‘আমাকে প্রাণ দেয় এই অক্ষরের অভ্যাস’

‘আমাকে প্রাণ দেয় এই অক্ষরের অভ্যাস’

ফারজানা শারমীন সুরভি লেখালেখির জগতে সম্ভাবনাময় এক নাম, যিনি লেখাকে একপ্রকার ধ্যান হিসেবে নিয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি করেছেন লেখার স্বতন্ত্র স্বর।  শঙ্খচিলের জন্য তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কাজী তাহমিনা—

১- ছোটোবেলায় কী হতে চাইতেন?

-কিছুই না! কেন যেন একদিন বড় হবো, বড় হয়ে আবার কিছু হতেও পারবো- এই ব্যাপারটিই বিশ্বাস হতে চাইতো না!

২- কেমন ছিল আপনার শৈশব, কৈশোর?

-হাসতে হাসতে রঙে ঝলমল শৈশব এবং ধুঁকতে ধুঁকতে ধূসর কৈশোর যাপন করেছিলাম। পাতাবাহারের মাঝামাঝি ছিঁড়ে ফেললে বুদবুদ দেখা যায়। শৈশবে সেই চকচকে বুদবুদ দেখে চেঁচিয়ে উঠতাম, “বাঘের চোখ! বাঘের চোখ!” নয়নতারা ফুল কানে গুঁজে, ছোট্ট আমি বড় হওয়ার চেষ্টা করতাম। মনে পড়ে, বালির ঢিবি ছিল বাড়ির কাছের এক কনস্ট্রাকশন সাইটের পাশে। তখনো সমুদ্র দেখা হয়নি। শুধু বিটিভিতে বাংলা সিনেমাতে নায়ক-নায়িকাকে সমুদ্রের তীরে নাচতে দেখেছিলাম। তাই বাস্তবের সেই বালির ঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে ভান করতাম সমুদ্রের তীরে হাঁটছি। দুই হাত দিয়ে বালি সরালেই শামুক-ঝিনুক পেতাম। মুঠো ভর্তি শামুক-ঝিনুক যত্ন করে জমিয়ে রাখতাম। কোন কোন চকচকে ঝিনুক সংগ্রহে রাখতে পেরে, নিজেকে মুক্তার মালিক মনে হত।

আসলে শৈশবে আমি একটা রূপকথার পৃথিবীতে বাস করতাম। ঠাকুরমার ঝুলি আর কমিকসের রঙ্গিন পৃথিবীতে এমনি ডুবে থাকতাম যে বিশ্বাস করতাম, পুকুরের পাশে গভীর রাতে দাঁড়ালে পরীদের নাচ দেখা যায়!

বরাবর গল্পের বইয়ে মুখ ডুবিয়ে থাকা আমার কিশোরী বেলার অবশ্য কোন আনন্দময় অতীত নেই। গায়ের রঙের জন্য আর স্বাস্থ্যের জন্য বুলিড হতাম খুব। চুল বাঁধতে পারতাম না ঠিকমতো। সাজতে জানতাম না। তাই  স্কুলে সহপাঠীদের কাছে বুলিড হতাম। কোন আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে গেলে মন খারাপ হয়ে যেত। সবখানে প্রথম দেখাতেই মানুষ বলতো, আমার এত সুন্দর ফর্সা মা আর বোনেরা থাকতে আমি দেখতে এত কুচ্ছিত হলাম কীভাবে? আমার এত মেধাবী বোনেরা থাকতে, আমি এত গরু-গাধা কীভাবে হলাম? আমার স্কুলের রেজাল্ট খুব খারাপ ছিল অন্য দশজনের তুলনায়, কিন্তু আর কোন কিশোরী কি মহাশ্বেতা দেবীর ‘অরণ্যের অধিকার’ পড়ে বীরসা মুণ্ডার জন্য কিংবা এলেক্স হ্যালির ‘রুটস’ এর কুন্টা কিন্টের জন্য অমন করে কাঁদতে পারতো? এখন পেছনে তাকালে অবশ্য কিশোরী সুরভিকে খুব আদর করতে ইচ্ছা করে। কিশোরী সুরভি পৃথিবীর সব কিছুর উপরে রেগে থাকত। কি সাংঘাতিক জেদ ছিল আমার! এখনো আছে!

৩- কী করতে ভালোবাসেন?

-বই পড়তে, লিখতে, ভ্রমণ করতে এবং ঘুমাতে খুব ভালোবাসি। কখনো কখনো একটা শান্ত নদীর পাশে ঘণ্টার পরে ঘণ্টা ধরে অলসভাবে বসে থাকতেও ভালো লাগে।

৪- আমেরিকাতে আপনার প্রথম বছরগুলো কেমন কেটেছিলো?

প্রথম কয়েক বছর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য, জীবনে প্রথম পরিবারকে ছেড়ে একা একা বসবাস, প্রতিকূল শীতকাল- এসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলাম। কিন্তু দুটো কারণে আমেরিকার বছরগুলোতে আমার জীবনের যুদ্ধটা সহজ ছিল- প্রথমত, স্বাধীনতা এবং দ্বিতীয়ত, বন্ধুত্ব!

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া একজন মেয়েকে ক্রমাগত সামাজিক জবাবদিহিতার এবং নাগরিক অনিরাপত্তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাই দেশে থাকতে স্বাধীনতা উপভোগ করার সৌভাগ্য হয়নি।

আমেরিকাতে পড়তে আসার পরে প্রথম বছরগুলোতে মনে হয়েছিল, আমি মানুষ থেকে পাখি হয়ে গিয়েছি! সমুদ্রের জলে ঝাঁপিয়েছি, জঙ্গলে ক্যাম্পিং করেছি, পাহাড়ে উঠেছি, জোৎস্নায় ভেসে যাওয়া হ্রদের তীরে বসে রবীন্দ্র সংগীত শুনেছি, বনের মধ্যে দিয়ে গভীর রাতে হাঁটতে হাঁটতে ভাল্লুকের হাসি শুনেছি- প্রবাসের এইসব স্মৃতি আমার সমগ্র জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ! তবে এসবের চেয়েও মূল্যবান ছিল বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা! অন্য দেশের, অন্য বর্ণের, অন্য ধর্মের বন্ধুদের কাছ থেকে যে শর্তহীন ভালোবাসা আমি আমেরিকাতে এসে পেয়েছি- তা নিঃসন্দেহে মানুষের প্রতি আমার বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করেছে।

৫-  ব্যর্থতাকে(সমাজ/ অন্যদের চোখে) কীভাবে  দেখেন?

-সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা খুব আপেক্ষিক একটা কনসেপ্ট, একটা সোশ্যালি কনস্ট্রাকটেড মরীচিকা! একটা এলেবেলে কবিতা লিখে আমার যে আনন্দ হয়, সমাজের চোখে তার কোন মূল্য নেই। কিন্তু ঐ আনন্দটুকুই আমার সাফল্য। সমাজের চোখে মূল্যহীন এইসব আনন্দে ভর দিয়েই আমি বেঁচে থাকি।

মানুষের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা পরিমাপের জন্য সমাজ যে নিক্তি ব্যবহার করে, সে বাটখারা আমার কাছে তুচ্ছ। জীবনকে এত আলতোভাবে যাপন করি এখন, মনের আরামটাই মুখ্য মনে হয়! সাফল্যের সাধনা না করে, নিজের আত্মাকে পুনঃপুনঃ আবিষ্কারের খেলাতে মগ্ন হই। এ খেলায় হার নেই, জিত নেই, শুধু শান্তি!

৬- আপনার কি মনে হয়, সংবেদনশীল মানুষরা বেশি বিষণ্ণতায় ভোগেন? বিষন্নতা নিয়ে বাঁচতে আপনার কোন পরামর্শ/ অভিজ্ঞতা আছে কি?

-পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী যে- সংবেদনশীল মানুষের সাথে বিষণ্ণতার আমৃত্যু বন্ধুত্ব! একজন মানুষের মন যতো সূক্ষ্ম, সে মানুষকে পরিপার্শ্বিক স্থূলতা ততো ব্যথিত করে !

বিষণ্ণতা থেকে বাঁচতে সচেতনভাবে নিজের মনের যত্ন নেওয়াটা জরুরী। আমি আমার পরিবেশ থেকে বিষণ্ণতার এবং স্ট্রেসের ট্রিগার চিহ্নিত করার চেষ্টা করি। এরপর সেই ট্রিগারগুলোকে জীবন থেকে বাদ দেই। এছাড়াও প্রফেশন্যাল থেরাপি এবং কাউন্সেলিং আমাকে বিষণ্ণতার সাথে যুদ্ধে জিততে সাহায্য করে।

৭- কেন লেখেন?

-লেখালেখি আমার জন্য থেরাপিউটিক একটা ব্যাপার। এই লেখার অভ্যাস আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। প্রতিদিন ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর পর, কফিতে চুমুক দিতে দিতে সকালের চিন্তাকে লেখার চেষ্টা করি। নামাজ, পূজা, মেডিটেশন নয়; আমাকে প্রাণ দেয় এই অক্ষরের অভ্যাস।

৮-  লেখালেখির মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক, ব্লগ ইত্যাদিকে কিভাবে দেখছেন?

-লেখালেখির মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক এবং ব্লগ একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। লেখকের সাথে পাঠকের সরাসরি ইন্ট্যারএকশনের সুযোগ বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোর সাহিত্য সাময়িকীর একক আধিপত্যকে অনেকটাই খর্ব করেছে। নিঃসন্দেহে, ফেসবুক এবং ব্লগ লেখালেখির জন্য ইতিবাচক প্ল্যাটফর্ম। 

৯-শিক্ষকতায় কেন এলেন?

-শিক্ষকতায় আসার সিদ্ধান্তটা হুট করে নিয়েছিলাম। আমেরিকাতে পড়তে আসার পরে একজন প্রফেসরের ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাদানের পদ্ধতি, ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে তাঁর এম্প্যাথেটিক আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সেই মুগ্ধতা আমাকে শিক্ষকতা পেশা বেছে নেয়ার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেছিল।

১০- সমালোচনা সহ্য করতে পারেন?

-কী ধরনের সমালোচনা, তার উপর নির্ভর করে! কেউ যদি আমার লেখালেখির কন্সট্রাকটিভ ক্রিটিসিজম করে, আমি মনোযোগ দিয়ে শুনে নিজের লেখাকে উন্নত করার চেষ্টা করি। কিন্তু কেউ যদি আমার জীবন-যাপন কিংবা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সমালোচনা করতে চায়, সেক্ষেত্রে সহ্য করি না এবং সমালোচনাকারীকে স্পষ্ট জানিয়ে দেই- সে সীমালংঘন করছে!

১১- নিজের ৫ টা গুণ আর ৫ টা দোষ সম্পর্কে বলতে চান?

-আমার পাঁচটা গুণ- বারবার ধাক্কা খেয়েও উঠে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি, জেদ, ভালোবাসার তীব্র ক্ষমতা, স্পষ্টবাদীতা, এবং এমপ্যাথি ।

আমার পাঁচটা দোষ- রাগ, দুঃশ্চিন্তা, মানুষের একই অপরাধ বারবার ক্ষমা করে তাকে বারবার সুযোগ দেয়া, আলস্য এবং প্রোক্র্যাস্টিনেশন।

১২-কোনো নারীকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে আপনি কী পরামর্শ দিবেন?

-একেকজন মানুষের গল্পটা একেকরকম। একেকজনের যুদ্ধটা একেকরকম। একেকজনের স্বপ্নটা একেকরকম। তাই কাউকে পরামর্শ দিতে পছন্দ করি না। মানুষ নিজেই তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছানোর রাস্তা চিনে নেয়!

পরিচিতি

ফারজানা শারমীন সুরভির জন্ম ১৭ নভেম্বর, ১৯৮৮। বাংলাদেশের ঢাকায়।তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক পলিসিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন । বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্দান ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে তুলনামূলক রাজনীতিতে পিএইচডি গবেষণারত এবং একই বিভাগে পাবলিক পলিসি বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

কোন গল্পগ্রন্থ এখনো প্রকাশিত না হলেও গল্পের পুষ্পিত কুঞ্জ (৫০ জন নারী গল্পকারের ৫০টি গল্প) এবং Ten Square: Hundred-Word Stories From Bangladesh শীর্ষক সংকলনে তার গল্প সংকলিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী ও অনলাইন পোর্টালে তার গল্প ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে মন্তব্য করুন :