২০২০ : ইসরাইলের হানিমুন ইয়ার

২০২০ : ইসরাইলের হানিমুন ইয়ার

হোয়াইট হাউজে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ‌্যে আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ছবি : উইকিপিডিয়া

২০২০ সাল ইসরাইলকে দু হাত উজার করে দিয়েছে। এসময়ে দেশটির সাথে কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের প্রকাশ্যবন্ধুত্ব হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম পরাশক্তি সংযুক্ত আরব আমিরাত এরমধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে চিরশত্রু ইরানকে অপরাপর মুসলিমপ্রধান দেশগুলোরও শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে প্রায় একঘরে করে ফেলেছে।

ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মধ্যে সম্পর্ক সূচিত হয়েছে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়াও আমেরিকা পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে মরক্কো ও সুদানের সাথেও ইসরাইলের মৈত্রী গড়ে দিয়েছে। বিনিময়ে সমস্যাসংকুল দেশগুলো আমেরিকা ও ইসরাইল থেকে পায় নানা রকমের প্যাকেজ উপহার।

আমেরিকা ও ইসরাইল এই চুক্তিকে শান্তি চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু বিশ্লেষকরা দাবি করেন, সাধারণত শান্তিচুক্তি হয় যুদ্ধরত দুটি দেশের মধ্যে। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সাথে ইসরাইলের কখনো যুদ্ধ বাঁধেনি।
ইসরাইল এই চুক্তিটি যদি ফিলিস্তিনের সাথে করতো, তাহলে ফিলিস্তিনে সহিংসতা কমে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা হওয়ার একটি সম্ভাবনা থাকত। এরচেয়ে বরং আব্রাহাম চুক্তিকে একটি সামরিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি বলা যেতে পারে।

২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ক্ষমতার ভারসাম্যে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, অচিরেই তা পূরণ করে নেয় ইরান। ক্রমেই দেশটি মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় এলাকায় প্রভাব বলয় বড়ানোর চেষ্টা করে। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদকে, লেবাননে হিজবুল্লাহকে, ইয়েমেন হুতিদেরকে এবং ইরাকের শক্তিশালী শিয়া দল এবং মিলিশিয়াকে বহুমাত্রায় পৃষ্ঠপোষকতা করা শুরু করে। যা এ এলাকার শক্তিশালী সুন্নি অধ্যুষিত দুই দেশ সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠে।

কৌশলগতভাবে আব্রাহাম চুক্তি ইরানের বিরুদ্ধে আরব আমিরাত, ইসরাইল ও আমেরিকার সম্পর্কের নতুন একটি মাত্রা দিয়েছে। চুক্তির ফলে এ অঞ্চলে ইরান ও তার পক্ষ হয়ে আক্রমণকারীদের মোকাবিলার জন্য ইসরাইলি নিরাপত্তা সহযোগিতা পাবে আমিরাত। বিশেষ করে ইসরাইলের বিখ্যাত সাইবার নিরাপত্তা ও সবর্শেষ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়া যুদ্ধকৌশলে ভূমিকা রাখবে। পাবে আমেরিকা থেকে অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম কেনার অধিকার।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিহায়ুর একটি সফল বছর ছিল ২০২০ সাল । ছবি : উইকিপিডিয়া

ইরানকে মোকাবিলার অজুহাতে আমেরিকা থেকে প্রায়ই আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম কিনছে আবুধাবি। এর সাথে গত কয়েকবছর ধরে যোগ হয়েছে স্টিলথ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার বায়না। এ নিয়ে আমেরিকার সাথে কূটনীতিক তৎপরতাও চলছে অনেকদিন ধরে। ইসরাইলের আপত্তি সত্ত্বেও বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্টিলথ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান আরব আমিরাত পাবে বলে সবুজ সংকেত দিয়েছে।

চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল, দুই দেশের মধ্যে অব্যাহত কূটনীতিক যোগাযোগ বজায়। এর অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো ইসরাইলের পূর্ণকালীন রাষ্ট্রদূত পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। সামনের দিনগুলোতে অবাধ বাণিজ্যিক যোগাযোগ সৃষ্টি হবে বলে দুই দেশই আশাবাদী । প্রাথমিকভাবে ইসরাইল স্বপ্ন দেখছে, বছরে ৪ বিলয়ন ডলারের বাণিজ্য হবে। সৃষ্টি হবে প্রায় ১৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের। কৃষি ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বশেষ উদ্ভাবন, সাইবার নিরাপত্তাসহ প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগ ও বাণিজ্যেও দ্বার উন্মোচিত হবে দুই দেশের মধ্যে।

পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে, ইসরাইলের মন্ত্রিপরিষদ গত ২২ নভেম্বর আরব আমিরাতের সঙ্গে পারস্পরিক ভিসা মুক্তি চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। ভিসা ছাড়াই খুব সহজে হাজার হাজার ইসরাইলি পর্যটক ভ্রমণে যাচ্ছে আবুধাবিতে । আরব রাষ্ট্র মিশর ও জর্ডানের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক থাকলেও ভিসা ছাড়াই যাতায়াত করা যেত না। এদিক দিয়ে বিষয়টি অনন্য।

অন্যদিকে দুই দেশের মধ্যে চালু হয়েছে সরাসরি বিমান চলাচল। আমিরাতি এক শেখ কিনে নিয়েছেন ইসরাইলের একটি জনিপ্রয় ফুটবল ক্লাব। আরব ও মুসলমানদের ব্যাপারে বর্ণবাদী আচরণের জন্য ক্লাবটির দুর্নাম এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য হয়নি। এ রকম আরো বহু বিলিয়ন ডলারের চুক্তি পাইপ লাইনে রয়েছে।

ইসরাইল অধিগ্রহনকৃত পশ্চিম তীর থেকে এক দল সেটেলর নেতাকে আরব আমিরাত আমন্ত্রণ জানিয়েছে নিজেদের দেশে। এই পশ্চিম তীর ১৯৬৭ সালের জর্ডান, সিরিয়া ও মিশরের সঙ্গে যুদ্ধের পর ইসরাইল দখল করে নেয়। অক্টোবরে গোলান মালভূমিতে অবস্থিত একটি ইসরাইলি ওয়াইন কোম্পানি থেকে ওয়াইন আমদানির চুক্তি করেছে আমিরাত। ১৯৬৭ সাল থেকে এ ভূখহুটিও ইসরারইলে দখলে। আমেরিকা ও ইসরাইল একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে পশ্চিম তীরে ইসরাইলের তল্লাসিচৌকিগুলো আধুনিকায়ন, আরব আমিরাত এই প্রকল্পেও অর্থায়ন করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসডিন্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিলেন প্রধান ক্রীড়ানক । ছবি : উইকিপিডিয়া

এতোদিন ইসরাইলের সাথে আরব আমিরাতে নিরাপত্তা চুক্তি ছিল গোপন ব্যাপার। আব্রাহম চুক্তির ফেলে সেই বিষয়গুলো এখন প্রকাশ্যে হবে। ২০১৫ সালে ইসরাইল আবুধাবিতে একটি কূটনীতিক অফিস খোলে। আন্তর্জাতিক নবায়ন শক্তি কেন্দ্রের অফিস ছিল সেটা। সিনিয়র ইসরাইলি নেতারা আবুধাবি সফর করত হরহামেশাই। ইসরাইলি এথলেটরা আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। এমনকি দুবাই ওয়ার্ল্ড এক্সপোতেও যোগদানের কথা ছিল। এখন সবকিছু হবে প্রকাশ্যে।

সামনের দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে চিরশত্রু ইরানের সাথে লড়াইয়ে, আর ইসরাইলকে প্রকাশ্যে নামতে হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সঙ্গে সমঝোতা পরিষ্কার হয়েছে; যাদের প্রত্যেকের এক ও অভিন্ন শত্রু ইরান। এখন ইসরাইলে হয়ে তারাও যুদ্ধে নামবে ইরানের সাথে।

এই চুক্তিটির আরেকটি নতুনত্ব হলো ফিলস্তিনের বিষয়ে ইসরাইলের বিরোধী অবস্থান থেকে এক চুলও সরে আসতে হয়নি। অস্বস্তিকর ফিলিস্তিন ইস্যুটি আলোচনার টেবিলে উঠে যাতে আনন্দময় পরিবেশ বিনষ্ট না করে সেজন্য সচেতনভাবেই ইস্যুটি দূরে রাখা হয়।


২০০২ সালে প্রয়াত সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ একটি প্রস্তাব দিয়েছিল যে, ইসরাইলের সাথে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে যাবে, যদি ইসরাইল ১৯৬৭ সালে অধিগ্রহণকৃত এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয় তবে। আরব লীগও সৌদি বাদশাহের আরব শান্তি উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগের মৃত্যু হয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে ফিলিস্তিনের ব্যাপারে আমেরিকা একটি ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে রেখেছে ইসরাইলকে। নিজেদের স্বার্থে, যখন যা খুশি করছে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়াই। ইসরাইলের এই বিপুল ক্ষমতা আরব বিশ্বকে ভরকে দিয়েছে, ফিলিস্তিনি সমস্যা অন্যের ঝামেলা তা নিজের কাধে নিয়ে ইসরাইলের সাথে তিক্ততা বাড়িয়ে কী লাভÑএমনটা ভাবা শুরু করে।

অন্যদিকে কথিত এই সম্প্রীতির আয়োজন ফিলিস্তিনিদের কাছে দু:খজনক এক অধ্যায়, বিশ্বাসভঙ্গের মতো যন্ত্রণাদায়ক। এর আগে আরব বিশ্বের সঙ্গে আলোচনায় বরবরই ইসরাইলের উপর একটি প্রধান শর্ত আরোপ করা হতো: আগে পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রসঙ্গটা ছিল আলোচনার শুরুতে। কিন্তু এবারই প্রথম যেখানে ইসরাইলের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি ছাড়াই আরব বিশ্বে তার নিজের শক্তিশালী একটি অবস্থান গড়ে নিতে পেরেছে। আরো একবার মধ্যপ্রাচ্যের দাবার টেবিলে পরাজিত হলো ফিলিস্তিন।

ইসরাইলের সাথে সংযুক্তি আর আমিরাতের চুক্তির পেছন থেকে যিনি কলকাঠি নেড়েছেন তিনি নিজেও একজন ফিলিস্তিনি মোহাম্মদ দাহালান। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কারণে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে বর্তমানে আবুধাবিতে বসবাস করছেন। যুবরাজের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা তিনি।
ফিলিস্তিনের বর্ষীয়াণ আন্দোলকর্মী ও আইনপ্রণেতা মুস্তাফা বারগুতির মতে, আমেরিকা ও ইসরাইল দুই দেশই চেয়েছে আরব বিশ্বের চিন্তাভাবনা বদলে নতুন শত্রু হিসেবে ইরানকে সাব্যস্ত করতে। ইসরাইলকে পাশে নিয়ে সেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সবাই সচেষ্ট।
এতকিছুর পরেও আরব আমিরাত এখনো জোর দিয়ে দাবি করছে যে, ইসরাইলের সাথে মৈত্রীচুক্তির ফলে, ফিলিস্তিনিরা লাভবান হবে। আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন যায়েদ বলেন, চুক্তির ফলে ফিলিস্তিনের মানুষের পাশে দাঁড়াতে সক্ষম হবে আমিরাত।

একটি সমৃদ্ধশালী ও স্থায়ী অঞ্চলের মধ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়ক হবে এই চুক্তি।ন্তু এ বক্তব্যের ব্যাপারে সন্দেহ আছে। ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে বরাবরই সতর্ক রাজপরিবার। সত্তরের দশকে দেশর তেল খাত বিকশিত হয়। অর্থনৈতিক বির্নিমাণে দক্ষ ফিলিস্তিনি শ্রমিক চেয়েছিল আরব আমিরাত।

ওদের সন্তানসন্ততিদের একটি উন্নত পড়াশোনার পরিবেশ দেওয়ার অভিপ্রায় ছিল শাসকদের। কিন্তু দেখা গেছে ফিলিস্তিনিরা তাদের সাথে করে বিপ্লবী মতাদর্শও নিয়ে হাজির হয়েছে আবুধাবিতে। এই বিষয়টা অস্বস্তিতে রাখব দুবাইয়ের শাসকদের।

ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড বেন গুরিয়েনের নীতি ছিল ইসরাইলের শত্রুর (আরব) শত্রুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করার। সেই নীতির আলোকে ইসরাইলের এক সময় ইরান, তুরস্ক ও ইথিওপিয়া, লেবাননেনর ম্যারোনাইট খ্রিস্টান ও ইরাকের কুর্দসের সঙ্গে খাতির পাতিয়েছিল। পরিবর্তিত বিশ্বে ইসরাইলের বন্ধু বদলে শত্রু হয়েছে, আবার শত্রু বন্ধু হয়ে সুরক্ষা দিচ্ছে। বছরটা তাই আসলেই ছিল হানিমুনের মতো আনন্দের।

তথ্যসূত্র : ফরেন পলিসি, আল জাজিরা, বিবিসি ও নিউইয়র্ক টাইমস।

লেখক : পলাশ সরকার

এখানে মন্তব্য করুন :