← লাইব্রেরি

১৮৮৪

হুতোম প্যাঁচার নক্সা (দ্বিতীয় ভাগ)

কালীপ্রসন্ন সিংহ

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৮৪

প্রকাশনা-তথ্য

হুতোম প্যাঁচার নক্সা।

দ্বিতীয় ভাগ।

(প্রবন্ধ কল্পনা।)

শ্রীতালা হূল্ ব্যাক্-ইয়ার ইয়ার কর্ত্তৃক

প্রচারিত।

স্বর্গাদিদমনু প্রাপ্তম চার্য্য মুখকন্দরাৎ।

প্রকাশয় চরিত্রাণাং মহৎত্ত্বস্যাত্মনস্তথা।

চিত্তবৃশ্চে দত্তান্মৈ প্রতিভা পরিমার্জ্জিতা।

তৃতীয় সংস্করণ।

কলিকাতা

শ্যামপুকুর—অভয়চরণঘোষের লেন,

কুমুদ্বন্ধু যন্ত্রে

শ্রীহরিদাস মান্না দ্বারা মুদ্রিত।

সন ১২৯১ সাল।

মূল্য ৷৷৹ আট আনা মাত্র।

হুতোম প্যাঁচার নক্সা।

দ্বিতীয় ভাগ।

(প্রবন্ধ কল্পনা।)

শ্রীতালা হূল্ ব্যাক্-ইয়ার ইয়ার কর্ত্তৃক

প্রচারিত।

স্বর্গাদিদমনুপ্রাপ্তম চার্য্য মুখকন্দরাৎ।

প্রকাশয় চরিত্রাণাং মহৎত্ত্বস্যাত্মনস্তথা।

চিত্তবৃশ্চে দত্তান্মৈ প্রতিভা পরিমার্জ্জিতা।

তৃতীয় সংস্করণ।

কলিকাতা

শ্যামপুকুর—অভয়চরণঘোষের লেন,

কুমুদ্বন্ধু যন্ত্রে

শ্রীহরিদাস মান্না দ্বারা মুদ্রিত।

সন ১২৯১ সাল।

দুর্গোৎসব

দুর্গোৎসব।

দুর্গোৎসব বাঙ্গলা দেশের পরব, উত্তর পশ্চিম প্রদেশে এর নাম গন্ধও নাই; বোধ হয়, রাজা কৃষ্ণচন্দরের আমল হতেই বাঙ্গলায় দুর্গোৎসবের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। পূর্ব্বে রাজা
রাজড়া ও বনেদি বড় মানুষদের বাড়ীতেই কেবল দুর্গোৎসব হতো, কিন্তু আজ কাল পুঁটে তেলিকেও প্রিতিমা আনতে দ্যাখা যায়; পূর্ব্বকার দুর্গোৎসব ও অ্যাখনকার দুর্গোৎসবে অনেক ভিন্ন।

ক্রমে দুর্গোৎসবের দিন সংক্ষেপ হোয়ে পড়লো; কৃষ্ণনগরের কারিকরেরা কূমারটুলী ও সিদ্ধেশ্বরীতলা জুড়ে বসে গ্যাল, জায়গায় জায়গায় রংকরা পাটের চুল, তবলকীর মালা, টীন ও পেতলের অসুরের ঢাল তলওয়ার, নানা রঙ্গের ছোবান প্রিতিমের কাপড় ঝুলতে লাগলো; দর্জ্জিরা ছেলেদের টুপী, চাপকান ও পেটী নিয়ে দরোজায় দরোজায় ব্যাড়াচ্চে; “মধু চাই!” “শাঁকা নেবে গো।” বোলে ফিরিওয়ালারা ডেকে ডেকে ঘুচ্চে। ঢাকাই ও শান্তিপুরে কাপুড়ে মহাজন, আতরওয়ালা ও যাত্রার দালালেরা আহার নিদ্রে পরিত্যাগ করেছে। কোন খানে কাঁসারীর দোকানে রাশীকৃত মধুপকের বাটী, চুমকী ঘটী ও পেতলের থালা ওজোন হচ্চে। ধূপ ধুনো, বেণে মসলা ও মাথাঘসার এক‍্ষ্ট্রা দোকান বসে গ্যাছে। কাপড়ের মহাজনেরা দোকানে ডবল পর্দা ফেলেচে; দোকান ঘর অন্ধকার প্রায়, তারি ভেতরে বসে যথার্থ পাইলাভে বউনি হচ্চে। সিঁদুরচুপড়ী, মোম্বাতি, পিঁড়ে ও কুশাসনেরা অবসর বুঝে দোকানের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার ধারে অ্যাকুভক্টের উপর বার দিয়ে বসেচে। বাঙ্গাল ও পাড়াগেঁয়ে চাকরেরা আরশী, ঘুনসী, গিল‍্টির গহনা ও বিলাতি মুক্তো অ্যকচ্যেটেয় কিনচেন; রবরের জুতো, কম্‌ফরটর, ষ্টিক্ ও ন্যাজওয়ালা পাগড়ী অগুন্তি উঠ‍্চে; ঐ সঙ্গে বেলোয়রি চূড়ী, আঙ্গিয়া, বিলিতি সোণার শীলআংটী ও চুলের গার্ড চ্যেনেরও অসঙ্গত খদ্দের। এত দিন জুতোর দোকান ধূলো ও মাকড়সার জালে পরিপূর্ণ ছিল, কিন্তু পূজোর মোর্সমে বিয়ের কনের মত ফেঁপে উঠ‍্ছে; দোকানের কপাটে কাই দিয়ে নানা রকম রঙ্গিণ কাগজ মারা হয়েছে, ভেতরে চেয়ার পাড়া, তার নীচে অ্যাক টুকরো ছেঁড়া কারপেট। সহরের সকল দোকানেরই শীতকালের কাগের মত ছেহাবা ফিরেচে। যত দিন ঘুনিয়ে আস‍্চে, ততই বাজারের কেনা ব্যাচা বাড়ছে, ততই কল‍্কেতা গরম হয়ে উঠছে। পল্লীগ্রামের টুলো অধ্যাপকেরা বৃত্তি ও বার্ষিক সাদ‍্তে বেরিয়েচেন, রাস্তায় রকম রকম তরবেতর চেহারার ভিড় লেগে গ্যাছে।

কোন খানে খুন, কোন খানে দাঙ্গা, কোথায সিঁদ চুরী, কোন খানে ভট্টাচার্য্য মহাশযের কাছ থেকে দু ভরি রূপো গাঁটকাটায় কেটে নিয়েচে; কোথাও মাগির নাকে থেকে নথটা ছিঁড়ে নিয়েচে; পাহারাওয়ালারা শশব্যস্ত, পুলীশ বদ মাহিশ পোরা, চোরেরা পূজোর মোর্শমে দেদার কারববি ফ্যালাও কচ্চে। “লাগে তাক্ না লাগে তুক্কো” “কিনিতো হাতী, লুটীত ভাঙার” তাদের জপমন্ত্র হযেছে; অনেকে পার্ব্বণের পূর্ব্বে শ্রীঘরে ও বাঙ্কুলে বসতি কচ্চে; কারো পুজোয় পাথরে পাঁচ কিল; কারো সর্ব্বনাশ! ক্রমে চতুর্থী এসে পড়‍্লো।“

এবার অমুক বাবুর নতুন বাড়ীতে পুজার ভারি ধূম। প্রতিপদাদি কল্পের পর ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা বিদায় আরম্ভ হয়েচে, আজও চোকে নাই—ব্রাহ্মণ পণ্ডিতে বাড়ী গিশগিশ কচ্চে। বাবু দেড়ফিট উচ্চ গদির উপোর তসর কাপড় পরে বার দিয়ে বসেচেন, দক্ষিণে দেওয়ান টাকা ও সিকী আধুলীর তোড়া নিয়ে খাতা খুলে বসেচেন, বামে হবীশ্বর ন্যায়লঙ্কার সভাপণ্ডিত অনবরত নশ্য নিচ্চেন ও নাসানিঃসৃত রঙ্গিণ কফ জল জাজিমে পুঁচ্চেন। এ দিকে জহুরী জড়ওয়া গহনার পুঁটুলী ও ঢাকাই মহাজন ঢাকাই শাড়ীর গাঁট নিয়ে বসেচে, মুন‍্সি, মোশাই, জামাই ও ভাগনে বাবুরা ফর্দ্দ কচ্চেন, সামনে কতকগুলি প্রিতিমে ফ্যালা দুর্গাদায়গ্রস্ত ব্রাহ্মণ, বাইযের দালাল, যাত্রার অধিকারী ও গাইয়ে ভিক্ষুক “যে আজ্ঞা” “ধর্ম্ম অবতার” প্রভৃতি প্রিয়বাক্যের উপহার দিচ্চেন। বাবু মধ্যে মধ্যে কারেও অ্যাক আধটা আগমনী গাইবার ফরমাস কচ্চেন। কেও খোস গল্প ও অন্য বড় মানুষের নিন্দাবাদ করে বাবুর মনোরঞ্জনের উপক্রমণিকা কচ্চেন,—আসল মত‍্লব দ্বৈপযান হ্রদে রয়েচে, উপযুক্ত সময়ে তীরস্থ হবে। আতরওয়ালা, তামাকওয়ালা, দানাওয়ালা ও অন্যান্য পাওনাদর মহাজনরা বাইরে বারণ্ডায় ঘুচ্চে— পূজো যায় তথাচ তাদের হিসেব নিকেস হচ্চে না। সভাপণ্ডিত মহাশয় সবপটে পিরিলীর বাড়ীর বিদেয় নেওয়া ও বিধবাদলের এবং বিপক্ষপক্ষের ব্রাহ্মণদের নাম কাট্‌চেন; অনেকে তাঁর পা ছুঁয়ে দিব্বি গালচেন যে, তাঁরা পিরিলীর বাড়ী চেনেন না, বিধবা বিয়ের সভায় যাওয়া চুলোয় যাক, গত বৎসর শয্যাগত ছিলেন বল্লেই হয়। কিন্তু বাণের মুখের জেলেডিঙ্গির মত তাঁদের কথা তল্ হয়ে যাচ্চে, নামকাটাদের পরিবর্ত্তে সভাপণ্ডিত আপনার জামাই, ভাগনে, নাতজামাই দৌত্তব ও খুড়তুতো ভেয়েদের নাম হাসিল কচ্চেন; এ দিগে নামকাটারা বাবু ও সভাপণ্ডিতকে বাপোন্ত করে পৈতে ছিঁড়ে গালে চড়িয়ে শাঁপ দিয়ে উঠে যাচ্চেন। অনেক উমেদারের অনিয়ত হাজ‍্বের পর বাবু কাকেও “আজ যাও” “কাল এসো” “হবে না” “এবার এই হলো” প্রভৃতি অনুজ্ঞায় আপ্যায়িত কচ্চেন=হজুরী সরকারের হেক্‌মত দ্যাখে কে, সকলেই শশব্যস্ত, পূজার ভারি ধূম!

ক্রমে চতুর্থীর অবসান হলো, পঞ্চমী প্রভাত হলেন— ময়রারা দুর্গোমোণ্ডা ও আগতোলা সন্দেশের ওজন দিতে আরম্ভ কল্লে পাঁঠার রেজিমেণ্টকে বেজিমেণ্ট বাজারে প্যারেড্ কত্তে লাগলো, গন্ধবেণেরা মস‍্লা ও মাথাঘসা বেঁধে বেঁধে ক্লান্ত হয়ে পড়‍্লো। আজ সহরের বড় রাস্তায় চলা ভার; মুটেরা প্রিমিয়মে মোট বইচে, দোকানে খদ্দের বসবার স্থান নাই। পঞ্চমী এইরূপে কেটে গ্যাল। আজ ষষ্ঠি, বাজারের শেষ কেনা বেচা, মহাজনের শেষ তাগাদা, আশার শেষ ভরসা। আজ আমাদের বাবুর বাড়ীরও অপুর্ব্ব শোভা, সব চাকর বাকর নতুন তক‍্মা, উর্দ্দী ও কাপড় পোরে ঘুরে বেড়াচ্চে, দরজার দুই দিগে পূর্ণকুম্ভ ও আম্রসার দেওয়া হয়েছে, ঢুলীরা মধ্যে মধ্যে রোশনচৌকী ও শানাইয়ের সঙ্গে বাজাচ্চে, জামাই ও ভাগনে বাবুরা নতুন জুতো ও নতুন কাপড় পোরে ফররা দিচ্চেন, বাড়ীর কোন বৈঠক খানায় আগমনী গাওনা হচ্চে, কোথাও নতুন তাস জোড়া পরকান হচ্চে, সমবয়সী ও ভিক্ষুকের ম্যালা লেগেছে, আতরের উমেদারেরা বাবুদের কাছে শিশি হাতে করে সাত দিন ঘুচ্চে, কিন্তু বাবুদের এমনি অনবকাশ যে দুফোঁটা আতর দানের অবসর হচ্চে না।

এ দিকে সহরের বাজারের, মোড়ে ও চৌরাস্তায় ঢুলী ও বাজন্দারের ভীড়ে সেঁদোনো ভার। রাজপথ লোকারণ্য; মালীরা পথের ধারে পদ্ম, চাঁদমালা, বিল্লীপত্তর ও কুঁচোফুলের দোকান সাজিয়ে বসেচে; দইয়ের ভার মণ্ডার খুলী ও লুচী কচুবীর ওড়ায় রাস্তা জুড়্যে গ্যেছে; রেও ভাট ও আমাদের মত ফলারেরা মিমো করে নিচ্ছে-কোথা যায়?

ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় সহরে প্রিতিমার অধিবাস হয়ে গ্যাল, কিছু ক্ষণ ঢোল ঢাকের শব্দ থাম্‌লো, পূজো বাড়ীতে ক্রমে “আনবে” “করবে” এটা কি হোল” কত্তে কত্তে যষ্ঠীর শর্ব্বরী অবসন্না হলো, সুখতাবা মৃদু পবন আশ্রয় করে উদয় হলেন, পাখিরা প্রভাত প্রত্যক্ষ করে ক্রমে ক্রমে বাসা পরিত্যাগ কত্তে আরম্ভ কল্লে; সেই সঙ্গে সহরের চারি দিগে বাজ‍্না বাদ্দি ব্যেজে উঠ‍্লো, নবপত্রিকার স্নানের জন্য কর্ম্মকর্ত্তারা শশব্যস্ত হলেন—ভাবুকের ভাবনায় বোধ হতে লাগলো, য্যান সপ্তমী কোরমাকান নতুন কাপড় পরিধান করে হাঁস‍্তে হাঁস‍্তে উপস্থিত হলেন।

এদিকে সহরের সকল কলাবউয়েরা বাজনা বাদ্দি করে স্নান কত্তে বেরুলেন, বাড়ীর ছেলেরা কাঁশর ও ঘড়ী বাজাতে বাজাতে সঙ্গে সঙ্গে চল্লো—এ দিকে বাবুর কলাবউয়েরাও স্নানের সরঞ্জাম বেরুলো, আগে আগে কাড়া নাগরা, ঢোল ও সানাইদারেরা বাজাতে বাজাতে চল্লো, তার পেছনে নতুন কাপড় পোরে আশা শোঁটা হাতে বাড়ীর দরওনেরা, তার পশ্চাৎ কলাবউ কোলে পুরোহিত, পুঁতি হাতে তন্ত্রধারক, বাড়ীর আচার্য্য বামুন, গুরু ও সভাপণ্ডিত, তার পশ্চাৎ বাবু, বাবুর মস্তকে লালসাঠিনের রূপোর রাম ছাতা ধরেচে, আশে পাশে ভাগ‍্নে, ভাইপো ও জামাইয়েরা, পশ্চাৎ আমলা ফযলা ও ঘরজামাইয়ে ভগিনীপতিরা, মোসাহেব ও বাজেদল, তাব শেষে নৈবিদ্দ, লাণ্টন ও পুষ্পপাত্র, শাঁক ঘণ্টা ও কুশাসন প্রভৃতি পূজার সরাঞ্জাম মাথায় মালীরা। এইপ্রকার সরঞ্জামে প্রসন্নকুমার ঠাকুর বাবুর ঘাটে কলাবউ নাওয়াতে চল্লেন, ক্রমে ঘাটে পৌঁছলে কলাবউয়ের পূজো ও স্নানের অবকাশে হজুরও গঙ্গার পবিত্র জলে স্নান করে নিয়ে স্তব পাঠ কত্তকত্তে অনুরূপ বাজনা বাদ্দির সঙ্গে বাড়িমুকো হলেন।

পাঠকবর্গ। এ সহরে আজ, কাল দুচার এজুকেড্ ইয়ংবেঙ্গাল ও পৌতলিকাতার দাস হয়ে পুজো আচ্ছা করে থাকেন ব্রাহ্মণ ভোজনের বদলে কতকগুলি দিল‍্দোস্ত মদে ভাতে প্রসাদ পান, আলাপি ফিমেল ফ্রেণ্ডেরাও নিমন্ত্রিত হয়ে থাকেন, পূজোরো কিছু রিফাইণ্ড কেতা। কারণ অপর হিন্দুদের বাড়ী নিমন্ত্রিত প্রদত্ত প্রণামীটাকা পুরোহিত ব্রাহ্মনেরই প্রাপ্য, কিন্তু এঁদের বাড়ী প্রণামীর টাকা বাবুর অ্যাকৌউণ্টে ব্যাঙ্কে জমা হয়; প্রতিমের সামনে বিলিতী চরবীর বাতী জ্বলে ও পূজোর দালানে জুতো নিয়ে ওঠ‍্বার অ্যালাওযেন্‌স থাকে। বিলেত থ্যাকে অর্ডর দিয়ে সাজ্ আনিয়ে প্রতিমে সাজান হয়—মা দুর্গা মুকুটের পরিবর্ত্তে বনেট্ পরেন, শ্যাণ্ডউইচের শেতল খান্ আর কলাবউ গঙ্গাজলের পরিবর্ত্তে কাৎলীকরা গরম জলে স্নান করে থাকেন, শেষে সেই প্রসাদী গরম জলে কর্ম্মকর্ত্তার প্রাতরাশের টি ও কফি প্রস্তুত হয়।

ক্রমে তাবৎ কলাবউয়েরা স্নান করে ঘরে ঢুক‍্লেন। এ দিকে পূজাও আরম্ভ হলো, চণ্ডীমণ্ডপে বারকোসের উপর আগাতোলা মোণ্ডাওয়ালা নৈবিদ্দ সাজান হলো, সঙ্গীত বুঝে চেলীর শাড়ী, চিনীর থাল, ঘড়া, চুম‍্কীঘটী ও সোণার লোহা; নয় ত কোথাও সন্দেশের পরিবর্ত্তে গুড় ও মধুপর্কের বাটীর বদলে খুরী ব্যবস্থা। ক্রমে পূজো শেষ হলো; ভক্তরা অ্যাতক্ষণ অনাহারে থেকে পূজোর শেষে প্রতিমারে পুষ্পাঞ্জলি দিলেন, বাড়ীর গিন্নিরা চণ্ডী শুনে জল খেতে গ্যালেন; কারো বা নবরাত্তির। আমাদের বাবুর বাড়ীর পূজোও শেষ হলো প্রায়, বলিদানের উদ্‌যোগ হচ্চে; বাবু মায় ষ্টাফ্ আদুড়গায়ে উঠানে দাঁড়িয়েচেন, কামার কোমোর বেঁধে প্রতিমের কাচ্ থেকে পূজোও প্রতিষ্ঠা করা খাঁড়া নিয়ে কাণে আশীর্ব্বাদী ফুল গুঁজে হাড়কাটের কাছে উপস্থিত হলো, পাশ্ থ্যেকে অ্যাক্ জন মোসাহেব “খুটী ছাড়! খুটী ছাড়!” বোলে চেঁচিয়ে উঠলেন, গঙ্গজালের ছড়া দিয়ে পাঁঠাকে হাড়কাটে পূরে দিয়ে খীল এঁটে দেওয়া হলো, অ্যাক্ জন পাঁঠার মুড়ি ও আর অ্যাক্ জন ধড়টা ট্যেনে ধল্লে—অমনি কামার জয় মা! মা গো! বোল্যেকোপ, তুল্লে, বাবুরাও সেই সঙ্গে জয় মা! মা গো! বলে প্রতিমের দিকে ফিরে চেঁচাতে লাগলেন—ছপ্ কোরে কোপ পড়ে গ্যাল—গীজা গীজা গীজা গীজা, নাক টুপ্ টুপ্‌ টুপ্, গীজা গীজা গীজা গীজা, নাক টুপ্ টুপ্ টুপ্ শব্দে ঢোল, কাড়ানাগরা ও ট্যাম‍্টেমী ব্যেজে উঠ‍্লো; কামার শরাতে সমাংস করে দিলে পাঁঠার মুড়ির মুখ চ্যেপে ধরে দালানে পাঠানা হলো, এদিকে অ্যাক‍্জন মোসাহেব সন্তর্পণে খর্পরেপ শরা আচ্ছ্বাদন কর্যে প্রতিমের সম্মুখে উপস্থিত কল্পে, বাবুরা বাজনার তরঙ্গের মধ্যে হাত্তালী দিতে দিতে ধীরে ধীরে চণ্ডীমণ্ডপে উঠলেন—প্রতিমার সাম‍্নে দানের সামগ্রী ও প্রদীপ জ্বেলে দেওয়া হলে আরতি আরম্ভ হলো, বাবু স্বহস্তে ধবল গঙ্গাজল চামর বীজন কত্তে লাগ‍্লেন,ধূপ ধুনোর ধোঁয়ে বাড়ি অন্ধকার হয়ে গ্যাল, এইরূপে আধঘণ্টা আরতীর পর শাঁক ব্যেজে উঠলো, সবাবু সকলে ভূমিষ্ট হয়ে প্রণাম করে বৈঠকখানায় গ্যালেন। এদিকে দালানে বামুনরা নৈবিদ্দ নিয়ে কাড়াকাড়ি কত্তে লাগলো। দেখ‍্তে দেখ‍্তে সপ্তমীও ফুরালো। ক্রমে নৈবিদ্দ বিলি, কাঙ্গালী বিদায় ও জলপান বিলানোতেই সে দিনের অবশিষ্ট সময় অতিবাহিত হয়ে গ্যাল, বৈকালে চণ্ডীর গানওয়ালারা খানিক্ ক্ষণ আসর জাগিয়ে বিদায় হলো— জগা স্যাকরা চণ্ডীর গানের প্রকৃত ওস্তাদ ছিল, সে মরে যাওয়াতেই আর চণ্ডীর গানের প্রকৃত গায়ক নাই; বিশেষত এক্ষণে শ্রোতাও অতিদুলর্ভ হয়েছে।

ক্রমে ছটা বাজ‍্লো, দালানের গ্যাসের ঝাড় জ্বেলেদিয়ে প্রতিমার আরতী আরম্ভ করে দেওয়া হলো এবং মা দুর্গার শেতলের জলপান ও অন্যান্য সরঞ্জামও সেই সময় দালানে সাজিয়ে দেওয়া হলো—মা দুর্গা যত খান বা না খান, লোকে দেখে প্রশংসা কল্লেই বাবুর দশটাকা খরচের সার্থকতা হবে। এদিকে সন্ধ্যার সঙ্গে দর্শকের ভিড় বাড়তে লাগ‍্লো, বাঙ্গাল দোকান‍্দার, ঘুস‍্কী ও খান‍্কী ক্ষুদে ক্ষুদে ছেলে ও আদ‍্বইসি ছোঁড়া সঙ্গে খাতায় খাতায় প্রতিমে দেখ‍্তে আস‍্তে লাগ‍্লো। এদিকে নিমন্ত্রিতেরা সেজে গুঁজে এসে টনাৎ করে অ্যাক‍্টা টাকা ফ্যেলে দিয়ে প্রণাম কল্লে, অমনি পুরুত অ্যাক‍্ছড়া ফুলের মালা নেমন্তন্নের গলায় দিয়ে টাকাটা কুড়িয়ে ট্যাকে গুঁজ‍্লেন, নেমন্তন্নেও হন্ হন্ করে চলে গ্যালেন। কল‍্কেতা সহরের এই একটি বড় আজ‍্গুবি কেতা অনেক স্থলে নিমন্ত্রিতে ও কর্ম্মকর্ত্তায় চোরে কামারের মত সাক্ষাৎ ও হয় না, কোথাও পুরোহিত বলে দ্যান “বাবুরা ওপরে, ঐ সিঁড়ি মসাই জান্‌না। “কিন্তু নিমন্ত্রিত য্যান চিরপ্রচলিত রীতি অনুসারেই” আজ্ঞে না আরো পাঁচ জায়গায় যেতে হবে থাক্” বলে টাকাটি দিয়েই অমনি গাড়িতে ওঠেন কোথাও যদি কর্ম্মকর্ত্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়; তবে গীরগীটের মত উভয়ে অ্যাক‍্বার ঘাড় নাড়ানাড়ি মাত্র হয়ে থাকে―সন্দেশ, মেঠাই চূলোয় যাক্, পান তামাক মাথায় থাক্, প্রায় সর্ব্বত্রই সাদর সম্ভাষণেরও বিলক্ষণ অপ্রতুল―দুই অ্যাক্ জায়গায় কর্ম্মকর্ত্তা জরির মছলন্দ প্যেতে, সাম‍্নে আতরদান, গোলাপ‍্পাস সাজিয়ে পয়সার দোকানের পোদ্দা রের মত বসে থাকেন। কোন বাড়ীর বৈঠকখানায় চোহেলের রৈ রৈ ও হৈ চৈয়ের তুফানে নেমন্তন্নেদের সেঁদুতে ভরসা হয় না-পাছে কর্ম্মকর্ত্তা তোড়ে কামড়ান। কোথায় দরজা বন্ধ, বৈঠকখানা অন্ধকার, হয় ত বাবু ঘুমুচ্চেন, নয় বেরিয়ে গ্যাছেন, দালানে জন মানব নাই, নেমন্ত্তন্নে কার সমুখে যে প্রণামী টাকাটি ফ্যেল‍্বেন ও কি কর‍্বেন, তা ভেবে স্থির কত্তে পারেন না, কর্ম্মকর্ত্তার ব্যাভার দ্যেখে প্রতিমে পর্য্যন্ত অপ্রস্তুত হন। অথচ এ রকম নিমন্ত্রণ না কল্লেই নয়। এই দরুণ অনেক ভদ্র লোক আজ কাল আর “সামাজিক„ নেমন্তন্নে স্বয়ং জান না, ভাগ্‌নে বা ছ্যেলে পুলের দ্বারাতেই ক্রিয়ে বাড়ির পুরুতের প্রাপ্য কিম্বা বাবুদের ওৎকরা টিকা টি পাঠিয়ে দ্যান কিন্তু আমাদের ছ্যেলে পুলে না থাকায় স্বয়ং গমনে অসমর্থ হওয়ায় স্থির করেছি, এবার অবধি প্রণামীর টাকায় পোষ্টেজ্ ষ্টাম্প কিনে ডাকে পাঠিয়ে দেবো, ত্যামন ত্যামন আত্মীয় স্থলে (সেফ্ অ্যারাইভ্যালের জন্য) রেজে ষ্টরী কবে পাঠান যাবে; যে প্রকারে হোক্, টাকাটি পৌঁছনো নে বিষয়। অধ্যাপক ভায়ারা এ বিষয়ে অনেক সুবিদে করে দিয়েচেন, পূজো ফুরিয়ে গেলে তাঁরা প্রণামীর টাকাটি আদায় কত্তে স্বয়ং ক্লেশ নিয়ে থাকেন, নেমন্তন্নের পূর্ব্ব হতে পূজোর শেষে তাঁদের আত্মীয়তা আরো বৃদ্ধি হয়, অনেকের প্রণামী চাইতে আসাই পূজোর প্রূফ্।

মনে করুন, আমাদের বাবু বনেদী বড় মানুষ; চাইল সতন্তর, আরতীর পর বানারসী জোড় পব্যে সভাসদ সঙ্গে নিয়ে দালানে বার দিলেন, অম‍্নি তক‍্মাপরা বাঁকা দরওয়ানেরা তলয়ার খুলে পাহারা দিতে লাগলো; হরকরা, হুঁকোবরদার, বিবির বাড়ীর বেহারা ও মোসাহেবরা জোড়হস্ত হয়ে দাঁড়ালো কখন কি ফরমাস হয়। বাবুর সামনে অ্যাক্‌টা সোনার আল‍্বোলা, ডাইনে অ্যাক্‌টা পান্নাবসান ফুরসি, বাঁয়ে অ্যাক্‌টা হীরে বসান টোপদার গুড়গুড়ি ও পেছনে অ্যাক‍্টা মুক্তোবসান পেঁচুয়া পড়‍্লো; বাবু আঁস্তাকুড়ের কুকুরের মত ইচ্ছা অনুসারে আসে পাশে মুখ দিচ্চেন ও আড়ে আড়ে সাম‍্নে বাজেলোকের ভিড়ের দিকে দেখ‍্চেন— লোকে কোন‍্টার কারিগরীর প্রশংসা কচ্চে; যে রকমে হোক্, লোক‍্কে দ্যাখান চাই যে, বাবুর রূপো সোণার জিনিস্ অঢেল, অ্যামন কি, বসাবার স্থান থাক‍্লে আরো দুটো ফুরসি বা গুড়গুড়ী দ্যাখান যেতো। ক্রমে অনেক অনাহুত ও নিমন্ত্রিত জড় হতে লাগ‍্লেন, বাজেলোকে চণ্ডীমণ্ডপ পুরে গ্যাল, জুতো চোরে সেই লাঙ্গাতলওযারের পাহারার ভেতরথ্যেকেও দু ঝুড়ী জুতো সরিয়ে ফেল্লে। কচ্ছপ জলে থ্যেকেও ডাঙ্গাস্থ ডিমের প্রতি যেমন মন রাখে, সেইরূপ অনেকে দালানে বসে বাবুর সঙ্গে কথাবার্ত্তার মধ্যে আপনার জুতোর ওপোরও নজর রেখেছিলেন; কিন্তু ওঠার সময দ্যাখেন্ যে, জুতোরাম কচ্ছপের ডিমের মত ফুটে সরেচেন, ভাঙ্গা ডিমের খোলার মত হয় ত অ্যাক‍্পাটি ছেঁড়াচটি পড়ে আছে।

এ দিকে দেখ‍্তে দেখ‍্তে গুড়ুম্ করে নটার তোপ্ পড়ে গ্যাল; ছেলেরা “বোমকালী কলকেত্তাওয়ালী” বোলে চেঁচিয়ে উঠলো। বাবুর বাড়ী নাচ, সুতরাং বাবু আর অধিক ক্ষণ দালানে বোস‍্তে পাল্লেন না, বৈঠকখানায় কাপড় ছাড়‍্তে গ্যালেন, এ দিকে উঠানের সমস্ত গ্যাস জ্বেলে দিয়ে মজ‍্লিসের উদযোগ হতে লাগলো, ভাগ‍্নেরা ট্যাসল দেওয়া টুপী ও পেটী পোরে ফপরদালালী কত্তে লাগ‍্লেন। এ দিকে দুই অ্যাক‍্জন নাচের মজলিসি নেমন্তন্নে আস‍্তে লাগ‍্লেন। মজ‍্লিসে তরফা নাবিয়ে দেওয়া হলো। বাবু জরি ও কালাবৎ এবং নানাবিধ জড়ওয়া গহনায় ভূষিত হয়ে ঠিক্ একটি “ইজিপ্‌সন্ মমী” স্যেজ্যে মজ‍্লিসে বার দিলেন―বাই সারঙ্গের সঙ্গে গান করে সভাস্থ সমস্তকে মোহিত কত্তে লাগ্‌লেন।

নেমত্তুন্নেরা নাচ্ দেখ‍্তে থাকুন,বাবু ফররা দিন্ ও লালচোকে রাজা উজীর মারুন—পাঠকবর্গ অ্যাক‍্বার সহরটার শোভা দেখুন—প্রায় সকল বাড়ীতেই নানা প্রকার রং তামাসা আরম্ভ হয়েচে। লোকেরা খাতায় খাতায় বাড়ি বাড়ি পূজো দ্যেখে ব্যাড়াচ্চে। রাস্তায় বেজায় ভীড়! মাড়ওয়ারি খোট্টার পাল, মাগির খাতা ও ইয়ারের দলে রাস্তা পুরে গ্যাচে। নেমন্তন্নের হাত লাঠনওয়ালা, বড় বড় গাড়ীর সইসেরা প্রলয় শব্দে পইস্ পইস্ কচ্চে, অথচ গাড়ী চালাবার বড় বেগতিক। কোথায় সকের কবি হচ্চে, ঢোলের চাটি ও গাওনার চীৎকারে নিদ্রাদেবী সে পাড়া থেকে ছুটে পালিয়েচেন, গানের তানে ঘুমন্তো ছোলেরা মার কোলে ক্ষণে ক্ষণে চম‍্কে উঠচে। কোথাও পাঁচালী আরম্ভ হয়েচে, বওয়াটে পিল্ ইয়ার ছোকরারা ভরপুর নেশায় ভোঁ হয়ে ছড়া কাট‍্চেন ও আপনা আপনি বাহোবা দিচ্চেন; রাত্তির শেষে শ্রাদ্ধ গড়াবে,অবশেষে পুলিশে দক্ষিণা দেবে। কোথায় যাত্রা হচ্চে, মণিগোঁসাই সং এসেচে, ছেলেরা মণিগোঁসায়ের রসিকতায় আহ্লাদে আটখানা হচ্চে, আসে পাশে চিকের ভেতর মেয়েরা উঁকী মাচ্চে, মজলিসে রাম মসাল জ্বল‍্চে, বাজে দর্শকদের বাতকর্ম্ম ও মসালের দুর্গন্ধে পূজোবাড়ীতে তিষ্ঠন ভার, ধূপ ধূনোর গন্ধও হার মেনেচে। কোন খানে পূজোবাড়ীর বাবুরাই খোদ মজ‍্লিস রেখেচেন―বৈঠকখানায় পাঁচো ইয়ার জুটে নেউল নাচানো, ব্যাং নাপানো, খ্যামটা ও বিদ্যাসুন্দর আরম্ভ করেচেন; অ্যাক্ অ্যাক্ বারের হাঁসির গরবায় সিয়াল ডাকে ও মদন আগুণের তানে―দালানে ভগবতী ভয়ে কাঁপ্‌চেন, সিঙ্গি চোরাকে কামড়ান পরিত্যাগ করে ন্যাজ গুটিয়ে পলাবার পথ দেখচে, লক্ষ্মী সরস্বতী শশব্যস্ত! এ দিকে সহরের সকল রাস্তাতেই লোকের ভিড়, সকল বাড়ীই আলোময়।

এই প্রকারে সপ্তমী, অষ্টমী ও সন্ধিপূজো কেটে গ্যালো। আজ নবমী; আজ পূজোর শেষ দিন; এত দিন লোকের মনে যে আহলাদটী জোয়ারের জলের মত বাড়‍্তে ছিল, আজ সেইটির একেবারে সারভাটা।

আজ কোথাও জোড়া মোষ, কোথাও নববুটাই পাঁটা, শুপারি, আক, কুমড়ো,মাগুরমাছ ও মরীচ বলিদান হয়েচে; কর্ম্মকর্ত্তা পাত্র টেনে পাঁচোইয়ারে জুটে নবমী গাচ্চেন ও কাদা মাটি কচ্চেন, ঢুলীর ঢোলে সঙ্গত হচ্চে উঠানে লোকারণ্য; উপর থেকে বাড়ীর মেয়েরা উকীনবমী মেরে দেখ‍্চেন। কোথাও হোমের ধূমে বাড়ী অন্ধকার হয়ে গেচে, কার সাধ্য প্রবেশ করে―কাঙ্গালী, ব্যেওভাট ও ভিক্ষুকের পুজোবাড়ী ঢোকা দূরে থাকুক, দরজা হতে মসাগুলো পর্য্যন্ত ফিরে যাচ্চে। ক্রমে দেখ‍্তে দেখ‍্তে দিনমণি অস্ত গ্যালেন, পূজোর আমোদ প্রায় সম্বৎসরের মত ফুরালো! ভোরাও ওক্তে ভয়বোঁ রাগিণীতে অনেক বাড়ীতে বিজয়া গাওনা হলো। ভক্তের চক্ষে ভগবতীর প্রতিমা পরদিন প্রাতে মলিন মলিন বোধ হতে লাগ‍্লো, শেষে বিসর্জ্জনের সমারোহ সুরু হলো,—আজ নিরঞ্জন।

ক্রমে দেখ‍্তে দেখ‍্তে দশটা ব্যেজে গ্যাল; দইকড়মা ভোগ দিয়ে প্রতিমার নিরঞ্জন করা হলো, আরতীর পর বিসর্জ্জনের বাজনা বেজে উঠলো, বামুনবাড়ীর প্রতিমারা সকালেই জলসই হলেন। বড় মানুষ ও বাজে জাতির প্রতিমা পুলিশের পাশ মত বাজ‍্না বাদ্দির সঙ্গে বিসর্জ্জন হবেন —এ দিকে এ কাজ সে কাজে গির্জ্জার ঘড়িতে টুং টাং টুং টাং করে দুপুর বেজ্যে গ্যাল, সূর্য্যের মৃদু তপ্ত উত্তাপে সহর নিম্‌কী রকম গরম হযে উঠ‍্লো, এলোমেলো হাওয়ায় রাস্তার ধূলো ও কাকর উড়ে অন্ধকার করে তুল্লে। বেকার কুকুর গুলো দোকানের পাটাতনের নীচে ও খানার ধারে শুয়ে জিব‍্বাইর করে্য হাঁপাচ্চে, বোজাই গাড়ির গরুগুলোর মুক্‌দে ফ্যানা পড়‍্চে―গাড়োয়ান ভয়ানক চীৎকারে “শালার গরু চলে না” বলে ন্যাজ মল্‌চে ও পাঁচনবাড়ি মাচ্চে; কিন্তু গরুর চাল্ বেগড়াচ্চে না, বোঝাইয়ের ভরে চাকা গুলি কোঁ কোঁ শব্দে রাস্তা মাতিয়ে চলেচে। চড়াই ও কাক গুলো বারাণ্ডা, আল‍্সে ও নলের নীচে চক্ষু মুদে বসে আছে। ফিরিওয়ালারা ক্রমে ঘরে ফিরে যাচ্চে, রিপুকর্ম্ম ও পরামাণিক্‌রা অনেক ক্ষণ হলো ফিরেচে, আলু পটোল। ঘি চাই। ও তামাকওয়ালা কিছুক্ষণ হলো ফিরে গ্যাছে। ঘোল চাই মাখন চাই। ভয়সা দই। ও মালাই দইওয়ালারা কড়ি ও পয়সা গুন্তে গুন্তে ফিরে যাচ্চে, অ্যাখন কেবল মধ্যে মধ্যে পাণিফল! কাগোজ বদোল। পেয়ালা পিরিচ—বিলাতী খেলেনা বর্ত্তন চাই পেয়ালা পিরিচ। ফিরিওয়ালাদের ডাক শোনা যাচ্ছে—নৈবিদ্দি মাথায় পুজো বাড়ির লোক, পূজুরী বামুন, প্যটো ও বাজন্দার ভিন্ন রাস্তায় বাজে লোক নাই। গুপুস্ করে একটার তোপ পড়ে গ্যাল। ক্রমে অনেক স্থলে ধূমধামে বিষর্জ্জনের উদ্যোগ হতে লাগলো।

হায়! পোত্তলিকতা কি শুভ দিনেই এস্থলে পদার্পণ করেছিল; অ্যাতো দেখে শুনে মনে স্থির জ্যেনেও আমরা তারে পরিত্যাগ কত্তে কত কষ্ট ও অসুবিধা বোধ কচ্চি ছ্যেলে ব্যালা যে পুতুল নিয়ে খেলোঘর পেতেছি, বৌ বৌ খেলেচি ও ছ্যেলে মেয়ের বে দিয়েচি, আবার বড় হয়ে সেই পুতুলকে পরমেশ্বর বলে পূজো কচ্চি, তাঁর পদাপর্ণে পুলকিত হচ্চি ও তাঁর বিসর্জ্জনে শোকের সীমা থাক্‌চে না শুধু আমরা ক্যেন—কত কত কৃতবিদ্যা বাঙ্গালী সংসারের ও জগদীশ্বরের সমস্ত তত্ত্ব অবগত থেকেও হয় ত সমাজ না হয় পরিবার পরিজনের অনুবোধে পুতুল পূজে আমোদ প্রকাশ করেন, বিসর্জ্জনের সময় কাঁদেন ও কাদারক্ত মেক্যে কোলাকূলী করেন,“কিন্তু নাস্তিকতায় নামলিখিয়ে বনে বসে থাকাও ভাল, তবু “জগদীশ্বরঅ্যাক‍্মাত্র“এটিজ্যেনে আবার পুতুল পূজায় আমোদ প্রকাশ করা উচিত নয়।

ক্রমে সহরের বড় রাস্তা চৌমাথা লোকারণ্য হয়ে উঠলো বেশ্যালয়ের বারাণ্ডা আলাপিতে পূরে গ্যাল, ইংরাজি বাজ‍্না, নিশেন, তুরুক্‌সোয়ার ও সার্জ্জন সঙ্গে প্রতিমার রাস্তায় বাহার দিয়ে ব্যাড়াতে লাগলেন—তখন” কার্ প্রতিমা উত্তম” “কার্ সাজ ভাল“”কার্ সরঞ্জাম সরেস” প্রভৃতির প্রশংসারই প্রয়োজন হচ্চে, কিন্তু হায়। “কার‍্ভক্তি সরেস“কেউ সে বিষয়ে অনুসন্ধান করে না—কর্ম্মকর্ত্তাও তার জন্য বড় কেয়ার করেন না। এ দিকে, প্রসন্নকুমার বাবুর ঘাট ভদ্দর লোক গোচের দর্শক, খুদে খুদে পোসাক করা ছেলে, মেয়ে ও ইস্কুলবয়ে ভরে গ্যাল। কর্ম্ম কর্ত্তারা কেউ কেউ প্রতিমে নিয়ে বাচ‍্খেলিয়ে ব্যাড়াতে লাগ‍্লেন— আমুদে মিন্‌সে ও ছোঁড়ারা নৌকোর ওপোর ঢোলের সঙ্গতে নাচ‍্তে লাগলো। সৌখীন বাবুরা খ্যাম‍্টা ও বাই সঙ্গে করে বোট্, পিনেস্ ও বজরার ছাতে বার দিয়ে বস‍্লেন -মোসাহেব ও ওস্তাদ চাকরেরা কবির সুরে দু অ্যাক্‌টা ব’দার গান গাইতে লাগ‍্লো।

” বিদায় হও মা ভগবতি এ সহরে এসো নাকো আর।

দিনে দিনে কলিকাতার মর্ম্ম দেখি চমৎকার॥

জষ্টিসেবা ধর্ম্মঅবতার, কায়মনে কচ্চেন সুবিচার।

এ দিকে ধূলোর তরে রাজপথেতে চেঁচিয়ে চেয়ে চলা ভায়॥

পথে হাগা মোতা চল‍্বে না, লহোরের জল তুল‍্তে মানা;

লাইসেন্সটেক‍্স মাথটচাঁদা, পাইখানায় বাসিময়লা রবেনা।

হেল‍্থ অফিসর, সেতখানার মেজেষ্টর,

ইন্‌কমের আসেসর সাল্লে সবারে

আবার গবর্ণরের গুয়ে দৃষ্টি সৃষ্টিছাড়া ব্যাবহার।

অসহ্য হতেছে মা গো। অসাধ্যবাস করা আর।

জীয়ন্তে এই তো জ্বালা মা গো।

মলেও শান্তি পাবে না,

মুখাগ্নির দফা রফা কলেতে কর্ব্বে সৎকার।

হুতোম দাস তাই সহর ছেড়ে আস‍্মানে করেন বিহার॥

এ দিকে দেখ‍্তে দেখ‍্তে দিনমণি য্যান সম্বৎসরের পুজোর আমোদের সঙ্গে অস্ত গ্যালেন। সন্ধ্যাবূধ বিচ্ছেদ বসন পরিধান করে দ্যাখা দিলেন। কর্ম্মকর্ত্তারা প্রতিমা নিরঞ্জন করে, নীলকণ্ঠ শঙ্কচীল উড়িয়ে “দাদা গো“দিদি গো” বাজনার সঙ্গে ঘট নিয়ে ঘরমুকো হলেন। বাড়ীতে পৌঁছে চণ্ডীমণ্ডপে পূর্ণ ঘটকে প্রণাম করে শান্তিজল নিলেন, পরে কাঁচা হলুদ ও ঘট জল খেয়ে পরস্পর কোলাকুলী কল্লেন। অবশেষে কলাপাতে দুর্গানাম লিখে সিদ্ধি খেয়ে বিজয়ার উপসংহার হলো। ক দিন মহাসমারোহের পর আজ সহরটা খাঁ খাঁ কর্ত্তে লাগ‍্লো―পৌতলিকের মন বড়ই উদাস হলো, কারণ লোকের যখন সুখের দিন থাকে, তখন সেটীর তত অনুভব কত্তে পারা যায় না, যত সেই সুখের মহিমা দুঃখের দিনে বোঝা যায়।

রথ

হুতোম প্যাঁচার নক্সা।

দ্বিতীয় ভাগ।

রথ।

হে সজ্জন! স্বভাবের সুনির্মল পটে,

রহস্য রসের রঙ্গে,

চিত্রিনু চরিত্র―দেবী সরস্বতীর বরে।

কৃপাচক্ষে হের একবার, শেষে বিবেচনা মতে

যার বা অধিক আছে ‘তিরস্কার’ কিম্বা ‘পুরস্কার’

দিও তাহা মোরে―বহু মানে লব শির পাতি।

স্নানযাত্রার আমোদ ফুরুলো, গুরুদাস গুঁই গুল‍্দার উড়ুনী পরিহার করে পুনরায় চির পরিচিত র‍্যাঁদা ও ঘিস‍্কাপ্ ধল্যেন। ক্রমে রথ এসে পড়লো। ফ্যাতো র‍্যতো পরব প্রলয় বুড়ুটে; এতে ইয়ারকির লেশমাত্র নাই, সুতরাং সহরে রথ পার্বণে বড় অ্যাক্‌টা ঘটা নাই; কিন্তু কলিকাতায় কিছুই ফাঁক যাবার নয়; রথের দিন চিৎপুর রোড্‌ লোকারণ্য হয়ে উঠলো, ছোট ছোট ছেলেরা বার্নীস্ করা জুতো ও সেপাইপ্যেড়ে ঢাকাই ধুতি পোরে,কোমরে রুমাল বেঁধে, চুল ফিরিয়ে, চাকর চাকরাণীদের হাত ধরে পয়নালার ওপোর পোদ্দারের দোকানে ও বাজারের বারাণ্ডায় রথ দেখতে দাঁড়িয়েছে। আদ‍্বইসি মাগিরা খাতায় খাতায় কোরা ও কলপ দেওয়া কাপড় পোরে রাস্তা যুড়ে চলেচে; মাটীর জগন্নাথ, কাঁঠাল, তাল‍্পাতের ভেঁপু, পাখা ও শোলার পাখি, বেধড়ক্ বিক্রী হচ্চে; ছ্যেলেদের দ্যাখাদেখী বুড়ো বুড়ো মিন্‌সেরাও তালপাতের ভেঁপু নিয়ে বাজাচ্চেন; রাস্তায় ভোঁ পোঁ ভোঁপোঁ শব্দের তুফান উঠেচে— ক্রমে ঘণ্টা, হরিবোল, খোল, খত্তাল ও লোকের গোলের সঙ্গে একখানা রথ এলো—রথের প্রথমে পেটা ঘড়ি, নিশান, খুন্তি, ভোড়োং ও নেড়ীর কবি; তার পর বৈরাগীদের দু তিন দল নিম খাসা কেত্তন, তার পেছনে সকের সংকীর্ত্তন গাওনা; দোয়ার দলের সঙ্গে বড় বড় আট‍্চালার মত গোলপাতার ছাতা ও পাখা চলেচে, আশে পাশে কর্ম্মকর্তারা পরিশ্রান্ত ও গলদঘর্ম্ম—কেউ নিশান্ ও রেশালার মিলে ব্যতিব্যস্ত, কেউ পাখার বন্দোবস্তে বিব্রত, সখের সংকীর্ত্তনওয়ালারা গোচসই বারাণ্ডার নীচে, চৌমাথার ও চকের সাম‍্নে থ্যেমে থ্যেমে গান করে যাচ্চেন, পেছোনে চোতাদারেরা চেঁচিয়ে হাত নেড়ে গান বলে দিচ্চেন, দোয়ারেরা কি গাচ্চেন, তা তাঁরা ভিন্ন আর কেউ বুজ‍্তে পাচ্চেন না। দর্শকদের ভিড়ের ভিতর এটা মাতাল ছিল, সে রথ দর্শন করে ভক্তিভরে মাত‍্লাম সুরে

“কে মা রথ এলি?

সর্ব্বাঙ্গে পেরেক মারা চাকা ঘুব ঘুরালি।

মা তোর সাম‍্নে দুটো ক্যেটো ঘোড়া,

চুড়োর উপর মুক্‌পোড়া,

চাঁদ চামুরে ঘণ্টা নাড়া,

মধ্যে বনমালী।

মা তোর চৌদিকে দেবতা আঁকা,

লোকের টানে চল‍্চে চাকা,

আগে পাছে ছাতা পাকা,

বেহদ্দ ছেনালী।”

গানটা গেয়ে “মা রথ। প্রণাম হই মা।” বোলে প্রণাম কল্লে। এদিকে রথ হেল‍্তে দুল‍্তে বেরিয়ে গ্যাল; ক্রমে এই রকমে দু চার খানা রথ দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে পড়‍্লো—গ্যাস জ্বালা মুটেরা মৈ কাঁদে করে দ্যাখা দিলে, পুলিসের পাসের সময় ফুরিয়ে এলো, দর্শকেরাও যে যার ঘরমুখো হলেন।

মাহেশে স্নানযাত্রায় যে প্রকাব ধুম হয়, রথে তত হয় না বটে; তবু ফ্যালা যায় না

এদিকে সোজা ও উল‍্টো রথ ফুরাল, শ্রাবণ মাসে ঢ্যালা ফ্যালা পার্ব্বণ, ভাদ্র মাসের অরন্ধন ও জন্মাষ্টমীর পর অনেক জায়গায় প্রিতিমের কাঠামোর ঘা পড়‍্লো, ক্রমে কুমোররা নায়েক বাড়ী অ্যাক মেটে, দো মেটে ও ত্যে মেটে করে ব্যাড়াতে লাগলো। কোলা বেঙ্গেরা ক্রোড়্ কোঁ ক্রোড়্ কোঁ ক্রোড়্ কোঁ শব্দে আগমনী গাইতে লাগলো; বর্ষা আঁবের আটী, কাঁটালের ভুঁতড়ি ও তালের এঁসো খেয়ে বিদেয় হলেন—দেখ‍্তে দেখ‍্তে পূজো এলো।

রামলীলা

রামলীলা।

দুর্গোৎসব অ্যাক বছরের মত ফুরুলো। ঢুলীরা নায়েক বাড়ী বিদেয় হয়ে শুঁড়ীর দোকানে রং বাজাচ্চে। ভাড়া করা ঝাড়েরা মুটের মাথায় বাঁশে ঝুলে টুনু টুনু শব্দে বালাথানায় ফিরে যাচ্ছে। জজ্‌মেনে বামুনের বাড়ীর নৈবিদ্দির আলো চাল ও পঞ্চ শস্য শুকুচ্চে, ব্রাহ্মণী ছেলে কোলে করে কার্টি নিয়ে কাগ তাড়াচ্চেন। সহরটা থম্ থমে। বাসাডেরা আজো বাড়ী হতে ফেরেন্ নি, আফিস্ ও ইস্কুল খোল বার আরো চার পাঁচ দিন বিলম্ব আছে।

যে দেশের লোকের যে কালে যে প্রকার হেম্মত থাকে, সে দেশে সে সময় সেই প্রকার কর্ম্মকাণ্ড, আমোদ প্রমোদ ও কার কারবার প্রচলিত হয়। দেশের লোকের মনই সমাজের লোকোমোটিবের মত, ব্যবহার কেবল ওদেরকর্কের কাজ করে। দেখুন, আমাদের পুর্ব্ব পুরুষেরা বঙ্গভূমি প্রস্তুত করে মল্লযুদ্ধে আমোদ প্রকাশ কত্তেন, নাটক ত্রোটকের অভিনয় দেখ‍্তেন, পরিশুদ্ধ সঙ্গীত ও সাহিত্যের উৎসাহ দিতেন; কিন্তু আজ কাল আমরা বারোইয়ারিতলায়, নয় বাড়ীতে, বেদেনীর নাচ ও “মদন আগুণের” তানে পরিতুষ্ট হচ্চি, ছোট ছোট ছেলে ও মেয়েদের অনুরোধ উপলক্ষ করে, পুতুল নাচ, পাঁচালী ও পচা খেঁউড়ে আনন্দ প্রকাশ কচ্চি, যাত্রা ওয়ালাদের “ছকুবাবু ও” সুন্দরের “সং নাবাতে হুকুম দিচ্চি। মল্ল যুদ্ধের তামাসা “দ্যাখ বুল্ বুল্ ফাইট” ও “ম্যাড়ার লড়াবে” পর্যবসিত হয়েছে। আমাদের পূর্ব্ব পুরুষেরা পরস্পর লড়াই করেচেন, আজকাল আমরা সর্ব্বদাই পরস্পরের অসাক্ষাতে নিন্দাবাদ করে থাকি, শেষে অ্যাক‍্পক্ষের “খেঁউড়ে” জিত ধরাই আছে।

আমাদের এই প্রকার অধঃপতন হবে না ক্যান? আমরা হামা দিতে আরম্ভ করেই ঝুমী, চুষী ও শোলার পাখীতে বর্ণপরিচয় করে থাকি, কিছু পরে ঘুড়ি, লাটিম, লুকোচুরী ও বৌ বৌ খ্যালাই আমাদের যুবত্বের এন‍্ণ্টন্‌স কোর্শ হয়, শেষে তাস্, পাশা ও বড়ে টিপে মাত্ করে ডিগ্রী নিয়ে বেরুই। সুতরাং ঐ গুলি পুরোনো পড়ার মত কেবল চিরকাল আউড়ে আস‍্তে হয়; বেশীর ভাগ বয়সের পরিণামের সঙ্গে ক্রমশ কতকগুলি আনুসঙ্গিক উপসর্গ উপস্থিত হয়।

রামলীলা এদেশের পবর্ নয়—এটি প্রলয় খোট্টাই। কিছুকাল পূর্ব্বে চানকের সেপাইদের দ্বারা এই রামলীলার সূত্রপাত হয়, পূর্ব্বে তারাই আপনা আপনি চাঁদা করে চানকের মাঠে রামবাবণের যুদ্ধের অভিনয় কত্তো; কিছুদিন এরকমে চল্যে, মধ্যে একবারে রহিত হয়ে যায়। শেষে বড়রাজারের দুচার ধনী খোট্টার উদ্যোগে ১৭৫৭ শকে পুনর্ব্বার “রামলীলা” আরম্ভ হয়। তদবধি এই বার বৎসর, রামলীলার ম্যালা চলে আশ্চে। কল‍্কেতায় আর অন্য কোন ম্যালা নাই বলেই অনেকে রমলীলায় উপস্থিত হন। এদের মধ্যে নিষ্কর্ম্মা বাবু, মাড়ওয়ারি খোট্টা, বেশ্যা ও বেণেই অধিক।

পাঠকবর্গ মনে করুন, আপনাদের পাড়ার বনেদী বড়মানুষ ও দলপতি বাবু দেড়ফিট উচ্চ গদির ওপোর বার দিয়ে বসেছেন। গদির সামনে বড় বড় বাক্‌স ও আয়না পড়েছে,বাবুর প্রকাণ্ড আল‍্বোলা প্রতি টানে শরদেব মেঘের মত শব্দ কচ্চে, আর মুষ্ক ও মুসর্ব্বব মেশান ইরাণী তামাকের খোস‍রে বাড়ী মাত্‌ করেচে। গদির কিছু দূরে অ্যাক‍্জন খোট্টা সিদ্ধির মাজুম, হজ্মীগুলি ও পালংতোড় প্রভৃতি “কুয়ৎকি চিজ্” রুমালে বেঁধে বসে আচেন। তিনি লক্ষ্ণৌয়ের অ্যাক জনসম্পন্ন জহুরীর পুত্র, এক্ষণে সহরেই বাস, হয়ত বছর কতক হলো আফিমের তেজমন্দি খ্যালায় সর্ব্বস্বান্ত হয়ে বাবুব অবশ্য পোষ্য হয়েচেন। মনে করুন, তাঁর অনেক প্রকার হাকিমী ঔষধ জানা আছে, সিদ্ধি সম্পর্কীয় মাজুমও উত্তম রকম প্রস্তুত কত্তে পারেন; বিশেষত বিস্তর বাই, কথক ও গানে ওযালীর সহিত পরিচয় থাকায় আপন হেক্‌মত ও হুনুরিতে আজ‍্কাল বাবুর দক্ষিণ হস্ত হয়ে উঠেচেন। এঁর পাশে ভবানী বাবু ও মিসুয়ার্স আর্টফুল ডজর‍্স উকীল সাহেবদের হেড‍্কেরাণী হলধর বাবু। ভবানীবাবু ঐ অঞ্চলের অ্যাকজন বিখ্যাত লোক, আদালতে ভারি মাইনের চাকরি করেন, এ সওয়ায় অন্তঃশিলে কোম্পানির কাগজের দালালী, বড় বড় রাজা রাজড়ার আমমোক্তারী ও মকদ্দমার ম্যানেজারি করা আছে। অ্যামন কি, অনেকেই স্বীকার করে থাকেন যে, ভবানীবাবু ধড়িবাজিতে উমেশ হতে সরেস ও বিষয় কর্ম্মে জয়কৃষ্ণ হতেও জবর। ভবানীবাবুর পার্শ্বস্থ হলধরও কম নন্—মনে করুন,হলধর উকীলের বাড়ীর মকদ্দমার তদ্বিরে, ফ্যের ফন্দিতে ও জাল জালিয়াতে প্রকৃত শুভঙ্কর। হলধরের মোচা গোঁপ, মুসকের মত ভুঁড়ি, হাতে ইষ্টিকবচ, কোমরে গোট ও মাদুলি,সরু ফিন্‌ ফিনে সাদা ধুতি পরিধান তার ভিতরে অ্যক্‌টা কাচ, কপালে টাকার মত অ্যাক্‌টা রক্তচন্দনের টিপ ও দাঁতে মিসি-চাদরটা তাল পাকিয়ে কাঁদে ফেলে অনবরত তামাক খাচ্চেন ও গোঁপে তা দিয়ে য্যান বুদ্ধি পাকাচ্চেন―অ্যামন সময় বাবুর মজ‍্লিসে ফলহরি বাবু ও রামভদ্দর বাবু উপস্থিত হলেন, ফলহরি ও রামভদ্দরকে দেখে বাবু সাদর সম্ভাষণে বসালেন, হুঁক্বাবরদার তামাক দিয়ে গ্যাল, বাবুরা শ্রান্তি দূর করে তামাক্ খ্যেতে খ্যেতে একথা সে কথার পর বল্লেন “মশাই আজ রামলীলার বড় ধুম।” আজ্ শুনলেম লক্ষাণের শক্তিশেল হবে, বিস্তর বাজী পুড়বে, এখানে আসবার সময় দেখলেম ওপাড়ার রামবাবুব চৌঘুড়ি গ্যাল। শম্ভুবাবু বগীতে লক্ষ্মীকে নিয়ে যাচ্চেন—আজ্‌ বেজায় ভীড়। মশাই যাবেন না? তখনি ভবানীবাবু এই প্রস্তাবের পোষকতা করেন— বাবু ও ও রাজী হলেন—অমনি “ওরে! ওরে। কোন্ হ্যায় রে! কোন্ হ্যায়।” শব্দ পড়ে গ্যাল; আসে পাশে “খোদাবন্ধ” ও “আজ্ঞা যাইয়ে” প্রতিধ্বনি হতে লাগ‍্লো—হরকরাকে হুকুম হলো বড় ব্রিজ‍্কা ও বিলাতি জুড়ি তইরি কত্তে বল। শীগ‍্গির।

ঠাওরাণ্, য্যান এ দিকে বাবুর ব্রীজ‍্কা প্রস্তুত হতে লাগ‍্লো, পেয়ারের আবদালীরা পাগ‍্ড়ী ও তক‍্মা পরে আয়নায় মুখ দেখচে। বাবু ড্রেসিংরুমে ঢুকে পোসাক্‌ পচ্চেন চার পাঁচ জন চাকরে পড়ে চাল্লীশ রকম প্যাটনের ট্যাসল দেওযা টুপি ও সাটীনের চাপকান পায়জামা বাছুনি কচ্চে। কোন্‌টা পল্লে বড় ভাল দ্যাখাবে বাবু মনে মনে এই ভাব‍্তে ভাব্‌তে ক্লান্ত হচ্চেন, হয় ত অ্যাকটা জামা পরে আবার খুলে ফেল্লেন। অ্যাকটা টুপি মাথায় দিয়ে আয়নায় মুখ দেখে মনে ধচ্চে না; আবার আর একটা মাথায় দেওয়া হচ্চে, সেটাও বড় ভাল মানাচ্চে না এই অবকাশে অ্যাক‍্জন মোসাহেবকে জিজ্ঞাসা কচ্চেন, ক্যামন হে এটা কি মাথায় দেবো? মোসাহেব সব দিক্ বজায় রেখে “আজ্ঞা পোসাক্ পল্লে আপনাকে জ্যামন খোলে সহরের কোন শালাকে অ্যামন খোলে না” বল্‌চেন, বাবু এই অবসরে আর অ্যাক্‌টা টুপি মাথায় দিয়ে জিজ্ঞাসা কচ্চেন,“এটা ক্যামন? মোসাহেব “আজ্ঞে অ্যামন আর কারো নাই“বলে; বাবুর গৌরব বাড়াচ্চেন ও মধ্যে মধ্যে “আপরুচি খানা ও পররুচি পিন্না” বয়েদটা নজির কচ্চেন। এই প্রকার অনেক তর্ক বিতর্ক ও বিবেচনার পর, হয়ত অ্যাক্‌টা বেয়াড়া রকমের পোশাক পরে, শেষে পোমেটম, ল্যাভেণ্ডার ও আতর ম্যেখে আংটী চেন ও ইষ্টিক বেচে নিয়ে দুঘণ্টার পর বাবু ড্রেসিংরুম হতে বৈটকখানায় বার দিলেন। হলধর, ভবানী, রামভদ্দর প্রভৃতি বৈটকখানাস্থ সকলেই আপনাদের কর্ত্তব্য কর্ম্ম বলেই য্যান” আজ্ঞে পোসাকে আপনাকে বড় খুলেচে” বলে নানা প্রকার প্রশংসা কত্তে লাগ‍্লেন, কেউ বল্লেন, হজুর” একি গিদ‍্সনের বাড়ির তইরি না? কেউ ঘড়ির চেন, কেউ আংটী ও ইষ্টিকের অনিয়ত প্রশংসা কত্তে আরম্ভ কল্লেন।

মোশাহেবদের মধ্যে যাঁদের কাপড় চোপড় গুলি, বাবুর ব্রিজ‍্কা ও বিলাতী জুড়ির যোগ্য নয়, তাঁরা বাবুর প্রসাদি কাপড় চোপর পরে, কানে আতরের তুলো গুঁজে, চেহারা খুলে নিলেন, প্রসাদি পোসাক পরে মোশাহেবদের আর আহ্লাদের সীমা রইলো না। মনে হতে লাগলো“বাড়ির কাছের উঠ‍্নোওয়ালা মুদি মাগি ও চেনা লোকেবা য্যান দেখতে পায়, আমি ক্যামন পোশাকে হুজুরের সঙ্গে যাচ্চি” কিন্তু দুঃখের বিষয় এই, যে অনেক মোসাহেব সর্ব্বদাই আক্ষেপ করে থাকেন যে, তাঁরা যখন বাবুদের সঙ্গে বড় বড় গাড়ী ও ভাল কাপড় চোপড় পরে বেরোন্ তখন কেউ তাঁদের দেখুতে পান না, আর গাম্‌ছা কাঁদে করে বাজার কত্তে বেরুলেই সকলের নজরে পড়েন।

এ দিকে টুং টাং টুং টাং করে মেকাবী ক্লাকে পাঁচটা বাজ্লো “হজুর গাড়ি হাজির” বলে হরকরা হুজুরে প্রোক্লেম কল্লে, বাবু মোশাহেবদের সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে উঠ‍্লেন―বিলাতী জুড়ি কৌচম্যানের ইঙ্গিতে টপাটপ্‌ টপাটপ্ শব্দে রাস্তা কাঁপিয়ে বাবুকে নিয়ে বেরিয়ে গ্যাল।

এ দিকে চাকরেরা “রাম বাঁচলুম” বলে কেউ বাবুর মছলন্দে গড়িয়ে পড়লো, কেউ হজুবের শোনাবাঁদান হুকোটা টেনে দেখ‍্তে লাগ‍্লো―অনেকে বাবুর ব্যবহারের কাপোড় চোপড় পরে ব্যাড়াতে বেরুলো, সহরের অনেক বড়মানুষের বাড়ি বাবুদের সাক্ষাতে বড় আঁটা আঁটী থাকে, কিন্তু তাঁদের অসাক্ষাতে বাড়ির অনেক ভাগ উদোম্‌ এলো হয়ে পড়ে।

ক্রমে বাবুর ব্রিজ‍্কা চিতপুর রোডে এসে পড়‍্লো। চিতপুর রোডে আজ‍্ গাড়ি ঘোঁড়ার অসম্ভব ভিড়। মাড়ওয়ারী খোট্টা ও বেশ্যারা খাতায় খাতায় ছক্কড় ও কেরাঞ্চীতে রামলীলা দেখ‍্তে চলেচে যাঁরা যোত্রহীন, তাঁরাও সকের অনুরোধ অ্যাড়াতে না পেরে হেঁটেই চলেচেন―কল‍্কেতা সহরের এই একটা আজব্ গুণ যে, মজুর হতে লক্ষপতি পর্য্যন্ত সকলের মনে সমান শক্। বড় লোকেরা দানসাগরে যাহা নির্ব্বাহ কর্ব্বেন, সামান্যলোককে ভীক্ষা বা চুরী পর্যন্ত স্বীকার করেও কায় ক্লেশে তিলকাঞ্চনে সেটীর নকল কত্তে হবে।

আন্দাজ করুন, য্যান এ দিকে ছক্কড় ও বড় বড় গাড়ীর গড়িতে রাস্তার ধুলো উড়িয়ে সহর অন্ধকার করে তুল্লে। সূর্য্যাদেবও সমস্ত দিন কমলিনীর সহবাসে কাটিয়ে সুরতপরিশ্রান্ত নাগরের মত ক্লান্ত হয়ে শ্রান্তি দূর করবার জন্যই য্যান অস্তাচল আশ্রয় কল্লেন; প্রিয়সখী প্রদোষের পিছে পিছে অভিসারিণী সন্ধ্যাবধূ ধীরে ধীরে সতিনী সর্ব্বরীর অনুসরণে নির্গতা হলেন; রহস্যজ্ঞ অন্ধকার সমস্ত দিন নিভৃতে লুকিয়ে ছিলো, অ্যাখন পাকিদের সঙ্কেত বাক্যে অবসর বুঝে ক্রমশ দিক্‌সকল আচ্ছাদিত করে নিশানাথের নিমিত্ত অপূর্ব্ব বিহারস্থল প্রস্তুত কত্তে আরম্ভ কল্লে। এদিকে বাবুর ব্রিজ‍্কা রামলীলার রঙ্গভূমিতে উপস্থিত হলো। রামলীলার রঙ্গভূমি, রাজা বাহাদুরের বাগান খানি পুর্ব্বে সহরের প্রধান ছিল, কিন্তু কুলপ্রদীপ কুমারদের কল্যাণে আজ‍্কাল প্রকৃত চিড়িয়াখানা হয়ে উঠেছে। পূর্ব্বে রামলীলা ঐ রাজা বদ্দিনাথ বাহাদুরের বাগানেতেই হতো; গত বৎসর হতে রহিত হয়ে রাজা নরসিংহ বাহাদুরের বাগানে আরম্ভ হয়েছে। নরসিংহ বাহাদুরের ফুলগাছের উপর যার পর নাই শক্ ছিল এবং চিরকাল এই ফুলগাছের উপাসনা করেই কাটিয়ে গ্যাচেন, সুতরাং তাঁর বাগান সহরের শ্রেষ্ঠ হবে বড় বিচিত্র নয়। অ্যামন কি অনেকেই স্বীকার করেচেন যে, গাছেরপারি পাট্যে রাজা বাহাদুরদের বাগান কোম্পানীর বাগান হতে বড় খাট ছিল না কিন্তু বর্ত্তমান কুমার বাহাদুর পিতার মৃত্যুর মাসেকের মধ্যে বাগান খানি অয়রান করে ফেল্লেন; বড় বড় গাছগুলি উপড়ে বিক্রি করা হলো, রাজা বাহাদুরের পুরাতন জুতো পর্য্যন্ত পড়ে রইলো না, যে প্রকারে হোক্ টাকা উপার্জ্জন করাই কুমার বাহাদুরের মতে কর্ত্তব্য কর্ম্ম। সুতরাং শেষে এই শ্রেষ্ঠ বাগান রামলীলার রঙ্গভূমি হয়ে উঠ‍্লো, ঘরে বাইরে বানর নাচ‍্তে নাগ‍্লো, সহরে শোরোত্ উঠলো এবার বদ্দিনাথের বদলে রাজা নরসিংহের বাগানে “রামলীলা” কিন্তু এবার গাড়ি ঘোড়ার টিকিট রাজা বদ্দিনাথের বাগানে রামলীলার সময় টিকিট বিক্রি করা পদ্ধতি ছিল না, রাজা বাহাদুর ও অপর বড়মান‍্সে বিলক্ষণ দশ টাকা সাহার্য্য কত্তেন তাতেই সমুদায় খরচ ক‍্লিয়ে উঠ‍্তো। কিন্তু রাজা বদ্দিনাথ বৃদ্ধাবস্থায় দুতিন বৎসর হলো দেহত্যাগ করায় রাজকুমার সুবৃদ্ধি বাহাদুরেবা বাগান খানি ভাগ করে নিলেন, মধ্যে দেইজি পাঁচিল পড়‍্লো সুতরাং অন্য বড় মানুষেরাও রামলীলায় তাদৃশ উৎসাহ দ্যাখালেন না, তাতেই এবার টিকিট করে কতক টাকা তোলা হয়। বল তে কি, কলিকাতা বড় চমৎকার সহর। অনেকেই রং তামাসায় অপব্যয় কত্তে বিলক্ষণ অগ্রসর, টিকিট সত্তে ও রামলীলার বাগান গাড়ি ঘোড়া ও জনতায় পরিপূর্ণ লোকের বেজায় ভীড়।

এ দিকে বাবুর ব্রিজ‍্কা জনতার জন্য অধিক দূর যেতে পাল্লে না, সুতরাং হজুর দল বল সমেত পায়দলে ব্যাড়ানোই সঙ্গত ঠাউরে গাড়ি হতে নেবে ব্যাড়াতে ব্যাড়তে রঙ্গভূমির শোভা দেখতে লাগ‍্লেন।

রঙ্গভূমির গেট হতে রামলীলার রণক্ষেত্র পর্য্যন্ত দুসারি দোকান বসেচে, মধ্যে মধ্যে নাগরদোলা খুচ্চে―গোলাবিখিলী, খেলেনা, চনেচুর ও চিনের বাদম প্রভৃতি ফিরিওয়ালাদের চিৎকার উঠ‍্চে। ইয়ারের দল খাতায় খাতায় প্যারেড করে ব্যাড়াচ্চে, রাঁড়, খোট্টা, বাজে লোক ও বেণের দলই বারো আনা। রণক্ষেত্রের চার দিকে ব্যেড়ার ধারে চার পাঁচ থাক্ গাড়ির সার, কোন গাড়ির ওপোর অ্যাক‍্জন শৌখিন ইয়ার দুচার দোস্ত ও দুই একটি মেয়েমানুষ নিয়ে মজা কচ্চেন। কোন খানির ভেতোরে চিনে কোট ও চুলের চ্যেনওলা চার জোন ইয়ার ও একটী মেয়ে মানুষ, কোন খানিতে গুটি কত পিল ইয়ার টেক্কা জ্যাঠা ইস্কুলের বই বেচে পয়সা সংগ্রহ করে গোলাবি খিলি ও চরসে মজা লুটচে। কতকগুলি গাড়ি নিছক্ খোট্টা মারওয়ারী ও মেড়ুয়াবাদী, কতকগুলি খোসপোশাকি বাবুতে পূর্ণ।

আমাদের হজুর এই সকল দেখ‍্তে দেখ‍্তে থম্নুমল বাবু হাত ধরে ক্রমে রণক্ষেত্রের দরজায় এসে পৌঁছিলেন—সেথায় বেজায় ভীড়। দশ বারোজন চৌকীদার অনবরত সপাস‍্প্ করে বেত মাচ্চে, দু জন সার্জ্জন সবলে ঠেলে রয়েছে তথাপি রাখ্তে পাচ্চে না থেকে থেকে “রাজা রামচন্দ্রঙ্গীকা জয়”! বলে খোট্টারাও রণক্ষেত্রের মধ্যহতে বানরেরা চেঁচিয়ে উঠচে। সকলেরি ইচ্ছা, রামচন্দ্রের মনোহর রূপ দেখে চরিতার্থ হবে, কিন্তু কার্ সাধ্য সহজে রামচন্দ্রের সমীপস্থ হয়।

হুজুর অনেক কষ্টেসৃষ্টে ব্যাড়ার দ্বার পার হয়ে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করে বানরেব দলে মিস‍্লেন। রণক্ষেত্রের অন্য দিকে লঙ্কা। মনে করুন সেথায় সাজা রাক্ষসেরা ঘুরে ব্যাড়াচ্চে ও বেড়ার নিকটস্থ মালভরা গাড়ির দিকে মূকন্যেড়ে হিঁ হিঁ করে ভয় দেখাচ্চে। সাজা বানরেরা লাফাচ্চে ও গাছ পাতরের বদলে ছেঁড়া কুঁপো ও পাঁকাটি নিয়ে ছোড়া ছুড়ি কচ্চে―বাবু এই সকল অদৃষ্টচর ব্যাপার দ্যেখে যার পর নাই পরিতুষ্ট হয়ে ব্যাড়ার পাশে পাশে হাঁ করে ঘুরে ব্যাড়াতে লাগ‍্লেন, আরো দু চার জন বেণে বড় মানুষ ও ব্যাদড়া বনেদী বাবুরা ভিতরে এসে বাবুর সঙ্গে জুটে গ্যালেন, মধ্যে মধ্যে দালাল ও তুলোওয়ালা ইন্‌ফুলুয়েনসল্ রিফরম‍্ড খোট্টার দলের সঙ্গেও বাবুর সেখানে সাক্ষাৎ হতে লাগ‍্লো, কেউ “রাম রাম” কেউ “আদাব” কেউ “বন্দীগি” প্রভৃতি সেলামাল‍্কীর সঙ্গে পানের দোনা উপহার দিয়ে বাবুর অভ্যর্থনা কত্তে লাগ‍্লো; এঁরা অনেকে দুই প্রহরের সময এসেচেন, রাত্রির দশটার পর ভর পেট রামলীলে গীলে বাড়ি ফির‍বেন।

রণক্ষেত্রের মধ্যে বাবু ও দু চার সবস‍্ক্রাইবর বড়মান‍্সের ছ্যেলেদের ব্যাড়াতে দেখে ম্যানেজর বা তাঁর আসিষ্টেণ্ট দৌড়ে নিকটস্থ হয়ে পানের দোনা উপহার দিয়ে রণ ক্ষেত্রের মধ্যস্থ দু চার কাগজের সংঙের তরজমা কবে বোজাতে লাগ‍্লেন,কত গাড়ি ও আন্দাজ কত লোক এসেচে; তার অ্যাক্‌টা মনগড়া মিমো দিলেন ও প্রত্যেক বানর ভাল্লুক ও রাক্ষসের সাজগোজের প্রশংসা কত্তেও বিস্মৃত হলেন না। বাবু ও অন্যান্য সকলে “এ দফে বড়ি আচ্ছা হুয়া আব বরস্” আব বরস্ এসি নেহি হুয়া থা” প্রভৃতি কম‍্প্লিমেণ্ট দিয়ে ম্যানেজরদের আপ্যায়িত কত্তে লাগ‍্লেন। এ দিকে বাজিতে আগুণ দেওয়া আরম্ভ হলো, ক্রমে চার পাঁচ রকম বাজে কেতার বাজী পুড়ে সে দিন রামলীলা বরখাস্ত হলো। রাম লক্ষ্মণকে আরতি করে ও ফুলের মালা দিয়ে প্রণাম করে বাজে লোকেরা জন্ম সফল বিবেচনা করে ঘরমুখো হলো। কেরাঞ্চীর ঘোঁড়ারা বাতকর্ম্ম কত্তে কত্তে বহু কষ্টে গাড়ি নিয়ে প্রস্থান কল্লে। বাবু সেই ভীড়ের ভিতর হতে অতি কষ্টে গাড়ি চিনে নিয়ে সওয়ার হলেন—সে দিনের রামলীলার এই রকমে উপসংহার হলো।

আমাদেরো এ সকল বিষয়ে বড় শক্, সুতরাং আমরাও একখানি ছ্যাক‍্ড়া গাড়ীর পিছনে বসে রামলীলা দেখ‍্তে যাচ্ছিলেম, গাড়িখানির ভিতরে অ্যাক‍্জন ছুতোর বাবু গুটি দুই গেরম্বাবী রাঁড় ও তাঁর চার পাঁচ জন দোস্ত ছিল, খানিক্ দূর যেতে না যেতেই অ্যাক্‌টা জন্মজ্যেঠা ফচ‍্কে ছোঁড়া রাস্তা থেকে “গাড়োয়ান পিছুভারি। গাড়োয়ান পিছুভারী” বলে চেঁচিয়ে ওঠায় গাড়োয়ান “কেবে শালা” বলে সপাৎ করে অ্যাক্ চাবুক ঝাড়‍্লে। ভেতর থেকে “আবে কেরে” “ল্যে বে যা” “ল্যে বে যা” চীৎকার হতে লাগ‍্লো, অগত্যা সে দিন আর যাওয়া হলো না, মনের শক্‌ মনেই রহিলো।

শরতের শশধর সচ্ছশ্যাম গগনমাঝে নক্ষত্রসমাজে বিরাজ কচ্চেন দেখে প্রণয়িণী রজনী মানভরে অবগুণ্ঠবতী হয়ে রয়েচেন। চক্রবাকদম্পতি কত প্রকার সাধ্য সাধনা কচ্চে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্চে না, সপত্নীর দুর্দ্দশা দর্শন করে সচ্ছসলিলে কুমুদিনী হাঁস‍্তেচে, চাঁদের চির অনুগত- চকোর চকোরী সর্ব্বরীর দুঃখে দুঃখিত হয়ে তাঁরে ভুড়ে ভর্ৎসনা কচ্চে, ঝিঝিপোকা ও উইচিংড়ারাও চীৎকার করে চকোর চকোরীর সঙ্গে যোগ দিতেচে, লম্পট শিরোমণির ব্যবহার দেখে প্রকৃতি সতী বিস্মিত হয়ে রয়েচেন, এ সময় নিকটস্থ হলে রজনীরঞ্জন বড় অপ্রস্তুত হবেন বলেই য্যান পবন বড় বড় গাছ পালায় ও ঝোপে ঝাপের আসে পাশে আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে চলেচেন। অভিমানিনী মানবতী রজনীর বিন্দু বিন্দু নয়নজল শিশিরচ্ছলে বনরাজী ও ফুলদামে অভিষিক্ত কচ্চে।

এদিকে বাবুর ব্রিজ‍্কা ও বিলাতি জুড়ি টপাটপ্ শব্দে রাস্তা কাঁপিয়ে ভদ্রাসনে পৌঁছিল। বাবু ড্রেসিংরুমে কাপড় ছাড়‍্তে গ্যালেন, সহচরেরা বৈঠকখানায় বসে তামাক্ খেতে খেতে রামলীলার জাওর কাট‍্তে লাগ‍্লেন এবং সকলে মিলে প্রাণখুলে দুচার অপর বড় মানুষের নিন্দাবাদ জুড়ে ছিলেন। বাবুও কিছু পরে কাপড় চোপড় ছেড়ে মজলিশে বার দিলেন, গুড়ুম্ করে নটার তোপ্ পড়ে গ্যাল।

বোধ হয়,মহিমার্ণব পাঠকবর্গের স্মরণ থাকতে পারে যে, বাবু রামভদ্দর হজুরের সঙ্গে রামলীলা দেখতে গিযেছিলেন, বর্ত্তমানে দু চার বাজে কথার পর বাবু রামভদ্দর বাবুকে দু অ্যাক‍্টা টপ্‌পা গাইতে অনুরোধ কল্লেন, রামভদ্দর বাবুর গাওনা বাজনায় বিলক্ষণ শক্, গলাখানিও বড় চমংকার, যদিও তিনি এ বিষয়ে পেসাদার নন্; কিন্তু সহরের বড় মানুষ মহলে ঐ গুণেই পরিচিত, বিশেষতঃ বাবু রামভদ্দরের আজকাল সময় ভাল, কোম্পানীর কাগজের দালালী ও গাঁতের মাল কেনার দরুণ বিলক্ষণ দশটাকা রোজগার কচ্চেন বাড়িতে নিত্য নৈমিত্তিক দোল দুর্গোৎসবও ফাঁক যায় না। বাপ মার শ্রাদ্ধ ও ছেলে মেয়ের বিয়ের সময় দশ জন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বলা আছে। গ্রামস্থ সমস্ত ব্রাহ্মণেরা প্রায় বাবুর দলস্থ। কায়স্থ ও নবশাক ও অনেকগুলি বাবুর অনুগত। কর্ম্মকাজের ভীড়ের দরুণ ভদ্দর বাবুর বারোমাস প্রায় সহরেই বাস, কেবল মধ্যে মধ্যে পাল পার্ব্বণ ও ছুটীটা আস‍্ঠায় বাড়ি যাওয়া আছে। ভদ্দর বাবুর সহরের বাদুড় বাগানের বাসাতেও অনেকগুলি ভদ্দর লোকের ছেলেকে অন্ন দেওয়া আছে ও দু চার জন বড় মানুষেও ভদ্দর বাবুরে বিলক্ষণ স্নেহ করে থাকেন। রামভদ্দর বাবু সিমলের রায় বাহাদুরের সোণার কাটি রূপার কার্টি ছিলেন ও অন্যান্য অনেক বড় মানুষেই এঁরে যথেষ্ট স্নেহ করে থাকেন, সুতরাং বাবু অনুরোধ করবামাত্র ভদ্দর বাবু তানপুরা মিলিয়ে একটী নিজ রচিত গান জুড়ে দিলেন, হলধর তবলা বাঁয়া ঠুকে নিয়ে বোলওয়াট ও ফ্যালওঘাটের সঙ্গে সঙ্গত আরম্ভ কল্লেন। রামলীলার নক্‌সা এই খানেই ফুরাইলো।

রেলওয়ে

রেলওয়ে।

দুর্গোৎসবের ছুটিতে হাওড়া হতে এলাহাবাদ পর্য্যন্ত রেলওয়ে খুলেছে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাল কাল অক্ষরে ছাপানো ইংরাজী বাঙ্গালায় এস্তেহার মারা গেছে; অনেকেই আমোদ করে বেড়াতে যাচ্ছেন—তীর্থ যাত্রিও বিস্তর। শ্রীপাঠ নিমতলার প্রেমানন্দ দাস বাবাজীও এই অবকাশে
বারানসী দর্শন কত্তে কৃতসঙ্কল্প হয়েছিলেন। প্রেমানন্দ বাবাজী শ্রীপাঠ জোড়াসাঁকোর প্রধান মঠের অ্যাক‍্জন কেষ্ট বিষ্ণুর মধ্যে, বাবাজীর অনেক শিষ্য সামন্ত ও বিষয় আসাও প্রচুর ছিল। বাবাজীর শরীর স্থুল, ভুঁড়িটি বড় তকিয়ার মত প্রকাণ্ড, হাত পা গুলিও তদনুরূপ মাংসল ও মেদময়। বাবাজীর বর্ণ কোষ্টীপাতরেব মত, হুঁকোর খোলের মত ও ধানসিদ্ধ হাঁড়ির মত চুক্‌ চুকে কাল। মস্তক কেশ হীন করে কামান, মধ্য স্থলে লম্বাচুলের চৈতনচুট‍্কি সর্ব্বদা খোপার মত বাঁধা থাক‍্তো; বাবাজী বহুকাল কচ্চদিয়ে কাপড় পরা পরিহার করেছিলেন, সুতরাং কৌপীনের উপর নানা রঙ্গের বহির্বাস ব্যবহার করেন। সর্ব্বদা সর্ব্বাঙ্গে গোপী মৃত্তিকা মাখা ছিল ও গলায় পদ্ম বিচি তুল‍্সি প্রভৃতি নানা প্রকার মালা সর্ব্বদা পরে থাক‍্তেন, তাতে একটী লাল বনাতের বড় বালিশের মত জপ মালার থলি পীতলের কড়ায় আকক্ষ ঝুল‍্তো।

বাবাজী একটি ভাল দিন স্থির করে প্রত্যুষেই দৈনন্দিন কার্য্য সমাপন কল্লেন ও তাড়াতাড়ি যথাকথঞ্চিত বাড়ীর বিগ্রহের প্রসাদ পেয়ে দুই শিষ্য ও তল্লিদার ও ছড়িদার সঙ্গে লয়ে মঠ হতে বেরিয়ে গাড়ির সন্ধানে চিৎপুররোডে উপস্থিত হলেন। পাঠকবর্গ মনে করুন, যেন স্কুল ও আফিস খোলবার অ্যাখনো বিলম্ব আছে, রামলীলার মেলার এখনো উপসংহার হয়নি, সুতরাং রাস্তায় গহনার কেরাঞ্চী থাকবার সম্ভাবনা কি, বাবাজী অনেক অনুসন্ধান করে শেষে অ্যাক্ গাড়ির আজ্ঞায় প্রবেশ করে অনেক কসা মাজার পর অ্যাকজনকে ভাড়া যেতে সম্মত কল্লেন। এদিকে গাড়ি প্রস্তুত হতে লাগ্‌লো, বাবাজী তারি অপেক্ষায় অ্যাক্ বেশ্যালয়ের বারাণ্ডার নীচে দাঁড়িয়ে রইলেন।

শ্রীপাঠ কুমার নগরের জ্ঞানানন্দ বাবাজী প্রেমানন্দ বাবাজীর পরম বন্ধু ছিলেন। তিনিও রেল গাড়িতে চড়ে বারানসী দর্শনে ইচ্ছুক হয়ে কিছু পূর্ব্বেই বাবাজীর শ্রীপাঠে উপস্থিত হয়ে সেবাদাসীর কাছে শুন‍্লেন, যে বাবাজীও সেই মানসে কিছু পূর্ব্বেই বেরিয়ে গ্যাচেন, সুতরাং এঁরই অনুসন্ধান কত্তে কত্তে সেই খানেই উভয়ের সাক্ষাৎ হলো। জ্ঞানানন্দ বাবাজী যার পর নাই কৃশ ছিলেন, দশ বৎসর জ্বর ও কাশী রোগ ভোগ করে শরীর শুকিয়ে কঞ্চি ও কাটের মত পাকিয়ে গেছিল, চক্ষু দুটি কোটরে বসে গ্যাছে, মাংসমেদের লেশমাত্র শরীরে নাই, কেবল কখান কঙ্কাল মাত্রে ঠেকেচে, তায় এক মাথা রূক্ষ তৈলহীন চুল, এক‍্খানা মোটা লুই দুপাট করে গায়ে জড়ানো, হাতে অ্যাক‍্গাছা বেঁউড় বাঁশের বাঁকা লাটি ও পায়ে অ্যাক‍্জোড়া জগন্নাথি উড়ে জুতো। অনবরত কাস‍্চেন ও গয়ার ফেল্‌চেন এবং মধ্যে মধ্যে শামুক হতে অ্যাক্ অ্যাক্ টিপ নস্য লওয়া হচ্চে। অনবরত নস্য নিয়ে নাকের নলি এমনি অসাড় হয়ে গ্যাচে; যে নাক দিয়ে অনবরত নস্য ও সর্দ্দি মিশ্রিত কফজল গড়াচ্চে, কিন্তু তিনি তা টেরও পাচ্ছেন না, অ্যামন কি, এর দরূণ তাঁরে ক্রমে খোঁনা হয়ে পড়‍্তে হয়েছিল এবং আলজীবও খরাপ হয়ে যাওযায় সর্ব্বদাই ভেটকী মাচের মত হাঁ করে থাক‍্তেন। প্রেমানন্দ জ্ঞানানন্দের সাক্ষাৎ পেয়ে বড়ই আহ্লাদিত হলেন। প্রথমে পরস্পরে কোলাকুলি হলো, শেষে কুশল প্রস্তাদির পর দুই বন্ধুতে দুই ভেয়ের মত একত্রে বারানসী দর্শন কত্তে যাওয়াই স্থির কল্লেন।

এদিকে কেরাঞ্চী প্রস্তুত হয়ে বাবাজীদের নিকটস্থ হলো, তল্পিদার তল্পি নিয়ে ছাতে, ছড়িদার ও সেবাৎ পেছোনেও দুই শিষ্য কোচ‍্বক্‌সে উঠ‍্লো। বাবাজীরা দুজনে গাড়ির মধ্যে প্রবেশ কল্লেন। প্রেমানন্দ গাড়িতে পদার্পণ কর‍্বামাত্র গাড়িখানি মড়্, মড়্ করে উঠলো, সাম‍্নে দিকে জ্ঞানানন্দ বসে পড়লেন। উপরের বারাণ্ডায় কতকগুলি বেশ্যা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা বাবাজীকে দেখে পরস্পর “ভাই! অ্যাক্‌টা অ্যাক‍্গাড়ি গোঁসাই দেখেছিস্। মিন্সে য্যান কুম্ভকর্ণ” প্রভৃতি বলাবলি কত্তে লাগ‍্লো। গাড়োয়ান গাড়িতে উঠে সপাসপ্ করে চাবুক দিয়ে ঘোড়ার রাস হ্যাঁচ‍্কাতে হ্যাঁচ‍্কাতে জীবে ট্যাক্ ট্যাক্ শব্দ করে চাবুক মাথার উপরে ঘোরাতে লাগ‍্লো, কিন্তু ঘোড়ার সাধ্য কি, যে অ্যাক্ পা নড়ে; কেবল অনবরত নাতি ছুড়‍্তে লাগ‍্লো ও মধ্যে মধ্যে বাতকর্ম্ম করে আসোর জমকিয়ে দিলে।

পাঠকবর্গের স্মরণ থাকতে পারে, যে আমরা পূর্ব্বেই বলে গেছি,কলিকাতা আজব সহর। ক্রমে রাস্তায় লোক জমে গ্যালো। এই ভিড়ের মধ্যে অ্যাক‍্টা চিনেরবাদামওয়ালা ফচ্কেছোঁড়া বলে উঠ‍্লে, “তবে গাড়োয়ান। অ্যাক্‌দিকে অ্যাকটা ধুম্মলোচন ও আর অ্যাক্‌দিকে অ্যাক‍্টা চিম‍্ড়ে সওয়ারি, আগে পাষাণ ভেঙ্গেনে,তবে গাড়ি চলবে। অমনি উপর থেকে বেশ্যারা বলে উঠ‍্লো “ওরে এই রোগা মিন্সেটার গলায় গোটা কতক পাথর বেঁধে দে, তা হলে পাষাণ ভাঙ্গা হবে।” প্রেমানন্দ এই সকল কথাতে বিরক্ত হয়ে ঘৃণা ও ক্রোধে জ্বলে উঠে খানিক্ ক্ষণ ঘাড় গুঁজে রইলেন, শেষে ইষৎঘাড় উচুকরে জ্ঞানানন্দকে বলেন, “ভায়া! সহরের স্ত্রীলোক গুলা কি ব্যাপিকা দেখেচো” ও শেষে প্রভো তোমার ইচ্ছা বলে হাই তুল্লেন। জ্ঞানানন্দও হাই তুল্লেন ও দুবার তুড়ি দিয়ে অ্যাক্ টীপ নস্য নিয়ে বল্লেন, “ঠিঁক বঁলেঁচো দাঁ দাঁ, ওঁরা ভত্তাঁর কাছে উপদেশ পাঁঞি নাঁঞি ওঁঞাদের রাঁমা রঁঞ্জিকারঁ পাঁঠ দেওঞা উচিত।”

প্রেমানন্দ রামাবঞ্জিকার নাম শুনে বড়ই পুলকিত হয়ে বল্লেন, “ভায়া না হলে আর মনের কথা কে বলে, রামাবঞ্জিকার মত পুঁথী ত্রিজগতে নাই,” প্রভো তোমার ইচ্ছা। জ্ঞানানন্দ অ্যাক‍্দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে অ্যাক্‌টীপ্ নস্য নিয়ে অনেক ক্ষণ চুপ করে থেকে মাথাটা চুলকে বল্লেন, “দাঁ দাঁ শুনেচি বিবিরাঁ নাকি রামারঞ্জিকা পড়‍্ছেঁ। প্রেমানন্দ অমনি আহ্লাদে “আরে ভায়া রামারঞ্জিকা পুঁথীর মত ত্রিজগতে হ্যান পুঁথী নাঞি। “প্রভো তোমার ইচ্ছা।

এদিকে অনেক কসলাতের পর কেরাঞ্চী গুড়ি গুড়ি চল‍্তে লাগ‍্লেন, তল্পিদারেরা গাড়ির ছাতে বসে গাঁজা টিপ‍্তে লাগ‍্লো, মধ্যে শরতের মেঘে অ্যাক‍্পসলা ভারী বৃষ্টি আরম্ভ হলো, বাবাজীরা গাড়ির দরজা ঠেলে দিয়ে অন্ধকারে বারোইয়ারির গুদম‍্জাত্ সংগুলির মত আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলেন। খানিক ক্ষণ এইরূপ নিস্তব্ধ হয়ে থেকে জ্ঞানানন্দ বাবাজী অ্যাবার গাড়ির ফাটলে চক্ষু দিয়ে বৃষ্টি কিরূপ পড়‍্চে তা দেখে নিয়ে অ্যাক্ টীপ নস্য নিলেন ও বার দুই কেসে বল্লেন,“দাঁদাঁ অ্যাঁক্‌টা সংজীর্ত্তন হঁক, শুঁধু শুঁধু বসে কাঁল কাঁটান হবছে ঞন্না” প্রেমানন্দ সংগীত বিদ্যার বড় প্রিয় ছিলেন, নিজে ভাল গাইতে পারুন আর নাই পারূন আড়ালে ও নির্জ্জনে সর্ব্বদা গলা বাজী কত্তেন ও দিবারাত্র গুন্ গুনোনির কামাই ছিল না। এ ছাড়া বাবাজী সংগীত বিষয়ক অ্যাক‍্খানা বইও ছাপিয়ে ছিলেন এবং ঐ সকল গান প্রথম প্রথম দু অ্যাক্ গোঁড়ার বাড়ি মজলিস করে গায়ক দিয়ে গাওনো হয়, সুতরাং জ্ঞানানন্দের কথাতে বড়ই প্রফুল্লিত হয়ে মল্লার ভেঁজে গান ধল্লেন―পাঠশালের ছেলেরা য্যামন ঘোসাবার সময় সদ্দার পোড়োর সঙ্গে গোলে হরি বোল দিয়ে গণ্ডায় এ্যাণ্ডা বোলে সায দিয়ে যায়, সেই, প্রকার জ্ঞানানন্দ প্রেমানন্দের সংগীত শুনে উৎসাহান্বিত হয়ে মধ্যে মধ্যে দুই অ্যাক্‌টা তান মার‍্তে লাগলেন। ভাঙা ও খোনা আওয়াজের একত্র চীৎকারে গাড়োয়ান গাড়ি থামিয়ে ফেল‍্লে, তল্লিদার তড়াক করে ছাত থেকে লাফিয়ে পড়ে গাড়ির দরজা খুলে দ্যাখে যে বাবাজীরা প্রেমোন্মত্ত হয়ে চীৎকার করে গান ধরেচেন। রাস্তার ধারে পাহারাওয়ালারা তামাক্ খেতে খেতে ঢুল‍্তেছিল, গাড়ির ভেতরের বেতরো বেয়াড়া আওয়াজে চমকে উঠে কল্কে ফেলে দৌড়ে গাড়ির কাছে উপস্থিত হলো। দোকানদারেরা দোকান থেকে গলা বাড়িয়ে উঁকীমেরে দেখতে লাগলো, কিন্তু বাবাজীরা প্রভৃপ্রেমগানে এমনি মেতে গিয়েছিলেন, যে তখনো তানমারা থামে নি। শেষে সহসা গাড়ি ধামাও লোকের গোলে চৈতন্য হলো ও পাহারাওয়ালাকে দেখে কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে পড়‍্লেন। সেই সময় রাস্তা দিয়ে অ্যাক্‌টা নক্‌দা মুটে ঝাঁকা কাঁদে কবে বেকার চলে যাচ্চিল, এই ব্যাপার দেখে সে থম‍্কে দাঁড়িয়ে “পুঙ্গিরবাই গাড়িমদ্দি ক্যালাবতী লাগাইচেন” বলে চলে গ্যাল। পাহারাওয়ালাকে কলকে পরিত্যাগ করে আসতে হয়ে ছিল বলে সেও বাবাজীদের বিলক্ষণ লাঞ্ছনা করে পুনরায় দোকানে গিয়ে বস‍্লো রেলওয়ে ব্যাগ হাতে অ্যাক্জন সহুরে নব্য বাবু অনেকক্ষণ পর্য্যন্ত গাড়ির অপেক্ষায অ্যাক্ দোকানে বসে ছিলেন, বৃষ্টিতে তাঁর রেলওয়ে টরমিণসে উপস্থিত হবার বিলক্ষণ ব্যাঘাত কত্তে ছিল, এক্ষণে বাবাজীদের গাড়োয়ানের সঙ্গে ঐ অবকাশে ভাড়া চুক্তি করে হুড়মুর করে গাড়ি মধ্যে ঢুকে পড়লেন। এদিকে গাড়োযানও গাড়ি হাঁকিয়ে দিলে। তল্পিদার খানিক দৌড়ে দৌড়ে শেষে গাড়ির পিছনে উঠে পড়লো।

আমাদের নব্য বাবুকে অ্যাক‍্জন বিখ্যাত লোক বল্লেও বলা যায়, বিশেষতঃ সহরের সন্নিকটবর্ত্তী একটী প্রসিদ্ধ স্থলে একটী ব্রাহ্ম সভা স্থাপন করে স্বয়ং তার সম্পাদক হয়ে ছিলেন, এসওয়ায় সেই গ্রামেই একটী ভারী মাইনের চাকরী ছিল। নব বাবু রিফরম্ড ক্লাসের টেকা ও সমাজের রঙ্গের গোলাম স্বরূপ ছিলেন, দিবারাত্র “সামিগ্রী কত্তেন” ও সর্ব্বদাই ভরপুর থাক‍্তেন— শনিবার ও রবিবারকিছু বেশী মাত্রায় কারগো নিতেন, মধ্যে মধ্যে বানচাল হওয়ারও বাকি থাকতো না। প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজের ফরণিচর ও লাইব্রেরীর রই কিন‍্তে বাবু ছুটী নিয়ে সহরে এসেছিলেন, কদিন খোঁড়া ব্রহ্মের সমাজেই প্রকৃতির প্রীতি ও প্রিয়কার্য্যসাধন করে বিলক্ষণ ব্রহ্মানন্দ লাভ করা হয়। মাতাল বাবু গাড়ির মধ্যে ঢুকে প্রথমে প্রেমানন্দ বাবাজীর ভুঁড়ির উপর টলে পড়‍্লেন, আবার ধাক্কা পেয়ে জ্ঞানানন্দের মুখের উপর পড়ে পুনরায় প্রেমানন্দের ভুঁড়িতে টলে পড়‍্লেন। বাবাজীরা উভয়ে তটস্থ হয়ে মুখ চাওয়া চায়ি কত্তে লাগ‍্লেন। মাতাল কোথা বসবেন, তা স্থির কত্তে না পেরে মোছনমানদের গাজীমিয়ার ধ্বজার মত অ্যাাক‍্বার এপাশ অ্যাক‍্বার ওপাশ কত্তে লাগ‍্লেন।

বাবাজীরা মাতাল বাবুর সঙ্গে অ্যাক্ খাঁচায় পোরা বাজ ও পায়রার মত বাস করুন, ছক্কড়খানি ভরপুর বোঝাইয়ে নবাবীচেলে চলুক, তল্পিদাররা অনবরত গাঁজা ফুক‍্তে থাক্। এদিকে বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় সহর আবার পূর্ব্বানুরূপ গুল‍্জার হয়েছে—মধ্যাবস্থ গৃহস্থরা বাজার কত্তে বেরিয়েচেন, সঙ্গে চাকর ও চকরাণীরা ধামা ও চাঙ্গারী নিয়ে পেচু পেচু চলেচে। চিৎপুর রোডে মেঘ কল্পে কাদা হয়, সুতরাং কাদার জন্য পথিকদের চলবার বড়ই কষ্ট হচ্চে, কেউ পয়নালার উপর দিয়ে, কেউ খানার ধার দিয়ে জুতো হাতে করে কাপড় তুলে চলেচেন। আলু পটল! ঘিচাই! গুড়! ও ঘোল! ফিরিওয়ালারা চীৎকার কত্তে কত্তে যাচ্চে, পাছে মেচুনীরা মাচের চুপড়ি মাথায় নিয়ে হাত ন্যেড়ে হন্ হন্ করে ছুটেছে, কারু সঙ্গে মেছোর কাঁদে বড়বড় ভেটকী ও মৌলবীর মত চাপ দাড়ী ও জামাজোড়া পরা চিংড়ি ভরা বাজরা ও ভার। রাজার বাজার, লালাবাবুর বাজার, পোস্তা ও কাপুড়েপটী জনতায় পরিপূর্ণ। দোকানে বিবিধ সামগ্রী ক্রয় বিক্রয় হচ্চে, দোকানদারেরা ব্যতিব্যস্ত, খদ্দেরদের বেজায় ভীড়! শীতলা ঠাকরুণ নিয়ে ডোমের পণ্ডিত মন্দিরের সঙ্গে গান করে ভিক্ষা কচ্চে, খঞ্জনি ও অ্যাক‍্তারা নিয়ে বষ্টুম ও ন্যাড়া ন্যেড়িরা গান কচ্চে, চার পাঁচজন তিন দিবস আহার হয় নাই, “বিদেশী ব্রাহ্মণকে কিছু দান কর! দাতালোক” ঘুচ্চেন, অনেকের মৌতাতের সময় উত্তীর্ণ হয়েচে, অন্য কোন উপায় নাই, কিছু উপার্জ্জনও হয় নাই, মদতওয়ালা ধার দেওয়া বন্ধ করেছে, গতকল্য গায়ের চাদরখানিতে চলেচে—আজ আর সম্বলমাত্র নাই। ম্যাথরেরা ময়লা ফেলে এসে মদের দোকানে ঢুকে কসে রম টান‍্চে ও মুদ্দাফরাশদের সঙ্গে উভয়ের অবলম্বিত পেসার কোন্‌টা উত্তম, তারি তাক‌রার হচ্চে। শুঁড়ি মধ্যস্থ হয়ে কখন মুদ্দফরাশের কাজ ম্যেথরের পেশা হতে শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করে মুদ্দফরাশকে সন্তুষ্ট কচ্চেন, কখন ম্যাথরের পেশা শ্রেষ্ঠ বলে মানচেন। ঢুলী, ডোম, কাওরা ও দুলে বেহারারা কুরুপাণ্ডব যুদ্ধের ন্যায় উভয় দলের সহায়তা কচ্চে; হয় ত অ্যামন সময় অ্যাকদল ঝুমুর বা গদাইনাচ আসরে উপস্থিত হবামাত্র তর্কাগ্নিতে অ্যাকবারে জল দেওয়া হলো—মদের দোকান বড়ই সরগরম সহরের দেবতারা পর্য্যন্ত রোজগেরে! কালী ও পঞ্চানন্দ প্রসাদী পাঁঠার ভাগা দিয়ে বসেচেন, অনেক ভদ্রলোকের বাড়ী উঠ‍্নো বরাদ্দ করা আছে কোথাও রসুই করা মাংসেরও সরবরাহ হয়, খদ্দের দলে মাতাল, বেণে ও বেশ্যাই বারো আনা। আজকাল পাঁঠা বড় দুষ্প্রাপ্য ও অগ্নিমূল্য হওয়ায় কোথাও কোথাও পাঁঠি পর্য্যন্ত বলি হয়, কোন স্থলে পোসাবিড়াল ও কুক্কুর পর্য্যন্ত ক্যেটে মাংসের ভাগায় মিশান দেওয়া হয়! যে মুখে বাজারের রসুই করা মাংস অক্লেশে চলে যায়, সেথায় বেরাল কুকুর ফ্যাল‍্বার সামগ্রী নয়। জলচর ও খেচরের মধ্যে নৌকো ও ঘুড়ি ও চতুষ্পদের মধ্যে কেবল খাট খাওয়া নাই।

পাঠকগণ! অ্যাতক্ষণ আপনাদের প্রেমানন্দ ও জ্ঞানানন্দের গাড়ি রেলওয়ে টরমিন‍্সে পৌঁছুলো প্রায়, দেখুন। আপনাদের বৈঠকখানার ঘড়ি নটা বাজিয়ে দিয়ে পুনরায় অবিশ্রান্ত টুকুটাকু করে চল্‌চে, আপনারা নিয়মাতিরিক্ত পরিশ্রম করে ক্লান্ত হন, চন্দ্র ও সূর্য্য অস্তাচলে আরাম করেন, কিন্তু সময় অ্যাক্ পরিমাণে চল‍্চে, ক্ষণকালের তরে অবসর, অবকাশ বা আরামের উপেক্ষা বা প্রার্থনা করে না। কিন্তু হায়! আমরা কখন কখন এই অমূল্য সময়ের এমনি অপব্যয় করে থাকি, যে শেষে ভেবে দেখে তার জন্য যে কত তীব্রতর পরিতাপ সহ্য কত্তে হয়, তার ইয়ত্তা করা যায় না।

এদিকে ব্রাহ্ম বাবু শেষে থপ্ করে জ্ঞানানন্দের কোলে বসে পড়লেন, ব্রাহ্মবাবুর চাপনে জ্ঞানানন্দ মৃত প্রায় হয়ে গুড়ি গুড়ি ম্যেরে পেনেল সই হয়ে রইলেন,বাবু সরে সাম‍্নে বসে খানিক অ্যাক‍্দৃষ্টে প্রেমানন্দের পানে চেয়ে ফিক্‌ করে হেসে রেলওয়ে ব্যাগটী পায়দানে নাবিয়ে জ্ঞানানন্দেরদিকে অ্যাক‍্বার কটাক্ষ করে নিয়ে পকেট হতে প্রেসিডেন্সি মেডিকেলহল ল্যাবেল দেওয়া একটী ফায়েল বার করে সিসির সমুদায় আরকটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে খানিক্ মুখ বিকৃত করে রুমালে মুখ পুঁচে জেব হতে দুডুমোসুপুরি বারকরে চিবুতে লাগ‍্লেন। প্রেমানন্দ ও জ্ঞানানন্দ ব্রাহ্মবাবুর গাড়িতে ওঠাতেই বড় বিরক্ত হয়েছিলেন এবং উভয়ে আড়ষ্ট হয়ে তাঁর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ কত্তেছিলেন, কারণ বাবুর একটী কালবনাতের পেণ্টুলেন ও চাপ্‌কান পরা ছিল, তার ওপোর অ্যাক্‌টা নীল মেরিনোর চাইনাকোট, মাথায় অ্যাক্‌টা বিভরহেয়ারের চোঙ্গাকাটা ট্যাসল লাগানো ক্যাটি কৃষ্ট ক্যাপ্ ও গলায় লাল ও হল‍্দে রঙ্গের জালাবোনা কম‍্ফরটার, হাতে একটি কারপেটের ব্যাগ্ ও অ্যাক‍্টা বিলিতি ওকের গাঁট বাইর করা ক্যেঁদো কোঁত‍্কা। এতদ্ভিন্ন বাবুর সঙ্গে একটি ওয়াচ্ ছিল,তার নিদর্শনস্বরূপ একটি চাবি ও দুটি শিল চুলের গার্ডচ্যেনে ঝুল‍্চে, হাতের আঙ্গুলে একটি আংটিও পরা ছিল, জ্ঞানানন্দ ঠাউরে ঠাউরে দেখলেন, যে সেটির ওপরে “ওঁ তৎসৎ” খোদা রয়েচে। ব্রাহ্মবাবু আরকের ঝাঁজ সাম‍্লে প্রেসিডেন্সি ডাক্তারখানার ল্যাবেল মারা ফায়েলটা গাড়ি হতে রাস্তায় ছুড়ে ফ্যেলে দিয়ে দেখ‍্লেন, প্রেমানন্দ ও জ্ঞানানন্দ অ্যাক‍্দৃষ্টে তাঁর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ কচ্চেন, সুতরাং কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে একটু মুচ্কে হেঁসে জ্ঞানানন্দকে জিজ্ঞাসা কল্লেন, “প্রভু! আপনার নাম?” জ্ঞানানন্দ, বাবুকে তাঁর দিকে ফিরে কথা কবার উদ্যম দেখেই শঙ্কিত হয়েছিলেন,অ্যাখন প্রথম অ্যাক‍্বার অ্যাক‍্টিপ্ নস্য নিলেম, শামুকটা বার দুরচার ঠুক‍্লেন, শেষে অতি কষ্টে “আমার নাম পুঁচ করেছেন ঞ’ “আমার নাম শ্রীজ্ঞানানন্দ দাস দেব, নিবাঁস শ্রীপাটকুমারনগর!” মাতাল বাবু নাম শুনে পুনরায় একটু মুচকে হেঁসে পুনরায় জিজ্ঞাসা কল্লেন, “দেব বাবাজীর গমন কোথায় হবে?” জ্ঞানানন্দ এ কথার কি উত্তর দিবেন, তা স্থির কত্তে না পেরে প্রেমানন্দের মুখচেয়ে রইলেন। প্রেমানন্দ জ্ঞানানন্দ হতে চালাক চোস্ত ও ধ্বড়িবাজ লোক, অনেক স্থলে পোড় খাওয়া হয়েছে, সুতরাং এই অবসরে বল্লেন, “বাবু আমরা দুইজনেই গোঁসাই গোবিন্দমানুষ। ইচ্ছা, বারাণসী দর্শন করে বৃন্দাবন যাব” বাবুর নাম? মাতাল বাবু পুনরায় কিঞ্চিৎ হাঁসলেন ও পকেট হতে দুডুমো সুপুরি মুখে দিয়ে বল্লেন, “আমার নাম কৈলাসমোহন্ বাড়ি এই খানেই, কর্ম্মস্থানে যাওয়া হচ্চে” প্রেমানন্দ বাবুর নাম শুনে কিঞ্চিৎ গম্ভীর ভাব ধারণ করে বল্লেন, “ভাল ভাল” উত্তম। ব্রাহ্ম বাবু পুনরায় জিজ্ঞাসা কল্লেন, দেব বাবাজী কি আপনার ভ্রাতা? এতে প্রেমানন্দ বল্লেন, হাঁ বাপু অ্যাক প্রকার ভ্রাতা বল্লেও বলা যায়; বিশেষতঃ সহধর্ম্মী, আরো জ্ঞানানন্দ ভায়া বিখ্যাত বংশীয়— পূজ্যপাদ জয়দেব গোস্বামী ওনার পূর্ব্ব পিতামহ। মাতাল বাবু এই কথায় ফিক্ করে হাঁস‍্লেন ও প্রেমানন্দকেজিজ্ঞাসা কল্লেন, উনি তো জয়দেবের বংশ, প্রভু কার বংশ? বোধ হয় নিতাই চৈতন্যের স্ববংশীয় হবেন? এই কথায় রহস্য বিবেচনায় প্রেমানন্দ চুপ্ করে গোঁ হয়ে বসে রইলেন। মনে মনে যে যার পর নাই বিরক্ত হয়েছিলেন, তা তার মুখ দেখে ব্রাহ্ম বাবু জান‍্তে পেরে অপ্রস্তুত হবার পরিবর্ত্তে বরং মনে মনে আহ্লাদিত হয়ে বাবাজীদের যথাসাধ্য বিরক্ত কত্তে কৃতনিশ্চিত হয়ে প্রেমানন্দের দিকে ফিরে বল্লেন, প্রভু! দিব্বি স্যেজেচেন সহসা আপনারে দেখে আমার মনে হচ্চে, য্যান কোথাও যাত্রা হবে, আপনারা সেজে গুজে চলেচেন। প্রভু একটী গান করুন দেখি, মধ্যে আপনাদের তানের ধমকে তো অ্যাকবার রাস্তায় মহামারী ব্যাপার ঘটে উঠেছিল, দ্যাখা যাক্ আবার কি হয়, শুনেচি প্রভু! সাক্ষাৎ তানস্যান।—প্রেমানন্দের সঙ্গে বাবুর এই প্রকার যত কথাবার্ত্তা হচ্চে, জ্ঞানানন্দ ততই ভয় পাচ্চেন ও মধ্যে মধ্যে গাড়ীর পার্শ্ব দিয়ে দেখচেন, রেলওয়ে টরমিন‍্স কত দূর, শীঘ্র পৌঁছুলে উভয়ের এই ভয়ানক ব্যল্লীকের হাত হতে পরিত্রাণ হয়।

এদিকে ব্রাহ্ম বাবুর কথায় প্রেমানন্দও বড়ই শঙ্কিত হতে লাগ‍্লেন, ছেলেবেলা তাঁর মাতাল ঘোড়া, ও সাহেবদের উপর বিজাতীয় ভয় ও ঘৃণা ছিল, তিনি অনেকবার মাতালের ভয়ানক অত্যাচারের গল্প শুনেছিলেন। অ্যাক‍্বর অ্যাক‍্জন মাতাল বাবু তাঁর হরিমন্দিরটী জিব দিয়ে চেটে নিয়ে ছিলো ও কিছু দিন হলো আর অ্যাক্ প্রিয়শিষ্য অ্যাক্‌টা ভেটো ঘোড়ার নাথিতে অসময়ে প্রাণত্যাগ করে, সুতরাং অতি বিনীতভাবে বল্লেন, বাবু আমরা গোঁসাইগোবিন্দলোক,সংগীতের আমরা কি ধার ধারি। তবে প্রেম সে কহো রাধাবিনোদ, হরি ভক্তের প্রেমের-তাঁরি প্রেমে দুটো সংকীর্ত্তন করে, মনকে শান্ত করে থাকি। ক্রমে ব্রাহ্ম বাবু সেই ক্ষণমাত্র সেবিত আরকের তেজ অনুভব কর্ত্তে লাগলেন, ঘাড়টি দুল‍্তে লাগলো, চক্ষু দুটি পাক‍্লো হয়ে জিব কথঞ্চিৎ আড় হতে লাগলো, অনেকক্ষণের পর, “ঠিক বলেচো বাপ্! বলে গাড়ির গদি ঠেস দিয়ে হেলে পড়‍্লেন এবং খানিকক্ষণ এই অবস্থায় থেকে পুনরায় উঠে প্রেমানন্দের দিকে ওৎকরে ঝুক‍্তে লাগলেন ও শেষ . তাঁর হাতটি ধরে বল্লেন, বাবাজী আমরা ইয়ার লোক, প্রাণ গড়ের মাঠের মত খোলা। শোনো একটা গাই, আমিও বিস্তর ঢপের গীত জানি, প্রভুর সেবাদাসী আছে তো? বলে হা! হা হা। হ্যেসে টলে জ্ঞানানন্দের মুখের উপর পড়ে হাত ন্যেড়ে চীৎকার করে এই গান ধরলেন,

চাষ মন চির দিন পূজিতে সেই পুতুলে।

রং চঙ্গে চক্‌চকে, সাধে কি ছেলে ভুলে॥

ডাক্ রাং অভরে, চিক্ মিক্ ঝিক্ মিক্ করে।

তায় সোনালী রূপালী, চুমকি বসমা আলো করে॥

আহ্লাদে পেহ্ল্যাদে ক্যেলে, তামাক্ খেগো বুড় ফ্যেলে।

কও কেমনে রহিব খ্যালাঘর কিসে চলে॥

চির পরিচিত প্রণয় সহজে কি ভগ্ন হয়।

থেকে থেকে মন ধায় চোরাসিঙ্গী পাটের চুলে॥

শম্মার সাহস বড়, ভূতের নামে জড়ো সড়ো

ঘরে আছেন গুণবর্তী, গঙ্গাজলে গোবর গুলে॥

সঙ্গীত শেষ হবার পূর্ব্বেই কেরাঞ্চি রেলওয়ে টরমিনসে উপস্থিত হলো। ব্রাহ্ম বাবু টল‍্তে টল‍্তে গাড়ি থামবার পূর্ব্বেই প্রেমানন্দের নাকটা খাম‍্চে নিয়ে ও জ্ঞানানন্দের চুল গুলা ধরে গাড়ি হতে তড়াক করে লাফিয়ে পড়‍্লেন।

আজ আরমানি ঘাট লোকারণ্য, গাড়ী পাল্কীর যেরূপ ভীড়, লোকেরও সেইরূপ রল্লা। বাবাজীরা সেই ভীড়ের মধ্যে অতিকষ্টে গাড়ী হতে অবতীর্ণ হলেন। তল্পিদার, ছড়িদার, সেবাৎ ও শিষ্যরা পরস্পরের পদানুরূপ প্রোসেসন ব্যেঁধে প্রভুদ্বয়কে মধ্যে করে শ্রেণী দিয়ে চল্লেন। জ্ঞানানন্দ ও প্রেমানন্দ দুজনে পরস্পর হাত ধরাধরি করে হেলতে দুল‍্তে যাওয়ায় বোধ হতে লাগ‍্লে য্যান অ্যাক‍্টা আরশুলো ও কাঁচপোকা একত্রে হয়ে চলেচে।

টুনুনাং ণ্টাং টুনুনাং ণ্টাং করে রেলওয়ে ইষ্টিম ফেরী ময়ুরপন্থীর ছাড়বার সঙ্কেত ঘণ্টা বাজ‍্চে, থার্ডক্লাস বুকিং অফিসে লোকের ঠ্যেল মেরেচে, রেলওরের চাপরাশীরা সপা সপ্ বেত মাচ্চে, ধাক্কা দিচ্চে ও গুঁতো লাগাচ্চে, তথাপি নিবৃত্তি নাই। “মশাই স্ত্রীরামপুর!” “বালি বালি” বর্দ্ধমান মশাই। আমার বর্দ্ধমানেরটা দিন‍্না, শব্দ উঠ‍্ছে, চারিদিকে কাটের ব্যাড়াঘেরা বুকিংক্লার্ক সন্ধ্যাপুজার অবসরমতে ঝোপ বুঝে কোপ ফেল‍্চেন। কারো টাকা নিয়ে চার আনার টিকিট ও দুই দোয়ানি দেওয়া হচ্ছে, বাকি চাবামাত্র চোপ রও ও নিকালো,কারো শ্রীরামপুরের দাম নিয়ে বালির টিকিট বেরুচ্চে, কেউ টিকিটের দাম দিয়ে দশমিনিট চীৎকার কচ্চে, কিন্তু সেদিকে ভ্রক্ষেপমাত্র নাই। কল্ফর্টর মাথায় জড়িয়ে ঝড়াক্ ঝড়াক্ করে কেবল টকিটে নম্বর দেবার কল নাড়চেন, সিস দিচ্চেন ও উপরি পয়সা পকেটে ফেল‍্চেন, পাইখানার কাটা দরজার মত ক্ষুদে জানলাটুকুতে অনেকে হুজুরের মুখ দেখ‍্তে পাচ্চে না যে কথা কয়ে, আপনার কাজ লয়। যদি চীৎকার করে ক্লার্ক বাবুর চিত্তাকর্ষণ কত্তে চেষ্টা করে,তখনি রেলওয়ে পুলিশের পাহারাওয়ালা ও জমাদারেরা গলা টিপে তাড়িয়ে দেবে। এদিকে সেকেনক্লাস ও গুড্‌স ও লগেজ ডিপার্টমেণ্টেও এইপ্রকার গোল, সেখানে ক্লার্কবাবুরাও কতক এই প্রকার, কিন্তু অ্যাত নয়। ফাষ্টক্লাস সাহেব বিবির স্থল, সেখানে চুঁশব্দটি নাই, ক্লার্ক রিক্তহস্তে টিকিট বেচতে আসেন ও সেই মুখেই ফিরে যান, পান তামাকের পয়সারও বিলক্ষণ অপ্রতুল থাকে। বাবাজীরা নটবরবেশে থার্ডক্লাস বুকিং আফিসের নিকট যাচ্চেন, অ্যামন সময় টুনুনাংণ্টাং টুনুনাংণ্টাং শব্দে ঘণ্টা ব্যেজে উ‍্ঠলো, ফোস্ ফোস্ করে ইষ্টিমারের ইষ্টিম ছাড়তে লাগ‍্লো, লোকেরা রল্লা বেঁধে জ্যেটি দিয়ে ইষ্টিমারে উঠতে লাগ‍্লো—জল‍্দি। চলো। চলো! শব্দে রেলওয়ে পুলিশের লোকেরা হাঁক‍্তে লাগ‍্লো। বাবাজীরা অতিকষ্টে সেই ভীড়ের মধ্যে ঢুকে টিকিট চাইলেন। বুকিং ক্লার্ক বাবাজীদের চেহারা দেখে ফিক্ করে হেঁসে হাত বাড়িয়ে টাকা চেয়ে নিয়ে টিকিট কাট‍্তে লাগলেন। এদিকে ঝ্যপ ঝ্যপ ঝ্যপ শব্দে ইষ্টিমারের হুইল ঘুরে ছ্যেড়ে দিলে। এদিকে প্রেমানন্দ মশাই টিকিটগুলি শীঘ্র দিন্ শীঘ্র দিন, ইষ্টিম খুল্লো ইষ্টিম চল্লো বলে চীৎকার কর্ত্তে লাগ‍্লেন, কিন্তু কাটাকপাটের হুজুরের ভ্রূক্ষেপ নাই; সিস দিয়ে “মদন আগুণ জ্বল্‌চে দ্বিগুণ কল্পে কি গুণ ঐ বিদেশী।” গান ধল্লেন—মশাই শুন‍্চেন কি? ইষ্টিম খুলে গ্যাল, এর পর গাড়ি পাওয়া ভার হবে, একি অত্যাচার মশাই। ক্লার্ক “আরে থামো না ঠাকুর বলে অ্যাক্ দাবড়ি দিয়ে অনেক ক্ষণের পর কাটাদরজা হতে হাত বাড়িয়ে টিকিট গুলি দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে পুনরায় “ইচ্ছা হয় যে উহার করে প্রাণ সপে সই হইগে দাসী, মদন আগুন” মশাই বাকী পয়সা দিন, বলি দরজা দিলেন যে? সে কথায় কে ভ্রূক্ষেপ করে, “জমাদর ভিড় সাফ্ করো, নিকালো, নিকালো” বলে ক্লার্ক সেই কাটগড়ার ভেতর থেকে চেঁচিয়ে উঠ‍্লেন, রেলপুলিসের পাহারাওলা ধাক্কা দিয়ে বাবাজীদের দল বল সমেত টরমিন্‌স হতে বার করে দিলে—প্রেমানন্দ মনে মনে বড়ই রাগত হয়ে মধ্যে মধ্যে ফিরে ফিরে বুকিং আফিসের দিকে চাইতে লাগ‍্লেন। এদিকে ক্লার্ক কাটাদরজার ফাটল দিয়ে মদন আগুনের শেষটুকু গাইতে গাইতে উঁকী মাত্তে লাগ‍্লেন।

বাবাজীরা কি করেন, অগত্যা টরমিন‍্স পরিহার করে অন্য ঘাটে নৌকার চেষ্টায় বেরুলেন— ভাগ্যক্রমে সেই সময পাশের ঘাটের গহনার ইষ্টিমারখানি খোলে নাই। বাবাজীরা আপনাপন অদৃষ্টকে ধন্যবাদ দিয়ে অতিকষ্টে সেই ইষ্টিমারে উঠে পেরিয়ে পড়‍্লেন—গহনার ইষ্টিমারে অসংখ্য লোক ওঠাতে বাবাজীরা লোকের চপ্‌টানে হট‍্প্রেসের ফরমার মত ও ইস্কু কলের গাঁটের মত জাঁত সহ্য করে পারে পড়ে কথঞ্চিৎ আরাম পেলেন এবং নদীতীরে অতি অল্পক্ষণ বিশ্রাম করেই এষ্টেসনে উপস্থিত হলেন।—টুনুনাংণ্টাং টুনুনাংণ্টাং শব্দে অ্যাক‍্বার ঘণ্টা বাজ‍্লো। বাবাজীরা অ্যাক‍্বার ঘণ্টা বাজ‍্বার উপেক্ষা করার ক্লেশ ভুগে এসেছেন, সুতরাং এবার মুকুয়ে তল্পি তল‍্পা নিয়ে ট্রেনের অপেক্ষা কত্তে লাগ‍্লেন-প্রেমানন্দ ঘাড় বাঁকিয়ে ট্রেনের পথ দেখ‍্ছেন, জ্ঞানানন্দ নস্য লবার জন্য সামূকটা ট্যাকে হতে বার কর‍্বার সময় দ্যাখেন যে, তার টাকার গেঁজেটি নাই। অমিনি দাঁদা সর্ব্বনাশঞ হলোঁ। সর্ব্বনাশঞ হলোঁ। আমার গেঁজেটি নাই বলে কাঁদ‍্তে লাগ‍্লেন, প্রেমানন্দ, ভায়ার চীৎকার ও ক্রন্দনে যার পর নাই শোকার্ত্ত হয়ে চীৎকার করে গোল কত্তে আরম্ভ কল্লেন, কিন্তু রেলওয়ে পুলিসের পাহারাওয়ালা ও জমাদারেরা “চপরাও” “চপরাও” করে উঠ‍্লো, সুতরাং পাছে পুনরায় এষ্টসন হতে বার করে দ্যায় এই ভয়ে আর বড় উচ্যবাচ্য না করে মনের খেদ মনেই সম্বরণ কল্লেন। জ্ঞানানন্দ মধ্যে মধ্যে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেল‍্তে লাগ‍্লেন ও ততই নস্য নিয়ে নিয়ে সামূকটা খালি করে তুল্লেন।

এদিকে হস্ হস্ হস্ করে ট্রেন টরমিন‍্সে উপস্থিত হলো, টুনুনাংণ্টাং টুনুনাংণ্টাং করে পুনরায় ঘণ্টা বাজ‍্লো, লোকেরা রল্লা করে গাড়ি চড়তে লাগ‍্লো, থার্ড ক্লাসের মধ্যে গার্ড ও দুজন বরকন্দাজের সহায়তায় লোক পোরা হতে লাগ‍্লো ভেতর থেকে “আর কোথা আস‍্ছো।” “সাহেব আর জায়গা নাই” “আমার বুঁচকী!” “আমার বুঁচকীটা দাও। “ছেলেটি দেখো। আমলো মিন্সে ছেলের ঘাড়ে বসেচিস যে!” চিৎকার হতে লাগ‍্লো, কিন্তু রেলওয়ে কর্ম্মচারীরা বিধিবদ্ধ নিয়মের অনুগত বলেই তাদৃশ চীৎকারে কর্ণপাত করেন না। অ্যাক্ অ্যাকধানি থার্ডক্লাশ কাঁকড়ার গর্ত্তের আকার ধারণ কল্পে, তথাপিও মধ্যে মধ্যে দুই অ্যাক্ জন এষ্টেসেনমাষ্টার ও গার্ড গাড়ীর কাছে এসে উকী মাচ্চেন— যদি নিশ্বাস ফ্যালবার স্থান থাকে, তা হলে আর যাত্রীকে ভরে দেওয়া হয়। যে সকল হতভাগ্য ইংরেজ বাক্হোলের যন্ত্রণা হতে জীবিত বেরিয়েছিলেন, তাঁরা এই কোম্পানির থার্ডক্লাশ দেখ‍্লে অ্যাক‍্দিন এঁদের এজেণ্ট ও লোকোমোটিব সুপরিণ্টেণ্ডেণ্টকে সাহস করে বল‍্তে পাত্তেন যে, তাঁদের থার্ডক্লাস যাত্রীদের ক্লেশ ব্লাক‍্হোলবদ্ধ সাহেবদের যন্ত্রণা হতে বড় অধিক নয়!

এদিকে প্রেমানন্দ ও জ্ঞানানন্দও দল বল নিয়ে এক‍্খানি গাড়িতে উঠ‍্লেন, ধপাধপ্ গাড়ির দরজা বন্ধ হতে লাগ‍্লো, “হরকরা” চাই মশাই। হরকরা “হরকরা” “ডেলিনুসার! ডেলিনুস।” কাগজ হাতে নেড়েরা ঘুচ্চে-লাবেল! ভাল লাবেল। লাল খেরোর দোবুজোন কাঁদে চাচারা বই বেচ্চেন—টুনুনাংণ্টাং টুনুনাংণ্টাং করে পুনরায় ঘণ্টা বাজলো, ইষ্টেসন্‌মাষ্টার খুদে সাদা নিশেন হাতে করে মাথায় কম্‌ফটার জড়িয়ে বেরুলেন, অল্‌রাইট্ বাবু? বলে গার্ড হজুরের নিকটস্থ হলো—অল্‌রাইট্। গুড়‍্মর্নিঙ‍্স্যার্ বলে এষ্টেসনমাষ্টার নিশেনটা তুল্লেন—এঞ্জিনের দিকে গার্ড হাত তুলে যাবার সঙ্কেতকরে পকেট হতে খুদে বাঁসিটি নিয়ে সিসের মত শব্দ কল্লে, ঘটাঘট্ ঘটাস্ ঘড়্ ঘড়্ ঘটাস্ শব্দে গাড়ি নড়ে উঠে হস্ হস্ হস্ করে বেরিয়ে গ্যাল।

এদিকে বাবাজীরা চাটগা ও চন্দন নগরের আমদানী পেরূ ও মোরোগের মত থার্ডক্লাস্ বদ্ধ হয়ে বিজাতীয় যন্ত্রণা ভোগ কত্তে কত্তে চল্লেন—জ্ঞানানন্দ বাবাজীর মুখের কাছে দুজন পেঁড়োর আয়মাদার আকক্ষ লম্বিত শ্বেতশ্মশ্রু সহ বিরাজ করায় রোসুনের খোস‍্বে জয়দেবের বংশধর যার পর নাই বিরক্ত হয়েছিলেন। মধ্যে মধ্যে আসমাদারের চামরের মত দাড়ি বাতাসে উড়ে জ্ঞানানন্দের মুখে পড়‍্চে, জ্ঞানানন্দ ঘৃণায় মুখ ফেরাবেন কি? পেছনদিকে দুজন চিনেম্যান হাত রুমালে খানার ভাত ঝুলিয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেমানন্দ গাড়িতে প্রবেশ করেছেন বটে, কিন্তু অ্যাখনো পদার্পণ কত্তে পারেন নাই। একটা ধোপার মোটের সঙ্গে ও গাড়ির পেনেলের সঙ্গে তাঁরভুঁড়িটী এমনি ঠ্যেসমেরেগ্যেছে যে গাড়িতে প্রবেশ করে পর্য্যন্ত শূন্যেই রয়েচেন। মধ্যে মধ্যে ভুঁড়ি চড়্ চড়্ কল্লে অ্যাক্ অ্যাক্ বার কারূ কাঁধ কারূ মাথার ওপোর হাত দিয়ে অবলম্বন কত্তে চেষ্টা কচ্ছেন, কিন্তু ওৎ সাব্যস্ত হয়ে উঠ‍্চে না, তার পাশে অ্যাক‍্মাগী একটী কচিছ্যেলে নিয়ে দাঁড়িয়েছে, বাবাজী হাত ফ্যালবার পূর্ব্বেই মাগী “বাবাজী কর কি। কর কি। আমার ছেলেটা দেখো” বলে চীৎকার করে উঠছে, অমনি গাড়ির সমুদায় লোক সেই দিকে দৃষ্টিপাত করায় বাবাজী অপ্রস্তুত হয়ে হাত দুটী জড়ো সড়ো করে ধোপার বুচকী ও আপনার ভুঁড়ির উপর লক্ষ্য কচ্ছেন—ঘর্ম্মে সর্ব্বাঙ্গ ভেসে যাচ্ছে। গাড়ির মধ্যে অ্যাক‍্দল গঙ্গাভক্তি তরঙ্গিণী যাত্রার দল ছিল, তার মধ্যে অ্যাক‍্টা ফোচ‍্কে ছোড়া—বাবাজীর ভূঁড়িটা বুঝি ফ্যেঁসে যায় বলে পাপীয়ার ডাক্ ডেকে ওঠায় গাড়ির মধ্যে অ্যাক‍্টা হাসির গররা পড়ে গ্যাল। প্রভো। তোমার ইচ্ছা বলে প্রেমানন্দ দীর্ঘ নিশ্বাস ফেল‍্লেন। এদিকে গাড়ি ক্রমে বেগ সম্বরণ করে থাম্‌লো বাইরে বালি। বালি! বালি! শব্দ হতে লাগ‍্লো।

বালি আক‍্টা বিখ্যাত স্থান! টেকচাঁদের বালির বেণীবাবুও বিখ্যাত লোক—আলালের ঘরের দুলাল মতিলাল বালিহতেই তরিবত পান; বিশেষতঃ বালির ব্রিজটাও বেশ। বালির যাত্রীরা বালিতে নাব‍্লেন। ধোপা ও গঙ্গা ভক্তির দল্‌টা বালিতে নাবায় প্রেমানন্দ হাঁপ ছেড়ে বাঁচ‍্লেন-দলের ছোড়া গুলো নাব্বার সময় প্রেমানন্দের ভুঁড়িতে অ্যাক্‌টা চিঁমটী কোটে গ্যাল। উতর পাড়া বালির লাগোয়া। আজ কাল জয়কৃষ্টের কল্যাণে উতরপাড়া বিলক্ষণ বিখ্যাত। বিশেষতঃ উরর পাড়া মডেল জমিদারের নর্ম্ম্যাল ইস্কুল প্রায় ইস্কুলের কোর্সলেক‍্চরর ডিগ্রী ও ডিপ্লোমা হোল‍্ডর, শুনতে পাই, গুরুজীর দু একটী ছাত্র প্রকৃত বেয়াল্লীশকর্ম্মা হয়ে বেরিয়েচেন।

বাবাজীরা যে সকল এষ্টেসন পারহতে লাগলেন, সেই সকলেই এষ্টেসনমাষ্টার সিগ‍্নেলার বুকিং ক্লার্ক ও অ্যাপ্রিনটিসদের, অ্যাক্ প্রকার চরিত্র, অ্যাক্ প্রকার মহিমা। কেউ মধ্যে মধ্যে অকারণে “পুলিসম্যান পুলিসম্যান করে চিৎকার করে সহসা ভদ্র লোকের অপমান কত্তে উদ্যত হচ্চেন। কেউ দুটী গরিব ব্যাওয়ার জীবন সর্বস্ব স্বরূপ পুটুলিটী নিয়ে টানাটানি কচ্চেন—ওজোন কচ্চেন! কোথাও বাঙ্গাল গোচের যাত্রী ও কোমোরে টাকার গেঁজেওয়ালা যাত্রীর নিজে টিকিট নিয়ে পকেটে ফেলে পুনরায় টিকিটের জন্য পেড়াপিড়ি করা হচ্চে—পাশে “পূলিসম্যান হাজির। কোন এষ্টেসনের এষ্টেসন মাষ্টার কম্‌ফর টার মাথায় জড়িয়ে চিনে কোটের পকেটে হাত পুরে বুক ফুলিয়ে বেড়াচ্চেন—অ্যাপ্রিনটিস ও কুলিদের ওপোর মিছে কাজের ফরমাস করা হচ্চে, হঠাৎ হজুরের কম্যাণ্ডিং আসপেক্‌ট্ট দেখে অ্যাক্‌দিন” ইনি কেহে? বলে অভ্যাগত লোকে পরস্পর হুইস‍্পর কত্তে পারে। বল‍্তেকি, হুজুরতো কম্ লোকনন—দি এষ্টেসন মাষ্টার।

যে সকল মহাত্মারা ছ্যেলে ব্যালা কল‍্কেতার চিনে বাজারে “কমস্যার। গুড্‌ সপ‍্স্যার। টেক্ টেক্ নটেক্ নটেক্ অ্যাকবার তোসি। বলে সমস্ত দিন চিৎকার করে থাকেন, যে মহাত্মারা সেলর ও গোরাদের গাড়ি ভাড়া করে মদের দোকান, এমটি হাউস, সাত পুকুর ও দম্দমায় নিয়ে ব্যাড়ান ও ক্লায়েণ্টের অবস্থা বুঝে বিনানুমতিতে পকেট হাতাড়ান্ আর্ সুলারা কাঁচপোকার রূপান্তরের মত তাঁদের মধ্যে অনেকেই চেহারা বদলে “দি এষ্টেসনমাষ্টার” হয়ে পড়েছেন—যে সকল ভদ্রলোক অ্যাাক‍্বার রেলওয়ে চড়েচেন, যাঁদের সঙ্গে অ্যাক‍্বার মাত্র এই মহাপুরুষরা কন‍্ট্যক‍্টে এসেচেন,তাঁরাই এই ভয়ানক কর্ম্মচারীদের সর্ব্বদাই কম‍্প্লেন করে থাকেন। ভদ্রতা এঁদের নিকট জ্যান “পুলিস্ ম্যানের„ ভয়েই এগুতে ভয় করেন, শিষ্টাচার ও সরলতার এঁরা নামও শোনেন নাই কেবল লাল’ সাদা গ্রীন্ সিগন্যাল এষ্টেসন, টিকিট ও অত্যাচারই এঁদের চিরারাধ্য বস্তু। ও আগেই স্বজাতী অপমান কত্তে বিলক্ষণ অগ্রসর।