চতুর্দ্দশপদী-কবিতাবলি
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৬৬
প্রকাশনা-তথ্য
চতুর্দ্দশপদী-কবিতাবলি।
শ্রীমাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রণীত।
কলিকাতা।
শ্রীযুত ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং ষ্ট্যান্হোপ্ যন্ত্রে
মুদ্রিত।
সন ১২৭৩ সাল, ইংরাজী ১৮৬৬।
প্রকাশক-দিগের বিজ্ঞাপন।
ইংরাজী ১৮৬২ সালের জুন মাসে কবিবর মাইকেল মধুসূদন দত্ত বারিষ্টর হইবার মানসে ইংলণ্ড যাত্রা করেন। যাত্রাকালে মাতৃভূমিকে সম্বোধন করিয়া যে একটী কবিতা লিখিয়া যান, তাহ সোমপ্রকাশ প্রভৃতি সম্বাদপত্রে এবং ১ম ভাগ মেঘনাদবধকাব্যের মুখবন্ধে মুদ্রিত হইয়াছে; অতএব সেটী এখানে উদ্ধৃত করা আর আবশ্যক বোধ হইতেছে না। মাইকেল মধুসূদন ইংলণ্ডে দেড় বৎসর থাকিয়া ১৮৬৩ সালের অক্টোবর মাসে ফ্রান্স রাজ্যে গমন করেন এবং ভরসেল্স নামক তথাকার সুপ্রসিদ্ধ নগরে দুই বৎসর কাল অবস্থিতি করেন। তিনি এই সময়ে ‘চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলি’ নাম দিয়া একশতটি কবিতা ছাপাইবার জন্য আমাদিগের নিকট পাঠাইয়া দেন। কবিতাগুলির প্রত্যেকেই চতুর্দ্দশমাত্র পদবিশিষ্ট। ইউরোপ খণ্ড হইতে ইতিপূর্ব্বে আর কখন বাঙ্গালা কবিতা লিখিত হইয়া মুদ্রিত হইবার নিমিত্ত কলিকাতায় প্রেরিত হয় নাই এই জন্য আমরা কবিবরের বন্ধুদিগের এবং সাধারণের সন্তোষার্থে কবিতাগুলির উপক্রমভাগটী মুদ্রাক্ষরে না ছাপাইয়া যেরূপ লিখিত ছিল অবিকল তদনুরূপ হস্তাক্ষরে ছাপাইলাম। উপক্রমটী দেখিয়া পাঠকবৃন্দ কবিবরের হস্তাক্ষর বুঝিতে পারিবেন এবং যেরূপে কবিতাটী লিখিত হইয়াছে তাহাও দেখিতে পাইবেন।
আমরা গ্রন্থকারের হস্তাক্ষর দেখিয়াই উক্ত কবিতাগুলির মুদ্রাকার্য্য সম্পন্ন করিয়াছি; পরন্তু কবিবরের অনুপস্থিতি নিবন্ধন প্রুফ সংশোধন করিতে, বোধ হয়, কোন কোন স্থানে ভুল রহিয়া গিয়া থাকিবে, এজন্য সহৃদয় পাঠকবর্গ আমাদিগের দোষ মার্জ্জনা করিবেন। ফলতঃ গ্রন্থকার স্বয়ং প্রুফ সংশোধন করিলে গ্রন্থখানি যেরূপ নির্ভুল হইত, তাঁহার অনুপস্থিতিতে সেরূপ হইবার কোন সম্ভাবনা নাই।
দত্তজ মহাশয় বিদেশে গিয়া এবং বিদেশে থাকিয়াও মাতৃভাষার উন্নতি-সাধনে বিরত হন নাই। তিনি দেড় মাসের পথ হইতেও প্রিয় অমিত্রাক্ষরছন্দে কবিতা লিখিয়া পাঠাইয়াছেন। দুঃখের বিষয় এই যে, তাঁহার অবকাশ কিছুই মাত্র ছিল না। অবকাশাভাব প্রযুক্ত যত দূর মনে করিয়া ছিলেন, তত দূর কৃতকার্য্য হইতে পারেন নাই। তিনি সুভদ্রার হরণ-বৃত্তান্ত লিখিতে আরম্ভ করিয়া সময়াভাবে শেষ করিতে পারেন নাই। পাঠকবর্গ ৩৮ সংখ্যক কবিতাটী পাঠ করিলেই জানিতে পারিবেন। তিলোত্তমা-সম্ভব কাব্য আদ্যন্ত সংশোধিত করিবার এবং বিদ্যালয়োপযোগী আর এক খানি নীতিগর্ভ পুস্তক রচনা করিবারও মানস করিয়াছিলেন, কিন্তু সময়াভাবে সে গুলিও শেষ করিতে পারেন নাই, সকলেরই কিয়দংশ মাত্র লিখিয়া ক্ষান্ত হইয়াছেন। তিনি ইউরোপে গিয়া আইন অভ্যাস করিতেই ব্যস্ত, অবকাশের অপ্রতুল হইবে তাহার সন্দেহ কি? বিশেষতঃ সেখান হইতে জর্ম্মান, ফ্রেঞ্চ, ইটালিক, লাটিন, গ্রীক, প্রভৃতি অনেক গুলি ভাষা শিখিয়াছেন তাহাতেই তাঁহার যথেষ্ট সময় লাগিয়াছে।
আমরা উপর্য্যুক্ত সুভদ্রাহরণ, তিলোত্তমা, ও হিতোপদেশের যে২ অংশ প্রাপ্ত হইয়াছিলাম তাহা ‘অসমাপ্ত কাব্যাবলি’ শিরোনাম দিয়া চতুর্দ্দশপদীর শেষভাগে সংযোজিত করিয়া দিলাম। পাঠকবর্গ দেখিলেই তাহাদের গুণাগুণ বুঝিতে পারিবেন।
৮০ সংখ্যক কবিতাটী গ্রন্থকার ইটালীর অধিপতি ভিকটর ইমানুয়েলকে উপঢৌকন স্বরূপ প্রেরণ করেন। ইটালীশ্বর স্বীয় প্রধান মন্ত্রীকে দিয়া দত্তজ মহাশয়কে এক প্রশংসাসূচক উত্তর লিখিয়া পাঠান। এই কবিতা ইটালীদেশীয় সুপ্রসিদ্ধ কবি দান্তের উপর লিখিত হয়। ইনি ফ্লরেন্স নগরে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৩০০ খৃঃ অব্দে উক্ত নগরের একজন প্রধান মাজিস্ট্রেটের পদে অভিষিক্ত হইয়া কোন সম্প্রদায় বিশেষের বিরোধে লিপ্ত থাকাতে তিনি স্বদেশ হইতে নির্ব্বাসিত হন। নির্ব্বাসিতাবস্থায় লা কমেডিয়ান নামে জগদ্বিখ্যাত কাব্য ইটালি ভাষায় রচনা করেন। এই কাব্যে স্বর্গ ও নরকের বিষয় অতি সুন্দররূপে বর্ণিত আছে। এরূপ অনুমান করা হয় যে, কবিগুরু দান্তে ভার্জিলের সমভিব্যাহারে নরকে প্রবেশ করিয়া পাপিদিগের যন্ত্রণা ভোগ বর্ণনা করেন। তিনি লাটিন ভাষায় আর কতকগুলি কাব্য লিখিয়া আপন যশঃ আরো বিস্তীর্ণ করেন। ১৮৩০ সালে ফ্লরেন্স নগরে তাঁহার স্মরণার্থে একটী সমাধি-মন্দির নির্ম্মিত হয়।
৮১ সংখ্যক কবিতাটী পণ্ডিতবর গোল্ডষ্টুকরকে লিখিত হয়। ইনি জর্ম্মানি দেশ-নিবাসী সংস্কৃত ভাষায় এক জন মহাপণ্ডিত এবং বোডিন কালেজে উক্ত ভাষার প্রধান অধ্যাপক; কতকগুলি সংস্কৃত গ্রন্থ সংশোধনপূর্ব্বক পুনর্মুদ্রিত করিয়াছেন, বিশেষতঃ সুবিখ্যাত উইলসন সাহেবকৃত সংস্কৃত অভিধানের সংশোধন ও পুনর্মুদ্রাঙ্কন কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। প্রায় দশ বৎসর হইল এই কর্ম্মে ব্যাপৃত আছেন, অ্যাপিও স্বরবর্ণের আদ্যক্ষর “অ” শেষ করিয়া উঠিতে পারেন নাই। ইংলণ্ডে অধুনা সংস্কৃত ভাষার উন্নতি-সাধন বিষয়ক “সংস্কৃত টেক্সট সোসাইটী” নামে যে এক সমাজ সংস্থাপিত হইয়াছে ইনি তাহারও একজন প্রধান সম্পাদক।
৮২ সংখ্যক কবিতাটী আলফ্রেড টেনিসনের উপর লিখিত। ইনি ইংলণ্ড দেশীর ইদানীন্তন সুপ্রসিদ্ধ কবি। ইংরাজী ভাষায় অনেকগুলি প্রসিদ্ধ কাব্য রচনা করিয়া আপন নাম চিরস্মরণীয় করিয়াছেন। ইনি অদ্যাপী জীবিত আছেন।
ভিকটর হ্যূগো ফ্রান্সদেশীর ইদানীন্তন অতি প্রসিদ্ধ কবি। ১৮০২ খৃঃ অব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। দশ বৎসর বয়ঃক্রম হইলে কবিতা লিখিতে আরম্ভ করেন, পরে অনেক গুলি কাব্য, নাটক এবং উপন্যাস লিখিয়া এই জগন্মণ্ডলে বিস্তর যশঃ বিস্তার করিয়াছেন।
ষ্ট্যানহোপ্ প্রেস,
কলিকাতা,
১লা আগস্ট ১৮৬৬।
শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং।
নির্ঘণ্ট পত্র।
অসমাপ্ত কাব্যাবলি।
উপক্রম।
যথা বিধি বন্দি কবি, আনন্দে আসরে,
কহে, যোড় করি কর, গৌড় সুভাজনে;—
সেই আমি, ডুবি পূর্বে ভারত-সাগরে,
তুলিল যে তিলোত্তমা-মুকুতা যৌবনে;—
কবি-গুরু বাল্মীকির প্রসাদে তত্পরে,
গম্ভীরে বাজায়ে বীণা, গাইল, কেমনে,
নাশিলা সুমিত্রা-পুত্র, লঙ্কার সমরে,
দেব-দৈত্য-নরাতঙ্ক—রক্ষেন্দ্র-নন্দনে;
কল্পনা দূতীর সাথে ভ্রমি ব্রজ-ধামে
শুনিল যে গোপিনীর হাহাকার ধ্বনি,
(বিরহে বিহ্বলা বালা হারা হয়ে শ্যামে;)—
বিরহ-লেখন পরে লিখিল লেখনী
যার, বীর জায়া-পক্ষে বীর পতি-গ্রামে,
সেই আমি, শুন, যত গৌড়-চূড়ামণি!—
ইতালী, বিখ্যাত দেশ, কাব্যের কানন,
বহুবিধ পিক যথা গায় মধুস্বরে,
সঙ্গীত-সুধার রস করি বরিষণ,
বাসন্ত আমোদে আমোদ মন পূরি নিরন্তরে;—
সে দেশে জনম পূর্বে করিলা গ্রহণ
ফ্রাঞ্চিস্কো পেতরাকা কবি; বাক্দেবীর বরে
বড়ই যশস্বী সাধু, কবি-কুল-ধন,
রসনা অমৃতে সিক্ত, স্বর্ণ বীণা করে।
কাব্যের খনিতে পেয়ে এই ক্ষুদ্র মণি,
স্বমন্দিরে প্রদানিলা বাণীর চরণে
কবীন্দ্র: প্রসন্নভাবে গ্রহিলা জননী
(মনোনীত বর দিয়া) এ উপকরণে।
ভারতে ভারতী-পদ উপযুক্ত গণি,
উপহাররূপে আজি অরপি রতনে॥
ফরাসীস দেশস্থ ভরশেল্স নগরে
১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দে
* * * *
৫৬
নহি আমি, চারু-নেত্রা, সৌমিত্রি কেশরী;
তবে কেন পরাভুত না হব সমরে?
চন্দ্র-চূড়-রথী তুমি, বড় ভয়ঙ্করী,
মেঘনাদ-সম শিক্ষা মদনের বরে।
গিরির আড়ালে থেকে, বাঁধ, লো সুন্দরি,
নাগ-পাশে অরি তুমি; দশ গোটা শরে
কাট গণ্ডদেশ তার, দণ্ড লো অধরে;
মুহুর্মুহুঃ ভূকম্পনে অধীর লো করি!—
এ বড় অদ্ভুত রণ! তব শঙ্খ-ধ্বনি
শুনিলে টুটে লো বল। শ্বাস-বায়ু-বাণে
ধৈরয-কবচ তুমি উড়ায়ে, রমণি,
কটাক্ষের তীক্ষ্ণ অস্ত্রে বিঁধ লো পরাণে।—
এতে দিগম্বরী-রূপ যদি, সুবদনি,
ত্রস্ত হয়ে ব্যস্তে কে লো পরাস্ত না মানে?
* * * * (২)
৯৮
প্রফুল্ল কমল যথা সুনির্ম্মল জলে
আদিত্যের জ্যোতিঃ দিয়া আঁকে স্ব-মূরতি;
প্রেমের সুবর্ণ রঙে, সুনেত্রা যুবতি,
চিত্রেছ যে ছবি তুমি এ হৃদয়-স্থলে,
মোছে তারে হেন কার আছে লো শকতি
যত দিন ভ্রমি আমি এ ভব-মণ্ডলে?—
সাগর-সঙ্গমে গঙ্গা করেন যেমতি
চির-বাস, পরিমল কমলের দলে,
সেই রূপে থাক তুমি! দূরে কি নিকটে,
যেখানে যখন থাকি, ভজিব তোমারে;
যেখানে যখন যাই, যেখানে যা ঘটে।
প্রেমের প্রতিমা তুমি, আলোক আঁধারে!
অধিষ্ঠান নিত্য তব স্মৃতি-সৃষ্ট মঠে,—
সতত সঙ্গিনী মোর সংসার-মাঝারে।
অন্নপূর্ণার ঝাঁপি
৩
(অন্নপূর্ণার ঝাঁপি।)
মোহিনী-রূপসী-বেশে ঝাঁপি কাঁখে করি,
পশিছেন, ভবানন্দ, দেখ তব ঘরে
অন্নদা! বহিছে শূন্যে সঙ্গীত-লহরী,
অদৃশ্যে অপ্সরাচয় নাচিছে অম্বরে।—
দেবীর প্রসাদে তোমা রাজপদে বরি,
রাজাসন, রাজছত্র, দেবেন সত্বরে
রাজলক্ষ্মী; ধন-স্রোতে তব ভাগ্যতরি
ভাসিবে অনেক দিন, জননীর বরে।
কিন্তু চিরস্থায়ী অর্থ নহে এ সংসারে;
চঞ্চলা ধনদা রমা, ধনও চঞ্চল;
তবু কি সংশয় তব, জিজ্ঞাসি তোমারে?
তব বংশ-যশঃ-ঝাঁপি—অন্নদামঙ্গল—
যতনে রাখিবে বঙ্গ মনের ভাণ্ডারে,
রাখে যথা সুধাহতে চন্দ্রের মণ্ডল॥
অর্থ
৭৯
(অর্থ।)
ভেবো না জনম তার এ ভবে কুক্ষণে,
কমলিনী-রূপে যার ভাগ্য-সরোবরে
না শোভেন মা কমলা সুবর্ণ কিরণে;—
কিন্তু যে, কল্পনা-রূপ খনির ভিতরে
কুড়ায়ে রতন-ব্রজ, সাজায় ভূষণে
স্বভাষা, অঙ্গের শোভা বাড়ায়ে আদরে!
কি লাভ সঞ্চয়ি, কহ, রজত কাঞ্চনে,
ধনপ্রিয়? বাঁধা রমা চির কার ঘরে?
তার ধন-অধিকারী হেন জন নহে,
যে জন নির্ব্বংশ হলে বিস্মৃতি-আঁধারে
ডুবে নাম, শিলা যথা তল-শূন্য দহে।
তার ধন-অধিকারী নারে মরিবারে।—
রসনা-যন্ত্রের তার যত দিন বহে
ভাবের সঙ্গীত-ব্বনি, বাঁচে সে সংসারে॥
আমরা
৯০
(আমরা!)
আকাশ-পরশী গিরি দমি গুণ-বলে,
নির্ম্মিলল মন্দির যারা সুন্দর ভারতে;
তাদের সন্তান কি হে আমরা সকলে?—
আমরা,— দুর্ব্বল, ক্ষীণ, কুখ্যাত জগতে,
পরাধীন, হা বিধাতঃ, আবদ্ধ শৃঙ্খলে?—
কি হেতু নিবিল জ্যোতিঃ মণি, মরকতে,
ফুটিল ধুতূরা ফুল মানসের জলে
নির্গন্ধে? কে কবে মোরে? জানিব কি মতে?
বামণ দানব-কুলে, সিংহের ঔরসে
শৃগাল কি পাপে মোরা কে কবে আমারে?—
রে কাল, পূরিবি কি রে পুনঃ নব রসে
রস-শূন্য দেহ তুই? অমৃত-আসারে
চেতাইবি মৃত-কল্পে? পুনঃ কি হরষে,
শুক্লকে ভারত-শশী ভাতিবে সংসারে?
আশা
৯৯
(আশা।)
বাহ্য-জ্ঞান শূন্য করি, নিদ্রা মায়াবিনী
কত শত রঙ্গ করে নিশা-আগমনে!—
কিন্তু কি শকতি তোর এ মর-ভবনে
লো। আশা!— নিদ্রার কেলি আইলে যামিনী,
ভাল মন্দ ভুলে লোক যখন শয়নে,
দুখ, সুখ, সত্য, মিথ্যা! তুই কুহকিনী,
তোর লীলা-খেলা দেখি দিবার মিলনে,—
জাগে যে স্বপন তারে দেখাস্, রঙ্গিণি!
কাঙ্গালী যে, ধন-ভোগ তার তোর বলে;
মগন যে, ভাগ্য-দোষে বিপদ-সাগরে,
(ভুলি ভূত, বর্ত্তমান ভুলি তোর ছলে)
কালে তীর লাভ হবে, সেও মনে করে!
ভবিষ্যত-অন্ধকারে তোর দীপ জ্বলে;—
এ কুহক পাইলি লো কোন্ দেব-বরে?
আশ্বিন মাস
১৮
(আশ্বিন মাস।)
সু-শ্যামাঙ্গ বঙ্গ এবে মহাব্রতে রত।
এসেছেন ফিরে উমা, বৎসরের পরে,
মহিষমর্দ্দিনীরূপে ভকতের ঘরে;
বামে কমকায়া রমা, দক্ষিণে আয়ত-
লোচনা বচনেশ্বরী, স্বর্ণবীণা করে;
শিখীপৃষ্ঠে শিখীধ্বজ, যাঁর শরে হত
তারক—অসুরশ্রেষ্ঠ; গণ-দল যত,
তার পতি গণদেব, রাঙা কলেবরে
করি-শিরঃ; —আদিব্রহ্ম বেদের বচনে।
এক পদ্মে শতদল। শত রূপবতী—
নক্ষত্রমণ্ডলী যেন একত্রে গগনে!—
কি আনন্দ! পূর্ব্ব কথা কেন কয়ে, স্মৃতি,
আনিছ হে বারি-ধারা আজি এ নয়নে?—
ফলিবে কি মনে পুনঃ সে পূর্ব্ব ভকতি?
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
৭৩
(ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত।)
স্ৰোতঃ-পথে বহি যথা ভীষণ ঘোষণে
ক্ষণ কাল, অল্পায়ুঃ পয়োরাশি চলে
বরিষায় জলাশয়ে; দৈব-বিড়ম্বনে
ঘটিল কি সেই দশা সুবঙ্গ-মণ্ডলে
তোমার, কোবিদ বৈদ্য? এই ভাবি মনে,—
নাহি কি হে কেহ তব বান্ধবের দলে,
তব চিতা-ভস্মরাশি কুড়ায়ে যতনে,
স্নেহ-শিল্পে গড়ি মঠ, রাখে তার তলে?
আছিলে রাখাল-রাজ কাব্য-ব্রজধামে
জীবে তুমি; নানা খেলা খেলিলা হরষে;
যমুনা হয়েছ পার; তেঁই গোপগ্রামে
সবে কি ভুলিল তোমা? স্মরণ-নিকষে,
মন্দ-স্বর্ণ-রেখা-সম এবে তব নামে
নাহি কি হে জ্যোতিঃ, ভাল স্বর্ণের পরশে?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
৮৪
(ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর৷)
বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
দীন যে, দীনের বন্ধু!— উজ্জ্বল জগতে
হেমাদ্রির হেম-কান্তি অম্লান কিরণে।
কিন্তু ভাগ্য-বলে পেয়ে সে মহা পর্ব্বতে,
যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
গিরীশ। কি সেবা তার সে সুখ-সদনে!—
দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী;
যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
দীর্ঘ-শিরঃ তরু-দল, দাসরূপ ধরি;
পরিমলে ফুল-কুল দশ দিশ ভরে;
দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
নিশায় সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে!
ঈশ্বরী পাটনী
৩৩
(ঈশ্বরী পাটনী।)
“সেই ঘাটে খেয়া দেয় ঈশ্বরী পাটনী।”
অন্নদামঙ্গল।
কে তোর তরিতে বসি, ঈশ্বরী পাটনি?
ছলিতে তোরে রে যদি কামিনী কমলে,—
কোথা করী, বাম করে ধরি যারে বলে,
উগরি, গ্রাসিল পুনঃ পূর্ব্বে সুবদনী?
রূপের খনিতে আর আছে কি রে মণি
এর সম? চেয়ে দেখ, পদ-ছায়া-ছলে,—
কনক কমল ফুল্ল এ নদীর জলে—
কোন্ দেবতারে পূজি, পেলি এ রমণী?
কাঠের সেঁউতি তোর, পদ-পরশনে
হইতেছে স্বর্ণময়। এ নব যুবতী—
নহে রে সামান্যা নারী, এই লাগে মনে;
বলে বেয়ে নদী-পারে যা রে শীঘ্রগতি।
মেগে নিস্, পার করে, বর-রূপ ধনে
দেখায়ে ভকতি, শোন্, এ মোর যুকতি!
উদ্যানে পুষ্করিণী
৬৩
(উদ্যানে পুষ্করিণী।)
বড় রম্য স্থলে বাস তোর, লো সরসি!
দগধা বসুধা যরে চৌদিকে প্রখরে
তপনের, পত্রময়ী শাখা ছত্র ধরে
শীতলিতে দেহ তোর; মৃদু শ্বাসে পশি,
সুগন্ধ পাখার রূপে, বায়ু বায়ু করে।
বাড়াতে বিরাম তোর আদরে, রূপসি,
শত শত পাতা মিলি মিষ্টে মরমরে;
স্বর্ণ-কান্তি ফুল ফুটি, তোর তটে বসি,
যোগায় সৌরভ-ভোগ, কিঙ্করী যেমতি
পাট-মহিষীর খাটে, শয়ন সদনে।
নিশায় বাসের রঙ্গ তোর, রসবতি,
লয়ে চাঁদে,—কত হাসি প্রেম-আলিঙ্গনে!
বৈতালিক-পদে তোর পিক-কুল-পতি;
ভ্রমর গায়ক; নীচে খঞ্জন, ললনে।
উর্ব্বশী
৫৮
(উর্ব্বশী।)
যথা তুষারের হিয়া, ধবল-শিখরে,
কভু নাহি গলে রবি-বিভাব-চুম্বনে
কামানলে; অবহেলি মন্মথের শরে
রথীন্দ্র, হেরিলা, জাগি, শয়ন-সদনে
(কনক-পুতলী যেন নিশার স্বপনে)
উর্ব্বশীরে। “কহ, দেবি, কহ এ কিঙ্করে,”—
সুধিলা সম্ভাষি শূর সুমধুর স্বরে,
“কি হেতু অকালে হেথা, মিনতি চরণে?”
উন্মদা মদন-মদে, কহিলা উর্ব্বশী;
“কামাতুরা আমি, নাথ, তোমার কিঙ্করী;
সরের সুকান্তি দেখি যথা পড়ে খসি
কৌমুদিনী তার কোলে, লও কোলে ধরি
দাসীরে; অধর দিয়া অধর পরশি,
যথা কৌমুদিনী কাঁপে, কাঁপি থরথরি।”
কবতক্ষ নদ
৩২
(কবতক্ষ-নদ।)
সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে।
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;
সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া-যন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!—
বহু-দেশে দেখিয়াছি বহু-নদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্ম-ভূমি-স্তনে।
আর কি হে হবে দেখা?—যত দিন যাবে,
প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে
বারি-রূপ কর তুমি; এ মিনতি, গাবে
বঙ্গজ-জনের কানে, সখে, সখা-রীতে
নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে
লইছে যে তব নাম বঙ্গের সঙ্গীতে!
কবি
১৪
(কবি।)
কে কবি— কবে কে মোরে? ঘটকালি করি,
শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন,
সেই কি সে যম-দমী? তার শিরোপরি
শোভে কি অক্ষয় শোভা যশের রতন?
সেই কবি মোর মতে, কল্পনা সুন্দরী
যার মনঃ-কমলেতে পাতেন আসন,
অস্তগামি-ভানু-প্রভা-সদৃশ বিতরি
ভাবের সংসারে তার সুবর্ণ-কিরণ।
আনন্দ, আক্ষেপ, ক্রোধ, যার আজ্ঞা মানে;
অরণ্যে কুসুম ফোটে যার ইচ্ছা-বলে;
নন্দন-কানন হতে যে সুজন আনে
পারিজাত কুসুমের রম্য পরিমলে;
মরুভূমে— তুষ্ট হয়ে যাহার ধেয়ানে
বহে জলবতী নদী মৃদু কলকলে!
কবিগুরু দান্তে
৮০
(কবিগুরুদান্তে।)
নিশান্তে সুবর্ণ-কান্তি নক্ষত্র যেমতি
(তপনের অনুচর) সুচারু কিরণে
খেদায় তিমির-পুঞ্জে; হে কবি, তেমতি
প্রভা তব বিনাশিল মানস-ভুবনে
অজ্ঞান! জনম তব পরম সুক্ষণে।
নব কবি-কুল-পিতা তুমি, মহামতি,
ব্রহ্মাণ্ডের এ সুখণ্ডে। তোমার সেবনে
পরিহরি নিদ্রা পুনঃ জাগিলা ভারতী।
দেবীর প্রসাদে তুমি পশিলা সাহসে
সে বিষম দ্বার দিয়া আঁধার নরকে,
যে বিষম দ্বার দিয়া, ত্যজি আশা, পশে
পাপ প্রাণ, তুমি, সাধু, পশিলা পুলকে।
যশের আকাশ হতে কভু কি হে খসে
এ নক্ষত্র? কোন্ কীট কাটে এ কোরকে?
কবিতা
১৭
(কবিতা।)
অন্ধ যে, কি রূপ কবে তার চক্ষে ধরে
নলিনী? রোধিলা বিধি কর্ণ-পথ যার,
লভে কি সে সুখ কভু বীণার সুস্বরে?
কি কাক, কি পিকধ্বনি,—সম-ভাব তার!
মনের উদ্যান-মাঝে, কুসুমের সার
কবিতা-কুসুম-রত্ন! —দয়া করি নরে,
কবি-মুখ-ব্রহ্ম-লোকে উরি অবতার
বাণীরূপে বীণাপাণি এ নর-নগরে। –
দুর্ম্মতি সে জন, যার মনঃ নাহি মজে
কবিতা-অমৃত-রসে! হায়, সে দুর্ম্মতি,
পুষ্পাঞ্জলি দিয়া সদা যে জন না ভজে
ও চরণপদ্ম, পদ্মবাসিনি ভারতি।
কর পরিমলময় এ হিয়া-সরোজে—
তুষি যেন বিজ্ঞে, মা গো, এ মোর মিনতি।
কবিবর আল্ফ্রেড টেনিসন্
৮২
(কবিবর আল্ফ্রেড্ টেনিসন্।)
কে বলে বসন্ত অশ্ত, তব কাব্য-বনে,
শ্বেতদ্বীপ? ওই শুন, বহে বায়ু-ভরে
সঙ্গীত-তরঙ্গ রঙ্গে! গায় পঞ্চ স্বরে
পিকেশ্বর, তুষি মনঃ সুধা-বরিষণে!
নীরব ও বীণা কবে, কোথা ত্রিভুবনে
বাগ্দেবি? অবাক্ কবে কল্লোল সাগরে?
তারারূপ হেম তার, সুনীল গগনে,
অনন্ত মধুর ধ্বনি নিরন্তর করে।
পূজক-বিহীন কভু হইতে কি পারে
সুন্দর মন্দির তব? পশ, কবিপতি,
(এ পরম পদ পুণ্য দিয়াছে তোমারে)
পুষ্পাঞ্জলি দিয়া পূজ করিয়া ভকতি৷
ষশঃ-ফুল-মালা তুমি পাবে পুরস্কারে।
ছুঁইতে শমন তোমা পাবে শকতি।
কবিবর ভিক্তর হ্যূগো
৮৩
(কবিবর ভিক্তর হ্যূগো।)
আপনার বীণা, কবি, তব পাণি-মূলে
দিয়াছেন বীণাপাণী, বাজাও হরষে!
পূর্ণ, হে যশস্বি, দেশ তোমার সুষশে,
গোকুল-কানন যথা প্রফুল্ল বকুলে
বসন্তে! অমৃত পান করি তব ফুলে
অলি-রূপ মনঃ মোর মত্ত গো সে রসে!
হে ভিতর, জয়ী তুমি এই মর-কুলে!
আসে যবে যম, তুমি হাসো হে সাহসে।
অক্ষয় বৃক্ষের রূপে তব নাম রবে
তব জন্ম-দেশ-বনে, কহিনু তোমারে;
(ভবিষ্যদ্বক্তা কবি সতত এ ভবে,
এ শক্তি ভারতী সতী প্রদানেন তারে)
প্রস্তরের স্তম্ভ যবে গল্যে মাটি হবে,
শৌভিবে আদরে তুমি মনের সংসারে!
কমলে কামিনী
(কমলে কামিনী।)
কমলে কামিনী আমি হেরিনু স্বপনে
কালিদহে। (বসি বামা শতদল-দলে
নিশীথে চন্দ্রিমা যথা সরসীর জলে
মনোহরা।) বাম করে সাপটি হেলনে
গজেশে, গ্রাসিছে তারে উগরি সঘনে।
গুঞ্জরিছে অলিপুঞ্জ অন্ধ পরিমলে,
বহিছে দহের বারি মৃদু কলকলে।—
কার না ভোলে রে মনঃ, এ হেন ছলনে!
কবিতা-পঙ্কজ-রবি, শ্রীকবিকঙ্কণ,
ধন্য তুমি বঙ্গভূমে! যশঃ-সুধাদানে
অমর করিলা তোমা অমরকারিণী
বাগ্দেবী। ভোগিলা দুখ জীবনে, ব্রাহ্মণ,
এবে কে না পূজে তোমা, মজি তব গানে?—
বঙ্গ-হৃদ-হ্রদে চণ্ডী কমলে কামিনী॥
করুণ-রস
৪৬
(করুণা-রস।)
সুন্দর নদের তীরে হেরিনু সুন্দরী
বামারে, মলিন-মুখী, শরদের শশী
রাহুর তরাসে যেন! সে বিরলে বসি,
হৃদে কাঁদে সুবদনা; ঝরঝরে ঝরি,
গলে অশ্রু-বিন্দু, যেন মুক্তা-ফল খসি।
সে নদের স্রোতঃ অশ্রু পরশন করি,
ভাসে, ফুল কমলের স্বর্ণকান্তি ধরি,
মধুলোভী মধুকরে মধুরসে রসি,
গন্ধামোদী গন্ধবহে সুগন্ধ প্রদানি।
না পারি বুঝিতে মায়া, চাহিনু চঞ্চলে
চৌদিকে; বিজন দেশ; হৈল দৈব-বাণী;—
“কবিতা-রসের স্রোতঃ এ নদের ছলে;
করুণা বামার নাম—রস-কুলে রাণী;
সেই ধন্য, বশ সতী যার তপোবলে!”
কল্পনা
৩৬
(কল্পনা।)
লও দাসে সঙ্গে রঙ্গে, হেমাঙ্গি কল্পনে,
বাগ্দেবীর প্রিয়সখি, এই ভিক্ষা করি;
হায় গতিহীন আমি দৈব-বিড়ম্বনে,—
নিকুঞ্জ-বিহারী পাখী পিঞ্জর-ভিতরি!
চল যাই মনানন্দে গোকুল-কাননে,
সরস বসন্তে যথা রাধাকান্ত হরি
নাচিছেন, গোপীচয়ে নাচায়ে; সঘনে
পূরি বেণুরবে দেশ! কিম্বা, শুভঙ্করি,
চল লো, আতঙ্কে যথা লঙ্কায় অকালে
পূজেন উমায় রাম, রঘুরাজ-পতি;
কিম্বা সে ভীষণ ক্ষেত্রে, যথা শরজালে
নাশিছেন ক্ষত্রকুলে পার্থ মহামতি।—
কি স্বরগে, কি মরতে, অতল পাতালে,
নাহি স্থল যথা, দেবি, নহে তব গতি!
কালিদাস
(কালিদাস।)
কবিতা-নিকুঞ্জে তুমি পিককুল-পতি।
কার গো না মজে মনঃ ও মধুর স্বরে?
শুনিয়াছি লোক-মুখে আপনি ভারতী,
সৃজি মায়াবলে সরঃ বনের ভিতরে,
নব নাগরীর বেশে তুষিলেন বরে
তোমায়; অমৃত রসে রসনা সিকতি,
আপনার স্বর্ণ বীণা অর্পিলা ও করে।—
সত্য কি হে এ কাহিনী, কহ, মহামতি?
মিথ্যা বা কি বল্যে বলি! শৈলেন্দ্র-সদনে,
লভি জন্ম মন্দাকিনী (আনন্দ জগতে!)
নাশেন কলুষ যথা এ তিন ভুবনে;
সঙ্গীত-তরঙ্গ তব উথলি ভারতে
(পুণ্যভূমি!) হে কবীন্দ্র, সুধা-বরিষণে,
দেশ-দেশান্তরে কর্ণ তোষে সেই মতে।
কাশীরাম দাস
(কাশীরাম দাস।)
চন্দ্রচূড়-জটাজালে আছিলা যেমতি
জাহ্নবী, ভারত-রস ঋষি দ্বৈপায়ন,
ঢালি সংস্কৃত-হ্রদে রাখিলা তেমতি;—
তৃষ্ণায় আকুল বঙ্গ করিত রোদন।
কঠোরে গঙ্গায় পূজি ভগীরথ ব্রতী,
(সুধন্য তাপস ভবে, নর-কুল-ধন!)
সগর-বংশের যথা সাধিলা মুকতি,
পবিত্রিলা আনি মায়ে, এ তিন ভুবন;
সেই রূপে ভাষা-পথ খননি স্ববলে,
ভারত-রসের স্রোতঃ আনিয়াছ তুমি
জুড়াতে গৌড়ের তৃষা সে বিমল জলে।
নারিবে শোধিতে ধার কভু গৌড়ভূমি।
মহাভারতের কথা অমৃত-সমান।
হে কাশি, কবীশদলে তুমি পুণ্যবান্॥
কিরাত-আর্জ্জুনীয়ম্
৪২
(করাত-আর্জ্জুনীয়ম্।)
ধর ধনুঃ সাবধানে পার্থ মহামতি।
সামান্য মেনো না মনে, ধাইছে যে জন
ক্রোধভরে তব পানে। ওই পশুপতি,
কিরাতের রূপে তোমা করিতে ছলন।
হুঙ্কারি আসিছে ছদ্মী মৃগরাজ-গতি,
হুঙ্কারি, হে মহাবাহু, দেহ তুমি রণ।
বীর-বীর্য্যে আশা-লতা কর ফলবতী—
বীরবীর্য্যে আশুতোষে তোষ, বীর-ধন!
করেছ কঠোর তপঃ এ গহন বনে;
কিন্তু, হে কৌন্তেয়, কহি, যাচিছ যে শর,
বীরতা-ব্যতীত, বীর, হেন অস্ত্র-ধনে
নারিবে লভিতে কভু,—দুর্ল্লভ এ বর!—
কি লাজ, অর্জ্জুন, কহ, হারিলে এ রণে?
মৃত্যুঞ্জয় রিপু তব, তুমি, রথি, নর!
কুরুক্ষেত্রে
৫৪
(কুরু-ক্ষেত্রে।)
যথা দাবানল বেড়ে অনল-প্রাচীরে
সিংহ- বৎসে। সপ্ত রথী বেড়িলা তেমতি
কুমারে। অনল-কণা-রূপে শর, শিরে
পড়ে পুঞ্জে পুঞ্জে পুড়ি, অনিবার-গতি।
সে কাল অনল-তেজে, সে বনে যেমতি
রোষে, ভয়ে সিংহ-শিশু গরজে অস্থিরে,
গরজিলা মহাবাহু চারি দিকে ফিরে
রোষে, ভয়ে। ধরি ঘন ধূমের মূরতি,
উড়িল চৌদিকে ধূলা, পদ-আস্ফালনে
অশ্বের। নিশ্বাস ছাড়ি আর্জ্জুনি বিষাদে,
ছাড়িলা জীবন-আশা তরুণ যৌবনে!
আধারি চৌদিক যথা রাহু গ্রামে চাঁদে
গ্রাসিলা বীরেশে যম। অন্তরে শয়নে
নিদ্রা গেলা অভিমন্যু অন্যায় বিবাদে।
কুসুমে কীট
২৪
(কুসুমে কীট।)
কি পাপে, কহ তা মোরে, লো বন-সুন্দরি,
কোমল হৃদয়ে তব পশিল,—কি পাপে—
এ বিষম যমদূত? কাঁদে মনে করি
পরাণ যাতনা তব; কত যে কি তাপে
পোড়ায় দুরন্ত তোমা, বিষদন্তে হরি
বিরাম দিবস নিশি! মৃদে কি বিলাপে
এ তোমার দুখ দেখি সখী মধুকরী,
উড়ি পড়ি তব গলে যবে লো সে কাঁপে?
বিষাদে মলয় কি লো, কহ, সুবদনে,
নিশ্বাসে তোমার ক্লেশে, যবে লো সে আসে
যাচিতে তোমার কাছে পরিমল-ধনে?
কানন-চন্দ্রিমা তুমি কেন রাহু-গ্রাসে?
মনস্তাপ-রূপে রিপু, হায়, পাপ-মনে,
এই রূপে, রূপবতি, নিত্য সুখ নাশে!
কৃত্তিবাস
(কৃত্তিবাস)
জনক জননী তব দিলা শুভ ক্ষণে
কৃত্তিবাস নাম তোমা!— কীর্ত্তির বসতি
সতত তোমার নামে সুবঙ্গ-ভবনে,
কোকিলের কণ্ঠে যথা স্বর, কবিপতি,
নয়নরঞ্জন-রূপ কুসুম-যৌবনে,
রশ্মি মাণিকের দেহে। আপনি ভারতী,
বুঝি কয়ে দিলা নাম নিশার স্বপনে,
পূর্ব্ব-জনমের তব স্মরি হে ভকতি!
পবন-নন্দন হনু, লঙ্ঘি ভীমবলে
সাগর, ঢালিলা যথা রাঘবের কানে
সীতার বারতা-রূপ সঙ্গীত-লহরী;—
তেমতি, যশস্বি, তুমি সুবঙ্গ-মণ্ডলে
গাও গো রামের নাম সুমধুর তানে,
কবি-পিতা বাল্মীকিকে তপে তুষ্ট করি!
কেউটিয়া সাপ
৬৫
(কেউটিয়া সাপ।)
বিষাগার শিরঃ হেরি মণ্ডিত কমলে
তোর, যম-দূত, জন্মে বিস্ময় এ মনে!
কোথায় পাইলি তুই,—কোন্ পুণ্য-বলে—
সাজাতে কুচূড়া তোর্, হেন সুভূষণে?
বড়ই অহিত-কারী তুই এ ভবনে।
জীব-বংশ-ধ্বংস-রূপে সংসার-মণ্ডলে
সৃষ্টি তোর। ছটফটি, কে না জানে, জ্বলে
শরীর, বিষাগ্নি যবে জ্বালাস্ দংশনে?—
কিন্তু তোর্ অপেক্ষা রে, দেখাইতে পারি,
তীক্ষ্ণতর বিষধর অরি নর-কুলে!
তোর সম বাহ্য-রূপে অতি মনোহারী,—
তোর সম শিরঃ-শোভা রূপ-পদ্ম-ফুলে।
কে সে? কবে কবি, শোন্! সে রে সেই নারী,
যৌবনের মদে যে রে ধর্ম্ম-পথ ভুলে!
কোজাগর-লক্ষ্মীপূজা
৫০
(কোজাগর-লক্ষ্মীপূজা।)
শোভ নভে, নিশাপতি, এবে হে বিমলে!—
হেমাঙ্গি রোহিণি, তুমি, অঙ্গ-ভঙ্গি করি,
হুলাহুলি দিয়া নাচ, তারা সঙ্গী-দলে!—
জান না কি কোন্ ব্রতে, লো সুর-সুন্দরি,
রত ও নিশায় বঙ্গ? পূজে কুতূহলে
রমায় শ্যামাঙ্গী এবে, নিদ্রা পরিহরি;
বাজে শাঁখ, মিলে ধূপ ফুল-পরিমলে।
ধন্য তিথি ও পূর্ণিমা, ধন্য বিভাবরী!
হৃদয়-মন্দিরে, দেবি, বন্দি এ প্রবাসে
এ দাস, এ ভিক্ষা আজি মাগে রাঙা পদে,—
থাক রঙ্গ-গৃহে, যথা মানসে, মা, হাসে
চিররুচি কোকনদ; বাসে কোকনদে
সুগন্ধ; সুরত্নে জ্যোৎস্না; সুতারা আকাশে;
শুক্তির উদরে মুক্তা; মুক্তি গঙ্গা-হ্রদে!
কোন এক পুস্তকের ভূমিকা পড়িয়া
৯৪
(কোন এক পুস্তকের ভূমিকা পড়িয়া।)
চাঁড়ালের হাত দিয়া পোড়াও পুস্তকে!
করি তস্মরাশি ফেল, কর্ম্মনাশা-জলে!—
সুভাবের উভযুক্ত বসন যে বলে
নার বুনিবারে, ভাষা! কুখ্যাতি-নরকে
যম-সম পারি তারে ডুবাতে পুলকে,
হাতী-সম গুঁড়া করি হাড় পদতলে!
কত যে ঐশ্বর্য্য তব এ ভব-মণ্ডলে,
সেই জানে, বাণীপদ ধরে যে মস্তকে!
কামার্ত্ত দানব যদি অপ্সরীরে সাধে,
ঘৃণায় ঘুরায়ে মুখ হাত দে সে কানে;
কিন্তু দেবপুত্র যবে প্রেম-ডোরে বাঁধে
মনঃ তার, প্রেম-সুধা হরষে সে দানে।
দূর করি নন্দঘোষে, ভজ শ্যামে, রাধে,
ও বেটা নিকটে এলে ঢাকো মুখ মানে।
গদা-যুদ্ধ
৫২
(গদা-যুদ্ধ।)
দুই মত্ত হস্তী যথা ঊর্দ্ধ শুণ্ড করি,
রকত-বরণ আঁখি, গরজে সঘনে,—
ঘুরায়ে ভীষণ গদা শূন্যে, কাল রণে,
গরজিলা দুর্য্যোধন, গরজিলা অরি
ভীমসেন। ধূলা-রাশি, চরণ-তাড়নে
উড়িল; অধীরে ধরা পর পর ধরি
কাঁপিলা;— টলিল গিরি সে ঘন কম্পনে;
উথলিল দ্বৈপায়নে জলের লহরী,
ঝড়ে যেন! যথা মেঘ, বজ্রানলে ভরা,
বজ্রানলে ভরা মেঘে আঘাতিলে বলে,
উজলি চৌদিক তেজে, বহিরায় ত্বরা
বিজলী; গদায় গদা লাগি রণ-স্থলে,
উগরিল অগ্নি-কণা দরশন হরা!
আতঙ্কে বিহঙ্গ-দল পড়িল ভূতলে॥
গোগৃহ-রণে
৫৩
(গোগৃহ-রণে।)
হুহুঙ্কারি টঙ্কারিল৷ ধনুঃ ধনুর্দ্ধারী
ধনঞ্জয়, মৃত্যুঞ্জয় প্রলয়ে যেমতি!
চৌদিকে ঘেরিল বীরে রথ সারি সারি,
স্থির বিজলীর তেজঃ, বিজলীর গতি!——
শর-জালে শূর-ব্রজে সহজে সংহারি
শূরেন্দ্র, শোভিলা পুনঃ যথা দিনপতি,
প্রখর কিরণে মেঘে খ-মুখে নিবারি,
শোভেন অম্লানে নভে। উত্তরের প্রতি
কহিলা আনন্দে বলী;—“চালাও স্যন্দনে,
বিরাট-নন্দন, দ্রুতে, যথা সৈন্য-দলে
লুকাইছে দুর্য্যোধন হেরি মোরে রণে,
তেজস্বী মৈনাক যথা সাগরের জলে
বজ্রাগ্নির কাল তেজে ভয় পেয়ে মনে।—
দণ্ডিব প্রচণ্ডে দুষ্টে গাণ্ডীবের বলে।”
ছায়াপথ
২৩
(ছায়া-পথ।)
কহ মোরে, শশিপ্রিয়ে, কহ, কৃপা করি,
কার হেতু নিত্য তুমি সাজাও গগনে,
এ পথ,—উজ্জ্বল কোটি মণির কিরণে?
এ সুপথ দিয়া কি গো ইন্দ্রাণী সুন্দরী;
আনন্দে ভেটিতে যান নন্দন-সদনে
মহেন্দ্রে,—সঙ্গেতে শত বরাঙ্গী অপ্সরী,
মলিনি ক্ষণেক কাল চারু তারা-গণে—
সৌন্দর্য্যে?—এ কথা দাসে কহ, বিভাবরি।
রাণী তুমি; নীচ আমি; তেঁই ভয় করে,
অনুচিত বিবেচনা পার করিবারে
আলাপ আমার সাথে; পবন-কিঙ্করে,—
ফুল-কুল সহ কথা কহ দিয়া যারে,
দেও কয়ে; কহিবে সে কানে, মৃদু স্বরে,
যা কিছু ইচ্ছহ, দেবি, কহিতে আমারে!
জয়দেব
(জয়দেব।)
চল যাই, জয়দেব, গোকুল-ভবনে
তব সঙ্গে, যথা রঙ্গে তমালের তলে
শিখীপুচ্ছ-চূড়া শিরে, পীতধড়া গলে
নাচে শ্যাম, বামে রাধা— সৌদামিনী ঘনে!
না পাই যাদবে যদি, তুমি কুতূহলে
পূরিও নিকুঞ্জরাজী বেণুর স্বননে।
ভুলিবে গোকুল-কুল এ তোমার ছলে,—
নাচিবে শিখিনী সুখে, গাবে পিকগণে,—
বহিবে সমীর ধীরে সুস্বর-লহরী,—
মৃদুতর কলকলে কালিন্দী আপনি
চলিবে। আনন্দে শুনি সে মধুর ধ্বনি,
ধৈরজ ধরি কি রবে ব্রজের সুন্দরী?
মাধবের রব, কবি, ও তব বদনে,
কে আছে ভারতে ভক্ত নাহি ভাবে মনে?
তারা
৭৮
(তারা।)
নিত্য তোমা হেরি প্রাতে ওই গিরি-শিরে
কি হেতু, কহ তা মোরে, সূচারু-হাসিনি?
নিত্য অবগাহি দেহ শিশিরের নীরে,
দেও দেখা, হৈমবতি, থাকিতে যামিনী।
বহে কলকল রবে স্বচ্ছ প্রবাহিনী
গিরি-তলে; সে দর্পণে নিরখিতে ধীরে
ও মুখের আভা কি লো, আইস, কামিনি,
কুসুম-শয়ন থুয়ে সুবর্ণ মন্দিরে?—
কিম্বা, দেহ কারাগার তেয়াগি ভূতলে,
স্নেহ-কারী জন-প্রাণ তুমি দেব-পুরে,
ভাল বাসি এ দাসেরে, আইস এ ছলে
হৃদয় আঁধার তার খেদাইতে দূরে?
সত্য যদি, নিত্য তবে শোভ নভস্তলে,
জুড়াও এ আঁখি দুটী নিত্য নিত্য ঊরে॥
তিলোত্তমা-সম্ভব
তিলোত্তমা-সম্ভব।
প্রথম সর্গ।
ধবল নামেতে খ্যাত হিমাদ্রির শিরে
দেবাত্মা, ভীষণ-মূর্ত্তি, অভ্র-ভেদী গিরি
অটল, ধবল-কায়; ব্যোমকেশ যেন
ঊর্দ্ধবাহু শুভ্র-বেশে, মজি চিরযোগে,
যোগী-কুলে পূজ্য যোগী!—কি নিকুঞ্জ-রাজী ৫
কি তরু, কি লতা, কিবা ফল-ফুলাবলী,
আর আর শৈল-শিরে শোভে যা, মুঞ্জরি
মরকত-ময় স্বর্ণ-কিরীটের রূপে;
না পরেন অচলেন্দ্র অবহেলি সবে,
বিমুখ ভবের সুখে ভব-ইন্দ্র যেন ১০
জিতেন্দ্রিয়! সুনাদিনী বিহঙ্গিনী যত,
বিহঙ্গম সু-নিনাদী, অলি মধু-লোভী,
কভু নাহি ভ্রমে তথা; সিংহ—বনরাজা,—
বন-লণ্ডভণ্ড-কারী শুণ্ডধর করী,—
গণ্ডার, শার্দ্দূল, কপি, বন-বাসী পশু,— ১৫
সুলোচনা কুরঙ্গিণী, বন-কমলিনী,—
ফণিনী কুন্তলে মণি, ফণী বিষ-ভরা,
না যার নিকটে তাঁর—বিকট-শেখরী!
সতত, তিমিরময়, গভীর গহ্বরে,
কোলাহলে জল-দল মহা কোলাহলে,২০
ভোগবতী স্রোতস্বতী পাতালে যেমতি
কল্লোলিনী! বহে বায়ু ভৈরব আরবে,
মহা কোপে লয়-রূপে, পূর্ণ তমোগুণে,
নিশ্বাস ছাড়েন যেন সর্ব্ব-নাশ-কারী!
কি দানব, কি মানব, যক্ষ, রক্ষঃ, বলী,২৫
কি দানবী, কি মানবী, কিবা নিশাচরী,
সকলেরি অগম্য—দুর্গম দুর্গ যেন!
দিবা নিশি মেঘ-রাশি উড়ে চারি দিকে,
ভূতেশের সঙ্গে ভূত নাচে রঙ্গে যেন।
এ হেন বিজন স্থানে দেব-কুল-পতি ৩০
বাসব, বসিয়া কেন একাকী, তা কহ,
পঙ্কজ-বাসিনি দেবি, এ তর কিঙ্করে?
সুরাসুর সহ অহি অনন্ত, যে বলে
আনন্দে মন্দরে বাঁধি, সিন্ধুরে মথিলা
অমৃত-রসের আশে, সেই বল-সম ৩৫
যাচি কৃপা, কর দয়া আজি অকিঞ্চনে,
বাগ্দেবি! যতনে মথি বাক্যের সাগরে,
কবিতার সুধা যেন পাই তব বলে!
কর দয়া অভাজনে, বিশ্ব-বিমোহিনি!
অসীম মহিমা তব, হায়, দীন আমি,— ৪০
কিন্তু যে চন্দ্রের বাস চন্দ্রচূড়-চূড়ে,
জননি, শিশির-বিন্দু ক্ষুদ্র ফুল-দলে
লভে না কি আভা কভু তাঁর শোভা হতে?
কোথা সে ত্রিদিব, যার ভোগ লভিবারে,
কঠোর তপস্যা নর করে যুগে যুগে, ৪৫
কত শত নরপতি রত অশ্বমেধে,
সগর রাজার বংশ ধ্বংস, মা, যে লোভে?
কোথা সে অমরাবতী—পূর্ণ চির-সুখে?
কোথা বৈজয়ন্ত-ধাম, রত্নময়ী পুরী,
মলিন প্রভায় যার প্রভাকর ভানু?৫০
কোথায় সে রাজ-ছত্র, রাজাসন কোথা,
রবি-পরিধির আভা মেরু-শৈলোপরি!
কোথায় নন্দন বন, বসন্ত যে বনে
বিরাজেন নিত্য সুখে? পারিজাত কোথা,
অক্ষয়-লাবণ্য ফুল? ঋষি-মনোহরা ৫৫
কোথা সে উর্ব্বশী, কহ? কোথা চিত্রলেখা,
জগত-জনের চিত্তে লেখা বিধুমুখী?
অলকা, তিলকা, রম্ভা, ভুবন-মোহিনী?
মিশ্রকেশী, যার চারু কেশ দিয়া গড়ি
নিগড়, বাঁধেন কাম স্বর্গ-বাসী-জনে? ৬০
কোথায় কিন্নর, কোথা বিদ্যাধর যত?
গন্ধর্ব্ব, মদন-গর্ব্ব খর্ব্ব যার রূপে,—
গন্ধর্ব্ব-কুলের রাজা চিত্ররথ রথী,
কামিনীর মনোরথ, নিত্য অরি-দমী
দৈত্য-রণে? কোথা, মা, সে ভীষণ অশনি, ৬৫
যার দ্রুত ইরম্মদে, গম্ভীর গর্জ্জনে,
দেব-কলেবর কাঁপে থর থর করি,
ভূধর অধীর ভয়ে, ভুবন চমকে
অতিঙ্কে? কোথা সে ধনুঃ, ধনুঃ-কুল-মণি
আভাময়, যার চারু রত্ন-কান্তি-ছটা ৭০
নব নীরদের শিরে ধরে শোভা, যথা
শিখির পুচ্ছের চূড়া রাখালের শিরে?
কোথায় পুষ্কর, কোথা আবর্ত্তক, দেবি,
ঘনেশ্বর? কোথা, কহ, সারথি মাতলি?
কোথা সে সুবর্ণ রথ, মনোরথ-গতি, ৭৫
যার স্থিরপ্রভা দেখি ক্ষণ-প্রভা লাজে
অস্থিরা, লুকায় মুখ, ক্ষণ দিয়া দেখা,
(কাদম্বিনী স্বজনীর গলা ধরি কাদি)
অম্বরে? কোথায় আজি ঐরাবত বলী,
গজেন্দ্র? কোথায় হয় উচ্চৈঃশ্রবা, কহ, ৮০
হয়েশ্বর, আশুগতি যথা আশুগতি?
কোথায় পৌলোমী সতী অনন্ত-যৌবনা,
দেবেন্দ্র-হৃদয়-সরে প্রফুল্ল নলিনী,
ত্রিদিব-লোচনানন্দ, আয়ত-লোচনা
রূপসী? কোথায় এবে স্বর্গ-কল্পতরু, ৮৫
কামদা বিধাতা যথা, যে তরুর পদে
আনন্দে নন্দন-বনে দেবী মন্দাকিনী
বহেন, বিমল-আভা, কল কল রবে?
কোথা মূর্ত্তিমান রাগ, ছত্রিশ রাগিণী
মূর্ত্তিমতী—নিত্য যারা সেবিত দেবেশে? ৯০
সে দেব-বিভব সব কোথা, কহ, এবে,
কোথা সে দেব-মহিমা,—দেবি রীণাপাণি?
দুরন্ত দানব-দ্বয়, দৈব-বলে বলী,
বিমুখি সমুখ রণে দেব দেব-রাজে,
পূরি দেবরাজ-পুরী ঘোর কোলাহলে, ৯৫
লুটি দেবরাজ-পুর-বৈভব, বিনাশি
(দ্বেষ-বিষে জ্বলি) হায়, দেব-রাজ-পুরে
সে পুরের অলঙ্কার, অহঙ্কারে আজি
বসিয়াছে রাজাসনে দেব-রাজ-ধামে
পামর! যেমতি শ্বাস রুদ্রের, প্রলয়ে ১০০
বাতময়, উথলিলে জল-সমাকুলে,
প্রবল তরঙ্গ-দল, অবহেলি রোধে,
ধরার কবরী হতে ছিঁড়ি লয় কাড়ি
সুবর্ণ কুসুম-দাম; যে সুন্দর বপুঃ
আনন্দে মদন- সখা সাজান আপনি ১০৫
দিয়া নানা ফুল-সাজ; সে সুন্দর বপুঃ
ফুল-সাজ-শূন্য বন্যা করে অনাদরে,—
গম্ভীর হুঙ্কারে পশে রম্য বন-স্থলে!
দ্বাদশ বৎসর যুঝি দিতিজারি যত,
দুর্জ্জয় দিতিজ-ভুজ প্রতাপে তাপিয়া ১১০
(হীন-বল দৈব-বলে) ভঙ্গ দিলা রণে
আতঙ্কে। দাবাগ্নি যথা, সঙ্গে সখা বায়ু,
হুহুঙ্কারে প্রবেশিলে গহন কাননে,
হেরি ভীম শিখা-পুঞ্জে ধূম-পুঞ্জ মাঝে,
চণ্ড মুণ্ড-মালিনীর লোল জিহ্বা যেন ১১৫
(রক্ত-বীজ-কুল-কাল!) আক্ত রক্ত-রসে;
পরমাদ গণি মনে পলায় কেশরী
মৃগেন্দ্র; করীন্দ্র-বৃন্দ পলায় তরাসে
ঊর্দ্ধশ্বাস; মৃগাদল ধায় বায়ু-বেগে;
কুরঙ্গ সুশৃঙ্গধর, ভুজঙ্গ চৌদিকে ১২০
পলায়; পলায় শূন্যে বিহঙ্গম উড়ি;
পলায় মহিষ-দল, রোষে রাঙা আঁখি,
কোলাহলে পূরি দেশ ক্ষিতি টলমলি
পলায় গণ্ডার, বন লণ্ডভণ্ড করি
পলায়নে; ধায় বাঘ; ধায় প্রাণ লয়ে ১২৫
ভল্লূক বিকটাকার; আর পশু যত
বলবন্ত, কিন্তু ভয়ে বলশূন্য এবে;—
অব্যর্থ কুলিশে ব্যর্থ হেরি সে সমরে,
পলাইলা পরিহরি সমর কুলিশী
পুরন্দর; পলাইলা জল-দল-পতি ১৩০
পাশী, সর্ব্বনাশী পাশে হেরি (দৈব-বলে)
ম্রিয়মাণ, মহোরগ যেন মন্ত্র-তেজে!
পলাইলা ঝড়াকারে বায়ু-কুল-পতি;
পলাইলা শিখী-পৃষ্ঠে শিখীধ্বজ রথী
সেনানী; মহিষাসনে সর্ব্ব-অন্ত-কারী ১৩৫
কতান্ত, কৃতান্ত-দূতে হেরিলে যেমতি
সহসা, পলায় প্রাণী প্রাণ বাঁচাইতে!
পলাইলা গদাধারী অলকার পতি,
ব্যর্থ গদা হাতে, হায়, দুর্য্যোধন যথা
মিত্র ক্ষত্র-শূন্য দেখি কুরুক্ষেত্রে, গেলা ১৪০
(বিষাদে নিশ্বাসি ঘন!) জলাশয় পানে,
একাকী, সহায়-হীন!— পলাইলা এবে
দেবগণ, রণভূমি ত্যজি অভিমানে;
পূরিল জগত দৈত্য জয় জয় নাদে,
বসিল দেবারি দুষ্ট দেব-রাজাসনে, ১৪৫
হর-কোপানল যেন, মদনে দহিয়া,
বিরহ-অনল-রূপে, ভৈরবে বেড়িল
রতির কোমল হিয়া, হায়, পোড়াইতে
সে হিয়া, কেন না রতি স্থাপি সে মন্দিরে
নিত্যানন্দ মদনের মুরতি, সুন্দরী ১৫০
পূজেন আদরে, প্রেম-ফুলাঞ্জলি দিয়া!
সুন্দ উপসুন্দাসুর, দ্বন্দ্বি সুর সহ
লণ্ড ভণ্ড করিল অখিল ভূমণ্ডলে।
ইত্যাদি—
দুঃশাসন
৬০
(দুঃশাসন।)
মেঘ-রূপ চাপ ছাড়ি, বজ্রাগ্নি যেমনে
পড়ে পাহাড়ের শৃঙ্গে ভীষণ নির্ঘোষে;
হেরি ক্ষেত্রে ক্ষত্র-গ্লানি দুষ্ট দুঃশাসনে,
রৌদ্ররূপী ভীমসেন ধাইলা সরোষে;—
পদাঘাতে বসুমতী কাঁপিলা সঘনে;
বাজিল ঊরুতে অসি গুরু অসি-কোষে।
যথা সিংহ সিংহনাদে ধরি মৃগে বনে
কামড়ি প্রগাঢ়ে ঘাড় লহু-ধারা শোষে;
বিদরি হৃদয় তার ভৈরব-আরবে,
পান করি রক্ত-স্রোতঃ গর্জ্জিলা পাবনি।
“মনাগ্নি নিবানু আমি আজি এ আহবে
বর্ব্বর!—পাঞ্চালী সতী, পাণ্ডব-রমণী,
তার কেশপাশ পর্শি, আকর্ষিলি যবে,
কুরু-কুলে রাজলক্ষ্মী ত্যজিলা তখনি।”
দেব-দোল
১৫
(দেব-দোল।)
ওই যে শুনিছ ধ্বনি ও নিকুঞ্জ-বনে,
ভেবো না গুঞ্জরে অলি চুম্বি ফুলাধরে;
ভেবো না গাইছে পিক কল কুহরণে,
তুষিতে প্রত্যুষে আজি ঋতু-রাজেশ্বরে!
দেখ, মীলি, ভক্তজন, ভক্তির নয়নে,
অধোগামী দেব-গ্রাম উজ্জ্বল-অম্বরে,—
আসিছেন সবে হেথা—এই দোলাসনে—
পূজিতে রাখালরাজ—রাধা-মনোহরে!
স্বৰ্গীয় বাজনা ওই! পিককুল কবে,
কবে বা মধুপ, করে হেন মধু-ধ্বনি?
কিন্নরের বীণা-তান অপ্সরার রবে!
আনন্দে কুসুম-সাজ ধরেন ধরণী,—
নন্দন-কানন-জাত পরিমল ভবে
বিতরেন বায়ু-ইন্দ্র পবন আপনি!
দ্বেষ
৬৭
(দ্বেষ।)
শত ধিক্ সে মনেরে, কাতর যে মনঃ
পরের সুখেতে সদা এ ভব-ভবনে!
মোর মতে নর-কুলে কলঙ্ক সে জন
পোড়ে আঁখি যার যেন বিষ-বরিষণে,
বিকশে কুসুম যদি, গায় পিক-গণে
বাসন্ত আমোদে পূরি ভাগ্যের কানন
পরের! কি গুণ দেখে, কব তা কেমনে,
প্রসাদ তোমার, রমা, কর বিতরণ
তুমি? কিন্তু এ প্রসাদ, নমি ষোড় করে
মাগি রাঙা পায়ে, দেবি; দ্বেষের অনলে
(সে মহা নরক ভবে!) সুখী দেখি পরে,
দাসের পরাণ যেন কভু নাহি জ্বলে,
যদিও না পাত তুমি তার ক্ষুদ্র ঘরে
রত্ন-সিংহাসন, মা গো, কুভাগ্যের বলে!
নদীতীরে প্রাচীন দ্বাদশ শিবমন্দির
৪০
(নদী-তীরে প্রাচীন দ্বাদশ শিব-মন্দির।)
এ মন্দির-বৃন্দ হেথা কে নির্ম্মিল কবে?
কোন্ জন? কোন্ কালেম জিজ্ঞাসিব কারে?
কহ মোরে, কহ, তুমি কলকল রবে,
ভুলে যদি, কল্লোলিনি, না থাক লো তারে!
এ দেউল-বৰ্গ গাঁথি উৎসর্গিল যবে
সে জন, ভাবিল কি সে, মাতি অহঙ্কারে,
থাকিবে এ কীর্ত্তি তার চিরদিন ভবে,
দীপরূপে আলো করি বিস্মৃতি-আঁধারে?
বৃথা ভাব, প্রবাহিণি, দেখ ভাবি মনে।
কি আছে লো চিরস্থায়ী এ ভবমণ্ডলে?
গুঁড়া হয়ে উড়ি যায় কালের পীড়নে
পাথর; হুতাশে তার কি ধাতু না গলে?—
কোথা সে? কোথা বা নাম? ধন? লো ললনে?
হায়, গত, যথা বিশ্ব তব চল জলে!
নন্দনকানন
৩০
(নন্দনকানন।)
লও দাসে, হে ভারতি, নন্দন-কাননে,
যথা ফোটে পারিজাত; যথায় উর্ব্বশী,—
কামের আকাশে বামা চির-পূর্ণ-শশী,—
নাচে করতালি দিয়া বীণার স্বননে;
যথা রম্ভা, তিলোত্তমা, অলকা রূপসী
মোহে মনঃ সুমধুর স্বর বরিষণে,—
মন্দাকিনী বাহিনীর স্বর্ণ তীরে বসি,
মিশায়ে সু-কণ্ঠ-রব বীচীর বচনে!
যথায় শিশিরের বিন্দু ফুল্লফুল-দলে।
সদা সদ্যঃ; যথা অলি সতত গুঞ্জরে;
বহে যথা সমীরণ বহি পরিমলে;
বসি যথা শাখা-মুখে কোকিল কুহরে;
লও দাসে; আঁখি দিয়া দেখি তব বলে
ভাব-পটে কল্পনা যা সদা চিত্র করে।
নিশা
২১
(নিশা।)
বসন্তে কুসুম-কুল যথা বনস্থলে,
চেয়ে দেখ, তারাচয় ফুটিছে গগনে,
মৃগাক্ষি!— সুহাস-মুখে সরসীর জলে,
চন্দ্রিমা করিছে কেলি প্রেমানন্দ-মনে।
কত যে কি কহিতেছে মধুর স্বননে
পবন— বনের কবি, ফুল্ল ফুল-দলে,
বুঝিতে কি পার, প্রিয়ে? নারিবে কেমনে,
প্রেম-ফুলেশ্বরী তুমি প্রমদা-মণ্ডলে?
এ হৃদয়, দেখ, এবে ওই সরোবরে,—
চন্দ্রিমার রূপে এতে তোমার মূরতি।
কাল বলি অবহেলা, প্রেয়সি, যে করে
নিশায়, আমার মতে সে বড় দুর্ম্মতি।
হেন সুবাসিত শ্বাস, হাস স্নিগ্ধ করে
যার, সে কি কভু মন্দ, ওলো রসবতি?
নিশাকালে নদীতীরে বটবৃক্ষ তলে শিবমন্দির
২২
(নিশাকালে নদী-তীরে বটবৃক্ষতলে শিব-মন্দির।)
রাজসূয়-যজ্ঞে যথা রাজাদল চলে
রতন-মুকুট শিরে; আসিছে সঘনে
অগণ্য জোনাকীব্রজ এই তরুতলে
পূজিতে রজনী-যোগে বৃষভ-বাহনে।
ধূপরূপ পরিমল অদূর কাননে
পেয়ে, বহিতেছে তাহে হেথা কুতূহলে
মলয়; কৌমুদী, দেখ, রজত-চরণে
বীচী-রব-রূপ পরি নূপুর, চঞ্চলে
নাচিছে; আশ্চর্য্য-রূপ এই তরু-পতি
উচ্চারিছে বীজমন্ত্র। নীরবে অম্বরে,
তারাদলে তারানাথ করেন প্রণতি
(বোধ হয়) আরাধিয়া দেবেশ শঙ্করে!
তুমিও, লো কল্লোলিনি, মহাব্রতে ব্রতী,—
সাজায়েছ, দিব্য সাজে, বর কলেবরে।
নীতিগর্ব্ভ কাব্য
নীতিগর্ভ কাব্য ।
(ময়ূর ও গৌরী।)
ময়ূর কহিল কাদি গৌরীর চরণে,
কৈলাস-ভবনে;—
“অবধান কর দেবি,
আমি ভৃত্য নিত্য সেবি
প্রিয়োত্তম সূতে তর এ পৃষ্ঠ-আসনে।
রথী যথা দ্রুত রথে,
চলেন পবন-পথে
দাসের এ পিঠে চড়ি সেনানী সুমতি;
তবু, মাগো, আমি দুখী অতি!
করি যদি কেকা-ধ্বনি,
ঘৃণায় হাসে অমনি
খেচর, ভুচর জন্তু;—মরি, মা, শরমে!
ডালে মূঢ় পিক যবে
গায় গীত, তার রবে
মাতিয়া জগৎ-জন বাখানে অধমে!
বিবিধ কুসুম কেশে,
সাজি মনোহর বেশে,
বরেন বসুধা দেবী যবে ঋতুবরে
কোকিল মঙ্গল-ধ্বনি করে।
অহরহ কুহুধ্বনি বাজে বনস্থলে;
নীরবে থাকি, মা, আমি; রাগে হিয়া জ্বলে!
ঘুচাও কলঙ্ক শুভঙ্করি,
পুত্ত্রের কিঙ্কর আমি এ মিনতি করি,
পা দুখানি ধরি। ”
উত্তর করিলা গৌরী সুমধুর স্বরে;—
“পুত্ত্রের বাহন তুমি খ্যাত চরাচরে,
এ আক্ষেপ কর কি কারণে?
হে বিহঙ্গ, অঙ্গ-কান্তি ভাবি দেখ মনে!
চন্দ্রককলাপে দেখ নিজ পুচ্ছ-দেশে;
রাখাল রাজার সম চুড়াখানি কেশে!
আখণ্ডল-ধনুর বরণে
মণ্ডিলা সু-পুচ্ছ ধাতা তোমার সৃজনে!
সদা জ্বলে তব গলে
স্বর্ণ হার ঝল ঝলে,
যাও, বাছা, নাচ গিয়া ঘনের গর্জ্জনে,
হরষে সু-পুচ্ছ খুলি
শিরে স্বর্ণ-চূড়া তুলি;
করগে কেলি ব্রজ-কুঞ্জ-বনে।
করতালি ব্রজাঙ্গনা
দেবে রঙ্গে বরাঙ্গনা —
তোষ গিয়া ময়ূরীরে প্রেম-আলিঙ্গনে!
শুন বাছা, মোর কথা শুন,
দিয়াছেন কোন কোন গুণ,
দেব সনাতন প্রতি-জনে;
সু-কলে কোকিল গায়,
বাজ বজ্র-গতি ধায়,
অপরূপ রূপ তব, খেদ কি কারণে?”—
নিজ অবস্থায় সদা স্থির যার মন,
তার হতে সুখীতর অন্য কোন জন?
(কাক ও শৃগালী।)
একটি সন্দেশ চুরি করি,
উড়িয়া বসিলা বৃক্ষোপরি,
কাক, হৃষ্ট-মনে;
সুখাদ্যের বাস পেয়ে,
আইল শৃগালী ধেয়ে
দেখি কাকে কহে দুষ্টা মধুর বচনে;—
“অপরূপ রূপ তব, মরি!
তুমি কি গো ব্রজের শ্রীহরি,—
গোপিনীর মনোবাঞ্ছা?—কহ গুণমনি!
হে নব নীরদ-কান্তি,
ঘুচাও দাসীর ভ্রান্তি,
যুড়াও এ কান দুটি করি বেণু-ধ্বনি!
পুণ্যবতী গোপ-বধূ অতি!
তেঁই তারে দিলা বিধি,
তব সম রূপ-নিধি—
মোহ হে মদনে তুমি; কি ছার যুবতী?
গাও গীত, গাও, সখে করি এ মিনতি!
কুড়াইয়া কুসুম-রতনে,
গাঁথি মালা সুচারু গাঁথনে,
দোলাইয়া দিব তব * * * *
দাসীর সাধনে * *
বাজাও মধুর * *
বাস-বসে মাতি * * * * *
মজিল * * *
মুখ খুলি * * *
* * * খে মু * * *
* * * গীত আ * * *
(রসাল ও স্বর্ণ-লতিকা।)
রসাল কহিল উচ্চে স্বর্ণ লতিকারে;—
“শুন মোর কথা, ধনি, নিন্দ বিধাতারে!
নিদারুণ তিনি অতি;
নাহি দয়া তব প্রতি;
তেঁই ক্ষুদ্র-কায়া করি সৃজিলা তোমারে!
মলয় বহিলে, হায়,
নতশিরা তুমি তায়,
মধুকর-ভরে তুমি পড় লো ঢলিয়া;
হিমাদ্রি সদৃশ আমি,
বন-বৃক্ষ-কুল-স্বামী,
মেঘলোকে উঠে শির আকাশ ভেদিয়া!
কালাগ্নির মত তপ্ত তপন তাপন,—
আমি কি লো ডরাই কখন?
দূরে রাখি গাভী-দলে,
রাখাল আমার তলে
বিরাম লভয়ে অনুক্ষণ,—
শুন, ধনি, রাজ-কাজ দরিদ্র পালন!
আমার প্রসাদ ভুঞ্জে পথ-গামী জন।
কেহ অন্ন রাঁধি খায়
কেহ পড়ি নিদ্রা যায়
এ রাজ-চরণে।
শীতলিয়া মোর ডরে
সদা আসি সেবা করে
মোর অতিথির হেথা আপনি পবন!
মধু-মাখা ফল মোর বিখ্যাত ভুবনে!
তুমি কি তা জাননা, ললনে?
দেখ মোর ডাল-রাশি,
কত পাখী বাঁধে আসি
বাসা এ আগারে!
ধন্য মোর জনম সংসারে!
কিন্তু তব দুখ দেখি নিত্য আমি দুখী;
নিন্দ বিধাতায় তুমি, নিন্দ, বিধুমুখি! ”
* * * মধুরস্বরে
* * * * রে,
* * * প্রভু,
* * * দয়ামি * *
* * * যথা * *
যুদ্ধার্থ গম্ভীরতার বাণী তব পানে!
সুধা-আশে আসে অলি,
দিলে সুধা যায় চলি,—
কে কোথা কবে গো দুখী সখার মিলনে?”
“ ক্ষুদ্র-মতি তুমি অতি ”
রাগি কহে তরুপতি,
“নাহি কিছু অভিমান? ধিক্ চন্দ্রাননে!”
নীরবিলা তরুরাজ, উড়িল গগনে
যমদূতাকৃতি মেঘ গম্ভীর স্বননে;
আইলেন প্রভঞ্জন,
সিংহনাদ করি ঘন,
যথা ভীম ভীমসেন কৌরব-সমরে।
আইল খাইতে মেঘ দৈত্যকুল রড়ে;
ঐরাবত পিঠে চড়ি
রাগে ছাঁত কড়মড়ি,
ছাড়িলেন বজ্র ইন্দ্র কড় কড় কড়ে!
ঊরু ভাঙ্গি কুরুরাজে বধিলা যেমতি
ভীম যোধপতি;
মহাঘাতে মড় মড়ি
রসাল ভূতলে পড়ি,
হায়, বায়ুবলে
হারাইলা আয়ু-সহ দর্প বনস্থলে!
ঊর্দ্ধশির যদি তুমি কুল মান ধনে;
করিওনা ঘৃণা তবু নীচশির জনে!
এই উপদেশ করি দিলা এ কৌশলে॥
সমাপ্ত ।
আদর্শপত্রের কয়েক স্থানে দৈবাৎ পোকায় কাটিয়া ফেলিয়াছে।
নূতন বৎসর
৬৪
(নূতন বৎসর।)
ভূত-রূপ সিন্ধু-জলে গড়ায়ে পড়িল
বৎসর, কালের ঢেউ, ঢেউর গমনে।
নিত্যগামী রথচক্র নীরবে ঘুরিল
আবার আয়ুর পথে। হৃদয়-কাননে,
কত শত আশা-লতা শুখায়ে মরিল,
হায় রে, কব তা কারে, কব তা কেমনে!
কি সাহসে আবার বা রোপিব যতনে
সে বীজ, যে বীজ ভূতে বিফল হইল
বাড়িতে লাগিল বেলা; ডুবিবে সত্বরে
তিমিরে জীবন-রবি। আসিছে রজনী,
নাহি যার মুখে কথা বায়ু-রূপ স্বরে;
নাহি যার কেশ-পাশে তারা-রূপ মণি;
চির-রুদ্ধ দ্বার যার নাহি মুক্ত করে
উষা,—তপনের দূতী, অরুণ-রমণী!
পণ্ডিতবর থিওডোর গোল্ডষ্টুকর
৮১
(পণ্ডিতবর থিওডোর্ গোল্ডষ্টুকর।)
মথি জলনাথে যথা দেব-দৈত্য-দলে
লভিলা অমৃত-রস, তুমি শুভ ক্ষণে
যশোরূপ সুধা, সাধু, লভিলা স্ববলে,
সংস্কৃতবিদ্যা-রূপ সিন্ধুর মথনে!
পণ্ডিত-কুলের পতি তুমি এ মণ্ডলে।
আছে যত পিকবর ভারত-কাননে,
সুসঙ্গীত-রঙ্গে তোষে তোমার শ্রবণে।
কোন্ রাজা হেন পূজা পায় এ অঞ্চলে?
বাজায়ে লুকল বীণা বাল্মীকি আপনি
কহেন রামের কথা তোমায় আদরে;
বদরিকাশ্রম হতে মহা গীত-ব্বনি
গিরি-জাত স্রোতঃ-সম ভীম ধ্বনি করে!
সখা তব কালিদাস, কবি-কুল-মণি!—
কে জানে কি পুণ্য তব ছিল জন্মান্তরে?
পরলোক
৪১
(পরলোক।)
আলোক-সাগর-রূপ রবির কিরণে,
ডুবে যথা প্রভাতের তারা সুহাসিনী;—
ফুটে যথা প্রেমামোদে, আইলে যামিনী,
কুসুম-কুলের কলি কুসুম-যৌবনে;—
বহি যথা সুপ্রবাহে প্রবাহ-বাহিনী,
লভে নিরবাণ সুখে সিন্ধুর চরণে;—
এই রূপে ইহ লোক—শাস্ত্রে এ কাহিনী—
নিরন্তর সুখরূপ পরম রতনে
পায় পরে পর-লোকে, ধরমের বলে।
হে ধর্ম্ম, কি লোভে তবে তোমারে বিস্মরি,
চলে পাপ-পথে নর, ভুলি পাপ-ছলে?
সংসার-সাগর-মাঝে তব স্বর্ণতরি
তেয়াগি, কি লোভে ডুবে বাতময় জলে?
দু দিন বাঁচিতে চাহে, চির দিন মরি?
পরিচয়
১১
(পরিচয়।)
যে দেশে উদয়ি রবি উদয়-অচলে,
ধরণীর বিম্বাধর চুম্বেন আদরে
প্রভাতে; যে দেশে গাই, সুমধুর কলে,
ধাতার প্রশংসা-গীত, বহেন সাগরে
জাহ্নবী; যে দেশে ভেদি বারিদ-মণ্ডলে
(তুষারে বপিত বাস উর্দ্দ্ধ কলেবরে,
রজতের উপবীত স্রোতঃ-রূপে গলে,)
শোভেন শৈলেন্দ্র-রাজ, মানঃ-সরোবরে
(স্বচ্ছ দরপণ!) হেরি ভীষণ মূরতি;–
যে দেশে কুহরে পিক বাসন্ত কাননে;–
দিনেশে যে দেশে সেবে নলিনী যুবতী;—
চাঁদের আমোদ যথা কুমুদ-সদনে;–
সে দেশে জনম মম; জননী ভারতী;
তেঁই প্রেম-দাস আমি, ওলো বরাঙ্গনে!
১২
(ঐ।)
কে না জানে কবি-কুল প্রেম-দাস ভবে,
কুসুমের দাস যথা মারুত্, সুন্দরি,
ভাল যে বাসিব আমি, এ বিষয়ে তবে
এ বৃথা সংশয় কেন? কুসুম-মঞ্জরী
মদনের কুঞ্জে তুই! কভু পিক-রবে
তোর গুণ গায় কবি; কভু রূপ ধরি
অলির, যাচে সে মধু ও কানে গুঞ্জরি,
ব্রজে যথা রসরাজ রাসের পরবে!
কামের নিকুঞ্জ এই! কত যে কি ফলে,
হে রসিক, এ নিকুঞ্জে, ভাবি দেখ মনে!
সরঃ ত্যজি সরোজিনী ফুটিছে এ স্থলে,
কদম্ব, বিম্বিকা, রম্ভা, চম্পকের সনে!
সাপিনীরে হেরি ভয়ে লুকাইছে গলে
কোকিল; কুরঙ্গ গেছে রাখি দু-নয়নে!
পুরুরবা
৭২
(পুৰ়ুরবা)
যথা ঘোর বনে ব্যাধ বধি অজাগরে,
চিরি শিরঃ তার, লভে অমূল রতনে;
বিমুখি কেশীরে আজি, হে রাজা, সমরে,
লভিলা ভুবন-লোভ তুমি কাম-ধনে!
হে সুভগ, যাত্রা তব বড় শুভ ক্ষণে!—
ঐ যে দেখিছ এবে, গিরির উপরে,
আচ্ছন্ন, হে মহীপতি, মূৰ্চ্ছা-রূপ ঘনে
চাঁদেরে, কে ও, তা জান? জিজ্ঞাস সত্বরে,
পরিচয় দেবে সখী, সমুখে যে বসি।
মানসে কমল, বলি, দেখেছ নয়নে;
দেখেছ পূর্ণিমা-রাত্রে শরদের শশী;
বধিয়াছ দীর্ঘ-শৃঙ্গী কুরঙ্গে কাননে;—
সে সকলে ধিক্ মান! ওই হে উর্ব্বশী!
সোণার পুতলি যেন, পড়ি অচেতনে।
পৃথিবী
৮৯
(পৃথিবী।)
নির্ম্মি গোলাকারে তোমা আরোপিলা যবে
বিশ্ব-মাঝে স্রষ্টা, ধরা! অতি হৃষ্ট মনে
চারি দিকে তারা-চয় সুমধুর রবে
(বাজায়ে সুবর্ণ বীণা) গাইল গগনে,
কুল-বালা-দল যবে বিবাহ-উৎসবে
হুলাহুলি দেয় মিলি বধূ-দরশনে।
আইলেন আদি প্রভা হেম-ঘনাসনে,
ভাসি ধীরে শূন্যরূপ সুনীল অর্ণবে,
দেখিতে তোমার মুখ। বসন্ত আপনি
আবরিলা শাম বাসে বর কলেবরে;
আঁচলে বসায়ে নব ফুলরূপ মণি,
নব ফুল-রূপ মণি কবরী উপরে।
দেবীর আদেশে তুমি, লো নব রমণি,
কটিতে মেখলা-রূপে পরিলা সাগরে।
প্রাণ
৩৫
(প্রাণ।)
কি সুরাজ্যে, প্রাণ, তব রাঙ্গ-সিংহাসন!
বাহু-রূপে দুই রথী দুর্জ্জয় সমরে,
বিধির বিধানে পুরী তব রক্ষা করে;—
পঞ্চ অনুচর তোমা সেৰে অনুক্ষণ।
সুহাসে ঘ্রাণেরে গন্ধ দেয় ফুলবন;
যতনে শ্রবণ আনে সুমধুর স্বরে;
সুন্দর যা কিছু আছে, দেখায় দর্শন
ভূতলে, সুনীল নভে, সর্ব্ব চরাচরে!
স্পর্শ, স্বাদ, সদা ভোগ যোগায়, সুমতি!
পদরূপে দুই বাজী তব রাজ-দ্বারে;
জ্ঞান-দেব মন্ত্রী তব—ভবে বৃহস্পতি;—
সরস্বতী অবতার রসনা সংসারে।
স্বর্ণস্রোতোরূপে লহু, অবিরল-গতি,
বহি অঙ্গে, রঙ্গে ধনী করে হে তোমারে!
বঙ্গদেশে এক মান্য বন্ধুর উপলক্ষে
৪৪
(বঙ্গদেশে এক মান্য বন্ধুর উপলক্ষে।)
হায় রে, কোথা সে বিদ্যা, যে বিদ্যার বলে,
দূরে থাকি পার্থ রথী তোমার চরণে
প্রণমিলা, দ্রোণগুরু! আপন কুশলে
তুষিলা তোমার কর্ণ গোগৃহের রণে?
এ মম মিনতি, দেব, আসি অকিঞ্চনে
শিখাও সে মহাবিদ্যা এ দূর অঞ্চলে।
তা হলে, পূজিব আজি, মজি কুতূহলে,
মানি যাঁরে, পদ তাঁর ভারত-ভবনে!
নমি পায়ে কব কানে অতি মৃদু স্বরে,—
বেঁচে আছে আজু দাস তোমার প্রসাদে;
অচিরে ফিরিব পুনঃ হস্তিনা নগরে;
কেড়ে লব রাজ-পদ তব আশীর্ব্বাদে।—
কত যে কি বিদ্যা-লাভ দ্বাদশ বৎসরে
করিনু, দেখিবে, দেব, স্নেহের আহ্লাদে।
বঙ্গভাষা
চতুর্দশপদী কবিতাবলি
(বঙ্গভাষা।)
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;—
তা সবে, (অবোধ আমি) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি!
কাটাইনু বহুদিন সুখ পরিহরি।
অনিদ্রায়, নিরাহারে সঁপি কায়, মনঃ,
মজিনু বিফল তপে অবরণ্যে বরি;—
কেলিনু শৈবলে, ভুলি কমল-কানন।
স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে,—
“ওরে বাছা, গৃহে তব রতনের রাজি,
এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?
যা ফিরি অজ্ঞান তুই, যা রে ফিরি ঘরে।”
পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে
মাতৃ-ভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মণিজালে॥
বটবৃক্ষ
২৫
(বটবৃক্ষ।)
দেব-অবতার ভাবি বন্দে যে তোমারে,
নাহি চাহে মনঃ মোর তাহে নিন্দা করি,
তরুরাজ! প্রত্যক্ষতঃ ভারত-সংসারে,
বিধির করুণা তুমি তরু-রূপ ধরি!
জীবকুল-হিতৈষিণী, ছায়া সু-সুন্দরী,
তোমার দুহিতা, সাধু! যবে বসুধারে
দগধে আগ্নেয় তাপে, দয়া পরিহরি,
মিহির, আকুল জীব বাঁচে পূজি তাঁরে।
শত-পত্রময় মঞ্চে, তোমার সদনে,
খেচর—অতিথি-ব্রজ, বিরাজে সতত,
পদ্মরাগ ফলপুঞ্জে ভুঞ্জি হৃষ্ট-মনে;–
মৃদু-ভাষে মিষ্টালাপ কর তুমি কত,
মিষ্টালাপি, দেহ-দাহ শীতলি যতনে!
দেব নহ; কিন্তু গুণে দেবতার মত।
বসন্তে একটী পাখীর প্রতি
৩৪
(বসন্তে একটি পাখীর প্রতি।)
নহ তুমি পিক, পাখি, বিখ্যাত ভারতে,
মাধবের বার্ত্তাবহ; যার কুহরণে
ফোটে কোটি ফুলপুঞ্জ মঞ্জু, কুঞ্জবনে!—
তবুও সঙ্গীত-রঙ্গ করিছ যে মতে
গায়ক, পুলক তাহে জনমে এ মনে!
মধুময় মধুকাল সর্ব্বত্র জগতে,—
কে কোথা মলিন কবে মধুর মিলনে,
বসুমতী সতী যবে রত প্রেমব্রতে?—
দুরস্ত কৃতান্ত-সম হেমন্ত এ দেশে
নির্দ্দয়; ধরার কষ্টে দুষ্ট তুষ্ট অতি!
না দেয় শােভিতে কভু ফুলরত্নে কেশে,
পরায় ধবল বাস বৈধব্যে যেমতি!—
ডাক তুমি ঋতুরাজে, মনােহর বেশে
সাজাতে ধরায় আসি, ডাক শীঘ্রগতি!
ফরামীস দেশে।
বাল্মীকি
৯২
(বাল্মীকি।)
স্বপনে ভ্রমিণু আমি গহন কাননে
একাকী। দেখিনু দূরে যুব এক জন,
দাঁড়ায়ে তাহার কাছে প্রাচীন ব্রাহ্মণ—
দ্রোণ যেন ভয়-শূন্য কুরুক্ষেত্র-রণে।
“চাহিস বধিতে মোরে কিসের কারণে?”
জিজ্ঞাসিলা দ্বিজবর মধুর বচনে।
“বধি তোমা হরি আমি লব তব ধন,”
উত্তরিল যুব জন ভীম গরজনে।—
পরিবরতিল স্বপ্ন। শুনিনু সত্বরে
সুধাময় গীত-ধ্বনি, আপনি ভারতী,
মোহিতে ব্রহ্মার মনঃ, স্বর্ণ বীণা করে,
আরম্ভিলা গীত যেন— মনোহর অতি!
সে দুরন্ত যুব জন, সে বৃদ্ধের বরে,
হইল, ভারত, তব কবি-কুল-পতি।
বিজয়া-দশমী
৪৯
(বিজয়া-দশমী।)
‘যেয়ো না, রজনি, আজি লয়ে তারদিলে!
‘গেলে তুমি, দয়াময়ি, এ পরাণ যাবে! —
‘উদিলে নির্দ্দয় রবি উদয়-অচলে,
‘নয়নের মণি মোর নয়ন হারাবে!
‘বার মাস তিতি, সতি, নিত্য অশ্রুজলে,
‘পেয়েছি তোমায় আমি! কি সান্ত্বনা-ভাবে—
‘তিনটি দিনেতে, কহ, লো তারা-কুন্তলে,
‘এ দীর্ঘ বিরহ-জ্বালা এ মন জুড়াবে?
‘তিন দিন স্বর্ণ দীপ জ্বলিতেছে ঘরে
'দূর করি অন্ধকার; শুনিতেছি বাণী—
‘মিষ্টতম এ সৃষ্টিতে এ কর্ণ-কুহরে!
‘দ্বিগুণ আঁধার ঘর হবে, আমি জানি,
‘নিবাও এ দীপ যদি!’—কহিলা কাতরে
নবমীর নিশা-শেষে গিরীশের রাণী।
বীর-রস
৫১
(বীর-রস।)
ভৈরব-আকৃতি শূরে দেখিনু নয়নে
গিরি-শিরে; বায়ু-রথে, পূর্ণ ইরম্মদে,
প্রলয়ের মেঘ যেন! ভীম শরাসনে
ধরি বাম করে বীর, মত্ত বীর-মদে,
টঙ্কারিছে মুহুর্মুহুঃ, হুঙ্কারি ভীষণে!
ব্যোমকেশ-সম কায়; ধরাতল পদে,
রতন-মণ্ডিত শিরঃ ঠেকিছে গগনে,
বিজলী-ঝলসা-রূপে উজলি জলদে।
চাঁদের পরিধি, যেন রাহুর গরাসে,
ঢালখান; ঊরু-দেশে অসি তীক্ষ্ণ অতি,
চৌদিকে বিবিধ অস্ত্র। সুধিনু তরাসে,—
“কে এ মহাজন, কহ, গিরি মহামতি?”
আইল শবদ বহি স্তবধ আকাশে—
“বীর-রস এ বীরেন্দ্র, রস-কুল-পতি!”
ব্রজ-বৃত্তান্ত
৯৬
(ব্রজ-বৃত্তান্ত।)
আর কি কাঁদে, লো নদি, তোর তীরে বসি,
মথুরার পানে চেয়ে, ব্রজের সুন্দরী?
আর কি পড়ে লো এবে তোর জলে খসি
অশ্রু-ধারা; মুকুতার কম রূপ ধরি?
বিন্দা,— চন্দ্রাননা দূতী— ক মোরে, রূপসি
কালিন্দি, পার কি আর হয় ও লহরী,
কহিতে রাধার কথা, রাজ-পুরে পশি,
নব রাজে, কর-যুগ ভয়ে যোড় করি?—
বঙ্গের হৃদয়-রূপ রঙ্গ-ভূমি-তলে
সাঙ্গিল কি এত দিনে গোকুলের লীলা?
কোথায় রাখাল-রাজ পীত ধড়া গলে?
কোথায় সে বিরহিণী প্যারী চারুশীলা?—
ডুবাতে কি ব্রজ-ধামে বিস্মৃতির জলে,
কাল-রূপে পুনঃ ইন্দ্র বৃষ্টি বরষিলা!
ভর্সেল্স নগরে রাজপুরী ও উদ্যান
৪১
(ভরসেল্স নগরে রাজপুরী ও উদ্যান।)
কত যে কি খেলা তুই খেলিস্ ভুবনে,
রে কাল, ভুলিতে কে তা পারে এই স্থলে?
কোথা সে রাজেন্দ্র এবে, যার ইচ্ছা-বলে
বৈজয়ন্ত-সম ধাম এ মর্ত্য-নন্দনে
শোভিল? হরিল কে সে নরাপ্সরা-দলে,
নিত্য যারা, নৃত্য-গীতে এসুখ-সদনে,
মজাইত রাজ-মনঃ, কাম-কুতূহলে?
কোথা বা সে কবি, যারা, বীণার স্বননে,
(কথারূপ ফুলপুঞ্জ ধরি পুট করে)
পূজিত সে রাজপদ? কোথা রথী যত,
গাণ্ডীবী-সদৃশ যারা প্রচণ্ড সমরে?
কোথা মন্ত্রী বৃহস্পতি? তোর হাতে হত।
রে দুরন্ত, নিরন্তর যেমত সাগরে
চলে জল, জীব-কুলে চালাস্ সে মত।
ভারত-ভূমি
৮৮
(ভারত-ভূমি।)
“কুক্ষণে তোরে লো, হায়, ইতালি! ইতালি!
এ দুখ-জনক রূপ দিয়াছেন বিধি।”—
কে না লোভে, ফণিনীর কুন্তলে যে মণি
ভূপতিত তারারূপে, নিশাকালে ঝলে?
কিন্তু কৃতান্তের দূত বিষদন্তে গণি,
কে করে সাহস তারে কেড়ে নিতে বলে?—
হায় লো ভারত-ভূমি! বৃথা স্বর্ণ-জলে
ধুইলা বরাঙ্গ তোর, কুরঙ্গ-নয়নি,
বিধাতা? রতন সিঁথি গড়ায়ে কৌশলে,
সাজাইলা পোড়া ভাল তোর লো, যতনি!
নহিস্ লো বিষময়ী যেমতি সাপিনী;
রক্ষিতে অক্ষম মান প্রকৃত যে পতি;
পুড়ি কামানলে, তোরে করে লো অধিনী
(হা ধিক্!) যবে যে ইচ্ছে, যে কামী দুর্ম্মতি!
কার শাপে তোর তরে, ওলো অভাগিনি,
চন্দন হইল বিষ; সুধা তিত অতি?
ভাষা
৭০
(ভাষা।)
লো সুন্দরী জননীর
সুন্দরীতরা দুহিতা!—
মূঢ় সে, পণ্ডিত-গণে তাহে নাহি গণি,
কহে যে, রূপসী তুমি নহ, লো সুন্দরি
ভাষা!—শত ধিক্ তারে! ভুলে সে কি করি
শকুন্তলা তুমি, তব মেনকা জননী?
রূপ-হীনা দুহিতা কি, মা যার অপ্সরী?—
বীণার রসনা-মূলে জন্মে কি কুধ্বনি?
কবে মন্দ-গন্ধ শ্বাস শ্বাসে ফুলেশ্বরী
নলিনী? সীতারে গর্ভে ধরিলা ধরণী।
দেব-যোনি মা তোমার; কাল নাহি নাশে
রূপ তাঁর; তবু কাল করে কিছু ক্ষতি।
নব রস-সুধা কোথা বয়েসের হাসে?
কালে সুবর্ণের বর্ণ ম্লান, লো যুবতি!
নব শশিকলা তুমি ভারত-আকাশে,
নব-ফুল বাক্য-বনে, নব মধুমতী।
ভূতকাল
৯৭
(ভূতকাল।)
কোন্ মূল্য দিয়া পুনঃ কিনি ভূত কালে,
—কোন্ মূল্য—এ মন্ত্রণা কারে লয়ে করি?
কোন্ ধন, কোন্ মুদ্রা, কোন্ মণি-জালে
এ দূর্ল্লভ দ্রব্য-লাভ? কোন্ দেবে স্মরি,
কোন্ যোগে, কোন্ তপে, কোন্ ধর্ম্ম ধরি?
আছে কি এমন জন ব্রাহ্মণে, চণ্ডালে,
এ দীক্ষা-শিক্ষার্থে যারে গুরু-পদে বরি,
এ তত্ত্ব-স্বরূপ পদ্ম পাই যে মৃণালে?—
পশে যে প্রবাহ বহি অকূল সাগরে,
ফিরি কি সে আসে পুনঃ পর্ব্বত-সদনে?
যে বারির ধারা ধরা সতৃষ্ণায় ধরে,
উঠে কি সে পুনঃ কভু বারিদাতা ঘনে?—
বর্তমানে তোরে, কাল, যে জন আদরে
তার তুই! গেলে তোরে পায় কোন্ জনে?
মধুকর
৩৯
(মধুকর।)
শুনি গুন গুন ধ্বনি তোর এ কাননে,
মধুকর, এ পরাণ কাঁদে রে বিষাদে!—
ফুল-কুল-বধূ-দলে সাধিস্ যতনে
অনুক্ষণ, মাগি ভিক্ষা অতি মৃদু নাদে,
তুমকী বাজায়ে যথা রাজার তোরণে
ভিখারী, কি হেতু তুই? ক মোরে, কি সাদে
মোমের ভাণ্ডারে মধু রাখিস্ গোপনে,
ইন্দ্র যথা চন্দ্রলোকে, দানব-বিবাদে,
সুধামৃত? এ আয়াসে কি সুফল ফলে?
কৃপণের ভাগ্য তোর! কৃপণ যেমতি
অনাহারে, অনিদ্রায়, সঞ্চয়ে বিকলে
বৃথা অর্থ; বিধি-বশে তোর সে দুর্গতি!
গৃহ-চ্যুত করি তোরে, লুটি লয় বলে,
পর জন পরে তোর শ্রমের সঙ্গতি!
মহাভারত
২৯
(মহাভারত।)
কল্পনা-বাহনে সুখে করি আরোহণ,
উতরিনু, যথা বসি বদরীর তলে,
করে বীণা, গাইছেন গীত কুতূহলে
সত্যবতী-সুত কবি,—ঋষিকুল-ধন!
শুনিনু গম্ভীর ধ্বনি; উন্মীলি নয়ন
দেখিনু কৌরবেশ্বরে, মত্ত বাহুবলে;
দেখিনু পবন-পুত্রে, ঝড় যথা চলে
হুঙ্কারে! আইলা কর্ণ— সূর্য্যের নন্দন—
তেজস্বী। উজ্জ্বলি যথা ছোটে অনম্বরে
নক্ষত্র, আইলা ক্ষেত্রে পার্থ মহামতি,
আলো করি দশদিশ, ধরি বাম করে
গাণ্ডীব— প্রচণ্ড-দণ্ড-দাতা রিপু প্রতি।
তরাসে আকুল হৈনু এ কাল সমরে,
দ্বাপরে গোগৃহ-রণে উত্তর যেমতি।
মিত্রাক্ষর
৯৫
(মিত্রাক্ষর।)
বড়ই নিষ্ঠুর আমি ভাবি তারে মনে,
লো ভাষা, পীড়িতে তোমা গড়িল যে আগে
মিত্রাক্ষর-রূপ বেড়ি! কত ব্যথা লাগে
পর যবে এ নিগড় কোমল চরণে—
স্মরিলে হৃদয় মোর জ্বলি উঠে রাগে!
ছিল না কি ভাব-ধন, কহ, লো ললনে,
মনের ভাণ্ডারে তার, যে মিথ্যা সোহাগে
ভুলাতে তোমারে দিল এ কুচ্ছ ভূষণে?—
কি কাজ রঞ্জনে রাঙি কমলের দলে?
নিজ-রূপে শশীকলা উজ্জ্বল আকাশে!
কি কাজ পবিত্রি মন্ত্রে জাহ্নবীর জলে?
কি কাজ সুগন্ধ ঢালি পারিজাত-বাসে?
প্রকৃত কবিতা-রূপী প্রকৃতির বলে,—
চীন-নারী-সম পদ কেন লৌহ-ফাঁসে?
মেঘদূত
(মেঘদূত।)
কামী যক্ষ দহি, মেঘ, বিরহ-দহনে,
দূত-পদে বরি পূর্ব্বে, তোমায় সাধিল
বহিতে বারতা তার অলকা-ভবনে,
যথা ক্ষুণ্ণ মনে প্রিয়া শূন্যঘরে ছিল।
কত যে মিনতি কথা কাতরে কহিল
তব পদতলে সে, তা পড়ে কি হে মনে?
জানি আমি, তুষ্ট হয়ে তার সে সাধনে
প্রদানিলা তুমি তারে যা কিছু যাচিল;
তেঁই গো প্রবাসে আজি এই ভিক্ষা করি;–
দাসের বারতা লয়ে যাও শীঘ্রগতি
বিরাজে, হে মেঘরাজ, যথা সে যুবতী,
অধীর এ হিয়া, হায়, যার রূপ স্মরি!
কুসুমের কানে স্বনে মলয় যেমতি
মৃদে, কয়ো তারে, দূত, এ বিরহে মরি!
(ঐ।)
গরুড়ের বেগে, মেঘ, উড় শুভ ক্ষণে।
সাগরের জলে সুখে দেখিবে, সুমতি,
ইন্দ্র-ধনুঃ-চূড়া শিরে ও শ্যাম মূরতি,
ব্রজে যথা ব্রজরাজ যমুনা-দর্পণে
হেরেন বরাঙ্গ, যাহে মজি ব্রজাঙ্গনে
দেয় জলাঞ্জলি লাজে! যদি রোধে গতি
তোমার, পর্ব্বত-বৃন্দ, মন্দ্রি ভীম স্বনে
বারি-ধারা-রূপ বাণে বিঁধো, মেঘপতি,
তা সকলে, বীর তুমি; কারে ডর রণে?—
এ দূর গমনে যদি হও ক্লান্ত কভু,
কামীর দোহাই দিয়া ডেকো গো পবনে
বহিতে তোমার ভার। শোভিবে, হে প্রভু,
খগেন্দ্রে উপেন্দ্র-সম, তুমি সে বাহনে!—
কৌস্তুভের রূপে পরো— তড়িত-রতনে।
যশঃ
৬৯
(যশঃ।)
লিখিনু কি নাম মোর বিফল যতনে
বালিতে, রে কাল, তোর্ সাগরের তীরে?
ফেন-চূড় জল-রাশি আসি কি রে ফিরে,
মুছিতে তুচ্ছেতে ত্বরা এ মোর লিখনে?
অথবা খোদিনু তারে যশোগিরি-শিরে,
গুণ-রূপ যন্ত্রে কাটি অক্ষর সুক্ষণে,—
নারিবে উঠাতে যাহে, ধুয়ে নিজ নীরে,
বিস্মৃতি, বা মলিনিতে মলের মিলনে?—
শূন্য-জল জল-পথে জলে লোক স্মরে;
দেব-শূন্য দেবালয়ে অদৃশ্যে নিবাসে
দেবতা; ভস্মের রাশি ঢাকে বৈশ্বানরে।
সেই রূপে, ধড় যবে পড়ে কালগ্রাসে,
যশোরূপাশ্রমে প্রাণ মর্ত্ত্যে বাস করে;—
কুযশে নরকে যেন, সুযশে—আকাশে!
যশের মন্দির
১৩
(যশের মন্দির।)
সুবর্ণ দেউল আমি দেখিনু স্বপনে
অতি-তুঙ্গ শৃঙ্গ শিরে! সে শৃঙ্গের তলে,
বড় অপ্রশস্ত সিঁড়ি গড়া মায়া-বলে,
বহুবিধ রোধে রুদ্ধ উর্দ্দ্ধগামী জনে!
তবুও উঠিতে তথা—সে দুর্গম স্থলে—
করিছে কঠোর চেষ্টা কষ্ট সহি মনে
বহু প্রাণী। বহু প্রাণী কাঁদিছে বিকলে,
না পারি লভিতে যত্নে সে রত্ন-ভবনে।
ব্যথিল হৃদয় মোর দেখি তা সবারে।–
শিয়রে দাঁড়ায়ে পরে কহিলা ভারতী,
মৃদু হাসি; “ওরে বাছা, না দিলে শকতি
আমি, ও দেউলে কার সাধ্য উঠিবারে?
যশের মন্দির ওই; ওথা যার গতি,
অশক্ত আপনি যম ছুঁইতে রে তারে!”
রামায়ণ
৮৬
(রামায়ণ।)
সাধিনু নিদ্রায় বৃথা সুন্দর সিংহলে।—
স্মৃতি, পিতা বাল্মীকির বৃদ্ধ-রূপ ধরি,
বসিলা শিয়রে মোর; হাতে বীণা করি,
গাইলা সে মহাগীত, যাহে হিয়া জ্বলে,
যাহে আজু আঁখি হতে অশ্রু-বিন্দু গলে!
কে সে মুঢ় ভূভারতে, বৈদেহি সুন্দরি,
নাহি আর্দ্রে মনঃ যার তব কথা স্মরি,
নিত্য-কান্তি কমলিনী তুমি ভক্তি-জলে!
দিব্য চক্ষুঃ দিলা গুরু; দেখিনু সুক্ষণে
শিলা জলে; কুম্ভকর্ণ পশিল সমরে,
চলিল অচল যেন ভীষণ ঘোষণে,
কাঁপায়ে ধরায় ঘন ভীম-পদ-ভরে।
বিনাশিলা রামানুজ মেঘনাদে রণে;
বিনাশিলা রঘুরাজ রক্ষোরাজেশ্বরে।
রাশিচক্র
৩৭
(রাশি-চক্র।)
রাজপথে শোভে যথা, রম্য-উপবনে,
বিরাম-আলয়বৃন্দ; গড়িলা তেমতি
দ্বাদশ মন্দির বিধি, বিবিধ রতনে,
তব নিত্য পথে শূন্যে, রবি, দিনপতি।
মাস কাল প্রতি গৃহে তোমার বসতি,
গ্রহেন্দ্র; প্রবেশ তব কখন সুক্ষণে,—
কখন বা প্রতিকূল জীব-কুল প্রতি!
আসে এ বিরামালয়ে সেবিতে চরণে
গ্রহব্রজ; প্রজাব্রজ, রাজাসন-তলে
পূজে রাজপদ যথা; তুমি, তেজাকর,
হৈমময় তেজঃ-পুঞ্জ প্রসাদের ছলে,
প্রদান প্রসন্নভাবে সবার উপর।
কাহার মিলনে তুমি হাস কুতূহলে,
কাহার মিলনে বাম,— শুনি পরস্পর।
রৌদ্র-রস
৯৮
(রৌদ্র-রস।)
শুনিনু গম্ভীর-ধ্বনি গিরির গহ্বরে,
ক্ষুধার্ত্ত কেশরী যেন নাদিছে ভীষণে;
প্রলয়ের মেঘ যেন গর্জ্জিছে গগনে;
সচূড়ে পাহাড় কাঁপে থর থর থরে,
কাঁপে চারি দিকে বন যেন ভূকম্পনে;
উথলে অদূরে সিন্ধু যেন ক্রোধ-ভরে,
যবে প্রভঞ্জন আসে নির্ঘোষ ঘোষণে।
জিজ্ঞাসিনু ভারতীরে জ্ঞানার্থে সত্বরে!
কহিলা মা,—“রৌদ্র নামে রস, রৌদ্র অতি,
রাখি আমি, ওরে বাছা, বাঁধি এই স্থলে,
(কৃপা করি বিধি মোরে দিলা এ শকতি)
বাড়বাগ্নি মগ্ন যথা সাগরের জলে।
বড়ই কর্কশ-ভাষী, নিষ্ঠুর, দুর্গতি,
সতত বিবাদে মত্ত, পুড়ি রোষানলে।”
শকুন্তলা
৯১
(শকুন্তলা।)
মেনকা অপ্সরারূপী, ব্যাসের ভারতী
প্রসবি, ত্যজিলা ব্যস্তে, ভারত-কাননে,
শকুন্তলা সুন্দরীরে, তুমি, মহামতি,
কণ্বরূপে পেয়ে তারে পালিলা যতনে,
কালিদাস! ধন্য কবি, কবি-কুল-পতি!—
তব কাব্যাশ্রমে হেরি এ নারী-রতনে
কে না ভাল বাসে তারে, দুষ্মন্ত যেমতি
প্রেমে অন্ধ? কে না পড়ে মদন-বন্ধনে?
নন্দনের পিক-ধ্বনি সুমধুর গলে;
পারিজাত-কুসুমের পরিমল শ্বাসে;
মানস-কমল-রুচি বদন-কমলে;
অধরে অমৃত-সুধা; সৌদামিনী হাসে;
কিন্তু ও মৃগাক্ষি হতে যবে গলি, ঝলে
অশ্রুধারা, ধৈর্য্য ধরে কে মর্ত্যে, আকাশে?
শনি
৭৪
(শনি।)
কেন মন্দ গ্রহ বলি নিন্দা তোমা করে
জ্যোতিষী? গ্রহেন্দ্র তুমি, শনি মহামতি!
ছয় চন্দ্র রত্নরূপে সুবর্ণ টোপরে
তোমার; সুকটিদেশে পর, গ্রহ-পতি
হৈম সারসন, যেন আলোক-সাগরে!
সুনীল গগন-পথে ধীরে তব গতি।
বাখানে নক্ষত্র-দল ও রাজ-মূরতি
সঙ্গীতে, হেমাঙ্গ বীণা বাজায়ে অম্বরে।
হে চল রশ্মির রাশি, সুধি কোন জনে,—
কোন জীব তব রাজ্যে আনন্দে নিবাসে?
জন-শূন্য নহ তুমি, জানি আমি মনে,
হেন রাজা প্রজা-শূন্য,—প্রত্যয়ে না আসে!—
পাপ, পাপ-জাত মৃত্যু, জীবন-কাননে,
তব দেশে, কীট-রূপে কুসুম কি নাশে?
শিশুপাল
৭৭
(শিশুপাল।)
নর-পাল-কুলে তব জনম সুক্ষণে
শিশুপাল! কহি শুন, রিপুরূপ ধরি,
ওই যে গরুড়-ধ্বজে গরজেন ঘনে
বীরেশ, এ ভব-দহে মুকতির তরি!
টঙ্কারি কার্ম্মুক, পশ হুহুঙ্কারে রণে;
এ ছার সংসার মায়া অন্তিমে পাসরি;
নিন্দাছলে বন্দ, ভক্ত, রাজীব-চরণে।
জানি, ইষ্টদেব তব, নহেন হে অরি
বাসুদেব; জানি আমি বাগ্দেবীর বরে।
লৌহদন্ত হল, শুন, বৈষ্ণব সুমতি,
ছিঁড়ি ক্ষেত্র-দেহ যথা ফলবান করে
সে ক্ষেত্রে; তোমায় ক্ষণ যাতনি তেমতি
আজি, তীক্ষ্ণ শর-জালে বধি এ সমরে,
পাঠাবেন সুবৈকুণ্ঠে সে বৈকুণ্ঠ-পতি।
শৃঙ্গার-রস
৪৫
(শৃঙ্গার-রস।)
শুনিনু নিদ্রায় আমি, নিকুঞ্জ-কাননে,
মনোহর বীণা-ধ্বনি;—দেখিনু সে স্থলে
রূপস পুরুষ এক কুসুম-আসনে,
ফুলের চৌপর শিরে, ফুল-মালা গলে।
হাত ধরাধরি করি নাচে কুতূহলে
চৌদিকে রমণী-চয়, কামাগ্নি-নয়নে,—
উজলি কানন-রাজি বরাঙ্গ-ভূষণে,
ব্রজে যথা ব্রজাঙ্গনা রাস-রঙ্গ-ছলে!
সে কামাগ্নি-কণা লয়ে, সে যুবক, হাসি,
জ্বালাইছে হিয়াবৃন্দে; ফুল-ধনুঃ ধরি,
হানিতেছে চারি দিকে বাণ রাশি রাশি,
কি দেব, কি নর, উভে জর জর করি!
“কামদেব অবতার রস-কুলে আসি,
শৃঙ্গার রসের নাম!” জাগিনু শিহরি।
শ্মশান
৪৫
(শ্মশান।)
বড় ভাল বাসি আমি ভ্রমিতে এ স্থলে,—
তত্ত্ব-দীক্ষা-দায়ী স্থল জ্ঞানের নয়নে।
নীরবে আসীন হেথা দেখি ভস্মাসনে
মৃত্যু,—তেজোহীন আঁখি, হাড়-মালা গলে,
বিকট অধরে হাসি, যেন ঠাট-ছলে!
অর্থের গৌরব বৃথা হেথা—এ সদনে—
রূপের প্রফুল্ল ফুল শুষ্ক হুতাশনে,
বিদ্যা, বুদ্ধি, বল, মান, বিফল সকলে।
কি সুন্দর অট্টালিকা, কি কুটীর-বাসী,
কি রাজা, কি প্রজা, হেথা উভয়ের গতি।
জীবনের স্রোতঃ পড়ে এ সাগরে আসি।
গহন কাননে বায়ু উড়ায় যেমতি
পত্র-পুঞ্জে, আয়ু-কুঞ্জে, কাল, জীব-রাশি
উড়ায়ে, এ নদ-পাড়ে তাড়ায় তেমতি।
শ্যামা-পক্ষী
৬৬
(শ্যামা-পক্ষী।)
আঁধার পিঞ্জরে তুই, রে কুঞ্জ-বিহারি
বিহঙ্গ, কি রঙ্গে গীত গাইস্ সুস্বরে?
ক মোরে, পূর্ব্বের সুখ কেমনে বিস্মরে
মনঃ তোর? বুঝা রে, যা বুঝিতে না পারি!
সঙ্গীত-তরঙ্গ-সঙ্গে মিশি কি রে ঝরে
অদৃশ্যে ও কারাগারে নয়নের বারি?
রোদন-নিনাদ কি রে লোকে মনে করে
মধুমাখা গীত-ধ্বনি, অজ্ঞানে বিচারি?
কে ভাবে, হৃদয়ে তোর কি ভাব উথলে?—
কবির কুভাগ্য তোর, আমি ভাবি মনে।
দুখের আঁধারে মজি গাইস বিরলে
তুই, পাখি, মজায়ে রে মধু-বরিষণে!
কে জানে যাতনা কত তোর ভব-তলে?
মোহে গন্ধে গন্ধরস সহি হুতাশনে!
শ্রীপঞ্চমী
১৬
(শ্রীপঞ্চমী।)
নহে দিন দূর, দেবি, যবে ভূভারতে
বিসর্জ্জিবে ভূভারতে, বিস্মৃতির জলে,
ও তব ধবল মূর্ত্তি সুদল কমলে;—
কিন্তু চিরস্থায়ী পূজা তোমার জগতে!
মনোরূপ-পদ্ম যিনি রোপিলা কৌশলে
এ মানব-দেহ-সরে, তার ইচ্ছামতে
সে কুসুমে বাস তব, যথা মরকতে
কিম্বা পদ্মরাগে জ্যোতিঃ নিত্য ঝলঝলে!
কবির হৃদয়-বনে যে ফুল ফুটিবে,
সে ফুল-অঞ্জলি লোক ও রাঙা চরণে
পরম-ভকতি-ভাবে চিরকাল দিবে
দশ দিশে, যত দিন এ মর ভবনে
মনঃ-পদ্ম ফোটে, পূজা, তুমি, মা, পাইবে!—
কি কাজ মাটির দেহে তবে, সনাতনে?
শ্রীমন্তের টোপর
৯৩
(শ্রীমন্তের টোপর।)
“শ্রীপতি
শিরে হৈতে ফেলে দিল লক্ষের টোপর॥”
চণ্ডী।
হেরি যথা সফরীরে স্বচ্ছ সরোবরে,
পড়ে মৎস্যরঙ্ক, ভেদি সুনীল গগনে,
(ইন্দ্র-ধনুঃ-সম দীপ্ত বিবিধ বরণে)
পড়িল মুকুট, উঠি, অকূল সাগরে,
উজলি চৌদিক শত রতনের করে
দ্রুতগতি! মৃদু হাসি হেম ঘনাসনে
আকাশে, সম্ভাষি দেবী, সুমধুর স্বরে,
পদ্মারে, কহিলা, “দেখ, দেখ লো নয়নে,
অবোধ শ্রীমন্ত ফেলে সাগরের জলে
লক্ষের টোপর, সখি! রক্ষিব, স্বজনি,
খুল্লনার ধন আমি।”—আশু মায়া বলে
স্বর্ণ ক্ষেমঙ্করী-রূপ লইলা জননী।
ব্জ্রনখে মৎস্যরঙ্কে যথা নভস্তলে
বিঁধে বাজ, টোপর মা ধরিলা তেমনি।
সংস্কৃত
৮৫
(সংস্কৃত।)
কাণ্ডারী-বিহীন তরি যথা সিন্ধু-জলে
সহি বহু দিন ঝড়, তরঙ্গ-পীড়নে,
লভে কূল কালে, মন্দ পবন-চালনে;
সে সুদশা আজি তব সুভাগ্যের বলে,
সংস্কৃত, দেব-ভাষা মানব-মণ্ডলে,
সাগর-কল্লোল-ধ্বনি, নদের বদনে,
বজ্রনাদ, কম্পবান্ বীণা-তার-পণে!—
রাজাশ্রম আজি তব! উদয়-অচলে,
কনক-উদয়াচলে, আবার, সুন্দরি,
বিক্রম-আদিত্যে তুমি হের লো হরষে,
নব আদিত্যের রূপে। পূর্ব্ব-রূপ ধরি,
ফোট পুনঃ পূর্ব্বরূপে, পুনঃ পূর্ব্ব-রসে!
এত দিনে প্রভাতিল দুখ-বিভাবরী;
ফোট মনানন্দে হাসি মনের সরসে।
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
৭৬
(সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।)
সুরপুরে সশরীরে, শূর-কুল-পতি
অর্জ্জুন, স্বকাজ যথ। সাধি পুণ্য-বলে
ফিরিলা কানন-বাসে; তুমি হে তেমতি,
যাও সুখে ফিরি এবে ভারত-মণ্ডলে,
মনোদ্যানে আশা-লতা তব ফলবতী!—
ধন্য ভাগ্য, হে সুভগ, তব ভব-তলে!
শুভ ক্ষণে গর্ভে তোমা ধরিলা সে সতী,
তিতিবেন যিনি, বৎস, নয়নের জলে
(স্নেহাসার।) যবে রঙ্গে বায়ু-রূপ ধরি
জনরব, দূর বঙ্গে বহিবে সত্বরে
এ তোমার কীর্তি-বার্ত্তা।—যাও দ্রুতে, তরি,
নীলমণি-ময় পথ অকূল সাগরে।
অদৃশ্যে রক্ষার্থে সঙ্গে যাবেন সুন্দরী
বঙ্গ-লক্ষ্মী। যাও, কবি আশীর্ব্বাদ করে!—
সমাপ্তে
১০০
(সমাপ্তে।)
বিসর্জ্জিব আজি, মা গো, বিস্মৃতির জলে
(হৃদয়-মণ্ডপ, হায়, অন্ধকার করি!)
ও প্রতিমা! নিবাইল, দেখ, হোমানলে
মনঃ-কুণ্ডে অশ্রু-ধারা মনোদুঃখে ঝরি!
শুখাইল দুরদৃষ্ট সে ফুল্ল কমলে,
যার গন্ধামোদে অন্ধ এ মনঃ, বিস্মরি
সংসারের ধর্ম্ম, কর্ম্ম! ডুবিল সে তরি,
কাব্য-নদে খেলাইনু যাহে পদ-বলে
অল্প দিন! নারিনু, মা, চিনিতে তোমারে
শৈশবে, অবোধ আমি! ডাকিলা যৌবনে;
(যদিও অধম পুত্র, মা কি ভুলে তারে?)
এবে—ইন্দ্রপ্রস্থ ছাড়ি যাই দূর বনে।
এই বর, হে বরদে, মাগি শেষ বারে,—
জ্যোতির্ম্ময় কর বঙ্গ—ভারত-রতনে!
সরস্বতী
৩১
(সরস্বতী।)
তপনের তাপে তাপি পথিক যেমতি
পড়ে গিয়া দড়ে রড়ে ছায়ার চরণে;
তৃষাতুর জন যথা হেরি জলবতী
নদীরে, তাহার পানে ধায় ব্যগ্র মনে
পিপাসা-নাশের আশে; এ দাস তেমতি,
জ্বলে যবে প্রাণ তার দুঃখের জ্বলনে,
ধরে রাঙা পা দুখানি, দেবি সরস্বতি!—
মার কোল-সম, মা গো, এ তিন ভুবনে
আছে কি আশ্রম আর? নয়নের জলে
ভাসে শিশু যবে, কে সান্ত্বনে তারে?
কে মোচে আঁখির জল অমনি আঁচলে
কে তার মনের খেদ নিবারিতে পারে,
মধুমাখা কথা কয়ে, স্নেহের কৌশলে?—
এই ভাবি, কৃপাময়ি, ভাবি গো তোমারে।
সাংসারিক জ্ঞান
৭১
(সাংসারিক জ্ঞান।)
“কি কাজ বাজায়ে বীণা; কি কাজ জাগায়ে
“সুমধুর প্রতিধ্বনি কাব্যের কাননে?
“কি কাজ গরজে ঘন কাব্যের গগনে
“মেঘ-রূপে, মনোরূপ ময়ূরে নাচায়ে?
“স্বতরিতে তুলি তোরে বেড়াবে কি বায়ে
“সংসার-সাগর-জলে, স্নেহ করি মনে
“কোন জন? দেবে অন্ন অৰ্দ্ধ মাত্র খায়ে,
“ক্ষুধায় কাতর তোরে দেখি রে তোরণে?
“ছিঁড়ি তার-কুল, বীণা ছুড়ি ফেল দূরে।”—
কহে সাংসারিক জ্ঞান—ভবে বৃহস্পতি।
কিন্তু চিত্ত-ক্ষেত্রে যবে এ বীজ অঙ্কুরে,
উপাড়ে ইহায় হেন কাহার শকতি?
উদাসীন-দশা তার সদা জীব-পুরে,
যে অভাগা রাঙা পদ ভজে, মা ভারতি!
সাগরে তরি
৭৫
(সাগরে তরি।)
হেরিনু নিশায় তরি অপথ সাগরে,
মহাকায়া, নিশাচরী, যেন মায়া-বলে,
বিহঙ্গিনী-রূপ ধরি, ধীরে ধীরে চলে,
রঙ্গে সুধবল পাখা বিস্তারি অম্বরে!
রতনের চুড়া-রূপে শিরোদেশে জ্বলে
দীপাবলী, মনোহরা নানা বর্ণ করে,—
শ্বেত, রক্ত, নীল, পীত, মিশ্রিত পিঙ্গলে।
চারি দিকে ফেনাময় তরঙ্গ সুস্বরে
গাইছে আনন্দে যেন, হেরি এ সুন্দরী
বামারে, বাখানি রূপ, সাহস, আকৃতি।
ছাড়িতেছে পথ সবে আস্তে ব্যস্তে সরি,
নীচ জন হেরি যথা ফুলের যুবতী।
চলিছে গুমরে বামা পথ আলো করি,
শিরোমণি-তেজে যথা ফণিনীর গতি।
সায়ংকাল
১৯
(সায়ংকাল।)
চেয়ে দেখ, চলিছেন মৃদে অস্তাচলে
দিনেশ, ছড়ায়ে স্বর্ণ, রত্ন রাশি রাশি
আকাশে। কত বা যত্নে কাদম্বিনী আসি
ধরিতেছে তা সবারে সুনীল আঁচলে! –
কে না জানে অলঙ্কারে অঙ্গনা বিলাসী?
অতি-ত্বরা গড়ি ধনী দৈব-মায়া-বলে
বহুবিধ অলঙ্কার পরিবে লো হাসি,—
কনক-কঙ্কণ হাতে, স্বর্ণ-মালা গলে!
সাজাইবে গজ, বাজী; পর্ব্বতের শিরে
সুবর্ণ কিরীট দিবে; বহাবে অম্বরে
নদস্রোতঃ, উজ্জ্বলিত স্বর্ণবর্ণ নীরে!
সুবর্ণের গাছ রোপি, শাখার উপরে
হেমাঙ্গ বিহঙ্গ থোবে। –এ বাজী করি রে
শুভ ক্ষণে দিনকর কর-দান করে।
সায়ংকালের তারা
২০
(সায়ংকালের তারা।)
কার সাথে তুলনিবে, লো সুর-সুন্দরি,
ও রূপের ছটা কবি এ ভব-মণ্ডলে?
আছে কি লো হেন খনি, যার গর্ভে ফলে
রতন তোমার মত, কহ, সহচরি
গোধূলির? কি ফণিনী, যার সু-কবরী
সাজায় সে তোমাসম মণির উজ্জ্বলে?—
ক্ষণমাত্র দেখি তোমা নক্ষত্র-মণ্ডলে
কি হেতু? ভাল কি তোমা বাসে না শর্ব্বরী?
হেরি অপরূপ রূপ বুঝি ক্ষুন্ন মনে
মানিনী রজনী রাণী, তেঁই অনাদরে
না দেয় শোভিতে তোমা সখীদল-সনে,
যবে কেলি করে তারা সুহাস-অম্বরে?
কিন্তু কি অভাব তব, ওলো বরাঙ্গনে,—
ক্ষণমাত্র দেখি মুখ, চির আঁখি স্মরে!
সীতা-বনবাসে
৪৭
(সীতা—বন-বাসে।)
ফিরাইলা বনপথে অতি ক্ষুণ্ণ মনে
সুরথী লক্ষ্মণ রথ, তিতি চক্ষুঃ-জলে;—
উজ্জ্বলিল বন-রাজী কনক কিরণে
স্যন্দন, দিনেন্দ্র যেন অস্তের অচলে।
নদী-পারে একাকিনী সে বিজন বনে
দাঁড়ায়ে, কহিলা সতী শোকের বিহ্বলে;—
“ত্যজিলা কি, রঘু-রাজ, আজি এই ছলে
চির জন্যে জানকীরে? হে নাথ, কেমনে
কেমনে বাঁচিবে দাসী ও পদ-বিরহে?
কে, কহ, বারিদ-রূপে, স্নেহ-বারি দানে,
(দাবানল-রূপে যবে দুখানল দহে)
জুড়াবে, হে রঘুচূড়া, এ পোড়া পরাণে? ”
নীরবিলা ধীরে সাধী; ধীরে যথা রহে
বাহ্য-জ্ঞান-শূন্য মূর্ত্তি, নির্ম্মিত পাষাণে!
৪৮
(ঐ।)
কত ক্ষণে কাঁদি পুনঃ কহিলা সুন্দরী;—
“নিদ্রায় কি দেখি, সত্য ভাবি কুস্বপনে?
হায়, অভাগিনী সীতা! ওই যে সে তরি,
যাহে বহি বৈদেহীরে আনিলা এ বনে
দেবর! নদীর স্রোতে একাকিনী, মরি!—
কাঁপি ভয়ে ভাসে ডিঙ্গা কাণ্ডারী-বিহনে!
অচিরে তরঙ্গ-চয়, নিষ্ঠুরে লো ধরি,
গ্রাসিবে, নতুবা পাড়ে তাড়ায়ে, পীড়নে
ভাঙ্গি বিনাশিবে ওরে! হে রাঘব-পতি,
এ দশা দাসীর আজি এ সংসার-জলে!
ও পদ-ব্যতীত, নাথ, কোথা তার গতি!”—
মূর্চ্ছায় পড়িলা সতী সহসা ভূতলে,
পাষাণ-নির্ম্মিত মূর্ত্তি কাননে যেমতি
পড়ে, বহে ঝড় যবে প্রলয়ের বলে।
সীতাদেবী
২৮
(সীতাদেবী।)
অনুক্ষণ মনে মোর পড়ে তব কথা,
বৈদেহি! কখন দেখি, মুদিত নয়নে,
একাকিনী তুমি, সতি, অশোক কাননে,
চারি দিকে চেড়ীবৃন্দ, চন্দ্রকলা যথা
আচ্ছন্ন মেঘের মাঝে! হায়, বহে বৃথা
পদ্মাক্ষি, ও চক্ষুঃ হতে অশ্রু-ধারা ঘনে!
কোথা দাশরথি শূর—কোথা মহারথী
দেবর লক্ষ্মণ, দেবি, চিরজয়ী রণে?
কি সাহসে, সুকেশিনি, হরিল তোমারে
রাক্ষস? জানেনা মূঢ়, কি ঘটিবে পরে!
রাহু-গ্রাহ-রূপ ধরি বিপত্তি আঁধারে
জ্ঞান-রবি, যবে বিধি বিড়ম্বন করে!
মজিবে এ রক্ষোবংশ, খ্যাত ত্রিসংসারে,
ভূকম্পনে দ্বীপ যথা অতল সাগরে!
সুভদ্রা
৫৭
(সুভদ্রা।)
যথা ধীরে স্বপ্ন-দেবী রঙ্গে সঙ্গে করি
মায়া—নারী-রত্নোত্তমা রূপের সাগরে,—
পশিলা নিশায় হাসি মন্দিরে সুন্দরী
সত্যভামা, সাথে ভদ্রা, ফুল-মালা করে।
বিমলিল দীপ-বিভা; পূরিল সত্বরে
সৌরভে শয়নাগার, যেন ফুলেশ্বরী
সরোজিনী প্রফুল্লিলা আচম্বিতে সরে,
কিম্বা বনে বন-সখী সুনাগকেশরী!
সিহরি জাগিলা পার্থ, যেমতি স্বপনে
সম্ভোগ-কৌতুকে মাতি সুপ্ত জন জাগে;—
কিন্তু কাঁদে প্রাণ তার সে কু-জাগরণে,
সাধে সে নিদ্রায় পুনঃ বৃথা অনুরাগে।
তুমি, পার্থ, ভাগ্য-বলে জাগিলা সুক্ষণে,
মরতে স্বরগ-ভোগ ভোগিতে সোহাগে।
সুভদ্রা-হরণ
অসমাপ্ত কাব্যাবলি।
সুভদ্রা-হরণ।
প্রথম সর্গ।
কেমনে ফাল্গুণী শূর স্বগুণে লভিলা
(পরাভবি যদু-বৃন্দে) চারু-চন্দ্রাননা
ভদ্রায়;—নবীন ছন্দে সে মহা কাহিনী
কহিবে নবীন কবি বঙ্গ-বাসি-জনে,
বাগ্দেবি, দাসেরে যদি কৃপা কর তুমি।
না জানি ভকতি, স্তুতি; না জানি কি কয়ে,
আরাধি, হে বিশ্বারাধ্যে, তোমায়; না জানি
কি ভাবে মনের ভাব নিবেদি ও পদে!
কিন্তু মার প্রাণ কভু নারে কি বুঝিতে
শিশুর মনের সাধ, যদিও না ফুটে
কথা তার? কৃপা করি ঊর গো আসরে।
আইস, মা, এ প্রবাসে, বঙ্গের সঙ্গীতে
জুড়াই বিরহ-জ্বালা, বিহঙ্গম যথা,
কারাবদ্ধ পিজিরায়, কভু কভু ভুলে
কারাগার-দুখ, স্মরি নিকুঞ্জের স্বরে!
ইন্দ্রপ্রস্থে পঞ্চ ভাই পাঞ্চালীরে লয়ে
কৌতুকে করিলা বাস। আদরে ইন্দিরা
(জগত-আনন্দময়ী) নব-রাজ-পুরে
ঊরিলা; লাগিল নিত্য বাড়িতে চৌদিকে
রাজ-শ্রী, শ্রীবরদার পদের প্রসাদে!—
এ মঙ্গল বার্ত্তা শুনি নারদের মুখে
শচী, বরাঙ্গনা দেবী, বৈজয়ন্ত-ধামে
রুষিলা। জ্বলিল পুনঃ পূর্ব্ব কথা স্মরি,
দাবানল-রূপ রোষ হিয়া-রূপ বনে,
দগধি পরাণ তাপে! “হা ধিক!”—ভাবিলা
বিরলে মানিনী মনে—“ধিক্ রে আমারে!
আর কি মানিবে কেহ এ তিন ভুবনে
অভাগিনী ইন্দ্রাণীরে? কেন তাকে দিলি
অনন্ত-যৌবন-কান্তি, তুই, পোড়া বিধি?
হায়, কারে কব দুখ? মোরে অপমানি,
ভোজ-রাজ-বালা কুন্তী—কুল-কলঙ্কিনী,—
পাপীয়সী—তার মান বাড়ান কুলিশী?
যৌবন-কুহকে, ধিক, যে ব্যভিচারিণী
মজাইল দেব-রাজে, মোরে লাজ দিয়া।
অর্জ্জুন—জারজ তার—নাহি কি শকতি
আমার—ইন্দ্রাণী আমি—মারি সে অর্জ্জুনে,
এ পোড়া চখের বালি?—দুর্য্যোধনে দিয়া
গড়াইনু জতুগৃহ; সে ফাঁদ এড়ায়ে
লক্ষ্য বিঁধি, লক্ষ রাজে বিমুখি সমরে
পাঞ্চালীরে মন্দমতি লভিল পঞ্চালে।
অহিত সাধিতে, দেখ, হতাশ হইনু
আমি, ভাগ্য-গুণে তার! —কি ভাগ্য? কে জানে
কোন্ দেবতার বলে বলী ও ফাল্গুণী?
বুঝিবা সহায় তার আপনি গোপনে
দেবেন্দ্র? হে ধর্ম্ম, তুমি পার কি সহিতে
এ আচার চরাচরে? কি বিচার তব!
উপপত্নী কুন্তীর জারজ-পুত্ত্র প্রতি
এত যত্ন? কারে কর এ দুখের কথা—
কার বা শরণ, হায়, লব এ বিপদে?”
কঙ্কণ-মণ্ডিত বাহু হানিলা ললাটে
ললনা! দুকূল সাড়ী তিতি গলগলে
বহিল আঁখির জল, শিশির যেমতি
হিম কালে পড়ি আর্দ্রে কমলের দলে!
“যাইব কলির কাছে” আবার ভাবিলা
মানিনী—“কুটিল কলি খ্যাত ত্রিভুবনে,—
এ পোড়া মনের দুঃখ কব তার কাছে,
এ পোড়া মনের দুখ সে যদি না পারে
জুড়াতে কৌশল করি, কে আর জুড়াবে?
যায় যদি মান, যাক্! আর কি তা আছে?”
ইত্যাদি।
সুভদ্রাহরণ
৩৮
(সুভদ্রা-হরণ।)
তোমার হরণ-গীত গাব বঙ্গাসরে
নব তানে, ভেবেছিনু, সুভদ্রা সুন্দরি;
কিন্তু ভাগ্যদোষে, শুভে, আশার লহরী
শুখাইল, যথা গ্রীষ্মে জলরাশি সরে!
ফলে কি ফুলের কলি যদি প্রেমাদরে
না দেন শিশিরামৃত তারে বিভাবরী?
ঘৃতাহুতি না পাইলে, কুণ্ডের ভিতরে,
ম্রিয়মাণ, অভিমানে তেজঃ পরিহরি,
বৈশ্বানর! দুরদৃষ্ট মোর, চন্দ্রাননে,
কিন্তু (ভবিষ্যৎ কথা কহি) ভবিষ্যতে
ভাগ্যবান্তর কবি, পূজি দ্বৈপায়নে,
ঋষি-কুল-রত্ন দ্বিজ, গাবে লো ভারতে
তোমার হরণ-গীত; তুমি বিজ্ঞ জনে,
লভিবে সুযশঃ, সাঙ্গি এ সঙ্গীত-ব্রতে!
সূর্য্য
২৭
(সূর্য্য।)
এখন ও আছে লোক দেশ দেশান্তরে
দেব ভাবি পূজে তোমা, রবি দিনমণি,
দেখি তোমা দিবামুখে উদয়-শিখরে,
লুটায়ে ধরণীতলে, করে স্তুতি-ধ্বনি;–
আশ্চর্য্যের কথা, সূর্য্য, এ না মনে গণি।
অসীম মহিমা তব, যখন প্রখরে
শোভ তুমি, বিভাবসু, মধ্যাহ্নে অম্বরে
সমুজ্জ্বল করজালে আবরি মেদিনী।
অসীম মহিমা তব, অসীম শকতি,
হেম-জ্যোতিঃ-দাতা তুমি চন্দ্র-গ্রহ-দলে;
উর্ব্বরা তোমার বীর্য্যে সতী বসুমতী;
বারিদ, প্রসাদে তব, সদা পূর্ণ জলে;–
কিন্তু কি মহিমা তাঁর, কহ, দিনপতি,
কোটি রবি শোভে নিত্য যাঁর পদতলে!
সৃষ্টিকর্ত্তা
২৬
(সৃষ্টিকর্ত্তা।)
কে সৃজিলা এ সুবিশ্বে, জিজ্ঞাসিব কারে
এ রহস্য কথা, বিশ্বে, আমি মন্দমতি?
পার যদি, তুমি দাসে কহ, বসুমতি;—
দেহ মহা-দীক্ষা, দেবি, ভিক্ষা চিনিবারে
তাঁহায়, প্রসাদে যাঁর তুমি, রূপবতী,—
ভ্রম অসম্ভ্রমে শূন্যে! কহ, হে আমারে,
কে তিনি, দিনেশ রবি, করি এ মিনতি,
যাঁর আদি জ্যোতিঃ, হেম-আলোক সঞ্চারে
তোমার বদন, দেব, প্রত্যহ উজ্জ্বলে?—
অধম চিনিতে চাহে সে পরম জনে,
যাঁহার প্রসাদে তুমি নক্ষত্র-মণ্ডলে
কর কেলি নিশাকালে রজত-আসনে,
নিশানাথ। নদকুল, কহ, কল কলে,
কিম্বা তুমি, অম্বুপতি, গম্ভীর স্বননে।
হরিপর্ব্বতে দ্রৌপদীর মৃত্যু
৮৭
(হরিপর্ব্বতে দ্রৌপদীর মৃত্যু।)
যথা শমী, বন-শোভা, পবনের বলে,
আঁধারি চোদিক, পড়ে সহসা সে বনে;
পড়িলা দ্রৌপদী সতী পর্ব্বতের তলে।—
নিবিল সে শিখা, যার সুবর্ণ-কিরণে
উজ্জ্বল পাণ্ডব-কুল মানব-মণ্ডলে!
অস্তে গেলা শশীকলা মলিনি গগনে!
মুদিলা, শুখায়ে, পদ্ম সরোবর-জলে!
নয়নের হেম-বিভা ত্যজিল নয়নে!—
মহাশোকে পঞ্চ ভাই বেড়ি সুন্দরীরে
কাঁদিলা, পূরি সে গিরি রোদন-নিনাদে;
দানবের হাতে হেরি অমরাবতীরে
শোকার্ত্ত দেবেন্দ্র যথা ঘোর পরমাদে।
তিতিল গিরির বক্ষঃ নয়নের নীরে;
প্রতিধ্বনি-ছলে গিরি কাঁদিল বিষাদে।
হিড়িম্বা
৬১
(হিড়িম্বা।)
উজলি চৌদিক এবে রূপের কিরণে,
বীরেশ ভীমের পাশে কর যোড় করি
দাঁড়াইলা, প্রেম-ডোরে বাঁধা কায় মনে
হিড়িম্বা; সুবর্ণ-কান্তি বিহঙ্গী সুন্দরী
কিরাতের ফাঁদে যেন! ধাইল কাননে
গন্ধামোদে অন্ধ অলি, আনন্দে গুঞ্জরি,—
গাইল বাসন্তামোদে শাখার উপরি
মধুমাখা গীত পাখী সে নিকুঞ্জ-বনে।
সহসা নড়িল বন ঘোর মড়মড়ে,
মদ-মত্ত হস্তী কিম্বা গণ্ডার সরোষে
পশিলে বনেতে, বন যেই মতে নড়ে!
দীর্ঘ-তাল-তুল্য গদা ঘুরায়ে নির্ঘোষে,
ছিন্ন করি লতা-কুলে, ভাঙি বৃক্ষ রড়ে,
পশিল হিড়িম্ব রক্ষঃ—রৌদ্র ভগ্নী-দোষে।
৬২
(ঐ।)
ক্রোধান্ধ মেঘের চক্ষে জ্বলে যথা খরে
ক্রোধাগ্নি তড়িত-রূপে; রকত-নয়নে
ক্রোধাগ্নি! মেঘের মুখে যেমতি নিঃসরে
ক্রোধ-নাদ বজ্রনাদে, সে ঘোর ঘোষণে
ভয়ার্ত্ত ভূধর ভূমে, খেচর অম্বরে,
ঘন হুহুঙ্কার-ধ্বনি বিকট বদনে,—
“রক্ষঃ-কুল-কলঙ্কিনি, কোথা লো এ বনে
তুই? দেখি, আজি তোরে কে বা রক্ষা করে!”
মূর্ত্তিমান্ রৌদ্র-রসে হেরি রসবতী,
সভয়ে কহিলা কাঁদি বীরেন্দ্রের পদে,—
“লৌহ-নখ চিল ওই; সফরীর গতি
দাসীর! ছুটিছে দুষ্ট ফাটি বীর-মদে,
অবলা অধীনা জনে রক্ষ, মহামতি,
বাঁচাই পরাণ ডুবি তব কৃপা-হ্রদে!”
“বউ কথা কও”
১০
(“বউ কথা কও।”)
কি দুখে, হে পাখি, তুমি শাখার উপরে
বসি, বউ কথা কও, কও এ কাননে?—
মানিনী ভামিনী কি হে ভামের গুমরে,
ঢাকিয়াছে ঘোমটায় সুচন্দ্র-বদনে?
তেঁই সাধ তারে তুমি মিনতি-বচনে?
তেঁই হে এ কথা-গুলি কহিছ কাতরে?
বড়ই কৌতুক, পাখি, জনমে এ মনে,—
নর-নারী-রঙ্গ কি হে বিহঙ্গিনী করে?
সত্য যদি, তবে শুন, দিতেছি যুকতি;
(শিখাইব শিখেছি যা ঠেকি এ কু-দায়ে)
পবনের বেগে যাও যথায় যুবতী;
“ক্ষম, প্রিয়ে,” এই বলি পড় গিয়া পায়ে!—
কভু দাস, কভু প্রভু, শুন, ক্ষুণ্ণ-মতি,
প্রেম-রাজ্যে রাজাসন থাকে এ উপায়ে।