যুদ্ধ দিনের স্মৃতি

যুদ্ধ দিনের স্মৃতি

বাঙিকে কোন কোন অঞ্চলে ফুটি বলে। এটাকে কেন ফুটি বলে জানি না, পাকলে ফেটে ফেটে যায় তাই কিনা। বসুন্ধরা আসার পর আমার মেজ বোন রেখার ছাদ বাগানের বাঙি খেয়েছি। এটা আমরা সাধারণত ঝোলা খেজুরের গুড় বা চিনি দিয়ে খাই। এই বাঙি খেতে খেতে মনে হলো যুদ্ধদিনের কথা, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যেন ঝাঁপি খুলে বসেছিল।

১৯৭১ এর মে-জুনের কথা, তখন আমরা পদ্মা পাড়ে কামারহাটে আমাদের দাদা বাড়িতে। সাথে আমাদের মেজ মামা, সেজ মামার পুরো পরিবার।

১৩ এপ্রিল পাবনা আক্রমনের পথে আতাইকুলা আমাদের নানা বাড়িতে পাক বাহিনী আগুন দেয়, তখন আমরা দাদা বাড়িতে চলে আসি।  কিছু দিন পর হঠাৎ নদী দিয়ে লঞ্চে করে মিলিটারির আগমন। আমরা সবাই তখন ঊর্দ্ধশ্বাসে নদীর উল্টো দিকে বিলের পথে দৌড়। বিলের মধ্যে আমার বাবার চাচাতো ভাইদের বাড়ি।

ভাদর হাট, হাটখালি ইউনিয়ন। বিলের মাঝে দ্বীপের মত, তাতে চাচাদের তিন ভাইয়ের তিনটে ঘর, চারিদিকে পানি। কোনমতে সবাই গিয়ে ওখানে আশ্রয় নিলাম। সকাল থেকে কারো খাওয়া হয়নি।  এমন সময় মেজ মামীর সহায়তাকারী জরিনা একটা গামছার পোটলা এনে বললো ” এটা রাঁধেন”।

গামছার মধ্যে কতগুলো খুদ, এগুলো ও রোজ চাল ঝেরে ঝেরে জমিয়েছে। সেই খুদ একটু হলুদ আর কাঁচা মরিচ দিয়ে রান্না হলো কোন রকমে, কারণ চুলা জ্বলতে চায় না, ভেতরে ভেজা। সবাই তা একটু আধটুকু মুখে দিয়ে আবার বিলের মধ্যে দিয়ে আতাইকুলার দিকে হাঁটা দিলাম।

আলোক চরে আমাদের জন্য একটা থাকবার জায়গা ঠিক করা হয়েছে, তার উদ্দ্যেশে যাত্রা। দুজন লোক ঠিক করা হলো আমাদের ট্রাঙ্ক, সুটকেসগুলো মাথায় করে এগিয়ে দেবার জন‌্য। এর আগে মামারা মাথায় করে এগুলো নিয়ে যাচ্ছিলেন। বিলের মধ্যে ভীষণ কাদা, সবাই খালি পায়ে হাঁটছে, সবার হাতেই একটা করে বোঝা।

জ্যোতি তখন অনেক ছোট ওর হাতে একটা হারিকেন, সে ওটা নিয়েই হাঁটছে। কিছু দূর গেলে আমার মেজমামা ওকে কাঁধে তুলে নিয়ে হাটঁতে লাগলেন। টুটুলের হাতে ট্রান্জিসটার, মিতার হাতে একটা গরম পানির ফ্লাস্ক।  রেখা, শিখা সবাই কিছু না কিছু নিয়ে হাঁটছে।

শোভন ও স্বাতীর বয়স তখন ৮-৯ মাস । ওদেরকেও কোলে নিয়ে হাঁটতে হচ্ছিল।  সবচেয়ে মজার ছিল, সবাই যেহেতু খালি পায়ে হাঁটছে, তাই সবার স্যান্ডেল একটা রশি দিয়ে মালার মতো গেঁথে একজনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কে যে ওটা বহন করেছিল, তা আর আজ এখন মনে নেই।

এর মধ্যে কাদার মধ্যে থাকা শামুক ভেঙে আমার পা কেটে গেল, কিছু করার নেই, ঐ অবস্থাতেই হাঁটা। বিলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি, কিভাবে যেন খবর ছড়িয়ে  যায়।

 হঠাৎ দেখি মায়ের মামাতো বোন জাহা খালা ( মনে হয় জাহানারার সংক্ষিপ্ত রূপ, আবুল হেসেন মামার বোন) পথ আগলে অপেক্ষা করছেন। তার বাড়িতে যেতে হবে, খেতে হবে, থাকতে হবে। হাত ধরে টানতে টানতে আমার মাকে নিয়ে গেলেন। অগত্যা আমরা তাদের পিছু পিছু। শেষে মেজ মামী বললেন “আমরা বাড়ি গিয়ে পৌঁছাই এভাবে আর পারা যাচ্ছে না, ভালোও লাগছে না, যা আছে দাও আমরা খেয়ে যাই”।

খালারা নিজেদের খাবার জন্য যে আটার রুটি করেছিলেন, সেটা মাঝে গুড় দিয়ে রোল করে সবার হাতে ধরিয়ে দিলেন, আমরা খেয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। খালু এসে জানালেন সামনের খালে অনেক পানি হেঁটে পার হওয়া যাবে না। তিনি নৌকা নিয়ে এসে ৩-৪ বারে আমাদের পার করে দিলেন। আবার শুরু হলো হাঁটা ।

সন্ধ্যা নাগাদ এক আত্মীয়ের বাড়িতে এসে পৌঁছালাম। ভীষণ ঝড় বৃষ্টি শুরু হলো। এর মধ্যেই বাড়ির পাশে একটা পুকুরে কোমর সমান পানি, আমরা বসে বসে ডুব দিয়ে গোসল করে আসলাম। উনারা অনেক কিছু রান্না করে আমাদের খাওয়ালেন।

আমরা সবাই অনেক ক্লান্ত, তাই কোনোরকমে নাকেমুখে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠে ফের আলোক চরের উদ্দেশ্য যাত্রা, উনারা কিছুতেই ছাড়বেন না, রান্না করে আমাদের খাইয়ে তবে ছাড়বেন।

এবারও যথারীতি মেজমামী উদ্ধার করলেন। খাটের নিচ থেকে আগের রাতে বেচে যাওয়া বিরাট এক গামলা ভাত বের করা হলো, পানি দিয়ে রাখা। বললেন ‘এই ভাত আমরা খেয়ে যাবো’। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ডাল দিয়ে পান্তা খেয়ে আমরা রওনা হলাম।

বেরিয়েই দেখি বাড়ির পাশে বাঙির ক্ষেত। বড় একটা বাঙি কিনে জরিনার গামছায় বেঁধে ওর হাতেই দেয়া হলো বইবার জন্য। বেশ কিছুটা পথ হাঁটবার পর শোভন, স্বাতি দুধ খাবে তাই বিলের মধ্যে একটা শুকনো জায়গা দেখে সব নামিয়ে আমরা একটু বসলাম। দুধ বানিয়ে দেওয়া হলো সুটকেসের উপর শুয়ে শোভন, স্বাতি দুধ খাচ্ছে।

এই ফাঁকে মেজমামা ছুরি দিয়ে লম্বা লম্বা করে বাঙিটা কেটে সবার হাতে এক ফালি এক ফালি ধরিয়ে দিলেন। চিনি, গুড় কিছু না, হাতে ধরে কামড়ে কামড়ে খাওয়া, নিমেষেই শেষ। মানুষ অনেক, সবাই ভাগেও পায়নি। এর মধ্যে দেখা গেল দূরে দুজন ঝাকা ভরে বাঙি নিয়ে যাচ্ছে, মেজ মামা এগিয়ে তাদের ডেকে বড় বড় দেখে আরো দুটো বাঙি কিনে আনলেন। সবাই মিলে যে কি তৃপ্তি করে খেলাম তা বলার নয়।

মনে হলো, ‘ ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’  আবার আমাদের সেই পথ চলা শুরু, কিন্তু সেই বাঙির স্বাদ এখনো আমার মুখে লেগে আছে- চিনি, গুড় নাই তাতে কি! আহা কি যে মজা, কি যে মিষ্টি ।

লেখক: ড. রেবেকা বানু, ফার্মেসি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এখানে মন্তব্য করুন :