মৃত্যু মানে না সিরিয়াল, মানে না সাকসেস

মৃত্যু মানে না সিরিয়াল, মানে না সাকসেস

বোধহয় মারা যাব! অদ্ভুত নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় কথাগুলো বলল কাওসার।

প্রাইমারী স্কুলের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। পেটা শরীর। অসুরের মত শক্তি। সবাই সমীহ করে চলত। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে উল্টো। কেন জানি খুব মানত আমাকে। বাজারের পাশে চৌরাস্তায় দোকান ছিল ওদের। প্রতিদিন লজেন্স, বিস্কিটসহ নানা কিছু পকেটভরে নিয়ে আসতো।

ছেলেটির ধ্যান-জ্ঞান ছিল পাইলট হবার। বিমান কিভাবে চালায়, এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতো মাঝেমধ্যেই।

তখন সিক্সে উঠে গেছি। ও মাদ্রাসায়, আমরা স্কুলে। বেশ কয়েকদিন সাক্ষাত নেই।

তিন রাস্তার মোড়ে হঠাৎ দেখা

ফ্যাকাসে মুখ, পুরো শরীর নীল। রক্তবর্ণ চোখ। প্রাণবন্ত ছেলেটি নির্জীব, নিস্প্রভ। প্রাণশক্তিহীন। ঠিক বসন্তের পাতাঝরা গাছের মতো।

মিনিট দশেক ছিলাম একসঙ্গে। শরীর খারাপ লাগছে বলে বাড়ির দিকে ছুটল। ওই শেষ যাওয়া। এর দিন পনের পরে শুনি কাওসার আর নেই।

তখন মাত্র জীবন বুঝতে চলেছি। সবকিছু রঙ্গিন। আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ভরপুর। কাওসারকে হারিয়ে প্রথম বুঝলাম, জীবন এমনই। সময় মেনে সবারই চলে যেতে হয়।

শৈশব থেকে দেখে এসেছি, তাদের সব ছিল। অহংকারে পা মাটিতে পড়তনা আংকেল-আন্টির। সন্তানদের ভালো স্কুল-কলেজে পড়িয়েছেন। এখন সবাই থিতু হয়েছে বিদেশে। দেশে গড়া সম্পদও ছেলেদের নামে লিখে দিয়েছেন।

কিন্তু ভাগ্য উল্টো। সন্তানরা বাবা-মায়ের খবর নেন না। নিজের তৈরি জমিতে গড়ে তোলা ভবনের একটি ফ্লাটে দাক্ষিণ্য দেখিয়ে থাকতে দিয়েছেন। ম্যানেজার বাকি ফ্লাটের ভাড়া তুলে পাঠিয়ে দেয় সেই সন্তানদের কাছে। জমিজমা অন্য যা ছিল সব বিক্রি করে টাকা বিদেশে নিয়ে গেছে গুণধর সন্তানরা।

জন্মের পর থেকেই আমরা সাকসেস খুঁজি। সর্বত্র কম্পিটিশন। গায়ে পড়ে কম্পিটিশন করি। ভালো থাকার কম্পিটিশন না, লোক দেখানো কম্পিটিশন।

বুঝতে শেখার আগেই সবচেয়ে ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়াটা চাই। এটাই শৈশবের সাকসেস।

ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া চাই। স্কলারশিপ চাই। এসএসসি-এইচএসসিতে নজরকাড়া রেজাল্ট চাই। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্সপ্রাপ্তির যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া মানেই সাকেসেসের শেষ না। এরপর নতুন যুদ্ধ বিদেশে ভালো ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ-রেসিডেন্ট, বিসিএস, ভালো চাকরি। এই সাকসেসের পরে স্বামী-স্ত্রী-সন্তান-সংসার। সমাজে মানিয়ে নিতে দু হাতে টাকা কামাও। বৈধ-অবৈধের খোলস থেকে বেরিয়ে সোসাইটিতে টিকে থাকাটাই তখন সাকেসেস।

আমাদের সমাজে সাকসেসের প্রাকটিসটাই এমন। আমাদের কেউ প্রোপার শিক্ষাটা দেয় না। শিক্ষকরাও বলেননা, নিজের মনে যা চায়, সেভাবে টিকে থাকাটাই আসল সাকসেস। ভালো থাকাটাই সাকসেস। এ কারণেই মেধাবী ডাক্তার সাবরিনা হয় চিটিংবাজ, অভিনেত্রী স্বর্ণা হয় দেহপসারিনী। মহল্লায় মহল্লায় শাহেদের মত বাটপারদের ছড়াছড়ি।

নাস্তিক থেকে মসজিদের ইমাম, সবার কাছেই সাকসেসের সংজ্ঞা এক। অঢেল অর্থ-বিত্ত চাই, প্রভাব-প্রতিপত্তি চাই। পনের হাজার টাকা বেতন পাওয়া কেরানি যখন বছর বছর মসজিদে কয়েকলাখ টাকা দান করে, তার নামেও মোনাজাতে প্রশংসার তুবড়ি ফোটে। চোখের জল-নাকের জল এক করে দোয়া চাওয়া হয়।

মৃত্যুর কোনো কম্পিটিশন নেই। কেউ স্বেচ্ছায় যেতে চায় না। এক্ষেত্রে আমাদের বেশিরভাগের সফলতার ভাণ্ডার যে শুন্য। তবুও মৃত্যু কোনো সিরিয়াল মানে না। সাকসেস মানে না।

লেখক: সানাউল হন সানি, সাংবাদিক, দৈনিক আমাদের সময়।

এখানে মন্তব্য করুন :