তীর্থ-সলিল
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯০৮
প্রকাশনা-তথ্য
তীর্থ-সলিল॥
শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ দত্ত-প্রণীত।
কলিকাতা;
সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরী কর্ত্তৃক
৩০, কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট্ হইতে প্রকাশিত।
১৩১৫।
একটাকা।
প্রিণ্টার্স:— মেসার্স মুখার্জ্জি এণ্ড চাটার্জ্জি
৭৬ নং বলরাম দে ষ্ট্রিট্, মেট্কাফ্ প্রেস্ কলিকাতা।
ভুমিকা।
‘তীর্থসলিলে’র প্রায় ত্রিশটি কবিতা ‘সাহিত্যে’-প্রকাশিত হইয়াছিল, অবশিষ্ট নূতন।
‘তীর্থসলিল’ জগতের সমস্ত সাহিত্য-মহাপীঠ হইতে বিন্দু বিন্দু করিয়া সংগৃহীত হইয়াছে। এই পুস্তকে প্রকাশিত সমস্ত কবিতাই নানা দেশের, বিভিন্ন যুগের, বিচিত্র কবিতার পদ্যানুবাদ; ক্ষেত্রবিশেষে অনুবাদের অনুবাদ। সকল স্থলে মূলের ছন্দ রাখিতে পারি নাই; তবে, মূলের ভাব অক্ষুণ্ণ রাখিতে সাধ্যমত চেষ্টা করিয়াছি।
বিশ্বমানবের নানা বেশ, নানা মূর্ত্তি ও নানা ভাবের সহিত পরিচয় সাধনই এই গ্রন্থ প্রচারের প্রধান উদ্দেশ্য। আমার জ্ঞান ও শক্তিতে যতটুকু সম্ভব তাহা করিলাম, আশা করি ভবিষ্যতে যোগ্যতর জনের সাধনাবলে সমগ্র বিশ্বের ভাব সম্পদ বাঙ্গালী সাধারণের আরো একান্ত রূপে আপনার হইয়া উঠিবে।
পরিশেষে এই গ্রন্থ সম্বন্ধে যে সমস্ত কবি ও লেখকের নিকট আমি ঋণী তাঁহাদের প্রত্যেককে আমার অন্তরের কৃতজ্ঞতা বিনয়ের সহিত জ্ঞাপন করিতেছি।
কলিকাতা;
৭ই আশ্বিন; ১৩১৫।
শ্রীসত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
উৎসর্গ।
বঙ্গীয় সাহিত্য-গগনের উজ্জল জ্যোতিষ্ক,
সমস্ত সৎ-সাহিত্যের বিচক্ষণ রসজ্ঞ,
বহু-ভাষা-বিদ্
মনস্বী
শ্রীযুক্ত জ্যোতিরিন্দ্র নাথ ঠাকুর
মহোদয়ের করকমলে,
আন্তরিক শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ
এই ক্ষুদ্র চয়ন-গ্রন্থ খানি অর্পিত হইল।
সূচী
'মিত্র' বন্দনা
‘মিত্র’-বন্দনা।
নিদ্রা বিহীন, চির-জাগ্রত, সারা ভূভাগের পতি,
অযুত নেত্র, অযুত কর্ণ, মিত্রের করি স্তুতি।
সভার মুখ্য, সত্যের মূল, সুন্দর কলেবর,
জ্ঞানের আকর, বলের নিধান, সবার পূজ্যবর!
যুদ্ধের আগে যোদ্ধারা যাঁরে বলি দেয় উপহার,
ঘোড়ার পৃষ্ঠে বসিয়া সওয়ার অর্চ্চনা ক’রে যাঁর;—
নিজের জন্য স্বাস্থ্য মাগে সে অশ্বের দ্রুত গতি,
প্রার্থনা করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিতে শত্রু প্রতি;
মিত্রের বরে প্রার্থনা পুরে শত্রুর হয় ক্ষয়,
দিবার মতন বলি দিব আজি গা’ব মিত্রের জয়!
‘অবস্তা’ গ্রন্থ।
অগ্নি
অগ্নি।
(সামবেদ)
হে চির নবীন! স্তুতির নিধান! বিচিত্র তব কাজ!
স্তন্য তেয়াগি’ আহুতির লাগি’ যজ্ঞে আসিলে আজ!
স্তনহীনা তব জননী অরণি, তাই কিহে অদ্ভুত!
জন্ম মাত্র যৌবন লভি’ হ’লে দেবতার দূত!
উপস্তুত।
অদৃষ্ট ও পুরুষকার
অদৃষ্ট ও পুরুষকার।
অদৃষ্ট, পুরুষকার,—মিছে তৰ্ক সব,
ও সব নহেক কোনো ধর্ম্মের বিভব;
ভাগ্যের প্রাধান্য মেনে গেছে ভীরু সবে,
সাহসী পুরুষকার;—জীবন আহবে।
আল্তাফ্ হুসেন্ আন্সারি৷
অনুতপ্ত
অনুতপ্ত।
প্রভু! কেবা আমি?—আমার ভাবনা তুমি ভাব অবিরত?
দুয়ারে এসেছ খুঁজিতে আমায়, কষ্ট হ’য়েছে কত;
শীতের বিষম রাত্রি কাটালে আমারি প্রতীক্ষায়,
দুরন্ত হিমে দুয়ার বাহিরে দাঁড়ায়ে একাকী, হায়!
প্রভুরে চিনিতে ভ্রম হ’ল মোর, ঘরে না লইনু বরি’,
ইহ পরকালে কি হ’বে আমার তাই সে ভাবিয়া মরি।
কণ্টক-ক্ষত চরণে তোমার শুকায় শোণিত-ধারা,
কিছুই হ’ল না এ অকৃতজ্ঞ অধম জনের দ্বারা।
দৈব বাণীতে ক’য়ে গেছে মোরে—“ওরে কান পেতে শোন্,
হৃদয়-দুয়ারে নিয়ত আঘাত করেন নিরঞ্জন!”
কতবার আমি শুনেছি সে বাণী,—শুনেছি আপন কানে,
মৃদুল মধুর বিষণ্ণ সুর আসিয়া লেগেছে প্রাণে;—
তবু উঠি নাই;—বলেছি ‘দুয়ার সকালে খুলিব কাল’,
হ’য়েছে সকাল, তবু বলি ‘কাল’,—একি হ’ল জঞ্জাল!
লোপ ডি ভেগা।
অন্ধ বালক
অন্ধ বালক।
বল গো কাহারে বলে আলো,
আমি তা’র কিছু যে জানি নি;
চোখে দেখে কি আনন্দ বল,
আমি যে গো অন্ধ চিরদিনই।
কত কি দেখেছ, বল সব,
রবি নাকি আলে। দেয় নিতি!
তাপ আমি করি অনুভব,
কেমনে সে করে দিবা রাতি?
দিন রাতি জানে না এ আঁখি,
ঘুম রাতি, খেলা মোর দিন;
না ঘুমায়ে জেগে যদি থাকি,—
মোর দিন র’বে চিরদিন।
শুনি আমি দুঃখ করে সবে,—
দুঃখ করে ভাবি মম ক্লেশ;
আপনি বুঝি না যে অভাবে,
তা’ আমি সহিতে পারি বেশ।
পা’ব না যা’— সে ভাবনা ছাই,
সে কেবল— মন-সুখে শনি;
গান গাই— রাজসুখে ভাই,
তবু আমি অন্ধ চিরদিনই।
সিবার।
অপূর্ব্ব বিষাদ
অপূর্ব্ব বিষাদ।
হৃদয়ে আমার বিষাদের ভার,
গেছে মন-সুখ ফুরায়ে;
বুঝি কভু হায় পা’ব না সে সুখ
এ জীবনে আর ফিরায়ে।
দরশন তা’র পাই না যেথায়,—
শ্মশান হেন গণি তায়;
বেসুর নীরস সারা সংসার
আমার চক্ষে আজি হায়।
ভেঙে শত চুর হয়েছে হৃদয়,
মনের কিছুই নাহি ঠিক,
কোথা যেন হায় ভাসিয়া বেড়ায়
ঘুরিয়া মরে সে চারিদিক।
হৃদয়ে আমার বিষাদের ভার
গেছে মন-সুখ ফুরায়ে;
বুঝি কভু হায় পা’ব না সে সুখ
এ জীবনে আর ফিরায়ে।
আমি চেয়ে থাকি তারি তরে শুধু
বাতায়ন পথে বিমনা;
তারি তরে যাই ঘরের বাহিরে
আর কাজে মন লাগে না।
মরি কি মূরতি মনোবিমোহন,
কি মধুর তার প্রকৃতি;
সে অধরে সেই সুধামাখা হাসি,
সে চোখে প্রেমের কি জ্যোতি!
সে মধুর বাণী বহি’ শত ধারে
হরণ করে গো প্রাণ মন;
মরি কিবা সুখ পরশে তাহার;
ওহো, আর সেই চুম্বন!
হৃদয়ে আমার বিষাদের ভার
গেছে মন-সুখ ফুরায়ে;
বুঝি কভু হায় পা’ব না সে বুখ
এ জীবনে আর ফিরায়ে।
নিয়ত হৃদয় জ্বলিছে আমার
তারি তরে, হায়, কোথা সে?
বারেকের তরে পাই যদি তারে
রাখি ধরি’ হৃদি-নিবাসে।
বারেক তাহারে পাইলে চুমিতে
—সতত যেমন মানসে,—
বুঝি, এ হৃদয় গলিয়া তখনি
চুম্বনে তা’র যা’বে মিশে!
গেটে।
অবিচার
অবিচার।
দুর্য্যুগে হাওরা গুমরি’ কাঁদে রে,
কথার অতীত ব্যথা তার;
দুর্জ্জয় হাওয়া,—যখন বাজেরে
মেঘ-মৃদঙ্গ অনিবার;
ক্ষুব্ধ পবন অশ্রু-বিকল,
নগ্ন কানন মসী-শাখাদল,
গিরি-গহ্বর বিহ্বল জল
স্মরি’ জগতের অবিচার!
শেলি।
অভাগীর চরম সাধ
অভাগীর চরম সাধ।
আর কি আমার নাম করে কেউ
আমাদের সেই গাঁয়?
ঘাটের পথে,— মাঠের কোলে,—
প্রাচীন বটের ছায়?
সেই যে, যেথা খেলেছিলাম
কতই খেলা, হায়!
মাগো, তোমায় মুখ দেখাতে
হয় মা আমার ভয়,
হতভাগীর এ অপরাধ
ক্ষমার যোগ্য নয়;—
তবু তোমার আমার লাগি’
অশ্রু আজো বয়।
বাবা আমার পুরুষ মানুষ
তাঁর ভ্রুকুটি সয়,
তুমি নারী,— ওই ত’ বাধা
ওইখানেই ত’ ভয়;
কেমন করে ছোঁবে?—যে জন
ছোঁবার যোগ্য নয়?
তবে আজি মর্তে বসে
ডাক্ছি মা তোমায়,
ছেলেবেলার মতন আমায়
ঘুম পাড়াবি আয়;
সাম্নে যে না দারুণ আঁধার
দৃষ্টি ডুবে যায়!
স্টিফেন্ ফিলিপস্।
ইতালির প্রতি
ইতালির প্রতি।
ইতালি! ইতালি! এত রূপ তুমি কেন ধরেছিলে, হায়,
অনন্ত ক্লেশ লেখা ও ললাটে নিরাশার কালিমায়;
এমন ভাগ্য কেন করেছিলে? করেছিলে কোন্ পাপ?
অপরের বর অদৃষ্টে তব কেন হ’ল অভিশাপ?
হ’ত ভাল যদি হ’তে কুৎসিত, অথবা সে হ’তে বলী,—
ভয়ে আসিত না, ভালবাসিত না, চরণে যেত না দলি’।
রূপের গরিমা, মহিমা তোমার পলে পলে তবু, হায়,
আত্ম-কলহে প্রত্যহ আজি তিলে তিলে ক্ষয় পায়।
হ’লে রূপহীনা সহিতে হতনা বর্ব্বর অভিযান,
গিরি লঙ্ঘিয়া আসিত না ‘গল্’ রক্ত করিতে পান;
তা, হ’লে এ ছবি দেখিতে হ’ত না, মরিতে হ’তনা লাজে,
পরের অস্ত্র হস্তে ধরিয়া তুমি ভ্রম’ রণ মাঝে।
কেন যে এ রণ জাননা কারণ,—তবুও বুঝিছ, হায়,
জয় পরাজয় সমান তোমার চির-শৃঙ্খল পায়।
ফিলিকাজা।
উদ্দীপনা
উদ্দীপনা।
ওহো! দেখ দাবানল জ্বলিল অন্তরে!
লম্ফে লম্ফে অট্টহাসে ছাইল কানন;
অশ্ব মোর তীরবেগে ছোটে বায়ু-ভরে।
এ বাহু কিনেছে নাম যুদ্ধে অগণন।
ওহে ভাই, দূর কর নিদ্রা, তন্দ্রা সব,
উদয় গিরির দিকে চল মোর সাথে,
আঁধারে মগন দেশ, নিস্পন্দ নীরব,
অরুণ কিরণ মোরা পা’ব পথে যেতে!
তপ্তলোহ বক্ষে মোর আবেগের ভরে
উঠিছে দুলিয়া,—তুমি এখনো ঘুমাও?
অপূর্ব্ব পুলকে মোর আঁখি আসে ভ’রে
ছুটেছি জ্যোতির দিকে উধাও, উধাও!
উঠ ভাই! জাগ ভাই! নহিলে এখনি
জাগা’বে বিবার্চ্চি বায়ু দংশিয়া সঘনে;—
পুড়িবে কপাল, শিরে পড়িবে অশনি,
বরণ করিতে হ’বে বিফল মরণে।
ম্যাক্সিম্ গোর্কি।
উন্মনা
উন্মনা।
মাগো, আমার মন বসে না
কাট্না নিয়ে থাক্তে ঘরে;
মন আই ঢাই স্বস্তি না পাই,
বুকের ভিতর কেমন করে।
কাল্কে যা’রে দেখেছিলাম
তারেই নয়ন খুঁজে মরে;
এক্টি বারের চোখের দেখায়
পরাণ কি গো এমনি করে!
স্যাফো।
উৎকণ্ঠিতা
উৎকণ্ঠিতা।
ওই গো আবার আকাশ ডাকে,—
আকাশ ডাকে ওই!
এমন সময় বাইরে থাকে?—
ছুটিই বা তা’র কই?
ওগো, তুমি ফিরে এস, ফিরে এস গো!
তোমায় ঘরে দেখে আমি নির্ভাবনা হই।
আবার আকাশ উঠছে ডেকে;
কখন গেছে সেই;
বাড়্ছে বাতাস থেকে থেকে,
ফিরতে কি তা’র নেই?
ওগো, তুমি ফিরে এস ফিরে এস গো!
তুমি কাছে থাকূলে ত’ ভয় পাইনে কিছুতেই।
ভেঙে বুঝি পড়্ল আকাশ
পড়্ল বুঝি ওই;
এমন দিনে ও নেই অবকাশ,—
একলা সারা হই!
ওগো, তুমি ফিরে এস ফিরে এস গো,
তোমার কাছে বসে আমি নির্ভাবনা হই।
চীন দেশের ‘শী-কিং’ গ্রন্থ।
ঊষায় ও নিশায়
ঊষায় ও নিশায়।
জাগিনু যখন ঊষা হাসে নাই,
সুধানু ‘সে আজ আসিবে কি?’
চ’লে যায় সাঁঝ, আর আশা নাই,
সে ত’ আসিল না, হায় সখি!
নিশীথ রাত্রে, ক্ষুব্ধ হৃদয়ে,
জাগিয়া লুটাই বিছানায়;
আপন রচন ব্যর্থ স্বপন
দুখ ভারে নুয়ে ডুবে যায়।
হায়েন্।
একটি মূষিকের প্রতি
একটি মূষিকের প্রতি
ওরে কচি! ওরে জড়সড়! নতমুখ!
কত আতঙ্কে দুরু দুরু তোর বুক,
অত দ্রুত আর হবেনা পলা’তে
তুরিত চলি’
মারিতে ধরিতে আমি যাবনারে
লাঙল তুলি’।
সত্যই ব্যথা পেয়েছি পরাণে, ভাই,
স্বভাবের ভাব—মানুষ তা রাখে নাই;
অকারণ নয় তোর এই ভয়,—
আমারে ত্রাস!
ধরাচর তবু তোরি সহচর,
মরণ-দাস।
সংশয় নাই,—তস্কর তুমি ভাই,
তা’তেই বা কি?―বেঁচে থাকা ও ত চাই;
বোঝা বোঝা ধানে দু’একটি শীষ,—
মাঙন এই;
সবা সনে বেঁটে নেব দেব-দান
তাড়াতে নেই।
ছোটবাসাটি ও ভেঙে গেছে, হায়,
যেটুকু আছে তা’ বাতাসে উড়ায়;
নাহিও কিছুই নূতন গড়িতে,—
পাতা কি ঘাস,
এসে প’ল ব’লে এদিকে পোষের
শীত-বাতাস।
দেখি মাঠ ঘাট হ’ল তৃণহীন,
শীত ঘনাইয়া আসে দিন দিন,
ভেবেছিলি হেথা জাড়ের ক’দিন
থাকিবি বেশ;
দলিয়া কোটর লাঙল কঠোর
গেল রে শেষ!
ওই অতগুলি তৃণ, পাতা, লতা,
কত শ্রমে কেটে এনেছিলি হেথা;
ফলে হ’লি দূর,—নাহি আর তোর
ঘর দুয়ার,
সহিতে বিধন শিলা-বরিষণ,
হিম, তুষার।
একা তুই ন’স্ দেখ্রে ইঁদুর,
কল্পনা যা’র হ’য়ে গেছে চূর,
ইঁদুর নরের অনেক মানসই
হয় বিফল;
সুখ আশা হায়, পিছে রেখে যায়
ব্যথা কেবল।
তবু আছ বেশ, মোর তুলনায়,
শুধু অনুভব,—আছ যে দশায়,
হায় রে মোরা যে পিছে দেখি ঘোর
ঘটনা চয়;
সমুখে দেখি না,—শুধু অনুমান,—
তা’তেও ভয়!
বার্ণ্স
একা
একা।
একাকী যদি কাটিল কাল, বাঁচিয়া সুখ নাই;
শোভার নিধি কি হ’বে?—যদি ভাবুক নাহি পাই।
যে দিন দেখা না পাই তব সে দিন হ’ক নাশ,
তোমায় ছেড়ে সুখের আশা মরীচিকার আশ।
ভবভূতি।
কবি ও মানব জীবন
কবি ও মানবজীবন।
জীবন—সে ত’ ভূতের সাথে রণ,
যে ভূত থাকে মনের গুহা মাঝে;
কবি ত সেই—নিজেই যেই জন
বিচার করে নিত্য নিজ কাজে।
ইব্সেন্
কবির প্রেম
কবির প্রেম।
গোলাপ যাহা প্রণয় যদি হ’ত তাই,
আমি তা’রি হ’তাম পাতার মত;—
দোঁহার তনু বাড়িত একই সাথে,
গানের দিনে কিম্বা দুখের রাতে
ফুলের বনে কিম্বা মাঠের মাঝে ভাই,
হর্ষে বিভোর কিম্বা শোকে হত!
গোলাপ যাহা প্রণয় যদি হ’ত তাই,
আমি তা’রি হ’তাম পাতার মত!
‘কথা’ যাহা আমি গো যদি হ’তাম তাই,
প্রণয় যদি হ’ত ‘সুরে’র মত;—
মূর্চ্ছনা কি উচ্চগ্রামে, খাদে
দোঁহার সর্ব্ব মিশিত এক(ই) সাথে,
দুপুর বেলা মধুর বৃষ্টিপাতে ভাই,
হর্ষে বিভোর পাখী দু’টির মত;
‘কথা’ যাহা আমিও যদি হ’তাম তাই,
প্রণয় যদি হ’ত সুরের মত!
জীবন যাহা—তুমি গো যদি হ’তে তাই,
আমি হ’তাম মরণেরি মত!
রৌদ্র বৃষ্টি হ’ত একই সাথে,
চৈত্র মাসের নূতন পাতে পাতে,
চৈত্র মাসের সকল শাখে শাখে ভাই
ফুলে যখন ফলের গন্ধ যত।
জীবন যাহা—তুমি গো যদি হ’তে তাই,
আমি হ’তাম মরণেরি মত!
তুমি গো যদি দুখের হ’তে ক্রীতদাস,
আমি হ’তাম হরষেরি সাথী;—
ভাগ্য ল’য়ে চলিত শুধু খেলা,
কখনো হাসি, কখনো হেলাফেলা,
বালক সম—বালিকা সম পরিহাস,
অরুণ সাথে অশ্রুময়ী রাতি!
তুমি গো যদি দুখের হ’তে ক্রীতদাস,
আমি হ’তাম হরষেরি সাথী!
তুমি যদি ‘মধু’র প্রিয়া হ’তে রাণী,
আমি হ’তাম ‘মাধবে’রি রাজা;—
মুকুল, ফুল, রাখিয়া বাজি মেলা,
পাতার পাশা হ’ত মোদের খেলা,
নিশার মত হ’ত ঊষার হাসিখানি,
নিশি হ’ত অরুণ রাগে মাজা!
চৈত্রনিশির তুমি যদি হ’তে রাণী,
আমি হতাম বসন্তেরি রাজা!
তুমি যদি সুখের প্রিয়া হও রাণী,
আর আমি হই বেদনারি রাজা;—
মদনে মোরা করিব দোঁহে শীকার,
ছিঁড়িয়া পাখা ঘটাব তা’র বিকার,
মুখেতে তা’র লাগাম এক দিব টানি,—
শিখাব তা’রে নাচনেরি মজা!
তুমি যদি সুখের প্রিয়া হও রাণী,
আর আমি হই দুঃখব্যথার রাজা!
সুইন্বার্ণ্।
করুণার বার্ত্তা
করুণার বার্ত্তা।
মধ্য-দিনের আলোর দোহাই, নিশির দোহাই,—ওরে!
প্রভু তোরে ছেড়ে যান্ নি কখনো, ঘৃণা না করেন তোরে
অতীতের চেয়ে নিশ্চয় ভাল হবেরে ভবিষ্যৎ,
একদিন খুসী হ’বি তুই লভি’ তাঁর কৃপা সুমহৎ।
অসহায় যবে আসিলি জগতে তিনি দিয়েছেন ঠাই,
তৃষ্ণা ও ক্ষুধা—দুঃখ যা’ছিল ঘুচায়ে দেছেন তাই;
পথ ভুলেছিলি,—তিনিই সুপথ দেখায়ে দেছেন তোরে,
সে কৃপার কথা স্মরণে রাখিস্;—অসহায় জনে, ওরে!
দলিস্নে কভু; ভিখারী আতুর বিমুখ যেন না হয়,
তাঁর করুণার বারতা ঘোষণা কর রে জগতময়।
কোরাণ।
কর্ম্ম ও কল্পনা
কর্ম্ম ও কল্পনা৷
কে আছ হে সুচতুর! কর শুভকাজ,
দিন না ফুরায় শুধু শুভ কল্পনায়;
জীবন মরণ সাথে মিশাইয়া, আজ,
অনন্ত কালেরে কর ছন্দ মধুময়।
গেটে৷
কাব্যাধিষ্ঠাত্রীর প্রতি
কাব্যাধিষ্ঠাত্রীর প্রতি।
দুঃখ নাই কল্পনা আমার,—তুমি যদি নাহি হও জন-বিমোহিনী;
তবে যদি নাহি পায় মর্ম্ম পরশিতে,—অভাগিনী তুমি!
আজ যদি সমস্ত জগৎ ছলায় কলায় বাঁধা পড়ে গো আপনি;—
সাহসে হৃদয় বাঁধ, দেখ’—ছেড় না সরল পথ তুমি!
সত্য রত্ন অমূল্য সে ধন,—যদ্যপি সে ধনে ধরে ও হৃদয়-খনি,
সুখ্যাতি ও অখ্যাতির বায়ু-বাণ হ’তে মুক্ত তবে তুমি!
যদি তুমি না পার দেখাতে ফিরাইয়া জগতেরে নিজরূপ খানি,
দেখ গো আপনি চেয়ে আপনার পানে,—গরবিনী তুমি!
বাস্তবের গভীর সাগর—তরঙ্গ সংক্ষুব্ধ তা’রে করেছ আপনি;
হঠাৎ-কবির দল মরিবে ডুবিয়া, বেঁচে র’বে তুমি!
সে কাল গিয়াছে চ’লে এবে,—মিথ্যা যবে কবিতার আছিল সঙ্গিনী
এখন ফিরাও গতি, আর পূজা তা’র করিয়ো না তুমি!
লুক্কায়িত গৌরবের ‘ভেদ’—প্রাণপ্রিয় স্বদেশের আরাধনে, ধনি;
কিঙ্করের যোগ্যতাও থাকে যদি তব—সম্রাট্ সে তুমি!
রসজ্ঞের নয়নে নয়নে থাকা যদি আনন্দের হয় বিমোহিনী,
সম্পর্ক রেখ না তবে মুর্খ, অরসিক, অন্ধ সনে তুমি!
যদি কেহ বুঝে তব গুণ, একজন! একজন! লও তারে গণি’;
তোর গর্ব্ব রেখে থাকে ‘হালি’ তা’র গর্ব্ব রেখ সখী তুমি।
আলতাফ্ হুসেন আন্সারি৷
কে
কে?
কে ছিল আদিতে? কে রাখিল ধরি’
দ্যুলোকে ভূলোকে আপন স্থানে?
কে অদ্বিতীয় পতি সকলের?
কোন্ দেবে পূজি হব্যদানে?
শকতি ও প্রাণ যে করিল দান?
দেবতারা যাঁর শাসন মানে?
মৃত্যু অমৃত ভৃত্য যাঁহার?
কারে পুজি মোরা হব্য-দানে?
যিনি মহিমায় করেন বিরাজ
নিখিল জীবের নয়নে প্রাণে?
পশু, পাখী, নর, যাঁহার অধীন?
কা’র পূজা করি হব্য-দানে?
রসের আধার সমুদ্র আর?
হিমাচল যাঁর কীর্ত্তি জানে?
দিকে দিকে যাঁর অভয় হস্ত?
কোন্ দেবে পূজি’ হব্যদানে?
অসীম ব্যোমের পরিমাণ করি,’—
বাতাস উজলি’ কিরণ-স্নানে,—
পৃথিবীরে দৃঢ় ক’রেছেন যিনি?
কারে পূজি মোরা হব্যদানে?
লভি’ প্রতিষ্ঠা ক্রন্দসী যাঁর
নিরত নিয়ত মহিমা গানে?
যাঁহার বিভায় দীপ্ত তপন?
কার পূজা করি হব্য-দানে?
ত্রিভুবন-ব্যাপী সলিল-গর্ভে
জাত জাতবেদা যাঁহারে আনে?
নিথিল দেবের জীবন-বস্তু?
কোন্ দেবে পূজি হব্যদানে?
নিপুণ চক্ষে বিপুল বিশ্ব
যিনি হেরিলেন সলিলাধানে,
সকল দেবের অধিদেব যিনি?
কারে পূজি মোরা হব্য-দানে?
পৃথিবীর পিতা, স্বর্গ-জনিতা,
তিন লোক বাঁধা যাঁর বিধানে,
তিনি যেন কভু না হ’ন বিমুখ,
যাঁরে পূজি মোরা হব্য-দানে।
সকল প্রজার প্রজাপতি! দেব!
বিশ্ব শাসিতে কে আর জানে?
মোদের আহুতি করছে গ্রহণ,
কামনা পূরাও কাম্য-দানে।
হিরণ্য-গর্ভ ঋষি।
কোকিল
কোকিল।
আরেক পাখী সে বেঁধেছিল বাসা,
অতিথির বেশে হ’ল তোর আসা,
বাসার সবে যে হ’ল কোণ-ঠাসা,
কোকিল! ওরে কোকিল!
অচেনা পক্ষী-জনকের কাছে,
অজানা পক্ষী-জননীর’ কাছে,
কণ্ঠে না জানি কি যে তোর আছে,
পাগল যাহে নিখিল!
ছাড়িয়া আপন কানন-নিবাস,—
যেথায় রূপালি কুসুমের হাস,
সুরে ভরি’ দিয়া ফাল্গুনী বাতাস
আয় তুই হেথা আয়!
কমলা-লেবুর শাখে নেমে পড়,
ফুলগুলি যা’র ঝরে ঝরঝর,
ফুল ঝরঝর গান নিরন্তর
আয়, আয় মধু-বায়!
সারাটি সকাল, সকল দুপুর,
সারা দিনমান শুনি ওই সুর,
লাগে না যেন গো কভু অমধুর
ও সুর আমার কাণে;
মন দিব ঘুষ,—এস,—নিয়ে যাও,
দূর দেশে আর হ’য়োনা উধাও,
কমলা-লেবুর শাখে গান গাও,—
থাক, থাক এইখানে।
‘ম-ন্যো-শু’ গ্রন্থ।
ক্ষীর ও নীর
ক্ষীর ও নীর।
শাস্ত্র অনেক, কাব্য অনেক, আয়ু-সংক্ষেপ, হায়!
দুর্ঘটনার অন্ত নাহিক, বাধা দেয় পায়, পায়;
সুধী যেইজন মরালের মত স্বভাবটি হয় তা’র,
সে করে যতনে ক্ষীর-সংগ্রহ নীর করি’ পরিহার৷
বৃদ্ধ চাণক্য।
গান
গান।
নূতন মধুর লালসা-লোলুপ অলি হে!
আম্র-মুকুলে গিয়েছিলে তুমি চুমিয়ে?;
আজি কমলের দুয়ারে মাত্র বুলিয়ে,
একেবারে তারে গেলে কি ভ্রমর ভুলিয়ে!
কালিদাস।
গুপ্ত প্রেম
গুপ্ত প্রেম।
(তিব্বত)
ডাঙায় ওই উঁচু ডাঙায়,
ফুল ফুটেছে শাদায় রাঙায়,
ওরে রাখাল ভাই!
নূতন তর ফুল ফুটেছে,
আন্ রে তুলে তাই!
আন্রে তুলে নুতন ফুলে,
আরে তুলে তায়;
হাতটি দিয়ে তুলিস্ নে রে
শুকিয়ে যাবে হায়!
পরাণ দিয়ে তুলে এনে
হিয়ায় বাঁধ তায়;
বুকের মাঝে গোপন রেখ,—
প্রাণের মাঝে, হায়।
গোপিকার গান
গোপিকার গান।
ছি ছি, কি লাজ, রাখাল! রাখাল!
লজ্জা সরম নাই;
চুমা দিয়ে পালিয়ে যাবে
দুইছি যখন গাই।
গোলাপ কত ফুট্ছে আবার,
বকুল হেসে লুট্ছে আবার,
তুমি এসে চুমা দিলে দুইছি যখন গাই!
রাখাল এসে পিছন থেকে
চুমা দিয়েই পালাল ভাই,
ধর্ব তা’রে কেমন ক’রে
দুইতে দুইতে গাই;
পায়রা কত উড়্ছে আবার,
কোকিলে গান জুড়্ছে আবার,
রাখাল এসে চুমা দিলে দুইছি যখন গাই।
এস ফিরে রাখাল! রাখাল!
চুমা দিয়ে যাওনা ভাই,
এড়ানো কি যায় কখনো
দুইতে দুইতে গাই;
পাপিয়া গানে মগন আবার,
আজকে যে গো মিলন সবার,
পিছন হ’তে চুমা দে যাও, দুইতে দুইতে গাই!
টেনিসন্।
গোলাপ গুচ্ছ
গোলাপ-গুচ্ছ।
সারাদিন আমি বেঁধেছি গোলাপ
গুচ্ছ করি’,
এবে একে একে দলগুলি তা’র
নিতেছি হরি’;
দিতেছি ছড়ায়ে যে পথে আমার
সে জন যায়,
একবার সেকি চাহিবে না ফিরি’?
চা’বে না? হায়!
তবে পড়ে থাক্,— তবে পড়ে থাক্,—
মরিয়া যা’বে?
আমি ভেবেছিনু নয়নে তাহার
পড়িয়া যা’বে।
হায়, কতকাল করিয়াছি শ্রম
সাধিতে হাত,
ফিরাতে কঠিন আঙুল বীণায়
দিবস রাত;
আজিকে আমার গাহিতে যতন
জানি যে গান,
সে কি শুনিবে না? হায় গো সেজন
দিবে না কান?
যাক্ ছিঁড়ে তার, গান থেমে যাক্
হৃদয় তলে;
আহা যদি আজ সেজন আমায়
গাহিতে বলে!
সারাটি জীবন শিখেছি শুধুই
বাসিতে ভাল,
এবার ভেবেছি সাধিয়া দেখিব
জ্বলে কি আলো;
মরম-কাহিনী শোনা’ব সে জনে,
শুনিবে সে কি?
দিবে সে কি মোরে স্বরগের সুখ?
ভালই, দেখি।
যে খুসী হারাক্ আমি ত’ বলি গো
এমনি ধারা,—
স্বর্গ যা’দের করতলে আসে
ধন্য তারা!
রবার্ট ব্রাউনিং।
চরম শান্তি
চরম-শান্তি।
প্রখর সূর্যের তাপে কি ভয় এখন?
দুরন্ত শীতেরে কেবা ডরে?
সমাপ্ত হ’য়েছে কর্ম্ম, পেয়েছ বেতন,
গেছ চলি’ আপনার ঘরে।
স্বর্ণ জিনি’ বর্ণ যা’র সে জন (ও) নিশ্চয়,
ধাঙ্গড়ের সঙ্গে হ’বে ধূলি মাঝে লয়।
অত্যাচার নারে আর স্পর্শিতে তোমায়,
ভ্রূকুটির ভয় নাহি আর,
এড়ায়েছ অশনের বসনের দায়,
তৃণ, তরু, সমান তোমার।
পাণ্ডিত্য, ঐশ্বর্য্য, রাজ্য,—তা’ও সুনিশ্চয়,
এমনি করিয়া হ’বে ধূলি মাঝে লয়।
বজ্র বিদ্যুতের ভয় নাহি, নাহি আর,—
যারে ভয় করে সর্ব্ব জন;
নিন্দা নারে পরশিতে কিম্বা তিরস্কার,
দুঃখ সুখ সব সমাপন।
প্রেমিক, প্রেমিকা, হায়, তারাও নিশ্চয়,
এমনি করিয়া হ’বে ধূলি মাঝে লয়।
শেক্সপীয়ার।
চাতকের প্রতি
চাতকের প্রতি।
বন্দি তোমা’ আনন্দ-মূরতি!
পাখী তুমি কখনত’ নহ,
স্বর্গে কিবা তা’রি কাছে অতি
ভরা-প্রাণে ঢাল স্বপ্ন-মোহ;
না শিখিয়া, না ভাবিয়া আহা, অজস্র গাহিছ অহরহ!
ঊর্দ্ধে দূরে,—দূর দূরান্তরে
ধরা হ’তে উড়েছ উধাও,
গূঢ় নীল গগণ-সাগরে
পুঞ্জ তেজ সম ছুটে যাও,
গাহিয়া উড়িয়া চল কত,—উড়িয়া কতই গান গাও।
শ্রান্তিভরে সূর্য্য পড়ে ঢলি’,
তাহারি সে সুবর্ণ-আলোকে
নেঘ-মালা উঠিছে উজলি’,
তুমি তাহে সাঁতারিছ সুখে,
অশরীরী আনন্দ যেন গো ছাড়া পেয়ে ছুটেছে দ্যুলোকে৷
গলিয়া পাণ্ডুর সন্ধ্যা মিশে
তোমারি প্রয়াণ-পথ ‘পরে;
পাইনা তোমার আর দিশে,
তারা যেন তীব্র রবিকরে;
উচ্ছ্বাসের উচ্চ স্বপ্ন তব, আহা তবু শুনি প্রাণ ভ’রে৷
শুভ্রকায়, রজত-গোলক,
শশাঙ্কের রশ্মির সমান,—
ক্ষীণ যা’র প্রদীপ্ত আলোক
ঊষার কিরণে ম্রিয়মাণ;
নয়নে যায়না দেখা, শেষে, আছে শুধু হয় অনুমান৷
মুখরিত ধরণী, সমীর,
হয়েছে তোমারি সুরে হায়,
নির্ম্মেঘ আকাশ যবে স্থির
নগ্ন-কায়া যামিনী ঘুমায়,
জ্যোৎস্না যেন বৃষ্টি করে চাঁদ, গগনের কূল ভেসে যায়৷
তুমি যে কি আমরা জানিনা,
জানিনা কি তুলনা তোমার,
ইন্দ্রধনু হ’তেও ঝরেনা
তেমন উজল বারিধার,—
তুমি যেথা সেথাই যেমন কলতান,—সঙ্গীত বিধার।
ভাবাবেশে উন্মাদ পরাণ,
অচেনা সে কবির মতন,—
অযাচিত গেয়ে যাও গান
মুগ্ধ ধর। নহে যতক্ষণ,—
অভিনব আশা-আশঙ্কায় যতক্ষণ নাহি ডুবে মন।
অবরিতা নৃপবালা হেন,
প্রাসাদের নিভৃত শিখরে,
ভালবাসা-ভারে উনমন
ক্লান্ত হিয়া জুড়াবার তরে
প্রেমেরি মতন মধুগান গাহ কুঞ্জ প্লাবিয়া সুস্বরে।
সোনালি সে জোনাকীর মত,—
হিমজলে পাপ্ড়ির স্তরে
ঢাল গো তরল আলো কত,
নিশীথে, অজ্ঞাতে, অগোচরে;
ঝরা ফুল আর তৃণদল রাখে যা’রে ঘিরিয়া আদরে।
পুঞ্জ-পত্র কুঞ্জের ভিতরে
গোলাপের মত নিমগন;
যতক্ষণ গন্ধ না বিতরে,—
তপ্ত বায়ু করে আলিঙ্গন;
শেষে সেই সৌরভেরি ভারে ক্লান্ত পক্ষ মন্থর পবন৷
বসন্তের বর্ষণের রব
কম্পন-চঞ্চল তৃণ‘পরে—
বর্ষণ-জাগ্রত ফুলে সব;—
যত সুর নিখিলে বিহরে,—
ক্লেদহীন, উচ্ছ্বাসে নবীন—তব সুর জিনে সকলেরে।
পাখী কিবা কিন্নর! শিখাও,
পূর্ণ প্রাণ কি ভাব-সৌরভে;
এমন ত’ শুনিনি কোথাও
মদিরা কি প্রণয়ের স্তবে,
স্বরগের সুধার প্লাবন আবেগে ঢালিতে মর ভবে৷
পরিণয়-নিশির সাহানা,
বিজয়ীর বিজয়ের তান,
ও গানের নহে সে তুলনা,
মিথ্যা তার মাধুরীর ভাণ;
কি যেন অভাব সে সকলে,—লুক্কায়িত—তবু বর্ত্তমান৷
বল, পাখী, কোথা সে নির্ঝর,—
উৎসারিত যাহে তব গান?
কোন্ গিরি, সাগর, প্রান্তর?
কোন্ মেঘ সোনার সমান?
সে কোন্ পাখীর ভালবাসা? সে কোন্ ব্যথার অবসান?
তব গান বরিষে অমিয়া,
নাহি তাহে অবসাদ-লেশ,
কভু বুঝি বিরক্তির ছায়া
আসে নাই দিতে তোমা’ ক্লেশ;
প্রেম জান; জান না প্রেমের তৃপ্ত সুখে দুঃখ কি অশেষ৷
জাগিয়া কি স্বপনে ঘুমায়ে
জান কি বারতা মরণের?
মর নর আমাদের চেয়ে
গভীর প্রকৃত কথা ঢের?
নহে তব গীতি স্রোতম্বিনী কেন চির সৌন্দর্য্যের ফের?
আগে পিছে চাহি চারিভিতে,
কামনা—কোথাও যাহা নাই;
আমাদের প্রাণের হাসিতে
মিশে আছে বেদনা সদাই;
সব চেয়ে সুমধুর গান—সব চেয়ে দুখের কথাই।
তবু মোরা পারিতাম যদি
ঘৃণা, ভয়, গর্ব্ব তেয়াগিতে;
জনমি’ যদি গো নিরবধি
নাহি হ’ত অশ্রু বরষিতে,
জানি না শকতি হ’ত কিনা তোমার ও আনন্দে মিশিতে৷
আনন্দের ছন্দ আছে যত,
যত আছে সুর, লয়, তান,—
রত্ন সম কাব্য শত শত
গ্রন্থের ভাণ্ডারে শোভমান,—
কবি বলে, ধরণী-বিরাগী, সকলের শ্রেষ্ঠ তব গান৷
আনন্দের জান যে বারতা
শিখাও হে তাহার সন্ধান,
ওই তব সংহত মত্ততা
কণ্ঠে মোর দিক্ আসি তান,
বিশ্ব বাহে শোনে গো বিস্ময়ে—মুগ্ধপ্রাণ আমারি সমান!
শেলি।
চিঠি
হিন্দুর ’পরে নির্ভর করে হিন্দুর যত আশা,
তবু মহারাণা ভুলিয়া আছেন তাহাদের ভালবাসা!
রাজপুতানার যত সর্দ্দার পৌরুষহীন আজ,
রাজপুতানার কুল-ললনার গেছে সম্ভ্রম-লাজ।
আকবর শাহ সমভূম সবে করিয়া ফেলিল প্রায়,
সবার দৃষ্টি আজিকে কেবল প্রতাপের মুখ চায়।
আকবর শাহ দালাল হ’য়েছে রাজপুতানার হাটে,
সবারে কিনেছে; প্রতাপে কিনিতে ধন নাই তার গাঁটে।
রাজপুতকুলে জন্ম লভিয়া মান কে হারাতে চায়?
তবুও সে ধন অনেকেরি গেছে বিকায়ে নৌরোজায়!
যবে একে একে হ’বে ক্ষত্রিয় শ্রেষ্ঠ রত্নহীন,
চিতোরের নারী আসিবে কি রাণা এই হাটে কোনোদিন?
অর্থ গিয়েছে, রাজ্য গিয়েছে তবুও প্রতাপ রায়,
পরম যতনে আছেন নিরত সে নিধির রক্ষায়।
নিরুপায় হ’য়ে অনেকে গিয়েছে, অপমানে জর্জ্জর,
সে কালিমা মুখে মাখে নাই শুধু হামির বংশধর।
প্রতাপ কোথায় এত বল পায় লোকে জিজ্ঞাসা করে,
শকতি তাঁহার তরবারে আর বীরোচিত অন্তরে।
মানুষ-হাটের এ দালাল কিছু রহিবে না চিরকাল,
মরিতে হইবে; তখন দেশের দূরে যা’বে জঞ্জাল;
সে দিন সবারে হ’বে বাহিরিতে প্রতাপের সন্ধানে,
বীর্য্যের বীজ হইবে রোপিতে বিজন রাজস্থানে;
তুমি শুধু জানো মান বাঁচাইতে, তাই সবে মুখ চায়,
দেশের গর্ব্ব কর প্রতিষ্ঠা অভিনব মহিমায়।
পৃথ্বীকবি (বিকানীর)।
চিত্রকূট
চিত্রকূট
ওই দেখ তরু‘পরে ফুলরাশি থরে থরে
শোভিছে প্রদীপমালা সম;
শিশির গিয়েছে ব’লে যেন তা’রা কুতুহলে
প’রেছে মালিকা মনোরম!
হেথায় ভেলার বন, বিল্ব-তরু অগণন
ফলভারে অবনত কায়;
কে করিবে উপভোগ এ কাননে নাহি লোক,
ফলে ফল বিফলে হেথায়।
ওই দেখ গাছে গাছে কেমন ঝুলিয়া আছে
মধুক্রম মধুমক্ষিকার;
ডাহুক ডাকিছে জলে, শিখি কেকারব ছলে
উত্তর দিতেছে যেন তার!
আপনি ঝরিয়া ফুল ঢেকেছে বিটপী-মূল,—
রচিয়াছে ফুলের আসন;
ফিরে করী দলে দলে, বিহগের কলকলে
চিত্রকূট মুগ্ধ করে মন।
বাল্মীকি
চির শরণ
চির-শরণ।
আমার রাখাল আপনি দয়াল, আমার ভাবনা কিরে?
তিনি রেখেছেন শ্যামল ক্ষেত্রে শান্ত হ্রদের তীরে;
তিনিই আমার দুর্ব্বল চিতে শক্তি করেন দান,
সুপথে চালান আমায় দয়াল নামের রাখিতে মান;
মরণের ছায়া ঘিরে যদি তবু করিব না কিছু ভয়,
তুমি আছ সাথে সহায়! শরণ! জানি আমি নিশ্চয়।
শত্রু পুরীতে রক্ষা করেছ আমারে দণ্ডধর!
অভিষেক মোরে করি’ আনন্দে ভরেছ এ অন্তর;
এমনি করুণা রহে যেন প্রভু! মোর ’পরে চিরদিন,
চিরদিন যেন তোমারি ছায়ায় রহিগো ভাবনা হীন।
রাজা দায়ুদ।
চুম্বন
চুম্বন।
প্রথমেতে কীটের চুম্বন!
চুম’ মোরে,—যেন তুমি পার না বুঝিতে
কোনো মতে,—কোন্ ভাবে আজি রজনীতে,—
ফুল যা’রে বল তুমি,—এ মোর আনন—
শতদল—গুটায়েছে পাপ্ড়িগুলি তা’র;
চুম্বন-পরশ দাও সর্ব্বত্র তাহার!
ফুটিব পরশ চিনি’ অমনি তখন!
ভ্রমরের চুম্বন এবার!
চুম’ মোরে,—যেন তুমি পশেছ অন্তরে
হর্ষভরে,—একদিন দিবা দ্বিপ্রহরে;
উড়াতে না পারে হায় সে দাবী ত’ আর
মুকুল সাহস ক’রে;—সব পর হাত;
তাই শেষে, শ্লথ-দল পুষ্প সম, নাথ!
এ ফুলে পাড়াই ঘুম বাহুতে তোমার!
রবার্ট্ ব্রাউনিং।
জপের গুটি
জপের গুটি।
জীবে প্রেম যাঁর চরম শিক্ষা আমি সে গুরুর শিখ্,
মর্ম্মতলেরো মর্ম্ম যেজন জাগ্রত অনিমিখ্;
অনুসন্ধান যে করেছে তাঁর সেই ত’ পেয়েছে ঠিক্!
নিশ্বাস গুলি যে মালার গুটিসে কেমন জপ মালা!
নিভৃতে আসিয়া করেছে আপনি অনাগত কাল আলা!
নিশ্বাস-মণি-মালা কে দেখেছে!—মালার উজল জ্বালা!
নানক।
জাতীয় সঙ্গীত (ইংলণ্ড)
জাতীয় সঙ্গীত।
(ইংলণ্ড)
রাজারে রক্ষা কর কর ভগবান!
রাজা আমাদের হউন আয়ুষ্মান্!
জয়ী কর তাঁরে, দাও তাঁরে যশ,
দাও দাও তাঁরে বিমল হরষ,
সুখে শান্তিতে রাজ্য করুন্ এই কর ভগবান!
জাগ, জাগ, প্রভু! জাগ, জাগ, ভগবান!
শত্রু দলিতে হওহে অধিষ্ঠান।
নষ্ট কর হে শত্রুর ছল,
নাশ দুষ্টের বুদ্ধি ও বল,
হে চির-শরণ, বিপদে মোদের অভয় কর হে দান।
ভাণ্ডারে তব যা’ আছে শ্রেষ্ঠদান,
সদয় হৃদয়ে দেহ তাঁরে ভগবান;
রাজা আমাদের বিধি ও বিধান,
বজায় রাখুন; হে কৃপা-নিধান!
মোরা যেন সদা মনে মুখে তাঁর গাহি মঙ্গল-গান।
কেরি।
জাতীয় সঙ্গীত (নরোয়ে)
জাতীয় সঙ্গীত।
(নরোয়ে)
ঝঞ্ঝা-মথিত সাগরোত্থিত
ভালবাসি এই দেশ,
হ’ক বন্ধুর,— আকর্ষণের
তবু তা’র নাহি শেষ।
ওগো ভালবেসো, তারে ভালবেসো,
না ভুলি’ পূর্ব্ব-কথা,
ভুলো না মোদের ‘সাগা’-সঙ্গীত,—
স্বপ্নময়ী সে গাথা।
বীর-সৈন্যের সহায়ে হ্যারাল্ড্
এই দেশ বাঁচায়েছে,
হাকন্ রক্ষণ ক’রেছে, ইভিণ্ড্
গান তার গেয়ে গেছে;
রক্তে এঁকেছে ক্রুশের চিহ্ন
নিশানে ওলাফ্ রাজা,
স্বেয়ার ভেঙেছে ভণ্ডামি,—ভয়
করেনি পোপের সাজা।
নর্স্ম্যান্! তুমি যেখানেই থাক
গাহিয়ো তাঁহার জয়,
জয়ী যিনি তোমা’ করেছেন, যবে
জয়ে ছিল সংশয়।
পিতৃগণের বীর জল্পনা,—
মায়েদের আঁখিজল,—
পন্থা মোদের করেছে বিশদ,
অধিকার অবিচল।
বটে গো আমরা বাসি ভাল এই
ঝঞ্ঝা-মথিত দেশ!
হ’ক বন্ধুর,— মায়ামন্ত্রের
তবু তার নাহি শেষ!
পূর্ব্ব পুরুষ যুঝিল যেমন
দেশের মুক্তি তরে,
ডাক পড়িলেই মোরাও সকলে
যুঝিব তেমনি ক’রে।
জন্ষ্ট্যার্ণ্ জোর্ণ্সন্।
জাতীয় সঙ্গীত (ফ্রান্স্)
জাতীয় সঙ্গীত।
(ফ্রান্স)
ফরাসীভূমির সন্তান সবে আয় রে আয় রে আয়!
কীর্ত্তিলাভের শুভ অবসর যায় রে বহিয়া যায়।
অত্যাচারের উদ্যত ধ্বজা রক্তে করিয়া স্নান,
আমাদের ’পরে বৈর সাধিতে হ’য়েছে অধিষ্ঠান!
শুনিছ কি সবে কি ভীষণ রবে কাঁপায়ে জলস্থল,
দম্ভের ভরে গর্জ্জন করে শত্রু-সৈন্য-দল!
তা’রা যে আসিছে কেড়ে নিতে বলে তোমার সকল ধন,
গ্রাসিতে শস্য-ক্ষেত্র নাশিতে পুত্ত্র ও পরিজন!
ধর হাতিরার ফ্রান্সের লোক, বাঁধ দল, বাঁধ দল!
চল্ রে চল্ রে চল্!
ঘৃণ্য শোণিতে হ’বে কি সিক্ত মোদের ক্ষেত্রতল!
বিশ্বাসঘাতী ক্রীতদাস-দলে জিজ্ঞাস’ কিবা চায়?
ওই অতগুলা রাজার জটলা কেন বা আজি হেথায়?
কিসের জন্য ঘৃণ্য শিকল হইতেছে নির্ম্মাণ?—
যুগ যুগ ধ’রে কাহাদের তরে?—আজি ল’ব সন্ধান।
আরে অপমান! ফরাসী! ফরাসী! সে নাকি মোদেরি তরে!
ফরাসী! ফরাসী! এ কি গো সহসা! একি আজি অন্তরে!
একি উল্লাস! আমরা প্রথম সাহসে করিয়া ভর,
ধার্য্য ক’রেছি দাস্য-নিগড় ছিঁড়িব অতঃপর।
ধর হাতিয়ার ফ্রান্সের লোক········ইত্যাদি।
একি অভাগ্য! একি অপমান! বিদেশীর দল এসে,
বিধি ও বিধান করে ব্যবস্থা ফরাসীর এই দেশে!
একি অপমান! অর্থের লোভে বিদেশী সৈন্য যত,
ফরাসীর বল ধূলি লুণ্ঠিত করিতেছে অবিরত।
ওগো ভগবান্! এমনি করিয়া রহিব কি চিরকাল?
নত মস্তকে বহিব লাঙ্গল, হাতে শৃঙ্খল জাল?
যাহারা ঘৃণ্য যাহারা অধম—তা’দের বাড়িবে বল?
ভাগ্য বিধাতা হ’বে কি মোদের অত্যাচারীর দল?
ধর হাতিয়ার ফ্রান্সের লোক........ ইত্যাদি।
ভয়ে কেঁপে মর; বিশ্বাসঘাতী অত্যাচারীর দল!
সকল দলের তোরা কলঙ্ক সবার ঘৃণার স্থল;
ভয়ে কেঁপে মর; সময় এসেছে, পা’বি তোরা এইবার,
পিতৃদ্রোহের ফন্দীর যাহা যোগ্য পুরস্কার!
তোদের সঙ্গে যু’ঝতে দেশের সকলেই আজি সৈন্য,
যদি হত হয়!—কি ভয়? মোদের লোকের নাহিক দৈন্য;
এ মাটি আবার দিবে উপহার প্রসবি’ নুতন বীর,
তা’রাও তৈয়ার হইবে বুঝিতে তারাও ভুলিবে শির;
ধর হাতিয়ার ফ্রান্সের লোক..... ইত্যাদি।
আমরা ফরাসী,—পালন করিব বীরের ধর্ম্ম যত,
বীরের মতন করিব আঘাত, সহিব বীরের মত;
যারা বিপক্ষে যুঝিছে মোদের লজ্জা-জড়িত মনে,
অভাগা তাহারা; তাহাদের মোরা ক্ষমিব হে প্রাণপণে।
কিন্তু এ দেশে রক্ত-পিপাসু দস্যু যে সব আছে,—
যা’রা ‘বুইয়ে’র পাতকের ভাগী—ফিরে তারি পাছে পাছে,
শার্দ্দূল সম যা’রা নির্ম্মম, নাহি প্রাণে মমতাই—
আপন মায়ের বুক চিরে যা’রা তাহাদের ক্ষমা নাই।
ধর হাতিয়ার ফ্রান্সের লোক.........ইত্যাদি।
আমরা পশিব একে একে একে কর্ম্মক্ষেত্র মাঝে,
যখন মোদের জ্যেষ্ঠের দল দেখিব বিরত কাজে;
পশিব ক্ষেত্রে, দেখিব তাঁদের দেহ-অবশেষ ধূলি,
গুণের চিহ্ণ দেখিব চক্ষে দেখিব কীর্ত্তি গুলি।
তাঁহাদের ধারা রাখিব আমরা—শুধু বেঁচে থাকা নয়;
তাঁদের মতন সমাধি যেন গো আমা-সবাকার হয়।
আমাদের হ’বে সেই গৌরব তুলনা যাহার নাই,
অত্যাচারের রুধিবারে গতি না হয় মরিব ভাই।
ধর হাতিয়ার ফ্রান্সের লোক········ইত্যাদি।
জন্মভূমির নির্ম্মল প্রেম! ওগো চির-সম্বল!
তোমার শত্রু নাশে উদ্যত এ বাহুতে দেহ বল।
ওগো স্বাধীনতা! প্রিয় স্বাধীনতা! হও ত্বরা পরকাশ!
আমাদের সাথে মিলিয়া আপন শত্রু করহ নাশ;
দাঁড়াও আসিয়া আমাদের এই জয় পতাকার ছায়,
ভৈরব রবে উচ্চার আমি তোমার সে ঘোষণায়!
হিংসায় জ্বলে যেন মরে যায় তোমার শত্রুচয়,
আমা-সবাকার গৌরব দেখি’—তোমার দেখিয়া জয়।
ধর হাতিয়ার ফ্রান্সের লোক! বাঁধ দল! বাঁধ দল!
চল্রে চল্রে চল্!
ঘৃণ্য শোণিতে হ’বে কি সিক্ত মোদের ক্ষেত্রতল!
রুজে দেলিল্।
জাতীয় সঙ্গীত (বর্ত্তমান ভারত)
জাতীয় সঙ্গীত।
(ভারতবর্ষ)
বন্দনা করি মায়!
সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা, চন্দন-শীতলায়!
যাঁহার জ্যোৎস্না-পুলকিত রাতি
যাঁহার ভূষণ বনফুল পাঁতি,
সুহাসিনী সেই মধুরভাষিণী—সুখদায়—বরদায়!
বন্দনা করি মায়।
সপ্তকোটির কণ্ঠনিনাদ যাঁহার গগন ছায়,
চৌদ্দটা কোটি হস্তে যাঁহার
চৌদ্দটা কোটি ধৃত তরবার,
এত বল তাঁর তবু মা আমার অবলা কেন গো হায়?
বন্দনা করি মায়।
বঙ্কিমচন্দ্র।
জাতীয় সঙ্গীত (বৈদিক ভারত)
জাতীয় সঙ্গীত।
(ঋগ্বেদ)
রথের অগ্রে ইন্দ্রের তেজ, মোরা পূজা করি তায়,
আমরা অটল শত্রুর ব্যূহে ইন্দ্রেরি মহিমায়;
তিনি আহ্বান শুনুন্ মোদের পূর্ণ রাখুন্ তূণ,
হীন শত্রুর ছিন্ন হউক অধম ধনুর্গুণ।
নিঃশেষে হত শত্রু যাঁহার মোরা তাঁর গাহি জয়,
আদেশে সিন্ধু দেশে দেশে ধায় মেঘে বর্ষণ হয়;
বিশ্বের ধন কর হে পোষণ পূর্ণ রাখ হে তূণ,
হীন শত্রুর ছিন্ন হউক অপটু ধনুর্গুণ।
অরাতির চোখে কভু আমা সবে দেখ না দেখ না দেব!
হিংস্র জনের মাথার বজ্র কর প্রভু নিক্ষেপ;
বসুধার বসু দান কর আর পূর্ণ রাখহে তূণ,
হীন শত্রুর ছিন্ন হউক্ অধম ধনুর্গুণ।
আমাদের আয়ু লক্ষ্য করিয়া, যা’রা ব্যাঘ্রের প্রায়,
ফিরিছে নিয়ত, আমাদেরি পায়ে নত কর তা’ সবায়;
তুমি যে বিবাধ, শক্তি অগাধ, মোদেরো পূর্ণ তূণ,
হীন শত্রুর ছিন্ন হউক্ অপটু ধনুর্গুণ।
শত্রু মোদের হউক্ সনাভি, দস্যু অথবা দাস,
আকাশের মত ছেয়ে ফেলে সবে নিঃশেষে কর নাশ;
কর অভিভূত তা’দের নিয়ত, মোদের ভর হে তূণ,
হীন শত্রুর ছিন্ন হউক্ অধম ধনুর্গুণ।
হে দেব! তোমার অনুগত মোরা, তোমার শরণ চাই,
হে সখা! সকল পাপ তাজি’ যেন পুণ্যের পথ পাই;
বন্দনা করি মোরা প্রাণ ভরি’ তুমি দেহ ভরি’ তূণ,
হীন শত্রুর হউক্ ছিন্ন অপটু ধনুর্গুণ।
সেই বিদ্যাটি শিখাও মোদের যা’র বলে অনিবার,
দুহিতে পারি হে ধরণী-ধেনুর অফুরান্ ক্ষীরধার;
যাহাতে বৃদ্ধি যাহাতে সিদ্ধি যাহাতে ভরে হে তুণ,
যা’তে অক্ষয় চিরদিন রয় মোদের ধনুর্গুণ।
রাজর্ষি সুদাস।
জাতীয় সঙ্গীত (মিশর)
জাতীয় সঙ্গীত।
(মিশর)
ওগো নীল-নদ-প্লাবিতা ধরণী! আমি ভালবাসি তোরে,
ওই ভালবাসা ধর্ম্ম আমার,--আমার পুণ্য ওরে!
হে মিশরভূমি! গরীয়সী তুমি, তুমি মহিমার ধাম,
অযুত যুগের জননী এ দেহ তোমারেই সঁপিলাম।
কত কীর্ত্তির শ্মশান তুমি গো, পুণ্য মিশরভূমি;
তব সন্তানে যে করে পীড়ন তারেও গ্রাসিবে তুমি;
মাকাশের তারা উপাড়িতে কভু সম্ভব যদি হয়,
আমাদের আশা নির্ম্মূল করা সম্ভব তবু নয়।
যুগের নিদ্রা করি’ পরিহার জেগেছি চলিতে আগে,
বিধির দত্ত মোদের স্বত্ব পুরোভাগে ওই জাগে;
অতীতে স্মরণ কর দেশবাসী; ভুলো না ভবিষ্যৎ,
মোদের সহায় ধর্ম্ম আছেন উজলি’ মোদের পথ।
জাতীয় সঙ্গীত (রুষিয়া)
জাতীয় সঙ্গীত।
(রুষিয়া)
সকল ভয়ের ভয় তুমি প্রভু! তোমারে নমস্কার;
বজ্র তোমার রণ-দুন্দুভি, বিদ্যুৎ তরবার!
তোমার রাজ্যে করুণা তোমার হউক মূর্ত্তিমান,
শান্তির ধারা বর্ষণ কর কালে কালে ভগবান।
হে কৃপা-নিধান! তোমার বিধান জগৎ ভুলিছে হায়,
তোমার নিদেশ ঠেলিছে মানুষ প্রত্যহ পায় পায়;
তোমার রাজ্যে করুণা তোমার হউক মুর্ত্তিমান্,
শান্তির ধারা বর্ষণ কর কালে কালে ভগবান্!
হে কৃপানিধান! তোমার বিধান জগৎ ভুলিছে হায়,
তোমার নিদেশ ঠেলিছে মানুষ প্রত্যহ পায় পায়।
রুদ্র তোমার ক্রোধ জেগে উঠে না যেন দহে গো প্রাণ,
শান্তির ধারা শিরে আমাদের বরিষ হে ভগবান্!
প্রতিশোধ তুমি শোধন করিছ, বল তব বৈভব,
অজ্ঞাতে কর বিচার সবার দেখ অলক্ষ্যে সব!
কৃপায় মোদের রক্ষা কর হে বিপদে পরিত্রাণ,
শান্তির ধারা বর্ষণ কর কালে কালে ভগবান্!
জাতীয় সঙ্গীত (হঙ্গেরি)
জাতীয় সঙ্গীত।
(হঙ্গেরি)
দেশের দশের ডাক শোনো ওই,
ওঠ, ওঠ, ম্যাগিয়ার!
এই বেলা যদি পার ত পারিলে,
নহিলে হ’ল না আর।
মুক্ত হ’বে? না,—রহিবে অধীন?
বুঝি চিনে লও পথ,
‘ম্যাগিরার আর র’বে না অধীন’
করিনু এই শপথ।
আমরা সকলে করিনু শপথ
ল’য়ে দেবতার নাম,
আর রহিব না অধীন,—হে প্রভু!
পুরাও মনস্কাম।
পেটোফি।
জাপানী ‘ঘুম পাড়ানি’
জাপানী ‘ঘুম-পাড়ানি’।
ঘুমো আমার সোণার খোকা, ঘুমো মায়ের বুকে;
আকাশ জুড়ে উঠ্লো তারা ঘুমো রে তুই সুখে।
হাত পা নেড়ে কান্না কেন? কান্না কেন এত?
চাঁদ উঠেছে, ঘুমোরে তুই সোনার চাঁদের মত!
একটি দিয়ে চুমো,— ঘুমো রে তুই ঘুমো।
ঘুমো আমার সোণার পাখী মায়ের বুকের ‘পরে:
ঘুমের ঘোরে ডরিয়ে কেন উঠলি অমন ক’রে?
ও কিছু নয়,— শব্দ ওঠে হাওয়ায় বাঁশের ঝাড়ে,
(আর) চকাচকী ডাকাডাকি ক’চ্চে পুখুর পাড়ে!
ঘুমো রে তুই ঘুমো— একটি দিয়ে চুমো।
ঘুমো আমার সোণার যাদু, কিসের তোমার ভয়?
কে কি করে?— কাছে কাছে মা যে তোমার রয়;
আমার খোকায় ছুঁতে নারে ঘাসের বনের সাপ,
বাজ পড়ে না,— যতই খুসী হ’ক না মেঘের দাপ!
ঘুমো মাণিক ঘুমো,— একটি দিয়ে চুমো।
ঘুমো মনের সাধে, শুধু, স্বপন দেখিস্ না রে,—
ভয় পাছে পা’স্ জেগে,— হুতোম ডাক্ছে যে আঁধারে।
গুটিসুটি মাথাটি রাখ্ আমার বুকের ‘পরে,
হাস্ রে শুধু,— দেখি আমি,— হাস্রে ঘুমের ঘোরে!
ঘুমো মাণিক ঘুমো,— ঘুমো রে তুই ঘুমো।
ঘুমো আমার সোণার খোকা, ঘুমো আমার কোলে,
ভূমিকম্পে পাহাড় যখন ঘর বাড়ী নে’ দোলে;
পাপের কর্ম্ম যে ক’রেছে দেব্তা তা’রেই মারে,
নির্দ্দোষী মোর সোণার খোকা,—কেউ না ছুঁতে পারে,
ঘুমো মাণিক ঘুমো—সোণার পাখী ঘুমো।
জীবন স্বপ্ন
জীবন স্বপ্ন।
ললাটের ’পরে ধর চুম্বন খানি,
শুনে যাও মম বিদায় বেলার বাণী;
আজনম মোর স্বপনে হ’য়েছে ভোর,―
বলেছে যাহারা বলেনি মিথ্যা ঘোর।
আশা-পাখীগুলি উড়ে যদি গিয়ে থাকে,―
দিনে কি নিশির নির্জ্জনতার ফাঁকে,―
কি করিব? হায়, পালানো তাদের ধারা,
জাগো কি ঘুমাও পালায়ে যাবেই তা’রা;
সজাগ কিবা সে খেয়ালে রয়েছি ব’লে,
উড়িয়া পালাতে কখনো কি তা’রা ভোলে?
যা’ করি, যা’ ভাবি, যা’ই দেখি মোরা চোখে
সবই নব নব স্বপন স্বপ্ন-লোকে!
সিন্ধুর কূলে গর্জ্জন গান শুনি,
করতলে ল’য়ে সোনার বালুকা গণি,
কত সে অল্প-তবু সব গেল ঝরি’,
নীল পারাবার নিল গো তাদের হরি’!
এখন একেলা হৃদয়ে তাদের স্মরি’
কেঁদে মরি আমি,―আমি শুধু কেঁদে মরি।
হায়, বিধি, মোর কিছু কি শকতি নাই?―
দৃঢ় মুষ্টিতে ধরিতে যে ধন পাই?
এ জীবনে কভু বাঁচাতে কি পারিব না?―
সিন্ধুর গ্রাস হইতে একটি কণা?
যা’ করি, যা’ দেখি, সকলি কি তবে খেলা!
স্বপ্ন-সাগরে স্বপন-ঢেউয়ের মেলা!
এড্গার অ্যালেন পো।
জোবেদীর প্রতি হুমায়ুন
জোবেদীর প্রতি হুমায়ুন।
গোলাপে ফুটাও তুমি সৌন্দর্য্য তোমার,
জ্যোতি তব ঊষার কিরণে;
পাপিয়ার কলস্বনে তোমারি মাধুরী,
মরালের শুভ্রতা বরণে!
জাগরণে স্বপ্ন সম সঙ্গে তুমি মোর,
চন্দ্র সম নিশীথে তন্দ্রায়;
আর্দ্র কর, স্নিগ্ধ কর, মৃগনাভি সম,
মুগ্ধ কর রাগিণীর প্রায়।
তবু যদি সাধি তোমা’ ভিখারীর মত
দেখা মোরে দিতে করুণায়;
বল তুমি “রহি অবগুণ্ঠনের মাঝে,
এ রূপ দেখাতে নারি হায়!”
তৃষা আর তৃপ্তি মাঝে র’বে ব্যবধান—
অর্থহীন এ অবগুণ্ঠন?
আমার আনন্দ হ’তে সৌন্দর্য্য তোমার
দূরে রাখে কোন্ আবরণ?
একি গো সমর-লীলা তোমায় আমায়?
ক্ষমা দাও, মাগি পরিহার;
মরমের (ও) মর্ম্ম যাহা তাই তুমি মোর,
জীবনের জীবন আমার!
সরোজিনী নাইডু।
জ্ঞানের প্রতি
জ্ঞানের প্রতি।
হে জ্ঞান! করেছ ধনী কত না জাতিরে,
যাহারে ছেড়েছ সেই ডুবেছে তিমিরে;
সংসারের সর্ব্বরত্ন তা’দেরি কারণ,
জানে যা’রা একমাত্র তুমি মূলধন।
আল্তাফ্ হসেন আন্সারি।
জ্যোৎস্নার কুহক
জ্যোৎস্নার কুহক।
ভঙ্গুর ভাবনা কতশত, কতশত অস্ফুট বেদনা,
মর্ম্মরিয়া প্রাণে ওঠে জেগে, দাঁড়ায়ে যখন আনমনা
চেয়ে থাকি লাবণ্য-তরল শরতের চাঁদে; আত্মহারা;
তবু সে রূপালি কুহকেতে একা আমি পড়ি নাই ধরা!
ৎসিসাতু।
দশা-চক্র
দশা-চক্র।
প্রথমে কাঁদুনে ছেলে মায়ের কোলে,
যত দুধ খায় তা’র আধেক তোলে।
ক্রমে খুঙ্গি পুঁথি লয়ে পাঠশালে যায়,
চক্চক্ করে মুখ প্রভাতী প্রভায়!
ক্রমশঃ হৃদয় তলে জাগে পীরিতি,
রচিছে হঠাৎ-কবি প্রণয়-গীতি!
মুখ ভরি’ গোঁফ দাড়ি বাড়িয়া ওঠে,
যশ লাগি’ মাথা দিতে সমরে ছোটে!
তার পর বিজ্ঞবর,—বেজায় ভুঁড়ি,
পঞ্চায়তে পায় মান, জ্ঞানের ঝুড়ি।
তার পর নড়বোড়ে ঠিক যেন সং,
দিনে দিনে ফিরে পায় শৈশবের ঢং!
তার পর ক্ষীণ তনু শয্যাতলে লীন,
দৃষ্টিহীন, সংজ্ঞাহীন,—সম্নিকট দিন।
শেক্সপীয়র
দিবা স্বপ্ন
দিবা স্বপ্ন।
তীর হ’তে দূরে সাগরে যে শিলা জাগে,
তা’রি ’পরে বসি’ দিবসে স্বপন দেখি;
হু হু করে হাওয়া, সাগরের পাথী ডাকে,
ঘুরে ফিরে ঢেউ শিলায় শিলায় ঠেকি’।
ভালবেসেছিনু কত এ জীবনে, আহা,
সুন্দর শিশু কত গো বন্ধু কত;
কোথা তা’রা? হায়, হাওয়া শুধু করে ‘হা—হা’,
ফেণমুখী ঢেউ ধায় পাগলের মত।
হায়েন্।
দিবা স্বপ্ন (২)
দিবা-স্বপ্ন।
সরু গলির মোড়ে, যখন, দিনের আলোক ঝরে,
ময়না দাঁড়ে গাহে, এমন গাইছে বছর ধ’রে;
সুসান্ যেতে পথে, হঠাৎ শুন্তে পেলে গান,
শব্দ সাড়া নাইক ভোরে শুধুই পাখীর তান।
মন ডুবিল গানে, একি, কি হ’ল ওর আজ,—
দেখ্ছে যেন, জাগে পাহাড় গাছের পরে গাছ;
উজল হিমের ঢেউ চলেছে গলিটির মাঝ দিয়ে,
ঘেঁসাঘেঁসি বস্তি মাঝে চল্লো নদী ধেয়ে!
সবুজ গোঠের ছবি, তাহার পাহাড় দু’টি ধারে,
সে পথ দিয়ে গেছে কত কল্সী নিয়ে ভ’রে;
এক্টি ছোট ঘর সে যেন বাবুইপাথীর বোনা,
তার চোখে সে ঘরের সেরা, নাইক তার তুলনা;
স্বর্গের সুখ পরাণে তা’র; মিলিয়ে আসে ধীরে—
ঘোর কুয়াসা, ছায়া, নদী, পাহাড় যত তীরে;
বইবে নারে নদী, পাহাড় তুলবে না আর শির,
স্বপন টুটে, নয়ন ফুটে, মুছে নয়ন নীর।
ওয়ার্ড্সোয়ার্থ্।
দুঃখের শিক্ষা
দুঃখের শিক্ষা।
সজল চোখে জলগ্রহণ করেনি যে জন,
কাটায় নি যে দীর্ঘ নিশি ঊষার পথ চাহি’,
ডাক্তে যা’রে হয়নি কভু ‘ত্রাহি ত্রাহি ত্রাহি’,
হা ভগবান! মোটে তোমায় চেনেনা সে জন
দুঃখে ভরা ধরার মাঝে পাঠাও তুমি সবে,
দাওনা বাধা যখন মোরা পাপের পথে চলি’;
অনুতাপের অনল মাঝে মরি শেষে জ্বলি’
মুহূর্ত্তেকের স্খলনে, হায়, জনম-দুখী ভবে।
গেটে।
দুঃখের হেতু
দুঃখের হেতু।
সকলে সুধায়, কেন খিন্ন দিন দিন,—
কেন আমি দুঃখে বিমলিন?
সদাই বিরস কেন সদাই বিমনা?
কৈশোরে এত কি দুর্ভাবনা?
হায়! তা’রা বুঝে না রে এ মৃত্যু-যাতনা,
ঘুচাতে যা’ কেহ পারিবে না,—
বিনা সে মধুর হাসি, বিনা সে চাহনি,—
(জগত-ভুলানো নিঝরিণী;)
কে ঘুচাবে দুঃখ জ্বালা? কে বর্ষিবে ঘুম?
হাহাকার করিবে নিঝুম!
সে কঠিনা, ক্ষমাহীনা, সুন্দরী সে নারী,
শিলা-সুকঠোর হিয়া তা’রি!
সে জানিতে নাহি চায় কেন আমি ক্ষীণ,
কেন বা গুমরি নিশি দিন;
আনন্দে যখনি, হায়, বিমুগ্ধ নয়নে
চাহি সে মধুর মুখ পানে,—
চাঁদ মুখ ঘিরে ফেলে মেঘে,
কুটিল ভ্রুকুটি কি যে উঠে, হায়, জেগে;
বিরহে, নৈরাশ্যে, সদা ডুবে আছি তাই,
ক্ষুব্ধ খেদ ভিন্ন কিছু নাই;
জীবন বিজন মোর, গহন সে হায়,
বিষাদের বিষ-লতিকায়।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
দুখ শর্ব্বরী মাঘে
দুখ-শর্ব্বরী মাঘে।
দুখ-শর্ব্বরী মাঘে,
বড় সুখী তরুলতা;
শাখে আর নাহি জাগে
শ্যামল শোভার কথা!
উত্তর বায়ু পারে না পত্র ঝরাতে,
বরষি’ করকা তীব্র স্বননে ত্বরাতে;
নাহি পারে আর পিণ্ড-তুষার জ্বরাতে,
বিকাশের মুখে তা’ সবায়।
দুখ-শর্ব্বরী মাঘে,
বড় সুখী নির্ঝর;
বুদ্বুদে নাহি জাগে
রঙিন্ রবির কর!
শুধুই মধুর বিস্তৃতি ল’য়ে সুখেতে,
লালসা-লহর শান্ত করে সে বুকেতে;
নিমেষের’ তরে উচ্চারে না ত’ মুখেতে
কঠোর কালের বারতায়।
আহা যদি সকলেরি
হ’ত গো এমনি হায়;
অতীতের সুখ স্মরি’
কে না কাঁদে যাতনায়?
মরমে মরমে পরিবর্ত্তন মানা,
প্রতিকার নাই,—চিকিৎসা নাই—জানা,
অথচ নহেক অপটু, বধির, কাণা,
সে কথা লেখেনি কবিতায়।
কীট্স
দু’দিনের শিশু
দু’দিনের শিশু।
“আমি আজো নামহীন,
বয়স দুইটি দিন।”
—কি ব’লে ডাকিব মোরা তোরে?
“আমি খুসী-টুস্টুসি,
আমার নামটি খুসী।”
—‘খুসী’! তুই খুসী থাক ওরে!
আনন্দ-সুধার পাত্র,
বয়স দু’দিন মাত্র,
‘খুসী’ ব’লে আমি ডাকি তোরে;
তুমি হাস চেয়ে চেয়ে,
আমি কহি গান গেয়ে,—
তোরে ঘিরি’ খুসী যেন ঝরে।
ব্লেক্
দেখে যাও
দেখে যাও।
দেবদারু ও বনলতা
দেবদারু ও বনলতা
বর্ষায় বাড়িয়া বনলতা,
উচ্চে উঠে দেবদারু বাহি’;
“কত হ’ল বয়ঃক্রম তব?”
জিজ্ঞাসে তরুর মুখ চাহি’।
তরু কহে “বর্ষ দুই শত,—
মাস ছয় এদিক্ ওদিক্।”
লতা বলে “এতে বৃদ্ধি এই!—
সপ্তাহে যা’ হ’ল মোর ঠিক!”
তরু বলে “বাঁচ আগে শীতের তুষারে,
আয়ু ও বৃদ্ধির কথা হ’বে তার পরে।”
খুশ্হাল্।
দ্বিধার জীবন
দ্বিধার জীবন।
যে অবধি না হয় ছিন্ন,
জীবনের এই মধুর চিহ্ন,
যে অবধি ব্যক্ত না হয়,―
ব্যক্ত যাহা হবেই হবে;―
সে পর্য্যন্ত মন রে আমার,
পূজার্চ্চনার কি ফল তোমার?
মন্ত্রজপে―ছেলেখেলায়
মিথ্যা নিয়ে মত্ত র’বে?
নূতন কিবা বল্ব কথা,
নব নিঝর বয় না সেথা,
নূতন ক’রে পায় না ব্যথা
মানুষ কভু মরণ-শেষে;
বরষ পরে বরষ নেমে,
দেয় গো ঢেকে কতই প্রেমে;
হর্ষ-গীতি যায় গো থেমে,
অশ্রুজলের স্রোতে ভেসে।
একটি দিনের কর্ম্ম যদি,
আবিল করে জীবন-নদী,
মানুষ যদি হয় গো ঋণী
মৃত্যু-মহাজনের কাছে;―
ধাক্কা স’য়ে যদি সে তা’র
শক্তি ফিরে হয় দাঁড়াবার,
জেগেই যদি উঠ্বে আবার
দু’দিন আগে দু’দিন পাছে;―
তবে কেন কান্নাকাটি?
কেন হৃদয় ফাটাফাটি?
জীবন কেন হ’বে মাটি
উপাসনায়―উপবাসে?
যতই ডাক করপুটে,―
যতই মর মাথাকুটে,―
জীবন তবু যাবে টুটে
মৃত্যু সাড়া দিলে এসে।
কাল!―সে বটে সবার প্রভু;―
এড়িয়ে কেহ যায় না কভু;
একটু হাসিখুসি তবু
ওরি মধ্যে লুট্তে হ’বে;
নইলে শুধু জীবন, মরণ,
দুঃখ ও সুখ, শান্তি ও রণ,
কেবল গণন এবং স্মরণ
কর্ত্তে শুধু থাক্বে ভবে!
দু’দিন পরে ভাঙ্লে মেলা
সকল তা’তেই সমান হেলা,―
ইষ্ট মন্ত্র, জপের মালা,
কর্ম্ম, খেলা, কান্না, হাসি;
যে ক’টা দিন আছিস্ বেঁচে,
ফিঙের মত বেড়াস্ নেচে,
বিশ্ব ব্যাপার এঁচে, এঁচে,
মরিস্ নে আর শূন্যে ভাসি’।
সুইন্বার্ণ।
নদী সংবাদ
নদী-সংবাদ।
বিশ্বামিত্র।
ত্যজি’ গিরি-জঙ্ঘায়,
ভাঙিয়া মন্দুরায়,
সাগর সঙ্গে মিলিতে রঙ্গে চলেছে তটিনী সঘনে;
এলায়ে সলিল-পাশ,
শতদ্রু সনে বিপাশ—
সুন্দর তনু ধেনু-যুগ্মক ছুটেছে বৎস-লেহনে!
ইন্দ্র প্রেরিত রথী,
সিন্ধুর পথে গতি,
ইন্দ্রাভিলাষ-পূর্ণকারিণী বাঞ্ছিত ধন কর দান
একই প্রবাহে দুলি’
তরঙ্গে রঙ্গে ফুলি’
সমান গমনে ঊর্ম্মি মিলায়ে সাগরে করগো অভিযান;
বৎস-লেহনকামী
ধেনু সম দ্রুতগামী
যেন মিলি দোঁহে সন্তান মোহে চলেছ অধীর গমনে;
শতদ্রু মাতার পাশে
বিপাশা নদী সকাশে
আসিয়া হ’য়েছি উপনীত আজি—ক্লান্ত হইয়া ভ্রমণে।
নদীদ্বয়।
আমরা রঙ্গে চলেছি,
সিন্ধুর দিকে ঢলেছি,
ফিরিবার নহে আমাদের গতি ফিরিবার নহে কভু সে;
কেন বারবার তবে,
ডাকে ঋষি আমা সবে,
সব জেনে শুনে কেন অকারণে ডাকে আমা সবে তবু সে?
বিশ্বামিত্র।
ওগো জলময়ী নদী,
ক্ষণতরে দোঁহে যদি
দাঁড়াও,—শুনাই নূতন স্তোত্র প্রসাদের অভিলাষী গো,
আমি কুশিকের পুত্র,
রচিব নূতন স্তোত্র,
যাহে শত ধারে ঈপ্সিত সোম ক্ষরি’ পড়ে রাশি রাশি গো?
নদীদ্বয়।
নাশিয়া বিরোধী বৃত্রে
নদীও নদ খনিত্রে
খনিলা ইন্দ্র বজ্র, আয়ুধ,— চলেছি তাঁহারি নির্দেশে,
দ্যুতিমান, পটুহস্ত,
যে কাজে করিলা ন্যস্ত,
তাই সাধিবারে ছুটিয়াছি মোরা,—ছুটিয়াছি দেশে বিদেশে
বিশ্বামিত্র।
বাসবের বীরকর্ম্ম
কীর্ত্তন করা ধর্ম্ম,—
কেমনে ইন্দ্র বজ্রে বিঁধিলা জলের অরাতি অহিরে;
বাসবের গাহি জয়
কেমনে সলিল চয়
আসিয়া মিলিল,—মিলিয়া ধাইল উর্ব্বরা করি’ মহীরে।
নদীদ্বয়।
ওগো ঋষি, ওগো হোতা,
বলিলে আজি যে কথা
ভুলিয়োনা তাহা, উক্থ রচিয়া আমাদের ক’র’ তুষ্ট,
করি গো নমস্কার,
আমাদের তুমি আর
পুরুষের মত ক’র’ না ক’র’ না বাচালতা-দোষ-দুষ্ট!
বিশ্বামিত্র।
শোনো গো আমার স্তুতি
দাও দোঁহে অনুমতি
বহুদূর হ’তে এসেছে এজন লয়ে ধন নানা মত;
তোমাদের যত জল
যাক্ সে রথের তল,
সুখে পর পারে যেতে দাও মোরে হও ওগো অবনত।
নদীদ্বয়।
ওগো ঋষি, ওগো হোতা,
শুনিনু সকল কথা;
সুখে হও পার ল’য়ে সে তোমার রথ ও তুরগ যত;
সন্তানে দিতে স্তন,
পতিৱে আলিঙ্গন,
নারী সে যেমন হয় অবনত, রহিলাম তা’রি মত।
বিশ্বামিত্র।
পার হয় যত নর
ভরত-বংশধর,—
ইন্দ্রপ্রেরিত তাহারা তোমার নির্দেশে নেমেছে নীরে;
পেয়েছি গো অনুমতি
রচি’ তোমাদের স্তুতি
গা’ব সব ঠাঁই থাকি সে যেথাই,—যজ্ঞে যজ্ঞে ফিরে।
ভরত-বংশধর
পার হ’ল যত নর,
রচি’ মনোজ্ঞ উক্থ নবীন করিছেন স্তুতি বিপ্র;
অন্নদে! ধনপ্রদে!
ক্ষুদ্র নদী ও নদে
পবিত্র জলে ভরিতে ভরিতে চল দেশে দেশে ক্ষিপ্র।
ঋগ্বেদ, তৃতীয় মণ্ডল, ৩৩ সূক্ত।
নব-সপত্নী সম্ভাষণ
নব-সপত্নী-সম্ভাষণ।
চকাচকীর ডাকাডাকি নদীর চরে শোনা যায়,
তুমি সতী! যোগ্য পতির, ভাগ্যবতী তুমি হায়।
আন্ গো তুলে কুমুদমালা যেখানে পা’স্ ডাহিন বাঁয়,
এই কুমারীর অন্বেষণে প্রভু মোদের ছিলেন, হায়।
অন্বেষিয়া না পেয়ে তায় মৌনে গেছে দীর্ঘদিন,
বিষাদ ভরে কেটেছে রাত শয্যামাঝে নিদ্রাহীন!
আন্ গো তুলে কুমুদ ফুলে আঁচল ভ’রে নিয়ে আয়,
আজকে বালা মোদের হ’বে বাণী বীণার ঘোষণায়।
চীন দেশের ‘শী-কিং’ গ্রন্থ।
নামকীর্ত্তন
নাম কীর্ত্তন।
আমার প্রভুর নাম কীর্ত্তন কর মন্দিরে তাঁর,
তাঁহারি প্রকাশ আকাশের তলে গাওহে বারম্বার।
তাঁর সে বিশাল কীর্ত্তি-কাহিনী কর সবে কীর্ত্তন,
তাঁহার অপার মহিমার কথা গাও হে অনুক্ষণ;
তুরীতে ভেরীতে বীণা বাঁশরীতে গাও সবে তাঁরি নাম,
কীর্ত্তন-সুখে নৃত্য করিয়া ফির হে অবিশ্রাম!
বাজায়ে মুখর করতাল সবে গাও হে ভরিয়া প্রাণ,
নিশ্বাস নিতে শিখেছ যে জন সেই কর নাম গান।
রাজা দায়ুদ।
নারী ও কংফুশিয়ো
নারী ও কংফুশিয়ো।
শিষ্য সহ কংফুশিয়ো লঙ্ঘিছেন যবে
‘টই’ নামে পর্ব্বতের শ্রেণী—
শুনিলেন আচম্বিতে, হাহাকার রবে
কাঁদে এক নারী অভাগিনী।
আজ্ঞায় চলিল শিষ্য নারীর উদ্দেশে,
দেখা পেয়ে কহিল তাহারে,
“হেন শোক হয় শুধু মহা-সর্ব্বনাশে,—
হাঁগো মাতা, হারায়েছ কারে?”
নারী কহে “যা কহিলে সত্য সে সকলি,
বাঘের কবলে গেছে স্বামী,
শ্বশুর গেছেন, গেছে নয়ন পুতলি
পুত্ত্র মোর; আছি শুধু আমি।”
“তবু, তুমি দেশ ছেড়ে যাও নাই চলে?”
জিজ্ঞাসিলা কংফুশিয়ো মুনি;
“সে কেবল সু-রাজার রাজ্যে আছি ব’লে।”
উত্তরিল নারী। তাহা শুনি’
শিষ্যদলে ডাকি’ মুনি কহিলেন শেষ,—
“বাঘ হ’তে ভয়ঙ্কর কু-রাজার দেশ!”
নারী বন্দনা (আরব)
নারী-বন্দনা।
(আরব)
বেতসী জিনিয়া নমনীয় তনু,—কিশলয় জিনি’ কচি;
বদন-ইন্দু ঘিরি’ কুন্তল রেখেছে যামিনী রচি’!
কজ্জল-হীন কাজল-নয়ন রেশমী পক্ষ্মে ঘেরা,
কান্ত কোমল ক্লান্ত সে দিঠি সকল দিঠির সেরা;
অধর অরুণ দশন তরুণ প্রবালে মুকুতা পাঁতি,
ক্ষীণ কটি, গুরু উরু নিতম্ব, জোড়া ভুরু প্রাণঘাতী!
এক বৃন্তের দু’টি দাড়িম্ব হৃদি‘পরে হৃদি-লোভা,
লঘু পাণি, লঘু চরণ, আঙুলে হেনার রঙীন শোভা।
নারী বন্দনা (কাফ্রি দেশ)
নারী-বন্দনা।
(কাফ্রি)
ওই কালো রূপ অমৃতের কূপ সুষমার খনি কালো,
শ্যাম পল্লব জিনিয়া পেলব কালো আমি বাসি ভাল;
নিবিড় রূপের স্নিগ্ধ গাঢ়তা স্বপনে ডুবায় আঁখি,
স্নিগ্ধ শ্যামল বদনে উজল চঞ্চল আঁখি-পাখী!
ললাট-ফলক বেড়িয়া অলক খেলা করে বায়ুভরে,
কোমলে কঠোর—সংহত তনু কাফ্রির মন হরে।
নারী বন্দনা (গ্রীস্)
নারী-বন্দনা।
(গ্রীস্)
কপোল তোমার গোলাপের মত, দুধে-আল্তার রং,
নিশ্বাস মধু, সরল নাসিকা,—নহে গরুড়ের ঢং;
দীঘল আঙুল, ক্ষুদ্র চরণ, উজল মাঝারি চোক্,
জোড়া নহে ভুরু,—ঈষৎ বক্র, হাসিতে তুষ্ট লোক;
নগ্ন মূরতি সুন্দর অতি, ভূষণে তেমনি শোভা,
তনু কমনীয়, সুখ নমনীয়, নিখিল পরাণ লোভা!
নারী বন্দনা (জাপান)
নারী-বন্দনা।
(জাপান)
মূল-পাপ্ড়ির জড়িমা-জড়িত আধ-বিকশিত আঁখি,
উজ্জ্বল যেন ছুরির মতন, শান্ত যেন গো পাখী!
সুন্দর কিবা দীর্ঘ ও গ্রীবা, বদন ডিম্বাকার,
বক্ষ ও উরু নহে নহে গুরু, ক্ষীণ পাণি পাদ তা’র;
পাণ্ডুবদন, পাণ্ডুবরণ, মাথায় কেশের রাশি
অতুল শিল্প ওষ্ঠ-অধরে আধ-বিকশিত হাসি!
নারী বন্দনা (পারস্য)
নারী-বন্দনা।
(পারস্য)
ঘন কুন্তল শত তরঙ্গে সতত রঙ্গ করে,
ভুরু ধনু কে গো ক’রেছ যোজনা নয়ন-পক্ষ্ম-শরে!
গুম্ফ-বিহীন ওষ্ঠে চিবুকে নীল সুষমার লেখা,
দীঘল সরল তনু নির্ম্মল, চোখে কজ্জল-রেখা;
কালো তিল—খুঁটে কুড়ায়ে তুলেছে,—ফুটায়ে তুলেছে রূপ,
অমল চরণে লুণ্ঠিত কত মুকুট-শীর্ষ ভূপ!
নারী বন্দনা (ভারতবর্ষ)
নারী-বন্দনা।
(ভারতবর্ষ)
পূর্ণিমা-চাঁদ বদলের ছাঁদ, লাবণ্যে তনু ছায়,
আধ-বিকশিত সোনার কমল উজলিছে মহিমায়;
পরশে তাহার শিরীষ-সুষমা, বলি-চিহ্নিত মাঝ,
কোকিল-কণ্ঠী, হরিণ-নয়না, হাসে ভাবে সদা লাজ।
নারী বন্দনা (মলয় উপদ্বীপ)
নারী-বন্দনা।
(মলয় উপদ্বীপ)
ললাট তোমার সিত পক্ষের তৃতীয়ার ক্ষীণ চাঁদ,
আধ-ফুটন্ত যূথিকার কলি স্ফুরিত নাসার ছাঁদ;
রাঙা দুটি গাল,—পুষ্ট রসাল, ধরেছে মাত্র রং,
নেবু গন্ধের তৃণের মতন কচি আঙুলের ঢং!
কুন্তল ঘন গন্ধ মগন গুবাক-ফুলের কাঁধি,
জোড়া-ভুরু যেন আকাশের পাথী চিত্রে রেখেছে বাঁধি’!
নয়নে তোমার শুক্র-তারার চির-উজ্জল বিভা,
পেকে-ফেটে-যাওয়া ডালিমের মত ওষ্ঠ অধর কিবা;
তিনটি রেখায় নিবিড় লেখায় শোভিত কণ্ঠ তা’য়,
ক্ষীণ কটি যেন ফুলের বৃন্ত হিল্লোলে দোলে হায়!
নারী বন্দনা (মিশর)
নারী-বন্দনা।
(মিশর)
রমণীর মণি, মমতার খনি, রাজার দুলালী ধনি,
অমা যামিনীর তিমির জিনিয়া কালো তব কেশ গণি,
কালো সে নিবিড় ফল-মণ্ডিত জম্বুবনের চেয়ে,
পৃষ্ঠ তোমার—স্কন্ধ তোমার—ললাট তোমার ছেয়ে!
কুসুম স্তবক স্তন দু’টি তব বিমুখ বিরাগ ভরে,
তীক্ষ্ণ উজল দশন অমল হীরকে মলিন করে;
লঘু লীলায়িত সকল অঙ্গ হিল্লোলে যেন দোলে,
তোমারে ঘিরিয়া যেন বসন্ত নব-পল্লব খোলে!
নারী বন্দনা (য়িহুদী দেশ)
নারী-বন্দনা।
(য়িহুদী)
তোমার মুখের গন্ধ মধুর নাসপাতি হ’তে মিঠে,
কিবা সর্ব্বৎ—কিবা সে সরাব অধর অমৃত ছিটে!
তরুণ তরুর ছন্দ তনুর, নীল কুন্তলজাল,
হৃদয়কুঞ্জে পুঞ্জে পুঞ্জে ব্রাহ্মণ সে সুরসাল!
লুকায়ে ও বুকে উৎসুক মুখে ও কি মৃগশিশু দু’টি?
আবরণ খানি করিলে মোচন—ওরা কি পালাবে ছুটি’?
স্ফটিকে গঠিত অঙ্গ তোমার, অমৃত পাত্র কায়,
কোন্ রস তাহে আছে যে অভাব ভাবিয়া পাই না হায়!
নারী বন্দনা (য়ুরোপ)
নারী-বন্দনা।
(য়ুরোপ—মধ্যযুগ)
অমলবরণী নবনীত জিনি’,—জিনি’ বরফের গুঁড়া,
কোমল চিকণ চিকুর সোণালি জিনি’ কাঞ্চণ-চূড়া!
অধর অরুণ, হাসিটি তরুণ, করুণ নয়ন দু’টি,
ক্ষীণ তনু—তাজা, পরিক্ষীণ মাজা,—তবু সে পড়ে না টুটি’!
বুকের বসন তুলিয়া ধরিয়া আছে দু’টি আখ্রোট,—
সোহাগ-ভিখারী আছে আজ বাড়ি’—সাথে আছে রাঙা ঠোঁট।
নিয়তি
নিয়তি।
দিন দিন নিয়তির নূতন ব্যাভার,
প্রণয়ে প্রশ্রয়ে তার নাহিক প্রত্যয়;
একদণ্ডে শক্তিমানে করে ধূলিসার,
ধূলার কীটেরে তুলি’ তারি গাহে জয়!
নিশ্ছিদ্র নূতন তরী ডুবায় সলিলে,
ভগ্নতরী কভু ঝড় তুফানে বাঁচায়;
একা আমি কি করিতে পারি এ নিখিলে?
কে আছে সুহৃদ্ মম? কারে ডাকি হায়!
যাহা করি বাধা দেয় নিয়তি তাহায়,
কেহ নাই শুনিবারে এ মম ক্রন্দন;
অদৃষ্ট অ-দৃষ্ট যদি না থাকিত হায়,
কিম্বা মোরে দৃষ্টি হ’তে করিত বর্জ্জন!
মহতের দুঃখ হেথা, নীচের উন্নতি;
শিশু বালিকার অঙ্গে বস্ত্র শত শত,
ছিন্ন বাসে লজ্জা পায় বরাঙ্গী যুবতী,
জ্ঞানীর না মিলে রুটি, মূর্খে মেওয়া যত।
বিশ্বাসী ভক্তের গৃহে আসন দুর্লভ,
বঞ্চকের ঘরে দেখ রক্ত মখমল;
সাজ সওয়ারের ভারে ক্লিষ্ট ঘোড়া সব,
বাজারে অবাধে গাধা খায় নানা ফল!
আনন্দে সকল পাখী কেলি করে বনে,
বন্দী শুধু―সেই যা’র সুকণ্ঠ, সুঠাম;
সত্য কি কল্পনা ইহা বুঝাব কেমনে?
শান্ত হও খুশ্হাল্ ভাগ্য তোরে বাম।
খুশ্হাল্।
নিয়তি (২)
নিয়তি।
নিয়তির গতি অপরূপ অতি,
নহে সে ধনের মানের বশ;
খণ্ডিত শির দিগ্বিজয়ীর
শকুনিতে খায় শোণিত রস!
কেহ আজনম না রহে অধম
দীন বলহীন বলিয়া শুধু,
যেই মাছি মরে পরশের ভরে
রাজার পাত্রে পিয়ে সে মধু!
ইমাম সাফাই মহম্মদ বিন্ ইদৃস্।
নিশীথে
নিশীথে।
কতদিন নীরব নিশীথে,
নিদ্রা যবে নাগপাশে বাঁধিবারে চায়,
স্মৃতি এসে জাগায় চকিতে
যে দিন গিয়েছে তা’রে নবীন আভায়;
সেই হাসি, অশ্রু, গীতি,
সেই কৈশোরের স্মৃতি,
প্রণয় নিয়ত কত নাচা’ত হিয়ায়;
যে চোখে জ্বলিত জ্যোতি
আজি সে মলিন অতি,
ভেঙে গেছে ফুল্ল প্রাণ এবে নিরাশায়!
এমনি রে নীরব নিশীথে,
ঘুমের বাঁধন যবে বাঁধিবারে চায়,
দুখ-স্মৃতি জাগায় চকিতে
অতীত দিনের ছবি নবীন আভায়!
মনে পড়ে যখন আবার,—
অটুট বাঁধনে বাঁধা বন্ধু সমুদায়,
একে একে সম্মুখে আমার
শিশিরে পল্লব সম ঝরে গেছে হায়,—
মনে হয় যেন আমি
একাকী মন্দিরে ভ্রমি’
উৎসবান্তে যবে সবে লয়েছে বিদায়,—
শুকায়েছে ফুল হার,
প্রদীপ জ্বলে না আর,
একা আমি,—আর কেহ নাহিক হেথায়
এমনি গো নীরব নিশীথে,
নিদ্রা যবে নাগপাশে বাঁধিবারে চায়,
স্মৃতি এসে জাগায় চকিতে
অতীত দিনের ছবি নবীন আভায়।
মূর।
নিষ্কলঙ্ক দারিদ্র্য
নিষ্কলঙ্ক দারিদ্র্য।
কেহ কি হয় অধোবদন
অকলঙ্ক দরিদ্রতায়?
দৈন্য মোরা করি বরণ,
ভীরু যে জন গণি না তার।
অকথিত, অকীর্ত্তিত
কর্ম্ম মোদের যেমনি হোক্,
মর্য্যাদা ত মুদ্রাচিহ্ন
মানুষ সোনা,—যেমনি হোক্।
শাকান্নে দিন যদিই কাটে,
‘গড়া’—না হয় পর্লামই তাই;
মূর্খে সাজাও লম্বশাটে,
মানুষ তবু মানুষই ভাই!
যেমনি হোক্—যেমনি হোক্,
আড়ম্বর—তা’ যত সে হোক্,
সরল যেজন সেই মহাজন
দীন দরিদ্র যাহা সে হোক্।
দর্পে চলে,—দর্পে চাহে,—
ওই যে—যাহে বল্ছে ‘প্রভু’—
যতই পূজা করুক তাহে
গণ্ডমূর্খ মাত্র তবু।
যেমনি হোক্ তাজ্টা তাহার,
কল্কাদার সে যেমনি হোক্,
বুদ্ধি যাহার আছে সে জন
হাস্বে দেখে, যেমনি হোক্।
রাজা পারেন মান্যদানে
সকল লোকেই ক’র্ত্তে মানী,
গড়্তে পারেন অখল প্রাণে
সামর্থ্য নাই সেটুক্খানি;
যেমনি হোক্—যেমনি হোক্,
মান্য তাঁদের যত সে হোক্,
উচ্চ সকল পদের চেয়ে
যোগ্যতা;—সে যেমনি হোক্:
বল গো তবে আসুক্ ভবে
আসিবে যাহা সুনিশ্চয়,
যোগ্যতা আর বুদ্ধি আবার
হউক্ জয়ী ধরণীময়!
যেমনি হোক্—যেমনি হোক্,
আসিবে সেদিন, যেমনি হোক্,
মানবে মানবে—ভাই ভাই হবে,
এ সারা ভুবনে যখনি হোক্।
রবার্ট বার্ণস্।
নিষ্ঠুরা সুন্দরী
নিষ্ঠুরা সুন্দরী।
কি ব্যথা তোমার ওহে সৈনিক,
কেন ভ্রম একা ম্রিয়মাণ!
শুকায় শেহালা হ্রদে হ্রদে, পাখী
গাহে না গান।
সৈনিক কিবা ব্যথিছে তোমায়?
কেন বা শ্রীহীন? কেন ম্লান?
শাখা-মূষিকের পূর্ণ কোটর,
মরাইয়ে ধান।
কমলের মত ধবল ললাটে
কেন বা ছুটিছে কাল-ঘাম?
কপোল-গোলাপ উঠিছে শুকা’য়ে,—
নাহি বিরাম।
“মাঠে মাঠে যেতে নারী সনে ভেট,—
সুন্দরী সে যে পরী-কুমারী,—
দীঘল চিকুর, লঘুগতি, আঁখি
উদাস তারি।
“গাঁথি’ মালা দিনু শিরে পরাইয়া,
কাঁকন, মেখলা কুসুমে গড়ি’;
চাহি’ মোর পানে আবেগে যেন সে
উঠে গুমরি’।
“চপল ঘোড়ায় লইনু তুলিয়া,
অনিমিখ সারা দিনমান;
পাশে হেলি’ সে যে গাহিল কেবলি
পরীর গান!
“আনি’ দিল মোরে কত ফলমূল,
দিল বনমধু, সুধারাশি গো
কহিল কি এক অপরূপ ভাষে,—
‘ভালবাসি গো!’
‘অপ্সর-বনে লয়ে গেল মোরে,
নিশ্বাসি’ কত কাদিল হায়;
মুদিনু তাহার ত্রস্ত নয়ন
চারি চুমায়।
“সেইখানে মোরে দিল সে নিদালি,
স্বপন দেখিনু কত হায়,
চরম স্বপন—তা’ও দেখেছি এ
গিরির গায়।
“মরণ পাংশু কত রথী, বীর,
কত রাজা মোরে ঘিরিয়া ঘোরে,
কহে তারা “হায়, নিঠুরা রূপসী
মজা’ল তোরে!
“দেখিনু তাদের ক্ষুধিত অধর,
লেখা যেন তাহে ‘সাবধান’
জেগে দেখি আমি হেথায় পড়িয়া,
গিরি শয়ান।
“সেই সে কারণে হেথা আমি আজ,
তাই ভ্রমি একা ম্রিয়মান;
যদিও শেহালা মরে হ্রদে, পাখী
না গাহে গান।”
নীলনদের বন্দনা
নীলনদের বন্দনা
জয় নীলনদ! জয়তু গোপন চারী!
স্বরূপ তোমার প্রকাশ মিশর দেশে;
আমা সবাকার তুমিই পালন কারী,
জীবন বাঁচাও কখন্ নিভৃতে এসে।
নিশিরে তুমিই দিবসে মিলাও আনি’,
তুমি আনন্দে পূর্ণ করহে প্রাণ;
বরষে বরষে জীবে জীবে প্রাণ দানি’
বন্যার জলে ভিজাও সকল স্থান।
বরষে বরষে কর রসার্দ্র দেশ,
নামিয়া গোপনে স্বর্গ সোপান হ’তে;
ওগো বলি-প্রিয়! ওগো বিমুক্ত-কেশ!
শস্যের ভার নিয়ে এস নীল স্রোতে।
দেবতা মানুষে গাহিছে তোমার জয়,
সবাই তোমারে ভালবাসে করে ভয়।
মিশরের চিত্র লিপি।
নেপালী শ্লোক
নেপালী শ্লোক।
আর ছায়া ছায়া নয়,—বটেরি ছায়া;
আর মারা নায়া নয়,—ঘরেরি মায়া।
পথের পথিক
পথের পথিক।
পথের পথিক! তুমি জানিলে না কি আকুল চোখে আমি চাই;
তোমারেই বুঝি খুঁজেছি স্বপনে, এতদিন তাহা বুঝি নাই!
কবে এক সাথে কাটায়েছি কোথা নিশ্চয় মোরা দুটিতে,
মুখ দেখে আজ মনে প’ড়ে গেল পথের মাঝারে ছুটিতে!
সাথে খেয়ে শুয়ে মানুষ যেন গো, পুরাণ যেন এ পরিচয়,
ও তনু কেবল তোমারি নহেক এ তনু শুধুই আমারি নয়!
চোখের মুখের সব অঙ্গের মাধুরী আবার আমারে দিয়ে,
আমার বাহুর বুকের পরশ চকিতের মত যাও গো নিয়ে।
কথা ত কহিতে পারিব না আমি মূরতি তোমার ভাবিব একা,
পথ‘পরে আঁখি রাখিব আমার ফিরে যত দিন না পাই দেখা।
আশায় রহিব আবার মিলিব তা’তে সন্দেহ আমার নাই,
দৃষ্টি রাখিব নিশিদিন যেন আর তোমা’ ধনে না হারাই।
হুইট্ম্যান
পদস্খলন
পদস্খলন।
কৌতুকে পড়িতেছিনু একদা দু’জনে,
সুন্দরের কথা,—তা’র প্রেমের কাহিনী,
নিভৃতে দু’জনে ছিনু অসংশয় মনে,
চোখাচোখি হ’তেছিল; শেণিত-বাহিনী
কপোল রঞ্জিয়াছিল দ্রুত অধ্যয়নে;
শেষে একঠায়ে মোরা ডুবিনু দু’জনে।
যখন পড়িনু মোরা,—চুমিল কেমনে
সে প্রেমিক ঈপ্সিত সে প্রফুল্ল আননে,—
যে আমারে ভুলিবে না কখনো জীবনে
কম্প্রবক্ষে মুখে মোর চুমিল অমনি!
পোড়া বই,—লিখেছিল কোন্ নষ্টজনে,
সে দিন সে কাব্য-পাঠ থামিল তখনি।
দান্তে।
পদস্থ বন্ধুর প্রতি
পদস্থ বন্ধুর প্রতি।
না হে বন্ধু, কাজ নাই আর, অভাব আমার নাইক বড়;
তোমার ‘ভালাই’ নিয়ে তুমি অন্য কোথাও সরে পড়।
রাজবাড়ীর উচ্ছিষ্টগুলো,—তোমায় হয় ত’ লাগে ভাল;
দোহাই তোমার,―আমীরী জাল আমার তরে কেন গড়?
ভালবাসার যত্ন সোহাগ আমি কেবল চাইরে ভাই,
খুব আমুদে সঙ্গী দু’জন,—মনের মতন যদি পাই;
পরিশ্রমের অন্ন দু’টি নিজের ঘরে খা’ব খুঁ’টি’;
‘মস্ত হ’বার ব্যস্ততা নাই’ ভগবানের হুকুম তাই।
(আমি) আপন মনে পথে পথেই গেয়ে বেড়াই প্রতিদিন,
তোমাদের জাঁকজমক্গুলো কর্ব্বে আমায় ভরসাহীন;
নিয়তির উচ্ছিষ্ট যদি ভাগ্যে পড়ে নিরবধি,
বল্ব “আমি যোগ্য নহি—আমি যে ভাই অতি দীন।”
আপ্নি খেটে আপন হাতে আন্বো খুঁটে যা’ কিছু পাই,
সবার চেয়ে বেশী রকম এইটে আমার সাজে রে ভাই;
যা’ হ’ক আমার ভিক্ষা ঝুলি,—কখ্খনো হবে না খালি;
‘মস্ত হ’বার ব্যস্ততা নাই'—ঈশ্বরেরও হুকুম তাই।
সে দিন আমি স্বপ্নে দেখি,—উড়েছি ওই নীল আকাশে,
সেখান হ’তে জগৎ পানে দেখছি চেয়ে বিষম ত্রাসে,—
বিশাল এক জীয়ন্তের নদে যায় রে ভেসে পদে পদে
কত রাজা, সৈন্য কত,—কতই জাতি ঘোর হুতাশে!
স্তব্ধ হ’লাম শব্দ শুনে,—জয়ধ্বনি সেইটে ভাই!
দেশ বিদেশে একজনের নাম চল্লো ধেয়ে শুনতে পাই;
ওগো মস্ত লোকেরা সব! তোমাদেরও হয় পরাভব?
‘উচ্চ আশার নাই প্রয়োজন’ ভগবানের হুকুম তাই!
যা’ হ’ক্ তা’ হ’ক সবার আগে তোমাদেরি ধন্য বলি,
ওগো মোদের কর্ম্মপটু রাজ্য-তরীর নাবিক গুলি!
পরস্পরের শান্তি-সুখে পরস্পরে দিচ্ছ ফুঁকে,
ভগ্নতরীর একটা দিকেই পড়্ছ ঝুঁকে সবাই মিলি’!
কূলে থেকে বল্ছি আমি ‘ভ্যালা রে মোর ভাই রে,
যা’ ক’রেছ খুব করেছ,—এমনি ধারাই চাই যে!’
তার পরে ফের রৌদ্রে বসে রোদ্ পোহাতে থাক্ব ক’সে,
‘উচ্চ আশার নাই প্রয়োজন’ ঈশ্বরেরও হুকুম তাই!
ঘৃতে আর চন্দনের কাঠে পুড়বে তুমি বুঝছি বেশ,
সুঁদ্রী কাঠের চিতার শুয়ে আমি হ’ব ভস্মশেষ;
তোমার শেষ-পালঙ্ক ধ’রে, আমীর উজীর চল্বে ঘিরে,
আমি যাব বাঁশের দোলায় নিয়ে আমার কাঙাল-বেশ।
মরণ কিন্তু মরণই—ঐ তোমারও যা আমারও তাই;
তোমার মশাল জ্বল্লো না আর আমার প্রদীপ নিব্ল রে ভাই।
তফাৎটা বা’ দেখ্ছি খাটে, চন্দনে আর সুঁদ্রী কাঠে;
‘উচ্চ আশার নাই প্রয়োজন’ ভগবানের হুকুম তাই!
তাই বলি ভাই আবার আমি মনের মতন হ’ব, ওরে,
চলে যা’ব জন্মের মত সেলাম ক’রে আড়ম্বরে;
তোমার এ সব রঙীন্ দেখে বাইরে ভাই এসেছি রেখে—
ছেঁড়া আমার চটিটা আর ভাঙা আমার বাঁশীটিরে।
আমি আমার বাঁশীর মত সমান স্বাধীনতাই চাই,
তা’তে তোমার রঙীন্ কাচের ঘরের কোনো ক্ষতিই নাই;
স্বাধীনতার বিজয় গীতে গাইব মোরা পথে পথে,
‘মস্ত হ’বার ব্যস্ততা নাই’ ঈশ্বরেরও হুকুম তাই।
বেরাঁজ্যার্।
পরমেষ্ঠী
পরমেষ্ঠী।
তখন ছিলনা ‘অস্তি’ ‘নাস্তি,’ না ছিল আকাশ
ভূমণ্ডল,
কে ছিল শরণ? কিবা আবরণ? সে কিগো গহন
গভীর জল?
মৃত্যু ছিল না, না ছিল অমৃত, না ছিল রাত্রি
না ছিল দিন,
বায়ুহীন দেশে নিশ্বাস ল’য়ে ছিল সেই ‘এক’
ক্রিয়া-বিহীন।
আঁধারের বুকে ঘনান্ধকার, ঠাহর না হয়
আকার কোনো,
সে মহার্ণবে আপনার তপে বাড়িতে লাগিল
মহিমা ঘন!
সেই আদিমের মনো-বিন্দুতে ধীরে ধীরে ধীরে
উপজে কাম,
কবিরা জানেন ‘নাস্তি’র সাথে সেই অস্তির
মিলন ধাম।
বিশ্বের বীজ অঙ্কুরি’ উঠে, মহা-মহিমায়
অখিল ভরে;
প্রযত্নবান পুরুষ ঊর্দ্ধে, নিম্নে প্রকৃতি
নিজেরে ধরে।
বিপুল সৃষ্টি!—কোথা হ’তে এল? কে জানে ইহার
জনম দিন?
সৃষ্টি কাহিনী কেমনে জানিবে? সৃষ্ট দেবতা
অর্ব্বাচীন?
পরম ব্যোমের পরম পুরুষ,—বিশ্ব লোকের
যে জন ধাতা,—
সে কথা হয় ত’ তিনিই জানেন, অথবা তিনিও
জানেন না তা’!
প্রজাপতি ঋষি৷
পরিবর্ত্তন
পরিবর্ত্তন।
বসন্তের গোলাপের আভা
শোভিছে ও কপোলে তোমার,
আর ওই হৃদয় ভরিয়া
বিরাজিছে শীতের তুষার!
কিন্তু ইহা যাবে উলটিয়া,
কার্য্য সাধি’ গেলে বর্ষচয়;—
তখন কপোল হবে হিম,
সন্তাপিবে বসন্ত হৃদয়!
হায়েন্।
পুণ্যের ক্ষয়
পুণ্যের ক্ষয়।
দেবতার মধ্যে এবে এ অধম দেশে
আশাদেবী আছেন কেবল,
অন্য সবে সুমেরুর স্বর্ণচূড়া বাহি’
গেছেন ত্যজিয়া ভূমণ্ডল।
অন্তর্হিত ধর্ম্মদেব সত্যদেব সহ,
শ্রী গিয়েছে ধী গিয়েছে চ’লে,
এ ভীরুর দেশে শুধু ধর্ম্মভীরু নাহি,
প্রতিজ্ঞা পালিতে এরা ভোলে।
দৃশ্চরিত্র দুর্জ্জনেরে করিতে বরণ
নারীদের দ্বিধা নাহি আর।
পাত্র ধনী?—ধন করে কলঙ্কমোচন,
কুৎসিতে সুন্দরে একাকার!
কুবেরের যূপে বলি পড়ে জোড়া জোড়া
লুব্ধ, নীচ, কুক্কুরী কুক্কুর,
পুণ্যের প্রাচীন যুগ অতীতে বিলীন,
হৃায় ধর্ম্ম হ’য়ে গেছে দূর।
থিয়োগ্নিস্।
পূর্ণ বিকাশ
পূর্ণ বিকাশ।
নারীর গর্ভে জন্ম লভিয়া
কে আছে এমন ভুবনে?—
ব্যাঘ্র অথবা বানরের ভাব
জাগেনি ক’ যার জীবনে?
মানুষ এখনো অপুষ্ট ভ্রূণ,—
আজো বাকী তার অনেকই;
হ’বে না তাহার নব উন্মেষ
নব নব যুগ সনে কি?
এখনো যে তা’র আব্ছায়া সব,
কত জাতি জীয়ে মরে গো;—
ত্রিকালদর্শী হেরে,—চিত্রের
রশ্মিতে ছায়া হরে গো!
এইরূপে যবে সবি এক হ’বে,
নির্ম্মল হ’বে দৃষ্টি,
গাহিব তখন, ‘জয় ভগবন,
মানুষ হ’য়েছে সৃষ্টি!’
টেনিসন্।
পূর্ব্বরাগ
পূর্ব্বরাগ।
নীরব যদিও রহে বালা আলাপনে,
আমি যবে কহি শোনে অবহিত মনে;
যদিও সাহসে চাহে না সে মুখ পানে,
দৃষ্টি তবুও তিষ্ঠেনা কোনো খানে!
কালিদাস।
পৃথিবীর সার্থকতা
পৃথিবীর সার্থকতা।
মনে কর তুমি নাই,—অথচ তোমার
নিখিল বিপুল বিশ্বে পূর্ণ অধিকার!
এ কথা কেমন?—শুধু কথামাত্র সার৷
গ্রহ-তারা-পুষ্প-ফলে বিচিত্র দর্শন
বীজমন্ত্র সম এই নিখিল ভুবন;—
ব্যাখ্যা, অর্থ, সার্থকতা সকলি ‘জীবন’!
খুশ্হাল৷
প্রবাসে
প্রবাসে।
হলুদ্ বরণ পাখী, ওরে হলুদ্ বরণ পাখী মোর,
শস্য খুঁটে নিস্নে আমার শস্য লুটে নিস্নে চোর!
বিদেশে বিদেশীর মাঝে পাইনে সাদর সম্ভাষণ,
চল্রে উড়ে পালাই দেশে যেথায় আছে আপন জন।
হলুদ্ বরণ পাখী, ওরে হলুদ্ বরণ পাখী মোর,
ভুট্টা খুঁটে নিস্নে মোদের নিস্নে ওরে ভুট্টা-খোর!
বিদেশে কেউ মন বোঝে না মিথ্যা মুখের পানে চাই,
চল্রে ভেসে আপন দেশে আপন জনের কাছে যাই।
সোনার বরণ পাখী, ওরে সোনার বরণ পাখী মোর,
মোদের রুটি নিস্নে লুটি’ পাখীরে পায় ধরি তোর;
বিদেশে বিদেশীর মাঝে থাক্তে মোরা পারিনা, ভাই,
চল্রে মোরা সবাই মিলে দেশের কোলে ফিরে যাই।
চীন দেশের ‘সী কিং’ গ্রন্থ।
প্রস্থিতা
প্রস্থিতা।
নয়ন রে তোর উদিত ভাগ্য এখনি অস্ত যায়,
মরম দেশের মহা উৎসব ফুরায়ে গেল সে হায়!
ধৈর্য্য-দুয়ারে কবাট পড়িল, পড়িল সে চিরতরে,
পড়ে যবনিকা, লুকাল বালিকা, চ’লে গেল লীলা ভরে।
কালিদাস।
প্রাচীন প্রেম
প্রাচীন প্রেম।
যখন তুমি প্রাচীন হ’বে সন্ধ্যাকালে তবে,
উনন্ পাড়ে বসে বসে কাট্বে সূতা যবে,
আমার রচা গানগুলি হায় গুন্গুনিয়ে গা’বে,
বল্বে তুমি ‘জানিস্ কিলো!
আহা যখন বয়েস্ ছিল
লিখ্ত গানে আমার কথা কবি সে তার ভাবে!’
শোনে যদি দাসীরা সব আমার রচা গান,—
কাজ সেরে শেষ ঘুমায় যখন,—গানে তোমার নাম
শুনে যদি ওঠেই জেগে,
বল্বে তা’রা ক্ষণেক থেকে,
‘ধন্য তুমি উদ্দেশে যার কবি রচে গান!’
মাটির তলে মাটি হয়ে ঘুমিয়ে আনি র’ব,
গাছের ছয়ে নিশির কায়ে, ছায়া যখন হ’ব,
তোমার গর্ব্ব, আমার প্রীতি,
মনে তোমার পড়্বে নিতি,
দিয়ো তখন—দিয়ো মোরে—দক্ষ প্রণয় তব;—
তুমি যখন প্রাচীন হবে, আমি—ধূলি হ’ব।
রঁস্যার্দ্দ্।
প্রিয় বিরহে
প্রিয়-বিরহে।
ওগো প্রিয়তম! তোমার কথাই ভাল লাগে মোর মনে,
লক্ষ যতনে যা’ বোঝার লোকে লাগে না মনের কোণে;
ক্ষীর দিয়া মুখে যদি পালঙ্কে রাখ গো জলের মীন,
তবু ধড়ফড়ি’ মরিবে সে, হায়, হইবে সংজ্ঞাহীন।
জহুরি চিনেছে হীরায়,—তাই সে হাতুড়ি মানে না আর,
স্বাতীর সোয়াদ পাপিয়াই জানে বিরহের ব্যথা যা’র;
কবীর কহিছে ভাবের ভুবনে গোপন নাহিক আর।
কবীর।
প্রিয়া যবে পাশে
প্রিয়া যবে পাশে।
প্রিয়া যবে পাশে, হস্তে পেয়ালা, গোলাপের মালা গলে;—
কেবা সুল্তান্? তখন আমার গোলাম সে পদতলে।
ব’লে দাও বাতি না জ্বালায় আজি আমোদের নাহি সীমা,
আজ প্রেয়সীর মুখ-চন্দ্রের আনন্দ পূর্ণিমা!
আমাদের দলে সরাব যা’চলে তাহে কারো নাহি রোষ,
তবে ফুলময়ী! তুমি না থাকিলে পরশিতে পারে দোষ।
আমাদের এই প্রেমিক সমাজে আতর ব্যাভার নাই,
প্রিয়ার কেশের সুরভিতে মোরা মগন সর্ব্বদাই।
শরের মুরলী শুনি আমি ওগো সমস্ত কান ভরি’,
আঁখি ভরি’ দেখি সুরার পেয়ালা—তব রূপ সুন্দরী!
শর্করা মিঠা আমারে ব’ল’ না, প্রিয়া! আমি তাহা জানি,
তবু সব চেয়ে ভালবাসি ওই মধুর অধর খানি।
অখ্যাতি হ’বে? অখ্যাতিতেই বেজে গেছে মোর নাম,
নাম যাবে? যাক্, নামই আমার সব লজ্জার ধাম;
মত্ত, মাতাল, ব্যসনী আমি গো, আমি কটাক্ষ-বীর,
একা আমি নই, আমারি মতন অনেকেই নগরীর।
মোল্লার কাছে মোর বিরুদ্ধে করিয়োনা অনুযোগ,
তাঁর’ আছে, হায়, আমারি মতন সুরা-মত্ততা রোগ!
প্রিয়ারে ছাড়িয়া থেক না হাফেজ! ছেড়না পেয়াল লাল,
এ যে গোলাপের চামেলির দিন—এ যে উৎসব কাল!
হাফেজ।
প্রিয়ার পরশ
প্রিয়ার পরশ।
সরস পরশে তব ইন্দ্রিয়ের উপজে বিকার,
ও পরশ চেতনারে ভ্রান্ত করি’ চিরায় আবার!
নিশ্চয় করিতে নারি,—হর্ষ ইহা কিম্বা দুঃখভার,
মোহ—নিদ্রা,—মত্ততা কি সুধাসেক,—বিষের সঞ্চার!
ভবভূতি।
প্রেম ও গৌরব
প্রেম ও গৌরব।
মোরে শুনায়ো না খ্যাতির কাহিনী, —ইতিহাসে খ্যাত নাম,
যৌবন-দিন শুধু মানবের সব গৌরব-ধাম!
বাইশ বছর বয়সের সেই প্রেম-কুসুমের হার,
জয়-মাল্যের চাইতে মূল্য শতগুণে বেশী তা’র।
বলি-লাঞ্ছিত ললাটের ’পরে পুষ্প-মুকুট কেন?
মরণ-পাংশু কুসুমের দলে স্নিগ্ধ শিশির হেন!
পাকা চুলে আর সাজায়ো না ফুলে, যাও, নিয়ে যাও মালা;
কে চাহে বিজয়-মাল্য?—যদি সে শুধুই নামের জ্বালা।
কীর্ত্তি! তোমার কৃপায় কখনো হর্ষ যদি বা আসে,
সে নহে তোমার শুনিতে-মস্ত কেতা-দুরস্ত ভাষে;
সে পুলক শুধু তখনি জাগে গো যবে গৌরব গানে,
ভাল বাসিবার অযোগ্য নহি, প্রিয়া মোর বুঝে প্রাণে।
গৌরব আমি খুঁজেছি, পেয়েছি প্রিয়ার নয়ন মাঝে,
কীর্ত্তি-ছটার প্রধান রশ্মি তারি চাহনিতে আছে;
যখনি সে আঁখি উজ্জ্বল হয় চাহিয়া আমার পানে,
আমি মনে জানি সেই ভালবাসা, কীর্ত্তি সে—জানি প্রাণে।
বায়রণ।
প্রেম ও মৃত্যু
প্রেম ও মৃত্যু।
ভালবাসা! যদি তোর পূর্ণ ক্ষেত্র হ’তে,
মরণ, সোনার শীষ তোলে;—
দিস্রে গলায়ে দিস্ শোকে মূঢ় প্রাণ,
সোনার প্রদীপ দিস্ জ্বেলে।
নিরাশার কুমন্ত্রণা করি’ পরাজয়
শুনাস্ মধুর আলাপন;
মরণ, ফসল তোর বাঁটি’ যদি লয়
ছাড়িস্ নে বপন রোপন।
বেরাঁজ্যার।
প্রেম-বিমুখ
প্রেম-বিমুখ।
ওরে মন! তুই ছেড়ে চলে আয় প্রেম বিমুখের সঙ্গ;—
কুমতি উদয় যার সাথে হয়,—হয়রে ভজন ভঙ্গ।
কাকে কি করিবে কর্পূর থেয়ে? কুকুর গঙ্গা নেয়ে?
গাধা কি করিবে অগুরু গন্ধে? মর্কট মালা ল’য়ে?
নাহিক সুমতি, সাধু সঙ্গতি, বিষয়ে ডুবিয়া মরে;
কহে সুরদাস কালো কম্বলে অন্য রং কি ধরে?
সুরদাস।
প্রেম-সঙ্কট
প্রেম সঙ্কট।
দুর্লভ জনে অনুরাগ মম, হায়,
লজ্জা বিষম, আমি পরবশ তায়।
এ কি সঙ্কট, সখী এ কি হ’ল দায়,
মরণই শরণ, নিরুপায়, নিরুপায়৷
প্রেমের ইন্দ্রজাল
প্রেমের ইন্দ্রজাল।
নীবীবন্ধন আপনি খসিছে, স্ফুরিছে ওষ্ঠাধর,
মনে মায়াবীজ বপন ক’রেছে;—সখী, সেকি যাদুকর?
যখনি আমার মদন-গোপালে নয়নে দেখেছি, হায়,
তখনি পড়েছি ইন্দ্রজালেতে,—সখী লো ঠেকেছি দায়!
শুকপাখী এসে চলে গেছে, হায়, মোরে করি’ উদ্ভ্রান্ত,
এ যদি কুহক নহে তবে আর কুহক কি তাই জান্ ত’।
কাল নিশি হ’তে খুন আসি’ চোখে কেবল পাগল করে;
স্বপনে সে আসে, জাগিলে লুকায়, মর্ম্ম বিদরে ওরে!
সখীরে সে শুধু চুম্বন দিতে চেয়েছিল এ অধরে,
তোদের দেখিয়া মদন-গোপাল চ’লে গেছে রোষভরে;
খেলা ছলে এসে ভালবাসা সে যে ঢেলে দিয়ে গেছে প্রাণে,
হায় সখি, মোর মদন-গোপাল না জানি কি গুণ জানে!
তামিল কবিতা।
প্রেমের নেশা
প্রেমের নেশা
ধন্য সে,—প্রভাতে জাগি’ সতৃষ্ণ নয়নে
প্রতিদিন যেইজন দেখে ও বয়ান;—
মাতাল চেতনা পায় নিশা অবসানে,
প্রেমের কাটে না নেশা না গেলে পরাণ!
সাদি।
প্রেমের বেদনা
প্রেমের বেদনা।
আবার ভালবাসা কাঁদায় মোরে,
অমৃত এনেছে সে তিক্তে ভ’রে;
দুখের নিধি মম পরাণ প্রিয়তম,
বেঁধেছে সে আমায় ফুলের ডোরে,—
বেঁধেছে সুচীময় ফুলের ডোরে।
এ কি গো ভালবাসা ঘটালে জ্বালা?
পরালে গলে মোর কেমন মালা?
ছিঁড়িতে নারি তায়, বহিতে প্রাণ যায়,
করিবি কি বা হায় মুগুধা বালা,
দোলায়ে দিল গলে কিসের মালা!
স্যাফো।
প্রেমের সুখ দুঃখ
প্রেমের সুখদুঃখ।
প্রেম রাখিল মাথাটি তা’র
কাঁটায় ভরা গোলাপ শেষে;—
ঠোঁট দু’টি তার শুকিয়ে এল,
আঁখির পাতা উঠ্ল ভিজে।
সঙ্গীহারা শিথানে তা’র
ভয় ভাবনা রইল ঘিরে;
তিলে তিলে পোহায় নিশি,
ঊষায় ধরা হাসে ফিরে;
ঊষার সাথে হরষ এসে
চুমিল সেই মুখটি ধীরে,
ভয় ভাবনা গেলেন সরে
ছিলেন যাঁরা শিথান ঘিরে!
আঁখিতে তা’র ফুট্ল আলো,
ঠোঁটে ঊষার হাসি-রাশি;
নিশায় বিষাদ রাজ্য করুক্
ঊষা ফিরে আন্বে হাসি!
সুইন্বার্ণ
প্রোষিত ভর্ত্তৃকা
প্রোষিত ভর্ত্তৃকা।
প্রভু মম যোদ্ধা তেজীয়ান্,
বীরাগ্রণী বীর;
নৃপ আগে রণে তিনি যান,
করে ধনু তীর।
যুদ্ধে যবে গেল প্রিয়তম,
সে অবধি কি গ্রীষ্মে কি শীতে,—
রুক্ষ কেশ ওড়ে শণ সম;
বাঁধিব সে? কাহারে তুষিতে?
বৃষ্টি চাই, তবু সূর্য্য ওঠে
নির্মেঘ আকাশে;
তাঁরি কথা প্রাণে সদা ফোটে,
মনে শুধু আসে।
কোথা মিলে বিস্মরণী লতা?
আমি দ্বারে করিব রোপণ;
জাগে যে কেবলি তাঁরি কথা,
হায় তাহে কেবলি রোদন!
“শী-কিং” গ্রন্থ।
ফার্সী উদ্ভট
ফার্সী উদ্ভট।
জিজ্ঞাসি’ বৃশ্চিকে ধীরে ধীরে,—
শীতে কেন এসনা বাহিরে?
বিছা বলে ‘গ্রীষ্মে বড় করেছি সুকাজ,—
তা’ বাহির হ’ব আজ!’
জিজ্ঞাসিনু বুড়া-বিপত্নীকে,—
কেন তুমি কর না ক’ নিকে?
“বৃদ্ধার রূপ বড়ই ঠেকে ফিঁকে।”
অর্থ আছে বালা-নারী লহ।
“বৃদ্ধা যদি আমারি অসহ,
বালা কেন চাইবে বুড়ায়? কহ!”
সাদি
বধু
বধূ।
ছেলেবেলার কথা ভাবি যখন জ্বলে সাঁঝের দীপ;
মনে পড়ে গাঙের ধারে তল্তা বাঁশের দীর্ঘ ছিপ্।
বাম দিকে সেই ঝর্ণা ঝরে, ডাহিন দিকে বইছে নদী,
দূরে হ’লে ও তোমরা আমার কাছেই আছ নিরবধি।
আঁখি যে ঠাঁই দেখ্তে না পায়, মন ছোটে সেই বাপের ঘরে,
বাপের মায়ের ভায়ের আদর না পেয়ে প্রাণ কেমন করে।
ঝর্ণা ঝরার ঝঙ্কারে আর নদীর কুলুকুলুর সাথে,
তোমাদের আনন্দ হাসি শুনি আমি আঁধার রাতে!
কেরল কাঠের নৌকা চ’ড়ে সরল কাঠের দাঁড়টি বেয়ে,
মাগো আমার ইচ্ছা করে তোমার কাছে জুড়াই গিয়ে।
বনচ্ছায়ায়
বনচ্ছায়ায়।
সবুজ বনের সবুজ ছায়,
আয় গো কে তোরা মেলিবি কায়;
পাখীর কণ্ঠে মিলায়ে তান,
গাহিবি মধুর—মধুর গান!
আয় গো হেথা আয় গো, হেথা আয়!
এখানে নাই—
কোনো বালাই,
শুধু শীত—শুধু শীতের বায়।
আকাঙ্ক্ষারে বিদায় ক’রে,
মেলিবি কায় রবির করে,
ফলের রাশি কুড়িয়ে এনে,
ভুঞ্জিবি আয় হরিষ মনে,
আয় গো হেথা জয় গো, হেথা আয়!
হেথায় নাই—
কোনো বালাই,
শুধু শীত—শুধু শীতের বায়।
শেক্সপীয়ার।
বন্দীর প্রার্থনা
বন্দীর প্রার্থনা ৷
বন্দী মোরা,—মোরা ভাগ্যহীন;
ভগবান! দাও হে সুদিন।
কর প্রভু শৃঙ্খল মোচন,—
দূর কর অধর্ম্মাচরণ;
ল’য়ে চল ঊষার মন্দিরে,
স্নিগ্ধ শান্ত স্বর্গনদী তীরে;
ল’য়ে চল আনন্দের চির নিকেতনে,
ল’য়ে চল শান্তি ধামে,—সান্ত্বনা ভুবনে,
শোনো প্রভু মোদের প্রার্থনা,
প্রভু মোরা হয়েছি ব্যাকুল;
দুর্ভাগার—বন্দীর প্রার্থনা,
দয়াময় হও অনুকূল!
সিঙ্কিভিচ।
বন্ধু গর্ব্ব
বন্ধু-গর্ব্ব।
তাদের গর্ব্ব ক’রে থাকি আমি,—সে কথাটি জানি আমি,
যাহারা নিয়ত আমারে ঘিরিয়া রয়েছে দিবস-যামী;
আমার গর্ব্ব, আমার সর্ব্ব, আমার বন্ধু তা’রা;—
এতগুলি মণি-রতনের মাঝে হ’য়ে আছি আমি হারা।
তা’রা ঢলঢল মুকুতার ফল,—তারা মুকুতার পাঁতি,
আমি একখানি রেশমের সূতা তা’দের রেখেছি গাঁথি’।
পশি’ পরশিয়া দেখিয়াছি আমি অন্তর সবাকার,
তাদের বক্ষ-নীড়ে গতিবিধি চিরদিন এজনার;
আমারে ঘিরিয়া আছে নিশিদিন, আমারে বেড়িয়া আছে,
মোরে নির্ভয়ে করি’ নির্ভর তা’রা হেসে খেলে বাঁচে;
তা’রা ঢলঢল লাবণ্য-জল-সিক্ত মুকুতা পাঁতি,
আমি একখানি রেশমের সূতা রেখেছি তা’দের গাঁথি’।
মস্কিন্ অল্ দরামি
বসন্তে
বসন্তে।
আম্র শাখায় ফুল দুলিয়ে,
মানিনীদের মান ভুলিয়ে,
পঞ্চশরের দূত এসেছে মধুর মলয় বায়;
ফুটেছে ফুল, অশোক বকুল,
মিলন আশে পরাণ আকুল,—
দূর প্রবাসীর নারী,—হৃদয় ধর্তে নারে হায়৷
ফাগুন এসে আগেই হিয়া!
কোমল ক’রে যায় রাখিয়া,
শেষে মদন সুযোগ পেয়ে বাগ হানে গো তায়৷
বসন্তে (২)
বসন্তে।
আবার ভাটেরা গান ধরিল নূতন,
নূতন কাহিনী বাঁশী কহে অনুখন,
থাকুন্ গুহায় যোগীবর, আমি আজ যা’ব উপবনে,
ওই দেখ বসন্তের ফুল আমায় যে ডাকিছে সঘনে!
স্থগিত রাখিতে ক্ষুধা ঘুমায় ভিখারী,
অধোমুখ আজো রাজা রাজ্য-কথা স্মরি’!
দেখিতে যা’ ভাল লাগে চোখে, দেখিলে তা’ দোষ যদি হয়,
তবে—তবে—তবে খুশ্হাল্ আজন্ম আসামী সুনিশ্চয়৷
খুশ্হাল৷
বসুন্ধরা
বসুন্ধরা।
জীবের জননী তুমি, অয়ি বসুন্ধরা!
অগাধ অনন্ত স্নেহে ও হৃদয় ভরা।
হে আদি-সস্তূতা, আজি বন্দিব তোমার,
মহীয়সী তব নাম নবীন গাথায়।
সাগরে বিহরে যা’রা বিচিত্র বরণ,—
আকাশে আমোদে ভাসে;— করে বিচরণ
পুণ্যময় ভূমি ’পরে শান্তি পারাবার;—
সকলি তোমার দেবী সকলি তোমার।
সবারে সমান ভাবে পাল গো আপনি
অনন্ত রতন ধনে, হে আদি-জননি!
ফুল্লমুখ শিশু হাসে—সে তোমারি কোলে;
শাখে শাখে পাকা ফল পুঞ্জে পুঞ্জে দোলে;
মানব-জীবন,—সেও তব ইচ্ছাধীন,
আপনি ফুটায়ে কর আপনাতে লীন!
হোমর।
বাতুলতা
বাতুলতা।
স্রোতের জলে লেখার চেয়ে বড়
এক্টা মাত্র আছে বাতুলতা;—
সেটা কেবল তা’রি কথাই ভাবা,—
ভাবে না যে জন্মে তোমার কথা।
“ম-ন্যো-শু” গ্রন্থ।
বালিকার অনুরাগ
বালিকার অনুরাগ।
(তার) রূপ দেখে হায় ঘরের কোণে মন কি রাখা যায়?
(সে যে) পথের ধারে দাঁড়িয়েছিল আমার প্রতীক্ষায়!
(সে যে) মিথ্য| এসে ফিরে গেল তাই ভাবি গো হায়।
পথের আনাগোনার মাঝে কতই মানুষ যায়,
(আমি) কখ্খনো ত’ চক্ষে অমন রূপ দেখি নি, হায়;
(তারে) দেখ্তে পেয়ে ও আজ কেন হায় যাই নি জানালায়।
ওড়্না খানি উড়িয়ে দেব অঙ্গরাখার‘পর,
তোমরা সবাই জেনে থাক, আস্বে আমার বর!
(আমি) বরের ঘোড়ায় চড়ে যাব কর্ত্তে বরের ঘর।
ওড়্না খানি উড়্ছে আমার বসন্ত হাওয়ায়,
ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ গো ওই দূরে শোনা যায়,
(আমি) পরের ঘরে কর্ব্ব আপন, আমায় দাও বিদায়।
চীন দেশের ‘শী-কি’ গ্রন্থ।
বিচারক
বিচারক।
পরের পরাণ মনের মাঝারে যত তোলাপাড়া হয়,
তা’র সনে যদি তোমার হিয়ার নাহি থাকে পরিচয়,
আচরণ তা’র বিচার করিতে যেয়ো না যেয়ো না তবে,
তুমি যাহা ভাব’ কলঙ্ক, তাহা অস্ত্রের লেখা হবে;
হয় ত’ সে রণে তুমি হেরে যেতে; সে তবু হয়েছে
ক্ষতের চিহ্ণ বহিছে এখন ক্ষতের যাতনা সহি’।
তা’র যতখানি তোমার নয়ন অপ্রিয় বলি’ মানে,
হয় ত’ তাহার চরিত্র-বল বিকশিত সেইখানে;
হয় ত’ সে কোনো রিপুর সঙ্গে জীবন মরণ রণ,
যা’র স্মৃতি আজো হৃদে জাগরূক রয়েছে অনুক্ষণ;—
যে রিপুর সাথে যুঝতে হয় ত’ তুমি হ’তে অধোমুখ,
অধরে মিশাত আজিকার ওই বিদ্রূপ হাসিটুক্।
যে ত্রুটির তরে তুমি কর ঘৃণা হয় ত’ সে কিছু নয়,
হয় ত’ দেবতা নিয়েছেন তা’র শক্তির পরিচয়;—
কঠিন মাটিতে পড়িয়া, আবার যাহে সে ভবিষ্যতে
পায়ে উঠিবারে আপনার বলে,—চলিবারে দৃঢ়পদে;
কিবা অন্তরে তুচ্ছ জানিয়া ধরণীর ধনমানে,
উড়ে যেতে যাহে মন চাহে তা’র আকাশের নীড় পানে।
“একেবারে গেছে,—“নষ্ট হ’রেছে” এমন ভেবনা মনে,
রাখো আশা রাখো ভালবাসা, ঘৃণা কোরো না পতিত জনে;
তা’র পতনের গভীরতা তা’র শোচনার পরিমাপ,
পতন যতই গভীর ততই উচ্চ সে পরিতাপ;
যত নীচে পড়ে গিয়েছে অভাগা, হরত’ সে পুনরায়,
হ’বে উন্নীত তেমনি উচ্চে বিধাতার মহিমায়।
আ্যাডেলেড্ অ্যান্ প্রোক্টার।
বিচিত্রা
বিচিত্রা।
হেথায় উঠিছে বীণাধ্বনি,
হোথায় শোকের হাহাকার;
হেথা তর্ক করে জ্ঞানী, গুণী,
মাতালের হোথায় চীৎকার!
হেথায় সুন্দরী মনোহরা,
হোথা বৃদ্ধা,―জীর্ণ দেহখান্;
না বুঝিনু কেমন এ ধরা,
অমৃত কি গরলে নির্ম্মাণ!
ভর্ত্তৃহরি
বিড়ম্বনা
বিড়ম্বনা।
বেঁচে থাকা বিড়ম্বনা, হায়!
এক্টুকু প্রেমের আরাম,
এক্টুকু জীবন সংগ্রাম,
তার পর?—বিদায়, বিদায়!
লীলাখেলা দু’দিনে ফুরায়;
এতটুকু আশার কিরণ,
এতটুকু মধুর স্বপন,
তার পর?―নীরবে বিদায়!
মন্ত্ নাইকেন্।
বিদায় ক্ষণে
বিদায় ক্ষণে।
মাঝিরা বলিল ‘গেল বেলা গেল,
আর বিলম্ব নয়।’
সেই ক্ষণে প্রিয়া শিখা’ল হিয়ায়
আঁখি কত কি যে কয়!
উদ্বেল হিয়া কাছে এল প্রিয়া
কহিতে বিদায় বাণী;
মনের যে কথা মুখে মিলাল তা’
আধেক চেতনা মানি’।
মুগ্ধ নয়ন জল-ভার-নত,
মেলি’ দুই খানি কর,
গোলাপের বনে মলয়ার মত
পড়িল বুকেরি ‘পর।
রাহু সম মোর উত্সুক বাহু
বেড়িয়া ধরিল তা’রে;
সে কহিল কাঁদি’ “পরিচয় যদি
না ঘটিত একেবারে।”
আবু মহম্মদ।
বিশ্ববাণীর বারতা এনেছি
বিশ্ববাণীর বারতা এনেছি বঙ্গের সভাতলে,
ভ’রেছি আমার সোনার ফলস নানা তীর্থের জলে;
ওগো তোরা আয় আয়!
নিখিল কবির সঙ্গীত ওঠে বঙ্গের বন ছায়!
স্তব্ধ বিমূঢ় শত শতাব্দ যাহাদের মুখ চায়,—
যা’দের ভাষায় অতীত জগৎ পুনর্জীবন পায়,—
ভা’রা আজি কুতু হলে
বঙ্গবাণীর মন্দিরে আসি’ মিলিয়াছে দলে, দলে!
আমার কণ্ঠে গাহিছে আজিকে জগতের যত কবি!
আমার তুলিতে আঁকিছে তাদের দুঃখ সুখের ছবি।
শত বিচিত্র সুর,
আজি একত্রে বিহরে হরষে অখণ্ড সুমধুর!
আমার কণ্ঠে গাহিছেন ব্যাস, বাল্মিকী, কালিদাস!
দান্তে, হোমার, শেক্ষপীয়ার, কণ্ঠে করিছে বাস!
গেটে, হুগো, বায়রণ,
হেঙজু, হাফেজ, স্যাফো, অবৈয়ার, খুসহাল, টেনিসন্।
ওমর খৈয়াম আসিয়া মিলেছে, এসেছে ভল্টেয়ার;
হায়েন্ এসেছে, শেলি, সাদি, কীটস, বার্ণস্, বেরাঞ্জার।
আরো যে এসেছে কত!
মোদের পদ্মবনে জগতের জুটেছে মধুব্রত!
নানা দেশে যা’রা ছিল গো ছিন্ন, ছিল নানা মত ভাষা,—
নানা কালে যা’রা ছিল বিভিন্ন, না ছিল মিলন আশা,
তা’রা আজি এক ঠাঁই!
আকুল হৃদয়ে করে কোলাকুলি পুলকের সীমা নাই।
প্রেম-যমুনায় মিলেছে অজিকে স্নেহ-গঙ্গার ধারা,
জ্বালা কুণ্ডের এসেছে প্রবাহ টুটিয়া পাষাণ কারা;
চুপে চুপে তা’রি সাথে
ঝরিয়া মিশেছে স্নিগ্ধ শিশির গোপনে তিমির রাতে।
কুম্ভ আমার ভরিরা এনেছি শত তীর্থের জলে,
বঙ্গবাণীর পুণ্যাভিষেক পুন আজি হ’বে ব’লে;
ওগো তোরা আয় আয়,
শতেক ধারায় তীর্থ সলিল উথলি বহিয়া যায়!
বৃদ্ধের যৌবন-স্বপ্ন
বৃদ্ধের যৌবন-স্বপ্ন
বুড়া হ’য়ে যৌবন যে চায়,
বল তা’রে ‘ওগো মহাশয়!
যে কর্ম্ম ক’রেছ তার এই যোগ্যবেশ, এই পরিচয়
তবে কেন মিছামিছি আর
আপন লজ্জার কথা তোলা বারম্বার?”
মরণেরে কেন ভয় করা?
এখন ত’ দেহে মোর জরা;
প্রিয়জন কত গেছে আগে, কাঁচা চুলে চলে গেছে তা’রা।
আর আমি ভেবে হ’ব সারা?
পাগল না হ’য়ে তবু পাগলের পারা!
মানুষ ত’ বালুকার ঘর,
ভাঙিছে গড়িছে নিরন্তর;
ভাল ক’রে আঁখি মেলে দেখ, —সন্দেহ রবে না অতঃপর।
নিয়তির চুল্লী কে এড়ায়?
খুস্হাল্,স্বচক্ষে দেখেছে,—
শুষ্ক, শ্যাম সব সে পোড়ায়!
খুশ্হাল্।
বৃদ্ধের স্বপ্ন
বৃদ্ধের স্বপ্ন।
আহা নিমেষের যৌবন-সুখ
ফিরে কর মোরে দান,
বালকের মত হাসি আরবার,
চাহিনা বুড়ার মান।
দূর হ’ কালের লুণ্ঠিত ধন,
যশের মুকুট নাও,
যায় ছিঁড়ে যাক্ জ্ঞানের লিখন,
জয় ধ্বজা ভেঙে দাও।
শিরায় শিরায় অনল-উৎস
কৈশোর এসে ফিরে,
দিক্ ভালবাসা, কীর্ত্তির আশা
মদির স্বপনে ঘিরে।
শুনিল দেবতা প্রার্থনা মম
হাসিয়া কহিল ধীরে,
“এখনি তোমার কামনা পূরিবে,—
যদি হাত রাখি শিরে।
“কিন্তু ভাবিয়া দেখ দেখি, এর
রাখিতে চাহ কি কিছু?
কামনা তোমার পূরাতে সময়
এখনি হটিবে পিছু!”
আহা প্রাণাধিকা পত্নীরে ছেড়ে
কে বল বাঁচিতে পারে?—
পারিনা ছাড়িতে প্রিয়ারে আমার,
রাখিতে দিবে কি তা’রে?
লইল দেবতা স্বর্ণ লেখনী,—
ডুবাইয়া জোছনাতে,—
লিখিল—‘বালক হইবে আবার
পতি হ’বে তারি সাথে!’
“নাহি তবে আর প্রার্থিত কিছু?—
এখনি বালক হ’বে,
বয়সের সাথে যা কিছু পেয়েছ,—
মনে রেখ, সব যা’বে।”
রহ দেখি,—আহা! কত আনন্দ
জনক-জীবনে, মরি,
পুত্ত্র, দুহিতা, —তাহাদের হায়,
তেয়াগ কেমনে করি?
ফেলিয়া লেখনী মধুর হাসিয়া
দেবতা কহিল “হায়,
বালক হইয়া পিতা হ’তে চাও!
বলিহারি কামনায়!”
আমি হাসিলাম, —ভাঙিল স্বপ্ন
হাসির আবেগ-ভরে,
লিখিনু কাহিনী তরুণ-পরাণ
প্রবীণ জনের তরে।
অলিভার্ ওয়েণ্ডেল্ হোম্স্
বেলুচির গান
বেলুচির গান।
শোনো বীর! শোনো বন্ধু আমার, শোনো নবতর তান,
আমি কবি—আমি গাথার গায়ক গাহিব নূতন গান!
মাণিক কুড়ায়ে পেয়েছি গো আমি বিঁধেছি মুক্তাফল,
ছন্দের কাঁদে বাঁধিয়া ফেলেছি ভাবরাশি চঞ্চল।
কল্য নির্ণাথে ছিলাম যখন মগন নিদ্রা-ঘোরে,
স্বপনে আমার কল্পনা এসে দেখা দিয়ে গেছে মোরে!
তাজা ঘাসে ভরা ক্ষেত্রের চেয়ে নধর সে কচি মুখ,
‘দুম্বা’ মেষের পুচ্ছ জিনিয়া রসে ডগমগ বুক!
শীর্ণবৃন্ত কুসুমের মত বায়ুভরে দোলে কায়,
নাগকেশরের পেলব সুষমা সকল অঙ্গ ছায়!
আমি ভাবি মনে বুঝি তা’র সনে মিলিব দিনের শেষে,
চির-আলোকিত পরীর রাজ্যে,—শত উৎসের দেশে!
অজ্ঞাত।
বৈরাগ্যোদয়
বৈরাগ্যোদয়।
বনের মধ্যে আমের বৃক্ষ দেখিলাম সুবিশাল,
শ্যামল তাহার পল্লব-ছায়া, ফল তা’র সুরসাল;
পথিকেরা এসে ফলের লালসে ভাঙিয়া ফেলিল শাখা!
হৃদয় কহিল—‘সংসার মাঝে আর শ্রেয় নয় থাকা।’
চিকণ দু’খানি সোনার কাঁকণ পরিল যখন নারী,
শব্দ হ’ল না বিন্দু মাত্র; হায়, কিছু পরে তারি
কাঁকণে কাঁকণ ঠেকিল যেমন দ্বন্দ উঠিল বাজি’!
হৃদয় কহিল ‘আর কেন? চল, সংসার সুখ ত্যজি’!
পক্ষীর দলে এসে পড়েছিল ভিন্ন দলের পাখী,
মুখে ছিল তা’র খাদ্যের ভার, তায় ছিল সে একাকী;
চঞ্চু আঘাতে সকলে মিলিয়া ব্যস্ত করিল তা’রে!
হৃদয় কহিল ‘পালাও, পালাও, কাজ নাই সংসারে।”
মসৃণ দেহ, উচ্চ ককুদ, উদ্ধৃত, বলবান
বৃষ চলিয়াছে; ভয়ে তার কাছে কেহ নহে আগুয়ান;
সে করিল এক ধেনুর কামনা,—অমনি শৃঙ্গাঘাত!
আমি লইলাম ভিক্ষাপাত্র; সংসারে প্রণিপাত।
বৌদ্ধজাতক গ্রন্থ।
বৌদ্ধের তপস্যা
বৌদ্ধের তপস্যা।
শশক-বর্ষ আসেনি তখনো ব্যাঘ্র-বর্ষ যায়,
ধর্ম্ম-চক্র ধরিতে হৃদয় ব্যাকুল হইল হায়;
তাই সে একদা তুষার সীমায় হইনু উপস্থিত,
সঙ্গী বিহীন নির্জ্জন গিরি, শঙ্কা বিহীন চিত।
পবনে গগনে যুক্তি করিয়া বৃষ্টি করিল শিলা,
চন্দ্র তপন হইল বন্দী, কেবলি মেঘের লীলা;
লোহার নিগড়ে নয় গ্রহ বাঁধা পড়িলেন একে একে,
দুনো উজ্জল ‘দুক্’ তারা শুধু দেখা যায় থেকে থেকে।
নয় রাতি নয় দিনমান ধরি’ বরফ-ফুল্কি ঝরে,
সরিষার মত কোনোটি পঙ্গপালের আকার ধরে!
বরফের গুঁড়া জমাট বাঁধিল বড় বড় চুড়া ব্যেপে,
নীচে বনভূমি মুরছিয়া পড়ে গুরুভার বুকে চেপে;
শিলা কঙ্কাল পুরিল তুষারে, ঘুচিল কালিমা রেখা;
ললাটের বলি চিহ্ণ মুছিল, ফুটিল জ্যোতির্লেখা!
ঊর্ম্মিল জল স্থির হ’ল নদী থামিল মধ্য পথে,
স্থল কিবা জল হ’ল সমতল, চিনিব সে কোন্ মতে?
কিবা পশু পাখী কিবা সে মানব খাদ্য না পায় কেহ,
বিফলে চকোর বরফ খুঁটিল, মূষিক খুঁড়িল গেহ;
গবয়, চমরী, ছাগ, কস্তূরী খুলিতে না পারে মুখ,
হেন দুর্য্যোগে মিললাপা! তুমি কতই পেয়েছ দুখ!
একা গুহাতলে বন্দী ছিলাম বরফের কারাগারে,
ভিক্ষুজনের জীর্ণ বসন হঠায়েছে বাত্যারে;
স্খলিত-দন্ত শীত-শার্দ্দূল পলায়ে গিয়াছে দূরে,
তপের তাপেতে গলেছে তুষার অযুত ধারার ঝুরে!
দুরন্ত ঝড় হয়েছে শান্ত ঘন ধারা বরিষণে,
প্রণত পঞ্চভূতের শীর্ষ বুদ্ধের শ্রীচরণে।
বহ্ণির কুলে জন্ম আমার, ব্যাঘ্র সে জ্ঞাতি মম,
বসতি আমার তুষারাস্তৃত গিরি-চূড়া দুর্গম;
সিংহের কুলে জনমি’ শুনেছি সঙ্ঘের মহাবাণী,
যে পথে গেছেন অর্হত সবে আমিও সে পথ জানি;
মহাযান পথে যাত্রী আমরা মরণে ও মোরা ধন্য,
ওগো উপাসক! তথাগতে জান, চিত্ত কর না অন্য;
দুখ মাঝে সুখে ছিল মিললাপা না ছিল হৃদয়ে শোক,
ওগো উপাসক! তোমা সবাকার চির-কল্যাণ হোক্।
লামা মিললাপা।
ব্যাকুল
ব্যাকুল।
ঘন গরজে, বন গহন,
মেঘে ছাইল সারা গগন,
ব্যাকুলা বালিকা
কেঁদে ফিরে একা
সাগর-তীরে দুখে মগন।
প্রচণ্ড ঢেউ পড়ে আছাড়ি’
ত্রাসে বালিকা উঠে ফুকারি’
একাকী—একাকী,
কেঁদে রাঙা আঁখি,
শ্রান্ত, ব্যথিত, আকুল মন।
শূন্য জগৎ, চূর্ণ হৃদয়,
বাঁচিবার সাধ আর নাহি হায়;
ডেকে নাও নাও,
কোলে ঠাঁই দাও,
অনেক দেখেছে দু’টি নয়ন।
শিলার।
ব্যাকুল (২)
ব্যাকুল।
কতদিন তুমি এমন করিয়া ভুলিয়া রহিবে? প্রভু!
কতদিন হেন রহিবে গোপনে? দেখা কি পাব না কভু?
কতদিন হেন যুক্তি করিব আপন মনের সনে?
শত্রুকুলের হর্ষ কতই দেখিব দুঃখ মনে?
প্রভু! ভগবান! বিচার করিয়া রাখ এ মিনতি মোর,
নয়নে কিরণ বিথারিয়া নাশ কাল-নিদ্রার ঘোর।
আমার প্রাণের ব্যাকুলতা হেরি’ শত্রু যেন না হাসে,
আমারে বেদনা দিতে যেন কেহ না পারে নিন্দা-ভাষে।
আমি বিশ্বাস রেখেছি তোমার অনন্ত করুণায়,
ওই হাতে আমি মুক্তি লভিব আছি সেই ভরসায়;
চিরদিন আমি তোমারি চরণে গাহিব হে ভগবান,
আমারে ঘিরিয়া রয়েছে তোমার রাজ-হস্তের দান।
রাজা দায়ুদ।
ভালবাসার নামান্তর
ভালবাসার নামান্তর।
পুলক-ভরা পাখীর গানে
আমরা কেন দিব গো কান?
সবার চেয়ে সুকণ্ঠ পিক
তোমার কণ্ঠে গাহিছে গান!
দেব্তারা আকাশের তারা
দেখান্ কিম্বা রাখুন্ ঢেকে,
সবার চেয়ে উজল তারা
ফুটেছে ওই তোমার চোখে!
বসন্ত আজ নূতন ক’রে
ফুটাক্ ফিরে ফুলের কলি,
ফুলের সেরা কুল যে ওগো
তোমার হিয়া, আমরা বলি!
গগন-শোভা দিনের রাজা,—
আবেগ-মাখা পাখীর ভাষা,—
বিকশিত হৃদয়-কুসুম,—
(তাদের) আরেক্টি নাম ভালবাসা।
ভিক্তর হুগো।
ভ্রমরের প্রতি
ভ্রমরের প্রতি।
তুমি বারবার পরশিছ তা’র ত্রস্ত চপল আঁখি,
কি গোপন বাণী কহ গুন্গুনি’ কানের সমীপে থাকি;
হস্ত তাড়না গ্রাহ্য কর না, চুরি কর চুম্বন,
আমরা মূর্খ, ওগো মধুকর তুমি সে রসিক জন।
কালিদাস।
মাউরি জাতির ‘ঘুম পাড়ানি’
মাউরি জাতির ‘ঘুম-পাড়ানি’।
(অস্ট্রেলিয়া)
খোকা আমার, খোকা আমার, ‘তুল্তুল্সী’র পাতা!
বেনামূলের গুচ্ছ আমার রাখ্রে বুকে মাথা!
মৃগনাভির কৌটা আমার খোকা ঘুম যায়,
গুগূগুলু ধূপধূনার আবেশ খোকার চোখে আয়!
মাঙ্গলিক
মাঙ্গলিক।
এ গৃহে শান্তি করুক্ বিরাজ মন্ত্র-বচন-বলে,
পরম ঐক্যে থাকুক্ সকলে, ঘৃণা যাক্ দূরে চ’লে;
পুত্রে পিতায়, মাতা দুহিতায় বিরোধ হউক দূর,
পত্নী পতির মধুর মিলন হোক্ আরো সুমধুর;
ভা’য়ে ভা’য়ে যদি দ্বন্দ্ব থাকে তা’ হোক্ আজি অবসান,
ভগিনী যেন গো ভগিনীর প্রাণে বেদনা না করে দান;
জনে জনে যেন কর্ম্মে বচনে তোষে সকলের প্রাণ,
নানা যন্ত্রের আওয়াজ মিলিয়া উঠুক্ একটি গান।
অথর্ব্ব-বেদ।
মাতার প্রতি
মাতার প্রতি।
উচ্চশির উচ্চে রাখা অভ্যাস আমার,
আমার প্রকৃতি, হায়, রুক্ষ ও কঠোর;
রাজার (ও) অবজ্ঞা দৃষ্টি পারেনাক মোর
নয়নেয়ে করিবারে নত একবার।
কিন্তু অয়ি স্নেহময়ী জননী আমার,
যখন নিকটে থাকে মূর্ত্তিখানি তোর,
অতি তীব্র অভিমান দর্প অতি ঘোর
সব যায়; বালা যেন পাই পুনর্ব্বার!
সে কি দেবতাত্মা তব?—শান্ত করে মোরে?
দেবতাত্মা,—বিশ্ব যার মুঠার ভিতরে,—
আমোদে মেলিয়া পাখা ফিরে যে অম্বরে!
মরমে মরি, মা, আজি স্মরিয়া আপন
কৃতকর্ম্ম;—যাহা ব্যথিয়াছে তব মন;—
যে মনে—সবার বেশী পাই স্নেহধন।
অন্ধ খেয়ালের মোহে ছাড়িয়া তোমায়,
ফিরিলাম খুঁজিয়া খুঁজিয়া বিশ্বময়,—
মমতার যদি কভু দেখা মিলে, হায়;
আশা ছিল, লভিলে তা’ জুড়াবে হৃদয়!
দেখিলাম যতদূর দৃষ্টি মোর যায়,
ফিরিলাম দ্বারে দ্বারে করাঘাত করি’
কাতরে কহিনু স্নেহ-ভিখারীরে, হায়,
ফিরায়োনা; ঘৃণাভরে সবে গেল সরি’।
সেই আমি খুঁজিতেছি সারাটি জীবন,
মমতার, হায়, তবু দেখা নাহি পাই;
আজ ফিরিয়াছে মন ভবনে আপন,
যেথা, মাগো, তুমি মোরে ডাকিছ সদাই।
আজ দেখিলাম যাহা দৃষ্টিতে তোমার,
সেই ত’ মমতা—চির-আরাধ্য আমার।
হায়েন্
মাতাল
মাতাল!
আমার ত্রুটির মার্জনা নাই?
রোষের শান্তি নাই কি তব?
আঙুর ফলের জল টুকু খাই;―
ভর্ৎসনা তাই নিয়ত স’ব?
এমন করিলে সুরা দিব ছেড়ে?―
তুমি মনে মনে ভেবেছ তাই?
কারণ-সংখ্যা গেল শুধু বেড়ে,
এবার দেখিবে কামাই নাই।
সুরার পেয়ালা বড় ভাল লাগে,
আরো ভাল লাগে উষ্মা তব;
পরিতোষ হেতু পান করি’ আগে
তোমারে জ্বালাতে ভ’রব নব!
কালিফ্ এজিদ।
মাতালের যুক্তি
মাতালের যুক্তি।
কালো মাটি কালো মেঘের ভাঁটিতে
চোঁয়ানো খাঁটিটি খায়!
গাছ পালা গুলো তা’রি পাত্রের
একটু প্রসাদ পায়!
সাগর দিব্য প্রভাতে প্রদোষে,
নদীর মদিরা বসে বসে শোষে!
আকাশে সূর্য্য সাতটা সাগর
একাই শুষিতে চায়!
দিন বুঝে বুঝে ক্রমে ক্ষীণ চাঁদ,
রবির ভাণ্ডে দিয়ে বসে হাত!
বল দেখি তবে আমারেই সবে
কেন বা দূষিছে হায়!
আনাক্রেয়ন্।
মানব সন্তান
মানব-সন্তান।
যত্নে রেখ এই ক্ষুদ্র মানব সন্তানে,
ক্ষুদ্র,— তবু অন্তরে সে ধরে বিশ্বম্ভরে;
শিশুরা জন্মের আগে রশ্মিরাশিরূপে
চঞ্চল পুলকভরে ফিরে নীলাম্বরে।
আসে তা’রা আমাদের অন্যায়ের দেশে,
বিধাতা পাঠান শুধু দিন দুই তরে;
শিশুর অস্পষ্টভাষে তাঁরি বাণী ফুটে,
ক্ষমার বারতা তাঁর শিশু-হাসে ক্ষরে।
তা’দের সে স্ফূর্ত্তি ভাতে আমাদের চোখে,
স্বর্গ কাঁদে শিশু যদি কাঁদে গো ক্ষুধায়;
আনন্দে তা’দের যে গো চির-অধিকার,
তা’রা ব্যথা পেলে বিশ্ব কাঁদে যাতনায়।
নির্ম্মল সে ফুলদলে রস যদি মরে,—
বিশ্বজনে পরশে তবে সে অপরাধ;
মানুষের ঘরে, মরি, দেবতা বিহরে!
হায় রে, নিগূঢ় নভস্তলে বজ্রনাদ—
জাগে,— যবে ভগবান ফিরেন খুঁজিয়া
সেই সব শিশু,— হায়, যা’রা ধরাতলে
এসেছিল একদিন দেবতার সাজে,—
এবে যা’রা ছিন্নবাসে,— সিক্ত অশ্রুজলে।
ভিক্তর হুগো
মানুষ
মানুষ।
পথ দেখিয়ে যায় গো নিয়ে
এমন মানুষ কই?
বাক্-চাতুরী কর্ব্বে না যে
ব্যাকুল যবে হই;
কোথায় আজি কাজের কাজী
তেমন মাঝি কই?
তুষ্ট আছে যে জন মনে
সত্য-মহিমায়,
দীর্ঘ নিশি দেশে যখন
ডুবায় কালিমায়,
তখনো যেই জান্ছে মনে
তপন সে কোথায়।
হঠাৎ লড়াই বাধিয়েছ তাই
দিবনা হায় দোষ,
হওনি জয়ী তা’তেও তেমন
হইনি অসন্তোষ,
সৈন্য এত নষ্ট হ’ল
করিনি তায় রোষ;
তবে যে ওই চিত্ত লঘু
ওরেই করি ভয়,
নেতা যে জন ব্যঙ্গ করা
তা’র কি উচিৎ হয়?
নটের মত ভঙ্গী,—ও ত’
রণভূমির নয়।
পরাজয়ের জন্য কারেও
দিই নে অপরাধ,
মৃতের সংখ্যা দেখিয়ে দিতে
নাহি মোদের সাধ;
শুধু অধীর করে হে বীর!
লঘু বিসম্বাদ।
দেশের লোকে তেজের বাণী
শুন্তে যবে চায়—
অপমানে চক্ষে মুখে
আগুন বাহিরায়,—
তখন দলাদলির গোলে
ব্যস্ত হ’লে?—হায়।
উদ্যত যা’র হয় নি বাহু
নাইক এমন লোক,
যাহার দিকে তাকিয়েছি হায়
ঝল্সে গেছে চোক্;
তোমরা শুধু বুঝলে না ক’
দেশের দুঃখ শোক!
যায় গো নিয়ে পথ দেখিয়ে
এম্নি মানুষ চাই,
কাঁদলে ব্যথায় বাক্ চাতুরী
কর্ব্বে না যে ভাই,
নিপুণ মাঝি চাই গো আজি
কাজের কাজী চাই!
ষ্টিফেন্ ফিলিপ্স্।
মায়া
মায়া।
শূন্য ব্যোম মনে হয় বিরাট খিলান,
জোনাকী—জোছনা-কণা,—হয় অনুমান!
অবাধ, অগাধ ব্যোম জানি তবু হায়,
জানি গো জোনাকী চুরি করে না জ্যোৎস্নায়।
বেদব্যাস।
মারাঠি গাথা
মারাঠি গাথা।
কানাই। আবার কিনিলে মোরে, হে সুন্দরী!
গোপী। আমি ত’ আসিনি; টেনে আনে বাঁশরী;
লহরিয়া উঠে হিয়া ঘনঘটাতে—
কানাই। বালিকা কেমনে এলে আঁধার রাতে?
কেমনে চিনিলে পথ? গভীর নিশা!
গোপী। চমকে বিজলী মুহু—পাইনু দিশা।
কানাই। পিছল সে বাঁকা পথ কাঁটায় ভরা,
বেদনা পেয়েছ বড়, বিম্বাধরা!
গোপী। লঘু গতি, দৃঢ় মতি করে সে হেলা।
কানাই। নিশি যে বিষম কালো,—তুমি একেলা!
গোপী। না, না বঁধু, একাকিনী আসেনি রাধা,
প্রেম যা’র সাথী তার কিসের বাধা!
মারাঠি গান
মারাঠি গান।
বাজিছে নাকাড়া কাড়া, বাজিছে বাঁশী,
বঁধু বিনা জ্বলে বুকে অনল-রাশি;
ফাগুনে সকল নারী সুখে বিহরে,
আমি শুধু দহি সই কুসুম-শরে।
কুহরে কোকিল নব রভস ভরে,
মরম উথুলে মোর মরমে মরে।
সে যদি আসিয়া করে হৃদয়-আলা,
তবে সই নেব তোর কুসুম-মালা;
সে রয়েছে কোন্ দেশে, কে জানে কোথায়,
আমি এ ‘ফাল্গুনী ফুল’ কোথা রাখি, হায়!
মিনি ও বিনি
মিনি ও বিনি।
মিনিতে আর বিনিতে
ঘুমিয়ে প’ল ঝিনুকে,
আয় গো তোরা দেখে যা’
মিনুকে আর বিনুকে।
ভিতর-রাঙা ঝিনুকটি,
বাহিরে তা’র রূপালি;
সাগর জলের শব্দেতে
ঘুরে বেড়ায় নিদালি!
দু’টি তারা ফুট্ফুটে
উঁকি দিয়ে দেখছে যে,
কোন্ স্বপনে নগ্ন তা’রা
কেউ কি পারে বল্তে সে?
চমক-ভাঙা সবুজ পাখী
শিশুটি দিতে লেগেছে,—
জাগো আমার লক্ষ্মী মেয়ে,
সূয্যি মামা জেগেছে!
টেনিসন্
মিলন-সঙ্কেত
মিলন-সঙ্কেত।
তোমারি স্বপন-সুখে জাগিয়া উঠি,
কাঁচা মিঠে ঘুমটুকু পড়ে গো টুটি’;
মৃদু নিশ্বাসে যবে সমীর চলে,
রশ্মি-উজল তারা আঁধারে জ্বলে,
তোমারি স্বপন-সুখে জাগিয়া উঠি,
তোমারি জানালা-তলে এসেছি ছুটি’;
চরণ কে যেন মোর আনে গো টানি’,
কে জানে কেমনে?—আমি জানি নে রাণী!
নিথর নিবিড় কালো নদীর‘পরে
চলিতে চলিতে বায়ু মূরছি’ পড়ে,—
মিলায় চাঁপার বাস—নিবিয়া আসে,
ভাবের ভুবন যেন স্বপন-দেশে;
পাপিয়ার অনুযোগ ফুটিতে নারি’
মরমে মরিয়া হায় গেল গো তা’রি,
আমিও মরিয়া যাব অমনি ক’রে,
আদরিণি! ও তোমার হৃদয় প‘রে!
এ তৃণ-শয়ন হ’তে তোলো আমারে,
মরি গো, মূরছি, ডুবে যাই আঁধারে।
পাণ্ডু অধরে আর নয়ন-পাতে,
বৃষ্টি কর গো প্রেম চুমার সাথে!
কপোল হ’য়েছে হিম, হায় গো প্রিয়,
দ্রুত তালে দুরু দুরু কাঁপিছে হিয়া;
ধর গে। চাপিয়া বুকে, এস গো ছুটি’
তোমারি বুকের ’পরে যাক্ সে টুটি’।
শেলি।
মুখর ও মৌন
মুখর ও মৌন।
আকুল কূজনে কপোত কাঁদিছে
মরম-যাতনা জুড়াতে তা’র;
আমারি মতন ব্যথিত সে জন,
মম সম বুকে দুখেরি ভার।
সে কাকলি শোনা যায় বনে বনে,
গোপন বেদনা আমারি শুধু;—
তবু আঁখি জল ঝরে অবিরল,
লুকানো আগুন জ্বলে সে ধূ ধূ!
হায় পাখী, মোরা প্রেমের বেদনা
আধা-আধি বেঁটে নিয়েছি দোঁহে;
মুখর কাকলি তোমাতে কেবলি,
মৌন ব্যথা সে আমারে দহে।
সিরাজ অল্ ওয়ারক।
মুমূর্ষু তাতার সিপাহীর গান
মুমূর্ষু তাতার সিপাহীর গান।
ঘোড়াটি আমার ভালবাসিত গো শুনিতে আমার গান,
এখন হ’তে সে ঘোড়াশালে বাঁধা র’বে সারাদিনমান।
জিনি’ তরঙ্গ সুন্দরী মোর তাতার-বাসিনী সাকী,—
লীলা-চঞ্চলা, রঙ্গনিপুণা,—শিবিরে এসেছি রাখি’!
ঘোড়ার আমার জুটিবে সওয়ার, ইয়ার পাইবে সাকী,
শুধু মা আমার এ বুড়া বয়সে কাঁদিয়া মুদিবে আঁখি।
মৃত-সঞ্জীবনী
মৃত-সঞ্জীবনী।
বসন্তের দিবা কি গো তুলনা তোমার?
তুমি যে সুন্দরী আরো, অয়ি লজ্জাশীলা!
ব্যস্ত করে দস্যু হাওয়া ফুলদলে, আর
‘মধু’র পত্তনি থাকে অতি অল্প বেলা।
কখনো প্রতপ্ত অতি স্বর্গের নয়ন,
বরণ তাহার প্রায় মনে হয় ম্লান;
হারায় সৌন্দর্য্য ক্রমে সৌন্দর্য্যের ধন,
পরিবর্ত্তনের ফেরে হয় ম্রিয়মাণ।
কিন্তু তব অনন্ত বসন্ত কোনো দিন
হ’বে না মলিন; হারা’বে না এই দান,
গর্ব্বে তোমা’ মৃত্যু নাহি বলিবে অধীন,
অমর সঙ্গীতে তুমি র’বে বর্ত্তমান!
মানব রহে গো যদি এ মর ধরায়,—
র’বে ইহা;—সঞ্জীবিত করিতে তোমায়।
শেক্সপীয়ার।
মৃত্যুঞ্জয়
মৃত্যুঞ্জয়।
প্রতি জনে যোগ্য কর্ম্ম প্রতি জনে যোগ্য পুরস্কার,—
ভাগ্য রহে দিতে;
যে পোষে বিশ্বের প্রাণ, বিসর্জ্জন করি’ আপনার,—
মরে সে বাঁচিতে।
সুইন্বার্ণ্।
মৃত্যুরূপা মাতা
মৃত্যুরূপা মাতা।
নিঃশেষে নিবেছে তারাদল, মেঘ এসে আবরিছে মেঘ,
স্পন্দিত, ধ্বনিত অন্ধকার, গরজিছে ঘূর্ণ্য-বায়ু-বেগ!
লক্ষ লক্ষ উন্মাদ পরাণ বহির্গত বন্দী-শালা হ’তে,
মহাবৃক্ষ সমূলে উপাড়ি’ ফুৎকারে উড়ায়ে চলে পথে!
সমুদ্র সংগ্রামে দিল হানা, উঠে ঢেউ গিরি-চূড়া জিনি’
নভস্তল পরশিতে চায়! ঘোররূপা হাসিছে দামিনী,
প্রকাশিছে দিকে দিকে তা’র,—মৃত্যুর কালিমা মাথা গায়
লক্ষ লক্ষ ছায়ার শরীর!—দুঃখ রাশি জগতে ছড়ায়,—
নাচে তা’রা উন্মাদ তাণ্ডবে; মৃত্যুরূপা মা আমার আয়!
করালী! করাল তোর নাম, মৃত্যু তোর নিশ্বাসে প্রশ্বাসে;
তোর ভীম চরণ-নিক্ষেপ প্রতি পদে ব্রহ্মাণ্ড বিনাশে!
কালী তুই প্রলয় রূপিণী, আয় মাগো, আয় মোর পাশে।
সাহসে যে দুঃখ দৈন্য চায়,—মৃত্যুরে যে বাঁধে বাহু পাশে,—
কাল-নৃত্য করে উপভোগ,—মাতৃরূপা তা’রি কাছে আসে।
বিবেকানন্দ।
মৃৎপাত্র ও স্বর্ণপাত্র
মৃৎপাত্র ও স্বর্ণপাত্র।
স্বর্ণপাত্র ভাঙিলেও তা’র সোনা বলি’ সমাদর,
ধননাশে জ্ঞানী জ্ঞানীই থাকেগো অক্ষয় গুণাকর;
মূর্খের যদি হয় ধননাশ—কিবা সে মূল্য তার?—
মাটির পাত্র ভাঙিবা মাত্র হ’য়ে পড়ে ধূলিসার।
পণ্ডিতা অবৈয়ার।
মেঘের গান
মেঘের গান।
মেঘমালা আদি-অন্তহীন!
ভাসিয়া আসি গো মোরা মানবের নেত্রপথে,
শিশিরে মাজিয়া তনু ক্ষীণ!
ছাড়িয়া গভীর শাস্তিময়
উচ্চভাষী সাগরের,— পিতা যিনি আমাদের,—
সুখময় তাঁহার নিলয়,—
যাই মোরা উচ্চ গিরিকূটে;
আঁখি মেলি’ একবার দেখে লই চারিধার,
গিরি সাজে বিটপী মুকুটে।
দেখি কত অর্ব্বুদ গিরির,
ভ্রুকুটি করিয়া চায় আছে সদা পাহারায়
সর্ব্ব-জীব-ধাত্রী পৃথিবীর!
দিই মোরা শস্যের জনম;
চিরস্রোতা তটিনীর মন্দ্রভাষী জলধির
শুনি গান নিত্য মনোরম।
দেখি তীক্ষ্ণ দিবার নয়ন;
চেয়ে আছে অনিমিখ্ পূর্ণ করি’ দশদিক,
দেখি সূর্য্য অশ্রান্ত-কিরণ!
মোদের অমর কায়া‘পরে
পরিয়া ঝটিকাবাস হাসি মোরা অট্টহাস,
দৃপ্ত রবি দেখি হেলা ভরে;
মর্ত্ত্যভূমি আতঙ্কে শিহরে!
এরিষ্টোফেনিস।
মেঘের প্রতি
মেঘের প্রতি।
আরো গম্ভীরে ডাক তুমি মেঘ, ডাক গম্ভীর স্বরে,
তোমার প্রসাদে পরাণ আমার অনুরাগ-রসে ভরে;
নিবিড় পরশ-হরষ-আবেশে ঘন রোমাঞ্চ হয়,
নব-বিকশিত নীপের পুলক জাগে সারা তনুময়।
শূদ্রক।
যথালাভ
যথালাভ।
হৃদয় চাহিয়াছিল নিধি;
নিরখি’ সে আনন্দ অপার!
পূর্ণ ধন নাহি পাই যদি
যা’ পেয়েছি,—প্রচুর আমার।
টল্ষ্টয়।
যুগ্মক
যুগ্মক।
হেয় মানি পারস্যের মহা আড়ম্বর,
পল্লবিত সোনার মুকুট;
খুঁজিও না,―পাওয়া যায় কোথায় সুন্দর
বারমাস গোলাপ অফুট।
নবীন রসাল পাতে গাঁথ, সখী, মালা,
আমাদের সেই সাজে বেশ,―
বসি’ যবে দ্রাক্ষা জটা-ছায়ায় নিরালা
দ্রব-চুনি সুরা করি শেষ!
হোরেস্।
যুগ্মপত্নীর প্রেম
যুগ্মপত্নীর প্রেম।
যুগ্ম পত্নী ছিল এক প্রাচীন জনের,
প্রৌঢ়া এক, বালা এক,—এই দু’জনের।
যখন বসিত বুড়া বালা-স্ত্রীর ঘরে,
পাকা চুল তুলিত সে আগ্রহের ভরে;
প্রৌঢ়া কিন্তু পাকা চুল তুলিবার ছলে,
কাঁচা উপাড়িত!—নিজ মিলাতে কুন্তলে!
দিনে দিনে এইরূপে বেড়ে উঠে প্রেমের বিপাক,—
দেখা দিল বিপ্র শিরে মাথা-জোড়া বিপর্য্যয় টাক!
লা ফন্তেন্।
যৌবন ও বার্দ্ধক্য
যৌবন ও বার্দ্ধক্য।
জগৎ যে সুখ হরণ করে তা’ ফিরে আর দিতে নারে,
কিশোর ভাবের অরুণিমা, হায়, ক্ষয় সে অন্ধকারে;
কপোল কেবলি হয় না পাণ্ডু যৌবন যবে যায়,
মনের পেলব কুসুম-সুষমা তা’রো আগে টুটে, হায়!
মগ্ন সুখেরে ঘিরিয়া তখনো যাহারা ভাসিতে থাকে,
অত্যাচারের আবর্ত্তে কিবা মজে কলঙ্ক পাঁকে;
দিক্-নিরূপণ হয় না তখন; দিশা যদি মিলে, তবু,
সাগর অকূল! ছেঁড়া পাল তুলে পৌঁছিতে নারে কভু।
মরণের হিম পরাণে তখন নামিয়া ভরে গো বুক,
পরের বেদনা বুঝিতে না পারে, না ভাবে আপন দুখ!
অশ্রুজলের উৎস নিরোধ হয় সে হিমের ভারে,
আঁখি ছলছলে উজলে যদি বা―সে শুধু তুষার-ধারে।
রসের ভাষণে রসনা যদিও মনেরে ভুলায়ে রাখে,
নিশীথ অবধি; হেতু তা’র হায়, ঘুম চোখে নাহি লাগে।
সে যেন জীর্ণ প্রাসাদ ঘিরিয়া শ্যামা লতিকার শোভা,
নিকটে ধূসর জর্জ্জর অতি, দূর হ’তে মনোলোভা!
হায় গো হইতে পারিতাম যদি যেমন ছিলাম আগে,
আগের মতন অনুভূতি যদি আবার মরমে জাগে;
অতীত স্মরিয়া তেমনি করিয়া আঁখি জল যদি ঝরে,
সে আবিল ধারা মিঠা হ’বে মোর জীবন মরুর ’পরে
বায়রণ।
যৌবন মুগ্ধা
যৌবন-মুগ্ধা।
যখন আমি ঘোম্টা তুলি নয়ন ‘পরে,
পাণ্ডুর হয় গোলাপগুলি ঈর্ষ্যা ভরে;
বিদ্ধ তাদের বক্ষ হ’তে ক্ষণে ক্ষণে,
ক্রন্দনেরি ছলে মধুর গন্ধ ক্ষরে!
কিম্বা, যদি সুগন্ধি কেশ আচম্বিতে
এলায়ে দিই মন্দ বায়ে আনন্দেতে,
চামেলি ফুল নালিশ করে ক্ষুণ্ন মনে,
গন্ধটি তা’র লুকায় চুলের সুগন্ধিতে!
যখন আমি দাঁড়াই একা মোহন সাজে,
এম্নি শোভা হয় যে, তখন অম্নি বাজে,
শতেক শ্যামা পাখীর কণ্ঠে কলস্বনে
বন্দনা গান, স্পন্দন তুলি’ কুঞ্জমাঝে!
জেবুন্নিসা।
রহস্যের চাবি
‘রহস্যের চাবি’।
অথর্ব্ব বেদ—যজ্ঞের সময়ে যিনি অন্যান্য ঋত্বিকের কার্য্য পরিদর্শন করিতেন তাঁহাকে ব্রহ্মা বলিত। এই ব্রহ্মাদিগের রচিত বেদই অথর্ব্ববেদ নামে পরিচিত।
অবস্তা—ইহাকে সাধারণতঃ জেন্দাবেস্তা বলে। প্রাচীন পারসীকদিগের ধর্ম্মশাস্ত্র। ইহা প্রায় বেদ সংহিতার সমকালবর্ত্তী।
অবৈয়ার—ইনি দাক্ষিণাত্যের একজন স্ত্রী-কবি। বিদ্যাবতী বলিয়া বিশেষ খ্যাতি আছে।
আনাক্রেয়ন—বুদ্ধদেবের সমসাময়িক। ইনি আজীবন সুরা ও নারীর বন্দনা গাহিছেন। জন্মভূমি গ্রীস্।
আবু মহম্মদ—হারুণ-অল্-রসীদের পৌত্র কালিফ্ বাৎহক্ ইহার কবিতায় মুগ্ধ হইয়া ইহাঁকে রাজ পরিচ্ছদে ভুষিত করেন। ইনি সুগায়কও ছিলেন।
আব্দল সালম্ বিন্ রাগোয়ান—ইনি হিজিরার দ্বিতীয় শতাব্দীতে জন্ম গ্রহণ করেন। ইহাঁর চরিত্র কতকটা বায়রণের মত।
আলতাফ্ হুসেন আন্সারি—ইনি ‘হালি’ অর্থাৎ নব্য-কবি নামে সাধারণের নিকট পরিচিত। আলিগড়ের স্যার সৈয়দ আহম্মদ ইহার বিশেষ বন্ধু ছিলেন। ইনি জীবিত।
আহলাণ্ড্—(খৃঃ ১৭৮৭-১৮৬২) বাহুল্য বর্জ্জিত মনোজ্ঞ ভাষায় করুণ রসের কবিতা ও গাথা রচনায় সিদ্ধ হস্ত ছিলেন। জন্মভূমি জর্ম্মনি।
ইবসেন্—(খৃঃ ১৮৩০-১৯-৬) বর্ত্তমান য়ুরোপীয় সভ্যতার নানা জটিল সমস্যা ইনি নাট্য বস্তুতে পরিণত করিয়াছেন। জন্মভূমি নরোয়ে।
ইমাম সাফাই মহম্মদ বিন্ ইদৃস—ইনি মহম্মদ প্রবর্ত্তিত ধর্ম্ম মতের একটি নূতন শাখা সৃষ্টি করেন। ভয়ানক তার্কিক ও ঘোর অদৃষ্টবাদী ছিলেন।
ইশী—ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কবিতা-রচনায় ইহাঁর নিপুণতা প্রকাশ পাইয়াছে। জন্মভূমি জাপান।
এজিদ্—মহম্মদের মদিনা প্রবেশের সত্তর বৎসর পরে ইনি কালিফ্ হন। কবিত্ব ভিন্ন ইহাঁর অন্য কোনও সদ্গুণ ছিল না। ইহাঁর মাতা মৈসুনা বেগম ও সুকবি ছিলেন।
এরিষ্টোফেনিস—খৃঃ পূঃ ৪৪৪-৩৮৮) ইহাঁর বুদ্ধিবৃত্তি, ভাষ প্রবাহ এবং কল্পনাশক্তি সমান প্রবল। ইনি ব্যঙ্গনাট্য রচনায় অদ্বিতীয়। জন্মভূমি গ্রীস্।
ওমর খৈয়াম—(খৃঃ ১০৫০-১১২৩) জন্ম খোরাসানের অন্তর্গত নিশাপুরে। ইনি গণিত শাস্ত্রেও বিশেষ ব্যুৎপন্ন ছিলেন।
ওয়ার্ড সোয়ার্থ—(খৃঃ ১৭৭০-১৮৫০) ইনি ঋষি কবি বলিয়া কথিত হইয়াছেন। জন্মভূমি ইংলণ্ড।
কবীর—ইনি সুলতান সেকন্দর লোতির সমকালবর্ত্তী ছিলেন। জন্ম বারাণসীর নিকটে। ইনি রামানন্দের শিষ্য, জাতিতে জোলা।
কালিদাস—নবরত্নের শ্রেষ্ঠতম রত্ন। ইহাঁর দেশ ও কাল সম্বন্ধে মতের ভয়ানক পার্থক্য আছে। ইহাঁর অধিকাংশ কাব্য উজ্জয়িনীতে রচিত বলিয়া বোধ হয়।
কীটস্—(খৃঃ ১৭৯৫-১৮২১) ‘সুন্দরই সত্য এবং সত্যই সুন্দর’—ইহাই তাঁহার কাব্যের প্রধান কথা।
কেরি—(খৃঃ ১৬৭০-১৭৪৩) ইনি মার্কুইস্ অফ্ হ্যালিফাক্সের ঔরস-পুত্র। ইনি কবি ও সঙ্গীত বিদ্যা-বিশারদ ছিলেন।
কোরাণ—কাহারও মতে ইহা মহম্মদ শ্রুত ঈশ্বরের বচন, কাহারও মতে ইহা মহম্মদের
নিজের রচনা। শেষ মতটিই সমীচীন।
খুস্হাল খাঁ খতক—ইনি একজন আফগান সর্দার, কবি এবং ভারত সম্রাট শাজাহানের বন্ধু ছিলেন। পিতৃদ্রোহী আরঙ্গজেব ইহাঁকেও নানা মতে ক্লেশ দিয়াছিল। সে কাহিনী ইহার লেখাতেই পাওয়া যায়।
গতিয়ে—(খৃঃ ১৮১১-১৮৭২) ফরাসী সমালোচকেরা বলেন, তিনি চিত্র লিখিতেন; শব্দ-শিল্পে তাঁহার ক্ষমতা অসীম।
গেটে—(খৃঃ ১৭৪৯–১৮৩২) ইহাঁর প্রতিভা সর্ব্বতোমুখী; ইনি জর্ন্মনির শ্রেষ্ঠ কবি, আবার বিজ্ঞানের ও অনেক নূতন তথ্য আবিষ্কার করিয়াছেন।
গোর্কি—জন্মভূমি রুষিয়া সামান্য ঝাড়ুদার হইতে ইনি একজন প্রতিষ্ঠাপন্ন উপন্যাসিক হইয়াছেন। বয়স এখন সাঁইত্রিস বৎসর।
চাণক্য—চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী। কূটবুদ্ধির জন্য বিখ্যাত।
চিত্রলিপি—অক্ষর সৃষ্টির পূর্ব্বে মিশর দেশে চিত্রের সাহায্যে মনোভাব জ্ঞাপন করিবার প্রথা ছিল।
জর্ণষ্ট্যার্ণ জর্ণসন্—নরোয়ের জাতীয় কবি। ইনি জীবিত।
জাতক গ্রন্থ—প্রায় দুই সহস্র বৎসর পূর্ব্বে ইহা একত্র প্রথিত হয়। জন্মান্তর বাদ ইহার প্রধান প্রতিপাদ্য। সম্ভবতঃ বুদ্ধ কথিত কাহিনী নিচয়ই ইহার ভিত্তি।
জেবুন্নিসা—সম্রাট আরঙ্গজেবের বিদুষী ও রূপসী কন্যা। ইনি কবি ছিলেন।
টলষ্টয় (কাউণ্ট)—ইনি লোক-হিতের জন্য সর্ব্বস্ব এমন কি স্বরচিত গ্রম্ব সমূহের স্বত্ব পর্য্যন্ত দান করিয়া কুটীরবাসী হইয়াছেন। পূর্ব্বে ইনি রুষিয়ার একজন প্রধান ভূস্বামী ছিলেন। এখন সভ্য জগতের মনের উপর রাজ্য করিতেছেন।
টেনিসন—(খৃঃ ১৮০৯-১৮৯২) ইনি মহারাণী ভিক্টোরিয়ার সভাকবি ছিলেন।
ৎসিসাতু—ইনি উদ্ভট শ্লোকের মত অনেক শ্লোক রচনা করিয়াছিলেন।
তলবকারোপনিষৎ—একশত পঞ্চাশখানি উপনিষদের অন্যতম। উপনিষদের অনেকাংশ ক্ষত্রিয়দিগের রচিত। সুতরাং যথার্থ ব্রহ্মজ্ঞানকে ক্ষত্রজ্ঞান বলিলেও ভুল হয় না।
থিয়গ্নিস্—ইনি আমাদের বুদ্ধদেবের সমসাময়িক; জন্ম গ্রীস্দেশে। ইনি একজন অভিজাত এবং তজ্জন্য গর্বিত।
দান্তে—( খৃঃ ১২৬৫-১৩২১ ) খৃষ্টান্ ইতালির প্রধান কবি। ইনি রাষ্ট্র নৈতিক ব্যাপারেও মিশিতেন।
দায়ূদ (রাজা)—ইনি খ্রীষ্টের প্রায় সহস্র বৎসর পূর্ব্বে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি প্রথম বয়সে নিজ পিতার মেষ সমূহের পরিচর্য্যা করিতেন। ক্রমশঃ নিজ চরিত্রের বলে ইহুদীদিগকে স্বাধীন করেন। ইহার রচিত গানগুলি ইহাঁর ঈশ্বর নির্ভরতার
উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নাইডু (সরোজিনী)—ইনি ইংরেজীতে চমৎকার কবিতা লিখিয়া থাকেন। নাইডু ইহার স্বামীর উপাধি। ইনি হায়দ্রাবাদের প্রসিদ্ধ ডাক্তার শ্রীযুক্ত অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যার মহাশয়ের কন্যা।
নানক—শিখ-ধর্ম্মের প্রবর্তক ও প্রথম গুরু। ইহাঁর রচিত গান গুলি অতীব মধুর।
নিকোলাস (দ্বিতীয়) বর্ত্তমান রুষ সম্রাট। ইনি কবিতাও লেখেন।
পৃথীকবি—ইনি রাণা প্রতাপসিংহের সমসাময়িক। জন্ম বিকানীয়ের রাজবংশে।
পেটোফি—হাঙ্গেরির জাতীয় কবি। ইহাঁর “Talpra Magyar” শীর্ষক সঙ্গীত বিনা রক্তপাতে হঙ্গেরির ভাগ্য পরিবর্ত্তন করিয়াছিল।
পেত্রার্ক—ইনি ‘সনেট’ নামক ছন্দোবন্ধের আবিষ্কর্তা। জন্মস্থান ইতালি।
পো (এডগার অ্যালেন্)—(খৃঃ ১৮০৯-১৮৪৯) জন্ম আমেরিকার বোষ্টন নগরে। ইঁহার রচনা ইন্দ্রজালের মত মোহকর।
প্রজাপতি—ইনি ঋগ্বেদীয় কয়েকটি সূত্রের রচয়িতা; ইইরি রচনা নব ভাবালোকে সমুজ্জ্বল।
প্রোক্টর (অ্যাডলেড্ অ্যান্)—ইনি একজন স্ত্রী কবি। উপদেশ মূলক কবিতাকে সরস করিতে ইনি বিশেষ পটু ছিলেন।
ফন্তেন্ (লা)—(১৬২১-১৬৯৫ ) ইহাকে ফরাসীদেশের বিষ্ণুশর্ম্মা বলা যাইতে পারে।
ফিলিকাজা—(১৬৪২-১৭০৭) ইহাঁর অনেক কবিতা পেত্রার্কের কবিতার সহিত তুলনীয়। জন্মভূমি ইতালি।
ফিলিপ্স্ (ষ্টিফেন)—ইংলণ্ডের বর্ত্তমান যুগের একজন শ্রেষ্ঠ কবি ও নাটককার। ইনি জীবিত। ‘মানুষ’ শীর্ষক কবিতাটি বুয়ার যুদ্ধের সময়ে রচিত।
বঙ্কিমচন্দ্র—(১২৪৩-১৩০০ সাল) নব্য বঙ্গের গুরু স্থানীয়। বর্ত্তমান যুগে ইনিই প্রথম বাংলাদেশে খাঁটি সাহিত্য রসের মর্য্যাদা বুঝাইয়া দেন।
বায়রণ—(খৃ: ১৭৮৮-১৮২৪) ইংলণ্ডের প্রতিভা প্রতিমা। জগদ্বিখ্যাত কবি।
বার্ণস্ (রবার্ট)—(১৭৫৯-১৭৯৬) জন্ম স্কটলণ্ডে। ইনি কৃষক হইলেও প্রথম শ্রেণীর কবি ইহাঁর আবেগময়ী ভাষা অতুলনীয়।
বাল্মীকি—ভারতবর্ষের কবি গুরু। পৃথিবীর সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্যের রচয়িতা। প্রথম জীবনে না কি দস্যু ছিলেন।
বিবেকানন্দ—(১৮৬৩-১৯০২) ইনি য়ুরোপ ও আমেরিকায় ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করেন। ইনি গদ্য পদ্য অনেক লিখিয়াছেন। সমন্বয়াচার্য্য শ্রীমৎ রামকৃষ্ণ পরমহংস ইহাঁর শুরু ছিলেন।
বিশ্বামিত্র—(খৃঃ পূঃ ১৭০০-১৬০০) ইনি অনেকগুলি ঋগ্বেদীয় সুক্তের রচয়িতা। ইনি অধ্যবসায় বলে ঋষিত্ব লাভ করেন।
বেদব্যাস—(খৃঃ পূঃ ১৬০০-১৫০০) ইনি দাসরাজকন্যা মৎসগন্ধার গর্ভে জন্ম-গ্রহণ করা সত্ত্বেও বেদ পড়িতে পাইয়াছিলেন, এমন কি অনেকটা তাঁহারি কৃপায় বেদ বর্ত্তমান কলেবর প্রাপ্ত হইয়া সুবিন্যস্ত ভাবে রক্ষিত হইয়াছে। এই ধীবর দৌহিত্র পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদিগের মধ্যে আসন পাইয়াছেন।
বেরাঁজ্যার—(খৃঃ ১৭৮০-১৮৫৭) ইহাঁর বিদ্রূপাত্মক সঙ্গীত সমূহ বিখ্যাত। জন্মভূমি ফ্রান্স!
বোয়ার্দ্দো—ইনি ইতালির কবি।
ব্রাউনিং (রবার্ট)—(১৮১২-১৮৮৯) ইনি মানব জীবনের সমস্ত রস নিজের মধ্যে অনুভব করিয়া স্বীয় কাব্যে তাহা নানা আকারে বিবৃত করিয়াছেন।
ব্লেক–(১৭৫৭-১৮২৭) ইনি কাঠ ও ইস্পাতের উপর ছবি খোদাই করিতেন। কবি হিসাবেও মন্দ ছিলেন না।
ভবভূতি—প্রায় বার শত বৎসর পূর্ব্বে ইনি দাক্ষিণাত্যে জন্ম গ্রহণ করেন। মনের অতি প্রবল ভাবাবেগ নির্ঝর-ঝাঙ্কৃত-তুল্য ভাষায় প্রকাশ করিতে ইনি সংস্কৃত সাহিত্যে অদ্বিতীয়।
ভর্ত্তৃহরি—ইনি বিক্রমাদিত্যের সহোদর বলিয়া প্রবাদ আছে। স্ত্রী চরিত্রে অশ্রদ্ধা বশতঃ বৈরাগ্য অবলম্বন করেন।
ভার্জ্জিল—(খৃঃ পূঃ ৭০-১৯) প্রাচীন রোমক সাম্রাজ্যের মহাকবি।
ভল্টেয়ার—(১৬৯৪-১৭৭৮) ইনি স্বীয় গ্রন্থে কাহাকেও বিদ্রূপ করিতে ছাড়তেন। এজন্য অনেকবার ইহাঁকে নির্বাসিত হইতে হইয়াছিল। ফরাসী বিপ্লবের দীক্ষা গুরু।
মন্ত্নাইকেন—বেলজিয়মের কবি।
‘মন্যোশু’—প্রাচীন জাপানী কবিতার সংগ্রহ ‘মন্যোশু’ অর্থাৎ সহস্রদল।
মস্কিন্ অল দরামি—হিজিরার দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রাচীন আরব কবিতার একটি সংগ্রহ পুস্তক প্রচারিত হয়। ঐ পুস্তকের নাম ‘হামাসা’। উহাতে এই কবির অনেক গুলি কবিত। আছে।
মাইকেল মধুসূদন—(১৮২৪-১৮৭৩) বঙ্গভাষার প্রথম মহাকবি। ইনি অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্ত্তক।
মিললাপা (লামা)—পিতৃব্য কর্ত্তৃক পিতৃধনে বঞ্চিত হইয়া ইনি মন্ত্রতন্ত্রের সাহায্যে তাহার উদ্ধার করিতে কৃতসঙ্কল্প হন; পরে মারণ উচাটনাদির অভ্যাসে মানসিক অবনতি হইতেছে বুঝিয়া বুদ্ধপদে চিত সমাহিত করেন। ইনি তিব্বতবাসীর প্রিয় কবি।
মূর—(১৭৮০-১৮৫২) জন্ম আয়র্লণ্ডে। ইনি লঘু চটুল কবিতা লিখিতে সিদ্ধ হস্ত।
য়ুরিপিডিস——ইনি সক্রেটিসের বন্ধু ছিলেন। প্রায় সত্তর খানি নাটক রচনা করেন। জন্মভূমি গ্রীস।
রঁস্যার্দ্দ—(১৫২৪-১৫৮৫) ইনি এবং ইহাঁর কয়েকটি কবিবন্ধু ‘সাতভাই চম্পা’ বা কৃত্তিকা-মণ্ডলী নামে অভিহিত হইতেন। জন্মভূমি ফ্রান্স।
রুজে দে লিল—ইনি মেয়র ডায়েট্রিকের অনুরোধে ফরাসীদের জাতীয় সঙ্গীত ‘লামাৰ্শেয়েঝ’ রচনা করেন। এই সঙ্গীতের প্রথম বঙ্গানুবাদ ১৩০০ সালের জ্যৈষ্ঠসংখার নব্যভারতে প্রকাশিত হয়। (বুইয়ে তৎকালীন ফরাসীরাজের সেনাপতি।
লোপ ডি ভেগা—(১৫৬২-১৬৩৫) জন্মভূমি স্পেন। অসংখ্য নাটক ও কবিতা রচনা করিয়াছিলেন।
শিলার—(১৭২৯-১৮৫) ইহাকে জর্ন্মনিবাসীরা জর্ন্মনির সেক্সপীয়ার বলে। প্রথমজীবনে চিকিৎসক ছিলেন।
শীকিং—ইহার অর্থ কবিতা পুস্তুক। চীনদেশের প্রাচীন কবিতা সমূহ প্রায় তিনহাজার বৎসর পূর্ব্বে একবার একত্র সংগৃহীত হয়; ঐ সংগ্রহ গ্রন্থের নাম ‘শীকিং’।
শূদ্রক—রাজা ও কবি। কেহ কেহ বলেন ইনি নিজে কবি ছিলেন না। ধাবক নামে কোনও কবির রচনা ক্রয় করিয়া নিজের নাম দিল্লা প্রচার করিতেন।
শেক্সপীয়ায়—( ১৫৬৪-১৬১৬ ) জগতের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। মানবচরিত্রের ঘুণ।
শেলি—(১৭৯২-১৮২২) ইহাঁর রচনা বিদ্যুতের মত তীব্র ও উজ্জ্বল। ইনি কবিসমাজের কবি নামে খ্যাত।
শ্রীহর্ষ—রাজা ও কবি। পদলালিত্যের জন্য বিখ্যাত। কেহ কেহ বলেন বাণভট্টের রচনা ইহার নামে প্রচারিত হইয়াছে।
সাদি—হিজিরার যন্ত্র শতাব্দীতে পারস্যের সিরাজ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। ইহার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ গুলিস্তাঁ।
সিঙ্কিভিচ—ইনি পোল্যাণ্ডের একজন বিখ্যাত লেখক। ইনি জীবিত।
সিবার—(১৬৭১-১৭৫৬) জন্মভূমি ইংলণ্ড।
সিরাজ অল্ ওয়ারক্—ইনি আরব দেশের কবি।
সুইনবার্ণ—ইহাঁকে বায়রণের মানসপুত্র বলা যাইতে পারে। ভাষা ও ছন্দের উপর ইহাঁর অসাধারণ ক্ষমতা। ইনি জীবিত।
সুদাস (রাজর্ষি)—ইনি বশিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্রের সমসাময়িক দিগ্বিজয়ী রাজা ও ঋগ্বেদীর সুক্তের রচয়িতা।
সুরদাস—ইহাঁর রচিত ভজনগুলি প্রত্যেক হিন্দুস্থানীর আদরের বস্তু। ইনি অন্ধ ছিলেন।
স্যাফো—(খৃঃ পুঃ ৬৩০-৫৭০) “কৃষ্ণকুম্ভলা, মধুরহাসিনী, নিষ্কলঙ্ক স্যাফো”। জন্মভূমি গ্রীস
হাফেজ—হিজিরার অষ্টম শতাব্দীতে পারঙ্গের সিরাজ নগরে জন্ম গ্রহণ করেন। ইহাঁর রচনার সহিত আমাদের বৈষ্ণব কবিদের রচনার ভাবগত সাদৃশ্য আছে।
হায়েন্—(১৭৯৯-১৮৫৬) ইহাঁর রচনায় সহজ সৌন্দর্য্য অননুকরণীয়। জন্মভূমি জর্ম্মনি। জাতিতে ইহুদী।
হিরণ্যগর্ভ—ইনি ঋগ্বেদীয় সুক্তের রচয়িতা। ইনি কবি এবং দার্শনিক।
হুইটম্যান—আমেরিকার কবি; বিশ্বপ্রেম ইহার কাব্যে ওতপ্রোত।
হুগো (ভিক্তর)—(১৮০২-১৮৮৫) কবি, দার্শনিক, উপন্যাসিক, স্বদেশ-প্রেমিক, অধ্যাত্ম বিদ্যায় পরম পণ্ডিত। ‘হাসি ও অশ্রুর সম্রাট’। জন্মভূমি ফ্রান্স।
হেঙজু—ইনি জাপান দেশের একজন প্রাচীন কবি।
হোমর—ইনি আমাদের বেদব্যাস অপেক্ষা প্রায় ছয় শত বৎসরের ছোট। য়ুরোপখণ্ডের প্রথম ও প্রধান মহাকাব্য রচয়িতা। জন্মভূমি গ্রীস্ অথবা এসিয়া মাইনর।
হোম্স্ (অলিভার ওয়েণ্ডেল)—ইহাঁর গদ্য ও পদ্য হাস্য-স্নিগ্ধ সরস মাধুর্যের জন্য প্রসিদ্ধ। জন্মস্থান জামেরিকার বোষ্টন নগরী।
হোরেস্—(খৃঃ পুঃ ৬৫-৮) জন্মভূমি ইতালি। ইহাঁর ভাষা ও ছন্দের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য ছিল। ইনি নানা ছন্দের নানা বিষয়ের কবিতা রচনা করিয়াছিলেন।
(আমেরিকার আদিম অধিবাসীদিগকে আমি লাল মানুষ নামে অভিহিত করিয়াছি।)
রাখাল ও রাজকন্যা
রাখাল ও রাজকন্যা।
চলিতে চলিতে কিশোর রাখাল
প্রাসাদ ছায়ায় দাঁড়াল আসি’;
নৃপ-বালা, হায়, দেখিল তাহায়,—
প্রেমের লালসা হৃদয়ে বাসি’।
ধীরে কহে বালা “হায় আমি যদি
নিকটে তোমার পেতাম যেতে,—
আহা কি ধবল বৎসের দল,
কিবা রাঙা ফুল ফুটেছে ক্ষেতে!
নীচে হ’তে তবে কহিল রাখাল
“একবার যদি এস গো হেথা,
আহা কি অরুণ কপোল তরুণ,
আহা কি ধবল ও বাহুলতা!”
তার পর, নিতি নীরব ব্যথায়,
প্রাসাদ ছায়ায় দাঁড়াত একা;
নয়ন তুলিয়া রহিত ভুলিয়া
যে অবধি বালা না দিত দেখা।
“এস, এস, এস রাজার দুলালী!”
পুলকের ধ্বনি উঠিত বাজি’;
মধুরে অমনি কহিত রমণী
“রাখাল রে ফিরে এসেছ আজি!”
গেল শীত; এল ফুলের সময়;—
মাঠে, ঘাটে, বাটে মুকুল-লেখা!;
রাখাল ফিরিল, প্রিয়ারে ঢুঁড়িল,
বৃথা হায়,—সে ত’ দিল না দেখা!
“দেখা দাও, ওগো, দেখা দাও ফিরে”
কহিল ফুকারি’ করুণ সুরে;
ধ্বনিল অমনি অশরীরী বাণী—
বিদায়—বিদায় রাখাল ওরে!”
আহ্লাণ্ড।
রাজা ও রাণী
রাজা ও রাণী।
“ওই শোনো গো কাক কোকিলে ডাকে,
সভায় তব লোক দেখ না কত!”
“না, না, কোথায় কাক কোকিলে ডাকে?
শব্দ হ’ল ঝিঁঝির ডাকের মত।
“ওই দেখ গো ভোরের আলো পেয়ে,
সভা তোমার উঠ্ছে যেন হেসে!”
“না—না, ও নয় দিনের আলো, প্রিয়ে,
উদয় চাঁদের রশ্মি ওঠে ভেসে।”
“হায় প্রিয়তম, ঝিল্লি তানের মাঝে,
মুখের বড় নিদ্রা তব সনে;
ভাবনা শুধু,—ফিরবে সভার লোক,
না জানি কি ভাব্বে তা’রা মনে!”
"সী-কিং” গ্রন্থ।
রাজার প্রতি
রাজার প্রতি।
রাজন্! যদি দুহিতে চাও মহীরে নিরবধি,
বৎস সম পালন কর সবে;
প্রজায় যদি তুষ্ট কর,—পুষ্ট কর যদি,
রাজ্য তোমার কল্প-ধেনু হবে।
ভর্ত্তৃহরি।
রুবাইয়াৎ
রুবাইয়াৎ।
বনচ্ছায়ায় কবিতার পুঁথি পাই যদি একখানি,
পাই যদি এক পাত্র মদিরা, আর যদি তুমি রাণী!
সে বিজনে মোর পার্শ্বে বসিয়া গাহ গো মধুর গান,
বিজন হইবে স্বর্গ আমার তৃপ্তি লভিবে প্রাণ।
সাকী! তুমি আজ পাত্র ভরিয়া এনো তাই নিশ্চয়,
ভুলায় যাহাতে অতীত শোচনা ভবিষ্যতের ভয়;
আগামী কল্য! সে ভাবনা আমি উড়ায়ে দিয়েছি হেসে,
আগামী কল্য চ’লে যেতে পারি গত-কল্যের দেশে।
জীবন খাতায় তোমার আমার হিসাব নিকাশ হ’লে,
ভেব না কখনো এমনটি আর হ’বে না ভূমণ্ডলে;
চির দিবসের সাকী আমাদের পাত্রটি হ’তে তা’র
এমন ঢেলেছে কোটি বুদ্বুদ―ঢালিছে সে অনিবার!
পথের মধ্যে ক্ষণিক বিরাম, ক্ষণেকের আহ্লাদ,
মধ্য-মরুর উৎসে ক্ষণিক জীবনের আস্বাদ;
আঁখি পালটিতে, আর কেহ নাই! ছায়া-যাত্রীর দল
নশ্বরতায় লয় হ’য়ে গেছে; ওরে তোরা ছুটে চল।
নরক অথবা স্বর্গের আমি করিনে ভরসা ভয়,
এই টুকু জানি,―মানব জীবন প্রতি মুহূর্ত্তে ক্ষয়,
এই টুকু খাঁটি, বাকী যাহা বল তাহা মিথ্যার জাল,
বারেক যে ফুল ফুটিল তাহারে চিরতরে নিল কাল।
অদ্ভুত!―নয়? কত লোক গেছে মৃত্যু-দুয়ার দিয়ে,
একটি প্রাণীও ফিরিয়া এলনা পথের বার্ত্তা নিয়ে;
কোটি কোটি লোক আমাদের আগে গিয়েছে গো ওই পথে,
ওর সন্ধান নিতে হ’লে তবু নিজেকেই হ’বে যেতে!
পর জীবনের পুঁথি পড়িবারে যাত্রা করিল মন,
আঁখি যাহা কভু না পায় দেখিতে করিবারে দর্শন;
ফিরে এসে ধীরে চুপে চুপে মোরে কহিল সে “ওরে ভাই,
আমিই স্বর্গ, আমিই নরক, সে আর কোথাও নাই।”
স্বর্গ―সে শুধু পূর্ণ কামনা,―স্বপন পূর্ণতার,
নরক―সে অনুতপ্ত মনের বিকট অন্ধকার;―
যেমন আঁধার হ’তে কিছু আগে বাহির হ’য়েছি সবে,
যেমন আঁধারে এক দিন, হায়, ডুবিতে আবার হ’বে।
প্রথম মাটিতে গড়া হ’য়ে গেছে শেষ মানুষের কায়,
শেষ নবান্ন হ’বে যে ধান্যে তা’রো বীজ আছে তা’য়;
সৃষ্টির সেই আদিম প্রভাত লিখে রেখে গেছে তাই,
বিচার-কর্ত্রী প্রলয় রাত্রি পাঠ যা’ করিবে ভাই।
বটে গো এমন প্রতিজ্ঞা আমি করেছি বারম্বার,
অনুতাপে মোর ক্ষীণ চিত্তের করিব সঙস্কার;
বিচার ক্ষমতা ছিল কি তখন? ফুল হাতে ঋতুরাজ
জীর্ণ আমার অনুতাপ টুকু ছিন্ন ক’রেছে আজ!
তবু বসন্ত গোলাপের সাথে দু’দিনেই লয় পায়,
কুসুম-গন্ধি যৌবন-পুঁথি পলে উলটিয়া যায়;
কাল যে পাপিয়া এই তরু শাখে গাহিতে ছিল গো গান,
কোথা হ’তে এসে কোন্ পথে হায় করিল সে প্রস্থান!
ওই যে উদয়-শিখরে চন্দ্র খুঁজিছে মোদের সবে,
মোদের অন্তে এমনি কতই অস্ত উদয় হ’বে;
উদয় শিখরে উঁকি দিয়ে ধীরে তখনো সন্ধ্যা হ’লে,
আমাদের সবে এই খান্টিতে খুঁজিবে সে,―নিষ্ফলে।
ওমর্ খৈয়াম।
রূপসী
রূপসী৷
লাবণ্য-খনি নিশামণি কি গো পিতা এই বালিকার?
কিবা সেই আদি রসের রসিক, কুসুম আয়ুধ যার?
কিবা সে পুষ্প-প্লাবিত চৈত্র? হেন রূপ নিশ্চয়
বেদ-প্রণেতা সে বুড়া ব্রহ্মার সৃষ্টি কখনো নয়।
কালিদাস।
রূপের মাধুরী
রূপের মাধুরী।
মিথ্যা কথা, পদ্ম নহে তুলনা তাহার,
লজ্জা মানে মৃগনাভি কেশবাসে যার;
কৃষ্ণভুরু ধনু তার পক্ষ্মরাজী শর,
প্রতি শর লাগে হায় প্রাণের ভিতর।
তীক্ষ্ণ যেন তরবারি দু’টি আঁখি তার,
প্রেমিকের প্রাণ ল’য়ে যুদ্ধ অনিবার!
অধরের কোণে কৃষ্ণ তিল শোভমান,
খুলেছে হাসী শিশু চিনির দোকান!
প্রদীপ্ত আলোক সম রূপশিখা তার,
প্রেমিক পতঙ্গ ফিরে ঘিরি’ অনিবার।
কপোল পরশে শুধু কাণের সে দুল্,
অধর ছুঁইতে পায় লবঙ্গের ফুল!
অনিন্দ্য সে রূপ তার রূপের মাধুরী,
কেবল পাষাণ প্রাণ, এই খেদে মরি।
কে জানে কতই লোকে কত কি যে চায়,
খুশ্হাল্ মুগ্ধ শুধু রূপের প্রভায়।
খুশহাল্।
লামার গান
লামার গান।
আকাশের পথে রবি শশী ধায়
সোহাগে ধরায় বেড়িয়া ধরে,
বিধাতার দীপ আলো করে দিক্
কিবা দক্ষিণে কি উত্তরে;
সে আলোকে সুখে ভাসে নরলোক,—
তা’রে কি কুকাজে মলিন করে?
সুদূর পূরবে আবরি’ আকাশ
তুষার শীর্ষ জাগে শিখরী,
গগন শয়ান তা’রি গহ্বরে
হিংসা বিরত ফিরে কেশরী;
সে ত’ নহে ক্রুর, হে শীত বাতাস,
তবে কেন হও তাহার অরি?
দখিণ বনের রাণী সে বাঘিনী
সকল শ্বাপদ অধীন তা’র,
যখন সাহসে জনপদে পশে
শোভা গৌরব ধরে না আর;
হে বসুন্ধরা! মঙ্গল-করা!
অপকার যেন না হয় তার।
পশ্চিমে,—হ্রদে অগাধ সলিলে
নানা জীব সুখে নৃত্য করে,
সোনালী দু’ চোখ তুলে ভেসে চলে
দেখিবারে দূর রত্নাকরে;
বাঁকা বঁড়্শী কি ছলভরা জালে
তা’রা যেন কভু ধরা না পড়ে।
উদীচি শিখরে পাহাড়ের নীড়ে
গৃধ্র বিহরে পাখীর চূড়া,
সে নহে দস্যু নহে নরঘাতী,
তুষ্ট সে পেলে ক্ষুদ্ কি কুঁড়া;
বিষ মাখা বাণ পেয়ে সন্ধান
গরিমা যেন গো না করে গুঁড়া;
লামা মিললাপা ইহাদের মাঝে
এই গহ্বরে বসতি করে,
রচে গান, জপ-চক্র ঘুরায়
নিখিল জীবের হিতের তরে;
নিশাচরী কোনো যাদুকরী যেন
ভ্রষ্ট না করে ভিক্ষুবরে।
লামা মিললাপা।
লাল মানুষের গান
লাল মানুষের গান।
(আমেরিকা)
বুকেতে বিঁধেছে তীর,
যাতনায় অস্থির,
ক্ষত মুখ বিঁধিছে কাঁটায়;
নিশির দেবতা! সাধি,
ক্ষত মোর দাও বাঁধি’
ঘুমের প্রলেপ দিয়া তায়।
নহিলে অসহ হ’লে
আঁখি যদি ভরে জলে,
ধ’রে তারে রাখা হ’বে দায়;
কাঁদিলে ভীরুর মত
গৌরব হ’বে হত,
তাহাও সহিতে নারি, হায়!
শান্তিহারা
শান্তিহারা।
আমার সুখের জন্ম নিশীথে, বৃদ্ধি আঁধারে তা’র!
ক্লান্ত পরাণে তাই ঘুরি ফিরি যেথায় অন্ধকার।
চিত্ত ব্যাকুল অঙ্কের মত কি যেন হাঁতাড়ি’ মরে,
মনের কুয়াসা মন জুড়ে আছে কিছুতেই নাহি সরে!
কাতরে কাটাই সারা দিনমান, কাঁদিয়া কাটাই নিশা,
সহি, দহি, ডাকি ভগবানে তবু শান্তির নাহি দিশা।
জার নিকোলাস্।
শিশু
শিশু
খোকা! দেখ ফুল!
খোকা দেখে এর চেয়ে ভাল ঢের,—
সুখের স্বপন হ’তেও মোহন,
দেখে ছবি জুল্জুল্!
খোকা, শোনো গান!
খোকা জানে এর চেয়ে ভালো ঢের,
যতই শোনাক্ ও গানের চেয়ে
মধুর পাখীর তান।
খোকা, দেখ চাঁদ!
চাঁদেরে আকাশে দেখে খোকা হাসে,
আলোয় সে দেয় ভালবাসা কত,—
নিশির মিটায় সাধ।
খোকা, দেখ ঢেউ!
আহা কচিমুখ হ’ল উৎসুক;
দুধের ছেলের গম্ভীর ছবি
দেখিবি কি তোরা কেউ?
খোকা, দেখ তারা!
খোকা তোলে হাত; হায় উন্মাদ,
যা’ কিছু শোভন তাহাতেই দাবী?
এ কি গো তোমার ধারা?
খোকা, ঘড়ি বাজে;
খোকা ঢুলে ঢুলে পড়ে বাহুমূলে,
জড় হ’য়ে এল পাপুড়ি ফুলের
পত্রপুটের মাঝে!
কিরণ-কুসুম! খোকা!
শুধু সুস্বপন দেখ তুমি ধন!
যে অবধি রাত না হয় প্রভাত
না ফুটে অরুণ-লেখা।
সুইন্বার্গ।
শিশু কন্দর্পের শাস্তি
শিশু-কন্দর্পের শাস্তি।
প্রেমের ক্ষুদ্র দেবতাটি হায় দেখিলেন একদিন,
রাঙা গোলাপের বুকেতে একটি ভ্রমর রয়েছে লীন!
জন্তুটি কি যে ভাবিয়া না পান্,
অঙ্গুলি তা’র পাখায় চাপান
সে অমনি ফিরে অঙ্গুলি চিরে রাখিল হুলের চিন্!
অমনি আঙুল উঠিল জ্বলিয়া,
নয়নের জল পড়িল গলিয়া,
কাঁদিয়া কাঁপিয়া চলিল ছুটিয়া শঙ্কায় বিমলিন;
জননী তাহার ছিলেন যেথায়
লুটায়ে সেথায় পড়িল ব্যথায়,
“আই—আই—মাগো মরেছি, মরেছি” কাঁদিয়া কহিল দীন,
“ওগো মা মরেছি, মরেছি, মরেছি,
ওগো মা সাপের বিষেতে জ্বরেছি,
পাখ্না-গজানো সর্প-শিশুর গরলে হইনু ক্ষীণ!
জননী হাসিয়া কহেন “বালক!
মধুপের হুল যদি ভয়ানক,
তবে যারে তারে ব্যথা কেন দাও বাণ হানি’ নিশি দিন?”
আনাক্রেয়ন্।
সতী
সতী।
প্রাণের আবেগে এসেছি ছুটিয়া
ছাড়িয়া ঘর;
এসেছি খুঁজিতে অনল-সমাধি
চিতার ‘পর।
অসহ জীবন জীবন যাতনা
সহেনা আর;
মুক্ত করিতে এসেছি, আমার
জীবন ভার।
সেই ত মরণ মধুর—মধুর—
বঁধুর সনে;
পুরিবে কি সাধ? থাকে যদি আহা
বিধির মনে!
এই, এই শেষ;— সকলি দেখেছি,
সানুর তলে
এখনি মিশিবে শরীরে শরীর,
হেম-অনলে।
উচ্চ এ গিরি;— এখনি পড়িব
চিতার মাঝে,
চল প্রিয়তম যাই সুরপুরে
দেবতা-সাজে!
আমি? আমি রব তোমারে ছাড়িয়া
ধরণী মাঝে?
গেছে উৎসব; উৎসব-দীপ
আর কি সাজে?
যুরিপিডিস।
সন্ধির আনন্দ
সন্ধির আনন্দ।
কমল, গোলাপ আন ভরিয়া অঞ্জলি,
আন বেলা, ফুল্লযূথী ছড়াও পবনে;
আমার ব্যথায় যা’রা ব্যথা পেলে মনে,—
এস আজ! আনন্দের অংশী হ’তে বলি।
আন গো অরুণ ফুল, আন শুভ্র কলি,
যে ফুল সাজিবে ভাল এ আনন্দ দিনে;
সুগন্ধ সলিল-ধারা ঢাল গো ভবনে,
আমার ভাবের সাথে মিলে এ সকলি।
শান্ত সে বিপক্ষ মোর, করেছে মার্জ্জনা,
শান্তি এবে, চাহে না সে মরণ আমার;
দয়া মাত্র গর্ব্ব তার,—নহে নহে ঘৃণা;
আশ্চর্য্য হ’য়োনা তবে উৎসাহে আমার;
এত সুখে—এ আনন্দে—ক্ষীণ মনোবীণা—
নহে ছিন্ন তন্ত্রী!—এই বিস্ময় অপার!
বোয়ার্দ্দো।
সমাপ্তে
সমাপ্তে।
আমারে মার্জ্জনা কর, হে কবি-সমাজ!
—এতক্ষণ গাহিলাম যাহাদের গান,—
ভুল যদি ঘটে থাকে ক্ষমা কর, আজ
বিদায়ের অশ্রুজলে হোক অবসান
আমার সকল ত্রুটি। ভালবাসি ব’লে,—
চেয়েছিম বাড়াইতে তোমাদের যশ,
গিয়েছিনু ছড়াইতে নব নব দলে
তোমাদের অন্তরের চির-নব রস;—
আনন্দের আত্মীয়তা করিতে স্থাপন—
লঙ্ঘিয়া সকল বাধা,—ভাষা, কাল, দেশ,
বর্ণ, জাতি, পাঁতি, কুল;—ছিল এ মনন;
নাহি জানি কি করিতে করিনু কি শেষ।
সুদূর অতীত হ’তে পা’ব কি ইঙ্গিত?—
ব্যর্থ কি সার্থক, হায়, আজিকার গীত!
সমুদ্রে ঝড়
সমুদ্রে ঝড়।
চারিদিকে বহিল বাতাস,—
তুলিয়া সাগর বক্ষে সংক্ষোভ ভীষণ;
অন্তস্তল করিয়া বিকাশ
উন্মাদ তরঙ্গ তীরে ধার অগণন।
কলরবে কাঁদিল মানব,
সশব্দে ছিঁড়িয়া যায় নৌকার বাঁধন;
উঠি’ মেঘ সহসা ভৈরব
নিল হরি’ নীলাকাশ, রবির কিরণ!
কাল নিশি নামিল সাগরে,
আকাশে অশনি ঘোর করে গরজন;
ব্যোম-পথে বিদ্যুৎ বিহরে,
গ্রাসিতে ছুটিয়া আসে আসন্ন মরণ৷
ঝঞ্ঝা ধায় গভীর স্বননে,
গগন চুমিতে চায় তরঙ্গ পাগল;
গর্জ্জিয়া সাগর-স্রোত হানে—
ছিন্ন পাল, ভগ্ন দাঁড়, তরুণী বিকল৷
ভগ্ন-চূড়া পাহাড়ের মত
ধেয়ে আসে জলরাশি নাচি’ নিরবধি;—
তুলে শিরে কাহারে ত্বরিতে,
কাহারে অতল-তলে জীবন্ত সমাধি৷
ভার্জ্জিল।
সম্ভোগ
সম্ভোগ।
ভালবাসি অস্ত্র খেলা, প্রেম ভালবাসি,
তাই ব’লে এসেছ ভর্ৎসিতে?
যদি সব ছেড়ে দিয়ে বনে আমি পশি,
সুনিশ্চিত অমরতা পারিবে ত’দিতে?
বাঁচাতে না পার যদি মৃত্যুবাণ হ’তে
বাক্য তবে বাড়ায়ো না আর;
মৃত্যু আসিবার আগে হইবে ভুঞ্জিতে
উপভোগ্য যা’ আছে ধরার।
তারিফ্।
সাকীর প্রতি
সাকীর প্রতি।
এস সাকী! দেহ পাত্র ভরিয়া
রঙ্গিল মদিরায়;
আর কারো হাতে এমন করিয়া
পাত্র কি লওয়া যায়?
সে রস ধরে না আঙুরের ফল,—
নাহি সে মর্ত্ত্য-লোকে,
সে যে রাঙিয়াছে তোমারি কপোল,
উজ্জ্বল করেছে চোখে।
আব্দল্ সালম্ বিন্ রাগোয়ান্।
সাকীর প্রতি (২)
সাকীর প্রতি।
ওগো সাকী মদিরা বিলাও,
পেয়ালা ভরিয়া বারেবার;
মধুপান বিনা মধু যা’বে?
বলিয়ো না—দোহাই তোমার।
আর কবে ফুলদলে পা’ব,
ফুল্লমুখী সুন্দরী সঙ্গিনী?
কোন বাধা বাঁধে মোরে আজি?—
হেন দিনে,—বল ত’ রঙ্গিনী!
দেখ, কি বলিছে ওরা—শোনো,
কি বলিছে বাঁশীতে বীণায়,—
‘গেলে দিন আসেনা ফিরিয়া’
কি দারুণ, কি বিষম হায়।
মিষ্ট বড় জীবনের সুখ,—
হায়—যদি থাকে চির দিন,
চির কাল না থাঁকিল যদি—
গণ’ তা’রে তুচ্ছ অর্থহীন।
কত না নূতন প্রেম হায়,
দলিত কালের পায় পায়!
খুশ্হাল্।
সাকীর প্রতি (৩)
সাকীর প্রতি।
সাকী! যদি জানো আস্বাদ মদিরার,
সুরা বিনা তবে আনিয়ো না কিছু আর;
ভজনা-গৃহের বেচিয়া মাদুর, দরী,
প্রেম-সুরা কিনে আনো তুমি সুন্দরী।
মাতাল! এখনো সংজ্ঞা যদি হে থাকে,
ওই শোনো, তোমা’ গোলাপর বনে ডাকে;
বিষণ্ণ চিতে সান্ত্বনা কর দান,
অখ্যাতি হ’ক তাহাতে দিয়ো না কান।
প্রেমের জগতে মনের গোপন-ধারা,
বেণুর কাঁদনি বীণার তানের পারা।
আচার নিষ্ঠ দানশীল ধনী হ’তে,
প্রেমিক ফকির শ্রেষ্ঠ সে বহু মতে।
সুল্তান হেন পরী হের কে আসিছে,
সারা সহরের লোক তা’র পিছে পিছে।
মাত্র বারেক দেখেছে যে জন মুখ,
সেই পথ চেয়ে রয়েছে গো উৎসুক।
আর কতদিন বিরহ-বেদনা হাফেজ সহিবে, হায়,
বুক-ফাটা দুখ কবে হ’বে শেষ? সে কথা সুধা’ব কা’য়?
হাফেজ।
সাগরে প্রেম
সাগরে প্রেম।
আমরা এখন প্রেমের দেশে, তবে,
বল, এখন কোথায় যাব আর?
থাক্বে হেথা?—যেতে কোথাও হ’বে?
পাল তুলে দিই?—ধরি তবে দাঁড়?
নানান্ দিকে বহে নানান্ বায়,
ফাগুন চিরদিনই ফাগুন হায়,
প্রেমের পাশে বন্দী মোরা তায়,
এখন বল, কোথায় যা’ব আর?
চুমার চাপে যে দুখ গেছে মরি’,—
অস্ত সুখের শেষ নিশাসে ভরি’,—
প্রসাদ পবন মোদের হ’বে সে;
ফুলে বোঝাই হ’বে নৌকা খান্,
পন্থা মোদের জানেন ভগবান,
আর জানে সেই কুসুম-ধনু যে!
প্রেমের পাশে বন্দী মোরা, হায়,
এখন বল, যা’ব আর কোথায়?
মাঝি মোদের প্রণয়-গাথা যত,
ধ্বজে দু’টি কপোত প্রণয়-ব্রত,
সোনার পাটা, সোনার হ’বে ছই,
রশারশি রসিক জনের হাসি,
নয়ন কোণে র’বে রসদ রাশি,
রসদ্ রবে অধর প্রান্তে সই!
প্রেমের পাশে বন্দী মোরা, হায়!
এখন বল, যা’ব আর কোথায়?
কোথায় শেষে নামাব, বল্, তোরে,
বিদেশী সব যেথায় নিতি ঘোরে?
কিম্বা মাঠের শেষে গাঁয়ের ঘাটে?—
যে দেশে ফুল ফোটে অনল মাঝে?
কিম্বা যেথায় তুষার বুকে সাজে?
কিম্বা জলের ফেণার সাথে ফাটে?
প্রেমের পাশে বন্দী মোরা হায়!
এখন বল,—যা’ব আর কোথায়?
কয় সে ধীরে “নামিও মোরে সেথা,
প্রেমের পাখী এক্টি মাত্র যেথা;—
একটি শর, এক্টি মাত্র হিয়া!”
তেমন পুরী যেথায় আছে, হায়,
নরের তরী যায় না গো সেথায়;
নারী সেথায় নাম্তে নারে, প্রিয়া!
তেয়োফিল্, গতিয়ে।
সাধের স্বপন
সাধের স্বপন।
সাধের স্বপন কোথায় আছে?—
প্রাণের মাঝে?—মনের মাঝে?
জন্ম কোথায় বল গো খুলে,
বাড়ে সে ধন কোন্ গোকুলে—
বল্ গো বল।
আঁথির মাঝে জন্মে সে ধন,
দৃষ্টি-রসে পুষ্ট সে ধন,
যেথায় জনম সেথাই মরণ!
আমরা তাহার মরণ-ঘড়ি
বাজাই চল!
টুং-টাং-ঢং,—টুং-টাং-ঢং
বাজাই অনর্গল!
শেক্সপীয়ার।
সার্থক দিন
সার্থক দিন।
আজিকার দিন যায় নি বিফলে,
পেয়েছি গো আজি তাহার দেখা!
হাসিতে মাণিক হাসিতে দেখেছি,
নয়নেরি জলে মুকুতা-লেখা!
দেখেছি দেখেছি তাহারি মুখ,
দুঃখ জীবনে জেনেছি সুখ;
(শুধু) তাহারে ফিরিয়া দেখিব বলিয়া
যাতনা ভুলিয়া যায় গো থাকা!
ম্যাক্সিম্ গোর্কি।
সৌন্দর্য্য ও সাধুতা
সৌন্দর্য্য ও সাধুতা।
ভাবিতাম, পদ্মপর্ণ! এ বিশ্ব-সংসারে
নাহি কিছু তোমা সম পুণ্য-সুবিমল;
তবে কেন কুক্ষিগত শিশির-কণারে
মুক্তা বলি’ লোকমাঝে প্রচার’ কেবল?
হেঙজু।
স্বদেশ-বন্দনা
স্বদেশ-বন্দনা।
(আমেরিকা)
স্বদেশ! আমার মাতৃভূমি!
স্বাধীনচেতার ধাত্রী তুমি;
সবে গাহি তোমার জয়-গান।
পিতৃগণের পুণ্য-ভবন,
আর্য্যগণের গৌরবের ধন,
সকল বনই জাগাক্ ধ্বনি
স্বাধীনতার তান।
স্বদেশ! আমার জন্মভূমি!
স্বাধীনতার ধাত্রী তুমি,
ভালবাসি মধুর তব নাম;
ভালবাসি গহন তোমার,—
তোমার নদী, চৈত্য, বিহার,
প্রেমোল্লাসে হৃদয় আমার
আকুল অবিরাম।
সুরে বাতাস উঠুক ভ’রে
সকল বনে বাজুক ফিরে
সুধাময় স্বাধীনতার গান;
সকল মুখে ফুটুক্ বাণী,
মিলুক্ এসে সকল প্রাণী,
মৌনী গিরির প্রতিধ্বনি
দীর্ঘ করুক্ তান।
পিতার পিতা! বিশ্বপাতা!
স্বাধীনতার জন্মদাতা!
মোরা তব—চরণে গাই গান,
স্বদেশ মোদের যুগে যুগে,
থাকুক স্বাধীনতার সুখে,
তোমার বলে রাজাধিরাজ!
হ’ক সে বলীয়ান্।
স্যামুয়েল স্মিথ্।
স্বপ্ন
স্বপ্ন।
স্বপ্ন শেষে গেল ল’য়ে মোরে তা’র পাশে;
বিশ্বময় অন্বেষি’ পাই নি যার দেখা!—
দেখিলাম চন্দ্রলোকে সে আজি নিবসে,
হ’য়েছে সুন্দরী আরো; কোমলতা মাথা
হাতখানি হাতে রেখে, কহিল “যদ্যপি
মিথ্যা নাহি কহে আশা, তবে তুমি হেথা
রবে এসে চিরকাল মোর কাছে; কবি!
কত না যাতনা দি’ছি,—দি’ছি কত ব্যথা;
কিন্তু দিবা মোর ফুরা’ল সন্ধ্যার আগে।
সে আনন্দ কে বুঝিবে? ভুঞ্জি যাহা এবে;
তোমার অপেক্ষা শুধু, আছি শুধু জেগে
নিরখি’ তোমার পথ; কবি, এস তবে।”
হায় রে ফুরা’ল কেন স্পর্শখানি তা’র,
কেন বা থামিল বাণী স্বর্গ সুষমার!
পেত্রার্ক।
স্মৃতি
স্মৃতি।
অন্তরে কাঁদিয়া ফিরে মোহময় তান,
থেমে গেলে গান!
বকুল শুকায়ে গেলে,—তবু তা’র ঘ্রাণ
মুগ্ধ করে প্রাণ!
গোলাপ ঝরিলে তার পাপ্ড়ি বিছায়
প্রিয়ার শয্যায়;
তুমি গেলে ভালবাসা পড়িবে ঘুমায়ে
স্মৃতিটি জড়ায়ে!
শেলি।
সৎস্বরূপ
সৎস্বরূপ।
বাক্য যাঁহারে বর্ণিতে নারে, বচন সৃষ্টি যাঁ’র,
তিনিই ব্রহ্ম; লোকে যাহা পূজে তাহা কতটুকু তাঁর!
মন যাঁরে মনে করিতে না পারে, মন কল্পনা যাঁর,
তিনিই ব্রহ্ম; লোকে যাহা পূজে তাহাই করোনা সার।
নয়ন যাঁহারে পায় না দেখিতে, নয়ন রচনা যাঁর,
তিনিই ব্রহ্ম; লোকে নাহি জানে পূর্ণ-প্রকাশ তাঁর।
কান যাঁর কথা শুনিতে না পায়, কানেরে শোনান্ যিনি,
তিনিই ব্রহ্ম; লোকে যাহা পূজে শুধু তাই নন্ তিনি।
প্রাণ অপারগ যার প্রণিধানে, প্রাণের প্রণেতা যিনি,
তিনিই ব্রহ্ম; লোকে যাহা বলে শুধু তাই নন্ তিনি।
ভাল মতে তাঁরে আমি ও জানিনে, জানিনে যে তাহা নয়,
এটুকু যে জন জানে অনুভবে,—জেনেছে তারি হৃদয়।
যে ভাবে জানিনে সে কিছু জেনেছে; জানেনা—যে ভাবে জানি;
ধারণা ধরিতে পারে না তাঁহারে, যে কহে তাহারে মানি।
অন্তরযামী বলি’ যে তাঁহারে জেনেছে—অমৃত তা’রি,
আত্মার বলে বিদ্যায় লভি’ অমৃতের অধিকারী।
তলবকারোপনিষৎ।
হাফেজের রুবাইয়াৎ
হাফেজের রুবাইয়াৎ।
তুমি বলেছিলে “ভাবনা কি? আমি তোমারেই ভালবাসি;
আনন্দে থাক, ধৈর্য্য-সলিলে ভাবনা সে যাক্ ভাসি।”
ধৈর্য্য কোথায়? কিবা সে হৃদয়? হৃদয় যাহারে কয়,
সে ত’ শুধু এক বিন্দু শোণিত আর ভাবনার রাশি।
সমীর! গোপনে আমার কথাটি বলিয়া এস হে তায়,
জানাও আমার মরমের জ্বালা তা’রে শত জিহ্বায়;
তেমন করিয়া বল না যাহাতে বেদনা সে মনে পায়,
নানা বারতার মধ্যে আমার কথাটি জানায়ো, হায়।
মরণের বাণ জীবন-দেউল যখন করিবে চূর্ণ,
সেই মুহূর্ত্তে জীবন-পাত্র ভরিয়া হইবে পূর্ণ!
তখন হাফেজ! সতর্ক থেকো, যবে ল’য়ে যাবে তুলি’
জীবন-গৃহের সব তৈজস ক্রমশঃ কালের কুলি।
নদীতীরে যেয়ো মদিরা-পাত্র সাথে লয়ে,—যদি পার,
প্যান্পেনে যত কুনোদের ছেড়ে দূরে থেকো, ভাল আরো;
এমন সাধের জীবন মোদের দিন দশ বই নয়,
তাজা বুকে হাসি মুখে থাকা ওগো তাইত উচিৎ হয়।
গোপনে গোলাপ-মুকুল রয়েছে তোমায় দেখে,
সরমে চামেলি রয়েছে হোথায় মুখানি ঢেকে;
গোলাপের কলি কোথা পাবে হায় অমন কায়া?
যে রবির রূপে রূপসী সে,—তাহা তোমারি ছায়া!
তোমার বিরহে তপ্ত অশ্রু গলিছে বাতির মত,
পেয়ালার মত গোলাপী আঁথিয় জল ঝরে অবিরত;
হৃদয়ের, এই সঙ্কট-দিনে শুনি যদি বীণা-তান,
আঁখি-বারি রূপে হৃদয়-রক্ত ঝরে ব্যাকুলিয়া প্রাণ।
হৃদয়ে করেছি কাঁদিবার ঠাঁই তোমার বিরহে স্বামী!
সান্ত্বনা—তাও রেখেছি হৃদয়ে যতনে লুকায়ে আমি,
শত ঝঞ্ঝার আঘাতে পরাণ যতই পীড়িছ প্রভু!
অটল হৃদয়,—প্রত্যয় তার ভাঙিয়া পড়ে না তবু।
সকল কামনা সফল করিতে তুমি আছ কৃপাময়!
তুমি কাজী, তুমি কোরাণ আমার, তুমি মোর সমুদয়,
আমার মনের কথাটি তোমায় কি আর জানা’ব আমি?
তোমার অজানা কিছু কি জগতে আছে অন্তর্যামী!
হাব্সী নারীর গান
হাব্সী নারীর গান।
বাতাস গরজায়, বৃষ্টি পড়ে;
পথিক দরজায়, বিদেশী অসহায়,
কাতর সে যে হায় বিষম ঝড়ে।
কাছে মা নাই তা’র দুধ কে দেবে আর?
গরম ক’রে আর আদর ক’রে?
বধূ সে কাছে নাই, গম কে ভাঙে ভাই,
রুটি কে গড়ে বল্ তাহার তরে?
বিদেশী অসহায়, কোথা সে যাবে হায়?
আমরা তারে আল্প বাঁচাই ঝড়ে,
নাই মা, বধূ নাই, খেতে কে দেবে ভাই?
কে তারে দেবে ঠাই?—বৃষ্টি পড়ে।
হৃদয়ের নিধি
হৃদয়ের নিধি।
সাগর মাঝে মুকুতা রাজে,
গগনে তারা সাজে গো,
প্রাণের মাঝে? হৃদয় মাঝে?
আছে প্রণয় আছে গো।
বিরাট নভঃ, সিন্ধু বিশাল,
হৃদয় মহান্ আরো সে;
কি ছার তারা মুকুতা জাল?
প্রণয় উজল তার’ যে!
এস কিশোরী হরষ মনে,
পরাণ তোমায় চায় গো,
হৃদয় সিন্ধু গগনের সনে
প্রণয়ে মিশিয়া যায় গো!
হায়েন্।