যে দশটি সিনেমা সাংবাদিকদের অবশ‌্যই দেখা উচিত

যে দশটি সিনেমা সাংবাদিকদের অবশ‌্যই দেখা উচিত

 

গণমাধ‌্যমের অন‌্যতম জনপ্রিয় দুটি মাধ‌্যম সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র। এই দুটির একটির সাথে আরেকটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সিনেমা যেমন সাংবাদের উপাদান হয়ে উঠে এসেছে খবরে বা ফিচারে, তেমনি সাংবাদিকতাকে উপজীব‌্য করে নানা সময়ে হয়েছে চলচ্চিত্র।  

এখানে আমরা সাংবাদিকতার উপর নির্মিত চলচ্চিত্র থেকে হলিউডের শ্রেষ্ঠ ১০টি চলচ্চিত্রকে বাছাই করার চেষ্টা করেছি। পৃথিবীর সবপ্রান্তের সাংবাদিকরা, যারা এ পেশাকে ভালোবোসেন, নতুন কিছু শেখার জন‌্য কিংবা অনুপ্রেরণা পাওয়ার জন‌্য এক মুহুর্ত দেরি না  করে দেখে নিতে পারেন চলচ্চিত্রগুলো।

অল দ্য প্রেসিডেন্টস ম্যান (১৯৭৬) 

১৯৭২ সালে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হেডকোয়ার্টারে দুর্বৃত্ত সন্দেহে ধরা পরে কিছু অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। এই অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে তদন্ত করার ভার পরে ওয়াশিংটন পোস্টের দুই সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড ও কার্ল বার্নস্টেইনের উপর।

একটি রহস্যময় সূত্রের সহায়তায় এই দুই রিপোর্টার অনুপ্রবেশকারীদের সাথে হোয়াইট হাউজের কিছু কর্মকর্তার সংযোগ খুঁজে পান। নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এই সাংবাদিক জুটি তাদের অনুসন্ধান চালিয়ে যায়, যা তাদের মুখোমুখি করে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বোচ্চ পদধারীর সাথে।  

কুখ্যাত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে নির্মিত অল দ্য প্রেসিডেন্টস ম্যান-কে একরকম সার্বজনীনভাবেই ধরা হয় সাংবাদিকতার উপর নির্মিত সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে। অ্যালান জে পাকুলা পরিচালিত এই ছবিটি ৮ বিভাবে মনোনয়ন সহ মোট ৪টি বিভাবে অস্কার জিতে নেয়। 

নেটওয়ার্ক (১৯৭৬)

রেটিং কমতে থাকায় বর্ষীয়ান সংবাদ-পাঠক হাওয়ার্ড বিলকে চাকরীচ্যুত করে টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ইউবিএস। ক্ষিপ্ত বিল টিভি পর্যায় এসে ঘোষণা দেয় সে তার নিউজ শোতে  লাইভে এসে আত্মহত্যা করবে। কিন্তু তার আত্মহত্যা আর করা হয় না। বরং নিউজ শোতে এসে করা তার অর্থহীন চিৎকার চেঁচামেচির পর দেখা যায় তার শো-এর রেটিং হুট করে বেড়ে গিয়েছে। যার ফলে তার চাকরি পুনর্বহাল করে কর্তৃপক্ষ। রেটিং এর স্বার্থে করা চেঁচামেচি বিলকে রাতারাতি আইকন বানিয়ে দেয়। 

টেলিভিশন নিউজকে ব্যাঙ্গ করে ১৯৭৬ সালে নির্মিত এই স্যাটায়ারটি আজকের দিনেও বেশ প্রাসঙ্গিক। সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতাকে ছাপিয়ে টিভি সংবাদ কিভাবে ক্ষোভ ও মেরুপ্রবণ হচ্ছে তার উজ্জ্বল নির্দেশক এই ছবি। সিডনি লুমেট পরিচালিত এই ছবিটি মোট ৪টি বিভাগে অস্কার ঘরে তুলেছিল।   

রেডস (১৯৮১)

বলশেভিক বিপ্লবের উপর রিপোর্ট করার জন্য রাশিয়ায় যান আমেরিকান সাংবাদিক জন রিড। বলশেভিক বিপ্লব সম্পর্কে সব জানার পর এই বিপ্লব স্পর্শ করে রিডকেও। পুরোদস্তুর বিপ্লবী হয়ে তিনি রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেন। দেশে এসে তিনি খুঁজে বের করেন আরেক নারীবাদী বিপ্লবী লুইস ব্র্যান্টকে। একসাথে তারা স্বপ্ন দেখতে থাকেন কিভাবে বলশেভিক বিপ্লবের আদর্শ ও ভাববাদ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা যায়। 

সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি ১৯৮২ সালে ৩টি বিভাবে অস্কার জিতে নেয়। ছবির প্রধান প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে ওয়ারেন বেটি, জ্যাক নিকলসন ও ডায়ান কিটোন। জন রিডের চরিত্রে অভিনয় করা ওয়ারেন বেটি ছবিটি পরিচালনাও করেছেন, এবং দুর্দান্ত পরিচালনার জন্য সেরা পরিচালক হিসেবে অস্কারও জিতেছেন সেই বছর।   

কিলিং ফিল্ডস (১৯৮৪)

নিউ ইয়র্ক টাইমসের খ্যাতনামা রিপোর্টার সিডনি শনবার্গের কম্বোডিয়ান গৃহযুদ্ধ কভার করার অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত হয়েছে এই ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রটি। এই গৃহযুদ্ধ কভার করার সময় তার সঙ্গী ছিলেন আমেরিকান চিত্র সাংবাদিক এল রকঅফ ও স্থানীয় দোভাষী ডিথ প্রান। 

যুদ্ধের নির্মমতা ও সর্বগ্রাসী রূপ যেমন ফুটে উঠেছে এই ছবিতে, তেমনি ফুটে উঠেছে এইরকম ভয়াবহ সময়ে একজন সাংবাদিকের কর্তব্য পালন করা কতটা কঠিন এবং একইসাথে জরুরী সেই বিষয়টি। 

১৯৮৪ সালে নির্মিত ছবিটিকে দেখা হয় একটি অলটাইম ক্লাসিক হিসেবে। ৭টি বিভাগে মনোনীত এবং ৩টি বিভাবে অস্কার জেতা এই ছবিটি পরিচালনা করেছেন ফরাসি নির্মাতা রোলান জফি। 

ব্রডকাস্ট নিউজ (১৯৮৭)

নেটওয়ার্ক – এর মতো এটিও একটি বুদ্ধিদীপ্ত স্যাটায়ার। একটি নেটওয়ার্ক টিভির সংবাদ প্রযোজক জেইন ক্রেইগ তরুণ রিপোর্টার টম গ্রুনিকের উপর দুর্বল হয়ে পড়ে। যেখানে এই দুইজনে মিলে ইতিমধ্যে একটি অদ্ভুত ও হাস্যকর রসায়ন গড়ে তুলছে, এরমধ্যে অবস্থা আরও গুরুতর করতে জেইনের বেস্টফ্রেন্ড, একই নেটওয়ার্কের সংবাদদাতা অ্যারন অল্টম্যান জানায় জেইনের প্রতি তারও গোপন দুর্বলতা রয়েছে। 

খাতায় কলমে বাংলা সিনেমার ত্রিভুজ প্রেম-এর কাহিনীর মতো শুনালেও এই হাস্যরসাত্মক স্যাটায়ারটিকে দেখা হয় বাস্তব নেটওয়ার্ক টিভির সবচেয়ে নিখুঁত উপস্থাপনা হিসেবে। হলি হান্টার অভিনীত জেইন চরিত্রটিকে বিবেচনা করা হয় বড় পর্দার সবচেয়ে সমৃদ্ধ চরিত্রগুলোর একটি হিসেবে। বলা হয়ে থাকে খ্যাতনামা মার্কিন নেটওয়ার্ক টিভি সিবিএস নিউজের বর্তমান প্রেসিডেন্ট সুজান জিরেনস্কির প্রথম জীবনের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই লেখা হয়েছিল জেইন চরিত্রটিকে।  

৭ বিভাবে অস্কার মনোনীত এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন খ্যাতনামা পরিচালক জেমস এল ব্রুকস।  

দ্য ইনসাইডার (১৯৯৯)

এক প্রতাপশালী টোবাকো কোম্পানিতে রিসার্চ কেমিস্ট হিসেবে কাজ করা জেফ্রি উইগান্ড একদিন ঘটনাক্রমে জানতে পারেন সিগারেটের সাথে ক্ষতিকর পদার্থ মেশাচ্ছে তার কোম্পানি। এবং এই দুষ্টচক্রের সাথে যুক্ত আছে আরও বেশ কিছু সিগারেট কোম্পানি। উইগান্ডের সাথে পেশাদারী সম্পর্ক ছিল অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ভিত্তিক জনপ্রিয় মার্কিন টেলিভিশন শো সিক্সটি মিনিটস এর প্রযোজক লাওয়েল বার্গম্যানের। বার্গম্যান প্রথম সন্দেহ করেন উইগান্ডের কাছে গোপন কোন তথ্য আছে। এবং অনেক বাগবণিতার পর একসময় তাকে রাজি করান এই তথ্য প্রকাশ করার জন্য। 

সিক্সটি মিনিটসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দুষ্টচক্রের চক্রান্ত ফাঁস করেন উইগান্ড। কিন্তু তা করতে গিয়ে বড় বড় কর্পোরেশনের রোষানলে পড়তে হয় উইগান্ড ও বার্গম্যানের। একটি অপ্রিয় সত্য ফাঁস করতে গিয়ে যে ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এই দুই ব্যক্তির তা নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘দ্য ইনসাইডার’। 

ছবিতে  জেফ্রি উইগান্ড ও লাওয়েল বার্গম্যান চরিত্রে অভিনয় করেছেন দুই বিখ্যাত হলিউড অভিনেতা রাসেল ক্রো ও আল পাচিনো। ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া মাইকেল মান পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি অস্কারে মোট ৭টি বিভাগে মনোনীত হয়েছিল। 

লাইভ ফ্রম বাগদাদ (২০০২)

নব্বইয়ের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ কিভাবে সিএনএন সম্প্রচার করেছে তার উপর ভিত্তি করে মূলত নির্মিত হয়েছে এই চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রে মাইকেল কিটোন অভিনয় করেছেন সিএনএন-এর অন-লোকেশন প্রযোজক রবার্ট উইনারের ভূমিকায়।

অ্যাকশন-ড্রামা ঘরানার এই ছবিটি মূলত যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ সম্প্রচারের দিকে আলোকপাত করেছে। বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে ফুটে উঠেছে যুদ্ধাবস্থায়ও ২৪ ঘণ্টা সাংবাদিকতার গুরুত্ব। এছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তাও ফুটে উঠেছে এই ছবিটিতে। 

জোডিয়াক (২০০৭)

ষাট ও সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্র্যান্সিসকোতে একজন রহস্যময় সিরিয়াল কিলারের উত্থান ঘটে। যে পুলিশকে চিঠি, রক্তভেজা কাপড় আর পত্রিকা অফিসে ধাঁধা পাঠিয়ে বিদ্রুপ করতো। এই সিরিয়াল কিলার নিজেই নিজেকে জোডিয়াক বলে আখ্যায়িত করে। বিখ্যাত জোডিয়াক কিলারকে খুঁজে বের করতে পুলিশ ও সাংবাদিকদের তদন্ত-কাজের উপর ভিত্তি করে এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন কিংবদন্তী পরিচালক ডেভিড ফিঞ্চার। 

জোডিয়াক রহস্য তদন্তে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন কার্টুনিস্ট, অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক রবার্ট গ্রেস্মিথ। একই নামে তার রচিত একটি বইয়ের উপর ভিত্তি করেই মূলত নির্মিত হয়েছে এই ছবিটি। ছবিতে রবার্ট গ্রেস্মিথের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জ্যাক ইলেনহল। এছাড়া ছবিতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, মার্ক রাফেলো ও এন্থনি এডওয়ার্ডস। 

স্পটলাইট (২০১৫)

২০০১ সালে আমেরিকান পত্রিকা বোস্টন গ্লোবের নবনিযুক্ত সম্পাদক মার্টি ব্যারন জানতে পারেন, একজন খ্রিস্টান পুরোহিতের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার শিশু নিপীড়নের অভিযোগ উঠলেও এ ব্যাপারে কোন বিস্তারিত তদন্ত করে নি কেউ। পুলিশ বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে, সাংবাদিক ও আইনজীবীরাও এ ব্যাপারে ঘাটাতে যায় নি।

ব্যারন  তার পত্রিকার একদল সাংবাদিককে দায়িত্ব দেয় এই ব্যাপারে বিস্তারিত তদন্ত করার জন্য। একজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে কেন্দ্র করে তদন্ত শুরু করলেও দ্রুতই ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসে। বোস্টন গ্লোবের সেই অনুসন্ধানী রিপোর্ট এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে এটা প্রকাশ করা অনেকটা ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার শামিল হয়ে পড়ে। 

সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে দুর্দান্ত সাংবাদিকতা বিষয়ক চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। মোট ৭টি বিভাবে অস্কার মনোনীত এই চলচ্চিত্রটি ২০১৬ সালের আসরে সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা চিত্রনাট্যের সম্মান ঘরে তুলে নেয়।   

দ্য পোস্ট (২০১৭)

কিংবদন্তী পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘দ্য পোস্ট’ নি ক্সন সরকারের দুর্নীতি-বিষয়ক গোপন নথী প্রকাশে ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের যে পাহারসম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে, তা কেন্দ্র করে নির্মিত। 

এই ছবি দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন একটি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমকে প্রতিনিয়ত কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে হয় একটি দুর্নীতিগ্রস্থ সরকারযন্ত্রের সাথে লড়তে। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে বাক-স্বাধীনতার ভূমিকা কেন সবচেয়ে বেশি তা-ও বুঝতে পারবেন এই ছবিটি দেখলে। 

অস্কার মনোনীত এই চলচ্চিত্রের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন টম হ্যাংক্স, মেরিল স্ট্রিপ, সারাহ পলসন এবং আরও অনেকে।

লেখক:  কিরো আদনান আহমেদ, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

এখানে মন্তব্য করুন :