রবীন্দ্রনাথের জ্যামিতি ও অন্যান্য শিল্পপ্রসঙ্গ

রবীন্দ্রনাথের জ্যামিতি ও অন্যান্য শিল্পপ্রসঙ্গ

গত বইমেলায় গিয়ে প্রথম যে স্টলে ঢুকেছিলাম, সেটা ছিল বেঙ্গল পাবলিকেশনস এর। শুরুতেই  এই বইটি দৃষ্টি কেড়েছিল ।

আমি ছবি বুঝি না। আর সত্যি বলতে কী ভালো ছবিতো কখনো দেখিওনি। যা দেখেছি ঢাকাতে জাদুঘরে,  যদিও বোঝার বয়স ছিল না। 

তাই চিত্রকলার বইয়ের প্রতি আমার একটা আগ্রহ সবসময়ই আছে। আর চিত্রকলার বইগুলো খুব আকর্ষণীয় হয়, নানান ছবি দেওয়া থাকে ভাঁজে ভাঁজে।

এই বইটাও সেরকমই। চমৎকার প্রচ্ছদ, বাঁধাই, পাতা এত মনোমুগ্ধকর যে আমি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেছি পড়ার সময়৷

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখা কোনো বই আমি আগে পড়িনি। এত মেদহীন এবং মৌলিক লেখনী তাঁর! আগে জানলে নিশ্চয়ই আরো আগে পড়তাম। নানান বিষয়ে জ্ঞানের ছটাও বইটিকে নিয়ে গেছে এক অন্য মাত্রায়।

রবীন্দ্রনাথের ছবি, ছবির পেছনের ভাবনা, ব্যবহৃত রঙের অর্থ দিয়ে শুরু হওয়া বইটি শেষ হয়েছে রিকশাচিত্রশিল্পের মুগ্ধতায়।

নানাবিধ বিষয় নিয়ে আলোকপাত আছে। রবিঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ, যামিনী রায়,  রবি বর্মা, জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, এস এম সুলতান, উইলিয়াম ব্লেইক, ফ্রান্সিস বেকন সকলেই উঠে এসেছেন বইয়ের পাতায় পাতায়। এছাড়াও এসেছে নন্দনতত্ত্ব, বাস্তববাদ এবং পরাবাস্তববাদের মতো চিত্রকলার জন্য অপরিহার্য বিষয়সমূহ।

মোট ২৩টি অধ্যায়ে প্রায় সমগ্র চিত্রকলার সারমর্ম আলোচিত হয়েছে বইটিতে ৷ রবীন্দ্রনাথ এর জ্যামিতি, রেখা ও রং এবং রবীন্দ্রনাথের আত্মপ্রতিকৃতি বিষয়ক চিত্রকর্ম, সেগুলোর পেছনের ভাবনা, সূক্ষ্মতা আলোচিত হয়েছে প্রথম তিনটি অধ্যায়ে।

এরপর এসেছে আরেক গুণী শিল্পী গগনেন্দ্রনাথের ছবির কথা। যামিনী রায় ও তাঁর চিত্রকলা অধ্যায়টি একটু বিশেষ মনোযোগ দিয়ে পড়েছি আমি।

কারণ, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে যামিনী রায়ের পেইন্টিং দেখে একটু বেশি আগ্রহী ছিলাম তাঁকে নিয়ে৷ রাজা রবি বর্মাকে নিয়ে এই প্রথম একটু বিস্তৃতভাবে পড়লাম।

এরপরের দুটো অধ্যায়ে আমাদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ছবিতে মানুষ, সমাজ এবং চিত্রকলায় বাস্তবতা আলোচিত হয়েছে।

কামরুল হাসান, এস এম সুলতানকে নিয়ে রয়েছে দুটো মননশীল প্রবন্ধ। উইলিয়াম ব্লেইক এবং এস এম সুলতানের প্রায় তুলনামূলক একটি আলোচনা রয়েছে। পাশ্চাত্য শিল্পকলা এবং ফ্রান্সিস বেকনের ছবি সম্পর্কেও আলোকপাত করেছেন লেখক।

এছাড়াও বাংলাদেশের চিত্রকলা, সার্ক চিত্রকলা উৎসব, এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী প্রভৃতি নানাবিধ বিষয়ে লেখকের নিজস্ব ভাবনা, দেশীয় পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠানগুলোর তাৎপর্য আলোচনা করেছেন হৃদয়গ্রাহীভাবে। চিত্রকলার নানান অপরিহার্য বিষয় যেমন উত্তর আধুনিকতা, পরাবাস্তববাদ, নন্দনতত্ত্ব প্রসঙ্গেও অবতারণা আছে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে শেষ অধ্যায়টি, রিকশা চিত্রশিল্প । বাংলাদেশের একটি অভিনব শিল্প, কিন্তু অবহেলিত। সেটি নিয়ে খুব সুন্দর একটি আলোচনা রয়েছে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

এই একটা বই পড়লেই আধুনিক চিত্রকলা সম্পর্কে অনেকখানি জেনে নেওয়া যাবে। তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিষয়গুলো লেখক তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ভাস্বর করে তুলেছেন।

সাহিত্য এবং চিত্রশিল্পের মধ্যে একটা আন্তরিক সম্পর্ক বিদ্যমান৷ চিত্র বুঝতে হলে সেই সময়ের সাহিত্য বোঝাও আবশ্যক। অনেক শিল্পীরা আবার দুইদিকেই ছিলেন সিদ্ধহস্ত। যাঁরা আমার মতোই সাহিত্য এবং চিত্র নিয়ে উৎসাহী তাঁদের মনের খোরাক মেটাতে পারবে এই বইটি কারণ সাহিত্য এবং চিত্রকে লেখক হাতে হাত ধরে উপস্থাপন করেছেন বইটিতে। মননশীল এই প্রবন্ধ সংকলনটি পড়লে এই স্তব্ধ দিনগুলোর গুটিকয়েক  একটু ভালো কাটবে বলেই আমার বিশ্বাস।

লেখক : শতাব্দী ভট্টাচার্য্য, এম বি বি এস, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।

 

এখানে মন্তব্য করুন :