নীল-দর্পণ নাটক
দীনবন্ধু মিত্র
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৭২
প্রকাশনা-তথ্য
নীল-দর্পণ নাটক।
নীলকর-বিষধর-দংশন-কাতর-প্রজানিকর-
ক্ষেমঙ্করেণ কেনচিৎ পথিকেনাভিপ্রণীতং।
তৃতীয় সংস্করণ।
কলিকাতা
বি, এ, বন্ধু এণ্ড কোং কর্ত্তৃক ইণ্ডিয়ান রয়াল যন্ত্রে
মুদ্রিত।
শকাব্দা ১৭৯৪।
ভূমিকা।
নীলকরনিকরকরে নীল-দর্পণ অৰ্পণ করিলাম। এক্ষণে তাঁহারা নিজ নিজ মূখ সন্দর্শন পূর্ব্বক তাঁহাদিগের ললাটে বিরাজমান স্বার্থ-পরতা-কলঙ্ক-তিলক বিমােচন করিয়া তৎপরিবর্ত্তে পরােপকার শ্বেত-চন্দন ধারণ করুন, তাহা হইলেই আমার পরিশ্রমের সাফল্য, নিরাশ্রয় প্রজা ব্রজের মঙ্গল এবং বিলাতের মুখ রক্ষা। হে নীলকরগণ! তােমাদিগের নৃশংস ব্যবহারে প্রাতঃস্মরণীয় সিড্নি, হাউয়ার্ড, হল প্রভৃতি মহানুভব দ্বারা অলঙ্কৃত ইংরাজকূলে কলঙ্ক রটিয়াছে। তােমাদিগের ধনলিপ্সা কি এতই বলবতী যে, তােমরা অকিঞ্চিৎকর ধনানুরােধে ইংরাজজাতির বহুকালার্জ্জিত বিমল যশস্তামরসে কীটস্বরূপে ছিদ্র করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছ। এক্ষণে তােমরা যে সাতিশয় অত্যাচার দ্বারা বিপুল অর্থ লাভ করিতেছ তাহা পরিহার কর, তাহা হইলে অনাথ প্রজারা সপরিবারে অনায়াসে কালাতিপাত করিতে পারিবে। তোমরা এক্ষণে দশ মুদ্রা ব্যয়ে শত মুদ্রার দ্রব্য গ্রহণ করিতেছ, তাহাতে প্রজাপুঞ্জের যে ক্লেশ হইতেছে, তাহা তোমরা বিশেষ জ্ঞাত আছ; কেবল ধনলাভপরতন্ত্র হইয়া প্রকাশ করণে অনিচ্ছুক। তােমরা কহিয়া থাকি যে, তােমাদের মধ্যে কেহ কেই বিদ্যাদানে অর্থ বিতরণ করিয়া থাকেন এবং সুযােগ ক্রমে ঔষধ দেন, একথা যদিও সত্য হয়, কিন্তু তাহাদের বিদ্যাদান পয়স্বিনী ধেনুবধে পাদুকা দানাপেক্ষাও ঘৃণিত এবং ঔষধ বিতরণ কালকূটকুম্ভে ক্ষীর ব্যবধান মাত্র। শ্যামচাঁদ আঘাত উপরে কিঞ্চিৎ টারপিন তৈল দিলেই যদি ডিস্পেন্সারি করা হয়, তবে তোমাদের প্রত্যেক কূটিতে ঔষধালয় আছে বলিতে হইবে। দৈনিক সংবাদপত্র সম্পাদকদ্বয় তোমাদের প্রশংসায় তাহাদের পত্র পরিপূর্ণ করিতেছে, তাহাতে অপর লােক যেমত বিবেচনা করুক, তােমাদের মনে কখনই ত আমন জন্মিতে পারে না; যেহেতু তােমরা তাহাদের এরূপ করণের কারণ বিলক্ষণ অবগত আছ। রজতের কি আশ্চর্য্য আকর্ষণ শক্তি! ত্রিংশৎ মুদ্রালােভে অবজ্ঞাস্পদ জুডাস, খীষ্ট-ধর্ম্ম-প্রচারক মহাত্মা যীজস্কে করাল পাইলেট করে অর্পণ করিয়াছিল; সম্পাদকযুগল সহজ মুদ্রা লাভ পরবশ হইয়া উপায়হীন দীন প্রজাগণকে তােমাদের করাল কবলে নিক্ষেপ করিবে আশ্চর্য্য কি? কিন্তু “চক্রবৎ পরিবর্ত্তন্তে দুঃখানি চ সুখানি চ।” প্রজাবৃন্দের সুখ-সূর্য্যোদয়ের সম্ভাবনা দেখা যাইতেছে। দাসী দ্বারা সন্তানকে স্তনদুগ্ধ দেওয়া অবৈধ বিবেচনায় দয়াশীল প্রজা-জননী মহারাণী ভিক্টোরিয়া প্রজাদিগকে স্বক্রোড়ে লইয়া স্তনপান করাইতেছেন। সুধীর সুবিজ্ঞ সাহসী উদারচরিত্র ক্যানিং মহােদয় গবর্ণর জেনেরল হইয়াছেন। প্রজার দুঃখে দুঃখী, প্রজার সুখে সুখী, দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন, ন্যায়পর গ্রাণ্ট মহামতি লেফ্টেনেণ্ট গবর্ণর হইয়াছেন এবং ক্রমশঃ সত্যপরায়ণ, বিচক্ষণ, নিরপেক্ষ ইডেন্, হারসেল্ প্রভৃতি রাজকার্য্য পরিচারকগণ শতদল স্বরূপে সিবিল্ সরভিস্ সরােবরে বিকসিত হইতেছেন। অতএব ইহা দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে, নীলকর দুষ্টরাহুগ্রস্ত প্রজাবৃন্দের অসহ্য কষ্ট নিবারণার্থে উক্ত মহানুভবগণ যে অচিরাৎ সদ্বিচাররূপ সুদর্শনচক্র হস্তে গ্রহণ করিবেন, তাহার সূচনা হইয়াছে।
কস্যচিৎ পথিকস্য।
তৃতীয় বারের বিজ্ঞাপন।
বঙ্গীয় সাহিত্য সমাজে যত নাটক দেখা যায় তন্মধ্যে “নীল-দর্পণ” যে সর্বোৎকৃষ্ট, যিনি ইহা একবার পাঠ বা শ্রবণ করিয়াছেন তিনি তাহা অবশ্যই স্বীকার করিবেন। এই নাটক দ্বারা প্রণেতার আন্তরিক উদ্দেশ্য সংসাধিত হইয়াছে কি না, তিনিই বলিতে পারেন। এ স্থলে সে বিষয়ের প্রসঙ্গ করা আমাদিগের অভিপ্রেত নহে। ইহা দ্বারা বঙ্গ ভাষার যে কতদূর উন্নতি হইয়াছে, তাহাই আমাদিগের বক্তব্য। অন্যান্য ভাষার ন্যায় বঙ্গভাষায় বিশুদ্ধ নাটক প্রচলিত ছিল না। সুতরাং ইনি অপরাপর ভাষাপেক্ষা কিছু দীনভাবাপন্ন ছিলেন। পরে এই নাটক মুদ্রিত হইলে বঙ্গভাষা তাঁহার প্রাচীন ও নব সহচরীগণের ন্যায় এই অপূর্ব্ব নাট্য রত্নকে মণিহারের মধ্যমণি করিয়া স্বীয় গলদেশে লম্বমান করিলেন। এই নাটক দ্বারা কেবল যে ভাষাই অলঙ্কৃত হইয়াছেন এমত নহে। ইহা অপর নাট্যকারগণকে প্রােৎসাহিত করিআছে। কিন্তু ক্ষোভের বিষয় এই যে, এই নাটক প্রায় আর কোন পুস্তকালয়েই বিক্রয়ার্থ দৃষ্ট হয় না। প্রথম মুদ্রিত পুস্তক নিঃশেষিত হইলে পর, মহামান্য সাহিত্য সমাজ শিরােমণি মৃত কালীপ্রসন্ন সিংহ মহােদয় ইহা দ্বিতীয় বার মুদ্রিত করেন। এক্ষণে তাহাও প্রায় আর দৃষ্টি গােচর হয় না। ভবিষ্যৎ নাট্যকার গণের আদর্শস্বরূপ ও বঙ্গ সাহিত্যের ভূষণ স্বরূপ এই অপূর্ব নাটকের এবম্প্রকার অভাব নিরাকরণ করা বঙ্গবাসীর পক্ষে সর্ব্বতােভাবে বিধেয়। এই সমস্ত পর্য্যালােচনানন্তর মৃত সিংহ মহােদয়ের মুদ্রিত পুস্তককে আদর্শ করিয়া এই নীলদর্পণের তৃতীয় মুদ্রাঙ্কন কার্য্যে প্রবৃত্ত হইলাম।
কলিকাতা।
২রা বৈশাখ।
শকাব্দা ১৭৯৪।
নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ।
পুরুষগণ।
গোলোকচন্দ্র বসু
নবীনমাধব ও
গোলোকচন্দ্র বসুর পুত্রদ্বয়।
বিন্দুমাধব
সাধুচরণ
প্রতিবাসী রাইয়ত।
রাইচরণ
সাধুর ভ্রাতা।
গোপীনাথ দাস
দেওয়ান।
আই, আই, উড
নীলকর।
পি, পি, রোগ
আমিন।
খালাসী।
তাইদ্গীর।
ম্যাজিষ্ট্রেট, আমলা, মোক্তার, ডেপুটি ইনস্পেক্টর, পণ্ডিত, জেলদারোগা, ডাক্তার, গোপ, কবিরাজ, চারি জন শিশু, লাটিয়াল, রাখাল।
কামিনীগণ।
সাবিত্রী
গোলোকের স্ত্রী।
সৈরিন্ধ্রী
নবীনের স্ত্রী।
সরলতা
বিন্দুমাধবের স্ত্রী।
রেবতী
সাধুচরণের স্ত্রী।
ক্ষেত্রমণি
সাধুর কন্যা।
আদুরী
গোলোক বসুর বাড়ীর দাসী।
পদী ময়রাণী।
নিম্নে মুদ্রিত কয়েকটি সঙ্গীত সাদরে নীলকরদিগকে উপহার প্রদত্ত হইল।
রাগিণী আড়ানা বাহার—তাল ভেওটা
হে নিরদয় নীলকরগণ।
আর সহে না প্রাণে এ নীল দহন॥
কৃষকের ধনে প্রাণে, দহিলে নীল আগুনে,
গুণরাশি কি কুদিনে, কল্লে হেতা পদার্পণ।
দাদনের সুকৌশলে, শ্বেত সমাজের বলে,
লুঠেছ সকল তো হে কি আর আছে এখন॥
দীন জনে দুঃখ দিতে কাহার না লাগে চিতে,
কেবল নীলের হেরি পাষাণ সমান মন।
বৃটন স্বভাবে শেষে, কালী দিলে বঙ্গে এসে,
তরিলে জলধিজল, পোড়াতে স্বর্ণভবন।
(বিদ্যাভূণী ক্বত)
কবির সুর।
নীল বানরে সোনার বাংলা কল্লে এবার ছারেখার।
অসময়ে হরিশ মলো লংয়ের হলো কারাগার।
প্রজার আর প্রাণ বাঁচানো ভার।
রাম সীতার কারণে, সুগ্রীবে মিতালী করে বধে রাবণে,
যত সওদাগরেরা সহায় এদের, ** দুটো এডিটার।
এখন স্পষ্ট লেখা ঘুচে গ্যালো, জজ সাহেব এক অবতার।
যত ** ** রাজত্ত্ব হলো, সাধুর পক্ষে গঙ্গাপার॥
(ঐ)
(সোমপ্রকাশ হইতে উদ্ধৃত)
রাগ সুরটমল্লার—তাল আড়াঠেকা।
নীল-দর্পণে লং সাহেব যথার্থ যা তাই লিখেছে।
নীলে নীলে সব নিলে প্রজার বল ভাই কি রেখেছে॥ ১
কারো * * কার, তাদের উপর অত্যাচার,
তাই নিয়ে বার বার, লিখে লিখে হরিশ মরেছে॥ ২
ইডন্, গ্রাণ্ট মহামতি, ন্যায়বান উভয়ে অতি,
করিতে প্রজার গতি, কত চেষ্টা পাইতেছে॥ ৩
ইণ্ডিগো রিপোর্ট পোড়ে, কে না অন্তরে পোড়ে,
তবু নীলির| নোড়ে চোড়ে, পোঁড়ার মুখ দেখাতেছে॥ ৪
বল্তে দুখে বুক বিদরে, ওয়েল্স অবিচার কোরে,
নির্দ্দোষী লংকে ধোরে, একটি মাস যাদ দিয়েছে॥ ৫
ওয়েল্স, পিকক, জাকসনে, বসিয়া বিচারাসনে,
* * * * * * * * হাজার টাকা ফাইন্ কোরেছে॥ ৬
নিদারুণ সেন্টেন্স শুনে, সিংহ বাবু দয়াগুণে,
হাজার টাকা দিলেন গুণে, ওয়াল্টারব্রেট তায় তাকে
হয়েছে॥ ৭
ইংলণ্ডেশ্বরী শুন, পিউনির সকল গুণ,
আইনে যে সুনিপুণ এবার তা বেরিয়ে পোড়েছে। ৮
যে অবধি কলিকাতা, পাইয়াছে এই বিধাতা,
সেই অবধি দেখি মাতা, রেস্ হেট্রেড খুব চেগেছে। ৯
বেঞ্চে বাতুলের মত, লম্প ঝম্প করে কত,
আবার বলে আমার মত, কে বা জজ হেথা এসেছে। ১০
কিন্তু পীল, সিটন আদি, এক এক বুদ্ধির কাঁদি,
তাদের লাগি আজো কাঁদি, হায় কি বিচার কোরে গেছে।
মহারাণী তোমা প্রতি, এই ক্ষণে এই মিনতি,
ওয়েল্স পাপে দেও মুকতি, ধীরাজ এই বলিতেছে। ১২
(ধীরাজকৃত)
চতুর্থ অঙ্ক
চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
ইন্দ্রাবাদের ফৌজদারি কাছারি।
উড, রােগ মাজিষ্ট্রেট, আমলা আসীন। গোলোকচন্দ্র,
নবীনমাধব, বিন্দুমাধব, বাদী প্রতিবাদীর মােক্তার,
নাজীর চাপরাসি; আরদালি, রাইয়ত প্রভৃতি
দণ্ডায়মান।)
প্র মােক্তার। অধীনের এই দরখাস্তের প্রার্থনা মঞ্জুর হয় (সেরেস্তাদারের হস্তে দরখাস্ত দান)—
মাজি। আচ্ছ। পাঠ কর। (উড সাহেবের সহিত পরামর্শ এবং হাস্য)
সেরেস্তা। (প্র মােক্তারের প্রতি) রামায়ণের পুথি লিখেছ যে, দরখাস্ত চুম্বক না হইলে কি সকল পড়া গিয়া থাকে? (দরখাস্তের পাত উল্টায়ন)
মাজি। (উড সাহেবের সহিত কথােপকথনানন্তর হাস্য সম্বরণ করিয়া) খােলােসা পড়।
সেরেস্তা। আসামির এবং আসামির মােক্তরের অনুপস্থিতিতে ফরিয়াদির সাক্ষী গণের সাক্ষ্য লওয়া হইয়াছে—প্রার্থনা ফরিয়াদির সাক্ষীগণকে পুনর্ব্বার হাজির আনা হয়।
বা মোক্তার। ধর্ম্মাবতার। মোক্তারগণ মিথ্যা শঠতা প্রবঞ্চনায় রত বটে, অনায়াসে হলোপ করিয়া মিথ্যা বলে, মোক্তারেরা অবিরত অপকৃষ্ণ কার্য্যে রত, বিবাহিতা কামিনীকে বিসর্জ্জন দিয়া তাহারা তাহাদের অমরালয় বারমহিলালয়ে কাল যাপন করে, জমিদারেরা ফলতঃ মোক্তারগণকে বিশেষ ঘৃণা করে, তবে স্বকার্য্য সাধন হেতু তাহারদিগের ডাকে এবং বিছানায় বসিতে দেয়, ধর্মাবতার! মোক্তারগণের বৃত্তিই প্রতারণা। কিন্তু নীলকরের মোক্তারদিগের দ্বারা কোন রূপে কোন প্রতারণা হইতে পারে না। নীলকর সাহেবেরা খ্রীষ্টিয়ান—খ্রীষ্টিয়ান—ধর্ম্মে মিথ্যা অতি উৎকট পাপ বলিয়া গণ্য হইয়াছে; পরদ্রব্য অপহরণ, পরনারীগমন, নরহত্যা প্রভৃতি জঘন্য কার্য্য খ্রীষ্টিয়ান ধর্ম্মে অতিশয় ঘৃণিত, খ্রীষ্টিয়ান ধর্ম্মে অসৎ ধর্ম্ম নিষ্পন্ন করা দূরে থাক্, মনের ভিতরে অসৎ অভিসন্ধিকে স্থান দিলেই নরকানলে দগ্ধ হইতে হয়। করুণা, মার্জ্জনা, বিনয়, পরোপকার খ্রীষ্টিয়ান ধর্ম্মের প্রধান উদ্দেশ্য; এমন সত্য সনাতন ধর্ম্ম পরায়ণ নীলকরগণ কর্ত্তৃক মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কখনই সম্ভবে না। ধর্ম্মাবতার! আমরা এই নীলকরের বেতন ভােগী মােক্তার, আমরা তাঁহাদিগের চরিত্র অনুসারে চরিত্র সংশােধন করিয়াছি, আমারদিগের ইচ্ছা হইলেও সাক্ষীকে তালিম দিতে সাহস হয় না, যেহেতুক সত্যপরায়ণ সাহেবেরা সূচাগ্রে চাকরের চাতুরী জানিতে পারিলে তাহার যথােচিত শাস্তি করেন। প্রতিবাদীর মানিত সাক্ষী কুটির আমীন মজ কুর তাহার এক দৃষ্টান্তের স্থল,—রাইয়াতকে বঞ্চিত করিয়া ছিল বলিয়া, দয়াশীল সাহেব উহাকে কর্ম্ম চ্যুত করিয়াছেন; এবং গােরিব ছাঁপােষা রাইয়তের ক্রন্দনে রােষপরবশ হইয়া প্রহারও করিয়াছেন।
উড। (মাজিস্ট্রেটের প্রতি) এক্সট্রিম্ প্রােভাকেশান্, এক্সট্রিম্ প্রােভােকেশান্।
বা মােক্তার। হুজুর! হুজুর হইতে আমার সাক্ষীগণের প্রতি অনেক সোয়াল হইয়াছিল, যদ্যপি তাহারা তালিমী সাক্ষী হইত, তবে সেই সােয়ালেই পড়িত; আইনকারকেরা বলিয়াছেন “বিচারকর্ত্তা আসামির আড ভােকেট্ স্বরূপ” সুতরাং আসামির পক্ষের যে সকল সােয়াল, তাহা হুজুর হইতেই হইয়াছে, অতএব সাক্ষীগণকে পুনর্ব্বার আনয়ন করিলে আসামির কিছুমাত্র উপকার দর্শাইবার সম্ভাবনা নাই, কিন্তু সাক্ষীগণের সমূহ ক্লেশ হইতে পারে। ধর্ম্মাবতার! সাক্ষীগণ চাসউপজীবী দীন প্রজা, তাহারা স্বহস্তে লাঙ্গল ধরিয়া স্ত্রী পুত্রের প্রতিপালন করে, তাহারদিগের সমস্ত দিবস ক্ষেত্রে না থাকিলে তাহারদিগের আবাদ ধ্বংস হইয়া যায়, বাড়ীতে ভাত খাইতে আইলে চাসের হানি হয় বলিয়া তাহারদের মেয়েরা গামছা করিয়া অন্ন ব্যঞ্জন ক্ষেত্রে লইয়া গিয়া তাহারদের খাওয়াইয়া আইসে। চাসাদিগের এক দিন ক্ষেত্র ছাড়িয়া আইলে সর্ব্বনাশ উপস্থিত হয়, এ সময়ে এত দূরস্থ জেলায় রাইয়ত দিগের তলর দিয়া আনিলে তাহারদিগের বৎসরের পরিশ্রম বিফল হয়; ধর্ম্মাবতার! ধর্ম্মাবতার যেমত বিচার করেন।
মাজি। কিছু হেতুবাদ দেখা যায় না। (উডের সহিত পরামর্শ) আবশ্যক হইতেছে না।
প্র মােক্তার। হুজুর! নীলকরের দাদন কোন গ্রামের কোন রাইয়তে স্বেচ্ছাধীন গ্রহণ করে না, আমীন্ খালাসীর সমভিব্যাহারে নীলকরসাহেব, অথবা তাঁহার দেওয়ান ঘােড়ায় চড়িয়া ময়দানে গমন পূর্ব্বক উত্তম উত্তম জমিতে কুটির মার্ক দিয়া রাইয়তদিগকে নীল করিতে হুকুম দিয়া আইসেন, পরে জমিয়াতের মালিকান রাইয়তদিগের কুটিতে ধরিয়া আনিয়া বেওরা ওয়ারি করিয়া দাদন লিখিয়া লয়নে। দাদন লইয়া রাইয়তেরা কাঁদিতে কাঁদিতে বাড়ী যায়, যে দিবস যে রাইয়ত দাদন লইয়া আইসে, সে দিবস সে রাইয়তের বাড়ীতে মরা কান্না পড়ে। নীলের দ্বারা দাদন পরিশােধ করিয়া ফাজিল পাওনা হইলেও রাইয়তদের নামে দাদনের বকেয়া বাকি বলিয়া খাতায় লেখা থাকে। এক বার দাদন লইলে রাইয়তেরা সাত পুরুষ ক্লেশ পায়। রাইয়তেরা নীল করিতে যে কাতর হয়, তাহা তাহারাই জানে, আর দীনরক্ষক পরমেশ্বর জানেন। রাইয়তেরা পাঁচ জন একত্রে বসিলেই পরস্পর নিজ নিজ দাদনের পরিচয় দেয় এবং ত্রাণের উপায় প্রস্তাব করে, তাহারদিগের সলা পরামর্শের আবশ্যক করে না, আপনারাই মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল। এমন রাইয়তে সাক্ষী দিয়া গেল যে, তাহারদিগের নীল করিতে ইচ্ছা ছিল, কেবল আমার মক্কেল তাহাদিগের পরামর্শ দিয়া এবং ভয় দেখাইয়া তাহাদের নীলের চাস রহিত করিয়াছেন, এ অতি আশ্চর্য্য এবং প্রত্যক্ষ প্রতারণা। ধর্ম্মাবতার! তাহারদিগের পুনর্ব্বার হুজুরে আনান হয়, অধীন দুই সােয়ালে তাহাদিগের মিথ্যা সাক্ষ্য প্রমাণ করিয়া দিবে। আমার মক্কেলের পুত্র নবীনমাধর বসু, করাল নীলকর নিশাচরের কর হইতে উপায়হীন চাসাদিগকে রক্ষা করিতে প্রাণপণে যত্ন করিয়া থাকেন, একথা স্বীকার করি এবং তিনি উড সাহেবের দৌরাত্ম্য নিবারণ করিতে অনেকবার সফলও হইয়াছেন, তাহা পলাশপূর জ্বালান মােকদ্দমার নথিতে প্রকাশ আছে। কিন্তু আমার মক্কেল গোলােকচন্দ্র বসু অতি নিরীহ মনুষ্য; নীলকর সাহেবদের ব্যাঘ্র অপেক্ষা ভয় করে, কোন গােলের মধ্যে থাকে না, কখন কাহারাে মন্দ করে না, কাহাকে মন্দ হইতে উদ্ধার করিতেও সাহসী হয় না, ধর্ম্মাবতার! গােলােকচন্দ্র বসু যে সুচরিত্রের লােক, তাহা জেলার সকল লোকে জানে, আমলাদিগের জিজ্ঞাসা হইলে প্রকাশ হইতে পারে—
গেলােক। বিচারপতি! আমার গত বৎসরের নীলের টাকা চুক্য়ে দিলেন না, তবু আমি ফৌজদারির ভয়েতে ৬০ বিঘা নীলের দাদন লইতে চাহিয়াছিলাম। বড় বাবু বলিলেন “পিতা! আমারদিগের অন্য আয় আছে, এক বৎসর কিম্বা দুই বৎসরের নীলের লােক্সানে কেবল ক্রিয়া কলাপ্ই বন্দ হবে, একেবারে অন্নাভাব হবে না, কিন্তু যাহাদের লাঙ্গলের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর, তাহাদের উপায় কি? আমরা এই হারে নীল করিলে সকলেরি তাই করিতে হইবে।” বড় বাবু একথা বিজ্ঞের মত বলিলেন, আমি কাযে কাযেই বলিলাম তবে সাহেবের হাতে পায় ধরে ৫০ বিঘায় রাজি করগে। সাহেব হাঁ না কিছুই বলিলেন না, গােপনে গােপনে আমাকে এই বৃদ্ধ দশায় জেলে দেবার যোগাড় করিলেন। আমি জানি, সাহেবদিগের রাজি রাখিতে পারিলেই মঙ্গল। সাহেবদের হাকিম ভাই ব্রাদার; সাহেবদের অমতে চলিতে আছে? আমাকে খালাস দেন, আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যদিও হাল গােরু অভাবে নীল করিতে না পারি, বৎসর বৎসর সহেবকে এক শত টাকা নীলের বদলে দিব। আমি কি রাইয়তদের শেখাইবার মানুষ? আমার সঙ্গে কি তাহাদের দেখা হয়?
প্র মােক্তার। ধর্ম্মাবতার! যে ৪ জন রাইয়ত সাক্ষ্য দিয়াছে, তাহার এক জন টিকিরি, তার কোন পুরুষে লাঙ্গল নাই, তার জমি নাই, জমা নাই, গোরু নাই, গোয়ালঘর নাই, সারে জমিনে তদারক্ হইলে প্রকাশ হইবে। কানাই তরফদার ভিন্ন গ্রামের রাইয়ত, তাহার সহিত আমার মক্কেলের কখন দেখা নাই, সে ব্যক্তি সেনাক্ত করিতে অশক্ত। এই এই কারণে আমি তাহারদের পুনর্ব্বার কোর্টে আনয়নের প্রার্থনা করি— ব্যবস্থা-কর্ত্তারা লিখিয়াছেন, নিষ্পত্তির অর্থে আসামিকে সকল প্রকার উপায়ের পন্থা দেওয়া কর্ত্তব্য। ধর্ম্মাবতার, আমার এই প্রার্থনা মঞ্জুর করিলে আমার মনে আক্ষেপ থাকে না।
বা মোক্তার। হুজর—
মাজি। (লিপি লিখন) বল, বল, আমি কর্ণ দিয়া লিখিতেছি না।
বা মোক্তার। হুজুর! এসময় রাইয়তগণকে কষ্ট দিয়া জেলায় আনিলে তাহাদের প্রচুর ক্ষতি হয়, নচেৎ আমিও প্রার্থনা করি সাক্ষীদিগকে আনান হয়, যেহেতু সোয়ালের কৌশলে আসামীর সাব্যস্ত অপরাধ আরো সাব্যস্ত হইতে পারে। ধর্ম্মাবতার! গোলোক বসের কুচরিত্রের কথা দেশ বিদেশ রাষ্ট আছে; যে উপকার করে, তাহারই অপকার করে। অপার সমুদ্র লঙ্ঘন করিয়া নীলকরেরা এদেশে আসিয়া গুপ্তনিধি বাহির করিয়া দেশের মঙ্গল করিতেছেন, রাজকোষের ধন বৃদ্ধি করিতেছেন এবং আপনারা উপকৃত হইতেছেন। এমত মহাপুরুষদিগের মহৎ কার্য্যে যে ব্যক্তি বিরুদ্ধাচরণ করে, তাহার কারাগার ভিন্ন আর স্থান কোথায়?
মাজি। (লিপির শিরোনাম লিখন) চাপরাসি।
চাপ। খোদাবন্দ্।
(সাহেবের নিকট গমন।)
মাজি। (উডের সহিত পরামর্শ) বিবিউড্কা পাস দেও-খানসামাকো বোলো, বাহারকা সাহেবলোক্ আজ্ জাগা নেই।
সেরেস্তা। হুজুর! কি হুকুম লেখা যায়।
মাজি। নথির সামিল থাকে।
সেরেস্তা। (লিখন) হুকুম হইল যে নথির সামিল থাকে। (মাজিষ্ট্রেটের দস্তখৎ) ধর্ম্মাবতার! আসামীর জবাবের হুকুমে হুজুরের দস্তখৎ হয় নাই—
মাজি। পাঠ কর।
সেরেস্তা। হুকুম হইল যে অসামীর নিকট হইতে ২০০ শত টাকা তাইনে দুই জন জামিন লওয়া হয় এবং সাফাই সাক্ষীদিগের নামে রীতিমত সফিনা জারী হয়।
(মাজিস্ট্রেটের দস্তখৎ।)
মাজি। মিরগাঁর ডাকাতি মোকদ্দমা কাল পেস্ কর।
(মাজিস্ট্রেট, উড, রোগ, চাপরাসি ও
আরদালীর প্রস্থান)
সেরেস্তা। নাজির মহাশয়! রীতিমত জামানত্নামা লেখাপড়া করিয়া নাও।
(সেরস্তাদার, পেস্কার, বাদীর মোক্তার ও
রাইয়তগণের প্রস্থান)
নাজির। (প্রতিবাদীর মোক্তারের প্রতি) অদ্য সন্ধ্যাকালে জামানত্নামা লেখা পড়া কিরূপে হইতে পারে, বিশেষ আমি কিছু ব্যস্ত আছি—
প্র মোক্তার। নাম্টা খুব বড় বটে, কিন্তু কিছু নাই (নাজিরের সহিত পরামর্শ) গহনা বিক্রী করিয়া এই টাকা দিতে হইবে।
নাজির। আমার তালুকও নাই, ব্যবসাও নাই, আবাদও নাই; এই উপজীবিকা। কেবল তোমার খাতিরে এক শত টাকায় রাজি হওয়া। চল আমার বাসায় যাইতে হইবে। দেওয়ান্জি ভায়া না শোনেন, ওঁদের পূজা আলাহিদা হয়েছে কি না?
(সকলের প্রস্থান)
চতুর্থ অঙ্ক।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
ইন্দ্রাবাদ, বিন্দুমাধবের বাসাবাড়ী।
(নবীনমাধব, বিন্দুমাধব এবং সাধূচরণ আসীন)
নবীন। আমার কাযে কাযেই বাড়ী যাইতে হইল। এ সংবাদ জননী শুনিবামাত্র প্রাণত্যাগ করিবেন। বিন্দু! তোমারে আর বল্বো কি; দেখ, পিতা যেন কোনমতে ক্লেশ না পান। বাস পরিত্যাগ করা স্থির করিয়াছি, সর্ব্বস্ব বিক্রয় করিয়া আমি টাকা পাঠাইয়া দিব, যে যত টাকা চাহিবে তাহাকে তাহাই দিবা।
বিন্দু। জেল্দারগা টাকার প্রয়াসী নহে, মাজিষ্ট্রেট্ সাহেবের ভয়ে পাচক ব্রাহ্মণ লইয়া যাইতে দিতেছে না।
নবীন। টাকাও দেও মিনতিও কর। আহা! বৃদ্ধশরীর! তিন দিন অনাহার! এত বুঝাইলাম, এত মিনতি করিলাম—বলেন “নবীন! তিন দিন গত হইলে আহার করি না করি বিবেচনা করিব, তিন দিনের মধ্যে এ পাপ মুখে কিছু মাত্র দিব না।”
বিন্দু। কিরূপে পিতার উদরে দুটি অন্ন দিব তাহার কিছুই উপায় দেখিতেছি না। নীলকরক্রীতদাস মূঢ়মতি মাজিষ্ট্রেটের মুখ হইতে নিষ্ঠুর কারাবাসানুমতি নিঃসৃত হওয়াবধি পিতা যে, চক্ষে হস্ত দিয়াছেন তাহা এখন পর্য্যন্ত নামাইলেন না। পিতার নয়নজলে হস্ত ভাসমান হইয়াছে, যে স্থানে প্রথম বসাইয়াছিলাম সেই স্থানেই উপবিষ্ট আছেন। নীরব, শীর্ণ-কলেবর, স্পন্দহীন, মৃতকপোতবৎ কারাগারপিঞ্জরে পতিত আছেন। আজ্ চার দিন, আজ্ তাঁহাকে অবশ্যই আহার করাইব। আপনি বাড়ী যান, আমি প্রত্যহ পত্র প্রেরণ করিব।
নবীন। বিধাতঃ! পিতাকে কি কষ্টই দিতেছ। বিন্দু তােমাকে রাত্র দিন জেলে থাকিতে দেয়, তাহা হইলেই আমি নিশ্চিন্ত হইয়া বাড়ী যাইতে পারি।
সাধু। আমি চুরি করি, আপনারা আমাকে চোর বলে ধরে দেন, আমি একরার করিব, তা হলেই আমাকে জেলে দেবে, আমি সেখানে কর্ত্তা মহাশয়ের চাকর হয়ে থাকিব।
নবীন। সাধু! তুমি এমনি সাধুই বট। আহা! ক্ষেত্রমণির সাংঘাতিক পীড়ার সমাচারে তুমি যে ব্যাকুল, তােমাকে যত শীঘ্র বাড়ী লইয়া যাইতে পারি ততই ভাল।
সাধু। (দীর্ঘ নিশ্বাস) বড় বাবু! মাকে গিয়ে কি দেখিতে পাব? আমার যে আর নাই।
বিন্দু। তােমাকে যে আরোক্ দিয়াছি, উহা খাওয়াইলে অবশ্যই নির্ব্ব্যাধি হইবে, ডাক্তার বাবু আদ্যোপান্ত শ্রবণ করে ঐ ঔষধ দিয়াছেন।
(ডেপুটি ইনিস্পেক্টারের প্রবেশ)
ডেপু। বিন্দুবাবু! আপনার পিতার খালাসের জন্য কমিসনর সাহেব বিশেষ করিয়া লিখিয়াছেন।
বিন্দু। লেফ্টেনাণ্ট গবর্ণর নিষ্কৃতি দিবেন সন্দেহ নাই।
নবীন। নিষ্কৃতির সমাচার কতদিনে আসিতে পারে?
বিন্দু। পোনের দিবসের অধিক হইবে না।
ডেপু। অমর নগরের আসিস্টাণ্ট মাজিস্ট্রেট এক জন মোক্তারকে এই আইনে ৬ মাস ফাটক দিয়াছিল, তাহার ১৬ দিন জেলে থাকিতে হয়।
নবীন। এমন দিন কি হবে, গবর্ণর সাহেব অনুকূল হইয়া প্রতিকূল মাজিষ্ট্রেটের নিকৃষ্ট নিষ্পত্তি খণ্ডন করিবেন?
বিন্দু। জগদীশ্বর আছেন, অবশ্যই করিবেন। আপনি যাত্রা করুন, অনেক দূর যাইতে হইবে।
(নবীনমাধব, বিন্দুমাধব ও সাধুচরণের প্রস্থান)
ডেপু। আহা! দুই ভাই দুঃখে দগ্ধ হইয়া জীবন্মৃত হইয়াছেন। লেফ্টেনাণ্ট গবর্ণরের নিষ্কৃতি অনুমতি সহোদরদ্বয়ের মৃতদেহ পুনর্জীবিত করিবে। নবীন বাবু অতি বীর পুরুষ, পরোপকারী, বদান্য, বিদ্যোৎসাহী, দেশহিতৈষী; কিন্তু নির্দ্দয় নীলকর কুজ্ঝটিকায় নবীন বাবুর সদ্ গুণ সমূহ মকুলেই ম্রীয়মান হইল।
(কালেজের পণ্ডিতের প্রবেশ)
অস তে আজ্ঞা হয়।
পণ্ডিত। স্বভাবতঃ শরীর আমার কিঞ্চিৎ উষ্ণ, রৌদ্র সহ্য হয় না। চৈত্র বৈশাখ মাসে আতপতাপে উন্মত্ত হইয়া উঠি। কয়েক দিন শিরঃপীড়ায় সাতিশয় কাতর, বিন্দুমাধবের বিষম বিপদের সময় এক বার আসিতে পারি নাই।
ডেপু। বিষ্ণুতৈলে আপনার উপকার দর্শিতে পারে। বিষ্ণু বাবুর জন্য বিষ্ণুতৈল প্রস্তুত করা গিয়াছে, আপনার বাসায় আমি কল্য কিঞ্চিৎ প্রেরণ করিব।
পণ্ডিত। বড় বাধিত হলেম। ছেলে পড়ালে সহজ মানুষ পাগল হয়, আমার তাহাতে এই শরীর।
ডেপু। বড় পণ্ডিত মহাশয়কে আর যে দেখিতে পাইনে?
পণ্ডিত। তিনি এ স্ববৃত্তি ত্যাগ করিবার পন্থা করিতেছেন—সোণার চাঁদ ছেলে উপার্জ্জন করিতেছে, তাঁহার সংসার রাজার মত নির্ব্বাহ হইবে। বিশেষ বৃষকাষ্ঠ গলায় বন্ধন করে কালেজে যাওয়া আসা ভাল দেখায় না, বয়স্ তো কম্ হয় নাই।
(বিন্দুমাধবের পুনঃ প্রবেশ।)
বিন্দু। পণ্ডিত মহাশয় এসেছেন—
পণ্ডিত। পাপাত্মা এমত অবিচার করেছে। তোমরা শুনিতে পাও না, বড় দিনের সময় ঐ কুটিতে একাদিক্রমে দশ দিবস যাপন করে আসিয়াছে। উহার কাছে প্রজার বিচার! কাজির কাছে হিন্দুর পরোব।
বিন্দু। বিধাতার নির্ব্বন্ধ।
পণ্ডিত। মোক্তার দিয়াছিলে কাহাকে?
বিন্দু। প্রাণধন মল্লিককে।
পণ্ডতি। ওকেও মোক্তীরনামা দেয়? অপর কোন ব্যক্তিকে দিলে উপকার দর্শিত; সকল দেবতাঁই সমান, ঠক্ বাচতে গা ঁউজোর
বিন্দু। কমিসনর সাহেব পিতার নিষ্কৃতির জন্য গবর্ণমেণ্টে রিপোর্ট করিয়াছেন।
পণ্ডিত। “এক ভন্ম আর ছার, দোষগুণ কব কার”। যেমন মাজিষ্ট্রেটে তেমনি কমিসনার।
বিন্দু। মহাশয় কমিসনারকে বিশেষ জানেন না, তাহাই একথা বলিতেছেন। কমিসনার সাহেব অতি নিরপেক্ষ, নেটিবদের উন্নতি আকাংক্ষী।
পণ্ডিত। যাহা হউক, এক্ষণ ভগবানের আনুকূল্যে তােমার পিতার উদ্ধার হইলেই সকল মঙ্গল। জেলে কি অবস্থায় আছেন?
বিন্দু। সর্বদা রােদন করিতেছেন এবং গত তিন দিন কিছু মাত্র আহার করেন নাই। আমি এখনি জেলে যাইব, আর এই সুসংবাদ বলিয়া তাঁহার চিত্ত বিনােদ করিব।
(এক জন চাপরাসির প্রবেশ)
তুমি জেলের চাপরাসি না?
চাপ। মশাই এট্টু জলদি করে জেলে আসেন। দারগা ডেকেচেন।
বিন্দু। আমার বাবাকে তুমি আজ দেখেছ?
চাপ। আপনি আসেন। আমি কিছু বল্তি পারিনে
বিন্দু। চল বাপু। (পণ্ডিতের প্রতি) বড় ভাল বােধ হইতেছে না, আমি চলিলাম।
(চাপরাসি ও বিন্দুমাধবের প্রস্থান)
পণ্ডিত। চল আমরাও জেলে যাই, বোধ হয় কোন মন্দ ঘটনা হইয়া থাকিবে।
(উভয়ের প্রস্থান)
চতুর্থ অঙ্ক।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
ইন্দ্রাবাদের জেলখানা।
(গোলোক চন্দ্রের মৃত দেহ উড়ানি পাকান দড়িতে দোদুল্যমান, জেল দারগা এবং জমাদার আসীন)
দার। বিন্দুমাধব বাবুকে কে ডাকিতে গিয়াছে?
জমা। মনিরদ্দি গিয়েছে। ডাক্তার সাহেব এলে তো নাবান হইতে পারে না।
দার। মাজিষ্ট্রেট সাহেবের আজ্ আসিবার কথা আছে না?
জমা। আজ্ঞে না; তাঁর আর চার্ দিন্ হবে। শনিবারে শচীগঞ্জের কুটিতে সাহেবদের সামপিন্ পার্টি আছে, বিবিদের নাচ হবে। উড সাহেবের বিবি আমারদিগের সাহেবের সঙ্গে নইলে নাচিতে পারেন না, আমি যখন আরদালি ছিলাম দেখিয়াছি। উড সাহেবের বিবিরি খুব দয়া, এক খান চিটীতে এ গোরিবকে জেলের জমাদ্দার করিয়া দিয়াছেন।
দার। আহা! বিন্দুবাবু পিতা আহার করেন নাই বলিয়া কত বিলাপ করিয়াছেন; এ দশা দেখলে প্রাণ ত্যাগ করিবেন।
(বিন্দুমাধবের প্রবেশ)
সকলি পরমেশ্বরের ইচ্ছা।
বিন্দু। একি, একি, আহা, আহা! পিতার উদ্বন্ধনে মৃত্যু হইয়াছে! আমি যে পিতার মুক্তির সম্ভাবনা ব্যক্ত করিতে আসিতেছি, কি মনস্তাপ! (নিজ মুস্তক গোলোকের বক্ষে রক্ষা করিয়া মৃত দেহ আলিঙ্গন পূর্ব্বক ক্রন্দন) পিতা আমাদিগের মায়া একেবারে পরিত্যাগ করিলেন! বিন্দুমাধবের ইংরাজী বিদ্যার গৌরব আর লোকের কাছে করবেন না? নবীনমাধবকে “স্বরপুর বৃকোদর” বলা শেষ হইল? বড় বধূকে “আমার মা, আমার মা,” বলিয়া বিপিনের সহিত যে আনন্দবিবাদ তাহার সন্ধি করিলেন! হা! আহারান্বেষণে ভ্রমনকারী বকদম্পতির মধ্যে বক ব্যাধ কর্ত্তৃক হত হইলে শাবক বেষ্টিত বকপত্নী যেমন সঙ্কটে পড়ে, জননী আমার তোমার উদ্বন্ধন সংবাদে সেই রূপ হইবেন—
দার। (হস্ত ধরিয়া বিন্দুমাধবকে অন্তরে আনিয়া) বিন্দু বাবু! এখন এত অধীর হইবেন না। ডাক্তার সাহেবের অনুমতি লইয়া সত্বরে অমৃতঘাটের ঘাটে লইয়া যাইবার উদ্যোগ করুন।
(ডিপুটি ইনস্পেক্টার এবং পণ্ডিতের প্রবেশ)
বিন্দু। দারগা মহাশয়! আমাকে কিছু বলবেন না। যে পরামর্শ উচিত হয় পণ্ডিত মহাশয় এবং ডেপুটি বাবুর সহিত করুন, আমার শোক বিকারে বাক্য রোধ হইয়াছে, আমি জন্মের মত একবার পিতার চরণ বক্ষে ধারণ করিয়া বসি।
(গোলোকের চরণ বক্ষে ধারণ পুর্ব্বক উপবিষ্ট)
পণ্ডিত। (ডেপুটি ইনস্পেক্টারের প্রতি) আমি বিন্দ মাধবকে ক্রোড়ে করিয়া রাখি, তুমি বন্ধন উন্মোচন কর—এ দেবশরীর, এ নরকে ক্ষণকালও রাখা নয়।
দার। মহাশয়! কিঞ্চিৎ কাল কাল অপেক্ষা করিতে হইবে—
পণ্ডিত। আপনি বুঝি নরকের দ্বারপাল? নতুবা এমত স্বভাব হইবে কেন।
দার। আপনি বিজ্ঞ, আমাকে অন্যায় ভর্ৎসনা করিতেছেন—
(ডাক্তার সাহেবের প্রবেশ)
ডাক্তার। হো, হো, বিন্দুমাধব! গড্স উইল—পণ্ডিত মহাশয় আসিয়াছেন, বিন্দুকে কালেজ ছাড়া হয় না।
পণ্ডিত। কালেজ ছাড়া বিধি হয় না।
বিন্দু। আমাদের বিষয় আশয় সব গিয়াছে, অবশেষে পিতা আমাদিগকে পথের ভিখারি করিয়া লােকান্তর গমন করিলেন (ক্রন্দন) অধ্যয়ন আর কি রূপে সম্ভবে।
পণ্ডিত। নীলকর সাহেবেরা বিন্দুমাধবদিগের সর্বস্ব লইয়াছে—
ডাক্তার। পাদরি সাহেবদের মুখে আমি প্লাণ্টার সাহেবদের কথা শুনিয়াছি এবং আমিও দেখিল। আমি মাতঙ্গ নগরের কুটি হইতে আসিল, একটি গ্রামে বসিয়াছে, আমার পাল্কির নিকট দিয়া দুই জন রাইয়ত বাজারে যাইল, একজনের হস্তে দুগ্দো আছে, আমি দুগ্দো কিনিতে চাহিল, এক রাইয়ত এক রাইয়তকে বলিল, নীলমাম্দো নীলমাম্দো” দুগ্দো রাখিয়া দৌড় দিল। আমি আর একজন রাইয়তকে জিজ্ঞাসা করিল, সে কহিল, রাইয়ত দুইজন দাদনের ভয়ে পলাইয়াছে। আমি দাদন লইয়াছি আমার গুদামে যাইতে কি কারণ হইতে পারে। আমি বুঝিলাম আমাকে প্লাণ্টার লইয়াছে। রাইয়তের হস্তে দুগ্দো দিয়া আমি গমন করিল।
ডেপু। ভ্যালিসাহেবের কান্সারণের এক গ্রাম দিয়া পাদরি সাহেব যাইতেছিলেন। রাইয়তেরা তাঁহাকে দেখিয়া “নীলভূত বেরিয়াছে, নীলভূত বেরিয়াছে” বলিয়া রাস্তা ছাড়িয়া স্ব স্ব গৃহে পলায়ন করিয়াছিল। কিন্তু ক্রমশঃ পাদরি সাহেবের বদান্যতা, বিনয় এবং ক্ষমা দর্শন করিয়া রাইয়তেরা বিস্ময়াপন্ন হইল এবং নীলকর পীড়নাতুর প্রজাপুঞ্জের দুঃখে পাদরি সাহেব যত আন্তরিক বেদনা প্রকাশ করিতে লাগিলেন, তাহারা তাঁহাকে তত ভক্তি করিতে লাগিল। এক্ষণ রাইয়তের পরম্পর বলাবলি করে “এক ঝাডের বাঁশ বটে—কোন খানায় দুর্গা-ঠাকুরুণের কাঠাম, কোন খানায় হাড়ির ঝুড়ি।”
পণ্ডিত। আমরা মৃত শরীরটি লইয়া যাই।
ডাক্তার। কিঞ্চিৎ দেখিতে হইবে। আপনারা বাহিরে আনিতে পারেন।
(বিন্দুমাধব এবং ডেপুটি ইনস্পেক্টার বন্ধন
মোচন পূর্ব্বক মৃত দেহ লইয়া যাওন
এবং সকলের প্রস্থান)
তৃতীয় অঙ্ক
তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
বেগুন বেড়ের কুটির দপ্তরখানার সন্মুখ।
(গোপীনাথ ও এক খালাসীর প্রবেশ)
গোপী। তােদের ভাগে কম্ না পড়িলেতো আমার কাণে কোন কথা তুলিস্নে।
খালাসী। ও গু কি অ্যাকা খ্যায়ে হজোম করা যায়? মুই বল্লাম, যদি খাবা, তবে দেওয়ানজিরি দিয়ে খাও, তা বল্লে “তোর দেওয়ানের
মুরদ বড়, এত আর সে ক্যাওটের পুত নয়, যে সাহেবেরে বাঁদর খ্যালয়ে নে বেড়াবে,
গােপী। আচ্ছা। তুই এখন যা, কায়েতবাচ্ছা কেমন মুগুর তা আমি দেখাব।
(খালাসীর প্রস্থান।)
ছােটসাহেবের জোরে ব্যাটার এত জোর। বোনাই যদি মনিব হয়, তবে কর্ম্ম করিতে বড়সুখ, ও কথাও বলবাে —বড়সাহেব ওকথায় আগুণ হয়, কিন্তু ব্যাটা আমার উপর ভারি চটা, আমারে কথায় কথায় শ্যামচাঁদ দেখায়। সে দিন মোজা সহিত লাতি মার্লে। কয়েক দিন কিছু ভাল ভাল দেখিতেছি। গোলােক বসের তলব হওয়া অবধি আমার প্রতি সদয় হইয়াছে। লােকের সর্ব্বনাশ করিতে পারিলেই সাহেবের কাছে পটু হওয়া যায়। “শত মারী ভবেৎ বৈদ্যঃ” (উড কে দর্শন করিয়া) এই যে আসিতেছেন, বসেদের কথা বলিয়া অগ্রে মন নরম করি।
(উডের প্রবেশ।)
ধর্ম্মাবতার, নবীন বসের চক্ষে এই বার জল বাহির হইয়াছে। বেটার এমন শাসন কিছুতেই হয় নাই! বেটার বাগান বাহির করিয়া লওয়া গিয়াছে, গাঁতি গদাই পােদ্কে পাটা করিয়া দেওয়া গিয়াছে, আবাদ এক প্রকার রহিত করা গিয়াছে, বেটার গোলা সব খালি পড়ে রহিয়াছে, বেটাকে দুই বার ফৌজদারিতে সােপর্দ্দ করা গিয়াছে, এত ক্লেশেও বেটা খাড়া ছিল, এই বারে একবারে পতন হইয়াছে।
উড। শালা শামনগরে কিছু কত্তে পারিনি।
গােপী। হুজুর, মুন্সিরে ওর কাছে এসেছিল, তা বেটা বল্লে “আমার মন স্থির নাই, পিতার ক্রন্দনে অঙ্গ অবশ হইয়াছে, আমারে ঘােল বলাইয়াছে।” নবীন বসের দুর্গতি দেখে শ্যামনগরের ৭।৮ ঘর প্রজা ফেরার হইয়াছে, আর সকলে হুজর যেমন হুকুম দিয়াছেন তেমনি করিতেছে।
উড। তুমি আচ্ছা দেওয়ান আছে, ভাল মত লব বার করেছিলে।
গােপী। আমি জান্তাম গােলােক বস্ বড় ভীত মানুষ, ফৌজদারীতে যাইতে হইলে পাগল হইবে। নবীন বসের যেমন পিতৃভক্তি তাহা হইলে বেটা কাযে কাযেই শাসিত হইবে, এই জন্যে বুড়ােকে আসামী করিতে বল্লাম, হুজর যে কৌশল বাহির করিয়াছেন তাহাও মন্দ নয়, বেটার স্করিপুণীর পাড়ে চার দেওয়া হইরাছে, উহার অন্তঃকরণে সাপের ডিম পড়িয়াছে।
উড। এক পাথরে দুই পক্ষী মরিল, দশ বিঘা নীল হইল, বাঞ্চতের মনে দুঃখ হইল। শালা বড় কাঁদাকার্টি করেছিল, বলে পুকুরে নীল হইলে আমার বাস উঠিবে, আমি জবাব দিয়াছি ভিটা জমতে নীল বড় ভাল হয়।
গোপী। ঐ জবাব পেয়ে বেটা নালিস করিয়াছে।
উড। মোকদ্দমা কিছু হইবে না, এ মাজিষ্ট্রেট বড় ভাল লোক আছে। দেওয়ানী কর্লে পাঁচ বচোরে মোকদ্দমা শেষ হবে না। মাজিষ্ট্রেট আমার বড় দোস্ত! দেখ তোমার সাক্ষী মাটোব্বর করে নটুন আইনে চার বজ্জাট্কে ফাটক দিয়াছে; এই আইনটা শ্যামচাঁদের দাদা হইয়াছে।
গোপী। ধর্ম্মাবতার, নবীন বস্ ঐ চারি জন রাইয়তের ফসল লোকসান হবে বলিয়া আপনার লাঙ্গন গোরু মাইন্দার দিয়া তাহাদের জমি চসিয়া দিতেছে এবং উহাদিগের পরিবারদিগের যাহাতে ক্লেশ না হয় তাহারি চেষ্টা করিতেছে।
উড। শালা দাদনের জমি চসিতে হইলে বলে আমার লাঙ্গল গোরু কমে গিয়েছে; বাঞ্চত্ বড় বজ্জাত, আচ্ছ। জব্দ হইয়াছে। দেওয়ান তুমি আচ্ছা কাম করিয়াছ, তোম্ছে কাম বেহেতার চলেগা।
গোপী। ধর্ম্মাবতারের অনুগ্রহ। আমার মানস বৎসর বৎসর দাদন বৃদ্ধি করি; এ কর্ম্ম একা করিবার নয়, ইহাতে বিশ্বাসী আমীন খালাসী আবশ্যক করে; যে ব্যক্তি দুটাকার জন্য হুজুরের ৩ বিঘা নীল লোক্সান করে, তার দ্বারা কর্ম্মের উন্নতি হয়?
উড। আমি সমজিয়াছি, আমীন শালা গোলমাল করিয়াছে।
গোপী। হুজুর, চন্দ্র গোল দারের এখানে নূতন বাস, দাদন কিছু রাখে না; আমীন উহার উঠানে রীতিমত এক টাকা দাদন বলিয়া ফেলিয়া দেয়, টাকাটি ফেরত দিবার জন্যে অনেক কাঁদাকাটি করে, এবং মিনতি করিতে করিতে রথ তলা পর্য্যন্ত আমীনের সঙ্গে আইসে, রথতলায় নীলকণ্ঠ বাবুর সহিত সাক্ষাৎ হয়, যিনি কালেজ হইতে একেবারে উকীল হইয়া বাহির হইয়াছেন।
উড। আমি ওকে জানি, ঐ বাঞ্চত্ আমার কথা খবরের কাগজে লিখিয়া দেয়।
গােপী। আপনাদের কাগজের কাছে উহাদের কাগজ দাঁড়াইতে পারে না, তুলনা হয় না, ঢাকাই জালার কাছে ঠাণ্ডাজলের কুঁজো। কিন্তু সংবাদ পত্রটি হস্তগত করিতে হুজুরদিগের অনেক ব্যয় হইয়াছে, যেমন সময়,
“সময় গুণে আপ্ত পর।
খোঁড়া গাধা ঘােড়ার দর॥”
নীলকণ্ঠ বাবু আমীনকে অনেক ভর্ৎসনা করেন, আমীন তাহাতে লজ্জিত হইয়া গােলদারের বাড়ী ফিরিয়া গিয়া দুই টাকার সহিত দাদনের টাকাটি ফেরত্ লইয়া আসিয়াছে! চন্দ্র গােলদার সয়তান, ৩।৪ বিঘা নীল অনায়াসে দিতে পারিত এই কি চাকরের কায? আমি দেওয়ানি আমিনি দুই করিতে পারি তবেই এসব নিমক্হারামী রহিত হয়।
উড। বড় বজ্জাতি, ছাফ্ নেমক্হারামী
গােপী। ধর্ম্মাবতার, বেয়াদবি মাফ্ হয়— আমীন আপনার ভগিনীকে ছােট সাহেবের কামরায় আনিয়াছিল।
উড। হাঁ হাঁ আমি জানি, ঐ বাঞ্চত্ আর পডী ময়রাণী ছােট সাহেবকে খারাপ করিয়াছে। বজ্জাত কো হাম্ জরূর শেখ লায়েঙ্গে, বাঞ্চত কো হামারা বট নেকা ঘরমে ভেজ ডেয়।
(উডের প্রস্থান।)
গোপী। দেখ দেখি বাবা কার হাতে বাঁদোর ভাল খেলে। কায়েত ধূর্ত্ত আর কাক ধূর্ত্ত।
ঠেকিয়াছ এই বার কায়েতের ঘায়।
বানাই বাবার বাবা হার মেনে যায়।
তৃতীয় অঙ্ক।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
নবীন মাধবের শয়নঘর।
(নবীন মাধব এবং সৈরিন্ধ্রী আসীন)
সৈরিন্ধ্রী। প্রাণনাথ, অলঙ্কার আগে না শ্বশুর আগে— তুমি যে জন্যে দিবা নিশি ভ্রমণ করে বেড়াইতেছ, যে জন্যে তুমি আহার নিদ্রা ত্যাগ করিয়াছি; যে জন্যে তোমার চক্ষু হইতে অবিরল জলধারা পড়িতেছে, যে জন্যে তোমার প্রফুল্ল বদন বিষণ্ণ হইয়াছে, যে জন্য তোমার শিরঃপীড়া জন্মিয়াছে, হে নাথ! আমি সেই জন্যে কি অকিঞ্চিৎকর আভরণ গুলিন দিতে পারি নে?
নবীন। প্রিয়সি, তুমি অনায়াসে দিতে পার কিন্তু আমি কোন্ মুখে লই। কামিনীকে অলঙ্কারে বিভূষিতা করিতে পতির কত কষ্ট, বেগবতী নদীতে সন্তরণ, ভীষণ সমুদ্রে নিমজ্জন, যুদ্ধে প্রবেশ, পর্ব্বতে আরােহণ, অরণ্যে বাস, ব্যাঘ্রের মুখে গমন,—পতি এত ক্লেশে পত্নীকে ভূষিত করে, আমি কি এমন মূঢ়, সেই পত্নীর ভূষণ হরণ করিব। পঙ্কজনয়নে, অপেক্ষা কর। আজ দেখি যদি নিতান্তই টাকার সুযােগ করিতে না পারি তবে কল্যতােমার অলঙ্কার গ্রহণ করিব।
সৈরিন্ধ্রী। হৃদয়বল্লভ! আমাদের অতি দুঃসময়, এখন কে তােমাকে পাঁচ শত টাকা বিশ্বাস করে ধার দেবে? আমি পুনর্ব্বার মিনতি করিতেছি, আমার আর ছােট বয়ের গহনা পোদ্দারের বাড়ীতে রেখে টাকার যােগাড় কর, তােমার ক্লেশ দেখে সােণার কমল ছােট বউ আমার মলীন হয়েছে।
নবীন। আহা! বিধুমুখি! কি নিদারুণ কথা বলিলে, আমার অন্তঃকরণে যেন অগ্নিবান প্রবেশ করিল—ছােট বধূমাতা আমার বালিকা, উত্তম বসন, উত্তম অলঙ্কারেই তাঁর অমেদ, তাঁর জ্ঞান কি, তিনি সংসারের বার্ত্তা কি বুঝেছেন, কৌতুকছলে বিপিনের গলার হার কেড়ে লইলে বিপিন যেমন ক্রন্দন করে, বধূমাতার অলঙ্কার লইলে তেমনি রােদন করবেন। হা ঈশ্বর! আমাকে এমন কাপুরুষ করিলে! আমি এমন নির্দ্দয় দস্যু হইলাম। আমি বালিকাকে বঞ্চিত করিব? জীবন থাকিতে হইবেনা—নরাধম নিষ্ঠুর নীলকরেও এমন কর্ম্ম করিতে পারে না—প্রণয়িনি! এমন কথা আর মুখে আনিও না।
সৈরি। জীবনকান্ত, আমি যে কষ্টে ও নিদারুণ কথা বলিয়াছি তাহা আমিই জানি আর সর্ব্বান্তর্যামী পরমেশ্বরই জানেন, ও অগ্নিবান তার সন্দেহ কি—আমার অন্তঃকরণ বিদীর্ণ করেছে, জিহ্বা দগ্ধ করেছে, পরে ওষ্ঠ ভেদ করে তােমার অন্তঃকরণে প্রবেশ করিয়াছে—প্রাণনাথ! বড় যন্ত্রণাতেই ছােট বয়ের গহনা লইতে বলিয়াছি—তােমার পাগলের ন্যায় ভ্রমণ, শ্বশুরের ক্রন্দন, শ্বাশুড়ির দীর্ঘ নিশ্বাস, ছােট বয়ের বিরস বদন, জ্ঞাতি বান্ধবের হেঁট মুখ, রাইয়ত জনের হাহাকার, এ সকল দেখে কি আমােদ আনন্দ মনে আছে? কোন রূপে উদ্ধার হইতে পারিলে সকলের রক্ষা। হে নাথ! বিপিনের গহনা দিতেও আমার যে কষ্ট, ছোট বয়ের গহনা দিতেও সেই কষ্ট; কিন্তু ছোট বয়ের গহনা দেওয়ার পূর্ব্বে বিপিনের গহনা দিলে ছোট বয়ের প্রতি আমার নিষ্ঠুরাচরণ করা হয়, ছোট বউ ভাবিতে পারে দিদি বুঝি আমায় পর ভাবিলেন। আমি কি এমন কায করে তার সরল মনে ব্যথা দিতে পারি, একি মাতৃতুল্য বড় যায়ের কাজ?
নবীন। প্রণয়িণি! তোমার অন্তঃকরণ অতি বিমল, তোমার মত সরল নারী নারীকুলে দুটী নাই—আহা! আমার এমন সংসার এমন হইল। আমি কি ছিলাম কি হলাম! আমার ৭ শত টাকা মুনফার গাঁতি, আমার ১৫ গোলা ধান, ১৬ বিঘার বাগান, আমার ২০ খান লাঙ্গল, ৫০ জন মাইন্দার, পূজার সময় কি সমারোহ, লোকে বাড়ী পরিপূর্ণ, ব্রাহ্মণ ভোজন, কাঙ্গালিকে অন্ন বিতরণ, আত্মীয়গণের আহার, বৈষ্ণবের গান, আমোদজনক যাত্রা, আমি কত অর্থ ব্যয় করিয়াছি, পাত্র বিবেচনায় এক শত টাকা দান করিয়াছি; আহা! এমন ঐশ্বর্য্যশালী হইয়া এখন আমি স্ত্রী ভাদ্র বধূর অলঙ্কার হরণ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি, কি বিড়ম্বনা! পরমেশ্বর তুমিই দিয়াছিলে, তুমিই লইয়াছ, আক্ষেপ কি —
সৈরি। প্রাণনাথ, তােমাকে কাতর দেখিলে আমার প্রাণ কাঁদিতে থাকে (সজলনেত্রে) আমার কপালে এত যাতনা ছিল, প্রাণকান্তের এত দুর্গতি দেখিতে হলাে—আর বাধা দিও না (তাবিজ খুলন)
নবীন। তােমার চক্ষে জল দেখিলে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয় (চক্ষে জল মােচন করিয়া) চুপ্ কর, শশিমুখি চুপ্ কর, (হস্ত ধরিয়া) রাখ আর এক দিন দেখি।
সৈরি। প্রাণনাথ, উপায় কি—আমি যা বলিতেছি তাই কর, কপালে থাকে অনেক গহনা হবে (নেপথ্যে হাঁচি) সত্যি—আদুরী আস ছে।
(দুইখান লিপি লইয়া আদুরীর প্রবেশ)
আদুরী। চিটি দুখান কন্তে আসেচে মুই কতি পারিনে, মাঠাকুরুণ তােমার হাতে দিতি বল্লে।
(লিপি দিয়া আদুরীর প্রস্থান)
নবীন। তোমাদের গহনা লইতে হয় না হয়, এই দুই লিপিতে জানিতে পারিব—(প্রথম লিপি খুলন)
সৈরি। চেঁচিয়ে পড়।
নবীন। (লিপিপাঠ) “রোকার আশীর্ব্বাদ জানিবেন —
আপনাকে টাকা দেওয়া প্রত্যুপকার করা মাত্র,
কিন্তু আমার মাতা ঠাকুরাণীর গতকল্য গঙ্গা
লাভ হইয়াছে, তদাদ্যকৃত্যের দিন সংক্ষেপ,
এ সংবাদ মহাশয়কে কল্যই লিখিয়াছি—
তামাক অদ্যাপি বিক্রয় হয় নাই। ইতি
শ্রী ঘনশ্যাম মুখোপাধ্যায়।”
কি দুর্দ্দৈব! মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের মাতৃশ্রাদ্ধে আমার এই কি উপকার! দেখি, তুমি কি অস্ত্র ধারণ করিয়া আসিয়াছ।
(দ্বিতীয় লিপি খুলন)
সৈরি। প্রাণনাথ, আশা করে নিরাশ হওয়া বড় ক্লেশ — ও চিটি ওম্নি থাক্ —
নবীন। (লিপিপাঠ)
“ প্রতিপাল্য শ্রীগোকুলকৃষ্ণ
পালিতস্য বিনয় পূর্ব্বক নমস্কারা নিবেদনঞ্চ
বিশেষ। মহাশয়ের মঙ্গলে নিজ মঙ্গল পরং
লিপি প্রাপ্তে সমাচার অবগত হইলাম। আমি
৩০০ টাকার যোগাড় করিয়াছি, কল্য সমভি-
ব্যাহারে নিকট পৌছিব, বক্রী এক শত টাকা
আগামী মাসে পরিশোধ করিব। মহাশয় যে
উপকার করিয়াছেন, আমি কিঞ্চিৎ সুদ দিতে
ইচ্ছা করি ইতি।”
সৈরি। পরমেশ্বর বুঝি মুখ তুলে চাইলেন— যাই আমি ছোট বউকে বলিগে।
(সৈরিন্ধ্রীর প্রস্থান।)
নবীন। (স্বগত) প্রাণ আমার সারল্যের পুত্তলিকা; এ ত ভীষণ প্রবাহে তৃণমাত্র—এই অবলম্বন করিয়া পিতাকে ইন্দ্রাবাদে লইয়া যাই, পরে অদৃষ্টে যাহা থাকে তাই হবে। দেড় শত টাকা হাতে আছে—তামাক কয়েক খান আর এক মান রাখিলে ৫০০ টাকা বিক্রয় হইতে পারে, তা কি করি সাড়ে তিন শত টাকাতেই ছাড়িতে হইল, আমলা খরচ অনেক লাগিবে যাওয়া আসাতে বিস্তর ব্যয় —এমন মিথ্যা মোকদ্দমায় যদি মেয়াদ হয়, তবে বুঝিলাম যে এ দেশে প্রলয় উপস্থিত। কি নিষ্ঠুর আইন প্রচার হইয়াছে। আইনের দোষ কি, আইন কর্ত্তাদিগের বা দোষ কি— যাহাদিগের হস্তে আইন অর্পিত হইয়াছে, তাহারা যদি নিরপেক্ষ হয়, তবে কি দেশের সর্ব্বনাশ ঘটে। আহা! এই আইনে কত ব্যক্তি বিনাপরাধে কারাগারে ক্রন্দন করিতেছে—তাহাদের স্ত্রী পুত্রের দুঃখ দেখিলে বক্ষ বিদীর্ণ হয়—উনানের হাঁড়ি উনানেই রহিয়াছে, উঠানের ধান উঠানেই শুকাইতেছে, গোয়ালের গোরু গোয়ালেই রহিয়াছে—ক্ষেত্রের চাস সম্পূর্ণ হলো না, সকল ক্ষেত্রে বীজ বপন হলো না, ধানের ক্ষেত্রের ঘাস নির্ম্মূল হলো না, বৎসরের উপায় কি—কোথা নাথ, কোথা তাত শব্দে ধূলায় পতিত হইয়া রোদন করিতেছে। কোন কোন মাজিষ্ট্রেট সুবিচার করিতেছেন, তাঁহাদের হস্তে এ আইন যমদণ্ড হয় নাই। আহা! যদি সকলে অমরনগরের মাজিষ্ট্রেটের ন্যায় ন্যায়বান্ হইতেন, তবে কি রাইয়তের পাকা ধানে মই পড়ে, শস্যপূর্ণ ক্ষেত্রে শলভ পতন হয়? তা হলে কি আমায় এই দুস্তর বিপদে পতিত হইতে হয়? হে লেফ্টেনাণ্ট গভর্ণর! যেমন আইন করিয়াছিলে, তেমনি সজ্জন নিযুক্ত করিতে তবে এমন অমঙ্গল ঘটিত না। হে দেশপালক! যদি এমত একটি ধারা করিতে যে, মিথ্যা মোকদ্দমা প্রমাণ হইলে ফরিয়াদীর মেয়াদ হইবে; তাহা হইলে অমরনগরের জেল নীলকরে পুর্ণ হইত এবং তাহারা এমত প্রবল হইতে পারিত না —আমাদিগের মাজিষ্ট্রেট বদলি হইয়াছে, কিন্তু এ মােকদ্দামা শেষ পর্য্যন্ত এখানে থাকিবে, তাহা হইলেই আমাদিগের শেষ।
(সাবিত্রীর প্রবেশ।)
সাবি। নবীন! সব লাঙ্গল যদি ছেড়ে দাও তাহলেও কি দাদন নিতে হবে? লাঙ্গল গােরু সব বিক্রী করে ব্যবসা কর, তাতে যে আয় হবে সুখে ভােগ করা যাবে, এ যাতনা আর সহ্য হয় না।
নবীন। মা, আমারও সেই ইচ্ছ। কেবল বিন্দুর কর্ম্ম হওয়া অপেক্ষা করিতেছি। আপাততঃ চাস ছাড়িয়া দিলে সংসার নির্ব্বাহ হওয়া দুস্কর, এই জন্য এত ক্লেশেও লাঙ্গল কয়েক খান রাখিয়াছি।
সাবি। এই শিরঃপীড়া লয়ে কেমন করে যাবে বল দেখি? হা পরমেশ্বর! এমন নীল এখানে হয়েছিল। (নবীনের মস্তকে হস্তামর্ষণ।)
(রেবতীর প্রবেশ।)
রেবতী। মা ঠাকুরুণ! মুই কনে যাব, কি কর্বাে, কল্লে কি, ক্যান মত্তি এনেলাম। পরের জাত ঘরে অ্যানে সামাল দিতে পাল্লাম না। বড় বাবু মােরে বাঁচাও, মাের পরাণ ফ্যাটে বারহলো—মোর ক্ষেত্রমণিরি অ্যানে দাও, মোর সোনার পূতুল অ্যানে দাও।
সাবি। কি হয়েচে, হয়েচে কি?
রেবতী। ক্ষেত্র মোর বিকেল বেলা পেঁচোর মার সঙ্গে দাস-দিগিতি জল আন্তি গিয়েলো। বাগান দিয়ে আসবার সমে চার জন নেটেলাতে বাছারে ধরে নিয়ে গিয়েছে। পদী সর্ব্বনাশী দেখ্য়ে দিয়ে পেল্য়েচে। বড়বাবু, পরের জাত কি কল্লাম কেন এনেলাম, বড় সাধে সাদ দেবো ভেবেলাম।
সাবি। কি সর্ব্বনাশ! সর্ব্বনেশেরা সব কত্তে পারে—লোকের জমি কেড়ে নিচ্চিস্, ধান কেড়ে নিচ্চিস্, গোরু বাচুর কেড়ে নিচ্চিস্, লাটির আগায় নীল বুন য়ে নিচ্চিস্—তা লোক কেঁদিই হোক্, কোকিই হোক্ কচ্চে—একি! ভাল মানুষের জাত্ খাওয়া!
রেবতী। মা! আদ পেটা খেয়ে নীল কত্তি নেগিচি, যে ক কুড়োয় দাগ মার্লি, তাই বোন্লাম—রেয়ে ছোঁড়া জমি চসে, আর ফুলে ফুলে কেঁদে ওটে— মাটেত্তে অ্যাসে একথা শুনে পাগল হয়ে যাবে অ্যানে।
নবীন। সাধু কোথায়?
রেবতী। বাইরি বসে কান্তি নেগেচে।
নবীন। সতীত্ব, কুলমহিলার অয়স্কান্ত মণি, সতীত্ব ভূষণে বিভূষিতা রমণী কি রমণীয়া! পিতার সরপুর বৃকোদর জীবিত থাকিতে কুলকামিনী অপহরণ! এই মুহুর্ত্তেই যাইয়া কেমন দুঃশাসন দেখিব; সতীত্ব শ্বেত উৎপলে নীলমণ্ডূক কখনই বসিতে পারিবে না।
(নবীনের প্রস্থান)
সাবি।
সতীত্ব সােণর নিধি বিধিদত্ত ধন।
কাঙ্গালিনী পেলে রাণী এমন রতন।
যদি নীল বানবের হস্ত হইতে পবিত্র মাণিক্য অপবিত্র না হইতে হইতে আনিতে পার, তবেই তােমাকে সার্থক গর্ভে স্থান দিয়াছিলাম। এমন অত্যাচার বাপের কালেও শুনি নাই—চল ঘােষ বউ, বাইরের দিকে যাই।
(উভয়ের প্রস্থান)
তৃতীয় অঙ্ক।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
রোগ সাহেবের কাম্রা।
(রোগ আসীন। পদী ময়রাণী এবং ক্ষেত্রমণির প্রবেশ।)
ক্ষেত্র। ময়রাপিসি! মোরে এমন কথা বলো না, মুই পরাণ দিতি পার্বো, ধর্ম্ম দিতি পার্বো না, মোরে কেটে কুচি কুচি কর, মোরে পুড়্য়ে ফেল, ভেসয়ে দাও, পূঁতে রাখ, মুই পর পুরুষ ছুঁতি পার্বো না; মোর ভাতার মনে কি ভাব্বে?
পদী। তোর ভাতার কোথায়, তুই কোথায়? এ কথা কেউ জান্তে পার্বে না এই রাত্রেই আমি সঙ্গে করে তোর মায়ের কাছে দিয়ে আস্বো।
ক্ষেত্র। ভাতারই যেন জান্তি পার্লে না— ওপরের দেবতাতো জান্তি পার্বে, দেবতার চকিতো ধুলো দিতি পার্বো না। আমার প্রাণের ভিতরতো পাঁজার আগুণ জল্বে। মোর স্বামী সতী বলে যত ভাল বাস্বে, তত মোর মনতো পুড়তি থাক্বে, জানাই হোক্ আর অজানাই হোক্, মুই উপপতি কত্তি কখনই পার্বো না।
রোগ। পদ্ম! খাটের উপরে আন্ না।
পদ্ম। আয় বাচা তুই সাহেবের কাছে আয়, তাের যা বল্তে হয় ওকে বল, আমার কাছে বলা অরণ্যে রােদন।
রোগ। আমার কাছে বলা শুয়ারের পায়ে মুক্ত ছড়ান, হা হা হা! আমরা নীলকর, আমরা যমের দোসর হইয়াছি, দাড়িয়ে থেকে কত গ্রাম জ্বালাইয়া দিয়াছি, পুত্রকে স্তন ভক্ষণ করাইতে করাইতে কত মাতা পুড়ে মরিল, তা দেখে কি আমরা স্নেহ করি, স্নেহ করিলে কি আমাদের কুটি থাকে। আমরা স্বভাবতঃ মন্দ নই, নীলকর্ম্মে আমাদের মন্দ মেজাজ বৃদ্ধি হইয়াছে। এক জন মানুষকে মারিতে মনে দুঃখ হইত, এখন দশ জন মেয়ে মানুষকে নিদ্দম করিয়া রামকান্ত পেটা করিতে পারি, তখনি হাঁসিতে হাঁসিতে খানা খাই—আমি মেয়ে মানুষকে অধিক ভাল বাসি, কুটির কর্ম্মে ও কর্ম্মের বড় সুবিধা হইতে পারে; সমুদ্রে সব মিশ্য়ে যাইতেছে। তাের গায় জোর নাই?—পদ্ম! টানিয়া আন্।
পদী। ক্ষেত্রমণি! লক্ষী মা আমার, বিছানায় এস, সাহেব তােরে একটা বিবির পােষাক দেবে বলেচে।
ক্ষেত্র। পােড়া কপাল বিবির পােষাকের চট্ পরে থাকি সেও ভাল, তবু য্যান বিবির পােষাক পর্তি না হয়। ময়রা পিসি! মাের বড় তেষ্টা পেয়েছে, মােরে বাড়ী দিয়ে আয়, মুই জল খেয়ে শেতল হই আহা, আহা! মাের মা এত বেল্ গলায় দড়ি দিয়েচে,মাের বাপ মাথায় কুড়ুল মেরেচে, মাের কাকা বুনাে মষির মত ছুটে ব্যাড়াচ্চে। মাের মার আর নেই, বাবা কাকা দুজনের মধ্যি মুই অ্যাখ সন্তান। মােরে ছেড়ে দে, মােরে বাড়ী রেখে আয়, তাের পায় পড়ি; পদি পিসি, তাের গু খাই—মা-রে মলাম!—জল তেষ্টায় মলাম্।
রােগ। কুঁজোয় জল আছে খাইতে দেও।
ক্ষেত্র। মুই কি হিঁদুর মেয়ে হয়ে সাহেবের জল খাতি পারি—মােরে নেটেলায় ছুঁয়েচে, মুই বাড়ী গিয়ে না নেয়ে তাে ঘরে যাতি পার্বো না।
পদী। (স্বগত) আমার ধর্ম্মও গেচে, জাতও গেচে। (প্রকাশে) তা মা! আমি কি কর্বো, সাহেবের খপ্পরে পড়্লে ছাড়া ভার। ছােট সাহেব! ক্ষেত্রমণি আজ বাড়ী যাক্, তখন আর এক দিন আস্বে।
রােগ। তুমি তবে আমার সঙ্গে থেকে মজা কর। তুই ঘর হইতে যা, আমার শক্তি থাকে আমি নরম কর্বো, নচেৎ তাের সঙ্গে বাড়ী পাঠাইয়ে দিব—ড্যাম্নেড্হাের, আমার বোধ হইতেছে তুই বাধা করে ছিলি, আসিতে দিস্নি, তাইতে ভদ্র লােকের মেয়েকে লাটিয়াল দিয়ে আনা হইল, আমি সহজে নীলের লাটিয়াল একার্য্যে কখন দিয়াছি? হারাম্ জাদী পদিময়রাণী।
পদী। তােমার কলিকে ডাকো, সেই তােমার বড় প্রিয় হয়েছে, আমি তা বুঝিয়াছি।
ক্ষেত্র। ময়রা পিসি! যাস্নেময়রা পিসি!। যাস্নে।
(পদী ময়রাণীর প্রস্থান)
মােরে কাল সাপের গত্তের মধ্যি একা রেকে গেলি, মাের যে ভয় করে, মুই যে কাঁপ্তি, নেগিচি, মাের যে ভয়্তে গা ঘুরতি নেগেচে, মাের মুখ যে তেষ্টায় ধুলাে বেটে গেল।
রােগ। ডিয়ার! (দুই হস্থে ক্ষেত্রমণির দুই হস্থ ধরিয়া টানন) আইস, আইস—
ক্ষেত্র। ও সাহেব! তুমি মাের বাবা; ও সাহেব! তুমি মাের বাবা, মােরে ছেড়ে দেও, পদী পিসির সঙ্গে দিয়ে মােরে বাড়ী পেট্য়ে দাও, আঁদার রাত, মুই একা যাতি পার্বাে না—(হস্ত ধরিয়া টানন) ও সাহেব! তুমি মাের বাবা, ও সাহেব? তুমি মাের বাবা, হাত ধল্লি জাত যায়, ছেড়ে দাও—তুমি মোর বাবা!
রােগ। তাের ছেলিয়ার বাবা হইতে ইচ্ছা হইয়াছে, আমি কোন কথায় ভুলিতে পারি না, বিছানায় আইস, নচেৎ পদাঘাতে পেট ভাঙ্গিয়া দিব।
ক্ষেত্র। মাের ছেলে মরে যাবে, দই সাহেব, মাের ছেলে মরে যাবে—মুই পােয়াতি!
রােগ। তােমাকে উলঙ্গ না করিলে তোমার লজ্জা যাইবে না।
(বস্ত্র ধরিয়া টানন।)
ক্ষেত্র। ও সাহেব! মুই তােমার মা, মােরে ন্যাংটো করাে না, তুমি মাের ছেলে, মাের কাপড় ছেড়ে দাও
(রোগের হস্তে নখ বিদারণ)
রােগ। ইন্কর্ন্যাল বিচ্! (বেত্র গ্রহণ করিয়া) এই বার তােমার ছেনালি ভঙ্গ হইবে।
ক্ষেত্র। মােরে অ্যাক্বারে মেরে ফ্যাল, মুই কিছু বল্বাে না। মাের বুকি অ্যাকটা তেরোনালের খোঁচা মার্ মুই স্বগ্গে চলে যাই—ও গুখেগাের বেটা, আঁটকুড়ির ছেলে, তাের বাড়ী যােড়া মরা মরে, মাের গায়ে যদি আবার হাত দিবি, তাের হাত মুই এঁচ্ড়ে কেম্ড়ে টুক্রাে টুক্রাে কর্বো, তোর মা বুন নেই, তাদের গিয়ে কাপড় কেড়ে নিগে না, দেঁড়য়ে রলি কেন, ও ভাই ভাতারির ভাই! মার না, মোর প্রাণ বার করে ফ্যাল না, আর যে মুই সইতি পারি নে।
রোগ। চুপ রাও হারামজাদী, ক্ষুদ্র মুখে বড় কথা।
(পেটে ঘুসি মারিয়া চুল ধরিয়া টানন)
ক্ষেত্র। কোথায় বাবা! কোথায় মা! দেখগো, তােমাদ্দের ক্ষেত্র মলে গাে (কম্পন)
(জানেলার খড়খড়ি ভাঙ্গিয়া নবীনমাধব ও তােরাপের
প্রবেশ।)
নবীন। (রােগের হস্ত হইতে ক্ষেত্রমণির কেশ ছাড়াইয়া লইয়া) রে নরাধম, নীচবৃত্তি, নীলকর! এই কি তােমার খ্রীষ্টান ধর্ম্মের জিতেন্দ্রিয়তা? এই কি তােমার খ্রীষ্টানের দয়া, বিনয়, শীলতা? আহা, আহা! বালিকা, অবলা, অন্ত্বর্ব্বত্নী কামিনীর প্রতি এই রূপ নির্দ্দয় ব্যবহার!
তােরাপ। সুমুন্দি দেঁড়িয়ে যেন কাটের পুতুল—গােডার বাক্যি হরে গিয়েছে—বড় বাবু! সুমুন্দির কি এমান আছে তা ধরম কথা শােন্বে, ও ঝ্যামন কুকুর মুই তেমনি মুগুর, সুমুন্দির ঝ্যামন চাবালি, মাের তেমনি হাতের পোঁচা (গলদেশ ধরিয়া গালে চপেটাঘাত) ডাকবি তাে যােমের বাড়ী যাবি (গাল টিপে ধরে) পাঁচ দিন চোরের এক দিন সেদের, পাঁচ দিন খাবালি এক দিন খা (কান মলন)
নবীন। ভয় কি ভাল করে কাপড় পর (ক্ষেত্রমণির বস্ত্র পরিধান) তােরাপ! তুই বেটার গাল টিপে রাখিস্, আমি ক্ষেত্রকে পাঁজা করে লইয়া পালাই—আমি বুনােপাড়া ছাড়্য়ে গেলে তবে ছেড়ে দিয়ে তুই দৌড় দিবি। নদীর ধার দিয়া যাওয়া বড় কষ্ট, আমার শরীর কাঁটায় ছড়ে গিয়েছে, এতক্ষণ বোধ করি বুনােরা ঘূময়েছে, বিশেষতঃ একথা শুন্লে কিছু বল্বে না, তুই তার পর আমাদের বাড়ী যাস, তুই কি রূপে ইন্দ্রাবাদ হইতে পালাইয়ে এলি এবং এখন কোথায় বাস করিতেছিস তাহা আমি শুন তে চাই।
তােরাপ। মুই এই নাতি নদীডে সাঁত্রে পার হয়ে ঘরে যাব—মোর নছিবির কথা আর কি শোন্বা—মুই মোক্তার সুমুন্দির আস্তাবলের ঝরকা ভেঙ্গে পেলয়ে একেবারে বসন্তবাবুর জমিদারীতে পেলয়ে গ্যালাম, তার পর নাতকরে জরু ছাবাল ঘর পোর্লাম! এই সুমুন্দিই তো ওটালে, নাঙ্গল করে কি আর খাবার যো নেকেচে, নীলের ঠ্যালাটি কেমন—তাতে আরার নেমোখারামী কত্তি বলে—কই শালা, গ্যাড্ ম্যাড্ করে জুতার গুতা মারিস্ নে?
(হাঁটুর গুতা)
নবীন। তোরাপ! মার্বার আবশ্যক কি, ওরা নির্দ্দয় বলে আমাদের নির্দ্দয় হওয়া উচিত নয়; আমি চলিলাম।
(ক্ষেত্রকে লইয়া নবীনমাধবের প্রস্থান।)
তোরাপ। এমন বস্গারও বেছাপ্পর কত্তি চাস—তোর বড় বাবারে বলে মেন্য়ে জুন্য়ে কাজ মেরে নে, জোর জোরাবতি কদিন চলে, পেলিয়ে গেলিতো কিছু কত্তি পার্বা না, মরার বাড়াতে গাল্ নেই! ও সুমুন্দি, নেয়েত্ ফেরার হলি ঝে কুটি কবরের মধ্যি ঢোক্বে। বড়বাবুর আরবচুরে টাকা গুনন চুক্য়ে দে, আর এবচোর ঝা বুন তি চাচ্ছে তাই নিগে, তোদের জন্যই ওরা বেপালটে পড়েচে, দাদন গাদ লিইতো হয় না, চসা চাই—ছোট সাহেব, স্যালাম, মুই আসি।
(চিত করিয়া ফেলিয়া পলায়ন।)
রোগ। বাই জোভ! বিটেন টু জেলি।
(প্রস্থান)
তৃতীয় অঙ্ক।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
গোলোক বসুর ভবনের দরদালান।
(সাবিত্রীর প্রবেশ।)
সাবিত্রী। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্ব্বক) রে নিদারুণ হাকিম! তুই আমাকেও কেন তলব দিলিনা—আমি পতি পুত্রের সঙ্গে জেলায় যেতাম। এ শ্মশানে বাস অপেক্ষা আমার সে যে ছিল ভাল। হা! কর্ত্তা আমার ঘরবাসী মানুষ—কখন গাঁ অন্তরে নিমন্ত্রণ খেতে যান না, তাঁর কপালে এত দুঃখ, ফোজদুরীতে ধরে নেগেল, তাঁর জেলে যেতে হবে; ভগবতি! তোমার মনে এই ছিল মা? আহা হা! তিনি যে বলেন আমার এড়োঘরে না শুলে ঘুম হয় না, তিনি যে আতপ চালের ভাত খান, তিনি যে বড় বউমার হাতে নইলে খান্ না, আহা! বুক চাপ্ড়ে চাপ্ড়ে রক্ত বার করেছেন, কেঁদে কেঁদে চক্ষু ফুলিয়েছেন, যাবার সময় বলেন “গিন্নি! এই যাত্রা আমার গঙ্গাযাত্রা হলাে”— (ক্রন্দন) নবীন বলেন, “মা! তােমার ভগবতীকে ডাক, আমি অবশ্য জয়ী হয়ে ওঁরে নিয়ে বাড়ী আস্বাে”—বাবার আমার কাঞ্চনমুখ কালী হয়ে গিয়েছে, টাকার যােগাড় করিতেইবা কত কষ্ট, ঘুরে ঘুরে ঘুর্ণি হয়েছে, পাছে আমি বউদের গহনা দিই, তাই আমারে সাহস দেন, মা টাকার কমি কি, মােকদ্দমায় কতই খরচ হবে। গাঁতির মােকদ্দমায় আমার গহনা বন্দক পড়্লে বাবার কতই খেদ—বলেন কিছু টাকা হতে এলেই মার গহনা গুলিন আগে খালাস করে আন্বাে—বাবার আমার মুখে সাহস, চক্ষে জল— বাবা আমার কাঁদিতে কাঁদিতে যাত্রা কর্লেন—আমার নবীন এই রােদে ইন্দ্রাবাদ গেল,আমি ঘরে বসে রলাম, মহাপাপিনী! এই কি তাের মার প্রাণ!—
(সৈরিন্ধ্রীর প্রবেশ।)
সৈরি। ঠাকুরুণ অনেক বেলা হয়েচে, স্নান কর। আমাদের অভাগা কপাল, তা নইলে এমন ঘটনা হবে কেন।
সাবিত্রী। (ক্রন্দন করিতে করিতে) না মা! আমার নবীন বাড়ী না ফিরে এলে আমি আর এদেহে অন্ন জল দেব না, বাছারে আমার খাওয়াবে কে?
সৈরি। সেখানে ঠাকুরপোর বাসা আছে, বামন আছে, কষ্ট হবেনা। তুমি এস স্নান করসে।
(তৈলপাত্র লইয়া সরলতার প্রবেশ।)
ছোট বউ! তুমি ঠাকুরুণকে তৈল মাখায়ে স্নান করায়ে রান্নাঘরে নিয়ে এস, আমি খাওয়ার জায়গা করিগে।
(সৈরিন্ধ্রীর প্রস্থান সরলতার তৈলমর্দ্দন।)
সাবিত্রী। তোতাপাখী আমার নীরব হয়েছে, মার মুখে আর কথা নাই, মা আমার বাসি ফুলের মত মলীন হয়েছেন। আহ, আহা! বিন্দুমাধবকে কত দিন দেখি নাই, বাবার কালেজ বন্দ হবে বাড়ী অস্বেন আশা করে রইচি, তাতে এই দায় উপস্থিত! (সরলতার চিবুকে হস্ত দিয়া) বাছার মুখ শুকাইয়া গিয়াছে, এখনো বুঝি কিছু খাউনি? ঘোর বিপদে পড়ে রইচি, তা বাছাদের খাওয়া হলো কি না, দেখিব কখন্? আমি আপনি স্নান করিতেছি, তুমি কিছু খাওগে মা, চল আমিও যাই।
(উভয়ের প্রস্থান)
দ্বিতীয় অঙ্ক
দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
বেগুনবেড়ের কুটির গুদাম ঘর।
(তোরাপ ও আর চারি জন রাইয়ত উপবিষ্ট)
তােরাপ। ম্যারে ক্যান ফ্যালায় না, মুই নেমােখ্যারামি কভি পার্বো না—ঝে বড় বাবুর জন্যি জাত বাঁচেচে, ঝার হিল্লেয় বসতি কত্তি নেগিচি, ঝে বড় বাবু হাল গােরূ বেঁচেয়ে নে ব্যাড়াচ্চে, মিত্যে সাক্ষি দিয়ে সেই বড় বাবুর বাপ্কে কয়েদ করে দেব? মুই তাে কখনুই পার্বাে না—জান কবুল।
প্রথম রাই। কুঁদির মুখি বাঁক্ থাকবে না, শ্যামচাঁদের ঠ্যালা বড় ঠ্যালা। মোদের চকি কি আর চামড়া নেই, না মােরা বড় বাবুর নুন খাইনি—করবো কি, সাক্ষি না দিলি যে আস্ত রাখে না—উট সাহেব মাের বুকি দেঁড়য়ে ঊটেলো—দ্যাদিনি
অ্যাকন তবাদি অক্ত ঝােজানি দিয়ে পড়চে—গোডার পা য্যান বল্দে গােরুর খুর।
দ্বিতীয়। প্যারেকের খোঁচা—সাহেবেরা যে প্যারেক্মারা জুতাে পরে, জানিসনে!
তােরাপ। (দন্ত কিড়মিড় করিয়া) দুত্তোর প্যারেকের মার প্যাট করে, লৌ দেখে গাডা মাের ঝাঁকি মেরে ওট্চে। উঃ কি বলবো—সমিন্দির অ্যাকবার ভাতারমারির মাটে পাই, এম্নি থাপ্পোড় ঝাঁকি, সমিন্দির চাবালিডে আসমানে উড়্য়ে দেই, ওর গ্যাড্ ম্যাড্ করা হের ভেতর দে বার করি।
তৃতীয়। মুই টিকির—জোন খাটে খাই। মুই কত্তা মশার সলা শুনে নীল কল্লাম না, তবে বল্লিতো খাটবে না, তবে মােরে গুদোমে পাের লে ক্যান—তানার সেমনতোনের দিন ঘুনয়ে এস্তেচে, ভেবেলাম এই হিড়িকি খাটে কিছু পূঁজি কর্বো করে সেমনতোনের সমে পাঁচ কুটম্বুর খবর নেব, তা গুদোমে ৫দিন পচতি লেগিচি আবার ঠ্যালবে সেই আন্দার বাদ।
দ্বিতীয়। আন্দারবাদে মুই অ্যাকবার গিয়েলাম—ঐ যে ভাবনাপুরীর কুটি, যে কুটির সাহেবডারে সকলি ভালবলে—ঐসুমুন্দি মাের অ্যাকবার ফোজদুরিতি ঠেলেলো। মুই সেবের কেচ্রির ভেতর অনেক তামসা দেখেলাম। ওয়াঃ! ন্যাজের কাছে বসে মাচেরটক সাহেব যেই হ্যাল মেরেছে, দুই সুমুন্দি মােক্তার ওমনি র,র, করে অ্যাসেছে, হেড়া হেড়ি যে কত্তি নেগলো, মুই ভাবলাম ময়নার মাটে সাদখাঁদের ধলা দামড়া আর জমাদ্দারদের বুদো এড়ের নড়ুই বেদ্লাে।
তােরাপ। তাের দোষ পেয়েলো কি? ভাবনাপুরীর সাহেবতো মিছে হ্যাংনামা করে না। সাচা কথা করে। ঘােড়া চড়ে সাব। সব সুমিন্দি যদি ঐ সুমিন্দির মত হতাে তা হলি সুমিন্দিগার এত বদ্নাম নট্তাে না।
দ্বিতীয়। আহ্লাদে যে আর বাঁচিনে গা।
ভাল ভাল করে গ্যালাম কেলাের মার কাছে।
কেলোর মা বলে আমার জামার সঙ্গে আছে।
এব্রে ও সুমিন্দির ইকসুল করা বেইরে গেছে, সুমিন্দির গুদোম্তে সাতটা রেয়েত বেইরেছে। অ্যাকটা নিচু ছেলে। সুমিন্দি গাই বাচুর গুদমে ভরলে—সুমিন্দি যে ঘাটা মাত্তি লেগেছে, বাবা!
তােরাপ। সুমিন্দিরে ভাল মানুষ পালি খ্যাতি আসে, মাচেরটক্ সাহেবডারে গাংপার করবার কোমেট কত্তি লেগেছে।
দ্বিতীয়। এ জেলার মাচেরটক্ না—ওজেলার মাচেরটকের দোষ পালে কি তাওতো বুঝ্তি পাচ্চিনে।
তোরাপ। কুটি খাতি যাইনি। হাকিমডেরে গাঁতবার জন্যি খানা পেক্য়েলো, হাকিমডে চোরা গোরুর মত পেল্য়ে রলো, খাতি গেল না—ওডা বড় নোকের ছাবাল, নীল মামদোর বাড়ী যাবে ক্যান। মুই ওর অণ্ডেরা পেইচি, এ সুমিন্দিরে বেলাতের ছোট নোক।
প্রথম। তবে এগোনের গারনাল সাহেব কুটি কুটি আইবুডো ভাত খেয়ে বেড়্য়েলো ক্যামন করে? দেখিস্নি, সুমিন্দিরে গোঁট বেঁদে তাঁনারে বর সেজ্য়ে মোদের কুটিতি এনেলো?
দ্বিতীয়। তানার বুঝি ভাগ ছেল।
তোরাপ। ওরে না, লাট সাহেব কি নীলির ভাগ নিতি পারে। তিনি নাম কিন্তি এয়েলেন। হালের গারনাল সাহেবডারে যদি খোদা বেঁচ্য়ে রাকে, মোরা প্যাটের ভাত করে খাতি পার্বো, আর সুমিন্দির নীল মামদো ঘাড়ে চাপ্তি পার্বে না —
তৃতীয়। (সভয়ে) মুই তবে মলাম, মামদোভূতি পালি নাকি ঝক্কোতে ছাড়ে না? বউ যে বলেলাে।
তােরাপ। এমান্নির ভাইরি আনেছে ক্যান! মান্নির ভাই নচা কথা সােমােজ কত্তি পারে না—সাহেবগার ডরে নেক সব গাঁ ছাড়া হতি নেগলাে, তাই বচোরদ্দি নানা নচে দিয়েলো —
ব্যারাল চকো হাঁদা হেম্দো।
নীলকুটির নীল মেম্দো।
বচোরদ্দি নানা কবি নচ্তি খুব।
দ্বিতীয়। নিতে আতাই একটা নচেচে সুনিস্ নি?
“জাত মাল্লে পাদ্রি ধরে।
ভাত মাল্লে নীল বাঁদরে॥”
তােরাপ। এওল নচন নচেচে; “জাত মাল্লে” কি?
দ্বিতীয়।
“জাত মাল্লে পাদ্রি ধরে।
ভাত মাল্লে নীল বাঁদরে॥”
চতুর্থ। হা! মাের বাড়ী যে কি হতি নেগেছে তা কিছুই জান্তি পাল্লাম না—মুই হলাম ভিনগাঁর রেয়েত, মুই স্বরপুর আলাম কবে, তা বস মশার সলায় পড়ে দাদন ঝ্যাড়ে ফ্যাল লাম? মাের কোলের ছেলেডার গা তেতো করেলাে তাইতি বস মশার কাছে মিচ্রি নিতি অ্যাকবার স্বরপুর আয়েলাম। আহা কি দয়ার শরীল, কি চেহারার চটক, কি অরপুরুবরূপে দেখেলাম, বসে আছেন য্যান গজেন্দ্রগামিনী।
তােরাপ। এবার ক কুড়াে ঢুক্য়েছে?
চতুর্থ। গ্যালবার দশ কুড়ো করেলাম, তার দাম দিতি আদা খ্যাচ্ড়া কল্লে —এবারে ১৫ বিঘের দাদন গতিয়েছে, ঝা বলচে তাই কচ্চি তবুতাে ব্যাভ্রম কত্তি ছাড়ে না।
প্রথম। মুই দুবচ্ছোর ধরে নাঙ্গ্ল দিয়ে এক বন্দ জমি তোল্লাম, এইবারে যাে হয়েলাে, তিলির জন্যিই জমিডে রেখেলাম, সে দিন ছােট সাহেব ঘােড়া চাপে অ্যাসে দেড়্য়ে থেকে জমিডের মার্গ মারালে—চাসার কি আর বাচন আছে?
তােরাপ। এডা কেবল আমীন সুমিন্দির হির ভিতি। সাহেব কি সব জমি খবর নাকে। ঐ সুমিন্দি সব ঢুঁড়ে বার করে দেয়। সুমিন্দি য্যান হন্নে কুকুরের মত ঘুরে ব্যাড়ায়, ভাল জমিডে দ্যাখে, ওমনি সাহেবের মার্গ মারে। সাহেবের তাে ট্যাকার কমি নি, ওরতাে আর মহাজন কত্তি হয় না, সুমিন্দি তবে ওমন করে ক্যান—নীল কর্বি তা কর, দামড়া গোরু কেন্, নাঙ্গল বেন্য়ে নে, নিজি না চস্তি পারিস মেইন্দার রাঘ, তাের জমির কমি কি, গাঁকে গাঁ ক্যান চসে ফ্যাল্না, মােরা গাঁতা দিতিতো নারাজ নই, তা হলি দু সনে নীল যে ছেপ্য়ে উট্তি পারে, সুমিন্দি তা কর বে না, মান্নির ভার নেয়েতের হেই বড় মিষ্টি নেগেছে, তাই চোস্চেন, তাই চোস্চেন (নেপথ্যে হো, হো, হো, মা, মা,) গাজিসাহেব, গাজিসাহেব, দরগা, দরগা, তােরা আম নাম কর, এডার মধ্যি ভুত আছে। চুপদে চুপদে——
(নেপথ্যে—হা নীল! তুমি আমারদিগের সর্ব্বনাশের জন্যেই এদেশে এসেছিলে—আহা! এ যন্ত্রণা যে আর সহ্য হয় না, এ কান্সারনের আর কত কুটি আছে না জানি, দেড় মাসের মধ্যে ১৪ কুটির জল খেলেম, এখন কোন্ কুটিতে আছি তাওতাে জানিতে পারিলাম না, জানিবই বা কেমন করে, রাত্রি যোগে চক্ষু বন্ধন করিয়া এক কুটি হইতে অন্য কুটি লইয়া যায়, উঃ মাগাে তুমি কোথায়!)
তৃতীয়। আম, আম, আম, কালী, কালী, দুর্গা, গণেশ, অসুর!—তােরাপ! চুপ, চুপ।
(নেপথ্যে) আহা! ৫ বিঘা হারে দাদন লইলেই এ নরক হইতে ত্রাণ পাই—হে মাতুল! দাদন লওয়াই কর্ত্তব্য, সংবাদ দিবার তাে আর উপায় দেখিনে, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছে, কথা কহিবার শক্তি নাই, মাগাে! তােমার চরণ দেড় মাস দেখিনি।
তৃতীয়। বউরি গিয়ে এ কথা বলবাে—শুনলি তাে মর্যে ভুত হয়েছে তবু দাদনের হাত ছাড়িতি পারিনি।
প্রথম। তুই মিনসে এমন হেবলাে—
তােমরা ভাল মানসির ছাবাল—মুই কথায় জান্তি পেরিছি—পরাণে চাচা, মােরে কাঁদে কত্তি পারিস, মুই ঝরকা দিয়ে ওরে পুচ করি, ওর বাড়ি কনে—
প্রথম। তুই যে নেড়ে।
তােরাপ। তবে তুই মাের কঁদে উটে দ্যাক্ —(বসিয়া ওট—কান্ধে উঠন) দ্যাল ধরিস, ঝরকার কাছে মুখ নিয়ে যা— (গােপীনাথকে দুরে দেখিয়া) চাচা লাব, চাচা লাব, গুপে সুমিন্দি আস্চে (প্রথম রাইয়তের ভূমিতে পতন)
(গোপীনাথ ও রামকান্ত হস্তে করিয়া
রোগসাহেবের প্রবেশ।)
তৃতীয়। দেওয়ানজি মশাই, এই ঘরডার মধ্যি ভুত আছে। এত বেল কানতি নেগেলাে।
গোপী। তুই যদি যেমন শিখাইয়া দেই তেমনি না বলিস তবে তুই ওমনি ভূত হবি। (জনান্তিকে রােগের প্রতি) মজুমদারের বিষয় এরা জানিয়াছে, এ কুর্টিতে আর রাখা নয়। ওঘরে রাখাই অবিধি হইয়াছিল।
রোগ। ও কথা পরে শােনা যাবে। নারাজ আছে কে, কোন বর্জ্জাত নষ্ট (পায়ের শব্দ)
গােপী। এরা সব দোরস্ত হয়েছে। এই নেড়ে বেটা ভারি হারামজাদা, বলে নেমকহারামি করতে পারিব না।
তােরাপ। (স্বগত) বাবারে! যে নাদনা, অ্যাকন তাে নাজি হই, ত্যাকন ঝা জানি তা করবাে। (প্রকাশে) দোই সাহেবের, মুই ও সােদা হইচি।
রোগ। চপরাও, শূয়ারকি বাচ্চা। রামকান্ত বড় মিষ্টি আছে (রামকান্তাঘাত এবং পায়ের, গুতা)
তোরাপ। আল্লা! মাগো গ্যালাম, পরাণে চাচা; একটু জল দে, মুই পানি তিসেয় মলাম, বাবা, বাবা, বাবা—
রােগ। তাের মুখে পেসাব করে দেবে না? (জুতার গুতা)
তোরাপ। মােরে ঝা বলবা মুই তাই করবাে— দোই সাহেবের, দোই সাহেবের, খােদার কসম।
রােগ। বাঞ্চতের হারাম জাদকি ছেড়েছে। আজ রাত্রে সব চালান দেবে। মুক্তিয়ারকে লেখ, সাক্ষ্য আদায় না হােলে কেউ বাইরে যেতে না পায়। পেস্কার সঙ্গে যাবে—(তৃতীয় রাইয়তের প্রতি) তোম রোতা হায় কাহে? (পায়ের গুতা)
তৃতীয়। বউ তুই কনেরে, মােরে খুন কর্যে ফ্যালালে, মারে, বউরে, মারে, মেলেরে, মেলেরে, (ভুমিতে চিত হইয়া পতন)
রােগ। বাঞ্চৎ বাউরা হায়।
(রোগের প্রস্থান।)
গােপী। (কমন তোরাপ, প্যাঁজ পয়জার দুইতাে হলাে।
তােরাপ। দেওয়ানজি মশাই, মােরে এট্টু পানি দিয়ে বাঁচাও, মুই মলাম।
গোপী। বাবা নীলের গুদাম, ভাবরার ঘর, ঘামও ছােটে, জলও খাওয়া যায়। আয় তাের। সকলে আয়, তােদের একবার জল খাইয়ে আনি।
(সকলের প্রস্থান।)
দ্বিতীয় অঙ্ক।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
(বিন্দুমাধবের শয়নঘর।)
(লিপি হস্তে সরলতা উপবিষ্ট।)
সর।
সরলা ললন জীবন এল না।
কমল হৃদয় দ্বিরদ দলনা
বড় আশায় নিরাশ হলেম। প্রাণেশ্বরের আগমন প্রতীক্ষায় নব সলিল শীকরাকাঙিক্ষণী চাতকিনী অপেক্ষাও ব্যাকুল হয়েছিলাম। দিন গণনা করিতেছিলাম যে দিদি বলেছিলেন, তাতে মিথ্যা নয়, আমার এক এক দিন এক এক বৎসর-গিয়েছে। —(দীর্ঘনিশ্বাস) নাথের আসার আশা তাে নির্ম্মূল হইল; এক্ষণে যে মহৎ কার্য্যে প্রবৃত্ত হয়েছেন তাহাতে সফল হইলেই তাঁর জীবন সার্থক—প্রাণেশ্বর, আমাদের নারীকুলে জন্ম, আমরা পাঁচ বয়স্যায় একত্রে উদ্যানে যাইতে পারি না, আমরা নগর ভ্রমণে অক্ষম, আমাদিগের মঙ্গলসূচক সভা স্থাপন সম্ভব না, আমাদের কালেজ নাই, কাছারী নাই, ব্রাহ্মসমাজ নাই—রমণীর মন কাতর হইলে বিনােদনের কিছু মাত্র উপায় নাই, মন অবোধ হইলে মনেরতো দোষ দিতে পারি না। প্রাণনাথ আমাদের একমাত্র অবলম্বন—স্বামীই ধ্যান, স্বামীই জ্ঞান, স্বামীই অধ্যয়ন, স্বামীই উপার্জ্জন, স্বামীই সভা, স্বামীই সমাজ, স্বামীরই সতীর সর্ব্বস্বধন। হে লিপি! তুনি আমার হৃদয় বল্লভের হস্ত হইতে আসিয়াছ, তােমাকে চুম্বন করি, [লিপি চুম্বন] তােমাতে আমার প্রাণকান্তের নাম লেখা আছে, তােমাকে তাপিত বক্ষে ধারণ করি, [বক্ষে ধারণ] আহা! প্রাণনাথের কি অমৃত বচন, পত্রখানি যত পড়ি ততই মন মােহিত হয়, আর একবার পড়ি (পঠন)
“প্রাণের সরলা!
তােমার মুখারবিন্দ দেখিবার জন্য আমার প্রাণ যে কি পর্য্যন্ত্ব ব্যাকুল হইয়াছে তাহা পত্রে ব্যক্ত করা যায় না! তােমার চন্দ্রানন বক্ষে ধারণ করিয়া আমি কি অনির্ব্বচনীয় সুখ লাভ করি। মনে করিয়াছিলাম সেই সুখের সময় আসিয়াছে, কিন্তু হরিষে বিষাদ, কালেজ বন্ধ হইয়াছে, কিন্তু বড় বিপদে পড়িয়ছি, যদি পরমেশ্বরের আনুকূল্যে উত্তীর্ণ হইতে না পারি তবে আর মুখ দেখাইতে পারিব না নীলকর সাহেবেরা গােপনে গােপনে পিতার নামে এক মিথ্যা মােকদ্দমা করিয়াছে, তাহাদের বিশেষ যত্ন তিনি কোনরূপে কারাবদ্ধ হন। দাদা মহাশয়কে এ সংবাদ আনুপূর্ব্বিক লিখিয়া আমি এখানকার তদ বিরে রহিলাম। তুমি কিছু ভাবনা করাে না, করুণাময়ের কৃপায় অবশ্যই সফল হইব। প্রেয়সি, আমি তােমার বঙ্গভাষার সেস্কপেয়ারের কথা ভূলি নাই, এক্ষণে বাজারে পাওয়া যায় না, কিন্তু প্রিয়বয়স্য বঙ্কিম তাঁহার খান দিয়েছেন বাড়ি যাইবার সময় লইয়া যাইব—বিধুমুখি, লেখা পড়ার সৃষ্টি কি সুখের আকর, এত দূরে থাকিয়াও তােমার সহিত কথা কহিতেছি। আহা! মাতাঠাকুরাণী যদি তােমার লিখনের প্রতি আপত্তি না করিতেন, তবে তােমার লিপিসুধা পান করে আমার চিত্তচকোর চরিতার্থ হইত ইতি।
তােমারি বিন্দমাধব।”
তােমারি———তাতে আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে, প্রাণেশ্বর, তােমার চরিত্রে যদি দোষ স্পর্শে তবে সুচরিত্রের আদর্শ হবে কে? আমি স্বভাবতঃ চঞ্চল, এক স্থানে এক দণ্ড স্থির হয়ে বসিতে পারিনে বলে ঠাকুরুণ আমাকে পাগ্লির মেয়ে বলেন। এখন আমার সে চাঞ্চল্য কোথায়! যে স্থানে বসে প্রাণপতির পত্র খুলিয়াছি সেই স্থানেই এক প্রহর বসে আছি। আমার উপরে চঞ্চলতা অন্তরে প্রবেশ করিয়াছে। ভাত উথলিয়া ফেনা সমূহে আবৃত হইলে উপরিভাগ স্থির হয়, কিন্তু ভিতরে ফুটিয়া থাকে; আমি এখন সেইরূপ হইলাম। আর আমার সে হাস্য বদন নাই। হাসি মুখের রমণী; সুখের বিনাশে হাসির সহমরণ। প্রাণনাথ, তুমি সফল হইলেই সকল রক্ষা, তােমার বিরস বদন দেখিলে আমি দশদিক্ অন্ধকার দেখি। হে অবােধ মন! তুমি প্রবােধ মনিবে না? তুমি কি অবােধ হইলে পার আছে, তােমার কান্না কেহ দেখিতে পায় না, কেহ শুনিতেও পায় না; কিন্তু নয়ন, তুমিই আমাকে লজ্জা দেবে (চক্ষু মুছিয়া) তুমি শান্ত না হইলে আমি ঘরের বাহিরে যেতে পারিনে —
(আদুরীর প্রবেশ।)
আদুরী। তুমি কত্তি লেগেচো কি? বড় হালদার্ণি যে ঘাটে যাতি পাচ্চে না; বল্লে কি, ঝার পানে চাই তানারি মুখ তােলো হাঁড়ি —
সর। (দীর্ঘ নিশ্বাস) চল যাই।
আদুরী। তেলে দেক্চি অ্যাকন হাত দেউনি। চূলগল্লাডা কাদা হতি লেগেছে; চিটিখান অ্যাকন ছাড়নি —ছােট হালদার ক্যাত চিটিতি মাের নাম ন্যাকে দেয়।
সর। বড় ঠাকুর নেয়েছেন?
আদুরী। বড় হালদার যে গাঁয় গ্যাল, জ্যালায় যে মকদ্দমা হতি লেগেছে, তােমার চিটিতি ন্যাকিনি—কত্তামশা যে কান্তি নেগ্লো।
সর। (স্বগত) প্রাণনাথ, সফল না হইলে যথার্থই মুখ দেখাইতে পারিবে না, (প্রকাশে) চল রান্না ঘরে গিয়ে তেল মাখি।
(উভয়ের প্রস্থান)
দ্বিতীয় অঙ্ক।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
সরপুর তেমাতা পথ।
(পদী ময়রাণীর প্রবেশ)
পদী। আমিন আঁটকুড়ির বেটাইতাে দেশ মজাচ্ছে। আমার কি সাধ, কচি কচি মেয়ে সাহেবেরে ধরে দিয়ে আপনার পায় আপনি কুড়ুল মারি—রেয়ে যে খেঁটে এনেছিল, সাধুদাদা না ধর্লিই জম্মের মত ভাত কাপড় দিত—আহা! ক্ষেত্রমণির মুখ দেখলে বুক ফেটে যায়—উপপতি করিছি বলে কি আমার শরীরে দয়া নেই— আমারে দেখে ময়রা পিসি, ময়রা পিসি, বলে কাছে আসে। এমন সােণার হরিণ, মা নাকি প্রাণ ধরে বাঘের মুখে দিতে পারে।— ছােট সাহেবের আর আগায় না, আমি রয়েছি, কলিবুনো রয়েছে—মাগাে কি ঘৃণা, টাকার জন্যে জাত জন্ম গেলো, বুনাের বিছানা ছুঁতে হলো—বড় সাহেব ড্যাক্রা আমারে দ্যাক্মার করেছে, বলে নাক কান কেটে দেবে—ড্যাক্রার ভমরতি হয়েছে, ভাতার খাগির ভাতার মেয়ে মানুষ ধরে গুদমে রাখ্তে পারে, মেয়ে মান্ষের পাছায় নাতি মার্তে পারে, ড্যাকরার সে রকমতাে এক দিন দেখ্লাম না। যাই আমিন কালামুখরে বলিগে, আমারে দিয়ে হবে না—আমার কি গাঁয় বেরােবার যো আছে, পাড়ার ছেলে আঁটকুড়ির বেটারা আমারে দেখ্লে যেন কাকের পিছনে ফিঙ্গে লাগে। (নেপথ্যে গীত।)
“যখন ক্ষ্যাতে, ক্ষ্যাতে বসে ধান কাটি।
মাের মনে জাগে, ও তার লয়ান দুটি॥”
(এক জন রাখালের প্রবেশ)
রাখাল। সায়েব, তােমার নীলির চারায় নাকি পোক ধরেছে?
পদী। তাের মা বনের গে ধরুক, আঁটকুড়ির বেটা, মার্ কোল ছেড়ে যাও, যমের বাড়ী যাও, কল্মি ঘাটায় যাও
রাখাল। মুই দুটো নিড়িন গড়াতি দিইচি—
(এক জন লাঠিয়ালের প্রবেশ)
বাবারে! কুর্টির নেটেলা!
(রাখালের বেগে পলায়ন)
লাঠি। পদ্মমুখি, মিশি মাগগি করে তুল্যে যে।
পদী। (লাঠিয়ালের গােটের প্রতি দৃষ্টি করে) তাের চন্দরহারের যে বাহার ভারি।
লাঠি। জান না প্রাণ, প্যায়দার পােষাক, আর নটীর বেশ।
পদী। তাের কাছে একটা কালাে বক্না চেয়ে ছিলুম, তা তুই আজও দিলিনে। আর কখনতাে ভাই তাের কাছে কিছু চাব না—
লাঠি। পদ্মমুখি, রাগ করিস্নে। আমরা কাল শ্যামনগর লুট্তে যাব, যদি কাল কালাে বক্না পাই, সে তাের গােয়ালঘরে বাঁদা রয়েছে। আমি মাচ নিয়ে যাবার সময় তাের দোকান দিয়ে হয়ে যাব।
(লাঠিয়ালের প্রস্থান)
পদী। সাহেবদের লুট বই আর কাজ নাই। কম্য়ে জম্য়ে দিলে চাসারাও বাঁচে, তােদেরও নীল হয়। শ্যামনগরের মুন্সীরে ১০ খান জমি ছাড়াবার জন্যে কত মিনতি কল্লে। “চোরা না শুনে ধর্ম্মের কাহিনী।” বড় সায়েব পােড়ারমুখো পােড়ার মুখ পুড়্য়ে বসে রলাে।
(চারিজন পাঠশালার শিশুর প্রবেশ)
চারিজন শিশু। (পাততাড়ি রেখে করতালি দিয়া)
ময়রাণী লো সই। নীল গেঁজোছো কই।
ময়রাণী লো সই। নীল গেঁজোছো কই।
ময়রাণী লো সই। নীল গেঁজোছো কই।
পদী। ছি বাবা কেশব, পিসি হই এমন কথা বলে না —
৪জন শিশু। (নৃত্য করিয়া)
ময়রাণী লো সই। নীল গেঁজোছো কই।
পদী। ছি দাদা অম্বিকে, দিদিকে ওকথা বল্তে নাই—
৪জন শিশু। (পদী ময়রাণীকে ঘুরে নৃত্য)
ময়রাণী লো সই। নীল গেঁজোছো কই।
ময়রাণী লো সই। নীল গেঁজোছো কই।
ময়রাণী লো সই। নীল গেঁজোছো কই।
নবীন মাধবের প্রবেশ)
পদী। ওমা কি লজ্জ্বা! বড়বাবুকে মুখ খান দেখালাম।
(ঘোম্টা দিয়া পদীর প্রস্থান।)
নবীন। দুরাচারিণী, পাপীয়সি—(শিশুদের প্রতি) তােমরা পথে খেলা করিতেছ, বাড়ী যাও অনেক বেলা হইয়াছে—
(৪ জন শিশুর প্রস্থান)
আহা! নীলের দৌরাত্ম্য যদি রহিত হয়! তবে আমি পাঁচ দিবসের মধ্যে এই সকল বালকদের পাঠের জন্যে স্কুল স্থাপন করিয়া দিতে পারি। এপ্রদেশের ইনিস্পেক্টর বাবুটি অতি সজ্জন, বিদ্যা জন্মিলে মানুষ কি সুশীল হয়; বাবুজি বয়সে নবীন বটেন, কিন্তু কথায় বিলক্ষণ প্রবীণ। বাবুজির নিতান্ত মানস, এখানে একটী স্কুল স্থাপন হয়। আমি এ মাঙ্গলিক ব্যাপারে অর্থ ব্যয় করিতে কাতর নই, আমার বড় আটচালা পরিপাটী বিদ্যামন্দির হইতে পারে, দেশের বালকগণ আমার গৃহে বসিয়া বিদ্যার্জ্জন করে, এর অপেক্ষা আর সুখ কি, অর্থের ও পরিশ্রমের সার্থকতাই এই। বিন্দুমাধব, ইনিস্পেক্টর বাবুকে সমভিব্যাহারে আনিয়াছিল, বিন্দুমাধবের ইচ্ছা, গ্রামের সকলেই স্কুল স্থাপনে সমােদ্যোগী হয়। কিন্তু গ্রামের দুর্দ্দশা দেখে ভায়ার মনের কথা মনেই রহিল—বিন্দু আমার কি ধীর, কি শান্ত, কি সুশীল, কি বিজ্ঞ, অল্প বয়েসের বিজ্ঞতা চারা গাছের ফলের ন্যায় মনােহর। ভায়া লিপিতে যে খেদোক্তি করিয়াছেন তাহা পাঠ করিলে পাষাণ ভেদ হয়, নীলকরেরও অন্তঃকরণ আর্দ্র হয়।—বাড়ী যাইতে পা উঠে না, উপায় আর কিছু দেখি নে, পাঁচ জনের এক জনও হস্তগত করিতে পারিলাম না, তাহাদের কোথায় লইয়া গিয়াছে কেহই বলিতে পারে না। তোরাপ্ বোধ করি কখনই মিথ্যা বলিবে না। অপর চারি জন সাক্ষ্য দিলেই সর্ব্বনাশ, বিশেষ আমি এপর্য্যন্ত কোন যোগাড় করতে পারি নাই, তাহাতে আবার মাজিষ্ট্রেট সাহেব উড্ সাহেবের পরম বন্ধু।
(এক জন রাইয়ত দুই জন ফৌজদারীর পিয়াদা এবং কুটির তাইদগিরের প্রবেশ)
রাইয়ত। বড়বাবু, মোর ছেলেদুটোরে দেখো, তাদের খাওয়াবার আর কেউ নেই—গেল সন্ আট গাড়ি নীল দেলাম, তার একটা পয়সা দেলে না, আবার বকেয়াবাকী বলে হাতে দড়ী দিয়েছে, আবার আন্দারাবাদ নিয়ে যাবে —
তাইদ। নীলের দাদন ধোপার ভ্যালা, এক বার লাগ্লে আর ওটে না—তুই বেটা চল, দেওয়াঞ্জির কাছ দিয়ে হোয়ে যেতি হবে—তোর বড় বাবুরও এমনি হবে।
রাইয়ত। চল্ যাব, ভয় করিনে, জেলে পচে মর্বো তবু গোড়ার নীল কর্বো না—হা বিদেতা২, কাঙ্গালেরে কেউ দেখে না (ক্রন্দন) বড় বাবু, মোর ছেলে দুটোরে খাতি দিওগো, মোরে মোটেত্তে ধরে আন্লে তাদের এক বার দ্যাক্তি পালাম না।
(নবীনমাধব ব্যতীত সকলের প্রস্থান)
নবীন। কি অবিচার! নবপ্রসূতী শশারু কিরাতের করগত হইলে তাহার শাবকগণ যেমন অনাহারে শুষ্ক হইয়া মরে, সেই রূপ এই রাইয়তের বালকদ্বয় অন্নাভাবে মরিবে।
(রাইচরণের প্রবেশ)
রাই। দাদা না ধল্লিই গোড়ার মেয়েরে দাম ঠাস করেলাম, মেরেতো ফ্যাল্তাম ত্যাকন না হয় ৬ মাস ফাঁসি য্যাতাম শালি।—
নবীন। ও রাইচরণ, কোথায় যাস?
রাই। মাঠাকুরুণ পূট ঠাকুরকে ডেকে আন্তি বল্লে পদী গুড়ি বল্লে তলপের প্যায়দা কাল আস বে।
(রাইচরণের প্রস্থান।)
নবীন। হা বিধাতঃ! এ বংশে কখন যা না হইয়াছিল তাই ঘটিল—পিতা আমার অতি নিরীহ, অতি সরল, অতি অকপট-চিত্ত, বিবাদ বিসম্বাদ কারে বলে জানেন না, কখন গ্রামের বাহির হন না, ফৌজদারীর নামে কম্পিত হন, লিপি পাঠ করে চক্ষের জল ফেলিয়াছেন, ইন্দ্রাবাদে যাইতে হইলে ক্ষিপ্ত হইবেন, কয়েদ হলে জলে ঝাঁপ দিবেন। হা! আমি জীবিত থাকিতে পিতার এই দুর্গতি হবে। মাতা আমার পিতার ন্যায় ভীতা নন, তাঁহার সাহস আছে, তিনি একেবারে হতাশ হন না, তিনি একাগ্রচিত্তে ভগবতীকে ডাকিতেছেন। কুরঙ্গনয়না আমার দাবাগ্নির কুরঙ্গিনী হয়েছেন, ভয়ে ভাবনায় পাগলিনীপ্রায়, নীলকুটির গুদামে তাঁর পিতার পঞ্চত্ব হয়, তাঁর সতত চিন্তা, পাছে পতির সেই গতি ঘটে। আমি কত দিকে সান্তনা করিব, সপরিবারে পলায়ন করা কি বিধি, না, পরোপকার পরম ধর্ম্ম, সহসা পরাঙ্মুখ হব না, —শামনগরের কোন উপকার করিতে পারিলাম না, চেষ্টার অসাধ্য ক্রিয়া কি, দেখি কি করিতে পারি—
(দুই জন অধ্যাপকের প্রবেশ)
প্রথম। ওহে বাপু, গোলোকচন্দ্র বসুর ভবন এই পল্লীতে বটে —পিতৃব্যের প্রমুখাত্ শ্রুত আছি বসুজ বড় সাধু ব্যক্তি, কায়স্থকুলতিলক।
নবীন। (প্রণিপাত করিয়া) ঠাকুর, আমি তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র।
প্রথম। বটে, বটে, আহা হা, সাধু সাধু, এবম্বিধ সুসন্তান সাধারণ পূণ্যের ফল নয়; যেমন বংশ——
“অস্মিৎস্তু নিগুর্ণং গােত্রে নাপত্যমুপজায়তে।
আকরে পদ্মরাগাণাং জন্ম কাচমণেঃ পুতঃ।”
শাস্ত্রের বচন ব্যর্থ হয় না, তর্কালঙ্কার ভায়া শ্লোকটা প্রণিধান করিলে না, হঃ, হঃ, হঃ, (নস্য গ্রহণ)
দ্বিতীয়। আমরা সৌগন্ধ্যার তারবিন্দ বাবুর আহূত, অদ্য গােলােকচন্দ্রের আলয়ে অবস্থান, তােমারদিগের চরিতার্থ করিব।
নবীন। পরম সৌভাগ্যের বিষয় এই পথে চলুন।
(সকলের প্রস্থান)
পঞ্চম অঙ্ক
পঞ্চম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
বেগুনবেড়ের কুটির দপ্তর খানার সন্মুখ।
(গোপীনাথ দাস এবং এক জন গোপের প্রবেশ)
গােপী। তুই এত খবর পেলি কেমন করে?
গােপ। মােরা হলাল পত্তিবাসী, সারা খুণ্ডি যাওয়া আসা কত্তি নেগিচি, নুন না থাক্লি নুন চেয়ে আন্চি, তেল্পলাডা তেলপলাডাই আন্লাম, ছেলে কান্তি নাগ্লাে গুড় চেয়ে দেলাম—বসিগার বাড়ী সাত পুরুষ খেয়ে মানুষ, মােরা আর ওনাদের খবর আকিনে?
গােপী। বিন্দু মাধবের বিবাহ হয় কোথায়?
গোপ। ঐ যে কি গাঁডা বলে, কল্কাতার পচ্চিম, যারা কায়েদ্ গার পইতে কত্তি চেয়েলাে—যে বামুন আচে, ইদিরি খেব্য়ে ওটা যায় না, আবার বামুন বেড়্য়ে তােলে—ছােট বাবুর শ্বশুরগার মান বড়, গারনাল্ সাহেব টুপি না খুলে এস্তি পারে না, পাড়াগাঁয় ওরা কি মেয়ে দেয়? ছােট বাবুর ন্যাকাপড়া দেখে চাসা গাঁ আনলে না। লােকে বলে সউরে মেয়েগুনাে কিছু ঠমক্মারা, আর ঘরে বাজারে চেনা যায় না, কিন্তু বসিগার বৌর মত শান্ত মেয়েতাে আর চোকি পড়ে না, গােমার মা পত্যই ওনাদের বাড়ী যায়, তা এই পাঁচ বচ্চোর বে হয়েছে, এক দিন মুখখান দ্যাখতি প্যালে না। যে দিন বে করে আলে, মােরা সেই দিন দেখেলাম—ভাবলাম সউরে বাবুরাে রাংরাজ ঘ্যাঁস, তাইতে বিবির ন্যাকাত্ মেয়ে পয়দা করেচে।
গােপী। বউটী সর্বদাই শ্বাশুড়ির সেবায় নিযুক্ত আছে।
গােপ। দেওয়াঞ্জি মশাই! বলবাে কি? মােগার গােমার মা বল্লে, পাড়াতেও আষ্ট ছােট বউ না থাক্লি যে দিন গলায় দড়ির খবর শুনেলো সেই দিনিই মাঠাকুরুণ মরতো, শুনেলাম সউরে মেয়ে গুনো। মিন্ষেগার ভ্যাড়া করে আখে, আর মা বাপিরি না খাতি দিয়ে মারে, কিন্তু এ বউডােরে দেখে জান্লাম, এডা কেবল গুঞ্জব্ কথা।
গােপী। নবীন বসের মাও বােধ করি বউটিকে বড় ভাল বাসে।
গােপ। মাঠাকুরুণ যে পির্তিমির মধ্যি কারে ভাল না বাসেন তাওতাে দেখ্তি পাইনে। আ! মাগি য্যান অন্নপুন্নো, তা তােমরা কি আর অন্ন একেচ যে তিনি পুন্নো হবেন—গােডার নীলি বুড়রে খেয়েচে, বুড়িরিও খাবে খাবে কওি নেগেচে—
গােপী। চুপ্ কর গুওডা, সাহেব শুন্লে এখনি আমাবস্যা বার কর্বে।
গােপ। মুই কি কর্বাে, তুমিতাে খুঁচয়ে খুঁচয়ে বিষ বার কত্তি নেগেচো, মাের্ কি সাধ, কুটিতি বসি গােড়ার শালারে গালাগালি করি।—
গােপী। আমার মনেতে কিছু দুঃখ হয়েছে— মিথ্যা মােকদ্দমা করে মানি মানুষ্টোরে নষ্ট কর্লাম। নবীনের শিরঃপীড়া আর নবীনের মার এই মলিন দশা শুনে আমি বড় ক্লেশ পাইতেছি।—
গােপ। ব্যাঙ্গের সর্দ্দি–দেওয়াঞ্জী মশাই খাপা হবেন্ না, মুই পাগল ছাগল আছি একটা, তামাক সাজে আন্বাে?
গােপী। গুওডা নন্দর বংশ, ভােগােলের শেষ।
গােপ। সাহেবেরাই সব কত্তি নেগেচে, সাহেবেরা আপনারা কামার আপনারা খাঁড়া, যেখানে পড়ায় সেখানে পড়ে। গােড়ার কুটিতি দ পড়ে, গেরামের নােক নেয়ে বাঁচে।—
গােপী। তুই গুওডা বড় ভেমো, আমি আর শুন্তে চাই না—তুই যা, সাহেবের আস্বার সময় হয়েছে।—
গােপ। মুই চল্লাম, মাের দুদির হিসেবডা করে মােরে কাল একটা টাকা দিতি হবে, মােরা গঙ্গাচ্ছানে যাব।—
(প্রস্থান।)
গােপী। বােধ করি, ঐ শিরঃপীড়ার উপরই কাল জ্রাঘাত হবে। সাহেব তােমার পুষ্করিণীর পাড়ে নীল বুন্বে তা কেই রাখিতে পারিবে না। সাহেবদের কিঞ্চিৎ অন্যায় বটে, গত বৎসরের টাকা না পেয়েও ৫০ বিঘা নীল করিতে এক প্রকার প্রবৃত্ত হয়েছে, তাহাতেও মন উঠিল না। পূর্ব্ব মাঠের ধানি জমি কয়েক খানার জন্যেই এত গােলমাল, নবীনবসের দেওয়াই উচিত ছিল—শেতলাকে তুষ্ট রাখিতে পারিলেই ভাল। নবীন মরেও এক কামড় কামড়াবে।—(সাহেবকে দূরে দেখিয়া)এই যে শুভ্রকান্তি নীলাম্বর আসিতেছেন আমাকে হয় তাে বা সাবেক দেওয়ানের সঙ্গে কতক দিন থাক্তে হয়।
(উডের প্রবেশ)
উড। এ কথা যেন কেহ না জান্তে পারে, মাতঙ্গ নগরের কুটিতে দাঙ্গা বড় হবে, লাটিয়াল সব্ সেখানে থাক্বে। এখানকার জন্যে দশজন পােদ সুড়কি ওয়ালা জোগাড় করে রাখবে-আমি যাব, ছােট সাহেব যাবে, তুমি যাবে। শালা কাচা গলায় বেঁধে বাড়াবাড়ী কওে পারবে না, বেমো আছে, কেমন করিয়া দারােগার মদৎ আন্তে পারবে—
গােপী। ব্যাটারা যে কাতর হয়েছে সুড়কিওয়ালার আবশ্যক হবে না। হিন্দুর ঘরে গলায় দড়ী দিয়ে, বিশেষ জেলের ভিতরে মরা বড় দোষ এবং ধিক্কারাস্পদ। এই ঘটু নাতে ব্যাটা বড় শাসিত হইয়াছে।
উড। তুমি বুঝিতেছ না, বাপের মরাতে রাস্কেলের সুখ হইল—বাপের ভয়েতে নীলের দাদন লইত, এখন বাঞ্চতের সে ভয় গেল, যেমন ইচ্ছা তেমনি করবে। শালা আমার কুটির বদনাম করে দিয়াছে। হারাম্জাদাকে কাল আমি গ্রেপ্তার কর্বাে, মজুমদারের সহিত দোস্ত করিয়া দিব। অমর নগরের মাজিষ্ট্রেটের মত হাকিম আইলে বজ্জাত্ সব কত্তে পার্বে?
গােপী। মজুমদারের মােকদ্দমার যে সূত্র করিয়াছে, যদি নবীন বসের এ বিভ্রাট না হতাে তবে এত দিন ভয়ানক হইয়া উঠিত—এখনও কি হয় বলা যায় না, বিশেষ যে হাকিম আসিতেছেন তিনি শুনিয়াছি রাইয়তের পক্ষ; আর মফঃস্বলে আইলে তাঁবূ আনেন। ইহাতে কিছু গােল বােধ হয়, ভয়ও বটে—
উড। তােম্ ভয় ভয় ককে হাম্কো ডেক্ কিয়া, নীলকর সাহেবকো কোই কাম্মে উর হ্যায়? গিধ্বড়্কি শালা, তোমারা মােনাসেফ না হোয় কাম্ ছোড় দেও।
গােপী। ধর্ম্মাবতার! কাযেই ভয় হয়—সাবেক দেওয়ান কয়েদ হলে তার পুত্র ৬ মাসের বাকি মাহিয়ানা লইতে আসিয়াছিল, তাহাতে আপনি দরখাস্ত করিতে বল্লেন, দরখাস্ত করিলে পর হুকুম দিলেন, কাগজ নিকাস ব্যতীত মাহিয়ানা দেওয়া যাইতে পারে না। ধর্ম্মাবতার, চাকর কয়েদ হলে বিচার এই?
উড। আমি জানি না? ও শালা, পাজি নেমক্হারাম বেইমান! মাহিয়ানার টাকায় তােমাদের কি হইয়া থাকে? তােমরা যদি নীলের দামের টাকা ভক্ষণ না কর, তবে কি ডেড্লি কমিসন হইত? তা হইলে কি দুঃখী প্রজারা কঁদিতে কঁদিতে পাদরি সাহেবের কাছে যাইত? তােমরা শালারা সব নষ্ট করিয়াছ; মাল কম পড়িলে তােমার বাড়ী বেচিয়া লইব—য়্যারাণ্ট কাউয়ার্ড হেলিশ্নেভ।
গােপী। আমরা, হুজুর, কসায়ের কুকুর—নাড়ী ভুঁড়িতেই উদর পূর্ণ করি। ধর্ম্মাবতার! আপনারা যদি মহাজনেরা যেমন খাতকের কাছে ধান আদায় করে, সেই রূপে নীল গ্রহণ করিতেন তাহা হইলে নীলকুটীর এত দুর্নাম হইত না, আমিন খালাসীরও প্রয়ােজন থাকিত না, আর আমাকে “গুপে গুওটা, গুপে গুওটা” বলিয়া সকুল লােকে গাল্ দিত না।
উড। তুমি ওটা ব্লাইণ্ড, তােমার চক্ষু নাই—
(এক জন উমেদারের প্রবেশ।)
আমি এই চক্ষে দেখিয়াছি (আপন চক্ষে অঙ্গুলি দিয়া) মহাজনেরা ধানের ক্ষেত্রে যায় এবং রাইয়তদিগের সঙ্গে বিবাদ করে। তুমি এই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা কর।
উমে। ধর্ম্মাবতার! আমি এবিষয়ের অনেক দৃষ্টান্ত দিতে পারি। রাইয়তেরা বলে “নীলকর সাহেবদের দৌলতে মহাজনের হাত হইতে রক্ষা পাইতেছি।”
গােপী। (উমেদারের প্রতি জনান্তিকে) ওহে বাপু! বৃথা খােসামদ। কর্ম্ম কিছু খালি নেই (উডের প্রতি) মহাজনেরা ধানের ক্ষেত্রে গমন করে এবং নিজ খাতকের সহিত বাদানুবাদ করে একথা যথার্থ বটে, কিন্তু এরূপ গমনের এবং বিবাদের নিগূঢ় মর্ম্ম অবগত হইলে শ্যামাচাঁদ-শক্তিশেলে অনাহারী প্রজারূপ সুমিত্রানন্দননিচয়ের নিপতন, খাতকের শুভাভিলাষী মহাজন মহাজনের ধানক্ষেত্রে ভ্রমণের সহিত তুলনা করিতেন না—আমাদের সঙ্গে মহাজনদের অনেক ভিন্নতা।
উড। আচ্ছা, আমারে বুঝাও। কিছু কারণ থাকিতে পারে, শালা লােক আমাদিগের সব কথা বলিতেছে, মহাজনের কথা কিছু বলে না।
গােপী। ধর্ম্মাবতার! খাতকদিগের সম্বৎসরের যত টাকা আবশ্যক সকলি মহাজনের ঘর হইতে আনে এবং আহারের জন্য যত ধান্য প্রয়ােজন তাহা মহাজনের গােলা হইতে লয়, বৎসরান্তে তামাক ইক্ষু তিল ইত্যাদি বিক্রয় করিয়া মহাজনের সুদ সমেত টাকা পরিশােধ করে অথবা বাজার দরে ঐ সকল দ্রব্য মহাজনকে দেয় এবং ধান্য যাহা জন্মে তাহা হইতে মহাজনের ধান্য দেড়া বাড়িতে অথবা সাড়ে সইয়ে বাড়িতে ফিরিয়া দেয়, ইহার পর যাহা থাকে তাহাতে ৩।৪ মাস ঘর খরচ করে। যদি দেশে অজন্মা বশতঃ কিম্বা খাতকের অসঙ্গত ব্যয় জন্য টাকা কিম্বা ধান্য বাকি পড়ে, তাহা বকেয়া বাকি বলিয়া নতূন খাতায় লিখিত হয়, বকেয়া বাকি ক্রমে ক্রমে উসুল পড়িতে থাকে, মহাজনেরা কদাপিও খাতকের নামে নালিশ করে না, সুতরাং যাহা বাকি পড়ে তাহা মহাজনদিগের আপাততঃ লােকসান বােধ হয়, এই জন্য মহাজনেরা কখন কখন মাঠে যায়, ধানের কারকীত্ রীতিমত হইতেছে কি না দেখে, খাজানা বলিয়া যত টাকা খাতকে চাহিয়াছে তদুপযুক্ত জমি বুনন হইয়াছে কি না তাহা অনুসন্ধান করিয়া জানে। কোন কোন অদূরদর্শী খাতক প্রতারণা করিয়া অধিক টাকা লইয়া সর্ব্বদাই ঋণে বিব্রত হইয়া মহাজনের লােক্সান্ করে এবং আপনারাও কষ্ট পায়, সেই কষ্ট নিবারণের জন্যেই মহাজনেরা মাঠে যায়, ‘নীলমাম্দো’ হইয়া যায় না (জিবকেটে) ধর্ম্মাবতার! এই নেড়ে হারাম্খোর বেটারা বলে।
উড। তােমার ছাড়ন্তো শনি ধরিয়াছে, নচেৎ তুমি এত অনুসন্ধান করিতেছ কি কারণ, নইলে তুই এত বেয়াদোব হইয়াছিস কেন? বজ্জাত্, ইন্সেস চিউয়স্ ব্রূট।
গােপী। ধর্ম্মাবতার। গালাগালি খেতেও আমরা, পয়জার খেতেও আমরা, শ্রীঘর যেতেও আমরা—কুটিতে ডিসপেন্সারি স্কুল হইলেই আপনার, খুন গুমি হইলেই আমরা। হুজুরের কাছে পরামর্শ করিতে গেলে রাগত হন, মজুমদারের মােকদ্দমায় আমার অন্তঃকরণ যে উচাটন হইয়াছে তা গুরুদেবই জানেন।
উড। বঞ্চিতকে একটা সাহসী কার্য্য করিতে বলি, শালা ওমনি মজুমদারের কথা প্রকাশ করে—আমি বরাবর বলিয়া আসিতেছি তুমি শালা বড় না লায়েক আছে—নবীন বস কে শচীগঞ্জের গুদামে পাঠাইয়া কেন তুমি স্থির হও না। গােপী। আপনি গরিবের মা বাপ, গেরিব চাকরের রক্ষার জন্য এক বার নবীন বস কে এ মােকদ্দমার কথা জিজ্ঞাসা করিলে ভাল হয়।
উড। চপ্ রাও ইউ ব্যাস্টার্ড অভ্ হাের্স্ বিচ্। তেরা ওয়াস্তে হাম্ কুত্তাকা সাৎ মুলাকাৎ করেগা, শাল কাউয়ার্ড কায়েত বাচ্ছা (পদাঘাতে গােপীর ভূমিতে পতন) কমিস্যনে তােকে সাক্ষী দিতে পাঠাইলে তুই হারামজাদা সর্ব্বনাশ কত্তিস্, ডেভিলিষ্ নিগার! (আর দুই পদাঘাত) এই মুখে তােম্ ক্যাওট্কা মাফিক কাম্ ডেগা—শালা কায়েত—কাল্কো কাম্ দেখ্কে হাম্ তােম্কা আপ্ছে জেলমে্ ভেজ দেগা।
(উড এবং উমেদারের প্রস্থান)
গােপী। (গাত্র ঝাড়িতে বাড়িতে উঠিয়া) সাত্ শত শকুনি করিয়া একটি নীলকরের দেওয়ান হয়, নচেৎ অগণনীয় মােজ হজম হয় কেমন করে? কি পদাঘাতই করিতেছে, বাপ্! বেটা যেন আমার কালেজ আউট বাবুদের গৌণপরা মাগ।
(নেপথ্যে) দেওয়ান দেওয়ান।
গােপী। বন্দা হাজির। এবার কার পালা—
“প্রেমসিন্ধু নীরে বহে নানা তরঙ্গ।”
(গোপীর প্রস্থান)
পঞ্চম অঙ্ক।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
নবীনমীধবের শয়ন ঘর।
(আদুরী বিছানা করিতে করিতে ক্রন্দন)
আদুরী। আহা! হা হা, কমে যাব, পরাণ ফ্যাটে বাঁর হলো, এমন করেও ম্যারেচে কেবল ধুক্ ধুক্ কর্ত্তি নেগেচে, মা ঠাঁকুরুণ দেখে বুক ফ্যাটে মরে যাবে। কুটি থরে নিয়ে গিয়েছে ভেবে তানারা গাচ্তলায় আঁচ্ড়া পিচ্ড়ি করে কান্তি নেগেচেন, কোলে করে যে মোদের বাড়ী পানে আন্লে তা দেখ্তি পালেন না।
(নেপথ্যে)|আদুরি আমরা ঘরে নিয়ে যাব?
আদুরী। তোমরা ঘরে নিয়ে এস, তানারা কেউ এখানে নেই।
(মূর্চ্ছাপন্ন নবীনমাধবকে বহন করতঃ সাধু এবং তোরাঁপের প্রবেশ)
সাধু। (নবীনমাধবকে শয্যায় শয়ন করাইয়া) মাঠাকুরুণ কোথায়?
আদুরী। তানারা গাচতলায় দেঁড়য়ে দেখ্তি নেগেলেন, (তোরাপকে দেখায়ে) ইনি যখন নে পেল্য়ে গ্যালেন, মোরা ভাবলাম কুটি নিয়ে গ্যাল, তানারা গাচতলায় আঁচ্ড়া পিচ্ড়ি কত্তি নেগ্লো, মুই নোক ডাক্তি বাড়ী আলাম্। মরা ছেলে দেখে মা ঠাকুরুণ কি বাঁচবে? তোমরা এট্ট দাঁড়াও মুই তানাদের ডাকে আনি।
(আদুরীর প্রস্থান।)
(পুরোহিতের প্রবেশ।)
পুরো। হা বিধাতঃ! এমন লোককেও নিপাত করিলে! এত লোকের অন্ন রহিত হইল! বড় বাবু যে আর গাত্রোত্থান করেন এমন বোধ হয় না।
সাধু। পরমেশ্বরের ইচ্ছা, তিনি মৃত মনুষ্যকেও বাঁচাইতে পারেন।
পুরো। শাস্ত্রমতে তেরাত্রে বিন্দুমাধব ভাগীরথিতীরে পিণ্ডদান করিয়াছেন, কেবল কত্রী-ঠাকুরাণীর অনুরোধে মাসিক শ্রাদ্ধের আয়োজন। শ্রাদ্ধের পর এস্থান হইতে বাস উঠাইবার স্থির হইয়াছিল এবং আমাকে বলিয়াছিলেন আর ও দুর্দ্দান্ত সাহেবদিগের সহিত দেখাও করিবেন না, তবে অদ্য কি জন্য গমন করিলেন?
সাধু। বড় বাবুর, অপরাধ নাই, বিবেচনারও ত্রুটি নাই। মাঠাকুরুণ এব বউ ঠাকুরুণ আনেক রূপ নিষেধ করিয়াছিলেন, তাঁহারা বলিলেন “যে কএক দিন এখানে থাকা যায় আমরা কুয়ার জল তুলিয়া স্নান করিব, অথবা আদুরী পুষ্করিণী হইতে জল আনিয়া দিবে, আমাদিগের কোন ক্লেশ হইবে না।” বড় বাবু বলিলেন “আমি ৫০ টাকা নজর দিয়া সাহেবের পায় ধরিয়া পুষ্করিণীর পাড়ে নীল করা রহিত করিব, এ বিপদে বিবাদের কোন কথা কহির না।” এই স্থির করিয়া বড় বাবু আমাকে আর তোরাপ্কে সঙ্গে লইয়া নীলক্ষেত্রে গমন করিলেন এবং কাঁদিতে কাঁদিতে সাহেবেকে বলিলেন “হুজুর! আমি আপনাকে ৫০ টাকা সেলামি দিতেছি, এ বৎসর এ স্থানটায় নীল কর্বেন না, আর যদি এই ভিক্ষা না দেন তবে টাকা লইয়া গরিব পিতৃহীন প্রজার প্রতি অনুগ্রহ করিয়া শ্রাদ্ধের নিয়ম ভঙ্গের দিন পর্য্যন্তু বুনন রহিত করুন।” নরাধম যে উত্তর দিয়াছিল তাহা পুনরুক্তি করিলেও পাপ আছে; এখনও শরীর লোমাঞ্চিতি হইতেছে। বেটা বল্লে “যবনের জেলে চোর ডাকাইতের সঙ্গে তোর পিতার ফাঁসি হইয়াছে, তাঁর শ্রাদ্ধে অনেক ষাড় কাঁটিতে হইবে, সেই নিমিত্তে টাকা রাখিয়া দে” এবৎ পায়ের জুতা বড় বাবুর হাঁটুতে ঠেকাইয়া। কহিল, “তোর বাপের শ্রাদ্ধে ভিক্ষা এই”।
পুরো। নারায়ণ! নারায়ণ! (কর্ণে হস্ত প্রদান)
সাধু। অমনি বড় বাবুর চক্ষু রক্তবর্ণ হইল, অঙ্গ থর থর করিয়া কাঁপিতে লাগিল, দন্ত দিয়া ঠোঁট কামড়াইতে লাগিলেন এবং ক্ষণেক কাল নিস্তব্ধ হয়ে থেকে সজোরে সাহেবের বক্ষঃস্থলে এমন একটি পদাঘাঁত করিলেন, বেটা বেনার বোঝার ন্যায় ধপাত্ করিয়া চিত হইয়া পড়িল। কেশে ঢালী, যে এক কুটির জমাদার হইয়াছে, সেই বেটা ও আর দশ জন সুড়কীওয়ালা, বড় বাবুকে ঘেরাও করিল, ইহাদিগকে বড় বাবু এক বার ডাকাতি মাদ্দা হইতে বাঁচাইয়াছেন, বেটারা বড় বাবুকে মারিতে একটু চক্ষু লজ্জা বোধ করিল। বড় সাহেব উঠিয়া জমাদ্দারকে একটা ঘুসি মারিয়া তাহার হাতের লাঠি লইয়া বড় বাবুর মাথায় মারিল, বড় বাবুর মস্তক ফাটিয়া গেল এবং অচৈতন্য হইয়া ভূমিতে পড়িলেন; আমি অনেক যন্ত্র করিয়াও গোলের ভিতর যাইতে পারিলাম না, তোরাপ দূরে দাঁড়াইয়া দেখিতেছিল, বড় বাবুকে ঘেরাও করিতেই এক গুঁয়ে মহিষের মত দৌড়ে গোল ভেদ করে বড় বাবুকে কৌলে লইয়া বেগে প্রস্থান করিল।
তোরাপ। মোরে বল্লেন “তুই এট্টু তফাৎ থাক্, জানি কি ধরা পাঁকড়া করে নে যাবে” মোর উপর সুমুন্দিদের বড় গোষা, মারা মারি হবে জান্লি মুই কি নুক্য়ে থাকি? এট্টু, আগে যাতি পাল্লে বড় বাবুকে বেচঁয়ে আন্তে পাওাম, আর দুই সুমুন্দিরি বরকোত্ বিবির দরগায় জবাই কত্তাম। বড় বাবুর মাতা দেখে মোর হাত্ পা প্যাটের মধ্যি গেল, তাা সুমুন্দিগার মারবো কখন—আল্লা! বড় বাবু মোরে এত বার বাঁচালে মুই বড় বাবুরি অ্যাকবার বাঁচাতি পাল্লাম না।
(কপালে ঘা মারিয়া রোদন)
পুরো। বুকে যে একটা অস্ত্রের ঘা দেখিতেছি?
সাধু। তোরাপ গোলের মধ্যে পঁহুছিবা মাত্র ছোট সাহেব পতিত বড় বাবুর উপর এক তলোয়ারের কোপ মারে, তোরাপ হস্ত দিয়া রক্ষা করে, তোরাপের বাম হস্ত কাটিয়া যায়, বড় বাবুর বুকে একটু খোঁচা লাগে।
পুরো। (চিন্তা করিয়া)
“বন্ধু স্ত্রী ভৃত্যবর্গস্য বুদ্ধেঃ সত্বস্য চাত্মনঃ।
আপন্নিকষপাষাণে নরোজানাতি সারতাং॥”
বড়বাড়ীর জন প্রাণী দেখিতেছি না, কিন্তু অপর গ্রামনিবাসী ভিন্ন জাতি তোরাপ বড় বাবুর নিকটে বদে রোদন করিতেছে, আহা! গরিব খেটেখেগো লোক, হস্তখানি একেবারে কাটিয়া দিয়াছে—উহার মুখ রক্ত মাখা কি রূপে হইল?
সাধু। ছোট সাহেব উহার হস্তে তলোয়ার মারিলে পর, নেজ মাড়িয়ে ধরিলে বেজী যেমন ক্যাচ ম্যাচ করিয়া কাম্ড়ে ধরে, তোরাপ জ্বালার চোটে বড় সাহেবের নাক কাম্ড়ে লইয়ে পালাইয়াছিল।
তোরাপ। নাক্টা মুই গাঁটি গুঁজে নেকিচি, বাবু বেঁচে উটলি দ্যাখাবো, এই দেখ (ছিন্ন নাঁসিকা দেখাওন) বড় বাবু যদি আপনি পালাতি পাত্তেন, সুমুন্দির কাণ দুটো মুই ছিঁড়ে আন্তাম্, খোদার জীব পরাণে মাত্তাম না?
পুরো। ধর্ম্ম আছেন, শূপর্ণখার নাসিকাচ্ছেদে দেবগণ রাবণের অত্যাচার হইতে ত্রাণ পাইয়াছিল, বড় সাহেবের নাসিকাচ্ছেদে প্রজারা নীলকরের দৌরাত্ম হইতে মুক্তি পাইবে না?
তােরাপ। মুই এখন ধানের গােলার মধ্যি নুক্য়ে থাকি, নাত করে পেল্য়ে যাব, সুমুন্দি নাকের জন্যি গাঁ নসাতলে পেট্য়ে দেবে।
(নবীনমাধরে বিছানার কাছে মাটিতে দুই বার সেলাম করিয়া তােরাপের প্রস্থান।)
সাধু। কর্ত্তা মহাশয়ের গঙ্গা লাভ শুনে মাঠাকুরুণ যে ক্ষীণ হয়েচেন, বড় বাবুর এ দশা দেখিবামাত্র প্রাণ ত্যাগ করিবেন সন্দেহ নাই—এত জল দিলাম, বুকে হাত বুলালাম, কিছুতেই চেতন হইল না, আপনি এক বার ডাকুন দিকি।—
পুরাে। বড় বাবু! বড় বাবু! নবীনমাধব! (সজল নয়নে)প্রজাপালক! অন্নদাতা!—চক্ষু নাড়িতেছেন। আহা জননী এখনি আত্মহত্যা করিবেন। উদ্বন্ধন বার্তা শ্রবণে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন দশ দিবস পাপ পৃথিবীর অন্ন গ্রহণ করিবেন না, অদ্য পঞ্চম দিবস, প্রত্যুষে নবীনমাধব জননীর গলা ধরিয়া অনেক রােদন করিলেন এবং কলিলেন, “মাতঃ যদি অদ্য আপনি আহার না করেন তবে মাতৃ আজ্ঞা লঙ্ঘন জনিত নরক মস্তকে ধারণ পূর্ব্বক আমি হবিষ্য করিব না, উপবাসী থাকিব”। তাহাতে জননী নবীনের মুখ চুন্বন করিয়া কহিলেন “বাবা আমি রাজমহিষী ছিলেম, রাজমাতা হলেম, আমার মনে কিছু খেদ থাকিত না, যদি মরণ কালে তাঁর চরণ একবার মন্তকে ধারণ করিতে পারিতাম; এমন পুণ্যাত্মার অপমৃত্যু হইল, এই কারণে আমি উপবাস করিতেছি। দুঃখিনীর ধন তোমরা, তোমার এবং বিন্দুমাধবের যুখ চেয়ে আমি অদ্য পুরোহিত ঠাকুরের প্রসাদ গ্রহণ করিব, তুমি আমার সম্মুখে চক্ষের জল ফেল না” বলিয়া নবীনকে পঞ্চম বর্ষের শিশুর ন্যায় ক্রোড়ে ধারণ করিলেন!
(নেপথ্যে বিলাপ সূচক ধ্বনি)
আসিতেছেন।
(সাবিত্রী, সৈরিন্ধ্রী, সরলতা, আদুরী, রেবতী, নবীনের খুড়ী এবং অন্যান্য প্রতিবাসিনীর প্রবেশ)
ভয় নাই, জীবিত আছেন—
সাবিত্রী। (নবীনের মৃতবৎ শরীর দর্শন করিয়া) নবীনমাধব! বাবা আমার, বাবা আমার, বাবা আমার, কোথায়, কোথায়, কোথায়, উহুহু।—(মূর্চ্ছিত হইয়া পতন)
সৈরি। (রোদন করিতে করিতে)ছোট বউ! তুমি ঠাকুরুণকে ধর, আমি প্রাণকান্তকে একবার প্রাণ ভরে দর্শন করি। (নবীনমাধবের সুখের নিকট উপবিষ্টা)
পুরো। (সৈরিন্ধ্রীর প্রতি) মা! তুমি পতিব্রতা সাধ্যসতী, তোমার শরীর সুলক্ষণে মণ্ডিত, পতিরতা সুলক্ষণা ভার্য্য়ার ভাগ্যে সত পতিও জীবিত হয়; চক্ষু নাঁড়িতেছেন, নির্ভয়ে সেবা কর। সাধু! কত্রী ঠাকুরাণীর জ্ঞান সঞ্চার হওয় পর্য্যন্ত তুমি এখানে থাক।
(প্রস্থান।)
সাধু। মা ঠাকুরুণের নাকে হাত দেয়া দেখ দেখি, মৃত শরীর অপেক্ষাও শরীর স্থির দেখিতেছি।
সর। (নাসিকায় হস্ত দিয়া রেবতীর প্রতি মৃদুস্বরে) নিশ্বাস বেস বহিতেছে, কিন্তু মাথা দিয়ে এমন আগুন বাহির হতেছে যে আমার গলা পুড়ে যাচ্যে।
সাধু। গোমস্তা মহাশয় কবিরাজ আন্তে গিয়ে সাহেবদের হাতেপড় লেন নাকি? আমি কবিরাজের বাসায় যাই।
(প্রস্থান)
সৈরি। আহা! আহা! প্রাণনাথ! যে জননীর অনাহারে এত খেদ করিতেছিলে, যে জননীর ক্ষীণতা দেখিয়া রাত্রি দিন পদ সেবায় নিযুক্ত ছিলে, যে জননী কয়েক দিবস তোমাকে ক্রোড়ে না করিয়া নিদ্রা যাইতে পারিতেন না; সেই জননী তোমার নিকটে মূর্চ্ছিত হইয়া পতিত আছেন, এক বার দেখিলে না! (সাবিত্রীকে অবলোকন করিয়া) আহা! হা! বৎসহারা হাম্মারবে ভ্রমণকারিণী গাভী সর্পাঘাতে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়া প্রান্তরে যেরূপ পতিত হইয়া ধাকে, জীবনাধার পুত্রশোকে জননী সেই রূপ ধরাশায়িনী হইয়া আছেন—প্রাণনাথ! একবার নয়ন মেলে দেখ, একবার দাসীরে অমৃত বচন দাসী বলে ডেকে কর্ণকুহর পরিতৃপ্ত কর—মধ্যাহৃসময় আমার সুখ সূর্য্য অস্তগত হইল—আমার বিপিনের উপায় কি হইবে!(রোদন করিতে করিতে নবীনমাধবের বক্ষের উপর পতন)
সর। ও গো তোমরা দিদিকে কোলে করে ধর।
সৈরি। (গাত্রোত্থান করিয়া) আমি অতি শিশুকালে পিতৃহীন হয়েছিলাম, আহা! এই কালনীলের জন্যেই পিতাকে কুটিতে ধরে নিয়ে যায়, পিতা আর ফিরিলেন না। নীলকুটি তাঁর যমালয় হইল। কাঙ্গালিনী জননী আমার, আমায় নিয়ে মামার বাড়ী যান, পতিশোকে সেই খানে তাঁর মৃত্যু হয়, মামীরা আমাকে মানুষ করেন, আমি মালিনীর হস্ত হইতে হঠাৎ পতিত পু্পের ন্যায় পথে পতিত হইয়া ছিলাম, প্রাণনাথ আমাকে আদর করে তুলে নিয়ে গৌরব বাড়াইয়াছিলেন; আমি জনক জননীর শোক ভুলে গিয়েছিলাম, প্রাণকান্তের জীবনে পিতা মাতা আমার পুনর্জ্জীবিত হইয়াছিলেন, (দীর্ঘনিশ্বাস) আমার সকল শোক নূতন হইতেছে, আহা! সর্ববাচ্ছাদক স্বামীহীন হইলে আমি আবার পিতা মাতা বিহীন পথের কাঙ্গালিনী হইব।
(ভূতলে পতন)
খুড়ী। (হস্ত ধারণ পূর্বক উত্তোলন করিয়া) ভয় কি? উতলা হও কেন? মা! বিন্দুমাধবকে ডাক্তার আন্তে লিখে দিয়াছে, ডাক্তার আইলেই ভাল হবেন।
সৈরি। সেজো ঠাকুরুণ! আমি বালিকা-কালে সেঁজোতির ব্রত করিয়াছিলীম, আলপানায় হস্ত রাখিয়া বলেছিলাম যেন রামের মত পতি পাই, কৌশল্যার মত শাশুড়ী পাই, দশরথের মত শ্বশুর পাই, লক্ষণের মত দেবর পাই; সেজো ঠাকুরুণ! বিধাতা আমাকে সকলি আশার অধিক দিয়াছিলেন; আমার তেজঃপুঞ্জ প্রজা-পালক রঘুনাথ স্বামী; অবিরল অমৃতৃ-মুখী বধূপ্রাণা কৌশল্যা শাশুড়ী; স্নেহপূর্ণলৌচন প্রফুল্লবদন বধূমাতা বধূমতা বলেই চরিতার্থ, দশ দিক্ আল করা শ্বশুর, শারদ কৌমুদী বিনিন্দিত বিমল বিন্দুমাধব আমার সীতা দেবীর লক্ষণদেবর অপেক্ষাও প্রিয়তর। মা গো! সকলি মিলেছে, কেবল একটি ঘটনার অমিল দেখিতেছি—আমি এখনও জীবিত আছি—রাম বনে গমন করিতেছেন, সীতার সহগমনের কোন উদ্যোগ দেখিতেছি না। আহা! আহা! পিতার অনাহারে মরণ শ্রবণে সাতিশয় কাতর ছিলেন, পিতার পারণের জন্যেই প্রাণনাথ কাচা গলায় থাকিতে থাকিতেই, স্বর্গধামে গমন করিতেছেন (এক দৃষ্টিতে মুখাবলোকন করিয়া) মরি, মরি, নাথের ওষ্ঠাধর একেবারে শুষ্ক হইয়া গিয়াছে—ওগো! তোমরা আমার বিপিনকে একবার পাঠশালা হতে ডেকে এনে দাও, আমি একবার (সাশ্রুনয়নে) বিপিনের হাত দিয়া স্বামীর শুষ্কমুখে একটু গঙ্গা জল দি।
(মুখের উপর মুখদিয়া অবস্থিতি)
সকলে। আহা! হা!
খুড়ি। (গাত্র ধরিয়া তুলিয়া) মা! এখন এমন কথা মুখে এনো না, (ক্রন্দন) মা! যদি বড় দিদির চেতন থাক্ত তবে এ কথা শুনে বুক ফেটে মর্তেন।
সৈরি। মা! স্বামী আমার ইহ লোকে বড় ক্লেশ পেয়েচেন, তিনি পরলোকে পরম সুখী হন এই আমার বাসনা। প্রাণনাথ দাসী তোমার যাবজ্জীবন জগদীশ্বরকে ডাক্বে, প্রীণনাথ! তুমি পরম ধার্ম্মিক, পরোপকারী, দীনপালক, তোমাকে অনাথবন্ধু বিশ্বেশ্বর অবশ্যই স্থান দিবেন। আহা! হা! জীবনকান্ত! দাসীকে অজ লইয়া যাও তোমার দেবারাধনার পুষ্প তুলিয়া দেবে।
আহা আহা মরি মরি একি সর্বনাশ।
সীতা ছেড়ে রাম বুঝি যায় বনবাস॥
কি করিব কোথা যাব কিসে বাঁচে প্রাণ।
বিপদ বান্ধব কর বিপদে বিধান॥
রক্ষ রক্ষ রমানাথ রমণী-বিভব।
নীলানলে হয় নাশ নবীনমাধব॥
কোথা নাথ দীননাথ প্রাণনাথ যায়।
অভাগিনী অনাথিনী করিয়ে আমায়॥
(নবীনের বক্ষে হস্ত দিয়া দীর্ঘনিশ্বাস)
পরিহরি পরিজন পরমেশ পায়।
লয় গতি দিয়ে পতি বিপদে বিদায়॥
দয়ার পয়োধি তুমি পতিত পাবন।
পরিণামে কর ত্রাণ জীবন জীবন॥
সর। দিদি! ঠাকুরুণ চক্ষু মেলিয়াছেন, কিন্তু আমার প্রতি মুখ বিকৃতি করিতেছেন (রোদন করিয়া) দিদি! ঠাকুরুণ আমার প্রত্তি এমন সকোপ নয়নে কখনত দৃষ্টি করেন নাই।
সৈরি। আহা, আহা, ঠাকুরুণ সরলতাকে এম্নি ভাল বাসেন যে, অজ্ঞানবশতঃ একটু রুষ্ট চক্ষে চাহিয়া সরলতা চাঁপা ফুল বালির খোলায় ফেলিয়া দিয়াছেন—দিদি! কেঁদো না, ঠাকুরুণের চৈতন্য হইলে তোমায় আবার চুম্বন করবেন এবং আদরে পাগলির মেয়ে বলবেন।
(সাবিত্রী গাত্রোত্থান করিয়া নবীনের নিকটে উপবিষ্ট, এবং কিঞ্চিৎ আহ্লাদ প্রকাশ করিয়া নবীনকে একদৃষ্টিতে অবলোকন করিতে করিতে)
সাবি। প্রসব বেদনার মত আর বেদনা নাই—কিন্ত যে অমূল্য রত্ন প্রসব করিয়াছি মুখ দেখে সব দুঃখ গেল (রোদন করিতে করিতে) আরে দুঃখ! বিবি যদি যমকে ছিটিলিখে কত্তারে না মার্তো তবে সোণার খোকা দেখে কত আহ্লাদ কত্তেন (হাত তালি)।
সকলে। আহা! আহা! পাগল হয়েচেন।
সাবি। (সৈরিন্ধ্রীর প্রতি) দাইবউ—ছেলে এক বার আমীর কোলে দাও, তাপিত অঙ্গ শীতল করি, কত্তার নাম করে খোকার মুখে একবার চুমো খাই (নবীনের মুখ চুম্বন)
সৈরি। মা! আমি যে তোমার বড় বউ, মা দেখ্তে পাচ্চ না-—তৌমার প্রাণের রাম অচৈতন্য হয়ে পড়ে রয়েচেন, কথা কহিতে পাচ্যেন না।
সাবি। ভাতের সময় কথা ফুটবে। আহা, হা! কত্তা থাক্লে আজ কত আনন্দ, কত বাজ্না বাজ্তো (ক্রন্দন)
সৈরি। সর্ব্বনাশরে উপর সর্ব্বনাশ! ঠাকুরণ পাগল হলেন?
সর। দিদি! জননীকে বিছেনা ছাড়া করিয়া দাও, তাঁরে আমি শুশ্রূষা দ্বারা সুস্থ করি।
সাবি। এমন চিটিও লিখেছিলে, এমন আহ্লাদের দিন বাজ্না হলো না (চারি দিকে অবলোকন করিয়া সবলে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক সরলতার নিকটে গিয়া) তোমার পায়ে পড়ি বিবি ঠাক্রুণ! আর এক খান চিটি লিখে যমের বাড়ী থেকে কত্তারে ফিরে এনে দাও, তুমি সাহেবের বিবি তা নইলে আমি তােমার পায়ে ধত্তাম।
সর। মাগাে! তুমি আমাকে জননী অপেক্ষাও স্নেহ কর, মা তােমার মুখে এখন কথা শুনে আমি যমযন্ত্রণা হইতেও অধিক যন্ত্রণা পাইলাম! (দুই হস্তে সাবিত্রীকে ধরিয়া) মা! তােমার এ দশা দেখে আমার অন্তঃকরণে অগ্নিবৃষ্টি হইতেছে।
সাবি। খান্কি বিটি, পাজি বিটি, মেলোচ্ছাে বিটি, আমাকে একাদশীর দিন ছুঁয়ে ফেল্লি (হস্ত ছাড়ায়ন)
সর। মাগাে! আমি তােমার মুখে একথা শুনে আর পৃথিবীতে থাকিতে পারিনে (সাবিত্রীর পদদ্বয় ধারণ পূর্ব্বক ভূমিতে শয়ন) মা! আমি তােমার পাদপদ্মে প্রাণত্যাগ করিব।
(ক্রন্দন)
সাবি। খুব হয়েছে, গস্তানি বিটি মরে গিয়েছে, কত্তা আমার স্বর্গে গিয়েচেন, তুই আবাগী নরকে যাবি (হাস্য করিতে করিতে করতালি)
সৈরি। (গাত্রোত্থান করিয়া) আহা! আহা! সরলতা আমার অতি সুশীলা, আমার শাশুড়ির সাত আদরের বউ, জননীর মুখে কুবচন শুনে অতিশয় কাতর হয়েচে! (সাবিত্রীর প্রতি) মা! তুমি আমার কাছে এস।
সাবি। দাই বউ! ছেলে একা রেখে এলে বাছা, আমি যাই।
(দৌড়ে নবীনের নিকটে উপবেশন)
রেবতী। (সাবিত্রীর প্রতি) হ্যাঁগা মা! তুমি যে বলে থাক ছােট বউর মত বউ গাঁয় নেই, ছােট বউরি না খেব্য়ে তুমি যে খাও না, তুমি সেই ছােট বউরি খান্কি বলে গাল দিলে। হ্যাঁগা মা! তুমি মাের কথা শােন্চো না—মােরা যে তােমাগার খায়ে মানুষ, কত যে খাতি দিয়েচো।
সাবি। আমার ছেলের আট কৌড়ের দিন আসিস্ তােরে জলপান দেব।
খুড়ী। বড় দিদি! নবীন তােমার বেঁচে উট্বে, তুমি পাগল হইও না।
সাবি। তুমি জান্লে কেমন করে? ও নামতো আর কেউ জানে না, আমার শ্বশুর বলেছিলেন, বউমার ছেলে হলে “নবীনমাধব” নাম রাখ্বো। আমি খােকা পেয়েছি, ঐ নাম রাখবো। কত্তা বল্তেন কবে খােকা হবে “নবীনমাধব” বলে ডাক্বো। (ক্রন্দন) যদি বেঁচে থাক্তেন আজ্ সে সাধ্ পুরতাে।
(নেপথ্যে শব্দ)
ঐ বাজ্না এয়েচে (হাততালি)
সৈরি। কবিরাজ আসিতেছেন, ছােট বউ উঠে ও ঘরে যাও।
(কবিরাজ ও সাধুচরণের প্রবেশ।)
(সরলতা, রেবতী এবং প্রতিবাসিনীদের প্রস্থান, সৈরিন্ধ্রী অবগুণ্ঠনাবৃতা হইয়া এক পার্শ্বে দণ্ডায়মান)
সাধু। এই যে মা ঠাকুরুণ উঠে বসিয়াছেন।
সাবি। (রােদন করিয়া) আমার কত্তা নেই বলে কি তােমরং আমার এমন দিনে ঢোল্ বাড়ী রেখে এলে?
আদুরী। ওনার ঘটে কি আর জ্ঞেন আছে, উনি অ্যাকেবারে পাগল হয়েছেন। উনি ঐ মরা বড় হালদারেরে বল্চেন “মাের কচি ছেলে” আর ছােট হালদারনিরি বিবি বলে কত গালাগালি দেলেন, ছােট হালদারনী কেঁদে ককাতি নেগ্লাে। তােমাদের বল্চেন বাজন্দেরে।
সাধু। এমন দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে!
কবি। (নবীনের নিকট উপবিষ্ট হইয়া) একে পতিশোকে উপবাসীনী, তাহাতে নয়নানন্দ নন্দনের ঈদৃশীদশা—সহসা এরূপ উন্মত্তা হওয়া সম্ভব, এবং নিদানসঙ্গত। নাড়ীর গতিক্টা দেখা আবশ্যক, কর্ত্রী ঠাকরুণ হস্ত দেন (হাত বাড়াইয়া)
সাবি। তুই আঁটকুড়ির ব্যাটা কুটির নোক্, তা নইলে ভাল মান্ষের মেয়ের হাতিধত্তে চাচ্চিস্ কেন, (গাত্রোত্থান করিয়া) দাই বউ! ছেলে দেখিস্ মা, আমি জল খেয়ে আসি, তোরে এক খান চেলির শাড়ি দেব।
(প্রস্থান)
কবি!|আহা? জ্ঞানপ্রদীপ আর প্রজ্বলিত হইবে না; আমি হিমসাগর তৈল প্রেরণ করির, তাহাই সেবন করা এক্ষণকার বিধি। (নবীনের হস্ত ধরিয়া) ক্ষীণতাধিক্যমাত্র, অপর কোন বৈলক্ষণ্য দেখিতেছি না, ডাক্তার ভায়ারা অন্য বিষয়ে গো বৈদ্য বটেন, কিন্ত কাটাকুটির বিষয়ে ভাল; ব্যয় বাহুল্য, কিন্তু একজন ডাক্তার আনা কর্ত্তব্য।—
সাধু। ছোট বাবুকে ডাক্তার সহিত আসিতে লেখা হইয়াছে।
কবি। ভালই হইয়াছে।—
(চারি জন জ্ঞাতির প্রবেশ)
প্রথম। এমন ঘটনা হইবে তাহা আমরা স্বপ্নেও জানি না। দুই প্রহরের সময়, কেহ আহার করিতেছে, কেহ স্নান করিতেছে, কেহবা আহার করিয়া শয়ন করিতেছে। আমি এখন শুনিতে পাইলাম।
দ্বিতীয়। আহা! মস্তকের আঘাতটি সাংঘাতিক বোধ হইতেছে; কি দুর্দ্দৈব! অদ্য বিবাদ হইবার কোন সম্ভাবনা ছিল না, নচেৎ রাইয়তেরা সকলেই উপস্থিত থাকিত।
সাধু। দুই শত রাইয়তে লাঠী হস্তে করিয়া মার্ মার্ করিতেছে এবৎ “হা বড় বাবু! হা বড় বাবু!” বলিয়া রোদন করিতেছে। আমি তাহাদিগের স্ব স্ব গৃহে যাইতে কহিলাম, যেহেতু একটু পন্থা পাইলেই, সাহেব নাকের জ্বালায় গ্রাম জ্বালাইয়া দিবে।
কবি। মস্তকটা ধৌত করিয়া আপাততঃ টারপিন তৈল লেপন কর; পশ্চাৎ সন্ধ্যাকালে আসিয়া অন্য ব্যবস্থা করিয়া যাইব। রোগীর গৃহে গোল করা ব্যাধ্যাধিক্যের মূল—কোন রূপ কথা বার্ত্তা এখানে না হয়।
(কবিরাজ, নাধুচরণ এবং জ্ঞাতিগণের এক দিকে, এবং আদুরীর অন্য দিকে প্রস্থান, সৈরিন্ধ্রীর উপবেশন।)
পঞ্চম অঙ্ক।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
সাধুচরণের ঘর।
(ক্ষেত্রমণির শয্যাকণ্টকি, এক দিকে সাধুচরণ, অপর দিকে রেবতী উপবিষ্ট)
ক্ষেত্র। বিছেনা বেড়ে পাত, ও মা! বিছেনা ঝেড়ে দে।
রেবতী। জাদু মোর্, সোণার চাঁদ মোর্, ওমন খারা কেন কচ্চো মা। বিছেনা ঝেড়ে দিইচি মা, বিছানায়তো কিছু নেইরে মা, মোদের ক্যাতার ওপরে তোমার কাকিমারা যে নেপ্ দিয়েচে তাইতো পেড়ে দিয়েছি মা।
ক্ষেত্র। স্য়াকুলির কাঁটা ফোটচে, মরে গ্যালাম, আরে মলাম্ রে, বাবার দিখি ফিরিয়ে দে।
সাধু। (আস্তে আস্তে ক্ষেত্রমণিকে ফিরায়ে, স্বগত) শয্য়াকণ্টকি মরণের পূর্ব্বলক্ষণ (প্রকাশে) জননী আমার দরিদ্রের রতনমণি; মা, কিছু খাও না মা, আমি যে ইন্দ্রাবাদ হইতে তোমার জন্যে বেদানা কিনে এনিচি মা, তোমার যে চুনুরি শাড়িতে বড় সাধ্ মা, তাও তো আমি কিনে এনিচি মা, কাপড় দেখে তুমি তো আহ্লাদ করিলে না মা!
রেবতী। মার মোর কত সাধ্, বলে সেমোন্তোনের সমে মোরে সাঁক্তির মালা দিতি হবে—আহা হাঁ! মার মোর কি রূপ কি হয়েচে, কর্বো কি, বাপোরে বাপোঃ! (ক্ষেত্রমণির মুখের উপর মুখ দিয়া অবস্থিতি) সোণার ক্ষেত্র মোর কয়লা পানা হয়ে গিয়েছে, দেখ দেখ মার চকির মণি কনে গ্যাল!
সাধু। ক্ষেত্রমণি! ক্ষেত্রমণি! ভাল করে চেয়ে দেখ না মা!
ক্ষেত্র। খোন্তা, কুড়ুল, মা! বাবা! আ! (পার্শ্ব পরিবর্ত্তন)
রেবতী। মুই কোলে তুলে নেই, মার বাছা মার কোলে ভাল থাকবে। (অঙ্কে উত্তোলন করিতে উদ্যত)
সাধু। কোলে তুলিস্নে টাল্ যাবে।
রেবতী। এমন পোড়া কপাল করেলীম! আহা হা! হারাণ যে মোর মউর চড়া কাত্তিক, মুই হারাণের রূপ ভোল্বো ক্যামন করে, বাপো! বাপো! বাপো!
সাধু। রেয়ে ছোঁড়া কখন গিয়েছে, এখনও এল না।
রেরতী। বড় বাবু মোরে বাগের মুখ থেকে ফিরে এনে দিয়েলো। আঁটকুড়ির বেটা এমন কিলও মেরিলি, বাছার পেট্ খসে গেল, তার পর বাছারে নিয়ে টানাটানি। আহা হা! দৌউত্র হয়েলো, রক্তোর দলা, তবু সব গড়ন দেখা দিয়েলো; আঙ্গুল গুলো পর্য্যন্ত হয়েলো। ছোট সাহেব মোর ক্ষেত্ররে খালে, বড় সাহেব বড় বাবুরি খালে। আহা হা! কাঙ্গালেরে কেউ রক্কে করে না!
সাধু। এমন কি পুণ্য করিছি যে দৌহিত্রের মুখ দর্শন করিব।
ক্ষেত্র। গা কেটে গেল—মাজা—ট্যাংরা মাচ হু—হু—হু—
রেবতী। নমীর আত্ বুঝি পোয়ালো, মোর সোণার পিত্তিমে জলে যায় মোর উপায় হবে কি! মোরে মা বলে ডাক্বে কেডা! ই কিত্তি নিয়ে এইলে—
(সাধুর গলা ধরিয়া ক্রন্দন)
সাধু। চুপ্ কর, এখন কাঁদিস্ নে, টাল্ যাবে।
(রাইচরণ এবং কবিরাজের প্রবেশ)
কবি। এক্ষণকার উপসর্গ কি? সে ঔষধ খাওয়ান হইয়াছিল?
সাধু। ঔষধ উদরস্থ হয় নাই—যাহা কিছু পেটের মধ্যে গিয়াছিল তাহাও তৎক্ষণাৎ বমন হইয়া গিয়াছে—এখন এক বার হাতটা দেখুন দিকি, বোধ হইতেছে, চরম কালের পূর্ব্ব লক্ষণ। রেবতী। কাঁটা কাঁটা কত্তি নেগেচে, এত পুরু করে বিছানা করে দেলাষ, তবু মা মোর ছোট্ ফট্ কচ্চেন—আঁর এক্টু ভাল অষুধ দিয়ে পরাণ দান দিয়ে যাও—মোর বড় সাধের কুটুম্বু গো!
(রোদন)
সাধু। নাড়ী পাওয়া যায় না।
কবি। (হস্ত ধরিয়া) এ অবস্থায় নাড়ী ক্ষীণ থাকা মঙ্গল লক্ষণ, “ক্ষীণে বলবতী নাড়ী সা নাড়ী প্রাণঘাতীকা।”
সাধু। ঔষধ এ সময় খাওয়ান না খাওয়ান সমান; পিতা মাতার শেষ পর্য্যন্ত আশ্বাস, দেখুন যদি কোন পন্থা থাকে।
কবি। আতপ তণ্ডুলের জল আবশ্যক, পূর্ণ মাত্রা সূচিকাভরণ সেবন করাই এক্ষণকার বিধি।
সাধু। রাইচরণ! ও ঘরে স্বস্ত্যয়নের জন্যে বড় রাণী যে আতপ চাল দিয়াছেন, তাহাই লইয়া আয়।
(রাইচরণের প্রস্থান)
রেবতী। আহা! অন্নপুন্নো কি চেতন আছেন, তা আপনি আলোচাল হাতে করে মোর ক্ষেত্রমণিরি দেক্তি আস্বেন, মোর কপাল হতেই মাঠাকুরুণ পাগল হয়েচেন।
কবি। একে পতিশোকে ব্যাকুলা, তাহাতে পুত্ত্র মৃতবৎ, ক্ষিপ্ততার ক্রমশঃ বৃদ্ধি হইতেছে, বোধ হয় কর্ত্রী ঠাকুরুণের নবীনের অগ্রে পরলোক হইবে, অতিশয় ক্ষীণা হইয়াছেন।
সাধু। বড় বাবুকে অদ্য কিরূপ দেখিলেন? আমার বোধ হয় নীলকরনিশাচরের অত্যাচারাগ্নি বড় বাবু আপনার পবিত্র শোণিত দ্বারা নির্ব্বাপিত করিলেন। কমিসনে প্রজার উপকার সম্ভব বটে, কিন্তু তাহাতে ফল কি? চৈতন বিলের এক শত কেউটে সর্প আমার অঙ্গময় একেবারে দংশন করে, তাহাও আমি সহ্য করিতে পারি, ইটের গাঁথনি উনানে সুঁদ্রি কাষ্ঠের জ্বালে প্রকাণ্ড কড়ায় টগ্বগ্ করিয়া ফুটিতেছে যে গুড়, তাহাতে অকস্মাৎ নিমগ্ন হইয়া খাবি খাওয়াও সহ্য করিতে পারি; আমাবস্যার রাত্রিতে হারে রে হৈ হৈ শব্দে নির্দ্দয় দুষ্ট ডাকাইতেরা সুশীল, সুবিদ্বান্ একমাত্র পুত্ত্রকে বধ করিয়া সম্মুখে পরমা-সুন্দরী পতি-প্রাণা দশ মাস গর্ভবতী সহধর্ম্মিণীর উদরে পদাঘাত দ্বারা গর্ভপাতন করিয়া সপ্তরুষার্জিত ধন সম্পত্তি অপহরণ পূর্ব্বক আমার চক্ষু তলোয়ার ফলায় অন্ধ করিয়া দিয়া যায়, তাহাও সহ্য করিতে পারি; গ্রামের ভিতরে একটা ছাড়িয়া দশটা নীলকুটি স্থাপিত হয় তাহাও সহ্য করিতে পারি, কিন্তু এক মূহুর্ত্তের নিমিত্তেও প্রজাপালক বড় বাবুর বিরহ সহ্য করিতে পারি না।
কবি। যে আঘাতে মস্তকের মস্তিষ্ক বাহির হইয়াছে, ঐ সাংঘাতিক। সান্নিপাতিকের উপক্রম দেখিয়া আসিয়াছি, দুই প্রহর অথবা সন্ধ্যাকালে প্রাণত্যাগ হইবে। বিপিনের হস্ত দিয়া একটু গঙ্গাজল মুখে দেওয়া গেল, তাহা দুই কস্ বহিয়া পড়িল। নবীনের কায়স্তিনী পতি শোকে ব্যাকুলা, কিন্তু পতির সদ্গতির উপায়ানুরক্তা।
সাধু। আহা! আহা! মা ঠাকুরুণ যদি ক্ষিপ্ত না হইতেন, তবে এ অবস্থা দর্শন করিয়া বুক ফেটে মরিতেন। ডাক্তার বাঁবুও মাথার ঘা সাংঘাতিক বলিয়াছেন।
কবি। ডাক্তার বাবুটি অতি দয়াশীল, বিন্দুবাবু টাকা দিতে উদ্যোগী হইলে, বলিলেন “বিন্দুবাবু তোমরা যে বিব্রত, তোমার পিতার শ্রাদ্ধ সমাধা হওয়ার সম্ভব নাই, এখন আমি তোমার কাছে কিছু লইতে পারি না, আমি যে বেহারায় আসিয়াছি সেই বেহারায় যাইব, তাহাদের আপনার কিছু দিতে হবে না” দুঃশাসন ডাক্তার হলে, কর্ত্তার শ্রাদ্ধের টাকা লইয়া ধাইত, বেটাকে আমি দুই বার দেখিছি, বেটা যেমন দুর্মুখো তেমনি অর্থপিশাচ।
সাধু। ছোট বাবু ডাক্তার বাবুকে সঙ্গে করে ক্ষেত্রমণিকে দেখিতে আসিয়াছিলেন, কিন্তু কোন ব্যবস্থা করিলেন না। আমার নীলকর অত্যাচারে অন্নাভাব দেখে ক্ষেত্রমনির নাম করে ডাকার বাবু আমারে দুই টাকা দিয়া গিয়েছেন।
কবি। দুঃশাসন ডাক্তার হলে হাত না ধরে বল্তো, বাঁচবে না; আর তোমার গোরু বেচে টাকা লইয়া যাইত।
রেবতী। মুই সর্ব্বস্ব বেচে টাকা দিতে পারি মোর ক্ষেত্রকে যদি কেউ বেঁচ্য়ে দেয়।
(চাল লইয়া রাইচরণের প্রবেশ)
কবি। চাল গুলিন প্রস্তরের বাটিতে ধৌত করিয়া জল আনয়ন কর।
(রেবতীর তণ্ডুল গ্রহণ)
জল অধিক দিও না—এ বাটিটীতো অতি পরিপাটী দেখিতেছি।
রেবতী। মাঠাকুরুণ গয়ায় গিয়েলেন, অনেক বাটি এনেলেন, মোর ক্ষেত্রকে এই বাটিডে দিয়েলেন। আহা! সেই মাঠীকুরুণ মোর ক্ষেপে উটেচেন, গাল্ চেপ্ড়ে মরেন বলে, হাত দুটো দড়ি দিয়ে বেঁদে এখেচে।
কবি। সাধু! খল আনয়ন কর, আমি ঔষধ বাহির করি।
(ঔষধের ডিপা খুলন)
সাধু। কবিরাজ মহাশয়! আর ঔষধ বাহির করিতে হইবে না, চক্ষের ভাব দেখুন দিকি; রাইচরণ এ দিকে আয়।
রেবতী। ওমা মোর কপালে কি হলো! ওমা মুই হারাণের রূপ ভোল্বো কেমন করে, বাপো! বাপো!—ও ক্ষেত্র, ও ক্ষেত্র, ক্ষেত্রমণি! মা—আর কি কথা কবা না, মা মোর বাপো, বাপো, বাপো! (ক্রন্দন)
কবি। চরম কাল উপস্থিত।
সাধু। রাইচরণ ধর্ ধর্।
(সাধুচরণ রাইচরণ দ্বারা শয্যা সহিত ক্ষেত্রকে বাহিরে লইয়া যাওন)
রেবতী। মুই সোণার নক্কি ভেস্য়ে দিতি পার্বো না! মারে মুই কনে যাবরে! সাহেবের সঙ্গি থাকা যে মোর ছিল ভাল মারে! মুই মুখ দেখে জুড়োতীম মারে! হো, হো হো!
(পাছা চাপড়াইতে চাপড়াইতে ক্ষেত্রমণির পশ্চাৎ ধাবন)
কবি। মরি, মরি, মরি, জননীর কি পরিতাপ—সন্তান না হওয়াই ভাল!
(প্রস্থান)
পঞ্চম অঙ্ক।
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
গোলোক বসুর বাটীর দরদালান।
(নবীন মাধবের মৃত শরীর ক্রোড়ে করিয়া সাবিত্রী আসীনা)
সাবি। আয়রের আমার জাদুমণির ঘুম্ আয়—গোপাল আমার বুক জুড়ানে ধন, সোণার চাঁদের মুখ দেখ্লে আমার সেই মুখ মনে পড়ে (মুখ চুম্বন) বাছা আমার ঘুমায়ে কাদা হয়েছে (মস্তকে হস্তামর্ষণ) আহা মরি, মরি, মশায় কাম্ড়ে করেছে কি?—গর্মি হয় বলে কি কর্বো, আর মশারি না খাট্য়ে শোব না। (বক্ষঃস্থলে হস্তামর্ষণ) মরে যাই, মার প্রাণে কি সয়, ছারপোকায় এমনি, কামড়েচে, বাছার কচি গা দিয়ে রক্ত ফুটে বেরুচ্চে। বাছার বিছানাটা কেউ করে দেয় না; গোপালেরে শোয়াই কেমন করে। আমার কি আর কেউ আছে, কর্ত্তার সঙ্গে সব গিয়েচে। (রোদন) ছেলে কোলে করে কাঁদিতেছি, হা পোড়া কপালি! (নবীনের মুখাবলোকন করে) দুঃখিনীর ধন আমার দয়ালা করিতেছে। (মুখ চুম্বন করিয়া) না বাবা তোমারে দেখে আমি সব দুঃখ ভুলে গিয়েছি, আমি কাঁদিতেছি না (মুখে স্তন দিয়া) মাই খাও গোপাল আমার, মাই খাও—গস্তানি বিটির পায় ধর্লাম তবু কত্তারে এক বার এনে দিলে না, গোপালের দুদ যোগান করে দিয়ে আবার যেতেন; বিটির সঙ্গে যে ভাব, চিটি লিখ্লিই যমরাজা ছেড়ে দিত। (আপনার হস্তে রজ্জু দেখিয়া) বিধবা হয়ে হাতে গহনা রাখিলে পতির গতি হয় না। চীৎকার করে কাঁদিতে লাগলাম, তবু আমারে শাঁকা পর্য়ে দিলে—প্রদীপে পুড়য়ে ফেলিচি তবু আছে (দন্ত দ্বারা হস্তের রজ্জু ছেদন) বিধবা হয়ে গহনা পরা সাজেও না, সয়ও না, হাতে ফোস্কা হয়েচে। (রোদন) আমার শাঁকা পরা যে ঘুচ্য়েচে, তার হাতের শাঁকা যেন তেরাত্রের মধ্যে নাবে (মাটিতে অঙ্গুলি মট্কায়ন) আপনিই বিছানা করি (মনে মনে শয্যাপাতন) মাজুরটো কাচা হয় নাই (হস্ত বাড়াইয়া) বালিস্টে নাগাল পাইনে—কাঁতা খানা ময়লা হয়েচে, (হস্ত দিয়া ঘরের মেজে ঝাড়ন) বাবারে শোয়াই (আস্তে আস্তে নবীনের মৃত শরীর ভূমিতে রাখিয়া) মার কাছে তোমার ভয় কি বাবা! সচ্চন্দে শুয়ে থাক থুথকুড়ি দিয়ে যাই (বুকে থুথ দেওন) বিবি বিটি আজ যদি আসে, আমি তার গলা টিপে মেরে ফেল্বো—বাছারে চোক ছাড়া করবো না, আমি গণ্ডি দিয়ে যাই (অঙ্গুলি দ্বারা নবীনের মৃত শরীর বেড়ে ঘরের মেজেয় দাগ দিতে দিতে মন্ত্র পঠন)
সাপের ফেনা বাঘের নাক।
ধূনোর আগুন চড়োক্ পাঁক॥
সাত সতিনের সাদা চুল।
ভাঁটির পাতা ধুতরো ফুল॥
নীলের বিচি মরিচ পোড়া।
মড়ার মাথা মাদার গোড়া॥
হন্নে কুকুর চোরের চণ্ডী।
যমের দাঁতে এই গণ্ডি॥
(সরলতার প্রবেশ)
সর। এঁরা সব কোথায় গেলেন—আহা! মৃত শরীর বেষ্টন করিয়া ঘুরিতেছেন—বোধ করি প্রাণকান্ত পথশ্রান্তে নিতান্ত ক্লান্তিবশতঃ ভূমিতে পতিত হইয়া শোকদুঃখবিনাশিনী নিদ্রাদেবীর শরণাপন্ন হইয়াছেন। নিদ্রে! তোমার কি লোকাতীত মহিমা! ভুমি বিধবাকে সধবা কর, বিদেশীকে দেশে আন, তোমার স্পর্শে করাবাসিদের শৃঙ্খল ছেদ হয়, তুমি রোগীর ধন্বন্তরি, তোমার রাজ্যে বর্ণভেদে ভিন্নতা নাই, তোমার রাজনিয়ম জাতিভেদে ভিন্ন হয় না; তুমি আমার প্রাণকান্তকে তোমার নিরপেক্ষ রাজ্যের প্রজা করিয়াছ, নচেৎ তাঁহার নিকট হইতে পাগলিনী জননী মৃতপুত্রকে কিরূপে আনিলেন। জিবীতনাথ পিতা ভ্রাতাবিরহে নিতান্ত অধীর হইয়াছেন। পূর্ণিমার শশধর যেমন কৃষ্ণপক্ষে ক্রমে ক্রমে হ্রাস প্রাপ্ত হয়, জীবিতনাথের মুখল৩াবণ্য সেইরূপ দিন দিন মলিন হইয়া একেবারে দূর হইয়াছে। মা গো, তুমি কখন উঠিয়া আসিয়াছ? আমি আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া সতত তোমার পেবায় রত আছি, আমি কি এত এচৈতন্য হয়ে পড়েছিলাম? তোমাকে সুস্থ করিবার জন্যে আম তোমার পতিকে যমরাজার বাড়ী হইতে আনিয়া দিব স্বীকার করিয়াছি, তুমি কিঞ্চিৎ স্থির রহিয়াছিলে। এই ঘোর রজনী, সৃষ্টী সংহারে প্রবৃত্ত প্রলয়কালের ভীষণ অন্ধতামসে অবনী আবৃত, আকাশমণ্ডল ঘনতর ঘনঘটায় আচ্ছন্ন; বহ্নিবাণের ন্যায় ক্ষণে ক্ষণে ক্ষণপ্রভা প্রকাশিত; প্রাণি মাত্রেই কালনিদ্রানুরূপ নিদ্রায় অভিভূত; সকলি নীরব; শব্দের মধ্যে অরণ্যাভ্যন্তরে অন্ধকারকুল শৃগালকুলের কোলাহল এবহ তস্করনিকরের অমঙ্গলকর কুক্কুরগণের ভীষণ শব্দ; এমত ভয়াবহ নিশীথ সময়ে জননি! তুমি কিরূপে একাকিনী বহির্দ্বারে গমন করিয়া মৃত পুত্ত্রকে আনয়ন করিলে?
(মৃত শরীরের নিকট গমন)
সাবি। আমি গণ্ডি দিইচি, গণ্ডির ভিতর এলি?
সর। আহা! এমত দেশ বিজয়ী জীবনাধিক সহোদর বিচ্ছেদে প্রাণনাথের প্রাণ থাকিবে না।
(ক্রন্দন)
সাবি। তুই আমার ছেলে দেখে হিংসে কচ্ছিস্? ও সর্ব্বনাশি, রাঁড়ী, আঁট্কুড়ির মেয়ে, তোর ভাতার ঘরে—বার হ, এখান থেকে বার হ, নইলে এখনি তোর গলায় পা দিয়ে জীব টেনে বার্ কর্বো।
সর। আহা! আমার শ্বশুর শাশুড়ির এমন সুবর্ণষড়ানন জলের মধ্যে গেল!
সাবি। তুই আমার ছেলের দিকে চাসনে, তোরে বারণ কচ্চি—ভাতারখাগি। তোর মরণ ঘুন্য়ে এয়েচে দেখ্চি।
(কিঞ্চিৎ অগ্রে গমন)
সর। আহা! কৃতান্তের করাল কর কি নিষ্ঠুর আমার সরল শাশুড়ির মনে তুমি এমন দুঃখ দিলে, হা যম!
সাবি। আবার ডাক্চিস, আবার ডাক্চিস। (দুই হস্তে সরলতার গলা টিপে ধরিয়া ভূমিতে ফেলিয়া) পাজিবিটি, যমসোহাগি, এই তোরে মেরে ফেলি (গলায় পা দিয়া দণ্ডায়মান) আমার কত্তারে খেয়েচে, আবার আমার দুদের বাছাকে খাবার জন্যে তোমার উপপতিকে ডাক্চো—মর্ মর্ মর্ মর্ (গলার উপর নৃত্য)।
সর। গ্যা—অ্যা, অ্যা, অ্যা—
(সরলতার মৃত্যু)
(বিন্দুনাধবের প্রবেশ)
বিন্দু। এই যে এখানে পড়িয়া রহিয়াছে—ওমা! ও কি! আমার সরলতাকে মেরে ফেলিলে জননি! (সরলতার মস্তক লইয়া) আমার প্রাণের মলা যে এ পাপ পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়াছেন (রোঁদনাস্তর সরলতার মুখচুম্বন)
সাবি। কাম্ড়ে মেরে ফেল নচ্ছার বিটিকে—আমার কচি ছেলে খাবার জন্যে যমকে ডাকছেল, আমি তাই গলায় পা দিয়ে মেরে ফেলিচি।
বিন্দু। হে মাতঃ, জননী যেমন যামিনীযোগে অঙ্গচালনা দ্বারা স্তনপানাসত্ত বক্ষঃস্থলস্থ দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বধ করিয়া নিদ্রাভঙ্গে বিলাপে অধীরা হইয়া আত্মঘাত বিধান করে, আপনার যদি এক্ষণে শোকদুঃখবিস্মারিকা ক্ষিপ্ততার অপগম হয়, তবে আপনিও আপনার জীবনাধিক সরলতা বধজনিত মনস্তাপে প্রাণ ত্যাগ করেন। মা! তেমার জ্ঞানদীপের কি আর উন্মেষ হইবে না—আপনার জ্ঞানসঞ্চার আর না হওয়াই ভাল। আহা, মৃত পতিপুত্রা নারীর ক্ষিপ্ততা কি সুখপ্রদ! মনোমৃগ ক্ষিপ্ততা-প্রস্তরপ্রাচীরে বেষ্টিত, শোক-শার্দ্দূল আক্রমণ করিতে অক্ষম। মা! আমি তোমার বিন্দুমাধব।
সাবি। কি,কি বলো?
বিন্দু। মা! আমি যে আর জীবন রাখিতে পারিনে—জননি পিতার উদ্বন্ধনে এবৎ সহোদরের মৃত্যুতে আপনি পাগল হইয়া আমার সরলতাকে বধ করিয়া আমার ক্ষত হৃদয়ে লবণ প্রদান করিলেন।
সাবি। কি? নবীন আমার নেই, নবীন আমার নেই!—মরি মরি বাবা আমার! সোণার বিন্দুমাধব আমার! অমি তোমার সরলতারে বধ করিয়াছি—ছোট বউমাকে আমি পাগল হয়ে মেরে ফেলিচি, (সরলতার মৃত শরীর অঙ্কে ধারণ করিয়া আলিঙ্গন) আহা, হা! আমি পতিপুত্ত্রবিহীন হয়েও জীবিত থাকিতে পারিতাম, কিন্তূ তোমাকে স্বহস্তে বধ করে আমার বুক ফেটে গেল—হো, ও, মা! (সরলতাকে আলিঙ্গন পূর্ব্বক ভূতলে পতনান্তনর মৃত্যু)
বিন্দু। (সাবিত্রীর গাত্রে হস্ত দিয়া) যাহা বলিলাম তাহাই ঘটিল! মাতার জ্ঞান সঞ্চারে প্রাণনাশ হইল! কি বিডম্বনা! জননী আর ক্রোড়ে লয়্যে মুখ চুম্বন করিবেন না! মা! আমার মা বলা কি শেষ হইল? (রোদন) জন্মের মত জননীর চরণধুলি মস্তকে দি। (চরণের ধূলি মৃত্তকে দেওন) জন্মের মত জননীর চরণরেণু ভোজন করিয়া মানব দেহ পবিত্র করি।
(চরণের ধূলি ভক্ষণ)
(সৈরিন্ধ্রির প্রবেশ)
সৈরি। ঠাকুর পো! আমি সহমরণে যাই আমারে বাধা দিও না! সরলতার কাছে বিপিন আমার পরম সুখে থাঁকবে—একি, একি! শাশুড়ি বয়ে এরূপ পড়ে কেন?
বিন্দু। বড়বউ, মাতাঠাকুরাণী সরলতাকে বধ করিয়াছেন, তৎপরে সহসা জ্ঞান সঞ্চার হওয়াতে, আপনিও সাতিশয় শোকসন্তপ্তা হইয়া প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন।
সৈরি। এখন! কেমন করে? কি সর্ব্বনাশ! কি হলো, কি হলো! আহা, আহা! ও দিদি আমার যে বড় সাঁধের চুলের দড়ি, তুমি যে আজো খোঁপায় দেউনি, আহা, আহা! আর তুমি দিদি বলে ডাকবে না (রোদন) ঠাকুরুণ, তোমার রামের কাছে তুমি গেলে আমায় যেতে দিলে না। ও মা! তোমায় পেয়ে আমি মায়ের কথা যে এক দিনও মনে করিনি।
(আদুরীর প্রবেশ)
আদু। বিপিন ডরয়ে উটেচে, বড়হালদার্নী তুমি শীগ্গির এস।
সৈরি। তুই সেইখান হতে ডাক্তে পারিসনি, একা রেখে এইচিস্?
(আদুরীর সহিত বেগে প্রস্থান)
বিন্দু। বিপিন আমার বিপদসাগরে ধ্রুব নক্ষত্র। (দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) বিনশ্বর অবনিমণ্ডলে মানবলীলা, প্রবল প্রবাহ-সমাকুলা গভীর স্রোতস্বতীর অত্যুচ্চ কূলতুম্য ক্ষণভঙ্গুর। তটের কি অপূর্ব্ব শোভা! লোচনা-নন্দপ্রদ নবীন দূর্ব্বাদলাবৃত ক্ষেত্র, অভিনব পল্যব-সুশোভিত মহীরূহ, কোথাও সন্ত্বোষসঙ্কুলিত ধীবরের পর্ণকূটীর বিরাজমান, কোথাও নব দূর্ব্বাদললোলূপা সবৎসা ধেনু আহারে বিমুগ্ধা; আহা! তথায় ভ্রমণ করিলে বিহঙ্গমদলের সুললিত ললিত তানে এবং প্রস্ফূটিত বনপ্রসূনসৌরভামৌদিত মন্দ মন্দ গন্ধবহে পূর্ণানন্দ আনন্দময়ের চিন্তায় চিত্ত অবগাহন করে। সহসা ক্ষেত্রোপরি রেখার স্বরূপ চিড়্ দর্শন, অচিরাৎ শোভাসহ কূল ভগ্ন হইয়া গভীর নীরে নিমগ্ন। কি পরিতাপ! স্বরপূরনিবাসী বসুকূল নীলকীর্ত্তিনাশায় বিলুপ্ত হইল—আহা! নীলের কি করাল কর!
নীলকর বিষধর বিষপোরা মূখ।
অনলশিখায় ফেলে দিল যত সুখ॥
অবিচারে কারাগারে পিতার নিধন।
নীলক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হলেন পতন॥
পতি পুত্রশোকে মাতা হয়ে পাগলিনী।
স্বহস্তে করেন বধ সরলা কামিনী॥
আমার বিলাপে মার জ্ঞানের সঞ্চার।
একেবারে উথলিল দুঃখ পারাবার॥
শোকশূলে মাখা হলো বিষ বিড়ম্বনা।
তখনি মলেন মাতা কে শোনে সান্ত্বনা॥
কোথা পিতা কোথা পিতা ডাকি অনিবার।
হাস্য মূখে আলিঙ্গন কর একবার॥
জননি জননি বলে চারি দিকে চাই।
আনন্দমময়ীর মূর্ত্তি দেখিতে না পাই॥
মা বলে ডাকিলে মাতা অমনি আসিয়ে।
বাছা বলে কাছে লন মূখমূছাইয়ে॥
অপার জননীস্নেহ কে জানে মহিমা।
রণে বনে ভীতমনে বলি মা, মা, মা মা,॥
সুখাবহ সহোদর জীবনের ভাই।
পৃথিবাতে হেন বন্ধু আর ছুটি নাই॥
নয়ন মেলিয়া দাদা দেখ এক বার।
বাড়ী আসিয়াছে বিন্দুমাধব তোমার॥
আহা! আহা! মরি মরি বুক ফেটে যায়!
প্রাণের সরলা মম লুকালো। কোথায়॥
রূপবতী গুণবতী পতিপরায়ণা।
মরালগমনা কান্তা কুরঙ্গ নয়ন॥
সহাস্য বদনে সতী সুমধুর স্বরে|
বেতাল করিতে পাঠ মম করে ধরে॥
অমৃত পঠনে মন হতো বিমোহিত।
বিজন বিপিনে বন বিহঙ্গসঙ্গীত॥
সরলা সরোজ কান্তি কিবা মনোহর।
আলো করেছিল মম দেহ সরোবর॥
কে হরিল সরোরুহ হইয়া নির্দ্দয়।
শোভাহীন সরোবর অন্ধকারময়॥
হেরি সব শবময় শ্মশান সংসার।
পিতা মাতা ভ্রাতাা দারা মরেছে আমার॥
|আহা! এরা সব দাদার মৃত দেহ অণ্বেষণ করিতে কোথায় গমন করিল—তাহারা আইলে জাহ্নবীযাত্রার আয়োজন করা যায়—আহা! পুরুষসিংহ নবীনমাধবের জীবন-নাটকের শেষ অঙ্ক কি ভয়ঙ্কর!
(সাবিত্রীর চরণ ধরিয়া উপবেশন)
সমাপ্তমিদং নীলদর্পণং নাম নাটকং।
প্রথম অঙ্ক
নীল দর্পণ
নাটক।
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
স্বরপুর গোলোকচন্দ্র বসুর গোলাঘরের রোয়াক।
(গোলোকচন্দ্র বসু এবং সাধুচরণ আসীন।)
সাধু। আমি তখনি বলেছিলাম, কর্ত্তা মহাশয়, আর এদেশে থাকা নয়, তা আপনি শুনিলেন না। কাঙ্গালের কথা বাসি হলে খাটে।
গোলোক। বাপু, দেশছেড়ে যাওয়া কি মুখের কথা? আমার এখানে সাত পুরুষ বাস। স্বর্গীয় কর্ত্তারা যে জমাজমি করে গিয়েছেন, তাতে কখন পরের চাকরী স্বীকার কত্তে হয়নি। যে ধান জন্মায় তাতে সম্বৎসরের খোরাক হয়, অতিথি সেবা চলে, আর পূজার খরচ কুলায়; যে শরিষা পাই, তাহাতে তেলের সংস্থান হইয়া ৬০।৭০ টাকার বিক্রী হয়। বল কি বাপু, আমার সোনার স্বরপূর, কিছুরি ক্লেশ নাই। ক্ষেতের চাল, ক্ষেতের ডাল, ক্ষেতের তেল, ক্ষেতের গুড়, বাগানের তরকারি, পুকুরের মাচ। এমন সুখের বাস ছাড়্তে, কার হৃদয় না বিদীর্ণ হয়? আর কেই বা সহজে পারে।
সাধু। এখন তাে আর সুখের বাস নাই। আপনার বাগান গিয়াছে, গাঁতিও যায় যায় হয়েছে। আহা! তিন বৎসর হয়নি সাহেব পত্তনি নিয়েছে, এর মধ্যে গাঁখান ছারক্ষার করে তুলেছে। দক্ষিণ পাড়ার মােড়লদের বাড়ীর দিকে চাওয়া যায় না, আহা! কি ছিল কি হয়েছে। তিন বৎসর আগে দুবেলায় ৬০ খান পাত পড়্তাে, ১০ খান লাঙ্গল ছিল, দাম্ড়াও ৪০।৫০টা হবে। কি উঠানই ছিল, যেন ঘােড় দৌডের মাঠ, আহা! যখন আসধানের পালা সাজাতাে বোধ হতাে যেন চন্দন বিলে পদ্ম ফুল ফুটে রয়েছে। গােয়াল খান ছিল যেন একটা পাহাড়। গেল সন্, গোয়াল সারিতে না পারায় উঠানে হুম্ড়ি খেয়ে পড়ে রয়েছে। ধানের ভূঁয়ে নীল করেনি বলে মেজো সেজো দুই ভাইকে ধরে সাহেব বেটা আর বৎসর কি মারটিই মেরেছিল; উহাদের খালাশ করে আন্তে কত কষ্ট, হাল গােরু বিক্রী হয়ে যায়। ঐ চোটেই দুই মােড়ল গাঁ ছাড়া হয়।
গােলোক। বড় মােড়ল না তার ভাইদের আন্তে গিয়াছিল?
সাধু। তারা বলেছে, ঝুলি নিয়ে ভিক্ষে করে খাব, তবু ওগাঁয় আর বাস কর্বো না! মােড়ল এখন একা পড়েছে। দুইখান লাঙ্গল রেখেছে, তা নীলের জমিতেই যােড়া থাকে। এও পালাবার যােগাড়ে আছে। কর্ত্তা মহাশয়, আপনিও দেশের মায়া ত্যাগ করুণ। গতবারে আপনার ধান গিয়াছে, এইবারে যান যাবে।
গোলােক। যান যাওয়ার আর বাকি কি? পুষ্করিণীটির চার্ পাড়ে চাস দিয়াছে, তাহাতে এবার নীল কর্বে, তা হলেই মেয়েদের পুকুরে যাওয়া বন্ধ হলাে! আর সাহেব বেটা বলেছে, যদি পুর্ব্ব মাঠের ধানি জমি কয় খানায় নীল না বুনি, তবে নবীন মাধবকে সাত কুটির জল খাওয়াইবে।
সাধু। বড়বাবু না কুটি গিয়াছেন?
গােলােক। সাধে গিয়াছেন, প্যায়দায় লয়ে গিয়াছে।
সাধু। বড়বাবুর কিন্তু ভ্যালা সাহস। সেদিনে সাহেব বলে “যদি তুমি আমিন্ খালাসিরকথা না শােনাে, আর চিহ্ণিত জমিতে নীল না কর, তবে তােমার বাড়ি উঠাইয়ে বেত্রাবতীর জলে ফেলাইয়া দিব, এবং তােমারে কুটির গুদামে ধান খাওয়াইব” তাহাতে বড়বাবু কহিলেন “আমার গতসনের ৫০ বিঘা নীলের দাম চুকায়ে না দিলে এবৎসর এক বিঘাও নীল করিব না, এতে প্রাণ পর্য্যন্ত পণ, বাড়ি কি ছার!”
গোলােক। তা না বলেই বা করে কি! দেখ দেখি, পঞ্চাশ বিঘা ধান হইলে আমার সংসারের কিছু কি ভাবনা থাকতো! তাই যদি নীলের দাম্ গুণো চুক্য়ে দেয়, তবু অনেক কষ্ট নিবারণ হয়।
(নবীন মাধবের প্রবেশ।)
কি বাবা, কি করে এলে?
নবীন। আজ্ঞে, জননীর পরিতাপ বিবেচনা করে কি কালসর্প ক্রোড়স্থ শিশুকে দংশন করিতে সঙ্কুচিত হয়? আমি অনেক স্তুতিবাদ করিলাম, তা তিনি কিছুই বুঝিলেন না। সাহেবের সেই কথা, তিনি বলেন ৫০ টাকা লইয়া ৬০ বিঘা নীলের লেখাপড়া করিয়া দাও, পরে একেবারে দুইসনের হিসাব চুকাইয়া দেওয়া যাবে।
গোলােক। ৬০ বিঘা নীল কত্তে হলে অন্য ফসলে হাত দিতে হবে না। অন্ন বিনাই মারা যেতে হলাে।
নবীন। আমি বলিলাম, সাহেব, আমাদিগের লােকজন লাঙ্গল গােরু সকলি আপনি নীলের জমিতে নিযুক্ত করে রাখুন, কেবল আমাদিগের সম্বৎসরের আহার দিবেন; আমরা বেতন প্রার্থনা করি না। তাহাতে উপহাস করিয়া কহিলেন, “তোমরাতো যবনের ভাত খাওনা।”
সাধু। যারা পেট ভাতায় চাক্রি করে, তারাও আমাদিগের অপেক্ষা সুখী।
গােলোক। লাঙ্গল প্রায় ছেড়ে দিয়াছি, তবুতাে নীল করা ঘােচে না। নাছোড়্ হইলে হাত কি? সাহেবের সঙ্গে বিবাদতো সম্ভবেনা, বেঁধে মারে সয় ভাল, কাযে কযেই গত্তে হবে।
নবীন। আপনি যেমন অনুমতি করিবেন, আমি সেইরূপ করিব। কিন্তু আমার মানস একবার মোকদ্দমা করা।
(আদুরীর প্রবেশ।)
আদুরী। মাঠাকুরুণ যে বক্তি লেগেচে, কত বেলা হলো, আপনারা নাবা খাবা কর্বেন্ না? ভাত শুক্য়ে যে চাল হয়ে গেল।
সাধু। (দাঁড়ায়ে) কর্ত্তা মহাশয়, এর একটা বিলি ব্যবস্থা করুণ, নতুবা আমি মারা যাই। দেড়খানা লাঙ্গলে নয় বিঘা নীল দিতে হলে, হাঁড়ি সিকেয় উঠ বে। আমি আসি, কর্ত্তা মহাশয় অবধান, বড়বাবু নমস্কার করি গো।
(সাধুচরণের প্রস্থান।)
গোলোক। পরমেশ্বর এভিটায় স্নান আহার কত্তে দেন, এমত বোধ হয় না, যাও বাবা, স্নান করগে!
(উভয়ের প্রস্থান)
প্রথম অঙ্ক।
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
সাধুচরণের বাড়ী।
(লাঙ্গল লইয়া রাইচরণের প্রবেশ)
রাই। (লাঙ্গল রাখিয়া) আমীন সুমুন্দি য্যান বাগ্, যে রোক্ করে মোর দিকি আস্চিলো বাবারে! মুই বলি মোরে বুঝি খালে। সাঁপোল তলার ৫ কুড়ো ভূঁই যদি নীলি গ্যাল, তবে মাগ্ ছেলেরে খাওয়াব কি। কাঁদাকাটি করে দ্যাক্বো, যদি না ছাড়ে তবে মোরা কাযেই দ্যাশ ছাড়ে যাব।
(ক্ষেত্রমণির প্রবেশ)
দাদা বাড়ি এয়েছে?
ক্ষেত্র। বাবা বাবুদের বাড়ি গিয়েছে, আলেন, আর দেরি নেই। কাকিমারে ডাক্তি যাবা না? তুমি বক্চো কি?
রাই। বক্চি মোর মাতা। একটু জল আন দিনি খাই, তেষ্টায় যে ছাতি ফেটে গ্যাল। সুমুন্দিরি—অ্যাত করি বল্লাম, তা কিছুতি শোন্লে না।
(সাধুচরণের প্রবেশ এবং ক্ষেত্রমণির প্রস্থান)
সাধু। রাইচরণ, তুই এত সকালে যে বাড়ি এলি?
রাই। দাদা, আমীন শালা সাঁপোল তলার জমিতি দাগ্ মেরেচে। খাব কি, বচ্ছোর যাবে কেমন করে। আহা জমিতো না, য্যান সোণার চাঁপা। এক কোন্ কেটে মহাজন কাৎকত্তাম। খাবকি, ছেলে পিলে খাবে কি, এতডা পরিবার না খাতি পেয়ে মারা যাবে, ও মা! রাত পোয়ালি যে দুকাটা চালির খরচ, না খাতি পেয়ে মর্বো, আরে পোড়া কপাল, আরে পোড়াকপাল; গোড্ডার নীলি কল্লে কি? অ্যাঁ! অ্যাঁ।
সাধু। ঐ ক বিঘা জমির ভরসাতেই থাকা, তাই যদি গ্যালো তবে আর এখানে থেকে কর্বো কি। আর যে দুই এক বিঘা নােনা ফেলা আছে, তাতেতো ফলন নাই, আর নীলের জমিতে লাঙ্গল থাক্বে, তা কারকিৎই বা কখন কর্বো। তুই কাঁদিস্নে, কাল হাল্ গোরু বেচে গাঁর মুখে ঝাঁটা মেরে বসন্ত বাবুর জমিদারিতে পাল্য়ে যাব।
(ক্ষেত্রমণি ও রেবতীর জল লইয়া প্রবেশ)
জল খা, জল খা, ভয় কি, “জীব দিয়েচে যে, আহার দেবে সে!” তা তুই আমিনকে কি বলে এলি।
রাই। মুই বলবো কি, জমিতি দাগ মার্তি নাগ্লাে, মোর বুকি য্যান বিদে কাটি পুড়্য়ে দিতি নাগ্লো। মুই পায় ধল্লাম, ট্যাকা দিতে চালাম; তা কিছুই শােন্লে না। বলে, “যা তাের বড় বাবুর কাছে যা, তাের বাবার কাছে যা,” মুই ফোজদুরি কর্বো বলে সেঁস্য়ে এইচি। (আমিনকে দূরে দেখিয়া।) ঐ দ্যাখ্ শালা আস্চে, প্যায়দা সঙ্গে করে এনেচে, কুটি ধরে নিয়ে যাবে।
(আমিন এবং দুইজন পেয়দার প্রবেশ)
আমিন। বাঁদ্, রেয়ে শালাকে বাঁদ্।
(পেয়দাদ্বয় দ্বারা রাইচরণের্ বন্ধন)
রেবতী। ওমা, ইকি, হ্যাঁগা বাঁদো ক্যান। কি সর্ব্বনাশ, কি সর্ব্বনাশ। (সাধুর প্রতি) তুমি দেঁড়্য়ে দ্যাক্চো কি, বাবুদের বাড়ি যাও, বড় বাবুকে ডেকে আনো।
আমিন। (সাধুর প্রতি) তুই যাবি কোথা, তোরও যেতে হবে। দাদন লওয়া রেয়ের কর্ম্ম নয়। ঢ্যারা সইতে অনেক সইতে হয়। তুই লেখা পড়া জানিস তােকে খাতায় দস্তখৎ করে দিয়ে আস্তে হবে।
সাধু। আমিন মহাশয়! একেকি নীলের দাদন বলাে, নীলের গাদন বল্যে ভাল হয় না? হা পােড়া অদৃষ্ট, তুমি আমার সঙ্গে আছ, যার ভয়ে পাল্য়ে এলাম, সেই ঘায় আবার পড়্লাম। পত্তনির আগে এ তাে রামরাজ্য ছিল, তা “হাবাতেও ফকির হলো দেশেও মন্বন্তর হলাে।”
আমিন। (ক্ষেত্রমণির প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া স্বগত) এ ছুঁড়িতো মন্দ নয়। ছােট সাহেব এমন মাল পেলেতাে লুপে নেবে— আপনার বুন দিয়ে বড় পেস্কারি পেলাম, মালটা ভাল— —দেখা যাক।
রেবতী। ক্ষেত্র, মা তুই ঘরের মধ্যে যা।
(ক্ষেত্রমণির প্রস্থান।)
আমিন। চল্ সাধু, এই বেলা মানে মানে কুটি চল্।
(যাইতে অগ্রসর হইল)
রেবতী। ও যে এট্টু জল খাতি চেয়েলাে, ও আমিন মশাই, তােকার কি মাগ্ ছেলে, নেই, কেবল লাঙ্গল রেখেছে আর এই মারপিট্! ওমা ও যে ডব্কা ছেলে, ওযে এতক্ষণ দুবার খায়, না খেয়ে সাহেবের কুটি যাবে কেমন করে, সে অনেক দূর। দোহাই সাহেবের। ওরে চাড্ডি খেইয়ে নিয়ে যাও—আহা, আহা, মাগ ছেলের জন্যেই কাতর, এখনাে চকি জল পড়্চে, মুখ শুইকে গেছে—কি কর্বো; কি পােড়া দেশে এলাম ধনে প্রাণে গ্যালাম, হায়, হায়, হায়, ধনে প্রাণে গ্যালাম (ক্রন্দন)
আমিন। আরে মাগি, তাের নাকিসুর এখন রাখ্, জল দিতে হয়তো দে, নয় ওমনি নিয়ে যাই।
(রাই চরণের জলপান এবং সকলের প্রস্থান।)
প্রথম অঙ্ক।
তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।
বেগুণ বেড়ের কুটি, বড় বাঙ্গালার বারেন্দা।
(আই, আই, উড সাহেব এবং গোপীনাথ দাস
দেওয়ানের প্রবেশ।)
গােপী। হুজুর, আমি কি কসুর করিতেছি; আপনি স্বচক্ষেইতাে দেখিতেছেন। অতি প্রত্যুষে ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিয়া তিন প্রহরের সময় বাসায় প্রত্যাগমন করি, এবং আহারের পরেই আবার দাদনের কাগচ পত্র লইয়া বসি, তাহাতে কোন দিন রাত্র দুইপ্রহরও হয়, কোন দিন বা একটাও বাজে।
উড। তুমি শালা বড় না লায়েক আছে। স্বরপুর, শাম নগর, শান্তিঘাটা এ তিন গাঁয় কিছু দাদন হলাে না। শ্যামচাঁদ বেগোর তোম্ দোরস্ত হােগা নেই।
গোপী। ধর্ম্মাবতার, অধীন হুজুরের চাকর, আপনিই অনুগ্রহ করিয়া পেস্কারি হইতে দেওয়ানী দিয়াছেন। হুজুর মালিক, মারিলেও মারিতে পারেন, কাটিলেও কার্টিতে পারেন। এ কুটির কতকগুলিন প্রবল শত্রু হইয়াছে, তাহাদের শাসন ব্যতীত নীলের মঙ্গল হওয়া দুস্কর।
উড। আমি না জানিলে কেমন করে শাসন করিতে পারে। টাকা, ঘোড়া লাটিয়াল, শড়কি— ওয়ালা আমার অনেক আছে, ইহাতে শাসন হইতে পারেনা? সাবেক দেওয়ান, শত্রুর কথা আমাকে জানাইতো—তুমি দেখিনি, আমি বজ্জাতদের চাবুক দিয়াছি, গোরু কেড়ে অনিয়াছি, জরু কয়েদ করিয়াছি; জোরু কয়েদ করিলে শালা লোক বড় শাসিত হয়। বজ্জাতি কা বাত্ হাম্ কুচ্ শুনা নেই—তুমি বেটা লক্কি ছাড়া আমারে কিছু বলিনি—তুমি শালা বড় না লায়েক আছে। দেওয়ানি কাম কায়েট্ কা হায় নেই বাবা—তোম কো জুতি মার্কে নেকাল ডেকে হাম্ এক আদ্মি ক্যাওটকো একাম্ দেগা।
গোপী। ধর্ম্মাবতার, যদিও বন্দা জাতিতে কায়স্থ, কিন্তু কার্য্যে ক্যাট, ক্যাওটের মতই কর্ম্ম দিতেছে। মোলাদের ধান ভেঙ্গে নীল করিবার জন্য এবং গোলোক বসের সাত পুরুষে লাখেরাজ বাগান ও রাজার আমলের গাঁতি বাহির করিয়া লইতে আমি যে সকল কার্য্য করিয়াছি, তাহা ক্যাওট কি, চামারেও পারে না, তা আমার কপাল মন্দ, তাই এত করেও যশ নাই।
উড। নবীনমাধর শালা সব টাকা চুক্য়ে চায়—— ওস কো হাম্ এক কৌড়ি নেহি দেগা, ওস্কো হিসাব দোরস্ত কর্কে রাখ—— বাঞ্চৎ বড়া মাম্লাবাজ্, হাম্ দেখেগা শালা কেস্তারে রূপেয়া লেয়।
গোপী। ধর্ম্মাবতার, ঐ এক জন কুটির প্রধান শত্রু। পলাশপুর জ্বালান কখনই প্রমাণ হইত না, যদি নবীন বস ওর ভিতরে না থাকিত। বেটা আপনি দরখাস্তের মুসাবিদা করিয়া দেয়, উকীল মোক্তারদিগের এমন সলা পরামর্শ দিয়াছিল, যে তাহার জোরেই হাকিমের রায় ফিরিয়া যায়। এই বেটার কৌশলেই সাবেক দেওয়ানের দুই বৎসর মেয়াদ হয়। আমি বারণ করিয়াছিলাম, নবীন বাবু, সাহেবের বিরুদ্ধাচরণ কর না। বিশেষ সাহেব তো তোমার ঘর জ্বালান্ নাই, তাতে বেটা উত্তর দিল “গোরিব প্রজাগণের রক্ষাতে দীক্ষিত হইয়াছি, নিষ্ঠুর নীলকরের পীড়ন হইতে যদি এক জন প্রজাকেও রক্ষা করিতে পারি, তাহা হইলেই আপনাকে ধন্য জ্ঞান করিব, আর দেওয়ানজিকে জেলে দিয়ে বাগানের শোধ লব।” বেটা যেন পাদরি হয়ে বসেছে। বেটা এবার আবার কি যোটা যোট করিতেছে, তার কিছুই বুঝিতে পারি না।
উড। তুমি ভয় পাইয়াছ, হাম্ বোলাকি নেই তুমি বড় না-লায়েক আছে, তোম ছে কাম্ হোগা নেই।
গোপী। হুজুর ভয় পাওয়ার মত কি দেখিলেন, যখন এ পদবীতে পদার্পণ করিছি, তখন ভয়, লজ্জা, সরম্, মান, মর্য্যাদার মাথা খাইয়াছি, গোহত্যা, ব্রহ্মহত্যা, স্ত্রীহত্যা, ঘর জ্বালান অঙ্গের অভরণ হইয়াছে, আর জেলখানা শিওরে করে বসে আছি।
উড। আমি কথা চাইনে, আমি কায চাই।
(সাধুচরণ, রাইচরণ, আমিন ও পেয়াদা দ্বয়ের
সেলাম্ করিতে করিতে প্রবেশ)
এ বজ্জাতের হস্তে দড়ি পড়িয়াছে কেন?
গোপী। ধর্ম্মাবতার, এই সাধুচরণ এক জন মাতব্বর রাইয়ত, কিন্তু নবীন বসের পরামর্শে নীলের ধ্বংসে প্রবৃত্ত হইয়াছে।
সাধু। ধর্ম্মাবতার নীলের বিরুদ্ধাচরণ করি নাই, করিতেছি না এবং করিবার ক্ষমতা নাই, ইচ্ছায় করি আর অনিচ্ছায় করি, নীল করিছি, এবারেও করিতে প্রস্তুত আছি। তবে সকল বিষয়ের সম্ভব অসম্ভব আছে, আদ্ আঙ্গুল চুঙ্গিতে আট্ আঙ্গুল বারূদ পুরিলে কাযেই ফাটে। আমি অতি ক্ষুদ্র প্রজা দেড় খানি লাঙ্গল রাখি, আবাদ হদ্দ ২০ বিঘা তার মধ্যে যদি ৯ বিঘা নীলে গ্রাস করে, তবে কাযেই চট্তে হয়। তা আমার চটায় আমিই মর্বো হুজুরের কি!
গোপী। সাহেবের ভয়, পাছে তুমি সাহেবকে তোমাদের বড়বাবুর গুদামে কয়েদ করে রাখ।
সাধু। দেওয়ানজি মহাশয়, মড়ার উপর আর খাঁড়ার ঘা কেন দেন। আমি কোন্ কীটস্য কীট, যে সাহেবকে কয়েদ কর্ব্যো, প্রবল প্রতাপশালী——
গোপী। সাধু, তোর সাধুভাষা রাখ, চাসার মুখে ভাল শুনায় না, গায় যেন ঝাঁটার বাড়ি মারে—
উড। বাঞ্চৎ বড় পণ্ডিত হইয়াছে।
আমিন। বেটা রাইয়েতদিগের আইন পরােয়ানা সব বুঝাইয়া দিয়া গোল করিতেছে, বেটার ভাই মরে লাঙ্গলঠেলে, উনি বলেন “প্রতাপশালী”
গােপী। ঘুঁটেকুড়ানির ছেলে সদরনায়েব।— ধর্ম্মাবতার! পল্লীগ্রামে স্কুল স্থাপন হওয়াতে চাসালােকের দৌরাত্ম্য বাড়িয়াছে।
উড। গবরণমেণ্টে এ বিষয়ে দরখাস্ত করিতে আমাদিগের সভায় লিখিতে হইবেক, স্কুল রহিত করিতে লড়াই করিব।
আমিন। বেটা মােকদ্দমা করিতে চায়।
উড। (সাধুচরণের প্রতি) তুমি শালা বড় বজ্জাত আছে। তােমার যদি ২০ বিঘার ৯বিঘা নীল করিতে বলেছে, তবে তুমি কেন আর ৯ বিঘা নূতন করিয়া ধান কর না।
গােপী। ধর্ম্মাবতার, যে লোকসান জমা পড়ে আছে তাহা হইতে ৯ বিঘা কেন, ২০ বিঘা পাট্টা করিয়া দিতে পারি।
সাধু। (স্বগত) হা ভগবান্! শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল। (প্রকাশে) হুজুর, যে ৯বিঘা নীলের জন্যে চিহ্ণিত হইয়াছে, তাহা যদি কুটির লাঙ্গল, গোরু ও মাইন্দার দিয়া আবাদ হয়, তবে আমি আর ৯বিঘা নূতন করিয়া ধানের জন্যে লইতে পারি। ধানের জমিতে যে কারকিত করিতে হয়, তার চার গুণ কারকিত নীলের জমিতে দরকার করে, সুতরাং যদিও ৯বিঘা আমার চাস দিতে হয় তবে বাকী ১১ বিঘার পড়ে থাক্বে, তা আবার নূতন জমি আবাদ কর্বো।
উড। শালা বড় হারাম্জাদা, দাদনের টাকা নিবি তুই, চাস দিতে হবে আমি, শালা বড় বজ্জাত (জুতার গুঁতা প্রহার) শ্যামাচাঁদ্কা সাৎ মুলাকাৎ হোনেছে হারামজাদ্কি সব ছােড় যা গা (দেয়াল হইতে শ্যামচাঁদ গ্রহণ)
সাধু। হুজুর, মাছি মেরে হাত কাল করা মাত্র, আমরা—
রাই। (সক্রোধে) ও দাদা, তুই চুপ দে, ঝা ন্যাকে নিতি চাচ্চে ন্যাকে দে। ক্ষিদের চোটে নাড়ী ছিঁড়ে পড়্লো, সারাদিন্ডে গ্যাল, নাতিও পালাম না, খাতিও পালাম না।
আমিন। কই শালা, ফৌজদারী কর্লিনে? (কান মলন)
রাই। (হাঁপাইতে২) মলাম, মাগো! মাগো!
উড। ব্লাডি নিগার মারো বাঞ্চৎ কো (শ্যামচাঁদাঘাত)
(নবীনমাধবের প্রবেশ।)
রাই। বড়বাবু, মলাম গো! জল খাবো গো! মেরেফ্যাল্লে গো!
নবীন। ধর্ম্মাবতার, উহাদিগের এখন স্নানও হয় নাই আহারও হয় নাই। উহাদের পরিবারেরা এখনও বাসি মুখে জল দেয় নাই। যদি শ্যামাচাঁদ আঘাতে রাইয়ত সমুদায় বিনাশ করিয়া ফেলেন, তবে আপনার নীল বুন্বে কে? এই সাধুচরণ গত বৎসর কত ক্লেশে ৪ বিঘা নীল দিয়াছে, যদি উহাকে এরূপ নিদারুণ প্রহারে এবং অধিক দাদন চাপাইয়া ফেরার করেন, তবে আপনারই লোকসান। উহাদের অদ্য ছাড়িয়া দেন, আমি কল্য প্রাতে সমভিব্যহারে আনিয়া আপনি যেরূপ অনুমতি করিবেন সেই রূপ করিয়া যাইব।
উড। তোমার নিজের চরকায় তেল দেও। পরের বিষয়ে কথা কহিবার কি আবশ্যক আছে? সাধু ঘোষ, তোর্ মত্কি, তা বল? আমার খানার সময় হইয়াছে।
সাধু। হুজুর, আমার মতের অপেক্ষা আছে কি? আপনি নিজে গিয়া ভাল ২ চার বিঘাতে মার্ক দিয়া আসিয়াছেন, আজ্ আমিন মহাশয় আর যে কয় খান ভাল জমী ছিল, তাহাতেও চিহ্ন দিয়া আসিয়াছেন। আমার অমতে জমী নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে, নীলও সেইরূপ হইবে। আমি স্বীকার করিতেছি বিনা দাদনে নীল করে দিব।
উড। আমার দাদন সব মিছে, হারামজাদা, বজ্জাত, বেইমান (শ্যামাচাঁদ প্রহার।)
নবীন। (সাধুচরণের পৃষ্ঠে হস্ত দিয়া আবরণ) হুজুর, গরিব ছা পোষা লোকটাকে একেবারে মেরে ফেলিলেন। আহা! উহার বাড়ীতে খাইতে অনেক গুলিন। এ প্রহারে একমাস শয্যাগত হইয়া থাকিতে হইবে। আহা! উহার পরিবারের মনে কি ক্লেশ হইতেছে, সাহেব, আপনারও পরিবার আছে, যদি আপনাকে খানার সময় কেহ ধৃত করিয়া লইয়া যায়, তবে মেম্সাহেবের মনে কেমন পরিতাপ জন্মে।
উত। চপ্রাও, শালা, পাজি, গোরুখোর। এ আর অমর নগরের মাজিষ্ট্রেট নয় যে কথায় কথায় নালিশ কর্বি, আর কুটির লােক ধরে মেয়াদ দিবি। ইন্দ্রাবাদের মাজিষ্ট্রেট তােমার মৃত্যু হইয়াছে। র্যাসকেল্—এই দিনের মধ্যে তুই ৬০ বিঘা দাদন লিখিয়া দিবি তবে তাের ছাড়ান, নচেৎ শ্যাঁমচাদ তাের মাথায় ভাঙ্গিব। গোস্তাকি! তাের দাদনের জন্যে দশ খানা গ্রামের দাদন বন্ধ রহিয়াছে।
নবীন। (দীর্ঘ নিশ্বাস) হে মাতঃ পৃথিবী! তুমি দ্বিধা হও, আমি তন্মধ্যে প্রবেশ করি। এমন অপমান আমার জন্মেও হয় নাই—হা বিধাত!
গােপী। নবীন বাবু, বাড়াবাড়ি কায কি, আপনি বাড়ী যান।
নবীন। সাধু, পরমেশ্বরকে ডাক, তিনিই দীনের রক্ষক।
নবীনমাধবের প্রস্থান।)
উড। গোলামকি গোলাম। দেওয়ান, দপ্তরখানায় লইয়া যাও, দস্তুর মােতাবেক দাদন দেও।
(উডের প্রস্থান।)
গােপী। চল সাধু, দপ্তরখানায় চল। সাহেব কি কথায় ভােলে।
“বাড়াভীতে ছাই তব বাড়াভাতে ছাই।
ধরেছে নীলের যমে আর রক্ষা নাই।”
(সকলের প্রস্থান)
প্রথম অঙ্ক
চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।
গোলোক বসুর দরদালান
সৈরিন্ধী চুলেরদড়ী বিনাইতে নিযুক্ত।
সৈরিন্ধী। আমার হাতে এমন দড়ী এক গাছিও হয় নি। ছােট বােউ বড় পয়মন্ত। ছােটবোয়ের নাম করে যা করি তাই ভাল হয়। এক পণ ছুট্ করেছি কিন্তু মুটোর ভিতর থাক্বে। যেমন একঢাল চুল তেমনি দড়ী হয়েছে। আহা চুলতো নয়, শ্যামাঠাকুরণের কেশ, মুখ্খানি যেন পদ্মফুল, সর্ব্বদাই হাস্য বদন। লোকে বলে “যাকে যায় দেখ্তে পারে না” আমিতো তার কিছুই দেখিনে। ছোটবােয়ের মুখ দেখলে আমারতো বুক জুড়িয়ে যায়। আমার বিপিনও যেমন, ছোটবউও তেমন। ছোট বউতো আমাকে মায়ের মত ভালবাসে।
(সিকাহস্তে সরলতার প্রবেশ)
সর। দিদি, দ্যাখ দেখি, আমি সিকের তলাটি বুন্তে পেরেছি কি না?—হয় নি?
সৈরিন্ধ্রী। (অবলোকন করিয়া) হ্যাঁ এই বার দিব্বি হয়েছে। ওবোন্, এই খান্টি যে ডুবিয়েছো, লালের পর জরদ্তে খোলেনা।
সর। আমি তোমার দিকে দেখে বুন্ছিলাম—
সৈরি। তাতে কি লালের পর জরদ আছে?
সর। না তাতে লালের পর সবুজ আছে। কিন্তু আমর সবুজ সুতা ফুর্য়ে গেছে, তাই আমি ওখানে জরদ দিয়েছি।
সৈরি। তোমার বুঝি আর হাটের দিন পর্য্যন্ত তর সইল না—তোমার বোন্ সকলি তাড়াতাড়ি বলে?
“বৃন্দাবনে অছেন হরি।
ইচ্ছা হলে রইতে নারি॥”
সর। বাহবা— আমার কি দোষ, হাটে কি পাওয়া যায়? ঠাকুরুণ গেলহাটে মহাশয়কে আন্তে বলেছিলেন, তা তিনি পান্ নি।
সৈরি। তবে ওঁরা যখন ঠাকুরপোকে চিটি লিখিবেন সেই সময় পাঁচ রঙ্গের সুতার কথা লিখে দিতে বল্বো।
সর। দিদি এ মাসের আর কদিন আছে গা —
সৈরি। (হাস্যবদনে) যার যে খানে ব্যথা, তার সেখানে হাত। ঠাকুরপোর কালেজ বন্দ হলে বাড়ি আস্বের কথা আছে—তাই তুমি দিন গুণ্চো—আর বোন্, মনের কথা বের্য়ে পড়েছে!
সর। মাইরি দিদি আমি তা ভেবে জিজ্ঞাসা করিনি—মাইরি।
তৈরি। ঠাকুরপোর আমার কি সুচরিত্র, কি মধুমাখা কথা! ওঁরা যখন ঠাকুরপোর চিটি গুলিন পড়েন, যেন অমৃত বর্ষণ হইতে থাকে? দাদার প্রতি এমন ভক্তি কখন দেখিনি, দাদারি বা কি স্নেহ, বিন্দু মাধবের নামে মুখে লাল পড়ে, আর বুক খান পাঁচ হাত হয়। আমার যেমন ঠাকুরপো, তেমনি ছোট বউ—(সরলতার গাল্ টিপে) সরলতা তো সরলতা—আমি কি তামাক পোড়ার কটোটা আনিনি, যেমন এক দণ্ড তামাক পোড়া নইলে বাঁচিনে, তেমনি কটোটা যেন আগে ভুলে এসিছি।
(আদুরীর প্রবেশ)
ও আদর, তামাক পোড়ার কোটটা আন্না দিদি।
আদুরী। মুই অ্যাকন কনে খুঁজে মর্বে।?
সৈরি। ওরে, রান্না ঘরের রকে উঠ্তে ডান দিকে চালের বাতায় গোঁজা আছে।
আদুরী। তবে খামাত্তে মোই খান আনি, তা নলি চালে ওটবো ক্যামন করে।
সর। বেশ বুঝেছে।
সৈরি। কেন ও তো ঠাকুরুণের কথা বেশ বুঝতে পারে? তুই রক কারে বলে জানিসনে, তুই ডান বুঝিস নে?
অঙ্গুরী। মুট ডান হতি গ্যালামি ক্যান। মোগার কপালের দোষ, গোরিব নোকের মেয়ে যদি বুড়ো হলো আর দাঁত পড়্লো, তবেই সে ডান হয়ে ওটলো।—মা ঠাকুরুণিরি বল্বো দিনি, মুইকি ডান হবার মত বুড়ো হইচি।
সৈরি। মরণ আর কি! (গাত্রোত্থান করে) ছোট বউ বসিস, আমি আস্চি, বিদ্যাসাগরের বেতাল শুন্বো।
(সৈরিন্ধ্রীর প্রস্থান
আদুরী। সেই সাগর নাড়ের বিয়ে দেয়, ছ্যা—নাকি দুটো দল হয়েছে, মুই আজাদের দলে।
সর। হ্যাঁ আদুরী, তোর ভাতার তোরে ভালবাস্তো? আদুরী। ছোট হালদার্ণি, সে খ্যাদের কথা আর তুলিস্নে? মিন্সের মুখ্খান মনে পড়্লি আজো মোর পরাণডা ডুক্রে কেঁদে ওটে। মোরে বড্ডি ভাল বাস্তো। মোরে বাউ দিতি চেয়েলো।
পুঁইচে কি এত ভারি রে প্রাণ, পুঁইচে কি এত ভারি।
মনের মত হলি পরে বাউ পরাতি পারি।
দেখদিনি খাটে কি না, মোরে ঘুমুতি দিত না, বিমুলি বল্তো, “ও পরাণ ঘুমুলে”।
সর। তুই ভাতারের নাম ধরে ডাক্তিস্?
আদুরী। ছি, ছি, ছি, ভাতার যে গুরুনোক, নাম ধত্তি আছে!
সর। তবে তুই কি বলে ডাক্তিস?
আদুরী। মুই বল্তাম, হ্যাদে ওয়ো শোন্চো —
(সৈরিন্ধ্রীর পুনঃ প্রবেশ)
সৈরি। আবার পাগ্লিকে কে খ্যাপালে?
আদুরী। মোর মিন্সের কথা সুদুচ্চেন তাই মুই বল্তি লেগিচি।
সৈরি। (হাস্যবদনে) ছোটবয়ের মত পাগল আর দুটি নাই, এত জিনিস থাক্তে আদুরীর ভাতারের গল্প ঘাঁটিয়ে ঘাঁটিয়ে শোনা হচ্চে।
(রেবতী ও ক্ষেত্রমণির প্রবেশ।)
আয় ঘােষ দিদি আয়, তােকে আজ্ কদিন ডেকে পাঠাচ্চি তা তাের আর বার হয় না। ছােটবউ এই নাও, তােমার ক্ষেত্রমণি এসেছে, আজ্ কদিন আমারে পাগল করেছে, বলে দিদি ঘােষেদের ক্ষেত্র শ্বশুর বাড়ি হতে এসেছে তা আমাদের বাড়ি এল না?
রেবতী। তা মােদের পত্তি এম্নি কের্পা বটে। ক্ষেত্র তাের কাকি মাদ্দের পরণাম কর।
(ক্ষেত্রমণির প্রণাম।)
সৈরি। জন্মায়তি হও, পাকাচুলে সিঁদূর পর, হাতের ন ক্ষয় যাক,ছেলে কোলে করে শ্বশুর বাড়ি যাও।
আদুরী। মাের কাছে ছােট হালদার্ণির মুখি খােই ফুট্তি থাকে, মেয়েডা গড় কল্লে তা বাঁচো মরাে একটা কথাও কলে না।
সৈরি। বালাই সেটের বাছা—আদুরী যা ঠাকুরুনকে ডেকে আন্গে ৷
(আদুরীর প্রস্থান।)
পােড়া কপালি কি বলিতে কি বলে তা কিছু বােঝে না,— কমাস হলাে?
রেবতী। ওকথা কি আজোদিদি পর্কাশ করিছি। মোর যে ভাঙ্গা কপাল, সত্যি কি মিথ্যে তাই বা কেমন করে জান্বো। তোমরা আপনার জন তাই বলি—এই মাসের কডা দিন গেলি চার মাসে পড়্বে।
সর। আজো পেট বেরোইনি।
সৈরি। এই আর এক পাগল, আজো তিন মাস পুরিনি ও এখনি পেট ডাগর হইয়াছে কি না তাই দেখ্চে।
সর। ক্ষেত্র তুনি ঝাপাটা তুলে ফেলছ কেন?
ক্ষেত্র। মোর ঝাপাটা দেখে মোর ভাশুর বড় খাপা হয়েলো, ঠাকুরুনিরি বল্লে ঝাপ্টা কাটা কস্বিদের আর বড়নোকের মেয়েগার সাজে। মুই শুনে নজ্জায় মরে গ্যালাম, সেই দিন ঝাপ্টা তুলে ফ্যাল্লাম।
সৈরি। ছোট বোউ, যাও দিদি কাপড় গুনো তুলে আন্গে, সন্ধা হলো।
(আদুরীর পুনঃ প্রবেশ।)
সর। (দাঁড়ায়ে) আয় আদুরী ছাদে গিয়ে কাপড় তুলি।
আদুরী। ছোট হালদার আগে বাড়িই আসুক, হা, হা, হা হা।
(সরলতার জীবকেটে প্রস্থান)
সৈরি। (সরোষে এবং হাস্য বদনে) দূর পোড়াকপালি, সকল কথাতেই তামাসা—ঠাকুরুন কইলো —
(সাবিত্রীর প্রবেশ।)
এই যে এসেছেন।
সাবি। ঘোযবোউ এইচিস, তোর মেয়ে এনিচিস বেস করিচিস—বিপিন আব্দার নিচ্লো তাকে শান্ত করে বাইরে দিয়ে এলাম!
রেবতী। মাঠাকুরুন পর্ণাম করি। তোর দিদি মারে পর্ণাম কর।
(ক্ষেত্রমণির প্রণাম।)
সাবি। সুখে থাক, সাত বেটার মা হও— (নেপথ্যে কাশি) বড় বোউমা ঘরে যাও বাবার বুঝি নিদ্রা ভেঙ্গেছে—আহা! বাছার কি সময়ে নাওয়া আছে, না সময়ে খাওয়া আছে, ভেবে ভেবে নবীন আমার পাতখানি হয়ে গিয়েছে —(নেপথ্যে “আদুরী”) মা যাওগো জল চাচ্ছেন বুঝি।
সৈরি। (জনান্তিকে আদুরীর প্রতি) আদুরী দেখ তোরে ডাক্চে।
আদুরী। ডাক্চেন মোরে, কিন্তু চাচ্চেন তোমারে।
সৈরি। পোড়ার মুখ—ঘোয দিদি আর এক দিন আসিস্।
(সৈরন্ধ্রীর প্রস্থান)
রেবতী। মাঠাকুরুণ, আরতো এখানে কেউ নেই— মুইতো বড় আপদে পড়িছি, পদী ময়রাণী কাল মোদের বাড়ি এয়েলো —
সাবি। রাম্, রাম্, রাম্, ও নচ্ছার বেটিকেও কেউ বাড়ি আস্তে দেয়—বেটির আর বাকি আছে কি, নাম লেখালেই হয়।
রেবতী। মা, তা মুই কর্বো কি, মোরতো আর ঘেরা বাড়ি নয়, মর্দেরা ক্ষ্যাতে খামারে গেলি বাড়ি বল্লিইবা কি, আর হাট বল্লিইবা কি—গস্তানি বিটি বলে কি—মা মোর গাডা কাঁটা দিয়ে ওট্চে— বিটি বলে, ক্ষেত্রকে ছোট সাহেব ঘোড়া চেপে যাতি যাতি দেখে পাগল হয়েচে, আর তার সঙ্গে একবার কুটির কামরাঙ্গার ঘরে যাতি বলেছে।
আদুরী। থু, থু, থু!—গোন্দো! প্যাঁজির গোন্দো!—সাহেবের কাছে কি মোরা জাতি পারি, গোন্দো থু থু! প্যাঁজির গোন্দো!— মুইতো আর একা বেরোব না, মুই সব সইতি পারি, প্যাঁজির গোন্দো সইতি পারিনে—থু, থু, গােন্দো! প্যাঁজির গোন্দো!
রেবতী। মা, তা গোরিবের ধর্ম্ম কি ধর্ম্ম নয়? বিটি বলে, টাকা দেবে, ধানের জমি ছেড়ে দেবে, আর জামাইরি কর্ম্ম করে দেবে —পোড়া কপাল টাকার! ধর্ম্ম কি ব্যাচ্বার জিনিস, না এর দাম আছে! কি বল বো বিটি সাহেবের নোক, তা নইলি মেয়ে নাতি দিয়ে মুখ ভেঙ্গে দেতাম। মেয়ে আমার অবাক হয়েছে, কাল থেকে ঝম্কে ঝম্কে ওট্চে।
আদুরী। মাগো যে দাড়ি! কথা কয় যে বােকা ছাগলে ফ্যাবা মারে। দাড়ি প্যাঁজ না ছাড়লি মুই তাে কখনই যাতি পার্বাে না, থু, থু, থু,! গোন্দো, প্যাঁজির গোন্দো।
রেবতী। মা সর্ব্বনাশী বলে, যদি মাের সঙ্গে না পেট্য়ে দিস তবে নেটেলা দিয়ে ধরে নিয়ে যাবে
সাবি। মগের মুলুক আর কি!— ইংরেজের রাজ্যে কেউ নাকি ঘর ভেঙ্গে মেয়ে কেড়ে নিয়ে যেতে পারে।
রেবতী। মা চাসার ঘরে সব পারে। মেয়ে লােক ধরে মর্দদের কায়দা করে, নীল দাদনে এ কত্তি পারে, নজোরে ধল্লি কত্তি পারে না? মা, জান না, নয়দারা রাজি নামা দিতি চাইনি বলে ওদের মেজো বোউরি ঘর ভেঙ্গে ধরে নিয়ে গিয়েলাে।
সাবি। কি অরাজক! সাধুকে একথা বলেছ?
রেবতী। না, মা, সে য়্যাকিই নীলির ঘায় পাগল, তাতে একথা শুনে কি আর রক্ষে রাখবে, রাগের মাথায় আপনার মাথায় আপ্নি কুড়ুল মেরে বস্বে।
সাবি। আচ্ছা, আমি কত্তাকে দিয়ে একথা সাধুকে বলবাে, তােমার কিছু বল্বার আবশ্যক নেই—কি সর্ব্বনাশ! নীলকর সাহেবেরা সব কত্তে পারে, তবে যে বলে সাহেবের বড় সুবিচার করে, আমার বিন্দু যে সাহেবদের কত ভাল বলে, তা এরা কি সাহেব না, না এরা সাহেবদের চণ্ডালি।
রেবতী। ময়রাণী বিটি আর এক কথা বলে গ্যালাে, তা বুঝি বড় বাবু শুনিন্ নি—কি একটা নতুন হুকুম হয়েছে, তাতে নাকি কুটেল সাহেবরা মাচেরটক্ সাহেবের সঙ্গে যােগ দিয়ে যাকে তাকে ৬ মাস ম্যাদ দিতি পারে। তা কত্তা মশাইরি নাকি এই ফাঁদে ফ্যালবার পথ কচ্চে।
সাবি। (দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া) ভগবতীর মনে যদি তাই থাকে, হবে।
রেবতী। মা কত কথা বলে গ্যাল, তাকি আমি বুঝতি পারি, নাকি এ ম্যাদের পিল্ হয় না —
আদুরী। ম্যাদেরে বুঝি পেটপোড়া খেব্এচে।
সাবি। আদুরী, তুই একটু চুপ কর বাছা।
রেবতী। কুটির বিবি এই মকদ্দামা পাকাবার জন্যি মাচেরটক্ সাহেবকে চিঠি ন্যাকেচে, বিবির কথা হাকিম নাকি বড্ডো শোনে।
আদুরী। বিবির আমি দেখিছি, নজ্জ্বাও নেই, সরমও নেই,—জ্যলার হাকিম মাচেরটক্ সাহেব, কত নাঙ্গাপাকড়ি, তেরোনাল ফির্তি থাকে, মাগো নাম কল্লি প্যাটের মধ্যি হাত পা সেঁদোয়— এই সাহেবের সঙ্গি ঘোড়া চেপে ব্যাড়াতি এয়েলো। বউ মান্সি ঘোড়া চাপে! —কেশের কাকি ঘরের ভাশুরির সঙ্গি হেসে কথা কয়েলো, তাই লোকে কত নজ্জ্বা দেলে, এতো জ্যালার হাকিম।
সাবি। তুই আবাগি কোন্ দিন মজাবি দেক্চি, তা সন্ধ্যা হলো, ঘোষবউ তোরা বাড়ি যা, দুর্গা আছেন।
রেবতী। যাই মা, আবার কলু বাড়ি দিয়ে তেল নিয়ে যাব, তবে সাজ জ্বলবে।
(রেবতী ও ক্ষেত্রমণির প্রস্থান।)
সাবি। তাের কি সকল কথায় কথা না কইলে চলে না?
(সরলতার কাপড় মাথায় করিয়া প্রবেশ।)
আদুরী। এই যে ধােপাবউ কাপড় নিয়ে আলেন।
(সরলতায় জিবকেটে কাপড় বাখন্।)
সাবি। ধোপাবউ কেন হতে গেললা, আমার সােনার বউ আমার রাজলক্ষী (পৃষ্ঠে হস্ত দিয়া) হ্যাগা মা, তুমি বই কি আর আমার কাপড় আনিবার মানুষ নাই—তুমি কি এক জায়গায় ১ দণ্ড স্থির হয়ে বসে থাক তে পার না —এমন পাগ লির পেটেও তােমার জন্ম হয়েছিল—কাপড়ডায় ফালাদিলে কেমন করে, তবে বােধ করি গায়েও ছড় গিয়েছে—আহা! মার আমার রক্ত-কমলের মত রং, একটু ছড় লেগেছে যেন রক্ত ফুটে বেরােচ্চে। তুমি মা আর অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে অমন করে যাওয়া আসা করাে না।
(সৈরিন্ধ্রীর প্রবেশ।)
সৈরি। আয় ছােটবউ ঘাটে যাই।
সাবি। যাও মা, দুই যায়ে এই বেলা বেলা থাক্তে থাক্তে গাধুয়ে এস।
(সকলের প্রস্থান।)