ইন্দিরা (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১৮৭৩)
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৭৩
প্রকাশনা-তথ্য
ইন্দিরা।
উপন্যাস।
বঙ্গদর্শন হইতে উদ্ধৃত।
কাঁটালপাড়া।
বঙ্গদর্শন যন্ত্রালয়ে শ্রী হারাণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,
কর্ত্তৃক মুদ্রিত।।
১২৮০।
মূল্য চারি আনা মাত্র।
ইন্দিরা।
উপন্যাস।
বঙ্গদর্শন হইতে উদ্ধৃত।
কাঁটালপাড়া।
বঙ্গদর্শন যন্ত্রালয়ে শ্রী হারাণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,
কর্ত্তৃক মুদ্রিত।।
১২৮০।
মূল্য চারি আনা মাত্র।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
তাহার পরেই মনেই বলিলাম, “এইবার সোণার চাঁদ, আর কোথায় যাইবে? তবে নাকি আমাকে গ্রহণ করিবে না?” যে অভিপ্রায়ে, আমার এত জাল পাতা, তাহা সিদ্ধই ইল। এখন আমি তাঁহার স্ত্রী বলিয়া পরিচয় দিলে, তিনি। যদি গ্রহণ না করেন, তবে তাঁহাকে সর্ব্বত্যাগী হইতে হইবে।
আমার পিতা নাম রাখিয়াছিলেন “ইন্দিরা”—মাতা
নাম রাখিয়াছিলেন “কুমুদিনী।” শ্বশুর বাড়ীতে ইন্দিরা নামই জানিত, কিন্তু পিত্রালয়ে অনেকেই আমাকে কুমুদিনী বলিত। রাম রাম দত্তের বাড়ীতে আমি কুমুদিনী নাম ভিন্ন ইন্দিরা নাম বলি নাই। ইঁহার কাছে আমি কুমুদিনী ভিন্ন ইন্দিরা নাম প্রকাশ করি নাই। কুমুদিনী নামেই লেখা পড়া হইয়াছিল।
কিছু দিন আমরা কলিকাতায় সুখে সচ্ছলে রহিলাম। আমি এপর্য্যন্ত পরিচয় দিলাম না। ইচ্ছা ছিল, একেবারে মহেশপুরে গিয়া পরিচয় দিব। ছলে কৌশলে স্বামীর নিকট হইতে মহেশপুরের সম্বাদ সকল জানিয়াছিলাম-সকলে কুশলে ছিলেন, কিন্তু তাঁহাদের দেখিবার জন্য বড় মন ব্যস্ত হইয়াছিল।
আমি স্বামীকে বলিলাম, “আমি একবার কালাদীঘি যাইয়া পিতামাতাকে দেখিয়া আসিব। আমাকে পাঠাইয়া দাও।”
স্বামী ইহাতে নিতান্ত অনিচ্ছুক। আমাকে ছাড়িয়া দিয়া কি প্রকারে থাকিবেন? কিন্তু এদিকে আমার আজ্ঞাকারী, “না” বলিতে পারিলেন না। বলিলেন, “কালাদীঘি যাইতে আসিতে এখান হইতে পনের দিনের পথ; এতদিন তোমাকে না দেখিতে পাইলে আমি মরিয়া যাইব। আমি তোমার সঙ্গে যাইব।”
আমি বলিলাম, “আমিও তাই চাই। কিন্তু তুমি কালাদীঘি গিয়া কোথায় থাকিবে?”
তিনি চিন্তা করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কালাদীঘিতে কতদিন থাকিবে?”
আমি বলিলাম, “তোমাকে যদি না দেখিতে পাই, তবে পাঁচদিনের বেশী থাকিব না।
তিনি বলিলেন, “সেই পাঁচদিন আমি বাড়ীতে থাকিব। পাঁচদিনের পর তোমাকে কালাদীঘি হইতে লইয়া আসিব।”
এইরূপ কথা বার্ত্তা হইলে পর আমরা যথাকালে উভয়ে শিবিকারোহণে কলিকাতা হইতে যাত্রা করিলাম। তিনি আমাকে কালাদীঘি নামাক সেই হতভাগ্য দীঘি পার করিয়া গ্রামের মধ্য পর্য্যন্ত পঁহুছিয়া দিয়া নিজালয় অভিমুখে যাত্রা করিলেন।
তিনি পশ্চাৎ ফিরিলে, আমি বাহ কদিগকে বলিলাম, “আমি আগে মহেশপুর যাইব—তাহার পর কালদীঘি আসিব। তোমরা আমাকে মহেশপুর লইয়া চল। যথেষ্ট পুরস্কার দিব।” তাহারা আমাকে মহেশপুর লইয়া গেল। গ্রামের বাহিরে বাহক ও রক্ষকদিগকে অবস্থিতি করিতে বলিয়া দিয়া আমি পদব্রজে গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করিলাম। পিতার গৃহ সম্মুখে দেখিয়া, এক নির্জ্জন স্থানে বসিয়া অনেক রোদন করিলাম। তাহার পর গৃহমধ্যে প্রবেশ করলাম। সম্মুখেই পিতাকে দেখিয়া প্রণাম করিলাম। তিনি আমাকে চিনিতে পারিয়া আহ্লাদে বিবশ হইলেন। সে সকল কথা এস্থানে বলিবার অবসর নাই।
আমি এত দিন কোথায় ছিলাম, কি প্রকারে আসিলাম—তাহা কিছুই বলিলাম না। পিতা মাতা জিজ্ঞাসা করিলে বলিলাম, “এর পরে বলিব।”
পর দিন পিতা আমার শ্বশুর বাড়ী লোক পাঠাইলেন। পত্রবাহককে বলিয়া দিলেন, “জামাতা যদি বাড়ী না থাকেন, তবে যেখানে থাকেন, সেইখানে গিয়া এই পত্র দিয়া আসিবি।”
আমি মাতাকে বলিলাম, “আমি আসিয়াছি, এ কথা তাঁহাকে জানাইও না। আমি এতদিন ঘরে ছিলাম না, কি জানি, তিনি যদি গ্রহণ করিতে অনিচ্ছুক হন, তবে আসিবেন না। অন্য কোন ছলে এখানে তাঁহাকে আনাও। তিনি এখানে আসিলে আমি সন্দেহ মিটাইব।” মাতা এ কথা পিতাকে বলিলে তিনি সম্মত হইলেন। পত্রে লিখিলেন, “আমি উইল করিব। তুমি আমার জামাতা এবং পরমাত্মীয়, আর সদ্বিবেচক। অতএব তোমার সঙ্গে পরামর্শ করিয়া উইল করিব। তুমি পত্র পাঠ এখানে আসিবে।” তিনি পত্র পাঠ আসিলেন। তিনি এখানে আসিলে পিতা তাঁহাকে যথার্থ কথা জানাইলেন।
শুনিয়া স্বামী মৌনাবলম্বন করিলেন। পরে বলিলেন, “আপনি পূজ্য ব্যক্তি। যে ছলেই হউক, এখানে আসিয়া যে আপনার দর্শন লাভ করিলাম, ইহাই যথেষ্ট। কিন্তু আপনার কন্যা এতদিন গৃহে ছিলেন না—কোথায় কি চরিত্রে কাহার গৃহে ছিলেন, তাহা কেহ জানে না। অতএব তাহাকে আমি গ্রহণ করিব না।”
পিতা মর্ম্মান্তিক পীড়িত হইলেন। এ কথা মাতাকে বলিলেন, মা আমাকে বলিলেন। আমি সমবয়স্কাদিগকে বলিলাম, “তোমরা উঁহাদিগকে চিন্তা করিতে মানা কর। তাঁকে একবার অন্তঃপুরে আন—তাহা হইলেই আমি উহাকে গ্রহণ করাইব।”
কিন্তু অন্তঃপুরে আসিতে কোন মতেই স্বীকৃত হইলেন না। বলিলেন, “আমি যে স্ত্রীকে গ্রহণ করিব না, তাহাকে সম্ভাষণও করি না।” শেষে মাতার রোদন এবং আমার সমবয়স্কাদিগের ব্যঙ্গের জ্বালায় সন্ধ্যার পর অন্তঃপুরে জল খাইতে আসিলেন।
তিনি জলযোগ করিতে আসনে বসিলেন। কেহ তাঁহার নিকটে দাঁড়াইল না—সকলেই সরিয়া গেল। তিনি অন্য মনে, মুখ নত করিয়া, আহার করিতেছিলেন, এমত সময়ে আমি নিঃশব্দে তাঁহার পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইয়া তাঁহার চক্ষু টিপিয়া ধরিলাম। তিনি হাসিতে২ বলিলেন,
“হাঁ দেখ্, কামিনি, তুই আরও কি কচি খুকী যে আমার ঘাড়ের উপর পড়িস্?”
কামিনী আমার কনিষ্ঠা ভগিনীর নাম।
আমি বলিলাম, “আমি কামিনী নই, কে বল, তবে ছাড়িব।”
আমার কণ্ঠ-স্বর শুনিয়া তিনি চমকিয়া উঠিলেন। বলিলেন, “এ কি এ?”
আমি তাঁহার চক্ষু ছাড়িয়া সম্মুখে দাঁড়াইলাম। বলিলাম, “চতুর চূড়ামণি! আমার নাম ইন্দিরা—আমি হরমোহন দত্তের কন্যা, এই বাড়ীতে থাকি। আপনাকে প্রাতঃপ্রণাম —আপনার কুমুদিনীর মঙ্গল ত?”
তিনি অবাক্ হইলেন। আমাকে দেখিয়াই যে তাঁহার আহ্লাদ হইল, তাহা বুঝিতে পারিলাম। বলিলেন, “এ আবার কোন্ রঙ্গ কুমুদিনি? তুমি এখানে কোথা হইতে?”
আমি বলিলাম, “কুমুদিনী আমার আর একটি নাম। তুমি বড় গোবর গণেশ, তাই এত দিন আমাকে চিনিতে পার নাই। কিন্তু তোমাকে যখন রাম রাম দত্তের বাড়ী ভোজন করিতে দেখিয়াছিলাম, আমি তখনই তোমাকে চিনিয়াছিলাম। নচেৎ সে দিন তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতাম না। প্রাণাধিক—আমি কুলটা নহি।”
তিনি ককটু আত্ম বিস্মৃতের মত হইলেন। পরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তবে এতদিন এত ছলনা করিয়াছিলে কেন?”
আমি বলিলাম, “তুমি প্রথম সাক্ষাতের দিনে বলিয়াছিলে যে তোমার স্ত্রীকে পাইলেও গ্রহণ করিবে না। নচেৎ সেই দিনেই পরিচয় দিতাম।” আমার অঞ্চলে বাঁধিয়া আনিয়াছিলাম। তাহা খুলিয়া দেখাইয়া বলিলাম “সেই রাত্রেই আমি প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম যে ‘হয় তুমি আমায় গ্রহণ করিবে, নচেৎ আমি প্রাণত্যাগ করিব।’ সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্যই এই খানি লেখাইয়া লইয়াছি। কিন্তু ইহা আমি ভাল করি নাই। তোমার সঙ্গে শঠতা করিয়াছি। তোমার অভিরুচি হয়, আমায় গ্রহণ কর; না অভিরুচি হয়, আমি তোমার উঠান ঝাঁট দিয়া খাইব—তাহা হইলেও তোমাকে দেখিতে পাইব, দান পত্র আমি এই নষ্ট করিলাম।”
এই বলিয়া সেই দান পত্র তাঁহার সম্মুখে খণ্ড২ করিয়া ছিন্ন করিলাম।
তিনি গাত্রোত্থান করিয়া——আমাকে আলিঙ্গন করিলেন। বলিলেন, “তুমি আমার সর্ব্বস্ব। তোমায় ত্যাগ করিলে আমি প্রাণে মরিব। তুমি আমার গৃহে গৃহিণী হইবে চল।”
সমাপ্ত।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
এখন হইতে এই ইতিবৃত্ত মধ্যে এক শত বার আমার স্বামীর উল্লেখ করিবার আবশ্যক হইবে। এখন তোমরা পাঁচ জন রসিকা মেয়ে একত্র কমিটিতে বসিয়া পরামর্শ করিয়া বলিয়া দেও, আমি কোন্ শব্দ ব্যবহার করিয়া। তাঁহার উল্লেখ করিব? এক শত বার “স্বামী স্বামী” করিয়া কান জ্বালাইয়া দিব? না জামাই বারিকের দৃষ্টাস্তানুসারে, স্বামীকে ‘উপেন্দ্র” বলিতে আরম্ভ করিব? “না প্রাণ নাথ” “প্রাণ কান্ত” “প্রাণেশ্বর” “প্রাণ পতি,” এবং “প্রাণাধিকের” ছড়া ছড়ি করিব? যিনি আমাদিগের সর্ব্বপ্রিয় সম্বোধনের পাত্র, যাঁহাকে পলকেই ডাকিতে ইচ্ছা করে, তাহাকে যে কি বলিয়া ডাকিব, এমন কথা পোড়া দেশের ভাষায় নাই। আমার এক সখী, (সে একটু সহর ঘেঁসা মেয়ে) স্বামীকে “বাবু” বলিয়া ডাকিত —কিন্তু শুধু বাবু বলিতে তাহার মিষ্ট লাগিল না—সে মনোদুঃখে স্বামীকে শেষে “বাবুরাম” বলিয়া ডাকিতে আরম্ভ করিল। আমারও ইচ্ছা করিতেছে, আমি তাই করি।
মাংসপাত্র ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া, মনে২ স্থির করিলাম, “যদি বিধাতা হারাধন মিলাইয়াছে—তবে ছাড়া হইবে না। বালিকার মত লজ্জা করিয়া সব নষ্ট না করি।”
এই ভাবিয়া আমি এমত স্থানে দাঁড়াইলাম যে,ভোজনস্থান হইতে বহির্ব্বাটীতে গমনকালে যে এদিক ওদিক চাহিতে চাহিতে যাইবে, সে দেখিতে পাইবে। আমি মনে বলিলাম যে, “যদি ইনি এদিক ওদিক চাহিতে২ না যান, তবে আমি এ কুড়ি বৎসর বয়স পর্য্যন্ত পুরুষের চরিত্র কিছুই বুঝি নাই।” আমি স্পষ্ট কথা বলি, তোমরা আমাকে মার্জ্জনা করিও—আমি মাথার কাপড় ফেলিয়া দিয়া দাঁড়াইয়াছিলাম। এখন লিখিতে লজ্জা করিতেছে, কিন্তু তখন আমার কি দায়, তাহা মনে করিয়া দেখ।
অগ্রে২ রাম রাম দত্ত গেলেন—তিনি কোন দিকে চাহিলেন না। তার পর স্বামী গেলেন-তাঁহার চক্ষু যেন চারিদিগে কাহার অনুসন্ধান করিতেছিল। আমি তাঁহার নয়নপথে পড়িলাম। তাঁহার চক্ষু আমারই অনুসন্ধান করিতেছিল, তাহা বিলক্ষণ জানিতাম। তিনি আমার প্রতি চাহিবা মাত্র, আমি ইচ্ছাপূর্ব্বক,—কি বলিব, বলিতে লজ্জা করিতেছে—সর্পের যেমন চক্রবিস্তার স্বভাবসিদ্ধ, কটাক্ষও আমাদিগের তাই। যাঁহাকে আপনার স্বামী বলিয়া জানিয়াছিলাম, তাঁহার উপর একটু অধিক করিয়া বিষ ঢালিয়া না দিব কেন? বোধ হয় “প্রাণনাথ” আহত হইয়া বাহিরে গেলেন।
হারাণী নামে রামরাম দত্তের একজন পরিচারিকা ছিল। আমার সঙ্গে তাহার বড় ভাব—সেও দাসী, আমিও দাসী—না হইবে কেন? আমি তাহাকে বলিলাম, “ঝি, আমার জন্মের শোধ একবার উপকার কর। বাবুটি কখন যাইবেন, আমাকে শীঘ্র খবর আনিয়া দে।”
হারাণী মৃদু হাসিল। বলিল, “ছি! দিদি ঠাকুরুন! তোমার এ রোগ আছে, তা জানিতাম না।”
আমিও হাসিলাম। বলিলাম, “মানুষের সকল দিন। সমান যায় না। এখন তুই গুরুমহাশয় গিরি রাখ——আমার এ উপকার করবি কি না বল্।”
হারাণী বলিল,“তোমার জন্য একাজ আমি করিব কিন্তু আর কারও জন্য হইলে করিতাম না।”
হারাণীর নীতি শিক্ষা এই রূপ।
হারাণী স্বীকৃত হইয়া গেল, কিন্তু ফিরিয়া আসিতে বিলম্ব হইতে লাগিল। ততক্ষণ আমি কাটা মাছের মত ছট্ফট্ করিতে লাগিলাম। চারি দণ্ড পরে হারাণী ফিরিয়া আসিয়া হাসিতে হাসিতে কহিল,“বাবুর অসুখ করিয়াছে—বাবু এ বেলা যাইতে পারিলেন না—আমি তাঁহার বিছানা লইতে আসিয়াছি।”
আমি বলিলাম, “কি জানি, যদি অপরাহ্নে চলিয়া যান—তুই একটু নির্জ্জন পাইলেই তাঁহাকে বলিস্ যে আমাদের রাঁধুনী ঠাকুরাণী বলিয়া পাঠাইলেন যে, ‘এ বেলা আপনার খাওয়া ভাল হয় নাই, রাত্রি থাকিয়া খাইয়া যাইবেন।’ কিন্তু রাঁধুনীর নিমন্ত্রণ, কাহারও সাক্ষাতে প্রকাশ করিবেন না। কোন ছল করিয়া থাকিবেন।” হারাণী আবার হাসিয়া বলিল, “ছি।” কিন্তু দৌত্য স্বীকৃত হইয়া গেল। হারাণী অপরাহ্নে আসিয়া আমাকে বলিল, “তুমি যাহা বলিয়াছিলে, তাহা বলিয়াছি। বাবুটি ভাল মানুষ নহেন—রাজি হইয়াছেন।”
শুনিয়া আহলাদিত হইলাম, কিন্তু মনে২ তাঁহাকে একটু নিন্দা করিলাম। আমি চিনিয়াছিলাম যে তিনি আমার স্বামী, এই জন্য যাহা করিতেছিলাম, তাহাতে আমার বিবেচনায় দোষ ছিল না। কিন্তু তিনি যে আমাকে চিনিতে পারিয়াছিলেন, এমত কোন মতেই সম্ভবে। আমি তাঁহাকে বয়ঃপ্রাপ্ত অবস্থায় দেখিয়াছিলাম— এজন্য আমার প্রথমেই সন্দেহ হইয়াছিল। তিনি আমাকে একাদশ বৎসরের বালিকা দেখিয়াছিলেন মাত্র। তিনি আমাকে চিনিতে পারিয়াছেন, এমত কোন লক্ষণও দেখি নাই। অতএব তিনি আমাকে পরস্ত্রী জানিয়া যে আমার প্রণয়াশায় লুব্ধ হইলেন, শুনিয়া মনে২ নিন্দা করিলাম। কিন্তু তিনি স্বামী, আমি স্ত্রী—তাঁহার মন্দ ভাবা আমার অকর্ত্তব্য বলিয়া সে কথার আর অলোচনা করিলাম না। মনে২ সঙ্কল্প করিলাম, যদি কখন দিনপাই, তবে এ স্বভাব ত্যাগ করাইব।
অবস্থিতি করিবার জন্য তাঁহাকে ছল খুঁজিয়া বেড়াইতে হইল না। তিনি কলিকাতায় কারবার আরম্ভ করিয়াছিলেন, সেই জন্য মধ্যে২ কলিকাতায় আসিতেন। রামরাম দত্তের সঙ্গে তাঁহার দেনা পাওনা ছিল। সেই সুত্রেই তাঁহার সঙ্গে নূতন আত্মীয়তা। অপরাহ্নে তিনি হারাণীর কথার স্বীকৃত হইয়া, রামরামের সঙ্গে পুনশ্চ সাক্ষাৎ হইলে বলিলেন, “যদি আসিয়াছি, তবে একবার হিসাবটা দেখিয়া গেলে ভাল হইত।” রামরাম বাবু বলিলেন, “ক্ষতি কি? কিন্তু কাগজ পত্র সব আড়তে আছে, আনিতে পাঠাই। আসিতে রাত্র হইবে। যদি অনুগ্রহ করিয়া কাল প্রাতে একবার পদার্পণ করেন—কিম্বা অদ্য অবস্থিতি করেন, তবেই হইতে পারে।” তিনি উত্তর করিলেন, “তাহার বিচিত্র কি? এ আমারই ঘর। একবারে কাল প্রাতেই যাইব।”
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
প্রথমে মনে করিলাম, যে আমার বেতনের টাকা গুলি সংগ্রাহ করিয়া শীঘ্রই পিত্রালযে যাইতে পারিব। কিন্ত মহেশপুর কোথায়, কেহ চিনে না-এমন লোক পাইলাম না যে কোন সুযোগ করিয়া দেয়। মহেশপুর কোন জেলা, কোন দিগে যাইতে হয়, আমি কুলবধূ, এ সকলের কিছুই জনিতাম না, সুতরাং কেহ কিছু বলিতে পারিল না। এই রূপে এক বৎসর রাম রাম বাবূর বাড়ীতে কাটিল। তাহার পর এক দিন অকস্মাৎ এ অন্ধকার পথে প্রদীপের আলো পড়িল, মনে হইল। শ্রাবণের রাত্রে নক্ষত্র দেখিলাম মনে হইলে।
এই সময়ে রাম রাম দত্ত আমাকে এক দিন ডাকিয়া বলিলেন, “আজ একটি বিশিষ্ট লোককে নিমন্তরণ করি- য়াছি-তিনি আমার মহাজন, আমি খাদক,—আজিকার পাক শাক যেন পরিপাটি হয়। নহিলে বড় প্রমাদ হইবে।”
আমি যত্ করিয়া পাক করিলাম। আহারের স্থান অন্তঃ- পুরেই হইল-সুতরাং আমিই পরিবেশন করিতে প্রবৃত্তা হইলাম। কেবল নিমন্ত্রিত ব্যক্তি এবং রামরাম বাবু আ- হারে বসিলেন।
আমি অগ্র অন্নব্যঞ্জন দিয়া আসিলাম-পরে তাঁহারা আসিলেন। তাহার পর মাংস দিতে গেলাম। আমি অবগুণ্ঠনবতী, কিন্তু ঘোমটায় স্ত্রীলোকের স্বভাব চাকা পড়ে না। ঘোমটার ভিতর হইতে একবার নিমন্ত্তিত বাবুটিকে দেখিয়া লইলাম।
দেখিলাম, তাঁহার বয়স ত্রিশবৎসর বোধ হয়; তিনি গৌরবর্ণ এবং অত্যন্ত সুপুরুয; তাঁহাকে দেখিয়াই রমণী মনোহর বলিয়া বোধ হইল। বলিতে কি, আমি মাং- সের পাত্র লইয়া একটু দাঁড়াইয়া রহিলাম, আর একবার তাহাকে ভাল করিয়া দেখিলাম। আমি ঘোমটার ভি- তর হইতে তাঁহাকে খর দৃষ্টিতে দেখিতে ছিলাম, এমত সময়ে তিনি মুখ তুলিলেন-দেখিতে পাইলেন যে আমি ঘোমটার ভিতর হইতে তাঁহার প্রতি তীব্র দৃষ্টিতে চাহিয়া আছি। পুরুষে বলিয়া থাকেন, যে অন্ধকারে প্রদীপের মত, অবগুণ্ঠন মধ্যে রমণীর কটাক্ষ অধিকতর তীব্র দে- খায়। বোধ হয়, ইনিও সেইরূপ দেখিয়া থাকিবেন। তিনি একটু মাত মৃদু হাসিয়া, মুখ নত করিলেন। সে হাসি কেবল আমিই দেখিতে পাইলাম। আমি সমুদায মাংস তাঁহার পাতে ফেলিয়া দিয়া চলিয়া আসিলাম।
আমি একটু লজ্জিতা, একটু সুখী হইয়া আসিলাম। লজ্জার মাথা খেয়ে বলিতে হইল- আমি নিতান্ত একটুকু সুখী হইয়া আসিলাম না। আমার নারী জন্মে প্রথম এই হাসি- আর কখন কেহ আমাকে দেখিয়া মধুর হাসি হাসে নাই। আর সকলের হাসি বিষ লাগিয়াছিল।
এতক্ষণ বোধ হয়, পতিব্রতা মগুলী আমার উপর ভ্রূভঙ্গী করিতেছেন এবং বলিতেছেন, “পাপিষ, এ যে অনু- রাগ।” আমি স্বীকার করিতেছি, এ অনুরাগ। কিন্তু আমি সধবা হইয়াও জন্মবিধবা। বিবাহের সময়ে একবার মাত্র স্বামিসন্দর্শন হইয়াছিল-সুতরাং যৌবনের প্রবৃত্তি সকল অপরিতৃপ্ত ছিল। এমন গভীর জলে ক্ষেপণী নি- ক্ষেপেই যে তরঙ্গ উঠিবে, তাহাতে বিচিত্র কি?
আমি স্বীকার করিতেছি যে এ কথা বলিয়া আমি দোষ শুন্য হইতে পারিতেছি না। সকারণে হউক, আর নিষ্কা- রণেই হউক, পাপ সকল অবস্থাতেই পাপ। পাপের নৈমিত্তিকতা নাই। কিন্তু আমার জন্মের মধ্যে এই প্রথম পাপ ও এই শেষ পাপ।
পাকশালায় ফিরিয়া আসিয়া, আমার যেন মনে হইল, আমি ইহাঁকে পূর্ব্বে কোথাও দেখিয়াছি। সন্্দেহ ভঞ্জ- নার্থ, আবার অন্তরাল হইতে ইহাঁকে দেখিতে গেলাম। বিশেষ করিয়া দেখিলাম। দেখিয়া মনে মনে বলিলাম, “চিনিয়াছি।”
এমত সময়ে রামরাম বাবু, আবার অন্যান্য খাদ্য লইয়া যাইতে ডাকিয়া বলিলেন। অনেক প্রকার মাংস পাক করিয়াছিলাম-লইয়া গেলাম। দেখিলাম, ইনি সেই কটাক্ষটি মনে করিয়া রাখিয়াছেন। রামরাম দত্তকে বলিলেন, “রাম বাবু, আপনার পাচিকাকে বলুন, যে পাক অতি পরিপাটি হইয়াছে।”
রামরাম ভিতরের কথা কিছু ববিলেন না, বলিলেন, “হাঁ উনি রাঁধেন ভাল।”
আমি মনে মনে বলিলাম “তোমার মাতা আর মুণ্ড রাঁধি।”
নিমন্ত্রিত বাবু কহিলেন, “কিন্তু এ বড় আশ্চর্য্য যে আপনার বাড়ীতে দুই এক খানা ব্যঞ্জন আমাদের দেশের মত পাক হইয়াছে।”
আমি মনে মনে ভাবিলাম, “চিনিয়াছি।” বস্তুতঃ দুই এক খানা ব্যঞ্জন আমাদের নিজ দেশের প্রথামত পাক করিয়াছিলাম।
রামরাম বলিলেন, “তা হবে; ওঁর বাড়ী এ দেশে নয়।”
ইনি এবার যো পাইলেন, একেবারে আমার মুখপানে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিয়া বলিলেন, “তোমাদের বাড়ী কোথায় গা?”
আমার প্রথম সমস্যা; কথা কই কি না কই। স্থির করিলাম কথা কহিব।
দ্বিতীয় সমস্যা, সত্য বলিব না মিথ্যা বলিব। স্থির করিলাম, মিথ্যা বলিব। কেন এরূপ স্থির করিলাম, তাহা যিনি স্ত্রীলোকের হৃদয়কে চাতুর্য্যপ্রিয়, বক্রপথগামী কবিয়াছেন, তিনিই জানেন। আমি ভাবিলাম, “আবশ্যক হয়, সত্য কথা বলা আমার হাতেই রহিল। এখন আর একটা বলিয়া দেখি।” এই ভাবিয়া আমি উত্তর করিলাম,
“আমাদের বাড়ী কালদীঘি।” তিনি চমকিয়া উঠিলেন। ক্ষণেক পরে মৃদুস্বরে কহিলেন, “কোন্ কালাদীঘি, ডাকাতে কালদীঘি?”
আমি বলিলাম “হাঁ।”
তিনি আর কিছু বলিলেন না।
আমি মাংস পাত্র হাতে করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম দাঁড়াইয়া থাকা আমার যে অকর্ত্তব্য, তাহা আমি ভুলিয়াই গিয়াছিলাম। দেখিলাম যে তিনি আর ভাল করিয়া আহার করিতেছেন না। তাহা দেখিয়া রামরাম দত্ত বলিলেন,
“উপেন্দ্র বাবু, আহার করুন না।” ঐটি শুনিবার আমার বাকি ছিল। উপেন্দ্র বাবু! আমি নাম শুনিবার আগেই চিনিয়াছিলাম, ইনি আমার স্বামী।
আমি পাকশালায় গিয়া পাত্র ফেলিয়া এক বার অনেক কালের পর আহলাদ করিতে বসিলাম। রামরাম দত্ত বলিলেন, “কি পড়িল?” আমি মাংসের পাত্র খানা ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়াছিলাম।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
যখন আমার চৈতন্য হইল, তখন কাক কোকিল ভাকিতেছে। বংশপত্রাবচ্ছেদে বালারুণকিরণ ভূমে পতিত আমি গাত্রোত্থান করিয়া গ্রামানুসন্ধানে গেলাম। কিছু দূর গিয়া এক খানি গ্রাম পাইলাম। আমার পিত্রালয় যে গ্রামে, সেই গ্রামের সন্ধান করিলাম; আমার শ্বশুরালয় যে গ্রামে, তাহারও সন্ধান করিলাম। কোন সন্ধান পাইলাম না। দেখিলাম, আমি ইহার অপেক্ষা বনে ছিলাম ভাল। একে লজ্জায় মুখ ফুটিয়া পুরুষের সঙ্গে কথা কহিতে পারি না, যদি কই, তবে সকলেই আমাকে যুবতী দেখিয়া আমার প্রতি সতৃষ্ণ কটাক্ষ করিতে থাকে। কেহ ব্যঙ্গ করে—কেহ অপমান সূচক কথা বলে। আমি মনে২ প্রতিজ্ঞা করিলাম, “এই
খানে মরি, সেও ভাল; তবু আর পুরুষের নিকট কোন কথা জিজ্ঞাসা করিব না।” স্ত্রীলোকেরা কেহ কিছু বলিতে পারিল না—তাহারাও আমাকে জন্তু মনে করিতে লাগিল। বোধ হয়, কেননা তাহারাও বিস্মিতের মত চাহিয়া কেবল এক জন প্রাচীনা বলিল, “মা, তুমি কে? অমন সুন্দর মেয়ে কি পথে ঘাটে একা বেরুতে আছে? আহা মরি, মরি, কি রূপ গা? তুমি আমার ঘরে আইস।” তাহার ঘরে গেলাম। সে আমাকে ক্ষুধাতুরা দেখিয়া খাইতে দিল। সে মহেশপুর চিনিত। তাহাকে আমি বলিলাম যে, তোমাকে টাকা দেওয়াইব —তুমি আমাকে রাখিয়া আইস।” তাহাতে সে কহিল যে, আমার ঘর সংসার ফেলিয়া যাইব কি প্রকারে? তখন সে যে পথ বলিয়া দিল, আমি সেই পথে গেলাম। সন্ধ্যা পর্য্যন্ত পথ হাঁটিলাম—তাহাতে অত্যন্ত শ্রান্তি বোধ হইল। এক জন পথিককে জিজ্ঞাসা করিলাম, “হাঁ গা, মহেশপুর এখান হইতে কত দূর?” সে আমাকে দেখিয়া স্তম্ভিতের মত রহিল। অনেক ক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিল, “তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?” যে গ্রামে প্রাচী্না আমাকে পথ বলিয়া দিয়াছিল, আমি সে গ্রামের নাম করিলাম। তাহাতে পথিক কহিল যে, “তুমি পথ ভুলিয়াছ। বরাবর উল্টা আসিয়াছ। মহেশপুর এখান হইতে দুই দিনের পথ।”
আমার মাথা ঘুরিয়া গেল। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “তুমি কোথায় যাইবে?” সে বলিল, “আমি এই নিকটে গৌরীগ্রামে যাইব।” আমি অগত্যা তাহার পশ্চাৎ২ চলিলাম।
গ্রামমধ্যে প্রবেশ করিয়া সে আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি এখানে কাহার বাড়ী যাইবে?” আমি কহিলাম, “আমি এখানে কাহাকেও চিনি না। একটা গাছ তলায় শয়ন করিয়া থাকিব।”
পথিক কহিল, “তুমি কি জাতি??
আমি কহিলাম, “আমি কায়স্থ।”
সে কহিল, “আমি ব্রাহ্মণ। তুমি আমার সঙ্গে আইস। তোমার ময়লা মোটা কাপড় বটে, কিন্তু তুমি বড় ঘরের মেয়ে। ছোট ঘরে এমন রূপ হয় না।”
ছাই রূপ! ঐ রূপ, রূপ, শুনিয়া আমি জ্বালাতন হইয়া উঠিয়াছিলাম। কিন্তু এ ব্রাহ্মণ প্রাচীন, আমি তাহার সঙ্গে গেলাম।
আমি সে রাত্রে ব্রাহ্মণের গৃহে, দুই দিনের পর একটু বিশ্রাম লাভ করিলাম। পর দিন প্রাতে উঠিয়া দেখিলাম যে, আমার অত্যন্ত গাত্র বেদনা হইয়াছে। পা ফুলিয়া উঠিয়াছে; বসিবার শক্তি নাই।
যত দিন না গাত্রের বেদনা আরাম হইল, ততদিন আমাকে কাজে কাজেই ব্রাহ্মণের গৃহে থাকিতে হইল। ব্রাহ্মণ ও তাঁহার গৃহিণী আমাকে যত্ন করিয়া রাখিল। কিন্তু মহেশপুর যাইবার কোন উপায় দেখিলাম না। কোন স্ত্রীলোকেই পথ চিনিত না, অথবা যাইতে স্বীকার করিল না। পুরুষে অনেকেই স্বীকৃত হইল-কিন্তু তাহা- দিগের সঙ্গে একাকিনী যাইতে ভয় করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণও নিষেধ করিলেন। বলিলেন, “উহাদিগের চরিত্র ভাল নহে, উহাদিগের সঙ্গে যাইও না। উহাদের কি মতলব বলা যায় না। আমি ভদ্র সন্তান হইয়া তোমার ন্যায় সুন্দরীকে পুরুষের সঙ্গে কোথাও পাঠাইতে পারি না।” সুতরাং আমি নিরস্ত হইলাম।
একদিন শুনিলাম যে ঐ গ্রামের কৃষ্ণদাস বসু নামক একজন ভদ্রলোক সপরিবারে কলিকাতায় যাইবেন। শুনিয়া আমি ইহা উত্তম সুযোগ বিবেচনা করিলাম। কলিকাতা হইতে আমার পিত্রালয় এবং শ্বশুরালয় অনেক দূর বটে, কিন্তু সেখানে আমার জ্ঞাতি খুল্লতাত বিষয় কর্থোপলক্ষে বাস করিতেন। আমি ভাবিলাম যে কলিকাতায় গেলে অবশ্য আমার খুল্লতাতের সন্ধান পাইব। তিনি অবশ্য আমাকে পিত্রালয়ে পাঠাইয়া দিবেন। না হয়, আমার পিতাকে সম্বাদ দিবেন।
আমি এই কথা ব্রাহ্মণকে জানাইলাম। ব্রাহ্মণ বলি- লেন, “এ উত্তম বিবেচনা করিয়াছ। কৃষ্ণদাস বাবুর সঙ্গে আমার জানাশুনা আছে। আমি তোমাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া বলিয়া দিয়া আসিব। তিনি প্রাচীন, আর বড় ভাল মানুষ।”
ব্রাহ্মণ আমাকে কৃষ্ণদাস বাবুর কাছে লইয়া গেলেন। বাহ্মণ কহিলেন, “এটি ভদ্রলোকের কন্যা। বিপাকে পড়িয়া পথ হারাইয়া এ দেশে আসিয়া পড়িয়াছেন। আ- পনি যদি ইহাঁকে সঙ্গে করিয়া কলিকাতায় লইয়া যান, তবে এ অনাখিনী আপন পিত্রালয়ে পঁহুছিতে পারে।” কৃষ্ণদাস বাবু সম্মত হইলেন। আমি তাঁহার অন্তঃপুরে গেলাম। পরদিন তাঁহার পরিবারস্থ স্ত্রীলোকদিগের সঙ্গে কলিকাতা যাত্রা করিলাম। প্রথম দিন চারি পাঁচ ক্রোশ হঁটিয়া গঙ্গাতীরে আসিতে হইল। পর দিন নৌ- কায উঠিলাম।
কলিকায পঁহুছিলাম। কৃষ্ণদাস বাবু কালীঘাটে পূজা দিতে আসিয়াছিলেন। ভবানীপুরে বাসা করিলেন। আ- মাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,
"তোমার খুড়ার বাড়ী কোথায়? কলিকাতায় না ভবা-
নীপুরে?"
তাহা আমি জানিতাম না।
জিজ্ঞাসা করিলেন, “কলিকাতার কোন্ জায়গায় তাঁহার বাসা?
তাহা আমি কিছুই জানিতাম না। আমি জানিতাম, যে মন মহেশপুর একখানি গগুগ্রাম, কলিকাতা তেমনি এক খানি গগুগ্রাম মাত্র। একজন ভদ্রলোকের নাম করি- লেই লোকে বলিয়াদিবে। এখন দেখিলাম যে, কলি- কাতা অনন্ত অটালিকার সমুদ্র বিশেষ। আমার জ্ঞাতি খুড়াকে সন্ধান করিবার কোন উপায় দেখিলাম না। কৃ- ষ্ণদাস বাবু আমার হইয়া অনেক সন্ধান করিলেন, কিন্ত কলিকাতায় একজন সামান্য গ্রাম্য লোকের ওরূপ সন্ধান করিলে কি হইবে?
কৃষ্ণদাস বাবু কালীর পূজা দিয়া কাশী যাইবেন, কল্পন ছিল। পূজা দেওয়া হইল, এক্ষণে সপরিবারে কশী যাই- বার উদ্যেগ করিতে লাগিলেন। আমি কাঁদিতে লাগি- লাম। তিনি কহিলেন, “তুমি আমার কথা শুন। রাম রাম দত্ত নামে আমার একজন আত্মীয় লোক ঠনঠনিয়ায় বাস করেন। কল্য তাঁহার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। তিনি বলিলেন, যে মহাশর আমার পাচিকার অভাবে বড় কষ্ট হইতেছে। আপনাদিগের দেশের অনেক ভদ্রলোকের মেয়ে পরের বাড়ী রাঁধিয়া খায়। অমাকে একটি দিতেপারে ন?” আমি বলিয়াছি, চেষ্টা দেখিব।” তুমি এ কার্য্য স্বীকার কর―নহিলে তোমার উপায় দেখি না। আমার এমত শক্তি নাই যে তোমায় আবার খরচ পত্র করিয়া কাশী লইয়া যাই। আর সেখানে গিয়াই বা তুকি কি করিবে? বরং এখানে থাকিলে তোমার খুড়ার সন্ধান করিতে পারিবে।”
অগত্যা স্বীকৃত হইতে হইল, কিন্তু রাত্রিদিন “রূপ! রপ! শুনিয়া আমার কিছু ভয় হইয়াছিল। পুরুষজাতি মাত্র আমার শত্রু বলিয়া বোধ হইয়াছিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,
রাম রাম বাবুর বয়স কত?”
উ। “তিনি আমার মত প্রাচীন।”
“তাঁহার স্ত্রী বর্ত্তমান কি না?”
উ। “দুইটি।”
“অন্য পুরুষ তাঁহার বাড়ীতে কে থাকে?”
উ। “তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের পুত্র অবিনাশ,বয়স দশ বৎসর। আর একটি অন্ধ ভাগিনেয়।”
আমি সম্মত হইলাম। পর দিন কৃষ্ণদাস বাবু আমাকে রাম রাম দত্রের বাড়ী পাঠাইয়া দিলেন। আমি তাঁহার বাড়ী পাচিকা হইয়া রহিলাম। শেষে কপালে এই ছিল! রাঁধিয়া খাইতে হইল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
গভীর রাত্রে সকলে আহারান্তে শরন করিলে পর, আমি নিঃশব্দে রামরাম দত্তের বৈঠকখানায় গেলাম। তথায় আমার স্বামী একাকী শয়ন করিয়াছিলেন।
যৌবন প্রাপ্তির পর আমার এই প্রথম স্বামিসম্ভাষণ। সে যে কি সুখ, তাহা কেমন করিয়া বলিব? আমি অত্যন্ত মুখরা—কিন্তু যখন প্রথম তাঁহার সঙ্গে কথা কহিতে গেলাম, কিছুতেই কথা ফুটিল না। কণ্ঠরোধ হইয়া আসিতে লাগিল। সর্ব্বাঙ্গ কাঁপিতে লাগিল। হৃদয়মধ্যে গুরুতর শব্দ হইতে লাগিল। রসনা শুকাইতে লাগিল। কথা আসিল না বলিয়া আমি কাঁদিয়া ফেলিলাম।
সে অশ্রুজল তিনি বুঝিতে পারিলেন না। তিনি বলিলেন, “কাঁদিলে কেন? আমি ত তোমাকে ডাকি নাই—তুমি আপনি আসিয়াছ—তবে কাঁদ কেন?”
এই নিদারুণ বাক্যে বড় মর্ম্ম পীড়া হইল, তিনি যে আমাকে কুলটা মনে করিতেছেন—ইহাতে চক্ষের প্রবাহ
আরও বাড়িল। মনে করিলাম, এখন পরিচয় দিই—এ যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না। কিন্তু তখনই মনে হইল যে, পরিচয় দিলে যদি ইনি না বিশ্বাস করেন—যদি মনে করেন যে, “ইহার বাড়ী কালাদীঘি, অবশ্য আমার স্ত্রী হরণের বৃত্তান্ত শুনিয়াছে, এক্ষণে ঐশ্বর্য্য লোভে আমার স্ত্রী বলিয়া মিথ্যা পরিচয় দিতেছে”—তাহা হইলে কি প্রকারে ইঁহার বিশ্বাস জন্মাইব? সুতরাং পরিচয় দিলাম না। দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া, চক্ষের জল মুছিয়া, তাঁহার সঙ্গে কথোপকথনে প্রবৃত্ত হইলাম। অন্যান্য কথার পরে তিনি বলিলেন, “কালাদীঘি তোমার বাড়ী শুনিয়া আমি আশ্চর্য্য হইয়াছি। কালদীঘিতে যে এমন সুন্দরী জন্মিয়াছে, তাহা আমি স্বপ্নেও জানিতাম না। আমাদিগের দেশে যে এমন সুন্দরী জন্মিয়াছে, তাহা এখনও আমার বিশ্বাস হইতেছে না।”
আমি নেকী সাজিয়া বলিলাম, “আমি সুন্দরী না বান্দরী। আমাদের দেশের মধ্যে আপনার স্ত্রীরই সৌন্দর্য্যের গৌরব।” এই ছল ক্রমে তাঁহার স্ত্রীর কথা পাড়িয়াই জিজ্ঞাসা করিলাম, “তাঁহার কি কোন সন্ধান পাওয়া গিয়াছে?”
উত্তর। না।―তুমি কত দিন দেশ হইতে আসিয়াছ? আমি বলিলাম, “আমি সে সকল ব্যাপারের পরেই দেশ হইতে আসিয়াছি। তবে বোধ হয়, আপনি অবার বিবাহ করিয়াছেন।”
উত্তর। না।
সপত্নী হয় নাই, শুনিয়া বড় আহ্লাদ হইল। বলিলাম, “আপনারা যেমন বড় লোক, এটি তেমনি বিবেচনার কাজ হইয়াছে। নহিলে যদি এর পরে আপনার স্ত্রীকে পাওয়া যায়, তবে দুই সতীনে ঠেঙ্গাঠেঙ্গি বাঁধিবে।”
তিনি মৃদু হাসিয়া বলিলেন, “সে ভয় নাই। সে স্ত্রীকে পাইলেও আমি আর গ্রহণ করিব, এমত বোধ হয় না। তাহার আর জাতি নাই, বিবেচনা করিতে হইবে।”
আমার মাথায় বজ্রাঘাত হইল। এত আশা ভরসা সব নষ্ট হইল। তবে আমার পরিচয় পাইলে, আমাকে আপন স্ত্রী বলিয়া চিনিলেও, আমাকে গ্রহণ করিবেন না! আমার এবারকার নারী জন্ম বৃথায় হইল।
সাহস করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “যদি এখন তাঁহার দেখা পান, তবে কি করিবেন?”
তিনি অম্লান বদনে বলিলেন, “তাকে ত্যাগ করিব।”
কি নির্দ্দয়! আমি স্তম্ভিতা হইয়া রহিলাল। পৃথিবী আমার চক্ষে ঘুরিতে লাগিল। সেই রাত্রে আমি স্বামি-শয্যায় বসিয়া তাঁহার আনন্দিত মোহনমূর্ত্তি দেখিতে২ প্রতিজ্ঞা করিলাম, “ইনি আমায় স্ত্রী বলিয়া গ্রহণ করিবেন, নচেৎ আমি প্রাণত্যাগ করিব।”
প্রথম পরিচ্ছেদ
ইন্দিরা।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
অনেক দিনের পর আমি শ্বশুর বাড়ী যাইতেছিলাম। আমি উনিশ বৎসরে পড়িয়াছিলাম, তথাপি এ পর্য্যন্ত শ্বশুরের ঘর করি নাই। তাহার কারণ, আমার পিতা ধনী, শ্বশুর দরিদ্র। বিবাহের কিছু দিন পরেই শ্বশুর আমাকে লইতে লোক পাঠাইয়াছিলেন, কিন্তু পিতা পাঠাইলেন না। বলিলেন, “বিহাইকে বলিও, যে, আগে আমার জামাতা উপার্জ্জন করিতে শিখুক—তার পর বধূ লইয়া যাইবেন—এখন আমার মেয়ে লইয়া গিয়া খাওয়াইবেন কি?” শুনিয়া আমার স্বামীর মনে বড় ঘৃণা জন্মিল —তাহার বয়স তখন ২০ বৎসর, তিনি প্রতিজ্ঞা করিলেন, যে স্বয়ং অর্থোপার্জ্জন করিয়া পরিবার প্রতিপালন করিবেন। এই ভাবিয়া তিনি পশ্চিমাঞ্চলে যাত্রা করিলেন। তখন রেইল হয় নাই—পশ্চিমের পথ অতি দুর্গম ছিল। তিনি পদব্রজে, বিনা অর্থে, বিনা সহায়ে, সেই পথ অতিবাহিত করিয়া, পঞ্জাবে গিয়া উপস্থিত হইলেন। যে ইহা পারে, সে অর্থ উপার্জ্জন করিতেও পারে। স্বামী অর্থোপার্জ্জন করিতে লাগিলেন—বাড়ীতে টাকা পাঠাইতে লাগিলেন—কিন্তু সাত আট বৎসর বাড়ী আসিলেন না, বা আমার কোন সম্বাদ লইলেন যে সময়ে আমার ইতিহাস আরম্ভ করিতেছি, তাহার কিছু পূর্ব্বে তিনি বাড়ী আসিলেন। রব উঠিল যে, তিনি কোমিসেরিয়েটের (কমিসেরিয়েট্ বটে ত?) কর্ম্ম করিয়া অতুল ঐশ্বর্য্যের অধিপতি হইয়া আসিয়াছেন। আমার শ্বশুর আমার পিতাকে লিখিয়া পাঠাইলেন, “আপনার আশীর্ব্বাদে উপেন্দ্র (আমার স্বামীর নাম উপেন্দ্র— নাম ধরিলাম, প্রাচীনারা মার্জ্জনা করিবেন; হাল আইনে। তাঁহাকে আমার “উপেন্দ্র” বলিয়া ডাকাই সম্ভব)— বধূমাতাকে প্রতিপালন করিতে সক্ষম। পালকী বেহারা পাঠাইলাম, বধূমাতাকে এ বাটীতে পাঠাইয়া দিবেন। নচেৎ আজ্ঞা করিলে পুত্রের বিবাহের আবার সম্বন্ধ করিব।”
পিতা দেখিলেন, নুতন বড়মানুষ বটে। পাল্কী খানার ভিতরে কিংখাপ মোড়া, উপরে রুপার বিট, বাট রুপার হাঙ্গরের মুখ। দাসী মাগী যে আসিয়াছিল, সে গরদ পরিয়া আসিয়াছে, গলায় বড় মোটা সোনার দানা। চারিজন কালো দাড়িওয়ালা ভোজপুরে পাল্কীর সঙ্গে আসিয়াছিল।
আমার পিতা হরমোহন দত্ত বুনিয়াদি বড়মানুষ। হাসিয়া বলিলেন, “মা, ইন্দিরে! আর তোমাকে রাখিতে পারি না। এখন যাও, আবার শীঘ্র লইয়া আসিব। দেখ, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ দেখিয়া হাসিও না।”
তাই আমি শ্বশুর বাড়ী যাইতেছিলাম। আমার শ্বশুর বাড়ীমনোহরপুর। আমার পিত্রালয় মহেশপুর; উভয় গ্রামের মধ্যে দশ ক্রোশ পথ। সুতরাং প্রাতে আহার করিয়া যাত্রা করিয়াছিলাম, পৌঁছিতে পাঁচ সাত দণ্ড রাত্রি হইবে, জানিতাম।
পথে কালাদীঘি নামে এক বৃহৎ দীর্ঘিকা আছে। তাহার জল প্রায় অর্দ্ধক্রোশ। পাহাড় পর্ব্বতের ন্যায় উচ্চ। তাহার ভিতর দিয়া পথ। চারি পার্শ্বে বট গাছ। তাহার ছায়া শীতল, জল নীলমেঘের মত, দৃশ্য অতি মনোহর। তথায় মনুষ্যের সমাগম বিরল। ঘাটের উপরে একখানি দোকান আছে মাত্র। নিকটে যে গ্রাম আছে, তাহারও নাম কালাদীঘি। এই দীঘিতে একা লোক জন আসিতে ভয় করিত। দস্যুতার ভয়ে এখানে দলবদ্ধ না হইয়া লোক আসিত। এই জন্য লোকে “ডাকাতে কালাদীঘি” বলিত। দোকানদারকে লোকে দস্যুদিগের সহায় বলিত। আমার সে সকল ভয় ছিল না। আমার সঙ্গে অনেক লোকষোলজন বাহক, চারি জন দ্বারবান, এবং অন্যান্য লোক ছিল।
যখন আমরা এইখানে পঁহুছিলাম, তখন বেলা আড়াই প্রহর। বাহকেরা বলিল, “যে আমরা কিছু জল, টল না খাইলে আর যাইতে পারি না।” দ্বারবানেরা বারণ করিল -বলিল, “এস্থান ভাল নয়।” বাহকের উত্তর করিল, “আমরা এত লোক আছি-আমাদিগের ভয় কি? আমার সঙ্গের লোক জন ততক্ষণ কেহই কিছুই খায় নাই। শেষে সকলেই বাহকদিগের মতে মত করিল।
দীঘির ঘাটে-বটতলায় আমার পাল্কী নামাইল। আমি ক্ষণেক পরে, অনুভবে বুঝিলাম যে লোক জন তফাতে গিয়াছে। আমি তখন সাহস পাইয়। অল্প দ্বার খুলিয়া দীঘি দেখিতে লাগিলাম। দেখিলাম, বাহকেরা সকলে দোকানের সম্মুখে, এক বটবৃক্ষ তলে বসিয়া জলপান খাইতেছে। সে স্থান আমার নিকট হইতে প্রায় দেড় বিঘা। দেখিলাম যে, সম্মুখে অতি নিবিড় মেঘের ন্যায়, বিশাল দীর্ঘিকা বিস্তৃত রহিয়াছে, চারিপার্শ্বে পর্ব্বতশ্রেণীবৎ উচ্চ অথচ সুকোমল শ্যামল তৃণাবরণ-শোভিত “পাহাড়;”— পাহাড় এবং জলের মধ্যে বিস্তৃত ভূমিতে দীর্ঘ বৃক্ষশ্রেণী; পাহাড়ে অনেক গোবৎস চরিতেছে—জলের উপরে জলচর পক্ষিগণ ক্রীড়া করিতেছে—মৃদু পবনের মৃদু ২ তরঙ্গ হিল্লোলে স্ফটিক ভঙ্গ হইতেছে—ক্ষুদ্রোর্ম্মিপ্রতিঘাতে কদাচিৎ জলজ পুষ্পপত্র এবং শৈবাল দুলিতেছে। দেখিতে পাইলাম যে আমার দ্বারবানেরা জলে নামিয়া স্নান করিতেছে—তাহাদের অঙ্গচালনে তাড়িত হইয়া শ্যামসলিলে শ্বেত মুক্তাহার বিক্ষিপ্ত হইতেছে। দেখিলাম যে বাহকেরা ভিন্ন আমার সঙ্গের লোক সকলেই এক কালে স্নানে নামিরাছে। সঙ্গে দুইজন স্ত্রীলোক—একজন শ্বশুর বাড়ীর, একজন বাপের বাড়ীর, উভয়েই জলে। আমার মনে একটু ভয় হইল—কেহ নিকটে নাই—স্থান মন্দ, ভাল করে নাই। কি করি,আমি কুলবধু মুখ ফুটিয়া কাহাকে ডাকিতে পারিলাম না।
এমত সময়ে পাল্কীর অপর পার্শ্বে কি একটা শব্দ হইল। যেন উপরিস্থ বটবৃক্ষের শাখা হইতে কিছু গুরু পদার্থ পড়িল। আমি সে দিগের কপাট অল্প খুলিয়া দেখিলাম। দেখিলাম, যে একজন কৃষ্ণবর্ণ বিকটাকার মনুষ্য।
দেখিতে২ আর এক জন মানুষ গাছের উপর হইতে লাফাইয়া পড়িল! দেখিতে দেখিতে আর একজন, আবার একজন! এইরূপে চারিজন প্রায় এক কালীনই গাছ হইতে লাফাইয়া পড়িয়াই-পাল্কী স্কন্ধে করিয়া। উঠাইল। উঠাইয়া ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটিল।
দেখিতে পাইয়া আমার দ্বারবানেরা “কোন্ হায় রে! কোন হায়রে রব তুলিয়া জল হইতে দৌড়াইল।
তখন বুঝিলাম যে, আমি দস্যু হস্তে পড়িয়াছি। তখন আর লজ্জায় কি করে! পাল্কীর উভয় দ্বার মুক্ত করিলাম। দেখিলাম যে, আমার সঙ্গের সকল লোকে অত্যন্ত কোলাহল করিয়া পশ্চাদ্ধাবিত হইয়াছে। প্রথমে ভরসা হইল। কিন্তু শীগ্রই সে ভরসা দূর হইল। তখন নিকটস্থ অন্যান্য বৃক্ষ হইতে লাফাইয়া পড়িয়া বহু সংখ্যক দস্যু দেখা দিতে লাগিল। আমি বলিয়াছি, জলের ধারে বটবৃক্ষের শ্রেণী। সেই সকল বৃক্ষের দিয়া দস্যুরা পাল্কী লইয়া যাইতেছিল। সেই সকল বৃক্ষ হইতে মনুষ্য লাফাইয়া পড়িতে লাগিল। তাহাদের কাহারও হাতে বাঁশের লাঠি, কাহারও হতে বটের ডাল। লোক সংখ্যা অধিক দেখিয়া আমার সঙ্গের লোকেরা পিছাইয়া পড়িতে লাগিল। তখন আমি নিতান্ত হতাশ্বাস হইয়া মনে করিলাম, লাফাইয়া পড়ি। কিন্তু বাহকেরা যে রূপ দ্রুত বেগে যাইতেছিল—তাহাতে পাল্কী হইতে নামিলে আঘাত প্রাপ্তির সম্ভাবনা। বিশেষতঃ এক জন দস্যু আমাকে লাঠি দেখাইয়া কহিল যে, নামিবি ত মাথা ভাঙ্গিয়া দিব।” সুতরাং আমি নিরস্ত হইলাম।
আমি দেখিতে লাগিলাম যে, এক জন দ্বারবান অগ্রসর হইয়া আসিয়া পাল্কী ধরিল, তখন এক জন দস্যু তাহাকে লাঠির আঘাত করিল। সে অচেতন হইয়া। মৃত্তিকাতে পড়িল। তাহাকে আর উঠিতে দেখিলাম না। বোধ হয়, সে আর উঠিল না।
ইহা দেখিয়া অবশিষ্ট রক্ষিগণ নিরস্ত হইল। বাহকেরা আমাকে নির্ব্বিঘ্নে লইয়া গেল। রাত্রি এক প্রহর পর্য্যন্ত তাহার এই রূপ বহন করিয়া পরিশেষে পাল্কী নামাইল। দেখিলাম, সে স্থান নিবিড় বন-অন্ধকার। দস্যুরা একটা মশাল জ্বালিল। তখন আমাকে কহিল, “তোমার যাহা কিছু আছে, দাও—নহিলে প্রাণে মারিব।” আমার অলঙ্কার বস্ত্রাদি সকল দিলাম—অঙ্গের অলঙ্কারও খুলিয়া দিলাম। তাহারা এক খানি মলিন, জীর্ণ বস্ত্র দিল, তাহা পরিয়া পরিধানের বহুমূল্য বস্ত্র ছাড়িয়া দিলাম। দস্যুরা আমার সর্ব্বস্ব লইয়া, পাল্কী ভাঙ্গিয়া রুপা খুলিয়া লইল। পরিশেষে অগ্নি জ্বালিয়া ভগ্ন শিবিকা দাহ করিয়া দস্ততার চিহ্ন মাত্র লোপ করিল।
তখন তাহারাও চলিয়া যায়! সেই নিবিড় অরণ্যে, অন্ধকার রাত্রে, আমাকে বন্য পশুদিগের মুখে সমর্পন করিয়া যায় দেখিয়া, আমি কাঁদিয়া উঠিলাম। আমি কহিলাম, “তোমাদিগের পায়ে পড়ি, আমাকে সঙ্গে লইয়া চল।” দস্যুর সংসর্গও আমার স্পৃহণীয় হইল।
এক প্রাচীন দস্যু সকরুণ ভাবে বলিল, “বাছা! অমন রাঙ্গা মেয়ে আমরা কোথায় লইয়া যাইব? এ ডাকতির এখনি সোহরত হইবে—তোমার মত রাঙ্গা মেয়ে আমাদের সঙ্গে দেখিলেই আমাদের ধরিবে।”
এক জন যুব দস্যু কহিল, “আমি ইহাকে লইয়া ফাটকে যাই, সেও ভাল, তবু ইহাকে ছাড়িতে পারি না।” সে আর যাহা বলিল, তাহা লিখিতে পারি না—এখন মনেও আনিতে পারি না। সেই প্রাচীন দস্যু ঐ দলের সর্দ্দার। সে যুবাকে লাঠি দেখাইয়া কহিল, “এই লাঠির বাড়ি এই খানে তোর মাথা ভাঙ্গিয়া রাখিয়া যাইব। ও সকল পাপ কি আমাদের সয়?” তাহারা চলিয়া গেল। যতক্ষণ তাহাদিগের কথা বার্ত্তা শুনাগেল—ততক্ষণ আমার জ্ঞান ছিল। তার পর সেইখানে আমি অজ্ঞান হইয়া পড়িলাম। হইয়াছে।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
তখন সে চিন্তিতভাব আমার দূর হইল। ইতিপূর্ব্বেই বুঝিতে পারিয়াছিলাম, যে তিনি আমার হাস্য কটাক্ষের বশীভূত হইয়াছেন। মনে২ করিলাম, যদি গণ্ডারের খড়া প্রয়োগে পাপ না থাকে, যদি হস্তীর শুণ্ড প্রয়োগে পাপ থাকে, যদি ব্যাঙের নখ ব্যবহারে পাপ না থাকে, যদি মহিষের শৃঙ্গাঘাতে পাপ না থাকে, তবে আমারও পাপ হইবে না। জগদীশ্বর আমাদিগকে যে সকল আয়ুধ দিয়াছেন, উভয়ের মঙ্গলার্থে তাহার প্রয়োগ করিব। আমি তাহার নিকট হইতে দূরে আসিয়া বসিলাম। তাঁহার সঙ্গে প্রফুল্ল হইয়া কথা কহিতে লাগিলাম। তিনি নিকটে আসিলেন, আমি তাঁহাকে কহিলাম, “আমার নিকটে আসিবেন না। আপনার একটি ভ্রম জন্মিয়াছে দেখিতেছি,” হাসিতে২ আমি এই কথা বলিলাম এবং বলিতে২ কবরী মোচন পূর্ব্বক (সত্য কথা না বলিলে কে এ ইতি
হাস বুঝিতে পারিবে?) আবার বাঁধিতে বসিলাম “আপনার একটি ভ্রম জন্মিয়াছে। আমি কুলটা নহি। আপনার নিকটে দেশের সম্বাদ শুনিব বলিয়াই আসিয়াছি। অসৎ অভিপ্রায় কিছুই নাই।”
বোধ হয়, তিনি এ কথা বিশ্বাস করিলেন না। অগ্রসর হইয়া বসিলেন। আমি তখন হাসিতে২ বলিলাম, “তুমি কথা শুনিলে না, তবে আমি চলিলাম। তোমার সঙ্গে এই সাক্ষাৎ,” এই বলিয়া আমি গাত্রোত্থান করি্লাম
অমি সত্য সত্যই গাত্রোত্থান করিলাম দেখিয়া তিনি ক্ষুর হইলেন; আসিয়া আমার হস্ত ধরিলেন। আমি রাগ করিয়া হাত ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলাম, কিন্তু হাসিলাম, বলিলাম, “তুমি ভাল মানুষ নও। আমাকে ছুঁইও না। আমাকে দুশ্চরিত্রা মনে করিও না।”
এই বলিয়া আমি দ্বারের দিকে অগ্রসর হইলাম। স্বামী—অদ্যাপি সে কথা মনে পড়িলে দুঃখ হয়—তিনি হাত ঘোড় করিয়া ডাকিলেন, “আমাকে রক্ষা কর, রক্ষা কর, যাইও না। আমি তোমার রূপ দেখিয়া পাগল হইয়াছি। এমন রূপ আমি কখন দেখি নাই।” আমি আবার ফিরিলাম—কিন্তু বসিলাম না—বলিলাম, “প্রাণা। ধিক! আমি কোন ছার, আমি যে তোমা হেন রত্ন ত্যাগ করিয়া যাইতেছি, ইহাতেই আমার মনের দুঃখ বুঝিও। কিন্তু কি করিব? ধর্ম্মই আমাদিগের এক মাত্র প্রধান উপায়-একদিনের সুখের জন্য আমি ধর্ম্ম ত্যাগ করিব না। আমি চলিলাম।”
তিনি বলিলেন, “আমি শপথ করিয়াছি, তুমি চিরকাল আমার হৃদয়েশ্বরী হইয়া থাকিবে। এক দিনের জন্য কেন?”
আমি হাসিয়া বলিলাম, “পুরুষের শপথে বিশ্বাস। নাই।” এই বলিয়া আবার চলিলাম—দ্বার পর্য্যন্ত আসিলাম। তখন আর ধৈর্য্যাবলম্বন করিতে না পারিয়া তিনি দুই হস্তে আমার দুই চরণ ধরিয়া পথ রোধ করিলেন।
তাঁহার দশা দেখিয়া আমার দুঃখ হইল। বলিলাম, “তবে তোমার বাসায় চল—এখানে থাকিলে তুমি আমায় ত্যাগ করিয়া যাইবে।”
তিনি তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন। তাঁহার বাসা সিমলায়, অল্পদূর, সেই রাত্রেই আমাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গেলেন। সেখানে গিয়া দেখিলাম, দুই মহল বাড়ী। একটি ঘরে আমি অগ্রে প্রবেশ করিলাম। প্রবেশ করিয়াই ভিতর হইতে দ্বার রুদ্ধ করিলাম। স্বামী বাহিরে পড়িয়া রহিলেন।
তিনি বাহির হইতে কাতরোক্তি করিতে লাগিলেন, আমি হাসিতে হাসিতে বলিলাম, “আমি এখন তোমারই দাসী হইলাম। কিন্তু দেখি তোমার প্রণয়ের বেগ কাল প্রাতঃকাল পর্য্যন্ত থাকে না থাকে। যদি কাল ও এমনি ভালবাসা দেখিতে পাই, তখন তোমার সঙ্গে আবার আলাপ করিব। আজ এই পর্য্যন্ত।”
আমি দ্বার খুলিলাম না। অগত্যা তিনি অন্যত্র গিয়া বিশ্রাম করিলেন। আনেক বেলা হইলে দ্বার খুলিলাম। দেখিলাম, স্বামী দ্বারে আসিয়া দাঁড়াইয়া আছেন। আমি আপনার করে তাঁহার কর গ্রহণ করিয়া বলিলাম, “প্রাণনাথ, হয় আমাকে রামরাম দত্তের বাড়ী পাঠাইয়া দাও, নচেৎ অষ্টাহ আমার সঙ্গে আলাপ করিও না। এই অষ্টাই তোমার পরীক্ষা।” তিনি অষ্টাহ পরীক্ষা স্বীকার করিলেন।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
পুরুষকে দগ্ধ করিবার যে কোন উপায় বিধাতা স্ত্রীলোককে দিয়াছেন, সেই সকল উপায়ই অবলম্বন করিয়া আমি অষ্টাহ স্বামীকে জ্বালাতন করিলাম। আমি স্ত্রী-
লোক-কেমন করিয়া মুখ ফুটিয়া সে সকল কথা বলিব। আমি যদি আগুন জ্বালিতে না জানিতাম, তবে গত রাত্রে এত আগুন জ্বলিত না। কিন্তু কি প্রকারে আগুন জ্বলিলাম—কি প্রকারে ফুৎকার দিলাম—কি প্রকারে স্বামীর হৃদয় দগ্ধ করিলাম, লজ্জায় তাহার কিছুই বলিতে পারি নাই। যদি আমার কোন পাঠিকা নর হত্যার ব্রত গ্রহণ করিয়া থাকেন, এবং সফল হইয়া থাকেন, তিনিই বুঝিবেন। যদি কোন পাঠক কখন এই রূপ নরঘাতিনীর হস্তে পড়িয়া থাকেন, তিনিই বুঝিবেন। বলিতে কি, স্ত্রীলোকই পৃথিবীর কণ্টক। আমাদের জাতি হইতে পৃথিবীর যত অনিষ্ট ঘটে, পুরুষ হইতে তত ঘটে না। সৌভাগ্য এই যে এই নরঘাতিনী বিদ্যা সকল স্ত্রীলোকে জানে না, তাহা হইলে এত দিনে পৃথিবীতে আগুন লাগিত।
এই অষ্টাহ আমি সর্ব্বদা স্বামীর কাছে কাছে থাকিতাম —আদর করিয়া কথা কহিতাম—নীরস কথা একটি কহিতাম না। হাসি, চাহনী, অঙ্গভঙ্গী,—সে সকল ত ইতর স্ত্রীলোকের অস্ত্র। আমি প্রথম দিনে আদর করিয়া কথা কহিলাম—দ্বিতীয় দিনে অনুরাগ লক্ষণ দেখাইলাম —তৃতীয় দিনে তাঁহার ঘরকরনার কাজ করিতে আরম্ভ করিলাম; যাহাতে তাঁহার আহারের পারিপাট্য, শয়নের পারিপাট্য, স্নানের পারিপাট্য হয়, সর্ব্বাংশে যাহাতে ভাল থাকেন, তাহাই করিতে আরম্ভ করিলাম—স্বহস্তে পাক করিলাম; খড়িকাটি পর্য্যন্ত স্বয়ং প্রস্তুত করিয়া রাখিলাম। লজ্জার কথা কহিব কি?—এক দিন একটু কাঁদিলাম; কেন কাঁদিলাম, তাহা স্পষ্ট তাঁহাকে জানিতে দিলাম না—অথচ একটু২ বুঝিতে দিলাম যে অষ্টাহ পরে পাছে বিচ্ছেদ হয়—পাছে তাহার অনুরাগ স্থায়ী না হয়, এই আশঙ্কায় কাঁদিতেছি। এক দিন, তাঁহার একটু অসুখ হইয়াছিল, সমস্ত রাত্রি জাগরণ করিয়া তাঁহার শুশ্রূষা করিলাম। এ সকল পাপাচরণ শুনিয়া আমাকে ঘৃণা করিও না—আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতে পারি যে সকলই কৃত্রিম নহে—আমি তাঁহাকে আন্তরিক ভাল বাসিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম। তিনি যে পরিমাণে আমার প্রতি অনুরাগী, তাহার অধিক আমি তাহার প্রতি অনুরাগিণী হইয়াছিলাম। বলা বাহুল্য যে তিনি অষ্টাহ পরে আমাকে মারিয়া তাড়াইয়া দিলেও আমি যাইতাম না।
ইহাও বলা বাহুল্য যে তাঁহার অনুরাগানলে অপরিমিত ঘৃতাহুতি পড়িতেছিল। তিনি এখন অনন্যকর্ম্মা হইয়া কেবল আমার মুখপানে চাহিয়া থাকিতেন। আমি গৃহকর্ম্ম করিতাম-তিনি বালকের মত আমার সঙ্গে সঙ্গে বেড়াইতেন। তাঁহার চিত্তের দুর্দ্দমনীয় বেগ প্রতিপদে দেখিতে পাইতাম, অথচ আমার ইঙ্গিতমাত্রে স্থির হইতেন। কখন কখন আমার চরণস্পর্শ করিয়া রোদ করিতেন, বলিতেন, “আমি এ আষ্টাহ তোমার কথা পালন করিব—তুমি আমায় ত্যাগ করিয়া যাইও না।” ফলে আমি দেখিলাম যে আমি তাঁহাকে ত্যাগ করিলে। তাঁহার উন্মাদ গ্রস্ত হওয়া অসম্ভব নহে।
পরীক্ষার শেষ দিন আমিও তাঁহার সঙ্গে কাঁদিলাম। বলিলাম, “প্রাণাধিক! আমি তোমার সঙ্গে আসিয়ী ভাল করিনাই। তোমাকে বৃথা কষ্ট দিলাম। এখন আমার বিবেচনা হইতেছে, পরীক্ষা মিথ্যা প্রম মাত্র। মানুষের মন স্থির নয়। তুমি আট দিন আমাকে ভাল বাসিলে—কিন্তু আট মাস পরে তোমার এ ভালবাসা থাকিবে কি না, তাহা তুমিও বলিতে পার না। তুমি আমায় ত্যাগ করিলে আমার কি দশা হইবে?”
তিনি হাসিয়া উঠিলেন, বলিলেন, “তোমার যদি সেই ভাবনা হয়, তবে আমি তোমাকে এখনই যাবজ্জীবনের উপায় করিয়া দিতেছি। পূর্ব্বেই আমি মনে করিয়াছি, তোমার যাবজ্জীবনের সংস্থান করিয়া দিব।”
আমিও ঐ কথাই পাড়িবার উদ্যোগ করিতেছিলাম; তিনি আপনি পাড়ায় আরও ভাল হইল। আমি তখন বলিলাম, “ছি! তুমি যদি ত্যাগ করিলে তবে আমি টাকা লইয়া কি করিব? ভিক্ষা করিয়া খাইলেও জীবন রক্ষা হয়, কিন্তু তুমি ত্যাগ করিলে জীবন রক্ষা হইবে না। তুমি এমন কোন কাজ কর, যাহাতে আমার বিশ্বাস হয় যে তুমি এজন্মে আমায় ত্যাগ করিবে না। আজ শেষ পরীক্ষার দিন।”
তিনি বলিলেন, “কি করিব, বল। তুমি যাহা বলিবে, তাহাই করিব।”
আমি বলিলাম “আমি স্ত্রীলোক, কি বলিব? তুমি আপনি বুঝিয়া কর।” পরে অন্য কথা পাড়িলাম। কথায়২ একটা মিথ্যা গল্প করিলাম। তাহাতে কোন ব্যক্তি আপন উপপত্নীকে সমুদায় সম্পত্তি লিখিয়া দিয়াছিল— এই প্রসঙ্গ ছিল।
তিনি গাড়ি প্রস্তুত করিতে বলিলেন। গাড়ি প্রস্তুত হইলে কোথায় গেলেন। আট দিনের মধ্যে এই তিনি প্রথমে আমার কাছ ছাড়া হইলেন। ক্ষণেক পরে ফিরিয়া আসিলেন। কোথায় গিয়াছিলেন, তাহা আমাকে কিছু বলিলেন না। আমিও কিছু জিজ্ঞাসা করিলাম না। অপরাহ্নে আবার গেলেন। এবার একখানি কাগজ হাতে করিয়া আসিলেন। বলিলেন, “ইহা লও। তোমাকে আমার সমস্ত সম্পত্তি লিখিয়া দিলাম। উকীলের বাড়ী হইতে এই দানপত্র লেখাইয়া আনিয়াছি। যদি তোমাকে আমি কখন ত্যাগ করি, তবে আমাকে ভিক্ষা করিয়া খাইতে হইবে।”
এবার আমার অকৃত্রিম অশ্রুজল পড়িল—তিনি আমাকে এত ভাল বাসেন! আমি তাঁহার চরণ স্পর্শ করিয়া বলিলাম, “আজি হইতে আমি তোমার চিরকালের দামী হইলাম। পরীক্ষা শেষ হইয়াছে।”