণা রমণী কখনও কাহারও দৃষ্টিবিষয়ে বা শ্রুতিগোচরে পতিত হয় নাই। তিনি স্বীয় বিশুদ্ধ চরিতে পতিপরায়ণতা গুণের এরূপ পরা কাষ্ঠা প্রদর্শিত করিয়া গিয়াছেন যে, বোধ হয়, বিধাতা, মানবজাতিকে পতিব্রতাধর্ম্মে উপদেশ দিবার নিমিত্ত, সীতার সৃষ্টি করিয়াছিলেন। তাঁহার তুল্য সর্ব্বগুণসম্পন্না কামিনী কোনও কালে ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, অথবা তাঁহার ন্যায় সর্ব্বগুণসম্পন্ন পতি পাইয়া, কখনও কোনও কামিনী তাঁহার মত দুঃখভাগিনী হইয়াছেন; এরূপ বোধ হয় না।

সম্পূর্ণ।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

পর দিন, প্রভাত হইবামাত্র, লক্ষ্মণ সুমন্ত্রকে বলিলেন, সারথে, অবিলম্বে রথ প্রস্তুত করিয়া আন; আর্য্যা জানকী তপোবনদর্শনে গমন করিবেন। সুমন্ত্র, আদেশপ্রাপ্তিমাত্র, রথ প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত, প্রস্থান করিলেন। অনন্তর, লক্ষ্মণ জানকীর বাসভবনে গমন করিয়া দেখিলেন, তিনি, তপোবনগমনের উপযোগী সমস্ত আয়োজন করিয়া, প্রস্তুত হইয়া, রথের প্রতীক্ষা করিতেছেন। লক্ষ্মণ, সন্নিহিত হইয়া, আর্য্যে, অভিবাদন করি, এই বলিয়া প্রণাম করিলেন। সীতা, বৎস, চিরজীবী ও চিরসুখী হও; এই বলিয়া, অকৃত্রিম স্নেহ সহকারে, আশীর্বাদ করিলেন। লক্ষ্মণ বলিলেন, আর্য্যে, রথ প্রস্তুতপ্রায়, প্রস্থানের অধিক বিলম্ব নাই। সীতা, পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়া, প্রফুল্ল বদনে বলিলেন, বৎস, অদ্য প্রভাতে তপোবনদর্শনে যাইব, এই আনন্দে আমি রাত্রিতে নিদ্রা যাই নাই; সমস্ত আয়োজন করিয়া, প্রস্তুত হইয়া আছি; রথ উপস্থিত হইলেই আয়োহণ করি। আমি মনে করিয়াছিলাম, আর্য্যপুত্র, এমন সময়ে, আমার তপোবনগমনে আপত্তি করিবেন; তাহা না করিয়া, প্রসন্ন মনে অনুমোদন করাতে, আমি কত প্রীতিলাভ করিয়াছি, বলিতে পারি। বোধ হয়, আমি জন্মান্তরে অনেক তপস্যা করিয়াছিলাম; সেই তপস্যার বলে, এমন অনুকূল পতি পাইয়াছি; আর্য্যপুত্রের মত অনুকূল পতি কখনও কাহারও ভাগ্যে ঘটে মাই আর্য্যপুত্রের স্নেহ, দয়া, ও মমতার কথা মনে হইলে, আমার সৌভাগ্যগর্ব্ব হইয়া থাকে। আমি দেবতাদের নিকট, কায়মনোবাক্যে, নিয়ত এই প্রার্থনা করিয়া থাকি, যদি পুনরায় নারীজন্ম হয়, যেন আর্য্যপুত্রকে পতি পাই। এই বলিয়া, সীতা প্রীতিপ্রফুল্ল ‘নয়নে বলিলেন, বৎস, বনবাসকালে, মুনিপত্নীদের সহিত আমার নিরতিশয়, প্রণয় হইয়াছিল; তাঁহাদিগকে দিবার নিমিত্ত, এই সমস্ত বিচিত্র বসন ও মহামূল্য আভরণ লইয়াছি।

এই বলিয়া, সীতা সেই সমুদয় লক্ষ্মণকে দেখাইতেছেন; এমন সময়ে, প্রতিহারী আসিয়া সংবাদ দিল, সুমন্ত্র রথ প্রস্তুত করিয়া দ্বারদেশে আনিয়াছেন। সীতা, তপোবনদর্শনে যাইবার নিমিত্ত, এত উৎসুক হইয়াছিলেন যে, শ্রবণমাত্র, অতিমাত্র ব্যগ্র হইয়া, সমুদয় দ্রব্যসামগ্রী লইয়া, লক্ষ্মণ সমভিব্যাহারে, রথে আরোহণ করিলেন। অনধিক সময়েই, রথ, অযোধ্যা হইতে বিনির্গত হইয়া, জনপদে প্রবিষ্ট হইল। সীতা, নয়নের ও মনের প্রতিপদ প্রদেশ সকল প্রত্যক্ষ করিয়া, প্রীত মনে বলিতে লাগিলেন, বৎস লক্ষ্মণ, আমি যে এই সকল মনোহর প্রদেশ, দেখিতেছি, ইহা কেবল আর্য্যপুত্রের প্রসাদের ফল; তিনি প্রসন্ন মনে অনুমোদন করিলে, আমার ভাগ্যে এ প্রীতিলাভ ঘটিয়া উঠিত না। আমি যেমন আহ্লাদ করিয়া প্রার্থনা করিয়াছিলাম, তিনিও তেমনই অনুকূলতাপ্রদর্শন করিয়াছেন। লক্ষ্মণ, মুগ্ধভাবা সীতার এইরূপ হর্ষাতিশয় দেখিয়া, এবং, অবশেষে রামচন্দ্র কিরূপ অনুকূলতাপ্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা ভাবিয়া, মনে মনে ম্রিয়মাণ হইলেন; অতি কষ্টে উচ্ছলিত, শোকাবেগের সংবরণ করিলেন; এবং, অনেক যত্নে, ভাবগোপন করিয়া, সীতার ন্যায় হর্ষপ্রদর্শন করিতে লাগিলেন।

এই ভাবে কিয়ৎ দূর গমন করিলে পর, সীতা সহসা ম্লানবদনা হইয়া লক্ষণকে বলিলেন, বৎস, এত ক্ষণ আমি মনের আনন্দে আসিতেছিলাম; কিন্তু সহসা আমার ভাবান্তর উপস্থিত হইল। দক্ষিণ নয়ন অনবরত স্পন্দিত হইতেছে; সর্ব্ব শরীর কম্পিত হইতেছে; অন্তঃকরণ, যার পর নাই, ব্যাকুল হইতেছে; পৃথিবী শূন্যময় দেখিতেছি। অকস্মাৎ এরূপ চিত্তচাঞ্চল্য ও অসুখের আবির্ভাব হইল কেন! কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। না জানি, আর্য্যপুত্র কেমন আছেন। হয় তাঁহার কোনও অশুভঘটনা হইয়াছে, নয় প্রাণাধিক ভরত ও শত্রুঘ্নের কোনও অনিষ্ট ঘটিয়াছে; কিংবা ভগবান্‌ ঋষ্যশৃঙ্গের আশ্রম হইতেই কোনও অশুভ সংবাদ আসিয়াছে; তথায় গুরুজন কে কেমন আছেন, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি। যাহা হউক, কোনও প্রকার সর্ব্বনাশ ঘটিয়াছে, তাহার সন্দেহ নাই; নতুবা, এমন আনন্দের সময়, এরূপ চিত্তচাঞ্চল্য ও অসুখসঞ্চার উপস্থিত হইবে কেন? যৎস, কি নিমিত্ত এরূপ হইতেছে ফল; আমার প্রাণ কেমন করিতেছে, আর আমার তপোবনদর্শনে অভিলাষ হইতেছে না; আমার ইচ্ছা হইতেছে, এখনই অযোধ্যায় ফিরিয়া যাই। ভাল, তোমায় জিজ্ঞাসা করি, আর্য্যপুত্র সঙ্গে আসিবেন বলিয়াছিলেন; তাঁহার আসা হইল না কেন? রথে উঠিবার সময়, আহ্লাদে তোমায় সে কথা জিজ্ঞাসিতে ভুলিয়াছিলাম। তাঁহার না আসাতে, আমার মনে নানা সন্দেহ উপস্থিত হইতেছে। বৎস, কি করি বল; আমার চিত্তচাঞ্চল্য ক্রমেই প্রবল হইতেছে। রাবণ হরণ করিয়া লইয়া যাইবার পূর্ব্ব ক্ষণে, ঠিক এইরূপ চিত্তচাঞ্চল্য ঘটিয়াছিল; আবার কি সেইরূপ কোনও উৎপাত উপস্থিত হইবে? না জানি, কি সর্ব্বনাশই ঘটিবে। এক বার মনে হইতেছে, তপোবন দর্শনে না আসিলে ভাল হইত; আর্য্যপুত্রের নিকটে থাকিলে, কখনও এরূপ অসুখ উপস্থিত হইত না। এক এক বার মনে হইতেছে, আর আমি এ জন্মে আর্য্যপুত্রকে দেখিতে পাইব না।

সীতার এইরূপ চিত্তচাঞ্চল্য দেখিয়া ও কাতরোক্তি শুনিয়া, লক্ষ্মণ যৎপরোনাস্তি বিষণ্ণ ও শোকাকুল হইলেন; কিন্তু, অতি কষ্টে ভাবগোপন করিয়া, শুষ্ক মুখে, বিকৃত স্বরে বলিলেন, আর্য্যে, আপনি কাতর হইবেন না; রঘুকুলদেবতারা আমাদের মঙ্গল করিবেন। বোধ হয়,, সকলকে ছাড়িয়া আসিয়াছেন, কেহ নিকটে নাই; এজন্যই, আপনকার এই চিত্তচাঞ্চল্য ঘটিয়াছে। আপনি অস্থির হইবেন; কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, উহার নিবৃত্তি হইবে। মধ্যে মধ্যে, সকলেরই চিত্তবৈকল্য ঘটিয়া থাকে। মন স্বভাবতঃ চঞ্চল, সকল সময়ে এক ভাবে থাকে না। আপনি অত উৎকণ্ঠিত হইবেন না।

সীতা, লক্ষ্মণের মুখশোষ ও স্বরবৈলক্ষণ্য দর্শনে, অধিকতর কাতর হইয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস, তোমার ভাব দেখিয়া, আমার অন্তঃকরণে বিষম সন্দেহ উপস্থিত হইতেছে। আমি, কখনও, তোমার মুখ এরূপ ম্লান দেখি নাই। যদি কোনও অনিষ্ট ঘটিয়া থাকে, স্পষ্ট করিয়া বল। বলি, আর্য্যপুত্র ভাল আছেন ত? কল্য অপরাহ্লোর পর, আর তাঁহার সঙ্গে দেখা হয় নাই। বোধ হয়, তাঁহাকে দেখিতে পাইলে, এত ক্ষণ এত অসুখ থাকিত না। তখন লক্ষ্মণ বলিলেন, আর্য্যে, আপনি ব্যাকুল হইবে না; আপনার উৎকণ্ঠা ও অসুখ দেখিয়া, আমিও উৎকণ্ঠিত হইয়াছিলাম ও অসুখবোধ করিয়াছিলাম; তাহাতেই আপনি আমার মুখশোষ ও স্বরবৈলক্ষণ্য লক্ষিত করিয়াছেন; নতুবা বাস্তবিক তাহা নহে; উহা মনে করিয়া, আপনি বিরুদ্ধ ভাবনা উপস্থিত করিবেন না। যত ভাবিবেন, যত আন্দোলন করিবেন, ততই উৎকণ্ঠা ও অসুখ বাড়িবে।

কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, তাঁহাদের রথ গোমতীতীরে উপস্থিত হইল। সেই সময়ে, সকলভুবনপ্রকাশক ভগবান কমলিনীনায়ক অস্তগিরিশিখরে অধিরোহণ করিলেন। সায়ংসময়ে, গোমতীতীর পরম রমণীয় হইয়া উঠে। তৎকালে, তথায়, অতি অসুস্থচিত্ত ব্যক্তিও সুচিত্ত ও অনির্বচনীয় প্রীতি প্রাপ্ত হয়। সৌভাগ্যক্রমে, সীতারও উপস্থিত আন্তরিক অসুখের সম্পূর্ণ অপসারণ হইল। লক্ষ্মণ দেখিয়া সাতিশয় প্রীত ও প্রসন্ন হইলেন। তাহারা, সে রাত্রি, সেই স্থানে অবস্থিতি করিলেন। জানকী পথশ্রমে, বিশেষতঃ মনের উৎকণ্ঠায়, সাতিশয় ক্লান্ত হইয়াছিলেন। সুতরাং, ত্বরায় তাঁহার নিদ্রাকর্ষণ হইল। তিনি যত ক্ষণ জাগরিত ছিলেন। লক্ষ্মণ, সতর্ক হইয়া, তাঁহাকে নানা মনোহর কথায় এরূপ ব্যাপৃত রাখিয়াছিলেন যে, তিনি অন্য কোনও দিকে মনঃসংযোগ করিবার অবকাশ পান নাই। ফলতঃ, দিবাভাগে জানকীর যেরূপ অসুখসঞ্চার হইয়াছিল, রজনীতে তাহার আর কোনও লক্ষণ ছিল না।

প্রভাত হইবামাত্র, তাঁহারা গোমতীতীর হইতে প্রস্থান করিলেন। সীতা, বামে ও দক্ষিণে, পরম রমণীয় প্রদেশ সকল নয়নগোচর করিয়া, যার পর নাই প্রীতিলাভ করিতে লাগিলেন। পূর্ব্ব দিন, তাঁহার যেরূপ উৎকণ্ঠা ও অসুখসঞ্চার হইয়াছিল, তাহার কোনও লক্ষণ লক্ষিত হইল না।

অবশেষে, রথ ভাগীরথীতীরে উপস্থিত হইল। ভাগীরথীর অপর পারে লইয়া গিয়া, সীতাকে, এ জন্মের মত, বিসর্জন দিয়া আসিতে হইবে, এই ভাবিয়া, লক্ষ্মণের শোকসাগর অনিবার্য্য বেগে উচ্ছলিত হইয়া উঠিল। আর তিনি ভাবগোপন বা অশ্রুবেগ সংবরণ করিতে পারিলেন না। সীতা, দেখিয়া, সাতিশয় বিষন্ন হইয়া, জিজ্ঞাসিলেন, বৎস, কি কারণে তোমার, এরূপ ভাব উপস্থিত হইল, বল। তখন লক্ষ্মণ নয়নের অশ্রুমার্জ্জন করিয়া বলিলেন, আর্য্যে, আপনি ব্যাকুল হইবেন না; বহু কালের পর, ভাগীরথীর দর্শনলাভ করিয়া, আমার অন্তঃকরণে কেমন এক অনির্বচনীয় ভাবের উদয় হইয়াছে; তাহাতেই অকস্মাৎ আমার নয়নযুগল হইতে বাষ্পবারি বিগলিত হইল। আমাদের পূর্ব্বপুরুষেরা কপিলশাপে ভস্মাবশেষ হইয়াছিলেন; ভগীরথ কত কষ্টে, গঙ্গা দেবীকে ভূমণ্ডলে আনিয়া, তাঁহাদের উদ্ধারসাধন করেন। বোধ হয়, তাহাই ভাগীরথীদর্শনে স্মৃতিপথে আরূঢ় হওয়াতে, এরূপ চিত্তবৈকল্য উপস্থিত হইয়াছিল। সীতা একান্ত মুগ্ধস্বভাব ও নিতান্ত সরলহৃদয়া; লক্ষ্মণের এই তাৎপর্য্যব্যাখ্যাতেই সন্তুষ্ট হইলেন; এবং গঙ্গা পার হইবার নিমিত্ত, নিতান্ত উৎসুক হইয়া, লক্ষ্মণকে বারংবায় তাহার উদেঘাগ করিতে বলিতে লাগিলেন; কিন্তু, গঙ্গা পার হইলেই যে, দুস্তর শোকসাগরে পরিক্ষিপ্ত হইবেন, তখন পর্য্যন্ত কিছুমাত্র বুঝিতে পারিলেন না।

কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, তরণীর সংযোগ হইল। লক্ষ্মণ, সুমন্ত্রকে সেই স্থানে রথ রাখিতে বলিয়া, সীতাকে তরণীতে আরোহণ করাইলেন, এবং, কিয়ৎ ক্ষণ মধ্যেই, তাঁহারে ভাগীরথীর অপর পারে উত্তীর্ণ করিলেন। সীতা, তপোবন দেখিবার নিমিত্ত নিতান্ত উৎসুক হইয়া, তদভিমুখে প্রস্থান করিবার উপক্রম করিলেন। তখন লক্ষ্মণ, বলিলেন, আর্য্যে, কিঞ্চিৎ অপেক্ষা করুন। আমার কিছু বক্তব্য আছে, এই স্থানে নিবেদন করিব। এই বলিয়া, তিনি অপোবদনে অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন। সীতা চকিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস, কিছু বলিবে বলিয়া, এত ব্যাকুল হইলে কেন? কি বলিবে ত্বরায় বল; তোমার ভাবান্তর দেখিয়া, আমার প্রাণ নিতান্ত ব্যাকুল হইতেছে। তুমি কি, আসিবার সময়, আর্য্যপুত্রের কোনও অশুভঘটনা শুনিয়াছ, অন্য কোনও সর্ব্বনাশ ঘটিয়াছে? কি হইয়াছে, শীঘ্র বল। তখন লক্ষ্মণ বলিলেন, দেবি, বলিব কি, আমার বাক্যনিঃসরণ হইতেছে না; আর্য্যের আজ্ঞাবহ হইয়া, আমার অদৃষ্টে যে এরূপ ঘটিবে, তাহা আমি স্বপ্নেও জানিতাম না। যে দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহা মনে করিয়া, আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে। ইতঃপূর্ব্বে আমার মৃত্যু হইলে, আমি সৌভাগ্যজ্ঞান করিতাম। যদি মৃত্যু অপেক্ষা, কোনও অধিকতর দুর্ঘটনা থাকে, তাহাও আমার পক্ষে শ্রেয়স্কর ছিল; তাহা হইলে, আজ আমায় এরূপ নিষ্ঠুর কাণ্ডের ভারগ্রহণ করিতে হইত না। হা বিধাতঃ! তোমার মনে কি এই ছিল! এই বলিয়া, উন্মূলিত তরুর ন্যায়, ভূতলে পতিত হইয়া, লক্ষণ হাহাকার করিতে লাগিলেন।

সীতা, লক্ষণের ঈদৃশ অভাবিত ভাবান্তর উপস্থিত দেখিয়া, কিয়ৎ ক্ষণ, স্তব্ধ ও হতবুদ্ধি হইয়া, দণ্ডায়মান রহিলেন; অনন্তর, হস্তধারণ পূর্ব্বক, তাঁহাকে ভূতল হইতে উঠাইয়া, অঞ্চল দ্বারা তদীয় নয়নের অশ্রুমার্জ্জন করিয়া দিলেন; এবং, তিনি কিঞ্চিৎ শান্ত হইলে, কাতর বচনে জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস, কি কারণে, তুমি এত ব্যাকুল হইলে? কি জন্যই বা, তুমি মৃত্যুকামনা করিলে? তোমায় একান্ত বিকলচিত্ত দেখিতেছি; অল্প কারণে, তুমি কখনই এত আকুল ও এত অস্থির হও নাই। বলি, আর্য্যপুত্রের ত কোনও অমঙ্গল ঘটে নাই? তুমি তদগতপ্রাণ; তোমার ভাব দেখিয়া বোধ হইতেছে, তাঁহারই অমঙ্গল ঘটিয়াছে। আমি এখন বুঝিতে পারিতেছি, এই জন্যই, কল্য অপরাহ্নে আমার তাদৃশ চিত্তবৈকল্য ঘটিয়াছিল। যাহা হয়, ত্বরায় বলিয়া, আমায় জীবনদান কর; আমার যাতনার একশেষ হইতেছে। ত্বরায় বল, আর বিলম্ব করিও না। আমি স্পষ্ট বুঝিতেছি, আমারই সর্ব্বনাশ ঘটিয়াছে; না হইলে, এমন সময়ে, তুমি এত ব্যাকুল হইতে না।

সীতার এইরূপ ব্যাকুলতা ও কাতরতা দর্শনে, লক্ষ্মণের শোকানল শতগুণ প্রবল হইয়া উঠিল; নয়নযুগল হইতে অনর্গল অশ্রুজল নির্গত হইতে লাগিল; কণ্ঠরোধ হইয়া, বাক্যনিঃসরণ রহিত হইয়া গেল। যত নিষ্ঠুর হউক না কেন, অবশেষে অবশ্যই বলিতে হইবে, এই ভাবিয়া, লক্ষ্মণ বলিবার নিমিত্ত বারংবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন; কিন্তু, কোনও ক্রমে, তাঁহার মুখ হইতে তাদৃশ নিষ্ঠুর বাক্য নির্গত হইল না। তাঁহাকে এতাদৃশ অবস্থাপন্ন দেখিয়া, সীতা তাঁহার হস্তে ধরিয়া, ব্যাকুল চিত্তে, কাতর বচনে, বারংবার এই অনুরোধ করিতে লাগিলেন, বৎস, আর বিলম্ব করিও না; আর্য্যপুত্র যে আদেশ করিয়াছেন, তাহা, যত নিষ্ঠুর হউক না কেন, ত্বরায় বল; তুমি কিছুমাত্র সঙ্কুচিত হইও না; আমি অনুমতি দিতেছি, তুমি নিঃশঙ্ক চিত্তে বল। তোমার কথা শুনিয়া ও ভাব দেখিয়া, স্পষ্ট বোধ হইতেছে, আমারই কপাল ভাঙিয়াছে। কি হইয়াছে, করায় বল, আর বিলম্ব করিও না; আমি, আর এক মুহূর্ত্ত এরূপ সংশয়িত অবস্থায় থাকিতে পারিব না; যাহা হয় বলিয়া, আমার প্রাণরক্ষা কর। বলি, আর্য্যপুত্রের কোনও অমঙ্গল ঘটে নাই? যদি তিনি কুশলে থাকেন,আমার আর যে সর্ব্বনাশ ঘটুক না কেন, আমি তাহাতে তত কাতর হইব না। আমার মাথা খাও, তোমায় আর্য্যপুত্রের দোহাই, শীঘ্র বল; আর বিলম্ব করিলে, তুমি অধিক ক্ষণ আমায় জীবিত দেখিতে পাইবে না। যদি,যাতনা দিয়া, আমার প্রাণবধ করা তোমার অভিপ্রেত না হয়, তবে ত্বরায় বল, আর বিলম্ব করিও না।

সীতার এইরূপ অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া, লক্ষ্মণ ভাবিলেন, আর বিলম্ব করা বিধেয় নহে। তখন, অনেক যত্নে, চিত্তের অপেক্ষাকৃত স্থৈর্য্যসম্পাদন করিয়া, অতি কষ্টে বাক্যনিঃসরণ করিলেন; বলিলেন, আর্য্যে, বলিব কি, বলিতে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে। আপনি একাকিনী রাবণ-গৃহে ছিলেন; সেই কারণে, পৌরগণ ও জানপদবর্গ, আপনকার চরিত্র বিষয়ে সন্দিহান হইয়া, অপবাদকীর্ত্তন করিয়া থাকে। আর্য্য ইহা অবগত হইয়া, একবারে স্নেহ, দয়া, ও মমতার বিসর্জন দিয়া, অপবাদবিমোচনের নিমিত্ত, আপনকার মায়াপরিত্যাগ করিয়াছেন; আমায় এই আদেশ দিয়াছেন, “তুমি, তপোবনদর্শনের ছলে লইয়া গিয়া, বাল্মীকির আশ্রমে রাখিয়া আসিবে।” এই সেই বাল্মীকির আশ্রম।

এই বলিয়া, লক্ষ্মণ ভূতলে পতিত ও মূর্চ্ছিত হইলেন। সীতাও, শ্রবণমাত্র হতচেতনা হইয়া, বাতাভিহতা কদলীর ন্যায়, ভূতলশায়িনী হইলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, লক্ষ্মণের সংজ্ঞালাভ হইলে, তিনি, অনেক যত্নে, জানকীর চৈতন্যসম্পাদন করিলেন। জানকী চেতনালাভ করিয়া, উন্মত্তার ন্যায়, স্থির নয়নে, লক্ষ্মণের মুখনিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। লক্ষ্মণ, হতবুদ্ধির ন্যায়, চিত্রার্পিতের প্রায়, অধোবদনে, গলদশ্রু নয়নে, দণ্ডায়মান রহিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, সীতার নয়নযুগল হইতে, প্রবল বেগে, বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল; ঘন ঘন নিশ্বাস বহিতে লাগিল; সর্ব্ব শরীর কম্পিত হইতে লাগিল। তদ্দর্শনে লক্ষ্মণ, যৎপরোনাস্তি ব্যাকুল হইয়া, সীতাকে প্রবোধ দিবার নিমিত্ত চেষ্টা পাইলেন; কিন্তু, কি বলিয়া প্রবোধ দিবেন, তাহার কিছু দেখিতে না পাইয়া, হতবুদ্ধি হইয়া, কেবল অবিশ্রান্ত অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন।

এই ভাবে কিয়ৎ ক্ষণ অতীত হইলে পর, সীতা চিত্তের অপেক্ষাকৃত স্থৈর্য্যসম্পাদন করিয়া বলিলেন, লক্ষ্মণ, কার দোষ দিব, সকলই আমার অদৃষ্টের দোষ; নতুবা, রাজার কন্যা, রাজার বধূ, রাজার মহিষী হইয়া, কে কখন্ আমার মত চিরদুঃখিনী হইয়াছে, বল? বুঝিলাম, যাবজ্জীবন দুঃখভোগের নিমিত্তই, আমার নারীজন্ম হইয়াছিল। বৎস, অবশেষে আমার যে এ অবস্থা ঘটিবে, তাহা কাহার মনে ছিল। বহু কালের পর আর্য্যপুত্ত্রের সহিত সমাগম হইলে, ভাবিয়াছিলাম, বুঝি এই অবধি দুঃখের অবসান হইল। কিন্তু, বিধাতা যে আমার কপালে সহস্রগুণ অধিক দুঃখ লিখিয়া রাখিয়াছিলেন, তাহা স্বপ্নেও জানিতাম না। হায় রে বিধাতা! তোর মনে কি এতই ছিল?

এই বলিতে বলিতে, জানকীর কণ্ঠরোধ হইয়া গেল। তিনি কিয়ৎ ক্ষণ বাক্যনিঃসরণ করিতে পারিলেন না; অনন্তর, দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ পূর্ব্বক বলিলেন, লক্ষ্মণ, নিষ্ঠুর বিধাতা আমার কপালে এত দুঃখভোগ লিখিলেন কেন, বুঝিতে পারিতেছি না। অথবা, বিধাতার অপরাধ কি; সকলেই আপন আপন কর্ম্মের ফলভোগ করে। আমি জন্মান্তরে যেরূপ কর্ম্ম করিয়াছিলাম, এ জন্মে সেইরূপ ফলভোগ করিতেছি। বোধ করি, পূর্ব্ব জন্মে, কোনও পতিপ্রাণা কামিনীকে পতিবিয়োজিতা করিয়াছিলাম; সেই মহাপাপেই আজ আমার এই দুরবস্থা ঘটিল; নতুবা আর্য্যপুত্ত্রের হৃদয় স্নেহ, দয়া, ও মমতায় পরিপূর্ণ; আমিও যে একান্ত পতিপ্রাণা ও শুদ্ধচারিণী, তাহাও তিনি বিলক্ষণ জানেন; তথাপি যে এমন সময়ে আমায় গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিলেন, সে কেবল আমার পূর্ব্বজন্মার্জ্জিত কর্ম্মের ফলভোগ। বৎস, আমি বনবাসে কাতর নহি। আর্য্যপুত্ত্রের সহবাসে, বহু কাল, বনবাসে ছিলাম; তাহাতে এক দিন, এক মুহূর্ত্তের নিমিত্ত; আমার অন্তঃকরণে দুঃখের লেশমাত্র ছিল না। আর্য্যপুত্ত্রসহবাসে যাবজ্জীবন বনবাসে থাকিলেও, আমার কিছুমাত্র দুঃখ হইত না। সে যাহা হউক, আমার অন্তঃকরণে এই দুঃখ হইতেছে, আর্য্যপুত্ত্র কি অপরাধে পরিত্যাগ করিয়াছেন, মুনিপত্নীরা জিজ্ঞাসা করিলে, আমি কি উত্তর দিব! তাঁহারা আর্য্যপুত্ত্রকে করুণাসাগর বলিয়া জানেন; আমি প্রকৃত কারণ বলিলে, তাঁহারা কখনই বিশ্বাস করিবেন না। তাঁহারা ভাবিবেন, আমি কোনও গুরুতর অপরাধ করিয়াছিলাম, তাহাতেই তিনি আমায় গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিয়াছেন। বৎস, বলিতে কি, যদি অন্তঃসত্ত্বা না হইতাম, এই মুহূর্ত্তে, তোমার সমক্ষে, জাহ্নবীজলে প্রবেশ করিয়া, প্রাণত্যাগ করিতাম। আর আমার জীবনধারণের ফল কি বল? এমন অবস্থাতেও কি প্রাণ রাখিতে হয়? আমি আশ্চর্য্যবোধ করিতেছি, আর্য্যপুত্ত্র পরিত্যাগ করিয়াছেন শুনিয়াও আমার প্রাণবিয়োগ ঘটিতেছে না। বোধ করি, আমার মত কঠিন প্রাণ আর কারও নাই; নতুবা, এখনও নির্গত হইতেছে না কেন? অথবা, বিধাতা আমায় চিরদুঃখিনী করিবার সঙ্কল্প করিয়াছেন; প্রাণত্যাগ হইলে, তাঁহার সে সঙ্কল্প বিফল হইয়া যায়; এজন্যই জীবিত রহিয়াছি।

এইরূপ আক্ষেপ ও বিলাপ করিতে করিতে, সীতা দীর্ঘ নিশ্বাস সহকারে, হায়! কি হইল বলিয়া, পুনরায় মূর্চ্ছিত ও ভূতলে পতিত হইলেন। সুশীল লক্ষ্মণ, দেখিয়া শুনিয়া, নিতান্ত কাতর ও শোকে একান্ত অভিভূত হইয়া, অবিরল ধারায় বাষ্পবারি বিমোচন করিতে লাগিলেন; এবং, রামচন্দ্রের অদৃষ্টচর অশ্রুতপূর্ব্ব লোকানুরাগপ্রিয়তাই এই অভূতপূর্ব্ব ভয়ানক অনর্থের মূল, এই ভাবিয়া, যৎপরোনাস্তি বিষণ্ণ ম্রিয়মাণ হইয়া, বলিতে লাগিলেন, যদি ইতঃপূর্ব্বে আমার মৃত্যু হইত, তাহা হইলে, এই লোকবিগর্হিত ধর্ম্মবিবর্জ্জিত বিষম কাণ্ড দেখিতে হইত না। আমি আর্য্যের আজ্ঞাপ্রতিপালনে সম্মত হইয়া, অতি অসৎ কর্ম্মই করিয়াছি। আমার মত পাষণ্ড ও পাষাণহৃদয় আর নাই; নতুবা, এরূপ নিষ্ঠুর কাণ্ডের ভারগ্রহণ করিব কেন? কেমন করিয়া, এমন সরলহৃদয়া, শুদ্ধচারিণী, পতিপ্রাণা কামিনীকে এরূপ সর্ব্বনাশের কথা শুনাইলাম? যদি আর্য্যের আদেশপ্রতিপালনে পরাঙ্মুখ হইয়া, আমায় এ জন্মের মত তাঁহার বিরাগভাজন ও জন্মান্তরে নিরয়গামী হইতে হইত, তাহাও আমার পক্ষে সহস্র গুণে শ্রেয়স্কর ছিল। সর্ব্বথা আমি অতি অসৎ কর্ম্ম করিয়াছি। হা বিধাতঃ! কেন তুমি আমায় এরূপ নিষ্ঠুর কাণ্ডের ভার গ্রহণে প্রবৃত্তি দিয়াছিলে? হা কঠিন হৃদয়! তুমি এখনও বিদীর্ণ হইতেছ না কেন? হা কঠিন প্রাণ! তুমি এখনও প্রস্থান করিতেছ না কেন? হা দগ্ধ কলেবর! তুমি এখনও সর্ব্ব অবয়বে বিশীর্ণ হইতেছ না কেন? আর আমি আর্য্যার এ অবস্থা দেখিতে পারি না। হা আর্য্য! তুমি যে এমন কঠিনহৃদয়, তাহা স্বপ্নেও জানিতাম না। যদি তোমার মনে এতই ছিল, তবে আর্য্যার উদ্ধারসাধনে তত সচেষ্ট হইবার কি প্রয়োজন ছিল? দশানন হরণ করিয়া লইয়া গেলে পর, উন্মত্ত ও হতচেতন হইয়া, হাহাকার করিয়া বেড়াইবারই বা কি আবশ্যকতা ছিল? তুমি অবশেষে এই করিবে বলিয়া, কি আমরা লঙ্কাসমরের দুঃসহ ক্লেশপরম্পরা সহ্য করিয়াছিলাম? যাহা হউক, তোমার মত নির্দয় ও নৃশংস ভূমণ্ডলে নাই।

কিয়ৎ ক্ষণ এইরূপ আক্ষেপ ও রামচন্দ্রের ভর্ৎসনা করিয়া, লক্ষ্মণ, উচ্ছলিত শোকাবেগের সংবরণ পূর্ব্বক, সীতার চৈতন্যসম্পাদনে সযত্ন হইলেন। চেতনাসঞ্চার হইলে, সীতা, কিয়ৎ ক্ষণ স্তব্ধ ভাবে থাকিয়া, স্নেহভরে সম্ভাষণ করিয়া, লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, ধৈর্য্য অবলম্বন কর; আর বিলাপ ও পরিতাপ করিও না। সকলই অদৃষ্টাধীন; আমার অদৃষ্টে যাহা ছিল, তাহাই ঘটিয়াছে; তুমি আর সে জন্য কাতর হইও না; শোকসংবরণ কর। আমার ভাবনা ছাড়িয়া দিয়া, ত্বরায় তুমি আর্য্যপুত্ত্রের নিকটে যাও। তিনি, আমায় বনবাস দিয়া, কাতর ও অস্থির হইয়াছেন, সন্দেহ নাই; যাহাতে তাঁহার শোকের নিবারণ ও চিত্তের স্থিরতা হয়, সে বিষয়ে যত্নবান হইবে; তাঁহাকে বলিবে, আমার পরিত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া, ক্ষোভ করিবার আবশ্যকতা নাই; তিনি সদ্বিবেচনার কার্য্যই করিয়াছেন। প্রাণপণে প্রজারঞ্জন করা রাজার প্রধান ধর্ম্ম; আমায় পরিত্যাগ করিয়া, তিনি রাজধর্ম্মপ্রতিপালন করিয়াছেন। আমি তাঁহার মন জানি; তিনি যে কেবল লোকাপবাদের ভয়ে এই করিয়াছেন, তাহাতে আমার সন্দেহ নাই। তিনি যেন, শোকশূন্য ও ক্ষোভশূন্য হইয়া, প্রশস্ত মনে, প্রজাপালনে নিয়ত ব্যাপৃত থাকেন। তাঁহার চরণে আমার প্রণাম জানাইয়া বলিবে, যদিও আমি, লোকাপবাদভয়ে, অযোধ্যা হইতে নির্বাসিত হইলাম, যেন তাঁহার অন্তঃকরণ হইতে এক বারে অপসারিত না হই। আমি, তপোবনে থাকিয়া, এই উদ্দেশে, ঐকান্তিক চিত্তে তপস্যা করিব, যেন জন্মান্তরেও তিনি আমার পতি হন। আর, তাঁহাকে বিশেষ করিয়া বলিবে, যদিও ভার্য্যাভাবে আমায় নির্বাসিত করিয়াছেন, কিন্তু যেন সামান্য প্রজা বলিয়া গণ্য করেন। তিনি সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর; যেখানে থাকি, তাঁহার অধিকারবহির্ভূত নই।

এই বলিয়া, একান্ত শোকাকুল হইয়া, সীতা কিয়ৎ ক্ষণ মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন; অনন্তর, নিতান্ত কাতর স্বরে বলিতে লাগিলেন, লক্ষ্মণ, আমার ভাগ্যে যাহা ঘটিয়াছে, আমি সে জন্য তত কাতর নহি; পাছে আর্য্যপুত্ত্রের মনে ক্লেশ হয়, সেই ভাবনাতেই আমি অস্থির হইতেছি। তাঁহাকে বিনয় করিয়া বলিবে, তিনি যেন শোকসংবরণ করিয়া ত্বরার সুস্থচিত্ত হন। আমার ক্লেশের একশেষ হইয়াছে, যথার্থ বটে; কিন্তু, সে জন্য, আমি তাঁহাকে অণুমাত্র দোষ দিব না; আমার যেমন অদৃষ্ট, তেমনই ঘটিয়াছে; তজ্জন্য তিনি যেন ক্ষোভ না করেন। বৎস, তোমায় আমার অনুরোধ এই, তুমি সর্ব্বদা তাঁহার নিকটে থাকিবে, ক্ষণকালের নিমিত্তও, তাঁহারে একাকী থাকিতে দিবে না; একাকী থাকিলেই, তাঁহার উৎকণ্ঠা ও অসুখ বাড়িবে। তিনি ভাল থাকিলেই আমার ভাল। যাহাতে তিনি সুখে থাকেন, সে বিষয়ে সর্ব্বদা যত্ন করিবে। এই বলিয়া, লক্ষ্মণের হস্তে ধরিয়া, সীতা বাষ্পপরিপ্লুত লোচনে, করুণ বচনে বলিলেন, তুমি আমার নিকট শপথ করিয়া বল, এ বিষয়ে কদাচ ঔদাস্য করিবে না? তপোবনে থাকিয়া, যদি লোকমুখে শুনিতে পাই, আর্য্যপুত্ত্র কুশলে আছেন, তাহা হইলেই, আমার সকল দুঃখ দূর হইবে।

এই বলিতে বলিতে, সীতার নয়নযুগল হইতে, অবিরল ধারায়, বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। তদীয় পতিপরায়ণতার সম্পূর্ণপ্রমাণপূর্ণ বচনপরম্পরা শ্রবণগোচর করিয়া, লক্ষ্মণের শোক প্রবাহ প্রবল বেগে প্রোচ্ছলিত হইয়া উঠিল; নয়নজলে বক্ষঃস্থল ভাসিয়া যাইতে লাগিল। সীতা সান্ত্বনাবাক্যে লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, শোকাবেগসংবরণ করিয়া, ত্বরায় তুমি আর্য্যপুত্ত্রের নিকটে যাও, আর বিলম্ব করিও না। বারংবার, এইরূপ বলিয়া, তিনি লক্ষ্মণকে বিদায় দিবার নিমিত্ত নিরতিশয় ব্যস্ত হইলেন। লক্ষ্মণ, প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন; এবং গলদশ্রু লোচনে, কাতর বচনে বলিতে লাগিলেন, আর্য্যে, আপনি পূর্ব্বাপর দেখিয়া আসিতেছেন, আমি আর্য্যের একান্ত আজ্ঞাবহ; যখন যে আদেশ করেন, দ্বিরুক্তি না করিয়া, তৎক্ষণাৎ তৎপ্রতিপালনে প্রবৃত্ত হই। প্রাণান্তস্বীকার করিয়াও, অগ্রজের আজ্ঞা প্রতিপালন করা অনুজের সর্ব্বপ্রধান ধর্ম্ম। আমি, সেই অনুজধর্ম্মের অনুবর্ত্তী হইয়া, আর্য্যের এই বিষম আজ্ঞার প্রতিপালনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম। আমি যে পাষাণহৃদয়ের কর্ম্ম করিবার ভারগ্রহণ করিয়াছিলাম, তাহা সম্পন্ন করিলাম। প্রার্থনা এই, আমার উপর আপনকার যে অপরিসীম স্নেহ ও বাৎসল্য আছে, তাহার যেন বৈলক্ষণ্য না হয়। আর, আর্য্যের আদেশ অনুসারে, এরূপ নৃশংস আচরণ করিয়া, আমি যে বিষম অপরাধ করিলাম, কৃপা করিয়া, আমার সেই অপরাধের মার্জ্জনা করিবেন।

লক্ষ্মণকে এইরূপ শোকাভিভূত দেখিয়া, সীতা বলিলেন, বৎস, তোমার অপরাধ কি? তুমি কেন অকারণে এত কাতর হইতেছ ও পরিতাপ করিতেছ? তোমার উপর রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হইবার কথা দূরে থাকুক, আমি কায়মনোবাক্যে, দেবতাদের নিকট, নিয়ত এই প্রার্থনা করিব, যেন জন্মান্তরে তোমার মত গুণের দেবর পাই; তুমি চিরজীবী হও। তুমি, অযোধ্যায় গিয়া, আর্য্যপুত্ত্রের চরণে আমার প্রণাম জানাইবে। ভরত, শত্রুঘ্ন, ও আমার ভগিনীদিগকে স্নেহসম্ভাষণ বলিবে; শ্বশ্রূদেবীরা ভগবান ঋষ্যশৃঙ্গের আশ্রম হইতে প্রত্যাগমন করিলে, তাঁহাদের চরণে আমার সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত নিবেদিত করিবে। বৎস, তোমায় আর একটি কথা বলিয়া দি। আমি চিরদুঃখিনী, বিধাতা আমার অদৃষ্টে সুখ লিখেন নাই; সুতরাং, আমার যে সর্ব্বনাশ ঘটিল, তাহাতে আমি দুঃখিত নহি। কিন্তু এই করিও, যেন আমার ভগিনীগুলি কষ্ট না পায়। তাহারা আমার নিমিত্ত অত্যন্ত শোকাকুল হইবে; যাহাতে ত্বরায় তাহাদের শোকনিবৃত্তি হয়, সে বিষয়ে তোমরা তিন জনে সতত যত্ন করিও; তাহারা সুখে থাকিলেও অনেক অংশে আমার দুঃখনিবারণ হইবে। তাহাদিগকে বলিবে, আমি আপন অদৃষ্টের ফলভোগ করিতেছি; আমার জন্য, শোকাকুল হইবার ও ক্লেশভোগ করিবার প্রয়োজন নাই।

এই বলিয়া, স্নেহভরে বারংবার আশীর্বাদ করিয়া, সীতা লক্ষ্মণকে প্রস্থান করিতে বলিলেন। লক্ষ্মণ, বাষ্পাকুল লোচনে ও শোকাকুল বচনে, আর্য্যে, আমার অপরাধমার্জ্জনা করিবেন, অঞ্জলিবদ্ধ পূর্ব্বক এই কথা বলিয়া, পুনরায় প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া, নৌকায় আরোহণ করিলেন। সীতা অবিচলিত নয়নে নিরীক্ষণ করিয়া রহিলেন। নৌকা, অল্প ক্ষণেই, ভাগীরথীর অপর পারে সংলগ্ন হইল। লক্ষ্মণ তীরে উত্তীর্ণ হইলেন; এবং কিয়ৎ ক্ষণ, নিস্পন্দ নয়নে, জানকীরে নিরীক্ষণ করিয়া, অশ্রুবিসর্জন করিতে করিতে, রথে আরোহণ করিলেন। রথ চলিতে আরম্ভ করিল। যত ক্ষণ সীতাকে দেখিতে পাওয়া গেল, লক্ষ্মণ অনিমিষ নয়নে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন; সীতাও, চিত্রার্পিত প্রায়, রথে দৃষ্টিযোজনা করিয়া রহিলেন। রথ ক্রমে ক্রমে দূরবর্ত্তী হইল। তখন লক্ষ্মণ, আর সীতাকে লক্ষিত করিতে না পারিয়া, হাহাকার ও শিরে করাঘাত করিয়া, রোদন করিতে লাগিলেন। সীতাও, রথ নয়নপথবহির্ভূত হইবামাত্র, যূথবিরহিত কুররীর ন্যায়, উচ্চৈঃ স্বরে ক্রন্দন করিতে আরম্ভ করিলেন।

সীতার ক্রন্দনশব্দ শ্রবণগোচর করিয়া, সন্নিহিত ঋষিকুমারেরা, শব্দ অনুসারে, ক্রন্দনস্থানে উপস্থিত হইলেন; দেখিলেন, এক অসূর্য্যম্পশ্যরূপা কামিনী, হাহাকার ও শিরে করাঘাত করিয়া, অশেষবিধ বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছেন। দেখিয়া, তাঁহাদের কোমল হৃদয়ে, যার পর নাই, কারুণ্যরস আবির্ভূত হইল। তাঁহারা, ত্বরিত গমনে বাল্মীকিসমীপে উপস্থিত হইয়া, বিনয়নম্র বচনে নিবেদন করিলেন, ভগবন্, আমরা, ফল কুসুম কুশ সমিধ আহরণের নিমিত্ত, ভাগীরথী সন্নিহিত অটবীবিভাগে পর্য্যটন করিতেছিলাম; অকস্মাৎ স্ত্রীলোকের আর্ত্তনাদ শুনিতে পাইলাম; এবং ইতস্ততঃ অনুসন্ধান করিয়া, কিয়ৎ ক্ষণ পরে দেখিতে পাইলাম, এক অলৌকিক রূপলাবণ্যে পরিপূর্ণা কামিনী, নিতান্ত অনাথার ন্যায়, একান্ত কাতর হইয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতেছেন। তাঁহাকে দেখিলে বোধ হয়, যেন কমলা দেবী ভূমণ্ডলে অবতীর্ণা হইয়াছেন। তিনি কে, কি কারণে রোদন করিতেছেন, কিছুই জানিতে পারিলাম না; কিন্তু, তাঁহার কাতরভাবের অবলোকন ও বিলাপবাক্যের আকর্ণন দ্বারা, আমাদের হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া গেল। আমরা, সাহস করিয়া, তাঁহাকে কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিতে পারিলাম না। অবশেষে, আপনাকে সংবাদ দেওয়া উচিত বিবেচনায়, ক্ষণ মাত্র বিলম্ব না করিয়া, আপনকার নিকটে আসিয়াছি। এক্ষণে, যাহা বিহিত বোধ হয়, করুন।

মহর্ষি, ঋষিকুমারদিগের মুখে এই বৃত্তান্ত শুনিয়া, তৎক্ষণাৎ ভাগীরথীতীরে উপস্থিত হইলেন; এবং, সীতার সম্মুখবর্ত্তী হইয়া, সস্নেহ সম্ভাষণ পুরঃসর, প্রশান্ত স্বরে বলিতে লাগিলেন, বৎসে, বিলাপ করিও না; কি কারণে তুমি আমার তপোবনে আসিয়াছ, তোমার আসিবার পূর্ব্বেই, আমি তাহার সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়াছি। তুমি মিথিলাধিপতি রাজা জনকের দুহিতা; কোশলাধিপতি মহারাজ দশরথের পুত্রবধূ; এবং রাজাধিরাজ রামচন্দ্রের মহিষী। রামচন্দ্র, অমূলক লোকাপবাদ শ্রবণে, চলচিত্ত ও সদসৎপরিবেদনাবিহীন হইয়া নিতান্ত নিরপরাধে, তোমায় নির্বাসিত করিয়াছেন। সীতা, সান্ত্বনাবাদ শ্রবণে, নয়নের অশ্রুমার্জ্জন করিলেন; এবং, সৌম্যমূর্ত্তি মহর্ষিকে সম্মুখবর্ত্তী দেখিয়া, গললগ্ন বসনে, তদীয় চরণে প্রণাম করিলেন। বাল্মীকি, রঘুকুলতিলক তনয় প্রসব কর, এই আশীর্বাদ করিয়া, বলিলেন, বৎসে, আর এখানে থাকিবার প্রয়োজন নাই, আমার আশ্রমে চল; আমি, আপন তনয়ার ন্যায়, তোমার রক্ষণাবেক্ষণ করিব। তথায় থাকিয়া, তুমি কোনও বিষয়ে কোনও ক্লেশ পাইবে না। জনপদবাসীরা, বন, এই শব্দ শুনিলে ভয়াকুল হয়; কিন্তু তপোবনে ভয়ের কোনও সম্ভাবনা নাই। ঋষিদের তপস্যার প্রভাবে, হিংস্র জন্তুরাও, স্বভাবসিদ্ধ হিংসাপ্রবৃত্তি দূরীভূত করিয়া, পরস্পর সৌহৃদ্য ভাবে কালহরণ করে। তপোবনের এরূপ মহিমা যে, স্বল্প কাল অবস্থিতি করিলেই, চিত্তের স্থৈর্য্যসম্পাদন হয়। তোমায় আসন্নপ্রসবা দেখিতেছি। প্রসবের পর, অপত্যসংস্কারবিধি যথাবিধি সমাহিত হইবে, কোনও অংশে অঙ্গহীন হইবে না। সমবয়স্কা মুনিকন্যারা তোমার সহচরী হইবেন; তাঁহাদের সহবাসে তোমার বিলক্ষণ চিত্তবিনোদন হইবে। বিশেষতঃ, তোমার পিতা আমার পরম বন্ধু; সুতরাং, আমার তপোবনে থাকিয়া, তোমার পিতৃগৃহবাসের সকল সুখ সম্পন্ন হইবে; আমি, অপত্যনির্বিশেষে, তোমার রক্ষণাবেক্ষণ করিব। অতএব, বৎসে, আর বিলম্ব করিও না, আমার অনুগামিনী হও।

এই বলিয়া, সীতারে সমভিব্যাহারে লইয়া, মহর্ষি তপোবনে প্রবেশ করিলেন; এবং, সকল বিষয়ের সবিশেষ বলিয়া দিয়া, সমবয়স্কা মুনিকাদের হস্তে সীতার ভারার্পণ করিলেন। মুনিকন্যারা, তদীয়সমাগমলাভে, পরম প্রীতি ও পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন; এবং, যাহাতে ত্বরায় তাঁহার চিত্তের স্থৈর্য্যসম্পাদন হয়, সে বিষয়ে অশেষবিধ যত্ন করিতে লাগিলেন।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

রাম, মন্ত্রভবনে প্রবিষ্ট হইয়া, রাজাসনে উপবিষ্ট হইলেন, এবং সন্নিহিত পরিচারক দ্বারা, ভরত, লক্ষ্মণ, শত্রু, তিন, জনকে, সত্বর উপস্থিত হইবার নিমিত্ত, ডাকিয়া পাঠাইলেন। দিবাবসানসময়ে, আর্য্য জনকতনয়াসহবাসে কালযাপন করেন; ঈদৃশ সময়ে, মন্ত্রভবনে গমন করিয়া, অকস্মাৎ আমাদিগের আহবান করিলেন কেন, ইহার কিছুই নির্ণয় করিতে না পারিয়া, ভরতপ্রভৃতি সাতিশয় সন্দিহান ও আকুলহৃদয় হইলেন, এবং, মনে মনে নানা বিতর্ক করিতে করিতে, সত্বর গমনে মন্ত্রভবনে প্রবেশ করিলেন; দেখিলেন, রাম, করতলে কপোল বিন্যস্ত করিয়া, একাকী উপবিষ্ট আছেন, মুহুর্মুহু দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ করিতেছেন; নয়নযুগল হইতে অনর্গল অশ্রুজল নির্গত হইতেছে। অগ্রজের তাদৃশী দশা দৃষ্টিগোচর করিয়া, অনুজেরা বিষাদসাগরে মগ্ন হইলেন, এবং, কি কারণে তিনি এরূপ অবস্থাপন্ন হইয়াছেন, কিছুই বুঝিতে না পারিয়া, স্তব্ধ ও হতবুদ্ধি হইয়া, সম্মুখে দণ্ডায়মান রহিলেন। অতি বিষম অনিষ্টসংঘটনের আশঙ্কা করিয়া, তিন জনের মধ্যে, কাহারও এরূপ সাহস হইল না যে, কারণ জিজ্ঞাসা করেন। অবশেষে, তাঁহারাও তিন জনে, ঘোরতর বিপৎপাত স্থির করিয়া, এবং রামের তাদৃশী দশা দর্শনে নিতান্ত কাতর ভাবাপন্ন হইয়া, অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন।

কিয়ৎ ক্ষণ পরে, রাম, উচ্ছলিত শোকাবেগের কথঞ্চিৎ সংবরণ ও নয়নের অশ্রুধারামার্জ্জন করিয়া, সস্নেহ সম্ভাষণ পূর্ব্বক, অনুজদিগকে সম্মুখদেশে বসিতে আদেশ করিলেন। তাঁহারা, আসনে উপবেশন করিয়া, কাতর ভাবে, রামচন্দ্রের নিতান্ত নিষ্প্রভ মুখচন্দ্রে দৃষ্টিযোজনা করিয়া রহিলেন। রামের নয়নযুগল হইতে, প্রবল বেগে, বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। তদ্দর্শনে তাঁহারাও, যৎপয়োনাস্তি শোকাভিভূত হইয়া, প্রভূত বাষ্পবারি বিমোচিত করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, লক্ষ্মণ, আর অপেক্ষা করিতে না পারিয়া, বিনয়পূর্ণ বচনে জিজ্ঞাসা করিলেন, আর্য্য, আপনকার এই অবস্থা দেখিয়া, আমরা ম্রিয়মাণ হইয়াছি। ভবদীয়, ভাব দর্শনে স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে, অবশ্যই কোনও অপ্রতিবিধেয় অনিষ্টসংঘটন হইয়াছে। গভীর জলধি, কখনও, অল্প কারণে আকুলিত হয় না; সামান্য বায়ুবেগের প্রভাবে, হিমাচল কদাচ বিচলিত হইতে পারে না। অতএব, কি কারণে, আপনি এরূপ কাতরভাবাপন্ন হইয়াছেন, তাহার সবিশেষ নির্দ্দেশ করি, আমাদের প্রাণরক্ষা করুন। আপনকার মুখারবিন্দ সায়ংকালের কমল অপেক্ষাও ম্লান, ও প্রভাতসময়ের শশধর অপেক্ষাও নিষ্প্রভ, লক্ষিত হইতেছে। ত্বরায় বলুন, আর বিলম্ব করিবেন না। আমাদের হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে।

লক্ষ্মণ, এইরূপ আগ্রহাতিশয় সহকারে, কারণ জিজ্ঞাসু হইলে, রামচন্দ্র অতি দীর্ঘনিশ্বাসভার পরিত্যাগ পূর্ব্বক, দুর্বহ শোকভরে অভিভূত হইয়া, নিতান্ত কাতর স্বরে থলিতে লাগিলেন, বৎস ভরত, বৎস লক্ষ্ণণ, বৎস শত্রুঘ্ন, তোমরা আমার জীবন; তোমরা আমার সর্ব্বস্ব ধন; তোমাদের নিমিত্তই আমি দুর্বহ রাজ্যভারের দুঃসহ বহনক্লেশ সহ্য করিতেছি। হিতসাধনে বা অহিতনিবারণে তোমরাই আমার প্রধান সহায়। আমি বিষম বিপদে পড়িয়াছি, এবং সেই বিপদ্‌ হইতে উদ্ধারলাভের অভিপ্রায়ে, তোমাদিগকে অসময়ে সমবেত করিয়াছি। আপতিত অনিষ্টের নিবারণোপায় একমাত্র আছে। আমি, অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া, অবশেষে, সেই উপায় অবলম্বন করাই সর্ব্বতোভাবে বিধেয় বোধ করিয়াছি। তোমরা অবহিত চিত্তে শ্রবণ কর; সকল বিষয়ের সবিশেষ সমস্ত তোমাদের গোচর করিয়া, সমুচিত অনুষ্ঠান দ্বারা, উপস্থিত, বিপৎপাত হইতে নিষ্কৃতিলাভ করিব।

এই বলিয়া, রাম বিরত হইলেন, এবং পুনর্বার, প্রবল বেগে, অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন। অমুজেরা, তদ্দর্শনে পূর্বাপেক্ষা অধিকতর কাতর হইয়া, ভাবিতে লাগিলেন, আর্য্যের ভাব দেখিয়া বোধ হইতেছে, অবশ্যই অতি বিষম অনর্থপাত ঘটিয়াছে; না জানি, কি সর্ব্বনাশের কথাই বলিবেন। কিন্তু, অনুভবশক্তি দ্বারা কিছুরই অনুধাবন করিতে না পারিয়া, শ্রেবণের নিমিত্ত নিতান্ত উৎসুক হইয়া, তাঁহারা, একান্ত আকুল হৃদয়ে, তদীয় বদনে দৃষ্টিযোজনা করিয়া রহিলেন।

রাম, কিয়ৎ ক্ষণ, মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন, অনন্তর, দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া বলিলেন, ভ্রাতৃগণ, শ্রবণ কর; আমাদের পূর্ব্বে, ইক্ষাকুবংশে যে মহানুভব নরপতিগণ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁহারা অপ্রতিহত প্রভাবে প্রজাপালন, ও অশেষবিধ অলৌকিক কর্ম্মসমুদয়ের অনুষ্ঠান দ্বারা, এই পরম পবিত্র রাজবংশকে ত্রিলোকবিখ্যাত করিয়া গিয়াছেন। আমার মত হতভাগ্য আর নাই; আমি জন্মগ্রহণ করিয়া সেই চিরপবিত্র ত্রিলোকবিখ্যাত বংশকে দুষ্পরিহর কলঙ্কপঙ্কে লিপ্ত করিয়াছি। লক্ষণ, তোমার কিছুই অবিদিত নাই। যৎকালে, আমরা তিন জনে পঞ্চবটীতে অবস্থিতি করি, দুর্বৃত্ত দশানন, আমাদের অনুপস্থিতিকালে, বলপূর্ব্বক, সীতারে আপন আলয়ে লইয়া যায়। সীতা একাকিনী, সেই দুর্বত্তের আলয়ে, দীর্ঘ কাল অবস্থিতি করেন। অবশেষে আমরা সুগ্রীবের সহায়তায়, দুরাচারের সমুচিত শাস্তিবিধান করিয়া, সীতার উদ্ধারসাধন করি। আমি সেই একাকিনী পরগৃহবাসিনী সীতারে লইয়া গৃহে রাখিয়াছি; ইহাতে পৌরগণ ও জনপদবর্গ অসন্তোষপ্রদর্শন ও কলঙ্ককীর্ত্তন করিতেছে। এজন্য, আমি প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, জানকীরে আর গৃহে রাখিব না। সর্ব্ব প্রযত্নে প্রজারঞ্জন, রাজার পরম ধর্ম্ম। যদি তাহাতে কৃতফার্য্য হইতে না পারি, নিতান্ত অনার্য্যের ন্যায়, বৃথা জীবনধারণের ফল কি বল। এক্ষণে, তোমরা, প্রশস্ত মনে, অনুমোদন কর; তাহা হইলে, আমি উপস্থিত সঙ্কট হইতে পরিত্রাণ পাই।

অগ্রজের এই কথা শ্রবণগগাচর করিয়া, অনুজেরা যৎপরোনাস্তি বিষন্ন হইলেন; এবং, ভয়ে ও বিস্ময়ে একান্ত অভিভূত ও কিংবর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ, অধোমুখে মৌনভাবে অবস্থিতি করিলেন। পরিশেষে, লক্ষ্মণ, অতি কাতর স্বরে, বিনীত ভাবে, নিবেদন করিলেন,—আর্য্য, আপনি যখন যে আজ্ঞা করিয়াছেন, আমরা কখনও তাহাতে দ্বিরুক্তি বা আপত্তি করি নাই। এক্ষণেও, আমরা আপনার আজ্ঞাপ্রতিরোধে প্রবৃত্ত নহি। কিন্তু, আপনকার প্রতিজ্ঞা শুনিয়া, আমাদের প্রাণপ্রয়াণের উপক্রম হইয়াছে। আমরা যে, আপনার নিকটে আসিয়া, এরূপ সর্ব্বনাশের কথা শুনিব, এক মুহূর্ত্তের নিমিত্ত, আমাদের অন্তঃকরণে সে আশঙ্কার উদয় হয় নাই। যাহা হউক, এ বিষয়ে আমার কিছু বক্তব্য আছে, যদি অনুমতি প্রদান করেন, নিবেদন করি।

লক্ষ্মণের এই বিনয়পূর্ণ কাতর বাক্য শ্রবণগগাচর করিয়া, রাম বলিলেন, বৎস, যাহা বলিতে ইচ্ছা হয়, স্বচ্ছন্দে বল। তখন লক্ষণ বলিলেন,—আর্য্যা জানকী একাকিনী রাবণগৃহে অবস্থিতি করিয়াছিলেন, যথার্থ বটে; এবং রাবণও অতি দুর্বৃত্ত, তাহার কোনও সংশয় নাই। কিন্তু, দুরাচারের সমুচিত শান্তিবিধানের পর, আর্য্যা আপনার সম্মুখে আনীত হইলে, আপনি, লোকাপবাদভয়ে, প্রথমতঃ, গ্রহণ করিতে অসম্মত হইয়াছিলেন; পরে, অলৌকিক পরীক্ষা দ্বারা, তিনি শুদ্ধচারিণী বলিয়া নিঃসংশয়িত রূপে স্থিরীকৃত হইলে, তাঁহারে গৃহে আনিয়াছেন। সে পরীক্ষাও সর্ব্ব জনসমক্ষে সমাহিত হইয়াছিল। আমরা উভয়ে, আমাদের সমস্ত সেনা ও সেনাপতিগণ, এবং যাবতীয় দেবগণ, দেবর্ষিগণ, ও মহর্ষিগণ পরীক্ষাকালে উপস্থিত ছিলেন। সকলেই, সাধুবাদপ্রদান পূর্ব্বক, আর্য্যা একান্ত শুদ্ধচারিণী বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছেন। সুতরাং, তাঁহারে আর পরগৃহবাসনিবন্ধন অপবাদে দুষিত করিবার সম্ভাবনা নাই। অতএব, আপনি কি কারণে, এক্ষণে, এরূপ বিষম প্রতিজ্ঞা করিতেছেন, বুঝিতে পারিতেছি না। অমূলক লোকাপবাদ শুনিয়া, ভবাদৃশ মহানুভাবদিগের বিচলিত হওয়া উচিত নহে। সামান্য লোকের, ন্যায় অন্যায় বিবেচনা নাই। তাহাদের বুদ্ধি ও বিবেচনা অতি সামান্য; যাহা তাহাদের মনে উদিত হয়, তাহাই বলে; এবং যাহা শুনে, সম্ভব অসম্ভব বিবেচনা না করি, প্রকৃত ঘটনা বলিয়া তাহাতেই বিশ্বাস করে। তাহাদের কথায় আস্থা করিতে গেলে, সংসারযাত্রা, সম্পন্ন হয় না। আর্য্যা যে সম্পূর্ণ শুদ্ধচারিণী, সে বিষয়ে, অন্ততঃ আমি যত দূর জানি, আপনকার অন্তঃকরণে অণুমাত্র সংশয় নাই'; এবং, অলৌকিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, তিনি আপন শুদ্ধচারিতার যে অসংশয়িত পরিচয়প্রদান করিয়াছেন, তাহাতে কাহারও অন্তঃকরণে অণুমাত্র সংশয় থাকিতে পারে না। এমন স্থলে, আর্য্যাকে গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিলে, লোকে আমাদিগকে নিতান্ত অপদার্থ স্থির করিবে। এবং ধর্ম্মতঃ বিবেচনা করিতে গেলে, আমাদিগকে দুরপনেয় পাপপঙ্কে লিপ্ত হইতে হইবে। অতএব, আপনি সকল বিষয়ের সবিশেষ পর্য্যালোচনা করিয়া কার্য্যাবধারণ করুন। আমরা আপনার একান্ত আজ্ঞাবহ; যে আজ্ঞা করিবেন, তাহাই, অসন্দিহান চিত্তে, শিবোধার্য্য করিব।

এই বলিয়া, লক্ষণ বিরত হইলেন। রাম, কিয়ৎ ক্ষণ, মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন; অনন্তর, দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ করিয়া বলিলেন, বৎস, সীতা যে একান্ত শুদ্ধচারিণী, সে বিষয়ে আমার অণুমাত্র সংশয় নাই; সামান্য লোকে যে, কোনও বিষয়ের সবিশেষ অনুধাবন না করিয়া, যাহা শুনে, বা যাহা তাহাদের মনে উদিত হয়, তাহাতেই বিশ্বাস করে ও তাহারই আন্দোলন করে, তাহাও বিলক্ষণ জানি। কিন্তু, এ বিষয়ে প্রজাদিগের কিছুমাত্র দোষ নাই; আমাদের অপরিণামদর্শিতা ও অবিমৃশ্যকারিতা দোষেই, এই বিষম সর্ব্বনাশ ঘটিতেছে। যদি আমরা, অযযাধ্যায় আসিয়া, সমবেত পৌরগণ ও জানপদবর্গ সমক্ষে, জানকীর পরীক্ষা করিতাম, তাহা হইলে, তাহাদের অন্তঃকরণ হইতে তৎসংক্রান্ত সকল সংশয় অপসারিত হইত। সীতা, অলৌকিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, স্বীয় শুদ্ধাচারিতার অসংশয়িত পরিচয়প্রদান করিয়াছেন বটে; কিন্তু, সেই পরীক্ষার যথার্থতা বিষয়ে প্রজালোকের সম্পূর্ণ বিশ্বাস নাই। বোধ করি, অনেকে পরীক্ষাব্যাপারের বিন্দু বিসর্গ অবগত নহে। সুতরাং, সীতায় চরিত্র বিষয়ে তাহাদের সংশয় দূর হয় নাই। বিশেষতঃ, রাবণের চরিত্র, ও বহু কাল একাকিনী সীতার তদীয় আলয়ে অবস্থান, এ দুই বিষয়ের বিবেচনা করিলে, সীতার চরিত্র বিষয়ে সন্দিহান হওয়া আশ্চর্য্যের বিষয় নহে। অতএব, আমি প্রজাদিগকে কোনও অংশে দোষ দিতে পারি না। আমারই অদৃষ্টবৈগুণ্য বশতঃ, এই উপদ্রব উপস্থিত হইতেছে। আমি যদি রাজ্যের ভারগ্রহণ না করিতাম; এবং, ধর্ম্ম সাক্ষী করিয়া, প্রজারঞ্জনপ্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ না হইতাম; তাহা হইলে, অমুলক লোকাপবাদে অবজ্ঞাপ্রদর্শন করিয়া, নিরুদ্বেগে সংসারযাত্রানির্বাহ করিতাম। যদি রাজা হইয়া প্রজারঞ্জন করিতে না পারিলাম, তাহা হইলে, জীবনধারণের ফল কি? দেখ, প্রজালোকে, সীতা অসতী বলিয়া, সিদ্ধান্ত করিয়া রাখিয়াছে; তাহাদের অন্তঃকরণ হইতে সেই সিদ্ধান্ত অপসারিত করা কোনও মতে সস্তাবিত নহে। সুতরাং, সীতাকে গৃহে রাখিলে, তাহারা আমারে অসতীসংসর্গী বলিয়া ঘৃণা, করিবে। যাবজ্জীবন ঘৃণাস্পদ হওয়া অপেক্ষা প্রাণত্যাগ করা ভাল। আমি, প্রজারঞ্জনের অনুরোধে; প্রাণত্যাগে। পরায়ুখ নহি; তোমরা আমার প্রাণাধিক; যদি ঐ অনুরোধে তোমাদিগেরও সংসর্গপরিত্যাগ করিতে হয়, তাহাতেও কাতর নহি; সে বিবেচনায়, সীতাপরিত্যাগ তাদৃশ দুরূহ ব্যাপার নহে। অতএব, তোমরা যত বল না কেন, ও যত অন্যায় হউক না কেন, আমি, সীতাকে গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিয়া, কুলের কলঙ্কবিমোচন করিব, নিশ্চয় করিয়াছি। যদি তোমাদের আমার উপর দয়া ও স্নেহ থাকে, এ বিষয়ে আর আপত্তি উত্থাপিত করিও না। হয় সীতাপরিত্যাগ, নয় প্রাণপরিত্যাগ করিব, ইহার একতয় পক্ষ স্থির সিদ্ধান্ত জানিবে।

এই বলিয়া, দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ করিয়া, রাম কিয়ৎ ক্ষণ, অশ্রুপূর্ণ নয়নে, অবনত বদনে, মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন; অনন্তর, লক্ষণকে বলিলেন, বৎস, অন্তঃকরণ হইতে সকল ক্ষোভ দূর করিয়া, আমার আদেশপ্রতিপালন কর। ইতঃপূর্ব্বেই, সীতা তপোবনদর্শনের অভিলাষ করিয়াছেন; সেই ব্যপদেশে, তুমি তাঁহারে লইয়া গিয়া মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে রাখিয়া আইস; তাহা হইলে, আমার প্রীতিসম্পাদন করা হয়। এ বিষয়ে আপত্তি করিলে, আমি যার পর নাই অসন্তুষ্ট হইব। তুমি কখনও আমার আত্মালঙ্ঘন কর নাই। অতএব বৎস; কল্য প্রভাতেই, মদীয় আদেশের অনুযায়ী কার্য্য করিবে, কোনও মতে অন্যথা করিবে না। আর, আমার সবিশেষ অনুরোধ এই, আমি যে হারে, এ জন্মের মত, বিসর্জন দিলাম, ভাগীরথী পার হইবার পূর্ব্বে, জানকী যেন, কোনও অংশে, এ বিষয়ের কিছুমাত্র জানিতে না পারেন। তোমার হৃদয় কারুণ্যরসে পরিপূর্ণ; এই নিমিত্ত, তোমায়। সাবধান করিয়া দিলাম।

এই বলিয়া, রামচন্দ্র, অবনত বদনে, অশ্রুবিমোচন করিতে লাগিলেন। তাঁহারাও তিন জনে, জানকীর পরিত্যাগ বিষয়ে তাঁহাকে তদ্রূপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেখিয়া, আপত্তিকরণে বিরত হইয়া, মৌনাবলম্বন পূর্ব্বক, বাষ্পবারিবিসর্জন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, রাম, সকলকে বিদায় দিয়া, বিশ্রামভবনে গমন করিলেন। চারি জনেরই, যার পর নাই, অসুখে রজনীযাপন হইল।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

লক্ষ্মণ নিষ্ক্রান্ত হইলে পর, রাম ও সীতা, বিশ্রামভবনে প্রবেশ করিয়া, অসঙ্কুচিত ভাবে, অশেষবিধ কথোপকথন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, সীতার নিদ্রাকর্ষণের উপক্রম হইল। তখন রাম বলিলেন, প্রিয়ে, যদি ক্লান্তিবোধ হইয়া থাকে, আমার গলদেশে ভুজলতা অর্পিত করিয়া, ক্ষণকাল বিশ্রাম কর। সীতা, কোমল বাহুল্লী দ্বারা, রামের গলদেশ অবলম্বন করিলে, তিনি অনির্বচনীয় স্পর্শসুখের অনুভব করিয়া বলিতে লাগিলেন, প্রিয়ে, তোমার বাহুলতার স্পর্শে আমার সর্ব্ব শরীরে যেন অমৃতধারার বর্ষণ হইতেছে, ইন্দ্রিয় -সকল অভূতপূর্ব্ব রসাবেশে অবশ হইয়া আসিতেছে, চেতনা।: বিলুপ্তপ্রায় হইতেছে; অকস্মাৎ আমার নিদ্রাবেশ, কি মোহাবেশ, উপস্থিত হইল, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। সীতা, রামমুখবিনিঃসৃত অমৃতায়মান বচনপরম্পরা শ্রবণগোচর করিয়া, হাস্যমুখে বলিলেন, নাথ, আপনি চিরানুকূল ও স্থিরপ্রসাদ। যাহা শুনিলাম, ইহা অপেক্ষা, স্ত্রীলোকের পক্ষে, আর কি সৌভাগ্যের বিষয় হইতে পারে! প্রার্থনা এই, যেন চির দিন এইরূপ স্নেহ ও অনুগ্রহ থাকে। সীতার মৃদু মধুর মোহন বাক্য কর্ণগোচর করিয়া, রাম বলিলেন, প্রিয়ে, তোমার কথা শুনিলে, শরীর শীতল হয়, কর্ণকুহর অমৃতরসে অভিষিক্ত হয়, ইন্দ্রিয় সকল বিমোহিত হয়, অন্তঃকরণের সজীবতা সম্পাদিত হয়। সীতা লজ্জিত হইয়া বলিলেন, নাথ, এই নিমিত্তই সকলে আপনাকে প্রিয়ংবদ বলে। যাহা হউক, অবশেষে এ অভাগিনীর যে। এত সৌভাগ্য ঘটিবে, ইহা স্বপ্নের অগোচর। এই বলিয়া, সীতা শয়নের নিমিত্ত উৎসুক হইলে, রাম বলিলেন, প্রিয়ে, এখানে অন্যবিধ শষ্যার সঙ্গতি নাই; অতএব, যে অনন্যসাধারণ রামবাহু, বিবাহসময় অবধি, কি গৃহে, কি বনে, কি শৈশবে, কি যৌবনে, উপধানস্থানীয় হইয়া আসিয়াছে, আজও সেই তোমার উপধানকার্য্য সম্পন্ন করুক। এই বলিয়া, রাম বাহু প্রসারিত করিলেন; সীতা, তদুপরি মস্তক বিন্যস্ত করিয়া, তৎক্ষণাৎ নিদ্রাগত হইলেন।

রাম, স্নেহভরে কিয়ৎ ক্ষণ সীতার মুখনিরীক্ষণ করিয়া, প্রীতিপ্রফুল্ল নয়নে বলিতে লাগিলেন, কি চমৎকার। যখনই প্রিয়ার বদনসুধাকরে, দৃষ্টিপাত করি, তখনই আমার চিত্তচকোর চরিতার্থ ও অন্তরাত্মা অনির্বচনীয় আনন্দবসে আপ্লুত হয়। ফলতঃ, ইনি গৃহের লক্ষীস্বরূপা, নয়নের রসাঞ্জনরূপিণী; ইহার স্পর্শ চন্দনরসে অভিষেকস্বরূপ; বাহুলতা; কণ্ঠদেশে বিনিবেশিত হইলে, শীতল মসৃণ মৌক্তিক হারের কার্য্য করে। কি আশ্চর্য্য! প্রিয়ায় সকলই অলৌকিক প্রীতিপ্রদ। রাম মনে মনে এইরূপ আলোচনা করিতেছেন, এমন সময়ে সীতা, নিদ্রাবেশে বলিয়া উঠিলেন; হা নাথ, কোথায় রহিলে।

সীতার স্বপ্নভাষিত শ্রবণগোচর করিয়া, রাম বলিতে লাগিলেন, কি চমৎকার! চিত্রদর্শনে, প্রিয়ার অন্তঃকরণে যে অতীত বিরহভাবনার আবির্ভাব হইয়াছিল, তাহাই, স্বপ্নে অস্তিত্বপরিগ্রহ করিয়া, যাতনাপ্রদান করিতেছে। এই বলিয়া, সীতার গাত্রে হস্তাবর্ত্তন করিতে করিতে, রাম, প্রেমভরে প্রফুল্লকলেবর হইয়া, বলিতে লাগিলেন, আহা! অকৃত্রিম প্রেম কি পরম পদার্থ! কি সুখ, কি দুঃখ, কি সম্পত্তি, কি বিপত্তি, কি যৌবন, কি বার্দ্ধক্য, সকল অবস্থাতেই একরূপ ও অবিকৃত। ঈদৃশ প্রণয়সুখের অধিকারী হওয়া অল্প সৌভাগ্যের কথা নহে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই, এরূপ প্রণয় জগতে নিতান্ত বিরল ও একান্ত দুর্লভ; যদি এত বিরল ও এত দুর্লভ না হইত, সংসারে সুখের সীমা থাকিত না।

রামের বাক্য সমাপ্ত না হইতেই, প্রতীহারী, সম্মুখে আসিয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিল, মহারাজ, দুর্মুখ দ্বারদেশে দণ্ডায়মান, কি আজ্ঞা হয়। দুর্মুখ অন্তঃপুরচারী অতি বিশ্বস্ত ভৃত্য। রাম, নূতন রাজ্যশাসন বিষয়ে প্রজা গণের অভিপ্রায় অবগত হইবার নিমিত্ত, তাহাকে নিয়োজিত করিয়াছিলেন। সে, প্রতিদিন, প্রচ্ছন্ন ভাবে, ঐ বিষয়ের অনুসন্ধান করিত, এবং যে দিন যাহা জানিতে পারি, রামের গোচর করিয়া যাইত। এক্ষণে উহাকে সমাগত শুনিয়া, রাম প্রতীহারীকে বলিলেন, হরায় উহারে আমার নিকটে আসিতে বল। দুর্মুখ আসিয়া, প্রণাম করিয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে সম্মুখে দণ্ডায়মান হইল। রাম, তাহার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, কি হে দুর্মুখ, আজ কি জানিতে পারিয়াছ, বল? দুর্মুখ বলিল, মহারাজ, কি পৌরগণ, কি জনপদগণ, সকলেই বলে, আমরা রামরাজ্যে পরম সুখে আছি।

এই কথা শুনিয়া, রাম বলিলেন, তুমি প্রতিদিনই প্রশংসা বাদের সংবাদ দিয়া থাক; যদি কেহ কোনও দোষকীর্ত্তন করিয়া থাকে, বল, তাহা হইলে প্রতিবিধানে যত্নবান্‌ হই; আমি, স্তুতিবাদশ্রবণবাসনায় তোমায় অনুসন্ধান করিতে পাঠাই নাই। দুর্মুখ, অন্য অন্য দিন, স্তুতিবাদ মাত্র শুনিয়া আসিত, সুতরাং, যাহা শুনিত, তাহাই অকপটে রামের নিকটে জানাইত। সে দিবস, সীতাসংক্রান্ত দোষকীর্ত্তন শুনিয়া, অপ্রিয়সংবাদপ্রদান অনুচিত, এই বিবেচনায়, গোপন করিয়া রাখিয়াছিল। এক্ষণে, রাম দোষকীর্ত্তনকথার উল্লেখ করিবামাত্র, সে চকিত ও হতবুদ্ধি হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ, মৌনাবলম্বন করিয়া রহিল; পরে, কথঞ্চিৎ বুদ্ধি স্থির করিয়া, শুষ্ক মুখে বিকৃত স্বরে বলিল, না মহারাজ, আমি কোনও দোষকীর্ত্তন শুনিতে পাই নাই। সে এই রূপে অপলাপ করিল বটে; কিন্তু, তাহার আকারপ্রকার দর্শনে, রামের অন্তঃকরণে বিষম সন্দেহ, উপস্থিত হইল। তখন তিনি, সাতিশয় চলচিত্ত হইয়া, আকুল বচনে বলিতে লাগিলেন, তুমি অবশ্যই দোষকীর্ত্তন শুনিয়াছ, অপলাপ করিতেছ কেন? কি শুনিমাছ বল, বিলম্ব করিও না; না বলিলে, আমি যার পর নাই অসন্তুষ্ট হইব, এবং, এ জন্মে, আর তোমার মুখাষলোকন করিব না।

রামের নির্ব্বন্ধাতিশয় দর্শনে সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া, দুর্মুখ মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিল, আমি কি বিষম সঙ্কটে পড়িলাম! কি রূপে রাজমহিষীসংক্রান্ত জনাপবাদ মহারাজের গোচর করিব? আমি অতি হতভাগ্য, নতুবা এরূপ কার্য্যের ভারগ্রহণ করিব কেন? কিন্তু যখন, অগ্র পশ্চাৎ না ভাবিয়া, ভারগ্রহণ করিয়াছি, তখন প্রভুর নিকটে, অকপটে, প্রকৃত কথাই বলা উচিত। এই স্থির করিয়া, সে কম্পিতকলেবর হইয়া বলিল, মহারাজ, যদি আমায় সকল কথা যথার্থ বলিতে হয়, আপনি গাত্রোখান করিয়া গৃহান্তরে চলুন; আমি সে সকল কথা, প্রাণান্তেও, এখানে বলিতে পারিব না। রাম, শুনিবার নিমিত্ত, এত উৎসুক হইয়াছিলেন যে, সীতার জাগরণ পর্য্যন্ত অপেক্ষা করিতে পারিলেন না; আস্তে আস্তে, আপন হস্ত হইতে তাঁহার মস্তক নাইলেন, এবং, দুর্মুখকে সমভিব্যাহারে লইয়া, সত্বর সন্নিহিত গৃহান্তরে প্রবেশ করিলেন।

এই রূপে গৃহান্তরে উপস্থিত হইয়া, রাম, সাতিশয় ব্যগ্রতাপ্রদর্শন পূর্ব্বক, দুর্মুখকে বলিলেন, বিলম্ব করিও না, কি শুনিয়াছ, বিশেষ করিয়া বল; তোমার আকার প্রকার দেখিয়া, আমার অন্তঃকরণে নানা সংশয় উপস্থিত হইতেছে। সে বলিল, মহারাজ, যে সর্ব্বনাশের কথা শুনিয়াছি, তাহা মহারাজের নিকট বলিতে হইবে এই মনে করিয়া, আমার সর্ব্ব শরীরের শোণিত শুষ্ক হইয়া যাইতেছে। কিন্তু যখন, পূর্ব্বাপর পর্য্যালোচনা না করিয়া, ওরূপ কার্য্যের ভার লইয়াছি, তখন অবশ্যই বলিতে হইবে। আমি যেরূপ শুনিয়াছি, নিবেদন করিতেছি, আমার অপরাধগ্রহণ করিবেন না। মহারাজ, প্রায় সকলেই, একবাক্য হইয়া, অশেষ প্রকারে, সুখ্যাতি করিয়া বলে, আমরা রামরাজ্যে পরম সুখে বাস করিতেছি; কোনও রাজা, কোশল দেশে, শাসনের এরূপ সুপ্রণালী প্রবর্ত্তিত করিতে পারেন নাই। কিন্তু, কেহ কেহ, রাজমহিষীর উল্লেখ করিয়া, কুৎসা করিয়া থাকে। তাহারা বলে, “আমাদের রাজার চিত্ত বড় নির্বিকার; একাকিনী সীতা এত কাল রাবণগৃহে রহিলেন; তিনি, তাহাতে কোনও দ্বৈধ বা দোষবোধ না করিয়া, অনায়াসে তাঁহারে গৃহে আনিলে। অতঃপর, আমাদের গৃহে স্ত্রীলোকদিগের চরিত্রে দোষ ঘটিলে, তাহাদের শাসন করা সহজ হইবে না; শাসন করতে গেলে, তাহারা, রাজমহিষীর উল্লেখ করিয়া, আমাদিগকে নিরুত্তর করিবে। অথবা, রাজা ধর্মাধর্ম্মের কর্ত্তা; তিনি যে ধর্ম অনুসারে চলিবেন, আমরা প্রজা, আমাদিগকেও, সেই ধর্ম্ম অবলম্বন করিয়া, চলিতে হইবে।” মহারাজ, যাহা শুনিয়াছিলাম, অবিকল নিবেদন করিলাম, আমার অপরাধমার্জ্জনা করিবেন। হা বিধাতঃ! এত দিনের পর, তুমি আমার দুমুখনাম অর্থ করিয়া দিলে! এই বলিয়, বিদায় লইয়া, রোদন করিতে করিতে, দুর্মুখ তথা হইতে প্রস্থান করিল।

দুর্মুখমুখে সীতাসংক্রান্ত অপবাদবৃত্তান্ত শ্রবণগোচর করিয়া, রাম, হা হতোহস্মি বলিয়া, ছিন্ন তরুর ন্যায়, ভূতলে পতিত হইলেন, এবং গলদশ্রু লোচনে, আকুল বচনে, বিলাপ ও পরিতাপ করিয়া বলিতে লাগিলেন, হায়! কি সর্ব্বনাশের কথা শুনিলাম। ইহা অপেক্ষা, আমার বক্ষঃস্থলে বজ্রাঘাত হওয়া ভাল ছিল। কি জন্য এখনও জীবিত রহিয়াছি। আমি নিতান্ত হতভাগ্য; নতুবা, কি নিমিত্তে, উপস্থিত রাজাধিকার বিসর্জন দিয়া, আমায় বনবাস আশ্রয় করিতে হইয়াছিল? কি নিমিত্তেই দুর্বৃত্ত দশানন, পঞ্চবটীতে প্রবেশ পূর্ব্বক, প্রাণপ্রিয়া জানকীরে লইয়া গিয়া, নির্মল রঘুকুল অভূতপূর্ব্ব অপবাদে দূষিত করিয়াছিল? কি নিমিত্তেই বা, সেই অপবাদ, অদ্ভুত উপায় দ্বারা নিঃসংশয়িতরূপে অপসারিত, হইয়াও, দৈবদুর্বিপাক বশতঃ পুনর্বার নবীভূত হইয়া, সর্ব্বতঃ সঞ্চারিত হইবে? সর্ব্বথা, আমার জন্মগ্রহণ ও শরীরধারণ দুঃখভোগের নিমিত্তেই নিরূপিত হইয়াছিল। এখন কি করি, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। এই লোকাপবাদ দুর্নিবার হইয়া উঠিয়াছে। এক্ষণে, অমূলক বলিয়া, এই অপবাদে উপেক্ষাপ্রদর্শন করি; অথবা, এ জন্মের মত নিরপরাধ জানকীরে বিসর্জন দিয়া, কুলের কলঙ্কবিমোচন করি; কি করি, কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না। কেহ কখনও আমার মত উভয় সঙ্কটে পড়ে না।

এইরূপ আক্ষেপ করিয়া, রাম, কিয়ৎ ক্ষণ, অধোদৃষ্টিতে মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। অনন্তর দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ পূর্ব্বক বলিলেন, অথবা এ বিষয়ে আর কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্যবিবেচনার প্রয়োজন নাই। যখন রাজ্যের ভারগ্রহণ করিয়াছি, সর্ব্বোপায়ে লোকরঞ্জন করাই আমার কর্ত্তব্য কর্ম্ম ও প্রধান ধর্ম্ম; সুতরাং, জানকীরেই বিসর্জন দিতে হইল। হা হত বিধে! তোমার মনে এই ছিল। এই বলিয়া, রাম মুর্চ্ছিত ও ভূতলে পতিত হইলেন।

কিয়ৎ ক্ষণ পরে চেতনাসঞ্চার হইলে, রাম নিতান্ত করুণ স্বরে বলিতে লাগিলেন, যদি আর আমার চেতনা না হইত, আমার পক্ষে সর্ব্বাংশে শ্রেয়স্কর হইত; নিরপরাধ জানকীয়ে বিসর্জন দিয়া, দুরপনেয় পাপপঙ্কে লিপ্ত হইতে হইত না। এই মাত্র, অষ্টাবক্রের সমক্ষে, প্রতিজ্ঞা করিলাম, যদি লোকরূঞ্জনের অনুরোধে, জানকীরেও বিসর্জন দিতে হয়, তাহাও করিব। এরূপ ঘটিবে বলিয়াই কি, আমার মুখ হইতে তাদৃশ বিষম প্রতিজ্ঞাবাক্য নিঃসৃত হইয়াছিল। হা প্রিয়ে জানকি! হা প্রিয়বাদিনি! হা রামময়জীবিতে! হা অরণ্যবাসসহচরি! পরিণামে তোমার যে এরূপ অবস্থা ঘটিবে তাহা স্বপ্নের অগোচর। তুমি এমন দুরাচারের, এমন নরাধমের, এমন হতভাগ্যের হস্তে পড়িয়াছিলে, যে, কিঞ্চিৎ কালের নিমিত্তও, তোমার ভাগ্যে সুখভোগ ঘটিয়া উঠিল না। তুমি, চন্দনতরুবোধে, দুর্বিপাক বিষবৃক্ষের আশ্রয়গ্রহণ করিয়াছিলে। আমি পরম পবিত্র রাজবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছি বটে; কিন্তু আচরণে চণ্ডাল অপেক্ষা সহস্র গুণে অধম; নতুবা, ‘বিনা অপরাধে, তোমায় বিসর্জন দিতে উদ্যত হইব কেন? হায়! যদি এই মুহূর্ত্তে আমার প্রাণবিয়োগ ঘটে, তাহা হইলে, আমি পরিত্রাণ পাই। আর বাঁচিয়া ফল কি; আমার জীবিত প্রয়োজন পর্য্যবসিত হইয়াছে; জগৎ ‘ শূন্য ও জীর্ণ অরণ্য প্রায় প্রতীয়মান হইতেছে।

এইরূপ বলিতে বলিতে, একান্ত আকুলহৃদয় ও কম্পমানকলেবর হইয়া, রাম কিয়ৎ ক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিলেন; অনন্তর, দীর্ঘ নিশ্বাস সহকারে, হায়! কি হইল বলিয়া, নিরতিশয় কাতর বাক্যে বলিতে লাগিলেন,—হা মাতঃ! হা তাত জনক! হা দেবি বসুন্ধরে! হা ভগবতি অরুন্ধতি! হা কুলগুরো বশিষ্ঠ! হা ভগবন্‌ বিশ্বামিত্র! প্রিয়বন্ধো বিভীষণ! হা পরমোপকারিন্‌ সখে সুগ্রীব! হা বৎস অঞ্জনা হৃদয়নন্দন! তোময়া কোথায় রহিয়াছ, কিছুই জানিতে পারিতেছ না; এখানে দুরাত্মা রাম তোমাদের সর্ব্বনাশে উদ্যত হইয়াছে। অথবা, আর আমি তাদৃশ মহাত্মাদিগের নামগ্রহণে অধিকারী নহি; আমার ন্যায় মহাপাতকী নামগ্রহণ করিলে, নিঃসন্দেহ তাঁহাদের পাপস্পর্শ হইবে। আমি যখন সরলহৃদয়া, শুদ্ধচারিণী, পতিপ্রাণা কামিনীরে, নিতান্ত নিরপরাধ জানিয়াও অনায়াসে বিসর্জন দিতে উদ্যত হইয়াছি, তখন আমা অপেক্ষা মহাপাতকী আর কে আছে? হা রামময়জীবিতে! পাষাণময় নৃশংস রাম হইতে, পরিণামে তোমার যে এরূপ দুর্গতি ঘটিবে, তাই তুমি স্বপ্নেও ভাব নাই। নিঃসন্দেহ, রামের হৃদয় বজ্রলেপময়; নতুবা এখনও বিদীর্ণ হইতেছে না কেন? অথবা, বিধাতা, জানিয়া শুনিয়াই, আমায় ঈদৃশ কঠিনহৃদয় করিয়াছেন; তাহা না হইলে; অনায়াসে এরূপ নৃশংস কর্ম্ম সম্পন্ন করিতে পারিব কেন? এই বলিয়া, গলদশ্রু নয়নে, বিশ্রামভবনে প্রতিগমন পূর্ব্বক, রাম, নিদ্রাভিভূতা সীতার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন; এবং অঞ্জলিবন্ধন পূর্ব্বক, সাতিশয় করুণ স্বরে সমোধন করিয়া বলিলেন, প্রিয়ে, হতভাগ্য রাম, এ জন্মের মত, বিদায় হইতেছে। এই বলিয়া, দুর্বিষহ শোকাহনে দগ্ধহৃদয় হইয়া, রাম গৃহ হইতে বহির্গত হইলেন, এবং অনুজগণের সহিত পরামর্শ করিয়া কর্ত্তব্যনিরূপণের নিমিত্ত, মন্ত্রভবন অভিমুখে প্রস্থান করিলেন।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

সীতাকে বনবাস দিয়া, রাম যার পর নাই অধৈর্য্য ও শোকাভিভূত হইলেন; এবং, আহার, বিহার, রাজকার্য্যপর্য্যালোচনা প্রভৃতি সমস্ত ব্যাপার একবারে বিসর্জন দিয়া, অন্যের প্রবেশপ্রতিষেধ পূর্ব্বক, একাকী, আপন বাসভবনে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। তিনি সীতাকে নিতান্ত পতিপ্রাণা ও একান্ত শুদ্ধচারিণী বলিয়া জানিতেন; এবং, পৃথিবীতে যত প্রিয় পদার্থ আছে, সর্ব্বাপেক্ষা তাঁহাকে অধিক ভাল বাসিতেন। বস্তুতঃ, উভয়ের এক মন, এক প্রাণ; কেবল, শরীর মাত্র বিভিন্ন ছিল। সীতা যেরূপ সাধুশীলা ও সরলান্তঃকরণা, রামও সর্ব্বাংশে তদনুরূপ ছিলেন; সীতা যেরূপ পতিপ্রাণা,; পতিহিতৈষিণী, পতিসুখে সুখিনী; রামও সেইরূপ সীতাগতপ্রাণ, সীতাহিতাকাঙ্ক্ষী ও সীতাসুখে সুখী ছিলেন। গৃহে রাজভোগে থাকিলে, তাঁহাদের যেরূপ সুখে সময় অতিবাহিত হইত; বনবাসে, পরস্পর সন্নিধান বশতঃ, বরং তদপেক্ষা অধিক সুখে কালযাপন হইয়াছিল। বনবাস হইতে বিনিবৃত্ত হইলে, তাঁহাদের পরস্পর প্রণয় ও অনুরাগ শত গুণে প্রগাঢ় হইয়া উঠে। উভয়েই উভয়কে, এক মুহূর্ত্তের নিমিত্ত, নয়নের অন্তরাল করিতে পারিতেন না। রাম, কেবল লোকবিরাগসংগ্রহের ভয়ে সীতাকে নির্বাসিত করিয়াছিলেন; সুতরাং, সীতানির্বাসনশোক তাঁহার একান্ত অসহ্য হইয়া উঠিল।

রামের আন্তরিক অসুখের সীমা ছিল না। কেনই আমি রাজবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলাম; কেনই আমি বনবাস হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইলাম; কেনই আমি পুনরায় রাজ্যের ভারগ্রহণ করিলাম; কেনই আমি দুর্মুখকে, পৌরগণের ও জানপদবর্গের অভিপ্রায়পরিজ্ঞানের নিমিত্ত, নিয়োজিত করিলাম; কেনই আমি লক্ষ্মণের উপদেশ অনুসারে না চলিলাম; কেনই আমি, নিতান্ত নৃশংস হইয়া, সীতারে বনবাস দিলাম; কেনই আমি, নিরতিশয় ক্লেশকর অকিঞ্চিৎকর রাজ্যভারবিসর্জন দিয়া, সীতার সমভিব্যাহারী না হইলাম; কি বলিয়া মনকে প্রবোধ দিব; কেমন করিয়া প্রাণধারণ করিব; প্রিয়ারে বনবাস দেওয়া অপেক্ষা, আমার আত্মঘাতী হওয়া সহস্র গুণে শ্রেয়ঃকল্প ছিল; ইত্যাদি প্রকারে, তিনি, অহোরাত্র, বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন। দুঃসহ শোকানলে নিরন্তর জ্বলিত হইয়া, তাঁহার শরীর, অল্প দিনের মধ্যেই, অর্দ্ধাবশিষ্ট হইল।

তৃতীয় দিবস, মধ্যাহ্ন সময়ে, লক্ষ্মণ, নিতান্ত দীনভাবাপন্ন মনে, অযোধ্যায় প্রবেশ করিলেন; এবং, সর্ব্বাগ্রে রামচন্দ্রের বাসভবনে গমন করিয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁহার সম্মুখদেশে দণ্ডায়মান হইয়া, গলদশ্রু লোচনে, গদ্গদ বচনে নিবেদন করিলেন, আর্য্য, দুরাত্মা লক্ষ্মণ আপনকার আজ্ঞাপ্রতিপালন করিয়া আসিল। রাম, অবলোকন ও আকর্ণনমাত্র, হা প্রেয়সি! বলিয়া, মূর্চ্ছিত ও ভূতলে পতিত হইলেন। লক্ষ্মণ, একান্ত শোকভারাক্রান্ত হইয়াও, বহু যত্নে, তাঁহার চৈতন্যসম্পাদন করিলেন। তখন তিনি, কিয়ৎ ক্ষণ শূন্য নয়নে লক্ষ্মণের মুখনিরীক্ষণ করিয়া, হাহাকার ও অতিদীর্ঘনিশ্বাসভারপরিত্যাগ পূর্ব্বক, ভাই লক্ষ্মণ! তুমি জানকীরে কোথায় রাখিয়া আসিলে; আমি, তাঁহার বিরহে, কেমন করিয়া প্রাণধারণ করিব; আর যে যাতনা সহ্য হয় না; এই বলিয়া, লক্ষ্মণের গলায় ধরিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। উভয়েই, অধৈর্য্য হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ বাষ্পবিসর্জন করিলেন। অনন্তর লক্ষ্মণ, অতি কষ্টে, স্বীয় শোকাবেগের সংবরণ করিয়া, রামের সান্ত্বনার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। রাম, কিঞ্চিৎ শান্তচিত্ত হইয়া, লক্ষ্মণের মুখে সীতাবিলাপান্ত’ সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইলেন। নয়নজলে বক্ষঃস্থল ভাসিয়া গেল; ঘন ঘন নিশ্বাস বহিতে লাগিল; কণ্ঠরোধ হইয়া, তিনি বাক্‌শক্তিরহিত হইয়া রহিলেন; এবং, পূর্ব্বাপর সমস্ত ব্যাপারের আলোচনা করিতে করিতে, দুঃসহ শোকভার আর সহ্য করিতে না পারিয়া, পুনরায় মূর্চ্ছিত হইলেন।

লক্ষ্মণ, পুনরায় পরম যত্নে, রামচন্দ্রের চৈতন্যসম্পাদন করিলেন; এবং, তাঁহার তাদৃশী দশা দেখিয়া, মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন, আর্য্য যে দুস্তর শোকসাগরে পরিক্ষিপ্ত হইলেন, তাহাতে এ জন্মে আর সুস্থচিত্ত হইতে পারিবেন না। শোকাপনোদনের কোনও উপায় দেখিতেছি না। যাহা হউক, সান্ত্বনার চেষ্টা করা আবশ্যক। তিনি, এইরূপ আলোচনা করিয়া, বিনয়পূর্ণ প্রণয়গর্ভ বচনে বলিলেন, আর্য্য, শোকে ও মোহে এরূপ অভিভূত হওয়া, ভবাদৃশ মহানুভাবের পক্ষে, কদাচ উচিত নহে। আপনি সকলই বুঝিতে পারেন। যাদৃশ বিধিনির্বন্ধ ছিল, ঘটিয়াছে; নতুবা আপনি, অকারণে, অথবা সামান্য কারণে, আর্য্যাকে বিসর্জন দিবেন, ইহা কাহার মনে ছিল! বিবেচনা করিয়া দেখুন, সংসারে কিছুই চির দিনের জন্য নহে। বৃদ্ধি হইলেই ক্ষয় আছে; উন্নতি হইলেই পতন হয়; সংযোগ হইলেই বিয়োগ ঘটে; জীবন হইলেই মরণ হইয়া থাকে। এই চিরপরিচিত সাংসারিক নিয়মের, কোনও কালে, অন্যভাব দেখিতে পাওয়া যায় না। এই সমুদয়ের আলোচনা করিয়া, আপনকার শোকসংবরণ করা উচিত, বিশেষতঃ, আপনি সকল লোকের হিতানুশাসন কার্য্যের ভার গ্রহণ করিয়াছেন; সে জন্যও আপনকার শোকাভিভূত হওয়া বিধেয় নহে। প্রিয়বিয়োগ ও অপ্রিয়সংযোগ শোকের কারণ, তাহার সন্দেহ নাই; কিন্তু ভবাদৃশ মহানুভাবদিগের একান্ত শোকাভিভূত হওয়া কদাচ উচিত হয় না। প্রাকৃত লোকেই শোকে ও মোহে বিচেতন হইয়া থাকে। অতএব, ধৈর্য্য অবলম্বন করুন; এবং, অন্তঃকরণ হইতে অকিঞ্চিৎকর শোককে নিষ্কাশিত করিয়া, রাজকার্য্যে মনোনিবেশ করুন। আর, আপনকার ইহারও অনুধাবন করা আবশ্যক, আপনি, কেবল লোকবিরাগসংগ্রহের ভয়ে, আর্য্যারে নির্বাসিত করিয়াছেন। আর্য্যাকে গৃহে রাখিলে, প্রজালোকে বিরাগ প্রদর্শন করিবে, কেবল এই আশঙ্কায়, আপনি তাঁহাকে বনবাস দিয়াছেন। এক্ষণে, তাঁহার নিমিত্ত শোকাকুল হইলে, সে আশঙ্কার নিরাস হইতেছে না। সুতরাং, যে দোষের পরিহারমানসে, আপনি ঈদৃশ দুষ্কর কর্ম্ম করিলেন, সেই দোষ পূর্ব্ববৎ প্রবল রহিতেছে; আর্য্যার পরিত্যাগে কোনও ফলোদয় হইতেছে না। আর, ইহারও অনুধাবন করা আবশ্যক, আপনি যত দিন শোকাভিভূত থাকিবেন, রাজকার্য্যে মনোনিবেশ করিতে পারিবেন না। প্রজাপালনকার্য্য উপেক্ষিত হইলে, রাজধর্ম্মপ্রতিপালন হয় না। অতএব, সকল বিষয়ের সবিশেষ পর্য্যালোচনা করিয়া, ধৈর্য্য অবলম্বন করুন; আর অধিক শোক ও মনস্তাপ করা কোনও ক্রমেই শ্রেয়স্কর নহে। অতীত বিষয়ের অনুশোচনায় কালহরণ করা সদ্বিবেচনার কার্য্য নয়।

লক্ষ্মণ এই বলিয়া বিরত হইলে, রাম কিয়ৎ ক্ষণ মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন; অনন্তর, সস্নেহ সম্ভাষণ পূর্ব্বক বলিলেন, বৎস, তোমার উপদেশবাক্য শুনিয়া, আমার জ্ঞানোদয় হইল। তুমি যথার্থ বলিয়াছ, আমি, যে উদ্দেশে, জানকীরে বনবাস দিয়া, রাক্ষসের ন্যায়, নিরতিশয় নৃশংস আচরণ করিলাম; এক্ষণে তাঁহার জন্য শোকাকুল হইলে, তাহা বিফল হইয়া যায়। বিশেষতঃ, শোকের ধর্ম্মই এই, তাহাতে অভিভূত হইলে, উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই প্রাপ্ত হইতে থাকে। শোকাভিভূত ব্যক্তি অভীষ্টলাভ করিতে পারে না, কেবল কর্ত্তব্য কর্ম্মে উপেক্ষা বশতঃ প্রত্যবায়গ্রস্ত হয়। অতএব, এই মুহূর্ত্ত অবধি, আমি শোকসংবরণে যত্নবান্ হইলাম। প্রতিজ্ঞা করিতেছি, আর আমি শোকে অভিভূত হইব না। প্রজালোকে, কোনও ক্রমে, আমায় শোকাভিভূত বোধ করিতে পারিবে না। অমাত্যদিগকে বল, কল্য অবধি, রীতিমত রাজকার্য্যপর্য্যালোচনায় প্রবৃত্ত হইব; তাঁহারা যেন, যথাকালে সমস্ত আয়োজন করিয়া, কার্য্যালয়ে উপস্থিত থাকেন।

এই বলিয়া, রামচন্দ্র, অবনত বদনে, কিয়ৎ ক্ষণ মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন; অনন্তর, অশ্রুপূর্ণ লোচনে, আকুল বচনে বলিতে লাগিলেন, হায়! রাজত্ব কি বিষম অসুখের ও বিপদের আস্পদ! লোকে, কি সুখভোগের লোভে, রাজ্যাধিকারলাভের কামনা করে, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। রাজ্যের ভার গ্রহণ করিয়া, আমায়, এ জন্মের মত, সকল সুখে জলাঞ্জলি দিতে হইল। যার পর নাই, নৃশংস হইয়া, নিতান্ত নিরপরাধে, প্রিয়ারে বনবাস দিলাম। এক্ষণে, তাঁহার জন্য যে অশ্রুপাত করিব, তাহারও পথ নাই। রাজত্বলাভে এই ফল দর্শিয়াছে যে, আমাকে স্নেহ, দয়া, মমতা, ও ভদ্রতার বিসর্জ্জন দিতে হইল। উত্তরকালীন লোকেরা, নিতান্ত নৃশংস অথবা নিতান্ত অপদার্থ বলিয়া, আমায় গণনা ও কলঙ্কঘোষণা করিবে।

এইরূপ আক্ষেপ করিয়া, রাম, কিয়ৎ ক্ষণ পরে, লক্ষ্মণকে বিদায় দিলেন; এবং, ধৈর্য্যাবলম্বন ও শোকাবেগসংবরণ পূর্ব্বক, পর দিন প্রভাত অবধি, যথানিয়মে রাজকার্য্যপর্য্যালোচনায় প্রবৃত্ত হইলেন। এই রূপে, তিনি রাজকার্য্যপর্যবেক্ষণে মনোনিবেশ করিলেন বটে; এবং লোকেও, বাহ্য আকার দর্শনে, বোধ করিতে লাগিল, রামচন্দ্র বড় ধৈর্য্যশীল, অনায়াসেই দুঃসহ শোকের সংবরণ করিলেন। কিন্তু, তাঁহার কোমল অন্তঃকরণ নিরন্তর দুর্বিষহ শোকদহনে দগ্ধ হইতে লাগিল। নিতান্ত নিরপরাধে প্রিয়ারে বনবাস দিয়াছি, এই শোক ও ক্ষোভ, বিষদিগ্ধ শল্যের ন্যায়, তাঁহাকে সতত মর্ম্মবেদনা প্রদান করিতে লাগিল। কেবল লোকবিরাগসংগ্রহের ভয়ে, তিনি জানকীরে নির্বাসিত করেন; এক্ষণেও, কেবল সেই লোকবিরাগসংগ্রহের ভয়েই, বাহ্য আকারে শোকসংবরণ করিলেন। যৎকালে, তিনি, নৃপাসনে আসীন হইয়া, মুর্ত্তিমান্ ধর্ম্মের ন্যায়, স্থির চিত্তে রাজকার্য্যপর্য্যালোচনা করিতেন, তখন তাঁহাকে দেখিয়া লোকে রোধ করিত, ভূমণ্ডলে তাঁহার তুল্য ধৈর্য্যশীল পুরুষ আর নাই। কিন্তু, রাজকার্য্য হইতে অবসৃত হইয়া, বিশ্রামভবনে প্রবেশ করিলেই, তিনি যৎপরোনাস্তি বিকলচিত্ত হইতেন। লক্ষ্মণ সদা সন্নিহিত থাকিতেন, এবং সান্ত্বনা করিবার নিমিত্ত অশেষবিধ প্রয়াস পাইতেন। কিন্তু, লক্ষ্মণের সান্ত্বনাবাক্যে, তাঁহার শোকানল প্রবল বেগে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিত। ফলতঃ, তিনি, কেবল হাহাকার, বাষ্পমোচন, আত্মভর্ৎসন, ও সীতার গুণকীর্ত্তন করিয়া, বিশ্রামসময় অতিবাহিত করিতেন। এই রূপে দুর্নিবার সীতাবিবাসনশোকে একান্ত আক্রান্ত হইয়া, তিনি দিন দিন কৃশ, মলিন, দুর্বল, ও সর্ব্ব বিষয়ে নিতান্ত নিরুৎসাহ হইতে লাগিলেন। বস্তুতঃ, রাজকার্য্য ব্যতীত, আর কোনও বিষয়েই তাঁহার প্রবৃত্তি ও উৎসাহ রহিল না।

এ দিকে, কিয়ৎ দিন পরে, জানকী দুই যমল কুমার প্রসব করিলেন। মহর্ষি বাল্মীকি, যথাবিধানে জাতকর্ম্মপ্রভৃতি ক্রিয়াকলাপ সম্পন্ন করিয়া, জ্যেষ্ঠের নাম কুশ ও কনিষ্ঠের নাম নাম লব রাখিলেন। মুনিতনয়ারা, সীতার সন্তান প্রসব দর্শনে, যার পর নাই, হর্ষ প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। সমস্ত আশ্রমে অতি মহান্ আনন্দকোলাহল হইতে লাগিল। সীতা, দুঃসহ প্রসববেদনায় অভিভূত হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ অচেতনপ্রায় ছিলেন। তিনি অপেক্ষাকৃত সাচ্ছন্দ্যলাভ করিলে, মুনিতনয়ারা, উল্লসিত মনে, প্রীতিপূর্ণ বচনে বলিলেন, জানকি, আজ বড় আনন্দের দিন; সৌভাগ্যক্রমে, তুমি পরম সুন্দর কুমারযুগল প্রসব করিয়াছ। সীতা, শ্রবণমাত্র, অতিমাত্র প্রফুল্ল ও আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইলেন; কিন্তু, কিয়ৎ ক্ষণ পরে, শোকভরে নিতান্ত অভিভূত হইয়া, অবিরল ধারায় অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে মুনিকন্যারা, সস্নেহ সম্ভাষণ সহকারে, জিজ্ঞাসা করিলেন, অয়ি জানকি, এমন আনন্দের সময় শোকাকুল হইলে কেন? বাষ্পভরে জানকীর কণ্ঠরোধ হইয়াছিল; এজন্য, তিনি কিয়ৎ ক্ষণ কোনও উত্তর করিতে পারিলেন না; অনন্তর, উচ্ছলিত শোকাবেগের কিঞ্চিৎ সংবরণ করিয়া, বলিলেন, অয়ি প্রিয়সখিগণ, তোমরা কি কিছুই জান না, যে আমি, এমন আনন্দের সময়, কি জন্য শোকাকুল হইলাম, জিজ্ঞাসা করিতেছ? পুত্ত্রপ্রসব করিলে, স্ত্রীলোকের আহ্লাদের একশেষ হয়, যথার্থ বটে; কিন্তু, কেমন অবস্থায়, আমার সেই আহ্লাদের সময় উপস্থিত হইয়াছে। আমার যে, এ জন্মের মত, সকল সুখ, সকল সাধ, সকল আহ্লাদ ফুরাইয়া গিয়াছে। যদি এই হতভাগ্যেরা আমার গর্ভে না থাকিত, তাহা হইলে, যে মুহূর্ত্তে লক্ষ্মণ পরিত্যাগবাক্য শুনাইলেন, সেই মুহূর্ত্তে আমি, জাহ্নবীজলে প্রবেশ করিয়া, প্রাণত্যাগ করিতাম; অথবা, অন্য কোনও প্রকারে, আত্মঘাতিনী হইতাম। আমায় কি আবার প্রাণ রাখিতে হয়, না লোকালয়ে মুখ দেখাইতে হয়।

এই রলিয়া, একান্ত শোকভারাক্রান্ত হইয়া, জানকী, অনিবার্য্য বেগে, বাষ্পবারি বিসর্জন করিতে লাগিলেন। মুনিকন্যারা, সীতার ঈদৃশ হৃদয়বিদারণ বিলাপবাক্য শ্রবণগোচর করিয়া, নিরতিশয় দুঃখিত হইলেন, এবং প্রণয়পূর্ণ বচনে বলিতে লাগিলেন, প্রিয়সখি, শোকাবেগের সংবরণ কর; যাহা বলিতেছ, যথার্থ বটে; কিন্তু, অধিক দিন, তোমায় এ অবস্থায় কালযাপন করিতে হইবে না। রাজা রামচন্দ্রের বুদ্ধিবিপর্য্যয় ঘটিয়াছিল; তাহাতেই তিনি, কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া, ঈদৃশ অদৃষ্টচর অশ্রুতপূর্ব্ব নৃশংস আচরণ করিয়াছেন। আমরা পিতার মুখে শুনিয়াছি, তুমি অচিরে পরিগৃহীতা হইবে; অতএব শোকসংবরণ কর। মুনিতনয়াদিগের সান্ত্বনাবাদ শ্রবণে, সীতার নয়নযুগল হইতে, প্রবল বেগে, বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। তদ্দর্শনে মুনিতনয়াদিগের কোমল হৃদয় দ্রবীভূত হইল; তাঁহারাও, শোকাভিভূত হইয়া, প্রভূত বাষ্পবারি বিমোচন করিতে লাগিলেন।

এই সময়ে, সদ্যঃপ্রসূত বালকেরা রোদন করিয়া উঠিল। স্নেহের এমনই মহিমা ও মোহিনী শক্তি যে, তাহাদের ক্রন্দনশব্দ কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইবামাত্র, জানকী এককালে সকল শোক বিস্মৃত হইলেন, এবং স্নেহভরে তাহাদের সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন।

কুমারেরা, শুক্লপক্ষীয় শশধরের ন্যায়, দিন দিন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া, জানকীর নয়নের ও মনের অনির্বচনীয় আনন্দসম্পাদন করিতে লাগিল। যখন তাহারা, আধ আধ কথায়, মা মা বলিয়া আহ্বান করিত; যখন তাহাদের সন্নিবেশিতমুক্তাকলাপসদৃশ দন্তগুলি দৃষ্টিগোচর হইত; যখন তাহাদের অর্দ্ধোচ্চারিত মৃদু মধুর বচনপরম্পরা তাঁহার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিত; যখন তিনি, তাহাদিগকে ক্রোড়ে লইয়া, স্নেহভরে তাহাদের মুখচুম্বন করিতেন; তখন তিনি সকল শোক বিস্মৃত হইতেন; তাঁহার সর্ব্ব শরীর, অমৃতাভিষিক্তের ন্যায়, শীতল, ও নয়নযুগল আনন্দাশ্রুসলিলে পরিপ্লুত হইত।

কুশ ও লব পঞ্চমবর্ষীয় হইলে, মহর্ষি বাল্মীকি, তাহাদের চূড়াকর্ম্মসম্পাদন করিয়া, বিদ্যারম্ভ করাইলেন। বালকেরা, অসাধারণ বুদ্ধি, মেধা, ও প্রতিভার প্রভাবে, অল্প কাল মধ্যেই, বিবিধ বিদ্যায় বিলক্ষণ ব্যুৎপন্ন হইয়া উঠিল। ইতঃপূর্বে বাল্মীকি, রাবণবধ পর্য্যন্ত লোকোত্তর রামচরিত অবলম্বন করিয়া, রামায়ণ নামে বহুবিস্তৃত মহাকাব্যের রচনা করিয়াছিলেন। সর্ব্বপ্রথম, তিনি সেই অমৃতরসবর্ষী অপূর্ব্ব মহাকাব্য, রামচন্দ্রের পুত্রদিগকে অধ্যয়ন করাইলেন। তাহারা, স্বল্প সময়েই, সেই বিচিত্র গ্রন্থ আদ্যন্ত কণ্ঠস্থ করিল; এবং, সীতার সমক্ষে মধুর স্বরে আবৃত্তি করিয়া, তাঁহার শোকনিবৃত্তি করিতে লাগিল। একাদশ বর্ষে, মহর্ষি, তাহাদের উপনয়নসংস্কার সম্পন্ন করিয়া, বেদ পড়াইতে আরম্ভ করিলেন। বালকেরা সংবৎসর কালেই, সমগ্র বেদশাস্ত্রে সম্পূর্ণ অধিকারলাভ করিল।

কুশ ও লবের বয়ঃক্রম পূর্ণ দ্বাদশ বৎসর হইল; কিন্তু তাহারা, কে, এ পর্য্যন্ত তাহারা তাহার কিছুমাত্র জানিতে পারিল না। তাহারা ঋষিকুমার ও তাহাদের জননী ঋষিপত্নী, তাহাদের এই সংস্কার জন্মিয়াছিল। ফলতঃ, জানকী যে ভাবে তপোবনে কালযাপন করিতেন; তাঁহাকে দেখিলে, কেহ ঋষিপত্নী ব্যতীত আর কিছুই বোধ করিতে পারিত না; এবং তাহাদেরও দুই সহোদরের আচার ও অনুষ্ঠান নয়নগোচর করিলে, ঋষিকুমার ব্যতিরিক্ত অন্যবিধ বোধ জন্মিবার সম্ভাবনা ছিল না। তাহারা জানকীকে জননী বলিয়া জানিত; কিন্তু তিনি যে মিথিলাধিপতির তনয়া, অথবা কোশলাধিপতির মহিষী, তাহা জানিতে পারে নাই। বাল্মীকি, যত্নপূর্ব্বক, এই বিষয় তাহাদের বোধবিষয় হইতে সঙ্গোপিত করিয়া রাখিয়াছিলেন; এবং তপোবনবাসীদিগকে এরূপ সাবধান করিয়া দিয়াছিলেন যে, কেহ, ভ্রমক্রমেও, তাহাদের সমক্ষে, এ বিষয়ের প্রসঙ্গ করিত না; আর, সীতাকেও বিশেষ করিয়া বলিয়া দিয়াছিলেন যে, তিনিও যেন, কোনও ক্রমে, তনয়দিগের নিকট আত্মপরিচয়প্রদান না করেন; তদনুসারে, সীতাও, তাহাদের নিকট, কখনও স্বসংক্রান্ত কোনও কথার উল্লেখ করেন নাই। তাহারা রামায়ণে রামের ও সীতার সবিশেষ বৃত্তান্ত অবগত হইয়াছিল; কিন্তু তাহাদের জননী যে জনকনন্দিনী, অথবা রামের সহধর্ম্মিণী, তাহা জানিতে পারে নাই; সুতরাং, ঐ মহাকাব্যে নিজ জনক জননীর বৃত্তান্ত বর্ণিত হইয়াছে, তাহা বুঝিতে পারে নাই। এই রূপে, এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত কুশ ও লব আত্মস্বরূপপরিজ্ঞানে সম্পূর্ণরূপ অনধিকারী ছিল।

জননীর অনির্বচনীয়স্নেহসহকৃত প্রযত্ন ব্যতিরেকে, যত দিন পর্য্যন্ত, সন্তানের জীবনরক্ষা সম্ভাবিত নয়; তাবৎ কাল জানকী, সর্ব্বশোকবিস্মরণ পূর্ব্বক, অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া, কুশ ও লবের লালন পালনে ব্যাপৃত ছিলেন। তাহাদের শৈশবকাল অতিক্রান্ত হইলে, মাতৃত্বের তাদৃশী অপেক্ষা রহিল না। তখন তিনি, তাহাদের বিষয়ে এক প্রকারে নিশ্চিন্ত হইয়া, ঋষিপত্নীদিগের ন্যায়, তপস্যায় মনোনিবেশ করিলেন। রামচন্দ্রের সর্ব্বাঙ্গীণমঙ্গলকামনাই তদীয় তপস্যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। যদিও রাম নিতান্ত নিরপরাধে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন; তথাপি, এক ক্ষণের জন্য, সীতার অন্তঃকরণে তাঁহার প্রতি রোষ বা বিরাগের উদয় হয় নাই। তিনি যে দুস্তর শোকসাগরে পরিক্ষিপ্ত হইয়াছিলেন, তাহা কেবল তাঁহার নিজের ভাগ্যদোষেই ঘটিয়াছে, এই বিবেচনা করিতেন; ভ্রমক্রমেও ভাবিতেন না যে, সে বিষয়ে রামচন্দ্রের কোনও অংশে কিছুমাত্র দোষ আছে। বস্তুতঃ, রামচন্দ্রের প্রতি তাঁহার যেরূপ অবিচলিত ভক্তি ও ঐকান্তিক অনুরক্তি ছিল, তাহার কিঞ্চিন্মাত্র ব্যতিক্রম ঘটে নাই। তিনি দেবতাদিগের নিকট, কায়মনোবাক্যে, নিয়ত এই প্রার্থনা করিতেন, যেন রামচন্দ্র কুশলে থাকেন; এবং জন্মান্তরে, তিনি যেন রামচন্দ্রেরই সহধর্ম্মিণী হয়েন। তিনি, দিবাভাগে, তপস্যাকার্য্যে ব্যাপৃত ও সখীভাবাপন্ন ঋষিকন্যাগণে পরিবৃত থাকিয়া, কথঞ্চিৎ কালযাপন করিতেন। কিন্তু, যামিনীযোগে একাকিনী হইলেই, তাঁহার দুর্নিবার শোকসিন্ধু উথলিয়া উঠিত। তিনি, কেবল রামচন্দ্রের চিন্তায় মগ্ন হইয়া, ও অবিশ্রান্ত অশ্রুপাত করিয়া, যামিনীযাপন করিতেন। ফলকথা এই, সীতা যেরূপ পতিপ্রাণা ছিলেন, তাহাতে অকাতরে বিরহযাতনা সহ্য করিতে পারিবেন, ইহা কোনও ক্রমে সম্ভাবিত নহে। কালসহকারে, সকলেরই শোক শিথিল হইয়া যায়; কিন্তু জানকীর শোক সর্ব্ব ক্ষণ নবীভাবাপন্ন ছিল। এই রূপে, ক্রমাগত দ্বাদশ বৎসর, দুর্বিষহ শোকদহনে নিরন্তর অন্তর্দাহ হওয়াতে, জানকীর অলৌকিক রূপ ও লাবণ্য এককালে অন্তর্হিত, এবং কলেবর চর্ম্মাবৃত কঙ্কাল মাত্রে পর্য্যবসিত হইল।

প্রথম পরিচ্ছেদ

সীতার বনবাস।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

রাম রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইলেন, এবং অপ্রতিহত প্রভাবে রাজ্যশাসন, ও অপত্যনির্বিশেষে প্রজাপালন, করিতে লাগিলেন। তাঁহার শাসনগুণে, স্বল্প সময়েই, সমস্ত কোশলরাজ্য সর্ব্বত্র সর্ব্বপ্রকার সুখসমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। ফলতঃ, তদীয় অধিকারকালে, প্রজালোকের সর্ব্বাংশে যাদৃশ সৌভাগ্যসঞ্চার ঘটিয়াছিল, ভূমণ্ডলে, কোনও কালে, কোনও রাজার শাসনসময়ে, সেরূপ লক্ষিত হয় নাই। তিনি, প্রতিদিন, যথাকালে, অমাত্যবর্গে পরিবৃত হইয়া, অবহিত চিত্তে রাজকার্য্যের পর্যালোচনা করিতেন; অবশিষ্ট সময়, ভ্রাতৃত্রয়ের ও জনকতনয়ার সহবাসসুখে, অতিবাহিত হইত।

কালক্রমে, জানকীর গর্ভলক্ষণ আবির্ভূত হইল। তদ্দর্শনে, রামের ও রামজননী কৌশল্যার আহ্লাদের সীমা রহিল না; সমস্ত রাজভবন উৎসবে পূর্ণ হইল; পুরবাসিগণ, অচিরে রাজকুমার দেখিব, এই মনের উল্লাসে, স্ব স্ব আবাসে, অশেষবিধ উৎসবক্রিয়া করিতে লাগিল। কিয়ৎ দিন পরে, মহর্ষি ঋষ্যশৃঙ্গ যজ্ঞাবশেষের অনুষ্ঠান করিলেন। রাজা রামচন্দ্র, পরিবারবর্গের সহিত তদীয় ‘আশ্রমে উপস্থিত হইবার নিমিত্ত, নিমন্ত্রিত হইলেন। এই সময়ে জানকীর গর্ভ প্রায় পূর্ণ অবস্থায় উপস্থিত; এজন্য তিনি এবং তদনুরোধে রাম ও লক্ষণ, নিমন্ত্রণরক্ষা করিতে পারিলেন না; কেবল বৃদ্ধ মহিষীরা, বশিষ্ট ও অরুন্ধতী সমভিব্যাহারে, জামাতৃষজ্ঞে গমন করিলেন। তাঁহারাও, পূর্ণগর্ভা জানকীরে গৃহে রাখিয়া, তথায় যাইতে, কোনও মতে, সম্মত ছিলেন না; কেবল, জামাতৃকৃত নিমন্ত্রণের উল্লঙ্ঘন সর্ব্বথা অবিধেয়, এই বিবেচনায়, নিতান্ত অনিচ্ছা পূর্ব্বক, যজ্ঞদর্শনে গমন করেন।

কতিপয় দিবস পূর্ব্বে, রাজা জনক তনয়া ও জামাতাকে দেখিবার নিমিত্ত, অযোধ্যায় আসিয়াছিলেন। তিনি, কৌশল্যাপ্রভৃতির নিমন্ত্রণগমনের অব্যবহিত পরেই, মিথিলায় প্রতিগমন করিলেন। প্রথমতঃ শ্বশ্রূজনবিরহ, তৎপরেই পিতৃবিরহ, উভয় বিরহে জানকী একান্ত শোকাকুলা হইলেন। পূর্ণগর্ভ অবস্থায় শোকমোহাদি দ্বারা অভিভূত হইলে, অনিষ্টাপাতের বিলক্ষণ সম্ভাবনা; এজন্য রামচন্দ্র, সর্ব্বকর্ম্মপরিত্যাগ পূর্ব্বক সীতার সান্ত্বনার নিমিত্ত, সতত, তৎসন্নিধানে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন।

এক দিবস, রামচন্দ্র জানকীসমীপে উপবিষ্ট আছেন; এমন সময়ে, প্রতীহারী আসিয়া বিনয়নম্র বচনে নিবেদন করিল, মহারাজ, মহর্ষি ঋষ্যশৃঙ্গের আশ্রম হইতে সংবাদ লইয়া, অষ্টাবক্র মুনি আসিয়াছেন। রাম ও জানকী, শ্রবণমাত্র; অতিমাত্র ব্যগ্র হইয়া বলিলেন, তাঁহাকে ত্বরায় এই স্থানে আন। প্রতীহারী, তৎক্ষণাৎ তথা হইতে প্রস্থান পূর্ব্বক, পুনর্বার অষ্টাবক্র সমভিব্যাহারে তাঁহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইল। অষ্টাবক্র, দীর্ঘায়ুরস্তু বলিয়া, হস্ত তুলিয়া আশীর্বাদ করিলেন। রাম ও জানকী প্রণাম করিয়া বসিতে আসনপ্রদান করিলেন। তিনি উপবিষ্ট হইলে, রাম জিজ্ঞাসিলেন, ভগবান্ ঋষ্যশৃঙ্গের কুশল? তাঁহার যজ্ঞ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হইতেছে? সীতাও জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন, আমার গুরুজন ও আর্য্যা শান্তা সকলে কুশলে আছেন? তাঁহারা আমাদিগকে মনে করেন, না এক বারেই ভুলিয়া গিয়াছেন?

অষ্টাবক্র, সকলের কুশলবার্ত্তাবিজ্ঞাপন করিয়া সমুচিত সম্ভাষণ পূর্ব্বক, জানকীকে বলিলেন, দেবি ভগবান্ বশিষ্ঠ, দেব আপনারে বলিয়াছেন, ভগবতী বিশ্বম্ভরা দেবী তোমায় প্রসব করিয়াছেন; সাক্ষাৎ প্রজাপতি রাজা জনক তোমার পিতা; তুমি সর্ব্বপ্রধান রাজকুলের বধূ হইয়াছ; তোমার বিষয়ে আর কোনও প্রার্থয়িতব্য দেখিতেছি না; অহোরাত্র এইমাত্র প্রার্থনা করিতেছি, তুমি বীরপ্রসবিনী হও। সীতা শুনিয়া লজ্জায় কিঞ্চিৎ সঙ্কুচিত হইলেন। রাম যার পর নাই হর্ষিত হইয়া বলিলেন, ভগবান্ বশিষ্ঠ দেব যখন এরূপ আশীর্বাদ করিতেছেন, তখন অবশ্যই আমাদের মনোরথ সম্পন্ন হইবে। অনন্তর, অষ্টাবক্র রামচন্দ্রকে বলিলেন, মহারাজ, ভগবতী অরুন্ধতী দেবী, বৃদ্ধ মহিষীগণ ও কল্যাণিনী শান্তা ভূয়োভূয়ঃ বলিয়াছেন, সীতা দেবী যখন যে অভিলাষ করিবেন, যেন তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদিত হয়। রাম বলিলেন, আপনি তাঁহাদিগকে আমার প্রণাম জানাইয়া বলিবেন, ইনি যখন, যে অভিলাষ করিতেছেন, তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদিত হইতেছে; সে বিষয়ে আমার, এক মুহূর্ত্তের জন্যও আলস্য বা ঔদাস্য নাই।

অনন্তর অষ্টাবক্র বলিলেন, দেবি জানকি, ভগবান ঋষ্যশৃঙ্গ সাদর ও সস্নেহ সম্ভাষণ পূর্ব্বক বলিয়াছেন, বৎসে, তুমি পূর্ণগর্ভা, এজন্য তোমায় আনিতে পারি নাই, তন্নিমিত্ত আমি যেন তোমার বিরাগভাজন না হই; আর, রাম ও লক্ষণকে তোমার চিত্তবিনোদনার্থে রাখিতে হইয়াছে; আরব্ধ যজ্ঞ সমাপিত হইলেই, আমরা সকলে, অযযাধ্যায় গিয়া, তোমার ক্রোড়দেশ এক বারে নব কুমারে সুশোভিত দেখিব।, রাম শুনিয়া, স্মিতমুখ ও হৃষ্টচিত্ত হইয়া, অষ্টাবক্রকে জিজ্ঞাসিলেন, ভগবান্ বশিষ্ঠ দেব আমার প্রতি কোনও আদেশ করিয়াছেন? অষ্টাবক্র বলিলেন, মহারাজ, বশিষ্ঠ দেব আপনারে বলিয়াছেন, বৎস, জামাতৃযজ্ঞে রুদ্ধ হইয়া, আমাদিগকে, কিছু দিন, এই স্থানে অবস্থিতি করিতে হইবে। তুমি বালক, অল্প দিন মাত্র, রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছ; প্রজারঞ্জনকার্য্য সর্ব্বদা অবহিত থাকিবে; প্রজারঞ্জনসম্ভূত নির্মল কীর্ত্তিই রঘুবংশীয়দিগের পরম ধন। রাম বলিলেন, আমি ভগবানের এই আদেশে সবিশেষ অনুগৃহীত হইলাম; তাঁহার আদেশ ও উপদেশ সর্ব্বদাই আমার শিরোধার্য্য। আপনি তাঁহার চরণারবিন্দে, আমার সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত জানাইয়া বলিবেন, যদি প্রজালোকের সর্ব্বাঙ্গীণ অনুরঞ্জনের জন্য, আমার স্নেহ, দয়া, বা সুখভোগ বিসর্জ্জন দিতে হয়, অথবা প্রাণপ্রিয়া জানকীর মায়াপরিত্যাগ করিতে হয়, তাহাতেও আমি কিছুমাত্র কাতর হইব না। তিনি যেন সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত ও নিরুদ্বেগ থাকেন; আমি প্রজারঞ্জনকার্য্যে, ক্ষণ কালের জন্যও, অলস বা অনবহিত নহি। সীতা শুনিয়া সাতিশয় হর্ষিত হইয়া বলিলেন, এরূপ না হইলেই বা, আর্যপুত্র রঘুকুলধুরন্ধর হইবেন কেন?

অনন্তর, রামচন্দ্র সন্নিহিত পরিচারকের প্রতি অষ্টাবক্রকে বিশ্রাম করাইবার আদেশ প্রদান করিলেন। অষ্টাবক্র, সমুচিত সম্ভাষণ ও আশীর্বাদপ্রয়োগ পূর্ব্বক বিদায় লইয়া, বিশ্রামার্থ প্রস্থান করিলে, রাম ও জানকী পুনরায় কথোপকথনে প্রবৃত্ত হইতেছেন, এমন সময়ে, লক্ষণ আসিয়া বলিলেন, আর্য্য, আমি এক চিত্রকরকে আপনার চরিত্র চিত্রিত করিতে বলিয়াছিলাম; সে এই আলেখ্য প্রস্তুত করিয়া আনিয়াছে, অবলোকন করুন। রাম বলিলেন, বৎস, দেবী দুর্মনায়মানা হইলে, কি রূপে তাঁহার চিত্তবিনোদন করিতে হয়, তাহা তুমিই বিলক্ষণ জান; তা জিজ্ঞাসা করি, এই চিত্রপটে কি পর্য্যন্ত চিত্রিত হইয়াছে? লক্ষণ, বলিলেন, আর্য্যা জানকীর অগ্নিপরিশুদ্ধিকাণ্ড পর্য্যন্ত।

রাম শুনিয়া সাতিশয় ক্ষুব্ধ হইয়া বলিলেন, বৎস, তুমি আমার সমক্ষে আর ও কথা মুখে আনিও না; ও কথা শুনিলে, অথবা মনে হইলে, আমি সাতিশয় কুণ্ঠিত ও লজ্জিত হই। কি আক্ষেপের বিষয়! যিনি জন্মপরিগ্রহ করাতে জগৎ পবিত্র হইয়াছে, তাঁহাকে আবার অন্য পাবন দ্বারা পূত, করিতে হইয়াছিল। হায়! লোকরঞ্জন কি দুরূহ ব্রত। সীতা বলিলেন, নাথ, সে সকল কথা মনে করিয়া, আপনি ‘অকারণে ক্ষুব্ধ হইতেছেন কেন? আপনি তৎকালে সদ্বিবেচনার কর্ম্মই করিয়াছিলেন; সেরূপ না করিলে, চিরনির্মল রঘুকুলে কলঙ্কস্পর্শ হইত, এবং আমারও অপবাদবিমোচন হইত না। সীতার বাক্য শ্রবণগগাচর করিয়া, রামচন্দ্র দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ পূর্ব্বক বলিলেন, প্রিয়ে, আর ও কথায় কাজ নাই; এস, আলেখ্য দেখি।

সকলে আলেখ্যদর্শনে প্রবৃত্ত হইলেন। সীতা, কিয়ৎ ক্ষণ, ইতস্ততঃ - দৃষ্টিসঞ্চারণ করিয়া জিজ্ঞাসিলেন, নাথ, আলেখ্যের উপরিভাগে ঐ সমস্ত কি চিত্রিত রহিয়াছে? রাম বলিলেন, প্রিয়ে, ও সকল সমন্ত্রক জৃস্তক অস্ত্র। ব্রহ্মাদি প্রাচীন গুরুগণ, বেদরক্ষার নিমিত্ত, দীর্ঘ কাল তপস্যা করিয়া, ঐ সকল তপোময় তেজঃপুঞ্জ পরম অস্ত্র প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। গুরুপরম্পরায় ভগবান কৃশাশ্বের নিকট সমাগত হইলে, রাজর্ষি বিশ্বামিত্র তাঁহার নিকট হইতে ঐ সমস্ত মহাস্ত্র পাইয়াছিলেন। পরম কৃপালু রাজর্ষি, সবিশেষ কৃপাপ্রদর্শন পূর্ব্বক, তাড়কানিধনকালে আমায় তৎসমুদয় দিয়াছিলেন। তদবধি, উহারা আমার অধিকারে আছে, তোমার পুত্র হইলে তাহাদের আশ্রয়গ্রহণ করিবে।

লক্ষ্মণ বলিলেন, দেবি, এ দিকে মিথিলাবৃত্তান্তে দৃষ্টিপাত করুন। সীতা দেখিয়া যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হইয়া বলিলেন, তাই ত, ঠিক যেন আর্য্যপুত্র হরধনু উত্তোলিত করিয়া ভাঙ্গিতে উদ্যত হইয়াছেন, আর পিতা আমার, বিস্ময়াপন্ন হইয়া, অনিমিষ নয়নে নিরীক্ষণ করিতেছেন। আ মরি মরি! কি চমৎকার চিত্র করিয়াছে। আবার, এ দিকে বিবাহকালীন সভা; সেই সভায় তোমরা চারি ভাই, তৎকালোচিত বেশ ভূষায় অলঙ্কৃত হইয়া, কেমন শোভা পাইতেছ! চিত্র দেখিয়া বোধ হইতেছে, যেন সেই প্রদেশে ও সেই সময়ে বিদ্যমান রহিয়াছি। শুনিয়া, পূর্ব্ব বৃত্তান্ত স্মৃতিপথে আরূঢ় হওয়াতে, রাম বলিলেন, প্রিয়ে, যথার্থ বলিয়াছ, যখন মহর্ষি শতানন্দ তোমার কমনীয় কোমল করপল্লব, আমার করে সমর্পিত করিয়াছিলেন, যেন সেই সময় বর্ত্তমান রহিয়াছে।

চিত্রপটের স্থলান্তরে অঙ্গুলিনির্দ্দেশ করিয়া, লক্ষণ বলিলেন, এই আর্য্যা, এই আর্য্যা মাণ্ডবী, এই বধু শ্রুতকীর্ত্তি; কিন্তু তিনি, লজ্জাবশতঃ, ঊর্ম্মিলার উল্লেখ করিলেন না। সীতা বুঝিতে পারিয়া, কৌতুক করিবার নিমিত্ত, হাস্যমুখে উর্মিলার দিকে অঙ্গুলিপ্রয়োগ করিয়া, লক্ষ্মণকে জিজ্ঞাসিলেন, বৎস, এ দিকে এ কে চিত্রিত রহিয়াছে? লক্ষ্মণ, কোনও উত্তর না দিয়া, ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, দেবি, দেখুন দেখুন, হরশাসনের ভঙ্গবার্ত্তাশ্রবণে ক্রোধে অধীর হইয়া, ক্ষত্রিয়কুলান্তকারী ভগবান্ ভৃগুনন্দন, আমাদের অযোধ্যাগমনপথ রুদ্ধ করিয়া দণ্ডায়মান আছেন; আর, এ ‘ দিকে দেখুন, ভুবনবিজয়ী আর্য্য, তাঁহার দর্পসংহার করিবার নিমিত্ত, শরাসনে শরসন্ধান করিয়াছেন। রাম আত্মপ্রশংসাবাদশ্রবণে অতিশয় লজ্জিত হইতেন; এজন্য বলিলেন, লক্ষ্মণ, এই চিত্রে আর আর নানা দর্শনীয় আছে, ঐ অংশ লইয়া আন্দোলন করিতেছ কেন? সীতা রামবাক্যশ্রবণে আহ্লাদিত হইয়া বলিলেন, নাথ, এমন না হইলে, সংসারের ললাকে, একবাক্য হইয়া, আপনার এত প্রশংসা করিবে কেন?

তৎপরেই অযোধ্যাপ্রবেশকালীন চিত্র নেত্রপথে পতিত হওয়াতে, রাম অশ্রুপূর্ণ লোচনে গদগদ বচনে বলিতে লাগিলেন, আমরা বিবাহ করিয়া আসিলে, কত উৎসবে দিনপাত হইয়াছিল; পিতৃদেবের কতই আমোদ, কতই আহ্লাদ; মাতৃদেবীরা, অভিনব বধূদিগকে পাইয়া, কেমন আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইয়াছিলেন; সতত, তাহাদের প্রতি কতই যত্ন, কতই বা মমতাপ্রদর্শন, করিতেন; রাজভবন নিরন্তর আহ্লাদময় ও উৎসবপূর্ণ হইয়াছিল। হায়! সে সকল কি আহ্লাদের, কি উৎসবের, দিনই গিয়াছে! লক্ষণ বলিলেন, আর্য্য, এই মন্থরা। রাম, মন্থরার নামশ্রবণে অন্তঃকরণে বিরক্ত হইয়া, কোনও উত্তর নাদিয়া, অন্য দিকে দৃষ্টিসঞ্চারণ পূর্ব্বক বলিলেন, প্রিয়ে, দেখ দেখ, শৃঙ্গবের নগরে, যে তাপসতরুর তলে, পরম বন্ধু নিষাদপতির সহিত সমাগম হইয়াছিল, উহা কেমন সুন্দর চিত্রিত হইয়াছে!

সীতা দেখিয়া হর্ষ প্রদর্শন করিয়া বলিলেন, নথি, এ দিকে জটাবন্ধন ও বক্ললধারণ কেমন সুন্দর চিত্রিত হইয়াছে, দেখুন। লক্ষ্মণ আক্ষেপ প্রকাশ করিয়া বলিলেন, “ইক্ষ্বাকুবংশীয়েরা, বৃদ্ধবয়সে, পুত্রহস্তে রাজ্যভার ন্যস্ত করিয়া, অরণ্যে বাস করেন; কিন্তু আর্য্যকে, বাল্যকালেই, কঠোর আরণ্য ব্রত অবলম্বন করিতে হইয়াছিল। অনন্তর, তিনি রামকে বলিলেন, আর্য্য, মহর্ষি ভরদ্বাজ, আমাদিগকে চিত্রকূটে যাইবার পথ দেখাইয়া দিয়া, যাহার কথা বলিয়াছিলেন, এই সেই কালিন্দীতটবর্ত্তী বটবৃক্ষ। তখন সীতা বলিলেন, কেমন নাথ, এই প্রদেশের কথা মনে হয়? রাম বলিলেন, প্রিন্স, কেমন করিয়া বিস্মৃত হইব? এই স্থলে তুমি, পথশ্রমে ক্লাহ ও কাতর হইয়া, আমার বক্ষঃস্থলে মস্তক দিয়া, নিদ্রা গিয়াছিলে।

সীতা অন্য দিকে অঙ্গুলিনির্দ্দেশ করিয়া বলিলেন, নাথ, দেখুন দেখুন, এ দিকে আমাদের দক্ষিণারণ্যপ্রবেশ কেমন সুন্দর চিত্রিত হইয়াছে। আমার স্মরণ হইতেছে, এই স্থানে আমি সূর্য্যের প্রচণ্ড উত্তাপে নিতান্ত ক্লান্ত হইলে, আপনি, হস্তস্থিত তালবৃন্ত আমার মস্তকের উপর ধরিয়া, আতপ নিবারণ করিয়াছিলেন। রাম বলিলেন, প্রিয়ে, এই সেই সকল গিরিতরঙ্গিণীতীরবর্ত্তী তপোবন; গৃহস্থগণ, বানপ্রস্থধর্ম্ম অবলম্বন পূর্ব্বক, সেই সেই তপোবনের তরুতলে কেমন বিশ্রামসুখসেবায় সময়াতিপাত করিতেছেন। লক্ষণ বলিলেন, আর্য্য, এই সেই জনস্থানমধ্যবর্ত্তী প্রস্রবণগিরি। এই গিরির শিখরদেশ, আকাশপথে সতত সঞ্চরমাণ জলধরমগুলীর যোগে, নিরন্তর নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কত; অধিত্যকা প্রদেশ ঘন সন্নিবিষ্ট বিবিধ বনপাদপসমূহে আচ্ছন্ন থাকাতে, সতত স্নিগ্ধ, শীতল, ও রমণীয়; পাদদেশে প্রসন্নসলিলা গোদাবরী, তরঙ্গবিস্তার করিয়া, প্রবল বেগে গমন করিতেছে। রাম বলিলেন, প্রিয়ে, তোমার স্মরণ হয়, এই স্থানে কেমন মনের সুখে ছিলাম। আমরা কুটীরে থাকিতাম; লক্ষ্মন, ইতস্ততঃ পর্য্যটন করিয়া, আহারোপযোগী ফল মুল প্রভৃতির। আহরণ করিতেন; গোদাবরীতীরে মৃদু মন্দ গমনে ভ্রমণ করিয়া, আমরা, প্রাহ্নে ও অপরাত্নে, শীতল সুগন্ধ গন্ধবহের, সেবন করিতাম। হায়! তেমন অবস্থায় থাকিয়াও, কেম সুখে সময় অতিবাহিত হইয়াছিল।

লক্ষণ আলেখ্যের অপর অংশে অঙ্গুলিয়োগ করিয়া বলিলেন, আর্য্যে, এই পঞ্চবটী, এই শূর্পণখা। মুগ্ধস্বভাব সীতা, যেন যথার্থই পূর্ব্ব অবস্থা উপস্থিত হইল, এইরূপ ভাবিয়া, ম্লান বদনে বলিলেন, হা নাথ, এই পর্য্যন্তই দেখা শুনা শেষ হইল। রাম হাস্যমুখে সান্ত্বনা করিয়া বলিলেন, অয়ি বিয়োগকাতরে, এ চিত্রপট, বাস্তবিক পঞ্চবটী অথবা পাপীয়সী শূর্পণখা নহে। লক্ষ্মণ ইতস্ততঃ দৃষ্টিসঞ্চারণ করিয়া বলিলেন, কি আশ্চর্য্য! চিত্রদর্শনে চিরাতীত, জনস্থানবৃত্তান্ত বর্তমানবৎ প্রতীয়মান হইতেছে! দুরাচার মারীচ, হিরন্ময় মৃগের আকৃতিধারণ করিয়া, যে অতি বিষম অনর্থ ঘটাইয়াছিল, যদিও সম্পূর্ণ বৈরনির্যাতন দ্বারা তাহার যথোচিত প্রতিবিধান হইয়াছে, তথাপি স্মৃতিপথে আরূঢ় হইলে, মর্ম্মবেদনাপ্রদান করে। এই ঘটনার পর, আর্য্য মানবসমাগমশূন্য জনস্থান ভূভাগে, বিকলচিত্ত হইয়া, যেরূপ কাতরভাবাপন্ন হইয়াছিলেন, তাহা অবলোকিত হইলে, পাষাণও দ্রবীভূত। হয়, বজ্রেরও হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়। সীতা, লক্ষ্মণের মুখে এই সকল কথা শুনিয়া, অশ্রুপূর্ণ নয়নে, মনে মনে বলিতে লাগিলেন, হায়! এ অভাগিনীর জন্য, আর্য্যপুত্রকে কতই ক্লেশভোগ করিতে হইয়াছিল। সেই সময়ে, রামেরও নয়নযুগল হইতে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। লক্ষ্মণ বলিলেন, আর্য্য, চিত্র দেখিয়া, আপনি এত শোকাভিভূত হইতেছেন কেন? রাম বলিলেন, বৎস, তৎকালে আমার যে বিষম অবস্থা ঘটিয়াছিল, যদি বৈরনির্যাতনসঙ্কল্প অনুক্ষণ অন্তঃকরণে জাগরূক না থাকিত, তাহা হইলে, আমি, কখনই প্রাণধারণ করিতে পারিতাম। চিত্রদর্শনে সেই অবস্থার স্মরণ হওয়াতে, বোধ হইল, যেন আমার হৃদয়ের গ্রন্থি সকল শিথিল হইয়া গেল। তুমি সকলই স্বচক্ষে দেখিয়াছ; এখন অনভিজ্ঞের মত কথা বলিতেছ কেন!

লক্ষ্মণ শুনিয়া কিঞ্চিৎ কুণ্ঠিত ও লজ্জিত হইলেন; এবং, বিষয়ান্তরের সংঘটন দ্বারা, রামের চিত্তবৃত্তির ভাবান্তরসম্পাদন আবশ্যক বিবেচনা করিয়া বলিলেন, আর্য্য, এ দিকে দণ্ডকারণ্যভূভাগ দৃষ্টিগোচর করুন; এই স্থানে দুর্দ্ধর্ষ কবন্ধ রাক্ষসের বাস ছিল; এ দিকে ঋষ্যমুক পর্ব্বতে মতঙ্গমুনির আশ্রম; এই সেই সিদ্ধ শবরী শ্রমণা; এই এ দিকে পম্পা সরোবর। রাম, পম্পাশব্দ শ্রবণগোচর করিয়া, সীতাকে বলিলেন, প্রিয়ে, পম্পা পরম রমণীয় সবোবর; আমি, তোমার অন্বেষণ করিতে করিতে, পম্পাতীরে উপস্থিত হইলাম; দেখিলাম, প্রফুল্ল কমল সকল, মন্দ মারুত দ্বারা ঈষৎ আন্দোলিত হইয়া, সরোবরের নিরতিশয় শোভাসম্পাদন করিতেছে; উহাদের সৌরভে চতুর্দিক্‌ আমোদিত হইয়া রহিয়াছে; মধুকরেরা, মধুপানে মত্ত হইয়া, গুন্‌ গুন্‌ স্বরে গান করিয়া, উড়িয়া বেড়াইতেছে; হংস, সারস প্রভৃতি বহুবিধ বারিবিহঙ্গগণ, মনের আনন্দে, নির্মল সলিলে কেলি করিতেছে। তৎকালে, আমার নয়নযুগল হইতে অবিশ্রান্ত অশ্রুধারা বিনির্গত হইতেছিল; সুতরাং সরোবরের শোভার সম্যক অনুভব করিতে পারি নাই; এক ধারা নির্গত ও অপর ধারা উদগত হইবার মধ্যে, মুহূর্ত্ত মাত্র নয়নের যে অবকাশ পাইয়াছিলাম, তাহাতেই কেবল এক এক বার অস্পষ্ট অবলোকন করিয়াছিলাম।

সীতা, চিত্রপটের আর এক অংশে দৃষ্টিযোজনা করিয়া, লক্ষ্মণকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস, ঐ যে পর্ব্বতে কুসুমিত কদম্বতরুর শাখায় ময়ুরময়ুরীগণ নৃত্য করিতেছে, আর শীর্ণকলেবর আর্য্যপুত্র তরুতলে মুর্চ্ছিত হইয়া পড়িতেছেন, তুমি গলদ নয়নে উঁহারে ধরিয়া রহিয়াছ, উহার নাম কি? লক্ষ্মণ বলিলেন, আর্য্যে, ঐ পর্ব্বতের নাম মাল্যবান্‌। মাল্যবান্‌ বর্ষাকালে অতি রমণীয় স্থান; দেখুন, সব জলধৱমণ্ডলের সহযোগে, শিখরদেশে কি অনির্বচনীয় শোভা সম্পন্ন হইয়াছে। এই স্থানে আর্য্য একান্ত বিলচিত্ত হইয়াছিলেন। শুনিয়া, পূর্ব্ব অবস্থা স্মৃতিপথে আরূঢ় হওয়াতে, রাম একান্ত আকুলহৃদয় হইয়া বলিলেন, বৎস, বিরত হও, বিরত হও; আর তুমি মাল্যবানের উল্লেখ করিও না; শুনিয়া, আমার শোকসাগর, অনিবার্য্য বেগে, উথলিয়া উঠিতেছে; জানকীর বিরহ পুনরায় নবীভাব অবলম্বন করিতেছে। এই সময়ে, সীতার আলস্যলক্ষণ আবির্ভূত হইল। তখন লক্ষণ বলিলেন, আর্য্য, আর চিত্রদর্শনের প্রয়োজন নাই; আর্য্যা জানকীর ক্লান্তিবোধ হইয়াছে। এক্ষণে উঁহার বিশ্রামসুখসেবা আবশ্যক; আমি প্রস্থান করি, আপনারা বিশ্রামভবনে গমন করুন।

এই বলিয়া বিদায় লইয়া, লক্ষ্মণ প্রস্থানোম্মুখ হইলে, সীতা রামকে বলিলেন, নাথ, চিত্র দেখিতে দেখিতে, আমার এক অভিলাষ জন্মিয়াছে, আপনাকে তাহা পূর্ণ করিতে হইবে। রাম বলিলেন, প্রিয়ে, কি অভিলাষ, বল, অবিলম্বেই সম্পাদিত হইবে। তখন সীতা বলিলেন, আমার অভিলাষ এই, পুনর্বার মুনিপত্নীদিগের সহিত সমাগত হইয়া, তপোবনে. বিহার ও নির্মল ভাগীরথীসলিলে অবগাহন করিব। সীতার অভিলাষ শ্রবণগগাচর করিয়া, রাম লক্ষ্মণকে বলিলেন, বৎস, এই মাত্র গুরুজন আদেশ করিয়া পাঠাইয়াছেন, জানকী যখন যে অভিলাষ করিবেন, তৎক্ষণাৎ তাহা পূর্ণ করিতে হইবে। অতএব, গমনের উপযোগী আয়োজন কর; কল্য প্রভাতেই, ইনি অভিলষিত প্রদেশে প্রেরিত হইবেন। সীতা সাতিশয় হর্ষিত হইয়া বলিলেন, নাথ, আপনিও সঙ্গে যাবেন? রাম বলিলেন, অয়ি মুগ্ধে, তাহাও কি আবার, তোমারে বলিতে হইবে! আমি কি তোমায় নয়নের অন্তরাল করিয়া, এক মুহূর্ত্তও সুস্থ হৃদয়ে থাকিতে পারিব? তৎপরে সীতা, সস্মিত মুখে, লক্ষ্মণের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিলেন, বৎস, তোমাকেও আমাদের সঙ্গে যাইতে হইবে। তিনি, যে আজ্ঞা, বলিয়া, গমনের উপযোগী আয়োজন করিবার নিমিত্ত, প্রস্থান করিলেন।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

রাজা রামচন্দ্র, অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানে কৃতসঙ্কল্প হইয়া, বশিষ্ঠ, জাবালি, কাশ্যপ, বামদেব প্রভৃতি মহর্ষিবর্গের নিকট স্বীয় অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন। বশিষ্ঠদেব, শ্রবণমাত্র, সাধুবাদপ্রদান পূর্ব্বক বলিলেন, মহারাজ, উত্তম সঙ্কল্প করিয়াছেন। আপনি সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধিপতি; অখণ্ড ভূমণ্ডলে যেরূপ একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন, পূর্ব্বতন কোনও নরপতি সেরূপ করিতে পারেন নাই। রামরাজ্যে প্রজালোকে যেরূপ সুখে ও স্বচ্ছন্দে কালযাপন করিতেছে, তাহা অদৃষ্টচর ও অশ্রুতপূর্ব্ব। রাজ্যভার গ্রহণ করিয়া, যে বিষয়ের অনুষ্ঠান করিতে হয়, আপনি তাহার কিছুই অসম্পাদিত রাখেন নাই; রাজকর্ত্তব্যের মধ্যে অশ্বমেধ মাত্র অবশিষ্ট আছে; তাহা সম্পাদিত হইলেই, আপনকার রাজ্যাধিকার আর কোনও অংশে অঙ্গহীন থাকে না। আমরা ইতঃপূর্ব্বে ভাবিয়াছিলাম, এ বিষয়ে মহারাজের নিকট প্রস্তাব করিব। যাহা হউক, যখন মহারাজ স্বয়ং সেই অভিলষিত বিষয়ের অনুষ্ঠানে উদযুক্ত হইয়াছেন, তখন আর তদ্বিষয়ে বিলম্ব করা বিধেয় নহে; অবিলম্বে তদুপযোগী আয়োজনের আদেশ প্রদান করুন।

বশিষ্ঠদেব বিরত হ‍ইবামাত্র, রামচন্দ্র পার্শ্বোপবিষ্ট অনুজদিগের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া বলিলেন, ভ্রাতৃগণ, ইনি যাহা বলিলেন, শ্রবণ করিলে; এক্ষণে, তোমাদের অভিপ্রায় অবগত হইলেই, কর্ত্তব্যনিরূপণ করি। আজ্ঞানুবর্ত্তী অনুজেরা, তৎক্ষণাৎ, আন্তরিক অনুমোদন প্রদর্শন করিলেন। তখন রাম বশিষ্ঠদেরকে সম্বোধিয়া বলিলেন, ভগবন্, যখন আমার অভিলাষ আপনাদের অভিমত ও অনুজদিগের অনুমোদিত হইতেছে, তখন আর তদনুযায়ী অনুষ্ঠানের কর্ত্তব্যতাবিষয়ে কোনও সংশয় নাই। এক্ষণে আমার বাসনা এই, নৈমিষারণ্যে অভিপ্রেত মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান হয়। নৈমিষারণ্য পরম পবিত্র যজ্ঞক্ষেত্র। এ বিষয়ে আপনকার কি অনুমতি হয়। বশিষ্ঠদেব তৎক্ষণাৎ সম্মতি প্রদান করিলেন।

অনন্তর, রামচন্দ্র অনুজদিগকে বলিলেন, দেখ, যখন কর্ত্তব্য স্থির হইল, তখন আর অনর্থক কালহরণ করা বিধেয় নহে। তোমরা সত্বর সমস্ত আয়োজন কর। অনুগত, শরণাগত, ও মিত্রভাবাপন্ন নৃপতিদিগের নিমন্ত্রণ কর। সময়নির্দেশ পূর্ব্বক, সমস্ত নগরে ও জনপদে এ বিষয়ের ঘোষণা করিয়া দাও। লঙ্কাসমরসহায় সুহৃদ্বর্গের পরম সমাদরে আহ্বান কর; তাঁহারা আমাদের যথার্থ বন্ধু, আমাদের জন্য, অকাতরে কত ক্লেশ সহ্য করিয়াছেন; তাঁহারা আসিলে, আমি পরম সুখী হইব। এতদতিরিক্ত, যাবতীয় ঋষিদিগের নিমন্ত্রণ কর; তাঁহারা যজ্ঞক্ষেত্রে আগমন করিলে, আমি আপনাকে চরিতার্থ জ্ঞান করিব। ভরত, তুমি, অবিলম্বে নৈমিষক্ষেত্রে গিয়া, যজ্ঞভূমিনির্ম্মাণের উদ্যোগ কর। লক্ষ্মণ, তুমি, আবশ্যক সমস্ত দ্রব্যের যথোচিত আয়োজন করিয়া, তৎসমুদয় সত্ত্বর তথায় পাঠাইয়া দাও। দেখ, যজ্ঞ দেখিবার নিমিত্ত, নৈমিষে অসংখ্য লোকের সমাগম হইবে; অতএব, যত্নপূর্ব্বক, সমস্ত বিষয়ের এরূপ আয়োজন করিবে, যেন, কোনও বিষয়ের অসঙ্গতি নিবন্ধন, কাহারও কোনও অংশে ক্লেশ বা অসুবিধা না ঘটে। তুমি সকল বিষয়ে পারদর্শী; তোমায় অধিক উপদেশ দিবার প্রয়োজন নাই।

এই বলিয়া রাম বিরত হইলে, বশিষ্ঠদেব বলিলেন, মহারাজ, সকল বিষয়েরই উচিতাধিক আয়োজন হইবে, সন্দেহ নাই; কিন্তু, আমি এক বিষয়ের একান্ত অসঙ্গতি দেখিতেছি। তখন রাম বলিলেন, আপনি কোন বিষয়ে অসঙ্গতির আশঙ্কা করিতেছেন, বলুন। বশিষ্ঠ বলিলেন, মহারাজ, শাস্ত্রকারেরা বলেন, সস্ত্রীক হইয়া ধর্ম্মকার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে হয়। অতএব, জিজ্ঞাসা করি; সে বিষয়ের কি ব্যবস্থা হইবে। শ্রবণমাত্র, রামের মুখকমল ম্লান ও নয়নযুগল অশ্রুজলে পরিপ্লুত হইয়া উঠিল। তিনি, কিয়ৎ ক্ষণ, অবনত বদনে, মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন; অনন্তর, দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ পূর্ব্বক, নয়নের অশ্রুমার্জ্জন ও উচ্ছলিত শোকাবেগের সংবরণ করিয়া বলিলেন, ভগবন্, ইতঃপূর্বে এ বিষয়ে আমার উদ্বোধ মাত্র হয় নাই; এক্ষণে, কি কর্ত্তব্য, উপদেশ করুন। বশিষ্ঠদেব, অনেক ক্ষণ একাগ্র চিত্তে চিন্তা করিয়া, বলিলেন, মহারাজ, পুনরায় দারপরিগ্রহ ব্যতিরেকে, আর কোনও উপায় দেখিতেছি না।

বশিষ্ঠবাক্য শ্রবণগোচর করিয়া, সকলেই এককালে মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। রাম নিতান্ত সীতাগতপ্রাণ; কেবল লোকবিরাগসংগ্রহভয়ে সীতাকে বনবাস দিয়া, জীবন্মৃত হইয়া ছিলেন। তাঁহার প্রতি রামের যে অবিচলিত স্নেহ ও ঐকান্তিক অনুরাগ ছিল; এ পর্য্যন্ত তাহার কিছুমাত্র ব্যতিক্রম হয় নাই। সীতার মোহিনী মূর্ত্তি অহোরাত্র তাঁহার অন্তঃকরণে জাগরূক ছিল। তিনি যে, উপস্থিত কার্য্যের অনুরোধে, পুনরার দারপরিগ্রহে সম্মত হইবেন, তাহার কোনও সম্ভাবনা ছিল না। যাহা হউক, বশিষ্ঠদেব দারপরিগ্রহ বিষয়ে বারংবার অনুরোধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু রামচন্দ্র, সে বিষয়ে ঐকান্তিকী অনিচ্ছা প্রদর্শিত করিয়া, মৌন ভাবে, অবনত বদনে, অবস্থিত রহিলেন। অনন্তর, বহুবিধ বাদানুবাদের পর, সীতার হিরণ্ময়ী প্রতিকৃতি সমভিব্যাহারে যজ্ঞ সম্পন্ন করাই সর্ব্বাংশে শ্রেয়ঃকল্প বলিয়া মীমাংসিত হইল।

এই রূপে সমুদয় স্থিরীকৃত হইলে, ভরত সর্ব্বাগ্রে নৈমিষক্ষেত্রে প্রস্থান করিলেন; এবং, সমুচিত স্থানে যজ্ঞ ভূমির নিরূপণ করিয়া, অনুরূপ অন্তরে, পৃথক্ পৃথক্ প্রদেশে, এক এক শ্রেণীর লোকের জন্য, তাহাদের অবস্থোচিত অবস্থিতিস্থান নির্ম্মিত করাইলেন। লক্ষ্মণও, অনতিবিলম্বে, অশেষবিধ অপর্য্যাপ্ত আহারসামগ্রী ও শয্যা বান প্রভৃতির সমবধান করিয়া, যজ্ঞক্ষেত্রে পাঠাইয়া দিলেন। অনন্তর, রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে রক্ষক নিযুক্ত করিয়া, যথাবিধানে যজ্ঞীয় অশ্বের মোচন পূর্ব্বক, মাতৃগণ ও অপরাপর পরিবারবর্গ সমভিব্যাহারে সসৈন্যে নৈমিষারণ্য প্রস্থান করিলেন।

কিয়ৎ দিন পরেই, নিমন্ত্রিতগণের সমাগম হইতে লাগিল। শত শত নৃপতি, বহুবিধ মহামুল্য উপহার লইয়া, অনুচরগণ ও পরিচারকবর্গ সমভিব্যাহারে, উপস্থিত হইতে আরম্ভ করিলেন; সহস্র সহস্র ঋষি, যজ্ঞদর্শনমানসে, ক্রমে ক্রমে, নৈমিষে আগমন করিতে লাগিলেন; অসংখ্য নগরবাসী ও জনপদবাসীরাও সমাগত হইলেন। ভরত ও শত্রুঘ্ন নরপতিগণের পরিচর্য্যার ভার গ্রহণ করিলেন; বিভীষণ ঋষিগণের কিঙ্করকার্য্যে নিযুক্ত হইলেন; সুগ্রীর অপরাপর নিমন্ত্রিত বর্গের তত্ত্বাবধানে ব্যাপৃত রহিলেন।

এ দিকে মহর্ষি বাল্মীকি, সীতার অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া, এবং কুশ ও লবের বয়ঃক্রম দ্বাদশবৎসরপূর্ণ দেখিয়া, মনে মনে সর্ব্বদা এই আন্দোলন করেন যে, সীতার যেরূপ অবস্থা দেখিতেছি, তাহাতে তিনি অধিক দিন জীবিত থাকিবেন, এরূপ বোধ হয় না; আর, কুশ ও লব, রাজাধিরাজতনয় হইয়া, যাবজ্জীবন তপোবনে কালযাপন করিবে, ইহাও কোনও মতে উচিত নহে; তাহাদের ধনুর্বেদ ও রাজধর্ম্ম, এ উভয়ের শিক্ষার সময় বহিয়া যাইতেছে। অতএব, যাহাতে সপুত্ত্রা সীতা পুনরায় পরিগৃহীতা হন, আশু তাহার কোনও উপায় উদ্ভাবিত করা আবশ্যক। অথবা, অন্য উপায় উদ্ভাবিত করিবার প্রয়োজন কি? শিষ্য দ্বারা সংবাদ দিয়া রামচন্দ্রকে আমার আশ্রমে আনাইয়া, অথবা স্বয়ং রাজধানীতে গিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া, সপুত্ত্রা সীতার পরিগ্রহপ্রার্থনা করি। রামচন্দ্র অবশ্যই আমার অনুরোধরক্ষা করিবেন। এই স্থির করিয়া, ক্ষণকাল মৌন ভাবে থাকিয়া, মহর্ষি বিবেচনা করিতে লাগিলেন, কিন্তু তিনি অত্যন্ত লোকানুরাগপ্রিয়; কেবল লোকবিরাগসংগ্রহের ভয়ে, পূর্ণগর্ভা অবস্থায়, নিতান্ত নিরপরাধে, জানকীরে নির্বাসিত করিয়াছেন এখন, আমার কথায়, তাঁহারে সহজে গৃহে লইবেন, তাহাও সম্পূর্ণ সন্দেহস্থল। যাহা হউক, কোনও সংবাদ না দিয়া নিশ্চিন্ত থাকা, কোনও মতে, উচিত কল্প হইতেছে না। এই দুই বালক, উত্তর কালে, অবশ্যই কোশলসিংহাসনে অধিরোহণ করিবে; এই সময়ে, পিতৃসমীপে নীত হইয়া, রাজনীতি বিষয়ে বিধিপূর্ব্বক উপদিষ্ট না হইলে, রাজকার্য্যনির্বাহে একান্ত অপটু ও রাজমর্য্যাদারক্ষণে নিতান্ত অক্ষম হইবে। বিশেষতঃ, রাজা রামচন্দ্র, আমায় কোশলরাজ্যের হিতসাধনে যত্নবিহীন বলিয়া, অনুযোগ করিতে পারেন। অতএব, এ বিষয়ে আর উপেক্ষা বা কালক্ষেপ করা বিধেয় নহে। রামচন্দ্রের নিকট সকল বিষয়ের সবিশেষ সংবাদ পাঠান উচিত। অথবা, একবারেই তাঁহার নিকটে সংবাদ না পাঠাইয়া, বশিষ্ঠ বা লক্ষ্মণের সহিত পরামর্শ করা কর্ত্তব্য; তাঁহারাই বা কিরূপ বলেন, দেখা আবশ্যক।

এক দিন, মহর্ষি, সায়ংসন্ধ্যা ও সন্ধ্যাকালীন হোমবিধির সমাধান করিয়া, আসনে উপবেশন পূর্ব্বক, একাকী এই চিন্তায় মগ্ন আছেন; এমন সময়ে, এক রাজভৃত্য আসিয়া রামনামাঙ্কিত নিমন্ত্রণপত্র তদীয় হস্তে সমর্পিত করিল। মহর্ষি, পত্রপাঠ করিয়া, পরমপ্রীতি প্রদর্শন পূর্ব্বক, সেই লোককে বিশ্রাম করিবার নিমিত্ত বিদায় দিলেন; এবং এক শিষ্যের উপর তাহার আহারাদিসমাধানের ভার প্রদান করিয়া, মনে মনে বলিতে লাগিলেন, আমি যে বিষয়ের নিমিত্ত উৎকণ্ঠিত হইয়াছি, দৈব অনুকূল হইয়া তাহার সিদ্ধির বিলক্ষণ উপায় করিয়া দিলেন। এক্ষণে, বিনা প্রার্থনায় কার্য্যসাধন করিতে পারিব। কুশ ও লবকে শিষ্যভাবে সমভিব্যাহারে লইয়া যাই। রামের ও উহাদের দুই সহোদরের আকৃতিগত যেরূপ সৌসাদৃশ্য, দেখিলেই, সকলে উহাদিগকে তাঁহার তনয় বলিয়া অনায়াসে বুঝিতে পারিবে; আর, অবলোকনমাত্র, রামেরও হৃদয় নিঃসন্দেহ দ্রবীভূত হইবে; এবং, তাহা হইলেই, আমার অভিপ্রেতসিদ্ধির পথ স্বতঃ পরিষ্কৃত হইয়া আসিবে।

মনে মনে এইরূপ সিদ্ধান্ত করিয়া, মহর্ষি জানকীর কুটীরে উপস্থিত হইলেন; এবং বলিলেন, বৎসে, রাজা রামচন্দ্র অশ্বমেধ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া, নিমন্ত্রণপত্র পাঠাইয়াছেন; কল্য প্রত্যূষে প্রস্থান করিব; মানস করিয়াছি, অপরাপর শিষ্যের ন্যায়, তোমার পুত্ত্রদিগকেও যজ্ঞদর্শনে লইয়া যাইব। সীতা তৎক্ষণাৎ সম্মতি প্রদান করিলেন। মহর্ষি, স্বীয় কুটীরে প্রতিগমন করিয়া, শিষ্যদিগকে প্রস্তুত হইয়া থাকিতে বলিয়া দিলেন; এবং কুশ ও লবকে বলিলেন, দেখ, এ পর্য্যন্ত জনপদের কোনও ব্যাপার তোমাদের নয়নগোচর হয় নাই। রামায়ণনায়ক রাজা রামচন্দ্র অশ্বমেধের অনুষ্ঠান করিয়াছেন। ইচ্ছা করিয়াছি তোমাদিগকে যজ্ঞদর্শনে লইয়া যাইব। তোমাদের, যজ্ঞদর্শন ও আনুষঙ্গিক রাজদর্শন সম্পন্ন হইবে; এবং, তথায় যে অসংখ্য জনপদবাসী লোক সমবেত হইবে, তাহাদিগকে দেখিয়া, তোমরা, অনেক অংশে, লৌকিক বৃত্তান্ত অবগত হইতে পারিবে। তাহারা দুই সহোদরে, রামায়ণে রামের অলৌকিক গুণপরম্পরার প্রকৃষ্ট ও প্রচুর পরিচয় পাইয়া, তাঁহাকে, সর্ব্বাংশে অদ্বিতীয় পুরুষ বলিয়া স্থির করিয়া রাখিয়াছিল; তাঁহাকে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিব, এই ভাবিয়া, তাহাদের আহ্লাদের সীমা রহিল না। এতদ্ব্যতিরিক্ত, যজ্ঞসংক্রান্ত মহাসমারোহ ও নানাদেশীয় বিভিন্নপ্রকার অসংখ্য লোকের একত্র সমাগম নয়নগোচর করিব; এই কৌতূহলও বিলক্ষণ প্রবল হইয়া উঠিল।

বাল্মীকির মুখে রামের নাম শুনিয়া, সীতার শোকানল প্রবল বেগে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল; নয়নযুগল হইতে অনর্গল অশ্রুজল নির্গলিত হইতে লাগিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, তাঁহার অন্তঃকরণে সহসা ভাবান্তর উপস্থিত হইল। এ পর্য্যন্ত, রাম সীতাগতপ্রাণ বলিয়া, তাঁহার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল; আর, তিনি ইহাও স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, নিতান্ত অনায়ত্ত হওয়াতেই, রাম তাঁহাকে নির্বাসিত করিয়াছেন। কিন্তু যজ্ঞের অনুষ্ঠানবার্ত্তা শ্রবণবিবরে প্রবিষ্ট হইবামাত্র, রাম আবার বিবাহ করিয়াছেন, এই ভাবিয়া, তিনি একবারে ম্রিয়মাণ হইলেন। যে সীতা অকাতরে পরিত্যাগদুঃখ সহ্য করিয়াছিলেন; রাম পুনরায় দারপরিগ্রহ করিয়াছেন, এই ক্ষোভ, সেই সীতার পক্ষে, একান্ত অসহ্য হইয়া উঠিল। পূর্ব্বে তিনি মনে ভাবিতেন, যদিও নিতান্ত নিরপরাধে নির্বাসিত হইয়াছি, কিন্তু আমার উপর তাঁহার যেরূপ অবিচলিত স্নেহ ও ঐকান্তিক অনুরাগ ছিল, কোনও অংশে তাহার কিছুমাত্র ব্যতিক্রম হয় নাই; এক্ষণে স্থির করিলেন, যখন পুনরায় দারপরিগ্রহ করিয়াছেন, তখন অবশ্যই স্নেহের ও অনুরাগের অন্যথাভাব ঘটিয়াছে।

সীতা, নিতান্ত আকুল চিত্তে, এই চিন্তা করিতেছেন এমন সময়ে, কুশ ও লব তদীয় কুটীরে প্রবিষ্ট হইয়া বলিল, মা, মহর্ষি বলিলেন, কল্য আমাদিগকে রাজা রামচন্দ্রের যজ্ঞদর্শনার্থে লইয়া যাইবেন। যে লোক নিমন্ত্রণপত্র আনিয়াছিল, আমরা কৌতূহলাবিষ্ট হইয়া, তাহার নিকটে গিয়া, রাজা রামচন্দ্রের বিষয়ে কত কথা জিজ্ঞাসা করিলাম। দেখিলাম, রাজা রামচন্দ্রের সকলই অলৌকিক কাণ্ড। কিন্তু মা, এক বিষয়ে আমরা, যার পর নাই, মোহিত ও চমৎকৃত হইয়াছি। রামায়ণ পড়িয়া, তাঁহার উপর আমাদের যে প্রগাঢ় ভক্তি জন্মিয়াছিল, এক্ষণে সেই ভক্তি সহস্র গুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল। কথায় কথায় শুনিলাম, রাজা, প্রজারঞ্জনের অনুরোধে, নিজ প্রেয়সী মহিষীকে নির্বাসিত করিয়াছেন। তখন, আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, তবে বুঝি রাজা পুনরায় দারপরিগ্রহ করিয়াছেন, নতুবা যজ্ঞের অনুষ্ঠানকালে সহধর্ম্মিণী কে হইবে? সে বলিল, যজ্ঞসমাধানের জন্য বশিষ্ঠদেব পুনরায় দারপরিগ্রহের নিমিত্ত অনেক অনুরোধ করিরাছিলেন। কিন্তু রাজা তাহাতে কোনও ক্রমে সম্মত হন নাই; সীতার হিরণ্ময়ী প্রতিকৃতি নির্ম্মিত হইয়াছে; সেই প্রতিকৃতি সহধর্ম্মিণীর কার্য্যনির্বাহ করিবে। দেখ মা, এমন মহাপুরুষ কোনও কালে ভূমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করেন নাই। রামচন্দ্র রাজধর্ম্মপ্রতিপালনে যেমন যত্নশীল, দাম্পত্যধর্ম্মপ্রতিপালনেও তদনুরূপ যত্নশীল। আমরা, ইতিহাসগ্রন্থে, অনেক অনেক রাজার ও অনেক অনেক মহাপুরুষের বৃত্তান্ত অবগত হইয়াছি; কিন্তু কেহই, কোনও অংশে, রাজা রামচন্দ্রের সমকক্ষ নহেন। প্রজারঞ্জনের অনুরোধে প্রেয়সীর পরিত্যাগ, ও সেই প্রেয়সীর স্নেহের অনুরোধে, যাবজ্জীবন, দারপরিগ্রহে বিমুখ হইয়া কালহরণ করা, এ উভয়ই অভূতপূর্ব্ব ব্যাপার। যাহা হউক, মা, রামায়ণ পড়িয়া অবধি আমাদের নিতান্ত বাসনা ছিল, এক বার রাজা রামচন্দ্রের মূর্ত্তি প্রত্যক্ষ করিব; এক্ষণে, সেই বাসনা পূর্ণ হইবার এই বিলক্ষণ সুযোগ ঘটিয়াছে; অনুমতি কর, আমরা মহর্ষির সহিত রামদর্শনে যাই। সীতা অনুমতি প্রদান করিলেন; তাহারাও দুই সহোদরে, সাতিশয় হর্ষিত হইয়া, মহর্ষিসমীপে গমন করিল।

রামচন্দ্র পুনরায় দারপরিগ্রহ করিয়াছেন, এই আশঙ্কা জন্মিয়া, যে অতিবিষম বিষাদবিধে সীতার সর্ব্ব শরীর আচ্ছন্ন হইয়াছিল, হিরণ্ময়ী প্রতিকৃতির কথা শ্রবণগোচর করিয়া, তাহা সম্পূর্ণ রূপে অপসারিত, এবং তদীয় চিরপ্রদীপ্ত শোকানল অনেক অংশে নির্বাপিত হইল। তখন, তাঁহার নয়নযুগল হইতে আনন্দবাষ্প বিগলিত হইতে লাগিল; এবং, নির্বাসনের ক্ষোভ তিরোহিত হইয়া, তদীর হৃদয়ে অভূতপূর্ব্ব সৌভাগ্যগর্ব্ব আবির্ভূত হইল।

পর দিন, প্রভাত হইবামাত্র, মহর্ষি বাল্মীকি, কুশ, সব, ও শিষ্যবর্গ সমভিব্যাহারে, নৈমিষপ্রস্থান করিলেন। দ্বিতীয় দিবস, অপরাহ্ণ সময়ে, তথায় উপস্থিত হইলে, বশিষ্ঠদেব, সাতিশয় সমাদরপ্রদর্শন পূর্ব্বক, তাঁহাকে ও তাঁহার শিষ্যদিগকে নির্দিষ্ট বাসস্থানে লইয়া গেলেন। কুশ ও লব, দূর হইতে রামচন্দ্রকে লোচনগোচর করিয়া, চমৎকৃত ও পুলকিত হইল, এবং পরস্পর বলিতে লাগিল, দেখ ভাই, রামায়ণে রাজা রামচন্দ্রের যে সমস্ত অলৌকিক গুণ কীর্ত্তিত হইয়াছে, তৎসমুদয় ইঁহার আকারে স্পষ্টাক্ষরে লিখিত আছে; দেখিলেই, অলৌকিক গুণসমুদয়ের অসাধারণ আধার বলিয়া, স্পষ্ট প্রতীতি জন্মে। ইনি যেমন সৌম্যমূর্ত্তি, তেমনই গম্ভীরাকৃতি। আমাদের গুরুদেব যেমন অলৌকিককবিত্বশক্তিসম্পন্ন, রাজা রামচন্দ্র তেমনই অলৌকিক গুণসমূদয়ে পূর্ণ। বলিতে কি, এরূপ মহাপুরুষ নায়কস্থলে পরিগৃহীত না হইলে, মহর্ষির প্রণীত মহাকাব্যের এত গৌরব হইত না। রাজা রামচন্দ্রের অলৌকিক গুণের পরিকীর্ত্তনে নিয়োজিত হওয়াতে তদীয় অলৌকিক কবিত্বশক্তির সম্পূর্ণ সার্থকতা জন্মিয়াছে। যাহা হউক, এত দিনে আমরা নয়নের চরিতার্থতালাভ করিলাম।

ক্রমে ক্রমে যাবতীয় নিমন্ত্রিতগণ সমবেত হইলে, নিরূপিত দিবসে, মহাসমারোহে, সঙ্কল্পিত মহাযজ্ঞের আরম্ভ হইল। অসংখ্য দীন, দরিদ্র, ও অনাথ, পৃথক পৃথক প্রার্থনায়, যজ্ঞক্ষেত্রে উপস্থিত হইতে লাগিল। অন্নার্থী অপর্যাপ্ত অন্ন, অর্থাভিলাষী প্রার্থনাধিক অর্থ, ভূমিকাঙ্ক্ষী আকাঙ্ক্ষাতিরিক্ত ভূমি, প্রাপ্ত হইতে লাগিল। ফলতঃ, যে ব্যক্তি যে অভিলাষে আগমন করিতে লাগিল, আগমনমাত্র তাহার সে অভিলাষ পূর্ণ হইতে লাগিল। অনবরত, চতুর্দিকে নৃত্য, গীত, বাদ্য হইতে লাগিল। সকলেই মনোহর বেশ ভূষায় সুশোভিত। সকলেরই মুখে আমোদের ও আহ্লাদের সম্পূর্ণ লক্ষণ সুস্পষ্ট লক্ষিত হইতে লাগিল; কাহারও অন্তঃকরণে দুঃখের বা ক্ষোভের সঞ্চার আছে, এরূপ বোধ হইল না। যে সকল দীর্ঘজীবী রাজা, ঋষি, বা অন্যাদৃশ লোক যজ্ঞদর্শনে আসিয়া ছিলেন, তাঁহারা মুক্ত কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, আমরা কখনও এরূপ যজ্ঞ দেখি নাই। অতীতবেদী ব্যক্তিরাও বলিতে লাগিলেন, কোনও কালে, কোনও রাজা, ঈদৃশ সমৃদ্ধি ও সমারোহ সহকারে, যজ্ঞ করিতে পারেন নাই; রাজা রামচন্দ্রের সকলই অদ্ভুত কাণ্ড।

এই রূপে, প্রত্যহ, মহাসমারোহে, যজ্ঞক্রিয়া হইতে লাগিল; এবং যাবতীয় নিমন্ত্রিতগণ, সভায় সমবেত হইয়া, যজ্ঞসংক্রান্ত সমৃদ্ধি ও সমারোহের আতিশয্যদর্শনে নিরতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইতে লাগিলেন।

সপ্তম পরিচ্ছেদ

সপ্তম পরিচ্ছেদ

এক দিন, মহর্ষি বাল্মীকি, বিরলে বসিয়া, বিবেচনা করিতে লাগিলেন, আমি, যজ্ঞদর্শনে আসক্ত হইয়া, এত দিন বৃথা অতিবাহিত করিলাম; এ পর্য্যন্ত, অভিপ্রেতসাধনের কোনও উপায় অবলম্বন করিলাম না। যাহা হউক, এক্ষণে, কি প্রণালীতে, কুশ ও লবকে রামচন্দ্রের দর্শনপথে পাতিত করি। উহাদের দুই সহোদরকে, সমভিব্যাহারে করিয়া, রাজসভায় লইয়া যাই; অথবা, রামচন্দ্রকে কৌশলক্রমে এখানে আনাই; এবং, বিরলে সকল বিষয়ের সবিশেষ নির্দেশ করিয়া, এবং কুশ ও লবের পরিচয় দিয়া, সীতার পরিগ্রহপ্রার্থনা করি। মহর্ষি, মনে মনে এবংবিধ বিবিধ বিতর্ক করিয়া, পরিশেষে স্থির করিলেন, কুশ ও লবকে রামায়ণগান করিতে আদেশ করি। তাহারা স্থানে স্থানে গান করিয়া বেড়াইলে, ক্রমে রাজার গোচর হইবে; তখন তিনি অবশ্যই, স্বীয় চরিতের শ্রবণমানসে, উহাদিগকে স্বসমীপে নীত করিবেন, এবং তাহা হইলেই, বিনা প্রার্থনায়, আমার অভিপ্রেত সিদ্ধ হইবে।

এই সিদ্ধান্ত করিয়া, মহর্ষি কুশ ও লবকে বলিলেন, বৎস কুশ, বৎস লব, তোমরা প্রতিদিন, সময়ে সময়ে, সমাহিত হইয়া, ঋষিগণের বাসকুটীরের সম্মুখে, নরপতিগণের পটমণ্ডপমণ্ডলীর পুরোভাগে, পৌরগণ ও জানপদবর্গের আবাসশ্রেণীর সমীপদেশে, এবং সভাভবনের অভিমুখভাগে, মনের অনুরাগে, বীণাসংযোগে রামায়ণের গান করিবে। যদি রাজা, কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া, তোমাদিগকে ডাকিয়া পাঠান, এবং তাঁহার সম্মুখে গান করিবার নিমিত্ত অনুরোধ করেন, তৎক্ষণাৎ গান করিতে আরম্ভ করিবে। আর, যত ক্ষণ তাঁহার নিকটে থাকিবে, কোনও প্রকারে ধৃষ্টতা প্রদর্শন বা অশিষ্ট ব্যবহার করিবে না। রাজা সকলের পিতৃস্থানীয়; অতএব, তোমরা তাঁহার প্রতি সম্পূর্ণ পিতৃভক্তিপ্রদর্শন করিবে। যদি, সঙ্গীত; শ্রবণে প্রীত হইয়া, রাজা পুরস্কারস্বরূপ অর্থপ্রদানে উদ্যত হন, লোভবশ হইয়া, কদাচ অর্থগ্রহণ করিবে না: বিনয় ও ভক্তিযোগ সহকারে নিস্পৃহতা দেখাইয়া, অর্থগ্রহণে অসম্মতিপ্রদর্শন করিবে; বলিবে, মহারাজ, আমরা বনবাসী, তপোবনে থাকিয়া, ফল মূল দ্বারা, প্রাণধারণ করি, আমাদর অর্থের প্রয়োজন নাই। আর, যদি রাজা তোমাদের পরিচয়জিজ্ঞাসা করেন, বলিবে, আমরা বাল্মীকির শিষ্য।

এইরূপ আদেশ ও উপদেশ দিয়া, মহর্ষি তুষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন। অনন্তর, তাহারা দুই সহোদরে, তদীয় আদেশ ও উপদেশের অনুবর্ত্তী হইয়া, বীণাসহযোগে, মধুর স্বরে, স্থানে স্থানে রামায়ণগান করিতে আরম্ভ করিল। যে শুনিল, সেই, মোহিত ও নিস্পন্দ ভাবে অবস্থিত হইয়া; অবিশ্রান্ত অশ্রুপাত করিতে লাগিল—না হইবেই বা কেন! প্রথমতঃ,—রামের চরিত্র অতি বিচিত্র ও পরম পবিত্র; দ্বিতীয়তঃ,—বাল্মীকির রচনা অতি চমৎকারিণী ও যার পর নাই চিত্তহারিণী; তৃতীয়তঃ,—কুশ ও লবের রূপমাধুরী দৃষ্টিগোচর হইলে, সকলকেই মোহিত হইতে হয়; তাহাতে আবার তাহাদের স্বর এমন মধুর যে, উহার সহিত তুলনা করিলে, কোকিলের কলরব কর্কশ বোধ হয়; চতুর্থতঃ,—বীণাযন্ত্রে তাহাদের যেরূপ অলৌকিক নৈপুণ্য জন্মিয়াছিল; তাহা অদৃষ্টচর ও অশ্রুতপূর্ব্ব। যে সঙ্গীতে এ সমুদয়ের সমবায় থাকে, তাহা শুনিয়া, কাহার চিত্ত অনির্বচনীয় প্রীতিরসে পূর্ণ না হয়।

কিঞ্চিৎ কাল পরেই, অনেকেই রামের নিকটে গিয়া বলিতে লাগিলেন, মহারাজ, দুই সুকুমার ঋষিকুমার, বীণাযন্ত্রসহযোগে, আপনকার চরিত্রগান করিতেছে; যে শুনিতেছে, সেই মোহিত হইতেছে। আমরা, জন্মাবচ্ছিন্নে, কখনও এমন অধুর সঙ্গীত শুনি নাই। তাহারা যমজ সহোদর। মহারাজ, মানবকলেবরে কেহ কখনও এমন রূপের মাধুরী দেখি নাই। স্বরের মাধুরীর কথা অধিক আর কি বলিব! কিন্নরেরাও শুনিলে পরাভবস্বীকার করিবে। আর, তাহারা যে কাব্যের গান করিতেছে, তাহা কাহার রচিত, বলিতে পারি না; কিন্তু এমন অভূতপূর্ব্ব ললিত রচনা কখনও শ্রবণগোচর করেন নাই। মহারাজ, আমাদের প্রার্থনা এই, তাহাদিগকে রাজসভায় আনাইয়া আপনকার সমক্ষে গান করিতে আদেশ করেন। আপনি তাহাদিগকে দেখিলে, ও তাহাদের গান শুনিলে, নিঃসন্দেহ, মোহিত হইবেন।

শ্রবণমাত্র, রামের অন্তঃকরণে অতিপ্রভূত কৌতূহলরস সঞ্চারিত হইল। তখন তিনি, এক সভাসদ ব্রাহ্মণ দ্বারা, তাহাদের দুই সহোদরকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাহারা, রাজা আহ্বান করিয়াছেন শুনিয়া, ক্ষণবিলম্ব ব্যতিরেকে, অতি বিনীত ভাবে সভামণ্ডপে প্রবেশ করিল। তাহাদিগকে দৃষ্টিগোচর করিবামাত্র, রামের হৃদয়ে কেমন এক অনির্বচনীয় ভাবের আবির্ভাব হইল। প্রীতিরস; অথবা বিষাদবিষ, সহসা সর্ব্ব শরীরে সঞ্চারিত হইল, ইহার অবধারণ করিতে পারিলেন না; কিয়ৎক্ষণ বিভ্রান্তচিত্তের ন্যায়, সেই দুই কুমারের উপর দৃষ্টিবিন্যাস করিয়া রহিলেন; এবং, অকস্মাৎ এরূপ ভাবান্তর উপস্থিত হইল কেন, তাহার অনুধাবন করিতে না পারিয়া, চিত্রার্পিতের ন্যায় উপবিষ্ট রহিলেন।

কুমারেরা, ক্রমে ক্রমে সন্নিহিত হইয়া, মহারাজের জয় হউক বলিয়া, রামচন্দ্রের সংবর্দ্ধনা করিল; এবং, তদীয় আদেশ অনুসারে, সমুচিত প্রদেশে উপবেশন করিয়া, যথোচিত বিনয় ও নিরতিশয় ভক্তিযোগ সহকারে, জিজ্ঞাসা করিল, মহারাজ, কি জন্য আমাদের আহ্বান করিয়াছেন? তাহারা সন্নিহিত হইলে, তদীয় কলেবরে নিজের ও জানকীর অবয়বের সম্পূর্ণ লক্ষণ প্রত্যক্ষ করিয়া, রাম একান্ত বিকলচিত্ত হইলেন; কিন্তু তৎকালে রাজসভায় বহু লোকের সমাগম হইয়াছিল; এজন্য, অতি কষ্টে চিত্তের চাঞ্চল্যসংবরণ করিয়া, সম্পূর্ণ সপ্রতিভের ন্যায়, তাহাদিগকে বলিলেন, শুনিলাম, তোমরা অপূর্ব্ব গান করিতে পার; যাঁহারা শুনিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই মুক্ত কণ্ঠে তোমাদের প্রশংসা করিতেছেন। এজন্য, আমিও তোমাদের সঙ্গীত শুনিবার মানস করিয়াছি। যদি তোমাদের অভিমত হয়, কিয়ৎ ক্ষণ গান করিয়া, আমায় প্রীতিপ্রদান কর। তাহারা বলিল, মহারাজ, আমরা যে কাব্যের গান করিয়া থাকি, তাহা বহুবিস্তৃত; তাহাতে মহারাজের পবিত্র চরিত সবিস্তর বর্ণিত হইয়াছে। এক্ষণে আমরা, আপনকার সমক্ষে, ঐ কাব্যের কোন অংশের গান করিব, আদেশ করুন।

সেই দুই কুমারকে নয়নগোচর করিয়া অবধি, রামের চিত্ত এত চঞ্চল এবং সীতানির্বাসনশোক এত প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল যে, লোকলজ্জার ভয়ে আর ধৈর্য্য অবলম্বন করা অসাধ্য ভাবিয়া, তিনি সহসা সভাভঙ্গ করিয়া, বিজনপ্রদেশসেবনের নিমিত্ত, নিরতিশয় উৎসুক হইয়াছিলেন; এজন্য বলিলেন, অদ্য তোমরা ইচ্ছামত যে কোনও অংশের গান কর; কল্য প্রভাত অবধি, প্রতিদিন কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ করিয়া, তোমাদের মুখে সমস্ত কাব্যের গান শুনিব। তাহারা, যে আজ্ঞা, মহারাজ, বলিয়া, সঙ্গীতের আরম্ভ করিল। সভাস্থ সমস্ত লোক, মোহিত হইয়া, মুক্ত কণ্ঠে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। রাম, কবির পাণ্ডিত্য ও রচনার লালিত্য দর্শনে নিরতিশয় চমৎকৃত হইয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, এই কাব্য কাহার রচিত, কাহার নিকটেই বা তোমরা সঙ্গীতশিক্ষা করিয়াছ? তাহারা বলিল, মহারাজ, এই কাব্য ভগবান্ বাল্মীকির রচিত; আমরা তাঁহার তপোবনে প্রতিপালিত হইয়াছি, এবং তাঁহার নিকটেই সমস্ত শিক্ষা করিয়াছি। তখন, রাম বলিলেন, ভগবান্ বাল্মীকি এই কাব্যে অদ্ভুত কবিত্বশক্তি প্রদর্শিত করিয়াছেন। অল্প শুনিয়া পরিতৃপ্ত হইতে পারা যায় না। আজ তোমাদের অনেক পরিশ্রম হইয়াছে; তোমাদিগকে আর অধিক কষ্ট দিতে আমার ইচ্ছা হইতেছে না; এখন তোমরা আবাসে গমন কর।

এই বলিয়া, তাহাদের দুই সহোদরকে বিদায় দিয়া, রাম সে দিবস সত্ত্বর সভাভঙ্গ করিলেন; এবং, বিশ্রামভবনে প্রবেশ করিয়া; একাকী চিন্তা করিতে লাগিলেন, এই দুই কুমারকে নয়নগোচর করিয়া, আমার অন্তঃকরণ এত আকুল হইল কেন, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না! আপন সন্তান দেখিলে, লোকের চিত্তে যেরূপ স্নেহের ও বাৎসল্যরসের সঞ্চার হয় বলিয়া শুনিতে পাই; আমারও, ইহাদিগকে দেখিয়া, ঠিক সেইরূপ হইতেছে। কিন্তু, এরূপ হইবার কোনও কারণই দেখিতেছি না। ইহারা ঋষিকুমার; আর, যদিই বা ঋষিকুমার না হয়, তাহা হইলেই বা আমার সে আশা করিবার সম্ভাবনা কি! আমি যে অবস্থায় যেরূপে প্রিয়ারে বনবাস দিয়াছি, তাহাতে তিনি দুঃসহ শোকে ও অসহনীয় অপমানভরে প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, তাহার সন্দেহ নাই। লক্ষ্মণ পরিত্যাগ করিয়া আসিলে, হয় তিনি আত্মঘাতিনী হইয়াছেন, নয় কোনও দুরস্ত হিংস্র জন্তু তাঁহার প্রাণসংহার করিয়াছে। তিনি যে, তেমন অবস্থায়, প্রাণধারণে সমর্থ হইয়া, নির্বিঘ্নে সন্তানপ্রসব করিয়াছেন; এবং তাহাদের লালন পালন করিতে পারিয়াছেন, এরূপ আশা নিতান্ত দুরাশা মাত্র। আমি যেরূপ হতভাগ্য, তাহাতে এত সৌভাগ্য কোনও ক্রমে সম্ভবিতে পারে না।

এই বলিয়া, একান্ত বিকলচিত্ত হইয়া, রাম কিয়ৎ ক্ষণ অশ্রুবিসর্জন করিলেন; অনন্তর, শোকাবেগসংবরণ করিয়া, বলিতে লাগিলেন, কিন্তু উহাদের আকার প্রকার দেখিলে, ক্ষত্ত্রিয়কুমার বলিয়া স্পষ্ট প্রতীতি জন্মে। অধিকন্তু, উহাদের কলেবরে আমার অবয়বের সম্পূর্ণ লক্ষণ লক্ষিত হইতেছে। আর, অভিনিবেশ পূর্ব্বক অবলোকন করিলে, সীতার অবয়ব সৌসাদৃশ্য নিঃসংশয়িত রূপে প্রতীয়মান হইতে থাকে; ভ্রূ, নয়ন, নাসিকা, কর, চিবুক, ওষ্ঠ, ও দন্তপংক্তিতে কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য লক্ষিত হয় না। এত সৌসাদৃশ্য কি আকস্মিক ঘটনা মাত্রে পর্য্যবসিত হইবে? আর, ইহারা বলিল, বাল্মীকির তপোবনে প্রতিপালিত হইয়াছে; আমিও লক্ষ্মণকে বলিয়াছিলাম, সীতারে বাল্মীকির তপোবনে রাখিয়া আসিবে। হয় ত, মহর্ষি, কারুণ্য বশতঃ, সীতাকে আপন আশ্রমে লইয়া গিয়াছিলেন; তথায় তিনি এই যমজ সন্তান প্রসব করিয়াছেন। লক্ষণ দেখিয়া, সকলে এরূপ বোধ করিতেন, জানকী গর্ভযুগলধারণ করিয়াছেন। এ সকলের আলোচনা করিলে, আমার আশা নিতান্ত দুরাশা বলিয়াও বোধ হয় না। অথবা, আমি, মৃগতৃষ্ণিকায় ভ্রান্ত হইয়া, অনর্থক আপনাকে ক্লেশ দিতে উদ্যত হইয়াছি। যখন আমি, নৃশংস রাক্ষসের ন্যায়, নিতান্ত নির্দয় ও নিতান্ত নির্মম হইয়া, তাদৃশী পতিপ্রাণা কামিনীরে, সম্পূর্ণ নিরপরাধে, বনবাস দিয়াছি, তখন আর সে সব আশা করা নিতান্ত মুঢ়ের কর্ম্ম। হা প্রিয়ে! তুমি, তেমন সুশীলা ও সরলহৃদয়া হইয়া, কেন এমন দুঃশীলের ও কুটিলহৃদয়ের হস্তে পড়িয়াছিলে। আমি যখন, তোমায় নিতান্ত পতিপ্রাণা ও একান্ত শুদ্ধচারিণী জানিয়াও, অনায়াসে বনবাস দিতে, এবং বনবাস দিয়া এ পর্য্যন্ত প্রাণধারণ করিতে পারিয়াছি, তখন, আমা অপেক্ষা নৃশংস ও পাষাণহৃদয় আর কে আছে?

এইরূপ আক্ষেপ করিতে করিতে; দুর্দ্ধর শোকভরে অভিভূত হইয়া, রাম বিচেতন প্রায় হইলেন, এবং অবিরল ধারায় বাষ্পবারিবিমোচন ও মুহুর্মুহুঃ দীর্ঘনিশ্বাসপরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে, কিঞ্চিৎ শান্তচিত্ত হইয়া, তিনি বলিতে লাগিলেন, বাল্মীকি সীতারে আপন আশ্রমে লইয়া গিয়াছিলেন, এবং সীতা তথায় এই দুই যমল তনয় প্রসব করিয়াছেন, তাহার সন্দেহ নাই। ইহারা যে প্রকৃত ঋষিকুমার নহে, তাহার এক দৃঢ় প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। আকার দেখিয়া স্পষ্ট বোধ হয়, ইহারা অল্প দিন মাত্র উপনীত হইয়াছে। এক্ষণে ইহাদের বয়ঃক্রম দ্বাদশ বৎসরের ন্যূন নহে। বোধ হয়, একাদশ বর্ষে উপনয়নসংস্কার সম্পন্ন হইয়াছে। ক্ষত্রিয়কুমার না হইলে, এ বয়সে উপনয়ন হইবে কেন? প্রকৃত ঋষিকুমার হইলে, মহর্ষি অবশ্যই অষ্টম বর্ষে ইহাদের সংস্কারসম্পাদন করিতেন। ইহা ভিন্ন, উপনীত ঋষিকুমারদিগের যেরূপ বেশ হয়, ইহাদের বেশ সর্ব্বাংশে সেরূপ লক্ষিত হইতেছে না। যদি ইহারা ক্ষত্রিয়কুমার হয়, তাহা হইলে, ইহাদের সীতার সন্তান হওয়া যত সম্ভব, অন্যের সন্তান হওয়া তত সম্ভব বোধ হয় না; কারণ, অন্য ক্ষত্রিয়সন্তানের তপোবনে প্রতিপালিত ও উপনীত হওয়ার সম্ভাবনা কি? আমার মত হতভাগ্য লোকের সন্তান না হইলে, ইহাদের কদাচ এ অবস্থা ঘটিত না।

মনে মনে এইরূপ বিতর্ক ও আক্ষেপ করিয়া, রাম বলিতে লাগিলেন, যদি প্রিয়া এ পর্য্যন্ত জীবিত থাকেন, এবং এই দুই কুমার আমার তনয় হয়, তাহা হইলে কি আহ্লাদের বিষয় হয়। প্রিয়া পুনরায় আমার নয়নের ও হৃদয়ের আনন্দদায়িনী হইবেন, ইহা ভাবিলেও, আমার সব শরীর অমৃতরসে অভিষিক্ত হয়। এই বলিয়া, যেন সীতার সহিত সমাগম অবধারিত হইয়াছে, ইহা স্থির করিয়া, রাম বলিতে লাগিলেন, এই দীর্ঘ বিয়োগের পর, যখন প্রথম সমাগম হইবে, তখন, বোধ হয়, আমি আহ্লাদে অধৈর্য্য হইব; প্রিয়ারও আহ্লাদের একশেষ হইবে, তাহার সন্দেহ নাই। প্রথমসমাগমসময়ে, উভয়েরই আনন্দাশ্রুপ্রবাহ প্রবল বেগে বাহিত হইতে থাকিবে। কিয়ৎ ক্ষণ, এইরূপ চিন্তায় মগ্ন হইয়া, তিনি হর্ষবাষ্পবিসর্জন করিলেন। পর ক্ষণেই, এই চিন্তা উপস্থিত হইল, আমি যেরূপ নৃশংস আচরণ করিয়াছি, তাহাতে, প্রিয়ার সহিত সমাগম হইলে, কেমন করিয়া তাঁহারে এ মুখ দেখাইব! অথবা, তিনি যেরূপ সাধুশীলা ও সরলহৃদয়া, তাহাতে অনায়াসেই আমার অপরাধমার্জ্জনা করিবেন। আমি দেখিবামাত্র, তাঁহার চরণে ধরিয়া, বিনীত বচনে ক্ষমাপ্রার্থনা করিব। কিয়ৎ ক্ষণ পরেই, আবার এই চিন্তা উপস্থিত হইল, পাছে প্রজালোকে বিরাগপ্রদর্শন করে, এই আশঙ্কায় আমি প্রিয়ারে বনবাসে পাঠাইয়াছি; এক্ষণে, যদি তাঁহারে গৃহে লই, তাহা হইলে, পুনরায় সেই আশঙ্কা উপস্থিত হইতেছে। এত কাল, আপনাকে ও প্রিয়াকে দুঃসহ বিরহযাতনায় যে দগ্ধ করিলাম, সে সকলই বিফল হইয়া যায়।

এই বলিয়া, নিতান্ত নিরুপায় ভাবিয়া, রাম কিয়ৎ ক্ষণ অপ্রসন্ন মনে অবস্থিত রহিলেন; অনন্তর, সহসা উদ্ভুত রোষাবেশ সহকারে বলিতে লাগিলেন, আর আমি অমূলক লোকাপবাদে আস্থা প্রদর্শন করিব না। অতঃপর প্রিয়ারে গৃহে লইলে, যদি প্রজালোকে অসন্তুষ্ট হয়, হউক; আর আমি তাহাদের ছন্দানুবৃত্তি করিতে পারিব না। আমি যথেষ্ট করিয়াছি। রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া, কে কখন, আমার ন্যায়, আত্মবঞ্চন করিয়াছে? প্রথমেই প্রিয়ারে বনবাস দেওয়া নিতান্ত নির্বোধের কর্ম্ম হইয়াছে। এক্ষণে আমি অবশ্যই তাঁহারে গৃহে লইব। নিতান্ত না হয়, ভরতের হস্তে রাজ্যভার সমর্পিত করিয়া, প্রিয়াসমভিব্যাহারে বানপ্রস্থধর্ম্ম অবলম্বন করিব। প্রিয়াবিরহিত হইয়া রাজ্যভোগ অপেক্ষা, তাঁহার সমভিব্যাহারে বনবাস, আমার পক্ষে, সহস্র গুণে শ্রেয়স্কর, তাহার সন্দেহ নাই।

রাম, আহার ও নিদ্রার পরিহার পূর্ব্বক, এইরূপ বহুবিধ চিন্তায় মগ্ন হইয়া, রজনীযাপন করিলেন।