কর্ম্মফল (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯০৩
প্রকাশনা-তথ্য
কর্ম্মফল
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রণীত।
কুন্তলীন আফিস হইতে
শ্রীএইচ বসু কর্তৃক
প্রকাশিত।
কলিকাতা;
১৩১০ সন।
কুন্তলীন প্রেস হইতে
শ্রীপূর্ণচন্দ্র দাস কর্ত্তৃক মুদ্রিত।
মূল্য॥ আট আনা মাত্র।
গ্রন্থকারের বিজ্ঞাপন।
আমার রচিত এই ক্ষুদ্র গল্পটি গ্রহণ করিয়া কুন্তলীনের স্বত্বাধিকারী শ্রীযুক্ত হেমেন্দ্রমােহন বসু মহাশয় বােলপুর ব্রহ্মচর্য্যাশ্রমের সাহায্যার্থে তিনশত টাকা দান করিয়াছেন।
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
অষ্টম পরিচ্ছেদ।
নলিনী। সতীশ, আমি তোমাকে কেন ডেকে পাঠিয়েচি বলি, রাগ কোরো না!
সতীশ। তুমি ডেকেচ বলে রাগ করব আমার মেজাজ কি এতই বদ্?
নলিনী। না ও সব কথা থাক! সকল সময়েই নদী সাহেবের চেলাগিরি কোরো না! বল দেখি আমার জন্মদিনে তুমি আমাকে অমন দামী জিনিস কেন দিলে?
সতীশ। যাঁকে দিয়েচি তাঁর তুলনায় জিনিসটার দাম এমনই কি বেশী!
নলিনী। আবার ফের নন্দীর নকল!
সতীশ। নন্দীর নকল সাধে করি। তার প্রতি যখন ব্যক্তিবিশেষের পক্ষপাত—
নলিনী। তবে যাও, তোমার সঙ্গে আর। আমি কথা কব না। সতীশ। আচ্ছা মাপ কর,আমি চুপ করে গুনব।
নলিনী। দেখ সতীশ, মিষ্টার নন্দী আমাকে নির্ব্বোধের মত একটা দামী ব্রেস্লেট পাঠিয়ে ছিলেন, তুমি অমনি নির্ব্বুদ্ধিতার সুর চড়িয়ে তার চেয়ে দামী একটা নেক্লেস্ পাঠাতে গেলে কেন?
সতীশ। যে অবস্থায় লোকের বিবেচনাশক্তি থাকে না সে অবস্থাটা তোমার জানা নেই বলে তুমি রাগ করচ নেলি!
নলিনী। আমার সাত জন্মে জেনে কাজ নেই। কিন্তু এ নেক্লেস্ তোমাকে ফিরে নিয়ে যেতে হবে।
সতীশ। ফিরে দেবে?
নলিনী। দেব। বাহাদুরি দেখাবার জন্য যে দান, আমার কাছে সে দানের কোন মূল্য নেই!
সতীশ। তুমি অন্যায় বলছ নেলি।
নলিনী। আমি কিছুই অন্যায় বলচিনে—তুমি। যদি আমাকে একটি ফুল দিতে আমি ঢের বেশী খুসি হতেম। তুমি যখন-তখন প্রায়ই মাঝে-মাঝে আমাকে কিছুনা কিছু দামী জিনিস পাঠাতে আরম্ভ করেছ। পাছে তোমার মনে লাগে বলে আমি এতদিন কিছুই বলি নি। কিন্তু ক্রমেই মাত্রা বেড়ে চলেছে আর আমার চুপ করে থাকা উচিত নয়। এই নাও তোমার নেক্লেস্।
সতীশ। এ নেক্লেস্ তুমি রাস্তায় টান মেরে ফেলে দাও কিন্তু আমি এ কিছুতেই নেবনা।
নলিনী। আচ্ছ সতীশ, আমি ত তোমাকে ছেলেবেলা হতেই জানি, আমার কাছে ভাঁড়িয়োনা। সত্য করে বল তোমার কি অনেক টাকা ধার হয় নি?
সতীশ। কে তোমাকে বলেচে? নরেন বুঝি?
নলিনী। কেউ বলে নি। আমি তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারি। আমার জন্য তুমি এমন অন্যায় কেন করচ?
সতীশ। সময়বিশেষে লোকবিশেষের জন্য মানুষ প্রাণ দিতে ইচ্ছে করে; আজকালকার দিনে প্রাণ দেবার অবকাশ খুঁজে পাওয়া যায় না—অন্ততঃ ধার করবার দুঃখটুকু স্বীকার করবার যে সুখ তাও কি ভোগ করতে দেবেনা? আমার পক্ষে যা দুঃসাধ্য আমি তোমার জন্য তাই করতে চাই নেলি একেও যদি তুমি নন্দী সাহেবের নকল বল তবে আমার পক্ষে মর্ম্মান্তক হয়।
নলিনী। আচ্ছা তোমার যা করবার তা ত করেচ—তোমার সেই ত্যাগস্বীকারটুকু আমি নিলেম—এখন এ জিনিসটা ফিরে নাও!
সতীশ। ওটা যদি আমাকে ফিরিয়ে নিতে হয় তবে ঐ নেক্লেস্টা গলায় ফাঁস লাগিয়ে দম বন্ধ করে আমার পক্ষে মারা ভাল।
নলিনী। দেন। তুমি শোধ করবে কি করে?
সতীশ। মার কাছ হতে টাকা পাব।
নলিনী। ছি ছি, তিনি মনে করবেন আমার জন্যই তাঁর ছেলের দেনা হচে।
সতীশ। সে কথা তিনি কখনই মনে করবেন না, তাঁর ছেলেকে নেক্লেস্ দিন হতে জানেন।
নলিনী। আচ্ছা সে যাই হোক তুমি প্রতিজ্ঞা কর এখন হতে তুমি আমাকে দামী জিনিষ দেবে না। বড় জোর ফুলের তোড়ার বেশী আর কিছু দিতে পারবে না।
সতীশ। আচ্ছা সেই প্রতিজ্ঞাই করলেম। নলিনী। যাক্, এখন তবে তোমার গুরু নন্দী সাহেবের পাঠ আবৃত্তি কর! দেখি স্তুতিবাদ করবার বিদ্যা তোমার কতদূর অগ্রসর হল। আচ্ছা আমার কানের ডগা সম্বন্ধে কি বলিতে পার বল— আমি তোমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিলেম।
সতীশ। যা বলব তাতে ঐ ডগাটুকু লাল হয়ে উঠবে।
নলিনী। বেশ বেশ, ভূমিকাটা মন্দ হয়নি। আজকের মত ঐটুকুই থাক বাকিটুকু আর একদিন হবে। এখনি কান ঝাঁ ঝাঁ করতে সুরু হয়েছে।
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ।
সতীশ। বড় সাহেব হিসাবের খাতাপত্র কাল দেখবেন। মনে করেছিলেম ইতিমধ্যে “গানির” টাকাটা নিশ্চয় পাওয়া যাবে তহবিল পূরণ করে রাখব—কিন্তু বাজার নেমে গেল। এখন জেল ছাড়া গতি নেই। ছেলেবেলা হতে সেখানে যাবারই আয়োজন করা গেছে!
কিন্তু অদৃষ্টকে ফাঁকি দেব! এই পিস্তলে দুটি গুলি পুরেচি—এই যথেষ্ট! নেলি—না না ও নাম নয়, ও নাম নয়—আমি তাহলে মরতে পারব না। যদি বা সে আমাকে ভালবেসে থাকে, সে ভালবাসা আমি ধূলিসাৎ করে দিয়ে এসেচি। চিঠিতে আমি তার কাছে সমস্তই কবুল করে লিখেছি। এখন পৃথিবীতে আমার কপালে যার ভালবাসা বাকি রইল সে আমার এই পিস্তল! আমার অন্তিমের প্রেয়সী, ললাটে তোমার চুম্বন নিয়ে চক্ষু মুদব! মেসোমশায়ের এ বাগানটি আমারই তৈরি। যেখানে যত দুর্ল্লভ গাছ পাওয়া যায় সব সংগ্রহ করে এনেছিলেম। ভেবে ছিলেম এ বাগান এক দিন আমারই হবে। ভাগ্য কার জন্য আমাকে দিয়ে এই গাছগুলো রোপণ করে নিচ্ছিল, তা আমাকে তখন বলে নি—তা হোক্, এই ঝিলের ধারে এই বিলাতি ষ্টিফানোটিস্ লতার কুঞ্জে আমার “এ জন্মের হাওয়া খাওয়া শেষ করব—মৃত্যুর দ্বারা আমি এ বাগান দখল করে নেব—এখানে হাওয়া খেতে আসতে আর কেউ সাহস করবে না!
মেসোমশায়কে প্রণাম করে পায়ের ধূল নিতে চাই। পৃথিবী হতে ঐ ধূলটুকু নিয়ে যেতে পারলে আমার মৃত্যু সার্থক হত। কিন্তু এখন সন্ধ্যার সময় তিনি মাসীমার কাছে আছেন—আমার এ অবস্থায় মাসীমার সঙ্গে দেখা করতে আমি সাহস করিনে! বিশেষতঃ পিস্তল ভরা আছে!
মরবার সময় সকলকে ক্ষমা করে শান্তিতে মরবার উপদেশ শাস্ত্রে আছে। কিন্তু আমি ক্ষমা করতে পারলেম না। আমার এ মরবার সময় নয়। আমার অনেক সুখের কল্পনা, ভোগের আশা ছিল—অল্প কয়েক বৎসরের জীবনে তা একে একে সমস্তই টুকরা টুক্রা হয়ে ভেঙেচে। আমার চেয়ে অনেক অযোগ্য অনেক নির্ব্বোধ লোকের ভাগ্যে অনেক অযাচিত সুখ জুটেছে, আমার জুটেও জুটল না—সে জন্য যারা দায়ী তাদের কিছুতেই ক্ষমা করতে পারব না- কিছুতেই না। আমার মৃত্যুকালের অভিশাপ যেন চিরজীবন তাদের পিছনে পিছনে ফেরে—তাদের সকল সুখকে কানা করে দেয়। তাদের তৃষ্ণার জলকে বাষ্প করে দেবার জন্য আমার দগ্ধ জীবনের সমস্ত দাহকে যেন আমি রেখে যেতে পারি!
হায়! প্রলাপ! সমস্তই প্রলাপ! অভিশাপের কোনো বলই নেই! আমার মৃত্যু কেবল আমাকেই শেষ করে দেবে—আর কারো গায়ে হাত দিতে পারবে না! আঃ-তারা আমার জীবনটাকে একেবারে ছারখার করে দিলে আর আমি মরেও তাদের কিছুই করতে পারলেম না। তাদের কোন ক্ষতি হবে না—তারা সুখে থাকবে তাদের দাঁতমাজা হতে আরম্ভ করে মশারি-ঝাড়া পর্যন্ত কোন তুচ্ছ কাজটিও বন্ধ থাকবে না—অথচ আমার সূর্য্য চন্দ্র নক্ষত্রের সমস্ত আলোক এক ফুৎকারে নিবল—আমার নেলি—উঃ ও নাম নয়!
ও কেও! হরেন! সন্ধ্যার সময় বাগানে বার হয়েচ যে! বাপমাকে লুকিয়ে চুরি করে কাঁচা পেয়ারা পাড়তে এসেচে। ওর আকাঙ্ক্ষা ঐ কাঁচা পেয়ারার চেয়ে আর অধিক উচ্চে চড়ে নি—ঐ গাছের নীচু ডালেই ওর অধিকাংশ সুখ ফলে আছে। পৃথিবীতে ওর জীবনের কি মূল্য! গাছের একটা কাঁচা পেয়ারা যেমন এ সংসারে ওর কাঁচা জীবনটাই বা তার চেয়ে কি এমন বড়। এখনি যদি ছিন্ন করা যায়, তবে জীবনের কত নৈরাশ্য হতে ওকে বাঁচানো যায় তা কে বলতে পারে? আর মাসীমা-ইঃ! একেবারে লুটাপুটি করতে থাকবে। আঃ!
ঠিক সময়টি, ঠিক স্থানটি, ঠিক লোকটি! হাতকে আর সামলাতে পাচ্চিনে! হাতটাকে নিয়ে কি করি! হাতটাকে নিয়ে কি করা যায়।
(ছড়ি লইয়া সতীশ সবেগে চারা গাছগুলিকে ক্রমাগত আঘাত করিতে লাগিল। তাহাতে তাহার উত্তেজনা ক্রমশঃ আরো বাড়িয়া উঠিতে লাগিল। অবশেষে নিজের হাতকে সে সবেগে আঘাত করিল; কিন্তু কোন বেদনা বোধ করিল না। শেষে পকেটের ভিতর হইতে পিস্তল সংগ্রহ করিয়া লইয়া সে হরেনের দিকে সবেগে অগ্রসর হইতে লাগিল)।
হরেন। (চমকিয়া উঠিয়া) এ কি! দাদা না কি! তোমার দুটি পায়ে পড়ি দাদা, তোমার দুটি পায়ে পড়ি—বাবাকে বলে দিয়ো না!
সতীশ। (চীৎকার করিয়া) মেসোমশায়— মেসোমশায়—এই বেলা রক্ষা কর—আর দেরি কোরো না-তোমার ছেলেকে এখনো রক্ষা কর?
শশধর। (ছুটিয়া আসিয়া) কি হয়েছে সতীশ! কি হয়েছে!
সুকুমারী। (ছুটিয়া আসিয়া) কি হয়েছে আমার বাছার কি হয়েছে!
হরেন। কিছুই হয় নি মা—কিছুই না-দাদা তোমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছেন।
সুকুমারী। এ কি রকম বিশ্রী ঠাট্টা! ছি ছি, সকলি অনাসৃষ্টি! দেখ দেখি! আমার বুক এখনো ধড়াস্ ধড়াস্ করচে! সতীশ, মদ ধরেচে বুঝি! সতীশ। পালাও—তোমার ছেলেকে নিয়ে এখনি পালাও! নইলে তোমাদের রক্ষা নেই! (হরেনকে লইয়া ত্রস্তপদে সুকুমারীর পলায়ন)
শশধর। সতীশ, অমন উতলা হয়ে না! ব্যাপারটা কি বল! হরেনকে কার হাত হতে রক্ষা করবার জন্য ডেকেছিলে?
সতীশ। আমার হাত হতে। (পিস্তল দেখাইয়া) এই দেখ মেসোমশায়!
দ্রুতপদে বিধুমুখীর প্রবেশ।
বিধু। সতীশ, তুই কোথায় কি সর্ব্বনাশ করে এসেছিস বলদেখি! আপিসের সাহেব পুলিশ সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাড়িতে খানাতল্লাসি করতে এসেচে। যদি পালাতে হয় ত এই বেলা পালা! হায় ভগবান, আমি ত কোন পাপ করিনি আমারি অদৃষ্টে এত দুঃখ ঘটে কেন?
সতীশ। ভয় নেই—পালাবার উপায় আমার হাতেই আছে।
শশধর। তবে কি তুমি-
সতীশ। তাই বটে মেসোমশায়—যা সন্দেহ করচ তাই! আমি চুরি করে মাসীর ঋণ শোধ করেচি। আমি চোর! মা, শুনে খুসি হবে, আমি চোর, আমি খুনী! এখন আর কাঁদতে হবে না—যাও যাও আমার সম্মুখ হতে যাও! আমার অসহ্য বোধ হচ্চে!
শশধর। সতীশ, তুমি আমার কাছেও ত কিছু ঋণী আছ, তাই শোধ করে যাও!
সতীশ। বল, কেমন করে শোধ করব! কি আমি দিতে পারি! কি চাও তুমি!
শশধর। ঐ পিস্তলটা দাও!
সতীশ। এই দিলাম! আমি জেলেই যাব! না গেলে আমার পাপের ঋণশোধ হবে না!
শশধর। পাপের ঋণ শাস্তির দ্বারা শোধ হয় না সতীশ, কর্ম্মের দ্বারাই শোধ হয়! তুমি নিশ্চয় জেনো আমি অনুরোধ কল্লে তোমার বড় সাহেব তোমাকে জেলে দেবেন না। এখন হতে জীবনকে সার্থক করে বেঁচে থাক!
সতীশ। মেসোমশায়, এখন আমার পক্ষে বাঁচা যে কত কঠিন তা তুমি জান না—মরব নিশ্চয় জেনে পায়ের তলা হতে আমার শেষ সুখের অবলম্বনটা আমি পদাঘাতে ফেলে দিয়ে এসেচি— এখন কি নিয়ে বাঁচব। শশধর। তবু বাঁচতে হবে, আমার ঋণের এই শোধ—আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালাতে পারবে না!
সতীশ। তবে তাই হবে।
শশধর। আমার একটা অনুরোধ শোন! তোমার মাকে আর মাসীকে অন্তরের সহিত ক্ষমা কর!
সতীশ। তুমি যদি আমাকে ক্ষমা করতে পার—তবে এ সংসারে কে এমন থাকতে পারে যাকে আমি ক্ষমা করতে না পারি! (প্রণাম করিয়া) মা, আশীর্ব্বাদ কর আমি সব যেন সহ্য করতে পারি—আমার সকল দোষগুণ নিয়ে তোমরা আমাকে যেমন গ্রহণ করেচ সংসারকে আমি যেন তেমনি করে গ্রহণ করি।
বিধু। বাবা, কি আর বলব! মা হয়ে আমি তোকে কেবল স্নেহই করেছি তোর কোন ভাল করতে পারিনি-ভগবান তোর ভাল করুন! দিদির কাছে আমি একবার তোর হয়ে ক্ষমাভিক্ষা করে নিইগে!
(প্রস্থান)
শশধর। তবে এস সতীশ, আমার ঘরে আজ আহার করে যেতে হবে?
দ্রুতপদে নলিনীর প্রবেশ।
নলিনী। সতীশ!
সতীশ। কি নলিনী!
নলিনী। এর মানে কি? এ চিঠি তুমি আমাকে কেন লিখেচ?
সতীশ। মানে যেমন বুঝেছিলে সেইটেই ঠিক! আমি তোমাকে প্রতারণা করে চিঠি লিখি নি। তবে আমার ভাগ্যক্রমে সকলি উল্টা হয়। তুমি মনে করতে পার তোমার দয়া উদ্রেক করবার জন্যই আমি—কিন্তু মেসোমশায় সাক্ষী আছেন আমি অভিনয় করছিলেম না—তবু যদি বিশ্বাস না হয় প্রতিজ্ঞারক্ষা করবার এখনো সময় আছে!
নলিনী। কি তুমি পাগলের মত বকচ? আমি তোমার কি অপরাধ করেছি যে তুমি আমাকে এমন নিষ্ঠুর ভাবে—
সতীশ। যে জন্য আমি এই সংকল্প করেছি সে তুমি জান নলিনী—আমি ত একবর্ণও গোপন করিনি তবু কি আমার উপর তোমার শ্রদ্ধা আছে?
নলিনী। শ্রদ্ধা! সতীশ, তোমার উপর ঐ জন্যই আমার রাগ ধরে! শ্রদ্ধা ছি, ছি, শ্রদ্ধা ত পৃথিবীতে অনেকেই অনেককে করে! তুমি যে কাজ করেছ আমিও তাই করেছি—তোমাতে আমাতে কোন ভেদ রাখিনি। এই দেখ আমার গহনাগুলি সব এনেচি—এগুলো এখনো আমার সম্পত্তি নয়—এগুলি আমার বাপ মায়ের। আমি তাঁদিগকে না বলে এনেচি এর কত দাম হতে পারে আমি কিছুই জানিনে; কিন্তু এ দিয়ে কি তোমার উদ্ধার হবে না?
শশধর। উদ্ধার হবে এই গহনাগুলির সঙ্গে আরো অমূল্য যে ধনটি দিয়েচ তা দিয়েই সতীশের উদ্ধার হবে।
নলিনী। এই যে শশধর বাবু, মাপ করবেন, তাড়াতাড়িতে আপনাকে আমি-
শশধর। মা, সে জন্য লজ্জা কি! দৃষ্টির দোষ কেবল আমাদের মত বুড়োদেরই হয় না—তোমাদের বয়সে আমাদের মত প্রবীন লোক হঠাৎ চোখে ঠেকেনা! সতীশ, তোমার আপিশের সাহেব এসেচেন্ দেখ্চি। আমি তাঁর সঙ্গে কথাবার্ত্তা কয়ে আসি, ততক্ষণ তুমি আমার হ’য়ে অতিথিসৎকার কর। মা, এই পিস্তলটা এখন তোমার জিম্বাতেই থাকতে পারে।
একাদশ পরিচ্ছেদ
একাদশ পরিচ্ছেদ।
সতীশ। মা এখেনে আমি যে কত সুখে আছি সে ত আমার কাপড়চোপড় দেখেই বুঝতে পার। কিন্তু মেসোমশায় যতক্ষণ না আমাকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করেন ততক্ষণ নিশ্চিন্ত হতে পারছিনে। তুমি যে মাসহরা পাও আমার ত তাতে কোন সাহায্য হবে না। অনেক দিন হতে নেব-নেব করেও আমাকে পোষ্যপুত্র নিচ্চেন না—বোধ হয় ওঁদের মনে মনে সন্তানলাভের আশা এখনো আছে।
বিধু। (হতাশভাবে) সে আশা সফল হয় বা সতীশ!
সতীশ। অ্যাঁ! বল কি মা!
বিধু। লক্ষণ দেখে ত তাই বোধ হয়!
সতীশ। লক্ষণ অমন অনেক সময় ভুলও ত হয়! বিধু। না ভুল নয় সতীশ এবার তোর ভাই হবে!
সতীশ। কি যে বল মা, তার ঠিক নেই— ভাই হবেই কে বল্লে! বোন্ হতে পারে না বুঝি!
বিধু। দিদির চেহারা যেরকম হয়ে গেছে নিশ্চয় তাঁর মেয়ে হবে না, ছেলেই হবে। তা ছাড়া ছেলেই হোক্ মেয়েই হোক্ আমাদের পক্ষে সমানই!
সতীশ। এত বয়সের প্রথম ছেলে, ইতিমধ্যে অনেক, বিঘ্ন ঘটতে পারে!
বিধু। সতীশ তুই চাক্রীর চেষ্টা কর!
সতীশ। অসম্ভব! পাস করতে পারিনি। তা ছাড়া চাকরী করবার অভ্যাস আমার একবারে গেছে। কিন্তু যাই বল মা, এ ভারি অন্যায়! আমি ত এতদিনে বাবার সম্পত্তি পেতেম তার থেকে বঞ্চিত হলেম, তার পরে যদি আবার—
বিধু। অন্যায় নয় ত কি সতীশ! এ দিকে। তোকে ঘরে এনেছেন, ওদিকে আবার ডাক্তার ডাকিয়ে ওষুধ ও খাওয়া চলচে। নিজের বোনপোর সঙ্গে এ কি রকম ব্যবহার! শেষকালে দয়াল ডাক্তারের ওষুধই ত খেটে গেল! অস্থির হোস্নে সতীশ! একমনে ভগবান্কে ডাক্—তাঁর কাছে কোনো ডাক্তারই লাগে না। তিনি যদি—
সতীশ। আহা তিনি যদি এখনো—! এখনো সময় আছে! মা এঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত কিন্তু যে রকম অন্যায় হল সে ভাব রক্ষা করা শক্ত হয়ে উঠেছে! ঈশ্বরের কাছে এঁদের একটা দুর্ঘটনা না প্রার্থনা করে থাক্তে পারচিনে— তিনি দয়া করে যেন—
বিধু আহা তাই হোক্ নইলে তোর উপায় কি হবে সতীশ আমি তাই ভাবি। হে ভগবান্ তুমি যেন—
সতীশ। এ যদি না হয় তবে ঈশ্বরকে আমি আর মান্বনা! কাগজে নাস্তিকতা প্রচার করব!
বিধু। আরে চুপ্ চুপ এখন অমন কথা মুখে আনতে নেই। তিনি দয়াময়, তাঁর দয়া হলে কি না ঘটতে পারে। সতীশ তুই আজ এত ফিট্ ফাট্ সাজ করে কোথায় চলেছিস্? উঁচু কলার পরে মাথা যে আকাশে গিয়ে ঠেক্ল! ঘাড় হেঁট করবি কি করে? সতীশ। এমনি করে কলারের জোরে যত দিন মাথা তুলে চল্তে পারি চলব তার পরে ঘাড় হেঁট করবার দিন যখন আসবে তখন এগুলো ফেলে দিলেই চলবে। বিশেষ কাজ আছে মা চল্লেম কথাবার্ত্তা পরে হবে। (প্রস্থান)
বিধু। কাজ কোথায় আছে তা জানি! মাগো, ছেলের আর তর্ সয়না! এ বিবাহটা ঘটবেই! আমি জানি আমার সতীশের অদৃষ্ট খারাপ নয়, প্রথমে বিঘ্ন যতই ঘটুক্ শেষ কালটায় ওর ভাল হয়ই এ আমি বরাবর দেখে আসচি! না হবেইবা কেন! আমি ত জ্ঞাতসারে কোন পাপ করিনি—আমি ত সতী স্ত্রী ছিলাম, সেইজন্যে আমার খুব বিশ্বাস হচ্চে দিদির এবারে—!
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
সতীশ। জেঠাই মা!
জেঠাই মা। কি বাপ্!
সতীশ। আজ ভাদুড়ি সাহেবের ছেলেকে মা চা খাওয়াবেন তুমি যেন সেখানে হঠাৎ গিয়ে পোড়োনা!
জেঠাই মা। আমার যাবার দরকার কি সতীশ!
সতীশ। যদি যাও ত তোমার এ কাপড়ে চলবে না, তোমাকে—
জেঠাই মা। সতীশ তোর কোন ভয় নেই আমি এই ঘরেই থাকব, যতক্ষণ তোর বন্ধুর চা খাওয়া না হয় আমি বার হব না।
সতীশ। জেঠাই মা, আমি মনে করছি তোমার এই ঘরেই তাকে চা খাওয়াবার বন্দোবস্ত করব। এ বাড়িতে আমাদের যে ঠাসাঠাসি লোক-চা খাবার ডিনার খাবার মত ঘর একটাও খালি পাবার জো নেই! মার শোবার ঘরে সিন্ধুক্ ফিন্ধুক্ কত কি রয়েচে সেখানে কাকেও নিয়ে যেতে লজ্জা করে।
জেঠাই মা। আমার এখানেও ত জিনিষ পত্র—
সতীশ। ওগুলো আজকের মত বা’র করে। দিতে হবে। বিশেষতঃ তোমার এই বঁটি চুপ্ড়ি বারকোশগুলো কোথাও না লুকিয়ে রাখলে চলবে না।
জেঠাই মা। কেন বাবা, ও গুলোতে এত লজ্জা কিসের? তাদের বাড়িতে কি কুট্না কুটবার নিয়ম নাই।
সতীশ। তা জানিনে জেঠাই মা, কিন্তু চা খাবার ঘরে ওগুলো রাখা দস্তুর নয়। এ দেখলে নরেন ভাদুড়ি নিশ্চয় হাসবে, বাড়ি গিয়ে তার বোনদের কাছে গল্প করবে।
জেঠাই মা। শোন একবার ছেলের কথা শোন! বঁটি চুপ্ড়ি ত চিরকাল ঘরেই থাকে! তা নিয়ে গল্প করতে ত গুনি নি!
সতীশ। তোমাকে আর এক কাজ করতে হবে জেঠাই মা—আমাদের নন্দকে তুমি যেমন করে পার এখানে ঠেকিয়ে রেখো। সে আমার কথা শুনবে না, খালি গায়ে ফস্ করে সেখান গিয়ে উপস্থিত হবে।
জেঠাই মা। তাকে যেন ঠেকালেম কিন্তু তোমার বাবা যখন খালি গায়ে—
সতীশ। সে আমি আগেই মাসীমাকে গিয়ে ধরেছিলেম তিনি বাবাকে আজ পিঠে খাবার। নিমন্ত্রণ করেছেন, বাবা এসমস্ত কিছুই জানেন না!
জেঠাই মা। বাবা সতীশ যা মন হয় করিস্। কিন্তু আমার ঘরটাতে তোদের ঐ খানাটানা গুলো—
সতীশ। সে ভাল করে সাফ করিয়ে দেব এখন।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ।
সতীশ। আমি তোমার কাছে বিদায় নিতে এসেচি নেলি!
নলিনী। কেন কোথায় যাবে!
সতীশ। জাহান্নমে।
নলিনী। সে জায়গায় যাবার জন্য কি বিদায় নেবার দরকার হয়? যে লোক সন্ধান জানে সে ত ঘরে বসেই সেখানে যেতে পারে! আজ তোমার মেজাজটা এমন কেন? কলারটা বুঝি ঠিক হালফেশানের হয়নি!
সতীশ। তুমি কি মনে কর আমি কেবল কলারের কথাই দিনরাত্রি চিন্তা করি!
নলিনী। তাইত মনে হয়!সেইজন্যই ত হঠাৎ তোমাকে অত্যন্ত চিন্তাশীলের মত দেখায়!
সতীশ। ঠাট্টা করে না নেলি তুমি যদি আজ। আমার হৃদয়টা দেখতে পেতে— নলিনী। তা হলে ডুমুরের ফুল এবং সাপের পাঁচপাও দেখতে পেতাম!
সতীশ। আবার ঠাট্টা! তুমি বড় নিষ্ঠুর! সত্যই বলচি নেলি আজ বিদায় নিতে এসেচি।
নলিনী। দোকানে যেতে হবে?
সতীশ। মিনতি করচি নেলি ঠাট্টা করে আমাকে দগ্ধ করো না। আজ আমি চিরদিনের মত বিদায় নেব।
নলিনী। কেন, হঠাৎ সেজন্য তোমার এত বেশী আগ্রহ কেন?
সতীশ। সত্য কথা বলি, আমি যে কত দরিদ্র তা তুমি জাননা!
নলিনী। সেজন্য তোমার ভয় কিসের। আমি ত তোমার কাছে টাকা ধার চাইনি।
সতীশ। তোমার সঙ্গে আমার বিবাহের সম্বন্ধ হয়েছিল—
নলিনী। তাই পালাবে? বিবাহ না হতেই হৃৎকম্প!
সতীশ। আমার অবস্থা জান্তে পেরে মিষ্টার ভাদুড়ি আমাদের সম্বন্ধ ভেঙে দিলেন! নলিনী। আমনি সেই অপমানেই কি নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে হবে! এত বড় অভিমানী লোকের কা্রো সঙ্গে কোন সম্বন্ধ রাখা শোভা পায় না। সাধে আমি তোমার মুখে ভালবাসার কথা শুনলেই ঠাট্টা করে উড়িয়ে দি!
সতীশ। নেলি, তবে কি এখনো আমাকে আশা রাখতে বল!
নলিনী। দোহাই সতীশ, অমন নভেলি ছাঁদে কথা বানিয়ে বলো না, আমার হাসি পায়। আমি তোমাকে আশা রাখতে বলব কেন? আশা যে রাখে সে নিজের গরজেই রাখে, লোকের পরামর্শ শুনে রাখে না!
সতীশ। সে ত ঠিক কথা! আমি জানতে চাই তুমি দারিদ্র্যকে ঘৃণা কর কি না!
নলিনী। খুব করি যদি সে দারিদ্র্য মিথ্যার দ্বারা নিজেকে ঢাক্তে চেষ্টা করে!
সতীশ। নেলি, তুমি কি কখনো তোমার চিরকালের অভ্যস্ত আরাম ছেড়ে গরীবের ঘরের লক্ষ্মী হতে পারবে! নলিনী। নভেলে যে রকম ব্যারামের কথা পড়া যায় সেটা তেমন করে চেপে ধরলে আরাম আপনি ঘরছাড়া হয়।
সতীশ। সে ব্যারামের কোন লক্ষণ কি তোমার-
নলিনী। সতীশ তুমি কখনো কোন পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হতে পারলে না! স্বয়ং নন্দীসাহেবও বোধ হয় অমন প্রশ্ন তুলতেন না। তোমাদের একচুলও প্রশ্রয় দেওয়া চলে না!
সতীশ। তোমাকে আমি আজও চিনতে পারলেম না নেলি!
নলিনী। চিনবে কেমন করে? আমি ত তোমার হাল ফেশানের টাই নই কলার নই— দিনরাত যা নিয়ে ভাব তাই তুমি চেন!
সতীশ। আমি হাত জোড় করে বলচি নেলি তুমি আজ আমাকে এমন কথা বলো না! আমি যে কি নিয়ে ভাবি তা তুমি নিশ্চয় জান-
নলিনী। তোমার সম্বন্ধে আমার অন্তর্দৃষ্টি যে এত প্রখর তাহ এতটা নিঃসংশয়ে স্থির করে না। ঐ বাবা আস্চেন। আমাকে এখানে দেখলে তিনি অনর্থক বিরক্ত হবেন আমি যাই! (প্রস্থান)
সতীশ। মিষ্টার ভাদুড়ি আমি বিদায় নিতে এসেচি।
ভাদুড়ি। আচ্ছা, তবে আজ—
সতীশ। যাবার আগে একটা কথা আছে।
ভাদুড়ি। কিন্তু সময়ত নেই আমি এখন বেড়াতে বের হব!
সতীশ। কিছুক্ষণের জন্য কি সঙ্গে যেতে পারি?
ভাদুড়ি। তুমি যে পার তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু আমি পার্ব না। সম্প্রতি আমি সঙ্গীর অভাবে তত অধিক ব্যাকুল হয়ে পড়িনি!
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
মন্মথ। ওকি ও, তোমার ছেলেটিকে কি মাখিয়েছ?
বিধু। মুর্চ্ছা যেয়ো না, ভয়ানক কিছু নয়— একটুখানি এসেন্স মাত্র। তাও বিলাতি নয়— তোমাদের সাধের দিশি!
মন্মথ। আমি তোমাকে বারবার বলেছি ছেলেদের তুমি এ সমস্ত সৌখিন জিনিষ অভ্যাস করাতে পারবে না।
বিধু। আচ্ছা যদি তোমার আরাম বোধ হয় ত কাল হতে কেরোসিন্ এবং কাষ্টর্ অয়েল মাখাব।
মন্মথ। সেও বাজে খরচ হবে। যেটা না হলেও চলে সেটা না অভ্যাস করাই ভাল। কেরোসিন্ ক্যাষ্টর্ অয়েল গায় মাথায় মাখা আমার মতে অনাবশ্যক।
বিধু। তোমার মতে আবশ্যক জিনিষ ক’টা আছে তাত জানিনা, গোড়াতেই আমাকে বোধ হয় বাদ দিয়ে বসতে হয়।
মন্মথ! তোমাকে বাদ দিলে যে বাদ-প্রতিবাদ একেবারেই বন্ধ হবে! এতকালের দৈনিক অভ্যাস হঠাৎ ছাড়লে এ বয়সে হয় ত সহ্য হবে না! যাই হোক্, এ কথা আমি তোমাকে আগে হতে বলে রাখছি ছেলেটিকে তুমি সাহেব কর বা নবাব কর বা সাহেবিনবাবির খিচুড়ি পাকা ও তার খরচ আমি জোগাব না। আমার মৃত্যুর পরে সে যা পাবে তাতে তার সখের খরচ কুলবে না।
বিধু। সে আমি জানি! তোমার টাকার উপরে ভরসা রাখলে ছেলেকে কপ্নি পরানো অভ্যাস করাতেম!
বিধুর এই অবজ্ঞাবাক্যে মর্ম্মাহত হইয়াও মন্মথ ক্ষণকালের মধ্যে সামলাইয়া লইলেন। কহিলেন আমিও তা জানি! তোমার ভগিনীপতি শশধরের পরেই তোমার ভরসা! তার সন্তান নেই বল ঠিক করে বসে আছ তোমার ছেলেকেই সে উইলে সমস্ত লিখে পড়ে দিয়ে যাবে। সেই জন্যই যখন তখন ছেলেটাকে ফিরিঙ্গি সাজিয়ে এক গা গন্ধ মাখিয়ে তার মেসোর আদর কাড়বার জন্য পাঠিয়ে দাও! আমি দারিদ্র্যের লজ্জা অনায়াসেই সহ্য করতে পারি কিন্তু ধনী কুটুম্বের সোহাগযাচনার লজ্জা আমার সহ্য হয় না।
এ কথা মন্মথর মনে অনেকদিন উদয় হইয়াছে —কিন্তু কথাটা কঠোর হইবে বলিয়া এ পর্য্যন্ত কখনো বলেন নাই। বিধু মনে করিতেন স্বামী তাঁহার গূঢ় অভিপ্রায় ঠিক বুঝিতে পারেন নাই, কারণ, স্বামী সম্প্রদায় স্ত্রীর মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধে অপরিসীম মুর্খ। কিন্তু মন্মথ যে বসিয়া বসিয়া তাঁহার চাল ধরিতে পারিয়াছেন হঠাৎ জানিতে পারিয়া বিধুর পক্ষে মর্ম্মান্তিক হইয়া উঠিল।
মুখ লাল করিয়া বিধু কহিলেন—ছেলেকে মাসীর কাছে পাঠালেও গায়ে সহে না এত বড়। মানীলোকের ঘরে আছি সে ত পূর্ব্বে বুঝতে পারিনি।
এমন সময় বিধবা জা ঘরে প্রবেশ করিয়া কহিলেন—মেজ বৌ তোদের ধন্য। আজ সতেরো বৎসর হয়ে গেল তবু তোদের কথা ফুরাল না! রাত্রে কুলায় না শেষকালে দিনেও দুইজনে মিলে ফিস্ ফিস্! তোদের জিবের আগায় বিধাতা এত মধু দিন রাত্রি জোগান কোথা হতে আমি তাই ভাবি! রাগ কোরোনা ঠাকুরপো, তোমাদের মধুরালাপে ব্যাঘাত করব না, একবার কেবল দু মিনিটের জন্য মেজ বৌয়ের কাছ হতে শেলাইয়ের প্যাটার্ণ্টা দেখিয়ে নিতে এসেছি!
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ।
হরেন। দাদা তুমি অনেকক্ষণ ধরে ও কি লিখচ কাকে লিখচ বল না।
সতীশ। যা, যা, তোর সে খবরে কাজ কি, তুই খেলা করগে যা!
হরেন। দেখি না কি লিখচ—আমি আজকাল পড়তে পারি!
সতীশ। হরেন তুই আমাকে বিরক্ত করিস্ নে বল্চি—যা তুই!
হরেন। ভয়ে আকার ভা, ল, ভাল, বয়ে আকার বা, সয়ে আকার সা, ভালবাসা। দাদা, কি ভালবাসার কথা লিখচ বল না! তুমিও কাঁচা পেয়ারা ভালবাস বুঝি! আমিও বাসি।
সতীশ। আঃ হরেন অত চেঁচাস্নে, ভালবাসার কথা আমি লিখিনি। হরেন। অ্যাঁ! মিথ্যা কথা বল্চ! আমি যে পড়লেম ভয়ে আকার ভা, ল, ভাল, বয়ে আকার সয়ে আকার ভালবাসা। আচ্ছা মাকে ডাকি তাঁকে দেখাও!
সতীশ। না, না, মাকে ডাক্তে হবে না! লক্ষ্মীটি তুই একটু খেলা করতে যা, আমি এইটে শেষ করি!
হরেন। এটা কি দাদা! এযে ফুলের তোড়া! আমি নেব!
সতীশ। ওতে হাত দিস্নে হাত দিস্নে ছিঁড়ে ফেল্বি!
হরেন। না আমি ছিঁড়ে ফেল্ব না, আমাকে দাও না!
সতীশ। খোকা কাল তোকে আমি অনেক তোড়া এনে দেব এটা থাক্।
হরেন। দাদা এটা বেশ, আমি এইটেই নেব।
সতীশ। না, এ আর একজনের জিনিষ আমি তোকে দিতে পারব না।
হরেন। অ্যাঁ, মিথ্যে কথা! আমি তোমাকে লজঞ্জুস্ আনতে বলেছিলেম তুমি সেই টাকায় তোড়া কিনে এনেছ-তাই বই কি, আরেকজনের জিনিষ বই কি!
সতীশ। হরেন লক্ষী ভাই তুই একটুখানি চুপ কর, চিঠিখানা শেষ করে ফেলি! কাল তোকে আমি অনেক লজঞ্জুস্ কিনে এনে দেব!
হরেন। আচ্ছ, তুমি কি লিখচ আমাকে দেখাও!
সতীশ। আচ্ছা দেখার আগে লেখাটা শেষ করি!
হরেন। তবে আমিও লিখি! (শ্লেট লইয়া চীৎকারস্বরে) ভয়ে আকার ভা, ল, ভাল, বয়ে আকার সা ভালবাসা।
সতীশ। চুপ্ চুপ্ অত চীৎকার করিসনে—আঃ থাম থাম!
হরেন। তবে আমাকে তোড়াটা দাও!।
সতীশ। আচ্ছা নে, কিন্তু খবরদার ছিঁড়িসনে! —ও কি করলি! যা বারণ করলেম তাই! ফুলটা ছিঁড়ে ফেল্লি! এমন বদ্ছেলেও, ত দেখিনি!(তোড়া কাড়িয়া লইয়া চপেটাঘাত করিয়া) লক্ষ্মীছাড়া কোথাকার! যা, এখান থেকে যা বল্চি! যা! (হরেনের চীংকারস্বরে ক্রন্দন, সতীশের সবেগে প্রস্থান, বিধুমুখীর ব্যস্ত হইয়া প্রবেশ)।
বিধু। সতীশ বুঝি হরেনকে কাঁদিয়েচে দিদি টের পেলে সর্ব্বনাশ হবে, হরেন, বাপ আমার কাঁদিসনে, লক্ষ্মী আমার, সোনা আমার!
হরেন। (সরোদনে) দাদা আমাকে মেরেচে!
বিধু। আচ্ছা আচ্ছা চুপ্ কর চুপ্ কর—আমি দাদাকে খুব করে মারব এখন!
হরেন। দাদা ফুলের তোড়া কেড়ে নিয়ে গেল!
বিধু। আচ্ছা সে আমি তার কাছ থেকে নিয়ে আস্চি! (হরেনের ক্রন্দন) এমন ছিঁচ্ কাঁদুনে ছেলেও ত আমি কখনো দেখিনি। দিদি আদর দিয়ে ছেলেটির মাথা খাচ্চেন। যখন যেটি চায় তখনি সেটি তাকে দিতে হবে। দেখনা, একবারে দোকান ঝাঁটিয়ে কাপড়ই কেনা হচ্চে! যেন নবাব পুত্র! ছি ছি নিজের ছেলেকে কি এমনি। করেই মাটি করতে হয়! (সতর্জ্জনে) খোকা, চুপ কর বলচি! ঐ হাম্দোবুড়ো আসচে! (সুকুমারীর প্রবেশ)। সুকুমারী। বিধু, ও কি ও! আমার ছেলেকে কি এমনি করেই ভূতের ভয় দেখাতে হয়! আমি চাকরবাকরদের বারণ করে দিয়েচি কেউ ওর কাছে ভূতের কথা বলতে সাহস করে না!—আর তুমি বুঝি মাসী হয়ে ওর এই উপকার করতে বসেচ! কেন বিধু, আমার বাছা তোমার কি অপরাধ করেচে। ওকে তুমি দুটি চক্ষে দেখতে পার না, তা আমি বেশ বুঝেচি! আমি বরাবর তোমার ছেলেকে পেটের ছেলের মত মানুষ করলেম আর তুমি বুঝি আজ তারই শোধ নিতে এসেচ।
বিধু। (সরোদনে) দিদি এমন কথা বলো না! আমার কাছে আমার সতীশ আর তোমার হরেনে প্রভেদ কি আছে!
হরেন। মা, দাদা আমাকে মেরেচে!
বিধু। ছি ছি খোকা, মিথ্যা বলতে নেই। দাদা তোর এখানে ছিলই না তা মারবে কি করে।
হরেন। বাঃ—দাদা যে এইখানে বসে চিঠি লিখছিল—তাতে ছিল, ভয়ে আকার ভা, ল, ভাল, বয়ে আকার সয়ে আকার, ভালবাসা! মা তুমি আমার জন্যে দাদাকে লজঞ্জুস্ আনতে বলেছিলে, দাদা সেই টাকায় ফুলের তোড়া কিনে এনেছে— তাতেই আমি একটু হাত দিয়েছিলেম বলেই অমনি আমাকে মেরেচে।
সুকুমারী। তোমরা মায়ে পোয়ে মিলে আমার ছেলের সঙ্গে লেগেচ বুঝি! ওকে তোমাদের সহ্য হচ্চে না! ও গেলেই তোমরা বাঁচ! আমি তাই বলি, খোকা রোজ ডাক্তার কব্রাজের বোতল বোতল ওষুধ গিলচে তবু দিন দিন এমন রোগী হচ্চে কেন! ব্যাপারখানা আজ বোঝা গেল!
দশম পরিচ্ছেদ
দশম পরিচ্ছেদ।
ভাদুড়িজায়া। শুনেছ, সতীশের বাপ হঠাৎ মারা গেছে।
মিষ্টার ভাদুড়ি। হাঁ, সে ত শুনেছি!
জায়া। সে যে সমস্ত সম্পত্তি হাঁসপাতালে দিয়ে গেছে, কেবল সতীশের মার জন্য জীবিতকাল পর্য্যন্ত ৭৫ টাকা মাসহা্রা বরাদ্দ করে গেছে। এখন কি করা যায়!
ভাদুড়ি। এত ভাবনা কেন তোমার?
জায়া। বেশ লোক যা হোক্ তুমি! তোমার মেয়ে যে সতীশকে ভালবাসে সেটা বুঝি তুমি দুই চক্ষু মেলে দেখতে পাওনা! তুমি ত ওদের বিবাহ দিতেও প্রস্তুত ছিলে। এখন উপায় কি করবে?
ভাদুড়ি। আমি ত মন্মথর টাকার উপর বিশেষ নির্ভর করিনি। জায়া। তবে কি ছেলেটির চেহারার উপরেই নির্ভর করে বসেছিলে? অন্নবস্ত্রটা বুঝি অনাবশ্যক?
ভাদুড়ি। সম্পূর্ণ আবশ্যক, যিনি যাই বলুন ওর চেয়ে আবশ্যক আর কিছুই নেই। সতীশের একটি মেসো আছে বোধ হয় জান।
জায়া। মেসো ত ঢের লোকেরই থাকে, তাতে ক্ষুধা শান্তি হয় না।
ভাদুড়ি। এই মেসোটি আমার মক্কেল— অগাধ টাকা—ছেলেপুলে কিছুই নেই—বয়সও নিতান্ত অল্প নয়। সে ত সতীশকেই পোষ্যপুত্র নিতে চায়।
জায়া। মেসোটি ত ভাল। তা চট্পট্ নিক্ না। তুমি একটু তাড়া দাও না।
ভাদুড়ি। তাড়া আমাকে দিতে হবে না, তার ঘরের মধ্যেই তাড়া দেবার লোক আছে। সবই প্রায় ঠিকঠাক্ এখন কেবল এ আইনের খট্কা উঠেছে—এক ছেলেকে পোষ্যপুত্র লওয়া যায় কি না-তা ছাড়া সতীশের আবার বয়স হয়ে গেছে। জায়া। আইন ত তোমাদেরই হাতে- তোমরা চোখ বুজে একটা বিধান দিয়ে দাও না।
ভাদুড়ি। ব্যস্ত হয়ো না-পোষ্যপুত্র না নিলেও অন্য উপায় আছে।
জায়া। আমাকে বাঁচালে! আমি ভাবছিলেম সম্বন্ধ ভাঙি কি করে! আবার আমাদের নেলি যে রকম জেদালো মেয়ে সে যে কি করে। বসত বলা যায় না। কিন্তু তাই বলে গরীবের হাতে ত মেয়ে দেওয়া যায় না। ঐ দেখ তোমার মেয়ে কেঁদে চোখ ফুলিয়েছে। কাল যখন খেতে বসেছিল এমন সময় সতীশের বাপ-মরার খবর পেল অমনি তখনি উঠে চলে গেল।
ভাদুড়ি। কিন্তু নেলি যে সতীশকে ভালবাসে। সে ত দেখে মনে হয় না। ওত সতীশকে নাকের জলে চোখের জলে করে। আমি আরো মনে কর্তাম নন্দীর উপরেই ওর বেশী টান।
জায়া। তোমার মেয়েটির ঐ স্বভাব—সে যাকে ভালবাসে তাকেই জ্বালাতন করে। দেখনা বিড়াল ছানাটাকে নিয়ে কি কাণ্ডটাই করে! কিন্তু আশ্চর্য্য এই তবু ত ওকে কেউ ছাড়তে চায় না।
নলিনীর প্রবেশ।
নলিনী। মা, একবার সতীশবাবুর বাড়ি যাবে না? তাঁর মা বোধ হয় খুব কাতর হয়ে পড়েছেন। বাবা, আমি একবার তাঁর কাছে যেতে চাই।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।
সুকুমারী। সতীশ!
সতীশ। কি মাসীমা!
সুকুমারী। কাল যে তোমাকে খোকার কাপড় কিনে আনবার জন্য এত করে বল্লেম অপমান বোধ হল বুঝি!
সতীশ। অপমান কিসের মাসিমা! কাল ভাদুড়ি সাহেবের ওখানে আমার নিমন্ত্রণ ছিল তাই—
সুকুমারী। ভাদুড়ি সাহেবের ওখানে তোমার এত ঘন ঘন যাতায়াতের দরকার কি তা ত ভেবে পাইনে। তার সাহেব মানুষ, তোমার মত অবস্থার লোকের কি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা সাজে? আমিত শুনলেম তোমাকে তারা আজকাল পোছে না, তবু বুঝি ঐ রঙীন টাইয়ের উপর টাইরিং, পরে বিলাতী কার্ত্তিক সেজে তাদের ওঁখানে আনাগোনা করতেই হবে! তোমার কি একটুও সম্মানবোধ নেই! তাই যদি থাকবে তবে কি কাজকর্ম্মের কোন চেষ্টা না করে এখানে এমন করে পড়ে থাকতে? তার উপরে আবার একটা কাজ করতে বললে মনে মনে রাগ করা হয় পাছে ওঁকে কেউ বাড়ির সরকার মনে করে ভুল করে! কিন্তু সরকারও ত ভাল—সে খেটে উপার্জ্জন করে খায়!
সতীশ। মাসীমা আমিও হয়ত তা পারতেম, কিন্তু তুমিইত-
সুকুমারী। তাই বটে! জানি, শেষকালে আমারি দোষ হবে! এখন বুঝচি তোমার বাপ তোমাকে ঠিক চিন্তেন তাই তোমাকে এমন করে শাসনে রেখেছিলেন। আমি আরো ছেলেমানুষ বলে দয়া করে তোমাকে ঘরে স্থান দিলেম, জেল থেকে বাঁচালেম শেষকালে আমারি যত দোষ হল। একেই বলে কৃতজ্ঞতা! আচ্ছা আমারি না হয় দোষ হল, তবু যে ক’দিন এখানে আমাদের অন্ন খাচ্চ দরকার মত দুটো কাজই না হয় করে দিলে। এমন কি কেউ করে না! এতে কি অত্যন্ত অপমান বোধ হয়! সতীশ। কিছু না, কিছু না, কি করতে হবে বল, আমি এখনি করচি।
সুকুমারী। খোকার জন্যে সাড়ে সাত গজ। রেনবো সিল্ক্ চাই—আর একটা সেলার সুট্—। (সতীশের প্রস্থানোদ্যম) শোন শোন ওর মাপটা নিয়ে যেয়ো জুতো চাই! (সতীশ প্রস্থানোন্মুখ) অত ব্যস্ত হচ্চ কেন—সবগুলো ভাল করে শুনেই যাও! আজও বুঝি ভাদুড়ি সাহেবের রুটি বিস্কুট খেতে যাবার জন্য প্রাণ ছট্ ফট্ করচে! খোকার জন্যে ষ্ট্র হ্যাট্ এনো—আর তার রুমালও এক ডজন চাই! (সতীশের প্রস্থান। তাহাকে পুনরায় ডাকিয়া) শোন সতীশ আর একটা কথা আছে! শুনলাম তোমার মেসোর কাছ হতে তুমি নূতন সুট্ কেনবার জন্য আমাকে না বলে টাকা চেয়ে নিয়েছ। যখন নিজের সামর্থ হবে তখন যত খুসি সাহেবিয়ানা করো, কিন্তু পরের পয়সায় ভাদুড়ি সাহেবদের তাক্ লাগিয়ে দেবার জন্য মেসোকে ফতুর করে দিয়ো না! সে টাকাটা আমাকে ফেরৎ দিয়ো! আজকাল আমাদের বড় টানাটানির সময়! সতীশ। আচ্ছা এনে দিচ্চি।
সুকুমারী। এখন তুমি দোকানে যাও, সেই টাকা দিয়ে কিনে বাকিটা ফেরৎ দিয়ো। একটা হিসাব রাখতে ভুলো না যেন (সতীশের প্রস্থানোদ্যম) শোন সতীশ—এই ক’টা জিনিষ কিন্তে আবার যেন আড়াই টাকা গাড়িভাড়া লাগিয়ে বসো না! ঐ জন্যে তোমাকে কিছু আন্তে বলতে ভয় করে। দু’পা হেঁটে চলতে হলেই অমনি তোমার মাথায় মাথায় ভাবনা পড়ে-পুরুষ মানুষ এত বাবু হলেত চলেনা! তোমার, বাবা রোজ সকালে নিজে হেঁটে গিয়ে নতুন বাজার হতে কই মাছ কিনে আন্তেন—মনে আছেত? মুটেকেও তিনি এক পয়সা দেন নাই!
সতীশ। তোমার উপদেশ মনে থাকবে— আমিও দেব না! আজ হতে তোমার এখানে মুটে ভাড়া বেহারার মাইনে যত অল্প লাগে সে দিকে আমার সর্ব্বদাই দৃষ্টি থাকবে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
দাম্পত্য কলহে চৈব বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া—শাস্ত্রে এইরূপ লেখে। কিন্তু দম্পতিবিশেষে ইহার ব্যতিক্রম। ঘটে অভিজ্ঞ ব্যক্তির তাহা অস্বীকার করেন না।
মন্মথবাবুর সহিত তাঁহার স্ত্রীর মধ্যে মধ্যে যে বাদ-প্রতিবাদ ঘটিয়া থাকে তাহা নিশ্চয়ই কলহ-তবু তাহার আরম্ভও বহু নহে তাহার ক্রিয়াও লঘু নহে—ঠিক অজাযুদ্ধের সঙ্গে তাহার তুলনা করা চলে না।
কয়েকটি দৃষ্টান্ত দ্বারা এ কথার প্রমাণ হইবে।
মন্মথবাবু কহিলেন—তোমার ছেলেটিকে যে বিলাতী পোষাক পরাতে আরম্ভ করেছ সে আমার পছন্দ নয়!
বিধু কহিলেন—পছন্দ বুঝি একা তোমারই আছে। আজকাল ত সকলেই ছেলেদের ইংরেজি কাপড় ধরিয়েছে! মন্মথ হাসিয়া কহিলেন—সকলের মতেই যদি চলবে তবে সকলকে ছেড়ে একমাত্র আমাকেই বিবাহ করলে কেন?
বিধু। তুমি যদি কেবল নিজের মতেই চলবে তবে এক না থেকে আমাকেই বা তোমার বিবাহ করবার কি দরকার ছিল!
মন্মথ। নিজের মত চালাবার জন্যও যে অন্য লোকের দরকার হয়।
বিধু। নিজের বোঝা বহাবার জন্য ধোবার দরকার হয় গাধাকে —কিন্তু আমি ত আর—
মন্মথ। (জিব কাটিয়া) আরে রাম রাম, তুমি আমার সংসার মরুভূমির আরব ঘোড়া। কিন্তু সে প্রাণীবৃত্তান্তের তর্ক এখন থাক্! তোমার ছেলেটিকে সাহেব করে তুলো না!
বিধু। কেন করব না! তাকে কি চাষা করব!
এই বলিয়া বিধু ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন।
বিধুর বিধবা জা পাশের ঘরে বসিয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া মনে করিলেন, স্বামীস্ত্রীতে বিরলে প্রেমালাপ হইয়া গেল।
নবম পরিচ্ছেদ
নবম পরিচ্ছেদ।
বিধু। আমার উপর রাগ কর যা কর ছেলের উপর কোরো না। তোমার পায়ে ধরি এবারকার মত তার দেনাটা শোধ করে দাও!
মন্মথ। আমি রাগারগি করচিনে, আমার যা কর্ত্তব্য তা আমাকে করতেই হবে! আমি সতীশকে বার বার বলেচি দেনা করলে শোধবার ভার আমি নেব না। আমার সে কথার অন্যথা হবে না!
বিধু। ওগো এত বড় সত্যপ্রতিজ্ঞ যুধিষ্টির হলে সংসারে চলে না! সতীশের এখন বয়স হয়েচে তাকে জলপানি যা দাও তাতে ধার না করে তাহার চলে কি করে বল দেখি।
মন্মথ। যার যেরূপ সাধ্য তার চেয়ে চাল বড় করলে কারোই চলে না, ফকিরেরও না বাদসারও না।
বিধু। তবে কি ছেলেকে জেলে যেতে দেবে? মন্মথ। সে যদি যাবার আয়োজন করে এবং তোমরা যদি তার যোগাড় দাও তবে আমি ঠেকিয়ে রাখব কি করে? (প্রস্থান)
শশধরের প্রবেশ।
শশধর। আমাকে এ বাড়ীতে দেখলে মন্মথ ভয় পায়। ভাবে কালো কোর্ত্তা ফরমাস দেবার জন্য ফিতা হাতে তার ছেলের গায়ের মাপ নিতে এসেছি। তাই ক’দিন আসিনি আজ তোমার চিঠি পেয়ে সুকু কান্নাকাটি করে আমাকে বাড়ী ছাড়া করেচে।
বিধু। দিদি আসেন নি?
শশধর। তিনি এখনি আসবেন। ব্যাপারটা কি?
বিধু। সবই ত শুনেছ। এখন ছেলেটাকে জেলে না দিলে ওঁর মন সুস্থির হচ্ছে না। র্যাঙ্কিন হার্ম্মানের পোষাক তাঁর পছন্দ হল না, জেলখানার কাপড়টাই বোধ হয় তাঁর মতে বেশ সুসভ্য।
শশধর। আর যাই বল, মন্মথকে বোঝাতে যেতে আমি পারব না। তার কথা আমি বুঝি নে আমার কথাও সে বোঝে না, শেষকালে— বিধু। সে কি আমি জানি নে? তোমরা ত তাঁর স্ত্রী নও যে মাথা হেঁট করে সমস্তই সহ্য করবে! কিন্তু এখন এ বিপদ ঠেকাই কি করে?
শশধর। তোমার হাতে কিছু কি
বিধু। কিছুই নেই—সতীশের ধার শুধ্তে আমার প্রায় সমস্ত গহনাই বাঁধা পড়েছে হাতে কেবল বালাজোড়া আছে।
সতীশের প্রবেশ।
শশধর। কি সতীশ, খরচপত্র বিবেচনা করে কর না এখন কি মুস্কিলে পড়েছ দেখ দেখি!
সতীশ। মুস্কিল ত কিছুই দেখি নে।
শশধর। তবে হাতে কিছু আছে বুঝি! ফাঁস কর নি।
সতীশ। কিছু ত আছেই।
শশধর। কত?
সতীশ। আফিম কেনবার মত।
বিধু। (কাঁদিয়া উঠিয়া) সতীশ, ও কি কথা তুই বলিস, আমি অনেক দুঃখ পেয়েছি, আমাকে আর দগ্ধাসনে। শশধর। ছি ছি সতীশ। এমন কথা যদিবা কখনো মনেও আসে তবু কি মার সামনে উচ্চারণ করা যায়? বড় অন্যায় কথা।
সুকুমারীর প্রবেশ।
বিধু। দিদি সতীশকে রক্ষা কর। ও কোন্ দিন কি করে বসে আমি ত ভয়ে বাঁচি নে। ও যা বলে শুনে আমার গা কাঁপে।
সুকুমারী। ও আবার কি বলে।
বিধু। বলে কিনা আফিম কিনে আনবে।
সুকুমারী। কি সর্ব্বনাশ! সতীশ আমার গা ছুঁয়ে বল এমন কথা মনেও আনবি নে! চুপ করে রইলি যে! লক্ষী বাপ আমার! তোর মা মাসীর কথা মনে করিস্।
সতীশ। জেলে বসে মনে করার চেয়ে এ সমস্ত হাস্যকর ব্যাপার জেলের বাইরে চুকিয়ে ফেলাই ভাল!
সুকুমারী। আমরা থাকতে তোকে জেলে কে নিয়ে যাবে?
সতীশ। পেয়াদা। সুকুমারী। আচ্ছা সে দেখব কত বড় পেয়াদা; ও গো এই টাকাটা ফেলে দাও না, ছেলে মানুষকে কেন কষ্ট দেওয়া!
শশধর। টাকা ফেলে দিতে পারি কিন্তু মন্মথ আমার মাথায় ইঁট ফেলে না মারে।
সতীশ। মেশোমশায়, সে ইঁট তোমার মাথায় পৌঁচ্বে না, আমার ঘাড়ে পড়বে। একে একজামিনে ফেল করেছি, তার উপরে দেন, এর উপরে। জেলে যাবার এত বড় সুযোগটা যদি মাটি হয়ে যায় তবে বাবা আমার সে অপরাধ মাপ করবেন না।
বিধু। সত্যি দিদি। সতীশ মেসোর টাকা নিয়েচে শুনলে তিনি বোধ হয় ওকে বাড়ী হতে বার করে দেবেন।
সুকুমারী। তা দিন না! আর কি কোথাও বাড়ি নাই না কি! ও বিধু সতীশকে তুই আমাকেই দিয়ে দে না! আমার ত ছেলেপুলে নেই, আমি না হয় ওকেই মানুষ করি! কি বলগো!
শশধর। সে ত ভালই। কিন্তু সতীশ যে বাঘের বাচ্ছা, ওকে টানতে গেলে তার মুখ থেকে প্রাণ বাঁচান দায় হবে! সুকুমারী। বাঘ মশায় ত বাচ্ছাটিকে জেলের পেয়াদার হাতেই সমর্পণ করে দিয়েছেন আমরা যদি তাকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাই এখন তিনি কোন কথা বলতে পারবেন না।
শশধর। বাঘিনী কি বলেন, বাচ্ছাই বা কি বলে!
সুকুমারী। যা বলে সে আমি জানি সে কথা আর জিজ্ঞাসা করতে হবে না! তুমি এখন দেনাটা শোধ করে দাও!
বিধু। দিদি!
সুকুমারী। আর দিদি দিদি করে কাঁদতে হবে না! চল্ তোর চুল বেঁধে দিই গে! এমন ছিরি করে তোর ভগ্নীপতির সাম্নে বাহির হতে লজ্জা করে না! (শশধর ব্যতীত সকলের প্রস্থান)
মন্মথর প্রবেশ।
শশধর। মন্মথ ভাই তুমি একটু বিবেচনা করে দেখ—
মন্মথ। বিবেচনা না করে ত আমি কিছুই করি না। শশধর। তবে দোহাই তোমার, বিবেচনা একটু খাট কর! ছেলেটাকে কি জেলে দেবে? তাতে কি ওর ভাল হবে?
মন্মথ। ভালমন্দর কথা কেউই শেষ পর্য্যন্ত ভেবে উঠ্তে পারে না। কিন্তু আমি মোটামুটি এই বুঝি যে, বার বার সাবধান করে দেওয়ার পরও যদি কেউ অন্যায় করে তবে তার ফলভোগ হতে তাকে কৃত্রিম উপায়ে রক্ষা করা কারও উচিৎ। হয় না। আমরা যদি মাঝে পড়ে ব্যর্থ করে না দিতেম তবে প্রকৃতির কঠিন শিক্ষায় মানুষ যথার্থ মানুষ হয়ে উঠ্তে পারত।
শশধর। প্রকৃতির কঠোর শিক্ষাই যদি একমাত্র শিক্ষা হত তবে বিধাতা বাপমায়ের মনে স্নেহটুকু দিতেন না। মন্মথ তুমি যে দিনরাত কর্ম্মফল কর্ম্মফল কর আমি তা সম্পূর্ণ মানি না। প্রকৃতি আমাদের কাছ হতে কর্ম্মফল কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নিতে চায় কিন্তু প্রকৃতির উপরে যিনি কর্ত্তা আছেন তিনি মাঝে পড়ে তার অনেকটাই মহকুপ দিয়ে থাকেন, নইলে কর্ম্মফলের দেনা শুধ্তে শুধ্তে আমাদের অস্তিত্ব পর্য্যন্ত বিকিয়ে যেত। বিজ্ঞানের হিসাবে কর্ম্মফল সত্য কিন্তু বিজ্ঞানের উপরেও বিজ্ঞান আছে সেখানে প্রেমের হিসাবে ফলাফল সমস্ত অন্য রকম। কর্ম্মফল নৈসর্গিক-্মার্জ্জনাটা তার উপরের কথা।
মন্মথ। যিনি অনৈসর্গিক মানুষ তিনি যা খুসি করবেন, আমি অতি সামান্য নৈসর্গিক, আমি কর্ম্মফল শেষ পর্য্যন্তই মানি।
শশধর। আচ্ছা আমি যদি সতীশের দেনা শোধ করে তাকে খালাস করি তুমি কি করবে?
মন্মথ। আমি তাকে ত্যাগ করব। দেখ সতীশকে আমি যে ভাবে মানুষ করতে চেয়েছিলেম প্রথম হতেই বাধা দিয়ে তোমরা তা ব্যর্থ করেছ। একদিক হতে সংযম আর একদিক হতে প্রশ্রয় পেয়ে সে একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। ক্রমাগতই ভিক্ষা পেয়ে যদি তার সম্মানবোধ এবং দায়িত্ববোধ চলে যায়, যে কাজের যে পরিণাম তোমরা যদি মাঝে পড়ে। কিছুতেই তাকে তা বুঝতে না দাও তবে তার আশা আমি ত্যাগ করলেম। তোমাদের মতেই তাকে মানুষ কর—দুই নৌকয়। পা দিয়েই তাহার বিপদ ঘটেছে। শশধর। ও কি কথা বলছ মন্মথ—তোমার ছেলে—
মন্মথ। দেখ শশধর নিজের প্রকৃতি ও বিশ্বাসমতেই নিজের ছেলেকে আমি মানুষ করতে পারি, অন্য কোন উপায় ত জানি না। যখন নিশ্চয় দেখছি তা কোন মতেই হবার নয় তখন পিতার দায়িত্ব আমি আর রাখব না। আমার যা সাধ্য তার বেশী আমি করতে পারব না!
মন্মথর প্রস্থান।
শশধর। কি করা যায়! ছেলেটাকে ত জেলে দেওয়া যায় না! অপরাধ মানুষের পক্ষে যত সর্ব্বনেশেই হৌক্ জেলখানা তার চেয়ে ঢের বেশী।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।
শশধর। আঃ কি বল! তুমি কি পাগল হয়েচ না কি?
সুকুমারী। আমি পাগল, না, তুমি চোখে দেখতে পাও না!
শশধর। কোনটাই আশ্চর্য্য নয়, দুটোই সম্ভব। কিন্তু—
সুকুমারী। আমাদের হরেনের জন্ম হতেই দেখনি ও’দের মুখ কেমন হয়ে গেছে। সতীশের ভাবখানা দেখে বুঝতে পার না!
শশধর। আমার অত ভাব বুঝবার ক্ষমতা নেই সে ত তুমি জানই! মন জিনিষটাকে অদৃশ্য পদার্থ বলেই শিশুকাল হতে আমার কেমন একটা সংস্কার বদ্ধমূল হয়ে গেছে! ঘটনা দেখলে তবু কতকটা বুঝতে পারি। সুকুমারী। সতীশ যখনি আড়ালে পায় তোমার ছেলেকে মারে, আবার বিধুও তাহার পিছনে পিছনে এসে খোকাকে জুজুর ভয় দেখায়।
শশধর। ঐ দেখ তোমরা ছোট কথাকে বড় করে তোল! যদিই বা সতীশ থোকাকে কখনো—
সুকুমারী। সে তুমি সহ্য করতে পার আমি পারব না—ছেলেকে ত তোমার গর্ভে ধরতে হয়নি!
শশধর। সে কথা আমি অস্বীকার করতে পারব না। এখন তোমার অভিপ্রায় কি শুনি!
সুকুমারী। শিক্ষা সম্বন্ধে তুমি ত বড় বড় কথা বল, একবার তুমি ভেবে দেখ না আমরা হরেনকে যে ভাবে শিক্ষা দিতে চাই তার মাসী তাকে অন্যরূপ শেখায়—সতীশের দৃষ্টান্তটিই বা তারপক্ষে কিরূপ সেটাও ত ভেবে দেখতে হয়।
শশধর। তুমি যখন অত বেশী করে ভাবচ তখন তার উপরে আমার আর ভাববার দরকার কি আছে! এখন কর্ত্তব্য কি বল? সুকুমারী। আমি বলি সতীশকে তুমি বল, তার মার কাছে থেকে সে এখন কাজকর্ম্মের চেষ্টা দেখুক। পুরুষমানুষ পরের পয়সায় বাবুগিরি করে সে কি ভাল দেখতে হয়!
শশধর। ওর মা যে টাকা পায় তাতে সতীশের চলবে কি করে?
সুকুমারী। কেন, ওদের বাড়িভাড়া লাগে না, মাসে পঁচাত্তর টাকা কম কি!
শশধর। সতীশের যেরূপ চাল দাঁড়িয়েছে পঁচাত্তর টাকা ত সে চুরুটের ডগাতেই ফুঁকে দেবে! মার গহনাগাঁঠি ছিল সে ত অনেক দিন হল গেছে এখন হবিষ্যান্ন বাঁধা দিয়ে ত দেনা শোধ হবে না!
সুকুমারী। যার সামর্থ্য কম তার অত লম্বা চালেই বা দরকার কি?
শশধর। মন্মথ ত সেই কথাই বলত। আমরাই ত সতীশকে অন্যরূপ বুঝিয়েছিলেম। এখন ওকে দোষ দিই কি করে?
সুকুমারী। না—দোষ কি ওর হতে পারে! সব দোষ আমারি! তুমি ত আর কারো কোন দোষ দেখতে পাও না—কেবল আমার বেলাতেই তোমার দর্শনশক্তি বেড়ে যায়।
শশধর। ওগো রাগ কর কেন—আমিও ত দোষী!
সুকুমারী। তা হতে পারে। তোমার কথা তুমি জান। কিন্তু আমি কখনো ওকে এমন কথা বলিনি যে তুমি তোমার মেসোর ঘরে পায়ের উপর পা দিয়া গোঁফে তা দাও আর লম্বা কেদারায় বসে বসে আমার বাছার উপর বিষদৃষ্টি দিতে থাক।
শশধর। না ঠিক ঐ কথাগুলো তুমি তাকে মাথার দিব্য দিয়ে শপথ করিয়ে নাওনি—অতএব তোমাকে দোষ দিতে পারিনে। এখন কি করতে হবে বল।
সুকুমারী। সে তুমি যা ভাল বোধ কর তাই কর। কিন্তু আমি বলচি সতীশ যতক্ষণ এ বাড়িতে থাকবে আমি থোকাকে কোনমতে বাইরে যেতে দিতে পারব না। ডাক্তার খোকাকে হাওয়া খাওয়াতে বিশেষ করে বলে দিয়েছে—কিন্তু হাওয়া খেতে গিয়ে ও কখন একলা সতীশের নজরে পড়বে সে কথা মনে করলে আমার মন স্থির থাকে না। ওত আমারই আপন বোনের ছেলে কিন্তু আমি ওকে এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করিনে—এ আমি তোমাকে স্পষ্টই বললেম।
সতীশের প্রবেশ।
সতীশ। কাকে বিশ্বাস কর না মাসীমা! আমাকে? আমি তোমার খোকাকে সুযোগ পেলে গলা টিপে মারব এই তোমার ভয়? যদি মারি, তবে তুমি তোমার বোনের ছেলের যে অনিষ্ট করেচ তার চেয়ে ওর কি বেশি অনিষ্ট করা হবে? কে আমাকে ছেলেবেলা হতে নবাবের মত সৌখীন করে তুলেচে এবং আজ ভিক্ষুকের মত পথে বের কল্লে? কে আমাকে পিতার শাসন হতে কেড়ে এনে বিশ্বের লাঞ্ছনার মধ্যে টেনে আনলে? কে আমাকে—
সুকুমারী। ওগো শুনচ? তোমার সামনে আমাকে এমনি করে অপমান করে? নিজের মুখে বল্লে কিনা খোকাকে গলা টিপে মারবে? ওমা, কি হবে গো! আমি কালসাপকে নিজের হাতে দুধকলা দিয়ে পুষেচি!
সতীশ। দুধকলা আমারও ঘরে ছিল—দুধকলায় আমার রক্ত বিষ হয়ে উঠত না— তা-হতে চিরকালের মত বঞ্চিত করে তুমি যে দুধকলা আমাকে খাইয়েচ তাতে আমার বিষ জমে উঠেচে! সত্য কথাই বলচ এখন আমাকে ভয় করাই চাই—এখন আমি দংশন করতে পারি!
বিধুমুখীর প্রবেশ॥
বিধু। কি সতীশ কি হয়েচে, তোকে দেখে যে ভয় হয়! অমন করে তাকিয়ে আছিস কেন? আমাকে চিন্তে পারচিস নে? আমি যে তোঁর মা সতীশ!
সতীশ। মা! তোমাকে মা বলব কোন্ মুখে? মা হয়ে কেন তুমি আমার পিতার শাসন হতে আমাকে বঞ্চিত করলে? কেন তুমি আমাকে জেল হতে ফিরিয়ে আনলে? সে কি মাসীর ঘর হতে ভয়ানক? তোমরা ঈশ্বরকে মা বলে ডাক, তিনি যদি তোমাদের মত মা হন তবে তাঁর আদর চাইনে তিনি যেন আমাকে নরকে দেন!
শশধর। আঃ সতীশ চল চল—কি বকচ থাম! এস বাইরে আমার ঘরে এস!
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
সতীশ। মা, এমন করে ত চলে না!
বিধু। কেন কি হয়েচে?
সতীশ। চাঁদনির কোটট্রাউজার পরে আমার বা’র হতে লজ্জা করে। সেদিন ভাদুড়ি সাহেবের বাড়ি ইভ্নিংপার্টি ছিল, কয়েকজন বাবু ছাড়া আর সকলেই ড্রেসসুট পরে গিয়েছিল, আমি সেখানে এই কাপড়ে গিয়ে ভারি অপ্রস্তুতে পড়েছিলাম। বাবা কাপড়ের জন্য যে সামান্য টাকা দিতে চান তাতে ভদ্রতা রক্ষা হয় না।
বিধু। জান ত সতীশ তিনি যা ধরেন ত। কিছুতেই ছাড়েন না! কত টাকা হলে তোমার মনের মত পোষাক হয়, শুনি।
সতীশ। একটা মর্ণিংসুট আর একট লাউঞ্জসুটে একশে টাকার কাছাকাছি লাগবে। একটা চলনসই ইভনিংড্রেস দেড়শো টাকার কমে কিছুতেই হবে না! বিধু। বল কি সতীশ! এ ত তিনশো টাকার ধাক্কা। এত টাকা—
সতীশ। মা, ঐ তোমাদের দোষ। এক ফকিরি করতে চাও সে ভাল, আর যদি ভদ্রসমাজে মিশ্তে হয় তবে অমন টানাটানি করে চলে না। ভদ্রতা রাখতে গেলে ত খরচ করতে হবে, তার ত কোন উপায় নেই। সুন্দর বনে পাঠিয়ে দাও না কেন সেখানে ড্রেস কোটের দরকার হবে না।
বিধু। তা ত জানি, কিন্তু—আচ্ছা তোমার মেসো ত তোমাকে জন্মদিনের উপহার দিয়ে থাকেন এবারকার জন্য একটা নিমন্ত্রণের পোশাক তাঁর কাছ হতে জোগাড় করে নাওনা। কথায় কথায় তোমার মাসীর কাছে একটু আভাস দিলেই হয়।
সতীশ। সে ত অনায়াসেই পারি কিন্তু বাবা যদি টের পান আমি মেসোর কাছ হতে কাপড় আদায় করেছি তা হলে রক্ষা থাকবে না।
বিধু। আচ্ছা সে আমি সামলাতে পারব। (সতীশের প্রস্থান) ভাদুড়ি সাহেবের মেয়ের সঙ্গে যদি সতীশের কোন মতে বিবাহের যোগাড় হয় তাহলেও আমি সতীশের জন্য অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারি। ভাদুড়ি সাহেব ব্যারিষ্টার মানুষ বেশ দু দশ টাকা রোজগার করে। ছেলেবেলা হতেই সতীশ ত ওদের বাড়ী আনাগোনা করে, মেয়েটি ত আর পাষাণ নয়, নিশ্চয় আমার সতীশকে পছন্দ করবে! সতীশের বাপ ত এ সব কথা একবার চিন্তাও করেন না, বলতে গেলে আগুণ হ’য়ে ওঠেন, ছেলের ভবিষ্যতের কথা আমাকেই সমস্ত ভাবতে হয়।
প্রথম পরিচ্ছেদ
কর্ম্মফল।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
আজ সতীশের মাসী সুকুমারী এবং মেসোমশায় শশধরবাবু আসিয়াছেন—সতীশের মা বিধুমুখী ব্যস্তসমস্তভাবে তাঁঁহাদের অভ্যর্থনায় নিযুক্ত। “এস দিদি, বস! আজ কোন্ পুণ্যে রায়মশায়ের দেখা পাওয়া গেল! দিদি না আসলে তোমার আর দেখা!” পাবার জো নেই।”
শশধর | এতেই বুঝবে তোমার দিদির শাসন কি রকম কড়া! দিনরাত্রি চোখে চোখে রাখেন!
সুকুমারী | তাই বটে, এমন রত্ন ঘরে রেখেও নিশ্চিন্তমনে ঘুমানো যায় না!
বিধুমুখী | নাকডাকার শব্দে!
সুকুমারী | সতীশ, ছি ছি, তুই এ কি কাপড় পরেছিস? তুই কি এই রকম ধুতি পরে ইস্কুলে যাস্ না কি? বিধু, ওকে যে ফ্রকটা কিনে দিয়ে-ছিলেম, সে কি হল?
বিধুমুখী। সে ও কোন্কালে ছিঁড়ে ফেলেছে!
সুকুমারী। তা ত ছিঁড়বেই! ছেলেমানুষের গায়ে এক কাপড় কতদিন টেঁকে! তা, তাই বলে কি আর নূতন ফ্রক তৈরি করাতে নেই! তোদের ঘরে সকলি অনাসৃষ্টি!
বিধুমুখী। জানই ত দিদি, তিনি ছেলের গায়ে সভ্যকাপড় দেখলেই আগুন হয়ে ওঠেন। আমি যদি না থাকতেম ত তিনি বোধ হয় ছেলেকে দোলাই গায়ে দিয়ে কোমরে ঘুন্সি পরিয়ে ইস্কুল পাঠাতেন—মাগো! এমন সৃষ্টিছাড়া পছন্দও কারো দেখি নি।
মুকুমারী। মিছে না! এক বই ছেলে নয়— একে একটু সাজাতে গোজাতেও ইচ্ছা করে না! এমন বাপও ত দেখি নি। সতীশ পশু রবিবার আছে তুই আমাদের বাড়ী যাস্ আমি তোর জন্য একসুট্ কাপড় র্যামজের ওখান হতে আনিয়ে রাখব। আহা ছেলেমানুষের কি সখ্ হয় না! সতীশ। একসুটে আমার কি হবে মাসিমা! ভাদুড়ি সাহেবের ছেলে আমার সঙ্গে একসঙ্গে পড়ে —সে আমাকে তাদের বাড়ীতে পিংপং খেলায় নিমন্ত্রণ করেছে—আমার ত সে রকম বাইরে যাবার মখ্মলের কাপড় নেই!
শশধর। তেমন যায়গায় নিমন্ত্রণে না যাওয়াই ভাল সতীশ!
সুকুমারী। আচ্ছা, আচ্ছা, তোমার আর বক্তৃতা দিতে হবে না! ওর যখন তোমার মতন বয়স হবে, তখন—
শশধর। তখন ওকে বক্তৃতা দেবার অন্য লোক হবে, বৃদ্ধ মেসোর পরামর্শ শোনবার অবসর হবে না।
সুকুমারী। আচ্ছা, মশায়, বক্তৃতা করবার অন্য লোক যদি তোমাদের ভাগ্যে না জুটত তবে তোমাদের কি দশা হত বল দেখি!
শশধর। সে কথা বলে লাভ কি! সে অবস্থা কল্পনা করাই ভাল!
সতীশ। (নেপথ্যের দিকে চাহিয়া) না, না, এখানে আনতে হবে না আমি যাচ্চি! (প্রস্থান) সুকুমারী। সতীশ ব্যস্ত হয়ে পালাল বিধু?
বিধুমুখী। থালায় করে তার জলখাবার আন্ছিল কি না, ছেলের তাই তোমাদের সাম্নে লজ্জা!।
সুকুমারী। আহা, বেচারার লজ্জা হতে পারে! ও সতীশ, শোন্ শোন্! তোর মেসোমশায় তোকে পেলেটির বাড়ি থেকে আইস্ ক্রিম্ খাইয়ে আনবেন, তুই ওঁর সঙ্গে যা! ওগো, যাও না— ছেলেমানুষকে একটু—
সতীশ। মাসীমা সেখানে কি কাপড় পরে যাব?
বিধুমুখী। কেন, তোর ত চাপকান আছে।
সতীশ। সে বিশ্রী!
সুকুমারী। আর যাই হোক্ বিধু, তোর ছেলে ভাগে পৈতৃক পছন্দটা পায় নি তাই রক্ষা! বাস্তবিক, চাপকান দেখলেই খান্সামা কিম্বা যাত্রা দলের ছেলে মনে পড়ে! এমন অসভ্য কাপড় আর নেই!
শশধর। এ কথাগুলো— সুকুমারী। চুপি চুপি বল্তে হবে? কেন ভয় করতে হবে কাকে! মন্মথ নিজের পছন্দমত ছেলেকে সাজ করাবেন আর আমরা কথা কইতেও পাব না!
শশধর। সর্ব্বনাশ! কথা বন্দ করতে আমি বলি নে! কিন্তু সতীশের সাম্নে এ সমস্ত আলোচনা—
সুকুমারী। আচ্ছা আচ্ছা বেশ! তুমি ওকে। পেলিটির ওখানে নিয়ে যাও!
সতীশ। না মাসীমা আমি সেখানে চাপকান পরে যেতে পারব না!
সুকুমারী। এই যে মন্মথবাবু আস্চেন। এখনি সতীশকে নিয়ে বকাবকি করে ওকে অস্থির করে তুলবেন। ছেলেমানুষ, বাপের বকুনির চোটে ওর এক দণ্ড শান্তি নেই। আয় সতীশ তুই আমার। সঙ্গে আয়—আমরা পালাই। (প্রস্থান)।
(মন্মথের প্রবেশ।)
বিধু সতীশ ঘড়ি ঘড়ি করে কয়দিন আমাকে অস্থির করে তুলেছিল। দিদি তাকে একটা রূপোর ঘড়ি দিয়েছেন—আমি আগে থাকতে বলে রাখলেম তুমি আবার শুনলে রাগ করবে।
(প্রস্থান)
মন্মথ। আগে থাকতে বলে রাখলেও রাগ করব। শশধর সে ঘড়িটি তোমাকে নিয়ে যেতে হবে।
শশধর। তুমি ত আচ্ছ লোক! নিয়ে ত গেলেম, শেষকালে বাড়ি গিয়ে জবাবদিহি করবে কে!
মন্মথ। না শশধর, ঠাট্ট নয়, আমি এ সব ভালবাসি নে!
শশধর। ভাল বাস না, কিন্তু সহ্যও করতে হয়—সংসারে এ কেবল তোমার এক্লারই পক্ষে বিধান নয়!
মন্মথ। আমার নিজের সম্বন্ধে হলে আমি নিঃশব্দে সহ্য করতেম। কিন্তু ছেলেকে আমি মাটি করতে পারি না। যে ছেলে চাবা-মাত্রই পায়, চাবার পূর্ব্বেই যার অভাব মোচন হতে থাকে সে নিতান্ত দুর্ভাগা। ইচ্ছা দমন করতে শিখে কেউ কোনকালে সুখী হতে পারে না। বঞ্চিত হয়ে ধৈর্য রক্ষা করবার যে বিদ্যা আমি তাই ছেলেকে দিতে চাই, ঘড়ি ঘড়ির চেন যোগাতে চাই নে।
শশধর। সে ত ভাল কথা কিন্তু তোমার ইচ্ছামাত্রই ত সংসারে সমস্ত বাধা তখনি ধূলিসাৎ হবে না। সকলেরই যদি তোমার মত সদ্বুদ্ধি থাকত তা হলে ত কথাই ছিল না; তা যখন নেই তখন সাধুসঙ্কল্পকেও গায়ের জোরে চালানো যায় না, ধৈর্য্য চাই। স্ত্রীলোকের ইচ্ছার একেবারে উল্টামুখে চলবার চেষ্টা করলে অনেক বিপদে পড়বে—তার চেয়ে পাশ কাটিয়ে একটু ঘুরে গেলে সুবিধামত ফল পাওয়া যায়। বাতাস যখন উল্টা বয় জাহাজের পাল তখন আড় করে রাখতে হয়, নইলে চলা অসম্ভব।
মন্মথ। তাই বুঝি তুমি গৃহিণীর সকল কথাতেই সায় দিয়ে যাও! ভীরু!
শশধর। তোমার মত অসম সাহস আমার নেই। যার ঘরকন্নার অধীনে চব্বিশঘণ্টা বাস করতে হয় তাঁকে ভয় না করব ত কাকে করব? নিজের স্ত্রীর সঙ্গে বীরত্ব করে লাভ কি? আঘাত করলেও কষ্ট, আঘাত পেলে ও কষ্ট। তার চেয়ে তর্কের বেলায় গৃহিণীর মতকে সম্পূর্ণ অকাট্য বলে স্বীকার করে কাজের বেলায় নিজের মত চালানোই সৎপরামর্শ—গোয়ার্ত্তমি করতে গেলেই মুষ্কিল বাধে। মন্মথ। জীবন যদি সুদীর্ঘ হত তবে ধীরে সুস্থে তোমার মতে চলা যেত। পরমায়ু যে অল্প।
শশধর। সেই জন্যই ত ভাই বিবেচনা করে চলতে হয়। সাম্নে একটা পাথর পড়লে যে লোক ঘুরে না গিয়া সেটা ডিঙিয়ে পথ সংক্ষেপ করতে চায় বিলম্ব তারই অদৃষ্টে আছে। কিন্তু তোমাকে এ সকল বলা বৃথা—প্রতিদিনই ত ঠেকছ তবু যখন শিক্ষা পাচ্চ না তখন আমার উপদেশে ফল নেই। তুমি এম্নি ভাবে চলতে চাও যেন তোমার স্ত্রী বলে একটা শক্তির অস্তিত্ব নেই—অথচ তিনি যে আছেন সে সম্বন্ধে তোমার লেশমাত্র সন্দেহ থাকবার কোনো কারণ দেখি নে।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
মিষ্টার ভাদুড়ির বাড়ীতে টেনিস্ক্ষেত্র।
নলিনী। ও কি সতীশ, পালাও কোথায়?
সতীশ। তোমাদের এখানে টেনিসপার্টি জান্তেম না আমি টেনিসসুট পরে আসিনি!
নলিনী। সকল গরুর ত এক রঙের চামড়া হয় না। তোমার না হয় ওরিজিন্যাল বলেই নাম রটবে। আচ্ছা আমি তোমার সুবিধা করে দিচ্চি। মিষ্টার নন্দী আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে!
নন্দী। অনুরোধ কেন, হুকুম বলুন না— আমি আপনারি সেবার্থে!
নলিনী। যদি একবারে অসাধ্য বোধ না। করেন ত আজকের মত আপনার সতীশকে মাপ করবেন—ইনি আজ টেনিস্সুট পরে আসেন নি। এত বড় শোচনীয় দুর্ঘটনা! নন্দী। আপনি ওকালতি করলে খুন, জাল, ঘর জ্বালানও মাপ করতে পারি। টেনিস্সুট না পরে এলে যদি আপনার এত দয়া হয় তবে আমার এই টেনিসসুটটা মিষ্টার সতীশকে দান করে তাঁর এই—এটাকে কি বলি! তোমার এটা কি সুট সতীশ?—খিচুড়ী সুটই বলা যাক—তা আমি সতীশের এই খিচুড়ী সুটটা পরে রোজ এখানে আসব। আমার দিকে যদি স্বর্গের সমস্ত সূর্য্য-চন্দ্রতারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তবু লজ্জা করব না। সতীশ এ কাপড়টা দান করতে যদি তোমার আপত্তি থাকে তবে তোমার দজ্জির ঠিকানাটা আমাকে দিয়ো। ফ্যাশনেবল ছাটের চেয়ে মিস ভাদুড়ীর দয়া অনেক মূল্যবান।
নলিনী। শোন, শোন সতীশ, শুনে রাখ। কেবল কাপড়ের ছাঁট নয় মিষ্ট কথার ছাঁদও তুমি মিষ্টার নন্দীর কাছে শিখতে পার। এমন আদর্শ আর পাবে না! বিলাতে ইনি ডিউক্ ডাচেস্ ছাড়া আর কার ও সঙ্গে কথাও কন নাই। মিষ্টার নন্দী আপনাদের সময় বিলাতে বাঙালী ছাত্র কে কে ছিল? নন্দী। আমি বাঙালীদের সঙ্গে সেখানে মিশিনি।
নলিনী। শুনচ সতীশ! রীতিমত সভ্য হতে গেলে কত সাবধানে থাকতে হয়! তুমি বোধ হয় চেষ্টা করলে পারবে। টেনিস্সুট সম্বন্ধে তোমার যে রকম সুক্ষ্ণ ধর্ম্মজ্ঞান তাতে আশা হয়। (অন্যত্র গমন)
সতীশ। (দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া) নেলিকে আজ পর্য্যন্ত বুঝতেই পারলেম না। আমাকে দেখে ও বোধ হয় মনে মনে হাসে। আমার ও মুস্কিল হয়েছে আমি কিছুতে এখানে এসে সুস্থ মনে থাকতে পারি নে—কেবলি মনে হয় আমার টাইটা বুঝি কলারের উপরে উঠে গেছে, আমার ট্রাউজারে হাঁটুর কাছটায় হয় ত কুঁচ্কে আছে। নন্দীর মত কবে আমিও বেশ ঐ রকম অনায়াসে ফুর্ত্তির সঙ্গে—
নলিনী। (পুনরায় আসিয়া) কি সতীশ এখনও যে তোমার মনের খেদ মিট্ল না! টেনিস্ কোর্ত্তার শোকে তোমার হৃদয়টা যে বিদীর্ণ হয়ে গেল! হায়, কোর্ত্তাহারা হৃদয়ের সান্ত্বনা জগতে কোথায় আছে—দর্জ্জির বাড়ী ছাড়া! সতীশ। আমার হৃদয়টার খবর যদি রাখতে তবে এমন কথা আর বলতে না নেলি!
নলিনী। (করতালি দিয়া) বাহবা! মিষ্টার নন্দীর দৃষ্টান্তে মিষ্ট কথার আমদানি এখনি সুরু হয়েছে! প্রশ্রয় পেলে অত্যন্ত উন্নতি হবে ভরসা হচ্ছে! এস একটু কেক খেয়ে যাবে, মিষ্ট কথার পুরস্কার মিষ্টান্ন।
সতীশ। না আজ আর খাব না, আমার শরীরটা—
নলিনী। সতীশ আমার কথা শোন—টেনিস্ কোর্ত্তার খেদে শরীর নষ্ট কোরো না-খাওয়া দাওয়া একেবারে ছাড়া ভাল নয়। কোর্ত্তা জিনিসটা জগতের মধ্যে সেরা জিনিস সন্দেহ নেই কিন্তু এই তুচ্ছ শরীরটা না হলে সেটা বুলিয়ে বেড়াবার সুবিধা হয় না!
ষোড়শ পরিচ্ছেদ
ষোড়শ পরিচ্ছদ।
শশধর। সতীশ একটু ঠাণ্ডা হও! তোমার প্রতি অত্যন্ত অন্যায় হয়েচে সে কি আমি জানিনে? তোমার মাসী রাগের মুখে কি বলেচেন সে কি অমন করে মনে নিতে আছে? দেখ, গোড়ায় যা ভুল হয়েচে তা এখন যতটা সম্ভব প্রতিকার করা যাবে তুমি নিশ্চিন্ত থাক!
সতীশ। মেসোমশায়, প্রতিকারের আর কোনো সম্ভাবনা নেই। মাসীমার সঙ্গে আমার এখন যেরূপ সম্পর্ক দাঁড়িয়েচে তাতে তোমার ঘরের অন্ন আমার গলা দিয়ে আর গলবে না। এতদিন তোমাদের যা খরচ করিয়েচি তা যদি শেষ কড়িটি পর্য্যন্ত শোধ করে না দিতে পারি তবে আমার মরেও শান্তি নাই। প্রতিকার বাদ কিছু থাকে ত সে আমার হাতে, তুমি কি প্রতিকার করবে? শশধর। না, শোন সতীশ—একটু স্থির হও! তোমার যা কর্ত্তব্য সে তুমি পরে ভেবো—তোমার সম্বন্ধে আমরা যে অন্যায় করেচি তার প্রায়শ্চিত্ত ত আমাকেই করতে হবে। দেখ, আমার বিষয়ের এক অংশ আমি তোমাকে লিখে দেব—সেটাকে তুমি দান মনে করো না, সে তোমার প্রাপ্য। আমি সমস্ত ঠিক করে রেখেচি—পর্শু শুক্রবারে রেজেষ্ট্রি করে দেব।
সতীশ। (শশধরের পায়ের ধূলা লইয়া) মেসোমসায়, কি আর বলব—তোমার এই স্নেহে—
শশধর। আচ্ছা থাক্ থাক্! ও সব স্নেহ ফ্নেহ আমি কিছু বুঝিনে, রসকস আমার কিছুই নেই—যা কর্ত্তব্য তা কোনো রকমে পালন কর্ত্তেই হবে এই বুঝি। সাড়ে আটটা বাজল, তুমি আজ কোরিন্থিয়ানে যাবে বলেছিলে যাও! সতীশ একটা কথা তোমাকে বলে রাখি। দানপত্রখানা আমি মিষ্টার ভাদুড়িকে দিয়েই লিখিয়ে নিয়েচি। ভাবে বোধ হল তিনি এই ব্যাপারে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন—তোমার প্রতি যে তার টান নেই এমন ত দেখা গেল না। এমন কি, আমি চলে আসবার
সময় তিনি আমাকে বল্লেন সতীশ আজকাল আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসে না কেন?
(সতীশের প্রস্থান)
ওরে রামচরণ, তোর মা ঠাকুরাণীকে একবার ডেকে দে ত!
সুকুমারীর প্রবেশ।
সুকুমারী। কি স্থির করলে?
শশধর। একটা চমৎকার প্ল্যান ঠাউরেচি!
সুকুমারী। তোমার প্ল্যান যত চমৎকার হবে সে আমি জানি। যাহোক সতীশকে এ বাড়ি হতে বিদায় করেচ ত?
শশধর। তাই যদি না করব তবে আর প্ল্যান কিসের? আমি ঠিক করেচি সতীশকে আমাদের তরফ মাণিকপুর লিখে পড়ে দেব—তা হলেই সে স্বচ্ছন্দে নিজের খরচ নিজে চালিয়ে আলাদা হয়ে থাকতে পারবে। তোমাকে আর বিরক্ত করবে না।
মুকুমারী। আহা কি সুন্দর প্ল্যানই ঠাউরেচ। সৌন্দর্য্যে আমি একেবারে মুগ্ধ! না, তুমি অমন পাগলামি করতে পারবে না আমি বলে দিলেম। শশধর। দেখ, এক সময়ে ত ওকেই সমস্ত সম্পত্তি দেবার কথা ছিল।
সুকুমারী। তখন ত আমার হরেন জন্মায়নি। তা ছাড়া তুমি কি ভাব তোমার আর ছেলেপুলে হবে না!
শশধর। সুকু, ভেবে দেখ আমাদের অন্যায় হচ্ছে। মনেই করনা কেন তোমার দুই ছেলে।
মুকুমারী। সে আমি অতশত বুঝিনে—তুমি যদি এমন কাজ কর তবে আমি গলায় দড়ি দিয়ে মরব—এই আমি বলে গেলেম।
(সুকুমারীর প্রস্থান)
সতীশের প্রবেশ।
শশধর। কি সতীশ থিয়েটারে গেলে না?
সতীশ। না মেসোমশায়, আজ আর থিয়েটার না। এই দেখ দীর্ঘকাল পরে মিষ্টার ভাদুড়ির কাছ হতে আমি নিমন্ত্রণ পেয়েচি! তোমার দানপত্রের ফল দেখ! সংসারের উপর আমার ধিক্কার জন্মে গেছে মেসোমশায়! আমি তোমার সে তালুক নেব না!
শশধর। কেন সতীশ? সতীশ। আমি ছদ্মবেশে পৃথিবীর কোনো সুখভোগ করব না। আমার যদি নিজের কোন মূল্য থাকে, তবে সেই মূল্য দিয়ে যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকুই ভোগ করব, তার চেয়ে এক কানা কড়িও আমি বেশি চাই না। তাছাড়া, তুমি যে আমাকে তোমার সম্পত্তির অংশ দিতে চাও মাসীমার সম্মতি নিযেচ ত!
শশধর। না সে তিনি—অর্থাৎ সে একরকম করে’ হবে। হঠাৎ তিনি রাজি না হতে পারেন, কিন্তু—
সতীশ। তুমি তাঁকে বলেছ?
শশধর। হাঁ, বলেছি বইকি! বিলক্ষণ! তাঁকে না বলেই কি আর—
সতীশ। তিনি রাজি হয়েছেন?
শশধর। তাকে ঠিক রাজি বলা যায় না বটে, কিন্তু ভাল করে বুঝিয়ে—
সতীশ। বৃথা চেষ্টা মেসোমশায়। তাঁর নারাজিতে তোমার সম্পত্তি আমি নিতে চাইনে। তুমি তাঁকে বলে আজ পর্য্যন্ত তিনি আমাকে যে অন্ন খাইয়েচেন তা উদগার না করে আমি বাঁচব না! তাঁর সমস্ত ঋণ সুদসুদ্ধ শোধ করে তবে আমি হাঁফ ছাড়ব।
শশধর। সে কিছুই দরকার নেই সতীশ— তোমাকে বরঞ্চ কিছু নগদ টাকা গোপনে—
সতীশ। না মেসোমশায় আর ঋণ বাড়বেনা। তামার কাছে এখন কেবল আমার একটি অনুরোধ আছে। তোমার যে সাহেব-বন্ধুর আপিসে আমাকে কাজ দিতে চেয়েছিলে, সেখানে আমার কাজ জুটিয়ে দিতে হবে।
শশধর। পারবে ত!
সতীশ। এর পরেও যদি না পারি তবে পুনর্ব্বার মাসীমার অন্ন খাওয়াই আমার উপযুক্ত শাস্তি হবে!
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ।
সুকুমারী। দেখ দেখি, এখন সতীশ কেমন পরিশ্রম ক’রে কাজকর্ম্ম করচে। দেখ অতবড় সাহেব-বাবু আজকাল পুরানো কালে আলপাকার চাপকানের উপরে কোঁচানো চাদর ঝুলিয়ে কেমন নিয়মিত আপিসে যায়!
শশধর। বড় সাহেব সতীশের খুব প্রশংসা করেন!
সুকুমারী। দেখ দেখি, তুমি যদি তোমার জমিদারিটা তাকে দিয়ে বসতে তবে এতদিনে সে টাই-কলার জুতা ছড়ি কিনেই সেটা নিলামে চড়িয়ে দিত। ভাগ্যে আমার পরামর্শ নিয়েছ তাইত সতীশ মানুষের মত হয়েচে!
শশধর। বিধাতা আমাদের বুদ্ধি দেন নেই কিন্তু স্ত্রী দিয়েচেন—আর তোমাদের বুদ্ধি দিয়েচেন তেমনি সঙ্গে সঙ্গে নির্ব্বোধ স্বামীগুলাকেও তোমাদের হাতে সমর্পণ করেছেন—আমাদেরই জিত! সুকুমারী। আচ্ছা আচ্ছা, ঢের হয়েচে, ঠাট্টা করতে হবে না! কিন্তু সতীশের পিছনে এতদিন যে টাকাটা ঢেলেচ সে যদি আজ থাকত তবে—
শশধর। সতীশ ত বলেচে কোনো-একদিন সে সমস্তই শোধ করে দেবে।
সুকুমারী। সে যত শোধ করবে আমার গায়ে রইল! সে ত বরাবরই ঐ রকম লম্বা-চৌড়া কথা বলে থাকে। তুমি বুঝি সেই ভরসায় পথ চেয়ে বসে আছ!
শশধর। এতদিন ত ভরসা ছিল তুমি যদি পরামর্শ দাও ত সেটা বিসর্জ্জন দিই!
সুকুমারী। দিলে তোমার বেশি লোকসান হবে না এই পর্য্যন্ত বলতে পারি! ঐ যে তোমার সতীশ বাবু আস্চেন! চাকরি হয়ে অবধি একদিনও ত আমাদের চৌকাঠ মাড়ান নি এম্নি তার কৃতজ্ঞতা! আমি যাই!
সতীশের প্রবেশ।
সতীশ। মাসীমা, পালাতে হবে না। এই দেখ আমার হাতে অস্ত্রশস্ত্র কিছুই নেই—কেবল খান কয়েক নোট আছে! শশধর। ইস্! এ যে এক তাড়া নোট। যদি আপিসের টাকা হয় ত এমন করে সঙ্গে নিয়ে বেড়ানো ভাল হচ্চে না সতীশ!
সতীশ। আর সঙ্গে নিয়ে বেড়াব না। মাসীমার পায়ে বিসর্জ্জন দিলাম। প্রণাম হই মাসীমা! বিস্তর অনুগ্রহ করে ছিলে—তখন তার হিসাব রাখতে হবে মনে ও করিনি সুতরাং পরিশোধের অঙ্কে কিছু ভুলচুক হতে পারে! এই পনেরো হাজার টাকা গুনে নাও! তোমার খোকার পোলাও পরমান্নে, একটি তণ্ডুলকণাও কম না পড়ুক!
শশধর। এ কি কাণ্ড সতীশ! এত টাকা কোথায় পেলে!
সতীশ। আমি গুণচট্ আজ ছয়মাস আগাম খরিদ করে রেখেচি—ইতিমধ্যে দর চড়েচে; তাই মুনফা পেয়েচি।
শশধর। সতীশ, এ যে জুয়াখেলা!
সতীশ। খেলা এইখানেই শেষ—আর দরকার হবে না। .
শশধর। তোমার এ টাকা তুমি নিয়ে যাও, আমি চাই না! সতীশ। তোমাকে ত দিই নাই মেসোমশায়! এ মাসীমার ঋণশোধ। তোমার ঋণ কোনকালে শোধ করতে পারব না!
শশধর। কি সুকু, এ টাকাগুলো—।
সুকুমারী। গুণে খাতাঞ্জির হাতে দাও না— ঐখানেই কি ছড়ানো পড়ে থাকবে?
শশধর। সতীশ, খেয়ে এসেচ ত?
সতীশ। বাড়ি গিয়ে খাব।
শশধর। অ্যাঁ সে কি কথা! বেলা যে বিস্তর হয়েচে। আজ এইখানেই খেয়ে যাও!
সতীশ। আর খাওয়া নয় মেসোমশায়! এক দফা শোধ করলেম, অন্নঋণ আবার নূতন করে ফাঁদতে পারব না! (প্রস্থান)
সুকুমারী। বাপের হাত হতে রক্ষা করে এত দিন ওকে খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করলেম, আজ হাতে দু’পয়সা আসতেই ভাবখান দেখেচ! কৃতজ্ঞতা এমনিই বটে! ঘোর কলি কি না!
সপ্তম পরিচ্ছেদ
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
শশধর। দেখ মন্মথ সতীশের উপরে তুমি বড় কড়া ব্যবহার আরম্ভ করেছ এখন বয়স হয়েছে এখন ওর প্রতি অতটা শাসন ভাল নয়!
বিধু। বল ত রায় মশায়! আমি ত ওঁকে কিছুতেই বুঝিয়ে পারলেম না!
মন্মথ। দুটো অপবাদ এক মুহূর্ত্তেই! একজন বল্লেন নির্দ্দয় আর একজন বল্লেন নির্ব্বোধ! যাঁর কাছে হতবুদ্ধি হয়ে আছি তিনি যা বলেন সহ্য করতে রাজি আছি—তাঁর ভগ্নী যাহা বলবেন তার উপরেও কথা কব না কিন্তু তাই বলে তাঁর ভগ্নীপতি পর্য্যন্ত সহিষ্ণুতা চলবে না! আমার ব্যবহারটা কি রকম কড়া শুনি!
শশধর। বেচার সতীশের একটু কাপড়ের সখ আছে, ও পাঁচ জায়গায় মিশতে আরম্ভ করেছে ওকে তুমি চাঁদনীর—
মন্মথ। আমি ত চাঁদনীর কাপড় পরতে বলিনে। ফিরিঙ্গি পোষাক আমার দু চক্ষের বিষ। ধুতি চাদর চাপকন চোগা পড়ুক কখনো লজ্জা পেতে হবে না।
শশধর। দেখ মন্মথ সতীশ যদি এ বয়সে সখ মিটিয়ে না নিতে পারে তবে বুড়া বয়সে খামকা কি করে বসবে সে আরো বদ্ দেখতে হবে। আর ভেবে দেখ যেটাকে আমরা শিশুকাল হতেই সভ্যতা বলে শিখচি তার আক্রমণ ঠেকাবে কি করে?
মন্মথ। যিনি সভ্য হবেন তিনি সভ্যতার মালমসলা নিজের খরচেই জোগাবেন। যে দিক হতে তোমার সভ্যতা আসছে টাকাটা সে দিক হতে আসছে না, বরং এখান হতে সেই দিকেই যাচ্ছে।
বিধু। রায় মশায়, পেরে উঠবে না—দেশের কথা উঠে পড়লে ওঁকে থামানো যায় না।
শশধর। ভাই মন্মথ, ও সব কথা আমি। বুঝি। কিন্তু ছেলেদের আবদারও ত এড়াতে পারিনে। সতীশ ভাদুড়ি সাহেবদের সঙ্গে যখন মেশামেশি কর্চে তখন উপযুক্ত কাপড় না থাকলে ও বেচারার বড় মুস্কিল। আমি রাঙ্কিনের বাড়ীতে ওর জন্য–
ভৃত্যের প্রবেশ।
ভৃত্য। সাহেব বাড়ী হতে এই কাপড় এয়েছে।
মন্মথ। নিয়ে যা কাপড়, নিয়ে যা! এখনি নিয়ে যা! (বিধুর প্রতি) দেখ সতীশকে যদি আমি এ কাপড় পরতে দেখি তবে তাহাকে বাড়ীতে থাকতে দেব না ‘মেসে’ পাঠিয়ে দেব সেখানে সে আপন ইচ্ছামত চলতে পারবে! (দ্রুত প্রস্থান)
শশধর। অবাক কাণ্ড!
বিধু। (সরোদনে) রায় মশায়, তোমাকে কি বলব আমার বেঁচে সুখ নেই। নিজের ছেলের উপর বাপের এমন ব্যবহার কেউ কোথাও দেখেচে!
শশধর। আমার প্রতি ব্যবহারটা ও ত ঠিক ভাল হল না। বোধ হয় মন্মথর হজমের গোল হয়েচে। আমার পরামর্শ শোন, তুমি ওকে রোজ সেই একই ডাল ভাত খাইয়ো না। ও যতই বলুক না কেন মাঝে মাঝে মসলাওয়ালা রান্না না হলে মুখে রোচে না, হজমও হয় না। কিছুদিন ওকে ভাল করে খাওয়াও দেখি তার পরে তুমি যা বলবে ও তাই শুনবে। এ সম্বন্ধে তোমার দিদি তোমার চেয়ে ভাল বোঝেন। (প্রস্থান, বিধুর ক্রন্দন)।
বিধবা জা। (ঘরে প্রবেশ করিয়া আত্মগত)। কখনো কান্না কখনো হাসি —কত রকম যে সোহাগ তার ঠিক নেই—বেশ আছে (দীর্ঘ নিশ্বাস)। ও মেজ বৌ, গোসাঘরে বসেছিসো! ঠাকুরপোকে ডেকে, দিই, মানভঞ্জনের পালা হ’য়ে যাক!