← লাইব্রেরি

১৮৮৪

ব্রজবিলাস

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৮৪

প্রকাশনা-তথ্য

ব্রজবিলাস।

যৎকিঞ্চিৎ অপূর্ব্ব মহাকাব্য

কবিকুলতিলকস্য

কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপো্স্য প্রণীত

দ্বিতীয় সংস্করণ

কলিকাতা

সংস্কৃত যন্ত্রে মুদ্রিত

এস. কে. লাহিড়ী এণ্ড কোং কর্ত্তৃক প্রকাশিত।

৫৪ নং কলেজ ষ্ট্রীট।

স ন ১ ২ ৯ ১ সা ল।

দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন।

ব্রজবিলাস নিঃশেষিত হইয়াছে। কিন্তু, গ্রাহকবর্গের আগ্রহনিবৃত্তি হয় নাই। এজন্য অনেকের অনুরোধপরতন্ত্র হইয়া, এই মহাকাব্য পুনরায় মুদ্রিত করিতে হইল।

ফাজিলচালাকেরা স্থির করিয়া রাখিয়াছেন, তাঁহাদের মত বিজ্ঞ, বোদ্ধা, যোদ্ধা, ভূমণ্ডলে আর নাই। তাঁহারা যে বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত করেন, অন্যে যাহা বলুক, তাঁহাদের মতে, তাহা অভ্রান্ত ও অকাট্য। শুনিতে পাই, আমার এই ক্ষুদ্র মহাকাব্য খানি অনেকের পছন্দসই জিনিস হইয়াছে। সেই সঙ্গে, ইহাও শুনিতে পাই, ফাজিলচালাকেরা রটাইতে আরম্ভ করিয়াছেন, ইহা বিদ্যাসাগরের লিখিত। যাঁহারা সেরূপ বলেন, তাঁহারা যে নিরবচ্ছিন্ন আনাড়ি, তাহা, এক কথায়, সাব্যস্ত করিয়া দিতেছি।

এক গণ্ডা এক মাস অতীত হইল, বিদ্যাসাগর বাবুজি, অতি বিদকুটে পেটের পীড়ায় বেয়াড়া জড়ীভুত হইয়া, পড়িয়া লেজ নাড়িতেছেন, উঠিয়া পথ্য করিবার তাকত নাই। এ অবস্থায়, তিনি এই মজাদার মহাকাব্য লিখিয়াছেন, এ কথা যিনি রটাইবেন, অথবা, এ কথায় যিনি বিশ্বাস করিবেন, তাঁহার বিদ্যা, বুদ্ধির দৌড় কত, তাহা সকলে, স্ব স্ব প্রতিভাবলে, অনায়াসে উপলব্ধি করিতে পারেন।

আমার প্রথম, বংধর, “অতি অল্প হইল”, ভুমিষ্ঠ হইলে, কেই কেহ, সন্দেহ করিয়া, কোনও মহোদয়কে জিজ্ঞাসা করিতেন, এই পুস্তক খানি কি আপনকার লিখিত? তিনি, কোনও উত্তর না দিয়া, ঈষৎ হাসিয়া, মৌনাবলম্বন করিয়া থাকিতেন। তাহাতে অনেকে মনে করিতেন, তবে ইহা ইঁহারই লিখিত। বিদ্যাসাগর মহাদয় সেরূপ চালাকি খেলেন কি না, ইহা জানিবার জন্য, এ বার আমি, চতুর, চালাক, বিশ্বস্ত বন্ধুবিশেষ দ্বারা, তাঁহার নিকট ঐরূপ জিজ্ঞাসা করাইব। দেখি, তিনি, পুর্ব্বোক্ত মহোদয়ের মত, ঈষৎ হাসিয়া, মৌনাবলম্বন করিয়া থাকেন; অথবা, আমার লিখিত নয় বলিয়া, স্পষ্ট বাক্যে উত্তর দেন। যেরূপ শুনিতে পাই, তাহাতে তিনি, “না বিইয়া কানাইর মা” হইতে চাহিবেন, সে ধরনের জন্তু নহেন।

অধিকন্তু, তিনি, ভাল লেখক বলিয়া, এক সময়ে, বিলক্ষণ প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিলেন, সত্য বটে। কিন্তু, যে অবধি, আমি প্রভৃতি কতিপয় উচ্চ দরের লেখকচূড়ামণি, সাহিত্যরঙ্গভূমিতে অবতীর্ণ হইয়া, নানা রঙ্গে, অভিনয় করিতে আরম্ভ করিয়াছি, সেই অবধি, তাঁহার লেখার আর তেমন গুমর নাই। ফলকথা এই, তিনি প্রভৃতি প্রাচীন দলের লেখকদিগের ভোঁতা কলমের খোঁতা মুখ হইতে, এবংবিধ রঙ‍্দার মহাকাব্য নিঃসৃত হওয়া, গোময়কুণ্ডে কমলোৎপত্তির ন্যায়, কোনও মতে সম্ভব নহে।

যথাবিহিত যাহা অভিহিত হইল, ইহাতে যদি প্রাচীন দলের অভিমানী লেখক মহোদয়েরা রাগ করেন, করুন। আমার হাতে কিছুই বহিয়া যাইবেক না। আমি, এ সকল বিষয়ে, কাহারও তুআক্কা রাখি না, ও রাখিতেও চাহি না। এ জন্যে, যদি আমায় নরকে যাইতে হয়, আমি তাহাতেও পিছপাঁও নই।

যদি বলেন, নরক কেমন সুখের স্থান, সে বোধ থাকিলে, তুমি, কখনই, নরকে যাইতে চাইতে না। এ বিষয়ে বক্তব্য এই, কিছু দিন পুর্ব্বে, কলিকাতায়, এক ভদ্রসন্তান বেয়াড়া ইয়ার হইয়াছিলেন। তিনি এক বারে উচ্ছন্ন যাইতেছেন ভাবিয়া, তাঁহার গুরুদেব, উপদেশ দিয়া, তাঁহাকে দুরস্ত করিবার চেষ্টা পাইয়াছিলেন। ‘তোমার কি নরকে যাইবার ভয় নাই’, গুরুদেব এই কথা বলিলে, সেই সুবোধ, সুশীল, বিনয়ী ভদ্রসন্তান কহিয়াছিলেন, ‘আপনি দেখুন, যত প্রবলপ্রতাপ রাজা রাজড়া, সব নরকে যাইবেন; যত ধনে মানে পুর্ণ বড় লোক, সব নরকে যাইবেন; যত দিলদরিয়া, তুখড় ইয়ার, সব নরকে যাইবেন। যত মৃদুভাষিণী, চারুহাসিনী, বারবিলাসিনী, সব নরকে যাইবেন; স্বর্গে যাইবার মধ্যে, কেবল আপনাদের মত টিকিকাটা বিদ্যাবাগীশের পাল। সুতরাং, অতঃপর নরকই গুল‍্জার এবং, নরকে যাওয়াই সর্ব্বাংশে বাঞ্ছনীয়। আমারও সেই উত্তর।

কিন্তু, একটি বিষয়ে, উক্ত ভদ্রসন্তানের মতের সহিত, আমার মতের সম্পূর্ণ বৈলক্ষণ্য আছে। তিনি কহিয়াছিলেন, টিকিকাটা বিদ্যাবাগীশের পাল স্বর্গে যাইবেন। আমার কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস এই, যদি নরক নামে বাস্তবিক কোনও স্থান থাকে। এবং, কাহারও পক্ষে, সেই নরকপদবাচ্য স্থানে যাইবার ব্যবস্থা থাকে; তাহা হইলে, টিকিকাটা বিদ্যাবাগীশের পাল সর্ব্বাগ্রে নরকে যাইবেন, এবং নরকের সকল জায়গা দখল করিয়া ফেলিবেন; আমরা আর সেখানে স্থান পাইব না।

শ্রীমান্ বিদ্যাবাগীশ খুড় মহাশয়েরা, শাস্ত্রের দোহাই দিয়া, মনগড়া বচন পড়িয়া, বলিয়া থাকেন, জ্ঞানকৃত পাপের নিষ্কৃতি নাই। বিষয়ী লোক শাস্ত্রজ্ঞ নহেন; সুতরাং, তাঁহাদের অধিকাংশ পাপ, জ্ঞানকৃত বলিয়া, পরিগণিত হইতে পারে না। কিন্তু, বিদ্যাবাগীশ খুড়দের, শাস্ত্রেও যেমন দখল, পাপেও তেমনই প্রবৃত্তি। সুতরাং, তাঁহাদের পাপের সংখ্যাও অধিক, এবং সমস্ত পাপই জ্ঞানকৃত। এমন স্থলে, তাঁহারাই নরক একচাটিয়া করিয়া ফেলিবেন, সে বিষয়ে অনুমাত্র সংশয় নাই। তাঁহারা, আমাদিগকে ভয় দেখাইবার জন্যে, নানা রঙ্ চড়াইয়া, বর্ণনা করিয়া, নরককে এমন ভয়ানক স্থান করিয়া তুলেন যে, শুনিলে হৃৎকম্প হয়, এবং, এক বারে হতাশ হইয়া পড়িতে হয়। কিন্তু, আপনাদের বেলায়, ‘মাকড় মারিলে থোকড় হয়’ বলিয়া, অবলীলা ক্রমে, সমস্ত পাপকর্ম্মে সম্পূর্ণ লিপ্ত হইয়া থাকেন। এ বিষরের অতি সুন্দর একটি উদাহরণ দর্শিত হইতেছে। কিছু কাল পূর্ব্বে, এই পরম পবিত্র গৌড়দেশে, কৃষ্ণহরি শিরোমণি নামে, এক সুপণ্ডিত অতি প্রসিদ্ধ কথক আবির্ভুত হইয়াছিলেন। যাঁহারা তাঁহার কথা শুনিতেন, সকলেই মোহিত হইতেন। এক মধ্যবয়স্কা বিধবা নারী, প্রত্যহ, তাঁহার কথা শুনিতে যাহিতেন। কথা শুনিয়া, এত মোহিত হইয়াছিলেন, যে তিনি, অবাধে, সন্ধ্যার পর, তাঁহাঁর বাসায় গিয়া, তদীয় পরিচর্য্যায় নিযুক্ত থাকিতেন। ক্রমে ক্রমে ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়া, অবশেষে, ঐ বিধবা রমণী গুণমণি শিরোমণি মহাশয়ের প্রকৃত সেবাদাসী হইয়া পড়িলেন।

এক দিন, শিরোমণি মহাশয়, ব্যাসাসনে আসীন হইয়া, স্ত্রীজাতির ব্যভিচার বিষয়ে অশেষবিধ দোষ কীর্ত্তন করিয়া, পরিশেষে কহিয়াছিলেন, ‘যে নারী পর পুরুযে উপগতা হয়, নরকে গিয়া, তাহাকে, অনন্ত কাল, যৎপরোনাস্তি শাস্তিভোগ করিতে হয়। নরকে এক লৌহময় শাল্মলি বৃক্ষ আছে। তাহার স্কন্ধ দেশ, অতি তীক্ষ্ণাগ্র দীর্ঘ কণ্টকে পরিপূর্ণ। যমদূতেরা, ব্যভিচারিণীকে, সেই ভয়ঙ্কর শাল্মলি বৃক্ষের নিকটে লইয়া গিয়া, বলে, তুমি, জীবদ্দশায়, প্রাণাধিকপ্রিয় উপপতিকে, নিরতিশয় প্রেমভরে, যেরূপ গাঢ় আলিঙ্গনদান করিতে; এক্ষণে, এই শাল্মলি বৃক্ষকে, উপপতি ভাবিয়া, সেইরূপ গাঢ় আলিঙ্গনদান কর। সে ভয়ে অগ্রসর হইতে না পারিলে, যমদূতেরা, যথাবিহিত প্রহার ও যথোচিত তিরস্কার করিয়া, বলপূর্ব্বক, তাহাকে আলিঙ্গন করায়; তাহার সর্ব্ব শরীর ক্ষত বিক্ষত হইয়া যায়; অবিশ্রান্ত শোণিতস্রাব হইতে থাকে; সে, যাতনায় অস্থির ও মৃতপ্রায় হইয়া, অতিকরুণ স্বরে, বিলাপ, পরিতাপ, ও অনুতাপ করিতে থাকে। এই সমস্ত অনুধাবন করিয়া, কোনও স্ত্রীলোকেরই, অকিঞ্চিৎকর, ক্ষণিক সুখের অভিলাষে, পর পুরুষে উপগতা হওয়া উচিত নহে’ ইত্যাদি।

ব্যভিচারিণীর ভয়ানক শান্তিভোগবৃত্তান্ত শ্রবণে, কথকচূড়ামণি শিরোমণি মহাশয়ের সেবাদাসী, ভয়ে ও বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া, প্রতিজ্ঞা করিলেন, ‘যাহা করিয়াছি, তাহার আর চারা নাই অতঃপর, আর আমি, প্রাণান্তেও, পর পুরুষে উপগত হইব না’। সে দিন, সন্ধ্যার পর, তিনি, পুর্ব্ববৎ, শিরোমণি মহাশয়ের আবাসে উপস্থিত হইয়া, যথাবৎ আর আর পরিচর্যা করিলেন; কিন্তু, অন্যান্য দিবসের মত, তাঁহার চরণসেবার জন্য, যথাসময়ে, তদীয় শয়নগৃহে প্রবেশ করিলেন না।

শিরোমণি মহাশয়, কিয়ৎ ক্ষণ, অপেক্ষা করিলেন। অবশেষে, বিলম্ব দর্শনে, অধৈর্য্য হইয়া, তাহার নামগ্রহণ পূর্বক, বারংবার আহ্বান করিতে লাগিলেন। সেবাদাসী, গৃহমধ্যে প্রবিষ্ট না হইয়া, দ্বারদেশে দণ্ডায়মান রহিলেন; এবং, গলবস্ত্র ও কৃতাঞ্জলি হইয়া, গলদশ্রু লোচনে, শোকাকুল বচনে কহিলেন, “প্রভো। কৃপা করিয়া, আমায় ক্ষমা করুন। সিমুল গাছের উপাখ্যান গুনিয়া, আমি ভয়ে মরিয়া রহিয়াছি; আপনকার চরণসেবা করিতে, আর আমার, কোনও মতে, প্রবৃত্তি ও সাহস হইতেছে না। না জানিয়া যাহা করিয়াছি, তাহা হইতে কেমন করিয়া নিস্তার পাইব, সেই ভাবনায় অস্থির হইয়াছি’।

সেবাদাসীর কথা শুনিয়া, পণ্ডিতচুড়ামণি শিরোমণি মহাশয় শয্যা হইতে গাত্রোখান করিলেন; এবং, দ্বারদেশে আসিয়া, সেবাদাসীর হস্তে ধরিয়া, সহাস্য মুখে কহিলেন, “আরে পাগলি! তুমি এই ভয়ে আজ শয্যায় যাইতেছ না? আমরা, পুর্ব্বাপর, যেরূপ বলিয়া আসিতেছি, আজও সেইরূপ বলিয়াছি। সিমুল গাছ, পূর্ব্বে, ঐরূপ ভয়ঙ্কর ছিল, যথার্থ বটে; কিন্তু, শরীরের ঘর্ষণে ঘর্ষণে, লৌহময় কণ্টক সকল ক্রমে ক্ষয় পাওয়াতে, সিমুল গাছ তেল হইয়া গিয়াছে; এখন, আলিঙ্গন করিলে, সর্ব্ব শরীর শীতল ও পুলকিত হয়”। এই বলিয়া, অভয়প্রদান ও প্রলোভনদর্শন পূর্ব্বক, শয্যায় লইয়া গিয়া, গুণমণি শিরোমণি মহাশয় তাঁহাকে, পুর্ব্ববৎ, চরণসেবায় প্রবৃত্ত করিলেন।

পূর্ব্ব বারে, অমার্জ্জনীয় অনবধানদোষ বশতঃ,নির্দ্দেশ করিতে বিস্মৃত হইয়াছি, এজন্য, ক্ষমা প্রার্থনা পূর্ব্বক, বিনয়নম্র বচনে নিবেদন করিতেছি, বেঢপ বিদ্যাবাগীশ দলের যেরূপ গুণকীর্ত্তন করিলাম, তাহাতে কেহ এরূপ না ভাবেন, আমাদের মতে, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সম্প্রদায়ের সমস্ত লোকই একবিধ, তাঁহাদের মধ্যে ইতরবিশেষ নাই। আমরা, সরল হৃদয়ে, ধর্ম্মপ্রমাণ নির্দ্দেশ করিতেছি, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সম্প্রদায়ে এরূপ অনেক মহাশয় ব্যক্তি আছেন যে, তাঁহাদিগকে দেখিলে, ও তাঁহাদের সহিত আলাপ করিলে, অন্তঃকরণ প্রকৃত প্রীতিরসে পুর্ণ, ও প্রভূত ভক্তিরসে আর্দ্র, হয়। তাঁহারা, যশোহর ধর্ম্মরক্ষিণী সভার আজ্ঞাবহ দলের ন্যায়, বাহ্যজ্ঞানশূন্য নহেন। তাঁহাদের সদসদ্বিবেক, উচিতানুচিতবিবেচনা প্রভৃতি, এ কাল পর্যন্ত, লয় প্রাপ্ত হয় নাই। তুচ্ছ লাভের লোভে, অবলীলা ক্রমে, ধর্ম্মাধর্ম্মবিবেচনায় বিসর্জ্জন দিতে পারেন, তাঁহারা সেরূপ প্রকৃতি ও সেরূপ প্রবৃত্তি লইয়া জন্মগ্রহণ করেন নাই।

সন ১২৯১ সাল।

২৫ আশ্বিন।

মাননীয় শ্রীযুক্ত বাবু তারাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়

যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণীসভাসম্পাদক

মহাশয় সমীপেষু

সবিনয়ং সবহুমানং নিবেদনম্

গৌড় দেশের সর্ব্বপ্রধান সমাজ নবদ্বীপের সর্ব্বপ্রধান স্মার্ত্ত শ্রীল শ্রীযুক্ত ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন ভট্টাচার্য্য, বিধবাবিবাহের অশাস্ত্রীয়তা প্রতিপন্ন করিবার নিমিত্ত, শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভার চতুর্থ সাংবৎসরিক অধিবেশনে, সংস্কৃত ভাষায় যে বক্তৃতা করিয়াছিলেন, সমাচারচন্দ্রিকানামক সংবাদপত্রের ৭৩ ভাগের ১২১ সংখ্যায়, তাহা মুদ্রিত হইয়াছে। এই চমৎকারিণী বক্তৃতা, যথোচিত যত্ন ও সবিশেষ অভিনিবেশ সহকারে, পাঠ করিয়া, আমার অন্তঃকরণে যে সমস্ত ভাবের আবির্ভাব হইয়াছে, তৎসমুদয়, লিপিবদ্ধ করিয়া, ব্রজবিলাস নামে, মুদ্রিত ও প্রচারিত করিলাম। গ্রন্থের অধিকতর গৌরববন্ধনবাসনায়, এই অপূর্ব্ব মহাকাব্য, শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা দেবীর অতিকমনীয় কোমলতম চরণকমলে, চন্দনচর্চ্চিত কুসুমাঞ্জলি স্বরূপ, সমর্পিত হইতেছে। আপনি, দয়া প্রদর্শন পুর্ব্বক, এই অতি অকিঞ্চিৎকর অথচ অতি মনোহর উপহারপ্রদানবার্ত্তা শ্রীমতী সভা দেবীর শ্রবণগোচর করিলে, আমি নিরতিশয় অনুগৃহীত হইব। কিমধিকেনেতি।

সন ১১৯১ সাল

১লা আশ্বিন।

অনুগ্রহপ্রত্যাশাপন্নস্য

কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য

চতুর্থ উল্লাস

চতুর্থ উল্লাস।

শ্রীমান্ নদিয়ায় চাঁদ ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন খুড় মহাশয়, শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্মরক্ষিণী সভায় আহূত হইয়া, বিধবাবিবাহ বিষয়ে নে বক্তৃতা লিখিয়া, সমবেত সমস্ত সভ্যগণের, ও রবাহূত তামাসাগির বহুসংখ্যক দর্শকগণের সমক্ষে পাঠ করিয়াছেন, ও তদুপলক্ষে বেধড়ক ধন্যবাদ পাইয়াছেন, তাহার আরম্ভ ভাগ ও উপসংহার ভাগ মাত্র আপাততঃ আলোচিত হইতেছে। এই দুই অংশই তাঁহার বক্তৃতার সারভাগ মধ্যবর্ত্তী অংশে কেবল ফেচফেচ, ফাজিলচালাকি, ও স্মৃতিশাস্ত্রে যে কিছু মাত্র বোধ ও অধিকার নাই, তাহার অসন্দিগ্ধ প্রমাণ প্রদর্শন করিয়াছেন; এ জন্য, অনাবশ্যক বিবেচনায়, সে অংশের আলোচনা এ বৈঠকে মুল‍্তুবি রাখা গেল। পরে, ইস্তাহার দ্বারা সময় নির্দ্ধারিত করিয়া, সে অংশেরও, মাফিক আইন, বিচার পূর্ব্বক, চুড়ান্ত হুকুম দেওয়া যাইবেক।

আরম্ভ ভাগ।

সকৃদংশো নিপততি সকৃৎ কন্যা প্রদীয়তে।

সকৃদাহ দদানীতি ত্রীণ্যেতানি সতাং সকৃৎ॥

ইত্যনেন মনুনা সকৃদ্দানবিধানাৎ বিহিতদানোত্তরগ্রহণস্যৈব

বিবাহপদার্থাভ্বৎ সুতরাং পুনর্ব্বিবাহোহসম্ভব ইতি।”

বিষয়বিভাগ এক বার হয়, কন্যাদান এক বার হয়, দিলাম এই বাক্য প্রয়োগ এক বার হয়; এই তিন সাধুদের এক বার। এই বচনে মনু এক বার দানের বিধি দিয়াছেন এবং যথাবিধি দানের পর যে গ্রহণ। তাহাই বিবাহশব্দবাচ্য, সুতরাং পুনর্ব্বার বিবাহ অসম্ভব।

ইহার তৎপর্য্য এই, মনু এক বার মাত্র কন্যাদানের বিধি দিয়াছেন; সুতরাং, এক বার কন্যা দান করিলে, সে কন্যার পুনরায় আর দান হইতে পারে না। কন্যাকর্ত্তা যথাবিধি কন্যার দান করেন, সেই দানের পর, বর যথাবিধি কন্যার যে গ্রহণ করেন, তাহারই নাম বিবাহ। সুতরাং, এইরূপ যথাবিধি দান ও যথাবিধি গ্রহণ ব্যতিরেকে, স্ত্রী পুরুষের যে মিলন, তাহা বিবাহ বলিয়া পরিগৃহীত নহে। যখন, এক বার কন্যাদান করিলে, সে কন্যার পুনরায় আর দান হইতে পারে না, তখন বিবাহিতা কন্যার পুনর্ব্বার বিবাহ কোনও মতে সম্ভবিতে পারে না।

বিদ্যারত্ন খুড় মহাশয় এ দেশের সর্ব্বপ্রধান সমাজের সর্ব্বপ্রধান স্মর্ত্ত; সুতরাং, এক্ষণে, স্মৃতিশাস্ত্রের সর্ব্বপ্রধান মীমাংসাকর্ত্তা। তাঁহার চাঁদমুখ বা স্বর্ণময়ী লেখনী হইতে, যখন যাহা বহির্গত হয়, তাহাই, বেদবাক্যের ন্যায়, অভ্রান্ত ও অকাট্য, সে বিষয়ে এক পয়সারও, এক কানা কড়িরও, সন্দেহ নাই। তাঁহার মীমাংসাতে দোষারোপ করিতে উদ্যত হওয়া অতি বড় আস্পর্দ্ধার কথা, ও অতি বড় মহাপাতকের কর্ম্ম, তাহারও কোনও সন্দেহ নাই। এজন্য, কেহ, সাহস করিয়া, সে বিষয়ে অগ্রসর হইতে পারেন না। কিন্তু, উপযুক্ত ভাইপোর সঙ্গে, খুড় মহাশয়ের যেরূপ পবিত্র সম্পর্ক, তাহাতে উপযুক্ত ভাইপো, খুড়র মীমাংসা লইয়া, যৎকিঞ্চিৎ আমোদ আহলাদ করিলে, সাধুসমাজে অপদস্থ বা নিদাভাজন হইতে হইবেক, এরূপ বোধ ও বিশ্বাস হয় না। এজন্য, আস্তে আস্তে, দুই একটি প্রশ্ন করিতে অগ্রসর হইতেছি।

প্রথম প্রশ্ন।

সতু যদ্যন্যজাতীয়ঃ পতিতঃ ক্লীব এব বা।

বিকর্ম্মন্থঃ সগোত্রো বা দাসো দীর্ঘাময়োহপি বা॥

ঊঢ়াপি দেয়া সান্যস্মৈ সহাভরণভূষণা।

যাহার সহিত কন্যার বিবাহ দেওয়া যায়, সে ব্যক্তি যদি অন্যজাতীয়, পতিত, ক্লীব, যথেচ্ছচারী, সগোত্র, দাস, অথবা চিররোগী হয়, তাহা হইলে, উঢ়া অর্থাৎ বিবাহিতা কন্যাকেও, বস্ত্রালঙ্কারে ভূষিতা করিয়া, অন্য পাত্রে দান করিবেক।

এই লক্ষ্মীছাড়া বচনের সহিত, খুড় মহাশয়ের অভ্রান্ত, অকাট্য মীমাংসার, আপাততঃ, বিরোধের মত বোধ হইতেছে। খুড় মহাশয়ের সিদ্ধান্ত এই, এক বার কন্যাদান করিলে, সে কন্যার পুনরায় আর দান হইতে পারে না; এবং, দান পূর্ব্বক গ্রহণ না হইলে বিবাহ সম্পন্ন হয় না; সুতরাং, বিবাহিতা কন্যার পুনর্ব্বার বিবাহ অসম্ভব। কিন্তু, উপরি দর্শিত কাত্যায়নবচনে, বিবাহিতা কন্যার পুনর্ব্বার অন্য পাত্রে দানের স্পষ্ট বিধি দৃষ্ট হইতেছে।

আর, বিবাহিতা কন্যার পুনর্ব্বার অন্য পাত্রে দানের যে কেবল বিধিই দৃষ্ট হুইতেছে, এরূপ নহে; পিতা বিবাহিতা বিধবা কন্যাকে পুনর্ব্বার অন্য পাত্রে দান করিয়াছেন, তাহারও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। যথা,

অর্জ্জুনস্যাত্মজঃ শ্রীমানিরাবান্নাম বীর্য্যবান্

সুতায়াং নাগরাজদ্র জাতঃ পার্থেন ধীমতা।

ঐরাবতেন সা দত্তা হনপত্যা মহাত্মনা।

পত্যৌ হতে সুপর্ণেন কৃপণা দীনচেতনা॥

নাগরাজের কন্যাতে অর্জ্জুনের, ইরাবান্ নামে, এক শ্রীমান্, বীর্য্যবান পুত্র জন্মে। সুপর্ণ কর্ত্তৃক ঐ কন্যার পতি হত হইলে, নাগরাজ মহাত্মা ঐরাবত সেই দুঃখিতা, বিষণ্ণা, পুত্রহীনা কন্যা অর্জ্জুনকে দান করেন।

এক্ষণে, সর্ব্বপ্রধান সমাজের সর্ব্বপ্রধান স্মার্ত্ত শ্রীমান বিদ্যারত্ন খুড় মহাশয়ের নিকট প্রশ্ন এই, বিবাহিতা কন্যার পুনর্ব্বার আর দান হইতে পারে না, তাঁহার এই সিদ্ধান্তের সহিত, কাত্যায়নবচনের ও পঞ্চম বেদ মহাভারতের বিরোধ ঘটিতেছে কি না; এবং ব্যবস্থা দিবার সময় বচন ফচন দেখা যায় না, তিনি পূর্ব্বে, অতি প্রশংসনীয় কমনীয় সাধুভাষায়, এই যে কবুল দিয়াছেন, এই সিদ্ধান্ত উহার একটি অকাট্য নজির খাড়া হইতেছে কি না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন।

খুড় মহাশয় বিবাহের যে লক্ষণ নির্দ্ধারিত করিয়াছেন, তাহাও, আমাদের স্থূল বুদ্ধিতে, সঙ্গত বলিয়া বোধ হইতেছে না। যথা,

বিহিতদানোত্তরগ্রহণস্যৈব বিবাহপদার্থত্বাৎ।

যথাবিধি দানের পর যে গ্রহণ, তাহাই বিবাহশব্দবাচ্য।

অর্থাৎ, বিধি পূর্ব্বক কন্যার দান, ও সেই দানের পর, বিধি পূর্ব্বক কন্যার যে গ্রহণ, তাহাকেই বিবাহ বলে। সুতরাং, যেখানে এ উভয়ের অসদ্ভাব, অর্থাৎ বিধি পূর্ব্বক দান ও গ্রহণ নাই, সে স্থলে বিবাহ শব্দ প্রযুক্ত হইতে পারে না।

বিবাহ অষ্টবিধ ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধব, রাক্ষস, পৈশাচ। যে স্থলে, কন্যাকে, যথাশক্তি বস্ত্রালঙ্কারে ভুষিতা করিয়া, স্বয়ং আহ্বান পূর্ব্বক সৎপাত্রে দান করা যায়, তাহার নাম ব্রাহ্ম বিবাহ। যে স্থলে, কন্যাকে, যথাশক্তি বস্ত্রালঙ্কারে ভূষিত করিয়া, যজ্ঞক্ষেত্রে যজ্ঞানুষ্ঠানব্যাপৃত ব্যক্তিকে দান করা যায়, তাহার নাম দৈব বিবাহ। যে স্থলে, বরের নিকট হইতে গোযুগল গ্রহণ করিয়া, কন্যাদান করা যায়, তাহার নাম আর্য বিবাহ। যে স্থলে, উভয়ে মিলিয়া ধর্ম্মের অনুষ্ঠান কর, ইহা কহিয়া, বিবাহার্থী ব্যক্তিকে কন্যাদান করা যায়, তাহার নাম প্রাজাপত্য বিবাহ
। যে স্থলে, বরপক্ষের নিকট হইতে ধন গ্রহণ পূর্ব্বক, কন্যাদান করা যায়, তাহার নাম আ্রসুর বিবাহ। যে স্থলে, বর ও কন্যা, পরস্পর অনুরাগ বশতঃ, আপন ইচ্ছা অনুসারে, দম্পতিভাবে মিলিত হয়, তাহার নাম গান্ধর্ব্ব বিবাহ। যে স্থলে, কন্যার কর্ত্তৃপক্ষকে যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া, বল পূর্ব্বক কন্যাহরণ করে, তাহার নাম রাক্ষস বিবাহ। যে স্থলে, ছল পূর্ব্বক কন্যাহরণ করে, তাহার নাম পৈশাচ বিবাহ।

এক্ষণে, খুড় মহাশয়ের নিকট প্রশ্ন এই, যথাবিধি দানের পর যে গ্রহণ, তাহাই বিবাহশব্দবাচ্য, তাঁহার নির্দ্ধারিত এই বিবাহ লক্ষণ গান্ধর্ব্ব, রাক্ষস, পৈশাচ, এই তিন বিবাহে খাটিতেছে কি না। গান্ধর্ব্ব বিবাহ, বর ও কন্যার স্বেচ্ছাতে, সম্পন্ন হইয়া থাকে, তাহাতে দান ও গ্রহণের কোনও সংস্রব নাই; দায়ী মুদ্দাই রাজি, কি করিবে কাজি; বর কন্যায়, রাজি হইয়া, কাজ শেষ করিলে, বাপের আর চালাকি করিবার দরকার থাকিতেছে না। কন্যার কর্ত্তৃপক্ষকে যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া, বল পূর্ব্বক কন্যাহরণের নাম রাক্ষস বিবাহ; ছল পূর্ব্বক কন্যাহরণের নাম পৈশাচ বিবাহ; এই দুই স্থলে, দান ও গ্রহণের সম্ভাবনাই নাই। সুতরাং, যথাবিধি দানের পর যে গ্রহণ, তাহাই বিবাহশব্দবাচ্য, এই লক্ষণ ঐ তিন বিবাহে খাটা অসম্ভব বোধ হইতেছে। যদি না খাটে, তবে মনু প্রভৃতি ধর্মশাস্ত্রকর্ত্তারা যে এই তিনকে বিবাহ বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন, তাহা কিরূপে সঙ্গত হয়; এবং, ব্যবস্থা দিবার সময় বচন ফচন দেখা যায় না, এই কবুলের আর একটি নজির খাড়া হয় কি না।

উপসংহার ভাগ।

যদি চাপরিতোষো বিদুষাৎ তদা পরাশরবচনং বাগ্ধত্তা বিষয়মিতি অত্রায়ম্ভাবঃ যৈস্ম বাগানৎ কৃতং তস্মিন বিদেশ গতে মৃতে পতিতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ স্ক্রীণাং মহতী বিপদেব সম্ভবতি তৎ কারণং ক্রয়তা, অজাতবিদেশগমনাদিদশায়াং যেভ্যো বাদানং কৃতং তেষু বিদেশাদিগতেষু অনগতিকানাং দৃশস্ত্রীণাং বিবাহং বিনা ভাদৃশবিপদুদ্ধার কদাপি ন সম্ভবতি, বাচা দত্তেতি কাশ্যপবচনেন বাগাদীনাং স্ত্রীণাং বিবাহকরণে নিন্দাশ্রবণাৎ তৎপরিণয়নে কেমপি প্রবৃত্তির্ন স্যাৎ অতঃসম্পূর্ণা আপদুপস্থিত। তত্রৈব পরাশরবচনং প্রতিসবিধায়কং নতু বিবাহিতায়া পুনর্বিবাহবিধায়ক তথাত্বে প্রাগুক্তমখাদিবচনবিরোধাপত্তিরিতি।

ইহাতে যদি পণ্ডিতগণের পবিতোষ না জমে, তবে পরশিরবচন বাগতা কন্যার বিষয়ে। ইহার অভিপ্রায় এই, যে ব্যক্তিকে কন্যার বাগান করা গিয়াছে, সে বিদেশগত, মৃত, পতিত, প্রব্রজিত, ও ক্লীব স্থির হইলে, প্রীদিগের বড়ই বিপদ ঘটে। তাহার কারণ শুন, যে সময়ে বিদেশগমনাদি ঘটে নাই, তখন যাহাদিগকে কন্যার বাগদান করা হয়, তাহার বিদেশাদিগত হইলে, অনন্যগতি তাদৃশ স্ত্রীদিগের বিবাহ ব্যতিরেকে তাদৃশ বিপদুন্ধার কদাপি সস্তষে না। বাচা দা এই কাপবচনে বাগা প্রভৃতি স্ত্রীদিগের বিবাহকরণে নিশাকীর্ত্তন আছে, ভজ তাহাদিগকে বিবাহ করিতে কাহারও প্রবৃত্তি না হইতে পারে, সুতরাং সম্পূর্ণ জাপদ উপস্থিত, পরাশরবচন এই বিষম্বেই বিশেষ বিধি হইতেছে, বিবাহিতার পুনর্ব্বার বিবাহের বিধিদায়ক নহে; সেরূপ হইলে, পূর্ব্বোক্ত মনু প্রভৃতির বচনের সহিত বিরোধ ঘটে।

শ্রীমান্ বিদ্যারত্ন খুড়র সিদ্ধান্ত এই, পরাশরের বিবাহবিধি বাগ্দত্তা কন্যার বিষয়ে, অর্থাৎ বাগ্দত্তা কন্যার বর বিদেশগত, মৃত, পতিত, প্রব্রজিত ও ক্লীব স্থির হইলে, সেই কন্যার অন্য পাত্রের সহিত বিবাহ হইতে পারিবেক, পরাশর এই বিধি দিয়াছেন; বিবাহিতা কন্যার পুনর্ব্বার বিবাহ তাঁহার অভিমত নহে।

খুড় মহাশয়ের চাঁদমুখ হইতে যখন যে ফয়তা নির্গত হয়, তাহাই অভ্রান্ত ও অকাট্য; দোষের মধ্যে, ব্যবস্থা দিবার সময় বচন ফচন দেখা যায় না, তদীয় এই কবুলের এক একটি নজির খাড়া হইয়া পড়ে।

তৃতীয় প্রশ্ন।

নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ।

পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরন্যো বিধীয়তে॥

অষ্টৌ বর্ষাণ্যপেক্ষেত ব্রাহ্মণী প্রোষিতং পতিম্।

অপ্রসূতা তু চত্বারি পরতোঽন্যৎ সমাশ্রয়েৎ॥

ক্ষত্রিয়া ষট্‌ সমাস্তিষ্ঠেদপ্রসূতা সমাত্রয়ম্।

বৈশ্যা প্রসূতা চত্বারি দ্বে বর্ষে ত্বিতরা বসেৎ॥

ন শূদ্রায়াঃ স্মৃতঃ কাল এষ প্রোষিতযোষিতাম্।

জীবতি শ্রূয়মাণে তু স্যাদেষ দ্বিগুণো বিধিঃ॥

অপ্রবৃত্তৌ তু ভূতানাং দৃষ্টিরেষা প্রজাপতেঃ।

অতোঽন্যগমনে স্ত্রীণামেষু দোষো ন বিদ্যতে॥

স্বামী অনুদ্দেশ হইলে, ‘মরিলে, সংসারধর্ম্ম পরিত্যাগ করিলে, ক্লীব স্থির হইলে, অথবা পতিত হইলে, স্ত্রীদিগের পুনর্ব্বর বিৰাহ শাস্ত্রবিহিত। স্বামী অনুদ্দেশ হইলে, ব্রাহ্মণজাতীয়া স্ত্রী আট বৎসর প্রতীক্ষা করিবে। যদি সন্তান না হইয়া থাকে, তবে চারি বৎসর; তৎপরে বিবাহ করিবেক। ক্ষত্রিয়জাতীয় স্ত্রী ছয় বৎসর প্রতীক্ষা করিবেক। যদি সন্তান না হইয়া থাকে, তবে তিন বৎসর। বৈশ্যজাতীয় স্ত্রী, যদি সন্তান না হইয়া থাকে, চারি বৎসর, নতুবা দুই বৎসর। শূদ্রজাতীয়া স্ত্রীর প্রতীক্ষার কালনিয়ম নাই। অনুদ্দেশ হইলেও, যদি জীবিত আছে বলিয়া শুনিতে পাওয়া যায়, তাহা হইলে পূর্ব্বোক্ত কালের দ্বিগুণ কাল প্রতীক্ষা করিবেক। কোনও সংবাদ না পাইলে, পূর্ব্বোক্ত কাল নিয়ম। প্রজাপতি ব্রহ্মার এই মত। অতএব, এই কয় স্থলে, স্ত্রীদিগের পুনর্ব্বার বিবাহ দোষবহ নহে।

নারদসংহিতার এই অংশ খুড় মহাশয়ের দিব্য চক্ষুর গোছর হইলে, তিনি, নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে, এই বচন বাগ্দত্তাবিষয়ক বলিয়া, অভ্রান্ত, অকাট্য সিদ্ধান্ত করিতে অগ্রসর হইতেন, এরূপ বোধ হয় না। কারণ, যদি এই বচন বাগ্দত্তাবিষয়ক হইত, তাহা হইলে, অনুদ্দেশ স্থলে, সন্তান হইলে এক প্রকার কালনিয়ম, সন্তান না হইলে আর এক প্রকার কালনিয়ম, কিরূপে সঙ্গত হইতে পারে। অতএব, খুড় মহাশয়ের নিকট প্রশ্ন এই পরাশরবচন বাগদত্তা বিষয়ে ব্যবস্থাপিত হইলে, নারদসংহিতার সহিত বিরোধ ঘটে কি না।

চতুর্থ প্রশ্ন।

শ্রীমান্ বিদ্যারত্ন খুড়র নিকট আর একটি প্রশ্ন এই; যে ব্যক্তিকে কন্যার বাগ্দান করা যায়, সে সগোত্র, চিররোগী, যথেচ্ছাচারী, অন্যজাতীয় প্রভৃতি স্থির হইলে, ঐ বাগ্দত্তা তা কন্যার কিরূপ গতি হইবেক। কারণ, খুড়র সিদ্ধান্ত এই, পরাশর, বাঙ্গতা কন্যার পক্ষে, বর বিদেশগত, মৃত, পতিত, প্রব্রজিত ও ক্লীব স্থির হইলে, বিবাহের বিধি দিয়াছেন। যখন, এই পাঁচটি স্কুল ধরিয়া, বাগা কন্যার পক্ষে, বিবাহের বিধি দেওয়া হইয়াছে; তখন, তন্নি স্বলে, কি রূপে বাঙ্গতা কন্যার বিবাহ হইতে পারে। মনে কর, কেহ, সজাতীয় স্থির করিয়া, কোনও ব্যক্তিকে কন্যার বাগান করিয়াছে; পরে জানা গেল, সে ব্যক্তি অঙ্গজাতীয়; এক্ষণে, ঐ বাদত কন্যাকে সেই অন্যজাতীয় পাত্রে দেওয়া যাইবেক; কিংবা, সজাতীয় অন্য পাত্র স্থির করিয়া, তাহার সহিত বিবাহ দেওয়া যাইবেক; অথবা, খুড় মহাশয়ের অভ্রান্ত সিদ্ধান্ত অনুসারে, বাঙ্গত্তা কন্যাকে যে পাঁচ স্কুলে অন্য পাত্রে দিবার বিধি আছে, এ সে পাঁচের অন্তর্গত স্থল নহে; সুতাং, তাহার আর বিবাহ হইবার পথ নাই; এজন্য, তাহাকে যাবজ্জীবন ব্রহ্মচর্য করিতে হইবেক। এই সন্দেহভঞ্জনের জন্য, খুড় মহাশয়ের নিকট এই লক্ষীছাড়া প্রশ্নটি অগত্যা উপস্থিত করিতে হইল।

পঞ্চম প্রশ্ন।

বাচাদত্তেতি কাশ্যপবচনেন বাগ্দত্তাদীনাং স্ত্রীণাং বিবাহকরণে নিন্দাশ্রবণাৎ তৎপরিণয়নে কেমপি প্রবৃত্তির্ন স্যাৎ অতঃ সম্পূর্ণ। আপদুপস্থিত তত্রৈব পরাশরবচনৎ প্রতিপ্রসববিধায়কম।

বাচাদত্তা এই কাশ্যপবচনে বাগ্দত্তা প্রভৃতি স্ত্রীদিগের বিবাহকরণে নিন্দাকীর্ত্তন আছে, এজন্য তাহাদিগকে বিবাহ করিতে কাহারও প্রবৃত্তি না হইতে পারে, সুতরাং সম্পূর্ণ আপঙ্গ উপস্থিত। পরাশরবচন সেই বিষয়েই বিশেষবিধি হইতেছে।

খুড় মহাশয়ের উপসংহারভাগের এই অংশটি দেখিয়া, আমার সন্দেহ হইতেছে, “যখন আসরে নামিব, তোমাদের হইয়াই নাচিব ও গাইব’, এই আশয় দিয়া, নলডাঙ্গার চেনা বাহাদুরের নিকট হইতে, তৈলবট লওয়া হইয়াছে। যাহা লিখিয়াছেন, তাহা দ্বারা, কৌশল করিয়া, আঁতিকুল, বৈষ্ণবকুল, উভয় রক্ষা করা হইয়াছে। প্রথমতঃ, বিধবাবিবাহ শাস্ত্রবিরুদ্ধ ও অসম্ভব, এইরূপ লিখিয়া, মতী যশোহহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা দেবীর মন রাখিয়াছেন; আর, উপরি নির্দিষ্ট অংশটুকু লিখিয়া, নলডাঙ্গার চেনা বাহাদুরের মান রাখিয়াছেন। এক্ষণে, স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে, বিধবার বিবাহপক্ষে শ্রীমা বিদ্যায়তু খুড়র সম্পূর্ণ আন্তরিক টান আছে, অন্য পক্ষে কেবল মৌখিক। কারণ, বিবাহের পক্ষে যাহা লিখিয়াছেন, তাহা অকাট্য; বিবাহের বিপক্ষে যাহা লিখিয়াছেন, তাহা টেকসই নয়। পরাশরুবচন বাঙ্গতা কন্যার বিষয়ে, এই যে কথা বলিয়াহেন, সে ছেলেখেলা মাত্র। কারণ, এ দিকের চন্দ্র ও দিকে উঠিলেও, পরাশরবচন বাত্তাবিষয়ক, ইহা কদাচ সার্য্য হইবার নহে। আর, এ দিকে, কাশ্যপছনে বাঙ্গা প্রভৃতি স্ত্রীদিগের বিবাহের যে নিষেধ আছে, সেই নিষেধ রহিত করিয়া, পরাশর বিবাহের বিশেষ বিধি দিয়াছেন, এই যে নির্দেশ করিয়াছেন, ইহা অকাট্য। নলডাঙ্গার চেনা বাহাদুরকে, প্রথমতঃ, লক্ষ্মীছাড়া ও বক্কেশ্বর ঠাহরাইয়াছিলাম। এক্ষণে দেখিতেছি, ইনি এক জন খুব তুখড় সিয়ান হোকরা; বিদ্যারত্ন খুড়কে হাত করিয়া, ভিতরে ভিতরে, কেমন কাজ গুছাইয়া লইয়াছেন। অথবা, তিনি দেখিতে যেরূপ শিষ্ট ও শান্তুপ্রকৃতি, তাহাতে এটি তাঁহার বুদ্ধির খেলা বলিয়া বোধ হয় না। মজুমদার বলিয়া তাঁহার যে একটি বেদড়া মন্ত্রী আছেন, এটি তারই তেঁদড়ামি।

অমায়িক, উদারচিত্ত, শ্রীমান্ বিদ্যারত্ন খুড় মহাশয় লিখিয়াছেন, কাশ্যপবচনে বাগ্দত্তা প্রভৃতি স্ত্রীদিগের বিবাহে নিন্দাকীর্ত্তন আছে। সুতরাং, কেহ তাহাদিগকে বিবাহ করিতে সম্মত হইবেক না; পরাশর সেই বিষয়েই বিশেষ বিধি দিয়াছেন; অর্থাৎ, বাদত্ত প্রভৃতির বর ক্লীব প্রভৃতি স্থির হইলে, তাহাদের পুনর্বার বিবাহ হইতে পারিবেক, পরাশর এই বিধি দিয়াছেন। খুড় মহাশয়ের উল্লিখিত কাশ্যপচন এই;—

সপ্ত পৌনর্ভবাঃ কন্যা বর্জনীয়াঃ কুলাধমাঃ।

বাচাদত্তা মনোদত্তা কৃতকৌতুকমঙ্গল॥

উদকস্পর্শিতা যা চ যা চ পাণিগৃহীতিকা।

অগ্নিৎ পরিগতা যা চ পুনর্ভুপ্রভবা চ যা।

ইত্যেতাঃ কাশ্যপেনোক্তা দহন্তি কুলমগ্নিবৎ॥

বাচদত্তা অর্থাৎ বাক্য দ্বারা যাহাকে দান করা গিয়াছে, মনোদ অর্থাৎ মনে মনে যাহাকে দান করা গিয়াছে, কৃতকৌতুকমঙ্গলা অর্থাৎ যাহার হস্তে বিবাহকাল বম করা গিয়াহে, উদকস্পর্শিত অর্থাৎ যাহাকে যথাবিধি দান করা গিয়াছে, পাণিগৃহীক্তি অর্থাৎ যাহার পাণিগ্রহণ যথাবিধি সম্পন্ন হইয়াছে, অগ্নিং পরিগ অর্থাৎ যাহার কুশণ্ডিকা যথাবিধি নিষ্পন্ন হইয়াছে,

পুনর্ভুপ্রভর অর্থাৎ পুঙুর গর্ডে যাহার জন্ম হইয়াছে; কুলের অধই সা পেইনর্ভব কন্যা বর্জন করিবেক। এই সাত কাশ্যপোক্তা কন্যা, বিবাহিতা হইলে, অগ্নির ন্যায়, কুল দগ্ধ করে।

খুড় মহাশয়ের মীমাংসা অনুসারে, এই কাশ্যপবচনে যাহাদের বিবাহ নিন্দিত ও নিষিদ্ধ হইয়াছিল, পরাশর, অমুদ্দেশ প্রভৃতি পাঁচ স্কুলে, তাহাদের বিবাহের বিধি দিয়াছেন। সুতরাং, অনুদ্দেশ প্রভৃতি পাঁচ স্থলে, বাচাদস্তা, মনোদতা, কতকৌতুকমঙ্গল, উদকস্পর্শিতা, পানিগৃহীতিকা, অগ্নিং পৱিগতা, পুনর্ভুপ্রভবা, এই সাত প্রকার ফন্যার বিবাহ বিধিসিদ্ধ হইতেছে। তন্মধ্যে, উদকস্পর্শিত অর্থাৎ যাহাকে যথাবিধি দান করা গিয়াছে, পাণিগৃহীতিকা অর্থাৎ যাহার পাণিগ্রহণ যথাবিধি সম্পন্ন হইয়াছে, অগ্নিং পরিগতা অর্থাৎ যাহার কুশণ্ডিকা যথাবিধি নিষ্পন্ন হইয়াছে, এই তিন কন্যাকে বিবাহিতা বলিয়া গণ্য করিতে হইবেক। এই তিন কন্যার পতি মৃত, পতিত, প্রব্রজিত প্রভৃতি স্থির হইলে, খুড় মহাশয়ের মীমাংসা অনুসারে, পরাশরের বিশেষবিধির বলে, তাহাদের বিবাহ হইতে পারিতেছে। সুতরাং, বিদ্যাসাগরের ব্যবস্থার সহিত, খুড় মহাশয়ের মীমাংসার, আর কোনও অংশে, অনুষত্র প্রভেদ বা বৈলক্ষণ থাকিতেছে না। এক্ষণে সকলে দেখুন, খুড় মহাশয়, কেমন চালাকি খেলিয়াছেন। শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা দেবীর দিব্য চক্ষে ধুলিমুষ্টি প্রক্ষেপ করিয়া, নলডাঙ্গার তৈলবটের সার্থকতা সম্পাদন করিয়াছেন কি না। যে আহামক মহামহোপাধ্যায়, বিদ্যাবাগীশ পুড়দের বাকে বিশ্বাস ও ব্যবস্থায় আস্থা করেন, তাঁর বাপ নির্বংশ।

ষষ্ঠ প্রশ্ন।

যে প্রসিদ্ধ পরিবারে, পরম পবিত্র গোমাংস প্রভৃতি পাক করিয়া দিবার নিমিত্ত, বিচক্ষণ মুসলমান পাচক, আর বিশুদ্ধ শূকরমাংস পাক করিয়া দিবার নিমিত্ত, উপযুক্ত হাড়ি পাচক নিযুক্ত থাকে, সেই পবিত্র পরিবারের অতি পবিত্র। পুরোহিতকুলে দোষম্পৰ্শ হইতে পারে কি না।

যদিও বিধবাবিবাহের সহিত, ঈদৃশ প্রশ্নের কোনও সংঅব নাই, তথাপি, অনেক দিন অবধি, এই বিষয়টি জানিবার নিমিত, ' আমরা অনেকে অতিশয় উৎসুক আছি। এজন্য, এই সুযোগে, এই পরম সুন্দর কর্ণসুখকর প্রশ্নটি অমায়িক, উদারচিত্ত, নদিয়ার চাঁদ খুড় মহাশয়ের টুকটুকে রাঙা, পায়ে, প্রগাঢ় ভক্তিযোগ সহকারে, চন্দনচর্চিত পুস্পাঞ্জলি স্বরূপ, সমর্পিত হইল।

এই কয় প্রশ্নের উত্তর পাইলেই, বিদ্যারত্ন ও কপিরত্ন, উভয় ধুড় মহোদয়ের সঙ্গে, নানা রঙ্গে, হুড়হুড়ি ও গুঁত গুতি আরম্ভ করিব। প্রশ্নের উত্তর পাইলে, হাম ও ফোৎ উপস্থিত করিবেক, এমন স্থলে, উত্তর না দেওয়াই ভাল, এই ভাবিয়া, চালাকি করিয়া, লেজ গুটাইয়া বসিয়া থাকিলে, আমি হাড়িব না। আমি খুড়র বড় খাতির রাখি, এজন্য প্রসনোহাকে এক মাস মিয়াল দিতেছি; এই মিয়া মধ্যে উত্তর না পাইপে, সঙ্কল্পিত তুমুল কাণ্ড অবধারিত উপস্থিত করিব। যদি না করি, খুড়র মাথা খাই।

যদি বলেন, তোমার ঠিকানা জানি না, উত্তর লিখিয়া কোথায় পাঠাইব। তাহার উত্তর এই, আপনি, যাঁহাদের মন যোগাইবার নিমিত্ত, এই দেবদুর্লভ ব্যবস্থা লিখিয়াছেন, আমার প্রশ্নের উত্তর লিখিয়া, সেই সাধুসমাজের অগ্রগণ্য, বিদকুটে ধন্য, বেয়াড়া মান্য, অসামান্যবুদ্ধিবিদ্যাসম্পন্ন মহাপুরুষদিগের নিকটে পাঠাইবেন। তাঁহারা যখন, দেশের ধর্ম্মরক্ষার জন্য, কোমর বাঁধিয়াছেন, তখন আপনকার উত্তর মুদ্রিত ও প্রচারিত করিতে কখনই পরান্মুখ হইতে পারিবেন না, যদি এতাদৃশ দেশহিতকর বিষয়ে পরান্মুখ হন, তাহা হইলে, তাঁহারা, নিঃসন্দেহ, মহাপাতকগ্রস্ত ও অন্তে অবধারিত অধোগতি প্রাপ্ত হইবেন। যদি না হন, আমি যেন উচ্ছন্ন যাই।

খুড় মহাশয়ের এই অপূর্ব্ব ব্যবস্থা দেখিয়া, কতকগুলি অবোধ, অর্ব্বচীন, বানরকল্প, অল্পদর্শী লোকে বলিতে আরম্ভ করিয়াছে,

হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র পাত্র,

যেমন পোড়ামুখ দেবতা তেমনই ঘুটের ছাই নৈবেদ্য।

অর্থাৎ, শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা যেমন অপূর্ব্ব বিচারালয়, শ্রীমান্ বিদ্যারত্ব খুড় তদুপযুক্ত ব্যবস্থাদাতা। তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ আহলাদ করিয়া, আমার কাছও, ঐরূপ নানা কথা, নানা রঙ্ চড়াইয়া, বলিতে আরম্ভ করিয়াছিল। আমি কিন্তু তাহাদিগকে দূর দূর করিয়া তাড়াইয়া দিয়াছি। ইহাতে, শ্রীমান নদিয়ার চাঁদ খুড় মহাশয়, অক্লেশে, বুঝিতে পারিবেন, উপযুক্ত ভাইপো খুড়য় রয়ে দরদের কি না।

ইহা সত্য বটে, এ দেশে খুড় ভাইপোয় মুখদেখাদেখি থাকে না; সর্ব্বদা ই দ্বেষাঘেষি, গালাগালি, মারামারি, ফাটাকাটি, বলিতে লজ্জা উপস্থিত হয়, জুতাপেটাপেটি পর্যপ্ত চলিয়া থাকে। খুড় যেমন হউন, ' আমি কিন্তু পুড় তেমন লীড়া ভাইপো নই। যদি সেরূপ লক্ষীছাড়া ভাইপো হইতাম, তাহা হইলে উপযুক্ত” এই দেলজ বিশেষণ লাভ করিতে পারিতাম না, এবং খুড় মহাশয়েরাও, এফুল চিত্তে, অকৃত্রিম ভক্তিবতরে, আমার পর পজি, কমনীয়, কোমল চরণকমলে, সচন্দন পুষ্পাঞ্জলি প্রদানে তৎপর ও অগ্রসর হইতেন না।

ফোনও অপরিহার্য কার্য্যবিশেষের অনুরোধে, আমি, কিঞ্চিৎকালের নিমিত্ত, সভামণ্ডপের বহির্দেশে গিয়াছিলাম। আবশ্যক কার্যের সমাধা করিয়া, প্রত্যাগমন পূর্ব্বক, শুনিতে পাইলাম, এক মহামহোপাধ্যায় বিদ্যভুড়ভুড়ি বিদ্যাবাগীশ খুড় বড় সুন্দর বক্তৃতা করিয়াছেন। হায়! হায়! কেন আমি এমন সময়ে উপস্থিত ছিলাম না, এই বলিয়া, মাথায় চাপড়াইয়া, যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইয়া, বক্তৃতার প্রশংসা কারী ব্যক্তিবর্গের নিকট, বিনয়বাক্যে প্রার্থনা করিলাম, ঐ বক্তৃতার স্কুল সর্ম্ম ও তাৎপর্য কি, আপনারা অনুগ্রহ করিয়া বলুন। তাঁহারা, মদীয় অনুরোধের বশবর্ত্তী হইয়া, অতি সংক্ষেপে, এই মাত্র কহিলেন, বিদ্যাবাগীশ খুড় বলিয়াছেন, বিধবাবিবাহসংসৃষ্ট লোক-সকল বিজাতক, অর্থাৎ তাহাদের জন্মের ব্যত্যয় আছে; এবং, সভাস্থ সত্য মহোদয়গণ, তদীয় চিত্তহারিণী বক্তৃতা শ্রবণে চমৎকৃত ও পুলকিত হইয়া, বক্তাকে মুক্তকণ্ঠে শতসহস্র সাধুবাদ প্রদান কয়িয়াছেন। এই কথা শুনিয়া, কি কারণে বলিতে পারি না,আমি কিয়ৎ ক্ষণ স্তব্ধ ও হতবুদ্ধির মত হইয়াছিলাম; অনন্তর, স্থিরচিত্তে, সকল বিষয়ের সবিশেষ পর্য্যালোচনা করিয়া, উপলব্ধি করিতে পারিলাম, যদি যথার্থই ঐরূপ বিদ্যাপ্রকাশ করিয়া থাকেন, তাহা হইলে, বা বিদ্যাবাগীশ খুড় মহাশয়, নিঃসংশয়, প্রকৃত পণ্ডিতপদবাচ্য। কারণ, নীতিশাস্ত্রে নিরুপিত আছে,

আত্মবৎ সর্ব্বভূতেষু যঃ পশ্যতি স পণ্ডিতঃ।

যিনি সকলকে আপনার মত দেখেন, তিনি পণ্ডিত।

যাহা হউক, ঈদৃশ অভাবনীয়, অচিন্তনীয় পাণ্ডিত্যপ্রকাশ দর্শনে, অনির্ব্বচনীয় প্রীতিরসে অভিষিক্ত হইয়া, উপযুক্ত ভাইপো, কায়মনোবাক্যে, প্রার্থনা, ও আশীর্ব্বাদ করিতেছেন, এই সুশীল, সুবোধ, সুসন্তান, সদ্বক্তা, সবিবেচক, বিদ্যাবাগীশ খুড়, চিরজীবী, চিরসুখী, ও চিরস্মরণীয় হইয়া, শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা দেবীর প্রিয় পোষ্য পুত্র অবতারবর্গের অবিশ্রান্ত অকৃত্রিম আনন্দবর্দ্ধন করুন।

ইতি ব্রজবিলাসে মহাকাব্যে কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য কৃতৌ

চতুর্থ উল্লাস।

পরাশরভাষ্য ও নির্ণয়সিন্তু ধৃত কাত্যায়নরচন।

মহাভারত। ভীষ্মপর্ব্ব। ৯১ অধ্যায়।

ব্রাহ্মো দৈবন্তখৈবার্য প্রাজাপত্যন্তথাসুরঃ।

গান্ধর্ব্বো রাক্ষসশ্চৈব পৈশাচশ্চাষ্টমোঽধমঃ॥ মনু। ৩। ২১।

ব্রাহ্মো বিবাহ আহূয় দীয়তে শক্ত্যলঙ্কৃতা। যাজ্ঞবল্ক্য। ১। ৫৮।

যজ্ঞস্থায়র্ত্বিঙ্গে দৈরঃ। যাজ্ঞবল্ক্য। ১। ৫৯।

আদায়ার্বন্ত গোদ্বয়ম্‌। যাজ্ঞবল্ক্য। ১। ৫৯।

ইত্যুক্ত্ব্য চরতাং ধর্ম্ম সহ যা দীয়তেহর্থিনে। স কায়ঃ। যাজ্ঞবল্ক্য। ১। ৬০।

আসুরো দ্রবিণাদাসাৎ। যাজ্ঞবল্ক্য॥ ১। ৩১।

গান্ধর্ব্বঃ সময়ান্মিথঃ। যাজ্ঞবল্ক্য। ১। ৬১।

রাক্ষসো যুদ্ধহরণাৎ ১। ৬৯।

পৈশাচঃ কন্যকাচ্ছলাৎ। যাজ্ঞবল্ক্য। ১। ৬১।

দ্বয়োঃ সকানম্নোর্মাতাপিতৃহিতো যোগো গান্ধর্ব্বঃ। বিষ্ণু। ২৪ অধ্যায়।

নারদসংহিতা, দ্বাদশ বিবাহপদ।

উদ্বাহুতত্ত্বঃত।

তৃতীয় উল্লাস

তৃতীয় উল্লাস।

কিছু দিন হইল, নলডাঙ্গার চেঙনা রাজা বিধবার বিবাহ দিতে আরম্ভ করিয়াছেন। বিধবাবিবাহ শাস্ত্রনিষিদ্ধ কর্ম ও দেশাচারবিরুদ্ধ ধর্ম্ম; তিনি সে বিষয়ে হাত দিয়াছেন; এজন্য, তাঁহাকে জব্দ করা আবশ্যক বিবেচনা করিয়া, শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভার ধর্ম্মপরায়ণ বিচক্ষণ সভ্য মহোদয়েরা, নবদ্বীপের প্রধান স্মার্ত্ত শ্রীমান্ ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন প্রভৃতি লম্বোদর খুড় মহাশয়দিগকে, সভায় আহ্বান করিয়াছিলেন। বিদ্যারত্ন খুড়, বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসিদ্ধ নহে, এই মর্মে এক ব্যবস্থা লিখিয়া, সমবেত সভ্যগণ সমক্ষে, পাঠ করিয়াছেন। ঐ ব্যবস্থা দেখিয়া, আমি যৎপরোনাস্তি আহলাদিত ও চমৎকৃত হইয়াছি। ব্যবস্থা দিবার সময় বচন কচন দেখা যায় না, পূর্ব্বে তাঁহার চাঁদমুখে এই যে অতি প্রশংসনীয় কমনীয় সাধু ভাষা শুনিয়াছিলাম, ঐ ব্যবস্থা সর্ব্বাংশে তদনুষায়িনী হইয়াছে, ইহা দেখাইবার নিমিত্তই, আমার এই উদ্যোগ ও আড়ম্বর।

সর্ব্বপ্রধান সমাজের সর্ব্বপ্রধান স্মার্ত্ত শ্রীমান্ বিদ্যারত্ন খুড়, বিধবাবিবাহ শাস্ত্রবিরুদ্ধ কর্ম্ম, ইহা প্রতিপন্ন করিবার নিমিত্ত, কোমর বাঁধিয়াছেন। এ বিষয়ে বিদ্যাসাগরের প্রচারিত পুস্তক খানি, একবার, মন দিয়া, আগাগোড়া দেখা তাঁহার পক্ষে নিতান্ত আবশ্যক ছিল। ইহা যথার্থ বটে বিদ্যাসাগর, তাঁহাদের মত, বেহুদা পণ্ডিত নহেন; তাঁহাদের মত, বেয়াড়া ধৰ্মনিষ্ঠ নহেন; তাঁহাদের মত, সাধুসমাজের অনুগতও আজ্ঞানুবর্ত্তী নহেন; তাঁহাদের মত, সাধুসমাজের অভিমত নির্ম্মল সনাতন ধর্ম্মের রক্ষা বিষয়ে তৎপর ও অগ্রসর নহেন। এমন কি, পবিত্র সাধুসমাজের প্রাতঃ স্মরণীয়, বহুদর্শী, বিচক্ষণ চাঁই মহোদয়েরা তাঁহাকে খৃষ্টান পর্যন্ত বলিয়া থাকেন। সুতরাং, তিনি শ্রীমান্ ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন খুড় প্রভৃতি, সাধুসমাজে প্রতিষ্ঠিত, মহামহোপাধ্যায়, মহাপুরুষদিগের সঙ্গে গণনীয় হইবার যোগ্য ব্যক্তি নহেন। কিন্তু, ইহাও দেখিতে ও শুনিতে পাওয়া যায়, বিদ্যাসাগর লিখিতে পড়িতে এক রকম বেস মজবুত; যখন যাহা লিখেন, তাহা সহসা কেহ অগ্রাহ্য করিতে পারেন না। যাঁহাদিগকে সকলে, বাস্তবিক ভাল লোক বলিয়া, প্রশংসা করিয়া থাকেন, তাদৃশ পণ্ডিতগণের মুখে শত সহস্র বার শুনিয়াছি, বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ বিষয়ে যে পুস্তক লিখিয়াছেন, তাহাতে দোষারোপ করিবার পথ নাই। বিদ্যারত্নের ব্যবস্থা দেখিয়া, স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে, ঐ অপবিত্র পুস্তক, কস্মিন্ কালেও, তাঁহার পবিত্র দৃষ্টিপথে পতিত হয় নাই। অথবা, তিনি সর্ব্বপ্রধান সমাজের সর্ব্বপ্রধান স্মার্ত্ত। স্মৃতি শাস্ত্রে তাঁহার অবিদিত কি আছে। সমুদায় স্মৃতি শাস্ত্র, তাঁহার দিব্য চক্ষুর উপর, সর্ব্ব ক্ষণ, নৃত্য করিতেছে। এমন স্থলে, স্মৃতি শাস্ত্র সংক্রান্ত কোনও বিষয়ে, বিদ্যাপ্রকাশ আবশ্যক হইলে, বিদ্যাসাগরের পুস্তক চুলায় যাউক, কোনও পুস্তক দেখিবার কোনও দরকার করে না। ধন্য সর্ব্বপ্রধান সমাজ নবদ্বীপ! ধন্য ক্ষণজন্মা ব্রজনাথ! ধন্য দেবদুর্লভ বিদ্যারত্ন উপাধি!

আমি, এ যাত্রায়, শ্রীমান্ বিদ্যারত্ন খুড়র সঙ্গে রীতি মত বিচার করিতে প্রবৃত্ত নহি। যদি কোনও মুখআলগা লোক, অগ্র পশ্চাৎ না ভাবিয়া, অম্লান বদনে, বলিয়া বসেন, তবে তুমি ভয় পাইয়াছ। তাঁহার প্রতি আমাযর বক্তব্য এই, আমি বড় ডাঙপিটে, কোনও কারণে ভয় পাইবার ছেলে নই। উপযুক্ত ভাইপো, খুড়র সঙ্গে, বিচার করিতে পিছপাঁও হইবেন, যদি কেহ, ভুল ভ্রান্তিতেও, সেরূপ ভাবেন, তিনি যত বড় ধনী, যত বড় মানী, যত বড় বিদ্বান্, যত বড় বুদ্ধিমান্, যত বড় হাকিম, যত বড় আমলা, যত বড় তেঁদড়া, যত বেদড়া বেড় হউন না কেন, তাঁহার মনোহর গাল, বসরাই গোপাপের মত টুকটুকেই হউক, আর রামছাগলের মত চাঁপদাড়িতে সুসজ্জিত ও সুশোভিতই হউক, ঠাস ঠাস করিয়া, দশ বার জোড়া চড় মারিয়া, সেই বেআদবকে, চিরকালের জন্যে, দুরন্ত করিয়া দিব। ইহার জন্যে যদি, শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্মরক্ষিণী সভা দেবীর সূক্ষ্ম বিচারে, ও অকাট্য ফয়তা অনুসারে, ক্রমান্বয়ে ছয় মাস, ফাঁসি যাইতে হয়, তাহাও মঞ্জর। আমি যে কেবল মুখে আক্ষালন করিতেছি, কেহ যেন তাহা না ভাবেন। ইতিপূর্ব্বে, শ্রীমান্ তর্কবাচস্পতি খুড়র সঙ্গে কেমন হুড়হুড়ি করেছি, তাহা কি আপনারা জানেন না, না কখনও শুনেন নাই। এ যাত্রায়, খুড়র কাছে দুই চারিটি প্রশ্ন করিব। ঐ সকল প্রশ্নের উত্তর পাইলে; রীতিমত বিচারে প্রবৃত্ত হইব। যদি উপেক্ষা করিয়া, অথবা ভয় পাইয়া, অথবা আর কোনও নিগুঢ় কারণের বশবর্ত্তী হইয়া, খুড় মহাশয় উত্তর দানে বিমুখ হন, দুও দুও বলিয়া, হাততালি দিয়া, ইয়ারবর্গ লইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ, আনন্দ মৃত্য করিব পরে, রীতিমত বিচারে প্রবৃত্ত হইয়া, মড় মড় করিয়া, খুড়র ঘাড় ভাঙিয়া ফেলিব।

যদি বলেন, খুড়র ঘাড় ভাঙিলে, খুড় মরিয়া যাইবেন। তাহার উত্তর এই, খুড়র ঘাড় বড় মজবুদ, সহজে ভাঙে, কার সাধ্য। আর, যদি ভাঙিয়াই যায়, তাহাতে আমি নাচার। আমি মনকে বুঝাইব, খুড়র কপালে লেখা ছিল, উপযুক্ত ভাইপোর হস্তে সদগতি হইবেক, তাহাই ঘটিয়াছে; বিধিনির্ব্বন্ধ অতিক্রম করে, কার সাধ্য। আর, ইহাও বুঝিয়া দেখা আবশ্যক, যদি, ভাগ্য ক্রমে, উপযুক্ত ভাইপোর চেষ্টা ও যত্নে, খুড়র সদগতিলাভ হয়, তাহাতে উতয়েরই প্রশংসা, উভয়েরই জন্ম সার্থক। যদি বলেন, খুড়র ঘাড় ভাঙ্গিলে তোমার পাপ জন্মিবে। তাহার উত্তর এই, পাপের জন্য আমার তত দুর্ভাবনা নাই। এ দেশে কোন কর্ম্ম করিলে, পাপস্পর্শ বা জাতিপাত ঘটিয়া থাকে। ছেলে ৰেলায়, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের এবং পবিত্র-সাধুসমাজের বিচক্ষণ বহুদর্শা চাঁই মহোদেয়দিগের মুখে, কখনও কখনও শুনিতাম, অপেয়পানে, অতক্ষভক্ষণে, অগম্যাগমনে পাপম্পৰ্শ ও জাতিপাত হয়। এখন, সে সকল কথা ভণ্ডামি বা প্রতারণা, অথবা মিছা ভয় দেখান বা পরিহাস করা মাত্র বোধ হইতেছে। পাপজনক রা জাতিপাতকর হইলে, এ দেশের বিশুদ্ধ সাধুসমাজে, ঐ সকল কর্ম্মের অনুষ্ঠান বা অনুমোদন চর্ম্মচক্ষে দেখা যাইত না। সচরাচর দৃষ্ট হইতেছে, সুরাপানে পাপ ও জাতিপাত হেইতেছে না; সাহেবদের মত খানা খাইলে পাপস্পর্শ ও জাতিপাত হইতেছে না; বিষয়াপন্ন লোকে, গাড়ীতে হাড়ি ও মুসলমান পাচক নিযুক্ত করিয়া, গোমাংস, শূকরমাংস প্রভৃতি বিশুদ্ধ বস্তু পাক করাইয়া খাইলে, পাপস্পর্শ ও জাতিপাত হইতেছে না; বেশ্যালয়ে, সদ্য মাংস সেবন পুর্ব্বক, আমোদ আহলাদ করিয়া, রাত্রি কাটাইলে, পাপস্পর্শ ও জাতিপাত হইতেছে না। ফলকথা এই, এ দেশে অপেয়পানে, অভক্ষ্যভক্ষণে, অগম্যাগমনে পাপস্পর্শ ও জাতিপাত হয়, তাহার কোনও নজির বা নিদর্শন পাওয়া যায় না। এমন স্থলে, উপযুক্ত ভাইপো খুড়র ঘাড় ভাঙিলে, পাপস্পর্শ বা জাতিপাত হইবেক, ইহা, কোনও ক্রমে, আমার, অন্তঃকরণে লইতেছে না। যদিই, উপযুক্ত ভাইপোর কপালগুণে, খুড়র ঘাড় ভাঙিলে পাপস্পর্শ ও জাতিপাত ঘটে, তাহার কি আর নিষ্কৃতি নাই। খুড়র ঘাড় ভাঙিলে, হয় গোহত্যার, নয় ব্রহ্মহত্যার, পাতক হইবেক। শুনিয়াছি, এ উভয়েরই যথোপযুক্ত প্রায়শ্চিত্তবিধান আছে। যদি স্পষ্ট বিধান না থাকে, বিদ্যাবাগীশ খুড় মহাশয়েরা চিরঞ্জীবী হউন, মনের মত তৈলবট সামনে ধরিলে, তাঁহারা একবারে অসামাল ও দিগ্বিদিক‍্জ্ঞানশূন্য হইয়া পড়িবেন, এবং প্রফুল্ল চিত্তে, হয় বচন গড়িয়া, নয় মজুদ বচনের ঘাড় ভাঙিয়া, অম্লান বদনে, নিখরকিচ ব্যবস্থা লিখিয়া দিবেন; তাহা হইলেই, সাধুসমাজে আর কোনও ওজর আপত্তি থাকিবেক না।

এ স্থলে উল্লেখ করা নিতান্ত আবশ্যক, ‘এ দেশে কোন কর্ম্ম করিলে; পাপস্পর্শ ও জাতিপাত হইয়া থাকে’, ইতিপূর্ব্বে, সামান্যকারে, এই যে নির্দ্দেশ করিয়াছি, তাহা প্রকৃত প্রস্তাবে ঠিক হয় নাই। কারণ, বিধবা বিবাহ দিলে, বিধবা বিবাহ করিলে, অথবা বিধবাবিবাহের সংশ্রবে থাকিলে, পাপস্পর্শ ও জাতিপাত হইয়া থাকে। এজন্যই, তাদৃশ ব্যক্তিরা পবিত্র সাধুসমাজে পরিগৃহীত হইতেছে না। সাধুসমাজ কাহাকে বলে, ঘটকচূড়ামণি শ্রীমান্ জনমেজয় বিদ্যাবাগীশ খুড়কে জিজ্ঞাসা করিলে, সবিশেষ জানিতে পারিবেন। যদি বলেন, ইনি কে। ইনি এক্ষণে শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা দেবীর এক প্রধান নায়ক। আগে, ইঁহাকে, এক জন আধকামারিয়া উকীল বলিয়া জানিতাম; এখন দেখিতেছি, ইনি সর্ব্ব শাস্ত্রের অদ্বিতীয় ভূঁইফোঁড় মীমাংসাকর্ত্তা; শ্রীমান্ ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন, তথা শ্রীমান্ ভুবনমোহন বিদ্যারত্ন, তথা শ্রীমান্ রামধন তর্ক পঞ্চানন প্রভৃতি প্রসিদ্ধ প্রাচীন খুড় মহাশয়েরা আর ইঁহার কাছে কলিকা পান না।

কালে ক্কিং বা ন দৃশ্যতে।

কালে কি বা না দেখা যায়।

যাহা হউক, এই প্রশংসনীয় দেশের অতি প্রশংসনীয় সাধুসমাজের অভিমত, নিরতিশয় প্রশংসনীয়, নির্মল, সনাতন ধর্ম্মের অপার মহিমা!!! বোধ করি, এমন নিরেট, টনটনিয়া, নিখিরকিচ ধর্ম্ম ভুমণ্ডলে আর নাই। ইঁহার ক্ষমাগুণ ও হজমশক্তি অতি অদ্ভুত। ইনি অপেয়পান, অভক্ষ্যভক্ষণ, অগম্যাগমন. প্রভৃতি অনায়াসে ক্ষমা করিতেছেন, হজম করিতেছেন। এইরূপ অদ্ভূতক্ষমতাশালী হইয়াও, কি কারণে ঠিক বলিতে পারি না, কেবল একটি অকিঞ্চিৎকর বিষয়ে, অর্থাৎ বিধবাবিবাহে, ইনি কিঞ্চিত অংশে দুর্ব্বলতা ও অক্ষমতা দেখাইতেছেন। ইহাতে কেহ কেহ বলিতে পারেন, সাধুসমাজের অভিমত নির্ম্মল সনাতন ধৰ্ম লোক ভাল, তার সন্দেহ নাই। কিন্তু, তিনি বড় পক্ষপাতী; পুরুষজাতির উপর, তিনি যত সদয়, স্ত্রীজাতির উপর, তিনি তত সদয় নহেন। আমার বিবেচনায় কিন্তু, তাঁহার উপর এ অপবাদ প্রবর্ত্তিত হইতে পারে না। কারণ, তিনি স্ত্রীজাতির উপরেও বেয়াড়া সদয়। দিব্য চক্ষে ঘর ঘর দেখিয়া লও, তিনি স্ত্রীজাতির ব্যভিচার, ভ্রূণহত্যা, বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন প্রভূতি, অকাতরে, বিনা ওজরে, ক্ষমা করিতেছেন, হজম করিতেছেন। তবে, তাহাদের পুনর্ব্বার বিয়ে, যে যৎকিঞ্চিৎ গোলযোগ করিতেছে, তাহা, ধরাধরি করিতে গেলে, একপ্রকার দোষের কথা বটে। আমি কিন্তু, এই সামান্য দোষ ধরিয়া, তাঁহার উপর রুষ্টিতে চাই না। কারণ, ইহা সর্ব্ববাদিসম্মত স্থির সিদ্ধান্ত

এক আধারে সকল গুণ বর্তে না;

এবং সুপ্রসিদ্ধ বিচারসিদ্ধ কথাও আছে,

গাধা সকল আর বইতে পারেন,

কেবল ভাতের কাঠিটি সইতে পারেন না।

এই সমস্ত অনুধাবন করিয়া দেখিলে, সাধুসমাজের অভিমত নির্ম্মল সনাতন ধর্ম্মের এই আংশিক দুর্ব্বলতা বা পক্ষপাতিতা দেখিয়া, অসন্তুষ্ট হওয়া কদাচ উচিত নহে। এ দেশের সাধুসমাজের সম্বুদ্ধি, সদ্বিবেচনা, সৎপ্রবৃত্তি প্রভৃতির পূর্ব্বপর যেরূপ অপুর্ব্ব পরিচয় পাওয়া যাইতেছে, এবং, সেই প্রশংসনীয় সাধুসমাজের অভিমত নির্ম্মল সনাতন ধর্ম্মের অপার মহিমা, অহরহঃ, যেরূপ প্রত্যক্ষ হইতেছে, তাহাতে এ উভয়কে যুক্তকণ্ঠে অকপট সাদুবাদ প্রদান করা সর্ব্বদেশীয় সর্ব্ববিধ ব্যক্তি মাত্রের সর্ব্বতোভাবে অবশ্যকর্ত্তব্য কর্ম্ম; যিনি না করিবেন, তিনি, শ্রীমর্তী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা দেবীর অকাট্য কয়তা অনুসারে,ধর্ম্মদ্বারে পতিত হইবেন।

যাঁহারা আমাকে জানেন, তাঁহারা মনে করেন, আমি বড় চতুর, চালাক, বুদ্ধিক্ষ্ণীবী জন্তু। তাঁহারা কেন আমাকে ওরূপ ভাবেন, তা আমি ঠিক জানি না। বোধ হয়, আমি বড় ফাজিলচালাক, তাঁহাদের চক্ষে ধুলিপ্রক্ষেপ করিয়া, অন্ধ করিয়া রাখিয়াছি, তাই তাঁহারা ওরূপ মনে করেন, স্পষ্ট কথা বলিতে গেলে, আমি বিদ্যাবাগীশ খুড়দের মত, গর্দ্দভচুড়ামণি; নতুবা, অকারণে, এত ফেচফেচ করিতেছি ও অগড়ম বগড়ম বকিতেছি কেন। অখবা, যাঁহারা এইরূপ করেন, তাঁহারা, এ দেশের সাধুসমাজে, বড় আদরণীয় ও প্রশংসনীয় হন, ইহা দেখিয়া, বিষম লোভে পড়িয়া, অসামাল হইয়া, এরূপ করিতে আরম্ভ করিয়াছি। শ্রীল যুক্ত ঘটকচূড়ামণি জনমেজয় বিদ্যাবাগীশ খুড় মহাশয় এ বিষয়ের জাজ্বল্যমান জলজিয়ন্ত দৃষ্টান্ত। এই খুড় মহাশয়, বিধাবা বিবাহের অশাস্ত্রীয়তা ও অযৌক্তিকতা বিষয়ে, এক বিচিত্র বক্তৃতা লিখিয়া, শ্রীমতী বশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা দেবীর চতুর্থ সাংবৎসরিক অধিবেশনে, পাঠ করিয়াছেন। সভাস্থ মহামহোপাধ্যায় বিদ্যাবাগীশের পাল, ঐ বক্তৃতা শ্রবণে মাত হইয়া, ঘটকচুড়ামণিকে শত শত বার ধন্যবাদ ও কপিরত্ন এই উপাধি দিয়াছেন; এবং শ্রীমতী সভা দেবীও, প্রিয়তম নায়কের বক্তৃতারসে গলিয়া গিয়া, দেশের ধর্ম্মরক্ষার দোহাই দিয়া, ঐ অদ্ভূত বক্তৃতা পুস্তকাকারে মুদ্রিত ও প্রচারিত করিয়াছেন। দেখুন, শ্রীমান্ জনমেজয় খুড় মহাশয়, ধর্ম্মশাস্ত্র বিষয়ে, বর্ণজ্ঞানানবচ্ছিন্ন হইয়াও, নিরবচ্ছিন্ন ফেচফেচ ও ফাজিলচালাকি করিয়া, কেমন ধন্যবাদ মারিয়াছেন। ইহা দেখিয়া, লোভসংবরণ করা, যাহাদের ফাজিলচালাকি করা রোগ আছে, তাহাদের পক্ষে, সহজ ব্যাপার নহে। ধন্যবাদের বাজার এত সভা দেখিয়া, কেইবা ফেচফেচ ও ফাজিলচালাকি করিতে ছাড়িবেক।

যাহা হউক, এরূপ চমৎকারিণী, চিত্তাহারিণী বক্তৃতার সমুচিত সমালোচনা হওয়া, সর্ব্বতোভাবে, উচিত ও আবশ্যক। কিন্তু, এই বিদকুটে সমালোচনা যার তার কর্ম্ম নহে। যেমন গ্রন্থকর্ত্তা, তেমনই সমালোচক চাই। যেমন বুনো ওল, তেমনই বাঘা তেঁতুল, অথবা, সাধুভাষায় বলিতে গেলে, যেমন কুকুর তেমনই মুগুর, না হইলে, বিশিষ্টরূপ ফলদায়ক হইয়া উঠে না। ফলকথা এই, আমার মত ফাজিল, চালাক, হুঁসিয়ার লোক ভিন্ন, অন্য কোনও মহামহোপাধ্যায় এই গ্রন্থের, প্রকৃত প্রস্তাবে, সমালোচনা করিতে পারিবেন, ইহা কোনও মতে সম্ভব নহে। সুতরাং, অগত্যা, আমাকেই এই গ্রন্থের সমালোচনা ব্রতে দীক্ষিত হইতে হইবেক। ইহাতে আমি কিছুমাত্র ক্লেশবোধ ৰা লোকসানজ্ঞান করিব না; কারণ, এই অপূর্ব্ব গ্রন্থের সমলোচনায় প্রবৃত্ত হইলে, যত মজা, যত আমোদ পাইব, বোধ হয়, এ জন্মে আর আমার ভাগ্যে সেরূপ ঘটা সম্ভব নহে। শ্রীমান্ বিদ্যারত্ন খুড়র নিকট যে কয়টি প্রশ্ন করিতেছি, ঐ সকল প্রশ্নের উত্তর পাইলেই, এক ক্ষুরে দুই খুড়র মাখা মুড়াইব; কারণ, দুই খুড়রই বিদ্যাপ্রকাশ একই রকমের। অর্থাৎ,

এ পিঠ ও পিঠ দুই পিঠ সমান।

সুতরাং, এক উদ্যোগেই, উভয় খুড়র সম্মান ও সদগতিদান হইবেক, স্বতন্ত্র অনুষ্ঠানের প্রয়োজন থাকিবেক না।

তেনৈব চ সপিগুত্বৎ তেনৈবাব্দিকমিষ্যতে।

এক অনুষ্ঠানেই সপিণ্ডীকরণ ও একোদ্দিষ্ট সম্পন্ন হইয়া যায়।

ইতি শ্রীব্রজবিলাসে মহাকাব্যে কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য কৃতৌ

তৃতীয় উল্লাসঃ।

যদি বলেন, এ স্থলে তুমি মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, জুয়াচুরি, বাটপাড়ি, জাল সাক্ষী, জাল মোকদ্দমা, প্রভৃতির উল্লেখ করিলে না কেন। তাহার কারণ এই ঐ সমস্ত, পবিত্র সাধুসমাজের নিরন্তর অনুষ্ঠান ও আন্তরিক অনুমোদন দ্বা রা, বহু কাল হইল, সদাচার বলিয়া প্রতিষ্ঠিত হইয়া গিয়াছে। ঐ সকল সাধুসমাজসম্মত সদাচারকে যে অর্ব্বাচীন নরাযধম দোষ বলিয়া উল্লেখ করিবেক, তাহার ইহকালও নাই, পরকালও নাই। এবিষয়ে, আমি শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা দেবীকে সাক্ষিনী করিতেছি।

প্রথম পরিশিষ্ট দেখ।

দ্বিতীয় উল্লাস

দ্বিতীয় উল্লাস।।

শুনিয়াছিলাম, নবদ্বীপ গৌড় দেশের সর্ব্বপ্রধান সমাজ। মা ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন খুড় সেই সর্বপ্রধান সমাজের সর্বপ্রধান আর্ত্ত। সুতরাং, এ দেশে, স্মৃতিশাস্ত্র বিষয়ে, বিদ্যারত্ন খুড়র জুড়ি নাই। তিনি যে ব্যবস্থা দেন, তাহা, বেদবাক্যের ন্যায়, অভ্রান্ত ও অকাট্য; কেহ, সাহস করিয়া, তাহাতে দোষারোপ করিতে অগ্রসর হয় না। তাঁহার বিষয়ে অনেক প্রশংসার কথা শুনিতাম। এবং, শুনিয়া গুনিয়া, তাঁহার উপর বেয়াড়া ভক্তি জন্মিয়াছিল। কিন্তু, কখনও তাঁহাকে পাপচক্ষে নিরীক্ষণ করি নাই। এজন্য, সদা সর্ব্বাদা মতলব কৱিতাম, যেরূপে পারি, একবার শ্রীমান্ নদিয়ার চাঁদকে নয়নগোচর করিয়া, মানবজন্ম সফল করিব। দৈবযোগে, এক দিন, অশুভ ক্ষণে, বিনা চেষ্টায়, তাঁহাকে দেখিতে পাইলাম। দেখিয়া কিন্তু, আমার পূর্ব্বসঞ্চিত ভক্তিভাব উড়িয়া গেল। অবাক ও হতজ্ঞান হইয়া, ভাবিতে লাগিলাম, ও মা! ইনিই ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন; ইনিই এ দেশের সর্ব্বপ্রধান সমাজের সর্ব্বপ্রধান স্মার্ত্ত; ইঁহারই এত প্রশংসা শুনিতাম; ইঁহাকেই এত দিন এত ভক্তি করিতাম। বলিতে কি, আমার মনটা বেয়াড়া খারাপ হইয়া গেল।

আমি পূর্ব্বে কখনও বিদ্যাসাগরকে দেখি নাই। এক দিন ইচ্ছা হইল, সকলে লোকটার এত প্রশংসা করে, অতএব, ইনি কিরূপ জানোয়ার, আজ একবার দেখিয়া আসিব। তাঁহার আবাসে উপস্থিত হইলাম। অবারিত দ্বার, কেহ বারণ করিল না; একবারে উপরে উঠিয়া, তাঁহার ঘরে প্রবিষ্ট হইলাম; দেখিলাম, লোকারণ্য। এক টেবিলের চারিদিকে, সাত আট জন বসিয়া আছেন; আর এক দিকে, প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ জন দাঁড়াইয়া আছেন। তাঁহাদের এক জনকে জিজ্ঞাসা করাতে, তিনি কহিলেন, ঐটি বিদ্যাসাগর, ঐটি ভাটপাড়ার আনন্দচন্দ্র শিরোমণি, ঐটি নবদ্বীপের প্রধান স্মার্ত্ত ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন। শ্রবণমাত্র, এক উদ্যোগে দুই মনস্কামনা পূর্ণ হইল, এই ভাবিয়া, আহলাদে গদগদ হইলাম। বিদ্যারত্ন ও বিদ্যাসাগর, উভয় জানোয়ারকেই, কিয়ৎ ক্ষণ, অনিমিষ নয়নে, নিরীক্ষণ করিলাম। দেখিলাম, শ্রীমান্ বিদ্যারত্ন খুড়, উকীলের মত, বক্তৃতা করিতেছেন; বিদ্যাসাগর বাবাজী, জজের মত, তাঁহার বক্তৃতা শুনিতেছেন। উপবিষ্ট বিষয়ী লোক গুলি বিদ্যারত্নকে লইয়া আসিয়াছেন। দণ্ডায়মান লোকগুলি বিদ্যাসাগরের নিকটে আসিয়াছিলেন; আজ আপনারা যান বলিয়া, তিনি তাঁহাদিগকে বিদায় দিয়াছেন; তাঁহারা, চলিয়া না গিয়া, দাঁড়াইয়া তামাসা দেখিতেছেন। প্রায় দুই ঘণ্টা কাল, যাহা দেখিলাম, শুনিলাম, ও বুঝিলাম; পাঠক বর্গের অবগতি জন্য, সে সমস্ত সংক্ষেপে .উল্লিখিত হইতেছে।

সাতক্ষীরার জমীদার বাবু প্রাণনাথ চৌধুরীর মৃত্যু হইয়াছে। তাঁহার দুই স্ত্রী ও চারি, পৌত্র বিদ্যমান। দুই স্ত্রীর গর্ভজাত দুই পুত্র, দুই দুই পুত্র রাখিয়া, পিতার জীবদ্দশায়, প্রাণত্যাগ করিয়াছেন। এক পুত্রের দুটি ঔরশ পুত্র, এক পুরে দুটি দত্তক পুত্র। ঔরস পৌত্রের উপনয়ন হয় নাই, দত্তক পৌত্রের উপনয়ন হইয়াছে। প্রাণনাথ বাবুর শ্রাদ্ধ কে করিবেন, এ কথা উপস্থিত হইল, তাঁহাদের গুরুদেব প্রসিদ্ধ পণ্ডিত জানকীজীবন ন্যায়রত্ন ব্যবস্থা দেন, উপনীত দত্তক পৌত্র শ্রাদ্ধ করিবেন। তদনুসারে, দত্তক পৌত্র, চতুর্থ দিবসে, প্রাণনাথ বাবুর শ্রাদ্ধ করিলেন। শ্রাদ্ধসভায়, অনেক বড় বড় বিদ্যাবাগীশ খুড়, উপস্থিত থাকিয়া, কার্য্য সম্পন্ন করেন, এবং, এই অন্ধ শাস্ত্রের বিধি অনুসারে অনুষ্ঠিত হইল, এই মর্ম্মের এক ব্যবস্থাপত্রে স্ব স্ব নাম স্বাক্ষর করিয়া, বিদায় লইয়া চলিয়া গেলেন।

অনুপনীত পৌত্রের পিতামহী, সপত্নীর পৌত্র শ্রাদ্ধ করিল, তাঁহার পৌত্র শ্রাদ্ধ করিতে পাইল না, ইহাতে অতিশয় অসন্তুষ্ট হইলেন, এবং দত্তক পৌত্রের কৃত শ্রাদ্ধ শাস্ত্রসিদ্ধ হয় নাই, ইহা প্রমাণ দ্বারা প্রতিপন্ন করিবার নিমিত্ত, বড় বড় বিদ্যাবাগীশ খুড়দিগকে ডাকাইলেন। ইহা কাহারও অবিদিত নাই বিদ্যাবাগীশ খুড় মহাশয়েরা ব্যবস্থা বিষয়ে কল্পতরু। কল্পতরুর নিকটে যে যাহা প্রার্থনা করে, সে তৎক্ষণাৎ তা প্রাপ্ত হয়। সেইরূপ, বিদ্যাবাগীশ খুড়দের নিকটে যে যেরূপ ব্যবস্থা চায়, সে তাহা পায়, কেহ কখনও বঞ্চিত হয় না। তবে একটু বিশেষ এই, কষ্পতরুর নিকট তৈলবট দাখিল করিতে হয় না; বিদ্যাবাগীশ খুড়রা, বিমা তৈলবটে, কাহারও উপর নেক নজর করেন না। যাহা হউক, তাঁহাদের দয়াগুণে ও উপদেশবলে, একাদশ দিবসে, পুনরায় প্রাণনাথ বাবুর শান্ধ হইল। অনেকের ভাগ্যে একটা শ্রদ্ধই জুটিয়া উঠে না; প্রাণনাথ বাবুর কি সৌভাগ্য, তিনি অনায়াসে, উপর্য্যুপরি, দুইটা শ্রাদ্ধ ভোগ করিলেন। এই শ্রাদ্ধসভাতেও, বড় বড় বিদ্যাবাগীশ খুড় মহাশয়েরা, উপস্থিত থাকিয়া, কার্য শেষ করিয়া, বিদায় লইয়া চলিয়া গেলেন।

শ্রদ্ধের পরেই, প্রাণনাথ বাবুর সমস্ত বিষয় চব্বিশ পরগণার কালেক্টর সাহেবের হস্তে গেল। দুই শ্রাদ্ধই, বাজারে দেনা করিয়া, সম্পাদিত হইয়াছিল; এজন্য, উভয় পক্ষকেই, শ্রাদ্ধের খরচের জন্য, কালেক্টর সাহেবকে জানাইতে হইল। তিনি কহিলেন, এক বাটীতে এক ব্যক্তির দুই শ্রাদ্ধ কেন হইল, ইহার কারণ না জানাইলে, তিনি টাকা দিতে পারিবেন না। দত্তকপক্ষীয়েরা, বিদ্যাসাগরের নিকটে গিয়া, যাহাতে তাঁহারা টাকা পান, তাহার উপায় করিয়া দিতে বলিলেন। বিদ্যাসাগর, সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, কহিলেন, আপনাদের টাকা পাইবার কোনও প্রতিবন্ধক দেখিতেছি না। আপনারা যথাশাস্ত্র কার্য্য করিয়াছেন। আপনারা কালেক্টর সাহেবকে জানাইবেন, গুরুদেব জানকীজীবন ন্যায়রত্ন আদেশ করিয়াছিলেন; তদনুসারে, আপনারা চতুর্থ দিবসে শ্রাদ্ধ কার্য্য সম্পন্ন করিয়াছেন। ইহাতেও যদি তিনি ওজর করেন, আমায় বলিবেন, আমি উপায় করিয়া দিব। তাঁহারা, বিদ্যাসাগরের উপদেশ অনুসারে, কালেক্টর সাহেবকে জানাইলেন।

প্রথম শ্রাদ্ধ শাস্ত্র অনুসারে হয় নাই, এজন্য আমাদিগকে, একাদশ দিবসে, পুনরায় শ্রাদ্ধ করিতে হইয়াছে, ইহা ভিন্ন দ্বিতীয় পক্ষের আর জবাব দিবার পথ ছিল না। সুতরাং, প্রথম শ্রাদ্ধ অসিদ্ধ, দ্বিতীয় শ্রাদ্ধ শাস্ত্র অনুসারে হইয়াছে, এই মর্ম্মের ব্যবস্থাপত্র সংগ্রহ আবশ্যক হইয়া উঠল। তাঁহারা অধমতারণ ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন খুড়র শরণাগত হইলেন। বিদ্যারত্ন তাদৃশ ব্যবস্থা দিতে সম্মত হইলেন, এবং তাঁহাদের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের নিকটে আসিয়া কহিলেন, আমি একটি ব্যবস্থার কথা বলিব, শুনিয়া আপনাকে সম্মতি দিতে হইবেক। বিদ্যাসাগর কহিলেন, আপনকার যাহা বক্তব্য আছে, বলুন। তদনুসারে, বিদ্যারত্ন বিদ্যাপ্রকাশ করিতে আরম্ভ করিলেন।

কিয়ৎ ক্ষণ পরে, বিদ্যারত্ন এমন একটি বচন আবৃত্তি করিলেন যে, তাহা দ্বারা, প্রথম শ্রাদ্ধ অসিদ্ধ ও দ্বিতীয় শ্রাদ্ধ শাস্ত্রসিদ্ধ বলিয়া, বোধ হইতে পারে। এই বচন শুনিয়া, বিদ্যাসাগর বিদ্যারত্নকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি ও পক্ষের ব্যবস্থা কি দেখিয়াছেন। বিদ্যারত্ন অম্লানবদনে উত্তর করিলেন, দেখিয়াছি কি, আমি ঐ ব্যবস্থায় নাম স্বাক্ষর করিয়াছি। বিদ্যাসাগরের বোধ ছিল, বিদ্যারত্ন ঐ ব্যবস্থায় সম্মত নহেন, এজন্য বিপরীত পক্ষের সমর্থন করিতেছেন। বিদ্যারত্ন পূর্ব্ব ব্যবস্থায় নাম স্বাক্ষর করিয়াছেন, এখন আবার ঐ ব্যবস্থায় দোষারোপ করিয়া, বিপরীত পক্ষের পোষকতা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। ইহা বুঝিতে পারিয়া, তিনি কিয়ৎক্ষণ হতবুদ্ধির মত হইয়া রইিলেন, অনন্তর বিদ্যারত্নকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, আপনি চান কি; আপনি ত বড় মজার লোক; পূর্ব্বে যে ব্যবস্থায় স্বাক্ষর করিয়াছেন, এখন আবার, ঐ ব্যবস্থা শাস্ত্রবিরুদ্ধ বলিয়া, বিচার করিতে বসিয়াছেন। আপনাকে জিজ্ঞাসা করি,যখন পূর্ব্ব ব্যবস্থায় স্বাক্ষর করেন, তখন কি এ বচনটি আপনার উপস্থিত হয় নাই। বিদ্যারত্ন, সহাস্য বদনে, উত্তর করিলেন, ব্যবস্থা দিবার সময় কি অত বচন ফচন দেখা যায়। এই অদ্ভুত কথা শুনিয়া, বিদ্যাসাগর কহিলেন, বিদ্যারত্ন মহাশয়, ও কথা উচ্চৈঃ স্বরে কহিবেন না। ঐ দেখুন, ন্যূনাধিক পঞ্চাশ জন ভদ্র লোক দাঁড়াইয়া কৌতুক দেখিতেছেন। হঁহারা নানা স্থানের লোক। এখান হইতে বহির্গত হইয়াই, বলিতে আরম্ভ করিবেন, নবদ্বীপের প্রধান স্মার্ত্ত আপন মুখে কবুল দিলেন, ব্যবস্থা দিবার সময় বচন ফচন দেখা যায় না। ব্যবস্থা দেওয়া আপনকার জীবিকা; কিন্তু, এ কথা সর্ব্বত্র প্রচারিত হইলে, আপকানার জীবিকার হানি হইবেক। এই বলিয়া, বিদ্যাসাগর দণ্ডায়মান লোক গুলির দিকে চাহিয়া কহিলেন, আমি আপনাদের নিকট এই ভিক্ষা চাহিতেছি, আপনারা এ কথা কোথাও ব্যক্ত করিবেন না; করিলে, ব্রাহ্মণের অন্ন মারা যাইবেক।

ইহা কহিয়া, বিদ্যাসাগর বিদ্যারত্ন কে বলিলেন, বিদ্যারত্ন মহাশয়, আপনিও কিছু লেখা পড়া শিখিয়াছেন, আমিও কিছু শিখিয়াছি। আপনি যদি পণ্ডিত বলিয়া পরিচয় দিতে পারেন, আমিও পারি। কিন্তু, ওরূপ পরিচয় দেওয়া দুরে থাকুক, যদি কেহ আমাকে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ভাবে, তাহাতে আমার যৎপরোনান্তি অপমান বোধ হয়। বলিতে কি, আপনাদের আচরণের জন্যে, ব্রাহ্মণজাতির মান একবারে গিয়াছে। আর আপনাকার বিদ্যাপ্রকাশের প্রয়োজন নাই; যথেষ্ট হইয়াছে; স্বস্থানে প্রস্থান করুন। এই বলিয়া, বিদ্যাসাগর তাঁহাকেও তাঁহার সমভিব্যাহারী মহাশয়দিগকে বিদায় করিয়া দিলেন। আমরাও সকলে, দেখিয়া শুনিয়া, অবাক্ হইয়া, চলিয়া গেলাম।

নবদ্বীপ এ দেশের সর্ব্বপ্রধান সমাজ; বিদ্যারত্ন সেই সর্ব্বপ্রধান সমাজের সর্ব্বপ্রধান স্মার্ত বলিয়া গণ্য ও মান্য; তাঁহার চাঁদমুখে স্বকর্ণে শুনিলাম, ব্যবস্থা দিবার সময়, বচন ফচন দেখা যায় না। জানকীজীবন ন্যায়রত্ন যথাশাস্ত্র ব্যবস্থা দিয়াছিলেন। বিদ্যারত্ন খুড় পূর্ব্বে ঐ ব্যবস্থায় নাম স্বাক্ষর করিয়াছেন; কিন্তু, অপর পক্ষের নিকট হইতে, পছন্দসই তৈলবট হস্তগত করিয়া, আজ আবার ঐ ব্যবস্থা অব্যবস্থা বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে প্রবৃত্ত। এ দেশের মুখে ছাই; এ দেশের সর্ব্বপ্রধান সমাজের মুখে ছাই; এ দেশের সর্ব্বপ্রধান সমাজের সর্ব্বপ্রধান স্মার্ত্তের মুখে ফুল চন্দন। যাঁহাদের এরূপ ব্যবহার, তাঁহাদের সহিত কিরূপ ব্যবহার করা উচিত ও আবশ্যক, এ হতভাগা দেশের হতভাগা লোকের সে বোধও নাই, সে বিবেচনাও নাই।

ইতি শ্রীব্রজবিলাসে মহাকাব্যে কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য কৃতৌ

দ্বিতীয় উল্লাসঃ।

দ্বিতীয় পরিশিষ্ট

দ্বিতীয় পরিশিষ্ট।

অনাবৃতাঃ কিল পুরা স্ক্রিয় আসন বরাননে।

কামচারবিহারিণ্যঃ স্বতন্ত্রাশ্চারুহাসিনি॥

‘তাসাং ব্যুচ্চরমাণানাং কৌমারাৎ মুভগে পীন।

নাধর্ম্মোহভূরারোহে স হি ধর্মঃ পুরাভবৎ॥

প্রমাণষ্টা ধর্ম্মোহয়ং পুজ্যতে চ মহর্ষিভিঃ।

উত্তরেষু চ রস্তোরু কুরুঙ্গাপি পুজ্যতে॥

স্ত্রশমলুগ্রহকরঃ স হি ধর্মঃ সনাতনঃ

অশ্মিংন্তু লোকে ন চিরাম্মাদেয়ং শুচিস্মিতে।

স্থাপিতা যেন যচ্চ তন্মে বিস্তরতঃ শৃণু এ॥

বভুবোদালকো নাম মহর্ষিরিতি নঃ শ্রুত।

শ্বেতকেতুরিতি খ্যাতঃ পুত্রস্যাভবনিঃ॥

ম্যাদেয়ং কৃতা তেন ধর্ম্মা বৈ শ্বেতকেভুনা।

কোপাৎ কমলপাক্ষি যখং তং নিবোধ মে॥

শ্বেতকেতেঃ কিল পুৱা সমক্ষং মাতরং পিতুঃ।

জাহ ব্রাহ্মণঃ পাণৌ গচ্ছাব ইতি চাব্রবীৎ॥

ঋষিপুত্রস্তুতঃ কোপং চকারামচোদিতঃ।

মাতরং তাং তথা দৃষ্টা নীয়মানাং বলাদিব॥

কুদ্ধৎ তন্তু পিতা দৃষ্টা শ্বেতকেতুমুবাচ হ।

মা তাত কোপং কাষীমেষ ধর্ম্ম সনাতনঃ॥

শীরতা হি সর্বেষাং বর্ণানামঙ্গনা ভুবি।

যথা গাবঃ স্থিতাস্তাত থে শ্বে বর্ণে তথা প্রজাঃ॥

ঋষিপুত্রোংশ তং ধৰ্মং শ্বেতকেতু চক্ষম।

চকার চৈব মর্যাদামিৎ স্ত্রীপুংসয়োভুবি॥

মানুষেষু মহাভাগে নত্বেবানন্য জন্তু।

তদা প্রভৃতি মর্যাদা স্থিতেয়মিতি নঃ শ্রুতম॥

ব্যুচ্চরস্তাঃ পতিং নার্যা অন্য প্রভৃতি পাতকম্।

জণহত্যাসমং ঘোরং ভবিষ্যত্যসুখাবহ॥

ভার্যাং তথা ব্যুচ্চরতঃ,কৌমারব্রহ্মচারিণীম্।

পতিতামেতদেব ভবিতা পাতকং ভুবি॥

পত্যা নিযুক্ত যা চৈব পত্নী পুত্রার্থমেব চ।

ন করিষ্যতি স্যশ্চ ভবিষ্যতি তদেব হি॥

ইতি তেন পুরা ভীরু মর্যাদা স্থাপিতা বলাৎ।

উদ্দালক পুণে ধর্মা বৈ শ্বেতকেতু॥

পাণ্ডু কুন্তীকে কহিতেছেন, হে সুমুখি! চারুহাসিনি। পুর্ব্ব কালে স্ত্রীলোকেরা অরুদ্ধা, স্বাধীনা, ও স্বচ্ছন্দবিহারিণী ছিল। পতিকে অতিক্রম করিয়া, পুকুরে উপগত হইলে, তাহাদের অধর্ম্ম হইত না। পূর্ব কালে এই ধর্ম ছিল; ইহা প্রামাণিক ধর্ম; ঋষিরা এই ধর্ম মান্থ করিয়া থাকেন। উত্তর কুরুদেশে অ্যাপি এই ধর্ম মন্তি ও প্রচলিত আছে। এই সনাতন ধর্ম ধীদিগের পক্ষে অত্যক্ত অনুকূল। যে ব্যক্তি যে কারণে লোকে এই নিয়ম স্থাপন করিয়াছেন, তাহা বিস্তারিত কহিতেছি, গুন। শুনিয়াছি, উদ্দালক নামে মহর্ষি ছিলেন; শ্বেতকেতু নামে তাঁহার এক পুত্র জন্যে। সেই থেকে যে কারণে কোপারিষ্ট হইয়া, এই ধর্মযুক্ত নিয়ম স্থাপন করিয়াছেন, তাহা গুন। একদা উন্দালক, শেতকেতু, ও কেতুর জননী, তিন জমে উপবিষ্ট আছেন। এমন সময়ে, এক ব্রাহ্মণ আসিয়া শেভকেতুর মাতার হস্তে ধরিলে, এবং, এস যাই বলি, একান্তে লইয়া গেলেন। তখন, বিপুত্র, এইরূপে জননীকে মীয়মানা দেখিয়া, সহ্য করিতে না পারিয়া, অত্যক্ত কুপিত হইলেন। উদ্দালক শ্বেতকেতুকে কুপিত দেখিয়া কহিলেন, বৎস! কোপ করিও না, এত ধর্ম। পৃথিবীতে সকল বর্ণেরই স্ত্রী অরক্ষিত। গোজাতি যেমন স্বচ্ছন্দ বিহার করে, মনুষ্যেরাও সেইরূপ স্ব স্ব বর্ণে স্বচ্ছন্দ বিহার করে। ঋষিপুত্র শ্বেতকেতু, সেই ধর্ম্ম সহ্য করিতে না পারিয়া, পৃথিবীতে স্ত্রীপুরুষের সম্বন্ধে এই নিয়ম স্থাপন করিয়াছেন। হে মহাভাগে! আমরা শুনিয়াছি, তদবধি এই নিয়ম মনুষ্য জাতির মধ্যে প্রচলিত আছে; কিন্তু অন্য অন্য জন্তুদিগের মধ্যে নহে। অতঃপর, যে নারী পতিকে অতিক্রম করিবেক, তাহার ভ্রূণহত্যার সমান অসুখজনক ঘোর পাতক জন্মিবেক। আর, যে পুরুষ বাল্যাবধি সাধুশীল পতিব্রত পত্নীকে অতিক্রম করিবেক, তাহারও ভূতলে সেই পাতক হইবেক। এবং যে স্ত্রী, পতি কর্ত্তৃক পুত্রার্থে নিযুক্তা হইয়া তাঁহার আজ্ঞা প্রতিপালন না করিবেক, তাহারও এই পাতক হইবেক। হে ভয়শীলে! সেই উদ্দালকপুত্র শ্বেতকেতু, বল পুর্ব্বক, পুর্ব্ব কালে এই ধর্ম্মযুক্ত নিয়ম স্থাপন করিয়াছেন।”

মহাভারত আদিপর্ব্ব। ১২২ অধ্যায়

পঞ্চম উল্লাস

পঞ্চম উল্লাস।

এতদ্দেশীয় পূজনীয় সাধুসমাজের প্রাতঃস্মরণীয় চাঁই মহোদয়বর্গের নিকট, কৃতাঞ্জলিপুটে, বিনয়নম্র বচনে, আমার নিবেদন এই, আমার এই ভাঁড়ামি, বা পাগলামি, অথবা পাণ্ডিত্যপ্রকাশ দেখিয়া, আপনারা যেন আমায় বিদ্দাসাগরের গোঁড়া, অথবা দলের পোক, না ভাবেন। ইহা যথার্থ বটে, কোনও কোনও কারণে, বিদ্যাসাগরের উপর আমার একটু আন্তরিক টান আছে। যেরূপ দেখিতে ও শুনিতে পাই, লোকটা অমায়িক, নিরহঙ্কার, পরোপকারী; যাঁহারা নিকটে যান, সকলেই সন্তুষ্ট হইয়া আইসেন। কিন্তু, এই খাতিরে, আমি তাঁহার গোঁড়া বলিয়া পরিচিত ও পরিগণিত হইতে সম্মত নহি। তাঁহার কথা উত্থাপিত হইলে, হদ্দমুদ্দ এই পর্যন্ত বলিতে রাজি আছি, লোকটা বড় মন্দ নয়। এ ভিন্ন, আর সকল বিষয়েই, আমি তাঁহার উপর মর্মান্তিক চটা। না চটিয়া, কেমন করিয়া, চলে বলুন। তিনি পবিত্র সাধুসমাজের অনুবর্তী হইয়া চলিতে রাজি নহেন; নিজে যাহা ভাল বুঝিবেন, তাই বলিবেন, তাই করিবেন; সাধুসমাজের দিজ্ঞজ চাঁইদিগের খাতির রাখিবেন না, ও তাঁহাদের নিষ্কলঙ্ক দৃষ্টান্তের অনুবর্তী হইয়া চলিবেন না। এমন লোককে, কেমন করিয়া, মানুষ বলিয়া গণ্য করি, বলুন।

পূর্বাপর যেরূপ দেখিয়া আসিতেছি, তাহাতে হত ভাগার বেটার বিষয়বুদ্ধি বড় কম; এমনকি, নাই বলিলেও, বোধ হয়, অন্যায় বলা হয় না। বিষয়বুদ্ধি থাকিলে, তিনি, কখনই, বিধবাঢ় বিবাহকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করিতেন না। বিধবা বিবাহে হাত দিয়া, পবিত্র সাধুসমাজে হেয় ও অশ্রদ্ধেয় হইয়াছেন, সকল লোকের গালাগালি খাইতেছেন, এবং শুনিতে পাই, ঐ উপলক্ষে দেনাগ্রস্তও হইয়াছেন। ইহারই নাম,

আপনার নাক কাটিয়া পয়েন্ন যাত্রাভঙ্গ করা।

এই রকমারিকাণ্ডে লিপ্ত হওয়াতে, তাঁহার নিজের নাকালের চুড়ান্ত হইয়াছে; এবং পুণ্যভূমি ভারতবর্ষকে, বিশেষতঃ, পরম পবিত্র গৌড় দেশকে, সর্বোপরি, সোনার লঙ্কা যশোহরপ্রদেশকে, একবারে ছারখার করিতে বসিয়াছেন। এমন বাঁদরামি, এমন পাগলামি, এমন মাতলামি, কেহ কখনও দেখিয়াছেন বা শুনিয়াছেন, আমার এরূপ বোধ হয় না। বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রেই বলিবেন, অথবা বলিবেন কেন, মুক্তকণ্ঠে বলিতেছেন, তিনি, নাম কিনিবার জন্যে, দেশের সর্বনাশের পথ করিয়াছেন। দেখুন, বাটীতে বিধবা থাকিলে, গৃহস্থের কত মত উপকার হয়। প্রথমত, বিনি মাইনায়, রাঁধুনি, চাকরানি, মেথরানি পাওয়া যায়। দ্বিতীয়তঃ, সময়ে সময়ে, বাটীর পুরুষদিগের, প্রকারান্তরে, অনেক উপকার দর্শে; তৃতীয়তঃ, বাটীয় চাকরেরা বিলক্ষণ বশীভূত থাকে, ছাড়াইয়া দিলেও, হতভাগার বেটারা নড়িতে চায় মা; চতুর্থতঃ, প্রতিবাসীরা অসময়ে, বাইতে আইসেন। এটি নিতান্ত সামান্য কথা নহে; কারণ, যেরূপ দেখিতে পাওয়া যায়, অসময়ে কে কাহারও দিক মাড়ায় না। যে পাষণ্ড এই সমস্ত সুবিধা ও উপকারের পথ রুদ্ধ করিবার চেষ্টা করে, তার, মুখদর্শন করা উচিত নয়। মুখের বিষয় এই, আমরা স্বাধীন জাতি নহি; স্বাধীন হইলে, এত দিন, কোন কালে, বিদ্যাসাগর বাবাজি স্বশরীরে স্বর্গারোহণ করিতেন। কারণ, স্বাধীন সাধুসমাজের তেজীয়ান্‌ চাঁই মহোদয়েরা, কখনই, এ অত্যাচার, এ অপমান, সহ করিয়া, গায়ের ঝাল গায়ে মারিয়া, চুপ করিয়া থাকিতেন না; বিদ্রোহী বলিয়া, বিচারালয়ে তাঁহার নামে অভিযোগ উপস্থিত করিতেন, এবং আপনারাই, ধর্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের ন্যায়, ধৰ্মাসনে বসিয়া, তাঁহাকে শূলে চড়াইয়া, যথোপযুক্ত আক্কেলসেলামি দিতেন। হায় রে সে কাল!!! হা জগদীশ্বর!.তুমি, কত কালে, সদয় হইয়া, এই হতভাগা দেশকে পুনরায় স্বাধীন করিবে। এরূপ যথেচ্ছার আর আমরা কত কাল সহ করিব!!! . বিধবাবিবাহ প্রচলিত হইলে, ব্যভিচার দোষের ও ভ্রুনহত্যা পাপের নিবারণ হইবেক, এ কথার অর্থ কি। ব্যভিচার যদি দোষ বলিয়া গণ্য হইত, তাহা হইলে, এই পবিত্র দেশের অতিপবিত্র সাধুসমাজে, কদাচ এরূপ প্রবল ভাবে প্রচলিত থাকিত না। পুরুষের ব্যভিচার, এ দেশে, দোষ বলিয়া কখনও উল্লিখিত হইতে শুনি নাই; কেবল স্ত্রীলোকের বেলায় দোষ বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে। কিন্তু, নিবিষ্ট চিত্তে অনুধাবন করিয়া দেখিলে, তাহাতে বাস্তবিক কোনও দোষ আছে, এরূপ প্রতীতি জন্মে না দোষের কথা দূরে থাকুক, ব্যভিচার, পূর্ব্ব কালে, সনাতন ধর্ম বলিয়া পরিগণিত ছিল; কেহ তাহাতে কিছুমাত্র দোষ বিবেচনা করিত না। ইহা সত্য বটে, উদ্দালক মুনির পু্ত্র শ্বেতকেতু খুড়, বুড়মি করিয়া, এই সনাতন ধর্মে দোষারোপ করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু, তিনি দুনিয়ার মালিক ছিলেন না। তিনি, রাগের বশীভুত হইয়া, না বুঝিয়া সুঝিয়া, এক কথা বলিয়া গিয়াছেন বলিয়া, সকলকে তাহা ঘাড় পাতিয়া লইতে হইবে, তাহার মানে কি। আর, ইহাও বিবেচনা করিয়া দেখা আবশ্যক, ব্যভিচার সনাতন ধর্ম বলিয়া পরিগণিত। সনাতন শব্দের অর্থ নিত্য, যাহার বিনাশ নাই, যাহা সর্ব কাল বিরাজমান থাকে। শ্বেত কেতুর এত বড় ক্ষমতা ছিল না যে, তিনি নিত্য পদার্থের লোপাপত্তি করিতে পারেন। সে ক্ষমতা থাকিলে, সনাতন ব্যভিচার ধর্ম, কোন কালে, লয়প্রাপ্ত হইতেন, একাল পর্য্যন্ত, নির্ব্বিরোধ ও অপ্রতিহত প্রভাবে, রাজত্ব ও একাধিপত্য করিতে পাইতেন না। যাহা হউক, যখন ব্যভিচার সনাতন ধর্ম্ম বলিয়া পরিগণিত, এবং যখন সেই সর্ব্বজীবহিতকর সনাতন ধর্ম, পৃথিবীর সর্ব্ব প্রদেশে, বিশেষতঃ পুণ্যভূমি ভাতবর্ষের পরম পবিত্র সাধুসমাজে, আবহমান কাল, এত প্রবলভাবে প্রচলিত রহিয়াছে, তখন উহাকে দোষ বলিয়া গণ্য করা ঘোরতর অধর্মের কর্ম্ম, তাহার সন্দেহ নাই। অতএব, বিদ্যাসাগর বাবাজি, সাধুসমাজে চির প্রচলিত সেই প্রশংসনীয় সনাতন ধর্ম্মকে দোষ বলিয়া গণ্য করিয়া তাহার নিবারণার্থে, বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত বলিয়া, যে পাণ্ডিত্যপ্রকাশ করিয়াছেন, তাহা গ্রাহ্য করা কদাচ উচিত নহে। ফলকথা এই, ব্যভিচার বন্ধ করিবার নিমিত্ত, বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত ও আবশ্যক, এ কথার অর্থ নাই।

ভ্রূণহত্যার বিষয়ে বক্তব্য এই যে, নির্ব্বোধ নির্বিবেক শাস্ত্রকারেরা, কি মতলবে বলিতে পারি না, ভ্রূণহত্যাকে পাপ বলিয়া নির্দেশ করিয়া গিয়াছেন; সে জন্য ভয় পাইয়া, বিধবা বিবাহ দেওয়া আবশ্যক বলিয়া বোধ হয় না। শাস্ত্রকারেরা, নিতান্ত পাগলের মত, কত বিষয়ে কত কথা বলিয়াছেন; কই, আমরা ত সে সকল কথা গ্রাহ করিতেছি না। তবে এইটির বেলায়, তাঁঁহআদের খাতির রাখিবার জন্য, ব্যস্ত হইবার কারণ কি।

কিঞ্চ, স্ত্রীলোক, গুরুজনের খাতির এড়াইতে না পারিয়া, কিংবা প্রিয় জনের নাছোড় পীড়াপীড়িতে পড়িয়া, সনাতন ব্যভিচার দেবের উপাসনায় প্রবৃত্ত হইলে, প্রকৃতিদেবীর অলঙ্ঘনীয় নিয়ম অনুসারে, গর্ভসঞ্চার, অধিকাংশ স্থলে, অপরিহার্য্য; এবং, পবিত্র সাধুসমাজের অবলম্বিত ও অনুমোদিত প্রথা অনুসারে, তথাবিধ স্থলে, জ্বণহত্যাও অপরিহার্য্য। অপরিহার্য্য বিষয়ের অনুঠান বা অনুমোন, কোনও অংশে, দোষাবহ বলিয়া বিবেচিত হওয়া উচিত মহে। এজন্যই, গোপকুলোদ্ভব ভগবান্ দেবকীনন্দন স্বীয় প্রিয়বান্ধব তৃতীয় পাণ্ডব অর্জ্জুনকে,

জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুর্ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ।

তন্মাদপরিহার্য্যেঽর্থে ন ত্বং শোচিতুমর্হসি॥

জন্মিলেই মৃত্যু অবধারিত, মৃত্যু হইলেই পুনর্জ্জন্ম অবধারিত। অতএব, অপরিহার্য্য বিষয়ে, তোমার শোক করা উচিত নহে।

এই সারগর্ভ উপদেশ দিয়াছিলেন। সেইরূপ,

জারাশ্রয়ে ধ্রুবো ভ্রূণো ভ্রূণে হত্যা ধ্রুবী স্মৃতা।

তস্মাদপরিহার্য্যেঽর্ধে ন দোষঃ সাঁধুসংসদি॥

উপপতির আশ্রয়গ্রহণে, ভ্রূণসঞ্চার অবধারিত; ভ্রূণসঞ্চার হইলে, ভ্রূণহত্যাও অবধারিত। অতএব, অপরিহার্য্য বিষয়ে, সাধুসমাজে দোষ নাই।

বস্তুতঃ, সূক্ষ্ম বিবেচনা করিয়া দেখিলে, ভ্রূণহত্যায় কোনও দোষ আছে, এরূপ প্রতীতি হয় না। ভ্রূণহত্যাকে পাপজনক, বা কোনও অংশে নিন্দনীয়, বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে পারেন, কই, এমন বেটা ছেলে ত, এ পর্যন্ত, আমাদের দিব্য চক্ষে ঠেকে নাই। পেট ফাঁপিলে, ও পেটে মল জমিলে, ডাক্তরেরা, জোলাপ দিয়া, পেট পরিষ্কার
করিয়া দেন। ভ্রুনহত্যাও, পৰিত্র সাধুসমাজের প্রাতঃস্মরনীয় চাঁই মহোদয়দিগের ন্যায়, স্থির চিত্তে বুৰিয়া দেখিলে, তাহার অতিরিক্ত কিছুই নহে। সাধুসমাজের অভিমত অভিধান গ্রন্থে, ভ্রুনহত্যা শব্দের যে বিশুদ্ধ ও বিশদ ব্যাখ্যা দেখিতে পাওয়া যায়, তাহাতেও ইহাই প্রতিপন্ন হয়। যথা, -

ভ্রুণহত্যা-সৎ, প্রীতিপ্রদ প্রয়োগবিশেষ দ্বারা, পেটে ফাঁপবিশেষ জন্মিলে, ও মলবিশেষ জমিলে, প্রক্রিয়াবিশেষ দ্বারা, পেটের ঐ ফাঁপবিশেষের নিবারণ, ও পেট হইতে ঐ মলবিশেষের নিকাশন।

কলকথা এই, ভ্রুণহত্যা, কিঞ্চিৎ অংশেও, দোষাবহ নহে; দোষাবহ হইলে, আমাদের এই পরম পবিত্র অতি বিচিত্র সাধুসমাজে, কদাচ, সচরাচর এরূপ প্রচলিত থাকিত না। এইরূপ চিরচলিত, দোষম্পর্শশূন্য, সার্ব্বজনীন সদাচারকে পাপ বলিয়া গণ্য করিয়া, তন্নিবারনার্থে বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত ও আবশ্যক বলিয়া, পাণ্ডিত্যপ্রকাশ করা, নিরবচ্ছিন্ন উন্মাদের লক্ষণ ব্যতীত আর কিছুই প্রতীত হয় না।

সাধুসমাজের বহুদর্শী বিচক্ষণ চাঁই মহোদয়বর্গের মুখে সদাসর্ব্বদা শুনিতে পাই, বিধবারা অবিবাহিত থাকাতে, সমাজের অশেষবিধ হিতসাধন হইতেছে; তাহাদের বিবাহ প্রচলিত হইলে, দেশটা একবারে ছারখার হইবেক। ইরেজি বিদ্যায় মূর্তিমত্ত, জলজিয়ন্ দেশহিতৈষী মহাপুরুষদিগের মুখেও, ঐরূপ কর্ণসুখকরী সাধুভাবা, সময়ে সময়ে, শুনিতে পাওয়া যায়। কিন্তু, এ বিষয়ে বিদ্যাবাগীশ খুড় মহাশয়দের মনোগত অভিপ্রায় কি, এ পর্যন্ত, কেহ তাহা স্থির বুঝিতে পারেন নাই। তাহার কারণ এই, শ্রীমান খুড় মহাশয়েরা নিতান্ত নিরীহ জন্তু; যাহাদিগকে, সর্ব্ব সময়ে, সর্ব্ব বিষয়ে, সাধুসমাজের ক্রীত দাসের ন্যায়, চলিতে ও বলিতে হয়; কোনও বিষয়ে, স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া, অভিপ্রায় প্রকাশ করা তাঁহাদের ইচ্ছা, ক্ষমতা, ও ব্যবসায়ের বহির্ভুত।

এক বড় মানুষের কতকগুলি উমেদার ছিলেন। আহার প্রস্তুত হইলে, বাবু, পার্শ্ববর্ত্তী গৃহে গিয়া, আহার করিতে বসিলেন; উমেদারেরাও, সঙ্গে সঙ্গে, তথায় গিয়া, বাবুর আহার দেখিতে লাগিলেন। নুতন পটোল উঠিয়াছে। পটোল দিয়া মাছের ঝোল করিয়াছে। বাৰু দুই চারি খান পটোল খাইয়া বলিলেন, পটোল অতি জঘন্য তরকারি বোলে দিয়া, ঝোলটাই খারাপ করিয়াছে। ইহা শুনিয়া, উমেদারেরা বিস্ময়াপন্ন হইয়া কহিলেন, কি অন্যায়! আপন কা্র ঝোলে পটোল!! পটোল ত ভদ্র লোকের খাদ্য নয়। কিন্তু, ঝোলে যত গুলি পটোল ছিল, বাৰু ক্রমে ক্রমে সকল গুলিই খাইলেন, এবং বলিলেন, দেখ, পটোলটা তরকারি বড় মন্দ নয়। তখন উমেদারের কহিলেন, পটোল তরকারির রাজা; পোড়ান, ভাজুন, সুক্তায় দেন, ডালনায় দেন, চড়চড়িতে দেন, ঝোলে দেন, ছোকায় দেন, দম্ করুন, কালিয়া করুন, সকলেই উপাদেয় হয়; বলিতে কি, এমন উৎকৃষ্ট তরকারি আর নাই। বাবু কহিলেন, তোমরা ত বেস লোক; যেই আমি বলিলাম, পটোল ভাল তরকারি নয়, অমনি তোমর পটোলকে, নরকে দিলে; যেই আমি বলিলাম, পটোল বড় মন্দ তরকারি নয়, অমনি তোমরা পটোলকে স্বর্গে তুলিলে। উমেদারেরা কহিলেন, মহাশয়, আপনি অন্যায় আজ্ঞা করিতেছেন। আমরা ঝোলের উমেদার নই, পটোলেরও উমেদার নই, উমেদার আপনকার; আপনি যাহাতে খুসি থাকেন, তাহাই আমাদের সর্ব্ব প্রযত্নে কর্ত্তব্য। এই উত্তর শুনিয়া, বাবু নিরুত্তর হইলেন।

শ্রীমান্ বিদ্যাবাগীশ খুড় মহাশয়েরা এই মনোহর উপাখ্যানের প্রকৃত দৃষ্টান্তস্থল। তাঁহারা শাস্ত্রেরও উমেদার নহেন, ধর্মেরও উমেদার নহেন; তাঁহারা উমেদার পয়সার; পয়সাওয়ালার যাহাতে খুসি থাকেন, তাহাই, তাঁহাদের সর্ব্ব প্রযত্নে কর্তব্য বলিয়া, নির্বিবাদে স্থিরীকৃত হইয়া রহিয়াছে।

যদি বলেন, সকল পয়সাওয়ালারা ত পয়সা দেন না, তবে কি জন্য তাঁহাদের সকলকে খুসি করিবার চেষ্টা করিবেন। ইহার উত্তর এই, খুড় মহাশয়েরা, গুড়কলসপিপীলিকা। গুড়ের কলসীর মুখ এমন বন্ধ করা আছে যে, তাহাতে কোনও মতে প্রবেশ করিবার সম্ভাবনা নাই; সুতরাং, গুড় খাইতে পাওয়ার প্রত্যাশা সুদুরপরাহত; তথাপি পিপীলিকারা, গুড়ের গন্ধেই মাত হইয়া, কলসীর চারি দিকে, সারি বাঁধিয়া, ঘুরিয়া বেড়াইতে থাকে। সেইরূপ, বিদ্যাবাগীশ পুড় মহাশয়েরা, পয়সা পান না পান, পয়সার গন্ধে অন্ধ হইয়া, যদি পাই এই প্রত্যাশায়, পয়সাওয়ালার গদির নীচে গরুড়ের ন্যায়। বসিয়া, শ্লোক পড়িয়া তোষামোদ ও জল উচু নীচু করেন, এবং, যৎকিঞ্চিৎ লাভের লোভসংবরণে অসমর্থ হইয়া, ইহকালে ও পরকালে এক কালে জলাঞ্জলি দিয়া, পয়সাওয়ালাদের খাতিরে, তাঁহাদের অভিমত ব্যবস্থায়, অবিকৃত চিতে, স্ব স্ব নাম স্বাক্ষর করিয়া থাকেন। শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভার চতুর্থ সাংবৎসরিক অধিবেশনে নিমন্ত্রিত বিদ্যাবাগীশের পাল, এবং পালের গোদা শ্রীমান্ ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন খুড়, যে ব্যবস্থাপত্রে স্বাক্ষর করিয়াছেন, তাহা এ বিষয়ের সর্ব্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্তস্থল। আশীর্ব্বাদ করি, পুণ্যশ্লোক, পূজ্যপাদ খুড় মহাশয়েরা চিরজীবী হউন।

ধর্ম্মকথা বলিতে গেলে, তাঁহাদের ঈদৃশ ব্যবহার, কোনও অংশে, দোষাবহ বলিয়া পরিগণিত হইতে পারে। কারণ, নীতিশাস্ত্রে ব্যবস্থাপিত আছে,

অর্থস্য পুরুষো দাসঃ।

মানুষ পয়সার গোলাম।

পয়সার জন্যে, মানুষে না করিতে পারে, এমন কর্ম্মই নাই। দেখুন, চুরি, ডাকাইতি, গলায় ছুরি, জুয়াচুরি, বাটপাড়ি, জাল সাক্ষী, জাল দলীল, জাল মোকদ্দমা, মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, প্রতারণা প্রভৃতি এ দেশের লোকের অঙ্গের আভরণ হইয়া উঠিয়াছে। যিনি, যে পরিমাণে, এই সকল বিষয়ে কৃতকার্য্য হইতে পারেন, তিনি, সেই পরিমাণে, সাধুসমাজে, বাহাদুর বলিয়া, গণনীয় ও প্রশংসনীয় হইয়া থাকেন।

অবশেষে, শ্রীমান্ বিদ্যারত্ন খুড়কে, কিছু উপদেশ দিয়া, এবারকার মত, জাল গুড়াইতেছি।

খুড় মহাশয়!

আপনি বেয়াড়া পণ্ডিত; কিন্তু, আপনকার মত, বেয়াড় আনাড়িও প্রায় চক্ষে পড়ে না। যে দিন, সর্ব্বপ্রথম, আপনার চাঁদমুখ নয়নগোচর করিয়া, মানবজন্ম সফল করি; সে দিন, ব্যবস্থা দিবার সময় বচন ফচন দেখা যায় না, এই কবুল দিয়া, হদ্দমুদ্দ আনাড়ির কর্ম্ম করিয়াছিলেন। সাবধান করিয়া দিতেছি, যেন উত্তর কালে, আর কখনও, ওরূপ মুখআলগা না হন। যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভার সভ্য মহোদয়দিগের আহ্বান অনুসারে, সভায় উপস্থিত হইয়াছিলেন, বেস করিয়াছিলেন; তাঁহারা সভায় বক্তৃতা করিতে বলিয়াছিলেন, ভালই; আপনকারদের দস্তুর মত, পাগলের ন্যায়, কতকগুলা অগড়ম বগড়ম বকিয়া, খানিক ক্ষণ গোলমাল করিয়া, বিদায় লইয়া চলিয়া গেলেই, বেস হইত। তাহা না করিয়া, বক্তৃতা লিখিয়া, ফাঁদে পা দিলেন কেন। যেরূপ জড়াইয়া পড়িয়াছেন, ছাড়াইয়া উঠা কঠিন। বলিতে কি, আপনি অতি বড় বক্কেশ্বর। এক্ষণে, আপনাকে এই উপদেশ দিতেছি, আপনাদের সমাজের সর্ব্বপ্রধান নৈয়ায়িক শ্রীমান্ ভুবনমোহন বিদ্যারত্ন খুড় মহাশয়ের নিকট, কিছু দিন জ্ঞান শিক্ষা করিবেন। তিনি, আপনার মত, বেহোঁস আহলাদিয়া ছোকরা, বা কাছাআলগা লোক, নহেন।

কিছু দিন হইল, নৈয়ায়িক বিদ্যারত্ন খুড়, শিয়ালদহ ইষ্টেশনে, খুলনার অস্তঃপাতী নৈহাটীনিবাসী যুক্ত বাবু কৈলাসচন্দ্র বসুর সহিত, বিধবাবিবাহ বিষয়ে, বাদানুবাদ করিতেছিলেন। বিদ্যাসাগর, বচনের অযথা অর্থ লিখিয়া, লোককে প্রতারণা করিয়াছেন; নৈয়ায়িক বিদ্যারত্ন খুড় এইরূপ বলাতে, নিকটবর্ত্তী এক ব্যক্তি কহিলেন, বিদ্যাসাগর, বচনের অযথা অর্থ লিখিয়া, লোককে প্রতারণা করিয়াছেন, যদি আপনকার এরূপ বোধ ও বিশ্বাস, থাকে, তাহা হইলে, ঐ সমস্ত লিখিয়া, সর্ব্ব সাধারণের গোচরার্থে, প্রচারিত করা আপনার উচিত। তাহাতে নৈয়ায়িক বিদ্যারত্ন খুড় কহিলেন,

“শতং বদ মা লিখ।”

শতবার বলিও, লিখিও না

কোনও বিষয়ে কোনও কথা বলিলে, যদি উত্তর কালে ধরাধরি পড়ে, কোন শালা বলিয়াছে বলিলেই, নিষ্কৃতি পাওয়া যায়; লিখিলে, ফাঁদে পা দেওয়া হয়, সহজে এড়াইতে বা ভাঁড়াইতে পারা যায় না। এজন্যই, পূর্ব্বোক্ত নীতিবাক্যে, লিখিতে নিষেধ। দেখুন দেখি, আপনার দুজনেই, এক এক বিষয়ে, সর্ব্বপ্রধান সমাজের সর্ব্বপ্রধান ব্যক্তি; উভয়েই বিদ্যারত্ন উপাধি ধরেন; উভয়েই সর্ব্বত্র সর্ব্বপ্রধান বিদায় মারিয়া থাকেন। কিন্তু, বুদ্ধি ও বিবেচনা বিষয়ে, উভয়ের আসমান জমীন ফরক। তিনি, পাগলের মত বেড়বেড় করিয়া বকিয়া, লোককে জ্বালাতন করিতে সম্মত আছেন। কিন্তু, লিখিয়া ফাঁদে পা দিতে, কোনও মতে, সম্মত নহেন। আপনি এমনই আনাড়ি, তাড়াতাড়ি লিখিয়া, ফাঁদে পা দিয়া জড়াইয়া পড়িলেন।

যদি বলেন, আমার উপরেই তোমার এতটা চোট কেন। আমাতে ও নৈয়ায়িক বিদ্যারত্নতে তফাৎ কি। আমরা উভয়েই ত, বিদায়ের সময়, এক ব্যবস্থায় স্বাক্ষযর করিয়াছি। ইহা সত্য বটে, আপনারা উভয়েই এক ব্যবস্থায় স্বাক্ষর করিয়াছেন; কিন্তু, সে জন্যে আমি আপনাদিকে ধর্ম্মতঃ অপরাধী করিতে পারি না। সে স্বাক্ষর আপনারা স্বেচ্ছা পূর্ব্বক করেন নাই; তাহা কেবল পয়সাওয়ালাদের খাতিরে ও পীড়াপীড়িতে করিতে হইমাছে। ঐ স্বাক্ষর না করিলে, আপনাদের, এ জন্মে আর, যশোহর প্রদেশে প্রবেশ করিবার অধিকার থাকিত না; এবং সেরূপ ঘটিলে, আমিই আবার আপনাদিগকে, আনাড়ির চুড়ামণি ও বেঅকুফের শিরোমণি বলিয়া, শত সহস্র বার তিরস্কার করিতাম। পয়সাওয়ালাদের মনোরঞ্জনই বিদ্যাবাগীশ দলের বিদ্যাভ্যাস ও শাস্ত্রানুশীলনের এক মাত্র উদ্দেশ্য, ইহা কাহারও অবিদিত নহে। আমার সুক্ষ বিচারে, সে বিষয়ে আপনাদের সাত খুন মাপ। আপনকার সন্তোষার্থে, অধিক আর কি বলি, পয়সাওয়ালাদের খাতিরে বা পীড়াপীড়িতে, কোনও কর্ম্ম করিলে, যদি কেহ আপনাদের উপর, কোনও প্রকায়ে, দোষামোপ করিতে অগ্রসর হয়, আমি খোদহাকিমি করিয়া, শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষণীসভা দেবীর সহায়তা গ্রহণ পূর্ব্বক, তাহাকে ফাঁসি দিতে, শূলে চড়াইতে, অথবা জন্মের মত দ্বীপান্তরে পাঠাইতে, ক্ষণ মাত্র বিলম্ব করিব না।

কিছু দিন হইল, অধুনা লোকান্তরবাসী, এক চিরস্মরণীয়, বহুদর্শী বিচক্ষণ,

পণ্ডিতে চ গুণাঃ সর্ব্বে মূর্খে দোষা হি কেবলম্।

এই নীতিবাক্যের, ‘পণ্ডিতের সব গুণ, দোষের মধ্যে বেটারা বড় মূর্খ’, এই ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। নিবিষ্টচিত্তে, বিশিষ্টরূপ বিবেচনা করিয়া বলুন দেখি, এই চমৎকারিণী ব্যাখ্যা, সর্ব্বাংশে সুসঙ্গত বলিয়া, নির্বিবাদে প্রতিপন্ন হয় কি না।

যাহা হউক, আপনি আর এরূপ কাঁচা কর্ম্ম না করেন, এই আমার প্রার্থনা, এই আমার অনুরোধ, এই আমার উপদেশ। পুনরায় এরূপ কাঁচা কর্ম্ম করিলে, যদিও, খুড় বলিয়া খাতির রাখিয়া, বাঁদরামি করিয়াছেন, না বলি; পাগলামি বা মাতলামি করিয়াছেন, এ কথা বলিতে কিছু মাত্র সঙ্কুচিত হইব না। অলমতিবিস্তরেণ; অর্থাৎ, এ বার এই পর্যন্ত।

খুড়র গুণের কথা অতি চমৎকার।

এমন গুণের খুড় না হেরিব আর

খুড়টির গুণের বালাই লয়ে মরি।

খুড়র পিরিতে সবে বল হরি হরি॥

হরিবোল! হরিবোল!

হরিবোল!

ইতি শ্রীব্রজবিলাসে মহাকাব্যে কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য কৃতৌ

পঞ্চম উল্লাসঃ।

সমাপ্তমিদম্ পূর্ব্বার্দ্ধম্।

দ্বিতীয় পরিশিষ্ট দেখ।

ও দেশের পুরুষজাতির পায়ে কোটি কোটি দণ্ডবৎ। তাঁহারা স্ত্রীলোকের পরকাল খাইবার আসল ওস্তাদ। স্ত্রীলোক, স্বভাবতঃ, সাতিশয় লজ্জাশীল; অতঃকরণে দূরভিলাষের উদয় হইলেও, তাঁহারা, লজ্জার খাতিরে, মুখ ফুটিয়া বলিতে পারেন না। তাহারা, স্বয়ম্প্রবৃত্ত হইয়া, ধর্ম্মভ্রষ্ট হইয়াছেন, এরূপ দৃষ্টান্ত অতিবিরল। কিন্তু, নিরতিশয় আক্ষেপের বিষয় এই পুরুষজাতির প্রবর্ত্তনাপরতন্ত্র হইয়া, এক বার অপথে পদার্পণ করিলে, লজ্জাভঙ্গ হইয়া যায়; একবার লজ্জাভঙ্গ হইলে, আর রক্ষা নাই। তখন,

“খুলিল মনের দ্বার না লাগে কপাট”।

সরিশেষ অভিনিবেশ সহকারে, অনুসন্ধান ও অনুধাবন করিয়া দেখিলে, ভয়ানক স্বার্থপর পুরুষজাতির অনিবার্য্য দুষ্প্রবৃত্তির আতিশয্যই স্ত্রীলোকের চরিত্রদোষের মূলকারণ বলিয়া স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ২। ২৭।

ধর্ম্মনির্ব্বাণ তন্ত্র ৩। ৭। ২১।

প্রথম উল্লাস

ব্রজবিলাস

প্রথম উল্লাস।

ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন বেহুদা পণ্ডিত।

আপাদমস্তক গুণ রতনে মণ্ডিত॥

শুভ ক্ষণে তাঁর মাতা ধরিল। উদরে।

নাহি দেখি সম তাঁর ভুবন ভিতরে॥

বুদ্ধির তুলনা নাই যেন বৃহস্পতি।

রূপের তুলনা নাই যেন রতিপতি॥

রসিকের চুড়ামণি সর্বগুণাকর।

সুশীলের শিরোমণি দয়ার সাগর॥

সুবোধের অগ্রগণ্য দানে কর্ণ প্রায়।

যেই যে বিধান চায় সেই তাহা পায়॥

এ বিষয়ে কেহ নাহি তাহার সমান।

এক মাত্র তিনি নিজ উপমার স্থান॥

তাঁহার গুণের কিছু করিব বর্ণন।

অবহিত চিত্তে সবে করই শ্রবণ॥

যদি আপনারা বলেন, তুমি কে হে বাপু; তোমার এত বড় আম্পর্ধা কেন। তুমি, বামন হয়ে, আকাশের চাঁদ ধরিতে চাও। তোমার এমন কি ক্ষমতা, যে তুমি বিশ্ববিজয়ী দিগ্গজ পণ্ডিতের গুণ বর্ণনা করিবে। আমার উত্তর এই, সবিশেষ না জানিয়া শুনিয়া, সহসা আমায় হেয়ঞ্জান করিবেন না। আমি এক জন; যথার্থ কথা বলিতে গেলে, আমি নিতান্ত যেমন তেমন এক জন নই। আমার পরিচয় শুনিলে, আপনারা চমকিয়া উঠিবেন, সে বিষয়ে এক কড়ারও সংশয় নাই। ‘বামন হয়ে আকাশের চাঁদ ধরিতে চাও’, এ কথাটি, বোধ হয়, আপনারা ঠাট্টা করিয়া বলিয়াছেন। আমি কিন্তু, ঠাট্টা না ভাবিয়া, শ্লাঘা জ্ঞান করিতেছি। আমাদের বংশমর্যাদা অতি বেয়াড়া। বামন বংশের আদিপুরুষ তারতবর্ষের পঞ্চম অবতার। তিনি, ত্রিলোকবিজয়ী বলি রাজার যজ্ঞক্ষেত্রে উপস্থিত হইয়া, কি ফেলাৎ, কি কারখানা, করিয়াছিলেন, তাহা কি কখনও আপনাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে নাই।

বাপ কা বেটা সিপাহী কা ঘোড়া

কুছ না রহে তব ভি থোড়া।

যদিও, যুগমাহাত্ম্যে, আদিপুরুষের সম্পূর্ণ ক্ষমতা আমাদের না থাকে, কিছু ত থাকিবে। তিনি এক পদে সমস্ত আকাশমণ্ডল আক্রমণ করিয়াছিলেন। আমরা কি, তাঁহার বংশের তিলক হইয়া, আকাশমগুলের এক অংশেও হাত বাড়াইতে পারিব না। অবশ্য পরিব। অল্প, ইহাও বিবেচনা করা আবশ্যক, আমি খাঁহাকে ধরিতে চাহিতেছি, তিনি আকাশের চাঁদ নহেন, নদিয়ার চাঁদ। নদিয়ার চাঁদকে ধরিতে যাওয়া, আমার মত বেহুদা বাহাদুরের পক্ষে, নিতান্ত অসংসাহসিকের কার্য্য বলিয়া বোধ হয় না।

এক সময়ে, চৈতন্য দেব, নদিয়ার চাঁদ বলিয়া, খ্যাত হইয়াছিলেন। বোধ হয়, তাঁর রঙটা বেস ফরসা ছিল, তাই তাঁকে নদিয়ার চাঁদ বলিত। যথার্থ গুণ প্রকাশ অনুসারে বলিতে গেলে, বিদ্যারত্ন খুড়ই নদিয়ার প্রকৃত চাঁদ। নদিয়ার চাঁদ, অর্থাৎ নদিয়া উজ্জ্বল করিয়াছেন। তাঁহার পূর্ব্বে, রঘুনাথ, জগদীশ, গদাধর, রঘুনন্দন প্রভৃতি নদিয়াকে যেমন উজ্জ্বল করিয়াছিলেন, শ্রীমান্ বিদ্যারত্ন খুড়, নিজগুণে, তদপেক্ষা শত সহস্র গুণে, অধিক উজ্জ্বল করিয়াছেন। বলিতে কি, খুড় যে এত বড় ভাগ্যধর হইবেন, ইহা, ক্ষণ কালের জন্যে, আমাদের কাহারও খেয়ালে আইসে নাই।

স্ত্রিয়াশ্চরিত্রং পুরুষ ভাগ্যং

দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যাঃ।

স্ত্রীলোকের চরিত্র ও পুরুষের ভাগ্যের কথা দেবতারা জানেন না, মানুষে কেমন করিয়া জানিবে।

ইতি পূর্বে বলিয়াছি, আমার পরিচয় শুনিলে, আপনাৱা চমকিয়া উঠিবেন। কিন্তু, অন্যমনস্ক হইয়া, এ পর্যন্ত আত্মপরিচয় দিতে পারি নাই। এজন্য, যদিও আপনার, সাহস করিয়া, মুখ ফুটিয়া বলিতে না পারুন, মনে মনে বিরক্ত হইতেছেন, তাহার সন্দেহ নাই। বোধ করি, পরিচয় দিতে বিলম্ব করা আর, কোনও মতে, উচিত হইতেছে না। যেরূপ দেখিতেছি, তাহাতে, আমি কে, ও কি ধরপের জানোয়ার, তাহা জানিবার জন্য, আপনারা ছটফট করিতেছেন। যদি বলেন, তবে পরিচয় দিতে এত বিলম্ব ও আড়ম্বর করিতেছ কেন। তাহার কারণ এই, পরিচয় দিলেই, ভুর ভাঙিয়া যাইবে; তাহা অপেক্ষা, চালাকি ও গোলমাল করিয়া, যত ক্ষণ আপনাদিগকে ফাঁকি দিতে পারি, সেই লাভ, সেই বাহাদুরি। যদি বলেন, লোককে ফাঁকি দেওয়া কি ভদ্রের কর্ম। এ বিষয়ে বক্তব্য এই, আপনারা ভদ্র কাহাকে বলেন, তাহা আমি জানি না। অভিধানে ভদ্র শব্দের যে অর্থ শিখিয়াছিলাম, সে অর্থের ভদ্র শব্দে নির্দেশ করিতে পারা যায়, এরূপ লোক দেখিতে পাই না। তবে

যদদারতি শ্রেষ্ঠগুদেবেতনরা জনঃ।

ইতর লোকে ভদ্র লোকের দৃষ্টান্তের অনুবর্তী হইয়া চলিয়া থাকে।

এই ব্যবস্থা অনুসারে, আমরা, শ্রীমান্ নদিয়ার চাঁদ বিদ্যারত্ন খুড় প্রভৃতি, এ কালের ভদ্রশব্দবাচ্য, মহাপুরুষদিগের দৃষ্টান্ত অনুসারে, চলিতে শিখিতেছি। কিছু কাল অভ্যাস করিলে, হয় ত, ব্যুৎপত্তিবলে, তাঁহাদের ঘাড়ে চড়িয়া বসিব। ইহার পর, আর তাঁহারা আমাদের কাছে কলিকা পাইবেন না।

বাঁশের চেয়ে কন‍্চি দড়।

শিষ্যবিদ্যা গরীয়সী॥

আমি বড় মজার লোক, বাজে গোল করিয়া, মিছা সময় নষ্ট করিতেছি। পরিচয় দিতে আর বিলম্ব করা, বোধ হয়, ভাল দেখাইতেছে না। পাঠক মহাশয়েরা শুনুন আমি কে। শুনিয়া কিন্তু, আপনারা অবাক হইবেন,

আমি উপযুক্ত ভাইপো।

কেমন, এখন, আমি কে, চিনিলেন। যদি কেহ বলেন, চিনিতে পারিলাম না; তাঁর বাপ নির্ব্বংশ হউক। কি পাপ! কি বালাই! কি বিড়ম্বনা! অনায়াসে, আমার পরম রমণীয় প্রফুল্ল মুখকমল হইতে, অতি বিষম অতিসম্পাতবাক্য বিনির্গত হইল। অথবা, সে জন্যে ভাবনাই বা কি; কলিকালে ত অভিসম্পাত ফলে না; যদি ফলিত, রক্ষা থাকিত না। বিদ্যভুড়ভুড়ি বিদ্যাবাগীশ খুড় মহাশয়েরা, কথায় কথায়, অভিসম্পাত দিয়া থাকেন। তাহাতে, এ পর্যন্ত, কার কি হয়েছে। চুলায় যাউক, আর বাজে কথায় কাজ নাই।

যদি বলেন, তুমি এত কাল কোথায় ছিলে। তুমি যে আজও নরলোকে বিরাজমান আছ, তাহার কোনও নিদর্শন পাওয়া যায় নাই কেন। ইহার উত্তর এই, আমি অজগরের ন্যায় অলস, কুম্ভকর্ণের ন্যায় নিদ্রালু; সহজে নড়িতে চড়িতে ইচ্ছা করে না; আর, নিদ্রাগত হইলে, সহজে নিদ্রাভঙ্গ হয় না। বিবেচনা করিতে গেল, আমি এক রকম খুব সুখে কাল কাটাইতেছি। তবে কি জানেন, শ্রীমান্ বিদ্যাবাগীশ খুড়দের বাড়াবাড়ি দেখিলে, উপযুক্ত ভাইপো হইয়া, উপেক্ষা করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিলে, ধর্ম্মবহির্ভূত ব্যবহার হয়। এজন্য, বহুবিবাহ বিষয়ক বিচারের সময়, মহামহোপাধ্যায় পূজ্যপাদ শ্রীমান্ তারানাথ তর্কবাচস্পতি ভট্টাচার্য্য খুড় মহাশয়কে কিছু উপদেশ দিয়াছিলাম। সম্প্রতি, মহামহোপাধ্যায় পূজ্যপাদ নদিয়ার চাঁদ শ্রীমান্ ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন ভট্টাচার্য্য খুড় মহাশয়, বিধবাবিবাহ বিষয়ক বিচার উপলক্ষে, যে অদৃষ্টচর, অশ্রুতপূর্ব্ব পাণ্ডিত্যপ্রকাশ করিয়াছেন, তৎসম্বন্ধে তাঁহাকে কিছু উপদেশ না দিলে, আমার মত যথার্থ উপযুক্ত ভাইপোর উপর, পক্ষপাতিতা দোষের আরোপ হইতে পারে; নিরবচ্ছিন্ন সেই ভয়ে, বিদ্যারত্ন খুড়কে উচিত মত উপদেশ দিতে, বদ্ধপরিকর হইলাম।

ইতি শ্রীব্রজবিলাসে মহাকাব্যে কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য কৃতৌ

প্রথম উল্লাসঃ

আমি এ স্থলে, শ্রীমান ব্রজনাথ বিদ্যারত্নকে নদিয়ার চাঁদ বলিলাম। কিন্তু, শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা দেরী, ইতিপুর্ব্বে, শ্রীমান্ ভুবনমোহন বিদ্যারত্নকে নবদ্বীপচন্দ্র অর্থাৎ নদিয়ার চাঁদ বলিয়াছেন। উভয়েই বিদ্যারত্ন উপাধিধারী, উভয়েই স্ব স্ব বিষয়ে সর্ব্বপ্রধান বলিয়া গণ্য, বিদ্যা বুদ্ধির দৌড়ও উভয়ের একই ধরণের। সুতরাং, উভয়েই নবদ্বীপচন্দ্র অর্থাৎ নদিয়ার চাঁদ বলিয়া প্রতিষ্ঠিত হইবার যোগ্য পাত্র, সে বিষয়ে সংশয় নাই। কিন্তু, এ পর্যন্ত, এক সময়ে, দুই চাঁদ দেখা যায় নাই। সুতরাং, এক জন বই, দুজনের নদিয়ার চাঁদ হইবার সন্তাবনা নাই। কিন্তু, উভয়ের মধ্যে, এক জন এক বারেই বঞ্চিত হইবেন, সেটাও ভলি দেখায় না; এবং, ঐ উপলক্ষে, দুজনে হুড়হুড়ি ও গুঁতগুঁতি করিয়া মরিবেন, সেটাও ভাল দেখায় না। এ জন্য, আমার বিবেচনায়, সমাংশ করিয়া, দুজনকেই, এক এক অর্দ্ধচন্দ্র দিয়া, সন্তুষ্ট করিয়া, বিদায় করা উচিত। শ্রীমঙী যশোহর হিন্দুধর্ম্মরক্ষণী সভা দেবী আমার এই পক্ষপাতবিহীন কয়তা ঘাড় পাতিয়া লইলে, আর কোনও গোলযোগ বা বিবাদ বিসংবাদ থাকে না। এক্ষণে, তাঁর যেরূপ মরজি হয়।

প্রথম পরিশিষ্ট

প্রথম পরিশিষ্ট।

জনমেজয় খুড় মহাশয় যখন উপাধি পান, সে সময়ে আমি অন্যমনস্ক ছিলাম। এজন্য, তিনি কি উপাধি পাইলেন, শুনিতে পাই নাই। পার্শ্ববর্ত্তী লোকদিগকে জিজ্ঞাসা করাতে, কেহ কেহ কহিলেন “কপিরত্ন”, কেহ কেহ কহিলেন, “কবিরত্ন। আমি বিষম সঙ্কটে পড়িলাম। উভয় পক্ষে লোকসংখ্যা সমান, সুতরাং, অধিকাংশের মতে কার্য্য শেষ করিবার পথ ছিল না। অবশেষে, অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া, আপাততঃ “কপিরত্ন” বলাই সাব্যস্ত করিলাম। কারণ, যদি উত্তর কালে কবিরত্ন বলিতে হয়, তাহায় পথ পরিষ্কার রহিল। কপ্-ই এই দুরের সন্ধি করিলে, কবি হইতে পারিবেক। কিন্তু, এখন কবিরত্ন বললে, যদি উত্তর কালে কপিরত্ন বলা আবশ্যক দাঁড়ায়, তাহার আর উপায় থাকিবেক না। ব্যাকরণের সূত্র অনুসারে, স্বরবর্ণ পরে থাকিলে, পদের অন্তস্থিত প স্থানে ব হয়; কিন্তু, ব স্থানে প হইবার বিধান নাই। যদি কেহ আপত্তি করেন, প স্থানে যে ব হয়, তাহা বর্গীয়; কিন্তু, কবি শব্দের ব আন্তঃস্থা; এমন স্থলে, ওরূপ সন্ধি দ্বারা, কি রূপে, কবিশব্দ সম্পন্ন করিবে। ইহার উত্তর এই, যখন এ দেশে উভয় বকারের, কি আকার, কি উচ্চারণ, কোনও অংশে কোনও প্রভেদ নাই, তখন বর্গীয় ও অন্তঃস্থা বকারের কথা ভুলিয়া, আপত্তি উত্থাপন করা খাটি বোকার কর্ম্ম।

এক গ্রামে দুই বিদ্যাবাগীশ খুড় ছিলেন। ইঁহারা দুই সহোদর। জ্যেষ্ঠ নৈয়ায়িক, কনিষ্ঠ স্মার্ত্ত। এক দিন, এক ব্যক্তি ব্যবস্থা জানিতে গিয়াছিলেন। স্মার্ত্ত বিদ্যাবাগীশ বাটীতে নাই শুনিয়া, তিনি চলিয়া যাইতেছেন দেখিয়া, নৈয়ায়িক বিদ্যাবাগীশ জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি জন্যে আসিয়াছ। তিনি কহিলেন, আমার একটা তিন বৎসরের দৌহিত্র মরিয়াছে; তাহাকে পুতিব বা পোড়াইব, ইহার ব্যবস্থা জানিতে আসিয়াছি। নৈয়ায়িক অনেক ভারিয়া চিন্তিয়া কহিলেন, তাহাকে পুতিয়া ফেল। সে ব্যক্তি জানিতেন, তিন বৎসরের ছেলেকে পোড়াইতে হয়, পুভিতে হয় না; তথাপি, সন্দেহ করিয়া, জিজ্ঞাসা করিতে আসিয়াছিলেন। এক্ষণে, পুতিতে হইবে, এই ব্যবস্থা শুনিয়া, তিনি সন্দিগ্ধ মনে ফিরিয়া যাইতেছেন; এমন সময়ে, পথিমধ্যে, স্মার্ত্তের সহিত সাক্ষাৎ হইলে, জিজ্ঞাসিলেন, পুতিব না পোড়াইব। তিনি পোড়াইতে বলিলেন। তখন সে ব্যক্তি কহিলেন, তবে বড় মহাশয় পুতিতে বলিলেন, কেন। স্মার্ত্ত, জ্যেষ্ঠের মান রক্ষার জন্য, কহিলেন, তিনি পরিহাস করিয়াছেন। অনন্তর তিনি, বাটীতে গিয়া, জ্যেষ্ঠকে কহিলেন, কি বুঝিয়া আপনি এমন ব্যবস্থা দিলেন; পোড়াইবার স্থলে পুতিতে বলা, অতি অন্যায় হইয়াছে। নৈয়ায়িক কহিলেন, আমি অনেক বিবেচনা করিয়াই, পুতিতে বলিয়াছি। পুতিয়া রাখিলে, যদি পোড়াইবার দরকার হয়, ভুলিয়া পোড়াইতে পারিবেক; কিন্তু, যদি পোড়াইতে বলিতাম, তখন পোড়াইয়া ফেলিলে, যদি পুতিবার দরকার হইত, তখন কোথায় পাইত।

যেমন পোড়াইবার দরকার হইলে, তুলিয়া পোড়াইতে পারিবেক, এই বিবেচনা করিয়া, নৈয়ায়িক পুতিবার ব্যবস্থা দিয়াছিলেন; সেইরূপ, কবিরত্ন বলা আবশ্যক হইলে, প স্থানে ব করিলেই চলিবেক, এই বিবেচনায়, উত্তর কালের পথ পরিষ্কার রাখিয়া, আমি কপিরত্ন উপাধিই সাব্যস্ত করিলাম; পরে যদি প্রমাণ প্রয়োগ দ্বারা প্রতিপন্ন হয়, খুড় মহাশয় কবিরত্ন উপাধি পাইয়াছেন; তখন, পুর্ব্বোক্ত প্রণালীতে, প স্থানে ব করিলেই, সর্বাংশে নিখিরকিচ হইবেক।

কপিরত্ন উপাধি সাব্যস্ত রাখিবার জন্য, যে প্রবল যুক্তি ও উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত দেখাইলাম, তাহা অকাট্য; কার বাপের সাধ্য, তাহাতে দন্তস্ফুট করে। এমন কি, “নবদ্বীপচন্দ্র, পণ্ডিতগণ্য, সুপ্রসিদ্ধ বাগ্মী,” নৈয়ায়িক পালের গোদা, শ্রীযুত ভুবনমোহন বিদ্যারত্ন খুড় মহাশয়, সাহস করিয়া, ভাহার প্রতিবাদ করিতে অগ্রসর হইতে পারিবেন না।

কিঞ্চ, শাস্ত্রকারেরাও ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন,

“প্রথমোপস্থিতপরিত্যাগে প্রমাণাভাবঃ”।

যাহা প্রথম উপস্থিত, তাহার পরিত্যাগ অপ্রামাণিক।

বর্ণমালা পাঠ করিতে আরম্ভ করিতে, প প্রথম উপস্থিত হয়, তৎপরে ব; এমন স্থলে, প পরিত্যাগ করিয়া ব ধরিতে গেলে, অর্থাৎ কপিরত্ন না বলিয়া কবিরত্ন বলিলে, উপরি দর্শিত প্রামাণিক ব্যবস্থার অপ্রামাণ্য ঘটে।

অপিচ, প অক্ষরটি মোলায়েম, ব অক্ষরটি কড়া; জনমেজয় ধুড় যেরূপ রসিকের চূড়ামণি, তাঁহার উপাধিটি যত মোলায়ম অক্ষরে বানান যাইবেক, ততই মানানসই হইবে; এ বিবেচনাতেও, কপিরত্ন বলাই উচিত ও আবশ্যক। সভায় উপস্থিত বিদ্যাবাগীশ পালের মধ্যে, যদি কেহ বহুদর্শী আলঙ্কারিক থাকেন, তিনিই এই মীমাংসাটির প্রকৃত রূপ তাৎপর্য্য গ্রহণ করিতে পারিবেন। স্মার্ত্ত নৈয়ায়িক প্রভৃতি পালের গোদারা, ফেলফেল করিয়া চাহিয়া থাকিবেন, ভিতরে প্রবেশ করিতে পারিবেন না।

অপরঞ্চ, প্রামাণিক লোকের মুখে শুনিতে পাওয়া যায়, ঘটকচূড়ামণি, প্রথম দশায়, “কচি পাঁঠা” এই অপুর্ব উপাধি পাইয়াছিলেন। বোকা পাঁঠা উপাধি হইলে, তিনি লোকালয়ে অধিকতর বলবিক্রমশালী বলিয়া প্রতিষ্ঠিত হইতে পারিবেন, এই প্রবল যুক্তি দেখাইয়া, কেহ কেহ কচি শব্দ স্থলে বোকা শব্দ বসাইতে চাহিয়াছিলেন। এ বিষয়ে নানা তর্ক ও বিস্তর বাদানুবাদও হইয়াছিল। অবশেষে, “বোকা পাঁঠা” অপেক্ষা কচি পাঁঠা” মোলায়ম, নিরবচ্ছিন্ন এই বিবেচনায়, “কচি পাঁঠা উপাধিই সাব্যস্ত হয়। এ অনুসারে, কপিরত্ন উপাধি সাব্যস্ত হওয়াই, ঘটকচূড়ামণি খুড় মহাশয়ের পক্ষে, সর্ব্বতোভাবে বিধিসিদ্ধ হইতেছে।