যেসব লক্ষণ ভ্যাকসিনের ‘ওয়েলকাম সাইন’ হিসেবে দেখছেন ফাউচি

যেসব  লক্ষণ  ভ্যাকসিনের ‘ওয়েলকাম  সাইন’ হিসেবে দেখছেন  ফাউচি

এন্থনি ফাউচি । ছবি : লাইফঅনলাইন ডটকম

করোনার ভ্যাকসিন কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে দেশে দেশে চলছে আলোচনা। অন্যদিকে ভ্যাকসিন শরীরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে তা নিয়ে সংশয় ও শঙ্কা কাজ করছে মানুষের মধ্যে।
এমনটা শুধু অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশেই নয়, ইউরোপ-আমেরিকাতেও এ নিয়ে মানুষের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। একেক দেশ একেক প্রতিষ্ঠানের টিকা প্রয়োগ করছে। টিকার উৎপাদন প্রণালী ভিন্ন, এগুলোর কার্যকারিতার হারেও তারতম্য রয়েছে।

স্বাস্থ্যকর্মী ও গবেষকরা ভ্যাকসিন নিয়ে সাধারণ মানুষের ভয়ভীতি ভাঙার ব্যাপারে সচেষ্ট। তারা বলছেন, ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর যে প্রতিক্রিয়া হয়, তা খুবই সাধারণ থেকে মাঝারি ধরনের। ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার অর্থ হলো ভ্যাকসিন সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে।

এ প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউজের প্রধান করোনা ভাইরাস বিষয়ক উপদেষ্টা এন্থনি ফাউচির বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। গেল বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণ যখন চূড়ায়, ঠান্ডা মাথায় রাতদিন খেটে তিনি পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করেছেন।

করোনা ভাইরাস

সম্প্রতি এমএসএনবিসি এর সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ভ্যাকসিন নেওয়ার পর দুটি প্রতিক্রিয়াকে তিনি ‘ওয়েলকাম সাইন’ হিসেবে দেখেন। যার অর্থ ভ্যাকসিন কাজ শুরু করেছে।

ফাউচি বলেন, ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ধাপের টিকা নেওয়ার পর তার বেশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। গত ২১ জানুয়ারি তিনি জানান, নির্ধারিত তারিখের দুই দিন আগে তিনি দ্বিতীয় ডোজের টিকা নেন।
তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আমার তেমন কিছু হবে না। টিকা নেওয়ার পর সামান্য ব্যথা ও শীত শীত বোধ হচ্ছিল। কিন্তু এর মানে এই নয়, ভ্যাকসিন নিয়ে আমি অসুস্থ হয়ে গেছি। ’

এন্থনি ফাউচি মর্ডানার প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছিলেন গত ২২ ডিসেম্বর। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, তার সামান্য ব্যথা লেগেছিল বাহুতে। তিনি বলেন, ‘টিকা নেওয়ার ৬ থেকে ১০ ঘন্টার মধ্যে আমার বাহুতে সামান্য ব্যথা বোধ করেছিলাম। কিন্তু সেটা ২৪ ঘণ্টা বা তারও কিছু বেশি সময় ছিল। পরে সেই ব্যথা একেবারেই চলে গেছে।’

আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বলেছে, সাধারণত এ ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কিন্তু এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই।
বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা যারা টিকা নিয়েছেন তারাও মানুষের উদ্বেগ কমাতে, তাদের নিজেদের যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা শেয়ার করছেন। অন্যদিকে ভ্যাকসিন উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

আমেরিকার ফুড ও ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) জানিয়েছে, দ্বিতীয় ডোজের টিকা নেওয়ার পর কিছু তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফাইজার ও মর্ডানার দ্বিতীয় ডোজের টিকা নেওয়ার পর অনেকে শরীরে প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার কথা জানান।

কক্সহেলথের সংক্রমক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রবিন ট্রটম্যান বলেন, এই শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত। কারণ, দ্বিতীয় ডোজের টিকা মানবশরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর কাজ করে থাকে।

এ কারণে সিডিসি বলেছে, ভ্যাকসিনের যে কোনো ডোজ নেওয়ার পর দুই তিন ধরনেরও প্রতিক্রিয়া হতে পারে । শরীরের যে স্থানে টিকা নেওয়া হয় অর্থাৎ বাহুতে কিছুটা ব্যথা বা জ্বলুনি হতে পারে। সেখান থেকে সারা শরীরেও ব্যথা অনুভব হতে পারে।

এছাড়া কারো কারো সামান্য জ্বর, শীত শীত অনুভব, ক্লান্তি ও মাথা ব্যথা হতে পারে। তবে এই ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বড়জোর দুই একদিন থাকতে পারে। টিকা নেওয়ার জায়গাটিতে লাল হওয়া বাড়লে কিংবা পার্শপ্রতিক্রিয়াগুলো কয়েকদিনেও না সারলে সে ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

সিডিসির তথ্যমতে, ফাইজার ও মর্ডানার দুটি ভ্যাকসিন এই মুহূর্তে আমেরিকায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই দুই ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে গ্রহণকারীর শরীরে নিষ্ক্রিয় ভাইরাস প্রবেশ করানো হয় না। বরং, মানুষের শরীরের ভেতরের কোষগুলোকে করোনা ভাইরাসের কিছু বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করতে শেখায়।

যাতে পরবর্তীতে আমাদের ইমিউন সিস্টেম করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ার ব্যাপারে প্রশিক্ষিত হয়।
মূলত, এ ধরনের ভ্যাকসিন মানবশরীরে প্রবেশের পর আমাদের নিজস্ব কোষকে একটি নতুন নির্দেশনা দেয়। করোনা ভাইরাসের বাইরের দিকে যে স্পাইক প্রোটিনের দেওয়াল আছে, সে রকম স্পাইক প্রোটিন যেন আমাদের শরীর তৈরি করে।


আমাদের কোষ যত বেশি স্পাইক প্রোটিন তৈরি করবে, আমাদের ইমিউন সিস্টেম বুঝতে সক্ষম হবে, করোনার দেহে যে প্রোটিন রয়েছে, তা আমাদের নিজস্ব নয় এবং এগুলোর আমাদের দেহের ভেতরে থাকার কথা না। সঙ্গে সঙ্গে রোধপ্রতিরোধ ক্ষমতা এন্টিবডি তৈরি করে সাড়া দেওয়া শুরু করে । তাই কারো শরীরে জ্বর বা ব্যথা যদি অনুভব হয়, আতংকগ্রস্ত না হয়ে ধরে নিতে হবে ঝুঁকি সনাক্ত করে এর বিরুদ্ধে কামান দাগছে আমাদের শরীর ।

সাধারণত যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় :


টিকা নেওয়ার স্থানে ব্যথা

মর্ডানার যারা টিকা নিয়েছেন তাদের বেশিরভাগই বলেছেন টিকা নেওয়ার স্থানে ব্যথা করছে। টিকা গ্রহীতাদের ৯২ শতাংশ মানুষের এমনটা হয়েছে।

ক্লান্তিবোধ

টিকা নেওয়ার পর কারো যদি তীব্র ক্লান্তিবোধ হয়, ভাববার কোনো কারণ নেই। কারণ এমনটা বহু মানুষেরই হয়ে থাকে। মর্ডানার টিকা নেওয়ার পর প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রহীতার এমন ক্লান্তি লেগেছিল।


হাড়ের সন্ধিস্থলে ব্যথা

মর্ডানার টিকা নেওয়ার পর ৪৬ শতাংশ গ্রাহক জানিয়েছেন টিকা নেওয়ার কয়েক ঘন্টা পর বা একদিন পর হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা অনুভব করছেন।


মাথাব্যথা

হাড়ের জোড়ায় ব্যথার চেয়েও বেশি মানুষের মধ্যে যেটি দেখা গেছে তা হলো মাথাব্যথা। মর্ডানার টিকা নেওয়ার পর ৬৪ শতাংশ গ্রাহক জানিয়েছেন তাদের মাথাব্যথা করছে। জার্নাল অব ভাইরোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, ব্যথারোধে আগেই ব্যথানাশক সেবন করলে, টিকার কার্যকারিতা হ্রাস পাবে।

এখানে মন্তব্য করুন :