বাংলার গোয়েন্দারা

বাংলার গোয়েন্দারা

গোয়েন্দা গল্প বা Detective story ভালো লাগে না এমন কাউকে পাওয়া দুষ্কর। কারণ গোয়েন্দা গল্প যে রোমাঞ্চ আমাদের মধ্যে তৈরি করে তা অন্য ধরণের উপন্যাস দিতে পারে না। এই রোমাঞ্চ শুধু তারাই অনুভব করতে পারবে যারা গোয়েন্দা গল্পের পোকা। শার্লক হোমসকে তো আমরা সবাই চিনি। অনেকে বলেন শার্লকের থেকে বড় গোয়েন্দা এখনও জন্মায়নি। তবে আমাদের বাঙালি গোয়েন্দারাও কিন্তু কম যায় না। যারা তাদের গল্প পড়েছে শুধু তারাই বুঝতে পারবে তাদের বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা কতটা। আজকের আলোচনা হবে কয়েকজন বাঘা বাঘা বাঙালি গোয়েন্দাদের নিয়ে।

কাকাবাবু

কাকাবাবু ওরফে রাজা রায়চৌধুরী এর গল্প শুধু রহস্যরোমাঞ্চ গল্প বললে কম বলা হবে, রহস্যের পাশাপাশি ওনার গল্পে রয়েছে অসাধারণ অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ। কালজয়ী এ চরিত্রের স্রষ্টা প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। যদিও অনেক রহস্যের সমাধান তিনি করেছেন কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে কাকাবাবুকে ঠিক গোয়েন্দা বলা চলে না। অন্তত উনি নিজেকে কখনোই গোয়েন্দা বলেন না। গল্পে আমরা তাকে দেখি একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে, যিনি একসময় ভারত সরকারের অধীনে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন।

একটি দুর্ঘটনায় তার একটি পা অকেজো হয়ে যাওয়ায় তিনি অনেক আগেই অবসর গ্রহণ করেন। দুটো ক্রাচে ভর করে এবং বুদ্ধির জোরেই এই এতসব অ্যাডভেঞ্চার করেন। আর তার অ্যাডভেঞ্চার গুলোর সঙ্গী হচ্ছে তার ভাইপো সন্তু। সন্তুকে বাইরে থেকে দেখে একটি শান্তশিষ্ট ছেলে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু অনেক গল্পে আমরা সন্তু যে কাকাবাবুর যোগ্য ভাইপো তার প্রমাণ পাই। সে শুধু বুদ্ধিতে নয়, মারপিটেও ওস্তাদ। চোখের পলকে ক্যারাটের প্যাঁচ মেরে কুপোকাত করে দিতে পারে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে রহস্য আর অ্যাডভেঞ্চার যেনো তাদের পিছুই ছাড়ে না।

তারা যেখানেই যায় এমনকি বেড়াতে গেলেও অ্যাডভেঞ্চার তাদের পিছু ধাওয়া করে। তবে তাদের অনেক অ্যাডভেঞ্চারে শুধু তারা দুজনই নয়, সাথে সন্তুর বন্ধু জোজোকেও আমরা পাই। জোজো একদম গুল ঝাড়ার ওস্তাদ, আর স্বভাবেও সন্তুর ঠিক উল্টো।

সন্তু যেমন সাহসী, জোজোটা তেমনই ভীতু। তবে বাহির থেকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। কারণ জোজো যেমন চঞ্চল তেমনই বকবক করে। আর কাকাবাবুর কথা আলাদা করে আর কিই বা বলব! তিনি যেমন সাহসী তেমনই বুদ্ধিমান এবং একই সাথে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। কখনো শত্রুর সমানে মাথা নত না করা কাকাবাবুর একটি প্রতিজ্ঞা আছে, কখনো যদি কেউ তাকে আঘাত করেন তিনি তার শোধ না নিয়ে ছাড়েন না।

১৯৭১ সালে প্রকাশিত ‘ভয়ংকর সুন্দর’ উপন্যাসের মাধ্যমেই কাকাবাবুর আবির্ভাব ঘটে। এ পর্যন্ত কাকাবাবুর মোট ৬টি সমগ্র প্রকাশিত হয়েছে।

ফেলুদা

সবার কথা জানি না, কিন্তু কিশোরী বয়সে ফেলুদা ছিল আমার স্বপ্নের হিরো। আমার অনেক অলীক কল্পনায় নিজেকে কল্পনা করতাম রহস্যময়ভাবে হারিয়ে যাওয়া এক মেয়ে, যাকে ফেলুদা বিপদ থেকে উদ্ধার করে। ফেলু মিত্তির অর্থাৎ প্রদোষ চন্দ্র মিত্র যাকে আমরা ফেলুদা নামেই চিনি, প্রথম আবির্ভাব ঘটে ১৯৬৫ সালে ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ উপন্যাসের মাধ্যমে যার লেখক সত্যজিৎ রায়, যিনি একাধারে সাহিত্যিক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা।

তবে প্রথম দিকে শখের প্রাইভেট ডিটেকটিভ হলেও পরে এই পেশাকেই ফেলুদা বেছে নেন। ফেলুদা আবার তার গুরু মানেন বিখ্যাত গোয়েন্দা শার্লক হোমসকে। তিনি হোমসের আদর্শ শিষ্যই বটে। কারণ গুরুর মত তারও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার পরিচয় প্রতিটি গল্পে বরাবরই পাওয়া যায়।

এই ফেলু মিত্তিরের অ্যাসিস্ট্যান্ট আবার তার কাকাতো ভাই তোপসে ওরফে তপেশ রন্জন মিএ। ফেলুদার সব রহস্য কাহিনী তোপসেই তার নিজের ভাষায় লেখে। এদের দুজনের সাথে আরো একজনকে পাই আমরা। তিনি হচ্ছেন বিখ্যাত রহস্যরোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক জটায়ু ওরফে লালমোহন গাঙ্গুলি। ওনার সাথে ফেলুদা আর তোপসের আলাপ হয় ‘সোনার কেল্লা’ রহস্য কাহিনীতে। এরপর থেকে প্রতিটি কাহিনীতে তিনিও ফেলুদার সঙ্গী। ভদ্রলোক আবার একটা ভীতুর ডিম।

তবে লেখক এই চরিত্রকে এমনই হাস্যরসের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন যে সকলের মন জয় করতে বাধ্য। ফেলুদার কিছু কিছু গল্পে আরো একজনকে পাই আমরা, যিনি জ্ঞানে ও বুদ্ধিতে ফেলুদাকেও টেক্কা দেন। তিনি হচ্ছেন সিধু জ্যাঠা, যার কাছে ফেলুদা মাঝে মধ্যেই নানান তথ্য জানার জন্য যেতো।

ব্যোমকেশ বক্সী

ব্যোমকেশ বক্সী, ফেলুদা বা কাকাবাবুরও অনেক আগের গোয়েন্দা। তার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩৩৯ সালে অর্থাৎ ইংরেজি সাল ১৯৩৩ এ। বাংলা সাহিত্যের আরেক কিংবদন্তি সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্যোমকেশ চরিত্র সৃষ্টি করেন। ব্যোমকেশ বক্সী আবার নিজেকে গোয়েন্দা বা ডিটেকটিভ বলেন না। তিনি সত্যান্বেষী, অর্থাৎ যে সত্যের অন্বেষণ করে। তাই তাকে ডিটেকটিভ বক্সী বা গোয়েন্দা বক্সী  না ডেকে সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী বলাই শ্রেয়। সব গোয়েন্দার মতই সত্যান্বেষী ভদ্রলোকেরও একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে, তার বন্ধু সাহিত্যিক অজিত।

তার ভাষাতেই বর্ননা করা হয়েছে ব্যোমকেশ বক্সীর প্রতিটি কাহিনী। সত্যান্বেষী বক্সী কিন্তু অন্য সব গোয়েন্দার মত ব্যাচেলর নন, তিনি বিবাহিত। পত্নী সত্যবতীর সাথে তার প্রথম সাক্ষাত হয় ‘অর্থমনর্থম’ কাহিনীতে। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিধারী এবং অসাধারন পর্যবেক্ষণসম্পন্ন ব্যোমকেশ বক্সী তার বুদ্ধির ঝলক দেখিয়ে বরাবরই পাঠকের মন জয় করে এসেছেন। আমার পাঠ করা ব্যোমকেশ সমগ্রের সবচেয়ে পছন্দের গল্প হচ্ছে ‘বহ্নি-পতঙ্গ’ , যেখানে সত্যান্বেষী একটি ছবি দেখে তার ব্রহ্মাস্ত্র অর্থাৎ বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে রহস্য সমাধানের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছান।

কাকাবাবু, ফেলুদা, ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে এখন পর্যন্ত অনেক অনেক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সব্যসাচী চক্রবর্তী, আবীর চ্যাটার্জি, প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি, যীশু সেনগুপ্ত, পরমব্রত চ্যাটার্জির মত অভিনেতাদের এসব চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গেছে।

লেখক : ফ্লোরা মৃত্তিকা বিশ্বাস, শিক্ষার্থী, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।

এখানে মন্তব্য করুন :