ভূস্বর্গ কাশ্মির ঘুরে দেখা

ভূস্বর্গ কাশ্মির ঘুরে দেখা

কাশ্মিরের অপরুপ ভূপ্রকৃতির ছবি আমার অনেক দিন ধরে দেখা। তাই মনে মনে সবসময়ই একটি পরিকল্পনা ছিল, একবার হলেও সেখানে ঘুরতে যাব। তো ২০১৯ সালের জুনে আমার সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রুপ নিল।

আর কাশ্মির ভ্রমণ শেষে আমার প্রথম অনুভূতিটা ছিল এমন, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের তার জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও কাশ্মিরে ঘুরতে যাওয়া উচিত।

যেটা আগে বলেছিলাম,  ছোটবেলা থেকে আমার বই ও পত্রিকায় পড়া এবং টিভিতে দেখা কাশ্মিরকে কেউ  অভিহিত করেছেন পৃথিবীর ভূস্বর্গ বলে, আবার কেউ কেউ একে সুইজারল্যান্ডের চাইতেও সুন্দর স্থান বলেছেন।

এইসব পড়তে পড়তে বা দেখতে দেখতে নিজের ভেতরে একধরনের আকাঙ্খা তৈরি হয়েছে কাশ্মির ঘুরে দেখার।

কাশ্মির যেহেতু বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, তাই কেউ সেখানে ভ্রমণে গেলে পরিকল্পনার কোথাও ফাঁকফোকড় রাখার সুযোগ নেই।

তাছাড়া আমি যেহেতু বাজেট ট্রাভেলার, তাই সেভাবেই সবকিছু পরিকল্পনা করেই এগুতে হয়েছে।

আমার ভ্রমণ ছিল সব মিলিয়ে ১২ দিনের। আমরা তিনজন মিলে গিয়েছিলাম। কিভাবে গিয়েছি সে বিষয়ে পরে আসছি। তার আগে কী দেখলাম তার বর্ণনা দিয়ে নেই। আমাদের প্রথম কয়েকটা দিন কেটেছে পথে পথে। ষষ্ঠ দিন পেহেলগাম পৌঁছে এক অর্থে কাশ্মিরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সুধা পান শুরু।

আমরা প্রথমে গেলাম আরু ভ্যালি, খুবই চমৎকার ও নৈসর্গিক একটি স্থান। আমাদের গত কয়েকদিনের দিনের যাত্রা সার্থক হতে শুরু হলো। পাইন গাছের সারি, নদীতে বরফগলা স্বচ্ছ পানির প্রবাহ, ভেড়ার পালের বিচরণ- প্রকৃতির এমন অদেখা চিত্র অন্যরকম এক আবেশ সৃষ্টি করেছিল আমাদের মনে।  

এখানে প্রায় ১ ঘন্টা সময় কাটিয়ে চলে গেলাম চন্দনওয়ারি। এবার বরফ দেখার পালা, পাহাড়ের পাদদেশ পুরাই বরফে ঢাকা। আমরাও পাহাড়ে উঠে গেলাম আর বরফ নিয়ে খেলা করতে শুরু করলাম। স্নিগ্ধ-বাতাস মনের কোঠায়  প্রশান্তি এনে দিল। এখানে ও প্রায় ২ ঘন্টা ঘুরে বেড়ালাম।

এবার যাবার পালা বেতাব ভ্যালি। বেতাব ভ্যালি মূলত একটি পার্ক, যেটা নদীর পাড়ে অবস্থিত। আশির দশকের বিখ্যাত হিন্দি “বেতাব” মুভির শুটিংয়ের পরে যার নাম হয়ে যায় বেতাব ভ্যালি। খুবই দৃষ্টিনন্দন ও হেঁটে বেড়ানোর জন্য অসাধারণ একটি জায়গা এই বেতাব ভ্যালি। এখানেও ১ ঘন্টার মত সময় কাটিয়ে চলে গেলাম পেহেলগামের মল চত্বরে।

এখানকার মসজিদ, হাসপাতাল ও দোকানপাট সবই যেন  অমায়িকভাবে সাদরে গ্রহণ করেছে আমাদের।

বিকেলের গোধূলির কিরণ ঐ দূরের পাহাড়ের চূড়ায় বরফের মিনারে স্বর্ণালি বিকিরণ ছড়াচ্ছিল। এ এক ভয়ংকর সুন্দর দৃশ‌্য।

 মাগরিবের আযান হলে সন্ধ্যাটা এখানেই আড্ডা দিতে লাগলাম। রাতের খাওয়া সেরে নিলাম কাশ্মিরি মজার মজার খাবার দিয়ে। রাতে হোটেলের রুমে আড্ডা দিতে দিতে ঘুমিয়ে গেলাম।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠেই নাস্তা সেরে ঘোড়া ও গাইড ঠিক করলাম আমাদের তিনজনের জন্য। পাহাড়ের উপর কিছুদূর পায়ে হেঁটে, কিছুদূর ঘোড়ায় চেপে দেড় ঘন্টা পর বাইসারান ভ্যালি পৌঁছে যাই। প্রকৃতি যেন সবুজ চাদর মুড়িয়ে আমাদের সম্ভাষণ জানাচ্ছিল।

জায়গাটা এত বেশি সুন্দর যে, আপনি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবেন না। চারিদিকে পাইন ও দেবদারু গাছের সারি আর তার পিছনে সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় বরফের আস্তরণ কি যে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তা স্বচক্ষে না দেখলে বুঝানো মুশকিল।

প্রায় ৩ ঘন্টা বাইসারান ভ্যালিতে সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। তারপর আবারো একই পথে ঘোড়া নিয়ে পাহাড় পেরিয়ে পেহেলগাম শহরে চলে আসলাম। এবার যাওয়ার পালা রাজধানীতে অর্থাৎ শ্রীনগর। দুপুরে পেহেলগাম থেকে অনন্তনাগ হয়ে শ্রীনগরে আসি আমরা ।

শ্রীনগরে এসে ডাল লেকে হাউস বোটে রুম নেই। সেদিন সন্ধ্যায় দোতলা খোলা বাসে করে গানের গানের তালে তালে ডাল লেক ঘুরে বেড়াই। সন্ধ্যার পরে হেঁটে হেঁটে শ্রীনগর শহর উপভোগ করি।   রাত্রি যাপন করি হাউসবোটেই।


এর পরদিন সকালে গাড়ি রিজার্ভ করে সোনমার্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু। পথিমধ্যে বিখ্যাত সিন্ধু নদীর উপত্যকায় চা বিরতির মুহুর্তটি এককথায় অসাধারণ ছিল। সোনমার্গ নেমে ঘোড়া ভাড়া করে বরফ দেখতে রওনা হলাম। প্রায় দেড় ঘন্টা পর সোনামার্গ মূল পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছালাম।  

অপরূপ প্রকৃতি যেন বহুকাল ধরে নিজেকে সাজিয়েছে। চারিদিকে বরফ আর বরফ, সাথে দেবদারু গাছের মিতালী। ‍এখানে স্কেটিং করলাম, বরফ গাড়িতে চড়লাম। দারুণ কিছু মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইলাম।প্রায় ২ ঘন্টার মত উপভোগ করে ঘোড়া নিয়ে ফিরে আসলাম।

আসার সময় ঝুম বৃষ্টিতে কাক ভেজা ভিজতে হলো। সোনমার্গ শেষে সন্ধ্যায় শ্রীনগরে চলে আসলাম এবং যার যার মত করে শপিং করলাম। রাতে শীনগরের বিখ্যাত খাবারগুলির স্বাদ উপভোগ করা হলো।

 কাশ্মিরের সেই বিখ্যাত ওয়াজুয়ানও পরখ করে দেখা হলো। অসাধারণ স্বাদ এই বাহারি পদের খাবারটির।

পরের দিন রিজার্ভ গাড়ি করে শ্রীনগরের স্থানীয় দর্শনীয় স্থানসূমহ ঘুরে দেখেছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল: নিশাতবাগ, শালিমার গার্ডেন, চাশমেশাহী, হযরত বাল মসজিদ ও কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয়। এইসব দেখতে দেখতে পুরো ডাল লেকটি আবারো ঘুরা হয়ে গেলো।

যেভাবে গেলাম ভূস্বর্গে ও আবার ফিরে আসলাম এই সোনার বাংলায়

কাশ্মির যাবার পরিকল্পনা করে, সে অনুসারে ভারতের ভিসার জন্য আবেদন করা হলো।  ১০ দিনের ভিতর ১ বছরের ভিসাও পেয়ে গেলাম। এক মাস আগে বাংলাদেশে অবস্থিত এক এজেন্ট থেকে কলকাতা টু জম্মু যাওয়া – আসার নন এসি স্লিপার টিকেট নিয়ে নিলাম।  এবার অপেক্ষার পালা নির্ধারিত দিনে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করার ।


১ম দিনঃ রাত ১০ টায় আরামবাগ কাউন্টার থেকে নন এসি বাসে করে রওনা দিয়ে বেনাপোল পৌঁছাই ভোরে। 

২য় দিনঃ  বেনাপোল ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে অটো তে করে বনগা রেলস্টেশন, ওখান থেকে ট্রেনে করে যাই কলকাতায়। ওখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর ২ টা। বাজেট রুম নিয়ে আমরা ৩ জন কলকাতায় সে রাতটি কাটিয়ে দেই।  

৩য় ও ৪র্থ দিনঃ বেলা ১১.৪৫ মিনিটে কলকাতা স্টেশন থেকে জম্মু-তাওয়াই এক্সপ্রেস নন এসি স্লিপারে করে যাত্রা শুরু। প্রায় ৪৮ ঘন্টা পর ৮০ টির বেশি জংশন পার করে আমরা জম্মু রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাই বেলা ১১ টায়।

৫ম দিনঃ জম্মুতে হরতালের কারণে সারাদিন গাড়ি বন্ধ ছিল, তাই সারাদিন অপেক্ষা করে সন্ধ্যায় জম্মু থেকে বাসে অনন্তনাগের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। অনন্তনাগ এসে পৌঁছায় ভোর ৫ টায়।

৬ষ্ঠ দিনঃ অনন্তনাগ থেকে পেহেলগামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে পৌঁছাই সকাল ১০ টায়। পেহেলগামে পৌঁছেই বাজেট হোটেলে রুম নিলাম আমরা। রুমে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পরলাম কাশ্মিরের সুধারস উপভোগ করার জন্য। রিজার্ভ কার ভাড়া নিলাম সারাদিনের জন্য।

আগেই বলেছি, আমারদের ভ্রমণ শুরু হয়েছিল ষষ্ঠ দিন থেকে।

আর ফেরার দিন শ্রীনগর থেকে বানিহাল পৌছালাম ট্রেনে। বানিহাল থেকে শেয়ার ট্যাক্সিতে করে জম্মু পৌছালাম রাত ১১ টায়।
জম্মু থেকে ৪৬ ঘন্টার ট্রেনে কলকাতা পৌঁছালাম।

১২তম দিনঃ কলকাতা থেকে বনগা রেলস্টেশন ওখান থেকে অটোতে বেনাপোল বর্ডার। বেনাপোল থেকে বাসে ঢাকা। এভাবেই সমাপ্তি হলো আমার কাশ্মির অভিযান।

কাশ্মির ভ্রমণ শেষ করার পর আমার দ্বিতীয়  উপলব্ধি, কাশ্মিরের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য অবলোকন করার জন্য ৪ মৌসুমে ৪ বার যেতে হবে।

লেখক: আসিফ হায়দার, ব্যবসায়ী, কক্সবাজার।


এখানে মন্তব্য করুন :