সংসারের খরচ কমাতে যা যা করতে পারেন

সংসারের খরচ কমাতে যা যা করতে পারেন

করোনাকালে অনেক পরিবারের আয়-উপার্জন কমে গেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের, মধ্যবিত্ত ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় কমে যাওয়ায় বিপদে পড়েছেন। বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি, বাসা ভাড়া , সন্তানের লেখাপড়ার খরচ এবং অন্যান্য নানামুখী খরচের চাপে অনেকেই দিশাহারা।

এসব চাপ সামাল দিতে আমরা নানা দিকে খরচ কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারি। ছোটখাটো অপচয় রোধ করে খরচ কমাতে চাইলে প্রথমেই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে, অপ্রয়োজনীয় বা অল্প প্রয়োজনীয় খরচের খাতগুলো।

আয় অনুযায়ী ব্যয়ের চেষ্টা করুন

মাসের শুরুতেই আপনার আয় ও সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি বাজেট বা তালিকা তৈরি করুন। কষ্ট করে চলতে হলেও কোনোভাবেই ঋণ করবেন না- নিজেকে এরকম একটি টার্গেট দিন।

অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বাদ দিন/ নিয়ন্ত্রণে রাখুন

আমাদের অনেকেরই অপ্রয়োজনে কেনাকাটা করার অভ্যাস রয়েছে। লাগুক বা না লাগুক নিজের জন্য, সন্তানের জন্য, পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য প্রায়ই অনেকে প্রচুর জামাকাপড়, জুতো ব্যাগ এবং অন্যান্য সামগ্রী কিনে থাকেন।

এখন তো সর্বত্রই অনলাইন শপগুলো কেনাকাটার করার বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। অনলাইনের নানা পণ্য থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল।

আর অনলাইন থেকে প্রচুর কেনাকাটা অনেকের নেশার মতো হয়ে গেছে।  এমন অনেকেই আছেন, যারা হয়তো যা কিনেছেন তা ব্যবহার করেন না, অথবা একবার দুবার ব্যবহার করে ফেলে রাখেন।

অনলাইনে দেখে যা ইচ্ছা সব কিনে ফেলা, অনেক সময় ‘ডিসকাউন্ট অফার’-এর ফাঁদে পড়ে অনেক অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে ফেলার অভ্যাস বাদ দিতে হবে বা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। খরচ কমাতে চাইলে আমাদের আসলে প্রয়োজন আর চাহিদার মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতে হবে। এমন অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে কিছু খরচ কমানো সম্ভব।

কমিয়ে আনুন বিদ্যুৎ বিল

কিছু চমৎকার অভ্যাস গঠনের মাধ্যমে বাসার বিদ্যুৎ বিল আপনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন । যেমন যে রুমে অবস্থান করছেন শুধু সে রুমের বাতি কিংবা ফ্যান চালিয়ে বাকি অন্য সব রুমের ফ্যান ও বাতি বন্ধ রাখতে পারেন।  এসি, ওভেন,  আয়রন- এগুলোর ব্যবহার যথাসম্ভভ কমিয়ে আনতে পারেন। টিভি, কম্পিউটার বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালিয়ে না রেখে আপনি যে শুধু নিজের বিদ্যুৎ বিল নিয়ন্ত্রণে রাখছেন তা নয় বরং এই অপচয় রোধ এর মাধ্যমে দেশ ও পরিবেশেরও উপকার হবে।

খাবারের অপচয় রোধ করুন

অনেক বাসায় খাবার অপচয় একটি নিয়মিত ঘটনা। আপনি নানাভাবে খাবার অপচয় বন্ধ করতে পারেন। ঠিক যতটুকু খাবেন, ততটুকু রান্নার অভ্যাস করুন । বাড়তি খাবার সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করুন, যাতে সেটা আবার গরম করে খাওয়া যায়।

আমাদের অনেকেরই রেস্টুরেন্টে গিয়ে কিংবা অনলাইনে অর্ডার করে বাইরের খাবার খাওয়ার অভ্যাস আছে। যখন তখন বাইরের খাবার খওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে, শুধু  যে টাকা সাশ্রয় হবে তা নয়, স্বাস্থ্যের জন্য তা ভালো।

 বাইরের খাবার মুখরোচক করতে প্রচুর তেল, মসলা, সস, ক্ষতিকর খাবারের রঙ, টেস্টিং সল্ট  ইত্যাদি ব্যবহার করার কারণে সেগুলো স্বাস্থ্যের জন্য খুব ক্ষতিকর। যারা প্রচুর বাইরের খাবার খায় প্রায়শই তাদের গ্যাস্ট্রিক, আলসার, বুক জ্বালাপোড়া, হজমে সমস্যা, ফুড পয়জনিং, ইত্যাদিতে ভুগতে হয়।

বাইরের খাবার খাওয়া কমিয়ে আনতে পারলে চিকিৎসা ব্যয় কমবে, স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হবে ।

আজকাল ইউটিউবে রেস্টুরেন্টের স্বাদে খাবার তৈরির নানা রকম রেসিপি পাওয়া যায় । একটু কষ্ট করলেই নিজেরাই উপকরণগুলো কিনে এনে ঘরেই বানিয়ে নিতে পারবেন রেস্টুরেন্টের স্বাদের খাবার। সে ক্ষেত্রে খরচ যেমন কমবে তেমনি মানের   বেপারেও আপনি নিশ্চিত থাকতে পারবেন।

শিক্ষা ব্যয় কমিয়ে আনুন

অনেক পরিবারের ব্যয়ের একটা বড় খাত হচ্ছে সন্তানদের পড়ালেখা।  এক্ষেত্রেও কিছুটা ব্যয় সংকোচন করা সম্ভব।  বিশেষ করে শিশুরা যদি ছোট হয়ে থাকে, তাদের পড়াশোনার দায়িত্ব বাবা- মা হিসেবে আপনি নিজেই নিতে পারেন।

তাছাড়া বাচ্চাকে খুব ছোটবেলা থেকে একই সাথে নানা রকম কোচিং করানো কিংবা পড়াশোনা বিষয়ক চাপ দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই একই সাথে গান, ছবি আঁকা, আরবি বা অন্যান্য ভাষা শেখা, ক্লাসের পড়াশোনা সবকিছু না শিখিয়ে ধাপেধাপে একটির পর একটি শেখান।  শিশুকে নিজের মত করে বড় হতে দিন, তাহলে শিশু আনন্দের সাথে শিখতে পারবে,  ধীরে ধীরে শিখলে শেখার চাপও অনুভব করবে না।

শিশুকে সাধারণ খেলনা ও পোশাকে অভ্যস্ত করুন

অপচয় না করার অভ্যাস শিশুদের ভেতরে ছোটবেলা থেকেই তৈরি করার চেষ্টা করুন। যখন তখন দামি খেলনা, দামি পোশাক অন্যান্য সামগ্রী কিনে দেয়া থেকে বিরত থাকুন।  শিশুদেরকে আপনি যে অভ্যাস করাবেন তারা অন্তত একটা বয়স পর্যন্ত তাতে অভ্যস্ত থাকবে।  শিশুরা আসলে যেকোনো খেলনা দিয়েই খেলতে পারে।

 অনেক পরিবারেই শিশুদেরকে ঘনঘন অযথা দামি খেলনা কিনে দিয়ে অভ্যস্ত করে ফেলা হয়, তখন তাদের বায়না ধরার হার আরো বেড়ে যায়। কিন্তু যদি তাদেরকে বোঝানো হয় এবং এসব অপ্রয়োজনীয়’ দামি খেলনা সবসময় না কিনে দেয়া হয় , তারা এমনিতেই সাধারণ খেলনা দিয়ে খেলতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। 

ধারকর্জ করায় সাবধান হোন

অনেকেই ধারকর্জ করে নানারকম শখের জিনিস হুটহাট কিনে ফেলেন। যাদের ক্রেডিট কার্ড আছে, তারাও অনেক সময় চিন্তা না করেই বেশি খরচ করে ফেলেন। এসব বব্যাপারে সচেতন হলে খরচ কমানো সম্ভব।

অব্যবহৃত জিনিসপত্র বিক্রি করে দিন

প্রায় প্রত্যেক বাসাতেই অব্যহতৃত বা স্বল্প ব্যবহৃত জিনিসে ঠাসা থাকে। যা আপনার কাজে লাগার কোনো সম্ভাবনা নেই, সেগুলো বিক্রি করে বা বদলে নিয়ে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনতে পারেন।

বারান্দা বা ছাদ বাগানে সবজি চাষ করুন

আজকাল অনেকেই ছোট পরিসরে ঘরেই বাগান করছেন। বেশি করে সবজি লাগান। যেমন: লাউ শাক, পুঁইশাক, পুদিনা পাতা, লেটুস, থানকুনি পাতা, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ লেবু গাছ ইত্যাদি অল্প পরিসরেই লাগানো সম্ভব।  এতে কিছুটা হলেও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি কীটনাশকমুক্ত সবজি খেতে পারবেন।

নিজের সাধ্যের সীমা বুঝুন

বন্ধুর লেটেস্ট মডেলের আইফোন, ট্যাব, বাইক নিত্যনতুন ব্র্যান্ডের পোশাক বা রেস্টুরেন্টে যাওয়ার চেকইন দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। পিয়ার প্রেসার, কিংবা সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলার হুজুগে আপনার সাধ্যের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ করবেন না। আপনার কাজ চলবে এমন ফোন কিনুন, সাধ্যের মধ্যে রুচিশীল পোশাক কিনুন। কিন্তু ঋণ করে ঘি খাওয়ার দরকার নেই।

খরচ এবং অপচয় কমালে যে জীবন যাপন যে সহজ হবে  তাই নয়, উদ্বৃত্ত বা সঞ্চিত অর্থ আপনার দু:সময়ে কাজে লাগতে পারে। এই অর্থ দিয়ে আপনি মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারেন। তাতে মানসিকভাবেও ভালো থাকবেন।

লেখক : কাজী তাহমিনা, লেখক ও শিক্ষক ( ইংরেজি বিভাগ) ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।

এখানে মন্তব্য করুন :