রাজকুমারের ১০৮ দিনের বন্দিজীবন

রাজকুমারের ১০৮ দিনের বন্দিজীবন

কান্নাডা সুপারস্টার রাজকুমার। ছবি : ডেকান হেরাল্ড

২০০০ সালের ৩০ জুলাই। রাত সাড়ে নয়টা। সবেমাত্র খাবার শেষ করেছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের আইকন রাজকুমার। কান্নাডাভাষী লোকজনের অত্যন্ত প্রিয় ডক্টর রাজকুমার।
বাইরে তখন তুমল ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার শ্বেতশুভ্র পর্দাগুলো বাতাসে উড়ছিল রাজহংসের ডানার মতো।


পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে রাজকুমার তিনদিন আগে এসেছেন তামিলনাড়ুর গাজানুরে এই ফার্মহাউজে। ব্যস্ততার কারণে ইদানিং ঘুরে বেড়ানোর মতো সময় পান না। একটা সুযোগ যখন মিলেছে, তা আর নষ্ট করতে চাননি, তাই সবাইকে নিয়ে এসে উঠেছেন ফার্মহাউজে।


খাবার খেয়েদেয়ে রাজকুমার, তার স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনেরা বসে টিভিতে তখন মজার একটা অনুষ্ঠান দেখছে। বাইরের তুমুল ঝড়বৃষ্টি, বাড়ির চারদিকে নারিকেল গাছসহ অন্যান্য গাছগুলোর আন্দোলন তাদের মনসংযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারেনি। বুঝতেই পারেনি একটু পর তাদের জীবনে যে ঝড় আসবে, সেই ঝড় ওলটপালট করে দেবে তাদের সামনের দিনগুলো।


সে রাতেই ফার্মহাউজ থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে দিমবুমে তামিলনাড়ুর আইজিপি ও স্পেশাল টাস্কফোর্সের প্রধানের নেতৃত্বে গোপন একটি সভা বসেছে। সভাায় যোগ দেওয়া প্রত্যেকটি সসদস্য উত্তেজিত ও চিন্তিত।

এই এলাকার প্রধান সমস্যা ডাকু ভীরাপ্পান ও তার দলবল, সেই ভীরাপ্পানকে ধরার একটি সুযোগ এসেছে। লোকটি শৃগালের মতো ধূর্ত ও হায়েনার মতোভয়ংকর। কখনো কখনো সে প্রেতের মতো, মুহূর্তে মিলিয়ে যেতে পারে বাতাসে । গোপন সূত্রে খবর এসেছে ভীরাপ্পান দিমবুনে একটি হিন্দু মন্দিরে আসছে। যে কোনো মূল্যে তাকে ফাঁদ পেতে ধরতেই হবে|

দস্যু ভীরাপ্পান। ছবি : ডেকান হেরাল্ড


ভীরাপ্পানকে ধরতে পুলিশ সদস্যরা যখন সভায় ব্যস্ত, সেই ঝড়বৃষ্টির রাতে ফার্মহাউজের অদূরে নারকেল গাছের আড়ালে তার লোকজন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বনের মধ্যে।

ভীরাপ্পানের হালকা শরীর। বেড়ালের মতো চলাফেরা করে সে নি:শব্দে। তার বাবাড়ি চুল ও বিশাল গোফের দুই প্রান্ত বেয়ে টুপটুপ করে জল ঝরছে। অন্যসময় সে উত্তেজনায় গোঁফের প্রান্ত ক্রমাগত পাকাতে থাকে। এখন সে তার কিছুই করছে না। উত্তেজনায় তার শরীর বেঁকে রয়েছে। চোখের পাতা পর্যন্ত পড়ছে না। জামাকাপড় ভিজে একাকার। সারা গায়ে বনের নরম মাটির কাদা লেপ্টে আছে। তার কাছে খবর আছে রাজকুমার এই সময় খাবার খেয়ে টিভি দেখে। এখনই শুরু করতে হবে অভিযান।


ভীরাপ্পান সংকেত দেওয়া মাত্রই তারা ১২-১৫ জন হামলে পড়ল রাজকুমারের বাড়িতে। ঘরে ঢুকেই কান্নাডা ভাষায় একটা কথা বললেন, ‘আমরা স্যারকে চাই। চলুন স্যার।’
ঘরের প্রত্যেকটা মানুষের মুখে কথা নেই। ভয়ে জমে গেছে সবাই। এই সে ভীরাপ্পান যে তামিলনাড়– ও কর্নাটকের ত্রাস। যার নামে তিনশ হত্যা মামলা রয়েছে। অপহরণের কত ঘটনা ঘটিয়েছে সে নিজেও মনে করতে পারে না।


ভীরাপ্পানের লোকজন রাজকুমারকে ঠেলতে ঠেলতে বাইরে নিয়ে গেল। বাইরে এসে বীরপ্পআন রাজকুমারকে ঘরে যারা ছিল তাদের কার কী পরিচয় সে ব্যাপারে জানতে চাইল।

রাজকুমারের কথা শুনে মনের মধ্যে কী খেলে গেল কে জানে, সে রাজকুমারের ঘরের দিকে তাকিয়ে ফিরতি পথ ধরল। এবার ঘরে ঢুকে ধরে আনল রাজকুমারের জামাতা, এক আত্মীয় ও এক সহকারী চলচ্চিত্র পরিচালককে। ভয়ে আতংকে তাদের কারো মুখে রক্ত নেই। থরথর করে কাঁপছে সবাই।
রাজকুমারের অপহরণের খবরে তামিলনাড়ু, কর্নাটকসহ গোটা ভারতজুড়ে যেন একটি বোমা পতন হলো। প্রচন্ড বিস্ফোরণের মতো সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। রাজ্য থেকে কেন্দ্র সরকারের মাথায় হাত কী করবে এখন।

বন্দিদশা থেকে মুক্তির পর বেঙ্গালুরুতে সংবাদ সম্মেলনে চিত্রনায়ক রাজকুমার। তার বাম পাশে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা। ছবি : ডেকান হেরাল্ড


ভীরাপ্পানের যে গোপন আস্তানা, বিস্তীর্ণ জঙ্গলময় এলাকাটি তামিলনাড়ু, কর্নটক ও কেরালার মধ্যে পড়েছে। তাকে গ্রেফতার নিয়ে এই তিন রাজ্যেও সরকারের মধ্যে প্রায়ই মনোমালিন্য ও পরস্পরের উপর দোষ চাপানো হচ্ছিল।

তামিলনাড়ুর ও কর্নাটক সরকারের মধ্যে এ ঘটনা ইতিপূর্বের উত্তেজনা ও রেষারেষিতে ঘি যোগ করে। কাভেরী নদীর পানি বন্টন নিয়ে দুই রাজ্যের মধ্যে বিরোধ তখন তুঙ্গে। রাজকুমারের অপহরণের খবরে কিছু কর্নাটকি ভক্ত আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে তামিল লোকজনের উপরে।
মানুষকে অপহরণ ও মুক্তিপণ হিসেবে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা ছিল দস্যু বীরাপ্পানের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ভীরাপ্পান সেসময়কার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার তার দলের সদস্যদের মুক্তি দাবি করেছে রাজকুমারের বিনিময়ে।


জানা গেল, স্পেশাল টাস্কফোর্স একবছর আগেই রাজবকুমাকে সাবধান করে দিয়েছিল যে ভীরাপ্পান তাকে অপহরণ করতে পারে। এ কথা শুনে রাজকুমার পাত্তা তো দেনইনি। বরং দম ফাটিয়ে হেসে বলেন, আমাকে কিডন্যাপ করে কী পাবে বীরাপ্পান একটি জামা আর ধুতি ছাড়া।

রাজকুমারকে যখন আটকে রাখা হয়েছিল তখন তাকে প্রায়ই টেলিভিশনে দেখা যেত ও রেডিওতে তার কন্ঠ শোনানো হতো। ভীরাপ্পান রেকর্ড করে এসব পাঠাত।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এ ঘটনায় তামিলনাড়ুর সরকার ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছে বলে অভিমত দেয়। রাকজুমারকে অপহরণ করা হতে পারে এটা জেনেও কেন তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেনি সেজন্য কড়া ভাষায় তিরষ্কার করে।
রাজকুমারের উদ্ধারের দাবিতে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকারের উপর ভীষণ চাপ এসে পড়ছিল। কংগ্রেস নেতা কৃষ্ণা ছুটে গেলেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। তারা দুইজন রুদ্ধশ্বাস সভা করে ঠিক করেন তামিল ম্যাগাজিনের প্রকাশক নাখিরান গোপালকে দায়িত্ব দেবেন আলোচকের জন্য। ভীরাপ্পান ভিডিও ও অডিও ক্যাসেট রেকর্ড করে এই গোপালের কাছেই পাঠাতেন।


গোপাল পরবর্তীতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনাটি মনে পড়লে এখনো আমি শিহরিত হই। তবে ভগবানকে ধন্যবাদ যে আমরা তাকে মুক্ত করতে পেরেছিলাম।’


গোপালের ভাষ্যমতে, ‘আমাকে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে দুই মুখ্যমন্ত্রী এক হলেন। আমি দশদিন ধরে ভীরাপ্পান বনের সম্ভাব্য যেসব এলাকায় থাকতে পারে সেসব জায়গায় খুঁজে বেড়াই। বেশ কিছু দিন প্রচেষ্টার পর অবশেষে ভীরাপ্পানের গোপন ডেরা খুঁজে পাই। ওরা রাজকুমারকে যেখানে আটকে রেখেছে বলেছে, সে জায়গায় তারা আমাদের নিয়ে যায়। আমাদেরকে বনজঙ্গলের মধ্যে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতেই চিন্তা হচ্ছিল এতো দীর্ঘপথ রাজকুমার সাহেব কীভাবে হেঁটেছিলেন।’
‘এ সময় আমার ভীষণ ভয় হচ্ছিল। ভীরাপ্পানের সঙ্গে আমার দেখা হবে সে জন্য নয়। ভয় পাচ্ছিলাম এই ভেবে যদি রাজকুমারকে আর জীবিত দেখতে না পাই সেজন্য। হাঁটতে হাঁটতে যখন গোপন ডেরায় পৌছে রাজকুমারকে দেখি, আমার সারা শরীর স্বস্তির পরশে জুড়িয়ে গেছে । এরপর বেশ কয়েক দফা আলোচনার পর রাজকুমারকে মুক্ত করতে পেরেছি আমরা। ’


রাজকুমার প্রেসব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, ভীরাপ্পান তার সঙ্গে ইজ্জত দিয়ে কথা বলতেন। অসম্মান করেনি।
ছবি : ডেকান হেরাল্ড


প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ সি দিনাকর, সেসময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন কর্নাটকে। তিনি তার এক বইয়ে জানান, এ ঘটনায় কর্নাটক সরকার ২০ কোটি রুপি কয়েক দফায় পরিশোধ করেছিল। পুরো মুক্তিপণের টাকা সরকারের কোষাগার থেকে গেছে, রাজকুমারের পরিবারের এক টাকাও দিতে হয়নি।

কেন সরকার এতগুলো টাকা দিল সে ব্যাপারে অবশ্য তিনি তার বইয়ে কিছু লেখেননি। মুখ্যমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা দুইবার মোবাইল ফোনে ভীরাপ্পানের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন।


১০৮ দিন বন্দি থেকে ২০০০ সালের ১৫ নভেম্বর রাজকুমার অক্ষত অবস্থায় মুক্তি পান। এই ১০৮ দিন আসলে কী হয়েছিল, তা রাজকুমার কখনোই বিস্তারিতভাবে বলেননি। তার মুক্তির পর একে প্রেসব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, ভীরাপ্পান তার সঙ্গে ইজ্জত দিয়ে কথা বলতেন। অসম্মান করেনি। সে বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াত। তবে রাজকুমার এও বলেন, এই সাড়ে তিন মাসে আসলে যা হয়েছে তা সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, ডেকান হেরাল্ড, দ্য হিন্দু।

লেখক : পলাশ সরকার

এখানে মন্তব্য করুন :