← লাইব্রেরি

১৮৮৫

কথামালা (১৮৮৫)

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৮৫

প্রকাশনা-তথ্য

কথামালা

শ্রীঈশ্বরচন্দ্রবিদ্যাসাগর প্রণীত।

চতুশ্চত্বারিংশ সংস্করণ।

কলিকাতা

সংস্কৃত যন্ত্র।

সংবৎ ১৯৪১।

সূচী

পৃষ্ঠা

বিজ্ঞাপন

রাজা বিক্রমাদিত্যের পাঁচ ছয় শত বৎসর পূর্ব্বে, গ্রীসদেশে ঈসপ নামে এক পণ্ডিত ছিলেন। তিনি, কতকগুলি নীতিগর্ভ গল্পের রচনা করিয়া, আপন নাম চিরস্মরণীয় করিয়া গিয়াছেন। ঐ সকল গল্প ইঙ্গরেজি প্রভৃতি নানা য়ুরোপীয় ভাষায় অনুবাদিত হইয়াছে, এবং, য়ুরোপের সর্ব্ব প্রদেশেই, অদ্যাপি, আদর পূর্ব্বক, পঠিত হইয়া থাকে। গল্পগুলি অতি মনোহর; পাঠ করিলে, বিলক্ষণ কৌতুক জন্মে, এবং আনুষঙ্গিক সদুপদেশলাভ হয়। এই নিমিত্ত, শিক্ষাকর্মাধ্যক্ষ শ্রীযুক্ত উইলিয়ম গর্ডন ইয়ঙ্‌ মহোদয়ের অভিপ্রায় অনুসারে, আমি ঐ সকল গল্পের অনুবাদে প্রবৃত্ত হই। কিন্তু, এতদ্দেশীয় পাঠকবর্গের পক্ষে, সকল গল্পগুলি তাদৃশ মনোহর বোধ হইবেক না; এজন্য ৬৮টি মাত্র, আপাততঃ, অনুবাদিত ও প্রচারিত হইল। শ্রীযুক্ত রেবেরেণ্ড টামস জেম্‌স, ঈসপরচিত গল্পের ইঙ্গরেজি ভাষায় অনুবাদ করিয়া, যে পুস্তক প্রচারিত করিয়াছেন, অনুবাদিত গল্পগুলি সেই পুস্তক হইতে পরিগৃহীত হইয়াছে।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা

কলিকাতা। সংস্কৃত কালেজ।

৭ই ফাল্গুন। সংবৎ ১৯১২।

সপ্তত্রিংশ সংস্করণের বিজ্ঞাপন

এই সংস্করণে, অশ্ব ও অশ্বপাল, বৃদ্ধা নারী ও চিকিৎসক, কুক্কুরদষ্ট মনুষ্য, পথিকগণ ও বটবৃক্ষ, কুঠার ও জলদেবতা, দুঃখী বৃদ্ধ ও যম, এই ছয়টি গল্প নূতন অনুবাদিত ও সন্নিবেশিত হইয়াছে। এক্ষণে, সমুদয়ে গল্পের সংখ্যা ৭৪টি হইল। পুস্তকের আদ্যোপান্ত, সবিশেষ যত্ন সহকারে, সংশোধিত হইয়াছে।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা

কলিকাতা।

১লা বৈশাখ। সংবৎ ১৯৩৯।

অশ্ব ও অশ্বারোহী

অশ্ব ও অশ্বারোহী

এক অশ্ব একাকী এক মাঠে চরিয়া বেড়াইত। কিছু দিন পরে, এক হরিণ, সেই মাঠে আসিয়া, চরিতে আরম্ভ করিল, এবং, ইচ্ছামত ঘাস খাইয়া, অবশিষ্ট ঘাস নষ্ট করিয়া ফেলিতে লাগিল। তাহাতে, অশ্বের আহার বিষয়ে, অতিশয় অসুবিধা ঘটিল। অশ্ব হরিণকে জব্দ করিবার চেষ্টা পাইতে লাগিল, কিন্তু কিছুতেই কিছু করিতে পারিল না। অবশেষে, সে এক মনুষ্যকে নিকটে দেখিয়া কহিল, ভাই! এই হরিণ আমার বড় অপকার করিতেছে, ইহাকে সমুচিত শাস্তি দিতে হইবেক। যদি এ বিষয়ে সাহায্য কর, তাহা হইলে,
আমার যথেষ্ট উপকার হয়। তখন মনুষ্য কহিল, ইহার ভাবনা কি। তুমি আমায়, তোমার মুখে লাগাম দিয়া, পিঠে উঠিতে দাও, তাহা হইলেই, আমি অস্ত্র লইয়া তোমার শত্রুর দমন করিতে পারিব। অশ্ব সম্মত হইল। মনুষ্য তৎক্ষণাৎ তাহার পৃষ্ঠে আরোহণ করিল; কিন্তু, হরিণের দমন করিতে না গিয়া, অশ্বকে আপন আলয়ে লইয়া গেল। তদবধি, অশ্বগণ মনুষ্যজাতির বাহন হইল।

অশ্ব ও গর্দ্দভ

অশ্ব ও গর্দ্দভ

এক ব্যক্তির একটি অশ্ব ও একটি গর্দ্দভ ছিল। সে, কোনও স্থানে যাইবার সময়, সমুদয় দ্রব্য সামগ্রী গর্দ্দভের পৃষ্ঠে চাপাইয়া দিত, অশ্ব বহু মূল্যের বস্তু বলিয়া, তাহার উপর কোনও ভার চাপাইত না। এক দিবস, সমুদয় ভার বহিয়া যাইতে যাইতে, গর্দ্দভের পীড়া উপস্থিত হইল।পীড়ার যাতনা ও ভারের আধিক্য বশতঃ, গর্দ্দভ, অতিশয় কাতর হইয়া, অশ্বকে কহিল, দেখ, ভাই! আমি আর এত ভার বহিতে পারিতেছি না; যদি তুমি, দয়া করিয়া, কিয়ৎ অংশ লও, তাহা হইলে, আমার অনেক পরিত্রাণ হয়, নতুবা আমি মারা পড়ি। অশ্ব কহিল, তুমি ভার বহিতে পার না পার, আমার কি; আমায় তুমি বিরক্ত করিও না; আমি, কখনও, তোমার ভারের অংশ লইব না।

গর্দ্দভ আর কিছুই বলিল না; কিন্তু, খানিক দূর গিয়া, যেমন মুখ থুবড়িয়া পড়িল, অমনি তাহার প্রাণত্যাগ হইল। তখন ঐ ব্যক্তি সেই সমুদয় ভার অশ্বের পৃষ্ঠে চাপাইল, এবং, ঐ ভারের সঙ্গে, মরা গর্দ্দভটিও চাপাইয়া দিল। তখন অশ্ব, সমুদয় ভার ও মরা গর্দ্দভ, উভয়ই বহিতে হইল দেখিয়া, আক্ষেপ করিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিল, আমার যেমন দুষ্ট স্বভাব, তাহার উপযুক্ত ফল পাইলাম। তখন যদি এই ভারের অংশ লইতাম, তাহা হইলে, এখন আমায় সমুদায় ভার ও মরা গর্দভ বহিতে হইত না।

অশ্ব ও গর্দ্দভ (২)

অশ্ব ও গর্দ্দভ

এক গর্দ্দভ, ভারী বোঝাই লইয়া, অতি কষ্টে, চলিয়া যাইতেছে। এমন সময়ে, এক যুদ্ধের অশ্ব, অতি বেগে, খট্ খট্ করিয়া, সেই খান দিয়া চলিয়া যায়। অশ্ব, গর্দ্দভের নিকটবর্ত্তী হইয়া, কহিল, অরে গাদা! পথ ছাড়িয়া দে; নতুবা, এক পদাঘাতে, তোর প্রাণসংহার করিব। গর্দ্দভ, ভয় পাইয়া, তাড়াতাড়ি, পথ ছাড়িয়া দিল; এবং, আপনার দুর্ভাগ্য ও অশ্বের সৌভাগ্য ভাবিয়া, মনে মনে অতিশয় দুঃখ করিতে লাগিল।

কিছু দিন পরে, ঐ অশ্ব যুদ্ধে গেল। তথায় এমন বিষম আঘাত লাগিল যে, সে, এক বারে, অকর্ম্মণ্য হইয়া গেল; সুতরাং, আর যুদ্ধে যাইবার উপযুক্ত রহিল না। ইহা দেখিয়া, অশ্বস্বামী উহাকে কৃষিকর্ম্মে নিযুক্ত করিয়া দিল।

এক দিন, বেলা দুই প্রহরের রৌদ্রে, অশ্ব লাঙ্গল বহিতেছে, এমন সময়ে, সেই গর্দ্দভ ঐ স্থানে উপস্থিত হইল, এবং, অশ্বের ক্লেশ দেখিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিল, আমি অতি মূঢ়, এজন্য তখন, ইহার সৌভাগ্য দেখিয়া, দুঃখ ও ঈর্ষ্যা করিয়াছিলাম। এক্ষণে, ইহার দুর্দ্দশা দেখিয়া, চক্ষে জল আইসে। আর, এ ও অতি মূঢ়, সৌভাগ্যের সময়, গর্ব্বিত হইয়া, অকারণে, আমার অপমান করিয়াছিল। তখন জানিত না যে, সৌভাগ্য চিরস্থায়ী নহে। এখন, আমার অপেক্ষাও, ইহার দুরবস্থা অধিক।

ইঁদুরের পরামর্শ

ইঁদুরের পরামর্শ

ইঁদুর সকল, বিড়ালের উপদ্রবে, নিতান্ত বিব্রত হইয়া, সকলে একত্র হইয়া, কিসে পরিত্রাণ হয়,
এই পরামর্শ করিতে বসিল। যাহার মনে যাহা উপস্থিত হইল, সে তাহাই কহিতে লাগিল। কিন্তু, কোনও প্রস্তাবই পরামর্শসিদ্ধ বোধ হইল না। পরিশেষে, এক বুদ্ধিমান ইঁদুর কহিল, বিড়ালের গলায় একটা ঘণ্টা বাঁধিয়া দেওয়া যাউক। ঘণ্টার শব্দ হইলে, আমরা বুঝিতে পারিব, বিড়াল আমাদিগকে খাইতে আসিতেছে। তাহা হইলেই, আমরা সাবধান হইতে পারিব।

এই প্রস্তাব শুনিয়া, সকলে ধন্য ধন্য করিতে লাগিল; এবং, সকলের মতে, উহাই কর্তব্য বলিয়া স্থির হইল। এক বৃদ্ধ ইঁদুর, এ পর্যন্ত চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। সে বলিল, অমুক যাহা কহিলেন, তাহা বিলক্ষণ বুদ্ধির কথা বটে; এবং, সেরূপ করিতে পারিলে, আমাদের ইষ্টসিন্ধিও হইতে পারে। কিন্তু, আমি এই জিজ্ঞাসা করিতেছি, আমাদের মধ্যে কে, সাহস করিয়া, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধিতে যাইবেক। ইহা শুনিয়া, পরস্পর মুখ চাহিয়া, সকলে হতবুদ্ধি ও স্তব্ধ হইয়া রহিল।

কোনও বিষয়ের প্রস্তাব করা সহজ, কিন্তু নির্ব্বাহ করিয়া উঠা কঠিন।

ঈগল ও দাঁড়কাক

ঈগল ও দাঁড়কাক

এক পাহাড়ের নিম্ন দেশে, কতকগুলি মেষ চরিতেছিল। এক ঈগল পক্ষী, পাহাড়ের উপর হইতে নামিয়া, ছোঁ মারিয়া, এক মেষশাবক লইয়া, পুনরায় পাহাড়ের উপর উঠিল। ইহা দেখিয়া, এক দাঁড়কাক ভাবিল, আমিও কেন, ঐ রূপ ছোঁ মারিয়া, একটা মেষ অথবা মেষশাবক লই না। ঈগল যদি পারিল, আমি না পারিব কেন? এই স্থির করিয়া, সে যেমন এক মেষের উপর ছোঁ মারিল, অমনি সেই মেষের লোমে তাহার পায়ের নখর জড়াইয়া গেল।

দাঁড়কাক, এই রূপে বদ্ধ হইয়া, ঝট‍্পট্ ও প্রাণভয়ে কা কা করিতে লাগিল। মেষপালক,
আদি অবধি অন্ত পর্য্যন্ত, এই ব্যাপার দেখিয়া, হাসিতে হাসিতে, তথায় উপস্থিত হইল, এবং সেই নির্বোধ দাঁড়কাককে ধরিয়া, তাহার পাখা কাটিয়া দিল। পরে সে, সায়ংকালে, ঐ দাঁড়কাক গৃহে লইয়া গেল। মেষপালকের শিশু সন্তানেরা দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, বাবা! তুমি আমাদের জন্যে ও কি পাখী আনিয়াছ? মেষপালক কহিল, যদি তোমরা উহাকে জিজ্ঞাসা কর, ও বলিবেক, আমি ঈগল পক্ষী; কিন্তু, আমি উহাকে দাঁড়কাক বলিয়া আনিয়াছি।

উদর ও অন্য অন্য অবয়ব

উদর ও অন্য অন্য অবয়ব

কোনও সময়ে, হস্ত, পদ প্রভৃতি অবয়ব সকল মিলিয়া পরামর্শ করিতে লাগিল, দেখ, ভাই সকল! আমরা নিয়ত পরিশ্রম করি; কিন্তু, উদর কখনও পরিশ্রম করে না। সে, সর্ব্ব ক্ষণ, নিশ্চিন্ত রহিয়াছে; আমরা, প্রাণপণে পরিশ্রম করিয়া, তাহার পরিচর্য্যা করিতেছি। যে, নিয়ত, আলস্যে কালহরণ করিবেক, আমরা কেন তাহার পরিচর্য্যা করিব। অতএব, আইস, সকলে প্রতিজ্ঞা করি, আজ অবধি, আমরা আর উদরের সাহায্য করিব না।

এই চক্রান্ত করিয়া, তাহারা পরিশ্রম ছাড়িয়া দিল। পা আর আহারস্থানে যায় না; হাত আর মুখে আহার তুলিয়া দেয় না; মুখ আর আহারের গ্রহণ করে না; দন্ত আর ভক্ষ্য বস্তুর
চর্ব্বণ করে না। উদরকে জব্দ করিবার চেষ্টায়, দুই চারি দিন এইরূপ করিলে, শরীর শুষ্ক হইয়া আসিল; অবয়ব সকল এত নিস্তেজ হইয়া পড়িল, যে আর নড়িবার শক্তি রহিল না। তখন তাহারা বুঝিতে পারিল, যদিও উদর পরিশ্রম করে না বটে, কিন্তু উদর প্রধান অবয়ব; উদরের পরিচর্য্যার জন্যে, পরিশ্রম না করিলে, সকলকেই দুর্ব্বল ও নিস্তেজ হইতে হইবেক। আমরা, পরিশ্রম করিয়া, কেবল উদরের সাহায্য করি, এমন নহে। উদরের পক্ষে, যেমন অন্য অন্য অবয়বের সহায়তা আবশ্যক, অন্য অন্য অবয়বের পক্ষেও, সেইরূপ উদরের সহায়তা আবশ্যক। যদি সুস্থ থাকা আবশ্যক হয়, সকল অবয়বকেই স্ব স্ব নিয়মিত কর্ম্ম করিতে হইবেক, নতুবা কাহারও ভদ্রস্থতা নাই।

একচক্ষু হরিণ

একচক্ষু হরিণ

এক একচক্ষু হরিণ, সতত, নদীর তীরে চরিয়া বেড়াইত। নদীর দিকে ব্যাধ আসিবার আশঙ্কা নাই, এই স্থির করিয়া, নিশ্চিন্ত হইয়া, স্থলের দিকে ব্যাধ আসিবার ভয়ে, সতত সেই দিকে দৃষ্টি রাখিত। দৈবযোগে, এক দিবস, কোনও ব্যাধ নৌকায় চড়িয়া যাইতেছিল। সে, দূর হইতে, ঐ হরিণকে চরিতে দেখিয়া, উহাকে লক্ষ্য করিয়া, শরনিক্ষেপ করিল। হরিণ, মনে মনে এই ভাবিয়া, প্রাণত্যাগ করিল, আমি, যে দিকে বিপদের আশঙ্কা করিয়া, সর্ব্বদা সতর্ক থাকিতাম, সে দিকে বিপদের কোনও কারণ
উপস্থিত হইল না; কিন্তু, যে দিকে বিপদের আশঙ্কা নাই ভাবিয়া, নির্ভাবনায় ছিলাম, সেই দিক হইতেই, শত্রু আসিয়া আমার প্রাণসংহার করিল।

কচ্ছপ ও ঈগল পক্ষী

কচ্ছপ ও ঈগল পক্ষী

পক্ষীরা অনায়াসে আকাশে উড়িয়া বেড়ায়, কিন্তু আমি পারি না; ইহা ভাবিয়া, এক কচ্ছপ অতিশয় দুঃখিত হইল, এবং, মনে মনে অনেক
আন্দোলন করিয়া, স্থির করিল, যদি কেহ আমায়, এক বার, আকাশে উঠাইয়া দেয়, তাহা হইলে, আমিও, পক্ষীদের মত, সচ্ছন্দে উড়িয়া বেড়াইতে পারি। অনন্তর, সে এক ঈগল পক্ষীর নিকটে গিয়া কহিল, ভাই! যদি তুমি, দয়া করিয়া, আমায় একটি বার আকাশে উঠাইয়া দাও, তাহা হইলে, সমুদ্রের গর্ভে বহু রত্ন আছে, সমুদয় উদ্ধৃত করিয়া তোমায় দি। আকাশে উড়িয়া বেড়াইতে, আমার বড় ইচ্ছ; হইয়াছে।

ঈগল, কচ্ছপের অভিলাষ ও প্রার্থনা শুনিয়া, কহিল, শুন কচ্ছপ! তুমি যে মানস করিয়াছ, তাহা সিদ্ধ হওয়া অসম্ভব। ভূচর জন্তু, কখনও, খেচরের ন্যায়, আকাশে উড়িতে পারে না। তুমি এ অভিপ্রায় ছাড়িয়া দাও। আমি যদি তোমায় আকাশে উঠাইয়া দি, তুমি তৎক্ষণাৎ পড়িয়া যাইবে, এবং, হয় ত, ঐ পড়াতেই, তোমার প্রাণত্যাগ ঘটিবেক। কচ্ছপ ক্ষান্ত হইল না, কহিল, তুমি আমায় উঠাইয়া দাও। আমি উড়িতে পারি, উড়িব; না উড়িতে পারি, পড়িয়া মরিব; তোমায় সে ভাবনা করিতে হইবেক না। এই বলিরা, কচ্ছপ অতিশয় পড়াপীড়ি করিতে লাগিল। তখন ঈগল, ঈষৎ হাস্য করিয়া, কচ্ছপকে লইয়া অনেক উর্ধে উঠিল, এবং, তবে তুমি উড়িতে আরম্ভ কর, এই বলিয়া, উহাকে ছাড়িয়া দিল। ছাড়িয়া দিবা মাত্র, কচ্ছপ এক পাহাড়ের উপর পড়িল, এবং, যেমন পড়িল, তাহার সর্ব্ব শরীর চূর্ণ হইয়া গেল।

অহঙ্কার করিলেই পড়িতে হয়।

নাহঙ্কারাৎ পরো রিপুঃ।

কাক ও জলের কলসী

কাক ও জলের কলসী

এক তৃষ্ণার্ত কাক, দুর হইতে, জলের কলসী দেখিতে পাইয়া, আহলাদিত হইয়া, ঐ কলসীর নিকটে উপস্থিত হইল, এবং, জলপান করিবার নিমিত্ত, নিতান্ত ব্যগ্র হইয়া, কলসীর ভিতর ঠোঁট প্রবেশ করাইয়া দিল; কিন্তু, কলসীতে জল অনেক নীচে ছিল, এজন্য, কোনও মতে, পান করিতে পারিল না। তখন সে, প্রথমে, কলসী ভাঙ্গিয়া ফেলিবার চেষ্টা পাইল; পরে কলসী উলটাইয়া দিয়া, জলপান করিবার চেষ্টা করিল; কিন্তু, বলের অল্পতা প্রযুক্ত, তাহার কোনও চেষ্টাই সফল হইল না। অবশেষে কতকগুলি লুড়ি সেই খানে পড়িয়া আছে দেখিয়া, এক একটি করিয়া, সমুদয় লুড়ি গুলি কলসীর
ভিতরে ফেলিল। তলায় লুড়ি পড়াতে, জল কলসীর মুখের গোড়ায় উঠিল; তখন কাক, ইচ্ছামত জলপান করিয়া, তৃষ্ণা নিবারণ করিল।

বলে যাহা সম্পন্ন না হয়, কৌশলে তাহা সম্পন্ন হইতে পারে।

কাজ আটকাইলে বুদ্ধি যোগায়।

কাক ও শৃগাল

কাক ও শৃগাল

এক কাক, কোনও স্থান হইতে, এক খণ্ড মাংস আনিয়া, বৃক্ষের শাখায় বসিল। সে ঐ মাংস খাইবার উপক্রম করিতেছে, এমন সময়, এক শৃগাল, সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া, কাকের মুখে মাংসখণ্ড দেখিয়া, মনে মনে স্থির করিল, কোনও উপায়ে, কাকের মুখ হইতে, ঐ মাংস লইয়া, আহার করিতে হইবেক। অনন্তর, সে কাককে সম্বোধন করিয়া কহিল, ভাই কাক!
আমি তোমার মত সর্ব্বাঙ্গসুন্দর পক্ষী কখনও দেখি নাই। কেমন পাখা! কেমন চক্ষু! কেমন গ্রীবা! কেমন বক্ষঃস্থল! কেমন নখর! দেখ, ভাই! তোমার সকলই সুন্দর; দুঃখের বিষয় এই, তুমি বোবা।

কাক, শৃগালের মুখে এইরূপ প্রশংসা শুনিয়া, অতিশয় আহ্লাদিত হইল, এবং মনে করিল, শৃগাল ভাবিয়াছে, আমি বোবা। এই সময়ে, যদি আমি শব্দ করি, তাহা হইলে, শৃগাল, এক বারে মোহিত হইবেক। এই বলিয়া, মুখবিস্তার করিয়া, কাক যেমন শব্দ করিতে গেল; অমনি তাহার মুখস্থিত মাংসখণ্ড ভূমিতে পতিত হইল। শৃগাল, যার পর নাই আহ্লাদিত হইয়া, ঐ মাংসখণ্ড উঠাইয়া লইল, এবং, মনের সুখে, খাইতে খাইতে, তথা হইতে চলিয়া গেল। কাক, হতবুদ্ধি হইয়া, বসিয়া রহিল।

আপন ইষ্ট সিদ্ধ করা অভিপ্রেত না হইলে, কেহ খোসামোদ করে না। আর, যাহারা খোসামোদের বশীভূত হয়, তাহাদিগকে তাহার ফলভোগ করিতে হয়।

কুকুর ও অশ্বগণ

কুকুর ও অশ্বগণ

এক কুকুর অশ্বগণের আহারস্থানে শয়ন করিয়া থাকিত। অশ্বগণ আহার করিতে গেলে, সে ভয়ানক চীৎকার করিত, এবং, দংশন করিতে উদ্যত হইয়া, তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিত। এক দিন, এক অশ্ব কহিল, দেখ, এই হতভাগা কুকুর কেমন দুর্বৃত্ত! আহারের দ্রব্যের উপর শয়ন
করিয়া থাকিবেক; আপনিও আহার করিবেক না, এবং, যাহারা ঐ আহার করিয়া প্রাণধারণ করিবেক, তাহাদিগকেও আহার করিতে দিবেক না।

কুকুর ও প্রতিবিম্ব

কুকুর ও প্রতিবিম্ব

এক কুকুর, মাংসের এক খণ্ড মুখে করিয়া, নদী পার হইতেছিল। নদীর নির্ম্মল জলে, তাহার যে প্রতিবিম্ব পড়িয়াছিল, সেই প্রতিবিম্বকে অন্য কুকুর স্থির করিয়া, সে মনে মনে বিবেচনা করিল, এই কুকুরের মুখে যে মাংসখণ্ড আছে, কাড়িয়া লই; তাহা হইলে, আমার দুই খণ্ড মাংস হইবেক।

এইরূপ লোতে পড়িয়া, মুখ বিস্তৃত করিয়া, কুকুর যেমন অলীক মাংসখণ্ড ধরিতে গেল, অমনি, উহার মুখস্থিত মাংসখণ্ড, জলে পড়িয়া, স্রোতে ভাসিয়া গেল। তখন সে, হতবুদ্ধি হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ, স্তব্ধ হইয়া রহিল; অনন্তর, এই বলিতে বলিতে, নদী পার হইয়া চলিয়া গেল, যাহারা, লোভের বশীভূত হইয়া, কল্পিত লাভের প্রত্যাশায়, ধাবমান হয়, তাহাদের এই দশাই ঘটে।

কুকুর, কুক্কুট ও শৃগাল

কুকুর, কুক্কুট, ও শৃগাল

এক কুকুর ও এক কুক্কুট, উভয়ের অতিশয় প্রণয় ছিল। এক দিন, উভয়ে মিলিয়া বেড়াইতে গেল। এক অরণ্যের মধ্যে রাত্রি উপস্থিত হইল। রাত্রিযাপন করিবার নিমিত্ত, কুক্কুট এক বৃক্ষের শাখায় আরোহণ করিল, কুকুর সেই বৃক্ষের তলে শয়ন করিয়া রহিল।

রাত্রি প্রভাত হইল। কুক্কুটদের স্বভাব এই প্রভাত কালে উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া থাকে। কুক্কুট শব্দ করিবা মাত্র, এক শৃগাল, শুনিতে পাইয়া, মনে মনে স্থির করিল, কোনও সুযোগে, আজ, এই কুক্কুটের প্রাণ নষ্ট করিয়া, মাংসভক্ষণ
করিব। এই স্থির করিয়া, সেই বৃক্ষের নিকটে গিয়া, ধূর্ত্ত শৃগাল কুক্কুটকে সম্বোধিয়া কহিল, ভাই! তুমি কি সৎ পক্ষী; সকলের কেমন উপকারক। আমি, তোমার স্বর শুনিতে পাইয়া, প্রফুল্ল হইয়া আসিয়াছি। এক্ষণে, বৃক্ষের শাখা হইতে নামিয়া আইস; দুজনে মিলিয়া, খানিক, আমোদ আহলাদ করি।

কুক্কুট, শৃগালের ধূর্ত্ততা বুঝিতে পারিয়া, তাহাকে ঐ ধূর্ত্ততার প্রতিফল দিবার নিমিত্ত, কহিল, ভাই শৃগাল! তুমি, বৃক্ষের তলে আসিয়া, খানিক অপেক্ষা কর, আমি নামিয়া যাইতেছি। শৃগাল শুনিয়া, হৃষ্ট চিত্তে, যেমন বৃক্ষের তলে আসিল, অমনি কুকুর তাহাকে আক্রমণ করিল, এবং, দন্তাঘাতে ও নখরপ্রহারে, তাহার সর্ব্ব শরীর বিদীর্ণ করিয়া, প্রাণসংহার করিল।

পরের মন্দচেষ্টায় ফাঁদ পাতিলে, আপনাকেই সেই ফাঁদে পড়িতে হয়।

কুক্কুরদষ্ট মনুষ্য

কুক্কুরদষ্ট মনুষ্য

এক ব্যক্তিকে কুকুরে কামড়াইয়াছিল। সে, অতিশয় ভয় পাইয়া, যাহাকে সম্মুখে দেখে, তাহাকেই বলে, ভাই! আমায় কুকুরে কামড়াইয়াছে; যদি কিছু ঔষধ জান, আমায় দাও। তাহার এই কথা শুনিয়া, কোনও ব্যক্তি কহিল, যদি ভাল হইতে চাও, আমি যা বলি, তা কর। সে কহিল, যদি ভাল হইতে পারি, তুমি যাহা বলিবে, তাহাই করিতে প্রস্তুত আছি। তখন ঐ ব্যক্তি বলিল, কুকুরের কামড়ে যে ক্ষত হইয়াছে, ঐ ক্ষতের রক্তে রুটির টুকরা ডুবাইয়া, যে
কুকুর কামড়াইয়াছে, তাহাকে খাইতে দাও; তাহা হইলেই, তুমি নিঃসন্দেহ ভাল হইবে। কুক্কুরদষ্ট ব্যক্তি, শুনিয়া, ঈষৎ হাসিয়া, কহিল, ভাই! যদি তোমার এই পরামর্শ অনুসারে চলি, তাহা হইলে, এই নগরে যত কুকুর আছে, তাহারা সকলেই, রক্তমাখা রুটির লোভে, আমায় কামড়াইতে আরম্ভ করিবেক।

কুঠার ও জলদেবতা

কুঠার ও জলদেবতা

এক দুঃখী, নদীর তীরে, গাছ কাটিতেছিল। হঠাৎ, কুঠার খানি, তাহার হাত হইতে ফস্কিয়া গিয়া, নদীর জলে পড়িয়া গেল। কুঠার খানি জন্মের মত হারাইলাম, এই ভাবিয়া, সেই দুঃখী অতিশয় দুঃখিত হইল, এবং, হায় কি হইল বলিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে, রোদন করিতে লাগিল। তাহার রোদন শুনিয়া, সেই নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবতার অতিশয় দয়া হইল। তিনি তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন, এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি, কি জন্যে, এত রোদন করিতেছ? সে সমুদয় নিবেদন করিলে, জলদেবতা তৎক্ষণাৎ
নদীতে মগ্ন হইলেন, এবং, এক স্বর্ণময় কুঠার হস্তে করিয়া, তাহার নিকটে আসিয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, এই কি তোমার কুঠার? সে কহিল, না মহাশয়! এ আমার কুঠার নয়। তখন তিনি, পুনরায়, জলে মগ্ন হইলেন, এবং, এক রজতময় কুঠার হস্তে লইয়া, তাহার সম্মুখে আসিয়া, জিজ্ঞাসা করিলেন, এই কি তোমার কুঠার? সে কহিল, না মহাশয়! ইহাও আমার কুঠার নয়। তিনি, পুনরায়, জলে মগ্ন হইলেন, এবং, তাহার লৌহময় কুঠারখানি হস্তে লইয়া, তাহাকে জিজ্ঞাসিলেন, এই কি তোমার কুঠার? সে, আপন কুঠার দেখিয়া, যার পর নাই আহ্লাদিত হইয়া কহিল, হাঁ মহাশয়! এই আমার কুঠার। আমি অতি দুঃখী; আর আমি কুঠার পাইব, আমার সে আশা ছিল না; কেবল আপনকার অনুগ্রহে পাইলাম; আপনি আমায়, জন্মের মত, কিনিয়া রাখিলেন।

জলদেবতা, প্রথমতঃ, তাহার নিজের কুঠার খানি তাহার হস্তে দিলেন; পরে, তুমি নির্লোভ, সত্যনিষ্ঠ, ও ধর্ম্মপরায়ণ; এজন্য, তোমার উপর অতিশয় সন্তুষ্ট হইয়াছি; এই বলিয়া, তাহার গুণের পুরস্কার স্বরূপ, সেই স্বর্ণময় ও রজতময় কুঠার দুই খানি তাহাকে দিয়া, অন্তর্হিত হইলেন। সেই দুঃখী ব্যক্তি, অবাক হইয়া, কিয়ৎ ক্ষণ, সেই স্থানে দাঁড়াইয়া রহিল; অনন্তর, গৃহে গিয়া, প্রতিবেশীদের নিকট, এই বৃত্তান্তের সবিশেষ বর্ণন করিল। সকলে বিস্ময়াপন্ন হইলেন।

এই অদ্ভুত বৃত্তান্ত শুনিয়া, এক ব্যক্তির অতিশয় লোভ জন্মিল। সে পর দিন, প্রাতঃকালে, কুঠার হস্তে লইয়া, নদীর তীরে উপস্থিত হইল, এবং, গাছের গোড়ায় দুই তিন কোপ মারিয়া, যেন হঠাৎ হাত হইতে ফস্কিয়া গেল, এইরূপ ভান করিয়া, কুঠার খানি জলে ফেলিয়া দিল, এবং, হায় কি হইল বলিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে রোদন করিতে লাগিল। জলদেবতা, তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া, রোদনের কারণ জিজ্ঞাসিলেন। সে, সমস্ত কহিয়া, অতিশয় শোক ও দুঃখপ্রকাশ করিতে লাগিল।

জলদেবতা, পূর্ব্ববৎ, জলে মগ্ন হইয়া, এক স্বর্ণময় কুঠার হস্তে লইয়া, তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন, এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন, এই কি তোমার কুঠার? স্বর্ণময় কুঠার দেখিয়া, সেই লোভী, এই আমার কুঠার বলিয়া, ব্যগ্র হইয়া, কুঠার ধরিতে গেল। তাহাকে, এইরূপ লোভী ও মিথ্যাবাদী দেখিয়া, জলদেবতা অতিশয় অসন্তুষ্ট হইলেন, এবং কহিলেন, তুই অতি লোভী, অতি অভদ্র, ও মিথ্যাবাদী; তুই এ কুঠার পাইবার যোগ্য পাত্র নহিস। এই ভর্ৎসনা করিয়া, সেই স্বর্ণময় কুঠার খানি জলে ফেলিয়া দিয়া, জলদেবতা অন্তর্হিত হইলেন। সে, হতবুদ্ধি হইয়া, নদীর তীরে বসিয়া, গালে হাত দিয়া, ভাবিতে লাগিল; অনন্তর, আমার যেমন কর্ম্ম, তাহার উপযুক্ত ফল পাইলাম, এই বলিয়া, বিষণ্ণ মনে চলিয়া গেল।

কৃপণ

কৃপণ

এক কৃপণের কিছু সম্পত্তি ছিল। সর্ব্বদা তাহার এই ভয় ও ভাবনা হইত, পাছে চোরে ও দস্যুতে অপহরণ করে। এজন্য, সে বিবেচনা করিল, যাহাতে কেহ সন্ধান না পায়, ও চুরি করিতে না পারে, এরূপ কোনও ব্যবস্থা করা আবশ্যক। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া, অবশেষে, সে সর্ব্বস্ব
বেচিয়া ফেলিল, এবং, এক তাল সোনা কিনিয়া, কোনও নিভৃত স্থানে, মাটিতে পুতিয়া রাখিল। কিন্তু, এরূপ করিয়াও, সে নিশ্চিন্ত হইতে পারিল না; প্রতিদিন, অবাধে, এক এক বার, সেই স্থানে গিয়া, দেখিয়া আসিত, কেহ, সন্ধান পাইয়া, লইয়া গিয়াছে কি না।

কৃপণ প্রত্যহ এইরূপ করাতে, তাহার ভৃত্যের মনে এই সন্দেহ জন্মিল, হয় ত, ঐ স্থানে প্রভুর গুপ্ত ধন আছে; নতুবা, উনি, প্রতিদিন, এক এক বার, ওখানে যান কেন? পরে, এক দিন, সুযোগ পাইয়া, সেই স্থান খুড়িয়া, সে সোনার তাল লইয়া পলায়ন করিল। পর দিন, যথাকালে, কৃপণ ঐ স্থানে গিয়া দেখিল, কেহ, গর্ত্ত খুড়িয়া, সোনার তাল লইয়া গিয়াছে। তখন সে মাথা কুড়িয়া, চুল ছিঁড়িয়া, হাহাকার করিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে, রোদন করিতে লাগিল।

এক প্রতিবেশী, তাহাকে শোকে অভিভুত ও নিতান্ত কাতর দেখিয়া, কারণ জিজ্ঞাসিল, এবং, সবিশেষ সমস্ত অবগত হইয়া, কহিল, ভাই! তুমি, অকারণে, রোদন করিতেছ কেন? এক খণ্ড প্রস্তর ঐ স্থানে রাখিয়া দাও; মনে কর, তোমার সোনার তাল পূর্ব্বের মত পোতা আছে। কারণ, যখন স্থির করিয়াছিলে, ভোগ করিবে না, তখন এক তাল সোনা পোতা থাকিলেও যে ফল, আর এক খান পাথর পোতা থাকিলেও সেই ফল। অর্থের ভোগ না করিলে, অর্থ থাকা না থাকা দুই সমান।

কৃষক ও কৃষকের পুত্রগণ

কৃষক ও কৃষকের পুত্রগণ

এক কৃষক কৃষিকর্ম্মের কৌশল সকল বিলক্ষণ অবগত ছিল। সে, মৃত্যুর পূর্ব্ব ক্ষণে, ঐ সকল কৌশল শিখাইবার নিমিত্ত, পুত্রদিগকে কহিল,
হে পুত্রগণ! আমি এক্ষণে ইহলোক হইতে প্রস্থান করিতেছি। আমার যে কিছু সংস্থান আছে, অমুক অমুক ভূমিতে অনুসন্ধান করিলে, পাইবে। পুত্রেরা মনে করিল, ঐ সকল ভূমির অভ্যন্তরে, পিতার গুপ্ত ধন স্থাপিত আছে।

কৃষকের মৃত্যুর পর, তাহারা, গুপ্ত ধনের লোভে, সেই সকল ভূমির অতিশয় খনন করিল। এই রূপে, যার পর নাই পরিশ্রম করিয়া, তাহারা গুপ্ত ধন কিছু পাইল না বটে; কিন্তু, ঐ সকল ভূমির অতিশয় খনন করাতে, সে বৎসর এত শস্য জন্মিল যে, গুপ্ত ধন না পাইয়াও, তাহারা পরিশ্রমের সম্পূর্ণ ফল প্রাপ্ত হইল।

খরগস ও কচ্ছপ

খরগস ও কচ্ছপ

কচ্ছপ স্বভাবতঃ অতি আস্তে চলে; এজন্য, এক খরগস কোনও কচ্ছপকে উপহাস করিতে লাগিল। কচ্ছপ, খরগসের উপহাসবাক্য শুনিয়া, ঈষৎ হাসিয়া কহিল, ভাল, ভাই! কথায় কাজ নাই, দিন স্থির কর; ঐ দিনে, দুজনে এক সঙ্গে
চলিতে আরম্ভ করিব; দেখা যাবে, কে আগে নিরূপিত স্থানে পঁহুছিতে পারে। খরগস কহিল, অন্য দিনের আবশ্যক কি; আইস, আজই দেখা যাউক; এখনই বুঝা যাইবেক, কে কত চলিতে পারে।

এই প্রতিজ্ঞা করিয়া, উভয়ে, এক কালে, এক স্থান হইতে, চলিতে আরম্ভ করিল। কচ্ছপ আস্তে আস্তে চলিত বটে; কিন্তু, চলিতে আরম্ভ করিয়া, এক বারও না থামিয়া, অবাধে চলিতে লাগিল। খরগস অতি দ্রুত চলিতে পারিত; এজন্য, মনে করিল, কচ্ছপ যত চলুক না কেন, আমি আগে পঁহুছিতে পারিব। এই স্থির করিয়া, খানিক দূর গিয়া, শ্রমবোধ হওয়াতে, সে নিদ্রা গেল; নিদ্রাভঙ্গের পর, নির্দিষ্ট স্থানে গিয়া দেখিল, কচ্ছপ তাহার অনেক পূর্ব্বে পঁহুছিয়াছে।

খরগস ও শিকারি কুকুর

খরগস ও শিকারি কুকুর

কোনও জঙ্গলে, এক শিকারি কুকুর, একটি খরগসকে ধরিবার নিমিত্ত, তাহার পশ্চাৎ ধাবমান হইল। খরগস, প্রাণের ভয়ে, এত দ্রুত দৌড়িতে লাগিল, যে, কুকুর, অতি বেগে দৌড়িয়াও, তাহাকে ধরিতে পারিল না; খরগস, এক বারে, দৃষ্টির বাহির হইয়া গেল। এক রাখাল এই তামাসা দেখিতেছিল; সে উপহাস করিয়া কহিল, কি আশ্চর্য্য! খরগস, অতি ক্ষীণ জন্তু হইয়াও, কুকুরকে বেগে পরাভব করিল। ইহা শুনিয়া, কুকুর কহিল, ভাই হে! প্রাণের ভয়ে দৌড়ন, আর আহারের চেষ্টায় দৌড়ন, এ উভয়ের কত অন্তর, তা তুমি জান না।

গর্দ্দভ, কুক্কুট, ও সিংহ

গর্দ্দভ, কুক্কুট, ও সিংহ

এক গর্দ্দভ ও এক কুক্কুট, উভয়ে এক স্থানে বাস করিত। এক দিন, ঐ স্থানের নিকট দিয়া, এক সিংহ যাইতেছিল। সিংহ, গর্দ্দভকে পুষ্টকায় দেখিয়া, তাহার প্রাণসংহার করিয়া, মাংসভক্ষণের মানস করিল। গর্দ্দভ, সিংহের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া, অতিশয় ভীত হইল।

এরূপ প্রবাদ আছে, সিংহ, কুক্কুটের শব্দ শুনিলে, অতিশয় বিরক্ত হয়, এবং, তৎক্ষণাৎ, সে স্থান হইতে চলিয়া যায়। দৈবযোগে, ঐ সময়ে, কুক্কুট শব্দ করাতে, সিংহ, তৎক্ষণাৎ, তথা হইতে চলিয়া গেল। কি কারণে, সিংহ সহসা সেখান হইতে চলিয়া যাইতেছে; তাহা বুঝিতে না পারিয়া, গর্দ্দভ ভাবিল, সিংহ, আমার ভয়ে, পলায়ন করিতেছে। এই স্থির করিয়া, গর্দ্দভ, আক্রমণ করিবার নিমিত্ত, সিংহের পশ্চাৎ ধাবমান হইল। সিংহ ফিরিয়া, এক চপেটাঘাতে, গর্দ্দভের প্রাণসংহার করিল।

নির্বোধেরা, আপনাকে বড় জ্ঞান করিয়া, মারা পড়ে।

ঘোটকের ছায়া

ঘোটকের ছায়া

এক ব্যক্তির একটি ঘোড়া ছিল। সে, ঐ ঘোড়া ভাড়া দিয়া, জীবিকানির্ব্বাহ করিত।
গ্রীষ্ম কালে, এক দিন, কোনও ব্যক্তি, চলিয়া যাইতে যাইতে, অতিশয় ক্লান্ত হইয়া, ঐ ঘোড়া ভাড়া করিল। মধ্যাহ্ন কাল উপস্থিত হইলে, সে ব্যক্তি ঘোড়া হইতে নামিয়া, খানিক বিশ্রাম করিবার নিমিত্ত, ঘোড়ার ছায়ায় বসিল। তাহাকে ঘোড়ার ছায়ায় বসিতে দেখিয়া, যাহার ঘোড়া, সে কহিল, ভাল, তুমি ঘোড়ার ছায়ায় বসিবে কেন? ঘোড়া তোমার নয়; এ আমার ঘোড়া, আমি উহার ছায়ায় বসিব, তোমায় কখনও বসিতে দিব না। তখন সে ব্যক্তি কহিল, আমি, সমস্ত দিনের জন্যে, ঘোড়া ভাড়া করিয়াছি; কেন তুমি আমায় উহার ছায়ায় বসিতে দিবে না? অপর ব্যক্তি কহিল, তোমাকে ঘোড়াই ভাড়া দিয়াছি, ঘোড়ার ছায়া ত ভাড়া দি নাই। এই রূপে, ক্রমে ক্রমে, বিবাদ উপস্থিত হওয়াতে, উভয়ে, ঘোড়া ছাড়িয়া দিয়া, মারামারি করিতে লাগিল। এই সুযোগে, ঘোড়া বেগে দৌড়িয়া পলায়ন করিল, আর উহার সন্ধান পাওয়া গেল না।

চোর ও কুকুর

চোর ও কুকুর

এক চোর, কোনও গৃহস্থের বাটীতে, চুরি করিতে গিয়াছিল। এক কুকুর, সমস্ত রাত্রি, ঐ গৃহস্থের বাটীর রক্ষণাবেক্ষণ করিত। চোর, ঐ কুকুরকে দেখিয়া, মনে ভাবিল, ইহার মুখ বন্ধ না করিলে, চীৎকার করিয়া, গৃহস্থকে জাগাইয়া দিবেক; তাহা হইলে, আর আমার অভীষ্ট সিদ্ধ হইবেক না। অতএব, অগ্রে ইহার মুখ বন্ধ করা আবশ্যক।

এই বিবেচনা করিয়া, চোর কুকুরের সম্মুখে মাংসের টুকরা ফেলিয়া দিতে লাগিল। তখন কুকুর কহিল, প্রথমেই, তোমায় দেখিয়া, আমার মনে নানা সন্দেহ জন্মিয়াছিল; এক্ষণে, তোমার কার্য্য দেখিয়া, আমার নিশ্চিত বোধ হইল, তুমি কদাচ ভদ্র লোক নহ। তোমার অভিসন্ধি এই, আমার মুখ বন্ধ করিয়া, গৃহস্থের সর্বনাশ করিবে। অতএব, যদি ভাল চাও, এখনই এখান হইতে চলিয়া যাও।

যাহারা উৎকোচ দিতে উদ্যত হয়, তাহারা কদাচ ভদ্র নয়; তাহাদের মনে অবশ্যই মন্দ অভিপ্রায় থাকে।

জ্যোতির্বেত্তা

জ্যোতিৰ্বেত্তা

এক জ্যোতিৰ্বেত্তা, প্রতিদিন, রাত্রিতে নক্ষত্রদর্শন করিতেন। এক দিন তিনি, আকাশে দৃষ্টিপাত করিয়া, নিবিষ্ট মনে নক্ষত্র দেখিতে দেখিতে, পথে চলিয়া যাইতেছিলেন; সম্মুখে এক কুপ ছিল, দেখিতে না পাইয়া, তাহাতে পড়িয়া গেলেন। তিনি, কূপে পতিত হইয়া, নিতান্ত কাতর স্বরে, এই বলিয়া লোকদিগকে ডাকিতে লাগিলেন, ভাই রে! কে কোথায় আছ, সত্বর আসিয়া, কুপ হইতে উঠাইয়া, আমার প্রাণরক্ষা
কর। এক ব্যক্তি, নিকট দিয়া, চলিয়া যাইতে ছিলেন; তিনি, তাঁহার কাতরোক্তি শুনিয়া, কুপের নিকট উপস্থিত হইলেন, এবং, পড়িয়া যাইবার কারণ জিজ্ঞাসিয়া, সমস্ত অবগত হইয়া, কহিলেন, কি আশ্চর্য্য! তুমি যে পথে চলিয়া যাও, সেই পথের কোথায় কি আছে, তাহা জানিতে পার না; কিন্তু, আকাশের কোথায় কি আছে, তাহা জানিবার জন্যে ব্যস্ত হইয়াছিলে।

টাক ও পরচুলা

টাক ও পরচুলা

এক ব্যক্তির মস্তকের সমুদয় চুল উঠিয়া গিয়াছিল। সকলকার কাছে, সেরূপ মাথা দেখাইতে, বড় লজ্জা হইত; এজন্য, সে সর্ব্বদা পরচুলা পরিয়া থাকিত। এক দিন সে, তিন চারি জন বন্ধুর সহিত, ঘোড়ায় চড়িয়া, বেড়াইতে গিয়াছিল। ঘোড়া বেগে দৌড়িতে আরম্ভ করিলে, ঐ ব্যক্তির পরচুলা, বাতাসে উড়িয়া, ভূমিতে পড়িয়া গেল। সুতরাং, তাহার টাক বাহির হইয়া পড়িল। তাহার সহচরেরা, এই ব্যাপার দেখিয়া, হাস্যসংবরণ করিতে পারিল না। সে ব্যক্তিও, তাহাদের সঙ্গে, হাস্য করিতে লাগিল, এবং কহিল, যখন আমার আপনার চুল মাথায় রহিল না, তখন পরের চুল আটকাইয়া রাখিতে পারিব, এরূপ প্রত্যাশা করা অন্যায়।

দাঁড়কাক ও ময়ূরপুচ্ছ

দাঁড়কাক ও ময়ূরপুচ্ছ

এক স্থানে, কতক গুলি ময়ূরপুচ্ছ পড়িয়া ছিল। এক দাঁড়কাক, দেখিয়া, মনে মনে বিবেচনা করিল, যদি আমি এই ময়ূরপুচ্ছ গুলি আপন পাখায় বসাইয়া দি, তাহা হইলে, আমিও ময়ূরের মত সুশ্রী হইব। এই ভাবিয়া, দাঁড়কাক ময়ূরপুচ্ছ গুলি আপন পাখায় বসাইয়া দিল, এবং, দাঁড়কাকদের নিকটে গিয়া, তোরা অতি
নীচ ও অতি বিশ্রী, আয় আমি তোদর সঙ্গে থাকিব না; এই বলিয়া, গালাগালি দিয়া, ময়ূরের দলে মিলিতে গেল।

ময়ূরগণ, দেখিবা মাত্র, তাহাকে দাঁড়কাক বলিয়া বুঝিতে পারিল; সকলে মিলিয়া, তাহার পাখা হইতে, একটি একটি করিয়া, ময়ূরপুচ্ছ গুলি তুলিয়া লইল; এবং, তাহাকে নিতান্ত অপদার্থ স্থির করিয়া, এত ঠোকরাইতে আরম্ভ করিল-যে, দাঁড়কাক, জ্বালায় অস্থির হইয়া পলায়ন করিল। অনন্তর, সে পুনরায় আপন দলে মিলিতে গেল। তখন, দাঁড়কাকেরা উপহাস করিয়া কহিল, অরে নির্ব্বোধ! তুই ময়ূরপুচ্ছ পাইয়া, অহঙ্কারে মত্ত হইয়া, আমাদিগকে ঘৃণা করিয়া ও গালাগালি দিয়া, ময়ূরের দলে মিলিতে গিয়াছিলি; সেখানে অপদস্থ হইয়া, আবার আমাদের দলে মিলিতে আসিয়াছিস। তুই অতি মির্লজ্জ। এই রূপে, যখোচিত তিরস্কার করিয়া তাহারা সেই নির্ব্বোধ দাঁড়কাককে তাড়াইয়া দিল।

যাহার যে অবস্থা, সে যদি তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহা হইলে তাহাকে কাহারও নিকট অপদস্থ ও অবমানিত হইতে হয় না।

দুঃখী বৃদ্ধ ও যম

দুঃখী বৃদ্ধ ও যম

এক বৃদ্ধ অতি দুঃখী ছিল। তাহার জীবিকা নির্ব্বাহের কোনও উপায় ছিল না। সে, বনে কাঠ কাটিয়া, সেই কাঠ বেচিয়া, অতি কষ্টে দিনপাত করিত। গ্রীষ্ম কালে, এক দিন, মধ্যাহ্ন সময়ে, সে, কাঠের বোঝা মাথায় করিয়া, বন হইতে আসিতেছে। ক্ষুধায় পেট জলিতেছে; তৃষ্ণায় ছাতি ফাটিতেছে; প্রখর রৌদ্রে সর্ব্ব শরীর দগ্ধপ্রায় ও গলদঘর্ম হইতেছে; পথের তপ্ত
ধূলি ও বালুকাতে, দুই পা পুড়িয়া যাইতেছে। অবশেষে, নিতান্ত ক্লান্ত হইয়া, কাঠের বোঝা ফেলিয়া, সে এক বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম করিতে বসিল। কিয়ৎক্ষণ পরে, সে মনে মনে কহিতে লাগিল; এরূপ ক্লেশভোগ করিয়া বাঁচিয়া থাকা অপেক্ষা, মরিয়া যাওয়া ভাল; কেনই বা আমার মরণ হয় না। আমার মত হতভাগ্য লোকের মরণ হইলেই মঙ্গল।

মনের দুঃখে, এইরূপ আক্ষেপ করিয়া, সেই চিরদুঃখী, যমকে সম্বোধিয়া, কহিতে লাগিল, যম! তুমি আমায় ভুলিয়া আছ কেন? শীঘ্র আসিয়া, আমায় লইয়া যাও; তাহা হইলেই আমার নিষ্কৃতি হয়; আর আমি ক্লেশ সহ্য করিতে পারি না। তাহার কথা সমাপ্ত না হইতেই, যম আসিয়া তাহার সম্মুখে দাঁড়াইলেন। সে, তাহার বিকট মূর্ত্তি দেখিয়া, ভয় পাইয়া, জিজ্ঞাসা করিল, আপনি কে, কি জন্যে এখানে আসিলেন? তিনি কহিলেন, আমি যম, তুমি আমায় ডাকিতেছিলে, তাই আসিয়াছি; এখন, কি জন্যে আমায় ডাকিতেছিলে, বল। তখন সে কহিল, মহাশয়! যদি আসিয়াছেন, তবে দয়া করিয়া, কাঠের বোঝাটি আমার মাথায় উঠাইয়া দেন, তাহা হইলে, আমার যথেষ্ট উপকার হয়। যম, শুনিয়া, ঈষৎ হাসিয়া, অন্তর্হিত হইলেন।

দুই পথিক ও ভালুক

দুই পথিক ও ভালুক

দুই বন্ধুতে মিলিয়া পথে ভ্রমণ করিতেছিল। দৈবযোগে, সেই সময়ে, তথায় এক ভালুক উপস্থিত হইল। বন্ধুদিগের মধ্যে এক ব্যক্তি;
ভালুক দেখিয়া, অতিশয় ভয় পাইয়া, নিকটবর্ত্তী বৃক্ষে আরোহণ করিল; কিন্তু, বন্ধুর কি দশা ঘটিল, তাহা এক বারও ভাবিল না। দ্বিতীয় ব্যক্তি, আর কোনও উপায় না দেখিয়া, এবং, একাকী ভালুকের সঙ্গে যুদ্ধ করা অসাধ্য ভাবিয়া, মৃতবৎ ভূতলে পড়িয়া রহিল। কারণ, সে পূর্ব্বে শুনিয়াছিল, ভালুক মরা মানুষ ছোঁয় না।

ভালুক আসিয়া তাহার নাক, কান, মুখ, চোক, বুক, পরীক্ষা করিল, এবং, তাহাকে মৃত নিশ্চয় করিয়া, চলিয়া গেল। ভালুক চলিয়া গেলে পর, প্রথম ব্যক্তি, বৃক্ষ হইতে নামিয়া, বন্ধুর নিকটে গিয়া, জিজ্ঞাসিল, ভাই! ভালুক তোমায় কি বলিয়া গেল। আমি দেখিলাম, সে, তোমার কানের কাছে, অনেক ক্ষণ, মুখ রাখিয়াছিল। দ্বিতীয় ব্যক্তি কহিল, ভালুক আমায় এই কথা কহিয়া গেল, যে বন্ধু, বিপদের সময়, ফেলিয়া পলায়, আর কখনও তাহাকে বিশ্বাস করিও না।

নেকড়ে বাঘ ও মেষ

নেকড়ে বাঘ ও মেষ

কোনও সময়ে, এক নেকড়ে বাঘকে কুকুরে কামড়াইয়াছিল। ঐ কামড়ের ঘা, ক্রমে ক্রমে, এত বাড়িয়া উঠিল যে, বাঘ আর নড়িতে পারে না; সুতরাং, তাহার আহার বন্ধ হইল। এক দিন, সে ক্ষুধায় কাতর হইয়া পড়িয়া আছে, এমন সময়ে, এক মেষ তাহার সম্মুখ দিয়া চলিয়া যায়। তাহাকে দেখিয়া, নেকড়ে অতি কাতর বাক্যে কহিল, ভাই হে! কয়েক দিন অবধি, আমি চলতশক্তিরহিত হইয়া পড়িয়া আছি;
ক্ষুধায় অস্থির হইয়াছি, তৃষ্ণায় ছাতি ফাটিয়া যাইতেছে। তুমি, কৃপা করিয়া, এই খাল হইতে জল আনিয়া দাও, আমি আহারের জোগাড় করিয়া লইব। মেষ কহিল, আমি তোমার অভিসন্ধি বুঝিয়াছি; জল দিবার নিমিত্ত নিকটে গেলেই, তুমি, আমার ঘাড় ভাঙ্গিয়া, আহারের জোগাড় করিয়া লইবে।

নেকড়ে বাঘ ও মেষের পাল

নেকড়ে বাঘ ও মেষের পাল

কোনও স্থানে কতকগুলি মেষ চরিত। কতিপয় বলবান কুকুর তাহাদের রক্ষণাবেক্ষণ করিত। ঐ সকল কুকুরের ভয়ে, নেকড়ে বাঘ মেষদিগকে আক্রমণ করিতে পারিত না। একদা, বাঘেরা করিল, এই সকল কুকুর থাকিতে,
আমরা কিছুই করিতে পারিব না। কৌশল করিয়া, ইহাদিগকে দূর করিতে না পারিলে, আমাদের সুবিধা নাই। অতএব, যাহাতে ইহারা মেষগণের নিকট হইতে যায়, এমন কোনও উপায় করা আবশ্যক।

এই স্থির করিয়া, তাহারা মেষগণের নিকট বলিয়া পাঠাইল, আইস, আমরা অতঃপর সন্ধি করি। কেন, চির কাল, পরস্পর বিবাদ করিয়া মরি। যে সকল কুকুর তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করে, তাহারাই সমস্ত বিবাদের মূল। তাহারা অনবরত চীৎকার করে, তাহাতেই আমাদের বিষম কোপ জন্মে। তাহাদিগকে বিদায় করিয়া দাও; তাহা হইলে, চির কাল, আমাদের পরস্পর সদ্ভাব থাকিবেক। নির্ব্বোধ মেষগণ, এই কুমন্ত্রণায় ভুলিয়া, কুকুরদিগকে বিদায় করিয়া দিল। এইরূপে, তাহারা রক্ষকশূন্য হওয়াতে, বাঘেরা, নিরুদ্বেগে, তাহাদের প্রাণসংহার করিয়া, ইচ্ছামত উদরপূর্ত্তি করিল।

শত্রুর কথায় ভুলিয়া, হিতৈষী বন্ধুকে দূর করিয়া দিলে,
নিশ্চিত বিপদ ঘটে।

পক্ষী ও শাকুনিক

পক্ষী ও শাকুনিক

এক শাকুনিক, ফাঁদ পাতিয়া, এক পক্ষী ধরিয়াছিল। পক্ষী, প্রাণনাশ উপস্থিত দেখিয়া, কাতর হইয়া, বিনয়বাক্যে শাকুনিককে কহিতে লাগিল, ভাই! তুমি, দয়া করিয়া, আমায় ছাড়িয়া দাও। আমি তোমার নিকট অঙ্গীকার করিতেছি, আমায় ছাড়িয়া দিলে, আমি অন্য অন্য পক্ষীদিগকে, ভুলাইয়া আনিয়া, তোমার ফাঁদে ফেলিয়া দিব। বিবেচনা করিয়া দেখ, তুমি, এক পক্ষীর পরিবর্ত্তে, কত পক্ষী পাইবে। শাকুনিক কহিল, না, আমি তোমায় ছাড়িয়া দিব না। যে, আপন মঙ্গলের নিমিত, সজাতীয় ও আত্মীয় দিগের সর্ব্বনাশ করিতে পারে, তাহার মৃত্যু হইলেই, পৃথিবীর মঙ্গল।

পথিক ও কুঠার

পথিক ও কুঠার

দুই পথিক এক পথ দিয়া চলিয়া যাইতেছিল। তাহাদের মধ্যে এক জন, সম্মুখে একখান কুঠার দেখিতে পাইয়া, তৎক্ষণাৎ, তাহা ভূমি হইতে উঠাইয়া লইল, এবং আপন সহচরকে কহিল, দেখ ভাই! আমি কেমন সুন্দর কুঠার পাইয়াছি। তখন সে কহিল, ও কি ভাই! এ কেমন কথা; আমি পাইলাম বলিতেছ কেন; আমরা উভয়ে পাইলাম, বল। উভয়ে এক সঙ্গে যাইতেছি, যাহা পাওয়া গেল, উভয়েরই হওয়া উচিত। অপর ব্যক্তি কহিল, না ভাই! তাহা হইলে অন্যায় হয়। তুমি কি জান না, যে যা পায়, তারই তা হয়। এই কুঠার, আমি পাইয়াছি, আমারই হওয়া উচিত; আমি তোমাকে ইহার অংশ দিব কেন। সে শুনিয়া নিরস্ত হইল।

এই সময়ে, যাহাদের কুঠার হারাইয়াছিল, তাহারা, খুজিতে খুজিতে, সেই স্থানে উপস্থিত হইল, এবং, পথিকের হস্তে কুঠার দেখিয়া, তাহাকে চোর বলিয়া ধরিল। তখন সে স্বীয় সহচরকে কহিল, হায়! আমরা মারা পড়িলাম। তাহার সহচর কহিল, ও কেমন কথা; এখন, আমরা মারা পড়িলাম, বল কেন, আমি মারা পড়িলাম, বল। যাহাকে লাভের অংশ দিতে চাহ নাই, তাহাকে বিপদের অংশভাগী করিতে যাওয়া অন্যায়।

পথিকগণ ও বটবৃক্ষ

পথিকগণ ও বটবৃক্ষ

একদা, গ্রীষ্ম কালে, কতিপয় পথিক, মধ্যাহ্ন সময়ের রৌদ্রে, অতিশয় তাপিত ও নিতান্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িল। নিকটে একটি বট গাছ দেখিতে পাইয়া, তাহারা উহার তলে উপস্থিত হইল, এবং, শীতল ছায়ায় বসিয়া, বিশ্রাম করিতে লাগিল। কিয়ৎ ক্ষণের মধ্যেই, তাহাদের শরীর শীতল, ও ক্লান্তি দূর হইল। তখন তাহারা নানাবিধ কথোপকথন করিতে লাগিল। তাহাদের মধ্যে এক জন, কিয়ৎ ক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া, কহিল, দেখ ভাই! এ গাছ কোনও কাজের নয়; না ইহাতে ভাল ফুল হয়, না ইহাতে ভাল ফল
হয়। বলিতে কি, ইহা মানুষের কোনও উপকারে লাগে না। এই কথা শুনিয়া, বটবৃক্ষ কহিল, মানুষ বড় অকৃতজ্ঞ; যে সময়ে, আমার আশ্রয় লইয়া, উপকার ভোগ করিতেছে, সেই সময়েই, আমি মানুষের কোনও উপকারে লাগি না বলিয়া, অম্লান মুখে আমায় গালি দিতেছে।

পিপীলিকা ও পারাবত

পিপালিকা ও পারাবত

এক পিপীলিকা, তৃষ্ণায় কাতর হইয়া, নদীতে জলপান করিতে গিয়াছিল। সে, হঠাৎ জলে পড়িয়া গিয়া, ভাসিয়া যাইতে লাগিল। এক পারাবত বৃক্ষের শাখায় বসিয়া ছিল। সে, পিপীলিকার এই বিপদ দেখিয়া, গাছের একটি পাতা ভাঙ্গিয়া, জলে ফেলিয়া দিল। ঐ পাতা পিপীলিকার সম্মুখে পড়াতে, সে তাহার উপর উঠিয়া বসিল, এবং, পাতা কিনারায় লাগিবা মাত্র, তীরে উঠিল।

এই রূপে, পারাবতের সাহায্যে, প্রাণদান পাইয়া, পিপীলিকা মনে মনে তাহাকে ধন্যবাদ দিতেছে, এমন সময়, হঠাৎ দেখিতে পাইল, এক
ব্যাধ জাল চাপা দিয়া, পায়রাকে ধরিবার উপক্রম করিতেছে; কিন্তু, পায়রা কিছুই জানিতে পারে নাই; সুতরাং, সে নিশ্চিন্ত বসিয়া আছে। পিপীলিকা, প্রাণদাতার এই বিপদ উপস্থিত দেখিয়া, সত্বর গিয়া, ব্যাধের পায়ে এমন কামড়াইল যে, সে, জ্বালায় অস্থির হইয়া, জাল ফেলিয়া দিল, এবং, মাটিতে বসিয়া পড়িয়া, পায়ে হাত বুলাইতে লাগিল। এই অবকাশে, পায়রাও, আপনার বিপদ বুঝিতে পারিয়া, তথা হইতে উড়িয়া গেল।

পীড়িত সিংহ

পীড়িত সিংহ

এক সিংহ, বৃদ্ধ ও দুর্বল হইয়া, আর শিকার করিতে পারিত না; সুতরাং, তাহার আহারবন্ধ হইয়া আসিল। তখন সে, পর্বতের গুহার মধ্যে থাকিয়া, এই কথা রটাইয়া দিল, সিংহ অতিশয় পীড়িত হইয়াছে; চলিতে পারে না, উঠিতে পারে না, কথা কহিতে পারে না। এই সংবাদ, নিকটস্থ পশুদের মধ্যে, প্রচারিত হইলে, তাহারা, একে একে, সিংহকে দেখিতে যাইতে লাগিল। সিংহ নিতান্ত নিস্তেজ হইয়াছে ভাবিয়া, যেমন কোনও পশু নিকটে যায়, অমনি সিংহ, তাহার ঘাড় ভাঙ্গিয়া, সচ্ছন্দে আহার করে।

এই রূপে কয়েক দিন গত হইলে, এক শৃগাল, সিংহকে দেখিবার নিমিত্ত, গুহার দ্বারে উপস্থিত হইল। সিংহ যথার্থই পীড়িত হইয়াছে, অথবা ছল করিয়া, নিকটে পাইয়া, পশুগণের প্রাণবধ করিতেছে, এ বিষয়ে শৃগালের সম্পূর্ণ সন্দেহ
ছিল। এজন্য, সে গুহায় প্রবেশ করিয়া, সিংহের নিতান্ত নিকটে না গিয়া, কিঞ্চিৎ দূরে থাকিয়া,জিজ্ঞাসা করিল, মহারাজ! আপনি কেমন আছেন? সিংহ, শৃগালকে দেখিয়া, অতিশয় আহলাদপ্রকাশ করিয়া, কহিল, কে ও, আমারি পরম বন্ধু শৃগাল! আইস, ভাই! আইস; আমি ভাবিতেছিলাম, ক্রমে ক্রমে, সকল বন্ধুই আমায় দেখিতে আসিল, পরম বন্ধু শৃগাল আসিল না কেন? যাহা হউক, ভাই! তুমি যে আসিয়াছ, ইহাতে, যার পর নাই, আহলাদিত হইলাম। যদি, ভাই! আসিয়াছ, দূরে দাঁড়াইয়া রহিলে কেন? নিকটে আইস, দুটা মিষ্ট কথা বল, আমার কর্ণ শীতল হউক। দেখ, ভাই! আমার শেষ দশা উপস্থিত; আর অধিক দিন বাঁচিব না।

শুনিয়া, শৃগাল কহিল, মহারাজ! প্রার্থনা করি, শীঘ্র সুস্থ হউন। কিন্তু আমায় ক্ষমা করিবেন, আমি আর অধিক নিকটে যাইতে, অথবা অধিক ক্ষণ এখানে থাকিতে, পারিব না। বলিতে কি, মহারাজ! পদচিহ্ন দেখিয়া, স্পষ্ট বোধ হইতেছে, অনেক পশু এই গুহার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল; কিন্তু, প্রবেশ করিয়া, কেহ পুনরায় বহির্গত হইয়াছে, কোনও ক্রমে, সেরূপ প্রতীতি হইতেছে না। ইহাতে, আমার অন্তঃকরণে, অতিশয় আশঙ্কা উপস্থিত হইয়াছে। আর আমার এখানে থাকিতে সাহস হইতেছে না; আমি চলিলাম। এই বলিয়া, শৃগাল পলায়ন করিল।

বাঘ ও ছাগল

বাঘ ও ছাগল

এক বাঘ, পাহাড়ের উপর বেড়াইতে বেড়াইতে, দেখিতে পাইল, একটি ছাগল, ঐ পাহাড়ের অতি উচ্চ স্থানে, চরিতেছে। ঐ স্থানে উঠিয়া, ছাগলের প্রাণসংহার করিয়া, তদীয় রক্ত ও মাংস খাওয়া বাঘের পক্ষে সহজ নহে; এজন্য সে, কৌশল করিয়া নীচে নামাইবার নিমিত্ত, কহিল, ভাই ছাগল! তুমি ওরূপ উচ্চ স্থানে বেড়াইতেছ কেন? যদি দৈবাৎ পড়িয়া যাও, মরিয়া যাইবে। বিশেষতঃ, নীচের ঘাস যত মিষ্ট ও যত কোমল, উপরের ঘাস তত মিষ্ট ও তত কোমল নয়। অতএব, নামিয়া আইস। ছাগল কহিল, ভাই বাঘ! তুমি আমায় মাপ কর, আমি নীচে যাইতে পারি না। আমি বুঝিতে পারিয়াছি, তুমি, আপন আহারের নিমিত্তে, আমায় নীচে যাইতে বলিতেছ, আমার আহারের নিমিত্তে নহে।

বাঘ ও বক

কথামালা

বাঘ ও বক

একদা, এক বাঘের গলায় হাড় ফুটিয়াছিল। বাঘ বিস্তর চেষ্টা পাইল, কিছুতেই হাড় বাহির করিতে পারিল না; যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া চারি দিকে দৌড়িয়া বেড়াইতে লাগিল। সে যে জন্তুকে সম্মুখে দেখে, তাহাকেই বলে, ভাই হে! যদি তুমি, আমার গলা হইতে, হাড় বাহির করিয়া দাও, তাহা হইলে, আমি তোমায় বিলক্ষণ পুরস্কার দি, এবং, চিরকালের জন্যে, তোমার কেনা হইয়া থাকি। কোনও জন্তুই সম্মত হইল না।

অবশেষে, এক বক, পুরস্কারের লোভে সম্মত হইল, এবং, বাঘের মুখের ভিতর, আপন, লম্বা ঠোট প্রবেশ করাইয়া দিয়া, অনেক যত্নে ঐ হাড় বাহির করিয়া আনিল। বাঘ সুস্থ হইল। বক পুরস্কারের কথা উত্থাপিত করিয়া মাত্র, সে, দাঁত কড়মড় ও চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া, কহিল, অরে নির্ব্বোধ! তুই বাঘের মুখে ঠোট প্রবেশ করাইয়া দিয়াছিলি। তুই যে নির্বিঘ্নে ঠোট বাহির করিয়া লইয়াছিল, তাহাই ভাগ্য করিয়া না মানিয়া, আবার পুরস্কার চাহিতেছিল। যদি বাঁচিবার সাধ থাকে, আমার সম্মুখ হইতে বা; নতুবা, এখনই তোর ঘাড় ভাঙ্গিব। বক শুনিয়া, হতবুদ্ধি হইয়া, তৎক্ষণাৎ তথা হইতে প্রস্থান করিল।

অসতের সহিত ব্যবহার করা ভাল নয়।

বালকগণ ও ভেকসমূহ

বালকগণ ও ভেকসমূহ

কতকগুলি বালক, এক পুষ্করিণীর ধারে, খেলা করিতেছিল। খেলা করিতে করিতে, তাহারা দেখিতে পাইল, জলে কতকগুলি ভেক ভাসিয়া রহিয়াছে। তাহারা, ভেকদিগকে লক্ষ্য করিয়া, ডেলা ছুড়িতে আরম্ভ করিল। ডেলা লাগিয়া, কয়েকটি ভেক মরিয়া গেল। তখন একটি ভেক বালকদিগকে কহিল, অহে বালকগণ! তোমরা এনিষ্ঠুর খেলা ছাড়িয়া দাও। ডেলা ছোড়া তোমাদের পক্ষে খেলা বটে; কিন্তু, আমাদের পক্ষে প্রাণনাশক হইতেছে।

বৃদ্ধ সিংহ

বৃদ্ধ সিংহ

এক সিংহ, অতিশয় বৃদ্ধ হইয়া, নিতান্ত দুর্ব্বল ও অক্ষম হইয়াছিল। সে, এক দিন, ভূমিতে পড়িয়া, ঘন ঘন নিশ্বাস টানিতেছে, এমন সময়ে, এক বনবরাহ তথায় উপস্থিত হইল। সিংহের সহিত ঐ বরাহের বিরোধ ছিল; কিন্তু, সিংহ অতিশয় বলবান বলিয়া, সে কিছুই করিতে পারিত না। এক্ষণে, সিংহের এই অবস্থা দেখিয়া, সে বারংবার দন্তাঘাত করিয়া চলিয়া গেল। সিংহের নড়িবার ক্ষমতা ছিল না; সুতরাং, বরাহের দন্তাঘাত সহ্য করিয়া রহিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরে, এক বৃষ তথায় উপস্থিত হইল। সিংহের সহিত এই বৃষেরও বিরোধ ছিল। এক্ষণে সে, সিংহকে মৃতবৎ পতিত দেখিয়া, শৃঙ্গ দ্বারা প্রহার করিয়া, চলিয়া গেল। সিংহ এ অপমানও সহ্য করিয়া রহিল।

দেখাদেখি, এক গর্দ্দভ ভাবিল, সিংহের যখন বল ও বিক্রম ছিল, তখন আমাদের সকলের উপরেই অত্যাচার করিয়াছে। এখন, সময় পাইয়া, সকলেই সেই অত্যাচারের পরিশোধ করিতেছে। বরাহ ও বৃষ, সিংহের অপমান করিয়া, চলিয়া গেল; সিংহ কিছুই করিতে পারিল না। আমিও সময় পাইয়াছি, ছাড়ি কেন? এই বলিয়া, সিংহের নিকটে গিয়া, সে তাহার মুখে পদাঘাত করিল। তখন সিংহ, আক্ষেপ করিয়া, কহিল, হায়! সময়গুণে, আমার কি দুর্দ্দশা ঘটিল। যে সকল পশু, আমায় দেখিলে, ভয়ে কাঁপিত, তাহারা, অনায়াসে, আমার অপমান করিতেছে। যাহা হউক, বরাহ ও বৃষ বলবান জন্তু; তাহারা যে অপমান করিয়াছিল, তাহা আমার, কথঞ্চিৎ, সহ্য হইয়াছিল। কিন্তু, সকল পশুর অধম গর্দ্দভ যে আমায় পদাঘাত করিল, ইহা অপেক্ষা, আমার শত বার মৃত্যু হওয়া ভাল ছিল।

বৃদ্ধা নারী ও চিকিৎসক

বৃদ্ধা নারী ও চিকিৎসক

এক বৃদ্ধা নারীর চক্ষু নিতান্ত নিস্তেজ হইয়া গিয়া- ছিল; এজন্য, তিনি কিছুই দেখিতে পাইতেন না। নিকটে এক প্রসিদ্ধ চিকিৎসক ছিলেন। বৃদ্ধা তাঁহার নিকটে গিয়া কহিলেন, কবিরাজ মহাশয়! আমার চক্ষুর দোষ জন্মিয়াছে, আমি কিছুই দেখিতে পাই না; আপনি আমার চক্ষু ভাল করিয়া দেন; আমি আপনাকে বিলক্ষণ পুরস্কার দিব; কিন্তু, ভাল করিতে না পারিলে, আপনি কিচুই পাইবেন না।

চিকিৎসক, বৃদ্ধার প্রস্তাবে সম্মত হইয়া, পর দিন, প্রাতঃকালে, তাঁহার আলয়ে উপস্থিত হইলেন। বৃদ্ধার গৃহ নানাবিধ দ্রব্যে পরিপূর্ণ দেখিয়া, চিকিৎসকের অতিশয় লোভ জন্মিল। তিনি স্থির করিলেন, প্রতিদিন, ইহাকে দেখিতে আসিব, এবং এক একটি দ্রব্য লইয়া যাইব। এজন্য, যাহাতে শীঘ্র তাহার পীড়ার শান্তি হইতে পারে, সেরূপ ঔষধ না দিয়া, কিছু দিন গোলমাল করিয়া কাটাইলেন। পরে, একে একে সমস্ত দ্রব্য লইয়া গিয়া, তিনি রীতিমত ঔষধ দিতে আরম্ভ করিলেন। বৃদ্ধার চক্ষু, অল্প দিনেই, পূর্ব্ববৎ, নির্দ্দোষ হইল। তিনি দেখিলেন, তাঁহার গৃহে যে নানাবিধ দ্রব্য ছিল, তাহার একটিও নাই; অনুসন্ধান দ্বারা জানিতে পারিলেন, চিকিৎসক, একে একে, সমুদয় লইয়া গিয়াছেন। এক দিন, চিকিৎসক বৃদ্ধাকে কহিলেন, আমার চিকিৎসায় তোমার পীড়ার শান্তি হইয়াছে। পীড়ার শান্তি হইলে, আমায় পুরস্কার দিবে, বলিয়াছিলে; এক্ষণে, প্রতিশ্রুত পুরস্কার দিয়া, সন্তুষ্ট করিয়া, আমায় বিদায় কর। বৃদ্ধা, চিকিৎসকের আচরণে, অতিশয় অসন্তুষ্ট হইয়া ছিলেন; এজন্য, কোনও উত্তর দিলেন না। চিকিৎসক, বারংবার চাহিয়াও, পুরস্কার না পাইয়া, বৃদ্ধার নামে বিচারালয়ে অভিযোগ করিলেন। বৃদ্ধা বিচারকদিগের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন; এবং, চিকিৎসককে স্পষ্ট বাক্যে চোর না বলিয়া, কৌশল করিয়া বলিলেন, কবিরাজ মহাশয় যাহা কহিতেছেন, তাহা যথার্থ বটে। আমি অঙ্গীকার করিয়াছিলাম, যদি আমার চক্ষু পূর্ব্ববৎ হয়, কোনও দোষ না থাকে, তবে উঁহাকে পুরস্কার দিব। উনি কহিতেছেন, আমার চক্ষু নির্দ্দোষ হইয়াছে; কিন্তু, আমি যেরূপ দেখিতেছি, তাহাতে আমার চক্ষু এখনও নির্দ্দোষ হয় নাই। কারণ, যখন আমার চক্ষুর দোষ জন্মে নাই, আমার গৃহে যে নানাবিধ দ্রব্য ছিল, সে সমস্ত দেখিতে পাইতাম। পরে, চক্ষুর দোষ জন্মিলে, সে সকল দেখিতে পাই নাই; এখনও, সে সব দেখিতে পাইতেছি না। ইহাতে, উঁহার চিকিৎসায়, আমার চক্ষু নির্দ্দোষ হইয়াছে, আমার সেরূপ বোধ হইতেছে না। এক্ষণে, আপনাদের বিচারে, যাহা কর্ত্তব্য হয়, করুন।

বিচারকেরা, বৃদ্ধার উত্তরবাক্যের মর্ম্ম বুঝিতে পারিয়া, হাস্যমুখে, তাঁহাকে বিদায় দিলেন, এবং, যথোচিত তিরস্কার করিয়া, চিকিৎসককে, বিচারালয় হইতে, চলিয়া যাইতে বলিলেন।

বৃষ ও মশক

বৃষ ও মশক

এক মশক, কোনও বৃষের মস্তকের উপর কিয়ৎ ক্ষণ উড়িয়া, অবশেষে তাহার শৃঙ্গের উপর বসিল, এবং মনে ভাবিল, হয় ত বৃষ আমার ভারে কাতর হইয়াছে। তখন তাহাকে কহিল, ভাই হে! যদি আমার ভার তোমার অসহ্য হইয়া থাকে, বল, আমি এখনই উড়িয়া যাইতেছি; আমি তোমায় ক্লেশ দিতে চাহি না। ইহা শুনিয়া, বৃষ কহিল, তুমি সে জন্য উদ্বিগ্ন হইও না। তুমি থাক বা যাও, আমার পক্ষে দুই সমান। তুমি এত ক্ষুদ্র যে, তুমি আমার শৃঙ্গে বসিয়াছ, এ পর্য্যন্ত আমার সে অনুভবই হয় নাই।

মন যত ক্ষুদ্র, আত্মশ্লাঘা তত অধিক হয়।

ব্যাঘ্র ও পালিত কুকুর

ব্যাঘ্র ও পালিত কুকুর।

এক স্থূলকায় পালিত কুকুরের সহিত, এক ক্ষুধার্ত শীর্ণকায় ব্যাঘ্রের সাক্ষাৎ হইল। প্রথম আলাপের পর, ব্যাঘ্র কুকুরকে কহিল, ভাল ভাই! জিজ্ঞাসা করি, বল দেখি, তুমি, কেমন করিয়া, এমন সবল ও স্থূলকায় হইলে; প্রতি দিন কিরূপ আহার কর, এবং, কি রূপেই বা, প্রতিদিনের আহার পাও। আমি, অহোরাত্র, আহারের চেষ্টায় ফিরিয়াও, উদর পূরিয়া, আহার করিতে পাই না। কোনও কোনও দিন, উপবাসীও থাকিতে হয়। এইরূপ আহারের কষ্টে, এমন শীর্ণ ও দুর্বল হইয়া পড়িয়াছি।

কুকুর কহিল, আমি যা করি, তুমি যদি তাই করিতে পার, আমার মত আহার পাও। ব্যাঘ্র কহিল, সত্য না কি; আচ্ছা, ভাই! তোমায় কি করিতে হয়, বল। কুকুর কহিল, আর কিছুই নয়; রাত্রিতে, প্রভুর বা বাটীর রক্ষণাবেক্ষণ করিতে হয়, এই মাত্র। ব্যাঘ্র কহিল, আমিও করিতে সম্মত আছি। আমি, আহারের চেষ্টায়, বনে বনে ভ্রমণ করিয়া, রৌদ্রে ও বৃষ্টিতে, অতিশয় কষ্ট পাই। আর এ ক্লেশ সহ্য হয় না। যদি, রৌদ্র ও বৃষ্টির সময়, গৃহের মধ্যে থাকিতে পাই, এবং, ক্ষুধার সময়, পেট ভরিয়া খাইতে পাই, তাহা হইলে, বাঁচিয়া যাই। ব্যাঘ্রের দুঃখের কথা শুনিয়া, কুকুর কহিল, তবে আমার সঙ্গে আইস। আমি, প্রভুকে বলিয়া, তোমার বন্দোবস্ত করিয়া দিব।

ব্যাঘ্র কুকুরের সঙ্গে চলিল। খানিক গিয়া, বাঘ কুকুরের ঘাড়ে একটা দাগ দেখিতে পাইল, এৰং, কিসের দাগ জানিবার নিমিত্ত, অতিশয় ব্যগ্র হইয়া, কুকুরকে জিজ্ঞাসিল, ভাই! তোমার ঘাড়ে ও কিসের দাগ। কুকুর কহিল, ও কিছুই নয়। ব্যাঘ্র কহিল, না ভাই! বল বল, আমার জানিতে বড় ইচ্ছা হইতেছে। কুকুর কহিল, আমি বলিতেছি, ও কিছুই নয়; বোধ হয়, গলবন্ধের দাগ। বাঘ কহিল, গলবন্ধ কেন? কুকুর কহিল, ঐ গলবন্ধে শিকলি দিয়া, দিনের বেলায়, আমায় বাঁধিয়া রাখে।

বাঘ, শুনিয়া, চমকিয়া উঠিল, এবং কহিল, শিকলিতে বাঁধিয়া রাখে। তবে তুমি, যখন যেখানে ইচ্ছা, যাইতে পার না। কুকুর কহিল, তা কেন, দিনের বেলায় বাঁধা থাকি বটে; কিন্তু, রাত্রিতে যখন ছাড়িয়া দেয়, তখন আমি, যেখানে ইচ্ছা, যাইতে পারি। তদ্ভিন্ন, প্রভুর ভৃত্যেরা কত আদর ও কত যত্ন করে, ভাল আহার দেয়, স্নান করাইয়া দেয়। প্রভুও, কখনও কখনও, আদর করিয়া, আমার গায় হাত বুলাইয়া দেন। দেখ দেখি, কেমন সুখে থাকি। বাঘ কহিল, ভাই হে! তোমার সুখ তোমারই থাকুক, আমার অমন সুখে কাজ নাই। নিতান্ত পরাধীন হইয়া, রাজভোগে থাকা অপেক্ষা, স্বাধীন থাকিয়া, আহারের ক্লেশ পাওয়া সহস্র গুণে ভাল। আর আমি তোমার সঙ্গে যাইব না। এই বলিয়া বাঘ চলিয়া গেল।

ব্যাঘ্র ও মেষশাবক

ব্যাঘ্র ও মেষশাবক

এক ব্যাঘ্র, পর্ব্বতের ঝরনায় জলপান করিতে করিতে, দেখিতে পাইল, কিছু দূরে, নীচের দিকে, এক মেষশাবক জলপান করিতেছে। সে, দেখিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিল, এই মেষশাবকের প্রাণসংহার করিয়া, আজকার আহার সম্পন্ন করি; কিন্তু, বিনা দোষে, এক জনের প্রাণবধ করা ভাল দেখায় না; অতএব, একটা দোষ দেখাইয়া, অপরাধী করিয়া, উহার প্রাণবধ করিব।

এই স্থির করিয়া, ব্যাঘ্র, সত্বর গমনে, মেষ শাবকের নিকট উপস্থিত হইয়া কহিল, অরে দুরাত্মন্! তোর এত বড় আস্পর্দ্ধা যে, আমি জলপান করিতেছি দেখিয়াও, তুই জল, ঘোলা করিতেছিস। মেষশাবক, শুনিয়া, ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে কহিল, সে কি মহাশয়! আমি, কেমন করিয়া, আপনকার পান করিবার জল ঘোলা করিলাম। আমি নীচে জলপান করিতেছি, আপনি উপরে জলপান করিতেছেন। নীচের জল ঘোলা করিলেও, উপরের জল ঘোলা হইতে পারে না। বাঘ কহিল, সে যাহা হউক, তুই, এক বৎসর পূর্ব্ব, আমার অনেক নিন্দা করিয়াছিলি; আজ তোরে তাহার সমুচিত প্রতিফল দিব। মেষশাবক কাঁপিতে কাঁপিতে কহিল, আপনি অন্যায় আজ্ঞা করিতেছেন; এক বৎসর পূর্ব্বে, আমার জম্মই হয় নাই; সুতরাং, তৎকালে আমি আপনকার নিন্দা করিয়াছি, ইহা কি রূপে সম্ভবিতে পারে। বাঘ কহিল, হাঁ সত্য বটে; সে তুই নহিস, তোর বাপ আমার নিন্দা করিয়াছিল। তুই কর, আর তোর বাপ করুক, একই কথা। আর আমি তোর কোনও ওজর শুনিতে চাহি না। এই বলিয়া, বাঘ ঐ অসহায়, দুর্ব্বল মেষশাবকের প্রাণসংহার করিল।

দুরাত্মার ছলের অসদ্ভাব নাই।

আমি অপরাধী নহি, বা এরূপ করা অন্যায়, ইহা কহিয়া, প্রবল ব্যক্তির অত্যাচার হইতে পরিত্রাণ পাওয়া যায় না।

মাছি ও মধুর কলসী

মাছি ও মধুর কলসী

এক দোকানে মধুর কলসী উলটিয়া পড়িয়াছিল। তাহাতে চারি দিকে মধু ছড়াইয়া যায়। মধুর
গন্ধ পাইয়া, ঝাঁকে ঝাঁকে, মাছি আসিয়া সেই মধু খাইতে লাগিল। যত ক্ষণ এক ফোঁটা মধু পড়িয়া রহিল, তাহারা ঐ স্থান হইতে নড়িল না। অধিক ক্ষণ তথায় থাকাতে, ক্রমে ক্রমে, সমুদয় মাছির পা মধুতে জড়াইয়া গেল; মাছি সকল আর, কোনও মতে, উড়িতে পারিল না; এবং, আর যে উড়িয়া যাইতে পারিবেক, তাহারও প্রত্যাশা রহিল না। তখন তাহারা, আপনাদিগকে ধিক্কার দিয়া, আক্ষেপ করিয়া, কহিতে লাগিল, আমরা কি নির্বোধ; ক্ষণিক সুখের জন্যে, প্রাণ হারাইলাম।

মৃণ্ময় ও কাংস্যময় পাত্র

মৃণ্ময় ও কাংস্যময় পাত্র

এক মৃণ্ময় পাত্র ও এক কাংস্য পাত্র নদীর স্রোতে ভাসিয়া যাইতেছিল। কাংস্যপাত্র মৃণ্ময়পাত্রকে কহিল, অহে মৃণ্ময় পাত্র! তুমি আমার নিকটে থাক, তাহা হইলে, আমি তোমার রক্ষা করিতে পারিব। তখন মৃণ্ময় পাত্র কহিল, তুমি যে এরূপ প্রস্তাব করিলে, তাহাতে আমি অতিশয় উপকৃত হইলাম। কিন্তু, আমি, যে আশঙ্কায়, তোমার তফাতে থাকিতেছি, তোমার নিকটে গেলে, আমার তাহাই ঘটিবেক। তুমি অনুগ্রহ করিয়া, তফাতে থাকিলেই, আমার মঙ্গল। কারণ, আমরা উভয়ে একত্র হইলে, আমারই সর্ব্বনাশ। তোমার আঘাত লাগিলে, আমিই ভাঙ্গিয়া যাইব।

প্রবল প্রতিবেশীর নিকটে থাকা পরামর্শসিদ্ধ নহে; বিবাদ উপস্থিত হইলে, দুর্ব্বলের সর্বনাশ।

মেষপালক ও নেকড়ে বাঘ

মেষপালক ও নেকড়ে বাঘ

এক মেষপালক, একটি মেষ কাটিয়া, পাক করিয়া, আত্মীয়দিগের সহিত, আহার ও আমোদ আহ্লাদ করিতেছে; এমন সময়ে, এক নেকড়ে বাঘ, নিকট দিয়া, চলিয়া যাইতেছিল। সে,
মেষপালককে, মেষের মাংসভক্ষণে আমোদ করিতে দেখিয়া, কহিল, ভাই হে! যদি আমায় ঐ মেষের মাংস খাইতে দেখিতে; তাহা হইলে, তুমি কতই হঙ্গাম করিতে।

মানুষের স্বভাব এই, অন্যকে যে কর্ম্ম করিতে দেখিলে, গালাগালি দিয়া থাকে, আপনারা সেই কর্ম্ম করিয়া দোষ বোধ করে না।

রাখাল ও ব্যাঘ্র

রাখাল ও ব্যাঘ্র

এক রাখাল কোনও মাঠে গরু চরাইত। ঐ মাঠের নিকটবর্তী বনে বাঘ থাকিত। রাখাল, তামাসা দেখিবার নিমিত্ত, মধ্যে মধ্যে, বাঘ আসিয়াছে বলিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে, চীৎকার করিত। নিকটস্থ লোকেরা, বাঘ আসিয়াছে শুনিয়া, অতিশয় ব্যস্ত হইয়া, তাহার সাহায্যের নিমিত্ত, তথায় উপস্থিত হইত। রাখাল, দাঁড়াইয়া, খিল খিল করিয়া হাসিত। আগত লোকেরা, অপ্রস্তুত হইয়া, চলিয়া যাইত।
অবশেষে, এক দিন, সত্য সত্যই, বাঘ আসিয়া তাহার পালের গরু আক্রমণ করিল। তখন রাখাল, নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া, বাঘ আসিয়াছে বলিয়া, উচ্চৈঃ স্বরে, চীৎকার করিতে লাগিল। কিন্তু, সে দিন, এক প্রাণীও, তাহার সাহায্যের নিমিত্ত, উপস্থিত হইল না। সকলেই মনে করিল, ধূর্ত্ত রাখাল, পূর্ব্ব পূর্ব্ব বারের মত, বাষ আসিয়াছে বলিয়া, আমাদের সঙ্গে তামাসা করিতেছে। বাঘ ইচ্ছামত পালের গরু নষ্ট করিল, এবং, অবশেষে, রাখালে প্রাণসংহার করিয়া চলিয়া গেল। নির্ব্বোধ রাখাল, সকলকে এই উপদেশ দিয়া, প্রাণত্যাগ করিল যে, মিথ্যাবাদীরা সত্য কহিলেও, কেহ বিশ্বাস করে না।

রোগী ও চিকিৎসক

রোগী ও চিকিৎসক

কোনও চিকিৎসক, কিছু দিন, এক রোগীর চিকিৎসা করিয়াছিলেন। সেই চিকিৎসকের
হস্তেই, ঐ রোগীর মৃত্যু হয়। তাহার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার সময়, চিকিৎসক, তাহার আত্মীয়গণের নিকটে উপস্থিত হইয়া, আক্ষেপ করিয়া কহিলেন, আহা! যদি এই ব্যক্তি আহারাদির নিয়ম করিয়া চলিতেন, সর্ব্বদা সকল বিষয়ে অত্যাচার না করিতেন, তাহা হইলে, ইঁহার অকালে মৃত্যু ঘটিত না। তখন মৃত ব্যক্তির এক আত্মীয় কহিলেন, কবিরাজ মহাশয়। আপনি যাহা আজ্ঞা করিতেছেন, তাহা যথার্থ বটে। কিন্তু, এক্ষণে, আপনকার এ উপদেশের কোনও ফল দেখিতেছি না। যখন সে ব্যক্তি জীবিত ছিলেন, এবং, আপনার উপদেশ অনুসারে, চলিতে পারিতেন, তখন তাঁহাকে এরূপ উপদেশ দেওয়া উচিত ছিল।

সময় বহিয়া গেলে উপদেশ দেওয়া বৃথা।

লবণবাহী বলদ

লবণবাহী বলদ

এক ব্যক্তি লবণের ব্যবসায় করিত। কোনও স্থানে লবণ সস্তা বিক্রীত হইতেছে শুনিয়া, সে তথায় উপস্থিত হইল, এবং কিছু লবণ কিনিয়া, বলদের পৃষ্ঠে বোৰাই করিয়া, লইয়া চলিল। পূর্ব্ব পূর্ব্ব বারে, সে যত বোঝাই করিত, এ বারে, তাহা অপেক্ষা অনেক অধিক বোৰাই করিয়াছিল; এজন্য, বলদ অতিশয় কাতর হইয়াছিল।

পথের ধারে এক নালা ছিল। ঐ নালায় অনেক জল থাকিত। নালার উপর এক সাঁক
ছিল। সেই সাঁকর উপর দিয়া, সকলে যাতায়াত করিত। বলদ, ইচ্ছা করিয়া, সেই সাঁকর উপর হইতে, নালায় পড়িয়া গেল। নালায় পড়িয়া যাওয়াতে, অধিকাংশ লবণ, জল লাগিয়া, গলিয়া গেল। বলদের ভারের অনেক লাঘব হইল; তখন সে, অকাতরে, চলিয়া যাইতে লাগিল।

ঐ ব্যক্তি, আর এক দিবস, সেই বলদ লইয়া, লবণ কিনিতে গিয়াছিল। সে দিবসও, ঐ বলদের পৃষ্ঠে অধিক ভার চাপাইল; বলদও, পুনরায়, ছল করিয়া, ঐ নালায় পড়িয়া গেল। এই রূপে, দুই দিন, অতিশয় ক্ষতি হইলে, ব্যবসায়ী ব্যক্তি বুঝিতে পারিল, বলদ, কেবল দুষ্টতা করিয়া, আমার ক্ষতি করিতেছে; অতএব, ইহাকে দুষ্টতার প্রতিফল দিতে হইল। এই স্থির করিয়া, সে ব্যক্তি, ঐ বলদ লইয়া, তূল কিনিতে গেল; এবং, তূল কিনিয়া,বলদের পৃষ্ঠে চাপাইয়া, লইয়া চলিল। বলদ, পূর্ব্ববৎ, ভার কমাইবার অভিপ্রায়ে, নালায় পড়িয়া গেল।

ব্যবসায়ী ব্যক্তি, পূর্ব্ব পূর্ব্ব বারে, লবণ গলিয়া যাইবার ভয়ে, যত শীঘ্র পারে, বলদকে উঠাইত; এ বারে, অনেক বিলম্ব করিয়া উঠাইল। অনেক বিলম্ব হওয়াতে, তূল ভিজিয়া অতিশয় ভারী হইল। সে, সমুদয় ভিজা তূল বলদের পৃষ্ঠে চাপাইয়া, লইয়া চলিল। সুতরাং, সে দিবস, নালায় পড়িবার পূর্ব্বে, বলদকে যত ভার বহিতে হইয়াছিল, নালায় পড়িয়া, তাহার দ্বিগুণ অপেক্ষা অধিক ভার বহিতে হইল।

সকল সময়ে এক ফিকির খাটে না।

লাঙ্গূলহীন শৃগাল

লাঙ্গূলহীন শৃগাল

কোনও সময়ে, এক শৃগাল ফাঁদে পড়িয়াছিল। যাহারা ফাঁদ পাতিয়াছিল, তাহারা তাহার প্রাণবধের উদ্যম করিল; কিন্তু, তাহার কাতরতা দেখিয়া, প্রাণে না মারিয়া, লাঙ্গুল কাটিয়া, ছাড়িয়া দিল। শৃগাল, লাঙ্গূল দিয়া, প্রাণ বাঁচাইল বটে; কিন্তু, লাঙ্গুল না থাকাতে, স্বজাতির নিকট যে অপমানবোধ হইবেক, তাহা ভাবিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিল, লাঙ্গূল যাওয়া অপেক্ষা, আমার প্রাণ যাওয়া ভাল ছিল।

পরিশেষে, এই অপমান শুধরিয়া লইবার জন্য, সকল শৃগালকে একত্র করিয়া, সে কহিতে লাগিল, দেখ, ভাই সকল! আমার ইচ্ছা এই, তোমরা সকলে, আমার মত, স্ব স্ব লাঙ্গূল কাটিয়া ফেল। লাঙ্গূল না থাকাতে, আমি যেরূপ স্বচ্ছন্দ শরীরে বেড়িয়া বেড়াইতেছি, তোমরা কেহই তাহা অনুভব করিতে পারিতেছ না। যদি পরীক্ষা করিয়া না দেখিতাম, বোধ করি, আমিও কখনও বিশ্বাস করিতাম না। বিবেচনা করিয়া দেখিলে; লাঙ্গূল থাকিলে, অতি কদর্য্য দেখায়, পদে পদে, যার পর নাই অসুবিধা ঘটে। ফলকথা এই, লাঙ্গুল রাখায়, অনর্থক ভার বহিয়া বেড়ান মাত্র লাভ। আমার আশ্চর্য্য বোধ হইতেছে যে, আমরা এত দিন লাঙ্গুল রাখিয়াছি কেন। হে বন্ধুগণ! আমি স্বয়ং, যার পর নাই, উপকার বোধ করিয়াছি; এজন্য, তোমাদিগকে পরামর্শ দিতেছি, তোমরাও, আমার মত, আপন আপন লাঙ্গুল কাটিয়া ফেল। লাঙ্গুল না থাকায় কত আরাম, এখনই বুঝিতে পারিবে।

এই প্রস্তাব শুনিয়া, এক বৃদ্ধ শৃগাল, অগ্রসর হইয়া, লাঙ্গুলহীন শৃগালকে কহিল, ভাই হে! যদি তোমার লাঙ্গুল ফিরিয়া পাইবার সম্ভাবনা থাকিত, তাহা হইলে, তুমি, কদাচ, আমাদিগকে লাঙ্গুল কাটিয়া ফেলিতে পরামর্শ দিতে না।

শশকগণ ও ভেকগণ

শশকগণ ও ভেকগণ

শশকজাতি অতি ক্ষীণজীবী ও নিতান্ত ভীরুস্বভাব জন্তু। প্রবল জন্তুগণ, দেখিতে পাইলেই, তাহাদের প্রাণবধ করিয়া, মাংস ভক্ষণ করে। এই দৌরাত্ম্য বশতঃ, তাহাদিগকে, প্রাণভয়ে, সর্ব্বদা সশঙ্কিত থাকিতে হয়। এজন্য এক দিন, তাহারা পরামর্শ করিয়া স্থির করিল, সর্ব্বদা সশঙ্কিত থাকিয়া প্রাণধারণ করা অপেক্ষা, প্রাণত্যাগ করাই শ্রেয়ঃ। অতএব, যেরূপে হউক, অদ্যই আমরা প্রাণত্যাগ করিব।

এই প্রতিজ্ঞা করিয়া, নিকটবর্ত্তী হ্রদে ঝাঁপ দিয়া প্রণত্যাগ করিবার মানসে, সকলে মিলিয়া তথায় উপস্থিত হইল। কতকগুলি ভেক সেই হ্রদের তীরে বসিয়াছিল; তাহারা, শশকগণ নিকটবর্ত্তী হইবা মাত্র, ভয়ে নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া, জলে লাফাইয়া পড়িল। ইহা দেখিয়া, সকলের অগ্রসর শশক স্বীয় সহচরদিগকে কহিল, দেখ, বন্ধুগণ! আমরা যত ভয় পাইয়াছি, যত নিরুপায় ভাবিয়াছি, তত করা উচিত নয়। তোমরা, এখানে আসিয়া, কতকগুলি প্রাণী দেখিলে; ইহারা আমাদের অপেক্ষাও ক্ষীণজীবী ও ভীরুস্বভাব।

তোমার অবস্থা যত মন্দ হউক না কেন, অন্যের অবস্থা এত মন্দ আছে যে, তাহার সহিত তুলনা করিলে, তোমার অবস্থা অনেক ভাল বোধ হইবেক।

শিকারি কুকুর

শিকারি কুকুর

এক ব্যক্তির একটি অতি উত্তম শিকারি কুকুর ছিল। তিনি যখন শিকার করিতে যাইতেন, কুকুরটি সঙ্গে থাকিত। ঐ কুকুরের বিলক্ষণ বল ছিল; শিকারের সময়, কোনও জন্তুকে দেখাইয়া দিলে, সে সেই জন্তুর ঘাড়ে এমন কামড়াইয়া ধরিত যে, উহা আর পলাইতে পারিত না। যত দিন তাহার শরীরে বল ছিল, সে, এই রূপে, আপন প্রভুর যথেষ্ট উপকার করিয়াছিল।

কালক্রমে, ঐ কুকুর, বৃদ্ধ হইয়া, অতিশয় দুর্ব্বল হইয়া পড়িল। এই সময়ে, তাহার প্রভু, এক দিন, তাহাকে সঙ্গে লইয়া, শিকার করিতে গেলেন। এক শূকর, তাঁহার সম্মুখ হইতে, দৌড়িয়া পলাইতে লাগিল। শিকারি ব্যক্তি ইঙ্গিত করিবা মাত্র, কুকুর, প্রাণপণে দৌড়িয়া গিয়া, শূকরের ঘাড়ে কামড়াইয়া ধরিল; কিন্তু, পূর্ব্বের, মত বল ছিল না, এজন্য, ধরিয়া রাখিতে পারিল না; শূকর অনায়াসে ছাড়াইয়া চলিয়া গেল।

শিকারি ব্যক্তি, ক্রোধে অন্ধ হইয়া, কুকুরকে তিরস্কার ও প্রহার করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন কুকুর কহিল, মহাশয়! বিনা অপরাধে, আমায় তিরস্কার ও প্রহার করেন কেন। মনে করিয়া দেখুন, যত দিন আমার বল ছিল, প্রাণপণে, আপনকার কত উপকার করিয়াছি। এক্ষণে, বৃদ্ধ হইয়া, নিতান্ত দুর্ব্বল ও অক্ষম হইয়া পড়িয়াছি বলিয়া, তিরস্কার ও প্রহার করা উচিত নহে।

শৃগাল ও কৃষক

শৃগাল ও কৃষক

ব্যাধগণে ও তাহাদের কুকুরে তাড়াতাড়ি করাতে এক শৃগাল, অতি দ্রুত দৌড়িয়া গিয়া, কোন কৃষকের নিকট উপস্থিত হইল, এবং কহিল
ভাই! যদি তুমি কৃপা করিয়া আশ্রয় দাও, তবে, এ যাত্রা, আমার পরিত্রাণ হয়। কৃষক কহিল, তোমার ভয় নাই, আমার কুটীরে লুকাইয়া থাক। এই বলিয়া, সে আপন কুটীযর দেখাইয়া দিল। শৃগাল, কুটীরে প্রবেশ করিয়া, এক কোণে লুকাইয়া রহিল। ব্যাধেরাও, অবিলম্বে, তথায় উপস্থিত হইয়া, কৃষককে জিজ্ঞাসিল, অহে ভাই! এ দিকে একটা শিয়াল আসিয়াছিল, কোন দিকে গেল, বলিতে পার। সে, কিছুই না বলিয়া, কুটীরের দিকে অঙ্গুলিপ্রয়োগ করিল। তাহারা, কৃষকের সঙ্কেত বুঝিতে না পারিয়া, চলিয়া গেল।

ব্যাধের প্রস্থান করিলে পর, শৃগাল, কুটীর হইতে বহির্গত হইয়া, চুপে চুপে চলিয়া যাইতে লাগিল। ইহা দেখিয়া, কৃষক, ভর্ৎসনা করিয়া, শৃগালকে কহিল, যা হউক, ভাই! তুমি বড় ভদ্র; আমি, বিপদের সময়, আশ্রয় দিয়া, তোমার প্রাণরক্ষা করিলাম। কিন্তু, তুমি, যাইবার সময়, আমায় একটা কথার সম্ভাষণও করিলে না। শৃগাল কহিল, ভাই হে! তুমি ই যেমন ভদ্রতা করিয়াছিলে, যদি অঙ্গলিতেও সেইরূপ ভদ্রতা করিতে, তাহা হইলে, আমিও, তোমার নিকট বিদায় না লইয়া, কাদাচ, কুটীর হইতে চলিয়া যাইতাম না।

এক কথায় যত মন্দ হয়, এক ইঙ্গিতেও তত মন্দ হইতে পারে

শৃগাল ও সারস

শৃগাল ও সারস

এক দিবস, এক শৃগাল এক সারসকে বলিল, ভাই! কাল তোমায় আমার আলয়ে আহার করিতে হইবেক। সারস সম্মত, ও পর দিন, যখাকালে, শৃগালের আলয়ে উপস্থিত হইল। উপহাস করিয়া, আমোদ করিবার নিমিত্ত, শৃগাল, অন্য কোনও আয়োজন না করিয়া, থালায় কিঞ্চিৎ ঝোল ঢালিয়া, সারসকে আহার করিতে বলিল, এবং আপনিও আহার করিতে বসিল। শৃগাল, জিহবা দ্বারা, অনায়াসেই, খালার ঝোল চাটিয়া খাইতে লাগিল। কিন্তু, সারসের ঠোট অতিশয় সরু ও লম্বা; সুতরাং, সে কিছুই আহার করিতে পারিল না, চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। আহারে বসিবার সময়, তাহার যেরূপ ক্ষুধা ছিল সেইরূপই রহিল, কিছুমাত্র নিবৃত্ত হইল না।

সারসকে আহারে বিরত দেখিয়া, শৃগাল ক্ষোভপ্রকাশ করিয়া কহিল, ভাই! তুমি ভাল করিয়া আহার করিলে না; ইহাতে আমি অতিশয় দুঃখিত হইলাম। বোধ করি, আহারের দ্রব্য সুস্বাদ হয় নাই, তাই ভাল করিয়া আহার করিলে না। সারস শুনিয়া, উপহাস বুঝিতে পারিয়া, তখন কোনও উক্তি করিল না; কিন্তু, শৃগালকে জব্দ করিবার নিমিত্ত, যাইবার সময় কহিল, ভাই! কাল তোমায়, আমার ওখানে গিয়া, আহার করিতে হইবেক। শৃগাল সম্মত হইল।

পর দিন, যথাকালে, শৃগাল সারসের আলয়ে উপস্থিত হইলে, সারস, এক গলাসরু পাত্রে আহারসামগ্রী রাখিয়া, শৃগালের সম্মুখে ধরিল, এবং, আইস, ভাই! ভোজন করি, এই বলিয়া, আহার করিতে বসিল। সারস, আপন সরু লম্বা ঠোট, অনায়াসে, পাত্রের মধ্যে প্রবিষ্ট করিয়া, আহার করিতে লাগিল। কিন্তু, শৃগাল, কোনও মতে, পাত্রের মধ্যে মুখ প্রবিষ্ট করিতে পারিল না; কেবল, ক্ষুধায় ব্যাকুল হইয়া, সেই পাত্রের গাত্র চাটিতে লাগিল। পরে, আহার সমাপ্ত হইলে, বিরক্তি প্রকাশ না করিয়া, সে এই বলিতে বলিতে চলিয়া গেল, আমি, কোনও মতে, সারসকে দোষ দিতে পারি না। আমি যে পথে চলিয়াছিলাম, সারসও সেই পথে চলিয়াছে।

সারসী ও তাহার শিশু সন্তান

সারসী ও তাহার শিশু সন্তান

এক সারসী, শিশু সন্তানগুলি লইয়া, কোনও ক্ষেত্রে বাস করিত। ঐ ক্ষেত্রের শষ্য সকল পাকিয়া উঠিলে, সারসী বুঝিতে পারিল, অতঃপর, কৃষকেরা শস্য কাটিতে আরম্ভ করিবেক। এই নিমিত্ত, প্রতিদিন, আহারের অন্বেষণে, বাহিরে যাইবার সময়, সে শিশু সন্তানদিগকে বলিয়া যাইত, তোমরা, আমার আসিবার পূর্বে, যাহা কিছু শুনিবে, আমি আসিবা মাত্র, সে সমুদয় অবিকল আমায় বলিবে।

এক দিন, সারসী বাসা হইতে বহির্গত হইআছে, এমন সময়ে, ক্ষেত্রস্বামী, শস্য কাটিবার সময় হইয়াছে কি না, বিবেচনা করিয়া দেখিবার নিমিত্ত, তথায় উপস্থিত হইল, এবং চারি দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিল, শস্য সকল পাকিয়া উঠিয়াছে, আর কাটিতে বিলম্ব করা উচিত নয়। অমুক অমুক প্রতিবেশীর উপর ভর দি, তাহারা কাটিয়া দিবেক। এই বলিয়া সে চলিয়া গেল।

সারসী বাসায় আসিলে, তাহার সন্তানের ঐ সকল কথা জানাইল, এবং কহিল, মা! তুমি আমাদিগকে শীঘ্র স্থানান্তরে লইয়া যাও। আর তুমি, আমাদিগকে এখানে রাখিয়া, বাহিরে যাইও না। যাহারা শস্য কাটিতে আসিবেক, তাহারা, দেখিলেই, আমাদের প্রাণবধ করিবেক। সারসী কহিল, বাছা সকল! তোমরা এখনই ভয় পাইতেছ কেন। ক্ষেত্রস্বামী যদি, প্রতিবেশীদিগের উপর ভর দিয়া, নিশ্চিন্ত থাকে, তাহা হইলে, শস্য কাটিতে আসিবার অনেক বিলম্ব আছে।

পর দিবস, ক্ষেত্রস্বামী পুনরায় উপস্থিত হইল; দেখিল, যাহাদের উপর ভার দিয়াছিল, তাহারা শস্য কাটিতে আইসে নাই। কিন্তু, শস্য সকল সম্পূর্ণ পাকিয়া উঠিয়াছিল; অতঃপর না কাটিলে, হানি হইতে পারে; এই নিমিত্ত, সে কহিল, আর সময় নষ্ট করা হয় না; প্রতিবেশীদিগের উপর ভর দিয়া নিশ্চিন্ত থাকিলে, বিস্তর ক্ষতি হইবেক। আর তাহাদের ভরসায় না থাকিয়া, আপন ভাই বন্ধু দিগকে বলি, তাহারা সত্বর কাটিয়া দিবেক। এই বলিয়া, সে আপন পুত্ত্রের দিকে মুখ ফিরাইয়া কহিল, তুমি তোমার খুড়াদিগকে আমার নাম করিয়া বলিবে, যেন তাহারা, সকল কর্ম্ম রাখিয়া, কাল সকালে আসিয়া, শস্য কাটিতে আরম্ভ করে। এই বলিয়া, ক্ষেত্রস্বামী চলিয়া গেল।

সারসশিশুগণ শুনিয়া অতিশয় ভীত হইল, এবং, সারসী আসিবা মাত্র, কাতর বাক্যে কহিতে লাগিল, মা! আজ ক্ষেত্রস্বামী আসিয়া এই এই কথা বলিয়া গিয়াছে। তুমি আমাদের একটা উপায় কর। কাল তুমি, আমাদিগকে এখানে ফেলিয়া, যাইতে পারিবে না। যদি যাও, আসিয়া আর আমাদিগকে দেখিতে পাইবে না। সারসী, শুনিয়া, ঈষৎ হাস্য করিয়া, কহিল, যদি এই কথা মাত্র শুনিয়া থাক, তাহা হইলে, ভয়ের বিষয় নাই। যদি ক্ষেত্রস্বামী, ভাই বন্ধু দিগের উপর ভর দিয়া, নিশ্চিন্ত থাকে, তাহা হইলে, শস্য কাটিতে আসিবার, এখনও, অনেক বিলম্ব আছে। তাহাদেরও শস্য পাকিয়া উঠিয়াছে। তাঁহারা, আগে আপনাদের শস্য না কাটিয়া, কখনও, ইহার শস্য কাটিতে আসিবেক না। কিন্তু, ক্ষেত্রস্বামী, কাল সকালে আসিয়া, যাহা কহিবেক, তাহা মন দিয়া শুনিও, এবং আমি আসিলে, বলিতে ভুলিও না। পর দিন, প্রত্যুষে, সারসী আহারের অন্বেষণে বহির্গত হইলে, ক্ষেত্রস্বামী তথায় উপস্থিত হইল; দেখিল, কেহই শস্য কাটিতে আইসে নাই; আর, শস্য সকল অধিক পাকিয়াছিল, এজন্য, ঝরিয়া ভূমিতে পড়িতেছে। তখন সে, বিরক্ত হইয়া, আপন পুত্ত্রকে কহিল, দেখ, আর প্রতিবেশীর, অথবা ভাই বন্ধুর, মুখ চাহিয়া থাকা উচিত নহে। আজ রাত্রিতে তুমি, যত জন পাও, ঠিকা লোক স্থির করিয়া রাখিবে। কাল সকালে, তাহাদিগকে লইয়া, আপনারাই কাটিতে আরম্ভ করিব; নতুবা বিস্তর ক্ষতি হইবেক।

সারসী, বাসায় আসিয়া, এই সমস্ত কথা শুনিয়া কহিল, অতঃপর, আর এখানে থাকা হয় না; এখন অন্যত্র যাওয়া কর্তব্য। যখন কেহ, অন্যের উপর ভর দিয়া, নিশ্চিন্ত না থাকিয়া, স্বয়ং আপন কর্ম্মে মন দেয়, তখন ইহা স্থির জানা উচিত, যে, সে যথার্থই ঐ কর্ম্ম সম্পন্ন করা মনস্থ করিয়াছে।

সিংহ ও অন্য অন্য জন্তুর শিকার

সিংহ ও অন্য অন্য জন্তুর শিকার

সিংহ ও আর কতিপয় জন্তু মিলিয়া শিকার করিতে গিয়াছিল। তাহারা, নানা বনে ভ্রমণ করিয়া, অবশেষে, এক বৃহৎ হরিণ শিকার করিল। ভাগের সময় উপস্থিত হইলে, সিংহ কহিল, তোমাদিগকে ব্যস্ত হইতে হইবেক না; আমি যথাযোগ্য ভাগ করিয়া দিতেছি। এই
বলিয়া, সেই হরিণকে সমান তিন অংশে বিভক্ত করিয়া, সিংহ কহিল, দেখ, প্রথম ভাগ আমি লইব, কারণ, আমি সকল পশুর রাজা; আর, আমি শিকারে যে পরিশ্রম করিয়াছি, সেই পরিশ্রমের পুরস্কার স্বরূপ, দ্বিতীয় ভাগ লইব; তৃতীয় ভাগের বিষয়ে আমার বক্তব্য এই, যাহার ক্ষমতা থাকে সে লউক। অন্য অন্য পশুরা, সিংহের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া, এই ভাবিতে ভাবিতে চলিয়া গেল, প্রবল লোকেরা স্বার্থপর ও বিবেচনাশূন্য হইলে, দুর্ব্বলের পক্ষে এইরূপ বিচারই হইয়া থাকে।

সিংহ ও ইঁদুর

সিংহ ও ইদুর

এক সিংহ, পর্ব্বতের গুহায়, নিদ্রা যাইতেছিল। দৈবাৎ, একটা ইঁদুর, সেই দিক দিয়া যাইতে যাইতে, সিংহের নাসারন্ধ্রে প্রবিষ্ট হইয়া গেল। প্রবিষ্ট হইবা মাত্র, সিংহের নিদ্রাভঙ্গ হইল। পরে, ইঁদুর নির্গত হইলে, সিংহ, ঈষৎ কুপিত হইয়া, নখরের প্রহার দ্বারা, তাহার প্রাণসংহারে
উদ্যত হইল। ইঁদুর, প্রাণভয়ে কাতর হইয়া, বিনয় করিয়া, কহিল, মহারাজ! আমি না জানিয়া অপরাধ করিয়াছি, ক্ষমা করিয়া, আমায় প্রাণদান করুন। আপনি সমস্ত পশুর রাজা; আমার মত ক্ষুদ্র পশুর প্রাণবধ করিলে, আপনকার কলঙ্ক আছে। সিংহ শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিল, এবং, দয়া করিয়া, ইঁদুরকে ছাড়িয়া দিল।

এই ঘটনার কিছু দিন পরে, সিংহ, ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে, এক শিকারির জালে পড়িল; বিস্তর চেষ্টা পাইল, কিছুতেই জাল ছাড়াইতে পারিল না। পরিশেষে, প্রাণরক্ষা বিষয়ে নিতান্ত নিরাশ হইয়া, সে এমন ভয়ঙ্কর গর্জ্জন করিতে লাগিল যে, সমস্ত অরণ্য কম্পিত হইয়া উঠিল।

সিংহ, ইতঃপূর্ব্বে, যে ইঁদুরের প্রাণরক্ষা করিয়াছিল, সে ঐ স্থানের অনতিদূরে বাস করিত। এক্ষণে সে, পূর্ব্ব প্রাণদাতার স্বর চিনিতে পারিয়া, সত্বর সেই স্থানে উপস্থিত হইল, তাহার এই বিপদ দেখিয়া, ক্ষণ মাত্র বিলম্ব না করিয়া, জাল কাটিতে আরম্ভ করিল, এবং, অল্পক্ষণের মধ্যেই, সিংহকে বন্ধন হইতে মুক্ত করিয়া দিল।

কাহারও উপর দয়াপ্রকাশ করিলে, তাহা প্রায় নিষ্ফল হয় না।

যে যত ক্ষুদ্র প্রাণী হউক না কেন, উপকৃত হইলে, কখনও না কখনও, প্রত্যুপকার করিতে পারে।

সিংহ ও তিন বৃষ

সিংহ ও তিন বৃষ

তিন বৃষের পরস্পর অতিশয় সম্প্রীত ছিল। তাহারা নিয়ত, এক মাঠে, এক সঙ্গে, চরিয়া বেড়াইত। এক সিংহ সর্ব্বদাই এই ইচ্ছা কল্পিত, এই তিন বৃষের প্রাণবধ করিয়া, মাংসভক্ষণ করিব। কিন্তু, উহারা এমন বলবান যে, তিন একত্র থাকিলে, সিংহ, আক্রমণ করিয়া, কিছু করিতে পারে না। এজন্য, সে মনে মনে বিবেচনা করিল, যাহাতে ইহারা পৃথক পৃথক চরে, এমন কোনও উপায় করি। পরে, কৌশল করিয়া, সে উহাদের মধ্যে এমন বিরোধ ঘটাইয়া দিল যে তিনের আর পরস্পর মুখ দেখাদেখি পর্য্যন্ত রহিল না। তখন তাহারা, পরস্পর
দূরে, পৃথক পৃথক স্থানে, চরিতে আরম্ভ করিল। সিংহও, এই সুযোগ পাইয়া, একে একে, তিনের প্রাণসংহার করিয়া, ইচ্ছামত আহার করিল।

বন্ধুদিগের পরস্পর বিরোধ শক্রর আনন্দের নিমিত্ত।

সিংহ ও নেকড়ে বাঘ

সিংহ ও নেকড়ে বাঘ

এক দিন, এক নেকড়ে বাঘ, খোঁয়াড় হইতে একটি মেষশাবক লইয়া, যাইতেছিল। পথিমধ্যে, এক সিংহের সহিত সাক্ষাৎ হওয়াতে, সিংহ, বল পূর্ব্বক, ঐ মেষশাবক কাড়িয়া লইল। নেকড়ে, কিয়ৎ ক্ষণ, স্তব্ধ হইয়া রহিল; পরে কহিল, এ অতি অবিচার; তুমি, অন্যায় করিয়া, আমার বস্তু কাড়িয়া লইলে। সিংহ, শুনিয়া, ঈষৎ হাস্য করিয়া, কহিল, তুমি যেরূপ কথা কহিতেছ, তাহাতে আমার বোধ হইতেছে, তুমি এই মেষশাবক অন্যায় করিয়া আন নাই; মেষপালক তোমায় উপহার দিয়াছিল।

সিংহ ও মহিষ

সিংহ ও মহিষ

একদা, এক সিংহ ও এক মহিষ, পিপাসায় কাতর হইয়া, এক সময়ে, এক খালে, জলপান করিতে গিয়াছিল। উভয়ে সাক্ষাৎ হওয়াতে, কে আগে জলপান করিবেক, এই বিষয় লইয়া, পরস্পর বিবাদ উপস্থিত হইল। উভয়েই প্রতিজ্ঞা করিল, প্রাণ যায় তাহাও স্বীকার, তথাপি বিপক্ষকে অগ্রে জলপান করিতে দিব না; সুতরাং, উভয়ের যুদ্ধ ঘটিবার উপক্রম হইয়া উঠিল।

এই সময়ে তাহারা, ঊর্দ্ধে দৃষ্টিপাত করিয়া, দেখিতে পাইল, কতকগুলি কাক ও শকুনি তাহাদের মস্তকের উপর উড়িতেছে; দেখিয়া বুঝিতে পারিল, যুদ্ধে যাহার প্রাণত্যাগ হইবেক, তাহার মাংস খাইবেক বলিয়া, উহারা উড়িয়া বেড়াইতেছে। তখন তাহাদের বুদ্ধির উদয় হইল; এবং পরস্পর কহিতে লাগিল, আইস ভাই! ক্ষান্ত হই, আর বিবাদে কাজ নাই। অনর্থক বিবাদ করিয়া, কাক ও শকুনির আহার হওয়া অপেক্ষা, সুহৃদ্ভাবে জলপান করিয়া চলিয়া যাওয়া ভাল।

সিংহ, গর্দ্দভ ও শৃগালের শিকার

সিংহ, গর্দ্দভ, ও শৃগালের শিকার

এক সিংহ, এক গর্দ্দভ, এক শৃগাল, এই তিনে মিলিয়া শিকার করিতে গিয়াছিল। শিকার সমাপ্ত হইলে পর, তাহারা, যথাযোগ্য ভাগ করিয়া লইয়া, ইচ্ছামত আহার করিবার মানস করিল। সিংহ গর্দ্দভকে ভাগ করিতে আজ্ঞা দিল। তদনুসারে, গর্দ্দভ, তিন ভাগ সমান করিয়া, স্বীয় সহচরদিগকে এক এক ভাগ লইতে বলিল। সিংহ, অতিশয় কুপিত হইয়া, নখরপ্রহার দ্বারা, গর্দ্দভকে তৎক্ষণাৎ খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলিল।

পরে, সিংহ শৃগালকে ভাগ করিতে বলিল। শৃগাল অতি ধূর্ত্ত, গর্দ্দভের ন্যায় নির্ব্বোধ নহে। সে, সিংহের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া, সিংহের ভাগে সমুদয় রাখিয়া, আপন ভাগে কিঞ্চিৎ মাত্র রাখিল। তখন, সিংহ সন্তুষ্ট হইয়া কহিল, সখে! কে তোমায় এরূপ ন্যায্য ভাগ করিতে শিখাইল? শৃগাল কহিল, যখন গর্দ্দভের দশা স্বচক্ষে দেখিলাম, তখন আর অপর শিক্ষার প্রয়োজন কি।

সিংহ, ভালুক ও শৃগাল

সিংহ, ভালুক, ও শৃগাল

কোনও স্থানে, মৃত হরিণশিশু পতিত দেখিয়া, এক সিংহ ও এক ভালুক, উভয়েই কহিতে লাগিল, এ হরিণশিশু আমার। ক্রমে বিবাদ উপস্থিত হইয়া, উভয়ের যুদ্ধ উপস্থিত হইল। অনেক ক্ষণ যুদ্ধ হওয়াতে, উভয়েই অতিশয় ক্লান্ত ও নিতান্ত নির্জীব হইয়া পড়িল; উভয়েরই আর নড়িবার ক্ষমতা রহিল না। এই সুযোেগ পাইয়া, এক শৃগাল আসিয়া, মৃত হরিণশিশু মুখে করিয়া, নির্বিঘ্নে চলিয়া গেল। তখন তাহারা উভয়ে, আক্ষেপ করিয়া, কহিতে লাগিল, আমরা অতি নির্বোধ, সর্ব্ব শরীর ক্ষতবিক্ষত করিয়া,
এবং নিতান্ত নির্জীব হইয়া, এক ধূর্ত্তের আহারের যোগাড় করিয়া দিলাম।

সিংহ, শৃগাল, ও গর্দ্দভ

সিংহ, শৃগাল, ও গর্দ্দভ

এক গর্দ্দভ ও একশৃগাল, উভয়ে মিলিয়া, শিকার করিতে যাইতেছিল। কিয়ৎ দূর গিয়া, তাহারা দেখিতে পাইল, কিঞ্চিৎ অন্তরে এক সিংহ বসিয়া আছে। শৃগাল, এই বিপদ উপস্থিত দেখিয়া, সত্বর সিংহের নিকটবর্ত্তী হইল, এবং, আস্তে আস্তে, কহিতে লাগিল, মহারাজ! যদি আপনি, কৃপা করিয়া, আমায় প্রাণদান দেন, তাহা হইলে, আমি গর্দ্দভকে আপনকার হস্তগত করিয়া দি। সিংহ সম্মত হইল। শৃগাল, কৌশল করিয়া, গর্দ্দভকে সিংহের হস্তগত করিয়া দিল। সিংহ, গর্দভকে হস্তগত করিয়া লইয়া, শৃগালের প্রাণবধ করিয়া, সে দিনের আহার সম্পন্ন করিল, গর্দ্দভকে, পর দিনের আহারের জন্যে, রাখিয়া দিল।

পরের মন্দ করিতে গেলে, আপনার মন্দ আগে হয়।

সিংহচর্ম্মাবৃত গর্দ্দভ

সিংহচর্ম্মাবৃত গর্দ্দভ

এক গর্দ্দভ, সিংহের চর্ম্মে সর্ব্ব শরীর আবৃত করিয়া, মনে ভাবিল, অতঃপর আমায় সকলেই সিংহ মনে করিবেক, কেহই গর্দ্দভ বলিয়া বুঝিতে পারিবেক না। অতএব, আজ অবধি, আমি এই বনে, সিংহের ন্যায়, আধিপত্য করিব। এই স্থির করিয়া, কোনও জন্তুকে সম্মুখে দেখিলেই, সে চীৎকার ও লম্ফ ঝম্ফ করিয়া ভয় দেখায়। নির্ব্বোধ জন্তুরা, তাহাকে সিংহ মনে করিয়া, ভয়ে পলাইয়া যায়। এক দিবস, এক শৃগালকে ঐ রূপে ভয় দেখাইলে, সে কহিল, অরে গর্দ্দভ! আমার কাছে তোর চালাকি খাটিবেক না। আমি যদি তোর স্বর না চিনিতাম, তাহা হইলে, সিংহ ভাবিয়া, ভয় পাইতাম।

হরিণ

হরিণ

এক হরিণ খালে জলপান করিতে গিয়াছিল। জলপান করিবার সময়ে, জলে তাহার শরীরের প্রতিবিম্ব পড়িয়াছিল। সেই প্রতিবিম্বে দৃষ্টিপাত করিয়া, হরিণ কহিল, আমার শৃঙ্গ যেমন দৃঢ়, তেমনই সুন্দর; কিন্তু, আমার পা দেখিতে অতি কদর্য্য ও অকর্মণ্য। হরিণ, এই রূপে, আপন অবয়বের দোষ ও গুণের বিবেচনা করিতেছে, এমন সময়ে, ব্যাধেরা আসিয়া তাড়া করিল। সে, প্রাণভয়ে, এত বেগে পলায়িতে লাগিল যে, ব্যাধেরা অনেক পশ্চাতে পড়িল। কিন্তু, জঙ্গলে প্রবেশ করিবা মাত্র, তাহার শৃঙ্গ লতায়।
এমন জড়াইয়া গেল যে, আর সে পলায়ন করিতে পারিল না। তখন ব্যাধেরা আসিয়া তাহার প্রাণবধ করিল। হরিণ, এই বলিয়া, প্রাণত্যাগ করিল যে, আমি, যে অবয়বকে কদর্ঘ্য ও অকর্মণ্য স্থির করিয়া, অসন্তুষ্ট হইয়াছিলাম, উহা আমায় শত্রুহস্ত হইতে বাঁচাইয়াছিল; কিন্তু, যে অবয়বকে দৃঢ় ও সুন্দর বোধ করিয়া, সন্তুষ্ট হইয়াছিলাম, তাহাই আমার প্রাণনাশের হেতু হইল।

হরিণ ও দ্রাক্ষালতা

হরিণ ও দ্রাক্ষালতা

ব্যাধগণে তাড়াতাড়ি করাতে, এক হরিণ, প্রাণভয়ে পলাইয়া, দ্রাক্ষাবনের মধ্যে লুকাইয়া রহিল,
এবং, ব্যাধেরা আর আমার সন্ধান পাইবেক না, এই স্থির করিয়া, সচ্ছন্দ মনে, দ্রাক্ষালতা খাইতে আরম্ভ করিল। ব্যাধগণ, হরিণের বিষয়ে নিরাশ হইয়া, ঐ দ্রাক্ষাবনের ধার দিয়া, চলিয়া যাইতেছিল। তাহারা, লতাভক্ষণের শব্দ শুনিয়া, বনের দিকে মুখ ফিরাইল, এবং, ঐ স্থানে হরিণ আছে, এই অনুমান করিয়া, শরনিক্ষেপ করিল। সেই শরের আঘাতে, হরিণের মৃত্যু হইল। হরিণ, এই কয়টি কথা বলিয়া, প্রাণত্যাগ করিল যে, যাহারা, বিপদের সময়, আমায় আশ্রয় দিয়াছিল, আমি যে তাহাদের অপকারে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম, তাহার সমুচিত প্রতিফল পাইলাম।