← লাইব্রেরি

১৮৭৪

মৃণালিনী (১৮৭৪)

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৭৪

প্রকাশনা-তথ্য

মৃণালিনী।

ঐতিহাসিক উপন্যাস।

শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

প্রণীত।

তৃতীয় সংস্করণ।

“বিভর্ষি চাকারমনির্বূ তানাং

মৃণালিনী হৈমমিবোপরাগম্।”

কাঁটালপাড়া।

বঙ্গদর্শন যন্ত্রালয়ে শ্রী হারাণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কর্ত্তৃক

মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

১৮৭৪।

মূল্য ১৵৹ একটাকা দুই আনা মাত্র।

মৃণালিনী।

ঐতিহাসিক উপন্যাস।

শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

প্রণীত।

তৃতীয় সংস্করণ।

“বিভর্ষি চাকারমনির্বূ তানাং

মৃণালিনী হৈমমিবোপরাগম্।”

কাঁটালপাড়া।

বঙ্গদর্শন যন্ত্রালয়ে শ্রী হারাণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কর্ত্তৃক

মুদ্রিত ও প্রকাশিত।

১৮৭৪।

বঙ্গকবিকুলতিলক

শ্রীযুক্ত বাবু দীনবন্ধু মিত্র

সুহৃদ্‌প্রধানকে

এই গ্রন্থ

প্রণয়োপহার স্বরূপ

উৎসর্গ

করিলাম।

চতুর্থ খণ্ড · অষ্টম পরিচ্ছেদ

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

মৃণালিনীর সুখ কি?

যেখানে হেমচন্দ্র তাঁহাকে সোপানপ্রস্তরাঘাতে ব্যথিত করিয়া রাখিয়া গিয়াছিলেন—মৃণালিনী এখনও সেইখানে। পৃথিবীতে যাইবার আর স্থান ছিল না—সর্ব্বত্র সমান হইয়াছিল। নিশা প্রভাতা হইল, মৃণালিনী উঠিলেন না। বেলা হইল, মৃণালিনী উঠিলেন না। গিরিজায়া যত কিছু বলিলেন—মৃণালিনী কোন উত্তর দিলেন না, অধোবদনে বসিয়া রহিলেন। স্নানাহারের সময় উপস্থিত হইল—গিরিজায়া তাঁহাকে জলে নামাইয়া স্নান করাইলেন। স্নান করিয়া মৃণালিনী আর্দ্রবসনে সেই স্থানে বসিয়া রহিলেন। গিরিজায়া স্বয়ং ক্ষুধাতুরা হইল—কিন্তু গিরিজায়া মৃণালিনীকে উঠাইতে পারিল না—সাহস করিয়া বার বার বলিতেও পারিল না। সুতরাং নিকটস্থ বন হইতে এবং ভিক্ষা দ্বারা কিঞ্চিৎ ফলমূল সংগ্রহ করিয়া ভোজন জন্য মৃণালিনীকে দিল। মৃণালিনী তাহা স্পর্শ করিলেন মাত্র। প্রসাদ গিরিজায়া ভোজন করিল—ক্ষুধার অনুরোধে মৃণালিনীকে ত্যাগ করিল না।

এইরূপে পূর্ব্বাচলের সূর্য্য মধ্যাকাশে, মধ্যাকাশের সূর্য পশ্চিমে গেলেন। সন্ধ্যা হইল। গিরিজায়া দেখিলেন যে তখনও মৃণালিনী গৃহে প্রত্যাগমন করিবার লক্ষণ প্রকাশ করিতেছেন না। গিরিজায়া বিশেষ চঞ্চল হইলেন। পূর্ব্বরাত্র জাগরণ গিয়াছে—এ রাত্রেও জাগরণের আকার। গিরিজায়া কিছু বলিলেন না—বৃক্ষপল্লব সংগ্রহ করিয়া সোপানোপরি আপন

মৃণালিনীর সুখ কি?

১৬৭

শয্যা রচনা করিলেন। মৃণালিনী তাঁহার অভিপ্রায় বুঝিয়া কহিলেন, “তুমি গৃহে গিয়া শয়ন কর।”

গিরিজায়া মৃণালিনীর কথা শুনিয়া আনন্দিত হইল, বলিল, “একত্রে যাইব।”

মৃণালিনী বলিলেন, “আমি পশ্চাৎ যাইতেছি।”

গি। “আমি ততক্ষণ অপেক্ষা করিব। ভিখারিণী দুই দণ্ড পর্ণশয্যায় শুইলে ক্ষতি কি? কিন্তু সাহস পাই ত বলি—রাজপুত্রের সহিত এ জন্মের মত সম্বন্ধ, ঘুচিল—তবে আর কার্ত্তিকের হিমে আমরা কষ্ট পাই কেন?”

মৃ। “গিরিজায়ে,—হেমচন্দ্রের সহিত এ জন্মে আমার সম্বন্ধ ঘুচিবে না। আমি কালিও হেমচন্দ্রের দাসী ছিলাম— আজিও তাঁহার দাসী।”

গিরিজায়ার বড় রাগ হইল—সে উঠিয়া বসিল। বলিল, “কি ঠাকুরাণি! তুমি এখনও বল আমি সেই পাষণ্ডের দাসী! তুমি যদি তাঁহার দাসী—তবে আমি চলিলাম—আমার এখানে আর প্রয়োজন নাই।”

মৃ। “গিরিজায়ে—যদি হেমচন্দ্র তোমাকে পীড়ন করিয়া থাকেন, তুমি স্থানান্তরে নিন্দা করিও। হেমচন্দ্র আমার প্রতি কোন অহিতাচরণ করেন নাই—আমি কেন তাঁহার নিন্দা সহিব? তিনি রাজপুত্র—আমার স্বামী; তাঁহাকে পাষণ্ড বলিও না।”

গিরিজায়া আরও রাগ করিল। বহুযত্নরচিত পর্ণশয্যা ছিন্ন ভিন্ন করিয়া ফেলিয়া দিতে লাগিল। কহিল “পাষণ্ড বলিব না—একবার বলিব” (বলিয়াই কতকগুলি শয্যাবিন্যাসের পল্লব সদর্পে জলে ফেলিয়া দিল) “একবার বলিব—শতবার বলিব” (আবার পল্লব প্রক্ষেপ)—“দশবার বলিব” (পল্লব প্রক্ষেপ) “শতবার বলি বলিব”—“সহস্রবার বলিব।” সকল পল্লবগুলিন জলে গেল। গিরিজায়া বলিতে লাগিল। “পাষণ্ড বলিব না? কি দোষে তোমাকে তিনি এত তিরস্কার করিলেন?”

মৃ। “সে আমারই দোষ—আমি গুছাইয়া সকল কথা তাঁহাকে বলিতে পারি নাই—কি বলিতে কি বলিলাম।”

গি। “ঠাকুরাণি! আপনার কপাল টিপিয়া দেখ।”

মৃণালিনী ললাট স্পর্শ করিলেন।

গি। “কি দেখিলে?”

মৃ। “বেদনা।”

গি। “কেন হইল?”

মৃ। “মনে নাই।”

গি। “তুমি হেমচন্দ্রের অঙ্গে মাথা রাখিয়াছিলে—তিনি ফেলিয়া দিয়া গিয়াছেন। পাতরে পড়িয়া তোমার মাথায় লাগিয়াছে।”

মৃণালিনী ক্ষণেক চিন্তা করিয়া দেখিলেন। কিছু মনে পড়িল না। বলিলেন, “মনে হয় না। বোধ হয়, আমি আপনি পড়িয়া গিয়া থাকিব।”

গিরিজায়া বিস্মিত হইল। বলিল “ঠাকুরাণি! এ সংসারে আপনি সুখী।”

মৃ। “কেন?”

গি। “আপনি রাগ করেন না।”

মৃ। “আমিই সুখী—কিন্তু তাহার জন্য নহে।”

গি। “তবে কিসে?”

মৃ। “হেমচন্দ্রের সাক্ষাৎ পাইয়াছি।”

তৃতীয় খণ্ড · অষ্টম পরিচ্ছেদ

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

মৃণালিনীর লিপি।

মৃণালিনী কহিলেন, “গিরিজায়ে, তিনি রাগ করিয়া বলিয়া থাকিবেন, ‘উত্তম হইয়াছে।’ আমি তাঁহাকে বঞ্চনা করিয়া মথুরায় বিবাহ করিতে গিয়াছি, ইহা শুনিয়া তিনি কেনই বা রাগ না করিবেন?”

গিরিজায়ারও তখন সংশয় জন্মিল। সে কহিল, “ইহা সম্ভব বটে।”

তখন মৃণালিনী কহিলেন, “তুমি এ কথা বলিয়া ভাল কর নাই। ইহা সংশোধন কর্ত্তব্য; তুমি আহারাদি করিতে যাও। আমি ততক্ষণ একখানি পত্র লিখিয়া রাখিব। তুমি আহারান্তে সেই লিপি লইয়া তাঁহার নিকট যাইবে।”

গিরিজায়া স্বীকৃত হইয়া সত্বরে আহারাদির জন্য গমন করিল। মৃণালিনী সংক্ষেপে পত্র লিখিলেন।

লিখিলেন,

“গিরিজায়া মিথ্যাবাদিনী। যে কারণে সে তোমার নিকট মৎসম্বন্ধে মিথ্যা বলিয়াছে তাহা জিজ্ঞাসা করিলে, সে স্বয়ং বিস্তারিত করিয়া কহিবে। আমি মথুরায় যাই নাই। যে রাত্রে তোমার অঙ্গুরীয় দেখিয়া যমুনাতটে আসিয়াছিলাম, সেই রাত্র অবধি আমার পক্ষে মথুরার পথ রুদ্ধ হইয়াছে। আমি মথুরায় না গিয়া তোমাকে দেখিতে নবদ্বীপে আসিয়াছি। নবদ্বীপে আসিয়াও যে এ পর্য্যন্ত তোমার সহিত সাক্ষাৎ করি নাই তাহার এক কারণ এই, আমার সহিত সাক্ষাৎ করিলে তোমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হইবে। আমার অভিলাষ তোমাকে দেখিব, তৎসিদ্ধিপক্ষে তোমাকে দেখা দেওয়ার আবশ্যক কি?”

গিরিজায়া এই লিপি লইয়া পুনরপি হেমচন্দ্রের গৃহাভিমুখে যাত্রা করিল। সন্ধ্যাকালে, মনোরমার সহিত কথোপকথন সমাপ্তির পরে, হেমচন্দ্র গঙ্গদর্শনে যাইতেছিলেন, পথে গিরিজায়ার সহিত সাক্ষাৎ হইল। গিরিজায়া তাঁহার হস্তে লিপি দান করিল।

হেমচন্দ্র কহিলেন, “তুমি আবার কেন?”

গি। “পত্র লইয়া আসিয়াছি।”

হে। “পত্র কাহার?”

গি। “মৃণালিনীর পত্র।”

হেমচন্দ্র বিস্মিত হইলেন, “এ পত্র কি প্রকারে তোমার নিকট আসিল?”

গি। “মৃণালিনী নবদ্বীপে আছেন। আমি মথুরার কথা আপনার নিকট মিথ্যা বলিয়াছি।”

হে। “এই পত্র তাহার?”

গি। “হাঁ তাহার স্বহস্তলিখিত।” হেমচন্দ্র লিপিখানি না পড়িয়া তাহা খণ্ড খণ্ড করিয়া ছিন্ন ভিন্ন করিলেন। ছিন্ন খণ্ড সকল বনমধ্যে নিক্ষিপ্ত করিয়া কহিলেন,

“তুমি যে মিথ্যাবাদিনী তাহা আমি ইতিপূর্ব্বেই শুনিতে পাইয়াছি। তুমি যে দুষ্টার পত্র লইয়া আসিয়াছ, সে যে বিবাহ করিতে যায় নাই, হৃষীকেশ কর্ত্তৃক গৃহবহিস্কৃতা হইয়াছে তাহা আমি ইতিপূর্ব্বেই শ্রুত হইয়াছি। আমি কুলটার পত্র পাঠ করিব না। তুমি আমার সম্মুখ হইতে দূর হও।”

গিরিজায়া চমৎকৃতা হইয়া নিরুত্তরে হেমচন্দ্রের মুখপানে চাহিয়া রহিল।

হেমচন্দ্র পথপার্শ্বস্থ এক ক্ষুদ্র বৃক্ষের শাখা ভগ্ন করিয়া হস্তে লইয়া কহিলেন, “দূর হও, নচেৎ বেত্রাঘাত করিব।”

গিরিজায়া ভীতা হইয়া পলায়ন করিল। তাহার একটি গীত মনে আসিল, কিন্তু গায়িতে পারিল না।

গিরিজায়া প্রত্যাগতা হইয়া হেমচন্দ্রের আচরণ মৃণালিনীর নিকট সবিশেষ বিবরিত করিল। এবার কিছু লুকাইল না। মৃণালিনী শুনিয়া কোন উত্তর করিলেন না। রোদনও করিলেন না। যেরূপ অবস্থায় শ্রবণ করিতেছিলেন, সেইরূপ অবস্থাতেই রহিলেন। দেখিয়া গিরিজায়া শঙ্কান্বিতা হইল—তখন মৃণালিনীর কথোপকথনের সময় নহে বুঝিয়া তথা হইতে সরিয়া গেল।

গিরিজায় অগত্যা রত্নময়ীর নিকট গেল। কহিল “সই!”

রত্ন। “কেন সই?”

গিরি। “আমার বড় একটি দুঃখ হইয়াছে।”

রত্ন। “কেন সই—তুমি সকল রসের রসমই—তোমার আবার দুঃখ কি সই।”

গিরি। “দুঃখ এই সই—বৈকাল অবধি আমার গীত গায়িবার বড় ইচ্ছা হইয়াছে—গান থামে না—কিন্তু গান গায়িতে পারিতেছি না।”

রত্ন। “কেন একি অলক্ষণ; কাঁকুড় গিলিতে গলায় বেঁধেছে না কি? নইলে তোমার গলা বন্ধ? নূন খেয়েছ বা।”

গিরি। “তা না সই—মৃণালিনী কঁদিতেছে—পাছে আমি গীত গায়িলে রাগ করে?”

রত্ন। “কেন, মৃণালিনী কঁদিতেছে কেন?”

গিরি। “তা কি জানি, জিজ্ঞাসা করিলে বলিবে না। সে কাঁদিয়াই থাকে। আমি এখন গীত গায়িলে পাছে রাগ করে?”

রত্ন। “তা করুক, তুমি এমন সাধে বঞ্চিত হবে কেন? চন্দ্রসূর্য্যের পথ বন্ধ হবে তবু তোমার গলাবন্ধ হবে না। তুমি এখানে না পার, পুকুর ধারে বসিয়া গাও।”

গি। “বেশ বলেছ সই। তুমি শুন।”

এই বলিয়া গিরিজায়া পাটনীর গৃহের অনতিদূরে যে এক সোপানবিশিষ্ট পুষ্করিণী ছিল, তথায় গিয়া সোপানোপরি উপবেশন করিল। শারদীয়া পূর্ণিমার প্রদীপ্ত কৌমুদীতে পুষ্করিণীর স্বচ্ছ নীলাম্বু অধিকতর নীলোজ্জ্বল হইয়া প্রভাসিত হইতেছিল। তদুপরি শ্বেত রক্ত কুমুদমালা অর্দ্ধ প্রস্ফুটিত হইয়া নীল জলে প্রতিবিম্বিত হইয়াছিল; চারিদিকে বৃক্ষমালা নিঃশব্দে পরস্পরাশ্লিষ্ট হইয়া আকাশের সীমা নির্দ্দেশ করিতেছিল; ক্কচিৎ দুই একটি দীর্ঘশাখা উর্দ্ধোত্থিত হইয়া আকাশ পটে চিত্রিত হইয়া রহিয়াছিল। তলস্থ অন্ধকারপুঞ্জ মধ্য হইতে নবস্ফুট কুসুম সৌরভ আসিতেছিল। গিরিজায়া সোপানোপরি উপবেশন করিল। সে জানিত, যে তথা হইতে সঙ্গীত ধ্বনি মৃণালিনীর কর্ণগোচর হইবার সম্ভাবনা—কিন্তু ইহাও তাহার নিতান্ত অসাধ নহে—বরং তাহাই কতক উদ্দেশ্য। আর উদ্দেশ্য নিজ পরযন্ত্রণাকাতর বিকৃতচিত্তের ভাবব্যক্তি। গিরিজায়া ভিখারিণী বেশে কবি; স্বয়ং কখন কবিতা রচনা করুক বা না করুক, কবির স্বভাবসিদ্ধ চিত্তচাঞ্চল্যপরতা প্রাপ্ত হইয়াছিল। সুতরাং কবি। কে না জানে যে কবির মনঃসরোবরে বায়ু বহিলে বীচি বিক্ষিপ্ত হয়?

গিরিজায়। প্রথমে ধীরে ধীরে, মৃদু মৃদু, গীত আরম্ভ করিল—যেন নবশিক্ষিত বিহঙ্গিনী প্রথমোদ্যমে স্পষ্ট গান করিতে পারিতেছে না। ক্রমে তাহার স্বর স্পষ্টতালাভ করিতে লাগিল—ক্রমে ক্রমে উচ্চতর হইতে লাগিল, শেষে সেই সর্ব্বাঙ্গ সম্পূর্ণ তানলয়বিশিষ্ট কমনীয় কণ্ঠধ্বনি, পুষ্করিণী, উপবন, আকাশ প্লাবিত করিয়া, স্বর্গচ্যুত স্বরসরিত্তরঙ্গ স্বরূপ মৃণালিনীর কর্ণে প্রবেশ করিতে লাগিল। গিরিজায়া গায়িল।

পরাণ না গেলো।

যো দিন দেখনু সই যমুনা কি তীরে,

গায়ত নাচত সুন্দর ধীরে ধীরে,

ওঁহি পর পিয় সই, কাহে বারি তীরে,

জীবন না গেলো?

ফিরে ঘর আয়নু, না কহনু বোলি,

তিতায়নু আঁখিনীরে আপনা আঁচোলি,

যব কাঁদনু লাগি সই, কাহে না পরাণি,

তই ক্ষণ না গেলো?

শুননু শ্রবণ পথে মধুর বাজে,

রাধে রাধে রাধে রাধে বিপিন মাঝে,

যব শুননু লাগি সই, সো মধুর বোলি,

জীবন না গেলো?

ধায়নু পিয়সই, সোহি উপকূলে,

লুটায় কাঁদি সই শ্যাম পদ মূলে,

সোহি পদ মূলে রই, কাহেলো হামারি,

মরণ না ভেল?

গিরিজায়া গায়িতে গায়িতে দেখিলেন, তাঁহার সম্মুখে চন্দ্রের কিরণোপরে মনুষ্যের ছায়া পড়িয়াছে। ফিরিয়া দেখিলেন, মৃণালিনী দাঁড়াইয়া আছেন। তাঁহার মুখ প্রতি চাহিয়া দেখিলেন, মৃণালিনী কাঁদিতেছেন।

গিরিজায়া দেখিয়া হর্ষান্বিত হইলেন,—তিনি বুঝিতে পারিলেন যে যখন মৃণালিনীর চক্ষে জল আসিয়াছে—তখন তাঁহার ক্লেশের কিছু শমতা হইয়াছে। ইহা সকলে বুঝে না—মনে করে “কই, ইহার চক্ষে ত জল দেখিলাম না? তবে ইহার কিসের দুঃখ?” যদি ইহা সকলে বুঝিত, সংসারের কত মর্ম্মপীড়াই না জানি নিবারণ হইত।

কিয়ৎক্ষণ উভয়েই নীরব হইয়া রহিলেন। মৃণালিনী কিছু বলিতে পারেন না গিরিজায়াও কিছু জিজ্ঞাসা করিতে পারেন পরে মৃণালিনী কহিলেন, “গিরিজায়া, আর একবার তোমাকে যাইতে হইবে।”

গি। “আবার সে পাষণ্ডের নিকট যাইব কেন?”

মৃ। “পাষণ্ড বলিও না। হেমচন্দ্র ভ্রান্ত হইয়া থাকিবেন—এ সংসারে অভ্রান্ত কে? কিন্তু হেমচন্দ্র পাষণ্ড নহেন। আমি স্বয়ং তাঁহার নিকট এখনই যাইব—তুমি সঙ্গে চল। তুমি আমাকে ভগিনীর অধিক স্নেহ কর—তুমি আমার জন্য না করিয়াছ কি? তুমি কখন আমাকে অকারণে মনঃপীড়া দিবে না— কখন আমার নিকট এ সকল কথা মিথ্যা করিয়া বলিবে না, ইহা আমি নিশ্চিত জানি। কিন্তু তাই বলিয়া, আমার হেমচন্দ্র আমাকে বিনাপরাধে ত্যাগ করিলেন ইহা তাঁহার মুখে না শুনিয়া কি প্রকারে অন্তঃকরণকে স্থির করিতে পারি? যদি তাঁহার নিজমুখে শুনি যে তিনি মৃণালিনীকে কুলটা ভাবিয়া ত্যাগ করিলেন, তবে এ প্রাণ বিসর্জ্জন করিতে পারিব।”

গি। “প্রাণ বিসর্জ্জন! সে কি মৃণালিনি?”

মৃণালিনী কোন উত্তর করিলেন না। গিরিজায়ার স্কন্ধে বাহু রোপণ করিয়া রোদন করিতে লাগিলেন। গিরিজায়াও রোদন করিল।

ক্ষণেক পরে গিরিজায়া মৃণালিনীর হস্ত ধীরে ধীরে নিজ স্কন্ধচ্যুত করিয়া চলিলেন।

দ্বিতীয় খণ্ড · অষ্টম পরিচ্ছেদ

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

মোহিনী।

সেই রত্নপ্রদীপদীপ্ত দেবীমন্দিরে, চন্দ্রালোকবিভাসিত দ্বার দেশে, মনোরমাকে দেখিয়া, পশুপতির হৃদয় উচ্ছ্বাসোন্মুখ সমুদ্রের ন্যায় স্ফীত হইয়া উঠিল। মনোরমা নিতান্ত খর্ব্বাকৃতা নহে, তবে তাহাকে বালিকা বলিয়া বোধ হইত তাহার হেতু এই, যে, মুখকান্তি অনির্ব্বচনীয় কোমল, অনির্ব্বচনীয় মধুর। নিতান্ত বালিকা বয়সের ঔদার্য্য বিশিষ্ট—সুতরাং হেমচন্দ্র যে তাহার পঞ্চদশ বৎসর বয়ঃক্রম অনুভব করিয়াছিলেন, তাহা অন্যায় হয় নাই। মনোরমার বয়ঃক্রম যথার্থ পঞ্চদশ কি ষোডশ, কি তদধিক, কি তন্ন্যূন, তাহা ইতিহাসে লেখে না। পাঠক মহাশয় স্বয়ং সিদ্ধান্ত করিবেন।

মনোরমার বয়স্ যতই হউক না কেন, তাহার রূপরাশি অতুল—চক্ষে ধরে না। বাল্যে, কৈশোরে, যৌবনে, সর্ব্বকালে সে রূপরাশি দুর্ল্লভ। একে বর্ণ সোনার চাঁপা; তাহাতে ভুজঙ্গশিশুশ্রেণীর ন্যায়, কুঞ্চিত অলকশ্রেণী বেড়িয়া থাকে; এক্ষণে বাপীজলসিঞ্চনে ঋজু হইয়াছে; অর্দ্ধচন্দ্রাকৃত নির্ম্মলললাট; ভ্রমর-ভর-স্পন্দিত নীলপুষ্প তুল্য, কৃষ্ণতার, চঞ্চল, লোচন-যুগল; মুহুর্মুহুঃ আকুঞ্চন-বিস্ফারণ-প্রবৃত্ত রন্ধ্রযুক্ত সুগঠন নাসা; অধরৌষ্ঠ যেন প্রাতঃশিশিরে সিক্ত, প্রাতঃ সূর্যের কিরণে প্রোদ্ভিন্ন, রক্ত কুসুমাবলির স্তরযুগল তুল্য; কপোল যেন, চন্দ্রকরোজ্জ্বল, নিতান্ত স্থির, গঙ্গাম্বু বিস্তারবৎ প্রসন্ন; শাবক হিংসা শঙ্কায় উত্তেজিতা, হংসীর ন্যায় গ্রীবা,—বেণী বাঁধিলেও সে গ্রীবার উপরে অবাধ্য ক্ষুদ্র কুঞ্চিত কেশ সকল আসিয়া কেলি করে। দ্বিরদ রদ যদি কুসুমকোমল হইত, কিম্বা চম্পক যদি গঠনোপযোগী কাঠিন্য পাইত, কিম্বা চন্দ্রকিরণ যদি শরীর বিশিষ্ট হইত, তবে তাহাতে সে বাহুযুগল গড়িতে পারা যাইত, —সে হৃদয় কেবল সেই হৃদয়েই গড়া যাইতে পারিত। এ সকলই অন্য সুন্দরীর আছে; মনোরমার রূপরাশি অতুল কেবল তাঁহার সর্ব্বাঙ্গীন সৌকুমার্য্যের জন্য। তাঁহার বদন সুকুমার, অধর, ভ্রূযুগ, ললাট, সুকুমার। সুকুমার কপোল; সুকুমার কেশ। অলকাবলি যে ভুজঙ্গ শিশুরূপী, সেও সুকুমার ভুজঙ্গ শিশু। গ্রীবায়, গ্রীবাভঙ্গীতে, সৌকুমার্য্য; বাহুতে, বাহুর প্রক্ষেপে, সৌকুমার্য্য; হৃদয়ের উচ্ছ্বাসে সেই সৌকুমার্য্য; সুকুমার চরণ, চরণ বিন্যাস সুকুমার। গমন সুকুমার, বসন্ত বায়ুসঞ্চালিত কুসুমিত লতার মন্দাদোলন তুল্য; বচন সুকুমার, নিশীথ সময়ে, জলরাশি পার হইতে সমাগত বিরহ সঙ্গীত তুল্য; কটাক্ষ সুকুমার, ক্ষণমাত্র জন্য মেঘমালামুক্ত সুধাংশুর কিরণ সম্পাত তুল্য; আর ঐ যে মনোরমা দেবীগৃহ দ্বারদেশে দাঁড়াইয়া আছেন,—পশুপতির মুখাবলোকন জন্য উন্নত মুখী, নয়ন তারা উর্দ্ধস্থাপন-স্পন্দিত, আর বাপীজলার্দ্র, অবদ্ধ কেশরাশির কিয়দংশ এক হস্তে ধরিয়া, এক চরণ ঈষন্মাত্র অগ্রবর্ত্তী করিয়া, যে ভঙ্গীতে মনোরমা দাঁড়াইয়া আছেন;—ও ভঙ্গীও সুকুমার; নবীন সূর্য্যাগ্রে সদ্য প্রফুল্ল দলমালাময়ী নলিনীর প্রসন্ন ব্রীড়া তুল্য সুকুমার। সেই মাধুর্য্যময় দেহের উপর দেবীপার্শ্বস্থিত রত্নদীপের আলোক পতিত হইল। পশুপতি অতৃপ্ত নয়নে দেখিতে লাগিলেন।

প্রথম খণ্ড · অষ্টম পরিচ্ছেদ

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

হৃষীকেশ।

মৃণালিনীর সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার শয়নাগারে আসিয়া হৃষীকেশ কহিলেন,

“মৃণালিনি! তােমার এ কি চরিত্র?”

মৃ। “আমার কি চরিত্র?”

হৃ। “তুমি অজ্ঞাত কুলশীলা পরকন্যা, গুরুর অনুরােধে আমি তােমাকে গৃহে স্থান দিয়াছি। তুমি আমার কন্যা মণিমালিনীর সঙ্গে এক শয্যায় শয়ন কর—তােমার কুলটাবৃত্তি কেন?”

মৃ। “আমার কুলটাবৃত্তি যে বলে সে মিথ্যাবাদী।”

হৃষীকেশের ক্রোধে অধর কম্পিত হইল। কহিলেন, “কি পাপীয়সি! আমার অন্নে উদর পােষণ করিয়া দুষ্কর্ম্ম করিবি, আর আমাকে দুর্ব্বাক্য বলিবি? তুই আমার গৃহ হইতে দূর হ। না হয় মাধবাচার্য্য ক্রোধ করিবেন, তা বলিয়া এমন কাল সর্প গৃহে রাখিতে পারিব না।”

মৃ। “যে আজ্ঞা—কালি প্রাতে আর আমাকে দেখিতে পাইবেন না।”

হৃষীকেশের বােধ ছিল যে যে কালে তাঁহার গৃহবহিষ্কৃতা হইলেই মৃণালিনী আশ্রয়হীনা হয়, সে কালে এমত উত্তর তাঁহার সম্ভবে না। কিন্তু মৃণালিনী নিরাশ্রয়ের আশঙ্কায় কিছুমাত্র ভীত নহে দেখিয়া মনে করিলেন যে তিনি আত্মজার গৃহে স্থান পাই বার ভরসাতেই এরূপ উত্তর করিলেন। ইহাতে তাঁহার কোপ আরও বৃদ্ধি হইল। তিনি অধিকতর বেগে কহিলেন,

“কালি প্রাতে! অদ্যই দূর হও।”

মৃ। “যে আজ্ঞা। আমি সখী মণিমালিনীর নিকট বিদায় হইয়া আজি দূর হইতেছি।” এই বলিয়া মৃণালিনী গাত্রোত্থান করিলেন।

হৃষীকেশ কহিলেন, “মণিমালিনীর সহিত কুলটার আলাপ কি?”

এবার মৃণালিনীর চক্ষে জল আসিল। কহিলেন, “তাহাই হইবে। আমি কিছুই লইয়া আসি নাই; কিছুই লইয়া যাইব না। এক বসনে চলিলাম। আপনাকে প্রণাম হই।”

এই বলিয়া দ্বিতীয় বাক্যব্যয় ব্যতীত মৃণালিনী শয়নাগার হইতে বহিষ্কৃতা হইয়া চলিলেন।

যেমন অন্যান্য গৃহবাসীর ব্যোমকেশের আর্ত্তনাদে শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিয়াছিলেন, মণিমালিনীও তদ্রূপ উঠিয়াছিলেন। মৃণালিনীর সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার পিতা শয্যাগৃহ পর্যন্ত আসিলেন দেখিয়া তিনি এই অবসরে ভ্রাতার সহিত কথােপকথন করিতেছিলেন। এবং ভ্রাতার দুশ্চরিত্র বুঝিতে পারিয়া তাঁহাকে ভর্ৎসনা করিতেছিলেন। যখন তিনি ভর্ৎসনা সমাপন করিয়া প্রত্যাগমন করেন, তখন প্রাঙ্গনভূমে, দ্রুতপাদ-বিক্ষেপিনী মৃণালিনীর সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,

“সই, অমন করিয়া এত রাত্রে কোথা যাইতেছ?”

মৃণালিনী কহিলেন “সখি, মণিমালিনি, তুমি চিরায়ুষ্মতী হও। আমার সহিত আলাপ করিও না—তােমার পিতার নিষেধ।”

মণি। “সে কি মৃণালিনী তুমি কঁদিতেছ কেন? সর্ব্বনাশ! পিতা কি বলিতে না জানি কি বলিয়াছেন, সখি, ফের। রাগ করিও না।”

মণিমালিনী মৃণালিনীকে ফিরাইতে পারিলেন না। পর্ব্বতসানুবাহী শিলাখণ্ডের ন্যায় অভিমানিনী সাধ্বী চলিয়া গেলেন। তখন অতি ব্যস্ত মণিমালিনী পিতৃসন্নিধানে আসিলেন। মৃণালিনীও গৃহের বাহিরে আসিলেন।

বাহিরে আসিয়া দেখিলেন, পূর্ব্ব সঙ্কেত স্থানে গিরিজায়া দাঁড়াইয়া আছে। মৃণালিনী তাহাকে দেখিয়া কহিলেন,

“তুমি এখনও দাঁড়াইয়া কেন?”

গি। “আমি যে তােমাকে পলাইতে বলিয়া আসিলাম। তুমি আইস না আইস—দেখিয়া যাইবার জন্য দাঁড়াইয়া আছি।”

মৃ। “তুমি কি ব্রাহ্মণকে দংশন করিয়াছিলে?”

গি। “নহিলে কে?”

মৃ। “নহিলে কে? কিন্তু তুমি যে গান করিতে করিতে চলিয়া গেলে শুনিলাম?”

গি। “তার পর তােমাদের কথা বার্ত্তার শব্দ শুনিয়া ফিরিয়া দেখিতে আসিয়াছিলাম। পরে অবস্থামতে কার্য্য করিলাম। এখন তুমি কোথা যাইবে?”

মৃ। “তােমার গৃহ আছে?”

গি। “আছে। পাতার কূটীর।”

মৃ। “সেখানে আর কে থাকে?”

গি। “এক বৃদ্ধা মাত্র। তাহাকে আজি বলি।”

মৃ। “চল তােমার গৃহে যাব।”

গি। “চল। তাই ভাবিতেছিলাম।” এই বলিয়া দুই জনে চলিলেন। যাইতে যাইতে গিরিজায়া কহিল, “কিন্তু সে ত কুটীর। সেখানে কয়দিন থাকিবে?”

মৃ। “কালি প্রাতে, অন্যত্র যাইব।”

গি। “কোথা? মথুরায়?”

মৃ। “মথুরায় আমার আর স্থান নাই।”

গি। “তবে কোথায়?”

মৃ। “যমালয়। এ কথা কি তােমার বিশ্বাস হয়?”

গি। “বিশ্বাস হইবে না কেন? কিন্তু সে স্থান ত আছেই—যখন ইচ্ছা তখনই যাইতে পারিবে। এখন কেন আর এক স্থানে যাও না?”

মৃ। “কোথা?”

গি। “নবদ্বীপ।”

মৃ। “গিরিজায়া তুমি ভিখারিণী বেশে কোন মায়াবিনী। তোমার নিকট কোন কথা গােপন করিব না। বিশেষ তুমি হিতৈষিণী। নবদ্বীপেই যাইব সংকল্প করিয়াছি।”

গি। “একাকিনী যাইবে?”

মৃ। “সঙ্গী কোথায় পাইব।”

গি। (গাইতে গাইতে)

“মেঘ দরশনে হায়, চাতকিনী ধায় রে।

সঙ্গে যাবি কে কে তােরা আয় আয় আয় রে॥

মেঘেতে বিজলি হাসি, আমি বড় ভাল বাসি,

যে যাবি সে যাবি তােরা, গিরিজায়া যায় রে॥”

মৃ। “একি রহস্য গিরিজায়া?”

গি। “আমি যাব।”

মৃ। “সত্য সত্যই?”

গি। “সত্য সত্যই যাব।”

মৃ। “কেন যাবে?”

গি। “আমার সর্ব্বত্র সমান। রাজধানীতে ভিক্ষা বিস্তর।”

চতুর্থ খণ্ড · একাদশ পরিচ্ছেদ

একাদশ পরিচ্ছেদ।

পূর্ব্ব পরিচয়।

প্রভাতে হেমচন্দ্র মাধবাচার্য্যের অনুসন্ধানে যাত্রা করিলেন। গিরিজায়া আসিয়া মৃণালিনীর নিকট বসিল।

গিরিজায়া মৃণালিনীর দুঃখের ভাগিনী হইয়াছিল, সহৃদয় হইয়া দুঃখের সময়ে দুঃখের কাহিনী সকল শুনিয়াছিল। আজি সুখের দিনে সে কেন সুখের ভাগিনী না হইবে? আজি সেইরূপ সহৃদয়তার সহিত সুখের কথাকেন না শুনিবে? গিরিজায়া ভিখারিণী—মৃণালিনী মহাধনীর কন্যা—উভয়ে এতদূর সামাজিক প্রভেদ। কিন্তু দুঃখের দিনে গিরিজায়া মৃণালিনীর একমাত্র সুহৃৎ, সে সময়ে ভিখারিণী আর রাজপুরবধূতে প্রভেদ থাকে না; আজি সেই বলে গিরিজায়া মৃণালিনীর হৃদয়ের সুখের অংশাধিকারিণী হইল।

যে আলাপ হইতেছিল তাহাতে গিরিজায় বিস্মিত ও প্রীত হইতেছিল। মৃণালিনীকে জিজ্ঞাসা করিল।—“তা এত দিন এমন কথা প্রকাশ কর নাই কি জন্য?”

মৃ। “এত দিন রাজপুত্রের নিষেধ ছিল এজন্য প্রকাশ করি নাই। এক্ষণে তিনি প্রকাশে অনুমতি করিয়াছেন এজন্য প্রকাশ করিতেছি।”

গি। “ঠাকুরাণি! যদি আদ্যোপান্ত প্রকাশ করিতে অনিচ্ছা না হয়, তবে আমার শুনিয়া বড় তৃপ্তি হয়।”

তখন মৃণালিনী বলিতে আরম্ভ করিলেন।

“আমার পিতা একজন বৌদ্ধমতাবলম্বী শ্রেষ্ঠী। তিনি অত্যন্ত ধনী ও মথুরারাজের প্রিয়পাত্র ছিলেন। মথুরার রাজকন্যার সহিত আমার সখীত্ব ছিল।

আমি একদিন মথুরার রাজকন্যার সহিত নৌকারোহণে যমুনায় জলবিহারে গিয়াছিলাম। তথায় অকস্মাৎ প্রবল ঝটিকারন্ত হওয়ায়, নৌকা জলমধ্যে নিমগ্ন হইল। রাজ কন্যা প্রভূতি অনেকেই রক্ষক এবং নাবিকদিগের হস্তে রক্ষা পাইলেন। আমি ভাসিয়া গেলাম। দৈবযোগে এক রাজপুত্র সেই সময়ে নৌকারোহণে ছিলেন। তাঁহাকে তৎকালে চিনিতাম না—তিনিই হেমচন্দ্র। তিনিও বায়ুর প্রবলতার কারণ নৌকা তীরে লইতে ছিলেন। জলমধ্যে আমার চুল দেখিতে পাইয়া স্বয়ং জলে পড়িয়া আমাকে উঠাইলেন। আমি তখন অজ্ঞান। হেমচন্দ্র আমার পরিচয় জানিতেন না। তিনি তখন তীর্থ দর্শনে মথুরায় আসিয়াছিলেন। তাঁহার বাসার্থ একটি স্বতন্ত্র গৃহ ছিল। তথায় আমায় লইয়া গিয়া শুশ্রুষা করিলেন। আমি জ্ঞানপ্রাপ্ত হইলে, তিনি আমার পরিচয় লইয়া আমাকে আমার পিতৃভবনে পাঠাইবার উদ্যোগ করিলেন। কিন্তু তিন দিবস পর্য্যন্ত ঝড় বৃষ্টি থামিল না। এরূপ দুর্দ্দিন হইল যে কেহ বাটীর বাহির হইতে পারে না। সুতরাং তিন দিন আমাদিগের উভয়ে এক গৃহে সহবাস হইল। উভয়ে উভয়ের পরিচয় পাইলাম। কেবল কুল পরিচয় নহে—উভয়ের অন্তঃকরণের পরিচয় পাইলাম। তখন আমার বয়স পঞ্চদশ বৎসর মাত্র। কিন্তু সেই বয়সেই আমি তাঁহার দাসী হইলাম। সে কোমল বয়সে সকল বুঝিতাম। হেমচন্দ্রকে দেবতার ন্যায় চক্ষে দেখিতে লাগিলাম। তিনি যাহা বলিতেন, তাহা পুরাণ বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। তিনি বলিলেন “বিবাহ কর।” সুতরাং আমারও বোধ হইল, ইহা অবশ্য কর্ত্তব্য। চতুর্থ দিবসে, দুর্য্যোগের উপশম দেখিয়া উপবাস করিলাম; দিগ্বিজয় উদ্যোগ করিয়া দিল। তীর্থ পর্য্যটনে রাজপুত্রের কূলপুরোহিত সঙ্গে ছিলেন। তিনি আমাদিগকে পরিণীত করিলেন।”

গি। “কন্যা সম্প্রদান করিল কে?”

মৃ। অরুন্ধতী নামে আমার মাতার এক প্রাচীন কুটুম্বিনী ছিলেন। তিনি সম্বন্ধে মাতার ভগিনী হইতেন। আমাকে বাল্যাবধি লালন পালন করিয়াছিলেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন, এবং আমার সকল দৌরাত্ম সহ্য করিতেন। আমি তাঁহার নামোল্লেখ করিলাম। দিগ্বিজয়, কোন ছলে পুরমধ্যে তাঁহাকে সম্বাদ পাঠাইয়া দিয়া ছলক্রমে হেমচন্দ্রের গৃহে তাঁহাকে ডাকিয়া আনিল। অরুন্ধতী মনে জানিতেন আমি যমুনায় ডুবিয়া মরিয়াছি। তিনি আমাকে জীবিতা দেখিয়া এতই আহ্লাদিতা হইলেন, যে আর কোন কথাতেই অসন্তুষ্ট হইলেন না। আমি যাহা বলিলাম তাহাতেই স্বীকৃতা হইলেন। তিনিই কন্যা সম্প্রদান করিলেন। বিবাহের পর মাসীর সঙ্গে পিতৃভবনে গেলাম। সকল কথা সত্য বলিয়া কেবল বিবাহের কথা লুকাইলাম। আমি, হেমচন্দ, দিগ্বিজয়, কুলপুরোহিত, আর অরুন্ধতী মাসী ভিন্ন এ বিবাহ আর কেহ জানিত না। অদ্য তুমি জানিলে। গি। “মাধবাচার্য্য জানেন না?”

মৃ। “না। তিনি জানিলে সর্ব্বনাশ হইত। মগধরাজ তাহাহইলে অবশ্য শুনিতেন। আমার পিতা বৌদ্ধ, মগধরাজ গুরুতর বৌদ্ধবিদ্বেষী।”

গি। “ভাল তোমার পিতা যদি তোমাকে এপর্য্যন্ত কুমারী বলিয়া জানিতেন, তবে এত বয়সেও তোমার বিবাহ দেন নাই কেন?”

মৃ। “পিতার দোষ নাই। তিনি অনেক যত্ন করিয়াছেন। কিন্তু বৌদ্ধ সুপাত্র পাওয়া সুকঠিন; কেন না বৌদ্ধধর্ম্ম প্রায় লোপ হইয়াছে। পিতা বৌদ্ধ জামাতা চাহেন অথচ সুপাত্রও চাহেন। এরূপ একটি পাওয়া গিয়াছিল, সে আমার বিবাহের পর। বিবাহের দিনস্থির হইয়া সকল উদ্যোগও হইয়াছিল। কিন্তু আমি সেই সময়ে জ্বর করিয়া বসিলাম। পাত্র অন্যত্র বিবাহ করিল।”

গি। “ইচ্ছাপূর্ব্বক জ্বর করিয়াছিলে?”

মৃ। “হাঁ ইচ্ছাপূর্ব্বক। আমাদিগের উদ্যানে একটা কূপ আছে তাহার জল কেহ স্পর্শ করে না। তাহার পানে বা স্নানে নিশ্চিত জ্বর। আমি রাত্রে গোপনে সেই জলে স্নান করিয়াছিলাম।”

গি। “পুনশ্চ সম্বন্ধ হইলে, সেই রূপ করিতে?”

মৃ। “সন্দেহ কি? নচেৎ হেমচন্দ্রের নিকট পলাইয়া যাইতাম।”

গি। “মথুরা হইতে মগধ এক মাসের পথ। স্ত্রীলোক হইয়া কাহার সহায়ে পলাইতে?”

মৃ। “আমার সহিত সাক্ষাতের জন্য হেমচন্দ্র মথুরায় এক বাণিজ্যাগার স্থাপন করিয়া আপনি তথায় রত্নদাস বণিক্ বলিয়া” পরিচিত হইলেন। বৎসরে এক বার করিয়া তথায় বাণিজ্য করিতে আসিতেন। যখন তিনি তথায় না থাকিতেন, তখন দিগ্বিজয় তথায় তাঁহার বাণিজ্যাগার রক্ষা করিত। দিগ্বিজয়ের প্রতি আদেশ ছিল যে যখন আমি যে রূপ আজ্ঞা করিব সে তখনই তদ্রুপ করিবে। সুতরাং আমি নিঃসহায় ছিলাম না।”

কথা সমাপ্ত হইলে গিরিজায়া বলিল “ঠাকুরাণি! আমি একটি বড় গুরুতর অপরাধ করিয়াছি। আমাকে মার্জ্জনা করিতে হইবে। আমি তাহার উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত করিতে স্বীকৃত আছি।”

মৃ। “কি এমন গুরুতর কাজ করিলে?”

গি। “দিগ্বিজয় টা তোমার হিতকারী তাহা আমি জানিতাম না, আমি জানিতাম ওটা অতি অপদার্থ। এজন্য আমি প্রভাতে তাহাকে ভালরূপে ঘা কত ঝাঁটা দিয়াছি। তা ভাল করি নাই।”

মৃণালিনী হাসিয়া বলিলেন, “তা কি প্রায়শ্চিত্ত করিবে?”

গি। “ভিখারীর মেয়ের কি বিবাহ হয়?”

মৃ। (হাসিয়া) “করিলেই হয়।”

গি। “তবে আমি সে অপদার্থটাকে বিবাহ করিব। আর কি করি?”

মৃণালিনী আবার হাসিয়া বলিলেন “তবে আজি তোমার গায় হলুদ দিব।”

দ্বিতীয় খণ্ড · একাদশ পরিচ্ছেদ

একাদশ পরিচ্ছেদ।

মুক্ত।

মনোরমা পশুপতির নিকট বিদায় হইয়াই দ্রুতপদে চিত্রগৃহে আসিলেন। পশুপতির সহিত শান্তশীলের কথোপকথন সময়ে শুনিয়াছিলেন যে ঐ ঘরে হেমচন্দ্র রুদ্ধ হইয়াছিলেন। আসিয়াই চিত্রগৃহের দ্বারেন্মোচন করিলেন। হেমচন্দ্রকে কহিলেন, “হেমচন্দ্র, বাহির হইয়া যাও।”

হেমচন্দ্র গৃহের বাহিরে আসিলেন। মনোরমা তাহার সঙ্গে সঙ্গে আসিলেন তখন হেমচন্দ্র মনোরমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন।

“আমি রুদ্ধ হইয়াছিলাম কেন?”

ম। “তাহা পশ্চাৎ বলিব।”

হে। “যে ব্যক্তি আমাকে রুদ্ধ করিয়াছিল সে কে?”

ম। “শান্তশীল।”

হে। “শান্তশীল কে?”

ম। “চৌরােদ্ধরণিক।”

হে। “এই কি তাহার গৃহ?”

ম। “না।”

হে। “এ কাহার গৃহ?”

ম। “পশ্চাৎ বলিব।”

হে। “যবন কোথায় গেল?”

ম। “শিবিরে গিয়াছে।”

হে। “শিবির! কত যবন আসিয়াছে?”

ম। “বিংশতি সহস্র।”

হে। “কোথায় তাহাদের শিবির?”

ম। “মহাবনে।”

হে। “মহাবন কোথায়?”

ম। “এই নগরের উত্তরে কিছু দূরে।”

হেমচন্দ্র করলগ্ন কপোল হইয়া ভাবিতে লাগিলেন।

মনােরমা কহিল, “ভাবিতেছ কেন? তুমি কি তাহাদিগের সহিত যুদ্ধ করিবে?”

হে। “বিংশতি সহস্রের সহিত একের কি যুদ্ধ সম্ভবে?”

ম। “তবে কি করিবে—গৃহে ফিরিয়া যাইবে?”

হে। “এখন গৃহে যাব না।”

ম। “কোথা যাবে?”

হে। “মহাবনে।”

ম। “যুদ্ধ করিবে না তবে মহাবনে যাইবে কেন?”

হে। “যবনদিগকে দেখিতে।”

ম। “যুদ্ধ করিবে না তবে দেখিয়া কি হইবে?”

হে। “দেখিলে জানিতে পারিব কি উপায়ে তাহারা বিনষ্ট হইবে।”

মনোরমা চমকিয়া উঠিলেন। কহিলেন, “বিংশতি সহস্র মানুষ মারিবে? কি সর্ব্বনাশ! ছি! ছি!”

হে। “মনোরমে, তুমি এ সকল সম্বাদ কোথায় পাইলে?”

ম। আরও সম্বাদ আছে। আজি রাত্রে তোমারে মারিবার জন্য তোমার গৃহে দস্যু আসিবে। আজি গৃহে যাইও না।” বলিয়া মনোরমা উর্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল।

চতুর্থ খণ্ড · চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

যবনদূত—যমদূত বা।

বেলা প্রহরেকের সময়ে নগরবাসীরা বিস্মিতলোচনে দেখিল, কোন অপরিচিত জাতীয় সপ্তদশ অশ্বারোহী পুরুষ রাজপথ অতিবাহিত করিয়া রাজভবনাভিমুখে যাইতেছে। তাহাদিগের আকারেঙ্গিত দেখিয়া নবদ্বীপবাসীরা ধন্যবাদ করিতে লাগিল। তাহাদিগের শরীর আয়ত, দীর্ঘ অথচ পুষ্ট; তাহাদিগের বর্ণ তপ্তকাঞ্চন সন্নিভ, তাহাদিগের মুখমণ্ডল বিস্তৃত, ঘনকৃষ্ণ শ্মশ্রুরাজি বিভূষিত; নয়ন প্রশস্ত, কৃষ্ণরেখাশোভিত। তাহাদিগের পরিচ্ছদ অনর্থক চাকচিক্যবিবর্জ্জিত; তাহাদিগের
যোদ্ধৃবেশ; সর্ব্বাঙ্গে প্রহরণজাল মণ্ডিত; লোচনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। আর যে সকল সিন্ধুপারজাত অশ্বপৃষ্ঠে তাহার আরোহণ করিয়া যাইতেছিল, তাহাই বা কি মনোহর! পর্ব্বত শিলাখণ্ডের ন্যায় বৃহদাকার, বিমার্জ্জিত-দেহ, বক্রগ্রীব, বল্‌গারোধাসহিষ্ণু, তেজোগর্ব্বে নৃত্যশীল! আরোহীরা কিবা তচ্চালন-কৌশলী—অবলীলা ক্রমে সেই রুদ্ধ বায়ুতুল্য তেজঃপ্রখর অশ্ব সকল দমিত করিতেছে। দেখিয়া বঙ্গবাসীরা বহুতর প্রশংসা করিল।

সপ্তদশ অশ্বারোহী দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় অধরোষ্ঠ সংশ্লিষ্ট করিয়া নীরবে রাজপুরাভিমুখে চলিল। কৌতুহল বশতঃ কোন নগরবাসী কিছু জিজ্ঞাসা করিলে, সমভিব্যাহারী একজন ভাষাজ্ঞ ব্যক্তি বলিয়া দিতে লাগিল “ইহারা যবন রাজার দূত।” এই বলিয়া ইহার প্রান্তরাল ও কোষ্ঠপালদিগের নিকট পরিচয় দিয়াছিল—এবং পশুপতির আজ্ঞা ক্রমে সেই পরিচয়ে নির্ব্বিঘ্নে নগরমধ্যে প্রবেশলাভ করিল।

সপ্তদশ অশ্বারোহী রাজদ্বারে উপনীত হইল। বৃদ্ধ রাজার শৈথিল্যে আর পশুপতির কৌশলে রাজপুরী প্রায় রক্ষকহীন। রাজসভা ভঙ্গ হইয়াছিল—পুরীমধ্যে কেবল পৌরজন ছিল মাত্র —অল্পসংখ্যক দৌবারিক দ্বার রক্ষা করিতেছিল। এক জন দৌবারিক জিজ্ঞাসা করিল, “তোমরা কি জন্য আসিয়াছ?”

যবনেরা উত্তর করিল “আমরা যবন রাজপ্রতিনিধির দূত; বঙ্গরাজের সহিত সাক্ষাৎ করিব।”

দৌবারিক কহিল “মহারাজাধিরাজ বঙ্গেশ্বর এক্ষণে অন্তঃপুরে গমন করিয়াছেন—এখন সাক্ষাৎ হইবে না।”

যবনেরা নিষেধ না শুনিয়া মুক্ত দ্বারপথে প্রবেশ করিতে উদ্যত হইল। সর্ব্বাগ্রে একজন খর্ব্বকায়, দীর্ঘবাহু, কুরূপ যবন। দুর্ভাগ্যবশতঃ দৌবারিক তাহার গতিরোধ জন্য শূলহস্তে তাহার সম্মুখে দাঁড়াইল। কহিল “পশ্চাৎ অপসৃত হও—নচেৎ এক্ষণেই বর্ষাঘাতে মারিব।”

“আপনিই তবে মর!” এই বলিয়া ক্ষুদ্রাকার যবন দৌবারিককে নিজ করস্থ বর্ষাগ্রে বিদ্ধ করিল। দৌবারিক প্রাণত্যাগ করিল। তখন আপন সঙ্গীদিগের মুখাবলোকন করিয়া ক্ষুদ্রকায় যবন কহিল, “এক্ষণে আপন আপন কার্য্য কর।” অমনি ষোড়শ বাক্যহীন অশ্বারোহীদিগের মধ্য হইতে ভীষণ জয়ধ্বনি সমুখিত হইল। তখন সেই ষোডশ যবনের কটিবন্ধ হইতে ষোড়শ অসিফলক নিষ্কোষিত হইল—এবং অশণি সম্পাত সদৃশ তাহার দৌবারিকদিগকে আক্রমণ করিল। দৌবারিকেরা রণসজ্জায় ছিল না—অকস্মাৎ নিরুদ্যোগে আক্রান্ত হইয়া আত্মরক্ষার কোন চেষ্টা করিতে পারিল না—মুহূর্ত্ত মধ্যে সকলেই নিপাত হইল।

ক্ষুদ্রকায় যবন কহিল “যেখানে যাহাকে পাও বধ কর। পুরী অরক্ষিতা—বৃদ্ধ রাজাকে বধ কর।”

তখন যবনেরা পুর মধ্যে তড়িতের ন্যায় প্রবেশ করিয়া বালবৃদ্ধবনিতা পৌরজন যেখানে যাহাকে দেখিল তাহাকে অসি দ্বারা ছিন্নমস্তক অথবা শূলাগ্রে বিদ্ধ করিল।

পৌরজন তুমুল আর্ত্তনাদ করিয়া ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে লাগিল। সেই ঘোর আর্ত্তনাদ, অন্তঃপুরে যথায় বৃদ্ধ রাজা ভোজন করিতেছিলেন তথায় প্রবেশ করিল। তাঁহার মুখ শুকাইল। জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি ঘটিয়াছে—যবন আসিয়াছে?”

পলায়নতৎপর পৌরজনেরা কহিল “যবন সকলকে বধ করিয়া আপনাকে বধ করিতে আসিতেছে।”

কবলিত অন্নগ্রাস রাজার মুখ হইতে পড়িয়া গেল। তাঁহার শুস্ক শরীর জলস্রোতঃপ্রহত বেতসের ন্যায় কাঁপিতে লা গিল। নিকটে রাজমহিষী ছিলেন—রাজা ভোজন পাত্রের উপর পড়িয়া যান দেখিয়া মহিষী তাঁহার হস্ত ধরিলেন; কহিলেন,

“চিন্তা নাই—আপনি গাত্রোত্থান করুন।” এই বলিয়া তাঁহার হস্ত ধরিয়া তুলিলেন। রাজা কলের পুত্তলীর ন্যায় দাঁড়াইয়া উঠিলেন।

মহিষী কহিলেন, “চিন্তা কি? নৌকায় সকল দ্রব্য নীত হইয়াছে, চলুন আমরা খড়ক্কী দ্বার দিয়া পুরুষোত্তম যাত্রা করি।”

এই বলিয়া মহিষী রাজার অধৌত হস্ত ধারণ করিয়া খড়ক্কী দ্বার পথে পুরুষোত্তম যাত্রা করিলেন। সেই রাজকুলকলঙ্ক অসমর্থ রাজার সঙ্গে বঙ্গরাজ্যের রাজলক্ষ্মীও যাত্রা করিলেন।

ষোড়শ সহচর লইয়া কর্কটাকার বখ্‌তিয়ার খিলিজি গৌড়ে শ্বরের রাজপুরী অধিকার করিল।

ষষ্টি বৎসর পরে যবন ইতিহাসবেত্তা মিন্‌হাজদ্দীন এইরূপ লিখিয়াছিলেন। ইহার কতদূর সত্য কতদূর মিথ্যা তাহা কে জানে? যখন মনুষ্যের লিখিত চিত্রে, সিংহ পরাজিত, মনুষ্য সিংহের অপমান কর্ত্তা স্বরূপ চিত্রিত হইয়াছিল, তখন সিংহের হস্তে চিত্রফলক দিলে কিরূপ চিত্র লিখিত হইত? মনুষ্য মুষিক তুল্য প্রতীয়মান হইত সন্দেহ নাই। মন্দভাগিনী বঙ্গভূমি, সহজেই দুর্ব্বলা, আবার তাহাতে শত্রু হস্তে চিত্রফলক!

তৃতীয় খণ্ড · চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

উপনয়—বহ্নিব্যাপ্য ধূমবান্।

গিরিজায়া গীত গায়িল।

“কাহে, সোই জীয়ত মরত কি বিধান?

ব্রজ কি কিশোর সোই, কঁহা গেল ভাগই,

ব্রজজন টুটায়ল পরাণ।”

সংগীত ধ্বনি হেমচন্দ্রের কর্ণে প্রবেশ করিল। স্বপ্নশ্রুত শব্দের ন্যায় কর্ণে প্রবেশ করিল।

গিরিজায়া আবার গায়িল।

“ব্রজ কি কিশোর সোই, কঁহা গেল ভাগই,

ব্রজবধূ টুটাল পরাণ।”

হেমচন্দ্র উন্মুখ হইয়া শুনিতে লাগিলেন।

গিরিজায়া আবার গায়িল।

“মিলি গেই নাগরী, ভুলি গেই মাধব,

রূপবিহীন গোপকুঙারী।

কে জানে পিয় সই, রসময় প্রেমিক,

হেন বঁধূ রূপকি ভিখারী॥”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “একি! মনোরমে, এযে গিরিজায়ার স্বর! আমি চলিলাম এই বলিয়া লম্ফ দিয়া হেমচন্দ্র শয্যা হইতে অবতরণ করিলেন। গিরিজায়া গায়িতে লাগিল।

“আগে নাহি বুঝনু, রূপ দেখি ভুলনু,

হৃদি বৈষ্ণু চরণ যুগল।

“যমুনা সলিলে সই, অব তনু ডারব,

আন সখি ভখিব গরল॥”

হেমচন্দ্র গিরিজায়ার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। ব্যস্তস্বরে কহিলেন,

“গিরিজায়ে! একি, গিরিজায়ে! তুমি এখানে? তুমি এখানে কেন? তুমি এদেশে কবে আসিলে?”

গিরিজায়া কহিল “আমি এখানে অনেক দিন আসিয়াছি।” এই বলিয়া আবার গায়িতে লাগিল।

“কিবা কাননবল্লরী, গল বেঢ়ি বাঁধই,

নবীন তমালে দিব ফাস।”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “তুমি এদেশে কেন এলে?”

গিরিজায়া কহিল, “ভিক্ষা আমার উপজীবিকা। রাজধানীতে অধিক ভিক্ষা পাইব বলিয়া আসিয়াছি।

“কি বা কানন বল্লরী, গল বেঢ়ি বাঁধই,

নবীন তমালে দিব ফাস।”

হেমচন্দ্র গীতে কর্ণপাত না করিয়া কহিলেন, “মৃণালিনী কেমন আছে, দেখিয়া আসিয়াছ?”

গিরিজায়া গায়িতে লাগিল।

“নহে—শ্যাম শ্যাম শ্যাম শ্যাম, শ্যাম নাম জপয়ি’

ছার তনু করব বিনাশ।”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “তোমার গীত রাখ। আমার কথার উত্তর দাও। মৃণালিনী কেমন আছে, দেখিয়া আসিয়াছ?”

গিরিজায়া কহিল, “মৃণালিনীকে আমি দেখিয়া আসি ঞনাই। এ গীত আপনার ভাল না লাগে অন্য গীত গায়িতেছি।

এজনমের সঙ্গে কি সই, জনমের সাধ ফুরাইবে।

কিবা জন্মান্তরে, এ সাধ মোর পুরাইবে॥”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “গিরিজায়ে, তোমাকে মিনতি করিতেছি গান রাখ, মৃণালিনীর সম্বাদ বল।”

গি। “কি বলিব?”

হে। “মৃণালিনীকে কেন দেখিয়া আইস নাই?”

গি। “গৌড়নগরে তিনি নাই।”

হে। “কেন? কোথায় গিয়াছেন?”

গি। “মথুরায়।”

হে। “মথুরায়? মথুরায়? কাহার সঙ্গে গেলেন? কি প্রকারে গেলেন? কেন গেলেন?”

গি। “তাঁহার পিতা কি প্রকারে সন্ধান পাইয়া লোক পাঠাইয়া লইয়া গিয়াছেন। বুঝি তাঁহার বিবাহ উপস্থিত। বুঝি বিবাহ দিতে লইয়া গিয়াছেন।”

হে। “কি? কি করিতে?”

গি। “মৃণালিনীর বিবাহ দিতে তাঁহার পিতা তাঁহাকে লইয়া গিয়াছেন।”

হেমচন্দ্র মুখ ফিরাইলেন। গিরিজায়া সে মুখ, সেই ভীম কান্তিযুক্ত মুখমণ্ডল দেখিতে পাইল না; আর যে হেমচন্দ্রের স্কন্ধস্থ ক্ষত মুখ ছুটিয়া বন্ধনবস্ত্র রক্তে প্লাবিত হইতেছিল তাহাও দেখিতে পাইল না। সে পূর্ব্বমত গায়িতে লাগিল।

“বিধি তোরে সাধি শুন, জন্ম যদি দিবে পুনঃ,

আমারে আবার যেন, রমণী জনম দিবে।

লাজভয় তেয়াগিব, এ সাধ মোর পুরাইব,

সাগর ছোঁচে রতন নিব, কণ্ঠে রাখ‍্বো নিশি দিবে।”

হেমচন্দ্র মুখ ফিরাইলেন। বলিলেন, “গিরিজায়ে, তোমার সম্বাদ শুভ। উত্তম হইয়াছে।”

এই বলিয়া হেমচন্দ্র গৃহমধ্যে পুনঃ প্রবেশ করিলেন।

হেমচন্দ্র যে কেন গিরিজায়াকে বলিলেন, তোমার সম্বাদ শুভ তাহা গিরিজায়া বুঝিল না। যে ক্রোধভরে, হেমচন্দ্র, এই মৃণালিনীর জন্য গুরুদেবের প্রতি শরসন্ধানে উদ্যত হইয়ছিলেন, সেই দুর্জ্জয় ক্রোধ হৃদয়মধ্যে সমুদিত হইল। অভিমানাধিক্যে, দুর্দ্দম ক্রোধাবেগে, হেমচন্দ্র গিরিজায়াকে বলিলেন, “তোমার সম্বাদ শুভ।”

গিরিজায়া তাহা বুঝিতে পারিল না। মনে করিল, এই ষষ্ঠ লক্ষণ। কেহ তাহাকে ভিক্ষা দিল না; সেও ভিক্ষার প্রতীক্ষা করিল না; “শিকলী কাটিয়াছে” সিদ্ধান্ত করিয়া গৃহাভিমুখে চলিল।

দ্বিতীয় খণ্ড · চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

বাতায়নে।

হেমচন্দ্র কিছু দিন উপবনগৃহে বাস করিলেন। জনার্দ্দনের সহিত প্রত্যহ সাক্ষাৎ হইত; কিন্ত ব্রাহ্মণের বধিরতা প্রযুক্ত ইঙ্গিতে আলাপ হইত মাত্র। মনোরমার সহিতও সর্ব্বদা সাক্ষাৎ হইত, মনোরমা কখন তাঁহার সহিত উপযাচিকা হইয়া কথা কহিতেন; কখন বা বাক্যব্যয় না করিয়া স্থানান্তরে চলিয়া যাইতেন। বস্ততঃ মনোরমার প্রকৃতি তাঁহার পক্ষে অধিকতর
বিস্ময়জনক বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। প্রথমতঃ তাঁহার বয়ঃক্রম দুরনুমেয়, সহজে তাঁহাকে বালিকা বলিয়া বোধ হইত, কিন্তু কখন কখন মনোরমাকে অতিশয় গাম্ভীর্য্যশালিনী দেখিতেন। মনোরমা কি অদ্যাপিও কুমারী? হেমচন্দ্র এক দিন কথোপকথনচ্ছলে মনোরমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মনোরমে, তোমার শশুর বাটী কোথা?” মনোরমা কহিল, “বলিতে পারি না।” আর এক দিন জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “মনোরমা। তুমি কয় বৎসরের হইয়াছ?” মনোরমা তাহাতেও উত্তর দিয়াছিলেন, “বলিতে পারি না।”

মাধবাচার্য্য হেমচন্দ্রকে উপবনে স্থাপিত করিয়া দেশ পর্য্যটনে যাত্রা করিলেন। তাঁহার অভিপ্রায় এই, যে এ সময় বঙ্গদেশীয় অধীন রাজগণে যাহাতে নবদ্বীপে সসৈন্য সমবেত হইয়া বঙ্গেশ্বরের আনুকূল্য করেন, তদ্বিষয়ে তাঁহাদিগকে প্রবৃত্তি দেন। হেমচন্দ্র নবদ্বীপে তাঁহার প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। কিন্তু নিষ্কর্ম্মে দিনযাপন ক্লেশকর হইয়া উঠিল। হেমচন্দ্র বিরক্ত হইলেন। এক এক বার মনে হইতে লাগিল যে দিগ্বিজয়কে গৃহরক্ষায় রাখিয়া অশ্ব লইয়া একবার গৌড়ে গমন করেন। কিন্তু তথায় মৃণালিনীর সাক্ষাৎ লাভ করিলে তাঁহার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হইবে, বিনা সাক্ষাতে গৌড় যাত্রায় কি ফলোদয় হইবে? এই সকল আলোচনায় যদিও গৌড়যাত্রায় হেমচন্দ্র নিরস্ত হইলেন, তথাপি অনুদিন মৃণালিনী চিন্তায় হৃদয় নিযুক্ত থাকিত। একদা প্রদোষ কালে তিনি শয়নকক্ষে, পর্য্যঙ্কোপরি শয়ন। করিয়া মৃণালিনীর চিন্তা করিতে ছিলেন। চিন্তাতেও হৃদয় সুখলাভ করিতেছিল। মুক্ত বাতায়ন পথে হেমচন্দ্র প্রকৃতির শোভা নিরীক্ষণ করিতে ছিলেন। নবীন শরদুদয়। রজনী চন্দ্রিকাশালিনী, আকাশ নির্ম্মল, বিস্তৃত, নক্ষত্রখচিত, ক্কচিৎ স্তর-পরম্পরা-বিন্যস্ত শ্বেতাম্বুদমালায় বিভূষিত। বাতায়ন পথে অদূরবর্ত্তিনী ভাগিরথীও দেখা যাইতে ছিল; ভাগিরথী বিশলোরসী, বহুদূরবিসর্পিণী, চন্দ্রকর প্রতিঘাতে উজ্জ্বলতরঙ্গিণী, দূরপ্রান্তে ধূমময়ী, নববারি-সমাগম-প্রমাদিনী। নববারি সমাগম জনিত কল্লোল হেমচন্দ্র শুনিতে পাইতেছিলেন। বাতায়ন পথে বায়ু প্রবেশ করিতেছিল, বায়ু গঙ্গাতরঙ্গে নিক্ষিপ্ত জলকণা-সংস্পর্শে শীতল, নিশাসমাগমে প্রফুল্ল বন্যকুসুম সংস্পর্শে সুগন্ধী; চন্দ্রকর-প্রতিঘাতী-শ্যামলোজ্বল বৃক্ষ পত্র বিধূত করিয়া, নদীতীরবিরাজিত কাশকুসুম আন্দোলিত করিয়া, বায়ু বাতায়ন পথে প্রবেশ করিতেছিল। হেমচন্দ্র বিশেষ প্রীতিলাভ করিলেন।

অকস্মাৎ বাতায়ন পথ অন্ধকার হইল—চন্দ্রালোকের গতিরোধ হইল। হেমচন্দ্র বাতায়ন সন্নিধি একটী মনুষ্য মুণ্ড দেখিতে পাইলেন। বাতায়ন ভূমি হইতে কিছু উচ্চ—এজন্য কাহারও হস্ত পদাদি কিছু দেখিতে পাইলেন না—কেবল এক খানি মুখ দেখিলেন। মুখ খানি অতি বিশাল শ্মশ্রুসংযুক্ত, তাহার মস্তকে উষ্ণীষ। সেই উজ্জ্বল চন্দ্রালোকে, বাতায়নে, নিকটে, সম্মুখে, শ্মশ্রুসংযুক্ত উষ্ণীযধারী মনুষ্য মুণ্ড দেখিলেন। দেখিয়া হেমচন্দ্র শয্যা হইতে লম্ফ দিয়া নিজ শাণিত অসি গ্রহণ করিলেন।

অসি গ্রহণ করিয়া হেমচন্দ্র চাহিয়া দেখিলেন যে বাতায়নে আর মনুষ্য মুণ্ড নাই।

হেমচন্দ্র অসি হস্তে দ্বারোদঘাটন করিয়া গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন। বাতায়নতলে আসিলেন। তথায় কেহ নাই।

গৃহের চতুঃপার্শ্বে, গঙ্গাতীরে, বনমধ্যে হেমচন্দ্র ইতস্ততঃ অন্বেষণ করিলেন। কোথাও কাহাকে দেখিলেন না।

হেমচন্দ্র গৃহে প্রত্যাবর্ত্তন করিলেন। তখন রাজপুত্র পিতৃদত্ত যোদ্ধৃবেশে আপাদমস্তক আত্মশরীর মণ্ডিত করিলেন। অকাল-জলদোদয় বিমর্ষিত গগনমণ্ডলবৎ তাঁহার সুন্দর মুখকান্তি অন্ধকারময় হইল। তিনি একাকী সেই গভীর নিশাতে শস্ত্রময় হইয়া যাত্রা করিলেন। বাতায়ন পথে মনুষ্য মুণ্ড দেখিয়া তিনি জানিতে পারিয়াছিলেন যে বঙ্গে যবন আসিয়াছে।

প্রথম খণ্ড · চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

পিঞ্জরের বিহঙ্গিনী।

বাষ্পীয় রথের গতি অতি বিচিত্র। দিল্লীহইতে কলিকাতা আসিতে দুই দিন লাগে না। কিন্তু ইতিহাসলেখকের লেখনীর গতি আরও বিচিত্র। পাঠক মহাশয় এই মাত্র দিল্লীতে; তৎপরেই প্রয়াগে; এক্ষণে আবার প্রাচীন নগরী লক্ষ্মণাবতীতে আসিয়া তাঁহাকে হৃষীকেশ ব্রাহ্মণের গৃহাভ্যন্তরে নেত্রপাত করিতে হইল।

হৃষীকেশ সম্পন্ন বা দরিদ্র ব্রাহ্মণ নহেন। তাঁহার বাসগৃহের
বিলক্ষণ সৌষ্ঠব ছিল। তদীয় অন্তঃপুর মধ্যে যথায় দুইটী তরুণী কক্ষ প্রাচীরে আলেখ্য লিখিতেছিলেন, তথায় পাঠকমহাশয়কে দাঁড়াইতে হইবে। উভয় রমণী আত্মকর্ম্মে সবিশেষ মনোভিনিবেশ করিয়াছিলেন, কিন্তু তন্নিবন্ধন পরস্পরের সহিত কথোপকথনের কোন বিঘ্ন জন্মিতেছিল না। সেই কথোপকথনের মধ্য ভাগ হইতে পাঠক মহাশয়কে শুনাইতে আরম্ভ করিব।

এক যুবতী অপরকে কহিলেন, “কেন, মৃণালিনি, কথার উত্তর দিস্ না কেন? আমি সেই রাজ পুত্রটীর কথা শুনিতে ভাল বাসি।”

“সই মণিমালিনি! তোমার সুখের কথা বল, আমি আনন্দে শুনিব।”

মণিমালিনী কহিল, “আমার সুখের কথা শুনিতে শুনিতে আমিই জ্বালাতন হইয়াছি, তোমাকে কি শুনাইব?”

মৃ। “তুমি শোন কার কাছে—তোমার স্বামীর কাছে?”

মণি। “নহিলে আর কারও কাছে বড় শুনিতে পাই না। এই পদ্মটী কেমন আঁকিলাম দেখ দেখি?”

মৃ। “ভাল হইয়াও হয় নাই। জল হইতে পদ্ম অনেক উর্দ্ধে আছে, কিন্তু সরোবরে সেরূপ থাকে না; পদ্মের বোঁটা জলে লাগিয়া থাকে, চিত্রেও সেইরূপ হইবে। আর কয়েকটী পদ্মপত্র আঁক; নহিলে পদ্মের শোভা স্পষ্ট হয় না। আরও, পার যদি উহার নিকট একটী হংস আঁকিয়া দাও।”

মণি। “হংস এখানে কি করিবে?”

মৃ। “তোমার স্বামীর ন্যায় পদ্মের কাছে সুখের কথা কহিবে।”

মণি। (হাঁসিয়া) “দুই জনেই সুকণ্ঠ বটে। কিন্তু আমি লিখিব না। আমি সুখের কথা শুনিয়া শুনিয়া জ্বালাতন হইয়াছি।”

মৃ। “তবে একটী খঞ্জন আঁক।”

ম। “খঞ্জন আঁকিব না। খঞ্জন পাখা বাহির করিয়া উড়িয়া যাইবে। এত মৃণালিনী নহে, যে স্নেহ-শিকলে বাঁধিয়া রাখিব।”

মৃ। “খঞ্জন যদি এমনই দুশ্চরিত্র হয়, তবে মৃণালিনীকে যেমন পিঞ্জরে পূরিয়াছ খঞ্জনকেও সেইরূপ করিও।”

ম। “আমরা মৃণালিনীকে পিঞ্জরে পূরি নাই—সে আপনি আসিয়া পিঞ্জরে প্রবেশ করিয়াছে।”

মৃ। “সে মাধবাচার্য্যের গুণ।”

ম। “সখি, তুমি কত বার বলিয়াছ যে মাধবাচার্য্যের সেই নিষ্ঠুর কাজের কথা সবিশেষ বলিবে। কিন্তু কই, আজিও কেন তুমি মাধবাচার্য্যের কথায় পিতৃগৃহ ত্যাগ করিয়া আসিলে।”

মৃ। মাধবাচার্য্যের কথায় আসি নাই। মাধবাচার্য্যকে আমি চিনিতাম না। আমি ইচ্ছা পূর্ব্বকও এখানে আসি নাই। একদিন সন্ধ্যার পর আমার দাসী আমাকে এই অঙ্গুরীয় দিল। এবং বলিল যে যিনি এই অঙ্গুরীয় দিয়াছেন তিনি উদ্যানে অপেক্ষা করিতেছেন। আমি দেখিলাম যে, উহা হেমচন্দ্রের সঙ্কেতাঙ্গুরীয়। তাঁহার সাক্ষাতের অভিলাষ থাকিলে তিনি এই অঙ্গুরীয় দ্বারা সঙ্কেত করিতেন। আমাদিগের বাটীর পশ্চাতেই উপবন ছিল। যমুনা হইতে শীতল বায়ু সেই উদ্যানকে স্নিগ্ধ কুরিত। তথায় তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ হইত।”

মণিমালিনী কহিলেন, “ঐ কথাটী মনে পড়িলেও আমার বড় অসুখ হয়। তুমি কুমারী হইয়া কি প্রকারে পুরুষের সহিত গোপনে প্রণয় করিতে?”

মৃ। “অসুখ কেন সখি—তিনিই আমার স্বামী। তিনি ভিন্ন অন্য কেহ কখন আমার স্বামী হইবে না।”

ম। “কিন্তু এ পর্য্যন্ত ত তিনি স্বামী হয়েন নাই। সুতরাং সাধ্বীর তাহা অকর্ত্তব্য। রাগ করিও না সখি! তোমাকে ভগিনীর ন্যায় ভাল বাসি; এই জন্য বলিতেছি। তোমার চরিত্রে এমন কলঙ্ক—ইহা যখনই মনে পড়ে তখনই আমার শরীরে জ্বর আইসে।”

মৃণালিনী অধোবদনে রহিলেন। ক্ষণেক পরে, চক্ষের জল মুছিলেন। কহিলেন, “মণিমালিনি! এ বিদেশে আমার আত্মীয় কেহ নাই। আমাকে ভালকথা বলে এমত কেহ নাই। যাহারা আমাকে ভালবাসিত তাহাদিগের সহিত যে আর কখন সাক্ষাৎ হইবে সে ভরসাও করি না। কেবলমাত্র তুমি আমার সখী—তুমি আমাকে ভাল না বাসিলে কে আর ভাল বাসিবে?”

ম। “আমি তোমাকে ভাল বাসিব, ও বাসিয়াও থাকি, কিন্তু যখন ঐ কথাটী মনে পড়ে, তখন মনে করি তোমার সঙ্গে আমার দেখা না হওয়াই ভাল ছিল।”

মৃণালিনী পুনশ্চ নীরবে রোদন করিলেন। কহিলেন, “সখি, তোমার মুখে এ কথা আমার সহ্য হয় না। যদি তুমি আমার নিকট শপথ কর, যে যাহা বলিব তাহা এ সংসারে কাহারও নিকটে ব্যক্ত করিবে না, তবে তোমার নিকট সকল কথা প্রকাশ করিয়া বলিতে পারি। তাহা হইলে তুমি আমাকে ভাল বাসিবে।”

ম। “আমি শপথ করিতেছি।”

মৃ। “তোমার চুলে দেবতার প্রসাদিত ফুল আছে। তাই স্পর্শ করিয়া শপথ কর।” মণিমালিনী তদ্রূপ করিলেন।

তখন মৃণালিনী মণিমালিনীর কাণে যাহা কহিলেন, তাহার এক্ষণে বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নাই। শ্রবণে মণিমালিনী পরম প্রীতি প্রকাশ করিলেন। গোপন কথা সমাপ্ত হইল।

মণিমালিনী কহিলেন, “তাহার পর, মাধবাচার্য্যের সঙ্গে তুমি কি প্রকারে আসিলে? সে বৃত্তান্ত বলিতেছিলে, বল।”

মৃণালিনী কহিলেন যে “আমি পূর্ব্বরীত্যনুসারে হেমচন্দ্রের অঙ্গুরীয় দেখিয়া সাক্ষাৎ প্রত্যাশায় ঐ উদ্যান মধ্যে প্রবেশ করিলে দূতী কহিল যে রাজপুত্র পুলিনলগ্ন নৌকায় অধিষ্ঠান করিতেছেন। আমি অনেক দিন রাজপুত্রকে দেখি নাই। ব্যগ্রতাবশতঃ বিবেচনাশূন্য হইলাম। পুলিনে আসিয়া দেখিলাম যে যথার্থই একখানি তরণী সৈকতে লগ্ন হইয়া রহিয়াছে। তাহার বহির্ভাগে এক জন পুরুষ দাঁড়াইয়া রহিয়াছে, মনে করিলাম যে রাজপুত্রই দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন। আমি তরণীর নিকট আসিলাম। নৌকার উপর যিনি দাড়াইয়াছিলেন তিনি আমার হস্তে ধরিয়া নৌকায় উঠাইলেন। অমনি নাবিকেরা নৌকা খুলিয়া দিল। কিন্তু আমি করস্পর্শেই বুঝিয়াছিলাম যে এ ব্যক্তি হেমচন্দ্র নহে।”

মণি। “আর অমনি তুমি চীৎকার করিলে?”

মৃ। “চীৎকার করি নাই। একবার ইচ্ছা হইয়াছিল বটে কিন্তু চীৎকার আসিল না।”

মণি। “আমি হইলে জলে ঝাঁপ দিতাম।”

মৃ। “হেমচন্দ্রকে না দেখিয়া কেন মরিব?”

মণি। “তার পর কি হইল?”

মৃ। “প্রথমেই নৌকারোহী আমাকে মাতৃসম্বোধন করিয়া আমার প্রধান ভয় দূর করিলেন; কহিলেন, “মাতঃ আমি আপ নাকে মাতৃসম্বোধন করিতেছি—আমি আপনার পুত্র, কোন আশঙ্কা করিবেন না। আমার নাম মাধবাচার্য্য, আমি হেমচন্দ্রের গুরু। কেবল হেমচন্দ্রের গুরু এমত নহি; ভারতবর্ষের রাজগণের মধ্যে অনেকের সহিত আমার সেই সম্বন্ধ। আমি এক্ষণে কোন দৈবকার্য্যে নিযুক্ত আছি তাহাতে হেমচন্দ্র আমার প্রধান সহায়; তুমি তাহার প্রধান বিঘ্ন।” আমি বলিলাম, ‘আমি বিঘ্ন?’ মাধবাচার্য্য কহিলেন, ‘তুমিই বিঘ্ন। যবনদিগের বিজিত করা, হিন্দু রাজ্যের পুনরুদ্ধার করা, সুসাধ্য কর্ম্ম নহে; হেমচন্দ্র ব্যতীত কাহারও সাধ্য নহে; হেমচন্দ্রও অনন্যমনা। না হইলে তৎকর্ত্তৃকও সিদ্ধ হইবে না। যত দিন আপনার সাক্ষাৎ লাভ সুলভ থাকিবে, তত দিন হেমচন্দ্রের আপনি ভিন্ন অন্য ব্রত নাই—সুতরাং যবনধ্বংস কে করে?’ আমি কহিলাম, “বুঝিলাম প্রথমে আমার ধ্বংস ব্যতীত যবনধ্বংস নাই। আপনার শিষ্য কি আপনার দ্বারা অঙ্গুরীয় প্রেরণ করিয়া আমাকে প্রাণত্যাগে অনুরোধ করিয়াছেন?”

মণি। “এত কথা বৃদ্ধকে বলিলে কি প্রকারে?”

মৃ। “বিপদ কালে লজ্জা কি? মাধবাচার্য্য আমাকে মুখরা মনে করিলেন, মৃদু হাসিলেন, কহিলেন ‘আমি যে তোমাকে এইরূপ হস্তগত করিব তাহা হেমচন্দ্র জানেন না।”

“আমি মনে মনে কহিলাম তবে, যাঁহার জন্য এ জীবন রাখিয়াছি, তাঁহার অনুমতি ব্যতীত সে জীবন ত্যাগ করিব না।” মাধবাচার্য্য বলিতে লাগিলেন, “তোমাকে প্রাণত্যাগ করিতে হইবে না—কেবল আপাততঃ হেমচন্দ্রকে ত্যাগ করিতে হইবে। ইহাতে তাঁহার পরম মঙ্গল। যাহাতে তিনি রাজ্যেশ্বর হইয়া তোমাকে রাজমহিষী করিতে পারেন, তাহা কি তোমার কর্ত্তব্য নহে, তোমার প্রণয়মন্ত্রে তিনি কাপুরুষ হইয়া রহিয়াছেন, তাঁহার সে ভাব দূর করা কি উচিত নহে?’ আমি কহিলাম? ‘যাহা উচিত তাহা তাঁহার নিজমুখে আমি শুনিতে পাইয়া থাকি। আমার সহিত সাক্ষাৎ যদি তাঁহার সঙ্গে অনুচিত হয়, তবে তিনি কদাচ আমার সহিত আর সাক্ষাৎ করিবেন না। তজ্জন্য আমার প্রতি মহাশয়ের পীড়ন অনাবশ্যক।’ মাধবাচার্য্য বলিলেন, ‘বালকে ভাবিয়া থাকে, বালক ও বৃদ্ধ উভয়ের বিবেচনাশক্তি তুল্য; কিন্তু তাহা নহে। এ বয়সে বঞ্চবিংশতিবর্ষীয় বালকের অপেক্ষা আমাদিগের পরিণামদর্শিতা যে অধিক তাহাতে সন্দেহ করিও না। আর তুমি সম্মতা হও বা না হও, যাহা সঙ্কল্প করিয়াছি তাহা সিদ্ধ করিব। আমি তোমাকে দেশাস্তরে লইয়া যাইব। গৌড় দেশে অতি শান্তস্বভাব এক ব্রাহ্মণের বাটীতে তোমাকে রাখিয়া আসিব। তিনি তোমাকে আপন কন্যার ন্যায় যত্ন করিবেন। এক বৎসর পরে আমি তোমার পিতার নিকট তোমাকে আনিয়া দিব। আর সে সময়ে হেমচন্দ্রে যে অবস্থায় থাকুন, তোমার সহিত তাঁহার বিবাহ দেওয়াইব, ইহা সত্য করিলাম। এই প্রলোভন-বাক্যেই হউক, আর অগত্যাই হউক, আমি নিস্তব্ধ হইলাম। তাহার পর এই খানে আসিয়াছি।”

চতুর্থ খণ্ড · চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ

চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ।

ধাতুমূর্ত্তির বিসর্জ্জন।

মহম্মদআলির নিকট বিদায় হইয়া, রাজপথ অতিবাহিত করিয়া পশুপতি ধীরে ধীরে চলিলেন। ধীরে ধীরে চলিলেন―যবনের কারাগার হইতে বিমুক্ত হইয়াও দ্রুতপদক্ষেপণে তাঁহার প্রবৃত্তি জন্মিল না। রাজপথে যাহা দেখিলেন, তাহাতে আপনার মনোমধ্যে আপনি মরিলেন। তাঁহার প্রতিপদে মৃত নাগরিকের দেহ চরণে বাজিতে লাগিল; প্রতিপদে শোণিতসিক্ত কর্দ্দমে চরণ আর্দ্র হইতে লাগিল। পথের দুই পার্শ্বে গৃহাবলী জনশূন্য―বহুগৃহ ভস্মীভূত; কোথাও বা তপ্ত অঙ্গার এখনও জ্বলিতেছিল। গৃহান্তরে দ্বার ভগ্ন―গবাক্ষ ভগ্ন―প্রকোষ্ঠ
ভগ্ন―তদুপরি মৃতদেহ! এখনও কোন হতভাগ্য মরণ যন্ত্রণায় অমানুষিক কাতরস্বরে শব্দ করিতেছিল। এ সকলের মূল তিনিই। দারুণ লোভের বশবর্ত্তী হইয়া তিনি এই রাজধানীকে শ্মশানভূমি করিয়াছেন। পশুপতি মনে মনে স্বীকার করিলেন যে তিনি প্রাণদণ্ডের যোগ্য পাত্র বটে―কেন মহম্মদআলিকে কলঙ্কিত করিয়া কারাগার হইতে পলায়ন করিলেন? যবন তাঁহাকে ধৃত করুক―অভিপ্রেত শাস্তিপ্রদান করুক―মনে করিলেন, ফিরিয়া যাইবেন। মনে মনে তখন ইষ্ট দেবীকে স্মরণ করিলেন―কিন্তু কি কামনা করিবেন? কামনার বিষয় আর কিছুই নাই। আকাশ প্রতি চাহিলেন। গগনের নক্ষত্রচন্দ্রগ্রহমণ্ডলী-বিভূষিত সহাস্য পবিত্র শোভা তাঁহার চক্ষে সহিল না―তীব্র জ্যোতিসম্পীড়িতের ন্যায় চক্ষুরধঃক্ষেপণ করিলেন। সহসা অনৈসর্গিক ভয় আসিয়া তাঁহার হৃদয় আচ্ছন্ন করিল―অকারণ ভয়ে তিনি আর পদক্ষেপ করিতে পারিলেন না। সহসা বলহীন হইলেন। বিশ্রাম করিবার জন্য পথিমধ্যে উপবেশন করিতে গিয়া দেখিলেন―এক শবাসনে উপবেশন করিতেছিলেন। শবনিস্রুত রক্ত তাঁহার বসনে এবং অঙ্গে লাগিল। তিনি কণ্টকিত-কলেবরে পুনরুত্থান করিলেন। আর দাঁড়াইলেন না। দ্রুতপদে চলিলেন। সহসা আর এক কথা মনে পড়িল―তাঁহার নিজ বাটী? তাহা কি যবনহস্তে রক্ষা পাইয়াছে? আর সে বাটীতে যে কুসুমময়ী প্রাণ-পুত্তলীকে লুকাইয়া রাখিয়াছিলেন, তাহার কি হইয়াছে? মনোরমার কি দশা হইয়াছে। তাঁহার প্রাণাধিকা, তাঁহাকে পাপ পথ হইতে পুনঃ পুনঃ নিবারণ করিয়াছিল, সেও বুঝি তাঁহার পাপ সাগরের তরঙ্গে ডুবিয়াছে। এ যবনসেনাপ্রবাহে সে কুসুম কলিকা না জানি কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে!

পশুপতি উন্মত্তের ন্যায় আপন ভবনাভিমুখে ছুটিলেন। আপনার ভবনসম্মুখে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, যাহা ভাবিয়াছিলেন তাহাই ঘটিয়াছে―জ্বলন্ত পর্ব্বতের ন্যায় তাঁহার উচ্চচূড় অট্টালিকা অগ্নিময় হইয়া জ্বলিতেছে।

দৃষ্টিমাত্র হতভাগ্য পশুপতির প্রতীত হইল যে যবনেরা তাঁহার পৌরজনসহ মনোরমাকে বধ করিয়া গৃহে অগ্নি দিয়া গিয়াছে। মনোরমা যে পলায়ন করিয়াছিল, তাহা তিনি কিছু জানিতে পারেন নাই।

নিকটে কেহই ছিল না যে তাঁহাকে এ সম্বাদ প্রদান করে। আপন বিকল চিত্তের সিদ্ধান্তই তিনি গ্রহণ করিলেন। হলাহল কলস পরিপূর্ণ হইল―হৃদয়ের শেষ তন্ত্রী ছিঁড়িল। তিনি কিয়ৎক্ষণ বিস্ফারিত নয়নে দহ্যমান অট্টালিকা প্রতি চাহিয়া রহিলেন―মরণোন্মুখ পতঙ্গবৎ অল্পক্ষণ বিচলশরীরে একস্থানে অবস্থিতি করিলেন―শেষে মহাবেগে সেই অনলতরঙ্গ মধ্যে ঝাঁপ দিলেন। সঙ্গের প্রহরী চমকিত হইয়া রহিল।

মহাবেগে পশুপতি জ্বলন্ত দ্বারপথে পুরমধ্যে প্রবেশ করিলেন। চরণ দগ্ধ হইল―অঙ্গ দগ্ধ হইল―কিন্তু পশুপতি ফিরিলেন না। অগ্নিকুণ্ড অতিক্রম করিয়া আপন শয়নকক্ষে গমন করিলেন―কাহাকেও দেখিলেন না। দগ্ধ শরীরে কক্ষে কক্ষে ছুটিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। তাঁহার অন্তরমধ্যে যে দুরন্ত তাগ্নি জ্বলিতেছিল―তাহাতে তিনি বাহ্যিক দাহযন্ত্রণা অনুভূত করিতে পারিলেন না।

ক্ষণে ক্ষণে গৃহের নূতন নূতন খণ্ড সকল অগ্নিকর্তৃক আক্রান্ত হইতেছিল। ক্ষণমধ্যে আক্রান্ত প্রকোষ্ঠ বিষম শিখা আকাশপথে উত্থিত করিয়া ভয়ঙ্কর গর্জ্জন করিতেছিল। ক্ষণে ক্ষণে দগ্ধ গৃহাংশ সকল অশণিসম্পাত শব্দে ভূতলে পড়িয়া যাইতেছিল। ধূম, ধূলি, তৎসঙ্গে লক্ষ লক্ষ অগ্নিস্ফুলিঙ্গে আকাশ অদৃশ্য হইতে লাগিল।

দাবানল-সম্বেষ্টিত আরণ্য-গজের ন্যায় পশুপতি অগ্নিমধ্যে ইতস্ততঃ দাস দাসী স্বজনসহিত মনোরমার অন্বেষণ করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। কাহারও কোন চিহ্ন পাইলেন না। হতাশ হইলেন। তখন দেবীর মন্দির প্রতি তাহার দৃষ্টিপাত হইল। দেখিলেন দেবী অষ্টভুজার মন্দির অগ্নি কর্তৃক আক্রান্ত হইয়া জ্বলিতেছে। পশুপতি পতঙ্গবৎ তন্মধ্যে প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন অনলমণ্ডল মধ্যে অদগ্ধা স্বর্ণপ্রতিমা বিরাজ করিতেছে। পশুপতি উন্মত্তের ন্যায় কহিলেন,

“মা! জগদম্বে! আর তোমাকে জগদম্বা বলিব না। আর তোমার পূজা করিব না। তোমাকে প্রণামও করিব না। আশৈশব আমি কায়মনোবাক্যে তোমার সেবা করিলাম―ঐ পদধ্যান ইহ জন্মে সার করিয়াছিলাম―এখন, মা এক দিনের পাপে সর্ব্বস্ব হারাইলাম। তবে কি জন্য তোমার পূজা করিয়াছিলাম? কেনই বা তুমি আমার পাপমতি অপনীত না করিলে?”

মন্দির-দহন অগ্নি অধিকতর প্রবল হইয়া গর্জ্জিয়া উঠিল। পশুপতি তথাপি প্রতিমা সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন, “ঐ দেখ! ধাতুমূর্ত্তি!―তুমি ধাতুমূর্ত্তি মাত্র, দেবী নহ―ঐ দেখ, অগ্নি গর্জ্জিতেছে। যে পথে আমার প্রাণাধিকা গিয়াছে―সেই পথে, তোমাকেও প্রেরণ করিবে। কিন্তু আমি অগ্নিকে এ কীর্ত্তি রাখিতে দিব না―আমি তোমাকে স্থাপনা করিয়াছিলাম―আমিই তোমাকে বিসর্জ্জন করিব। চল! ইষ্টদেবি! তোমাকে গঙ্গার জলে বিসর্জ্জন করিব।”

এই বলিয়া পশুপতি প্রতিমা উত্তোলন আকাঙ্ক্ষায় উভয় হস্তে তাহা ধৃত করিলেন। সেই সময়ে আবার অগ্নি গর্জ্জিয়া উঠিল। তখনই পর্ব্বত বিদারানুরূপ প্রবল শব্দ হইল,―দগ্ধ মন্দির, আকাশপথে ধূলিধূম ভস্ম সহিত অগ্নি স্ফুলিঙ্গ রাশি প্রেরণ করিয়া, চূর্ণ হইয়া পড়িয়া গেল। তন্মধ্যে প্রতিমাসহিত পশুপতির সজীবনে সমাধি হইল।

চতুর্থ খণ্ড · তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

বিহঙ্গিনী পিঞ্জরে।

পশুপতি, মনোরমার বুদ্ধিপ্রদীপ জ্বালিবার অনেক যত্ন করিতে লাগিলেন কিন্তু ফলোৎপত্তি কঠিন হইল। পরিশেষে বলিলেন, “মনোরমে, রাত্রি অধিক হইয়াছে। আমি শয়নে যাই।”

মনোরমা অম্লান বদনে কহিলেন, “যাও।”

পশুপতি শয়নে গেলেন না। বসিয়া মালা গাঁথা দেখিতে লাগিলেন। আবার উপায়ান্তর স্বরূপ, ভয়সূচক চিন্তায় কার্য্য সিদ্ধি হইবেক ভাবিয়া, মনোরমাকে ভীতা করিবার জন্য পশুপতি কহিলেন, “মনোরমে, যদি ইতিমধ্যে যবন আইসে, তবে তুমি কোথায় যাইবে?”

মনোরমা মালা হইতে মুখ না তুলিয়া কহিলেন, “বাটীতে থাকিব।”

পশুপতি কহিলেন, “বাটীতে তোমাকে কে রক্ষা করিবে?”

মনোরমা পূর্ব্ববৎ অন্যমনে কহিলেন, “জানি না। নিরুপায়।”

পশুপতি আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি আমাকে কি বলিতে মন্দিরে আসিয়াছ?”

ম। “দেবতা প্রণাম করিতে।”

পশুপতি বিরক্ত হইলেন। কহিলেন, তোমাকে মিনতি করিতেছি, মনোরমে, এইবার যাহা বলিতেছি, তাহা মনোযোগ দিয়া শুন—তুমি আজিও বল, আমাকে বিবাহ করিবে কি না?”

মনোরমার মালা সম্পন্ন হইয়াছিল—তিনি তাহা কৃষ্ণ মার্জ্জা রের গলায় পরাইতে ছিলেন—পশুপতির কথা কর্ণে গেল না। মার্জ্জার মালা পরিধানে বিশেষ অনিচ্ছা প্রকাশ করিতেছিল— যত বার মনোরমা মালা তাহার গলায় দিতে ছিলেন, তত বার সে মালার ভিতর হইতে মস্তক বাহির করিয়া লইতেছিল— মনোরমা কুন্দনিন্দিত দন্তে অধর দংশন করিয়া ঈষৎ হাসিতে ছিলেন আর আবার মালা তাহার গলায় দিতে ছিলেন। পশুপতি অধিকতর বিরক্ত হইয়া বিড়ালকে এক চপেটাঘাত করিলেন—বিড়াল উর্দ্ধলাঙ্গূল হইয়া দূরে পলায়ন করিল। মনোরমা সেইরূপ দংশিতাধরে হাসিতে হাসিতে করস্থ মালা—পশুপতিরই মস্তকে পরাইয়া দিলেন।

মার্জ্জার প্রসাদ মস্তকে পাইয়া রাজপ্রসাদভোগী ধর্ম্মাধিকার হতবুদ্ধি হইয়া রহিলেন। অল্প ক্রোধ হইল—কিন্তু দংশিতাধরা হাস্যময়ীর তৎকালে অনুপম রূপমাধুরী দেখিয়া তাঁহার মস্তক ঘূরিয়া গেল। তিনি মনোরমাকে আলিঙ্গন করিবার জন্য বাহু প্রসারণ করিলেন—অমনি মনোরমা লম্ফ দিয়া দূরে দাঁড়াইল—পথিমধ্যে উন্নতফণা কালসর্প দেখিয়া পথিক যেমন দূরে দাঁড়ায় সেইরূপ দাঁড়াইল।

পশুপতি অপ্রতিভ হইলেন; ক্ষণেক মনোরমার মুখ প্রতি চাহিতে পারিলেন না—পরে চাহিয়া দেখিলেন—মনোরমা প্রৌঢ়বয়সী মহিমাময়ী সুন্দরী।

পশুপতি কহিলেন, “মনোরমে, দোষ ভাবিও না। তুমি আমার পত্নী—আমাকে বিবাহ কর।” মনোরমা পশুপতির মুখপ্রতি তীব্র কটাক্ষ করিয়া কহিলেন,

“পশুপতি! কেশবের কন্যা কোথায়?”

পশুপতি কহিলেন, “কেশবের কন্যা কোথায় জানি না—জানিতেও চাহি না। তুমি আমার একমাত্র পত্নী।” ম। “আমি জানি কেশবের কন্যা কোথায়—বলিব?”

পশুপতি অবাক্ হইয়া মনোরমার মুখপ্রতি চাহিয়া রহিলেন। মনোরমা বলিতে লাগিলেন,

এক জন জ্যোতির্ব্বিদ গণনা করিয়া বলিয়াছিল যে কেশবের কন্যা অল্পবয়সে বিধবা হইয়া স্বামীর অনুমৃতা হইবেন। কেশব এই কথায়, অল্পকালে কন্যার বিয়োগ শঙ্কা করিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছিলেন। তিনি ধর্ম্মনাশ ভয়ে অগত্যা কন্যাকে পাত্রস্থা করিলেন, কিন্তু বিধিলিপি খণ্ডাইবার ভরসায় বিবাহের রাত্রেই কন্যা লইয়া প্রয়াগধামে পলায়ন করিলেন। তাঁহার অভিলাষ এই ছিল যে তাঁহার কন্যা স্বামীর মৃত্যু সম্বাদ কস্মিন্‌কালে না পাইতে পারেন। দৈবাধীন কিয়ৎকাল পরে প্রয়াগে কেশবের মৃত্যু হইল। তাঁহার কন্যা পূর্ব্বেই মাতৃহীনা হইয়াছিল—এক্ষণে মৃতুকালে কেশব হৈমবতীকে উপাধ্যায়ের হস্তে সমর্পণ করিয়া গেলেন। মৃত্যুকালে কেশব উপাধ্যায়কে এই কথা বলিয়া গেলেন, ‘গুরো!—এই অনাথা কন্যাকে আপন গৃহে রাখিয়া প্রতিপালন করিবেন। ইহার স্বামী পশুপতি—কিন্তু জ্যোতির্ব্বিদেরা বলিয়া গিয়াছেন যে ইনি অল্পবয়সে স্বামীর অনুমৃতা হইবেন। অতএব আপনি আমার নিকট প্রতিশ্রুত হউন, যে এই কন্যাকে কখন জ্ঞাত করাইবেন না যে পশুপতি ইহার স্বামী। অথবা পশুপতিকে কখন জানাইবেন না যে ইনি তাঁহার পত্নী।”

উপাধ্যায় তদ্রূপ প্রতিশ্রুত হইলেন। সেই পর্য্যন্ত তিনি তাহাকে পরিবারস্থা করিয়া প্রতিপালন করিয়া তোমার সহিত বিবাহের কথা গোপন করিয়াছেন।”

প। “এখন সে কন্যা কোথায়?” ম। “আমিই কেশবের কন্যা—জনার্দ্দন শর্ম্মা তাঁহার উপাধ্যায়।”

পশুপতি চিত্ত হারাইলেন; তাঁহার মস্তক ঘূরিতে লাগিল। তিনি বাঙ্‌নিষ্পত্তি না করিয়া প্রতিমাসমীপে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলেন। পরে গাত্রোত্থান করিয়া মনোরমাকে বক্ষে ধারণ করিতে গেলেন। মনোরমা পূর্ব্ববৎ সরিয়া দাঁড়াইলেন। কহিলেন,

“এখন নয়—আরও কথা আছে।”

প। “মনোরমে—রাক্ষসি! এতদিন কেন আমাকে এ অন্ধকারে রাখিয়াছিলে?”

ম। “কেন? তুমি কি আমার কথায় বিশ্বাস করিতে?”

প। “মনোরমে, তোমার কথায় কবে আমি অবিশ্বাস করিয়াছি? আর যদিই আমার অপ্রত্যয় জন্মিত, তবে আমি জনার্দ্দন শর্ম্মাকে জিজ্ঞাসা করিতে পারিতাম।”

ম। “জনার্দ্দন কি তাহা প্রকাশ করিতেন? তিনি শিষ্যের নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আছেন।”

প। “তবে তোমার কাছে প্রকাশ করিলেন কেন?”

ম। তিনি আমার নিকট প্রকাশ করেন নাই। একদিন গোপনে ব্রাহ্মণীর নিকট প্রকাশ করিতেছিলেন। আমি দৈবাৎ গোপনে থাকিয়া শুনিয়াছিলাম। আরও, আমি বিধবা বলিয়া পরিচিতা। তুমি আমার কথায় প্রত্যয় করিলে লোকে প্রত্যয় করিবে কেন? তুমি জনসমাজে নিন্দনীয় না হইয়া কি প্রকারে আমাকে গ্রহণ করিতে?”

প। “আমি সকল লোককে একত্রিত করিয়া তাহাদিগকে বুঝাইয়া বলিতাম।”

ম। “ভাল, তাহাই হউক—জ্যোতির্ব্বিদের গণনা?” প। “আমি গ্রহশান্তি করাইতাম। ভাল, যাহা হইবার তাহা হইয়া গিয়াছে। এক্ষণে যদি আমি রত্ন পাইয়াছি, তবে আর তাহা কণ্ঠচ্যুত করিব না। তুমি আর আমার গৃহ ত্যাগ করিয়া যাইতে পারিবে না।”

মনোরমা কহিলেন, “এ গৃহ ত্যাগ করিতে হইবে। পশুপতি, আমি যাহা আজি বলিতে আসিয়াছিলাম, তাহা বলি শুন। এ গৃহ ত্যাগ কর। তোমার রাজ্যলাভের দুরাশা ত্যাগ কর। প্রভুর প্রতি অহিতাচরণের কল্পনা ত্যাগ কর। এ দেশ ত্যাগ কর। চল, আমরা কাশীধামে যাত্রা করি। সেইখানে আমি তোমার চরণ সেবা করিয়া জীবন সার্থক করিব। যে দিন আমাদিগের আয়ুঃশেষ হইবে, একত্রে পরমধামে যাত্রা করিব। যদি ইহা স্বীকৃত হও—আমার ভক্তি অচলা থাকিবে। নহিলে—”

প। “নহিলে কি?”

মনোরমা তখন, উন্নতমুখে, সবাস্পলোচনে, দেবীপ্রতিমার সম্মুখে দাঁড়াইয়া, যুক্তকরে, গদ্গদ কণ্ঠে কহিলেন, “নহিলে, দেবী সমক্ষে শপথ করিতেছি তোমায় আমায় এই সাক্ষাৎ। এ জন্মে আর সাক্ষাৎ হইবে না।”

পশুপতিও দেবীর সমক্ষে বদ্ধাঞ্জলি হইয়া দাঁড়াইলেন। বলিলেন,

“মনোরমে—আমিও শপথ করিতেছি, আমার জীবন থাকিতে তুমি আমার গৃহ ত্যাগ করিয়া যাইতে পাইবে না। মনেরমে, আমি যে পথে পদার্পণ করিয়াছি—সে পথ হইতে ফিরিবার উপায় থাকিলে আমি ফিরিতাম—তোমাকে লইয়া সর্ব্বত্যাগী হইয়া কাশী যাত্রা করিতাম। কিন্তু অনেক দূর গিয়াছি; আর ফিরিবার উপায় নাই—যে গ্রন্থি বদ্ধ করিয়াছি তাহা আর খুলিতে পারি না—স্রোতে ভেলা ভাসাইয়া আর ফিরাইতে পারি না। যাহা ঘটিবার তাহা ঘটিয়াছে। তাই বলিয়া কি আমার পরম সুখে আমি বঞ্চিত হইব? তুমি আমার পত্নী—আমার কপালে যাই থাকুক, আমি তোমাকে গৃহিণী করিব। তুমি ক্ষণেক অপেক্ষা কর—আমি শীঘ্র আসিতেছি।” এই বলিয়া পশুপতি শীঘ্র মন্দির হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেলেন। মনোরমার চিত্তে সংশয় জন্মিল। তিনি চিন্তিতান্তঃকরণে কিয়ৎক্ষণ মন্দির মধ্যে দাঁড়াইয়া রহিলেন। আর একবার পশুপতির নিকট বিদায় না লইয়া যাইতে পারিলেন না।

অল্পকাল পরেই পশুপতি ফিরিয়া আসিলেন। বলিলেন, “রাণাধিকে! আজি আর তুমি আমাকে ত্যাগ করিয়া যাইতে পারিবে না। আমি সকল দ্বার রুদ্ধ করিয়া আসিয়াছি।”

মনোরমা বিহঙ্গিনী পিঞ্জরে বন্ধ হইল।

তৃতীয় খণ্ড · তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

হেতু—ধূমাৎ।

মনোরমা এবং হেমচন্দ্র গৃহ মধ্যে প্রবেশ করিলে মৃণালিনীকে বিদায় দিয়া গিরিজায় উপবন গৃহ প্রদক্ষিণ করিতে লাগিলেন। যেখানে যেখানে বাতায়নপথ মুক্ত দেখিলেন, সেই খানে সাবধানে মূখ উন্নত করিয়া গৃহমধ্যে দৃষ্টিপাত করিলেন। এক কক্ষে হেমচন্দ্রকে শয়ানাবস্থায় দেখিতে পাইলেন; দেখিলেন তাঁহার শয্যোপরি মনােরমা বসিয়া আছে। গিরিজায়া সেই বাতায়নতলে উপবেশন করিলেন। পূর্ব্বরাত্রে সেই বাতায়ন পথে যবন হেমচন্দ্রকে দেখা দিয়াছিল।

বাতায়নতলে উপবেশনে গিরিজায়ার অভিপ্রায় এই ছিল যে, হেমচন্দ্র মনােরমায় কি কথােপকথন হয়, তাহা বিরলে থাকিয়া শ্রবণ করেন। কিন্তু হেমচন্দ্র নিদ্রাগত, কোন কথোপকথনই ত হয় না। একাকী নীরবে সেই বাতায়নতলে বসিয়া গিরিজায়ার বড়ই কষ্ট হইল। কথা কহিতে পারেন না, হাসিতে পারেন না, ব্যঙ্গ করিতে পারেন না, বড়ই কষ্ট—স্ত্রী রসনা কণ্ডূয়িত হইয়া উঠিল মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন—সেই
পাপিষ্ঠ দিগ্বিজয়ই বা কোথায়? তাহাকে পাইলেও ত মুখ খুলিয়া বঁচি। কিন্তু দিগ্বিজয় গৃহমধ্যে প্রভুর কার্য্যে নিযুক্ত ছিল—তাহারও সাক্ষাৎ পাইলেন না। তখন অন্য পাত্রাভাবে গিরিজায়া আপনার সহিত মনে মনে কথােপকথন আরম্ভ করিলেন। সে কথােপকথন শুনিতে পাঠক মহাশয়ের কৌতূহল জন্মিয়া থাকিলে, প্রশ্নোত্তরছলে তাহা জানাইতে পারি। গিরিজায়াই প্রশ্নকর্ত্রী, গিরিজায়াই উত্তর দাত্রী।

প্র। ওলাে তুই বসিয়া কেলো?

উ। গিরিজায়া লাে।

প্র। এখানে কেন লো?

উ। মৃণালিনীর জন্যে লো।

প্র। মৃণালিনী তাের কে?

উ। কেহ না।

প্র। তবে তার জন্যে তাের এত মাথা ব্যথা কেন?

উ। আমার আর কাজ কি? বেড়িয়া বেড়িয়া কি করিব?

প্র। মৃণালিনীর জন্যে এখানে কেন?

উ। এখানে তার একটী শিকলী কাটা পাখী আছে।

প্র। পাখী ধরিয়া নিয়ে যাবি না কি?

উ। শিকলী কেটে থাকে ত ধরিয়া কি করিব? ধরিবই বা কিরূপে?

প্র। তবে বসিয়া কেন?

উ। দেখি শিকল কেটেছে কি না।

প্র। কেটেছে না কেটেছে, জেনে কি হইবে?

উ। পাখীটীর জন্যে মৃণালিনী প্রতি রাত্রে কত লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে—আজি না জানি কতই কাঁদবে যদি ভাল সম্বাদ লইয়া যাই তবে অনেক রক্ষা হবে।

প্র। আর যদি শিকলী কেটে থাকে?

উ। মৃণালিনীকে বলিব, যে পাখী হাত ছাড়া হয়েছে—রাধাকৃষ্ণ নাম শুনিবে ত আবার বনের পাখী ধরিয়া আন। পড়া পাখীর আশা ছাড়। পিঁজরা খালি রাখিওনা।

প্র। মর ছুঁড়ি ভিখারির মেয়ে? তুই আপনার মনের মত কথা বলিলি! মৃণালিনী যদি রাগ করিয়া পিঁজরা ভাঙ্গিয়া ফেলে?

উ। ঠিক্ বলেছিস্ সই! তা সে পারে। বলা হবে না।

প্র। তবে এখানে বসিয়া রোদ্রে পুড়িয়া মরিস কেন?

উ। বড় মাতা ধরিয়াছে ভাই। এই যে ছুঁড়ী ঘরের ভিতর বসিয়া আছে—এ ছুঁড়ী বােবা–নহিলে এখনও কথা কয় কেন? মেয়ে মানুষের মুখ—এখনও বন্ধ?

ক্ষণেক পরে গিরিজায়ার মনস্কাম সিদ্ধ হইল। হেমচন্দ্রের নিদ্রাভঙ্গ হইল। তখন মনােরমা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন।

“কেমন তােমার ঘুম হইয়াছে?”

হ। “বেশ ঘুম হইয়াছে।”

ম। “এখন বল কি প্রকারে আঘাত পাইলে?”

তখন হেমচন্দ্র রাত্রের ঘটনা সংক্ষেপে বিবরিত করিলেন। শুনিয়া মনােরমা চিন্তা করিতে লাগিলেন।

হেমচন্দ্র কহিলেন, “তােমার জিজ্ঞাস্য শেষ হইল। আমার কথার উত্তর দাও। কালি রাত্রে তুমি আমার সঙ্গ পরিত্যাগ করিয়া গেলে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল সকল বল।”

মনােরমা মৃদু মৃদু, অস্ফূট স্বরে কি বলিলেন। গিরিজায়া তাহা শুনিতে পাইলেন না। বুঝিলেন চুপি চুপি কি কথা হইল।

গিরিজায় আর কোন কথা না শুনিতে পাইয়া গাত্রেত্থান করিলেন। তখন পূনর্ব্বার প্রশ্নোত্তর মালা মনােমধ্যে গ্রন্থিত হইতে লাগিল।

প্রশ্ন। কি বুঝিলে?

উত্তর। কয়েকটী লক্ষণ মাত্র।

প্র। কি কি লক্ষণ?

গিরিজায়া অঙ্গুলিতে গণিতে লাগিলেন, এক, মেয়েটী আশ্চর্য্য সুন্দরী; আগুনের কাছে ঘৃত কি তরল থাকে? দুই—মনােরমা ত হেমচন্দ্রকে ভাল বাসে, নহিলে এত যত্ন করিল কেন? তিন, একত্রে বাস। চারি, একত্রে রাত্রে পর্যটন। পাঁচ, চুপি চুপি কথা।

প্র। মনােরমা ভালবাসে; হেমচন্দ্রের কি?

উ। বাতাস না থাকিলে কি জলে ঢেউ হয়? আমাকে যদি কেহ ভাল বাসে আমি তাহাকে ভাল বাসিব সন্দেহ নাই।

প্র। কিন্তু মৃণালিনীও ত হেমচন্দ্রকে ভাল বাসে তবে ত হেমচন্দ্র মৃণালিনীকে ভালবাসিবেই।

উ। যথার্থ। কিন্তু মৃণালিনী অনুপস্থিত, মনােরমা উপস্থিত। দূর হইতে চুম্বক পাতর লােহাকে টানে না।

এই ভাবিয়া গিরিজায়া ধীরে ধীরে গৃহের দ্বারদেশে আসিয়া দাঁড়াইলেন। তথায় একটী গীত আরম্ভ করিয়া কহিলেন,

“ভিক্ষা দাও গো।”

দ্বিতীয় খণ্ড · তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

নৌকা-যানে।

হেমচন্দ্র ত উপবন গৃহে সংস্থাপিত হইলেন। আর মৃণালিনী? নির্ব্বাসিতা, পরপীড়িতা, সহায়হীনা মৃণালিনী কোথায়?

সান্ধ্যগগনে রক্তিম মেঘমালা কাঞ্চনবর্ণ ত্যাগ করিয়া ক্রমে ক্রমে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করিল। রজনীদত্ত তিমিরাবরণে গঙ্গার বিশাল হৃদয় অস্পষ্টীকৃত হইল। সভামণ্ডলে পরিচারক হস্তজ্বালিত দীপমালার ন্যায় অথবা প্রভাতে উদ্যানকুসুম সমূহের ন্যায়, আকাশে নক্ষত্রগণ ফুটিতে লাগিল। প্রায়ান্ধকারে নদীহৃদয়ে নৈশ সমীরণ কিঞ্চিৎ খরতর বেগে বহিতে লাগিল। তাহাতে রমণীহৃদয়ে নায়ক সংস্পর্শ জনিত প্রকল্পের ন্যায়, নদীবক্ষে তরঙ্গ উত্থিত হইতে লাগিল। কূলে তরঙ্গাভিঘাতজনিত ফেনপুঞ্জে, শ্বেতপুষ্পমালা গ্রন্থিত হইতে লাগিল। বহুলোকের কোলাহলের ন্যায় বীচিরব উত্থিত হইল। নাবিকেরা নৌ সকল তীরলগ্ন করিয়া রাত্রের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা করিতে লাগিল। তন্মধ্যে একখানি ছােট ডিঙ্গী অন্য নৌকা হইতে পৃথক্‌ এক খালের মুখে লাগিল। নাবিকেরা আহারাদির ব্যবস্থা করিতে লাগিল।

ক্ষুদ্র তরণীতে দুইটীমাত্র আরােহী। দুইটাই স্ত্রীলােক। পাঠককে বলিতে হইবে না যে ইহারা মৃণালিনী আর গিরিজায়া।

গিরিজায়া মৃণালিনীকে সম্বোধন করিয়া কহিল “আজিকার দিন কাটিল।”

মৃণালিনী কোন উত্তর করিলেন না।

গিরিজায়া পুনরপি কহিল, “কালিকার দিনও কাটিবে—পরদিনও কাটিবে—কেন কাটিবে না?”

মৃণালিনী তথাপি কোন উত্তর করিলেন না। কেবলমাত্র দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিলেন।

গিরিজায়া কহিল, “ঠাকুরাণী এ কি এ? দিবানিশি চিন্তা করিয়া কি হইবে? যদি আমাদিগের নবদ্বীপ যাত্রা অকর্ত্তব্য কর্ম্ম হইয়া থাকে, চল এখনও ফিরিয়া যাই।”

মৃণালিনী এবার উত্তর করিলেন। বলিলেন, “কোথায় যাইব?”

গি। “চল হৃষীকেশ গৃহে যাই।”

মৃ। “বরং এই গঙ্গাজলে অবগাহন করিয়া মরিব।”

গি “চল তবে মথুরায় যাই।”

মৃ। “আমি ত রলিয়াছি তথায় আমার স্থান নাই। কূলটার ন্যায় রাত্রিকালে যে পিতার গৃহ ত্যাগ করিয়া আসিয়াছি, কি বলিয়া সে পিতার গৃহে আর মুখ দেখাইব?”

গি। “কিন্ত তুমি ত আপন ইচ্ছায় আইস নাই, অসৎ জভিপ্রায়েও আইস নাই। যাইতে ক্ষতি কি?”

মৃ। “সে কথা কে বিশ্বাস করিবে? যে পিতার গৃহে আদরের গৃহিণী ছিলাম সে পিতার গৃহে ঘৃনিত হইয়াই বা কি প্রকারে থাকিব?”

গিরিজায়া অন্ধকারে দেখিতে পাইল না, যে মৃণালিনীর চক্ষুঃ হইতে বারিবিন্দুর পর বারিবিন্দু পড়িতে লাগিল। গিরিজয়া কহিল “তবে কোথায় যাইবে?”

মৃ। “যেখানে যাইতেছি।”

গি। “সে ত সুখের যাত্রা! তবে অন্যমন কেন? যাহাকে দেখিতে ভাল বাপি তাহাকে দেখিতে যাইতেছি ইহার অপেক্ষা সুখ আর কি আছে?”

মৃ। “নবদ্বীপে আমার সহিত হেমচন্দ্রের সাক্ষাৎ হইবে না।”

গি। “কেন? তিনি কি সেখানে নাই?”

মৃ। “সেইখানেই আছেন। কিন্ত তুমি ত জান যে আমার সহিত এক বৎসর অসাক্ষাৎ তাঁহার ব্রত। আমি কি সে ব্রত ভঙ্গ করাইব?”

গিরিজায়া নীরব হইয়া রহিল। মৃণীলিনী আবার কহিলেন, “আর কি বলিয়াই বা তাঁহার নিকট দাঁড়াইব? আমি কি বলিব যে হৃশীকেশের উপর রাগ করিয়া আসিয়াছি না বলিব যে হৃষীকেশ আমাকে কুলটা বলিয়া বিদায় করিয়া দিয়াছেন?”

গিরিজায়া ক্ষণেক নীরব থাকিয়া কহিল, “তবে কি নবদ্বীপে তোমার সঙ্গে হেমচন্দ্রের সাক্ষাৎ হইবে না?”

মৃ। “না।”

গি। “তবে যাইতেছ কেন?”

মৃ। “তিনি আমাকে দেখিতে পাইবেন না কিন্তু আমি তাঁহাকে দেখিব। তাঁহাকে দেখিতেই যাইতেছি।” গিরিজায়ার মুখে হাসি ধরিল না। বলিল “তবে আমি গীত গাই।”

চরণ তলে দিনু হে শ্যাঁম পরাণ রতন।

দিবনা তোমারে নাথ মিছার যৌবন॥

এ রতন সমতুল, ইহা তুমি দিবে মূল,

দিবানিশি মোরে নাথ দিবে দরশন॥

ঠাকুরাণী, তুমি তাঁহাকে দেখিয়া ত জীবন ধারণ করিবে; আমি তোমার দাসী হইয়াছি আমার ত তাহাতে পেট ভরিবে না, আমি কি খেয়ে বাঁচিব?”

মৃ। “আমি দুই একটা শিল্পকর্ম জানি। মালা গাঁথিতে জানি, চিত্র করিতে জানি, বস্ত্রে কারুকার্য্য করিতে জানি। তুমি বিপণে আমার শিল্পরচনা বিক্রয় করিয়া দিবে?”

গিরি। “আর আমি ঘরে ঘরে গীত গাইব। “মৃণাল অধমে” গাইব কি?”

মৃণালিনী অর্দ্ধসহাস্য, অর্দ্ধসকোপ দৃষ্টিতে গিরিজায়ার প্রতি কটাক্ষ করিলেন।

গিরিজায়া কহিলেন, “অমন করিয়া চাহিলে আমি গীত গাইব।” এই বলিয়া গাইল।

সাধের তরণী আমার কে দিল তরঙ্গে।

কে আছে কাণ্ডারী হেন, কে যাইবে সঙ্গে॥

মৃণালিনী কহিল “যদি এত ভয় তবে একা এলে কেন?”

গিরিজায়া কহিলেন “আগে কি জানি।” বলিয়া গাইতে লাগিল।

“ভাসল তরি সকাল বেলা, ভাবিলাম এ জল খেলা

মধুর বহিবে বায়ু ভেসে যাব রঙ্গে।

গগনে গরজে ঘন, বহে খর সমীরণ,

কূল ত্যজি এলাম কেন? মরিতে আতঙ্গে॥”

মৃণালিনী কহিল, “কুলে ফিরিয়া যাওনা কেন?”

গিরিজায়া গাইতে লাগিল।

“মনে করি কূলে ফিরি, বাহি তরি ধীরি ধীরি,

কূলেতে কণ্টক তরু, বেষ্টিত ভূজঙ্গে।”

মৃণালিনী কহিল “তবে ডুবিয়া মর না কেন?”

গিরিজায়া কহিল, “মরি তাহাতে ক্ষতি নাই কিন্তু” বলিয়া আবার গাইল।

“যাহারে কাণ্ডারী করি, সাজাইয়া দিনু তরি;

সে কভু দিল না পদ; তরণীর অঙ্গে॥”

মৃণালিনী কহিলেন, “গিরিজায়া, এ কোন্‌ অপ্রেমিকের গান।”

গি। “কেন?”

মৃ। “আমি হইলে তরি ডুবাই।”

গি। “সাধ করিয়া?”

মৃ। “সাধ করিয়া।”

গি। “তবে তুমি জলের ভিতর কি দেখিয়াছ?”

মৃ। “দেখিয়াছি।”

গি। “কি দেখিয়াছ?”

মৃ। রত্ন

রাগিণী মল্লার—তাল কাওয়ালি।

রাগিণী—সিন্ধু ভৈরবী—তাল আড়া

প্রথম খণ্ড · তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

আচার্য্য।

ইহার কিছু দিন পরে, একদিন প্রয়াগতীর্থে, গঙ্গা যমুনা সঙ্গমে, অপূর্ব্ব প্রাবৃট্‌দিনান্তশোভা প্রকটিত হইতেছিল। প্রাবৃট্‌কাল, কিন্তু মেঘ নাই, অথবা যে মেঘ আছে, তাহা স্বর্ণময় তরঙ্গমালাবৎ পশ্চিম গগনে বিরাজ করিতেছিল। সূর্য্যদেব অস্তে গমন করিয়াছিলেন। বর্ষার জলসঞ্চারে গঙ্গা যমুনা উভয়েই সম্পূর্ণশরীরা, যৌবনের পরিপূর্ণতায় উন্মাদিনী যেন দুই ভগিনী ক্রীড়াচ্ছলে পরস্পরে আলিঙ্গন করিতেছিল। চঞ্চল বসনাগ্রভাগবৎ তরঙ্গমালা পবনতাড়িত হইয়া কূলে প্রতিঘাত করিতেছিল। বর্ষাকালে সেই গঙ্গা যমুনা সঙ্গমের জলময় শোভা যে না দেখিল তাহার বৃথায় চক্ষুঃ।

একখানি ক্ষুদ্রতরণীতে দুই জন মাত্র নাবিক। তরণী অসঙ্গত সাহসে সেই দুর্দ্দমনীয় যমুনার স্রোতােবেগে আরােহণ করিয়া, প্রয়াগের ঘাটে আসিয়া লাগিল। একজন নৌকায় রহিল একজন তীরে নামিল। ঘাটের উপরে, সংসারবিরাগী পুণ্যপ্রয়াসীদিগের কতকগুলিন আশ্রম আছে। তন্মধ্যে একটি ক্ষুদ্র কুটীরে আগত ব্যক্তি প্রবেশ করিলেন।

কুটীর মধ্যে এক ব্রাহ্মণ কুশাসনে উপবেশন করিয়া জপে নিযুক্ত ছিলেন; ব্রাহ্মণ অতি দীর্ঘাকার পুরুষ; শরীর শুষ্ক; আয়ত মুখমণ্ডলে শ্বেতশ্মশ্রু বিরাজিত; ললাট ও বিরলকেশ তালুদেশে অল্পমাত্র বিভূতিশােভা। ব্রাহ্মণের কান্তি গম্ভীর এবং কটাক্ষ কঠিন; দেখিলে তাহাকে নির্দ্দয় বা অভক্তিভাজন বলিয়া বােধ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, অথচ শঙ্কা হইত। আগন্তুককে দেখিবামাত্র তাঁহার সে পরুষভাব যেন দূর হইল, মুখের গাম্ভীর্য্য মধ্যে প্রসাদের সঞ্চার হইল। আগন্তুক ব্রাহ্মণকে প্রণাম করিয়া সম্মুখে দণ্ডায়মান হইলেন। ব্রাহ্মণ আশীর্ব্বাদ করিয়া কহিলেন,

“বৎস হেমচন্দ্র, আমি অনেক দিবসাবধি তােমার প্রতীক্ষা করিতেছি।”

হেমচন্দ্র বিনীতভাবে কহিলেন, “অপরাধ গ্রহণ করিবেন না, দিল্লীতে কার্য্য সিদ্ধ হয় নাই। পরন্তু যবন আমার পশ্চাদ্গামী হইয়াছিল; এই জন্য কিছু সতর্ক হইয়া আসিতে হইয়াছিল। তদ্ধেতু বিলম্ব হইয়াছে।”

ব্রাহ্মণ কহিলেন, “দিল্লীর সম্বাদ আমি সকল শুনিয়াছি। যােগমায়ার দর্শনে আমার শিষ্য দেবিদাস গমন করিয়াছিলেন। তােমার সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইয়াছিল, তােমার স্মরণ থাকিতে পারে। তিনি আমার নিকট সকল পরিচয় দিয়াছেন। এবং ইহাও বলিয়াছেন, যে এক রাত্রি তুমি তাঁহার আশ্রমে লুক্কায়িত ছিলে। এক্ষণে যে যবন রাজার চরেরা তোমার অনুসরণ করিয়াছিল তাহারা কি প্রকারে নিবৃত্ত হইল?”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “তাহারা যমুনা-জলচরের উদরে পরিপক্ক হইতেছে। ও শ্রীচরণ আশীর্ব্বাদে সকল বিপদ্ হইতে উদ্ধার পাইয়াছি।”

ব্রাহ্মণ কহিলেন, “অনর্থক বিপদ্‌কে কেনই নিমন্ত্রিত করিয়া আন? কেবল ক্রীড়া কৌতূহলের বশীভূত হইয়া বিপদাগার যবনদুর্গমধ্যে কেন প্রবেশ করিয়াছিলে?”

হেম। “যবনদুর্গমধ্যে প্রবেশ করিবার উদ্দেশ্য এই, যে তাহা না করিলে যবনদিগের মন্ত্রণা কিছুই অবগত হইতে পরিতাম না। আর অসতর্ক হইয়াও আমি দুর্গমধ্যে প্রবেশ করি নাই। আমার অনুগত ভৃত্য দিগ্বিজয় যবনবেশে দুর্গ নিকটে আমার অশ্ব রক্ষা করিতেছিল। আমার পূর্ব্বপ্রদত্ত আদেশানুসারেই আমার নির্গমনের বিলম্ব দেখিয়া দুর্গমধ্যে অশ্ব লইয়া গিয়াছিল। ঐ উৎসবের দিন ভিন্ন, প্রবেশের এমত সুযোগ হইত না, এজন্য ঐ দিন দুর্গমধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলাম।”

ব্রাহ্মণ কিঞ্চিৎ পরুষভাবে কহিলেন, “এ সকল ঘটনা ত অনেক দিন হইয়া গিয়াছে, ইহার পূর্ব্বে তোমার এখানে আসার সম্ভাবনা ছিল। তুমি কেন বিলম্ব করিলে? তুমি মথুরায় গিয়াছিলে?”

হেমচন্দ্র অধোবদন হইলেন। ব্রাহ্মণ কহিলেন “বুঝিলাম তুমি মথুরায় গিয়াছিলে। আমার নিষেধ গ্রাহ্য কর নাই। যাহাকে দেখিতে মথুরায় গিয়াছিলে, তাহার কি সাক্ষাৎ পাইয়াছ?”

এবার হেমচন্দ্র রুক্ষভাবে কহিলেন “সাক্ষাৎ যে পাইলাম সে আপনারই দয়া। মৃণালিনীকে আপনি কোথায় প্রেরণ করিয়াছেন?”

মাধবাচার্য্য কহিলেন, “আমি যে কোথায় পাঠাইয়াছি, তাহা তুমি কি প্রকারে সিদ্ধান্ত করিলে?”

হে। “মাধবাচার্য্য ভিন্ন এ মন্ত্রণা কাহার? আমি মৃণালিনীর ধাত্রীর মুখে শুনিলাম যে মৃণালিনী আমার অঙ্গুরীয় দেথিয়া কোথায় গিয়াছে আর তাহার উদ্দেশ নাই। আমার অঙ্গুরীয় আপনি পাথেয় জন্য ভিক্ষা স্বরূপ লইয়াছিলেন। অঙ্গুরীয়ের পরিবর্ত্তে অন্য রত্ন দিতে চাহিয়াছিলাম কিন্তু আপনি গ্রহণ করেন নাই। তৎকালেই আমি সন্দিহান হইয়াছিলাম, কিন্তু আপনাকে অদেয় আমার কিছুই নাই এই জন্যই বিনা বিবাদে অঙ্গুরীয় প্রদান করিয়াছিলাম। কিন্তু আমার সে অসতর্কতার আপনিই সমুচিত প্রতিফল দিয়াছেন।”

মাধবাচার্য্য কহিলেন, “যদি তাহাই হয়, আমার উপর রাগ করিও না। তুমি দেবকার্য্য না সাধিলে কে সাধিবে? তুমি যবনকে না দূরীকৃত করিলে কে করিবে? যবন নিপাত তোমার এক মাত্র ধ্যান স্বরূপ হওয়া উচিত। এখন মৃণালিনী তোমার হৃদয়ের অর্দ্ধভাগিনী হইবে কেন? এক বার তুমি মৃণালিনীর আশায় মথুরায় বসিয়াছিলে বলিয়া তুমি পিতৃরাজ্যভ্রষ্ট হইয়াছ। যবনাগমনকালে হেমচন্দ্র যদি মথুরায় না থাকিয়া মগধে থাকিত, তবে মগধ জয় কেন হইবে? আবার কি সেই মৃণালিনীপাশে বদ্ধ হইয়া নিশ্চেষ্ট হইয়া থাকিবে! মাধবাচার্য্যের জীবন থাকিতে তাহা হইবে না সুতরাং যেখানে থাকিলে মৃণালিনী তোমার দুষ্প্রাপণীয়া হইবে, আমি তাহাকে সেইখানে রাখিয়াছি।”

হে। “আপনার দেবকার্য্য আপনি উদ্ধার করুন; আমি অবসৃত হইলাম।”

মা। “তোমার দুর্ব্বুদ্ধি ঘটিতেছে। এই কি তোমার দেবভক্তি? ভাল তাহাই না হউক, দেবতারা আত্মকর্ম্ম সাধন জন্য তোমার ন্যায় মনুষ্যের সাহায্যের অপেক্ষা করেন না। কিন্তু তুমি কাপুরুষ যদি না হও, তবে তুমি কি প্রকারে শত্রুশাসন হইতে অবসৃত হইতে চাও; এই কি তোমার বীরগর্ব্ব? এই কি তোমার শিক্ষা? রাজবংশে জন্মিয়া কি প্রকারে আপন অপহৃত রাজ্যোদ্ধারে বিমুখ হইতে চাহিতেছ?”

হে। “রাজ্য—শিক্ষা—গর্ব্ব অতল জলে নিমগ্ন হউক।”

মা। “নরাধম! তোমার জননী কেন তোমাকে দশমাস দশদিন গর্ব্ভে ধারণ করিয়া যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছিল? কেনই বা দ্বাদশবর্ষ দেবারাধনা ত্যাগ করিয়া এ পাষণ্ডকে সর্ব্ববিদ্যা শিখাইলাম?”

মাধবাচার্য্য অনেক ক্ষণ নীরবে করলগ্নকপোল হইয়া রহিলেন। ক্রমে হেম চন্দ্রের অনিন্দ্য গৌর মুখকান্তি মধ্যাহ্ন-মরীচি-বিশোষিত স্থলপদ্মবৎ আরক্ত বর্ণ হইয়া আসিতেছিল; কিন্তু গর্ভাগ্নি গিরি-শিখর তুল্য, তিনি স্থির ভাবে দাঁড়াইয়া রহিলেন। পরিশেষে মাধবাচার্য্য কহিলেন “হেমচন্দ্র, ধৈর্য্যাবলম্বন কর। মৃণালিনী কোথায় তাহা বলিব—মৃণালিনীর সহিত তোমার বিবাহ দেওয়াইব। কিন্তু এক্ষণে আমার পরামর্শানুবর্ত্তী হও, অগ্রে স্বকার্য্য সাধন কর।”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “মৃণালিনী কোথায় না বলিলে আমি। যবন বধ জন্য লৌহমাত্র স্পর্শ করিব না।”

মাধবাচার্য কহিলেন, “আর যদি মৃণালিনী মরিয়া থাকে?”

হেমচন্দের চক্ষু হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইল। তিনি কহিলেন “তবে সে আপনারই কাজ।” মাধবাচার্য্য কহিলেন, “আমি স্বীকার করিতেছি আমিই দেবকার্য্যের কণ্টককে, বিনষ্ট করিয়াছি।”

হেমচন্দ্রের মুখকান্তি বর্ষণোন্মুখ মেঘবৎ বর্ণ প্রাপ্ত হইল।

ত্রস্ত হস্তে ধনুকে শর সংযোজন করিয়া কহিলেন “যে মৃণালিনীর বধকর্ত্তা সে আমার বধ্য। এই শরে গুরুহত্যা ব্রহ্মহত্যা উভয় দুষ্ক্রিয়া সাধন করিব।”

মাধবাচার্য্য হাস্য করিলেন। কহিলেন, “গুরুহত্যা ব্রহ্মহত্যায় তোমার যত আমোদ, স্ত্রী হত্যায় আমার তত নহে। এক্ষণে তোমাকে পাতকের ভাগী হইতে হইবে না। মৃণালিনী জীবিতা আছে। পার তাহার সন্ধান করিয়া সাক্ষাৎ কর। এক্ষণে আমার আশ্রম হইতে স্থানান্তরে যাও। আশ্রম কলুষিত করিও না; অপাত্রে আমি কোন ভার ন্যস্ত করি না।” এই বলিয়া মাধবাচার্য্য পূর্ব্ববৎ জপে নিযুক্ত হইলেন।

হেমচন্দ্র আশ্রম হইতে নির্গত হইলেন। ঘাটে আসিয়া ক্ষুদ্র তরণী আরোহণ করিলেন। যে দ্বিতীয় ব্যক্তি নৌকায় ছিল, তাহাকে বলিলেন, “দিগ্বিজয়! নৌকা ছাড়িয়া দাও।”

দিগ্বিজয় বলিল, “কোথায় যাইব?” হেমচন্দ্র বলিলেন, “যেখানে ইচ্ছা—যমালয়।”

দিগ্বিজয় প্রভুর স্বভাব বুঝিত। অস্ফুটস্বরে কহিল, “সেটা অল্প পথ।” এই বলিয়া সে তরণী ছাড়িয়া দিয়া স্রোতের প্রতিকূলে বাহিতে লাগিল।

হেমচন্দ্র অনেক ক্ষণ নীরবে থাকিয়া শেষে কহিলেন, “দূর হউক! ফিরিয়া চল।”

দিগ্বিজয় নৌকা ফিরাইয়া পুনরপি প্রয়াগের ঘাটে উপনীত হইল। হেমচন্দ্র লম্ফ দিয়া তীরে অবতরণ করিয়া পুনর্ব্বার মাধবাচার্য্যের আশ্রমে গেলেন।

তাঁহাকে দেখিয়া মাধবাচার্য্য কহিলেন। পুনর্ব্বার কেন আসিয়াছ?”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “আপনি যাহা বলিবেন তাহাই স্বীকার করিব। মৃণালিনী কোথায় আছে আজ্ঞা করুন।”

মা। “তুমি সত্যবাদী—আমার আজ্ঞাপালন করিতে স্বীকার করিলে। ইহাতেই আমি সন্তুষ্ট হইলাম। গৌড়নগরে এক শিষ্যের বাটীতে মৃণালিনীকে রাখিয়াছি। তোমাকেও সেই প্রদেশে যাইতে হইবে, কিন্তু তুমি তাহার সাক্ষাৎ পাইবে না। শিষ্যের প্রতি আমার বিশেষ আজ্ঞা আছে যে যতদিন মৃণালিনী তাঁহার গৃহে থাকিবে ততদিন সে পুরুষান্তরের সাক্ষাৎ না পায়।”

হে। “সাক্ষাৎ না পাই যাহা বলিলেন ইহাতেই আমি চরিতার্থ হইলাম। এক্ষণে কি কার্য্য করিতে হইবে অনুমতি করুন।”

মা। “তুমি দিল্লী গিয়া যবনের মন্ত্রণা কি জানিয়া আসিআছ?”

হে। “যবনেরা বঙ্গ বিজয়ের উদ্যোগ করিতেছে। অতি ত্বরায় বখ্‌তিয়ার খিলিজি সেনা লইয়া তদ্দেশাভিমুখে যাত্রা করিবে।”

মাধবাচার্য্যের মুখ হর্ষপ্রফুল্ল হইল। তিনি কহিলেন, “এত দিনে বিধাতা বুঝি এ দেশের প্রতি সদয় হইলেন।”

হেমচন্দ্র একতানমনে মাধবাচার্য্যের প্রতি চাহিয়া তাঁহার কথার প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। মাধবাচার্য্য বলিতে লাগিলেন,

“কয় মাস পর্য্যন্ত আমি কেবল গণনায় নিযুক্ত আছি। গণনার যাহা ভবিষ্যৎ বলিয়া প্রতিপন্ন হইয়াছে তাহা ফলিবার উপক্রম হইতেছে।”

হেম। “কি প্রকার?” মা। “গণিয়া দেখিলাম যে যবন সাম্রাজ্য ধ্বংস বঙ্গরাজ্য হইতে আরম্ভ হইবে।”

হে। “তাহা হইতে পারে। কিন্তু কত কালেই বা তাহা হইবে? আর কাহা কর্ত্তৃক?”

মা। “তাহাও গণিয়া স্থির করিয়াছি। যখন পশ্চিম দেশীয় বণিক বঙ্গরাজ্যে অস্ত্র ধারণ করিবে তখন যবনরাজ্য উৎসন্ন হইবেক।”

হে। “তবে আমার জয়লাভের কোথা সম্ভাবনা? আমি ত বণিক্ নহি।”

মা। “তুমিই বণিক্। মথুরায় যখন তুমি মৃণালিনীর প্রয়াসে দীর্ঘকাল বাস করিয়াছিলে তখন তুমি কি ছলনা করিয়া তথায় বাস করিতে”

হে। “আমি তখন বণিক্ বলিয়া মথুরায় পরিচিত ছিলাম বটে।”

মা। “সুতরাং তুমিই পশ্চিমদেশীয় বণিক্। বঙ্গরাজ্যে গিয়া তুমি অস্ত্র ধারণ করিলেই যবন নিপাত হইবে। তুমি আমার নিকট প্রতিশ্রুত হও, যে কল্য প্রাতেই বঙ্গে যাত্রা করিবে। যে পর্য্যন্ত তথায় না যবনের সহিত যুদ্ধ কর, সে পর্য্যন্ত মৃণালিনীর সহিত সাক্ষাৎ করিবে না।”

হেমচন্দ্র দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, “তাহাই স্বীকার করিলাম। কিন্তু একা যুদ্ধ করিয়া কি করিব?”

মা। “বঙ্গেশ্বরের সেনা আছে।”

হে। “থাকিতে পারে—সে বিষয়েও কতক সন্দেহ; কিন্তু যদি থাকে তবে তাহারা আমার অধীন হইবে কেন?”

মা। “তুমি অগ্রগামী হও। নবদ্বীপে আমার সহিত সাক্ষাৎ হইবে। সেই খানে গিয়া ইহার বিহিত উদ্যোগ করা যাইবে। বঙ্গেশ্বরের নিকট আমি পরিচিত আছি।”

“যে আজ্ঞা” বলিয়া হেমচন্দ্র প্রণাম করিয়া বিদায় হইলেন। যতক্ষণ তাঁহার বীরমূর্ত্তি নয়নগোচর হইতে লাগিল, আচার্য্য ততক্ষণ তৎপ্রতি অনিমিক লোচনে চাহিয়া রহিলেন। আর যখন হেমচন্দ্র অদৃশ্য হইলেন, তখন মাধবাচার্য্য মনে মনে বলিতে লাগিলেন,

“যাও, বৎস! প্রতিপদে বিজয় লাভ কর! যদি ব্রাহ্মণবংশে আমার জন্ম হয়, তবে তোমার পদে কুশাঙ্কুরও বিধিবে না। মৃণালিনী! মৃণালিনী বিহগীরে আমি তোমারই জন্যে পিঞ্জরে বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছি। কিন্তু কি জানি পাছে তুমি তাহার কলধ্বনিতে বিমোহিত হইয়া পরমকার্য্য বিস্মৃত হও, তোমার পরম মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী ব্রাহ্মণ তোমাকে কিছু দিনের জন্য মনঃপীড়া দিতেছে।”

চতুর্থ খণ্ড · ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ।

মহম্মদআলির প্রায়শ্চিত্ত।

যে রাত্রে রাজধানী যবনসেনা বিপ্লবে পীড়িত হইতেছিল, সেই রাত্রে পশুপতি একাকী কারাগারে অবরুদ্ধ ছিলেন। নিশাবশেষে সেনাবিপ্লব সমাপ্ত হইয়া গেল। মহম্মদআলি তখন তাঁহার সম্ভাষণে আসিলেন। পশুপতি কহিলেন,

“যবন!—প্রিয় সম্ভাষণে আর আবশ্যক করে না। একবার তোমারই প্রিয়সম্ভাষণে বিশ্বাস করিয়া এই অবস্থাপন্ন হইয়াছি। বিধর্ম্মী যবনকে বিশ্বাস করার যে ফল তাহা প্রাপ্ত হইয়াছি। এক্ষণে আমি মৃত্যু শ্রেয়ঃকল্পনা করিয়া অন্য ভরসা ত্যাগ করিয়াছি। তোমাদিগের কোন প্রিয়সম্ভাষণ শুনিব না।”

মহম্মদআলি কহিল। “আমি প্রভুর আজ্ঞা প্রতিপালন করি। প্রভুর আজ্ঞা প্রতিপালন করিতে আসিয়াছি। আপনাকে যবন বেশ পরিধান করিতে হইবে।”

পশুপতি কহিলেন, “সে বিষয়ে চিত্তস্থির করুন। আমি এক্ষণে মৃত্যু স্থির করিয়াছি। প্রাণত্যাগ করিতে স্বীকৃত আছি— কিন্তু যবন ধর্ম্ম অবলম্বন করিব না।”

ম। “আপনাকে এক্ষণে যবনধর্ম্মাবলম্বন করিতে বলিতেছি না। কেবল মাত্র রাজ প্রতিনিধির তৃপ্তার্থ যবনের পরিচ্ছদ পরিধান করিতে বলিতেছি।”

প। “ব্রাহ্মণ হইয়া কি জন্য স্নেচ্ছের বেশ করিব?”

ম। “আপনি ইচ্ছাপূর্ব্বক না পরিলে, আপনাকে বলপূর্ব্বক পরাইব। অস্বীকারে লাভের ভাগ অপমান।”

পশুপতি উত্তর করিলেন না। মহম্মদ আলি স্বহস্তে তাঁহাকে যবন বেশ পরাইলেন। কহিলেন, “আমার সঙ্গে আসুন।”

প। “কোথায় যাইব?”

ম। “আপনি বন্দী—জিজ্ঞাসার আবশ্যক কি?”

মহম্মদ আলি তাঁহাকে সিংহদ্বারে লইয়া চলিলেন। যে ব্যক্তি পশুপতির রক্ষায় নিযুক্ত ছিল, সেও সঙ্গে সঙ্গে চলিল।

দ্বারে প্রহরিগণের জিজ্ঞাসামতে মহম্মদ আলি আপন পরিচয় দিলেন; এক সঙ্কেত করিলেন। প্রহরিগণ তাঁহাদিগকে যাইতে দিল। সিংহদ্বার হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া তিন জনে কিছু দূর রাজপথ অতিবাহিত করিলেন। তখন যবনসেনা নগরমন্থন সমাপন করিয়া বিশ্রাম করিতেছিল। সুতরাং রাজপথে আর উপদ্রব ছিল না। মহম্মদ আলি কহিলেন,

“ধর্ম্মাধিকার! আপনি আমাকে বিনা দোষে তিরস্কার করিয়াছেন। বখ্‌তিয়ার খিলিজির এরূপ অভিপ্রায় আমি কিছুই অবগত ছিলাম না। তাহা হইলে আমি কদাচ প্রবঞ্চকের বার্ত্তাবহ হইয়া আপনার নিকট যাইতাম না। যাহা হউক আপনি আমার কথায় প্রত্যয় করিয়া এরূপ দুর্দশাপন্ন হইয়াছেন। ইহার যথাসাধ্য প্রায়শ্চিত্ত করিলাম। গঙ্গাতীরে তরণী প্রস্তুতা আছে―আপনি যথেষ্ট স্থানে প্রস্থান করুন। আমি এইখান হইতে বিদায় হই।”

পশুপতি বিস্ময়াপন্ন হইয়া অবাক্‌ হইয়া রহিলেন। মহম্মদআলি পুনরপি কহিতে লাগিলেন, “আপনি এই সাবশেষা রজনীমধ্যে এ নগরী ত্যাগ করিবেন। নচেৎ কল্য প্রাতে যবনের সহিত আপনার সাক্ষাৎ হইলে প্রমাদ ঘটিবে। খিলিজির আজ্ঞার বিপরীতাচরণ করিলাম―ইহার সাক্ষী এই প্রহরী। সুতরাং আত্মরক্ষার জন্য ইহাকেও দেশান্তরিত করিলাম। ইহাকেও আপনার নৌকায় লইয়া যাইবেন।”

এই বলিয়া মহম্মদআলি বিদায় হইলেন। পশুপতি কিয়ৎকাল বিস্ময়াপন্ন হইয়া থাকিয়া গঙ্গাতীরাভিমুখে চলিলেন।

চতুর্থ খণ্ড · দশম পরিচ্ছেদ

দশম পরিচ্ছেদ।

প্রেম—নানা প্রকার।

আনন্দাশ্রু-প্লাবিত-বদনা মৃণালিনীকে হেমচন্দ্র হস্ত ধরিয়া উপবন গৃহাভিমুখে লইয়া চলিলেন। হেমচন্দ্র মৃণালিনীকে একবার অপমানিতা, তিরস্কৃতা, ব্যথিতা, করিয়া ত্যাগ করিয়া গিয়াছিলেন আবার আপনিই আসিয়া তাঁহাকে হৃদয়ে গ্রহণ করিলেন,—ইহা দেখিয়া গিরিজায়া বিস্মিত হইল; কিন্তু মৃণালিনী একটি কথাও জিজ্ঞাসা করিলেন না—একটি কথাও কহিলেন না। আনন্দ-পরিপ্লববিবশা হইয়া বসনে অশ্রুস্রুতি আবরিত করিয়া চলিলেন। গিরিজায়াকে ডাকিতে হইল না—সে স্বয়ং অন্তরে থাকিয়া সঙ্গে সঙ্গে চলিল।

উপবনবাটিকায় মৃণালিনী আসিলে তখন উভয়ে বহুদিনের হৃদয়ের কথা সকল ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। তখন হেমচন্দ্র, যে যে ঘটনায় মৃণালিনীর প্রতি তাঁহার চিত্তের বিরাগ হইয়াছিল, আর যে যে কারণে সেই বিরাগের ধ্বংস হইয়াছে তাহা বলিলেন। তখন মৃণালিনী যে প্রকারে হৃষীকেশের গৃহ ত্যাগ করিয়া ছিলেন, যে প্রকারে নবদ্বীপে আসিয়াছিলেন সেই সকল তখন উভয়েই পূর্ব্বোদিত কত হৃদয়ের ভাব পরস্পরের নিকট ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। তখন উভয়েই কত ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কল্পনা করিতে লাগিলেন। তখন কতই নূতন নূতন প্রতিজ্ঞায় বদ্ধ হইতে লাগিলেন। তখন উভয়ে নিতান্ত নিষ্প্রয়োজনীয় কত কথাই অতি আবশ্যকীয় কথার ন্যায় আগ্রহ সহকারে ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। তখন কতবার

১৭২

মৃণালিনী।

উভয়ে মোক্ষোন্মুখ অশ্রুজল কষ্টে নিবারিত করিলেন; তখন কতবার উভয়ের মুখপ্রতি চাহিয়া অনর্থক মধুর হাসি হাসিলেন—সে হাসির অর্থ “আমি এখন কত সুখী।” পরে যখন প্রভাতোদয়সূচক পক্ষিগণ রব করিয়া উঠিল, তখন কতবার উভয়েই বিস্মিত হইয়া ভাবিলেন যে “আজি এখনই রাত্রি পোহাইল কেন?”—আর সেই নগরমধ্যে যবনবিপ্লবের যে কোলাহল উচ্ছ্বসিতসমুদ্রের বীচিরববৎ উঠিতেছিল—আজি হৃদয় সাগরের তরঙ্গরবে সে রব ডুবিয়া গেল।

উপবনগৃহে আর এক স্থানে আর একটা কাণ্ড হইতেছিল। দিগ্বিজয় প্রভুর আজ্ঞামত রাত্রি জাগরণ করিয়া গৃহ রক্ষা করিতেছিল, মৃণালিনীকে লইয়া যখন হেমচন্দ্র আইসেন, তখন সে দেখিয়া চিনিল। মৃণালিনী তাহার নিকট অপরিচিতা ছিলেন না—যে কারণে পরিচিত ছিলেন, তাহা ক্রমে প্রকাশ পাইতেছে। মৃণালিনীকে দেখিয়া দিগ্বিজয় কিছু বিস্মিত হইল কিন্তু জিজ্ঞাসার সম্ভাবনা নাই; কি করে? ক্ষণেক পরে গিরিজায়াও আসিল দেখিয়া দিগ্বিজয় মনে ভাবিল “বুঝিয়াছি—ইহারা দুই জন গৌড় হইতে আমাদিগের দুই জনকে দেখিতে আসিয়াছে। ঠাকুরাণী যুবরাজকে দেখিতে আসিয়াছেন—আর এ ছুঁড়ি আমাকে দেখিতে আসিয়াছে সন্দেহ নাই।” এই ভাবিয়া দিগ্বিজয় একবার আপনার গোঁপ দাড়ি চুমরিয়া ইল, এবং ভাবিল, “না হবে কেন?” আবার ভাবিল, “এ ছুঁড়ি কিন্তু বড় নষ্ট—এক দিনের তরে কই আমাকে যে ভাল কথা বলে নাই—কেবল আমাকে গালিই দেয়—তবে ও আমাকে দেখিতে আসিবে তাহার সম্ভাবনা কি? যাহা হউক একটা পরীক্ষাই করিয়া দেখা যাউক। রাত্রি ত শেষ হইল—প্রভুও ফিরিয়া আসিয়াছেন এখন আমি পাশ কাটিয়া একটুকু শুই। দেখি মাগী আমাকে খুঁজিয়া লয় কি না?” ইহা ভাবিয়া দিগ্বিজয় এক নিভৃত স্থানে গিয়া শয়ন করিল। গিরিজায়া তাহা দেখিল।

দুর্ভাগ্যক্রমে দিগ্বিজয় রাত্রিজাগরণে ক্লান্ত ছিল শয়ন মাত্র নিদ্রাভিভূত হইয়া সকল বিস্মৃত হইল। গিরিজায়া তখন মনে মনে বলিতে লাগিল, “আমি ত মৃণালিনীর দাসী—মৃণালিনী এ গৃহের কর্ত্রী হইলেন অথবা হইবেন—তবে ত বাড়ীর গৃহকর্ম্ম করিবার অধিকার আমারই। এইরূপ মনকে প্রবোধ দিয়া গিরিজায়া একগাছা ঝাঁটা সংগ্রহ করিল এবং যে ঘরে দিগ্বিজয় শয়ন করিয়া আছে সেই ঘরে প্রবেশ করিল। দিগ্বিজয় চক্ষু বুজিয়া আছে, পদধ্বনিতে বুঝিল যে গিরিজায়া আসিল—মনে বড় আনন্দ হইল—তবেত গিরিজায়া তাঁহাকে ভাল বাসে? দেখি গিরিজায়া কি বলে? এই ভাবিয়া দিগ্বিজয় চক্ষু বুজিয়াই রহিল। অকস্মাৎ তাহার পৃষ্ঠে দুম্ দাম্ করিয়া ঝাঁটার ঘা পড়িতে লাগিল। “আঃ মলো ঘর গুলায় ময়লা জমিয়া রহিয়াছে দেখ—এ কি? এক মিন্সে চোর নাকি? মলো মিন্সে! রাজার ঘরে চুরি!” এই বলিয়া আবার সম্মার্জ্জনীর আঘাত। দিগ্বিজয়ের পিট ফাটিয়া গেল।

“ও গিরিজায়া—আমি! আমি!” “আমি! আমি! আরে তুই বলিয়াই ত খাঙ্গরা দিয়া বিছাইয়া দিতেছি।” এই বলিবার পর আবার বিরাশী সিল্কা ওজনে ঝাঁটা পড়িতে লাগিল।

“দোহাই! দোহাই! গিরিজায়া! অমি দিগ্বিজয়।” (আবার চুরি করিতে এসে আমি দিগ্বিজয়! দিগ্বিজয় কেরে মিন্সে।” ঝাঁটার বেগ আর থামে না।

দিগ্বিজয় এবার সকাতরে কহিল, “গিরিজায়া আমাকে একেবারে ভুলিয়া গেলে?” গিরিজায়া বলিল “তোর সঙ্গে আমার সঙ্গে কোন্ পুরুষে আলাপ রে মিন্সে!”

দিগ্বিজয় দেখিল নিস্তার নাই—রণে ভঙ্গ দেওয়াই পরামর্শ। দিগ্বিজয় তখন অনুপায় দেখিয়া, উর্দ্ধশ্বাসে গৃহ হইতে পলায়ন করিল। গিরিজায়া সম্মার্জ্জনী হস্তে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবিত হইল।

তৃতীয় খণ্ড · দশম পরিচ্ছেদ

দশম পরিচ্ছেদ।

এত দিনের পর।

হেমচন্দ্র মৃণালিনীকে হস্ত ধরিয়া তুলিলেন। উভয়ে উভয়ের সম্মুখীন হইয়া দাঁড়াইলেন।

এত কাল পরে, দুই জনের সাক্ষাৎ হইল। যে দিন প্রদোযকালে, যমুনার উপকূলে, নৈদাঘানিলসন্তাড়িত বকুলতলে দাঁড়াইয়া, নীলাম্বুময়ীর চঞ্চম তরঙ্গশিরে নক্ষত্ররশ্মির প্রতিবিম্ব নিরীক্ষণ করিতে করিতে উভয়ে উভয়ের নিকট সজলনয়নে বিদায় গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহার পর এই সাক্ষাৎ হইল। নিদাঘের পর বর্ষা গিয়াছে বর্ষার পর শরৎ যায়, কিন্তু ইহাদিগের হৃদয়মধ্যে যে কত দিন গিয়াছে তাহা কি ঋতু গণনায় গণিত হইতে পারে?

সেই নিশীথ সময়ে, স্বচ্ছসলিলা বাপীতীরে, দুইজনে পরস্পর সম্মুখীন হইয়া দাঁড়াইলেন। চারিদিকে, সেই নিবীড় বন, ঘনবিন্যস্ত লতাস্রগ্‌বিশোভী বিশাল বিটপী সকল দৃষ্টিপথ রুদ্ধ করিয়া দাঁড়াইয়াছিল; সম্মুখে নীলনীরদ খণ্ডবৎ দীর্ঘিকা শৈবাল-কুমুদ-কহলার সহিত বিস্তৃত রহিয়াছিল। শিরোপরে, চন্দ্র-নক্ষত্র-জলদ সহিত আকাশ আলোকে হাসিতেছিল। চন্দ্রালোক, আকাশে, বৃক্ষশিরে, লতাপল্লবে, বাপীসোপানে, নীলজলে, সর্ব্বত্র হাসিতেছিল। প্রকৃতি স্পন্দহীনা, ধৈর্যময়ী। সেই ধৈর্য্যময়ী প্রকৃতির প্রসাদ মধ্যে, মৃণালিনী, হেমচন্দ্র, মুখে মুখে দাঁড়াইলেন।

ভাষার কি শব্দ ছিল না? তাহাদিগের মনে কি বলিবার কথা ছিল না? যদি মনে বলিবার কথা ছিল, ভাষার শব্দ ছিল, তবে কেন ইহারা কথা কহে না?

মনুষ্যের একটী ব্যতীত মন নহে। তখন চক্ষেরে দেখাইতেই মন উন্মত্ত—কথা কহিবে কি প্রকারে? এমত সময়ে কেবল প্রণয়ীর নিকটে অবস্থিতিমাত্র, এত গুরুতর সুখ, যে হৃদয়মধ্যে অন্য সুখের স্থান থাকে না। যে সে সুখ ভোগ করিতে থাকে, সে আর কথার সুখ বাসনা করে না।

সে সময়ে এত কথা বলিবার থাকে, যে কোন্ কথা আগে বলিব, তাহা কেহ স্থির করিতে পারে না।

মনুষ্যভাষায় এমন কোন্ শব্দ আছে যে সে সময়ে প্রযুক্ত হইতে পারে?

তাঁহারা পরস্পরের মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। হেমচন্দ্র, মৃণালিনীর সেই প্রেমময় মুখ আবার দেখিলেন—হৃষীকেশবাক্যে প্রত্যয় দূর হইতে লাগিল। সে গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে ত প্রেমোক্তি লেখা আছে! হেমচন্দ্র তাঁহার লোচন প্রতি চাহিয়া রহিলেন, সেই অপূর্ব্ব আয়তনশালী—ইন্দীবরনিন্দিত, অন্তঃকরণের দর্পণরূপ চক্ষুঃপ্রতি চাহিয়া রহিলেন—তাহা হইতে কেবল প্রেমাশ্রুজল বহিতেছে!—সে চক্ষুঃ যাহার সে কি অবিশ্বাসিনী!

হেমচন্দ্র প্রথমে কথা কহিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “মৃণালিনি! কেমন আছ?”

মৃণালিনী উত্তর করিতে পারিলেন না। এখনও তাঁহার চিত্তশান্ত হয় নাই; উত্তরের উপক্রম করিলেন; কিন্তু আবার চক্ষু জলে ভাসিয়া গেল। কণ্ঠরুদ্ধ হইল; কথা সরিল না।

হেমচন্দ্র আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কেন আসিয়াছ?” মৃণালিনী তথাপি উত্তর করিতে পারিলেন না। হেমচন্দ্র তাঁহার হস্ত ধারণ করিয়া সোপানোপরি বসাইলেন, স্বয়ং নিকটে বসিলেন। মৃণালিনীর যে কিছু চিত্তের স্থিরতা ছিল, এই আদরে তাহা লোপ হইল। ক্রমে ক্রমে, তাঁহার মস্তক আপনি আসিয়া হেমচন্দ্রের স্কন্ধে স্থাপিত হইল, মণালিনী তাহা জানিমাও জানিতে পারিলেন না। কিন্তু আবার রোদন করিলেন— তাঁহার অশ্রুজলে হেমচন্দ্রের স্বন্ধ আর বক্ষঃ প্লাবিত হইল। এ সংসারে মৃণালিনী যত সুখ অনুভূত করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে কোন সুখই এই রোদনের তুল্য নহে।

হেমচন্দ্র আবার কথা কহিলেন। “মৃণালিনি! আমি তোমার নিকট গুরুতর অপরাধ করিয়াছি। সে অপরাধ আমায় ক্ষমা করিও। আমি তোমার নামে কলঙ্করটনা শুনিয়া তাহা বিশ্বাস করিয়াছিলাম। বিশ্বাস করিবার কতক কারণও ঘটিয়াছিল—তাহা তুমি দূর করিতে পারিবে। যাহা আমি জিজ্ঞাসা করি তাহার পরিষ্কার উত্তর দাও।”

মৃণালিনী হেমচন্দ্রের স্কন্ধ হইতে মস্তক না তুলিয়া কহিলেন “কি?”

হেমচন্দ্র বলিলেন, “তুমি হৃষীকেশের গৃহত্যাগ করিলে কেন?”

ঐ নাম শ্রবণমাত্র কুপিতা ফণিনীর ন্যায় মৃণালিনী মস্তকোত্তোলন করিলেন। কহিলেন, “হৃষীকেশ আমাকে গৃহ হইতে বিদায় করিয়া দিয়াছে।”

হেমচন্দ্র ব্যথিত হইলেন—অল্প সন্দিহান হইলেন—কিঞ্চিৎ চিন্তা করিলেন। এই অবকাশে মৃণালিনী পুনরপি হেমচন্দ্রের স্কন্ধে মস্তক রাখিলেন। সে সুখাসনে শিরোরক্ষা এত সুখ, যে মৃণালিনী তাহাতে বঞ্চিত হইয়া থাকিতে পারিলেন না। হেমচন্দ্র জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন তোমাকে হৃষীকেশ গৃহবহিস্কৃত করিয়া দিল?”

মৃণালিনী হেমচন্দ্রের হৃদয়মধ্যে মুখ লুকাইলেন। অতি মৃদুরবে কহিলেন, “তোমাকে কি বলিব! হৃষীকেশ আমাকে কুলটা বলিয়া তাড়াইয়া দিয়াছে!”

শ্রুতমাত্র তীরের ন্যায় হেমচন্দ্র দাঁড়াইয়া উঠিলেন। মৃণালিনীর মস্তক তাঁহার বক্ষশ্চ্যুত হইয়া সোপানে আহত হইল।

“পাপীয়সি—নিজমুখে স্বীকৃত হইলি!” এই কথা দন্তমধ্য হইতে ব্যক্ত করিয়া হেমচন্দ্র বেগে প্রস্থান করিলেন। পথে গিরিজায়াকে দেখিলেন; গিরিজায়া, তাঁহার সজলজলদভীমমূর্ত্তি দেখিয়া চমকিয়া দাঁড়াইল। লিখিতে লজ্জা করিতেছে—কিন্তু না লিখিলে নয়। হেমচন্দ্র পদাঘাতে গিরিজায়াকে পথ হইতে অপসৃতা করিলেন। বলিলেন, “তুমি যাহার দূতী তাহাকে পদাঘাত করিলে আমার চরণ কলঙ্কিত হইত।” এই বলিয়া হেমচন্দ্র গৃহে চলিয়া গেলেন।

যাহার ধৈর্য্য নাই, যে ক্রোধের জন্মমাত্র অন্ধ হয়, সে সংসারের সকল সুখে বঞ্চিত। কবি কল্পনা করিয়াছেন, যে কেবল অধৈর্য্য মাত্র দোষে বীরশ্রেষ্ঠ দ্রোণাচার্য্যের নিপাত হইয়াছিল। “অশ্বত্থামা হতঃ” এই শব্দ মাত্র শুনিয়া তিনি ধনুর্ব্বাণ ত্যাগ করিলেন। প্রান্তর দ্বারা সবিশেষ তত্ত্ব লইলেন না। হেমচন্দ্রের কেবল অধৈর্য্য নহে—অধৈর্য্য, অভিমান, ক্রোধ।

শীতল সমীরণময়ী উষার পিঙ্গল মূর্ত্তি বাপীতীরবনে উদয় হইল। তখনও মৃণালিনী আহত মস্তক ধারণ করিয়া সোপানে বসিয়া আছেন। গিরিজায় জিজ্ঞাসা করিল,

“ঠাকুরাণি, আঘাত কি গুরুতর বোধ হইতেছে?”

মৃণালিনী কহিলেন, “কিসের আঘাত?” গি। “মাতায়।”

মৃ। “মাতায় আঘাত? আমার মনে হয় না।”

দ্বিতীয় খণ্ড · দশম পরিচ্ছেদ

দশম পরিচ্ছেদ।

ফাঁদ।

পূর্ব্বেই কথিত হইয়াছে যে বাপীতীর হইতে হেমচন্দ্র মনোরমার অনুবর্ত্তী হইয়া যবন সন্ধানে আসিতেছিলেন। মনোরমা, ধর্ম্মাধিকারের গৃহ কিছু দূরে থাকিতে, হেমচন্দ্রকে কহিলেন, “সম্মুখে এই অট্টালিকা দেখিতেছ?”

হে। “দেখিতেছি।”

ম। “ঐ গৃহে যবন প্রবেশ করিয়াছে।

হে। “কেন?”

এ প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়া মনোরমা কহিলেন, “তুমি এইখানে বৃক্ষের অন্তরালে লুক্কায়িত থাক। যবনকে এইস্থান দিয়া যাইতে হইবে।”

হে। “তুমি কোথা যাইবে?”

ম। “আমি এই গৃহমধ্যে যাইব।”

হেমচন্দ্র স্বীকৃত হইলেন। মনোরমার আচরণ দেখিয়া কিছু বিস্মিত হইলেন। তাহার পরামর্শানুসারে পথিপার্শ্বে বৃক্ষান্তরালে লুক্কায়িত হইয়া রহিলেন। মনোরমা গুপ্তপথে অলক্ষ্যে গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন।

এই সময়ে শান্তশীল পশুপতির গৃহে আসিতেছিল। সে দেখিল যে এক ব্যক্তি বৃক্ষান্তরালে লুক্কায়িত হইল। শান্তশীল সন্দেহ প্রযুক্ত সেই বৃক্ষতলে গেল। তথায় হেমচন্দ্রকে দেখিয়া প্রথমে চৌর অনুমানে কহিল, “কে তুমি? এখানে কি করিতেছ?” পরে তৎক্ষণে হেমচন্দ্রের বহুমূল্যের অলঙ্কার শোভিত যোদ্ধৃবেশ দেখিয়া কহিল, “আপনি কে?”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “আমি যে হই না কেন?”

শা। “আপনি এখানে কি করিতেছেন?

হে। “আমি এখানে যবনানুসন্ধান করিতেছি।”

শান্তশীল চমকিত হইয়া কহিলেন, “যবন কোথায়?”

হে। “এই গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়াছে।”

শান্তশীল ভীত ব্যক্তির ন্যায় স্বরে কহিলেন, “এ গৃহে কেন?”

হে। “তাহা আমি জানি না।”

শা। “এ গৃহ কাহার?”

হে। “তাহা জানি না।”

শা। “তবে আপনি কি প্রকারে জানিলেন যে এই গৃহে যবন প্রবেশ করিয়াছে?”

হে। “তা তোমার শুনিয়া কি হইবে?”

শা। “এই গৃহ আমার। যদি যবন ইহাতে প্রবেশ করিয়া থাকে তবে কোন অনিষ্ট কামনা করিয়া গিয়াছে সন্দেহ নাই। আপনি যোদ্ধা এবং যবনদ্বেষী দেখিতেছি। যদি ইচ্ছা থাকে তবে আমার সঙ্গে আসুন—উভয়ে চোরকে ধৃত করিব।”

হেমচন্দ্র সম্মত হইয়া শান্তশীলের সঙ্গে চলিলেন। শান্তশীল সিংহদ্বার দিয়া পশুপতির গৃহে হেমচন্দ্রকে লইয়া প্রবেশ করিলেন। এবং এক কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিয়া কহিলেন, “এই গৃহমধ্যে আমার সুবর্ণ রত্নাদি সকল আছে আপনি ইহার প্রহরায় অবস্থিতি করুন। আমি ততক্ষণ সন্ধান করিয়া আসি কোন্ স্থানে যবন লুক্কায়িত আছে।”

এই কথা বলিয়াই শান্তশীল সেই কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন। এবং হেমচন্দ্র কোন উত্তর দিতে না দিতেই বাহির দিকে কক্ষ দ্বার রুদ্ধ করিলেন। হেমচন্দ্র ফাঁদে পড়িয়া বন্দী হইয়া রহিলেন।

চতুর্থ খণ্ড · দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।

পরামর্শ।

হেমচন্দ্র মাধবাচার্য্যের বসতি স্থলে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন যে আচার্য্য জপে নিযুক্ত আছেন। হেমচন্দ্র প্রণাম করিয়া কহিলেন,

“আমাদিগের সকল যত্ন বিফল হইল। এক্ষণে ভৃত্যের প্রতি আর কি আদেশকরেন? যবন কর্ত্তৃক বঙ্গ অধিকৃত হইয়ছে। বুঝি এ ভারত ভূমির অদৃষ্টে যবনের দাসত্ব বিধিলিপি! নচেৎ বিনা বিবাদে যবনেরা বঙ্গজয় করিল কি প্রকারে? যদি এখন এই দেহ পতন করিলে এক দিনের তরেও জন্মভূমি দস্যুহস্ত হইতে মুক্তা হয় তবে এইক্ষণে তাহা করিতে প্রস্তুত আছি। সেই অভিপ্রায়ে কালি রাত্রে রণাকাঙ্ক্ষায় নগর মধ্যে অগ্রসর হইয়াছিলাম—কিন্তু রণত দেখিলাম না। কেবল দেখিলাম যে এক পক্ষ আক্রমণ করিতেছে, অপর পক্ষ পলাইতেছে।”

মাধবাচার্য্য কহিলেন, “বৎস! দুঃখিত হইও না। দৈবনির্দ্দেশ কখন বিফল হইবার নহে। আমি যখন গণনা করিয়াছি যে যবন পরাভূত হইবে, তখন নিশ্চয়ই জানিও যে তাহারা পরাভূত হইবে। যবনেরা নবদ্বীপ অধিকার করিয়াছে বটে, কিন্তু নবদ্বীপধিকার ত বঙ্গাধিকার নহে। প্রধান রাজা সিংহাসন ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিয়াছেন, কিন্তু এই বঙ্গভূমে অনেক করপ্রদ রাজা আছেন; তাঁহারা ত এখনও বিজিত হয়েন নাই। কে জানে যে সেই সকল রাজা সমবেত হইয়া প্রাণপণ করিলে, যবন বিজিত না হইবে?” হেমচন্দ্র কহিলেন, “তাহার অল্পই সম্ভাবনা।”

মাধবাচার্য্য কহিলেন, “জ্যোতিষী গণনা মিথ্যা হইবার নহে। অবশ্য সফল হইবে। তবে আমার এক ভ্রম হইয়া থাকিবে। পূর্ব্বদেশে যবন পরাভূত হইবে—ইহাতে আমরা বঙ্গেই যবন জয় করিবার প্রত্যাশা করিয়াছিলাম। কিন্তু বঙ্গ রাজ্য ত প্রকৃত পূর্ব্ব নহে—কামরূপই পূর্ব্ব। বোধ হয় তথায়ই আমাদিগের আশা ফলবতী হইবে।”

হে। “কিন্তু এক্ষণে ত যবনের কামরূপ গমনের কোন সম্ভাবনা দেখি না।”

মা। “এই যবনেরা ক্ষণকাল স্থির নহে। সুস্থির হইলেই কামরূপ আক্রমণ করিবে।”

হে। “তাহাও মানিলাম। এবং ইহারা যে কামরূপ আক্রমণ করিলে পরাজিত হইবে তাহাও মানিলাম। কিন্তু তাহা হইলে আমার পিতৃরাজ্যোদ্ধারের কি সদুপায় হইল?”

মা। “এই যবনেরা এ পর্য্যন্ত পুনঃ পুনঃ জয়লাভ করিয়া অজেয় বলিয়া রাজগণমধ্যে প্রতিপন্ন হইয়াছে। ভয়ে কেহ তাহাদিগের বিরোধী হইতে চাহে না। তাহারা এক বার মাত্র পরাজিত হইলে তাহাদিগের সে মহিমা আর থাকিবে না। তখন ভারতবর্ষীয় তাবৎ আর্য্যবংশীয় রাজারা ধৃতাস্ত্র হইয়া উঠিবেন। সকলে এক হইয়া অস্ত্র ধারণ করিলে যবনেরা কত দিন তিষ্ঠিবে?”

হে। “গুরুদেব! আপনি আশামাত্রের আশ্রয় লইতেছেন —আমিও তাহাই করিলাম। এক্ষণে আমি কি করিব-আজ্ঞা করুন।”

মা। “আমিও তাহাই চিন্তা করিতেছিলাম। এ নগর মধ্যে তোমার আর অবস্থিতি করা অকর্ত্তব্য; কেন না যবনের” তোমার মৃত্যুসাধন সঙ্কল্প করিয়াছে। আমার আজ্ঞা তুমি অদ্যই এ নগর ত্যাগ করিবে।”

হে। “কোথায় যাইব?”

মা। “আমার সঙ্গে কামরূপ চল।”

হেমচন্দ্র অধোবদন হইয়া, অপ্রতিভ হইয়া, মৃদু মৃদু কহিলেন, “মৃণালিনীকে কোথায় রাখিয়া যাইবেন?”

মাধবাচার্য্য বিস্মিত হইয়া কহিলেন, “সে কি? আমি ভাবিয়াছিলাম যে তুমি কালিকার কথায় মৃণালিনীকে চিত্ত হইতে দূর করিয়াছিলে?”

হেমচন্দ্র পূর্ব্বের ন্যায় মৃদুভাবে বলিলেন “মৃণালিনী অত্যজ্যা। তিনি আমার পরিণীতা পত্নী।”

মাধবাচার্য্য চমৎকৃত হইলেন। রুষ্ট হইলেন। ক্ষোভ করিয়া কহিলেন, “আমি ইহার কিছু জানিলাম না?”

হেমচন্দ্র তখন আদ্যোপান্ত তাহার বিবাহের বৃত্তান্ত বিবরিত করিলেন। শুনিয়া মাধবাচার্য্য কিছুক্ষণ মৌন হইয়া রহিলেন। কহিলেন, “যে স্ত্রী অসদাচারিণী, সে ত শাস্ত্রানুসারে ত্যজ্যা। মৃণালিনীর চরিত্র সম্বন্ধে যে সংশয় তাহা কালি প্রকাশ করিয়াছি।”

তখন হেমচন্দ্র ব্যোমকেশের বৃত্তান্ত সকল প্রকাশ করিয়া বলিলেন। শুনিয়া মাধবাচার্য্য আনন্দ প্রকাশ করিলেন। কহিলেন,

“বৎস! বড় প্রীতি পাইলাম। তোমার প্রিয়তমা এবঞ্চ গুণবতী ভার্য্যাকে তোমার নিকট হইতে বিযুক্ত করিয়া তোমাকে অনেক ক্লেশ দিয়াছি। এক্ষণে আশীর্ব্বাদ করিতেছি তোমরা দীর্ঘজীবী হইয়া বহুকাল একত্রে ধর্ম্মাচরণ কর। যদি তুমি এক্ষণে সস্ত্রীক হইয়াছ তবে তোমাকে আর আমি আমার সঙ্গে কামরূপ যাইতে অনুরোধ করি না। আমি অগ্রে যাইতেছি। যখন সময় বুঝিবেন তখন তোমার নিকট কামরূপাধিপতি দূত প্রেরণ করিবেন। এক্ষণে তুমি বধূকে লইয়া মথুরায় গিয়া বাস কর—অথবা অন্য অভিপ্রেত স্থানে বাস করিও।”

এইরূপ কথোপকথনের পর হেমচন্দ্র মাধবাচার্য্যের নিকট বিদায় হইলেন। মাধবাচার্য্য আশীর্ব্বাদ, আলিঙ্গন করিয়া সাশ্রুলোচনে তাঁহাকে বিদায় করিলেন।

দ্বিতীয় খণ্ড · দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।

অতিথিসৎকার।

হেমচন্দ্র গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া এক সুন্দর অশ্ব সজ্জিত করিয়া তদুপরি আরোহণ করিলেন। এবং অশ্বে কষাঘাত করিয়া মহাবনাভিমুখে যাত্রা করিলেন। নগর পার হইলেন; তৎপরে প্রান্তর। প্রান্তরেরও কিয়দংশ পার হইলেন, এমত সময়ে অকস্মাৎ স্কন্ধদেশে গুরুতর বেদনা পাইলেন। দেখিলেন, স্কন্ধে একটা তীর বিদ্ধ হইয়াছে। পশ্চাতে অশ্বের পদধ্বনি শ্রুত হইল। ফিরিয়া দেখিলেন, তিনজন অশ্বারোহী আসিতেছে।

হেমচন্দ্র ঘোটকের মুখ ফিরাইয়া তাহাদিগের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। ফিরিবামাত্র দেখিলেন, প্রত্যেক অশ্বারোহী তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া এক এক শরসন্ধান করিল। হেমচন্দ্র
বিচিত্র শিক্ষা কৌশলে করস্থ শূলান্দোলন দ্বারা তীরত্রয়ের এক কালীন নিবারণ করিলেন।

অশ্বারোহিগণ পুনর্ব্বার একেবারে শরসংযোগ করিল। এবং তাহা নিবারিত হইতে না হইতেই পুনর্ব্বার শরত্রয় ত্যাগ করিল।

এই রূপ অবিরত হস্তে হেমচন্দ্রের উপর বাণক্ষেপ করিতে লাগিল। হেমচন্দ্র তখন বিচিত্র রত্নাদি মণ্ডিত চর্ম্ম হস্তে লইলেন, এবং তৎসঞ্চালন দ্বারা অবলীলাক্রমে সেই শরজাল বর্ষণ নিরাকরণ করিতে লাগিলেন; কদাচিৎ দুই এক শর অশ্ব শরীরে বিদ্ধ হইল মাত্র। স্বয়ং অক্ষত রহিলেন।

বিস্মিত হইয়া অশ্বারোহিত্রয় নিরস্ত হইল। পরস্পরে কি পরামর্শ করিতে লাগিল। হেমচন্দ্র সেই অবকাশে তৎপ্রতি এক তীরত্যাগ করিলেন। যে শরবেধে কুতব-উদ্দীনের মত্তহস্তী ভূমিশায়ী হইয়াছিল, সেই জাতীয় বিশাল শরত্যাগ করিলেন। সে অব্যর্থ সন্ধান। শর, এক জন অশ্বারোহীর ললাট মধ্যে বিদ্ধ হইল। সে অমনি অশ্বপৃষ্ঠচ্যুত হইয়া ধরাতলশায়িত হইল।

তৎক্ষণাৎ অপর দুই জনে অশ্বে কষাঘাত করিয়া, শূল যুগল প্রণত করিয়া হেমচন্দ্রের প্রতি ধাবমান হইল। এবং শূলক্ষেপ যোগ্য নৈকট্য প্রাপ্ত হইলে শূলক্ষেপ করিল। যদি তাহারা হেমচন্দ্রকে লক্ষ্য করিয়া শূলত্যাগ করিত, তবে হেমচন্দ্রের বিচিত্র শিক্ষায় তাহা নিবারিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল; কিন্তু তাহা না করিয়া আক্রমণ কারীরা হেমচন্দ্রের অশ্ব প্রতি লক্ষ্য করিয়া শূল ত্যাগ করিয়াছিল। তত দূর অধঃপর্য্যন্ত হস্ত সঞ্চালনে হেমচন্দ্রের বিলম্ব হইল। একের শূল নিবারিত হইল। অপরের সন্ধান নিবারিত হইল না। শূল অশ্বের গ্রীবাতলে বিদ্ধ হইল। সেই আঘাত প্রাপ্তি মাত্র সে রমণীয় ঘোটক মুমূর্ষু হইয়া ভূতলে পড়িল।

সুশিক্ষিতের ন্যায় হেমচন্দ্র পতনশীল অশ্ব হইতে লম্ফদিয়া ভূতলে দাঁড়াইলেন। এবং পলক মধ্যে নিজকরস্থ করাল শূল উন্নত করিয়া কহিলেন, “আমার পিতৃদত্ত শূল শত্রুরক্ত পান না করিয়া কখন আমার হস্ত ত্যাগ করে নাই।” তাঁহার এই কথা সমাপ্ত হইতে না হইতে তদগ্রে বিদ্ধ হইয়া দ্বিতীয় অশ্বারোহী ভূতলে পতিত হইল।

ইহা দেখিয়া তৃতীয় অশ্বারোহী অশ্বের মুখ ফিরাইয়া বেগে পলায়ন করিল। সেই শান্তশীল।

হেমচন্দ্র তখন অবকাশ পাইয়া নিজস্কন্ধবিদ্ধ তীর মোচন করিলেন। তীর কিছু অধিক মাংসভেদ করিয়াছিল—মোচন মাত্র অতিশয় শোণিত স্রুতি হইতে লাগিল। হেমচন্দ্র নিজপরিধান বস্ত্র দ্বারা তাহার নিবারণ চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহা নিষ্ফল হইল। ক্রমে হেমচন্দ্র রক্তক্ষতি হেতু দুর্ব্বল হইতে লাগিলেন। তখন বুঝিলেন, যে যবনশিবিরে গমনের অদ্য আর কোন সম্ভাবনা নাই। অশ্ব হত হইয়াছে—নিজবল হত হইতেছে। অতএব অপ্রসন্ন মনে, ধীরে ধীরে, নগরাভিমুখে প্রত্যাবর্ত্তন করিতে লাগিলেন।

হেমচন্দ্র প্রান্তর পার হইলেন। তখন শরীর নিতান্ত অবশ হইয়া আসিল—শোণিত-স্রোতে সর্ব্বাঙ্গ আর্দ্র হইল; গতিশক্তি রহিত হইয়া আসিতে লাগিল। কষ্টে নগরমধ্যে প্রবেশ করিলেন। আর যাইতে পারেন না। এক কুটীরনিকটে বটবৃক্ষতলে উপবেশন করিলেন। তখন রজনী প্রভাত হইয়াছে। রাত্রি জাগরণ—সমস্ত রাত্রের পরিশ্রম—রক্তস্রাবে বলহানি— হেমচন্দ্রের চক্ষে পৃথিবী ঘূরিতে লাগিল। তিনি বৃক্ষমূলে পৃষ্ঠ রক্ষা করিলেন। চক্ষু মুদিত হইল—নিদ্রা প্রবল হইল— চেতন অপহৃত হইল। নিদ্রাবেশে স্বপ্নে যেন শুনিলেন কে গায়িতেছে,

“কণ্টকে গঠিল বিধি মৃণাল অধমে।”

নিদ্রাভঙ্গ হইল। হেমচন্দ্র নয়নোন্মীলন করিয়া দেখিলেন, প্রাতঃসূর্য্যকিরণে পৃথিবী হাসিতেছে, শির উপরি শত শত পক্ষী মিলিত হইয়া সহর্ষে কলরব করিতেছে—নাগরিকেরা স্ব স্ব কার্য্যে যাইতেছে। হেমচন্দ্র শূলদণ্ডে ভর করিয়া গাত্রোত্থান পূর্ব্বক গৃহাভিমুখে যাত্রা করিলেন।

চতুর্থ খণ্ড · দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

বিনা সূতার হার।

পশুপতি উচ্চ-অট্টালিকায় বহু ভৃত্য সমভিব্যাহারে বাস করিতেন বটে, কিন্তু তাঁহার পুরী কানন হইতে অন্ধকার। গৃহ যাহাতে আলো হয়, স্ত্রী পুত্র পরিবার—এ সকলই তাঁহার গৃহে ছিল না।

অদ্য শান্তশীলের সহিত কথোপকথনের পর পশুপতির সেই সকল কথা মনে পড়িল। মনে ভাবিলেন, “এত কালের
পর বুঝি এ অন্ধ কার পুরী আলো হইল—যদি জগদম্বা অনুকূলা হয়েন তবে মনোরমা এ অন্ধকার ঘুচাইবে।”

এই রূপ ভাবিতে ভাবিতে পশুপতি, শয়নের পূর্ব্বে অষ্টভূজাকে নিয়মিত প্রণামবন্দনাদির জন্য দেবীমন্দিরে প্রবেশ করিলেন। প্রবেশ করিয়া দেখিলেন যে তথায় মনোরমা বসিয়া আছেন।

পশুপতি কহিলেন “মনোরমা কখন আসিলে?”

মনোরমা পূজাবশিষ্ট পুষ্পগুলিন লইয়া বিনাসূত্রে মালা গাঁথিতে ছিলেন। কথার কোন উত্তর দিলেন না। পশুপতি কহিলেন, “আমার সঙ্গে কথা কও। যতক্ষণ তুমি থাক ততক্ষণ সকল যন্ত্রণা বিস্মৃত হই।”

মনোরমা মুখ তুলিয়া চাহিয়া দেখিলেন। পশুপতির মুখ প্রতি চাহিয়া রহিলেন, ক্ষণেক পরে কহিলেন, “আমি তোমাকে কি বলিতে আসিয়াছিলাম, কিন্তু তাহা আমার মনে হইতেছে॥”

পশুপতি কহিলেন, “তুমি মনে কর। আমি অপেক্ষা করিতেছি।”

পশুপতি বসিয়া রহিলেন, মনোরমা মালা গাঁথিতে লাগিলেন।

অনেকক্ষণ পরে পশুপতি কহিলেন, আমারও কিছু বলিবার আছে। মনোযোগ দিয়া শুন। আমি এ বয়স্ পর্য্যন্ত কেবল বিদ্যোপার্জ্জন করিয়াছি—বিষয়ালোচনা করিয়াছি, অর্থেপার্জ্জন করিয়াছি; সংসার ধর্ম্ম করি নাই। যাহাতে অনুরাগ তাহাই করিয়াছি, দারপরিগ্রহে বিরাগ, এজন্য তাহা করি নাই। কিন্তু যে পর্য্যন্ত তুমি আমার নয়নপথে আসিয়াছ সেই পর্য্যন্ত মনোরমা লাভ আমার এক মাত্র ধ্যান স্বরূপ হইয়াছে। সেই লাভের জন্য এই নিদারুণ ব্রতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। যদি জগদীশ্বরী অনুগ্রহ করেন তবে দুই চারি দিনের মধ্যে রাজ্য লাভ করিব এবং তোমার পাণিগ্রহণ করিব। ইহাতে তোমার বৈধব্যজনিত যে বিঘ্ন, শাস্ত্রীয় প্রমাণের দ্বারা আমি তাহার নিরাকরণ করিতে পারিব। কিন্তু তাহাতে দ্বিতীয় বিঘ্ন এই যে তুমি কুলীন কন্যা, জনার্দ্দন শর্ম্মা কুলীন শ্রেষ্ঠ, আমি শ্রোত্রীয়।”

মনোরমা এ সকল কথায় কর্ণপাত করিতেছিলেন কি না সংশয়। পশুপতি দেখিলেন যে মনোরমা চিত্ত হারাইয়াছেন। পশুপতি, সরল, অবিকৃতা, বালিকা মনোরমাকে ভাল বাসিতেন,—প্রৌঢ়া তীক্ষ্ণ বুদ্ধিশালিনী মনোরমাকে ভয় করিতেন। কিন্তু অদ্য ভাবান্তরে সন্তুষ্ট হইলেন না। তথাপি পুনরুদ্যম করিয়া পশুপতি কহিলেন, “কিন্তু কুলরীতি ত শাস্ত্রমূলক নহে, কুলনাশে ধর্ম্মনাশ বা জাতিভ্রংশ হয় না। তাঁহার অজ্ঞাতে যদি তোমাকে বিবাহ করিতে পারি, তবে ক্ষতিই কি? তুমি সম্মত হইলেই তাহা পারি। পরে তোমার পিতামহ জানিতে পারিলে বিবাহ ত ফিরিবে না।”

মনোরমা কোন উত্তর করিলেন না। তিনি সকল শ্রবণ করিয়াছিলেন কি না সন্দেহ। একটি কৃষ্ণবর্ণ মার্জ্জার তাঁহার নিকটে আসিয়া বসিয়াছিল, তিনি সেই বিনাসূত্রের মালা তাহার গলদেশে পরাইতে ছিলেন। পরাইতে মালা খুলিয়া গেল। মনোরমা তখন আপন মস্তকহইতে কেশগুচ্ছ ছিন্ন করিয়া তৎসূত্রে আবার মালা গাঁথিতে লাগিলেন।

পশুপতি উত্তর না পাইয়া, নিঃশব্দে মালা-কুসুমমধ্যে মনোরমার অনুপম অঙ্গুলির গতি মুগ্ধলোচনে দেখিতে লাগিলেন।

তৃতীয় খণ্ড · দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

প্রতিজ্ঞা—পর্ব্বতো বহ্নিমান্।

নিদ্রাগুণে হেমচন্দ্র কিঞ্চিৎ সবল হইয়াছিলেন। শােণিতস্রাবও কতক মন্দীভূত হইয়াছিল। শূলে ভর করিয়া হেমচন্দ্র স্বচ্ছন্দে গৃহে প্রত্যাগমন করিতে পারিলেন।

গৃহে আসিয়া দেখিলেন, মনােরমা দ্বারদেশে দাঁড়াইয়া আছেন।

মৃণালিনী ও গিরিজায়া অন্তরালে থাকিয়া মনােরমাকে দেখিলেন।

মনােরমা চিত্রার্পিত পুত্তলিকার ন্যায় দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন। দেখিয়া মৃণালিনী মনে মনে ভাবিলেন, “আমার প্রভু যদি রূপে বশীভূত হয়েন, তবে আমার সুখের নিশি প্রভাত হইয়াছে।” গিরিজায়া ভাবিল, “রাজপুত্ত্র যদি রূপে মুগ্ধ হয়েন, তবে আমার ঠাকুরাণীর কপাল ভাঙ্গিয়াছে।”

হেমচন্দ্র মনােরমার নিকট আসিয়া কহিলেন, “মনােরমে—এমন করিয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছ কেন?”

মনােরমা কোন কথা কহিলেন না। হেমচন্দ্র পুনরপি ডাকিলেন, “মনােরমে!”

তথাপি উত্তর নাই; হেমচন্দ্র দেখিলেন আকাশমার্গে তাঁহার স্থিরদৃষ্টি স্থাপিত হইয়াছে।

হেমচন্দ্র পুনর্ব্বার বলিলেন, “মনোরমে, কি হইয়াছে?”

তখন মনােরমা ধীরে ধীরে আকাশ হইতে চক্ষু ফিরাইয়া হেমচন্দ্রের মুখমণ্ডলে স্থাপিত করিলেন। এবং কিয়ৎকাল অনিমিক্লোচনে তৎপ্রতি চাহিয়া রহিলেন। পরে হেমচন্দ্রের রুধিরাক্ত পরিচ্ছদে দৃষ্টিপাত হইল। তখন মনােরম বিস্মিত হইয়া কহিলেন।

“একি হেমচন্দ্র? রক্ত কেন? তােমার মুখ শুষ্ক; তুমি কি আহত হইয়াছ?”

হেমচন্দ্র অঙ্গুলির দ্বারা স্কন্ধের ক্ষত দেখাইয়া দিলেন।

মনােরমা, তখন হেমচন্দ্রের হস্তধারণ করিয়া গৃহমধ্যে পালঙ্কোপরি লইয়া গেলেন। এবং পলকমধ্যে বারিপূর্ণ ভৃঙ্গার আনীত করিয়া, একে একে হেমচন্দ্রের গাত্রবসন পরিত্যক্ত করাইয়া অঙ্গের রুধির সকল ধৌত করিলেন। এবং গােজাতিপ্রলোভন নবদূর্ব্বাদল ভূমি হইতে ছিন্ন করিয়া আপন কুন্দনিন্দিত দন্তে চর্ব্বিত করিলেন। পরে তাহা ক্ষতমুখে ন্যস্ত করিয়া উপবীতাকারে বস্ত্র দ্বারা বাঁধিলেন। তখন কহিলেন,

“হেমচন্দ্র! আর কি করিব? তুমি সমস্ত রাত্রি জাগরণ করিআছ, নিদ্রা যাইবে?”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “নিদ্রাভাবে নিতান্ত কাতর হইতেছি।”

মৃণালিনী মনােরমার কার্য্য দেখিয়া চিন্তান্তঃকরণে গিরিজায়াকে কহিলেন, “এ কে গিরিজায়ে?”

গি। “নাম শুনিলাম মনেরমা।”

মৃ। “এ কি হেমচন্দ্রের মনােরমা?”

গি। “তুমি কি বিবেচনা করিতেছ?”

মৃ। “আমি ভাবিতেছি, মনের মাই ভাগ্যবতী। আমি হেমচন্দ্রের সেবা করিতে পাইলাম না, সে করিল। যে কার্য্যের জন্য আমার অন্তঃকরণ দগ্ধ হইতেছিল—মনােরমা সে কার্য্য সম্পন্ন করিল—দেবতারা উহাকে আয়ুষ্মতী করুন। গিরিজায়ে, আমি-গৃহে চলিলাম আমার আর থাকা উচিত নহে। তুমি এই পল্লীতে থাক, হেমচন্দ্র কেমন থাকেন সম্বাদ লইয়া যাইও। মনােরমা যেই হউক, হেমচন্দ্র আমারই।”

কে বলে সমুদ্রতলে রত্ন জন্মে? এ সংসারে রত্ন রমণীর হৃদয়।

দ্বিতীয় খণ্ড · দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

কুসুমনির্ম্মিতা।

উপনগর প্রান্তে, গঙ্গাতীরবর্ত্তি এক অট্টালিকা হেমচন্দ্রের বাসার্থে রাজপুরুষেরা নির্দ্দিষ্ট করিলেন। হেমচন্দ্র মাধবাচার্য্যের পরামর্শানুসারে সুরম্য অট্টালিকায় আবাস সংস্থাপিত করিলেন।

নবদ্বীপে জনার্দ্দন নামে এক বধির বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। তিনি বয়োবাহুল্য প্রযুক্ত এবং শ্রবণেন্দ্রিয়ের হানিপ্রযুক্ত সর্ব্বতোভাবে অসমর্থ। অথচ নিঃসহায়। তাহার সহধর্ম্মিণীও প্রাচীনা এবং শক্তিহীনা। কিছু দিন হইল ইহাদিগের পর্ণকুটীর প্রবল বাত্যায় বিনাশ প্রাপ্ত হইয়াছিল। সেই অবধি ইহারা আশ্রয়ভাবে এই বৃহৎ পূরীর এক পার্শ্বে রাজপুরুষদিগের অনুমতি লইয়া বাস করিতে ছিল। এক্ষণে কোন রাজপুত্ত্র আসিয়া তথায় বাস করিবেন শুনিয়া তাহারা পরাধিকার ত্যাগ করিয়া বাসান্তরের অন্বেষণে যাইবার উদ্যোগ করিতেছিল।

হেমচন্দ্র ইহা শুনিয়া দুঃখিত হইলেন। বিবেচনা করিলেন যে এই বৃহৎ ভবনে আমাদিগের উভয়েরই স্থান হইতে পারে। ব্রাহ্মণ কেন নিরাশ্রিত হইবেন? হেমচন্দ্র দিগ্বিজয়কে আজ্ঞা করলেন, যে ব্রাহ্মণকে গৃহত্যাগ করিতে নিবারণ কর। ভৃত্য ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিল “এ কার্য্য ভৃত্য দ্বারা সম্ভব না। ব্রাহ্মণঠাকুর আমার কথা কাণে তুলেন না।”

ব্রাহ্মণ বস্তুতঃ অনেকেরই কথা কাণে তুলেন না—কেন না তিনি বধির। হেমচন্দ্র ভাবিলেন ব্রাহ্মণ অভিমান প্রযুক্ত ভৃত্যের আলাপ গ্রহণ করেন না। এজন্য স্বয়ং তৎসম্ভাষণে গেলেন। ব্রাহ্মণকে প্রণাম করিলেন।

জনার্দ্দন আশীর্ব্বাদ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,

“তুমি কে?”

হে। “আমি আপনার ভৃত্য।”

জ। “কি বলিলে—তােমার নাম রামকৃষ্ণ?”

হেমচন্দ্র অনুভব করিলেন ব্রাহ্মণের শ্রবণশক্তি বড় প্রবল নহে। অতএব উচ্চতরস্বরে কহিলেন, “আমার নাম হেমচন্দ্র। আমি ব্রাহ্মণের দাস।”

জ। “ভাল ভাল; প্রথমে ভাল শুনিতে পাই নাই, তােমার নাম হনূমান দাস। হেমচন্দ্র মনে ভাবিলেন, “নামের কথা দূর হউক। কার্য্য সাধন হইলেই হইল।” বলিলেন “নবদ্বীপাধিপতির এই অট্টালিকা, তিনি ইহা আমার বাসের জন্য নিযুক্ত করিয়াছেন। শুনিলাম আমার অসায় আপনি শঙ্কিত হইয়া এস্থল ত্যাগ করিতেছেন!”

জ। “না—এখনও গঙ্গাস্নানে যাই নাই, এই স্নানের উদ্যোগ করিতেছি।”

হে। (অত্যুচ্চৈঃস্বরে) “স্নান যথা সময়ে করিবেন। এক্ষণে আমি এই অনুরােধ করিতে আসিয়াছি যে আপনি এ গৃহ ত্যাগ করিয়া যাইবেন না।”

জ। “গৃহে আহার করিব না। তােমার বাড়ীতে কি? আদ্য শ্রাদ্ধ?”

হে। “ভাল আহারাদির অভিলাষ করেন তাহার ও উদ্যোগ হইবে। এক্ষণে যেরূপ এ গৃহে অবস্থিতি করিতেছেন সেইরূপই করুন।”

জ। “ভাল ভাল; ব্রাহ্মণ ভােজন করাইলে দক্ষিণা ত আছেই। তা বলিতে হইবে না। তােমার বাটী কোন স্থানে?”

হেমচন্দ্র হতাশ্বাস হইয়া প্রত্যাবর্ত্তন করিতেছিলেন, এমন সময়ে পশ্চাৎ হইতে কেহ তাঁহার উত্তরীয় ধরিয়া টানিল। হেমচন্দ্র ফিরিয়া দেখিলেন। দেখিয়া প্রথম মূহুর্তে তাঁহার বােধ হইল সম্মুখে একখানি কুসুমনির্ম্মিতা দেবী প্রতিমা। দ্বিতীয় মূহুর্তে দেখিলেন প্রতিমা সজীব; তৃতীয় মূহুর্তে দেখিলেন, প্রতিমা নহে বিধাতার নির্ম্মাণকৌশল-সীমা-রূপিণী বালিকা অথবা পূর্ণযৌবন তরুণী।

বালিকা না তরুণী? ইহা হেমচন্দ্র তাহাকে দেখিয়া নিশ্চিত করিতে পারিলেন না।

বীণানিন্দিতস্বরে সুন্দরী কহিলেন, “তুমি পিতামহকে কি বলিতেছিলা? তােমার কথা উনি শুনিতে পাইবেন কেন?”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “তাহা ত পাইলেন না দেখিলাম। তুমি কে?”

বালিকা কহিল, “আমি মনােরম।”

হে। “ইনি তােমার পিতামহ?”

মনো। “তুমি পিতামহকে কি বলিতেছিল?”

হে। “শুনিলাম ইনি এ গৃহ ত্যাগ করিয়া যাইবার উদ্যোগ করিতেছেন। আমি তাহা নিবারণ করিতে আসিয়াছি।”

ম। “এ গৃহে এক রাজপুত্ত্র আসিয়াছেন তিনি আমাদিগকে থাকিতে দিবেন কেন?”

হে। “আমিই সেই রাজপুত্ত্র। আমি তােমাদিগকে অনুরোধ করিতেছি তােমরা এখানে থাক।”

ম। “কেন?”

এ কেনর উত্তর নাই? হেমচন্দ্র অন্য উত্তর না পাইয়া কহিলেন, “কেন? মনে কর যদি তােমার সহােদর আসিয়া এই গৃহে বাস করিত সে কি তােমাদিগকে তাড়াইয়া দিত?”

ম। “তুমি কি আমার ভাই?”

হে। “আজি হইতে তােমার ভাই হইলাম। এখন বুঝিলে?”

ম। “বুঝিয়াছি। কিন্তু ভগিনী বলিয়া আমাকে কখন তিরস্কার করিবে না ত?”

হেমচন্দ্র মনােরমার কথার প্রণালীতে চমৎকৃত হইতে লাগিলেন। ভাবিলেন “একি অলৌকিক সরলা বালিকা? না উন্মাদিনী?” কহিলেন, “কেন তিরস্কার করিব?”

ম। “যদি আমি দোষ করি?”

হে। “দোষ দেখিলে কে না তিরস্কার করে?”

মনোরমা ক্ষুণ্ণভাবে দাঁড়াইয়া রহিলেন, বলিলেন “আমি কখন ভাই দেখি নাই; ভাইকে কি লজ্জা করিতে হয়?”

হে। “না।”

ম। “তবে আমি তােমাকে লজ্জা করিব না—তুমি আমাকে লজ্জা করিবে?”

হেমচন্দ্র হাসিলেন—কহিলেন, “আমার বক্তব্য তােমার পিতামহকে জানাইতে পারিলাম না।—তাহার উপায় কি?”

ম। “আমি বলিতেছি।” এই বলিয়া মনােরমা মৃদু মৃদু স্বরে জনার্দ্দনের নিকট হেমচন্দ্রের অভিপ্রায় জানাইলেন। হেমচন্দ্র দেখিয়া বিস্মিত হইলেন যে মনােরমার সেই মৃদু কথা বধিরের বােধগম্য হইল।

ব্রাহ্মণ আনন্দিত হইয়া রাজপুত্ত্রকে আশীর্ব্বাদ করিলেন। এবং কহিলেন, “মনােরমে ব্রাহ্মণীকে বল রাজপুত্র তাঁহার নাতি হইলেন—আশীর্ব্বাদ করুন।” এই বলিয়া ব্রাহ্মণ স্বয়ং “ব্রাহ্মণি! ব্রাহ্মণি!” বলিয়া ডাকিতে লাগিলেন। ব্রাহ্মণী তখন স্থানান্তরে গৃহকার্য্যে ব্যাপৃতা ছিলেন—ডাক শুনিতে পাইলেন না। ব্রাহ্মণ অসন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন “ব্রাহ্মণীর ঐ বড় দোষ। কাণে কম শােনেন।”

প্রথম খণ্ড · দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

গজহন্তা।

কুতবউদ্দীন, দেওয়ানে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক বখ্‌তিয়ার খিলিজি এবং অন্যান্য বন্ধুবর্গ লইয়া কথোপকথনে নিযুক্ত ছিলেন, এমত সময়ে কয়েক জন সৈনিক পূর্ব্বপরিচিত হিন্দু যুবাকে সশস্ত্র ধৃত করিয়া আনয়ন করিল।

রক্ষিগণ অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া যুবাকে রাজপ্রতিনিধিসমক্ষে উপস্থিত করিলে, কুতবউদ্দীন বিশেষ মনোযোগ পূর্ব্বক তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। যুবকের অবয়বও নিরীক্ষণযোগ্য। তাঁহার বয়ঃক্রম পঞ্চবিংশতি বৎসরের ন্যূন। শরীর ঈষন্মাত্র দীর্ঘ, এবং অনতিস্থূল ও বলব্যঞ্জক। মস্তক যেরূপ পরিমিত হইলে, শরীরের উপযোগী হইত, তদপেক্ষা বৃহৎ, এবং তাহার গঠন অতি রমণীয়। ললাট প্রশস্ত বটে, কিন্তু অল্পবয়ঃপ্রযুক্ত অনতিবৃহৎ, তাহার মধ্য দেশে “রাজদণ্ড” নামে পরিচিত শিরা প্রকটিত। ভ্রূযুগ সূক্ষ্ম, তরলরোম; তত্তলস্থ অস্থি কিছু উন্নত। চক্ষুঃ বিশেষ আয়ত নহে, কিন্তু অসাধারণ ঔজ্জ্বল্য গুণে আয়ত বলিয়া বোধ হইত। নাসা মুখের উপযোগী; অত্যন্ত দীর্ঘ নহে, কিন্তু অগ্রভাগ সূক্ষ্ম। ওষ্ঠাধর ক্ষুদ্র; সর্ব্বদা পরস্পরে সংশ্লিষ্ট; পার্শ্বভাগে অস্পষ্ট মণ্ডলার্দ্ধ রেখায় বেষ্টিত। ওষ্ঠে ও চিবুকে কোমল নবীন রোমাবলি শোভা পাইতেছিল। অঙ্গের গঠন, বলসূচক হইলেও, কর্কশতা শূন্য। বর্ণ প্রায় সম্পূর্ণ গৌর। অঙ্গে কবচ, মস্তকে উষ্ণীষ, পৃষ্ঠে তূণীর লম্বিত; করে ধনুঃ; কটিবন্ধে অসি।

কুতবউদ্দীন যুবাকে আপাদ মস্তক নিরীক্ষণ করিতেছেন, দেখিয়া যুবা ভ্রূকুটী করিলেন এবং কুতবকে কহিলেন, “আপনকার কি আজ্ঞা?”

শুনিয়া কুতব হাসিলেন। বলিলেন, “তুমি কি শরত্যাগে আমার হস্তী বধ করিয়াছ?”

যুবা। “করিয়াছি।”

কু। “কেন তুমি আমার হাতী মারিলে?”

যুবা। “না মারিলে হাতী আপনার সেনাপতিকে মারিত।”

ইহা শুনিয়া বখ্‌তিয়ার খিলিজি বলিলেন, “হাতী আমার কি করিত?”

যুবা। “চরণে দলিত করিত।”

বখ্‌তিয়ার। “আমার কুঠার কি জন্য ছিল?”

যুবা। “হস্তীকে পিপীলিকা দংশনের ক্লেশানুভব করাইবার জন্য।”

কুতব উদ্দীনের ওষ্ঠাধরপ্রান্তে অল্পমাত্র হাস্য প্রকটিত হইল। সেনাপতি অপ্রতিভ হয়েন দেখিয়া কুতবউদ্দীন তখন কহিলেন,

“তুমি হিন্দু, মুসলমানের বল জান না। সেনাপতি, অনায়াসে কুঠারাঘাতে হস্তিবধ করিত। তথাপি তুমি যে সেনাপতির মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় তীরত্যাগ করিয়াছিলে—ইহাতে তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হইলাম। তোমাকে পুরস্কৃত করিব।” এই বলিয়া কুতবউদ্দীন কোষাধ্যক্ষের প্রতি যুবাকে শত মুদ্রা দিতে অনুমতি করিলেন।

যুবা শুনিয়া কহিলেন, “যবন রাজপ্রতিনিধি! শুনিয়া লজ্জিত হইলাম। যবন সেনাপতির জীবনের মূল্য কি শত মুদ্রা?”

কুতবউদ্দীন কহিলেন, “তুমি রক্ষা না করিলে যে সেনাপতির জীবন বিনষ্ট হইত, এমত নহে। তথাপি সেনাপতির মর্য্যাদানুসারে দান উচিত বটে। তোমাকে সহস্র মুদ্রা দিতে অনুমতি করিলাম।”

যুবা। “যবনের বদান্যতায় আমি সন্তুষ্ট হইলাম। আমিও আপনাকে প্রতিপুরস্কৃত করিব। যমুনাতীরে আমার বাসগৃহ, সেই পর্য্যন্ত আমার সঙ্গে এক জন লোক দিলে, আমি আপনার পুরস্কার পাঠাইব। যদি রত্ন অপেক্ষা মুদ্রায় আপনার আদর অধিক হয়, তবে আমার প্রদত্ত রত্ন বিক্রয় করিবেন। দিল্লীর শ্রেষ্ঠীরা তদ্বিনিময়ে আপনাকে লক্ষ মুদ্রা দিবে।”

কুতবদ্দীন কহিলেন, “হইতে পারে, তুমি ধনী। এজন্য সহস্র মুদ্রা তোমার গ্রহণযোগ্য নহে। কিন্তু তোমার বাক্য সম্মানসূচক নহে—তুমি সদভিপ্রেত কার্য্যে উদ্যত হইয়াছিলে বলিয়া অনেক ক্ষমা করিয়াছি—অধিক ক্ষমা করিব না। আমি যে তোমার রাজার প্রতিনিধি, তাহা তুমি কি বিস্মৃত হইলে?”

যুবা। “আমার রাজার প্রতিনিধি ম্লেচ্ছ নহে।”

কুতবউদ্দীন সকোপ কটাক্ষে কহিলেন, “তবে কে তোমার রাজা? কোন্ দেশে তোমার বাস?”

যুবা। “মগধে আমার বাস?”

কুত। “মগধ এই বখ্‌তিয়ার কর্ত্তৃক যবনরাজ্যভুক্ত হইয়াছে।”

যুবা। “মগধ দস্যু কর্ত্তৃক পীড়িত হইয়াছে।”

কুত। “দস্যু কে?”

যুবা। “বখ্‌তিয়ার খিলিজি।”

কুতবউদ্দীনের চক্ষে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতে লাগিল। কহিলেন “তোমার মৃত্যু উপস্থিত।”

যুবা হাসিয়া কহিলেন, “দস্যুহস্তে?”

কুত। “আমার আজ্ঞায় তোমার প্রাণদণ্ড হইবে। আমি যবন সম্রাটের প্রতিনিধি।”

যুবা। “আপনি যবন দস্যুর ক্রীত দাস।”

কুতবউদ্দীন ক্রোধে কম্পিত হইলেন। কিন্তু নিঃসহায় যুবকের সাহস দেখিয়াও বিস্মিত হইলেন। কুতবউদ্দীন রক্ষিবর্গকে অজ্ঞা করিলেন, “ইহাকে বন্ধন করিয়া বধ কর।”

বখ্‌তিয়ার খিলিজি, ইঙ্গিতে তাহাদিগকে নিষেধ করিলেন। পরে কুতবকে বিনয় করিয়া কহিলেন, “প্রভো! এই হিন্দু বাতুল। নচেৎ অনর্থক কেন মৃত্যু কামনা করিবে? ইহাকে বধ করায় অপৌরুষ।”

যুবা বখ্‌তিয়ারের মনের ভাব বুঝিয়া হাসিলেন। বলিলেন,

“খিলিজি সাহাব! বুঝিলাম আপনি অকৃতজ্ঞ নহেন। আমি হস্তিচরণ হইতে আপনাকে রক্ষা করিয়াছি বলিয়া আপনি আমার প্রাণরক্ষার জন্য যত্ন করিতেছেন। কিন্তু নিবৃত্ত হউন। আমি আপনার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় হস্তী বধ করি নাই। আপনাকে একদিন স্বহস্তে বধ করিব বলিয়া আপনাকে হস্তীর চরণ হইতে রক্ষা করিয়াছি।”

রাজপ্রতিনিধি এবং সেনাপতি উভয়ে উভয়ের মুখাবলোকন করিলেন। খিলিজি কহিলেন,

“তুমি নিশ্চিত বাতুল। আপনি প্রাণ হারাইতে বসিয়াছ, অন্যে রক্ষা করিতে গেলে, তাহারও প্রতিবন্ধক হইতেছ। ভাল আমাকে স্বহস্তে বধ করিবার এত সাধ কেন?”

যুবা। “কেন? তুমি আমার পিতৃরাজ্যাপহরণ করিয়াছ। আমি মগধরাজপুত্র। যুদ্ধকালে হেমচন্দ্র মগধে থাকিলে তাহা যবন দস্যু জয় করিতে পারিত না। অপহারী দস্যুর প্রতি রাজদণ্ড বিধান করিব।”

বখ্‌তিয়ার কহিলেন, “এখন বাঁচিলে ত?”

কুতবউদ্দীন কহিলেন, “তোমার যে পরিচয় দিতেছ এবং তোমার যেরূপ স্পর্দ্ধা তাহাতে তোমাকে ছাড়িয়া দিতে পারি না। তুমি এক্ষণে কারাগারে বাস করিবে। পশ্চাৎ তোমার প্রতি দণ্ডাজ্ঞা প্রচার হইবে। রক্ষিগণ, এখন ইহাকে কারাগারে লইয়া যাও।”

রক্ষিগণ হেমচন্দ্রকে বেষ্টিত করিয়া লইয়া চলিল। কুতবউদ্দীন তখন বখ্‌তিয়ারকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন,

“সাহাব! এই হিন্দুকে কি ভাবিতেছেন?”

বখ্‌তিয়ার কহিলেন, “অগ্নিস্ফুলিঙ্গ স্বরূপ। যদি কখন হিন্দুসেনা পুনর্ব্বার সমবেত হয়, তবে এ ব্যক্তি সকলকে অগ্নিময় করিবে।”

কুত। “সুতরাং অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পূর্ব্বেই নির্ব্বাণ করা কর্ত্তব্য।”

উভয়ে এই রূপ কথোপকথন হইতেছিল ইত্যবসরে দুর্গমধ্যে তুমুল কোলাহল হইতে লাগিল। ক্ষণপরে পুররক্ষিগণ আসিয়া সম্বাদ দিল, যে বন্দী পলাইয়াছে।

কুতবউদ্দীন ভ্রূভঙ্গ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি প্রকারে পলাইল?”

রক্ষিগণ কহিল, “দুর্গমধ্যে একজন যবন একটা অশ্ব লইয়া ফিরাইতেছিল। আমরা বিবেচনা করিলাম যে কোন সৈনিকের অশ্ব। আমরা ঘোটকের নিকট দিয়া যাইতেছিলাম। তাহার নিকটে আসিবামাত্র বন্দী চকিতের ন্যায় লম্ফ দিয়া অশ্বপৃষ্ঠে উঠিল। এবং অশ্বে কষাঘাত করিয়া বায়ুবেগে দুর্গ দ্বার দিয়া নিষ্ক্রান্ত হইল।”

কুত। “তোমরা পশ্চাদ্বর্ত্তী হইলে না কেন?”

রক্ষি। “আমরা অশ্ব আনিতে আনিতে সে দৃষ্টিপথের অতীত হইল।”

কুত। “তীর মারিলে না কেন?”

রক্ষি। “মারিয়াছিলাম। তাহার কবচে ঠেকিয়া তীর সকল মাটিতে পড়িল।”

কুত। “যে যবন অশ্ব লইয়া ফিরাইতেছিল সে কোথা?”

রক্ষি। “প্রথমে আমরা বন্দীর প্রতিই মনোনিবেশ করিয়াছিলাম। পশ্চাৎ অশ্বপালের সন্ধান করায় তাহাকে দেখিতে পাইলাম না।”

কুতবউদ্দীন আদৌ ক্রীতদাস ছিলেন।

চতুর্থ খণ্ড · নবম পরিচ্ছেদ

নবম পরিচ্ছেদ।

স্বপ্ন।

গিরিজায়া কহিল, “গৃহে চল।” মৃণালিনী বলিলেন, “নগরে এ কিসের গোলযোগ?” তখন যবনসেনা নগর মন্থন করিতেছিল।

তুমুল কোলাহল শুনিয়া উভয়ের শঙ্কা হইল। গিরিজায়। বলিলেন, “চল এই বেলা সতর্ক হইয়া যাই।” কিন্তু দুই জন রাজপথের নিকট পর্য্যন্ত গিয়া দেখিলেন গমনের কোন উপায়ই নাই। অগত্যা প্রত্যাগমন করিয়া সরোবরে সোপানে বসিলেন। গিরিজায়া বলিলেন, “যদি এখানে উহারা আইসে?”

মৃণালিনী নীরবে রহিলেন। গিরিজায়া আপনিই বলিলেন “বনের ছায়া মধ্যে এমত লুকাইব—কেহ দেখিতে পাইবে না।”

উভয়ে আসিয়া সোপানোপরি উপবেশন করিয়া রহিলেন।

মৃণালিনী ম্লান বদনে গিরিজায়াকে কহিলেন “গিরিজায়ে, বুঝি আমার যথার্থই সর্ব্বনাশ উপস্থিত হইল।”

গি। “সে কি?”

মৃ। “এই এক অশ্বারোহী গমন করিল; ইনি হেমচন্দ্র। সখি—নগরে ঘোর যুদ্ধ হইতেছে; যদি নিঃসহায়ে প্রভু সে যুদ্ধে গিয়া থাকেন—না জানি কি বিপদে পড়িবেন।”

গিরিজায়া কোন উত্তর করিতে পারিল না। তাহার নিদ্রা আসিতেছিল। কিয়ৎক্ষণ পরে মৃণালিনী দেখিলেন যে গিরিজায়া ঘুমাইতেছে।

মৃণালিনীও, একে আহারনিদ্রাভাবে দুর্ব্বলা—তাহাতে সমস্ত রাত্রিদিন মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছিলেন সুতরাং নিদ্রা ব্যতীত আর শরীর বহে না—তাঁহারও তন্দ্রা আসিল। নিদ্রায় তিনি স্বপ্ন দেখিতে লাগিলেন। দেখিলেন যেন হেমচন্দ্র একাকী সর্ব্বসমরবিজয়ী হইয়াছেন। মৃণালিনী যেন বিজয়ী বীরকে দেখিতে রাজপথে দাঁড়াইয়াছিলেন। রাজপথে, হেমচন্দ্রের অগ্রে, পশ্চাতে, কত হস্তী, অশ্ব, রথাদিযাইতেছে। মৃণালিনীকে যেন সেই সেনাতরঙ্গ ফেলিয়া দিয়া চরণদলিত করিয়া চলিয়া গেল—তখন হেমচন্দ্র নিজ সৈন্ধবী তুরঙ্গী হইতে অবতরণ করিয়া তাঁহাকে হস্ত ধরিয়া উঠাইলেন। তিনি যেন হেমচন্দ্রকে বলিলেন “প্রভো! অনেক যন্ত্রণা পাইয়াছি; দাসীকে আর ত্যাগ করিও না।” হেমচন্দ্র যেন বলিলেন, “আর কখন তোমায় ত্যাগ করিব না।” সেই কণ্ঠস্বরে যেন⸻

তাঁহার নিদ্রাভঙ্গ হইল, “আর কখন তোমায় ত্যাগ করিব না।” জাগ্রতেও এই কথাও শুনিলেন। চক্ষু উন্মীলন করিলেন—কি দেখিলেন? যাহা দেখিলেন তাহা বিশ্বাস হইল না। আবার দেখিলেন—সত্য! হেমচন্দ্র সন্মুখে!—হেমচন্দ্র বলিতেছেন—“আর একবার ক্ষমা কর—আর কখন তোমায় ত্যাগ করিব না।

নিরভিমানিনী, নিলর্জ্জা মৃণালিনী আবার তাঁহার কণ্ঠলগ্না হইয়া স্কন্ধে মস্তক রক্ষা করিলেন।

তৃতীয় খণ্ড · নবম পরিচ্ছেদ

নবম পরিচ্ছেদ।

অমৃতে গরিল—গরলামৃত।

হেমচন্দ্র আচার্য্যের কথায় বিশ্বাস করিয়া মৃণালিনীকে দুশ্চরিত্রা বিবেচনা করিয়াছিলেন; মৃণালিনীর পত্র পাঠ না করিয়া তাহা ছিন্ন ভিন্ন করিয়াছিলেন, তাঁহার দূতীকে বেত্রাঘাত করিতে প্রস্তুত হইয়াছিলেন। কিন্তু ইহা বলিয়া তিনি মৃণালিনীকে ভাল বাসিতেন না, তাহা নহে। মৃণালিনীর জন্য তিনি রাজ্যত্যাগ করিয়া মথুরাবাসী হইয়াছিলেন। এই মৃণালিনীর জন্য গুরুর প্রতি শরসন্ধান করিতে প্রস্তুত হইয়াছিলেন, মৃণালিনীর জন্য গৌড়ে নিজব্রত বিস্মৃত হইয়া ভিখারিণীর তোষামোদ করিয়া ছিলেন। আর এখন? এখন, হেমচন্দ্র মাধবাচার্য্যকে শূল। দেখাইয়া বলিয়াছিলেন, “মৃণালিনীকে এই শূলে বিদ্ধ করিব?” কিন্তু তাই বলিয়া কি, এখন তাহার স্নেহ একেবারে ধ্বংস প্রাপ্ত হইয়াছিল? স্নেহ কি এক দিনে ধ্বংস হইয়া থাকে? বহুদিন অবধি পার্ব্বতীয় বারি পৃথিবী হৃদয়ে বিচরণ করিয়া আপন গতিপথ খোদিত করে, এক দিনের সূর্য্যাতপে কি সে নদী শুকায়? জলের যে পথ খোদিত হইয়াছে, জল সেই পথেই যাইবে, সে পথ রোধ কর, পৃথিবী ভাসিয়া যাইবে। হেমচন্দ্র সেইরাত্রে, নিজ শয়ন কক্ষে, শয্যোপরি শয়ন করিয়া সেই মুক্ত বাতায়ন সন্নিধানে মস্তক রাখিয়া, বাতায়নপথে দৃষ্টি করিতেছিলেন—
তিনি কি নৈশ শোভা দৃষ্টি করিতে ছিলেন? যদি তাঁহাকে সে সময়ে কেহ জিজ্ঞাসা করিত যে রাত্র সজ্যোৎস্না কি অন্ধকার, তাহা তিনি তখন সহসা বলিতে পারিতেন না। তাঁহার হৃদয় মধ্যে যে রজনীর উদয় হইয়াছিল, তিনি কেবল তাহাই দেখিতেছিলেন। সে রাত্রি ত তখনও সজ্যোৎস্না! নহিলে তাঁহার উপাধান আর্দ্র কেন? কেবল মেঘোদয় মাত্র। যাহার হৃদয়-আকাশে অন্ধকার বিরাজ করে সে রোদন করে না।

যে কখন রোদন করে নাই, সে মনুষ্যমধ্যে অধম। তাহাকে বিশ্বাস করিও না। নিশ্চিত জানিও সে পৃথিবীর সুখ কখন ভোগ করে নাই—পরের সুখও কখন তাহার সহ্য হয় না। এমত হইতে পারে, যে কোন আত্মচিত্তবিজয়ী মহাত্মা বিনা বাস্পমোচনে গুরুতর মনঃপীড়া সকল সহ্য করিতেছেন, এবং করিয়া থাকেন; কিন্তু তিনি যদি কস্মিন্ কালে, এক দিন বিরলে, একবিন্দু অশ্রুজলে পৃথিবী সিক্ত না করিয়া থাকেন, তবে তিনি চিত্তজয়ী মহাত্মা হইলে হইতে পারেন, কিন্তু আমি বরং চোরের সহিত প্রণয় করিব, তথাপি তাঁহার সঙ্গে নহে।

হেমচন্দ্র রোদন করিতেছিলেন,—যে স্ত্রীকে পাপিষ্ঠা, মনে স্থান দিবার অযোগ্য বলিয়া জানিয়াছিলেন, তাহার জন্য রোদন করিতেছিলেন। মৃণালিনীর কি তিনি দোষ আলোচনা করিতেছিলেন? তাহা করিতেছিলেন বটে, কিন্তু কেবল তাহাই নহে। এক একবার মৃণালিনীর প্রেমপরিপূর্ণ মুখমণ্ডল, প্রেমপরিপূর্ণ বিস্তীর্ণ নেত্র, প্রেম পরিপূর্ণ কথা, প্রেম পরিপূর্ণ কার্য্য সকল মনে করিতেছিলেন। এক দিন মথুরায়, হেমচন্দ্র মৃণালিনীর নিকট একখানি লিপি প্রেরণ করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়াছিলেন, উপযুক্ত বাহক পাইলেন না; কিন্তু মৃণালিনীকে গবাক্ষ পথে দেখিতে পাইলেন। তখন হেমচন্দ্র একটী আম্র ফলের উপরে আবশ্যকীয় কথা লিখিয়া মৃণালিনীর ক্রোড় লক্ষ্য করিয়া বাতায়ন পথে প্রেরণ করিলেন; আম্র ধরিবার জন্য মৃণালিনী কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া আসাতে আম্র মৃণালিনীর ক্রোড়ে পড়িয়া তাঁহার কর্ণে লাগিল, অমনি তদাঘাতে কর্ণবিলম্বী রত্নকুণ্ডল কর্ণ ছিন্ন ভিন্ন করিয়া কাটিয়া পড়িল; কর্ণশ্রুত রুধিরে মৃণালিনীর গ্রীবা ভাসিয়া গেল। মৃণালিনী ভ্রুক্ষেপও করিলেন না; কর্ণে হস্তও দিলেন না; হাসিয়া আম্র তুলিয়া লিপি পাঠ পূর্ব্বক, তখনই তৎপৃষ্ঠে প্রত্যুত্তর লিখিয়া আম্র প্রতিপ্রেরণ করিলেন। এবং যতক্ষণ হেমচন্দ্র দৃষ্টিপথে রহিলেন ততক্ষণ বাতায়নে থাকিয়া হাস্যমুখে দেখিতে লাগিলেন। হেমচন্দ্রের তাহা মনে পড়িল। আর এক দিন মৃণালিনীকে বৃশ্চিক দংশন করিয়াছিল। তাহার যন্ত্রণায় মৃণালিনী মুমূর্ষুবৎ কাতর হইয়াছিলেন। তাঁহার একজন পরিচারিকা তাহার উত্তম ঔষধ জানিত; তংসেবন মাত্র যন্ত্রণা একেবারে শীতল হয়; দাসী শীঘ্র ঔষধ আনিতে গেল। ইত্যবসরে হেমচন্দ্রের দূতী গিয়া কহিল যে হেমচন্দ্র উপবনে তাঁহার প্রতীক্ষা করিতেছেন। মুহুর্ত্তমধ্যে ঔষধ আসিত, কিন্তু মৃণালিনী তাহার অপেক্ষা করেন নাই; অমনি সেই মরণাধিক যন্ত্রণা বিস্মৃত হইয়া উপবনে উপস্থিত হইলেন। আর ঔষধি সেবন হইল না। হেমচন্দ্রের তাহা স্মরণ হইল। আর এক দিন হেমচন্দ্র মথুরা হইতে গুরু দর্শনে যাইতেছিলেন; মথুরা হইতে এক প্রহরের পথ আসিয়া হেমচন্দ্রের পীড়া হইল। তিনি এক পান্থনিবাসে পড়িয়া রহিলেন; কি প্রকারে এ সম্বাদ অন্তঃপুরে মৃণালিনীর কর্ণে প্রবেশ করিল। মৃণালিনী সেই রাত্রে এক ধাত্রী মাত্র সঙ্গে লইয়া রাত্রিকালে সেই এক যোজন পথ পদব্রজে অতিক্রম করিয়া হেমচন্দ্রকে দেখিতে আসিলেন। যখন মৃণালিনী পান্থনিবাসে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, তখন তিনি পথশ্রান্তিতে প্রায় নির্জ্জীব; চরণ ক্ষত বিক্ষত; রুধির বহিতেছিল। সেই রাত্রিতেই মৃণালিনী পিতার ভয়ে প্রত্যাবর্ত্তন করিলেন। গৃহে আসিয়া তিনি স্বয়ং পীড়িতা হইলেন। হেমচন্দ্রের তাহাও মনে পড়িল। আর কত দিনের কত কথা মনে পড়িল। সেই সকল কথা মনে করিয়া হেমচন্দ্র কাঁদিতেছিলেন, শত বার আপনি প্রশ্ন করিতেছিলেন, “সেই মৃণালিনী অবিশ্বাসিনী—ইহা কি সম্ভব?” শতবার ভাবিতেছিলেন, “কেন আমি মৃণালিনীর পত্র পড়িলাম না? নবদ্বীপে কেন আসিয়াছে তাহাই বা কেন জানিলাম না? তাহা হইলে এ সংশয়ের মোচন হইত।” পত্র খণ্ড গুলিন যে বনে নিক্ষিপ্ত করিয়াছিলেন, তাহা যদি সেখানে পাওয়া যায় তবে তাহা মুক্ত করিয়া যতদূর পারেন, ততদূর মর্ম্মাবগত হইবেন; এইরূপ প্রত্যাশা করিয়া এক বার সেই বন পর্য্যন্ত গিয়াছিলেন, কিন্তু সেখানে বনতলস্থ অন্ধকারে কিছুই দেখিতে পায়েন নাই। বায়ু লিপিখণ্ড সকল উড়াইয়া লইয়া গিয়াছিল। যদি তখন আপন দক্ষিণ বাহু ছেদন করিয়া দিলে হেমচন্দ্র সেই লিপিখণ্ড গুলিন পাইতেন তবে হেমচন্দ্র তাহাও দিতেন।

আবার ভাবিতে ছিলেন, “আচার্য্য কেন মিথ্যা কথা বলিবেন। আচার্য্য অত্যন্ত সত্যনিষ্ঠ—কখন মিথ্যা বলিবেন না। বিশেষ আমাকে পুত্রাধিক স্নেহ করেন—জানেন এ সম্বাদে আমার মরণাধিক যন্ত্রণা হইবে, কেন আমাকে তিনি মিথ্যা কথা বলিয়া এত যন্ত্রণা দিবেন? আর তিনিও স্বেচ্ছাক্রমে এ কথা বলেন নাই। আমি সদর্পে তাঁহার নিকট কথা বাহির করিয়া লইলাম—যখন আমি বলিলাম যে আমি সকলই অবগত আছি—তখনই তিনি কথা বলিলেন। মিথ্যা বলিবার উদ্দেশ্য থাকিলে বলিতে অনিচ্ছুক হইবেন কেন? তবে হইতে পারে, হৃষীকেশ তাঁহার নিকট মিথ্যা বলিয়া থাকিবে। কিন্তু হৃষীকেশই বা অকারণে গুরুর নিকট মিথ্যা বলিবে কেন? আর মৃণালিনীই বা তাহার গৃহ ত্যাগ করিয়া নবদ্বীপে আসিবে কেন? মৃণালিনী অবিশ্বাসিনী বা?”

যখন এইরূপ ভাবেন, তখন হেমচন্দ্রের মুখ কালিমাময় হয়, ললাট ঘর্ম্মসিক্ত হয়; তিনি শয়ন ত্যাগ করিয়া উঠিয়া বসেন; দন্তে অধর দংশন করেন, লোচন আরক্ত এবং বিস্ফারিত হয়; শূল ধারণ জন্য হস্ত মুষ্টিবদ্ধ হয়। আবার মৃণালিনীর প্রেমময় মুখমণ্ডল মনে পড়ে। অমনি ছিন্নমুল বৃক্ষের ন্যায় শয্যায় পতিত হয়েন; উপাধানে মুখ লুক্কায়িত করিয়া শিশুর ন্যায় রোদন করেন। হেমচন্দ্র ঐরূপ রোদন করিতে ছিলেন, এমত সময়ে তাঁহার শয়নগৃহের দ্বার উদঘাটিত হইল। গিরিজায়া প্রবেশ করিল।

হেমচন্দ্র প্রথমে মনে করিলেন মনোরমা। তখনই দেখিলেন, সে কুসুমময়ী মূর্ত্তি নহে। পরে চিনিলেন যে গিরিজায়া। প্রথমে বিস্মিত, পরে আহ্লাদিত, শেষে কৌতুহলাক্রান্ত হইলেন। বলিলেন, “তুমি আবার কেন?”

গিরিজায়া কহিল, “আমি মৃণালিনীর দাসী। মৃণালিনীকে আপনি ত্যাগ করিয়াছেন কিন্তু আপনি মৃণালিনীর ত্যাজ্য নহেন। সুতরাং আমাকে আবার আসিতে হইয়াছে। আমাকে বেত্রাঘাত করিতে সাধ থাকে করুন। আমি একবার সরিয়া গিয়াছিলাম কিন্তু ঠাকুরাণীর জন্য এবার তাহা সহিব স্থির সঙ্কল করিয়াছি।”

এ তিরস্কারে হেমচন্দ্র অত্যন্ত অপ্রতিভ হইলেন। বলিলেন, “তোমার কোন শঙ্কা নাই। স্ত্রীলোককে আমি মারিব না। তুমি কেন আসিয়াছ? মৃণালিনী কোথায়? বৈকালে তুমি বলিয়াছিলে তিনি নবদ্বীপে আসিয়াছেন? নবদ্বীপে আসিয়াছেন কেন? আমি তাঁহার পত্র না পড়িয়া ভাল করি নাই।”

গি। “মৃণালিনী নবদ্বীপে আপনাকে দেখিতে আসিয়াছেন।”

হেমচন্দ্রের শরীর কণ্টকিত হইল। এই মৃণালিনীকে কুলটা বলিয়া অপমানিত করিয়াছেন? তিনি পুনরপি গিরিজায়াকে কহিলেন “মৃণালিনী কোথায় আছেন?”

গি। “তিনি আপনার নিকট জন্মের শোধবিদায় লইতে আসিয়াছেন। সরোবরতীরে দাঁড়াইয়া আছেন। আপনি আসুন।”

এই বলিয়া গিরিজায়া চলিয়া গেল। হেমচন্দ্র তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবিত হইলেন।

গিরিজায়া বাপীতীরে, যথায় মৃণালিনী সোপানোপরি বসিয়া ছিলেন, তথায় উপনীত হইলেন। হেমচন্দ্র ও তথায় আসিলেন। গিরিজায়া কহিল, “ঠাকুরাণি! গাত্রোত্থান কর। রাজপুত্র আসিয়াছেন।”

মৃণালিনী উঠিয়া দাঁডাইলেন। উভয়ে উভয়ের মুখ নিরীক্ষণ করিলেন। মৃণালিনীর দৃষ্টি লোপ হইল; অশ্রুজলে চক্ষু পূরিয়া গেল। অবলম্বন শাখা ছিন্ন হইলে যেমন শাখাবিলম্বিনী লতা ভূতলে পড়িয়া যায়, মৃণালিনী সেইরূপ হেমচন্দ্রের পদমূলে পতিত হইলেন। গিরিজায়া অন্তরে গেল।

দ্বিতীয় খণ্ড · নবম পরিচ্ছেদ

নবম পরিচ্ছেদ।

মোহিতা।

পশুপতি অতৃপ্ত নয়নে দেখিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে মনোরমার সৌন্দর্য্য-সাগরের এক অপূর্ব্ব মহিমা দেখিতে পাইলেন। যেমন সূর্য্যের প্রখর করমালায় হাস্যময় অম্বুরাশি মেঘ সঞ্চারে ক্রমে ক্রমে গম্ভীর কৃষ্ণ কান্তি প্রাপ্ত হয়, তেমনি পশুপতি দেখিতে দেখিতে মনোরমার সৌকুমার্য্যময় মুখমণ্ডল গম্ভীর হইতে লাগিল। আর সে বালিকা সুলভ ঔদার্য্য-ব্যঞ্জক ভাব রহিল না। অপূর্ব্ব তেজোভিব্যক্তির সহিত, প্রগল্ভ বয়সের ও দুর্লভ গাম্ভীর্য্য তাহাতে বিরাজ করিতে লাগিল। পশুপতি কহিলেন, “মনোরমে, এত রাত্রে কেন আসিয়াছ?—এ কি? আজি তোমার এ ভাব কেন?”

মনোরমা উত্তর করিলেন, “আমার কি ভাব দেখিলে?”

প। “তোমার দুই মূর্ত্তি—এক মূর্ত্তি আনন্দময়ী, সরলা, বালিকা—সে মুর্ত্তিতে কেন আসিলে না—সেই রূপে আমার হৃদয় শীতল হয়। আর তোমার এই মূর্ত্তি—গম্ভীরা, তেজস্বিনী, প্রখর বুদ্ধিশালিনী—সেমূর্ত্তি দেখিলে আমি ভীত হই। তখন বুঝিতে পারি, যে তুমি কোন দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছ। আজি তুমি এ মূর্ত্তিতে আমাকে ভয় দেখাইতে কেন আসিয়াছ?”

ম। “পশুপতি, তুমি এত রাত্রি জাগরণ করিয়া কি করিতেছ?”

প। “আমি রাজকার্য্যে ব্যস্ত ছিলাম—কিন্তু তুমি—”

ম। “পশুপতি, আবার? রাজ কার্য্যে না আত্মকার্য্যে?”

প। “আত্মকার্য্যই বল। রাজকার্য্যই হউক আর আত্মকার্য্যই হউক আমি কবে না ব্যস্ত থাকি? তুমি আজি জিজ্ঞাসা করিতেছ কেন?”

ম।”আমি সকল শুনিয়াছি।”

প। “কি শুনিয়াছ?”

ম। “যবনের সহিত পশুপতির মন্ত্রণা—শান্তশীলের সহিত মন্ত্রণা—দ্বার পার্শ্বে থাকিয়া সকল শুনিয়াছি।”

পশুপতির মুখমণ্ডল যেন মেঘান্ধকারে ব্যাপ্ত হইল। তিনি বহুক্ষণ চিন্তামগ্ন থাকিয়া কহিলেন।

“ভালই হইয়াছে। সকল কথাই আমি তোমাকে বলিতাম—না হয় তুমি আগে শুনিয়াছ। তুমি কোন্ কথা না জান?”

ম। “পশুপতি, তুমি আমাকে ত্যাগ করিলে?”

প। “কেন, মনোরমে? তোমার জন্যই আমি এ মন্ত্রণা করিয়াছি। আমি এক্ষণে রাজভৃত্য, ইচ্ছামত কার্য্য করিতে পারি না। এখন বিধবাবিবাহ করিলে জনসমাজে পরিত্যক্ত হইব কিন্তু যখন আমি স্বয়ং রাজা হইব তখন কে আমায় ত্যাগ করিবে? যেমন বল্লাল সেন কৌলীন্যের নূতন পদ্ধতি প্রচলিত করিয়াছিলেন, আমি সেইরূপ বিধবার পরিণয়ের নূতন পদ্ধতি প্রচলিত করিব।”

মনোরম দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, “পশুপতি, সে সকল আমার পক্ষে স্বপ্ন মাত্র। তুমি রাজা হইলে, আমার সে স্বপ্ন ভঙ্গ হইবে। আমি কখন তোমার মহিষী হইব না।”

প। “কেন, মনোরমে?”

ম। “কেন? তুমি রাজ্যভার গ্রহণ করিলে আর কি আমায় ভাল বাসিবে? রাজ্যই তোমার হৃদয়ে প্রধান স্থান লাভ করিবে।—তখন আমার প্রতি তোমার হতাদর হইবে। তুমি যদি ভাল না বাসিলে —তবে আমি কেন তোমার পত্নীত্বশৃঙ্খলে বদ্ধ হইব?”

প। “এ কথাকে কেন মনে করিতেছ? অগ্রে তুমি—পরে রাজ্য। আমার চিরকাল এইরূপ থাকিবে।”

ম। “রাজা হইয়া যদি তাহা কর, রাজ্য অপেক্ষা প্রণয়ে যদি অধিক মনোভিনিবেশ কর তবে তুমি রাজ্য করিতে পারিবে না। তুমি রাজ্যচ্যুত হইবে। বিলাসানুরাগী রাজার রাজ্য থাকে না।”

পশুপতি প্রশংসমান চক্ষে মনোরমার মুখপ্রতি চাহিয়া রহিলেন। কহিলেন, “যাহার বামে এমন সরস্বতী, তাহার আশঙ্কা কি? না হয় তাহাই হউক। তোমার জন্য রাজ্য ত্যাগ করিব।”

ম। “তবে রাজ্য গ্রহণ করিতেছ কেন? ত্যাগার্থ গ্রহণে ফল কি?”

প। “তোমার পাণিগ্রহণ।”

ম। “সে আশা ত্যাগ কর। তুমি রাজ্যলাভ করিলে আমি কখন তোমার পত্নী হইব না।”

প। “কেন, মনোরমে! আমি কি অপরাধ করিলাম?”

ম। “তুমি বিশ্বাসঘাতক—আমি বিশ্বাসঘাতককে কি প্রকারে ভক্তি করিব? কি প্রকারে বিশ্বাসঘাতককে ভাল বাসিব।”

প। “কেন আমি কিসে বিশ্বাসঘাতক হইলাম?”

ম। “তোমার প্রতিপালক প্রভুকে রাজ্যচ্যুত করিবার কল্পনা করিতেছ; শরণাগত রাজপুত্রকে বধের কল্পনা করিতেছ; ইহা কি বিশ্বাসঘাতকের কর্ম্ম নয়? যে প্রভুর নিকট বিশ্বাস নষ্ট করিল, অতিথির নিকট বিশ্বাস নষ্ট করিল সে পত্নীর নিকট অবিশ্বাসী না হইবে কেন?”

পশুপতি নীরব হইয়া রহিলেন। মনােরম পুনরপি বলিতে লাগিলেন, “পশুপতি, আমি মিনতি করিতেছি এই দুরভিসন্ধি ত্যাগ কর।”

পশুপতি পূর্ব্ববৎ অধােবদনে রহিলেন, তাঁহার রাজ্যাকাঙ্ক্ষা এবং মনােরমার লাভাকাঙ্ক্ষা উভয়ই গুরুতর। কিন্তু রাজ্য লাভের যত্ন করিলে, মনোরমার প্রণয় হারাইতে হয় সেও অত্যজ্য। উভয় শঙ্কটে তাঁহার চিত্ত মধ্যে গুরুতর চাঞ্চল্য জন্মিল। তাঁহার মতির স্থিরতা দূর হইতে লাগিল। “যদি মনােরমাকে পাই ভিক্ষাও ভাল, রাজ্যে কাজ কি?” এইরূপ পুনঃ পুনঃ মনে ইচ্ছা হইতে লাগিল। কিন্তু তখনই আবার ভাবিতে লাগিলেন, “কিন্তু তাহা হইলে লােকনিন্দা, জনসমাজে কলঙ্ক, জাতিনাশ, সকলের ঘৃণিত হইব। তাহা কি প্রকারে সহিব?” পশুপতি নীরবে রহিলেন; কোন উত্তর দিতে পারিলেন না।

মনােরমা উত্তর না পাইয়া কহিতে লাগিলেন, “শুন পশুপতি, তুমি আমার কথায় উত্তর দিলে না। আমি চলিলাম। কিন্তু এই প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে ইহ জন্মে আমার সাক্ষাৎ হইবে না।”

এই বলিয়া মনােরম পশ্চাৎ ফিরিলেন। পশুপতি রােদন করিয়া উঠিলেন।

অমনি মনোরমা আবার ফিরিলেন। আসিয়া পশুপতির হস্তধারণ করিলেন। পশুপতি তাঁহার মুখপানে চাহিয়া দেখিলেন। দেখিলেন, যে তেজোগর্ব্ববিশিষ্টা, কুঞ্চিতভ্রূবীচি-বিক্ষেপকারিণী সরস্বতী মূর্ত্তি আর নাই; কুসুম সুকুমারী বালিকা তাঁহার হস্তধারণ করিয়া তাঁহার সঙ্গে রােদন করিতেছে।

মনােরমা কহিলেন, “পশুপতি, কাঁদিতেছ কেন?”

পশুপতি চক্ষের জল মুছিয়া কহিলেন, “তােমার কথায়।” ম। “কেন, আমি কি বলিয়াছি?”

প। “তুমি আমাকে ত্যাগ করিয়া যাইতেছিলে।”

ম। “আর আমি এমন কর্ম্ম করিব না।”

প। “তুমি আমার রাজমহিষী হইবে?”

ম। “হইব।”

পশুপতির আনন্দ সাগর উছলিয়া উঠিল। উভয়ে অশ্রুপূর্ণ লোচনে উভয়ের মুখপ্রতি চাহিয়া উপবেশন করিয়া রহিলেন। সহসা মনোরমা পক্ষিণীর ন্যায় গাত্রোত্থান করিয়া চলিয়া গেলেন।

চতুর্থ খণ্ড · পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।

অন্তিমকালে।

পশুপতি স্বয়ং অষ্টভুজার অর্চনা করিতেন বটে―কিন্তু তথাপি তাঁহার নিত্য সেবার জন্য দুর্গাদাস নামে এক জন ব্রাহ্মণ নিযুক্ত ছিলেন। নগরবিপ্লবের পরদিবস দুর্গাদাস শ্রুত হইলেন যে পশুপতির গৃহ ভস্মীভূত হইয়া ভূমিসাৎ হইয়াছে। তখন ব্রাহ্মণ অষ্টভুজার মূর্ত্তি ভস্ম হইতে উদ্ধৃত করিয়া আপন গৃহে স্থাপন করিবার সঙ্কল্প করিলেন। যবনেরা নগর লুঠ করিয়া তৃপ্ত হইলে, বখ্‌তিয়ার খিলিজি অনর্থক নগরবাসীদিগের পীড়ন নিষেধ করিয়া দিয়াছিলেন। সুতরাং এক্ষণে সাহস করিয়া বাঙ্গালিরা রাজপথে বাহির হইতেছিল। ইহা দেখিয়া দুর্গাদাস অপরাহ্নে অষ্টভুজার উদ্ধারে পশুপতির ভবনাভিমুখে যাত্রা করিলেন। পশুপতির ভবনে গমন করিয়া, যথায় দেবীর মন্দির ছিল, সেই প্রদেশে গেলেন। দেখিলেন অনেক ইষ্টকরাশি স্থানান্তরিত না করিলে, দেবীর প্রতিমা বহিষ্কৃত করিতে পারা যায় না। ইহা দেখিয়া দুর্গাদাস আপন পুত্রকে ডাকিয়া আনিলেন। ইষ্টক সকল অর্দ্ধ দ্রবীভূত হইয়া পরস্পর
লিপ্ত হইয়াছিল―এবং এক্ষণ পর্য্যন্ত সন্তপ্ত ছিল। পিতাপুত্রে এক দীর্ঘিকা হইতে জলবহন করিয়া তপ্ত ইষ্টক সকল শীতল করিলেন, এবং বহু কষ্টে তন্মধ্য হইতে অষ্টভুজার অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। যথাস্থানের ইষ্টকরাশি স্থানান্তরিত হইলে তন্মধ্য হইতে দেবীর প্রতিমা আবিষ্কৃতা হইল। কিন্তু প্রতিমার পাদমূলে―এ কি? সভয়ে পিতাপুত্র নিরীক্ষণ করিলেন যে মনুষ্যের মৃতদেহ রহিয়াছে। তখন উভয়ে মৃতদেহ উত্তোলন করিয়া দেখিলেন যে পশুপতির দেহ।

বিস্ময়সূচক বাক্যের পর দুর্গাদাস কহিলেন, “যে প্রকারেই প্রভুর এ দশা হইয়া থাকুক, ব্রাহ্মণের এবঞ্চ প্রতিপালিতের কার্য্য আমাদিগের অবশ্য কর্তব্য। গঙ্গাতীরে এই দেহ লইয়া আমরা প্রভুর সৎকার করি চল।”

এই বলিয়া দুই জনে প্রভুর দেহ বহন করিয়া গঙ্গাতীরে লইয়া গেলেন। তথায় পুত্রকে শবরক্ষায় নিযুক্ত করিয়া দুর্গাদাস নগরে কাষ্ঠাদি সৎকারের উপযোগী সামগ্রীর অনুসন্ধানে গমন করিলেন। এবং যথাসাধ্য সুগন্ধী কাষ্ঠ এবং অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করিয়া গঙ্গাতীরে প্রত্যাগমন করিলেন।

তখন দুর্গাদাস পুত্রের আনুকূল্যে যথাশাস্ত্র দাহের পূর্ব্বগামিক্রিয়া সকল সমাপন করিয়া সুগন্ধী কাষ্ঠে চিতা রচনা করিলেন। এবং তদুপরি পশুপতির মৃতদেহ স্থাপন করিয়া অগ্নি প্রদান করিতে গেলেন।

কিন্তু অকস্মাৎ শ্মশানভূমে এ কাহার আবির্ভাব হইল? ব্রাহ্মণদ্বয় বিস্মিতলোচনে দেখিলেন যে, এক মলিন বসনা, রূক্ষকেশী, আলুলায়িতকুন্তলা, ভস্ম ধূলি সংসর্গে বিবর্ণা, উন্মাদিনী আসিয়া শ্মশানভূমে অবতরণ করিতেছে। রমণী ব্রাহ্মণদিগের নিকটবর্ত্তিনী হইলেন। দুর্গাদাস সভয়চিত্তে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কে?”

রমণী কহিলেন, “তোমরা কাহার সৎকার করিতেছ?”

দুর্গাদাস কহিলেন, “মৃত ধর্ম্মাধিকার পশুপতির।”

রমণী কহিলেন, “পশুপতির কি প্রকারে মৃত্যু হইল?”

দুর্গাদাস কহিলেন, “প্রাতে নগরে জনরব শুনিয়াছিলাম যে তিনি যবন কর্ত্তৃক কারাবদ্ধ হইয়া কোন সুযোগে রাত্রিকালে পলায়ন করিয়াছিলেন। অদ্য তাঁহার অট্টালিকা ভস্মসাৎ হইয়াছে দেখিয়া ভস্মমধ্য হইতে অষ্টভুজার প্রতিমা উদ্ধার মানসে গিয়াছিলাম। তথায় গিয়া প্রভুর মৃতদেহ পাইলাম।”

রমণী কোন উত্তর করিলেন না। গঙ্গাতীরে, সৈকতের উপর উপবেশন করিলেন। বহুক্ষণ নীরবে থাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমরা কে?” দুর্গাদাস কহিলেন, “আমরা ব্রাহ্মণ। ধর্ম্মাধিকারের অন্নে প্রতিপালিত হইয়াছিলাম। আপনি কে?”

তরুণী কহিলেন, “আমি তাঁহার পত্নী।”

দুর্গাদাস কহিলেন, “তাঁহার পত্নী বহুকাল নিরুদ্দিষ্টা। আপনি কি প্রকারে তাঁহার পত্নী?”

যুবতী কহিলেন, “আমি সেই নিরুদ্দিষ্টা কেশবকন্যা। অনুমরণভয়ে পিতা আমাকে এতকাল লুক্কায়িত রাখিয়াছিলেন। আমি অদ্য কালপূর্ণে বিধিলিপি পূরাইবার জন্য আসিয়াছি।”

শুনিয়া পিতাপুত্রে শিহরিয়া উঠিলেন। তাহাদিগকে নিরুত্তর দেখিয়া বিধবা বলিতে লাগিলেন, “এক্ষণে স্ত্রী জাতির কর্ত্তব্য কার্য্য করিব। তোমরা উদ্যোগ কর।”

দুর্গাদাস তরুণীর অভিপ্রায় বুঝিলেন। পুত্রের মুখ চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি বল?”

পুত্র কিছু উত্তর করিল না। দুর্গাদাস তখন তরুণীকে কহিলেন, “মা, তুমি বালিকা―এ কঠিন কার্য্যে কেন প্রস্তুত হইতেছ?”

তরুণী ভ্রূভঙ্গী করিয়া কহিলেন, “ব্রাহ্মণ হইয়া অধর্ম্মে প্রবৃত্তি দিতেছ কেন?―ইহার উদ্যোগ কর।”

তখন ব্রাহ্মণ আয়োজনজন্য নগরে পুনর্ব্বার চলিলেন। গমনকালে বিধবা দুর্গাদাসকে কহিলেন, “তুমি, নগরে যাইতেছ। নগরপ্রান্তে রাজার উপবনবাটিকায় হেমচন্দ্র নামে বিদেশী রাজপুত্র বাস করেন। তাঁহাকে বলিও মনোরমা গঙ্গাতীরে চিতারোহণ করিতেছে―তিনি আসিয়া একবার তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া যাউন, তাঁহার নিকট ইহলোকে মনোরমার এইমাত্র ভিক্ষা।”

হেমচন্দ্র যখন ব্রাহ্মণমুখে শুনিলেন, যে মনোরমা পশুপতির পত্নী পরিচয়ে তাঁহার অনুমৃতা হইতেছেন, তখন তিনি কিছুই বুঝিতে পারিলেন না। অতি ব্যস্তে দুর্গাদাসের সমভিব্যাহারে গঙ্গাতীরে আসিলেন। তথায় মনোরমার অতি মলিনা, উন্মাদিনী মূর্ত্তি, তাহার স্থির গম্ভীর, এখনও অনিন্দ্য-সুন্দর, মুখকান্তি দেখিয়া তাঁহার চক্ষের জল আপনি বহিতে লাগিল। তিনি বলিলেন “মনোরমে! ভগিনি! এ কি এ?”

তখন মনোরমা, জ্যোৎস্নাপ্রদীপ্ত সরোবর তুল্য স্থির মূর্ত্তিতে মৃদু-গম্ভীর স্বরে, কহিলেন, “ভ্রাতঃ যে জন্য আমার জীবন, তাহা আজি চরমপ্রাপ্ত হইয়াছে। অদ্য আমি আমার স্বামীর সঙ্গে গমন করিব।”

মনোরমা সংক্ষেপে অন্যের অশ্রাব্য স্বরে হেমচন্দ্রের নিকট পূর্ব্বকথার পরিচয় দিয়া বলিলেন,

“আমার স্বামী অপরিমিত ধনসঞ্চয় করিয়া রাখিয়া গিয়াছেন। আমি এক্ষণে সে ধনের অধিকারিণী। আমি তাহা তোমাকে দান করিতেছি। তুমি তাহা গ্রহণ করিও। নচেৎ পাপিষ্ঠ যবনে তাহা ভোগ করিবে। তাহার অল্পাংশ ব্যয় করিয়া জনার্দ্দন শর্ম্মাকে কাশীধামে স্থাপন করিবে। জনার্দ্দনকে অধিক ধন দিও না। তাহা হইলে যবনে অপহরণ করিবে। আমার দাহান্তে তুমি আমার স্বামীর গৃহে গিয়া অর্থের অনুসন্ধান করিও। আমি যে স্থান বলিয়া দিতেছি সেই স্থান খনন করিলেই তাহা পাইবে। আমি ভিন্ন সে স্থান আর কেহই জানে না।” এই বলিয়া মনোরমা যথায় অর্থ আছে তাহা বর্ণিত করিলেন।

তখন মনোরমা আবার হেমচন্দ্রের নিকট বিদায় হইলেন। জনার্দ্দনকে ও তাঁহার পত্নীকে উদ্দেশে প্রণাম করিয়া হেমচন্দ্রের দ্বারা তাঁহাদিগের নিকট কত স্নেহসূচক কথা বলিয়া পাঠাইলেন।

পরে ব্রাহ্মণেরা মনোরমাকে যথা শাস্ত্র এই ভীষণ ব্রতে বৃতা করাইলেন। এবং শাস্ত্রীয় আচারান্তে, মনোরমা ব্রাহ্মণের আনীত নূতন বস্ত্র পরিধান করিলেন। দিব্য বসন পরিধান করিয়া, দিব্য পুষ্পমালা কণ্ঠে পরিয়া, পশুপতির প্রজ্বলিত চিতা প্রদক্ষিণ পূর্ব্বক, তদুপরি আরোহণ করিলেন। এবং সহাস্য আননে সেই প্রজ্বলিত হুতাশন রাশির মধ্যে উপবেশন করিয়া, নিদাঘসন্তপ্ত-কুসুম-কলিকার ন্যায় অনলতাপে প্রাণত্যাগ করিলেন।

চতুর্থ খণ্ড · পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

জাল ছিঁড়িল।

বঙ্গেশ্বরপুরে অধিষ্ঠিত হইয়াই বখ্‌তিয়ার খিলিজি ধর্ম্মাধিকারের নিকট দূত প্রেরণ করিলেন। ধর্ম্মাধিকারের সহিত সাক্ষাতের অভিলাষ জানাইলেন। তাঁহার সহিত যবনের সন্ধি নিবন্ধন হইয়াছিল, তাহার ফলোৎপাদনের সময় উপস্থিত!

পশুপতি ইষ্টদেবীকে প্রণাম করিয়া, কুপিতা মনোরমার নিকট বিদায় লইয়া, কদাচিৎ উল্লাসিত, কদাচিৎ সশঙ্কিত চিত্তে যবন সমীপে উপস্থিত হইলেন। বখ্‌তিয়ার খিলিজি গাত্রোত্থান করিয়া সাদরে তাঁহার অভিবাদন করিলেন এবং কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। পশুপতি রাজভৃত্যবর্গের রক্তনদীতে চরণ প্রক্ষালিত করিয়া আসিয়াছেন, সহর্ষে কোন উত্তর দিতে পারিলেন না। বখ্‌তিয়ার খিলিজি তাঁহার চিত্তের ভাব বুঝিতে পারিয়া কহিলেন,

“পণ্ডিতবর! রাজসিংহাসনারোহণের পথ কুসুমাবৃত নহে। এ পথে চলিতে গেলে, বন্ধু বর্গের অস্থিমুণ্ড সর্ব্বদা পদে বিদ্ধ হয়।”

পশুপতি কহিলেন, “সত্য। কিন্তু যাহারা বিরোধী তাহাদিগের বধ আবশ্যক। ইহারা নির্ব্বিরোধী।”

বখ্‌তিয়ার কহিলেন, “আপনি কি শোণিত প্রবাহ দেখিয়া নিজ অঙ্গীকার স্মরণে অসুখী হইতেছেন।”

পশুপতি কহিলেন, “যাহা স্বীকার করিয়াছি, তাহা অবশ্য করিব। মহাশয়ও যে তদ্রুপ করিবেন তাহাতে আমার কোন সংশয় নাই।”

বখ্। “কিছুমাত্র সংশয় নাই। কেবল মাত্র আমাদিগের এক যাজ্ঞা আছে।”

প। “আজ্ঞা করুন।”

ব। “কুতবউদ্দীন বঙ্গশাসনভার আপনার প্রতি অর্পিত করিলেন। অদ্য হইতে আপনি বঙ্গে রাজ প্রতিনিধি হইলেন। কিন্তু যবন সম্রাটের সঙ্কল্প এই যে যবন ধর্ম্মাবলম্বী ব্যতীত কেহ তাহার রাজকার্য্যে সংলিপ্ত হইতে পারিবে না। আপনাকে যবনধর্ম্ম অবলম্বন করিতে হইবে?”

পশুপতির মুখ শুকাইল। তিনি কহিলেন “সন্ধির সময়ে এরূপ কোন কথা হয় নাই।”

ব। “যদি না হইয়া থাকে, তবে সেটা ভ্রান্তি মাত্র। আর এ কথা উত্থাপিত না হইলেও; আপনার ন্যায় বুদ্ধিমান্ ব্যক্তির দ্বারায় অনায়াসেই অনুমিত হইয়া থাকিবে। কেন না এমন কখন সম্ভবে না যে নবজিত হিন্দুরাজ্য যবন কর্ত্তৃক হিন্দুহস্তে প্রত্যর্পিত হইবে।”

প। “আমি বুদ্ধিমান্ বলিয়া আপনার নিকট প্রতীয়মান হইতে পারিলাম না। ইহা আমা কর্ত্তৃক অনুমিত হয় নাই।”

ব। “যদিও পূর্ব্বে না হইয়া থাকে, তবে এক্ষণে হইল। আপনি যবনধর্ম্ম অবলম্বনে স্থিরসঙ্কল্প হউন।”

প। (সদর্পে) “আমি স্থিরসঙ্কল্প হইয়াছি যে যবন সম্রাটের সাম্রাজ্যের জন্যেও সনাতন ধর্ম্ম ত্যাগ করিয়া নরকগামী হইব না।”

ব। “ইহা আপনার ভ্রম। যাহাকে সনাতন ধর্ম্ম বলিতেছেন, সে ভূতের পূজা মাত্র। কোরাণ উক্ত ধর্ম্মই সত্য ধর্ম্ম। তদবলম্বী হইয়া ইহকাল পরকালের মঙ্গল সাধন করুন।”

পশুপতি যবনের শঠতা বুঝিলেন। বুঝিলেন যে তাহার অভিপ্রায় এই মাত্র, যে কার্য্য সিদ্ধ করিয়া নিবদ্ধ সন্ধি ছলক্রমে ভঙ্গ করিবে। আরও বুঝিলেন, ছলক্রমে না পারিলে বলক্রমে করিবে। অতএব কপটের সহিত কাপট্য অবলম্বন না করিয়া দর্প করিয়া ভাল করেন নাই। তিনি ক্ষণেক চিন্তা করিয়া কহিলেন, “যে আজ্ঞা আমি আজ্ঞানুবর্ত্তী হইব।”

বখ্‌তিয়ার ও তাঁহার মনের ভাব বুঝিলেন। বখ্‌তিয়ার যদি পশুপতির অপেক্ষা চতুর না হইতেন তবে এত সহজে বঙ্গ জয় করিতে পারিতেন না। বঙ্গভূমির অদৃষ্টলিপি এই যে এ ভূমি যুদ্ধে জিত হইবে না; চাতুর্য্যেই ইহার জয়। চতুর ক্লাইব সাহেব ইহার দ্বিতীয় পরিচয় স্থান।

বখ্‌তিয়ার কহিলেন, “ভাল, ভাল। অদ্য আমাদিগের শুভ দিন। এরূপ কার্য্যে বিলম্বের প্রয়োজন নাই। আমাদিগের পুরোহিত উপস্থিত; এখনই আপনাকে ইস্‌লামের ধর্ম্মে দীক্ষিত করিবেন।”

পশুপতি দেখিলেন, সর্ব্বনাশ। বলিলেন, “একবার মাত্র অবকাশ দিউন, পরিবারগণকে লইয়া আসি, সপরিবারে একেবারে দীক্ষিত হইব।”

বখ্‌তিয়ার কহিলেন, “আমি তাঁহাদিগকে আনিতে লোক পাঠাইতেছি। আপনি এই প্রহরীর সঙ্গে গিয়া বিশ্রাম করুন্।”

প্রহরী আসিয়া পশুপতিকে ধরিল। পশুপতি ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলেন, “সে কি? আমি কি বন্দী হইলাম?”

বখ্‌তিয়ার কহিলেন, “আপাততঃ তাহাই বটে।”

পশুপতি রাজপুরী মধ্যে নিরুদ্ধ হইলেন। ঊর্ণনাভে র জাল ছিঁড়িল—সে জালে কেবল সে স্বয়ং জড়িত হইল। আমরা পাঠক মহাশয়ের নিকট পশুপতিকে বুদ্ধিমান্ বলিয়া পরিচিত করিয়াছি। পাঠক মহাশয় বলিবেন, যে ব্যক্তি শত্রুকে এতদূর বিশ্বাস করিল, সহায়হীন হইয়া তাহাদিগের অধিকৃত পুরীমধ্যে প্রবেশ করিল তাহার চতুরতা কোথায়? কিন্তু বিশ্বাস করিয়া কি করেন। এ বিশ্বাস না করিলে যুদ্ধ করিতে হয়। ঊর্ণনাভ জাল পাতে, যুদ্ধ করে না।

সেই দিন রাত্রিকালে মহাবন হইতে বিংশতি সহস্র যবন আসিয়া নবদ্বীপ প্লাবিত করিল। বঙ্গজয় সম্পন্ন হইল। যে সূর্য্য সেই দিন অস্তে গিয়াছে, আর তাহার উদয় হইল না। আর কি উদয় হইবে না? উদয় অস্ত উভয়ই ত স্বাভাবিক নিয়ম। আকাশের সামান্য নক্ষত্রটাও অস্ত গেলে পুনরুদিত হয়।

তৃতীয় খণ্ড · পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

আর একটি সম্বাদ।

সেই দিন মাধবাচার্য্যের পর্যটন সমাপ্ত হইল। তিনি নবদ্বীপে উপস্থিত হইলেন। তথায় প্রিয়শিষ্য হেমচন্দ্রকে দর্শন দান করিয়া চরিতার্থ করিলেন। এবং আশীর্ব্বাদ আলিঙ্গন কুশল প্রশ্নাদির পরে, বিরলে উভয়ের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কথোপকথন করিতে লাগিলেন।

আপন ভ্রমণবৃত্তান্ত সবিস্তারে বিবরিত করিয়া মাধবাচার্য্য কহিলেন; “এত শ্রম করিয়া কতকদূর কৃতকার্য্য হইয়াছি। এতদ্দেশের অধীন রাজগণের মধ্যে অনেকেই রণক্ষেত্রে সসৈন্যে সেনরাজার সহায়তা করিতে স্বীকৃত হইয়াছেন। অচিরাৎ সকলে আসিয়া নবদ্বীপে সমবেত হইবেন।”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “তাঁহারা অদ্যই এস্থানে না আসিলে সকলই বিফল হইবে। যবনসেনা আসিয়াছে, মহাবনে অবস্থিতি করিতেছে। আজি কালি নগর আক্রমণ করিবে।”

মাধবাচার্য্য শুনিয়া শিহরিয়া উঠিলেন। কহিলেন, “বঙ্গেশ্বরের পক্ষ হইতে কি উদ্যম হইয়াছে?”

হে। “কিছুই না। বোধ হয় রাজসন্নিধানে এ সম্বাদ এ পর্যন্ত প্রচার হয় নাই। আমি দৈবাৎ কালি এ সম্বাদ প্রাপ্ত হইয়াছি।”

মা। “এ বিষয় তুমি রাজগোচর করিয়া সৎপরামর্শ দাও নাই কেন?”

হে। “সম্বাদ প্রাপ্তির পরেই পথিমধ্যে দ্স্যু কর্ত্তৃক আহত হইয়া রাজপথে পড়িয়াছিলাম। এইমাত্র গৃহে আসিয়া কিঞ্চিৎ বিশ্রাম করিতেছি। বলহানি প্রযুক্ত রাজসমক্ষে যাইতে পারি নাই। এখনই যাইতেছি।”

মা। “তুমি এখন বিশ্রাম কর। আমি রাজার নিকট যাইতেছি। পশ্চাৎ যেরূপ হয় তোমাকে জানাইব।” এই। বলিয়া মাধবাচার্য্য গাত্রোথান করিলেন।

তখন হেমচন্দ্র বলিলেন, “প্রভো! আপনি গৌড় পর্য্যন্ত গমন করিয়াছিলেন শুনিলাম—?

মাধবাচার্য্য অভিপ্রায় বুঝিয়া কহিলেন, “গিয়াছিলাম। তুমি মৃণালিনীর সম্বাদ কামনা করিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছ? মৃণালিনী তথায় নাই।”

হে। “কোথায় গিয়াছে?”

মা। “তাহা আমি অবগত নহি—কেহ সম্বাদ দিতে পারিল না।”

হে। “কেন গিয়াছে?”

মা। “বৎস! সে সকল পরিচয় যুদ্ধান্তে দিব।”

হেমচন্দ্র ভ্রূকুটী করিয়া কহিলেন, “স্বরূপ বৃত্তান্ত আমাকে জানাইলে, আমি যে মর্ম্মপীড়ায় কাতর হইব সে আশঙ্কা করিবেন না। আমিও কিয়দংশ শ্রবণ করিয়াছি। যাহা অবগত আছেন, তাহা নিঃসঙ্কোচে আমার নিকট প্রকাশ করুন।”

মাধবাচার্য্য গৌড়নগরে গমন করিলে হৃষীকেশ তাঁহাকে আপন জ্ঞানমত মৃণালিনীর বৃত্তান্ত জ্ঞাত করিয়াছিলেন। তাহাই প্রকৃত বৃত্তান্ত বলিয়া মাধবাচার্য্যেরও বোধ হইয়াছিল; মাধবাচার্য্য কস্মিন‍্কালে স্ত্রীজাতির অনুরাগী নহেন—সুতরাং স্ত্রীচরিত্র বুঝিতেন না। এক্ষণে হেমচন্দ্রের কথা শুনিয়া তাঁহার বোধ হইল, যে, হেমচন্দ্র সেই বৃত্তান্তই কতক কতক শ্রবণ করিয়া মৃণালিনীর কামনা পরিত্যাগ করিয়াছেন—অতএব কোন নূতন মনঃপীড়ার সম্ভাবনা নাই বুঝিয়া, পুনর্ব্বার আসনগ্রহণপূর্ব্বক হৃষীকেশের কথিত বিবরণ হেমচন্দ্রকে শুনাইতে লাগিলেন।

হেমচন্দ্র অধোমুখে করতলোপরি ভ্রূকুটী-কুটিল-ললাট সংস্থাপিত করিয়া নিঃশব্দে সমুদায় বৃত্তান্ত শ্রবণ করিলেন। মাধবাচার্য্যের কথা সমাপ্ত হইলেও বাঙ‍্নিষ্পত্তি করিলেন না। সেই অবস্থাতেই রহিলেন, মাধবাচার্য্য ডাকিলেন “হেমচন্দ্র!” কোন উত্তর পাইলেন না। পুনরপি ডাকিলেন “হেমচন্দ্র!” তথাপি নিরুত্তর।

তখন মাধবাচার্য্য গাত্রোথান করিয়া হেমচন্দ্রের হস্ত ধারণ করিলেন; অতি কোমল, স্নেহময় স্বরে কহিলেন, “বৎস। তাত! মুখোত্তোলন কর, আমার সঙ্গে কথা কও!”

হেমচন্দ্র মুখোত্তোলন করিলেন। মুখ দেখিয়া মাধবাচার্য্যও ভীত হইলেন। মাধবাচার্য্য কহিলেন, “আমার সহিত আলাপ কর। ক্রোধ হইয়া থাকে তাহা ব্যক্ত কর।”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “কাহার কথায় বিশ্বাস করিব? হৃষীকেশ একরূপ কহিয়াছে। ভিখারিণী আর এক প্রকার বলিল।”

মাধবাচার্য্য কহিলেন, “ভিখারিণী কে? সে কি বলিয়াছে?”

হেমচন্দ্র অতি সংক্ষেপে উত্তর দিলেন।

মাধবাচার্য্য সঙ্কুচিত স্বরে কহিলেন, “হৃষীকেশেরই কথা মিথ্যা বোধ হয়।”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “হৃষীকেশের প্রত্যক্ষ!”

তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলেন। পিতৃদত্ত শূল হস্তে লইলেন। কম্পিত কলেবরে গৃহমধ্যে নিঃশব্দে পদচারণ করিতে লাগিলেন।

আচার্য্য জিজ্ঞাসা করিলেন “কি ভাবিতেছ?”

হেমচন্দ্র করস্থ শূল দেখাইয়া কহিলেন, “মৃণালিনীকে এই শূলে বিদ্ধ করিব।”

মাধবাচার্য্য তাঁহার মুখকান্তি দেখিয়া ভীত হইয়া অপসৃত হইলেন।

প্রাতে মৃণালিনী বলিয়া গিয়াছিলেন “হেমচন্দ্র আমারই।”

দ্বিতীয় খণ্ড · পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

বাপীকূলে।

অকাল জলদোদয় স্বরূপ ভীম মূর্ত্তি রাজপুত্র হেমচন্দ্র যবনান্বেষণে নিষ্কন্ত হইলেন। ব্যাঘ্র আহার্য্য দেখিবামাত্র বেগে ধাবিত হয়, হেমচন্দ্র যবন দেখিবামাত্র সেইরূপ ধাবিত হইলেন। কিন্তু কোথায় যবনের সাক্ষাৎ পাইবেন তাহার স্থিরতা ছিল না।

হেমচন্দ্র একটা মাত্র যবন দেখিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি এই সিদ্ধান্ত করিলেন, যে হয় যবন সেনা নগর সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া লুক্কায়িত আছে নতুবা এই ব্যক্তি যবন সেনার পূর্ব্বচর। যদি যবন সেনাই আসিয়া থাকে, তবে তৎসঙ্গে একাকী সংগ্রাম সম্ভবে না। কিন্তু যাহাই হউক, প্রকৃত অবস্থা কি তাহার অনুসন্ধান না করিয়া হেমচন্দ্র কদাচ স্থির থাকিতে পারেন না। যে মহংকার্য্য জন্য মৃণালিনীকে ত্যাগ করিয়াছেন, অদ্য রাত্রে নিদ্রা ভিভূত হইয়া সে কর্ম্মে উপেক্ষা করিতে পারেন না। বিশেষ যবনবধে হেমচন্দ্রের অন্তরিক আনন্দ। উষ্ণীযধারী মুণ্ড দেখিয়া অবধি তাঁহার জিঘাংসা ভয়ানক প্রবল হইয়াছে সুতরাং তিনি হির হইবার সম্ভাবনা কি? অতএব দ্রুতপদ বিক্ষেপে হেমচন্দ্র রাজপথাভিমুখে চলিলেন।

উপবন গৃহ হইতে রাজপথ কিছু দূর। যে পথ বাহিত করিয়া উপবন গৃহ হইতে রাজপথে যাইতে হয় সে বিরল-লোকপ্রবাহ গ্রাম্য পথ মাত্র। হেমচন্দ্র সেই পথে চলিলেন। সেই পথ পার্শ্বে অতি বিস্তারিত, সুরম্য সোপানাবলি শোভিত, এক দীর্ঘিকা ছিল। দীর্ঘিকা পার্শ্বে অনেক বকুল, শাল, অশোক, চম্পক, কদম্ব, অশ্বথ, বট, আম, তিন্তিড়ী প্রভৃতি বৃক্ষ সমূহ ছিল। বৃক্ষগুলিন সুশৃঙ্খল শ্রেণীবিন্যস্ত ছিল এমত নহে, বহুতর বৃক্ষ পরস্পর শাখায় শাখায় সম্বদ্ধ হইয়া বাপীতীরে ঘনান্ধকার করিয়া রহিত। দিবসেও তথায় অন্ধকার। কিম্বদন্তী ছিল যে সেই সরোবরে ভূতযোনি বিহার করিত। এই সংস্কার প্রতিবাসীদিগের মনে এরূপ দৃঢ় হইয়া উঠিয়াছিল যে সচরাচর তথায় কেহ যাইত না। যদি যাইত তবে একাকী কেহ যাইত না। নিশাকালে কদাপি কেহ যাইত না।

পৌরাণিক ধর্ম্মের একাধিপত্য কালে হেমচন্দ্রও দেবযোনির অস্তিত্ব সম্বন্ধে প্রত্যয়শালী হইবেন তাহার বিচিত্র কি? কিন্তু প্রেত সম্বন্ধে প্রত্যয়শালী বলিয়া তিনি গন্তব্য পথে যাইতে সঙ্কোচ করেন এরূপ ভীরু স্বভাব তাঁহার নহে। অতএব তিনি নিঃসঙ্কোচে বাপীপার্শ্ব দিয়া চলিলেন। নিঃসঙ্কোচ বটে কিন্তু কৌতুহল শূন্য নহেন। বাপীর পার্শ্বে সর্ব্বত্র এবং তত্তীর প্রতি অনিমিক লোচনে চক্ষুঃ নিক্ষিপ্ত করিতে করিতে চলিলেন। সোপানমার্গের নিকটবর্তী হইলেন। সহসা চমকিত হইলেন। জনশ্রুতির প্রতি তাহার বিশ্বাস দৃঢ়ীকৃত হইল। দেখিলেন, চন্দ্রালোকে, সর্ব্বাধঃস্থ সোপানে, জলে চরণ রক্ষা করিয়া শ্বেতবসন-পরিধানা কে বসিয়া আছে। স্ত্রীমূর্ত্তি বলিয়া তাঁহার বোধ হইল। শ্বেত-বসনা, অবেণী-সম্বদ্ধকুন্তলা; কেশজালে স্কন্ধ, পৃষ্ঠদেশ, বাহুযুগল, মুখমণ্ডল, হৃদয়, সর্ব্বত্র আচ্ছন্ন করিয়া রহিয়াছে। প্রেত বিবেচনা করিয়া হেমচন্দ্র নিঃশব্দে চলিয়া যাইতে ছিলেন। কিন্তু মনে ভাবিলেন, যদি মনুষ্য হয়? এত রাত্রে কে এ স্থানে? সে ত যবনকে দেখিলে দেখিয়া থাকিতে পারে? এই সন্দেহে হেমচন্দ্র ফিরিলেন। সাহসে ভর করিয়া বাপীতীরারোহণ করিলেন, সোপানমার্গে ধীরে ধীরে অবতরণ করিতে লাগিলেন। প্রেতিনী তাঁহার আগমন জানিতে পারিযাও সরিল না। পূর্ব্ববৎ রহিল। হেমচন্দ্র তাহার নিকটে আসিলেন। তখন সে উঠিয়া দাঁড়াইল; হেমচন্দ্রের দিকে ফিরিল; হস্ত দ্বারা মুখাবরণকারী কেশদাম অপসৃত করিল। হেমচন্দ্র তাহার মুখ দেখিলেন। সে প্রেতিনী নহে, কিন্তু প্রেতিনী হইলে হেমচন্দ্র অধিকতর বিস্ময়াপন্ন হইতেন না। কহিলেন, “কে মনোরমে! তুমি এখানে?” মনোরমা কহিল, “আমি এখানে অনেক বার আসি—কিন্তু তুমি এখানে কেন?”

হেম। “আমার কর্ম্ম আছে।”

মনো। “এ রাত্রে কি কর্ম্ম?”

হেম। “পশ্চাৎ বলিব, তুমি এরাত্রে এখানে কেন?”

মনো। “তোমার এ বেশ কেন? হাতে শূল; কাঁকালে তরবারি; তরবারে এ কি জ্বলিতেছে? একি হীরা? মাথায় এ কি? ইহাতে যে ঝক‍্মক্ করিয়া জ্বলিতেছে, এই বা কি? এও কি হীরা? এত হীরা পেলে কোথা?”

হেম। “আমার ছিল।”

মনো। “এ রাত্রে এত হীরা পরিয়া কোথায় যাইতেছ? চোরে যে কাড়িয়া লইবে?”

হেম। “আমার নিকট হইতে চোরে কাড়িতে পারে না।”

মনো। “ত রাত্রে এত অলঙ্কারে প্রয়োজন কি? তুমি কি বিবাহ করিতে যাইতেছ।”

হেম। “তোমার কি বোধ হয় মনোরমে?”

মনো। “মানুষ মারিবার অস্ত্র লইয়া কেহ বিবাহ করিতে যায় না। তুমি যুদ্ধে যাইতেছ?”

হেম। “কাহার সঙ্গে যুদ্ধ করিব? তুমিই বা এখানে কি করিতেছিলে?”

মনো। “স্নান করিতেছিলাম। স্নান করিয়া বাতাসে চুল শুকাইতেছিলাম। এই দেখ চুল এখনও ভিজিয়া রহিয়াছে।” এই বলিয়া মনোরমা আর্দ্র কেশ হেমচন্দ্রের হস্তে স্পর্শ করাইলেন।

হেম। “এত রাত্রে স্নান কেন?”

মনো। “আমার গা জ্বালা করে।”

হে। “গঙ্গাস্নান না করিয়া এখানে কেন?”

মনো। “এখানকার জল বড় শীতল।”

হে। “তুমি সর্ব্বদা এখানে আইস?”

মনো। “আসি।”

হে। “আমি তোমার সম্বন্ধ করিতেছি―তোমার বিবাহ হইবে। বিবাহ হইলে এরূপ কি প্রকারে আসিবে?”

মনো। “আগে বিবাহ হউক।”

হে। হাসিয়া কহিলেন, “তোমার লজ্জা নাই―তুমি কালামুখী।”

মনো। “তিরস্কার কর কেন? তুমি যে বলিয়াছিলে তিরস্কার করিবে না।”

হে। “সে অপরাধ লইও না। এখান দিয়া কাহাকে যাইতে দেখিয়াছ?”

ম। “দেখিয়াছি।”

হে। “তাহার কি বেশ?”

ম। “যবনের বেশ।”

হেমচন্দ্র অত্যন্ত বিস্মিত হইলেন; বলিলেন, “সে কি? তুমি যবন চিনিলে কি প্রকারে?”

ম। “আমি পূর্ব্বে যবন দেখিয়াছি।”

হে। “সে কি? কোথায় দেখিলে?”

ম। “যে খানে দেখি—তুমি কি সেই যবনের অনুসরণ করিবে?”

হে। “করিব—সে কোন্ পথে গেল?”

ম। “কেন?”

হে। “তাহাকে বধ করিব?

ম। “নরহত্যা করিয়া কি হইবে?”

হে। “যবন আমার পরম শত্রু।”

ম। “তবে একটী যবন মারিয়া কি তৃপ্তিলাভ করিবে?”

হে। “আমি যত যবন দেখিতে পাইব তত মারিব।”

ম। “পারিবে?”

হে। “পারিব।”

মনোরমা বলিলেন, “তবে সাবধানে আমার সঙ্গে আইস।”

হেমচন্দ্র ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন। যবন যুদ্ধে এই বালিকা পথপ্রদর্শিণী।

মনোরমা তাঁহার মানসিক ভাব বুঝিলেন, বলিলেন “আমাকে বালিকা ভাবিয়া অবিশ্বাস করিতেছ?”

হেমচন্দ্র মনোরমার প্রতি চাহিয়া দেখিলেন। বিস্ময়াপন্ন হইয়া ভাবিলেন—মনোরমা কি মানুষী?

প্রথম খণ্ড · পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

ভিখারিণী।

সখীদ্বয় অল্পক্ষণ নিঃশব্দে আলেখ্যেদত্তমনা হইয়া কর্ম্ম করিতেছিলেন, এমত সময়ে বালকণ্ঠনিঃসৃত মধুর সঙ্গীত তাঁহাদিগের কর্ণরন্ধে প্রবেশ করিল।

“মথুরাবাসিনি, মধুর হাসিনি,

শ্যামবিলাসিনি—রে!”

মৃণালিনী কহিলেন, “সই, কোথায় গান করিতেছে।”

মণিমালিনী কহিলেন “বহির্ব্বাটীতে গাইতেছে।”

গায়ক গাইতে লাগিল।

“কহলো নাগরি, গেহ পরিহরি,

কাহে বিবাসিনী—রে।”

মৃ। “সখি! কে গাইতেছে জান?”

মণি। “কোন ভিখারিণী হইবে।”

আবার গীত।

“বৃন্দাবনধন, গোপিনীমোহন,

কাহে তু তেয়াগী,—রে

দেশ দেশ পর, সো শ্যামসুন্দর,

ফিরে তুয়া লাগি—রে।”

মৃণালিনী বেগের সহিত কহিলেন, “সই! সই! উহাকে বাটীর ভিতর ডাকিয়া আন।”

মণিমালিনী গায়িকাকে ডাকিতে গেলেন। ততক্ষণ সে গাইতে লাগিল।

“বিকচনলিনে, যমুনা পুলিনে,

বহুত পিয়াসা—রে।

চন্দ্রমাশালিনী, যা মধুযামিনী,

না মিটল আশা—রে॥

সা নিশা সমরি—”

এমন সময়ে মণিমালিনী উহাকে ডাকিয়া বাড়ীর ভিতর আনিলেন।

সে অন্তঃপুরে আসিয়া পূর্ব্ববৎ গাইতে লাগিল।

“সা নিশা সমরি, কহলো সুন্দরি,

কাঁহা মিলে দেখা—রে।

শুনি যাওয়ে চলি, বাজয়ি মুরলী,

বনে বনে একা—রে।”

মৃণালিনী তাহাকে কহিলেন, “তোমার দিব্য স্বর, তুমি গীতটী আবার গাও।”

গায়িকার বয়স ষোড়শ বৎসর। ষোড়শী, খর্ব্বাকৃতা এবং কৃষ্ণাঙ্গী। গিরিজায়া প্রকৃত কৃষ্ণবর্ণা। তাই বলিয়া তাহার গায়ে ভ্রমর বসিলে যে দেখা যাইত না, অথবা কালি মাখিলে জল মাখিয়াছে বোধ হইত কিম্বা জল মাখিলে কালি বোধ হইত যেরূপ কৃষ্ণবর্ণ আপনার ঘরে থাকিলে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ বলি, পরের ঘরে হইলে পাতুরে কালো বলি, ইহার সেইরূপ কৃষ্ণবর্ণ। কিন্তু বর্ণ যেমন হউক না কেন, ভিখারিণী কুরূপা নহে। তাহার অঙ্গ পরিষ্কার, সুমার্জ্জিত, চাকচিক্যবিশিষ্ট; মুখখানি প্রফুল্ল, চক্ষু দুটী বড়, অত্যন্ত শ্বেত, চঞ্চল, হাস্যময়; লোচনতারা নিবিড় কৃষ্ণ, এক টী তারার পার্শ্বে একটী তিল। ওষ্ঠাধর ক্ষুদ্র, রক্তপ্রভ, তদন্তরে অতি পরিষ্কার, অমলশ্বেত, কুন্দকলিকা-সন্নিভ দুই শ্রেণী দন্ত। কেশগুলিন সূক্ষ্ম, গ্রীবার উপরে মোহিনী কবরী, তাহাতে যূথিকার মালা বেষ্টিত। যৌবন সঞ্চারে শরীরের গঠন সুন্দর হইয়াছিল, যেন কৃষ্ণ প্রস্তরে কোন শিল্পকার পুত্তল খোদিত করিয়াছিল। পরিচ্ছদ অতি সামান্য কিন্তু পরিষ্কার, ধূলি কর্দ্দম পরিপূর্ণ নহে। অঙ্গ একেবারে নিরাভরণ নহে, অথচ অলঙ্কার গুলিন, ভিখারির যোগ্য বটে। প্রকোষ্ঠে পিতলের বলয়; গলায় কাছের মালা’ নাসিকায়, ক্ষুদ্র একটী তিলক, ভ্রূমধ্যে ক্ষুদ্র একটী চন্দনের “টিপ।” সে আজ্ঞামত পূর্ব্ববৎ গায়িতে লাগিল।

“মথুরাবাসিনী, মধুরহাসিনী, শ্যামবিলাসিনী,—রে।

কহলো নাগরি, গেহ পরিহরি, কাহে বিবাসিনী—রে॥

বৃন্দাবনধন, গোপিনীমোহন, কাহে তু তেয়াগী—রে॥

দেশ দেশ পর, সো শ্যামসুন্দর, ফিরে তুয়া লাগি—রে॥

বিকচ নলিনে, যমুনা পুলিনে, বহুতপিয়াসা—রে॥

চন্দ্রমাশালিনী, যা মধুযামিনী, না মিটল আশা—রে॥

সা নিশা সমরি, কহলো সুন্দরি, কাঁহা মিলে দেখা—রে॥

শুনি, যাওয়ে চলি, বাজায়ি মুরলী, বনে বনে একা—রে।”

গীত সমাপ্ত হইলে মৃণালিনী কহিলেন, “তুমি সুন্দর গাও।” সই মণিমালিনী, ইহাকে কিছু দিলে ভাল হয়। তুমি আজি একটী মুদ্রা আমায় ঋণ দাও; মাধবাচার্য্যের স্বীকৃত অর্থ আসিলে আমি পরিশোধ করিব।”

মণিমালিনী অর্থ আনিতে গেলেন, ইত্যবসরে মৃণালিনী বালিকাকে নিকটে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “শুন ভিখারিণি; তোমার নাম কি?”

ভিখা। “আমার নাম গিরিজায়া।”

মৃ। “তোমার গৃহ কোথা?”

গিরি। “এই নগরেই থাকি।”

মৃ। “তুমি কি গীত গাইয়া দিন যাপন কর?”

গিরি। “আর কি করিব?”

মৃ। “তুমি গীত সকল কোথা হইতে সংগ্রহ করিয়াছ?”

গি। “যেখানে যা পাই তাহা শিখি।”

মৃ। “এ গীতটী কোথা শিখিলে?”

গি। “একটী বণিক আমাকে শিখাইয়াছে।”

মৃ। “সে বণিক্ কোথায় থাকে?”

গি। “এই নগরেই আছে।”

মৃণালিনীর মুখ হর্ষোৎফুল্ল হইল—প্রাতঃসূর্য্যকর স্পর্শে যেন পদ্ম ফুটিয়া উঠিল। কহিলেন,

“সে বণিক্ কিসের বাণিজ্য করে?”

গিরি। “যাহার বাণিজ্য সকলে করে, সেও তাহার বাণিজ্য করে।”

মৃ। “সে কিসের বাণিজ্য?”

গি। “কথার বাণিজ্য।”

মৃ। “এ নূতন বাণিজ্য বটে। তাহাতে লাভালাভ কিরূপ?”

গি। “ইহাতে লাভের অংশ প্রীতি, অলাভ কলহ।”

মৃ। “তুমিও ব্যবসায়ী বটে। ইহার মহাজন কে?”

গি। “যে মহাজন।”

মৃ। “তুমি ইহার কি?”

গি। “নগ্দা মুটে।”

মৃ। “ভাল—তোমার বোঝা নামাও। সামগ্রী কি আছে দেখি।”

গি। “এ সামগ্রী দেখে না; শুনে।” মৃ। “ভাল শুনি।”

গি। “তবে শুনুন।” এই বলিয়া গিরিজায়া গাইতে লাগিল।

“যমুনার জলে মোরে, কি নিধি মিলিল।

ঝাঁপ দিয়া পশি জলে, যতনে তুলিয়া গলে,

পরেছিনু কুতূহলে, যে রতনে।

নিদ্রার আবেশে মোর, গৃহেতে পশিল চোর,

কণ্ঠের কাটিল ডোর, মণি হরে নিল।

মৃণালিনী, বাস্পপীড়িত লোচনে, গদ্গদস্বরে, অথচ হাসিয়া কহিলেন, “এ কোন্ চোরের কথা।”

গি। “বণিক্ বলিলেন চুরির ধন লইয়াই তাঁহার ব্যাপার।”

মৃ। “তাঁহাকে বলিও যে চোরা ব্যাপারে সাধু লোকের প্রাণ বাঁচে না।”

গি। “বুঝি ব্যাপারিরও নয়।”

মৃ। “কেন ব্যাপারির কি?”

গিরিজায়া গাইল।

“ঘাট বাট তট মাট ফিরি, ফিরনু বহু দেশ।

কঁহা মেরে কান্ত বরণ, কাঁহা রাজবেশ।

হিয়াপর রোপনু পঙ্কজ, কৈনু যতন ভারি।

সোহি পঙ্কজ কাঁহা মোর, কাঁহা মৃণাল হামারি॥”

মৃণালিনী, সস্নেহ কোমল স্বরে কহিলেন, “মৃণাল কোথায়? আমি সন্ধান বলিয়া দিতে পারি, তাহা মনে রাখিতে পারিবে?”

গি। “পারিব—কোথায় বল।”

মৃণালিনী বলিলেন।

“কণ্টকে গঠিল বিধি, মৃণাল অধমে।

জলে তারে ডুবাইল পীড়িয়া মরমে॥

“রাজহংস দেখি এক নয়নরঞ্জন।

চরণে বেড়িয়া তারে, করিল বন্ধন॥

বলে হংসরাজ কোথা করিবে গমন।

হৃদয় কমলে মোর, তোমার আসন॥

আসিয়া বসিল হংস হৃদয় কমলে।

কাঁপিল কণ্টক সহ মৃণালিনী জলে॥

হেন কালে কাল মেঘ, উদিল আকাশে।

উড়িল মরালরাজ, মানস বিলাসে॥

ভাঙ্গিল হৃদয়পদ্ম, তার বেগভরে।

ডুবিয়া অতল জলে, মৃণালিনী মরে॥”

কেমন গিরিজায়া শিখিতে পারিবি?

গিরি। “তা পারিব। চক্ষের জল টুকু শুদ্ধ কি শিখিব?”

মৃ। “না। এ ব্যবসায় আমার লাভের মধ্যে ঐ টুকু।”

মৃণালিনী গিরিজায়াকে এই কবিতা গুলিন অভ্যাস করাইতে ছিলেন। এমত সময়ে মণিমালিনীর পদধ্বনি শুনিতে পাইলেন। মণিমালিনী তাঁহার স্নেহশালিনী সখী সকলেই জানিয়াছেন। তথাপি মণিমালিনী পিতৃপ্রতিজ্ঞাভঙ্গের সহায়তা করিবে এরূপ তাঁহার বিশ্বাস জন্মিল না। অতএব তিনি এ সকল কথা সখীর নিকট গোপনে যত্নবতী হইয়া গিরিজায়াকে কহিলেন; “আজি আর কাজ নাই। বণিকের সহিত সাক্ষাৎ করিও। তোমার বোঝা কালি আবার আনিও। যদি গ্রহণযোগ্য কোন সামগ্রী থাকে, তবে তাহা আমি ক্রয় করিব।”

গিরিজায় বিদায় হইল। মৃণালিনী যে তাহাকে পারিতোষিক দিবার অভিপ্রায় করিয়াছিলেন তাহা ভুলিয়া গিয়াছিলেন।

গিরিজায়া কতিপয় পদ গমন করিলে মণিমালিনী একটী রৌপ্য মুদ্রা আনিয়া মৃণালিনীর হস্তে অর্পণ করিলেন। তখন মৃণালিনী মুদ্রাটী লইয়া গিরিজায়াকে দিতে গেলেন এবং দানের অবকাশে উহার কাণে কাণে কহিলেন, “আমার ধৈর্য্য হইতেছে। কালি পর্য্যন্ত অপেক্ষা করিতে পারিব না; তুমি আজ রাত্রে প্রহরেকের সময় আসিয়া এই গৃহের উত্তর দিকে প্রাচীর মূলে অবস্থিতি করিও; তথায় আমার সাক্ষাৎ পাইবে। তোমার বণিক যদি আসেন, সঙ্গে আনিও।”

গিরিজায়া কহিল, “বুঝিয়াছি। আমি নিশ্চিত আসিব।”

মণিমালিনীর নিকট প্রত্যাগতা হইলে মণিমালিনী কহিলেন, “সই ভিখারিণীকে কাণে কাণে কি বলিতেছিলে?”

মৃণালিনীকহিলেন, “কি বলিব সই—

সই মনের কথা সই, সই মনের কথা সই।

কাণে কাণে কি কথাটি বলে দিলি ওই॥

সই ফিরে কনা সই, সই ফিরে কনা সই।

সই কথা কোস্ কথা কব, নইলে কারো নই।”

মণিমালিনী হাসিয়া কহিলেন,

“হলি কিলো সই?”

মৃণালিনী কহিলেন,

“তোমারই সই।”

এই গীত জয়জয়ন্তী রাগিণী ঢিমে তেতালা তাল।

চতুর্থ খণ্ড · পরিশিষ্ট

পরিশিষ্ট।

হেমচন্দ্র মনোরমার দত্ত ধন উদ্ধার করিয়া তাহার কিয়দংশ জনার্দ্দনকে দিয়া তাঁহাকে কাশী প্রেরণ করিলেন। অবশিষ্ট ধন গ্রহণ কর্ত্তব্য কি না, তাহা মাধবাচার্য্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন। মাধবাচার্য্য বলিলেন, “এই ধনের বলে পশুপতির বিনাশকারী বখ্‌তিয়ার খিলিজিকে প্রতিফল দেওয়া কর্ত্তব্য। এবং তদভিপ্রায়ে ইহা গ্রহণও উচিত। দক্ষিণে, সমুদ্রের উপকূলে অনেক প্রদেশ জনহীন হইয়া পড়িয়া আছে। আমার পরামর্শ যে তুমি এই ধনের দ্বারা তথায় নূতন রাজ্য সংস্থাপন কর, এবং তথায় যবনদমনোপযোগী সেনা সৃজন কর। তৎসাহায্যে পশুপতির শত্রুর নিপাত সিদ্ধ করিও।”

এই পরামর্শ করিয়া মাধবাচার্য্য সেই রাত্রেই হেমচন্দ্রকে নবদ্বীপ হইতে দক্ষিণাভিমুখে যাত্রা করাইলেন। মৃণালিনী, গিরিজায়া এবং দিগ্বিজয় তাঁহার সঙ্গে গেলেন। মাধবাচার্য্যও হেমচন্দ্রকে নূতন রাজ্যে স্থাপিত করিবার জন্য তাঁহার সঙ্গে গেলেন। রাজ্যসংস্থাপন অতি সহজ কাজ হইয়া উঠিল, কেননা যবনদিগের ধর্ম্মদ্বেষিতায় পীড়িত এবং তাহাদিগের ভয়ে ভীত হইয়া অনেকেই তাহাদিগের অধিকৃত রাজ্য ত্যাগ করিয়া হেমচন্দ্রের নবস্থাপিত রাজ্যে বাস করিতে লাগিল। মাধবাচার্য্যের পরামর্শেও অনেক প্রধান ধনী ব্যক্তি তথায় আশ্রয় লইল। এইরূপ অতি শীঘ্র ক্ষুদ্র রাজ্যটী সৌষ্ঠবান্বিত হইয়া উঠিল। ক্রমে ক্রমে সেনা সংগ্রহ হইতে লাগিল। অচিরাৎ রমণীয় রাজপুরী নির্ম্মিত হইল। মৃণালিনী তন্মধ্যে মহিষী হইয়া সে পুরী আলো করিলেন।

গিরিজায়ার সহিত দিগ্বিজয়ের পরিণয় হইল। গিরিজায়া মৃণালিনীর পরিচর্য্যায় নিযুক্তা রহিলেন, দিগ্বিজয় হেমচন্দ্রের কার্য্য পূর্ব্ববৎ নির্ব্বাহ করিতে লাগিলেন। কথিত আছে যে বিবাহ অবধি এমন দিনই ছিল না, যেদিন গিরিজায়া এক আধ ঘা ঝাঁটার আঘাতে দিগ্বিজয়ের শরীর পবিত্র করিয়া না দিত। ইহাতে যে দিগ্বিজয় বড়ই দুঃখিত ছিলেন এমত নহে। বরং একদিন কোন দৈবকারণ বশতঃ গিরিজায়া ঝাঁটা মারিতে ভুলিয়া ছিলেন, ইহাতে দিগ্বিজয় বিষণ্ণ বদনে গিরিজায়াকে গিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “গিরি, আজি তুমি আমার উপর রাগ করিয়াছ না কি?” বস্তুতঃ ইহারা যাবজ্জীবন পরমসুখে কালাতিপাত করিয়াছিল।

হেমচন্দ্রকে নূতন রাজ্যে স্থাপন করিয়া মাধবাচার্য্য কামরূপে গমন করিলেন। তথায় হেমচন্দ্রের সাহায্যে বখতিয়ার খিলিজি পরাভূত হইয়া দূরীকৃত হইলেন। এবং প্রত্যাগমন কালে অপমানে ও কষ্টে তাঁহার প্রাণবিয়োগ হইল। কিন্তু সে সকল ঘটনা বর্ণিত করা এ গ্রন্থের উদ্দেশ্য নহে।

রত্নময়ী এক সম্পন্ন পাটনীকে বিবাহ করিয়া হেমচন্দ্রের নূতন রাজ্যে গিয়া বাস করিল। তথায় মৃণালিনীর অনুগ্রহে তাহার স্বামীর বিশেষ সৌষ্ঠব হইল। গিরিজায়া ও রত্নময়ী চিরকাল “সই” “সই” রহিল।

মৃণালিনী মাধবাচার্য্যের দ্বারা হৃষীকেশকে অনুরোধ করাইয়া মণিমালিনীকে আপন রাজধানীতে আনিলেন। মণিমালিনী রাজপুরীমধ্যে মৃণালিনীর সখীর স্বরূপ বাস করিতে লাগিলেন। তাঁহার স্বামী রাজবাটীর পৌরহিত্যে নিযুক্ত হইলেন।

শান্তশীল যখন দেখিল, যে হিন্দুর আর রাজ্য পাইবার সম্ভাবনা নাই তখন সে আপন চতুরতা ও কর্ম্মদক্ষতা দেখাইয়া যবনদিগের প্রিয়পাত্র হইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। হিন্দুদিগের প্রতি অত্যাচার ও বিশ্বাসঘাতকতা দ্বারা শীঘ্র সে মনস্কাম সিদ্ধ করিয়া অভীষ্ট রাজকার্য্যে নিযুক্ত হইল।

হেমচন্দ্রের স্থাপিত রাজ্যের এক্ষণে কোন চিহ্ন নাই। কিন্তু বঙ্গদেশে সমুদ্রের উপকূলে যে সকল জনপদ ছিল তাহার কিছুরই এক্ষণে চিহ্ন নাই।

সমাপ্তোঽয়ং গ্রন্থঃ।

চতুর্থ খণ্ড · প্রথম পরিচ্ছেদ

চতুর্থ খণ্ড।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

ঊর্ণনাভ।

যতক্ষণ মৃণালিনীর সুখের তারা ডুবিতেছিল, ততক্ষণ বঙ্গদেশের সৌভাগ্য শশীও সেই পথে যাইতেছিল। যে ব্যক্তি রাখিলে, বঙ্গ রাখিতে পারিত, সেই ঊর্ণনাভের ন্যায় বিরলে বসিয়া অভাগা জন্মভূমিকে বন্ধ করিবার জন্য জাল পাতিতে ছিল। নিশীথ সময়ে নিভৃতে বসিয়া ধর্ম্মাধিকার পশুপতি, নিজ দক্ষিণ হস্তস্বরূপ শান্তশীলকে ভর্ৎসনা করিতেছিলেন। “শান্তশীল! প্রাতে যে সম্বাদ দিয়াছ, তাহা ত কেবল তোমার অপারগতার পরিচয় মাত্র। তোমার প্রতি আর কোন ভার দিবার ইচ্ছা নাই।”

শান্তশীল কহিল, “যাহা অসাধ্য তাহা পারি নাই। অন্য কার্য্যের পরিচয় গ্রহণ করুন।”

প। “সৈনিকদিগকে কি উপদেশ দেওয়া হইতেছে?”

শা। “এই যে, আমাদিগের আজ্ঞা না পাইলে কেহ সজ্জিত না হয়।”

প। “প্রান্তপাল ও কোষ্ঠপাল দিগকে কি উপদেশ দেওয়া হইয়াছে?”

শা। “এই বলিয়া দিয়াছি যে অচিরাৎ যবন সম্রাটের নিকট হইতে কর লইয়া কতিপয় যবন দূত স্বরূপ আসিতেছে। তাহাদিগের গতিরোধ না করে।” প। “দামোদর শর্ম্মা উপদেশানুযায়ী কার্য্য করিয়াছেন কি না?”

শা। “তিনি অতি চতুরের ন্যায় কর্ম্ম নির্ব্বাহ করিয়াছেন।”

প। “সে কি প্রকার?”

শা। “তিনি একখানি পুরাতন গ্রন্থের একখানি পত্র পরিবর্ত্তন করিয়া তাহাতে আপনার রচিত যবন বিষয়িণী কবিতা গুলিন ন্যস্ত করিয়াছিলেন। তাহা লইয়া অদ্য প্রাহ্নে রাজাকে শ্রবণ করাইয়াছেন। এবং মাধবাচার্য্যের অনেক নিন্দা করিযাছেন।”

প। “কবিতায় ভবিষ্যৎ বঙ্গবিজেতার রূপ বর্ণনা সবিস্তারে লিখিত আছে। তৎসম্বন্ধে মহারাজ কোন অনুসন্ধান করিয়াছিলেন?”

শা। “করিয়াছিলেন, মদন সেন সম্প্রতি কাশীধাম হইতে প্রত্যাগমন করিয়াছেন, এ সম্বাদ মহারাজ অবগত আছেন। মহারাজ কবিতায় ভবিষ্যৎ বঙ্গজেতার অবয়ব বর্ণনা শুনিয়া তাঁহাকে ডাকিতে পাঠাইলেন। মদন সেন উপস্থিত হইলে মহারাজ জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কেমন, তুমি মগধে যবনরাজ প্রতিনিধিকে দেখিয়া আসিয়াছ?’ সে কহিল ‘আসিয়াছি।’ মহারাজ তখন আজ্ঞা করিলেন, ‘সে দেখিতে কি প্রকার, বিবরিত কর।’ তখন মদন সেন বখ্‌তিয়ার খিলিজির যথার্থ যেরূপ দেখিয়াছেন তাহাই বিবরিত করিলেন। কবিতাতেও সেই রূপ বর্ণিত ছিল। সুতরাং বঙ্গজয় ও তাঁহার রাজ্যনাশ নিশ্চিত বলিয়া বুঝিলেন।”

প। “তাহার পর।”

শা। “রাজা তখন রোদন করিতে লাগিলেন, কহিলেন ‘আমি এ বৃদ্ধ বয়সে কি করিব? সপরিবারে যবনহস্তে প্রাণে নষ্ট হইব দেখিতেছি।’ তখন দামোদর শিক্ষামত কহিলেন, ‘মহারাজ! ইহার সদুপায় এই যে, অবসর থাকিতে থাকিতে আপনি সপরিবারে তীর্থযাত্রা করুন। ধর্ম্মাধিকারের প্রতি রাজকার্য্যের ভার দিয়া যাউন। তাহা হইলে আপনার শরীর রক্ষা হইবে। পরে শাস্ত্র মিথ্যা হয় রাজ্য পুনঃপ্রাপ্ত হইবেন।’ রাজা এ পরামর্শে সন্তুষ্ট হইয়া নৌকা সজ্জা করিতে আদেশ করিয়াছেন। অচিরাৎ সপরিবারে পুরুষোত্তমে যাত্রা করিবেন।”

প। “দামোদর সাধু। তুমিও সাধু। এক্ষণে আমার মনস্কামনা সিদ্ধির সম্ভাবনা দেখিতেছি। নিতান্ত পক্ষে, স্বাধীন রাজা না হই, যবনরাজ প্রতিনিধি হইব। কার্য্য সিদ্ধ হইলে তোমাদিগকে সাধ্যমত পুরস্কৃত করিতে ত্রুটি করিব না। তাহা ত জান। এক্ষণে বিদায় হও। কল্য প্রাতেই যেন তীর্থ যাত্রা জন্য নৌকা প্রস্তুত থাকে।”

শান্তশীল বিদায় হইল।

তৃতীয় খণ্ড · প্রথম পরিচ্ছেদ

তৃতীয় খণ্ড।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

“উনি তােমার কে?”

যে কুটীরের নিকটস্থ বৃক্ষতলে বসিয়া হেমচন্দ্র বিশ্রাম করিতেছিলেন। সেই কুটীর মধ্যে এক পাটনী বাস করিত। কুটীর মধ্যে তিনটী ঘর। এক ঘরে পাটনীর পাকাদি সমাপন হইত। অপর ঘরে পাটনীর পত্নী শিশু সন্তান সকল লইয়া শয়ন করিয়াছিল। তৃতীয় ঘরে পাটনীর যুবতী কন্যা রত্নময়ী আর অপর দুইটী স্ত্রীলােক শয়ন করিয়াছিল। সেই দুইটী স্ত্রীলােক পাঠক মহাশয়ের নিকট পরিচিত; মৃণালিনী আর গিরিজায়া নবদ্বীপে অন্যত্র আশ্রয় না পাইয়া এই স্থানে আশ্রয় লইয়াছিলেন।

একে একে তিনটী স্ত্রীলােক প্রভাতে জাগরিতা হইল। প্রথমে রত্নময়ী জাগিল। গিরিজায়াকে সম্বােধন করিয়া কহিল।

“সই?”

গি। “কি সই?”

র। “তুমি কোথায় সই?”

গি। “বিছানা সই।”

র। “উঠ না সই!” গি। “না সই।”

র। “গায়ে জল দিব সই।”

গি। “জল সই? ভাল সই, তাও সই।”

র। “নহিলে ছাড়ি কই।”

গি। “ছাড়িবে কেন সই? তুমি আমার প্রাণের সই— তোমার মত আছে কই? তুমি পারঘাটার রসমই—তোমায় না কইলে আর কারে কই?”

র। “কথায় সই তুমি চির জই; আমি তোমার কাছে বোবা হই, আর মিলাইতে পারি কই?”

গি। “আমি মিলাইব? খই আর দই।”

র। “সকাল বেলাই খাই খাই?”

গি। “খেতে কই পাই।”

র। “আর মিল পাইনে ভাই।”

গি। “মিল আছে—তোমার মুখে ছাই।”

র। “পোড়ার মুখে ছাই, ঠিক মিলেছে ভাই, আর মিলে কাজ নাই, আমি কাজে যাই।”

গি। “কাজে? কি পার করিতে? দেখ তুফানে পড়ি ও না।”

র। “তুফান দেখিলে পাড়ি দিব কেন?”

গি। “কপালের কথা। কে বলিতে পারে? যদিই একদিন তুফানে পড়িলে?”

র। “হাল ছাড়িয়া দিব।”

গি। “ডুবে মরিবে যে?”

র। “গঙ্গায় মরিলে স্বর্গ পাব।”

গি। “তবে ডুবেই মর। আমি একটী গীত গাই—

সিন্ধুকূলে রই, নূতন তরি বই পারে তােরা, কে যাইবিগো।

নূতন ডিঙ্গায় নূতন মাঝি—কে যাইবিগো।

দান দিবে যেই, পার হবে সেই, দান দিয়ে, কে যাইবিগো।

অই দেখ বয়, মধুর মলয়, এই বেলা, কে যাইবিগো।

তুলে দিব পাল, না ছাড়িব হাল, সুখের পারে কে যাইবিগো।

যদি পথিক পাই, কূল তেজে যাই, অকূল মাঝে কে যাইবিগো।

পাইলে তুফান, আগে দিব প্রাণ, আমার সাতে, কে যাইবিগো।”

রত্নময়ী কহিল, “তুমি আমার অপেক্ষাও রসের পাটনী। বেলা না হইলে আরও দুই একটী গীত শুনিতাম। এখন গৃহের কাজ সারিয়া ঘাটের কাজে যাই।”

এই বলিয়া রত্নময়ী গৃহকর্মে গেল। মৃণালিনী এপর্য্যন্ত কোন কথা কহেন নাই। এখন গিরিজায়া তাঁহাকে সম্বােধন করিয়া কহিল,

“ঠাকুরাণি জাগিয়াছ?”

মৃণালিনী কহিলেন, “জাগিয়াই আছি। জাগিয়াই থাকি। তােমার গান শুনিতে ছিলাম—তােমার মত কাণ্ডারীকে কেহ যেন বিশ্বাস করে না।”

গি। “কেন?”

মৃ। “তুমি ঘাটে আনিয়া আমায় ডুবাইলে।”

গিরিজায়া তখন গম্ভীরভাবে কহিল, “কি করিব? আমার দোষ নাই। আমি শুনিয়াছি তিনি এই নগরমধ্যে আছেন; এপর্য্যন্ত সন্ধান পাই নাই। কিন্তু আমরা ত সবে দুই তিন দিন আসিয়াছি মাত্র। শীঘ্র সন্ধান করিব।”

মৃ। “গিরিজারে—যদি এ নগরে সন্ধান না পাই। তবে যে এই পাটনীর গৃহে মৃত্যু পর্য্যন্ত বাস করিতে হইবে। আমার যে যাইবার স্থান নাই।

মৃণালিনী উপাধানে মুখ লুকাইলেন। গিরিজায়ার গণ্ডে নীরবস্রুত অশ্রু বহিতে লাগিল।

এমত সময়ে—রত্নময়ী শশব্যস্তে গৃহমধ্যে আসিয়া কহিল, “সই! সই! দেখিয়া যাও। আমাদিগের বটতলায় কে ঘুমাইতেছে। আশ্চর্য্য পুরুষ!”

গিরিজায়া কুটীর দ্বারে দেখিতে আইল। মৃণালিনীও কুটীর দ্বার পর্য্যন্ত আসিয়া দেখিলেন। উভয়েই দৃষ্টিমাত্র চিনিলেন।

সাগর একেবারে উছলিয়া উঠিল। মৃণালিনী গিরিজায়াকে আলিঙ্গন করিলেন। গিরিজায়া গায়িল,

“কণ্টকে গঠিল বিধি মৃণাল অধমে।”

সেই ধ্বনি স্বপ্নবৎ হেমচন্দ্রের কর্ণে প্রবেশ করিয়াছিল। মৃণালিনী গিরিজায়ার কণ্ঠকণ্ডুয়ন দেখিয়া কহিলেন,

“চুপ, রাক্ষসি, আমাদিগের দেখা দেওয়া হইবে না, ঐ উনি জাগরিত হইতেছেন। এই অন্তরাল হইতে দেখ উনি কি করেন। উনি যেখানে যান, অদৃশ্য ভাবে, দূরে থাকিয়া, উঁহার সঙ্গে যাও।—একি! উঁহার অঙ্গ রক্তময় দেখিতেছি কেন? চল, তবে আমিও সঙ্গে চলিলাম।”

হেমচন্দ্র গাত্রোত্থান করিয়া কিয়দ্দূর গেলে, মৃণালিনী আর গিরিজায়া তাঁহার অনুসরণার্থ গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্তা হইলেন। তখন রত্নময়ী জিজ্ঞাসা করিল,

“ঠাকুরাণি, উনি তােমার কে?”

মৃণালিনী কহিলেন, “দেবতা জানেন।”

দ্বিতীয় খণ্ড · প্রথম পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় খণ্ড।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

বঙ্গেশ্বর।

অতি বিস্তীর্ণ সভামণ্ডপে নবদ্বীপােজ্বলকারী রাজাধিরাজ গৌড়েশ্বর লাক্ষ্মণেয়, বিরাজ করিতেছেন। উচ্চ শ্বেত প্রস্তরের বেদির উপরে রত্ন প্রবাল বিভূষিত সিংহাসনে, রত্ন প্রবাল মণ্ডিত ছত্র তলে বর্ষীয়ান্ রাজা বসিয়া আছেন। শিরােপরে কনককিঙ্কিণী সম্বেষ্টিত বিচিত্র কারু কার্য্য়ে খচিত শুভ্র চন্দ্রাতপ শােভা পাইতেছে। এক দিকে পৃথগাসনে, হােমাবশেষ বিভূষিত, অনিন্দমূর্ত্তি ব্রাহ্মণমণ্ডলী সভাপণ্ডিতকে পরিবেষ্টিত করিয়া বসিয়া আছেন। যে আসনে, এক দিন হলায়ূধ উপবেশন করিয়াছিলেন, সে আসনে এক্ষণে একজন অপরিণামদর্শী চাটুকার অধিষ্ঠান করিতেছিল। অন্য দিকে মহামাত্য ধর্ম্মাধিকারকে অগ্রবর্ত্তী করিয়া প্রধান রাজপুরুষেরা উপবেশন করিয়াছিলেন। মহাসামন্ত, মহাকুমারামাত্য, প্রমাতা, উপরিক, দাসাপরাধিক, চৌরােদ্ধরণিক, শৌল্কিক, গৌল্মিকগণ, ক্যত্রপ, প্রাপ্তপালেরা, কোষ্ঠপালেরা, কাণ্ডারক্য, তদাযুক্তক, বিনিযুক্তক, প্রভৃতি সকলে উপবেশন করিতেছেন। মহাপ্রতীহার সশস্ত্রে সভার অসাধারণ রক্ষা করিতেছেন। স্তাবকেরা উভয় পার্শ্বে শ্রেণীবদ্ধ হইয়া দাড়াইয়া আছে। সর্ব্বজন হইতে পৃথগাসনে, কুশাসন মাত্র গ্রহণ করিয়া পণ্ডিতবর মাধবাচার্য্য উপবেশন করিয়া আছেন।

রাজসভার নিয়মিত কার্য্য সকল সমাপ্ত হইলে, সভাভঙ্গের উদ্যোগ হইল। তখন মাধবাচার্য্য রাজাকে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, “মহারাজ! ব্রাহ্মণের বাচালতা মার্জ্জনা করিবেন। আপনি রাজনীতি বিশারদ, এক্ষণে ভূমণ্ডলে যত রাজগণ আছেন, সর্ব্বাপেক্ষা বহুদর্শী; প্রজাপালক; আপনিই আজন্ম রাজা। আপনার অবিদিত নাই যে শত্রুদমন রাজার প্রধান ধর্ম্ম। আপনিই প্রবল শত্রুদমনের কি উপায় করিয়াছেন?”

রাজা কহিলেন, “কি অজ্ঞা করিতেছেন?” সকল কথা বর্ষীয়ান রাজার শ্রুতিসুলভ হয় নাই।

মাধবাচার্য্যের পুনরুক্তির প্রতীক্ষা না করিয়া ধর্ম্মাধিকার পশুপতি কহিলেন, “মহারাজাধিরাজ! মাধবাচার্য্য রাজসমীপে জিজ্ঞাসু হইয়াছেন, যে রাজশত্রু দমনের কি উপায় হইয়াছে। বঙ্গেশ্বরের কোন্ শত্রু এ পর্যন্ত দমিত হয় নাই, তাহা এখনও আচার্য্য ব্যক্ত করেন নাই। তিনি সবিশেষ বাচন করুন।”

মাধবাচার্য্য অল্প হাস্য করিয়া এবার অত্যুচ্চস্বরে কহিলেন, “মহারাজ, তুরকীয়েরা আর্য্যাবর্ত্ত প্রায় সমুদয় হস্তগত করিয়াছে। আপাততঃ তাহারা মগধ জয় করিয়া গৌড়রাজ্য আক্রমণের উদ্যোগে আছে।”

এবার কথা রাজার কর্ণে প্রবেশ লাভ করিল। তিনি কহিলেন, “তুরকীদিগের কথা বলিতেছেন? তুরকীয়েরা কি আসিয়াছে?”

মাধবাচার্য্য কহিলেন, “ঈশ্বর রক্ষা করিতেছেন; এখনও তাহারা এখানে আসে নাই। কিন্তু আসিলে আপনি কি প্রকারে তাহাদিগের নিবারণ করিবেন?”

রাজা কহিলেন, “আমি কি করিব—আমি কি করিব? আমার এই প্রাচীন শরীর, আমার যুদ্ধের উদ্যোগ সম্ভবে না। আমার এক্ষণে গঙ্গালাভ হইলেই হয়। তুরকীয়েরা আসে আসুক।”

এবম্ভূত রাজবাক্য সমাপ্ত হইলে সভাস্থ সকলেই নীরব হইল। কেবল মহাসামন্তের কোষমধ্যস্থ অসি অকারণ ঈষৎ ঝনৎকার শব্দ করিল। অধিকাংশ শ্রোতৃবর্গের মুখে কোন ভাবই ব্যক্ত হইল না। মাধবাচার্য্যের চক্ষে একবিন্দু অশ্রুপাত হইল।

সভাপণ্ডিত দামােদর প্রথমে কথা কহিলেন। “আচার্য্য, আপনি কি ক্ষুব্ধ হইলেন? যেরূপ রাজাজ্ঞা হইল, ইহা শাস্ত্র সঙ্গত। শাস্ত্রে ঋষিবাক্য প্রযুক্ত আছে, যে তুরকীয়েরা এ দেশ অধিকার করিবে। শাস্ত্রে আছে, অবশ্য ঘটিবে—কাহার সাধ্য নিবারণ করে? তবে যুদ্ধোদমে প্রয়ােজন কি?”

মাধবাচার্য্য কহিলেন, “ভাল সভাপণ্ডিত মহাশয়, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, আপনি এতদুক্তি কোন শাস্ত্রে দেখিয়াছেন?”

দামােদর কহিলেন, “মৎস্যপুরাণে আছে যথা—”

মাধ। “যথা থাকুক—মৎস্যপুরাণ আনিতে অনুমতি করুন; দেখান এরূপ উক্তি কোথায় আছে?”

দামাে। “আমি বিস্মৃত হইয়াছিলাম, বিষ্ণুপুরাণে আছে।”

মাধ। “বিষ্ণুপুরাণ আমি সমগ্র কণ্ঠস্থ বলিতেছি; দেখান এ কবিতা কোথায় আছে?”

দামাে। “আমি কি এতই ভ্রান্ত হইলাম? ভাল স্মরণ করিয়া দেখুন দেখি, মানব ধর্ম্ম শাস্ত্রে একথা আছে কি না?”

মাধ। “বঙ্গেশ্বরের সভাপতি মানব ধর্ম্ম শাস্ত্রের ও কি পারদর্শী নহেন?”

দামাে। “কি জ্বালা! আপনি আমাকে বিহ্বল করিয়া তুলিলেন। আপনার সম্মুখে সরস্বতী বিমনা হয়েন, আমি কোন্ ছার? আপনার সম্মুখে আমার গ্রন্থের নাম স্মরণ হইবে না; কিন্তু কবিতাটা শ্রবণ করুন।”

মাধ। “গৌড়েশ্বরের সভাপণ্ডিত যে অনষ্টুপ্ছন্দে একটী কবিতা রচনা করিয়া থাকিবেন, ইহা কিছুই অসম্ভব নহে। কিন্তু আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতেছি—তুরকজাতীয় কর্তৃক বঙ্গবিজয়বিষয়িণী কথা কোন শাস্ত্রে কোথাও নাই।”

পশুপতি কহিলেন, “আপনি কি সর্ব্বশাস্ত্রবিৎ?”

মাধবাচার্য্য কহিলেন, “আপনি যদি পারেন, তবে আমাকে অশাস্ত্রজ্ঞ বলিয়া প্রতিপন্ন করুন।”

সভাপণ্ডিতের একজন পারিষদ কহিলেন, “আমি করিব। আত্মশ্লাঘা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। যে আত্মশ্লাঘা পরবশ—সে যদি পণ্ডিত তবে মূর্খ কে?”

মাধবাচার্য্য কহিলেন, “মূর্খ তিন জন। যে আত্মরক্ষায় যত্নহীন, যে সেই যত্নহীনতার প্রতিপোষক, আর যে আত্মবুদ্ধির অতীত বিষয়ে বাক্যব্যয় করে, ইহারাই মূর্খ। আপনি ত্রিবিধ মূর্খ।”

সভাপণ্ডিতের পারিষদ্ অধোবদনে উপবেশন করিলেন।

পশুপতি কহিলেন, “যবন আইসে আমরা যুদ্ধ করিব।”

মাধবাচার্য কহিলেন “সাধু! সাধু! আপনার যেরূপ যশঃ সেইরূপ প্রস্তাব করিলেন। জগদীশ্বর আপনাকে কুশলী করুন। আমার কেবল এই জিজ্ঞাস্য যে যদি যুদ্ধই অভিপ্রায়, তবে তাহার কি উদ্যোগ হইয়াছে?”

পশুপতি কহিলেন, “মন্ত্রণা গোপনেই বক্তব্য। এ সভাতলে প্রকাশ্য নহে। কিন্তু যে অশ্ব পদাতি এবং নাবিক সেনা সংগৃহীত হইতেছে কিছু দিন এই নগরী পর্যটন করিলে তাহা জানিতে পারিবেন।”

মা। “কতক কতক জানিয়াছি।”

প। “তবে এ প্রস্তাব করিতেছেন কেন?”

মা। “প্রস্তাবের তাৎপর্য্য এই যে এক বীর পুরুষ এক্ষণে এখানে সমাগত হইয়াছেন। মগধের যুবরাজ হেমচন্দ্রের বীর্য্যের খ্যাতি শুনিয়া থাকিবেন?”

প। “বিশেষ শুনিয়াছি। ইহাও শ্রুত আছি যে তিনি মহাশয়ের শিষ্য। আপনি বলিতে পারিবেন যে ঈদৃশ বীর পুরুষের বাহু-রক্ষিত মগধ রাজ্য পরহস্তগত হইল কি প্রকারে?”

মাধ। “যবন বিপ্লবের কালে যুবরাজ প্রবাসে ছিলেন। এই মাত্র কারণ।”

প। “তিনি কি এক্ষণে নবদ্বীপে আগমন করিয়াছেন?”

মাধ। “আসিয়াছেন। রাজ্যপহারক যবন এই দেশে আগমন করিতেছে শুনিয়া এই দেশে তাহাদিগের সহিত সংগ্রাম করিয়া দস্যুর দণ্ডবিধান করিবেন। বঙ্গরাজ তাঁহার সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করিয়া উভয়ের শত্রু বিনাশের চেষ্টা করিলে উভয়ের মঙ্গল।”

প। “রাজবল্লভের অদ্যই তাঁহার পরিচর্যায় নিযুক্ত হইবে। তাঁহার নিবাসার্থে যথাযােগ্য বাসগৃহই নির্দ্দিষ্ট হইবে। সন্ধিনিবন্ধনের মন্ত্রণা যথাযােগ্য সময়ে স্থির হইবে।”

পরে রাজাজ্ঞায় সভা ভঙ্গ হইল।

প্রথম খণ্ড · প্রথম পরিচ্ছেদ

মৃণালিনী।

প্রথম খণ্ড।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

রঙ্গভূমি।

মহম্মদ ঘোরির প্রতিনিধি তুর্কস্থানীয় কুতুবউদ্দীন যুধিষ্ঠির ও পৃথ্বীরাজের সিংহাসনে উপবেশন করিয়াছেন। দিল্লী, কান্যকুব্জ, মগধাদি প্রাচীন সাম্রাজ্য সকল যবনকরকবলিত হইয়াছে। অশোক বা হর্ষবর্দ্ধন, বিক্রমাদিত্য বা শিলাদিত্য, ইহাঁদিগের পরিত্যক্ত ছত্রতলে যবনমুণ্ড আশ্রিত হইয়াছে। ক্ষত্রিয়, শূদ্র; নন্দবংশ, গুপ্তবংশ;—ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ; রাঠোর, তুয়ার; এ সকলে আর ভারতবর্ষের স্বামিত্ব লইয়া বিবাদ করে না। যবনের শ্বেত ছত্রে সকলের গৌরব ছায়ান্ধকারব্যাপ্ত করিয়াছে।

বঙ্গীয় ৬০৬ অব্দে যবনকর্ত্তৃক মগধ জয় হইল। প্রভূত রত্ন-রাশি সঞ্চিত করিয়া বিজয়ী সেনাপতি বখ্‌তিয়ার খিলিজি, রাজ-প্রতিনিধির চরণে উপঢৌকন প্রদান করিলেন।

কুতুবউদ্দীন প্রসন্ন হইয়া বখ্‌তিয়ার খিলিজিকে পূর্ব্বভারতের আধিপত্যে নিযুক্ত করিলেন। গৌরবে বখ্‌তিয়ার খিলিজি রাজপ্রতিনিধির সমকক্ষ হইয়া উঠিলেন।

কেবল ইহাই নহে; বিজয়ীসেনাপতির সম্মানার্থ কুতবউদ্দীন মহাসমারোহ পূর্ব্বক উৎসবাদির জন্য দিনাবধারিত করিলেন।

উৎসববাসর আগত হইল। প্রভাতাবধি, “রায় পিথোরার” প্রস্তরময় দুর্গের প্রাঙ্গনভূমি জনাকীর্ণ হইতে লাগিল। সশস্ত্রে, শত শত সিন্ধুনদপারবাসী শ্মশ্রুল যোদ্ধৃবর্গ রঙ্গাঙ্গনের চারিপার্শ্বে শ্রেণীবদ্ধ হইয়া দাঁড়াইল; তাহাদিগের করস্থিত উন্নতফলক বর্ষার অগ্রভাগে প্রাতঃসূর্য্যকিরণ জ্বলিতে লাগিল। মালাসম্বন্ধ কুসুমদামের ন্যায় তাহাদিগের বিচিত্র উষ্ণীষশ্রেণী শোভা পাইতে লাগিল। তৎপশ্চাতে দাস, শিল্পী প্রভৃতি অপর মুসলমানেরা বিবিধ বেশভূষা করিয়া দণ্ডায়মান হইল। যে দুই এক জন হিন্দু কৌতূহলের একান্ত বশবর্ত্তী হইয়া সাহসে ভর করিয়া রঙ্গ দর্শনে আসিয়াছিল তাহারা তৎপশ্চাতে স্থান পাইল, অথবা স্থান পাইল না, কেন না যবনদিগের বেত্রাঘাতে ও পদাঘাতে পীড়িত এবং ভীত হইয়া অনেককে পলায়ন করিতে হইল।

রাজপ্রতিনিধি স্বদলে সমাগত হইয়া রঙ্গাঙ্গনের শিরোভাগে দণ্ডায়মান হইলেন। তখন রহস্য আরম্ভ হইল। প্রথমে মল্লদিগের যুদ্ধ, পরে খড়্গী, শূলী, ধানুষ্কী, সশস্ত্র অশ্বারোহীর যুদ্ধ, হইতে লাগিল। পরে মত্ত সেনামাতঙ্গ সকল মাহুত সহিত আনীত হইয়া নানাবিধ ক্রীড়াকৌশল দেখাইতে লাগিল। দর্শকেরা মধ্যে মধ্যে একতানমনে ক্রীড়া সন্দর্শন করিতে লাগিলেন, মধ্যে মধ্যে আপন আপন মন্তব্য সকল পরস্পরের নিকট ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। এক স্থানে কয়েকটী বর্ষীয়ান্ মুসলমান একত্র হইয়া বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিতেছিলেন।

এক জন কহিল,

“সত্য সত্যই কি পারিবে?”

অপর উত্তর করিল,

“না পারিবে কেন? ঈশ্বর যাহাকে সদয় সে কি না পারে? রোস্তম পাহাড় বিদীর্ণ করিয়াছিল, তবে বখ্‌তিয়ার যুদ্ধে একটা হাতী মারিতে পারিবে না?”

তৃতীয় ব্যক্তি কহিল, “তথাপি উহার ঐ ত বানরের ন্যায় শরীর, এ শরীর লইয়া মত্ত হস্তীর সঙ্গে যুদ্ধে সাহস করা, পাগলের কাজ।”

প্রথম প্রস্তাবকর্ত্তা কহিল “বোধ হয় খিলিজিপুত্র এক্ষণে তাহা বুঝিয়াছে; সেই জন্য এখনও অগ্রসর হইতেছে না।”

আর এক ব্যক্তি কহিল, “আরে, বুঝিতেছ না, বখ্‌তিয়ারের মৃত্যুর জন্য পাঁচ জনে ষড়্‌যন্ত্র করিয়া এই এক উপায় করিয়াছে। বেহার জয় করিয়া বখ্‌তিয়ারের বড় দম্ভ হইয়াছে। আর রাজপ্রসাদ সকলই তিনি একক ভোগ করিতেছেন। এই জন্য পাঁচ জনে বলিল যে বখ্‌তিয়ার অমানুষ বলবান্, চাহি কি মত্ত হাতী একা মারিতে পারে। কুতুবউদ্দীন তাহা দেখিতে চাহিলেন। বখ্‌তিয়ার দম্ভে লঘু হইতে পারিলেন না, সুতরাং অগত্যা স্বীকার করিয়াছেন।”

এই বলিতে বলিতে রঙ্গাঙ্গন মধ্যে তুমুল কোলাহল ধ্বনি সংঘোষিত হইল। দ্রষ্টৃবর্গ সভয় চক্ষে দেখিলেন, পর্ব্বতাকার, শ্রাবণের দিগন্তব্যাপী জলদাকার, এক মত্ত মাতঙ্গ, মাহুত কর্ত্তৃক আনীত হইয়া, রঙ্গাঙ্গন মধ্যে দুলিতে দুলিতে প্রবেশ করিল। তাহার মুহুর্মুহুঃ শুণ্ডাস্ফালন, মুহুর্মুহুঃ বিপুল কর্ণতাড়ন, এবং বিশাল বঙ্কিম দন্তদ্বয়ের অমল-শ্বেত স্থির শোভা দেখিয়া দর্শকেরা সভয়ে পশ্চাদ্গত হইয়া দাঁড়াইলেন। পশ্চাদপসারী দর্শকদিগের বস্ত্র মর্ম্মরে, ভয়সূচক বাক্যে, এবং পদধ্বনিতে কিয়ৎক্ষণ রঙ্গাঙ্গন মধ্যে অস্ফুট কলরব হইতে লাগিল। অল্পক্ষণ মধ্যে সে কলরব নিবৃত্ত হইল। কৌতূহলের আতিশয্যে সেই জনাকীর্ণ স্থল একেবারে শব্দহীন হইল। সকলে রুদ্ধনিশ্বাসে বখ্তিয়ার খিলিজির রঙ্গপ্রবেশের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। তখন বখ্‌তিয়ার খিলিজিও রঙ্গমধ্যে প্রবেশ করিয়া গজরাজের সম্মুখীন হইয়া দেখা দিলেন। যাহারা পূর্ব্বে তাঁহাকে চিনিত না, তাহারা তাঁহাকে দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইল, অপিচ বিরক্ত হইল। তাঁহার শরীরে বীরলক্ষণ কিছুই ছিল না। তাঁহার দেহের আয়তন অতি ক্ষুদ্র, গঠন অতি কদর্য্য। শরীরের সকল স্থানই দোষবিশিষ্ট। তাঁহার বাহুযুগল বিশেষ কুরূপশালিত্বের কারণ হইয়াছিল। “আজানুলম্বিত বাহু” সুলক্ষণ হইলে হইতে পারে, কিন্তু দেখিতে কদর্য্য সন্দেহ নাই। বখ্‌তিয়ারের বাহুযুগল জানুর অধোভাগ পর্য্যন্ত লম্বিত সুতরাং আরণ্যনরের সহিত তাঁহার দৃশ্যগত সাদৃশ্য লক্ষিত হইত। তাঁহাকে দেখিয়া একজন মুসলমান আর একজনকে কহিল, “ইনিই বেহার জয় করিয়াছেন? এই শরীরে এত বল?”

একজন অস্ত্রধারী হিন্দুযুবা নিকটে দাঁড়াইয়াছিল। সে কহিল,

“পবননন্দন হনু কলিকালে মর্কট রূপ ধারণ করিয়াছেন।”

যবন কহিল, “তুই কি বলিস রে কাফের?”

হিন্দু পুনরপি কহিল, “পবননন্দন কলিতে মর্কট রূপ ধারণ করিয়াছেন।”

যবন কহিল, “আমি তোর কথা বুঝিতে পারিতেছি না, তুই তীর ধনু লইয়া এখানে আসিয়াছিস কেন?”

হিন্দু কহিল, “আমি বাল্যকালে তীর ধনু লইয়া খেলা করিতাম। সেই অবধি অভ্যাস দোষে তীর ধনু আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে।”

যবন কহিল, “হিন্দুদিগের সে অভ্যাস দোষ ক্রমে ঘুচিতেছে। এ খেলায় আর এখন কাফেরের সুখ নাই। সুভান এল্লা! একি?”

এই বলিয়া যবন রঙ্গভূমি প্রতি অনিমেষ লোচনে চাহিয়া রহিল। বখ্‌তিয়ার নিজ দীর্ঘভুজে এক শাণিত কুঠার ধারণ করিয়া বারণরাজের সম্মুখে দাঁড়াইয়াছিলেন। কিন্তু বারণ তাঁহাকে লক্ষ্য না করিয়া, ইতস্ততঃ সমযোগ্য প্রতিযোগীর অন্বেষণ করিতে লাগিল। ক্ষুদ্রকায় একজন মনুষ্য যে তাহার রণাকাঙ্ক্ষী হইয়া দাঁড়াইয়াছে ইহা তাহার হস্তিবুদ্ধিতে উপজিল না। বখ্‌তিয়ার মাহুতকে অনুজ্ঞা করিলেন, যে হস্তীকে তাড়াইয়া আমার উপর দাও। মাহুত গজশরীরে চরণাঙ্গুলি সঞ্চালন দ্বারা সঙ্কেত করিয়া বখ্‌তিয়ারকে দেখাইয়া দিল। তখন হস্তী ঊর্দ্ধশুণ্ডে বখ্‌তিয়ারকে আক্রমণ করিল। বখ্‌তিয়ার নিমেষ মধ্যে করিশুণ্ডপ্রক্ষেপ হইতে ব্যবহিত হইয়া শুণ্ডোপরে তীব্র কুঠারাঘাত করিল। যূথপতি ব্যথায় ভীষণ চীৎকার করিয়া উঠিল। এবং ক্রোধে পতনশীল পর্ব্বতবৎ বেগে প্রহারকারীর প্রতি ধাবমান হইল; কুঠারাঘাতে সে বেগ রোধের কোন সম্ভাবনা রহিল না। দ্রষ্টৃবর্গ সকলে দেখিল, যে পলকমধ্যে বখ্‌তিয়ার কর্দ্দম পিণ্ডবৎ দলিত হইবেন। সকলে বাহূত্তোলন করিয়া “পলাও পলাও” শব্দ করিতে লাগিল। কিন্তু বখ্‌তিয়ার মগধ জয় করিয়া আসিয়া রঙ্গভূমে পলায়নতৎপর হইবেন কি প্রকারে? তিনি, তদপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়ঃ বিবেচনা করিয়া হস্তি-পদতলে প্রাণত্যাগ মনে মনে স্বীকার করিলেন।

করিরাজ আত্মবেগভরে তাঁহার পৃষ্ঠের উপরে আসিয়া পড়িয়াছিল; একেবারে বখ্‌তিয়ারকে দলিত করিবার মানসে, নিজ বিশাল চরণ উত্তোলন করিল কিন্তু তাহা বখ্‌তিয়ারের স্কন্ধে স্থাপিত হইতে না হইতেই ক্ষয়িতমূল অট্টালিকার ন্যায়, সশব্দে রজ-উৎকীর্ণ করিয়া অকস্মাৎ যূথপতি ভূতলে পড়িয়া গেল। অমনি তাহার মৃত্যু হইল।

যাহারা সবিশেষ দেখিতে না পাইল, তাহারা বিবেচনা করিল যে বখ্‌তিয়ার খিলিজি কোন কৌশলে হস্তির বধসাধন করিয়াছেন। তৎক্ষণাৎ মুসলমান মণ্ডল মধ্যে ঘোরতর জয়ধ্বনি হইতে লাগিল। কিন্তু অন্যে দেখিতে পাইল যে হস্তীর গ্রীবার উপর একটী তীর বিদ্ধ রহিয়াছে। কুতবউদ্দীন বিস্মিত হইয়া সবিশেষ জানিবার জন্য মৃতগজের নিকট আসিলেন, এবং স্বীয় অস্ত্রবিদ্যার প্রভাবে বুঝিতে পারিলেন যে এই শরবেধই হস্তীর মৃত্যুর একমাত্র কারণ। বুঝিলেন যে শর, অসাধারণ বাহুবলে নিক্ষিপ্ত হইয়া স্থূল হস্তিচর্ম্মে, তৎপরে হস্তিগ্রীবার বিপুল মাংসরাশি ভেদ করিয়া মস্তিষ্ক বিদ্ধ করিয়াছে। শরনিক্ষেপকারীর আরও এক অপূর্ব্ব নৈপুণ্যলক্ষণ দেখিলেন। গ্রীবার যে স্থানে মস্তিষ্ক এবং মেরুদও মধ্যস্থ মজ্জার সংযোগ হইয়াছে সেই স্থানেই তীর বিদ্ধ হইয়াছে। তথায় সূচিমাত্র প্রবিষ্ট হইলে জীবের প্রাণ বিনষ্ট হয়—পলকমাত্রও বিলম্ব হয়। এই স্থানে শর বিদ্ধ না হইলে কখনই বখ্‌তিয়ারের রক্ষা সিদ্ধ হইত না। কুতবউদ্দীন, আরও দেখিলেন তীরের গঠন সাধারণ হইতে ভিন্ন। তাহার ফলক অতি দীর্ঘ, সূক্ষ্ম, এবং একটী বিশেষ চিহ্নে অঙ্কিত। তিনি সিদ্ধান্ত করিলেন, যে, যে ব্যক্তি এই শর ত্যাগ করিয়াছিল, সে অসাধরণ বাহুবলশালী; তাহার শিক্ষা বিচিত্র, এবং হস্ত অতি লঘুগতি।

কুতবউদ্দীন গজঘাতী প্রহরণ হস্তে গ্রহণ করিয়া দর্শকমণ্ডলীকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন যে “এ তীর কে ত্যাগ করিয়াছিল?”

কেহ উত্তর দিল না। কুতুবউদ্দীন পুনরপি জিজ্ঞাসা করিলেন “এ তীর কে ত্যাগ করিয়াছিল?”

যে যবন জনেক হিন্দুশস্ত্রধারীকে তাড়না করিয়াছিল, সে এইবার কহিল, “জাঁহাপনা! এক জন কাফের এই স্থানেই দাঁড়াইয়া তীর মারিয়াছিল দেখিয়াছি, কিন্তু তাহাকে আর দেখিতেছি না।”

কুতব-উদ্দীন ভ্রূকুটী করিয়া কিয়ৎক্ষণ বিমনা হইয়া রহিলেন। পরে কহিলেন, “বখ্‌তিয়ার খিলিজি মত্তহস্তী যুদ্ধে বধ করিয়াছেন, তোমরা তাঁহার প্রশংসা কর। কোন কাফের তাঁহার গৌরবের লাঘব জন্মাইবার অভিলাষে, অথবা তাঁহার প্রাণসংহার জন্য এই তীর ক্ষেপ করিয়া থাকিবে। আমি তাহার সন্ধান করিয়া সমুচিত দণ্ডবিধান করিব। তোমরা সকলে গৃহে গিয়া আজিকার দিন আনন্দে যাপন করিও।”

ইহা শুনিয়া দর্শকগণ ধন্যবাদ পূর্ব্বক স্ব স্ব স্থানে গমন করিতে উদ্‌যুক্ত হইল। ইত্যবসরে কুতবউদ্দীন একজন পারিষদকে হস্তস্থিত তীর প্রদান করিয়া তাহার কর্ণে কর্ণে উপদেশ দিলেন; “যাহার নিকট এইরূপ তীর দেখিবে তাহাকে আমার নিকট লইয়া আসিবে। অনেকে সন্ধান কর।”

Medulla Oblongata. পাঠক মহাশয় “ব্রাইড্ অব্ লেমরমূরে” এইরূপ একটী বৃত্তান্ত মনে পড়িতে পারে।

চতুর্থ খণ্ড · ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

পিঞ্জর ভাঙ্গিল।

যতক্ষণ পশুপতি গৃহে ছিলেন ততক্ষণ তিনি মনোরমাকে চক্ষে চক্ষে রাখিয়াছিলেন। যখন তিনি যবনদর্শনে গেলেন, তখন তিনি গৃহের সকল দ্বার রুদ্ধ করিয়া শান্তশীলকে গৃহ রক্ষায় রাখিয়া গেলেন।

পশুপতি যাইবা মাত্র, মনোরমা পলায়নের উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। গৃহের কক্ষে কক্ষে অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। পলায়নের উপযুক্ত কোন পথ মুক্ত দেখিলেন না। অতি উর্দ্ধে কতকগুলিন গবাক্ষ ছিল; কিন্তু তাহা দুরারোহণীয়; তাহার মধ্য দিয়া মনুষ্য শরীর নির্গত হইবার সম্ভাবনা ছিল না; আর
তাহা ভূমি হইতে এত উচ্চ, যে তথা হইতে লম্ফ দিয়া ভূমিতে পড়িলে অস্থি চুর্ণিত হইবার সম্ভাবনা। মনোরমা উন্মাদিনী; সেই গবাক্ষপথেই নিষ্ক্রান্ত হইবার মানস করিলেন।

অতএব পশুপতি যাইবার ক্ষণকাল পরেই, মনোরমা পশুপতির শয্যাগৃহে পালঙ্কের উপর আরোহণ করিলেন। পালঙ্ক হইতে গবাক্ষারোহণ সুলভ হইল। পালঙ্ক হইতে গবাক্ষ অবলম্বন করিয়া, মনোরমা গবাক্ষরন্ধ্র, দিয়া প্রথমে দুই হস্ত, পশ্চাৎ মস্তক, পরে বক্ষ পর্য্যন্ত বাহির করিয়া দিলেন। গবাক্ষ নিকটে উদ্যানস্থ একটি আম্রবৃক্ষের ক্ষুদ্র শাখা দেখিলেন। মনোরমা তাহা ধৃত করিলেন; এবং তখন পশ্চাৎ ভাগ গবাক্ষ হইতে বহিস্কৃত করিয়া, শাখাবলম্বনে ঝুলিতে লাগিলেন। কোমল শাখা তাঁহার ভরে নমিত হইল; তখন ভূমি তাঁহার চরণ হইতে অনতিদূরবর্ত্তী হইল। মনোরমা শাখা ত্যাগ করিয়া অবলীলাক্রমে ভূতলে পড়িলেন। এবং তিল মাত্র অপেক্ষা না করিয়া জনার্দ্দনের গৃহাভিমুখে চলিলেন।

তৃতীয় খণ্ড · ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

“আমি ত উন্মাদিনী”

অপরাহ্নে মাধবাচার্য্য প্রত্যাবর্ত্তন করিলেন। তিনি সম্বাদ আনিলেন, যে, ধর্ম্মাধিকার প্রকাশ করিয়াছেন যে, যবনসেনা আসিয়াছে বটে, কিন্ত পুর্ব্বজিত রাজ্যে বিদ্রোহের সম্ভাবনা শুনিয়া যবনসেনাপতি সন্ধিসংস্থাপনে ইচ্ছুক হইয়াছেন। আগামী কল্য তাঁহারা দূত প্রেরণ করিবেন। দূতের আগমন সাপেক্ষ কোন যুদ্ধোদ্যম হইতেছে না। এই সম্বাদ দিয়া মাধাবচার্য্য কহিলেন, “এই কুলাঙ্গার রাজা ধর্ম্মাধিকারের বুদ্ধিতে নষ্ট হইবে।”

কথা হেচন্দ্রের কর্ণে প্রবেশলাভ করিল কি না সন্দেহ। তাঁহাকে বিমনা দেখিয়া মাধবাচার্য্য বিদায় হইলেন।

সন্ধ্যার প্রাক্কালে মনোরমা, হেমচন্দ্রের গৃহে প্রবেশ করিলেন। হেমচন্দ্রকে দেখিয়া মনোরম! কহিলেন,

“ভ্রাতঃ তোমার ললাট কুঞ্চিত; তোমার ভ্রূকুটীকুটিল বিস্ফারিত লোচনে পলক নাই; লোচনযুগল—দেখি—তাই ত চক্ষু আর্দ্র; তুমি রোদন করিয়াছ।”

হেমচন্দ্র মনোরমার মুখপ্রতি চাহিয়া দেখিলেন; আবার চক্ষু অবনত করিলেন; পুনর্ব্বার উন্নত গবাক্ষপথে দৃষ্টি করিলেন; আবার মনোরমার মুখপ্রতি চাহিয়া রহিলেন। মনোরমা বুঝিলেন যে দৃষ্টির এইরূপ গতির কোন উদ্দেশ্য নাই। যখন কথা কণ্ঠাগত, অথচ বলিবার নহে, তখনই দৃষ্টি এইরূপ হয়। মনোরমা কহিলেন,

“হেমচন্দ্র, তুমি কেন কাতর হইয়াছ? কি হইয়াছে? হেমচন্দ্র কহিলেন, “কিছু না।”

মনােরামা প্রথমে কিছু বলিলেন না—পরে আপনা আপনি মৃদু মৃদু কথা কহিতে লাগিলেন “কিছু না— বলিবে না! ছি! ছি! বুকের ভিতর বিছা পুষিবে।” বলিতে বলিতে মনােরমার চক্ষু দিয়া এক বিন্দু বারি বহিল;—পরে অকস্মাৎ হেমচন্দ্রের মুখ প্রতি চাহিয়া কহিলেন; “আমাকে বলিবে না কেন? আমি যে তােমার ভগিনী।”

মনােরমার মুখের ভাবে, শান্তদৃষ্টিতে এত যত্ন, এত মৃদুতা, এত সহৃদয়তা প্রকাশ পাইল, যে, হেমচন্দ্রের অন্তঃকরণ দ্রবীভূত হইল। তিনি কহিলেন, “আমার যে যন্ত্রণা তাহা ভগিনীর নিকট কথনীয় নহে।”

মনােরমা কহিলেন। “তবে আমি ভগিনী নহি।”

হেমচন্দ্র কিছুতেই উত্তর করিলেন না। তথাপি প্রত্যাশাপন্ন হইয়া মনােরমা তাঁহার মুখপ্রতি চাহিয়া রহিলেন। কহিলেন

“আমি তােমার কেহ নহি।”

হেম। “আমার দুঃখ ভগিনীর অশ্রাব্য—অপরের ও অশ্রাব্য।”

হেমচন্দ্রের কণ্ঠস্বর করুণাময়—নিতান্ত আধিব্যক্তি পরিপূর্ণ; তাহা মনােরমার অন্তস্তলে গিয়া বাজিল। তখনই সে স্বর পবিবর্ত্তিত হইল, চক্ষে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইল—অধর দংশন করিয়া হেমচন্দ্র কহিলেন, “আমার দুঃখ কি? দুঃখ কিছুই না। আমি মালাভ্রমে কাল সর্প কণ্ঠে ধরিয়াছিলাম, এখন তাহা কণ্ঠচ্যুত করিয়াছি।

মনােরমা আবার পূর্ব্ববৎ হেমচন্দ্রের প্রতি অনিমিক্ চক্ষে চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে, তাঁহার মুখমণ্ডলে, অতি মধুর, অতি সকরুণ, হাস্য প্রকটিত হইল। বালিকা, প্রগল্‌ভতা প্রাপ্ত হইলেন। মনোরমা কহিলেন, “বুঝিয়াছি। তুমি না বুঝিয়া ভালবাস, তাহার পরিণাম ঘটিয়াছে।”

হে। “ভাল বাসিতাম।” হেমচন্দ্র বর্ত্তমানের পরিবর্ত্তে অতীত কাল ব্যবহার করিলেন। অমনি নীরবে নিঃস্রুত অশ্রুজলে তাঁহার মুখমণ্ডল ভাসিয়া গেল।

মনোরম বিরক্ত হইলেন। বলিলেন “ছি, ছি! প্রতারণা! এসংসার প্রতারণা, প্রতারণা! প্রতারণা! কেবল প্রতারণা!” মনোরমা বিরক্তিবশতঃ আপন অলকদাম চম্পকাঙ্গুলিতে জড়িত করিয়া টানিতে লাগিলেন।

হেমচন্দ্র বিস্মিত হইলেন; কহিলেন “কি প্রতারণা করিলাম?”

মনোরমা কহিলেন, “ভালবাসিতাম কি? তুমি ভালবাস। নহিলে কাঁদিলে কেন? কি? আজি তোমার স্নেহের পাত্র অপরাধী হইয়াছে বলিয়া তোমার প্রণয় বিনষ্ট হইয়াছে? কে তোমায় এমত প্রবোধ দিয়াছে?” বলিতে বলিতে মনোরমার প্রৌঢ়ভাবাপন্ন মুখ কান্তি সহসা প্রফুল্ল পদ্মবৎ অধিকতর ভাবব্যঞ্জক হইতে লাগিল, চক্ষু অধিক জ্যোতিঃস্ফূর্য্যৎ হইতে লাগিল, কণ্ঠস্বর অধিকতর পরিস্ফুট, আগ্রহ প্রকম্পিত হইতে লাগিল; বলিতে লাগিলেন, “এ কেবল বীর দম্ভকারী পুরুষদিগের দুর্প মাত্র, অহঙ্কার করিয়া প্রণয় অগ্নি নির্ব্বাণ করা যায়? তুমি বালির বাঁধ দিয়া এই কুলপরিপ্লাবিনী গঙ্গার বেগ রোধ করিতে পারিবে, তথাপি তুমি প্রণয়িনীকে পাপিষ্ঠা মনে করিয়া কখনও প্রণয়ের বেগ রোধ করিতে পারিবে না। হা কৃষ্ণ! মানুষ সকলেই প্রতারক!”

হেমচন্দ্র বিস্মিত হইয়া ভাবিলেন, আমি ইহাকে এক দিন বালিকা মনে করিয়াছিলাম!”

মনোরমা কহিতে লাগিলেন, “তুমি পুরাণ শুনিয়াছ? আমি পণ্ডিতের নিকট তাহার গূঢ়ার্থসহিত শুনিয়াছি। লেখা আছে, ভগীরথ গঙ্গা আনিয়াছিলেন; এক দাম্ভিক মত্ত হস্তী তাহার বেগ সম্বরণ করিতে গিয়া ভাসিয়া গিয়াছিল। ইহার অর্থ কি? গঙ্গা প্রেম প্রবাহ স্বরূপ; ইহা জদীশ্বর পদ-পদ্ম-নিঃসৃত; ইহা জগতে পবিত্র,—যে ইহাতে অবগাহন করে সেই পুণ্যময় হয়। ইনি মৃত্যুঞ্জয় জটা-বিহারিণী; যে মৃত্যুকে জয় করিতে পারে, সেও প্রণয়কে মস্তকে ধারণ করে। আমি যেমন শুনিয়াছি, ঠিক সেইরূপ বলিতেছি। দাম্ভিক হস্তী দম্ভের অবতার স্বরূপ, সে প্রণয়বেগে ভাসিয়া যায়। প্রণয় প্রথমে একমাত্র পথ অবলম্বন করিয়া উপযুক্ত সময়ে শতমুখী হয়, প্রণয় স্বভাবসিদ্ধ হইলে, শত পাত্রে ন্যস্ত হয়—পরিশেষে সাগর সঙ্গমে লয় প্রাপ্ত হয়— সংসারস্থ সর্ব্বজীবে বিলীন হয়।”

হে। তোমার উপদেষ্টা কি বলিয়াছেন প্রণয়ের পাত্রাপাত্র নাই? পাপাসক্তকে কি ভালবাসিতে হইবে?”

ইহার উত্তর ত মনোরমার উপদেষ্টা বলিয়া দেন নাই। উত্তর জন্য আপনার হৃদয় মধ্যে সন্ধান করিলেন; অমনি উত্তর আপনি মুখে অসিল। কহিলেন, “পাপাসক্তকে ভালবাসিতে হইবে। প্রণয়ের পাত্রাপাত্র নাই। সকলকেই ভালবাসিবে, প্রণয় জন্মাইলেই তাহাকে যত্নে স্থান দিবে, কেন না প্রণয় অমূল্য। ভাই, যে ভাল, তাকে কে না ভালবাসে? যে মন্দ, তাকে যে আপনা ভুলিয়া ভালবাসে, আমি তাকে বড় ভালবাসি। কিন্তু আমি ত উন্মাদিনী।”

হেমচন্দ্র বিস্মিত হইয়া কহিলেন, “মনোরমা, এ সকল তোমায় কে শিখাইল? তোমার উপদেষ্টা অলৌকিক ব্যক্তি।”

মনোরমা মুখাবনত করিয়া কহিলেন, “তিনি সর্বজ্ঞানী, কিন্তু—”

হে। “কিন্তু কি?”

ম। “তিনি অগ্নিস্বরূপ—আলো করেন, কিন্তু দগ্ধও করেন।”

মনোরমা ক্ষণেক মুখাবনত করিয়া নীরব হইয়া রহিলেন।

হেমচন্দ্র বলিলেন, “মনোরমা, তোমার মুখ দেখিয়া, আর তোমার কথা শুনিয়া, আমার বোধ হইতেছে তুমিও ভালবাসিয়াছ। বোধ হয় যাঁহাকে তুমি অগ্নির সহিত তুলনা করিলে তিনিই তোমার প্রণয়াধিকারী।”

মনোরমা পূর্ব্বমত নীরবে রহিলেন। হেমচন্দ্র পুনরপি বলিতে লাগিলেন। যদি ইহা সত্য হয়, তবে আমার একটি কথা শুন। স্ত্রীলোকের সতীত্বের অধিক আর ধর্ম্ম নাই; যে স্ত্রীর সতীত্ব নাই, সে শূকরীর অপেক্ষাও অধম। সতীত্বের হানি কেবল কার্য্যেই ঘটে এমত নহে; স্বামিভিন্ন অন্য পুরুষের চিন্তা মাত্রও সতীত্বের বিঘ্ন। তুমি বিধবা, যদি স্বামিভিন্ন অপরকে মনেও ভাব তবে তুমি ইহলোকে পরলোকে স্ত্রীজাতির অধম হইয়া থাকিবে। অতএব সাবধান হও। যদি কাহারও প্রতি চিত্ত নিবিষ্ট থাকে, তবে তাহাকে বিস্মৃত হও।”

মনোরমা উচ্চ হাস্য করিয়া উঠিলেন; পরে মুখে অঞ্চল দিয়া হাসিতে লাগিলেন, হাসি বন্ধ হয় না। হেমচন্দ্র কিঞ্চিৎ অপ্রসন্ন হইলেন, কহিলেন, “রহস্য করিতেছ কেন?”

মনোরম কহিলেন, “ভাই, এই গঙ্গাতীরে গিয়া দাঁড়াও; গঙ্গাকে ডাকিয়া কহ, “গঙ্গে, তুমি পর্ব্বতে ফিরে যাও।”

হে। “কেন?”

ম। “স্মৃতি কি আপন ইচ্ছাধীন? একি পাট কাপড়, মনে করিলে তুলিব, মনে করিলে পরিব? রাজপুত্র, কালসর্পকে মনে করিয়া কি সুখ? কিন্তু তথাপি তুমি তাহাকে ভুলিতেছ না কেন?”

হে। “তাহার দংশনের জ্বালায়।”

ম। “আর সে যদি দংশন না করিত? তবে কি তাহাকে ভুলিতে?”

হেমচন্দ্র উত্তর করিলেন না। মনোরমা বলিতে লাগিলেন “তোমার ফুলের মালা কাল সাপ হইয়াছে, তবু তুমি ভুলিতে পারিতেছ না; আমি, আমি ত পাগলিনী—আমি আমার পুষ্পহার কেন ছিঁড়িব?”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “তুমি এক প্রকার অন্যায় বলিতেছ না। বিস্মৃতি স্বেচ্ছাধীন ক্রিয়া নহে; লোকে আত্মগরিমায় অন্ধ হইয়া পরের প্রতি যে সকল উপদেশ দান করে, তন্মধ্যে “বিস্মৃত হও” এই উপদেশের অপেক্ষা হাস্যাস্পদ আর কিছুই নাই। কেহ কাহাকে বলে না, অর্থচিন্তা ত্যাগ কর; যশের ইচ্ছা ত্যাগ কর; জ্ঞানচিন্তা ত্যাগ কর; ক্ষুধানিবারণেচ্ছা ত্যাগ কর; তৃষ্ণানিবারণেচ্ছা ত্যাগ কর; নিদ্রা ত্যাগ কর; তবে কেন বলিবে, প্রণয় ত্যাগ কর? প্রণয় কি এ সকল অপেক্ষায় সুখকারিতায় ন্যূন? এ সকল অপেক্ষায় প্রণয় নূন নহে— কিন্তু ধর্ম্মের অপেক্ষা ন্যূন বটে। ধর্ম্মের জন্য প্রেমকে সংহার করিবে। স্ত্রীর পরম ধর্ম্ম সতীত্ব। সেই জন্য বলিতেছি, যদি পার, প্রেম সংহার কর।”

ম। “আমি অবলা; জ্ঞানহীনা; বিবশা; আমি ধর্ম্মাধর্ম কাহাকে বলে তাহা জানি না। আমি এই মাত্র জানি ধর্ম্ম ভিন্ন প্রেম জন্মে না।”

হে। “সাবধান, মনোরমে! বাসনা হইতে ভ্রান্তি জন্মে; ভ্রান্তি হইতে অধর্ম্ম জন্মে। তোমার ভ্রান্তি পর্য্যন্ত হইয়াছে। তুমি বিবেচনা করিয়া বল দেখি, তুমি যদি ধর্ম্মে একের পত্নী, মনে অন্যের পত্নী হইলে, তবে তুমি দ্বিচারিণী হইলে কি না?”

গৃহমধ্যে হেমচন্দ্রের অসিচর্ম্ম ঝুলিতেছিল; মনোরমা চর্ম্ম হস্তে লইয়া কহিলেন, “ভাই, হেমচন্দ্র, তোমার এ ঢাল কিসের চামড়া?”

হেমচন্দ্র হাস্য করিলেন। মনোরমার মুখ প্রতি চাহিয়া দেখিলেন, বালিকা।

দ্বিতীয় খণ্ড · ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

পশুপতি।

বঙ্গদেশে ধর্ম্মাধিকার পশুপতি অতি অসাধারণ ব্যক্তি তিনি দ্বিতীয় বঙ্গেশ্বর। রাজা বৃদ্ধ, বার্দ্ধক্যের ধর্ম্মানুসারে পরমতাবলম্বী এবং রাজকার্য্যে অযত্নবান্ হইয়াছিলেন, সুতরাং প্রধানামাত্য ধর্ম্মাধিকারের হস্তেই বঙ্গরাজ্যের প্রকৃত ভার অর্পিত হইয়াছিল। এবং সম্পদে অথবা ঐশ্বর্য্যে পশুপতি বঙ্গেশ্বরের সমকক্ষ ব্যক্তি হইয়া উঠিয়াছিলেন।

পশুপতির বয়ঃক্রম পঞ্চত্রিংশৎ বৎসর হইবে। তিনি দেখিতে অতি সুপুরুষ। তাঁহার শরীর দীর্ঘ, বক্ষ বিশাল; সর্বাঙ্গ অস্থিমাংসের উপযুক্ত সংযোগে সুঠাম। তাঁহার বর্ণ তপ্তকাঞ্চনসন্নিভ; ললাট অতি বিস্তৃত, মানসিক শক্তির মন্দির স্বরূপ। নাসিকা দীর্ঘ এবং উন্নত, চক্ষু ক্ষুদ্র কিন্তু অসাধারণ ঔজ্জ্বল্য-সম্পন্ন। মুখকান্তি জ্ঞান-গাম্ভীর্য্য-ব্যঞ্জক এবং অনুদিন বিষয়ানুষ্ঠানজনিত চিন্তার গুণে কিছু পরুষভাবপ্রকাশক। তাহা হইলে কি হয়, রাজসভাতলে তাঁহার ন্যায় সর্বাঙ্গসুন্দর পুরুষ আর কেহই ছিল না। লোকে বলিত, বঙ্গদেশে তাদৃশ পণ্ডিত এবং বিচক্ষণ ব্যক্তিও কেহ ছিল না।

পশুপতি জাতিতে ব্রাহ্মণ কিন্তু তাঁহার জন্মভূমি কোথা তাহা কেহ বিশেষ জ্ঞাত ছিল না। কথিত ছিল যে তাঁহার পিতা শাস্ত্রব্যবসায়ী দরিদ্র ব্রাহ্মণ ছিলেন।

পশুপতি কেবল আপন বুদ্ধিবিদ্যার প্রভাবে গৌড় রাজ্যের প্রধান পদে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন।

পশুপতি যৌবনকালে কাশীধামে পিতার নিকট থাকিয়া শাস্ত্রাধ্যয়ন করিতেন, তথায় কেশব নামে এক বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। হৈমবতী নামে কেশবের এক অষ্টমবর্ষীয়া কন্যা ছিল। তাহার সহিত পশুপতির পরিণয় হয়। কিন্তু অদৃষ্ট বশতঃ বিবাহের রাত্রেই কেশব, সম্প্রদানের পর কন্যা লইয়া অদৃশ্য হইল। আর তাহার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। সেই পর্য্যন্ত পশুপতি পত্নীসহবাসে বঞ্চিত ছিলেন। কারণবশতঃ একাল পর্যন্ত দ্বিতীয় দ্বারপরিগ্রহ করেন নাই। তিনি এক্ষণে রাজপ্রাসাদ তুল্য উচ্চ অট্টালিকায় বাস করিতেন, কিন্তু বামানয়ন-নিঃসৃত জ্যোতিরভাবে সেই উচ্চ অট্টালিকা আজি অন্ধকারময়।

আজি রাত্রে সেই উচ্চ অট্টালিকায় এক নিভৃত কক্ষে, পশুপতি একাকী দীপালোকে বসিয়া আছেন। এই কক্ষের পশ্চাতেই আম্রকানন। আম্রকাননে নিষ্ক্রান্ত হইবার জন্য একটি গুপ্তদ্বার আছে। সেই দ্বারে আসিয়া নিশীথকালে, মৃদু মৃদু কে আঘাত করিল। গৃহাভ্যন্তর হইতে পশুপতি দ্বার উদঘাটিত করিলেন। এক ব্যক্তি গৃহে প্রবেশ করিল। সে যবন জাতীয়। হেমচন্দ্র তাহাকেই বাতায়ন পথে দেখিয়াছিলেন। পশুপতি, তখন তাহাকে পৃথগাসনে উপবেশন করিতে বলিয়া বিশ্বাস জনক অভিজ্ঞান দেখিতে চাহিলেন। যবন অভিজ্ঞান দৃষ্ট করাইলেন।

পশুপতি সংস্কৃতে কহিলেন। “বুঝিলাম আপনি যবন সেনাপতির বিশ্বাসপত্র। সুতরাং আমারও বিশ্বাসপাত্র। আপনারই নাম মহম্মদ আলি? এক্ষণে সেনাপতির অভিপ্রায় কি প্রকাশ করুন।”

যবন সংস্কৃতে উত্তর দিল। কিন্তু তাঁহার সংস্কৃতের তিনভাগ ফারসী, আর অবশিষ্ট চতুর্থ ভাগ যেরূপ সংস্কৃত তাহা ভারতবর্ষে কখন ব্যবহৃত হয় নাই। তাহা মহম্মদআলিরই সৃষ্ট সংস্কৃত। পশুপতি বহুকষ্টে তাহার অর্থ বোধ করিলেন। পাঠক মহাশয়ের সে কষ্টভোগের প্রয়োজন নাই, আমরা তাঁহার সুবোধার্থ সে নূতন সংস্কৃতের অনুবাদ করিয়া দিতেছি।

যবন কহিল, “খিলিজি সাহেবের অভিপ্রায় আপনি অবগত আছেন। বিনা যুদ্ধে, বঙ্গবিজয় করিবেন তাঁহার ইচ্ছা হইয়াছে। কি হইলে আপনি এ রাজ্য তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিবেন?”

পশুপতি কহিলেন, “আমি এ রাজ্য তাঁহার হস্তে সমর্পণ করিব কি না তাহা অনিশ্চিত। স্বদেশবৈরিতা মহাপাপ। আমি এ কর্ম্ম কেন করিব?”

য। “উত্তম। আমি চলিলাম। কিন্তু আপনি তবে কেন খিলিজির নিকট দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন?”

প। “তাঁহার যুদ্ধের সাধ কতদূর পর্য্যন্ত তাহা জানিবার জন্য।”

য। “তাই আমি আপনাকে জানাইয়া যাই। যুদ্ধেই তাঁহার আনন্দ।”

প। “কি মনুষ্য যুদ্ধে, কি পশুযুদ্ধে? হস্তিযুদ্ধে কেমন আনন্দ?

মহম্মদ আলি সকোপে কহিলেন “বঙ্গে যুদ্ধাভিপ্রায়ে আসা পশু যুদ্ধেই আসা। বুঝিলাম ব্যঙ্গ করিবার জন্যই আপনি সেনাপতিকে লোক পাঠাইতে বলিয়াছিলেন। আমরা যুদ্ধ জানি, ব্যঙ্গ জানি না। যাহা জানি তাহা করিব।”

এই বলিয়া মহম্মদ আলি গমনেদ্যোগী হইল। পশুপতি কহিলেন, “ক্ষণেক অপেক্ষা করুন। আর কিছু শুনিয়া যান। আমি যবন হস্তে এ রাজ্য সমর্পণ করিতে অসম্মত নহি। অক্ষমও নহি। আমিই বঙ্গের রাজা, সেন রাজা নাম মাত্র। কিন্তু সমুচিত মূল্য না পাইলে আপন রাজ্য কেন আপনাদিগকে দিব?”

মহম্মদ আলি কহিলেন, “আপনি কি চাহেন?”

প। “খিলিজি কি দিবেন?”

ম। “আপনার যাহা আছে, তাহা সকলই থাকিবে— আপনার জীবন, ঐশ্বর্য্য, পদ সকলই থাকিবে। এই মাত্র।”

প। “তবে আমি পাইলাম কি? এ সকলই ত আমার আছে—কি লোভে আমি এ গুরুতর পাপানুষ্ঠান করিব?”

ম। “আমাদের আনুকূল্য না করিলে কিছুই থাকিবেক না; যুদ্ধ করিলে, আপনার ঐশ্বর্য, পদ, জীবন পর্যন্ত অপহৃত হইবে।”

প। “তাহা যুদ্ধ শেষ না হইলে বলা যায় না। আমরা যুদ্ধ করিতে একেবারে অনিচ্ছুক বিবেচনা করিবেন না। বিশেষ মগধে বিদ্রোহের উদ্যোগ হইতেছে তাহাও অবগত আছি। তন্নিবারণজন্য এক্ষণে খিলিজি ব্যস্ত, বঙ্গজয় চেষ্টা আপাততঃ কিছু দিন তাঁহাকে ত্যাগ করিতে হইবে তাহাও অবগত আছি। আমার প্রার্থিত পুরস্কার না দেন, না দিবেন, কিন্তু যুদ্ধ করাই যদি স্থির হয়, তবে আমাদিগের এই উত্তম সময়। যখন বেহারে বিদ্রোহিসেনা সজ্জিত হইবে, গৌড়েশ্বরের সেনাও তথায় গিয়া তাহাদিগের সহায়তা করিবে।”

ম। “ক্ষতি কি? পিপীলিকা দংশনের উপর মক্ষিকা দংশন করিলে হস্তী মরে না। কিন্তু আপনার প্রার্থিত পুরস্কার কি, তাহা শুনিয়া যাইতে বাসনা করি।”

প। “শ্রবণ করুন। আমি এক্ষণে প্রকৃত বঙ্গের ঈশ্বর, কিন্তু লোকে আমাকে বঙ্গেশ্বর বলে না। আমি স্বনামে রাজা হইতে বাসনা করি। সেন বংশ লোপ হইয়া পশুপতি বঙ্গাধিপতি হউক।”

ম। “তাহাতে আমাদিগের কি উপকার করিলেন? আমাদিগকে কি দিবেন?”

প। “রাজকর মাত্র। মুসলমানের অধীনে করপ্রদ মাত্র রাজা হইব।”

ম। “ভাল; আপনি যদি প্রকৃত বঙ্গেশ্বর, রাজ্য যদি আপনার এরূপ করতলস্থ, তবে আমাদিগের সহিত আপনার কথা বার্ত্তার আবশ্যক কি? আমাদিগের সাহায্যের প্রয়োজন কি? আমাদিগকে কর দিবেন কেন?”

প। “তাহা স্পষ্ট করিয়া বলিব। ইহাতে কপটতা করিব না। প্রথমতঃ সেনরাজা আমার প্রভু; বয়সে বৃদ্ধ, আমাকে স্নেহ করেন। স্ববলে যদি আমি তাঁহাকে রাজ্যচ্যুত করি—তবে অত্যন্ত লোকনিন্দা। আপনারা কিঞ্চিন্মাত্র যুদ্ধোদ্যম দেখাইয়া, আমার আনুকূল্যে বিনা যুদ্ধে রাজধানী প্রবেশ পূর্ব্বক তাঁহাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া আমাকে তদুপরি স্থাপিত করিলে সে নিন্দা হইবে না। দ্বিতীয়তঃ রাজ্য অনধিকারীর অধিকারগত হইলেই বিদ্রোহের সম্ভাবনা, আপনাদিগের সাহায্যে সে বিদ্রোহ সহজেই নিবারণ করিতে পারিব। তৃতীয়তঃ আমি স্বয়ং রাজা হইলে এক্ষণে সেন রাজার সহিত আপনাদিগের যে সম্বন্ধ, আমার সঙ্গেও সেই সম্বন্ধ থাকিবে। আপনাদিগের সহিত যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকিবে। যুদ্ধে আমি প্রস্তুত আছি—কিন্তু জয় পরাজয় দুইয়ের সম্ভাবনা। জয় হইলে আমার নূতন লাভ কিছুই হইবে না কিন্তু পরাজয়ে সর্বস্ব হানি। কিন্তু আপনাদিগের সহিত সন্ধি করিয়া রাজ্য গ্রহণ করিলে সে আশঙ্কা থাকিবে না। বিশেষতঃ সর্ব্বদা যুদ্ধোদ্যত থাকিতে হইলে নুতন রাজ সুশাসিত হয় না।”

ম। “আপনি রাজনীতিজ্ঞের ন্যায় বিবেচনা করিয়াছেন। আপনার কথায় আমার সম্পূর্ণ প্রত্যয় জন্মিল। আমিও এইরূপ স্পষ্ট করিয়া খিলিজি সাহেবের অভিপ্রায় ব্যক্ত করি। তিনি এক্ষণে অনেক চিন্তায় ব্যস্ত আছেন যথার্থ—কিন্তু হিন্দুস্থানে যবনরাজ একেশ্বর হইবেন, অন্য রাজার নাম মাত্র আমরা রাখিব না। কিন্তু আপনাকে বঙ্গে শাসন কর্ত্তা করিব। যেমন দিল্লীতে মহম্মদ ঘোরির প্রতিনিধি কুতুবউদ্দীন, যেমন পূর্ব্বদেশে কুতুবউদ্দীনের প্রতিনিধি বখ‍্তিয়ার খিলিজি, তেমনি বঙ্গে আপনি বখ‍্তিয়ারের প্রতিনিধি হইবেন। আপনি ইহাতে স্বীকৃত আছেন কিনা?”

পশুপতি কহিলেন, “আমি ইহাতে সম্মত হইলাম।”

ম। “ভাল; কিন্তু আমার আর এক কথা জিজ্ঞাস্য আছে। আপনি যাহা অঙ্গীকার করিতেছেন তাহা সাধন করিতে আপনার ক্ষমতা কি?”

প। “আমার অনুমতি ব্যতীত একটী পদাতিও যুদ্ধ করিবে না। রাজকোষ আমার অনুচরের হস্তে। আমার আদেশ ব্যতীত যুদ্ধোদ্যোগে একটী কপর্দ্দকও ব্যয়িত হইবে না। পঞ্চজন অনুচর লইয়া খিলিজিকে রাজপুর প্রবেশ করিতে বলিও; কেহ জিজ্ঞাসা করিবে না ‘কে তোমরা?”

ম। “আরও এক কথা বাকি আছে। এই দেশে যবনের পরম শত্রু হেমচন্দ্র বাস করিতেছে। অদ্য রাত্রেই তাহার মুণ্ড যবন শিবিরে প্রেরণ করিতে হইবে।”

প। “আপনারা আসিয়াই তাহা ছেদন করিবেন—আমি শরণাগত-হত্যা-পাপ কেন স্বীকার করিব?”

ম। “আমাদিগ হইতে হইবে না। যবন সমাগম শুনিবামাত্র সে ব্যক্তি নগর ত্যাগ করিয়া পলাইবে। আজি সে নিশ্চিন্ত আছে। আজি লোক পাঠাইয়া তাহাকে বধ করুন।”

প। “ভাল, ইহাও স্বীকার করিলাম।”

ম। “আমরা সন্তুষ্ট হইলাম। আমি আপনার উত্তর লইয়া চলিলাম।”

প। “যে আজ্ঞা। আর একটা কথা জিজ্ঞাস্য আছে।”

ম। “কি, আজ্ঞা করুন।”

প। “আমি ত রাজ্য আপনাদিগের হস্তে দিব। পরে যদি আপনারা আমাকে বহিষ্কৃত করেন।”

ম। “আমরা আপনার কথায় নির্ভর করিয়া অল্প মাত্র সেনা লইয়া দূত পরিচয়ে পুরপ্রবেশ করিব। তাহাতে যদি আমরা স্বীকার মত কর্ম্ম না করি আপনি সহজেই আমাদিগকে বহিস্কৃত করিয়া দিবেন।”

প। “আর যদি আপনারা অল্প সেনা লইয়া না আইসেন?”

ম। “তবে যুদ্ধ করিবেন।” এই বলিয়া মহম্মদ আলি বিদায় হইল।

প্রথম খণ্ড · ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

দূতী।

লক্ষ্মণাবতী নগরীর প্রদেশান্তরে যেখানে সর্ব্বধন বণিকের বাটীতে হেমচন্দ্র অবস্থিতি করিতেছিলেন, পাঠক মহাশয় সেই খানে চলুন। বণিকের গৃহদ্বারে এক অশোক বৃক্ষ বিরাজ করিতেছিল; অপরাহ্নে তাহার তলে উপবেশন করিয়া, একটী কুসু-
মিত অশোকশাখা নিষ্প্রয়োজনে হেমচন্দ্র ছুরিকা দ্বারা খণ্ড খণ্ড করিতেছিলেন, এবং মূহুর্মূহুঃ পথপ্রতি দৃষ্টি করিতেছিলেন, যেন কাহারও প্রতীক্ষা করিতেছেন। যাহার প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, সে আসিল না। দিগ্বিজয় আসিল, হেমচন্দ্র দিগ্বিজয়কে কহিলেন,

“দিগ্বিজয়, ভিখারিণী আজি এখনও আসিল না। আমি বড় ব্যস্ত হইয়াছি। তুমি একবার তাহার সন্ধানে যাও।”

“যে আজ্ঞা” বলিয়া দিগ্বিজয় গিরিজায়ার সন্ধানে চলিল। নগরীর রাজপথে গিরিজায়ার সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইল।

গিরিজায়া বলিল, “কে ও দিগ্বিজয়?” দিগ্বিজয় রাগ করিয়া কহিল, “আমার নাম দিগ্বিজয়।”

গি। “ভাল দিগ্বিজয়—আজি কোন্‌ দিগ্জয় করিতে চলিয়াছ?”

দি। “তোমার দিগ্‌।”

গি। “আমি কি একটা দিগ্? তোর দিগ্বিদিগ্‌ জান নাই।”

দি। “কেমন করিয়া থাকিবে—তুমি যে অন্ধকার। এখন চল, প্রভু তোমাকে ডাকিয়াছেন।”

গি। “কেন?”

দি। “তোমার সঙ্গে বুঝি আমার বিবাহ দিবেন।”

গি। “কেন ভোমার কি মুখ-অগ্নি করিবার আর লোক যুটিল না।”

দি। “না। সে কাজ তোমাকেই করিতে হইবে। এখন চল।”

গি। “পরের জন্যেই মলেম। তবে চল।”

এই বলিয়া গিরিজায়া দিগ্বিজয়ের সঙ্গে চলিলেন। দিগ্বিজয়, অশোকতলস্থ হেমচন্দ্রকে দেখাইয়া দিয়া অন্যত্র গমন করিল। হেমচন্দ্র অন্যমনে মৃদু মৃদু গাইতেছিলেন।

“বিকচ নলিনে, যমুনা পুলিনে, বহুত পিয়াসা রে”

গিরিজায়া পশ্চাৎ হইতে গাইল

“চন্দ্রমাশালিনী, যা মধু যামিনী, না মিটল আশা রে।”

গিরিজায়াকে দেখিয়া হেমচন্দ্রের মুখ প্রফুল্ল হইল। কহিলেন,

“কে গিরিজায়া! আশা কি মিট্ল?”

গি। “কার আশা? আপনার না আমার।”

হে। “আমার আশা। তাহা হইলেই তোমার মিটিবে।”

গি। “আপনার আশা কি প্রকারে মিটিবে? লোকে বলে রাজা রাজড়ার আশা কিছুতেই মিটে না।”

হে। “আমার অতি সামান্য আশা।”

গি। “যদি কখন মৃণালিনীর সাক্ষাৎ পাই তবে এ কথা তাঁহার নিকট বলিব।”

হেমচন্দ্র বিষণ্ণ হইলেন। কহিলেন, “তবে কি আজিও মৃণালিনীর সন্ধান পাও নাই? আজি কোন্‌ পাড়ায় গীত গাইতে গিয়াছিলে?”

গি। “অনেক পাড়ায়—সে পরিচয় আপনার নিকট নিত্য নিত্য কি দিব? অন্য কথা বলুন।”

হেমচন্দ্র নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, “বুঝিলাম বিধাতা বিমুখ। ভাল পুনর্ব্বার কালি সন্ধানে যাইবে।”

গিরিজায়া তখন প্রণাম করিয়া কপট বিদায়ের উদ্যোগ করিল। গমনকালে হেমচন্দ্র তাহাকে কহিলেন, “ভাল—গিরিজায়া—তোমাকেত আমি তোমার পুরস্কার স্বরূপ বসন ভূষণ দিরাছি—সে গুলিন্‌ পর না কেন?”

গি। “সুবদনা ভিখারিণীকে কে ভিক্ষা দিবে? আপনি যত দিন আছেন, তত দিন যেন আমার ভিক্ষার প্রয়োজন নাই। আপনি যথেষ্ট পুরস্কার করিতেছেন কিন্ত আপনি ত বসন্তের কোকিল। উড়িয়া গেলে আমার যে ভিক্ষা, সেই ভিক্ষা করিতে হইবে। আর আমি আপনার কোন কাজ করিতে পারিলাম না; সে গুলিন আপনার ফিরাইয়া দিব।”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “ফিরাইয়া দিবে কেন? গিরিজায়া, তুমি হাসিতেছ না কিন্ত তোমার চক্ষু হাসিতেছে। আজি কি তোমার গান শুনিয়া কেহ কিছ বলিয়াছে?”

গি। “কে কি বলিবে? এক মাগী তাড়া করিয়া মারিতে আসিয়াছিল—বলে মথুরাবাসিনীর জন্যে শ্যামসুন্দরের ত মাথাব্যথা পড়িয়াছে।”

হেমচন্দ্র দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া অস্ফুটস্বরে, যেন আপনা আপনি কহিতে লাগিলেন “এত যত্নেও যদি সন্ধান না পাইলাম, তবে আর বৃথা আশা—কেন মিছা কালক্ষেপ করিয়া আত্মকর্ম্ম নষ্ট করি;—গিরিজায়ে, কালি তোমাদিগের নগর হইতে বিদায় হইব।”

“তথাস্ত।” বলিয়া গিরিজায়া মৃদু মৃদু গান করিতে লাগিল,—

“শুনি যাওয়ে চলি, বাজায়ি মুরলী, বনে বনে একা রে।”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “ও গান এই পর্য্যন্ত! অন্য গীত গাও।”

গিরিজায়া গাইল,

“কটিবাস কসিয়ে, রাস রসে রসিয়ে, মাতিল রস কামিনী।”

গাইতে গাইতে গিরিজায়া লজ্জিতা হইলেন, তখন গীত পরিবর্ত্তন করিয়া গাইলেন,

“যে ফুল ফুটিত সখি; গৃহ তরু শাখে,

কেন রে পবনা, উড়ালি তাকে।”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “পবনে যে ফুল উড়ে তাহার জন্য দুঃখ কি? ভাল গীত গাও।”

গিরিজায়া গাইল,

“কণ্টকে গঠিল বিধি, মৃণাল অধমে।

জলে তারে ডুবাইল, পড়িয়া মরমে॥”

হেম। “কি কি? মৃণাল কি?”

গি।

“কণ্টকে গঠিল বিধি, মৃণাল অধমে।

জলে তারে ডুবাইল পীড়িয়া মরমে॥

রাজহংস দেখি এক নয়ন রঞ্জন।

চরণে বেড়িয়া তারে করিল বন্ধন॥

না—অন্য গান গাই।”

হে। “না—না—না—এই গান—এই গান গাও। তুমি রাক্ষসী।”

গি।

“বলে হংসরাজ কোথা করিবে গমন।

হৃদয় কমলে দিব তোমারে আসন।

আসিয়। বসিল হংস, হৃদয় কমলে।

কাঁপিল কণ্টক সহ মৃণালিনী জলে॥

হে। “গিরিজায়ে! গিরি—এ গীত তোমাকে কে শিখাইল?”

গি। (সহাস্যে)

“হেনকালে কাল মেঘ উদিল আকাশে।

উড়িল মরালরাজ, মানস বিলাসে॥

ভাঙ্গিল হৃদয়পদ্ম তার বেগভরে।

ডুবিয়া অতল জলে মৃণালিনী মরে।”

হেমচন্দ্র বাষ্পাকুললোচনে গদ্গদস্বরে গিরিজীয়াকে কহিদেন, “এ আমারি মৃণালিনী। তুমি তাহাকে কোথায় দেখিলে?”

গি।

“দেখিলাম সরোবরে, কাঁপিচে পবন ভরে,

মৃণাল উপরে মৃণালিনী।”

হে। “এখন রূপক রাখ আমার কথার উত্তর দাও—কোথায় মৃণালিনী?”

গি। “এই নগরে।”

হেমচন্দ্র রুষ্টভাবে কইলেন, “তা ত আমি অনেক দিন জানি। এ নগরে কোন্‌ স্থানে?”

গি। “হৃষীকেশ শর্ম্মার বাড়ী।”

হে। “কি পাপ! সে কথা আমিই তোমাকে বলিয়া দিয়াছিলাম। এত দিনত তাহার সন্ধান করিতে পার নাই, এক্ষণে কি সন্ধান করিয়াছ?”

গি। “সন্ধান করিয়াছি।”

হেমচন্দ্র দুই বিন্দু—দুই বিন্দু মাত্র অশ্রু মোচন করিলেন। পুনরপি কহিলেন “সে এখান হইতে কত দূর?”

গি। “অনেক দুর।”

হে। “সে এখান হইতে কোন্‌ দিকে যাইতে হয়?”

গি। “এখান হইতে দক্ষিণ, তার পর পূর্ব্ব; তার পর উত্তর, তার পর পশ্চিম—”

হেমচন্দ্র হস্ত মুষ্টিবদ্ধ করিলেন। কহিলেন এ সময়ে ব্যঙ্গ ত্যাগ কর নচেৎ মস্তক চূর্ণ করিব।”

গি। “শান্ত হউন। পথ বলিয়া দিলে কি আপনি চিনিতে পারিবেন? যদি তা না পারিবেন, তবে জিজ্ঞাসার আবশ্যক? আজ্ঞা করিলে আমি সঙ্গে করিয়া লইয়া যাইব।”

মেঘমুক্ত সূর্য্য়ের ন্যায় হেমচন্দ্রের মুখ প্রফুল্ল হইল। তিনি কহিলেন,

তোমার সর্ব্বকামনা সিদ্ধ হউক—মৃণালিনী কি বলিল?”

গি। “তা ত বলিয়াছি।”

“ডুবিয়া অতল জলে মৃণালিনী মরে।”

হে। “মৃণালিনী কেমন আছে?”

গি। “দেখিলাম শরীরে কোন পীড়া নাই।”

হে। “সুখে আছে কি ক্লেশে আছে কি বুঝিলে?”

গি। “শরীরে গহনা, পরিধানে ভাল কাঁড়-হৃষীকেশ ব্রাহ্মণের কন্যার সই।”

হে। “তুমি অধঃপাতে যাও; মনের কথা কিছু বুঝিলে?”

গি। “বর্ষাকালের পদ্মের মত। মুখখানি কেবল জলে ভাসিতেছে।”

হে। “পরগৃহে কি ভাবে আছে?”

গি। “এই অশোক ফুলের স্তবকের মত। আপন গৌরবে আপনি নম্র।”

হে। “গিরিজায়ে! তুমি বয়সে বালিকা মাত্র। তোমার ন্যায় বালিকা আর দেখি নাই।”

গি। “মুষ্ট্যাঘাতের উপযুক্ত পাত্রও এমন আর দেখেন নাই।”

হে। “সে আপরাধ লইও না। মৃণালিনী আর কি বলিল?”

গি। “যো দিন জানকী—”

হে। “আবার?”

গি। “যো দিন জানকী—রঘুবীর নিরখি—”

হেমচন্দ্র গিরিজায়ার কেশাকর্ষণ করিলেন। তখন সে কহিল “ছাড়! ছাড়! বলি! বলি!”

“বল্‌” বলিয়া হেমচন্দ্র কেশ ত্যাগ করিলেন।

তখন গিরিজায়া আদ্যোপান্ত মুণালিনীর সহিত কথোপকথন বিবরিত করিল। পরে কহিল;

“মহাশয় আপনি যদি মৃণালিনীকে দেখিতে চান তবে আমার সঙ্গে একপ্রহর রাত্রে যাত্রা করিবেন।”

গিরিজায়ার কথা সমাপ্ত হইলে, হেমচন্দ্র অনেকক্ষণ নিঃশবে অশোক তলে পাদচারণ করিতে লাগিলেন। বহুক্ষণ পরে কিছুমাত্র না বলিয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন। এবং তথা হইতে একখানি পত্র আনিয়া গিরিজায়ার হস্তে দিলেন, এবং কহিলেন,

“মৃণালিনীর সহিত সাক্ষাতে আমার এক্ষণে অধিকার নাই। তুমি রাত্রে কথামত তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবে এবং এই পত্র তাঁহাকে দিবে। কহিবে দেবতা প্রসন্ন হইলে অবশ্য শীঘ্র বৎসরেক মধ্যে সাক্ষাৎ হইবে। মৃণালিনী কি বলেন অদ্য রাত্রেই আমাকে বলিয়া যাইও।”

গিরিজায়া বিদায় হইলে, হেমচন্দ্র অনেকক্ষণ চিন্তিতান্তঃকরণে অশোক বৃক্ষতলে তৃণশয্যায় শয়ন করিয়া রহিলেন। ভুজোপরে মস্তক রক্ষা করিয়া, পৃথিবীর দিকে মুখ রাখিয়া, শয়ান রহিলেন। কিয়ৎকাল পরে, সহসা তাঁহার পৃষ্ঠদেশে কঠিন করস্পর্শ হইল। মুখ ফিরাইয়া দেখিলেন, সম্মুখে মাধবাচার্য্য।

মাধবাচার্য্য কহিলেন, “বৎস! গাত্রোত্থান কর। আমি তোমার প্রতি অসন্তষ্ট হইয়াছি—সন্তুষ্টও হইয়াছি। তুমি আমাকে দেখিয়া বিস্মিতের ন্যায় কেন চাহিয়া রহিয়াছ?”

হেমচন্দ্র কহিলেন, “আপনি এখানে কোথা হইতে আসিলেন?”

মাধবাচার্য্য এ কথায় কোন উত্তর না দিয়া কহিতে লাগিলেন,

তুমি এ পর্য্যন্ত নবদ্বীপে না গিয়া পথে বিলম্ব করিতেছ—ইহাতে তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়াছি। আর তুমি বে মৃণালিনীর সন্ধান পাইয়াও আত্মসত্য প্রতিপালনার্থ তাহার সাক্ষাতের সুযোগ উপেক্ষা করিলে, এজন্য তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়াছি। তোমাকে কোন তিরস্কার করিব না। কিন্ত এখানে তোমার আর বিলম্ব করা হইবে না। মৃণালিনীর প্রত্যুত্তরের প্রতীক্ষা করা হইবে না। বেগবান্‌ হৃদয়কে বিশ্বাস নাই। আমি অদ্যই নবদীপে যাত্রা করিব। তোমাকে আমার সঙ্গে যাইতে হইবে নৌকা প্রস্তত আছে। অস্ত্র শস্ত্রাদি গৃহমধ্য হইতে লইয়া আইস। আমার সঙ্গে চল।”

হেমচন্দ্র নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন। হানি নাই—আমি আশা ভরসা বিসর্জ্জন করিরাছি। চলুন। কিন্ত আপনি—কামচর না অন্তর্যামী?”

এই বলিয়া হেমচন্দ্র গৃহমধ্যে পুনঃপ্রবেশ পূর্ব্বক বনিকের নিকট বিদায় গ্রহণ করিলেন। এবং আপনার সম্পত্তি এক জন বাহকের স্বন্ধে দিয়া আচার্য্যের অনুবর্ত্তী হইলেন।

চতুর্থ খণ্ড · সপ্তম পরিচ্ছেদ

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

যবনবিপ্লব।

সেই নিশীতে নবদ্বীপনগর বিজয়োন্মত্ত যবনসেনার নিস্পীড়নে, বাত্যাসন্তাড়িত তরঙ্গোৎক্ষেপী সাগর সদৃশ চঞ্চল হইয়া উঠিল। রাজপথ, ভূরি ভূরি অশ্বারোহিগণে, ভূরি ভূরি পদাতি দলে, ভূরি ভূরি খড়্গী ধানুকী শূলী সমূহ সমারোহে, আচ্ছন্না হইয়া গেল। সেনাবলহীন রাজধানীর নাগরিকেরা ভীত হইয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল; দ্বার রুদ্ধ করিয়া সভয়ে ইষ্টনাম জপ করিতে লাগিল।

যবনেরা, রাজপথে যে দুই একজন হতভাগ্য আশ্রয়হীন ব্যক্তিকে প্রাপ্ত হইল, তাহাদিগকে শূলবিদ্ধ করিয়া, রুদ্ধদ্বার ভবন সকল আক্রমণ করিতে লাগিল। কোথাও বা দ্বার ভগ্ন করিয়া, কোথাও বা প্রাচীর উল্লঙ্ঘন করিয়া, কোথাও বা শঠতা পূর্ব্বক ভীত গৃহস্থকে জীবনাশা দিয়া গৃহপ্রবেশ করিতে লাগিল। গৃহ প্রবেশ করিয়া, গৃহস্থের সর্ব্বস্বাপহরণ, পশ্চাৎ স্ত্রীপুরুষ, বৃদ্ধ বনিতা বালক, সকলেরই শিরচ্ছেদ, ইহাই নিয়ম পূর্ব্বক করিতে লাগিল। কেবল যুবতীর পক্ষে দ্বিতীয় নিয়ম।

শোণিতে গৃহস্থের গৃহ সকল প্লাবিত হইতে লাগিল। শোণিতে রাজপথ পঙ্কিল হইল। শোণিতে যবনসেন রক্তচিত্রময় হইল। অপহৃত দ্রব্যজাতের ভারে অশ্বের পৃষ্ঠ এবং মনুষ্যের স্কন্ধ পীড়িত হইতে লাগিল। শূলগ্রে বিদ্ধ হইয়া ব্রাহ্মণের মুণ্ড সকল ভীষণভাব ব্যক্ত করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণের যজ্ঞোপবীত অশ্বের গলদেশে দুলিতে লাগিল। সিংহাসনস্থ শালগ্রামশিলা সকল যবন পুরীষে আবরিত হইল।

ভয়ানক শব্দে নৈশাকাশ পরিপূর্ণ হইতে লাগিল। অশ্বের পদধ্বনি, সৈনিকের কোলাহল, হস্তীর বৃংহিত, যবনের জয় শব্দ; তদুপরি পীড়িতের আর্ত্তনাদ। মাতার রোদন, শিশুর রোদন, বৃদ্ধের করুণাকাঙ্ক্ষা, যুবতীর কণ্ঠ বিদার।

যে বীরপুরুষকে মাধবাচার্য্য এত যত্নে যবনদমনার্থ নবদ্বীপে লইয়া আসিয়াছিলেন, এ সময়ে তিনি কোথা? এই ভয়ানকযবনপ্রলয়কালে, হেমচন্দ্র রণোন্মুখ নহেন। একাকী রণোন্মুখ হইয়া কি করিবেন?

হেমচন্দ্র তখন আপন গৃহে শয়ন মন্দিরে, শয্যাপরে শয়ন করিয়াছিলেন। নগরাক্রমণের কোলাহল তাঁহার কর্ণে প্রবেশ করিল। তিনি দিগ্বিজয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কিসের শব্দ?”

দিগ্বিজয় কহিল, “যবন সেনা নগর আক্রমণ করিয়াছে।” হেমচন্দ্র চমৎকৃত হইলেন। তিনি এ পর্য্যন্ত বখ্‌তিয়ার কর্ত্তৃক রাজপুরাধিকার এবং রাজার পলায়নের বৃত্তান্ত শুনেন নাই। দিগ্বিজয় তদ্বিশেষ হেমচন্দ্রকে শুনাইলেন।

হেমচন্দ্র কহিলেন, “বাঙ্গালিরা কি করিতেছে?”

দি। “যে পারিতেছে পলায়ন করিতেছে, যে না পারিতেছে সে প্রাণ হারাইতেছে।”

হে। “আর বঙ্গীয় সেনা?”

দি। “কাহার জন্য যুদ্ধ করিবে? রাজা ত পলাতক। সুতরাং তাহারা আপন আপন পথ দেখিতেছে।”

হে। “আমার অশ্বসজ্জা কর।” দিগ্বিজয় বিস্মিত হইল, জিজ্ঞাসা করিল, “কোথায় যাইবেন?”

হে। “নগরে।” দি। “একাকী?”

হেমচন্দ্র ভ্রূকুটী করিলেন। ভ্রূকুটী দেখিয়া দিগ্বিজয় ভীত হইয়া অশ্বসজ্জা করিতে গেল।

হেমচন্দ্র তখন মহামূল্য রণসজ্জায় সজ্জিত হইয়া, সুন্দর অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করিলেন। এবং ভীষণ শূলহস্তে, নির্ঝরিণীপ্রেরিত জলবিম্ববৎ সেই অসীম যবনসেনাসমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন।

হেমচন্দ্র দেখিলেন, যবনেরা যুদ্ধ করিতেছে না, কেবল অপ হরণ করিতেছে। যুদ্ধজন্য কেহই তাহাদিগের সম্মুখীন হয় নাই, সুতরাং যুদ্ধে তাহাদিগেরও মন ছিল না। যাহাদিগের অপহরণ করিতেছিল তাহাদিগকেই অপহরণকালে বিনাযুদ্ধে মারিতে ছিল। সুতরাং যবনেরা দলবদ্ধ হইয়া হেমচন্দ্রকে নষ্ট করিবার কোন উদ্যোগ করিল না। যে কোন যবন তৎকর্ত্তৃক আক্রান্ত হইয়া তাঁহার সহিত একা যুদ্ধোদ্যম করিল সে তৎক্ষণাৎ মরিল।

হেমচন্দ্র বিরক্ত হইলেন। তিনি যুদ্ধাকাঙ্ক্ষায় আসিয়াছিলেন, কিন্তু যবনেরা পূর্ব্বেই বিজয় লাভ করিয়াছে, অর্থসংগ্রহ ত্যাগ করিয়া তাঁহার সহিত রীতিমত যুদ্ধ করিল না। তিনি মনে মনে ভাবিলেন, “একটি একটি করিয়া গাছের পাতা ছিঁডিয়া কে অরণ্যকে নিষ্পত্র করিতে পারে? একটি একটি যবন মারিয়া কি করিব? যবন যুদ্ধ করিতেছে না—যবন বধেই বা কি সুখ? বরং গৃহীদিগের রক্ষার সাহায্যে মন দেওয়া ভাল।” হেমচন্দ্র তাহাই করিতে লাগিলেন, কিন্তু বিশেষ কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না। দুইজন যবন তাঁহার সহিত যুদ্ধ করে, অপর যবনে সেই অবসরে গৃহস্থদিগের সর্ব্বস্বান্ত করিয়া চলিয়া যায়। যাহাই হউক হেমচন্দ্র যথাসাধ্য পীড়িতের উপকার করিতে লাগিলেন। পথপার্শ্বে এক কুটীর মধ্য হইতে হেমচন্দ্র আর্ত্তনাদ শ্রবণ করিলেন। যবন কর্ত্তৃক আক্রান্ত ব্যক্তির আর্ত্তনাদ বিবেচনা করিয়া হেমচন্দ্র গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন।

দেখিলেন গৃহমধ্যে যবন নাই। কিন্তু গৃহমধ্যে যবনদৌরাত্ম্যের চিহু সকল বিদ্যমান রহিয়াছে। দ্রব্যাদি প্রায় কিছুই নাই যাহা আছে তাহার ভগ্নাবস্থা, আর এক ব্রাহ্মণ আহত অবস্থায় ভূমে পড়িয়া আর্ত্তনাদ করিতেছে। সে এ প্রকার গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হইয়াছে যে মৃত্যু আসন্ন। হেমচন্দ্রকে দেখিয়া সে যবন ভ্রমে কহিতে লাগিল,

“আইস—প্রহার কর—শীঘ্র মরিব—মার—আমার মাথা লইয়া সেই রাক্ষসীকে দিও—আঃ—প্রাণ যায়—জল! জল! কে জল দিবে।”

হেমচন্দ্র কহিলেন “তোমার গৃহে জল আছে?”

ব্রাহ্মণ কাতরোক্তিতে কহিতে লাগিল—“জানি না—মনে হয় না—জল! জল! পিশাচি!—সেই পিশাচীর জন্য প্রাণ গেল।”

হেমচন্দ্র কুটীর মধ্যে অন্বেষণ করিয়া দেখিলেন, এক কলসে জল আছে। পাত্রাভাবে পত্রপুটে তাহাকে জল দান করিলেন। ব্রাহ্মণ কহিল “না!—না! জল খাইব না! যবনের জল খাইব না।” হেমচন্দ্র কহিলেন, “আমি যবন নহি, আমি আর্য্যবর্ণ—আমার স্পৃষ্ট জল পান করিতে পার। আমার কথায় বুঝিতে পারিতেছ না।”

ব্রাহ্মণ জলপান করিল। হেমচন্দ্র কহিলেন, “তোমার আর কি উপকার করিব?”

ব্রাহ্মণ কহিল, “আর কি করিবে? আর কি? আমি মরি। মরি! যে মরে তাহার কি করিবে?” হেমচন্দ্র কহিলেন, “তোমার কেহ আছে? তাহাকে তোমার নিকট রাখিয়া যাইব?”

ব্রাহ্মণ কহিল, “আর কে—কে আছে? কেবল—কেবল সেই রাক্ষসী। সেই রাক্ষসী—তাহাকে—বলিও—বলিও আমার অপ—অপরাধের প্রতিশোধ হইয়াছে।”

হেমচন্দ্র। “কে সে? কাহাকে বলিব?”

ব্রাহ্মণ কহিতে লাগিল—“কে সে? সে পিশাচী? পিশাচী চেন না? পিশাচী মৃণালিনী—মৃণালিনী! মৃণালিনী—পিশাচী।”

ব্রাহ্মণ অধিকতর আর্ত্তনাদ করিতে লাগিল।—হেমচন্দ্র মৃণালিনীর নাম শুনিয়া চমকিত হইলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “মৃণালিনী তোমার কে হয়?”

ব্রাহ্মণ কহিলেন “মৃণালিনী কে হয়? কেহ না—আমার যম।”

হেমচন্দ্র। “মৃণালিনী তোমার কি করিয়াছে?”

ব্রাহ্মণ। “কি করিয়াছে?—কিছু না—আমি তার—দুর্দ্দশা করিয়াছি, তাহার প্রতিশোধ হইল—”

হেমচন্দ্র। “কি দুর্দ্দশা করিয়াছ?”

ব্রাহ্মণ। “আর কথা কহিতে পারি না, জল দাও।”

হেমচন্দ্র পুনর্ব্বার তাহাকে জলপান করাইলেন। ব্রাহ্মণ জলপান করিয়া স্থির হইলে হেমচন্দ্র তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন “তোমার নাম কি?”

ব্রা। “ব্যোমকেশ।”

হেমচন্দ্রের চক্ষুঃ হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইল। দন্তে অপর দংশন করিলেন। করস্থ শূল দৃঢ়তর মুষ্টিবদ্ধ করিয়া ধরিলেন। আবার তখনই শান্ত হইয়া কহিলেন,

“তোমার নিবাস কোথা?” ব্রা। “গৌড়—গৌড় জান না? মৃণালিনী আমার পিতার গৃহে থাকিত।”

হে। “তার পর?”

ব্রা। “তার পর—তার পর কি? তার পর আমার এই দশা—মৃণালিনী লক্ষ্মী—সাবিত্রী—আমার প্রতি ফিরিয়া চাহিল না। রাগ করিয়া আমার পিতার নিকট আমি তাহার মিথ্যাপবাদ দিলাম। পিতা তাহাকে বিনা দোষে গৃহবহিষ্কৃত করিয়া দিলেন। রাক্ষসী—রাক্ষসী আমাদিগের গৃহ ত্যাগ করিয়া গেল।”

হে। “তবে তুমি তাহাকে গালি দিতেছ কেন?”

ব্রা। “কেন?—কেন গালি—গালি দিই? মৃণালিনী আমাকে ফিরিয়া দেখিত না—আমি—আমি তাহাকে দেখিয়া জীবন—জীবন ধারণ করিতাম। সে চলিয়া আসিল, সেই—সেই অবধি আমার সর্ব্বস্ব ত্যাগ, তাহার জন্য কোন্ দেশে—কোন দেশে না গিয়াছি—কোথায় পিশাচীর সন্ধান না করিয়াছি। গিরিজায়া—ভিখারীর মেয়ে—তার আযি বলিয়া দিল—নবদ্বীপে আসিয়াছে—নবদ্বীপে আসিলাম—সন্ধান নাই। যবন—যবন হস্তে মরিলাম, রাক্ষসীর জন্য মরিলাম দেখা হইলে বলিও—সতী লক্ষ্মীর অবমাননা করিয়াছিলাম—ফুল ফলিল।”

আর ব্যোমকেশের কথা সরিল না। সে পরিশ্রমে একেবারে নির্জ্জীব হইয়া পড়িল। নির্ব্বাণোন্মুখ দীপ নিবিল। বিকট মুখভঙ্গী করিয়া ব্যোমকেশ প্রাণত্যাগ করিল।

হেমচন্দ্র আর দাঁড়াইলেন না। আর যবন বধ করিলেন না। কোন মতে পথ করিয়া গৃহাভিমুখে চলিলেন।

তৃতীয় খণ্ড · সপ্তম পরিচ্ছেদ

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

গিরিজায়ার সম্বাদ।

গিরিজায়া যখন পাটনীর গৃহে প্রত্যাবর্ত্তন করে, তখন প্রাণান্তে হেমচন্দ্রের নবানুরাগের কথা মৃণালিনীর সাক্ষাতে ব্যক্ত করিবে না স্থির করিয়াছিল। মৃণালিনী তাহার আগমন প্রতীক্ষায় পিঞ্জরে বদ্ধ বিহঙ্গিনীর ন্যায় চঞ্চলা হইয়া রহিয়াছিলেন; গিরিজায়াকে দেখিবামাত্র কহিলেন, “বল গিরিজায়ে, কি দেখিলে? হেমচন্দ্র কেমন আছেন?”

গিরি জায়া কহিল “ভাল আছেন?”

মৃ। “কেন, অমন করিয়া বলিলে কেন? তোমার কণ্ঠস্বরে উৎসাহ নাই কেন? যেন দুঃখিত হইয়া বলিতেছ কেন?”

গি। “কই কিছু না।”

মৃ। “গিরিজায়া আমাকে প্রতারণা করিও না; হেমচন্দ্র কি আরোগ্যলাভ করেন নাই, তাহা হইলে আমাকে স্পষ্ট করিয়া বল। সন্দেহের অপেক্ষা প্রতীতি ভাল।”

গিরিজায়া এবার সহাস্যে কহিল, “তুমি কেন অনর্থক ব্যস্ত হও। আমি নিশ্চিত বলিতেছি তাঁহার শরীরে কিছুই ক্লেশ নাই। তিনি উঠিয়া বেড়াইতেছেন।”

মৃণালিনী ক্ষণেক চিন্তা করিয়া কহিলেন, “মনোরমার সহিত তাঁহার কোন কথা বার্ত্তা শুনিলে?”

গি। “শুনিলাম।”

মৃ। “কি শুনিলে?”

গিরিজায়া তখন হেমচন্দ্র বিবরিত কথা সকল কহিলেন। কেবল হেমচন্দ্রের সগোচরে যে মনোরমা নিশা পর্য্যটন করিয়াছেন ও কাণে কাণে কথা বলিয়াছিলেন, এই দুইটা বিষয় গোপন করিলেন। মৃণালিনী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি হেমচন্দ্রের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছ?”

গিরিজায়া কিছু ইতস্ততঃ করিয়া কহিল, “করিয়াছি।”

মৃ। “তিনি কি কহিলেন?”

গি। “তোমার কথা জিজ্ঞাসা করিলেন।

মৃ। “তুমি কি বলিলে?”

গি। “আমি কহিলাম তুমি ভাল আছ।”

মৃ। “আমি এখানে আসিয়াছি তাহা বলিয়াছ?”

গি। “না।”

মৃ। “গিরিজায়া, তুমি ইতস্ততঃ করিয়া উত্তর দিতেছ। তোমার মুখ শুস্ক। তুমি আমার মুখপানে চাহিতে পারিতেছ না। আমি নিশ্চিত বুঝিতেছি তুমি কোন অমঙ্গল সম্বাদ আমার নিকট গোপন করিতেছ। আমি তোমার কথায় বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না। যাহা থাকে অদৃষ্টে, আমি স্বয়ং হেমচন্দ্রকে দেখিতে যাইব। পার, আমার সঙ্গে আইস, নচেৎ আমি একাকিনী যাইব।”

এই বলিয়া মৃণালিনী অবগুণ্ঠনে মুখাবৃত করিয়া বেগে রাজপথে আরোহণ করিয়া চলিলেন।

গিরিজায়া তাঁহার পশ্চাদ্ধাবিতা হইল। কিছু দূর আসিয়া তাঁহার হস্ত ধরিয়া কহিল, “ঠাকুরাণি, ফের; আমি যাহা গোপন করিয়াছি তাহা প্রকাশ করিতেছি।”

মৃণালিনী গিরিজায়ার সঙ্গে সঙ্গে গৃহে ফিরিয়া আসিলেন। তখন গিরিজায় যাহা যাহা গোপন করিয়াছিল তাহা সবিস্তারে প্রকাশিত করিল।

য়ুনানীয়েরা প্রণয়েশ্বর ক্যুপিদ্‌কে অন্ধ বলিয়া কল্পনা করিত। তিনি কাণা হউন, কিন্তু তাঁহার সেবক সেবিকারা রাত্রি দিন চক্ষুঃ চাহিয়া থাকে। যে বলে যে প্রেমাসক্ত ব্যক্তি অন্ধ সে হস্তিমূর্খ। আমি যদি অন্যাপেক্ষা তোমাকে অধিক ভালবাসি, তাহাহইলে ইহা নিশ্চিত, যে অন্যে যাহা দেখিতে পায় তদপেক্ষা আমি তোমার অধিক গুণ দেখি। সুতরাং এখানে অন্যাপেক্ষা আমার দৃষ্টির তীব্রতা অধিক। তবে অন্ধ হইলাম কই?

দ্বিতীয় খণ্ড · সপ্তম পরিচ্ছেদ

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

চৌরোদ্ধরণিক।

মহম্মদ আলি বাহির হইয়া দৃষ্টি পথাতীত হইলে অন্য একজন গুপ্ত-দ্বার নিকটে আসিয়া মৃদুস্বরে কহিল, “প্রবেশ করিব?”

পশুপতি কহিলেন, “কর।”

একজন চৌরোদ্ধরণিক প্রবেশ করিল। সে প্রণত হইলে পশুপতি আশীর্ব্বাদ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেমন শান্তশীল! মঙ্গল সম্বাদ ত?”

চৌরোদ্ধরণিক কহিল, “আপনি একে একে প্রশ্ন করুন—আমি ক্রমে সকল সম্বাদ নিবেদিতেছি।”

পশু। “যবনদিগের অবস্থিতি স্থানে গিয়াছিলে?”

শান্ত। “সেখানে কেহ যাইতে পারে না।”

পশু। “কেন?”

শান্ত। “অতি নিবিড় বন, দুর্ভেদ্য।”

পশু। “কুঠার হস্তে বৃক্ষচ্ছেদন করিতে করিতে গেলে না কেন?”

শান্ত। “ব্যাঘ্র ভল্লূকের দৌরাত্ম্য।”

পশু। “সশস্ত্র গেলে না কেন?”

শান্ত। “যে সকল কাঠুরিয়ার ব্যাঘ্র ভল্লূক বধ করিয়া বনমধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল তাহারা সকলেই যবনহস্তে প্রাণত্যাগ করিয়াছে—কেহই ফিরিয়া আইসে নাই।”

পশু। “তুমিও না হয় না আসিতে?”

শান্ত। “তাহা হইলে কে আসিয়া আপনাকে সম্বাদ দিত?”

পশুপতি হাসিয়া কহিলেন, “তুমিই আসিতে।”

শান্তশীল প্রণাম করিয়া কহিল, “আমিই সম্বাদ দিতে আসিয়াছি।”

পশুপতি আনন্দিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি প্রকারে গেলে?”

শান্ত। “প্রথমে উষ্ণীষ, শস্ত্র ও তদুপযোগী বসন সংগ্রহ করিলাম। তাহা লুক্কায়িত করিয়া বাঁধিয়া পৃষ্ঠে সংস্থাপিত করিলাম। তৎপরে কাঠুরিয়ার বেশ ধরিয়া কাঠুরিয়াদিগের সঙ্গে বনমার্গে প্রবেশ লাভ করিলাম। পরে যখন যবনেরা কাঠুরিয়াদিগের দেখিতে পাইয়া তাহাদিগের বধে প্রবৃত্ত হইল— তখন আমি অপসৃত হইয়া বৃক্ষান্তরালে বেশ পরিবর্ত্ত করিলাম। পরে মুসলমান হইয়া যবনশিবিরে সর্ব্বত্র পর্য্যটন করিলাম।”

পশু। “প্রশংসনীয় বটে। যবন সৈন্য কত দেখিলে?”

শান্ত। “সে বৃহৎ অরণ্যে যত ধরে। বোধ হয় বিংশতি সহস্র হইবে।”

পশুপতি ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। পরে কহিলেন “তাহাদিগের কথাবার্ত্তা কি শুনিলে?”

শান্ত। “বিস্তর শুনিলাম—কিন্তু তাহার কিছুই আপনার নিকট নিবেদন করিতে পারিলাম না।”

পশু। “কেন?”

শান্ত। “যাবনিক ভাষায় পণ্ডিত নহি।” পশুপতি হাস্য করিলেন। শান্তশীল তখন কহিলেন, “মহম্মদ আলি এখানে যে আসিয়াছিলেন, তাহাতে বিপদ্ আশঙ্কা করিতেছি।”

পশুপতি চমকিত হইয়া কহিলেন, “কেন?”

শা। “তিনি অলক্ষিত হইয়া আসিতে পারেন নাই। তাঁহার আগমন কেহ কেহ জানিতে পারিয়াছে।”

পশুপতি অত্যন্ত শঙ্কান্বিত হইয়া কহিলেন, “কিসে জানিলে?”

শান্তশীল কহিলেন, “আমি শ্রীচরণ দর্শনে আসিবার সময় দেখিলাম যে বৃক্ষতলে এক ব্যক্তি লুক্কায়িত হইল। তাহার যােদ্ধৃবেশ। তাহার সহিত কথােপকথনে বুঝিলাম যে সে মহম্মদ আলির গৃহপ্রবেশ দৃষ্টি করিয়া তাহার জন্য প্রতীক্ষা করিতেছে, অন্ধকারে তাহাকে চিনিতে পারিলাম না।”

প। “তার পর।”

শা। “তার পর দাস তাহাকে চিত্রগৃহে কারারুদ্ধ করিয়া রাখিয়া আসিয়াছে।”

পশুপতি চৌরােদ্ধরণিককে সাধুবাদ করিতে লাগিলেন। এবং কহিলেন, যে “কল্য প্রাতে উঠিয়া সে ব্যক্তির প্রতিবিহিত করা যাইবেক। আজি রাত্রে সে কারারুদ্ধই থাক। এক্ষণে তােমাকে অন্য এক কার্য্য সাধন করিতে হইবে। যবনসেনাপতির ইচ্ছা অদ্য রাত্রে তিনি মগধরাজপুত্রের ছিন্ন মস্তক দর্শন করেন। তাই এখনই সংগ্রহ করিবে।”

শা। “কার্য্য নিতান্ত সহজ নহে। রাজপুত্র পিপীলিকা নহেন।”

প। “আমি তােমাকে একা যুদ্ধে যাইতে বলিতেছি না। কতকগুলি লােক লইয়া তাঁহার গৃহ আক্রমণ করিবে।”

শা। “লােকে কি বলিবে?”

প। “লােকে বলিবে দসুতে তাঁহাকে হত্যা করিয়া গিয়াছে।”

শা। “যে আজ্ঞা। আমি চলিলাম।”

পশুপতি শান্তশীলকে পুরস্কার করিয়া বিদায় করিলেন। পরে গৃহাভ্যন্তরে যথা বিচিত্র সূক্ষ্ম কারুকার্য্য খচিত মন্দিরে অষ্টভুজামূর্ত্তি স্থাপিতা আছে, তথায় গমন করিয়া প্রতিমাগ্রে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিলেন। পরে গাত্রোত্থান করিয়া যুক্ত করে ভক্তিভাবে ইষ্টদেবের স্তুতি করিয়া কহিলেন, “জননি! বিশ্ব-পাত্রি! আমি অকূল সাগরে ঝাঁপ দিলাম—দেখিও মা! আমায় উদ্ধার করিও। আমি জননী স্বরূপা জন্মভূমি কখন দেবদ্বেষী যবনকে বিক্রয় করিব না। কেবল মাত্র এই আমার পাপাভিসন্ধি যে অক্ষম প্রাচীন রাজার স্থানে আমি রাজা হইব। যেমন কণ্টকের দ্বারা কণ্টক উদ্ধার করিয়া পরে উভয় কণ্টককে দূরে নিক্ষিপ্ত করে—তেমনি আমি যবন সহায়তায় রাজ্য লাভ করিয়া রাজ্য সহায়তায় যবনকে নিপাত করিব। ইহাতে পাপ কি মা! যদি ইহাতে পাপ হয়, যাবজ্জীবন প্রজার সুখানুষ্ঠান করিয়া সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিব। জগৎপ্রসবিনি! প্রসন্ন হইয়া আমার কামনা সিদ্ধ কর।”

এই বলিয়া পশুপতি পুনরপি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিলেন। প্রণাম করিয়া গাত্রোথান করিলেন— শয্যাগৃহে যাইবার জন্য। ফিরিলেন, ফিরিয়া দেখিলেন—অপূর্ব্ব দর্শন:—

সম্মুখে, দ্বারদেশ ব্যাপিত করিয়া, জীবনময়ী প্রতিমারূপিণী তরুণী দাঁড়াইয়া রহিয়াছে।

পশুপতি প্রথমে চমকিত হইলেন—শিহরিয়া উঠিলেন। পরক্ষণেই উচ্ছ্বাসোন্মুখ সমুদ্রবারিবৎ আনন্দে স্ফীত হইলেন।

তরুণী বীণানিন্দিত স্বরে কহিলেন, “পশুপতি!”

পশুপতি দেখিলেন——মনোরমা!

প্রথম খণ্ড · সপ্তম পরিচ্ছেদ

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

লুব্ধ।

মৃণালিনী বা গিরিজায়া এতন্মধ্যে কেহই আত্মপ্রতিশ্রুত বিস্মৃতা হইলেন না। উভয়ে প্রহরেক রাত্রে হৃষীকেশের গৃহপার্শ্বে সংমিলিত হইলেন। মৃণালিনী গিরিজায়াকে দেখিবামাত্র কহিলেন,

“কই, হেমচন্দ্র কোথায়?

গিরিজায়া কহিল “তিনি আইসেন নাই।”

“আইসেন নাই!” এই কথাটী মৃণালিনীর অন্তস্তল হইতে ধ্বনিত হইল। ক্ষণেক উভয়ে নীরব। তৎপরে মৃণালিনী, জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন আসিলেন না?”

গি। “তাহা আমি জানি না। এই পত্র দিয়াছেন।” এই বলিয়া গিরিজায়া তাঁহার হস্তে লিপি দান করিল। মৃণালিনী কহিলেন, “কি প্রকারে বা লিপি পাঠ করি? গৃহে গিয়া প্রদীপ জ্বলিয়া পাঠ করিলে মণিমালিনী জাগরিতা হইয়া দেখিতে পাইবে—হা বিধাত!”

গিরিজায়া কহিল “অধীর হইও না। আমি প্রদীপ, তৈল, পাতর, লোহা, সকলই আনিয়া রাখিয়াছি। এখনই আলো করিতেছি।”

গিরিজায়া শীঘ্র হস্তে অগ্ন্যুৎপাদন করিয়া প্রদীপ জ্বালিত করিল। অগ্ন্যুৎপাদন শব্দ এক জন গৃহবাসীর কর্ণে প্রবেশ করিল—দীপালোক সে দেখিতে পাইল।

গিরিজায়া দীপ জ্বালিত করিলে মৃণালিনী নিম্নলিখিত মত মনে মনে পাঠ করিলেন।

“মৃণালিনী! কি বলিয়া আমি তোমাকে পত্র লিখিব? তুমি আমার জন্যে দেশত্যাগিনী হইয়া পর গৃহে কষ্টে কালাতিপাত করিতেছ। যদি দৈবানুগ্রহে তোমার সন্ধান পাইয়াছি, তথাপি তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম না। তুমি ইহাতে আমাকে অপ্রণয়ী মনে করিবে—অথবা অন্যা হইলে মনে করিত—তুমি করিবে না। আমি কোন বিশেষ ব্রতে নিযুক্ত আছি—যদি তৎপ্রতি আমি অবহেলা করি, তবে আমি কুলাঙ্গার। তৎসাধন জন্য আমি গুরুর নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছি যে, তোমার সহিত এ স্থানে সাক্ষাৎ করিব না। আমি নিশ্চিত জানি যে, আমি যে তোমার জন্য সত্য ভঙ্গ করিব, তোমারও এমত সাধ নহে। অতএব এক বৎসর কোন ক্রমে দিন যাপন কর। পরে ঈশ্বর প্রসন্ন হয়েন, তবে অচিরাৎ তোমাকে রাজপুরবধূ করিয়া আত্মসুখ সম্পূর্ণ করিব। এই অল্পবয়স্কা প্রগল‍্ভবুদ্ধি বালিকা হস্তে উত্তর প্রেরণ করিও।” মণালিনী পত্র পড়িয়া গিরিজয়াকে কহিলেন,

“গিরিজায়ে! আমার লেখনী পত্রাদি কিছুই নাই যে লিপি প্রেরণ করি। তুমি মুখে আমার প্রত্যুত্তর লইয়া যাও। তুমি বিশ্বাসভাগিনী—পুরস্কার স্বরূপ আমার অঙ্গের অলঙ্কার দিতেছি।”

গিরিজায়া কহিল, “প্রত্যুত্তর কাহার নিকট লইয়া যাইব। তিনি আমাকে লিপি দিয়া বিদায় করিবার সময় বলিয়া দিয়াছিলেন, যে আজি রাত্রেই তামাকে প্রত্যুত্তর আনিয়া দিও। আমিও স্বীকৃত ছিলাম। আসিবার সময় মনে করিলাম, হয়ত তোলার নিকট মসী লেখনী প্রভৃতি নাই; এ জন্য সে সকল সংগ্রহ করিয়া আনিবার জন্য তাঁহার উদ্দেশে গেলাম। তাঁহার সাক্ষাৎ পাইলাম না, শুনিলাম তিনি সন্ধ্যাকালে নবদ্বীপ যাত্রা করিয়াছেন।”

মৃ। “নবদ্বীপ?”

গি। “নবদ্বীপ।”

মৃ। “সন্ধ্যাকালেই?”

গি। “সন্ধ্যাকালেই। শুনিলাম তাঁহার গুরু আসিয়া তাঁহাকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়াছেন।”

মৃ। “মাধবাচার্য! মাধবাচার্যই আমার কালস্বরূপ।” পরে অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া মৃণালিনী কহিলেন, “গিরিজায়ে, তুমি বিদায় হও। অধিককাল আমি গৃহের বাহিরে থাকিব না।”

গিরিজায়া কহিল, “আমি চলিলাম। এই বলিয়া গিরিজায়া বিদায় হইল। তাহার মৃদু মৃদু গীতধ্বনি শুনিতে শুনিতে মৃণালিনী গৃহমধ্যে পুনঃ প্রবেশ করিলেন।

মৃণালিনী বাটীর মধ্যে প্রবেশ করিয়া যেমন দ্বার রুদ্ধ করিবার উদ্যোগ করিতেছিলেন, অমনি পশ্চাৎ হইতে কে আসিয়া তাঁহার হস্ত ধারণ করিল। মৃণালিনী চমকিয়া উঠিলেন। হস্ত রোধকারী কহিল,

“তবে সাধ্বি! এই বার জালে পড়িয়াছ। এ গুপ্ত প্রসাদভোজী কে শুনিতে পাই না।”

মৃণালিনী তখন ক্রোধে কম্পিত হইয়া কহিলেন, “ব্যোমকেশ! ব্রাহ্মণকুলে পাষণ্ড! হস্ত ত্যাগ কর।”

ব্যোমকেশ হৃষীকেশের পুত্র। এ ব্যক্তি ঘোরমূর্খ, এবং দুশ্চরিত্র। সে মৃণালিনীর প্রতি বিশেষ অনুরক্ত হইয়াছিল, এবং স্বাভিলাষ পূরণের অন্য কোন সম্ভাবনা নাই জানিয়া বলপ্রকাশে কৃতসঙ্কল্প হইয়াছিল। কিন্তু মৃণালিনী মণিমালিনীর সঙ্গ প্রায় ত্যাগ করিতেন না এ জন্য ব্যোমকেশ এ পর্য্যন্ত অবসর প্রাপ্ত হয় নাই।

মৃণালিনীর ভর্ৎসনায় ব্যোমকেশ কহিল “কেন, হস্ত ত্যাগ করিব? আমি কি মনুষ্য নই? যদি একের মনোরঞ্জন করিয়াছ, তবে অপরের পার না?”

মৃ। “দুর্ব্বৃত্ত! যদি না ছাড়িবে, তবে এখনই ডাকিয়া গৃহস্থ সকলকে উঠাইব।”

ব্যো। “উঠাও। আমি কহিব অভিসারিকাকে ধরিআছি।”

মৃ। “তবে অধঃপাতে যাও।” এই বলিয়া মৃণালিনী সবলে হস্তমোচন জন্য চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কৃতকার্য্য হইতে পারিলেন না। ব্যোমকেশ কহিল, “অধীর হইও না। আমার মনোরথ পূর্ণ হইলেই আমি তোলায় ত্যাগ করিব। এখন তোমার সই ভগিনী মণিমালিনী কোথায়?”

মৃ। “আমিই তোমার ভগিনী।”

ব্যো। “তুমি আমার প্রাণেশ্বরী।”

এই বলিয়া ব্যোমকেশ মৃণালিনীকে হস্তদ্বারা আকর্ষণ করিয়া লইয়া চলিলেন। যখন মাধবাচার্য্য তাঁহাকে হরণ করিয়াছিল, তখন মৃণালিনী স্ত্রীস্বভাবসুলভ চীৎকারে রতি দেখান্ নাই, এখনও শব্দ করিলেন না।

অকস্মাৎ ব্যোমকেশ কাতর স্বরে বিকট চীৎকার করিয়া উঠিল। “রাক্ষসি! তোর দন্তে কি বিষ আছে?” এই বলিয়া ব্যোমকেশ মৃণালিনীর হস্ত ত্যাগ করিয়া আপন পৃষ্ঠে হস্ত মার্জ্জন করিতে লাগিলেন। স্পর্শানুভবে জানিলেন যে পৃষ্ঠ দিয়া দরদরিত রুধির পড়িতেছে।

মৃণালিনী মুক্তহস্ত হইয়াও পলাইলেন না। তিনিও প্রথমে ব্যোমকেশের ন্যায় বিস্মিত হইয়াছিলেন, কেন না তিনি ত ব্যোমকেশকে দংশন করেন নাই। ভল্লুকোচিত কার্য্য তাঁহার করণীয় নহে। কিন্তু তখনই নক্ষত্রালোকে খর্ব্বাকৃতা বালিকামূর্ত্তি সম্মুখ হইতে অপসৃত হইতেছে দেখিতে পাইলেন। গিরিজায়া তাঁহার বসনাকর্ষণ করিয়া মৃদুস্বরে “পলাইয়া আইস” বলিয়া স্বয়ং পলায়ন করিল।

পলায়ন মৃণালিনীর স্বভাবসঙ্গত নহে। তিনি পলায়ন করিলেন না। ব্যোমকেশ প্রাঙ্গনে দাঁড়াইয়া আর্ত্তনাদ করিতেছে এবং কাতরোক্তি করিতেছে দেখিয়া, তিনি গজেন্দ্রগমনে নিজ শয়নাগার অভিমুখে চলিলেন। কিন্তু তৎকালে ব্যোমকেশের আর্ত্তনাদে গৃহস্থ সকলেই জাগরিত হইয়াছিল। সম্মুখে হৃষীকেশ। হৃষীকেশ পুত্রকে শশব্যস্ত দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,

“কি হইয়াছে, কেন যাঁড়ের ন্যায় চীৎকার করিতেছ?”

ব্যোমকেশ কহিল, “মৃণালিনী অভিসারে গমন করিয়াছিল, আমি তাহাকে ধৃত করিয়াছি বলিয়া সে আমার পৃষ্ঠে দারুণ দংশন করিয়াছে।”

হৃষীকেশ পুত্রের কুরীতি কিছুই জানিতেন না। মৃণালিনীকে প্রাঙ্গন হইতে উঠিতে দেখিয়া এ কথায় তাঁহার বিশ্বাস হইল। তৎকালে তিনি মৃণালিনীকে কিছুই বলিলেন না। নিঃশব্দে গজগামিনীর পশ্চাৎ তাঁহার শয়নাগারে আসিলেন।