মায়া

মায়া

নিতুর চোখে আবারও পানি চলে এসেছে। মাহমুদ এত নিষ্ঠুরের মত আচরণ করছে! নিতুর ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোন দামই যেন তার কাছে নেই। এত বছর ধরে এত যত্নের সাথে সংসার করেও কেন নিতু একটিবারের জন্যে হলেও নিজের ইচ্ছেমত কোন কাজ করতে পারবেনা-এটা সে ভেবে পায়না।

যতবারই নিতু তার শখের গাছগুলোকে রেখে সপ্তাহ-দশদিনের জন্য গ্রামে গিয়েছে, এসে দেখেছে সব গাছ শুকিয়ে মরে আছে। ঠিকমত রোদ-পানি না পেলে কোন গাছ ই বা বাঁচে? কিন্তু এসবে মাহমুদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আগ্রহ তো দূরে থাক, নিতুর সন্তানসম প্রিয় গাছগুলোর জন্য সামান্য সহানুভুতিও ওর নেই। বরং প্রতিবার গ্রাম থেকে ফিরে মৃতপ্রায় গাছগুলি দেখে নিতু যখন কান্না করে দেয়, সেটাকে মাহমুদের কাছে ন্যাকামি এবং তার পরিবারের প্রতি নিতুর উন্নাসিকতা ছাড়া আর কিছু মনে হয়না।

মাহমুদ-নিতুর ভ্রাম্যমাণ সংসার আজ প্রায় পনেরো বছরের। মাহমুদ সরকারি চাকুরে। প্রায়ই তাকে জায়গা বদল করতে হয়। তাই সংসারও তাদের সাথে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলমান। যেখানেই যাক, ঘরে একটু সবুজের আবাদ না করলে নিতুর দমবন্ধ লাগে। ওর হাতে গাছ হয়ও খুব সরস। কিন্তু আফসোস একটাই, খুব বেশিদিন নিতু তাদের সঙ্গ উপভোগ করতে পারেনা। উৎসবের ছুটিছাটায়, বা এমনিতেও সাপ্তাহিক ছুটিতে মাহমুদ গ্রামে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যায়।

বাবা-মা বেঁচে আছেন বিধায় এই চাওয়া অযৌক্তিক ও নয়, নিতু সেটা জানে। তবু প্রতিবারই নিতুকে কেন ওর সাথে দৌঁড় লাগাতে হবে, এ প্রশ্নের উত্তর চাওয়া অবান্তর। মাহমুদ মনে করে , নিতু তার শ্বশুড়-শাশুড়িকে ভালোবাসে না। তাই ওর গ্রামে যাওয়ার আগ্রহে এত কমতি।

এদিকে যার জ্বালা, সেই বোঝে। চিরন্তন আটপৌঢ়ে বাঙালি শ্বশুড়বাড়ির মতই, নিতুর কপালে প্রতিবারই নিন্দে-মন্দ বন্টন হয়। “আমাদের ছেলেটা শুকায়ে গ্যাসে ক্যান? বৌ যত্ন নেওনা?” এই চিরায়ত লাইন দিয়ে নিতুর অভ্যর্থনা শুরু হয়, এবং শেষ পর্যন্ত এমন কিছু বলা হয়, যে প্রতিবারই নিতু খুব বেশি মন খারাপ করে বাসায় ফিরে আসে। তবে নিতু কোন এলিয়েন সমাজ থেকে উঠে আসেনি।

সে জানে, এইসব খোঁচাখুচি সংসারে খুবই রুটিন একটা ব্যাপার। সব মেয়েরাই এগুলো মানিয়ে চলে। তারপরেও, নিজের ভালোবাসার বস্তুগুলোকে অবহেলা করে যেচে পড়ে খোঁটা শুনতে যাওয়ার তাড়া কয়জনেরই বা থাকে? তাই মাঝে মাঝে লম্বা ছুটিতে নিতু বাড়ি যেতে চায় না। ছেলে জাবিরকে নিয়ে শহরের বাসাতেই থাকতে চায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই কথাটা বলাই সার, মাহমুদ দুই দিনের জন্য গ্রামে গেলেও কখনো নিতুদের রেখে যায় না।

এই ইস্যুটাও আসলে এত বড় নয়, নিতুর মনে বেশি কষ্ট লাগে আসলে যখন দেখে, মাহমুদ অন্য সব ব্যাপারেও এক তরফা হুকুম চালিয়ে যায়। নিতু তার সংসারের যতই যত্ন নেক না কেন, ছেলেকে মানুষ করার জন্য যতই খাটুক, বা মেহমান এলে আপ্যায়নের জন্য যতই জান দিয়ে দিক-নিতুর প্রতি মাহমুদের কোন কৃতজ্ঞতা নেই। বরং সে ধরেই নিয়েছে- মেয়েদের তো এগুলোই করার কথা। নিতুর কাছে মাহমুদ কেন যেন কখনোই মন খোলা হতে পারে না।

এভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটু একটু করে দূরত্ব বাড়তে বাড়তে কখন আলোকবর্ষ অতিক্রম করে ফেলেছে, নিতু ভেবে অবাক হয়। আজকাল ওর সব কথাতেই মাহমুদ নিরাসক্ত। বিশেষ করে গত বছরখানেক ধরে।“এবার নাহয় শুধু তুমি যাও, এমনিতেও জাবির এর ফাইনাল পরীক্ষার আর দেরি নেই। এখন বেড়াতে গেলে কতগুলা দিন ছেলেটা পড়া থেকে দূরে থাকবে। ফিরে এসে সব গুছিয়ে নিতে নিতে ওর অনেক বেগ পেতে হবে। জানোই তো, প্রেশার না দিলে ও একদম.।

”“জাবির, তোমার ব্যাগ গুছানো হয়নি?”- নিতুকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মাহমুদ তাদের ছেলের সাথে কথা বলা শুরু করে।“ তোমার দুই একটা বই নিয়ে নাও। সুযোগ পেলে পড়বে। আর অত পড়েই কি হবে? আমিও সারাজীবন পড়ায় ফাঁকি দিয়ে শুধু পরীক্ষার আগে পড়েই ভালো ভালো রেজাল্ট করেছি। আমার ছেলে কি আমার চেয়ে ভিন্ন হবে?- মাহমুদের কথায় গর্বের সাথে যেন নিতুর প্রতি তাচ্ছিল্য ঝরে পড়ে।

জাবির ভদ্রছেলের মত উঠে গিয়ে নিজের ব্যাগ গোছানো শুরু করে। নিতু এবার কেঁদেই দেয় নিরবে। ছেলেটাও কি বাবার মত হয়ে যাচ্ছে। আজকাল নিতুর সাথে কোন কথাই বলে না। নিজের রুমে সারাক্ষণ দরজা লাগিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে দরজা খোলা থাকলে নিতু গিয়ে কথা বলতে চায়। কিন্তু ওর বাবার মতই একইভাবে নিতুকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে জাবির আনমনে তার কাজ করতে থাকে। টিন-এজ বয়স। এই সময় এমন উচাটন স্বাভাবিক-নিতু এসব ভালোই বোঝে। তারপরেও নিজের মায়ের সাথে কথা বলবেনা? কতদিন হলো নিজের হাতে ভাত মাখিয়ে ছেলেটাকে খাওয়ায় না। নিতু ভেবে দেখল-আসলে কত দিন হলো, সে রান্নাও করে না।

মাহমুদ একজন রান্নার বুয়া রেখেছে। এ কি নিতুর প্রতি উদাসীনতা দেখানোর আরেক কৌশল? কেন, নিতু কি ভালো রাঁধতে পারে না? এর আগে যারাই নিতুর রান্না খেয়েছেন, সবাই তৃপ্তির সাথে বাহবা দিয়ে গেছেন। কিন্তু মাহমুদ এখন সকালের বাজারটা এনে নিতুর সাথে কথা না বলেই রান্নাঘরে গিয়ে বুয়াকে অর্ডার দিয়ে দেয়-এটা দিয়ে ওটা রেঁধো। বুয়াটাও বেয়াদব হয়েছে মাহমুদের আস্কারা পেয়েছে। নিতু তাকে অনেকদিন বলেছে-তুমি সরো, আমি রান্না করছি। মহিলা নিতুর দিকে না তাকিয়েই কাটা-বাছা শেষ করে চুলায় হাড়ি চাপিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে নিতুর ইচ্ছে হয়, সব ছেড়ে চলে যেতে। কিন্তু কীভাবে? এত দিনের এত মায়ার সংসার- চাইলেই কি ফেলে যাওয়া যায়? মাহমুদের সকালের নাস্তা খাওয়ার সময় আগে প্রায়ই নিতু ওর মুখে দুই এক লোকমা তুলে দিত। মাহমুদও তাতে মুচকি হেসে নিজের ভালোলাগা প্রকাশ করত। নিতু খুব ভালো উলের কাজ জানে। ওর হাতে বুনা সোয়েটার দিয়ে শুধু মাহমুদই নয়, ওর শ্বশুড়, বড় ভাশুড় সবাই শীতকাল কাটিয়ে দিতেন। এখনো দেন। নিতুর প্রতি নাখোশ শাশুড়ি পর্যন্ত ওর হাতের হাঁসের মাংস খেয়ে সমালোচনা না করে, আরেক চামচ প্লেটে তুলে নিতেন। সে সব মনে হয় কত জন্মের আগের কথা!

নিতু ছাদে গিয়ে অনেকক্ষণ গাছগুলোর ডালে ডালে নিতু হাত বুলিয়ে দিল। “প্লিজ আমি আসা পর্যন্ত তোমরা থেকো…”- অবুঝ শিশুর মত নিষ্ফল আবদার করে নিতু নিচে নেমে আসে। মাহমুদ ট্যাক্সি ডেকে এনেছে। খোলা দরজা দিয়ে জাবির উঠে বসার পরে নিতুও উঠে পরে। মাহমুদ সামনের সিটে বসে ড্রাইভারকে চলতে বলে। নিতু ভাবে- কেনই বা এদের সাথে যাচ্ছি? কাপড়ের ব্যাগ গুলোর মত আমাকেও এক নিষ্প্রাণ পোটলার মত টেনে নিয়ে যাচ্ছে ।

বাবা-মা মাহমুদ আর জাবিরকে জড়িয়ে ধরেন। নিতু আবার কে? ওর দিকে তাকানোর সময় আছে? ও যখন দুজনকে পায়ে ধরে সালাম করলো, তখনো উনারা নির্বিকার। জাবিরকে নিয়ে দাদী এখনো ব্যস্ত- “আহারে, মানিক আমার! মায়ের যত্নের অভাবে কতই না শুকিয়ে গেছে!” মানে, সিরিয়াসলি? নিতুর মাথা চট করে গরম হয়ে যায়। এর আগে নিজের ছেলেকে নিয়ে বলতেন, এখন বলছেন নিতুর ছেলেকে নিয়ে! বউ হিসেবে যে যেমনই হোক, কোন মা কি নিজের ছেলের অযত্ন করতে পারে? আদিখ্যেতার তো একটা সীমা থাকা দরকার।বাড়িতে এসেই তর্কাতর্কি শুরু করতে চাইছেনা নিতু। কিন্তু জাবির কেন দাদীকে ধরে কাঁদছে? নিতুর নিজের ছেলেও কি মনে করে, তার মা তাকে যত্ন করেনা? “বাবা জাবির, কী হয়েছে সোনা, কাঁদছ কেন?” জাবির হয়তো লজ্জা পেয়েই নিজেকে তড়িঘড়ি সামলে নেয়। দাদা-দাদীকে সালাম করে চট করে ভিতর-বাড়িতে চলে যায়। আচ্ছা যাক, পরে একসময় নিতু ছেলেকে শক্ত করে ধরবে। কী এমন দুঃখ, যা মাকে বলা যায়না?

নিতু তার শ্বশুড় বাড়ির একমাত্র প্রিয় জায়গা- শান বাঁধানো পুকুর ঘাটটাতে এসে বসে। বড় বড় গাছের ছায়ায় পুকুরের পানি বড় শান্ত, ঠান্ডা। এখানে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়ে দেয়া যায় অনায়াসে। আগেও যতবার এসেছে, কাজ না থাকলে এই পুকুর পাড়েই নিতু আস্তানা গেড়ে বসে থাকত। আজও বসে থাকতে বড় ভালো লাগছে। তবে কী যেন একটা অন্যরকম অনুভুতি হচ্ছে। মনে হচ্ছে কিছু ঠিক নেই। বেশি ভাবতে যাওয়ার আগেই হঠাৎ ঝুপ করে বৃষ্টি নেমে এল। নিতু বাড়ির দিকে দৌঁড় দেয়। ভালো বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সামনের উঠানটা ইতোমধ্যে পিচ্ছিল হয়ে গেছে। নিতু সাবধানে পা ফেলে। সেদিনও এমন বৃষ্টিতে সব পিছল হয়ে ছিল।

নিতুরা শহরে ফিরে এসেছে। দরজা দিয়ে ঢুকেই নিতু ছাদের দিকে দৌঁড় দেয়। জানে, কী দেখতে পাবে। তবুও ওর গাছগুলি এখনো বেঁচে আছে হয়তো- মনে মনে এই দূরাশা নিয়ে নিতু এগিয়ে যায়। আজ এখানেও বৃষ্টি হচ্ছে। ছাঁদ হয়তো আবারও পিচ্ছিল হয়ে যাবে। সেদিনও এমন বৃষ্টিতে সব পিছল হয়ে ছিল।

মাহমুদ ক্লান্ত হয়ে বাসায় ঢোকে। যতটা না ভ্রমণের ক্লান্তি, তার চেয়ে মানসিক ক্লান্তিই বেশি। বছর খানেক ধরেই এমন গহীন অতলে ডুবে যাওয়ার মত ক্লান্তি ওকে পেয়ে বসেছে। আজ আবার সেদিনের মত বৃষ্টি হচ্ছে। এই স্মৃতি-জাগানিয়া বৃষ্টি মাহমুদের ভিতরে ক্লান্তির সাথে অত্যন্ত গ্লানিবোধ তৈরি করে দেয়।“নিতুটা একটা পাগল। এই বৃষ্টির মধ্যে কেউ ছাদে যায়?”- মাহমুদ ভাবে। ইদানিং প্রায়ই মনে হয়- নিতুর সাথে সেদিন অমনটা কেন করল সে? না হয় মেয়েটা একটু গাছ ভালোবাসত। গ্রাম থেকে ফিরে এসে ঘরের কাজ শুরু না করেই ছাদে দৌঁড় দিয়েছিল, তার গাছগুলি বেঁচে আছে কিনা দেখতে। নিচ থেকে চিৎকার দিয়ে দিয়ে মাহমুদ তাকে নিষ্ঠুর ভঙ্গীতে অনেক কটুকথা বলেছিল।

মাহমুদের মনে পড়ে না, ঠিক কবে থেকে নিতুকে সে ভালোবাসার মানুষ না ভেবে শুধুই সংসারের একটা অনুষংগ ভাবা শুরু করেছিল। এতটা নিরাসক্ত হয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। তবে বিয়ের সাত-আট বছর পার হয়ে গেলে এটা কি সব দম্পতিরই একটা কমন অভিযোগ নয়- যে আমার সঙ্গী আমাকে আর আগের মত ভালোবাসেনা? মাহমুদও তাই নিতুর অভিযোগ-অভিমানকে বেশি পাত্তা দিতে রাজি ছিল না।

তাছাড়া নিতুর অভিমান একটু বেশিই। বাড়িতে গেলে মাহমুদের মা, চাচী একটু ত্যাড়া কথা বললেই নিতু কান্না কাটি করত-যা ওর একদম ভালো লাগে না। কোন সংসারে বউদের শাশুড়ি-ননদকে একটু সমঝে চলতে হয়না? তাছাড়া ওরা তো মাহমুদদের সাথে থাকেনও না। বছরে মাত্র কয়েকবার অল্পকিছু দিনের জন্য কেন নিতু তাদের সহ্য করতে পারেনা? এই ব্যাপারে মাহমুদ কখনোই নিতুকে সহানুভুতি দেখাতে পারেনি। তবে মুখে স্বীকার না করলেও মাহমুদ নিতুর উপরে মনে মনে খুশিই ছিল। নিতু ভালোই তার সংসারটাকে সাজিয়ে নিয়েছিল। ছেলে জাবিরের পড়াশোনা, ওর নৈতিক শিক্ষা সবদিকে নিতুর কড়া নজরের বদৌলতেই আজ কোথাও নিয়ে গেলে ছেলের আচার-ব্যাবহারে মুরব্বিরা সবাই খুশি হয়। তবে ছেলেটা আজকাল খুব গম্ভীর হয়ে গেছে।

বয়ঃসন্ধি চলছে তো, এছাড়াও নতুন পরিস্থিতিটা নিজে নিজে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বাছা একটু অকূল পাথারে পড়ে গেছে। মাহমুদ আর কতটুকুই করতে পারবে? অফিসের কাজে তো সারাদিন বাইরেই থাকতে হয়। আর নিতুর সাথে যেমন, ওর সাথে জাবিরের আগে থেকেই এতটা ঘনিষ্টতা কখনোই ছিলনা। এখন হঠাত করে উঠতি-বয়সী একটা ছেলের জীবনে বাবা দখলদারিত্ব দেখাতে গেলে সেটা হিতে বিপরীত হতে পারে, মাহমুদ সেটা ভালোই জানে।

কিন্তু বাসায় ঢোকা অবদি ছেলেটার সাড়া শব্দ নেই কেন? ছাদে গেল নাকি?দুরুদুরু বক্ষে মাহমুদ ছাদে উঠে আসে। নিতুর শখের গাছগুলি নিশ্চয়ই এবারো মরে গেছে। কিন্তু সে জন্য ও চিন্তিত নয়। ও ভাবছে ছেলেকে কী বলবে! এইতো সেই জায়গাটায় ছেলেটা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। “বাবা জাবির!” ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে মাহমুদ অসহায় ভংগীতে তাকে ডাকে।

নিতুর খুব অবাক লাগছে। আজ তার স্বামী আর ছেলে দুজনেই এই বৃষ্টির মধ্যে ছাদে চলে এসেছে। নিতুকে তার গাছের ব্যাপারে সান্তনা দিতে কি? “ মানুষের জীবনটা এমনই, বাবা। হঠাৎই ঝড় এসে সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়। কিন্তু মানুষ হয়ে জন্মালে সেই ঝড় মোকাবেলা করার জন্য চেষ্টা করতে হয়। তুমি কি সেই চেষ্টা করবেনা? তুমি মনমরা হয়ে থাকলে, পড়াশুনা না করলে, সারাদিন ঘরে দরজা দিয়ে রাখলে কার বেশী দুঃখ হতো? তোমার মায়ের। মাকে দুঃখ দিতে হয়না বাবা”।

নিতু এ কী শুনছে? মাহমুদ ছেলেকে বোঝাচ্ছে যেন নিতুকে কষ্ট না দেয়! আরেহ, কোন জাদুবলে মাহমুদের মনে ওর জন্য এত দয়া চলে আসল?“কিন্তু মা আমাকে এত বড় দুঃখ কীভাবে দিল? আমার চেয়ে মায়ের গাছের জন্য এত মায়া হয়ে গেল? বৃষ্টির মধ্যে গাছ দেখতে চলে গেল?”নিতুর হাসি পেয়ে যায়! ওর ছেলে দেখি ওর মতই অভিমানী হয়েছে! ও কি গতবারের ঘটনা মনে রেখে তাহলে এতদিন ধরে নিতুর সাথে এত শীতল আচরণ করছিল? “বোকা ছেলে! তুই আর গাছ কি এক হলি? ওর আমার অবসরের সঙ্গী। আর তুই আমার নাড়ি ছেড়া ধন। আমি মরে গেলেও কি তোর জন্য আমার মায়া কমে যাবে?”- নিতুর হেসে হেসে বলা কথাগুলিতে জাবিরের কোন ভাবান্তর হয়না।

সে মাথা নিচু করে রেখেছে। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানিও পড়ছে। নিতু ছেলের কাছে এগিয়ে যায়। জাবির যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে বৃষ্টির পানি জমে ছোটখাট একটা পুকুর হয়ে আছে। নিতু কাছে গিয়ে সেই পুকুরে ছেলের প্রতিবিম্ব দেখে। কী সুন্দর তার ছেলেটা, মাশা আল্লাহ। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের বাবাও কম না। দুজনের মুখ এত বিষন্ন কেন?- ভাবনাটা মাথায় এসেও বেশীক্ষণ থাকতে পারে না। আরো কিছু একটা অস্বস্তিকর ভাবনা নিতুর মনে ভয়ের ছাপ ফেলে দেয়। পানিতে নিতুর ছায়া নেই কেন? এখন মনে পড়ছে- গ্রামের সেই পুকুর ঘাটে বসেও নিতুর অস্বস্তি লাগছিল-সেখানেও নিতুর কোন প্রতিবিম্ব ছিলনা!

মাহমুদ তার একমাত্র ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ আদর করে দেয়। ওর অভিমান তো ঠিকই আছে! নিতু সেবার বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে পাগলের মত গাছ দেখার জন্য ছুটে না এলে, পা পিছলে পড়ে মাথায় আঘাত পেতো না, আর তিন দিন কোমায় থেকে সবাইকে কাঁদিয়ে পৃথিবী ছেড়ে, এই মায়ার সংসার ছেড়ে চলেও যাওয়া লাগতো না। কিছুই আর আগের মত নেই। বুয়ার রান্নায় কোন স্বাদ নেই। অফিস থেকে এলে দ্রুত পায়ে ছুটে এসে কেউ দরজা খুলে দেয় না। হাত থেকে ফাইল, ছাতা সরিয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা লেবুর শরবত কেউ এগিয়ে দেয় না। এমনকি অভিযোগ-অভিমান করারও এখন কেউ নেই। মাহমুদের কেন যেন নিতুর গাছগুলির জন্য এখন অনেক মায়া পড়ে গেছে। প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে পানি দিয়ে যেন নিতুর প্রতি একসময়কার অবহেলার প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় সে এখন। কিন্তু যে এটা দেখলে সব চেয়ে বেশী খুশি হতো, সেই নিতুই তো নেই। একা একা অন্ধকার কবরে শুয়ে আছে। নিতুকে ছাড়া জাবিরই বা কীভাবে চলবে জীবনে? “একবার, শুধু একবার যদি জানতে নিতু, আমরা তোমাকে মিস করি, আমরা তোমাকে ছাড়া ভালো নেই- তুমি কি ওপারে ভালো আছো নিতু?”

আনমনে মুখ থেকে বেরিয়ে আসা কথাগুলোর সাথে মাহমুদের অশ্রুসিক্ত চোখ শূন্য ঘরে নিতুকে খুঁজে বেড়ায়।

নিতু কি একা একা আসলেই ভালো আছে? ও আছেই বা কোথায়? এই সংসারের মায়া কাটিয়ে সে কি আদৌ যেতে পেরেছে?- স্বামী আর ছেলের কথাবার্তা শুনে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর নিতুর সত্যি হাসি পেয়ে যায়। আজব মায়ার বাঁধনেই এতদিন আটকা পড়ে ছিল। এইবার আর অভিমান করে সব ছেড়েছুড়ে যেতে কোন বাধা নেই।

লেখকঃ মেহজেবীন আক্তার, পিএইচডি গবেষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

এখানে মন্তব্য করুন :