সেরাম ইনস্টিটিউট এবং সিইও আদর পুনেওয়ালার দূরদৃষ্টি

সেরাম ইনস্টিটিউট এবং সিইও আদর পুনেওয়ালার দূরদৃষ্টি

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সিইও আদর পুনেওয়ালা। ছবি : দ‌্য উইক।

করোনার এই ভয়ালরাজত্বকালে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যারা সাধারণ মানুষের কাছে পরম আরাধ্য ভ্যাকসিন পৌঁছে দিচ্ছে, তাদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ খুবই স্বাভাবিক।

হয়তো এ আগ্রহ থেকেই, গেলো বছর ভারতে সার্চ ইঞ্জিনে সবচেয়ে বেশিবার খোঁজা হয়েছে শিল্পপতি আদর পুনেওয়ালা ও তার স্ত্রী নাতাশাকে। সাধারণ মানুষের এই কৌতূহলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। 

ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি হলো সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। আর আদর পুনেওয়ালা হলেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) । নাতাশা পুনেওয়ালা সেখানে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রায় সবরকমের টিকা উৎপাদনে সক্ষম সেরাম ইনস্টিটিউট। প্রতিবছর দেড় বিলিয়ন ডোজ টিকা উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি। সারা বিশ্বের ৬৫ শতাংশ শিশু টিকা নিচ্ছে আদরের প্রতিষ্ঠান থেকে। ১৭০ টিরও বেশি দেশের শিশুরা যক্ষ্মা ও হামের বিরুদ্ধে লড়ছে এই টিকার সহায্যে।

সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। ছবি : বিজনেস ইনসাইডার

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও এস্ট্রোজেনেকা যে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছে, তা ভারতে উৎপাদনের দায়িত্ব পেয়েছে সেরাম। যার সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বহুদেশ।

এছাড়া করোনার ভ্যাকসিন উৎপাদনে আরো কয়েকটি পশ্চিমা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির সঙ্গেও চুক্তি হয়েছে সেরামের। এগুলো হলো: এস্ট্রাজেনেকা, নোভাভ্যাক্স ও জনসন এন্ড জনসন।

সেরাম তাদের ভ্যাকসিন উৎপাদন করে ভারত ও অন্যান্য দেশে রপ্তানি করবে। সেরাম নাক দিয়ে নেওয়া যায় এমন আরেকটি ভ্যাকসিন উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে। আমেরিকান কোম্পানি কোডাজেনিসক্সের সঙ্গে মিলে ডিএক্স-০০৫ নামে ভ্যাকসিনের সফল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে।

এ অবস্থায় একদিনে পৌঁছেনি প্রতিষ্ঠানটি। সেরামের প্রতিষ্ঠাতা ও আদরের বাবা সাইরাস পুনেওয়ালা যার ভিত্তি গড়ে করে দিয়েছেন। আর আদর পুনেওয়ালা দূরদৃষ্টি দিয়ে বাড়িয়ে  নেন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা।

এখন সরামের বার্ষিক মুনাফা ৭৮২ মিলিয়ন ডলার।  রাজস্বের ৮৫ শতাংশ আসে বিদেশ থেকে। পুনেওয়ালা পরিবারের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৩ বিলিয়ন ডলার। করোনাকালীন সময়ে ভারতের শীর্ষ ধনীদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে সম্পদ বেড়েছে সাইরাস পুনেওয়ালার। বর্তমানে তিনি পৃথিবীর ৫৭ তম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি।

আদর পুনেওয়ালা ও তার স্ত্রী নাতাশা পুনেওয়ালা। ছবি মিড ডে

লক্ষ্য দুই বিলিয়ন ডলার ডোজ টিকা উৎপাদন

মুম্বাই থেকে সড়কপথে তিন ঘণ্টার দূরত্ব সেরাম ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসের। ৫০ একর জায়গার উপর এটি গড়ে উঠেছে।  দুটি কারখানা ভবন, কংক্রিট ও গ্লাস দিয়ে তৈরি দৈত্যাকারের বিশাল ওয়ারহাউস।

সিরামের নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণে খরচ পড়েছে ৭০০ মিলিয়ন ডলার।  বছরে দুই বিলিয়ন ডলার ডোজ টিকা বানানোর সামর্থ্য অর্জনের পথে সেরাম। যা তাকে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভ্যাকসিন উৎপাদক সানোফি এর চাইতেও অনেক অনেক দূরে এগিয়ে রাখবে।

ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে পুনেতে আগমন

ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে পুনেওয়ালাদের পূর্ব পুরুষরা পশ্চিম ভারত থেকে পুনেতে আসে।

এখানে স্থানীয় ব্রিটিশ অফিসার্স ক্লাবে চাকরি জুটিয়ে নেন আদরের দাদার বাবা। তার কাজ ছিল বিলিয়ার্ডের স্কোর টুকে রাখা ও ড্রিংকস আনা নেওয়া। সামরিক বাহিনীর অফিসারদের সঙ্গে খাতির পাতিয়ে বাগিয়ে নেন নির্মাণকাজ । কিছুদিনের মধ্যে  ব্যবসায়ী হিসেবে নামও করেন।

এতো বেশি জমিজিরাত করতে থাকেন যে লোকজন তাকে ডাকা শুরু করে পুনেওয়ালা। সস্পত্তি ভাগবাটোয়ারা হলে আদর পুনেওয়ালার দাদা সলির ভাগে পড়ে একটি বাড়ি ও ৪০ একজর খাস জমি। তার দাদা ওই জমিতে রেসের ঘোড়ার খামার করেন। কিন্তু সদ্য স্বাধীন ভারতে একদা ‘খেলাধুলা রাজা’র ভবিষ্যত অনিশ্চিয়তায় পড়ে।

নতুন কিছু করতে চাইলেন সলির ছেলে সাইরাস। তিনি ভাবলেন, গণমানুষের বাজার সৃষ্টিতে সম্ভাবনা রয়েছে এমন কিছু করা যায় কিনা।

সাইরাস পুনেওয়ালার হাত ধরে যাত্রা সেরামের। ছবি: ফোর্বস

সেরাম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হলো যেভাবে 

ভারতে নিদারুণ দরকার এমন দুটি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ বানানোর কথা ভাবলেন সাইরাস। একটি হলো সাপের কামড়ের এন্টি ভেনম ও টিটেনাসের প্রতিবিষ।

সাইরাস অবসরে যাওয়া রেসেরঘোড়া মুম্বাইয়ে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বেচতেন। প্রতিষ্ঠানটি ঘোড়া থেকে টিটেনাসের প্রতিবিষ তৈরি করত। একটা সময় সাইরাসের মনে হলো তিনি নিজে এর থেকে আরো বেশি মুনাফা করতে পারেন।

১৯৬৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দ্য সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। শিগগিরই প্রতিষ্ঠানটি টিটেনাসের ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ শুর করে।

আর ওই সময়টা ছিল অনেকগুলো ভ্যাকসিন আবিষ্কারের একটি যুগসন্ধিকাল। হাম, রুবেলা ও মাম্পসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয় ৭০ এর দশকের শুরুতে। বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে গুটি বসন্তের পোলিও চিরতরে নির্মূলে বদ্ধপরিকর। সাইরাস বুঝতে পারলেন এসব  ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে তার সোনালী ভবিষ্যত হাতছানি দিচ্ছে।

ভারতে তখন ভ্যাকসিন উৎপাদন হতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। আর ওইসব প্রতিষ্ঠানের কাজ হতো ঢিমেতালে। সেরামের ক্ষীপ্রগতির ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনেরর স্বল্প খরচ জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ে একের পর এক কাজ পাইয়ে দেয়।

সেখান থেকে যে মুনাফা হয়, তা দিয়ে ইউরোপ ও আমেরকিা থেকে নির্মাণ যন্ত্রসরঞ্জাম আমদানি করতে থাকেন তিনি। এরফলে সেরামের উৎপাদনের তালিকায় নিত্যনতুন নাম অর্ন্তভুক্ত হতে থাকে। 

 সেরামের হাল ধরলেন আদর পুনেওয়ালা

পশ্চিমা ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারকরা গত কয়েকদশক ধরে আরো জটিল ভ্যাকসিন প্রস্তত করার দিকে ঝুঁকছে, যেগুলোর দামও বেশি। দরিদ্র দেশগুলোর ওগুলো কেনার সামর্থ্য নেই। স্বল্প খরচে একই সুবিধা দেবে এমন যে কারো জন্য উন্মুক্ত হয় ভ্যাকসিনের বাজার। সেই সুযোগ পুরোমাত্রায় কাজে লাগান আদর পুনেওয়ালা।

ওদিকে উন্নত দেশগুলো কয়েক দশক আগেই কিছু কিছু ভ্যাকসিন উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ এই মৌলিক ভ্যাকসিন উৎপাদন করে ততো মুনাফা আসছিল না। 

একটি খাত থেকে বড় বড় কোম্পানির চলে যাওয়ার পর শূন্যতা সৃষ্টি হয়। আদর এই শূন্যতাটুকু অনুভব করে, তা পূরণ করতে সক্ষম হন।

আদর ২০১১ সালে যুক্তরাজ্য থেকে পড়াশোনা শেষে সেরামের সঙ্গে যুক্ত হন। ভ্যাকসিনের বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে এ ধরনের চালু কথার বিপরীতে নতুন নতুন সম্ভাবনা দেখতে পান তিনি। গত কয়েক বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। তার কোম্পানির উৎপাদন ক্ষমতা ও সামর্থ্য ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছেন।

আরেকটি বিষয় তাকে পীড়িত করেছে সেটা হলো ভারতের আমলাতন্ত্র। দেখা গেছে কোনো মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টার বসে থাকতে হতো। তিনি ভাবলেন, এভাবে কর্মকর্তাদের পিছন পিছন না ঘুরে বরং, প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হোক। তাহলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের সুযোগ পাওয়া যাবে।

আদর পুনেওয়ালা বলেন, ‘মানুষ আজ হতবাক, তাদের প্রশ্ন কেন আমরা একমাত্র উৎপাদক। কেন আমরা কোভিডের টিকা এতো বিশালমাত্রায় উৎপাদন করতে পারছি।  কারণ, আমাদের দূরদৃষ্টি ছিল এবং সেজন্য অর্থকড়ি সব আগে থেকে এখাতে বিনিয়োগ করেছি।’

আদর পুনেওয়ালার ব্যাটম্যান কার । ছবি : জিকিউ ইন্ডিয়া ডটকম।

গাড়ি সংগ্রহের খেয়াল

আদর পুনেওয়ালা ফ্যাশন ও বিলাসী জীবনযাপনের জন্যও আলোচিত। তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে দুর্লভ ৩৩ টি গাড়ি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যাটম্যান কারটি।

ব্যাটমানের পোশাক পরে কার ড্রাইভ করা তার শখ। পুনের সড়কে তিনি যখন কারটি নিয়ে বের হন পাশে থাকে তার সন্তানরা। মার্সিডিজ ব্রান্ডের গাড়িটিকে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে ব্যাটম্যানের কারের আদলে। 

ব্যক্তিগত বিমানটি এয়ারফোর্স ওয়ানের মতো

ব্যক্তিগত বিমানটিকেও অনেকটা এয়ারফোর্স ওয়ানের রূপ দেওয়া হয়েছে। ব্রান্ড নিউ  এয়ারবাস এ ৩২০ এর ভেতরের নকশা, আসবাবপত্র রুপান্তর করা হয়েছে আদর পুনেওয়ালার রুচি অনুযায়ী।  উড়োজাহাজে আছে  ১০ জনের মিটিং করার উপযোগী বোর্ড রুম, পাঁচতারকা হোটেলের মতো জাঁকজমকপূর্ণ একটি বেডরুম। নিচ থেকে উপরে উঠার সুবিধার্থে রয়েছে লিফট।

বিমানের ভেতরে অত্যন্ত বিলাসবহুল নকশা ও শিল্পকর্ম, মার্বেল পাথরের মেঝে, নকশা খোদাই করা কাঠের দরজায়। এর জন্য আদর পুনেওয়ালা খরচ করেছেন এক মিলিয়ন ডলার।

তথ্যসূত্র: ইকনোমিক টাইমস, মানিকন্ট্রোল, সেরাম ইনস্টিটিউট, ইন্ডিয়া ডটকম, প্রি অরগ, জিকিউ ইন্ডিয়া ডটকম। 

লেখক : পলাশ সরকার

এখানে মন্তব্য করুন :