← লাইব্রেরি

১৯১৮

আখ্যানমঞ্জরী (তৃতীয় ভাগ)

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯১৮

প্রকাশনা-তথ্য

আখ্যানমঞ্জরী
তৃতীয় ভাগ।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সঙ্কলিত।

নূতন বন্দোবস্তের দ্বিতীয় সংস্করণ।

প্রকাশক—শ্রীসিদ্ধেশ্বর পান,
২০।১ নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট্, কলিকাতা।

১৯১৮।

আখ্যানমঞ্জরী

তৃতীয় ভাগ।

ঈ শ্ব র চ ন্দ্র বি দ্যা সা গর স ঙ্ক লি ত।

নূতন বন্দোবস্তের দ্বিতীয় সংস্করণ।

প্রকাশক—শ্রীসিদ্ধেশ্বর পান, শ্রীসিদ্ধেশ্বর প্রেস্‌ ডিপজিটরি,

২০।১ নং কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট্, কলিকাতা।

সন ১৩২৫।

[মূল্য॥০ আট আনা।

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

বিজ্ঞাপন।

আখ্যানমঞ্জরী পুস্তকবিশেষের অনুবাদ নহে, কতিপয় ইঙ্গরেজী পুস্তক অবলম্বন পূর্ব্বক সঙ্কলিত হইল। যদি আখ্যানগুলি বালকদিগের ভাষাজ্ঞান ও আনুষঙ্গিক নীতিজ্ঞান বিষয়ে কিঞ্চিৎ অংশেও ফলোপধায়ক হয়, তাহা হইলে শ্রম সফল বোধ করিব।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্মা।

কলিকাতা। সংবৎ ১৯২০, ১লা অগ্রহায়ণ।

বিজ্ঞাপন।

রাজকীয় বদান্যতা, মাতৃভক্তি, ভ্রাতৃবিবোধ, নিঃস্বতা ও নিঃস্পৃহতা, বর্বরজাতির সৌজন্য, ন্যায়পরায়ণতা, এই ছয়টি আখ্যান অপেক্ষাকৃত থাকায় ও সরল ভাষায় লিখিত, এজন্য প্রথম ভাগে সঞ্চালিত হইয়াছে। এই সঞ্চালন নিবন্ধন ন্যূনতার পবিহারার্থে, যথার্থ বদান্যতা, পতিপরায়ণতার একশেষ, নৃশংসতার চুড়ান্ত, দয়াশীলতা, পতিব্রতা কামিনী, অকুতোভয়তা, আশ্চর্য্য সুদমন, এই সাতটি উপাখ্যান নুতন সঙ্কল্পিত ও এই পুস্তকে সন্নিবেশিত হইল। যে অভিপ্রায়ে আখ্যানমঞ্জরী দুই ভাগে বিভক্ত হইল, প্রথম ভাগের বিজ্ঞাপনে তাহা উল্লিখিত হইয়াছে।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্মা।

বর্দ্ধমান। সংবং ১৯২৪। ১লা ফাল্গুন।

সূচী।

অকুতোভয়তা

অকুতোভয়তা

ফরাসিদেশে দেশুলিয়র নামে এক সদ্বংশসম্ভূতা কামিনী ছিলেন। তিনি অসাধারণ কবিত্বশক্তি দ্বারা স্বদেশে বিলক্ষণ প্রতিপত্তিলাভ করেন এবং সর্ব্বপ্রকার লোকের নিকট সাতিশয় আদরণীয় হয়েন।

একদা তিনি লুনিরেলের কৌণ্ট ও কৌণ্টেসের সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত তাঁহাদের বাসস্থানে গমন করিলেন।
তথায় উপস্থিত হইলে, কৌণ্ট ও কৌণ্টেস্ তাঁহার সমুচিত সমাদর ও পরিচর্য্যা করিয়া বলিলেন, রাত্রিবাসের নিমিত্ত আপনি ইচ্ছানুসারে গৃহ মনোনীত করিয়া লউন, কিন্তু একটি গৃহ নির্দ্দিষ্ট করিয়া বলিলেন, কেবল এই গৃহে থাকিতে পাইবেন না, ইহাতে রাত্রিকালে ভূতের আবির্ভাব ও উপদ্রব হয়। কেবল আমরা উভয়ে ঐরূপ ভাবি, এরূপ নহে, এই বাটীতে যত লোক আছে, দেখিয়া শুনিয়া সকলেরই ঐরূপ সংস্কার জন্মিয়াছে। এই গৃহের মধ্যে বাত্রিতে প্রায় সর্ব্বদাই বিকট শব্দ ও গোলযোগ শুনিতে পাওয়া যায়। এজন্য কেহ সাহস করিয়া রাত্রিতে এই গৃহে প্রবেশ করিতে পারে না।

এই কথা শ্রবণমাত্র, অতিমাত্র কৌতুহলাক্রান্ত হইয়া, দেশুলিয়র বলিলেন, অদ্য আমি এই গৃহেই রজনীযাপন করিব, এবং কি কারণে ঐরূপ শব্দ ও গোলযোগ হয়, পরীক্ষা করিয়া দেখিব। কৌণ্ট মহাশয় তাঁহার এই প্রতিজ্ঞা শুনিয়া চকিত হইয়া উঠিলেন, এবং চমৎকৃত হইযা বলিলেন, আমবা কোনও ক্রমে আপনাকে এই ভয়ঙ্কর গৃহে বাত্রিবাস কবিতে দিব না। প্রভূত কৌতূহল বশতঃ এক্ষণে আপনকার এরূপ ইচ্ছা ও সাহস হইতেছে বটে, কিন্তু অকিঞ্চিৎকর কৌতূহল চরিতার্থ করিতে গিয় পরিণামে আপনকার অসুখ ও যন্ত্রণার সীমা থাকিবে না, অধিক কি, আপনকার প্রাণসংশয় পর্যন্ত ঘটিতে পারে। অতএব আমি কোনও মতে আপনার এই অসংসাহসিক অধ্যবসায়ের অনুমোদন করিতে পারিব না।

এইরূপে তিনি অনেক বুঝাইলেন ও অনেক ভয় দেখাইলেন, কিন্তু দেশুলিয়র, কোনও ক্রমেই বিচলিত হইলেন না। কৌণ্টেস্ও তাঁহাকে অশেষ প্রকারে বুঝাইলেন ও বিস্তর বাদানুবাদ করিলেন, কিন্তু কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না। দেশুলিয়রের এই স্থির-সিদ্ধান্ত ছিল, লোকে সচরাচর যে ভূতের গল্প ও ভূতের উপদ্রবের বর্ণন করে, সে সকল নিরবচ্ছিন্ন ভ্রান্তিমূলক ও কুসংস্কারজনিত, দুর্ব্বলচিত্ত লোকেরাই তাদৃশ কল্পিত বিষয়ে বিশ্বাস করিয়া থাকে। এই সংস্কারবশতঃ, কিছুতেই তাঁহার সাহস সঙ্কুচিত বা ব্যতিক্রান্ত হইল না। তদ্দর্শনে কৌণ্ট ও কৌণ্টেস্ ভয়ে ও দুর্ভাবনায় অভিভূত হইযা, যথোচিত বিনয় করিলেন, ভর্ৎসনা করিলেন, দুঃখপ্রকাশ করিলেন, কিন্তু কিছুতেই তাঁহাকে অবলম্বিত অধ্যবসায় হইতে বিরত করিতে পারিলেন না, অবশেষে, নিতান্ত নিরুপায় ভাবিয়া, তাঁহার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন।

অনন্তর দেশুলিয়র এক পরিচারিকা সমভিব্যাহারে শয়নাগারে প্রবেশ করিলেন, এবং পরিচ্ছদপরিহার পূর্ব্বক, পল্যঙ্কে আরোহণ করিয়া, পরিচারিকাকে বলিলেন, পল্যঙ্কের শিখরের দিকে একটি বড় বাতি জ্বালিয়া রাখ, এবং দৃঢ়রূপে দ্বার বন্ধ করিয়া চলিয়া যাও। সে তাঁহার আদেশানুরূপ কার্য্যের সমাধা করিয়া প্রস্থান করিলে পর, তিনি শয়ন করিয়া কিয়ৎক্ষণ পুস্তক পাঠ করিলেন, এবং পাঠ করিতে করিতে নিদ্রাভিভূত হইলেন।

কিঞ্চিৎ কাল পরে, বিকট শব্দ হইতে লাগিল। সেই শব্দে তাঁহার নিদ্রাভঙ্গ হইল। অবিলম্বে দ্বার উদ্ঘাটিত ও পদসঞ্চারধ্বনি আরব্ধ হইল। শ্রবণমাত্র, দেশুলিয়র স্থির করিলেন, বাটীর সকলে যাহাকে ভূত ভাবিয়া ভয় পাইতে থাকে, সে এই। পরে তিনি অবিচলিত চিত্তে ও অসঙ্কুচিত স্বরে, তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, তুমি যে হও না কেন, আমি তোমায় স্পষ্ট বলিতেছি, কিছুতেই ভয় পাই না, এবং এই বাটীর সকলের যে অমূলক ভয় ও সংস্কার জন্মিয়া আছে, আজ তাহার নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্ভাবিত করিব বলিয়া, যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিযাছি, কোনও কারণে তাহা হইতে বিচলিত হইব না। যদি ভয় দেখাইয়া, আমায় তাহা হইতে বিরত করা তোমার অভিপ্রেত হয়, তুমি কদাচ কৃতকার্য্য হইতে পারিবে না। আমার ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন, শেষ পর্য্যন্ত না দেখিয়া, আমি ক্ষান্ত হইব না।

দেশুলিয়র এই বলিয়া বিরত হইলেন, কিন্তু উত্তর পাইলেন না। তিনি পুনরায় সেইরূপ বলিলেন, তথাপি কোনও উত্তর পাইলেন না। পল্যঙ্কের অতি সন্নিকটে একটি কাঠের পরদা ছিল, উহা উলটিয়া মশারির উপর পতিত হওয়াতে, একটা বিকট শব্দ হইল। যাহাদের ভূতের ভয় আছে, এরূপ অবস্থায় ঐরূপ শব্দ শুনিলে ও ঘটনা দেখিলে, তাহাদের বুদ্ধিভ্রংশ ও চৈতন্যধ্বংস হয়, তাহার কিছুমাত্র সংশয় নাই। কিন্তু, দেশুলিয়রের মনে ভয় বা উদ্বেগের অণুমাত্র সঞ্চার হইল না। তাঁহার এই সন্দেহ হইল, বাটীর কোনও ভৃত্য আমায় ভয় দেখাইতে আসিয়াছে। যাহা হউক, তিনি সেই রাত্রিচরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কে, কি জন্য এখানে আসিয়াছ, বল। তুমি কখনই এরূপে ভয়প্রদর্শন করিয়া, আমায় ব্যাকুল বা বিচলিত করিতে পারিবে না। সে কোনও উত্তর দিল না, প্রশান্তভাবে গৃহমধ্যে ভ্রমণ করিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে, সে জ্বলন্ত বাতির নিকটে উপস্থিত হইল। অবিলম্বে বৃহৎ বাতি ও বাতির প্রকাণ্ড আধার উলটিয়া পড়িল। ভয়ানক শব্দ ও গৃহ অন্ধকারময় হইল। তাহাতেও তিনি কিঞ্চিন্মাত্র ভীত বা বিচলিত হইলেন না।

অবশেষে, সেই রাত্রিচর পল্যঙ্কের পাদদেশে উপস্থিত হইল। তখনও দেশুলিয়রের অন্তঃকরণে অণুমাত্র ভয়সঞ্চার হইল না। ভাল হইল, তুমি কি পদার্থ, এখনই আমি অনায়াসে তাহার নির্ণয় করিতে পারিব, এই বলিয়া গাত্রোত্থান পূর্ব্বক, পল্যঙ্কের পাদদেশে হস্তপ্রসারণ করিয়া, তিনি তাহার অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। তাঁহার দুই কর মখমলের ন্যায় কোমল দুই কর্ণে সংলগ্ন হইল। তিনি বলপূর্বক সেই দুই কর্ণ ধরিলেন, এবং যাবৎ রাত্রিশেষ ও সূর্য্যোদয় না হয়, ছাড়িবেন না স্থির করিলেন, কিন্তু কাহার কর্ণ ধরিলেন, কিছুই অবধারণ করিতে পারিলেন না। এই ভাবে অবস্থিত হইয়া, তিনি রজনীর অবশিষ্ট ভাগ অতিবাহিত করিলেন।

রাত্রি প্রভাত হইলে, এই অদ্ভুত ব্যাপারের স্বরূপনির্ণয় হইল। ঐ বাটীতে এক বৃহৎ কুকুর ছিল। দেশুলিয়র দেখিলেন, ঐ কুক্কুরের কর্ণ ধরিয়া আছেন। ভয়ঙ্কর ভৌতিক ব্যাপারের এইরূপে পর্য্যবসান হওয়াতে, তিনি উচ্চৈঃস্বরে হাস্য করিতে লাগিলেন, অনন্তর সেই কুকুরের কর্ণপরিত্যাগ পূর্ব্বক, নিশ্চিন্ত হইয়া শয়ন করিয়া রহিলেন।

এদিকে, কৌণ্ট ও কৌণ্টেস্, শয়নাগারে প্রবেশ করিয়া, যৎপরোনাস্তি উদ্বেগ ও দুর্ভাবনায় রজনীযাপন করিলেন, একবারও নয়ন মুদ্রিত করিতে পারিলেন না। তাঁহারা এই বিষয়ের যত আন্দোলন করিতে লাগিলেন, উত্তরোত্তর ততই ব্যাকুল হইতে লাগিলেন। অবশেষে, তাঁহারা এই সিদ্ধান্ত করিলেন, আমরা প্রাতঃকালে উঠিয়া, দেশুলিয়রেব প্রাণত্যাগ হইয়াছে, অবধারিত দেখিতে পাইব। রজনী অবসন্ন হইবামাত্র, তাঁহারা শয়নাগার হইতে বহির্গত হইয়া, বিষণ্ন বদনে অবসন্ন গমনে ভূতাবিষ্ট গৃহের দ্বারদেশে উপস্থিত হইলেন, সাহস করিয়া, সহসা সেই গৃহে প্রবেশ করিতে পারিলেন না। কিয়ৎক্ষণ পরে প্রবেশ করিয়াও, কথা কহিতে তাঁহাদের সাহস হইল না। রাত্রিতে কি সর্ব্বনাশ ঘটিয়াছে, কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া, স্তব্ধ ও হতবুদ্ধি হইয়া উভয়ে দণ্ডায়মান রহিলেন।

তাঁহাদিগকে সমাগত দেখিয়া, দেশুলিয়র মশারির অভ্যন্তর হইতে বিনির্গমন পূর্ব্বক, প্রাতঃকর্ত্তব্য নমস্কারসম্ভাষণাদি করিয়া, সহাস্য মুখে তাঁহাদের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন। তাঁহাকে জীবিত, অক্ষতশরীর ও প্রফুল্লচিত্ত দেখিয়া, তাঁহাদের কলেবরে প্রাণসঞ্চার হইল। রাত্রিতে যার পর যে ঘটনা হইয়াছিল, তিনি তৎসমুদয়ের অবিকল বর্ণন করিতে লাগিলেন। শুনিতে শুনিতে, তাঁহাদের হৃৎকম্প হইতে লাগিল। অবশেষে, দেশুলিয়র কৌণ্ট মহাশয়কে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, এ বিষয়ে আপনকার বিলক্ষণ ভ্রম জন্মিয়া আছে, এবং প্রশ্রয় দেওয়াতে, সেই ভ্রম, ক্রমে বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে। আর আপনকার ঈদৃশ অমূলক কুসংস্কার থাকা উচিত নহে। আপনারা যাহাকে ভূত বলিয়া স্থির করিয়া রাখিয়াছেন, ঐ দেখুন, সে শুইয়া রহিয়াছে। এই বলিয়া অঙ্গুলিনির্দেশ পূর্ব্বক, তিনি ঐ কুক্কুর দেখাইয়া দিলেন, এবং হাস্যমুখে রাত্রিবৃত্তান্তের শেষ ভাগের বর্ণনা করিলেন।

সবিশেষ সমস্ত শ্রবণগোচর করিয়া, তাঁহারা স্ত্রী-পুরুষে চমৎকৃত হইলেন। অনন্তর, দেশুলিয়র পুনরায় কৌণ্টকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ভবাদৃশ ব্যক্তির ঈদৃশ কুসংস্কারের বশীভূত হওয়া উচিত নহে। দেখুন, এই অমূলক কুসংস্কারের দোষে, আপনাদের অন্তঃকরণে কত শঙ্কা জন্মিয়াছিল। গত রাত্রিতে আমার কি বিপদ ঘটে, এই দুর্ভাবনায় আপনারা কত অসুখে কালযাপন করিয়াছেন, বলিতে পারি না। লোকে যে সকল ব্যাপারের প্রকৃত কারণে নির্ণয় করিতে না পারে, উহাদিগকে অলৌকিক ঘটনা জ্ঞান করিয়া থাকে। তৎপরে তিনি দ্বারদেশে উপস্থিত হইলেন, এবং প্রত্যহ চাবি দিয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়া রাখে, অথচ, কুকুর কিরূপে দ্বার খুলিয়া গৃহে প্রবেশ করে, এই সংশয়চ্ছেদন করিবার নিমিত্ত, ঘরের পরীক্ষা করিতে লাগিলেন, অবিলম্বে দেখিতে পাইলেন, তাহার কল প্রভৃতি এত শিথিল হইয়া গিয়াছিল যে, কিছু বলপূর্ব্বক ধাক্কা মারিলেই, কপাট খুলিয়া যায়।

এইরূপে গৃহপ্রবেশ অনাআসসাধ্য হওয়াতে, কুক্কুর প্রত্যহ অধিক রাত্রিতে সেই গৃহে প্রবেশ করিত, কিয়ৎক্ষণ ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিয়া, পল্যঙ্কে আরোহণ পূর্ব্বক, তদুপরি নিদ্রা যাইত, এবং রাত্রিশেষে নিদ্রাভঙ্গ হইলে, গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া স্বস্থানে গিয়া অবস্থিতি করিত। সে রাত্রিতেও পল্যঙ্কে আরোহণ করিবার অভিপ্রায়ে, উহার পাদদেশে গমন করিয়াছিল, বোধ হয়, দেশুলিয়র বলপূর্ব্বক কর্ণে ধরিয়া না রাখিলে, তদুপরি আরোহণ করিত।

যাহা হউক, কৌণ্ট ও কৌণ্টেস্, এইরূপে ভৌতিক বৃত্তান্তের সিদ্ধান্ত হওয়াতে, অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন, এবং দেশুলিয়রের সাহস, বুদ্ধিকৌশল ও অকুতোভয় দর্শনে চমৎকৃত হইয়া, মুক্তকণ্ঠে তাঁহাকে শত শত সাধুবাদপ্রদান করিতে লাগিলেন। ফলতঃ, তিনি স্ত্রীলোক হইয়া সাহস ও অকুতোভয়তার যেরূপ পরিচয় দিয়াছেন, পুরুষ জাতির মধ্যেও, সচরাচর সেরূপ দেখিতে পাওয়া যায় না।

কৌণ্ট - ফ্রান্স প্রভৃতি য়ুরোপীয় জনপদে সম্ভ্রান্ত লোকদিগের পদবীবিশেষ। কৌণ্টের সহধর্ম্মিণীর পদবী কৌণ্টেস্‌।

অকৃত্রিম প্রণয়

অকৃত্রিম প্রণয়

দুই য়ুরোপীয় ব্যক্তি, দৈবঘটনায় আল্‌জিয়র্স্ প্রদেশে দাসত্ব-শৃঙ্খলে বন্ধ হইয়াছিল। তন্মধ্যে এক ব্যক্তি স্পানিয়ার্ড, তাহার নাম এণ্টোনিয়, অপর ব্যক্তি ফরাসি, তাহার নাম রজর্। তাহারা উভয়ে একস্থানে কর্ম্ম ও একসঙ্গে আহারাদি ও অবস্থিতি করিত। ক্রমে ক্রমে পরস্পর প্রণয় জন্মিলে, নিশ্চিন্তসময়ে একত্র বসিয়া উভয়ে দুঃখের কথা কহিত। এইরূপে পরস্পরের নিকট স্ব স্ব মনোদুঃখের বর্ণন কবিয়া, তাহাদের দাসত্বনিবন্ধন অসহ্য যন্ত্রণার অনেক লাঘব বোধ হইত। যাহা হউক, জন্মভূমি, পিতা, মাতা, স্ত্রী, পুত্র, স্বজন প্রভৃতি বিরহিত ও দূরদেশে দাসত্বশৃঙ্খলে বদ্ধ হইয়া, পশুর ন্যায় পরিশ্রম করা নিরতিশয় কষ্টপ্রদ, সে কষ্ট সহ করিয়া কালযাপন করা সহজ ব্যাপার নহে।

সমুদ্রের তীরবর্তী এক পর্ব্বতের উপর দিয়া যে পথ প্রস্তুত হইতেছিল, তাহারা উভয়ে একদিন ঐ পথে কর্ম্ম করিতেছে, এমন সময়ে এণ্টোনিয়, সহসা কর্ম্ম হইতে বিরত হইয়া সমুদ্রে দৃষ্টিনিক্ষেপপূর্ব্বক, দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া স্বীয় সহচরকে বলিল, এই অর্ণবের অপর পারে আমার যাবতীয় অভিলষিত পদার্থ আছে, প্রতিক্ষণেই আমার বোধ হয়। যেন আমি এক একবার দেখিতে পাইতেছি, আমার স্ত্রী ও সন্তানেরা সমুদ্রের তীরে আসিয়া, একদৃষ্টিতে এই দিকে চাহিয়া রহিয়াছে, এবং আমার মৃত্যু হইয়াছে ভাবিয়া, অবিশ্রান্ত অশ্রুপাত করিতেছে, আমার ইচ্ছা হয়, সন্তরণ দ্বারা এই জলরাশি অতিক্রম করিয়া, তাহাদের নিকটে যাই। ফলতঃ সেই দিন অবধি এণ্টোনিয় যখন যখন সেই স্থলে কর্ম্ম করিতে যাইত, সমুদ্রে দৃষ্টিপাত করিবামাত্র তাহার অন্তঃকরণে ঐরূপ ভাবের আবির্ভাব হইত।

একদিন, কর্ম্ম করিতে করিতে এণ্টোনিয় উর্দ্ধশ্বাসে দৌডিয়া গিয়া রজর্‌কে বলিল, সখে, বোধ হয় এতদিনের পর আমাদের দুঃখের অবসান হইল। রজর্ বলিল, কিরূপে? এণ্টোনিয় বলিল, ঐ দেখ, একখান জাহাজ নঙ্গর করিয়া রহিয়াছে, উহা এখান হইতে দুই তিন ক্রোশের অধিক নহে। এস, আমরা এই পর্ব্বতের উপরিভাগ হইতে ঝাঁপ দিয়া সমুদ্রে পড়ি, এবং সাঁতারিয়া গিয়া ঐ জাহাজে উঠি। যদি এই চেষ্টায় কৃতকার্য্য না হইয়া প্রাণত্যাগ করিতে হয়, তাহা, এরূপে দাসত্ব করা অপেক্ষা সহ গুণে শ্রেয়স্কর।

এই কথা শুনিয়া রজর্ বলিল, যদি তুমি এইরূপে আপনার পরিত্রাণ করিতে পার, আমি তাহাতে আহ্লাদিত আছি। তবে তোমার সহিত আমার যে প্রণয় জন্মিয়াছে, কলেবরে প্রাণসঞ্চার থাকিতে সে প্রণয়ের অপনয়ন হইবে না, সুতরাং তোমার বিরহে আমায় আরও অধিক যন্ত্রণাভোগ করিতে হইবে। যাহা হউক, আমি তোমার নিকট এই প্রার্থনা করিতেছি, যদি তুমি, এই বিপদ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া নিরাপদে দেশে যাইতে পার, আমার পিতার অন্বেষণ করিও। তিনি বৃদ্ধ হইয়াছেন, যদি পুত্রশোকে অদ্যাপি জীবিত থাকেন, তাঁহাকে বলিবে—

এই পর্যন্ত বলিবামাত্র, এণ্টোনিয় তাহার কথা স্থগিত করিয়া বলিল, তুমি কি মনে করিয়াছ, আমি তোমায় এই অবস্থায় রাখিয়া, একাকী এখান হইতে যাইব? তাহা কখনই হইবে না। তোমায় আমায় অভেদশরীর, হয় দুই জনেই নিস্তার পাইব, নয় দুই জনেই প্রাণত্যাগ করিব।

এণ্টোনিয়ের কথা শুনিয়া রজর্ বলিল, সখে, তুমি যাহা বলিতেছ, যথার্থ বটে, কিন্তু আমি সন্তরণ জানি না, কিরূপে তোমার সঙ্গে দুস্তর সলিলরাশি অতিক্রম করিয়া জাহাজে যাইব। এণ্টোনিয় বলিল, তুমি সে জন্য উদ্বিগ্ন হইও না। তুমি আমার কটিবন্ধ ধরিযা থাকিবে, আমার শরীরে প্রভূত সামর্থ্য ও সন্তরণে বিলক্ষণ নৈপুণ্য আছে, আমি অনায়াসে তোমায় লইয়া জাহাজ পর্য্যন্ত যাইতে পারিব। রজর্ বলিল, এণ্টোনিয়, ও কল্পনায় কোনও ফলোদয় হইবে না, হয় আমি, ভয়ে অভিভূত হইয়া তোমার কটিবন্ধ ছাডিয়া দিব, নয় টানাটানি করিয়া তোমাকেও জলমগ্ন করিব, অতএব ও কথায় আর কাজ নাই। বলিতে কি, তোমার প্রস্তাব শুনিযা, আমার হৃৎকম্প হইতেছে। আমার কথা শুন, আমার ভাগ্যে যাহা আছে, তাহাই ঘটিবে, তুমি আত্মবক্ষার উপায় দেখ। আর বৃথা সময় নষ্ট করিও না, এস, তোমায শেষ আলিঙ্গন করি। এই বলিয়া রজর্, অশ্রুপূর্ণলোচনে এণ্টোনিয়কে আলিঙ্গন করিল। তখন এণ্টোনিয় বলিল, বয়স্য, রোদন করিতেছ কেন? এ অশ্রুবিসর্জ্জনেব সময় নয়। উপায়চিন্তনে বিরত অথবা উপস্থিত উপায়ের অবলম্বনে বিমুখ হইয়া অশ্রুবিসর্জ্জন করা নারীর কর্ম্ম, এরূপ আচরণ করা পুরুষের ধর্ম্ম নহে। অতএব সাহস অবলম্বন কর, আর বাধা দিও না। যদি আর বিলম্ব কর, উভযেই মারা পড়িব, পবে আর এরূপ সুযোগ ঘটিবে না। আমি তোমায় শেষ কথা বলিতেছি, যদি তুমি আমার প্রস্তাবে সম্মত না হও, আমি এই মুহূর্তে তোমার সমক্ষে আত্মঘাতী হইব।

এণ্টোনিয় এই কথা বলিয়া, স্বীয় প্রিয় বয়স্যের প্রত্যুত্তরের প্রতীক্ষা না করিয়াই, তাহাকে ধাক্কা দিয়া সমুদ্রে ফেলিল, এবং স্বয়ং তাহার অনুবর্ত্তী হইল। রজর্, সমুদ্রে পতিত হইবামাত্র, ভয়ে বিহ্বল হইযা জীবনের আশায় বিসৰ্জ্জন দিয়াছিল। কিন্তু এণ্টোনিয় তাহাকে আশ্বাস ও সাহস প্রদান করিয়া, অনেক কষ্টে স্বীয় কটিবন্ধধারণে সম্মত করিল, এবং পাছে রজর্ কটিবন্ধ ছাড়িয়া দেয়, এই আশঙ্কায় বারংবার তাহার দিকে সোৎকণ্ঠ দৃষ্টিপাত করিতে করিতে, সেই জাহাজকে লক্ষ্য করিয়া, বিলক্ষণ বলপূর্ব্বক সন্তরণ করিয়া চলিল। এই সময়ে এণ্টোনিয় যাদৃশ উৎকণ্ঠাসহকারে রজরের দিকে দৃষ্টিসঞ্চারণ করিতে লাগিল, বোধ করি, জননীও পুত্রের বিপৎকালে তাদৃশ উৎকণ্ঠাপ্রদর্শন করেন না।

যাহারা জাহাজে ছিল, তাহারা, দুই জনের গিরিশিখর হইতে সমুদ্রে পতন দেখিতে পাইয়াছিল। কিন্তু কি উদ্দেশে উহারা এরূপ অসংসাহসিকের কর্ম্ম করিল, তাহার মর্ম্ম বুঝিতে না পারিয়া, তাহারা নানা বিতর্ক করিতেছে, এমন সময়ে দেখিতে পাইল, একখান নৌকা উহাদের অনুসরণে প্রবৃত্ত হইয়াছে। যাহাদের উপর দাসবর্গের তত্ত্বাবধানের ভার ছিল, তাহারা উহাদের দুই জনকে এইরূপে পলায়ন করিতে দেখিয়া, ধরিবার নিমিত্ত ঐ নৌকা লইয়া আসিতেছিল। রজর্ সর্ব্বাগ্রে ঐ নৌকা দেখিতে পাইল, এবং বুঝিতে পারিল, ইহা নিঃসন্দেহ তাহাদিগকে ধরিবার নিমিত্ত আসিতেছে। আর, সে ইহাও বুঝিতে পারিল, এণ্টোনিয়, বহুক্ষণ বলপূর্ব্বক সন্তরণ করিয়া, ক্রমে ক্লান্ত হইয়া পড়িতেছে। তখন সে সাতিশয় কাতর হইয়া বলিল, বয়স্য এণ্টোনিয়, একখান নৌকা আমাদের অনুসরণ করিতেছে। তুমি একাকী হইলে, ঐ নৌকা আমাদিগকে ধরিবার পূর্ব্বে, অনায়াসে জাহাজে পঁহুছিতে পার, আমি কেবল তোমার গতি প্রতিরোধ করিতেছি। তুমি আমার আশায় বিসর্জ্জন দিয়া, আত্মরক্ষার উপায় দেখ, নতুবা দুই জনেই ধৃত ও পুনরায় তীরে নীত হইব।

এই বলিযা রজর্, এণ্টোনিয়ের কটিবন্ধ ছাড়িয়া দিল, এবং তৎক্ষণাৎ জলমগ্ন হইল। অকৃত্রিম প্রণয়ের কি অনির্ব্বচনীয় প্রভাব। এণ্টোনিয়, রজরকে কটিবন্ধপবিত্যাগপূর্ব্বক জলমগ্ন হইতে দেখিয়া, তাহাকে তুলিবার নিমিত্ত তৎক্ষণাৎ জলে প্রবিষ্ট হইল। কিয়ৎক্ষণ, উভয়েই অলক্ষিত হইয়া রহিল।

নৌকার লোকেরা, উহাদিগকে দেখিতে না পাইয়া, কোন দিকে যাইতে হইবে স্থির করিতে না পারিয়া, কিঞ্চিৎ কাল স্থির হইয়া রহিল। জাহাজের লোকেরাও, কৌতূহলাক্রান্তচিত্তে ও অবিচলিতনয়নে, এই অদ্ভুত ব্যাপারের অবলোকন করিতেছিল। তাহারা, দুই জনকে জলমগ্ন হইতে দেখিয়া, উহাদের উদ্দেশের নিমিত্ত একখান বোট খুলিয়া দিল। কিয়ৎক্ষণ চারিদিক নিরীক্ষণ করিয়া বোটের লোকেরা দেখিতে পাইল, এণ্টোনিয়, এক হস্তে রজরকে ধরিয়া আছে, অপর হস্ত দ্বারা বোটের নিকট আসিবার নিমিত্ত প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছে। নাবিকেরা তদ্দর্শনে কারুণ্যরসে পরিপূর্ণ হইয়া, যৎপরোনাস্তি বলপূর্ব্বক ক্ষেপণী চালিত করিয়া তাহাদের নিকটে উপস্থিত হইল, এবং তৎক্ষণাৎ উভয়কে বোটে উঠাইয়া লইল।

এই সময়ে, এণ্টোনিয় এরূপ নিবীর্য্য হইয়া পড়িয়াছিল যে, আর এক মুহূর্ত বিলম্ব হইলে, উভয়ে নিঃসন্দেহ জলমগ্ন হইত। তোমরা আমার বন্ধুর প্রাণরক্ষা কর, এইমাত্র বলিয়া সে অচেতন হইল। বোধ হইতে লাগিল, যেন তাহার প্রাণত্যাগ হইয়াছে। বোটে উঠাইবার সময় রজর্ অচেতন ছিল। সে, কিয়ৎক্ষণ পরে নয়নদ্বয় উন্মীলিত করিল, এবং এণ্টোনিয়কে মৃত্যুলক্ষণাক্রান্ত পতিত দেখিয়া, শোকে একান্ত বিকলচিত্ত হইল, হায়। কি সর্ব্বনাশ ঘটিল। বলিয়া, এণ্টোনিয়ের অচেতন কলেবর আলিঙ্গন করিয়া অশ্রুজলে ভাসাইয়া দিল, এবং নিতান্ত অধীর হইয়া, আকুলবচনে বলিতে লাগিল, বয়স্য, আমিই তোমার প্রাণবধ করিলাম। তুমি যে আমার দাসত্বমোচন ও প্রাণরক্ষার নিমিত্ত এত যত্ন ও এত আয়াস করিতেছিলে, আমা হইতে তাহার এই পুরস্কার পাইলে। আমি অতি নৃশংস ও নরাধম, নতুবা এখন পর্য্যন্ত জীবিত রহিয়াছি কেন। তোমার প্রাণবিয়োগ দেখিয়া কি আমায় প্রাণধারণ করিতে হয়। তোমায় হারাইয়া, আমি প্রাণধারণের কোনও ফল দেখিতেছি না।

এইরূপ আক্ষেপ করিয়া, সে সহসা দণ্ডায়মান হইল, এবং যদি নাবিকেরা বলপূর্ব্বক নিবারণ না করিত, তাহা হইলে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়া নিঃসন্দেহ প্রাণত্যাগ করিত। নাবিকেরা নিবারণ করাতে, সে যৎপরোনাস্তি বিলাপ ও পরিতাপ করিয়া বলিতে লাগিল, কেন তোমরা আমায় নিবারণ করিতেছ। আমি এরূপ বন্ধুর বিরহে, কখনই প্রাণধারণ করিতে পারি না। আমার জন্যই উহার প্রাণনাশ ঘটিয়াছে। অনন্তর এণ্টোনিয়ের শরীরের উপর পতিত হইয়া সে বলিতে লাগিল, এণ্টোনিয়, আমি অবশ্যই তোমার অনুগামী হইব, কেহই আমায় নিবারণ করিয়া রাখিতে পারিবে না। অহে নাবিকগণ, তোমাদিগকে ঈশ্বরের দোহাই, তোমরা আমায় আর নিবারণ করিও না। আমি কৃতাঞ্জলি হইয়া ভিক্ষা করিতেছি, আমায় প্রাণাধিক বন্ধুর অনুগামী হইতে দাও।

সৌভাগ্যক্রমে কিয়ৎক্ষণ পরে এণ্টোনিয় এক দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিল। তদ্দর্শনে রজর্, আহ্লাদে অধীর হইয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিল, আমার বন্ধু জীবিত আছেন, আমার বন্ধু জীবিত আছেন, জগদীশ্বরের কৃপায় এখন উহাব প্রাণত্যাগ হয় নাই। নাবিকেরা তাহার চৈতন্যসম্পাদনের নিমিত্ত যথেষ্ট চেষ্টা করিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে নয়নদ্বয় উন্মীলিত করিয়া, এণ্টোনিয় স্বীয় প্রিয় বয়স্যের দিকে দৃষ্টিপাতপূর্ব্বক বলিল, রজর্, আমি তোমার প্রাণরক্ষা করিতে পারিয়াছি, এজন্য জগদীশ্বরকে ধন্যবাদ দাও। রজর্, এণ্টোনিয়ের চেতনা-সঞ্চার ও নয়নোন্মীলন দর্শনে এবং অমৃতায়মান বাক্য শ্রবণে, আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইল। তদীয় নয়নযুগল হইতে প্রবল বেগে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল।

কিয়ৎক্ষণ পরে, সেই বোট জাহাজের নিকটে উপস্থিত হইল। জাহাজস্থিত লোকেরা, নাবিকদিগের মুখে সবিশেষ সমস্ত শ্রবণ করিয়া, কারুণ্যরসে পরিপূর্ণ হইল, এবং তাহাদের প্রতি সাতিশয় স্নেহ ও দয়া প্রদর্শন করিতে লাগিল। ঐ জাহাজ মালাকাপ্রদেশে যাইতেছিল, তথায় উপস্থিত হইয়া, তাহাদের দুই বন্ধুকে সেই স্থানে অবতীর্ণ করিয়া দিল। তাহারা আন্তরিক কৃতজ্ঞতাসহকারে তদীয় দঅয়া ও সৌজন্যের উল্লেখ পূর্বক, প্রভূত সাধুবাদ প্রদান করিয়া, অশ্রুপূর্ণনয়নে তাহাদের নিকট বিদায় লইল। এই ঘটনা দ্বারা দুই বন্ধুর চিরবর্দ্ধিত অকৃত্রিম প্রণয় সহস্র গুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল। অতঃপর উভয়কে পৃথক্ পৃথক্ স্থানে যাইতে হইবে, সুতরাং পরস্পরের বিচ্ছেদ অপরিহার্য্য হইয়া উঠিল। কিরূপে এরূপ বন্ধুর বিচ্ছেদযাতনা সহ্য করিব, এই ভাবনায় উভয়ে নিতান্ত অস্থির হইল। অবশেষে বাষ্পাকুললোচনে গদগদবচনে প্রণয়রসপূর্ণ সম্ভাষণ ও বারংবার গাঢ় আলিঙ্গন করিযা, স্ব স্ব জম্মভূমি, পরিবার ও আত্মীয়বর্গেব উদ্দেশে প্রস্থান করিল।

অদ্ভুত আতিথেয়তা

অদ্ভুত আতিথেয়তা

একদা আরবজাতির সহিত মূরদিগের সংগ্রাম হইয়াছিল। আরবসেনা, বহুদূব পর্যন্ত, এক মূর সেনাপতির অনুসরণ কবে। তিনি অশ্বারোহণে ছিলেন, প্রাণভয়ে দ্রুতবেগে পলায়ন করিতে লাগিলেন। আরবেরা তাহার অনুসরণে বিরত হইলে, তিনি স্বপক্ষীয় শিবিরের উদ্দেশে গমন করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহার দিগ্‌ভ্রম জন্মিয়াছিল, এজন্য, দিঙনির্ণয় করিতে না পারিয়া, তিনি বিপক্ষের শিবিবসন্নিবেশস্থানে উপস্থিত হইলেন। সে সময়ে তিনি এরূপ ক্লান্ত হইয়াছিলেন যে, আর কোনও ক্রমে অশ্বপৃষ্ঠে গমন করিতে পারেন না।

কিয়ৎক্ষণ পরে, তিনি, এক আরবসেনাপতির পটমণ্ডপদ্বারে উপস্থিত হইযা, আশ্রয়প্রার্থনা করিলেন। আতিথেয়তাবিষয়ে পৃথিবীতে কোনও জাতিই আরবদিগের তুল্য নহে। অতিথিভাবে আববদিগের আলয়ে উপস্থিত হইলে, তাঁহারা সাধ্যানুসাবে তাহার পরিচর্য্যা করেন, সে ব্যক্তি শত্রু হইলেও, অণুমাত্র অনাদর, বিদ্বেষপ্রদর্শন, বা বিপক্ষতাচরণ করেন না।

আরবসেনাপতি তৎক্ষণাৎ প্রার্থিত আশ্রয় প্রদান করিলেন, এবং তাহাকে নিতান্ত ক্লান্ত ও ক্ষুৎপিপাসায় একান্ত অভিভূত দেখিয়া, আহারাদিব উদে্যাগ করিযা দিলেন।

মুরসেনাপতি ক্ষুন্নিবৃত্তি, পিপাসাশান্তি ও ক্লান্তিপবিহাব করিযা উপবিষ্ট হইলে, বন্ধুভাবে উভয় সেনাপতিব কথোপকথন ইতে লাগিল। তাহারা পরস্পর স্বীয় স্বীয় পূর্বপুরুষদিগের সাহস, পরাক্রম, সংগ্রামকৌশল প্রভৃতির পরিচয় প্রদান করিতে লাগিলেন। এই সমযে, সহসা আবসেনাপতিব মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ গাত্রোত্থান ও তথা হইতে প্রস্থান করিলেন, এবং কিঞ্চিৎ পরেই মুরসেনাপতিকে বলিযা পাঠাই- লেন, আমার অতিশয় অসুখবোধ হইয়াছে, এজন্য আমি উপস্থিত থাকিয়া, আপনকার পরিচর্যা কবিতে পারিলাম না, আহারসামগ্রী ও শয্যা প্রস্তুত হইয়াছে, আপনি আহার করিয়া শয়ন করুন। আর, আমি দেখিলাম, আপনকার অশ্ব যেরূপ ক্লান্ত ও হতবীর্য্য হইয়াছে, তাহাতে আপনি, কোনও ক্রমে নিরুদ্বেগে ও নিরুপদ্রবে, স্বীয় শিবিবে পঁহুছিতে পারিবেন না। অতি প্রত্যুষে, এক দ্রুতগামী তেজস্বী অশ্ব, সজ্জিত হইয়া, পট- মণ্ডপের এরদেশে দণ্ডায়মান থাকিবে, আমিও সেই সময়ে আপনাব সহিত সাক্ষাৎ করিব, এবং যাহাতে আপনি সত্বব প্রস্থান করিতে পারেন, তদ্বিষয়ে যথোপযুক্ত আনুকূল্য করিব।

কি কারণে আরবসেনাপতি এরূপ বলিযা পাঠাইলেন, তাহার মৰ্ম গ্রহ করিতে না পারি, মূরসেনাপতি, আহার করি, সন্দিহানচিত্তে শয়ন করিলেন। বজনীশেষে, আরবসেনাপতি লোক তাঁহার নিদ্রাভঙ্গ কমাইল, এবং বলিল, আপনকার প্রস্থা- নেব সময় উপস্থিত, গাত্রোখান ও মুখপ্রক্ষালন করুন, আহার প্রস্তুত। মূরসেনাপতি, শষ্যাপবিত্যাগ পূর্বক, মুখপ্রক্ষালনাদিব সমাপন কবি, আহাবস্থানে উপস্থিত হইলেন, কিন্তু সেখানে আরবসেনাপতিকে দেখিতে পাইলেন না, পরে, দ্বাবদেশে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, তিনি সজ্জিত অশ্বের মুখবশ্মিধারণ করিয়া দণ্ডায়মান আছেন।

আরবসেনাপতি দর্শনমাত্র, সাদর সম্ভাষণ করিযা, মূরসেনাপতিকে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করাইলেন, এবং বলিলেন, আপনি সত্বর প্রস্থান করুন, এই বিপক্ষশিবিরে মধ্যে, আমা অপেক্ষা আপনকার ঘোরতর বিপক্ষ আর নাই। গত রাজনীতিতে, যৎকালে, আমরা উভয়ে, একাসনে আসীন হইয়া, অশেষবিধ কথোপকথন করিতেছিলাম, আপনি, স্বীয় পূর্বপুরুষদিগের বৃত্তান্তবর্ণন করিতে করিতে, আমার পিতার প্রাণহন্তার নির্দেশ করিয়াছিলেন। আমি শ্রবণমাত্র, বৈবসাধনবাসনার বশবর্ত্তী হইয়া, বাংবার এই শপথ ও প্রতিজ্ঞা করিযাছি, সূর্যোদয় হইলেই, প্রাণপণে পিতৃহন্তার প্রাণবধসাধনে প্রবৃত্ত হইব। এখন পর্যন্ত সূর্য্যের উদয় হয নাই, কিন্তু উদযেরও অধিক বিলম্ব নাই, আপনি সত্বর প্রস্থান করুন। আমাদের জাতীয় ধর্ম্ম এই, প্রাণান্ত ও সর্ব্বস্বান্ত হইলেও, অতিথির অনিষ্টচিন্তা করি না। কিন্তু আমার পটমণ্ডপ হইতে বহির্গত হইলেই, আপনকার অতিথিভাব অপগত হইবে, এবং সেই মুহূর্ত্ত অবধি, আপনি স্থির জানিবেন, আমি আপনকার প্রাণসংহারের নিমিত্ত প্রাণপণে যত্ন ও অশেষ প্রকারে চেষ্টা করিব। এই যে অপর অশ্ব সজ্জিত হইয়া দণ্ডায়মান আছে দেখিতেছেন, সূর্যোদয় হইবামাত্র, আমি উহাতে আরোহণকরিয়া, বিপক্ষভাবে আপনকার অনুসরণে প্রবৃত্ত হইব। কিন্তু, আমি আপনাকে যে অশ্ব দিয়াছি, উহা আমার অশ্ব অপেক্ষা কোনও অংশে হীন নহে, যদি উহা দ্রুতবেগে গমন করিতে পারে, তাহা হইলে, আমাদের উভয়ের প্রাণরক্ষার সম্ভাবনা।

এই বলিয়া, আরবসেনাপতি সাদর সম্ভাষণ ও করমর্দ্দন পূর্ব্বক, তাঁহাকে বিদায় দিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করিলেন। আরবসেনাপতিও, সূর্যোদয়দর্শনমাত্র, অশ্বে আরোহণ করিয়া, তদীয় অনুসরণে প্রবৃত্ত হইলেন। মূরসেনাপতি কতিপয় মুহুর্ত্ত পূর্ব্বে প্রস্থান কৰিছিলেন, এবং তদীয় অশ্বও বিলক্ষণ সবল ও দ্রুতগামী ছিল, এজন্য, তিনি নির্বিঘ্নে স্বপক্ষীয় শিবিরসন্নিবেশস্থানে উপস্থিত হইলেন। আরবসেনাপতি, সবিশেষ যত্ন ও নিরতিশয় আগ্রহ সহকারে, তাঁহার অনুসরণ করিতে ছিলেন, কিন্তু তাঁহাকে স্বপক্ষশিবিরে প্রবিষ্ট হইতে দেখিয়া, এবং অতঃপর আর বৈরসাধনসঙ্কল্প সফল হইবার সম্ভাবনা নাই বুঝিতে পাবিয়া, স্বীষ শিবিরে প্রতিগমন করিলেন।

অপত্যস্নেহের একশেষ

অপত্যস্নেহের একশেষ

আমেরিকার অন্তঃপাতী চিলিনামক জনপদে সান্‌ফর্নাণ্ডো নামে এক নগর আছে। ষাটি বৎসরের অধিক অতীত হইল, তথা স্পেনদেশীয় মিশনরিদিগের এক আশ্রম ছিল। ঐ আশ্রমের অধ্যক্ষ মহোদয়ের এই ব্যবসায় ছিল, তিনি অস্ত্রধারী ভৃত্যবর্গ সমভিব্যাহারে লইয়া, অসহায় আদিম নিবাসীদিগের শিশুসন্তান হরণ করিয়া আনিতেন, এবং তাহাদিগকে খৃষ্টান করিয়া, দাসের ন্যায় স্বজাতীয়বর্গের পরিচর্য্যায় নিযুক্ত রাখিতেন।

একদা তিনি ঐ উদ্দেশে জলপথে প্রস্থান করিলেন, এক-
স্থানে উপস্থিত হইয়া,নৌকাবন্ধনের আদেশ দিলেন। ভৃত্যদিগকে তীরে অবতীর্ণ করিয়া, শিশুসংগ্রহের নিমিত্ত প্রেরণ করিলেন, এবং স্বয়ং সেই নৌকায় অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। তদীয় ভৃত্যেরা ইতস্ততঃ অনেক অন্বেষণ করিয়া, পরিশেষে এক কুটীর দেখিতে পাইল। তাহারা অভীষ্টসিদ্ধির সম্ভাবনা দর্শনে, সাতিশয় হৃষ্ট হইয়া কুটীরদ্বারে উপস্থিত হইল। দেখিল, এক নারী আহারসামগ্রী প্রস্তুত করিতেছে, আর তাহার দুটি শিশুসন্তান সমীপদেশে ক্রীড়া করিতেছে।

ঐ নারী দর্শনমাত্র, তাহাদের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া, স্বীয় সন্তানদ্বিতয় লইয়া পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল। অস্ত্রধারী মিশনরিভৃত্যেরা তাহার পশ্চাৎ ধাবমান হইল। একে স্ত্রীজাতি পুরুষ অপেক্ষা দুর্ব্বল, তাহাতে আবার ক্রোড়ে দুই সন্তান, সুতরাং পলায়ন দ্বারা সেই অনুসরণকারী দস্যুদিগের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাওয়া, কোনও ক্রমে সম্ভাবিত নহে। সে, কিয়ৎ ক্ষণের মধ্যেই ধৃত ও সন্তান সমভিব্যাহারে, বলপূর্ব্বক নদীতীরে নীত হইল। মিশনরি মহোদয়, নৌকায় অবস্থিত হইয়া, উৎসুকচিত্তে স্বীয় ভৃত্যদিগের প্রত্যাগমন-প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, এক্ষণে তাহাদিগকে শিশুদ্বয় সমভিব্যাহারে প্রত্যাগত দেখিয়া, প্রীতমনে ও প্রফুল্লবদনে প্রশংসাবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন।

ঐ নারীর স্বামী ও দুই তিনটি অধিকবয়স্ক সন্তান, মৎস্য ধরিবার নিমিত্ত, স্থানান্তরে গিয়াছিল, তাহাদিগকে ছাড়িয়া যাইতে হইতেছে, এবং হয় ত আর তাহাদের সহিত সাক্ষাৎ ও মিলন হইবে না, এই শোকে কাতর হইয়া, সে আর্ত্তনাদ, রোদন ও নৌকারোহণে অনিচ্ছাপ্রদর্শন করিতে লাগিল। তদ্দর্শনে মিশনরি মহোদয় স্বীয় ভৃত্যদিগকে এই আদেশ দিলেন, উহারে বলপূর্ব্বক নৌকায় আরোহণ করাও। তদনুসারে তাহারা বলপ্রদর্শনের আরম্ভ করিলে, ঐ স্ত্রীলোক নিতান্ত নিরুপায় ভাবিয়া বাধাদানে বিরত হইল। যদি সে, অতঃপবও নৌকারোহণে অসম্মতি প্রদর্শন করিত, তাহা হইলে, তাহারা নিঃসন্দেহ উহার প্রাণবধ করিয়া, দুই শিশুকে নৌকায় লইয়া যাইত।

অবশেষে ঐ হতভাগা নারী, শিশুসন্তান সহিত নৌকায় আরোহিত ও মিশনরির আশ্রমে নীত হইল। স্থলপথে গেলে অনায়াসে পথ চিনিতে পারা যায়, সুতরাং সে পলাইয়া পুনরায় আপন আলয়ে যাইতে পারে, এই আশঙ্কায় মিশনরি মহোদয় উহাদিগকে জলপথে লইয়া গেলেন। স্বামী ও অবশিষ্ট সন্তানদিগের অদর্শনে, সেই স্ত্রীলোকের অন্তঃকরণে অতি প্রবল শোকানল প্রজ্বলিত হইতে লাগিল। সে আহারনিদ্রাপরিহার পূর্ব্বক, উন্মত্তার ন্যায় কালক্ষেপ করিতে, এবং মধ্যে মধ্যে দুই সন্তান লইয়া, আপন আবাসের উদ্দেশে পলায়ন করিতে আরম্ভ করিল, সতর্ক মিশনরিভৃত্যেরাও, প্রতিবারেই তাহাকে ধরিয়া আশ্রমে আনিতে লাগিল।

অবশেষে, মিশনরি মহাশয় অতিশয় বিরক্ত হইয়া উঠিলেন। তদীয় আদেশক্রমে, তাঁহার ভৃত্যেরা একদিন ঐ স্ত্রীলোককে নিতান্ত নির্দয় প্রহার করিল। অনন্তর তিনি এই ব্যবস্থা করিলেন, উহার পুত্রেরা এখানে থাকুক, উহাকে অন্য এক আশ্রমে পাঠান যাউক। তদনুসারে সে একাকিনী আতাবাগো নদীর তীরবর্ত্তী আশ্রমান্তরে প্রেরিত হইল। মিশনরিভৃত্যেরা, হস্তবন্ধনপূর্ব্বক নৌকায় আরোহণ করাইয়া, তাহাকে ঐ আশ্রমে লইয়া চলিল। সে, আমায় কি অভিপ্রায়ে কোথায় লইয়া যাইতেছে, তাহার কোনও অবধারণ কবিতে পারিল না, ইহা বুঝিতে পারিল, অনেক দূরে লইয়া যাইতেছে। অত্যন্ত দূরবর্তী হইলে, আর আমি আবাসে আসিতে, এবং পতিদর্শন ও পুত্রমুখনিরীক্ষণ করিতে পাইব না, সেই জন্যই ইহারা আমায় এরূপে স্থানান্তরিত করিতেছে।

এই সমস্ত ভাবিয়া নিতান্ত হতাশ হইয়া, ঐ স্ত্রীলোক অকস্মাৎ আবির্ভূত প্রভূতবলসহকারে, হস্তের বন্ধনচ্ছেদন পূর্ব্বক ঝম্পপ্রদান করিল, এবং সন্তরণ করিয়া নদীর অপর পারে চলিল। স্রোতের প্রবণতা বশতঃ অনেক দূর ভাসিয়া গিয়া, সে তীরবর্ত্তী গণ্ডশৈলের পাদদেশে সংলগ্ন হইল। ঐ গণ্ডশৈল, এই ঘটনা প্রযুক্ত অদ্যাপি মাতৃশৈল নামে প্রসিদ্ধ আছে। সে, তীরে উত্তীর্ণ হইয়া, অরণ্যে প্রবেশপূর্ব্বক লুকাইয়া রহিল। তদ্দর্শনে নৌকাস্থিত মিশনরি, সাতিশয় কুপিত হইয়া ঐ পর্ব্বতের নিকট নৌকা লাগাইতে আদেশপ্রদান করিলেন। নৌকা সেই স্থানে লগ্ন হইলে, তদীয় আদেশক্রমে ভৃত্যেরা অরণ্যে প্রবেশ করিয়া, সেই স্ত্রীলোকের অন্বেষণ করিতে লাগিল; কিয়ৎক্ষণ পরে দেখিতে পাইল, সে নিতান্ত ক্লান্ত হইয়া, গণ্ডশৈলের পাদদেশে মৃতবৎ পতিত আছে। তাহারা তাহাকে উঠাইয়া নৌকায় লইযা গেল, এবং যৎপরোনাস্তি প্রহারপূর্ব্বক তাহার দুই হস্ত পৃষ্ঠদেশে লইয়া দৃঢ়রূপে বদ্ধ করিল, এবং জাবিতানামকস্থানবাসী মিশনরিদিগের আশ্রমে লইয়া চলিল।

জাবিতায় নীত হইয়া সেই স্ত্রীলোক এক গৃহে রুদ্ধ রহিল। এই স্থান সান্‌ফার্নাণ্ডো হইতে চল্লিশ ক্রোশ বিপ্রকৃষ্ট, মধ্যবর্ত্তী প্রদেশ গভীর অরণ্য দ্বারা পরিবৃত, সেই অরণ্য দুষ্প্রবেশ ও দুরতিক্রম বলি, তৎকাল পর্য্যন্ত তত্রত্য লোকমাত্রের বোধ ও বিশ্বাস ছিল। কেহ কখনও স্থলপথে, এক স্থান হইতে স্থানান্তরে যাইবার চেষ্টা করিত না। ফলতঃ, যাতায়াতের পক্ষে জলপথ ভিন্ন উপায়ান্তর পরিজ্ঞাত ছিল না। বিশেষতঃ বর্ষাকাল, বর্ষাকালে ঐ প্রদেশে গগনমণ্ডল নিরন্তর নিবিড় ঘনঘটায় আচ্ছন্ন থাকে, রাত্রিকাল এরূপ অন্ধতমসে আবৃত হয় যে, কোনও ব্যক্তি বা বস্তু সম্মুখে থাকিলেও লক্ষ্য করিতে পারা যায় না। ঈদৃশ প্রবল প্রতিবন্ধক সত্ত্বে, অতি দুঃসাহসিক ব্যক্তিও সাহস করিয়া, স্থলপথে জাবিতা হইতে সান্‌ফার্নাণ্ডো যাইতে উদ্যত হইতে পাবে না।

কিন্তু, সুতবিরহবিধুরা জননীর পক্ষে, এই সমস্ত প্রতিবন্ধক, প্রতিবন্ধক বলিয়াই গণনীয় নহে। সেই হতভাগা নারী এই চিন্তা করিতে লাগিল, আমার পুত্রেরা সান্‌ফার্নাণ্ডোতে রহিল, আমি তাহাদের বিরহে একাকিনী এখানে থাকিয়া, কোনও ক্রমে প্রাণধারণ করিতে পারিব না, তাহারাও আমার অদর্শনে শোকাকুল হইআ, নিঃসন্দেহ প্রাণত্যাগ করিবে। অতএব আমি অবশ্য তাহাদের নিকটে যাইব, এবং যেরূপে পারি, খৃষ্টধর্মাবলম্বীদিগের হস্ত হইতে উদ্ধার করিয়া, তাহাদিগকে তাহাদের পিতার নিকটে লইয়া যাইব। তিনি আবাসে আসিয়া আমাদিগকে দেখিতে না পাইয়া, কতই বিলাপ ও কতই পরিতাপ করিতেছেন, আমরা অকস্মাৎ কোথায় গেলাম, কিছুই অনুধাবন করিতে না পারিয়া, ইতস্ততঃ কতই অনুসন্ধান করিতেছেন, এবং কোনও সন্ধান করিতে না পারিয়া, হতবুদ্ধি ও ম্রিয়মাণ হইয়া, যারপরনাই অসুখে ও দুর্ভাবনায় কালহরণ করিতেছেন। পুত্রেরাও, মাতৃশোকে ও ভ্রাতৃশোকে আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়াছে, এবং অহোরাত্র হাহাকার করিতেছে।

সেই স্ত্রীলোকের পলাইবার কোনও আশঙ্কা নাই, এই ভাবিয়া আশ্রমবাসীরা তাহার রক্ষণ বিষয়ে সবিশেষ মনোযোগ রাখে নাই। আর, প্রহার ও দৃঢ় বন্ধন দ্বাবা, তাহার হস্তদ্বয় ক্ষতবিক্ষত হইয়াছিল, এজন্য আশ্রমের পরিচারকেরা, কর্ত্তৃপক্ষের অগোচরে তাহার হস্তের বন্ধন কিঞ্চিৎ শিথিল করিয়া দিয়াছিল। সে পুত্রদিগকে দেখিবার নিমিত্ত নিতান্ত অধীর হইয়া, দন্ত দ্বারা হস্তের বন্ধনচ্ছেদনপূর্ব্বক, গৃহ হইতে বহির্গত হইল, সাধ্য অসাধ্য বিবেচনা না করিয়া, সান্‌ফর্নাণ্ডো উদ্দেশে প্রস্থান করিল, এবং চতুর্থ দিবস প্রত্যুষে সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া, যে কুটীরে তাহার পুত্রদিগকে রুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল, উহার চতুর্দিকে উন্মত্তার ন্যায় পরিভ্রমণ করিতে লাগিল।

এই হতভাগা নারী যেরূপ দুঃসাধ্য ব্যাপারের সমাধান করিয়াছিল, অসাধারণ বলবান ও অত্যন্ত সাহসী পুরুষেরাও তাহাতে প্রবৃত্ত হইতে পারে না। বর্ষাকালে তাদৃশ দুষ্প্রবেশ, দুরতিক্রম, হিংস্ৰজন্তুপরিবৃত অরণ্যের অতিক্রম করা, কোনও ক্রমে সহজ ব্যাপার নহে। প্রহারে ও অনাহারে সে নিতান্ত নির্বীর্য্য হইয়াছিল, বর্ষার প্রাবল্যনিবন্ধন জলপ্লাবন হওয়াতে, সেই অরণ্যের অধিকাংশ জলমগ্ন হইয়াছিল, মধ্যে মধ্যে সন্তরণ দ্বারা বহুসংখ্যক নদীরও অতিক্রম করিতে হইয়াছিল। এই চারি দিন, কি আহার করিয়া প্রাণধারণ করিলি, এই জিজ্ঞাসা করাতে সে বলিয়াছিল, অত্যন্ত ক্ষুধা ও ক্লান্তিবোধ হইলে, অন্য কোনও আহার না পাইয়া, যে সকল বৃহৎ কাল পিপীলিকা শ্রেণীবদ্ধ হইয়া বৃক্ষে উঠে, তাহাই ভক্ষণ করিতাম।

অপত্যস্নেহের অনির্বচনীয় প্রভাব॥।

কিয়ৎ ক্ষণ পরে আশ্রমবাসীরা সেই স্ত্রীলোককে প্রত্যাগত দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইল, এবং ক্ষণবিলম্ব ব্যতিরেকে, তাহাকে আশ্রমের অধ্যক্ষ মিশনরি মহোদয়ের নিকটে লইয়া গেল। তিনি দেখিয়া, অত্যন্ত কোপাবিষ্ট হইয়া কি জন্য ও কি রূপে সে তথায় উপস্থিত হইল, জিজ্ঞাসা করিলেন। সে অশ্রুপূর্ণ লোচনে, আকুলবচনে সবিশেষ সমস্ত নিবেদন করিল। শুনিয়া, মিশনরি মহাপুরুষের অন্তঃকরণে কিছুমাত্র দয়ার সঞ্চার হইল না। তিনি তাহাকে তৎক্ষণাৎ অধিকতরদূরবর্ত্তী আশ্রমান্তরে প্রেরিত করিবার আদেশপ্রদান কবিলেন, মিশনরি-ভৃত্যদিগের নির্দয় প্রহার ও অরণ্যে কণ্টকাবৃত স্থানের অতিক্রম দ্বারা, তাহার সর্বাঙ্গে যে ক্ষত হইয়াছিল, তাহার শোষণের নিমিত্তও ঐ পাপীয়সীকে দুই চারি দিন সেই পবিত্র আশ্রমে অবস্থিতি করিতে দিলেন না।

অরুনোকোনদীর তীরে মিশনরিদিগের যে আশ্রম ছিল, ঐ হতভাগা নারী অবিলম্বে তথায় প্রেরিত হইল, আর যে পুত্রদিগের স্নেহের বশীভূত হইয়া, এত কষ্ট ও এত যাতনা সহ্য করিয়াছিল, একবার একক্ষণের জন্য তাহাদের মুখ দেখিতে পাইল না। এই আশ্রমে নীত হইয়া, সে নিতান্ত হতাশ ও শোকে একান্ত অভিভূত হইল, এবং একবারেই আহারত্যাগ ও কতিপয় দিবসেই প্রাণত্যাগ করিল।

আশ্চর্য্য দস্যুদমন

আশ্চর্য্য দস্যুদমন

রাইন্ নদীর তীরে যুদফ্ নামে এক গ্রাম আছে। ঐ গ্রামস্থ এক গৃহস্থ, রবিবার প্রাতঃকালে সন্নিহিত গ্রামান্তরের দেবালয়ে, সপরিবারে উপাসনা করিতে গেলেন। একটি শিশুসন্তান ও একমাত্র তরুণী পরিচারিকা বাটীতে রহিল। এই পরিচারিকার নাম হাঁচেন্। সে গৃহস্থের আহার প্রস্তুত করিতেছে, এমন সময়ে বটেলর্ নামক এক যুবক তথায় উপস্থিত হইল। হাঁচেনের সহিত এই ব্যক্তির বিবাহের কথা উত্থাপিত হইয়াছিল, এজন্য সে মধ্যে
মধ্যে আসিয়া, তাহার সহিত সাক্ষাৎ ও কথোপকথন করিত। ক্রমে ক্রমে ঐ ব্যক্তির উপর হাঁচেনের অনুরাগসঞ্চার হয়। সে তাহাকে সুবোধ ও সচ্চরিত্র ব্যক্তি বলিয়া বোধ করিত। কিন্তু বটেলব, বাস্তবিক সেরূপ লোক নহেন। হাঁচেন ব্যতিরিক্ত ব্যক্তিমাত্রেই তাহাকে অলস, অকর্ম্মণ্য ও দুশ্চরিত্র বলিয়া জানিত। গৃহস্বামী তাহাকে বিলক্ষণ চিনিতেন, এজন্য তাহাকে তাঁহার বাটীতে আসিতে নিষেধ করিয়া দিয়াছিলেন। তদনুসারে, সে আর তাঁহার বাটীতে প্রবেশ বা হাঁচেনের সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিত না। হাঁচেন সেজন্য অতিশয় দুঃখিত ছিল। রবিবার প্রাতঃকালে গৃহস্বামীর অনুপস্থিতিরূপ সুযোগ দেখিয়া, সে নির্ভয়ে ঐ বাটীতে আসিযাছিল।

হাঁচেন, তাহাকে সমাগত দেখিয়া, আহ্লাদে পুলকিত হইল, সাদর সম্ভাষণ পুরঃসর তাহাকে বসাইয়া, উত্তম ভক্ষ্য দ্রব্য আনিয়া আহার করিতে দিল, এবং তাহার নিকটে বসিয়া, প্রফুল্লচিত্তে কথোপকথন করিতে লাগিল। আহার করিতে করিতে, বটেলরের হস্ত হইতে ছুরীখানি ভূমিতে পডিয়া গেল, অথবা সে ইচ্ছা করিয়া ফেলিয়া দিল, এবং হাঁচেনকে ঐ ছুরী তুলিয়া দিতে বলিল। হাঁচেন্ হাস্যমুখে পরিহাস করিয়া বলিল, সকলে বলে, তুমি অত্যন্ত অলস ও অকর্মণ্য লোক, এ কথা নিতান্ত অলীক বোধ হইতেছে না, নতুবা, ছুরীখানি আপনি না তুলিয়া, আমায় তুলিয়া দিতে বলিবে কেন। ছুরী, আমার অপেক্ষা তোমার নিকটে আছে। সুতরাং তুমি অনায়াসে তুলিয়া লইতে পার। তুমি আপনি তুলিয়া লও, আমি কখনই তুলিয়া দিব না। পরিশ্রমে এত কাতর হওযা পুরুষের উচিত নহে।

যাহা হউক, অবশেষে হাঁচেন ছুরী তুলিয়া দিতে, তাহার নিকটে আসিল, এবং মস্তক অবনত করিয়া, যেমন ছুরী তুলিতে গেল, অমনই সেই দুরাত্মা, বাম হস্ত দ্বারা বিলক্ষণ বলপূর্ব্বক তদীয় গ্রীবা ধরিয়া, দক্ষিণ হস্ত দ্বারা বস্ত্রমধ্য হইতে এক তীক্ষ্ণধার অস্ত্র বহিষ্কৃত করিল, এবং কটূক্তিপ্রয়োগ ও ভয়প্রদর্শন করিয়া বলিল, যদি বাঁচিতে চাও, চীৎকার করিও না, এবং তোমার প্রভুর সম্পত্তি কোন্ স্থানে আছে, দেখাইয়া দাও, নতুবা এখনই তোমার কণ্ঠচ্ছেদন করিব। তদীয় ঈদৃশ ব্যবহার দর্শনে, চমৎকৃত ও ভয়ে অভিভূত হইয়া, হাঁচেন্ বলিল, কি কর, ছাড়িয়া দাও, আমার প্রাণ যায়, আর খানিক এরূপে ধরিয়া থাকিলে, আমি মরিয়া যাইব। সে বলিল, হয় তোমার প্রভুর সম্পত্তি দেখাইয়া দাও, নয় এখনই তোমার প্রাণবধ করিব।

হাঁচেন্ বিস্তর বুঝাইল, কিন্তু কিছুতেই তাহাকে নিরস্ত করিতে পারিল না। অবশেষে, নিতান্ত নিরুপায় ভাবিয়া, সে ভাবগোপন করিয়া বলিল, আমি যেরূপ দেখিতেছি, তাহাতে তোমার অভিপ্রায় অনুসারে না চলিলে, আমার নিষ্কৃতি নাই। কিন্তু যদি তুমি আমায় তোমার সঙ্গে লইয়া যাও, তবেই আমি তোমায় প্রভুর সম্পত্তি দেখাইয়া দি। কারণ, তুমি সম্পত্তি লইয়া গেলে পর, প্রভু আমায় চোর বলিয়া সন্দেহ করিবেন; এবং তদুপলক্ষে অনেক শাস্তি পাইতে ও লাঞ্ছনাভোগ করিতে হইবে। সুতরাং আমি কোনও ক্রমে আর এখানে থাকিতে পারিব না, তদপেক্ষা তোমার সঙ্গে যাওয়াই, আমার পক্ষে সর্ব্বাংশে শ্রেয়স্কর। অতএব আমার কথা শুন, গ্রীবা ছাড়িয়া দাও, সত্বর কার্য্য সম্পন্ন কর, তাঁহাদের আসিবার অধিক বিলম্ব নাই, তাঁহারা আসিয়া পড়িলে তোমার সকল চেষ্টা বিফল হইবে, এবং উভযেই মারা পড়িব।

হাঁচেনের কথা শ্রবণগোচর করিয়া, সে তাহার মতানুবর্ত্তী হইয়াছে বলিয়া, বটেলরের নিশ্চিত বোধ জন্মিল। তখন সে তাহার গ্রীবা ছাডিয়া দিল। হাঁচেন, সেই দুরাত্মাকে প্রভুর শয়নাগারে লইয়া গেল, যে করণ্ডকে তাঁহার সম্পত্তি স্থাপিত ছিল, দেখাইয়া দিল, এবং গৃহের কোণ হইতে, এক কুঠার আনিয়া, তাহার হস্তে দিয়া বলিল, এই কুঠার লইয়া করণ্ডক ভগ্ন কর, কেবল হস্তদ্বারা কৃতকার্য্য হইতে পারিবে না। সত্বর কার্য্য শেষ কর। এই অবকাশে আমি একবার উপরে যাই, আমার যে দ্রব্যসামগ্রী আছে, ও এতদিন কর্ম্ম করিয়া যাহা সঞ্চয় করিয়াছি, সমুদয় লইয়া আসি। হাঁচেনের ভাবদর্শনে ও বাক্যশ্রবণে, সেই দুরাত্মা অতিশয় সন্তুষ্ট হইল, এবং প্রদর্শিত করণ্ডক ভাঙ্গিয়া, তন্মধ্য হইতে অর্থের নিষ্কাশন করিতে লাগিল। হাঁচেন, এইরূপে সেই দুরাচারের হস্ত হইতে নিস্তার পাইয়া, গৃহ হইতে বহির্গত হইল, এবং মুহূর্ত্তমাত্র ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিয়া, নিঃশব্দপদসঞ্চারে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক, নিমিষমধ্যে সেই য়নাগারের দ্বার এরূপে রুদ্ধ করিল যে, আর সে দুরাত্মার গৃহ হইতে বহির্গত হইবার উপায় রহিল না।

এইরূপে বটেলরকে গৃহমধ্যে রুদ্ধ করিয়া, হাঁচেন বাটীর বহির্দ্বারে উপস্থিত হইল, এবং লোকসংগ্রহ করিবার নিমিত্ত, কাতরস্বরে চীৎকার করিতে লাগিল। কিন্তু, দুর্ভাগ্যক্রমে সে দিন সে সময়ে সেখানে ব্যক্তিমাত্র ছিল না, কেবল গৃহস্বামীর পঞ্চমবর্ষীয় পুত্রটি কিঞ্চিৎ দূরে খেলা করিতেছিল। তাহাকে দেখিতে পাইয়া, তাহার নামগ্রহণ পূর্ব্বক হাঁচেন উচ্চৈঃস্বরে বলিল, তুমি ঐ পথ দিয়া দৌডিয়া তোমার পিতার নিকটে যাও, এবং তাঁহাকে সত্বর বাটীতে আসিতে বল, নতুবা আমার প্রাণান্ত ও তাঁহার সর্ব্বস্বান্ত হইবে। বালক, তাহার অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া, নির্দ্দিষ্ট পথ দিয়া দৌড়িয়া পিতার নিকটে চলিল। সে তাহার অভিপ্রায় বুঝিয়া, তদনুযায়ী কার্য্য করিতে গেল, ইহা দেখিযা কিঞ্চিৎ অংশে নিশ্চিন্ত হইয়া, হাঁচেন্ দ্বারদেশে উপবিষ্ট হইল, এবং ঈশ্বরের কৃপায়, আজ আমি প্রভুর সম্পত্তিরক্ষা করিতে পারিলাম, এই ভাবিয়া আহ্লাদে অধীব হইয়া, আনন্দাশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিল।

কিন্তু, হাঁচেনের এই আনন্দ অধিকক্ষণস্থায়ী হইল না। অতি বিকট তুরীশব্দ তাহার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল। বটেলর এক সহচরকে সঙ্গে আনিয়াছিল, এবং এই উপদেশ দিয়া তাহাকে কিঞ্চিৎ দূরে রাখিয়া আসিযাছিল যে, আবশ্যক হইলে তুরীশব্দ দ্বারা যেরূপ সঙ্কেত করিব, তদনুযায়ী কার্য্য করিবে। সে গৃহমধ্যে রুদ্ধ হইয়া এবং হাঁচেন্ বালককে তাহার পিতার নিকট সংবাদ দিতে পাঠাইল ইহা শুনিতে পাইয়া, গৃহ হইতে বহির্গত হইবার অশেষবিধ চেষ্টা পাইল, কিন্তু কোনও ক্রমে কৃতকার্য্য হইতে না পারিয়া, জানালা খুলিয়া তুরীশব্দ দ্বারা স্বীয় সহচরকে সতর্ক করিয়া বলিল, ঐ পথ দিয়া যে বালক দৌড়িয়া যাইতেছে, তাহাকে ধর এবং হাঁচেনের প্রাণবধ কর। হাঁচেন শুনিয়া, চকিত হইযা চারিদিক নিরীক্ষণ করিতে লাগিল, কিন্তু কাহাকেও দেখিতে পাইল না। বালক দ্রুতবেগে দৌড়িয়া যাইতেছে, কেহ তাহাকে ধরিল না, ইহা অবলোকন করিয়া সে বিবেচনা করিল, দুবাত্মা আমায় ভয় দেখাইয়া বশীভূত করিবার অভিপ্রায়ে মিথ্যা আস্ফালন করিতেছে। কিন্তু কিয়ৎ দূর গিয়া, বালক এক সেতুর উপর উপস্থিত হইবামাত্র, বটেলরের সহচর সেতুর নিম্নদেশ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া, বালককে বগলে লইয়া সেই বাটীর দিকে ধাবমান হইল।

এই অতর্কিত নূতন বিপদ উপস্থিত দেখিয়া, হাঁচেন অত্যন্ত শঙ্কিত ও চিন্তাম্বিত হইল, এবং সত্বর বাটীর মধ্যে প্রবেশ পূর্ব্বক দৃঢ়রূপে বহির্দ্বার রুদ্ধ করিয়া ফেলিল। এই দ্বার ব্যতিরিক্ত বাটীতে প্রবেশ করিবার আর পথ ছিল না। অনেক গুলি জানালা ছিল বটে, কিন্তু সে সমস্তই লোহার গরাদ দ্বারা বিলক্ষণরূপে রক্ষিত। সুতরাং দ্বিতীয় দস্যুর বাটীর মধ্যে প্রবেশ করিবার সম্ভাবনা নাই এই স্থির করিয়া, হাঁচেন্ ভাবিতে লাগিল, যদি প্রভুর প্রত্যাগমন পর্য্যন্ত ইহাদিগকে এই অবস্থায় রাখিতে পারি, তাহা হইলেই মঙ্গল, নতুবা ইহারা আমার প্রাণবধ করে তাহাও স্বীকার, তথাপি প্রাণ থাকিতে প্রভুর সর্ব্বনাশ করিতে পারিব না।

হাঁচেন, উদ্বিগ্নচিত্তে উপবিষ্ট হইয়া এই চিন্তা করিতেছে, এমন সময়ে সেই দুরন্ত দস্যু দ্বারদেশে উপস্থিত হইল, এবং কুৎসিত কটূক্তিপ্রয়োগ ও অশেষবিধ ভযপ্রদর্শন পূর্ব্বক, হাঁচেন কে সম্বোধন করিয়া বলিল, যদি ভাল চাহিস্, দরজা খুলিয়া দে, নতুবা আমি দরজা ভাঙ্গিয়া প্রবেশ করিব। ঈশ্বরের ইচ্ছায় যাহা আছে তাহাই হইবে, হাঁচেন এইমাত্র উত্তর দিল। বালক, ভয়ে অস্থির হইযা ক্রমাগত বিকট চীৎকার করিতে লাগিল। হাঁচেন কোনও ক্রমে দ্বার উদ্ঘাটিত করিল না দেখিয়া, জানালা হইতে মুখ বাড়াইয়া বটেলব স্বীয় সহচরকে বলিল, যদি সে অবিলম্বে দরজা খুলিয়া না দেয়, তাহার সমক্ষে ঐ বালকের গলা কাটিয়া ফেল। ঈদৃশ ভয়প্রদর্শন শ্রবণে, হাচেনের হৃৎকম্প ও বুদ্ধিভ্রংশ হইল। তখন সে দ্বার খুলিয়া দিয়া, বালকের প্রাণরক্ষা করিতে উদ্যত হইল। কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষণেই বিবেচনা করিল, নিবপরাধ বালকের প্রাণবধ করায় উহাদের কোনও ইষ্টাপত্তি দেখিতেছি না। কিন্তু দ্বার খুলিয়া দিলে, আমার প্রাণবধ ও প্রভুর সর্ব্বনাশ অবধারিত। বিশেষতঃ, দ্বার খুলিয়া দিলে, বালকের প্রাণবধ করিবে না, তাহারই স্থিরতা কি। অতএব আমি কোনও ক্রমে দ্বার খুলিব না, ভাগ্যে যাহা আছে, তাহাই ঘটিবে। এই স্থির করিয়া, সে উপবিষ্ট রহিল। কিন্তু সেই দস্যু, দরজা খুলিয়া দে, নতুবা বালককে কাটিয়া ফেলি, এবং বাটীতে আগুন লাগাইয়া দি, নিরন্তর এই ভয়প্রদর্শন করিতে লাগিল।

কিয়ৎক্ষণ পরে সেই দস্যু, বালককে ভূতলে ফেলিয়া, বাটীতে আগুন লাগাইয়া দিবার অভিপ্রায়ে, অগ্নিপ্রজ্বালনের উপযোগী দ্রব্যের অন্বেষণ করিতে লাগিল। ঐ বাটীতে একটি মিল্ ছিল। যে গৃহে মিল্ থাকিত, উহার ভিত্তিতে একটি বৃহৎ গর্ত্ত ছিল। ঐ গর্ত্ত দ্বারা মিলের চক্রেব উপব যাইতে পারা যায়। দস্যু, সহসা সেই গর্ত্ত দেখিতে পাইয়া, এবং গর্ত্ত দ্বারা বাটীতে প্রবিষ্ট হইতে পারা যায় বুঝিতে পারিয়া, অতিশয় আনন্দিত হইল, এবং বালকের পলায়ননিবারণার্থ তাহার হস্তপদবন্ধন পূর্ব্বক, উদ্ভাবিত গর্ত্ত দ্বারা বাটীতে প্রবেশ কবিবার চেষ্টা দেখিতে গেল। বাটীতে ঐরূপ গর্ত্ত আছে, কিংবা তদ্দারা বাটীতে প্রবেশ করিতে পারা যায, হাঁচেন ইহা অবগত ছিল না, এবং দস্যু ঐ উপায় অবলম্বন করিয়া বাটীতে প্রবেশ করিবার উদ্যোগ করিতেছে, তাহাও জানিতে পারে নাই, কারণ, সে যেখানে বসিয়াছিল, তথা হইতে ঐ দিক দেখিতে পাওয়া যায় না। কিন্তু ভাবিতে ভাবিতে, এই সময়ে তাহার মনে সহসা এক বিষয় উদিত হইল। সে বিবেচনা করিল, ববিবারের দিন মিল্ অবধারিত বন্ধ থাকে, কেহ কখনও উহা চলিতে দেখে নাই। কিন্তু আজ যদি মিল চালাইয়া দি, তাহা হইলে প্রতিবেশীরা নিঃসন্দেহ বোধ করিবে, অবশ্যই কোনও অসামান্য ব্যাপার ঘটিয়াছে, এবং সেরূপ বোধ হইলে অনেকে এস্থানে উপস্থিত হইতে পারে। আর, প্রভুও দূর হইতে দেখিতে পাইয়া, এরূপ বিরূপ ঘটনার কারণনির্ণয করিতে না পারিয়া, ব্যস্ত হইয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিতে পারেন।

এই স্থিব করিয়া, হাঁচেন মিল্ চালাইতে চলিল। বহু দিন ঐ বাটীতে থাকাতে, সে মিল্ চালাইবার প্রণালী বিলক্ষণ অবগত ছিল, এক্ষণে মিল্‌ঘরে প্রবেশ করিয়া, মুহূর্ত্তের মধ্যে কল চালাইয়া দিল। সমুদয় যন্ত্র প্রবলবেগে চলিতে আরম্ভ করিল। চক্র ও যন্ত্রের অপরাপর অবয়ব হইতে ভয়ঙ্কর শব্দ উত্থিত হইতে লাগিল। এই সময়ে, সেই দস্যু অতি কষ্টে গর্ত্ত দ্বারা প্রবেশ করিয়া, মিলের বৃহৎ চক্রে দণ্ডায়মান হইল, এবং নিতান্ত অনায়ত্ত হইয়া, সেই চক্রের সঙ্গে ঘুরিতে লাগিল। প্রথমতঃ, সে যন্ত্রের গতি স্থগিত করিবার, তৎপরে ঘূর্ণমান চক্র হইতে অপসৃত হইবার বিস্তর চেষ্টা পাইল, কিন্তু কোনও ক্রমে কৃতকার্য্য হইতে পারিল না। তখন সে ভয়ে ও বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হইয়া গেল, এবং প্রতিক্ষণেই প্রাণবিনাশের আশঙ্কা করিতে লাগিল। অবশেষে, প্রাণবক্ষা বিষয়ে নিতান্ত হতাশ হইয়া, সে বিকট আর্ত্তনাদ ও উৎকট আত্মভর্ৎসনা আরব্ধ করিল। হাঁচেন, অসম্ভাবিত আর্তনাদ শ্রবণে চকিত হইয়া, সত্বরগমনে সেই স্থানে উপস্থিত হইল এবং দেখিল, ইঁদুর যেমন কলে পড়িয়া বিবশ হইয়া ছটফট করিতে থাকে, ঐ দুরন্ত দস্যুর অবিকল সেই অবস্থা ঘটিয়াছে।

হাঁচেন্‌কে উপস্থিত দেখিয়া, দস্যু নিতান্ত কাতরবাক্যে এই প্রার্থনা করিতে লাগিল, তুমি যন্ত্রের গতি স্থগিত করিয়া, আমায় প্রাণদান কর, আমি জন্মের মত তোমার ক্রীতদাস হইয়া থাকিব। হাঁচেন তাহার প্রার্থনায় কর্ণপাত করিল না, দাঁড়াইয়া হাস্যমুখে কৌতুক দেখিতে লাগিল। চক্রের সঙ্গে, অবিশ্রামে ঘূর্ণিত হওয়াতে, দস্যু ক্রমে ক্রমে বিচেতন হইল, এবং যন্ত্রের নিম্নভাগে পতিত হইয়া, সেই অবস্থায় ঘুরিতে লাগিল। যত ক্ষণ পর্যন্ত তাহার চেতনা ছিল, সে একবার বিনয়, একবার লোভপ্রদর্শন, একবার বা ভয়প্রদর্শন করিয়া নিরন্তর হাঁচেনের নিকট এই প্রার্থনা করিয়াছিল, তুমি আমায় প্রাণদান কর। সে মনে করিলে, যন্ত্রের গতি স্থগিত করিয়া, অনায়াসে ঐ দস্যুকে অবতীর্ণ করিতে পারি, কিন্তু সেরূপ করা তাহার পক্ষে কোনও ক্রমে পরামর্শসিদ্ধ ছিল না, কারণ, বিপদ হইতে উত্তীর্ণ হইলেই দস্যু পুনরায় নিজমূর্ত্তি ধরিত, তাহার সন্দেহ নাই। হাঁচেন ইহাও জানিত, যন্ত্রে থাকিলে তাহার প্রাণনাশের কোনও আশঙ্কা নাই, কেবল উৎকট ভয়ে সাতিশয় অভিভূত থাকিয়া, আন্তরিক যাতনা ভোগ করিবে। এই সকল কারণে, সে তাহার অবতারণে বিরত রহিল।

অবশেষে, হাঁচেন বহির্দ্বারের কপাটে উৎকট আঘাত শুনিয়া, সত্বরগমনে তথায় উপস্থিত হইল, এবং স্বীয় প্রভুকে প্রত্যাগত দেখিয়া, অবিলম্বে দ্বার খুলিয়া দিল। গৃহস্বামী সপবিবারে ও সমবেত প্রতিবেশিবর্গ সমভিব্যাহারে বাটীতে প্রবেশ করিলেন। তিনি, রবিবারে মিল চলিতে দেখিয়া, যৎপুরোনাস্তি বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া আসিয়াছিলেন, পরে বাটীর বহির্ভাগে পঞ্চমবর্ষীয় বালককে বদ্ধহস্ত বদ্ধপদ, ভূতলে নিক্ষিপ্ত, এবং বহির্দ্বার রুদ্ধ দেখিয়া, কি সর্বনাশ ঘটিয়াছে কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া, নিবতিশয় ব্যাকুলচিত্ত হইয়াছিলেন, এজন্য নিতান্ত ব্যগ্র হইয়া, হাঁচেনকে এই সমস্ত বিরূপ ঘটনার কারণ জিজ্ঞাসিলেন। সে, সংক্ষেপে সমস্ত বৃত্তান্ত বিদিত করিয়া, মুর্চ্ছিত ও ভূতলে পতিত হইল। গৃহস্বামী, অনেক কষ্টে তাহার চৈতন্যসম্পাদন করিলেন। অনন্তর সকলে মিলঘরে প্রবেশ করিয়া, যন্ত্রের গতি স্থগিত করিলেন। অচেতন দস্য তন্মধ্য হইতে নিষ্কাশিত হইল। পরে, সকলে গৃহস্বামীর শনাগারের দ্বার উদ্ঘাটিত করিয়া, বটেলবকে রুদ্ধ করিলেন। উভয়ে তৎক্ষণাৎ রাজপুরুষদিগের হস্তে সমর্পিত হইল, এবং অনতিবিলম্বে উৎকট অপরাধের সমুচিত প্রতিফল পাইল। গৃহস্বামী, হাঁচেনের মুখে আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত সবিশেষ অবগত হইয়া, তদীয় অদ্ভুত সাহস, অবিচলিত প্রভুভক্তি ও নিরতিশয় প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দর্শনে মোহিত ও চমৎকৃত হইলেন, এবং এই সমস্ত অসাধারণ গুণের যথোপযুক্ত পুরস্কারস্বরূপ আপন জ্যেষ্ঠ পুত্রের সহিত তাহার বিবাহ দিলেন। হাঁচেন অতি দীনের কন্যা। তাহার ভাগ্যে ঈদৃশ সমৃদ্ধিশালী পরিবারে পরিণয় ঘটিবার কোনও সম্ভাবনা ছিল না। সে, এক্ষণে, আশার অতিরিক্ত ফললাভ করিয়া, সুখে ও স্বচ্ছন্দে কালহরণ করিতে লাগিল।

যব কলায় প্রভৃতি শস্য বা অন্যবিধ কঠিন দ্রব্য চূর্ণ করিবার যন্ত্র

উৎকট বৈরসাধন

উৎকট বৈরসাধন

যৎকালে মুসলমানেরা য়ুরোপের অন্তবর্ত্তী অনেক দেশের জয় ও অধিকার করিতেছিলেন, সেই সময়ে ফ্লাণ্ডর্স প্রদেশে বিদবমন নামে এক ব্যক্তি এক নগরের অধিপতি ছিলেন। ঐ নগরে মুসলমানদের আধিপত্য সংস্থাপিত হইলে, বিদবমন, তাঁহাদের অত্যাচারদর্শনে একান্ত বিকলহৃদয় হইয়া, তথা হইতে প্রস্থান করিলেন, এবং এক খৃষ্টীয় রাজার অধিকারে প্রবিষ্ট হইয়া, তথায় অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। কিন্তু স্বদেশানুরাগের আতিশয্যবশতঃ, তিনি মনে মনে এই বিবেচনা করিতে লাগিলেন, স্বীয় জন্মভূমির ঈদৃশী দুরবস্থা দেখিয়া নিশ্চেষ্ট ও নিশ্চিন্ত থাকা নিতান্ত কাপুরুষ ও নিতান্ত অপদার্থের কর্ম। বিশেষতঃ, অধিকারচ্যুত হইয়া, অন্যদীয় আশ্রয় অবলম্বন পূর্ব্বক, অসারদেহভারবহন করা অপেক্ষা আমার পক্ষে প্রাণত্যাগ করা সহস্রগুণে শ্রেয়ঃকল্প। এক্ষণে উত্তম কল্প এই, স্বীয় নগরে প্রতিগমন পূর্ব্বক তত্রত্য লোকদিগের হৃদয়ে স্বদেশানুরাগ উদ্দীপিত করিবার চেষ্টা পাই, যদি এ বিষয়ে কৃতকার্য্য হই, স্বীয় জন্মভূমিকে মুসলমানদের অত্যাচার হইতে মুক্ত করিতে পারিব।

ঈদৃশ-সঙ্কল্পারূঢ় হইয়া, বিদবমন্ প্রচ্ছন্ন-বেশে স্বীয় নগরে প্রবেশ করিলেন, এবং মুসলমানদের প্রতিকূলে অস্ত্রধারণ করিবার নিমিত্ত স্বদেশীয়দিগকে উৎসাহিত করিতে লাগিলেন। কিন্তু ইতঃপূৰ্বে মুসলমানদিগের প্রতিকূলবর্ত্তী হইয়া, তত্রত্য লোকদিগকে যে অসহ্য যন্ত্রণা ও উৎকট অত্যাচার সহ্য করিতে হইয়াছিল, তৎসমুদয় তৎকাল পর্য্যন্ত তাহাদের হৃদয়ে বিলক্ষণ জাগরূক ছিল, এজন্য তাহারা সাহস করিয়া, তদীয় উপদেশ ও পরামর্শের অনুবর্ত্তী হইতে পারিল না। তাহারা এই বিবেচনা করিল, যদি মুসলমানদের প্রতিকূলাচরণে প্রবৃত্ত হইয়া কৃতকার্য্য হইতে না পারি, তাহারা অধিকতর অত্যাচার কবিবে, এবং রাজবিদ্রোহী বলিয়া অনেকের প্রাণদণ্ড হইবে, তদপেক্ষা এই অবস্থায় কালযাপন করা অনেক অংশে শ্রেয়স্কর। সুতরাং বিদবমন্ সিদ্ধকাম হইতে পারিলেন না।

একদিন তিনি, কিংকর্ত্তব্য-নিরূপণে নিবিষ্টচিত্ত হইয়া উপবিষ্ট আছেন, এমন সময়ে, এক মুসলমান সৈনিকপুরুষ, পরপ্রেরিত প্রণিধি বলিয়া তাঁহাকে অবরুদ্ধ করিল। বিচারালয়ে নীত হইলে, তিনি অশেষপ্রকারে আত্মদোষক্ষালনের চেষ্টা পাইলেন, কিন্তু বিচারকর্ত্তার অন্তঃকরণ হইতে সন্দেহ দূর হইল না। বিচারকর্ত্তা তাঁহার প্রকৃত পরিচয় পাইলে ও যথার্থ উদ্দেশ্য অবগত হইলে, তিনি সহজে নিষ্কৃতিলাভ করিতে পারিতেন না, তাঁহার উপর পরপ্রেরিত প্রণিধিবোধে দুরভিসন্ধির আশঙ্কামাত্র জন্মিয়াছিল, তদ্বিষয়ে সবিশেষ প্রমাণ পাওয়া গেল না, এজন্য বিচারকর্ত্তা অন্যবিধ উৎকট দণ্ডবিধানে বিরত হইয়া, কোড়া মারিয়া ছাড়িয়া দিতে আদেশ দিলেন।

এইরূপ দণ্ড ব্যবস্থা হইলে, বিদবমন তদনুযায়ী কার্য্যকরণের উপযোগী স্থানে নীত হইলেন। রাজপুরুষেরা নির্দিষ্ট স্তম্ভে তাঁহার হস্তবন্ধন করিল। যে ব্যক্তির উপর কোড়া মারিবার ভার ছিল, সে অপরাধীর নিকট কিঞ্চিৎ পাইলে প্রহারের সংখ্যা ও ঔৎকট্য উভয়েরই অনেক লাঘব করিত। কিন্তু বিদবমন্ উৎকোচদানে অসমর্থ বা অসম্মত হওযাতে, সে সাতিশয় অসন্তুষ্ট হইয়া, বিলক্ষণ বলপূর্ব্বক প্রহার করিতে লাগিল। বিদবমন্ যাতনায় অস্থির হইয়া আর্তনাদ করিলে, সে, অরে দুরাত্মন্! অসন্তোষ প্রদর্শন করিতেছ, এই বলিয়া পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর বলসহকারে প্রহার করিতে আরম্ভ করিল। বিদবমন, নিতান্ত কাতর হইয়া, কিয়ৎক্ষণ ক্ষান্ত থাকিতে অনুরোধ করিলে, সে পূর্ব্ববৎ, অরে দুরাত্মন্! অসন্তোষ প্রদর্শন করিতেছ, এই বলি উপর্য্যুপরি প্রহার করিতে আরম্ভ করিল।

এইরূপ যাতনাভোগ ও অবমাননালাভ কবিয়া, বিদবমন বৈরসাধনে কৃতসঙ্কল্প হইলেন, এবং শপথ পূর্ব্বক প্রতিজ্ঞা করিলেন, যেরূপে পারি, এই অত্যাচারের সমুচিত প্রতিফল প্রদান করিব। তিনি অনতিচির সময়ের মধ্যেই, কি প্রধান, কি সামান্য, কি ধনী, কি দরিদ্র, কি উদাসীন, কি রাজপুরুষ সর্ব্ববিধ লোকের নিকট বিশিষ্টরূপ পরিচিত ও প্রতিপন্ন হইলেন এবং সর্ব্বত্র অব্যাহতগতি ও একজন গণনীয় ব্যক্তি হইয়া উঠিলেন।

যে ব্যক্তি কোড়াপ্রহার করিয়াছিল, তাহাক্ষে সমুচিত শাস্তিপ্রদান করাই তিনি সর্ব্বপ্রথম ও সর্ব্বপ্রধান কর্ম্ম বলিয়া অবধাবিত করিলেন, এবং অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া, কেবল তদনুকূল উদ্যেগে ব্যাপৃত রহিলেন। সুযোগ পাইয়া, তিনি নগরাধ্যক্ষের আলয় হইতে এক বহুমূল্য স্বর্ণপাত্রের অপহরণ করিলেন, এবং কৌশলক্রমে সেই স্বর্ণপাত্র ঘাতকের আলয়ে সংস্থাপিত করিয়া, অন্য লোক দ্বারা রাজপুরুষদিগের নিকট অপহৃত দ্রব্য অমুক স্থানে আছে, এই সংবাদ দেওয়াইলেন। তাঁহারা ঘাতকের আলয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, অপহৃত স্বর্ণপাত্র বহিষ্কৃত করিলেন। সে চৌর্য্যাভিযোগে বিচারালয়ে নীত হইল। তাহার গৃহে অপহৃত বস্তু লক্ষিত হইযাছিল, সুতবাং, সেই অভিযোগ নিঃসংশয়িতরূপে সপ্রমাণ হইল। আরবীয় বিধানশাস্ত্রের ব্যবস্থা সকল অত্যন্ত কঠিন, চৌর্য্যাপরাধ প্রমাণসিদ্ধ হইলে, অপরাধীর প্রাণদণ্ড হয়। তদনুসারে, সেই ঘাতকের প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা হইলে, সে বধস্থানে নীত হইল। সেই নগরে ঐ ব্যক্তি ব্যতিরিক্ত ঘাতকান্তর নিযুক্ত ছিল না। বিদবমন্, স্বয়ং ঘাতককর্ম্মের অনুষ্ঠানে সম্মত হইয়া, তীক্ষধার তরবারি লইয়া, প্রফুল্লচিত্তে বধস্থানে উপস্থিত হইলেন।

সেই ঘাতকের উপর তাঁহার মর্মান্তিক আক্রোশ জন্মিয়াছিল, এজন্য তিনি, তাহার বধসাধন করিয়াই, বৈরসাধনপ্রবৃত্তি চরিতার্থ হইল, এরূপ বোধ করিলেন না। কেবল তাঁহার চেষ্টায়, বিনা অপরাধে, তাহার প্রাণদণ্ড হইতেছে, ইহা তাহাকে অবগত না করিলে, তাঁহার চিত্তে সন্তোষবোধ হইল না। উপস্থিত ব্যাপার নির্ব্বাহের সমুদয় আয়োজন হইলে, তিনি তাহাকে অনুচ্চস্বরে বলিলেন, দেখ, যে অভিযোগে তোমার প্রাণদণ্ড হইতেছে, সে বিষয়ে তুমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। কিছুকাল পূর্ব্বে তুমি আমায় অত্যন্ত যাতনা দিয়াছিলে, সেই আক্রোশে আমি নগরাধ্যক্ষের আলয় হইতে স্বর্ণপাত্রের অপহরণ করিয়া উহা তোমার আবাসে রাখিয়া, অমূলক চৌর্য্যাভিযোগে তোমার বধসাধন করিতেছি।

এই কথা শুনিবামাত্র, ঘাতক, উচ্চৈঃস্বরে, পার্শ্ববর্ত্তী লোকদিগকে সম্বোধন কবিয়া বলিল, এ ব্যক্তি কি বলিতেছে, তোমরা শুনিলে? তখন বিদব্‌মন, অরে দুরাত্মন। তুমি অসন্তোষ প্রদর্শন করিতেছ, এই বলিয়া, এক প্রহারেই তাহার মস্তকচ্ছেদন করিলেন।

মানুষ, ক্রোধের অধীন ও বৈরসাধনবাসনার বশবর্ত্তী হইলে, ধর্ম্মাধর্ম্মবিবেচনায় এককালে জলাঞ্জলি দেয়।

যে ব্যক্তির হস্তে বিদবমন্‌কে যাতনাভোগ করিতে হইয়াছিল, তিনি তাহাকে সমুচিত প্রতিফলপ্রদান করিলেন, অতঃপর যাঁহাদের আদেশে তাঁহার যাতনাভোগ ঘটিয়াছিল, তাঁহাদের উপর বৈরসাধনে উদ্‌যুক্ত হইলেন। অভিপ্রেত-সম্পাদনের নিমিত্ত, তিনি নগরপ্রাচীরের সন্নিধানে এক বাড়ী ভাড়া লইলেন, এবং অবিচলিত অধ্যবসায় সহকারে, সুরঙ্গখনন করিতে আরম্ভ করিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই, সেই সুরঙ্গ প্রস্তুত হইল। ঐ নগরপ্রাচীর এরূপে নির্ম্মিত হইয়াছিল যে, পুরদ্বার রুদ্ধ করিয়া রাখিলে, বিপক্ষের পক্ষে, সেই নগরে প্রবেশ করা, কোনও ক্রমে, সহজ ব্যাপার নহে। সুরঙ্গ প্রস্তুত করিয়া রাখিবার উদ্দেশ্য এই যে, যখন মুসলমানদিগের কোনও বিপক্ষ সেই নগর আক্রমণ করিবে, তাহাদিগকে ঐ সুরঙ্গ দেখাইয়া দিবেন, তাহা হইলে, তাহারা, অনায়াসে নগরে প্রবেশ করিয়া, মুসলমানদিগকে পরাজিত করিতে পারিবে।

অতঃপর বিদবমন, উৎসুকচিত্তে বিপক্ষের আগমনপ্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। অনতিবিলম্বে, তাঁহার অভিপ্রেতসিদ্ধির সম্পূর্ণ সুযোগ ঘটিয়া উঠিল। কিছু দিন পরেই, ফরাসিসৈন্য সেই নগর আক্রমণ করিল। প্রথম উদ্যমে নগর হস্তগত করিতে অসমর্থ হইয়া, তাহারা শিবির ভঙ্গ করিয়া প্রতিপ্রয়াণের উদ্যোগ করিতেছে, এমন সময়ে বিদবমন, ফরাসিসেনাপতির নিকটে গিয়া, সবিশেষ সমস্ত বলিয়া, সেই উদ্যোগের নিবারণ করিলেন। সেনাপতি, অভিপ্রেতসমাধানের ঈদৃশ অসম্ভাবিত সদুপায়লাভে, যৎপরোনাস্তি প্রীতিপ্রাপ্ত হইলেন, এবং অবিলম্বে, বিদবমনের সমভিব্যাহারে, কতিপয় অকুতোভয অসংসাহসিক সৈনিক-পুরুষ প্রেরিত করিলেন। তাহাবা সেই সুরঙ্গ দ্বারা নগরে প্রবিষ্ট হইয়া, পুরদ্বার উদ্ঘাটিত করিলে, সমুদয় ফরাসিসৈন্য, অতর্কিতরূপে, উচ্ছলিত অর্ণবপ্রবাহেব ন্যায়, নগরে প্রবেশ করিল। অনধিক সময়ের মধ্যেই নগরস্থ সমস্ত মুসলমান তদীয় তরবারি-প্রহারে ছিন্নমস্তক ও ভূতলশায়ী হইল।

চাতুরীর প্রতিফল

চাতুরির প্রতিফল

আমেরিকার অন্তর্বর্ত্তী মিশৌরী নদীর তীরে, আদিমনিবাসী অসভ্যজাতির অধিষ্ঠিত যে প্রদেশ আছে, কিয়ৎকাল পূর্ব্বে, তথায় য়ুরোপীয় লোকের প্রায় যাতায়াত ছিল না। একদা এক য়ুরোপীয় বণিক্‌, নানাবিধ দ্রব্যসামগ্রী লইয়া সেই প্রদেশে বাণিজ্য করিতে গিয়াছিলেন। তাঁহার সঙ্গে অনেক বন্দূক ও বারুদ ছিল। তিনি, কিছুদিন তথায় অবস্থিতি করিয়া, তত্রত্য লোকদিগকে বন্দুক ও বারুদের ব্যবহার শিক্ষা করাইলেন। তাহারা মৃগয়াজীবী, বন্দুক ও বারুদ দ্বারা মৃগয়ার পক্ষে বিলক্ষণ সুবিধা দেখিয়া, ব্যগ্র হইয়া তাঁহার নিকট হইতে সমুদয় কিনিয়া লইল, এবং তাহার বিনিময়ে, তত্রত্য উৎপন্ন বস্তু পর্য্যাপ্ত পরিমাণে প্রদান করিল। বণিক্‌, স্বদেশে প্রতিগমন পূর্ব্বক, সেই সমস্ত বস্তু বিক্রয় করিয়া, যথেষ্ট লাভ করিলেন।

কিয়ৎদিন পরে, এক ফরাসি বণিক্‌, ভূরি পরিমাণে বারুদ লইয়া, সেই প্রদেশে ব্যবসায় করিতে গেলেন। তত্রত্য লোকেরা পূর্ব্বে যে বারুদ লইয়াছিল, তাহা তৎকাল পর্য্যন্ত নিঃশেষিত হয় নাই। সুতরাং তাহারা আর বারুদ লইতে সম্মত হইল না।
ঐ ব্যক্তি, বারুদ দিয়া বিনিময়লব্ধ দ্রব্যের বিক্রয় দ্বারা বিলক্ষণ লাভ করিব, এই প্রত্যাশায়, ব্যয় ও পরিশ্রম স্বীকার করিয়া সেইস্থানে গিয়াছিলেন। এক্ষণে, সম্ভাবিত লাভবিষয়ে হতাশ হইয়া, তিনি এই বিবেচনা করিতে লাগিলেন, কি উপায়ে বারুদগ্রহণে ইহাদের প্রবৃত্তি জন্মাইব। অবশেষে, তিনি এক উপায় উদ্ভাবিত করিলেন, এবং, তত্রত্য লোকদিগকে সমবেত করিয়া, কথাপ্রসঙ্গে বলিলেন, তোমরা বারুদের ব্যবহার করিয়া থাক, কিন্তু বারুদ কি পদার্থ, তাহার কিছুমাত্র জান না, শুনিলে চমৎকৃত হইবে। উহা আমাদের দেশের শস্যবিশেষ, বৎসরের অমুক সময়ে ভূমিতে বপন করিলে, অন্যান্য বীজের ন্যায়, যথাকালে ফলপ্রদান করে।

এই কথা শুনিয়া, সমবেত লোকসকল চমৎকৃত হইল, এবং একবার শস্য জন্মাইতে পারিলে, আমাদের আর য়ুরোপীয়দের নিকট হইতে ক্রয় করিবার আবশ্যকতা থাকিবে না, এই বিবেচনা করিয়া, বহুবিধ দ্রব্যের বিনিময় দ্বারা, তাঁহার নিকট হইতে সমস্ত বারুদ লইল, এবং নির্দ্দিষ্ট সময় উপস্থিত হইলে, যত্নপূর্ব্বক, ক্ষেত্রে তৎসমুদয়ের বপন করিতে লাগিল। য়ুরোপীয় বণিক্‌, এইরূপ চাতুরী করিয়া স্বদেশে প্রতিগমনপূর্ব্বক বিনিময়লব্ধ দ্রব্যসমূহের বিক্রয় দ্বারা যথেষ্ট লাভ করিলেন।

মিশৌরীয় লোকেরা, ক্ষেত্রে বারুদের বপন করিয়া ভূরি পরিমাণে ফললাভ প্রত্যাশায় অশেষবিধ যত্ন করিতে আরম্ভ করিল, এবং চারা জন্মিলে, পাছে বন্য জন্তুতে নষ্ট করিয়া যায়, এই আশঙ্কায় সতর্ক হইয়া, অহোরাত্র ক্ষেত্রের রক্ষণাবেক্ষণ করিতে লাগিল। বহুদিন অতীত হইল, তথাপি চারা নির্গত হইল না। তখন অনেকের মনে এই সন্দেহ উপস্থিত হইল, হয় ত সে ব্যক্তি প্রতারণা করিয়া গিয়াছে। কিন্তু যখন শস্যের নির্দ্দিষ্ট সময় অতীত হইয়া গেল, অথচ অঙ্কুর পর্য্যন্ত অবলোকিত হইল না, তখন তাহারা প্রতারিত হইয়াছি বলিয়া নিশ্চিত বুঝিতে পারল, এবং প্রতিজ্ঞা করিল, আর কখনও আমরা য়ুরোপীয়লোকের সহিত ব্যবহার বা তাহাদের কথায় বিশ্বাস করিয়া কোনও কার্য্য করিব না।

যথেষ্ট লাভ হওয়াতে ফরাসি বণিকের বিলক্ষণ লোভ জন্মিয়াছিল। কিন্তু এই চাতুরীর পর আর মিশৌরী যাইতে আর সাহস হইল না। তিনি অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া, অবশেষে অশেষবিধ দ্রব্যসামগ্রী সমভিব্যাহারে দিয়া, আপন ব্যবসায়ের অংশীকে তথায় পাঠাইয়া দিলেন, বলিয়া দিলেন, আমি তাহাদের সঙ্গে এই চাতুরী করিয়া আসিয়াছি, সাবধান, যেন তাহারা তোমায় আমার অংশী বা আত্মীয় বলিয়া জানিতে না পারে।

অংশীর নিকট হইতে এই উপদেশ লইয়া, সে ব্যক্তি মিশৌরীতে উপস্থিত হইলেন। তত্রত্য লোকেরা আনীত দ্রব্যসমুদয়ের দর্শনার্থ জাহাজে যাতায়াত করিতে লাগিল। ফরাসি বণিক্‌, পরিচয়প্রদান-বিষয়ে সবিশেষ সাবধান হইয়াছিলেন। কিন্তু তত্রত্য লোকেরা কোনও প্রকারে বুঝিতে পারিল, যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে চাতুরী করিয়া গিয়াছে, এ তাহার প্রেরিত ও আত্মীয়, কিন্তু তাহার নিকট কোনও কথাই ব্যক্ত না করিয়া, কতিপয় দিবস ভাবগোপন করিযা রহিল। তাহারা গ্রামের মধ্যস্থলে এক স্থান নিরূপিত করিয়া দিলে, বণিক্, সমুদয় দ্রব্য তথায় অবতীর্ণ করিলেন।

যে সকল লোক পূর্ব্ব প্রতারিত হইযাছিল, তাহারা আপনাদের অধিপতির অনুমতিগ্রহণ পূর্ব্বক দলবদ্ধ হইয়া, এককালে ফরাসি বণিকের দ্রব্যালয়ে উপস্থিত হইল, এবং এক মুহূর্ত্তর মধ্যে তাঁহার সমুদয় দ্রব্য বলপূর্বক উঠাইয়া লইয়া স্ব স্ব আলয়ে প্রস্থান করিল। তদ্দর্শনে তিনি কিয়ৎক্ষণ হতবুদ্ধি হইয়া রহিলেন, অনন্তর অধিপতির নিকটে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, আপনকার প্রজারা অতি অন্যায়াচরণ করিয়াছে, বিনিময়ে কোনও দ্রব্য না দিয়া, আমার সমস্ত বস্তু বলপূর্ব্বক উঠাইয়া আনিয়াছে, আপনি তাহাদের সমুচিত শাসন করুন, ও আমার ন্যায্য প্রাপ্য দেওয়াইয়া দেন।

এই অভিযোগ শ্রবণগোচর করিয়া, অধিপতি গভীরভাবে এই উত্তরপ্রদান করিলেন, আমি অবশ্যই যথার্থ বিচার করিব, এবং তোমাকে তোমার প্রাপ্য দেওয়াইব, কিন্তু কিছুদিন অপেক্ষা করিতে হইবে। একজন ফরাসি বণিক, আমার প্রজাদিগকে পরামর্শ দিয়া, বারুদের বপন করাইযাছে। শস্য জন্মিলেই ঐ বারুদ লইয়া, তাহারা মৃগয়া কবিতে আরম্ভ করিবে, মৃগয়ালব্ধ যাবতীয় পশুচর্ম্ম, তোমার দ্রব্যের বিনিময়ে, তোমায় দেওয়াইব। বণিক্, অধিপতির এই বাক্যের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া বলিলেন, আমাদের দেশে বারুদের বপন করিলে শস্য জন্মিয়া থাকে, কিন্তু এখানকার ভূমি তাদৃশ শস্যের উৎপাদনের উপযুক্ত নহে, সুতরাং আপনকার প্রজারা যে বারুদের বপন করিযাছে, তাহাতে শস্য জন্মিবার সম্ভাবনা নাই। আপনি অনুগ্রহ করিয়া, আমার প্রাপ্যদানের আদেশ প্রদান করুন। যে ব্যক্তি এদেশে বারুদ-বপনের পরামর্শ দিয়াছিল, সে ভদ্রলোক নহে, সে আপনকার প্রজাদের সহিত চাতুরী করিয়া গিয়াছে। আমি নিরপরাধ, অন্যের অপরাধে, আমার দণ্ড করা বিধেয় নহে।

এই কথা শুনিয়া অধিপতি কিঞ্চিৎ কুপিত হইয়া, এইমাত্র উত্তর দিলেন, যদি তুমি আপন মঙ্গল চাও, অবিলম্বে আমার অধিকার হইতে চলিয়া যাও। ফরাসি বণিক, বিষন্ন হইয়া, এই ভাবিতে ভাবিতে প্রস্থান করিলেন, সেবার চাতুরীতে যত লাভ হইয়াছিল, এবার অন্ততঃ তাহার চতুর্গুণ ক্ষতি হইল, এবং চিরকালের জন্য এরূপ এক লাভের পথ রুদ্ধ হইযা গেল। যাহা হউক, আমরা সভ্য, অসভ্য জাতির নিকট বিলক্ষণ নীতিশিক্ষা পাইলাম।

দয়া ও সৌজন্যের পরাকাষ্ঠা

দয়া ও সৌজন্যের পরাকাষ্ঠা

খৃষ্টধর্ম্মাবলম্বীদিগের মধ্যে কোয়েকব নামে এক সম্প্রদায় আছে। ঐ সম্প্রদায়ের লোকদিগের নিয়ম এই, তাঁহারা প্রাণান্তেও অন্যের অনিষ্টাচরণ করেন না, এবং অন্যে তাঁহাদের অনিষ্টাচরণে প্রবৃত্ত হইলেও, তাঁহারা রোষের বশবর্ত্তী হইয়া বৈরসাধনে উদ্যত হয়েন না। ইংলণ্ডের অধীশ্বর দ্বিতীয় চার্লসের অধিকারকালে, এক জাহাজে বাণিজ্যার্থে বিনীস্‌ যাত্রা করিয়াছিল। ঐ জাহাজের অধ্যক্ষ ও তদীয় সহকারী কোয়েকব সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন।

এই সময়ে খৃষ্টধর্ম্মাবলম্বী য়ুরোপীয় লোক ও মুসলমানধর্ম্মাবলম্বী তুরুষ্কজাতি, এ উভয়ের পরস্পর ভয়ানক বিরোধ ও বিদ্বেষভাব চলিতেছিল। সুযোগ পাইলে, তাঁহারা পরস্পরের জাহাজ লুণ্ঠন ও তত্রত্য লোকদিগকে রুদ্ধ করিয়া দাসরূপে বিক্রয় করিতেন। পূর্ব্বোক্ত জাহাজ বিনীস্‌ হইতে প্রতিগমন করিতেছে, পথিমধ্যে তুরুষ্কজাতীয় দস্যুদল আক্রমণ করিয়া,
তত্রত্য লোকদিগকে নিরস্ত্র ও আপনাদিগের সম্পূর্ণ আয়ত্ত করিয়া লইল, এবং দশ জন তুরুষ্কদস্যু, আয়ত্তীকৃত লোকদিগের দাসরূপে বিক্রয় করিবার নিমিত্ত, ঐ জাহাজ আফ্রিকায় লইয়া চলিল।

পরদিন রজনীতে, অনবধানবশতঃ তুরুষ্কেরা সকলেই এককালে নিদ্রাগত হইয়াছিল। এই সুযোগ দেখিয়া, জাহাজের সহকারী অধ্যক্ষ তাহাদের সমস্ত অস্ত্র হস্তগত করিলেন, এবং আপন লোকদিগকে বলিলেন, দেখ, আমি তুরুষ্কদিগকে নিরস্ত্র করিয়াছি, এক্ষণে উহারা আমাদের সম্পূর্ণ বশে আসিয়াছে। কিন্তু সকলকে সাবধান করিয়া দিতেছি, কেহ কোপাবিষ্ট হইয়া, উহাদের উপর কোনও প্রকারে অত্যাচার করিও না। যাবৎ আমরা মাজর্কায় না পঁহুছি, তাবৎ উহাদিগকে বশে রাখিব। মাজর্কা দ্বীপ স্পেন্‌দেশীয়দিগের অধিকৃত, এজন্য তিনি ভাবিয়াছিলেন, তথায় পঁহুছিলে সকল শঙ্কা দূর হইবে, এবং নির্বিঘ্নে ও সত্বরে স্বদেশে প্রতিগমন করিতে পারিবেন।

রজনী প্রভাত হইল। এক জন তুরুষ্কের নিদ্রাভঙ্গ হইলে, সে জাহাজের উপরিভাগে গিয়া দেখিল, তাহারা ইংরেজদিগের সম্পূর্ণ বশে আসিয়াছে, জাহাজ মাজর্কা অভিমুখে চালিত হইতেছে, এবং ঐ স্থান এত সন্নিহিত হইয়াছে যে, অল্প সময়ের মধ্যেই জাহাজ তথায় উপস্থিত হইবে। স্পেন্‌দেশীয়েরা তুরুষ্কজাতির অত্যন্ত বিদ্বেষী, যদি উহারা তাহাদের নিকট বিক্রীত হয়, উহাদের দুরবস্থার একশেষ ঘটিবে। এই ভাবিয়া, সে ব্যক্তি ভয়ে একান্ত অভিভূত হইল, এবং ক্ষণবিলম্ব ব্যতিরেকে স্বজাতীয়দিগকে জাগরিত করিয়া, উপস্থিত বিপদের বিষয় তাহাদের গোচর করিল। সকলেই ভয়ে ম্রিয়মাণ ও কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া, বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিল।

কিয়ৎক্ষণ পরে, তুরুষ্কেরা জাহাজের অধ্যক্ষ ও তদীয় সহকারীর নিকট উপস্থিত হইল, এবং অঞ্জলিবন্ধন পূর্ব্বক অশ্রুপূর্ণ লোচনে কাতর বচনে বলিতে লাগিল, আমরা তোমাদিগকে আপন বশে আনিয়া, দাসরূপে বিক্রয় করিতে লইয়া যাইতেছিলাম। কিন্তু ঈশ্বরেচ্ছায় আমরা এক্ষণে তোমাদের সম্পূর্ণ বশে আসিয়াছি। এখন তোমরা আমাদিগকে দাসরূপে বিক্রয় করিবে, সন্দেহ নাই। যাহা হউক, তোমাদের নিকট একমাত্র প্রার্থনা এই, আমাদিগকে স্পেনদেশীয়দিগের নিকট বিক্রয় করিও না। তাহারা অত্যন্ত নির্দ্দয় ও তুরুষ্কজাতির অত্যন্ত বিদ্বেষী, তাহাদের হস্তগত হইলে, আমাদের দুর্গতির সীমা থাকিবে না। অধ্যক্ষ ও সহকারী, তাহাদের এই প্রার্থনা শুনিয়া বলিলেন, তোমরা নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত হও, আমরা অঙ্গীকার করিতেছি, তোমাদের প্রাণহিংসা বা স্বাধীনতার উচ্ছেদ করিব না। অনন্তর তাঁহারা তাহাদিগকে জাহাজের অভ্যন্তরভাগে লুকাইয়া থাকিতে বলিলেন, এবং আপন লোকদিগকে সবিশেষ সাবধান করিয়া দিয়া বলিলেন, যতক্ষণ মাজর্কার বন্দরে জাহাজ থাকিবে, আমাদের সঙ্গে তুরুষ্কজাতীয় লোক আছে, ইহা কোনও মতে প্রকাশ না হয়। তুরুষ্কেরা, তাঁহাদের দয়া ও সৌজন্যের একশেষ দর্শনে নিরতিশয় প্রীত হইয়া, আন্তরিক ভক্তিসহকারে অশেষপ্রকারে সাধুবাদপ্রদান করিতে লাগিল।

অল্প সময়ের মধ্যেই, জাহাজ মাজর্কার বন্দরে উপস্থিত হইল। সেই স্থানে আর একখানি ইংলণ্ডীয় জাহাজ ছিল। উহার অধ্যক্ষ, এই জাহাজে আসিয়া কথোপকথন করিতে লাগিলেন। কথায় কথায়, অধ্যক্ষ ও তদীয় সহকারী তাঁহার নিকট তুরুষ্কদিগের বৃত্তান্ত ব্যক্ত করিয়া বলিলেন, আমরা উহাদিগকে বিক্রয় করিব না, স্থির করিয়াছি, আফ্রিকার কোনও নিরাপদ্‌ স্থানে অবতীর্ণ করিয়া দিব। তিনি তাঁহাদের দয়া ও সৌজন্যের বিষয় অবগত হইয়া হাসিতে লাগিলেন, এবং বলিলেন, যদি আপনারা উহাদিগকে বিক্রয় করেন, প্রত্যেক ব্যক্তিতে দ্বাত্রিংশৎ শত মুদ্রা পাইতে পারেন। তাঁহারা বলিলেন, যদি আমরা এই দ্বীপের সম্পূর্ণ আধিপত্য পাই, তথাপি উহাদিগকে বিক্রয় করিব না।

কিয়ৎ ক্ষণ কথোপকথনের পর, অপর জাহাজের অধ্যক্ষ প্রস্থান করিলেন। প্রস্থানকালে তাঁহারা তাঁহাকে এই অঙ্গীকার করাইলেন, আপনি তুরুষ্কদিগের বিষয় কাহারও নিকট ব্যক্ত করিবেন না। কিন্তু তিনি সেই অঙ্গীকারের প্রতিপালন না করিয়া স্পেনদেশীয়দিগের নিকট সবিশেষ সমুদয় ব্যক্ত করিলেন। তাঁহারা শুনিয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন, যেরূপে পারি, ঐ জাহাজ হইতে তুরুষ্কদিগকে লইয়া আসিব। অধ্যক্ষ ও তাঁহার সহকারী, এই প্রতিজ্ঞার বিষয় অবগত হইবামাত্র জাহাজ খুলিয়া দিলেন। স্পেনদেশীয়েরাও ঐ জাহাজ ধরিবার জন্য, আপনাদের এক জাহাজ খুলিয়া দিলেন, কিন্তু ইংলণ্ডীয় জাহাজ ধরিতে পারিলেন না।

এইরূপে পলায়ন করিয়া, তাঁহারা ক্রমাগত নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভ্রমণ করিলেন, কিন্তু, কিরূপে তুরুষ্কদিগের পরিত্রাণ করিবেন, স্থির করিতে পারিলেন না। যাহা হউক, ইহা অবধারিত করিয়া রাখিয়াছিলেন, তাহাদিগকে কোনও মতে খৃষ্টীয়দিগের অধিকারে অবতীর্ণ করিয়া দিবেন না। একদা, তুরুষ্কেরা ইঙ্গরেজদিগকে আপন বশে আনিবার নিমিত্ত উদ্যম করিয়াছিল, কিন্তু অধ্যক্ষ ও সহকারীর সতর্কতা প্রযুক্ত কৃতকার্য্য হইতে পারিল না। ইহাতে কোয়েকব্‌দিগের অন্তঃকরণে তাহাদের প্রতি বিদ্বেষবুদ্ধির উদয় হইল না, তাঁহাদের দয়া ও সৌজন্য পূর্ব্ববৎ অবিচলিতই রহিল।

এই সময়ে জাহাজের কর্ম্মচারীরা সাতিশয় বিরাগ ও অসন্তোষ প্রদর্শিত করিয়া, অধ্যক্ষদিগকে বলিতে লাগিল, আমরা আপনাদের আজ্ঞানুবর্ত্তী বলিয়া, আমাদিগকে বিপদে ফেলা আপনাদের উচিত নহে। কি আশ্চর্য্য। আপনারা আমাদের অপেক্ষা তুরুষ্কদিগের জীবন ও স্বাধীনতার রক্ষার নিমিত্ত অধিক ব্যগ্র হইয়াছেন। এই প্রদেশে তুরুষ্কদিগের জাহাজ সতত যাতায়াত করে, সুতরাং আমাদিগকে ত্বরায় তুরুষ্কদিগের হস্তে পড়িতে হইবে, তাহার সন্দেহ নাই। অধ্যক্ষ ও সহকারী, অনেক বুঝাইয়া তাহাদের অসন্তোষ নিবারণ করিলেন।

পরিশেষে জাহাজ বার্ববি উপকূলে উপস্থিত হইলে, তুরুষ্কদিগকে তথায় অবতীর্ণ করিয়া দেওয়া অবধারিত হইল। ঐ স্থান মুসলমানদের অধিকৃত। এক্ষণে এই বিচার উপস্থিত হইল, কিরূপে উহাদিগকে তীরে অবতীর্ণ করিয়া দেওয়া যায়। যদি বোটে পাঠাইয়া দেওয়া যায়, উহারা অস্ত্রসংগ্রহ পূর্ব্বক আসিয়া, জাহাজ আক্রমণ ও অধিকার করিতে পারে। যদি দুই চারি জন নাবিক সঙ্গে দিয়া পাঠান যায়, উহারা তাহাদের প্রাণবিনাশ করিতে পারে। যদি দুই ভাগ করিয়া দুইবারে পাঠান যায়, যাহারা প্রথম তীরে অবতীর্ণ হইবে, তাহারা লোকসংগ্রহ করিয়া আমাদের উপর অত্যাচার করিতে পারে।

এইরূপে বিবেচনার পর, সহকারী অধ্যক্ষ বলিলেন, আমি দুই তিন জন লোক সঙ্গে লইয়া, এককালে সকলকে তীরে অবতীর্ণ করিয়া আসিতেছি। অধ্যক্ষ সম্মতিপ্রদান করিলে, সহকারী নির্ব্বিরোধে ও নিরুদ্বেগে উহাদিগকে তীরে অবতীর্ণ করিয়া দিলেন। তুরুষ্কেরা, তাঁহাদের যার পর নাই সদয় ও সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার দর্শনে মোহিত হইয়াছিল, এক্ষণে তীরস্থ হইয়া আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইল, এবং কৃতজ্ঞতাপূর্ণ হৃদয়ে তাঁহাকে বলিল, আপনারা অনুগ্রহ পূর্ব্বক, আমাদের সঙ্গে ঐ গ্রাম পর্য্যন্ত চলুন, আমরা আপনাদের যথোচিত সমাদর ও পরিচর্য্যা করিব। আপনারা আমাদের প্রতি যেরূপ ব্যবহার করিয়াছেন, আমরা যাবজ্জীবন তাহা বিস্মৃত হইতে পারিব না। যাহা হউক, সহকারী তাহাদের প্রার্থনানুযায়ী কার্য্য না করিয়া, অবিলম্বে জাহাজে প্রতিগমন করিলেন।

অনুকূলবায়ুবশে তাঁহাদের জাহাজ অনতিবিলম্বে ইংলণ্ডে উপস্থিত হইল। তুরুষ্কদস্যুসংক্রান্ত যাবতীয় বৃত্তান্ত, অল্প সময়ের মধ্যেই সর্ব্বতঃ সঞ্চারিত হইল। কোয়েকবদিগের সদয় ব্যবহার শ্রবণে সকলেই চমৎকৃত হইলেন। বস্তুতঃ, এই বৃত্তান্ত শ্রবণে সর্ব্বসাধারণের অন্তঃকরণে এমন অসাধারণ কৌতূহল উদ্বুদ্ধ হইয়াছিল যে, যাহারা বিপক্ষের সহিত এরূপ ব্যবহার করিতে পারে, তাহারা কিরূপ মনুষ্য, ইহা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিবার নিমিত্ত, ইংলণ্ডেশ্বর স্বয়ং স্বীয় সহোদর ও কতিপয় সম্ভ্রান্ত লোক সমভিব্যাহারে, সেই জাহাজে উপস্থিত হইলেন, এবং তাঁহাদের মুখে আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, তিনি সহকারী অধ্যক্ষের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিলেন, তুরুষ্কদিগকে আমার নিকটে আনা তোমার উচিত ছিল। সহকারী বলিলেন, আমি তাহাদিগকে স্বদেশে পঁহুছাইয়া দেওয়া, তাহাদের পক্ষে অধিকতর শ্রেয়স্কর মনে করিয়াছিলাম।

দয়ালুতা ও ন্যায়পরতা

দয়ালুতা ও ন্যায়পরতা

জর্ম্মনির সম্রাট দ্বিতীয় জোজেফের এই রীতি ছিল, সামান্য পরিচ্ছদ পরিধান করিয়া, রাজধানীর উপশল্যে একাকী পদব্রজে ভ্রমণ করিতেন। একদা, এক দীন বালক তদীয় সৌম্যমুর্ত্তি দর্শনে সাহসী হইয়া, সহসা তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। তাঁহাকে সম্রাট্ বলিয়া জানিত না, একজন সামান্য ধনবান্ ব্যক্তি জ্ঞান করিয়া, অশ্রুপূর্ণলোচনে, কাতরবচনে বলিল, মহাশয়,
আপনি কৃপা করিয়া আমায় কিছু ভিক্ষা দেন। সম্রাট্ অত্যন্ত দয়ালুস্বভাব, এই ব্যাপার দর্শনে তাঁহার অন্তঃকরণে করুণা-সঞ্চার হইল। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, অহে বালক, তোমার আকারপ্রকার ও প্রার্থনাপ্রণালী দেখিয়া স্পষ্ট বোধ হইতেছে, তুমি অতি অল্প দিন ভিক্ষা করিতে আরম্ভ কবিয়াছ।

এই কথা শ্রবণমাত্র বালক বলিল, মহাশয়, আমি ইহার পূর্ব্বে কখনও কাহারও নিকট ভিক্ষা করি নাই, আমাদের অত্যন্ত দুরবস্থা ও বিপদ ঘটিয়াছে, এজন্য আজ ভিক্ষা করিতে আসিয়াছি। অল্পদিন হইল, আমার পিতৃবিযোগ হইয়াছে। আমাদের কেহ সহায় নাই, এবং জীবিকা নির্ব্বাহের কোনও উপায় নাই। আমরা দুই সহোদর, আমি জ্যেষ্ঠ। আমাদের জননী আছেন, তিনি অত্যন্ত পীডিত হইয়া শয্যাগত রহিয়াছেন। সম্রাট জিজ্ঞাসা করিলেন, কে তোমার জননীর চিকিৎসা করিতেছে। বালক বলিল, মহাশয়, তিনি বিনা চিকিৎসায় পড়িয়া আছেন, চিকিৎসককে দিতে, অথবা চিকিৎসক যে ঔষধের ব্যবস্থা করিবেন, তাহা কিনিতে পারি, আমাদের এমন সঙ্গতি নাই, সেই জন্য ভিক্ষা করিতে আসিয়াছি।

দীন বালকের মুখে দুরবস্থাবর্ণন শ্রবণ করিয়া, সম্রাটের হৃদয়ে প্রভূত কারুণ্যরস উচ্ছ্বলিত হইল। তিনি, শোকপূর্ণ দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্ব্বক, সেই বালকের বাটীর ঠিকানা জানিয়া লইলেন, এবং তাহার হস্তে কতিপয় মুদ্রা প্রদান পূর্ব্বক বলিলেন, তুমি সত্বর তোমার জননীর নিমিত্ত চিকিৎসক লইয়া যাও, কোনও খানে বিলম্ব করিও না। বালক, মুদ্রালাভে প্রফুল্ল হইয়া, চিকিৎসক আনিবার নিমিত্ত দ্রুতবেগে প্রস্থান করিল।

এদিকে, সম্রাট অন্বেষণ করিতে করিতে, সেই বালকের আলয়ে উপস্থিত হইলেন, এবং দর্শনমাত্র বুঝিতে পারিলেন, বালক যেরূপ বর্ণন কবিয়াছিল, তাহাদের দুরবস্থা তদপেক্ষা অনেক অধিক, দেখিলেন, তাহার জননী শয্যাগত আছে, আর, একটা শিশুসন্তান নিতান্ত অশান্ত হইয়া তাহার পার্শ্বে রোদন ও উৎপাত করিতেছে। তিনি তাহার নিকটবর্ত্তী হইয়া, চিকিৎসাব্যবসায়ী বলিয়া আপন পরিচয় দিলেন, এবং নিরতিশয় সদয়ভাবে, মৃদুবচনে তাহার পীড়ার বিষয়ে সবিশেষ সমস্ত জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন।

তদীয় সদয় ভাব অবলোকন ও কোমল সম্ভাষণ শ্রবণ করিয়া, সেই স্ত্রীলোক বলিল, মহাশয, কযেক দিবস অবধি আমার অতিশয় পীড়া হইয়াছে বটে, কিন্তু আমি পীড়া অপেক্ষা, দুরবস্থায় অধিক অভিভূত হইযাছি, আমার দুর্ভাগ্যের বিষয়ে আপনার নিকটে কি পরিচয় দিব। অল্প দিন হইল, স্বামীর মৃত্যু হইয়াছে, যাহা কিছু সংস্থান ছিল, অমুক বণিক্ দেউলিয়া হওযাতে, সমস্ত লোপ পাইয়াছে। আমার দুটি সন্তান, দুটিই শিশু, উহাদের প্রতিপালনের কোনও উপায় নাই। বিশেষতঃ, আমার উৎকট রোগ জন্মিয়াছে, অর্থাভাবে চিকিৎসা হইতেছে না, সুতরাং ত্বরায় আমার প্রাণবিয়োগ হইবে, তখন এই দুই হতভাগ্যের কি দশা ঘটিবে, সেই ভাবনায় আমি অতিশয় অভিভূত হইয়াছি। বড় পুত্রটি অতিশয় মাতৃবৎসল, সে আমার চিকিৎসার নিমিত্ত ভিক্ষা করিতে গিয়াছে।

এই অনাথ পরিবারের দুরবস্থা শ্রবণ করিয়া, সম্রাট সাতিশয় শোকাকুল হইলেন, এবং বাষ্পবারিপরিপূরিত নয়নে বলিলেন, তুমি উদ্বিগ্ন হইও না, তোমার এ দুরবস্থা অধিক দিন থাকিবে না। ত্বরায় তোমার রোগশান্তি ও দুঃখশান্তি হইবে, তাহার সন্দেহ নাই। এক্ষণে তুমি আমায় একখণ্ড কাগজ দাও, তোমাব অবস্থানুরূপ ঔষধের ব্যবস্থা লিখিয়া দিতেছি। অন্য কাগজ ছিল না, এজন্য সেই স্ত্রীলোক, জ্যেষ্ঠ পুত্রের পড়িবার পুস্তকের প্রান্তভাগে যে কাগজ ছিল, তাহাই ছিন্ন করিয়া তাঁহার হস্তে দিল। তিনি, লিখন সমাপ্ত করিয়া টেবিলের উপর রাখিযা দিলেন, এবং আমি যে ব্যবস্থা করিলাম, উহাতে তুমি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যলাভ করিবে, এই বলিয়া প্রস্থান করিলেন।

সম্রাট বহির্গত হইবার অব্যবহিত পরক্ষণেই, সেই দুঃখিনীর জ্যেষ্ঠ পুত্র, চিকিৎসক সঙ্গে লইয়া গৃহপ্রবেশ করিল, এবং আহ্লাদে অধীর হইয়া জননীকে সম্ভাষণ করিয়া বলিতে লাগিল, মা, তুমি আর ভাবনা করিও না, আমি টাকা পাইয়াছি ও চিকিৎসক আনিয়াছি। পুত্রের আহ্লাদ দর্শনে, তাহার নয়নদ্বয় অশ্রুপূর্ণ হইয়া আসিল। সে, পুত্রকে পার্শ্বে বসাইয়া, তাহার মুখচুম্বন করিল, এবং বলিল, বৎস, তোমার যত্ন ও আগ্রহ দেখিয়া আমার বোধ হইতেছে, তুমি অতিশয় মাতৃবৎসল, জগদীশ্বর তোমায় দীর্ঘজীবী ও নিরাপদ করুন। এই বলিয়া সে বলিল, আর চিকিৎসক না হইলেও চলিত। ইতঃপূর্ব্বে একজন আসিয়াছিলেন। তিনি অত্যন্ত দয়ালু, ঔষধের ব্যবস্থা লিখিয়া, টেবিলের উপর রাখিয়াছেন, আমায় অনেক উৎসাহ ও আশ্বাস দিয়া এইমাত্র চলিয়া গেলেন।

এই কথা শুনিয়া, পুত্রের আনীত চিকিৎসক সেই স্ত্রীলোককে বলিলেন, যদি তোমার আপত্তি না থাকে, তিনি কি ব্যবস্থা করিয়া গিয়াছেন, দেখি। সে বলিল আমার কোনও আপত্তি নাই, আপনি স্বচ্ছন্দে দেখুন। তখন তিনি, সেই কাগজ হস্তে লইয়া, সম্রাটের স্বাক্ষরদর্শনে চকিত হইয়া উঠিলেন, এবং বলিলেন, আজ তোমার কি সৌভাগ্যের দিন বলিতে পারি না। আমার পূর্ব্ব যে ব্যক্তি আসিযাছিলেন, তিনি অন্যবিধ চিকিৎসক। তিনি তোমার পক্ষে যে ব্যবস্থা করিয়া গিয়াছেন, আমার সেরূপ ব্যবস্থা করিবার ক্ষমতা নাই। তাঁহার ব্যবস্থা দ্বারা তোমার যেরূপ উপকার দর্শিবে, আমার ব্যবস্থায় কোনও ক্রমে সেরূপ হওয়া সম্ভাবিত নহে। অধিক আর কি বলিব, আজ অবধি তোমার দুরবস্থার অবসান হইল। যিনি তোমার আলয়ে আসিয়াছিলেন, তিনি চিকিৎসক বা অন্যবিধ ব্যক্তি নহেন, জর্ম্মনির সম্রাট্ পরম দয়ালু দ্বিতীয় জোজেফ্। তিনি তোমার দুরবস্থাদর্শনে দয়ার্দ্রচিত্ত হইয়া, এই কাগজে তোমাকে অনেক টাকা দিবার অনুমতি লিখিয়া দিয়াছেন।

শ্রবণমাত্র, সেই স্ত্রীর ও তাহার পুত্রের অন্তঃকরণে যেরূপ ভাবের উদয় হইতে লাগিল, তাহার বর্ণন করিতে পারা যায় না। তাহারা উভয়েই, সম্রাটের দয়া ও সৌজন্যের একশেষ দর্শনে, মোহিত ও চমৎকৃত হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল, অনন্তর অশ্রুপূর্ণলোচনে, গদগদবচনে, জগদীশ্বরের নিকট তাঁহার অচল রাজ্য ও দীর্ঘ আয়ুর প্রার্থনা করিতে লাগিল। এই অতর্কিত আনুকূল্য লাভ করিয়া, সেই স্ত্রীলোক ত্বরায় রোগমুক্ত হইল, এবং সুখে ও স্বচ্ছন্দে সংসারযাত্রানির্ব্বাহ করিতে লাগিল।

আর একদিন সম্রাট্ রাজপথে একাকী ভ্রমণ করিতেছেন, এমন সময়ে এক দীন বালিকা সেই পথ দিয়া আপনার বস্ত্র বিক্রয় করিতে যাইতেছে। সে সম্রাটকে চিনিত,না, সুতরাং তাঁহাকে লক্ষ্য না করিয়া, তাঁহার সম্মুখ দিয়া, চলিয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু, তিনি তাহার মুখ দেখিয়া স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন, সে অত্যন্ত দুরবস্থায় পড়িয়াছে। তখন তিনি তাহাকে সদয় সম্ভাষণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, অয়ি বালিকে। কি জন্য তোমায় বিবর্ণ ও বিষণ্ন দেখিতেছি, বল।

এই সস্নেহবাক্য শ্রবণগোচর করিয়া, বালিকা দণ্ডায়মান হইল, এবং বলিতে লাগিল, মহাশয়, কিছু দিন হইল, আমি পিতৃহীন হইয়াছি, আমাদের এরূপ দুরবস্থা যে, দিনপাত হওয়া কঠিন। আমার জননী অসুস্থ হইয়াছেন, তাঁহার পথ্য ও ঔষধের নিমিত্ত, আর কোনও উপায় দেখিতে না পাইয়া, অবশেষে আমার পরিধেয় বস্ত্র বিক্রয় করিতে যাইতেছি, আমার আর বস্ত্র নাই। আজ ইহা বিক্রয় করিয়া কঞ্চিৎ চলিবে, কাল কি উপায় হইবে, এই ভাবিয়া আমি অস্থির হইয়াছি। বোধ হয়, পথ্য ও ঔষধের অভাবে, জননীকে প্রাণত্যাগ করিতে হইবে।

এই বলিতে বলিতে সেই বালিকার নয়নযুগল হইতে, প্রবলবেগে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। সে কিয়ৎক্ষণ মৌনাবলম্বন করিয়া রহিল, অনন্তর শোকসংবরণ করিয়া বলিতে লাগিল, মহাশয, যদি এ রাজ্যে ন্যায় অন্যায় বিচার থাকিত, তাহা হইলে কখনই আমাদের এরূপ দুরবস্থা ঘটিত না। আমার পিতা, বহুকাল সৈন্যসংক্রান্ত কর্ম্মে নিযুক্ত ছিলেন, এবং, যেরূপ যত্ন ও উৎসাহ সহকারে কার্য্যনির্ব্বাহ করিয়াছিলেন, সম্রাট ন্যায়বান হইলে, তিনি সবিশেষ পুরস্কার পাইতে পারিতেন, পুরস্কার পাওয়া দূরে থাকুক, যখন তিনি বৃদ্ধ ও অকর্মণ্য হইলেন, তখন আর সম্রাট তাঁহার কোনও সংবাদ লইলেন না। তিনি অর্থাভাবে, শেষ দশায় অনেক ক্লেশভোগ করিয়া প্রাণত্যাগ করিয়াছেন।

সম্রাট্ শুনিয়া সাতিশয় দুঃখিত ও শোকাকুল হইলেন,এবং তাহাকে সান্ত্বনাপ্রদানার্থ বলিলেন, তুমি সম্রাটের উপর যে দোষারোপ করিতেছ, তাহা বোধ হয় বিচারসিদ্ধ নহে। তাঁহার উপর তোমাদের যে দাওয়া আছে, হয় ত তিনি তাহা জানিতেই পারেন নাই। তাঁহাকে রাজ্যশাসনসংক্রান্ত নানা বিষয়ে নিরন্তর ব্যাপৃত থাকিতে হয়। তোমার পিতার দুরবস্থার বিষয় তাঁহার গোচর হইলে, অবশ্যই তিনি সমুচিত বিবেচনা করিতেন। এক্ষণে তোমায় পরামর্শ দিতেছি, সবিশেষ সমস্ত বিবরণ লিখিয়া, তাঁহার নিকট প্রার্থনাপত্র প্রদান কর।

এই কথা শুনিয়া বালিকা বলিল, মহাশয়, আপনি প্রার্থনাপত্র প্রদানের পরামর্শ দিতেছেন বটে, কিন্তু তদ্দারা আমাদের উপকারের কোনও প্রত্যাশা নাই। আমাদের কেহ সহায় নাই। দুঃখীর পক্ষে অনুকূল কথা বলেন, এমন লোক দেখিতে পাই না। যদি আমাদের সম্পত্তি থাকিত, অনেকে আমাদের আত্মীয় হইতেন ও সহায়তা করিতেন। আমাদের মত লোকের প্রার্থনা সম্রাটের গোচর হওযা, কোনও মতে সম্ভাবিত নহে। তখন সম্রাট বলিলেন, তুমি সে জন্য উদ্বিগ্ন হইও না। সম্রাটের নিকট আমার বিলক্ষণ প্রতিপত্তি আছে। আমি অঙ্গীকার করিতেছি, সাধ্যানুসারে তোমাদের সহায়তা করিব। আর বোধ করি, যাহাতে তোমাদের পক্ষে যথার্থ বিচার হয়, আমি তাহা করিতে পারিব।

ইহা বলিয়া, তিনি সেই বালিকার হস্তে কতিপয় মুদ্রা প্রদান পূর্ব্বক বলিলেন, তোমার বস্ত্রবিক্রয় করিবার প্রয়োজন নাই, গৃহে গমন কর। তুমি দুই দিবস পরে রাজবাটীতে গিয়া, আমার সহিত সাক্ষাৎ করিবে। ইতিমধ্যে আমি তোমাদের বিষয়ে চেষ্টা দেখিব, এবং কত দূর করিতে পারি, তাহা তোমাকে জানাইব। তুমি ঐ দিন অবশ্য আমার নিকটে যাইবে, কোনও মতে অন্যথা করিবেনা। এই বলিয়া সম্রাট্ তাহার পিতার নাম জানিয়া লইলেন; এবং তাহাকে আশ্বাসিত হইতে বলিয়া প্রস্থান করিলেন।

বালিকা তাঁহার এইরূপ নিরুপাধি দয়া ও অসামান্য সৌজন্য দর্শনে, মোহিত ও চমৎকৃত হইল, এবং আহ্লাদে পুলকিত হইয়া, বাষ্পবারিপরিপূরিতনয়নে কিয়ৎক্ষণ তাঁহার দিকে নিরীক্ষণ করিয়া রহিল, পরে তিনি দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইলে, গৃহপ্রতিগমনপূর্ব্বক, সবিশেষ সমস্ত আপন জননীর গোচর করিল।

সম্রাট্ রাজবাটীতে প্রবিষ্ট হইয়াই উপস্থিত বিষয়ের তত্ত্বানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন, এবং অবিলম্বে জানিতে পারিলেন, বালিকা যাহা বলিয়াছিল, তাহার সমস্তই সম্পূর্ণ সত্য। বালিকা ও তাহার জননী যে অকারণে এত দিন কষ্টভোগ করিতেছে, এবং তাহার পিতাও যে, শেষদশায় ক্লেশভোগ করিয়া প্রাণত্যাগ করিয়াছে, সে জন্য তিনি যৎপরোনাস্তি ক্ষোভ ও পরিতাপ প্রাপ্ত হইলেন, এবং কালবিলম্ব না করিয়া তাহাদের উভয়কে রাজবাটীতে আনাইলেন। সেই বালিকার পিতা যত বেতন পাইতেন, তৎসমান পেন্সন্ প্রদানের আদেশ দিয়া, তিনি তাহাদিগকে বিনীতভাবে বলিলেন, যথাকালে পেন্সন্ না পাওয়াতে তোমাদিগকে অনেক ক্লেশভোগ করিতে হইয়াছে, সে জন্য আমি তোমাদের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করিতেছি। তোমরা বিবেচনা করিয়া দেখ, আমি ইচ্ছাপূর্ব্বক তোমাদিগকে ক্লেশ দি নাই। যদি তোমাদের পরিচিতের মধ্যে কাহারও পক্ষে কোনও অন্যায় ঘটিয়া থাকে, এই প্রার্থনা করিতেছি, তোমরা তাহাদিগকে আমায় জানাইতে বলিবে।

এই বলিয়া সম্রাট তাহাদিগকে বিদায় দিলেন, এবং তদবধি এই নিয়ম করিলেন, এবং এই ঘোষণা করিয়া দিলেন যে, তিনি সপ্তাহের মধ্যে অমুক দিন, অমুক সময়ে প্রজাদের সহিত সাক্ষাৎ করিবেন, এবং যাঁহার যে প্রার্থনা বা অভিযোগ থাকে, তিনি সেই সময়ে তাঁহাকে জানাইতে পারিবেন।

সম্পূর্ণ।

দয়াশীলতা

দয়াশীলতা

ইংলণ্ডের অধীশ্বর তৃতীয় জর্জের জননী অত্যন্ত দয়াশীল ছিলেন, পরের দুরবস্থা শুনিলে সাধ্যানুসারে তদ্বিমোচনে যত্নবতী হইতেন। তিনি অবাধে সংবাদপত্র পাঠ করিতেন। ১৭৪২ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে, এক ব্যক্তি এই মর্ম্মে বিজ্ঞাপন প্রচারিত করিয়াছিলেন যে, “আমি কিছুকাল সৈন্যসংক্রান্ত কর্ম্মে নিযুক্ত ছিলাম, এক্ষণে দুর্ঘটনাক্রমে যার পর নাই দুরবস্থায় পড়িয়াছি, আমার পরিবার আছে, তাহাদেরও অত্যন্ত দুর্গতি ঘটিয়াছে। যাঁহাদের দয়া ও পরের দুঃখ দূর করিবার ক্ষমতা আছে, তাঁহাদের পক্ষে এই বিজ্ঞাপনই যথেষ্ট। তাদৃশ ব্যক্তিরা অমুকস্থানে আসিলে, আমার পূর্ব্বতন ও ইদানীন্তন অবস্থার সবিশেষ পরিচয় পাইতে পারিবেন।”

বিজ্ঞাপন দৃষ্টিগোচর করিয়া, রাজজননী নির্দ্দিষ্ট স্থানে গিয়া স্বচক্ষে তাহার অবস্থা দেখিবেন, ও স্বকর্ণে তাহার দুঃখের কথা শুনিবেন, স্থির করিলেন। রাজপথে বহির্গত হইলে, কেহ তাঁহারে জানিতে না পারে, এজন্য তিনি সামান্য বেশে, সামান্য যানে আরোহণ করিয়া, এবং একমাত্র সহচরী সমভিব্যাহারে লইয়া প্রস্থান করিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে তিনি তাহার আলয়ে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, একটি স্ত্রীলোক শয়ন করিয়া আছে, রোগ, শোক ও দৈন্যবশতঃ, তাহার শরীর অত্যন্ত শীর্ণ ও বিবর্ণ হইয়া গিয়াছে, বক্ষঃস্থলে একটি অতি অল্পবয়স্কা বালিকা শয়ন করিয়া আছে, তাহার আকার জননীর অপেক্ষাও শীর্ণ ও বিবর্ণ, নয়ন দুটি মুদ্রিত, দেখিয়া বোধ হইল, তাহার মৃত্যু হইয়াছে, গৃহের একপার্শ্বে একটি হীনবেশ ম্লানমুখ পুরুষ, শীর্ণকায় শিশু-সন্তান ক্রোড়ে লইয়া, স্নেহপূর্ণ ও শোকাকুললোচনে তাহার মুখনিবীক্ষণ করিতেছে।

গৃহপ্রবেশপূর্ব্বক সেই নিতান্ত নিৰুপায় পরিবারের দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করিবামাত্র রাজজননী এত দুঃখিত ও ব্যথিত হইলেন যে, আর অগ্রসর হইতে পারিলেন না, স্বীয় সহচরীর হস্তধারণ, করিয়া সেই স্থানেই দণ্ডায়মান রহিলেন। ইতঃপূর্ব্বে ঈদৃশ হৃদয়বিদারণ ব্যাপার কখনও তাঁহার নয়নগোচর হয় নাই। গৃহস্বামী তাঁহাদিগকে দেখিবামাত্র, চকিত হইয়া দণ্ডায়মান হইলেন, শিশুসন্তানটাকে তাহার মৃতকল্পা জননীর পার্শ্বদেশে রাখিয়া দিলেন এবং তাঁহাদের সম্মুখবর্ত্তী হইয়া সাদরবচনে বসিবার অভ্যর্থনা করিলেন। রাজজননী, আমরা বসিতেছি, তুমি ব্যস্ত হইও না, এই বলিয়া আসনপবিগ্রহ করিলেন।

কিয়ৎক্ষণ পরে, তাহার সহচরী আগমন-প্রয়োজন ব্যক্ত করিলেন। তিনি গৃহস্বামীকে বলিলেন, আমরা সংবাদপত্রে আপনকার বিজ্ঞাপন দেখিয়াছি, এবং বিজ্ঞাপনপত্রে যেরূপ লিখিত ছিল, তদনুসারে আপনকার অবস্থার সবিশেষ বিবরণ জানিবার নিমিত্ত আসিয়াছি। তিনি শুনিয়া বিনীতভাবে বলিলেন, আপনারা যে এই দীনের প্রতি দয়া করিয়া এ পর্যন্ত আগমন করিয়াছেন, ইহাতে আমি চরিতার্থ হইলাম, বোধ হয়, আজ আমার দুঃখের নিশার অবসান হইল। আমার দুরবস্থা আপনারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিলেন, তাহার আর পরিচয় দিবার প্রয়োজন নাই। কি কারণে আমি এই দুঃসহ দুরবস্থায় পড়িয়াছি, তাহার সবিশেষ বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন,—

আমি এক রেজিমেণ্টে এনসাইনের পদে নিযুক্ত ছিলাম, আপন কার্য্যে যথোচিত যত্ন ও পবিশ্রম করাতে, অল্পদিনের মধ্যে কর্তৃপক্ষের অনুগ্রহভাজন হইলাম। তদ্দর্শনে আমার সমকক্ষ কতিপয় ব্যক্তির অন্তঃকরণে ঈর্ষার উদয় হইল। ঈর্ষার বশীভূত হইয়া, তাহারা আমার অনিষ্টচেষ্টা করিতে লাগিল। তাহাদের মধ্যে একজন অতি উদ্ধতস্বভাব ছিল। সে অকারণে অথবা অতি সামান্য কারণে, আমার নিকট দ্বন্দ্বযুদ্ধের প্রস্তাব পাঠাইল। তাদৃশ যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবার বিশিষ্ট হেতু না দেখিয়া, আমি তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইলাম না। এই উপলক্ষে তাহারা আর কতকগুলি লোক লইয়া চক্রান্ত করিল, এবং যাহাতে আমি অবমানিত ও পদচ্যুত হই, অনন্যকর্ম্মা হইয়া, কেবল সেই চেষ্টা করিতে লাগিল। তাহারা একপরামর্শ হইয়া, সেনাপতির নিকটে আমার কুৎসা করিতে আরম্ভ করিল। কেহ বলিল, আমি কাপুরুষ, কেহ বলিল, আমি পরনিন্দক, কেহ বলিল, আমি অকর্ম্মণ্য লোক। সেনাপতির আদেশ অনুসারে আমার চরিত্রবিষয়ে অনুসন্ধান আরব্ধ হইল। অনেকেই আমার বিপক্ষ, কৌশল করিয়া আমায় দোষী সপ্রমাণ করিয়া দিল। আমি পদচ্যুত হইলাম। জর্ম্মনিদেশে এই ঘটনা হয়। কর্ত্তৃপক্ষের নিকট বিচার প্রার্থনায় আমি অবিলম্বে ইংলণ্ডে প্রত্যাগমন করিলাম। কিন্তু, কেহ সহায় না থাকাতে, কৃতকার্য্য হইতে পারিলাম না। কর্তৃপক্ষ আমার প্রার্থনায় কর্ণপাত করিলেন না। সুতরাং এই স্থলেই আমার আশালতা নির্মূল হইল। সেই সময়েই আমার সহধর্ম্মিণী উৎকট রোগে আক্রান্ত হইলেন। নিতান্ত অসঙ্গতিপ্রযুক্ত তাঁহার চিকিৎসা করাইতে পারিলাম না। সতত জননীর নিকট থাকিয়া, ও আবশ্যকমত আহারাদি না পাইযা, পুত্ত্র ও কন্যাটিও ঐ রোগে আক্রান্ত হইয়াছে। যদিও বিষম বিপদে ও দুরবস্থায় পড়িয়াছি, কিন্তু নিতান্ত অপদার্থ হইয়া, দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিতে প্রবৃত্তি হইল না। অবশেষে উপায়ান্তর দেখিতে না পাইয়া, নিতান্ত হতাশ, শোকাকুল ও উন্মত্তপ্রায় হইয়া, সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রচারিত করিলাম।

এই সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া, রাজজননীর অন্তঃকরণে অতিশয় দয়ার উদয় হইল। তিনি তৎক্ষণাৎ গৃহস্বামীর হস্তে দশটি গিনি দিলেন, এবং আত্মপরিচয় প্রদান করিয়া বলিলেন, যাহাতে তোমার পক্ষে যথার্থ বিচার হয়, তাহা আমি করিব, তুমি সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকিবে। গৃহস্বামী তাঁহার পরিচয় শ্রবণ করিয়া বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন, এবং জানু পাতিয়া উপবিষ্ট ও কৃতাঞ্জলি হইয়া, তদীয় দয়া, সৌজন্য ও অনুগ্রহ প্রদর্শনের নিমিত্ত ধন্যবাদ প্রদান করিবার উপক্রম করিলেন। কিন্তু রাজ জননী তৎক্ষণাৎ সেই গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া, স্বীয় সহচরী সমভিব্যাহারে যানারোহণপূর্ব্বক প্রস্থান করিলেন।

রাজজননী গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া, সৈন্যসংক্রান্ত কর্ম্মের অধ্যক্ষকে ডাকাইলেন, এবং পূর্ব্বোক্ত পদচ্যুত ব্যক্তির দুরবস্থার সবিশেষ বর্ণন করিয়া, তাঁহার পক্ষে যথার্থ বিচার করিবার নিমিত্ত বলিয়া দিলেন। সপ্তাহ অতীত না হইতেই, সে ব্যক্তি লেপ্টেনেণ্টপদে প্রতিষ্ঠিত হইলেন। তিনি যে রেজিমেণ্ট কর্ম্ম পাইলেন, উহা অবিলম্বে ফ্রাণ্ডর্স প্রদেশে প্রস্থান করিবে, এজন্য রাজজননী তাঁহাকে বলিলেন, তুমি নিরুদ্বেগে প্রস্থান কর, আমি তোমার স্ত্রী, পুত্র, কন্যার সমস্ত ভার লইলাম, যতদিন তুমি প্রত্যাগমন না কর, আমি তাহাদের ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করিব। তদনুসারে সে ব্যক্তি নিশ্চিন্ত হইয়া, রেজিমেণ্ট সমভিব্যাহারে প্রস্থান করিলেন, এবং নিজ কার্য্যে বিলক্ষণ দক্ষতাপ্রদর্শন করাতে, কর্ত্তৃপক্ষের অনুগ্রহে অল্পকালমধ্যে মেজরপদে অধিরূঢ় হইযা, স্বদেশে প্রত্যাগত হইলেন।

দস্যু ও দিগ্বিজয়ী

দস্যু ও দিগ্বিজয়ী

মাসিডোনিয়ার অধীশ্বর, প্রসিদ্ধ দিগ্বিজয়ী, মহাবীর আলেকজাগুরের অধিকারকালে, থ্রেস্ দেশে এক অতি পরাক্রান্ত দুর্দ্দান্ত দস্যু ছিল। ঐ দস্যুর দৌরাত্মে, থ্রেস্ ও তৎপার্শ্ববর্ত্তী প্রদেশ সকল কম্পিত হইযাছিল। একদা, সে ধৃত ও আলেকজাণ্ডারের সম্মুখে নীত হইলে, তিনি সরোষ নয়নে ও উদ্ধত বচনে বলিতে লাগিলেন, অরে দুরাত্মন্, তুই দস্যুবৃত্তি করিয়া জীবিকানির্ব্বাহ করিস্। সর্ব্বদাই তোর অশেষবিধ অত্যাচারের কথা শুনিতে পাই। আমি, বহুদিন অবধি তোরে ধরিবার চেষ্টা করিতেছিলাম, কিন্তু কৃতকার্য্য হইতে পারি নাই। আজ তুই আমার সম্পূর্ণ বশে আসিয়াছিস্, তোরে সমুচিত শাস্তিপ্রদান করিব। এক্ষণে, তুই আপন সবিশেষ পরিচয় দে।

এই কথা শুনিয়া, সেই দস্যু, কিঞ্চিম্মাত্র ভীত বা ক্ষুব্ধ না হইয়া, বলিল, আমি থ্রেসদেশনিবাসী একজন প্রসিদ্ধ যোদ্ধা। আলেকজাণ্ডর বলিলেন, অরে নরাধম, তুই যোদ্ধা বলিয়া পরিচয় দিতেছিস্? তুই চোর, তুই দস্যু, তুই লুণ্ঠনব্যবসায়ী, তুই হত্যাকারী, তুই দেশের কণ্টকস্বরূপ। তোর অসাধারণ সাহস আছে, এজন্য আমি তোর প্রশংসা করি। কিন্তু, তুই অতি দুরাচার ও সর্ব্বসাধারণের যার পর নাই অনিষ্টকারী, এজন্য আমি অবশ্যই তোরে ঘৃণা করিব ও সমুচিত শাস্তি দিব।

ইহা শুনিয়া, দস্যু বলিল, আমি কি করিয়াছি যে, আপনি আমায় এত ভৎসনা করিতেছেন? তিনি বলিলেন, তুই, আমার অধিকারে বাস করিয়া, আমার প্রভুশক্তির অবমাননা করিয়াছিস, এবং আমার প্রজাগণের প্রাণহিংসা ও সর্ব্বস্বলুণ্ঠন করিয়া কালযাপন করিস্। দস্যু বলিল, এক্ষণে আমি আপনকার বশে আসিয়াছি, সুতরাং আপনি যে তিরস্কার, যে অপমান বা যে শাস্তি প্রদান করিবেন, আমায় সে সমস্ত সহ্য করিতে হইবে, আমি সেজন্য কিঞ্চিম্মাত্র শঙ্কিত বা দুঃখিত নহি। কিন্তু, যদি আমায় আপনকার ভর্ৎসনাবাক্যের উত্তর দিতে হয়, আমি অকুতোভয়ে দিব।

আলেকজাণ্ডর বলিলেন, যাহা বলিতে হয়, স্বচ্ছন্দে বল, কোনও ব্যক্তি আমার বশে আসিয়াছে বলিয়া যে, তাহাকে অকুতোভয়ে কথা কহিতে দিব না, আমার সেরূপ রীতি বা প্রকৃতি নহে। দস্যু বলিল, তবে অগ্রে আমি আপনকার প্রতি এক প্রশ্ন করিব, পরে আপনার প্রশ্নের উত্তর দিব। আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনি কিরূপে কালযাপন করিতেছেন? তিনি বলিলেন, বীর-পুরুষের ন্যায়, দেশে দেশে আমার নাম ও কীর্ত্তি ঘোষিত হইতেছে, আমার তুল্য সাহসী, পরাক্রান্ত সম্রাট ও দিগ্বিজয়ী আর কে আছে?

দস্যু বলিল, আমার আত্মশ্লাঘা করিতে ইচ্ছা নাই, আর, যাহারা আত্মশ্লাঘা করে, তাহাদিগকে ঘৃণা করি। কিন্তু, এ সময়ে বলা আবশ্যক, এজন্য বলিতেছি, আমারও বহুদূর পর্যন্ত নাম ও কীর্ত্তি ঘোষিত হইযাছে, আর, আমার তুল্য সাহসী সেনাপতি আর কেহই নাই। আপনি বিলক্ষণ অবগত আছেন, আমি সহজে বিজিত ও আপনকার বশে আনীত হই নাই।

আলেকজাণ্ডর বলিলেন, তুই যত বল্ না কেন, তুই পাপাশ্য় দুর্বৃত্ত দস্যু ব্যতিরিক্ত আর কিছুই নহিস। দস্যু বলিল, আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, দিগ্বিজয়ী কাহাকে বলে? আপনি দিগ্বিজয়ী, আপনি কি অকিঞ্চিৎকর আধিপত্যলাভের দুরাশাগ্রস্ত হইয়া, অন্যায় পথ অবলম্বন পূর্ব্বক মানবমণ্ডলীর প্রাণবধ, সর্ব্বস্বলুণ্ঠন প্রভৃতি অশেষবিধ উৎকট অনিষ্টাচরণ করেন নাই? আমি শত সহচর সমভিব্যাহারে এক প্রদেশে যাহা করিযাছি, আপনি লক্ষ সহচর সমভিব্যাহারে শত শত প্রদেশে তাহাই করিয়াছেন। আমি কতিপয় সামান্য ব্যক্তির সর্বনাশ করিয়াছি, আপনি শত শত ভূপতির সর্ব্বনাশ করিয়াছেন। আমি কতিপয় সামান্য গৃহের উচ্ছেদসাধন করিযাছি, আপনি কত সমৃদ্ধ রাজ্য ও কত সমৃদ্ধ নগরীর উচ্ছেদসাধন করিয়াছেন। এক্ষণে, বিবেচনা করিয়া দেখুন, আমাতে ও আপনাতে বিশেষ কি? তবে, আমি সামান্য-কুলে জন্মিয়াছি, এবং সামান্য দস্যু বলিয়া পরিচিত হইয়াছি। আপনি বিখ্যাত-কুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, এবং সেইজন্য, আমা অপেক্ষা প্রবল ও পরাক্রান্ত দস্যু হইযাছেন, এইমাত্র বিশেষ।

আলেকজাণ্ডর বলিলেন, আমি অন্যের ধন লইয়াছি বটে, কিন্তু অকাতরে সেই ধনের বিতরণ করিয়াছি। আমি কোনও কোনও রাজ্যের ও নগরের উচ্ছেদ করিয়াছি বটে, কিন্তু কত শত সমৃদ্ধ রাজ্য ও নগর সংস্থাপিত করিয়াছি। তদ্ব্যতিরিক্ত, আমার যত্নে ও উৎসাহদানে শিল্প, বাণিজ্য ও দর্শনশাস্ত্রের কত উন্নতি হইয়াছে। দস্যু বলিল, আমি ধনৰানের ধনহরণ করিযাছি বটে, কিন্তু, সেই ধন অকাতরে অনেক দরিদ্রকে দান করিয়াছি। আমি কখনও কাহারও গৃহদাহ করিয়াছি বটে, কিন্তু নিজ অর্থ দিয়া, অনেক অনাথের গৃহনির্মাণ করিয়া দিয়াছি। আমি অন্যের উপর অত্যাচাব করিয়াছি বটে, কিন্তু অনেক বিপন্ন ব্যক্তির বিপদুদ্ধার করিয়াছি। আপনি যে দর্শনশাস্ত্রের উল্লেখ করিলেন, আমি তাহার কিছুমাত্র জানি না বটে, কিন্তু ইহা স্থির জানি, আমি অথবা আপনি জগতের যত অনিষ্ট করিয়াছি, আমরা কিছুতেই তাহার প্রতিবিধান করিতে পারিব না।

দস্যু এইরূপ অকুতোভয়তা ও স্বরূপবাদিতা দর্শনে, আলেকজাণ্ডার পর নাই প্রীতি প্রাপ্ত হইলেন, তৎক্ষণাৎ তাহার বন্ধনমোচনের এবং সমুচিত পরিচর্যার আদেশপ্রদান করিলেন, অনন্তর, একান্তে আসীন হইয়া, দস্যু ও দিগ্বিজয়ীর বিশেষ কি, নিবিষ্টচিত্তে, এই বিষয়ে চিন্তা করিতে লাগিলেন।

নৃশংসতার চূড়ান্ত

নৃশংসতার চূড়ান্ত

সুপ্রসিদ্ধ নাবিক কলম্বস্‌ আমেরিকা মহাদ্বীপ আবিষ্কৃত করিলে, সর্ব্বপ্রথম তথায় স্পানিয়ার্ডদিগের অধিকার ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁহারা, অর্থলালসা চরিতার্থ করিবার নিমিত্ত, দুর্বল নিরপরাধ আদিমনিবাসী লোকদিগের উপর, যৎপরোনাস্তি অত্যাচার করেন। কেয়নাবো নামে এক ব্যক্তি কোনও প্রদেশের অধিপতি ছিলেন। স্পানিয়ার্ডেরা, তাঁহাকে অধিকারচ্যুত ও কারাগারে রুদ্ধ করিয়া রাখেন। তিনি কারাগারে থাকিয়া, অশেষবিধ কষ্ট ও যাতনা ভোগ করিয়া, প্রাণত্যাগ করেন। এইরূপে তাঁহার অধিকারভ্রংশ ও দেহযাত্রার পর্য্যবসান হওয়াতে, তদীয় সহধর্ম্মিণী এনাকেয়োনা, নিতান্ত নিরুপায় ও নিঃসহায় হইলেন, তাঁহার সহোদর, বিহিচিয়ো, জারাগুয়াপ্রদেশের অধিপতি ছিলেন, তাঁহার অধিকারে গিয়া আশ্রয়গ্রহণ করিলেন।

কিছুদিন পরে, বিহিচিয়োর মৃত্যু হইল। তাঁহার ভগিনী এনাকেয়োনা, তদীয় অধিকারে প্রতিষ্ঠিত হইলেন। ইতঃপূর্ব্বে, স্পানিয়ার্ডেরা তাঁহার সর্ব্বনাশ করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি, বৈরসাধনবুদ্ধির অধীন না হইয়া, তাঁহাদের প্রতি সাতিশয় সদয় ব্যবহার করিতে লাগিলেন, তাঁহাদের অনিষ্টচেষ্টা বা উচ্ছেদবাসনা, একক্ষণের জন্য, তাঁহার উন্নত অন্তঃকরণে উদিত হয় নাই। ফলতঃ, তিনি বিলক্ষণ মহানুভাবা ও উদারস্বভাবা ছিলেন। কিন্তু, এনাকেয়োনার সৌজন্য ও সদ্য ব্যবহার দর্শনে, স্পানিয়ার্ডদিগের সেনাপতি ওবেণ্ডো স্থির করিলেন, জারাগুয়াবাসীরা বিশ্বাস জন্মাইয়া, অনায়াসে আমাদের উচ্ছেদসাধন করিতে পারিবে, এই অভিপ্রায়েই এরূপ আত্মীয়তা করিতেছে, অতএব, তাহাদিগকে সমুচিত প্রতিফল দেওয়া উচিত। অনন্তর, তিনি সৈন্যসংগ্রহ পূর্ব্বক, তৎপ্রদেশাভিমুখে প্রস্থান করিলেন, প্রচার করিয়া দিলেন, এনাকেয়োনার সহিত সাক্ষাৎকারমাত্র এই যাত্রার উদ্দেশ্য।

স্পানিয়ার্ডদিগের সেনাপতি সাক্ষাৎ করিতে আসিতেছেন, এই সংবাদ পাইয়া, এনাকেয়োনা আপন অনুগত যাবতীয় কাসীকদিগের ও প্রধান প্রধান প্রজাবর্গের নিকট এই আদেশ পাঠাইলেন, স্পানিয়ার্ডদিগের সেনাপতি সাক্ষাৎ করিতে আসিতেছেন, সমুচিত সম্মান সহকারে তাঁহার সংবর্দ্ধনা করা আবশ্যক। অতএব, তোমরা যথাকালে রাজধানীতে উপস্থিত হইবে। আমেরিকার আদিমনিবাসীদিগের মধ্যে এই প্রথা প্রচলিত ছিল, কোনও মান্য ও আদরণীয় ব্যক্তি সাক্ষাৎ করিতে আসিলে, তাঁহারা মহাসমারোহে নগর হইতে বহির্গত হইয়া, সংবর্দ্ধনা করিতে যাইতেন। তদনুসারে, ওবেণ্ডো রাজধানীর সন্নিহিত হইবামাত্র, এনাকেয়োনা, স্বীয় অমাত্যগণ, পারিষদ্‌গণ, ও প্রধান প্রধান প্রজাবর্গ সমভিব্যাহারে, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ ও যথোচিত সম্মান পূর্ব্বক সংবর্দ্ধনা করিলেন। দেশাচারনুরূপ মঙ্গলাচার অনুষ্ঠিত হইল, যুবতী কামিনীরা, তালতরুশাখা সঞ্চালিত করিয়া, স্পানিয়ার্ডদিগের সম্মুখে নৃত্য করিতে আরম্ভ করিল, এবং তৎকালোচিত সঙ্গীত সকল গীত হইতে লাগিল।

ওবেণ্ডো রাজধানীতে উপস্থিত হইলে, এনাকেয়োনা সর্ব্বাপেক্ষা প্রশস্ত ভবনে তাঁহাকে বাস করাইলেন। তাঁহার সমভিব্যাহারী লোকেরা তৎসন্নিহিত অপরাপর ভবনে অবস্থিতি করিল। তাঁহাদের মান ও আদরের পরিসীমা রহিল না। এনাকেয়োনা, অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া, তাঁহাদের পরিচর্য্যা করিতে লাগিলেন। সেই প্রদেশে যতদূর পর্য্যন্ত উপাদেয় আহারসামগ্রী প্রভৃতি পাওয়া যাইতে পারে, তদীয় আদেশ অনুসারে, সবিশেষ যত্ন সহকারে, তৎসমস্ত আহৃত হইতে লাগিল। প্রতিদিন মহোৎসব ও নৃত্য গীত বাদ্য হইতে লাগিল। যাহাতে তাঁহাদের সুখে, স্বচ্ছন্দে ও আমোদপ্রমোদে কালাতিপাত হয়, তিনি তদ্বিষয়ে সাধ্যানুরূপ যত্ন করিতে ত্রুটি করিলেন না। ফলতঃ, তিনি শ্বেতকায় জাতির প্রতি পূর্ব্বাপর যেরূপ সদয় ও অমায়িক ব্যবহার করিয়া আসিতেছিলেন, এ সময়েও সম্পূর্ণ সেইরূপ করিলেন।

কিন্তু ওবেণ্ডো, যে অমূলক সংস্কারের অনুবর্ত্তী হইয়া আসিয়াছিলেন, জারাগুয়াবাসীদিগের ঈদৃশ সৌজন্য ও সদ্ব্যবহার দর্শনেও তাহা অপসারিত হইল না। তাঁহারা, তাঁহার ও তদীয় সহচরবর্গের প্রাণবিনাশের মন্ত্রণা করিতেছেন, এই সিদ্ধান্ত করিয়া, তিনি মনে মনে স্থির করিলেন, অবিলম্বে তাঁহাদের উপর বিলক্ষণরূপ বৈরসাধন করিবেন। তদনুসারে, তিনি তাঁহাদিগকে বলিলেন, তোমরা এতদিন, আমাদিগকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত, কত ক্রীড়া কৌতুক দেখাইলে, এক্ষণে, আমি একদিন তোমাদিগকে আমাদের দেশের ক্রীড়া কৌতুক দেখাইব। তোমরা অমুক দিন, অমুক সময়ে, অমুক ভবনে উপস্থিত হইবে। তাঁহারা শুনিয়া অতিশয় সন্তুষ্ট ও তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন। তদনন্তর, তিনি স্পানিয়ার্ডদিগকে গোপনে এই উপদেশ দিলেন, তোমরা স্ব স্ব অস্ত্রশস্ত্র লইয়া, এরূপে প্রস্তুত হইয়া থাকিবে, যেন আমি ইঙ্গিত করিবামাত্র, আমার ইচ্ছানুরূপ কার্য্যসম্পাদন করিতে পার।

ক্রীড়াকৌতুকপ্রদর্শনের নিরূপিত সময় উপস্থিত হইল। এনাকেয়োনা, স্বীয় কন্যা, অমাত্যগণ, পারিষদবর্গ ও করদ কাসীকদিগের সমভিব্যাহারে, নির্দ্ধারিত আগারে প্রবেশ করিলেন। সকলে যথাযোগ্য স্থানে উপবিষ্ট হইলেন, এবং উৎসুকচিত্তে কৌতুকদর্শনের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। ওবেণ্ডো, স্পানিয়ার্ডদিগকে যেরূপ আদেশ ও উপদেশ দিয়া রাখিয়াছিলেন, তদনুযায়ী যাবতীয় কার্য্য সুন্দররূপে সম্পাদিত হইয়াছে দেখিয়া, অভিপ্রেত কার্য্যানুষ্ঠানের সঙ্কেত করিলেন। তদনুসারে, তাঁহার সৈন্যগণ সেই ভবনের চতুর্দ্দিক্‌ বেষ্টিত করিল এবং কোনও ব্যক্তিকে তথা হইতে বহির্গত হইতে দিল না, অনন্তর, ভবনের অভ্যন্তরভাগে প্রবেশ পূর্ব্বক, কাসীকদিগকে স্তম্ভে বদ্ধ করিয়া, এনাকেয়োনাকে নিরুদ্ধ করিল, এবং তোমরা ও তোমাদের রাজ্ঞী আমাদের প্রাণবধের চেষ্টায় ছিলে, এই বলিয়া কাসীকদিগকে যৎপরোনাস্তি যন্ত্রণা দিতে লাগিল, যাবৎ, অন্ততঃ দুই চারি জন আর সহ্য করিতে না পারিয়া, রাজ্ঞী ও তাঁহারা অপরাধী বলিয়া স্বীকার না করিলেন, তাবৎকাল পর্য্যন্ত ক্ষান্ত হইল না।

জারাগুয়াবাসীরা বাস্তবিক তাদৃশ দোষে দূষিত নহেন, কিন্তু স্পানিয়ার্ডেরা, যন্ত্রণাবলে দুই চারি জনকে অপরাধ স্বীকার করাইয়া, রাজ্ঞী প্রভৃতি সকলেরই অপরাধ সপ্রমাণ হইল, স্থির করিয়া লইল, এবং এই অমূলক অপরাধের দণ্ডবিধানার্থে, সেই ভবনে অগ্নিপ্রদান করিল। নিরপরাধ কাসীকেরা স্তম্ভে বদ্ধ থাকিয়া ভস্মাবশেষ হইলেন। অগ্নিদানসমকালে, ভবনের বহির্ভাগে, অতি ভয়ানক হত্যাকাণ্ড আরব্ধ হইল। নগরের যে সমস্ত লোক, কৌতুকদর্শনবাসনায় তথায় সমবেত হইয়াছিল, ওবেণ্ডোর অশ্বারোহী সৈনিকেরা তাহাদের উপর অস্ত্র চালাইতে আরম্ভ করিল। স্ত্রীলোক ও বালক পর্য্যন্ত ঐ নৃশংস রাক্ষসদিগের হস্ত হইতে নিস্তার পাইল না।

এইরূপ প্রতিশ্রুত ক্রীড়া কৌতুক দর্শন করাইয়া, স্পানিয়ার্ডমহাপুরুষেরা এনাকেয়োনাকে সান ডোমিঙ্গোনামক স্বাধিকৃত স্থানে লইয়া গেল, এবং বিচারাসনে আসীন হইয়া, তাঁহাকে অপরাধিনী স্থির করিয়া, উদ্বন্ধন দ্বারা তাঁহার প্রাণদণ্ড করিল। এই হতভাগ্য রাজ্ঞী, স্পানিয়ার্ডদিগের প্রতি পূর্ব্বাপর যে সদয় ও অমায়িক ব্যবহার করিয়াছিলেন, এতদিনে তাহার সম্পূর্ণ ফললাভ করিলেন।

আমেরিকার আদিমনিবাসীদিগের মধ্যে কোনও কোনও জাতি আপনাদিগের অধিপতিকে কাসীক বলিত।

পতিপরায়ণতার একশেষ

পতিপরায়ণতার একশেষ

জর্ন্মনির অধীশ্বর তৃতীয় কনরাদের অধিকারকালে, বাবেরিয়ার ডিয়ুক গুযেলফু, বিদ্রোহী হইযা সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। কনরাদ, তাঁহার দমনের নিমিত্ত, বহুসংখ্যক সৈন্য সমভিব্যাহারে, উইন্সবর্গের দুর্গমধ্যে প্রবিষ্ট হইলে, সেই দুর্গ অবরুদ্ধ করিলেন। গুয়েলফ্, কিছু দিন বিলক্ষণ সাহস ও পরাক্রম প্রদর্শিত করিয়া, পরিশেষে, পরাজিত হইলেন, এবং ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া, সম্রাটের নিকট দূতপ্রেরণ করিলেন।

দূত, সম্রাটের শিবিরে উপস্থিত হইযা, ডিয়ুকের প্রার্থনা নিবেদন করিল। তিনি, দূতের প্রতি সমুচিত সৌজন্য ও সমাদর প্রদর্শিত করিয়া, বলিলেন, তুমি ডিষুককে বল, তিনি, স্বীয় সৈন্য ও অনুচরবর্গ সমভিব্যাহারে, আমার শিবিরের মধ্য দিয়া প্রস্থান ককন, আমি অঙ্গীকার করিতেছি, তাঁহার উপর, কোনও প্রকারে, অত্যাচার করিব না। দূত, দুর্গমধ্যে প্রতিগমন করিয়া, স্বীয় প্রভুর নিকট সবিশেষ সমস্ত নিবেদন করিল। ডিয়ুক ও
তদীয় সেনাপতিগণ শুনিয়া সাতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন, এবং অবিলম্বে প্রস্থান করিবার উদেযাগ দেখিতে লাগিলেন।

এই সংবাদ শ্রবণে সন্দিহান হইয়া, ডিযুকের পত্নী মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিলেন, আমার স্বামী সম্রাটের সম্পূর্ণ বিপক্ষতাচরণ করিয়াছেন, এক্ষণে তিনি যে সহসা এরূপ সৌজন্যপ্রদর্শন করিতেছেন, উহা, বোধ হয় বাস্তবিক নহে, ইহাতে কোনও গূঢ় অভিসন্ধি আছে, হ্য়ত আমরা দুর্গ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলে, আমাদিগকে আক্রমণ করিবেন। এই সন্দেহভঞ্জনের নিমিত্ত, তিনি আপনার বিশ্বস্ত, বিচক্ষণ, কার্য্যদক্ষ, এক ভদ্র লোককে সম্রাটের নিকট পাঠাইলেন।

এই ব্যক্তি, রাজসমীপে উপস্থিত হইয়া, নিবেদন করিলেন, মহারাজ, আপনি যে, ভিযুকের প্রার্থনা অনুসারে, দয়াপ্রদর্শন করিয়াছেন, ইহাতে তিনি ও তদীয় অনুচরবর্গ চরিতার্থ হইয়াছেন। ডিযুকের পত্নী আপনকার নিকট আর এক প্রার্থনা জানাইয়াছেন, নিবেদন করি, তিনি বলিয়াছেন, আপনি যে আমার স্বামীর প্রতি ক্ষমাপ্রদর্শন করিয়াছেন, ইহাতে আমরা সকলে চরিতার্থ হইয়াছি, এক্ষণে দুর্গমধ্যে যে সকল সম্ভ্রান্ত স্ত্রীলোক আছেন, তাঁহারা ও আমি দুর্গ হইতে নির্গত হইলে, যাহাতে আমাদের উপর কোনও অত্যাচার না হয়, এবং যাহাতে নির্বিঘ্নে কোনও নিরাপদ স্থানে পঁহুছিতে পারি, এরূপ এক অনুমতিপত্র লিখিয়া দিলে, আমরা নির্ভয়ে প্রস্থান করিতে পারি, আর ঐ অনুমতিপত্রে ইহাও নির্দিষ্ট থাকে, আমরা নিজে যাহা লইয়া যাইতে পারি, তাহা লইয়া যাইব, সে বিষয়ে কোনও আপত্তি না ঘটে।

ডিয়ুকপত্নীর প্রার্থনা শুনিয়া, সম্রাট তৎক্ষণাৎ তদ্বিষয়ে সম্মতিপ্রদান করিলেন। অসম্ভব, ভিয়ুক্ ও তদীয় অনুচরবর্গ দুর্গমধ্য হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন, এবং সম্রাটের শিবিরের মধ্য দিয়া প্রয়াণ করিতে লাগিলেন। সম্রাট ও তাঁহার সেনাপতিগণ, এক অভূতপূর্ব্ব ব্যাপার নয়নগোচর করিয়া, যৎপরোনাস্তি বিস্ময়াপন্ন হইলেন। তাঁহারা দেখিলেন, সর্বাগ্রে ডিয়ুকের পত্নী, তৎপশ্চাৎ ক্রমে ক্রমে অপরাপর সম্ভ্রান্ত স্ত্রীলোক, স্ব স্ব স্বামীকে স্কন্ধে লইয়া অতি কষ্টে প্রস্থান করিতেছেন।

যৎকালে ডিয়ুকের পত্নী, সম্রাটের নিকট অনুমতিপত্রের প্রার্থনা করিয়া পাঠান, তিনি ও তদীয় সেনাপতিগণ এই বিবেচনা করিয়াছিলেন যে, বসন ভূষণ প্রভৃতি যে সমস্ত মহামূল্য বস্তু আছে, তৎসমুদয় নির্বিঘ্নে লইয়া যাইবার অভিপ্রায়েই, ভিযুকপত্নী তাদৃশ অনুমতিপত্রের প্রার্থনা করিয়াছেন, তৎপরিবর্ত্তে তাঁহারা যে স্ব স্ব স্বামীকে স্কন্ধে করিয়া লইয়া যাইবেন, ইহা, এক মুহূর্ত্তের জন্যও, তাঁহাদের মনে উদিত হয় নাই। এক্ষণে, তাঁহাদের পতিপরায়ণতার ঐকান্তিকতা দর্শনে, সম্রাটের অন্তঃকরণে নিরতিশয় দয়া, বিস্ময় ও সন্তোষের আবির্ভাব হইল। তিনি সেই স্ত্রীলোকদিগকে, মুক্তকণ্ঠে, শতশত সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন।

ফলতঃ, এই অদৃষ্টচর অশ্রুতপূর্ণ ব্যাপার দৃষ্টিগোচর করিয়া, সম্রাট এত প্রীত ও চমৎকৃত হইয়াছিলেন যে, সেই খ্রীলোক দিগের অভূত পতিপরায়ণতার পুরস্কারস্বরূপ, তাঁহাদের পতিদিগের অপরাধ মার্জ্জনা করিলেন, ডিযুক ও তদীয় অনুচরবর্গের প্রস্থান স্থগিত করিয়া, তাঁহাদিগকে পরম সমাদরে ও মহাসমারোহে আহার করাইলেন, এবং সরল অন্তঃকরণে, সম্পূর্ণ অভয়প্রদান করিয়া, বিদায় দিলেন।

পতিব্রতা কামিনী

পতিব্রতা কামিনী

এবরার্ডনামক এক ব্যক্তি দেশ পর্য্যটন করিয়াছিলেন। তিনি পর্য্যটনকালে, যে দেশে যে সমস্ত অসামান্য বিষয় দেখিতেন, তৎসমুদয় লিপিবদ্ধ করিয়া, এক আত্মীয়ের নিকট পাঠাইতেন। তাঁহার লিখিত পত্র সকল ১৭৭৬ খৃষ্টাব্দে প্রচারিত হয়। তন্মধ্যে এক পত্রে পতিপরায়ণতাব এক অভূতপূর্ব্ব উদাহরণ উল্লিখিত হইয়াছে। ঐ পত্রের মর্ম্ম এই—

আমি, আল্পস্ পর্ব্বতের নানা অংশে ও জর্ম্মনি দেশে পর্য্যটন করিয়া, বিবেচনা করিলাম, ইষ্ট্রিয়াতে যে পারদের আকর আছে, তাহা না দেখিয়া, স্বদেশে প্রতিগমন করা উচিত নহে। তদনুসারে, এক পথদর্শকের সমভিব্যাহারে, আকরে প্রবিষ্ট হইলাম। যাহারা কর্ম্ম করিতেছিল, তাহাদের দুববস্থা দেখিয়া, আমার যেরূপ কষ্টবোধ হইল, তাহার বর্ণনা করিতে পারি না। আমি জন্মাবচ্ছিন্নে, তাহাদের মত হতভাগ্য লোক দেখি নাই। উৎকট অপরাধবিশেষে, রাজদণ্ড অনুসারে, এক ভয়ঙ্কর স্থানে যাবজ্জীবন কর্ম্ম করিতে হয়। তাহারা, এই স্থানে প্রবিষ্ট হইয়া, এ জন্মে আর সূর্য্যের মুখ দেখিতে পায় না। যাহারা তাহাদের উপর কর্ত্তৃত্ব করে, তাহারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর, প্রহার করিয়া কর্ম্ম করায়। সর্বদা পারা ঘাঁটিয়া, তাহাদের আকার অঙ্গারের ন্যায় মলিন, এবং শরীর নিতান্ত শীর্ণ ও নিস্তেজ হইয়া গিয়াছে। তাহারা রাজব্যয়ে আহার পাইয়া থাকে, কিন্তু অল্প দিনেব মধ্যেই, এরূপ উৎকট অগ্নিমান্দ্য ঘটে যে, কিছুমাত্র আহার করিতে পারে না, এবং শরীরের সন্ধিস্থল সকল এরূপ সঙ্কুচিত হইয়া যায় যে, সচরাচর প্রায় দুই বৎসরের অধিক বাঁচে না।

এই হৃদয়বিদারণ নিদারুণ ব্যাপার দর্শনে, আমার অন্তঃকরণে অতি বিষম শোক উপস্থিত হইল। আমি, আক্ষেপ করিয়া, মনে মনে বলিতে লাগিলাম, মনুষ্যের ন্যায় নির্দ্দয় ও নির্বিবেক জন্তু ভূমণ্ডলে আর নাই, দুর্ভর অর্থলালসার বশীভূত হইয়া, দুর্বলদিগের উপর কি ভয়ানক অত্যাচার করিয়া থাকে। এই সময়ে, পশ্চাদ্ভাগ হইতে কোনও ব্যক্তি, আমার নাম গ্রহণ ও সপ্রণয় সম্ভাষণ করিয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, ভ্রাতঃ। তুমি কেমন আছ। সেখানে, আমায় এরূপে সম্ভাষণ করেন, ঈদৃশ ব্যক্তি কেহ ছিলেন না, সুতরাং, আমি চকিত হইয়া মুখ ফিরাইলাম, দেখিলাম, তথাকার এক কর্ম্মকর আমার নিকট আসিতেছেন। তিনি অবিলম্বে আমার সম্মুখবর্তী হইয়া বলিলেন, কি হে, আমায় চিনিতে পারিতেছেন না? কিয়ৎক্ষণ অনিমিষ-নয়নে নিরীক্ষণ করিয়া আমি ঐ ব্যক্তিকে চিনিতে পারিলাম, দেখিলাম, আমার বহু কালের বন্ধু কৌণ্ট আল্‌বার্ট সম্ভাষণ করিতেছেন। তোমার অবশ্যই স্মরণ হইবে, তিনি বিয়েনার রাজসভার একজন প্রসিদ্ধ পারিষদ, সর্ব্বদা প্রফুল্লচিত্ত, সর্ব্বলোকের হৃদয়রঞ্জন, এবং স্ত্রী পুরুষ উভয় জাতির আদর ও প্রশংসার আস্পদ ছিলেন। আমি, অনেক বার, তোমার মুখে তাঁহার প্রশংসা শুনিয়াছি, তুমি বলিতে, তিনি ইদানীন্তন কালের অলঙ্কারস্বরূপ, দয়া ও সৌজন্যের অদ্বিতীয় আকরস্বরূপ, স্বীয় প্রভূত সম্পত্তি কেবল দীনের দুঃখবিমোচনে নিয়োজিত রাখিয়াছেন।

তাঁহার ঈদৃশ অসম্ভাবিত দুরবস্থা দর্শনে, আমি, নিতান্ত শোকাক্রান্ত ও একান্ত হতবুদ্ধি হইযা, দণ্ডায়মান রহিলাম, আমার মুখ হইতে বাক্যনিঃসরণ হইল না, নয়ন হইতে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে, শোকসংবরণ করিয়া, তাঁহার ঈদৃশ দশা ঘটিবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি বলিলেন, কিছুদিন হইল, কোনও কাবণে, এক সেনাপতির সহিত আমার বিবাদ উপস্থিত হয়, অপমানবোধ হওয়াতে সম্রাটের আদেশ অমান্য করিয়া, তাহার সহিত দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হই, এবং তাহার প্রাণসংহার করিয়াছি স্থির করিয়া, পলাইয়া, ইষ্ট্রিয়ার জঙ্গলে লুকাইয়া থাকি। রাজপুরুষেরা অনুসন্ধান করিয়া, আমাকে অবরুদ্ধ কবে। ঐ স্থানে কতকগুলি দুর্দ্দান্ত দস্যু বাস করিত। তাহারা, রাজপুরুষদিগের হস্ত হইতে উদ্ধার করিয়া, আমায় আশ্রয় দেয়। তাহাদের সহবাসে নয় মাস অতিবাহিত করি। এই দস্যুরা সন্নিহিত জনপদে অত্যন্ত দৌরাত্ম্য করিত। তাহাদের দমনের নিমিত্ত, একদল সৈন্য প্রেরিত হয়। দস্যুদলে ও সৈন্যদলে ঘোরতর সংগ্রাম হইতে লাগিল। অবশেষে, দস্যুদলের অধিকাংশ নিধনপ্রাপ্ত হইল। হতাবশিষ্ট দস্যুদিগের সহিত ধৃত ও প্রাণদণ্ডার্থে রাজধানীতে নীত হইলাম। তথায় উপস্থিত হইলে, সকলে আমায় চিনিতে পারিল। বন্ধুবর্গের সবিশেষ অনুরোধে, আমার প্রাণদণ্ড রহিত হইয়া, যাবজ্জীবন এই স্থানে রুদ্ধ থাকিয়া, কর্ম্ম করিবার আদেশ হইয়াছে।

এইরূপে, আলবর্টি আমার নিকট স্বীয় অবস্থার বর্ণন করিতেছেন, এমন সময়ে সেই স্থলে এক স্ত্রীলোক উপস্থিত হইলেন। তাঁহার আকার প্রকার দেখিবামাত্র, আমার স্পষ্ট বোধ হইল, ইনি সামান্য নারী নহেন, অবশ্যই কোনও সম্ভ্রান্ত লোকের কন্যা হইবেন। তাদৃশ ভয়ঙ্কর স্থানে থাকাতে ও দুঃসহ ক্লেশ ভোগ করাতেও, তাঁহাব অসামান্য রূপলাবণ্য এক কালে লয়প্রাপ্ত হয় নাই, তখনও তাঁহার রূপে বিলক্ষণ মাধুরী ও মোহনী শক্তি ছিল। ফলতঃ, তিনি জর্ম্মনির এক অতি সম্ভ্রান্ত কুলের কন্যা, কৌণ্ট আল্‌বর্টির সহধর্ম্মিণী। তিনি অত্যন্ত পতিপরায়ণা, যাহাতে পতির অপরাধ-মার্জ্জনা হয়, প্রাণপণে তাহার চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু কৃতকার্য্য হইতে পারেন নাই। অবশেষে, অন্য কোনও উপায় না দেখিয়া, তদীয় বিরহে প্রাণধারণ করা অসাধ্য ভাবিয়া, সমদুঃখভাগিনী হইবার নিমিত্ত, তাঁহার সহিত এই ভয়ঙ্কর স্থানে আসিয়া রহিয়াছেন। তিনি, তাঁহার সহবাসে, সন্তুষ্ট চিত্তে, কালহরণ করিতেছেন, তাহার সহিত আকরে কর্ম্ম করিতেছেন। পূর্ব্বতন সুখসৌভাগ্যের অবস্থা, একক্ষণের জন্যও, তাঁহার মনে উদিত হয় না। এরূপ স্ত্রীলোককেই পতিব্রতা কামিনী বলে। আমি, ইঁহার আচরণ দর্শনে, মোহিত ও চমৎকৃত হইযাছি।

এই আকরের অনতিদূরে এক ক্ষুদ্র গ্রাম আছে। কতিপয় দিন আমি তথায় অবস্থিতি করি। একদিন, তিন ব্যক্তি বিয়েনা হইতে আসিয়া, আমার পার্শ্ববর্ত্তী গৃহে উত্তীর্ণ হইলেন, এবং তত্রত্য লোকের নিকট হতভাগ্য কৌণ্ট আল্‌বর্টির বিষয়ে অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। আমি শ্রবণমাত্র সেই গৃহে উপস্থিত হইলাম, এবং যে রূপে যে অবস্থায় তাঁহাদের স্ত্রীপুরুষকে দেখিয়া আসিয়াছিলাম, সজল-নয়নে তাহার সবিশেষ বর্ণন করিলাম, অনন্তর, জিজ্ঞাসা করিয়া, জানিতে পাবিলাম, এই তিন জনের মধ্যে এক ব্যক্তি আল্‌বর্টির পরম বন্ধু, দ্বিতীয় ব্যক্তি তাঁহার সহধর্ম্মিণীর সহোদর, তৃতীয় ব্যক্তি তাঁহার পিতৃব্যপুত্র। আল্‌বর্টি, যে সেনাপতির সহিত দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া, এইরূপ বিপদগ্রস্ত হইয়াছেন, তিনি হত হয়েন নাই, আহতমাত্র হইয়াছিলেন। সেনাপতি, সুস্থ হইয়া, আল্‌বর্টির অপরাধ-মার্জ্জনার প্রার্থনা করাতে, সম্রাট তাঁহাকে ক্ষমা করিয়াছেন। তদনুসারে, ইঁহারা তিনজনে তাঁহাদের স্ত্রীপুরুষকে লইয়া যাইতে আসিযাছেন।

এই সংবাদ শুনিয়া, আমি আহ্লাদে পুলকিত হইলাম, ক্ষণবিলম্ব ব্যতিরেকে, তাঁহাদিগকে আকরে লইযা গেলাম, আল্‌বর্টি ও তাঁহার সহধর্ম্মিণীকে এই শুভসংবাদ দিলাম। শুনিয়া, ও এই তিন জন আত্মীয়কে দেখিয়া, তাঁহারা যে অনির্ব্বচনীয় আনন্দের অনুভব করিলেন, তাহার বর্ণন করিতে পারা যায় না। বহির্গমনোপযোগী বেশপরিবর্ত্রন প্রভৃতিতে কতিপয় দণ্ড অতিবাহিত হইল। যখন, তাঁহারা স্ত্রীপুরুষে, তত্রত্য সহচরদিগের নিকট বিদায় লইতে লাগিলেন, আমি দেখিয়া আহ্লাদে অধীর হইয়া, অশ্রুবিসর্জ্জন করিতে লাগিলাম। কিয়ৎক্ষণ পরে, আমরা সেই ভয়ঙ্কর স্থান হইতে বহির্গত হইলাম। আল্‌বর্টি ও তাঁহার সহধর্ম্মিণী বহুদিবসের পর, সূর্য্যের মুখ দেখিতে পাইলেন। রাজধানীতে প্রতিগমন করিয়া, তাঁহারা স্ত্রীপুরুষে পুনরায় রাজপ্রসাদভাজন, পূর্ব্বতন পদে প্রতিষ্ঠিত ও প্রভূত সম্পত্তিতে অধিকারী হইয়াছেন, এবং পরম সুখে কালযাপন করিতেছেন।

পিতৃভক্তি ও পতিপরায়ণতা

পিতৃভক্তি ও পতিপরায়ণতা

পূর্ব্বকালে গ্রীস্ দেশের অন্তঃপাতী স্পার্টা নগরে লিয়নিডাস নামে রাজা ছিলেন। তিনি ঐ নগরের ক্লিযম্ব্রোটস্ নামক এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সহিত খিলোনিস্ নাম্নী সর্ব্বগুণসম্পন্ন স্বীয় তনয়ার বিবাহ দেন। খিলোনিস্, পিতা ও পতি উভয়ের প্রতি এরূপ ভক্তিমতী ও স্নেহশালিনী ছিলেন যে, আবশ্যক হইলে, তাঁহাদের জন্য অকাতরে প্রাণত্যাগ করিতে পারিতেন, এবং তাঁরাও উভযে, তদীয় প্রশংসনীয় গুণগ্রাম দর্শনে সাতিশয় প্রীত ছিলেন, এবং তাঁহাকে আপন আপন প্রাণ অপেক্ষা অধিক ভাল বাসিতেন।

ক্লিয়ম্ব্রোটস্, শ্বশুরকে রাজ্যচ্যুত করিয়া, স্বয়ং রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইবার অভিলাষে, চক্রান্ত করিলেন। লিয়নিডাস্, চক্রান্তের সন্ধান পাইয়া, এবং জামাতার অভিসন্ধি কতদূর পর্য্যন্ত, তাহার নিশ্চিত সংবাদ জানিতে না পারিয়া, প্রাণবিনাশশঙ্কায় এক দেবালয়ের আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। পূর্ব্বকালীন গ্রীকদিগের এই রীতি ছিল, যদি কোনও ব্যক্তি প্রাণভয়ে পলাইয়া দেবালয়ে প্রবেশ কবিত, সে উৎকট অপরাধ করিলেও, যতক্ষণ দেবালয়ের সীমার মধ্যে থাকিত, তাঁহারা তাহার বিরুদ্ধাচরণে প্রবৃত্ত হইতেন না।

খিলোনিস, পিতার এই অতর্কিত বিপৎপাতের বিষয় সবিশেষ অবগত হইযা, শোকে ম্রিয়মাণ হইলেন, এবং পতিসমীপে উপস্থিত হইযা কৃতাঞ্জলিপুটে বলিতে লাগিলেন, কেন তুমি এরূপ অপকর্মে প্রবৃত্ত হইয়াছ, ইহাতে অধর্ম্ম, অপযশ ও পরিণামে নানা অনর্থ ঘটিবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা আছে। অতএব আমার কথা শুন, এ অধ্যবসায় হইতে বিরত হও। যদি তুমি আমার অনুরোধরক্ষা না কর, আমি তোমার সমক্ষে আত্মঘাতিনী হইব। আমি জীবিত থাকিয়া, পিতার দুরবস্থা দর্শন করিতে পারিব না।

এই বলিয়া, পতির চরণে পতিত হইয়া, খিলোনিস্ অবিশ্রান্ত অশ্রুবিসর্জ্জন করিতে লাগিলেন। ক্লিয়ম্ব্রোটস্, দুরাকাঙক্ষার আতিশয্যবশতঃ, রাজ্যভোগের লোভসংবরণে অসমর্থ হইয়া বলিলেন, কেন তুমি আমায় বিরক্ত করিতেছ। তুমি আমার প্রেয়সী, আমি তোমায় প্রাণ অপেক্ষা ভালবাসি, তাহার কোনও সন্দেহ নাই। কিন্তু এ বিষয়ে আমি তোমার অনুরোধরক্ষা করিতে পারিব না। তুমি স্ত্রীজাতি, রাজনীতির মর্ম্ম কি বুঝিবে, এরূপ বিষয়ে তোমাব হস্তার্পণ করা উচিত নহে। খিলোনিস্, এইরূপে হতাদর হইয়া, আপন আবাসগৃহে প্রতিগমন করিলেন, এবং পিতার নিমিত্ত নিতান্ত আকুলচিত্ত হইয়া, স্বামিসহবাসসুখে বিসর্জ্জন দিয়া, পিতৃসন্নিধানে উপস্থিত হইলেন। সেই অবস্থায় পিতাকে যত দূর সুখে ও স্বচ্ছন্দে রাখিতে পারা যায়, তিনি প্রাণপণে তাহার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ফলতঃ, তদীয় সন্নিধান, পরিচর্য্যা ও সান্ত্বনাবাদ দ্বারা, লিয়নিডাসের দুঃখ ও শোকের অনেক লাঘব হইযাছিল।

কিয়ৎ দিন পরে, লিয়নিডাসের অবস্থার পরিবর্ত্ত হইল। তিনি পুনরায় রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইলেন। তদ্দর্শনে খিলোনিস্, আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইয়া পতিগৃহে প্রতিগমন করিলেন, এবং পতির অগোচরে ও অসম্মতিতে পিতৃসন্নিধানে গমন করিয়াছিলেন, তৎপ্রযুক্ত তাঁহার নিকট যে অপরাধিনী হইয়াছিলেন, তজ্জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করিলেন। তিনি, তদীয় বিনয় ও আত্মীয়বর্গের অনুরোধের বশীভূত হইয়া, অবশেষে তাহাঁর অপরাধ-মার্জ্জনা করিলেন।

জামাতা যে অনিষ্টাচরণে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, লিয়নিডাস্ তাহা বিস্মৃত হইতে পারিলেন না, সুতরাং তিনি বৈরনির্য্যাতনে উদ্‌যুক্ত হইলেন। তখন ক্লিয়ম্ব্রোটস্‌কে প্রাণবিনাশশঙ্কায়, দেবালয়ের আশ্রয় লইতে হইল। তদ্দর্শনে খিলোনিস, শোকাকুল হইয়া, দুই শিশুসন্তান সমভিব্যাহারে লইয়া পতিসন্নিধানে উপস্থিত হইলেন, এবং সমদুঃখভাগিনী হইয়া দিনযাপন করিতে লাগিলেন।

কতিপয় দিবস অতীত হইলে, লিয়নিডাস কিয়ৎসংখ্যক সৈন্য সমভিব্যাহারে লইয়া, সেই দেবালযের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন, দেখিলেন, তাঁহার তনয়া ধূলিধূসরিত কলেবরে স্বামীর পার্শ্বদেশে আসীন হইযা, বিষন্নবদনে রোদন কবিতেছেন, দুটি শিশু সন্তান, জননীর বিষাদ ও রোদন দর্শনে নিতান্ত আকুল হইয়া, বিরসবদনে ও নিস্পন্দনয়নে তাঁহার মুখনিরীক্ষণ করিয়া রহিয়াছে।

যতগুলি লোক সেই স্থলে উপস্থিত ছিলেন, এই শোচনীয় ব্যাপার দর্শনে, সকলেরই হৃদয় দ্রবীভূত হইল, অনেকেরই নয়ন হইতে বাষ্পবারি বিগলিত হইতে লাগিল, এবং সকলেই রাজকন্যার পতিপরায়ণতাগুণের একশেষ দর্শনে মোহিত হইয়া, মুক্তকণ্ঠে সাধুবাদপ্রদান করিতে লাগিলেন। লিয়নিডাস, জামাতাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, অরে দুরাত্মন, আমি যে তোকে কন্যাদান করিয়াছিলাম, তাহাতেই শ্লাঘাজ্ঞান করিয়া, তোর চরিতার্থ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তুই এমন দুরাশয় যে, দুর্বুদ্ধির অধীন হইয়া আমার নির্বাসনে ও রাজ্যাপহরণে উদ্যত হইয়াছিলি। এক্ষণে তোরে তাহার প্রতিফল প্রদান করিব।

ক্লিয়ম্ব্রোটস বাস্তবিক অপরাধী। শ্বশুরের তিরস্কারবাক্যশ্রবণে, অধোবদনে মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন, উত্তরপ্রদান করিতে পারিলেন না।

অনন্তর লিয়নিডাস, স্বীয় তনয়াকে সম্বোধন ও সস্নেহ সম্ভাষণ করিয়া বলিলেন, বৎসে, তুমি আমার আবাসে চল, এ নরাধমের নিমিত্ত শোকাকুল হইয়া বিলাপ, পরিতাপ ও ক্লেশভোগ করিতেছ কেন? তখন খিলোনিস্ বলিলেন, তাত, আপনি আমায় যে শোকে আকুল দেখিতেছেন, আমার স্বামীর দুরবস্থাই তাহাব আদিকারণ নহে। ইতঃপূর্ব্বে আপনার যে বিপদ ঘটিয়াছিল, সেই অবধি উহার সূত্রপাত হইযাছে, এবং সেই অবধি এ পর্য্যন্ত আমার সহচর হইয়া রহিয়াছে। আপনি বিপক্ষ জয় করিয়া, পুনরায় বাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছেন, ইহা আমার পক্ষে মহোৎসবের এক প্রধান কারণ বটে, কিন্তু আপনি আমায় যাহার হস্তে সমর্পিত কবিয়াছেন, এবং যাঁহাব সহচরী হইয়া আমায় যাবজ্জীবন কালহরণ কবিতে হইবে, যখন সে ব্যক্তি আপনার কোপদৃষ্টিতে পতিত হইয়াছেন, এবং অবশেষে তাঁহার কি অবস্থা ঘটিবে তাহার স্থিরতা নাই, তখন আমি কিরূপে উৎসবে কালহরণ করিতে পারি? যদি আমার প্রতি আপনার স্নেহ থাকে, এবং আমারে চিরদুঃখিনী করা অভিপ্রেত না হয়, কৃপা করিয়া উঁহার অপরাধ মার্জ্জনা করুন।

কন্যার এই প্রার্থনা শুনিয়া, লিয়নিডাস বলিলেন, বৎসে, আমি তোমায় আপন প্রাণ অপেক্ষা অধিক ভালবাসি, এবং তোমার অনুরোধে সকল কর্ম্ম করিতে পারি। কিন্তু, এই দুরাত্মা আমার যেরূপ বিদ্রোহাচরণে উদ্যত হইয়াছিল, তাহাতে আমি কখনও উহার উপর অক্রোধ হইতে পারি না। বোধহয়, উহার শোণিত দর্শন না করিলে আমার কোপশান্তি হইবে না। তখন খিলোনিস্ বলিলেন, তাত, আপনি ইহা স্থির সিদ্ধান্ত জানিবেন, আমি জীবিত থাকিয়া, কখনই উঁহার প্রাণদণ্ড দেখিতে পারিব না। যখন উঁহার প্রাণবধ অবধারিত জানিতে পারিব, তখন অগ্রে আমি আত্মঘাতিনী হইব। যাহা হউক, যখন উনি আপনার বিদ্রোহাচরণে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, আমি উঁহাকে অতিশয় দুরাচার ও অধার্ম্মিক বোধ করিযাছিলাম। কিন্তু, এখন আমি উঁহারে আর সেরূপ বোধ করিতেছি না, কারণ, আমি স্পষ্ট দেখিতেছি, রাজ্যভোগ মনুষ্যের এত প্রার্থনীয় বিষয় যে, তাহার জন্য ধর্ম্মাধর্ম্মবোধ, উচিতানুচিতবিবেচনা ও হিতাহিতবিবেক থাকে না। আপনি যে রাজ্যভোগের নিমিত্ত তনয়াকে অনাথা ও চিরদুঃখিনী করিতে উদ্যত হইয়াছেন, উনিও সেই রাজ্যভোগের লোভসংবরণে অসমর্থ হইয়া, তাদৃশ অসদাচরণে দুষিত হইয়াছিলেন।

এই বলিয়া, খিলোনিস্ কিয়ৎক্ষণ মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন, অনন্তর বাষ্পাকুললোচনে কাতরবচনে সম্বোধন করিয়া, পিতাকে বলিতে লাগিলেন, তাত, আমি বিবেচনা করিয়া দেখিলাম, আমার মত হতভাগা ও পাপীয়সী ভূমণ্ডলে আর নাই। পিতা ও পতির নিকট যেরূপ অবমানিত হইলাম, তাহাতে আর আমার প্রাণধারণে কোনও ফল নাই। পিতা ও পতি উভয়েই যাহার প্রতি সমান বিগুণ, তাহার প্রাণধারণ বৃথা, এই দণ্ডে প্রাণবিয়োগ হইলে, আমার সকল যন্ত্রণার শেষ হয়। এই বলিয়া, স্বামীর গলদেশে হস্তাৰ্পণ করিযা খিলোনিস্ অনর্গল অশ্রুবিসৰ্জ্জন করিতে লাগিলেন।

লিয়নিডাস্, পূর্ব্বাপর সমস্ত শ্রবণ ও অবলোকন পূর্ব্বক, কিয়ৎক্ষণ মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন, অনন্তর সন্নিহিত আত্মীয়বর্গের সহিত পরামর্শ করিয়া, ক্লিয়ম্ব্রোটসকে বলিলেন, অবে দুরাত্মন, আমি কেবল কন্যার অনুবোধে তোর প্রাণবধে ক্ষান্ত হইলাম। কিন্তু, তোকে আর আমার অধিকারে থাকিতে দিব না। আমি আদেশ দিতেছি, তুই এই দণ্ডে স্পার্টা হইতে প্রস্থান কর্। অনন্তব তিনি তনয়াকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, বৎসে, আমি কেবল তোমার অনুরোধে এই নরাধমের প্রাণবধ করিলাম না। এক্ষণে শোক পরিত্যাগ করিয়া আমার সঙ্গে আবাসে আইস, তোমায় উহার সমভিব্যাহারিণী হইতে হইবে না। এ বিষয়ে আমি তোমার প্রতি যেরূপ স্নেহ ও দয়া প্রদর্শিত করিলাম, তাহাতে তোমার আমায় পরিত্যাগ করিয়া যাওয়া উচিত নহে।

লিয়নিডাসের অনুরোধ ফলদায়ক হইল না। ক্লিয়ম্ব্রোটস্ উত্থিত ও দণ্ডায়মান হইলে, খিলোনিস্ জ্যেষ্ঠ সন্তানটিকে তাঁহার হস্তে দিলেন, এবং কনিষ্ঠটিকে স্বয়ং ক্রোড়ে লইয়া, পিতার চরণবন্দনাপূর্ব্বক পতিসমভিব্যাহারে নির্বাসনে প্রস্থান করিলেন।

পুরুষজাতির নৃশংসতা

পুরুষজাতির নৃশংসতা

ইংলণ্ডের রাজধানী লণ্ডন নগরে, তামস্ ইঙ্কল্ নামে এক ব্যক্তি ছিল। সে সঙ্গতিপন্ন লোকের সন্তান, যাহাতে সে উপার্জ্জনে ও লাভালাভপরিদর্শনে সম্যক সমর্থ হয়, তাহার পিতা তাহাকে বিলক্ষণরূপে তদুপযোগিনী শিক্ষা দিয়াছিলেন। ইঙ্কলের পিতা যথেষ্ট সঙ্গতি করিয়া গিয়াছিলেন, তথাপি সে অর্থলোভের বশীভূত হইয়া, অধিকতর উপার্জ্জনের অভিলাষে, বিংশতি বৎসর বয়ঃক্রমকালে আমেরিকায় প্রস্থান করিল। ইঙ্কল যে অর্ণবপোতে যাইতেছিল, খাদ্যসামগ্রীর অসদ্ভাব উপস্থিত হওয়াতে; তৎসংগ্রহার্থে উহা আমেরিকার এক স্থানে গিয়া নঙ্গর করিল। অর্ণবপোতস্থিত অনেকেই তীরে অবতীর্ণ হইল, এবং ইতস্ততঃ ভ্রমণ ও অবলোকন করিতে লাগিল। তন্মধ্যে ইঙ্কল্ প্রভৃতি কতিপয় ব্যক্তি, অপরিজ্ঞাতরূপে অনেক দূর পর্যন্ত গমন করিয়াছিল।

ইতঃপূর্ব্বে, য়ুরোপীয়েরা আমেরিকার আদিম নিবাসীদিগের সর্ব্বনাশ করিয়াছিলেন, এজন্য উহারা তাঁহাদের উপর খড়্গহস্ত হইয়াছিল, সুযোগ পাইলে বৈরসাধনের ত্রুটি করিত না। কতিপয় য়ুরোপীয়কে তীরে উঠিয়া ভ্রমণ করিতে দেখিয়া, উহারা অস্ত্র লইয়া তৎক্ষণাৎ আক্রমণ করিল। অনেকেই পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল; একমাত্র ইঙ্কল্, পলাইয়া অলক্ষিতরূপে সন্নিহিত অরণ্যে প্রবেশ করিল, এবং প্রাণভয়ে দ্রুতপদে ধাবমান হইয়া, অরণ্যের অতি নিবিড় অংশে উপস্থিত হইল। ভয়ে ও শ্রমে সে নিতান্ত নির্বীর্য্য হইয়াছিল, এক গণ্ডশৈলের নিকটে গিয়া, আর চলিতে না পারিয়া ভূতলে পতিত হইল।

এই সময়ে, ঐ প্রদেশের অধিপতির কন্যা ইয়ারিকোনাম্নী কামিনী, যদৃচ্ছাক্রমে সেই স্থানে ভ্রমণ করিতে আসিযাছিল। সে ঐ স্থানে উপস্থিত হইযা এক য়ুরোপীযকে মৃতকল্প পতিত দেখিয়া, প্রথমতঃ চকিত হইযা উঠিল, কিন্তু তদীয় আকার দর্শনে বুঝিতে পারিল, এ ব্যক্তি বিপদগ্রস্ত হইয়া এরূপ অবস্থাপন্ন হইয়াছে। স্ত্রীজাতির অন্তঃকরণ স্বভাবতঃ দয়ার্দ্র ও স্নেহপূর্ণ। ইঙ্কলের এই অবস্থা দেখিয়া,ইয়ারিকোর অন্তঃকরণে স্নেহ ও দয়ার সঞ্চার হইল। তখন সে, সঙ্কেতবিশেষ দ্বারা অভয়প্রদান করিয়া, ইঙ্কলকে এক গিরিবিবরে লইয়া গেল। সে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় অতিশয় কাতর হইয়াছে বুঝিতে পারিয়া, স্বল্প সময়ের মধ্যে সুস্বাদু ফল মূল সংগৃহীত করিয়া, আহারার্থে প্রদান করিল, এবং পানার্থে এক নির্মল নির্ঝর দেখাইয়া দিল। এইরূপে ক্ষুন্নিবৃত্তি ও পিপাসা-শান্তি হইলে, ইঙ্কলের শরীরে বলাধান হইল, তখন সে, সঙ্কেত দ্বারা সেই কামিনীর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করিল। কিয়ৎক্ষণ পরে ইয়ারিকো তথা হইতে প্রস্থান করিল, এবং একখানি সুদৃশ্য পশুচর্ম্ম আনিয়া, তাহার শয়নার্থে প্রদান করিল। সে দিবস সায়ংকাল পর্য্যন্ত সেই স্থানে থাকিয়া, তাহাকে সঙ্কেত দ্বারা অভয়প্রদান পূর্বক, ঐ নিভৃত স্থানে রাত্রিযাপন করিতে বলিয়া, ইযারিকো স্বীয় আবাসে প্রতিগমন করিলে, ইঙ্কল্ একাকী সেই গুহাগৃহে রজনীযাপন করিল।

পরদিন প্রভাত হইবামাত্র, ইয়ারিকো ইঙ্কলের নিকট উপস্থিত হইল, এবং অবণ্য হইতে নানাবিধ সুরস ফল মূলের আহরণ করিয়া, আহারার্থে প্রদান করিল। তাহার আহার সমাপ্ত হইলে, ইযারিকো তদীয় সন্নিকটে উপবিষ্ট হইল। ইঙ্কল্ অতি সুশ্রী সুগঠন পুরুষ। কিয়ৎ ক্ষণ অবিচলিতনয়নে অবলোকন করিয়া, ইয়ারিকো তাহার হস্তগ্রহণ পূর্ব্বক, আপনার হস্তের সহিত তুলনা করিতে লাগিল, তাহার বক্ষঃস্থলের বসনোদ্ঘাটন করিয়া নিরীক্ষণ করিল, পরে তাহার চিবুক ধরিয়া, মুখ, নাসিকা, নয়ন প্রভৃতি প্রত্যেক অবয়বেব পরীক্ষা করিতে লাগিল। ইয়ারিকোর নিতান্ত ইচ্ছা, তাহার সহিত কথোপকথন করে, কিন্তু, পরস্পরের ভাষার বিজাতীয় বিভিন্নতা প্রযুক্ত তাহা সম্পন্ন হইয়া উঠিল না। ফলতঃ, ক্রমে ক্রমে ইঙ্কলের উপর ঐ কামিনীর নিরতিশয় স্নেহ ও অনুরাগ জন্মিল।

এইরূপে কতিপয় দিবস অতিবাহিত হইলে, তাহাদের পরস্পর বিলক্ষণ সদ্ভাব ও প্রণয় জন্মিয়া উঠিল, এবং ক্রমে ক্রমে উভয়েই উভয়ের ভাষা কিছু কিছু বুঝিতে পারিতে লাগিল। একদিন উভয়ে উপবিষ্ট হইয়া কথোপকথন করিতেছে, এমন সময়ে ইঙ্কল্ পরিণয় প্রস্তাব করিল। ইয়ারিকো সম্মতিপ্রদর্শন করিলে, উভয়ে ধর্ম্মসাক্ষী করিয়া পরিণয়পাশে বদ্ধ হইল, এবং পরস্পর নিরতিশয় প্রণয়ে কালযাপন করিতে লাগিল। ইয়ারিকো, প্রায় সমস্ত দিন তাহার নিকটে থাকিয়া, তদীয় আহারাদির সমবধান করিয়া দিত, এবং ঐরূপ অবস্থায়, সে যতদূর সুখে, স্বচ্ছন্দে ও নিরাপদে কালযাপন করিতে পারে, তদ্বিষয়ে যথাশক্তি যত্ন ও চেষ্টার ত্রুটি করিত না।

এই ভাবে কতিপয় মাস অতিক্রান্ত হইলে, একদিন ইঙ্কল্ বলিল, দেখ, এ অবস্থায় কালযাপন করা অতিশয় কষ্টদায়ক, প্রাণভয়ে আমায় সদা সশঙ্ক থাকিতে হয়, আর তুমিও আমার নিমিত্ত নিয়ত ব্যাকুল ও শঙ্কাকুল থাক। যদি তোমার মত হয়, সুযোগক্রমে এখান হইতে প্রস্থান করি। যে স্থলে আমার স্বদেশীয়েরা আছেন, তথায় গেলে সকল কষ্ট ও সকল শঙ্কার নিবারণ হইয়া যায়। তুমি অসময়ে আশ্রয় দিয়া যেমন আমার প্রাণরক্ষা কবিয়াছ, এবং এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত নির্বিঘ্নে ও সুখ-স্বচ্ছন্দে রাখিয়াছ, আমিও আপন আয়ত্ত স্থানে তোমায় তেমনই সুখে ও স্বচ্ছন্দে রাখিব। তুমি আমার প্রাণেশ্বরী, তোমায় পরিত্যাগ করিয়া যাইতে, আমার কোনও মতে ইচ্ছা নাই। আমি বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন লোক, আমার সমভিব্যাহারে গেলে, তুমি যাবজ্জীবন নিরতিশয় সুখসম্ভোগে কালহরণ করিতে পারিবে। তুমি এ বিষয়ে অসম্মত হইও না। ইয়ারিকো এই প্রস্তাবে সম্মতি প্রদর্শন করিলে, ইঙ্কল্ বলিল, অতঃপর তুমি প্রতিদিন সমুদ্রের তীরে যাইবে, এবং য়ুরোপীয় অর্ণবপোত দেখিতে পাইলে আমায় সংবাদ দিবে।

একদিন ইয়ারিকো, য়ুরোপীয় অর্ণবপোত দেখিতে পাইয়া ইঙ্কলকে সংবাদ দিলে, সে তৎসমভিব্যাহারে অর্ণবতীরে উপস্থিত হইল, এবং সঙ্কেতবিশেষ দ্বারা পোতস্থিত লোকদিগকে আপন গমনমানস জানাইল। একজন য়ুরোপীয়কে একাকী দেখিয়া, তাহারা তাহাকে লইয়া যাইবার নিমিত্ত তৎক্ষণাৎ এক বোট পাঠাইয়া দিল। ইঙ্কল ও ইয়ারিকো, সেই বোটে আরোহণ করিয়া অর্ণবপোতে গমন কবিল। ঐ পোতে কতিপয় য়ুরোপীয়া কামিনী ছিলেন, ইয়ারিকো, তাহাদের পরিচ্ছদ, সমাদর ও আধিপত্য দর্শনে মুগ্ধ হইয়া মনে মনে বলিতে লাগিল, প্রিয়তমের আবাসে উপস্থিত হইলে, আমারও এইরূপ পরিচ্ছদ, সমাদর ও আধিপত্য হইবে। আমি অসভ্য জাতির কন্যা, সভ্যজাতীয়ের সহধর্ম্মিণী হইযা, অসুলভ সুখসম্ভোগে কালহরণ আমার ভাগ্যে ঘটিবে, ইহা আমি একদিন একক্ষণের জন্য মনে ভাবি নাই।

ঐ অর্ণবপোত বারবেড়োনামক স্থানে যাইতেছিল। ঐ প্রদেশ দাসদাসীবিক্রয়ের এক প্রধান স্থান। যে সকল য়ুরোপীয়েরা তথায় কৃষিব্যবসায় করিত, তাহাদের তৎসংক্রান্ত কর্ম্মনির্ব্বাহার্থে কর্ম্মকরের অত্যন্ত প্রয়োজন হইত, এজন্য য়ুরোপীয়েরা বলপূর্ব্বক, আফ্রিকা ও আমেরিকার আদিম নিবাসীদিগকে অর্ণবপোতে উঠাইয়া লইত, এবং আমেরিকার কৃষিব্যবসায়ী য়ুরোপীয়দিগের নিকট বিক্রয় করিত। সুতরাং তত্তৎপ্রদেশে অর্ণবপোত উপস্থিত হইলেই, ক্রেতৃগণ দাসক্রয়ার্থে আসিত। এই সময়ে দাসদাসীর সাতিশয় প্রয়োজন উপস্থিত হইয়াছিল, এজন্য ঐ জাহাজ নঙ্গর করিবামাত্র, ক্রেতৃগণ নৌকায় চড়িয়া জাহাজে উপস্থিত হইতে লাগিল। সে বার, ঐ জাহাজে বিক্রয়োপযোগী দাসদাসী ছিল না, সুতরাং তাহারা নিতান্ত হতাশ হইল। কিয়ৎক্ষণ পরে ইয়ারিকোকে দেখিতে পাইয়া, এক ব্যক্তি তাহাকে ইঙ্কলের সম্পত্তি বলিয়া বুঝিতে পারিয়া, তাহার নিকটে ক্রয় প্রস্তাব কবিল। ইঙ্কল্ অসম্মতি প্রদর্শন করিলে, প্রথম প্রস্তাবিত ন্যূন মূল্যই অসম্মতির কারণ, এই বিবেচনা করিয়া সে একবারে অত্যন্ত অধিক মূল্যদানের প্রস্তাব করিল। ইঙ্কল্, কোনও ক্রমে বিক্রয় করিতে সম্মত হইল না। পরে সে বাসস্থান স্থির করিয়া, ইয়ারিকোকে লইয়া তথায় গমন করিল।

ইঙ্কলের অর্থলালসা অত্যন্ত প্রবল, অধিক অর্থলাভের অভিলাষেই, সে আমেরিকায় গমন করে। কিন্তু, দৈবঘটনায় এ পর্যন্ত উপার্জ্জন দূরে থাকুক, প্রাণান্ত ঘটিবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা হইয়াছিল। যত দিন অরণ্যে ইয়ারিকোর আশ্রয়ে ছিল, বাঁচিয়া স্বদেশীয় সমাজে আসিতে পারে কি না, তাহারই নিশ্চয় ছিল না, সুতরাং তৎকালে লাভালাভের ভাবনা একবারও তাহার হৃদয়ে উদিত হয় নাই। এক্ষণে, ঐ সকল শঙ্কা একবারে নিবারিত হওয়াতে, সে অনুক্ষণ এই ভাবিতে লাগিল, যদি আমি বিপদগ্রস্ত না হইয়া, যথাকালে এই স্থানে আসিতে পারিতাম, তাহা হইলে এতদিন আমার কত লাভ হইত। এখন কি উপায়ে অপচয়পূরণ কবিব, এই চিন্তাই বিলক্ষণ বলবতী হইয়া উঠিল। আপাততঃ ক্ষতিপূরণের উপায়ান্তর না দেখিয়া, এক দিন সে মনে মনে বিবেচনা করিতে লাগিল, যদি ইয়ারিকোর সহবাস না ঘটিত, তাহা হইলে আমি কোনও ক্রমে সে অরণ্যে এতদিন থাকিতাম না, অবশ্যই সুযোগ করিয়া, অনেক পূর্ব্বে এখানে আসিয়া উপার্জ্জন করিতে পাবিতাম। বিবেচনা করিতে গেলে, উহার জন্যই আমার এত ক্ষতি হইয়াছে। সে দিবস এক ব্যক্তি উহাকে অনেক মূল্যে কিনিতে উদ্যত হইয়াছিল। এক্ষণে দাসদাসীর যেরূপ আবশ্যকতা দেখিতেছি, বোধ করি, তদপেক্ষা অধিক মূল্যে বিক্রয় করিতে পারিব, তাহা হইলে আপাততঃ কিয়ৎ অংশে ক্ষতিপূরণ হইবে।

এই স্থির করিয়া, সমধিক মূল্য পাইয়া, ইঙ্কল্ তত্রত্য এক দাসবণিকের নিকট ইয়ারিকোকে বিক্রয় করিল। ইয়ারিকো, এই সর্ব্বনাশ উপস্থিত দেখিয়া, বারংবার পূর্ব্ববৃত্তান্ত স্মরণ করাইতে লাগিল। ইঙ্কল্ তাহাতে কর্ণপাত করিল না। অবশেষে, তোমার সহযোগে আমার গর্ভ হইযাছে অন্ততঃ প্রসবকাল পর্য্যন্ত অপেক্ষা কর, এমন অবস্থায় আমার প্রতি এরূপ নৃশংস, আচরণ করা তোমার কদাচ উচিত নয়। কাতরবচনে গলদশ্রুলোচনে এই সকল কথা বলিয়া, ইয়ারিকো তাহার অন্তঃকরণে করুণা জন্মাইবাব যথেষ্ট চেষ্টা পাইল। কিন্তু তাহার নিষ্ঠুর অন্তঃকরণ পূর্ব্ববৎ অবিচলিতই রহিল, বরং গর্ভসংবাদ অবগত হইয়া, সে দাসক্রয়বিক্রয়ের নিয়মানুসারে, ক্রেতার নিকট অধিক মুল্যের প্রার্থনা করিতে লাগিল। ক্রেতা, তাহার প্রার্থনা পূর্ণ করিয়া, ক্রীত-দাসী লইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিল।

মহানুভবতা

মহানুভবতা

ইটালির অন্তঃপাতী জেনোয়া প্রদেশের শাসনকার্য্য সর্ব্বতন্ত্র প্রণালীতে সম্পাদিত হইত। কিন্তু, তত্রত্য সম্ভ্রান্ত লোকদিগের হস্তেই, সচরাচর শাসনকার্য্য ন্যস্ত থাকিত। সম্ভ্রান্ত মহাশয়েরা সকল বিষয়েই সম্পূর্ণ আধিপত্য করিতেন, এবং শ্রেণীস্থ লোকদিগের হিতসাধনপক্ষে যাদৃশ যত্ন ও আগ্রহ প্রদর্শন করিতেন, সর্ব্বসাধারণের পক্ষে কদাচ সেরূপ করিতেন না। এজন্য উভয় পক্ষের মধ্যে সর্ব্বদা বিষম বিরোধ উপস্থিত হইত। ফলতঃ, উভয় পক্ষই সুযোগ পাইলে, পরস্পর অহিতচিন্তনে ও অনিষ্টসাধনে পরাঙ্মুখ হইতেন না। একদা, সম্ভ্রান্ত লোকদিগকে অপদস্থ করিয়া, সাধারণ লোকে কতিপয় স্বপক্ষীয় কার্য্যদক্ষ ব্যক্তির হস্তে শাসনকার্য্যের ভারার্পণ করাতে, তাঁহারাই জেনোয়াসমাজের শাসনসংক্রান্ত সমস্ত ব্যাপার সম্পন্ন করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের সর্ব্বপ্রধানের নাম য়ুবর্টো। তিনি অতি দীনের সন্তান,
কিন্তু, স্বীয় বুদ্ধি, যত্ন ও পরিশ্রমের গুণে, বাণিজ্যব্যবসায় অবলম্বনপূর্ব্বক বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন ও অসাধারণ ক্ষমতাপন্ন হইয়া উঠেন।

কিছু দিন পরে, সম্ভ্রান্ত পক্ষ, সাধারণ পক্ষকে পর্য্যুদস্ত করিয়া, পুনরায় আপনাদের হস্তে শাসনকার্য্যের ভার গ্রহণ করিলেন। উত্তরকালে আর তাঁহাদিগকে কোনও ক্রমে পর্য্যুদস্ত হইতে না হয়, এজন্য তাঁহারা সাধারণপক্ষীয় প্রধান ও ক্ষমতাপন্ন লোকদিগের দমন করিতে আরম্ভ করিলেন, সর্ব্বপ্রধান য়ুবর্টোকে সর্ব্বতন্ত্রবিদ্রোহী বলিয়া অবরুদ্ধ করাইলেন, এবং তাঁহার সর্বস্বহরণ করিয়া, সর্ব্বতন্ত্রের অধিকারসীমা হইতে নির্বাসনের আদেশপ্রদান করিলেন। এই আদেশ স্বকর্ণে শ্রবণ করিবার নিমিত্ত, য়ুবর্টো প্রধান বিচারকের নিকট আনীত হইলেন। সন্ত্রান্তপক্ষীয় এডর্ণোনামক এক ব্যক্তি প্রধান বিচারক ছিলেন, তিনি বিচারাসন হইতে গর্ব্বিতবাক্যে সম্বোধন করিয়া য়ুবর্টোকে বলিলেন, অরে পাপিষ্ঠ নরাধম, তুই অতি নীচের সন্তান, কিঞ্চিৎ অর্থসঞ্চয় করিয়া তোর এত আশা বাড়িয়াছিল যে, তুই আপন পূর্ব্বতন অবস্থার বিস্মরণপূর্ব্বক, সম্ভ্রান্ত লোকদিগকে অপদস্থ ও অবমানিত করিতে উদ্যত হইয়াছিলি। কিন্তু তাঁহারা তোর প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহপ্রদর্শন করিয়াছেন, তোর যেমন অপরাধ, তদুপযুক্ত দণ্ডবিধান না করিয়া, তোরে কেবল পূর্ব্বতন অবস্থায় স্থাপিত ও জেনোয়ার অধিকার হইতে নির্বাসিত করিলেন।

এইরূপ গর্ব্বিত ভর্ৎসনাবাক্য শ্রবণগোচর করিয়া, য়ুবর্টো কোনও প্রকারে ঔদ্ধত্য বা কোপচিহ্ন প্রদর্শিত করিলেন না, বিচারকের আদেশ শিরোধার্য্য করিয়া লইলেন, কিন্তু এডর্ণোকে এই মাত্র বলিলেন, আপনি আমার প্রতি যে সকল পরুষ ভাষার প্রয়োগ করিলেন, হয় ত ইহার নিমিত্ত উত্তরকালে আপনাকে অনুতাপ করিতে হইবে। অনন্তর, তিনি নেপল্‌স প্রস্থান করিলেন। তত্রত্য কতিপয় বণিক্ তাঁহার নিকট ঋণী ছিলেন। তাঁহারা সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, স্ব স্ব ঋণের পরিশোধ করিলেন। এইরূপে কিছু অর্থ হস্তগত হওয়াতে, তিনি এক সন্নিহিত দ্বীপে গমন করিলেন, এবং তন্মাত্র অবলম্বনপূর্ব্বক পুনর্বার বাণিজ্যে প্রবৃত্ত হইয়া, অসাধারণ বুদ্ধি, ক্ষমতা ও পরিশ্রমের গুণে, অল্প দিনের মধ্যে বিলক্ষণ সম্পত্তিশালী হইয়া উঠিলেন।

বিষয়কার্য্যের অনুরোধে, য়ুবর্টো সর্ব্বদা যে সকল স্থানে যাতায়াত করিতেন, তন্মধ্যে টিউনিস্ নগর মুসলমানদের অধিকৃত। মুসলমানেরা খৃষ্ট-ধর্ম্মাবলম্বীদিগের বিষম বিদ্বেষী। তৎকালে তাঁহাদের এই রীতি ছিল, যুদ্ধে পরাজিত খৃষ্টীয়দিগকে বন্দী করিয়া আনিতেন, এবং তাহাদিগকে দাস ও লৌহশৃঙ্খলে বন্ধ করিয়া, রাজদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীদিগের ন্যায়, অতি নিকৃষ্ট কষ্টদায়ক কর্ম্মে নিযুক্ত বাখিতেন। একদা, য়ুবর্টো এই নগরে গিয়া, তত্রত্য এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইতেছেন, এমন সময়ে দেখিতে পাইলেন, এক অল্পবয়স্ক খৃষ্টীয় দাস পথের ধারে মাটি কাটিতেছে। তাহার দুই চরণ লৌহশৃঙ্খলে বদ্ধ। তদীয় আকার প্রকার দেখিয়া, ভদ্রসন্তান বলিয়া স্পষ্ট প্রতীতি হইল। যেরূপ কষ্টসাধ্য কর্ম্মে নিযুক্ত আছে, সে কোনও ক্রমে তাহা করিতে পারিতেছে না, এক এক বার কর্ম্ম করিতেছে, এক এক বার বিরত হইয়া দীর্ঘনিশ্বাসত্যাগ ও অশ্রুবিসর্জ্জন করিতেছে।

এই ব্যাপার দর্শনে, য়ুবর্টোর অন্তঃকরণে সাতিশয় দয়ার উদয় হইল। তিনি ইটালিক ভাষায় তাহার পরিচয জিজ্ঞাসা করিলেন। সে, স্বদেশীয় ভাষাশ্রবণে, স্বদেশীয়জ্ঞানে তাঁহার দিকে মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইল, এবং শোকাকুলবচনে আপন দুরবস্থার পরিচয় দিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ কথোপকথনের পর সে বলিল, আমি জেনোয়ার প্রধান বিচারক এডর্ণোর পুত্র।

এই কথা কর্ণগোচর হইবামাত্র, নির্বাসিত বণিক্ চকিত হইয়া উঠিলেন, তৎকালে ভাবগোপন করিয়া, তৎক্ষণাৎ তথা হইতে প্রস্থান করিলেন, যে ব্যক্তি এডর্ণোর পুত্রকে দাস করিয়া রাখিয়াছিলেন, তাঁহার অনুসন্ধান করিয়া তদীয় আলয়ে উপস্থিত হইলেন, এবং তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া জিজ্ঞাসিলেন, আপনি কি লইয়া এই খৃষ্টীয় যুবককে দাসত্বমুক্ত করিতে পারেন। তিনি বলিলেন, আমার এরূপ বোধ আছে, ঐ যুবক ধনবান লোকের সন্তান, এজন্য আমি পাঁচ সহস্র টাকার ন্যূনে উহাকে ছাডিয়া দিব না। য়ুবর্টো, অবিলম্বে ঐ টাকা দিয়া, সেই যুবকের দাসত্বমোচন করিলেন।

এইরূপে আপন অভিপ্রেত সিদ্ধ হওয়াতে, তিনি আন্তরিক পরিতোষলাভ করিলেন, এবং অবিলম্বে এক ভৃত্য ও এক উত্তম পরিচ্ছদ সমভিব্যাহারে লইয়া, সেই যুবকের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন, অহে যুবক, তুমি স্বাধীন হইয়াছ, আর তোমায় মুসলমানদিগের দাসত্ব করিতে হইবে না। এই বলিয়া, তিনি স্বহস্তে তদীয় পদদ্বয় হইতে শৃঙ্খলমোচনপূর্ব্বক, নূতন পরিচ্ছদ পবিধান করাইয়া দিলেন। সে, চমৎকৃত ও হতবুদ্ধি হইয়া, এই সমস্ত ব্যাপার স্বপ্নদর্শনবৎ বোধ করিতে লাগিল, এবং সে যে যথার্থ ই দাসত্বশৃঙ্খল হইতে মুক্ত হইযাছে, কোনও ক্রমে তাহার এরূপ প্রতীতি জন্মিল না। কিন্তু, যখন য়ুবর্টো, আপন আবাসে লইয়া গিয়া, তাহার প্রতি স্বীয় সন্তানের ন্যায় স্নেহপ্রদর্শন করিতে লাগিলেন, তখন তাহার অন্তঃকরণ হইতে সকল সংশয অপসারিত হইল। সেই যুবক, য়ুবর্টোর এই অসাধারণ দয়ার কার্য্য ও অলোকসামান্য সৌজন্য দর্শনে মোহিত ও বিস্মিত হইয়া, তদীয় আবাসে কতিপয় দিবস অবস্থিতি করিল।

কিছু দিন পরেই, এক জাহাজ ইটালি যাইতেছে জানিতে পারিয়া, য়ুবর্টো সেই যুবককে স্বদেশে পাঠাইয়া দেওয়া অবধারিত করিলেন। প্রস্থানকালে তিনি তাহাকে পাথেয়ের উপযোগী অর্থ ও অন্যান্য আবশ্যক দ্রব্য দিয়া বলিলেন, বৎস, তোমার উপর আমার এমনই স্নেহ জন্মিয়াছে যে, তোমাকে ছাড়িয়া দিতে আমার কোনও মতে ইচ্ছা হইতেছে না। তোমার পিতা মাতা তোমার জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল আছেন, এবং অনবরত বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছেন, কেবল এই অনুরোধে আমি তোমায় তাঁহাদের নিকটে পাঠাইয়া দিতেছি, নতুবা আমি তোমায় অন্ততঃ আরও কিছু দিন আমার নিকটে বাখিতাম। যাহা হউক, জগদীশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিতেছি, নিরাপদে স্বদেশে প্রতিগমন করিয়া জনকজননীর শোকাপনোদন ও আনন্দবর্দ্ধন কর। এই বলিয়া, একখানি পত্র তাহার হস্তে সমর্পিত করিয়া য়ুবর্টো বলিলেন, এই পত্রখানি তোমার পিতার হস্তে দিবে।

সেই যুবক, তদীয় স্নেহ, সদাশয়তা ও অমায়িকতার আতিশয্য-দর্শনে মুগ্ধ হইয়া বলিল, মহাশয, আপনি আমার প্রতি যেরূপ স্নেহ ও অনুগ্রহপ্রদর্শন করিযাছেন, কেহ কখনও কাহারও প্রতি সেরূপ করে না, আপনার স্নেহ ও দয়া, যাবজ্জীবন আমার অন্তঃকরণে জাগরূক থাকিবে, আমি একদিন এক মুহূর্ত্তের নিমিত্তে তাহা বিস্মৃত হইতে পারিব না, প্রার্থনা এই, আপনি যেন এ চিবক্রীত অধীনকে বিস্মৃত না হন। এই বলিয়া সে, অকৃত্রিম ভক্তিপ্রদর্শনপূর্বক প্রণাম ও আলিঙ্গন করিল। য়ুবর্টো, স্নেহভরে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া, গলদশ্রু-লোচনে দণ্ডায়মান রহিলেন, যুবক অশ্রুবিসৰ্জ্জন করিতে করিতে প্রস্থান করিল।

এডর্ণো ও তাঁহার সহধর্ম্মিণী, বহু দিন পুত্রের কোনও উদ্দেশ না পাইয়া স্থির করিয়াছিলেন, সে নিঃসন্দেহ কাল গ্রাসে পতিত হইয়াছে, সুতরাং তাহার পুনর্দর্শনবিষযে নিতান্ত নিরাশ হইয়াছিলেন। এক্ষণে সেই যুবক সহসা তাঁহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইলে, তাঁহারা চমৎকৃত ও আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইলেন, এবং উভয়েই এককালে স্নেহভরে গাঢ় আলিঙ্গন করিয়া, প্রভূত আনন্দাশ্রু বিসর্জ্জন করিতে লাগিলেন। তিনজনেই কিয়ৎক্ষণ জড়প্রায় হইয়া রহিলেন, কাহারও মুখ হইতে বাক্যনিঃসরণ হইল না। অনন্তর, এডর্ণো ও তাঁহার সহধর্ম্মিণী জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস, তুমি এত দিন কিরূপে কোথায় ছিলে, বল। তখন সেই যুবক, যেরূপে অবরুদ্ধ ও দাসত্বশৃঙ্খলে বন্ধ হয়, তাহার সবিস্তর বর্ণন করিলে, এডর্ণো বাষ্পপূর্ণনয়নে বলিলেন, কোন্ মহানুভাব তোমায দাসত্বশৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিয়া, আমাদিগকে জন্মের মত কিনিয়া রাখিলেন, বল। সে বলিল, এই পত্রে দৃষ্টিপাত করিলে, সকল অবগত হইতে পারিবেন।

এডর্ণো, ব্যস্ত হইয়া সেই পত্রের উদ্ঘাটন করিলেন। পত্রের মর্ম্ম এই, আপনি যে পাপিষ্ঠ নীচের সন্তানকে, যৎপরোনাস্তি গর্ব্বিতবাক্যে ভর্ৎসনা কুরিয়া, সর্বস্ব হরণপূর্ব্বক নির্ব্বাসিত করিয়াছিলেন, সেই নরাধম আপনকার একমাত্র পুত্রকে দাসত্বশৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিয়াছে। পত্র পাঠ করিয়া, এডর্ণো, পূর্ব্বকৃত নিজ নৃশংস আচরণ ও য়ুবর্টোর অসাধারণ দয়া ও সৌজন্য প্রদর্শন, এ উভয়ের তুলনা করিয়া যৎপরোনাস্তি ক্ষুব্ধ ও লজ্জায় অধোবদন হইলেন। এই সময়ে, তাঁহার পুত্র ভক্তিরসে পরিপূর্ণ হইযা, য়ুবর্টোর স্নেহ, দয়া ও সৌজন্যের সবিস্তর বর্ণন করিতে লাগিল। এ ঋণের পরিশোধ নাই বুঝিতে পারিয়া, এডর্ণো, যথাশক্তি প্রত্যুপকারকরণে কৃতসঙ্কল্প হইলেন, এবং যাবতীয় সম্ভ্রান্ত্রদিগকে সম্মত করিয়া, য়ুবর্টোকে পত্র লিখিলেন, আপনি আমায় জন্মের মত কিনিয়া রাখিয়াছেন, আপনি যে কেমন মহানুভাব ব্যক্তি, তাহা আমি এতদিনে বুঝিতে পারিলাম। প্রার্থনা এই, আপনি আমার অপরাধ মার্জ্জনা করিয়া, আমায় বন্ধু বলিয়া পরিগণিত করেন। আপনার পক্ষে যে নির্ব্বাসনের আদেশ হইযাছিল, তাহা রহিত হইয়াছে। এক্ষণে আপনি অনায়াসে জেনোয়া আসিয়া অবস্থিতি করিতে পারেন।

অল্প দিনের মধ্যেই, য়ুবর্টো জেনোয়ায় প্রত্যাগমন করিলেন, এবং সর্ব্বসাধারণের সম্মানাস্পদ হইয়া, সুখে ও স্বচ্ছন্দে কালযাপন করিতে লাগিলেন।

যেখানে রাজা নাই, সর্ব্বসাধারণ লোকের মতানুসারে শাসন সংক্রান্ত যাবতীয় কার্য্যের নির্ব্বাহ হয়, তাহাকে সর্ব্বতন্ত্র বলে। সর্ব্ব—সাধারণ, তন্ত্র—রাজ্যচিন্তা।

যতো ধর্ম্মস্ততো জয়ঃ

যতো ধর্ম্মস্ততো জয়ঃ

জর্ম্মন্‌ সাগরের উপকূলে এক সমৃদ্ধিশালী জনপদ আছে। কিছু কাল পূর্ব্বে, ঐ জনপদে সাবিনস নামে এক যুবক ছিলেন। এই
যুবক সমৃদ্ধবংশসম্ভূত। তিনি যেরূপ অসাধারণগুণসম্পন্ন ছিলেন, সচরাচর সেরূপ দেখিতে পাওয়া যায় না। তাঁহার প্রতিবেশিনী অলিন্দানাম্নী এক কামিনী অলৌকিকরূপলাবণ্যপূর্ণা ও অসামান্যগুণসম্পন্না ছিলেন। ক্রমে ক্রমে, উভয়েরই অন্তঃকরণে প্রণয়সঞ্চার হইলে, সাবিনস্‌ যথানিয়মে অলিন্দার পাণিগ্রহণ করিলেন। এইরূপে দম্পতিভাবে সম্বদ্ধ হইয়া, উভয়ে মনের সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন।

কিন্তু অবিচ্ছিন্ন সুখসম্ভোগে কালহরণ করা অল্প লোকের ভাগ্যে ঘটিয়া থাকে। অন্যশুভদ্বেষিণী ঈর্ষ্যা, কিয়ৎ কালের নিমিত্ত তাঁহাদের সুখে কালহরণ করিবার দুরতিক্রম প্রত্যূহ হইয়া উঠিল। ঐ স্থানে এরিয়ানানাম্নী অপর এক কামিনী ছিলেন। তাঁহার সহিত সাবিনসের সন্নিহিতকুটুম্বসম্বন্ধ ছিল। এরিয়ানা বিলক্ষণ সুরূপা, সাতিশয় সমৃদ্ধিশালিনী, স্বভাবতঃ প্রফুল্লহৃদয়া, সদ্বিবেচনাপূর্ণ ও দয়াদাক্ষিণ্যাদিসদ্‌গুণসম্পন্না ছিলেন। তাহার একান্ত বাসনা ছিল, সাবিনসের সহধর্ম্মিণী হইয়া সুখে কালযাপন করিবেন। কিন্তু সাবিনস্‌, অলিন্দার পাণিগ্রহণ করাতে, তাঁহার সে বাসনা বিফল হইয়া গেল। তদ্দ্বারা তাঁহার হৃদয় ঈর্ষ্যাকলুষিত ও বিদ্বেষদূষিত হইল। ঈর্ষ্যার কি অনির্বচনীয় মহিমা। তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ প্রফুল্লহৃদয়তা ও দয়াদাক্ষিণ্যাদি গুণ অন্তর্হিত হইল। তিনি ঈর্ষ্যার বশীভূত ও বিদ্বেষবুদ্ধির অধীন হইয়া, অনবরত এই চিন্তা করিতে লাগিলেন, কিরূপে তাঁহাদের অনিষ্টসাধন করিতে পারিবেন, এবং কিরূপেই বা তাঁহাদের বিযোগসংঘটন করিয়া দিবেন। উভয়ের মধ্যে অলিন্দার উপরেই তাঁহার সমধিক আক্রোশ জন্মিয়াছিল কাবণ, অলিন্দা না থাকিলে তাঁহাব সাবিনসের সহিত পবিণয়- সংঘটনের আর কোনও প্রতিবন্ধক ছিল না।

কিছুদিন পরেই, এরিয়ানাব মনস্কামনা পূর্ণ হইবার বিলক্ষণ সুযোগ ঘটিয়া উঠিল। দীর্ঘকাল ব্যাপিয়া, অপর এক ব্যক্তির সহিত সাবিনসের বিবাদ চলিতেছিল। ঐ বিবাদে তাঁহার পরাজযের কিছুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না। দৈববিড়ম্বনায় উহার এরূপে নিষ্পত্তি হইল যে, সাবিনসের সর্ব্বস্বান্ত হইয়া গেল। এতদিন তিনি বিলক্ষণ সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তি বলিযা গণনীয় ছিলেন, এক্ষণে একবারে নিতান্ত নিঃস্ব হইয়া পড়িলেন। এরিযানার যে তাঁহার উপর মর্ম্মান্তিক রোষ ও দ্বেষ জন্মিযাছিল, এপর্য্যন্ত তিনি তাহার বিন্দুবিসর্গও অবগত ছিলেন না। তিনি জানিতেন, এরিয়ানা তাঁহার অতি আত্মীয়, এজন্য এই দুঃসময়ে তাঁহার নিকট আনুকূল্য প্রার্থনা করিলেন। এরিয়ানা আনুকূল্য প্রদানে সম্মত হইলেন না। তদ্দর্শনে সাবিনস্ বিস্তর অনুযোগ ও ভর্ৎসনা করিলেন। তখন এরিয়ানা বলিলেন, তুমি যদি আমার মতানুসারে চল, এবং আমি যে প্রস্তাব করিব তাহাতে সম্মত হও, তাহা হইলে আমি তোমার হস্তে সর্ব্বস্বসমর্পণ করিব, এবং যাবজ্জীবন তোমার আজ্ঞানুবর্ত্তিনী হইযা চলিব। আমার প্রস্তাব এই, তুমি অদ্যাবধি অলিন্দা সংস্রব পরিত্যাগ কর।

সর্বস্বান্ত হওয়াতে, সাবিনস যার পর নাই দুরবস্থায় পড়িয়াছিলেন, যথার্থ বটে, কিন্তু তিনি সুশীল, সচ্চরিত্র, সদ্বিবেচক ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন, এবং অলিন্দাকে অত্যন্ত ভাল বাসিতেন। তিনি অর্থলোভে পত্নীপরিত্যাগে সম্মত হইবার লোক ছিলেন না, এজন্য ঘৃণা ও রোষ প্রদর্শন পূর্ব্বক, এরিয়ানার প্রস্তাবে অমত ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করিলেন। এরিয়ানা তাহাতে অবমানিত বিবেচনা করিয়া, যৎপয়োনাস্তি কুপিত হইলেন, এবং তদবধি সাবিনসের সহধর্ম্মিণী হইবার প্রত্যাশায় বিসর্জ্জন দিয়া, যাহাতে তাঁহাদের উচ্ছেদসাধন করিতে পারেন, সর্ব্ব প্রযত্নে তাহারই চেষ্টা ও অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। পূর্ব্বে সাবিনসের পিতা, এরিয়ানার পিতার নিকট ঋণগ্রহণ কবিয়াছিলেন। তিনি তাহার পরিশোধ করিয়া যান নাই। ইতঃপূর্ব্বে সে বিষয়ের কোনও উল্লেখ ছিল না। কিন্তু এরিয়ানা, কি সাবিনস্, কেহই এ পর্য্যন্ত ঐ ঋণের বিষয় কিছুমাত্র অবগত ছিলেন না। সদ্ভাব থাকিলে, এরিয়ানা কদাচ ঐ ঋণের আদায়ের চেষ্টা পাইতেন না। কিন্তু, এক্ষণে উল্লিখিত ঋণের সন্ধান পাইয়া, তিনি বিচারালয়ে সাবিনসের নামে অভিযোগ উপস্থিত করিলেন। সাবিনস্, ঋণপরিশোধে অসমর্থ হওয়াতে, কারাগাবে নিক্ষিপ্ত হইলেন। তাঁহার প্রেয়সী অলিন্দা, স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত হইযা, তাঁহার সহিত কারাগাবে প্রবেশ করিলেন।

এরূপ অবস্থায় অনেকেরই চিত্তবৈকল্য ও বুদ্ধিবিপর্য্যয় ঘটিয়া থাকে, এবং সাতিশয় সুখসম্ভোগের অবস্থায় সহসা দুঃসহ ক্লেশভোগ ঘটিলে, প্রায় সকলেই শোকাকুল ও ম্রিয়মাণ হয়। কিন্তু সাবিনস ও অলিন্দা, সচ্ছন্দচিত্তে ও অবিচলিত সদ্ভাবে কালহরণ করিতে লাগিলেন, একদিন, একক্ষণের জন্য তাঁহাদের বিষাদ বা অসন্তোষের লক্ষণ ঘটে নাই। উভযেই উভয়কে সুখী ও সচ্ছন্দচিত্ত করিবার নিমিত্ত, প্রাণপণে যত্ন ও প্রয়াস করিতেন। কখনও কখনও সাবিনস্ অলিন্দার কষ্ট-দর্শনে ক্ষুব্ধ হইয়া আক্ষেপ প্রকাশ করিতেন। কিন্তু অলিন্দা বলিতেন, অয়ি নাথ, তুমি অকারণে আক্ষেপ করিতেছ কেন? যদি আমি তোমার সহবাসসুখে বঞ্চিত না হই, তাহা হইলে যত দুরবস্থা ঘটুক না কেন, আমি অণুমাত্র অসুখবোধ করিব না। যতদিন আমার এরূপ বিশ্বাস থাকিবে, আমার উপর তোমার স্নেহের ও অনুরাগের বৈলক্ষণ্য ঘটে নাই, ততদিন কোনও কারণেই আমার চিত্তবৈকল্য বা কষ্টবোধ হইবে না, এবং যত দিন তোমার প্রেয়সী বলিয়া আমার অভিমান থাকিবে, ততদিন সম্পত্তিনাশ, বন্ধুবিচ্ছেদ বা অন্যবিধ কোনও কারণে আমি কিছুমাত্র দুঃখবোধ করিব না। অলিন্দার এইরূপ বাক্যবিন্যাস শ্রবণে মোহিত ও পুলকিত হইয়া, সাবিনস্ অশ্রুবিসর্জ্জন করিতেন।

সর্বস্বান্ত ঘটিবার পরেও, তাঁহাদের যৎকিঞ্চিৎ যাহা সংস্থান ছিল, কিছুদিনের মধ্যেই তাহা নিঃশেষিত হইল, সুতরাং সকল বিষয়েই তাঁহাদের দুঃখের একশেষ ঘটিল। তাঁহারা তাহাতে অণুমাত্র বিষাদ বা অসন্তোষ প্রদর্শন করিলেন না। অল্পদিন হইল, তাঁহাদের যে সন্তান জন্মিয়াছিল, সেইটিকে অবলম্বন করিয়া, তাঁহারা নিরুদ্বেগচিত্তে কালহরণ করিতে লাগিলেন। যাহা হউক, এই সময়ে তাঁহাদের দুঃখের অবধি ছিল না, এবং কত কালে সেই দুঃখের অবসান হইবে, তাহারও স্থিরতা ছিল না।

একদিন অপরাহ্ণসময়ে, তাঁহাদের পুত্রটি ক্রীড়া করিতেছে, এবং তাঁহারা উভয়ে প্রফুল্লচিত্তে ও উৎসুকনয়নে, তাহার ক্রীড়ানিরীক্ষণ করিতেছেন, এমন সময়ে, সহসা এক ব্যক্তি তাঁহাদের সম্মুখবর্ত্তী হইল, এবং অনুচ্চস্বরে তাঁহাদিগকে বলিতে লাগিল, অদ্য দুই দিবস হইল এরিয়ানার মৃত্যু হইয়াছে, মৃত্যুকালে তিনি বিনিযোগপত্র দ্বারা, আপন সর্বস্ব এক আত্মীয় ব্যক্তিকে দান করিয়া গিয়াছেন। ঐ আত্মীয় ব্যক্তি এক্ষণে উপস্থিত নাই, কার্য্যোপলক্ষে দূরদেশে আছেন। কিঞ্চিৎ ব্যয় করিলে, ঐ বিনিযোগপত্র অনায়াসে আপনাদের হস্তগত ও অগ্নিসাৎ হইতে পারে, তাহা হইলে আপনারা তাঁহার সমস্ত সম্পত্তির অধিকারী হইতে পারেন, কারণ, ঐ বিনিযোগপত্রের অসদ্ভাব ঘটিলে, আপনারাই সর্ব্বাগ্রে অধিকারী।

সাবিনস্ ও অলিন্দা, এই ধর্ম্মবিদ্বিষ্ট প্রস্তাব শ্রবণগোচর করিয়া, যৎপরোনাস্তি ঘৃণাপ্রদর্শন কবিলেন, সাতিশয় অসন্তোষ ও রোষ প্রদর্শন পূর্ব্বক প্রস্তাবকারীকে গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিলেন, এবং এরিয়ানার মৃত্যুসংবাদশ্রবণে সাতিশয় শোকাকুল হইয়া, বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন। বস্তুতঃ, এরিয়ানার মৃত্যু হয় নাই, তিনি, সাবিনস্ ও অলিন্দার মনের ভাবপরীক্ষার্থে, ছলনা করিয়া ঐ লোককে ঐরূপ বলিতে পাঠাইয়া দেন। তিনি স্থির করিয়াছিলেন, ইহারা যেরূপ দুরবস্থায় পড়িয়াছে, এই প্রস্তাব শুনিলে অবশ্য তদনুযায়ী কার্য্য করিতে সম্মত হইবে। বিশেষতঃ, আমা হইতে তাহাদের কারাবাস ঘটিয়াছে, সুতরাং আমার মৃত্যু শুনিলে, নিঃসন্দেহ তাহাদের আহ্লাদ জন্মিবে। তিনি, পার্শ্ববর্ত্তী গৃহে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থিতি কবিতেছিলেন, সুতরাং স্বকর্ণে ও তাঁহার প্রেরিত প্রতিনিবৃত্ত লোকের মুখে সবিশেষ সমস্ত শ্রবণ করিয়া, তাঁহাদের প্রতি তাঁহার অতিশয ভক্তি জন্মিল, এবং যে বিদ্বেষবুদ্ধির অধীন হইয়া এতদিন তাঁহাদিগকে কষ্ট দিয়াছিলেন, তাহা এককালে অন্তর্হিত হইল। এরূপ সুশীল ও ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিদিগকে অকারণে অবমানিত করিযাছি, ও যারপরনাই কষ্ট দিয়াছি, ইহা ভাবিয়া তিনি যৎপরোনাস্তি ক্ষুব্ধ ও লজ্জিত হইলেন।

তখন এরিয়ানার হৃদযে স্বভাবসিদ্ধ দয়াদাক্ষিণ্যপ্রভৃতি সদগুণসমুদয় পুনরায় আবির্ভূত হইল। তিনি, অশ্রুপূর্ণলোচনে সেই গৃহে প্রবেশ করিয়া, আকুলবচনে পূর্ব্বকৃত নৃশংস আচরণের নিমিত্ত ক্ষমাপ্রার্থনা করিলেন, এবং উভয়কেই স্নেহভরে আলিঙ্গন করিয়া, প্রবলবেগে বাষ্পবারিবিসর্জ্জন করিতে লাগিলেন। সাবিনস্ ও অলিন্দা সেই দিবসেই কারামুক্ত হইলেন। এরিয়ানা, বিনিয়োগপত্র দ্বারা তাঁহাদিগকে স্বীয় সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নির্দ্ধারিত করিয়া রাখিলেন, এবং যাহাতে তাঁহারা আপাততঃ সুখে ও সচ্ছন্দে কালযাপন করিতে পারেন, তাহারও ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। তাঁহারা এইরূপে সকল ক্লেশ হইতে মুক্ত হইয়া, পরম সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন। কিছুদিন পরেই এরিয়ানার মৃত্যু হইল। অন্তিম সময়ে তিনি এই কথা বলিয়া যান যে, ধর্ম্মপথে থাকিলে অবশ্যই সুখ, সম্পত্তি ও সৌভাগ্যলাভ ঘটে, ধার্ম্মিক ব্যক্তিকে যদিও কোনও কারণে আপাততঃ কষ্টভোগ করিতে হয়, কিন্তু যদি তিনি ধর্মপথ হইতে বিচলিত না হন, চরমে জয়লাভ স্থির সিদ্ধান্ত।

যথার্থ বদান্যতা

আখ্যানমঞ্জরী।

তৃতীয় ভাগ।

যথার্থ বদান্যতা

ইংল্যাণ্ডের অন্তঃপাতী ফ্রোম নগরে বো নামে এক সঙ্গতিপন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার মৃত্যু হইলে তদীয় সহধর্মিণী সমস্ত বিষযেব অধিকাবিণী হইলেন। এই কামিনী নিবতিশয় দয়াশীল ছিলেন, অন্যের দুঃখ দেখিলে, অত্যন্ত দুঃখিত হইতেন, এব সাধ্যানুসারে তাহার দুঃখ বিমোচনে যত্ন করিতেন। তাহার যে নিরূপিত আয় ছিল, গ্রাসাচ্ছাদনের উপযোণী অংশ ব্যতিবিত্ত তৎসমুদয় দীনগণেব দাবিদ্রঃখ নিবাবণে নিয়োজিত হইত ফলতঃ, তিনি সেরূপ পরোপকারীতে দীক্ষিত ছিলেন, সেরূপ সচরাচর নযনগোচর হয় না।

বিবি বব কতকগুলি গ্রন্থেব বচনা করিয়াছিলেন। তিনি, পুস্তকবিক্রেতাদিগের নিকট হইতে প্রথমবাব যে টাকা পাইলেন এক দীন পরিবাবেব দুরবস্থা দেখি, সমুদয় তাহাদিগকে দান কবিলেন। একদা, আর একটি নিরুপায় পরিবারের দুববস্থা দেখিয়া, তাঁহার অত্যন্ত দয়া উপস্থিত হইল, কিন্তু যাহাতে তাহাদের যথার্থ উপকার হয়, এরূপ অর্থ তৎকালে তাহার হস্তে ছিল না। উপায়ান্তর না দেখিয়া, অবশেষে, বাসন বিক্রয় করিয়া, তিনি তাহাদের আনুকূল্য করিলেন। তাহার এই রীতি ছিল, সঙ্গে কিছু না লইয়া, বাটী হইতে বহিগত হইতেন না, কারণ, দীন দুঃখী তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইলে, যদি কিছু দিতে না পারিতেন, তাহা হইলে, তাহার অত্যন্ত ক্লেশবোধ হইত।

তিনি, কেবল ধন দ্বারা সাহায্য করিয়া, ক্ষান্ত থাকিতেন না,অবসরকালে, গৃহে বসিযা, স্বহস্তে নানাবিধ পবিচ্ছদ প্রস্তুত করিয়া রাখিতেন, এবং যখন যাহাদের যেরূপ পরিচ্ছদের অপ্রতুল দেখিতেন, তাহাদিগকে সেইরূপ দিতেন। তিনি অন্যের বিপদে বিপদ জ্ঞান করিতেন, অন্যের শোকে শোকাকুল হইতেন, অন্যকে রোদন করিতে দেখিলে, অশ্রুপাত না করিয়া থাকিতে পারিতেন না,পীড়িত বা বিপদাপন্ন ব্যক্তি-দিগের সর্বদা তত্ত্বাবধান করিতেন, এবং যে বিষয়ে তাহাদের অপ্রতুল দেখিতেন, নিজ ব্যয়ে তাহার সমাধা করিয়া দিতেন।

পথিমধ্যে যদি তিনি অপরিচিত বালক দেখিতে পাইতেন, আর যদি, তাহার আকার দেখিলে, সুবোধ ও বুদ্ধিমান্ বলিয়া বোধ হইত, তৎক্ষণাৎ তাহার বিষয়ে সবিশেষ অনুসন্ধান করিতেন, যদি জানিতে পারিতেন, পিতা মাতার অসঙ্গতি-প্রযুক্ত তাহার বিদ্যাশিক্ষা হইতেছে না, অবিলম্বে তাহাকে

উপযুক্ত বিদ্যালয়ে নিযুক্ত করিয়া দিতেন, এবং স্বয়ং সমস্ত ব্যয়ের নির্ব্বাহ করিতেন। এইরূপে তিনি অনেক দীন বালকের বিদ্যাশিক্ষার উপায় করিয়া দিয়াছিলেন। তিনি, কখনও কখনও, স্বয়ং পরিশ্রম করিয়া, তাহাদিগকে ধর্ম্ম ও নীতি বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। যখন তিনি কোনও বালককে তাঁহার অভিলাষানুরূপ ফললাভ করিতে দেখিতেন, আমার যত্ন ও অর্থব্যয় সার্থক হইল ভবিয়া আহ্লাদে পুলকিত হইতেন, তাহার বিপরীত দেখিলে, তাহার শোকের ও ক্ষোভের সীমা থাকিত না।

তিনি যে কেবল নিতান্ত নিরুপায় লোকদিগকে সাহায্য কবিতেন এরূপ নহে। অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থার লোকেরাও,কষ্টে পড়িলে, তাঁহার নিকট যথেষ্ট আনুকূল্য প্রাপ্ত হইতেন। তিনি বলিতেন, অসঙ্গতি বা অল্প সঙ্গতি প্রযুক্ত, লোকের যে ক্লেশ ও দুর্ভাবনা ঘটে, তাহার নিবারণ করিতে পারিলেই, মানব জাতির যথার্থ উপকার করা হয়। তদনুসারে, যে সকল লোক নিতান্ত নিঃস্ব বা দুরবস্থা গ্রস্ত নহেন, তিনি, তাদৃশ ব্যক্তিদিগেরও কষ্ট দেখিলে, বিলক্ষণ সাহায্য করিতেন।

এই দয়াশীল স্ত্রীলোকের আয় অধিক ছিল না, এজন্য সকলেই, তাঁহার তাদৃশ দান দেখিয়া, আশ্চর্য্য জ্ঞান করিতেন, তিনি, কিরূপে এই সমস্ত ব্যয়ের নির্ব্বাহ করেন, কিছুই বুঝিতে পারিতেন না।

তিনি অত্যন্ত অমায়িক, নিতান্ত সরলস্বভাব, ও সর্ব্বথা অহমিকাশূন্য ছিলেন, সর্ব্বদা, সর্ব্ববিধ লোকে সহিত, সদয় ও সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার করিতেন। ফলতঃ, তিনি, কেবল লোকরঞ্জন ও সাধ্যানুসারে লোকের ক্লেশ-নিবারণের জন্যই জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন।

বিবি বোব মৃত্য হইলে, সকল লোকই যৎপরোনান্তি দুঃখিত হইয়াছিলেন। নিঃস্ব ও নিরুপায় লোকদিগের শোকের ও দুঃখের অবধি ছিল না। তাঁহার অভাবে, তাহারা পৃথিবী অন্ধকারময় দেখিল এবং তদীয় সদনে ও সমাধিস্থানে সমবেত হইয়া, অত্যন্ত বিলাপ ও তাঁহার পারলৌকিক মঙ্গল প্রার্থন করিতে লাগিল। তিনি যে নিরতিশয় দয়া ও সৌজন্য সহকার তাহাদেব প্রার্থনা শুনিতেন এবং অকাতবরে তত্তৎ প্রার্থনা পূর্ণ করিতেন, বহুদিন পর্যন্ত তাহারা, পরস্পর সেই সমস্ত কীর্তন করিতে করিতে অবিশ্রান্ত অশ্রুবিসর্জ্জন করিত।

সৌভ্রাত্র

সৌভ্রাত্র

খৃষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে, পোর্তুগীস্‌দিগের জাহাজ ভারতবর্ষে যাতায়াত করিত, একদা এক জাহাজ, অন্যূন দ্বাদশ শত লোক লইয়া, ভারতবর্ষে আসিতেছিল। প্রথমতঃ কিছু দিন কোনও অসুবিধা বা উপদ্রব ঘটে নাই। ঐ জাহাজ নিয়ে ও নিরুদ্বেগে, আফ্রিকা পর্যন্ত উপস্থিত হইল, অনন্তর উত্তমাশা অন্তরীপ অতিক্রান্ত করিয়া, উত্তরপূর্ব্বাভিমুখে চলিতে চলিতে, আরোহীদিগের দুর্ভাগ্যক্রমে, এক জলমগ্ন পাহাড়ে সংলগ্ন হইল। তলভেদ হইয়া এরূপে জলপ্রবেশ হইতে লাগিল যে, অবিলম্বে উহার অর্ণবপ্রবাহে মগ্ন হওয়া অপরিহার্য্য হইয়া উঠিল।

জাহাজের উপর পিনেস্ নামে একখানি ক্ষুদ্র তরী ছিল। এই সর্ব্বনাশ উপস্থিত দেখিয়া, কাপ্তেন সেই পিনেস্ জলে ভাসাইলেন, এবং কিছু আহারসামগ্রী লইয়া, আর ঊনবিংশতি ব্যক্তির সহিত উহাতে আরোহণ করিলেন। এতদ্ভিন্ন অনেকে ঐ পিনেসে আসিবার নিমিত্ত উদ্যম করিয়াছিল, কিন্তু অধিক লোক হইলে পাছে মগ্ন হইয়া যায়, এই আশঙ্কায় তাঁহারা তরবারিপ্রহার দ্বারা উহাদিগকে নিবৃত্ত করিলেন। এইরূপে কাপ্তেন ও তৎসমভিব্যাহারীরা প্রস্থান করিলে পর, জাহাজ অবশিষ্ট আরোহিবর্গের সহিত অর্ণবগর্ভে প্রবিষ্ট হইল।

সমুদ্রপথে, কম্পাস্ ব্যতিরেকে দিঙ্‌নির্ণয় হয় না। জাহাজে কম্পাস্ ছিল, কিন্তু কাপ্তেন, প্রাণবিনাশশঙ্কায় নিতান্ত অভিভূত ও একান্ত ব্যাকুলচিত্ত হইয়া, কম্পাস লইতে বিস্মৃত হইয়াছিলেন। সুতরাং পিনেসের লোকেরা দিঙ্‌নিরূপণ করিতে না পারিয়া, যদৃচ্ছাক্রমে দাঁড় বাহিয়া চলিলেন। সমুদ্রের জল এরূপ লবণময় যে, কোনও ক্রমে পান করিতে পারা যায় না। জাহাজে পানার্থ জল ছিল, পিনেসের লোকেরা ব্যাকুলতা প্রযুক্ত, তাহা লইতে পারেন নাই, এজন্য তাঁহাদের পিপাসানিবন্ধন কষ্টের একশেষ ঘটিয়াছিল। তাঁহারা এইরূপ দুরবস্থায়, পিনেস্, চালাইতে লাগিলেন।

জাহাজের কাপ্তেন পূর্ব্বাবধি পীড়িত ও সাতিশয় দুর্ব্বল ছিলেন, চারি দিন পরে তাঁহার মৃত্যু হইল। এই দুর্ঘটনা দ্বারা পিনেসে অশেষবিধ বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইতে লাগিল। সকলেই কর্ত্তৃত্বভার গ্রহণে ও আজ্ঞা প্রদানে উদ্যত, কেহই অধীনতাস্বীকারে ও আজ্ঞাপ্রতিপালনে সম্মত নহেন। অবশেষে, সকলে ঐকমত্য অবলম্বন পূর্ব্বক, এক অভিজ্ঞ বৃদ্ধ ব্যক্তির হস্তে কর্ত্তৃত্বভার অর্পিত করিলেন।

কত দিনে তাঁহারা তীর প্রাপ্ত হইবেন, তাহার নিশ্চয় ছিল না। আর তাঁহারা যে আহারসামগ্রী লইয়া পিনেসে আরোহণ করিয়াছিলেন, তাহা প্রায় নিঃশেষ হইয়া আসিল। সুতরাং স্বল্পাবশিষ্ট ভাগ দ্বারা সকলের অধিক দিন প্রাণধারণ হওয়া কোনও মতে সম্ভাবিত নহে। এজন্য, নুতন কাপ্তেন এই প্রস্তাব করিলেন, আমরা পিনেসে যত লোক আছি, অবশিষ্ট আহারসামগ্রী দ্বারা অধিক দিন সকলের প্রাণধারণ অসম্ভব। অতএব লাটরি করিয়া আপাততঃ সমুদয়ের চতুর্থ ভাগ লোককে সমুদ্রে প্রক্ষিপ্ত করা যাউক, তাহা হইলে, তদ্বারা অপেক্ষাকৃত অধিক দিন চলিতে পারিবে।

এই প্রস্তাবে সকলে সম্মতিপ্রদৰ্শন করিলেন। পিনেসে সমুদয়ে উনিশ ব্যক্তি ছিলেন, তন্মধ্যে এক ব্যক্তি পাদরি, আর এক ব্যক্তি সূত্রধর। প্রথম ব্যক্তি, অন্তিম সময়ে ধর্ম্মবিষয়ক উপদেশ দিবেন, এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি, আবশ্যক হইলে পিনেসের মেরামত করিতে পারিবেন, এই বিবেচনায় সকলে তাঁহাদের উভয়কে ছাড়িয়া, লাটরি করিতে সম্মত হইলেন। আর নূতন কাপ্তেন বয়সে প্রাচীন, বিশেষতঃ তিনি না থাকিলে, পিনেস্ চালান কঠিন হইয়া উঠিবে, এজন্য সকলে তাঁহাকেও ছাড়িয়া দিলেন। তিনি, অনেকক্ষণ পর্যন্ত এই বিষয়ে সম্মত হয়েন নাই, পরিশেষে, সকলের সবিশেষ অনুরোধে তাঁহাকে সম্মত হইতে হইল।

এইরূপে তিন জনকে ছাড়িয়া দিয়া, অবশিষ্ট ষোল জনের মধ্যে লাটরি হইল। যে চারিজনকে অর্ণবপ্রবাহে প্রক্ষিপ্ত করা অবধারিত হইল, তন্মধ্যে তিন জন তৎকালোচিত উপাসনাকার্য্য সম্পন্ন করিয়া, প্রাণত্যাগে প্রস্তুত হইলেন, চতুর্থ ব্যক্তির কনিষ্ঠ সহোদর পিনেসে ছিলেন, তিনি জ্যেষ্ঠের প্রাণনাশের উপক্রম দর্শনে যৎপরোনাস্তি কাতর ও শোকাভিভূত হইয়া, নিরতিশয় স্নেহভরে তাঁহাকে প্রগাঢ় আলিঙ্গন করিলেন, এবং অশ্রুপূর্ণ লোচনে আকুল বচনে বলিতে লাগিলেন, ভ্রাতঃ, আমি কোনও ক্রমে আপনাকে প্রাণত্যাগ করিতে দিব না, আপনার স্থলাভিষিক্ত হইয়া, আমি প্রাণত্যাগ করিতেছি। বিবেচনা করিয়া দেখুন, আপনি বিবাহ করিয়াছেন, আপনার স্ত্রী আছেন, অনেক গুলি সন্তান হইযাছে, বিশেষতঃ, তিনটি অনাথা ভগিনী আছে। আপনি জীবিত থাকিলে সকলের ভরণপোষণ করিতে পারিবেন। এমন স্থলে, আপনার প্রাণত্যাগ কবা, কোনও ক্রমে পরামর্শসিদ্ধ নহে। আপনি প্রাণত্যাগ করিলে যত অনিষ্ট ঘটিবে, আমি অকৃতদার, আমি মরিলে অপেক্ষাকৃত অনেক অংশে অল্প অনিষ্ট ঘটিবে

জ্যেষ্ঠ, কনিষ্ঠের এই অদ্ভুত প্রস্তাব শ্রবণে বিস্ময়াপন্ন ও তদীয় স্নেহের ও সৌজন্যের আতিশয্য দর্শনে যৎপরোনাস্তি মুগ্ধ ও আর্দ্র হইয়া, অশ্রুবিসর্জ্জন করিতে করিতে গদগদ বচনে বলিতে লাগিলেন, বৎস, আমি কোনও ক্রমে তোমার প্রস্তাবে সম্মত হইতে পারি না, কাবণ, পরের প্রাণ দিয়া আপনার প্রাণরক্ষা করা অপেক্ষা অধর্ম্ম আর নাই। বিশেষতঃ, তুমি কনিষ্ঠ সহোদর, নিরতিশয় স্নেহপাত্র, তাহাতে আবার তুমি আমার প্রাণরক্ষার প্রস্তাব করিয়া, অনির্বচনীয় স্নেহপ্রদর্শন করিয়াছ। যদি আমি তোমায় আমার স্থলে প্রাণত্যাগ করিতে দি, তাহা হইলে আমার অধর্ম্মের একশেষ হইবে, এবং অবশেষে শোকে ও অনুশয়ে দগ্ধ হইয়া, আত্মঘাতী হইতে হইবে। অতএব ক্ষান্ত হও, আমায় প্রাণত্যাগ করিতে দাও।

জ্যেষ্ঠের এই সকল কথা শুনিয়া কনিষ্ঠ বলিলেন, আপনি অবধারিত জানিবেন, আমি কোনও ক্রমে আপনাকে আমার সমক্ষে প্রাণত্যাগ করিতে দিব না। কনিষ্ঠ, এই বলিয়া, জানুপাতন পূর্ব্বক, দৃঢ়বন্ধনে তাঁহার চরণে ধরিয়া রোদন করিতে লাগিলেন। জ্যেষ্ঠ ও অন্যান্য সকলে বিস্তর চেষ্টা পাইলেন, কিন্তু, কোনও ক্রমে তাঁহার ভুজবন্ধনের অপনয়ন করিতে পারিলেন না। তখন জ্যেষ্ঠ বলিলেন, বৎস, তুমি এ অধ্যবসায় পরিত্যাগ কর। আমি যেরূপ করিতেছিলাম, আমি অবিদ্যমানে তুমি সেইরূপ আমার পুত্রকন্যাদিগেব লালনপালন, আমার পত্নীর রক্ষণাবেক্ষণ ও অনাথা ভগিনীদিগের ভরণপোষণ করিতে পারিবে। অতএব, আমার কথা শুন, ক্ষান্ত হও, আমায় প্রাণত্যাগ করিতে দাও।

এইরূপে জ্যেষ্ঠ, কনিষ্ঠকে অনেক প্রকারে বুঝাইলেন, কিন্তু কোনও ক্রমে তাঁহাকে বিরত করিতে পারিলেন না। অবশেষে, তাঁহাকে কনিষ্ঠের প্রস্তাবে সম্মত হইতে হইল। অনন্তর অপর তিন জন ও সেই যুবক অর্ণবপ্রবাহ প্রক্ষিপ্ত হইলেন। তিন জন তৎক্ষণাৎ অদর্শন প্রাপ্ত হইলেন, কিন্তু সেই যুবক সন্তরণ-বিষয়ে বিলক্ষণ নিপুণ ছিলেন, এজন্য সহসা জলমগ্ন হইলেন না। তিনি কিয়ৎক্ষণ সন্তরণ পূর্ব্বক, প্রাণভয়ে অভিভূত ও কাতর হইয়া, দক্ষিণ হস্ত দ্বাবা পিনেসের ক্ষেপণী ধারণ করিলেন। একজন পোতবাহ অস্ত্র দ্বারা তৎক্ষণাৎ তাঁহার হস্তচ্ছেদন করিলে, তিনি পুনরায় সন্তরণ করিতে লাগিলেন, এবং কিয়ৎ ক্ষণ পরে, অপর হস্ত দ্বারা পিনেসের ক্ষেপণী অবলম্বন করিলেন। তখন পোতবাহ পূর্ব্ববৎ তাঁহার ঐ হস্তের ছেদন করিল। তিনি পুনরায় অর্ণবপ্রবাহে পতিত হইলেন, কিন্তু তখনও জলমগ্ন না হইয়া, শোণিতোদ্গারী দুই ছিন্ন হস্ত ঊর্দ্ধে তুলিয়া, পোতের সন্নিহিত স্থানে সন্তরণ করিতে লাগিলেন।

সেই যুবকের ভ্রাতৃস্নেহেব একশেষ দর্শনে, সকলের হৃদয় দ্রবীভূত হইয়াছিল, এক্ষণে তাঁহার এই অবস্থা নয়নগোচর করিয়া, সকলেরই অন্তঃকরণে যারপরনাই করুণার উদয় হইল। তাঁহারা সকলেই অশ্রুবিসৰ্জ্জন করিতে লাগিলেন, এবং কিয়ৎক্ষণ পরে একবাক্য হইয়া বলিলেন, আমাদের ভাগ্যে যাহা থাকে তাহাই ঘটিবে, আমরা অবশ্যই উহার প্রাণরক্ষা করি। জন্মাবচ্ছিন্নে কেহ কখনও ভ্রাতৃস্নেহের এরূপ দৃষ্টান্ত দৃষ্টিগোচর করি নাই। এই বলিয়া, তাঁহারা তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে পিনেসে উঠাইয়া লইলেন, এবং কথঞ্চিৎ তদীয় হস্তের শিরাবন্ধন করিয়া, শোণিতস্রাব স্থগিত করিলেন।

পিনেসের লোকেরা, সে দিবস অবিশ্রামে দাঁড় বাহিতে লাগিলেন। পরদিন প্রভাত হইবামাত্র, তাঁহারা অনতিদূরে স্থল দেখিতে পাইলেন। তদ্দর্শনে সকলেরই অন্তঃকরণে সাহস ও উৎসাহের সঞ্চার হইল। তখন তাঁহারা, সেই দিক্ লক্ষ্য করিয়া, বিলক্ষণ বলসহকারে ক্ষেপণীক্ষেপণ করিতে লাগিলেন। কিঞ্চিৎ কাল পরে, পিনেস আফ্রিকার অন্তর্বর্ত্তী মোজাম্বিক্ পর্ব্বতের সন্নিহিত হইলে, তাঁহারা জগদীশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়া, বাষ্পবারিপরিপূরিত নয়নে, তীরে অবতীর্ণ হইলেন। সৌভাগ্যক্রমে, অনতিদূরে পোর্ত গীসদিগের এক উপনিবেশ ছিল, তাহা অনতিবিলম্বে, সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া, আশ্রয় প্রাপ্ত হইলেন।

উপনিবেশের লোকেরা, তাহাদের দুরবস্থার আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া, যৎপবোনাস্তি দুঃখিত হইলেন, কিন্তু ঐ দুই সহোদরের, বিশেষতঃ কনিষ্ঠের, ভ্রাতৃস্নেহেব এক- শেষ শ্রবণগোচর কবিয়া, এবং পরিশেষে যেরূপে কনিষ্ঠের প্রাণরক্ষা হইয়াছে তৎসমুদয় বিদিত হইয়া, নিরতিশয় আহলাদিত হইলেন, এবং তাঁহাদের দুই সহোদবকে, এবং কনিষ্ঠের প্রাণরক্ষা উপলক্ষে পিনেসস্থিত লোকদিগকে, মুক্তকণ্ঠে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন।

স্বপ্নসঞ্চরণ

স্বপ্নসঞ্চরণ

ইটালির অন্তঃপাতী পেডুয়া নগরে, সাইরিলো নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি স্বভাবতঃ সুশীল, সচ্চরিত্র, সরলহৃদয় ও ধর্ম্মপরায়ণ ছিলেন, কিন্তু স্বপ্নাবস্থায় ইহার সম্পূর্ণ বিপরীতভাবাপন্ন হইতেন। তিনি, নিদ্রিত অবস্থায়, শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া, ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতেন, এবং বহুবিধ বিগর্হিত কর্ম্মের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইতেন।

যৎকালে সাইরিলো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিতেন, তাঁহার অধ্যাপক, তাঁহাকে কতকগুলি প্রশ্ন দিয়া, উত্তর লিখিয়া আনিতে বলিয়া দিয়াছিলেন। সেই সকল প্রশ্নের উত্তর লিখিয়া, পর দিন যথাকালে বিদ্যালয়ে লইয়া যাওয়া অসাধ্য বিবেচনা করিয়া, তিনি যৎপরোনাস্তি উৎকণ্ঠিত হইলেন। না লইয়া গেলে,
অধ্যাপক মহাশয়ের নিকট ভর্ৎসনা ও অবমাননা প্রাপ্ত হইবেন, এজন্য তাঁহার অতিশয় দুর্ভাবনা উপস্থিত হইল। সেই দুর্ভাবনা বশতঃ কিছু লিখিতে না পারিয়া, তিনি নিতান্ত বিষণ্ণ-মনে শয়ন করিলেন, কিন্তু, পরদিন প্রাতঃকালে, শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া দেখিলেন, তাঁহার টেবিলের উপর ঐ সমস্ত প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর লিখিত রহিয়াছে, আশ্চর্য্যের বিষয় এই, তৎসমুদয় তাঁহার স্বহস্তলিখিত।

এইরূপ অঘটনঘটনা দর্শনে, তিনি যৎপরোনাস্তি বিস্ময়াপন্ন হইলেন, এবং যথাসময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গমনপূর্ব্বক, স্বীয় অধ্যাপক মহাশয়ের নিকট, আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। তিনি শুনিয়া সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। এই অদ্ভুত ব্যাপারের সবিশেষ পরীক্ষা করিবার মানসে, সেদিন তিনি তাঁহাকে পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকসংখ্যক ও অধিক দুরূহ প্রশ্নের উত্তর লিখিয়া আনিতে আদেশ দিলেন, এবং এই অভূতপূর্ব্ব ব্যাপারের নিগূঢ় তত্ত্ব অবধারিত করিবার অভিপ্রায়ে, সে দিবস রজনীযোগে, প্রচ্ছন্নভাবে, তদীয় আবাসগৃহের সন্নিধানে অবস্থিতি করিলেন। সাইরিলো, শয়নগৃহে প্রবেশপূর্ব্বক, নিদ্রাগত হইলেন, কিন্তু, দুই তিন দণ্ড পরেই, প্রগাঢ়নিদ্রাবস্থায় শয্যা হইতে উঠিলেন, প্রদীপ জ্বালিয়া পড়িতে ও লিখিতে বসিলেন, এবং অনধিক সময়ের মধ্যেই, সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লিখিয়া, সমাপন করিলেন। তদ্দর্শনে যারপরনাই চমৎকৃত হইয়া, অধ্যাপক মহাশয় স্বীয় আবাসগৃহে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। যৌবনকাল উত্তীর্ণ হইলে, সাইরিলো সতত সাতিশয় বিষণ্ণচিত্ত ও সর্ব্ববিষয়ে নিতান্ত নিরুৎসাহ হইয়া উঠিলেন, সাংসারিক কোনও বিষয়ে তাঁহার আর অনুরাগমাত্র রহিল না। অবশেষে, সংসারাশ্রমে বিসর্জ্জন দিয়া, তিনি এক ধর্ম্মাশ্রমে প্রবিষ্ট হইলেন। তথায় তিনি স্বয়ং ধর্ম্মচিন্তা, অপেক্ষাকৃত অজ্ঞ ব্যক্তিদিগকে ধর্ম্মবিষয়ে উপদেশদান ও অশেষবিধ কঠোর ব্রতের অনুষ্ঠান করিতে লাগিলেন। অল্প দিনের মধ্যেই, তিনি সর্ব্বাংশে বিশুদ্ধহৃদয়, সদাচারপূত ও উত্তম ধর্ম্মোপদেশক বলিয়া বিলক্ষণ প্রতিপত্তি লাভ করিলেন। কিন্তু, তাঁহার এই প্রতিপত্তি দীর্ঘকালস্থায়িনী হইল না। দিবাভাগে, যে সকল সদনুষ্ঠান দ্বারা, সাধু বলিয়া গণনীয় ও সকলের আদরণীয় হইতেন, রজনীযোগে, স্বপ্নসঞ্চরণকালীন জঘন্য আচরণ দ্বারা, সে সমুদয় তিরোহিত হইয়া যাইত। তিনি, প্রায় প্রত্যহ, নিদ্রিত অবস্থায় শয্যাপরিত্যাগ করিয়া, অন্যান্য গৃহে প্রবেশ করিতেন, এবং পরুষ ও অশ্লীল ভাষার উচ্চারণ করিতে থাকিতেন। ক্রমে ক্রমে, আশ্রমবাসী ব্যক্তিমাত্রেই তাঁহার এই অদ্ভুত আচরণের বিষয় অবগত হইলেন। ধর্ম্মাশ্রমবাসীদিগের পক্ষে, এইরূপে গৃহে গৃহে প্রবেশ ও অপভাষাপ্রয়োগ নিরতিশয় দোষাবহ, সুতরাং, তাহার নিবারণের উপায় করা অতি আবশ্যক। কিন্তু, ধর্ম্মাশ্রমের নিয়মাবলীর বহির্ভূত বলিয়া, তাঁহাকে রজনীযোগে গৃহমধ্যে রুদ্ধ করিয়া রাখা বিহিত বোধ হইল না, সুতরাং, তিনি, প্রতি রাত্রিতেই, ঐরূপ কুৎসিত কাণ্ড করিতে লাগিলেন। একদিন দৃষ্ট হইল, সাইরিলো স্বীয় গৃহে কেদারায় বসিয়া, নিদ্রা যাইতেছেন। তিনি, দুই তিন দণ্ড স্থিরভাবে থাকিয়া, যেন কাহারও সহিত কথোপকথন করিতেছেন, এই ভাবে অবস্থিত হইলেন, এবং উচ্চৈঃস্বরে হাস্য ও অবজ্ঞাসূচক অঙ্গুলিধ্বনি করিতে লাগিলেন, অনন্তর, যেন আর কেহ তাঁহার নিকটে দাঁড়াইয়া আছে, এই মনে করিয়া, ঐ দিকে মুখ ফিরাইয়া, তাহার নিকট হইতে নস্য গ্রহণমানসে, অঙ্গুলিবিস্তার করিলেন, কিন্তু তাহা না পাইয়া, যৎপরোনাস্তি বিরক্ত হইয়া, স্বীয় নস্যধানী বহিষ্কৃত করিলেন, তাহাতে কিছুমাত্র নস্য না থাকাতে, অঙ্গুলি দ্বারা তাহার অভ্যন্তরভাগ খুঁটরাইয়া কিঞ্চিৎ গ্রহণ করিলেন, এবং চারি দিকে দৃষ্টিসঞ্চারণ করিয়া, পাছে কেহ উহা লয়, এই আশঙ্কায়, সাবধানে স্বীয় বসনমধ্যে লুকাইয়া রাখিলেন। এইরূপে, কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধভাবে অবস্থিত হইয়া, তিনি অকস্মাৎ সাতিশয় কুপিত হইয়া উঠিলেন, এবং ক্রোধভরে অশেষবিধ জঘন্য শপথ ও অভিশাপবাক্যের উচ্চারণ করিতে লাগিলেন। তাঁহার ধর্ম্মভ্রাতৃবর্গ, এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত, কৌতুক দেখিতেছিলেন, এক্ষণে ঐ সকল কুৎসাপূর্ণ বাক্য শ্রবণে বিরক্ত হইয়া, স্ব স্ব আবাসগৃহে প্রতিগমন করিলেন।

আর এক দিন, তিনি, স্বপ্নাবেশে শয্যাপরিত্যাগ করিয়া, উপাসনাগৃহে প্রবিষ্ট হইলেন, এবং তত্রত্য তৈজস দ্রব্যসমূহের অপহরণমানসে, তৎসমুদয়ের অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। দৈবযোগে, ঐ সমস্ত দ্রব্য, পরিষ্কৃত করিয়া আনিবার নিমিত্ত, স্থানা ন্তরে প্রেরিত হইয়াছিল, সুতরাং, তাঁহার অভিপ্রায় সম্পন্ন হইয়া উঠিল না। এজন্য, তিনি ক্রোধে অন্ধ হইলেন, এবং রিক্তহস্তে প্রতিনিবৃত্ত হইতে অনিচ্ছু হইয়া, সেই গৃহস্থিত কতিপয় পরিচ্ছদ লইলেন, এবং সর্ব্বতঃ সশঙ্ক দৃষ্টিপাত করিতে করিতে, স্বীয় গৃহে প্রবেশ পূর্ব্বক সেই সমস্ত অপহৃত বস্তু শয্যাতলে লুকাইয়া রাখিয়া, পুনরায় শয়ন করিলেন। যে সকল ব্যক্তি তাঁহার এই কুৎসিত কার্য্য দেখিতেছিলেন, তাঁহারা, তিনি পরদিন প্রাতঃকালে কিরূপ আচরণ করেন, ইহা জানিবার নিমিত্ত নিতান্ত উৎসুকচিত্তে রজনীযাপন করিলেন।

রাত্রি প্রভাত হইলে, সাইরিলোর নিদ্রাভঙ্গ হইল। তিনি, শয্যার মধ্যস্থল সাতিশয় উন্নত দেখিয়া, বিস্ময়াপন্ন হইলেন, এবং কি কারণে সেরূপ হইয়াছে, তাহার কারণানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়া, কতিপয় পরিচ্ছদ তথায় স্থাপিত দেখিয়া, পূর্ব্বাপেক্ষা অধিকতর বিস্ময়াপন্ন হইলেন। অনন্তর, কিছুই নির্ণয় করিতে না পারিয়া, তিনি, আকুলচিত্তে, ধর্ম্মভ্রাতাদিগের নিকট সবিশেষ সমস্ত নির্দ্দিষ্ট করিয়া বলিলেন, এই সমস্ত পরিচ্ছদ কিরূপে আমার শয্যাতলে নিহিত হইল, কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। তাঁহারা বলিলেন, তুমি স্বয়ং এই কাণ্ড করিয়াছ। তিনি শুনিয়া কি পর্য্যন্ত শোকাকুল ও অনুতাপানলে দগ্ধ হইলেন, তাহা বলিতে পারা যায় না।

এক সম্পত্তিশালিনী ধর্ম্মপরায়ণা নারী এই ধর্ম্মাশ্রমের যথেষ্ট আনুকূল্য করিতেন। তিনি মৃত্যুকালে এই প্রার্থনা ও এই অভিলাষ প্রকাশ করিয়া যান, যেন্‌ তাঁহার কলেবর ঐ ধর্ম্মাশ্রমের কোনও স্থানে সমাহিত হয়। তদনুসারে, তাঁহার কলেবর তথায় নীত, এবং তদীয় মহামূল্য পরিচ্ছদ ও সমস্ত আভরণের সহিত, মহাসমারোহে সমাহিত হইল। উল্লিখিত ব্যাপারের সমাধানসময়ে আশ্রমস্থ ধর্ম্মভ্রাতৃবর্গ সমবেত হইয়া, যৎপরোনাস্তি শোকপ্রকাশ ও সেই নারীর পারলৌকিকমঙ্গলকামনায় জগদীশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। এই সময়ে সাইরিলো যেরূপ অকৃত্রিম শোক, পরিতাপ ও মঙ্গলকামনা করিয়াছিলেন, বোধ হয় আর কেহই সেরূপ করিতে পারেন নাই।

পরদিন প্রাতঃকালে, আশ্রমবাসীরা অবলোকন করিলেন, সেই নারীর সমাধিস্থান উদ্ঘাটিত হইয়াছে, তদীয় কলেবর সর্ব্বাংশে বিকলিত হইয়াছে, যে সকল অঙ্গুলিতে অঙ্গুরীয় ছিল, তৎসমুদয় ছিন্ন ও মহামূল্য পরিচ্ছদ অপহৃত হইয়াছে। এই অতিবিগর্হিত ধর্ম্মবহির্ভুত ব্যাপার দর্শনে সকলেই সাতিশয় শোকাকুল ও বিস্ময়াপন্ন হইলেন, এবং যে নরাধম দ্বারা এই জঘন্য কাণ্ড সম্পন্ন হইয়াছিল, সকলেই তাহাকে লক্ষ্য করিয়া, একবাক্য হইয়া, যথোচিত তিরস্কার করিতে লাগিলেন। এই বিষয়ে সাইরিলো সর্ব্বাপেক্ষায় সমধিক ক্ষুব্ধ ও শোকাকুল হইয়াছিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে, তিনি আপন আবাসগৃহে প্রবিষ্ট হইলেন, এবং স্বীয় শয্যাতলে বস্তুবিশেষের অন্বেষণে প্রবৃত্ত হইয়া দেখিলেন, ঐ নারীর পরিচ্ছদ, অলঙ্কার প্রভৃতি সমস্ত বস্তু সেই স্থানে স্থাপিত আছে। তখন, গত রজনীতে তিনিই ঐ সমস্ত ব্যাপার সম্পন্ন করিয়াছেন, ইহা বুঝিতে পারিয়া, সাইরিলো শোকে ও পরিতাপে ম্রিয়মাণ হইলেন। অতি বিষম অনুতাপানলে তাঁহার হৃদয় দগ্ধ হইয়া যাইতে লাগিল। তিনি ক্ষণবিলম্ব ব্যতিরেকে, ধর্ম্মভ্রাতৃবর্গকে সমবেত করিয়া, গলদশ্রুলোচনে, শোকাকুল বচনে, সমস্ত বর্ণন করিলেন। অনন্তর, সকলে একমতাবলম্বী হইয়া তাঁহার সম্মতিগ্রহণ পূর্ব্বক, তাঁহাকে আশ্রমান্তরে প্রেরিত করিলেন। তত্রত্য প্রধান ব্যক্তির এরূপ ক্ষমতা ছিল, তিনি আবশ্যক বোধ করিলে, কোনও ব্যক্তিকে গৃহবিশেষে রুদ্ধ করিয়া রাখিতে পারেন। এই আশ্রমে সাইরিলো রজনীযোগে এক গৃহে রুদ্ধ থাকিতেন, সুতরাং, স্বপ্নাবেশে গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া, যথেচ্ছাচারণ করিতে পারিতেন না।