← লাইব্রেরি

১৮৭১

বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৭১

প্রকাশনা-তথ্য

বহুবিবাহ

রহিত হওয়া উচিত কি না

এতদ্বিষয়ক বিচার

ঈ শ্ব র চ ন্দ্র বি দ্যা সা গ র প্র ণী ত।

দ্বিতীয় সংস্করণ।

কলিকাত৷

সংস্কৃত যন্ত্রে মুদ্রিত

সংবৎ ১৯২৮।

বিজ্ঞাপন

এ দেশে বহুবিবাহপ্রথা প্রচলিত থাকাতে, স্ত্রীজাতির যৎপরোনাস্তি ক্লেশ ও সমাজের বহুবিধ অনিষ্ট হইতেছে। রাজশাসন ব্যতিরেকে, সেই ক্লেশের ও সেই অনিষ্টের নিবারণ সম্ভাবনা নাই। এজন্য, দেশস্থ লোকে, সময়ে সময়ে, এই কুৎসিত প্রথার নিবারণপ্রার্থনায়, রাজদ্বারে আবেদন করিয়া থাকেন। প্রথমতঃ, ১৬ বৎসর পূর্ব্বে, শ্রীযুত বাবু কিশোরীচাঁদ মিত্র মহাশয়ের উদ্যোগে, বন্ধুবৰ্গসমবায়নামক সভা হইতে ভারতবর্ষীয় ব্যবস্থাপক সমাজে এক আবেদনপত্র প্রদত্ত হয়। বহুবিবাহ শাস্ত্রসম্মত কার্য্য, তাহা রহিত হইলে হিন্দুদিগের ধর্ম্মলোপ হইবেক, অতএব এ বিষয়ে গবর্ণমেণ্টের হস্তক্ষেপ করা বিধেয় নহে, এই মর্ম্মে প্রতিকুল পক্ষ হইতেও এক আবেদনপত্র প্রদত্ত হইয়াছিল। ঐ সময়ে, এই দুই আবেদনপত্রপ্রদান ভিন্ন, এ বিষয়ের অন্য কোনও অনুষ্ঠান দেখিতে পাওয়া যায় নাই।

২। দুই বৎসর অতীত হইলে, বৰ্দ্ধমান, নবদ্বীপ, দিনাজপুর, নাটোর, দিঘাপতি প্রভৃতি স্থানের রাজার ও দেশস্থ প্রায় যাবতীয় প্রধান লোকে, বহুবিবাহনিবারণপ্রার্থনীয়, ব্যবস্থাপক সমাজে আবেদনপত্র প্রদান করেন। এই সময়ে, দেশস্থ লোকে এ বিষয়ে একমত হইয়াছিলেন, বলা যাইতে পারে। কারণ, নিবারণপ্রার্থনায় প্রায় সকল স্থান হইতেই আবেদনপত্র আসিয়াছিল, তদ্বিষয়ে প্রতিকূলকথা কোনও পক্ষ হইতে উচ্চারিত হয় নাই। লোকান্তরবাসী সুপ্রসিদ্ধ বাবু রমাপ্রসাদ রায় মহাশয়, এই সময়ে, এই কুৎসিত প্রথার নিবারণবিষয়ে যেরূপ যত্নবান হইয়াছিলেন, এবং নিরতিশয় উৎসাহসহকারে অশেষপ্রকারে যেরূপ পরিশ্রম করিয়াছিলেন, তাহাতে তাঁহাকে সহস্ৰ সাধুবাদ প্রদান করিতে হয়। ব্যবস্থাপক সমাজ বহুবিবাহনিবারণী ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ করবেন, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ আশ্বাস জন্মিয়াছিল। কিন্তু, এই হতভাগ্য দেশের দুর্ভাগ্যক্রমে, সেই সময়ে রাজবিদ্রোহ উপস্থিত হইল। রাজপুরুষের বিদ্রোহনিবারণবিষয়ে সম্পূর্ণ ব্যাপৃত হইলেন; বহুবিবাহনিবারণবিষয়ে আর তাঁহাদের মনোযোগ দিবার অবকাশ রহিল না।

৩। এইরূপে এই মহোদ্‌যোগ বিফল হইয়া যায়। তৎপরে, বারাণসীনিবাসী অধুনা লোকান্তরবাসী রাজা দেবনারায়ণ সিংহ মহোদয় বহুবিবাহ নিবায়ণবিষয়ে অত্যন্ত উৎসাহী ও উদ্‌যোগী হইয়াছিলেন। এই সময়ে, উদারচরিত রাজাবাহাদুর ভারতবর্ষীয় ব্যবস্থাপক সমাজের সভ্য ছিলেন। তিনি নিজে সমাজে এ বিষয়ের উত্থাপন করিবেন, স্থির করিয়াছিলেন। তদনুসারে তদ্বিষয়ক উদ্‌যোগও হইতেছিল। কিন্তু, আক্ষেপের বিষয় এই, তাঁহার ব্যবস্থাপক সমাজে উপবেশন করিবার সময় অতীত হইয়া গেল; সুতরাং, তথায় তাঁহার অভিপ্রেত বিষয়ের উথাপন করিবার সুযোগ রহিল না।

৪। পাঁচ বৎসর অতিক্রান্ত হইল, পুনরায় বহুবিবাহনিবারণের উদ্‌যোগ হয়। ঐ সময়ে, বর্ধমান, নবদ্বীপ প্রভৃতির রাজা, দেশের অন্যান্য ভুম্যধিকারিগণ, তদ্ব্যতিরিক্ত অনেকানেক প্রধান মনুষ্য, এবং বহুসংখ্যক সাধারণ লোক, একমতাবলম্বী হইয়া, এ দেশের তৎকালীন লেপ্টেনেণ্ট গবর্ণর শ্রীযুত সর সিসিল বীডন মহোদয়ের নিকট আবেদনপত্র প্রদান করেন। মহামতি সর সিসিল বীডন, আবেদনপত্র পাইয়া, এ বিষয়ে বিলক্ষণ অনুরাগ প্রকাশ ও অনুকূল বাক্য প্রয়োগ করিয়াছিলেন; এবং যাহাতে বহুবিবাহনিবারণী ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ হয়, তদুপযোগী উদ্যোগও দেখিতেছিলেন। কিন্তু, উপরিস্থ কর্তৃপক্ষের অনভিপ্রায় বশতঃ, অথবা কি হেতু বশতঃ বলিতে পারা যায় না, তিনি এতদ্বিষয়ক উদ্‌যোগ হইতে বিরত হইলেন।

৫। শেষবার আবেদনপত্র প্রদত্ত হইলে, কোনও কোনও পক্ষ হইতে আপত্তি উত্থাপিত হইয়াছিল। সেই সকল আপতির মীমাংসাকরা উচিত ও আবশ্যক বোধ হওয়াতে, এই পুস্তক মুদ্রিত হইতে আরম্ভ হয়। কিন্তু, এ বিষয় আপাততঃ স্থগিত রহিল, এবং আমিও, ঐ সময়ে অতিশয় পীড়িত হইয়া, কিছু কালের জন্য শয্যাগত হইলাম; সুতরাং তৎকালে পুস্তক মুদ্রিত করিবার তাদৃশ আবশ্যকতাও রহিল না, আর, তাহা সম্পন্ন করিয়া উঠি, আমার তাদৃশ ক্ষমতাও ছিল না। এই দুই কারণ বশতঃ, পুস্তক এত দিন অর্দ্ধমুদ্রিত অবস্থায় কালযাপন করিতেছিল।

৬। সম্প্রতি শুনিতেছি, কলিকাতাস্থ সনাতনধর্মরক্ষিণী সভা বহুবিবাহনিবারণবিষয়ে বিলক্ষণ উদযোগী হইয়াছেন; তাঁহাদের নিতান্ত ইচ্ছা, এই অতিজঘন্য, অতিনৃশংস প্রথা রহিত হইয়া যায়। এই প্রথা নিবারিত হইলে, শাস্ত্রের অবমাননা ও ধর্ম্মের ব্যতিক্রম ঘটিবেক কি না, এই আশঙ্কার অপনয়নার্থে, সভার অধ্যক্ষ মহাশয়েরা ধর্ম্মশাস্ত্রব্যবসায়ী প্রধান প্রধান পণ্ডিতের মত গ্রহণ করিতেছেন, এবং রাজদ্বারে আবেদন করিবার অপরাপর উদযোগ দেখিতেছেন। তাঁহারা, সদভিপ্রায়প্রণোদিত হইয়া, যে অতি মহৎ দেশহিতকর ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন, হয়ত সে বিষয়ে তাঁহাদের কিছু আনুকূল্য হইতে পারিবেক, এই ভাবিয়া, আমি পুস্তক মুদ্রিত ও প্রচারিত করিলাম।

৭। শেষবারের উদযোগের সময়, কেহ কেহ কহিয়াছিলেন, রাজপুরুষেরা পরামর্শ দিয়া, কোনও ব্যক্তিকে এ বিষয়ে প্রবৃত্ত করিয়াছেন, তাহাতেই বহুবিবাহনিবারণপ্রার্থনায় আবেদনপত্র প্রদত্ত হইয়াছে। কেহ কেহ কহিয়াছিলেন, যাহাদের উদযোগে আবেদনপত্র প্রদত্ত হইয়াছে; তাহারা হিন্দুধর্ম্মদ্বেষী, হিন্দুধর্ম্ম লোপ করিবার অভিপ্রায়ে এই উদযোগ করিয়াছে। কিন্তু, সনাতনধর্ম্মরক্ষিণী সভার এই উদযোগে তাদৃশ অপবাদপ্রবর্ত্তনের অণুমাত্র সম্ভাবনা নাই। যাহাতে এ দেশে হিন্দুধর্ম্মের রক্ষা হয়, সেই উদ্দেশে সনাতনধর্ম্মরক্ষিণী সভা সংস্থাপিত হইয়াছে। ঈদৃশ সভার অধ্যক্ষেরা, রাজপুরুষদিগের উপদেশের বশবর্ত্তী হইয়া, হিন্দুধর্ম্ম লোপের জন্য, এই উদযোগ করিয়াছেন, নিতান্ত নির্ব্বোধ ও নিতান্ত অনভিজ্ঞ না হইলে, কেহ এরূপ কহিতে পারিবেন না। তবে, প্রস্তাবিত দেশহিতকর বিষয়মাত্রে প্রতিপক্ষতা করা যাঁহাদের অভ্যাস ও ব্যবসায়, তাঁহারা কোনও মতে ক্ষান্ত থাকিতে পারিবেন না। তাঁহারা, এরূপ সময়ে, উন্মত্তের ন্যায় বিক্ষিপ্তচিত্ত হইয়া উঠেন; এবং, যাহাতে প্রস্তাবিত বিষয়ের ব্যাঘাত ঘটে, স্বতঃ পরতঃ সে চেষ্টার ত্রুটি করেন না। ঈদৃশ ব্যক্তিরা সামাজিক দোষসংশোধনের বিষম বিপক্ষ। তাঁহাদের অদ্ভুত প্রকৃতি ও অদ্ভুত চরিত্র; নিজেও কিছু করিবেন না, অন্যকেও কিছু করিতে দিবেন না। তাঁহারা চিরজীবী হউন।

৮॥ এ বিষয়ে যেরূপ ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ হওয়া আবশ্যক, রাজা দেবনারায়ণ সিংহ মহোদয়ের উদযোগের সময়, তাহার পাণ্ডুলেখ্য প্রস্তুত হইয়াছিল। ঐ পাণ্ডুলেখ্য, বিধিবদ্ধ হইয়া, এতৎপ্রদেশীয় হিন্দুসমাজের বহুবিবাহবিষয়ক ব্যবস্থারূপে প্রবর্ত্তিত হইলে, দেশের ও সমাজের মঙ্গল ভিন্ন, কোনও প্রকার অমঙ্গল বা অসুবিধা ঘটতে পারে, এরূপ বোধ হয় না। পাণ্ডুলেখ্য পুস্তকের পরিশিষ্টে মুদ্রিত হইল।

৯। পরিশেষে, সনাতনধর্মরক্ষিণী সভার নিকট প্রার্থনা এই, যখন তাঁহারা এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন, সবিশেষ যত্ন ও যথোচিত চেষ্টা না করিয়া যেন ক্ষান্ত না হয়েন। তাঁহারা কৃতকার্য্য হইতে পারিলে, দেশের ও সমাজের যে, যার পর নাই, হিতসাধন হইবেক, তাহা বলা বাহুল্যমাত্র; সেরূপ সংস্কার না জন্মিলে, তাঁহারা কদাচ এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতেন না। বহুবিবাহপ্রথা প্রচলিত থাকাতে, সমাজে যে মহীয়সী অনিষ্টপরম্পরা ঘটিতেছে, তদ্দর্শনে তদীয় অন্তঃকরণে বহুবিবাহবিষয়ে ঘৃণা ও দ্বেষ জন্মিয়াছে; সেই ঘৃণা প্রযুক্ত, সেই দ্বেষ বশতঃ, তাঁহারা তন্নিবারণবিষয়ে উদযোগী হইয়াছেন, তাহার সংশয় নাই।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা।

কাশীপুর।

১লা শ্রাবণ। সংবৎ ১৯২৮।

বহুবিবাহ

স্ত্রীজাতি অপেক্ষাকৃত দুর্ব্বল ও সামাজিকনিয়মদোষে পুৰুষজাতির নিতান্ত অধীন। এই দুর্বলতা ও অধীনতা নিবন্ধন, তাঁহারা পুরুষ-জাতির নিকট অবনত ও অপদস্থ হইয়া কালহরণ করিতেছেন প্রভুতা-পন্ন প্রবল পুরুষজাতি, যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত হইয়া, অত্যাচার ও অন্যায়াচরণ করিয়া থাকেন, তাঁরা নিতান্ত নিরুপায় হইয়া, সেই সমস্ত সহ্য করিয়া জীবনযাত্রা সমাধান করেন। পৃথিবীর প্রায় সর্ব প্রদেশেই স্ত্রীজাতির ঈদৃশী অবস্থা। কিন্তু, এই হতভাগ্য দেশে, পুৰুষজাতির নৃশংসতা, স্বার্থপরতা, অবিমৃশ্যকারিতা প্রভৃতি দোষের আতিশয্য বশতঃ, স্ত্রীজাতির যে অবস্থা ঘটিয়াছে, তাহা অন্যত্র কুত্রাপি লক্ষিত হয় না। অত্রত্য পুৰুষজাতি, কতিপয় অতিগহিত প্রথার নিতান্ত বশবর্তী হইয়া, হতভাগা স্ত্রীজাতিকে অশেষবিধ যাতনাপ্রদান করিয়া আসিতেছেন। তন্মধ্যে, বহুবিবাহপ্রথা এক্ষণে সর্বাপেক্ষা অধিকতর অনিষ্টকর হইয়া উঠিয়াছে। এই অতিজঘন্য অতিনৃশংস প্রথা প্রচলিত থাকাতে, স্ত্রীজাতির দুরবস্থার ইয়ত্তা নাই। এই প্রথার প্রবল যুক্ত, তাঁহাদিগকে যে সমস্ত ক্লেশ ও যাতনা ভোগ করিতে হইতেছে, তৎসমুদায় আলোচনা করিয়া দেখিলে, হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়। ফলতঃ, এতম্মুলক অত্যাচার এত অধিক ও এত অসহ্য হইয়া উঠিয়াছে যে . যাঁহাদের কিঞ্চিত্র হিতাহিতবোধ ও সদসদ্বিবেকশক্তি আছে, তাদৃশ ব্যক্তিমাত্রেই এই প্রথার বিষম বিদ্বেষী হইয়া উঠিয়াছেন। তাঁহাদের আন্তরিক ইচ্ছা, এই প্রথা এই দণ্ডে রহিত হইয়া যায়। অধুনা এ দেশের যেরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে, তাহাতে রাজশাসন ব্যতিরেকে, ঈদৃশ দেশব্যাপক দোষ নিবারণের উপায়ান্তর নাই। এজন্য, অনেকে উদ্যুক্ত হইয়া, অশেষদোষাস্পদ বহুবিবাহ প্রথা নিবারণের নিমিত্ত, রাজদ্বারে আবেদন করিয়াছেন। এ বিষয়ে কোনও কোনও পক্ষ হইতে আপত্তি উত্থাপিত হইতেছে। যথাশক্তি সেই সকল আপত্তির উত্তর প্রদানে প্রবৃত্ত হইতেছি।

উপসংহার

উপসংহার।

উপস্থিত বহুবিবাহনিবারণচেষ্টা বিষয়ে, আমি যে সকল আপওি শুনিতে পাইয়াছি, তাহাদের নিরাকরণে যথাশক্তি যত্ন করিলাম। আমার যত্ন কত দূর সফল হইয়াছে, বলিতে পারি না। যাঁহারা দয়া করিয়া এই পুস্তক পাঠ করিবেন, তাঁহারা তাহার বিবেচনা করিতে পারিবেন। এ বিষয়ে এতদ্ব্যতিরিক্ত আরও কতিপয় আপত্তি উপস্থিত হইতে পারে; সে সকলেরও উল্লেখ করা আবশ্যক।

প্রথম;—কতকগুলি লোক বিবাহবিষয়ে যথেচ্ছাচারী; ইচ্ছা হইলেই বিবাহ করিয়া থাকেন। এরূপ ব্যক্তিসকল নিজে সংসারের কর্ত্তা; সুতরাং, বিবাহ প্রভৃতি সাংসারিক বিষয়ে অন্যদীয় ইচ্ছার বশবর্ত্তী নহেন। ইহারা স্বেচ্ছানুসারে ২। ৩। ৪। ৫ বিবাহ করিয়া থাকেন। ইহারা আপত্তি করিতে পারেন, সাংসারিক বিষয়ে মনুষ্যমাত্রের সম্পূর্ণ কর্ত্তৃত্ব ও স্বেচ্ছানুসারে চলিবার সম্পূর্ণ ক্ষমতা আছে; প্রতিবেশিবর্গের সে বিষয়ে কথা কহিবার বা প্রতিবন্ধক হইবার অধিকার নাই। যাঁহাদের একাধিক বিবাহ করিতে ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি নাই, তাহারা এক বিবাহে সন্তুষ্ট হইয়া সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করুন; আমরা তাঁহাদিগকে অধিক বিবাহ করিতে অনুরোধ করিব না। আমাদের অধিক বিবাহ করিবার ইচ্ছা আছে, আমরা ভাহা করিব; সে বিষয়ে তাঁহারা দোষদর্শন বা আপত্তি উদ্যাপন করিবে কেন।

দ্বিতীয়;—পিতা মাতা পুত্রের বিবাহ দিয়াছেন। বিবাহের পর, কন্যাপক্ষীয়দিগকে, বহুবিধ দ্রব্যসামগ্রী দিয়া, মধ্যে মধ্যে জামাতার তত্ত্ব করিতে হয়। তবে তত্ত্বের সামগ্রী ইচ্ছানুরূপ না হইলে, জামাতৃপক্ষীয় স্ত্রীলোকেরা অসন্তুষ্ট হইয়া থাকেন। কোনও কোনও স্থলে এই অসন্তোষ এত প্রবল ও দুর্নিবার হইয়া উঠে যে তদুপলক্ষে পুনরায় পুত্রের বিবাহ দেওয়া আবশ্যক হয়।

তৃতীয়;—কখনও কখনও অতি সামান্য কারণে বৈবাহিকদিগের পরস্পর বিলক্ষণ অস্বরস ঘটিয়া উঠে। তথাবিধ স্থলেও পিতা মাতা, বৈবাহিককুলের উপর আক্রোশ করিয়া, পুনরায় পুত্রের বিবাহ দিয়া থাকেন।

চতুর্থ;—কোনও কারণে, কোনও কোনও স্থলে, পুত্রবধূর উপর শাশুড়ীর বিষম বিদ্বেষ জন্মে। সেই বিদ্বেবুদ্ধির বশবর্ত্তিনী হইয়া, তিনি স্বামীকে সম্মত করিয়া পুনরায় পুত্রের বিবাহ দেন।

পঞ্চম;—অধিক অলঙ্কার দানসামগ্রী প্রভৃতি পাওয়া যাইতেছে, এই লোভে আক্রান্ত হইয়া, কোনও কোনও পিতা মাতা কদাকারা কন্যার সহিত পুত্রের বিবাহ দেন। সেই স্ত্রীর উপর পুত্রের অনুরাগ জন্মে না। পরিশেষে পুত্রের সন্তোষার্থে পুনরায় তাহার বিবাহ দিতে হয়।

ষষ্ঠ;—অন্য কোনও লোভ নাই, কেবল কুটুম্বিতার বড় সুখ হইবেক, এ অনুরোধেও পিতা মাতা, পুত্রের হিতাহিত বিবেচনা না করিয়া, তাহার বিবাহ দিয়া থাকেন। সে স্থলেও অবশেষে পুনরায় পুত্রের বিবাহ দিবার আবশ্যকতা ঘটে।

যদি রাজশাসন দ্বারা বহুবিবাহ প্রথা রহিত হইয়া যায়, তাহা হইলে, পুত্রের বিবাহবিয়ে পিতামাতার যে স্বেচ্ছাচার আছে, তাহার উচ্ছেদ হইবেক। সুতরাং তাঁহাদেরও তন্নিবারণবিষয়ে আপত্তি করিবার আবশ্যকতা আছে। কিন্তু এপর্য্যন্ত, কোনও পক্ষ হইতে তাদৃশ আপত্তি স্পষ্ট বাক্যে উচ্চারিত হয় নাই। সুতরাং, ঐ সকল আপত্তির নিৱাকরণে প্রবৃত্ত হইবার প্রয়োজন নাই।

বহুবিবাহপ্রথা নিবারাণার্থ আবেদনপত্র প্রদানবিষয়ে যাঁহারা প্রধান উদ্যোগী, কোনও কোনও পক্ষ হইতে তাঁহাদের উপর এই অপবাদ প্রবর্তিত হইতেছে যে, তাঁহারা কেবল নাম কিনিবার জন্য দেশের অনিষ্টসাধনে উদ্যত হইয়াছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য এই যে, বিংশতি সহস্রের অধিক লোক আবেদন পত্রে স্বাক্ষর করিয়াছেন। ইঁহারা সকলে এত নির্ব্বোধ ও অপদার্থ নহেন, যে এককালে সদস্য দ্বিবেচনাশূ্ন্য হইয়া, কতিপয় ব্যক্তির নামক্রয়বাসনা পূর্ণ করিবাব জন্য, স্ব স্ব নাম স্বাক্ষর করিলেন। নিম্নে কতিপয় স্বাক্ষরকারীর নাম নির্দ্দিষ্ট হইতেছে; —

বর্দ্ধমানাধিপতি শ্রীযুত মহারাজাধিরাজ মহাতাপচন্দ্র বাহাদুর

নবদ্বীপাধিপতি শ্রীযুত মহারাজ সতীশচন্দ্র রায় বাহাদুর

শ্রীযুত রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ বাহাদুর (পাইকপাড়া)

শ্রীযুত রাজা সত্যশরণ ঘোষাল বাহাদুর (ভূকৈলাস)

শ্রীযুত বাবু জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় (উত্তরপাড়া

শ্রীযুত বাবু রাজকুমার রায় চৌধুরী (বারিপুর)

শ্রীযুত রাজা পূর্ণচন্দ্র রায় (সাওড়াপুলী)

শ্রীযুত বাবু সারদাপ্রসাদ রায় (চকদিঘী)

শ্রীযুত বাবু যজ্ঞেশ্বর সিংহ (ভাস্তাড়া)

শ্রীযুত রায় প্রিয়নাথ চৌধুরী (টাকী)

শ্রীযুত বাবু শিবনারায়ণ রায় (জাড়া)

শ্রীযুত বাবু শম্ভুনাথ পণ্ডিত

শ্রীযুত বাবু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর

শ্রীযুত বাবু রামগোপাল ঘোষ

শ্রীযুত বাবু হীরালাল শীল

শ্রীযুত শ্যামাচরণ মল্লিক

শ্রীযুত বাবু রাজেন্দ্র মল্লিক

শ্রীযুত বাবু রাজেন্দ্র দত্ত

শ্রীযুত বাবু নৃসিংহ দত্ত

শ্রীযুত বাবু গোবিন্দচন্দ্র সেন

শ্রীযুত বাবু হরিমোহন সেন

শ্রীযুত বারু মাধবচন্দ্র সেন

শ্রীযুত বাবু রামচন্দ্র ঘোষাল

শ্রীযুত বাবু ঈশ্বরচন্দ্র ঘোষাল

শ্রীযুত বাবু দ্বারকানাথ মল্লিক

শ্রীযুত বাবু কৃষ্ণকিশোর ঘোষ

শ্রীষুত বাবু দ্বারকানাথ মিত্র

শ্রীযুত বাবু দয়ালচাঁদ মিত্র

শ্রীযুত বাবু রাজেন্দ্রলাল মিত্র

শ্রীযুত বাবু প্যারীচাঁদ মিত্র

শ্রীযুত বাবু দুর্গাচরণ লাহা

শ্রীযুত বাবু শিবচন্দ্র দেব

শ্রীযুত বাবু শ্যামাচরণ সরকার

শ্রীযুত বাবু কৃষ্ণদাস পাল

এক্ষণে অনেকে বিবেচনা করিতে পারিবেন, এই সকল ব্যক্তিকে তত নির্ব্বোধ ও অপদার্থ জ্ঞানকরা সঙ্গত কি না। বহুবিবাহ প্রথা নিবারণ হওয়া উচিত ও আবশ্যক, এরূপ সংস্কার না জম্মিলে, এবং তদর্থে রাজদ্বারে আবেদনকরা পরামর্শসিদ্ধ বোধ না হইলে, ইঁহারা অন্যের অনুরোধে, বা অন্যবিধ কারণ বশতঃ, আবেদনপত্রে নাম স্বাক্ষর করিবার ব্যক্তি নহেন। আর, বহুবিবাহপ্রধা নিবারিত হইলে দেশের অনিষ্টসাধন হইবেক, এ কথার অর্থগ্রহ করিতে পারা যায় না। বহুবিবাহ প্রথা যে, যার পর নাই, অনিষ্টের কারণ হইয়া উঠিয়াছে, তাহা, বোধ হয়, চক্ষু কর্ণ হৃদয় বিশিষ্ট কোনও ব্যক্তি অস্বীকার করিতে পারেন না। সেই নিরতিশয় অনিষ্টকর বিষয়ের নিবারণ হইলে, দেশের অনিষ্টসাধন হইবেক, আপত্তিকারী মহাপুরুষদের মত সূক্ষদর্শী না হইলে, তাহা বিবেচনা করিয়া স্থির করা দুরূহ। যাহা হউক, ইহা নির্ভয়ে ও নিঃসংশয়ে নির্দেশ করা যাইতে পারে, যাঁহারা বহুবিবাহ- প্রথা নিবারণের জন্য রাজদ্বারে আবেদন করিয়াছেন, স্ত্রীজাতির দুরবস্থাবিমোচন ও সমাজের দোষসংশোধন ভিন্ন, তাঁহাদের অন্য কোনও উদ্দেশ্য বা অভিসন্ধি নাই।

ক্রোড়পত্র

ক্রোড়পত্র

অতি অল্প দিন হইল, শ্রীযুত ক্ষেত্রপাল স্মৃতিরত্ন, শ্রীযুত নারায়ণ বদরত্ন প্রভৃতি এয়োদশ ব্যক্তির স্বাক্ষরিত বহুবিবাহবিষয়ক শাস্ত্রসম্মত বিচার নামে এক পত্র প্রচারিত হইয়াছে। বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়কবিচারনামক পুস্তক প্রচারিত হইবার পরে, ঐ বিচারপত্র আমার হস্তগত হয়। বহুবিবাহ শাস্ত্রসম্মত ব্যবহার, তাহা রহিত হওয়া কদাচ উচিত নহে; সর্ব্বসাধারণের নিকট ইহা প্রতিপন্ন করাই এই বিচারপত্রপ্রচারের উদ্দেশ্য। স্বাক্ষরকারী মহাশয়েরা স্বপক্ষসমর্থনার্থ স্মৃতি ও পুরাণের কতিপয় বচন প্রমাণরূপে উদ্ধৃত করিয়াছেন। তন্মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রমাণ এই;—

১। একামূঢ়া তু কামার্থমন্যাং বোঢ়ুং য ইচ্ছতি।

সমর্থস্তোষয়িত্বার্থৈঃ পূর্ব্বোঢ়ামপরাং বহেৎ।

মদনপারিজাতধৃতস্মৃতিঃ।

যে ব্যক্তি এক স্ত্রী বিবাহ করিয়া রতিকামনায় অন্য স্ত্রী বিবাহ করিতে ইচ্ছা করেন তিনি সমর্থ হইলে পূর্ব্বপরিণীতাকে অর্থ দ্বারা তুষ্টা করিয়া অপর স্ত্রী বিবাহ করিবেন।

২। একৈব ভার্য্যা স্বীকার্য্যা ধর্ম্মকর্ম্মোপযোগিনা।

প্রার্থনে চাতিরাগে চ গ্রাহ্যানেকা অপি দ্বিজ॥

স্বতন্ত্রগার্হস্থ্যধর্ম্মপ্রস্তাবে ব্রহ্মাণ্ডপুরাণম্।

ধর্ম্মকর্ম্মোপযোগী ব্যক্তিদিগের এক ভার্য্যা স্বীকার করা কর্ত্তব্য, কিন্তু উপযাচিত হইয়া কেহ কন্যা প্রদানেচ্ছু হইলে অথবা রতিবিষয়ক সাতিশয় অনুরাগ থাকিলে তাঁহারা অনেক ভার্য্যাও গ্রহণ করিবেন।

এই দুই প্রমাণদর্শনে, অনেকের অন্তঃকরণে, বহুবিবাহ শাস্ত্রানুগত ব্যাপার বলিয়া প্রতীতি জম্মিতে পারে, এজন্য এতদ্বিষয়ে কিছু বলা আবশ্যক হইতেছে। বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিয়ক বিচার পুস্তকে, দর্শিত হইয়াছে, শাস্ত্রকারেরা বিবাহবিষয়ে চারি বিধি দিয়াছেন, সেই চারি বিধি অনুসারে, বিবাহ ত্রিবিধ নিত্য, নৈমিত্তিক, কাম্য। প্রথম বিধির অনুযায়ী বিবাহ নিত্য বিবাহ; বিবাহ না করিলে, মনুষ্য গৃহস্থাশ্রমে অধিকারী হইতে পারে না। দ্বিতীয় বিধি অনুযায়ী বিবাহও নিত্য বিবাহ; তাহা না করিলে, আশ্রমভ্রংশনিবন্ধন পাতকগ্রস্ত হইতে হয়। তৃতীয় বিধির অনুযায়ী বিবাহ নৈমিত্তিক বিবাহ; কারণ, তাহা স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব চিররোগিত্ব প্রভৃতি নিমিত্ত বশতঃ করিতে হয়। চতুর্থ বিধির অনুযায়ী বিবাহ কাম্য বিবাহ। এই বিবাহ, নিত্য ও নৈমিত্তিক বিবাহের, ন্যায়, অবশ্যকর্ত্তব্য নহে, উহা পুরুষের সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন, অর্থাৎ ইচ্ছা হইলে তাদৃশ বিবাহ করিতে পারে, এইমাত্র। পুত্রলাভ ও ধর্ম্মকার্য্যসাধন গৃহস্থাশ্রমের উদ্দেশ্য। দারপরিগ্রহ ব্যতিরেকে এ উভয় সম্পন্ন হয় না; এই নিমিত্ত, প্রথম বিধিতে দারপরিগ্রহ গৃহস্থাশ্রম প্রবেশের দ্বারস্বরূপ ও গৃহস্থাশ্রমসমাধানের অপরিহার্য উপায়স্বরূপ নির্দিষ্ট হইয়াছে। গৃহস্থাশ্রমসম্পাদনকালে স্ত্রীবিয়োগ ঘটিলে, যদি পুনরায় বিবাহ না করে, তবে সেই দারবিরহিত ব্যক্তি আশ্রমত্রংশনিবন্ধন পাতকগ্রস্ত হয়; এজন্য, ঐ অবস্থায় গৃহস্থ ব্যক্তির পক্ষে পুনরায় দারপরিগ্রহের অবশ্যকর্ত্তব্যতাবোধনার্থে, শাস্ত্রকারের দ্বিতীয় বিধি প্রদান করিয়াছেন। স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব চিররোগিত্ব প্রভৃতি দোষ ঘটিলে, পুত্রলাভ ও ধর্ম্মকার্য্যসাধনের ব্যাঘাত ঘটে; এজন্য, শাস্ত্রকারেরা তাদৃশ স্থলে স্ত্রীসত্ত্বে পুনরায় বিবাহ করিবার তৃতীয় বিধি দিয়াছেন।গৃহস্থাশ্রমসমাধানার্থ শাস্ত্রোক্তবিধানামুসারে সবর্ণাপরিণয়ান্তে, যদি কোনও উৎকৃষ্ট বর্ণ যদৃচ্ছাক্রমে বিবাহে প্রবৃত্ত হয়, তাহার পক্ষে অসবর্ণাবিবাহে অধিকারবোধনার্থ শাস্ত্রকারের চতুর্থ বিধি প্রদর্শন করিয়াছেন; এবং এই বিধি দ্বারা, তাদৃশ ব্যক্তির তথাবিধ স্থলে সবর্ণাবিবাহ একবারে নিষিদ্ধ হইয়াছে।

স্মৃতিরত্ন, বেদরত্ন প্রভৃতি মহাশয়দিগের অবলম্বিত প্রথম ও দ্বিতীয় প্রমাণে যে বিবাহের বিধি পাওয়া যাইতেছে, তাহা কাম্যবিবাহ; কারণ, প্রথম প্রমাণে, “যে ব্যক্তি এক স্ত্রী বিবাহ করিয়া রতিকামনায় অন্য স্ত্রী বিবাহ করিতে ইচ্ছা করেন”, এবং দ্বিতীয় প্রমাণে, “রতিবিষয়ক সাতিশয় অনুরাগ থাকিলে তাঁহারা অনেক ভার্য্যাও গ্রহণ করিবেন”, এইরূপে কাম্য বিবাহের স্পষ্ট পরিচয় প্রদত্ত হইয়াছে। রতিকামনা ও রতিবিষয়ক সাতিশয় অনুরাগবশতঃ যে বিবাহ করা হইবেক, তাহা কাম্য বিবাহ ব্যতিরিক্ত নামান্তর দ্বারা উল্লিখিত হইতে পারে না। মনু কাম্যবিবাহস্থলে অসবর্ণবিবাহের বিধি দিয়াছেন, এবং সেই বিধি দ্বারা তথাবিধ স্থলে সবর্ণাবিবাহ একবারে নিষিদ্ধ হইয়াছে। সুতরাং স্মৃতিরত্ন, বেদরত্ন প্রভৃতি মহাশয়দিগের অবলম্বিত প্রথম ও দ্বিতীয় প্রমাণ দ্বারা ইহাই প্রতিপন্ন হইতেছে, যে ব্যক্তি, সবর্ণাবিবাহ করিয়া, রতিকামনায় পুনরায় বিবাহ করিতে উদ্যত হয়, সে অসবর্ণ বিবাহ করিতে পারে; নতুবা যদৃচ্ছাক্রমে বিবাহপ্রবৃত্ত ব্যক্তি, রতিকামনা পূর্ণ করিবার নিমিত্ত, পূর্ব্বপরিণীতা সজাতীয় স্ত্রীর জীবদ্দশায়, পুনরায় সজাতীয়া বিবাহ করিবেক, ইহা কোনও ক্রমে প্রতিপন্ন হইতে পারে না। মদনপারিজাতধৃত স্মৃতিবাক্যে ও ব্রহ্মাণ্ডপুরাণবচনে সামান্যাকারে কাম্যবিবাহের বিধি আছে, তাদৃশবিবাহাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি সবর্ণা বা অসবর্ণা বিবাহ করিবেক, তাহার কোনও নির্দ্দেশ নাই। মনু কাম্য- বিবাহের বিধি দিয়াছেন, এবং তাদৃশবিবাহাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি অসবর্ণা বিবাহ করিবেক, স্পষ্টাক্ষরে নির্দ্দেশ করিয়াছেন। এমন স্থলে, মনুবাক্যের সহিত একবাক্যতা সম্পাদন করিয়া, উল্লিখিত স্মৃতিবাক্য ও পুরাণবাক্যকে অসবর্ণাবিবাহবিষয়ক বলিয়া ব্যবস্থা করাই প্রকৃত শাস্ত্রার্থ, সে বিষয়ে কোনও অংশে কিছুমাত্র সংশয় বা আপত্তি হইতে পারে না। অতএব, ঐ দুই প্রমাণ অবলম্বন করিয়া, যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত বহুবিবাহকাণ্ড শাস্ত্রসম্মত ব্যবহার, ইহা প্রতিপন্ন করতে চেষ্টা করা নিতান্ত নিষ্ফল প্রয়াসমাত্র।

স্মৃতির, বেদরত্ন প্রভৃতি মহাশয়দিগের অবলম্বিত তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, অষ্টম, নবম ও দশম প্রমাণ অসবর্ণাবিবাহবিষয়ক বচন। অসবর্ণা বিবাহব্যবহার কলিযুগে রহিত হইয়াছে; সুতরাং, এ স্থলে, তদ্বিষয়ে কিছু বলিবার প্রয়োজন নাই। তাঁহাদের অবলম্বিত অবশিষ্ট প্রমাণে এক ব্যক্তির অনেক স্ত্রী বিদ্যমান থাকার উল্লেখ আছে, কিন্তু তদ্বারা যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত বহুবিবাহকাণ্ড শাস্ত্রসম্মত বলিয়া প্রতিপন্ন হইতে পারে না। ঐ সকল প্রমাণ সর্ব্বাংশে পরম্পর এত অনুরূপ যে একটি প্রদর্শিত হইলেই, সকলগুলি প্রদর্শিত করা হইবেক। এজন্য, এস্থলে তন্মধ্যে একটি প্রমাণ উদ্ধৃত হইতেছে;—

৭। সর্ব্বাসামেকপত্নীনামেকা চেৎ পুত্রিণী ভবেৎ।

সর্ব্বাস্তেন্তেন পুত্রেণ প্রাহ পুত্রবতীর্ম্মনুঃ॥ মনুঃ

স্বজাতীয় বহু স্ত্রীর মধ্যে যদি একটি স্ত্রী পুত্রবতী হয়; তবে সেই পুত্র দ্বারা সকল স্ত্রীকেই মনু পুত্রবতী কহিয়াছে।

এই মনুবচনে অথবা এতদনুরূপ অন্যান্য মুনিবচনে এরূপ কিছুই নির্দিষ্ট নাই যে তদ্দ্বারা শাস্ত্রোক্ত নিমিত্ত ব্যতিরেকে লোকের ইচ্ছাধীন বহুভার্য্যাবিবাহ প্রতিপন্ন হইতে পারে। উল্লিখিত বচনসমূহে যে বহুভার্য্যাবিবাহের পরিচয় পাওয়া যাইতেছে, তাহা অধিবেদনের নির্দ্দিষ্ট নিমিত্তনিবন্ধন, তাহার সন্দেহ নাই। ফলকথা এই, যখন শাস্ত্রকারেরা কাম্যবিবাহস্থলে কেবল অসবর্ণাবিবাহের বিধি দিয়াছেন, যখন ঐ বিধি দ্বারা, পূর্ব্বপরিণীতা স্ত্রীর জীবদ্দশায়, যদৃচ্ছাক্রমে সবর্ণাবিবাহ সর্ব্বতোভাবে নিষিদ্ধ হইয়াছে, যখন উল্লিখিত বহুবিবাহসকল অধিবেদনের নির্দিষ্ট নিমিত্ত বশতঃ ঘটা সম্পূর্ণ সম্ভব হইতেছে, তখন যদৃচ্ছাক্রমে যত ইচ্ছা বিবাহ করা শাস্ত্রকারদিগের অনুমোদিত কার্য্য, ইহা কোনও মতে প্রতিপন্ন হইতে পারে না। বস্তুতঃ, যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত বহুবিবাহকাণ্ড শাস্তানুগত ব্যবহার নহে। আর, তাদৃশ বহুবিবাহকাণ্ড ন্যায়ানুগত ব্যবহার কি না, সে বিষয়ে কিছু বলা নিতান্ত নিম্প্রয়োজন। বহুবিবাহ যে অতিজঘন্য, অতিনৃশংস ব্যবহার, কোনও মতে ন্যায়ানুগত নহে, তাহা, যাঁহাদের সামান্যরূপ বুদ্ধি ও বিবেচনা আছে, তাঁহারাও অনায়াসে বুঝিতে পারেন। ফলতঃ, যে মহাপুরুষেরা স্বয়ং বহুবিবাহপাপে লিপ্ত, তদ্ব্যতিরিক্ত অন্য কোনও ব্যক্তি বহুবিবাহব্যবহারের রক্ষাবিষয়ে চেষ্টা করিতে পারেন, অথবা অন্য কেহ বহুবিবাহপ্রথা নিবারণের উদ্যোগ করিলে, দুঃখিত হইতে পারেন, কিংবা তাহানিবারিত হইলে, লোকের ধর্ম্মলোপ বা দেশের সর্বনাশ হইল মনে ভাবিতে পারেন, এত দিন আমার সেরূপ বোধ ছিল না। বলিতে কি, স্মৃতিরত্ন, বেদরত্ব প্রভৃতি মহাশয়দিগের অধ্যবসায় দর্শনে, আমি বিস্ময়াপন্ন হইয়াছি। বহু বিবাহ নিবারণের চেষ্টা হইতেছে দেখিয়া, তাহারা সাতিশয় দুঃখিত.ও বিলক্ষণ কুপিত হইয়াছেন, এবং ধর্ম্মরক্ষিণীসভার অধ্যক্ষেরা এ বিষয়ে চেষ্টা করিতেছেন বলিয়া, তাহাদের প্রতি স্বেচ্ছাচারী, শাস্ত্রানভিজ্ঞ, কুটিলমতি, অপরিণামদর্শী প্রভৃতি কটুক্তি প্রয়োগ করিয়াছেন। আমার বোধে, এই ভাবে এই বিচারপত্র প্রচার করা স্মৃতিরত্ন, বেদরত্ব প্রভৃতি মহাশয়দিগের পক্ষে সুবোধের কার্য্য হয় নাই।

অনেকের মুখে শুনিতে পাই, তাঁহারা কলিকতাস্থ রাজকীয় সংস্কৃতবিদ্যালয়ের ব্যাকরণশাস্ত্রের অধ্যাপক শ্রীযুত তারানাথ তর্ক বাচস্পতি ভট্টাচার্য্য মহাশয়ের পরামর্শে, সহায়তায় ও উত্তেজনায় বহুবিবাহবিষয়ক শাস্ত্রসম্মত বিচারপত্র প্রচার করিয়াছেন। কিন্তু সহসা এ বিষয়ে বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হইতেছে না। তর্কবাচস্পতি মহাশয় এত অনভিজ্ঞ নহেন যে, এরূপ অসমীচীন আচরণে দূষিত হইবেন। পাঁচ বৎসর পূর্ব্বে, যখন বহুবিবাহনিবারণপ্রার্থনায়, রাজদ্বারে আবেদন করা হয়; সে সময়ে তিনি এ বিষয়ে বিলক্ষণ অনুরাগী ছিলেন, এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া, নিরতিশয় আগ্রহ ও উৎসাহ সহকারে, আবেদনপত্রে নাম স্বাক্ষর করিয়াছেন। এক্ষণে তিনিই আবার, বহুবিবাছরক্ষণপক্ষ অবলম্বন করিয়া, এই লজ্জাকর, ঘৃণাকর, অনর্থকর, অধর্ম্মকর ব্যবহারকে শাস্ত্রসম্মত বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে প্রয়াস পাইবেন, ইহা সম্ভব বোধ হয় না।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা।

কাশীপুর।

২৪ এ শ্রাবণ। সংবৎ ১১২৮।

স্মৃতিরত্ন, বেদরত্ন প্রভৃতি মহাশয়েরা, যেরূপ পাঠ ধরিয়াছেন ও যেরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছেন তাহাই পরিগৃহীত হইল। আমার বিবেচনায় স্থিতীয় প্রমাণের প্রথমার্দ্ধে পাঠের ব্যতিক্রম হইয়াছে, সুতরাং ব্যাখ্যাও বৈলক্ষণ্য ঘটিয়াছে। বোধ হয়, প্রকৃত পাঠ এই;—

একৈর ভার্য্যা স্বীকার্য্যা ধর্ম্মকর্মোপযোগিনী।

ধর্মকর্মের উপযোগিনী এক ভার্য্যা বিবাহ করা কর্তব্য।

৫ পৃষ্ঠ হইতে ১০ পৃষ্ট পর্য্যন্ত দেখ।

বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক বিচার পুস্তকের ১০ পৃষ্ঠ অবধি ১৪ পৃষ্ঠ পর্য্যন্ত দেখ।

চতুর্থ আপত্তি

চতুর্থ আপত্তি।

কেহ কেহ আপত্তি করিতেছেন, বহু কাল পূর্ব্বে এ দেশে কুলীন ব্রাহ্মণদিগের অত্যাচার ছিল। তখন অনেকে অনেক বিবাহ করিতেন। এক্ষণে, এ দেশে সে অত্যাচারের প্রায় নিবৃত্তি হইয়াছে; যাহা কিছু অবশিষ্ট আছে, অল্প দিনের মধ্যেই তাহার সম্পূর্ণ নিবৃত্তি হইবেক। এমন স্থলে, বহুবিবাহ নিবারণ বিষয়ে রাজশাসন নিতান্ত নিষ্প্রয়োজন।

এক্ষণে কুলীনদিগের পূর্ব্ববৎ অত্যাচার নাই, এই নির্দ্দেশ সম্পূর্ণ প্রতারণবাক্য; অথবা, যাঁহারা সেরূপ নির্দ্দেশ করেন, কুলীনদিগের আচার ও ব্যবহার বিষয়ে তাঁহাদের কিছুমাত্র অভিজ্ঞতা নাই। পূর্ব্বে, বিবাহ বিষয়ে কুলীনদিগের যেরূপ অত্যাচার ছিল, এক্ষণেও তাঁহাদের তদ্বিষয়ক অত্যাচার সর্ব্বতোভাবে তদবস্থ আছে, কোনও অংশে তাহার নিবৃত্তি হইয়াছে, এরূপ বোধ হয় না। এ বিষয়ে বৃথা বিতণ্ডা না করিয়া, বর্ত্তমান কতকগুলি কুলীনের নাম, বয়স, বাসস্থান, ও বিবাহসংখ্যার পরিচয় প্রদত্ত হইতেছে।

হুগলী জিলা।

নাম
বিবাহ
বয়স
বাসস্থান

ভোলানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
৮০
৫৫
বসো

ভগবান্ চট্টোপাধ্যায়
৭২
৬৪
দেশমুখো

পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
৬২
৫৫
চিত্রশালি

মধুসূদন মুখোপাধ্যায়
৫৬
৪০
চিত্রশালিঐ

তিতুরাম গাঙ্গূলি
৫৫
৭০
চিত্রশালিঐ

রামময় মুখোপাধ্যায়
৫২
৫০
তাজপুর

বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়
৫০
৬০
ভুঁইপাড়া

শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায়
৫০
৬০
পাখুড়া

নবকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
৫০
৫২
ক্ষীরপাই

ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৪৪
৫২
আঁকড়িশ্রীরামপুর

যদুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
৪১
৪৭
চিত্রশালি

শিবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
৪০
৪৫
তীর্ণা

রামকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
৪০
৫০
কোননগর

শ্যামাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
৪০
৫০
চুঁচুড়া

ঠাকুরদাস মুখোপাধ্যায়
৪০
৫৫
দণ্ডিপুর

নবকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
৩৬
৪৪
গৌরহাটী

রঘুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
৩০
৪০
খামারগাছী

শশিশেখর মুখোপাধ্যায়
৩০
৬০
খামারগাছীঐ

তারাচরণ মুখোপাধ্যায়
৩০
৩৫
বরিজহাটী

ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২৮
৪০
গুড়প

শ্রীচরণ মুখোপাধ্যায়
২৭
৪০
খামারগাছী

ভবনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
২৩
৪০
জাঁইপাড়া

মহেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২২
৩৫
খামারগাছী

গিরিশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২২
৩৪
কুচুণ্ডিয়া

প্রসন্নকুমার চট্টোপাধ্যায়
২১
৩৫
কাপসীট

পার্ব্বতীচরণ মুখোপাধ্যায়
২০
৪০
ভৈটে

যদুনাথ মুখোপাধ্যায়
২০
৩৭
মাহেশ

কৃষ্ণপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
২০
৪৫
বসন্তপুর

হরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২০
৪০
রঞ্জিতবাটী

রমানাথ চট্টোপাধ্যায়
২০
৫০
গরলগাছা

অন্নদাচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
২০
৪৫
ভৈটে

দীননাথ চট্টোপাধ্যায়
১৯
২৮
বসন্তপুর

রামরত্ন মুখোপাধ্যায়
১৭
৪৮
জয়রামপুর

কেদারনাথ মুখোপাধ্যায়
১৭
৩২
মাহেশ

দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
১৬
২০
চিত্রশালি

গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
১৬
৩৫
মহেশ্বরপুর

অভয়চরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫
৩০
মালিপাড়া

অন্নদাচরণ মুখোপাধ্যায়
১৫
৩৫
গোয়াড়া

শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়
১৫
৩৫
সোঁতিয়া

জগচ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়
১৫
৪০
খামারগাছী

অঘোরনাথ মুখোপাধ্যায়
১৫
৩৬
ভুইপাড়া

হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়
১৫
৩২
মোগলপুর

ননীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫
২৪
পাতা

যদুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫
২২
পাতাঐ

দীননাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
১৫
২৫
বেলেসিকরে

ভুবনমোহন মুখোপাধ্যায়
১৫
২৪
ভৈটে

কালীপ্রসাদ গাঙ্গূলি
১৫
৪৫
পশপুর

সূর্য্যকান্ত মুখোপাধ্যায়
১৫
৩৫
ভৈটে

রামকুমার মুখোপাধ্যায়
১৪
৩২
ক্ষীরপাই

কৈলাসচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
১৪
৪৫
মধুখণ্ড

কালীকুমার মুখোপাধ্যায়
১৪
৩৫
সিয়াখালা

মাধবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
১৩
৫০
বৈঁচী

হরিশ্চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩
৪০
গরলগাছা

কার্ত্তিকেয় মুখোপাধ্যায়
১২
৩০
দেওড়া

যদুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
১২
৩০
তাঁতিসাল

মোহিনীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়
১২
৩০
মালিপাড়া

সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
১২
৪০
মালিপাড়াঐ

ব্রজরাম চট্টোপাধ্যায়
১২
২৫
চন্দ্রকোনা

কৈলাসচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১২
৩২
কৃষ্ণনগর

রামতারক বন্দ্যোপাধ্যায়
১২
২৮
জয়রামপুর

কালিদাস মুখোপাধ্যায়
১২
৪০
ভূঁইপাড়া

বিশ্বম্ভর মুখোপাধ্যায়
১২
৩০
বলাগড়

তিতুরাম মুখোপাধ্যায়
১২
৪০
নতিবপুর

প্রসন্নকুমার গাঙ্গুলি
১২
৩৬
গজা

মনসারাম চট্টোপাধ্যায়
১১
৬৫
ভঞ্জপুর

আশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়
১১
১৮
তাঁতিমাল

প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায়
১১
৩০
গরলগাছা

লক্ষ্মীনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
১১
২৫
বিদ্যাবতীপুর

শিবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
১১
৪৫
বিদ্যাবতীপুরঐ

কালীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
১১
৩০
ভৈটে

রামকমল মুখোপাধ্যায়
১১
৪০
নিত্যানন্দপুর

কালীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়
১১
২৮
বৈঁচী

দ্বারকানাথ মুখোপাধ্যায়
১১
২৫
বৈঁচীঐ

মতিলাল মুখোপাধ্যায়
১১
৪৫
বৈঁচীঐ

ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১১
৪৫

দুর্গারাম বন্দ্যোপাধ্যায়
১১
৫০
শ্যামবাটী

যজ্ঞেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়
১০
৪৫
আনুড়

প্রসন্নকুমার চট্টোপাধ্যায়
১০
৩৫
বেঙ্গাই

চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
১০
৩০
বৈতল

প্রতাপচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
১০
৪০
বসন্তপুর

কৈলাসচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
১০
৪০
সিয়াখালা

রামচাঁদ মুখোপাধ্যায়

৩৬
যদুপুর

কৈলাসচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

৩০
নপাড়া

সূর্য্যকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

৪০
বৈঁচী

গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

৪৫
বৈঁচীঐ

চুনিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

৩২
বৈঁচীঐ

কালীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

৪০
মোল্লাই

গণেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

২০
দেওড়া

দিগম্বর বন্দ্যোপাধ্যায়

৩৫
গুড়প

কালিদাস মুখোপাধ্যায়

৪০
মালিপাড়া

যাদবচন্দ্র গাঙ্গূলি

৩৫
বহরকুলী

মাধবচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

২৫
সিকরে

কেদারনাথ মুখোপাধ্যায়

৩২
বরিজহাটী

ঈশ্বরচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

৪৫
পাতুল

শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায়

৪৫
জয়রামপুর

হরিশ্চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

৬০
শ্যামবাটী

রামচাঁদ চট্টোপাধ্যায়

৪০
ভঞ্জপুর

ঈশ্বরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

৩২
ভঞ্জপুরঐ

দিগম্বর মুখোপাধ্যায়

৩৬
রত্নপুর

কুড়ারাম মুখোপাধ্যায়

৩২
নতিবপুর

দুর্গাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়

৬২
মথুরা

বৈকুণ্ঠনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

৩৪
বসন্তপুর

শ্রীধর বন্দ্যোপাধ্যায়

৩৫
ভুরসুবা

রামসুন্দর মুখোপাধ্যায়

৫০
আঁটপুর

বেণীমাধব গাঙ্গুলি

৫০
চিত্রশালি

শ্যামাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

৩০
মোগলপুর

নবকুমার মুখোপাধ্যায়

২২
চন্দ্রকোনা

যদুনাথ মুখোপাধ্যায়

৩০
বাখরচক

চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যার

৩০
বসন্তপুর

উমাচরণ চট্টোপাধ্যায়

৪০
রঞ্জিতবাটী

উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

২৬
নন্দনপুর

গঙ্গানারায়ণ মুখোপাধ্যায়

৩০
গৌরহাটী

ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

৩২
পশপুর

কালাচাঁদ মুখোপাধ্যায়

৫০
সুলতানপুর

মনসারাম চট্টোপাধ্যায়

৪৫
তারকেশ্বর

গঙ্গানারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়

২২
আমড়াপাট

বিশ্বম্ভর মুখোপাধ্যায়

৪০
বালিগোড়

ঈশ্বরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

৩৫
তারকেশ্বর

মাধবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

৪০
তালাই

ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায়

২৬
টেকরা

হরশম্ভু বন্দ্যোপাধ্যায়

৪০
মাজু

নীলাম্বর বন্দ্যোপাধ্যায়

৩২
সন্ধিপুর

কালিদাস মুখোপাধ্যায়

৩০
বালিডাঙ্গা

ভোলানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

৩৬
গৌরাঙ্গপুর

দ্বারকানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

৩০
কৃষ্ণনগর

সীতারাম মুখোপাধ্যায়

৩৫
চন্দ্রকোনা

রামধন মুখোপাধ্যায়

৪০
চন্দ্রকোনা

নবকুমার মুখোপাধ্যায়

৪৩
বরদা

ধর্ম্মদাস মুখোপাধ্যায়

৩৫
নারীট

সূর্য্যকুমার মুখোপাধ্যায়

২৬
বরদা

শরচ্চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

১৯
নপাড়া

মহেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

১৮
দণ্ডিপুর

অনুসন্ধান দ্বারা যত দূর ও যেরূপ জানিতে পারিয়াছি, তদনুসারে কুলীনদিগের বিবাহসংখ্যা প্রভৃতি প্রদর্শিত হইল। সবিশেষ অনুসন্ধান করিলে, আরও অনেক বহুবিবাহকারীর নাম পাওয়া যাইতে পারে। ৪।৩।২ বিবাহ করিয়াছেন এরূপ ব্যক্তি অনেক, এস্থলে তাঁহাদের নাম নির্দ্দেশ করা গেল না। হুগলী জিলাতে বহুবিবাহকারী কুলীনের যত সংখ্যা, বর্দ্ধমান, নবদ্বীপ, যশর, বরিসাল, ঢাকা প্রভৃতি জিলাতে তদপেক্ষা ন্যূন নহে; বরং কোনও কোনও জিলায় তাদৃশ কুলীনের সংখ্যা অধিক। কুলীনদিগের বিবাহের যে সংখ্যা প্রদর্শিত হইল, তাহা ন্যূনাধিক হইবার সম্ভাবনা। যাঁহারা অধিকসংখ্যক বিবাহ করিয়াছেন, তাঁহারা নিজেই স্বকৃত বিবাহের প্রকৃত সংখ্যা অবধারিত বলিতে পারেন না। সুতরাং, অন্যের তাহা অবধারিত জানিতে পারা সহজ নহে। বিবাহের যে সকল সংখ্যা নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে, যদি কোনও স্থলে প্রকৃত সংখ্যা তদপেক্ষা অধিক হয়, তাহাতে কোনও কথা নাই; যদি ন্যূন হয়, তাহা হইলে কুলীনপক্ষপাতী আপত্তিকারী মহাশয়েরা অনায়াসে বলিবেন, আমি ইচ্ছাপুর্ব্বক সংখ্যাবৃদ্ধি করিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছি। কিন্তু, আমি সেরূপ করি নাই; অনুসন্ধান দ্বারা যাহা জানিতে পারিয়াছি, তাহাই নির্দ্দেশ করিয়াছি; জ্ঞানপূর্ব্বক কোনও বৈলক্ষণ্য করি নাই।

প্রসিদ্ধ জনাই গ্রাম কলিকাতার ৫। ৬ ক্রোশ মাত্র অন্তরে অবস্থিত। এই গ্রামের যে সকল ব্যক্তি একাধিক বিবাহ করিয়াছেন, তাঁহাদের পরিচয় স্বতন্ত্র প্রদত্ত হইতেছে।

নাম
বিবাহ
বয়স

মহানন্দ মুখোপাধ্যায়
১০
৩৫

যদুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
১০
২৯

আনন্দচন্দ্র গাঙ্গূলি

৬৫

দ্বারকানাথ গাঙ্গূলি

৩২

ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়

৫০

চন্দ্রকান্ত মুখোপাধ্যায়

৬৪

শ্যামাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

১৮

দীননাথ চট্টোপাধ্যায়

২৬

ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

৪৫

ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

২৭

নীলকণ্ঠ বন্দ্যোপাধ্যায়

৫০

সীতানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

২৯

ত্রিপুরাচরণ মুখোপাধ্যায়

৩৫

কালিদাস গাঙ্গূলি

২৬

দীননাথ গাঙ্গূলি

১৯

কালীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়

৪০

ক্ষেত্রমোহন চট্টোপাধ্যায়

৪০

কালীপদ মুখোপাধ্যায়

৫০

মাধবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

৩৫

নবকুমার মুখোপাধ্যায়

৪৩

নীলমণি গাঙ্গূলি

৪৮

কালীকুমার মুখোপাধ্যায়

৫৫

চন্দ্রনাথ গাঙ্গূলি

৫০

শ্রীনাথ চট্টোপাধ্যায়

৪৩

হারানন্দ মুখোপাধ্যায়

৬০

প্যারীমোহন চট্টোপাধ্যায়

৪০

সূর্য্যকুমার মুখোপাধ্যায়

৪০

ভোলানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

৫৫

সীতানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

৫৫

চন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায়

৬০

চন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায়

২৫

রমানাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

২৫

হরিনাথ মুখোপাধ্যায়

৬২

রাজমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

৫৭

ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়

৫০

দীননাথ মুখোপাধ্যায়

৫০

বিশ্বম্ভর মুখোপাধ্যায়

৫০

রামকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

৫০

প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায়

৩৫

চন্দ্রকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

৩২

কালীকুমার গাঙ্গূলি

২৫

আশুতোষ গাঙ্গূলি

২০

যদুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

৩১

নবীনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

৩৩

কেদারনাথ মুখোপাধ্যায়

২৮

গৌরীচরণ মুখোপাধ্যায়

২৮

ভগবানচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

৩২

দ্বারকানাথ গাঙ্গূলি

৩০

কালীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়

৩২

হরিহর গাঙ্গূলি

৩৫

কামাখ্যানাথ মুখোপাধ্যায়

২৮

প্যারীমোহন গাঙ্গূলি

৩৩

কালিদাস মুখোপাধ্যায়

৩৫

চন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায়

২৮

নবীনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

২৪

নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়

২৮

দীননাথ মুখোপাধ্যায়

৩০

যদুনাথ গাঙ্গূলি

২৭

বিশ্বেশ্বর মুখোপাধ্যায়

২৭

গোপালচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়

২৭

চন্দ্রকুমার গাঙ্গূলি

২১

মহেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

২১

প্রিয়নাথ বন্দোপাধ্যায়

২২

যোগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

২০

এক্ষণে, সকলে বিবেচনা করিয়া দেখুন, বিবাহবিষয়ে কুলীনদিগের অত্যাচারের নিবৃত্তি হইয়াছে কি না। এখন যেরূপ অত্যাচার হইতেছে, পূর্ব্বে ইহা অপেক্ষা অধিক ছিল, এরূপ বোধ হয় না। বরং, পূর্ব্ব অপেক্ষা এক্ষণে অধিক অত্যাচার হইতেছে, ইহাই সম্পূর্ণ সম্ভব। পূর্ব্বে অধিক টাকা না পাইলে, কুলীনেরা কুলভঙ্গে সম্মত ও প্রবৃত্ত হইতেন না। অধিক টাকা দিয়া, কুলভঙ্গ করিয়া, কন্যার বিবাহ দেন, এরূপ ব্যক্তিও অধিক ছিলেন না। এ কারণে, স্বকৃতভঙ্গের সংখ্যা তখন অপেক্ষাকৃত অনেক অল্প ছিল। কিন্তু, অধুনাতন কুলীনেরা, অস্প লাভে সন্তুষ্ট হইয়া, কুলভঙ্গ করি। থাকেন। আর, কুলভঙ্গ করিয়া, কন্যার বিবাহ দিবার লোকের সংখ্যাও এক্ষণে অনেক অধিক হইয়াছে। পূর্ব্বে, কোনও গ্রামে কেবল এক ব্যক্তি কুলভঙ্গ করিয়া কন্যার বিবাহ দিতেন। পরে তাঁহার পাঁচ পুত্র হইল। তাঁহারা সকলে কন্যার বিবাহবিষয়ে পিতৃদৃষ্টান্তের অনুবর্ত্তী হইয়া চলিয়াছেন। এক্ষণে, সেই পাঁচ পুত্রের পুত্রদিগকে, কুলভঙ্গ করিয়া, কন্যার বিবাহ দিতে হইতেছে। সুতরাং, যে স্থানে কেবল এক ব্যক্তি কুলভঙ্গ করিয়া কন্যার বিবাহ দিতেন, সেই স্থানে এক্ষণে সেই প্রথা অবলম্বন করিয়া চলিবার লোকের সংখ্যা অনেক অধিক হইয়াছে। মূল্যও অল্প, গ্রাহকের সংখ্যাও অধিক, এজন্য, কুলভঙ্গ ব্যবসায়ের উত্তরোত্তর শ্রীকৃদ্ধিই হইতেছে। সুতরাং, স্বকৃতভঙ্গের সংখ্যা এখন অনেক অধিক এবং উত্তরোত্তর অধিক বই ন্যূন হওয়া সম্ভব নহে। স্বতভঙ্গেরা অধিক বিবাহ করিতেছেন, এবং স্থানে স্থানে তাঁহাদের যে কন্যার পাল জম্মিতেছে, তাহাদিগকে স্বকৃতভঙ্গ পাত্রে অর্পন করিতে হইতেছে। এমন স্থলে, বিবাহবিষয়ক অত্যাচারের বৃদ্ধি ব্যতীত হ্রাস কিরূপে সম্ভব হইতে পারে, বুঝিতে পারা যায় না। যাহা হউক, কুলীনদিগের বিবাহ- বিষয়ক অত্যাচারের প্রায় নিবৃত্তি হইয়াছে, যাহা কিছু অবশিষ্ট আছে, অল্প দিনেই তাহার সম্পূর্ণ নিবৃত্তি হইবেক, এ কথা সম্পূর্ণ অলীক।

কলিকাতাবাসী নব্যসম্প্রদায়ের অধিকাংশ লোক পল্লীগ্রামের কোনও সংবাদ রাখেন না; সুতরাং, তত্রত্য যাবতীয় বিষয়ে তাঁহারা সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ; কিন্তু, তৎসংক্রান্ত কোনও বিষয়ে অভিপ্রায় প্রকাশের প্রয়োজন হইলে, সম্পূর্ণ অভিজ্ঞের ন্যায়, অসঙ্কুচিত চিত্তে তাহা করিয়া থাকেন। তাঁহার, কলিকাতার ভাবভঙ্গী দেখিয়া, তদনুসারে পল্লী গ্রামের অবস্থা অনুমান করিয়া লয়েন। ঐ সকল মহোদয়ের বলেন, এ দেশে বিদ্যার সবিশেষ চর্চ্চা হওয়াতে, বহু- বিবাহাদি কুপ্রথার প্রায় নিবৃত্তি হইয়াছে।

এ কথা যথার্থ বটে বহুকাল ইঙ্গরেজী বিদ্যার সবিশেষ অনুশীলন ও ইঙ্গরেজাতির সহিত ভূয়িষ্ঠ সংসর্গ দ্বারা, কলিকাতার ও কলিকাতার অব্যবহিত সন্নিহিত স্থানে কুপ্রথা ও কুসংস্কারের অনেক অংশে নিবৃত্তি হইয়াছে; কিন্তু, তদ্ব্যতিরিক্ত সমস্ত স্থানে ইঙ্গরেজী বিদ্যার তাদৃশ অনুশীলন হইতেছে না; ও ইঙ্গরেজজাতির সহিত তদ্রূপ ভূয়িষ্ঠ সংসর্গ ঘটিতেছে না; সুতরাং তত্তৎ স্থানে কুপ্রথা ও কুসংস্কারের প্রাদুর্ভাব তদবস্থই রহিয়াছে। ফলতঃ, পল্লীগ্রামের অবস্থা কোনও অংশে কলিকাতার মত হইয়াছে, এরূপ নির্দ্দেশ নিতান্ত অসঙ্গত। কার্য্যকারণভাবব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টি করিলে, এরূপ সংস্কার কদাচ উদ্ভূত হইতে পারে না। কলিকাতায় যে কারণে যত কালে যে কার্য্যের উৎপত্তি হইয়াছে, যে সকল স্থানে যাবৎ সেই কারণের তত কাল সংযোগ না ঘটিতেছে, ভাবৎ তথায় সেই কার্য্যের উৎপত্তি প্রত্যাশা করা যাইতে পারে না। কলিকাতায় যত কাল ইঙ্গরেজী বিদ্যার যেরূপ অনুশীলন ও ইঙ্গরেজজাতির সহিত যেরূপ ভূয়িষ্ঠ সংসর্গ হইয়াছে। পল্লীগ্রামে যাবৎ সর্ব্বতোভাবে ঐরূপ না ঘটিতেছে, তাবৎ তথায় কলিকাতার অনুরূপ ফললাভ কোনও ক্রমে সম্ভবিতে পারে না। যাহা হউক, কলিকাতার ভাবভঙ্গী দেখিয়া, তদনুসারে পল্লীগ্রামের অবস্থা অনুমানকরা নিতান্ত অব্যবস্থা।

ফলকথা এই, কোনও বিষয়ে মত প্রকাশের প্রয়োজন হইলে, তদ্বিষয়ের বিশেষজ্ঞ না হইয়া, তাহা করা পরামর্শসিদ্ধ নহে। সবিশেষ অনুসন্ধান ব্যতিরেকে কেহ কোনও বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হইতে পারেন না। বহুবিবাহপ্রথাবিষয়ে সবিশেষ অনুসন্ধান করিলে, ঐ জঘন্য ও নৃশংস প্রথার অনেক নিবৃত্তি হইয়াছে, উহা আর পূর্ব্বের মত প্রবল নাই, পরপ্রতারণা যাঁহার উদ্দেশ্য নহে তাদৃশ ব্যক্তি কদাচ এরূপ নির্দ্দেশ করিতে পারেন না। ঈর্ষ্যার পরতন্ত্র, বা বিদ্বেষ- বুদ্ধির অধীন, অথবা কুসংস্কারবিশেষের বশবর্ত্তী হইয়া, প্রস্তাবিত বিষয়ের প্রতিপক্ষত করামাত্র যাহার মুখ্য উদ্দেশ্য, তিনি তদ্বিষয়ের বিশেষজ্ঞই হউন, আর অনভিজ্ঞই হউন, যাহা স্বপক্ষসমর্থনের, বা পরপক্ষখণ্ডনের, উপযোগী জ্ঞান করিবেন, তাহাই সচ্ছন্দে নির্দ্দেশ করিবেন, যাহা নির্দ্দেশ করিতেছেন, তাহা সম্পূর্ণ অবাস্তব হইলেও, তাহাকেই তদ্বিষয়ের প্রকৃত অবস্থা বলিয়া কীর্ত্তন করিতে কিঞ্চিন্মাত্র সঙ্কুচিত হইবেন না। কোনও ব্যক্তি, সদভিপ্রায়প্রবর্ত্তিত হইয়া, কার্য্যবিশেষের অনুষ্ঠান করিলে, উক্তবিধ ব্যক্তিরা ঐ অনুষ্ঠানকে, অসদভিপ্রায় প্রণোদিত বলিয়া, অম্লান মুখে অতথ্যনির্দ্দেশ করেন; কিন্তু আপনারা যে জিগীষার বশ হইয়া, অতথ্যনির্দ্দেশ দ্বারা পরের চক্ষে ধূলি প্রক্ষেপ করিতেছেন, তাহা একবারও ভাবিয়া দেখেন না।

তৃতীয় আপত্তি

তৃতীয় আপত্তি।

কেহ কেহ আপত্তি করিতেছেন, বহুবিবাহ প্রথা রহিত হইলে, ভঙ্গ কুলীনদিগের সর্ব্বনাশ। এক ব্যক্তি অনেক বিবাহ করিতে না পারিলে, তাঁহাদের কৌলীন্যমর্য্যাদার সমূলে উচ্ছেদ ঘটিবেক। এই আপত্তির বলাবল বিবেচনা করিতে হইলে, ভঙ্গকুলীনের কুল, চরিত্র প্রভৃতির পরিচয় প্রদান আবশ্যক।

পূর্ব্বে উল্লিখিত হইয়াছে, বংশজকন্যা বিবাহ করিলে, কুলীনের কুলক্ষয় হয়, এজন্য কুলীনেরা বংশজকন্যার পাণিগ্রহণে পরাঙ্মুখ থাকেন। এ দিকে, বংশজদিগের নিতান্ত বাসনা, কুলীনে কন্যাদান করিয়া বংশের গৌরববৃদ্ধি করেন। কিন্তু সে বাসনা অনায়াসে সম্পন্ন হইবার নহে। যাঁহারা বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন, তাদৃশ বংশজেরাই সেই সৌভাগ্যলাভে অধিকারী। যে কুলীনের অনেক সন্তান থাকে, এবং অর্থলোভ সাতিশয় প্রবল হয়, তিনি, অর্থলাভে চরিতার্থ হইয়া, বংশজকন্যার সহিত পুত্রের বিবাহ দেন। এই বিবাহ দ্বারা কেবল ঐ পুত্রের কুলক্ষয় হয়, তাঁহার নিজের বা অন্যান্য পুত্রের কুলমর্য্যাদার কোনও ব্যতিক্রম ঘটে না।

এইরূপে, যে সকল কুলীনসন্তান, বংশজকন্যা বিবাহ করিয়া, কুলভ্রষ্ট হয়েন, তাঁহারা স্বকৃতভঙ্গ কুলীন বলিয়া উল্লিখিত হইয়া থাকেন। ঈদৃশ ব্যক্তির অতঃপর বংশজকন্যা বিবাহে আর আপত্তি থাকে না। কুলভঙ্গ করিয়া কুলীনকে কন্যাদান করা বহুব্যয়সাধ্য, এজন্য সকল বংশজের ভাগ্যে সে সৌভাগ্য ঘটিয়া উঠে না। কিন্তু স্বকৃতভঙ্গ কুলীনেরা কিঞ্চিৎ পাইলেই তাঁহাদিগকে চরিতার্থ করিতে প্রস্তুত আছেন। এই সুযোেগ দেখিয়া, বংশজেরা, কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ দিয়া সন্তুষ্ট করিয়া, স্বকৃতভঙ্গকে কন্যাদান করিতে আরম্ভ করেন। বিবাহিতা স্ত্রীর কোনও ভার লইতে হইবেক না, অথচ আপাততঃ কিঞ্চিৎ লাভ হইতেছে, এই ভাবিয়া স্বকৃতভঙ্গেরাও বংশজদিগকে উদ্ধার করিতে বিমুখ হয়েন না; এইরূপে, কিঞ্চিৎ লাভলোভে, বংশজকন্যাবিবাহকরা স্বকৃতভঙ্গের প্রকৃত ব্যবসায় হইয়া উঠে।

এতদ্ভিন্ন, ভঙ্গকুলীনদের মধ্যে এই নিয়ম হইয়াছে, অন্ততঃ স্বসমান পর্য্যায়ের ব্যক্তিদিগকে কন্যাদান করিতে হইবেক, অর্থাৎ স্বকৃতভঙ্গের কন্যা স্বকৃতপাত্রে দানকরা আবশ্যক। তদনুসারে, যে সকল স্বকৃতভঙ্গের অবিবাহিতা কন্যা থাকে, তাঁহারাও কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ দিয়া সন্তুষ্ট করিয়া, স্বকৃতভঙ্গকে কন্যাদান করেন। স্বকৃতভঙ্গের পুত্র, পৌত্র প্রভৃতির পক্ষেও স্বকৃতভঙ্গ পাত্রে কন্যাদান করা শ্লাঘার বিষয়; এজন্য তাঁহারাও, সবিশেষ যত্ন করিয়া, স্বকৃতভঙ্গ পাত্রে কন্যাদান করিয়া থাকেন।

স্বকৃতভঙ্গ কুলীন এইরূপে ক্রমে ক্রমে অনেক বিবাহ করেন। স্বকৃতভঙ্গেয় পুত্রেরা এ বিষয়ে স্বকৃতভঙ্গ অপেক্ষা নিতান্ত নিকৃষ্ট নহেন। তৃতীয় পুৰুষ অবধি বিবাহের সংখ্যা ন্যূন হইতে আরম্ভ হয়। পূর্ব্বে, বংশজকন্যা গ্রহণ করিলে, কুলীন এককালে কুলভ্রষ্ট ও বংশজভাবাপন্ন হইয়া, হেয় ও শ্রদ্ধেয় হইতেন; ইদানীং, পাঁচপুরুষ পর্য্যন্ত, কুলীন বলিয়া গণ্য ও মান্য হইয়া থাকেন।

যে সকল হতভাগা কন্যা স্বকৃতভঙ্গ অথবা দুপুরুষিয়া পাত্রে অর্পিতা হয়েন, তাঁহারা যাবজ্জীবন পিত্রালয়ে বাস করেন। বিবাহকর্ত্তা মহাপুরুষেরা, কিঞ্চিৎ দক্ষিণা পাইয়া, কন্যাকর্ত্তার কুলরক্ষা অথবা বংশের গৌরববৃদ্ধি করেন, এইমাত্র। সিদ্ধান্ত করা আছে, বিবাহ- কর্ত্তাকে বিবাহিতা স্ত্রীর তত্ত্বাবধানের, অথবা ভরণপোষণের, ভারবহন করিতে হইবেক না। সুতরাং কুলীনমহিলারা, নামমাত্রে বিবাহিতা হইয়া, বিধবা কন্যার ন্যায়, যাবজ্জীবন, পিত্রালয়ে কালযাপন করেন। স্বামিসহবাসসৌভাগ্য বিধাতা তাঁহাদের অদৃষ্টে লিখেন নাই; এবং তাঁহারাও সে প্রত্যাশা করেন না। কন্যাপক্ষীয়েরা সবিশেষ চেষ্টা পাইলে, কুলীন জামাতা শ্বশুরালয়ে আসিয়া দুই চারি দিন অবস্থিতি করেন, কিন্তু সেবা ও বিদায়ের ত্রুটি হইলে, এ জন্মে আর শ্বশুরালয়ে পদার্পণ করেন না।

কোনও কারণে কুলীনমহিলার পর্ভসঞ্চার হইলে, তাহার পরি- পাকার্থে, কন্যাপক্ষীয়দিগকে ত্রিবিধ উপায় অবলম্বন করিতে হয়। প্রথম, সবিশেষ চেষ্টা ও যত্ন করিয়া, জামাতার আনয়ন। তিনি আসিয়া, দুই এক দিন শ্বশুরালয়ে অবস্থিতি করিয়া, প্রস্থান করেন। ঐ গর্ভ তৎসহযোগসম্ভুত বলিয়া পরিগণিত হয়। দ্বিতীয়, জামাতার আনয়নে কৃতকার্য্য হইতে না পারিলে, ব্যভিচারসহচরী ভ্রূণহত্যাদেবীর আরাধনা। এ অবস্থায়, এতদ্ব্যতিরিক্ত নিস্তারের আর পথ নাই। তৃতীয় উপায় অতি সহজ, অতি নির্দোষ ও সাতিশয় কৌতুকজনক। তাহাতে অর্থব্যয়ও নাই, এবং ভ্রূণহত্যাদেবীর উপাসনাও করিতে হয় না। কন্যার জননী, অথবা বাটীর অপর গৃহিণী, একটি ছেলে কোলে করিয়া, পাড়ায় বেড়াইতে যান, এবং একে একে প্রতিবেশীদিগের বাটীতে গিয়া, দেখ মা, দেখ বোন, অথবা দেখ্ বাছা, এইরূপ সম্ভাষণ করিয়া, কথা প্রসঙ্গে বলিতে আরম্ভ করেন, অনেক দিনের পর কাল রাত্রিতে জামাই আসিয়াছিলেন। হঠাৎ আসিলেন, রাত্রিকাল, কোথা কি পাব; ভাল করিয়া খাওয়াতে পারি নাই; অনেক বলিলাম, এক বেলা থাকিয়া, খাওয়া দাওয়া করিয়া যাও; তিনি কিছুতেই রহিলেন না; বলিলেন, আজ কোনও মতে থাকিতে পারি না। সন্ধ্যার পরেই অমুক গ্রামের মজুমদারের বাটীতে একটা বিবাহ করিতে হইবেক। পরে, অমুক দিন, অমুক গ্রামের হালদারদের বাটীতেও বিবাহের কথা আছে, সেখানেও যাইতে হইবেক। যদি সুবিধা হয়, আসিবার সময় এই দিক হইয়া যাইব। এই বলিয়া ভোর ভোর চলিয়া গেলেন। স্বর্ণকে বলিয়াছিলাম, ত্রিপুরা ও কামিনীকে ডাকিয়া আন্, তারা জামায়ের সঙ্গে খানিক আমোদ আহলাদ করিবে। একলা যেতে পারিব না বলিয়া, ছুঁড়ী কোনও মতেই এল না। এই বলিয়া, সেই দুই কন্যার দিকে চাহিয়া, বলিলেন, এবার জামাই এলে, মা তোরা যাস্ ইত্যাদি। এইরূপে পাড়ার বাৰ্টী বাড়ী বেড়াইয়া জামাতার আগমনবার্তা কীর্ত্তন করেন। পরে স্বর্ণমঞ্জরীর গর্ভসঞ্চার প্রচার হইলে, ঐ গর্ভ জামাতৃকৃত বলিয়া পরিপাক পায়।

এই সকল কুলীমহিলার পুত্র হইলে, ডাহারা দুপুরুযিয়া কুলীন বলিয়া গণনীয় ও পূজনীয় হয়। তাহাদের প্রতিপালন ও উপনয়নান্ত সংস্কার সকল মাতুলদিগকে করিতে হয়। কুলীন পিতা কখনও তাহাদের কোনও সংবাদ লয়েন না ও তত্ত্বাবধান করেন না; তবে, অন্নপ্রাশনাদি সংস্কারের সময় নিমন্ত্রণপত্র প্রেরিত হইলে, এবং কিছু লাভের আশ্বাস থাকিলে, আসিয়া আভ্যুদয়িক করিয়া যান। উপনয়নের পর, পিতার নিকট পুত্রের বড় আদর। তিনি সঙ্গতিপন্ন বংশজদিগের বাটীতে তাহার বিবাহ দিতে আরম্ভ করেন; এবং পণ, গণ প্রভৃতি দ্বারা বিলক্ষণ লাভ করিতে থাকেন। বিবাহের সময়, মাতুলদিগের কোনও কথা চলে না, ও কোনও অধিকার থাকে না। পুত্র যত দিন অল্পবয়স্ক থাকে, তত দিনই পিতার এই লাভজনক ব্যবসায় চলে। তাহার চক্ষু ফুটিলে, তাঁহার ব্যবসায় বন্ধ হইয়া যায়। তখন সে আপন ইচ্ছায় বিবাহ করিতে আরম্ভ করে, এবং এই সকল বিবাহে পণ, গণ প্রভৃতি যা পাওয়া যায়, তাহা তাহারই লাভ, পিতা তাহাতে হস্তক্ষেপ করিতে পারেন না। কন্যাসন্তান জস্মিলে, তাহার নাড়ীচ্ছেদ অবধি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পর্য্যন্ত যাবতীয় ক্রিয়া মাতুলদিগকেই সম্পন্ন করিতে হয়। কুলীনকন্যার বিবাহ ব্যয়সাধ্য, এজন্য পিতা এ বিবাহের সময় সে দিক দিয়া চলেন না। কুলীনভাগিনেয়ী যথাযোগ্য পাত্রে অর্পিতা না হইলে, বংশের গৌরব- হানি হয়; এজন্য, তাঁহারা, ভঙ্গকুলীনের কুলমর্য্যাদার নিয়মানুসারে, ভাগিনেয়ীদের বিবাহকার্য্য নির্ব্বাহ করেন। এই সকল কন্যারা, স্ব স্ব জননীর ন্যায় নামমাত্রে বিবাহিতা হইয়া, মাতুলালয়ে কাল- যাপন করেন।

কুলীনভগিনী ও কুলীনভাগিনেয়ীদের বড় দুর্গতি। তাহাদিগকে, পিত্রালয়ে অথবা মাতুলালয়ে থাকিয়া, পাচিকা ও পরিচারিকা উভয়ের কর্ম্ম নির্ব্বাহ করিতে হয়। পিতা যত দিন জীবিত থাকেন, কুলীনমহিলার তত দিন নিতান্ত দুরবস্থা ঘটে না। তদীয় দেহাত্যয়ের পর, ভ্রাতারা সংসারের কর্ত্তা হইলে, তাঁহারা অতিশয় অপদস্থ হন। প্রখরা ও মুখরা ভ্রাতৃভার্য্যারা তাঁহাদের উপর, যার পর নাই, অত্যাচার করে। প্রাতঃকালে নিদ্রাভঙ্গ, রাত্রিতে নিদ্রাগমন, এ উভয়ের অন্তর্বর্ত্তী দীর্ঘ কাল, উৎকট পরিশ্রম সহকারে সংসারের সমস্ত কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়াও, তাঁহারা সুশীলা ভ্রাতৃভার্য্যাদের নিকট প্রতিষ্ঠালাভ করিতে পারেন না। তাঁহারা সর্ব্বদাই তাঁহাদের উপর খড়্গহস্ত। তাঁহাদের অশ্রুপাতের বিশ্রাম নাই বলিলে, বোধ হয়, অত্যুক্তিদোৰে দূষিত হইতে হয় না। অনেক সময়, লাঞ্ছনা সহ্য করিতে না পারিয়া, প্রতিবেশীদিগের বাটীতে গিয়া, অশ্রুবিসর্জন করিতে করিতে, তাঁহাৱা আপন অদৃষ্টের দোষ কীর্ত্তন ও কৌলীন্যপ্রথার গুণ কীর্ত্তন করিয়া থাকেন; এবং পৃথিবীর মধ্যে কোথাও স্থান থাকিলে চলিয়া যাইতাম, আর ও বাড়ীতে মাথা গলাইতাম না, এইরূপ বলিয়া, বিলাপ ও পরিতাপ করিয়া, মনের আক্ষেপ মিটান। উত্তরসাধকের সংযোগ ঘটিলে, অনেকানেক বয়স্থা কুলীমহিলা ও কুলীনদুহিতা, যন্ত্রণাময় পিত্রালয় ও মাতুলালয় পরিত্যাগ করিয়া, বারাঙ্গনাবৃত্তিঅবলম্বন করেন।

ফলতঃ, কুলীনমহিলা ও কুলীনতনয়াদিগের যন্ত্রণার পরিসীমা নাই। যাঁহারা কখনও তাঁহাদের অবস্থা বিষয়ে দৃষ্টিপাত করেন, তাঁহারাই বুঝিতে পারেন, ঐ হতভাগা নারীদিগকে কত ক্লেশে কালযাপন করিতে হয়। তাঁহাদের যন্ত্রণার বিষয় চিন্তা করিলে, হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়, এবং যে হেতুতে তাঁহাদিগকে ঐ সমস্ত দুঃসহ ক্লেশ ও যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইতেছে, তা বিবেচনা করিয়া দেখিলে, মনুষ্যজাতির উপর অত্যন্ত অশ্রদ্ধা জন্মে। এক পক্ষের অমূলক অকিঞ্চিৎকর গৌরবলাভলোভ, অপর পক্ষের কিঞ্চিৎ অর্থলাভলোভ, সমস্ত অনর্থের মূলকারণ; এবং এই উভয় পক্ষ ভিন্ন দেশস্থ যাবতীয় লোকের এ বিষয়ে ঔদাস্য অবলম্বন উছার সহকারী কারণ। যাঁহাদের দোষে কুলীনকন্যাদের এই দুরবস্থা, যদি তাঁহাদের উপর সকলে অশ্রদ্ধা ও বিদ্বেষ প্রদর্শন করিতেন, তাহা হইলে, ক্রমে এই অসহ্য অত্যাচারের নিবারণ হইতে পারিত। অশ্রদ্ধা ও বিদ্বেষের কথা দূরে থাকুক, অত্যাচারকারীরা দেশস্থ লোকের নিকট, যার পর নাই, মাননীয় ও পুজনীয়। এমন স্থলে, রাজদ্বারে আবেদন ভিন্ন, কুলীনকামিনীদিগের দুরবস্থাবিমোচনের কি উপায় হইতে পারে। পৃথিবীর কোনও প্রদেশে স্ত্রীজাতির ঈদৃশী দুরবস্থা দেখিতে পাওয়া যায় না। যদি ধর্ম্ম থাকেন, রাজা বল্লালসেন ও দেবীবর ঘটক- বিশারদ নিঃসন্দেহ নরকগামী হইয়াছেন। ভারতবর্ষের অন্যান্য অংশে, এবং পৃথিবীর অপরাপর প্রদেশেও বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত আছে। কিন্তু, তথায় বিবাহিতা নারীদিগকে, এতদ্দেশীয় কুলীনকামিনীদের মত, দুর্দশায় কালযাপন করিতে হয় না। তাহারা স্বামীর গৃহে বাস করিতে পায়, স্বামীর অবস্থানুরূপ সাচ্ছাদন পায়, এবং পর্যায়ক্রমে স্বামীর সহবাসসুখলাভ করিয়া থাকে। স্বামিগৃহবাস, স্বামিসহবাস, স্বামিদত্ত গ্রাসাচ্ছাদন কুলীনকন্যাদের স্বপ্নের অগোচর।

এ দেশের ভঙ্গকুলীনদের মত পাষণ্ড ও পাতকী ভূমণ্ডলে নাই। তাঁহারা দয়া, ধর্ম, চক্ষুলজ্জা ও লোকলজ্জায় একবারে বর্জিত। তাঁহাদের চরিত্র অতি বিচিত্র। চরিত্রবিষয়ে তাঁহাদের উপমা দিবার স্থল নাই। তাঁহারাই তাঁহাদের একমাত্র উপমাস্থল। —কোনও অতি- প্রধান ভঙ্গকুলীনকে কেহ জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ঠাকুরদাদা মহাশয়! আপনি অনেক বিবাহ করিয়াছেন, সকল স্থানে যাওয়া হয় কি। তিনি অম্লানমুখে উত্তর করিলেন, যেখানে ভিজিট পাই, সেই খানে যাই। —গত দুর্ভিক্ষের সময়, এক জন ভঙ্গকুলীন অনেকগুলি বিবাহ করেন। তিনি লোকের নিকট আস্ফালন করিয়াছিলেন, এই দুর্ভিক্ষে কত লোক অন্নাভাবে মারা পড়িয়াছে, কিন্তু আমি কিছুই টের পাই নাই; বিবাহ করিয়া সচ্ছন্দে দিনপাত করিয়াছি। —গ্রামে বারোয়ারিপূজার উদ্যোগ হইতেছে। পূজার উদ্যোগীরা, ঐ বিষয়ে চাঁঁদা দিবার জন্য, কোনও ভঙ্গকুলীনকে পীড়াপীড়ি করাতে, তিনি, চাঁদার টাকা সংগ্রহের জন্য, একটি বিবাহ করিলেন। —বিবাহিত স্ত্রী স্বামীর সমস্ত পরিবারের ভরণপোষণের উপযুক্ত অর্থ লইয়া গেলে, কোন ভঙ্গকুলীন, দয়া করিয়া, তাহাকে আপন আবাসে অবস্থিতি করিতে অনুমতি প্রদান করেন কিন্তু সেই অর্থ নিঃশেষ হইলেই, তাহাকে বাটী হইতে বহিস্কৃত করিয়া দেন। —পুত্রবধূর ঋতুদর্শন হইয়াছে। সে যাঁহার কন্যা, তাঁহার নিতান্ত ইচ্ছা, জামাতাকে আনাইয়া, কন্যর পুনর্বিবাহসংস্কার নির্ব্বাহ করেন। পত্র দ্বারা বৈবাহিককে আপন প্রার্থনা জানাইলেন। বৈবাহিক পত্রোত্তৱে অধিক টাকার দাওয়া করিলেন। কন্যার পিতা তত টাকা দিতে অনিচ্ছু বা অসমর্থ হওয়াতে, তিনি পুত্রকে শ্বশুরালয়ে খাইতে দিলেন না; সুতরাং, পুত্রবধূর পুনর্বিবাহসংস্কার এ জন্মের মত স্থগিত রহিল। —বহুকাল স্বামীর মুখ দেখেন নাই; তথাপি কোনও ভঙ্গকুলীনের ভার্য্যা ভাগ্যক্রমে গর্ভবতী হইয়াছিলেন। ব্যভিচারিণী কন্যাকে গৃহে রাখিলে, জ্ঞাতিবর্গের নিকট অপদস্থ ও সমাজচ্যুত হইতে হয়, এজন্য, তাহাকে গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করা পরামর্শ স্থির হইলে, তাহার হিতৈষী আত্মীয়, এই সর্ব্বনাশ নিবারণের অন্য কোনও উপায় করিতে না পারিয়া, অনেক চেষ্টা করিয়া, তদীয় স্বামীকে আনাইলেন। এই মহাপুরুষ, অর্থলাভে চরিতার্থ হইয়া, সর্ব্বসমক্ষে স্বীকার করিলেন, রত্নমঞ্জরীর গর্ভ আমার সহযোগে সম্ভূত হইয়াছে।

ভঙ্গকুলীনের চরিত্রবিষয়ে এ স্থলে একটি অপূর্ব্ব উপাখ্যান কীর্ত্তিত হইতেছে। কোনও ব্যক্তি মধ্যাহ্নকালে বাটীর মধ্যে আহার করিতে গেলেন; দেখিলেন, যেখানে আহারের স্থান হইয়াছে, তথায় দুটি অপরিচিত স্ত্রীলোক বসিয়া আছেন। একটির বয়ঃক্রম প্রায় ৬০ বৎসর, দ্বিতীয়টির বয়ঃক্রম ১৮।১৯ বৎসর। তাঁহাদের পরিচ্ছদ দুরবস্থার একশেষ প্রদর্শন করিতেছে; তাঁহাদের মুখে বিষাদ ও হতাশতার সম্পূর্ণ লক্ষণ সুস্পষ্ট লক্ষিত হইতেছে। ঐ ব্যক্তি স্বীয় জননীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, মা ইঁহারা কে, কি জন্যে এখানে বসিয়া আছেন। তিনি বৃদ্ধার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কহিলেন,ইনি ভট্টরাজের স্ত্রী, এবং অল্পবয়স্কাকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, ইনি তাঁহার কন্যা। ইঁহারা তোমার কাছে আপনাদের দুঃখের পরিচয় দিবেন বলিয়া বসিয়া আছেন।

ভট্টরাজ দুপুরুষিয়া ভঙ্গকুলীন; ৫।৬ টি বিবাহ করিয়াছেন। তিনি ঐ ব্যক্তির নিকট মাসিক বৃত্তি পান; এজন্য, তাঁহার যথেষ্ট খাতির রাখেন। তাঁহার ভগিনী, ভাগিনেয় ও ভাগিনেয়ীরা তাঁহার বাচীতে থাকে; তাঁহার কোনও স্ত্রীকে কেহ কখনও তাঁহার বাটীতে অবস্থিতি করিতে দেখেন নাই।

সেই দুই স্ত্রীলোকের আকার ও পরিচ্ছদ দেখিয়া, ঐ ব্যক্তির অন্তঃকরণে অতিশয় দুঃখ উপস্থিত হইল। তিনি, আহার বন্ধ করিয়া, তাঁহাদের উপাখ্যান শুনিতে বসিলেন। বৃদ্ধা কহিলেন, “আমি ভট্টরাজের ভার্য্যা; এটি তাঁর কন্যা, আমার গর্ভে জন্মিয়াছে। আমি পিত্রালয়ে থাকিতাম। কিছু দিন হইল, আমার পুত্র কহিলেন, মা আমি তোমাদের দুজনকে অন্ন বস্ত্র দিতে পারি না। আমি কহিলাম, বাছা বল কি, আমি তোমার মা, ও তোমার ভগিনী, তুমি অন্ন না দিলে আমরা কোথায় যাইব। তুমি এক জনকে অন্ন দিবে, আর এক জন কোথায় যাইবে; পৃথিবীতে অন্ন দিবার লোক আর কে আছে। এই কথা শুনিয়া পুত্র কহিলেন, তুমি মা, তোমায় অন্ন বস্ত্র যেরূপে পারি দিব, উহার ভার আমি আর লইতে পারি না। আমি রাগ করিয়া বলিলাম, তুমি কি উহাকে বেশ্যা হইতে বল। পুত্র কহিলেন, আমি তাহা জানি না, তুমি উহার বন্দোবস্ত কর। এই বিষয় লইয়া, পুত্রের সহিত আমার বিষম মনান্তর ঘটিয়া উঠিল, এবং অবশেষে আমায় কন্যাসহিত বাটী হইতে বহির্গত হইতে হইল।

কিছু দিন পূর্ব্বে শুনিয়াছিলাম, আমার এক মাস্তত ভগিনীর বাটীতে একটি পাচিকার প্রয়োজন আছে। আমরা উভয়ে ঐ পাচিকার কর্ম্ম করিব, মনে মনে এই স্থির করিয়া, তথায় উপস্থিত হইলাম। কিন্তু, আমাদের দুর্ভাগ্যক্রমে, ২।৪ দিন পূর্ব্বে, তাঁহারা পাচিকা নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তখন নিত্যন্ত হতাশ্বাস হইয়া, কি করি, কোথায় যাই, এই চিন্তা করিতে লাগিলাম। অমুক গ্রামে আমার স্বামীর এক সংসার আছে, তাহার গর্ভজাত সন্তান বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন, এবং তাঁহার দয়া ধর্ম্মও আছে। ভাবিলাম, যদিও আমি বিমাতা, এ বৈমাত্রেয় ভগিনী; কিন্তু,তাঁহার শরণাগত হইয়া দুঃখ জানাইলে, অবশ্য দয়া করিতে পারেন। এই ভাবিয়া, অবশেৰে তাঁহার নিকটে উপস্থিত হইলাম, এবং সবিশেষ সমস্ত কহিয়া, সজলনয়নে, তাঁহার হস্তে ধরিয়া বলিলাম। বাবা তুমি দয়া না করিলে, আমাদের আর গতি নাই।

আমার কাতরতা দর্শনে, সপত্নীপুত্র হইয়াও, তিনি যথেষ্ট স্নেহ ও দয়া প্রদর্শন করিলেন, এবং কহিলেন, যত দিন তোমরা বাঁচিবে, তোমাদের ভরণপোষণ করিব। এই আশ্বাসবাক্য শ্রবণে আমি আহ্লাদে গদ্গদ হইলাম। আমার চক্ষুতে জলধারা বহিতে লাগিল। তিনি যথোচিত যত্ন করিতে লাগিলেন। কিন্তু, উহার বাটীর স্ত্রীলোকেরা সেরূপ নহেন। এ আপদ আবার কোথা হইতে উপস্থিত হইল এই বলিয়া, তাহারা, যার পর নাই, অনাদর ও অপমান করিতে লাগিল। সপত্নীপুত্র ক্রমে ক্রমে সবিশেষ সমস্ত অবগত হইলেন। কিন্তু তাহাদের অত্যাচার নিবারণ করিতে পারিলেন না। এক দিন, আমি তাঁহার নিকটে গিয়া সমুদয় বলিলাম। তিনি কহিলেন, মা আমি সমস্ত জানিতে পারিয়াছি; কিন্তু কোনও উপায় দেখিতেছি না। আপনারা কোনও স্থানে গিয়া খাকুন; মধ্যে মধ্যে, আমার নিকট লোক পাঠাইবেন; আমি আপনাদিগকে কিছু কিছু দিব।

এই রূপে নিরাশ্বাস হইয়া, কন্যা লইয়া, তথা হইতে বহির্গত হইলাম। পৃথিবী অন্ধকারময় বোধ হইতে লাগিল। অবশেষে ভাবিলাম, স্বামী বর্ত্তমান আছেন, তাঁহার নিকটে যাই, এবং দুরবস্থা জানাই, যদি তাঁহার দয়া হয়। এই স্থির করিয়া, পাঁচ সাত দিন হইল, এখানে আসিয়াছিলাম। আজ তিনি স্পষ্ট জবাব দিলেন, আমি তোমাদিগকে এখানে রাখিতে, ৰা অন্ন বস্ত্র দিতে পারিব না। অনেকে বলিল, তোমায় জানাইলে কোনও উপায় হইতে পারে, এ জন্য এখানে আসিয়া বসিয়া ছিলাম। ঐ ব্যক্তি শুনিয়া ক্রোধে ও দুঃখে অতিশয় অভিভূত হইলেন, এবং অশ্রুপাত করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, তিনি, ভট্টরাজের বাটীতে গিয়া, যথোচিত ভর্ৎসনা করিয়া বলিলেন, আপনার আচরণ দেখিয়া আমি চমৎকৃত হইয়াছি। আপনি কোন্ বিবেচনায় তাহাদিগকে বাটী হইতে বহিস্কৃত করিয়া দিতেছেন। এক্ষণে, আপনি তাহাদিগকে বাটীতে রাখিবেন কি না, স্পষ্ট বলুন। ঐ ব্যক্তির ভাবভঙ্গী দেখিয়া, বৃত্তিভোগী ভট্টরাজ ভয় পাইলেন, এবং কহিলেন, তুমি বাটীতে যাও, আমি ঘরে বুঝিয়া পরে তোমার নিকটে যাইতেছি।

অপরাহ্নকালে, ভট্টরাজ ঐ ব্যক্তির নিকটে আসিয়া বলিলেন, তাহাদিগকে বাটীতে রাখা পরামর্শ স্থির; কিন্তু, তোমায়, মাস মাস তাহাদের হিসাবে আর কিছু দিতে হইবেক। ঐ ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ স্বীকার করিলেন, এবং তিন মাসের দেয় তাঁহার হস্তে দিয়া কহিলেন, এই রূপে তিন তিন মাসের টাকা আগামী দিব; এতদ্ভিন্ন, তাঁহাদের পরিধেয় বস্ত্রের ভার আমার উপর রহিল। আর কোনও ওজর করিতে না পারিয়া, নিরুপায় হইয়া, ভট্টরাজ, স্ত্রী ও কন্যা লইয়া গৃহ প্রতিগমন করিলেন। তিনি নিজে দুঃশীল লোক নহেন। কিন্তু, তাঁহার ভগিনী দুর্দ্দান্ত দস্যু, তাহার ভয়ে ও তাহার পরামর্শে, তিনি স্ত্রী ও কন্যাকে পূর্ব্বোক্ত নির্ঘাত জবাব দিয়াছিলেন। বৃত্তিদাতা ক্রুদ্ধ হইয়াছেন, এবং মাসিক আর কিছু দিবার অঙ্গীকার করিয়াছেন, এই কথা শুনিয়া, ভগিনীও অগত্যা সম্মত হইল। ভট্টরাজ, কখনও কখনও কোনও স্ত্রীকে আনিয়া নিকটে রাখিবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিলে, ভগিনী খড়্গহস্ত হইয়া উঠিত। সেই কারণে, তিনি, কখনও, আপন অভিপ্রায় সম্পন্ন করিতে পারেন নাই। ভঙ্গকুলীনদিগের ভগিনী, ভাগিনেয় ও ভাগিনেয়ীরা পরিবারস্থানে পরিগণিত; স্ত্রী, পুত্র, কন্যা প্রভৃতির সহিত তাঁহাদের কোনও সংস্রব থাকে না।

যাহা হউক, ঐ ব্যক্তি, পূর্ব্বোক্ত ব্যবস্থা করিয়া দিয়া, স্থানান্তরে গেলেন, এবং যথাকালে অঙ্গীকৃত মাসিক দেয় পাঠাইতে লাগিলেন। কিছু দিন পরে, বাটীতে, গিয়া, তিনি সেই দুই হতভাগা নারীর বিষয়ে অনুসন্ধান করিয়া জার্নিলেন, ভট্টরাজ ও তাঁহার ভগিনী স্থির করিয়াছিলেন, বৃত্তিদাতার অঙ্গীকৃত নূতন মাসিক দেয় পুরাতন মাসিক বৃত্তির অন্তর্গত হইয়াছে, আর তাহা কোনও কারণে রহিত হইবার নহে; অনুসারে, ভট্টরাজ, ভগিনীর উপদেশের বশবর্ত্তী হইয়া, স্ত্রী ও কন্যাকে বাটী হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিয়াছেন। তাঁহারাও, গত্যন্তরবিহীন হইয়া, কোনও স্থানে গিয়া অবস্থিতি করিতেছেন। কন্যাটি সুশ্রী ও বয়স্থা, বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন করিয়াছে, এবং জননীর সহিত সচ্ছন্দে দিনপাত করিতেছে।

এই উপাখ্যানে ভঙ্গকুলীনের যাদৃশ আচরণের পরিচয় পাওয়া যাইতেছে, অতি ইতর জাতিতেও তাদৃশ আচরণ লক্ষিত হয় না। প্রথমতঃ, এক মহাপুরুষ বৃদ্ধ মাতা ও বয়স্থা ভগিনীকে বাটী হইতে বহিস্কৃত করিয়া দিলেন। পরে, তাঁহারা স্বামী ও পিতার শরণাগত হইলে, সে মহাপুরুষও তাঁহাদিগকে বাটী হইতে বঞ্চিত করিলেন। এক ব্যক্তি, দয়া করিয়া, সেই দুই দুর্ভাগার গ্রাসাচ্ছাদনের ভারবহনে অঙ্গীকৃত হইলেন, তাহাতেও স্ত্রী ও কন্যাকে বাটীতে রাখা পরামর্শসিদ্ধ হইল না। স্বামী ও উপযুক্ত পুত্রসত্ত্বে, কোনও ভদ্রগৃহে, বৃদ্ধা স্ত্রীর কদাচ এরূপ দুর্গতি ঘটে না। পিতা ও উপযুক্ত ভ্রাতা বিদ্যমান থাকিতে, কোনও ভদ্রগৃহের কন্যাকে, নিতান্ত অনাথার ন্যায়, অন্নবস্ত্রের নিমিত্ত, বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন করিতে হয় না। ঐ কন্যার স্বামীও বিদ্যমান আছেন। কিন্তু, তাঁহাকে এ বিষয়ে অপরাধী করিতে পারা যায় না। তিনি স্বকৃতভঙ্গ কুলীন। যাহা হউক, আশ্চর্যের বিষয় এই, ঈদৃশ দোষে দুষিত হইয়াও, ভট্টরাজ ও তাঁহার উপযুক্ত পুত্র লোকসমাজে হেয় বা অশ্রদ্ধেয় হইলেন না।

ভঙ্গকুলীনের কুল, চরিত্র প্রভৃতির পরিচয় প্রদত্ত হইল। এক্ষণে, সকলে বিবেচনা করিয়া দেখুন, এক ব্যক্তি অনেক বিবাহ করিতে না পারিলে, ঈদৃশ কুলীনের অপকার বা মানহানি ঘটিবেক, এই অনুরোধে, বহুবিবাহপ্রথা প্রচলিত থাকা উচিত ও আবশ্যক কি না। প্রথমতঃ, মেলবন্ধনের পূর্ব্বে, তাঁহাদের পুরাতন কুল এককালে নির্ম্মূল হইয়া গিয়াছে; তৎপরে, বংশজকন্যাপরিণয় দ্বারা, পুনরায়, তদীয় কপোল- কম্পিত নূতন কুলের লোপাপত্তি হইয়াছে। এইরূপে, দুই বার যাঁহাদের কুলোচ্ছেদ ঘটিয়াছে, তাঁহাদিগকে কুলীন বলিয়া গণ্য করিবার এবং তদীয় শশরিষাণসদৃশ কুলমর্য্যাদার আদর করিবার কোনও কারণ বা প্রয়োজন লক্ষিত হইতেছে না। তাঁহাদের অবৈধ, নৃশংস, লজ্জাকর আচরণ দ্বারা সংসারে যেরূপ গরীয়সী অনিষ্টপরম্পরা ঘটিতেছে, তাহাতে তাঁহাদিগকে মনুষ্য বলিয়া গণনা করা উচিত নয়। বোর হয়, এক উদ্যমে তাঁহাদের সমূলে উচ্ছেদ করিলে, অধর্ম্মগ্রন্ত হইতে হয় না। সে বিবেচনায়, তদীয় অকিঞ্চিৎকর কপোলকল্পিত কুলমর্য্যাদা হানি অতি সামান্য কথা। যাহা হউক, তাঁহাদের কুলক্ষয় হইয়াছে, সুতরাং তাঁহাৱা কুলীন নহেন; তাঁহারা কুলীন নহেন, সুতরাং তাঁহাদের কৌলীন্যমর্য্যাদা নাই; তাঁহাদের কৌলীন্যমর্য্যাদা নাই, সুতরাং বহুবিবাহপ্রথা নিবারণ দ্বারা কৌলীন্যমর্য্যাদার উচ্ছেদ- সম্ভাবনাও নাই।

এস্থলে ইহা উল্লেখ করা আবশ্যক, এরূপ কতকগুলি ভঙ্গকুলীন আছেন, যে বিবাহব্যবসায়ে তাহাদের যৎপরোনাস্তি বিদ্বেষ। তাঁহারা বিবাহব্যবসায়ীদিগকে অতিশয় হেয়জ্ঞান করেন, নিজে প্রাণান্তেও একাধিক বিবাহ করিতে সম্মত নহেন, এবং যাহাতে এই কুৎসিত প্রথা রহিত হইয়া যায়, তদ্বিষয়েও চেষ্টা করিয়া থাকেন। উভয়বিধ ভঙ্গকুলীনের আচরণ পরস্পর এত বিভিন্ন, যে তঁহাদিগকে এক জাতি বা এক সম্প্রদায়ের লোক বলিয়া, কোনও ক্রমে প্রতীতি জন্মে ন। দুর্ভাগ্যক্রমে, উক্তরূপ ভঙ্গকুলীনের সংখ্যা অধিক নয়। যাহা হউক, তাঁঁহাদের ব্যবহার দ্বারা বিলক্ষণ প্রতিপন্ন হইতেছে, বিবাহ- ব্যবসায় পরিত্যাগ করা ভঙ্গকুলীনের পক্ষে নিতান্ত দুরূহ বা অসাধ্য ব্যাপার নহে।

ডাক্তারেরা চিকিৎসা করিতে গেলে, তাঁহাদিগকে যাহা দিতে হত, এ দেশের সাধারণ লোকে তাকে ভিজিট্ (Visit} রলে।

দ্বিতীয় আপত্তি

দ্বিতীয় আপত্তি।

কেহ কেহ আপত্তি করিতেছেন, বহুবিবাহপ্রথা নিবারিত হইলে, কুলীন ব্রাহ্মণদিগের জাতিপাত ও ধর্ম্মলোপ ঘটিবেক। এই আপত্তি ন্যায়োপেত হইলে, বহুবিবাহ প্রথার নিবারণচেষ্টা কোনও ক্রমে উচিত কর্ম্ম হইত না। কৌলীন্যপ্রথার পূর্ব্বাপর পর্য্যালোচনা করিয়া দেখিলে, এই আপত্তি ন্যায়োপেত কি না, ইহা প্রতীয়মান হইতে পারিবেক; এজন্য, কৌলীন্যমর্য্যাদার প্রথম ব্যবস্থা ও বর্ত্তমান অবস্থা সংক্ষেপে উল্লিখিত হইতেছে।

রাজা আদিসূর, পুত্রেষ্টিযাগের অনুষ্ঠানে কৃতসঙ্কল্প হইয়া, অধিকারস্থ ব্রাহ্মণদিগকে যজ্ঞসম্পাদনার্থে আহ্বান করেন। এ দেশের তৎকালীন ব্রাহ্মণেরা আচারভ্রষ্ট ও বেদবিহিত ক্রিয়ার অনুষ্ঠানে নিতান্ত অনভিজ্ঞ ছিলেন; সুতরাং তাঁহারা আদিসূরের অভিপ্রেত যজ্ঞ সম্পাদনে সমর্থ হইলেন না। রাজা, নিরুপায় হইয়া, ৯৯৯ শাকে কান্যকুজ্বরাজের নিকট, শাস্ত্রজ্ঞ ও আচারপূত পঞ্চ ব্রাহ্মণ প্রেরণ প্রার্থনায়, দূত প্রেরণ করিলেন। কান্যকুব্জরাজ, তদনুসারে, পঞ্চ গোত্রের পঞ্চ ব্রাহ্মণ পাঠাইয়া দিলেন;—


শাণ্ডিল্যগোত্র
ভট্টনারায়ণ।


কাশ্যপগোত্র
দক্ষ।


বাৎস্যগোত্র
ছান্দড়।


ভরদ্বাজগোত্র
শ্রীহর্ষ।


সাবর্ণগোত্র
বেদগর্ভ।

ব্রাহ্মণেরা সস্ত্রীক সভৃত্য অশ্বারোহণে গৌড়দেশে আগমন করেন। চরণে চর্ম্মপাদুকা, সর্বাঙ্গ সূচীবিদ্ধ বস্ত্রে আবৃত, এইরূপ বেশে তাম্বুল চর্ব্বণ করিতে করিতে, রাজবাটীর দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া, তাঁহারা দ্বারবানকে কহিলেন, ত্বরায় রাজার নিকট আমাদের আগমনসংবাদ দাও। দ্বারী, নরপতিগোচরে উপস্থিত হইয়া, তাহাদের আগমনসংবাদ প্রদান করিলে, তিনি প্রথমতঃ অতিশয় আহ্লাদিত হইলেন; পরে, দৌবারিকমুখে তাঁহাদের আচার ও পরিচ্ছদের বিষয় অবগত হইয়া, মনে মনে কহিতে লাগিলেন, এ দেশের ব্রাহ্মণেরা আচারভ্রষ্ট ও ক্রিয়াহীন রলিয়া, আমি দুরদেশ হইতে ব্রাহ্মণ আনাইলাম। কিন্তু, যেরূপ শুনিতেছি, তাহাতে উহাদিগকে আচারপূত বা ক্রিয়াকুশল বলিয়া বোধ হইতেছে না। যাহা হউক, আপাততঃ সাক্ষাৎ না করিয়া, উহাদের আচার প্রভৃতির বিষয় সবিশেষ অবগত হই, পরে যেরূপ হয় করিব। এই স্থির করিয়া, রাজ দ্বারবানকে কহিলেন, ব্রাহ্মণ ঠাকুরদিগকে বল, আমি কার্য্যান্তরে ব্যাপৃত আছি, এক্ষণে সাক্ষাৎ করিতে পারিব না; তাঁহারা বাসস্থানে গিয়া শ্রান্তিদূর করুন; অবকাশ পাইলেই, সাক্ষাৎ করিতেছি।

এই কথা শুনিয়া দ্বারবান, ব্রাহ্মণদিগের নিকটে আসিয়া, সমস্ত নিবেদন করিল। রাজা অবিলম্বেই তাঁহাদের সংবর্দ্ধনা করিবেন, এই স্থির করিয়া, ব্রাহ্মণেরা আশীর্বাদ করিবার নিমিত্ত জলগণ্ডুষ হস্তে দণ্ডায়মান ছিলেন; এক্ষণে, ভঁহার অনাগমনবার্ত্তাশ্রবণে, করস্থিত আশীর্বাদবারি নিকটবর্ত্তী মল্লকাষ্ঠে ক্ষেপণ করিলেন; ব্রাহ্মণদিগের এমনই প্রভাব, আশীর্বাদবারি স্পর্শমাত্র, চিরশুষ্ক মল্লকাষ্ঠ সঞ্জীবিত, পল্লবিত ও পুষ্পফলে সুশোভিত হইয়া উঠিল। এই অদ্ভুত সংবাদ তৎক্ষণাৎ নরপতিগোচরে নীত হইল। রাজা শুনিয়া চমৎকৃত হইলেন। তাঁহাদের আচার ও পরিচ্ছদের কথা শুনিয়া, প্রথমতঃ তাঁহার মনে অশ্রদ্ধা ও বিরাগ জন্মিয়াছিল; এক্ষণে বিলক্ষণ শ্রদ্ধা ও অনুরাগ জন্মিল। তখন তিনি, গলবস্ত্র ও কৃতাঞ্জলি হইয়া, দ্বারদেশে উপস্থিত হইলেন, এবং দৃঢ়তর ভক্তিযোগ সহকারে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া, ক্ষমাপ্রার্থনা করিলেন।

অনন্তর, রাজা নির্ধারিত শুভ দিবসে সেই পঞ্চ ব্রাহ্মণ দ্বারা পুষ্টিযাগ করাইলেন। যাগপ্রভাবে রাজমহিষী গর্ভবতী ও যথাকালে পুত্রবতী হইলেন। রাজা, যৎপরোনান্তি প্রীত হইয়া, নিজ রাজ্যে বাস করিবার নিমিত্ত, ব্রাহ্মণদিগকে অত্যন্ত অনুরোধ করিতে লাগিলেন। ব্রাহ্মণেরা, রাজার নির্বন্ধ উল্লঙ্ঘনে অসমর্থ হইয়া, তদীয় প্রস্তাবে সম্মত হইলেন, এবং পঞ্চকোটি, কামকোটি, হরিকোটি, কঙ্কগ্রাম, বটগ্রাম এই রাজপ্রদত্ত পঞ্চ গ্রামে এক এক জন বসতি করিলেন।

ক্রমে ক্রমে এই পাঁচ জনের ষট্প‌ঞ্চাশৎ সন্তান জন্মিল। ভট্ট- নারায়ণের ষোড়শ, দক্ষের ষোড়শ, শ্রীহর্ষের চারি, বেগর্ভের দ্বাদশ, ছান্দড়ের আট। এই প্রত্যেক সন্তানকে রাজা বাসার্থে এক এক গ্রাম প্রদান করিলেন। সেই সেই গ্রামের নামানুসারে তত্তৎ সন্তানের সন্তানপরম্পরা অমুকগ্রামীণ, অর্থাৎ অমুকগাঁই, বলিয়া প্রসিদ্ধ হইলেন। শাণ্ডিল্যগোত্রে ভট্টনারায়ণবংশে বন্দ্য, কুসুম, দীর্ঘাঙ্গী, ঘোষলী, বটব্যাল, পারিহা, কুলকুলী, কুশারি, কুলভি, সেয়ক, গড়গড়ি, আকাশ, কেশরী, মাষচটক, বসুয়ারি, করাল, এই ষোল গাঁই। কাশ্যপগোত্রে দক্ষবংশে চট্ট, অম্বুলী, তৈলবাটী, পোড়ারি, হড়, গূড়, ভুরিষ্ঠাল, পলিধি, পাকড়াসী, পূষলী, মূলগ্রামী, কোয়ারী, পলসায়ী, পীতমুণ্ডী, সিমলায়ী, ভট্ট এই ষোল গাঁই। ভরদ্বাজগোত্রে শ্রীহর্ষবংশে মুখুটী, ডিংসাই, সাহরি, রাই এই চারি গাঁই। সাবর্ণগোত্রে বেদর্ব্ভবংশে গাঙ্গুলি, পুংলিক, “নন্দিগ্রামী, ঘণ্টেশ্বরী, কুন্দগ্রামী, সিয়ারি, সাটেশ্বরী, দায়ী, নায়েরী, পারিহাল, বালিয়া, সিদ্ধল এই বার গাঁই। বাৎস্যগোত্রে ছান্দড়বংশে কাঞ্জিলাল, মহিন্তা, পূতিতুণ্ড, পিপলাই, ঘোষাল, বাপুলি, কাঞ্জারী, সিমলাল এই আট গাঁই।

ভট্রনারায়ণ প্রভৃতির আগমনের পূর্ব্বে, এ দেশে সাতশত ঘর ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁহারা অবধি হেয় ও অশ্রদ্ধেয় হইয়া রহিলেন, এবং সপ্তশতীনামে প্রসিদ্ধ হইয়া পৃথক্ সম্প্রদায়রূপে পরিগণিত হইতে লাগিলেন। তাঁহাদের মধ্যে জগাই, ভাগাই, সাগাই, নানসী, আরখ, বালথবি, পিখুরী, মুলুকজুরী প্রভৃতি গাঁই ছিল। সপ্তশতী পঞ্চগোত্রবহির্ভূত, এজন্য কান্যকুব্জাগত পঞ্চ ব্রাহ্মণের সন্তানেরা ইঁহাদের সহিত আহার ব্যবহার ও আদান প্রদান করিতেন না; যাঁহারা করিতেন, তাঁহারও সপ্তশতীর ন্যায় হেয় ও অশ্রদ্ধেয় হইতেন।

কালক্রমে আদিসুরের বংশধ্বংস হইল। সেনবংশীয় রাজারা গৌড়দেশের সিংহাসনে অধিরোহণ করিলেন। এই বংশোদ্ভব অতি প্রসিদ্ধ রাজা বল্লালসেনের অধিকারকালে কৌলীন্যমর্য্যাদা ব্যবস্থাপিত হয়। ক্রমে ক্রমে, কান্যকুব্জাগত ব্রাহ্মণদিগের সন্তানপরম্পরার মধ্যে বিদ্যালোপ ও, আচারভ্রংশ ঘটিয়া আসিতেছিল, তন্নিবারণই কৌলীন্যমর্য্যাদাপনের মুখ্য উদ্দেশ্য। রাজা বলসেন বিবেচনা করিলেন, আচার, বিনয়, বিদ্যা প্রভৃতি সদ্গুণের সবিশেষ পুরষ্কার করিলে, ব্রাহ্মণেরা অবশ্যই সেই সকল গুণের রক্ষাবিষয়ে সবিশেষ যত্ন করিবেন। তদনুসারে, তিনি পরীক্ষা দ্বারা যাঁহাদিগকে নবগুণবিশিষ্ট দেখিলেন, তাঁহাদিগকে কৌলীন্যমর্যাাদা প্রদান করিলেন। কৌলীন্যপ্রবর্ত্তক নয় গুণ এই,—আচার, বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থ- দর্শন, নিষ্ঠা, আবৃত্তি, তপস্যা, দান। আবৃত্তিশব্দের অর্থ পরিবর্ত্ত; পরিবর্ত্ত চারিপ্রকার, আদান, প্রদান, কুশত্যাগ ও ঘটকার্যে প্রতিজ্ঞা। আদান, অর্থাৎ সমান বা উৎকৃষ্ট গৃহ হইতে কন্যা গ্রহণ; প্রদান, অর্থাৎ সমান অথবা উৎকৃষ্ট গৃহে কন্যাদান; কুশত্যাগ, অর্থাৎ কন্যার অভাবে কুশময়ী কন্যার দান; ঘটকাগ্রে প্রতিজ্ঞা, অর্থাৎ উভয় পক্ষে কন্যার অভাব ঘটিলে, ঘটকের সম্মুখে বাক্যমাত্র দ্বারা পরস্পর কন্যাদান। সৎকুলে কন্যাদান ও সৎকুল হইতে কন্যাগ্রহণ কুলের প্রধান লক্ষণ; কিন্তু কন্যার অভাব ঘটিলে, আদান প্রদান সম্পন্ন হয় না; সুতরাং কন্যাহীন ব্যক্তি সম্পূর্ণ কুললক্ষণাক্রান্ত হইতে পারেন না। এই দোষের পরিহারার্থে কুশময়ী কন্যার দান ও ঘটকসমক্ষে বাক্যমাত্র দ্বারা পরস্পর কন্যাদানের ব্যবস্থা হয়।

পূর্ব্বে উল্লিখিত হইয়াছে, কান্যকুব্জাগত পঞ্চ ব্রাহ্মণের ষট্প‌ঞ্চাশৎ সন্তান এক এক গ্রামে বাস করেন; সেই সেই গ্রামের নামানুসারে, এক এক গাঁই হয়; তাঁহাদের সন্তানপরম্পরা সেই সেই গাঁই বলিয়া প্রসিদ্ধ হন। সমুদয়ে ৫৬ গাঁই; ভন্মধ্যে বন্দ্য, চট্ট, মুখুটী, ঘোষাল, পুতিতুণ্ড, গাঙ্গুলি, কাঞ্জিলাল, কুন্দগ্রামী এই আট গাঁই সর্বতোভাবে নবগুণবিশিষ্ট ছিলেন, এজন্য কৌলীন্যমর্য্যাদা প্রাপ্ত হইলেন। এই আট গাঁইর মধ্যে চট্টোপাধ্যায়বংশে বহুরূপ, সুচ, অরবিন্দ, হলায়ুধ, বাঙ্গাল এই পাঁচ; পুতিতুণ্ডরংশে গোবর্দ্ধনাচার্য্য; ঘোষালবংশে শির; গঙ্গোপাধ্যায়রংশে শ্নিশ; কুন্দগ্রামিবংশে তোষাকর; বন্দ্যোপাধ্যায়বংশে জাহ্লন, মহেশ্বর, দেবল, বামন, ঈশান, মকরন্দ এই ছয়; মুখোপাধ্যায়বংশে উৎসাহ, গরুড় এই দুই; কাঞ্জিলালবংশে কানু, কুতুহল এই দুই; সমুদয়ে এই উনিশ জন কুলীন হইলেন। পালধি, পাকড়াশী, সিমলায়ী, বাপুলি, ভুরিষ্ঠাল, কুলকুলী, বটব্যাল, কুশারি, সেয়ক, কুসুম, ধোষলী, মাষচটক, বসুয়ারি, করাল, অম্বুলী, তৈলবাটী, মূলগ্রামী, পূবর্লী, আকাশ, পলসায়ী, কোয়ারী, সাহরি, ভট্টাচার্য্য, সাটেশ্বরী, নায়েরী, দায়ী, পারিহাল, সিয়ারী, সিদ্ধল, পুংসিক, নন্দিগ্রামী, কাঞ্জারী, সিমলাল, বালী, এই ৩৪ গাঁই অষ্টগুণবিশিষ্ট ছিলেন, এজন্য শ্রোত্রিয়সংজ্ঞাভাজন হইলেন। পূর্ব্বোক্ত নয় গুণের মধ্যে ইঁহারা আবৃত্তিগুণে বিহীন ছিলেন; অর্থাৎ, বন্য প্রভৃতি আট গাঁই আদানপ্রদানবিষয়ে যেমন সাবধান ছিলেন, পালধি প্রভৃতি চৌত্রিশ গাই তদ্বিষয়ে তদ্রূপ সাবধান ছিলেন না; এজন্য তাঁহাৱা কৌলীন্যমর্য্যাদা প্রাপ্ত হইলেন না। আর দীর্ঘাঙ্গী, পারিহা, কুলভী, গোড়ারি, রাই, কেশরী, ঘণ্টেশ্বরী, ডিংসাই, পীতমুণ্ডী, মহিন্তা, গুড়, পিপলাই, হড়, গড়গড়ি, এই চৌদ্দ গাঁই সদাচার-পরিভ্রষ্ট ছিলেন, এজন্য গৌণ কুলীন বলিয়া পরিগণিত হইলেন।

এরূপ প্রবাদ আছে, রাজা বল্লালসেন, কৌলীন্যমর্য্যাদাস্থাপনের দিন স্থির করিয়া, ব্রাহ্মণদিগকে নিত্যক্রিয়াসমাপনান্তে রাজসভায় উপস্থিত হইতে আদেশ করেন। তাহাতে কতকগুলি ব্রাহ্মণ এক প্রহরের সময়, কতকগুলি দেড় প্রহরের সময়, আর কতকগুলি আড়াই প্রহরের সময় উপস্থিত হন। যাঁহাৱা আড়াই প্রহরের সময় উপস্থিত হন, তাঁহারা কৌলীন্যমর্য্যাদা প্রাপ্ত হইলেন; যাঁহারা দেড় প্রহরের সময়, তাঁহারা শ্রেত্রিয়, আর যাঁহারা এক প্রহরের সময়, তাঁহার গৌণ কুলীন, হইলেন। ইহার তাৎপর্য্য এই, প্রকৃত প্রস্তাবে নিত্যক্রিয়া করিতে অধিক সময় লাগে; সুতরাং যাহারা আড়াই প্রহরের সময় অসিয়াছিলেন, তাঁহারা প্রকৃত প্রস্তাবে নিত্যক্রিয়া করিয়াছিলেন; তদ্বারা রাজা তাঁহাদিগকে সদাচারপূত বলিয়া বুঝিতে পারিলেন, এজন্য তাঁহাদিগকে প্রধান মর্য্যাদা প্রদান করিলেন। দেড় প্রহরের সময় আগতেরা আচারাংশে ন্যূন ছিলেন, এজন্য ন্যূন মর্য্যাদা প্রাপ্ত হইলেন; আর এক প্রহরের সময় আগতেরা আচারভ্রষ্ট বলিয়া অবধারিত হইলেন, এজন্য রাজা তাঁহাদিগকে, হেয়জ্ঞান করিয়া, অপকৃষ্ট ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিগণিত করিলেন।

এই রূপে কৌলীন্যমর্য্যাদা ব্যবস্থাপিত হইল। নিয়ম হইল, কুলীনেরা কুলীনের সহিত আদানপ্রদান নির্বাহ করিবেন; শ্রোত্রিয়ের কন্যা গ্রহণ করিতে পারিবেন, কিন্তু শ্রোত্রিরকে কন্যাদান করিতে পারিবেন না, করিলে কুলভ্রষ্ট ও বংশজভাবাপন্ন হইবেন আর গৌণ কুলীনের কন্যাগ্রহণ করিলে, এক কালে কুলক্ষয় হইবেক; এই নিমিত্ত, গৌণ কুলীনেরা অরি, অর্থাৎ কুলের শত্রু, বলিয়া প্রসিদ্ধ ও পরিগণিত হইলেন।

কৌলীন্যমর্য্যাদাব্যবস্থাপনের পর, বল্লালসেনের আদেশানুসারে, কতকগুলি ব্রাহ্মণ ঘটক এই উপাধি প্রাপ্ত হইলেন। ঘটকদিগের এই ব্যবসায় নিরূপিত হইল যে, তাঁহারা কুলীনদিগের স্তুতিবাদ ও বংশাবলী কীর্ত্তন করিবেন এবং তাঁহাদের গুণ, দোষ ও কৌলীন্যমর্য্যাদাসংক্রান্ত নিয়ম বিষয়ে সবিশেষ দৃষ্টি রাখিবেন।।

কুলীন, শ্রোত্রিয় ও গৌণকুলীন ব্যতিরিক্ত আর একপ্রকার ব্রাহ্মণ আছেন, তাঁহাদের নাম বংশজ। এরূপ নির্দিষ্ট আছে, ব্রাহ্মণদিগকে শ্রেণীবদ্ধ করিবার সময়, বল্লালের মুখ হইতে বংশজশব্দ নির্গত হইয়াছিল এইমাত্র; বাস্তবিক, তিনি কোনও ব্রাহ্মণদিগকে বংশজ বলিয়া স্বতন্ত্র শ্রেণীতে বিভক্ত করেন নাই; উত্তর কালে বংশজব্যবস্থা হইয়াছে। যে সকল কুলীনের কন্যা ঘটনাক্রমে শ্রোত্রিয়গৃহে বিবাহিতা হইল, তাঁহারা কুলভ্রষ্ট হইতে লাগিলেন। এই রূপে যাঁহাদের কুলভ্রংশ ঘটিল, তাহারা বংশজসংজ্ঞাভাজন ও মর্য্যাদাবিষয়ে গৌণ কুলীনের সমকক্ষ হইলেন; অর্থাৎ, গৌণ কুলীনের কন্যা গ্রহণ করিলে যেমন কুলক্ষয় হইয়া যায়, বংশজকন্যা গ্রহণ করিলেও কুলীনের সেইরূপ কুলক্ষয় ঘটে। এতদনুসারে বংশজ ত্রিবিধ,—প্রথম, শ্রোত্রিয় পাত্রে কন্যাদাভা কুলীন বংশজ; দ্বিতীয়, গৌণ কুলীনের কন্যাগ্রাহী কুলীন বংশজ; তৃতীয়, বংশজের কন্যাগ্রাহী কুলীন বংশজ। স্থুল কথা এই, কোনও ক্রমে কুলক্ষয় হইলেই, কুলীন বংশজভাবাপন্ন হইয়া থাকেন।

কৌলীন্যমর্যাদা ব্যবস্থাপিত হইলে, এতদ্দেশীয় ব্রাহ্মণেরা পাঁচ শ্রেণীতে বিভক্ত হইলেন—প্রথম, কুলী; দ্বিতীয়, শ্রোত্রিয়; তৃতীয়, বংশজ; চতুর্থ, গৌণ কুলীন; পঞ্চম, পঞ্চগোত্রবহির্ভূত সপ্তশতী সম্প্রদায়।

কালক্রমে, গৌণ কুলীনেরা শ্রোত্রিয়শ্রেণীতে নিবেশিত হইলেন, কিন্তু সর্ব্বাংশে শ্রোত্রিয়দিগের সমান হইতে পারিলেন না। প্রকৃত শ্রোত্রিয়েরা শুদ্ধ শ্রোত্রিয়, ও গৌণ কুলীনেরা কষ্ট শ্রোত্রিয়, বলিয়া উল্লিখিত হইতে লাগিলেন। গৌণকুলীনসংজ্ঞকালে তাঁহারা যেরূপ হেয় ও অশ্রদ্ধেয় ছিলেন, কষ্টশ্রোত্রিয়সংজ্ঞাকালেও সেইরূপ রহিলেন।

কৌলীন্যমর্য্যাদাব্যবস্থাপনের পর, ১০ পুরুষ গত হইলে, দেবীবর ধটকবিশারদ কুলীনদিগকে মেলবদ্ধ করেন। যে আচার, বিনয়, বিদ্যা প্রভৃতি গুণ দেখিয়া, বল্লাল ব্রাহ্মণদিগকে কৌলীন্যমর্যাদা প্রদান করিয়াছিলেন, ক্রমে ক্রমে তাহার অধিকাংশই লোপাপত্তি পায়; কেবল আবৃত্তিগুণমাত্রে কুলীনদিগের যত্ন ও আস্থা থাকে। কিন্তু, দেবীবরের সময়ে, কুলীনেরা এই গুণেও জলাঞ্জলি দিয়াছিলেন। বল্লালদত্ত কুলমর্য্যাদার আদানপ্রদানের বিশুদ্ধিরূপ একমাত্র অবলম্বন ছিল, তাহাও লয়প্রাপ্ত হয়। যে সকল দোষে এককালে কুল নির্মূল হয়, কুলীনত্রেই সেই সমস্ত দোষে দুষিত হইয়াছিলেন। যে যে কুলীন একবিধ দোবে দূষিত, দেবীবর তঁহাদিগকে এক সম্প্রদায়ে নিবিষ্ট করেন। সেই সম্প্রদায়ের নাম মেল। মেলশব্দের অর্থ দোষমেলন, অর্থাৎ দোষানুসারে সম্প্রদায়বন্ধন। দেবীবর ব্যবস্থা করেন, দোষ যায় কুল তায়। বল্লাল গুণ দেখিয়া কুলমর্য্যাদার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন; দেবীবর দোষ দেখিয়া কুলমর্য্য্যাদার ব্যবস্থা করিয়াছেন। পৃথক্ পৃথক্ দোষ অনুসারে, দেবীবর তৎকালীন কুলীদিগকে ৩৬ মেলে বদ্ধ করেন। তন্মধ্যে ফুলিয়া ও খড়দহ মেলের প্রাদুর্ভাব অধিক। এই দুই মেলের লোকেরাই প্রধান কুলীন বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকেন। এবং, এই দুই মেলের লোকেরাই, যার পর নাই, অত্যাচারকারী হইয়া উঠিয়াছেন। যে যে দোষে এই দুই মেল বদ্ধ হয়, তাহা উল্লিখিত হইতেছে।

গঙ্গানন্দমুখোপাধ্যায় ও শ্রীপতিবন্দ্যোপাধ্যায় উভয়ে একৰি দোষে লিপ্ত ছিলেন; এজন্য, দেবীবর এই দুয়ে ফুলিয়ামেল বদ্ধ করেন। নাধা, বন্ধ, বারুইহাটী, মুলুকজুরী এই দোষচতুষ্টয়ে ফুলিয়ামেল বদ্ধ হয়। নাধানামকস্থানবাসী বন্দ্যোপাধ্যায়েরা বংশজ ছিলেন; গঙ্গানন্দের পিতা মনোহর তাঁহাদের বাটীতে বিবাহ করেন। এই বংশজ- কন্যাবিবাহ দ্বারা তাঁহার কুলক্ষয় ও বংশজভাবাপত্তি ঘটে। মনোহরের কুলরক্ষার্থে, ঘটকেরা পরামর্শ করিয়া নাধার বন্দ্যোপাধ্যায়দিগকে শ্রোত্রিয় করিয়া দিলেন। তদবধি নাধার বন্দ্যোপাধ্যায়েরা, বাস্তবিক বংশজ হইয়াও, মাষচটকনামে শ্রোত্রিয় বলিয়া পরিগণিত হইতে লাগিলেন। বস্তুতঃ, এই বিবাহ দ্বারা মনোহরের কুলক্ষয় ঘটিয়াছিল, কেবল ঘটকদিগের অনুগ্রহে কথঞ্চিৎ কুলরক্ষা হইল। ইহার নাম নাধাদোষ। শ্রীনাথচট্টোপাধ্যায়ের দুই অবিবাহিতা দুহিতা ছিল। হাঁইনামক মুসলমান, ধন্ধনামক স্থানে, বলপূর্ব্বক ঐ দুই কন্যার জাতিপাত করে। পরে, এক কন্যা কংসারিতনয় পরমানন্দ পূতিতুণ্ড, আর এক কন্যা গঙ্গাবরবন্দ্যোপাধ্যায় বিবাহ করেন। এই গঙ্গাবরের সহিত নীলকণ্ঠ গঙ্গোর আদানপ্রদান হয়। নীলকণ্ঠগঙ্গোর সহিত আদানপ্রদান দ্বারা, গঙ্গানন্দও যবনদোষে দূষিত হয়েন। ইহার নাম ধন্ধদোষ। বারুইহাটীগ্রামে ভোজন করিলে, ব্রাহ্মণের জাতিভ্রংশ ঘটিত। কাঁচনায় মুখুটী অর্জুনমিশ্র ঐ গ্রামে ভোজন করিয়াছিলেন। শ্রীপতিবন্দ্যোপাধ্যায় তাঁহার সহিত আদানপ্রদান করেন। এই শ্রীপতিরন্দ্যোপাধ্যায়ের সহিত আদানপ্রদান দ্বারা গঙ্গানন্দও তদ্দোষে দূষিত হয়েন। ইহার নাম বারুইহাটীদোষ। গঙ্গানন্দভ্রাতৃপুত্র শিবাচার্য্য, মুলুকজুরীকন্যা বিবাহ করিয়া, কুলভ্রষ্ট ও সপ্তশতীভাবাপন্ন হন; পরে শ্রীপতিবন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা বিবাহ করেন। ইহার নাম মুলুকজুরীদোষ।

যোগেশ্বর পণ্ডিত ও মধুচট্টোপাধ্যায়, উভয়ে একবিধ দোযে লিপ্ত ছিলেন; এজন্য এই দুয়ে খড়দহমেল বন্ধ হয়। যোগেশ্বরের পিতা হরিমুখোপাধ্যায় গড়গড়িকন্যা, যোগেশ্বর নিজে পিপলাই কন্যা, বিবাহ করেন। মধুচট্টোপাধ্যায় ডিংসাই রায় পরমানন্দের কন্যা বিবাহ করেন। যোগেশ্বর এই মধুচট্টোকে কন্যাদান করিয়াছিলেন।

বংশজ, গৌণ কুলীন ও সপ্তশতী সম্প্রদায়ের কন্যা বিবাহ করিলে, এক কালে কুলক্ষয় ও বংশজভাবাপত্তি ঘটে। ফুলিয়ামেলের প্রকৃতি গঙ্গানন্দমুখোপাধ্যায়ের পিতা মনোহর বংশজকন্যা বিবাহ করেন; গঙ্গানন্দভ্রাতৃপুত্র শিৱাচার্য্য মুলুকজুরীকন্যা বিবাহ করেন। খড়দহমেলের প্রকৃতি যোগেশ্বর পণ্ডিতের পিতা হরিমুখোপাধ্যায় গড়গড়িকন্যা, যোগেশ্বর নিজে পিপলাইকন্যা, আর মধুচট্টোপাধ্যায় ডিংসাইকন্যা, বিবাহ করেন। মুলুকজুরী পঞ্চগোত্রবহির্ভূত সপ্তশতী- সম্প্রদায়ের অন্তর্বর্ত্তী; গড়গড়ি, পিপলাই ও ডিংসাই গৌণ কুলীন। ফুলিয়া ও খড়দহ মেলের লোকেরা কুলীন বলিয়া যে অভিমান করেন, তাহা সম্পূর্ণ ভ্রান্তিমুলক; কারণ, বংশজ, গৌণ কুলীন ও সপ্তশতী কন্যা বিবাহ দ্বারা বহু কাল তাঁহাদের কুলক্ষয় ও বংশজ- ভাবাপত্তি ঘটিয়াছে। অধিকন্তু, যবনদোষস্পর্শবশতঃ, ফুলিয়ামেলের লোকদিগের জাতিভ্রংশ হইয়া গিয়াছে। এইরূপ, সকল মেলের লোকেরাই কুবিবাহাদিদোষে কুলভ্রষ্ট ও বংশজভাবাপন্ন হইয়া গিয়াছেন। ফলতঃ, মেলবন্ধনের পূর্ব্বেই বল্লাল প্রতিষ্ঠিত কুলমর্য্যাদার লোপাপত্তি হইয়াছে। এক্ষণে যাঁহারা কুলীন বলিয়া অভিমান করেন, তাঁহারা বাস্তবিক বহু কালের বংশজ। যাঁহাৱা বংশজ বলিয়া পরিগণিত হইয়া থাকেন, কৌলীন্যপ্রথার নিয়মানুসারে, ভঁহাদের সহিত ইদানীন্তন কুলাভিমানী বংশজদিগের কোনও অংশে কিছুমাত্র বিভিন্নতা নাই।

যেরূপ দর্শিত হইল, তদনুসারে বহু কাল রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদিগের কৌলীন্যমর্য্যাদা লয়প্রাপ্ত হইয়াছে। কৌলীন্যের নিয়মানুসারে কুলীন বলিয়া গণনীয় হইতে পারেন, ইদানীং ঈদৃশ ব্যক্তিই অপ্রাপ্য ও অপ্রসিদ্ধ। অতএব, যখন কুলীনের একান্ত অসদ্ভাব ঘটিয়াছে, তখন, বহুবিবাহপ্রথা নিবারিত হইলে, কুলীনদিগের জাতিপাত ও ধর্ম্মলোপ ঘটিৰেক, এই আপত্তি কোনও মতে ন্যায়োপেত বলিয়া অঙ্গীকৃত হইতে পারে না।

দেবীবর যে যে ঘর লইয়া মেল বদ্ধ করেন, সেই সেই ঘরে আদান প্রদান ব্যবস্থাপিত হয়। মেলবন্ধনের পূর্ব্বে, কুলীনদিগের আট ঘরে পরস্পর আদান প্রদান প্রচলিত ছিল। ইহাকে সর্ব্বদ্বারী বিবাহ কহিত। তৎকালে আদান প্রদানের কিছুমাত্র অসুবিধা ছিল না। এক ব্যক্তির অকারণে একাধিক বিবাহ করিবার আবশ্যকতা ঘটিত না, এবং কোনও কুলীনকন্যাকে যাবজ্জীবন অবিবাহিত অবস্থায় কালযাপন করিতে হইত না। এক্ষণে, অল্প ঘরে মেল বদ্ধ হওয়াতে, কাল্পনিককুলরক্ষার্থে, এক পাত্রে অনেক কন্যাদান অপরিহার্য্য হইয়া উঠিল। এই রূপে, দেবীবরের কুলীনদিগের মধ্যে বহু বিবাহের সূত্রপাত হইল।

অবিবাহিত অবস্থায় কন্যার ঋতুদর্শন শাস্ত্রানুসারে ঘোরতরপাতক- জনক। কাশ্যপ কহিয়াছেন,

পিতুর্গেহে চ য়া কন্যা রজঃ পশ্যত্যসংস্কৃতা।

ভ্রূণহত্যা পিতুস্তস্যাঃ সা কন্যা বৃষলী স্মৃতা॥

যস্তু তাং বরয়েৎ কন্যাং ব্রাহ্মণো জ্ঞানদুর্বলঃ।

অশ্রাদ্ধেয়মপাংক্তেয়ং তং বিদ্যাদ্বৃযলীপতিম্॥(২৮)

যে কন্যা বিবাহিত অবস্থায় পিতৃগৃহে রজস্বলা হয়, তাহার পিতা ভ্রূণহত্যাপাপে লিপ্ত হন। সেই কন্যাকে বৃষলী বলে। যে জ্ঞানহীন ব্রাহ্মণ সেই কন্যার পাণিগ্রহণ করে, সে অশ্রাদ্ধেও, অপাংক্তেয় ও বৃষলীপতি।

যম কহিয়াছেন।

মত চৈব পিতা চৈব জ্যেষ্ঠো ভ্রাতা তথৈব চ।

ত্রয়ন্তে নরকং যান্তি দৃষ্ট্বা কন্যাং রজস্বলাম্॥ ২৩॥

যস্তাং বিবাহয়েৎ কন্যাং ব্রাহ্মণো মদমোহিতঃ।

অসম্ভাষ্যো হপ্যাংক্তেয়ঃ স বিপ্রো বৃষলীপতিঃ॥২৪॥

কন্যাকে অবিবাহিত অবস্থায় রজস্বলা দেখিলে, মাতা, পিতা, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, এই তিন জন নরকগামী হয়েন। যে ব্রাহ্মণ, অজ্ঞানান্ধ হইয়া, সেই কন্যাকে বিবাহ করে, সে অসম্ভাষ্য, অপাংক্তেয় ও বৃষলীপতি।

পৈঠীনসি কহিয়াছেন,

যাবন্নোদ্ভিদ্যতে স্তনৌ তাবদেব দেয়া। অথ ঋতুমতী ভবতি দাতা প্রতিগ্রহীতা চ নরকমাপ্নোতি পিতৃপিতামহপ্রপিতামহাশ্চ বিষ্ঠায়াং জায়ন্তে। তস্মান্নগ্নিকা দাতব্যা॥

স্তনপ্রকাশের পূর্বেই কন্যাদান করিবেক। যদি কন্যা বিবাহের পূর্ব্বে ঋতুমতী হয়, দাতা ও গ্রহীতা উভয়ে নরকগামী হয়, এবং পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ বিষ্ঠায় জন্মগ্রহণ করেন। অতএব ঋতুদর্শনের পূর্ব্বেই কন্যাদান করিবেক।

ব্যাস কহিয়াছেন,

যদি সা দাতৃবৈকল্যাদ্রজঃ পশ্যেৎ কুমারিকা।

ভ্রুণহত্যাশ্চ তাবত্যঃ পতিতঃ স্যাভদপ্রদঃ॥

যে ব্যক্তি দানাধিকারী, যদি তাহার দোষে কুমারী ঋতুদর্শন করে; তবে, সেই কুমারী অবিবাহিত অবস্থায় যত বার ঋতুমতী হয়, তিনি তত বার ভ্রণহত্যাপাপে লিপ্ত, এবং যথাকালে তাহার বিবাহ না দেওয়াতে, পতিত হন।

অবিবাহিত অবস্থায় কন্যার ঋতুদর্শন ও ঋতুমতী কন্যার পাণিগ্রহণ এক্ষণকার কুলীনদিগের গৃহে সচরাচর ঘটনা। কুলীনেরা, দেবীবরের কপোলকল্পিত প্রথার আজ্ঞাবর্ত্তী হইয়া, ঘোরতর পাতকগ্রস্ত হইতেছেন। শাস্ত্রানুসারে বিবেচনা করিতে গেলে, তাঁহারা বহু কাল পতিত ও ধর্ম্মচ্যুত হইয়াছেন।

কুলীনমহাশয়েরা যে কুলের অহঙ্কারে মত্ত হইয়া আছেন, তাহা বিধাতার সৃষ্টি নহে। বিধাতার সৃষ্টি হইলে, সে বিষয়ে স্বতন্ত্র বিবেচনা করিতে হইত। এ দেশের ব্রাহ্মণেরা বিদ্যাহীন ও আচারভ্রষ্ট হইতেছিলেন। যাহাতে তাঁহাদের মধ্যে বিদ্যা, সদাচার প্রভৃতি গুণের আদর থাকে, এক রাজা তাহার উপায়স্বরূপ কুলমর্য্যাদা ব্যবস্থা, এবং কুলমর্য্যাদা রক্ষার উপায়স্বরূপ কতকগুলি নিয়ম সংস্থাপন, করেন। সেই রাজপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুসারে বিবেচনা করিয়া দেখিলে, কুবিবাহাদি দোষে বহু কাল কুলীনমাত্রের কুলক্ষয় হইয়া গিয়াছে। যখন, রাজপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুসারে, রাজদন্ত কুলমর্য্যাদার উচ্ছেদ হইয়াছে, তখন কুলীনম্মন্য মহাপুরুষদিগের ইদানীন্তন কুলাভিমান নিরবচ্ছিন্ন ভ্রান্তিমাত্র। অনন্তর, দেবীবর যেরূপে যে অবস্থায় কুলের ব্যবস্থা করিয়াছেন, তাহাতে কুলীনগণের অহঙ্কার করিবার কোনও হেতু দেখিতে পাওয়া যায় না। কুলীনেরা সুবোধ হইলে, অহঙ্কার না করিয়া, বরং তাদৃশ কুলের পরিচয় দিতে লজ্জিত হইতেন। লজ্জিত হওয়া দূরে থাকুক, সেই কুলের অভিমানে, শাস্ত্রের মস্তকে পদার্পণ করিয়া, স্বয়ং নরকগামী হইতেছেন, এবং পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, তিন পুরুষকে পরলোকে বিষ্ঠাহ্রদে বাস করাইতেছেন। ধন্য রে অভিমান! তোর প্রভাব ও মহিমার ইয়ত্তা নাই। তুই মনুষ্যজাতির অতি বিষম শত্রু। তোর কুহকে পড়িলে, সম্পূর্ণ মতিচ্ছন্ন ঘটে। হিতাহিতবোধ, ধর্ম্মাধর্ম্মবিবেচনা একবারে অন্তর্হিত হয়।

কৌলীন্যমর্য্যাদাব্যবস্থাপনের পর, দশ পুরুষ গত হইলে, দেবীবর, কুলীনদিগের মধ্যে নানা বিশৃঙ্খলা উপস্থিত দেখিয়া, মেলবন্ধন দ্বারা নূতন প্রণালী সংস্থাপন করেন। এক্ষণে, মেলবন্ধনের সময় হইতে দশ পুরুষ অর্তীত হইয়াছে; এবং কুলীনদিগের মধ্যে নানা বিশৃঙ্খলাও ঘটিয়াছে। সুতরাং পুনরায় কোনও নূতন প্রণালী সংস্থাপনের সময় উপস্থিত হইয়াছে। প্রথমতঃ, ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে বিশৃঙ্খলা উপস্থিত দেখিয়া, বল্লালসেন তন্নিবারণাভিপ্রায়ে কৌলীন্যমর্য্যাদা সংস্থাপন করেন। তৎপরে, কুলীনদিগের মধ্যে বিশৃঙ্খলা উপস্থিত দেখিয়া, দেবীবর তন্নিবারণাশয়ে মেলবন্ধন করেন। এক্ষণে, কুলীনদিগের মধ্যে যে অশেষবিধ বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইয়াছে, কুলাভিমান পরিত্যাগ ভিন্ন তন্নিবারণের আর সদুপায় নাই। যদি তাঁহারা সুবোষ, ধর্ম্মভীরু ও আত্মমঙ্গলাকাঙক্ষী হন, অকিঞ্চিৎকর কুলাভিমানে বিসর্জ্জন দিয়া, কুলীননামের কলঙ্ক বিমোচন করুন। আর, যদি তাঁহারা কুলাভিমান পরিত্যাগ নিতান্ত অসাধ্য বা একান্ত অবিধেয় বোধ করেন, তবে তাঁহাদের পক্ষে কোনও নূতন ব্যবস্থা অবলম্বন করা আবশ্যক। এ অবস্থায়, বোধ হয়, পুনরায় সর্ব্বদ্বারী বিবাহ প্রচলিত হওয়া ভিন্ন, কুলীনদিগের পরিত্রাণের পথ নাই। এই পথ অবলম্বন করিলে, কোনও কুলীনের অকারণে একাধিক বিবাহের আবশ্যকতা থাকিবে না; কোনও কুলীনকন্যাকে, যাবজ্জীবন বা দীর্ঘ কাল অবিবাহিত অবস্থায় থাকিয়া, পিতাকে নরকগামী করিতে হইবেক না; এবং রাজনিয়ম দ্বারা বহুবিবাহ প্রথা নিবারিত হইলে, কোনও ক্ষতি বা অসুবিধা ঘটিবেক না। এ বিষয়ে কুলীনদিগের ও কুলীনপক্ষপাতী মহাশয়দিগের যত্ন ও মনোযোগ করা কর্ত্তব্য। অনিষ্টকর, অধর্ম্মকর কুলাভিমানের রক্ষাবিষয়ে, অন্ধ ও অবোধেদের ন্যায়, সহায়তা করা অপেক্ষা, যে সকল দোষ বশতঃ কুলীনদিগের ধর্ম্মলোপ ও যার পর নাই অনিষ্টসংঘটন হইতেছে, সেই সমস্ত দোষের সংশোধনপক্ষে যত্নবান্ হইলে, কুলীনপক্ষপাতী মহাশয়দিগের বুদ্ধি, বিবেচনা ও ধর্ম্মের অনুযায়ী কর্ম্ম করা হইবেক।

ইদানীন্তন কুলাভিমানী মহাপুরুষেরা কুলীন বলিয়া অভিমান করিতেছেন, এবং দেশস্থ লোকের পুজনীয় হইতেছেন। যদি তদীয় চরিত্র বিশুদ্ধ ও ধর্ম্মমার্গানুযায়ী হইত, তবে তাহাতে কেহ কোনও ক্ষতিবোধ বা আপত্তি উত্থাপন করিত না। কিন্তু তাঁহাদের আচরণ, যার পর নাই, জঘন্য ও ঘৃণাস্পদ হইয়া উঠিয়াছে। তাঁহাদের আচরণবিষয়ে লোকসমাজে শত শত উপাখ্যান প্রচলিত আছে; এস্থলে সে সকলের উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন। ফলকথা এই, দয়া, ধর্ম্মভয়, লোকলজ্জা প্রভৃতি একবারে তাঁহাদের হৃদয় হইতে অন্তর্হিত হইয়া গিয়াছে। কন্যাসন্তানের সুখদুঃখগণনা বা হিতাহিতবিবেচনা তদীয় চিত্তে কদাচ স্থান পায় না। কন্যা যাহাতে করণীয় ঘরে অর্পিত হয়, কেবল তদ্বিষয়ে দৃষ্টি থাকে। অঘরে অর্পিতা হইলে কন্যা কুলক্ষয়কারিণী হয়; এজন্য, কন্যার কি দশা হইবেক, সে দিকে দৃষ্টিপাত না করিয়া, যেন তেন প্রকারেণ, কন্যাকে পাত্রসাৎ করিতে পারিলেই, তাঁহারা চরিতার্থ হয়েন। অবিবাহিত অবস্থায়, কন্যা বাটী হইতে বহির্গত হইয়া গেলে, তাঁহাদের কুলক্ষয় ঘটে; বাটীতে থাকিয়া, ব্যভিচারদোষে আক্রান্ত ও ভ্রূণহত্যাপাপে বারংবার লিপ্ত হইলে, কোনও দোষ ও হানি নাই। কঞ্চিৎ কুলরক্ষা করিয়া, অর্থাৎ বিবাহিতা হইয়া, কন্যা বারাঙ্গনাবৃত্তি অবলম্বন করিলে, তাঁহাদের কিঞ্চিন্মাত্র ক্ষোভ, লজ্জা বা ক্ষতিবোধ হয় না। তাহার কারণ এই যে, এ সকল ঘটনায় কুললক্ষী বিচলিত হয়েন না। যদি কুললক্ষী বিচলিতা না হইলেন, তাহা হইলেই তাঁহাদের সকল দিক রক্ষা হইল। কুললক্ষীরও তাঁহাদের উপর নিরতিশয় স্নেহ ও অপরিসীম দয়া। তিনি, কোনও ক্রমে, সেই স্নেহ ও সেই দয়া পরিত্যাগ করিতে পারেন না। এ স্থলে, কুললক্ষীর স্নেহ,ও দয়ার একটি আশ্চর্য্য উদাহরণ প্রদর্শিত হইতেছে।

অমুক গ্রামে অমুক নামে একটি প্রধান কুলীন ছিলেন। তিনি তিন চারিটি বিবাহ করেন। অমুক গ্রামে যে বিবাহ হয়, তাহাতে তাঁহার দুই কন্যা জন্মে। কন্যার জন্মাবধি মাতুলালয়ে থাকিয়া প্রতি- পালিত হইয়াছিল। মাতুলেরা ভাগিনেয়ীদের প্রতিপালন করিতেছেন ও যথাকালে বিবাহ দিবেন এই স্থির করিয়া, পিতা নিশ্চিন্ত খার্কিতেন, কোনও কালে তাহাদের কোনও তত্ত্বাবধান করিতেন না। দুর্ভাগ্যক্রমে, মাতুলদের অবস্থা ক্ষুন্ন হওয়াতে, তাঁহারা ভাগিনেয়ীদের বিবাহকার্য্য নির্ব্বাহ করিতে পারেন নাই। প্রথম কন্যার বয়ঃক্রম ১৮। ১৯ বৎসর, দ্বিতীয়টির বয়ঃক্রম ১৫|১৬ বৎসর, এই সময়ে কোনও ব্যক্তি ভুলাইয়া তাহাদিগকে বাট হইতে বাহির করিয়া লইয়া যায়।

প্রায় এক পক্ষ অতীত হইলে, তাহাদের পিতা এই দুর্ঘটনার সংবাদ পাইলেন, এবং কিঙ্কর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া, এক আত্মীয়ের সহিত পরামর্শ করিবার নিমিত্ত, কলিকাতায় আগমন করিলেন। আত্মীয়ের নিকট এই দুর্ঘটনায় বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া, তিনি গলদশ্রু লোচনে আকুল বচনে কহিতে লাগিলেন, ভাই এত কালের পর আমায় কুললক্ষী পরিত্যাগ করিলেন; আর আমার জীবনধারণ বৃথা; আমি অতি হতভাগ্য, নতুবা কুললক্ষী বাম হইবেন কেন। আত্মীয় কহিলেন, তুমি যে কখনও কন্যাদের কোনও সংবাদ লও নাই, এ তোমার সেই পাপের প্রতিফল। যাহা হউক, কুলীন ঠাকুর, অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া, অবশেষে কন্যা- পহারীর শরণাগত হইলেন এবং প্রার্থনা করিলেন, আপনি দয়া করিয়া তিন মাসের জন্য কন্যা দুটি দেন, আমি তিন মাস পরে উহাদিগকে আপনার নিকট পঁহুছাইয়া দিব। কন্যাপহারী যাঁহাদের অনুরোধ রক্ষা করেন, এরূপ অনেক ব্যক্তি, কুলীনঠাকুরের কাতরতা দর্শনে ও আর্ত্তবাক্য শ্রবণে অনুকম্পাপরতন্ত্র হইয়া, অনেক অনুরোধ করিয়া, তিন মাসের জন্য, সেই দুই কন্যাকে পিতৃহস্তে সমর্পণ করাইলেন। তিনি, চরিতার্থ হইয়া, তাদের দুই ভাগনীকে আপন বসতিস্থানে লইয়া গেলেন, এবং এক ব্যক্তি, অঘরে বিবাহ দিবার জন্য, চুরী করিয়া লইয়া গিয়াছিল; অনেক যত্নে, অনেক কৌশলে, ইহাদের উদ্ধার করিয়াছি, ইহা প্রচার করিয়া দিলেন। কন্যাৱা না পলায়ন করিতে পারে, এজন্য, এক রক্ষক নিযুক্ত করিলেন। সে সর্ব্বক্ষণ তাহাদের রক্ষণাবেক্ষণ করিতে লাগিল।

এইরূপ ব্যবস্থা করিয়া, কুলীনঠাকুর অর্থের সংগ্রহ ও বরের অন্বেষণ করিবার নিমিত্ত নির্গত হইলেন এবং এক মাস পরে, ভাদ্রমাসের শেষে, বিবাহোপযোগী অর্থ সংগ্রহপূর্ব্বক এক ষষ্টিবর্ষীয় বর সমভিব্যাহারে বাটীতে প্রত্যাগমন করিলেন। বর কন্যাদের চরিত্রবিষয়ে কিঞ্চিৎ জানিতে পারিয়াছিলেন; এজন্য, নিয়মিত অপেক্ষা অধিক দক্ষিণা না পাইয়া, কুলীনঠাকুরের কুলরক্ষা করিতে সম্মত হইলেন না। পর রাত্রিতেই সম্প্রদানক্রিয়া সম্পন্ন হইয়া গেল। কুলীনঠাকুরের কুলরক্ষা হইল। যাঁহাৱা বিবাহক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন, স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, কুললক্ষী বিচলিত হইলেন না, এই আহ্লাদে ব্রাহ্মণের নয়নযুগলে অশ্রুধারা বহিতে লাগিল।

পর দিন প্রভাত হইবামাত্র, বর স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। কতিপয় দিবস অতীত হইলে, বিবাহিতা কুলবালারাও অন্তর্হিতা হইলেন। তদবধি আর কেহ তাঁহাদের কোনও সংবাদ লয় নাই; এবং, সংবাদ লইবার আবশ্যকতাও ছিল না। তাঁহারা পিতার কুলরক্ষা করিয়াছেন। অতঃপর যথেচ্ছাচারিণী হইলে, পিতার কুলোচ্ছেদের আশঙ্কা নাই। বিশেষতঃ, তিনি কন্যাপহারীর নিকট অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, তিন মাস পরে কন্যাদিগকে তাঁহার নিকট পঁহুছাইয়া দিবেন। বিবাহের অব্যবহিত পরেই, প্রতিশ্রুত সময় উত্তীর্ণ হইয়া যায়। সে যাহা হউক, কুলীনঠাকুর কুললক্ষীর স্নেহ ও দয়ায় বঞ্চিত হইলেন না, ইহাই পরম সৌভাগ্যের বিষয়। চঞ্চলা বলিয়া লক্ষীর বিলক্ষণ অপবাদ আছে। কিন্তু কুলীনের কুললক্ষী সে অপবাদের আস্পদ নহেন।

অনেকেই এই ঘটনার সবিশেষ বিবরণ অবগত হইয়াছিলেন, কিন্তু, তজ্জন্য, কে কুলীনঠাকুরের প্রতি অশ্রদ্ধা বা অনাদর প্রদর্শন করেন নাই।

আদিসুরো নবনবর্ত্যধিকনবশতীশতাব্দে পঞ্চ ব্রাক্ষণামানায়য়ামাসু।

কৃষ্ণচন্দ্রচরিত্র।

ভট্টনারায়ণো দক্ষো বেদগর্ভোহথ ছান্দড়ঃ।

অথ শ্রীহর্ষনামা চ কান্যকুব্জাৎ সমাগতাঃ॥

শাণ্ডিল্যগোত্রজশ্রেষ্ঠো ভট্টনারায়ণঃ কবিঃ।

দক্ষোহথ কাশ্যপশ্রেষ্ঠো বাৎস্যশ্রেষ্ঠোহথ ছান্দড়ঃ॥

ভরদ্বাজকুলশ্রেষ্ঠ শ্রীহর্ষে’হর্ষবর্জনঃ।

বেদর্গর্ভোহথ সাবর্ণো যথা বেদ ইতি স্মৃতঃ॥

বিক্রমপুরের লোকে বলেন, বল্লালসেনের বাটীর দক্ষিণে যে দিঘী আছে, তাহার উত্তর পাড়ে পাকা ঘাটের উপর ঐ বৃক্ষ অদ্যাপি সজীব আছে। বৃক্ষ অতি বৃহৎ; নাম গজারিবৃক্ষ। এজাতীয় বৃক্ষ বিক্রমপুরের আর কোথাও নাই। ময়মনসিংহ জিলার মধুপুর পাহাড় ভিন্ন অন্যত্র কুত্রাপি লক্ষিত হয় না। মল্লকাষ্ঠ স্থলে অনেকে গজের আলানস্তম্ভ বলিয়া উল্লেখ করিয়া থাকেন।

এই উপাখ্যান সচরাচর যেরূপ উল্লিখিত হইয়া থাকে, অবিকল সেইরূপ নির্দিষ্ট হইল।

পঞ্চকোটি কামকোটির্হরিকোটিস্তথৈব চ।

কঙ্কগ্রামো বটগ্রামস্তেষাং স্থানানি পঞ্চ চ॥

ভট্টতঃ ষোড়শোদ্ভুাত দক্ষতশ্চাপি ষোড়শ।

চত্বারঃ শ্রীহর্ষজাতা দ্বাদশ বেদগর্ভতঃ॥

অষ্টারথ পরিজ্ঞেয়া উদ্ভুতাশ্ছান্দড়ান্মুনেঃ॥

বন্দ্যঃ কুসুমো দীর্ঘাঙ্গী ঘোষলী বটব্যালকঃ।

পারী কুলী কুশারিশ্চ কুলভিঃ সেয়কো গড়ঃ।

আকাশঃ কেশরী মাষো বসুয়ারিঃ করালকঃ।

ভট্টবংশোদ্ভবা এতে শাণ্ডিল্যে ষোড়শ স্মৃতাঃ॥

চট্টোতম্বুলী তৈলবাটী পোড়ারির্হড়গূড়াকৌ।

ভূরিশ্চ পালধিশ্চৈব পৰ্কটিঃ পুষলী তথা।

মূলগ্রামী কোয়ারী চ পলসায়ী চ পীতকঃ।

সিমলায়ী তথা ভট্ট ইমে কাশ্যপসংজ্ঞকাঃ॥

আদৌ মুখটী ডিণ্ডী চ সাহরী রাইকস্তথা।

ভারদ্বাজা ইমে জাতাঃ শ্রীহর্ষস্যতনূদ্ভবাঃ॥

গাঙ্গুলিঃ পুংসিকো নন্দী ঘণ্টা কুন্দ সিয়ারিকাঃ।

সাটা দায়ী তথা নায়ী পারী বালী চ সিদ্ধলঃ।

বেদগর্ভোদ্ভবা এতে সাবর্ণে দ্বাদশ স্মৃতাঃ॥

কাঞ্জিবিল্লী মহিস্তা চ পূতিতুণ্ডশ্চ পিপ্পলী।

ঘোষালো বাপুিলিশ্চৈব কাঞ্জারী চ তথৈব চ।

সিমলালশ্চ বিজ্ঞেয়া ইমে বাৎস্যকসংজ্যকাঃ॥

আদিসূরের বংশধ্বংস সেনবংশ তাজা।

বিক্ষক্‌সেনের ক্ষেত্রজ পুত্র বল্লালসেন রাজা॥

আচারো বিনয়ো বিদ্যা প্রতিষ্ঠা তীর্থদর্শনম্।

নিষ্ঠাবৃত্তিন্তপো দানং নবধা কুললক্ষণম্॥

এরূপ প্রবাদ আছে, পুর্ব্বে নিষ্ঠা শান্তিস্তপো দানম্ এইরূপ পাঠ ছিল; পরে, বল্লালকালীন ঘটকেরা শান্তিশব্দস্থলে আবৃত্তিশব্দ নিবেশিত করিয়াছেন।

আদানঞ্চ প্রদানঞ্চ কুশত্যাগস্তথৈব চ।

প্রতিজ্ঞা ঘটকাগ্রেষু পরিবর্ত্তশ্চতুর্বিধঃ॥

বন্দ্যশ্চট্টোহথ মুখুটী ঘোষালশ্চ ততঃ পরঃ।

পুতিতুণ্ডশ্চ গাঙ্গুলিঃ কাঞ্জিঃ কুন্দেন চাষ্টমঃ।

বহুরূপঃ সুচো নাম্না অরবিন্দো হলায়ুধঃ।

বাঙ্গালশ্চ সমাখ্যাতাঃ পঞ্চৈতে চট্টবংশজাঃ।

পুতির্গোবর্দ্ধনাচার্য্যঃ শিরো ঘোষালসম্ভবঃ।

গাঙ্গুলীয়ঃ শিশো নাম্না কুন্দো রোষাকরোহপিচ॥

জাহ্লনাখ্যস্তথা বন্দ্যো মহেশ্বর উদারধীঃ।

দেবলো বামনশ্চৈব ঈশানো মকরন্দকঃ॥

উৎসাহগরুড়খ্যাতৌ মুখরংশসমুদ্ভবৌ।

কানুকুতূহলাবেতৌ কাঞ্জিকুলপ্রতিষ্ঠিতৌ।

উনবিংশতিসংখ্যাতা মহারাজেন পূজিতাঃ॥

পালধিঃ পর্কটিশ্চৈব সিমলায়ী চ বাপুলিঃ।

ভূরিঃ কুলী বটব্যালঃ কুশারিং মেয়কস্তথা।

কুসুমো ঘোষলী মাষো বসুয়ারিঃ করালকঃ।

তাম্বুলী তৈলবাটী চ মূলগ্রামী চ পুষলী।

আকাশঃ পলসায়ী চ কোয়ারী সাহরিস্তথা।

ভট্টঃ ষাটশ্চ নায়েরী দায়ী পারী সিয়ারিকঃ।

সিদ্ধলঃ পুংসিকো নন্দী কাঞ্জারী সিমললিকঃ।

বালী চেতি চতুস্ত্রিংশদ্বল্লালনৃপপূজিতাঃ॥

দীর্ঘাঙ্গী পারিঃ কুলভী পোড়ারী রাই কেশরী।

ঘণ্টা ডিণ্ডী পীতমুণ্ডী মহিস্তা গূড় পিপলী।

হড়শ্চ গড়গড়িশ্চৈব ইমে গৌণাঃ প্রকীর্ত্তিতাঃ।

শ্রোত্রিয়ায় সুতাং দত্ত্বা কুলীনো বংশজো ভবেৎ।

অরয়ঃ কুলনাশকাঃ।

যৎকন্যালভমাত্রেণ সমূলস্তু বিনশ্যতি॥

বল্লালবিষয়ে নূনং কুলীনা দেবতাঃ স্বয়ম।

শ্রোত্রিয়া মেরবো জ্ঞয়া ঘটকা স্তুতিপাঠকাঃ।

অশং বংশং তথা দোষং যে জানন্তি মহাজনাঃ।

ত এব ঘটকা জ্ঞেয়া ন নামগ্রহণাৎ পরম্॥

বল্লালের মুখ হইতে বংশজ নির্গত হইয়াছিল এইমাত্র, তিনি বংশজব্যবস্থা করেন নাই, ঘটকদিগের এই নির্দেশ সম্যক্ সংলগ্ন বোধ হয় না। ৫৬ গাঁইর মধ্যে, ৩৪ গাঁই শ্রোত্রিয়, ও ১৪ গাঁই গৌণ কুলীন, বলিয়া ব্যবস্থাপিত হইয়াছিলেন; অবশিষ্ট ৮ গাঁইর লোকের মধ্যে কেবল ১২ জন কুলীন হন, এই ১৯ জন ব্যতিরিক্ত লোকদিগের বিষয়ে কোনও ব্যবস্থা দেখিতে পাওয়া যায় না। বোধ হইতেছে, বল্লাল এই সকল লোকদিগকে বংশজশ্রেণীবদ্ধ করিয়াছিলেন। বোধ হয়, ইঁহারই আদিবংশজ; তৎপরে, আদানপ্রদানদোষে যে সকল কুলীনের কুলভ্রংশ ঘটিয়াছে, তাঁরাও বংশজসংজ্ঞাভাজন হইয়াছেন। ইহাও সম্পূর্ণ সম্ভর বোধ হয়, এই দি- বংশজেরা বক্সালের নিকট ঘটক উপাধি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

দোষাম্মেলয়তীতি মেলঃ।

দোষো যত্র কুলং তত্র।

১ ফুলিয়া, ২ খড়দহ, ৩ সর্ব্বানন্দী, ৪ বল্লভী, ৫ সুরাই, আচার্য্যশেখরী, ৭ পণ্ডিতরত্নী, ৮ বাঙ্গাল, ৯ গোপালঘটকী, ১০ ছায়ানরেন্দ্রী, ১১ বিজয়পণ্ডিতী, ১২ চাঁদাই, ১৩ মাধাই, ১৪ বিদ্যাধরী, ১৫ পারিহাল, ১৬ শ্রীরঙ্গভট্টী, ১৭ মালাধরখানী, ১৮ কাকুস্থী, ১৯ হরিমজুমদারী, ২০ শ্রীবর্দ্ধনী, ২১ প্রমেদিনী, ২২ দশরথঘটকী, ২৩ শুভরাজখানী, ২৪ নড়িয়া, ২৫ রায়মেল, ২ চট্টরাঘবী, ২৭ দেহাটী, ২৮ ছয়ী, ২৯ ভৈরবঘটকী, ৩০ আচন্বিতা, ৩১ ঘরাধরী, ৩২ বালী, ৩৩ রাঘবঘোবলী, ৩৪ শুঙ্গসর্ব্বনন্দী, ৩৫ সদানন্দখানী, ৩৬ চন্দ্রবতী।

অনূঢ়া শ্রীনাথসুতা ধন্ধঘাটস্থলে গতা।

হাঁসাইখানদারেণ যবনেন বলাৎকৃতা॥

ধন্ধস্থানগতা কন্যা শ্রীনাথচট্টজাত্মজা।

যবনেন চ সংসৃষ্টা সোঢ়া কংসসুতেন নৈ।

নাথাইচকট্টের কন্যা হাঁসাইথানদারে।

সেই কন্যা বিভা কৈল বন্দ্য গঙ্গাবরে॥

কি কি দোষে কোন কোন মেল বদ্ধ হয়, দোষমালাগ্রন্থে তাহার সবিস্তর বিবরণ আছে; বাহুল্যভয়ে এস্থলে সে সকল উল্লিখিত হইল না। যাঁহার সবিশেষ জানিতে চাহেন, তাঁহাদের পক্ষে দোষমালাগ্রন্থ দেখা আবশ্যক।

উদ্বাতত্বধৃত।

যাহাকে শ্রাদ্ধে নিমন্ত্রণ করিয়া ভোজন করাইলে শ্রাদ্ধ পণ্ড হয়।

যাহার সহিত এক পংক্তিতে বসিয়া ভোজন করিতে নাই।

যমসংহিতা।

যাহার সহিত সম্ভাষণ করিল পাতক জন্মে।

জীমূতবাহনকৃত দায়ভাগধৃত।

ব্যাসসংহিতা। দ্বিতীয় অধ্যায়।

যদিও, অবিবাহিত অবস্থায় কন্যার ঋভুদর্শন ও ঋতুমতী কন্যার পাণিগ্রহণ শাস্ত্রানুসারে ঘোরতপাতকজনক; কিন্তু, কুলাভিমানী মহাপুরুষেরা উহাকে দোষ বলিয়া গ্রাহ্য করেন না। দোষ বোধ করিলে, অকিঞ্চিৎকরকুলাভিমানের বশবর্ত্তী হইয়া চলিতেন না, এবং কন্যাদিগকে অবিবাহিত অবস্থায় রাখিয়া নিজে নরকগামী হইতেন না, এবং পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ এই তিন পূর্ব্বপুরুষকে পরলোকে বিষ্ঠাকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত করিতেন না। হয়ত, তাঁহারা,

কামমামণাতিগৃেহে কন্যর্ত্তুমত্যপি।

নচৈবৈং প্রস্থে গুণহীনায় কহির্চিচৎ॥ ৯। ৮৯॥

কন্যা ঋতুমতী হইয়া মৃত্যুকাল পর্য্যন্ত বরংগৃহে থাকিবেক, তথাপি তাহাকে কদাচ নির্গুণ পাত্রে প্রদান করিবেক না।

এই মানবীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়া চলেন বলিয়া ভাবিয়া থাকেন। মনু নির্গুণ পাত্রে কন্যাদান অবিধেয় বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। কিন্তু, ইদানীন্তন কুলাভিমানীমহাশয়েরা সর্ব্বাপেক্ষা নির্গুণ; আচার, বিনয়, বিদ্যা প্রভৃতি গুণে তাঁহারা একবারে বর্জ্জিত হইয়াছেন। সুতরাং, তাঁহাদের অভিমত শাস্ত্র অনুসারে বিবেচনা ঝরিতে গেলে, এক্ষণকার কুলীন পাত্রে কন্যাদান করাই সর্ব্বতোভাবে অবিধেয় বলিয়া নিঃসংশয়ে প্রতিপন্ন হইবেক।

১ হর্ষ, ২ গর্ভ, ও শ্রীনিবাস, ৪ আরব, ৫ ত্রিৰিক্রম, ৬ কাক, ৭ সাধু, ৮ জলাশয়, ৯ বাণেশ্বর, ১০ গুহ, ১১ মাধব, ১২ কোলাহল। শ্রীহর্ষ প্রথম গৌড়দেশে গমন করেন।

১ উৎসাহ, ২ আহিত, ৩ উদ্ধব, ৪ শিব, ৫ নৃসিংহ, ৬ গর্ভেশ্বর, ৭ মুরারি, ৮ অনিরুদ্ধ, ৯ লক্ষ্মীধর, ১০ মনোহর। মুখুটীৰংশে উৎসাহ প্রথম কুলীন হন।

১ গঙ্গানন্দ, ২ রামাচার্য্য, ৩ রাঘবেন্দ্র, ৪ নীলকণ্ঠ, ৫ বিষ্ণু, ৬ রামদেব, ৭ সীতারাম, ৮ সদাশিব, ৯ গোরাচাঁদ, ১০ ঈশ্বর। গঙ্গানন্দ ফুলিয়ামেলের প্রকৃতি। ঈশ্বরমুখোপধ্যায় খড়দহগ্রামবাসী।

পঞ্চম আপত্তি

পঞ্চম আপত্তি।

কেহ কেহ আপত্তি করিতেছেন, বহুবিবাহপ্রথা নিবারিত হইলে, কায়স্থজাতির আদ্যরসের ব্যাঘাত ঘটিবেক। এই আপত্তি অতি দুর্বল ও অকিঞ্চিৎকর। আদ্যরস না হইলে, কায়স্থদিগের জাতিপাত ও ধর্ম্মলোপ হয় না, এবং বিবাহবিষয়েও কোনও অসুবিধা ঘটে না।

কায়স্থজাতি দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রথম কুলীন, দ্বিতীয় মৌলিক। ঘোষ, বসু, মিত্র এই তিন ঘর কুলীন কায়স্থ। মৌলিক দ্বিবিধ, সিদ্ধ ও সাধ্য। দে, দত্ত, কর, সিংহ, সেন, দাস, গুহ, পালিত এই আট ঘর সিদ্ধ মৌলিক। আর সোম, রুদ্র, পাল, নাগ, ভঞ্জ, বিষ্ণু, ভদ্র, রাহা, কুণ্ড, সুর, চন্দ্র, নন্দী, শীল, নাথ, রক্ষিত, আইচ, প্রভৃতি যে বায়ত্তর ঘর কায়স্থ আছেন, তাঁহারা সাধ্য মৌলিক। সাধ্য মৌলিকেরা মাদাবিষয়ে সিদ্ধ মৌলিক অপেক্ষা নিকৃষ্ট। সিদ্ধ মৌলিকেরা সম্মৌলিক, সাধ্য মৌলিকের বায়ত্তরিয়া, বলিয়া সচরাচর উল্লিখিত হইয়া থাকেন।

কায়স্থজাতির বিবাহের স্থূল ব্যবস্থা এই, —কুলীনের জ্যেষ্ঠ পুত্রকে কুলীনকন্যা বিবাহ করিতে হয়; মৌলিককন্যা বিবাহ করিলে, তাহার কুলভ্রংশ ঘটে। কিন্তু প্রথম কুলীনকন্যা বিবাহ করিয়া, মৌলিককন্যা বিবাহ করিলে, কুলের কোনও ব্যাঘাত ঘটে না। কুলীনের অপর পুত্রের মৌলিককন্যা বিবাহ করিতে পারেন, এবং সচরাচর তাহাই করিয়া থাকেন। মৌলিকমাত্রের কুলীনপাত্রে কন্যাদান ও কুলীন- কন্যা বিবাহ করা আবশ্যক। মৌলিকে মৌলিকে আদানপ্রদান হইলে, জাতিপাত ও ধর্ম্মলোপ হয় না; কিন্তু, তাদৃশ আদানপ্রদান কারীদিগকে কায়স্থসমাজে কিছু হেয় হইতে হয়। ৬০।৭০ বৎসর পূর্ব্বে, মৌলিকে মৌলিকে বিবাহ নিতান্ত বিরল ছিল না, এবং নিতান্ত দোষাবহ বলিয়াও পরিগৃহীত হইত না।

মৌলিকেরা কুলীনের দ্বিতীয় পুত্র প্রভৃতিকে কন্যাদান করিয়া থাকেন। কিন্তু, কতিপয় মৌলিকপরিবারের সঙ্কল্প এই, কুলীনের জ্যেষ্ঠ পুত্রকে কন্যাদান করিডে হইবেক। কুলীনের জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রথমে মৌলিককন্যা বিবাহ করিতে পারেন না। কুলীনকন্যা বিবাহ দ্বারা যাঁহার কুলরক্ষা হইয়াছে, মৌলিক কায়স্থ, অনেক যত্ন ও অর্থব্যয় করিয়া তাঁহাকে কন্যা দান করেন। কুলীনের জ্যেষ্ঠ পুত্র এইরূপে মৌলিকগৃহে যে দ্বিতীয় সংসার করেন, তাহার নাম আদ্যরস; আর, যে সকল মৌলিকের গৃহে এইরূপ বিবাহ হয়, তাহাদিগকে আদ্যরসের ঘর বলে।

মৌলিকেরা, আদ্যরস করিয়া, অনেক যত্নে জামাতাকে গৃহে রাখেন। তাহার কারণ এই বোধ হয়, কুলীনের জ্যেষ্ঠ সন্তান পিতৃমর্য্যাদা প্রাপ্ত হন। আদ্যরসপ্রিয় মৌলিকদিগের উদ্দেশ্য এই, তাঁহাদের দৌহিত্র সেই মর্য্যাদার ভাজন হইবেন। কিন্তু, যে ব্যক্তির দুই সংসার, তাহার কোন্ স্ত্রী প্রথম পুত্রবতী হইবেক, তাহার স্থিরতা নাই। পূর্ব্ব- পরিণীতা কুলীনকন্যার অগ্রে পুত্র জম্মিলে, আদ্যরসের উদ্দেশ্য বিফল হইয়া যায়। জামাতাকে পুর্ব্বপরিণীতা কুলীনকন্যার নিকটে যাইতে দেওয়া, সেই উদ্দেশ্যসাধনের প্রধান উপায়। এজন্য, জামাতাকে সন্তুষ্ট করিয়া গৃহে রাখা নিতান্ত আবশ্যক হইয়া উঠে। তাদৃশ স্থলে, পূর্ব্বপরিণীতা কুলীনকন্যা স্বামীর মুখ দেখিতে পান না। বস্তুতঃ, তাদৃশী কুলীনকন্যাকে, নামমাত্রে বিবাহিতা হইয়া, বিধবা কন্যার ন্যায়, পিত্রালয়ে কালযাপন করিতে হয়। কুলীন জামাতাকে বশে রাখা বিলক্ষণ ব্যয়সাধ্য; এজন্য, যে সকল আদ্যরসকারী মৌলিকের অবস্থা ক্ষুণ্ণ হইয়াছে, তাঁহারা তদ্বিষয়ে কৃতকার্য্য হইতে পারেন না; সুতরাং আদ্যরসের মুখ্যফললাভ তাঁহাদের ভাগ্যে ঘটিয়া উঠে না। ঈদৃশ স্থলে, কুলীনের জ্যেষ্ঠ পুত্র কুলীনকন্যা ও মৌলিককন্যা উভয়কে লইয়া সংসারযাত্রা নির্বাহ করেন।

পূর্ব্বে উল্লিখিত হইয়াছে, আদ্যৱস না করিলে, মোলিকের জাতি- পাত ও ধর্ম্মলোপ হয় না, এবং বিবাহবিষয়েও কিছুমাত্র অসুবিধা ঘটে না। কুলীনের মধ্যম প্রভৃতি পুত্রকে কন্যাদান করিলেই মৌলিকের সকল দিক রক্ষা হয়। এজন্য, প্রায় সকল মৌলিকেই তাদৃশ পাত্রে কন্যাদান করিয়া থাকেন। আমি কুলীনের জ্যেষ্ঠ পুত্রকে কন্যাদান করিয়াছি, নিরবচ্ছিন্ন এই অভিমানসুখলাভের বশবর্ত্তী হইয়া, কেবল কতিপয় মৌলিকপরিবার আদ্যরস করেন। কিন্তু, তুচ্ছ অভিমানসুখের জন্য, পূর্ব্বপরিণীতা নিরপরাধা কুলীনকন্যার সর্ব্বনাশ করিতেছেন, ক্ষণকালের জন্যেও সে বিবেচনা করেন না। যে দেশে আপন কন্যার হিতাহিত বিবেচনার পদ্ধতি নাই, সে দেশে পরের কন্যার হিতাহিত বিবেচনা সুদূরপরাহত।

সে সকল আদ্যরসপ্রিয় পরিবার নিঃস্ব হইয়াছেন, এবং অর্থ ব্যয় করিয়া, প্রকৃতপ্রস্তাবে, আদ্যরস করিতে সমর্থ নহেন; আদ্যরস অশেষপ্রকারে, তাঁহাদের পক্ষে, বিলক্ষণ বিপদের স্বরূপ হইয়া উঠিয়াছে। তাঁহাদের আন্তরিক, ইচ্ছা এই, আদ্যরসপ্রথা এই দণ্ডে রহিত হইয়া যায়। রাজশাসন দ্বারা এই কুৎসিত প্রথার উচ্ছেদ হইলে, তাঁহারা পরিত্রাণ বোধ করেন; কিন্তু, স্বয়ং সাহস করিয়া পথপ্রদর্শনে প্রবৃত্ত হইতে পারেন না। যদি তাঁহারা, আদ্যরসে বিসর্জ্জন দিয়া, কুলীনের দ্বিতীয় প্রভৃতি পুত্রে কন্যাদান করিতে আরম্ভ করেন, তাঁহাদের জাতিপাত বা ধর্ম্মলোপ হইবে না। তবে, আদ্যরস করিল না, অথবা করিতে পারিল না, এই বলিয়া, প্রতিবেশীরা তাঁহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া, নিন্দা ও উপহাস করিবেন। কেবল এই নিন্দা ও এই উপহাসের ভয়ে, তাহারা আদ্যরস হইতে বিরত হইতে পারিতেছেন না। স্পষ্ট কথা বলিতে হইলে, আমাদের দেশের লোক বড় নির্ব্বোধ, বড় কাপুরুষ।

রাজশাসন দ্বারা বহুবিবাহপ্রধা নিবারিত হইলে, আদ্যরসের ব্যাঘাত ঘটিবেক, সন্দেহ নাই। কিন্তু, তদ্দ্বারা কতিপয় মৌলিক পরিবারের তুচ্ছ অভিমানসুখের ব্যাঘাত ভিন্ন, কায়স্থজাতির কোনও অংশে কোনও অসুবিধা বা অপকার ঘটিবে, তাহার কোনও সম্ভাবনা লক্ষিত বা অনুমেয় হইতেছে না। আদ্যরস, কায়স্থজাতির পক্ষে, অপরিহার্য্য ব্যবহার নহে। এই ব্যবহার অনেক অংশে অনিষ্টকর ও অধর্ম্মকর, তাহার সন্দেহ নাই। যখন, এই ব্যবহার রহিত হইলে, কায়স্থজাতির অহিত, অধর্ম্ম, বা অন্যবিধ অসুবিধা ও অপকার ঘটিতেছে না, তখন উহা বহুবিবাহনিবারণের আপত্তিস্বরূপে উত্থাপিত বা পরিগৃহীত হওয়া কোনও মতে উচিত বা ন্যায়ানুগত নহে। আর, যদি রাজনিয়ম দ্বারা, বা অন্যবিধ কারণে, অকারণে একাধিক বিবাহ করিবার প্রথা রহিত হইয়া যায়, তাহা হইলেও আদ্যরসের এককালে উচ্ছেদ হইতেছে না। কুলীনের যে সকল জ্যেষ্ঠ সন্তানের স্ত্রীৰিয়োগ ঘটিবেক, তাঁহারা আদ্যরসের ঘরে দারপরিগ্রহ করিতে পারিবেন। যাহা হউক, এই আদ্যরসের ব্যাঘাত ঘটিবেক, অতএব বহুবিবাহপ্রথা নিবারিত হওয়া উচিত নহে, ঈদৃশ আপত্তি উথাপন করা কেবল আপনাকে উপহাসাস্পদ করা মাত্র।

পরিশিষ্ট

পরিশিষ্ট

পুস্তকের দ্বিতীয় প্রকরণে কতকগুলি সংস্কৃত শ্লোক প্রমাণরূপে পরিগৃহীত হইয়াছে; কিন্তু, ঐ সকল শ্লোক কোন গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃত হইল, তত্তৎস্থলে তাহার নির্দেশ নাই। শ্লোকসকল, বহুকাল পূর্ব্বে, বিক্রমপুরবাসী প্রসিদ্ধ কুলাচার্য্য ঈশ্বরচন্দ্র তর্কভূষণ মহাশয়ের নিকট হইতে সংগৃহীত হইয়াছিল। কিন্তু, তর্কভুষণ মহাশয় যে পুস্তক হইতে উদ্ধৃত করিয়া দেন, অনবধান বশতঃ, ঐ পুস্তকের নাম লিখিয়া রাখা হয় নাই। তর্কভূষণ মহাশয়ের লোকান্তর প্রাপ্তি হইয়াছে; সুতরাং এ বিষয়ে তদীয় সাহায্যলাভের আর প্রত্যাশা নাই। উল্লিখিত শ্লোক সমূহের অধিকাংশ অত্রত্য কুলাচার্য মহাশয়দিগের কণ্ঠস্থ আছে; কিন্তু ঐ গ্রন্থ আঁহাদের নিকটে নাই; এবং এখানে কোনও স্থানে আছে কি না, তাহারও অনুসন্ধান পাওয়া গেল না। এই নিমিত্ত, নিতান্ত নিরুপায় হইয়া, গ্রন্থের নাম নির্দেশ করিতে পারি নাই

পুস্তকের চতুর্থ প্রকরণে, বিবাহব্যবসায়ী ভঙ্গকুলীনদিগের বাস, বয়স, বিবাহসংখ্যার যে পরিচয় প্রদত্ত হইয়াছে, তদ্বিষয়ে কিছু বলা আবশ্যক। তাদৃশ ভঙ্গকুলীনদিগের পৈতৃক বাসস্থান নাই; কতকগুলি পিতার মাতুলালয়ে, কতকগুলি নিজের মাতুলালয়ে, কতকগুলি পুত্রের মাতুলালয়ে অবস্থিতি করিয়া থাকেন; আর কতকগুলি কখন কোন আলয়ে অবস্থিতি করেন, তাহার স্থিরতা নাই। সুতরাং তাঁহাদের যে বাসস্থান নির্দিষ্ট হইয়াছে, কোনও কোনও স্থলে, তাহার বৈলক্ষণ্য লক্ষিত হইতে পারে। তাহাদের বয়ঃক্রম বিষয়ে বক্তব্য এই যে, এই বিষয় পাঁচ বৎসর পূর্বে সংগৃহীত হইয়াছিল; সুতরাং, এক্ষণে তাঁহাদের পাঁচ বৎসর অধিক বয়স হইয়াছে, এবং হয়ত কেহ কেহ পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন। আর বিবাহসংখ্যা দৃষ্টি করিয়া, কেহ কেহ বলিতে পারেন, অধিকবয়স্কদিগের বিবাহের সংখ্যা যেরূপ অধিক, অল্প- বয়স্কদিগের সেরূপ অধিক দৃষ্ট হইতেছে না; ইহাতে বোধ হইতেছে, এক্ষণে বিবাহব্যবসায়ের অনেক হ্রাস হইয়াছে। এ বিষয়ে বক্তব্য এই যে, যাঁহাদের বিবাহের সংখ্যা অধিক, এক দিনে বা এক বৎসরে, তাঁহারা তত বিবাহ করেন নাই, তাঁহাদের বিবাহের সংখ্যা ক্রমে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছে, এবং অদ্যাপি বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতেছে। ভঙ্গকুলীনের জীবনের অন্তিম ক্ষণ পর্য্যন্ত বিবাহ করিয়া থাকেন। এই পাঁচ বৎসরে, অল্পবয়স্ক দলের মধ্যে অনেকের বিবাহসংখ্যা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছে; এবং, ক্রমে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া, অধিক বয়সে এক্ষণকার বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিদের সমান হইবেক, সে বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। অতএব, উভয় পক্ষের বিবাহ- সংখ্যাগত বর্ত্তমান বৈলক্ষণ্যদর্শনে, ভঙ্গকুলীনদিগের বিবাহব্যবসায় আর পূর্ব্বের মত প্রবল নাই, এরূপ সিদ্ধান্তকরা কোনও মতে ন্যায়ানুমোদিত হইতে পারে না।

প্রথম আপত্তি

প্রথম আপত্তি।

এরূপ কতগুলি লোক আছেন যে বহুবিবাহপ্রথার দোষকীর্ত্তন বা নিবারণকথার উত্থাপন হইলে, তাঁহারা খড়গহস্ত হইয়া উঠেন। তাহাদের এরূপ সংস্কার আ ছে, বহুবিবাহকাণ্ড শাস্ত্রানুমত ও ধর্ম্মানুগত ব্যাপার। যাঁহারা এ বিষয়ে বিরাগ বা বিদ্বেষ প্রদর্শন করেন, তাঁহাদের মতে তাদৃশ ব্যক্তি সকল শাস্ত্রদ্রোহী ধর্মদ্বেষী নাস্তিক ও নরাধম বলিয়া পরিগণিত। তাঁহারা সিদ্ধান্ত করিয়া রাখিয়াছেন, বহুবিবাহপ্রথা নিবারিত হইলে, শাস্ত্রের অবমাননা ও ধর্ম্মলোপ ঘটিবেক। তাঁহারা শাস্ত্র ও ধর্ম্মের দোহাই দিয়া বিবাদ ও বাদানুবাদ করিয়া থাকেন, কিন্তু, এ বিষয়ে শাস্ত্রেই বা কতদূর পর্যন্ত অনুমোদন আছে, এবং পুরুষজাতির উচ্ছল ব্যবহার দ্বারাই বা কতদূর পর্যন্ত অনার্য্য, আচরণ ঘটিয়া উঠিয়াছে, তাহা সবিশেষ অবগত নহেন। এ দেশে সকল ধর্ম্মই শাস্ত্রমুলক, শাস্ত্রে যে বিষয়ের বিধি আছে, তাহাই ধর্ম্মানুগত বলিয়া পরিগৃহীত, আর শাস্ত্রে যাহা প্রতিষিদ্ধ হইয়াছে, তাহাই ধর্ম্মবহির্ভুত বলিয়া পরিণিত হইয়া থাকে। সুতরাং, বিবাহবিষয়ে শাস্ত্রকারদিগের যে সমস্ত বিধি অথবা নিষেধ আছে, তৎসমুদয় পরীক্ষিত হইলেই, বহুবিবাহকাণ্ড শাস্ত্রানুমত ও ধর্ম্মা নুগত ব্যাপার কি না, এবং বহুবিবাহ প্রথা নিবারিত হইলে শাস্ত্রের অবমাননা ও ধর্ম্মলেপের শঙ্কা আছে কি না, অবধারিত হইতে পারিবেক।

দক্ষ কহিয়াছেন,

অনাশ্রমী ন তিষ্ঠেত্তু দিনমেকমপি দ্বিজঃ।

আশ্রমেণ বিনা তিষ্ঠন্ প্রায়শ্চিত্তীয়তে হি সঃ॥

দ্বিজ, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, এই তিন বর্ণ আশ্রমবিহীন হইয়া এক দিনও থাকিবে না; বিনা আশ্রমে অবস্থিত হইলে পাতকগ্রস্ত হয়।

এই শাস্ত্র অনুসারে, আশ্রমবিহীন হইয়া থাকা দ্বিজের পক্ষে নিষিদ্ধ ও পাতকজনক। দ্বিজপদ উপলক্ষণমাত্র, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, চারি বর্ণের পক্ষেই এই ব্যবস্থা।

বামনপুরাণে নির্দ্দিষ্ট আছে,

চত্বর আশ্রমাশ্চৈব ব্রাহ্মণস্য প্রকীর্ত্তিতাঃ।

ব্রহ্মশ্চর্য্যঞ্চ গ্রার্হস্থ্যং বানপ্রস্থঞ্চ ভিক্ষুকম্।

ক্ষত্রিয়স্যাপি কথিতা আশ্রমাস্ত্রয় এব হি।

ব্রহ্মশ্চর্য্যঞ্চ গার্হস্থ্যমাশ্রমদ্বিতয়ং বিশঃ।

গার্হস্থ্যমুচিতত্ত্বেকং শূদ্রস্য ক্ষণমাচরেৎ॥

ব্রহ্মচর্য্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস, ব্রাহ্মণের এই চারি আশ্রম নিদিষ্ট আছে। ক্ষত্রিয়ের প্রথম তিন; বৈশ্যের প্রথম দুই, শূদ্রের গার্হস্থ্য মাত্র এক আশ্রম; সে হৃষ্ট চিত্তে তাহারই অনুষ্ঠান করিবে।

এই ব্যবস্থা অনুসারে, সমুদয়ে ব্রহ্মচর্য্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস, এই চারি আশ্রম। কালভেদে ও অধিকারিভেদে মনুষ্যের পক্ষে এই আশ্রমচতুষ্টয়ের অন্যতম অবলম্বন আবশ্যক; নতুবা আশ্রমভ্রংশনিবন্ধন পাতকগ্রস্ত হইতে হয়। ব্রাহ্মণ চারি আশ্রমেই অধিকারী; ক্ষত্রিয় ব্রহ্মচর্য্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ এই তিন আশ্রমে; বৈশ্য ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য এই দুই আশ্রমে; শূদ্র একমাত্র গার্হস্থ্য আশ্রমে অধিকারী। উপনয়নসংস্কারান্তে, গুরুকুলে অবস্থিতিপূর্ব্বক, বিদ্যাভ্যাস ও সদাচাৱশিক্ষাকে ব্রহ্মচর্য্য বলে; ব্রহ্মচর্য্যসমাপনান্তে, বিবাহ করিয়া, সংসাৱষাত্রাসম্পাদনকে গার্হস্থ্য বলে; গার্হস্থ্যধর্ম্মপ্রতিপালনান্তে, যোগাভ্যাসার্থে বনবাস আশ্রয়কে বানপ্রস্থ বলে; বানপ্রস্থধর্ম্মসমাধানান্তে, সর্ব্ববিষয়পরিত্যাগকে সন্ন্যাস বলে।

মনু কহিয়াছেন,

গুরুণানুমতঃ স্নাত্বা সমাবৃত্তো যথাবিধি।

উদ্বহেত দ্বিজো ভার্য্যাং সবর্ণাং লক্ষণান্বিতাম্॥ ৩। ৪।

দ্বিজ, গুরুর অনুজ্ঞালাভান্তে, যথাবিধানে স্নান ও সমাবর্ত্তন করিয়া সজাতীয় সুলক্ষণা ভার্য্যার পাণিগ্রহণ করিবেক।

বিবাহের এই প্রথম বিধি। এই বিধি অনুসারে, বিদ্যাভ্যাস ও সদাচারশিক্ষার পর, দারপরিগ্রহ করিয়া, মনুষ্য গৃহস্থাশ্রমে প্রবিষ্ট হয়।

ভার্য্যায়ৈ পূর্ব্বমারিণ্যৈ দত্ত্বাগ্নীনস্ত্যকর্ম্মণি।

পুনর্দারক্রিয়াং কুর্য্যাৎ পুনরাধানমেব চ॥ ৫। ১৬৮।

পূর্ব্বমৃতা স্ত্রীর যথাবিধি অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া নির্বাহ করিয়া, পুনরায় দারপরিগ্রহ ও পুনরায় অগ্ন্যাধান করিবেক।

বিবাহের এই দ্বিতীয় বিধি। এই বিধি অনুসারে, স্ত্রীবিয়োগ হইলে গৃহস্থ ব্যক্তির পুনরায় দারপরিগ্রহ আবশ্যক।

মদ্যপাসাধুবৃত্তা প্রতিকূলা চ যা ভবেৎ।

ব্যাধিতা বাধিবেত্তব্যা হিংস্রার্থগ্নী চ সর্ব্বদা। ৯। ৮০

যদি স্ত্রী সুরাপায়িণী, ব্যভিচারিণী, সতত স্বামীর অভিপ্রায়ের বিপরীতকারিণী, চিররোগিণী, অতিক্রূরস্বভারা, ও অর্থনাশিনী হয়, তৎসত্ত্বে অধিবেদন, অর্থাৎ পুনরায় দারপরিগ্রহ, করিবেক।

বন্ধ্যাষ্টমেহধিবেদ্যাব্দে দশমে তু মৃতপ্রজা।

একাদশে স্ত্রীজননী সদ্যস্তৃপ্রিয়বাদিনী। ৯। ৮১।

স্ত্রী বন্ধ্যা হইলে অষ্টম বর্ষে, মৃতপুত্রা হইলে দশম বর্ষে, কন্যামাত্র প্রসবিনী হইলে একাদশ-বর্ষে, ও অপ্রিয়বাদিনী হইলে কালাতিপাত ব্যতিরেকে, অধিবেদন করিবে।

বিবাহের এই তৃতীয় বিধি। এই বিধি অনুসারে, স্ত্রী বন্ধ্যা প্রভৃতি অবধারিত হইলে তাহার জীবদ্দশায় পুনরায় বিবাহ করা আবশ্যক।

সবর্ণাগ্রে দ্বিজাতীনাং প্রশস্তা দারকর্ম্মণি।

কামতস্তু প্রবৃত্তানামিমাঃ স্যুঃ ক্রমশো বরাঃ॥৩। ১২।

শূদ্রৈব ভার্য্যা শূদ্রস্য সা চ স্বা চ বিশঃ স্মৃতেঃ।

তে চ স্বা চৈব রাজ্ঞশ্চ তাশ্চ স্বা চাগ্রজন্মনঃ॥৩।১৩।

দ্বিজাতির পক্ষে অগ্রে সবর্ণাবিবাহই বিহিত। কিন্তু, যাহারা যদৃচ্ছাক্রমে বিবাহ করিতে প্রবৃত্ত হয়, তাহারা অনুলোমক্রমে বর্ণান্তরে বিবাহ করিবেক; অর্থাৎ ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণী, ক্ষত্রিয়া, বৈশ্যা, শূদ্রা; ক্ষত্রিয়ের ক্ষত্রিয়া, বৈশ্যা, শূদ্রা; বৈশ্যের বৈশ্যা, শূদ্রা; শূদ্রের একমাত্র শূদ্রা ভার্য্যা হইতে পারে।

বিবাহের এই চতুর্থ বিধি। এই বিধি অনুসারে, সবর্ণাবিবাহই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এই তিন বর্ণের পক্ষে প্রশস্তকল্প। কিন্তু, যদি কোনও উৎকৃষ্ট বর্ণ, যথাবিধি সবর্ণাবিবাহ করিয়া, যদৃচ্ছাক্রমে পুনরায় বিবাহ করিতে অভিলাষী হয়, তবে সে আপন অপেক্ষা নিকৃষ্ট বর্ণে বিবাহ করিতে পারে।

যে সমস্ত বিধি প্রদর্শিত হইল, তদনুসারে বিবাহ ত্রিবিধ নিত্য, নৈমিত্তিক, কাম্য। প্রথম বিধি অনুসারে যে বিবাহ করিতে হয়, তাহা নিত্য বিবাহ; এই বিবাহ না করিলে, মনুষ্য গৃহস্থাশ্রমে অধিকারী হইতে পারে না। দ্বিতীয় বিধির অনুযায়ী বিবাহও নিত্য বিবাহ; তাহা না করিলে, আশ্রমভ্রংশনিবন্ধন পাতকগ্রস্ত হইতে হয়। তৃতীয় বিধির অনুযায়ী বিবাহ নৈমিত্তিক বিবাহ; কারণ, তাহা স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব প্রভৃতি নিমিত্ত বশতঃ করিতে হয়। চতুর্থ বিধির অনুযায়ী বিবাহ কাম্য বিবাহ। এই বিবাহ নিত্য ও নৈমিত্তিক বিবাহের ন্যায় অবশ্যকর্ত্তব্য নহে, উহা পুরুষের সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন, অর্থাৎ ইচ্ছা হইলে তাদৃশ বিবাহ করিতে পারে, এইমাত্র। কাম্য বিবাহে কেবল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এই বর্ণত্রয়ের অধিকার প্রদর্শিত হওয়াতে, শূদ্রের তাদৃশ বিবাহে অধিকার নাই।

পুত্রলাভ ও ধর্ম্মকার্য্যসাধন গৃহস্থাশ্রমের উদ্দেশ্য। দারপরিগ্রহ ব্যতিরেকে এ উভয়ই সম্পন্ন হয় না; এই নিমিত্ত, প্রথম বিধিতে দারপরিগ্রহ গৃহস্থাশ্রমপ্রবেশের দ্বারস্বরূপ ও গৃহস্থাশ্রমসমাধানের অপরিহার্য্য উপায়স্বরূপ নির্দিষ্ট হইয়াছে। গহস্থাশ্রমসম্পাদনকালে, স্ত্রীবিয়োগ ঘটিলে যদি পুনরায় বিবাহ না করে, তবে সেই দারবিরহিত ব্যক্তি আশ্রমভ্রংশনিবন্ধন পাতকগ্রস্ত হয়; এজন্য, ঐ অবস্থায় গৃহস্থ ব্যক্তির পক্ষে পুনরায় দারপরিগ্রহের অবশ্যকর্ত্তব্যবোধনার্থে, শাস্ত্রকারেরা দ্বিতীয় বিধি প্রদান করিয়াছেন। স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব চিররোগিত্ব প্রভৃতি দোষ ঘটিলে, পুত্রলাভ ও ধর্ম্মকার্য্যসাধনের ব্যাঘাত ঘটে। এজন্য, শাস্ত্রকারেরা তাদৃশ স্থলে, স্ত্রীসত্ত্বে পুনরায় বিবাহ করিবার তৃতীয় বিধি দিয়াছেন। গৃহস্থাশ্রমসমাধানা শাস্ত্রোক্তবিধানানুসারে সবর্ণাপরিণয়ান্তে, যদি কোনও উৎকৃষ্ট বর্ণ যদৃচ্ছাক্রমে বিবাহে প্রবৃত্ত হয়, তাহার পক্ষে অসবর্ণবিবাহে অধিকারবোধনার্থ শাস্ত্রকারের চতুর্থ বিধি প্রদর্শন করিয়াছেন। বিবাহবিষয়ে এতদ্ব্যতিরিক্ত আর বিধি দেখিতে পাওয়া যায় না। সুতরাং, স্ত্রী বিদ্যমান থাকিতে, নির্দিষ্ট নিমিত্ত ব্যতিরেকে, যদৃচ্ছাক্রমে পুনরায় সবর্ণবিবাহ করা শাস্ত্রকারদিগের অনুমোদিত নহে। ফলতঃ, সবর্ণাবিবাহান্তর যদৃচ্ছাক্রমে বিবাহপ্রবৃত্ত ব্যক্তির পক্ষে অসবর্ণাবিবাহের বিধি প্রদর্শিত হওয়াতে, তাদৃশ ব্যক্তির তথাবিধ স্থলে সবর্ণাবিবাহ নিষিদ্ধকল্প হইতেছে।

এরূপ বিধিকে পরিসংখ্যা বলে। পরিসংখ্যাবিধির নিয়ম এই, যে স্থল ধরিয়া বিধি দেওয়া যায়, তদ্ব্যতিরিক্ত স্থলে নিষেধ সিদ্ধ হয়। বিধি ত্রিবিধ অপূর্ব্ববিধি, নিয়মবিধি ও পরিসংখ্যাবিধি। বিধি ব্যতিরেকে যে স্থলে কোনও রূপে প্রবৃত্তি সম্ভবে না, তাহাকে অপূর্ব্ববিধি কহে; যেমন, “স্বর্গকামো যজেত”, স্বকামনায় যাগ করিবেক। এই বিধি থাকিলে, লোকে স্বর্গলাভবাসনায় কদাচ যাগে প্রবৃত্ত হইত না; কারণ, যাগ করিলে স্বর্গলাভ হয় ইহা প্রমাণান্তর দ্বারা প্রাপ্ত নহে। যে বিধি দ্বারা কোনও বিষয় নিয়মবদ্ধ করা যায়, তাহাকে নিয়মবিধি বলে; যেমন, “সমে যজেত”, সম দেশে যাগ করিবেক। লোকের পক্ষে যাগ করিবার বিধি আছে; সেই যাগ কোনও স্থানে অবস্থিত হইয়া করিতে হইবেক; লোকে ইচ্ছানুসারে সমান অসমান উভয়বিধ স্থানেই যাগ করিতে পারিত; কিন্তু “সমে যজেত”, এই বিধি দ্বারা সমান স্থানে যাগ করিবেক ইহা নিয়মবদ্ধ হইল। যে বিধি দ্বারা বিহিত বিষয়ের অতিরিক্ত স্থলে নিষেধ সিদ্ধ হয়, এবং বিহিত স্থলে বিধি অনুযায়ী কার্য্য করা সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন থাকে, তাহাকে পরিসংখ্যাবিধি বলে; যেমন, “পঞ্চ পঞ্চনখা ভক্ষ্যাঃ”, পাঁচটি পরুনখ ভক্ষণীয়। লোকে যদৃচ্ছাক্রমে যাবতীয় পঞ্চনখ জন্তু ভক্ষণ করিতে পারিত, কিন্তু “পঞ্চ পঞ্চনখা ভক্ষ্যাঃ”, এই বিধি দ্বারা বিহিত শশ প্রভৃতি পঞ্চ ব্যতিরিক্ত কুক্কুরাদি যাবতীয় পঞ্চনখ জন্তু ভক্ষণনিষেধ সিদ্ধ হইতেছে; অর্থাৎ লোকের পঞ্চনখ জন্তুর মাংসভক্ষণে প্রবৃত্তি হইলে, শশ প্রভৃতি পঞ্চ ব্যতিরিক্ত পঞ্চনথ জন্তুর মাংসভক্ষণ করিতে পারিবেক না; শশ প্রভৃতি পঞ্চানখ জন্তুর মাংসভক্ষণও লোকের সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন; ইচ্ছা হয় ভক্ষণ করিবেক, ইচ্ছা না হয় ভক্ষণ করিবেক না। সেইরূপ, যদৃচ্ছাক্রমে অধিক বিবাহে উদ্যত পুৰুষ সবর্ণা অসবর্ণা উভয়বিধ স্ত্রীরই পাণিগ্রহণ করিতে পারিত; কিন্তু, যদৃচ্ছাক্রমে বিবাহে প্রবৃত্তি হইলে অসবর্ণাবিবাহ করিবেক, এই বিধি প্রদর্শিত হওয়াতে, যদৃচ্ছাস্থলে অসবর্ণাব্যতিরিক্তস্ত্রীবিবাহনিষেধ সিদ্ধ হইতেছে। অসবর্ণাবিবাহও লোকের ইচ্ছাধীন, ইচ্ছা হয় তাদৃশ বিবাহ করিবেক, ইচ্ছা না হয় করিবেক না; কিন্তু যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত হইয়া বিবাহ করিতে হইলে, অসবর্ণাব্যতিরিক্ত বিবাহ করিতে পারিবেক না, ইহাই বিবাহবিষয়ক চতুর্থ বিধির উদ্দেশ্য। এই বিবাহবিধিকে অপূর্ব্ববিধি বলা যাইতে পারে না; কারণ, ঈদৃশ বিবাহ লোকের ইচ্ছাবশতঃ প্রাপ্ত হইতেছে; যাহা কোনও রূপে প্রাপ্ত নহে, তদ্বিষয়ক বিধিকেই অপূৰ্ববিধি বলে। এই বিবাহবিধিকে নিয়মবিধি বলা যাইতে পারে না; কারণ, ইহা দ্বারা অসবর্ণাবিবাহ অবশ্যকর্ত্তব্য বলিয়া নিয়মবদ্ধ হইতেছে না। সুতরাং, এই বিবাহবিধিকে অগত্যা পরিসংখ্যাবিধি বলিয়া অঙ্গীকার করিতে হইবেক।

বিবাহবিষয়ক বিধিচতুষ্টয়ের স্থূল তাৎপর্য্য এই, প্রথম বিধি অনুসারে গৃহস্থ ব্যক্তির সবর্ণাবিবাহ অবশ্য কর্তব্য; গৃহস্থ অবস্থায় স্ত্রীবিয়োগ হইলে, দ্বিতীয় বিধি অনুসারে সবর্ণাবিবাহ অবশ্য কর্তব্য; স্ত্রী বন্ধ্যা প্রভৃতি স্থির হইবে, তৃতীয় বিধি অনুসারে সবর্ণাবিবাহ অবশ্য কর্তব্য; সবর্ণাবিবাহ করিয়া যদৃচ্ছাক্রমে বিবাহপ্রবৃত্ত হইলে, ইচ্ছা হয় চতুর্থ বিধি অনুসারে অসবর্ণা বিবাহ করিবেক, অসবর্ণাব্যতিরিক্ত বিবাহ করিতে পারিবেক না। কলিযুগে অসবর্ণাবিবাহব্যবহার রহিত হইয়াছে, সুতরাং যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত বিবাহের আর স্থল নাই।

এক্ষণে ইহা বিলক্ষণ প্রতিপন্ন হইতেছে যে ইদানীন্তন যদৃচ্ছা প্রবৃত্ত বহুবিবাহকাণ্ড কেবল শাস্ত্রকারদিগের অনুমোদিত নয় এরূপ নহে, উহা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হইতেছে। সুতরাং যাঁহারা যদৃচ্ছাক্রমে বহু বিবাহ করিতেছেন, তাঁহারা নিষিদ্ধ কর্ম্মের অনুষ্ঠানজন্য পাতকগ্রস্ত হইতেছেন। যাজ্ঞবল্ক্য কহিয়াছেন,

বিহিতস্যাননুষ্ঠানান্নিন্দিতস্য চ সেবনাৎ।

অনিগ্রহাচ্চেন্দ্রিয়াণাং নরঃ পতনমূচ্ছতি॥৩।২১৯।

বিহিত বিষয়ের অবহেলন ও নিষিদ্ধ বিষয়ের অনুষ্ঠান করিলে, এবং ইন্দ্রিয়বশীকরণ করিতে না পারিলে, মনুষ্য পাতকগ্রস্ত হয়।

কোনও কোনও মুনিবচনে এক ব্যক্তির অনেক স্ত্রী বিদ্যমান থাকা নির্দিষ্ট আছে, তদ্দর্শনে কেহ কেহ কহিয়া থাকেন, যখন শাস্ত্রে এক ব্যক্তির যুগপৎ বহু স্ত্রী বিদ্যমান থাকার স্পষ্ট উল্লেখ দৃষ্টিগোচর হইতেছে, তখন যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত বহু বিবাহ শাস্ত্রকাৱদিগের অনুমোদিত কার্য্য নহে, ইহা কি রূপে পরিগৃহীত হইতে পারে। তাঁহাদের অভিপ্রেত শাস্ত্র সকল এই,—

১। সবর্ণা বহুভার্য্যাসু বিদ্যমানাসু জ্যেষ্ঠয়া সহ ধর্ম্মকার্য্যং কারয়েৎ।

সজাতীয়া বহু ভার্য্যা বিদ্যমান থাকিলে জ্যেষ্ঠার সহিত-ধর্ম্ম-কার্য্যের অনুষ্ঠান করিবেক।

২। সর্ব্বাসামেকপত্নীমেকা চেৎ পুত্রিণী ভবেৎ।

সর্বাস্তানস্তেন পুত্রেণ প্রাহ পুত্রবতীর্মনুঃ॥৯।১৮৩

মনু কহিয়াছেন, সপত্নীদের মধ্যে যদি কেহ পুত্রবতী হয়, সেই সপত্নীপুত্র দ্বারা তাহারা সকলেই পুত্রবতী গণ্য হইবেক।

৩। ত্রিবিবাহং কৃতং যেন ন করোতি চতুর্থকম্।

কুলানি পাতয়েৎ সপ্ত ভ্রূণহত্যাব্রতং চরেৎ॥

যে ব্যক্তি তিন বিবাহ করিয়া চতুর্থ বিবাহ না করে, সে সাত কুল পাতিত করে, তাহার ভ্রূণহত্যা প্রায়শ্চিত্ত করা আবশ্যক।

এই সকল বচনে এরূপ কিছুই নির্দিষ্ট নাই যে তদ্দারা শাস্ত্রোক্ত নিমিত্ত ব্যতিরেকে পুরুষের ইচ্ছাধীন বহু বিবাহ প্রতিপন্ন হইতে প্রথম বচনে এক ব্যক্তির বহু ভার্য্যা বিদ্যমান থাকার উল্লেখ আছে; কিন্তু ঐ বহুভার্য্যাবিবাহ অধিবেদনের নির্দিষ্ট নিমিত্ত নিবন্ধন নহে, তাহার কোনও হেতু লক্ষিত হইতেছে না। দ্বিতীয় বচনে যে বহু বিবাহের উল্লেখ আছে, তাহা যে কেবল পূর্ব্ব পূর্ব্ব স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব নিবন্ধন ঘটিয়াছিল, তাহা স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে, কারণ, ঐ বচনে পুত্রহীন। সপত্নীদিগের বিষয়ে ব্যবস্থা প্রদত্ত হইয়াছে। তৃতীয় বচনে তিন বিবাহের পর বিবাহান্তরের অবশ্যকর্ত্তব্যতানির্দেশ আছে। কিন্তু এই বচন বহুবিবাহবিষয়ক নহে। ইহার স্থল এই,— যে ব্যক্তির ক্রমে দুই স্ত্রী গত হইয়াছে, সে পুনরায় বিবাহ করিলে, তাহার তিন বিবাহ হয়; চতুর্থ বিবাহ না করিলে, তাহার প্রত্যয় ঘটে। এই প্রত্যয়ের পরিহারার্থে ইদানীং এক আচার প্রচলিত হইয়াছে। সে আচার এই, বিবাহার্থী ব্যক্তি, প্রথমতঃ এক ফুল গাছকে স্ত্রী কল্পনা করিয়া, উহার সহিত তৃতীয় বিবাহ সম্পন্ন করে; তৎপরে যে বিবাহ হয়, তাহা চতুর্থ বিবাহস্থলে পরিগৃহীত হইয়া থাকে। এইরূপ তিন বিবাহ ও চারি বিবাহই এই বচনের উদ্দেশ্য। কেহ কেহ এই ব্যবস্থা করেন, যেখানে তিন স্ত্রী বর্ত্তমান আছে, সেই স্থলে এই বচন খাটিবেক। যদি এই ব্যবস্থা আদরণীয় হয়, তাহা হইলে বর্ত্তমান তিন স্ত্রীর বিবাহ অধিবেদনের নির্দিষ্ট নিমিত্ত নিবন্ধন, আর চতুর্থ বিবাহ এতদচনোক্তদোষপরিহারস্বরূপ নিমিত্ত নিবন্ধন বলিতে হইবেক। অর্থাৎ, প্রথমতঃ স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব প্রভৃতি নিমিত্ত বশতঃ ক্রমে ক্রমে তিন বিবাহ ঘটিয়াছে; পরে, তিন স্ত্রী বিদ্যমান থাকিলে, এই বচনে যে চতুর্থ বিবাহের অবশ্যকর্ত্তব্য নির্দেশ আছে, তদনুসারে পুনরায় বিবাহ করা আবশ্যক হইতেছে। মনু- বচনে অধিবেদনের যে সমস্ত নিমিত্ত নির্দিষ্ট আছে, এতদ্বচনোক্তদোষ- পরিহার তদতিরিক্ত নিমিত্তান্তর বলিয়া পরিগণিত হইবেক। ফল কথা এই, যখন শাস্ত্রকারের কাম্যবিবাহস্থলে কেবল অসবর্ণা বিবাহের বিধি দিয়াছেন, যখন ঐ বিধি দ্বারা পূর্ব্বপরিণীতা স্ত্রীর জীবদ্দশায় যদৃচ্ছা- ক্রমে সবর্ণাবিবাহ করা সর্ব্বতোভাবে নিষিদ্ধ হইয়াছে, যখন উল্লিখিত বহুবিবাহ সকল অধিবেদনের নির্দিষ্ট নিমিত্তবশতঃ ঘটা সম্পূর্ণ সম্ভব হইতেছে, তখন যদৃচ্ছাক্রমে যত ইচ্ছা বিবাহ করা শাস্ত্রকারদিগের অনুমোদিত কার্য্য, ইহা কোনও মতে প্রতিপন্ন হইতে পারে না।

কেহ কেহ কহিয়া থাকেন, যখন পুরাণে ও ইতিহাসে- কোনও কোনও রাজার যুগপৎ বহু স্ত্রী বিদ্যমান থাকার নিদর্শন পাওয়া যাইতেছে, তখন পুরুষের বহু বিবাহ শাস্ত্রানুমত কর্ম্ম নহে, ইহা কিরূপে অঙ্গীকৃত হইতে পারে। ইহা যথার্থ বটে, পূর্ব্বকালীন কোনও কোনও রাজার বহু বিবাহের পরিচয় পাওয়া যায়; কিন্তু, সে সকল বিবাহ যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত বিবাহ নহে। রামায়ণে উল্লিখিত আছে, রাজা দশরথের অনেক মহিলা ছিল। কিন্তু তিনি যে যদৃচ্ছাক্রমে সেই সমস্ত বিবাহ করিয়াছিলেন, কোনও ক্রমে এরূপ প্রতীতি জন্মে না। রামায়ণে যেরূপ নির্দিষ্ট আছে, তদনুসারে তিনি বৃদ্ধ বয়স পর্য্যন্ত পুত্র- মুখ নিরীক্ষণে অধিকারী হয়েন নাই। ইহা নিশ্চিত বোধ হইতেছে, তাঁহার প্রথমপরিণীতা স্ত্রী বন্ধ্যা বলিয়া পরিগণিত হইলে, তিনি দ্বিতীয় বার বিবাহ করেন; এবং সে স্ত্রীও পুত্র প্রসব না করাতে, তাঁহারও বন্ধ্যাত্ব বোধে, রাজা পুনরায় বিবাহ করিয়াছিলেন। এইরূপে ক্রমে ক্রমে তাঁহার অনেক বিবাহ ঘটে। অবশেষে, চরম বয়সে, কৌশল্যা, কেকয়ী, সুমিত্রা, এই তিন মহিষীর গর্ভে তাঁহার চারি সন্তান জন্মে। সুতরাং, রাজা দশরথের বহু বিবাহ পূর্ব্ব পূর্ব্ব স্ত্রীর বন্ধ্যাত্বশঙ্কা নিবন্ধন ঘটিয়াছিল, স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে। দশরথ যে কারণে বহু বিবাহ করিয়াছিলেন, অন্যান্য রাজারও সেই কারণে, অথবা শাস্ত্রোক্ত অন্য কোনও নিমিত্তবশতঃ, একাধিক বিবাহ করেন, তাহার সংশয় নাই। তবে, ইহাও লক্ষিত হইতে পারে, কোনও কোনও রাজা, যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত হইয়া, বহু বিবাহ করিয়াছিলেন। কিন্তু, সেই দৃষ্টান্ত দর্শনে বহুবিবাহকাণ্ড শাস্ত্রানুমত ব্যাপার বলিয়া প্রতিপন্ন হইতে পারে না। রাজার আচার সর্ব্বসাধারণ লোকের পক্ষে আদর্শস্বরূপে পরিগৃহীত হওয়া উচিত নহে। ভারতবর্ষীয় রাজাৱা স্ব স্ব অধিকারে এক প্রকার সর্ব্বশক্তিমান্ ছিলেন। প্রজারা ধর্ম্মশাস্ত্রের ব্যবস্থা অতিক্রম করিয়া চলিলে, রাজা দণ্ডবিধানপূর্ব্বক তাহাদিগকে ন্যায়পথে অবস্থাপিত করিতেন। কিন্তু, রাজারা উৎপথপ্রতিপন্ন হইলে, তাঁহাদিগকে ন্যায়পথে প্রবর্ত্তিত করিবার লোক ছিল না। বস্তুতঃ, রাজারা সর্ব্ব বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রেচ্ছ ছিলেন। সুতরাং, যদি কোনও রাজা, উচ্ছৃঙ্খল হইয়া, শাস্ত্রোক্ত নিমিত্ত ব্যতিরেকে, যদৃচ্ছাক্রমে বহু বিবাহ করিয়া থাকেন, সর্ব্বসাধারণ লোকে, সেই দৃষ্টান্তের অনুবর্ত্তী ছইয়া, বহু বিবাহ করিলে, তাহা কোনও ক্রমে বৈধ বলিয়া প্রতিপন্ন হইতে পারে না। মনু কছিরছেন,—

সোহগ্নির্ভবতি বায়ুশ্চ সোহর্কঃ সোমঃ স ধর্ম্মরাট্।

স কুবেরঃ স বরুণঃ স মহেন্দ্রঃ প্রভাবতঃ॥ ৭।৭।

বালোহপি নাবমন্তব্যো মনুষ্য ইতি ভূমিপঃ।

মহতী দেবতা হ্যেষা নররূপেণ তিষ্ঠতি॥ ৭।৮।

রাজা প্রভাবে সাক্ষাৎ, অগ্নি, বায়ু, সূর্য্য, চন্দ্র, যম, কুবের, বরুণ, ইন্দ্র। রাজা বালক হইলেও, তাঁহাকে সামান্য মনুষ্য জ্ঞান করা উচিত নহে। তিনি নিঃসন্দেহ মহতী দেবতা, নররূপে বিরাজ করিতেছেন।

রাজা প্রাকৃত মনুষ্য নহেন; শাস্ত্রকারেরা তাঁহাকে মহতী দেবতা বলিয়া গণ্য করিয়াছেন। অতএব, যেমন দেবতার চরিত্র মনুষ্যের অনুকরণীয় নহে; সেইরূপ, রাজার চরিত্রও মনুষ্যের পক্ষে অনুকরণীয় হইতে পারে না। এই নিমিত্ত, যাহা সর্ব্বসাধারণ লোকের পক্ষে সর্ব্বথা অবৈধ, তেজীয়ানের পক্ষে তাহা দোষাবহ নয় বলিয়া, শাস্ত্রকারেরা ব্যবস্থা দিয়াছেন।

ফলতঃ, যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত বহুবিবাহকাণ্ড যদৃচ্ছাপ্রবৃত্তব্যবহারমূলকমাত্র। এই অতিজঘন্য অতিনৃশংস ব্যাপার শাস্ত্রানুমত বা ধর্ম্মানুগত ব্যবহার নহে; এবং ইহা নিবারিত হইলে, শাস্ত্রের অবমাননা বা ধর্ম্মলোপের অণুমাত্র সম্ভাবনা নাই।

দক্ষ সংহিতা। প্রথম অধ্যায়

উদ্বাহতত্বধুত।

বেদাধ্যয়ন ও ব্রহ্মচর্য্যসমাপনের পর গৃহস্থাশ্রমপ্রবেশের পূর্ব্বে অনুষ্ঠীয়মান ক্রিয়াবিশেষ।

মনুসংহিতা।

মনুসংহিতা।

মনুসংহিতা।

যে সতত স্বামীর প্রতি দুঃশ্রব কটুক্তিপ্রয়োগ করে।

মনুসংহিত।

স্ত্রীবিয়োগরূপ নিমিত্তবশতঃ করিতে হয়, এ জন্য এই বিবাহের নৈমিত্তিকত্বও আছে।

বিনিযোগবিধিরপ্যপূর্ব্ববিধিনিয়মবিধিপরিসংখ্যাবিধিভেদাত্রিবিধঃ বিধিং বিনা কখনপি যদর্থগোচরবৃত্তির্নোপপদ্যতে অসাবপূর্ব্ববিধিঃ নিয়তপ্রবৃত্তিফলকো বিধির্নিয়মবিধিঃ স্ববিষয়াদন্যত্র প্রবৃত্তিবিরোধী বিধিঃ পরিসংখ্যাবিধিঃ তদুক্তং বিধিরতাত্তমপ্রাপ্তৌ নিয়মঃ পাক্ষিকে সতি। তত্রশ্চান্যত্র চ প্রাপ্তৌ পরিসংখ্যেতি গীয়তে। বিধিস্বরূপ।

বিষ্ণুসংহিতা। ২৬ অধ্যায়।

মনুসংহিতা।

উদ্বাহতত্ত্বধৃত।

এতদ্ববচনং বর্তমানস্মীত্রিকপরমিতি বদন্তি। উদ্বাহতত্ত্ব।

ষষ্ঠ আপত্তি

ষষ্ঠ আপত্তি।

কেহ কেহ আপত্তি করিতেছেন, এ দেশে বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত থাকাতে, অশেষবিধ অনিষ্ট ঘটিতেছে, সন্দেহ নাই; যাহাতে তাহার নিবারণ হয়, তদ্বিষয়ে সাধ্যানুসারে সকলের যথোচিত চেষ্টা করা ও যত্নবান্ হওয়া নিতান্ত উচিত ও আবশ্যক। কিন্তু, বহুবিবাহ সামাজিক দোষ; সামাজিক দোষের সংশোধন সমাজের লোকের কার্য্য; সে বিষয়ে গবর্ণমেণ্টকে হস্তক্ষেপ করিতে দেওয়া কোনও ক্রমে বিধেয় নহে।

এই আপত্তি শুনিয়া, আমি কিয়ৎক্ষণ হাস্য সংবরণ করিতে পারি নাই। সামাজিক দোষের সংশোধন সমাজের লোকের কার্য্য, এ কথা শুনিতে আপাততঃ অত্যন্ত কর্ণসুখকর। যদি এ দেশের লোক সামাজিক দোষসংশোধনে প্রবৃত্ত ও যত্নবান্ হয়, এবং অবশেষে কৃতকার্য্য হইতে পারে, তাহা অপেক্ষা সুখের, আহ্লাদের, ও সৌভাগ্যের বিষয় আর কিছুই হইতে পারে না। কিন্তু দেশস্থ লোকের প্রবৃত্তি, বুদ্ধিবৃত্তি, বিবেচনাশক্তি প্রভৃতির অশেষ প্রকারে যে পরিচয় পাওয়া গিয়াছে, এবং অদ্যাপি পাওয়া যাইতেছে, তাহাতে তাহারা সমাজের দোষ- সংশোধনে যত্ন ও চেষ্টা করিবেন, এবং সেই যত্নে ও সেই চেষ্টায় ইষ্টসিদ্ধি হইবেক, সহজে সে প্রত্যাশা করিতে পারা যায় না। ফলতঃ, কেবল আমাদের যত্ন ও চেষ্টায় সমাজের সংশোধনকার্য্য সম্পন্ন হইবেক, এখনও এ দেশের সে দিন, সে সৌভাগ্যদশা উপস্থিত হয় নাই; এবং কত কালে উপস্থিত হইবেক, দেশের বর্ত্তমান অবস্থা দেখিয়া, তাহা স্থির বলতে পারা যায় না। বোধ হয়, কখনও সে দিন ও সে সৌভাগ্যদশা উপস্থিত হইবেক না।

যাঁহারা এই আপত্তি করেন, তাঁহারা নব্য সম্প্রদায়ের লোক। নব্য সম্প্রদায়ের মধ্যে যাঁহারা অপেক্ষাকৃত বয়োবৃদ্ধ ও বহুদর্শী হইয়াছেন, তাঁহারা অর্ব্বাচীনের ন্যায়, সহসা এরূপ অসার কথা মুখ হইতে বিনির্গত করেন না। ইহা যথার্থ বটে, তাঁহারাও এক কালে অনেক বিষয়ে অনেক আস্ফালন করিতেন; সমাজের দোষসংশোধন ও সমাজের শ্রীবৃদ্ধিসাধন তাঁহাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য, এ কথা সর্ব্বক্ষণ তাঁহাদের মুখে নৃত্য করিত। কিন্তু, এ সকল পঠদ্দশার ভাব। তাঁহারা পঠদ্দশা সমাপন করিয়া বৈষয়িক ব্যাপারে প্রবৃত্ত হইলেন। ক্রমে ক্রমে, পঠদ্দশার ভাবের তিরোভাব হইতে লাগিল। অবশেষে, সামাজিক দোষের সংশোধন দূরে থাকুক, স্বয়ং সেই সমস্ত দোষে সম্পূর্ণ লিপ্ত হইয়া, সচ্ছন্দ চিত্তে কালযাপন করিতেছেন। এখন তাঁহারা বহুদর্শী হইয়াছেন; সমাজের দোষসংশোধন, সমাজের শ্রীবৃদ্ধিসাধন, এ সকল কথা, ভ্রান্তিক্রমেও, আর তাঁহাদের মুখ হইতে বহির্গত হয় না; বরং, ঐ সকল কথা শুনিলে, বা কাহাকেও ঐ সকল বিষয়ে সচেষ্ট হইতে দেখিলে, তাঁহারা হাস্য ও উপহাস করিয়া থাকেন।

এই সম্প্রদায়ের অল্পবয়স্কদিগের এক্ষণে পঠদ্দশার ভাব চলিতেছে। অল্পবয়স্কদলের মধ্যে যাঁহারা অল্প বয়সে বিদ্যালয় পরিত্যাগ করেন, তাঁহাদেরই আস্ফালন বড়। তাঁহাদের ভাবভঙ্গী দেখিয়া, অনায়াসে লোকের এই বিশ্বাস জন্মিতে পারে, তাঁহারা সমাজের দোষসংশোধনে ও শ্রীবৃদ্ধিসম্পাদনে প্রাণসমৰ্পণ করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহারা যে মুখমাত্রসার, অন্তরে সম্পূর্ণ অসার, অনায়াসে সকলে তাহা বুঝিতে পারেন না। তদৃশ ব্যক্তিরাই উন্নত ও উদ্ধত বাক্যে কহিয়া থাকেন, সমাজের দোষসংশোধন সমাজের লোকের কার্য্য, সে বিষয়ে গবর্ণমেণ্টকে হস্তক্ষেপ করইতে দেওয়া বিধেয় নহে। কিন্তু, সমাজের দোষসংশোধন কিরূপ কার্য্য, এবং কিরূপ সমাজের লোক, অন্যদীয় সাহায্য নিরপেক্ষ হইয়া, সমাজের দোষসংশোধনে সমর্থ, যাঁহাদের সে বোধ ও সে বিবেচনা আছে, তাঁহারা, এ দেশের অবস্থা দেখিয়া, কখনই সাহস করিয়া বলিতে পারেন না, আমরা কোনও কালে, কেবল আত্মযত্নে ও আত্মচেষ্টায়, সামাজিক দোষ- সংশোধনে কৃতকার্য্য হইতে পারি। আমরা অত্যন্ত কাপুরুষ, অত্যন্ত অপদার্থ; আমাদের হতভাগা সমাজ অতিকুৎসিত দোষপরম্পরায় অত্যন্ত পরিপূর্ণ। এ দিকের চন্দ্র ও দিকে গেলেও, এরূপ লোকের ক্ষমতায় এরূপ সমাজের দোসংশোধন সম্পন্ন হইবার নহে। উল্লিখিত নব্য প্রামাণিকেরা কথায় বিলক্ষণ প্রবীণ; তাঁহাদের যেরূপ বুদ্ধি, যেরূপ বিদ্যা, যেরূপ ক্ষমতা, তদপেক্ষা অনেক অধিক উচ্চ কথা কহিয়া থাকেন। কথা বলা যত সহজ, কার্য্য করা তত সহজ নহে।

আমাদের সামাজিক দোষসংশোধনে প্রবৃত্তি ও ক্ষমতা বিষয়ে দুটি উদাহরণ প্রদর্শিত হইতেছে; প্রথম, ব্রাহ্মণজাতির কন্যাবিক্রয়; দ্বিতীয়, কায়স্থজাতির পুত্রবিক্রয়। ব্রাহ্মণজাতির অধিকাংশ শ্রোত্রিয় ও অনেক বংশজ কন্যাবিক্রয় করেন; আর, সমুদায় শ্রোত্রিয় ও অধিকাংশ বংশজ কন্যাক্রয় করিয়া বিবাহ করেন। এই ক্রয়বিক্রয় শাস্ত্রানুসারে অতি গর্হিত কর্ম্ম; এবং প্রকারান্তরে বিবেচনা করিয়া দেখিলে, অতি জঘন্য ব্যবহার। অত্রি কহিয়াছেন,

ক্রয়ক্রীতা চ যা কন্যা পত্নী সা ন বিধীয়তে।

তস্যাং জাতাঃ সুতান্তেষাং পিতৃপিণ্ডং ন বিদ্যতে।

ক্রয় করিয়া যে কন্যাকে বিবাহ করে, সে পত্নী নহে; তাহার গর্ভে যে সকল পুত্র জন্মে, তাহারা পিতার পিণ্ডদানে অধিকারী নয়।

ক্রয়ক্রীতা তু যা নারী ন সা পত্ন্যভিধীয়তে।

ন সা দৈবে ন সা পৈত্র্যে দাসীং তাং কবয়ো বিদুঃ।

ক্রয় করিয়া যে নারীকে বিবাহ করে, তাহাকে পত্নী বলে না; সে দেবকার্য্যে ও পিতৃকার্য্যে বিবাহকর্ত্তার সহধর্ম্মচারিণী হইতে পারে না; পণ্ডিতেরা তাহাকে দাসী বলিয়া গণনা করেন।

বৈকুণ্ঠবাসী হরিশর্ম্মার প্রতি ব্রহ্মা কহিয়াছেন,

যঃ কন্যাবিক্রয়ং মূঢ়ো লোভাচ্চ কুরুতে দ্বিজ।

স গচ্ছেন্নরকং ঘোরং পুরীষহ্রদসংজ্ঞকম্।

বিক্রীতায়াশ্চ কন্যায়া যঃ পুত্রো জায়তে দ্বিজ।

স চাণ্ডাল ইতি জ্ঞেয়ঃ সর্ব্বধর্ম্মবহিষ্কৃতঃ।

হে দ্বিজ, যে মূঢ় লোভবশতঃ কন্যাবিক্রয় করে, সেপুরীষহ্রদ নামক ঘোর নরকে যায়। হে দ্বিজ, বিক্রীতা কন্যার যে পুত্র জন্মে, সে চণ্ডাল, তাহার কোনও ধর্ম্মে অধিকার নাই।

দেখ! কন্যাক্রয় করিয়া বিবাহকরা শাস্ত্রানুসারে কত দুষ্য। শাস্ত্রকারেরা তাদৃশ স্ত্রীকে পত্নী বলিয়া, ও তাদৃশ স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানকে পুত্র বলিয়া, অঙ্গীকার করেন না; তাঁহাদের মতে তাদৃশ স্ত্রী দাসী; তাদৃশ পুত্র সর্ব্বধর্ম্মবহিষ্কৃত চণ্ডাল। সস্ত্রীক হইয়া ধর্ম্মকার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে হয়। কিন্তু, শাস্ত্রানুসারে তাদৃশ স্ত্রী ধর্ম্মকার্য্যে স্বামীর সহচারিণী হইতে পারে না। পিণ্ডপ্রত্যাশায় লোকে পুত্রপ্রার্থনা করে। কিন্তু, শাস্ত্রানুসারে তাদৃশ পুত্র পিতার পিণ্ডদানে অধিকারী নহে। আর, যে ব্যক্তি অর্থলোভে কন্যাবিক্রয় করে, সে চিরকালের জন্য নরকগামী হয়।

অর্থলোভে কন্যাবিক্রয় ও কন্যাক্রয় করিয়া বিবাহকরা অতি জঘন্য ব্যবহার, ইহা সকলেই স্বীকার করিয়া থাকেন; যাঁহারা কন্যা বিক্রয় করেন, এবং যাঁহারা, কন্যা ক্রয় করিয়া, বিবাহ করেন, তাঁহারাও, সময়ে সময়ে, এই ক্রয়বিক্রয় ব্যবসায়কে অতি গর্হিত বলিয়া কীর্ত্তন করিয়া থাকেন। এই ব্যবহার, যার পর নাই, অধর্ম্মকর ও অনিষ্টকর, তাহাও সকলের বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম হইয়া আছে। যদি আমাদের সামাজিক দোষসংশোধনে প্রবৃত্তি ও ক্ষমতা থাকিত, তাহা হইলে, এই কুৎসিত কাণ্ড এত দিন এ প্রদেশে প্রচলিত থাকিত না।

ব্রাহ্মণজাতির কন্যাবিক্রয় ব্যবসায় অপেক্ষা, কায়স্থজাতির পুত্রবিক্রয় ব্যবসায় আরও ভয়ানক ব্যাপার। মধ্যবিধ ও হীনাবস্থ কায়স্থজাতির কন্যা হইলেই সর্ব্বনাশ। কন্যার যত বয়োবৃদ্ধি হয়, পিতার সর্ব্বশরীরের শোণিত শুষ্ক হইতে থাকে। যার কন্যা, তার সর্ব্বনাশ; যার পুত্র, তার পৌষমাস। বিবাহের সম্বন্ধ উপস্থিত হইলে, পুত্রবান্ ব্যক্তি অলঙ্কার, দানসামগ্রী প্রভৃতি উপলক্ষে পুত্রের এত মূল্য প্রার্থনা করেন, যে মধ্যবিধ ও হীনাবস্থ কায়স্থের পক্ষে কন্যাদায় হইতে উদ্ধার হওয়া দুর্ঘট হয়। এ বিষয়ে বরপক্ষ এরূপ নির্লজ্জ ও নৃশংস ব্যবহার করেন, যে তাঁহাদের উপর অত্যন্তু অশ্রদ্ধা জন্মে। কৌতুকের বিষয় এই, কন্যার বিবাহদিবার সময় যাঁহারা শশব্যস্ত ও বিপদ্গ্রস্ত হন; পুত্রের বিবাহদিবার সময়, তাঁহাদেরই আর একপ্রকার ভাবভঙ্গী হয়। এইরূপে, কায়স্থের কন্যার বিবাহের সময় মহাবিপদ, ও পুত্রের বিবাহের সময় মহোৎসব, জ্ঞান করেন। পুত্রবিক্রয় ব্যবসায় যে অতি কুৎসিত কর্ম্ম, তাহা কায়স্থমাত্রে স্বীকার করিয়া থাকেন। কিন্তু আপনার পুত্রের বিবাহের সময়, সে বোধও থাকে না, সে বিবেচনাও থাকে না। আশ্চর্য্যের বিষয় এই, যাঁহারা নিজে সুশিক্ষিত ও পুত্রকে সুশিক্ষিত করিতেছেন, এ ব্যবসায়ে তাঁহারাও নিতান্ত অল্প নির্দ্দয় নহেন। যে বালক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায়উত্তীর্ণ হইয়াছে; তাহার মূল্য অনেক; যে তদপেক্ষা উচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছে, তাহার মূল্য তদপেক্ষা অনেক অধিক; যাহারা তদপেক্ষাও অধিকবিদ্য হইয়াছে, তাহাদের সহিত কন্যার বিবাহ প্রস্তাব করা অনেকের পক্ষে অসংসাহসিক ব্যাপার। আর, যদি তদুপরি ইষ্টকনির্ম্মিত বাসস্থান ও গ্রাসাচ্ছাদনের সমাবেশ থাকে, তাহা হইলে, সর্ব্বনাশের ব্যাপার। বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন না হইলে, তাদৃশ স্থলে বিবাহের কথা উত্থাপনে অধিকারী হয় না। অধিক আশ্চর্য্যের বিষয় এই, পল্লীগ্রাম অপেক্ষা কলিকাতায় এই ব্যবসায়ের বিষম প্রাদুর্ভাব। সর্ব্বাপেক্ষা আশ্চর্য্যের বিষয় এই, ব্রাহ্মণজাতির কন্যার মূল্য ক্রমে অল্প হইয়া আসিতেছে, কায়স্থজাতির পুত্রের মূল্য উত্তরোত্তর অধিক হইয়া উঠিতেছে। যদি বাজার এইরূপ থাকে, অথবা আরও গরম হইয়া উঠে; তাহা হইলে, মধ্যবিধ ও হীনাবস্থ কায়স্থপরিবারের অনেক কন্যাকে, ব্রাহ্মণজাতীয় কুলীনকন্যার ন্যায়, অবিবাহিত অবস্থায় কালযাপন করিতে হইবে।

যেরূপ দেখিতে ও শুনিতে পাওয়া যায়, কায়স্থমাত্রে এ বিষয়ে বিলক্ষণ জ্বালাতন হইয়াছেন। ইহা যে অতি লজ্জাকর ও ঘৃণাকর ব্যবহার, সে বিষয়ে মতভেদ দেখিতে পাওয়া যায় না। কায়স্থজাতি, একবাক্য হইয়া, যে বিষয়ে ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রদর্শন করিতেছেন, তাহা অদ্যাপি প্রচলিত আছে কেন। যদি এ দেশের লোকের সামাজিক দোষসংশোধনে প্রবৃত্তি ও ক্ষমতা থাকিত, তাহা হইলে, কায়স্থজাতির পুত্রবিক্রয় ব্যবহার বহু দিন পূর্ব্বে রহিত হইয়া যাইত।

এ দেশের হিন্দুসমাজ-ঈদৃশ দোষপরম্পরায় পরিপূর্ণ। পূর্ব্বোক্ত নব্যপ্রামাণিকদিগকে জিজ্ঞাসা করি, এপর্য্যন্ত, তাঁহারা তন্মধ্যে কোন কোন দোষের সংশোধনে কত দিন কিরূপ যত্ন ও চেষ্টা করিয়াছেন; এবং তাঁহাদের যত্নে ও চেষ্টায় কোন কোন দোষের সংশোধন হইয়াছে; এক্ষণেই বা তাঁহারা কোন কোন দোষের সংশোধনে চেস্টা ও যত্ন করিতেছেন।

বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত থাকাতে, অশেষপ্রকারে হিন্দুসমাজের অনিষ্ট ঘটিতেছে। সহস্র সহস্র বিবাহিতা নারী, যার পর নাই, যন্ত্রণাভোগ করিতেছেন। ব্যভিচারদোষের ও ভ্রূণহত্যাপাপের স্রোত প্রবলবেগে প্রবাহিত হইতেছে। দেশের লোকের যত্নে ও চেষ্টায় ইহার প্রতিকার হওয়া কোনও মতে সম্ভাবিত নহে। সম্ভাবনা থাকিলে, তদর্থে রাজদ্বারে আবেদন করিবার কিছুমাত্র প্রয়োজন থাকিত না। এক্ষণে, বহুবিবাহ প্রথা রহিত হওয়া আবশ্যক, এই বিবেচনায়, রাজদ্বারে আবেদন করা উচিত; অথবা এরূপ বিষয়ে রাজদ্বারে আবেদন করা ভাল নয়, অতএব তাহা প্রচলিত থাকুক, এই বিবেচনায়, ক্ষান্ত থাকা উচিত। এই জঘন্য ও নৃশংস প্রথা প্রচলিত থাকাতে, সমাজে যে গরীয়সী অনিষ্টপরম্পরা ঘটিতেছে, যাহারা তাহা অহরই প্রত্যক্ষ করিতেছেন, এবং তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া, যাহাদের অন্তঃকরণ দুঃখনলে দগ্ধ হইতেছে, তাহাদের বিবেচনায়, যে উপায়ে হউক, এই প্রথা রহিত হইলেই, সমাজের মঙ্গল। বস্তুতঃ, রাজশাসন দ্বারা এই নৃশংস প্রথার উচ্ছেদ হইলে, সমাজের মঙ্গল ভিন্ন অমঙ্গল ঘটিবেক, তাহার কোনও হেতু বা সম্ভাবনা দেখিতে পাওয়া যায় না। আর, যাহারা তদর্থেরাজদ্বারে আবেদন করিয়াছেন, তাঁহাদের যে কোনও প্রকারে অন্যায় বা অবিবেচনার কর্ম্ম করা হইয়াছে, তর্ক দ্বারা তাহা প্রতিপন্ন করাও নিভান্ত সহজ বোধ হয় না। আমাদের ক্ষমতা গবর্ণমেণ্টের হস্তে দেওয়া উচিত নয়, এ কথা বলা বালকতা প্রদর্শন মাত্র। আমাদের ক্ষমতা কোথায়। ক্ষমতা থাকিলে, ঈদৃশ বিষয়ে গবর্ণমেণ্টের নিকটে যাওয়া কদাচ উচিত ও আবশ্যক হইত না; আমরা নিজেই সমাজের সংশোধনকার্য্য সম্পন্ন করিতে পারিতাম। ইচ্ছা নাই, চেষ্টা নাই, ক্ষমতা নাই, সুতরাং সমাজের দোষসংশোধন করিতে পারিবেন না; কিন্তু তদর্থে রাজদ্বারে আবেদন করিলে অপমানবোধ বা সর্ব্বনাশজ্ঞান করিবেন, এরূপ লোকের সংখ্যা, বোধ করি, অধিক নহে; এবং অধিক না হইলেই, দেশের ও সমাজের মঙ্গল।

অত্রিসংহিতা।

দত্তকমীমাংসাধৃত।

ক্রিয়াযোগসার। উনবিংশ অধ্যায়।

সপ্তম আপত্তি

সপ্তম আপত্তি।

কেহ কেহ আপত্তি করিতেছেন, ভারতবর্ষের সর্ব্বপ্রদেশেই, হিন্দু মুসলমান উভয়বিধ সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যে, বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত আছে। তন্মধ্যে, কেবল বাঙ্গালাদেশের হিন্দুসম্প্রদায়ের লোক, ঐ প্রথা রহিত করিবার নিমিত্ত, আবেদন করিয়াছেন। বাঙ্গলাদেশ ভারতবর্ষের এক অংশ মাত্র। এক অংশের এক সম্প্রদায়ের লোকের অনুরোধে, ভারতবর্ষীয় যাবতীয় প্রজাকে অসন্তুষ্ট করা গবর্ণমেণ্টের উচিত নহে।

এই আপত্তি কোনও ক্রমে যুক্তিযুক্ত বোধ হইতেছে না। বহুবিবাহ- প্রথা প্রচলিত থাকাতে, বাঙ্গলাদেশে হিন্দুসম্প্রদায়ের মধ্যে যত দোষ ও যত অনিষ্ট ঘটিতেছে; বোধ হয়, ভারতবর্ষের অন্য অন্য অংশে তত নহে, এবং বাঙ্গালাদেশের মুসলমানসম্প্রদায়ের মধ্যেও, সেরূপ দোষ বা সেরূপ অনিষ্ট শুনতে পাওয়া যায় না। সে যাহা হউক, যাঁহারা আবেদন করিয়াছেন, বাঙ্গলাদেশে হিন্দুসম্প্রদায়ের মধ্যে বহুবিবাহনিবন্ধন যে অনিষ্ট সংঘটন হইতেছে, তাহার নিবারণ হয়, এই তাঁহাদের উদ্দেশ্য, এই তাঁহাদের প্রার্থনা। এ দেশের মুসলমানসম্প্রদায়ের লোকে বহু বিবাহ করিয়া থাকেন; তাঁহারা চিরকাল সেরূপ করুন; তাহাতে আবেদনকারীদিগের কোনও আপত্তি নাই, এবং তাহাদের এরূপ ইচ্ছাও নহে, এবং প্রার্থনাও নহে, যে গবর্ণমেণ্ট এই উপলক্ষে তাঁহাদেরও বহুবিবাহের পথ রুদ্ধ করিয়া দেন। অথবা, গবর্ণমেণ্ট এক উদ্যমে ভারতবর্ষের সর্ব্বসাধারণ লোকের পক্ষে বিবাহবিষয়ে ব্যবস্থা করুন, ইহাও তাঁহাদের অভিপ্রেত নহে। বহুবিবাহসূত্রে স্বদেশের যে মহতী দুরবস্থা ঘটিয়াছে, তদ্দর্শনে তাঁহারা দুঃখিত হইয়াছেন, এবং সেই দুরবস্থা বিমোচনের উপায়ান্তর না দেখিয়া, রাজদ্বারে আবেদন করিয়াছেন। স্বদেশের ও স্বসম্প্রদায়ের দুরবস্থা বিমোচন মাত্র তাঁহাদের উদ্দেশ্য। যদি গবর্ণমেণ্ট সদয় হইয়া তাঁহাদের আবেদন গ্রাহ্য করিয়া, এ দেশের হিন্দুসম্প্রদায়ের বিবাহবিষয়ে কোনও ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ করেন, তাহাতে এ প্রদেশের মুসলমানসম্প্রদায়, অথবা ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়, অসন্তুষ্ট হইবেন কেন। এ দেশের হিন্দুসম্প্রদায় গবর্ণমেণ্টের প্রজা। তাহাদের সমাজে কোনও বিষয় নিরতিশয় ক্লেশকর হইয়া উঠিয়াছে। তাঁহাদের যত্নে ও ক্ষমতায় সে ক্লেশের নিবারণ হইতে পারে না। অথচ সে ক্লেশের নিবারণ হওয়া নিতান্ত আবশ্যক। প্রজারা, নিরুপায় হইয়া, রাজার আশ্রয়গ্রহণপূর্বক সহায়তা প্রার্থনা করিয়াছে। এমন স্থলে, প্রজার প্রার্থনা পরিপূরণকরা রাজার অবশ্যকর্ত্তব্য। এক প্রদেশের প্রজাবর্গের প্রার্থনা অনুসারে, তাহদের হিতার্থে কেবল সেই প্রদেশের জন্য, কোনও ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ করিলে, হয়ত প্রদেশান্তরীয় প্রজারা অসন্তুষ্ট হইবেক, এই আশঙ্কা করিয়া তদ্বিষয়ে বৈমুখ্য অবলম্বন করা রাজধর্ম্ম নহে।

এরূপ প্রবাদ আছে, ভারতবর্ষের ভূতপূর্ব গবর্ণর জেনেরেল মহাত্মা লার্ড বেণ্টিক, অতি নৃশংস সহগমনপ্রথা রহিত করিবার নিমিত্ত, কৃভসঙ্কল্প হইয়া, প্রধান প্রধান রাজপুরুষদিগকে পরামর্শ জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন। তাঁহারা সকলেই স্পষ্ট বাক্যে কহিয়াছিলেন, এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিলে, ভারতবর্ষের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যস্ত, যাবতীয় লোক যৎপরোনাস্তি অসন্তুষ্ট হইবেক, অবিলম্বে রাজবিদ্রোহে অভুথান করবেক। মহামতি মহাসত্ত্ব গবর্নর জেনেরেল, এই সকল কথা শুনিয়া, ভীত বা হতোৎসাহ না হইয়া কহিলেন, যদি এই প্রথা রহিত করিয়া এক দিন আমাদের রাজ্য থাকে, তোহা হইলেও ইরেজজাতির নামের,যথার্থ গেরিব ও রাজ্যাধিকারের সম্পূর্ণ সার্থকতা হইবেক। তিনি, প্রজার দুঃখদর্শনে দয়ার্দ্রচিত্ত ও স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া, এই মহাকার্য্য সম্পন্ন করিয়াছিলেন। এক্ষণেও আমরা সেই ইঙ্গরেজজাতির অধিকারে বাস করিতেছি; কিন্তু অবস্থার কত পরিবর্ত্ত হইয়াছে। যে ইঙ্গৱেজজাতি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া, রাজ্য- ভ্রংশভয় অগ্রাহ্য করিয়া, প্রজার দুঃখ বিমোচন করিয়াছেন। এক্ষণে স্বতঃপ্রবৃত্ত হওয়া দূরে থাকুক, প্রজারা বারংবার প্রার্থনা করিয়াও কৃতকার্য্য হইতে পারে না। হায়!

"তে কেহ পি দিবসা গতাঃ”।

সে এক দিন গিয়াছে।

যাহা হউক, আবেদনকারীদের অভিমত ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ করিলে, গবর্ণমেণ্ট এতদ্দেশীয় মুসলমান বা অন্যান্য প্রদেশীয় হিন্দু মুসলমান উভয়বিধ প্রজাবর্গের নিকট অপরাধী হইবেন, অথবা তাহারা অসন্তুষ্ট হইবেক, এই ভয়ে অভিভূত হইয়া প্রার্থিত বিষয়ে বৈমুখ অবলম্বন করিবেন, এ কথা কোনও মতে শ্রদ্ধেয় হইতে পারে না। ইঙ্গরেজজাতি তত নির্ব্বোধ, তত অপদার্থ ও তত কাপুরুষ নহেন। যেরূপ শুনিতে পাই, তাঁহারা রাজ্যভোগের লোভে আকৃষ্ট হইয়া, এ দেশে অধিকার বিস্তার করেন নাই; সর্ব্বাংশে এ দেশের শ্রীবৃদ্ধিসাধনই তাঁহাদের রাজ্যাধিকারের একমাত্র উদ্দেশ্য।

এ স্থলে, একটি কুলীমহিলার আক্ষেপোক্তির উল্লেখ না করিয়া, ক্ষান্ত থাকিতে পারিলাম না। ঐ কুলীনমহিলা ও তাঁহার কনিষ্ঠা ভগিনীর সহিত সাক্ষাৎ হইলে, জ্যেষ্ঠা জিজ্ঞাসা করিলেন, আবার না কি বহুবিবাহনিবারণের চেষ্টা হইতেছে। আমি কহিলাম, কেবল চেষ্টা নয়, যদি তোমাদের কপালের জোর থাকে, আমরা এ বারে কত কার্য্য হইতে পারি। তিনি কহিলেন, যদি আর কোনও জোর না থাকে, তবে তোমরা কৃতকার্য্য হইতে পারিবে না; কুলীনের মেয়ের নিতান্ত পোড়া কপাল; সেই পোড়া কপালের জোরে গত হবে, তা আমরা বিলক্ষণ জানি। এই বলিয়া, মৌনবলম্বনপূর্ব্বক, কিরৎক্ষণ ক্রোড়স্থিত শিশু কন্যাটির মুখ নিরীক্ষণ করিলেন; অনন্তর, সজলনয়নে আমার দিকে চাহিয়া কহিলেন, বহুবিবাহ নিবারণ হইলে, আমাদের আর কোনও লাভ নাই আমরা এখনও যে সুখভোগ করিতেছি, তখনও সেই সুখভোগ করিব। তবে যে হতভাগীরা আমাদের গর্ভে জন্মগ্রহণ করে, যদি তাহারা আমাদের মত চিরদুঃখিনী না হয়, তাহা হইলেও আমাদের অনেক দুঃখ নিবারণ হয়। কিঞ্চিৎকাল, এইরূপ আক্ষেপ করিয়া, সেই কুলীনমহিলা কহিলেন, সকলে বলে, এক স্ত্রীলোক আমাদের দেশের রাজা; কিন্তু আমরা সে কথায় বিশ্বাস করি না; স্ত্রীলোকের রাজ্যে স্ত্রীজাতির এত দুরবস্থা হইবে কেন। এই কথা বলিবার সময়, তাঁহার ম্লান বদনে বিষাদ ও নৈরাশ্য এরূপ সুস্পষ্ট ব্যক্ত হইতে লাগিল যে আমি দেখিয়া, শোকাভিভূত হইয়া, অশ্রু বিসৰ্জন করিতে লাগিলাম।

হা বিধাতঃ! তুমি কি কুলীনকন্যাদের কপালে, নিরবচ্ছিন্ন ক্লেশ- ভোগ ভিন্ন, আর কিছুই লিখিতে শিখ নাই। উল্লিখিত আক্ষেপবাক্য আমাদের অধীশ্বরী করুণাময়ী ইংলণ্ডেশ্বরীর কর্ণগোচর হইলে, তিনি সাতিশয় লজ্জিত ও নিরতিশয় দুঃখিত হন, সন্দেহ নাই।

এই দুই কুলীনমহিলার সংক্ষিপ্ত পরিচয় এই —ইঁহারা দুপুরুষিয়া ভঙ্গকুলীনের কন্যা এবং স্বকৃতভঙ্গ কুলীনের বনিতা। জ্যেষ্ঠার বয়ঃক্রম ১১।১২ বৎসর, কনিষ্ঠার বয়ঃক্রম ১৬। ১৭ বৎসর। জ্যেষ্ঠার স্বামীর বয়ঃক্রম ৩০ বৎসর, তিনি এপর্য্যন্ত ১২ টি বিবাহ করিয়াছেন। কনিষ্ঠার স্বামীর বয়ঃক্রম ২৫| ২৬ বৎসর, তিনি এপর্য্যন্ত ৩২ টির অধিক বিবাহ করেন নাই।