বিশ্বকাঁপানো ব্যান্ড বিটিএস

বিশ্বকাঁপানো ব্যান্ড বিটিএস

সারা পৃথিবীতে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি অভিনব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে ব্যান্ড মিউজিকের অনত্যম প্রধান অনুষঙ্গ উনুক্ত কনসার্ট। আনন্দময় পরিবেশে একত্রে হৈহুল্লোড় করে গান শোনা  ও  অবাধে নাচার সুযোগ থেকে বঞ্চিত তরুণরা।

সঙ্গীতের ইন্দ্রজাল বোনায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘাতক করোনা ভাইরাস। তবে এই প্রতিকূল সময়েও প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মিউজিক দিয়ে ভক্তদের মনের খোরাক মিটিয়েছে কোরিয়ান ব্যান্ড দল বিটিএস। ব্যান্ড দলটি এই মুহূর্তে সারাবিশ্বের তরুণদের কাছে অপার এক বিস্ময় ও ভালোবাসার নাম। কে পপ গানের জগতের সম্রাট। 

বিটিএস কোনো গতানুুগতিক ব্যান্ড দল নয়। শুরু থেকেই প্রথাগত চিন্তাভাবনা বিরোধী বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান দলটির মধ্যে। গানলিখন, সঙ্গীত সৃষ্টির অভিনবত্ব এবং নানা ইস্যুতে সক্রিয়শীলতা অন্যান্য কে-পপ দল থেকে বিটিএসকে করেছে আলাদা।

এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নজর কাড়ে তরুণদের। কারণ, বিটিএস তরুণদের কথা বলে, তরুণদের হতাশা, রাগ, ক্ষোভ ও  মনস্তত্ত্বের অতল গভীরে গিয়ে আলোকপাত করে। যা দেখা যেত না সমসাময়িক অন্যান্য কে-পপ দলের মধ্যে।

বিটিএস তারকা আরএম। ছবি: কোরিয়াবু

একই সাথে ব্যান্ডের সদস্যরা সমাজের অসঙ্গতি নিয়ে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেন। সমাজে যে চালু আখ্যান তা তুলে ধরেন এবং চ্যালেঞ্জও জানান।

গানের কথায় থাকে কিশোর-তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, টিনেজারদের মানসিক সংকট, ক্ষয়ক্ষতি, ভালোবাসার কোনো কিছুর দিকে যাত্রা এবং ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ। তাদের কাজে ছাপ মেলে সাহিত্য, ইতিহাস, বৈশ্বিক টানাপোড়েন, মনস্তাত্ত্বিক ধারণা এবং এই পৃথিবীর সমান্তরাল আরেকটি পৃথিবীর অস্তিত্বের বিষয়টি।

সারাবিশ্বে এখন কে পপ গান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। গত কয়েক দশক ধরে সঙ্গীতের রাজত্ব একচ্ছত্র শাসন করত রেডিও মোঘল ও বিভিন্ন গণমাধ্যম। ওরা কে পপ সঙ্গীতকে চিত্রিত করত নতুন ও অদ্ভূত কিছু একটা বলে। তাদের মূল আগ্রহের বিষয় ছিল পশ্চিমা সুর ও গান। কে-পপ গানকে সযতেœ এড়িয়ে যাবার একটি চেষ্টা পশ্চিমা মিডিয়ার মধ্যে ছিল। 

জে হোপ। ছবি : কোরিয়াবু

কিন্তু বিটিএস পশ্চিমা সঙ্গীত দুনিয়ার ওই চালুপ্রথা ভেঙে ফেলেছে। দেখিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও একটি ব্যান্ডদল পৃথিবীর নানা প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে।

এক্ষেত্রে বিটিএস নিউমিডিয়া অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যে আসল সক্ষমতা তার সদ্ব্যবহার করেছে। টুইটারসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের পোস্ট শেয়ার করেছে।

আর এসব খবর প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে ভাইরাল করে ভক্তরা। ইন্টারনেটে তাদের ভক্তদের গ্রুপের নাম (ARMY) আর্মি।

জিমিন । ছবি: কোরিয়াবু

আর্মি  বিটিএসের এলবাম রিলিজ হলে, নতুন কোনো গান বের হলে, বিভিন্ন জায়গায় কনসার্টের খবর, ব্যান্ড দলের সদস্যদের খবরাখবর প্রচার ও প্রকাশ করে গভীর ভালোবাসা নিয়ে। অর্থাৎ ব্যান্ড দলটির সব আপডেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিটিএসের ট্রেন্ডিংয়ের কাজটি এরাই করে দেয়।।

ভক্তদের এই তুমুল সীমাহীন ভালোবাসার ব্যাপারে অবগত বিটিএস। ব্যান্ডের সদস্যরা নিজেরাই স্বীকার করে, এখন আমরা যা, তা আসলে ভক্তদের গভীর ভালোবাসার ফল। ব্যান্ডের সদস্য আরএম বলেন, ভক্তরা জানে আমরা সবসময় তাদের সাথেই আছি।  আমরাও জানি ওরা আছে আমাদের হৃদয়ে। 

বিটিএস ব্যান্ডের আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০১০ সালে। এর মূল কৃতিত্ব কে পপ পরিকল্পনাকারী ও বিগ হিট এন্টারটেনমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা ব্যাং সিহাইয়ুকের। তিনি খুঁজে বের করেন সিউলের আন্ডারগ্রাউন্ড র‌্যাপ তারকা আরএমকে। আরএম একে একে নিয়ে আসেন জিন, সুগা, জে-হোপ, জিমিন, ভি, জাং-কুককে। প্রত্যেকের রয়েছে নাচ, র‌্যাপ ও গান গাওয়ার অনন্য পারদর্শিতা।

জিন । ছবি: কোরিয়াবু

তাদের প্রথম গান ‘নো মোর ড্রিম’। ২০১৩ সালে গানটি রিলিজ হলে চারদিকে হইচই পড়ে যায়। কোরিয়াায় শিশুদের ওপর সামাজিক চাপের সমালোচনা করা হয় গানে। অভিভাবকরা কীভাবে নিজেদের প্রত্যাশার ভাারি বোঝা চাপিয়ে দেন শিশুদের কাঁধে তার কড়া সমালোচনা ছিল গানে।

এলবামের নাম ছিল ‘টু কুল ফর স্কুল’। কোরিয়ান ভাষায় এলবামটি বের হয়। জাপানিশ্রোতা টানতে পাশাপাশি জাপানি একটি সংস্করণও বের করা হয় ।

মানুষের শারীরিক কাঠামো, চেহারা, পুরুষালি চেহারার চালু মডেল তারা ভাঙতে শুরু করে। এলজিবিটিকিউ প্লাস অধিকারের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে থাকে ব্যান্ডটি।

ভি । ছবি : কোরিয়াবু

তারা নিজেদের কোমল একটি প্রতিকৃতি গড়েছে। যেখানে পুরুষের আদলে শক্তিশালী ভাবটা কমিয়ে নিরপেক্ষ একটি ভাব আনা হয়েছে। ওরা মাথার চুলে রংয়ের খেলা খেলে,  ব্যান্ডদলের সদস্যরা নিজেরা নিজেদের কাঁধে হাত রাখে বন্ধুত্বের ও নির্ভরতা শক্তি দিয়ে। আর পোশাক ও চুলের স্টাইলের নিজস্বতা তো রয়েছেই। 

এছাড়া অভিনব নাচ, নাচের মুদ্রায় নতুনত্ব, স্টেজ পারফর্মিং, হাই কোয়ালিটি মিউজিক ভিডিও নির্মাণ, কোরিয়োগ্রাফি এসব বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ দলটিকে শুধুমাত্র কে-পপ দলগুলোর মধ্যেই অনন্য করেনি বরং বৈশ্বিক পপসঙ্গীতের বাজারেও স্বতন্ত্র করেছে।  

শুধু গান গেয়েই সামাজিক আন্দোলনের দায়িত্ব সারেনি বিটিএস। ব্লাক লাইভ মেটারস আন্দোলনের সময় ব্যান্ড দলটি এক মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে।

জাংকুক । ছবি :কোরিয়াবু

করোনার মধ্যে গত আগস্টে বিটিএস ‘ডিনামাইট’ নামে একটি ইংরেজি গান করে। ডিনামাইট ইউএস টপচার্টে বিস্ফোরণ ঘটায়। কোরিয়ান কোনো গান এই  প্রথম শীর্ষে উঠে। একই সপ্তাহে নতুন এলবাম বি প্রকাশিত হয়। ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো ব্যান্ডের এলবাম ও গান একই সপ্তাহে বিলবোর্ড চার্টেও শীর্ষে উঠে। 

গত অক্টোবরে ভার্চুয়ালি শো করেছে বিটিএস। টিকিট কেটে শ্রোতাদের শুনতে হয়েছে গান। দুই রাতের ইভেন্টের জন্য বিক্রি হয় দশ লাখের মতো টিকিট। এছাড়া আমেরিকাসহ ইউরোপে ওদের কনসার্টের টিকিট বিক্রি হয়ে যায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। টিকিট না পেলেও  ক্যাম্প করে থেকেও ভক্তরা শোনে ওদের গান।

গায়ক বা ব্যান্ডদলের ক্ষেত্রে যেটি হয় জনপ্রিয়তা আসে, কিন্তু অর্থনৈতিক সাফল্য ধরা দেয় না। অর্থকড়ির মালিক হন পরিবেশকরা, আর শিল্পিদের তাতে শূন্য থালা। সেদিক থেকেও সফল বিটিএস। বর্তমানে এটি একটি পাবলিক কোম্পানি।

সুগা । ছবি: কোরিয়াবু

বিলিনিয়র হয়েছেন ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ব্যাং। অন্যদিকে দলের প্রত্যেক তারকা হয়েছেন মিলিওনিয়ার।

গ্রামি নমিনেশন পেয়েছে বিটিএস। ইউটিউবে ব্যান্ডের সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা শীর্ষ দশটি মিউজিক একাউন্টের একটি। গত বছর একাউন্টের ভিউ হয়েছে ১৩ বিলিয়নেরও বেশি। এই জন্যই ইউটিউবের মিউজিক ট্রেন্ড ম্যানেজার কেভিন মিনন বলেন, বিটিএস নিজেরা নিজেদের রেকর্ড ভাঙছে। ওদের এখন একমাত্র প্রতিযোগী ওরা নিজেরাই। দি ডিনামাইট ভিডিওটি ২৪ ঘন্টায় ১০১ মিলিয়ন দর্শক-শ্রোতা দেখেন। ইউটিউব প্লাটফর্মের জন্যও এটি নজিরবিহীন ঘটনা।  

আরএম এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমরা একেবারেই সাধারণ গোছের কয়েকজন একত্রে মিলেছি। যাদের ব্যাকগ্রাউন্ডও উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।  আমাদের গানের উপজীব্য হলো সত্যিকারের বাস্তবতা। এ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় সব মানুষকে। জীবনে পছন্দের পথ বেছে নেওয়া, বিষাদ, আত্মসম্মান এসব।

কোরিয়ান শব্দ ব্যাংটান সোনিয়োনডান-এর আদ্যক্ষর হলো বিটিএস। এর ইংরেজি অর্থ দাঁড়ায় বুলেটপ্রুফ বয় স্কাউটস।  ২০১৭ সালে পুনরায় নামকরণ করা হয় বিটিএস-বিয়োন্ড দ্য সিন (পর্দার অন্তরালে)।

টাইম ম‌্যাগাজিনের প্রচ্ছদে বিটিএস। ছবি : কোরিয়াবু

সদস্যদের মধ্যে একজনই ইংরেজি জানেন, তিনি আরএম। বেশিরভাগ গানই কোরিয়ান ভাষায় করা। তবে সারাপৃথিবীর তরুণদের মন কেড়ে নিতে ভাষা কোনো প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেনি। অনবদ্য সুর, মিউজিক ভিডিও, নাচ, পোশাক, স্টাইল  দিয়ে সব ভাষাভাষীর মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছে বিটিএস। 

আরএম এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমাদের নিজেকে সবার আগে ভালোবাসতে হবে এটাই আমাদের প্রধান নিয়ম। জীবনে ভাবনার বাইরেও অনেক কিছু ঘটে। থাকবে সমস্যা, নানামুখী সংকট। কিন্তু এগুলোকে স্বীকার করে নিতে হবে। ভালো থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের মতো হওয়া। আমরা এখনো চেষ্টা করছি নিজেদের মতো হতে। জানালেন, নিজের কাছে নিজেকে স্বীকার করা-এই থিমকে নিয়ে তারা একটি এলবামও বের করেছে।   

তথ্যসূত্র : টাইম ম্যাগাজিন, কোরিয়াবু ডটকম, বিবিসি ও ইউটিউব।

লেখক : পলাশ সরকার

এখানে মন্তব্য করুন :