শকুন্তলা (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ১৮৫৪)
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৫৪
শকুন্তলা
কালিদাস প্রণীত অভিজ্ঞানশকুন্তল নাম নাটকের
উপাখ্যান ভাগ
শ্রীঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্ত্তৃক
বাঙ্গলাভাষায় সঙ্কলিত
কলিকাতা
সংস্কৃত যন্ত্রে মুদ্রিত
সংবৎ ১৯১১
বিজ্ঞাপন
ভারতবর্ষের সর্বপ্রধান কবি কালিদাসপ্রণীত শকুন্তলা সংস্কৃতভাষায় সর্ব্বোৎকৃষ্ট নাটক। এই পুস্তকে সেই সর্ব্বোৎকৃষ্ট নাটকের উপাখ্যান ভাগ সঙ্কলিত হইল। এই উপাখ্যানে মূল গ্রন্থের অলৌকিক চমৎকারিত্ব সন্দর্শনের প্রত্যাশা করা যাইতে পারে না। যাঁহারা সংস্কৃতে শকুন্তলা পাঠ করিয়াছেন এবং এই উপাখ্যান পাঠ করিবেন চমৎকারিত্ব বিষয়ে এ উভয়ের কত অন্তর তাহা অনায়াসে বুঝিতে পরিবেন এবং সংস্কৃতানভিজ্ঞ পাঠকবর্গের নিকট কালিদাসের ও শকুন্তলার এইৰূপে পরিচয় দিলাম বলিয়া মনে মনে কত শত বার আমার তিরস্কার করিবেন। বস্তুতঃ বাঙ্গলায় এই উপাখ্যান সঙ্কলন করিয়া আমি কালিদাসের ও শকুন্তলার অবমাননা করিয়াছি। অতএব হে পাঠকবর্গ! আপনাদের নিকট আমার প্রার্থনা এই আপনার যেন এই শকুন্তলা দেখিয়া কালিদাসের শকুন্তলার উৎকর্ষ পরীক্ষা না করেন।
শ্রীঈশ্বরচন্দ্রশর্ম্মা।
কলিকাতা। সংস্কৃত কালেজ।
২৫এ অগ্রহায়ণ। ১৯১১ সংবৎ।
অশুদ্ধিশোধন।
পৃষ্ঠা
৪
১২
২৩
২৩
২৮
৩৪
৩৫
৪২
৫০
৫৮
৬২
৬২
৭১
৭৪
৮৯
৯১
৯৪
৯৫
পংক্তি
১৫
১৭
৭
১৬
৪
১১
৯
৬
১০
১৫
১
১৯
১২
২০
১৮
৪
৪
১৭
অশুদ্ধ
আশ্রমবাসিদিগের
প্রাভাত
শীরর
নদী বেগপ্রভাবে
তপস্বির
একান্ত অভিলাষী
তপোবনবাসিরা
কহিতে
পুরষ্কার
যাহার
ভাগ্যে থাকে অধিক হইবেক
বৎস!
কহিতেছন
বিস্ময়াবিষ্ট
মৎস্যর
চিত্রণৈপুণ্যের
দেবরাজ!
দেখ
শুদ্ধ
আশ্রমবাসীদিগের
প্রভাত
শরীর
নদীবেগপ্রভাবে
তপস্বীর
অভিলাষী
তপোবনাসীরা
মনে মনে কহিতে
পুরস্কার
যাঁহার
অধিক ভাগ্যে থাকে ঘটিবেক
বৎসে!
কহিতেছেন
কিঞ্চিৎ কেপিবিষ্ট
মৎসের
চিত্রনৈপুণ্যের
দেবরাজ
দেখুন
চতুর্থ অঙ্ক
চতুর্থ অঙ্ক
এইরূপে কিয়দিন অতীত হইল। পরিশেষে রাজা, গান্ধর্ব্ববিধানে শকুন্তলার পাণিগ্রহ সমাধান পূর্ব্বক ধর্ম্মারণ্যে কিছু দিন অবস্থিতি করিয়া, নিজ রাজধানী প্রস্থান করিলেন।
রাজা প্রস্থান করিলে পর, এক দিবস অনসুয়া প্রিয়ংবদাকে কহিতে লাগিলেন সখি! যদিও শকুন্তলা গান্ধর্ব্ব বিবাহ দ্বারা আপুন অনুৰূপ পতি লাভ করিয়াছে,তথাপি আমার এই ভাবন হইতেছে যে পাছে রাজা নগরে গিয়। অন্তঃপুরবাসিনীদিগের সমাগমে শকুন্তলাকে ভুলিয়া যান। প্রিয়ংবদা কহিলেন সখি! সে সন্দেহ করি ও না; তেমন আকৃতি কখন গুণশূন্য হয় না। কিন্তু আমার আর ভাবনা হইতেছে, না জানি, তাত কণু এই বৃত্তান্ত শুনিয়া কি করেন। অনসূয়া কহিলেন সখি! আমার বোধ হইতেছে তিনি শুনিয়া রুষ্ট অথবা অসন্তুষ্ট হইবেন না; এ তাঁহার অনভিমত কর্ম্ম হয় নাই। কেন না, তিনি প্রথমাবধিই এই সঙ্কল্প করিয়াছেন গুণবান পাত্রে কন্যা প্রতিপাদন করিবেন; যদি দৈবই তাহা সম্পন্ন করিল তাহা হইলে তিনি বিনা আয়াসে কৃতকার্য্য হইলেন। সুতরাং ইহাতে তাঁহার রোষ বা অসন্তোষের বিষয় কি। উভয়ে এইরূপ কথোপকথন করিতে করিতে আশ্রমকুটীরের কিঞ্চিৎ দূরে পুষ্প চয়ন করিতে লাগিলেন।
এ দিকে শকুন্তলা রাজার চিন্তায় একান্ত নিমগ্ন হইয়া একাকিনী কুটীরে উপবিষ্টা আছেন। এমত সময়ে দুর্ব্বাসা ঋষি আসিয়া শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া কহিলেন আমি অতিথি। শকুন্তলা এককালে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া ছিলেন সুতরাং দুর্বাসার কথা শুনিতে পাইলেন না। দুর্ব্বাসা অবজ্ঞা দর্শনে রোষপরবশ হইয়া কহিলেন আঃ পাপীয়সি - তুমি অতিথির অপমান করিলে। তুমি যাহার চিন্তায় নিমগ্ন হইয়া আমাকে অবজ্ঞা করিলে; আমি এই শাপ দিতেছি; তাহাকে স্মরণ করাইয়া দিলেও সে তোমাকে স্মরণ করিবেক না।
প্রিয়ংবদা “শুনিতে পাইয়া ব্যাকুল হইয়া কহিতে লাগিলেন হয়! হায়! কি সর্ব্বনাশ হইল; শূন্য হৃদয়া শকুন্তলা কোন পূজনীয় ব্যক্তির নিকট অপরাধিনী হইল। এই বলিয়া সেই দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কহিতে লাগিলেন সখি! যে সে নয়, ইনি দুর্বাসা; ইঁহার কথায় কথায় কোপ; ঐ দেখ, শাপ দিয়া রোষভরে সত্বরে প্রস্থান করিতেছেন। অনসূয়া কহিলেন প্রিয়ংবদে! বৃথা আক্ষেপ করিলে আর কি হইবে বল; শীঘ্র গিয়া পায় ধরিয়া ফিরাইয়া আন; আমি পাদ্য অর্ঘ্য প্রভৃতি প্রস্তুত করিয়া রাখিতেছি। প্রিয়ংবদা দুর্ব্বাসার পশ্চাৎ ধাবমানা হইলেন। অনসূয়া কুটীরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন।
অনসূয়ার কুটীরে পহুছিবার পূর্ব্বেই, প্রিয়ংবদ পথিমধ্যে তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া কহিলেন সখি! জানই ত, সে স্বভাবতঃ অতি কুটিলহৃদয়; সে কি কাহারও অনুনয় গ্রহণ করে; তথাপি অনেক অনুনয় বিনয় করিয়া কিঞ্চিৎ শান্ত করিয়াছি। যখন দেখিলাম নিতান্তই ফিরিবেন না, তখন চরণে ধরিয়া এই নিবেদন করিলাম ভগবন্! সে তোমার কন্যা, তোমার প্রভাব ও মহিমা কি জানে। কৃপা করিয়া তাহার এই প্রথমাপরাধ ক্ষমা করিতে হইবেক। তখন তিনি-কহিলেন আমি যাহা কহিয়াছি কোন ক্রমেই অন্যথা হইবার নহে; তবে যদি কোন অভিজ্ঞান দর্শাইতে পারে তাহ হইলেই তাহার শাপ মোচন হইবেক। এই বলিয়াই চলিয়া গেলেন। অনসূয়া কহিলেন ভাল আশ্বাসের পথ হইয়াছে; রাজর্ষি প্রস্থান কালে শকুন্তলার অঙ্গুলীতে এক স্বনামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় পরাইয়া দিয়া গিয়াছেন। অতএব শকুন্তলার হস্তেই শকুন্তলার শাপ মোচনের উপায় রহিয়াছে। রাজা যদিই বিস্মৃত হন, তাহার সেই স্বনামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় দেখাইলেই স্মরণ হইবে। এইৰূপ কথোপকথন করিতে করিতে কুটীরাভিমুখে চলিলেন।
কিয়ৎক্ষণ পরে উভয়ে কুটীর দ্বারে উপস্থিত হইয়। দেখিলেন শকুন্তলা করতলে কপোল বিন্যাস করিয়া স্পন্দহীনা মুদ্রিতনয়না চিত্রার্পিতার ন্যায় উপবিষ্ট আছেন। তখন প্রিয়ংবদা কহিলেন অনসূয়ে! দেখ দেখ, শকুন্তল। পতিচিন্তায় মগ্ন হইয়া একবারে বাহ্যজ্ঞানশুন্য হইয়া রহিয়াছে; ও কি অতিথি অভ্যাগতের তত্ত্বাবধান করিতে পারে। অনসূয়া কহিলেন সখি! এই বৃত্তান্ত আমাদের দুজনের মনে মনেই থাকুক। কোন মতেই কর্ণান্তর করা হইবেক না; শকুন্তলা শুনিলে প্রাণে বাচিবেক না। প্রিয়ংবদা কহিলেন সখি! তুমি কি পাগল হয়েছ; এ কথাও কি শকুন্তলাকে শুনাতে হয়; কোন ব্যক্তি উষ্ণোদকে নবমালিকা সেচন করে।
কিয়দ্দিন পরে মহর্ষি কণ্ব সোমতীর্থ হইতে প্রত্যাগমন করিলেন। এক দিবস তিনি অগ্নিগুহে প্রবিষ্ট হইয়া হোমকার্য্য সম্পাদন করিতেছেন, এমত সময়ে দৈববাণী হইল ‘মহর্ষে! রাজা দুষ্মন্ত, মৃগয়া উপলক্ষে তোমার তপোবনে আসিয়া, শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করিয়া গিয়াছেন এবং শকুন্তলাও তৎসহযোগে গর্ভবতী হইয়াছেন”। মহর্ষি, এই ৰূপে শকুন্তলাপরিণয় বৃত্তাস্ত অবগত হইয়া, তাহার অগোচরে ও সম্মতি ব্যতিরেকে সম্পন্ন হইয়াছে বলিয়া, কিঞ্চিন্মাত্রও রোষ বা অসন্তোষ প্রদর্শন করিলেন না। বরং যৎপরোনাস্তি প্রীত হইয়। কহিতে লাগিলেন আমার পরম সৌভাগ্য যে শকুন্তলা এতাদৃশ সৎপাত্রের হস্তগত হইয়াছে। অনন্তর শকুন্তলার নিকটে গিয়া সাতিশয় পরিতোষ প্রদর্শন করিয়া কহিলেন বৎসে! আমি তোমার পরিণয় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া অনির্ব্বচনীয় প্রীতি প্রাপ্ত হইয়াছি; এবং অদ্যই, দুই শিষ্য ও গোতমীকে সমভিব্যাহারে দিয়া, তোমাকে ভর্তৃসন্নিধানে পাঠাইয়। দিতেছি। অনন্তর কণ্বের আদেশানুসারে শকুন্তলার প্রস্থানের উদ্যোগ হইতে আরম্ভ হইল।
প্রস্থানসময় উপস্থিত হইল। গোতমী এবং শার্ঙ্গরব ও শারদ্বত নামে দুই শিষ্য শকুন্তলা সমভিব্যহারে গমনের নিমিত্ত প্রস্তুত হইলেন। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা যথাসম্ভব বেশ ভূষা সমাধান করিয়া দিলেন। মহর্ষি শোকাকুল হইয়। মনে মনে কহিতে লাগিলেন অদ্য শকুন্তলা যাইবে বলিয়া আমার মন উৎকণ্ঠিত হইতেছে, নয়ন বাষ্পবারিপরিপূর্ণ হইতেছে, কণ্ঠরোধ হইয়া বাক্শক্তিরহিত হইতেছি, জড়তায় নিতান্ত অভিভূত হইতেছি। কি আশ্চর্য্য! আমি বনবাসী, স্নেহবশতঃ আমারও ঈদৃশ বৈক্লব্য উপস্থিত হইতেছে, না জানি সংসারীরা এমত অবস্থায় কি দুঃসহ ক্লেশ ভোগ করিয়া থাকে। বুঝিলাম স্নেহ অতি বিষম বস্তু! পরে শোকাবেগ সংবরণ করিয়া শকুন্তলাকে কহিলেন বৎসে! বেলা হইতেছে, প্রস্থান কর, আর অনর্থক কাল হরণ করিতেছ কেন। এই বলিয়া তপোবনতরুদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন হে সন্নিহিত তরুগণ! যিনি তোমাদিগকে জলসেক না করিয়া কদাচ অগ্রে জলপান করিতেন না, যিনি ভূষণপ্রিয়া হইয়াও স্নেহবশতঃ তোমাদের পল্লব ভঙ্গ করিতেন না, তোমাদের কুসুম প্রসবের সময় উপস্থিত হইলে যাঁহার আনন্দের সীমা থাকিত না, সেই শকুন্তলা পতিগৃহ যাইতেছেন তোমরা সকলে অনুমতি কর।
অনন্তর, সকলে গাত্রোথান করিলেন। শকুন্তল,গুরুজনদিগকে প্রণাম করিয়া,প্রিয়ংবদার নিকটে গিয়া অশ্রুপূর্ণ নয়নে কহিতে লাগিলেন সখি! আর্য্যপুত্রকে দেখিবার নিমিত্ত আমার চিত্ত অত্যন্ত ব্যগ্র হইয়াছে বটে; কিন্তু তপোবন পরিত্যাগ করিয়া যাইতে আমার পা উঠিতেছে না। প্রিয়ংবদা কহিলেন সখি! তুমিই ষে কেবল তপোবন বিরহেকাতরা হইতেছ এৰূপ নহে; তোমার বিরহে তপোবনের কি অবস্থা হইতেছে দেখ। দেঁখ! সচেতন জীব মাত্রেই নিরানন্দ ও শোকাকুল হইয়াছে—হরিণ গণ আহার বিহারে পরাঙ্মুখ হইয়া স্থির হইয়া রহিয়াছে, মুখের গ্রাস মুখ হইতে পড়িয়া যাইতেছে; ময়ুর মধুরী নৃত্য পরিত্যাগ করিয়। উৰ্দ্ধমুখ হইয়া রহিয়াছে; কোকিলগণ আম্রমুকুলের রসাস্বাদে বিমুখ হইয়া নীরব হইয়া আছে; মধুকর মধুকরী মধুপানে বিরত হইয়াছে ও গুন গুন ধ্বনি পরিত্যাগ করিয়াছে।
কণ্ব কহিলেন বৎসে! আর কেন বিলম্ব কর,বেলা হয়। তখন শকুন্তলা কহিলেন তাত! বনতোষিণীকে সম্ভাষণ না করিয়। যাইব না। এই বলিয়া বনতোষিণীর নিকটে গিয়া কহিলেন বনতোল্লিণি! শাখাবাহুদ্বারা আমাকে স্নেহভরে আলিঙ্গন কর; আজি অবধি আমি দুরবর্ত্তিনী হইলাম। অনন্তর অনুসূয়া ও প্রিয়ংবদাকে কহিলেন সখি! আমি বনতোষিণীকে তোমাদের হস্তে সমর্পণ করিলাম। তাঁঁহারা কহিলেন,সখি! আমাদিগকে কাহার হস্তে সমর্পণ করিলে বল। এই বলিয়া শোকাকুল হইয়া রোদন করিতে লাগিলেন। তখন কণ্ব কহিলেন অনস্থয়ে! প্রিয়ংবদে! তোমরা কি পাগল হইলে, তোমরা কোথায় শকুন্তলাকে সান্ত্বনা করিবে, না হইয়া, তোমরাই রোদন করিতে আরম্ভ করিলে।
এক পূর্ণগর্ভা হরিণী কুটীরের প্রান্তে শয়ন করিয়াছিল; তাহার দিকে দৃষ্টিপাত হওয়াতে,শকুন্তলা কণ্বকে কহিলেন তাত! এই হরিণী নির্ব্বিঘ্নে প্রসব হইলে আমাকে সংবাদ দিবে, ভুলিবে না বল। কণ্ব কহিলেন, না বৎসে! আমি কখনই বিস্মৃত হইব না।
কয়েক পদ গমন করিয়া শকুন্তলার গতিভঙ্গ হইলে, শকুন্তলা কহিলেন আমার অঞ্চল ধরিয়া কে টানে; এই বলিয়া মুখ ফিরাইলেন। কী কহিলেন বৎসে তুমি জননীর ন্যায় যাহাকে প্রতিপালন করিয়াছিলে, যাহার আহারের নিমিত্ত শ্যামাক আহরণ করিতে, যাহার মুখ কুশের অগ্র ভাগ দ্বারা ক্ষত হইলে ইঙ্গুদীতৈল দিয়া ব্রণ শোষণ করিয়া দিতে, সেই মাতৃহীন হরিণশিশু তোমার গমন রোধ করিতেছে। শকুন্তলা তাহার গাত্রে হস্ত প্রদান করিয়া কহিলেন বাছা! আর আমার সঙ্গে এস কেন, ফিরিয়া যাও, আমি তোমাকে পরিত্যাগ করিয়া যাইতেছি। তুমি মাতৃহীন হইলে আমি তোমাকে প্রতিপালন করিয়াছিলাম; এখন আমি চলিলাম; অতঃপর তাত কণ্ব তোমার রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। এই বলিয়া রোদন করিতে করিতে চলিলেন। তখন কণ্ব কহিলেন বৎসে শান্ত হও, অশ্রুবেগ সংবরণ কর, পথ দেখিয়া চল, উচ্চ নীচ না দেখিয়া পদক্ষেপ করাতে বারংবার আঘাত লাগিতেছে।
এইৰূপ নানা কারণে গমনের বিলম্ব দেখিয়া শার্ঙ্গরব কণ্বকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন ভগবন্! আপনকার আর অধিক দূর সঙ্গে আসিবার আবশ্যক নাই; এই স্থলেই যাহা বলিতে হয় বলিয়া দিয়া প্রতিগমন করুন। কণ্ব কহিলেন তবে আইস এই ক্ষীরবৃক্ষের ছায়ায় দণ্ডায়মান হই। অনন্তর সকলে সন্নিহিত ক্ষীরপাদপচ্ছায়ায় অবস্থিত হইলে কণ্ব কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া শার্ঙ্গরবকে কহিলেন বৎস! তুমি, শকুন্তলাকে সম্মুখে রাখিয়া, রাজাকে, আমার নাম গ্রহণ করিয়া, কহিবে “আমরা বনবাসী তপস্যায় কাল যাপন করি; তুমি অতি প্রধান বংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছ, এবং বন্ধুবর্গের অগোচরে স্বেচ্ছাক্রমে শকুন্তলাতে স্নেহ প্রদর্শন করিয়াছ; এই সমস্ত বিবেচনা করিয়া অন্যান্য সহধর্ম্মিণীর ন্যায় শকুন্তলাতেও স্নেহ দৃষ্টি রাখিবে। আমাদের এই পর্য্যন্ত প্রার্থনা। ইহার ভাগ্যে থাকে অধিক হইবেক; তাহা আমাদিগের বলিয়া দিবার নয়”।
শার্ঙ্গরবের প্রতি এই সন্দেশ নির্দেশ করিয়া শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন বৎসে: এক্ষণে তোমাকেও কিছু উপদেশ দিব। আমরা বনবাসী বটি কিন্তু লৌকিক বৃত্তান্তেরও নিতান্ত অনভিজ্ঞ নহি। তুমি পতিগৃহে গিয়া গুরুজনদিগের শুশ্রুষা করিবে, সপত্নীদিগের সহিত প্রিয়সখীব্যবহার করিবে, স্বামী কাকর্শ্য প্রদর্শন করিলেও রোষবশা হইয়া প্রতিকূলচারিণী হইবে না, পরিচারিণীদিগের প্রতি সম্পূর্ণ দয়া দক্ষিণ্য প্রদর্শন করবে, এবং সৌভাগ্য গর্ব্বে গর্ব্বিত হইবে না। যুবতীরা এৰূপ ব্যবহারিণী হইলেই গৃহিণীপদে প্রতিষ্ঠিত হয়, বিপরীতকারিণীরা কুলের কণ্টক স্বৰূপ। ইহা কহিয়া কহিলেন দেখ; গোতমীই বা কি বলেন। গোতনী কহিলেন বধুদিগকে এই বই আর কি কহিয়া দিতে হইবেক। পরে শকুন্তলাকে কহিলেন বাছা! উনি যে গুলি বলিলেন সকল মনে রাখিও।
এইৰূপে উপদেশ প্রদান সমাপ্ত হইলে, কণ্ব শকুন্তলাকে কহিলেন বঙ্গ আমরা আর অধিক দূর যাইব না। আমাকে ও সখীদিগকে আলিঙ্গন কর। শকুন্তলা অশ্রুপূর্ণ নয়নে কহিলেন অনসূয়া প্রিয়ংবদাও কি এই খান হইতে ফিরিয়া যাইবে। ইহার সেই পর্য্যন্ত আমার সঙ্গে যাউক। কণ্ব কহিলেন বৎসে। ইহাদের বিবাহ হয় নাই। অতএব সে পর্য্যন্ত যাওয়া উপযুক্ত নয়; গোতমী তোমার সঙ্গে যাবেন। শকুন্তলা পিতাকে আলিঙ্গন করিলেন। দুই চক্ষে ধারা বহিতে লাগিল। তখন কণ্ব কহিলেন বৎসে! এত কাতর হইতেছ কেন; তুমি পতিগৃহে গিয়া গৃহিণী পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া সাংসারিক কার্য্যে অনুক্ষণ এৰূপ ব্যস্ত থাকিবে যে আমার বিরহজনিত শোক অনুভব করিবার অবকাশ পাইবে না। শকুস্তল পিতার চরণে নিপতিত হইয়া কহিলেন তাত! আবার কত দিনে এই তপোবনে আসিব। কণ্ব কহিলেন বৎসে! সসাগরা ধরিত্রীর একাধিপতির মহিষী হইয়া, এবং অপ্রতিহতপ্রভাব স্বীয় তনয়কে সিংহাসনে সন্নিবেশিত ও তদীয় হস্তে সমস্ত সাম্রাজ্যের ভার সমর্পিত দেখিয়া, পতি সমভিব্যাহারে পুনর্ব্বার এই শান্তরসাস্পদ তপোবনে আসিবে।
শকুন্তলাকে এই ৰূপ শোকাকুলা দেখিয়া গোতমী কহিলেন বাছা! আর কেন, ক্ষান্ত হও, যাবার বেলা বহিয়া যায়। সখীদিগকে যাহা কহিতে হয় কহিয়া লও। আর বিলম্ব করা হয় না। তখন শকুন্তলা সখীদিগের নিকটে গিয়া কহিলেন সখি! তোমরা উভয়ে আমাকে এককালে আলিঙ্গন কর। উভয়ে আলিঙ্গন করিলেন। তিন জনেই রোদন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে সখীরা শকুন্তলাকে কহিলেন সখি! - যদি রাজা শীঘ্র চিনিতে না পারেন তবে তাহাকে তাঁহার স্বনামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় দেখাইও। শকুন্তলা শুনিয়া সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া কহিলেন সখি! তোমরা এমন কথা বলিলে কেন বল। আমার হৃৎকম্প হইতেছে। সখীরা কহিলেন না সখি, ভীত হইও না; স্নেহের স্বভাবই এই অনিষ্ট আশঙ্কা করে।
এইৰূপে ক্রমে ক্রমে সকলের নিকট বিদায় লইয়া শকুন্তলা,গোতমী প্রভৃতি সমভিব্যাহারে, দুষ্মন্ত রাজধানী প্রতি প্রস্থান করিলেন। মহর্ষি কণ্ব, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা এক দৃষ্টিতে শকুন্তলার দিকে চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে ক্রমে শকুন্তলা দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইলে অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগপূর্বক উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন। মহর্ষিও দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন অনসূয়ে! প্রিয়ংবদে! তোমাদের সহচরী প্রস্থান করিয়াছেন। এক্ষণে শোকাবেগ সংবরণ করিয়া আমার সহিত আশ্রমে প্রতিগমন কর। এই বলিয়া মহর্ষি আশ্রমাভিমুখ হইলেন এবং তাঁহারাও তাঁঁহার অনুগামিনী হইলেন। যাইতে যাইতে মহর্ষি মনে মনে কহিতে লাগিলেন যেমন, স্থাপিত ধন ধনস্বামীকে প্রত্যপণ করিলে লোক নিশ্চিন্ত ও সুস্থ হয় তদ্রুপ, আদ্য আমি শকুন্তলাকে পতিগৃহে প্রেরণ করিয়া নিশ্চিন্ত ও সুস্থ হইলাম।
তৃতীয় অঙ্ক
তৃতীয় অঙ্ক।
রাজা এইরূপে মাধব্য সমভিব্যাহারে সমস্ত সৈন্য সামন্ত বিদায় করিয়া দিয়া তপস্বিকার্য্যানুরোধে তপোবনে বাস করিতে লাগিলেন। কিন্তু দিন যামিনী কেবল শকুন্তলাচিন্তায় একান্ত নিমগ্ন হইয়া,দিনে দিনে কৃশ, মলিন ও দুর্ব্বল এবং সর্ব্ব বিষয়ে নিতান্ত নিরুৎসাহ হইতে লাগিলেন। ফলতঃ, আহার, বিহার, শয়ন, উপবেশন কোন বিষয়েই তাহার মনের সুখ ছিল না। কোন্ সময়ে কোন্ স্থানে গেলে শকুন্তলাকে দেখিতে পাই নয়ত এই অনুধ্যান ও এই অনুসন্ধান। কিন্তু পাছে তপোবনবাসিরা তাঁহার অভিসন্ধি বুঝিতে পারেন এই আশঙ্কায় সতত সাতিশয় সঙ্কুচিত থাকেন। আর তিনি শকুন্তলার প্রতি যেরূপ, শকুন্তলাও তাঁহার প্রতি সেইরূপ কি না এ বিষয়েও সম্পূর্ণ সংশয়ারূঢ় ছিলেন।
এক দিবস মধ্যাহ্ন কালে একাকী নির্জ্জনে উপবিষ্ট হইয়া ভাবিতে লাগিলেন শকুন্তলাদর্শন ব্যতিরেকে আর আমার প্রাণ ধারণের উপায় নাই। কিন্তু, তপস্বীদিগের প্রয়োজন সম্পন্ন হইলে, যখন তাহারা আমাকে রাজধানী গমনের অনুমতি করিবেন তখন আমার কি দশা হইবেক। কি রূপে তাপিত প্রাণ শীতল করিব। সে যাহা হউক, এখন কোথায় গেলে শকুন্তলাকে দেখিতে পাই। বোধ করি শকুন্তলা মালিনীনদীর তীরবর্ত্তী সুশীতল লতামণ্ডপে আতপকাল অতিপাত করিতেছেন; অতএব সেই খানেই যাই, প্রিয়াকে দেখিতে পাইব। এই বলিয়াই একাকী গ্রীষ্মকালের মধ্যাহ্ন সময়েই সেই লতামণ্ডপের উদ্দেশে প্রস্থান করিলেন।
এ দিকে, শকুন্তলার, রাজদর্শনদিবসাবধি, ক্রমে ক্রমে পূর্ব্বরাগসম্ভব সমস্ত স্মরদশার আবির্ভাব হইতে লাগিল। ফলতঃ, তাঁহার ও রাজার অবস্থার কোন অংশে কোন প্রভেদ ছিল না। সে দিবস শকুন্তলা সাতিশয় অসুস্থ হওয়াতে, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা তাহাকে মালিনীতীরবর্ত্তী নিকুঞ্জবনে লইয়া গেলেন এবং তন্মধ্যবর্ত্তী সুশীতল শিলাতলে নব পল্লব ও জলার্দ্র পদ্ম পত্র প্রভৃতি দ্বারা শয্যা প্রস্তুত করিয়া তাহাতে শয়ন করাইয়া অশেষ প্রকারে শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন।
রাজা, ক্রমে ক্রমে সেই নিকুঞ্জ বনের সন্নিহিত হইয়া, চরণ চিহ্ন প্রভৃতি নানা লক্ষণ দ্বারা বুঝিতে পারিলেন শকুন্তলা তথায় আছেন। অনন্তর কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া লতার অন্তরাল হইতে শকুন্তলাকে অবলোকন করিয়া যৎপরোনাস্তি প্রীত হইয়া, কহিতে লাগিলেন আঃ! আমার নয়ন যুগল শীতল হইল প্রাণপ্রিয়াকে দেখিলাম। অনন্তর, ইহারা তিন সখীতে মিলিয়া কথোপকথন করিতেছে, লতাবলয়ে ব্যবহিত হইয়া কিয়ৎক্ষণ অবলোকন করি, এই বলিয়া উৎসুক মনে ও সতৃষ্ণ নয়নে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন।
এখানে, শকুন্তলার শরীরতাপ সাতিশয় প্রবল হওয়াতে, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা, সুশীতল জলার্দ্র নলিনী দল লইয়া কিয়ৎক্ষণ বাযু সঞ্চালন করিয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন কেমন নলিনীদলবাযু তোমার সুখজনক বোধ হইতেছে? শকুন্তলা কহিলেন সখি! তোমরা কি বাতাস করিতেছ? তাহারা উভয়ে শুনিয়া সাতিশয় বিষন্ন হইয়া পরস্পর মুখাবলোকন করিতে লাগিলেন। বাস্তবিক, তৎকালে শকুন্তলা দুষ্মন্তচিন্তায় একান্ত মগ্ন হইয়া একবারে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়াছিলেন। শুনিয়া ও শকুন্তলার অবস্থা দেখিয়া মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন ইহাকে অত্যন্ত অসুস্থশরীর দেখিতেছি; কিন্তু কি কারণে অসুস্থ হইয়াছে? কি গ্রীষ্ম দোষেই ইহার এরূপ অসুখ, কি যে কারণে আমার এই দশা ঘটিয়াছে ইহারও তাহাই। অথবা এ বিষয়ে আর সংশয় করিবার আবশ্যকতা নাই। গ্রীষ্ম দোষে কামিনী গণের এরূপ অবস্থা কোন মতেই সম্ভাবিত নয়।
প্রিয়ংবদা শকুন্তলার অগোচরে অনসূয়াকে কহিলেন সখি! সেই রাজর্ষির প্রথম দর্শনাবধিই শকুন্তলার মন এ প্রকার হইয়াছে; আর কোন কারণে ইহার এরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে এমত বোধ হয় না। অনসূয়া কহিলেন সখি! আমারও এই অনুভব হয়; ভাল জিজ্ঞাসা করিতেছি। এই বলিয়া শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন প্রিয়সখি! তোমার শরীরের সন্তাপ অতি প্রবল হইয়া উঠিতেছে; অতএব তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করিব। শকুন্তলা কহিলেন সখি! কি বলিবে বল। তখন অনসূয়া কহিলেন সখি! তোমার মনের কথা কি আমরা তাহার বিন্দু বিসর্গও জানি না। কিন্তু ইতিহাসকথায় বিরহীদিগের যেরূপ অবস্থা শুনিতে, পাওয়া যায় বোধ করি তোমারও যেন সেই অবস্থাই ঘটিয়াছে। অতএব বল কি নিমিত্ত তোমার এই ক্লেশ। প্রকৃত রূপে রোগ নির্ণয় হইলে প্রতীকার চেষ্টা হইতে পারে না। শকুন্তলা কহিলেন সখি! আমার অত্যন্ত ক্লেশ হইতেছে, এখন বলিতে পারিব না। প্রিয়ংবদা কহিলেন অনসূয়া ভালই বলিতেছে; কেন আপনার মনের ক্লেশ গোপন করিয়া রাখ। দিন দিন দুর্ব্বল ও কৃশ হইতেছ; দেখ, তোমার শরীরে আর কি আছে; কেবল লাবণ্যময়ী ছায়ামাত্র অবশিষ্ট রহিয়াছে!
রাজা অন্তরাল হইতে শুনিয়া কহিতে লাগিলেন প্রিয়ংবদা যথার্থ কহিয়াছে। শকুন্তলার শরীর নিতান্ত কৃশ ও একান্ত বিবর্ণ হইয়াছে; দেখিলে দুঃখ উপস্থিত হয়। কিন্তু এ অবস্থাতে দেখিয়াও আমার মনে কি অনির্ব্বচনীয় প্রীতির উদয় হইতেছে।
শকুন্তলা, মনের ব্যথা আর গোপন করা অনাবশ্যক বিবেচনা করিয়া, দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্ব্বক কহিলেন সখি! যদি তোমাদের কাছে না বলিব আর কার কাছেই বলিব; কিন্তু মনের বেদনা ব্যক্ত করিয়া তোমাদিগকে কেবল দুঃখভাগিনী করিব। অনসূয়াও প্রিয়ংবদা কহিলেন সখি! এই নিমিত্তই আমরা এত জিদ করিতেছি; তুমি কি জাননা আত্মীয় জনের নিকট দুঃখের কথা কহিলেও দুঃখের অনেক লাঘব হয়।
এই সময়ে রাজা শঙ্কিত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন দুঃখের দুঃখী ও সুখের সুখী যখন জিজ্ঞাসা করিয়াছে তখন এ অবশ্যই আপন মনের বেদনা ব্যক্ত করিবে। প্রথম সন্দর্শন দিবসে প্রস্থান কালে সতৃষ্ণনয়নে বারংবার নিরীক্ষণ করিয়াছিল তথাপি এখন কি কহিবে এই ভয়ে কাতর হইতেছি।
শকুন্তলা কহিলেন যে অবধি সেই রাজর্ষি আমার নয়নগোচর হইয়াছেন—এই মাত্র কহিয়া লজ্জায় নম্রমুখী হইয়া রহিলেন আর অধিক কহিতে পারিলেন না। তখন তাঁহারা উভয়ে কহিলেন সখি! বল, বল; আমাদের নিকট লজ্জা কি। তখন শকুন্তলা কহিলেন সেই অবধি তাহাতে অনুরাগিণী হইয়া আমার এই অবস্থা ঘটিয়াছে। এই বলিয়া বিষণ্ণ বদনে অশ্রুপূর্ণ নয়নে লজ্জায় অধোমুখী হইয়া রহিলেন। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা সাতিশয় প্রীত হইয়া কহিলেন সখি! সৌভাগ্য ক্রমে তুমি অনুরূপ পাত্রেই অনুরাগিণী হইয়াছ; অথবা মহানদী সাগর পরিত্যাগ করিয়া আর কোন্ জলাশয়ে প্রবেশ করিবেক?
রাজা শুনিয়া আহ্লাদ সাগরে মগ্ন হইয়া কহিতে লাগিলেন যা শুনিবার তা শুনিলাম; এত দিনের পর তাপিত প্রাণ শীতল হইল। শকুন্তলা কহিলেন অতএব, যদি তোমাদের মত হয় তবে এমন কোন উপায় কর যাহাতে আমি সেই রাজর্ষির অনুকম্পার পাত্র হই। নতুবা আমাকে মনে রাখিও। প্রিয়ংবদা, শুনিয়া সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া, শকুন্তলার অগোচরে অনসূয়াকে কহিলেন সখি! আর ইহাকে সান্ত্বনা করিয়া ক্ষান্ত রাখিবার সময় নাই। আর কালাতিপাত করা অকর্ত্তব্য। তখন অনসূয়া কহিলেন সখি! যাহাতে অবিলম্বে শকুন্তলার মনোরথ সম্পন্ন হয় এমন কি উপায় হয় বল। প্রিয়ংবদা কহিলেন সখি! অবিলম্বে শকুন্তলার মনোরথ সম্পন্ন হওয়া দুষ্কর নহে। তুমি কি দেখ নাই, সেই রাজর্ষি, শকুন্তলাকে দেখিয়া অবধি, দিন দিন দুর্ব্বল ও কৃশ হইতেছেন।
রাজা শুনিয়া আত্মশরীরে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন যথার্থই এরূপ হইয়াছি বটে। নিরন্তর অন্তরতাপে তাপিত হইয়া আমার শরীর বিবর্ণ ও মলিন হইয়া গিয়াছে; এবং দুর্ব্বল ও কৃশও যৎপরোনাস্তি হইয়াছি।
প্রিয়ংবদা কহিলেন অনসূয়ে! ইহার মদনলেখন করা যাউক। আমি পুষ্পের মধ্যগত করিয়া দেবসেবা ব্যপদেশে সেই রাজর্ষির হস্তে দিয়া আসিব। অনসূয়া কহিলেন সখি! এ অতি উত্তম পরামর্শ; দেখ, শকুন্তলাই বা কি বলে। শকুন্তলা কহিলেন সখি! আমাকে আর কি জিজ্ঞাসা করিবে; তোমাদের যা ভাল বোধ হয় তাই কর। তখন প্রিয়ংবদা কহিলেন তবে আর বিলম্বে কাজ নাই; মনোমত এক পত্রিকা রচনা কর। শকুন্তলা কহিলেন সখি! পত্রিকা রচনা করিতেছি; কিন্তু পাছে তিনি অবজ্ঞা করেন এই ভয়ে আমার হৃদয় কম্পিত হইতেছে।
রাজা শকুন্তলার আশঙ্কা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিতে লাগিলেন সুন্দরি! তুমি যাহার অবজ্ঞা ভয়ে ভীত হইতেছ সে এই তোমার সমাগমের নিমিত্ত একান্ত উৎসুক হইয়া রহিয়াছে; তুমি কি জান না, রত্ন কাহাকেও অন্বেষণ করে না, রত্নেরই সকলে অন্বেষণ করিয়া থাকে। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদাও শকুন্তলার আশঙ্কা শুনিয়া কহিলেন অয়ি আত্মগুণাবমানিনি! কোন ব্যক্তি শরৎকালীন জ্যোৎস্নাকে আতপত্র দ্বারা নিবারণ করিয়া থাকে। শকুন্তলা ঈষৎ হাস্য করিয়া পত্রিকা রচনায় প্রবৃত্ত হইলেন। পরে, রচনা প্রস্তুত হইলে, কহিলেন সখি! আমি রচনা স্থির করিয়াছি; কিন্তু লিখন সামগ্রী কিছুই নাই। তখন প্রিয়ংবদা কহিলেন কেন এই পদ্ম পত্রে লিখ।
লিখন সমাপন করিয়া শকুন্তলা সখীদিগকে কহিলেন ভাল, শুন দেখি সঙ্গত হইয়াছে কি না। তাহারা শুনিতে লাগিলেন; শকুন্তলা পড়িতে আরম্ভ করিলেন “হে নির্দয়! তোমার মন আমি জানি না; কিন্তু আমি তোমাতে একান্ত অনুরাগিণী হইয়া নিরন্তর সন্তাপিত হইতেছি”। রাজা শুনিয়া, আর অন্তরালে থাকিতে না পারিয়া, সহসা সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা, দেখিয়া সাতিশয় হর্ষিত হইয়া, গাত্রোত্থান পূর্ব্বক, পরম সমাদরে স্বাগত জিজ্ঞাসা করিয়া বসিবার সংবর্ধনা করিলেন। শকুন্তলাও,সাতিশয় ব্যস্ত সমস্ত হইয়া, গাত্রোত্থান করিতে উদ্যত হইলেন।
তখন রাজা নিবারণ করিয়া কহিলেন সুন্দরি! এত ব্যস্ত হইতে হইবে না। দেখ, তোমার শরীরের যেরূপ গ্লানি, তাহাতে কোন মতেই শয্যা পরিত্যাগ করা কর্ত্তব্য নহে। সখীরা রাজাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন মহারাজ! এই শিলাতলে উপবেশন করুন। রাজা উপবিষ্ট হইলেন। শকুন্তলা, লজ্জায় অত্যন্ত জড়ীভূতা হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন হে হৃদয়! তত উতলা হইয়া এখন এত কাতর হইতেছ কেন। রাজা অনসূয়া ও প্রিয়ংবদাকে কহিলেন বোধ হইতেছে তোমাদের সখী অতিশয় অসুস্থ হইয়াছেন। উভয়ে ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন এখন সুস্থ হইবেন। শকুন্তলা শুনিয়া লজ্জায় নম্রমুখী হইয়া রহিলেন।
অনসূয়া কহিলেন মহারাজ! শুনিতে পাই রাজাদিগের অনেক মহিষী থাকে; কিন্তু সকলেই প্রেয়সী হয় না। অতএব আমরা যেন সখীর নিমিত্ত অবশেষে মনোদুঃখ না পাই। রাজা কহিলেন, যথার্থ বটে রাজাদিগের অনেক মহিলা থাকে; কিন্তু আমি অকপট হৃদয়ে কহিতেছি তোমাদের সখীই আমার জীবন সর্ব্বস্ব হইবেন। তখন অনসূয়া ও প্রিয়ংবদ। সাতিশয় হর্ষিত হইয়া কহিলেন মহারাজ! আমরা নিশ্চিন্ত ও চরিতার্থ হইলাম। শকুন্তলা কহিলেন সখি! আমরা মহারাজকে লক্ষ্য করিয়া কত কথা কহিয়াছি; ক্ষমা প্রার্থনা কর। সখীরা হাস্যমুখে কহিলেন, যে কহিয়াছে সেই ক্ষমা প্রার্থনা করিবে অন্যের কি দায়। তখন শকুন্তলা কহিলেন মহারাজ! যদি কিছু কহিয়া থাকি ক্ষমা করবেন। পরোক্ষে কে কি না বলে। রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিলেন।
এইরূপ কথোপকথন চলিতেছে এমত সময়ে প্রিয়ংবদা, লতামণ্ডপের বহির্ভাগে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া, কহিলেন অনসূয়ে! মৃগশাবকটী উৎসুক হইয়া ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিতেছে; বোধ করি আপন জননীকে অন্বেষণ করিতেছে। অতএব আমি উহার মার কাছে দিয়া আসি। তখন অনসূয়া কহিলেন সখি! ও অতি চঞ্চল; তুমি একাকিনী উহাকে ধরিতে পারিবে না; অতএব চল আমিও যাই। শকুন্তলা উভয়কেই প্রস্থান করিতে দেখিয়া কহিলেন সখি! দুজনেই আমাকে ফেলিয়া চলিলে, আমি এখানে একাকিনী রহিলাম। তাঁহারা কহিলেন সখি! কেন, পৃথিবীনাথকে তোমার নিকটে রাখিয়া গেলাম। এই বলিয়া হাসিতে হাসিতে উভয়ে লতামণ্ডপ হইতে প্রস্থান করিলেন।
উভয়ে প্রস্থান করিলে, শকুন্তলা, সত্য সত্যই সখীরা চলিয়া গেল এই বলিয়া,উৎকণ্ঠিতার ন্যায় হইলেন। রাজা কহিলেন সুন্দরি! সখীদের নিমিত্ত এত উৎকণ্ঠিত হইতেছ কেন। আমি তোমার সখীস্থানে রহিয়াছি। শকুন্তলা কহিলেন মহারাজ! আপনি অতি মান্য ব্যক্তি; এ দুঃখিনীকে অপরাধিনী করেন কেন। এই বলিয়া শয্যা হইতে উঠিয়া গমনোম্মুখী হইলেন। রাজা কহিলেন সুন্দরি! এ কি কর; একে মধ্যাহ্নকাল অতি উত্তাপের সময়; তাহাতে তোমার অবস্থা এই। এমত সময়ে এমত অবস্থায় লতামণ্ডপ হইতে বহির্গত হওয়া কোন ক্রমেই উচিত নহে। এই বলিয়া হস্তে ধরিয়া নিবারণ করিলেন। শকুন্তলা কহিলেন মহারাজ! ছাড়িয়া দাও, সখীদিগের নিকটে যাই; তুমি জান না, আমি আপনার অধীন নই। রাজা লজ্জিত ও সঙ্কুচিত হইয়া শকুন্তলার হাত ছাড়িয়া দিলেন। শকুন্তলা কহিলেন মহারাজ! আপনি লজ্জিত হইতেছেন কেন,আমি আপনাকে কিছু বলি নাই; দৈবের তিরস্কার করিতেছি। রাজা কহিলেন দৈবকে তিরস্কার কেন কর, দৈবের অপরাধ কি। শকুন্তলা কহিলেন দৈবের তিরস্কার শত বার করিব; সে আমাকে পরের অধীন করিয়া পরের গুণে লোভিত করে কেন।
এই বলিয়া শকুন্তলা চলিয়া যাইবার উপক্রম করিলেন। রাজা পুনর্ব্বার শকুন্তলার হস্তে ধরিলেন। শকুন্তলা কহিলেন মহারাজ কি কর, ইতস্ততঃ ঋষিরা ভ্রমণ করিতেছেন। তখন রাজা কহিলেন সুন্দরি! তুমি গুরুজনের ভয় করিতেছ কেন। ভগবান্ কণ্ব কখনই রুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হইবেন না। শত শত ঋষিকন্যারা গান্ধর্ব্ব বিধান দ্বারা আপনাদিগকে অনুরূপ পাত্রের হস্তগত করিয়াছেন এবং তাহাদের গুরুজনেরাও পরিশেষে সবিশেষ অবগত হইয়া অনুমোদন করিয়াছেন। শকুন্তলা, মহারাজ! এই সম্ভাষণমাত্রপরিচিত ব্যক্তিকে ভুলিবেন এই বলিয়া, রাজার হাত ছাড়াইয়া চলিয়া গেলেন। রাজা কহিলেন সুন্দরি! তুমি আমার সম্মুখ হইতে চলিয়া গেলে, কিন্তু আমার চিত্ত হইতে যাইতে পারিবে না। শকুন্তলা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন ইহা শুনিয়া আর আমার পা উঠিতেছে না। যাহা হউক, অন্তরালে থাকিয়া ইহার অনুরাগ পরীক্ষা করিব। এই বলিয়া লতা বিতানে আবৃতশরীরা হইয়া কিঞ্চিৎ অন্তরে অবস্থান করিলেন।
রাজা একাকী লতামণ্ডপে অবস্থিত হইয়া শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া কহিতে লাগিলেন প্রিয়ে! আমি তোমা বই আর জানি না; কিন্তু তুমি নিতান্ত নির্দ্দয় হইয়া আমাকে একবারেই পরিত্যাগ করিয়া গেলে, তুমি অতি কঠিন। পরে কিয়ৎক্ষণ মৌন ভাবে থাকিয়া কহিলেন আর এই প্রিয়াশূন্য লতামণ্ডপে থাকিয়া কি করি। পরে শকুন্তলার মৃণালবলয় সম্মুখে পতিত দেখিয়া তৎক্ষণাৎ তাহা উঠাইয়া লইলেন এবং পরম সমাদরে বক্ষস্থলে স্থাপিত করিয়া,কৃতার্থম্মন্য চিত্তে শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া, কহিতে লাগিলেন প্রিয়ে! তোমার এই মৃণালবলয় অচেতন হইয়াও এই দুঃখিত ব্যক্তির দুঃখ শান্তি করিলেক; কিন্তু তুমি তাহা করিলে না। শকুন্তলা, আর ইহা শুনিয়া বিলম্ব করিতে পারি না; কিন্তু কি বলিয়াই যাই; অথবা এই মৃণালবলয়ের ছলেই যাই, এই বলিয়া পুনর্ব্বার লতামণ্ডপে প্রবেশ করিলেন। রাজা দর্শন মাত্র হর্ষ সাগরে মগ্ন হইয়া কহিলেন এই যে, আমার প্রাণেশ্বরী আসিয়াছেন। বুঝিলাম, দেবতারা আমার পরিতাপ শুনিয়া সদয় হইলেন “তাহাতেই পুনর্ব্বার প্রিয়াকে দেখিতে পাইলাম। চাতক পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ হইয়া জল প্রার্থনা করিল, অমনি নব জলধর হইতে সুশীতল সলিলধারা নিপতিত হইল।
শকুন্তলা রাজার সম্মুখবর্ত্তীনী হইয়া কহিলেন মহারাজ! অর্দ্ধ পথে স্মরণ হওয়াতে আমি এই মৃণালবলয় লইতে আসিয়াছি; আমার মৃণাবলয় দাও। রাজা কহিলেন যদি তুমি আমাকে যথাস্থানে নিবেশিত করিতে দাও, তোমার মৃণালবলয় তোমাকে ফিরিয়া দি, নতুবা দিব না। শকুন্তলা অগত্যা সম্মত হইলেন। রাজা কহিলেন এস এই শিলাতলে বসিয়া পরাইয়া দি। উভয়ে শিলাতলে উপবিষ্ট হইলেন। রাজা শকুন্তলার হস্ত লইয়া কিয়ৎক্ষণ স্পর্শসুখ অনুভব করিতে লাগিলেন। শকুন্তলাও স্পর্শসুখ অনুভব করিয়া জড়প্রায় হইয়া কহিলেন আর্য্যপুত্র! সত্বর হও সত্বর হও। রাজা আর্য্যপুত্রসম্ভাষণ শ্রবণে সাতিশয় হর্ষ প্রাপ্ত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন স্ত্রীলোকেরা স্বামীকেই আর্য্যপুত্র শব্দে সম্ভাষণ করিয়া থাকে। বুঝি আমার মনোরথ সম্পন্ন হইল। অনন্তর শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন সুন্দর! মৃণালবলয়ের সন্ধি সম্যক্ সংশ্লিষ্ট হইতেছে না; যদি তোমার মত হয়, অন্য প্রকারে সঙ্টন করিয়া পরই। শকুন্তলা ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন তোমার যা অভিরুচি।
অনন্তর রাজা, নানা ছলে বিলম্ব করিয়া, শকুন্তলার হন্তে মৃণালবলয় পরাইয়া দিয়া কহিলেন সুন্দরি! দেখ দেখ, কেমন সুন্দর হইয়াছে। শকুন্তলা কহিলেন দেখিব কি, কর্ণোৎপলরেণ আমার নয়নে নিপতিত হইয়াছে, দেখিতে পাই না। রাজা হাস্যমুখে কহিলেন যদি তোমার মত হয় ফুৎকার দ্বারা পরিষ্কার করিয়া দি। শকুন্তলা কহিলেন তাহা হইলে অত্যন্ত উপকৃত হই বটে; কিন্তু তোমাকে অত দূর বিশ্বাস হয় না। রাজা কহিলেন সুন্দরি। না না না; নূতন ভৃত্য কখন প্রভুর আদেশের অতিরিক্ত করিতে পারেন। শকুন্তলা কহিলেন ঐ অতি ভক্তিই চোরের লক্ষণ। অনন্তর রাজা শকুস্তলার চিবুকে ও মস্তকে হস্ত প্রদান করিয়া তাহার মুখ কমল উত্তোলন করিলেন। শকুন্তলা শঙ্কিতা ও কম্পিতা হইয়া রাজাকে বারংবার নিষেধ করিতে লাগিলেন। রাজা কহিলেন সুন্দরি! শঙ্কা করিও না। এই বলিয়া শকুন্তলার নয়নে ফুৎকার প্রদান করিতে লাগিলেন।
কিয়ৎক্ষণ পরে শকুন্তলা কহিলেন আর তোমার পরিশ্রম করিতে হইবেক না; আমার নয়ন পূর্ব্ববৎ হইয়াছে; আর কোন অসুখ নাই। মহারাজ! তুমি আমার এত উপকার করিলে, আমি তোমার কোন প্রত্যুপকার করিতে পারিলাম না। আমি অত্যন্ত লজ্জিত হইতেছি। রাজা কহিলেন সুন্দরি; আর কি প্রত্যুপকার চাই; আমি যে তোমার সুরভি মুখকমলের আঘ্রাণ পাইয়াছি তাহাই আমার পরিশ্রমের যথেষ্ট পুরস্কার হইয়াছে। দেখ মধুকর কেমলের আভ্রাণ মাত্রেই সন্তুষ্ট হইয়া থাকে। শকুন্তলা কহিলেন সন্তুষ্ট না হইয়াই কি করে।
এইরূপ কৌতুক ও কথোপকথন হইতেছে, এমত সময়ে “চক্রবাকবধু! রজনী উপস্থিত; এই সময়ে চক্রবাককে সম্ভাষণ করিয়া লও” এই শব্দ শকুন্তলার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। তখন শকুন্তলা সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া রাজাকে কহিলেন মহারাজ! আমার পিতৃম্বসা আর্য্যা গোতমী, আমার শারীরিক অসুস্থতা শুনিয়া, আমি কেমন আছি জানিতে আসিতেছেন। এই নিমিত্তই অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা চক্রবাক চক্রবাকীচ্ছলে আমাদিগকে সাবধান করিতেছে। অতএব তুমি সত্বর লতামণ্ডপ হইতে নিৰ্গত ও অন্তৰ্হিত হও। রাজা, ভাল আমি চলিলাম যেন পুনরায় দেখা হয়, এই বলিয়া লতাবিতানে ব্যবহিত হইয় শকুন্তলাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন।
কিয়ৎক্ষণ পরে, শান্তিজলপূর্ণ কমণ্ডলু হন্তে লইয়া, গোতমী লতামগুপে প্রবেশ করিলেন এবং শকুন্তলার শরীরে হস্ত প্রদান করিয়া কহিলেন বাছা! শুনিলাম আজি তোমার অত্যন্ত অসুখ হয়েছিল, এখন কেমন আছ, কিছু উপশম হয়েছে?। শকুন্তলা কহিলেন হাঁ পিসি! আজি বড় অসুখ, হয়েছিল; এখন অনেক ভাল আছি। তখন গোতমী, কমণ্ডলু হইতে শান্তিজল লইয়া শকুন্তলার সর্ব্ব শরীরে সেচন করিয়া, কহিলেন বাছা! সুস্থ শরীরে চিরজীবনী হইয়া থাক। অনন্তর লতামণ্ডপে অনসুয়া অথবা প্রিয়ংবদা কাহাকেও সন্নিহিত না দেখিয়া কহিলেন এই অসুখ তুমি একলা আছ বাছা, কেউ কাছে নাই। শকুন্তলা কহিলেন না পিসি! আমি একলা ছিলাম না; অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা বরাবর আমার নিকটে ছিল; এই মাত্র মালিনীতে জল অনিতে গেল। তখন গোতমী কহিলেন বাছা! আর রোদ নাই, অপরাহ্ন হয়েছে এস কুটীরে যাই। শকুন্তল। অগত্য তাঁহার অনুগামিনী হইলেন। রাজাও, আর আমি প্রিয়াশুন্য লতামণ্ডপে থাকিয়া কি করি, এই বলিয়া শিবিরোদ্দেশে প্রস্থান করিলেন।
দ্বিতীয় অঙ্ক
দ্বিতীয় অঙ্ক
রাজা মৃগয়ায় আগমন কালে স্বীয় প্রিয়বয়স্য মাধব্য নামক ব্রাহ্মণকে সমভিব্যাহারে আনিয়াছিলেন। রাজসহচরেরা, নিয়ত রাজভোগে কাল যাপন করিয়া,স্বভাবতঃ সাতিশয় বিলাসী ও সুখাভিলাষী হইয়া উঠে। অশন, বসন, শয়ন, উপবেশন কোন বিষয়ে কিঞ্চিন্মাত্র ক্লেশ হইলে তাহাদের একান্ত অসহ্য হয়। মাধব্য রাজধানীতে অশেষ সুখ সম্ভোগে কাল যাপন করিতেন। অরণ্যে সে সকল সুখভোগের লেশও ছিল না; প্রত্যুত, সকল বিষয়েই সবিশেষ ক্লেশ ঘটিয়া উঠিয়াছিল।
এক দিবস মাধব্য, প্রভাতে গাত্রোত্থান করিয়া, যৎপরোনান্তি বিরক্ত হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন এই মৃগয়াশীল রাজার বয়স্য হইয়া আমার প্রাণ গেল। প্রতিদিন প্রাতঃকালে মৃগয়ায় যাইতে হয় এবং এই মৃগ, এই বরাহ, এই শার্দুল, এই করিয়া মধ্যাহ্ন কাল পর্য্যন্ত বনে বনে ভ্রমণ করিতে হয়। গ্রীষ্মকালে পল্বল ও বননদী সকল শুষ্ক প্রায় হইয়া আইসে; যে অল্পপ্রমাণ জল থাকে তাহাও, বৃক্ষের গলিত পত্র সকল অনবরত পতিত হওয়াতে,অত্যন্ত কটু ও অত্যন্ত কষায় হইয়া উঠে। পিপাসা পাইলে সেই বিরস বারিই পান করিতে হয়। আহারের সময় নিয়মিত নাই; প্রায় প্রতিদিন অনিয়ত সময়েই আহার করিতে হয়। আহার সামগ্রীর মধ্যে শূল্য মাংসই অধিকাংশ; তাহাও প্রত্যহ সুচারুরূপ পাক করা হয় না। আর প্রাতঃকাল অবধি মধ্যাহ্ন পর্যন্ত অশ্বপৃষ্ঠে পরিভ্রমণ করিয়া সর্ব্বশরীর বেদনায় এরূপ অভিভূত হইয়া থাকে যে রাত্রিতেও সুখে নিদ্রা যাইতে পারি না। রাত্রিশেষে নিদ্রার আবেশ হয়; কিন্তু ব্যাধগণের বন গমন কোলাহলে অতি প্রত্যুষেই নিদ্রাভঙ্গ হইয়া যায়। আর ত্বরায় যে এই সকল ক্লেশের অবসান হইবেক তাহারও সম্ভাবনা দেখিতেছি না। সে দিবস আমরা পশ্চাৎ পড়িলে, তিনি, একাকী এক মৃগের অনুসরণক্রমে. তপোবনে প্রবিষ্ট হইয়া, আমাদের দুর্ভাগ্যক্রমে, শকুন্তলানাম্নী এক তাপসকন্যা নিরীক্ষণ করিয়াছেন। তাহাকে দেখিয়া অবধি আর নগর গমনের কথাও মুখে আনেন না। এই ভাবিতে ভাবিতেই রাত্রি প্রভাত হইয়া গেল এক বারও চক্ষু মুদি নাই।
মাধব্য এই সমস্ত চিন্তা করিতেছেন, এমত সময়ে দেখিতে পাইলেন, রাজা মৃগয়ার বেশ করিয়া, মৃগয়াকালীন সহচরগণে পরিবেষ্টিত হইয়া, সেই দিকেই আসিতেছেন। তখন তিনি মনে মনে এই বিবেচনা করিলেন বিকলাঙ্গের ন্যায় হইয়া থাকি; তাহা হইলেও, যদি আজি বিশ্রাম করিতে পাই। এই বলিয়া, ভগ্নশরীরের ন্যায় একান্ত বিকল হইয়া রহিলেন এবং, রাজা সন্নিহিত হইবামাত্র, সাতিশয় কাতরতা প্রদর্শনপূর্ব্ক কহিলেন বয়স্য! আমার সর্ব্ব শরীর অবশ হইয়া আছে, হস্তপ্রসারণ করি এমত ক্ষমতা নাই; অতএব কেবল বাক্যদ্বারাই আশীর্ব্বাদ করি।
রাজা মাধব্যকে তদবস্থ অবস্থিত দেখিয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন বয়স্য! তোমার শরীর এরূপ বিকল হইল কেন? মাধব্য কহিলেন কেন হইল কি আবার; স্বয়ং অস্থি ভাঙ্গিয়া দিয়া অশ্রুপাতের কারণ জিজ্ঞাসা করিতেছ!। রাজা কহিলেন বয়স্য! বুঝিতে পারিলাম না। মাধব্য কহিলেন নদীতীরবর্ত্তী রেতস যে কুব্জভাব অবলম্বন করে সে কি স্বেচ্ছা বশতঃ সেই রূপ করে, অথবা নদী-বেগপ্রভাবে। রাজা কহিলেন নদীবেগ তাহার কারণ। মাধব্য কহিলেন তুমিও আমার অঙ্গবৈকল্যের। রাজা কহিলেন সে কেমন?। মাধব্য কহিলেন আমি কি বলিব,ইহা কি উচিত হয় যে রাজকার্য্য পরিত্যাগ করিয়া বনচরের ব্যবসায় অবলম্বন পূর্ব্বক নিয়ত বনে বনে ভ্রমণ করিবে। আমি ব্রাহ্মণের সন্তান; সর্ব্বদা মৃগের অনুসরণে কাননে কাননে ভ্রমণ করিয়া সন্ধিবন্ধ সকল শিথিল হইয়া গিয়াছে এবং সর্ব্ব শরীর অবশ হইয়া রহিয়াছে। অতএব বিনয় বাক্যে প্রার্থনা করিতেছি অন্ততঃ এক দিনের মত আমাকে বিশ্রাম করিতে দাও।
রাজা মাধব্যের প্রার্থনা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন এ ত এইরূপ কহিতেছে; আমারও শকুন্তলা দর্শন দিবসাবধি মৃগয়া বিষয়ে মন নিতান্ত নিরুৎসুক হইয়াছে। শরাসনে শর সন্ধান করি কিন্তু মৃগের উপরি নিক্ষেপ করিতে পারি না; যেহেতু, তাহাদিগের মুগ্ধ নয়ন অবলোকন করিলে, শকুন্তলার সেই অলৌকিক বিভ্রম বিলাসশালী নয়নযুগল মনে পড়ে। মাধব্য রাজার মুখে দৃষ্টি পাত করিয়া কহিলেন ইনি ত আর কিছু মনে করিয়া ভাবিতে লাগিলেন আমি অরণ্যে রোদন করিলাম। রাজা ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন না হে না, আমি অন্য কিছু ভাবিতেছি না; সুহৃদ্বাক্য লঙ্ঘন করা কর্ত্তব্য নহে এই বিবেচনায় অদ্য মৃগয়ায় ক্ষান্ত হইলাম। মাধব্য, শ্রবণ মাত্র যৎপরোনাস্তি আনন্দিত হইয়া, চিরজীবী হও বলিয়া, চলিয়া যাইবার উদ্যম করিলেন। রাজা কহিলেন বয়স্য! যাইও না, আমার কিছু কথা আছে। মাধব্য কি কথা বল, এই বলিয়া শ্রবণোম্মুখ হইয়া দণ্ডায়মান রহিলেন। রাজা কহিলেন বয়স্য! কোন অনায়াসসাধ্য কর্ম্মে তোমাকে আমার সহায়তা করিতে হইবেক। মাধব্য কহিলেন কি মিষ্টান্ন ভক্ষণে? সে বিষয়ে আমি বিলক্ষণ নিপুণ বটি। রাজা কহিলেন না হে না, আমি যাহা কহিব। এই বলিয়া দৌবারিককে আহ্বান করিয়া সেনাপতিকে আনয়ন করিতে আদেশ দিলেন।
দৌবারিকমুখে রাজার আহ্বানবার্ত্তা শ্রবণ করিয়া, সেনাপতি অনতিবিলম্বে নরপতিগগাচরে উপস্থিত হইলেন এবং মহারাজের জয় হউক বলিয়া, কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন মহারাজ! সমুদায় উদ্যোগ হইয়াছে; আর অনর্থ কাল হরণ করিতেছেন কেন, মৃগয়ায় চলুন। রাজা কহিলেন আজি মাধব্য, মৃগয়ার দোষ কীর্ত্তন করিয়া, আমাকে নিরুৎসাহ করিয়াছে। সেনাপতি রাজার অগোচরে ইঙ্গিত দ্বারা মাধব্যকে কহিলেন সখে! তুমি স্থিরপ্রতিজ্ঞ হইয়া থাক; আমি কিয়ৎ ক্ষণ স্বামীর চিত্তবৃত্তি অনুবর্ত্তন করি। অনন্তর রাজাকে কহিলেন মহারাজ! ও পাগলের কথা শুনেন কেন; ও কখন্ কি না বলে। মৃগয়া অপকারী কি উপকারী মহারাজই বিবেচনা করিয়া দেখুন না কেন। প্রথমত, স্থূলতা ও জড়তা অপগত হইয়া, শরীর বিলক্ষণ পটু ও কর্ম্মক্ষম হয়; ভয় জন্মিলে, অথবা ক্রোধের উদয় হইলে, জন্তুগণের মনের গতি কিরূপ হয় তাহা বারংবার প্রত্যক্ষ হইতে থাকে; আর চলিত লক্ষ্যে শর ক্ষেপ করা অভ্যাস হইয়া আইসে; যদি চলিত লক্ষ্যে শর ক্ষেপ অব্যর্থ হয় ত তাহা অপেক্ষা ধনুর্ধরের পক্ষে অধিক শ্লাঘার বিষয় আর কি হইতে পারে। অতএব, মৃগয়াকে ব্যসন মধ্যে গণ্য করা অতি অবিবেচনার কর্ম্ম। বিবেচনা করুন, এরূপ আমোদ ও এরূপ উপকার আর কিসে আছে। মাধব্য, শুনিয়া কৃত্রিম কোপ প্রকাশ করিয়া কহিলেন অরে নরাধম! ক্ষান্ত হ, আর তোর প্রবৃত্তি জন্মাইতে হইবেক না; ইনি আজি আপন প্রকৃতি প্রাপ্ত হইয়াছেন। আমি দেখিতেছি তুই, বনে বনে ভ্রমণ করিয়া, এক দিন নরনাসিকালোলুপ ভল্লুকের মুখে পড়িবি।
উভয়ের এই রূপ বিবাদারম্ভ দেখিয়া রাজা সেনাপতিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন দেখ! আমরা আশ্রমসমীপে আছি; এই নিমিত্ত তোমার মতে সম্মত হইতে পারিলাম না। অদ্য মহিষেরা,নিপানে অবগাহন করিয়া, নিরুদ্বেগে জলক্রীড়া করুক; হরিণগণ, তরুচ্ছায়ায় দলবদ্ধ হইয়া, রোমন্থ অভ্যাস করুক; বরাহের অশঙ্কিত চিত্তে পল্বলে মুস্তা ভক্ষণ করুক; আর আমার শরাসনও বিশ্রাম করুক। সেনাপতি কহিলেন মহারাজের যেমন অভিরুচি। রাজা কহিলেন তবে যে সকল মৃগয়নুচর পূর্ব্ব বন প্রস্থান করিয়াছে তাহাদিগকে ফিরাইয়া আন। আর সেনাসংক্রান্ত লোকদিগকে বিশেষ করিয়া নিষেধ কর যেন তাহারা কোন ক্রমে তপোবনের উৎপীড়ন না জন্মায়।
সেনাপতি যে আজ্ঞা মহারাজ বলিয়া নিষ্ক্রান্ত হইলে, রাজা সন্নিহিত মৃগয়াসহচরদিগকে মৃগয়াবেশ পরিত্যাগ করিতে আদেশ করিলেন। তদনুসারে সমুদায় পরিচারকগণ তথা হইতে প্রস্থান করিলে, রাজা ও মাধব্য উভয়ে সন্নিহিত সুশীতল লতামণ্ডপে প্রবিষ্ট হইয়া উপবেশন করিলেন।
এইরূপে উভয়ে নির্জ্জনে উপবিষ্ট হইলে,রাজা মাধব্যকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন বয়স্য! তুমি চক্ষুর ফল পাও নাই; যেহেতু, দর্শনীয় বস্তুই দেখ নাই। মাধব্য কহিলেন কেন তুমি ত আমার সম্মুখে রহিয়াছ। রাজা কহিলেন তা নয় হে, আমি আশ্রমললামভূতা কদুহিতা শকুন্তলাকে উল্লেখ করিয়া কহিতেছি। মাধব্য, কৌতুক করিবার নিমিত্ত, কহিলেন এ কি বয়স্য! তপস্বিকন্যায় অভিলাষ। রাজা কহিলেন বয়স্য! পুরুবংশীয়েরা এরূপ দুরাচার নহে যে অনুচিত বস্তুর উপভোগে অভিলাষ করে। তুমি জান না, শকুন্তলা মেনকাগর্ভসম্ভূতা রাজর্ষি বিশ্বামিত্রের কন্যা; তপস্বীর আশ্রমে প্রতিপালিত হইয়াছে এই মাত্র; নতুবা, বস্তুতঃ সে তপস্বিকন্যা নহে।
মাধব্য, শকুন্তলার প্রতি রাজার প্রগাঢ় অনুরাগ দেখিয়া, হাস্যমুখে কহিলেন যেমন পিণ্ডখর্জজূর আহার করিয়া রসনা মিষ্টরসে অভিভূত হইলে তেঁতুল খাইতে অভিলাষ হয়; সেইরূপ, স্ত্রীর পরিভোগে পরিতৃপ্ত হইয়া তুমি এই অভিলাষ করিতেছ। রাজা কহিলেন বয়স্য! তুমি তাহাকে দেখ নাই এই নিমিত্ত এরূপ কহিতেছ। মাধব্য কহিলেন তার সন্দেহ কি; সে বস্তু অবশ্যই রমণীয় যাহা তোমারও বিস্ময় জন্মাইয়াছে। রাজা কহিলেন, বয়স্য! অধিক কি কহিব তাহার শরীর মনে করিলে মনে,এই উদয় হয় বুঝি বিধাতা প্রথমতঃ চিত্র পটে চিত্রিত করিয়া পরে জীবন দান করিয়াছেন; অথবা, মনে মনে মনোমত উপকরণসামগ্রীসকল সঙ্কলন করিয়া, মনে মনে অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলি যথা স্থানে বিন্যাস করিয়া, মনে মনেই তাহার শরীর নির্ম্মাণ করিয়াছেন; নতুবা হস্ত দ্বারা নির্ম্মাণ করিলে শরীরের সেরূপ কোমলতা ও রূপ লাবণ্যের সেরপ মাধুরী সম্ভবিত না। ফলতঃ, ভাই রে, সে এক অলৌকিক স্ত্রীরত্নসৃষ্টি। মাধব্য কহিলেন বয়স্য! বুঝিলাম শকুন্তলা যাবতীয় রূপবতীদিগের পরাভবস্থান। রাজা কহিলেন তাহার রূপ, অনাঘ্রাত প্রফুল্ল পুষ্প স্বরূপ, নখাঘাত বর্জ্জিত নব পল্লব স্বরূপ, অপরিহিত নূতন রত্ন স্বরূপ, অনাস্বাদিত অভিনব মধু স্বরূপ,জন্মান্তরীণ পুণ্যরাশির অখণ্ড ফল স্বরূপ। জানিনা, কোন্ ভাগ্যবানের ভাগ্যে সেই নির্ম্মল রূপের ভোগ আছে।
রাজার মুখে শকুন্তলার এই রূপ বর্ণনা শুনিয়া চমৎকৃত হইয়া মাধব্য কহিলেন বয়স্য তবে শীঘ্র শীঘ্র তাহার উদ্ধার কর; যেন এরূপ অসুলভরূপনিধান কন্যানিধান কোন অসভ্য তপস্বীর হস্তে পতিত না হয়। রাজা কহিলেন শকুন্তলা নিতান্ত পরাধীন। বিশেষতঃ কুলপতি কণ্ব এক্ষণে আশ্রম নাই। মাধব্য কহিলেন ভাল বয়স্য! জিজ্ঞাসা করি বল দেখি তোমার উপর তাহার অনুরাগ আছে কি না। রাজা কহিলেন বয়স্য! তপস্বিকন্যারা স্বভাবতঃ অপ্রগল্ভস্বভাবা তথাপি তাহার আকার ইঙ্গিতে আমার প্রতি তাহার অনুরাগের স্পষ্ট চিহ্ন লক্ষিত হইয়াছে। যত ক্ষণ আমার সম্মুখে ছিল আমার সহিত কথা কহে নাই; কিন্তু আমি কথা কহিতে আরম্ভ করিলে অনন্যচিত্তা হইয়া স্থির কর্ণে শ্রবণ করিয়াছে। আর নয়নে নয়নে সঙ্গতি হইলে মুখ ফিরাইয়া লইয়াছে; কিন্তু অন্য দিকেও অধিক ক্ষণ চাহিয়া থাকে নাই। আর প্রস্থান কালে, কয়েক পদ মাত্র গমন করিয়া, কুশের অঙ্কুরে পদতল ক্ষত হইল এই বলিয়া দাঁড়াইয়া রহিল; এবং কুরুবক শাখায় বল্কল লাগিয়াছে এই বলিয়া বল্কল মোচনচ্ছলে আমার দিকে মুখ ফিরাইয়া সতৃষ্ণ নয়নে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। মাধব্য কহিলেন বয়স্য! তবে তোমার মনোরথ সিদ্ধির অধিক বিলম্ব নাই। তপোবন তোমার উপবন হইয়া উঠিল। রাজা কহিলেন বয়স্য! কোন কোন তপস্বীরা আমাকে চিনিতে পারিয়াছেন। এখন বল দেখি কি ছলে কিছু দিন তপোবনে থাকি। মাধব্য কহিলেন কেন অন্য ছলের প্রয়োজন কি? তুমি রাজা, তপোবনে গিয়া তপস্বীদিগকে বল রাজস্ব দাও। রাজা কহিলেন তপস্বীরা অন্যবিধ রাজস্ব দেন। তাহারা যে রাজস্ব দেন তাহা রত্নরাশি অপেক্ষাও সমধিক প্রার্থনীয়। দেখ, প্রজারা রাজাদিগকে যে রাজস্ব দেয় তাহা বিনশ্বর; কিন্তু তপস্বীরা তপস্যার ষষ্ঠাংশ স্বরূপ অবিনশ্বর রাজস্ব প্রদান করিয়া থাকেন।
রাজা ও মাধব্য উভয়ের এই রূপ কথোপকথন চলিতেছে, এমত সময়ে দ্বারবান্ আসিয়া কহিল মহারাজ! তপোবন হইতে দুই ঋষিকুমার আসিয়া দ্বার দেশে দণ্ডায়মান আছেন কি আজ্ঞা হয়। রাজা কহিলেন অবিলম্বে লইয়া আইস। অনন্তর ঋষিকুমারেরা রাজসমীপে উপনীত হইয়া মহারাজের জয় হউক বলিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন। রাজা আসন হইতে গাত্রোত্থান করিয়া প্রণাম করিলেন এবং জিজ্ঞাসিলেন তপস্বীরা কি আজ্ঞা করিয়া পাঠাইয়াছেন জানিতে ইচ্ছা করি। ঋষিকুমারেরা কহিলেন মহারাজ! আপনি এখানে আছেন জানিতে পারিয়া তপস্বীরা মহারাজকে এই অনুরোধ করিতেছেন যে মহর্ষি কণ্ব আশ্রমে নাই, এই নিমিত্ত নিশাচরেরা যজ্ঞের বিঘ্ন জন্মাইতেছে। অতএব তাঁহার প্রত্যাগমন পর্য্যন্ত আপনাকে এই স্থানে থাকিয়া তপোবনের উপদ্রব নিবারণ করিতে হইবেক। রাজা কহিলেন অনুগৃহীত হইলাম। মাধব্য কহিলেন বয়স্য! মন্দ কি,এ তোমার অনুকূল গলহস্ত। রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিলেন; অনন্তর, দৌবারিককে আহ্বান করিয়া সারথিকে রথ প্রস্তুত করিতে আদেশ দিয়া, ঋষিকুমারদিগকে কহিলেন আপনারা প্রস্থান করুন; আমি অবিলম্বে তপোবনে উপস্থিত হইতেছি। ঋষিকুমারেরা সাতিশয় আহ্লাদিত হইয়া কহিলেন মহারাজ! না হইবে কেন, আপনি যে বংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন আপনার এই ব্যবহার তাহার উপযুক্তই বটে। বিপাকে অভয়দান পুরুবংশীয়দিগের কুলব্রত।
এই বলিয়া আশীর্ব্বাদ করিয়া ঋষিকুমারেরা প্রস্থান করিলে পর, রাজা মাধব্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন বয়স্য! যদি তোমার শকুন্তলাদর্শনে কৌতূহল থাকে আমার সমভিব্যাহারে চল। মাধব্য কহিলেন তোমার মুখে তাহার বর্ণনা শুনিয়া তাহাকে দেখিতে অত্যন্ত অভিলাষ ছিল বটে; কিন্তু এক্ষণে নিশাচরের নাম শুনিয়া সে অভিলাষ একবারেই গিয়াছে। রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন ভয় কি আমার নিকটে থাকিবে। মাধব্য কহিলেন তবে আর নিশাচরে আমার কি করিবেক। এই রূপ কথোপকথন হইতেছে; এমত সময়ে দ্বারপাল আসিয়া কহিল মহারাজ রথ প্রস্তুত, আরোহণ করিলেই হয়। কিন্তু বৃদ্ধ মহিষীর বার্ত্তা লইয়া করভক এই মাত্র রাজধানী হইতে উপস্থিত হইল। রাজা কহিলেন অবিলম্বে উহাকে আমার নিকটে লইয়া আইস। অনন্তর করভক রাজসমীপে আসিয়া নিবেদন করিল মহারাজ! বৃদ্ধ দেবী আজ্ঞা করিয়াছেন আগামী চতুর্থ দিবসে তাঁহার এক ব্রত আছে; সেই দিবসে মহারাজকে তথায় উপস্থিত থাকিতে হইবেক।
রাজা, এ দিকে তপস্বীদিগের কার্য্য, এ দিকে গুরুজনের আজ্ঞা, উভয়ই অনুল্লঙ্ঘনীয়, কি করি; এই বলিয়া নিতান্ত চিন্তিত হইলেন। মাধব্য পরিহাস করিয়া কহিলেন কেন ত্রিশঙ্কুর মত মধ্যস্থলে অবস্থিতি কর। রাজা কহিলেন বয়স্য! এ পরিহাসের সময় নয়; সত্য সত্যই অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়াছি; কি করি কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না। পরে কিয়ৎক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিলেন মা তোমাকে পুত্র বলিয়া পরিগ্রহ করিয়াছেন; অতএব তুমি রাজধানী ফিরিয়া যাও; এবং যাইয়া জননীর পুত্রকার্য্য সম্পাদন কর। তাঁহাকে কহিবে আমি তপস্বীদিগের কার্য্যে অত্যন্ত ব্যস্ত আছি এই নিমিত্ত যাইতে পারিলাম না। মাধব্য, ভাল আমি চলিলাম, কিন্তু তুমি যেন আমাকে নিশাচরভয়ে কাতর মনে করিও না; এই বলিয়া কহিলেন এক্ষণে আমি রাজার অনুজ হইলাম। অতএব রাজার অনুজের মত যাইতে ইচ্ছা করি। রাজা কহিলেন আমার সঙ্গে অধিক লোক জন রাখিলে তপোবনের উৎপীড়ন হইতে পারে; অতএব সমুদায় অনুচরদিগকে তোমারই সঙ্গে পাঠাইতেছি। মাধব্য শুনিয়া সাতিশয় আনন্দিত হইয়া কহিলেন তাহা হইলে আজি আমি যুবরাজ হইলাম।
এইরূপে মাধবের রাজধানী প্রতিগমন নির্দ্ধারিত হইলে, রাজা মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন এ অতি চপলস্বভাব, হয় ত শকুন্তলাবৃত্তান্ত অন্তঃপুরে প্রচার করিবেক। কি করি। অথবা এইরূপ কহিয়া বিদায় করি। এই বলিয়া মাধব্যের হস্তে ধরিয়া কহিলেন বয়স্য! ঋষিরা কয়েক দিনের নিমিত্ত তপোবনে থাকিতে আদেশ করিয়াছেন; তাহাদের আজ্ঞা অবহেলন করা কোন মতেই কর্ত্তব্য নহে এই নিমিত্ত রহিলাম; নতুবা যথার্থই আমি শকুস্তলা লাভে, অভিলাষী হইয়াছি এমত নয়। আমি ইতিপূর্ব্বে তোমার নিকট শকুন্তলাসংক্রান্ত যে সকল গল্প করিয়াছি সে সমস্তই পরিহাস মাত্র; তুমি যেন যথার্থ ভাবিয়া -একে আর করিও না। মাধব্য কহিলেন তাহার সন্দেহ কি; আমি, এক বারও তোমার ঐ সকল কথা যথার্থ ভাবি নাই। অনন্তর রাজা তপস্বীদিগের যজ্ঞবিঘ্ননিরাকরণার্থে তপোবনে প্রবেশ করিলেন এবং মাধব্যও যাবতীয় সৈন্য সামন্ত ও সমুদায় অনুযাত্রিকগণ সঙ্গে লইয়া রাজধানী প্রস্থান করিলেন।
পঞ্চম অঙ্ক
পঞ্চম অঙ্ক
রাজা দুষ্মন্ত, রাজকার্য্যসমাধানান্তে একান্তে আসীন হইয়া, স্বীয় প্রিয়বয়স্য মাধব্যের সহিত কথোপকথনরসে কাল যাপন করিতেছেন এমত সময়ে হংসপদিক নামী এক পরিচারিণী সঙ্গীতশালাতে অতি মধুর স্বরে এই ভাবের একটা গান করিতে লাগিল “অহে মধুকর! অভিনবমধুলোভে সহকারমঞ্জরীতে তখন তাদৃশ প্রণয় প্রদর্শন করিয়া এখন, কমলমধু পানে পরিতৃপ্ত হইয়া, উহাকে একবারে বিস্মৃত হইলে কেন”।
তানলয়বিশুদ্ধস্বরসংযোগবতী গীতি শ্রবণ করিয়া রাজা অকস্মাৎ যৎপরোনাস্তি উন্মনঃ হইলেন। কিন্তু কি নিমিত্ত উন্মনাঃ হইতেছেন তাহার কিছুই অনুধাবন করিতে ন পারিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন কেন এই মনোহর গীতি শ্রবণ করিয়া আমার মন এমন আকুল হইতেছে। প্রিয়জনবিরহ ব্যতিরেকে মনের এরূপ আকুলতা হয় না; কিন্তু আমার প্রিয়জনবিরহ উপস্থিত দেখিতেছি না। অথবা মনুষ্য, সর্ব্ব প্রকারে সুখী হইয়াও, রমণীয় বস্তু দর্শন কিংবা সুমধুর গীতি শ্রবণ করিয়া যে আকুলহৃদয় হয় বোধ করি, অনতিপরিস্ফুট ৰূপে জন্মান্তরীণ স্থির সৌহৃদ্য তাহার স্মৃতি পথে আৰূঢ় হয়।
রাজা মনে মনে এইৰূপ বিতর্ক করিতেছেন এমত সময়ে কঞ্চুকী আসিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিল মহারাজ! হিমালয়ের উপত্যকাবর্ত্তি অরণ্যবাসী কয়েক জন তপস্বী মহর্ষি কণুের সন্দেশ লইয়া মহারাজের নিকট আসিয়াছেন কি আজ্ঞা হয়। রাজা তপস্বিনাম শ্রবণমাত্র অতিমাত্র আদর প্রদর্শন পূর্বক কছিলেন তুমি উপাধ্যায় সোমরাতকে বল, অভ্যাগত তপস্বীদিগকে, বেদবিধি অনুসারে সৎকার করিয়া স্বয়ং সমভিব্যাহারে করিয়া আমার নিকটে লইয়া আইসেন। আমিও ইত্যবকাশে তপস্বিদর্শনযোগ্য প্রদেশে গিয়া রীতিমত অবস্থিতি করিতেছি।
এই আদেশ দিয়া কঞ্চুকীকে বিদায় করিয়া রাজা অগ্নিগৃহে গিয়া অবস্থিতি করিলেন এবং কহিতে লাগিলেন ভগবান্ কণ্ব কি নিমিত্ত আমার নিকট ঋষি প্রেরণ করিলেন; কি তাঁহাদের তপস্যার বিঘ্ন ঘটিয়াছে, কি কোন দুরাত্মা তাঁহাদের উপর কোন প্রকার অত্যাচার করিয়াছে; .কিছুই নির্ণয় করিতে না পারিয়া আমার মন অত্যন্ত আকুল হইতেছে। তখন পার্শ্ববর্ত্তিনী পরিচারিক কহিল মহারাজ! আমার বোধ হইতেছে ধর্ম্মারণ্যবাসী ঋষির মহারাজের অধিকারে নির্ব্বিঘ্নে ও নিরাকুলচিত্তে তপস্যার অনুষ্ঠান করিতেছেন, সেই হেতু প্রীত হইয়া মহারাজকে সভাজন করিতে আসিয়াছেন।
এবস্প্রকার কথোপকথন হইতেছে এমত সময়ে সোমরাত তপস্বীদিগকে সমভিব্যাহারে করিয়া উপস্থিত হইলেন। রাজা, দূর হইতে দেখিতে পাইয়া, আসন হইতে গাত্রোথান করিয়া তাঁহাদের আগমন প্রতীক্ষায় দণ্ডায়মান রহিলেন। তখন সোমরাত তপস্বীদিগকে কহিলেন ঐ দেখুন, সসাগরা সদ্বীপা ধরিত্রীর অদ্বিতীয় অধিপতি আসন পরিত্যাগ পূর্বক দণ্ডায়মান হইয়া আপনাদের প্রতীক্ষা করিতেছেন। শার্ঙ্গরব কহিলেন নরপতিদিগের এরূপ বিনয় ও সৌজন্য দেখিলে সাতিশয় প্রীত হইতে হয় ও অত্যন্ত প্রশংসা করিতে ও সাধুবাদ দিতে হয়; অথবা ইহার বিচিত্র কি-তরুগণ ফলিত হইলে ফল ভরে অবনত হইয়াই থাকে; বর্ষাকালীন জলধরগণ বারিভরে নম্রভাবই অবলম্বন করে; সৎপুরুষদিগেরও প্রথ। এই, সমৃদ্ধিশালী হইলে অনুদ্ধতস্বভাবই হয়েন।
শকুন্তলার দক্ষিণাক্ষি স্পন্দন হইতে লাগিল। তিনি সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া গোতমীকে কহিলেন পিসি! আমার দক্ষিণ নয়নের স্পন্দন হইতেছে কেন?। গৌতমী কহিলেন বৎসে! তোমার অমঙ্গল দূর হউক; পতিকুলদেবতারা তোমার মঙ্গল করুন। যাহা হউক, শকুন্তলা তদবধি মনে মনে নানা প্রকার আশঙ্কা করিতে লাগিলেন ও অত্যন্ত অস্থির হইলেন।
রাজা শকুন্তলাকে দেখিয়া কহিতে লাগিলেন এই অবগুণ্ঠনবতী কামিনী কে, কি নিমিত্তই বা ইনি তপস্বীদিগের সমভিব্যাহারে আসিয়াছেন। পার্শ্ববর্ত্তিনী পরিচারিক কহিল মহারাজ! আমিও দেখিয়া অবধি নানা বিতর্ক করিতেছি কিন্তু কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। যাহ। হউক, गशद्वास्त्र! এৰূপ ৰূপ লাবণ্যের মাধুরী কখন কাহার নয়নগোচর হয় নাই। রাজা কহিলেন সে যা হউক পরস্ত্রীতে দৃষ্টিপাত করা কর্ত্তব্য নহে। এ দিকে শকুন্তলাও আপনার অস্থির হৃদয়কে এই-বলিয়া সান্ত্বনা করিতে লাগিলেন হৃদয়; এত আকুল হইতেছ কেন; আর্য্যপুত্রের ভাব মনে করিয়া আশ্বাসিত হও ও ধৈর্য্য অবলম্বন কর।
তাপসের ক্রমে ক্রমে সন্নিহিত হইয়াং মহারাজের জয় হউক বলিয়া হস্ত তুলিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন। রাজা প্রণাম করিয়া ঋষিদিগকে আসন পরিগ্রহ করিতে কহিলেন। ঋষির অভীষ্টসিদ্ধিরন্তু বলিয়া পুনর্ব্বার আশীর্ব্বাদ প্রয়োগ করলেন। অনন্তর সকলে উপবেশন করিলে রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন কেমন, মুনিদিগের নির্ব্বিঘ্নে তপস্যানুষ্ঠান হইতেছে। ঋষিরা কহিলেন মহারাজ! আপনি রক্ষাকর্ত্তা থাকিতে ধর্ম্ম ক্রিয়ার বিঘ্ন সম্ভাবনা কোথায়; সূর্য্যদেবের উদয় হইলে কি অন্ধকারের আবির্ভাব হইতে পারে?। রাজা শুনিয়া কৃতার্থম্মন্য হইয়া কহিলেন অদ্য আমার রাজশব্দ সার্থক হইল। পরে জিজ্ঞাসা করিলেন ভগবান কণ্বের কুশল? ঋষিরা কহিলেন হা মহারাজ! মহর্ষি সর্ব্বাংশেই কুশলী।
এই ৰূপে প্রথমসমাগমোচিত শিষ্টাচারপরম্পরা পরিসমাপ্ত হইলে, শাঙ্গ রব কহিলেন আমাদিগের গুরু মহর্ষি করে যে সন্দেশ লইয়া আসিয়াছি নিবেদন করি শ্রবণ করুন। মহর্ষি কহিয়াছেন “আপনি আমার অজ্ঞাতসারে আমার কন্যার পাণিগ্রহণ করিয়াছেন। আমি সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়। তদ্বিষয়ে সম্পূর্ণ সম্মতি প্রদান করিয়াছি। আপনি আমার শকুন্তলার সর্বাংশে যোগ্য পাত্র। এক্ষণে আপনকার সহধর্ম্মিণী অন্তঃসত্ত্বা হইয়াছেন গ্রহণ করুন”। গোতমীও কহিলেন আর্য্য। আমি কিছু বলিতে চাই কিন্তু বলিবার পথ নাই। শকুন্তলা আপন গুরুজনের অনুমতির অপেক্ষা রাখে নাই; তুমিও তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর নাই। অতএব তোমরা পরস্পরের সম্মতিতে যাহা করিয়াছ তাহাতে অন্যের কথা কহিবার কি আছে।
শকুন্তলা শুনিয়া মনে মনে সাতিশয় শঙ্কিত হইয়। এই ভাবিতে লাগিলেন না জানি আর্য্যপুত্র কি বলেন। রাজ দুর্ব্বাসার শাপপ্রভাবে শকুন্তলাপরিণয় বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত বিস্তৃত হইয়াছিলেন সুতরাং শুনিয়া বিস্ময়াপন্ন হইয়া কহিলেন এ আবার কি উপস্থিত। শকুন্তল। শুনিয়া একবারে ম্ৰিয়মাণা হইলেন। শার্ঙ্গরব কহিলেন মহারাজ! আপনি লৌকিক ব্যবহার বিলক্ষণ অবগত হইয়াও এৰূপ কহিতেছেন কেন। আপনি কি জানেন না যে পরিণীত নারী যদিও অত্যন্ত সাধুশীলা হয় তথাপি সে নিয়ত পিতৃকুলবাসিনী হইলে লোকে নানা কথা কহিয়া থাকে। এই নিমিত্ত সে পতির অপ্রিয়া হইলেও তাহার পিতৃপক্ষীয়েরা তাহাকে পতিকুলবাসিনী করিতে চাহে।
রাজা কহিলেন আমি ইহার পাণিগ্রহণ করিয়াছি না কি?। শকুন্তলা শুনিয়া বিষাদ সমুদ্রে মগ্ন হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন,হে হৃদয়! যে আশঙ্কা করিতেছিলে তাহাই ঘটিয়াছে। শার্ঙ্গরব রাজার অস্বীকার শ্রবণে, তদীয় ধূর্ত্ততা আশা করিয়া যৎপরোনাস্তি কুপিত হইয়া কহিলেন মহারাজ! জগদীশ্বর আপনাকে ধর্ম্ম সংস্থাপন কার্য্যে নিয়োজিত করিয়াছেন। অন্যে অন্যায় করিলে আপনাকে দণ্ড বিধান করিতে হয়। এক্ষণে আপনাকে জিজ্ঞাসা করি রাজা হইয়া অনুষ্ঠিত কার্য্যের অপলাপে প্রবৃত্ত হইয়। ধর্ম্মদ্বেষী হওয়া উচিত কি না?। রাজা কহিলেন আমাকে এত অভদ্র স্থির করিতেছেন কেন?। শার্ঙ্গরব কহিলেন মহারাজ! আপনকার অপরাধ নাই; যাহারা ঐশ্বর্য্যমদে মত্ত হয় তাহাদের এইৰূপই স্বভাব ও এইৰূপই আচরণ হইয়া থাকে। রাজা কহিলেন আপনি অন্যায় ভৎর্সনা করিতেছেন; আমি কোন ক্রমেই এৰূপ ভৎর্সনার যোগ্য নহি।
এইৰূপে রাজাকে অস্বীকারপরায়ণ ও শকুন্তলাকে লজ্জায় অধোমুখী দেখিয়া গোতমী শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন বৎসে! লজ্জিতা হইও না; আমি তোমার মুখের ঘোমটা খুলিয়া দিতেছি; তথা হইলেই মহারাজ তোমাকে চিনিতে পরিবেন। এই বলিয়া মুখের অবগুণ্ঠন নিরীকরণ করিয়া দিলেন। রাজা তথাপি চিনিতে পারলেন না; বরং পূর্ব্বাপেক্ষায় সমধিক সংশয়াৰূঢ় হইয়া মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন শার্ঙ্গরব কহিলেন মহারাজ! এৰূপ মৌনভাবে রহিলেন কেন!। রাজা কহিলেন মহাশয়! কি করি বলুন; অনেক ভাবিয়া দেখিলাম; কিন্তু ইঁহার হার পাণিগ্রহণ করিয়াছি বলিয়া কোন ক্রমেই স্মরণ হইতেছে না। সুতরাং কি প্রকারে ইঁহাকে ভার্য্যা বলিয়া পরিগ্রহ করি। বিশেষতঃ ইনি এক্ষণে অন্তঃসত্ত্বা হইয়াছেন।
রাজার এই বচনবিন্যাস শ্রবণ করিয়া শকুন্তলা মনে মনে কহিতে লাগিলেন হয় কি সর্ব্বনাশ! একবারে প্লাণিগ্রহণেই সন্দেহ॥ রাজমহিষী হইয়া অশেষ সুখ সম্ভোগে কাল হরণ করিব বলিয়া যত আশা করিয়াছিলাম সে সমুদায় এক কালে নির্ম্মূল হইল। শার্ঙ্গরব কহিলেন মহারাজ! বিবেচনা করুন মহর্ষি কেমন সদাশয়তা প্রদর্শন করিয়াছেন। আপনি তাহার অগোচরে তদীয় অনুমতিনিরপেক্ষ হইয়া তাঁহার কন্যার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি তাহাতে রোষ বা অসন্তোষ প্রদর্শন না করিয়া বরং সাতিশয় সন্তুষ্টই হইয়াছেন এবং আপনকার নিকট কন্যাকে পাঠাইয়া দিয়াছেন। এক্ষণে প্রত্যাখ্যান করিয়া এৰূপ সদাশয় মহানুভাবের অবমাননা করা মহারাজের কোন ক্রমেই কর্ত্তব্য নহে। অতএব আপনি স্থির চিত্তে বিবেচনা করিয়া কর্ত্তব্য নিৰ্দ্ধারণ করুন। So শারদ্বত শার্ঙ্গরব অপেক্ষা উদ্ধতস্বভাব ছিলেন। তিনি কহিলেন অহে শার্ঙ্গরব! স্থির হও, আর তোমার বৃথা বাগজাল বিস্তার করিবার প্রয়োজন নাই। আমি এককথায় সকল বিষয়ের শেষ করিতেছি। এই বলিয়া শকুন্তলার দিকে মুখ ফিরাইয়া কহিলেন শকুন্তলে! আমাদের যাহা বলিবার, বলিয়াছি। মহারাজ এইৰূপ কহিতেছেন। তোমার যাহা বক্তব্য থাকে বল এবং যাহাতে উঁহার প্রতীতি জন্মে এৰূপ কর। তখন শকুন্তলা অতি মৃদুস্বরে কহিলেন যখন তাদৃশ অনুরাগ এতাদৃশ বিপরীত ভাব অবলম্বন করিয়াছে তখন আমি পূর্ব্ব বৃত্তান্ত স্মরণ করাইয়া কি করিব। কিন্তু আত্মশোধন আবশ্যক এই নিমিত্ত কিছু বলিতেছি। এই বলিয়া রাজাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন আর্য্যপুত্র!— এই মাত্র কহিয়া কিঞ্চিৎ স্তব্ধ হইয়া কহিলেন যখন পরিণয়েই সন্দেহ জন্মিয়াছে তখন আর আর্য্যপুত্র শব্দে সম্বোধন করা অবিধেয়। এই বলিয়া পুনর্ব্বার কহিলেন পৌরব! আমি সরলহদইয়া, ভাল মন্দ কিছুই জানি না। তৎকালে তপোবনে সেইৰূপ অমায়িকতা দেখাইয়া, ও ধর্ম্ম সাক্ষী করিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়া, এক্ষণে এৰূপ দুর্ব্বাক্য কহিয়া প্রত্যাখ্যান করা তোমার কর্ত্তব্য নহে।
রাজা শুনিয়া ৰিঙ্কল্পৰিষ্ট হইয়া কহিলেন ঋষিতনয়ে! যেমন বর্ষাকালীন নদী তীরতরুকেও পতিত ও আপনার প্রবাহকেও পঙ্কিল করে, সেইরূপ তুমি আমাকেও পতিত ও আপন কুলকেও কলঙ্কিত করিতে উদ্যত হইয়াছ। শকুন্তলা কহিলেন ভাল, যদি তুমি যথার্থই পরিণয় সন্দেহ করিয়া, পরস্ত্রীবোধ পরিগ্রহ করিতে শঙ্কিত হও, কোন অভিজ্ঞান দর্শাইয়া তোমার আশঙ্কা দূর করিতেছি। রাজা কহিলেন এ উত্তম কল্প; ভাল, কোই কি অভিজ্ঞান, দেখাও। শকুন্তলা রাজদত্ত অঙ্গুরীয় অঞ্চলের কোণে বাঁধিয়া রাখিয়াছিলেন; এক্ষণে ব্যস্ত হইয়া অঙ্গুরীয় খুলিতে গিয়া দেখিলেন অঞ্চলের কোণে অঙ্গুরীয় নাই। তখন ম্লানবদনা ও বিষাদ সমুদ্রে মগ্না হইয়া গোতমীর মুখ পানে চাহিয়া রহিলেন। গোতমী কহিলেন বোধ হয়, আলগা বাঁধা ছিল, নদীতে স্নান করিবার সময় পড়িয়া গিয়াছে।
রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিলেন এবং কহিলেন “স্ত্রীজাতি অত্যন্ত প্রত্যুৎপন্নমতি” এই যে কথা প্রসিদ্ধ আছে ইহা তাহার এক উত্তম উদাহরণ।
রাজার এইরূপ ভাবদর্শনে ম্রিয়মাণ হইয়া শকুন্তলা কহিলেন আমি দৈবের প্রতিকুলতা বশতঃ অঙ্গরীয় দর্শন বিষয়ে অকৃতকার্য্য হইলাম। ভাল, এমন কোন কথা বলিতেছি যাহা শুনিলে অবশ্যই তোমার পূর্ব্ববৃত্তান্ত স্মরণ হইবেক। রাজা কহিলেন এক্ষণে শুনা আবশ্যক; কি বলিয়া আমার প্রতীতি জন্মাইতে চাও, বল। শকুন্তলা কহিলেন মনে করিয়া দেখ, এক দিন তুমি ও আমি দুজনে নবমালিকা মণ্ডপে বসিয়া ছিলাম। তোমার হস্তে একটী জলপূর্ণ পদ্মপত্রের ঠোঙা ছিল। রাজা কহিলেন ভাল, বলিয়া যাও, শুনিতেছি। শকুন্তলা কহিলেন সেই সময়ে আমার কৃতপুত্র দীর্ঘাপাঙ্গ নামে মৃগশাবক তথায় উপস্থিত হইল। তুমি উহাকে সেই জল পান করিতে আহ্বান করিলে। তুমি অপরিচিত ৰলিয়া সে তোমার নিকটে আসিল না। পরে আমি হন্তে করিলে, সে আসিয়া অনায়াসে পান করিল। তখন তুমি পরিহাস করিয়া কহিলে সকলেই সজাতীয়ে বিশ্বাস করিয়া থাকে। তোমরা দুজনেই জঙ্গলা, এই জন্য ও তোমার নিকটে আসিল।
রাজা শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন কামিনীদিগের এইরূপ মধুমাখা প্রবঞ্চনাবাক্য বিষয়াসক্ত ব্যক্তিদিগের বশীকরণমন্ত্রস্বরূপ। গোতমী শুনিয়া কিঞ্চিৎ কোপ প্রদর্শন করিয়া কহিলেন মহাভাগ! এ জন্মাবধি তপোবনে প্রতিপালিত, প্রবঞ্চনা কাকে বলে জানে না। রাজা কহিলেন তাপসবৃদ্ধে! প্রবঞ্চনা স্ত্রীজাতির স্বভাবসিদ্ধ বিদ্যা; শিখিতে হয় না। মানুষের কথা কি কহিব পশু পক্ষীদিগের মধ্যেও বিনা শিক্ষায় প্রবঞ্চনানৈপুণ্য দেখিতে পাওয়া যায়। দেখ, কেহ শিখাইয়া দেয় না, অথচ কোকিলারা, কেমন প্রবঞ্চনা করিয়া, স্বীয় সন্তানদিগকে অন্য পক্ষী দ্বারা প্রতিপালিত করিয়া লয়। শকুন্তলা রুষ্টা হইয়া কহিলেন অনার্য্য! তোমার আপনার যেমন মন, অন্যকেও সেইরূপ মনে কর। রাজা কহিলেন তাপসকন্যে! দুষ্মন্ত গোপনে কোন কর্ম্ম করে না। যখন যাহা করিয়াছে সমুদায়ই সর্ব্বত্র প্রসিদ্ধ আছে। কোই, কেই বলুক দেখি, তোমার পাণিগ্রহণবৃত্তান্ত জানে কি না। শকুন্তলা কহিলেন তুমি আমাকে স্বেচ্ছাচারিণী করিলে। পুরুবংশীয়েরা অতি উদারস্বভাব এই বিশ্বাস করিয়া, যখন আমি মধুমুখ পাষাণহৃদয়ের হস্তে আত্ম সমর্পণ করিয়াছি, তখন আমার ভাগ্যে যে এই ঘটিবেক ইহা অসম্ভব নহে। এই বলিয়া অঞ্চল মুখে দিয়া রোদন করিতে লাগিলেন।
তখন শার্ঙ্গরব কহিলেন না বুঝিয়া কর্ম্ম করিলে,পরিশেষে এইরূপ মনস্তাপ পাইতে হয়। এই নিমিত্ত সকল কর্ম্মই, বিশেষতঃ যাহা নির্জ্জনে করা যায়, সবিশেষ পরীক্ষা না করিয়া করা কর্ত্তব্য নহে। পরস্পরের মন না জানিয়া বন্ধুতা করিলে, সেই বন্ধুতা পরিশেষে শত্রুতাতে পর্য্যবসিত হয়। শার্ঙ্গরবের এই তিরস্কারবাক্য শ্রবণ করিয়া রাজা কহিলেন কেন আপনি স্ত্রীলোকের কথায় বিশ্বাস করিয়া আমার উপর এরূপ দোষারোপ করিতেছেন। শার্ঙ্গরব কিঞ্চিৎ কোপাবিষ্ট হইয়া কহিলেন যে ব্যক্তি জন্মাবচ্ছিন্নে চাতুরী শিখে নাই তাহার কথা অপ্রমাণ; আর যাঁহারা পরপ্রতারণাকে বিদ্যা বলিয়া শিক্ষা করেন তাঁহাদের কথাই প্রমাণ হইল। তখন রাজা শার্ঙ্গরবকে কহিলেন মহাশয়! আপনি বড় যথার্থবাদী। আমি স্বীকার করিলাম প্রতারণাই আমাদের বিদ্যা ও ব্যবসায়। কিন্তু আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, ইঁহাকে প্রতারণা করিয়া আমার কি লাভ হইবেক। শার্ঙ্গরব কোপে কম্পিত কলেবর হইয়া কহিলেন ‘নিপাত’। রাজা কহিলেন পুরুবংশীয়েরা নিপাত লাভ করে এ কথা অশ্রদ্ধেয়।
এইরূপে উভয়ের বিবাদারম্ভ দেখিয়া, শারদ্বত কহিলেন শার্ঙ্গরব! আর উত্তরোত্তর বাক্ছলে প্রয়োজন কি? আমরা গুরুর নিয়োেগ অনুষ্ঠান করিয়াছি; এক্ষণে ফিরিয়া যাই চল। এই বলিয়া রাজাকে কহিলেন মহারাজ। ইনি তোমার পত্নী, ইচ্ছা হয় গ্রহণ কর, ইচ্ছা হয় ত্যাগ কর; পত্নীর উপর পরিণেতার সর্ব্বতোমুখী প্রভুতা আছে। এই বলিয়া শার্ঙ্গরব, শারদ্বত ও গোতমী তিন জনে প্রস্থান করিলেন।
শকুন্তলা, সকলকে প্রস্থান করিতে দেখিয়া, অশ্রুপূর্ণ লোচনে কাতরবচনে কহিলেন ইনি ত আমার এই করিলেন; তোমরাও আমাকে ফেলিয়া চলিলে। আমার কি গতি হইবেক। এই বলিয়া তাঁহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। গোতমী কিঞ্চিৎ থামিয়া কহিলেন বৎস শার্ঙ্গরব! শকুন্তলা কাঁদিতে কাঁদিতে আমাদের সঙ্গে আসিতেছে। দেখ, রাজা প্রত্যাখ্যান করিলেন; এখানে থাকিয়া আর কি করিবেক, বল। আমি বলি, আমাদের সঙ্গেই আসুক। শার্ঙ্গরব শুনিয়া সরোষ নয়নে মুখ ফিরাইয়া শকুন্তলাকে কহিলেন আঃ দুর্ব্বত্তে! স্বাতন্ত্র অবলম্বন করিতেছ?। শকুন্তলা ভয়ে কাঁপিতে লাগিলেন। তখন শার্ঙ্গরব শকুন্তলাকে কহিলেন দেখ, রাজা যেরূপ কইিতেছেন, যদি তুমি যথার্থই সেইরূপ হও, তাহা হইলে তুমি স্বৈরিণী হইলে; তাত কণ্ব তোমাকে লইয়া আর কি করিবেন। আর যদি তুমি মনে মনে আপনাকে পতিব্রতা বলিয়া জান, তাহা হইলে পতিগৃহে থাকিয়া দাসীবৃত্তি করাও তোমার পক্ষে শ্রেয়ঃ। অতএব, এই খানেই থাক, আমরা চলিলাম; এই বলিয়া প্রস্থান করিলেন। এইরূপে তপস্বীদিগকে প্রস্থানোন্মুখ দেখিয়া, রাজা শার্ঙ্গরবকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন মহাশয়! আপনি উঁহাকে মিথ্যা প্রতারণা করিতেছেন কেন। পুরুবংশীয়েরা জিতেন্দ্রিয়; প্রাণান্তেও পরবনিতা পরিগ্রহে প্রবৃত্ত হয় না। দেখুন, চন্দ্র কুমুদিনীকেই প্রফুল্ল করেন; সূর্য্য কমলিনীকেই উল্লাসিত করিয়া থাকেন। তখন শার্ঙ্গরব কহিলেন মহারাজ! আপনি পরকীয় মহিলা আশঙ্কা করিয়া, অধর্ম্ম ভয়ে, শকুন্তলা পরিগ্রহে পরাঙ্খুখ হইতেছেন; কিন্তু ইহাও অসম্ভাবিত নহে আপনি পূর্ব্ব বৃত্তান্ত বিস্মৃত হইয়াছেন। ইহা শুনিয়া রাজা পার্শ্বোপবিষ্ট পুরোহিতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন,ভাল, মহাশয়কেই ব্যবস্থা জিজ্ঞাসা করি, আপনি পাতকের লাঘব গৌরব বিবেচনা করিয়া উপস্থিত বিষয়ে কি কর্তব্য বলুন। আমিই পূর্ব্ববৃত্তান্ত বিস্মৃত হইয়াছি, অথবা এই স্ত্রীই মিথ্যা বলিতেছেন; এমত সন্দেহ স্থলে, আমি দারত্যাগী হই, অথবা পরস্ত্রীস্পর্শপাতকী হই।
পুরোহিত শুনিয়া কিয়ৎক্ষণ বিবেচনা করিয়া কহিলেন, ভাল, মহারাজ! যদি এরূপ করা যায়। রাজা কহিলেন কি আজ্ঞা করুন। পুরোহিত কহিলেন ঋষিতনয়া প্রসবকাল পর্যন্ত এই স্থানে অবস্থিতি করুন। যদি বলেন এ কথা বলি কেন; সিদ্ধ পুরুষেরা কহিয়াছেন আপনকার প্রথম সন্তান চক্রবর্ত্তিলক্ষণাক্রান্ত হইবেন। যদি মুনিদৌহিত্র সেইৰূপ হন ইঁহাকে গ্রহণ করিবেন। নতুবা ইহার পিতৃসমীপ গমন স্থিরই রহিয়াছে। রাজা কহিলেন যাহা আপনাদিগের অভিরুচি। তখন পুরোহিত শকুন্তলাকে কহিলেন বৎসে! আমার সঙ্গে আইস। শকুন্তলা, পৃথিবি! বিদীর্ণ হও আমি প্রবেশ করি, আর আমি এ প্রাণ রাখিব না, এই বলিয়া রোদন করিতে করিতে পুরোহিতের অনুগামিনী হইলেন।
সকলে প্রস্থান করিলে পর, রাজা নিতান্ত উন্মনাঃ হইয়া শকুন্তলার বিষয়ই অনন্যমনে চিন্তা করিতেছেন; এমত সময়ে “কি আশ্চর্য্য ব্যাপার! কি আশ্চর্য্য ব্যাপার!” এই আকুল বাক্য রাজার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। তখন তিনি, কি হইল! কি হইল! বলিয়া, পা্ররশ্ববর্ত্তিনী প্রতিহারীকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। পুরোহিত, সহসা রাজসমীপে আসিয়া, বিস্ময়োৎফুল্ল লোচনে আকুল বচনে কহিলেন মহারাজ! বড় এক অদ্ভুত কাণ্ড হইয়া গেল। কণ্বশিষ্যেরা প্রস্থান করিলে পর, সেই স্ত্রী অপ্সরাতীর্থের নিকট আপন অদৃষ্টকে ভৎর্সনা করিয়া উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে আরম্ভ করিল; আমনি এক জ্যোতিঃ পদার্থ স্ত্রীবেশে সহসা আবির্ভূত হইয়া তাহাকে লইয়া অন্তর্হিত হইল। রাজা কহিলেন মহাশয়! যে বিষয় প্রত্যাখান করা গিয়াছে সে বিষয়ের অনুসন্ধানে আর প্রয়োজন কি। আপনি আবাসে গমন করুন। পুরোহিত, মহারাজের জয় হউক বলিয়া আশীর্ব্বদ করিয়া, প্রস্থান করিলেন। রাজাও শকুন্তলাবৃত্তান্ত লইয়া অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়াছিলেন অতএব শয়নাগারে গমন করিলেন।
প্রথম অঙ্ক
শকুন্তলা
প্রথম অঙ্ক।
অতি পূর্ব্বকালে এই ভারতবর্ষে মহাবল পরাক্রান্ত দুষ্মন্ত নামে সম্রাট্ ছিলেন। তিনি, কোন সময়ে, বহুতর সৈন্য সামন্ত সমভিব্যাহারে করিয়া, মৃগয়ায় গমন করিয়াছিলেন। এক দিন তিনি, এক হরিণশিশুকে লক্ষ্য করিয়া, শরাসনে শরসন্ধান করিলেন। হরিণশিশু, রাজার অভিসন্ধি বুঝিতে পারিয়া, প্রাণভয়ে অতি দ্রুতবেগে পলাইতে আরম্ভ করিল। রাজা রথারোহণে ছিলেন, সারথিকে আজ্ঞা দিলেন মৃগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ রথ চালন কর। সারথি কশাঘাত করিবামাত্র অশ্বগণ বায়ুবেগে ধাবমান হইল।
কিয়ৎক্ষণে রথ মৃগের সন্নিহিত হইলে, রাজা শর নিক্ষেপের উপক্রম করিতেছেন; এমন সময়ে দূর হইতে দুই তপস্বী উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিলেন মহারাজ! এ আশ্রমমৃগ, বধ করিবেন না, বধ করিবেন না। সারথি শব্দশ্রবণান্তে অবলোকন করিয়া কহিল মহারাজ! দুই তপস্বী এই মৃগের প্রাণবধ করিতে নিষেধ করিতেছেন। রাজা,তপস্বীর নাম শ্রবণমাত্র ব্যস্ত সমস্ত হইয়া, সারথিকে ছিলেন ত্বরায় রশ্মি সংযত করিয়া রথের বেগ সম্বরণ সারথি, যে আজ্ঞা মহারাজ বলিয়া, রশ্মি সংযত করিল।
এই অবকাশে তপস্বীরা রথের সন্নিহিত হইয়া কহিতে লাগিলেন মহারাজ! এ আশ্রমমৃগ, বধ করিবেন না, বধ করিবেন না। আপনকার বাণ অতি তীক্ষ্ণ ও বজ্রসম; এই ক্ষীণজীবী অল্পপ্রাণ মৃগশাবকের উপর নিক্ষেপ করিবার যোগ্য নহে। অতএব শরাসনে যে শর সন্ধান করিয়াছেন আশু তাহার প্রতিসংহার করুন। আপনকার শস্ত্র আর্ত্তের পরিত্রাণের নিমিত্ত,নিরপরাধীকে প্রহর করিবার নিমিত্ত নহে।
রাজা তৎক্ষণাৎ শর প্রতিসংহার করিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া প্রণাম করিলেন। তপস্বীর দীর্ঘায়ুরস্তু বলিয়া হস্ত তুলিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন এবং কহিলেন মহারাজ! আপনি যেমন বংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন আপনকার এই বিনয় ও সৌজন্য তাহার উপযুক্তই বটে। এক্ষণে প্রার্থনা করি আপনকার এক পুত্র হউক; এবং সেই পুত্র এই সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর একাধিপতি হউন। রাজা প্রণাম করিয়া কহিলেন ব্রাহ্মণের আশীর্ব্বাদ গ্রহণ করিলাম। অনন্তর তাপসের কহিলেন মহারাজ! নদীতীরে আমাদিগের গুরু মহর্ষি কণ্বের আশ্রয় যাইতেছে। যদি কার্য্যক্ষতি না হয় তথায় গিয়া আবার সৎকার গ্রহণ করুন। আর তপস্বীরা নির্ব্বিঘ্নে ধর্ম্মকার্য্য সমাধা করিতেছেন দেখিয়া বুঝিতে পারিবেন আপনকার ভুজবলে ভূমণ্ডল কিৰূপ শাসিত হইতেছে; রাজা জিজ্ঞাসিলেন মহর্ষি আশ্রমে আছেন?। তপস্বীরা কহিলেন মহারাজ! এইমাত্র, স্বীয় দুহিতা শকুন্তলার প্রতি অতিথিসৎকারের ভার প্রদান করিয়া, তাহার কোন দুর্দ্দৈব শান্তির নিমিত্ত, সোমতীর্থ প্রস্থান করিলেন। রাজা কহিলেন ভাল তাঁহাকেই দর্শন করিতেছি; তিনিই আমার ভক্তি দেখিয়া মহর্ষিকে জানাইবেন। তখন তাপসেরা, এক্ষণে আমরা চলিলাম, এই বলিয়া প্রস্থান করিলেন।
রাজা সারথিকে কহিলেন সূত। রথ প্রেরণ কর,পুণ্যঃশ্রম দর্শন করিয়া আত্মাকে পবিত্র করিব। সারথি, ভূপতির আদেশ পাইয়া, পুনর্বার রথচালন করিল; রাজা কিয়দ্দুর গমন ও ইতস্ততঃ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন সূত! কেহ কহিয়া দিতেছে না তথাপি তপোবন বলিয়া বোধ হইতেছে। দেখ! কোটরস্থিত শুকের মুখভ্রষ্ট নীবার সকল তরুতলে পতিত রহিয়াছে; তপস্বীরা ইঙ্গুদী ফল ভাঙ্গিয়াছিলেন সেই সকল উপলখণ্ড ভু পতিত আছে; ঐ দেখ! কুশভূমিতে হরিণশিশু নিঃশঙ্ক চিত্তে চরিয়া বেড়াইতেছে; এবং যজ্ঞীয় ধূমসমাগমে নবপল্লব সকল মলিন হইয়া গিয়াছে। সারথি কহিলেন মহারাজ যথার্থ আজ্ঞা করিতেছেন।
রাজা কিঞ্চিৎ গমন করিয়া সারথিকে কহিলেন সূত! আশ্রমের পীড়া হওয়া উচিত নহে; অতএব এই স্থানেই রথ স্থাপন কর, আমি অবতীর্ণ হইতেছি। সারথি রশ্মি সংযত করিল। রাজা রথ হইতে অবতীর্ণ হইলেন এবং স্বীয় শরীরে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন সূত! তপোবনে বিনীত বেশে প্রবেশ করাই কর্ত্তব্য: অতএব শরাসন ও সমুদয় আভরণ রাখ। এই বলিয়া সেই সমস্ত সূতহস্তে সমর্পণ করিলেন; এবং কহিলেন অশ্বদিগের অতিশয় পরিশ্রম হইয়াছে; অতএব, আশ্রম বালীদিগের দর্শন ফরিয়া প্রত্যাগমন করিবার মধ্যে,তাহাদিগকে বিশ্রাম করাও। সারথিকে এই আদেশ দিয়া তপোবনে প্রবেশ করিলেন।
তপোবনে প্রবেশ করিবামাত্র, রাজার দক্ষিণবাহুস্পন্দ হইল। রাজা, তপোবনে পরিণয়সূচক লক্ষণ দেখিয়া, বিস্ময়াপন্ন হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন এই আশ্রমপদ শান্তরসাস্পদ; অথচ আমার দক্ষিণবাহু স্পন্দ হইতেছে; এস্থানে মাদৃশ জনের এতদনুযায়ি ফল লাভের সম্ভাবনা কোথায়। অথবা ভবিতব্যের দ্বার সর্ব্বত্রই হইতে পারে। মনে মনে এই আন্দোলন করিতেছেন, এমত সময়ে “প্রিয়সখি এ দিকে এ দিকে” এই শব্দ রাজার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। রাজা শ্রবণ করিয়া কহিতে লাগিলেন বৃক্ষবাটিকার দক্ষিণাংশে স্ত্রীলোকের সম্বোধন শুনা যাইতেছে। অতএব কি বৃত্তান্ত অনুসন্ধান করিতে হইল।
“এই বলিয়া, কিঞ্চিৎ গমন করিয়া, রাজা দেখিতে পাইলেন তিনটি অল্পবয়স্কা তপস্বিকন্যা অনতিবৃহৎ সেচন কলস কক্ষে লইয়া আলবালে জলসেচন করিতে আসিতেছে। রাজা, তাহাদের রূপের মাধুরী দর্শনে চমৎকৃত হইয়া, কহিতে লাগিলেন ইহারা আশ্রমবাসিনী; ইহারা যেরূপ, এরূপ রূপবতী রমণী আমার অন্তঃপুরে নাই। বুঝিলাম, আজি উদ্যানলতা সৌন্দর্যগুণে বনলতার নিকট পরাজিত হইল। এই বলিয়া তরুচ্ছায়ায় দণ্ডায়মান হইয়া তাহাদিগকে অবলোকন করিতে লাগিলেন।
শকুন্তলা, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা নামী দুই সহচরীর সহিত বৃক্ষবাটিকাতে উপস্থিত হইয়া, আলবালে জলসেচন করিতে আরম্ভ করিলেন। অনসূয়া পরিহাস করিয়া শকুন্তলাকে কহিলেন সখি শকুন্তলে! বোধ করি, তাত কণ্ব তোমা অপেক্ষাও আশ্রমপাদপদিগকে ভাল বাসেন। যেহেতু, তুমি নরমালিকাকুসুমকোমলা; তথাপি তোমাকে আলবালজলসেচনে নিযুক্ত করিয়াছেন। শকুন্তলা, ঈষৎ হাস্য করিয়া, কহিলেন সখি অনসূয়ে! কেবল পিতা আদেশ করিয়াছেন বলিয়াই জলসেচন করিতে আসিয়াছি এমত নহে; আমারও ইহাদিগের উপর সহোদরস্নেহ আছে। প্রিয়ংবদা কহিলেন সখি শকুন্তলে! যে সকল বৃক্ষ গ্রীষ্মকালে কুসুম প্রসব করে তাহাদিগের সেচন সমাপন হইল; এক্ষণে,যাহাদের কুসুমের সময় অতিক্রান্ত হইয়াছে, আইস, তাহাদিগকেও সেচন করি। লাভের অভিসন্ধি না রাখিয়া যে কর্ম্ম করা যায় তাহাতে অধিকতর ধর্ম্ম লাভ হয়।
রাজা,দেখিয়া শুনিয়া প্রীত ও চমৎকৃত হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন এই সেই কণ্বতনয়া শকুন্তলা! হায়! মহর্ষি অতি অবিবেচক, এমন শরীরে বল্কল পরাইয়াছেন। কিন্তু, যেমন প্রফুল্ল কমল শৈবল যোগে অধিক শোভা পায়, যেমন পূর্ণ শশধর কলঙ্ক সম্পর্কে সাতিশয় শোভমান হয়; সেইরূপ, এই, কৃশাঙ্গী বল পরিধান করিয়া যার পর নাই মনোহারিণী হইয়াছে দের আকার স্বভাবসুন্দর তাহাদের কি না কার্য্য করে।
শকুন্তলা, জলসেচন করিতে করিতে সম্মুখে দৃষ্টিপাত করিয়া, সখীদিগকে সম্বোধন করিয়া, কহিলেন সখি’ দেখ দেখ, সমীরণভরে ঐ সহকারতরুর নব পল্লব পরিচালিত হইতেছে; বোধ হইতেছে, যেন সহকারতরু অঙ্গুলিসঙ্কেত দ্বারা আমাকে আহ্বান করিতেছে। অতএব আমি তথায় চলিলাম। এই বলিয়া সেই সহকারতরুতলে গিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। তখন প্রিয়ংবদা পরিহাস করিয়া কহিলেন সখি! ঐ খানেই খানিক থাক। শকুন্তলা জিজ্ঞাসিলেন, কেন?। প্রিয়ংবদা কহিলেন তুমি সমীপবর্ত্তিনী থাকাতে যেন সহকারতরু অতিমুক্তলতার সহিত সমাগত হইল। শকুন্তলা, শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া, কহিলেন সখি! এই নিমিত্তই তোমাকে প্রিয়ংবদা বলে।
রাজা, প্রিয়ংবদার পরিহাস শ্রবণে সাতিশয় পরিতোষ লাভ করিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন প্রিয়ংবদা যথা কহিয়াছে। কেন না, শকুন্তলার অধরে নবপল্লব শোভার আবির্ভাব; বাহুযুগল কোমল বিটপ শোভা ধারণ করিয়াছে; নব যৌবন বিকসিত কুসুম রাশির ন্যায় ব্যাপিয়া রহিয়াছে।
অনসুয়া কহিলেন শকুন্তলে! দেখ দেখ, তুমি যে নববালিকার বনতোষিণী নাম রাখিয়াছ সে স্বয়ংবরা হইয়া সহকারতরুকে আশ্রয় করিয়াছে। শকুন্তলা, শুনিয়া বনতোষিণীর সমীপে গিয়া, সহর্ষ মনে কহিতে লাগিলেন সখি অনসূয়ে! ইহাদের উভয়েরই অতি রমণীয় সময় উপস্থিত; নবমালিকা বিকসিত নব কুসুমে সুশোভিত হইয়াছে, এবং সহকারও ফলভরে অবনত হইয়া রহিয়াছে। উভয়ের এইরূপ কথোপকথন হইতেছে, ইত্যবসরে প্রিয়ংবদা হাস্যমুখে অনসূয়াকে কহিলেন অনসুয়ে! কি নিমিত্ত শকুন্তলা সর্ব্বদাই বনতোষিণীকে উৎসুক নয়নে নিরীক্ষণ করে,জান?। অনসূয়া কহিলেন না সখি! জানিনা,কি বল দেখি। প্রিয়ংবদা কহিলেন এই মনে করিয়া, যে মন বনতোষিণী স্বানুরূপ সহকারের সহিত সমাগতা হইয়াছে, আমিও যেন তেমনি আপন অনুরূপ বর পাই। শকুন্তলা কহিলেন ইটি তোমার আপনার মনের কথা।
শকুন্তলা, এই বলিয়া অনতিদূরবর্ত্তনী মাধবীলতার সমীপবর্ত্তিনী হইয়া, হৃষ্ট মনে প্রিয়ংবদাকে কহিলেন সখি! তোমাকে এক প্রিয় সংবাদ দি; মাধবীলতা .. অবধি অগ্রপর্যন্ত, মুকুল নির্গত হইয়াছে। প্রিয়ংবদা কহিলেন সখি! আমিও তোমাকে এক প্রিয় সংবাদ দি, তোমার বিবাহ নিকট হইয়াছে। শকুন্তলা, শুনিয়া কিঞ্চিৎ কৃত্রিম কোপ প্রকাশ করিয়া, কহিলেন এ তোমার মনগড়া কথা; আমি তোমার কথা শুনিতে চাহি না! প্রিয়ংবদা কহিলেন সখি! আমি পরিহাস করিতেছি না। তাত কণ্বের প্রমুখাৎ শুনিয়াছি, মাধবীলতার এই যে মুকুল নির্গম এ তোমারই শুভসূচক। উভয়ের এইরূপ কথোপকথন শ্রবণ করিয়া, অনসূয়া হাসিতে হাসিতে কহিলেন প্রিয়ংবদে! এই নিমিত্তই শকুন্তলা মাধবী লতাকে সাদর মনে সেচন ও সস্নেহ নয়নে নিরীক্ষণ করে। শকুন্তলা কহিলেন সে জন্যে ত নয়, মাধবীলতা আমার ভগিনী হয়, এই নিমিত্ত উহাকে সাদর মনে সেচন ও সস্নেহ নয়নে নিরীক্ষণ করি।
এই বলিয়া, শকুন্তলা মাধবীলতায় জলসেচন আরম্ভ করিলেন। এক মধুকর মাধবীলতার অভিনব মুকুলে মধুপান করিতেছিল; জলসেক করিবামাত্র, মাধবীলতা পরিত্যাগ করিয়া, বিকসিত কুসুম ভ্রমে, শকুন্তলার প্রফুল্ল মুখ কমলে উপবিষ্ট হইবার উপক্রম করিল। শকুন্তলা, কয় পল্লব সঞ্চালন দ্বারা, নিবারণ করিতে লাগিলেন। দুবৃর্ত্ত মধুকর তথাপি নিবৃত্ত হইল না, গুন গুন করিয়া অধর মাপে পরিভ্রমণ করিতে লাগিল। তখন শকুন্তলা, ..কান্ত অধীরা হইয়া, কহিতে লাগিলেন সখি! পরিত্রাণ কর; দুর্বৃত্ত মধুকর আমাকে নিতান্ত ব্যাকুল করিয়াছে। তখন উভয়ে হাসিতে হাসিতে কহিলেন সখি! আমাদের পরিত্রাণ করিবার ক্ষমতা কি; দুষ্মন্তকে স্মরণ কর; রাজারাই তপোবনের রক্ষণাবেক্ষণ করিয়া থাকেন। ইতিমধ্যে ভ্রমর অত্যন্ত উৎপীড়ন আরম্ভ করাতে, শকুন্তলা কহিলেন দেখ, এই দুর্ব্বৃও কোন মতে নিবৃত্ত হইতেছে না; অতএব আমি এখান হইতে যাই। এই বলিয়া দুই চারি পদ গমন করিয়া কহিলেন কি আপদ! এখানেও আবার আমার সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছে। সখি! পরিত্রাণ কর। তখন তাঁহারা পুনর্ব্বার কহিলেন প্রিয় সখি! আমাদের প্ররিত্রাণের ক্ষমতা কি; দুস্মন্তকে স্মরণ কর; তিনি তোমার পরিত্রাণ করিবেন।
রাজা শুনিয়া মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন ইহাদিগের সম্মুখে উপস্থিত হইবার এই বিলক্ষণ সুযোগ ঘটিয়াছে। কিন্তু আমি রাজা বলিয়া পরিচয় দিতে ইচ্ছা হইতেছে না। কি করি। অথবা অতিথিবেশে উপস্থিত হইয়া অভয় প্রদান করি। এই স্থির করিয়া,সত্ত্বর গমনে তাঁহাদের সম্মুখবর্ত্তী হইয়া, কহিতে লাগিলেন। বংশোদ্ভব রাজা; দুষ্মন্ত দুর্ব্বত্তদিগের শাসনকর্ত্তা বিদ্যমান থাকিতে, কোন দুরাত্মা মুগ্ধস্বভাবা তপস্বিকন্যাদিগের সহিত অশিষ্ট ব্যবহার করিতেছে।
তপস্বিকন্যার, এক অপরিচিত যুব ব্যক্তিকে সহসা সম্মুখে উপস্থিত দেখিয়া, প্রথমতঃ কিছু ব্যস্ত সমস্ত হইলেন। কিঞ্চিৎ পরেই, অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা) কহিলেন, না, মহাশয়! এমন কিছু অনিষ্ট ঘটনা হয় নাই। তবে কি জানেন,আমাদিগের প্রিয়সখীকে এক দুষ্ট মধুকর অতিশয় আকুল করিয়াছিল। তাহাতেই কিছু কাতর হইয়াছিলেন। রাজা,ঈষৎ হাস্য করিয়া,শকুন্তলাকে জিজ্ঞাসিলেন কেমন, তপস্য বৃদ্ধি হইতেছে। শকুন্তলা সসাঞ্ছসা ও নম্ৰমুখী হইয়া রহিলেন কিছুই উত্তর দিতে পারিলেন না;; অনসূয়া, শকুন্তলাকে উত্তর দামে পরাঙ্মুখী দেখিয়া, রাজাকে কহিলেন। মহাশয়। তপস্যার বৃদ্ধি হইতেছে; এক্ষণে অতিথিবিশেষ লাভ দ্বারা বিশেষ বৃদ্ধি হইল। প্রিয়ংবদা শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কছিলেন সখি! যাও যাও কুটীর হইতে অর্ঘপাত্র লইয়া আইস; আর এই ঘটে যে জল আছে তা হাতেই পাদ প্রক্ষালন সম্পন্ন হইবেক। রাজা কহিলেন, না না,এত ব্যস্ত হইতে হইবেক না; মধুর সম্ভাষণ দ্বারাই আতিথ্য করা হইয়াছে। তখন অনসূয়া কহিলেন মহাশয়! এই সুশীতল সপ্তপর্ণবেদীতে উপবেশন করিয়। শ্রান্তি দূর করুন। রাজা কহিলেন তোমরাও জলসেচন দ্বারা অতিশয় শ্রান্ত হইয়াছ, মুহূর্ত্ত বিশ্রাম কর। প্রিয়ংবদা কহিলেন সখি শকুন্তলে! অতিথির অভ্যর্থন। রক্ষা করা কর্ত্তব্য; আইস আমরাও বসি। অনন্তর সকলেই উপবেশন করিলেন।
এইৰূপে সকলে উপবিষ্ট হইলে, শকুন্তলা মনে মনে কহিতে লাগিলেন, কেন এই অপরিচিত ব্যক্তিকে নয়নগোচর করিয়া আমার মনে তপোবনবিরুদ্ধ বিকার উপস্থিত হইতেছে; এই বলিয়া, তাঁহার নাম, ধাম, জাতি, ব্যবসায়াদির বিষয় জানিবার নিমিত্ত নিতান্ত উৎসুক হইলেন। রাজ তাপসকন্যাদিগের প্রতি দুষ্টিপাত করিয়া কহিলেন তোমাদিগের সমান বয়স, সমান ৰূপ; সেই নিমিত্ত তোমাদিগের সৌহৃদ্য অতি রমণীর হইয়াছে। প্রিয়ংবদা রাজার অগোচরে অনসূয়াকে কহিলেন সখি! এ ব্যক্তি কে; কেমন চতুর, গম্ভীরাকৃতি ও প্রভাবশালী; মধুর আলাপ দ্বারা চিরপরিচিত সুহৃদের ন্যায় প্রতীতি জন্মাইতেছেন। অনসূয়া কহিলেন সখি! আমার ও এ বিষয়ে কৌতূহল উপস্থিত হইয়াছে। ভাল, জিজ্ঞাসা করিতেছি। এই বলিয়া রাজাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন মহাশয়! আপনকার মধুরালাপ শ্রবণে সাহসী হইয়া জিজ্ঞাসিতেছি আপনি কোন্ রাজর্ষিবংশ অলঙ্কৃত করিয়া আছেন? কোন্ দেশকে আপনার বিরহে কাতর করিতেছেন? কি নিমিত্তই বা এরূপ সুকুমার হইয়াও তপোবনদর্শনপরিশ্রম স্বীকার করিয়াছেন? শকুন্তলা, শুনিয়া মনকে প্রবোধ দিয়া, কহিলেন হে হৃদয়! এত উতলা হও কেন? তুমি যাহা ভাবিতেছিলে অনসূয়া তাহাই জিজ্ঞাসা করিতেছে।
রাজা শুনিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন কি রূপে আত্মপরিচয় প্রদান করি, কি রূপেই বা আত্মগোপন করি। এই বলিয়া কিঞ্চিৎ ভাবিয়া কহিলেন ঋষিতনয়ে! আমি রাজা দুষ্মন্তের ধর্ম্মাধিকারে নিযুক্ত; পুণ্যাশ্রম দর্শনপ্রসঙ্গে এই ধর্ম্মারণ্যে উপস্থিত হইয়াছি। অনসূয়া কহিলেন অদ্য তপস্বীদিগের বড় সৌভাগ্য; মহাশয়ের সমাগমে অদ্য তাঁহারা পরম পরিতোষ লাভ করিবেন। এইরূপ কথোপকথন চলিতে লাগিল। কিন্তু পরস্পর সন্দর্শনে, রাজা ও শকুন্তলা উভয়েরই মন চঞ্চল হইল এবং উভয়েরই আকারে ও ইঙ্গিতে সেই চিত্তচাঞ্চল্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতে লাগিল। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা,উভয়ের মন বুঝিতে পারিয়া,রাজার অগোচরে শকুন্তলাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন প্রিয়সখি! যদি আজি তাত কণ্ব আশ্রমে থাকিতেন তাহা হইলে জীবিতসর্ব্বস্ব দিয়াও এই অতিথিকে কৃতার্থ করিতেন। শকুন্তলা, শুনিয়া কিঞ্চিৎ কৃত্রিম কোপ প্রকাশ করিয়া, কহিলেন তোমরা কিছু মনে করিয়া এই কথা বলিতেছ; আমি তোমাদের কথা শুনিব না।
রাজা, শকুন্তলার বৃত্তান্ত সবিশেষ অবগত হইবার নিমিত্ত একান্ত কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া, সখীদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন আমি তোমাদিগের সখীর বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করিতে বাঞ্ছা করি। তাঁহারা কহিলেন মহাশয়! আপনকার এ অভ্যর্থনা অনুগ্রহবিশেষ; আপনি অসস্কুচিত চিত্তে জিজ্ঞাসা করুন। রাজা কহিলেন মহর্ষি কণ্ব জন্মাবচ্ছিন্নে দারপরিগ্রহ করেন নাই। তিনি কৌমারব্রহ্মচারী, নিয়ত ধর্ম্ম চিন্তায় ও ব্রহ্মোপাসনায় একান্ত রত! অথচ তোমাদের সখী তাঁহার কন্যা, ইহা কি রূপে সম্ভবে, বুঝিতে পারিতেছি না।
রাজার এইরূপ অভ্যর্থনা শুনিয়া অনসূয়া কহিলেন মহাশয়! শ্রবণ করুন; শুনিয়া থাকিবেন বিশ্বামিত্র নামে এক অতিপ্রভাবশালী রাজর্ষি ছিলেন। তিনি কোন সময়ে গোমতীতীরে অতিকঠোর তপস্যা আরম্ভ করেন। দেবতারা, তদ্দর্শনে সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া, রাজর্ষির সমাধি ভঙ্গ করিবার নিমিত্ত মেনকানাম্নী অপ্সরাকে পাঠাইয়া দেন। মেনকা তদীয় আশ্রমে উপস্থিত হইয়া মায়াজাল বিস্তার করিলে, রাজর্ষির সমাধিভঙ্গ হইল। বিশ্বামিত্র ও মেনকা আমাদের সখীর জনক জননী। পরে নির্দ্দয়া মেনকা সদ্যঃ প্রসূতা তনয়াকে অরণ্যে পরিত্যাগ করিয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল। আমাদের সখী সেই বিজন বনে অনাথা পড়িয়া রহিলেন। এক পক্ষী, কোন অনির্ব্বচনীয় কারণে স্নেহরসপরবশ হইয়া, পক্ষপুট দ্বারা আচ্ছাদন করিয়া, রক্ষণাবেক্ষণ করিতে লাগিল। দৈবযোগে, তাত কণ্ব পর্যটন ক্রমে সেই সময়ে সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। সদ্যপ্রসূতা কন্যাকে তদবস্থ পতিত দেখিয়া তাঁহার অন্তঃকরণে কারুণ্য রসের আবির্ভাব হইল। তিনি, তৎক্ষণাৎ আশ্রমে আনয়ন করিয়া, স্বীয় তনয়ার ন্যায় পালন করিতে আরম্ভ করিলেন এবং, প্রথমে এক শকুন্ত অর্থাৎ পক্ষী লালন করিয়াছিল, এই নিমিত্ত নাম শকুন্তলা রাখিলেন।
রাজা শকুন্তলার জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া কহিলেন সম্ভব বটে; নতুবা মানুষীতে এরূপ অলৌকিক রূপ লাবণ্য হওয়া অসম্ভব। ভূতল হইতে জ্যোতির্ম্ময় বিদ্যুতের উৎপত্তি হয় না। শকুন্তলা লজ্জায় নম্রমুখী হইয়া রহিলেন। প্রিয়ংবদা, হাস্যমুখে শকুন্তলার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া, রাজাকে সম্বোধিয়া কহিলেন মহাশয়ের আকার ইঙ্গিত দর্শনে বোধ হইতেছে যেন আর কিছু জিজ্ঞাসা করিবেন। শকুন্তলা, রাজার অগোচরে, প্রিয়ংবদাকে ভঙ্গি ও অঙ্গুলি দ্বারা তর্জ্জন করিতে লাগিলেন। রাজা কহিলেন তুমি বিলক্ষণ অনুভব করিয়াছ; তোমাদের সখীর বিষয়ে আমার আরো কিছু জিজ্ঞাস্য আছে। প্রিয়ংবদা কহিলেন এত বিচার করিতেছেন কেন অসঙ্কুচিত চিত্তে জিজ্ঞাসা করুন। রাজা কহিলেন আমার জিজ্ঞাস্য এই, তোমাদের সখী, যাবৎ বিবাহ না হইতেছে তাবৎ পর্য্যন্তমাত্র, তাপসব্রতসেবা করিবেন, অথবা যাবজ্জীবন হরিণীদিগের সহবাসে কালযাপন করিবেন। প্রিয়ংবদা কহিলেন তাত কণ্ব সঙ্কল্প করিয়া রাখিয়াছেন অনুরূপ পাত্র না পাইলে শকুন্তলার বিবাহ দিবেন না। শুনিয়া,সাতিশয় হর্ষিত হইয়া,মনে মনে কহিতে লাগিলেন আমার শকুন্তলালাভ নিতান্ত অসম্ভব নহে। হৃদয়! আশ্বাসিত হও, এক্ষণে সন্দেহ নির্ণয় হইয়াছে; যাহাকে অগ্নি আশঙ্কা করিতেছিলে তাহা স্পর্শশীতল রত্ন হইল।
শকুন্তলা, কৃত্রিম কোপ প্রদর্শন করিয়া, কহিলেন অনসুয়ে! আমি চলিলাম, আর আমি এখানে থাকিব না। অনসূয়া কহিলেন সখি কি নিমিত্তে? শকুন্তলা বলিলেন দেখ, প্রিয়ংবদা মুখে যাহা আসিতেছে তাহাই কহিতেছে; আমি যাইয়া আর্য্যা-গোতমীকে কহিয়া দিব। অনসূয়া কহিলেন সখি! অভ্যাগত মহাশয়ের এ পর্য্যন্ত অতিথি সৎকার করা হয় নাই; ইহাঁকে পরিত্যাগ করিয়া তোমার চলিয়া যাওয়া উচিত নহে। শকুন্তলা কিছু না বলিয়া চলিয়া যাইতে লাগিলেন। তখন প্রিয়ংবদা শকুন্তলাকে আট্কাইয়া কহিলেন সখি! তুমি যাইতে পাইবে না। আমার দুই কলসী জল ধার; আগে শোধ দাও, তবে যাইতে দিব। এই বলিয়া শকুন্তলাকে বলপূর্ব্বক নিবারণ করিলেন। রাজা কহিলেন হে তাপসকন্যে! তোমার সখী বৃক্ষসেচন দ্বারা অতিমাত্র ক্লান্ত হইয়াছেন, আর উহাকে,পল্বল হইতে জল আনাইয়া,অধিকতর ক্লান্ত করা অনুচিত। আমি তোমার সখীকে ঋণমুক্ত করিতেছি। এই বলিয়া, অঙ্গুলি হইতে অঙ্গুরীয় উন্মোচন করিয়া, জল কলসের মূল্যস্বরূপ প্রিয়ংবদার হস্তে অর্পণ করিলেন।
অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা, অঙ্গুরীয়মুদ্রিত নামাক্ষর পাঠ করিয়া বিস্ময়াপন্ন হইয়া, ‘পরস্পর মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। অঙ্গুরীয়ে যে দুষ্মন্ত নাম মুদ্রিত ছিল প্রদান কালে রাজার তাহা স্মরণ ছিল না। এক্ষণে আত্মপ্রকাশ সম্ভাবনা দেখিয়া সাবধান হইয়া,কহিলেন যে মুদ্রিত নাম দেখিয়া তোমরা অন্যথা ভাবিও না। আমি রাজপুরুষ,রাজা আমাকে, প্রসাদচিহু স্বরূপ, এই স্বনামাঙ্কিত অঙ্গুরীয় প্রদান করিয়াছেন। প্রিয়ংবদা রাজার ছল বুঝিতে পারিলেন এবং কহিলেন মহাশয়! তবে এই অঙ্গুরীয় অঙ্গুলিবিযুক্ত করা কর্ত্তব্য নহে; আপনকার কথাতেই ইনি ঋণমুক্তা হইলেন। পরে ঈষৎ হাসিয়া শকুন্তলার দিকে চাহিয়া কহিলেন সখি শকুন্তলে! এই মহাশয়, অথবা মহারাজ, তোমাকে মুক্ত করিলেন এক্ষণে ইচ্ছা হয় যাও। শকুন্তলা মনে মনে কহিতে লাগিলেন এ ব্যক্তিকে পরিত্যাগ করিয়া যাওয়া আর আমার সাধ্য নহে। অনন্তর প্রিয়ংবদাকে কহিলেন আমি যাই না যাই তোমার কি।
রাজা, শকুন্তলার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন আমি ইহার প্রতি যেরূপ এ আমার প্রতি সেরূপ কি না, বুঝিতে পারিতেছি না। অথরা, আর সন্দেহের বিষয় কি; যেহেতু, আমার সহিত কথা কহিতেছে না বটে, কিন্তু আমি কথা কহিতে আরম্ভ করিলে, অনন্যচিত্তা হইয়া স্থিরকর্ণে শ্রবণ করে; আর নয়নে নয়নে সঙ্গতি হইলে, তৎক্ষণাৎ মুখ ফিরাইয়া লয় বটে, অন্য দিকেও অধিক ক্ষণ চাহিয়া থাকে না। অন্তঃকরণে অনুরাগ সঞ্চার না হইলে এরূপ ভাব হয় না।
রাজার ও তাপসকন্যাদিগের এইরূপ আলাপ হইতেছে, এমত সময়ে সহসা অনতিদূরে কোলাহল হইতে লাগিল এবং কেহ কহিতে লাগিল হে তপস্বিগণ! মৃগয়াবিহারী রাজা দুষ্মন্ত, সৈন্য সামন্ত সমভিব্যাহারে করিয়া, তপোবনসমীপে উপস্থিত হইয়াছেন; তোমরা তপোবনস্থ প্রাণিসমূহের রক্ষার্থে সত্বর ও যত্নবান্ হও। বিশেষতঃ, এক আরণ্য গজ, রাজার রথ দর্শনে শঙ্কিত হইয়া,তপস্যার মূর্ত্তিমান্ বিঘ্ন স্বরূপ, ধর্ম্মারণ্যে প্রবেশ করিতেছে।
তাপসকন্যারা শুনিয়া সাতিশয় ব্যাকুল হইলেন। রাজা শুনিয়া বিরক্ত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন কি আপদ! আমার অনুযায়ী লোকেরা, আমার অন্বেষণে আসিয়া, তপোবনের পীড়া জন্মাইতেছে। যাহা হউক, এক্ষণে ত্বরায় গিয়া নিবারণ করিতে হইল। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা কহিলেন মহাশয়! আরণ্য গজের কথা শুনিয়া আমরা যৎপরোনাস্তি ব্যাকুল হইয়াছি; অনুমতি করুন কুটীরে যাই। রাজা ব্যস্তসমস্ত হইয়া কহিলেন তোমরা কুটীরে যাও; আমিও তপোবনপীড়াপরিহারের চেষ্টা পাই। অনসূয়া ও প্রিয়ংবদা প্রস্থান কালে কহিলেন মহাশয়! যেন পুনরায় আমরা আপনকার দর্শন পাই; আপনকার সমুচিত অতিথিসৎকার করা হয় নাই এ জন্য আমরা অত্যন্ত লজ্জিত হইতেছি। রাজা, কহিলেন না, তোমাদের দর্শনেই আমার যথেষ্ট সৎকার লাভ হইয়াছে।
অনন্তর সকলে প্রস্থান করিলেন। শকুন্তলা, দুই চারি পদ গমন করিয়া, ছল ক্রমে কহিলেন অনসূয়ে! কুশাগ্র দ্বারা আমার পদতল ক্ষত হইল, আমি চলিতে পারি না। আর আমার বল্কল কুরুবকশাখায় লাগিয়া গেল, কিঞ্চিৎ অপেক্ষা কর ছাড়াইয়া লই। এই বলিয়া, বল্কল মোচনচ্ছলে বিলম্ব করিয়া, সতৃষ্ণ নয়নে রাজাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। রাজাও মনে মনে কহিতে লাগিলেন শকুন্তলাকে দেখিয়া আর আমার নগর গমনে তাদৃশ অনুরাগ নাই। অতএব তপোবনের অনতিদূরে শিবির সন্নিবেশন করি। আমি আমার মনকে কোন মতেই শকুন্তলা হইতে নিবৃত্ত করিতে পারিতেছি না।
ষষ্ঠ অঙ্ক
ষষ্ঠ অঙ্ক
নদীতে স্নান করিবার সময় রাজদত্ত অঙ্গুরীয় শকুন্তলার অঞ্চল হইতে সলিলে ভ্রষ্ট হইয়াছিল। ভ্রষ্ট হইবামাত্র এক অতি বৃহৎ রোহিত মৎস্য গ্রাস করিয়া ফেলে। সেই মৎস্য কয়েক দিবস পরে এক ধীবরের জালে পতিত হয়। ধীবর, খণ্ড খণ্ড বিক্রয় করিবার মানসে ঐ মৎস্যকে নানা খণ্ডে বিভক্ত করিয়া, তদীয় উদর মধ্যে অঙ্গুরীয় প্রাপ্ত হইল। অঙ্গুরীয় পাইয়া, পরম উল্লাসিত মনে, এক মণিকারের আপণে বিক্রয় করিতে গেল। মণিকার, সেই মণিময় অঙ্গুরীয় রাজনামাঙ্কিত দেখিয়া, ধীবরকে চোর নিশ্চয় করিয়া নগরপালকে সংবাদ দিল। নগরপাল আসিয়া ধীবরকে পিছমোড়া করিয়া বাধিল এবং জিজ্ঞাসিল অরে বেটা চোর। তুই এই অঙ্গুরীয় কোথায় পাইলি, বল। ধীবর, কহিল মহাশয়! আমি চোর নহি। তখন নগরপাল কহিল তুই বেটা যদি চোর নহিস্, এ অঙ্গুরীয় কেমন করিয়া পাইলি। যদি চুরি করিস্ নাই,রাজা কি সুব্রাহ্মণ দেখিয়া তোকে দান করিয়াছেন।
এই বলিয়া নগরপাল চৌকীদারকে হুকুম দিলে, চৌকীদার তাহাকে প্রহার করিতে আরম্ভ করিল। ধীবর কহিল অরে চৌকীদার! আমি চোর নহি, আমাকে মার কেন। আমি কেমন করিয়া এই আঙ্গটী পাইলাম বলিতেছি। এই বলিয়া কহিল আমি ধীবরজাতি, মাছ ধরিয়া বিক্রয় করিয়া জীবিকা নির্ব্বাহ করি। নগরপাল শুনিয়া কোপাবিষ্ট হইয়া কহিল মর বেটা, আমি তোর জাতি কুল জিজ্ঞাসিতেছি না কি। এই অঙ্গুরীয় কেমন করিয়া তোর হাতে আসিল, বল। ধীবর কহিল আজি সকালে আমি শচীতীর্থে জাল ফেলিয়াছিলাম। একটা বড় রুই মাছ আমার জালে পড়ে। খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিয়া দেখিলাম তাহার উদর মধ্যে এই আঙ্গটী ছিল। তার পর এই দোকানে আসিয়া দেখাইতেছি এমত সময়ে আপনি আসিয়া আমাকে ধরিলেন। আমি আর কিছুই জানি না আমাকে মারিতে হয় মারুন, কাটিতে হয় কাটুন; আমি চুরী করি নাই।
নগরপাল শুনিয়া আঘ্রাণ লইয়া দেখিল অঙ্গরীয়ে আমিষ গন্ধ নির্গত হইতেছে। তখন সে সন্দিহান হইয়া, চৌকীদারকে কহিল তুই এ বেটাকে এই খানে সাবধানে বসাইয়া রাখ। আমি রাজবাটীতে গিয়া এই সকল বৃত্তান্ত রাজার গোচর করি। রাজা সকল শুনিয়া যেমন অনুমতি করেন। এই বলিয়া নগরপাল অঙ্গুরীয় লইয়া রাজভবনে গমন করিল। কিয়ৎক্ষণ পরে প্রত্যাগত হইয়। চৌকীদারকে কহিল অরে! ত্বরায় ধীবরের বন্ধন খুলিয়া দে। এ চোর নয়। অঙ্গুরীয় প্রাপ্তি বিষয়ে যাহা কহিয়াছে তাহার কিছুই মিথ্য নহে। আর রাজা উহাকে অঙ্গুরীয়মূল্যের অনুৰূপ এই মহামুল্য পুরস্কার দিয়াছেন। এই বলিয়া পুরস্কার দিয়া ধীবরকে বিদায় করিল এবং চৌকীদারকে সঙ্গে লইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল।
এ দিকে, অঙ্গুরীয় হন্তে পতিত হইবামাত্র, শকুন্তলাবৃত্তান্ত আদ্যোপাস্তু রাজার স্মৃতিপথে আৰূঢ় হইল। তখন তিনি, নিতান্ত কাতর হইয়া, যৎপরোনাস্তি বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন; এবং শকুন্তলার পুনর্দ্দর্শন বিষয়ে একান্ত হতাশ্বাস হইয়া সর্ব্ব বিষয়ে নিতান্ত নিরুৎসাহ হইলেন। আহার, বিহার ও রাজকার্য্যপর্য্যালোচনা একবারেই পরিত্যক্ত হইল। শকুন্তলার চিন্তায় একান্ত মগ্ন হইয়া সর্ব্বদাই ম্লানবদনে কাল যাপন করেন। কাহারও সহিত বাক্যালাপ করেন না। . কাহাকেও নিকটে আসিতে দেন না। কেবল প্রিয়বয়স্য মাধব্য সর্ব্বদ সমীপে উপবিষ্ট থাকেন। তিনি সান্তনা বাক্যে প্রবোধ দিতে আরম্ভ করিলে, তাঁহার শোকসাগর উথলিয়া উঠিত; নয়নযুগল হইতে অনবরত বাষ্পবারি বিগলিত হইতে থাকিত।
এক দিবস, রাজার চিত্তবিনোদনার্থে মাধব্য তাঁহাকে প্রমদবনে লইয়া গেলেন। উভয়ে সুশীতল শিলাতলে উপবিষ্ট হইলে, মাধব্য জিজ্ঞাসা করিলেন ভাল বয়স্য। যদি তুমি তপোবনে যথার্থই শকুন্তলার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলে, তবে তিনি উপস্থিত হইলে প্রত্যাখ্যান করিলে কেন। রাজা শুনিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন বয়স্য! ও কথা আর কেন জিজ্ঞাস কর। আমি রাজধানী প্রত্যাগমন করিয়া শকুন্তলাবৃত্তান্ত একবারে বিস্মৃত হইয়াছিলাম। কেন বিস্মৃত হইলাম কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। সে দিবস প্রিয়া কত প্রকারে বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন; কিন্তু আমার কেমন মতিচ্ছন্ন ঘটিয়াছিল কিছুই স্মরণ হইল না। তাঁহাকে স্বেচ্ছাচারিণী মনে করিয়া, কতই দুর্ব্বাক্য কছিয়াছি,কতই অপমান করিয়াছি। এই বলিতে বলিতে নয়নযুগল অশ্রুজলে পরিপূর্ণ হইয়া আসিল; বাকশক্তিরহিতের ন্যায় হইয়া কিয়ৎ ক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। অনন্তর মাধব্যকে কহিলেন ভাল, আমিই যেন বিস্মৃত হইয়াছিলাম, তোমাকে ত সমুদায় কহিয়াছিলাম; তুমি কেন কথা প্রসঙ্গে কোন দিন শকুন্তলার কথা উত্থাপন কর নাই। তুমিও কি আমার মত বিস্মৃত হইয়াছিলে।
তখন মাধব্য কহিলেন বয়স্য! আমার দোষ নাই; তুমি সমুদায় কহিয়া পরিশেষে কহিয়াছিলে শকুন্তলা সংক্রান্ত যে সকল কথা কহিলাম সমস্তই পরিহাসমাত্র, বাস্তবিক নহে। আমিও নিতান্ত নির্ব্বোধ, তোমার শেষ কথাই সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছিলাম। এই নিমিত্ত আর সে কথা উত্থাপন করি নাই। প্রত্যাখ্যান দিবসে আমি তোমার নিকটে ছিলাম না। থাকিলেও বরং, যাহা শুনিয়াছিলাম, বলিতাম। রাজা, দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া, বাষ্পাকুল লোচনে গদগদ বচনে কহিলেন বয়স্য! কার দোষ দিব, সকলই আমার অদৃষ্টের দোষ। এই বলিয়া অত্যন্ত শোকাকুল হইলেন। তখন মাধব্য কহিলেন বয়স্য! এৰূপ শোকে অভিভূত হওয়া তোমার উচিত নহে। দেখ, সৎপুরুষেরা শোক মোহের বশীভূত হয়েন না। প্রাকৃত জনেরাই শোক মোহে বিচেতন হইয়া থাকে। যদি উভয়েই বাযুভরে বিচলিত হয় তবে বৃক্ষে ও পর্ব্বতে বিশেষ কি! তুমি অতি গম্ভীরস্বভাব; ধৈর্য্য অবলম্বন করিয়া শোকাবেগ সংবরণ কর।
প্রিয়বয়স্যের প্রবোধ বাক্য শ্রবণ করিয়া রাজা কহিলেন সখে আমি নিতান্ত অবোধ নহি; কিন্তু আমার মন কোন ক্রমেই প্রবোধ মানে না। কি বলিয়াই বা প্রবোধ দিব। প্রত্যাখ্যানের পর, প্রিয়া প্রস্থান কালে, সাতিশয় কাতরতা প্রদর্শন পূর্বক, আমার দিকে যে বারংবার বাস্পপূর্ণ দৃষ্টিপাত করিয়াছিলেন, সেই কাতর দৃষ্টিপাত আমার হৃদয়ে বিষলিপ্ত শল্যের ন্যায় বিদ্ধ হইয়। আছে। আমি সেই সময়ে তাহার প্রতি যে ক্রুরের ব্যবহার করিয়াছি তাহা মনে করিয়া আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে। মরিলেও আমার এ দুঃখ বিমোচন হইবেক না।
মাধব্য রাজাকে নিতান্ত কাতর দেখিয়া আশ্বাস প্রদানর্থ কহিলেন বয়স্য! অত কাতর হইও না; কিছু দিন পরে পুনর্ব্বার শকুন্তলার সহিত সমাগম হইবেক। রাজা কহিলেন বয়স্য! আমি এক মুহুর্তের নিমিত্তেও সে আশা করি না! আর আমি প্রিয়ার দর্শন পাইব না। এ জন্মের মত আমার সকল মুখ ফুরাইয়া গিয়াছে। নতুবা, তৎকালে আমার তেমন দুর্ব্বুদ্ধি ঘটিল কেন। মাধব্য কহিলেন বয়স্থ্য! কোন বিষয়েই এত নিরাশ হওয়া উচিত নয়। ভবিতব্যের কথা কে বলতে পারে। দেখ, এই অঙ্গুরীয় যে পুনরায় তোমার হন্তে আসিবে,কাহার মনে ছিল। ইহা শুনিয়া অঙ্গুরীয়ে দৃষ্টিপাত করিয়া রাজা উহাকে সচেতন বোধে সম্বোধন করিয়। কহিলেন অঙ্গুরীয়! তুমিও আমার মতো হতভাগা,নতুবা কি নিমিত্ত, প্রিয়ার অঙ্গুলীতে স্থান পাইয়া, পুনর্ব্বার সেই দুর্ল্ভ স্থান হইতে ভ্রষ্ট হইলে। মাধব্য কহিলেন বয়স্য! তুমি কি উপলক্ষে তাহার অঙ্গুলীতে অঙ্গুরীয় পরাইয়া দিয়াছিল। রাজা কহিলেন রাজধানী প্রতিগমন কালে, প্রিয়া অশ্রুপূর্ণ নয়নে আমার হস্ত ধরিয়া কহিলেন আর্য্যপুত্র! কতদিনে আমাকে নিকটে লইয়া যাইবে। তখন আমি এই অঙ্গুরীয় তাহার কোমল অঙ্গলীতে পরাইয়া দিয়া কহিলাম প্রিয়ে! তুমি প্রতি দিন আমার নামের এক একটী অক্ষর গণিবে গণনা সমাপ্ত না হইতে হইতেই আমার লোক আসিয়া তোমাকে লইয়া যাইবে। প্রিয়ার নিকট সরল হৃদয়ে এই প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছিলাম। কিন্তু মোহান্ধ হইয়া একবারেই বিস্মৃত হইয়া যাই।
তখন মাধব্য কহিলেন ভাল বয়স্য! এ অঙ্গুরীয় কেমন করিয়া রোহিত মৎস্যর উদরে প্রবিষ্ট হইল। রাজা কহিলেন শুনিয়াছি শুচীতীর্থে স্নান করিবার সময় প্রিয়ার অঞ্চলপ্রান্ত হইতে সলিলে ভ্রষ্ট হইয়াছিল। মাধব্য কহিলেন হাঁ সম্ভব বটে; সলিলে মগ্ন হইলে রোহিত মৎস্যে গ্রাস করিয়াছিল। রাজা অঙ্গুরীয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া কহিলেন আমি এই অঙ্গুরীয়কে যথোচিত তিরস্কার করিব। এই বলিয়া কহিলেন অরে অঙ্গুরীয়! প্রিয়ার কোমল করপল্লব পরিত্যাগ করিয়া জলে মগ্ন হইয়া তোমার কি লাভ হইল বল। অথবা তোমাকে তিরস্কার করা অন্যায়; কারণ অচেতন ব্যক্তি কখন গুণ গ্রহণ করিতে পারে না। নতুবা আমিই কি নিমিত্ত প্রিয়াকে পরিত্যাগ করিলাম। এই বলিয়া অশ্রুপূর্ণ নয়নে শকুন্তলাকে উদ্দেশ করিয়া কহিতে লাগিলেন প্রিয়ে! আমি তোমাকে অকারণে পরিত্যাগ করিয়াছি। অনুতাপানলে আমার হৃদয় দগ্ধ হইয়া যাইতেছে। দর্শন দিয়া প্রাণ রক্ষা কর।
রাজা শোকাকুল হইয়া এইরূপ বিলাপ করিতেছেন এমত সময়ে চতুরিকা নাম্নী এক পরিচারিকা এক চিত্রফলক আনয়ন করিল। রাজা চিত্তবিনোদনার্থে ঐ চিত্রফলকে শকুন্তলার প্রতিমূর্ত্তি চিত্রিত করিয়াছিলেন। মাধব্য দেখিয়া বিস্ময়োৎফুল্ল লোচনে কহিলেন বয়স্য! তুমি চিত্রফলকে কি অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়াছ। দেখিয়া কোন ক্রমেই চিত্র বোধ হইতেছে না। আহা মরি, কি রূপ লাবণ্যের মাধুরী! কি অঙ্গসৌষ্ঠব! কি অমায়িক ভাব! মুখারবিন্দে কি সলজ্জ ভাব প্রকাশ পাইতেছে! রাজা কহিলেন সখে! তুমি প্রিয়াকে দেখ নাই এই নিমিত্ত আমার চিত্রনৈপুণ্যের এত প্রশংসা করিতেছ। যদি তাঁহাকে দেখিতে, চিত্র দেখিয়া কখনই সন্তুষ্ট হইতে না। তাঁহার অলৌকিক রূপ লাবণ্যের কিঞ্চিৎ অংশ মাত্র এই চিত্রফলকে আবিভূত হইয়াছে। এই বলিয়া পরিচারিকাকে কহিলেন চতুরিকে! বর্ত্তিকা ও বর্ণপাত্র লইয়া আইস। অনেক অংশ চিত্রিত করিতে অবশিষ্ট আছে।
এই বলিয়া চতুরিকাকে বিদায় করিয়া রাজা মাধব্যকে কহিলেন সখে! আমি স্বাদু শীতল নির্ম্মল জলপূর্ণ নদী পরিত্যাগ করিয়া এক্ষণে শুষ্ককণ্ঠ হইয়া মৃগতৃষ্ণিকায় পিপাসা শান্তি করিতে উদ্যত হইয়াছি। প্রিয়াকে সাক্ষাৎ পাইয়া পরিত্যাগ করিয়া, এক্ষণে চিত্রদৰ্শন দ্বারা চিত্ত বিনোদনের চেষ্টা পাইতেছি। মাধব্য কহিলেন বয়স্য! চিত্রফলকে আর কি লিখিবে?। রাজা কহিলেন বয়স্য! তপোবন ও মালিনী নদী লিখিব; যেরূপে হরিণ গণকে তপোবনে সচ্ছন্দে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে এবং হংস গণকে মালিনীতে জলক্রীড়া করিতে দেখিয়াছিলাম সে সমুদায়ও চিত্রিত করিব; এবং প্রথম দর্শন দিবসে প্রিয়ার কর্ণে শিরীষ পুষ্পের যেরূপ আভরণ দেখিয়াছিলাম তাহাও লিখিব।
এইরূপ কথোপকথন হইতেছে এমত সময়ে প্রতীহারী আসিয়া রাজহস্তে এক পত্র সমৰ্পণ করিল। রাজা পাঠ করিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন। তখন মাধব্য জিজ্ঞাসা করিলেন বয়স্য! কোথাকার পত্র, পত্র পাঠ করিয়া বিষন্ন হইলে কেন?। রাজা কহিলেন বয়স্য! ধনমিত্র নামে এক বণিক্ সমুদ্র পথে বাণিজ্য করিত। সমুদ্রে নৌকা মগ্ন হইয়া তাহার প্রাণ ত্যাগ হইয়াছে। সে ব্যক্তি নিঃসন্তান। নিঃসন্তানের ধনে রাজার অধিকার। এই নিমিত্ত অমাত্য আমাকে তাহার সমুদায় সম্পত্তি আত্মসাৎ করিতে লিখিয়াছেন। দেখ, বয়স্য! নিঃসন্তান হওয়া কত দুঃখের বিষয়। বংশ লোপ হইল, নাম লোপ হইল, বহু কালে বহু কষ্টে উপার্জ্জিত ধন অন্যের হস্তে গেল। ইহা অপেক্ষা আক্ষেপের বিষয় আর কি হইতে পারে। এই বলিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া কহিলেন আমার লোকান্তর হইলে আমারও বংশ, নাম ও রাজ্যের এই গতি হইবেক।
রাজার এইরূপ আক্ষেপ শুনিয়া মাধব্য কহিলেন বয়স্য! তুমি অকারণে এত পরিতাপ কর কেন। তোমার সন্তানের বয়স্ অতীত হয় নাই। কিছু দিন পরে তুমি অবশ্যই পুত্রমুখ নিরীক্ষণ করিবে। রাজা কহিলেন বয়স্য! তুমি আমাকে মিথ্যা প্রবোধ দাও কেন। উপস্থিত পরিত্যাগ করিয়া অনুপস্থিত প্রত্যাশা করা মূঢ়ের কর্ম্ম। আমি যখন নিতান্ত বিচেতন হইয়া প্রিয়াকে পরিত্যাগ করিয়াছি তখন আর আমার পুত্রমুখ নিরীক্ষণের আশা নাই।
এইরূপে কিয়ৎ ক্ষণ বিলাপ করিয়া রাজা, অপুত্রতানিবন্ধন শোক সংবরণ পূর্ব্বক, প্রতীহারীকে কহিলেন, শুনিয়াছি, ধনমিত্রের অনেক ভার্য্যা আছে তন্মধ্যে কেহ অন্তঃসত্ত্বা আছেন কি না, অমাত্যকে এ বিষয়ের অনুসন্ধান করিতে বল। প্রতীহারী কহিল মহারাজ! অযোধ্যানিবাসী শ্রেষ্ঠীর কন্যা ধনমিত্রের এক ভার্য্যা। শুনিয়াছি শ্রেষ্ঠিকন্যা অন্তঃসত্ত্বা হইয়াছেন। তথন রাজা কহিলেন তবে অমাত্যকে বল, সেই গর্ভস্থ সন্তান ধনমিত্রের সমস্ত ধনের উত্তরাধিকারী হইবেক।
এই আদেশ দিয়া প্রতীহারীকে বিদায় করিয়া রাজা মাধব্যের সহিত পুনর্ব্বার শকুন্তলাসংক্রান্ত কথোপকথন আরম্ভ করিতেছেন এমত সময়ে ইন্দ্রসারথি মাতলি দেবরথ লইয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। রাজা দেখিয়া আহলাদিত হইয়া মাতলিকে স্বাগত জিজ্ঞাসা করিয়া আসন পরিগ্রহ করিতে বলিলেন। মাতলি আসন পরিগ্রহ করিয়া কহিলেন মহারাজ! দেবরাজ যদর্থে আমাকে আপনকার নিকটে পাঠাইয়াছেন নিবেদন করি শ্রবণ করুন্। কালনেমির সন্তান দুর্জয় নামে কতক গুলি দানব দেবতাদিগের বিষম শত্রু হইয়া উঠিয়াছে। কতিপয় দিবসের নিমিত্ত আপনাকে দেবলোকে গিয়া দুর্জ্জয় দানব দলের দমন করিতে হইবেক। রাজা কহিলেন দেবরাজের এই আদেশে বিশেষ অনুগৃহীত হইলাম। পরে মাধব্যকে কহিলেন বয়স্য! অমাত্যকে বল, আমি কিয়দ্দিনের নিমিত্ত দেবকার্য্যে ব্যাপৃত হইলাম; তিনিই একাকী সমস্ত রাজকার্য্য পর্য্যালোচনা করুন। এই বলিয়া সসজ্জ হইয়া ইন্দ্ররথে আরোহণ পূর্ব্বক দেবলোক প্রস্থান করিলেন।
সপ্তম অঙ্ক
সপ্তম অঙ্ক।
রাজা দানব জয় কার্য্যে ব্যাপৃত হইয়া দেবলোকে কিছু দিন অবস্থিতি করিলেন। দেবকার্য্য সমাধানান্তে মর্ত্যলোকে প্রত্যাগমন কালে মাতলিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন দেখ, দেবরাজ আমার যে গুরুতর সৎকার করেন আমি আপনাকে সেই সৎকারের নিতান্ত অনুপযুক্ত জ্ঞান করিয়া মনে মনে অত্যন্ত লজ্জিত হই। মাতলি কহিলেন মহারাজ! ও অপরিতোষ উভয় পক্ষেই সমান। আপনি দেবতাদিগের যে উপকার করেন দেবরাজকৃত সৎকারকে তদপেক্ষা গুরুতর জ্ঞান করিয়া লজ্জিত হন। দেবরাজও স্বকৃত সৎকারকে মহারাজকৃত উপকারের নিতান্ত অনুপযুক্ত বিবেচনা করিয়া সাতিশয় সঙ্কুচিত হন।
ইহা শুনিয়া রাজা কহিলেন দেবরাজসারথে! এমন কথা বলবেন না; বিদায় দিবার সময় দেবরাজ যে সৎকার করিয়া থাকেন তাহা মনোরথেরও অগোচর। দেখুন সমাগত সর্ব্ব দেব সমক্ষে অৰ্দ্ধাসনে উপবেশন করাইয়া স্বহস্তে আমার গলদেশে মন্দারমালা সমর্পণ করেন। মাতলি কহিলেন মহারাজ! আপনি সময়ে সময়ে দানব জয় করিয়া দেবরাজের যে মহোপকার করেন দেবরাজকৃত সৎকারকে আমি তদপেক্ষা অধিক বোধ করি না। বিবেচনা করিতে গেলে আজি কালি মহারাজের ভুজবলেই দেবলোক নিরুপদ্রব হইয়াছে। রাজা কহিলেন আমি যে অনায়াসে দেবরাজের আদেশ সম্পন্ন করিতে পারি সে দেবরাজেরই মহিমা। নিযুক্তেরা প্রভুর প্রভাবেই মহৎ মহৎ কর্ম্ম সকল সমাধান করিয়া উঠে। যদি সূর্যদেব আপন রথের অগ্র ভাগে না রাখিতেন তাহা হইলে অরুণ কি অন্ধকার দূর করিতে পারিতেন। তখন মাতলি অত্যন্ত প্রীত হইয়া কহিলেন মহারাজ! বিনয় সদগুণের শোভা সম্পাদন করে এই কথা আপনাতেই বিলক্ষণ বর্ত্তিয়াছে।
এইরূপে কথোপকথনে আসক্ত হইয়া কিয়দ্দূর আগমন করিয়া রাজা মাতলিকে জিজ্ঞাসা করিলেন দেবরাজসারখে! ঐ যে পূর্ব্ব পশ্চিমে বিস্তৃত পর্ব্বত স্বর্ণনির্ম্মিতের ন্যায় প্রতীয়মান হইতেছে, ও পর্ব্বতের নাম কি?। মাতলি কহিলেন মহারাজ! ও হেমকূট পর্ব্বত; কিন্নর ও অপ্সরাদিগের বাসভূমি, তপস্বীদিগের তপস্যা সিদ্ধির সর্ব্বপ্রধান স্থান। ভগবান্ কশ্যপ এই পর্ব্বতে তপস্যা করেন। তখন রাজা কহিলেন তবে আমি ভগবান্কে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া যাইব। এতাদৃশ মহাত্মার নাম শ্রবণ করিয়া, বিনা প্রণাম প্রদক্ষিণ, চলিয়া যাওয়া অবিধেয়। অতএব তুমি রথ স্থির কর; আমি এই স্থানেই অবতীর্ণ হইতেছি।
মাতলি রথ স্থির করিলেন। রাজা রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন দেবরাজসারথে! এই পর্ব্বতের কোন্ অংশে ভগবানের আশ্রম। মাতলি কহিলেন মহারাজ! মহর্ষির আশ্রম অতিদূরবর্ত্তী নহে; চলুন, আমি সমভিব্যাহারে যাইতেছি। কিয়দ্দুর গমন করিয়া, এক ঋষিকুমারকে সমাগত দেখিয়া, মাতলি জিজ্ঞাসা করিলেন ভগবান্ কশ্যপ এক্ষণে কি করিতেছেন?। ঋষিকুমার কহিলেন তিনি এক্ষণে নিজপত্নী অদিতিকেও অন্যান্য ঋষিপত্নীদিগকে পতিব্রতাধর্ম্ম শ্রবণ করাইতেছেন। তখন রাজা কহিলেন তবে আমি এখন তাহার নিকটে যাইব না। মাতলি কহিলেন মহারাজ! আপনি, এই অশোক বৃক্ষ মূলে অবস্থিত হইয়া, কিয়ৎক্ষণ অপেক্ষা করুন। আমি মহর্ষির নিকট আপনকার আগমন সংবাদ নিবেদন করি। এই বলিয়া মাতলি প্রস্থান করিলেন।
রাজার দক্ষিণ বাহু স্পন্দ হইতে লাগিল। তখন তিনি নিজ হস্তকে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন হে হন্ত! আমি যখন নিতান্ত বিচেতন হইয়া প্রিয়াকে পরিত্যাগ করিয়াছি, তখন আর আমার অভীষ্টলাভের প্রত্যাশা নাই। তবে তুমি কি নিমিত্ত বৃথা স্পন্দিত হইতেছ?। মনে মনে এই আক্ষেপ করিতেছেন। এমত সময়ে, “বৎস! এত দুর্বৃত্ত হও কেন” এই শব্দ রাজার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। রাজা শ্রবণ করিয়া মনে মনে এই বিতর্ক করিতে লাগিলেন এ অবিনয়ের স্থান নহে; এই অরণ্যে যাবতীয় জীব জন্তু, স্থান মাহাত্মে হিংসা, দ্বেষ, মদ, মাৎসর্য প্রভৃতি পরিত্যাগ করিয়া, পরস্পর পরম সৌহার্দ্দে কাল যাপন করে; কেহ কাহারো প্রতি অত্যাচার বা অনুচিত ব্যবহার করে না। এমন স্থানে কে দুর্ব্বত্ততা করিতেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান করিতে হইল।
এই রূপ কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া, শব্দানুসারে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া দেখিলেন এক অতি অল্প বয়স্ক শিশু সিংহশিশুর কেশর আকর্ষণ করিয়া অত্যন্ত উৎপীড়ন করিতেছে এবং দুই তাপসী সমীপে দণ্ডায়মান আছেন। দেখিয়া চমৎকৃত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন তপোবনের কি অনির্ব্বচনীয় মহিমা! মানবশিশু সিংহশিশুর উপর বল প্রকাশ করিতেছে। সিংহশিশুও অবিকৃত চিত্তে সেই বল প্রকাশ সহ্য করিতেছে। অনস্তর, কিঞ্চিৎ নিকটবর্ত্তী হইয়া, সেই শিশুকে নিরীক্ষণ করিয়া, স্নেহরসপরিপূর্ণ চিত্তে কহিতে লাগিলেন আপন ঔরস পুত্রকে দেখিলে মন যেরূপ স্নেহরসে আর্দ্র হয়, এই শিশুকে দেখিয়া আমার মন সেইরূপ হইতেছে কেন?। অথবা, আমি পুত্রহীন বলিয়াই, এই সৰ্বাঙ্গসুন্দর শিশুকে দেখিয়া, আমার মনে এরূপ প্রগাঢ় স্নেহরসের আবির্ভাব হইতেছে।
এ দিকে, সেই শিশু সিংহশাবকের উপর অত্যন্ত উৎপীড়ন আরম্ভ করাতে, তাপসীরা কহিতে লাগিলেন বৎস! এই সকল জন্তুকে আমরা আপন, সন্তানের ন্যায় স্নেহ করি; তুমি কেন অকারণে উহাকে ক্লেশ দাও। আমাদের কথা শুন, ক্ষান্ত হও, সিংহশিশুকে ছাড়িয়া দাও; ও আপন জননীর নিকটে যাউক। আর যদি তুমি উহাকে ছাড়িয়া না দাও, সিংহী তোমাকে-জব্দ করিবেক। বালক শুনিয়া, কিঞ্চিম্মাত্রও ভীত না হইয়া, সিংহশাবকের উপর পূর্ব্বাপেক্ষায় অধিকতর উপদ্রব আরম্ভ করিল। তাপসীরা ভয় প্রদর্শন দ্বারা তাহাকে ক্ষান্ত করা অসাধ্য বুঝিয়া, প্রলোভনার্থে কহিলেন বৎস! যদি তুমি সিংহশিশুকে ছাড়িয়া দাও,তোমাকে একটা ভাল খেলানা দি।
রাজা, এই কৌতুক দেখিতে দেখিতে, ক্রমে ক্রমে অগ্রসর হইয়া তাহাদের অতি নিকটে উপস্থিত হইলেন; কিন্তু সহসা তাহাদের সম্মুখে না আসিয়া, এক বৃক্ষের অন্তরালে থাকিয়া, সস্নেহনয়নে সেই শিশুকে অবলোেকন করিতে লাগিলেন। এই সময়ে সেই বালক, কোই কি খেলানা দিবে দাও বলিয়া, হস্ত প্রসারণ করিল। রাজা, বালকের হস্তে দৃষ্টিপাত করিয়া, চমৎকৃত হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন কি আশ্চর্য! এই বালকের হস্তে চক্রবর্ত্তিলক্ষণ লক্ষিত হইতেছে। তাপসীদিগের সঙ্গে কোন খেলানা ছিল না; সুতরাং তাঁহারা তৎক্ষণাৎ দিতে না পারাতে, বালক কুপিত হইয়া কহিল তোমরা খেলানা না দিলে, আমি ইহাকে ছাড়িয়া দিব না। তখন এক তাপসী অপর তাপসীকে কহিলেন সখি! ও কথায় ভুলাবার ছেলে নয়। কুটীরে মাটীর মযুর আছে ত্বরায় লইয়া আইস। তাপসী মৃন্ময় ময়ূরের আনয়নার্থ কুটীরে গমন করিলেন।
প্রথমে সেই শিশুকে দেখিয়া রাজার অন্তঃকরণে যে স্নেহের সঞ্চার হইয়াছিল, ক্রমে ক্রমে সেই স্নেহ গাঢ়তর হইতে লাগিল। তখন তিনি মনে মনে কহিতে লাগিলেন কেন, এই অপরিচিত শিশুকে ক্রোড়ে করিবার নিমিত্ত, আমার মন এত উৎসুক হইতেছে!। পরের পুত্র দেখিলে মনে এত মেহোদয় হয় আমি পূর্ব্বে জানিতাম না। আহা! যাহার এই পুত্র, সে ইহাকে ক্রোড়ে লইয়া যখন ইহার মুখ চুম্বন করে, হাস্য করিলে যখন ইহার মুখ মধ্যে অর্দ্ধবিনির্গত দন্ত গুলি অবলোকন করে, যখন ইহার মৃদু মধুর আধ আধ কথা গুলি শ্রবণ করে তখন সেই পুণ্যবান্ ব্যক্তি কি অনির্ব্বচনীয় প্রীতি প্রাপ্ত হয়!। আমি অতি হতভাগ্য! সংসারে আসিয়া এই পরম সুখে বঞ্চিত রহিলাম। পুত্রকে ক্রোড়ে লইয়া, তাহার মুখ চুম্বন করিয়া, সর্ব্ব শরীর শীতল করিব; পুত্রের অর্দ্ধবিনির্গত দন্ত গুলি অবলোকন করিয়া, নয়নযুগলের সার্থকতা সম্পাদন করিব, অথবা অর্দ্ধোচ্চারিত মৃদু মধুর বচন পরস্পরা শ্রবণে শ্রবণেন্দ্রিয়ের চরিতার্থতা লাভ করিব; এ জন্মের মত আমার সে আশালতা নির্ম্মূল হইয়া গিয়াছে।
ময়ূরের আনয়নে বিলম্ব দেখিয়া, কুপিত হইয়া বালক কহিল এখনও ময়ূর দিলে না; তবে আমি ইহাকে ছাড়িব না; এই বলিয়া সিংহশিশুকে অত্যন্ত বলপূর্ব্বক আকর্ষণ করিতে লাগিল। তাপসী চেষ্টা পাইলেন কিন্তু তাহার হস্ত হইতে সিংহশাবক ছাড়াইতে পারিলেন না। তখন বিরক্ত হইয়া কহিলেন এমন সময়ে এখানে কোন ঋষিকুমার নাই যে ছাড়াইয়া দেয়। এই বলিয়া, পার্শ্বে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবা মাত্র, রাজাকে দেখিতে পাইয়া কহিলেন মহাশয়! আপনি অনুগ্রহ করিয়া সিংহশিশুকে এই বালকের হস্ত হইতে মুক্ত করিয়া দেন। রাজা তৎক্ষণাৎ নিকটে আসিয়া, সেই বালককে ঋষিপুত্র বোধে সম্বোধন করিয়া, কহিলেন অহে ঋষিকুমার! তুমি কেন তপোবনের বিরুদ্ধ আচরণ করিতেছ। তখন তাপসী কহিলেন মহাশয়! আপনি জানেন না, এ ঋষিকুমার নয়। রাজা কহিলেন বালকের আকার প্রকার দেখিয়াই বোধ হইতেছে ঋষিকুমার নয়। কিন্তু এ স্থানে ঋষিকুমার ব্যতীত অন্যবিধ বালকের সমাগম সম্ভাবনা নাই, এই জন্য আমি এরূপ বোধ করিয়াছিলাম।
এই বলিয়া রাজা সেই বালকের হস্তগ্রহ হইতে সিংহশিশুকে মুক্ত করিয়া দিলেন; এবং, স্পর্শসুখ অনুভব করিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন পরের পুত্রের গাত্রস্পর্শ করিয়া আমার এরূপ সুখানুভব হইতেছে; যাহার পুত্র, সে ব্যক্তি ইহার গাত্র স্পর্শ করিয়া কি অনুপম সুখানুভব করে তাহা বলা যায় না!।
বালক অত্যন্ত দুরন্ত হইয়াও রাজার নিকট অত্যন্ত শান্তস্বভাব হইল ইহা দেখিয়া, এবং উভয়ের আকারগত সৌসাদৃশ্য দর্শন করিয়া, তাপসী বিস্ময়াপন্ন হইলেন। রাজা, সেই বালককে ক্ষত্রিয়সন্তান নিশ্চয় করিয়া, জিজ্ঞাসিলেন এই বালক যদি ঋষিকুমার না হয়, কোন ক্ষত্রিয় বংশে জন্মিয়াছে, জানিতে ইচ্ছা করি। তাপসী কহিলেন মহাশয়! এ পুরুবংশীয়। রাজা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন আমি যে বংশে জন্মিয়াছি ইহারও সেই বংশে জন্ম। পুরুবংশীয়দিগের এই রীতি বটে; তাঁহারা, প্রথমতঃ অশেষ সাংসারিক সুখভোগে কাল যাপন করিয়া, পরিশেষে সস্ত্রীক হইয়া অরণ্যবাস আশ্রয় করেন।
অনন্তর তাপসীকে জিজ্ঞাসিলেন এ দেবভূমি; মানুষে ইচ্ছা করিলেই এ স্থানে আসিতে পারে না। অতএব এ বালক কি সংযোগে এখানে আসিল?। তাপসী কহিলেন ইহার জননী অপ্সরা সম্বন্ধে এখানে আসিয়া এই সন্তান প্রসব করিয়াছেন। রাজা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন পুরুবংশ ও অপ্সরাসম্বন্ধ এই দুই কথা শুনিয়া, আমার হৃদয়ে পুনর্ব্বার আশার সঞ্চার হইতেছে। যাহা হউক, ইহার পিতার নাম জিজ্ঞাসা করি, তাহা হইলেই সন্দেহ ভঞ্জন হইবেক।
এই বলিয়া তাপসীকে পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসিলেন আপনি জানেন এই বালক পুরুবংশীয় কোন রাজার পুত্র। তখন তাপসী কহিলেন মহাশয়! কে সেই ধর্ম্মপত্নীপরিত্যাগী পাপাত্মার নাম কীর্ত্তন করিবেক। রাজা শুনিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন এই কথা আমাকেই লক্ষ্য করিতেছে। ভাল, ইহার জননীর নাম জিজ্ঞাসা করি তাহা হইলেই এক কালে সকল সন্দেহ দূর হইবেক। অথবা, পরস্ত্রী বিষয়ে এত অনুসন্ধান করা অবিধেয়। আর, আমি যখন মোহান্ধ হইয়া স্বহস্তে আশালতার মূলচ্ছেদন করিয়াছি, তখন সে আশালতাকে বৃথা পুনরুজ্জীবিত করিবার চেষ্টা করিয়া, পরিশেষে কেবল সমধিক ক্ষোভ পাইতে হইবেক। অতএব ও কথায় আর কাজ নাই।
রাজা মনে মনে এই আন্দোলন করিতেছেন,এমতসময়ে অপরা তাপসী কুটীর হইতে মৃণ্ময় মযূর আনয়ন করিলেন এবং বালককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন বৎস! কেমন শকুন্তলাবণ্য দেখ। এই বাক্যে শকুন্তলা শব্দ শ্রবণ করিয়া, বালক কহিল কোই আমার মা কোথায়?। তখন তাপসী কহিলেন না বৎস! তোমার মা এখানে আইসেন নাই। আমি তোমাকে পক্ষীর লাবণ্য দেখিতে কহিয়াছি। এই বলিয়া রাজাকে কহিলেন মহাশয়! এই বালক জন্মবধি জননী ভিন্ন আপনার আর কাহাকেও দেখে নাই; নিয়ত জননীর নিকটেই থাকে; এই নিমিত্ত অত্যন্ত মাতৃ বৎসল। শকুন্তলাবণ্য শব্দে জননীর নামাক্ষর শ্রবণ করিয়া উহার জননীকে মনে পড়িয়াছে। উহার জননীর নাম শকুন্তলা।
সমুদায় শ্রবণ করিয়া রাজা মনে মনে কহিতে লাগিলেন ইহার জননীরও নাম শকুন্তলা। কি আশ্চর্য! উত্তরোত্তর সকল কথাই আমার বিষয়ে খাটিতেছে। এই সকল শুনিয়া আমার আশাই বা না জন্মিবে কেন। অথবা, আমি মৃগতৃষ্ণিকায় ভ্রান্ত হইয়া নামসাদৃশ্য শ্রবণে মনে মনে বৃথা আন্দোলন করিতেছি। এরূপ নামসাদৃশ্য শত শত ঘটিতে পারে।
শকুন্তলা অনেক ক্ষণ অবধি পুত্রকে দেখেন নাই, এই নিমিত্ত সাতিশয় উৎকণ্ঠিতা হইয়া, অন্বেষণ করিতে করিতে সহসা সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। রাজা, বিরহকৃশা মলিনবেশা শকুন্তলাকে সহসা সেই স্থানে উপস্থিত দেখিয়া, বিস্ময়াপন্ন হইয়া এক দৃষ্টিতে তাঁহার দিকে চাহিয়া রহিলেন; নয়নযুগল জলধারা বহিতে লাগিল। বাকৃশক্তিরহিত হইয়া দণ্ডায়মান রহিলেন; একটীও কথা কহিতে পারিলেন না। শকুন্তলাও অকস্মাৎ রাজাকে দেখিয়া, স্বপ্নদর্শনবৎ বোধ করিয়া, স্থির নয়নে তাঁহার দিকে চাহিয়া রহিলেন; নয়নযুগল বাষ্পবারিতে পরিপূর্ণ হইয়া আসিল। বালক, শকুন্তলাকে দেখিবামাত্র, মা মা করিয়া তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইল; এবং জিজ্ঞাসিল মা! ও কে, ওকে দেখিয়া তুই কাঁদিস্ কেন। তখন শকুন্তলা গদগদ বচনে কহিলেন বাছা! ও কথা আমাকে জিজ্ঞাসা কর কেন; আপন অদৃষ্টকে জিজ্ঞাসা কর।
কিয়ৎক্ষণ পরে রাজা মনের আবেগ সংবরণ করিয়া শকুন্তলাকে কহিলেন প্রিয়ে! আমি তোমার প্রতি যে অসদ্ব্যবহার করিয়াছি তাহা বলিবার নয়। তৎকালে আমার মতিচ্ছন্ন ঘটিয়াছিল তাহাতেই অবমাননা করিয়া বিদায় করিয়াছিলাম। কয়েক দিবস পরেই আমার সকল বৃত্তান্ত স্মরণ হইয়াছিল। তদবধি আমি কি অসুখে কাল যাপন করিয়াছি তাহা আমার অন্তরাত্মাই জানেন। আমি পুনর্ব্বার তোমার দর্শন পাইব আমার সে আশা ছিল না। আজি আমার কি সৌভাগ্যের দিবস বলিতে পারি। এক্ষণে তুমি প্রত্যাখ্যানদুঃখ পরিত্যাগ করিয়া আমার অপরাধ মার্জনা কর।
এই বলিয়া উম্মূলিত তরুর ন্যায় ভূতলে পতিত হইলেন। তদ্দর্শনে শকুন্তলা অন্তে ব্যন্তে রাজার হস্তে ধরিয়া কহিলেন আর্যপুত্র! উঠ, উঠ। তোমার দোষ কি; আমার অদৃষ্টের দোষ। এত দিনের পরে দুঃখিনীকে যে স্মরণ করিয়াছ তাহাতেই আমার সকল দুঃখ দূর হইল। এই বলিয়া শকুন্তলার চক্ষে ধারা বহিতে লাগিল। রাজা গাত্রোত্থান করিয়া বাষ্পপূর্ণ নয়নে কহিতে লাগিলেন প্রিয়ে! প্রত্যাখ্যান কালে তোমার নয়নযুগল হইতে যে জলধারা বিগলিত হইয়াছিল,তাহা উপেক্ষা করিয়াছিলাম; পরে সেই দুঃখে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া গিয়াছিল। এক্ষণে তোমার চক্ষের জলধারা মুছিয়া দিয়া সকল দুঃখ দূর করি। এই বলিয়া স্বহস্তে শকুন্তলার চক্ষের জল মুছিয়া দিলেন। শকুন্তলার শোকসাগর আরো উথলিয়া উঠিল; দ্বিগুণ প্রবাহে নয়নে বারিধারা বহিতে লাগিল।
অনন্তর, দুঃখাবেগ নিবারণ করিয়া, শকুন্তলা রাজাকে কহিলেন আর্য্যপুত্র! তুমি যে এই দুঃখিনীকে পুনর্ব্বার স্মরণ করিবে সে প্রত্যাশা ছিল না। অতএব কি রূপে আমি পুনরায় তোমার স্মৃতিপথে পতিত হইলাম ভাবিয়া স্থির করিতে পারিতেছি না। তখন রাজা কহিলেন প্রিয়ে! তৎকালে তুমি আমাকে যে অঙ্গুরীয় দেখাইতে পার নাই, কয়েক দিবস পরে উহা আমার হস্তে পড়িলে, আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত আমার স্মৃতিপথে আরূঢ় হয়। এই সেই অঙ্গুরীয়। এই বলিয়া, স্বীয় অঙ্গুলিস্থিত সেই অঙ্গুরীয় দেখাইয়া,পুনর্ব্বার শকুন্তলার অঙ্গুলীতে পরাইয়া দিবার চেষ্টা করিলেন। তখন শকুন্তলা কহিলেন আর্য্যপুত্র! আর আমার ও অঙ্গুরীয়ে কাজ নাই। ওই আমার সর্বনাশ করিয়াছিল। ও তোমার অঙ্গুলীতেই থাকুক। আর আমার উহাকে ধারণ করতে সাহস হয় না।
উভয়ের এই রূপ কথোপকথন হইতেছে, ইত্যবসরে মাতলি আসিয়া প্রফুল্ল বদনে কহিলেন মহারাজ! এত দিনের পর আপনি যে ধর্মপত্নী সহিত সমাগত হইলেন, ইহাতে আমরা কি পর্যন্ত আহলাদিত হইয়াছি বলিতে পারি না। ভগবান্ কশ্যপও শুনিয়া সাতিশয় প্রীত হইয়াছেন। এক্ষণে গিয়া ভগবানের সহিত সাক্ষাৎ করুন; তিনি আপনার প্রতীক্ষা করিতেছেন। তখন রাজা শকুন্তলাকে কহিলেন প্রিয়ে! চল, আজি উভয়ে এক সমভিব্যাহারে ভগবানের চরণ দর্শন করিব। শকুন্তলা কহিলেন আর্য্যপুত্র! ক্ষমা কর, আমি তোমার সঙ্গে গুরুজনের নিকট যাইতে পারিব না। তখন রাজা কহিলেন প্রিয়ে! শুভ সময়ে এক সমভিব্যাহারে, গুরুজনের নিকটে যাওয়া দূষ্য নহে। চল, বিলম্ব করিয়া কাজ নাই।
এই বলিয়া রাজা, শকুন্তলাকে সঙ্গে লইয়া, মাতলি সমভিব্যাহারে কশ্যপের নিকট উপস্থিত হইলেন; দেখিলেন ভগবান্ অদিতির সহিত একাসনে বসিয়া আছেন। তখন সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে সম্মুখে সস্ত্রীক দণ্ডায়মান রহিলেন। কশ্যপ ও অদিতি, “বৎস! চিরজীবী হইয়া অপ্রতিহত প্রভাবে অখণ্ড ভূমণ্ডলে একাধিপত্য কশ্ন” এই বলিয়া আশীর্ব্ব দ করিলেন। শকুন্তলাও স্বয়ং প্রণাম করিলেন এবং পুত্রটীকেও প্রণাম করাইলেন। কশ্যপ কহিলেন বৎসে! তোমার স্বামী ইন্দ্রসদৃশ, পুত্র জয়ন্তসদৃশ; তোমাকে অন্য আর কি আশীর্ব্বাদ করিব; তুমি শচীসদৃশী হও। অনন্তর কশ্যপ ও অদিতি সকলকে উপবেশন করিতে কহিলেন।
সকলে উপবিষ্ট হইলে, রাজা কৃতাঞ্জলি হইয়া বিনয় বচনে নিবেদন করিলেন ভগবন্! শকুন্তলা আপনকার সগোত্র মহর্ষি কণ্বের পালিত তনয়া। আমি মৃগয়াপ্রসঙ্গে মহর্ষির তপোৰনে উপস্থিত হইয়া, গান্ধর্ব্ব বিধানে ইহার পাণিগ্রহণ করিয়াছিলাম। পরে ইনি যৎকালে রাজধানীতে উপস্থিত হন, তখন আমার এরূপ স্মৃতিভ্রংশ হইয়াছিল যে ইহাকে চিলিতে পারিলাম না। চিনিতে না পারিয়া প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলাম। ইহাতে আমি মহাশয়ের ও মহর্ষি কণ্বের নিকট অত্যন্ত অপরাধী হইয়াছি। কৃপা করিয়া আমার সেই অপরাধ মার্জ্জনা করিতে হইবেক এবং যাহাতে মহর্ষি কণ্ব আমার এই অপরাধ মার্জ্জনা করেন তাহারও উপায় করিতে হইবেক। কশ্যপ শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন বৎস! সে জন্য তুমি কুণ্ঠিত হইও না। এ বিষয়ে তোমার অণুমাত্রও অপরাধ নাই। যে কারণে তোমার স্মৃতিভ্রংশ হইয়াছিল, তুমি ও শকুন্তলা উভয়েই অবগত নহ। এই নিমিত্ত আমি তোমাদিগকে সেই স্মৃতিভ্রংশের প্রকৃত হেতু কহিতেছি। শুনিলে শকুন্তলার হৃদয় হইতে প্রত্যাখ্যাননিবন্ধন সকল ক্ষোভ দূর হইবেক। এই বলিয়া শকুন্তলাকে কহিলেন বৎসে! রাজা তপোবন হইতে প্রত্যাগমন করিলে পর, এক দিন তুমি পতিচিন্তায় মগ্ন হইয়া কুটীরে উপবিষ্ট ছিলে। সেই সময়ে দুর্ব্বাসা আসিয়া অতিথি হন। তুমি এককালে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া ছিলে সুতরাং তাঁহার সৎকার বা সংবর্দ্ধনা করা হয় নাই। তিনি, তাহাতে সাতিশয় কুপিত হইয়া, তোমাকে এই শাপ দিয়া চলিয়া যান যে তুমি যাঁহার চিন্তায় মগ্ন হইয়া অতিথির অবমাননা করিলে সে কখনই তোমাক স্মরণ করিবে না। তুমি সেই শাপ শুনিতে পাও নাই। তোমার সখীরা শুনিতে পাইয়া তাঁহার চরণে ধরিয়া অনেক অনুনয় বিনয় করে। তখন তিনি কহিলেন এ শাপ অন্যথা হইবার নহে। তবে যদি কোন অভিজ্ঞান দৰ্শাইতে পারে তাহাহইলে স্মরণ করিবেক। এইরূপে শাপবৃত্তান্ত কহিয়া রাজাকে কহিলেন বৎস! দুর্ব্বাসার শাপ প্রভাবেই তোমার স্মৃতিভ্রংশ হইয়াছিল, তাহাতেই তুমি উহাঁকে চিনিতে পার নাই। শকুন্তলার সখীর অনুনয় বিনয়ে কিঞ্চিৎ শান্ত হইয়া, দুর্ব্বসা অভিজ্ঞান দর্শনকে শাপমোচনের উপায় নির্দ্ধারিত করিয়া দিয়াছিলেন। সেই নিমিত্ত, অঙ্গরীয় দর্শন মাত্র শকুন্তলাবৃত্তান্ত পুনর্ব্বার তোমার স্মৃতিপথে আরূঢ় হয়।
দুর্ব্বাসার শাপবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া, সাতিশয় হর্ষিত হইয়া, রাজা কহিলেন ভগবন্! এক্ষণে আমি সকলের নিকট সকল অপরাধ হইতে মুক্ত হইলাম। শকুন্তলাও শুনিয়া মনে মনে-কহিতে লাগিলেন এই নিমিত্তই আমার এই দুর্দ্দশা ঘটিয়াছিল। নতুবা, আর্য্যপুত্র এমন সরলসদয় হইয়া, কেন আমাকে অকারণে পরিত্যাগ করিবেন। দুর্ব্বাসার শাপেই আমার সর্বনাশ ঘটিয়াছিল। এই নিমিত্তই, তপোবন হইতে প্রস্থান কালে, সখীরাও যত্ন পূর্ব্বক, আর্যপুত্রকে অঙ্গুরীয় দেখাইতে কহিয়াছিলেন। আজি ভাগ্যে এই কথা শুনিলাম; নতুবা যাবজ্জীবন আমার অন্তঃকরণে, আর্যপুত্র অকারণে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন বলিয়া, ক্ষোভ থাকিত।
পরে, কশ্যপ রাজাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন বৎস! তোমার এই পুত্র সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধিপতি হইবেন, এবং সকল ভুবনের ভর্ত্তা হইয়া উত্তর কালে ভরত নামে প্রসিদ্ধ হইবেন। তখন রাজা কহিলেন ভগবন্! আপনি যখন এই বালকের সা..র করিয়াছেন তখন ইহাতে কি না সম্ভবিতে পারে। অদিতি কহিলেন অবিলম্বে কণ্ব ও মেনকার নিকট এই প্রিয় সংবাদ প্রেরণ করা আবশ্যক। তদনুসারে কশ্যপ, দুই শিষ্যকে আহ্বান করিয়া, কণ্ব ও মেনকার নিকট সংবাদ দানার্থ, প্রেরণ করিলেন। এবং রাজাকে কহিলেন বৎস! বহু দিবস হইল রাজধানী হইতে আসিয়াছ, অতএব আর বিলম্ব না করিয়া, দেবরথে আরোহণ পূর্ব্বক পত্নী পুত্র সমভিব্যাহারে প্রস্থান কর। তখন রাজা, মহাশয়ের যে আজ্ঞা, এই বলিয়া, প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া সস্ত্রীক সপুত্র রথে আরোহণ করিলেন এবং নিজ রাজধানী প্রত্যাগমন পূর্ব্বক পরম সুখে রাজ্য শাসন ও প্রজা পালন করিতে লাগিলেন।
সম্পূর্ণ