শুভ জন্মদিন জোকার

শুভ জন্মদিন জোকার

আমরা কেউ জোকার কে চিনি অথবা না চিনি,জেনে হোক না জেনে হোক হোয়াই সো সিরিয়াস কথাটা বলিই বিভিন্ন সময়ে।

এই ডায়ালগটি যে মানুষটির জন্য দুনিয়াজুড়ে প্রচলিত,তিনি হলেন হিথক্লিফ এন্ড্রু লেজার। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই অভিনেতার আজকে জন্মদিন।যেখানেই থাকুন,ভালো থাকুন।

অনেকের কথা জানি না,আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি।তখন ২০১০ সাল।সুপারহিরো মুভি বা মাস্টারপিস মুভি,হিথ লেজার,ব্যাটম্যান সম্পর্কে ধারনা বলতে গেলে শুন্য।

কিন্তু কোথায় যেন হোয়াই সো সিরিয়াস শুনেছিলাম,প্রায়ই বলতাম তারপর থেকে।এরপর বিভিন্ন জায়গায় জোকার এর সাথে লিখা দেখতাম হোয়াই সো সিরিয়াস! তারপর একটা গেঞ্জি গিফট পেলাম,জোকার এবং হোয়াই সো সিরিয়াস।

সেইদিনই খুব ইচ্ছা হলো, এত এত দেখি হোয়াই সো সিরিয়াস, আসলে ব্যাপারটা কি!ওইদিন যে একবার দেখলাম,তারপর মুভি এবং অভিনয় সম্পর্কে ধারনা এবং আগ্রহ,ভালো লাগা সব বদলে গেলো!

৪ এপ্রিল ১৯৭৯ সাল,পার্থ,অস্ট্রেলিয়া।দুনিয়ায় আসেন এক ক্ষণজন্মা অভিনেতা,হিথক্লিফ এন্ড্রু লেজার।দুনিয়া জুড়ে অবশ্য মানুষ তার আসল নামের থেকে জোকার নামেই বেশি চেনে।

এই ক্ষণজন্মা অভিনেতা খুব কম সময়েই নিজের অভিনয় দিয়ে কোটি কোটি ভক্ত রেখে গেছেন।সম্ভবত তার অভিনীত জোকার চরিত্রটি সর্বকালের সেরা জনপ্রিয় ভিলেন চরিত্র হিসেবে প্রথমে থাকবে। তার মা স্যালি লেজার ছিলেন শিক্ষিকা,বাবা কিম লেজার ছিলেন খনি প্রকৌশলী। তিনি ছিলেন বাবা মার দ্বিতীয় সন্তান,তার বড় বোনের নাম ক্যাথেরিন লেজার।

লেজার খেলাধুলায় খুবই পারদর্শী ছিলেন, ক্রিকেট,হকি,সার্ফিং এগুলোতে দক্ষ ছিলেন।কিন্তু তার সবচেয়ে ভালো দক্ষতা এবং আগ্রহ ছিলো দাবায়। তিনি দশ বছর বয়সে জুনিয়র দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হন।

হিথ লেজার এর অভিনয় এর প্রতি খুবই আগ্রহ দেখে ক্যাথেরিন তাকে একটি মঞ্চদলের সাথে ভিড়িয়ে দেন ।অভিনয়ে মনোযোগ দেয়ার ফলে তাকে হকি খেলা ছেড়ে দিতে হয়।

১৯৯২ সালে প্রথম তিনি ক্লাউনিং এরাউন্ড নামে একটি ড্রামাতে অতিরিক্ত হিসেবে কাজ শুরু করেন।এরপর পার্থ টেলিভিশনে শিপ টু শোর নামক ধারাবাহিকেও অতিরিক্ত হিসেবে কাজ করার পর অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশিন ড্রামা সোয়েট এ অভিনয় করেন।সেটিই ছিলো ক্যামেরার সামনে তার প্রথম কাজ।

সমকামী সাইক্লিস্টের চরিত্রে অভিনয় করে অনেক প্রশংসা পান তিনি।।১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলীয় চলচিত্র ব্ল্যাকরক (১৯৯৭) দিয়ে তার চলচিত্রে অভিষেক হয়।এরপর তিনি টেন থিংস আই হেট এবাউট ইউ তে অভিনয় করেন।

২০০০ থেকে ২০০৫ এর ভিতর তিনি দ্য প্যাট্রিয়ট, মনস্টারস বল, আ নাইটস টেল, দ্য ফোর ফিদারস, দ্য অর্ডার, নেড কেলি তে অভিনয় করেন। ২০০৫ সালে ব্রোকব্যাক মাউন্টেইন এ অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসিত হন,এবং বিভিন্ন পুরষ্কারও লাভ করেন।এরপরে তিনি ক্যান্ডি এবং আ’ম নট দেয়ার এ অভিনয় করেন।

তারপর,তার সেই মহাকাব্য,দ্য জোকার চরিত্রে দ্য ডার্ক নাইট মুভিতে অভিনয়।যা সুপারহিরো মুভি সম্পর্কে মানুষের ধারনাই বদলে দিয়েছিলো।তিনিই একমাত্র ভিলেন,হিরোর থেকে যিনি বেশি জনপ্রিয় হয়েছিলেন তার অভিনয় দিয়ে। দ্য ডার্ক নাইট মুভি দিয়ে তিনি যে মাইলফলক তৈরি করে রেখে গেছেন,এটা কারো পক্ষে আর কখনোই মনে হয় না ভাঙা সম্ভব।

একমাত্র সুপারভিলেন তিনি,যিনি অস্কার লাভ করেছিলেন। এত অসাধারন অভিনয় করেছিলেন তিনি,কিন্তু মুভিটা তিনি দেখে যেতে পারেননি। পারেননি নিজে উপস্থিত থেকে নিজের অস্কার টা গ্রহন করতে। মুভি রিলিজ হওয়ার ও ছয়মাস আগে,২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

জোকার এবং হিথ লেজারঃ- মানুষ তাকে চেনে জোকার হিসেবে। অন্তত পাঁচ ভাগের একভাগ মানুষ বলবে তারা জোকার কে চেনে কিন্তু লেজার কে চেনে না। এ থেকেই বোঝা যায় জোকার চরিত্রটিকে তিনি কোন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখানে তার নিজের পরিচয়ই ঢাকা পরে গেছে।

জোকার চরিত্রে ইতিপুর্বে অনেকেই অভিনয় করেছেন,ভবিষ্যতেও অনেকেই করবেন,কিন্তু যতদিন সিনেমা বেঁচে আছে,ততদিন হিথ লেজার এর জোকার এর কোন মৃত্যু নেই।

ব্যাটম্যান বিগিনস এর ব্যাপক সফলতার পর ক্রিস্টোফার নোলান দ্য ডার্ক নাইট মুভিটি বানানোর প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেন।ব্যাটম্যান তো পাওয়া গেলো,কিন্তু জোকার কোথায় পাওয়া যায়?নোলান ব্যাটম্যান হওয়ার জন্য লেজার কে একবার বলেছিলো কিন্তু সুপারহিরো মুভি করতে ইচ্ছুক ছিলেন না তাই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।কিন্তু ব্যাটম্যান বিগিনস দেখে নিজেই নোলান কে জোকার হিসেবে নিতে অনুরোধ করেন।নোলান যখন অল্পবয়স্ক অপরিনত অনভিজ্ঞ একজন কে জোকার হিসেবে সিলেক্ট করেন,অনেকেই তার উপর নাখোশ হয়েছিলেন।

স্বয়ং জ্যাক নিকোলসন ও রেগে গিয়েছিলো। কিন্তু নোলান বুঝতে পেরেছিলো যে, হ্যা হবে,এই ছেলে কে দিয়েই হবে।তিনি হিথ এর উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন,যার ফলাফল দ্য ডার্ক নাইট, সর্বকালের সেরা সুপারহিরো মুভি যা আইএমডিবিতে সেরা মুভির তালিকায় চতুর্থ! জোকার চরিত্রটিকে অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য লেজার মুভিটির চিত্রনাট্য লেখা শুরু হওয়ার ও আগে তোড়জোড় শুরু করে দেন। তিনি চরিত্রটির সমস্ত কিছু ফুটিয়ে তোলার জন্য একমাস একটি হোটেল রুমে একা অবস্থান করেন।তিনি তার নিজের মেক আপ নিজেই করতেন।

তিনি জোকার এর গলা আরো ভয়ংকর করে তুলতে নিজের কন্ঠ বদলিয়ে কথা বলতেন।তিনি জোকার চরিত্র কিভাবে ফুটিয়ে তুলবেন,কিভাবে কি করবেন,কি করছেন,চিন্তাধারা সব একটি ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। গতানুগতিক কমিকবুকের জোকার এর সাথে তার জোকারের বেশ অমিল ছিলো।

শুটিং শুরু হওয়ার পর এলিভেটর সিনে প্রথমে জোকার বেশে হিথ লেজার কে দেখে মাইকেল কেইন ভয়ে তার ডায়ালগ ভুলে গিয়েছিলেন,এতটাই ভয়ংকর ছিলো তার মেক আপ। শুটিং এ ক্রিস্টোফার নোলান তার অসাধারন অভিনয় এবং চিন্তাশক্তি দেখে মুভির কিছু অংশ পরিচালনার ভার তার হাতে ছেড়ে দেন। লেজার তার অসাধারন চিন্তাশক্তি এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রমান রাখেন যখন তাকে জেলে রাখা হয়,গর্ডনকে যখন কমিশনার করা হয়, হাততালি দেয়া টা স্ক্রিপ্টে ছিলো না, লেজার নিজেই এটি করেছিলেন এবং এটি মুভির অন্যতম সেরা একটি দৃশ্য পরিণত হয় এটি। তারপর হাসপাতালে বোমা ফাটানোর জন্য যখন রিমোট টিপেন,কিন্তু বোমা ফাটেনি,তখন লেজার নিজে কৌশলে দৃশ্যটা সামাল দেন,এবং এটিও অসাধারণ একটি অংশে পরিণত হয়।

জোকার চরিত্রে অভিনয় করার জন্য তিনি প্রচন্ড পরিশ্রম করতেন। তিনি দুঘন্টার বেশি ঘুমোতে পারতেন না ডাক্তারদের দেয়া ওষুধ খাওয়ার পরেও।

বিভিন্ন ওষুধ এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন এমনটাই ধারনা করা হয়।২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি তাকে অচেতন অবস্থায় দেখে ইমার্জেন্সি তে কল দেন।কিন্তু ডাক্তাররা তাকে দুপুরবেলা মৃত ঘোষণা করেন। অনেকেই বলেন তার এই অকালমৃত্যুর জন্য এই জোকার চরিত্রটিই দায়ী। জ্যাক নিকলসন একবার বলেছিলেন আমি তাকে নিষেধ করেছিলাম। দ্য ডার্ক নাইট মুভি রিলিজ হওয়ার পর দুনিয়াজুড়ে সাড়া পরে যায়।

কে এই ভয়ংকর জোকার?জোকার চরিত্রে অসাধারন অভিনয় করে কোটি কোটি ভক্ত বানিয়ে ফেলেন এই একটি মুভি দিয়েই।দর্শক সমালোচক সবার ভুয়সী প্রশংসা ছিলো জোকার এর জন্য। জোকার চরিত্রে অভিনয় এর জন্য অনেক পুরষ্কার পান,তার মাঝে অভিনেতাদের জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক,অস্কার,যা একমাত্র সুপারভিলেন হিসেবে তিনিই পেয়েছিলেন।

যদিও এসব এর কিছুই দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি।তিনি দেখে যেতে পারেননি তার জন্য কত কোটি কোটি ভক্ত পাগল,তিনি দেখে যেতে পারেননি তাকে ঘিরে কি উন্মাদনা। তিনি দেখে যেতে পারেননি একটা মুভি দিয়েই কিভাবে তিনি শত শত বছর রাজত্ব করার উপায় রেখে গেছেন। যখন তাকে অস্কারের জন্য ঘোষণা করা হয়,উপস্থিত সবার চোখে ছিলো পানি।অসাধারন এই ক্ষনজন্মা অভিনেতা নিজের জয় দেখে যেতে পারেননি। হিথক্লিফ এন্ড্রু লেজার মারা গেছেন,কিন্তু রেখে গেছেন এমন একটি চরিত্র,যার মরণ নেই। তিনি জোকার চরিত্রে সবসময় আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তার এই জন্মদিনে তাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।

যেখানেই থাকবেন,ভালো থাকবেন।আপনি প্রমান করে গেছেন,মানুষ বাঁচে তার কর্মের মাঝে,বয়সের মাঝে নয়।

 শুভ জন্মদিন ।

লেখকঃ অন্বয় আকিব, ওয়ার্ল্ড ইউনিভারসিটি অব বাংলাদেশে বিবিএতে অধ্যয়নরত।

এখানে মন্তব্য করুন :