বেতালপঞ্চবিংশতি
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৬৮
প্রকাশনা-তথ্য
বেতালপঞ্চবিংশতি
শ্রীঈশ্বরচন্দ্রবিদ্যাসাগরপ্রণীত।
নবম সংস্করণ।
কলিকাতা
সংস্কৃত যন্ত্র
সংবৎ ১৯২৫
বিজ্ঞাপন
কালেজ অব্ ফোর্ট উইলিয়ম নামক বিদ্যালয়ে তত্রত্য ছাত্রগণের প্রথমপাঠার্থে বাঙ্গালা ভাষায় হিতোপদেশ নামে যে পুস্তক নির্দিষ্ট ছিল তাহার রচনা অতি কদর্য্য। বিশেষতঃ কোন কোন অংশ এমন দুরূহ ও অসংলগ্ন যে কোন ক্রমেই অর্থবোধ ও তাৎপর্য্যগ্রহ হইবার বিষয় নহে। তৎপরিবর্তে পুস্তকান্তর প্রচলিত করা উচিত ও অবশ্যক বিবেচনা করিয়া উক্ত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মহামতি শ্রীযুক্ত মেজর জি টি মার্শল মহোদয় কোন নুতন পুস্তক প্রস্তুত করিতে আদেশ করেন। তদনুসারে আমি বৈতালপচীসীনামক প্রসিদ্ধ হিন্দী পুস্তক অবলম্বন করিয়া এই গ্রন্থ লিখিয়া ছিলাম।
যৎকালে প্রথম প্রচারিত হয় আমার এমন আশা ছিল না বেতালপঞ্চবিংশতি সর্ব্বত্র পরিগৃহীত হইবেক। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে বাঙ্গালা ভাষার অনুশীলনকারী ব্যক্তিমাত্রেই আদরপূর্ব্বক গ্রহণ করিয়াছেন এবং এতদ্দেশীয় প্রায় সমুদয় বিদ্যালয়েই প্রচলিত হইয়াছে। ফলতঃ দুই বৎসরের অনধিককালমধ্যেই প্রথম মুদ্রিত সমস্ত পুস্তক নিঃশেষ রূপে পর্য্যবসিত হয়।
প্রায় সংবৎসর অতিক্রান্ত হইল পুস্তকের অসদ্ভাব হুইয়াছে। কিন্তু কোন কোন কারণবশতঃ আমি পুনর্মুদ্রাকরণে এ পর্য্যন্ত পরাঙ্মুখ ছিলাম। পরিশেষে গ্রাহকমণ্ডলীর অগ্রহাতিশয় দর্শনে দ্বিতীয় বার মুদ্রিত ও প্রচারিত করিলাম। যে যে স্থান অসঙ্গত ও অপরিশুদ্ধ ছিল সুসঙ্গত ও পরিশোধিত হইয়াছে এবং অশ্লীল পদ বাক্য ও উপাখ্যানভাগ সকল পরিত্যাগ করা গিয়াছে। এক্ষণে বেতালপঞ্চবিংশতি পূর্ব্ববৎ সর্ব্বত্র পরিগৃহীত হইলে শ্রম সফল বোধ করিব।
শ্রীঈশ্বরচন্দ্রশর্ম্মা
কলিকাতা।
১০ ই ফাগুন। সংবৎ ১৯০৬।
অষ্টম উপাখ্যান
অষ্টম উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
মিথিলানগরে গুণাধিপ নামে রাজা ছিলেন। দক্ষিণদেশীয় চিরঞ্জীব নামে রজঃপূত তাঁহার গুণগ্রাহকতা ও বদান্যতা কীর্ত্তি শ্রবণ করিয়া তন্নিকটে কর্ম্মের প্রার্থনায় উপস্থিত হইল। কিন্তু তাহার দুরদৃষ্টক্রমে রাজা তৎকালে সর্ব্ব ক্ষণ অন্তঃপুরবাসী হইয়া মহিলাগণসহবাসে কালযাপন করিতেন বহু কালেও এক বার রাজসভায় উপস্থিত হইতেন না। সংবৎসর ব্যতীত হইল তথাপি চিরঞ্জীব রাজসাক্ষাৎকার লাভ করিতে পারিল না এবং ব্যয়োপযুক্ত যৎকিঞ্চিৎ যাহা সমভিব্যাহারে আনিয়াছিল তাহাও ক্রমে ক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হইল।
এই রূপে নিঃসম্বল হইয়া চিরঞ্জীব মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিল আমি প্রায় এক বৎসর হইল আশারাক্ষসীর মায়ায় মুগ্ধ হইয়া শ্ববৃত্তিসেবাপ্রত্যাশায় দূর দেশ হইতে আসিয়া রাজ্যতন্ত্রপরাঙ্মুখ স্ত্রীপরতন্ত্র রাজার আশ্রয় লইয়াছি। অভীষ্টসিদ্ধির কথা দূরে থাকুক এ পর্য্যন্ত তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতেও পারিলাম না। দেবতা কত দিনে আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া রাজাকে অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইবার সুমতি প্রদান করিবেন তাহাও বুঝিতে পারিতেছি না। আর এ ব্যক্তিকে অমাত্যায়াত্ত দেখিতেছি স্বয়ং রাজকার্য্যে মনোযোগে করে না। কিন্তু রাজা স্বায়ত্ত না হইলেও তাঁহার নিকট মাদৃশ জনের অনায়াসে প্রার্থনাসিদ্ধির সম্ভাবনা নাই। আর অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেই যে আমি এতাদৃশ ব্যক্তির নিকট প্রার্থনা করিয়া কৃতকার্য্য হইতে পারিব ইহারই বা নিশ্চয় কি। বিশেষতঃ এক্ষণে আমি নিঃসম্বল হইলাম। ভিক্ষা দ্বারা পরান্নসংগ্রহ ব্যতিরেকে এ স্থলে অবস্থিতি করিবারও উপায় নাই। কিন্তু পরান্নসেবা মৃত্যুযন্ত্রণা অপেক্ষাও সমধিক ক্লেশদায়িনী। অতএব অনিশ্চিত শ্ববৃত্তিলাভপ্রত্যাশায় আর এক শ্ববৃত্তি অবলম্বন করা অতি নির্ঘৃণ ও কাপুরুষের কর্ম্ম। ফলতঃ আশার দাসত্ব স্বীকার করিলেই এই সমস্ত দুঃসহ ক্লেশ ভোগ করিতে হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি আশাকে দাসী করিয়া সকল ক্লেশের মস্তকে পদার্পণ করিয়াছে তাহারই জীবন সার্থক এবং যদি সংসারে কেহ সুখী থাকে তবে সে ব্যক্তিই যথার্থ সুখী। অতএব অদ্যই আমি সংসারাশ্রমে জলাঞ্জলি দিয়া অরণ্যে গিয়া জগদীশ্বরের আরাধনায় প্রবৃত্ত হইব। এই নিশ্চয় করিয়া চিরঞ্জীব মিথিলা পরিত্যাগপূর্ব্বক অরণ্য প্রবেশ করিল।
কিয়ৎ দিন পরে রাজা গুণাধিপ অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইয়া পুনর্বার রাজকার্য্যে নিবিষ্টমনা হইলেন এবং কতিপয় দিবসের পর কিয়দংশ সৈন্য সামন্ত সমভিব্যাহারে করিয়া মৃগয়ায় গমন করিলেন। ইতস্ততঃ নানা বনে ভ্রমণ করিয়া পরিশেষে তিনি এক মৃগের অনুসরণক্রমে অশ্বারোহণে একাকী অরণ্যের নিবিড়তর প্রদেশে প্রবিষ্ট হইলেন। তৎকালে সকলভুবনপ্রকাশক ভগবান্ কমলিনীনায়ক অস্তাচলচূড়াবলম্বী হইলে চারি দিক্ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইতে লাগিল এবং সে মৃগও দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইল।
তখন রাজা যৎপরোনাস্তি ভীত ও ক্ষুৎপিপাসায় পীড়িত হইয়া অত্যন্ত বিষণ্ণ ও চিন্তাকুল হইলেন। কিন্তু ভয়ক্ষোভ অপেক্ষা বুভুক্ষা ও পিপাসার পীড়া ক্রমে ক্রমে অধিক প্রবল হইয়া উঠিল। তিনি একান্ত অধৈর্য্য হইয়া ইতস্ততঃ জলান্বেষণ করিতে লাগিলেন। পরিশেষে সেই নিবিড় অরণ্যমধ্যে অসম্ভাবিত কুটীর দর্শন করিয়া হৃষ্টমনা হইলেন। রজঃপূত চিরঞ্জীব বিষয়বিরক্ত হইয়া ঐ কুটীর নির্মাণ করিয়া তপস্যা করিতেছিলেন। রাজা তথায় উপস্থিত ও কুটীরদ্বারে দণ্ডায়মান হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কাতরতা প্রদর্শনপূর্ব্বক জলদান দ্বারা প্রাণদান প্রার্থনা করিলেন। চিরঞ্জীব আতিথেয়তা প্রদর্শনপূর্ব্বক তৎক্ষণাৎ তপোবনসুলভ সুস্বাদ ফল ও সুশীতল জল প্রদান করিল।
রাজা ফল ও জল পাইয়া একপ্রকার ক্ষুধানিবৃত্তি ও পিপসাশান্তি করিলেন এবং সাতিশয় পরিতৃপ্ত হইয়া আপনাকে পুনর্জীবিত বোধ করিতে লাগিলেন। পরে মহোপকারক চিরঞ্জীবের ভাবদর্শনে প্রকৃতঋষিবোধ না হওয়াতে বিনয়পূর্ব্বক কহিলেন মহাশয় আপনি আমার যে মহোপকার করিলেন তাহাতে আমি আপনকার চিরক্রীত রহিলাম। এক্ষণে এক অনুচিত প্রার্থনা দ্বারা ধৃষ্টতাপ্রকাশে প্রবৃত্ত হইতেছি অনুগ্রহপূর্ব্বক অপরাধ মার্জ্জনা করিবেন। আমি ক্রিয়া দ্বারা আপনাকে বিশুদ্ধ তপস্বী দেখিতেছি কিন্তু আকার ইঙ্গিত দর্শনে কোন ক্রমেই প্রকৃত তপস্বী বলিয়া বোধ হয় না। এই বিষয়ে আমার গুরুতর সংশয় উপস্থিত হইয়াছে। আপনি প্রাণসংশয়সময়ে জলদান দ্বারা আমাকে জীবনদান করিয়াছেন এক্ষণে কৃপাপ্রকাশপূর্ব্বক সংশয়াপনোদন দ্বারা চরিতার্থ করুন।
চিরঞ্জীব রাজার অনুরোধলঙ্ঘনে অসমর্থ হইয়া আত্মপরিচয় প্রদানপূর্ব্বক কহিল আমি লোকমুখে মিথিলাধিপতি রাজা গুণাধিপের আশ্রিতপ্রতিপালনকীর্ত্তি শ্রবণ করিয়া কর্ম্মপ্রার্থনায় তাঁহার নিকট গিয়াছিলাম। কিন্তু আমার ভাগ্যদোষে রাজা বিষয়সম্ভোগে আসক্ত হইয়া সংবৎসরমধ্যেও অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেন না। তৎপরে আমি নানা কারণে বিরক্ত হইয়া অরণ্যবাস আশ্রয় করিয়াছি। কিন্তু জাতিস্বভাসিদ্ধ রজোগুণের অতিরেকপ্রযুক্ত আমার অন্তঃকরণ সাত্ত্বিক কার্য্যে অনুরক্ত হইতেছে না এখনও রাজসপ্রকৃতিসুলভ বিষয়ানুরাগে বিচলিত হইতেছে। অতএব তোমার এই সংশয় নিতান্ত অমূলক নহে তুমি উত্তম অনুভব-করিয়াছ। রাজা শুনিয়া মনে মনে অত্যন্ত লজ্জিত হইলেন।
পর দিন প্রভাত হইবামাত্র রাজা গুণাধিপ আত্মপরিচয় প্রদানপূর্ব্বক চিরঞ্জীবকে রাজধানীতে লইয়া গেলেন এবং সাতিশয় অনুগ্রহভাজন ও প্রিয়পাত্র করিয়া আপন নিকটে রাখিলেন। তদবধি রাজা তাহার প্রতি সর্ব্বদাই সদয় ছিলেন সে ব্যক্তিও প্রাণান্তপর্য্যন্ত স্বীকার করিয়া তদীয় নিদেশ সম্পাদন করিত।
এক দিবস রাজা কোন অনুল্লঙ্ঘনীয় প্রয়োজনানুরোধে চিরঞ্জীবকে দেশান্তরে প্রেরণ করিয়াছিলেন। সে রাজকার্য্য সম্পাদন করিয়া পরিশেষে অর্ণবতীরে উপস্থিত হইয়া এক অপূর্ব্ব দেবালর দর্শন করিল এবং তন্মধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক দর্শনাদি করিয়া নির্গত হইবামাত্র এক পরম সুন্দরী স্ত্রীকে সহসা উপস্থিত দেখিয়া তাহার লোকাতিগ সৌন্দর্য্যে মোহিত হইয়া একতান মনে অবলোকন করিতে লাগিল। সেই রমণী তাহার এইরূপ ভাব দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল হে পুরুষবর তুমি কি নিমিত্তে এ স্থানে আসিয়াছ এবং কি নিমিত্তেই বা চিত্রার্পিতের ন্যায় দণ্ডায়মান আছ। চিরঞ্জীব কহিল পর্য্যটনস্পৃহায় আসিয়াছিলাম কিন্তু তোমার অলৌকিক রূপ লাবণ্য দর্শনে মোহিত হইয়াছি। স্ত্রী কহিল তুমি এই সরোবরে অবগাহন কর, তাহা হইলে আমি তোমার আজ্ঞাকারিণী হইব।
চিরঞ্জীব শ্রবণমাত্র অতিমাত্র হৃষ্ট হইয়া সরোবরে অবগাহন করিল কিন্তু জলমধ্য হইতে মন্তক উত্তোলন করিয়া দেখিল আপন আলয়ে উপস্থিত হইয়াছে। তখন যৎপরোনান্তি বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া আর্দ্রবস্ত্রপরিত্যাগ ও বস্ত্রান্তরপরিধান করিল এবং অবিলম্বে নরপতিগোচরে উপস্থিত হইয়া পূর্ব্বাপর সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদিল। এই অদ্ভুত ব্যাপার কর্ণগোচর করিয়া রাজা অত্যন্ত বিস্ময়াপন্ন হইলেন এবং কহিলেন আমাকে ত্বরায় সেই স্থানে লইয়া চল। অনন্তর উভয়ে সমুচিত যানারোহণপূর্ব্বক সমুদ্রতীরে উপস্থিত হইয়া সেই দেবালয়ে প্রবেশ করিলেন এবং যথোচিত ভক্তিযোগ সহকারে পূজাপ্রণামাদি সমাধান করিয়া নির্গত হইলেন।
এই অবসরে সেই সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী রমণী রাজার সম্মুখে আসিয়া দণ্ডায়মান হইল এবং তদীয় সৌন্দর্য্য দর্শনে মোহিত হইয়া কহিল মহারাজ আমার প্রতি যে আজ্ঞা করিবেন তাহাতেই সম্মত হইব। রাজা কহিলেন যদি তুমি আমার বচনানুসারে কার্য্য করিতে চাহ আমার প্রিয়পাত্র চিরঞ্জীবের সহধর্ম্মিণী হও। সে কহিল আমি তোমার রূপ ও গুণের বশীভূত হইয়াছি ইহার স্ত্রী কি প্রকারে হইব। রাজা কহিলেন তুমি এইমাত্র অঙ্গীকার করিয়াছ আমার বচনীনুসারে কর্ম্ম করিবে। সজ্জনেরা প্রাণপর্য্যন্তও পণ করিয়া প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন করেন। অতএব আপন বাক্য রক্ষা কর চিরঞ্জীবের সহধর্ম্মিণী হও। পরিশেষে সেই স্ত্রী সম্মত হইলে রাজা গান্ধর্ব্ব বিধান দ্বারা উভয়কে পরস্পর সহচর করিয়া দিয়া আপন সমভিব্যহারে নগরে আনয়ন করিলেন এবং তাহাদের জীবিকানির্বাহার্থে এক নিষ্কর ভূম্যধিকার নির্দ্ধারিত করিয়া দিলেন।
বেতাল জিজ্ঞাসিল মহারাজ রাজা ও চিরঞ্জীবের মধ্যে কোন্ ব্যক্তির অধিক উপকারিতা প্রকাশ হইল। রাজা কহিলেন চিরঞ্জনীবের। বেতাল কহিল কি প্রকারে। বিক্রমাদিত্য কহিলেন রাজা পরিশেশে চিরঞ্জীবের নানা মহোপকার করিলেন যথার্থ বটে, কিন্তু চিরঞ্জীব মৃগয়াদিবসে ফল জল ও আশ্রয় দান দ্বারা রাজার যে উপকার করিয়াছিল তাহার সহিত উহার তুলনা হইতে পারে না।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
অষ্টাদশ উপাখ্যান
অষ্টাদশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
কুবলয়পুরে ধনপতি নামে বণিক্ ছিলেন। তিনি ধনবতীনাম্নী নিজ কন্যার গৌরীকালে গৌরীদত্তনামক ধনাঢ্য বণিকের সহিত বিবাহ দিলেন। কিয়ৎ কাল পরে ধনবতীর এক কন্যা জন্মিল। গৌরীদত্ত কন্যার নাম মোহিনী রাখিলেন। কালক্রমে তিনি লোকান্তর প্রাপ্ত হইলে তাঁহার জ্ঞাতিবর্গ ধনবতীকে অসহায়িনী দেখিয়া তদীয় সর্ব্বস্ব অপহরণ করিল। তখন সে নিতান্ত দুরবস্থাগ্রস্ত হইয়া কন্যা লইয়া এক তমিস্রা রজনীতে পিত্রালয়ে পলায়ন করিল।
কিয়ৎ দূর গমন করিয়া পথ ভুলিয়া উহারা এক শ্মশানে উপস্থিত হইল। তথায় এক চোর রাজদণ্ডনুসারে তিন দিবস শূলোপরি আরোহিত ছিল বিধিবিপাকে সে পর্য্যন্ত তাহার প্রাণপ্রয়াণ হয় নাই। দৈবযোগে ধনবতীর দক্ষিণ হস্ত সেই চোরের চরণে লগ্ন হইলে সে অত্যন্ত ব্যথিত হইয়া কহিল তুমি কে কি নিমিত্ত এমন সময়ে আমাকে মর্ম্মান্তিক যাতনা দিলে। ধনবতী কহিল আমি জ্ঞানপূর্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা দি নাই। যাহা হউক আমার অপরাধ ক্ষমা কর। অনন্তর আত্মপরিচয় দিয়া চোরকে জিজ্ঞাসা করিল তুমি কে কি নিমিত্তে শ্মশানে আছ ও কি দুঃখ ভোগ করিতেছ বল।
চোর কহিল আমি বণিগ্জাতি চৌর্য্যাপরাধে শূলে আরোহিত হইয়াছি। অদ্য তৃতীয় দিবস তথাপি প্রাণ নির্গত হইতেছে না তাহাতেই অত্যন্ত যন্ত্রণা ভোগ করিতেছি। জন্মকালে জ্যোতির্বিদেরা গণনা দ্বারা স্থির করিয়াছিলেন অবিবাহিত অবস্থায় আমার মৃত্যু হইবেক না। তদনুসারে যাবৎ বিবাহ না হইবেক তাবৎ এই অবস্থায় এই দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইবেক। যদি তুমি কৃপা করিয়া কন্যাদান কর তবেই এই অসহ্য যাতনা হইতে পরিত্রাণ পাই। আমার চিরসঞ্চিত সুবর্ণরাশি আছে যদি আমার প্রার্থনা সিদ্ধ কর সমুদায় তোমাকে দি।
ধনবতী অর্থলোভে বিমূঢ় হইয়া মনে মনে মলিম্লুচের প্রার্থনায় সম্মতপ্রায় হইল এবং কহিল বহুকালাবধি আমার দৌহিত্রমুখদর্শনের বাসনা আছে তোমাকে কন্যাদান করিলে আমার সে বাসনা সম্পন্ন হয় না নতুবা আমার আর কোন আপত্তি নাই। চোর কহিল তুমি এক্ষণে কন্যাদান করিয়া আমাকে যন্ত্রণা হইতে মুক্ত কর। আমি অনুমতি করিতেছি তোমার কন্যা বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে কোন ব্রাহ্মণকুমারকে ধনদান দ্বারা সম্মত করিয়া তদ্দ্বারা ক্ষেত্রজ পুত্ত্র উৎপন্ন করিয়া লইবে। তাহা হইলে তোমারও বাসনা পূর্ণ হইল এবং আমিও এই দুঃসহ যন্ত্রণা হইতে পরিত্রাণ পাইলাম।
ধনবতী কন্যা প্রদান করিল। তখন চোর কহিল ঐ পূরোবর্ত্তী গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে আমার গৃহ। গৃহের পূর্ব্ব ভাগে কূপের নিকট এক বটবৃক্ষ আছে তাহার মূলে আমার সমস্ত সম্পত্তি নিহিত আছে যাইয়া গ্রহণ কর। ইহা কহিবামাত্র চোরের প্রাণবিয়োগ হইল এবং ধনবতীও চৌরনির্দিষ্ট ন্যগ্রোধবৃক্ষের মূল খননপূর্ব্বক সমস্ত স্বর্ণমুদ্রা হস্তগত করিয়া পিত্রালয়ে প্রস্থান করিল। পরে সে পিতাকে পূর্ব্বাপর সমুদয় বৃত্তান্ত অবগত করাইয়া তাঁহার হস্তে সমস্ত সম্পত্তি সমর্পণপূর্ব্বক তদীয় আবাসে বাস করিতে লাগিল।
কিয়ৎ কাল পরে মোহিনী যৌবনবতী হইল। সে এক দিবস স্বীয় সহচরীগণ সঙ্গে লইয়া গবাক্ষদ্বার দিয়া রথ্যা নিরীক্ষণ করিতেছে দৈবযোগে সেই সময়ে এক পরম সুন্দর বিংশতিবর্ষীয় ব্রাহ্মণতনয় তথায় উপস্থিত হইল। তাহাকে অবলোকন করিয়া মোহিনীর মন মোহিত হইল। তখন সে আপন এক সহচরীকে কহিল তুমি এই ব্রাহ্মণকে আমার মার নিকটে লইয়া যাও। সখী তৎক্ষণাৎ ব্রাহ্মণতনয়কে লইয়া তাহার জননীর নিকট উপস্থিত করিলে সে চৌরবৃত্তান্ত স্মরণ করিয়া তাহাকে প্রার্থনানুরূপ অর্থ দিয়া নিয়োগ প্রদান করিল।
মোহিনী গর্ভবতী ও যথাকালে পুত্ত্রবতী হইল। সূতিকাষষ্ঠীরজনীতে সে স্বপ্নে দেখিল দুই হস্ত পঞ্চ মস্তক প্রতিমস্তকে তিন তিন চক্ষুঃ ও এক এক অর্দ্ধচন্দ্র অতি দীর্ঘ জটাভার পৃষ্ঠদেশে লম্বমান দক্ষিণ হস্তে ত্রিশূল বাম হস্তে নরকপাল ব্যাঘ্রচর্ম্ম পরিধান ভুজঙ্গের মেখলা উজ্জ্বলরজতগিরিতুল্য কলেবর অতিশুভ্র নাগযজ্ঞোপবীত ভস্মভূষিতসর্ব্বাঙ্গ এবংবিধ আকার ও বেশবিশিষ্ট বৃষভারূঢ় এক পুরুষ তাহার সম্মুখে আসিয়া কহিতেছেন বৎসে মোহিনি তোমার পুত্ত্র জন্মিয়াছে আমি অতিশয় আহ্লাদিত হইয়াছি। এই বালক ক্ষণজন্মা। তুমি আমার আজ্ঞানুসারে ঐ শিশুকে সহস্র সুবর্ণ সহিত পেটকমধ্যগত করিয়া কল্য অর্দ্ধরাত্র সময়ে রাজদ্বারে রাখিয়া আসিবে। রাজা তাহাকে পুত্ত্রবৎ প্রতিপালন করিবেক। রাজার স্বর্গারোহণের পর তোমার পুত্ত্র তদীয় সিংহাসনের অধিকারী হইয়া ক্রমে ক্রমে নিজ প্রতাপ ও নীতিবিদ্যা প্রভাবে সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীর অদ্বিতীয় অধিপতি হইবেক।
এমন কালে মোহিনীর নিদ্রাভঙ্গ হইলে সে আপন জননীর নিকটে গিয়া সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিল। ধনবতী শুনিয়া অত্যন্ত আনন্দিত হইল এবং পর দিবস নিশীথসময়ে ঐ শিশুকে সহস্র সুবর্ণমুদ্রা সহিত পেটকমধ্যস্থ করিয়া রাজদ্বারে রাখিয়া আসিল। সেই সময়ে রাজাও স্বপ্নে দেখিতেছেন যে পূর্ব্বোক্তপ্রকার পুৰুষ তাঁহার সম্মুখবর্ত্তী হইয়া কহিতেছেন মহারাজ গাত্রোত্থান কর এক চক্রবর্ত্তিলক্ষণাক্রান্ত সন্তান পেটকমধ্যশায়ী তোমার দ্বারদেশে উপনীত। অবিলম্বে আনয়ন করিয়া পুত্ত্রনির্বিশেষে প্রতিপালন কর। উত্তর কালে সেই তোমার উত্তরাধিকারী হইবেক এবং পুত্ত্রকার্য্য করিবেক।
রাজার তৎক্ষণাৎ নিদ্রাভঙ্গ হইল। তখন তিনি আপন মহিষীকে জাগরিত করিয়া স্বপ্নবৃত্তান্ত শ্রবণ করাইলেন। অনন্তর উভয়ে দ্বারদেশে আসিয়া পেটক পতিত দেখিয়া অত্যন্ত আহ্লাদিত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ পেটকের মুখোদ্ঘাটন করিয়া দেখিলেন বালকের রূপে পেটক আলোকময় করিয়াছে। রাজ্ঞী পুত্ত্রকে ক্রোড়ে লইয়া অগ্রগামিনী হইলেন রাজা স্বর্ণমুদ্রা গ্রহণপূর্ব্বক পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন।
প্রভাত হইবামাত্র রাজা আপন সভার সামুদ্রিকবেত্তা পণ্ডিতগণকে আহ্বান করিয়া দেবপ্রসাদলব্ধ বালকের লক্ষণপরীক্ষার্থে আজ্ঞা প্রদান করিলেন। তাঁহারা দৃষ্টিগোচর করিয়া কহিলেন মহারাজ আপাততঃ তিন স্পষ্ট সুলক্ষণ দৃষ্ট হইতেছে উন্নত ললাট বিস্তৃত বক্ষঃস্থল ও দীর্ঘ অকার। পরে শাস্ত্রানুসারে পরীক্ষা করিয়া কহিলেন সামুদ্রিক শাস্ত্রে পুরুষের দ্বাত্রিংশৎ শুভ লক্ষণ নির্দিষ্ট আছে মহারাজ সেই সমুদায় এই একাধারে লক্ষিত হইতেছে। অতএব এই বালক সমস্ত পৃথিবীর সম্রাট হইবেন সন্দেহ নাই।
রাজা পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়া পারিতোষিক প্রদানপূর্ব্বক ব্রাহ্মণদিগকে বিদায় করিয়া দীন দরিদ্র অনাথ প্রভৃতিকে প্রার্থনাধিক অর্থদান করিলেন। ষষ্ঠ মাসে অন্নপ্রাশন দিয়া বালকের নাম হরদত্ত রাখিলেন। বালক অল্পকালমধ্যে চতুর্দশ বিদ্যায় পারদর্শী হইলেন এবং রাজার লোকান্তরপ্রাপ্তি হইলে তদীয় সিংহাসনে আরোহণ করিয়া ক্রমে ক্রমে সমস্ত ভূমণ্ডলে আপন আধিপত্য স্থাপন করিলেন।
কিয়ং কাল পরে হরদত্ত তীর্থযাত্রায় নির্গত হইয়া প্রথমতঃ পিতৃকৃত্যসম্পাদনার্থে গয়াধামে উপস্থিত হইলেন। ফল্গুতীরে যথাবিধি শ্রাদ্ধ করিয়া রাজা পিতৃপিণ্ডপ্রদানে উদ্যত হইলে নদীমধ্য হইতে পিণ্ডগ্রহণার্থে তিন জনের তিন দক্ষিণ হস্ত যুগপৎ নির্গত হইল এক ক্ষেত্রিক চোরের দ্বিতীয় বীজী ব্রাহ্মণের তৃতীয় প্রতিপালক রাজার।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এক্ষণে ইহাদিগের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি শাস্ত্র ও যুক্তি অনুসারে হরদত্তদত্তপ্রিণ্ডগ্রহণে অধিকারী হইতে পারে। রাজা বলিলেন চোর। বেতাল কহিল অন্যেরা কি অপরাধ করিয়াছে। রাজা বলিলেন ব্রাহ্মণ অর্থ লইয়া বীজ বিক্রয় করিয়াছেন। রাজাও সহস্র সুবর্ণ লইয়া প্রতিপালনাদি করিয়াছেন। অতএব তাঁহাদের পিণ্ডগ্রহণে অধিকার হইতে পারে না।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
উপক্রমণিকা
বেতালপঞ্চবিংশতি
উপক্রমণিকা
উজ্জয়িনী নগরে গন্ধর্ব্বসেন নামে রাজা ছিলেন। তাঁহার চারি মহিষী ছিল। তাহাদের গর্ভে রাজার ছয় পুত্র জন্মে। রাজকুমারেরা সকলেই সুপণ্ডিত ও অতিশয় বলবান্ ছিলেন। কালক্রমে নৃপতির লোকান্তরপ্রাপ্তি হইলে সর্ব্বজ্যেষ্ঠ শঙ্কু সিংহাসনে অধিরোহণ করিলেন। তৎকনিষ্ঠ বিক্রমাদিত্য বিদ্যানুরাগ নীতিপরতা ও শাস্ত্রানুশীলন দ্বারা বিশেষ বিখ্যাত ছিলেন তথাপি রাজ্যভোগের লোভসংবরণে অসমর্থ হইয়া জ্যেষ্ঠের প্রাণ সংহারপূর্ব্বক স্বয়ং রাজেশ্বর হইলেন এবং ক্রমে ক্রমে নিজ বাহুবলে সমস্ত দিগ্বিজয় করিয়া লক্ষযোজনবিস্তীর্ণ জম্বুদ্বীপের অধীশ্বর হইয়া আপন নামে অব্দ প্রচলিত করিলেন। কিয়দ্দিনান্তর রাজা মনে মনে বিবেচনা করিলেন জগদীশ্বর আমাকে নানা জনপদের অধিপতি করিয়া অসংখ্য প্রজাগণের হিতাহিতচিন্তার ভার দিয়াছেন। কিন্তু আমি আত্মসুখে নির্বৃত হইয়া তাহাদের অবস্থার প্রতি ক্ষণমাত্রও দৃষ্টিপাত করি না। কেবল অধিকৃতবর্গের বিবেচনার উপর নির্ভর করিয়া নিশ্চিন্ত রহিয়াছি। তাহারা প্রজাগণের সহিত কিরূপ ব্যবহার করিতেছে অন্ততঃ এক বারও পরীক্ষা করিয়া দেখা উচিত। অতএব আমি প্রচ্ছন্ন বেশে দেশভ্রমণ করিয়া প্রজাগণের অবস্থা অবলোকন করিব। অনন্তর নিজ অনুজ ভর্ত্তৃহরির হস্তে সমস্ত সাম্রাজ্যের ভার সমর্পণ করিয়া স্বয়ং সন্ন্যাসীর বেশে দেশে দেশে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।
উজ্জয়িনী নগরে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ বহুকালাবধি তপস্যা করিতেছিলেন। এক দিন তিনি আপন উপাস্য দেবতার নিকট বরস্বরূপ এক অমরফল পাইয়া আনন্দিত মনে গৃহে আসিয়া ব্রাহ্মণীর নিকট কহিলেন দেখ দেবতা তপস্যায় তুষ্ট হইয়া আজি আমাকে এই ফল দিয়াছেন এবং কহিয়াছেন ইহা ভক্ষণ করিলে নর অমর হয়! ব্রাহ্মণী শুনিয়া অতিশয় খেদ করিয়া কহিলেন হায় অমর হইয়া আর কত কাল এ যন্ত্রণা ভোগ করিব। তুমি কি সুখে অমর হইবার অভিলাষ কর বুঝিতে পারি না। বরং এই দণ্ডে মৃত্যু হইলে সংসারের ক্লেশ হইতে পরিত্রাণ হয়।
গৃহিনীর এইরূপ বাক্যে হতবুদ্ধি হইয়া ব্রাহ্মণ কহিলেন আমি তৎকালে না বুঝিয়া দেবতার নিকট ফল লইয়াছিলাম এক্ষণে তোমার কোথা শুনিয়া আমার চৈতন্য হইল। এখন তুমি যেরূপ কহিবে তাহাই করিব। ব্রাহ্মণী কহিলেন এই ফল রাজা ভর্ত্তৃহরিকে দিয়া ইহার পরিবর্ত্তে পারিতোষিক স্বরূপ কিঞ্চিৎ অর্থ লইয়া আইস। তাহা হইলে অনায়াসে সংসারযাত্রা নির্বাহ করিয়া পরমার্থ-সাধনে যত্ন করিতে পারিবে।
ইহা শুনিয়া ব্রাহ্মণ রাজার নিকটে উপস্থিত হইলেন এবং যথাবিধি আশীর্বাদপ্রয়োগের পর দেবদত্ত ফলের গুণব্যাখ্যা ও পূর্ব্বাপর সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া বিনয়পূর্ব্বক নিবেদন করিলেন মহারাজ আপনি এই ফল লইয়া আমাকে কিঞ্চিৎ অর্থ প্রদান করুন। আপনি চিরজীবী হইলে সমস্ত রাজ্যের মঙ্গল। রাজা ফল গ্রহণ করিয়া লক্ষ মুদ্রা প্রদানপূর্ব্বক ব্রাহ্মণকে বিদায় করিলেন এবং নিতান্ত স্ত্রৈণতা প্রযুক্ত মনে মনে বিবেচনা করিলেন যে ব্যক্তির চির জীবন ও স্থির যৌবন হইলে আমি যাবজ্জীবন সুখী হইব তাহাকেই এই ফল দেওয়া কর্ত্তব্য। অনন্তর অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া প্রেয়সী মহিষীর হস্তে ফল প্রদান করিলেন এবং করিলেন প্রিয়ে তুমি আমার জীবনসর্ব্বস্ব এই ফল খাও অমর হইবে ও চির কাল যুবতী থাকিবে। রাজ্ঞী ফল গ্রহণ করিলেন। রাজা প্রীত মনে সভায় প্রত্যাগমন করিয়া অমাত্যবর্গের সহিত রাজকার্য্য পর্য্যালোচনা করিতে লাগিলেন।
এক নগরপাল রাজমহিষীর প্রিয় পাত্র ছিল তিনি ঐ ফল তাহার হস্তে সমর্পণ করিলেন। কিন্তু নগরপাল এক বারাঙ্গনাকে অত্যন্ত ভাল বাসিত সে ঐ ফল তাহার হস্তে দিয়া অশেষপ্রকার গুণ বর্ণন করিল। বারাঙ্গনা ফল পাইয়া মনে মনে বিবেচনা করিল আমি অধম জাতি কুক্রিয়া দ্বারা উদরপূর্ত্তি করি আমার চিরজীবিনী হওয়া কেবল বিড়ন্বনামাত্র। অতএব এই ফল রাজাকে দেওয়া উচিত রাজা চিরজীবী হইলে অসংখ্য লোকের মঙ্গল হইবে। অনন্তর রাজার নিকটে গিয়া বিনয়পূর্ব্বক নিবেদন করিল মহারাজ আমি এই এক অপূর্ব্ব ফল পাইয়াছি ইহা ভক্ষণ করিলে নর অমর হয়। এই ফল আপনকার যোগ্য আপনি গ্রহণ করুন।
রাজা সেই অমরফল বারাঙ্গনার হস্তে দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন। কিন্তু তৎকালে সে ভাব গোপনে রাখিলেন এবং ফল লইয়া পুরস্কার প্রদানপূর্ব্বক তাহাকে বিদায় দিয়া ভাবিতে লাগিলেন এই ফল রাজ্ঞীকে দিয়াছি ইহা কি রূপে বারাঙ্গনার হস্তে আইল। পরে সবিশেষ অনুসন্ধান দ্বারা পূর্ব্বাপর সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইলেন এবং সংসারের প্রতি অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া বিবেচনা করিতে লাগিলেন এই সংসার অতি অকিঞ্চিৎকর ইহাতে সুখের লেশমাত্র নাই প্রত্যুত পরিণামে নিরয়গামী হইতে হয়। অতএব বৃথা মায়ায় মুগ্ধ হইয়া আর ইহাতে লিপ্ত থাকা কোন ক্রমেই শ্রেয়স্কর নহে। বরং ইহা পরিত্যাগ করিয়া অরণ্যে গিয়া জগদীশ্বরের আরাধনা করি চরমে পরম পুরুষার্থ মুক্তিপদার্থ লাভ করিতে পারিব।
অন্তঃকরণে এইরূপ সঙ্কল্প করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশিয়া রাজা রাজ্ঞীকে জিজ্ঞাসিলেন তুমি সে ফল কি করিয়াছ। তিনি কহিলেন ভক্ষণ করিয়াছি। তখন রাজা সাতিশয় বিরাগ প্রদর্শনপূর্ব্বক রাণীকে সেই ফল দেখাইলেন। রাণী দৃষ্টিমাত্র হতবুদ্ধি ও স্তব্ধ হইয়া রহিলেন কিছুই উত্তর করিতে পারিলেন না। রাজা ভর্ত্তৃহরি অবিলম্বে অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইয়া প্রক্ষালনপূর্ব্বক ফল ভক্ষণ করিলেন এবং রাজ্যাধিকার পরিত্যাগ করিয়া একাকী অরণ্য প্রবেশপুরঃসর যোগসাধনে প্রবৃত্ত হইলেন। বিক্রমাদিত্যের সিংহাসন শূন্য রহিল। দেবরাজ উজ্জয়িনীর অরাজক সংবাদ প্রাপ্তিমাত্র এক যক্ষকে রক্ষক নিযুক্ত করিয়া পাঠাইলেন। যক্ষ সতকতাপূর্ব্বক দিবারাত্র নগরীর রক্ষণাবেক্ষণ করিতে লাগিল। অল্প দিনের মধ্যেই দেশে বিদেশে প্রচার হইল রাজা ভর্ত্তৃহরি রাজত্ব পরিত্যাগ করিয়া বনপ্রস্থান করিয়াছেন। রাজা বিক্রমাদিত্য শ্রবণমাত্র অতিমাত্র ব্যগ্র হইয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন করিলেন। তিনি অর্দ্ধরাত্র সময়ে নগরে প্রবেশ করিতেছেন এমন সময়ে নগররক্ষক যক্ষ আসিয়া নিষেধ করিয়া কহিল তুই কে কোথায় যাইতেছিস্ দাঁড়া তোর নাম কি বল্। রাজা কহিলেন আমি বিক্রমাদিত্য আপন নগরে যাইতেছি তুই কে কি নিমিত্ত আমাকে রোধ করিতেছিস্ বল্।
যক্ষ কহিল ত্রিদশাধিপতি ইন্দ্র আমাকে নগররক্ষার ভার দিয়া পাঠাইয়াছেন। তাঁহার অনুমতি ব্যতিরেকে আমি তোমাকে অসময়ে নগরে প্রবেশ করিতে দিব না। অথবা যদি তুমি যথার্থ রাজা বিক্রমাদিত্য হও অগ্রে আমার সঙ্গে যুদ্ধ কর তবে নগরে যাইতে দিব। রাজা শ্রবণমাত্র বদ্ধপরিকর হইয়া যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হইলেন। যক্ষও তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত হইয়া তাঁহার সম্মুখীন হইল। ঘোরতর সংগ্রাম হইতে লাগিল। পরিশেষে রাজা যক্ষকে ভূতলে ফেলিয়া তাহার বক্ষঃস্থলে আরোহণ করিয়া বসিলেন। তখন যক্ষ কহিল মহারাজ তুমি আমাকে পরাভব করিয়াছ। তোমার প্রভাব দেখিয়া বুঝিলাম তুমি যথার্থই রাজা বিক্রমাদিত্য। এক্ষণে আমাকে ছাড়িয়া দাও আমি তোমাকে প্রাণদান দিতেছি।
রাজা শুনিয়া হাস্য করিয়া কহিলেন তুই বাতুল নতুবা কি নিমিত্ত এমন অসঙ্গত বাক্য প্রয়োগ করিবি, তুই আমাকে প্রাণদান কি দিবি, আমি মনে করিলে এখনি তোর প্রাণদণ্ড করিতে পারি। যক্ষ শুনিয়া কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া কহিল মহারাজ যাহা কহিতেছ যথার্থ বটে। কিন্তু আমি তোমাকে আসন্ন মৃত্যু হইতে বাঁচাইতেছি। যাহা কহি অবহিত হইয়া শ্রবণ কর। শুনিয়া তদনুসারে কার্য্য করিলে দীর্ঘজীবী হইয়া নিরুদ্বেগে অখণ্ড ভূমণ্ডলে একাধিপত্য করিতে পারিবে। তখন ভূপতি বিস্মিত ও ব্যগ্রচিত্ত হইয়া তাহাকে ছাড়িয়া দিলেন। যক্ষও ক্ষণমধ্যে সমরশ্রান্তি পরিহার করিয়া বিক্রমাদিত্যকে সম্বোধিয়া অভিপ্রেত উপাখ্যানের উপক্রম করিল।
মহারাজ শ্রবণ কর
ভোগবতী নগরে চন্দ্রভানু নামে অতি প্রতাপশালী নরপতি ছিলেন। তিনি এক দিবস মৃগয়াবিলাষে কোন অটবীতে প্রবিষ্ট হইয়া দেখিলেন এক তপস্বী অধঃশিরাঃ বৃক্ষে লম্বমান ধূমপান করিতেছেন। অনেক অনুসন্ধানের পর তত্রত্যলোকমুখে অবগত হইলেন তপস্বী কাহারও সহিত বাক্যালাপ করেন না বহুকালাবধি একাকী এই ভাবে তপস্যা করিতেছেন। ফলতঃ রাজা সন্ন্যাসীর এইরূপ কঠোর ব্রত দর্শনে বিস্ময়াপন্ন হইয়া নগরে প্রত্যাবর্ত্তন করিলেন। পর দিন যথাকালে রাজসভায় অধিষ্ঠান করিয়া কহিলেন হে অমাত্যবর্গ হে সভাসদগণ আমি গত কল্য মৃগয়ায় গিয়া বিপিনমধ্যে এক অদ্ভূত তপস্বী দেখিয়াছি। যদি কেহ তাঁহাকে রাজধানীতে আনিতে পারে তাহাকে লক্ষ্য মুদ্রা পারিতোষিক দিব।
এই রাজবাক্য নগরমধ্যে প্রচারিত হইলে এক প্রসিদ্ধ বারবনিতা নৃপতিসমীপে আসিয়া আবেদন করিল মহারাজ আজ্ঞা পাইলে আমি ঐ তপস্বীর ঔরসে পুত্ত্র জন্মাইয়া ঐ পুত্ত্র তাহার স্কন্ধে দিয়া আপনকার সভায় আনিতে পারি। রাজা শুনিয়া চমৎকৃত হইলেন এবং তাপসের আনয়নের নিমিত্ত পরম সমাদর পূর্ব্বক বারনারীকে বিদায় করিলেন। সে ভূপালের নিয়োগানুসারে যোগীর আশ্রমে উপস্থিত হইয়া দেখিল যোগী যথার্থই মুদ্রিতনয়ন অধঃশিরাঃ বৃক্ষে লম্বমান হইয়া ধূমপান করিতেছেন। অত্যন্ত শীর্ণদেহ কেহ কোন প্রশ্ন করিলে উত্তর দেন না। তদ্দর্শনে বারযোষিৎ সহসা সন্ন্যাসীর সমাধিভঙ্গ করা অসাধ্য জানিয়া সেই আশ্রমের অনতিদূরে এক সুশোভন উপবন ও তন্মধ্যে পরম রমণীয় হর্ম্ম্য নির্মাণ করাইল এবং নানা উপায় চিন্তিয়া পরিশেষে যুক্তিপূর্ব্বক মোহনভোগ প্রস্তুত করিয়া ধূমপায়ী তপস্বীর আস্যদেশে প্রদান করিল। তপস্বী রসনাসংযোগ দ্বারা মিষ্ট বোধ হওয়াতে ক্রমে ক্রমে সমুদায় ভক্ষণ করিলেন। বারাঙ্গনা পুনর্বার দিল তিনিও তৎক্ষণাৎ ভক্ষণ করিলেন।
এই রূপে ক্রমাগত কতিপয় দিবস মোহনভোগ উপযোগ করিয়া কিঞ্চিৎ সামর্থ্য বোধ হইলে সন্ন্যাসী নেত্রদ্বয় উন্মীলিত করিয়া তৰু হইতে অবতীর্ণ হইলেন এবং বারনারীকে জিজ্ঞাসিলেন তুমি কে কি অভিপ্রায়ে একাকিনী এই নির্জন বনস্থানে আগমন করিয়াছ। সে কহিল আমি দেবকন্যা দেবলোকে তপস্যা করি। সম্প্রতি মর্ত্ত্যলোকীয় তীর্থপর্য্যটন প্রসঙ্গে পরম পবিত্র কর্ম্মক্ষেত্র ভারতবর্ষে আসিয়া যোগানুষ্ঠানবাসনায় এক আশ্রম নির্মাণ করিয়াছি। নিয়ত তথায় অবস্থিত করি। অদ্য সৌভাগ্যক্রমে এই আশ্রমে প্রবেশ করিয়া আপনকার সন্দর্শন ও সম্ভাষণানুগ্রহ লাভ দ্বারা চরিতার্থতা প্রাপ্ত হইলাম। তপস্বী কহিলেন আমি তোমার সৌজন্য ও সুশীলতা দেখিয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়াছি এবং তোমার সন্দর্শনে আত্মাকে চরিতার্থ বোধ করিতেছি। যে হেতু জন্মান্তরীণপুণ্যসঞ্চয় ব্যতিরেকে সাধুসমাগম লব্ধ হয় না। যাহা হউক আমি তোমার আশ্রমদর্শনের বাসনা করি। যদি প্রতিবন্ধক না থাকে ও সমধিক দূরবর্ত্তী না হয় আমাকে তথায় লইয়া চল।
বারবিলাসিনী তপস্বীর অভ্যর্থনা শুনিয়া কৃতার্থম্মন্য ও অতিমাত্র ব্যগ্র হইয়া তাঁহাকে আপন আলয়ে লইয়া গেল এবং অতি যত্ন ও পরম সমাদর পুরঃসর নানাবিধ সুস্বাদ মিষ্টান্ন ও সুরস পানীয় প্রদান করিল। তাপস বারনারীর কপট জালে বদ্ধ হইয়া তদ্দত্ত সমস্ত বস্তু ভক্ষণ ও পান করিলেন। এই রূপে ক্রমে ক্রমে ধূমপান পরিত্যাগপূর্ব্বক যোগাভ্যাসে জলাঞ্জলি দিয়া বারবনিতার সহিত বিষয়বাসনায় কালযাপন করিতে লাগিলেন। বারাঙ্গনা গর্ভবতী ও যথাকালে পুত্ত্রবতী হইল। কিয়ৎ দিন অতীত হইলে পর সে সন্ন্যাসীর নিকট নিবেদন করিল মহাশয় বহু দিবস অতিক্রান্ত হইল আমরা অনবরত কেবল বিষয়বাসনায় কালযাপন করিলাম। এক্ষণে তীর্থযাত্রা দ্বারা দেহ পবিত্র করা উচিত।
বারবনিতা এইরূপ প্রবঞ্চনা দ্বারা তপস্বীকে সংজ্ঞাশূন্য করিয়া তাঁহার স্কন্ধে পুত্ত্র প্রদানপূর্ব্বক চন্দ্রভানুর রাজধানী লইয়া চলিল। ক্রমে ক্রমে রাজসভার সন্নিধানে উপস্থিত হইলে রাজা বারাঙ্গনাকে দূর হইতে চিনিতে পারিয়া এবং সন্ন্যাসীর স্কন্ধে পুত্ত্র দেখিয়া সামাজিকদিগকে কহিলেন দেখ দেখ যে বারনারী যোগীর আনয়নবিষয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়া গিয়াছিল সে আপন প্রতিজ্ঞা পরিপূর্ণ করিয়া আসিতেছে। আমি উহার অসম্ভব বুদ্ধিকৌশলে চমৎকৃত হইয়াছি। অধিক কি কহিব এই বুদ্ধিমতী বারবনিতা চিরশুষ্ক নীরস তৰুকে পল্লবিত ও ফল পুষ্পে সুশোভিত করিয়াছে। সামাজিকেরা কহিলেন মহারাজ যথার্থ আজ্ঞা করিতেছেন এ সেই বারাঙ্গনাই বটে।
রাজা ও সভাসদগণের এইরূপ কথোপকথন শ্রবণে সন্ন্যাসীর সহসা বোধসুধাকরের উদয় হওয়াতে মোহান্ধকার নিরস্ত হইল। তখন তিনি পূর্ব্বাপর পর্য্যালোচনা করিয়া যৎপরোনাস্তি ক্ষোভ প্রাপ্ত হইলেন এবং আপনাকে বারংবার ধিক্কার দিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন দুরাত্মা চন্দ্রভানু ঐশ্বর্য্যমদে মত্ত ও ধর্ম্মাধর্ম্মজ্ঞানশূন্য হইয়া আমার তপস্যভ্রাংশের নিমিত্ত এই দুর্বিগাহ মায়াজাল বিস্তার করিয়াছিল। আমিও অতি অধম ও অবশেন্দ্রিয় অনায়াসে স্বৈরিণীর মায়ায় মুগ্ধ হইয়া চিরসঞ্চিত কর্ম্মফলে বঞ্চিত হইলাম। অনন্তর ক্রোধে কম্পান্বিতকলেবর হইয়া স্কন্ধস্থিত পুত্ত্রকে ভূতলে নিক্ষেপ করিয়া তৎক্ষণাৎ তথা হইতে প্রস্থান করিলেন এবং অন্য এক অরণ্যের মধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক পূর্ব্বাপেক্ষায় সহস্রগুণ মনোযোগ ও অধ্যবসায় সহকারে যোগসাধন করিতে লাগিলেন এবং কিয়ৎ কাল পরে ঐ নরেশ্বরের মৃত্যুসাধন করিয়া কৃতকার্য্য হইলেন।
এই রূপে আখ্যায়িকা সমাপন করিয়া যক্ষ কহিল মহারাজ ইহার তাৎপর্য্য এই যে তুমি ও রাজা চন্দ্রভানু আর ঐ যোগী তিন জন এক নগরে এক নক্ষত্রে এক লগ্নে জন্মিয়াছিলে। তন্মধ্যে তুমি রাজবংশে জন্ম গ্রহণ করিয়া পৃথিবীর রাজত্ব করিতেছ। চন্দ্রভানু তৈলিকগৃহে জন্ম লইয়া ভোগবতী নগরীর অধিপতি হইয়াছিল। আর যোগী কুন্তকারকুলে উৎপন্ন হইয়া যত্নপূর্ব্বক যোগসাধন করিয়া চন্দ্রভানুর প্রাণবধ করিয়াছে এবং তাহাকে বেতাল করিয়া শ্মসানবর্ত্তী শিরীষবৃক্ষে লম্বিত করিয়া রাখিয়াছে। এক্ষণে অনন্যকর্ম্মা হইয়া কেবল তোমার প্রাণসংহারের চেষ্টা দেখিতেছে। তাহাতে কৃতকার্য্য হইলেই উহার অভীষ্ট সিদ্ধ হয়। যদি তুমি তাহার হস্ত হইতে আত্মরক্ষা করিতে পার বহু কাল অকণ্টকে রাজ্যভোগ করিতে পারিবে। আমি তোমাকে সবিশেষ সকল কহিয়া সতর্ক করিয়া দিলাম তুমি এ বিষয়ে ক্ষণমাত্রও অসাবধান থাকিবে না।
এইরূপ উপদেশ দিয়া যক্ষ স্বস্থানে প্রস্থান করিল। রাজাও শুনিয়া ত্রস্ত ও বিস্ময়গ্রস্ত হইয়া নানাপ্রকার চিন্তা করিতে করিতে রাজবাটীতে প্রবিষ্ট হইলেন। পর দিন প্রভাতে তিনি সিংহাসনোপবিষ্ট হইলে ভৃত্যবর্গ ও প্রজাগণ বহু দিনের পর রাজসন্দর্শন লাভ করিয়া আনন্দপ্রবাহে মগ্ন হইল। রাজা বিক্রমাদিত্য রাজনীতির অনুবর্ত্তী হইয়া রাজ্যশাসন ও প্রজাপালন করিতে লাগিলেন।
কিয়ৎ দিন পরে শান্তশীল নামে এক সন্ন্যাসী শ্রীফল হস্তে রাজসভায় উপস্থিত হইলেন এবং ফল প্রদানপূর্ব্বক রাজাকে আশীর্বাদ করিয়া কক্ষস্থিত আসন পাতিয়া তদুপরি উপবেশন করিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ কথোপকথন করিয়া রাজার নিকট বিদায় লইয়া সন্ন্যাসী সভা হইতে প্রস্থান করিলে পর নরপতি অন্তঃকরণে এই বিতর্ক করিতে লাগিলেন যক্ষ যে সন্ন্যাসীর কথা কহিয়াছিল এ সেই ব্যক্তিই বা হয়। যাহা হউক সহসা এই ফল ভক্ষণ করা উচিত নহে। মনে মনে এইরূপ স্থির করিয়া কোষাধ্যক্ষের হস্তে প্রদান করিয়া কহিলেন তুমি এই ফল যত্নপূর্ব্বক রাখিবে। সন্ন্যাসী প্রত্যহ গমনাগমন ও ফলপ্রদান করিতে লাগিলেন।
এক দিবস রাজা বয়স্যবর্গসমভিব্যাহারে মন্দুরাসন্দর্শনার্থ গমন করিয়াছিলেন। সেই সময়ে সন্ন্যাসীও তথায় উপস্থিত হইয়া পূর্ব্ববৎ ফল প্রদানপূর্ব্বক আশীর্বাদ করিলেন। দৈবযোগে ঐ ফল ভুপতির করতল হইতে ভূতলে পতিত ও ভগ্ন হওয়াতে তন্মধ্য হইতে এক অপূর্ব্ব রত্ন নির্গত হইল। রাজা ও রাজবয়স্যগণ তদীয়প্রভাদর্শনে চমৎকৃত হইলেন। রাজা যোগীকে জিজ্ঞাসা করিলেন মহাশয় আপনি কি জন্যে আমাকে এই রত্নগর্ভ ফল দিলেন।
যোগী কহিলেন মহারাজ শাস্ত্রে রাজা গুরু জ্যোতির্বিদ ও চিকিৎসকের নিকট রিক্ত হস্তে যাইতে নিষেধ আছে। এই জন্যে আমি এই রত্নগর্ভ ফল লইয়া আসিয়াছিলাম। আর এক রত্নগর্ভ ফলের কথা কি কহিতেছেন প্রতিদিন আপনাকে যে যে ফল দিয়াছি সকলের মধ্যেই এতাদৃশ এক এক রত্ন আছে। তখন রাজা কোষাধ্যক্ষকে ডাকাইয়া কহিলেন তোমাকে যত শ্রীফল রাখিতে দিয়াছি সমূদয় আনয়ন কর। কোষাধ্যক্ষ রাজার আদেশানুসারে সমস্ত ফল আনয়ন করিল। রাজা প্রত্যেক ফল ভাঙ্গিয়া সকলের মধ্যেই এক এক রত্ন দেখিয়া অত্যন্ত আহ্লাদিত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ রাজসভায় আগমনপূর্ব্বক এক মণিকারকে ডাকাইয়া রত্নের পরীক্ষা করিতে আজ্ঞা দিয়া কহিলেন এই অসার সংসারে ধর্ম্মই সার পদার্থ অতএব তুমি ধর্ম্মপ্রমাণ প্রত্যেক রত্নের মূল্য নিরূপণ করিয়া দাও।
এইরূপ রাজবাক্য শ্রবণ করিয়া মণিকার কহিল মহারাজ আপনি যথার্থ আজ্ঞা করিয়াছেন। ধর্ম্ম রক্ষা করিলে সকল রক্ষা হয় ধর্ম্ম লোপ করিলে সকল লোপ হয়। অতএব আমি ধর্ম্ম সাক্ষী করিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছি আপন জ্ঞান অনুসারে যথার্থ মূল্য নিরূপণ করিয়া দিব। ইহা কহিয়া প্রত্যেক রত্নের লক্ষণ পরীক্ষা করিয়া কহিল মহারাজ বিলক্ষণ বিবেচনা করিয়া দেখিলাম সকল মণিই সর্ব্বাঙ্গসুন্দর কোটি মুদ্রাও একৈকের প্রকৃত মূল্য নহে। এ সকল অমূল্য রত্ন।
রাজা শুনিয়া অতিশয় হৃষ্ট হইয়া সমুচিত পারিতোষিক প্রদানপূর্ব্বক মণিকারকে বিদায় করিলেন এবং হস্ত দ্বারা সন্ন্যাসীর হস্ত গ্রহণ করিয়া সিংহাসনার্দ্ধে উপবেশন করাইয়া কহিলেন মহাশয় আমার সমস্ত সাম্রাজ্যও আপনকার এক রত্নের তুল্যমূল্য হইবেক না। আপনি সন্ন্যাসী হইয়া এই সকল অমূল্য রত্ন কোথায় পাইলেন এবং কি অভিপ্রায়েই বা আমাকে দিলেন জানিতে ইচ্ছা করি। যোগী কহিলেন মহারাজ মন্ত্রণা ঔষধ গৃহচ্ছিদ্র এ সকল সর্ব্বসমক্ষে ব্যক্ত করা বিধেয় নহে। যদি অনুমতি হয় নির্জনে গিয়া নিবেদন করি। মহারাজ, নীতিজ্ঞেরা কহেন মন্ত্রণা ষট্ কর্ণে প্রবিষ্ট হইলে অপ্রকাশিত থাকে না, তাহাতে কার্য্যহানির সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। চারি কর্ণে হইলে প্রকাশিত হয় না অথচ কার্য্যসিদ্ধি করে। আর দুই কর্ণের মন্ত্রণা মনুষ্যের কথা দূরে থাকুক ব্রহ্মাও জানিতে পারেন না।
ইহা শুনিয়া রাজা সন্ন্যাসীকে নির্জনে লইয়া কহিতে লাগিলেন হে যোগীশ্বর আপনি আমাকে এত রত্ন দিলেন কিন্তু এক দিনও আমার আলয়ে ভোজন বা জলগ্রহণ করিলেন না, ইহাতে আমি আপনকার নিকট অত্যন্ত লজ্জিত হইতেছি। যদি আপনকার কোন অভিপ্রায় থাকে ব্যক্ত কৰুন আমি প্রাণান্তেও তৎসম্পাদনে পরাঙ্মুখ হইব না। সন্ন্যাসী কহিলেন মহারাজ গোদাবরীতীরস্থিত শ্মশানে মন্ত্র সিদ্ধ করিবার বাসনা করিয়াছি তাহাতে অষ্টসিদ্ধি লাভ হইবেক। অতএব তোমার নিকট এই প্রার্থনা করিতেছি তুমি এক দিন সন্ধ্যা অবধি প্রভাত পর্য্যন্ত আমার সন্নিহিত থাকিবে। তুমি সন্নিহিত থাকিলেই আমার মন্ত্র সিদ্ধ হইবেক। রাজা কহিলেন আমি নিঃসন্দেহ যাইব আপনি দিন নির্ণয় করিয়া বলুন। সন্ন্যাসী কহিলেন তুমি আগামী ভাদ্র কৃষ্ণচতুর্দশীতে সন্ধ্যাকালে একাকী আমার নিকটে যাইবে। রাজা কহিলেন আপনি নিশ্চিন্ত থাকিবেন আমি অবশ্য যাইব। এই রূপে রাজাকে বচনবদ্ধ করিয়া বিদায় লইয়া সন্ন্যাসী আপন আশ্রমে প্রস্থান করিলেন।
নির্দ্ধারিত কৃষ্ণ চতুর্দশী উপস্থিত হইল। সন্ন্যাসী সায়ং সময়ে সমুদয় সংগ্রহপূর্ব্বক শ্মশানে যোগাসনে বসিলেন। রাজা বিক্রমাদিত্যও প্রতিশ্রুত সময় সমুপস্থিত জানিয়া সাহসে নির্ভর করিয়া করে তরবারি ধারণপূর্ব্বক একাকী সন্ন্যাসীর নিকট উপস্থিত হইলেন। তিনি ইতস্ততঃ দৃষ্টিসঞ্চারণ করিয়া দেখিতে লাগিলেন নানাপ্রকার আকারবিশিষ্ট ভূত প্রেত পিশাচ শঙ্খিনী ডাকিনীগণ বিকট হাস্য করিয়া চতুর্দিকে নৃত্য করিতেছে আর যোগী তাহাদের মধ্যে বসিয়া দুই হন্তে দুই কপাল লইয়া বাদ্য করিতেছেন। রাজা এতাদৃশ ভয়ানক ব্যাপার দর্শনে কিঞ্চিন্মাত্রও ভীত হইলেন না বরং যোগীকে প্রণাম করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন মহাশয় ভৃত্য উপস্থিত, আদেশ দ্বারা চরিতার্থ করিতে আজ্ঞা হয়। যোগী কহিলেন এই আসনে উপবেশন কর।
রাজা যোগীর আজ্ঞানুসারে আসনপরিগ্রহ করিয়া কিয়ৎ ক্ষণ পরে পুনর্বার নিবেদন করিলেন মহাশয় আমার প্রতি কি আজ্ঞা হয়। যোগী কহিলেন মহারাজ তোমার বাক্যনিষ্ঠায় অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছি। অথবা সৎপুৰুষেরা প্রাণান্তেও প্রতিজ্ঞাপ্রতিপালনে পরাঙ্মুখ হয়েন না। যাহা হউক যদি অনুগ্রহ করিয়া আসিয়াছ আমার এক সাহায্য কর। দুই ক্রোশ দক্ষিণে এক শ্মশান আছে। তথায় গিয়া দেখিবে এক শিরীষবৃক্ষে শব ঝুলিতেছে। তুমি ঐ শব আমার নিকটে লইয়া আইস আমি ইতিমধ্যে পূজার আয়োজন করিতেছি। রাজা যথা আজ্ঞা বলিয়া তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করিলেন সন্ন্যাসীও রাজাকে শবানয়নে প্রেরণ করিয়া পূজায় বসিলেন।
একে কৃষ্ণচতুর্দশীরাত্রি সহজেই ঘোরতর অন্ধকারে আবৃত তাহাতে ঘনঘণ্টা দ্বারা গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন হইয়া মুষলধারায় বৃষ্টি হইতেছিল আর ভূতপ্রেতগণ চতুর্দিকে ভয়ানক কোলাহল করিতেছিল। এইরূপ সঙ্কটে কাহার হৃদয়ে না ভয়সঞ্চার হয়। কিন্তু রাজার তাহাতে ভয় বা ব্যাকুলতার লেশমাত্রও উপস্থিত হইল না। পরিশেষে নানা সঙ্কট হইতে উত্তীর্ণ হইয়া প্রেতভূমিতে উপনীত হইলেন। দেখিলেন কোন স্থলে বিকটমূর্ত্তি ভূত সকল জীবিত মনুষ্য ধরিয়া তাহাদের প্রাণ সংহার করিতেছে। কোন স্থলে ডাকিনীগণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালক ধরিয়া চর্ব্বণ করিতেছে। অনন্তর ইতস্ততঃ অন্বেষণ করিয়া শিরীষবৃক্ষের নিকটে গিয়া দেখিলেন ইহার মূল অবধি অগ্রভাগ পর্য্যন্ত প্রত্যেক বিটপ ও পল্লব ধক্ ধক্ করিয়া জ্বলিতেছে আর চারি দিকে অনবরত কেবল মার্ মার্ ধর্ ধর্ ইত্যাদি ভয়ানক শব্দ হইতেছে।
এই সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া রাজা ভয় পাইলেন না। কিন্তু মনে মনে বিবেচনা করিয়া স্থির করিলেন যক্ষ যে সন্ন্যাসীর কথা কহিয়াছিল এ অবশ্যই সেই ব্যক্তি হইবে। পরে ক্রমে ক্রমে বৃক্ষের অত্যন্ত সন্নিহিত হইয়া দেখিলেন শব রজ্জুবদ্ধ অধঃশিরাঃ লম্বমান আছে। রাজা শবদর্শনে শ্রম সফল বোধ করিয়া অত্যন্ত আহ্লাদিত হইলেন এবং নির্ভয়ে বৃক্ষে আরোহণপূর্ব্বক খড়্গাঘাত দ্বারা বন্ধনরজ্জুচ্ছেদন করিলেন। শব ভূতলে পতিত হইবামাত্র উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে লাগিল। রাজা তাহার কণ্ঠশব্দশ্রবণে সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন এবং ত্বরায় তৰু হইতে অবতীর্ণ হইয়া নিকটে গিয়া জিজ্ঞাসিলেন তুমি কে, কি নিমিত্ত তোমার এরূপ দুরবস্থা ঘটিয়াছে বল। সে শুনিবামাত্র খিল্ খিল্ করিয়া হাসিয়া উঠিল। রাজা দেখিয়া শুনিয়া অত্যন্ত বিস্ময়াপন্ন ও চিন্তান্বিত হইলেন এবং এই অদ্ভুত ব্যাপারে মর্ম্মাববোধে অসমর্থ হইয়া অশেষপ্রকার কল্পনা করিতে লাগিলেন।
এই অবসরে শব বৃক্ষে উঠিয়া পূর্ব্ববৎ রজ্জুবদ্ধ ও লম্বমান হইয়া রহিল। রাজাও তৎক্ষণাৎ বৃক্ষে আরোহণ ও রজ্জুচ্ছেদন পুরঃসর শবকে কক্ষে নিক্ষিপ্ত করিয়া অবতীর্ণ হইলেন এবং সাতিশয় নির্বন্ধ সহকারে তাহার এরূপ বিপৎপ্রাপ্তির কারণ জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। সে কিছুই উত্তর দিল না। রাজা ক্ষণ কাল চিন্তা করিয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন যক্ষের নিকট যে তৈলিকের কথা শুনিয়াছিলাম সে এই ব্যক্তি আর যোগীও সেই কুম্ভকার আপন যোগসিদ্ধির উদ্দেশে ইহার প্রাণসংহার করিয়া শ্মশানে রাখিয়াছে। অনন্তর তাহাকে উত্তরীয়বস্ত্রে বন্ধন করিয়া যোগীর নিকট লইয়া চলিলেন।
অর্দ্ধপথে উপস্থিত হইলে শবাবিষ্ট বেতাল বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞাসিল অহে বীরপুরুষ তুমি কে আমাকে কোথায় লইয়া যাও। ভূপতি কহিলেন আমি রাজা বিক্রমাদিত্য শান্তশীলনামক যোগীর আজ্ঞানুসারে তোমাকে তাঁহার আশ্রমে লইয়া যাইতেছি। বেতাল কহিল মহারাজ মূঢ় দুর্বুদ্ধি ও অলসেরাকেবল নিদ্রা আলস্য ও কলহে কালহরণ করে। কিন্তু বুদ্ধিমান্ চতুর ও পণ্ডিত ব্যক্তিদিগের সদা সদালাপ সৎকর্ম্মের অনুষ্ঠান ও শাস্ত্রচিন্তা দ্বারা আনন্দে কালযাপন হয়। অতএব সমস্ত পথ মৌন ভাবে গমন করা অপেক্ষা সৎকথার আলোচনা শ্রেয়সী বোধ করিয়া এক এক প্রসঙ্গ করিতেছি শ্রবণ কর। আমি প্রত্যেক প্রসঙ্গের পরিশেষে প্রশ্ন করিব যদি তুমি তত্তৎ প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর দাও তৎক্ষণাৎ ফিরিয়া যাইব। আর যদি জানিয়াও যথার্থ উত্তর না দাও অবিলম্বে তোমার বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ ও অন্তে নরকপাত হইবেক। রাজা অগত্যা তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইয়া তাহাকে সন্ন্যাসীর আশ্রমে লইয়া চলিলেন এবং বেতালও উপাখ্যান আরম্ভ করিল।
উপসংহার
উপসংহার
বেতাল কহিল মহারাজ আমি তোমার অধ্যবসায় সাহস স্ব ও বিরত্ব দর্শনে অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছি। এক্ষণে তোমাকে কিছু উপদেশ দিতেছি অবধানপূর্ব্বক শ্রবণ কর।
যে যোগী তোমাকে শবানয়নার্থে প্রেরণ করিয়াছে সে কুম্ভকারকুলোদ্ভব। তাহার নাম শান্তশীল। আর এই যে শব দেখিতেছ ইহা ভোগবতীর অধিপতি রাজা চন্দ্রভানুর মৃত দেহ। শান্তশীল আপন যোগসিদ্ধির নিমিত্ত অনেক কৌশলে তাহার প্রাণবধ করিয়া প্রায় কৃতকার্য্য হইয়া আছে। এক্ষণে তোমার প্রাণসংহার করিতে পারিলেই উহার সম্পূর্ণ রূপে প্রয়োজনসিদ্ধি হয়। অতএব আমি তোমাকে সাবধান করিয়া দিতেছি। যোগী পূজা সমাপন করিয়া কহিবেক মহারাজ সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত কর। তদনুসারে তুমি প্রণত হইলে সে তৎক্ষণাৎ খড়্গপ্রহার করিবেক। তুমি প্রণাম না করিয়া কহিবে আমি সমস্ত পৃথিবীর সম্রাট্ কোন কালে কাহাকেও দণ্ডবৎ প্রণাম করি নাই ও কেমন করিয়া দণ্ডবৎ প্রণাম করিতে হয় তাহাও জানি না। আপনি কৃপা করিয়া দেখাইয়া দিলে প্রণাম করিতে পারি। অনন্তর সে যেমন ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিবেক অমনি তুমি খড়্গপ্রহার দ্বারা তাহার শিরশ্ছেদন করিবে এবং চন্দ্রভানু ও শান্তশীল উভয়ের মৃত দেহ তৈলকটাহে নিক্ষেপ করিলে শান্তশীলের সম্পূর্ণ যোগফল পাইয়া নিরুদ্বেগে অখণ্ড সাম্রাজ্য করিতে পারিবেক। সে ব্যক্তি আততায়ী, আততায়ীর প্রাণবধে পাতক নাই।
এই বলিয়া বেতাল সেই মৃত শরীর হইতে বহির্গত হইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল। রাজা সেই শব লইয়া সন্ন্যাসীর সন্নিধানে উপস্থিত হইলে তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া রাজার বহু প্রশংসা করিতে লাগিলেন। অনন্তর জীবন দানপূর্ব্বক সেই মৃত শরীর বলি প্রদান করিলেন এবং পূজার অন্যান্য অঙ্গ সমাপন করিয়া রাজাকে কহিলেন মহারাজ সাষ্টাঙ্গ প্রণাম কর তোমার প্রতাপবৃদ্ধি ও অভীষ্টসিদ্ধি হইবেক। রাজা বেতালবাক্য স্মরণ করিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া অতি বিনয়ে নিবেদন করিলেন মহাশয় আমি উক্ত প্রকার প্রণাম করিতে জানি না। আপনি গুৰু, কৃপা করিয়া দেখাইয়া দেউন। পরে যোগী রাজাকে প্রণাম শিখাইবার নিমিত্ত যেমন ভূতলে দণ্ডবৎ পতিত হইলেন অমনি রাজা বেতালের উপদেশানুসারে খড়্গাঘাত দ্বারা তাহার শিরশ্ছেদন করিলেন।
দেবতারা রাজার সাহসদর্শনে সন্তুষ্ট হইয়া দুন্দুভিধ্বনি ও পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিলেন। দেবরাজ বিমান হইতে অবতরণপূর্ব্বক রাজাকে দর্শন দিয়া কহিলেন মহারাজ আমি তোমার প্রতি প্রীত হইয়াছি বরপ্রার্থনা কর। রাজা অনিমিষসহস্রনয়নেপলক্ষিত কলেবর দর্শনে দেবরাজ নিশ্চয় করিয়া আপনাকে কৃতার্থ বোধ করিলেন এবং কহিলেন আপনকার প্রসাদে পৃথিবীতে আমার কোন প্রার্থয়িতব্য নাই। এক্ষণে এইমাত্র প্রার্থনা করি যেন আমার এই বৃত্তান্ত সমস্ত সংসারে প্রসিদ্ধ হয়। ইন্দ্র কহিলেন মহারাজ যাবৎ চন্দ্র সূর্য্য পৃথিবী ও আকাশমণ্ডল থাকিবেক তাবৎ কাল পর্য্যন্ত তোমার এই বৃত্তান্ত নিঃসন্দেহ ধরাতলে প্রসিদ্ধ থাকিবেক।
এই রূপে রাজাকে বরপ্রদান করিয়া দেবরাজ দেবলোকে প্রস্থান করিলেন, অনন্তর রাজা মন্ত্র প্রয়োগপূর্ব্বক দুই মৃত দেহ তৈলকটাহে নিক্ষেপ করিবামাত্র দুই বিকটবেশ বীরপুৰুষ উপস্থিত হইল এবং কৃতাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিল মহারাজ কি আজ্ঞা হয়। রাজা কহিলেন আমি যখন যখন স্মরণ করির তোমরা আমার নিকটে উপস্থিত হইবে। তাহারা যে আজ্ঞা মহারাজ বলিয়া প্রস্থান করিল। রাজা বিক্রমাদিত্যও চরিতার্থ হইয়া হৃষ্ট চিত্তে রাজধানী প্রত্যাগমনপূর্ব্বক পরম সুখে রাজ্যশাসন ও প্রজাপালন করিতে লাগিলেন।
সম্পূর্ণ
ঊনবিংশ উপাখ্যান
ঊনবিংশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
চিত্রকূট নগরে রূপদত্ত নামে রাজা ছিলেন। তিনি এক দিন একাকী অশ্বারোহণ করিয়া মৃগয়ায় গমন করিলেন। মৃগের অন্বেষণে ইতস্ততঃ অনেক ভ্রমণ করিয়া পরিশেষে তিনি এক ঋষির আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। তথায় এক পরম রমণীয় সরোবর ছিল তাহার তীরে গিয়া দেখিলেন কমল সকল প্রফুল্ল হইয়া আছে মধুকরেরা মধুপানে মত্ত হইয়া কমল হইতে কমলান্তরে ভ্রমণ করত গুন্ গুন্ রবে গান করিতেছে হংস সারস চক্রবাক প্রভৃতি জলবিহঙ্গমগণ তাহার তীরে ও নীরে বিহার করিতেছে চারি দিকে কিসলয়কুসুমসুশোভিত নানাবিধ পাদপসমূহ বসন্তলক্ষ্মীর সৌভাগ্য বিস্তার করিতেছে সর্ব্বতঃ শীতল সুগন্ধ গন্ধবহের মন্দ মন্দ সঞ্চার হইতেছে। রাজা মৃগয়াব্যাপারে অত্যন্ত পরিশ্রান্ত ছিলেন বৃক্ষমূলে অশ্ব বন্ধন করিয়া তথায় উপবেশনপূর্ব্বক শ্রান্তি দূর করিতে লাগিলেন।
কিয়ৎ ক্ষণ পরে এক ঋষিকন্যা আসিয়া সেই সরোবরে স্নান করিতে অবতীর্ণ হইল। রাজা দর্শনমাত্র হতজ্ঞান হইলেন। স্নানবিধি সমাপন করিয়া ঋষিতনয়া আশ্রমাভিমুখী হইলে রাজা তাহার সম্মুখবর্ত্তী হইয়া কহিলেন ঋষিকন্যে তোমার এ কেমন ধর্ম্ম। আমি আতপে তাপিত হইয়া বিশ্রামার্থে তোমার আশ্রমে অতিথি হইলাম। তুমি এমনই আতিথেয়ী যে এক বার সম্ভাষণ দ্বারাও আমার সৎকার করিলে না। ঋষিকন্যা শুনিয়া দণ্ডায়মান হইলেন।
এই অবসরে ঋষিও বনান্তর হইতে ফল পুষ্প ও কুশ সমিধ আহরণ করিয়া প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। রাজা দর্শনমাত্র আত্মপরিচয় প্রদানপূর্ব্বক সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলে ঋষি অভীষ্টসিদ্ধির্ভবতু বলিয়া আশীর্বাদ করিলেন। রাজা আশীর্বাদ শ্রবণে মনে মনে দুষ্ট অভিসন্ধি করিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিলেন মহাশয় আমি শুনিয়াছি কালত্রয়ে ঋষিবাক্য অন্যথা হয় না। আপনি আমাকে আশীর্বাদ করিলেন আমার অভিলাষ পূর্ণ হইবেক কিন্তু আমি তাহার কোন সম্ভাবনা দেখিতেছি না। ঋষি কহিলেন আমি কহিতেছি অবশ্যই তোমার অভিলাষ পূর্ণ হইবেক। তখন রাজা অম্লান মুখে কহিলেন আমি এই কন্যার করগ্রহণের অভিলাষ করিয়াছি।
ঋষি রাজার দুষ্ট অভিপ্রায়ে মনে মনে কুপিত হইয়াও আপন আশীর্বাদ যথার্থ করিবার নিমিত্ত রাজাকে কন্যা সম্প্রদান করিলেন। রাজা নবপ্রণয়িনীকে সমভিব্যাহারিণী করিয়া রাজধানী প্রতি চলিলেন। কিয়ৎ দূরে গিয়া রজনী উপস্থিত হইল। রাজা ও রাজপ্রেয়সী যথাসম্ভব ফলমূলাদি দ্বারা কথঞ্চিৎ ক্ষুধানিবৃত্তি করিয়া তৰুতলে শয়ন করিলেন।
অর্দ্ধরাত্র সময়ে এক দুর্দান্ত রাক্ষস আসিয়া রাজাকে জাগরিত করিয়া কহিল আমি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত্ত হইয়া আসিয়াছি তোমার ভার্য্যাকে ভক্ষণ করিব। রাজা কহিলেন তুমি আমার প্রাণাধিকা প্রেয়সীকে পরিত্যাগ কর অন্য যাহা প্রার্থনা করিবে তাহাই আনিয়া দিব। তখন রাক্ষস কহিল যদি তুমি প্রশস্ত মনে স্বহস্তে দ্বাদশবর্ষীয় ব্রাহ্মণকুমারের মস্তকচ্ছেদন করিয়া আমার হস্তে দিতে পার তাহা হইলে আমি তোমার প্রিয়তমাকে পরিত্যাগ করি। রাজা প্রিয়তমার প্রাণরক্ষার্থে ব্রহ্মহত্যাতেও সম্মত হইলেন এবং কহিলেন তুমি সপ্তম দিবসে আমার রাজধানীতে যাইবে আমি তোমার প্রার্থিত বস্তু প্রদান করিব।
এই রূপে রাজাকে ব্রহ্মধধপ্রতিজ্ঞায় বদ্ধ করিয়া রাক্ষস প্রস্থান করিল। রাজাও প্রভাত হইবামাত্র প্রেয়সীসমভিব্যাহারে রাজধানীতে আসিয়া প্রধান মন্ত্রীর সমক্ষে রাক্ষসবৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। মন্ত্রী কহিল মহারাজ আপনি উৎকণ্ঠিত হইবেন না আমি অনায়াসে এই বিষয় সম্পন্ন করিয়া দিব। রাজা মন্ত্রিবাক্যে নির্ভর করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া নব প্রণয়িনীর সহিত পরম সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন।
মন্ত্রী এক পুৰুষপ্রমাণ কাঞ্চনময়ী প্রতিমা নির্মাণ করাইয়া রত্নালঙ্কারে মণ্ডিত করিয়া নগরের চতুষ্পথে স্থাপন করিলেন এবং প্রচার করিয়া দিলেন যে ব্রাহ্মণ বলিদানার্থে দ্বাদশবর্ষীয় পুত্ত্র প্রদান করিবেন তিনি এই প্রতিমা প্রাপ্ত হইবেন।
নগরবাসী এক অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণের দ্বাদশবর্ষীয় পুত্ত্র ছিল। ব্রাহ্মণ ঘোষণার বিষয় অবগত হইয়া ব্রাহ্মণীর নিকট কহিলেন দেখ নির্দ্ধন ব্যক্তির সংসারাশ্রমে বাস করা বিড়ম্বনামাত্র। ধনই ধর্ম্ম ও সুখের মূল। আমি জন্মদরিদ্র। চির কালের মধ্যে সাংসারিক কোন সুখের মুখ দেখিতে পাইলাম না। এক্ষণে ধনাগমের এই এক সহজ উপায় উপস্থিত। যদি তুমি মত কর পুত্ত্র দিয়া স্বর্ণময়ী প্রতিমা লইয়া আসি তাহা হইলে পরম সুখে কালযাপন করিতে পারিব।
ব্রাহ্মণী সম্মতা হইলেন। ব্রাহ্মণ পুত্ত্র দিয়া প্রতিমা লইয়া তদ্বিক্রয় দ্বারা ধনসংগ্রহ করিলেন। সপ্তম দিবস প্রত্যূষ সময়ে রাক্ষস সভায় আসিয়া রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিবামাত্র মন্ত্রী দ্বাদশবর্ষীয় ব্রাহ্মণবালক ও তীক্ষ্ণধার খড়্গ আনিয়া রাজার সম্মুখে রাখিল। অনন্তর রাজা শিরশ্ছেদনার্থে খড়্গ উদ্যত করিলে ব্রাহ্মণবালক অধোমুখে ঈষৎ হাস্য করিল। রাজা অম্লান মুখে তাহার মস্তকচ্ছেদন করিয়া রাক্ষসের হস্তে সমর্পণ করিলেন।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ মৃত্যুসময়ে সকলেই রোদন করিয়া থাকে বালক হাস্য করিল কেন বল। রাজা কহিলেন বাল্যকালে পিতা মাতা প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন। তৎপরে কোন বিপদ্ ঘটিলে রাজা রক্ষা করিয়া থাকেন। কিন্তু আমার ভাগ্য সকলই বিপরীত হইল। পিতা মাতা অর্থলোভে বিক্রয় করিলেন এবং প্রাণভয়ে যে রাজার শরণাগত হইব তিনিই স্বয়ং মস্তকচ্ছেদনে উদ্যত। মনে মনে এই আলোচনা করিয়া সে হাস্য করিয়াছিল।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
একবিংশ উপাখ্যান
একবিংশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
জয়স্থল নগরে বিষ্ণুস্বামী নামে ধর্ম্মাত্মা ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁহার চারি পুত্ত্র ছিল। এক জন দ্যূতাসক্ত দ্বিতীয় লম্পট তৃতীয় নির্লজ্জ চতুর্থ নাস্তিক। ব্রাহ্মণ পুত্ত্রদিগের অসদ্ব্যবহার ও কদাচার দর্শনে অতিশয় বিরক্ত হইয়া এক দিবস চারি জনকে একত্র করিয়া এইরূপ ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন যে ব্যক্তি দ্যূতক্রীড়ায় আসক্ত হয় কমলা ভ্রান্তিক্রমেও তাহার প্রতি দৃষ্টিপতি করেন না। ধর্ম্মশাস্ত্রে লিখিত আছে নাসাকর্ণচ্ছেদনপূর্ব্বক গর্দ্দভে আরোহণ করাইয়া দ্যূতকারীকে দেশ হইতে বহিস্কৃত করিবেক। দৃতাসক্ত ব্যক্তি হিতাহিতবিবেচনা ও ধর্ম্মাধর্ম্মজ্ঞান শূন্য হয়। ধর্ম্মনন্দন রাজা যুধিষ্ঠির দ্যূতাসক্ত হইয়া সমস্ত সাম্রাজ্য ও আপন ভার্য্যা পর্য্যন্ত হারাইয়া পরিশেষে বনবাসদুঃখে কালযাপন করিয়াছিলেন। আর যে ব্যক্তি লম্পট হয় সে সুখভ্রমে দুঃখার্ণবে প্রবেশ করে। লম্পটেরা বারাঙ্গনানুরাগে সর্ব্বস্বান্ত করিয়া পরিশেষে চৌর্য্যবৃত্তি অবলম্বন করে। ফলতঃ লম্পট ব্যক্তির সত্ত্ব শীল আচার বিচার নিয়ম ধর্ম্ম সমস্তই নষ্ট হয়। আর যে ব্যক্তি নির্লজ্জ তাহাকে ভর্ৎসনা করা বা উপদেশ দেওয়া বৃথা। তাহার লোকনিন্দার ভয় থাকে না এবং গর্হিত কর্ম্ম করিয়াও ঘৃণাবোধ হয় না। ফলতঃ এবংবিধ ব্যক্তির যত ত্বরায় মৃত্যু হয় ততই মঙ্গল। আর যে ব্যক্তি পরকালের ভয় না করে দেবতা ও গুৰুজনে শ্রদ্ধাবান্ না হয় এবং সনাতন বেদাদি শাস্ত্রে আস্থাশূন্য হয় সে অতি পাষণ্ড তাহার সহিত বাক্যালাপ করিলেও অধর্ম্ম আছে। লোকে পুত্ত্রের মঙ্গলপ্রার্থনায় জপ তপ দান ধ্যান ব্রত উপবাসাদি করে কিন্তু আমি কায়মনোবাক্যে তোমাদের মৃত্যু প্রার্থনা করিতেছি।
পিতার এইপ্রকার তিরস্কারবাক্য শ্রবণ করিয়া চারি জনেরই অন্তঃকরণে অত্যন্ত ঘৃণা জন্মিল। তখন তাহারা পরস্পর কহিতে লাগিল বাল্যকালে বিদ্যাভ্যাসে ঔদাস্য করিয়াছিলাম তাহাতেই আমাদের এই দুরবস্থা ঘটিয়াছে এক্ষণে বিদেশে গিয়া বিদ্যাভ্যাস কর। উচিত। এইরূপ সঙ্কল্প করিয়া চারি জনে নানা দেশে ভ্রমণপূর্ব্বক অল্পকালমধ্যে সমস্ত বিদ্যায় পারদর্শী হইল। প্রত্যাগমনসময়ে তাহারা পথিমধ্যে দর্শন করিল এক চর্ম্মকার মৃত ব্যাঘ্রের মাংস ও চর্ম্ম লইয়া প্রস্থান করিল কেবল অস্থি সকল স্থানে স্থানে পতিত রহিল।
তাহাদের এক ব্যক্তি অস্থিসঙ্ঘটনী বিদ্যা শিক্ষা করিয়া ছিল সে মন্ত্রপ্রভাবে সমস্ত অস্থি একস্থানস্থ করিয়া ব্যাঘ্রের কঙ্কাল সঙ্কলন করিল। দ্বিতীয় মাংসসঞ্জননী বিদ্যা দ্বারা সমুদায় দেহে মাংস জন্মাইয়া দিল। তৃতীয় চর্ম্মযোজনী বিদ্যা জানিত সে তৎপ্রভাবে ব্যাঘ্রের সর্ব্ব শরীর চর্ম্ম দ্বারা আচ্ছাদিত করিল। চতুর্থ মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা দ্বারা ব্যাঘ্রের প্রাণদান করিল। ব্যাঘ্র হিংস্র জন্তু তৎক্ষণাৎ গাত্রোত্থান করিয়া তাহাদের চারি জনেরই প্রাণসংহার করিল।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এই চারি জনের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি অধিক নির্বোধ। রাজা কহিলেন যে ব্যক্তি জীবনদান করিল যেই সর্ব্বাপেক্ষা অধিক নির্বোধ।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
একাদশ উপাখ্যান
একাদশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
পুণ্যপুর নগরে বল্লভ নামে প্রজাবল্লভ নরপতি ছিলেন। তাঁহার অমাত্যের নাম সত্যপ্রকাশ। এক দিবস রাজা সত্যপ্রকাশের নিকট কহিলেন দেখ যে ব্যক্তি রাজ্যেশ্বর হইয়া অভিলাষানুরূপ বিষয়ভোগ না করে তাহার রাজ্য ক্লেশপ্রপঞ্চমাত্র। অতএব অদ্যাবধি আমি ইচ্ছানুরূপ সুখ সম্ভোগে প্রবৃত্ত হইলাম তুমি সমস্ত রাজকার্য্যের ভার লইয়া আমাকে অবসর দাও। ইহা কহিয়া অমাত্যহস্তে সমস্ত সাম্রাজ্যের ভার সমর্পণ করিয়া রাজা ভোগসুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন।
সত্যপ্রকাশ অগত্যা রাজপ্রস্তাবে সম্মত হইলেন কিন্তু স্বতন্ত্র রাজতন্ত্রনির্বাহ ও অহর্নিশ দুরবগাহনীভিশাস্ত্রপর্য্যালোচনা দ্বারা একান্ত ক্লান্ত হইতে লাগিলেন।
এক দিবস অমাত্য আপন ভবনে উৎকণ্ঠিত মনে নির্জনে বসিয়া আছেন এই অবসরে তাঁহার গৃহলক্ষ্মী লক্ষ্মীনাম্নী পত্নী তথায় উপস্থিত হইয়া স্বামীকে বিষণ্ণ দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল এখন তোমাকে কি নিমিত্তে সর্ব্বদা উৎকণ্ঠিত দেখি এবং কি নিমিত্তেই বা তুমি দিন দিন দুর্বল হইতেছ। তিনি কহিলেন রাজা আমার প্রতি সমুদায় ভার দিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া ভোগসুখে কালযাপন করিতেছেন। আমি তাঁহার আদেশানুসারে ইদানীং সমস্ত রাজকার্য্য নির্বাহ করিতেছি এবং রাজ্যের নানাবিষয়িনী উৎকট চিন্তা দ্বারা এরূপ দুর্বল হইতেছি। তখন তাঁহার পত্নী কহিল তুমি অনেক দিন রাজকার্য্য করিলে এক্ষণে রাজার নিকট কিছু দিনের অবকাশ লইয়া নিশ্চিন্ত হইয়া তীর্থপর্য্যটন কর।
সত্যপ্রকাশ সহধর্ম্মিণীর উপদেশানুসারে রাজসমীপে আবেদন করিয়া বিদায় লইয়া তীর্থভ্রমণে নির্গত হইলেন। ক্রমে ক্রমে সমস্ত তীর্থ দর্শন করিয়া পরিশেষে তিনি সেরুবন্ধরামেশ্বরে উপস্থিত হইলেন। তথায় সূর্য্যবংশাবতংস শ্রীরামচন্দ্রপ্রতিষ্ঠিত দেবাদিদেব মহাদেবের মন্দিরে প্রবেশপূর্ব্বক দর্শনবন্দনাদি করিয়া নির্গত হইয়া সমুদ্রে দৃষ্টিপাত করিবামাত্র প্রবাহমধ্য হইতে এক স্বর্ণময় অদ্ভুত মহীরুহ বহির্গত হইল। দেখিলেন তদুপরি এক পরম সুন্দরী নায়িকা হস্তে বীণা লইয়া মধূর কোমল তানলয়বিশুদ্ধ স্বরসংযোগে সঙ্গীত করিতেছে। সত্যপ্রকাশ বিস্ময়াবিষ্ট ও অনন্যদৃষ্টি হইয়া নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে ঐ অদ্ভুত তরু প্রবাহমধ্যে বিলীন হইল।
এইরূপ অঘটনঘটনা সন্দর্শনে চমৎকৃত হইয়া সত্যপ্রকাশ ত্বরায় স্বদেশে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক রাজসমীপে কৃতাঞ্জলি হইয়া আবেদন করিলেন মহারাজ আমি এক আশ্চর্য্য দর্শন করিয়াছি কিন্তু বর্ণনা করিলে তাহাতে কোন প্রকারেই অন্যের বিশ্বাস জন্মাইতে পারিব না। প্রাচীন পণ্ডিতেরা কহিয়াছেন যে বিষয় কাহারও বুদ্ধিগম্য ও বিশ্বাসযোগ্য না হয় তাহা কদাপি বর্ণন করিবেক না করিলে উপহাসাস্পদ হয়। কিন্তু মহারাজ আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি এই নিমিত্ত নিবেদন করিতেছি যে স্থানে ত্রেতাবতার ভগবান্ রামচন্দ্র দশাননবংশধ্বংসবিধানোদ্যোগে মহাকায়মহাবলকপিবলযাহায্যে শতযোজনবিস্তীর্ণ অর্ণবোপরি লোকাতীতকীর্ত্তিহেতু সেতু সঙ্ঘটন করিয়াছিলেন তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলাম উত্তালতরঙ্গমালাসঙ্কুল কল্লোলিনীবল্লভপ্রবাহমধ্য হইতে অকস্মাৎ এক স্বর্ণময় বৃক্ষ নির্গত হইল। তদুপরি এক পরম সুন্দরী কন্যা বীনাবাদনপূর্ব্বক আমি আপনকার নিকট সংবাদ দিতে আসিয়াছি। রাজা শ্রবণমাত্র অতিমাত্র কৌতূহলাবিষ্ট হইয়া পুনর্বার সত্যপ্রকাশের হস্তে রাজ্যভার প্রদানপূর্ব্বক সেতুবন্ধরামেশ্বরে উপস্থিত হইলেন। পরিশেষে নিরূপিত সময়ে মহাদেবের পূজা করিয়া মন্দির হইতে নির্গত হইয়া সত্যপ্রকাশের বর্ণনানুরূপ ভূরুহ নিরীক্ষণ করিলেন এবং সেই সকললোকললামভূতা সর্ব্বাঙ্গসুন্দরীর সৌন্দর্য্য সন্দর্শনে বিমূঢ় ও পূর্ব্বাপর পর্য্যালোচনাপরিশূন্য হইয়া ক্ষণবিলম্ব ব্যতিরেকে লম্ফ প্রদানপূর্ব্বক ঐ বৃক্ষের উপরি আরোহণ করিলেন বৃক্ষও রাজাকে লইয়া তৎক্ষণাৎ পাতালপুর প্রবিষ্ট হইল।
অনন্তর সেই কন্যা রাজার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিল অহে বীরপুরুষ তুমি কে কি অভিপ্রায়ে এ স্থানে আগমন করিলে বল। তিনি কহিলেন আমি পুন্যপুরের রাজা নাম বল্লভ তোমার সৌন্দর্য্য ও সৌকুমার্য্য দর্শনে মুগ্ধ হইয়া আসিয়াছি। কন্যা কহিল আমি তোমার সাহসে সন্তুষ্ট হইয়াছি। যদি তুমি কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশীতে আমার সহিত সর্ব্বপ্রকার সম্বন্ধ পরিত্যাগ করিতে পার তাহা হইলে আমি তোমাকে বিবাহ করি। রাজা শুনিয়া আনন্দপ্রবাহে মগ্ন ও তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন। তৎপরে সে রাজাকে এই নিয়ম রক্ষার্থে পুনর্বার প্রতিজ্ঞারূঢ় করিয়া গান্ধর্ব্ব বিধান দ্বারা আপন প্রতিজ্ঞা সম্পন্ন করিল। রাজা পরম কৌতুকে কালযাপন করিতে লাগিলেন।
কৃষ্ণ চতুর্দশী উপস্থিত হইল। কন্যা সাতিশয় আগ্রহ ও ব্যগ্রতা প্রদর্শন পূর্ব্বক রাজাকে নিকটে থাকিতে নিষেধ করিলে তিনি পূর্ব্বকৃত প্রতিজ্ঞা অনুসারে তৎক্ষণাৎ তথা হইতে অপসৃত হইলেন। কিন্তু কি কারণে পূর্ব্বে বচনবদ্ধ করিয়াছিল এবং এক্ষণে এতাদৃশ আগ্রহ ও ব্যগ্রতা প্রদর্শন পূর্ব্বক পুনরায় নিষেধ করিল যাবৎ ইহার সবিশেষ অবগত না হইব তাবৎ আমার অন্তঃকরণে এক বিষম সংশয় থাকিবেক। অতএব ইহার অনুসন্ধান করা আবশ্যক। এই বলিয়া কৌতুহলাকুলিত চিত্তে অন্তরালে থাকিয়া অবলোকন করিতে লাগিলেন।
অর্দ্ধরাত্রসময়ে সহসা এক রাক্ষস আসিয়া কন্যার অঙ্গে করার্পণ করিল। রাজা তর্দর্শনে একান্ত অসহমান হইয়া করতলে করাল করবাল ধারণপূর্ব্বক তৎক্ষণাৎ তথায় উপস্থিত হইলেন এবং অশেষপ্রকার তিরস্কার করিয়া কহিলেন অরে দুরাচার রাক্ষস তুই আমার সমক্ষে প্রিয়তমার অঙ্গে হস্তার্পণ করিস না। যাবৎ তোরে না দেখিয়াছিলাম তাবৎ অন্তঃকরণে ভয় ছিল এক্ষণে দেখিয়া নির্ভয় হইয়াছি এবং তোর প্রাণদণ্ড করিতে আসিয়াছি। এই বলিয়া খড়্গপ্রহার দ্বারা তাহার শিরশ্ছেদ করিলেন। তখন কন্যা অকৃত্রিম সন্তোষ প্রদর্শনপূর্ব্বক কহিল তুমি দুর্দান্ত রাক্ষসের হস্ত হইতে মুক্ত করিয়া আমারে জীবনদান করিলে। আমি এত দিম কি পর্য্যন্ত যন্ত্রণাভোগ করিয়াছি বর্ণনা করিতে পারি না।
রাজা জিজ্ঞাসিলেন সুন্দরি কি কারণে তুমি এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত এই দারুণ দৈবদুর্বিপাকগ্রস্ত ছিলে বল।
সে কহিল মহারাজ শ্রবণ কর আমি বিদ্যাধরনামক গন্ধর্ব্বরাজের কন্যা। নাম রত্নমঞ্জরী। ভোজনকালে আমি নিকটে উপবিষ্ট না থাকিলে পিতার তৃপ্তি হইত না। এজন্য নিত্যই ভোজনসময়ে তাঁহার সন্নিহিত থাকিতাম। এক দিন বাল্যখেলায় আসক্ত হইয়া ভোজনবেলায় গৃহে উপস্থিত ছিলাম না। পিতা আমার অপেক্ষায় বুভুক্ষায় কাতর হইয়া ক্রোধভরে এই শাপ দিলেন অদ্যাবধি তুমি রসাতলবাসিনী হইবে এবং কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশীতে এক রাক্ষস আসিয়া অশেষপ্রকার যন্ত্রণা দিবে। আমি শুনিয়া অত্যন্ত কাতর হইলাম এবং পিতার চরণে ধরিয়া বহুবিধ স্তুতি ও বিনীতি করিয়া নিবেদন করিলাম পিতঃ আমার দূরদৃষ্টক্রমে সামান্য অপরাধে গুরু দণ্ড বিধান করিলেন। এক্ষণে কৃপা করিয়া শাপমোচনের কোন উপায় করিয়া দেন নতুবা কত কাল যন্ত্রণাভোগ করিব। ইহা কহিয়া আমি রোদন করিতে লাগিলাম। তখন তিনি পূর্ব্বার্জ্জিত স্নেহরসের সহায়তা দ্বারা আমার বিনয়ের বশীভূত হইয়া কহিলেন এক মহাবল পরাক্রান্ত বীরপুরুষ আসিয়া সেই রাক্ষসের প্রাণদণ্ড করিলে তোমার শাপমোচন হইবেক। আমি সেই শাপানুসারে এই পাপাবিষ্ট ছিলাম। বহু দিনের পর তুমি আমাকে মুক্ত করিলে। এক্ষণে অনুমতি কর পিতৃদর্শনে যাই।
রাজা কহিলেন যদি তুমি উপকার স্বীকার কর তবে প্রথমে এক বার আমার ধাজধানীতে চল পরে পিতৃদর্শনে যাইবে। রত্নমঞ্জরী মহোপকারকের নিকট অবশ্যকর্ত্তব্য কৃতজ্ঞতাস্বীকারের অন্যথাভাবে অধর্ম্ম জানিয়া রাজার প্রার্থনায় সম্মত হইলে তিনি তাহাকে সমভিব্যাহারে লইয়া রাজধানীতে উপস্থিত হইলেন এবং কিয়ৎ কাল তৎসহবাসে বিষয়রসে কালযাপন করিয়া পরিশেষে অনিচ্ছাপূর্ব্বক তাহাকে পিতৃদর্শনে যাইতে অনুমতি করিলেন। তখন রত্নমঞ্জরী কহিল মহারাজ বহু কাল মনুষ্যসহবাস দ্বারা আমার গন্ধর্ব্বত্ব গিয়াছে এখন মনুষ্যভাবাপন্ন হইয়াছি। পিতা আমার গন্ধর্ব্বপতি এক্ষণে তাঁহার নিকটে গিয়া সমুচিত আদর পাইব না। অতএব আর আমার তথায় যাইবে অভিলাষ নাই তোমার নিকটেই যাবজ্জীবন অবস্থিতি কবিব। রাজা শুনিয়া অতিশয় হর্ষ প্রাপ্ত হইলেন এবং রাজকার্য্য বিস্মরণপূর্ব্বক দিন যামিনী সেই কামিনীর সহিত বিষয়বাসনায় কালযাপন করিতে লাগিলেন। এই সমস্ত ব্যাপার দর্শন করিয়া প্রধান অমাত্য সত্যপ্রকাশ প্রাণত্যাগ করিলেন।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসিল মহারাজ কি কারণে অমাত্য প্রাণত্যাগ করিলেন বল। বিক্রমাদিত্য কহিলেন মন্ত্রী বিবেচনা করিলেন রাজা বিষয়রসে আসক্ত হইয়া রাজ্যচিন্তা পরিত্যাগ করিলেন প্রজা অনাথ হইল। এক্ষণে আর কোন ব্যক্তিই আমার প্রতি সমুচিত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিবেক না। অহোরাত্র এই বিষম চিন্তাবিষ শরীরে প্রবিষ্ট হওয়াতে সত্যপ্রকাশের প্রাণবিয়োগ হইল।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
চতুর্থ উপাখ্যান
চতুর্থ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
ভোগবতী নগরীতে অনঙ্গসেন নামে অতি প্রসিদ্ধ মহীপাল ছিলেন। চূড়ামণি নামে সর্ব্বগুণাকর শুকপক্ষী সর্ব্ব কাল তাঁহার সন্নিহিত থাকিত। এক দিবস রাজা প্রসঙ্গক্রমে চূড়ামণিকে জিজ্ঞাসিলেন শুক তুমি কি কি জান। সে কহিল মহারাজ আমি ভূত ভবিষ্যৎ বর্ত্তমান কালত্রয়ের বৃত্তান্ত জানি। তখন রাজা কহিলেন যদি তুমি ত্রিকালজ্ঞ হও বল কোন্ স্থানে আমার উপযুক্ত রমণী আছে। চূড়ামণি নিবেদন করিল মহারাজ মগধদেশাধিপতি রাজা বীরসেনের চন্দ্রাবতী নামে এক কন্যা আছে সে পরম সুন্দরী ও অতিপণ্ডিতা তাহার সহিত মহারাজের বিবাহ হইবেক।
রাজা অনঙ্গসেন শুকের সর্ব্বজ্ঞত্বপরীক্ষার্থে চন্দ্রকান্তনামক সুপ্রসিদ্ধ দৈবজ্ঞকে ডাকাইয়া জিজ্ঞাসিলেন মহাশয় আপনি গণনা দ্বারা নির্দ্ধারিত করিয়া বলুন কোন্ কামিনীর সহিত আমার বিবাহ হইবেক। তিনি জ্যোতির্বিদ্যাপ্রভাবে অবগত হইয়া কহিলেন মহারাজ চন্দ্রাবতী নামে এক অতিরূপবতী রমণী আছে। গণনা দ্বারা দৃষ্ট হইতেছে তাহার সহিত আপনকার পরিণয় হইবেক। রাজা শুনিয়া শুকের প্রতি অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন। পরে এক সদ্বক্তা চতুর বুদ্ধিমান্ কার্য্যসাধক ব্রাহ্মণকে অনাইয়া নানা উপদেশ দিয়া শুভসম্বন্ধস্থিরীকরণার্থে মগধেশ্বরের নিকট পাঠাইলেন।
চন্দ্রাবতীর নিকটেও মদনমঞ্জরী নামে এক শারিকা থাকিত। তাহারও সর্ব্বজ্ঞতাখ্যাতি ছিল। তিনি এক দিবস তাহাকে জিজ্ঞাসিলেন শারিকে যদি তুমি ভূত ভবিখ্যৎ বর্ত্তমান সমুদায় বলিতে পার আমার যোগ্য পতি কোথায় আছেন বল। শারিকা কহিল রাজনন্দিনি আমি দেখিতেছি ভোগবতী নগরীর অধিপতি রাজা অনঙ্গসেন তোমার পতি হইবেন। ফলতঃ অনঙ্গসেন ও চন্দ্রাবতী উভয়েরই এই রূপে শ্রবণ দ্বারা অন্তরে অনুরাগ সঞ্চার হইল এবং সমাগমাভাব প্রযুক্ত উভয়েরই ক্রমে ক্রমে পূর্ব্বরাগসম্ভব স্মরদশার উদয় হইতে লাগিল।
কিয়ৎ দিন পরে অনঙ্গসেনের প্রেরিত ব্রাহ্মণ নগধেশ্বরের নিকট উপস্থিত হইয়া স্বীয় রাজার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলে তিনি তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন এবং বাগ্দানের দ্রব্য সমুদায় সমভিব্যাহারে দিয়া এক ব্রাহ্মণকে ঐ ব্রাহ্মণের সহিত পাঠাইলেন। কহিয়া দিলেন তুমি তথা হইতে প্রত্যাগমন না করিলে আমি কোন উদ্যোগ করিতে পারিব না। বাগ্দানের দ্রব্য সামগ্রা লইয়া ব্রাহ্মণেরা অনঙ্গসেনের নিকট উপস্থিত হইয়া সবিশেষ সমস্ত বিজ্ঞাপন করিলে তিনি আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইলেন এবং সুবিজ্ঞ দৈবজ্ঞ দ্বারা বিবাহের দিন নির্দিষ্ট করিয়া মগধেশ্বরপ্রেরিত ব্রাহ্মণ দ্বারা তাঁহার নিকট সংবাদ পাঠাইয়া দিলেন। অনন্তর নির্দ্ধারিত দিবসে যথাসময়ে মগধেশ্বরের আলয়ে উপস্থিত হইয়া চন্দ্রাবতীর পাণিগ্রহণপূর্ব্বক নিজ রাজধানী প্রত্যাগমন করিয়া পরম সুখে কালক্ষেপণ করিতে লাগিলেন।
চন্দ্রাবতী শ্বশুরালয়ে আগমনকালে মদনমঞ্জরী শারিকারে নিজ সমভিব্যাহারে আনিয়াছিলেন। তিনি তাহাকে সর্ব্বদা আপন সমক্ষে রাখিতেন। রাজাও ক্ষণ কালের নিমিত্ত চূড়ামণিকে দৃষ্টিপথের বহির্ভূত করিতেন না। এক দিবস রাজা ও রাজমহিষী অন্তঃপুরে একাসনে উপবিষ্ট আছেন এবং পিঞ্জরস্থ শুক শারিকাও তাঁহাদের সম্মুখে আছে এমন সময়ে রাজা রাজ্ঞীকে কহিলেন দেখ একাকী থাকিলে অতি কষ্টে কালযাপন হয়। অতএব আমার অভিলাষ শুকের সহিত তোমার শারিকার বিবাহ দিয়া উভয়কে এক পিঞ্জরে রাখি তাহা হইলে উহারা আনন্দে কালহরণ করিতে পারিবেক। রাজ্ঞী ঈষৎ হাসিয়া অনুমোদন প্রদর্শন করিলে রাজা পরম সমাদরে শুক শারিকার বিবাহ নির্বাহ করিয়া উভয়কে এক পিঞ্জরে স্থাপিত করিলেন।
এক দিবস রাজা নির্জনে রাজমহিষীর সহিত রসপ্রসঙ্গে কালযাপন করিতেছেন এই সময়ে শুক শারিকাকে কহিতে লাগিল দেখ এই অসার সংসার মধ্যে ভোগ অতি সার পদার্থ। যে ব্যক্তি এই জগতে জন্মগ্রহণ করিয়া ভোগসুখে পরাঙ্মুখ থাকে তাহার বৃথা জন্ম। অতএব কি নিমিত্ত তুমি ভোগবিষয়ে নিরুৎসাহিনী হইতেছ। শারিকা কহিল পুরুষজাতি অত্যন্ত শঠ অধর্ম্মী ও স্ত্রীহত্যাকারী এজন্য পুরুষসংসর্গে আমার রুচি হয় না। শুক কহিল নারীও অতিশয় শঠ চপলা মিথ্যাবাদিনী ও পুরুষঘাতিনী। উভয়ের এইরূপ বিবাদারম্ভ দেখিয়া রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন হে শুক হে শারিকে কেন তোমরা অকারণে কলহ করিতেছ। তখন শারিকা কহিল মহারাজ পুরুষ বড় অধর্ম্মী এই নিমিত্তে পুরুষজাতির প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও অনুরাগ নাই। আমি পুরুষের ব্যবহার ও চরিত্র বিষয়ে এক উপাখ্যান কহিতেছি শ্ররণ করুন।
ইলাপুরে মহাধন নামে অতি ঐশ্বর্য্যশালী শ্রেষ্ঠী ছিলেন। বহু কাল অতীত হইল তথাপি তাঁহার পুত্ত্র হয় না এ নিমিত্ত তিনি সর্ব্বদাই মনোদুঃখে কালযাপন করেন। কিয়ৎ দিন পরে জগদীশ্বরের কৃপায় তাঁহার সহধর্ম্মিণী এক কুমার প্রসব করিলেন। শ্রেষ্ঠী অধিক বয়সে পুত্ত্রমুখ নিরীক্ষণ করিয়া আপনাকে কৃতার্থ বোধ করিলেন এবং পুত্ত্রের নাম নয়নানন্দ রাখিয়া অতিযত্নপূর্ব্বক লালনপালন করিতে লাগিলেন। বালক পঞ্চমবর্ষীয় হইলে তিনি তাহাকে বিদ্যাভ্যাসের নিমিত্ত উপযুক্ত শিক্ষকের হস্তে সমর্পণ করিলেন। সে স্বভাবদোষবশতঃ বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিয়া কেবল দুর্বৃত্ত বালকগণের সহিত কুৎসিত ক্রীড়ায় আবিষ্ট হইয়া কালযাপন করে ক্ষণমাত্রও অধ্যয়নে মনোনিবেশ করে না। ফলতঃ ক্রমে ক্রমে যত বয়োবৃদ্ধি হইতে লাগিল ততই তাহার কুক্রিয়াসক্তিও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।
কিয়ৎ কাল পরে শ্রেষ্ঠী পরলোক প্রাপ্ত হইলেন। নয়নানন্দ সমস্ত পৈতৃক ধনের অধিকারী হইয়া দ্যূতক্রীড়া সুরাপান আদি ব্যসনে আসক্ত হইল এবং কয়েক বৎসরের মধ্যে দুষ্ক্রিয়া দ্বারা সমস্ত ধন নষ্ট করিয়া অত্যন্ত দুর্দশায় পড়িল। পরে সে ইলাপুর পরিত্যাগপূর্ব্বক মানা দেশ ভ্রমণ করিয়া পরিশেষে চন্দ্রপুরনিবাসী হেমগুপ্ত শেঠের নিকট উপস্থিত হইল এবং স্বনাম ও পিতৃনাম উল্লেখপূর্ব্বক আত্মপরিচয় প্রদান করিল। হেমগুপ্ত তাহার পিতার পরম বন্ধু ছিলেন উহাকে পাইয়া অত্যন্ত আহ্লাদিত হইলেন এবং যথোচিত সমাদর ও প্রীতি প্রদর্শনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন বৎস তুমি কি সংযোগে অকস্মাৎ এ স্থলে উপস্থিত হইলে।
নয়নানন্দ কহিল আমি কতিপয় অর্ণবপোত লইয়া সিংহলদ্বীপে বাণিজ্য করিতে যাইতেছিলাম। দৈবের প্রতিকূলতা প্রযুক্ত অকস্মাৎ প্রবল বাত্যা উত্থিত হওয়াতে সমস্ত অর্ণবপোত জলমগ্ন হইল। আমি কেবল ভাগ্যবলে একফলকমাত্র অবলম্বন করিয়া বহু কষ্টে প্রাণরক্ষা করিয়াছি। এ পর্য্যন্ত আসিয়া আপনকার সহিত সাক্ষাৎ করিব এমন আশা ছিল না। আমার সমভিব্যাহারের লোক সকল কে কোন্ দিকে গেল বাঁচিয়া আছে কি মরিয়াছে কিছুই অনুসন্ধান করিতে পারি নাই। দ্রব্য সামগ্রী সমুদায় জলমগ্ন হইয়াছে। এ অবস্থার দেশে প্রবেশ করিতে অত্যন্ত লজ্জা হইতেছে। কি করি কোথায় যাই কোন উপায় ভাবিয়া পাই না। পরিশেষে আপনকার নিকট উপস্থিত হইয়াছি।
তদীয়বাক্যাবসানে হেমগুপ্ত মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন আমি আপন কন্যার উপযুক্ত বরের নিমিত্ত নানা স্থান অন্বেষণ করিতেছি কোথায়ও মনোনীত হইতেছে না। বুঝি ভগবান্ কৃপা করিয়া গৃহে উপস্থিত করিয়া দিলেন। এ অতিসদ্বংশজাত পৈতৃক অতুল অর্থসম্পত্তির ন্যায় পৈতৃক অতুল গুণসম্পত্তিরও উত্তরাধিকারী হইয়াছে সন্দেহ নাই। অতএব ত্বরায় দিন স্থির করিয়া ইহার সহিত কন্যার বিবাহ দি। মনে মনে এইপ্রকার কল্পনা করিয়া শ্রেষ্ঠিনীর নিকটে গিয়া কহিলেন দেখ এক শ্রেষ্ঠীর পুত্ত্র উপস্থিত হইয়াছে সে সৎকুলোদ্ভব। তাহার পিতার সহিত আমার অতি আত্মীয়তা ছিল। যদি তোমার মত হয় তাহার সহিত রত্নাবতীর বিবাহ দেওয়া যায়।
শ্রেষ্ঠিনী শুনিয়া সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন ভগবানের ইচ্ছা না হইলে এরূপ ঘটে না। বিনা চেষ্টায় মনস্কাম সিদ্ধ হওয়া অতি ভাগ্যের কথা। অতএব বিলম্বের প্রয়োজন নাই ত্বরায় পুরোহিত ডাকাইয়া দিন স্থির করিয়া শুভ কর্ম্ম সম্পন্ন কর। শ্রেষ্ঠী এই রূপে ভার্য্যার সম্মতি বুঝিয়া মহাধননন্দনের নিকটে গিয়া আপন অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন। সে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইল। তখন তিনি পুরোহিত ডাকাইয়া শুভ দিন ও শুভ লগ্ন নির্দ্ধারিত করিয়া মহাসমারোহে কন্যার বিবাহ দিলেন। বর কন্যা পরম কৌতুকে কালযাপন করিতে লাগিল।
কিয়ৎ দিন পরে নয়নানন্দ মনোমধ্যে কোন অসৎ অভিসন্ধি করিয়া আপন পত্নীর নিকট কহিল দেখ অনেক কাল হইল আমি স্বদেশে যাই নাই এবং বন্ধুবর্গেরও কোন সংবাদ পাই নাই। তাহাতে অন্তঃকরণে কি পর্য্যন্ত উৎকণ্ঠা জন্মিয়াছে বলিতে পারি না। অতএব তোমার পিতা মাতার মত করিয়া আমারে বিদায় করিয়া দাও। আর যদি ইচ্ছা হয় তুমিও সমভিব্যাহারে চল। পতিব্রতা রত্নাবতী আপন জননীর নিকটে গিয়া স্বামীর অভিপ্রায় ব্যক্ত করিয়া তদ্বিযয়ের সিদ্ধির নিমিত্ত অনেক অনুরোধ করিল।
শ্রেষ্ঠিনী শুনিয়া স্বামীর সন্নিধানে গিয়া কহিলেন তোমার জামাতা গৃহে যাইতে উদ্যত হইয়াছেন। শ্রেষ্ঠী কহিলেন ভাল ভাবনা কি বিদায় করিয়া দিব। তুমি কি জান না জন জামাতা ভাগিনেয় এই তিন কোন কালে আপন হয় না ও তাহাদের উপর বল প্রকাশ চলে না। জামাতা যাহাতে সন্তুষ্ট থাকেন তাহাই কর্ত্তব্য। তাহাকে বল ইতিমধ্যে ভাল দিন দেখিয়া বিদায় করিয়া দিতেছি। অনন্তর আপন তনয়াকে আহ্বান করিয়া হাস্যমুখে জিজ্ঞাসিলেন বৎসে তোমার অভিপ্রায় কি শ্বশুরালয়ে যাইরে কি পিতৃগৃহে থাকিবে।
রত্নাবতী লজ্জায় নম্রমুখী ও নিরুত্তরা হইয়া রহিল। অনন্তর কার্য্যান্তরব্যপদেশে তৎক্ষণাৎ তথা হইতে অপসৃতা হইয়া স্বামীর নিকটে গিয়া কহিল দেখ পিতা মাতা সম্মত হইয়াছেন কহিলেন তুমি যাহাতে সন্তুষ্ট হও তাহাই করিবেন। অতএব আমি তোমাকে এই অনুরোধ করিতেছি তুমি কোন ক্রমে আমাকে ছাড়িয়া যাইও না। আমি তোমার অদর্শনে প্রাণধারণ করিতে পারিব না।
পরিশেষে শ্রেষ্ঠী জামাতাকে অনেক ঐশ্বর্য্য দিয়া মহাসমাদরপূর্ব্বক বিদায় করিলেন এবং কন্যাকেও সর্ব্বালঙ্কারে ভূষিতা করিয়া তাহার সমভিব্যাহারিণী করিয়া দিলেন। নয়নানন্দ সাতিশয় আনন্দিত হইয়া শ্বশ্রূ ও শ্বশুরের পাদবন্দনপূর্ব্বক বিদায় লইয়া প্রস্থান করিল এবং রত্নাবতীও শিবিকারোহণ করিয়া অতি আনন্দিত মনে তাহার সঙ্গে চলিল।
অনন্তর নয়নানন্দ এক নিবিড় জঙ্গলে উপস্থিত হইয়া শ্রেষ্ঠিকন্যাকে কহিল দেখ এই অরণ্যে অত্যন্ত দস্যুভয় আছে শিবিকায় আরোহণ ও অঙ্গে অলঙ্কারধারণ করিয়া যাওয়া উচিত নহে। খুলিয়া আমার হস্তে দাও আমি বস্ত্রাবৃত করিয়া রাখি নগর নিকটবর্ত্তী হইলে পুনরায় পরিবে। আর বাহকেরাও শিবিকা লইয়া এই স্থান হইতে ফিরিয়া যাউক কেরল আমরা দুই জনে দরিদ্রবেশে গমন করি। তাহা হইলে নিরুপদ্রবে এই দুর্গম বত্ম অতিক্রম করিতে পারিব।
রত্নাবতী তৎক্ষণাৎ অঙ্গ হইতে উন্মোচন করিয়া স্বামিহস্তে সমস্ত আভরণ সমর্পণ করিল এবং দাস দাসী ও বাহকদিগকে বিদায় করিয়া দিয়া একাকিনী সেই শঠের সমভিব্যাহারিনী হইয়া চলিল। নয়নানন্দ এই রূপে মহামূল্য অলঙ্কারসমূহ হস্তগত করিয়া ক্রমে ক্রমে অরণ্যের অতি নিবিড় ও অগম্য প্রদেশে প্রবেশ করিল এবং তাদৃশ পতিপরায়ণা হিতৈষিণী প্রণয়িনীকে অন্ধকূপে নিক্ষেপপূর্ব্বক পলায়ন করিয়া স্বদেশে উপস্থিত হইল। রত্নাবতী কূপে পতিত হইয়া হা তাত হ। মতঃ বলিয়া উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে লাগিল। দৈবযোগে এক পথিক তথায় উপস্থিত হইয়া তাদৃশ নিবিড় অরণ্যমধ্যে অসম্ভাবিত রোদনশব্দ শ্রবণ করিয়া অতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইল এবং শব্দানুসারে গমন করিয়া কূপের সমীপবর্ত্তী হইয়া তন্মধ্যে দৃষ্টি নিক্ষেপপূর্ব্বক অবলোকন করিল এক পরম সুন্দরী নারী অশ্রুমুখী নানাপ্রকার বিলাপ করিতেছে। পথিক দর্শনমাত্র অতিমাত্র ব্যাকুল হইয়া সেই স্ত্রীরত্নকে পরম যত্নে কূপ হইতে উদ্ধার করিয়া জিজ্ঞাসা করিল তুমি কে কি নিমিত্ত একাকিনী এই ভয়ঙ্কর কাননে আসিয়াছিলে কি প্রকারেই বা তোমার ঈদৃশী দুর্দশা ঘটিল বল।
রত্নাবতী পতিনিন্দা অতি গর্হিত বুঝিয়া প্রকৃত ব্যাপার গোপনে রাখিয়া কহিল আমি চন্দ্রপুরনিবাসী হেমগুপ্ত শেঠের কন্যা। আমার নাম রত্নাবতী। আমি আপন পতির সহিত শ্বশুরালয়ে যাইতেছিলাম। এই স্থানে উপস্থিত হইবামাত্র অকস্মাৎ কয়েক জন দস্যু আসিয়া প্রথমতঃ অঙ্গ হইতে সমস্ত ভূষণ এ গ্রহণপূর্ব্বক আমাকে এই কূপে ফেলিয়া দিল এবং আমার পতিকে প্রহার করিতে করিতে লইয়া গেল। এক্ষণে তাঁহার কি দশা ঘটিয়াছে কিছুই জানি না। পান্থ শুনিয়া অতিশয় আক্ষেপ করিতে লাগিল এবং অশেষপ্রকার আশ্বাস প্রদানপূর্ব্বক রত্নাবতীকে সঙ্গে লইয়া তাহার পিত্রালয়ে পঁহুছাইয়া দিল।
রত্নাবতী পিতা মাতার অত্যন্ত স্নেহপাত্র ছিল। তাঁহারা তাহার ঈদৃশ অসম্ভাবিত দুরবস্থা দর্শনে বিস্ময়াপন্ন হইয়া জিজ্ঞাসিলেন বৎসে তোমার এ কি দশা ঘটিয়াছে। সে কহিল এক অরণ্যমধ্যে অকস্মাৎ চারি দিক্ হইতে অস্ত্রধারী পুরুষেরা আসিয়া বলপূর্ব্বক আমার অঙ্গ হইতে সমুদায় অলঙ্কার খুলিয়া লইল এবং তাঁহাকে যত সম্পত্তি দিয়া বিদায় করিয়াছিলে সে সমুদায়ও অপহরণ করিল। অনন্তর আমাকে এক অন্ধকূপে ফেলিয়া দিয়া তাঁহার পৃষ্ঠে যষ্টিপ্রহার করিতে করিতে কহিতে লাগিল আর কোথা কি গোপন করিয়া রাখিয়াছিস্ বাহির করিয়া দে। তখন তিনি কাতর হইয়া বিনয় করিয়া কহিলেন আমাদের নিকট যাহা ছিল সমস্ত তোমাদের হস্তগত হইয়াছে আর কিছুমাত্র নাই। তোমাদের প্রহারে প্রাণ ওষ্ঠাগত হইতেছে। চরণে ধরি ও কৃতাঞ্জলি হইয়া ভিক্ষা করি ছাড়িয়া দাও। বারংবার এইপ্রকার কাতরোক্তি প্রয়োগ করিতে লাগিলেন নির্দয় দস্যুরা তথাপি তাঁহাকে বন্ধন করিয়া লইয়া গেল। তৎপরে ছাড়িয়া দিল কি মারিয়া ফেলিল কিছুই জানিতে পারি নাই। তখন তাহার পিতা কহিলেন বৎসে তুমি উৎকণ্ঠিত হইও না। আমার অন্তঃকরণে লইতেছে তোমার পতি জীবিত আছেন। চোরেরা অর্থপিশাচ অর্থ হস্তগত হইলে আর অকারণে প্রাণনাশ করে না। এই রূপে অশেষবিধ আশ্বাস ও প্রবোধ দিয়া অবিলম্বে আর একপ্রস্থ অলঙ্কার প্রস্তুত করিয়া দিলেন।
এ দিকে নয়নানন্দ আপন ভবনে উপস্থিত হইয়া সেই অলঙ্কার বিক্রয় দ্বারা অর্থসংগ্রহ করিয়া দিবারাত্র দ্যূতক্রীড়া ও সুরাপান দ্বারা কালক্ষেপ করিতে লাগিল এবং কিয়ৎ দিনের মধ্যেই পুনর্বার নিঃস্বভাবাপন্ন ও অন্নবস্ত্রবিহীন হইয়া মনে মনে বিবেচনা করিল আমি যে কুব্যবহার করিয়াছি তাহা শ্বশুরালয়ে কোন প্রকারেই প্রকাশ পায় নাই। অতএব কোন ছল করিয়া তথায় উপস্থিত হই। পরে দুই চারি দিন অবস্থিতি করিয়া সুযোগক্রমে কিঞ্চিৎ অপহরণ করিয়া পলাইয়া আসিব। মনে মনে এই দুই সঙ্কল্প করিয়া শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হইল এবং প্রবেশ করিবামাত্র সর্ব্বাগ্রে স্বীয় পত্নী রত্নাবতীর দৃষ্টিপথে পতিত হইল। পতিপ্রাণা রত্নাবতী পতিকে সমাগত দেখিয়া অন্তঃকরণে চিন্তা করিল পতি অতিদুবাচার হইলেও নারীর পরম গুরু। তাঁহাকে সন্তুষ্ট রাখিতে পারিলেই নারী ইহলোকে ও পরলোকে চরিতার্থতা প্রাপ্ত হয়। আর যে নারী কুমতিপরতন্ত্র হইয়া পরমগুরু স্বামীর কাদাচিৎক কুব্যবহারকে অপরাধ গণ্য করিয়া তাঁহার প্রতি কোন প্রকারে অশ্রদ্ধা বা অনাদর প্রদর্শন করে সে আপন ঐহিক ও পারলৌকিক সকল সুখে জলাঞ্জলি দেয়। আর ইনি কেবল ভ্রান্তিক্রমেই সেরূপ ব্যবহার করিয়াছিলেন সন্দেহ নাই। অতএব আমি সেই সামান্য দোষ ধরিয়া অপরাধিনী হইব না। যাহা হউক ইনি এক্ষণে বিশেষ না জানিয়াই এখানে আসিয়াছেন আমাকে দেখিতে পাইলেই নিঃসন্দেহ পলায়ন করিবেন। অতএব অগ্রে ভয়ভঞ্জন করিয়া দেওয়া উচিত।
রত্নাবতী অন্তঃকরণে এই সকল আলোচনা করিয়া ত্বরায় নিকটবর্ত্তিনী হইয়া কহিল নাথ তুমি অন্তঃকরণমধ্যে কোন শঙ্কা করিও না। আমি পিতা মাতার নিকট কহিয়াছি চোরেরা অলঙ্কার গ্রহণপূর্ব্বক আমাকে কূপে নিক্ষিপ্ত করিয়া তোমাকে বন্ধন করিয়া লইয়া গিয়াছে। অতএব সে সকল কথা স্মরণ করিয়া ভীত হইবার আবশ্যকতা নাই। আমার পিতা মাতা তোমার নিমিত্ত অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত আছেন তোমাকে দেখিলে অতিশয় আহ্লাদিত হইবেন। আর তোমার স্থানান্তরে যাইবার প্রয়োজন নাই। এই স্থানেই অবস্থিতি কর আমি চির কাল তোমার চরণ সেবা করিব।
এইরূপ উপদেশ দিয়া রত্নাবতী প্রস্থান করিলে পর সেই ধূর্ত্ত তৎক্ষণাৎ শ্বশুরের নিকটে গিয়া প্রণাম করিল। শ্রেষ্ঠী আলিঙ্গনপূর্ব্বক আশীর্বাদ করিয়া অশ্রুপূর্ণ লোচনে গদ্গদ বচনে জামাতাকে সবিশেষ সমস্ত জিজ্ঞাসিতে লাগিলেন। তখন সে স্বীয় সহধর্ম্মিণীর উপদেশানুরূপ পূর্ব্বাপর কল্পিত বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া পরিশেষে কহিল মহাশয় যেরূপ বিপদে পড়িয়াছিলাম তাহাতে কোন ক্রমে প্রাণরক্ষার সম্ভাবনা ছিল না। কেবল জগদীশ্বরের কৃপায় ও আপনাদিগের শ্রীচরণারবিন্দের অকৃত্রিমস্নেহসম্বলিত আশীর্বাদ প্রভাবে এ যাত্রা পরিত্রাণ পাইয়াছি। যন্ত্রণার পরিসীমা ছিল না। অধিক কি কহিব শত্রুও যেন কখন এরূপ বিপদে পতিত না হয়। ইহা কহিয়া যেন যথার্থই পূর্ব্বাবস্থা স্মরণ হইল এইপ্রকার ভান করিয়া রোদন করিতে লাগিল। তদ্দর্শনে হেমগুপ্তের অন্তঃকরণে অত্যন্ত অনুকম্পা জন্মিল।
রজনী উপস্থিতা হইল। পতিপ্রাণা রত্নাবতী স্বামিসমাগমসৌভাগ্যমদে মত্তা হইয়া পূর্ব্বকৃত তদীয় নৃশংস ব্যবহার বিস্মরণপূর্ব্বক তৎসহবাসসুখসম্ভোগাভিলাষে মনের উল্লাসে সর্ব্বাঙ্গে সর্ব্বপ্রকার অলঙ্কার পরিধান করিয়া শয়নাগারে প্রবেশ করিল। নয়নানন্দ কিয়ৎ ক্ষণ কৃত্রিম কৌতুকের পর নিদ্রাবেশ প্রকাশ করিতে লাগিল। তখন রত্নাবতী কহিল আজি তুমি পথশ্রান্ত আছ আর অধিক ক্ষণ জাগরণক্লেশ সহ্য করিবার প্রয়োজন নাই। শয়ন কর আমি চরণ সেবা করি। সে কহিল তুমিও শয়ন কর চরণ সেবা করিতে হইবেক না।
অনন্তর উভয়ে শয়ন করিলে ধূর্ত্ত তৎক্ষণাৎ কপট নিদ্রার আশ্রয় লইয়া নাসিকাধ্বনি করিতে আরম্ভ করিল। রত্নাবতীও পতিকে নিদ্রাভিভূত জানিয়া অনতিবিলম্বে নিদ্রায় অচেতন হইল। পরে সেই দুরাত্মা অবসর বুঝিয়া গাত্রোত্থানপূর্ব্বক আপন কটিদেশ হইতে এক তীক্ষ্ণধার ছুরিকা বহিষ্কৃত করিল এবং অনায়াসে সেই স্ত্রীরত্ন রত্নাবতীর কণ্ঠনালীচ্ছেদনপূর্ব্বক সমস্ত আভরণ লইয়া পলাইল।
ইহা কহিয়া শারিকা কহিল মহারাজ যাহা বর্ণনা করিলাম সমুদয় স্বচক্ষে দেখিয়াছি। তদবধি আমার পুরুষের প্রতি অভ্যন্ত অশ্রদ্ধা ও অবিশ্বাস জন্মিয়াছে। প্রতিজ্ঞা করিয়াছি পুরুষের সহিত বাক্যালাপ করিব না এবং সাধ্যানুসারে পুরুষেয় সংসর্গপরিত্যাগে যত্নবতী থাকিব। পুরুষেরা অতি ধূর্ত্ত অতি নৃশংস অতি স্বার্থপর। মহারাজ অধিক কি কহিব পুরুষসহবাস সসর্পগৃহবাস অপেক্ষাও ভয়ানক এই নিমিত্ত আর আমার পুরুষের মুখাবলোকন করিতে ইচ্ছা নাই।
রাজা শুনিয়া কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া শুককে কহিলেন কেমন হে চূড়ামণি তুমি স্ত্রীলোককে কি নিমিত্তে ঘৃণা কর তাহার সবিশেষ বর্ণন কর।
তখন শুক কহিল মহারাজ শ্রবণ করুন।
কাঞ্চনপুর নগরে সাগরদত্ত নামে এক শ্রেষ্ঠী ছিলেন। তাঁহার শ্রীদত্ত নামে সুরূপ সুশীল শান্তস্বভাব এক পুত্ত্র ছিল। অনঙ্গপুরনিবাসী সোমদত্তশ্রেষ্ঠীর কন্যা জয়শ্রীর সহিত তাহার বিবাহ হয়। কিয়ৎ দিন পরে শ্রীদত্ত বাণিজ্যার্থে দেশান্তর প্রস্থান করিল। জয়শ্রী আপন পিত্রালয়ে বাস করিতে লাগিল। দীর্ঘ কাল অতীত হইল তথাপি শ্রীদত্ত প্রত্যাগমন করিল না।
এক দিবস জয়শ্রী আপন প্রিয়বয়স্যার নিকট কহিল দেখ সখি আমার যৌবন বৃথা হইল। আজি পর্য্যন্ত সংসারের সুখ কিছুমাত্র জানিতে পারিলাম না। বলিতে কি এ রূপে একাকিনী কালহরণ করা কঠিন হইয়া উঠিয়াছে। তুমি কোন উপায় চিন্তা কর। তখন সখী কহিল প্রিয়সখি ধৈর্য্য ধর ভগবানের ইচ্ছা হয় ভ অবিলম্বে তোমার প্রিয়সমাগম হইবেক। জয়শ্রী ইচ্ছানুরূপ উত্তর না পাইয়া অসন্তোষ প্রকাশ করিল এবং তৎক্ষণাৎ অট্টালিকায় আরোহণ করিয়া গবাক্ষদ্বার দিয়া রাজপথ নিরীক্ষণ করিতে লাগিল।
দৈবযোগে সেই স্থান দিয়া এক পরম সুন্দর যুবা পুরুষ গমন করিতেছিল। ঘটনাক্রমে তাহার ও জয়শ্রীর চারি চক্ষুঃ একত্র হইবাতে উভয়েই উভয়ের মন হরণ করিল। জয়শ্রী তৎক্ষণাৎ আপন সখীকে আহ্বান করিয়া কহিল দেখ যে রূপে পার ঐ হৃদয়চোর ব্যক্তির সহিত সংঘটন করিয়া দাও। জয়শ্রীর সখী তাহার নিকটে গিয়া কথাচ্ছলে তাহার অভিপ্রায় বুঝিয়া কহিল সোমদত্তের কন্যা জয়শ্রী তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে চান সন্ধ্যার পর তুমি আমার বাটীতে আসিবে। এই বলিয়া তাহাকে আপন গৃহ দেখাইয়া দিল। তখন সে কহিল তোমার সখীর নিকটে কহ আমি অত্যন্ত অনুগৃহীত হইলাম। অবশ্যই সায়ংকালে তোমার আবাসে আসিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিব।
তদনন্তর সখী জয়শ্রীর নিকটে আসিয়া সবিশেষ সমুদায় আবেদন করিলে সে অত্যন্ত আহ্লাদিতা হইল এবং তাহাকে পারিতোষিক দিয়া প্রশংসা করিয়া কহিল যদি তুমি আমাকে তাহার সহিত মিলাইয়া দিতে পার তবে আমাকে চির কালের মত কিনিয়া রাখ আমি কোন কালে তোমার এ ধার শুধিতে পারিব না। এক্ষণে তুমি আপন আলয়ে গিয়া অবস্থিতি কর সে আসিবামাত্র আমাকে সংবাদ দিবে। এই বলিয়া সখীকে বিদায় করিয়া স্বয়ং প্রিয়সমাগমোচিত বেশ ভূষা করিতে লাগিল।
শুভ সন্ধ্যাকাল উপস্থিত হইলে সেই যুবা রতিপতির আদেশানুরূপ বেশ পরিগ্রহ করিয়া সখীর আলয়ে উপস্থিত হইল। সে পরম সমাদরপূর্ব্বক বসিতে আসন দিয়া জয়শ্রীর নিকটে গিয়া প্রিয়তমের উপস্থিতিসংবাদ দিল। জয়শ্রী শুনিয়া আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইয়া কহিল সখি কিঞ্চিৎ বিলম্ব কর গৃহজন নিদ্রিত হইলেই তোমার সহিত গিয়া প্রাণনাথের হস্তে যৌবনসম্পত্তি সমর্পণ করিয়া জন্ম সার্থক করিব। অনন্তর পরিবারস্থ সমস্ত লোক নিদ্রাগত হইলে জয়শ্রী সখীর সহিত তদীয় আবাসে উপস্থিত হইয়া অননুভূতপূর্ব্ব চিরাকাঙ্ক্ষিত রসাস্বাদ দ্বারা যৌবনের চরিতার্থতা লাভ করিয়া নিশাবসানসময়ে স্বীয় আবাসে প্রত্যাগমন করিল। সে এই রূপে প্রত্যই প্রিয়সমাগমসুখে কালযাপন করিতে লাগিল।
কিয়ৎ দিন পরে তাহার স্বামীও বিদেশ হইতে প্রত্যাগত হইয়া প্রথমতঃ শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হইল। জয়শ্রী শ্রীদত্তের সমাগমনে মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিল এ আপদ আবার এত দিনের পর কোথা হইতে উপস্থিত হইল। কি করি কোথায় যাই প্রাণনাথের নিকটে যাইবার ব্যাঘাত জন্মিল। কত দিন থাকিবেক কত জ্বলাইবেক তাহাও জানি না। এইরূপ চিন্তায় পড়িয়া স্নানভোজনাদি সমস্ত পরিত্যাগপূর্ব্বক বিষণ্ণ মনে সখীর সহিত নানাপ্রকার পরামর্শ করিতে লাগিল।
রজনী উপস্থিত হইলে জয়শ্রীর মাতা জামাতাকে পরম সমাদর ও যত্ন পূর্ব্বক ভোজন করাইয়া দাসী দ্বারা শয়নাগারে গিয়া বিশ্রাম করিতে কহিলেন এবং আপন কন্যাকেও পতিশুশ্রূষার্থে গমন করিতে আদেশ দিলেন। জয়শ্রী প্রথমতঃ অসম্মত হওয়াতে তাহার মাতা নানাবিধ প্রবোধবাক্য ও ভৎসনা দ্বারা নিরুত্তরা করিয়া বলপূর্ব্বক গৃহপ্রবেশ করাইলেন। তখন সে বিবশা হইয়া গৃহপ্রবেশপূর্ব্বক পল্যঙ্কে আরোহণ করিয়া বিযুক্ত মুখে শয়ন করিয়া রহিল। শ্রীদত্ত প্রণয়িনীকে সপ্রেম সম্ভাষণ করিয়া প্রীতিবাক্য প্রয়োগ করিতে লাগিল। সে তাহাতে অত্যন্ত বিরক্তি প্রকাশ করিতে লাগিল। তখন শ্রীদত্ত তাঁহার সন্তোষ জন্মাইবার নিমিত্ত নিজানীত নানাবিধ বহুমূল্য অলঙ্কার ও পট্টশাটী প্রভৃতি কামিনীজনকমনীয় দ্রব্য প্রদান করিলে জয়শ্রী অত্যন্ত কোপপ্রকাশপূর্ব্বক তদ্দত্ত সমস্ত বস্তু দূরে নিক্ষেপ করিল। তখন শ্রীদত্ত নিতান্ত নিরুপায় ভাবিয়া ক্ষান্ত রহিল এবং অত্যন্ত পথশ্রান্ত ছিল তৎক্ষণাৎ নিদ্রাগত হইল। জয়শ্রী পতিকে নিদ্রায় অচেতন দেখিয়া মনে মনে আহ্লাদিতা হইল এবং পতিদত্ত বস্ত্র ও অলঙ্কার পরিধান করিয়া গাঢ়তর অন্ধকারাচ্ছন্ন রজনীতে একাকিনী নির্ভয়ে প্রিয়তমের উদ্দেশে চলিল। সেই সময়ে এক তস্কর ঐ পথে গমন করিতেছিল। সে সর্ব্বালঙ্কারভূষিতা কামিনীকে অর্দ্ধরাত্র সময়ে একাকিনী গমন করিতে দেখিয়া বিবেচনা করিতে লাগিল এই যুবতী অসহায়িনী হইয়া নিশীথ সময়ে নির্ভয়ে কোথায় যাইতেছে। যাহা হউক সবিশেষ অনুসন্ধান করিতে হইল। এই বলিয়া তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিল।
এ দিকে জয়শ্রীর প্রিয় সখা সখীর আলয়ে একাকী শয়ন করিয়া তাহার আগমনপ্রতীক্ষায় কালক্ষেপ করিতেছিল। দৈবযোগে এক কালসর্প আসিয়া দংশিয়া তাহার প্রাণসংহার করিয়া গেল। সে মৃত পতিত রহিল। জয়শ্রী তথায় উপস্থিত হইয়া মৃত প্রিয়তমকে কপটনিদ্রিত বোধ করিয়া নামগ্রহণপুরঃসর আহ্বান করিতে লাগিল কিন্তু কোনপ্রকার উত্তর না পাইয়া মনে মনে বিবেচনা করিল আমার আসিতে বিলম্ব হওয়াতে অভিমানে উত্তর দিতেছে না। অনন্তর তাহার পার্শ্বে শয়ন করিয়া প্রিয়সম্ভাষণপূর্ব্বক বারংবার আহ্বান করিতে আরম্ভ করিল। চোরও কিঞ্চিৎ দূরে দণ্ডায়মান হইয়া সহাস্য আস্যে এই রহশ্য দর্শন করিতে লাগিল। নিকটবর্ত্তী বটবৃক্ষবাসী এক পিশাচও ঐ কৌতুক দেখিতেছিল। সে মনে মনে কল্পনা করিল এই সুযোগে এই দুশ্চরিত্রাকে সমুচিত দণ্ড দিতে হইল। এই বলিয়া তদীয় প্রিয়তমের মৃত শরীরে আবির্ভূত হইয়া দন্ত দ্বারা জয়শ্রীর নাসিকাচ্ছেদনপূর্ব্বক পুনরায় আপন আবাসবৃক্ষে আরোহণ করিল। চোর এই সমস্ত অবলোকন করিয়া চমৎকৃত হইতে লাগিল।
জয়শ্রীর জ্ঞানোদয় হইল। সে তৎক্ষণাৎ প্রিয়তমকে মৃত নিশ্চয় করিয়া সখীর নিকটে আসিয়া পূর্ব্বাপর সমস্ত বর্ণন করিয়া কহিল সখি আমি অকস্মাৎ এই আপদে পড়িয়াছি কি উপায় করি বল। গৃহে গিয়া পিতা মাতার নিকট মুখ দেখাইতে পারিব না। তাঁহারা কারণ জিজ্ঞাসিলে কি উত্তর দিব। বিশেষতঃ আজি আবার সেই সর্ব্বনাশিয়া আসিয়াছে সেই বা দেখিয়া শুনিয়া কি মনে করিবেক। সখি তুমি আমাকে বিষ আনিয়া দাও খাইয়া প্রাণত্যাগ করে তাহা হইলেই সকল আপদ্ ঘুচিয়া যায়। এই বলিয়া শিরে করাঘাত করিতে লাগিল। সখী শুনিয়া বিস্ময়াপন্না ও নিরুত্তরা হইয়া রহিল।
কিয়ৎ ক্ষণ পরেই জয়শ্রী আপন উৎপন্নমতিত্ববলে এক উপায় স্থির করিয়া কহিল সখি আর চিন্তা নাই উত্তম উপায় স্থির করিয়াছি শুন দেখি সঙ্গত হয় কি না। আমি এই অবস্থায় গৃহে গিয়া শয়নমন্দিরে প্রবেশপূর্ব্বক চীৎকার করিয়া রোদন করিতে আরম্ভ করি। গৃহজন রোদনশব্দে জাগরিত হইয়া কারণজিজ্ঞাসার্থ উপস্থিত হইলে কহিব আমার স্বামী ক্রোধে অন্ধ হইয়া বিনা অপরাধে বহু প্রহার করিয়া পরিশেষে নাসিকাচ্ছেদন করিয়া দিলেন। সখী কহিল উত্তম যুক্তি হইয়াছে ইহাতে সকল দিক্ রক্ষা পাইবেক। অতএব অবিলম্বে গৃহে গিয়া এইরূপ কর।
জয়শ্রী সত্বর হইয়া গৃহে গিয়া শয়নাগারে প্রবেশপূর্ব্বক উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে লাগিল। গৃহজন ক্রন্দনধ্বনিশ্রবণে ব্যাকুল হইয়া জয়শ্রীর শয়নগৃহে প্রবেশ করিয়া দেখিল তাহার নাসিকা নাই সমস্ত গাত্র ও বস্ত্র শোণিতে অভিষিক্ত হইয়াছে এবং সে নিজে ভূতলে পতিত হইয়া রোদন করিতেছে। অনন্তর বারংবার হেতু জিজ্ঞাসা করাতে জয়শ্রী আপন স্বামীর দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ কহিল ঐ দুর্বৃত্ত দস্যু আমার এই দুর্দশা করিয়াছে। তখন সমস্ত পরিবার একবাক্য হইয়া শ্রীদত্তকে অশেষপ্রকার তিরস্কার করিতে আরম্ভ করিল।
সুশীল শ্রীদত্ত পূর্ব্বাপর কিছুই জানে না। অকস্মাৎ এতাদৃশ বিরুদ্ধ বাক্য শ্রবণে চমৎকৃত হইয়া মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিল আমি সবিশেষ না জানিয়া শ্বশুরালয়ে আসিয়া অতি গর্হিত কর্ম্ম করিয়াছি। ইহাকে অতি দুশ্চরিত্রা দেখিতেছি। প্রথমতঃ শত শত চাটু বচনেও আলাপ করে নাই এক্ষণে অনায়সে মিথ্যাপবাদ দিতেছে। এই নিমিত্তই নীতিজ্ঞেরা কহিয়াছেন যে মনুষ্যের কথা দূরে থাকুক দেবতারাও স্ত্রীলোকের চরিত্র ও পুরুষের ভাগ্যের কথা বুঝিতে পারেন না। জানি না পরিশেষে কি বিপদ্ ঘটিবেক। ইত্যাদি নানাবিধ চিন্তা করিয়া মৌনাবলম্বনপূর্ব্বক অধোমুখ হইয়া রহিল।
পর দিন প্রভাত হইবামাত্র জয়শ্রীর পিতা রাজদ্বারে সংবাদ দিয়া জামাতাকে বিচারালয়ে নীত করিল। রাজ। বাদী ও প্রতিবাদী উভয় পক্ষকে পরস্পর সম্মুখবর্ত্তী করিয়া প্রথমতঃ জয়শ্রীকে জিজ্ঞাসিলেন কে তোমার এ দুর্দশা করিয়াছে বল আমি তাহার সমুচিত দণ্ডবিধান করিতেছি। তখন জয়শ্রী পতি প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া কহিল মহারাজ ইনি আমার স্বামী ইহাঁ হইতেই আমার এই দুর্দশা ঘটিয়াছে। অনন্তর রাজা শ্রীদত্তকে জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কি নিমিত্ত এমন দুষ্কর্ম্ম করিলে। সে কহিল মহারাজ আমি এ বিষয়ের বিন্দু বিসর্গও জানি না ইহাতে আপনকার বিচারে যেরূপ ব্যবস্থা হয় করুন। এই বলিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া অধোমুখে দণ্ডায়মান রহিল।
রাজা বাদী প্রতিবাদীর বাক্য পর্যালোচনা করিয়া পরিশেষে ঘাতকদিগকে ডাকাইয়া শ্রীদত্তকে শূলে দিতে আদেশ করিলেন। চোর পূর্ব্বাপর সমস্ত ব্যাপার অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ব্বক দেখিতেছিল। সে অকারণে এক ব্যক্তির প্রাণবধের উপক্রম দেখিয়া রাজার সম্মুখে আসিয়া নিবেদন করিল মহারাজ সবিশেষ অনুসন্ধান না করিয়া বিনা অপরাধে এক ব্যক্তির প্রাণদণ্ড করিতেছেন। আপনি ধর্ম্মাবতার যথার্থ বিচার করুন ব্যভিচারিণীর বাক্যে বিশ্বাস করিবেন না।
রাজা শুনিয়া চমৎকৃত হইলেন এবং সবিশেষ জিজ্ঞাসাপূর্ব্বক তথ্যানুসন্ধান করিয়া লোক দ্বারা জয়শ্রীর মৃত পতিত প্রিয়তমের বক্ত্রমধ্য হইতে তদীয় ছিন্ন নাসিকা আনাইয়া দেখিলেন। তখন চোরকে যথার্থবাদী ও শ্রীদত্তকে নিরপরাধী বোধ করিয়া উভয়কে পারিতোষিক প্রদানপূর্ব্বক বিদায় করিলেন এবং জয়শ্রীর মস্তকমুণ্ডন ও তাহাতে তক্রসেচন তৎপরে তাহাকে গর্দ্দভে আরোহণ ও নগরে পরিভ্রমণ করা ইয়া আপন অধিকার হইতে বহিষ্কৃত করাইয়া দিলেন। এই বলিয়া চূড়ামণি কহিল মহারাজ নারী এইরূপ গুণে পরিপূর্ণা হয়।
উপক্রান্ত উপাখ্যান সমাপন করিয়া বেতাল জিজ্ঞাসিল মহারাজ নয়নানন্দ ও জয়শ্রী এই উভয়ের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি অধিক পাপী। রাজা কহিলেন আমার মতে দুই সমান।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
চতুর্দশ উপাখ্যান
চতুর্দশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
কুসুমবতী নগরীতে সুবিচার নামে রাজা ছিলেন। তাঁহার চন্দ্রপ্রভা নামে অবিবাহিতা দুহিতা ছিল। রমণীয় বসন্তসময় উপস্থিত হইলে রাজকুমারী উপবনবিহারে অভিলাষিণী হইয়া পিতার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। রাজা সম্মত হইলেন এবং রাজধানীর অনতিদূরে যোজনবিস্তৃত অতি রমণীয় এক উপবন ছিল তাহাতে স্ত্রীলোকের বাসোপযোগিতাসম্পাদনার্থে বহুসংখ্যক লোক প্রেরণ করিলেন। তাহাদিগের তথায় উপস্থিত হইবার পূর্ব্বে বিংশতিবর্ষবয়স্ক অতি রূপবান্ মনস্বী নামে বিদেশীয় ব্রাহ্মণকুমার আতপতাপিত ও পথশ্রান্ত হইয়া উপবনমধ্যবর্ত্তী এক নিকুঞ্জমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক স্নিগ্ধ ছায়াতে নিদ্রাগত হইয়াছিল। রাজপরিচারকেরা তথায় উপস্থিত হইয়া আবশ্যক কর্ম্ম সকল সম্পন্ন করিয়া প্রস্থান করিল। দৈবযোগে ঐ ব্রাহ্মণকুমার কাহারও দৃষ্টিপথে পতিত হইল না।
পরে রাজকুমারী স্বীয় সহচরীবর্গ ও পরিচারিকাগণের সহিত তথায় উপস্থিত হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে ব্রাহ্মণকুমারের সমীপবর্ত্তিনী হইলেন। ভ্রমণকারিণীদিগের পদশব্দে মনস্বীরও নিদ্রাভঙ্গ হইল। ব্রাহ্মণকুমারের ও রাজকুমারীর চারি চক্ষুঃ একত্র হইলে ব্রাহ্মণকুমার মোহিত ও মূর্চ্ছিত হইয়া ভূতলে পড়িলেন রাজকুমারীও সাত্ত্বিকভাবপ্রভাবে কম্পমানকলেবরা ও বিচেতনপ্রায়া হইলেন। সখীগণ অকস্মাৎ ঈদৃশ অতি বিষম বিষমশরদশা উপস্থিত দেখিয়া মনুষ্যবাহ্য যানে আরোহণ করাইয়া তৎক্ষণাৎ রাজকুমারীকে গৃহে লইয়া গেল। ব্রাহ্মণকুমার সেই স্থানেই স্পন্দন্থীন পতিত রহিলেন।
শশী ও ভূদেব নামে দুই ব্রাহ্মণ কামরূপে বিদ্যা শিক্ষা করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন করিতেছিলেন তাঁহারাও আতপে তাপিত হইয়া বিশ্রামার্থ সেই উপবনের নিকুঞ্জমধ্যে উপস্থিত হইলেন। প্রবেশমাত্র সেই ব্রাহ্মণকুমারকে তদবস্থ পতিত দেখিয়া ভূদেব স্বীয় সহচরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন বল দেখি শশী এ এরূপ অচেতন হইয়া পতিত আছে কেন। শশী কহিলেন বোধ করি কোন নায়িকা ভ্রূচাপ দ্বারা কটাক্ষশর প্রহার করিয়াছে তাহাতেই এ এ রূপে পতিত আছে। ভূদেব কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া কহিলেন ইহাকে জাগরিত করিয়া সবিশেষ জিজ্ঞাসা করি। অনন্তর ভূদেব শশীর নিষেধ না মানিয়া নানাবিধ উপায় দ্বারা তাহার চৈতন্য সম্পাদন করিলেন এবং জিজ্ঞাসিলেন অহে ব্রাহ্মণতনয় কি কারণে তোমার ঈদৃশী দশা ঘটিয়াছে বল। ব্রাহ্মণকুমার কহিলেন যে ব্যক্তি দুঃখ দূর করিতে সমর্থ তাহার অগ্রেই দুঃখের কথা ব্যক্ত করা উচিত। নতুবা অনর্থ ইতস্ততঃ ব্যক্ত করিলে কেবল আপন মূঢ়তামাত্র প্রকাশ পায়। ভূদেব কহিলেন ভাল তুমি আমার অগ্রে ব্যক্ত কর আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে রূপে পারি তোমার দুঃখ দূর করিব। মনস্বী কহিলেন কিয়ৎ ক্ষণ পূর্ব্বে এক রাজকন্যা এই উপবনে ভ্রমণ করিতে আসিয়াছিল তাহাকে দেখিয়া আমার এই দশা ঘটিয়াছে। অধিক কি কহিব তাহাকে না পাইলে আমার প্রাণত্যাগ হইবেক।
তখন ভূদেব কহিলেন তুমি আমার সমভিব্যাহারে চল যাহাতে তোমার মনোরথ সিদ্ধ হয় তদ্বিষয়ে অশেষপ্রকার যত্ন করিব। আর যদি তোমার প্রার্থিতসম্পাদনবিষয়ে নিতান্তই কৃতকার্য্য হইতে না পারি অন্ততঃ বহুসংখ্যক অর্থ দিয়া বিদায় করিব। মনস্বী কহিলেন যদি আমার অভিপ্রেত স্ত্রীরত্নলাভের সদুপায় করিতে পার তোমাদের সমভিব্যাহারে যাই নতুবা ধনের নিমিত্তে আমার কিঞ্চিন্মাত্র স্পৃহা নাই। ভূদেব মনস্বীর এইরূপ বাক্য শ্রবণ করিয়া কিঞ্চিৎ হাস্য করিলেন এবং অবশ্যই তোমার মনোরথ সম্পন্ন করিব তুমি আমাদের সমভিব্যাহারে চল এই বলিয়া আপন আলয়ে লইয়া গেলেন এবং তথায় উপস্থিত হইয়া সর্ব্ব কর্ম্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক অগ্রে তাহাকে এক একাক্ষর মন্ত্র শিখাইয়া দিলেন। কহিলেন তুমি এই মন্ত্র উচ্চারণ করিলে ষোড়শবর্ষীয়া কন্যা হইবে এবং ইচ্ছা করিলেই পুনর্বার আপন স্বরূপ প্রাপ্ত হইবে।
মনস্বী মন্ত্রবলে ষোড়শবর্ষীয়া কন্যা হইলেন। ভূদেব অশীতিবর্ষদেশীয়ের আকার ধারণ করিলেন এবং মনস্বীকে বধূবেশ ধারণ করাইয়া সঙ্গে লইয়া রাজা সুবিচারের নিকট উপস্থিত হইলেন। রাজা বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ দর্শনমাত্র গাত্রোত্থান করিয়া প্রণামপূর্ব্বক বসিতে আসন প্রদান করিলেন।
ব্রাহ্মণ আসন পরিগ্রহ করিয়া আশীর্বাদ করিলেন যিনি এই জগন্মণ্ডল প্রলয়পয়োধিজলে নিলীন হইলে মীনরূপ ধারণ করিয়া ধর্ম্মমূল অপৌরুষেয় বেদের রক্ষা করিয়াছেন যিনি বরাহমূর্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া বিশাল দশনাগ্রভাগ দ্বারা প্রলয়জলনিমগ্ন মেদিনীমণ্ডলের উদ্ধার করিয়াছেন যিনি কূর্ম্মরূপ অবলম্বন করিয়া পৃষ্ঠে এই সসাগরা ধরা ধারণ করিয়া আছেন যিনি নরসিংহ আকার স্বীকার করিয়া নখকুলিশপ্রহার দ্বারা বিষম শত্রু হিরণ্যকশিপুর বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিয়াছেন যিনি দৈত্যরাজ বলিকে ছলিবার নিমিত্ত বামন অবতার হইয়া দেবরাজকে পুনর্বার ত্রিলোকীর ইন্দ্রত্বপদে সংস্থাপিত করিয়াছেন যিনি জমদগ্নির ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়া পিতৃবধামর্ষপ্রদীপ্ত হইয়া তীক্ষ্ণধার কুঠার দ্বারা মহাবীর্য্য কার্ত্তবীর্য্য অর্জুনের ভুজবন ছেদন করিয়াছেন এবং একবিংশতি বার পৃথ্বীকে নিঃক্ষত্রিয়া করিয়া অরাতিশোণিতজলে পিতৃতর্পণ করিয়াছেন যিনি দেবতাগণের অভ্যর্থনা অনুসারে দশরথগৃহে অংশচতুষ্টয়ে অবতীর্ণ হইয়া বানরসৈন্য সমভিব্যাহারে সমুদ্রে সেতুবন্ধনপূর্ব্বক দুর্বৃত্ত দশাননের বংশ ধ্বংস করিয়াছেন যিনি দ্দাপরযুগের অন্তে ধর্ম্মসংস্থাপনার্থে যদুবংশে অংশে অবতীর্ণ হইয়া দৈত্যবধ দ্বারা ভূমির ভার হরিয়া অশেষপ্রকার লীলা করিয়াছেন যিনি বেদমাগবিপ্লাবনের নিমিত্ত বুদ্ধাবতার হইয়া দয়ালুত্ব জিতেন্দ্রিয়ত্ব প্রভৃতি সদ্গুণের পরা কষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন যিনি সন্তলগ্রামে বিষ্ণুযশা নামক ধর্ম্মনিষ্ঠ ব্রহ্মপরায়ণ ব্রাহ্মণের ভবনে অবতীর্ণ হইয়া ভুবনমণ্ডলে কল্কীনামে বিখ্যাত হইবেন এবং অতি দ্রুতগামী দেবদত্ত তুরঙ্গমে আরোহণ করিয়া করতলে করাল করবাল ধারণপূর্ব্বক বেদবিদ্বেষী ধর্ম্মমার্গপরিভ্রষ্ট নষ্টমতি দুরাচারদিগের সমুচিত দণ্ড বিধান করিবেন সেই ত্রিলোকীনাথ বৈকুণ্ঠস্বামী ভূতভাবন ভগবান্ আপনকার রক্ষা করুন। রাজা জিজ্ঞাসিলেন মহাশয় কোথা হইতে আসিতেছেন। বৃদ্ধবেশী ভূদেব কহিলেন মহারাজ আমি গঙ্গার পূর্ব্ব পার হইতে আসিতেছি। ইনি আমার পুত্ত্রবধূ। ইঁহাকে ইঁহার পিত্রালয় হইতে আনিতে গিয়াছিলাম প্রত্যাগমন করিয়া দেখিলাম মারীভয়ে গ্রামস্থ সমস্ত লোক স্থানত্যাগ করিয়া দেশান্তরে প্রস্থান করিয়াছে। গৃহে ব্রাহ্মণী ও বিংশতিবর্ষীয় পুত্ত্র রাখিয়া গিয়াছিলাম তাহারাও সেই উপদ্রবের সময় দেশত্যাগ করিয়াছে কোথায় গিয়াছে কিছুই অনুসন্ধান করিতে পারি নাই। জানি না কত স্থান ভ্রমণ করিলে তাহাদিগের দর্শন পাইব। তাহাদের অদর্শনে আমার আহার নিদ্রা পরিত্যাগ হইয়াছে। এক্ষণে মানস করিয়াছি পুত্ত্রবধূকে বিশ্বস্তহস্তে ন্যস্ত করিয়া তাহাদের অন্বেষণে নির্গত হইব। আপনি দেশাধিপ আপন অপেক্ষা বিশ্বাসভাজন কোথায় পাইব। আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমার প্রত্যাগমন পর্য্যন্ত পুত্ত্রবধূটিকে আপনকার অন্তঃপুরে রাখুন।
রাজা শুনিয়া মনে মনে বিবেচনা করিলেন পরকীয় মহিলা গৃহে রাখা অতি কঠিন কর্ম্ম কিন্তু অস্বীকার করিলে ব্রাহ্মণ মনঃক্ষুণ্ণ হইবেন। অতএব চন্দ্রপ্রভার নিকটে দিয়া তাহার প্রতি ইহার রক্ষণাবেক্ষণের ভার দি। অনন্তর ব্রাহ্মণকে কহিলেন মহাশয় যাহা আজ্ঞা করিতেছেন তাহাতে আমি সম্মত হইলাম। ভূদেব অত্যন্ত হৃষ্ট চিত্তে আশীর্বাদ প্রয়োগপূর্ব্বক রাজার হস্তে পুত্ত্রবধূ সমর্পণ করিয়া তৎক্ষণাৎ তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। রাজাও অনতিবিলম্বে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া কন্যার হস্তে কন্যাবেশধারী মনস্বীর ভার সমর্পণ করিলেন।
রাজকন্যা ব্রাহ্মণবধূকে সমবয়স্কা দেখিয়া আদরপূর্ব্বক তাহার ভার লইলেন এবং আপন সহোদরার ন্যায় যত্ন ও স্নেহ করিতে লাগিলেন। সর্ব্বদা একত্র উপবেশন একত্র ভোজন ও এক শয্যায় শয়নাদি দ্বারা পরস্পরের প্রণয়সঞ্চার হইতে লাগিল। ফলতঃ মনস্বী ক্রমে ক্রমে রাজকন্যার প্রাণ অপেক্ষা প্রিয় হইয়া উঠিলেন। এক দিবস তিনি রাজকন্যার মনের ভাবপরীক্ষার্থে কথাপ্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করিলেন প্রিয়সখি তুমি দিবানিশি কি চিন্তা কর এবং কি নিমিত্ত দিনে দিনে দুর্বল হইতেছ বল।
রাজপুত্ত্রী কহিলেন সখি বসন্তকালে এক দিবস সখীগণ সঙ্গে লইয়া বনবিহারে গিয়াছিলাম। তথায় দৈবযোগে এক পরম সুন্দর যুবা ব্রাহ্মণকুমার আমার নয়নপথের পথিক হইলেন। তদবধি তদাসক্তচিত্তা হইয়া তদ্বিরহে দিনে দিনে এরুপ দুর্বল হইতেছি। দুঃসহ বিরাহানল ক্রমে প্রবল হইয়া নিরন্তর অন্তর দাহ করিতেছে। আমার আহার বিহার শয়ন উপবেশন কোন বিষয়েই সুখ নাই। দিবানিশি কেবল সেই মোহনমূর্ত্তি চিন্তা করিয়া প্রাণধারণ করিতেছি এবং চতুর্দিক্ তন্ময় দেখিতেছি। তাহার নাম ধাম কিছুই জানি না। ভাবিয়া চিন্তিয়া কোন উপায় স্থির করিতে পারি নাই। নিতান্ত নির্লজ্জা হইয়া কাহারও নিকট মনের ব্যথা ব্যক্ত করিতে পারি না। তুমি আমার দ্বিতীয় প্রাণ তোমার নিকট কোন কথাই গোপনীয় নাই। তুমি কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করিলে তাহাতেই প্রকাশ করিলাম। ফলতঃ তোমার নিকটে মনের বেদনা বর্ণন করিয়াও অনেক স্বাস্থ্য বোধ হইল। তুমি এ বিষয় অতি গোপনে রাখিবে।
এই রূপে রাজকন্যার অভিপ্রায় বুঝিয়া মনস্বী আনন্দপ্রবাহে মগ্ন হইলেন এবং কহিলেন প্রিয়সখি আমি যদি তোমার প্রিয়সমাগম সম্পন্ন করিতে পারি তবে আমাকে কি পারিতোষিক দাও। রাজকন্যা কহিলেন সখি অধিক কি কহিব যদি তুমি তাহাকে মিলাইয়া দিতে পার তোমার দাসী হইয়া চির কাল চরণসেবা করিব। মনস্বী তৎক্ষণাৎ আপন স্বরূপ প্রাপ্ত হইয়া প্রিয়সম্ভাষণপূর্ব্বক রাজকুমারীর করগ্রহণ করিলেন। রাজকন্যা এইরূপ অসম্ভাবিত প্রিয়সমাগম দ্বারা মনোরথনদীর পার প্রাপ্ত হইয়া প্রথমতঃ বাক্পথাতীত হর্ষ বিস্ময় লজ্জার উদ্রেক সহকারে পরম রমণীয় অনির্বচনীয় দশান্তর প্রাপ্ত হইলেন। অনন্তর লজ্জাভঙ্গ হইলে এই রূপান্তরপ্রতিপত্তিরূপ অদ্ভুত ব্যাপারের নিগূঢ়তত্ত্ববোধার্থে কৌতুকাবিষ্ট হইয়া সবিশেষ কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। মনস্বী আপন বিচেতনদশা অবধি ভূদেবের তিরস্করণীবিদ্যাদানপ্রসাদপর্য্যন্ত আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া পরিশেষে ধর্ম্ম সাক্ষী করিয়া গান্ধর্ব্ববিধান অনুসারে পাণিগ্রহ সমাধান করিলেন।
অল্প দিনের মধ্যেই রাজকুমারী অন্তর্বত্নী হইলেন। এই সময়ে এক দিবস রাজা সুবিচার সপরিবার অমাত্যভবনে নিমন্ত্রিত হইলেন। রাজকন্যা এক নিমিষের নিমিত্তেও ব্রাহ্মণবধূকে নয়নের অন্তরাল করিতেন না। সুতরাং তিনি অমাত্যভবনপ্রস্থানকালে তাহাকে আপন সমভিব্যাহারে লইয়া গেলেন। অমাত্যের পুত্ত্র ব্রহ্মাণবধূর অসামান্যরূপলাবণ্যদর্শনে মোহিত হইল এবং নিতান্ত অধৈর্য্য হইয়া আপন মিত্রের নিকট কহিল যদি এই নারী হস্তগত না হয় প্রাণত্যাগ করিব। ফলতঃ মন্ত্রিপুত্ত্রের ক্রমে ক্রমে বিরহবেদনা এরূপ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল যে কেবল দশমী দশা মাত্র অবশিষ্ট রহিল।
তখন তাহার মিত্র অন্য কোন উপায় না দেখিয়া অমাত্যের নিকটে গিয়া আপন মিত্রের অবস্থা ও প্রার্থনা ব্যক্ত করিলে তিনি রাজার নিকটে সবিশেষ কহিয়া আপন পুত্ত্রের নিমিত্ত ব্রাহ্মণবধূ প্রার্থনা করিলেন। রাজা শুনিয়া অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইলেন এবং কহিলেন অরে মূখ স্থাপিত ধন স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে অন্যকে দেওয়া গর্হিত কর্ম্ম। বিশেষতঃ ব্রাহ্মণ ব্যতিক্রমের সম্ভাবনা নাই ছানিয়া বিশ্বাস করিয়া আমার নিকট পুত্ত্রবধূ সমর্পণ করিয়া গিয়াছেন সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করা অত্যন্ত নীতিবিরুদ্ধ। আমি তোমার অনুরোধে এরূপ দুষ্ক্রিয়ায় প্রবৃত্ত হইব না। মন্ত্রী শুনিয়া নিরাশ হইয়া আপন গৃহে গমন করিলেন। কিন্তু পুত্ত্রের তাদৃশী দশা দেখিয়া নিতান্ত কাতর হইয়া আহার নিদ্রা পরিহারপূর্ব্বক বিষাদসমুদ্রে মগ্ন হইলেন।
এই রূপে সর্ব্বাধিকারী ক্রমে ক্রমে পুত্ত্রের তুল্যদশা প্রাপ্ত হইলে রাজকার্য্যব্যাঘাতের উপক্রম দেখিয়া অন্যান্য প্রধান রাজপুরুষেরা রাজার নিকটে নিবেদন করিল মহারাজ মন্ত্রিপুত্ত্রের যেরূপ অবস্থা দেখিতেছি তাহাতে তাহার জীবনরক্ষা হওয়া কঠিন। তাহার কোন অমঙ্গল ঘটিলে মন্ত্রীও প্রাণত্যাগ করিবেন সন্দেহ নাই। এরূপ কর্ম্মদক্ষ কার্য্যসহায় দ্বিতীয় ব্যক্তি নাই, সুতরাং রাজকার্য্যের অনেক বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইবেক। অতএব আমরা সকলে বিনয়বাক্যে প্রার্থনা করিতেছি সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের পুত্ত্রবধূকে পুত্ত্রের নিকট প্রেরণ করুন। বহু দিবস হইল ব্রাহ্মণের উদ্দেশ নাই আর তাঁহার আসিবার সম্ভাবনা বোধ হয় না। যদিও কালান্তরে প্রত্যাগমন করেন ব্রাহ্মণজাতি অর্থলোভী বহুসংখ্যক অর্থ দিয়া অনায়াসে বিদায় করিতে পারিবেন অথবা কন্যান্তরসঙ্ঘটন করিয়া তাঁহার পুত্ত্রের বিবাহ দিলেও তাঁহাকে সন্তুষ্ট করিতে পারিবেন।
রাজা নিতান্ত নিরুপায় ভাবিয়া ব্রাহ্মণবধুর নিকটে গিয়া মন্ত্রিপুত্ত্রের প্রার্থনা জানাইলেন। কপটচারী মনস্বী নিবেদন করিলেন মহারাজ আপনি দেশাধিপতি বিশেষতঃ এক্ষণে আমি আপনকার আশ্রয়ে আছি। অতএব আপনকার আজ্ঞাপ্রতিপালন করা আমার উচিৎ কর্ম্ম। কিন্তু বিবাহিতনারীর পুরুষান্তরসেবা শাস্ত্রনিষিদ্ধ ও লোকাচারবিরুদ্ধ। আপনি দণ্ডধারী হইয়া কি রূপে ঈদৃশ বিসদৃশ আজ্ঞা করিতেছেন বুঝিতে পারিলাম না। মহারাজ আমি প্রাণান্তেও পরপুরুষের মুখাবলোকন করিব না। রাজা শুনিয়া বিষণ্ণ হতবুদ্ধি ও কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইলেন।
মনস্বী আর এখানে থাকায় ভদ্রস্থতা নাই অতঃপর পলায়ন করাই শ্রেয়ঃ এই স্থির করিয়া বধুবেশ পরিত্যাগপূর্ব্বক কৌশলক্রমে রাজবাটী হইতে পলায়ন করিলেন। রাজা ব্রাহ্মণবধূর অদর্শনবৃত্তান্ত অবগত হইয়া এক বারে সাগরে মগ্ন হইলেন এবং ভাবিতে লাগিলেন এ আবার কি বিষম বিপদ উপস্থিত হইল। ব্রাহ্মণ আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলে কি উত্তর দিব। ফলতঃ ব্রাহ্মণবধূর নিকট এরূপ অনুচিত প্রার্থনা করাই অতি অসঙ্গত কর্ম্ম হইয়াছে। ষদর্থে প্রার্থনা করিলাম তাহাও সিদ্ধ হইল না অথচ ঘোরতর বিপদে পড়িলাম।
এ দিকে মনস্বী ভূদেবের নিকটে আসিয়া পূর্ব্বাপর সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিলে তিনি অত্যন্ত প্রীত ও চমৎকৃত হইলেন এবং স্বীর সহচর শশীকে বিংশতিবর্ষীয় পুত্ত্র সাজাইয়া স্বয়ং পূর্ব্ববৎ বৃদ্ধবেশ ধারণপূর্ব্বক পুত্ত্রবধূর আনয়নার্থে রাজার নিকট গমন করিলেন। রাজা প্রণাম ও স্বাগত প্রশ্ন করিয়া বসিতে আসন দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন মহাশয়ের এত দিন বিলম্ব হইল কেন। ভুদেব কহিলেন মহারাজ বিলম্বের কথা কেন জিজ্ঞাসা করেন। অনেক কষ্টে অন্বেষণ করিয়া পুত্ত্র পাইয়াছি। এক্ষণে পুত্ত্র পুত্ত্রবধূ লইয়া গৃহে যাইব। রাজা ব্রহ্মশাপভয়ে কম্পিত ও কৃতাঞ্জলি হইয়া ব্রাহ্মণের নিকট সবিশেষ সমস্ত নিবেদন করিলেন।
ব্রাহ্মণ শুনিয়া কোপে কম্পমানকলেবর হইলেন এবং শাপপ্রদানে উদ্যত হইয়া কহিলেন তোমার এ কি ব্যবহার। আমি তোমাকে রাজা জানিয়া বিশ্বাস করিয়া পুত্ত্রবধূ সমর্পণ করিয়াছিলাম। তুমি আপন ইষ্টসিদ্ধির নিমিত্ত যথেচ্ছ বিনিয়োগে প্রবৃত্ত হইয়া আমার সর্ব্বনাশ করিয়াছ। বলিতে কি কোন কালে আমার এ মনোবেদনা দূর হইবেক না। রাজা শুনিয়া অত্যন্ত ভীত হইলেন এবং অশেষপ্রকার স্তুতি ও বিনীতি করিয়া কহিলেন মহাশয় কৃপা করিয়া আমার এই অপরাধ ক্ষমা করুন। আপনকার যে অপকার করিয়াছি তাহার প্রতিক্রিয়ার্থে যাহা আজ্ঞা করিবেন তাহাতেই সম্মত হইব। ভুদেব কহিলেন যদি তুমি আমার পুত্ত্রের সহিত আপন কন্যার বিবাহ দিতে পার তাহা হইলে আমি কথঞ্চিৎ ক্ষমা করিতে পারি।
রাজা ব্রহ্মকোপানলে কুলক্ষয়ভয়ে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন, এবং জ্যোতির্বিদ ব্রাহ্মণ দ্বারা শুভ দিন ও শুভ লগ্ন নির্ণয় করিয়া কন্যার বিবাহ দিলেন। অনন্তর ভূদেব রাজকন্যা লইয়া আলয়ে উপস্থিত হইলে মনস্বী ও শশী উভয়ে এই ভার্য্যা আমার আমার বলিয়া পরস্পর বিবাদ আরম্ভ করিলেন। মনস্বী কহিলেন ইহাকে আমি পূর্ব্বে বিবাহ করিয়াছি এবং আমার সহযোগে ইহার গর্ভসঞ্চার হইয়াছে। শশী কহিলেন রাজা সর্ব্বসমক্ষে আমাকে কন্যাদান করিয়াছেন।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এক্ষণে এই কন্যা শাস্ত্র ও যুক্তি অনুসারে কাহার ভার্য্যা হইবেক। বিক্রমাদিত্য কহিলেন আমার মতে মনস্বীর। বেতাল কহিল শাস্ত্রে লিখিত আছে কন্যার দান বিক্রয় পরিত্যাগে পিতা মাতার সম্পূর্ণ অধিকার। রাজা সর্ব্বসমক্ষে ধর্ম্ম সাক্ষী করিয়া শশীকে কন্যা দান করিয়াছেন। অতএব ঐ পিতৃদত্তা কন্যা শশীরই হইতে পারে তাহা না হইয়া মনস্বীর কেন হয় বল। রাজা কহিলেন তুমি যাহা কহিতেছ তাহার যথার্থতাবিষয়ে আমি অণুমাত্র সংশয় করি না। কিন্তু মনস্বী পূর্ব্বে বিবাহ করিয়াছে এবং তৎসহযোগে রাজকন্যার গর্ভ হইয়াছে। এক্ষণে সে মনস্বীর পত্নী হইলে তাহারও সতীত্ব রক্ষা হয় এবং ধর্ম্মেরও মান থাকে।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
চতুর্বিংশ উপাখ্যান
চতুর্বিংশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
কলিঙ্গদেশে যজ্ঞশর্ম্মা নামে ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিনি অনেক দেবতার আরাধনা করিয়া বহু কালের পর এক পুত্ত্র পাইয়াছিলেন। ঐ পুত্ত্র অল্পকালমধ্যে সর্ব্ব শাস্ত্রে সুপণ্ডিত হইল এবং অনন্যকর্ম্মা ও অনন্যধর্ম্মা হইয়া নিরন্তর পিতৃসেবা করিতে লাগিল। পিতা মাতার ভাগ্যদোষে ঐ বালক পঞ্চদশ বষ বয়ঃক্রমকালে কালগ্রাসে পতিত হইল। তাহার পিতা মাতা প্রথমতঃ যৎপরোনাস্তি বিলাপ ও পরিতাপ করিলেন পরিশেষে অগ্নিসংস্কারার্থে গ্রামোপান্তবর্ত্তী শ্মশানে লইয়া গিয়া চিতারচনা করিতে লাগিলেন।
এক বৃদ্ধ যোগী বহুকালাবধি ঐ শ্মশানে যোগাভ্যাস করিতেছিলেন। তিনি পঞ্চদশবর্ষীয় ব্রাহ্মণকুমারের মৃত দেহ পতিত দেখিয়া মনে মনে বিবেচনা করিলেন আমার এই প্রাচীন দেহ জরায় জীর্ণ ও শীর্ণ হইয়া কার্য্যাক্ষম হইয়াছে অতএব এই যুবদেহে প্রবেশ করি তাহা হইলে বহু কাল যোগাভ্যাস করিতে পারিব। এই বলিয়া জগদীশ্বরের নাম স্মরণপূর্ব্বক সেই শরীরে প্রবেশ করিলেন। ব্রাহ্মণকুমার তৎক্ষণাৎ জাবিত হইয়া উঠিল। যজ্ঞশর্ম্মা পুত্ত্রকে প্রত্যাগতজীবিত দেখিয়া প্রথমতঃ প্রফুল্ল বদনে হাস্য করিলেন কিন্তু এক নিমেষ পরেই পুনর্বার পূর্ব্ববৎ বিষণ্ণ বদনে রোদনে প্রবৃত্ত হইলেন।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসিল মহারাজ ব্রাহ্মণ পুত্ত্রকে পুনর্জীবিত দেখিয়া হৃষ্ট মনে হাস্য করিয়া কি কারণে পর ক্ষণেই রোদন করিলেন বল। রাজা কহিলেন ব্রাহ্মণ প্রথমতঃ পুত্ত্রকে পুনর্জীবিত বোধ করিয়া আহ্লাদে হাস্য করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি পরশরীরপ্রবেশনী বিদ্যা জানিতেন তৎপ্রভাবে পর ক্ষণেই বুঝিতে পারিলেন পুত্ত্র জীবিত হয় নাই যোগীর প্রবেশ দ্বারা এইরূপ হইয়াছে অতএব রোদন করিলেন।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
তৃতীয় উপাখ্যান
তৃতীয় উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
বর্দ্ধমান নগরে রূপসেন নামে অতি বিজ্ঞ গুণগ্রাহী পরম ধার্ম্মিক দয়ালু রাজা ছিলেন। এক দিবস দক্ষিণদেশনিবাসী বীরবরনামা রাজপুত কর্ম্মপ্রাপ্তির আশয়ে রাজদ্বারে উপস্থিত হইল। দ্বারবান্ তাহার প্রমুখাৎ সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া রাজসমীপে বিজ্ঞাপন করিল মহারাজ বীরবর নামে এক অস্ত্রধারী পুরুষ কর্ম্মের প্রার্থনায় আসিয়া দ্বারদেশে দণ্ডায়মান আছে। আজ্ঞা পাইলে সাক্ষাৎকারে আসিয়া বিশেষ রূপে আপন অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। রাজা আজ্ঞা করিলেন অবিলম্বে লইয়া আইস।
অনন্তর রাজাজ্ঞা অনুসারে দ্বারী বীরবরকে নরপতিগোচরে উপস্থিত করিলে রাজা তাহার আকার প্রকার দর্শনে কর্ম্মঠ বোধ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন বীরবর কত বেতন পাইলে তোমার অনায়াসে নির্বাহ হইতে পারে। বীরবর নিবেদন করিল মহারাজ প্রত্যহ সহস্রস্বর্ণমুদ্রাপ্রদানের আদেশ হইলেই আমার চলিতে পারে। রাজা জিজ্ঞাসিলেন তোমার পরিবার কত। সে কহিল মহারাজ এক স্ত্রী এক পুত্ত্র ও এক কন্যা আর স্বয়ং এই চারি এতদ্বতিরিক্ত আর আমার পরিবার নাই। রাজা শুনিয়া মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন ইহার পরিজন অতি অল্প তথাপি কি নিমিত্ত এত অধিক প্রার্থনা করে। যাহা হউক এক ভৃত্যের নিমিত্ত নিত্য নিত্য এতাদৃশ ব্যয় যুক্তিসিদ্ধ নহে। অথবা এ অর্থব্যয় ব্যর্থ হইবেক না অবশ্যই ইহার কোন বিশেষ গুণ থাকিবেক। অতএব কিয়ৎ কালের নিমিত্তে রাখিয়া ইহার গুণ পরীক্ষা করা উচিত। অনন্তর কোষাধ্যক্ষকে আহ্বান করিয়া আজ্ঞা দিলেন তুমি প্রতিদিন প্রাতঃকালে বীরবয়কে সহস্র সুবর্ণ দিবে কোন মতে অন্যথা না হয়।
বীরবর রাজাজ্ঞাশ্রবণে পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়া ধন্যবাদ করিতে লাগিল এবং কোষাধ্যক্ষের নিকট হইতে তদ্দিবসপ্রাপ্য নির্দ্ধারিত সুবর্ণ গ্রহণপূর্ব্বক নৃপনির্দিষ্ট বাসস্থানে গমন করিল। তথায় উপস্থিত হইয়া প্রথমতঃ সেই স্বর্ণকে ভাগদ্বয়ে বিভক্ত করিয়া এক ভাগ বিপ্রসাৎ করিল অবশিষ্ট ভাগ পুনর্বার দ্বিভাগ করিয়া এক অর্দ্ধ বৈরাগী বৈষ্ণব সন্ন্যাসী প্রভৃতিকে দিল অন্য অর্দ্ধ দ্বারা নানাবিধ খাদ্য দ্রব্য সংগ্রহ করিয়া শত শত দীন দুঃখী অনাথ প্রভৃতিকে যথোচিত ভোজন করাইয়া অবশিষ্ট যৎকিঞ্চিৎ স্বয়ং পুত্ত্র কলত্র ও দুহিতার সহিও আহার করিল।
প্রতিদিন এই রূপে দিনপাত করিয়া সায়ংকালে বর্ম্ম ও খড়্গ চর্ম্ম ধারণপূর্ব্বক সমস্ত রজনী রাজদ্বারে উপস্থিত থাকে। রাজা তাহার শক্তি ও প্রভুভক্তি পরীক্ষার্থে কি দ্বিপ্রহর কি তৃতীয় প্রহর রাত্রি যখন যাহা আজ্ঞা করেন অতি দুঃসাধ্য হইলেও সে তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পন্ন করিয়া আইসে।
এক দিবস নিশীথ সময়ে অকস্মাৎ স্ত্রীলোকের রোদনধ্বনি শুনিয়া রাজা বীরবরকে আহ্বান করিলে সে তৎক্ষণাৎ সম্মুখবর্ত্তী হইয়া কহিল মহারাজ কি আজ্ঞা হয়। রাজা কহিলেন দক্ষিণ দিকে স্ত্রীলোকের ক্রন্দনশব্দ শুনা যাইতেছে ত্বরায় ইহার তথ্যানুসন্ধান করিয়া আমাকে সংবাদ দাও। বীরবর যে আজ্ঞা মহারাজ বলিয়া তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করিল। রাজা বীরবরকে এক মুহূর্ত্তের নিমিত্তেও আজ্ঞাপ্রতিপালনে পরাঙ্মুখ না দেখিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন এবং তাহার সাহস দেখিবার নিমিত্ত আপনিও গুপ্ত ভাবে পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন।
বীরবর সেই রোদনশব্দ লক্ষ্য করিয়া অতি প্রসিদ্ধ এক ভয়ঙ্কর শ্মশানে উপস্থিত হইল। দেখিল এক সর্ব্বালঙ্কারভূষিতা পরম সুন্দরী স্ত্রী শিরে করাঘাত ও হাহাকার করিয়া উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতেছে। বীরবর দেখিয়া অতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইল এবং সাহসপূর্ব্বক সম্মুখবর্ত্তী হইয়া জিজ্ঞাসিল তুমি কে কি দুঃখে এই ঘোর রজনীতে একাকিনী শ্মশানবাসিনী হইয়া বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছ। সে কিছুই উত্তর দিল না বরং পূর্ব্ব অপেক্ষায় অধিক রোদন করিতে লাগিল। অনন্তর বীরবর বিশেষ ব্যগ্রতা প্রদর্শনপূর্ব্বক বারংবার জিজ্ঞাসিতে লাগিল। সে কহিল আমি রাজলক্ষ্মী রাজা রূপসেনের গৃহে নানা অন্যায় ও অলক্ষ্মীর হইতেছে; তৎপ্রযুক্ত তদীয় আবাসে অচিরাৎ অলক্ষ্মীর প্রবেশ হইবেক। সুতরাং আমি রাজার রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া যাইব। আমি প্রস্থান করিলে পর অল্প দিনের মধ্যেই রাজার প্রাণবিয়োগ হইবেক সেই দুঃখে দুঃখিতা হইয়া রোদন করিতেছি।
প্রভুর এইরূপ অসম্ভাবিত ভাবী অমঙ্গল শ্রবণে বিষাদসমুদ্রে মগ্ন হইয়া বীরবর কহিল দেবি আপনি যে আজ্ঞা করিলেন তাহাতে কোন ক্রমেই সন্দেহ করিতে পারি না। কিন্তু যদি কোন উপায় থাকে বলুন আমি রাজার মঙ্গলের নিমিত্ত প্রাণান্ত পর্য্যন্ত স্বীকার করিতে প্রস্তুত আছি। রাজলক্ষ্মী কহিলেন পূর্ব্ব দিকে যোজনান্তে এক দেবী আছেন। যদি কেহ ঐ দেবীর নিকটে আপন পুত্ত্রকে স্বহস্তে বলিদান দেয় তবে তিনি প্রসন্না হইয়া রাজার সমস্ত বিঘ্ন বিনাশ করিতে পারেন।
রাজলক্ষ্মীর এইরূপ বাক্য শুনিয়া বীরবর সত্বর গৃহাভিমুখে গমন করিল। রাজাও কৌতুকাবিষ্ট হইয়া পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। বীরবর গৃহে উপস্থিত হইয়া আপন পত্নীকে জাগরিত করিয়া সমস্ত জ্ঞাত করিলে সে তৎক্ষণাৎ পুত্ত্রের নিদ্রাভঙ্গ করিয়া কহিল বৎস তোমার মস্তক দিলে রাজার অচল রাজ্য হয়। তখন পুত্ত্র কহিল হে মাতঃ প্রথমতঃ আপনকার আজ্ঞা দ্বিতীয়তঃ স্বামিকার্য্য তৃতীয়তঃ পাঞ্চভৌতিক বিনশ্বর দেহ দেখসেবায় নিয়োজিত হইবেক। ইহা অপেক্ষা আমার প্রাণত্যাগের উত্তম সময় আর ঘটিবেক না। অতএব শুভ কর্ম্মে বিলম্ব করা কর্ত্তব্য নহে। আপনারা সত্বর হইয়া কার্য্য সম্পাদন করুন।
বীরবর পুত্ত্রের এইরূপ পরমাদ্ভুত বাক্য শ্রবণে বিস্ময়া পন্ন হইয়া অশ্রুমুখে সহধর্ম্মিণীকে কহিল যদি তুমি সচ্ছন্দ মনে পুত্ত্র প্রদান কর তবেই আমি দেবীর নিকট বলিদান দিয়া রাজকার্য্য নিষ্পাদন করি। এইরূপ স্বামিবাক্য শ্রবণানন্তর বীরবরের ভার্য্যা আবেদন করিল নাথ ধর্ম্মশাস্ত্রে কহে স্বামী মূক বধির পঙ্গু অন্ধ কাণ খঞ্জ কুব্জ কুষ্ঠী যেরূপ হউন তাঁহাকে সন্তুষ্ট রাখিতে পারিলে নারী যেরূপ চরিতার্থতা প্রাপ্ত হয় শাস্ত্রবিহিত দান ধ্যান ব্রত তপস্যাদি দ্বারা তাদৃশ হয় না। আর যদি স্বামীর প্রতি অনাদর করিয়া পারলৌকিক সুখসম্ভোগ লেভে নানা ধর্ম্ম কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে তাহার সে সকল নিষ্ফল ও অন্তে অধোগতির কারণ হয়। অতএব আমার পুত্ত্র পৌত্রে প্রয়োজন কি তোমার চরণশুশ্রূষা করিলেই উভয় লোকে নিস্তার পাইব। তাহার পুত্ত্র কহিল হে পিতঃ যে ব্যক্তি স্বামিকার্য্যসম্পাদনে সমর্থ তাহারই জন্ম সার্থক এবং সেই স্বর্গলোকে অনন্ত কাল সুখসম্ভোভ করে। অতএব আর কি নিমিত্তে সংশয়ে কালহরণ করিতেছেন কার্য্যসাধনে তৎপর হউন। বিলম্বে কার্য্যহানিসম্ভাবনা।
ইত্যাকার নানাপ্রকার কথোপকথনান্তে বীরবর সপরিবারে দেবীর মন্দিরোদ্দেশে গমন করিল। রাজা এই রূপে বীরবরের সপরিবারের প্রভুভক্তির প্রবলতা ও অচলতা দেখিয়া অত্যন্ত চমৎকৃত ও আহ্লাদিত হইলেন এবং মনে মনে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদানপূর্ব্বক গুপ্ত ভাবে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে বীরবর দেবীর মন্দিরে উপস্থিত হইল এবং গন্ধ পুষ্প ধূপ দীপ নৈবেদ্য আদি নানা উপচার দ্বারা যথাবিধি পূজা করিয়া সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত পূর্ব্বক দেবীর সম্মুখে কৃতাঞ্জলি হইয়া কহিল হে জগদীশ্বরি তোমাকে প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত আমি প্রাণাধিকপ্রিয় পুত্ত্রকে স্বহস্তে বলিদান দিতেছি। কৃপা কর যেন আমার প্রভুর দীর্ঘ আয়ুঃ ও অচল রাজ্য হয়।
এই বলিয়া খড়্গ লইয়া বীরবর অকাতরে পুত্ত্রের মস্তকচ্ছেদন করিল। বীরবরের কন্যা এই রূপে জীবিতাধিক সহোদরের প্রাণবিয়োগ দেখিয়া খড়্গপ্রহার দ্বারা প্রাণত্যাগ করিল। তাহার পত্নীও শোকে অধীরা হইয়া তৎক্ষণাৎ তনয় তনয়ার অনুগামিনী হইল। তখন বীরবর বিবেচনা করিল প্রভুকার্য্য সম্পন্ন করিলাম। এক্ষণে আর কি নিমিত্ত দাসত্বশৃঙ্খলে বদ্ধ থাকি আর কি সুখেই বা জীবন ধারণ করি। এই বলিয়া সেই বিষম খড়্গ দ্বারা স্বীয় শিরশ্ছেদন করিল।
এই রূপে ক্রমে ক্রমে চারি জনের অদ্ভুত মরণ দেখিয়া রাজার অন্তঃকরণে অত্যন্ত নির্বেদ উপস্থিত হইল। তখন তিনি কহিতে লাগিলেন যে রাজ্যের নিমিত্ত এতাদৃশ প্রভুভক্ত সেবকের সর্ব্বনাশ হইল আর আমি সেই বিষন রাজ্যের ভোগে প্রবৃত্ত হইব না। আমি অতিশয় স্বার্থপর। নতুবা কি নিমিত্ত বীরবরকে পুত্ত্রহত্যা হইতে নিবৃত্ত করিলাম না। কি নিমিত্তই বা তাহাকে আত্মঘাতী হইতে দিলাম। উপক্রমেই এই ঘোরতর অধ্যবসায় হইতে বীরবরকে বিরত করা আমার উচিত কর্ম্ম ছিল। সর্ব্বথা আমি অতি অসৎ কর্ম্ম করিয়াছি। এক্ষণে আত্মহত্যারূপ প্রায়শ্চিত্ত ব্যতীত চিত্তসন্তোষ জন্মিবেক না।
এই বলিয়া খড়্গ লইয়া মস্তকচ্ছেদনে উদ্যত হইবামাত্র ভগবতী কাত্যায়নী তৎক্ষণাৎ আবিভূতা হইয়া হস্তধারণপূর্ব্বক রাজাকে মরণব্যবসায় হইতে নিবৃত্ত করিলেন। কহিলেন বৎস তোমার সাহস দেখিয়া প্রসন্ন হইয়াছি অভিপ্রেত বর প্রার্থনা কর। রাজা কহিলেন মাতঃ যদি প্রসন্ন হইয়া থাকেন এই চারি জনের জীবন দান করুন। ইহা অপেক্ষা এক্ষণে আমার আর গুরুতর প্রার্থয়িতব্য নাই। দেবী তথাস্তু বলিয়া অবিলম্বে পাতল হইতে অমৃত আনয়নপূর্ব্বক তাহাদের গাত্রে সেচন করিবামাত্রে চারি জনেই তৎক্ষণাৎ সুপ্তোত্থিতের ন্যায় গাত্রোত্থান করিল। রাজা যথার্থ প্রভূভক্ত বীরবরকে অপত্য কলত্র সহিত পুনর্জীবিত দেখিয়া অপরিসীম হর্ষ প্রাপ্ত হইলেন এবং দেবীর চরণারবিন্দে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া নানাবিধ স্তুতি ও বিনতি করিতে লাগিলেন। পরিশেষে দেবী রাজাকে নানা অভিলষিত বর প্রদান দ্বারা চরিতার্থ করিয়া অন্তর্হিতা হইলেন। অনন্তর তাঁহারা সকলেই স্ব স্ব স্থানে প্রস্থান করিলেন। পর দিন প্রভাত হইবামাত্র গাত্রোত্থান করিয়া রাজা রূপসেন সভাসমারোহণপূর্ব্বক সর্ব্বভাজনসমক্ষে ধর্ম্ম সাক্ষী করিয়া প্রভুপরায়ণ বীরবরকে অর্দ্ধরাজ্যেশ্বর করিলেন। দেশে বিদেশে রাজা ও বীরবর উভয়ের নির্বিবাদ ধন্যবাদ হইল।
এই রূপে কথা সমাপ্ত করিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ পূর্ব্বাপর সমস্ত শ্রবণ করিলে। এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি কাহার ঔদার্য্য অধিক হইল। বিক্রমাদিত্য উত্তর দিলেন আমার বোধে রাজার ঔদার্য্য অধিক। বেতাল কহিল কেন। রাজা বলিলেন স্বামীর নিমিত্ত সর্ব্বনাশস্বীকার ও প্রাণদান করা সেবকের উচিত কর্ম্ম। অতএব বীরবর রাজকার্য্যার্থে ঈদৃশ সাহস প্রকাশ করিয়া আত্মধর্ম্ম প্রতিপালন করিয়াছে। কিন্তু রাজা যে সেবকের নিমিত্ত রাজ্যাধিকার তৃণতুল্য বোধ করিয়া অনায়াসে প্রাণত্যাগে উদ্যত হইলেন ইহা কেবল দয়ার্দ্রচিত্ততা ও অকৃত্রিম ঔদার্য্যের কর্ম্ম।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
ত্রয়োদশ উপাখ্যান
ত্রয়োদশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
চন্দ্রহৃদয় নগরে রণধীর নামে প্রবলপ্রভাপ নরপতি ছিলেন। রাজা রণধীরের প্রভাবে প্রজারা চির কাল নিরুপদ্রবে বাস করিত। কিয়ৎ দিন পরে নগরে গুরুতর চৌর্য্যক্রিয়ার আরম্ভ হইল। পৌরেরা চৌরের উপদ্রবে অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়া সকলে মিলিয়া রাজসমীপে স্ব স্ব দুঃখ নিবেদন করিল। রাজা সবিশেষ সমস্ত শ্রবণগোচর করিয়া কহিলেন যাহা হইয়াছে তাহার আর উপায় নাই। অতঃপর যাহাতে না হইতে পায় তদ্বিষয়ে বিশেষরূপ যত্নবান্ থাকিলাম। এইরূপ আশ্বাস দিয়া নগরবাসীদিগকে বিদায় করিলেন এবং নূতন নূতন প্রহরী নিযুক্ত করিয়া তাহাদিগকে অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ব্বক নগররক্ষার আদেশ দিয়া স্থানে স্থানে পাঠাইলেন কহিয়া দিলেন চোর পাইলে তাহার প্রাণদণ্ড করিবে। প্রহরীরা অত্যন্ত সাবধানে নগররক্ষা করিতে লাগিল তথাপি চৌর্য্যের কিঞ্চিন্মাত্র নিবৃত্তি হইল না বরং দিনে দিনে বৃদ্ধিই হইতে লাগিল। তখন পুরবাসীরা পুনর্বার একত্র হইয়া রাজার নিকটে গিয়া আপন আপন দুঃখ জানাইলে রাজা তাহাদিগকে কহিলেন এক্ষণে তোমরা বিদায় হও অদ্য রজনীতে আমি স্বয়ং নগররক্ষায় যাইব। প্রজারা রাজাজ্ঞা অনুসারে স্বীয় স্বীয় আলয়ে গমন করিল। রাজাও সায়ংকাল উপস্থিত হইলে অসি চর্ম্ম ও বর্ম্ম ধারণপূর্ব্বক একাকী নগররক্ষায় নির্গত হইলেন এবং কিয়ৎ দূরে গিয়া এক অপরিচিত ব্যক্তিকে সম্মুখে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কে কোথায় যাইতেছ তোমার বাস কোথায়। সে কহিল আমি চোর তুমি কে কি নিমিত্ত আমার পরিচয় লইতেছ বল। রাজা ছল করির কহিলেন আমিও চোর। তখন সে অত্যন্ত আহ্লাদিত হইয়া কহিল আইস উভয়ে একত্র হইয়া চুরি করিতে যাই। রাজা তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন।
অনন্তর চোর রাজাকে সহচর করিয়া এক ধনাঢ্য গৃহস্থের ভবনে প্রবেশপূর্ব্বক বহুবিধ অর্থ হরণ করিয়া নগর হইতে বহির্গত হইল এবং কিয়ৎ দূরে গিয়া এক প্রচ্ছন্ন সুরঙ্গ দ্বারা পাতালমধ্যে প্রবিষ্ট হইল। পরে সে আপন আলয়ে উপস্থিত হইয়া রাজাকে দ্বারদেশে বসিতে আসন দিয়া বাটীমধ্যে প্রবেশ করিল। এই অবসরে এক দাসী আসিয়া কথায় কথায় রাজার পরিচয় গ্রহণপূর্ব্বক সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া কহিল মহারাজ তুমি কি নিমিত্ত এই দুর্বৃত্ত দস্যুর সহিত এ স্থানে আসিয়াছ। সে না আসিতে আসিতে যত দূর পর পলায়ন কর নতুবা আসিয়াই তোমার প্রাণবিনাশ করিবেক। রাজা শুনিয়া অতিশয় বিষণ্ণ হইলেন এবং কহিলেন আমি পথ জানি না কি রূপে পলাইব। যদি তুমি কৃপা করিয়া পথ দেখাইয়া দাও তাহা হইলে এ বার আমার প্রাণরক্ষা হয়। তখন সেই দাসী পথ প্রদর্শন করিলে রাজা পলাইয়া আপন নগরে উপস্থিত হইলেন।
পর দিন প্রভাত হইবামাত্র রাজা রণধীর আপন সমস্ত সৈন্য সামন্ত সমভিব্যাহারে সেই কূপ দ্বারা পাতালে প্রবিষ্ট হইয়া চোরের ভবন রোধ করিলেন। এক রাক্ষস সেই পাতালস্থ নগরের অধিষ্ঠাত্রী দেবতার ন্যায় রক্ষণাবেক্ষণ করিত। চোর রাজাবরোধ হইতে আত্মরক্ষার নিতান্ত অনুপায় দেখিয়া নগররক্ষক রাক্ষসের শরণাপন্ন হইল এবং নিবেদন করিল এক রাজা সসৈন্য আসিয়া আমার উপর আক্রমণ করিয়াছে। যদি তুমি এ সময়ে আমার সহায়তা না কর অদ্যই তোমার নগর পরিত্যাগ করিয়া অন্যত্র বাস করিব। এই বলিয়া প্রলোভনস্বরূপ তাহার আহারোপযোগী দ্রব্য উপঢৌকন দিয়া সম্মুখে কৃতাঞ্জলি দণ্ডায়মান রহিল।
রাক্ষস আহারসামগ্রী উপহার পাইয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইল এবং তুমি নির্ভয় হও আমি কিয়ৎক্ষণমধ্যেই রাজার সমস্ত সৈন্য নষ্ট করিতেছি এই বলিয়া তৎক্ষণাৎ তথায় উপস্থিত হইয়া সৈন্যান্তগত নর করী তুরঙ্গ প্রভৃতি এক এক গ্রাসে ভক্ষণ করিতে আরম্ভ করিল। রাজা রাক্ষসের ভয়ানক আকার ও ক্রিয়া দর্শনে অত্যন্ত কাতর হইয়া পলায়ন করিলেন। ফলতঃ যে পলাইতে পারিল তাহারই প্রাণরক্ষা হইল অবশিষ্ট সমস্ত সৈন্য সেই দুর্দান্ত রাক্ষসের গ্রাসে পতিত হইয়া পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল।
রাজা একাকী পলায়ন করিতে লাগিলেন। চোর রাক্ষসের সহায়তাতে সাহসী ও স্পর্দ্ধাবান্ হইয়া তাঁহার পশ্চাৎ ধাবমান হইল এবং ক্রমে ক্রমে সন্নিহিত হইয়া ভৎসনা করিয়া কহিতে লাগিল অরে কুলাঙ্গার ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিয়া এরূপ কাপুরুষতা প্রকাশ করিতেছিস্। তোরে ধিক্। রাজা হইয়া ভঙ্গ দিয়া রণক্ষেত্র হইতে প্রস্থান করিলে ইহ লোকে অকীর্ত্তি ও পর লোকে নরকপাত হয়। রাজা তৎকালে নিতান্ত ব্যাকুল ও সর্ব্বথা উপায়হীন হইয়াও কেবল কুলাভিমান ও খড়্গ চর্ম্ম সহায় করিয়া চোরের সম্মুখীন হইলেন।
ঘোরতর সংগ্রাম হইতে লাগিল। পরিশেষে রাজা রণধীর চোরকে পরাজিত করিয়া বন্ধনপূর্ব্বক রাজধানীতে আনয়ন করিলেন এবং পর দিন প্রাতঃকালে শূলদানের ব্যবস্থা করিয়া বধ্যবেশ প্রদানপূর্ব্বক তাহাকে গর্দ্দভে আরোহণ করাইয়া নগরের সমস্ত প্রদেশে ভ্রমণ করাইতে আদেশ দিলেন। চোর প্রায় সকলেরই সর্ব্বনাশ করিয়াছিল সুতরাং সকলেই তাহাকে এই অবস্থায় দেখিয়া অত্যন্ত আহ্লাদিত হইয়া তাহার অশেষপ্রকার তিরস্কার ও রাজার ভূরি ভূরি প্রশংসা করিতে লাগিল।
কিন্তু ধর্ম্মধ্বজনামক বণিকের গৃহের নিকটবর্ত্তী হইলে তাহার কন্যা শোভনা গবাক্ষদ্বার দিয়া চোরকে নয়নগোচর করিয়া তাহার রূপ লাবণ্যে মোহিত হইল এবং তৎক্ষণাৎ আপন পিতার নিকটবর্ত্তিনী হইয়া কহিল তুমি রাজার নিকটে গিয়া যে রূপে পার ঐ চোরকে ছাড়াইয়া আন। বণিক্ কহিল যে চোর সমস্ত নগর নির্দ্ধন করিয়াছে যাহার নিমিত্তে রাজার সমস্ত সৈন্য ক্ষয় হইয়াছে এবং রাজারও নিজের প্রাণসংশয় পর্য্যন্ত ঘটিয়াছিল তাহাকে আমার কথায় কখন ছাড়িয়া দিবেন না। শোভনা কহিল যদি তোমার সর্ব্বস্ব দিলেও রাজা উহাকে ছাড়িয়া দেন তাহাও তোমাকে করিতে হইবেক। ফলতঃ যদি তুমি উহাকে না আনিতে পার আমি প্রাণত্যাগ করিব।
ঐ কন্যা ধর্ম্মধ্বজের প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয় ছিল সুতরাং সে তাহার নির্বন্ধ উল্লঙ্ঘনে অসমর্থ হইয়া রাজসমীপে গিয়া আবেদন করিল মহারাজ আমি আপন সমস্ত সম্পত্তি দিতেছি আপনি এই চোরকে ছাড়িয়া দিউন। রাজা কহিলেন এই চোর আমার ও পৌরবর্গের যৎপরোনাস্তি অপকার করিয়াছে আমি কোন প্রকারেই উহাকে ছাড়িয়া দিব না। তখন ধর্ম্মধ্বজ আপন কন্যার নিকটে আসিয়া কহিল আমি সর্ব্বস্বদান পর্য্যন্ত স্বীকার ও যথোচিত বিনয়পূর্ব্বক প্রার্থনা করিলাম রাজা কোন ক্রমেই চোরকে ছাড়িয়া দিতে সম্মত হইলেন না। তখন শোভনা অভীষ্টসিদ্ধিবিষয়ে নিতান্ত নিরাশ হইয়া বিষাদসাগরে মগ্ন হইল।
এই সময়মধ্যে রাজপুরুষেরা চোরকে সমস্ত নগর ভ্রমণ করাইয়া পরিশেষে বধ্যভূমিতে আনয়নপূর্ব্বক শূলস্তম্ভের নিকট দণ্ডায়মান করিল। শোভনার এই অপরূপ বৃত্তান্ত তৎক্ষণাৎ নগরমধ্যে প্রচার হওয়াতে অনতিবিলম্বে চোরেরও কর্ণগোচর হইল। তখন সে প্রথমতঃ হাস্য করিতে লাগিল অনন্তর হাস্য হইতে বিরত হইয়া রোদন আরম্ভ করিবামাত্র রাজপুরুষেরা তাহাকে শূলোপরি আরোহণ করাইল।
বণিক্কন্যা চোরের মৃত্যুসংবাদ পাইবামাত্র সহগমনের উদ্যোগ করিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইল এবং যথানিয়মে চিতা প্রস্তুত হইলে সেই চোরকে শূল হইতে অবতীর্ণ করিয়া আলিঙ্গনপূর্ব্বক মৃত্যুশয্যায় শয়ন করিল। দাহকেরা অগ্নিদানের উপক্রম করিল। নিকটে এক কাত্যায়নীর মন্দির ছিল। দেবী তথা হইতে নির্গত হইয়া শ্মশানভূমিতে উপস্থিত হইলেন এবং কহিলেন বৎসে বরপ্রার্থনা কর তোমার সাহস ও সতীত্ব দর্শনে সন্তুষ্ট হইয়াছি। শোভনা কহিল জননি যদি প্রসন্ন হইয়া থাক এই চোরের জীবন দান কর। দেবী তৎক্ষণাৎ পাতাল হইতে অমৃত আনয়ন করিয়া চোরের প্রাণদান করিলেন।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ চোর কি নিমিত্ত প্রথমতঃ হাস্য ও পরে রোদন করিল বল। রাজা কহিলেন চোর কন্যার কামনা শুনিয়া মনে মনে বিবেচনা করিল আমার মৃত্যুসময়ে ইহার প্রণয়সঞ্চার হইল ভগবানের কি ইচ্ছা কিছুই বুঝা যায় না। এই বিবেচনা করিয়া প্রথমে হাস্য করিল। অনন্তর চিন্তা করিল এই কন্যা আমার নিমিত্তে রাজাকে সর্ব্বস্ব দিতে উদ্যত হইয়াছে আমি ইহার এমন কি উপকারে আসিতাম। এই অনুশোচনা করিয়া দুঃখিত হইয়া রোদন করিল।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
ত্রয়োবিংশ উপাখ্যান
ত্রয়োবিংশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
ধর্ম্মপুরে গোবিন্দ নামে ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁহার দুই পুত্ত্র। তন্মধ্যে এক জন ভোজনবিলাসী অর্থাৎ অন্নব্যঞ্জনে যদি কোন দোষ থাকিত তাহা অত্যন্ত দুর্জ্ঞেয় হইলেও সে সে অন্ন ভোজন করিতে পারিত না। দ্বিতীয় শয্যাবিলাসী অর্থাৎ শয্যায় কোনপ্রকার দুর্লক্ষ্য বিঘ্ন ঘটিলে তাহাতে তাহার নিদ্রা হইত না। ফলতঃ এই এক এক বিষয়ে তাহাদের অনন্যসাধারণ নৈপুণ্য ছিল। এই লোকাতীত চতুরতা লোকপরম্পরায় তত্রত্য নরপতির কর্ণগোচর হইলে তিনি তাহাদের তত্তদ্গুণের পরীক্ষার্থে অত্যন্ত কৌতূহলাবিষ্ট হইলেন এবং উভয়কে নিজরাজধানীতে আনাইয়া জিজ্ঞাসিলেন তোমরা কে কোন্ বিষয়ে চতুর।
তদনুসারে তাহারা আপন আপন পরিচয় প্রদান করিলে রাজা প্রথমতঃ ভোজনবিলাসীর পরীক্ষার্থে পাচক ব্রাহ্মণকে ডাকাইয়া নানাবিধ সুরস অন্ন ব্যঞ্জন প্রভৃতি প্রস্তুত করিতে আদেশ দিলেন। পাচক রাজাজ্ঞা অনুসারে সাতিশয় যত্ন সহকারে চর্ব্ব্য চূষ্য লেহ্য পেয় প্রভৃতি ভক্ষ্য দ্রব্য প্রস্তুত করিয়া ভূপতিসমীপে সংবাদ করিল। রাজা ভোজনবিলাসীকে সেই সমস্ত ভক্ষণ করিবার আদেশ করিলে সে ভোজনস্থানে উপস্থিত হইল এবং আসনে উপবেশনমাত্র গাত্রোত্থান করিয়া রাজসমীপে প্রত্যাগমন করিল।
রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন কেমন পর্য্যাপ্ত ভোজন হইয়াছে। সে কহিল না মহারাজ আমার ভোজন করা হয় নাই। রাজা জিজ্ঞাসিলেন কেন। সে কহিল মহারাজ অন্নে শবগন্ধ নির্গত হইতেছে বোধ করি শ্মশানসন্নিহিতক্ষেত্রজাত ধান্যের তণ্ডুল পাক করিয়াছিল। রাজা শুনিয়া উন্মত্তপ্রলাপবৎ অসঙ্গত বোধ করিয়া কিঞ্চিৎ হাস্য করিলেন এবং এই ব্যাপার গোপনে রাখিয়া ভাণ্ডারীকে ডাকাইয়া সেই তণ্ডুলের বিষয়ে অনুসন্ধান করিতে আজ্ঞা দিলেন। ভাণ্ডারী সমস্ত বিষয়ের সবিশেষ অনুসন্ধান করিয়া নরপতিগোচরে আসিয়া নিবেদন করিল মহারাজ অমুক গ্রামের শ্মশানসন্নিহিতক্ষেত্রজাত ধান্যে ঐ তণ্ডুল প্রস্তুত হইয়াছিল। রাজা শুনিয়া অত্যন্ত চমৎকৃত হইলেন এবং ভোজনবিলাসীর অশেষ প্রশংসা করিয়া কহিলেন তুমি যথার্থ ভোজনবিলাসী বট।
অনন্তর এক সুশোভিত শয়নাগারে দুগ্ধফেননিভ পরম রমণীয় শয্যা প্রস্তুত করাইয়া শয্যাবিলাসীকে শয়ন করিতে আজ্ঞা দিলেন। সে কিয়ৎ ক্ষণ শয়ন করিয়া রাজসমীপে আসিয়া নিবেদন করিল মহারাজ ঐ শয্যার সপ্তম তলে এক ক্ষুদ্র কেশ পতিত আছে তাহা আমার অতিশয় ক্লেশকর হইতে লাগিল এজন্য শয়ন করিতে পারিলাম না। রাজা শুনিয়া অতিশয় চমৎকৃত হইলেন এবং স্বয়ং শয়নাগারে প্রবেশ করিয়া অন্বেষিয়া দেখিলেন শয্যার সপ্তম তলে যথার্থই এক কেশ পতিত আছে। তখন তাহার প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন এবং বারংবার প্রশংসা করিয়া কহিলেন তুমি যথার্থ শয্যাবিলাসী বট। অনন্তর তাহাদের দুই জনকে যথোচিত পারিতোষিক প্রদানপূর্ব্বক বিদায় করিলেন।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ উভয়ের মধ্যে কোন্ জন অধিক প্রশংসনীয়। রাজা কহিলেন আমার মতে শয্যাবিলাসী।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
দশম উপাখ্যান
দশম উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
গৌড়দেশে বর্দ্ধমান নামে এক নগর আছে। তথায় গুণশেখর নামে অশেষগুণসম্পন্ন নরপতি ছিলেন। তাঁহার প্রধান অমাত্য অভয়চন্দ্র বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী ছিল। নরপতিও তদীয় উপদেশের বশবর্ত্তী হইয়া ক্রমে ক্রমে তদ্ধর্ম্মাক্রান্ত হইলেন এবং শিবপূজা বিষ্ণুপূজা গোদান ভূমিদান পিতৃকৃত্য প্রভৃতি ক্রিয়া স্বয়ং সমস্ত পরিত্যাগ করিয়া মন্ত্রিপ্রধান অভরচন্দ্রের প্রতি আদেশ করিলেন আমার রাজ্যমধ্যে যেন এই সমস্ত অবৈধ ব্যাপার প্রচলিত না থাকে।
সর্ব্বাধিকারী রাজাজ্ঞাপ্রাপ্তিমাত্র রাজ্যমধ্যে এই ঘোষণা প্রদান করিল যদি অতঃপর কোন ব্যক্তি এই সকল রাজনিষিদ্ধ কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে রাজা তাহার সর্ব্বস্বাপহরণ ও নির্বাসনরূপ দণ্ড বিধান করিবেন। প্রজারা কুলক্রমাগতধর্ম্মপরিত্যাগে অনিচ্ছু ও রাজার প্রতি মনে মনে অসন্তুষ্ট হইয়াও দণ্ডভয়ে প্রকাশ্য রূপে তদনুষ্ঠানে বিরত হইল। এক দিবস অভয়চন্দ্র রাজার নিকট নিবেদন করিল মহারাজ সংক্ষেপে ধর্ম্মশাস্ত্রের মর্ম্ম প্রকাশ করিতেছি শ্রবণ করুন। যদি কোন ব্যক্তি কাহারও প্রাণহিংসা করে তবে সে জন্মান্তরে ঐ ব্যক্তির প্রানহন্তা হয়। এই উৎকট হিংসাপাপের প্রবলতা প্রযুক্তই মানবজাতি সংসারে আসিয়া জন্মমৃত্যুপরম্পরারূপ দুর্ভেদ্য শৃঙ্খলে বদ্ধ থাকে। এই নিমিত্তই শাস্ত্রকারেরা নিরূপণ করিয়াছেন অহিংসা মনুষ্যের প্রধান ধর্ম্ম। মহারাজ দেখুন হরিহর বিরিঞ্চি প্রভৃতি প্রধান দেবতারাও কেবল কর্ম্মদোষে সংসারে আসিয়া বারংবার অবতার হইতেছেন। অতএব অতি প্রবল জন্তু হস্তী অবধি অতি ক্ষুদ্র কীট পর্য্যন্ত প্রত্যেক জীবের প্রাণরক্ষা করা প্রধান ও পবিত্র ধর্ম্ম।
আর বিবেচনা করিয়া দেখুন মনুষ্যেরা যে পরমাংস দ্বারা আপন মাংস বৃদ্ধি করে ইহা অপেক্ষা গুরুতর অধর্ম্ম আর আছে। এবংবিধ ব্যক্তিরা দেহান্তে নরকগামী হইয়া অশেষপ্রকার যন্ত্রণা ভোগ করে। বিশেষতঃ যে ব্যক্তি স্বদৃষ্টান্ত অনুসারে অন্যের দুঃখ বিবেচনা না করিয়া প্রাণহিংসাপূর্ব্বক মাংসভক্ষণাদি দ্বারা আত্মসুখ সম্পন্ন করে সে রাক্ষস তাহার আয়ু বিদ্যা বল বিত্ত যশ প্রভৃতি হ্রাস প্রাপ্ত হয় এবং সে কাণ খঞ্জ কুব্জ মূক অন্ধ পঙ্গু বধির রূপে পুনঃ পুনঃ জন্মগ্রহণ করে। আর সুরাপান অপেক্ষা গুরুতর পাপ আর নাই। অতএব জীবহিংসা ও সুরাপান সর্ব্ব প্রষত্নে পরিত্যাগ করা উচিত।
ইত্যাদি অশেষপ্রকার উপদেশ দ্বারা অভয়চন্দ্র বৌদ্ধধর্ম্মে রাজার এরূপ শ্রদ্ধা ও অনুরাগ জন্মাইল যে যে ব্যক্তি তাঁহার সমক্ষে ঐ ধর্ম্মের প্রশংসা করিত সে অশেষ প্রকারে রাজপ্রসাদভাজন হইত। ফলতঃ রাজা সবিশেষ অনুরাগ ও ভক্তিযোগ সহকারে রাজ্যমধ্যে স্বাবলম্বিত অভিনব ধর্ম্মের বহুল প্রচার করিলেন।
কালক্রমে রাজার লোকান্তরপ্রাপ্তি হইলে তাঁহার পুত্ত্র ধর্ম্মধ্বজ পৈতৃক সিংহাসনে আরোহণ করিলেন। তিনি সনাতন বেদশাস্ত্রের অনুবর্ত্তী হইয়া বৌদ্ধদিগের যথোচিত তিরস্কার ও নানাপ্রকার দণ্ড করিতে লাগিলেন পিতৃপ্রিয়পাত্র প্রধান মন্ত্রীকে শিরোমুণ্ডনপূর্ব্বক গর্দ্দভে আরোহণ ও নগরপ্রদক্ষিণ করাইয়া দেশবহিষ্কৃত করিলেন এবং বৌদ্ধধর্ম্মের সমূলে উন্মূলন করিয়া বেদোদিত সনাতন ধর্ম্মের পুনঃস্থাপনে অশেষপ্রকার যত্ন ও প্রয়াস করিতে লাগিলেন।
কিয়ৎ দিন পরে ঋতুরাজ বসন্তের সমাগমে রাজা ধর্ম্মধ্বজ মহিষীত্রয় সমভিব্যাহারে উপবনবিহারে গমন করিলেন। সেই উপবনে সুশোভন এক সরোবর ছিল। রাজা তাহাতে কমল-সকল প্রফুল্ল দেখিয়া স্বয়ং জলাবতরণপূর্ব্বক কতিপর পুষ্প লইয়া তীরে আসিয়া এক মহিষীর হস্তে প্রদান করিলেন। দৈবযোগে এক পদ্ম হস্ত হইতে ভ্রষ্ট হইয়া সেই মহিষীর পদোপরি পতিত হওয়াতে তৎপ্রহার দ্বারা তাহার সেই পদ ভগ্ন হইল। তখন রাজা হা হতোঽস্মি বলিয়া অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়া প্রতীকারচেষ্টা করিতে লাগিলেন।
সায়ংকাল উপস্থিত হইল এবং সুধাকরের উদয় হইবামাত্র তদীয় অমৃতময় সুশীতল করস্পর্শে দ্বিতীয়া মহিষীর গাত্র স্থানে স্থানে দগ্ধ হইয়া গেল। আর তৎকালে অকস্মাৎ এক গৃহস্থের ভবনে উদূখলের শব্দ হওয়াতে তৎশ্রবণে তৃতীয়া মহিষীর শিরোবেদনা ও তদুপলক্ষে মূর্চ্ছা হইল।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসিল মহারাজ উহাদিগের মধ্যে কোন্ কুমারী অধিক সুকুমারী। রাজা কহিলেন সুধাংশুকিরণস্পর্শে যাহার গাত্র দগ্ধ হইল আমার মতে সেই সর্ব্বাপেক্ষা সুকুমারী।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
দ্বাদশ উপাখ্যান
দ্বাদশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
চূড়াপুরে দেবস্বামী নামে এক ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিনি রূপে রতিপতি বিদ্যায় বৃহস্পতি ও ঐশ্বর্য্যে ধনপতি ছিলেন। কিয়ৎ দিন পরে দেবস্বামী লাবণ্যবতী নামে এক গুণবতী ব্রাহ্মণকন্যাকে বিবাহ করিয়া আনিলেন। ঐ কন্যা রূপলাবণ্যে ভুবনবিখ্যাত ছিল। উভয়ে প্রণয়ে কালষাপন করিতে লাগিলেন।
একদা বিপ্রদম্পতী গ্রীষ্মের প্রাদুর্ভাব প্রযুক্ত অট্টালিকার উপরিভাগে শয়ন করিয়া নিদ্রা যাইতেছিলেন। সেই সময়ে এক গন্ধর্ব্ব বিমানারোহণে আকাশপথে ভ্রমণ করিতেছিল। দৈবযোগে বিপ্রকামিনীর প্রতি দৃষ্টিপাত হওয়াতে সে তাহার রূপে মোহিত হইল এবং বিমান কিঞ্চিৎ অবতীর্ণ করিয়া নিদ্রাম্বিতা লাবণ্যবতীকে লইয়া পলায়ন করিল।
কিয়ৎ ক্ষণ বিলম্বে নিদ্রাভঙ্গ হইলে দেবস্বামী স্বীয় প্রেয়সীকে পার্শ্ববর্ত্তিনী না দেখিয়া অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়া ইতস্ততঃ বিস্তর অন্বেষণ করিতে লাগিলেন কিন্তু কোন সন্ধান না পাইয়া সাতিশয় বিষণ্ণ ভাবে নিশা যাপন করিলেন। পর দিন প্রভাত হইবামাত্র তিনি অতিমাত্র ব্যগ্র ও চিন্তাকুল চিত্তে পুনরায় বিশেষ করিয়া অশেষপ্রকার অনুসন্ধান করিলেন। পরিশেষে নিতান্ত নিরাশ্বাস ও উন্মত্তপ্রায় হইয়া সংসারাশ্রম পরিত্যাগপূর্ব্বক সন্ন্যাসীর বেশে দেশে দেশে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।
এক দিবস দেবস্বামী দিবা দ্বিপ্রহরের সময় অতিশয় ক্ষুধার্ত্ত হইয়া এক ব্রাহ্মণের আলয়ে অতিথি হইলেন এবং কহিলেন আমি ক্ষুধায় অত্যন্ত কাতর হইয়াছি কিছু ভোজনীয় দ্রব্য দিয়া আমার প্রাণরক্ষা কর। গৃহস্থ ব্রাহ্মণ তৎক্ষণাৎ এক পাত্র দুগ্ধে পরিপূর্ণ করিয়া অতিথি ব্রাহ্মণের হস্তে ভক্ষণার্থে সমর্পণ করিলেন। গৃহস্থ ব্রাহ্মণের গ্রহবৈগুণ্য প্রযুক্ত পূর্ব্বে এক কৃঞ্চসর্প ঐ দুগ্ধে মুখার্পণ করাতে তাহা অত্যন্ত বিষাক্ত হইয়া ছিল। পান করিবামাত্র সেই বিষ সর্ব্বাঙ্গব্যাপী হইয়া অতিথি ব্রাহ্মণকে ক্রমে ক্রমে কাতর ও অচেতন করিতে লাগিল। তখন তিনি গৃহস্থ ব্রাহ্মণকে তুমি বিষভ ক্ষণ করাইয়া ব্রহ্মহত্যা করিলে ইহা কহিয়া ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন। ব্রাহ্মণ অকস্মাৎ ব্রহ্মহত্যা দেখিয়া অত্যন্ত বিষণ্ণ হইলেন এবং বাটীর মধ্যে প্রবেশিয়া আপন পত্নীকে তুই দুগ্ধ বিষ মিশ্রিত করিয়া রাখিয়াছিলি তাহাতেই ব্রহ্মহত্যা হইল তুই অতি দুর্বৃত্তা আর ভোর মুখাবলোকন করিব না ইত্যাদি নানাপ্রকার তিরস্কার ও বহু প্রহার করিয়া গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিলেন।
ইহা কহিয়া বেতাল বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এই স্থলে কোন্ ব্যক্তি দোষভাগী হইবেক। রাজা কহিলেন সর্পের মুখে স্বাভাবিক বিষ থাকে সুতরাং সে দোষী হইতে পারে না। আর গৃহস্থ ব্রাহ্মণ ও তাঁহার ব্রাহ্মণী সেই দুগ্ধকে বিষাক্ত বলিয়া জানিতেন না সুতরাং তাঁহারাও ব্রহ্মহত্যাপাপে লিপ্ত হইবেন না। আর অতিধি ব্রাহ্মণ সবিশেষ না জানিয়া পান করিয়াছেন অতএব তিনিও আত্মঘাতী নহেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ যে সবিশেষ অনুসন্ধান না করিয়া অকারণে নিরপরাধা সহধর্ম্মিণীকে পরিত্যাগ করিলেন তাহাতে তিনি অকারণপরিত্যাজন্য দুরদৃষ্টভাগী হইবেন।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইতাদি।
দ্বাবিংশ উপাখ্যান
দ্বাবিংশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
বিশ্বপুর নগরে নারায়ণ নামে ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিনি এক দিন মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন এক্ষণে বার্দ্ধক্যবশতঃ আমার শরীর শীর্ণ ও ইন্দ্রিয় সকল জীর্ণ হইয়াছে কিন্তু ভোগাভিলাষ পূর্ব্বাপেক্ষা প্রদীপ্ত হইতেছে। আমি পরকলেবরপ্রবেশনী বিদ্যা জানি। অতএব এই জরাজীর্ণ ভোগাক্ষম শীর্ণ শরীর পরিত্যাগ করিয়া কোন যুবশরীরে প্রবিষ্ট হই তাহা হইলে আর কিছু কাল অনায়াসে অভিলাষানুরূপ সুখ সম্ভোগ করিতে পারিব। কিন্তু সহসা এই দেহ ত্যাগ করিয়া দেহান্তরে প্রবেশ করিলে আমার এই অভিপ্রায়ের প্রকাশসম্ভাবনা। অতএব প্রথমতঃ যোগাভ্যাসচ্ছলে পরিবারের নিকট বিদায় লইয়া বনপ্রবেশ করি পরে তথা হইতে আপন অভিপ্রায় সম্পন্ন করিব। নারায়ণ মনে মনে এইরূপ সঙ্কল্প করিয়া পুত্ত্র পৌত্ত্র দুহিতৃ দৌহিত্র কলত্র আদি সমস্ত পরিবার একত্র করিয়া তাঁহাদের সম্মুখে কহিতে লাগিলেন দেখ আমি এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত সংসারাশ্রমে বদ্ধ থাকিরা বিষয়বাসনায় আসক্ত হইয়া কালযাপন করিলাম। এক দিন এক মুহূর্ত্তের নিমিত্তেও পর কালের হিতচিন্তা করি নাই। এক্ষণে আমার শেষ দশা উপস্থিত। অতএব অভিলাষ করিয়াছি অরণ্য প্রবেশপূর্ব্বক যোগাভ্যাস দ্বারা তনুত্যাগ করিব। ফলতঃ আর আমার এক ক্ষণের নিমিত্তেও এই মায়াময় অকিঞ্চিৎকর সংসারে লিপ্ত থাকিতে বাসনা নাই। এক্ষণে তোমরা ঐকমত্য অবলম্বনপূর্ব্বক অনুমতি কর নির্মমও নিঃসঙ্গ হইয়া মোক্ষপথের পথিক হই।
নারায়ণ এইরূপ কপটবাক্যে পরিবারে নিকট বিদায় লইয়া বনপ্রস্থান করিল। পরে তথায় বৃদ্ধ দেহ পরিত্যাগ করিয়া অন্য এক যুবশরীরে প্রবেশপূর্ব্বক বিষয়াভিলাষ পূর্ণ করিতে লাগিল। কিন্তু মহারাজ সে পূর্ব্বদেহপরিত্যাগের অব্যবহিত পূর্ব্ব ক্ষণে রোদন করিয়া পরদেহপ্রবেশকালে বিকসিত আস্যে হাস্য করিয়াছিল। অতএব জিজ্ঞাসা করি ইহার রেদিন ও হাস্যের কারণ কি। রাজা বিক্রমাদিত্য কহিলেন শুন বেতাল পূর্ব্ব কলেবর পরিত্যাগ করিলেই বহু কালের বহু যত্নের পরিবারের সহিত আর কোন সম্বন্ধ থাকিল না এই মমতায় মুগ্ধ হইয়া রোদন করিয়াছিল। আর পরশরীরপ্রবেশ সম্পন্ন হওয়াতেই ভোগপথ অকণ্টক হইল তাহাতেই আহ্লাদিত হইয়া হাস্য করিয়াছিল।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
দ্বিতীয় উপাখ্যান
দ্বিতীয় উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ দ্বিতীয় উপাখ্যান আরম্ভ করি অবধান কর।
যমুনাতীরে ধর্ম্মস্থল নামে এক নগর আছে। তথায় কেশব নামে এক পরম ধার্ম্মিক ব্রাহ্মণ ছিলেন। ঐ ব্রাহ্মণের মধুমালতী নামে এক পরমসুন্দরী দুহিতা ছিল। কালক্রমে মধুমালতী বিবাহযোগ্যা হইলে তাহার পিতা ও ভ্রাতা উভয়ে উপযুক্ত পাত্র অন্বেষণে তৎপর হইলেন।
কিয়ৎ দিন পরে ব্রাহ্মণ যজমানপুত্ত্রের বিবাহোপলক্ষে গ্রামান্তরে গমন করিলেন। ব্রাহ্মণের পুত্ত্রও অধ্যয়নের নিমিত্ত গুরুগৃহে প্রস্থান করিলেন। দৈবযোগে সেই সময়ে এক সুকুমার ব্রাহ্মণকুমার কেশবের গৃহে অতিথি হইলেন। কেশবের ব্রাহ্মণী তাহাকে রূপে রতিপতি ও বিদ্যায় বৃহস্পতি দেখিয়া মনে মনে বাসনা করিলেন যদি সৎকুলোদ্ভব হয় ও অঙ্গীকার করে তবে ইহাকেই জামাতা করিব। অনন্তর যথোচিত অতিথিসৎকার করিয়া তাহার কুলের পরিচয় লইলেন এবং সৎকুলজাত জানিয়া আনন্দিত হইয়া কহিলেন বৎস যদি তুমি স্বীকার কর তোমার সহিত আমার মধুমালতীর বিবাহ দি। বিপ্রতনয় মধুমালতীর লোকাতীত লাবণ্য দর্শনে মুগ্ধ হইয়া বিপ্রপত্নীর প্রস্তাবে সম্মত হইলেন এবং ব্রাহ্মণের প্রত্যাগমনপ্রতীক্ষায় তদীয় আবাসে বাস করিতে লাগিলেন।
কতিপয় দিবসের পর ব্রাহ্মণ ও তাঁহার পুত্ত্র উভয়ে মধুমালতীপ্রদানে সত্যবন্ধ করিয়া এক এক পাত্র লইয়া প্রবাস হইতে প্রত্যাগমন করিলেন। তিন পাত্র একত্র হইল। একের নাম ত্রিবিক্রম দ্বিতীয়ের নাম বামন তৃতীয়ের নাম মধুসূদন। তিন জনই রূপ গুণ বিদ্যা বয়ঃক্রমে তুল্য কোন ক্রমেই ইতর বিশেষ করিতে পারা যায় না। তখন ব্রাহ্মণ অত্যন্ত বিপদ্গ্রস্ত হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন এক কন্যা তিন বর উপস্থিত, কি উপায় করি। তিন জনেই তিন জনের নিকট প্রতিশ্রুত হইয়াছি। এক্ষণকার কর্ত্তব্য কি।
ব্রাহ্মণ এইপ্রকার চিন্তা করিতেছেন এমন সময়ে ব্রহ্মাণী আসিয়া কহিলেন তুমি এখানে নিশ্চিন্ত বলিয়া কি ভাবিতেছ সর্পাঘাতে মধুমালতী প্রাণত্যাগ করিল। তখন কেশবশর্ম্মা ব্যস্ত সমস্ত হইয়া চারি পাঁচ জন বিষবৈদ্য আনাইয়া অযেশপ্রকার চিকিৎসা করাইলেন। কিন্তু কোন প্রকারেই প্রতীকার দর্শিল না। বিষবৈদ্যেরা কহিল মহাশয় আপনকার কন্যাকে কালে দংশন করিয়াছে এবং বার তিথি নক্ষত্র সমুদায়ের দোষ পাইয়াছে। স্বয়ং ধন্বন্তরি উপস্থিত হইলেও ইহাকে বাঁচাইতে পারিবেন না। এক্ষণকার যাহা কর্ত্তব্য থাকে করুন আমরা বিদায় হই। এই বলিয়া প্রণাম করিয়া বিষবৈদ্যেরা প্রস্থান করিল।
কিয়ং ক্ষণ পরেই মধুমালতীর প্রাণত্যাগ হইল। তখন ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণের পুত্ত্র এবং তিন বর পাঁচ জন একত্র হইয়া তদীয় মৃত দেহ শ্মশানে লইয়া গিয়া যথাবিধি দাহক্রিয়া করিলেন। ব্রাহ্মণ পুত্ত্র সহিত গৃহে আসিয়া নানাবিধ বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন। বরেরা তিন জনেই এইরূপ অসুলভরূপনিধান কন্যানিধান লাভে হতাশ হইয়া বৈরাগ্য লইলেন। তন্মধ্যে ত্রিবিক্রম চিতা হইতে সমুদয় অস্থি সঞ্চয়ন করিলেন এবং বস্ত্রখণ্ডে বন্ধনপূর্ব্বক কক্ষে নিক্ষিপ্ত করিয়া দেশে দেশে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। বামন সন্ন্যাসী হইয়া তীর্থযাত্রা করিলেন। তৃতীয় মধুসূদন সেই শ্মশানের প্রান্ত ভাগে এক পর্ণশালা নির্মাণ করিয়া তাহার এক কোণে মধুমালতীর রাশীকৃত দেহভস্ম রাখিয়া যোগ সাধন করিতে লাগিলেন।
এক দিবস বামন ভ্রমণ করিতে করিতে মধ্যাহ্ন কালে এক ব্রাহ্মণের আলয়ে উপস্থিত হইলেন। ব্রাহ্মণ ভোজনকালে সন্ন্যাসী উপস্থিত দেখিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া কহিলেন মহাশয় যদি কৃপা করিয়া দীনের ভবনে পদার্পণ করিয়াছেন তবে অনুগ্রহপূর্ব্বক ভিক্ষা স্বীকার করিলে চরিতার্থ হই পাকের অধিক বিলম্ব নাই। সন্ন্যাসী সম্মত হইলেন এবং পাকান্তে ভোজনে বসিলেন। ব্রাহ্মণী পরিবেশন করিতে লাগিলেন। এই অবসরে ব্রাহ্মণের পঞ্চমবর্ষীয় নিতান্ত অশান্ত ভাবে উৎপাত আরম্ভ করিয়া পরিবেশনের ব্যাঘাত জন্মাইতে লাগিল। ব্রাহ্মণী নানা প্রকারে সান্ত্বনা করিলেন বালক কোন ক্রমেই প্রবোধ মানিলেক না। তখন তিনি ক্রোধভরে পুত্ত্রকে প্রজ্বলিতহুতাশনপূর্ণ চুল্লীতে নিক্ষেপ করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া পরিবেশন করিতে লাগিলেন।
সন্ন্যাসী ব্রাহ্মণীর এইরূপ বিরূপ আচরণ দেখিয়া নারায়ণ নারায়ণ বলিয়া তৎক্ষণাৎ ভোজনপাত্র হইতে হস্ত উত্তোলন করিলেন। ব্রাহ্মণ কহিলেন মহাশয় অকস্মাৎ ভোজনে বিরত হইলেন কেন। সন্ন্যাসী কহিলেন যে স্থানে এরূপ রাক্ষসের ব্যবহার তথায় কি প্রকারে ভোজন করিতে প্রবৃত্তি হয়। ব্রাহ্মণ কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া তৎক্ষণাৎ গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং সঞ্জীবনী বিদ্যার পুস্তক বহির্গত করিয়া তন্মধ্য হইতে এক মন্ত্র লইয়া জপ করিতে লাগিলেন। পুত্ত্র প্রাণদান পাইয়া পূর্ব্ববং উৎপাত আরম্ভ করিল। তখন সন্ন্যাসী চমৎকৃত হইয়া ভোজন সমাপন করিলেন এবং মনে মনে এই চিন্তা করিতে লাগিলেন যদি কোন উপায়ে পুস্তকখানি হস্তগত হয় তবে প্রিয়াকে পুনর্জীবিত করিতে পারি। যাহা হউক পুস্তক হস্তগত করিবার চেষ্টা দেখা আবশ্যক।
মনে মনে এইরূপ কল্পনা করিয়া ব্রাহ্মণকে কহিলেন অদ্য অপরাহ্ণ হইল অতএব আর স্থানান্তরে না গিয়া তোমার ভবনেই রাত্রিকাল অবস্থান করিব। গৃহস্থ ব্রাহ্মণ সমাদরপূর্ব্বক এক স্বতন্ত্র স্থান নির্দিষ্ট করিয়া দিলেন। রজনী উপস্থিত হইল। সমুদয় গৃহস্থ ভোজনাবসানে স্ব স্ব নির্দিষ্ট স্থানে গিয়া শয়ন করিল। সকলে নিদ্রাভিভূত হইলে বামন নিঃশব্দ পদসঞ্চারে গৃহপ্রবেশপূর্ব্বক সঞ্জীবনী বিদ্যার পুস্তক হস্তগত করিয়া প্রস্থান করিলেন এবং কতিপয় দিবসের মধ্যেই সেই শ্মশানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন মধুসূদন স্বহস্তনির্মিত পর্ণকুটীরে যোগসাধন করিতেছেন। এই অবসরে দৈবযোগে ত্রিবিক্রমও তথায় উপস্থিত হইলেন।
এই রূপে তিন জন একত্র হইলে পর বামন কহিলেন আমি মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা শিখিয়াছি। তোমরা অস্থি ও ভস্ম একত্র কর আমি প্রিয়াকে প্রাণদান দিব। তাঁহারা মহাব্যস্ত হইয়া অস্থি ও ভস্ম একত্রে করিলেন। বামন পুস্তক হইতে মৃতসঞ্জীবন মন্ত্র বহির্গত করিয়া জপ করিতে লাগিলেন। মন্ত্রপ্রভাবে কন্যা তৎক্ষণাৎ প্রাণদান পাইল। তখন তাঁহারা মধুমালতীর রূপ লাবণ্যের মাধুরী দর্শনে মুগ্ধ হইয়া এই কামিনী আমার আমার বলিয়া পরস্পর বিরোধ করিতে লাগিলেন।
ইহা কহিয়া বেতাল বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এই তিনের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি মধুমালতীর পাণিগ্রহণে যথার্থ অধিকারী হইতে পারে। রাজা কহিলেন যে ব্যক্তি কুটীর নির্মাণ করিয়া এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত শ্মশানবাসী হইয়াছিল শাস্ত্রানুসারে সেই এই কামিনীর পাণিগ্রহণাধিকারী। বেতাল কহিল যদি ত্রিবিক্রম অস্থিসঞ্চয়ন না করিত এবং বামন নানা দেশে ভ্রমণ করিয়া সঞ্জীবনী বিদ্যা সংগ্রহ করিতে না পারিত তবে কি প্রকারে ঐ কন্যা জীবনদান পাইত। রাজা কহিলেন যাহা কহিতেছ যথার্থ বটে কিন্তু ত্রিবিক্রম অস্থিসঞ্চয়ন দ্বারা ঐ কন্যার পুত্ত্রস্থানীয় হইয়াছে আর বাসন জীবনদান দ্বারা তাহার পিতৃকল্প হইয়াছে সুতরাং তাহারা এই কন্যার প্রণয়ভাজন হইতে পারে না। কিন্তু মধুসূদন ভস্মরাশি সংগ্রহ ও উটজ নির্মাণপূর্ব্বক শ্মশানবাসী হইয়া যথার্থ প্রণয়ীর কর্ম্ম করিয়াছে। অতএব সেই ব্যক্তিই এই প্রমদার পতি হইতে পারে।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
নবম উপাখ্যান
নবম উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
মগধপুর নামে এক নগর আছে। তথায় বীরবর নামে রাজা ছিলেন। হিরণ্যদত্ত নামে বণিক্ তাঁহার অধিকারে বাস করিত। ঐ বণিকের মদনসেনা নামে এক পরম সুন্দরী কন্যা ছিল। ঋতুরাজ বসন্ত সমাগত হইলে মদনসেনা স্বীয় সহচরীবর্গ সমভিব্যাহারে করিয়া উপবনভ্রমণে গমন করিল। দৈবযোগে ধর্ম্মদত্ত বণিকের পুত্ত্র সোমদত্তও বনবিহারবাসনায় সেই উপবনে উপস্থিত হইল। সে কিয়ৎ ক্ষণ ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিয়া দূর হইতে দর্শন করিল এক পরম সুন্দরী পূর্ণযৌবনা কামিনী সখীগণ সহিত ভ্রমণ করিতেছে। ক্রমে ক্রমে নিকটবর্ত্তী হইয়া মদনসেনার অসামান্য রূপলাবণ্য নয়নগোচর করিয়া মোহিত হইল এবং নিতান্ত অধৈর্য্য হইয়া তাহার নিকটে গিয়া কহিল সুন্দরি তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন হও আমি নিতান্ত বিচেতন হইয়াছি। অধিক কি কহিব যদি তুমি অনুকুল না হও তোমার সমক্ষে আত্মঘাতী হইব। মদনসেনা শুনিয়া অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়া সোমদত্তকে অশেষপ্রকার সদুপদেশ প্রদান করিল কিন্তু কোন প্রকারেই তাহাকে প্রকৃতিস্থ করিতে পারিল না। বরং সোমদত্ত পূর্ব্বাপেক্ষা অধিক অধৈর্য্য ও ব্যাকুল হইয়া অঞ্জলি বদ্ধ করিয়া অশ্রুমুখে সম্মুখে দণ্ডায়মান রহিল। তখন মদনসেনা উদারস্বভাবতা প্রযুক্ত পরের প্রাণ রক্ষা করা প্রধান ধর্ম্ম বোধ করিয়া কহিল আগামী পঞ্চম দিবসে আমার বিবাহ হইবেক তৎপরে শ্বশুরালয়ে যাইব। প্রতিজ্ঞা করিতেছি অগ্রে তোমার সহিত সাক্ষাৎ না করিয়া স্বামিসেবায় প্রবৃত্ত হইব না। তুমি এক্ষণে ক্ষান্ত হও গৃহে গমন কর। সোমদত্ত মদনসেনার বাক্যে আশ্বাসিত হইয়া বিশ্বসিত মনে গৃহে গমন করিল।
তৎপরে পঞ্চম দিবসে পরিণীতা হইয়া মদনসেনা শ্বশুরালয়ে গমন করিল। রজনী উপস্থিত হইলে গৃহজনেরা তাহাকে শয়নাগারে প্রেরণ করিল। সে সর্ব্বাঙ্গ বস্ত্রাবৃত করিয়া মৌনাবলম্বনপূর্ব্বক শয্যার এক পার্শ্বে উপবিষ্টা রহিল। তাহার স্বামী পরম সমাদরে কর গ্রহণপূর্ব্বক প্রিয়সম্ভাষণ করিতে লাগিল। কিন্তু মদনসেনা তৎকালোচিত নবোঢ়াচেষ্টিত সমুদায়ের বৈপরীত্যে সোমদত্তের বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া কহিল যদি তুমি আমাকে তাহার নিকটে যাইতে অনুমতি না দাও আমি আত্মহত্যা করিব। তাহার স্বামী প্রথমতঃ বিস্তর নিষেধ করিল কিন্তু তাহার আগ্রহাতিশয় দেখিয়া কহিল যদি তুমি নিতান্তই তাহার নিকটে যাইতে চাও যাও আমি নিষেধ করিতে পারি না। প্রতিজ্ঞাপরিপূর্ণ অবশ্যকর্ত্তব্য বটে।
মদনসেনা এই রূপে স্বামীর সম্মতি লাভ করিয়া অর্দ্ধরাত্র সময়ে একাকিনী সোমদত্তের উদ্দেশে চলিল। রাজপথে উপস্থিত হইলে এক তস্কর তাহার সম্মুখে আসিয়া জিজ্ঞাসিল সুন্দরি তুমি কে এবং সর্ব্বাঙ্গে সর্ব্বপ্রকার অলঙ্কার ধারণ করিয়া এ ঘোর রজনীতে কোথায় যাইতেছ। তোমাকে একাকিনী দেখিতেছি অথচ তোমার অন্তঃকরণে ভয়সঞ্চার লক্ষিত হইতেছে না। মদনসেনা কহিল আমি হিরণ্যদত্ত শ্রেষ্ঠীর কন্যা আমার নাম মদনসেনা প্রতিজ্ঞাপ্রতিপালনার্থে সোমদত্তের নিকট যাইতেছি।
চোর শুনিয়া কিঞ্চিৎ হাস্য করিয়া তাহার গাত্র হইতে অলঙ্কারগ্রহণের উদ্যম করিলে মদনসেনা শঙ্কিত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে পূর্ব্বাপর বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া কহিল ভ্রাতঃ আমি অনেক যত্নে স্বামীকে সম্মত করিয়া তাঁহার অনুমতি লইয়া এই প্রতিজ্ঞাতার হইতে মুক্ত হইবার উপায় করিয়াছি। তুমি আমার বেশ ভঙ্গ করিয়া প্রতিবন্ধকতাচরণ করিও না। এই স্থানে অবস্থিতি কর প্রতিজ্ঞা করিতেছি প্রত্যাগমনসময়ে সমস্ত অলঙ্কার তোমার হস্তে সমর্পণ করিয়া যাইব। চোর মদনসেনার বাক্যে বিশ্বাস করিয়া তাহাকে ছাড়িয়া দিল এবং সেই স্থানে উপবিষ্ট হইয়া অলঙ্কারপ্রত্যাশায় প্রত্যাগমনপ্রতীক্ষা করিতে লাগিল।
মদনসেনা সোমদত্তের শয়নাগারে প্রবেশ করিয়া তাহাকে সুপ্ত দেখিয়া জাগরিত করিল। সোমদত্ত মদনসেনার অসম্ভাবিত সমাগমে বিস্ময়াপন্ন হইয়া জিজ্ঞাসা করিল তুমি এই ঘোর রজনীতে একাকিনী কি প্রকারে কোথা হইতে উপস্থিত হইলে। মদনসেনা কহিল বিবাহের পর শ্বশুরালয়ে গিয়াছি তথা হইতে আসিতেছি। কয়েক দিবস হইল উপবনবিহারকালে তোমার নিকট যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম তৎপ্রতিপালনার্থে উপস্থিত হইয়াছি, এক্ষণে তোমার ইচ্ছা বলবতী। সোমদত্ত জিজ্ঞাসিল তোমার পতির নিকটে এই বৃত্তান্ত ব্যক্ত করিয়াছ কি না। সে উত্তর দিল তাঁহার নিকটে সমস্ত অবিকল বর্ণন করিলাম তিনি শুনিয়া ও বিবেচনা করিয়া কিঞ্চিৎ কাল পরে অনুমতি করিলেন তৎপরে তোমার নিকটে আসিয়াছি।
সোমদত্ত কিয়ৎ ক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিল আমি পরকীয় মহিলার অঙ্গস্পর্শ করিব না শাস্ত্রে তদ্বিষয়ে অনেক অধর্ম্ম নির্দেশ আছে। যাহা হউক তোমার বাক্যনিষ্ঠায় ও তোমার পতির ভদ্রতায় অতিশয় প্রীত হইলাম। অকপট হৃদয়ে কহিতেছি তুমি প্রতিজ্ঞাতার হইতে মুক্ত হইলে এক্ষণে যাও নির্বিঘ্নে পতিশুশ্রূষার প্রবৃত্ত হও।
তদনন্তর মদনসেনা প্রত্যাবর্ত্তনকালে মলিম্লুচের নিকটে উপস্থিত হইল। সে তাহাকে ত্বরায় প্রত্যাগত দেখিয়া কারণ জিজ্ঞাসিলে মদনসেনা সবিশেষ সমস্ত বর্ণন করিল। চোর শুনিয়া যৎপরোনাস্তি আহ্লাদিত হইয়া অকপট হৃদয়ে কহিল আমার অলঙ্কারের প্রয়োজন নাই। তুমি অতি সুশীলা ও সত্যবাদিনী। ধর্ম্মে ধর্ম্মে তোমার যে সতীত্ব রক্ষা হইল তাহাই আমার পরম লাভ। তুমি নির্বিঘ্নে আপন আলয়ে গমন কর। এই বলিয়া চোর চলিয়া গেল। অনন্তর মদনসেনা স্বামিসন্নিধানে উপস্থিত হইলে সে আর তাহার প্রতি পূর্ব্ববৎ প্রণয়সম্ভাষণ না করিয়া অপ্রসন্ন মনে শয়ান রহিল।
ইহা কহিয়া বেতাল বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞাসিল মহারাজ এই চারি জনের মধ্যে কাহার ভদ্রতা অধিক। রাজা উত্তর দিলেন চোরের। বেতাল কহিল কি প্রকারে। রাজা কহিলেন মদনসেনার স্বামী তাহাকে অন্যসংক্রান্তহৃদয়া দেখিয়া পরিত্যাগ করিয়াছিল প্রশস্ত মনে সোমদত্তের নিকট গমনে অনুমতি করে নাই। তাহা হইলে উহার মন এক্ষণে অপ্রসন্ন হইত না। আর সোমদত্ত উপবনে তাদৃশ অধৈর্য্য প্রদর্শন করিয়া এক্ষণে কেবল রাজদণ্ডভয়েই পরাঙ্মুখ হইল আন্তরিক ধর্ম্মভীরুতা প্রযুক্ত নহে। আর মদনসেনা সোমদত্তের নিকট প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল এবং প্রতিজ্ঞা প্রতিপালন করা উচিত কর্ম্ম বটে কিন্তু স্ত্রীলোকের পক্ষে সতীত্ব প্রতিপালন করাই সর্ব্বাপেক্ষা প্রধান ধর্ম্ম। সুতরাং প্রতিজ্ঞাভঙ্গভয়ে সতীত্বভজে প্রবৃত্ত হওয়া অসতীর কর্ম্ম বলিতে হইবেক। অতএব তাহার এই সত্যনিষ্ঠা সাধুবাদযোগ্য নহে। কিন্তু চোর স্বভাবতঃ অর্থগৃধ্নু সে যে মহামূল্য অলঙ্কার সমস্ত হস্তে পাইয়া মদনসেনার কেবল সতীত্বরক্ষা শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া লোভসংবরণপূর্ব্বক তাহাকে অক্ষত বেশে গমন করিতে দিল ইহাকে কেবল অকৃত্রিম ঔদার্য্যের কার্য্য বলিতে হইবেক।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
পঞ্চদশ উপাখ্যান
পঞ্চদশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
ভারতবর্ষের উত্তর সীমায় হিমালয় নামে অতি প্রসিদ্ধ পর্ব্বত আছে। তাহার প্রস্থদেশে পুষ্পপুর নামে পরম রমণীয় নগর ছিল। গন্ধর্ব্বরাজ জীমূতকেতু ঐ নগরে রাজত্ব করিতেন। তিনি কামনা করিয়া বহু কাল কল্পবৃক্ষের আরাধনা করিয়াছিলেন। কল্পবৃক্ষ প্রসন্ন হইয়া বরপ্রদান করিলে রাজা জীমূতকেতুর এক পুত্ত্র জন্মিল। পুত্ত্রের নাম জীমূতবাহন রাখিলেন।
জীমূতবাহন স্বভাবতঃ ধর্ম্মাত্মা দয়াবান্ ও পরোপকারী ছিলেন এবং অল্পকালমধ্যে সর্ব্বশাস্ত্রপারদর্শী ও যুদ্ধবিদ্যাবিশারদ হইয়া উঠিলেন। কিয়ৎ কাল পরে তিনিও কল্পবৃক্ষকে প্রসন্ন করিয়া এই বর প্রার্থনা করিলেন আমার প্রজারা সর্ব্বপ্রকার সম্পত্তিতে পরিপূর্ণ হউক। কল্পবৃক্ষের বয়দান দ্বারা তদীয় প্রজা সর্ব্বপ্রকার সম্পত্তিতে পরিপূর্ণ হইল এবং ত্বরায় ঐশ্বর্য্যমদে মত্ত হইয়া রাজাকেও তৃণতুল্য বোধ করিতে লাগিল। ফলতঃ অল্পকালমধ্যে রাজা ও প্রজা বলিয়া কোন বিশেষ রহিল না।
তখন জীমূতকেতুর জ্ঞাতিবর্গ গোপনে পরামর্শ করিল ইহারা পিতা পুত্ত্রে অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া দিবানিশি কেবল ধর্ম্মচিন্তায় কালযাপন করিতেছে রাজ্যের প্রতি ক্ষণ মাত্রও দৃষ্টিপাত করে না। প্রজা সকল উচ্ছৃঙ্খল হইতে লাগিল। অতএব ইহাদের উভয়কে রাজ্যচ্যুত করিয়া যাহাতে উপযুক্তরূপ রাজ্যশাসন হয় এমন করা উচিত। অনন্তর সৈন্য সংগ্রহপূর্ব্বক রাজপুরীর চতুর্দিক্ নিরোধ করিল।
সবিশেষ সংবাদ পাইয়া যুবরাজ জীমূতবাহন পিতার নিকট নিবেদন করিলেন মহারাজ জ্ঞাতিবর্গ একবাক্য হইয়া আমাদিগকে রাজ্যচ্যুত করিবার অভিসন্ধিতে এই উদ্যোগ করিয়াছে। এক্ষণে আপনকার আজ্ঞা পাইলে রণক্ষেত্রে প্রবিষ্ট হইয়া বিপক্ষ পক্ষের সৈন্যক্ষয় ও সমুচিত দণ্ডবিধান করি।
জীমূতকেতু কহিলেন এই ক্ষণভঙ্গুর পাঞ্চভৌতিক দেহ অতি অকিঞ্চিৎকর। বিনশ্বর রাজ্যপদের নিমিত্ত বহুসংখ্যক জীব হিংসা করিয়া মহাপাপে লিপ্ত হওয়া উচিত নহে। রাজা যুধিষ্ঠির প্রথমতঃ কুরুক্ষেত্রযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া পশ্চাৎ অনেক অনুতাপ করিয়াছিলেন। অতএব রাজ্যপদ পরিত্যাগ করিয়া কোন নিভৃত স্থানে গিয়া প্রশান্ত মনে জগদীশ্বরের আরাধনা করা ভাল। এইরূপ সঙ্কল্প করিয়া পিতা পুত্ত্রে নগর হইতে নির্গত হইলেন এবং মলয় পর্ব্বতে গিয়া তদীয় অধিত্যকাতে কুটীর নির্মাণপূর্ব্বক তপস্যা করিতে লাগিলেন।
তথায় অল্পকালমধ্যে এক ঋষিকুমারের সহিত রাজকুমারের অত্যন্ত বন্ধুত্ব জন্মিল। এক দিবস দুই বন্ধুতে একত্র হইয়া ভ্রমণার্থে নির্গত হইলেন। অনতিদূরে এক কাত্যায়নীর ছিল তথায় শ্রবণমনোহর বীণাশব্দ শ্রবণ করিয়া কৌতুকাবিষ্ট চিত্তে সত্বর উপস্থিত হইয়া দেখিলেন এক পরম সুন্দরী কন্যা বীণানুগত স্তুতিগর্ভ গাত দ্বারা ভগবতী কাত্যায়নীর আরাধনা করিতেছে। উভয়ে একতানমনা হইয়া শ্রবণ ও দর্শন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে সেই কন্যা জীমূতবাহনকে নয়নগোচর করিয়া মনে মনে তাহাকে পতিত্বে বরণ করিল এবং স্বীয় সহচরী দ্বারা জীমূতবাহনের নাম ধাম জাতি ব্যবসায়াদির পরিচয় লইয়া গৃহে প্রস্থান করিল।
অনন্তর তাহার সহচরী তদীয়নিদেশক্রমে তাহার মাতার অগ্রে পূর্ব্বাপর সমস্ত বৃত্তান্ত কহিল। তিনিও তৎক্ষণাৎ আপন পতি রাজা মলয়কেতুর নিকটে কন্যার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন। মলয়কেতু স্বীয় পুত্ত্র মিত্রাবসুকে আহ্বান করিয়া কহিলেন তোমার ভগিনী বিবাহযোগ্যা হইয়াছে আর নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নহে সমুচিত পাত্র অন্বেষণ করিতে হইবেক। শুনিলাম গন্ধর্ব্বাধিপতি রাজা জীমূতকেতু রাজ্যাধিকার পরিত্যাগপূর্ব্বক কেবল নিজ পুত্ত্র জীমূতবাহনকে সমভিব্যাহারে লইয়া মলয়াচলে আসিয়া বাস করিয়াছেন। আমার অভিপ্রায় জীমূতবাহনকে কন্যাদান করি। অতএব তুমি রাজা জীমূতকেতুর নিকটে গিয়া আমার মানস প্রকাল কর।
মিত্রাবসু পিতার আজ্ঞানুসারে জীমূতকেতুসমীপে সবিশেষ সমস্ত কহিলে তিনি সম্মত হইলেন এবং জীমূতবাহনকে মিত্রাবসুর সমভিব্যাহারে মলয়কেতুর নিকট পাঠাইয়া দিলেন। মলয়কেতু শুভ লগ্নে স্বীয় কন্যা মলয়বতীর বিবাহকার্য্য সম্পন্ন কয়িলেন। বর কন্যা পরম সুখে কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন।
এক দিন জীমূতবাহন ও মিত্রাবসু উভয়ে মলয়মহীধরপরিসরে ভ্রমণ করিতে বাসনা করিয়া বাসস্থান হইতে বহির্গত হইলেন। ভূধয়ের উত্তর ভাগে উপস্থিত হইয়া দূর হইতে এক শ্বেতবর্ণ বস্তুরাশি দর্শন করিয়া জীমূতবাহন মিত্রাবসুকে জিজ্ঞাসা করিলেন বয়স্য গণ্ডশৈলের ন্যায় ধবলবর্ণ রাশীকৃত কি বস্তু দৃষ্ট হইতেছে। মিত্রাবসু কহিলেন মিত্র পূর্ব্বকালে গরুড়ের সহিত নাগগণের ঘোরতর যুদ্ধ হইয়াছিল। কিয়ৎ কাল পরে নাগেরা সম্পূর্ণ রূপে পরাজিত হইয়া সন্ধিপ্রার্থনা করিলে গরুড় কহিলেন যদি তোমরা আমার আহারের নিমিত্ত প্রত্যহ এক এক নাগ উপহার দিতে পার তাহা হইলে আমি তোমাদের প্রার্থনায় সম্মত হই নতুবা অদ্যই ভক্ষণ করিয়া নাগলোক নিঃশেষ করিব। নিরুপায় নাগেরা তাহাতেই সম্মত হইয়া আপন আপন আলয়ে গমন করিল। তদবধি প্রতিদিন এক এক নাগ পাতাল হইতে আসিয়া ঐ স্থানে উপস্থিত থাকে গরুড় মধ্যাহ্নকালে আসিয়া ভক্ষণ করেন। এই রূপে ভক্ষিত নাগগণের অস্থি দ্বারা ঐ পর্ব্বাতাকার রাশি প্রস্তুত হইয়াছে।
শ্রবণমাত্র জীমূতবাহনের অন্তঃকরণ কারুণ্যরসে পরিপূর্ণ হইল। তখন তিনি মনে মনে বিবেচনা করিলেন মধ্যাহ্নকাল আগতপ্রায় অবশ্যই এক নাগ গরুড়ের সন্তোষার্থে পর্য্যায়ক্রমে উপস্থিত হইবেক আমি আপন প্রাণ দিয়া তাহার প্রাণ রক্ষা করিব। অনন্তর কৌশলক্রমে শ্যালককে বিদায় করিয়া ক্রমে ক্রমে অস্থিরাশির নিকটবর্ত্তী হইয়া রোদনশব্দ শ্রবণ করিলেন এবং ত্বরায় সেই রোদনস্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন এক বৃদ্ধা নাগিনী শিরে করাঘাতপূর্ব্বক হাহাকার ও উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতেছে। জিজ্ঞাসা করিলেন মা তুমি কি নিমিত্ত রোদন করিতেছ। সে গরুড়বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া কহিল অদ্য আমার পুত্ত্র শঙ্খচূড়ের বার ক্ষণকালপরেই গরুড় আসিয়া তাহাকে ভক্ষণ করিবেক। আমার দ্বিতীয় পুত্ত্র নাই। আমি সেই দুঃখে দুঃখিত হইয়া রোদন করিতেছি। জীমূতবাহন কহিলেন মা আর রোদন করিও না। আমি আপন প্রাণ দিয়া তোমার পুত্ত্রের প্রাণ রক্ষা করিব। নাগিনী কহিল বৎস তুমি কি কারণে পরের নিমিত্ত প্রাণত্যাগ করিবে। আর পরের পুত্ত্র দিয়া আপন পুত্ত্র রক্ষা করিলে আমারও অধর্ম্ম ও অকীর্ত্তি হইবেক।
এই রূপে উভয়ে কথোপকথন হইতেছে ইত্যবসরে শঙ্খচূড়ও তথায় উপস্থিত হইল এবং জীমূতবাহনের অভিসন্ধি শুনিয়া তাঁহার পরিচয় গ্রহণপূর্ব্বক বিশেষজ্ঞ হইয়া কহিল মহারাজ অন্যায় আজ্ঞা করিতেছেন। বিবেচনা করিয়া দেখুন আমার মত কত শত ব্যক্তি সংসারে জন্মিতেছে ও মরিতেছে, কিন্তু আপনার ন্যায় ধর্ম্মাত্মা দয়ালু সংসারে সর্ব্বদা জন্মগ্রহণ করেন না। অতএব আমার পরিবর্ত্তে আপনকার প্রাণত্যাগ করা কোন ক্রমেই উচিত ও উপযুক্ত নহে। আপনি জীবিত থাকিলে লক্ষ লক্ষ ব্যক্তির মহোপকার হইবেক। আমি জীবিত থাকিয়া কোন কালে কাহারও কোন উপকার করিতে পারিব না। মাদৃশ ব্যক্তির জীবন মরণ দুই তুল্য।
জীমূতবাহন কহিলেন শুন শঙ্খচূড় প্রতিজ্ঞা করিয়াছি আপন প্রাণ দিয় তোমার প্রাণ রক্ষা করিব। আমি ক্ষত্রিয়জাতি, ক্ষত্রিয়েরা প্রতিজ্ঞাভঙ্গ অপেক্ষা প্রাণত্যাগ অতি লঘু ও সহজ জ্ঞান করেন। বিশেষতঃ প্রাণস্নেহে প্রতিজ্ঞাপ্রতিপলিনে পরাঙ্মুখ হইলে নরকগামী হইতে হয়। অতএব যখন স্বমুখে ব্যক্ত করিয়াছি তখন অবশ্যই প্রাণ দিয়া তোমার প্রাণ রক্ষা করির তুমি স্বস্থানে প্রস্থান কর। এই বলিয়া অশেষপ্রকার বিনয় ও অনুরোধ বাক্যে শঙ্খচূড়কে বিদায় করিলেন এবং তদীয় প্রতিশীর্ষ হইয়া গরুড়ের আগমনপ্রতীক্ষায় নির্দিষ্ট স্থানে উপবিষ্ট রহিলেন। শঙ্খচূড় রাজপুত্ত্রের নির্বন্ধ উল্লঙ্ঘনে অসমর্থ হইয়া অপ্রশস্ত মনে বিরস বদলে মলয়াচলবাসিনী কাত্যায়নীর সন্নিধানে উপস্থিত হইল এবং একাগ্রচিত্ত হইয়া প্রাণদাতা জীমূতবাহনের প্রাণরক্ষার উপায় প্রার্থনা করিতে লাগিল।
নিরূপিত সময় উপস্থিত হইলে গরুড় আসিয়া চঞ্চুপুট দ্বারা রাজপুত্ত্র গ্রহণপূর্ব্বক নভোমণ্ডলে উড্ডীন হইয়া মণ্ডলাকারে ভ্রমণ করিতে লাগিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরে জীমূতবাহনের দক্ষিণবাহুস্থিত নামাঙ্কিত মণিময় কেয়ূর শোণিতলিপ্ত হইয়া মলয়বতীর সম্মুখে পতিত হইল। মলয়বতী নামাক্ষরপরিচয় দ্বারা প্রিয়তমের প্রাণাত্যয় নিশ্চয় করিয়া শিরে করাঘাতপূর্ব্বক ভূতলে পতিত হইয়া উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিল। তাহার পিতা মাতা ভ্রাতা কেয়ূরদর্শনে বিষণ্ণ হইয়া হাহাকার করিতে লাগিলেন। রাজা মলয়কেতু ইতস্ততঃ বহুসংখ্যক লোক প্রেরণ করিয়া পরিশেষে স্বয়ং পুত্ত্র সহিত জীমূতবাহনের অন্বেষণে নির্গত হইলেন।
শঙ্খচূড় কাত্যায়নীর আলয় হইতে রাজপরিবারের আকস্মিক কোলাহল শ্রবণ করিয়া সবিশেষ অনুসন্ধান দ্বারা জীমূতবাহনের অমঙ্গল-বৃত্তান্ত জানিতে পারিয়া অশ্রুপূর্ণ নয়নে পূর্ব্ব স্থানে উপস্থিত হইল এবং গরুড়কে সম্বোধন করিয়া উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিল অহে বিহঙ্গরাজ তুমি শঙ্খচূড়ভ্রমে রাজা জীমূতবাহনকে লইয়া গিয়াছ। ইনি তোমার ভক্ষ্য নহেন। আমার নাম শঙ্খচূড় অদ্য আমার বার। তুমি রাজপুত্ত্রকে পরিত্যাগ করিয়া আমাকে ভক্ষণ কর। নতুবা তোমারে ঘোরতর অধর্ম্ম স্পর্শিবেক।
গরুড় শুনিয়া অত্যন্ত শঙ্কিত হইলেন এবং মৃতকল্প জীমূতবাহনকে জিজ্ঞাসা করিলেন অহে মহাপুরুষ তুমি কে কি নিমিত্ত আত্মপ্রাণদানে উদ্যত হইয়াছ। রাজপুত্ত্র স্বীয় পরিচয় প্রদানপূর্ব্বক কহিলেন অদ্য বা অব্দশতান্তে অবশ্যই মৃত্যু হইবেক। অতএব যে ব্যক্তি ক্ষণবিধ্বংসী তুচ্ছ শরীর ব্যয় দ্বারা পরোপকার করিয়া দিগন্তব্যাপিনী ও অনন্তকালস্থায়িনী কীর্ত্তি উপার্জ্জন করে তাহারই এই সংসারে জন্মগ্রহণ করা সার্থক। নতুবা স্বোদরপরায়ণ কাক কুক্কুর শৃগালাদি হইতে বিশেষ কি। এই বিবেচনায় আমি আপন প্রাণব্যয় দ্বারা শঙ্খচূড়ের প্রাণ রক্ষা করিতে আসিয়াছি। গরুড় শুনিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন এবং জীমূতবাহনকে শত শত ধন্যবাদ দিয়া কহিলেন জগতে সকলেই আপন আপন প্রাণরক্ষায় যত্নবান্। কিন্তু আপন প্রাণ দিয়া পরের প্রাণ রক্ষা করে এমন ব্যক্তি অতিবিরল। ফলতঃ এতাদৃশ ব্যক্তিই যথার্থ সৎপুরুষ। যাহা হউক আমি তোমার দয়া ও সাহস দর্শনে অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছি বর প্রার্থনা কর।
জীমূতবাহন কহিলেন হে খগেশ্বর যদি প্রসন্ন হইয়া থাক এই ধর দাও, যে তুমি অতঃপর আর নাগহিংসা করিবে না এবং এই দীর্ঘ কাল পর্য্যন্ত ভক্ষণ করিয়া যে অসংখ্য নাগের প্রাণ সংহার করিয়াছ তাহাদিগের জীবন দান কর। গরুড় তথাস্তু বলিয়া তৎক্ষণাৎ পাতাল হইতে অমৃত আনয়নপূর্ব্বক অস্থিস্তুপের উপর সেচন করিয়া মৃত নাগ সমুদয়ের জীবন দান করিলেন এবং জীমূতবাহনকে কহিলেন রাজকুমার আমার প্রসাদে তোমাদের অপহৃত রাজ্যের পুনরুদ্ধার হইবেক। এইরূপ বর প্রদান করিয়া গরুড় অন্তর্হিত হইলে শঙ্খচূড়ও জীমূতবাহনের অশেষপ্রকার স্তুতি করিয়া বিদায় লইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল।
জীমূতবাহন এইরূপ বরলাভে চরিতার্থ হইয়া আপন পিতার নিকট উপস্থিত হইলেন এবং লোক দ্বারা শ্বশুরালয়ে আপন মঙ্গলময়ী বার্ত্তা প্রেরণ করিলেন। তাঁহাদের রাজ্যাপহারক জ্ঞাতিবর্গ বরপ্রদানবৃত্তান্ত শুনিয়া রাজা জীমূতকেতুর শরণাপন্ন হইল এবং স্তুতি ও বিনতি দ্বারা প্রসন্ন করিয়া তাঁহাদের পিতা পুত্ত্রকে রাজ্যপদে পুনঃস্থাপন করিল।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ জীমূতবাহন ও শঙ্খচূড় এ উভয়ের মধ্যে কোন্ ব্যক্তির অধিক ভদ্রতাপ্রকাশ হইল। বিক্রমাদিত্য কহিলেন শঙ্খচূড়ের। বেতাল কহিল কি প্রকারে। রাজা কহিলেন শঙ্খচূড় জীমূতবাহনের প্রাণদানবিষয়ে প্রথমতঃ কোন ক্রমেই সম্মত হয় নাই। পরিশেষে সম্মত হইয়াও কাত্যায়নীর নিকটে গিয়া উপকারকের মঙ্গল প্রার্থনা করিতে লাগিল এবং পুনর্বার আসিয়া জীবনদানে উদ্যত হইয়া জীমূতবাহনের প্রাণ রক্ষা করিল। বেতাল কহিল যে ব্যক্তি পরার্থে প্রাণ দান করিল তাহার অধিক হইল না কেন। রাজা কহিলেন জীমূতবাহন ক্ষত্ত্রিয়জাতি ক্ষত্ত্রিয়েরা প্রাণত্যাগ অতি অকিঞ্চিৎকর জ্ঞান করে। অতএব এই জীবনদান জীমূতবাহনের পক্ষে তাদৃশ দুষ্কর নহে।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
পঞ্চবিংশ উপাখ্যান
পঞ্চবিংশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
দক্ষিণ দেশে ধর্ম্মপুর নামে নগর আছে তথায় মহাবল নামে মহাবল পরাক্রান্ত নরপতি ছিলেন। এক প্রতিপক্ষ রাজা চতুরঙ্গিণী সেনা লইয়া তদীয় রাজধানী অবরোধ কহিলে রাজা মহাবল স্বীয় সমস্ত সৈন্য সামন্ত সহকারে সমরসাগরে অবগাহন করিয়া অশেষপ্রকার প্রতীকারচেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু ক্রমে ক্রমে স্বপক্ষ সৈন্য-সমস্ত ক্ষয়প্রাপ্ত হইলে নিতান্ত নিৰুপায় ভাবিয়া মহিষী ও তনয়াকে সমভিব্যাহারিণী করিয়া অরণ্যপ্রয়াণ করিলেন। কিয়ৎ দূর গমন করিয়া তিন জনেই অতিশয় ক্ষুধার্ত্ত হইলেন। তখন রাজা মহিষী ও তনয়াকে এক সন্নিহিত তৰুতলে অবস্থিতি করিতে কহিয়া স্বয়ং ভক্ষ্য দ্রব্য আহরণার্থে অরণ্যের অনধিকদূরবর্ত্তী এক নগরে প্রবিষ্ট হইলেন।
সায়ংকাল উপস্থিত হইল। রাজা প্রত্যাগত হইলেন না। রাজমহিষী ও রাজকুমারী রাজার অনাগমনে নানা অনিষ্ট আশঙ্কা করিয়া অত্যন্ত বিষণ্ণ মনে অশেষপ্রকার চিন্তা করিতে লাগিলেন। ঐ দিবস কুণ্ডিনাধিপতি রাজা চন্দ্রসেন আপন জ্যেষ্ঠ পুত্ত্রকে সঙ্গে লইয়া সেই কাননে মৃগয়ায় আসিয়াছিলেন। তাঁহারা তাদৃশ নিবিড় অরণ্যমধ্যে অসম্ভাবিত নরচরণচিহ্ন দর্শন করিয়া বিস্ময়ান্বিত চিত্তে অশেষপ্রকার কল্পনা করিতে লাগিলেন। পরিশেষে পুংবিলক্ষণ লক্ষণাদি দ্বারা স্ত্রীলোকের পদচিহ্ন নিশ্চয় হইল। রাজা কহিলেন চরণচিহ্ন দ্বারা অনুমান হইতেছে দুই রমণী অচিরে এই স্থান দিয়া গমন করিয়াছে। অতএব চল চারি দিক্ অন্বেষণ করি।
পিতা পুত্ত্র কিয়ৎ ক্ষণ ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে সায়ংকালে দেখিতে পাইলেন এক তৰুমূলে দুই পরম সুন্দরী নারী অবিরলবিগলিতজলধারাকুল লোচনে পরস্পর বদননিরীক্ষণ করত যূথবিরহিত কুররীযুগলের ন্যায় প্রগাঢ় উৎকণ্ঠায় কালযাপন করিতেছে। অনন্তর প্রণয়গর্ভ সম্ভাষণাদি দ্বারা তৎকালোচিত সান্ত্বনা প্রদান করিয়া রাজা রাজকন্যাকে লইলেন এবং রাজকুমার রাজমহিষীকে গ্রহণ করিলেন।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ অতঃপর এই দুই স্ত্রীর পুত্ত্র জন্মিলে তাহাদের পরস্পর কি সম্বন্ধ হইবেক বল। রাজা বিক্রমাদিত্য স্থিত চিত্তে বহু ক্ষণ চিন্তা করিলেন কিন্তু কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন।
পঞ্চম উপাখ্যান
পঞ্চম উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
ধারা নগরে মহাবল নামে মহাবল পরাক্রান্ত নরপতি ছিলেন। তাঁহার দূতের নাম হরিদাস। ঐ দূতের মহাদেবী নামে এক পরম সুন্দরী কন্যা ছিল। কালসহকারে কন্যা যৌবনসীমায় উত্তীর্ণ হইলে হরিদাস মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিল কন্যা বিবাহযোগ্যা হইল অতঃপর বর অন্বেষণ করিয়া উহার বিবাহসংস্কার নির্বাহ করা উচিত। অনন্তর পরিবারের মধ্যে মহাদেবীর বিবাহের কথার আন্দোলন হইতে আরম্ভ হইলে সে এক দিবস আপন পিতার নিকট নিবেদন করিল পিতঃ যে ব্যক্তির সহিত আমার বিবাহ দিবেন সে যেন সর্ব্বগুণালঙ্কৃত হয়। হরিদাস কন্যার এই প্রশংসনীয় প্রার্থনা শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া নানা স্থানে উপযুক্ত পাত্র অনুসন্ধান করিতে লাগিল।
এক দিবস রাজা মহাবল হরিদাসকে আজ্ঞা করিলেন হরিদাস দক্ষিণ দেশে হরিশ্চন্দ্র নামে রাজা আছেন। তিনি আমার পরম বন্ধু। বহুদিনাবধি তাঁহার শারীরিক ও রাজ্যবিষয়ক কোন সংবাদ না পাইয়া অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত আছি। অতএব তুমি তথায় গিয়া আমার কুশল সংবাদ দিয়া ত্বরায় তাঁহার সর্ব্বাঙ্গীন মঙ্গল সংবাদ লইয়া আইস। হরিদাস রাজকীয় আদেশানুসারে কিয়ৎ দিবসের মধ্যে রাজা হরিশচন্দ্রের রাজধানীতে উপস্থিত হইয়া তাঁহার নিকট নিজ প্রভুর আদেশ জানাইল। হরিশ্চন্দ্র দূতমুখে মিত্রের মঙ্গলবার্ত্তা শ্রবণ করিয়া আনন্দসাগরে মগ্ন হইলেন এবং সমুচিত পুরস্কার প্রদানপূর্ব্বক হরিদাসকে কতিপয় দিবস তথায় অবস্থিতি করিতে অনুরোধ করিলেন।
এক দিবস রাজা হরিশ্চন্দ্র সভামধ্যে হরিদাসকে জিজ্ঞাসা করিলেন হরিদাস তুমি কি বোধ কর কলিযুগের আরম্ভ হইয়াছে কি না। তখন সে কৃতাঞ্জলি হইয়া কহিল হাঁ মহারাজ কলিকাল উপস্থিত হইয়াছে। তাহার অধিকারপ্রভাবেই সংসারে মিথ্যাপ্রপঞ্চ প্রবল হইয়া উঠিতেছে। সত্যের হ্রাস হইতেছে। পৃথিবী অল্প ফল দিতেছেন। লোক মুখে মিষ্ট বাক্য ব্যবহার করে কিন্তু অন্তরে সম্পূর্ণ কপটতা। রাজারা প্রজার সুখ সমৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টি না রাখিয়া কেবল কোষপরিপূরণে যত্নবান্ হইয়াছেন। ব্রাহ্মণেরা সৎকর্ম্মের অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করিয়াছেন এবং লোভী হইয়াছেন। স্ত্রীলোক লজ্জা পরিত্যাগ ও স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করিয়াছে। পুত্ত্র পরম গুরু পিতা মাতার শুশ্রূষা ও আজ্ঞাপ্রতিপালনে পরাঙ্মুখ এবং ভ্রাতা ভ্রাতার প্রতি স্নেহশূন্য দৃষ্ট হইতেছে। মিত্রতানিবন্ধন অকৃত্রিমপ্রণয়সম্বলিত ব্যবহার আর দৃষ্টিগোচর হয় না। নিত্য নৈমিত্তিক প্রায়শ্চিত্ত উপাসনাদি কর্ম্মে কাহারও আস্থা নাই। পামরেরা বিরোধী তর্ক দ্বারা ধর্ম্মমূল সনাতন বেদশাস্ত্রের বিপ্লাবনে উদ্যত হইয়াছে। মহারাজ ইত্যাদি নানা প্রকারে কেবল অধর্ম্মের সঞ্চার নেত্রগোচর হইতেছে। রাজা শুনিয়া সন্তুষ্ট হইয়া হরিদাসকে ধন্যবাদ প্রদান করিলেন।
সভাভঙ্গান্তে রাজা অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। হরিদাস আপন বাসস্থানে উপস্থিত হইয়া এক অপরিচিত ব্রাহ্মণকুমারকে উপবিষ্ট দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল তুমি কে কি নিমিত্ত আসিয়াছ। সে কহিল আমি তোমার নিকটে কিছু প্রার্থনা করিতে আসিয়াছি। হরিদাস কহিল কি প্রার্থনা বল আমার সামর্থ্য হয় সম্পন্ন করিব। সে কহিল তোমার এক পরম সুন্দরী গুণবতী কন্যা আছে তাহার সহিত আমার বিবাহ দাও। হরিদাস কহিল আমি কন্যার প্রার্থনানুসারে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে ব্যক্তি সমস্ত বিদ্যায় পারদর্শী ও অসাধারণগুণসম্পন্ন হইবেক তাহাকে কন্যা দান করিব। সে কহিল আমি বাল্যকালবিধি পরম যত্নে নানা বিদ্যা অভ্যাস করিয়াছি। আর আমার অসাধারণ গুণ এই যে অদ্ভুত এক রথ নির্মাণ করিয়াছি তাহাতে আরোহণ করিলে ক্ষণমধ্যে বর্ষগম্য দেশেও উপস্থিত হওয়া যায়।
হরিদাস শুনিয়া সন্তুষ্ট হইল এবং কন্যাদান স্বীকার করিয়া কহিল কল্য প্রাতঃকালে তুমি আমার নিকটে রথ লইয়া আসিবে। এই বলিয়া ব্রাহ্মণতনয়কে বিদায় করিয়া স্নান আহ্নিক ভোজন সমাপন করিল এবং অপরাহ্ণে রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া বিদায় লইয়া স্বদেশগমনার্থে প্রস্তুত হইয়া রহিল।
পর দিন প্রভাত হইবামাত্র ব্রাহ্মণকুমার হরিদাসের নিকট উপস্থিত হইলে উভয়ে রথারোহণ করিয়া ক্ষণমধ্যে ধারানগরে উত্তীর্ণ হইল। হরিদাসের আগমনের পূর্ব্বে তাহার পত্নী ও পুত্ত্র পৃথক্ পৃথক্ এক এক ব্রাহ্মণতনয়ের নিকট অঙ্গীকার করিয়াছিল যে মহাদেবীর সহিত বিবাহ দিব তাহাতে কেবল হরিদাসের প্রত্যাগমনপ্রতীক্ষাহ প্রতিবন্ধক ছিল। এক্ষণে সেই পূর্ব্বাশ্বাসিত বরেরাও হরিদাসকে গৃহাগত শুনিয়া বিবাহের নিমিত্ত তদীয় আলয়ে উপস্থিত হইল।
এই রূপে তিন বর একত্র দেখিয়া হরিদাস অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিল তিন জনে তিন জনের নিকট অঙ্গীকার করিয়াছি তিন জনই বিদ্যাবান্ ও অসাধারণগুণসম্পন্ন কাহাকেই নিরাশ করি। অনন্তর তাহাদিগকে কহিল অদ্য তোমরা আমার আলয়ে অবস্থিতি কর আমি পুত্ত্র ও গৃহিণীর সহিত পরামর্শ করিয়া কর্ত্তব্য স্থির করিব। তাহারা সম্মত হইয়া সে দিবস হরিদাসের আবাসে অবস্থিতি করিল। দৈবযোগে সেই রজনীতে বিন্ধ্যাচলবাসী এক রাক্ষস আসিয়া হরিদাসকন্যাকে হরণ করিয়া আপন আলয়ে পলায়ন করিল।
গৃহজন প্রভাতে গাত্রোত্থান করিয়া দেখিল মহাদেবী গৃহে নাই। তখন সকলে একত্র হইয়া নানাপ্রকার কল্পনা করিতে লাগিল। বিবাহার্থী ব্রাহ্মণকুমারেরাও ভাবিভার্য্যার অদর্শনবার্ত্তা শ্রবণ করিয়া ম্লান বদনে তথায় উপস্থিত হইল। তন্মধ্যে এক ব্যক্তি সমাধিবলে ভূত ভবিষ্যৎ বর্ত্তমান সমুদায় প্রত্যক্ষবৎ দেথিত। সে সকলকে বিষণ্ণ দেখিয়া হরিদাসকে কহিল মহাশয় উৎকণ্ঠিত হইবেন না। আমি দেখিতেছি এক রাক্ষস আপনকার কন্যার রূপলাবণ্যে মোহিত হইয়া তাহাকে হরণ করিয়া বিন্ধ্যপর্ব্বতে রাখিয়াছে। যদি তথা হইতে প্রত্যাহরণ করিবার কোন উপায় থাকে চেষ্টা দেখুন। দ্বিতীয় কহিল আমি শব্দবেধী শর নিক্ষেপ দ্বারা বিপক্ষের প্রাণসংহার করিতে পারি। অতএব কোন ক্রমে তথায় উপস্থিত হইতে পারিলে রাক্ষসের বিনাশসম্পাদন করিতে পারিব। তখন তৃতীয় কহিল আমার এই রথে আরোহণ করিয়া প্রস্থান কর ক্ষণমধ্যে তথায় উপস্থিত হইতে পারিবে।
অনন্তর সে রধারোহণপূর্ব্বক নিমিষবমধ্যে তথায় উপস্থিত হইয়া শব্দবেধী শর দ্বারা ক্রব্যাদের প্রাণদণ্ড করিয়া মহাদেবী সমভিব্যাহারে পুনরায় নিমিষমধ্যে ধারা নগরে প্রত্যাগমন করিল। অনন্তর তিন বর একত্র হইয়া পরস্পর বিবাদ করিয়া কহিতে লাগিল আমিই ইহার পাণিগ্রহণাধিকারী। আমি না হইলে ইহার উদ্ধার হইবার সম্ভাবনা ছিল না। হরিদাস কর্ত্তব্যাবধারণে বিমূঢ় হইয়া অত্যন্ত ব্যাকুল হইল।
এই রূপে উপাখ্যান সমাপন করিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এই তিনের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি মহাদেবীর বিবাহাধিকারী হইতে পারে। বিক্রমাদিত্য কহিলেন যে ব্যক্তি রাক্ষসের প্রাণসংহার করিয়া প্রত্যানয়ন সাধন করিয়াছে। বেতাল কহিল তিন জনই সমান বিদ্বান্ এবং তিন জনই প্রত্যানয়নবিষয়ে সমান সাহায্য করিয়াছে তবে কি নিমিত্ত এই কন্যা কেবল প্রত্যাহর্ত্তার কামিনী হইল। রাজা কহিলেন তিন জনই অসাধারণ গুণ প্রকাশ করিয়াছে যথার্থ বটে কিন্তু সূক্ষ্ম বিবেচনা করিলে প্রত্যাহর্ত্তার গুণেই প্রকৃত কার্য্য নির্বাহ হইয়াছে অতএব তাহারই প্রাধান্য যুক্তিযুক্ত বোধ হইতেছে।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
প্রথম উপাখ্যান
প্রথম উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ শ্রবণ কর
বারাণসী নগরীতে প্রতাপমুকুট নামে এক প্রবলপ্রতাপ নরপতি ছিলেন। তাঁহার মহাদেবীনাম্নী মহিষী ও বজ্রমুকুট নামে নন্দন ছিল। এক দিবস রাজকুমার অমাত্যপুত্ত্রকে সমভিব্যাহারে করিয়া মৃগয়ায় গমন করিলেন। ক্রমে ক্রমে নানা ভ্রমণ করিয়া পরিশেষে কোন নিবিড় অরণ্যানী প্রবেশপূর্ব্বক তন্মধ্যবর্ত্তী পরম রমণীয় সুশোভিত সরোবর সন্নিধানে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন ঐ সরসীর তীরে হংস বক চক্রবাক সারস প্রভৃতি নানাবিধ জলচর পক্ষিগণ কলরব করিতেছে। প্রফুল্ল কমলসমূহের সৌরভে চারি দিক্ আমোদিত হইয়া আছে। মধুকরেরা মধুগন্ধে অন্ধ হইয়া গুন্ গুন্ ধ্বনি করত ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতেছে। তীরস্থিত তরুগণ অভিনব পল্লব ফল কুসুম সমূহে সুশোভিত আছে। তাহাদিগের ছায়া অতিস্নিগ্ধ বিশেষতঃ শীতল সুগন্ধ গন্ধবহের মন্দ মন্দ সঞ্চার দ্বারা পরম রমণীয় হইয়া আছে। তথায় প্রবেশমাত্রেই শ্রান্ত ও আতপতাপিত ব্যক্তির ক্লান্তি দূর হয়। ঐ সরসীর চারি দিকে চারি প্রস্তরময় ঘাট ছিল রাজকুমার অন্যতম দ্বারা অবতীর্ণ হইয়া হস্ত মুখ প্রক্ষালন করিলেন।
অনতিদূরে এক মহাদেবের মন্দির ছিল। বজ্রমুকুট সমীপবর্ত্তী বকুলবৃক্ষের স্কন্ধে অশ্ব বন্ধনপূর্ব্বক মন্দিরমধ্যে প্রবেশ ও দর্শনপ্রণামাদি করিয়া কিয়ৎ ক্ষণ পরে বহির্গত হইলেন। ঐ সময়মধ্যে এক রাজকন্যাও স্বীয় সহচরীবর্গের সহিত সেই সরোবরের অপর পারে উপস্থিত হইয়া স্নান পূজা সমাপনপূর্ব্বক বৃক্ষের ছায়াতে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। দৈবযোগে তাঁহার ও নৃপতনয়ের চারি চক্ষু একত্র হইল। তদীয় নিৰুপম সৌন্দর্য্য সন্দর্শনে নৃপনন্দন মোহিত হইলেন। রাজপুত্ত্রীয় নৃপকুমারকে নয়নগোচর করিয়া কৃতার্থম্মন্যা হইয়া শিরঃস্থিত পদ্ম হস্তে লইলেন। অনন্তর কর্ণসংযুক্ত করিয়া দন্ত দ্বারা ছেদনপূর্ব্বক পদতলে নিক্ষেপ করিলেন। পুনর্বার গ্রহণ ও হৃদয়ে স্থাপন করিয়া বারংবার রাজতনয়ের প্রতি সতৃষ্ণ দৃষ্টিপাত করিতে করিতে স্বীয় প্রিয়বয়স্যাগণের সহিত স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন।
কুমারী ক্রমে ক্রমে দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইলে রাজকুমার বিরহবেদনায় অতিশয় ব্যাকুল হইলেন এবং সর্ব্বাধিকারিকুমারের নিকটে আসিয়া লজ্জানম্র মুখে কহিতে লাগিলেন মিত্র আজি আমি এক পরম সুন্দরী রমণী নিরীক্ষণ করিয়াছি। তাহার নাম ধাম কিছুই জানিতে পারি নাই। কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি তাহাকে না পাইলে প্রাণত্যাগ করিব। আমাত্যপুত্ত্র সমস্ত শ্রবণ করিয়া তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে গৃহে প্রত্যানয়ন করিলেন। রাজকুমার দুঃসহ বিরহবেদনায় নিতান্ত অধীর হইয়া শাস্ত্রচিন্তা সদালাপ রাজকার্য্যপর্য্যালোচনা ও আবশ্যক স্নানভোজনাদি ক্রিয়া পর্য্যন্ত পরিত্যাগ করিয়া একাকী নির্জনে বিষণ্ণ মনে কালযাপন করিতে লাগিলেন। পরিশেষে চিত্তবিনোদনের কোন উপায় না দেখিয়া স্বহস্তে সেই কামিনীর প্রতিমূর্ত্তি চিত্রিত করিলেন। দিন যামিনী কেবল সেই প্রতিমূর্ত্তি সন্দর্শন করেন। কাহারও সহিত বাক্যালাপ করেন না কেহ কিছু জিজ্ঞাসা করিলেও উত্তর দেন না। সর্ব্বাধিকারিপুত্ত্র নৃপনন্দনের তাদৃশী দশা নিরীক্ষণ করিয়া উপদেশচ্ছলে অশেষপ্রকার ভর্ৎসনা করিলেন।
প্রিয় বয়স্যের উপদেশবাক্য শ্রবণ করিয়া রাজকুমার কহিলেন সখে আমি যখন এ পদবীতে পদার্পণ করিয়াছি তখন আমার হিতাহিত চিন্তা ও সুখ দুঃখ বিবেচনা নাই। নিশ্চয় করিয়াছি মনোরথ সম্পন্ন না হইলে জীবন পরিত্যাগ করিব। বন্ধুর এইরূপ বাক্য শুনিয়া অমাত্যকুমার মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন আর এখন উপদেশ দ্বারা ধৈর্য্যসম্পাদনের সময় নাই। এ নিতান্ত অধীর হইয়াছে। অতঃপর কোন উপায় চিন্তা করা উচিত। এইরূপ নিশ্চয় করিয়া কুমারকে জিজ্ঞাসা করিলেন বয়স্য প্রস্থানকালে সেই সীমন্তিনী তোমাকে কিছু কহিয়াছিল কিংবা তুমি তাহাকে কিছু কহিয়াছিলে। রাজপুত্ত্র কহিলেন না বয়স্য আমি তাহাকে কিছু কহি নাই এবং সেই সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরীও আমাকে কোন কথা কহে নাই। তখন অমাত্যপুত্ত্র কহিলেন তবে তাহার সমাগম দুঃসাধ্য বোধ হইতেছে। রাজপুত্ত্র কহিলেন যদি সেই সুলোচনা লোচনানন্দদায়িনী না হয় আমি প্রাণত্যাগ করিব। তখন তিনি অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া পুনরায় কহিলেন ভাল বয়স্য জিজ্ঞাসা করি প্রস্থানসময়ে সে কোন সঙ্কেত করিয়াছিল কি না।
রাজকুমার কমলবৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। তখন অমাত্যপুত্ত্র কহিলেন সথে আর চিন্তা নাই আমি তৎকৃত সঙ্কেতের তাৎপর্য্যাগ্রহ করিয়াছি এবং তাহার নাম ধান জানিতে পারিয়াছি। এখন প্রতিজ্ঞা করিতেছি অল্পকালমধ্যেই তাহার সহিত সমাগম সম্পন্ন করিয়া দিব। অধিক ব্যাকুল হইলেই অভীষ্টসিদ্ধি হয় না ধৈর্য্য অবলম্বন কর। তখন রাজপুত্ত্র কহিলেন যদি বুঝিয়া থাক সমুদায় বিশেষ করিয়া বর্ণন কর শুনিলেও আপাততঃ স্থির হইতে পারি। তিনি কহিলেন বয়স্য শ্রবণ কর পদ্মপুষ্প মস্তক হইতে নামাইয়া কর্ণে সংলগ্ন করিয়াছিল তদ্দ্বারা তোমাকে এই কহিয়াছে আমি কর্ণাটনগরনিবাসিনী। দন্ত দ্বারা খণ্ডন করিয়া ইহা ব্যক্ত করিয়াছে আমি দন্তবাট রাজার কন্যা। তৎপরে পদতলে নিক্ষিপ্ত করিয়া এই সঙ্কেত করিয়াছে আমার নাম পদ্মাবতী। আর হৃদয়ে স্থাপন করিয়া এই অভিপ্রায় প্রকাশ করিয়াছে তুমি আমার হৃদয়বল্লভ।
বয়স্যের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া কুমার অপার আনন্দসাগরে মগ্ন হইলেন এবং ব্যগ্র হইয়া বারংবার কহিতে লাগিলেন বয়স্য ত্বরায় আমাকে কর্ণাট নগরে লইয়া চল। অনন্তর উভয়ে সমুচিত পরিচ্ছদ পরিধান ও অস্ত্র বন্ধনপূর্ব্বক অশ্বারোহণ করিলেন। কতিপয় দিবসের পরে কর্ণাট নগরে উপস্থিত হইয়া তাঁহারা রাজবাটীর নিকটে গিয়া দেখিলেন এক বৃদ্ধা আপন ভবনদ্বারে উপষিষ্টা আছে। উভয়ে অশ্ব হইতে অবতীর্ণ হইয়া তাহার নিকটে গিয়া কহিলেন মা আমরা বাণিজ্যব্যবসায়ী বিদেশীয় লোক। দ্রব্যসামগ্রী সমগ্র পশ্চাৎ আসিতেছে। বাসা অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত আমরা অগ্রসর হইয়াছি। যদি কৃপা করিয়া স্থান দাও তবে থাকিতে পাই। বৃদ্ধা তাহাদিগের মনোহর রূপদর্শনে ও মধুর আলাপ শ্রবণে প্রীত হইয়া প্রসন্ন মনে কহিল এ তোমাদের গৃহ যত দিন ইচ্ছা সচ্ছন্দে অবস্থিতি কর।
এই রূপে উভয়ে সেই বর্ষীয়সীর সদনে আবাসগ্রহণ করিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে বৃদ্ধা তাঁহাদের সন্নিধানে আগমন করিয়া কথোপকথন আরম্ভ করিলে সর্ব্বাধিকারিপুত্ত্র জিজ্ঞাসা করিলেন মা কয় জন তোমার পরিবার আর কি প্রকারে বা নির্বাহ হয়। বৃদ্ধা কহিল আমার পুত্ত্র রাজসংসারে কর্ম্ম করে রাজার অতি প্রিয় পাত্র। আর পদ্মাবতী নামে রাজার এক কন্যা আছেন আমি তাঁহার ধাত্রী ছিলাম। এক্ষণে বৃদ্ধা হইয়াছি গৃহে থাকি কিন্তু রাজা অনুগ্রহ করিয়া অন্ন বস্ত্র প্রদান করেন। আর রাজকন্যা অত্যন্ত ভাল বাসেন এজন্য প্রতিদিন এক এক বার তাঁহাকে দেখিতে যাই। ইহা শুনিয়া রাজপুত্ত্র কহিলেন কল্য যাইবার সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়া যাইবে আমি রাজকন্যার নিকট কোন সংবাদ পাঠাইব। বৃদ্ধা কহিল যদি প্রয়োজন থাকে বল আজিই আমি রাজকন্যাকে জানাইয়া আসি। তখন রাজকুমার হৃষ্ট হইয়া কহিলেন তুমি রাজকন্যাকে কহিবে জ্যৈষ্ঠশুক্লপঞ্চমীতে সরোবরের তীরে যে রাজপুত্ত্রকে দেখিয়াছিলে সে তোমার সঙ্কেতানুসারে উপস্থিত হইয়াছে। এই বাক্য কর্ণগোচর হইবামাত্র বৃদ্ধা যষ্টি গ্রহণপূর্ব্বক রাজভবনে গমন করিল। কন্যান্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া দেখিল রাজকন্যা একাকিনী নির্জনে উপবিষ্টা আছেন। বৃদ্ধা সম্মুখবর্ত্তিনী হইবামাত্র রাজকন্যা সমাদরপূর্ব্বক বসিতে আসন প্রদান করিলেন। সে উপবিষ্টা হইয়া কহিল বৎসে বাল্যকালে অনেক যত্নে তোমাকে মানুষ করিয়াছি। এক্ষণে ভগবানের অনুগ্রহে তুমি তৰুণাবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছ। আমার অন্তঃকরণের অভিলাষ এই উপযুক্ত পাত্রের হস্তগতা হও। এইরূপ আড়ম্বরপূর্ব্বক ভূমিকা করিয়া কহিতে লাগিল জ্যৈষ্ঠশুক্লপঞ্চমীতে বাপীতটে যে রাজকুমারের মন হরণ করিয়া আনিয়াছিলে তিনি আমার গৃহে উত্তীর্ণ হইয়াছেন এবং আমার দ্বারা এই সংবাদ পাঠাইয়াছেন যে কমলসঙ্কেতে আমার নিকট যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলে তাহা পূর্ণ কর আমি উপস্থিত হইয়াছি। আর আমিও কহিতেছি এই রাজপুত্ত্র তোমার যোগ্য বর তুমি যেরূপ রূপবতী সে ব্যক্তিও তদনুরূপ বটে।
রাজকন্যা শ্রবণমাত্র কোপ প্রকাশ করিয়া হস্তে চন্দন লেপনপূর্ব্বক বৃদ্ধার উভয় গণ্ডে চপেটাঘাত করিলেন এবং কহিলেন তুমি অতি ত্বরায় আমার অন্তঃপুর হইতে দূর হও। বৃদ্ধা এইপ্রকার তিরস্কার লাভ করিয়া বিরক্ত হইয়া বিষণ্ণ বদনে সদনে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক রাজকুমারের নিকটে পূর্ব্বাপর সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিল। তিনি শ্রবণমাত্র অতিমাত্র ব্যাকূল ও হতাশ্বাস হইয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক পার্শ্ববর্ত্তী প্রিয় বয়স্যের প্রতি কহিতে লাগিলেন সখে এখন কি উপায় করি। নিতান্ত বুঝিলাম বিধি বাম হইয়াছে মনস্কামসিদ্ধির কোন সম্ভাবনা বোধ হইতেছে না। নতুবা সেই বামলোচনা কি নিমিত্ত তিরস্কার করিয়া বৃদ্ধাকে বিদায় করিল। অন্তঃকরণে প্রণয়সঞ্চার থাকিলে দূতীর প্রতি এত অনাদর হয় না। তখন তিনি কহিলেন বয়স্য মর্ম্মগ্রহ না করিয়া কেন অকারণে এত ব্যাকুল হও। শ্রীখণ্ডরসাভিষিক্ত দশ করশাখা প্রহারের তাৎপর্য্য এই যে শুক্ল পক্ষের দশ দিবস অবশিষ্ট আছে তদবসানে অন্ধকার পক্ষে তোমার সহিত সমাগম হইবেক।
শুক্ল পক্ষ অতিক্রান্ত হইল। বৃদ্ধা পুনর্বায় রাজকুমারীর নিকটে গিয়া কুমারের প্রার্থনা জানাইল। তিনি শুনিয়া অত্যন্ত কোপ প্রকাশ করিলেন এবং গলহস্ত প্রদানপূর্ব্বক বৃদ্ধাকে অন্তঃপুরের খড়ক্কী দিয়া বাহির করিয়া দিলেন। সে তৎক্ষণাৎ রাজকুমারের নিকটে আসিয়া এই বৃত্তান্ত জানাইল। তিনি শুনিয়া নিরাশ্বাস হইয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক অধোমুখে চিন্তা করিতে লাগিলেন। তখন সর্ব্বাধিকারীর পুত্ত্র কহিলেন বয়স্য কেন উৎকণ্ঠিত হইতেছ আর ভাবনা নাই। এ অনুকূল গলহস্ত অপ্রশস্ত নহে। তুমি পূর্ণমনোরথ হইয়াছ। অদ্য রজনীযোগে তোমাকে সেই দ্বার দিয়া তাহার অন্তঃপুরে যাইতে সঙ্কেত করিয়াছে। রাজপুত্ত্র আনন্দপ্রবাহে মগ্ন হইয়া দিবাবসানপ্রতীক্ষায় কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন।
প্রদোষকাল উপস্থিত হইলে রাজকুমার বিহারযোগ্য বেশ ভুষা সমাধান করিয়া প্রিয় বয়স্যের সহিত অর্দ্ধরাত্র সময়ে নির্দ্ধারিত দ্বারদেশে উপস্থিত হইলেন। সর্ব্বাধিকারীর পুত্ত্র দ্বারের বহির্ভাগে দণ্ডায়মান রহিলেন তিনি তন্মধ্য দিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন রাজকুমারী তাঁহার প্রতীক্ষা করিতেছেন। নয়নে নয়নে সঙ্গতি হওয়াতে উভয়ে চরিতার্থতা প্রাপ্ত হইলেন। রাজকন্যা পার্শ্ববর্ত্তিনী বয়স্যার প্রতি দ্বাররোধের আদেশ দিয়া রাজকুমারের কর গ্রহণপূর্ব্বক বিলাসভবনে প্রবেশ করিলেন এবং সুশোভিত স্বর্ণময় পল্যঙ্কে উপবেশনানন্তর বল্লভের কণ্ঠদেশে স্বহস্তসঙ্কলিত ললিত মালতীমালা সমর্পণ করিয়া স্বয়ং তালবৃন্ত সঞ্চালন করিতে লাগিলেন।
তখন রাজকুমার কহিলেন প্রিয়ে তোমার বদনসুধাকরসন্দর্শনেই আমার চিত্তচকোর চরিতার্থ হইয়াছে আর এরূপ পরিশ্রম স্বীকারের প্রয়োজন নাই। বিশেষতঃ তোমার কোমল করপল্লব শিরীষকুসুম অপেক্ষাও সুকুমার কোন ক্রমেই তালবৃন্তধারণের যোগ্য নহে। আমার হস্তে প্রদান কর আমি তোমার সেবা দ্বারা শ্রম সফল করি। পদ্মাবতী কহিলেন নাথ আমার নিমিত্ত তোমার অনেক পরিশ্রম ও ক্লেশ হইয়াছে অতএব তোমার সেবা করাই আমার উচিত হয়। উভয়ের এইরূপ বচনবৈদগ্ধী শ্রবণ করিয়া পার্শ্ববর্ত্তিনী সখী পদ্মাবতীর করতল হইতে তালবৃন্ত গ্রহণপূর্ব্বক বায়ু সঞ্চালন করিতে লাগিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরে উভয়ের সাত্ত্বিক ভাবের আবির্ভাব দেখিয়া সহচরীগণ কার্য্যান্তরব্যপদেশে গৃহ হইতে বহির্গত হইলে কান্ত ও কামিনী কৌতুকে যামিনী যাপন করিলেন।
রজনী অবসন্ন হইল। কুমার অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইবার মানস প্রকাশ করিলেন। তখন কুমারী কহিলেন নাথ আমার এই অন্তঃপুরে সখীগণ ব্যতিরেকে অন্যের প্রবেশাধিকার নাই তুমি নির্ভয়ে অবস্থিতি কর। আমি তোমাকে বিদায় দিয়া ক্ষণমাত্রও প্রাণধারণ করিতে পারিব না। রাজকুমার প্রিয়তমার এতাদৃশ প্রণয়রসাভিষিক্ত মৃদুমধুর বচনপরম্পরা শ্রবণে শ্রবণেন্দ্রিয়ের চরিতার্থতা লাভ করিয়া তদীয় প্রস্তাবে সম্মত হইলেন এবং তাহার সহচর হইয়া পরম সুখে নানা কৌতুকে কালযাপন করিতে লাগিলেন। এই রূপে কতিপয় দিবস অতীত হইলে রাজকুমার নিজ রাজধানী গমনের অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন। রাজকন্যা কোন ক্রমেই সম্মত হইলেন না। ক্রমে ক্রমে প্রায় মাস অতীত হইল রাজকুমার তথাপি অনুমতি লাভ করিতে পারিলেন না। এখানে রাজা প্রতাপমুকুট এতাবৎ দিবস পর্য্যন্ত প্রাণাবিকপ্রিয় পুত্ত্রের কোন উদ্দেশ না পাইয়া শোকাকুল হইয়া দেশ বিদেশ অন্বেষণ করিতে দূত প্রেরণ করিলেন। রাজপুত্ত্র গমনবিষয়ে নিতান্ত নিৰুপায় হইয়া একান্ত চিন্তাকুল হইলেন। এক দিবস তিনি নির্জনে বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন আমি অকিঞ্চিৎকর ইন্দ্রিয়সুখপরতন্ত্র হইয়া পিতা মাতা আত্মীয়গণ জন্মভূমি প্রভৃতি সকল পরিত্যাগ করিলাম। আর যে জীবিতাধিক বান্ধবের বুদ্ধিকৌশলে ঈদৃশ অসুলভ সুখসম্ভোগে কালহরণ করিতেছি মাসাবধি তাঁহারও কোন সংবাদ লইলাম না। বোধ করি বন্ধু আমারে স্বার্থপর ও অকৃতজ্ঞ ভাবিতেছেন।
রাজকুমার একাকী এইরূপ চিন্তা করিতেছেন এমন সময়ে রাজকন্যা অকস্মাৎ তথায় উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে উৎকণ্ঠিত দেখিয়া জিজ্ঞাসিলেন নাথ আজি কি নিমিত্ত তুমি এমন বিমনা হইয়াছ। তোমার চন্দ্রবদন বিষণ্ণ দেখিলে আমি দশ দিক্ শূন্য দেখি। অসুখের কারণ বল ত্বরায় তাহার প্রতীকার করিতেছি। বজ্রমুকুট কহিলেন পিতার সর্ব্বাধিকারীর পুত্ত্র আমার সহচর হইয়া আসিয়াছেন। তিনি আমার পরম মিত্র মাসাবধি তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ নহি এবং তৎসম্পর্কীয় কোন বার্ত্তাও শুনিতে পাই নাই জানি না কিপ্রকার আছেন। তিনি অতি চতুর সর্ব্বশাস্ত্রে পণ্ডিত ও নানা গুণরত্নে মণ্ডিত। তাঁহার বুদ্ধিকৌশলেই তোমার সমাগম লাভ করিয়াছি এবং এতাবৎ দিবস পর্য্যন্ত এই বাক্পথাতীত সুখসম্ভোগে কালহরণ করিতেছি। তিনিই তোমার সমুদায় সঙ্কেভের মর্ম্মোদ্ভেদ করিয়াছেন।
পদ্মাবতী কহিলেন অয়ি নাথ এরূপ বন্ধুর অদর্শনে চিত্ত অবশ্যই উৎকণ্ঠিত হইতে পারে। এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত তাঁহার কোন সংবাদ লওয়ায় তোমার অতি অভদ্রতা প্রকাশ হইয়াছে। রহস্যবিদ বন্ধু প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয় হয়। বিবেচনা করিয়া দেখিলে তুমি তাঁহার নিকট অত্যন্ত অপরাধী হইয়াছ ও যার পর নাই, অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়াছ। যাহা হউক এক্ষণে কর্ত্তব্য এই তাঁহার পরিতোষ জন্য আমি নানাবিধ মিষ্টান্ন প্রস্তুত করিয়া পাঠাই এবং তুমিও কিয়ৎ ক্ষণের নিমিত্ত তথায় গিয়া সমুচিত সদ্ভাব প্রদর্শন করিয়া আইস। রাজপুত্ত্র তৎক্ষণাৎ সেই গুপ্ত দ্বার দিয়া অন্তঃপুর হইতে বহির্গত হইয়া বৃদ্ধার ভবনে উপস্থিত হইলেন এবং বহু দিবসের পর অকপটপ্রণয়পবিত্র মিত্র সহ সাক্ষাৎকারলাভে অশ্রুপূর্ণলোচন হইয়া তাঁহার নিকট অদর্শনদিনাবধি পূর্ব্বাপর সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন।
রাজপুত্ত্রকে বন্ধুদর্শনে প্রেরণ করিয়া রাজকন্যা মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন এ কেবল বন্ধুর বুদ্ধিকৌশলেই কৃতকার্য্য হইয়াছে অতএব অবশ্যই সকল কথা তাহার নিকট ব্যক্ত করিবেক। আর সে ব্যক্তিও তাহার অন্যান্য বান্ধবের নিকট প্রকাশ করিবেক সন্দেহ নাই। এই রূপে আমার অযশ ক্রমে ক্রমে জগদ্ব্যাপ্ত হইবার সম্ভাবনা। অতএব এমন ব্যক্তিকে জীবিত রাখা কোম ক্রমেই উপযুক্ত নহে। এইরূপ ভাবিয়া তৎক্ষণাৎ নানাবিধ বিষমিশ্রিত মিষ্টান্ন প্রস্তুত করিয়া সখী দ্বারা পাঠাইয়া দিলেন।
মিষ্টান্ন উপনীত হইলে মন্ত্রিপুত্ত্র জিজ্ঞাসা করিলেন বয়স্য এ সকল কি। রাজপুত্ত্র বলিলেন মিত্র অদ্য আমি তোমার নিমিত্ত অতিশয় উৎকণ্ঠিত হইয়াছিলাম। রাজকন্যা আমার দিকে দৃষ্টিপতি করিয়া কারণজিজ্ঞাসু হইলে আমি তোমার অশেষবিধ প্রশংসা করিয়া কহিলাম প্রিয়ে আমি এই বন্ধুর অদর্শনে বিষণ্ণ হইতেছি। রাজকন্যা তোমার কথা শুনিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছেন এবং আমাকে অগ্রে পাঠাইয়া দিয়া স্বহস্তে এই সমস্ত প্রস্তুত করিয়া তোমার আহারের নিমিত্ত প্রেরণ করিয়াছেন। আমাকে কহিয়া দিয়াছেন তুমি আপন সমক্ষে তাঁহাকে ভোজন করাইয়া আসিবে। অতএব বয়স্য কিছু ভক্ষণ কর তাহা হইলে পরম সন্তোষ পাই এবং যাইয়া তাঁহার নিকট কহিতে চাই আমার বন্ধু মিষ্টান্ন আহার করিয়া তোমার শিল্পনৈপুণ্যের অশেষ প্রশংসা করিয়াছেন।
তখন অমাত্যপুত্ত্র রাজপুত্ত্রের নিকট পুনর্বার মনোযোগপূর্ব্বক পূর্ব্বাপর সমস্ত শ্রবণ করিয়া কহিলেন বয়স্য তুমি আমার নিমিত্ত কালকূট আনিয়াছ। এ মিষ্টান্ন নহে সাক্ষাৎ কৃতান্ত জিহ্বাস্পর্শমাত্রেই প্রাণসংহার করিবেক। যাহা হউক আমার পরম ভাগ্য এই যে তুমি খাও নাই। তুমি ঋজুস্বভাব কাহার কি ভাব কিছুই বুঝিতে চেষ্টা কর না। তোমাকে এক সার কথা কহি স্বৈরিণীরা স্বভাবতঃ আপন প্রিয়ের প্রিয়পাত্রের প্রতি অতিশয় বিষদৃষ্টি হয়। অতএব তুমি তাহার সমক্ষে আমার নাম গ্রহণ করিয়া বুদ্ধির কর্ম্ম কর নাই।
কুমার কহিলেন বয়স্য আমি তোমার এ কথায় বিশ্বাস করিতে পারি না। তুমি তাহার স্বভাব জান না এই নিমিত্ত এরূপ কহিতেছ। এমন সদাশয় স্ত্রীলোক আমি কখন দেখি নাই। তাহার নাম করিলে আমার রোমাঞ্চ হয়। বলিতে কি তুমি আর বার এপ্রকার কহিলে আমি তোমার উপর বিরক্ত হইব। ভাল কথায় প্রয়োজন নাই আমি তোমার সন্দেহ দূর করিতেছি। এই বলিয়া এক লাড়ু লইয়া বিড়ালকে ভক্ষণ করাইলেন। বিড়াল তৎক্ষণাৎ পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। তখন রাজপুত্ত্র চমৎকৃত হইয়া কহিতে লাগিলেন এরূপ দুর্বৃত্তার সহিত পরিচয় রাখা উচিত নহে। আর আমি জন্মাবচ্ছিন্নে সেই পাপীয়সীর মুখ দর্শন করিব না। মন্ত্রিপুত্ত্র কহিলেন না বয়স্য তাহাকে এক বারেই পরিত্যাগ করা হইবেক না রাজধানীতে লইয়া যাইবার সুযোগ দেখিতে হইবেক। রাজপুত্ত্র কহিলেন তাহাও তোমার বুদ্ধিসাধ্য।
অমাত্যপুত্ত্র কহিলেন বয়স্য এক পরামর্শ বলি শুন। অদ্য তুমি পদ্মাবতীর নিকটে গিয়া পূর্ব্বাপেক্ষায় অধিকতর প্রণয় প্রকাশ করিবে এবং কহিবে বন্ধু মিষ্টান্ন আহারের অব্যবহিত পর ক্ষণেই অচেতনপ্রায় হইয়া নিদ্রাগত হইলেন। আমি তোমাকে দেখিবার নিমিত্ত উৎসুক হইয়া তাঁহার নিদ্রাভঙ্গ পর্য্যন্ত অপেক্ষা করিতে না পারিয়া তাঁহাকে না বলিয়াই চলিয়া আসিয়াছি। আমি এখন তোমাকে এক ক্ষণ নিরীক্ষণ না করিলে দশ দিক্ শূন্য দেখি। ফলতঃ আর আমি বন্ধুর অনুরোধে এক মুহূর্ত্তের নিমিত্তেও তোমাকে পরিত্যাগ করিয়া যাইতে পারিব না। ইত্যাদি নানাবিধ কপট বাক্য দ্বারা তাহার বিশ্বাস জন্মাইয়া দিবা যাপন করিবে। পরে সে নিদ্রাগতা হইলে তদীয় সমস্ত আভরণ হরণপূর্ব্বক তাহার বাম জঙ্ঘাতে এক ত্রিশূলের চিহ্ন দিয়া চলিয়া আসিবে। রাজপুত্ত্র সহিত হইলেন এবং পদ্মাবতীর নিকটে গিয়া পূর্ব্বাপেক্ষায় সমধিক প্রীতি প্রকাশ করিলেন। পরে রজনীযোগে উভয়ে শয়ন করিলে রাজকন্যা সে দিবস ত্বরায় নিদ্রাভিভূতা হইলেন। কুমার দেখিলেন পদ্মাবতী সুষুপ্তিপ্রাপ্তা হইয়াছেন। তখন মন্ত্রিপুত্ত্রের উপদেশানুরূপ সমস্ত সম্পাদন করিয়া বৃদ্ধার আবাসে উপস্থিত হইলেন।
পর দিন প্রভাতে মন্ত্রিপুত্ত্র সন্ন্যাসীর বেশ ধারণপূর্ব্বক এক শ্মশানে উপস্থিত হইলেন এবং স্বয়ং গুরু হইয়া রাজপুত্ত্রকে শিষ্য করিয়া কহিলেন তুমি নগরে গিয়া এই অলঙ্কার বিক্রয় কর। যদি কেহ তোমাকে চোর বলিয়া ধরে তাহাকে আমার নিকটে লইয়া আসিবে। রাজপুত্ত্র তাঁহার বচনানুসারে ভূষণগ্রহণপুরঃসর নগর প্রবেশ করিয়া রাজসদনের সমীপস্থিত স্বর্ণকারের নিকট বিক্রয়ার্থ উপস্থিত হইলেন। সে দর্শনমাত্র বিস্ময়াপন্ন হইয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিল কিয়ৎ দিবস হইল আমি রাজকন্যার নিমিত্ত এই সকল অলঙ্কার গড়িয়া দিয়াছি ইহার হস্তে কি প্রকারে আইল। এ ব্যক্তিকে বৈদেশিকে দেখিতেছি। অনন্তর সন্দিহান হইয়া কারিকরদিগকে জিজ্ঞাসা করাতে তাহারা কহিল হাঁ এ সমস্ত রাজকন্যার অলঙ্কার বটে। তখন স্বর্ণকার রাজকুমারকে চোর নিশ্চয় করিয়া কহিল এ রাজকন্যার অলঙ্কার দেখিতেছি তুমি কোথায় পাইলে যথার্থ বল।
স্বর্ণকার ভয় প্রদর্শনপূর্ব্বক বার বার এইপ্রকার জিজ্ঞাসা করাতে রাজপথবাহী দশ দ্বাদশ উদাসীন ব্যক্তিও কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া তথায় উপস্থিত হইল। ফলতঃ অল্পকালমধ্যেই ঐ অলঙ্কার লইয়া অত্যন্ত আন্দোলন হইতে লাগিল। পরিশেষে নগররক্ষক এই সংবাদ পাইয়া রাজকুমার ও স্বর্ণকার উভয়কে রুদ্ধ করিল। পরে সে অলঙ্কারের প্রাপ্তিবৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিলে কুমার কহিলেন শ্মশানবাসী গুরুদের আমারে এই অলঙ্কার বিক্রয় করিতে পাঠাইয়াছেন। তিনি কোথায় পাইয়াছেন আমি তাহার কিছুই জানি না। যদি তোমাদের সন্দেহ হয় তাঁহাকে গিয়া জিজ্ঞাসা কর। পরিশেষে পুররক্ষী গুরু শিষ্য উভয়কে অলঙ্কারসমেত রাজসমক্ষে লইয়া গিয়া পূর্ব্বাপর সমস্ত বিজ্ঞাপন করিল।
রাজা অলঙ্কারদর্শনে নানা প্রকারে সন্দিহান হইয়া যোগীকে নির্জনে আনিয়া বিনয়বাক্যে জিজ্ঞাসা করিলেন মহাশয় আপনি এই সমস্ত অলঙ্কার কোথায় পাইলেন। যোগী কহিলেন মহারাজ কৃষ্ণচতুর্দশীরজনীতে আমি নগরপ্রান্তবর্ত্তী শ্মশানে ডাকিনীমন্ত্র সিদ্ধ করিয়াছিলাম। মন্ত্রপ্রভাবে ডাকিনী স্বয়ং উপস্থিত হইয়া প্রসাদস্বরূপ স্বীয় অলঙ্কার উন্মোচন করিয়া দিয়াছেন এবং আমিও তাঁহার বাম জঙ্ঘাতে যোগসিদ্ধির প্রমাণস্বরূপ এক ত্রিশূলের চিহ্ন দিয়াছি। এ সমুদায় সেই অলঙ্কার। রাজা শুনিয়া বিস্ময়াপন্ন হইয়া অবিলম্বে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন এবং নিজ মহিষীকে কহিলেন দেখ দেখি পদ্মাবতীর বাম জঙ্ঘাতে কোন চিহ্ন আছে কি না। রাজ্ঞী সবিশেষ অবগত হইয়া রাজার নিকটে আসিয়া কহিলেন এক ত্রিশূলের চিহ্ন আছে।
রাজা এইপ্রকার অঘটনঘটনা শ্রবণে হতবুদ্ধি ও লজ্জায় অধোমুখ হইয়া ভাবিতে লাগিলেন এপ্রকার স্বৈরিণীকে গৃহে রাখা উচিত কর্ম্ম নহে ইহাতে অধর্ম্ম আছে। অতএব এখন কি কর্ত্তব্য। অথবা পণ্ডিতমণ্ডলী একত্র করিয়া সবিশেষ কহিয়া জিজ্ঞাসা করি তাঁহারা ধর্ম্মশাস্ত্র অনুসারে যেরূপ ব্যবস্থা দিবেন তদনুরূপ কার্য্য করিব। কিন্তু গৃহচ্ছিদ্র প্রকাশ করিতে শাস্ত্রে নিষেধ আছে। পণ্ডিতমণ্ডলী সংগ্রহ করিয়া ব্যবস্থা জিজ্ঞাসিলে আমার এই অপযশ ক্রমে ক্রমে দেশে বিদেশে প্রচার হইবেক। তদপেক্ষা উত্তম কল্প এই সেই সন্ন্যাসীকেই ইহার পরামর্শ জিজ্ঞাসা করি। সন্ন্যাসী সবিশেষ অবগত আছেন শাস্ত্রজ্ঞও বটেন ধর্ম্মতঃ প্রশ্ন করিলে অবশ্যই যথাশাস্ত্র ব্যবস্থা দিবেন। অনন্তর বিজন প্রদেশে আসিয়া সন্ন্যাসীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন মহাশয় ধর্ম্মশাস্ত্রে দুশ্চরিত্রা স্ত্রীর বিষয়ে কিরূপ দণ্ড নিরূপিত আছে। সন্ন্যাসী কহিলেন মহারাজ ধর্ম্মশাস্ত্রে লিখিত আছে স্ত্রী বালক ও ব্রাহ্মণ ইহারা অভ্যন্ত অপরাধী হইলেও বধাহ নহে রাজা ইহাদের নির্বাসন করিবেন।
তখন রাজা অন্তঃপুরে গিয়া রাজ্ঞীকে কহিলেন পদ্মাবতী অতিদুশ্চরিত্রা এজন্য শাস্ত্রবিধানানুসারে আমি ইহাকে দেশবহিষ্কৃতা করিব। রাজ্ঞী কন্যার প্রতি অত্যন্ত স্নেহবতী ছিলেন কিন্তু পতিব্রতাত্ব প্রযুক্তি রাজার মতেই সম্মতা হইলেন। তদনন্তর নৃপতি কন্যাকে শিবিকারোহণের আদেশ দিয়া তাহার অগোচরে বাহকদিগকে আজ্ঞা দিলেন তোমরা পদ্মাবতীকে কোন অরণ্যানীতে পরিত্যাগ করিয়া ত্বরায় আমাকে সংবাদ দাও। বাহকেরা রাজাজ্ঞা সম্পাদন করিল। অমাত্যপুত্ত্রও তৎক্ষণাৎ রাজকুমারকে সঙ্গে লইয়া রাজকুমারীর উদ্দেশে চলিলেন এবং ইতস্ততঃ অনেক অন্বেষণ করিয়া পরিশেষে সেই অরণ্যে প্রবেশিয়া দেখিলেন পদ্মাবতী একাকিনী বৃক্ষমূলে বসিয়া যুথভ্রষ্টা হরিণীর ন্যায় বিষণ্ণ বদনে রোদন করিতেছেন। পরে অশেষবিধ আশ্বাস প্রদান দ্বারা তাঁহার শোকাবেগ নিবারণ করিয়া সঙ্গে লইয়া উভয়ে স্বদেশাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। রাজধানীতে উপস্থিত হইলে প্রজাগণ অতিশয় আনন্দিত হইল। রাজা প্রতাপমুকুট বধূসহিত পুত্ত্র পাইয়া আনন্দপ্রবাহে মগ্ন হইয়া নগরে মহোৎসবের আদেশ করিলেন।
এই রূপে আখ্যায়িকা সমাপন করিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ রাজা ও মন্ত্রিপুত্ত্র এ উভয়ের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি নিরপরাধে রাজকুমারীর বসপ্রেষণজন্য দুরদৃষ্টভাগী হইবেন। বিক্রমাদিত্য কহিলেন আমার মতে রাজা। বেতাল কহিল কি নিমিত্তে। রাজা কহিলেন শাস্ত্রকারেরা আততায়ী ব্যক্তির বধ ও বিদ্রোহাচরণে দোষাভাব লিখিয়াছেন। অতএব বিষপ্রদায়িনী রাজকন্যার প্রতি এরূপ প্রতিকূলতাচরণে মন্ত্রিপ্রত্ত্রকে দোষী বলিতে পারা যায় না। কিন্তু রাজা যে অজ্ঞাতকুলশীল ব্যক্তির বাক্যে বিশ্বাস করিয়া প্রমাণাত্তরনিরপেক্ষ ও বিচারবিমুখ হইয়া অপত্যস্নেহ বিস্মরণপূর্ব্বক অকৃতাপরাধে কন্যাকে বনবাস দিলেন ইহাতে তাঁহার রাজধর্ম্মবিরুন্ধ কর্মের অনুষ্ঠানজন্য পাপস্পর্শ হইতে পারে।
ইহা শুনিয়া বেতাল পূর্ব্বপ্রতিজ্ঞা অনুসারে শ্মশানে গিয়া পূর্ব্ববৎ বৃক্ষে লম্বমান হইল। রাজাও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইয়া তাহাকে বৃক্ষ হইতে অবতারণপূর্ব্বক স্কন্ধে করিয়া সন্ন্যাসীর আশ্রমাভিমুখে চলিলেন।
বিংশ উপাখ্যান
বিংশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
বিশালপুর নগরে অর্থদত্ত নামে ধনাঢ্য বণিক্ ছিল। সে কমলপুরনিবাসী মদনদাস বণিকের সহিত আপন কন্যা অনঙ্গমঞ্জরীর বিবাহ দিয়াছিল। কিছু দিন পরে মদনদাস ভার্য্যাকে তাহার পিত্রালয়ে রাখিয়া বাণিজ্যার্থে দ্বীপান্তর প্রস্থান করিল।
এক দিবস অনঙ্গমঞ্জরী গবাক্ষদ্বার দিয়া রাজপথ অবলোকন করিতেছে ঐ সময়ে কমলাকরনামক সুকুমার ব্রাহ্মণকুমার তথায় উপস্থিত হইল। উভয়ের নয়নে নয়নে আলিঙ্গন হইলে পরস্পর পরস্পরের রূপলাবণ্যদর্শনে মোহিত হইল। ব্রাহ্মণকুমার নিকাম ব্যাকুল হইয়া গৃহগমনপূর্ব্বক প্রিয় বয়স্যের নিকট স্বীয় বিরহবেদনা নিবেদন করিয়া বিচেতন ও শয্যাগত হইল। তাহার সখা উশীরানুলেপন চন্দনবারিসেচন সরসকমলদলশয়্যা ও জলাদ্রতালবৃন্তসঞ্চালন দ্বারা শুশ্রূষা করিতে লাগিল।
এ দিকে অনঙ্গমঞ্জরীও অনঙ্গশরপ্রহারে জর্জ্জরিতাঙ্গী হইয়া ধরাশয্যা অবলম্বন করিলে তাহার সখী সবিশেষ জিজ্ঞাসা দ্বারা সমস্ত অবগত হইয়া প্রবোধদানচ্ছলে অনেক ভর্ৎসনা করিল। তখন সে কহিল সখি আমি নিতান্ত অবোধ নহি কিন্তু মন আমার প্রবোধ মানে না। নির্দয় কন্দর্পের নিরন্তর শরপ্রহারে আমি জর্জ্জরিত হইয়াছি। আর যাতনা সহ্য হয় না। যদি সেই চিত্তচোরকে ধরিয়া দিতে পার তাহা হইলেই প্রাণধারণ করিব নতুবা আত্মঘাতিনী হইব।
ইহা কহিয়া অনঙ্গমঞ্জরী অশ্রুপূর্ণ নয়নে অত্যায়ত নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিল। তখন তাহার সহচরী কালবিলম্ব অনুচিত বিবেচনা করিয়া কমলাকরের আলয়ে গমনপূর্ব্বক তাহাকেও স্বীয় সহচরীর তুল্যাবস্থ দেখিয়া মনে মনে বিবেচনা করিল দুরাত্মা কন্দর্পের কিছুই অসাধ্য নাই কি স্ত্রী কি পুরুষ সকলকেই সমান রূপে কুসুমময় শরাসনের আজ্ঞাকারী করিতে পারে। অনন্তর সে কমলাকরের নিকট কহিল অর্থদত্তশেঠের কন্যা অনঙ্গমঞ্জরী প্রার্থনা করিতেছে তুমি তাহার প্রাণদান কর। কমলাকর শুনিয়া তৎক্ষণাৎ গাত্রোত্থান করিল এবং কহিল আপাততঃ তুমি এই অমৃতায়মান মনোহর বাক্য দ্বারা আমায় প্রাণদান করিলে।
পরে সহচরী কমলাকরকে সমভিব্যাহারে লইয়া অনঙ্গমঞ্জরীর আবাসে উপস্থিত হইয়া দেখিল সে প্রাণত্যাগ করিয়াছে। অমনি কমলাকর হা প্রেয়সি বলিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগপূর্ব্বক ভূতলে পতিত ও পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেন।
অনঙ্গমঞ্জরীর গৃহজন এই সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া উভয়কে শ্মশানে লইয়া এক চিতায় অগ্নিদান করিল। দৈবযোগে অর্থদত্তের জামাতা মদনদাসও সেই সময়ে শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হইল এবং নিজ ভার্য্যা অনঙ্গমঞ্জরীর মৃত্যুবৃত্তান্ত শুনিয়া হাহাকার করিতে করিতে ঊর্দ্ধশ্বাসে শ্মশানে গিয়া জ্বলচ্চিতায় ঝম্পপ্রদানপূর্ব্বক প্রাণত্যাগ করিল।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এই তিনের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি অধিক ইন্দ্রিয়দাস। রাজা কহিলেন মদনদাস। বেতাল বলিল কেন। রাজা কহিলেন তাহার স্ত্রী পরপুরুষে অনুরাগিণী হইয়া বিরহে প্রাণত্যাগ করিল তাহাতে তাহার অন্তঃকরণে বিরাগ জন্মিল না। প্রত্যুত তাহার বিয়োগে প্রাণধারণ করিতে অসমর্থ হইয়া অগ্নিপ্রবেশ করিল।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
ষষ্ঠ উপাখ্যান
ষষ্ঠ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
ধর্ম্মপুর নামে অতি প্রসিদ্ধ নগর আছে। তথায় ধর্ম্মশীল নামে অতি সুশীল রাজা ছিলেন। তাঁহার মন্ত্রীর নাম অন্ধক। মন্ত্রী এক দিবস রাজাকে পরামর্শ দিলেন মহারাজ নব মন্দির নির্মাণপূর্ব্বক তন্মধ্যে কাত্যায়নীর প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করিয়া প্রতিদিন যথাবিধানে পূজা করিতে আরম্ভ করুন শাস্ত্রে ইহার বিশেষ ফলশ্রুতি আছে। রাজা মন্ত্রীর পরামর্শে পরম পরিতুষ্ট হইলেন এবং নূতন মন্দির নির্মাণ করাইয়া তন্মধ্যে ভগবতী কাত্যায়নীর কাঞ্চনময়ী প্রতিমূর্ত্তি সংস্থাপনপূর্ব্বক প্রত্যহ মহাসমারোহে পূজা করিতে লাগিলেন, বিনা পূজায় প্রাণান্তেও জলগ্রহণ করিতেন না।
রাজা এই রূপে দেবতারাধনে যত্নবান্ ও গো ব্রাহ্মণে ভক্তিমান্ ছিলেন তথাপি সংসারাশ্রমসারভূত তনয়ের মুখচন্দ্রনিরীক্ষণে অধিকারী হইলেন না। সর্ব্বদাই মনে মনে চিন্তা করেন শাস্ত্রে ও লোকাচারে প্রসিদ্ধ আছে অপুত্ত্র ব্যক্তির সংসারাশ্রম ধনজনপরিপূর্ণ হইলেও শূন্যপ্রায় এবং পরকালেও সদ্গতি লাভ হয় না। অতএব কি কর্ত্তব্য।
এক দিবস মন্ত্রিপ্রবর অন্ধকের পরামর্শানুসারে কাত্যায়নীর মন্দিরে প্রবেশপূর্ব্বক সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে স্তব করিতে লাগিলেন দেবি তুমি ত্রিলোকজননী। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর প্রভৃতি দেবগণ অষ্ট প্রহর তোমার আরাধনা করেন। তুমি কালে কালে ত্রিভুবনের মহানর্থহেতু উৎপাতধূমকেতুপ্রায় মহিষাসুর রক্তবীজ প্রভৃতি দুর্বৃত্ত দৈত্যদানবগণের প্রাণসংহার করিয়া ভূমির ভার হরিয়াছ। আর যখন যে স্থানে তোমার ভক্তেরা বিপদ্গ্রস্ত হইয়াছে তুমি তৎক্ষণাৎ তথায় উপস্থিত হইয়া তাহাদের পরিত্রাণ করিয়াছ। তুমি শরণাগত ভক্তগণের মনোবাঞ্ছা পরিপূর্ণ করিয়া থাক এই নিমিত্ত আমি তোমার শরণাপন্ন হইয়াছি আমার মনস্কামনা পরিপূর্ণ কর। এইরূপস্তবাবসানে পুনর্বার সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া দণ্ডায়মান রহিলেন।
অনন্তর আকাশবাণী হইল রাজন্ আমি তোমার প্রতি অতিশয় প্রসন্ন হইয়াছি অভিপ্রেত বর প্রার্থনা কর। রাজা শুনিয়া কৃতার্থম্মন্য হইয়া আনন্দগদ্গদ স্বরে কহিলেন জননি যদি প্রসন্ন হইয়া থাক কৃপা করিয়া এই বর দাও যেন আমি অবিলম্বে পুত্ত্রমুখ নিরীক্ষণ করি। দেবী কহিলেন বৎস অবিলম্বে তোমার পুত্ত্র জন্মিবেক এবং ঐ পুত্ত্র সুশীল শান্তস্বভাব ও সর্ব্ব বিষয়ে পারদর্শী হইবেক।
কিয়ৎ দিন অতীত হইলে রাজার এক পুত্ত্র জন্মিল। রাজা মহাসমারোহে সপরিবারে দেবীর মন্দিরে উপস্থিত হইয়া স্বহস্তে দেবীর পূজাকার্য্য নির্বাহ করিলেন এবং সমাগত দীন দরিদ্র অনাথ প্রভৃতিকে প্রার্থনাধিকধনদান দ্বারা পরিতুষ্ট করিয়া বিদায় করিলেন।
এক দিবস দীনদাস নামে তন্তুবায় কোন কার্য্য উপলক্ষে নিজ বন্ধুর সহিত রাজধানীতে গমন করিতেছিল। দৈবযোগে তাহার সজাতীয়া সেই নগরবাসিনী এক পরম সুন্দরী কন্যা নয়নগোচর হওয়াতে তদীয় অসামান্য রূপ লাবণ্য দর্শনে মোহিত হইল। অনন্তর সে দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইলে তন্তুবায় মনে মনে চিন্তা করিল আমাদের মহারাজ পুত্ত্রবিষয়ে নিতান্ত নিরাশ হইয়াও ভগবতী কাত্যায়নীর প্রসাদে বৃদ্ধ বয়সে পুত্ত্রমুখ নিরীক্ষণ করিয়াছেন। দেবীর কৃপাদৃষ্টি হইলে আমারও এই স্ত্রীরত্ন লাভ সম্পন্ন হইতে পারে।
এই চিন্তা করিয়া দেবীর মন্দিরে প্রবেশপূর্ব্বক দৃঢ়তর ভক্তিযোগ সহকারে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে মানসিক করিল ভগবতি যদি এই কামিনীর সহিত আমার বিবাহ হয় আমি স্বহস্তে আপন মস্তক ছেদন করিয়া তোমার পূজা দিব। এইরূপ মানস করিয়া প্রণামপূর্ব্বক আপন বন্ধুর সহিত নির্দিষ্ট স্থানে প্রস্থান করিল। পরে নিজালয়ে প্রত্যাগমনানন্তর সেই সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী রমণীর দুঃসহ বিরহানলে দগ্ধহৃদয় হইয়া আহারবিহারাদি সমস্ত বিষয়ে অনুরাগশূন্য হইল এবং অষ্ট প্রহর অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া কেবল সেই কামিনীর বিভ্রমবিলাসাদি ধ্যান করিতে লাগিল।
তাহার সহচর স্বীয় প্রিয় বয়স্যের এবংবিধ অপ্রতিবিধেয় স্মরদশাপ্রাদুর্ভাব দেখিয়া অত্যন্ত বিষণ্ণমনা হইল এবং অশেষপ্রকার চিন্তা করিয়াও কোন উপায় নির্দ্ধারণে অসমর্থ হইয়া পরিশেষে তাহার পিতার নিকট সবিশেষ সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিল। তাহার পিতা সমস্ত শ্রবণ ও স্বচক্ষে সমুদায় দর্শন করিয়া বিবেচনা করিল ইহার যেরূপ দশা দেখিতেছি বোধ করি সেই কন্যার সহিত বিবাহ না হইলে প্রাণত্যাগ করিতে পারে। অতএব এ বিষয়ে উপেক্ষা করা বিধেয় নহে বরং যাহাতে ত্বরায় ইহার অভীষ্টসিদ্ধি হয় তদ্বিষয়ে যত্নবান্ হওয়া কর্ত্তব্য।
এই নিশ্চয় করিয়া দীনদাসের পিতা পুত্ত্রের মিত্রকে সমভিব্যাহারে লইয়া সেই কন্যার পিত্রালয়ে উপস্থিত হইল এবং যথোচিত শিষ্টাচার ও মিষ্টালাপের পর গৃহস্বামীকে কহিল আমি তোমার নিকট কিছু প্রার্থনা করিতে আসিয়াছি, যদি তুমি দিতে অসম্মত না হও ব্যক্ত করি। সে কহিল যদি সাধ্যাতীত না হয় অবশ্য দিব তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। এইরূপ বচনবদ্ধ করিয়া দীনদাসের পিতা গৃহস্বামীর নিকট আপন অভিপ্রায় ব্যক্ত করিবামাত্র সে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইয়া শুভ দিন ও শুভ লগ্ন নির্দ্ধারিত করিয়া কন্যাদান করিল। তন্তুবায়তনয় অভিলষিতদারসমাগম দ্বারা কৃতার্থম্মন্য হইয়া পরম সুখে কালহরণ করিতে লাগিল।
কিয়ৎ দিন পরে দীনদাসের শ্বশুরালয়ে কর্ম্মবিশেষ উপস্থিত হওয়াতে সে নিমন্ত্রিত হইয়া পূর্ব্ব বন্ধুকে সমভিব্যাহারে করিয়া স্ত্রীসহিত শ্বশুরালয়ে প্রস্থান করিল। সেই নগর নিকটবর্ত্তী হইলে দেবীর মন্দিরসন্দর্শনে পূর্ব্বকৃত মানসিক স্মরণ হওয়াতে দীনদাস মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিল আমি অত্যন্ত অসত্যবাদী পামর। দেবীর নিকট মানসিক করিয়া বিস্মৃত হইয়া রহিয়াছি। জন্মজন্মান্তরেও আমি এই গুরুতর অপরাধ হইতে নিষ্কৃতি পাইব না। যাহা হউক এক্ষণে ক্ষণমাত্রও বিলম্ব না করিয়া দেবীর ধার পরিশোধ করা উচিত।
তৎপরে স্বীয় সহচরকে কহিল মিত্র তুমি ক্ষণ কাল অপেক্ষা কর আমি ত্বরায় দেবীদর্শন করিয়া প্রত্যাগমন করিতেছি। এই বলিয়া তথায় উপস্থিত ও সন্নিহিত সরোবরে স্নাত হইয়া প্রথমতঃ যথাবিধি পূজা করিল অনন্তর ভগবতি কাত্যায়নি বহু কাল হইল আমি তোমার নিকট মানসিক করিয়াছিলাম অদ্য তাহার পরিশোধ করিতেছি। এই বলিয়া মন্দিরস্থিত খড়্গ লইয়া স্কন্ধদেশে আঘাত করিবামাত্র মস্তক দেই হইতে পৃথগ্ভূত হইয়া ভূতলে পতিত হইল।
পরে দীনদাসের আসিতে অনেক বিলম্ব দেখিয়া তাহার বন্ধু তাহার স্ত্রীকে কহিল তুমি এই খানে থাক আমি বন্ধুকে ডাকিয়া আনি। এই বলিয়া তথায় গমন করিয়া মন্দিরমধ্যে প্রবেশপূর্ব্বক দেখিল দীনদাসের মস্তক ও দেহ পৃথক্ পৃথক্ পতিত আছে। তদ্দর্শনে হতবুদ্ধি হইয়া সে মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিল সংসার অতি বিরুদ্ধ স্থান। কোন ব্যক্তিই বোধ করিবেক না এ স্বয়ং প্রাণত্যাগ করিয়াছে। সকলেই কহিবেক আমি এই স্ত্রীর সৌন্দর্য্যে মোহিত হইয়া আপন অসদভিপ্রায় সাধনের নিমিত্ত বন্ধুর প্রাণনাশ করিয়াছি। অকারণে এরূপ বিরূপ লোকারপবাদগ্রস্ত হওয়া অপেক্ষা প্রাণত্যাগ করাই বিধেয়। এই ভাবিয়া সে ব্যক্তিও তৎক্ষণাৎ সেই খড়্গ দ্বারা আপন মস্তকচ্ছেদন করিল।
তন্তুবায়তনয়া বহু ক্ষণ একাকিনী দণ্ডায়মান থাকিয়া তাহাদের অন্বেষণার্থে দেবীর মন্দিরে উপস্থিত হইল এবং উভয়কেই মৃত পতিত দেখিয়া বিবেচনা করিল দৈবদুর্বিপাকে আমার যে দুরবস্থা ঘটিল তাহাতে বোধ করি পূর্ব্ব জন্মে কত পাতক করিয়াছিলাম। বিশেষতঃ বাল্যাবধি বৈধব্যযন্ত্রণা ভোগ করিয়া অসার দেহভার বহন করা বিড়ম্বনামাত্র। আর লোকেও বিশেষ না জানিয়া কহিবেক এই স্ত্রী দুশ্চরিত্রা আপন অভীষ্টসিদ্ধির নিমিত্ত স্বামীর ও স্বামীর বন্ধুর প্রাণনাশ করিয়াছে। অতএব সর্ব্ব প্রকারেই আমার প্রাণত্যাগ করা উপযুক্ত।
এই বলিয়া সেই শোণিতলিপ্ত খড়্গ লইয়া আপন শিরশ্ছেদন করিতে উদ্যত হইবামাত্র দেবী তৎক্ষণাৎ আবির্ভূতা হইয়া তাহার হস্ত ধারণ করিলেন এবং কহিলেন বৎসে আমি তোমার সাহস ও সদ্বিবেচনা দর্শনে প্রসন্ন হইয়াছি বরপ্রার্থনা কর। তন্তুবায়দুহিতা কহিল জননি যদি প্রসন্ন হইয়া থাক এই উভয়ের প্রাণদান কর। দেবী তথাস্তু বলিয়া উভয়ের কলেবরের সহিত শিরঃসংযোগ করিতে আদেশ দিয়া অন্তর্হিতা হইলেন। তন্তুবায়কন্যা কাত্যায়নীর বচনশ্রবণে আহ্লাদে অন্ধপ্রায়া হইয়া একের মস্তক অন্যের শরীরে যোজিত করিয়া দিল। উভয়েই তৎক্ষণাৎ প্রাণদান পাইয়া গাত্রোত্থান করিল। এই রূপে উপাখ্যান সম্পূর্ণ করিয়া বেতাল বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ শাস্ত্রের বিধি অনুসারে এক্ষণে কোন্ ব্যক্তি ঐ কন্যার স্বামী হইতে পারে। রাজা কহিলেন শুন বেতাল যেমন নদীর মধ্যে গঙ্গা উত্তম পর্ব্বতের মধ্যে সুমেরু বৃক্ষের মধ্যে কল্পতরু সেইরূপ সমুদায় অঙ্গের মধ্যে মস্তক উত্তম এই নিমিত্তে শাস্ত্রকারেরা ইহার নাম উত্তমাঙ্গ রাখিয়াছেন। অতএব পূর্ব্বস্বামীর উত্তমাঙ্গোপলক্ষিতকলেবরবিশিষ্ট ব্যক্তিই তাহার স্বামী হইবেক।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
ষোড়শ উপাখ্যান
ষোড়শ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
চন্দ্রশেখর নগরে রত্নদত্ত নামে বণিক্ বাস করিত। তাহার উন্মাদিনী নামে পরম সুন্দরী কন্যা ছিল। সে বিবাহযোগ্যা হইলে তাহার পিতা তত্রত্য নরপতির নিকটে গিয়া নিবেদন করিল মহারাজ আমার এক স্বরূপা কন্যা আছে যদি আপনকার ইচ্ছা হর গ্রহণ করুন নতুবা অন্য ব্যক্তিকে দিব।
রাজা শুনিয়া দুই তিন বয়োবৃদ্ধ প্রধান রাজপুরুষদিগকে উন্মাদিনীর লক্ষণপরীক্ষার্থে প্রেরণ করিলেন। তাহারা রাজকীয় আদেশ অনুসারে রত্নদত্তের আলয়ে উপস্থিত হইল এবং উন্মাদিনীকে ইন্দ্রের অপ্সরা অপেক্ষাও রূপবতী ও সর্ব্ব প্রকারে সুলক্ষণা দেখিয়া পরামর্শ করিল এই কন্যা মহিষী হইলে রাজা ইহার নিতান্ত বশতাপন্ন হইয়া এক বারেই রাজ্যচিন্তা পরিত্যাগ করিবেন॥ অতএব উত্তম কল্প এই রাজার নিকটে কুরূপা ও কুলক্ষণা বলিয়া পরিচয় দেওয়া যাউক। অনন্তর তাহারা রাজসমীপে পরামর্শানুরূপ সংবাদ দিলে তিনি তাঁহাদের বাক্যে বিশ্বাস করিয়া অস্বীকার করিলেন। তখন রত্নদত্ত সৈন্যাধ্যক্ষ বলভদ্রবর্ম্মার সহিত আপন কন্যার বিবাহ দিল।
এক দিবস রাজা নগরভ্রমণে নির্গত হইয়া সেনাপতির বাটীর নিকটে উপস্থিত হইলেন। তৎকালে উন্মাদিনী মনোহর বেশ ভূষা করিয়া অট্টালিকার উপরিভাগে দণ্ডায় মান ছিল। রাজা উন্মাদিনীকে নয়নগোচর করিয়া মোহিত ও উন্মত্তপ্রায় হইয়া তৎক্ষণাৎ প্রত্যাগমন করিলেন। রাজাকে সহসা প্রত্যাগত ও বিচেতন দেখিয়া এক প্রিয় পার্শ্বচর জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ কি নিমিত্তে আজি আপনাকে চলচিত্ত দেখিতেছি। রাজা কহিলেন অদ্য বলভদ্রের ভবনে এক স্ত্রী দেখিলাম তাহার লোকাতীত রূপ লাবণ্য দর্শনে আমার মন মোহিত হইয়াছে ও আমি এইরূপ বিকল হইয়াছি।
পার্শ্বচর কহিল মহারাজ যাহাকে নিরীক্ষণ করিয়াছেন সে রত্নদত্তের কন্যা। তাহার নাম উন্মাদিনী। আপনি অস্বীকার করতে সেনাপতি বলভদ্রের সহিত তাহার বিবাহ হইয়াছে। রাজা কহিলেন আমি যাহাদিগকে ঐ কন্যার লক্ষণ দেখিতে পাঠাইয়াছিলাম বুঝিলাম তাহারা প্রতারণা করিয়াছে। অনন্তর দৌবারিক দ্বারা তাহাদিগকে আহ্বান করিয়া কহিলেন অদ্য আমি নগরভ্রমণে নির্গত হইয়া রত্নদত্তের কন্যাকে স্বচক্ষে দেখিয়াছি। জন্মাবচ্ছিন্নে তাহার তুল্য সুরূপা সুলক্ষণা নারী নিরীক্ষণ করি নাই। তবে তোমরা কি নিমিত্ত তৎকালে কুরূপা ও কুলক্ষণা কহিয়া আমাকে তাদৃশ স্ত্রীরত্নলাভে বঞ্চিত করিলে।
রাজপুরুষেরা কৃতাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিল মহারাজ যাহা আজ্ঞা করিতেছেন যথার্থ বটে। কিন্তু তৎকালে আমরা বিবেচনা করিয়াছিলাম যে এরূপ সুরূপা কন্যা মহিষী হইলে মহারাজ কাজকার্য্য পরিত্যাগ করিয়া অহোরাত্র অন্তঃপুরে অবস্থিতি করিবেন। ভদ্দ্বারা রাজ্যভঙ্গসম্ভাবনা। এই আশঙ্কায় আমরা এরূপ কল্পিত বাক্য দ্বারা মহারাজের নিকট কুরূপা ও কুলক্ষণা কহিয়াছিলাম। ইহাতে আমাদের যে অপরাধ হইয়াছে ক্ষমা করিতে আজ্ঞা হয়। রাজা তোমরা যাহা কহিলে যথার্থ বটে ইহা কহিয়া তাহাদিগকে বিদায় দিলেন। কিন্তু আপনি নিতান্ত বিচেতন হইয়া দিনযামিনী কেবল উন্মাদিনী চিন্তা করিতে লাগিলেন। রাজার এই অবস্থা কর্ণপরম্পরায় সমস্ত নগরমধ্যে প্রচারিত হইলে সেনাপতি বলভদ্রবর্ম্মা রাজার নিকটে উপস্থিত হইয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিল মহারাজ বলভদ্র আপনকার দাস উন্মাদিনী দাসী। দাসীর নিমিত্তে এপর্য্যন্ত ক্লেশস্বীকারের আবশ্যকতা কি। মহারাজের আজ্ঞা হইলেই সে উপস্থিত হইতে পারে।
রাজা শুনিয়া অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইলেন এবং কহিলেন আমার কি ধর্ম্মজ্ঞান নাই যে পরস্ত্রীস্পর্শ দ্বারা পাপসঞ্চয় করিব। শাস্ত্রকারেরা পরস্ত্রীতে মাতৃদৃষ্টি করিতে অনুমতি করিয়াছেন। বলভদ্র কহিল মহারাজ শাস্ত্রকারেরা ইহাও নির্দিষ্ট করিয়াছেন পত্নীর উপর পরিণেতার সর্ব্বতোমুখী প্রভুতা আছে। তদনুসারে আমি আপনাকে উন্মাদিনী দান করিতেছি তাহা হইলে আর মহারাজের পরস্ত্রীস্পর্শদোষের আশঙ্কা কি। রাজা কহিলেন যাহাতে সমস্ত সংসারে অপযশ হইবেক প্রাণান্তেও আমি এরূপ কর্ম্ম করিব না। যশোধনেরা এই পঞ্চীকৃত ভূতপঞ্চময় ক্ষণবিনশ্বর শরীরের অনুরোধে অবিনশ্বর যশঃশরীরের অপক্ষয় করেন না।
সেনাপতি কহিল মহারাজ আমি তাহাকে গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিয়া অন্য স্থানে রাখিব তাহা হইলে সে সাধরণস্ত্রী হইবেক তখন আর অপযশের আশঙ্কা কি। রাজা শুনিয়া পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলেন যদি তুমি পতিব্রতা নারীকে কুলটা কর তাহা হইলে আমি তোমার গুরুতর দণ্ডবিধান করিব এবং জন্মাবচ্ছিন্নে আর মুখাবলোকন করিব না। তখন বলভদ্র ভীত ও নিতান্ত নিরুপায় হইয়া প্রণাম করিয়া বিদায় লইল। কিন্তু উন্মাদিনীচিন্তা কালস্বরূপিণী হইয়া দশম দিবসে রাজার প্রাণসংহার করিল।
প্রভুভক্ত বলভদ্র এবংবিধ ধর্ম্মশীল স্বামীর প্রাণবিনাশসংবাদ শ্রবণে অতিশয় শোক ও পরিতাপ প্রাপ্ত হইয়া মনে মনে বিবেচনা করিল এতাদৃশ প্রভুর লোকান্তরগমনের পর আর প্রাণধারণের প্রয়োজন কি। বিবেচনা করিলে আমার নিমিত্তই স্বামীর এই অকালমৃত্যু হইল। জানি না জন্মান্তরে এই পাপে আমাকে কত যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইবেক। অতএব এক্ষণে প্রাণত্যাগরূপ প্রায়শ্চিত্ত করিয়া আত্মাকে বিশুদ্ধ করি। এইরূপ অধ্যবসায়ারূঢ় হইয়া প্রেতভূমিতে উপস্থিত হইল এবং চিতা প্রস্তুত করিতে আদেশ দিয়া সূর্য্যাভিমুখে প্রার্থনা করিতে লাগিল ভগবন্ ভাস্কর আমি কৃতাঞ্জলি হইয়া একান্তচিত্তে প্রার্থনা করিতেছি যেন জন্মে জন্মে এইরূপ ধর্ম্মপরায়ণ প্রভু পাই।
এই বলিয়া বলভদ্র প্রজ্বলিত চিতায় আরোহণ করিলে তাহার পত্নী উন্মাদিনী মনে মনে বিবেচনা করিল আমার আর জীবনধারণ বৃথা বরং সহগমনপথ অবলম্বন করি পরকালে সদ্গতি পাইব। ধর্ম্মশাস্ত্রপ্রবর্ত্তকেরা কহিয়াছেন সহগমন স্ত্রীলোকের পরম ধর্ম্ম। নারী চির কাল দুশ্চরিত্রা ও নানাবিধদুষ্কৃতকারিণী হইলেও সহগমনবলে স্বামীর সহিত স্বর্গলোকে অনন্ত কাল সুখ সম্ভোগ করে এবং পতি যদি অতি দুরাচার ও পাপাত্মা হয়েন সহগমনপ্রভাবে নারী তাঁহারও উদ্ধারকারিণী হয়। এই ভাবিয়া সে সহগামিনী হইয়া প্রাণ পরিত্যাগ করিল।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ এই তিন জনের মধ্যে কোন্ ব্যক্তির ভদ্রতা অধিক। বিক্রমাদিত্য কহিলেন রাজার। বেতাল কহিল কি নিমিত্তে। তিনি কহিলেন রাজা উন্মাদিনীর নিমিত্তে জীবন পরিত্যাগ করিলেন তথাপি অধর্ম্ম ও অপযশ ভয়ে পরস্ত্রীস্পর্শে প্রবৃত্ত হইলেন না। আর স্বামীর নিমিত্ত সেবকের প্রাণত্যাগ করা উচিত কর্ম্ম। স্ত্রীলোকেরও স্বামীর সহগামিনী হওয়া প্রধান ধর্ম্ম। অতএব রাজার ভদ্রতা সর্ব্বাপেক্ষা অধিক।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
সপ্তদশ উপাখ্যান
সপ্তদশ উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ
হেমকূট নগরে বিষ্ণুশর্ম্মা নামে পরম ধার্ম্মিক ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁহার গুণাকর নামে পুত্ত্র ছিল। ঐ পুত্ত্র বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া দ্যূতক্রীড়ায় অত্যন্ত আসক্ত হইল এবং ক্রমে ক্রমে পিতার সর্ব্বস্ব দুরোদরমুখে আহুতি দিয়া পরিশেষে অর্থনিমিত্ত তস্করবৃত্তি অবলম্বন করিল। তখন বিষ্ণুশর্ম্মা তাহাকে গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিলেন।
গুণাকর নিতান্ত নিরুপায় হুইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে এক নগরের প্রান্তভাগে উপস্থিত হইল এবং দেখিল এক সন্ন্যাসী শ্মশানে উপবেশন করিয়া যোগাভ্যাস করিতেছেন। পরে সে যোগীর নিকটে গিয়া সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাতপূর্ব্বক সমীপদেশে উপবিষ্ট হইল। যোগী গুণাকরের প্রতি দৃষ্টিপাত দ্বারা তাহাকে ক্ষুধার্ত্ত বোধ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কিছু ভোজন করিবে। সে কহিল মহাশয় আপনি কৃপা করিয়া প্রসাদ দিলে অবশ্য ভোজন করিব। তখন তিনি এক নরকপালপূর্ণ অন্ন ব্যঞ্জন তাহার সম্মুখে রাখিয়া ভোজন করিতে কহিলেন। সে কহিল মহাশয় এ অন্ন ব্যঞ্জন ভোজন করিতে আমার প্রবৃত্তি হয় না।
তখন যোগী যোগাসনে আসীন হইয়া নয়নদ্বয় মুদ্রিত করিবামাত্র এক যক্ষকন্যা অঞ্জলিবন্ধপূর্ব্বক তাঁহার সম্মুখবর্ত্তিনী হইয়া নিবেদন করিল মহাশয় দাসী উপস্থিত কি আজ্ঞা হয়। যোগী কহিলেন এই ব্রাহ্মণ বুভুক্ষু হইয়া আমার আশ্রমে আসিয়াছেন ইঁহার যথোচিত অতিথিসৎকার কর। যক্ষকন্যা যোগীর আজ্ঞা প্রাপ্তিমাত্র মায়াবলে নিমিষমধ্যে এক রম্য হর্ম্ম্য নির্মাণপূর্ব্বক তাহাতে যথাযথ সুখসাধন বস্তুজাত সুসজ্জিত করিয়া পরিশেষে ব্রাহ্মণকে সমভিব্যাহারে লইয়া গেল এবং নানাবিধ অন্ন ব্যঞ্জন মৎস্য মাংস দধি দুগ্ধ মিষ্টান্ন প্রভৃতি দ্বারা ইচ্ছানুরূপ ভোজন করাইয়া তাহাকে মহার্হ বেশ ভূষা পরিধাপনপূর্ব্বক মণিময় পর্য্যঙ্কে শয়ন করাইল। পরে রজনী উপস্থিত হইলে স্বয়ং পরম রমণীয় বেশ ভূষী সমাধান করিয়া পল্যঙ্কের একদেশে উপবেশনপূর্ব্বক চরণসেবা করিতে লাগিল। ফলতঃ গুণাকরের পরম সুখে রজনীযাপন হইল।
প্রভাতে নিদ্রাভঙ্গ হইলে যক্ষকন্যা ও তৎকৃত যাবতীয় ব্যাপারের চিহ্নমাত্র দেখিতে না পাইয়া গুণাকর অত্যন্ত দুঃখিত মনে সন্ন্যাসীর নিকটে গিয়া নিবেদন করিল মহাশয়ের প্রসাদে কল্য রাজভোগে রজনী যাপন করিয়াছি। কিন্তু নিশাবসানে সেই কামিনী প্রস্থান করিয়াছে এবং তৎকৃত সেই সমস্ত হর্ম্ম্যাদিও লয় পাইয়াছে। যোগী কহিলেন যক্ষকন্যা বিদ্যাপ্রভাবে আসিয়াছিল। যে ব্যক্তি বিদ্যায় সিদ্ধ হয় তাহার নিকটে দীর্ঘ কাল অবস্থিতি করে। গুণাকর কৃতাঞ্জলি হইয়া কহিল মহাশয় যদি কৃপা করিয়া উপদেশ দেন তাহা হইলে আমিও সেই বিদ্যার সাধনা করি। যোগী তদীয় বিনয়ের বশীভূত হইয়া এক মন্ত্র উপদেশ দিয়া কহিলেন তুমি এই মন্ত্র লইয়া চত্বারিংশৎ দিবস অর্দ্ধরাত্র সময়ে জলাবগাহনপূর্ব্বক একাগ্র চিত্তে জপ কর।
গুণাকর সন্ন্যাসীর আদেশানুরূপ জপ করিয়া তাঁহার নিকটে আসিয়া কহিল মহাশয় আপনকার আদেশানুসারে যথানিয়মে চল্লিশ দিন জপ করিয়াছি এক্ষণে কি আজ্ঞা হয়। যোগী কহিলেন আর চল্লিশ দিন অগ্নিপ্রবেশ করিয়া জপ কর তাহা হইলেই তুমি কৃতকার্য্য হইবে। তখন সে কহিল মহাশয় বহু দিবস হইল গৃহ পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছি। পিতা মাতা প্রভৃতিকে দেখিবার নিমিত্ত চিত্ত অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হইয়াছে। অতএব অগ্রে এক বার পরিবার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আসি পশ্চাৎ আপনকার নির্দেশানুরূপ মন্ত্র সাধন করিব। এই বলিয়া সন্ন্যাসীর নিকট বিদায় লইয়া গুণাকর আপন আলয়ে প্রস্থান করিল। গৃহে উপস্থিত হইবামাত্র তাহার পিতা মাতা বহু কালের পর পুত্ত্রকে গৃহাগত দেখিয়া অত্যন্ত রোদন করিতে লাগিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন বৎস এত দিন তুমি কোথায় ছিলে। আমরা তোমার অদর্শনে মৃতপ্রায় হইয়া আছি। গুণাকর কহিল হে তাত হে মাতঃ আমি ইতস্ততঃ নানা স্থানে ভ্রমণ করিয়া পরিশেষে সৌভাগ্যক্রমে এক পরম দরালু সন্ন্যাসীর দর্শন পাইয়াছি এবং তাঁহার শরণ লইয়াছি। এক্ষণে তাঁহার উপদেশানুসারে মন্ত্র সাধন করিতেছি। তোমাদিগকে বহু কাল না দেখিয়া অতিশয় উৎকণ্ঠিত ও চলচিত্ত হইয়াছিলাম তাহাতেই এক বার কিয়ৎ ক্ষণের নিমিত্ত দর্শন করিতে আসিয়াছি। সম্প্রতি জন্মের মত বিদায় লইয়া যোগসাধনার্থে প্রস্থান করিব।
গুণাকর এই বলিয়া পলায়নের উদ্যম করিলে তাহার জননী বাষ্পাকুল লোচনে গদ্গদ বচনে কহিতে লাগিলেন বৎস এ তোমার যোগাভ্যাসের সময় নয়। গৃহস্থাশ্রমে থাকিয়া গৃহস্থধর্ম্ম প্রতিপালন কর তাহা হইলেই তুমি যোগাভ্যাসের সম্পূর্ণ ফল পাইবে। গৃহস্থাশ্রম সমস্ত আশ্রমের মূল এবং সমস্ত আশ্রম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। বিশেষতঃ পরম গুরু পিতা মাতার শুশ্রূষা করাই গৃহীর প্রধান ধর্ম্ম। অতএব যাবৎ আমরা জীবিত আছি তাবৎ তোমার তীর্থযাত্রা বা যোগানুষ্ঠানের প্রয়োজন নাই। কেবল আমাদের শুশ্রূষা কর তাহাতেই তোমার পরম ধর্ম্ম লাভ হইবেক। আর বিবেচনা কর তুমি আমাদের একমাত্র পুত্ত্র মা বলিয়া সম্বোধন করিতে দ্বিতীয় ব্যক্তি নাই। অন্ধের যষ্টির ন্যায় তুমি আমাদের জীবনের একমাত্র অবলম্বন আছ। আমরা তোমাকে বিদায় দিয়া কোন ক্রমেই প্রাণধারণ করিতে পারিব না। অতএব এ দুর্বুদ্ধি পরিত্যাগ কর। যদি নিতান্তই যোগাভ্যাসের অতিলাষ হইয়া থাকে অন্ততঃ আমাদের মৃত্যু পর্য্যন্ত অপেক্ষা কর পরে ইচ্ছানুসারে ধর্ম্ম উপার্জ্জন করিবে।
গুণাকর শুনিয়া কিঞ্চিৎ হাস্য করিল এবং কহিল এই মায়াময় সংসার অতি অকিঞ্চিৎকর। ইহাতে লিপ্ত থাকিয়া কেবল জন্মমৃত্যুপরম্পরারূপ দুর্ভেদ্য কঠিন শৃঙ্খলে বদ্ধ থাকিতে হয়। প্রত্যক্ষপরিদৃশ্যমান পদার্থমাত্রই মায়াপ্রপঞ্চ বাস্তবিক কিছুই নহে। কে কাহার পিতা কে কাহার মাতা কে কাহার পুত্ত্র। সকলই ভ্রান্তিমূলক। অতএব আর আমি বৃথা মায়ায় মুগ্ধ হইব না এবং শ্রেয়ঃসাধন বোধ করিয়া যে পথ অবলম্বন করিয়াছি তাহাও পরিত্যাগ করিব না। এই বলিয়া পিতা মাতার নিকট বিদায় হইল এবং সন্ন্যাসীর আশ্রমে উপস্থিত হইয়া অগ্নিপ্রবেশপূর্ব্বক মন্ত্রসাধনে যত্ন করিতে লাগিল কিন্তু সিদ্ধ হইতে পারিল না। ইহা কহিয়া বেতাল বিক্রমাদিত্যকে জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ কি কারণে ব্রাহ্মণ সাধনা করিয়া সিদ্ধ হইতে পারিল না বল। বিক্রমাদিত্য কহিলেন একাগ্রচিত্ত না হইলে মন্ত্রসিদ্ধি হয় না। ব্রাহ্মণের মনে একান্ত নিষ্ঠা ছিল না সেই বৈগুণ্য প্রযুক্তই তাহার সাধনা বিফল হইল। ইহা শুনিয়া বেতাল কহিল যে সাধক মন্ত্র সিদ্ধ করিবার উদ্দেশে এতাদৃশ-দুঃসহ ক্লেশ স্বীকার করিলেক সে একাগ্রচিত্ত হয় নাই তাহার প্রমাণ কি। বিক্রমাদিত্য কহিলেন সে একাগ্রচিত্ত হইলে পরিবারের নিমিত্ত চঞ্চলচিত্ত হইত না এবং মধ্যে যোগভঙ্গ করিয়া তাহাদের দর্শনে যাইত না। ফলতঃ সকলই অদৃষ্টমূলক। নতুবা যোগাভ্যাস দ্বারা সর্ব্ব প্রকারে নির্মম ও জ্ঞানসম্পন্ন হইয়াও কি নিমিত্তে সিদ্ধপ্রায় সাধনফলে বঞ্চিত হইল বল।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
সপ্তম উপাখ্যান
সপ্তম উপাখ্যান
বেতাল কহিল মহারাজ শ্রবণ কর।
চম্পা নগরে চন্দ্রাপীড় নামে নরপতি ছিলেন। তাঁহার সুলোচনা নামে ভার্য্যা ও ত্রিভুবনসুন্দরী নামে অতি সুন্দরী কন্যা ছিল। কন্যা কালক্রমে বিবাহযোগ্যা হইলে রাজা উপযুক্ত পাত্রের নিমিত্ত অত্যন্ত চিন্তিত হইলেন। নানাদেশীয় রাজারা ক্রমে ক্রমে অবগত হইলেন রাজা চন্দ্রাপীড়ের এক পরমসুন্দরী কন্যা আছে তাহার রূপলাবণ্যের মাধুরী দর্শনে মুনিজনেরও মন মোহিত হয়। তাঁহারা সকলেই বিবাহপ্রার্থনায় নিপুণতর চিত্রকর দ্বারা স্ব স্ব প্রতিমূর্ত্তি চিত্রিত করাইয়া চন্দ্রাপীড়ের নিকট পাঠাইতে লাগিলেন। রাজা মনোনীত করিবার নিমিত্ত সেই সকল চিত্র কন্যার নিকট প্রেরণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু কাহারও ছবি তাহার মনোনীত হইল না। তখন রাজা কন্যাকে স্বয়ংবরের আদেশ করিলেন। সে তাহাতে অসম্মতা হইয়া কহিল তাত স্বয়ংবর বৃথা আড়ম্বরমাত্র তাহাতে আমার প্রয়োজন নাই। যে ব্যক্তি বিদ্যা বুদ্ধি বিক্রম এই তিনে অসাধারণ হইবেক আমি তাহাকেই পতিত্বে বরণ করিব।
কিয়ৎ দিন পরে দেশান্তর হইতে চারি বর উপস্থিত হইল। রাজি তাহাদিগকে আপন আপন গুণের পরিচয় দিতে কহিলেন॥ তন্মধ্যে এক ব্যক্তি কহিল মহারাজ আমি বাল্যাবধি বহু যত্নে ও বহু পরিশ্রমে নানা বিদ্যায় কৃতকার্য্য হইয়াছি। আর আমার এক অসাধারণ গুণ এই যে প্রতিদিন একখণ্ড বহুমূল্য বস্ত্র প্রস্তুত করিয়া পাঁচ রত্ন মুল্যে বিক্রয় করি। তাহার মধ্যে এক রত্ন সর্ব্বাগ্রে ব্রাহ্মণহস্তে সমর্পণ করি। দ্বিতীয় দেবসাৎ করিয়া তৃতীয় আপন অঙ্গে ধারণ করি। চতুর্থ ভাবী ভার্য্যায় নিমিত্ত স্থাপন করিয়া পঞ্চম দ্বারা নিত্য ব্যয় নির্বাহ করি॥ এই ওণ আমা ভিন্ন অন্য কোন ব্যক্তির নাই। আর আমার রূপের পরিচয় দিবার আবশ্যকতা কি মহারাজ প্রত্যক্ষ নিরীক্ষণ করিতেছেন। দ্বিতীয় কহিল আমি জলচর স্থলচর সমস্ত পশু পক্ষীর ভাষা জানি। আমার সমান বলবান্ ত্রিভুবনে আর কোন ব্যক্তি নাই। আর আমার রূপ আপনকার সম্মুখেই উপস্থিত রহিয়াছে। তৃতীয় কহিল আমি শাস্ত্রে অদ্বিতীয় আমার সৌন্দর্য্য সাক্ষাৎ দেখিতেছেন। আপন মুখে বর্ণন করিয়া নির্লজ্জ হইবার প্রয়োজন কি। চতুর্থ কহিল আমি শস্ত্রবিদ্যায় অদ্বিতীয়, শব্দবেধী শর নিক্ষেপ করিতে পারি। আর আমার রূপলাবণ্যের বিষয় জগন্মণ্ডলে প্রসিদ্ধ আছে এবং আপনিও স্বচক্ষে দেখিতেছেন।
এই রূপে ক্রমে ক্রমে চারি জনের বিদ্যা ও রূপ গুণের পরিচয় লইয়া রাজা মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন। চারি জনকেই বিদ্যা ও রূপ গুণে অসাধারণ দেখিতেছি কাহাকে কন্যাদান করি। অনন্তর আপন কন্যার নিকটে গিয়া চারি জনের গুণব্যাখ্যা করিয়া কহিলেন বৎসে এই চারি বর উপস্থিত তুমি কাহাকে মনোনীত কর। শুনিয়া ত্রিভুবনসুন্দরী লজ্জায় অধোমুখী ও নিরুত্তরা হইয়া রহিল।
ইহা কহিয়া বেতাল জিজ্ঞাসা করিল মহারাজ কোন্ ব্যক্তি যুক্তিমার্গানুসারে ত্রিভুবনসুন্দরীর পতি হইতে পারে। রাজা কহিলেন যে ব্যক্তি বস্ত্র নির্মাণ করিয়া বিক্রয় করে সে জাতিতে শূদ্র। যে ব্যক্তি পশু পক্ষীর ভাষা শিক্ষা করিয়াছে সে বৈশ্য। যিনি সমস্ত শাস্ত্রে পারদর্শী হইয়াছেন তিনি ব্রাহ্মণ জাতি। কিন্তু শস্ত্রবেদী ব্যক্তি কন্যার সজাতীয় সেই শাস্ত্র ও যুক্তি অনুসারে এই কন্যার পরিণেতা হইতে পারে।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।