যেভাবে প্রতিভাবান ফুটবলারের খনিতে রূপান্তরিত হল ফ্রান্স

যেভাবে প্রতিভাবান ফুটবলারের খনিতে রূপান্তরিত হল ফ্রান্স

গত বিশ্বকাপে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল ফ্রান্স। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস যেমন নজর কেড়েছে, তেমনি নজর কেড়েছে ফরাসি দলে বহু বর্ণের মিশ্রণ। বিশেষ করে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন।

কিন্তু আপনি যদি এই কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারদের ইতিহাস দেখেন, দেখবেন তাদের সবারই জন্ম ফ্রান্সে এবং ফ্রেঞ্চ ফেডারেশনের সকার সিস্টেম থেকেই বেরিয়ে এসেছে এমবাপে-কান্তে-পগবারা।

শুধু এবারের বিশ্বকাপজয়ীরাই নন,  গত বিশ-পঁচিশ বছর ধরেই বিশ্ব ফুটবলে প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে আসছেন ফরাসি ফুটবলাররা। ফ্রান্স ছাড়িয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জার্সি গায়েও আলো ছড়িয়েছেন তারা।

এই উত্থানের পেছনের কাহিনী কি? কেন হঠাৎ করে ফ্রান্স প্রতিভাবান জন্মানোর উত্তম স্থানে রূপান্তরিত হয়েছে? তারই উত্তর খোঁজার প্রয়াস এই লেখায়।

ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফা খেলোয়াড়দের কোনো দেশের সাথে ন্যূনতম যোগাযোগ থাকলেই তাদের সে দেশের হয়ে খেলার অনুমোদন দেয়। অর্থাৎ কারো বাবা-মা কিংবা দাদা-নানা যে দেশে জন্মেছেন তিনি চাইলে সেই দেশের হয়েও খেলতে পারবেন।

 গত বিশ্বকাপে সর্বমোট ৮২ জন ফুটবলার অংশগ্রহণ করেছে যাদের জন্ম যে দেশের জার্সি গায়ে তারা মাঠে নেমেছে সে দেশে নয়। কোন দেশ থেকে আসছেন তাহলে এত ফুটবলার? যদি আমরা ফুটবল মানচিত্রের দিকে তাকাই তাহলে একটা দেশকেই দেখবো পুরো বিশ্বে আলো ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। দেশটি ফ্রান্স।

২০১৮ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা সর্বমোট ৫০ জন ফুটবলারের জন্ম ফ্রান্সে। এদের মধ্যে ২১জন ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে খেলেছে, বাকি ২৯জন বিশ্বের অন্যান্য দলের হয়ে। এই তালিকায় দ্বিতীয় দেশটি ব্রাজিল। গত বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ২৮ জন ফুটবলারের (২৩ জন জাতীয় দলে, ৫ জন অন্যান্য দলে) জন্মদাত্রী ব্রাজিল কিন্তু ফ্রান্সের ধারেকাছেও নেই।

শুধু এই বিশ্বকাপেই না, গত চার আসর ধরেই ফ্রান্স থেকেই সর্বাধিকসংখ‌‌্যক খেলোয়াড় ও কোচ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে আসছে। এবং সংখ্যাটা প্রতি বিশ্বকাপেই বাড়ছে। ১৯৯৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জেতা ফ্রান্স কীভাবে হঠাৎ করেই বিশ্বফুটবলে প্রতিভার বিপ্লব ঘটাচ্ছে জানতে হলে আমাদের একটু ইতিহাসের পাতা থেকে ঘুরে আসতে হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষ হয়েছে, তখন ফ্রান্স বলতে গেলে পুরোপুরি বিধ্বস্ত এক দেশ। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ফরাসি সরকার দেশ পুনর্গঠনে হাত দেয়। দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার উপনিবেশগুলো থেকে শ্রমিক নিয়োগ নিতে শুরু করে তারা।

এই শ্রমিকরাই চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশক জুড়ে ফরাসি সরকারের দেশ পুনর্নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এই সময়ে ফ্রান্স প্রায় ২৭ লক্ষ অভিবাসী গ্রহণ করে যা ইউরোপের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি।

ষাটের দশক ও সত্তরের দশকের শুরুতে ফ্রান্সের অর্থনীতি বেশ চাঙা হয়ে উঠে। সাথে সাথে আবারো ফ্রান্সজুড়ে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। ফলে ফ্রান্স আরেক দফায় অভিবাসী গ্রহণ শুরু করে। এবার অভিবাসীদের প্রায় সবাই আসে আফ্রিকা, ক্যারিবীয় ও আরবে অবস্থিত ফরাসি উপনিবেশগুলো থেকে।

যেহেতু শহর গড়ার জন্যই অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ তাই এই অভিবাসীদের অধিকাংশেরই জায়গা হয় প্যারিস, মার্শেই, লিওঁর মতো প্রধান শহরগুলোর পাশে থাকা আবাসিক এলাকাগুলোতে।

শুধু শ্রমিক সংকট না, একই সময়ে ক্রীড়াখাতেও ফ্রান্স যাচ্ছিল ঘোর সংকটের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে ফুটবলের অন্ধকারতম সময় ছিল সেটি। ১৯৬০ থেকে ১৯৭৪ এর মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্স তিনটি বিশ্বকাপ এবং তিনটি ইউরোতে কোয়ালিফাই করতেই ব্যর্থ হয়। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশন তাদের কাঠামো সংস্কারে মনোযোগ দেয়।

প্রতিভা অন্বেষণের জন্য একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করে ফেডারেশন, যা ইউরোপের প্রথম অ্যাকাডেমি সিস্টেমগুলোর একটি। ১৯৭২ সালে ভিশিতে একটি জাতীয় ট্রেনিং সেন্টার খোলা হয়। চার বছর পর ফ্রেঞ্চ ফেডারেশন দেশের বড় বড় ক্লাবগুলোর সাথে এক হয়ে কাজ করা শুরু করে।

১৯৮৮ সালে ফেডারেশন এই ট্রেনিং সেন্টারকে নিয়ে যায় প্যারিসের দক্ষিণে অবস্থিত এক শহরতলীতে, যার নাম ক্লেয়ারফন্তেইন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই এই ফরাসি অ্যাকাডেমি বিশ্বের সেরা অ্যাকাডেমিগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

রাজধানীতে স্থানান্তরিত করার প্রায় সাথে সাথেই যেন এই অ্যাকাডেমির কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা রাতারাতি বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৮ বিশ্বকাপই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মত সোনালি ট্রফিতে হাত রাখে জিদানরা। এ জয় এক কথায় তাদের অনন্য সিস্টেমেরই জয়।

সাথে জয়ী হলো ফ্রান্সের বর্ণ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও। কারণ ‘৯৮-এর সেই বিশ্বকাপজয়ী ফরাসি দলের অনেক ফুটবলারই ছিল বিংশ শতাব্দীতে অভিবাসীদের সন্তান কিংবা সরাসরি অভিবাসী। জাতীয় দলের এই বৈচিত্র্যের জন্য তাদেরকে বলা হতো ব্ল্যাক-ব্লাঙ্ক-বিয়ার (BLACK-BLANC-BEUR), যার বাংলা করলে দাঁড়ায় কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ-আরব। এর দ্বারা ফ্রান্সের পতাকার তিন রঙকেও ইঙ্গিত করা হতো।

কিন্তু এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সবাই মেনে নিতে পারেনি।  দলে অভিবাসী অশ্বেতাঙ্গদের আধিক্য খেপিয়ে দিয়েছিল উগ্রপন্থীদের। জাঁ মারি লে পেনের মত জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদরা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এ ব্যাপারে।

বর্তমানে জার্মান ফুটবলে যেমন বর্ণবাদের কালো ছায়া, বিশ বছর আগে ফ্রান্সের অবস্থাও অনেকটা এমনই ছিল। তবে ফ্রেঞ্চ ফুটবল ফেডারেশন কখনো কোন অন্তর্গত বর্ণবাদ বরদাস্ত করেনি। দেশব্যাপী বর্ণবাদী মন্তব্য উপেক্ষা করে ফ্রেঞ্চ ফেডারেশন দলে সমতা নীতি বজায় রেখেছে। যার ফলে অভিবাসীরা, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব ফুটবলাররাও শ্বেতাঙ্গদের মত সমান সুযোগ পেয়েছে।

ফলাফলটা আমাদের চোখের সামনেই। জিদান-অঁরি কিংবা এ যুগের পগবা-কান্তে, ফরাসি ফুটবলকে সবচেয়ে বেশি রাঙিয়েছে এর অভিবাসী সন্তানেরাই। এবং আমরা যদি তাদের শেকড়ের সন্ধানে যাই, দেখবো অধিকাংশই এসেছে একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে।

না, আফ্রিকার কোন দেশের নাম বলবো না। স্থানটি হচ্ছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস। ফ্রান্সে আসা শতকরা ৩৮ ভাগ অভিবাসীই স্থায়ী হয় বৃহত্তর প্যারিসে। প্যারিসের মূল শহরের চারপাশ ঘিরে রয়েছে একটি শহরতলী, যার নাম ব্যানলিঁও। মজার ব্যাপার হচ্ছে ফ্রেঞ্চ ব্যানলিঁও শব্দের আভিধানিক অর্থই হচ্ছে শহরতলী। আর এই শহরতলীতেই বসবাস অধিকাংশ অভিবাসীদের।

প্যারিসের চারপাশ ঘিরে থাকলেও এই শহরতলীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা প্যারিস থেকে ঠিক উল্টো। অভিবাসীদের আধিক্য থাকার কারণে জায়গাটি এমনিতেই অনগ্রসর। সারাবছর গণ্ডগোল লেগেই থাকে। এখানকার বেকারত্ব, অপরাধ ও দারিদ্র্যতার হারও বেশি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে ফ্রান্সের সবচেয়ে প্রতিভাবান ফুটবলারদের অনেকেই উঠে এসেছে এই ব্যানলিঁও থেকে।

 কেন বলতে পারবেন? কারণ, এখানেই ফ্রান্সের ফুটবল কাঠামো মিলিত হয়েছে এর অভিবাসী গোষ্ঠীর সাথে। আর এই কারণেই প্যারিস ফুটবল বিশ্বের সেরা ট্যালেন্ট পুল। তাই ফরাসি লীগ (লীগ ওয়ান) তেমন নামকরা লীগ না হওয়া সত্ত্বেও ফ্রান্স থেকে আজ উঠে আসছে রোমাঞ্চকর সব ফুটবল প্রতিভারা। কেননা ট্রেনিং সেন্টার ক্লেয়ারফন্তেইনে আসার পর থেকেই এখান থেকে বের হতে থাকে প্রতিভার খনি।

২০০২ সাল থেকেই বিশ্বকাপে খেলা প্যারিসিয়ান ফুটবলারের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। ২০১৮ বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলারদের মধ্যে মোট ১৮ জনের জন্ম বৃহত্তর প্যারিসে। আর ফ্রান্সের জাতীয় দলেরই ৮ জন ফুটবলার এসেছে ব্যানলিঁও থেকে। এদের মধ্যে আছে ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় বালক কিলিয়ান এমবাপ।

আলজেরীয় মা ও ক্যামেরুনেয়ীয় বাবার ঘরে জন্ম নেয়া এমবাপে বেড়ে উঠেছে ‘বন্ডি’ নামে প্যারিসের এক মফস্বলে। এবং বলাই বাহুল্য, এই বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের ট্রফি জেতা এই ফুটবল প্রতিভাও ফরাসি সিস্টেম ক্লেয়ারফন্তেইনের আরেকটি প্রোডাক্ট।

শুধু ফ্রান্স না, বিগত বছরগুলোতে মরক্কো, আলজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, পর্তুগাল, ক্যামেরুন, টোগোর মত বিভিন্ন দেশের জার্সি গায়ে দেখা গিয়েছে প্যারিসে জন্ম নেয়া ফুটবলারদের। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ফ্রান্সের অনুরোধেই ফিফা ২০১০ সালে তাদের খেলোয়াড় মাইগ্রেশন নীতি শিথিল করে। যার ফলে এতো এতো ফরাসি খেলোয়াড় আজকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছে।

এ বছর সেনেগালের হয়ে ৪জন খেলেছে যাদের জন্ম বৃহত্তর প্যারিসে। সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল গত বিশ্বকাপে। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে অংশ নেয়া আলজেরিয়া সদস্য ২৩ জনের মধ্যে ১৫ জনেরই জন্মস্থান ফ্রান্স।

কেন ফ্রান্স ফুটবল বিশ্বের অন্য যেকোনো জাতির তুলনায় অনন্য বুঝতে পারছেন তো? একটি স্বীকৃত একাডেমী সিস্টেম ও তার স্বতন্ত্র অভিবাসন নীতির জন্যই ফ্রান্স আজ অনন্য। যার সুফল শুধু এখন ফ্রান্স একা ভোগ করছে না, ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো ফুটবল বিশ্বে।

দলে আফ্রিকান খেলোয়াড়দের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখে আপনি ভ্রু কুঁচকাতে পারেন, কিন্তু আপনাকে মনে রাখতে হবে এই খেলোয়াড়দের সবাই গড়ে উঠেছে ফ্রান্সের সকার সিস্টেমের মধ্য দিয়েই। ক্যামেরুন কিংবা আলজেরিয়ায় থাকলে কিলিয়ান এমবাপে আজকের এমবাপে হয়ে উঠতেন কি-না সন্দেহ আছে।

চিন্তা করে দেখুন, ফ্রান্সকে যে কারণে কটাক্ষ করা হচ্ছে, তারা কিন্তু করছে তার উল্টো। আমরা বলছি ফ্রান্সের দল গড়ে উঠেছে তাদের উপনিবেশ থেকে ধার করে। কিন্তু বাস্তবে যেটা হচ্ছে, ফ্রান্স তাদের অভিবাসীদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাচ্ছে তাদের অনন্য সকার সিস্টেমের মাধ্যমে এবং তার ফল ভোগ করতে দিচ্ছে পুরো বিশ্বকে। ওইসব অভিবাসী সন্তানরা অনেকেই দক্ষ ফুটবলারে রূপান্তরিত হয়ে তাদের পূর্বসূরিদের দেশে ফেরত যাচ্ছে, তার পূর্বসূরিরা সে দেশে থেকে গেলে তা হয়তো কখনোই সম্ভব হতো না।

লেখক:  কিরো আদনান আহমেদ, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

এখানে মন্তব্য করুন :