স্বাধীনতার জন্য এক মায়ের আত্মত্যাগের কাহিনী

স্বাধীনতার জন্য এক মায়ের  আত্মত্যাগের কাহিনী

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের পরিচয় নতুন করে দেয়ার দরকার পড়ে না৷ কেবল একটিই পরিচয় নয় তাঁর। স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পুরস্কারসহ নানান পুরস্কার পেয়েছেন জনপ্রিয় এই কথা সাহিত্যিক। নানান ভাষায় তাঁর বই অনূদিত হয়েছে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়েছে তাঁর বই।

তবুও অগণিত মূল্যবান কাজের মধ্যেও তাঁর রচিত হাঙর নদী গ্রেনেড হয়ে থাকবে আলাদা কিছু। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে গাঁথা হয়েছে হাজার পংক্তিমালা, রচিত হয়েছে কত শত গল্প-উপন্যাস-কাব্য-নাটক-গবেষণামূলক প্রবন্ধ। তার মধ্যেও ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড দখল করে রেখেছে বিশেষ স্থান।

অনন্যা প্রকাশন প্রকাশিত ১২৮ পৃষ্ঠার বইখানাতে প্রথমেই নজর কেড়েছে উৎসর্গপত্রটি, গুরুত্বপূর্ণ এই বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে বিশ্বখ্যাত চিত্রপরিচালক-সাহিত্যিক-শিল্পী সত্যজিৎ রায়কে।

উপন্যাসটির পটভূমি হলদী গাঁ, কেন্দ্রীয় চরিত্র বুড়ি। বুড়ি এক ছোট্ট মেয়ে, যে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে গ্রামের আর পাঁচটা মেয়ে থেকে একেবারে আলাদা হয়ে। সাধারণ মেয়েদের যেমন ঘরকন্নার স্বপ্ন থাকে, বুড়ির তা অনুভূতিতে তেমন দোলা দেয় না।

বরং তার মনের তল পাওয়াই দায়। সে আকাশের পাখি হতে চায়, নদীর মাঝি হতে চায়। চায় দূর-দূরান্তে হারিয়ে যেতে। কিন্তু এক সাধারণ গ্রাম্য বালিকার পক্ষে তা সম্ভব হয় না, তাই সে তার মনের গহীনেই গড়ে তোলে তার নিজের সাম্রাজ্য। অল্প বয়েসেই তার বিয়ে হয়ে যায় তার দ্বিগুণ বয়সী দোজবর চাচাতো ভাইয়ের সাথে। আগের পক্ষের সলীম-কলীম নামে দুটো ছেলের মাও হতে হয় বুড়িকে। স্বামীর সোহাগ, সন্তানদের ভালোবাসা দুটোই পায় বুড়ি। কিন্তু তবুও একান্তই তার নিজস্ব সন্তানের জন্য হাহাকার বুড়িকে পরিণত করে এক পরিপূর্ণ নারীতে।

রইস নামে একটি বোবা ছেলের জন্মের মধ্য দিয়ে এক অনাস্বাদিত স্বপ্নের শেষ হয় বুড়ির। গল্প এগোতে থাকে, দেশে শুরু হয় যুদ্ধ, প্রতিরোধ। হলদী গাঁয়েও এসে লাগে আগুনের হলকা। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ছুটে যায় সলীম-কলীম। বুড়ি উৎসাহ দেয় মুক্তিযোদ্ধাদের। যুদ্ধে তার নিজেরও যাওয়ার আকুল ইচ্ছে থাকে, কিন্তু এই অক্ষমতাকে সে এমনভাবে পুষিয়ে দেয়, মনোজগতে গভীরভাবে আলোড়ন তুলে তা৷ স্তব্ধ করে দেয়, ভাবতে শেখায় নতুন করে ‘মা’ কে।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেরা এই উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তু দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য এক মায়ের করুণ এবং সাহসী আত্মত্যাগের কাহিনী। নিজের নাড়িছেঁড়া ধনকে দেশের জন্য অকুতোভয়ে, অকাতরে বিসর্জন দেয়ার এই কাহিনী পড়লে চোখে জল আসে, মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময় এবং সেই সময়ের ত্যাগ স্বীকারকারী সকল মানুষকে অনুভব করা যায় হৃদয় দিয়ে, কৃতজ্ঞতায় মাথা নুয়ে আসে। এমন হাজারো বুড়ির জন্য আজ আমরা নিঃশ্বাস নেই স্বাধীন বাতাসে।

লেখক : শতাব্দী ভট্টাচার্য্য, এম বি বি এস, সিলেট এম জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।

এখানে মন্তব্য করুন :