বিশ্বের সবচেয় বিলাসবহুল বাড়ি আন্টিলিয়া

বিশ্বের সবচেয় বিলাসবহুল বাড়ি আন্টিলিয়া

এশিয়া মহাদেশের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকার দশ নম্বরে আছেন। রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যানের মোট সম্পদের পরিমাণ ৮২.১ বিলিয়ন ডলার।


তার বাড়ি তো আর আটদশজনের মতো সাধারণ কোনো বাড়ি হবে না, সেটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমরা কী জানি, তিনি যে বাড়িতে বাস করেন, সেটি পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও বিলাসাবহুল বাড়ি। তার চেয়েও বিলাসবহুল একটি বাড়ি আছে, সেটি অবশ্য একটি রাজপ্রাসাদ, যুক্তরাজ্যের বাকিংহাম প্যালেস, ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যরা বাস করেন যেখানে।


ব্যক্তিমালিকানধীন পৃথিবীর সবচেয়ে বিলাসবহুল বাড়িটি নির্মাণে খরচ হয়েছে মোট ২.২ বিলিয়ন ডলার। ২৭ তলা এ ভবনে বাস করেন আম্বানি পরিবারের মোটে ছয় সদস্য। আর তাদের সেবায় নিয়োজিত আছেন ৬০০ কর্মচারী। একদিক দিয়ে বলা যায়, প্রতিটি সদস্যের জন্য একশ জন করে কর্মচারী ।

দৃষ্টিনন্দন এ বাড়ির নাম আন্টিলিয়া, আটলান্টিক মহাসাগরের নিচে এক রহস্যময় দ্বীপের নামানুসারে বাড়ির নামকরণ। ভারতের মুম্বাইয়ে সবচেয়ে বিলাসবহুল এলাকা হিসেবে পরিচিত আলটামাউন্ট সড়কে বাড়িটির অবস্থান।

২০১২ সাল থেকে আম্বানি পরিবার এই বাড়িতে বসবাস করে আসছে। ভবন থেকে চোখে পড়ে আরব সাগরের নীল জলরাশি ও পুরো মুম্বাই শহর। বাড়ির মোট আয়তন চার লাখ স্কয়ার ফুট। পৃথিবীর সেরা জিনিস দিয়ে সাজানো হয়েছে বাড়িটি।


ভবনটি ২৭ তলা বিশিষ্ট হলেও কিন্তু উচ্চতায় এটি স্বাভাবিক ২৭ তলা ভবনেরও দ্বিগুণ বা তারচেয়েও বেশি। ভবনের মোট উচ্চতা ৫৬৮ ফুট, এই উচ্চতায় সাধারণ একটি ভবন হতে পারে ৬০ তলা। ভবনের একটি বিশেষত্ব হলো রিখটার স্কেলে আট মাত্রার ভূমিকম্প অনায়াসে সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে।


ভবনের ডিজাইন করা হয়েছে পদ্ম ফুল ও সূর্যের আদলে । পুরো ভবনের ভেতরে বারবার এই দুটি আদল ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ক্রিস্টাল পাথর, মার্বেল পাথর ও ঝিনুকের সাহায্যে।

আম্বানি পরিবারের সদস্যরা ভবনের উপরের দিকের ছয়টি ফ্লোর নিয়ে বাস করেন। মুকের আম্বানীর স্ত্রী নিতা আম্বানি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমরা ঘরের ভেতর সূর্যের আলো পেতে চেয়েছিলাম এবং সে ভাবেই নকশা করা হয়। শিকাগোর বিখ্যাত স্থাপত্য নকশাপ্রস্তুতশারী প্রতিষ্ঠান পারকিনস এন্ড উইল ভবনের নকশা কওে আর ভেতরের ইন্টেরিয়র ডিজাইন করে অস্ট্রেলিয়ান প্রতিষ্ঠান লাইটেন হোল্ডিংস।


নিতা আম্বানি জানান, বাড়িটির নির্মাণশৈলী আধুনিক হলেও বাড়িটির মূলে রয়েছে ভারতীয় ঐতিহ্যের ছোয়া।
নির্মাণ শৈলী আধুনিক হলেও ভবনটির স্থাপত্যের থিম নেওয়া হয়েছে হিন্দু ধর্ম থেকে। ভবনের নিচ থেকে ছাদ পর্যন্ত কাঠামোকে ছয়টি অংশ যথাক্রমে মাটি, পানি, আগুন, বায়ু, শব্দ ও আলো হিন্দুধর্ম অনুসারে পৃথিবী সৃষ্টির যে মূল উপাদান, সেই উপাদানের অনুকরণে নির্মাণ করা হয়েছে।


বাড়ির ভেতরে রয়েছে বিশাল মন্দির। নিতা আম্বানি জানান, ভবনের নকশা যখন করা হয় ঠিকমতো মন্দির স্থাপন করা ছিল আমাদের পক্ষে একটি চ্যালেঞ্জ। মন্দিরটি এমন করে বানানো হয়েছে যেখানে এক সঙ্গে ৫০ জন বসে পুজোঅর্চনা করতে পারে। আম্বানি পরিবারের সদস্য ও তাদের মেহমানরা ওখানে নিয়মিত পুজোর কাজটি সারেন। বাড়িতে রয়েছে বিশালাকার শ্বেতশুভ্র গনেশ ও শিব মূর্তি।

মুকেশ আম্বানির গাড়ি সংগ্রহের শখ রয়েছে। আন্টিলিয়ার নিচের দিকের ছয়টি ফ্লোর ব্যবহৃত হয় গ্যারেজ হিসেবে। সংগ্রহে রয়েছে ১৬৭ গাড়ি।


বাড়ির ভেতরে ৯টি লিফট রয়েছে। আছে বিনোদন কেন্দ্র যা দুটি ফ্লোর নিয়ে সাজানো। এরমধ্যে রয়েছে একটি ইয়োগা কেন্দ্র, একটি নাচের স্টুডিও, জাকুজি, স্পা কেন্দ্র, সুইমিং পুল। রয়েছে নিজস্ব আইসক্রিম পার্লার। একটি ব্যক্তিগত থিয়েটার আছে যেখানে একসাথে ৫০ জন মানুষ বসে উপভোগ করতে পারে অনুষ্ঠান।

মুম্বাইয়ের আবহাওয়া তপ্ত, সে তাপ থেকে রক্ষা পেতে আন্টালিয়ায় অনন্য ব্যবস্থা হয়েছে। আছে একটি আইসরুম যেখান থেকে প্রতিটি রুমে বের হয় হিমশীতল বাতাস। ভবনের প্রতিটি তলার ডিজাইন ভিন্ন, একটির সঙ্গে আরেকটি কোনো মিল নেই। সিনেমা দেখার জন্য রয়েছে নিজস্ব অত্যাধুনিক সিনেমা হল। একসঙ্গে আশি জন বসে সিনেমা দেখার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে।

কর্মচারী ও কর্মকর্তারা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। তাদের জন্য রয়েছে আলাদা থাকার ব্যবস্থা।কর্মচারীদেও মধ্যে রয়েছে বিশ্বখ্যাত শেফ ও তাদের সহযোগীরা। এরা আবার নামিদামী রেস্টুরেন্ট ও হোটেল থেকে প্রশিক্ষিত। মোট কথা আম্বানি পরিবার কর্মীদের কাছ থেকে সেরা সার্ভিস পেয়ে থাকেন।

বাড়ির বাইরের দিকে বেশ কয়েকটি বারান্দা রয়েছে, প্রতিটি বারান্দা সুসজ্জিত গাছগাছালি দিয়ে। ওই বারান্দাগুলোর সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে বিচিত্র ফুল ও গাছের সমাহার। বাড়ির ভেতরের দেওয়ালেও শোভা পায় দুর্লভ ও দৃষ্টিনন্দন গাছ।
আম্বানি পরিবার প্রায়ই বড় বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সেই পার্টিতে আমন্ত্রিত অতিথিরা যে রথিমহারথিরা হবেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এমন অনুষ্ঠান পরিচালনা করার জন্য রয়েছে বিশাল হলরুম। রয়েছে বিশাল মঞ্চ। বাড়িতে রয়েছে ৯ টি লিফট, যা বাড়ির বাসিন্দা ও অতিথিদে চলাচলে সুবিধা দেয়।বাড়ির ছাদের উপরে রয়েছে হেলিপ্যাড, মোট তিনটি হেলিপ্যাড। ইচ্ছে হলে যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারে তারা আকাশ পথে।


বাড়িটির জমি ছিল এক সময় ওয়াকফ সম্পত্তি। এ নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে। আম্বানিদের চোখ ঝলসে দেওয়া বিলাসবহুল জীবনযাপনকে অনেক ধনী ব্যক্তিরাও ভালো চোখে দেখেন না।

যেমন টাটা গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান রতন টাটা। তিনি একবার বলেছিলেন, ভারতের ধনী ব্যক্তিদের গরীবের প্রতি যে কোনো সহানুভূতি নেই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আন্টিলিয়া । যে ব্যক্তিরা ওখানে বাস করেন তারা কি তাদের চারপাশটা দেখতে পান না।

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, ভোগ,আর্কিটেকচারাল ডাইজেস্ট ইন্ডিয়া ও বিবিসি।

লেখক : পলাশ সরকার

এখানে মন্তব্য করুন :