শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটার ইকবালের অন্যরকম লড়াই

শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটার ইকবালের অন্যরকম লড়াই

ইকবাল হোসেন খানের ধ্যানজ্ঞানে ক্রিকেট। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন বড় ক্রিকেটার হবেন, হয়েছেনও। ওপেনিংয়ে ব্যাট করেন। প্রতিপক্ষের বোলারদের বোলিং বারুদের বিরুদ্ধে লড়েন অসীম সাহসিকতায়, বুক চিতিয়ে মোকাবিলা করেন বাউন্সার, ইনসুইং-আউটসুইং বল।


কিন্তু ইকবালের বেড়ে উঠা আর আটদশটা মানুষের মতো সহজ ও স্বাভাবিক ছিল না। সমাজের চোখে তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী, অর্থাৎ শারীরিকভাবে পূর্ণ সক্ষম নন এমন একজন। এই সাময়িক অক্ষমতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন নিজের স্বপ্নের পথে। বর্তমানে বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের হয়ে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের প্রতাকা উড়াচ্ছেন গর্বের সঙ্গে।


ইকবালের জন্ম দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে খুলনার বাগেরহাটে। সুন্দরবনের পাশে ওই অঞ্চলের মানুষের প্রকৃতি ও ধরন অন্য জেলার মানুষের চেয়ে কিছুটা হলেও আলাদা। তাদেরকে বিরুপপ্রকৃতির সঙ্গে লড়তে হয় প্রতিনিয়ত। তাই জন্মগত লড়াকু বলা চলে তাদের।


ঘূর্ণিঝড় আইলা ও সিডরের আঘাতে ইকবালদের ভীষণ ক্ষতি হয়েছিল; ঘর উড়িয়ে নিয়েছিল, খোলা আকাশের নিচে থাকতে হয়েছিল। অবশ্য যার জীবনের সঙ্গে লড়তে হয় প্রতিদিন প্রতিক্ষণ, তার কাছে আইলার আঘাতই কী আর সিডরের তান্ডবই বা কী। ইকবাল বহু দিনের ফাইটার, তার যে শারীরিক অসূর্ম্পণতা ছিল, সেটা জয়ের একটি অদ্ভুত তাড়না ছিল ছোটবেলা থেকেই।


ইকবালের মুখেই শোনা যাক তার ছোটবেলার কথা, তিনি বলেন,‘ ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আমার খুব আগ্রহ। ব্যাটিং করতে চাইতাম। আর সবার মতো নিজেও খেলাধুলা করতে চাইতাম। পাড়া মহল্লায় যারা খেলতেন, তাদেরকে এটা সেটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করতাম। অর্থাৎ খেলাধুলার প্রতি আমার সব সময় একটা আগ্রহ ছিল।’


‘২০১৪ সালে পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি, শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের জন্য সদস্য খোঁজা হচ্ছে। আমি নিজেও মোটামুটি ভালো ব্যাটিং করি, সেই আত্মবিশ্বাসটুকু সম্বল করে আমিও আবেদন করি। শুরু হলো বাছাই প্রক্রিয়া। প্রথম ৫০ জনের দলে, তারপর ৩০ জনের দিলে, এরপর ২৩ জনের দলে এভাবে আস্তে আস্তে আমি দলে খেলার সুযোগ পাই।’


২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে একটি দল যায় ভারতের ত্রিপুরাতে। সেখানে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রা অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখান এবং বাংলাদেশ দল জয়ী হয়। এর পরের বছর ত্রিদেশীয় সিরিজেও বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল খেলে। সেখানেও বাংলাদেশ দল চ্যাম্পিয়ন হয়। এছাড়া দেশেও বিভিন্ন ম্যাচে খেলে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখান ইকবাল। হয়েছেন কয়েকবার ম্যান অব দ্য ম্যাচ।


জানালেন, দেশে তার প্রিয় খেলোয়াড় সাকিব আল হাসান। আর দেশের বাইরে প্রিয় খেলোয়াড়ের তালিকায় রয়েছেন ভারতের বিরাট কোহলি, দক্ষিণ আফ্রিকার হাশিম আমলা ও পাকিস্তানের বাবর আজম। তবে জীবনের অনুপ্রেরণা বা খেলোয়াড়ি জীবনের উৎসাহ-উদ্দীপনা পান সাকিব আল হাসানের কাছ থেকে। কারণ, সাকিবের মধ্যে রানের জন্য বা খেলার জন্য যে মনোভাব দেখতে পান, সে রকম মানসিকতার অধিকারী হতে চান তিনি নিজেও ।


এতো গেলো জীবনের একটি দিক অর্থাৎ খেলোয়াড়ি অধ্যায়ের দিক। সেই জীবনের আরেকটি দিক আছে; খ্যাতিহীন, পয়সা ছাড়া অভাব অনটনের জীবন, যেখানে ওই ক্রিকেট খেলোয়াড়কে অন্য আরেক মাঠে যুদ্ধ করতে হয় পরিবারের জন্য অর্থ যোগাতে। জীবনের এই অধ্যায়ে তিনি খাবার হোটেলে কাজ করা ইকবাল হোসেন খান। করোনার কারণে সেই হোটেলটিও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ছেদ পড়েছে ইকবালের জীবিকা অর্জনে।

ইকবাল বলেন, ‘ছোটোবেলায় বাবা মারা গেছেন। ভাইটির বয়স তখন দেড় বছর। সে মানসিকভাবে অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য অনেক অর্থ লাগে। এইতো কিছুদিন আগে, অসুস্থতা বাড়লে ভর্তি করতে হয় হাসপাতালে। বাড়িতে আছেন বৃদ্ধা মা। তিনিও বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগে থাকেন।’

পরিবারের এমন আর্থিক দৈন্যদশায়ও ইকবালের চোখে স্বপ্নরা খেলে যায়। তিনি প্রতিবন্ধী ও তরুণদের জন্য একটি স্পোর্টস একাডেমি করতে চান। তার যুক্তি হলো, যারা খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত হন তারা কখনো খারাপ পথে যেতে পারে না। মাদক, জুয়ার মতো অপরাধগুলো তাদেরকে হাতছানি দিতে পারে না। শারীরিক ফিটনেস ও এর যে নেশা সেটা মানুষকে অন্য অনেক খারাপ দিক থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

কিন্তু এর জন্য তো প্রচুর অর্থের যোগান লাগবে, জমি লাগবে বা অনুদান লাগবে এগুলো কোথায় পাবেন, জিজ্ঞেস করতেই এক মুহূর্ত নিরব থাকলেন। এই সময়টাতেই হয়তো কোনো উপায় খুঁজলেন ইকবাল। বললেন, আমরা শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটাররাতো দেশেরই প্রতিনিধিত্ব করি, দেশের পতাকা ওড়াই। আমাদেরকে যদি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) একীভূত করে নিত, একটি বেতন ধরত, তাহলে আর আমাদের এতো দুশ্চিন্তা থাকত না। আমরাও যে আয় করতে পারি, আমরাও যে কারো বোঝা নই, বরং একটি সম্পদ সেটি প্রমাণিত হতো।


ইকবালদের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ থানার ৯ নম্বর বলবুনিয়া ইউনিয়নের মধ্য কালিকাবাড়ি গ্রামে। বললেন, একবার ঘুরে যাবেন আমাদের বাড়ি। এসে দেখে যাবেন আমরা কী দুর্দশায় থাকি। কিন্তু দেশের জন্য যখন খেলি, তখন আর অভাব অনটন, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কষ্টের কথা মাথায় থাকে না।

লেখক : পলাশ সরকার

এখানে মন্তব্য করুন :