মহাভারত (উপক্রমণিকাভাগ)
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৯৩
প্রকাশনা-তথ্য
মহাভারত।
উপক্রমণিকাভাগ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সঙ্কলিত।
তৃতীয় সংস্করণ।
কলিকাতা
সংস্কৃত যন্ত্র।
বিজ্ঞাপন
মহাভারতের উপক্রমণিকাভাগ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতে ক্রমে ক্রমে প্রকাশিত হইয়াছিল। ইহা পৃথক প্রচারিত হয় আমার এরূপ অভিলাষ ছিল না। অবশেষে কতিপয় বন্ধুর সবিশেষ অনুরোধে পুস্তকাকারে প্রচারিত হইল। পুস্তকাকারে প্রচারিত করিতে গেলে পরিশ্রমসহকারে সংশোধনাদি করা আবশ্যক, কিন্তু অবকাশবিরহাদি কারণ বশতঃ তাহা সম্যক্ সমাহিত হইয়া উঠে নাই; সুতরাং বিশেষজ্ঞ মহাশয়েরা স্থানে স্থানে অশেষ দোষ দর্শন করিবেন, তাহার সন্দেহ নাই।
মহাভারতে নির্দ্দেশ আছে, কেহ প্রথম অবধি, কেহ আস্তীকপর্ব্ব অবধি, কেহ উপরিচর রাজার উপাখ্যান অবধি, ভারতের আরম্ভ বিবেচনা করিয়া থাকেন। যাঁহার শেষ কল্প অবলম্বন করেন, তাঁহাদের মতে উপরিচর রাজার উপাখ্যান অবধি ভারতের প্রকৃত আরম্ভ; সুতরাং তত্তন্মতে তৎপূর্ব্ববর্তী অধ্যায় সকল তদীয় উপক্রমণিকা স্বরূপ। এই পুস্তক ঐ অংশের অনুবাদ মাত্র; এই নিমিত্ত শেষ কল্প অবলম্বন করিয়া অনুবাদিত অংশ উপক্রমণিকাভাগ বলিয়া উল্লিখিত হইল।
মূলগ্রন্থের অবিকল অনুবাদ প্রকাশ করাই তত্ত্ববোধিনী সভার উদ্দেশ্য ছিল, আমিও অনুবাদকালে তদনুরূপ চেষ্টা ও যত্ন করিয়াছিলাম। কিন্তু সভার অভিপ্রায় রক্ষা বিষয়ে কত দূর কৃতকার্য্য হইয়াছি, বলিতে পারা যায় না। যাহা হউক, মূলের সহিত ঐক্য করিয়া দেখিলে অনেক স্থলে অর্থগত ও তাৎপর্য্যনিষ্ঠ বৈলক্ষণ্য লক্ষিত হইবেক, তাহার সংশয় নাই। মূলগ্রন্থে অনেক স্থান এরূপ আছে যে, সহজে অর্থবোধ ও তাৎপর্য্যগ্রহ হওয়া দুর্ঘট। সেই সকল স্থল, অনুধাবন করিয়া অথবা টীকাকরদিগের ব্যাখ্যা দেখিয়া পূর্ব্বাপর যেরূপ বোধ হইয়াছিল, তদনুসারেই অনুবাদিত হইয়াছে; সুতরাং তত্তস্থলের অনুবাদ সর্বসম্মত হওয়া সম্ভাবিত নহে। ফলতঃ নানা কারণ বশতঃ মহাভারতের অনুবাদ নিতান্ত সহজ ব্যাপার নয়।
যাহা হউক, এই পুস্তক পাঠ করিয়া সকলে প্রীত হইবেন, এরূপ প্রত্যাশা করতে পারা যায় না। যদি ইহা পাঠকবিশেষের পক্ষে কিঞ্চিৎ অংশেও প্রীতিপ্রদ হয়, তাহা হইলেই শ্রম সফল বোধ করিব।
কলিকাতা।
সংবৎ ১৯১৬! ১লা মাঘ।
শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা।
অষ্টচত্বারিংশ অধ্যায়
অষ্টচত্বারিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগ ভগিনী জরৎকারু অবিলম্বে ভ্রাতৃ সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া স্বীয় স্বামীর প্রস্থানবৃত্তান্ত যথাতথ নিবেদন করিলেন। ভুজগরাজ এই অতি মহৎ অপ্রিয় শ্রবণে সাতিশয় বিষন্ন হইয়া ভগিনীকে কহিলেন, ভদ্রে? তুমি জান, যে উদ্দেশে তোমায় আমি জরৎকারুক দান করিয়াছিলাম। তাহা কেবল সর্পকুলের হিতার্থে; যদি তাঁহার ঔরসে তোমার পুত্র জন্মে, সেই পুত্র রাজা জনমেজয়ের সপস হইতে আমাদিগের পরিত্রাণ করিবেক। ভগবান্ সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা পূর্ব্বে সর্ব্বসুরসমক্ষে ইহাই কহিয়াছিলেন। অতএব জিজ্ঞাসা করি, তৎসহযোগে তোমার গর্ভসম্ভাবনা হইয়াছে কি না? আমার বাসনা এই, জরৎকারুকে যে ভগিনী দান করিয়াছিলাম, তাহা নিষ্ফল না হয়। তোমাকে আমার এরূপ প্রশ্ন করা কোনও ক্রমেই ন্যায্য নহে; কিন্তু গুরুতর কার্যসংক্রান্ত বিষয় বলিয়া অগত্যা এরূপ অনুচিত জিজ্ঞাসা করিতে হইল। আর আমি বিলক্ষণ জানি, তাহার তপস্যায় যেরূপ অনুরাগ, কোনও মতেই প্রত্যাগমনে সম্মত হইবেন না। এই নিমিত্ত আমি তাহাকে নিবৃত্ত করিবার প্রয়াস পাইব না। তিনি যেরূপ উগ্রস্বভাব, আমাকে শাপ দিলেও দিতে পারেন। অতএব মুনি কি বলিলেন, কি করিলেন, আদ্যোপান্ত সমুদায় বর্ণন করিয়া আমার চিরস্থিত ঘোর হৃদয়শল্য উদ্ধৃত কর।
এইরূপ কাতরোক্তি শ্রবণ করিয়া জরৎকারু শোকসন্তপ্ত ভুজগরাজ বাসুকিকে আশ্বাস প্রদান পূর্ব্বক কহিলেন, যৎকালে সেই মহাতপাঃ মহাত্মা গমন করেন, আমি তাহাকে পুত্রের বিষয় জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। তিনি, অস্তি অর্থাৎ গর্ভসঞ্চার হইয়াছে, এই মাত্র উত্তর প্রদান করিয়া প্রস্থান করিলেন। তিনি পরিহাসকালেও ভুলিয়া কখনও মিথ্যা কথা কহেন নাই, সুতরাং এমন গুরুতর বিষয়ে মিথ্যা কহিবেন কেন? তিনি, হে ভুজঙ্গমে! তুমি পরিতাপ করিও না, তোমার গর্ভে প্রদীপ্ত দিবাকর ও প্রজ্বলিত অনলতুল্য তেজস্বী এক পুত্র জন্মিবেক, এই কথা বলিয়া গিয়াছেন। অতএব ভ্রাতঃ! তোমার মনে যে বিষম দুঃখ আছে, তাহা দূর কর।
নাগরাজ বাকি এই বাক্য শ্রবণ করিয়া তথাস্তু বলিলেন, এবং আহ্লাদসাগরে মগ্ন হইয়া ভগিনীর যথোচিত সম্মান ও সমাদর করিলেন। যেমন শুক্লপক্ষের শশাঙ্ক অন্তরীক্ষে দিন দিন বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতে থাকে, তদ্রপ তাহার গর্ভ দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। পূর্ণ কাল উপস্থিত হইলে, নাগভগিনী জরৎকারু পিতৃ মাতৃ উভয় কুলের ভয়হারক দেবকুমারতুল্য এক কুমার প্রসব করিলেন। নাগভাগিনেয় মাতুলালয়েই প্রতিপালিত হইতে লাগিলেন। অসাধারণ বুদ্ধিশক্তি ও জ্ঞানবৈরাগ্যদিগুণসম্পন্ন বালক বাল্যকালেই ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিয়া ভৃগুকুলোদ্ভব চ্যবন মুনির নিকট যাবতীয় বেদ ও বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করিলেন। যৎকালে তিনি গর্ভস্থ ছিলেন, তাঁহার পিতা, অস্তি, বলিয়া বনপ্রস্থান করেন, এই নিমিত্ত তিনি লোকে আস্তীক নামে প্রসিদ্ধ হইলেন। ভুজগরাজ পরম ধতে সেই অপ্রমিতবুদ্ধিশালী বালকের লালন পালন করিতে লাগিলেন। তিনিও দিন দিন বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়া নাগকুলের আনন্দ বর্দ্ধন করিতে লাগিলেন।
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগগণের ও বাসুকির বাক্য শ্রবণ করিয়া এলাপত্র নামে এক নাগ বাসুকিকে সম্বোধিয়া কহিল, হে নাগরাজ! যিনি যাহা বলুন, কোনও ক্রমে সে যজ্ঞ অন্যথা হইবার নহে,, এবং পাকুলোদ্ভব যে রাজা জনমেজয় হইতে আমাদের কুলক্ষয়সম্ভাবনা হইয়াছে, তাহাকেও বঞ্চনা করিতে পারা যাইবে না। যে ব্যক্তি দৈবদুর্বিপাক গ্রস্ত হয়, তাহার দৈবই অবলম্বন করা উচিত; এমন স্থলে দৈৰ ব্যতিরেকে পরিত্রাণের আর উপায় নাই। হে নাগগণ। তামাদিগেরও এ দৈব ভয়, অতএব দৈবই অবলম্বন করা শ্রেয়ঃ। এ বিষয়ে আমি যাহা কহি, অবহিত হইয়া শ্রবণ কর।
যৎকালে জননী আমাদিগকে শাপ প্রদান করিলেন, আমি মাতৃক্রোড়ে থাকিয়া! ভয়াকুলিত চিত্তে দেবতাদিগের এই বাক্য শ্রবণ করিলাম। দেবতারা শপিশাৰণে একান্ত দুঃখিত হইয়া ব্রহ্মার নিকটে আসিয়া কহিলেন, হে দেবদেব! কঠিন হৃদয়া ক আপনার সমক্ষে স্বীয় প্রিয়তম তনয়দিগকে নিষ্ঠুর শাপ দিলেন; কোনও জননী কোনও কালেই এরূপ বিরূপ আচরণ করেন নাই। আপনিও তথাস্তু বলিয়া তাহার বাক্যই প্রমাণ করিলেন। কি কারণে তাঁহাকে নিষেধ করিলেন না, আমরা জানিতে বাসনা করি। ব্রহ্মা কহিলেন, হে দেবগণ! সর্পেরা অতি স্বভাব, তীক্ষ্ণবিষ, ঘোররূপ, ও অসংখ্য, অতএব আমি প্রজাদিগের হিতার্থে কদ্রুকে নিবারণ করি নাই। কিন্তু যে সকল সর্প অতি তীক্ষ্ণবিষ, ক্ষুদ্রাশয়, ও অকারণে পরহিংসক, তাহাদিগেরই বিনাশ হইবেক; যাহারা ধর্ম্মপরায়ণ, তাহাদের “কোনও ভাবনা নাই। সেই কাল উপস্থিত হইলে, যে উপায়ে তাহাদের ভয়মোচন হইবেক, তাহাও কহিতেছি, শ্রবণ কর। যাযাবরবংশে জরৎকারু নামে তপস্বী, জিতেন্দ্রিয়, ধীমান্, মহর্ষি জন্ম গ্রহণ করিবেন। সেই জরৎকারুর আস্তীক নামে পুঞ্জ জন্মিবেক; তাহা হইতেই সপত্রের নিবারণ হইৰেক এবং যে সকল স ধর্ম্মপরায়ণ তাহারা রক্ষা পাইবেক। দেবগণ, পিতামহবাক্য শ্রবণ করিয়া জিজ্ঞাসিলেন, হে প্রভো! মহাতপাঃ মহাবীর্য্য, মহামুনি জরৎকারু কাহার গর্ভে’সেই মহাত্মা পুত্র উৎপাদন করিবেন? ব্রহ্মা কহিলেন, মহাবীর্য জরৎকারু মুনি সনাম্নী কন্যাতে সেই মহাবীর্য পুত্র উৎপাদন করিবেন। সর্পরাজ বাকির জরৎকারু নামে এক ভগিনী আছে, তাহার গর্ভে সেই পুল জন্মিবেক, এবং সেই পুত্রই সৰ্পৰ্গণের শাপমোচন করিবেক। দেবগণ শ্রবণমাত্র তথাস্তু বলিলেন; ব্রহ্মাও দেবতাদিগকে পূর্ব্বেো ক্ত বাক্য কহিয়া স্বর্গারোহণ করিলেন।
অতএব, হে নাগরাজ বসুকে! এক্ষণে আমার অভিপ্রায় এই যে, নাগকুলের ভয়শান্তি নিমিত্ত ব্রতপরায়ণ যাচমান জরৎকারু ঋষিকে ভিক্ষাস্বরূপ জরৎকারুনাম্নী ভগিনী প্রদান কর। আমি শাপমোচনের এই উপায় শ্রবণ করিয়াছি।
অষ্টপঞ্চাশ অধ্যায়
অষ্টপঞ্চাশ অধ্যায়—আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, রাজা জনমেজয় আস্তীককে এই রূপে বরদানে উদ্যত হইলে, আমরা তাঁহার আর এই এক অদ্ভুত ব্যাপার শ্রবণ করিয়াছি। নাগরাজ তক্ষক ইন্দ্রহস্ত হইতে চ্যুত হইয়া নভোমণ্ডলেই থাকিল। তখন রাজা জনমেজয় অত্যন্ত চিন্তান্বিত হইলেন। ভয়ার্ত্ত তক্ষক সেই বিধি পূর্ব্বক হুত প্রদীপ্ত যজ্ঞীয় হুতাশনে পতিত হইল না। শৌনক কহিলেন, হে সুনন্দন! মনীষাসম্পন্ন ব্রাহ্মণদিগের মন্ত্র সকল কি নিস্তেজ হইয়াছিল, যে তক্ষক অগ্নিতে পতিত হইল না। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, পন্নগরাজ ইন্দ্রহস্ত হইতে চ্যুত ও বিচেতন হইয়া পতিত হইতেছে, এমন সময়ে আস্তীক, তিষ্ঠ তিষ্ঠ, এই বাক্য তিন বার উচ্চারণ করিলেন, এবং তক্ষকও উদ্বিগ্ন চিত্তে অন্তরীক্ষে অবস্থিত হইল। তখন, রাজা সদস্যগণের উপদেশবশবর্তী হইয়া কহিলেন, অস্তীক যাহা কহিলেন, তাহাই হউক, এই কর্ম্ম সমাপিত হউক, নাগগণ নিরাপদ্ হউক, আস্তীক প্রীত হউন, এবং সূতের বাক্য সত্য হউক।
রাজা আস্তীককে বর প্রদান করিবামাত্র, চারি দিকে প্রীতিপূর্ণ কোলাহল উখিত হইল, সর্পসত্র নিবৃত্ত হইল, ভরতকুলতিলক রাজা জনমেজয় প্রীতি প্রাপ্ত হইলেন, যে সমস্ত ঋত্বিক্ ও সদস্যগণ সেই সর্পসত্রে সমাগত হইয়াছিলেন, রাজা তাঁহাদিগকে অপর্য্যাপ্ত অর্থ প্রদান করিলেন, আর যে লোহিতনয়ন সূত যজ্ঞায়তননির্ম্মাণকালে কহিয়াছিলেন যে, এক ব্রাহ্মণকে উপলক্ষ করিয়া সর্পসত্র রহিত হইবেক, প্রীত হইয়া তাঁহাকেও প্রভূত অর্থ, অন্যান্য নানা দ্রব্য, এবং অন্ন বস্ত্র দান করিলেন। তদনন্তর যথাবিধি অবভূথক্রিয়া সম্পাদন করিলেন। পরে প্রীত মনে যথোচিত সৎকার করিয়া কৃতকৃত্য মহাত্মা আস্তীককে স্বগৃহে প্রেরণ করিলেন, এং তাঁহার প্রস্থানকালে কহিলেন, ভগবন্! পুনর্ব্বার যেন আপনকার আগমন হয়। যৎকালে আমি অশ্বমেধ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিব, আপনাকে সেই যজ্ঞে সদস্য হইতে হইবেক।
আস্তীক, এই রূপে স্বকার্য্যসাধন ও রাজার সন্তোষসম্পাদন করিয়া, তথাস্তু বলিয়া হৃষ্ট চিত্তে স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন, এবং পরম প্রীত মনে মাতুলের ও জননীর সন্নিধানে গমন পূর্ব্বক, তদীয় পাদবন্দন করিয়া আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। যে সমস্ত নাগ সেই স্থানে উপস্থিত ছিল, শ্রবণমাত্র তাহাদের শোক ভয় ও মোহ দূর হইল। তাহারা সাতিশয় প্রীত হইয়া আস্তীককে কহিল, বৎস! অভিলষিত বর প্রার্থনা কর। তাহারা চারি দিক হইতে ভূয়োভূয়ঃ ইহাই কহিতে লাগিল, হে বিদ্বন্! আমরা তোমার কি প্রিয় কর্ম্ম করিব বল আমরা পরম প্রীত হইয়াছি, তুমি আমাদের সকলকে ঘোর বিপদ হইতে মুক্ত করিয়াছ; বৎস! আমরা তোমার কি অভীষ্ট সম্পাদন করিব বল। অস্তীক কহিলেন, যে সকল ব্রাহ্মণ অথবা অন্যান্য মানবগণ প্রসন্ন মনে সায়ং ও প্রাতঃকালে আমার এই উপাখ্যান পাঠ করিবেক, এই বর দাও, যেন তোমাদের হইতে তাহাদিগের কোনও ভয় থাকে না। নাগগণ প্রীত ও প্রসন্ন হইয়া কহিল, হে ভাগিনেয়। তুমি যে প্রার্থনা করিলে, আমরা প্রীত চিত্তে নিঃসন্দেহ তাহা সম্পাদন করিব।
যে ব্যক্তি দিবাভাগে অথবা রাত্রি কালে অসিত, আর্ত্তিমান, ও সুনীথকে স্মরণ করিবে, তাহার সর্পভয় থাকিবে না। মহাভাগ নাগগণ! যে মহাযশস্বী মহাপুরুষ মহর্ষি জরৎকারুর ঔরসে নাগভগিনী জরৎকারুর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, এবং যিনি জনমেজয়ের সর্পসত্রে তোমাদিগের রক্ষা করিয়াছেন, আমি তাঁহাকে স্মরণ করিতেছি; অতএব তোমাদের আমাকে হিংসা করা উচিত নহে। হে মহাবিষ সর্প! অপসৰ্পণ কর, তোমার মঙ্গল হউক, চলিয়া যাও, জনমেজয়ের যজ্ঞান্তে আস্তীক যে বাক্য কহিয়াছিলেন, তাহা স্মরণ কর। যে সর্প আস্তীকবাক্য শুনিয়া নিবৃত্ত না হয়, তাহার মস্তক শিংশবৃক্ষফলের ন্যায় শত খণ্ডে বিদীর্ণ হইয়া যায়।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দ্বিজেন্দ্র আস্তীক সমাগত ভুজগগণ কর্ত্তৃক এই প্রকার উক্ত হইয়া, পরম প্রীতি প্রাপ্ত ও গমনাভিলাষী হইলেন। তিনি ভুজগগণকে সর্পসত্রভয় হইতে মুক্ত করিয়া পুত্র পৌত্র রাখিয়া যথাকালে কাল প্রাপ্ত হইলেন। হে ঋষিপ্রবর! আমি আপনার নিকট আস্তীকের উপাখ্যান যথাবৎ কীর্ত্তন করিলাম। এই উপাখ্যান কীর্ত্তন করিলে কখনও সপর্ভয় থাকে না। হে ভৃগুকুলাবতংস! আপনকার পূর্ব্ব পুরুষ ভগবান্ প্রমতি, স্বীয় পুত্র রুরু কর্ত্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া, প্রীতিপ্রফুল্ল চিত্তে অস্তীকের পরম পবিত্র চরিত্র যেরূপ কীর্ত্তন করিয়াছিলেন, এবং আমিও তাঁহার নিকট যেরূপ শুনিয়াছিলাম, আপনকার নিকট আদ্যোপান্ত অবিকল বর্ণন করিলাম। আপনি ডুণ্ডুভবাক্য শ্রবণ করিয়া আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, আস্তীকের সেই পরমপবিত্র ধর্ম্মময় আখ্যান শ্রবণ করিলেন, এক্ষণে আপনকার অতি মহৎ কৌতূহল নিবৃত্ত হউক।
যদি কোনও অংশে ন্যূনতা ঘটিয়া থাকে, এই আশঙ্কা করিয়া সম্ভাবিত ন্যূনতার পরিহারার্থে যে যজ্ঞ করিয়া প্রধান যজ্ঞের সমাপন করে, তাহার নাম অবভূথ।
অষ্টম অধ্যায়
অষ্টম অধ্যায়— পৌলোমপর্ব্ব।
সূত কহিলেন, ভৃগুপুত্র ঢ্যবনের ঔরসে সুকন্যাগর্ভে প্রতি নামে অতি তেজস্বী তনয় উৎপন্ন হইলেন। প্রমতিও ঘৃতাচীগর্ভে করুনামক এবং রুরুও প্রমদ্বরাগর্ভে শুনকনামক পুত্র উৎপাদন করিলেন। সেই সুপ্রসিদ্ধ মহাতেজাঃ রুরুর আদ্যোপান্ত তাবৎ বৃত্তান্ত সবিস্তর বর্ণন করি, হে ঋষিপ্র শৌনক! শ্রবণ করুন।
পূর্ব্ব কালে স্থূলকেশনামা সর্বভূতহিতকারী তপঃপরায়ণ বিদ্যাবান্ এক মহর্ষি ছিলেন। গন্ধর্বরাজ বিশ্বাবসুসহযোগে মেনকানামী অপরা গর্ভবতী হইয়াছিল। নির্লজ্জ নির্দয়। মেনকা, যথাকালে স্থূলকেশের আশ্রমে উপস্থিত হইয়া, তথায় গর্ভ পরিত্যাগ পূর্বক নদীতীরে প্রস্থান করিল। সেই গর্ভে এক পরম সুন্দরী কন্যা জন্মিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরে মহর্ষি স্থূলকেশ তথায় উপস্থিত হইয়া, সেই দেবকন্যাসদৃশী সদ্যঃ প্রসূতা কন্যাকে অসহায়িনী পরিত্যক্তা দেখিয়া, অত্যন্ত করুণাবিষ্ট হইলেন, তাহাকে কন্যা স্বরূপে পরিগ্রহ করিয়া অসন্তাননির্বিশেষে প্রতি পালন করিতে লাগিলেন এবং যথাক্রমে বিধি পূর্ব্বক তাহার জাতকাদি সমস্ত ক্রিয়া নির্বাহ করিলেন। কন্যা সেই শুভপ্রদ আমপদে দিনে দিনে বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। সেই কন্যাকে রূপে, গুণে, ও শীলে সকল প্রমদা অপেক্ষা বর। অর্থাৎ উত্তমা দেখিয়া, মহর্ষি তাঁহার নাম প্রমদ্বয়া রাখিলেন।
এক দিবস প্রমহিনন্দন রুরু শাশ্রমবাসিনী প্রমদ্বরাকে নয়নগেচির করিয়া মদনবাণে আহত হইলেন, এবং নিজ মনোরথ স্বীয় প্রিয়বয়স্য প্রাৱা আত্মপিতার গোচর করিলেন। তদনুসারে প্রমতি স্থূলকেশসন্নিধানে উপস্থিত হইয়া আপন পুত্রার্থে সেই কন্যা প্রার্থনা করিলেন। স্থূলকেশ ফনী নক্ষত্রে বিবাহের দিন স্থির করিয়া রুরুকে প্রমদ্বরা প্রদান করিলেন।
বিবাহের কিছু পূর্বে, এক দিন প্রমরা সখীগণ সমভিব্যাহারে ক্রীড়া করিতেছিল। তাহার ক্রীড়া স্থানে এক সর্প সুপ্ত পতিত ছিল। আসন্নমরণা প্রমরা অজ্ঞাতসারে সেই সর্পের উপর পদার্পণ করিল, এবং সর্প কুপিত হইয়া বিষাক্ত দশন দ্বারা দংশন করিবামাত্র, বিশ্রী, বিবর্ণা, বিচেতনা ও মুক্তকেশা হইয়া ভূতলে পতিতা হইল। তদ্দর্শনে তদীয় বন্ধুগণ নিরানন্দসাগরে নিমগ্ন হইলেন। কিন্তু সে গতজীবন ও হতশ্রী হইয়াও পুনর্বার রমণীয়দর্শনা হইয়া সুপ্তার ন্যায় শোভ। পাইতে লাগিল। ফলতঃ, প্রমদরা পূর্বাপেক্ষা অধিকতর মনোহর হইল।
এই রূপে ভূহলপতিতা গত প্রাণী প্রমরাকে সেই অবস্থায় তাহার পিতা ও অন্যান্য তপস্বিগণ অবলোকন করিতে লাগিলেন। অনশুর স্বস্ত্যত্রেয়, মহাক্কানু, কুশিক, শঙ্খমেখল, উদ্দালক, কঠ, শ্বেত, ভরদ্বাজ, কৌণকুৎস্য, আষ্টিষেণ, গৌতম ও পুত্রসহিত প্রমতি এবং অন্যান্য বনবাসী পষিগণ অনুকম্পাপরবশ হইয়া অধ্যায় সমাগমন করিলেন। তাঁহারা সকলেই সেই সর্বাঙ্গসুন্দরী কন্যাকে তুজঙ্গবিষ প্রভাবে কাল গ্রাসপতিতা দেখিয়া বিলাপ ও পরিতাপ করিতে লাগিলেন। রুরু তদ্দর্শনে যৎপয়োনাস্তি কাতর হইয়া তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।
অষ্টাদশ অধ্যায়
অষ্টাদশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দেবতারা অমৃতমন্থনের আদেশ পাইয়া মন্দর গিরিকে মন্থনদণ্ড করিবার নিশ্চয় করিলেন। কিন্তু সেই উক্ত শুঙ্গসমূহসুশোভিত, বহুললতাজালসংকীর্ণ, বহুবিধ বিহগম গুলকোলাহলসঙ্কুল, অনেকব্যালকুলসমাকুল, অস্পরকিয়র অমরগণসেবিত, একাদশসহস্র যোজন উন্ন, ও তৎপরিমাণে ভূগর্ভে অবস্থিত গিরিরাজের উদ্ধরণ অসমর্থ হইয়া, তাহারা ব্রহ্মা ও নারায়ণের নিকটে আসিয়া বিনয়বচনে নিবেদন করিলেন, কাপিনারা আমাদিগের হিতার্থে কোনও সদুপায় নির্ধারণ ও গন্দরের উদ্ধ রণে যত্ন করুন।
অপ্রমেয়স্বরূপ নারায়ণ ও ব্রহ্মা তাহাদিগের প্রার্থনায় সম্মত হইয়া ভুজগরাজ অনন্তদেবকে মন্দরেরণের আদেশ প্রদান করিলেন। মহবিল মহাবীর্য অনন্তদেব তাঁহাদিগের নিদেশানুসারে সমস্ত বন ও বনচরগণ সহিত সেই পর্বতরাজের উদ্ধরণ করিলেন। তদনন্তর দেবগণ অনদেৰ সমভিব্যাহারে অর্ণবতীরে উপস্থিত হইলেন, এবং অর্ণবকে সম্বোধিয়া কহিলেন, আমরা অমৃতলাভার্থে তোমার জল মন্থন করিব। সমুদ্র কহিলেন, মন্দরপরিভ্রমণ দ্বারা আমাকে বিস্তর ক্লেশ সহ করিতে হইবেক, অতএব আমিও যেন লাভের অংশভাগী হই। অনন্তর সমুদায় দেবতা ও অসুর মণ্ডলী কূর্ম্মরাজের নিকট প্রার্থনা করিলেন, তুমি এই গিরির অধিষ্ঠান হও। কূর্ম্মরাজ তথাস্তু বলিয়া মরগিরির অধিষ্ঠানার্থে আপন পৃষ্ঠ পাতিয়া দিলেন। দেবরাজ তৎপৃষ্ঠে অধিষ্ঠিত শৈলরাজকে যন্ত্রসহকারে চালিত করিলেন।
এই রূপে অমরগণ মন্দরকে মন্থনদণ্ড ও বাসুকিকে মন্থনচ্ছু করিয়া অমৃতলাভাভিলাষে সলিলনিধি সমুদ্রের মন্থন আরম্ভ করিলেন। মহাবল দানবাহ্রদল রঞ্জু স্থানীয় নাগরাজের মুখদেশ ও দেবগণ তাঁহার পুচ্ছদেশ ধারণ করিলেন। ভগবান্ অনন্তদেব নারায়ণের অপর মূর্তি, এই নিমিত্ত তিনি তাঁহার দুর্বিষহ বিষের প্রভাব সংবরণ করিয়া দিলেন। দেবতারা মন্থনার্থে নাগরাজ বাসুকিকে বল পূর্বক আকর্ষণ করাতে, তাঁহার মুখ হইতে বারংবার ধূম ও অগ্নিশিখ সহিত অতি প্রভূত শ্বাসবায়ু নিঃসৃত হইতে লাগিল। ঐ সমস্ত শ্বাসবায়ু সমবেত হইয়া বিদ্যুৎ সহিত মেঘসমূহরূপে পরিণত হইল এবং শ্রান্ত ও সন্তপ্ত দেবদানবদিগের উপর বারি বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিল। আর সেই শৈলের শিখরদেশ হইতে সমস্তুতঃ পুষ্পবৃষ্টি হইতে লাগিল।
এই রূপে মন্দরগিরি দ্বারা সুরাসুরগণ কর্তৃক মথ্যমান সমুদ্র হইতে মেঘরবানুকারী বিশাল শব্দ হইতে লাগিল। নানাবিধ শত শত জলচরগণ মন্দরগিরির মর্দনে নিষ্পিষ্ট হইয়া পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল। পাতালতলবাসী অন্যান্য বহুবিধ জলীয় প্রাণিগণ মন্দরাঘাতে প্রাণত্যাগ করিল। গিরিরাজ অনবরত ভ্রাম্যমাণ হওয়াতে, তদীয় শিখরদেশস্থিত অতি প্রকাণ্ড মহীরুহ সকল পরস্পর সংঘৃষ্ট হইয়া পতগগণ সহিত নিপতিত হইতে লাগিল। যেমন নীলবর্ণ জলধর সৌদামিনীমণ্ডল দ্বারা সমবৃত হয়, তোপ মন্দর সেই সমস্ত ভূরুহের পরস্পর সংঘর্ষণসস্তৃত অতি প্রভূত হুতাশনের শিখা সমূহ দ্বারা সমাবৃত হইল। ঐ হুতাশন মশঃ প্রবল হইয়া অরণ্যবিনির্গত কুঞ্জর ও কেশৱী সকল দগ্ধ করিল। তদ্ব্যতীত অন্য নানা বনচর ঐ হুতাশনের আহুতি হইল। হুতাশন এই রূপে ইতস্ততঃ দাহ আরম্ভ করাতে, দেবরাজ ইন্দ্র মেঘসম্ভুত সলিলসেক দ্বারা তাহার শান্তি সম্পাদন করিলেন।
তদনন্তর মহাদ্রুমগণের নির্যাস ও অশেষবিধ ওষধিরস সাগরসলিলে গলিয়া পড়িতে লাগিল। সেই সমস্ত অমৃতগুণসম্পন্ন রসের ও কাঞ্চননিবের প্রভাবে সুরগণ অমরত্ব প্রাপ্ত হইলেন। অর্ণবারি উক্তৰিধ রস, কাঞ্চননি, ও অন্যান্য বহুবিধ উৎকৃষ্ট রসে মিশ্রিত হইয়া ক্ষীররূপে পরিণত হইল। সেই ক্ষীর হইতে ঘৃত উৎপন্ন হইল।
অনন্তর দেবতারা পদ্মাসনে আসীন বরদ ব্রহ্মার নিকটে আসিয়া নিবেদন করিলেন, ভগবন্! দেবাদিদেব নারায়ণ ব্যতিরেকে আমরা সমুদায় দেব দানব একান্ত ক্লান্ত হইয়াছি। কোন্ কালে মস্থন আরম্ভ করা গিয়াছে, এখন পর্যন্তও অমৃত উদ্ভূত হয় নাই। তখন ব্রহ্মা নারায়ণকে কহিলেন, তুমি ইহাদিগের বলাধান কর; তোমা ব্যতিরেকে এ বিষয়ে আর গতি নাই। নারায়ণ কহিলেন, যাহারা এই ব্যাপারে নিযুক্ত আছে, তাহাদিগের সকলকেই আমি বল প্রদান করিতেছি। সকলে মিলিত হইয়া মন্দর পরিভ্রমণ দ্বারা সরিৎপতিকে আলোড়িত করুক।
সমুদায় দেব ও দানৰ নারায়ণের বচন শ্রৰণ মাত্র বল প্রাপ্ত ও একবাক্য হইয়া পুনর্বার প্রবল রূপে জলধিমন্থন আরম্ভ করিলেন। তদনন্তর মধ্যমান অন্ত্যেধির গর্ভ হইতে শীতলময়ুখসম্পন্ন সৌম্য ও প্রসন্নমূর্ত্তি চন্দ্র উৎপন্ন হইলেন। শ্বেতসয়োজসমাসীনা লক্ষী, সুরাদেবী, ও শ্বেতবর্ণ অশ্বরত্ন উচ্চৈঃশ্রবাঃ স্মৃত হইতে আবির্ভূত হইলেন। তৎপরে কৌস্তুভনামা শ্রীমন্ মহোজ্জল দিব্য মণি ঘূত হইতে সমুদ্ভূত হইয়া নারায়ণের বক্ষঃস্থলে লম্বমান হইল। লক্ষী, সুৱা, শশধর, ও মনোজব অশ্বরাজ আদিত্যপথানুসারী হইয়া দেবপক্ষে গমন করিলেন। অনন্তর মুর্তিমান্ ধরিদেব অমৃতপূর্ণ শ্বেত কমণ্ডলু হস্তে করিয়া আবির্ভূত হইলেন। এই পরমাদ্ভুত ব্যাপার অবলোকন করিয়া দানবগণ, এই অমৃত আমার আমার বলিয়া, কোলাহল করিতে লাগিল। তদনন্তর ধলকান্তি, দশনচতুষ্টয়সম্পন্ন, মহাকায় ঐরাবতনামা মাতঙ্গরাজ উৎপন্ন হইল। বজ্রধারী দেবরাজ ঐ গজরাজ অধিকার করিলেন।
দেবাসুরগণ ইহাতেও ক্ষান্ত না হইয়া সাতিশয় মন্থন করাতে, কালকূট উৎপন্ন হইয়া ধূমবহুল প্রজ্বলিত অনলের যায় সহসা জগম্মল আকুল করিল। ঐ অতি বিষম বিষের গন্ধ আম্রাণ করিয়া ত্রৈলোক্য বিচেতন ও মুচ্ছিত হইল! ব্রহ্মা তদ্দর্শনে সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া অনুরোধ করাতে, ভগবান্ মন্ত্রমূর্তি মহেশ্বর লোকরক্ষার্থে তৎক্ষণাৎ তাহা পান করিয়া কণ্ঠদেশে ধারণ করিলেন। তদবধি তিনি ত্রিলোকে নীলকণ্ঠ নামে বিখ্যাত হইলেন।
দানবেরা এই অদ্ভুত ঘটনা দর্শনে নিতান্ত নিরাশ হইয়া অমৃত ‘ও লক্ষী লাভার্থে ঘোরতর বিরোধ উপস্থিত করিল। তখন নারায়ণ, মোহিনী মায়া অবলম্বন করিয়া স্ত্রীরূপ পরিগ্রহ পূৰ্বক, দানবদলের নিকট উপস্থিত হইলেন। মুঢ়মতি দৈত্য দানবগণ তাঁহার পরমাদ্ভুত রূপলাবণ্য অবলোকনে মোহিত ও তগতচিত্ত হইয়া তাঁহাকে অমৃত প্রদান করিল।
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
অষ্টাবিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, গরুড় সর্পগণ কর্ত্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া মাতৃসমীপে আসিয়া কহিলেন, জননি! আমি অমৃত আহরণে যাইছে, পথে কি আহার করিব, বলিয়া দাও। বিনতা কহিলেন, সমুদ্রমধ্যে বহু সহস্র নিষাদ বাস করে, তাহাদিগকে ভক্ষণ করিয়া অমৃত আহরণ কর। কিন্তু কোনও ক্রমেই তোমার যেন ব্রাহ্মণবধে বুদ্ধি না জন্মে; . ব্রাহ্মণ সব ভূতের অবধ্য ও অনলতুল্য। ব্রাহ্মণের কোপ জন্মাইলে তিনি অগ্নি, সূর্য, বিষ ও শস্ত্রস্বরূপ হন। ব্রাহ্মণ শাস্ত্রে সর্বভূতের গুরুরূপ পরিকীর্তিত হইয়াছেন। ইত্যাদি কারণে ব্রাহ্মণ সাধুদিগের পরম পূজনীয়। অতএব বৎস! তুমি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইলেও কোনও ক্রমে কদাপি ব্রাহ্মণের বধ বা বিদ্রোহাচরণ করিবে না। সংশিতব্রত ব্রাহ্মণ ক্রুদ্ধ হইলে যেরূপ ভস্ম করিতে পারেন, কি অগ্নি, কি সূর্য, কেহই সেরূপ পারেন না। বক্ষ্যমাণ বিবিধলক্ষণাক্রান্ত ব্যক্তিকে ব্রাহ্মণ বলিয়া জানিবে। ব্রাহ্মণ সকল জীবের অগ্রজ, সকল বর্ণের শ্রেষ্ঠ, সকল লোকের পিতা ও গুরু।
গরুড় মাতৃমুখে ব্রাহ্মণের এইরূপ মহিমা ও প্রভাব শ্রবণ করিয়া জিজ্ঞাসিলেন, মাতঃ। ব্রাহ্মণের কি প্রকার আকার, কীদৃশ শীল ও কিরূপ পরাক্রম, তিনি কি অগ্নির স্থায় প্রদীপ্তকলেবর অথবা সৌম্যমূর্ত্তি? আমি যে সমস্ত শুভ লক্ষণ দ্বারা ব্রাহ্মণকে চিনিতে পারি, তৎসমুদায় তুমি হেতুনির্দেশ পূর্বক বৃর্ণন কর'। বিনতা কহিলেন, বৎস! যিনি তোমার কণ্ঠপ্রবিষ্ট হইয়া বড়িশ প্রায় ক্লেশকর হইবেন ও জুলন্ত অঙ্গারের ন্যায় কণ্ঠদাহ করিবেন, তাঁহাকে সুব্রাহ্মণ জানিৰে। তুমি ক্রুদ্ধ হইয়াও কদাপি ব্রাহ্মণবধ করিবে না। বিনতা পুত্রবাৎসল্য প্রযুক্ত পুনর্ব্বার কহিলেন, যিনি তোমার জঠরে জীর্ণ হইবেন না, তাঁহাকে সুব্রাহ্মণ জানিবে। সর্পমায়া প্রতারিত। পরম দুঃখিতা পুত্রবৎসলা বিনতা পুত্রের অতুল বীর্য জানিয়াও প্রীত মনে এই আশীর্বাদ করিতে লাগিলেন, বায়ু তোমার পক্ষদ্বয় রক্ষা করুন, চন্দ্র ও সূর্য পৃষ্ঠদেশ, অগ্নি মস্তক, ও বসুগণ সর্ব শরীর রক্ষা করুন। আর আমিও সংশতা ও অতপরায়ণ হইয়া এই স্থানে, তোমার মঙ্গলচিন্তনে তৎপরা রহিলাম। এক্ষণে অভিপ্রেত কার্য্য সিদ্ধি নিমিত্ত নির্বিঘ্নে প্রস্থান কর।
এইরূপ মাতৃবাক্য শ্রবণানন্তর বিহগরাজ পক্ষ বিস্তার পূর্ব্বক নভোমণ্ডলে আরোহণ করিলেন। তিনি কিয়ৎ ক্ষণ পরে বুভুক্ষিত হইয়া দ্বিতীয়কৃতান্তপ্রায় নিষাদগণের বাসস্থানে অবতীর্ণ হইলেন। তাঁহার অবতরণবেগ দ্বারা এরূপ ধূলিপ্রবাহ উত্থিত হইল যে, নিষাদেরা অন্ধ ও নভোমণ্ডল আচ্ছন্ন হইল, সমুদ্রের জল শুষ্ক হইতে লাগিল, আর পক্ষপবনবেগে সমীপৰী বৃক্ষ সকল বিচলিত হইল। তৎপরে বিহগরাজ নিষাদদিগের পথ রুদ্ধ করিয়া - অতি প্রকাণ্ড মুখ বিস্তার করিলেন। বিষাদমগ্ন নিষাদগণ, পবনবেগ ও ধূলিবর্ষ দ্বার। অন্ধপ্রায় ও দিগ্বিদিগ্জ্ঞানশূন্য হইয়া, ত্বরিত গমনে সেই ভুজঙ্গভোজীর মুখাভিমুখে ধাবমান হইল। যেমন সমস্ত অরণ্য বায়ুবেগে বিঘূর্ণিত হইলে সহস্র সহস্র পক্ষী কাতর হইয়া অন্তরীক্ষে আরোহণ করে, সেইরূপ নিষাদেরা গরুড়ের অতি প্রকাণ্ড বিস্তৃত মুখমধ্যে প্রবিষ্ট হইতে লাগিল। বুভুক্ষিতু বিহগরাজ এই রূপে নিষাদগণের প্রাণসংহার করিয়া মুখসঙ্কোচন করিলেন।
ধীবর, যাহারা মৎস্য ধরিয়া বিক্রয় করিয়া জীবিকা নির্বাহ করে।
যে ব্যক্তি যথানিয়মে নিত্য নৈমিত্তিক প্রায়শ্চিত্ত উপাসনাদি ধর্ম্মের অনুষ্ঠান করে।
ঊনচত্বারিংশ অধ্যায়
উনচত্বারিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! সমস্ত নাগগণ এলাপবাক্য শ্রবণে সাতিশয় হর্ষিত হইয়া শত শত সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিল। বাসুকিও শুনিয়া পরম হর্ষ প্রাপ্ত হইলেন, এবং তদবধি, স্বীয় স্বসা জরৎকারুকে পরমাদরে পরিপালন করিতে লাগিলেন।
এই রূপে কিয়ৎ কাল অতীত হইলে পর, দেবতারা সমুদ্র মন্থন আরম্ভ করিলেন। অতি বলবা নাগরাজ বাকি মনরঞ্জু হইয়াছিলেন। দেবগণ মন্থনকার্য্য সমাপন করিয়া, বাসুকিকে সমভিব্যাহারে লইয়া, ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হইলেন এবং বিনয়বচনে নিবেদন করিলেন, ভগবন্! বাসুকি মাতৃশাপে ভীত হইয়া সাতিশয় পরিতাপ পাইতেছেন। ইনি জ্ঞাতিবর্গের হিতৈী, আপনি কৃপা করিয়া ইহার মনোবেদনা দূর করুন। বাকি সতত আমাদের হিতৈষী ও প্রিয়কারী। হে দেবদেব! প্রসন্ন হইয়া ইহার মানসিক ক্লেশ নিরাকরণ করুন।
দেবগণের অভ্যর্থনা শুনিয়া ব্রহ্মা কহিলেন, হে অমরগণ! পূর্ব্ব কালে এলাপত্র ইহাকে যাহা কহিয়াছিল, তাহা আমারই বাক্য। নাগরাজ বাকি যথাসময়ে তদনুযায়ী কার্য করুন, যাহারা পাপাত্মা, তাহাদিগেরই বিনাশ হইবেক, ধর্মপরায়ণ দিগের কোনও আশঙ্কা নাই। দ্বিজশ্রেষ্ঠ জরৎকারু জন্মগ্রহণ করিয়া কঠোর তপস্যায় একান্ত রত হইয়াছেন; বাসুকি যথাকালে তাহাকে ভগিনী দান করুন। এলপত্র নাগকুলের হিতজনক যে বাক্য কহিয়াছে, তাহা কদাচ অন্যথা হইবেক না।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, এইরূপ প্রজাপতিবাক্য শ্রবণানন্তর নাগরাজ বাসুকি, জরৎকারুকে ভগিনীদানসংকল্প করিয়া, বহুসংখ্যক নাগগণকে তৎসমীপে নিয়ত অবস্থিতি করিবার নিমিত্ত নিযুক্ত করিলেন। কহিয়া দিলেন, জরৎকারু ভার্য্যাপরিগ্রহের বাসনা প্রকাশ করিলে ত্বরায় আমাকে সংবাদ দিবে, তাহা হইলেই অমাদিগের সকল রক্ষা দুইবেক।
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
ঊনত্রিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, এক ব্রাহ্মণ সস্ত্রীক গরুড়ের কণ্ঠে প্রবিষ্ট হইয়। জ্বলন্ত অঙ্গারের ন্যায় দাহ করিতে লাগিলেন। তখন বিহগরাজ তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! অমি মুখব্যাদান করিয়াছি, তুমি স্বরায় নির্গত হও; ব্রাহ্মণ সদা পাপ কর্ম্মে রত হইলেও আমার বধ্য নহেন। গরুড়বাক্য শ্রবণ করিয়া ব্রাহ্মণ কহিলেন, আমার ভার্য্যা নিষাদীও আমার সমভিব্যাহারে নির্গত হউক। গরুড় কহিলেন, তুমি নিষাদীকে লইয়া অবিলম্বে বহির্গত হও; বিলম্ব করিলে আমার জঠরানলে ভস্ম হইয়া যাইবে। তখন বিপ্র নিষাদী সহিত নিষ্ক্রান্ত হইয়া গরুড়ের সমুচিত সংবর্ধনা করিয়া স্বাভিমত প্রদেশে প্রস্থান করিলেন।
এই রূপে সস্ত্রীক বিপ্র নিষ্ক্রান্ত হইলে, বিহগরাজ দুই পক্ষ বিস্তৃত করিয়া অন্তরীক্ষে আরোহণ করিলেন। তিনি কিয়ৎ ক্ষণ পরে নিজ পিতা কশ্যপের দর্শন পাইলেন। কশ্যপ জিজ্ঞাসিলেন, বৎস! তোমার সর্ব্বাঙ্গীন মঙ্গল কি না, আর নরললকে তুমি পর্যাপ্ত ভোজন পাইতেছ কি না। গরুড় কহিলেন, পিতঃ! আমার মাতা ও ভ্রাতা কুশলে আছেন, আর আমিও শারীরিক ভাল আছি, কিন্তু পর্যাপ্ত ভোজন পাই না। সর্পেরা আমাকে অমৃত আহরণে প্রেরণ করিয়াছে, আমি জননীর দাসীভাববিমোচনার্থে অমৃত আহরণ করিব। জননী নিষাদভক্ষণের আদেশ দিয়াছিলেন, আমি তদনুসারে সহস্র সহস্র নিষাদ ভক্ষণ করিয়াছি, কিন্তু ক্ষুধানিবৃত্তি হয় নাই। অতএব, যাহা আহার করিয়া অমৃত আহরণ করিতে পারি, আপনি এরূপ কোনও ভক্ষ্য দ্রব্য নির্দেশ করুন। কশ্যপ কহিলেন, বৎস! সম্মুখে সরোবর অবলোকন করিতেছ, ঐ পবিত্র সরোবর দেবলোকেও বিখ্যাত। তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিতে পাইবে, এক হস্তী অম্মুখে কূর্ম্মরূপী স্বীয় জ্যেষ্ঠ সহোদরকে আকর্ষণ করিতেছে। আমি তাহাদিগের পূর্ব জন্মের বৈরকারণ ও আকারের পরিমাণ সবিস্তর বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর।
বিভাবসু নামে অতি ক্রোধাবিষ্ট মহর্ষি ছিলেন। তাহার কনিষ্ঠ সহোদরের নাম সুপ্রতীক। সুপ্রতীকের এরূপ অভিলাষ নহে যে, পৈতৃক ধন অবিভক্ত থাকে; এজন্য তিনি জোষ্ঠের নিকট সর্ব্বদাই বিভাগের কথা উত্থাপন করেন। এক দিন বিভাবসু বিরক্ত হইয়া সুপ্রতীককে কহিলেন, দেখ, অনেকেই মোহন্ধি হইয়া সর্বদাই বিভাগ করিতে বাঞ্ছা করে; কিন্তু বিভক্ত হইয়াই অর্থমোহে বিমোহিত হইয়া পরস্পরে বিরোধ আরম্ভ করে। স্বার্থপর মূঢ় ভ্রাতারা ধনার্থে পৃথগৃভূত হইলে, শত্রুরা মিত্রভাবে প্রবিষ্ট হইয়া তাহাদের মনোভঙ্গ জন্মাইয়া দেয়; এবং ক্রমে ক্রমে ভগ্নস্নেহ হইলে, তাহারা পরস্পরের নিকট পরস্পরের দোষারোপ করিয়া বৈর বৃদ্ধি করিয়া দিতে থাকে; এইরূপ হইলে অবিলম্বেই তাহাদিগের সর্বনাশ ঘটে। এই নিমিত্ত ভ্রাতৃবিভাগ সাধুর্দিগের অনুমোদিত নহে। তুমি নিতান্ত মূঢ় হইয়া ধনবিভাগ প্রার্থনা করিতেছ, কোনও ক্রমেই আমার বারণ শুনিতেছ না; অতএব হস্তিয়োনি প্রাপ্ত হইবে। সুপ্রতীক এই রূপে অভিশপ্ত হইয়া বিভাবসুকে কহিলেন, তুমিও কচ্ছপযযানি প্রাপ্ত হইবে। বুদ্ধিভ্রষ্ট সুপ্রতীক ও বিভাবসু এই রূপে পরস্পরদত্ত শাপ প্রভাবে গজত্ব ও কচ্ছপ প্রাপ্ত হইয়াছে। এক্ষণে তাহারা পশুযযানি প্রাপ্ত হইয়াও রোষদোষ বশতঃ পরস্পর দ্বেষরত এবং শরীরগুরুতা ও বলদৰ্পে দর্পিত হইয়, পূর্ব্ববৈরানুসরণ পূর্ব্বক, এই সবোবরে বস্থিতি করিতেছে। তীরস্থিত গজের শব্দ শুনিতে পাইয়া জলমধ্যবাসী কচ্ছপ সমস্ত সরোবর আলোড়িত করিয়া উখিত হইয়াছে, এবং মহাবীর্য গজও কচ্ছপকে উত্থিত দেখিয়া ও কুণ্ডলীকৃত করিয়া জলে অবতীর্ণ হইয়াছে; তদীয় দন্ত, শুণ্ড, লাঙ্গল ও পদচতুষ্টয়ের বেগে সবোবর বিচলিত হইয়াছে, কচ্ছপও মস্তক উদ্যত করিয়া যুদ্ধার্থে সম্মুখীন হইয়াছে। গজের আকার ছয় যোজন উন্নত ও দ্বাদশ যোজন বিস্তৃত; কচ্ছপ তিন যোজন উন্নত, তাহার শরীরের মণ্ডল দশযোজনপ্রমাণ। উহারা পরস্পর প্রাণবধে কৃতসংকল্প হইয়া যুদ্ধোন্মত্ত হইয়াছে; তাহাদিগকে ভক্ষণ করিয়া কার্য সাধন কর।
কশ্যপ গরুড়কে ইহা কহিয়া এই আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন, দেবতাদিগের সহিত যুদ্ধকালে তোমার মঙ্গল হউক; আর পূর্ণকুশু, গো, ব্রাহ্মণ ও আর যে কিছু মঙ্গলকর বস্তু আছে, সে সমস্ত তোমার শুভদায়ক হউক। হে মহাবল পরাক্রান্ত! যৎকালে তুমি দেবতাদিগের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইবে, তখন ঋক, যজুঃ, সাম, এই ত্রিবিধ বেদ, পবিত্র যজ্ঞীয় হবিঃ, সমস্ত রহস্যশাস্ত্র ও সমস্ত বেদ, তোমার বলাধান করিবেন। গরুড় পিতার আশীর্বাদ শ্রবণ করিয়া তৎক্ষণাৎ তথা হইতে প্রস্থান করিলেন, এবং অনতিদূরে সেই নির্মল সলিলপূর্ণ পক্ষিকুলসমাকুল হ্রদ দেখিতে পাইলেন। অনন্তর পিতৃবাক্য স্মরণ পূর্ব্বক এক নখে গজ ও অপর নখে কচ্ছপ গ্রহণ করিয়া আকাশমণ্ডলে অধিৱেহণ করিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে অলম্বনামক তীর্থে উপস্থিত হইয়া দেবৃক্ষগণের উপরি আরোহণের উপক্রম করিলে, তাহারা তদীয় পক্ষপবনে আহত হইয়া সাতিশয় কম্পিত হইল, এবং এই আশঙ্কা করিতে লাগিল, পাছে গরুড়ভরে ভগ্ন হই। গরুড়, সেই অভিলষিতফুল প্রদ দেবমদিগকে ভঙ্গভয়ে কম্পিত দেখিয়া, অন্যান্য অতি প্রকাণ্ড বৃক্ষ সমীপে উপস্থিত হইলেন। ঐ সমস্ত মহাম কাঞ্চনময় ও রজতময় ফলে পরিপূর্ণ ও সতত সাতিশয় শোভমান; তাহাদের শাখা সকল প্রবালকল্পিত, মুলদেশ অনবরত সাগরসলিলে ক্ষালিত হইতেছে। তন্মধ্যে অত্যুচ্চ অতি প্রকাণ্ড বটবৃক্ষ গরুড়কে প্রবল বেগে আগমন করিতে দেখিয়া কহিল, অহে বিহগরাজ! তুমি আমার এই শতযোজনবিস্তৃত মহাশাখায় অবস্থিত হইয়া গজ ও কচ্ছপ ভক্ষণ কর।পৰ্বততুল্যকলের বেগবান্ বিনতাতনয়ের স্পর্শমাত্র, বহুসহস্রবিহগসেবিত বটবৃক্ষ বিচলিত ও সেই নির্দিষ্ট শাখ। ভগ্ন হইল।
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
শৌনক কহিলেন, রাজা জনমেজয় নিজ মন্ত্রীদিগকে আত্মপিতার স্বর্গারোহণ বিষয়ে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, তাহা তুমি আমার নিকট পুনর্বার সবিস্তর বর্ণন কর। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! রাজ। মন্ত্রীদিগকে যেরূপ জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, এবং মন্ত্রীরা পরীক্ষিতের পরলোেকপ্রাপ্তির বিষয় যেরূপ বর্ণন করিয়াছিলেন, শ্রবণ করুন। জনমেজয় কহিলেন, হে অমাত্যগণ! আমার ভুবনবিখ্যাত অভিযশস্বী পিতা কালবশ হইয়া যে রূপে নিধন প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহা তোমরা সবিশেষ জান, এক্ষণে তোমাদিগের নিকট পিতৃবৃত্তান্ত আদ্যোপান্তু শ্রবণ করিয়া তদীয় হিতসাধনে যত্নবান্ হইব, কিন্তু তদুপলক্ষে কদাচ অন্যের অহিচরণ করিব না।
ধর্ম্মবেত্তা প্রজ্ঞাগুণসম্পন্ন মন্ত্রিগণ, মহাঙ্গা নৃপতিকর্ত্তৃক ক এই রূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া, নিবেদন করিলেন, মহারাজ! আপনকার মহাত্মা রাজাধিরাজ পিতার যেরূপ চরিত্র ছিল ‘ও যে রূপে তাঁহার লোকাত্তর প্রাপ্তি হয়, তৎসমুদায় শ্রবণ করুন। আপনকার ধর্মাত্মা মহাত্মা প্রজাপালনতৎপর পিতা যাদৃশ গুণসম্পন্ন ছিলেন, তাহা বর্ণন করিতেছি। সেই ধর্ম্মবো রাজা মুর্তিমান্ ধর্ম্মের স্যায় ধর্ম্মতঃ প্রজাপালন করিয়াছিলেন। ভঁহাজধকারকালে চারি বর্ণ স্ব স্ব ধর্ম্মে রত ছিল। সেই অতুলবিক্রমশালী মান্ ভূপতি পৃথ্বীদেবীকে ন্যায়ানুসারে রক্ষা করিয়াছিলেন। তাঁহার কেহ দ্বেষ্টা ছিল না, তিনিও কাহারও দ্বেষ করিতেন না, প্রজাপতির ন্যায় সর্ব ভূতে সমদর্শী ছিলেন। তদীয় অপ্রতিহত শাসনপ্রভাবে ব্রাহ্মণ, ক্ষক্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র স্ব স্ব কর্ম্মে রত ছিল। তিনি বিধবা, অনাথ, বিকলাঙ্গ, ও দীন দরিদ্র গণের ভরণ পোষণ করিতেন। সেই সত্যবাদী, দৃঢ়বিক্রম, সর্বতোষক, সর্ব্বপোষক, শ্রীমান্ রাজা দ্বিতীয় শশধরের ন্যায় সর্ব ভূতের নয়নরঞ্জন ও সর্ব্বলোকপ্রিয় ছিলেন। তিনি শারদ্বতের নিকট ধনুর্বেদ শিক্ষা করেন, কৃষ্ণের অতি প্রিয় ছিলেন। কুরুকুল পরিক্ষীণ হইলে, অভিমন্যুর ঔরসে উত্তরার গর্ভে তাঁহার জন্ম হয়, এই নিমিত্ত তাহার নাম পরীক্ষিৎ। তিনি রাজধর্ম্মনিপুণ, সর্বগুণসম্পন্ন, জিতেন্দ্রিয়, মনস্বী, মেধাবী, ধর্ম্মপরায়ণ, ষড়বর্গ জয়ী, মহাবুদ্ধি, ও অদ্বিতীয় নীতিশাস্ত্রবেত্তা ছিলেন; ষাটি বৎসরপ্রজাপালন করেন। পরে সকলকে দুঃখাবে নিক্ষিপ্ত করিয়া পরলোকযাত্রা করিয়াছেন। তদনন্তর আপনি সহস্র বৎসরের এই কুলক্রমাগত রাজ্য ধর্ম্মত প্রাপ্ত হইয়াছেন; আপনি শৈশব কালেই অভিষিক্ত হইয়া সর্বভূতের পালন করিতেছেন।
জনমেজয় কহিলেন, ধর্ম্মপরায়ণ পূর্ব্বপুরুষদিগের চরিত্র অনুশীলন করিয়া বোধ হইতেছে, এই কুলে কোনও কালে এমন আস্তীকপর্ব। রাজা হয়েন নাই যে, তিনি প্রজাদিগের প্রিয় ও হিতকারী ছিলেন না। আমার পিতা তথাবিধ রাজা হইয়া কেন অকালে কালগ্রাসে পৱিক্ষিপ্ত হইলেন বল, আমি আদ্যোপান্ত অবিকল শুনিতে বাসনা করি। প্রিয়কারী হিতৈষী মন্ত্রিগণ এই রূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া পরীক্ষিতের মৃত্যুবৃত্তান্ত যথাবৎ বর্ণন করিতে আরম্ভ করিলেন। মন্ত্রিগণ কহিলেন, মহারাজ! আপনকারু পিতা রাজাধিরাজ পাণ্ডুর ন্যায় শস্ত্রবিদ্যায় অদ্বিতীয় ও সতত মৃগয়াশীল ছিলেন। একদা, তিনি আমাদিগের হস্তে সমস্ত সাম্রাজ্যের ভার সমর্পণ করিয়া মৃগয়ায় গিয়াছিলেন। অরণ্যে প্রবেশ করিয়া শর দ্বারা এক মৃগ বিদ্ধ করিলেন। বিদ্ধ মৃগ পলায়ন করিল। রাজা তৎপশ্চাৎ ধাবমান হইলেন, কিন্তু পলায়িত মৃগকে আর দেখিতে পাইলেন না। তিনি ষষ্টিবর্ষবয়স্ক ও জরাগ্রস্ত হইয়াছিলেন, এজন্য ত্বরায় পরিশ্রান্ত ও ক্ষুধা হইলেন। সেই নিবিড় অরণ্যে এক মুনি মৌনব্রত অবলম্বন পূর্বক সমাধি করিতেছিলেন, রাজা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন। মুনি কিছুই উত্তর দিলেন না। রাজা অত্যম্ভ ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত ছিলেন, মুনিকে মৌমাবলম্বী দেখিয়া তৎক্ষণাৎ রোষবশ হইলেন। তিনি তাঁহাকে মৌনব্রতী বলিয়া জানিতেন না, এই নিমিত্ত্ব কোপাবিষ্ট হইয়া, অটনী দ্বারা ধরাতল হইতে এক মৃত সর্প উদ্ধৃত করিয়া, সেই শুদ্ধচিত্ত ঋষির স্কন্ধে নিক্ষিপ্ত করিলেন। ঋষি এই রূপে অবমানিত হইয়াও কুপিত হইলেন না, রাজাকে ভাল মন্দ কিছুই বলিলেন না, স্কন্ধে মৃত সর্প ধারণ পূর্ব্বক অবস্থিতি করিতে লাগিলেন।
কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য্য।
রাজা পরীক্ষিৎ ষাটি বৎসর বয়সে তক্ষকের দংশনে প্রাণত্যাগ করেন, সুতরাং তাঁহার ষাটি বৎসর প্রজাপালন সম্ভব ও সঙ্গত হয় টীকাকার নীলকণ্ঠ কহেন, মূলে যে ষাটি বৎসর নির্দেশ আছে, তাহা জন্ম অবধি গণনা অভিপ্রায়ে, রাজ্যলাভাবধি গুণনা অভিপ্রায় নহে, কারণ পরীক্ষিৎ ছাব্বিশ বৎসর বয়সে রাজ্যলাভ করিয়া চব্বিশ বৎসর মাত্র প্রজাপালন করেন।
ঊনবিংশ অধ্যায়
ঊনবিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তদনন্তর সমুদায় দৈত্য দানব ঐকমত্য অবলম্বন পূর্বক নানাবিধ অস্ত্র শস্ত্র হস্তে লইয়া দেবতাদিগকে আক্রমণ করিল। মহাবীর্য ভগবান্ বিষ্ণু, নরদেৰ সমভিব্যাহারে দানবেন্দ্রদিগের নিকট হইতে অমৃত হরণ করিলেন। দেবগণ বিষ্ণুর নিকট হইতে অমৃত প্রাপ্ত হইয়া সৃষ্ট চিত্তে পান করিতে বসিলেন। দেবতারা অমৃত পান আর করিলে, রাহু নামে এক ধূর্ত্ত দানব অবসর বুঝিয়া দেবরূপ পরিগ্রহ পূর্বক ঐ সমভিব্যাহারে অমৃত পান করিল। অমৃত দানবের কণ্ঠদেশ মাত্র গমন করিয়াছে, এমন সময়ে চন্দ্র ও সূর্য দেবতাদিগের হিতার্থে ঐ গূঢ় ব্যাপার ব্যক্ত করিয়া দিলেন। ভগবান্ চক্রপাণি সুদর্শন চক্র দ্বারা দানবের শিরচ্ছেদন করিলেন। রাহুর শৈশৃঙ্গসম চক্রচ্ছিন্ন প্রকাণ্ড মস্তক তৎক্ষণাৎ নভোমণ্ডলে আরোহণ করিয়া অতি ভয়ঙ্কর শব্দ করিতে লাগিল। অবশেষে তাহার কবন্ধ, সবন, সপর্বত, সদ্বীপ, মহীমণ্ডল কম্পিত করিয়া, ভূতলে পতিত হইল। তদবধি চন্দ্র ও সূর্যের সহিত রাহুমুখের চিরন্তন বৈরনির্বন্ধ হইল। এই নিমিত্তই ঐ মুখ অদ্যাপি তাঁহাদিগকে মধ্যে মধ্যে গ্রাস করিয়া থাকে। ভগবান্ নারায়ণ নিরুপম নারীরূপ পরিহার করিয়া নানাবিধ আয়ুধ ধারণ পুর্ব্বক দানবদল আক্রমণ করিলেন।
তদনন্তর লৰণার্ণবতীয়ে দেবদানবদলের খোতর সমর আর হইল। সহস্র সহস্র তীক্ষাগ্র প্রাস তোমর প্রভৃতি বিবিধ শস্ত্র সমস্ততঃ পতিত হইতে লাগিল। অসুরগণ খড়গ চক্র শক্তি গদ প্রভৃতি শাঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হইয়া শশাণিত বমন করিতে করিতে ভূতুলশায়ী হইল। তাহাদিগের তপ্তকাঞ্চনশোভিত মস্তক সকল অতি দারুণ পট্টিশপ্রহারে কলেবর হইতে পৃথভূত হইয়া অনবরত ধরাতলে পতিত হইতে লাগিল। সমরনিহত মহাসুরগণ রুধিরলিপ্তকলেবর হইয়া ধাতুরাগরঞ্জিত গিরিশিখরের ন্যায় ভূশয্যায় শয়ন করিল। পরস্পর শস্ত্র প্রহার দ্বারা রণক্ষেত্রে হাহ রব উথিত হইল। দূর হইতে লৌহময় তীক্ষ্ণ পরিঘের আঘাত ও সন্নির্ষে মুষ্টি প্রহার ইত্যাদি প্রকারে রণপ্রবৃত্ত দেবদানবদলের কোলাহল নভোমণ্ডল ব্যাপ্ত করিল। চারি দিকে কেবল ছিন্ধি, ভিন্ধি, ঘাতয়, পাতয় ইত্যাদি ঘোতর শব্দ শ্রত হইতে লাগিল।
এই রূপে মহাভয়দায়ী তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ হইলে, নর ও নারায়ণ যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হইলেন। ভগবান্ নারায়ণ, নরদেবের দিব্য ধনু অবলোকন করিয়া, দানবকুলবিলয়কারী স্বীয় চক্র স্মরণ করিলেন। সেই অরাতিনিপাতন, সূর্য্যসমপ্রভ, অপ্রতিহত প্রভাব, ভীষণমূর্ত্তি সুদর্শন চক্র স্মৃতমাত্র অন্তরীক্ষ হইতে অবতীর্ণ হইল। করিক দীর্ঘবাহু ভগবা, প্রজ্বলিতহুতাশনসম, পরপুরাবদারণ, মহাপ্রভ, চক্র বিপক্ষদলে প্রক্ষেপ করিলেন। ভগবৎপ্রেরিত চক্র মহাবেগে গমন করিয়া সহস্র সহস্র দৈত্য দানব সংহার করিল; কোনও স্থলে অতি প্রদীপ্ত দহনের ন্যায় প্রজ্জ্বলিত হইয়া অসুরদল নিপাত করিল; কোনও স্থলে ভূতলে ও নভোমণ্ডলে বিচরণ পূর্ব্বক পিশাচের ন্যায় তাহাদের শোণিত পনি করিতে লাগিল।
নবজলধরকলেবর মহাবল পরাক্রান্ত অসুরেরাও গিরি নিক্ষেপ দ্বারা দেবদল দলন করিতে আরম্ভ করিল। তখন আকাশমণ্ডল হইতে অতি প্রকাণ্ড ভয়ানক ভূধর সকল পরম্পরাভিঘাত পূর্বক বহুবিধ জলধরের ন্যায় সমস্ততঃ পতিত হইতে লাগিল। এইরূপ অবিরত অদ্রিপাতে অভিহতা হইয়া সন্দ্বীপ সকাননা পৃথিবী বিচলিত হইল। তখন নরদেব স্বর্ণমুখ শিলীমুখ সমূহ দ্বারা অসুরবিক্ষিপ্ত গিরিসমূহের শিখর বিদারণ পূর্বক গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন করিলেন। মহাবল পরাক্রান্ত দুর্দান্ত অসুরদল ভগ্নল হইয়া ও নভোমণ্ডলে প্রজ্বলিতহুতাশনসম, সুদর্শনচক্রকে পরিকুপিত অবলোকন করিয়া ভয়ে ভূমধ্যে ও লবণার্ণবগর্ভে প্রবেশ করিল।
দেবতারা এই রূপে জয় প্রাপ্ত হইয়া সমুচিতসৎকারবিধান পূর্বক মন্দর গিরিকে পূর্ব স্থানে স্থাপিত করিলেন। জলধরেরাও গগনমণ্ডল ও স্বর্গলোক নিনাদিত করিয়া যথাগত প্রতিগমন করিল। তদনন্তর দেবতারা আনন্দসাগরে মগ্ন হইয়া সেই অমৃতভাণ্ড সুরক্ষিত করিয়া নারায়ণের নিকট নিহিত করিলেন।
বাণ।
একচত্বারিংশ অধ্যায়
একচত্বারিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তেজস্বী শৃঙ্গী কৃশের নিকট পিতার শববহনবার্তা শ্রবণ করিয়া কোপানলে জ্বলিত হইয়া উঠিলেন, এবং কৃশের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া প্রিয় বাক্যে সম্বোধিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, বয়স্য! কি নিমিত্ত আমার পিতা স্কন্ধে মৃত সর্প ধারণ করিতেছেন, বল। কৃশ কহিলেন, রাজা পরীক্ষিৎ মৃগয়ায় ভ্রমণ করিতে করিতে তোমার পিতার স্কন্ধে মৃত সর্প ক্ষেপণ করিয়া গিয়াছেন। শৃঙ্গী কহিলেন, হে কৃশ! আমার পিতা রাজা পরীক্ষিতের কি অপরাধ করিয়াছিলেন, স্বরূপ বর্ণন কর; পরে আমি আপন তপস্যার প্রভাব দেখাইতেছি। কৃশ কহিলেন, অভিমন্যতনয় রাজা পরীক্ষিৎ মৃগয়ারসে ব্যাসক্ত হইয়া একাকী অরণ্যে পরিভ্রমণ করিতেছিলেন। এক মৃগ তাঁহার বাণে বিদ্ধ হইয়া পলায়ন করিলে, রাজা তাহার অন্থেষণার্থ বনে বনে ভ্রমণ করিয়া পরিশেষে এই স্থানে উপস্থিত হইলেন, এবং ক্ষুৎপিপাসায় কাতর ও নিতান্ত শ্রান্ত হয়। তোমার পিতাকে পলায়িত মৃগের কথা বারংবার জিজ্ঞাসিতে লাগিলেন। তোমার পিতা মৌনব্রতাবলম্বী, অতএব কিছুই উত্তর দিলেন না। রাজা রুষ্ট হইয়া অটনী দ্বারা তাহার স্কন্ধে মৃত সর্প ক্ষেপণ করিয়াছেন। তোমার পিতা তদবধি তদবস্থই আছেন, রাজা নিজ রাজধানী হস্তিনাপুর প্রস্থান করিয়াছেন।
এই রূপে পিতৃস্কন্ধে মৃতসর্গক্ষেপণবার্তা শ্রবণ করিয়া ঋষিকুমার শৃঙ্গী ক্রোধানলে প্রজ্বলিত হইলেন, তাহার নয়নযুগল লোহিতবর্ণ হইল। তেজস্বী শৃঙ্গী ক্রোধে অন্ধ হইয়া আচমন পূর্ব্বক এই বলিয়া রাজাকে শাপ প্রদান করিলেন, যে রাজকুলাধম মৌনব্রতপরায়ণ বৃদ্ধ পিতার স্কন্ধে মৃত সর্প ক্ষেপণ করিয়াছে, অতি তীক্ষতেজাঃ তীক্ষৰিষ সর্পরাজ তক্ষক আমার বচনানুসারে অতি ক্রুদ্ধ হইয়া অদ্য হইতে সপ্ত রাত্রির মধ্যে সেই কুরুকুলের অকীর্ত্তিকর, ব্রাহ্মণের অবমাননাকারী, পাপিষ্ঠ দুরাচারকে যমালয়ে লইয়া যাইবেক।
শৃঙ্গী ক্রোধভরে রাজা পরীক্ষিৎকে এই শাপ প্রদান করিয়া গোষ্ঠস্থিপিতৃসন্নিধানে উপস্থিত হইলেন। তথায় পিতার স্কন্ধে মৃত ‘ভুজগ অবলোকন করিয়া পূর্বাপেক্ষা অধিকতর কোপাবিষ্ট হইলেন, এবং দুঃখে অশ্রুবর্ষণ করিতে করিতে পিতাকে কহিলেন, পিতঃ! কুরুকুলাধম পরীক্ষিৎ তোমার যেরূপ অবমাননা করিয়াছিল, আমি ক্রোধে অধীর হইয়া তাহাকে তদুপযুক্ত এই ভয়ানক শাপ দিয়াছি যে, সর্পশ্রেষ্ঠ তক্ষক সপ্ত দিবসে তাহাকে যমালয়ে লইয়া যাইবেক।
শমীক ঋষি ক্রোধা পুত্রের এইরূপ উগ্র বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, বৎস! তুমি যে কর্ম্ম করিয়াছ, তাহাতে আমি সন্তুষ্ট হইলাম না। ইহা তপস্বীর ধর্ম্ম নহে। আমরা সেই রাজার অধিকারে বাস করি, তিনি স্যায়পথাবলম্বী হইয়া আমাদের রক্ষা করিতেছেন; তাহার অনিষ্টাচরণ করা আমার অভিমত নহে। সৎপথাবলম্বী রাজ। কদাচিৎ কোনও অপর করিলেও অম্মাদৃশ লোকের ক্ষমা করা উচিত। ধর্ম্মকে নষ্ট করিলে ধর্ম্ম আমাদিগকে নষ্ট করেন, সন্দেহ নাই। দেখ, যদি রাজা রক্ষণাবেক্ষণ না কারন, আমাদের ক্লেশের আর পরিসীমা থাকে না, আর ইচ্ছানুরূপ ধর্ম্মানুষ্ঠান করিতে পারি না। ধর্ম্মপরায়ণ রাজারা আমাদের রক্ষা করেন, তাহাতেই আমরা নির্বিঘ্নে বহুলধর্ম্মোপাৰ্জন করি। সেই উপার্জিত ধর্ম্মে ধর্ম্মতঃ রাজাদিগের ভাগ আছে। অতএব রাজা কদাচিৎ অপরাধ করিলে ক্ষমা করাই কর্ত্তব্য। বিশেষতঃ, রাজা পরীক্ষিৎ স্বীয় পিতামহ পাণ্ডুর ন্যায় আমাদিগের রক্ষা করিতেছেন। প্রজাপালন রাজার পরম ধর্ম্ম। অদ্য সেই মহাত্মা ক্ষুধার্ত ওঁ শ্রান্ত হইয়া, আমার মৌনব্রতধারণের বিষয় না জানিয়াই, এই কর্ম্ম করিয়াছেন। দেশ অরাজক হইলে নিয়ত্ব দত্যুভয়াদি নানা দোষ জন্মে। লোক উদ্ধৃঙ্খল হইলে খাজা দণ্ডবিধান দ্বারা শাসন করেন। দগুভয়েই পুনর্বার শান্তি স্থাপন হয়। ভয়ে উদ্বিগ্ন হইলে কেহ ধর্ম্মানুষ্ঠান করিতে পারে না, ভয়ে উদ্বিগ্ন হইলে কেহ ক্রিয়ানুষ্ঠান করিতে পারে না। রাজা ধর্ম্ম স্থাপন করেন, ধর্ম্ম হইতে স্বর্গ স্থাপিত হয়, রাজার প্রভাবেই নির্বিঘ্নে যাবতীয় যজ্ঞক্রিয়া নির্বাহ হয়, অনুষ্ঠিত যজ্ঞক্রিয়া দ্বারা দেবতাদিগের প্রীতি জন্মে, দেবতা হইতে বৃষ্টি, বৃষ্টি হইতে শস্য, শস্য হইতে মনুষ্যদিগের প্রাণ ধারণ হয়। অতএব অভিষেকাদিগুণসম্পন্ন রাজা মনুষদিগের বিধাতা স্বরূপ। ভগবান স্বায়ম্ভুব মনু কহিয়াছেন, রাজা দশ শ্রেত্রিয়ের সমান মান্য। সেই রাজা অদ্য ক্ষুধিত ও শ্রান্ত হইয়া, আমার মোনতধারণের বিষয় না জানিয়াই, এরূপ কর্ম্ম করিয়াছেন, সন্দেহ নাই। তুমি বালস্বভাবসুলভ অবিমৃষ্যকারিতাপরবশ হইয়া কি নিমিত্ত সহসা এরূপ দুর্ম্ম করিলে? রাজা কোনও ক্রমেই আমাদিগের শাপ দিবার পাত্র নহেন।
একত্রিংশ অধ্যায়
একত্রিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
শৌনক জিজ্ঞাসা করিলেন, হে সৃনন্দন! দেবরাজ ইন্দ্রের কি অপরাধ ও কিরূপ অনবধানদোষ ঘটিয়াছিল, বালখিল মহর্ষিগণের সস্তা দ্বারাই বা গরুড় কেন উৎপন্ন হইলেন, দেবর্ষি কশ্যপেরই বা কেন ক্ষিরাজ পুত্র জন্মিল, আর সেই পক্ষীই বা কি কারণে সর্বভূতের অনভিজবনীয়, অবধ্য, কামচারী ও কামবীর্য্য হইলেন? আমি এই সমস্ত বিষয় শুনিতে বাসনা করি; যদি পুরাণে বর্ণিত থাকে, কীর্তন কর। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাশয় যাহা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, ইহা পৌরাণিক বিষয় বটে; আমি সংক্ষেপে সমুদায় বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
কোনও সময়ে প্রজাপতি কশ্যপ পুত্রকামনায় যজ্ঞ করিয়াছিলেন। ঋষি, দেব ও গন্ধর্বগণ সেই যজ্ঞে তাহার সমুচিত সাহয্য করেন। কশ্যপ ইন্দ্রকে এবং বালখিল্য মুনিগণ ও অন্যান্য দেবতাদিগকে যজ্ঞীয় কাষ্ঠের আহরণে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। ইন্দ্র স্বীয় সামর্থ্যানুরূপ পর্ব্বকার কাষ্ঠভার লইয়া অক্লেশে আগমন করিতে করিতে দেখিতে পাইলেন, অতি খর্বাকৃতি বালখিল্য ঋষিরা সকলে মিলিয়া একটিমাত্র পত্রবৃন্ত অনিতেছেন; তাহাদের কলেবর অঙ্গুষ্ঠপ্রমাণ; তাঁহারা অতি শীর্ণকায়, নিরাহার, নিত্যন্ত দুর্বল, গোষ্পদের জালে মগ্ন হইয়া ক্লেশ পাইতেছেন। বীর্য্যমত্ত পুরন্দর তদ্দর্শনে বিস্ময়াপন্ন হইয়া উপহাস করিতে লাগিলেন, এবং তাঁহাদিগকে লঙ্ঘন করিয়া সত্বর গমনে প্রস্থান করিলেন। ঋষিগণ এই রূপে যৎপরোনাস্তি অবমানিত হইয়া সাতিশয় রোষাবিষ্ট হইলেন, এবং যাহাতে ইন্দ্রের ভয় জন্মে, এরূপ এক মহৎ কর্ম্মের অনুষ্ঠান করিলেন। তাঁহারা এই কামনা করিয়া মহার্থ মন্ত্র প্রয়োগ পূর্বক যথাবিধি হুতাশনমুখে আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন যে, কামবীর্য্য, কামগম, দেবরাজভয়প্রদ অন্য এক ইন্দ্র উৎপন্ন হউক, অদ্য আমাদিগের তপস্যাফলে ইন্দ্রের শতগুণ শৌর্যবীর্যসম্পন্ন, মনের তুল্য বেগবান, কোন দারুণ প্রাণী উৎপন্ন হউক।
দেরাজ ইন্দ্র এই ব্যাপার অবগত হইয়া বিষঃ চিত্তে কশ্যপের শরণাগত হইলেন। প্রজাপতি কশ্যপ দেবরাজমুখে সমস্ত শ্রবণ করিয়া বালখিল্যগণসীপে গমন পূর্বক কর্ম্মসিদ্ধির প্রার্থনা করিলেন। সত্যবাদী বালখিল্যগণ তৎক্ষণাৎ, তথাস্তু, বলিলেন। তখন প্রজাপতি কশ্যপ প্রিয় সম্ভাষণ পূর্বক সাদর বচনে তাহাদিগকে কহিলেন, দেখ, ইনি ব্রহ্মার নিয়োগানুসারে ত্রিভুবনের ইন্দ্র হইয়াছেন; তোমরাও আবার ইন্দ্রের নিমিত্ত যত্ন করিতেছ; ব্রহ্মার নিয়ম অন্যথা করা তোমাদিগের উচিত নয়; কিন্তু তোমাদিগের সংকল্পও ব্যর্থ করা আমার অভিপ্রেত নহে; অতএব তোমরা যে ইন্দ্রের নিমিত্ত যত্ন করিতেছ, তিনি অতি বলবান পক্ষীন্দ্র হউন, আমার অনুরোধে তোমরা দেবরাজের প্রতি প্রসন্ন হও। তপোধন বালখিল্যগণ মুনিশ্রেষ্ঠ প্রজাপতি কশ্যপের বাক্যশ্রবণানন্তর তাঁহার সমুচিত অর্জন করিয়া নিবেদন করিলেন, ভগবন্! আমরা সকলে মিলিয়া ইন্দ্রার্থে এই উদ্যোগ করিয়াছি, অপিনিও পুত্রার্থে এই অনুষ্ঠান করিয়াছেন; অতএব আপনি এই ফলোম্মুখ কর্ম্ম গ্রহণ করিয়া আহা শ্রেয়স্কর বোধ হয়, করুন। এই সময়েই যশস্বিনী কল্যাণিনী ব্রতপরায়ণ। দক্ষকন্যা বিনতা দেবী বহুকাল তপস্যা করিয়া ঋতুস্নানান্তে পুত্রকামনায় স্বামিসন্নিধানে উপস্থিত হইলেন। তখন কশ্যপ তাহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, দেবি? তুমি যাহা মানস করিয়াছি, তাহা সফল হইবে, বালখিল্যগণের তপঃপ্রভাবে ও আমার সংকল্পবলে তোমার গর্ভে ত্রিভুবনেশ্বর দুই বীর পুত্র জন্মিবেক, তাহার মহাভাগ ও ত্রিলোকপূজিত হইবেক। ভগবান্ কশ্যপ বিনতাকে পুনর্বার কহিলেন, তুমি সাবধানা হইয়া এই, মহোদয় গর্ভ ধারণ কর। ঐ দুই সৰ্বলোকপূজিত কামরূপী বিহঙ্গম সকল পক্ষীর ইন্দ্রত্ব পদ প্রাপ্ত হইবেক। অনুস্থার প্রীতিপ্রফুল্ল বদনে ইন্দ্রকে কহিলেন, বৎস! তোমার সেই দুই মহাবীর্য ভ্রাতা তোমার সহায় হইবেক, তাহাদিগের দ্বারা, তোমার কখনও কোনও অপকার ঘটিবে না। অতএব বিষাদ পরিত্যাগ কর, তুমিই ত্রিভুবনে ইন্দ্র থাকিবে। কিন্তু আর কখন তুমি অতি কোপন বাশ্বজু ব্রহ্মবাদী ব্রাহ্মণদিগকে উপহাস বা অমান্য করিও না। ইন্দ্র এইরূপ পিতৃৰাক্য শ্রবণে নিঃশঙ্ক হইয়া দেবলোকে গমন করিলেন। বিনতাও পতির বরপ্রদান দ্বারা চরিতার্থতা লাভ করিয়া সাতিশয় হর্ষ প্রাপ্ত হইলেন, এবং যথাকালে অরুণ ও গরুড় দুই পুত্র প্রসব করিলেন। তন্মধ্যে অরুণ বিকলাঙ্গ, তিনি সূর্যদেবের পুনরাবন্তী হইয়াছেন; আর হিরণ্যগর্ভ ব্রহ্মা গরুড়কে পক্ষিজাতির ইন্দ্রত্ব পদে অভিষিক্ত করিয়াছেন। হে ভৃগুনন্দন! এক্ষণে সেই বিনতাহৃদয়নন্দন পতগেন্দ্রের অতিমহৎ কর্ম্ম কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
একপঞ্চাশ অধ্যায়
একপঞ্চাশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, অনন্তর রাজা জনমেজয় মন্ত্রিগণের সহিত পরামর্শ স্থির করিয়া সৰ্পসত্রানুষ্ঠানের প্রতিজ্ঞা করিলেন, এবং পুরোহিত ও ঋত্বিকৃদিগকে আহ্বান করিয়া জিজ্ঞাসিলেন, যে দুরাত্মা তক্ষক পিতার প্রাণহিংসা করিয়াছে, এক্ষণে আমি কি উপায়ে তাহাকে, যথোচিত প্রতিফল দিতে পারি, আপনার। তাহা বলুন। আপনারা এমন কোনও কর্ম্ম জানেন কি না যে, তদ্বারা আমি তাহাকে তাহার বন্ধুবর্গের সহিত প্রদীপ্ত অনলে নিক্ষিপ্ত করিতে পারি। সে যেমন আমার পিতাকে বিষবহ্নি দ্বারা দগ্ধ করিয়াছে, আমিও সেই পাপিষ্ঠকে তদ্রুপ দগ্ধ করিতে বাসনা করি। ঋত্বিগণ কহিলেন, মহারাজ! পুরাণে সপসত্রনামে এক মহৎ যজ্ঞের উল্লেখ আছে। দেবতারা তোমার নিমিত্তই ঐ যজ্ঞের সৃষ্টি করিয়াছেন। পৌরাণিকেরা কহেন, তোমা ভিন্ন ঐ যজ্ঞ করিবার অন্য লোক নাই, আর আমরাও ঐ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতে জানি।
রাজা এই কথা শ্রবণ করিয়াই তক্ষককে প্রদীপ্ত অগ্নিমুখে প্রবিষ্ট ও দগ্ধ বোধ করিলেন, এবং সেই মন্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণদিগকে কহিলেন, আমি সেই যজ্ঞ করব, আপনারা সমুদায় আয়োজন করুন। তদনুসারে সেই বেদবি বহুজ্ঞ ঋত্বিকগণ, শাস্ত্র প্রমাণ পরিমাণ করিয়া পরম সমৃদ্ধিযুক্ত প্রভূতধনধান্যাদিসম্পন্ন অভি প্রায়ানুরূপ যজ্ঞায়তন নির্মাণ পূর্বক, রাজাকে সপত্রে দীক্ষিত করিলেন। কিন্তু প্রথমতই যজ্ঞের বিঘ্নকর এক মহৎ লক্ষণ উপস্থিত হইয়াছিল। যজ্ঞায়তননির্ম্মাণকালে বাস্তুবিদ্যাবিশারদ পুরাণবেত্তা বুদ্ধিজীবী সূত্রধার কহিল, যে স্থানে ও যে সময়ে যজ্ঞায়তনের মাপন আরম্ভ হইল, তাহাতে বোধ হইতেছে, এক ব্রাহ্মণকে উপলক্ষ করিয়া এই যজ্ঞের ব্যাঘাত জন্মিবেক। রাজা এই কথা শ্রবণ করিয়া, দীক্ষিত হইবার পূর্ব্বে, দ্বারপালকে এই আদেশ দিলেন, যেন কোনও ব্যক্তিই আমার অজ্ঞাতসারে প্রবেশ করিতে না পারে।
একবিংশ অধ্যায়
একবিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কদ্রু ও বিনতা পরস্পর দাস্য পণ করিয়া অমর্ষগ্রস্ত ও রোষপরবশ হইয়াছিলেন। এক্ষণে, রজনী প্রভাত ও দিবাকর উদিত হইবামাত্র, অনতিদূরবর্তী তুরগরাজ উচ্চৈঃ এবার দর্শনার্থ প্রস্থান করিলেন। কিয়দ্দুর গমন করিয়া তাঁহারা জলধি অবলোকন করিলেন; জলধি অপ্রমেয়, অচিন্তনীয়, সর্বভূতভয়ঙ্কর জলচরসমূহে সতত সমাকীর্ণ, সমস্ত রত্নের অদ্বিতীয় অকর, জলাধিপতি বরুণ দেবতার আলয়, নাগগণের আবাসস্থান, অসুরগণের পরম মিত্র, স্থলচর প্রাণিসমূহের পক্ষে অতি ভয়ানক, অমৃতের একমাত্র উৎপত্তিস্থান, পাঞ্চজন্য শঙ্খের প্রভবভূমি, তাহার গর্ভে প্রবল বাড়বানল সর্ব্বকাল অবস্থিতি করিতেছে, এবং জলচরগণ অনবরত ঘোরর শব্দ করিতেছে, তদীয় কলেবর প্রবল পবনবেগে নিরন্তর পরিচালিত হইতেছে, সুতরাং অবিচ্ছেদে পর্বতাকার তরঙ্গ উঠিতেছে, এবং তদ্দর্শনে বোধ হয় যেন তিনি তরঙ্গরূপ হস্ত উত্তোলন করিয়া নৃত্য করিতেছেন, চন্দ্রের হ্রাস বৃদ্ধি অনুসারে তাহার হ্রাস বৃদ্ধি হয়, অপ্রমেয় প্রভাব ভগবান্ গোবিন্দ বরাহমূর্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া অন্তৰ্জলে প্রবেশ পূর্বক তাঁহাকে আলোড়িত ও আবিল করিয়াছিলেন, ব্রতপরায়ণ ব্রহ্মর্ষি অত্রি শত শত বৎসরেও তাঁহার তল স্পর্শ করিতে পারেন নাই, অপ্রমিততেজাঃ ভগবান্ পদ্মনাক্ত প্রলয়কালে যোগনিদ্রা অবলম্বন করিয়া তাহার তরঙ্গ শয্যায় শয়ন করিয়া থাকেন, মৈনাক ভূধর দেবরাজের বজ্রপাত ভয়ে কাতর হইয়া শরণাগত হইলে তিনি তাহাকে অভয় প্রদান করিয়াছিলেন, অসুরদল ঘোর যুদ্ধে পরাজিত হইয়া তাঁহার আশ্রয়ে আসিয়া পরিত্রাণ পায়, এবং সহস্র সহস্র মহানদী প্রতিদ্বন্দিনী অভিসারিকাদিগের ন্যায় সতত তাঁহাতে সমাবেশ করিয়েছে।
একষষ্টিতম অধ্যায়
একষষ্টিতম অধ্যায়—ভারতসূচনা।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, প্রথমতঃ গুরুদেবকে ভক্তি শ্রদ্ধা সহকারে একাগ্র চিত্তে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া এবং সমস্ত ব্রাহ্মণগণ ও অন্যান্য বিদ্বান ব্যক্তিদিগের সম্মান ও সৎকার করিয়া, সর্ব্বলোকবিখ্যাত ধীমান্ মহর্ষি ব্যাসদেবের অশেষ মত বর্ণন করিব। মহারাজ! আপনি এই ভারতীয় কথা শ্রবণের যোগ্য পাত্র, এবং গুরুদেবের আদেশ পাইয়া আমারও এই মহতী কথার কীর্ত্তনে উৎসাহ জন্মিতেছে।
মহারাজ! শ্রবণ করুন। রাজ্যের নিমিত্ত দ্যূতক্রীড়া দ্বারা যে রূপে কৌরব ও পাণ্ডবদিগের আত্মবিচ্ছেদ, পাণ্ডবদিগের বনবাস ও সর্ব্বসংহারকারী সংগ্রাম ঘটিয়াছিল, তাহা আমি আপনার নিকট বর্ণন করিব। যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চ বীর, পিতার পরলোক প্রস্থানের পর, অরণ্য হইতে আলয়ে প্রত্যাগমন করিলেন, এবং অচিরকালমধ্যেই বেদে ও ধনুর্ব্বেদে কৃতবিদ্য হইয়া উঠিলেন। কৌরবেরা পাণ্ডবদিগকে এইরূপ শ্রী, কীর্ত্তি, রূপ, বল, বীর্য্য ও ঔদার্য্য সম্পন্ন এবং পুরবাসিগণের প্রিয় দেখিয়া অত্যন্ত ঈর্ষাপরবশ হইলেন। ক্রুরস্বভাব দুর্য্যোধন, কর্ণ ও সৌবল, একমতাবলম্বী হইয়া, পাণ্ডবদিগের নানা নিগ্রহ করিতে ও তাঁহাদিগের উপর যৎপরোনাস্তি অত্যাচার করিতে আরম্ভ করিল। পাপাত্মা দুর্য্যোধন ভীমকে অন্নের সহিত বিষপান করাইয়াছিল; কিন্তু ভীম তাহা জীর্ণ করিয়াছিলেন। ভীম গঙ্গাতটে নিদ্রিত ছিলেন, দুরাত্মা দুর্য্যোধন সেই অবস্থায় তাঁহাকে বন্ধ করিয়া গঙ্গাপ্রবাহে প্রক্ষেপ পূর্ব্বক গৃহে আসিয়াছিল। পরে কুন্তীনন্দন জাগরিত হইয়া বাহুবলে বন্ধনচ্ছেন পূর্বক গঙ্গাপ্রবাহ হইতে উত্থান করেন। একদা ভীমকে নিদ্রিত দেখিয়া, দুর্য্যোধন অতি তীক্ষ্ণবিষ কৃষ্ণসর্প দ্বারা তাঁহার সর্বাঙ্গে দংশন করায়, তথাপি তাঁহার প্রাণনাশ হয় নাই।
এই রূপে দুর্য্যোধন পাণ্ডবদিগের যে সকল নিগ্রহ করিত, মহামতি বিদুর তৎপ্রতীকার ও তৎসমুদায় হইতে তাহাদের রক্ষণবিষয়ে সতত অবহিত ছিলেন। স্বর্গবাসী দেবরাজ ইন্দ্র যেমন জীবলোকের সুখপ্রদ, বিদুর পাণ্ডবদিগের নিয়ত সেইরূপ সুখপ্রদ ছিলেন।
যখন দুরাত্মা দুর্য্যোধন, কি গুপ্ত কি প্রকাশিত, কোনও উপায়েই পাণ্ডবদিগের বিনাশ করিতে পারিল না, তখন কর্ণ দুঃশাসন প্রভৃতি সচিবগণের সহিত মন্ত্রণা করিয়া এবং ধৃতরাষ্ট্রের অনুজ্ঞা লইয়া জতুগৃহ নির্ম্মাণ করাইল। পুত্রের চিত্তরঞ্জনকারী রাজা ধৃতরাষ্ট্র রাজ্যভোগাভিলাষে পাণ্ডবদিগকে নির্ব্বাসিত করিলেন। তাঁহারা পঞ্চ ভ্রাতা ও জননী ছয় জনে হস্তিনাপুর হইতে প্রস্থান করিলেন। মহাপ্রাজ্ঞ বিদুর মহাশয় প্রস্থানকালে তাঁহাদের মন্ত্রিস্বরূপ হইয়াছিলেন; তাহারই মন্ত্রণাপ্রভাবে তাঁহারা নিশীথ সময়ে জতুগৃহদাহ হইতে মুক্ত হইয়া বন প্রস্থান করিতে পারিয়াছিলেন। পাণ্ডবেরা বারণাবতনগরে উপস্থিত হইয়া জননীসহিত অথায় অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। তাঁহারা ধৃতরাষ্ট্রের আদেশানুসারে, অত্যন্ত সাবধান ও সতর্ক হইয়া, জতুগৃহে সংবৎসর বাস করিলেন। অনন্তর বিদুরের উপদেশ ক্রমে প্রথমতঃ সুরঙ্গ প্রস্তুত করিলেন; পরে সেই জতুগৃহে অগ্নি প্রদান করিয়া এবং দুরাচার পুরোচনকে দগ্ধ করিয়া জননীসহিত গুপ্ত ভাবে পলায়ন করিলেন।
কিয়ৎ দূর গমন করিয়া পাণ্ডবেরা এক বননির্ঝর সমীপে হিড়িম্বনামক এক মহাভয়ানক রাক্ষস দেখিতে পাইলেন, এবং ঐ রাক্ষসরাজের প্রাণবধ করিয়া প্রকাশভয়ে তথা হইতে পলায়ন করিলেন। ভীমসেন এই স্থলে হিড়িম্বা রাক্ষসীর পাণিগ্রহণ করেন। এই হিড়িম্বার গর্ভে ঘটোৎকচের জন্ম হয়। অনন্তর পাণ্ডবেরা একচক্রানামক নগরীতে উপস্থিত হইলেন, এবং ব্রহ্মচারিবেশ পরিগ্রহ পূর্ব্বক বেদাধ্যয়নরত ও ব্রতপরায়ণ হইয়া, কিছু কাল এক ব্রাহ্মণের আলয়ে অবস্থিতি করিলেন। তথায় এক মহাবল পরাক্রান্ত বকনামক ভয়ানক ক্ষুধার্ত্ত রাক্ষস ছিল; মহাবাহু ভীমসেন তাহার নিকটে গিয়া, নিজ বাহুবীর্য্য প্রভাবে তাহার প্রাণবধ করিয়া, নগরবাসীদিগের ভয় নিরাকরণ ও শোক নিবারণ করিলেন।
কিয়ৎ দিন পরে পাণ্ডবেরা শ্রবণ করিলেন, পাঞ্চালদেশে দ্রৌপদী নামে এক কন্যা স্বয়ংবরা হইয়াছেন। স্বয়ংবরবৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া তাঁহার তথায় গমন করিলেন, এবং দ্রৌপদী লাভ করিয়া সংবৎসর কাল পাঞ্চালদেশে অবস্থান করিলেন। অনন্তর তাঁহাদিগকে সকলে পাণ্ডব বলিয়া জানিতে পারিতে, পুনর্ব্বার তাঁহারা হস্তিনাপুর প্রত্যাগমন করিলেন।
রাজা ধৃতরাষ্ট্র ও ভীষ্মদেব পাণ্ডবদিগকে কহিলেন, হে বৎসগণ! কিসে তোমাদিগের ভ্রাতৃবিরোধ না হয়, এই বিষয় বিবেচনা করিয়া আমরা স্থির করিয়াছি, তোমাদিগকে খাণ্ডবপ্রস্থে বাস করিতে হইবেক; অতএব তোমরা খাণ্ডবপ্রস্থ প্রস্থান কর। ঐ নগর পরম রমণীয়, বাসের উপযুক্ত স্থান। তাঁহারা, তাঁহাদিগের দুই জনের বচনানুসারে, আপনাদিগের সমুদায় সম্পত্তি গ্রহণ পূর্ব্বক সমস্ত সুহৃজ্জন সমভিব্যাহারে খাণ্ডবপ্রস্থ প্রস্থান করিলেন।
পাণ্ডবের তথায় বহু বৎসর বাস করিলেন, এবং শস্ত্রবলপ্রভাবে অন্যান্য নরপতিদিগকে বশীভূত করিলেন। এই রূপে তাঁহারা ধর্ম্মনিষ্ঠ, সত্যব্রতপরায়ণ, সর্ব্ব বিষয়ে সাবধান ও ক্ষমাশীল হইয়া অনেকানেক বিপক্ষগণকে বশীভূত করিতে লাগিলেন। মহাযশস্বী ভীমসেন পূর্ব্ব দিক্ জয় করিলেন, মহাবীর অর্জ্জুন উত্তর দিক্, নকুল পশ্চিম দিক্, বিপক্ষপক্ষক্ষয়কারী সহদেব দক্ষিণ দিক্ জয় করিলেন। এই রূপে তাঁহারা সকলে সমস্ত পৃথিবীকে আপনাদিগের বশীভূত করিলেন। সূর্য্যদেব স্বভাবতঃ সতত বিরাজমান আছেন, এক্ষণে যথার্থ বিক্রমশালী পঞ্চ পাণ্ডব সূর্য্যদেবের ন্যায় বিরাজমান হওয়াতে, পৃথিবী ষট্সূর্য্যসম্পন্নার ন্যায় হইল।
অনন্তর, যথার্থবিক্রমশালী তেজস্বী ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির, কোনও প্রয়োজনবশতঃ প্রাণ অপেক্ষাও প্রিয়, পুরুষশ্রেষ্ঠ, স্থিরমতি, সর্ব্বগুণালঙ্কৃত অর্জুনকে বনপ্রেরণ করিলেন। তিনি পূর্ণ সংবৎসর ও এক মাস বনবাস করিয়া, কৃষ্ণের সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত, দ্বারকা গমন করিলেন। তথায় তিনি বাসুদেবের অনুজা রাজীবলোচনা মধুরভাষিণী সুভদ্রার পাণিগ্রহণ করিলেন। যেমন ইন্দ্রের শচী, নারায়ণের লক্ষী, সেইরূপ সুভদ্রা পাণ্ডুনন্দন অর্জুনের সহধর্ম্মিণী হইলেন।
কুন্তীতনয় অর্জ্জুন, বাসুদেবের সহায়তা প্রাপ্ত হইয়া, খাণ্ডবদাহে হব্যবাহনের তৃপ্তি সম্পাদন করিলেন। বাসুদেব সহায় থাকাতে খাণ্ডবদাহ অর্জ্জুনের কষ্টসাধ্য হইল না। অগ্নি প্রীত হইয়া অর্জ্জুনকে ধনুঃশ্রেষ্ঠ গাণ্ডীব অক্ষয়বাণপুর্ণ দুই তুণ, এবং কপিধ্বজরথ প্রদান করিলেন। অর্জ্জুন খাণ্ডবদাহকালে ময়নামক অসুরকে মুক্ত করেন, এই নিমিত্ত ময়াসুর রাজসূয়যজ্ঞকালে সর্ব্বরত্নালঙ্কৃত দিব্য সভা নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন। নিতান্ত দুর্ম্মতি হীনবুদ্ধি দুর্য্যোধন সেই সভা দর্শনে লোভাক্রান্ত হইলেন; তৎপরে শকুনির সহিত পাশক্রীড়াতে যুধিষ্ঠিরকে বঞ্চনা করিয়া দ্বাদশ বৎসরের নিমিত্ত বনপ্রেরণ করিলেন। পাণ্ডবেরা দ্বাদশ বৎসর বনবাসের পর এক বৎসর অজ্ঞাতবাসে থাকিলেন।
পাণ্ডবেরা, এই রূপে ত্রয়োদশ বৎসর অতিক্রম করিয়া, যখন চতুর্দ্দশ বর্ষে স্বীয় রাজ্যাধিকার প্রার্থনা করিয়াও প্রাপ্ত হইলেন না, তখন যুদ্ধারম্ভ হইল। তাঁহারা সেই যুদ্ধে ক্ষত্রিয়কুলের ধ্বংস ও রাজা দুর্য্যোধনের প্রাণবধ করিয়া পুনরায় রাজ্যাধিকার লাভ করিলেন।
মহাত্মা পাণ্ডবদিগের পুরাবৃত্ত, রাজ্যাধিকারের নিমিত্ত ভ্রাতৃভেদ ও যুদ্ধজয়ের বৃত্তান্ত এই।
একাদশ অধ্যায়
একাদশ অধ্যায়— পৌলোমপর্ব্ব।
ডুণ্ডুভ কহিল, পূর্ব কালে খগম নামে এক সত্যবাদী তপোৰীর্যসম্পন্ন ব্রাহ্মণ আমার বাল্যকালের সখা ছিলেন। এক দিবস তিনি অগ্নিহোত্রানুষ্ঠানে সাতিশয় ব্যাসক্ত আছেন, এমন সময়ে আমি, বালস্বভাবসুলভ কৌতূহলপরতন্ত্র হইয়া, তৃণ দ্বারা এক ভুজঙ্গ নির্মাণ করিয়া তাহাকে ভয় প্রদর্শন করিলাম। তিনি মুচ্ছিত হইলেন, কিন্তু চেতনাপ্রাপ্তি হইলে কোপানলে দগ্ধ হইয়া কহিলেন, আমাকে ভয় প্রদর্শন করিবার নিমিত্ত যাদৃশ নির্বী সর্প নিৰ্মাণ করিয়াছ, আমার শাপে ভুমি তাদৃশ সর্প হইয়া জন্ম গ্রহণ করিবে। আমি তাহার তপস্যার প্রভাব অবগত ছিলাম; অতএব অতিশয় উদ্বিগ্ন হইয়া প্রণতি পূর্বক কৃতাঞ্জলিপুটে সম্মুখে দাড়াইয়া নিবেদন করিলাম, ভ্রাতঃ! আমি সখা বলিয়া পরিহাস করিবার নিমিত্ত হাসিতে হাসিতে এই কর্ম্ম করিয়াছি, এক্ষণে ক্ষমা করিয়া শাপ নিবারণ কর।
খগম আমাকে নিতান্ত কাতর দেখিয়া মুহুর্মুহুঃ উষ্ণ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্ব্বক ব্যাকুল চিত্তে কহিলেন, দেখ, আমি যাহা কহিয়াছি, কোন ক্রমেই তাহার অন্যথা হইবেক না; তবে এখন যাহা কহি, অবধান পূর্ব্বক শ্রবণ করিয়া সর্ব কাল স্মরণ করিয়া রাখিৰে। মহর্ষি প্রমতির রুরু নামে এক পরম পবিত্র পুত্র জন্মিবেন, তাহার দর্শনে তোমার শাপ মোচন হইবেক। আপনি রুরু নামে খ্যাত ও প্রতিরও অত্যুজ বটেন। আপনার দর্শন পাইয়াছি, এক্ষণে স্বরূপ প্রাপ্ত হইয়া আপনাকে হিতোপদেশ দিতেছি, শ্রবণ করুন। পোলোমপর্ব শাপভ্রষ্ট সহস্রপাদ ইহা কহিয়া ডুঙুভরূপ পরিত্যাগ পূর্বক পুনর্ধার স্বীয় ভাস্বর স্বরূপ প্রাপ্ত হইলেন এবং কহিলেন, হে মহাপ্রভাব রুরো! অহিংসা পরম ধর্ম্ম, অতএব ব্রাহ্মণের কখনও প্রাণিহিংসা করা উচিত নহে। বেদের আদেশ এই যে, ব্রাহ্মণ সদা প্রস্তচিত্ত, বেদবেদাঙ্গবেত্তা, ও সর্বভূতের অভয়প্রদ হইবেন। অহিংসা, সত্যকথন, ক্ষমা, ও বেদধারণ ব্রাহ্মণের পরম ধর্ম্ম। আপনি ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণের ক্ষত্রিয়ধর্ম্ম অবলম্বন করা বিধেয় নহে। দণ্ডধারণ, উগ্রস্বভাবতা, ও প্রজাপালন এ সকল ক্ষত্রিয়ের ধর্ম্ম। পূর্বে জনমেজয়ের যজ্ঞে সর্পকুলের হিংসা আরম্ভ হইয়াছিল। অবশেষে, তপঃপ্রভাকসম্পন্ন বেদৰেদাঙ্গপারগ দ্বিজশ্রেষ্ঠ আস্তীক মহাশয় হইতে ভয়ার্ত্ত সর্পদিগের পরিত্রাণ হইল।
একোনষষ্টিতম অধ্যায়
একোনষষ্টিতম অধ্যায়—ভারতসূচনা।
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি আমার নিকট ভৃগুবংশের বৃত্তান্ত প্রভৃতি অখিল মহৎ আখ্যান কীর্ত্তন করিলে, ইহাতে আমি তোমার প্রতি প্রীত হইয়াছি। এক্ষণে আমি তোমাকে পুনর্ব্বার অনুরোধ করিতেছি, ব্যাসসংক্রান্ত যে সমস্ত কথা আছে, সে সমুদায় আমার নিকট কীর্ত্তন কর। অতি দুঃসাধ্য সর্পসত্রে মহাত্মা সদস্যগণ অবসরকালে যে যে বিষয়ে যে সকল বিচিত্র কথা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন, আমরা তোমার নিকট সেই সমস্ত কথা যথাবৎ শ্রবণ করিতে বাসনা করি; তুমি আমাদিগের নিকট বর্ণনা কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, সর্পসত্রনিযুক্ত ব্রাহ্মণেরা অবসরকালে বেদমূলক নানা অখ্যান কীর্ত্তন করিয়াছিলেন, কিন্তু ব্যাসদেব মহাভারতরূপ বিচিত্র আখ্যান কীর্ত্তন করেন। শৌনক কহিলেন, ভগবান কৃষ্ণদ্বৈপায়ন অবসরকালে, রাজা জনমেজয় কর্ত্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া, পাণ্ডবদিগের যশস্কর যে মহাভারতরূপ আখ্যান বিধি পূর্ব্বক শ্রবণ করাইয়াছিলেন, মহানুভাব মহর্ষির মনঃসাগরসম্ভূত সেই পরম পবিত্র কথা যথাবিধি শুনিতে অভিলাষ করি, হে সাধুশ্রেষ্ঠ! তুমি তাহা কীর্ত্তন কর; আমি অদ্যাপি আখ্যানশ্রবণে তৃপ্ত হই নাই। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ঋষিপ্রবর! আমি কৃষ্ণদ্বৈপায়নপ্রোক্ত মহৎ উৎকৃষ্ট মহাভারত-নামক আখ্যান প্রথমাবধি সমুদায় কীর্ত্তন করিব, আপনি শ্রবণ করুন। আমারও এই আখ্যান কীর্ত্তন করিতে অত্যন্ত আহ্লাদ জম্মিতেছে।
চতুঃপঞ্চাশ অধ্যায়
চতুঃপঞ্চাশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তদনন্তর নাগভগিনী জরৎকারু স্বীয় সহোদরের বচনানুসারে আপন পুত্রকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, বৎস! আমার ভ্রাতা কোনও প্রয়োজনসাধনোদ্দেশে আমারে তোমার পিতাকে দান করিয়াছিলেন। এক্ষণে সেই প্রয়োজন উপস্থিত, তাহা সম্পন্ন কর।
মাতৃবাক্য শ্রবণ করিয়া আস্তীক কহিলেন, জননি! মাতুল মহাশয় কি প্রয়োজনসাধনোদ্দেশে তোমারে আমার পিতাকে দান করিয়াছিলেন, তুমি আমাকে তাহার সবিশেষ বল, শুনিয়া আমি তাহ সম্পন্ন করিব। বন্ধুকুলহিতৈষিণী নাগরাজভগিনী জরৎকারুপুত্রকে সবিশেষ সমস্ত কহিতে লাগিলেন।
বৎস! শ্রবণ কর। সমস্ত নাগকুলের জননী ক রোশা হইয়া আপন পুত্রদিগকে এই শাপ দিয়াছিলেন যে, আমি বিনতার সহিত দাসত্ব পণ করিয়া শুক্লবর্ণ উচ্চৈঃশ্রবাকে কৃষ্ণবর্ণ করিবার নিমিত্ত কহিয়াছিলাম, কিন্তু তোমরা আমার সে কথা রক্ষা করিলে না; অতএব রাজী জনমেজয়ের যজ্ঞে অগ্নি তোমাদিগকে দগ্ধ করিবেন; তাহাতে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়া তোমরা প্রেতলোকে গমন করিবে। সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা নাগজননীর শাপদান শ্রবণ করিয়া তথাস্তু বলিয়া অনুমোদন করিলেন। বাসুকি এইরূপ পিতামহবাক্য শ্রবণ করিয়া অমৃতমন্থনকালে দেবতাদিগের শরণাগত হইলেন। দেবতারা অমৃত লাভে কৃতকার্য্য হইয়া আমার ভ্রাতাকে সমভিব্যাহারে করিয়া পিতামহসমীপে উপস্থিত হইলেন, এবং স্তুতি ও প্রণতি দ্বারা তাহাকে প্রসন্ন করিয়া শাপনিৰারণের উপায় প্রার্থনা করিলেন; কহিলেন, ভগব? নাগৱাঞ্জ বাসুকি জ্ঞাতিকুলক্ষয়সম্ভাবনা দর্শনে যৎপরোনাস্তি কাতর হইয়াছেন। আপনি কৃপা করিয়া শাপমোচনের উপায় বিধান করুন। ব্রহ্মা কহিলেন, জরৎকারু জরৎকারুনাম্নী যে ভার্য্যা পরিগ্রহ করিবেন, তাহার গর্ভজাত ব্রাহ্মণ সর্পকুলকে সেই শাপ হইতে মুক্ত করিবেন। পন্নগরাজ বাকি সেই বাকা শ্রবণ করিয়া আমায় তোমার পিতাকে দান করিয়াছিলেন। তুমিও প্রয়োজনসাধনের সময় উপস্থিত হইবার পূর্বেই আমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছ। এক্ষণে সেই সময় উপস্থিত, উপস্থিত ভয় হইতে নাগকুলের পরিত্রাণ কর, আমার ভ্রাতাকে সেই বিষম হুতাশন হইতে রক্ষা কর। আমার ভ্রাতা যে অভিপ্রায়ে আমায় ভোমার পিতাকে দান করিয়াছিলেন, যেন তাহা বিফল না হয়; এক্ষণে তোমার কি অভিপ্রায় বল।
আস্তীক এইরূপ মাতৃবাক্য শ্রবণ করিয়া অঙ্গীকার করিলেন, এবং শোকসন্তপ্ত বাসুকিকে আশ্বাস প্রদান করিয়া কহিলেন, মাতুল! আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি, আপনাকে মাতৃশাপ হইতে মুক্ত করিব। আপনি সুস্থচিত্ত হউন, আপনার কোনও ভয় নাই, যাহাতে আপনাদিগের মঙ্গল হয়, আমি তদ্বিষয়ে বিশিষ্টরূপ যত্নবান্ হইব। অন্য কথা দূরে থাকুক, পরিহাসকালেও আমি কখনও মিথ্যা কহি নাই। অদ্য আমি সপসদীক্ষিত রাজা জনমেজয়ের নিকট গিয়া, মাঙ্গলিক বাক্য দ্বারা তাঁহাকে প্রশ্ন করিয়া, যাহাতে সেই যজ্ঞ নিবারণ হয়, তাহা করিব, আপনি নিশ্চিন্ত হউন, আমি সমুদায় সম্পন্ন করিব, আপনি মামার বিষয়ে কোনও ক্রমেই সন্দিহান হইবেন না। বাসুকি কহিলেন, বৎস! আমি মাতৃদগুনিগৃহীত হইয়া ঘূর্ণিত হইতেছি, আমার হৃদয় বিদীর্ণ প্রায় হইতেছে, দিগ্ভ্রম জম্মিতেছে। আস্তীক কহিলেন, মহাশয়। আপনার আর পরিতাপ করিবার অবশ্যকতা নাই। সর্পসত্রের প্রদীপ্ত হুতাশন হইতে মহাশয়ের যে ভয় জন্মিয়াছে, আমি তাহা দূর করিব, প্রলয়কালীন অনলতুল মহাখোর ব্রহ্মদণ্ড নিরাক্ষরণ করি, অপিনি কোনও ক্রমেই ভীতু হইবেন না।
এইরূপ আশ্বাস প্রদান দ্বারা বাসুকির অতি-বিষম শোকানল শান্তি করিয়া দ্বিজশ্রেষ্ঠ আস্তীক ভূজগকুলের পরিত্রাণের নিমিত্ত সর গমনে রাজা জনমেজয়ের সর্বগুণসম্পন্ন সপত্রে উপস্থিত হইলেন; দেখিলেন, সূর্য্য ও বহ্নি সম তেজস্বী সদস্যগণ উৎকৃষ্ট বজ্ঞায়তনে উপবিষ্ট আছেন। প্রবেশকালে দ্বারবানেরা নিবারণ করিল। তখন সেই অদ্বিতীয় পুণ্যশীল দ্বিজশ্রেষ্ঠ প্রবেশলাভের নিমিত্ত সর্পত্রের ভূয়সী প্রশংসা করিলেন। অনন্তর যজ্ঞক্ষেন্ত্রে উপস্থিত হইয়া বাজার, ঋত্বিকগণের, সদস্যযবর্গের এবং যক্ষ্মীয় হুতাশনের প্রশংসা করিতে আরম্ভ করিলেন।
চতুর্থ অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায়— পৌলোমপর্ব্ব।
সৌতি কহিলেন, নৈমিষারণ্যে কুলপতি শৌনকের দ্বাদশবার্ষিক যজ্ঞে যে সমস্ত ঋষি সমাগত হইয়াছিলেন, সূতকুলোদ্ভব ললামহর্মণপুত্র পৌরাণিক উগ্রশ্রবাঃ পুরাণকীর্ত্তন দ্বারা তাঁহাদের চিত্তরঞ্জন করিতেছিলেন। তিনি কৃতাঞ্জলি হুইয়া নিবেদন করিলেন, হে মহর্ষিগণ! রাজা জনমেজয়ের সর্পসত্রানুষ্ঠানের কারণান্তর স্বরূপ উতঙ্কচরিত আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করিলাম; এক্ষণে আপনারা আর কি শুনিতে বাসনা করেন? অজ্ঞা করুন, আর কি বর্ণনা করিব।
ঋষিগণ কহিলেন, হে লোমহর্ষণপুত্র! আমরা শ্রবণবাসনাপরবশ হইয়া কথাপ্রসঙ্গক্রমে যে যে বিষয় তোমাকে জিজ্ঞাসা করিব, তুমি তৎসমুদায় বর্ণন করিবে। এক্ষণে কুলপতি শৌনক অগ্নিগৃহে অবস্থিত হাছেন; তিনি দেবতা, অসুর, মনুষ, সর্প, ও..ন্ধব ঘটিত অলৌকিক তাবৎ বৃত্তান্ত জানেন; তিনি বিদ্বান্, কার্যদক্ষ, ব্রতপরায়ণ, বেদ ও বেদান্ত শাস্ত্রের অদ্বিতীয় গুরু, সত্যবাদী, শান্তচিত্ত, তপস্যারত; তিনি আমাদিগের সকলের গুরু, মহামান্য, তাহার আগমন প্রতীক্ষা কর। তিনি পরুমপূজিত আসনে আসীন হইয়া যাই। জিজ্ঞাসিবেন, তাহাই কহিবে।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তাহাই ভাল, সেই মহাত্মা আসন পরিগ্রহ করিয়া জিজ্ঞাসিলেই পরম পবিত্র বহুবিধ কথা কীর্ত্তন করিব। অনন্তর বিপ্রকুলতিলক মহর্ষি শৌনক যথাবিধি দেবযজ্ঞ পিতৃতর্পণ প্রভৃতি সমস্ত ক্রিয়া সমাপন করিয়া, যে স্থানে উগ্রশ্রবাঃ ও ব্রতপরায়ণ ব্রহ্মর্ষি ও সিদ্ধগণ উপবিষ্ট ছিলেন, তথায় উপস্থিত হইলেন, এবং ঋত্বি ও সদস্যগণ উপবিষ্ট হইলে স্বয়ং আসন পরিগ্রহ করিয়া কহিতে আরম্ভ করিলেন।
চতুর্দ্দশ অধ্যায়
চতুর্দ্দশ অধ্যায়—আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, জরৎকারু এই রূপে গৃহস্থাশ্রমপ্রবেশে কৃতসংকল্প হইয়া ভার্য্যালভার্থে সমস্ত ভূমণ্ডল পরিভ্রমণ করিলেন, কিন্তু কোনও ব্যক্তিই তাঁহাকে কন্যাদান করিল না। এক দিন তিনি পিতৃলোকের আদেশ প্রতিপালনার্থে বনপ্রবেশপূর্ব্বক উচ্চৈঃ স্বরে তিন বার কন্যা ভিক্ষা করিলেন। তখন বাসুকি স্বীয় ভগিনী আনয়ন করিয়া দান করিতে উদ্যত হইলেম। কিন্তু সেই কন্যা সনাম্নী নহে, এই আশঙ্কা করিয়া তিনি প্রথমতঃ তাঁহাকে প্রতিগ্রহ করিলেন না, কারণ, তিনি প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, যদি কন্যা সনাম্নী ও হয় তাহার বন্ধুগণ স্বেচ্ছাক্রমে দান করিতে উদ্যত হয়েন, তবেই তাহাকে ভার্য্যা স্বরূপে পরিগ্রহ করিব। অনন্তর মহাপ্রাজ্ঞ মহাতপাঃ জরৎকারু বাসুকিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে ভুজঙ্গম! সত্য কহ তোমার এই ভগিনীর নাম কি? বাসুকি কহিলেন, হে জরৎকারু! আমার এই অনুজার নাম জরৎকারু, আমি তোমাকে দান করিতেছি, তুমি প্রতিগ্রহ কর। আমি ইহাকে তোমার নিমিত্তই এত কাল রাখিয়াছিলাম, এক্ষণে তুমি পরিগ্রহ কর। ইহা কহিয়া বাসুকি জরৎকারুকে ভগিনী দান করিলেন। তিনিও বেদবিহিত বিধান অনুসারে তাঁহাকে ভার্য্যা স্বরূপে পরিগ্রহ করিলেন।
চতুর্বিংশ অধ্যায়
চতুর্বিংশ অধ্যায় অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
গরুড় দেবতাদিগের এইরূপ স্তুতি ও প্রার্থনা শুনিয়া এবং আপন কলেবর অবলোকন করিয়া তৎপ্রতিসংহার করিতে আরম্ভ করিলেন এবং কহিলেন, আমার দেহ দর্শনে সকল প্রাণীকে আর ভীত হইতে হইবেক না। সকলেই ভয়ানক অকার দেখিয়া ভীত হইয়াছে; অতএব আমি আত্মতেজঃ সংহার করিতেছি। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কামগম কামৰীর্য্য বিহঙ্গম, অরুণকে আত্মপৃষ্ঠে আরোহণ করাইয়া, পিত্রালয় হইতে মহার্ণবের অপরপারবর্ত্তিনী স্বীয় জননীর সন্নিধানে উপস্থিত হইলেন, এবং ঐ সময়ে সূর্য্য স্বীয় উগ্র তেজঃ দ্বারা ত্রিলোক দগ্ধ করিবার উদ্যম করাতে, মহাদ্যুতি অরুণকে পূর্ব দিকে স্থাপিত করিলেন।
রুরু কহিলেন, ভগবান্ সূর্য্য কি নিমিত্ত সমস্ত ভুবন দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন, আর দেবতারাই বা তাহার কি অপকার করিয়াছিলেন যে, তিনি এত কুপিত হইলেন? প্রমতি কহিলেন, যে সময় চন্দ্র ও সূর্য্য, রাহুকে ছদ্মবেশে অমৃত পান করিতে দেখিয়া দেবতাদিগের নিকট ব্যক্ত করিয়া দেন, তদবধি তাহাদের উভয়ের সহিত রাহুর বৈরামুবন্ধ হয়। পরে ঐ দুষ্ট গ্রহ সূর্য্যকে গ্রাসযন্ত্রণা দিতে আরম্ভ করিলে, তিনি এই ভাবিয়া ক্রুদ্ধ হইলেন যে, আমি দেবতাদিগের মঙ্গল চেষ্টা। করিয়া রাহুর কোপে পতিত হইলাম, এবং তন্নিবন্ধন আমিই একাকী নানা অনর্থকর পাপ ভোগ করিতেছি; বিপৎকালে কোন ব্যক্তিকেই সহায়তা করিতে দেখিতে পাই না; যৎকালে রাহু আমাকে গ্রাস করে, দেবতারা দেখিয়া অনায়াসে সহ করিয়া থাকে; অতএব নিঃসন্দেহ আমি সকল লোক সংহার করিব।
সূর্যদেব এই মানস করিয়া অস্তাচলচূড়াবলম্বী হইলেন, এবং লোকবিনাশনমানসে স্বীয় তেজঃ বৃদ্ধি করিতে লাগিলেন। মহর্ষিগণ তদ্দর্শনে সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া দেবতাদিগের নিকটে গিয়া নিবেদন করিলেন, অদ্য অর্দ্ধরাত্র সময়ে সর্ব্বলোকভয়প্রদ মহান্ দাহ আরম্ভ হইবেক; তাঁহাতে ত্রৈলোক্যবিনাশ সম্ভাবনা। তখন দেবতারা ঋষিগণ সমভিব্যাহারে সর্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, ভগবন্! অদ্য কোথা হইতে মহৎ দাহভয় উপস্থিত হইল? সূর্য্য লক্ষিত হইতেছে না, এক্ষণে রজনী উপস্থিত; জানি না, সূর্য উদয় হইলে কি দশা ঘটিবেক।
পিতামহ কহিলেন, হে দেবগণ! আমাদের সূর্য লোকসংহারে উদ্যত হইয়াছেন; অদ্য উদিত হইলেই ত্রিলোক ভস্মরাশি করিবেন। কিন্তু পূর্বেই ইহার প্রতিবিধান করিয়া রাখিয়াছি। কশ্যপের অরুণ নামে মহাকায় মহাতেজাঃ এক পুত্র জন্মিয়াছে, সে সূর্যসম্মুখে অবস্থিতি করিবেক, তাহার সারথি হইবেক, এবং তদীয় তেজঃ সংহার করিবেক। প্রতি কহিলেন, তদনন্তর অরুণ ব্রহ্মার আদেশানুসারে সমস্ত কার্যানুষ্ঠানে সম্মত হইলেন, এবং সূর্য উদিত হইবামাত্র তাহাকে আচ্ছাদন করিয়া তাহার সম্মুখে অবস্থিত হইলেন। সূর্য্য যে কারণে কুপিত হইয়াছিলেন, এবং অরুণ যে রূপে তাঁহার সারথি হইলেন, সে সমুদায় কীর্ত্তন করিলাম।
চতুশ্চত্বারিংশ অধ্যায়
চতুশ্চত্বারিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মন্ত্রিগণ রাজাকে তক্ষকের ফণমণ্ডলে বেষ্টিত দেখিয়া বিষণ্ণবদন ও সাতিশয় দুঃখিত হইয়া রোদন করিতে লাগিলেন। অনন্তর, ভঁহারা তক্ষকের ভয়ঙ্কর গর্জন শ্রবণে ভয়ার্ত হইয়া পলায়ন করিতে আরম্ভ করিলেন, এবং দেখিতে পাইলেন, তক্ষক নভোমণ্ডলে প্রদীপ্ত অগ্নিশিখার ন্যায় গমন করিতেছেন। তদনন্তর, সেই প্রাসাদকে ভুজগরাজের বিষজনিত হুতাশনে বেষ্টিত ও প্রজ্বলিত অবলোকন করিয়া, তাঁহারা চারি দিকে পলায়ন করিলেন। রাজা বজ্রাহত প্রায় ভূতলে পতিত হইলেন।
এই রূপে রাজা তক্ষকদংশনে প্রাণত্যাগ করিলে, অমাত্যগণ রাজপুরোহিত দ্বারা তদীয় পারলৌকিক ক্রিয়াকলাপ সমাধান করাইলেন, এবং যাবতীয় পৌরগণকে সমবেত করিয়া রাজার শিশু পুত্রকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। লোকে এই কুরুকুলপ্রবীর শক্তঘাতী রাজাকে জনমেজয় নামে ঘোঘণা করে। মহামতি রাজশ্রেষ্ঠ জনমেজয় বালক হইয়াও, পুরোহিত ও মন্ত্রিবর্গের সহিত মন্ত্রণা করিয়া, স্বীয় প্রপিতামহ মহাবীর অর্জুনের ন্যায়, রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। রাজমন্ত্রিগণ, অভিনব রাজাকে দুষ্টদমনাদি কার্যে বিশিষ্টরূপ পারদশী দর্শন করিয়া, তাঁহার দারক্রিয়া সমাধানার্থে কাশিরাজ সুবর্ণবর্মার নিকট তদীয় বপুষ্টমানাম্নী কন্যা প্রার্থনা করিলেন। কাশিরাজ কুরুকুলপ্রদীপ রাজা জনমেজয়কে পুষ্টম প্রদান করিলেন। জনমেজয় তাঁহাকে সহধর্ম্মিণী পাইয়া পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। তিনি কদাপি অন্য নারীতে আসক্তচিত্ত হয়েন নাই। যেমন পুরূরবা পূর্ব্ব কালে উর্বশীকে পাইয়া তাঁহার সহিত বিহার করিয়াছিলেন, তোপ ইনিও এই মহির্ষী পাইয়া প্রসন্ন হইয়া নানা মনোহর সরোবর ও রমণীয় উপবনে তাহার সহিত বিহারসুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন। পতিব্রত বপুষ্টমাও হৃষ্টচিত্তা হইয়া অনুরাগাতিশয় সহকারে বিহারকালে সেই সৎপতিকে পরম সুখী করিয়াছিলেন।
চতুস্ত্রিংশ অধ্যায়
চতুস্ত্রিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
গরুড় কহিলেন, হে দেবরাজ! তোমার ইচ্ছানুসারে অদ্যাবধি তোমার সহিত আমার সখা হউক; আমার বল অতি প্রভূত ও অত্যন্ত অসস্থ। সাধুরা কদাপি স্বীয় বল প্রশংসা ও গুণ কীর্ত্তন করেন না; তুমি সখা, তুমি জিজ্ঞাসা করিতেছ, এই নিমিত্ত বর্ণন করিব; নতুবা অকারণে অত্মিপ্রশংসা করা উচিত নহে। আমার বলের কথা অধিক কি বলিব, এই পৃথিবীকে সমুদয় পর্বত, সমুদায় বন ও সমুদায় সাগর সহিত এক পক্ষে বহন করিতে পারি; আর তুমিও যদি ঐ পক্ষ অবলম্বন কর, ঐ সমভিব্যাহারে তোমাকেও বহিতে পারি; আর যদি আমি এই স্থাবরজঙ্গমাত্মক সমস্ত ভুবন একত্র করিয়া বহন করি, তথাপি আমি পরিশ্রান্ত হইব না। আমার এত বল।
গরুড়ের এইরূপ উক্তি শুনিয়া সর্বলোকহিতকারী কিরীট ধারী শ্রীমান্ দেবরাজ কহিলেন, হে বিহুগরাজ! তুমি যাহা কহিলে তোমাতে সকলই সম্ভব; এক্ষণে তুমি আমার সহিত পরমোৎকৃষ্ট বন্ধুতা স্থাপন কর। আর যদি তোমার অমৃতে প্রয়োজন না থাকে, আমাকে প্রদান কর; তুমি যাহাদিগকে দিবে, তাহারা কেবল আমাদিগের উপর অত্যাচার করিবে। গরুড় কহিলেন, হে সহস্রাক্ষ! আমি কোনও কারণ বশতঃ অমৃত লইয়া যাইতেছি; কিন্তু কাহাকেও পান করিতে দিব না। আমি যে স্থানে ইহা রাখিব, যদি পার, তথা হইতে হরণ করিয়া আনিও। ইন্দ্র কহিলেন, হে পক্ষীন্দ্র! তুমি যাহা কহিলে, ইহাতে আমি সন্তুষ্ট হইলাম, অভিলষিত বর প্রার্থনা কর। তখন গরুড় কপুত্রগণের দৌরাত্ম্য ও ছলকৃত মাতৃদাস্ত স্মরণ করিয়া কহিলেন, আমি সকলের প্রভু হইয়াও তোমার নিকট এই প্রার্থনা করিতেছি যে, মহাবল ভুজগগণ আমার ভক্ষ্য হউক। দেবরাজ গরুড়কে তথাস্তু বলিয়া, মহাত্মা দেবদেব যোগীশ্বর হরির নিকট উপস্থিত হইলেন। তিনি শুনিয়া গরুড়োক্ত বিষয়ে স্বীয় সম্মতি প্রদান করিলেন। অনন্তর ভগবান্ ত্রিদশনায়ক পুনর্বার গরুড়কে কহিলেন, তুমি অমৃত স্থাপন করিলেই আমি হরণ করিয়া আনিব,
এইরূপ সম্ভাষণ করিয়া দেবরাজ বিদায় হইলে, গরুড় মাতৃসমীপে উপস্থিত হইলেন, এবং হৃষ্ট মনে সমস্ত সর্পদিগকে কহিলেন, আমি অমৃত আনিয়াছি, কুশের উপর রাখিয়া দিব; তোমরা স্বরায় স্নান ও মঙ্গলাচরণ করিয়া পান কর। দেখ, তোমরা যেরূপ কহিয়াছিলে, আমি তাহাই সম্পাদন করিলাম; অতএব অদ্য প্রভৃতি আমাৱ জননী দাসীভাব হইতে মুক্ত হউন। সর্পেরা তাহাকে তথাস্তু বলিয়া স্নান করিতে গেল; এবং ইন্দ্রও অবসর বুঝিয়া আগমন পূর্ব্বক অমৃত গ্রহণ করিয়া পুনর্বার স্বর্গারোহণ করিলেন। সর্পেরা স্নানক্রিয়া জপবিধি ও মঙ্গলাচরণ সমাধান করিয়া হৃষ্ট চিত্তে অমৃতপানাভিলাষে সেই প্রদেশে উপস্থিত হইল। কিন্তু গরুড় যে কুশাসনে রাখিবেন বলিয়াছিলেন, তথায় অমৃত না দেখিয়া বিবেচনা করিল, আমরা যেমন দুল করিয়া বিনতাকে দাসী করিয়াছিলাম, তেমনই ছল করিয়া অমৃত গ্রহণ করিয়াছে। পরে, এই স্থানে অমৃত রাখিয়াছিল বলিয়া, তাহারা কুশাসন চাটিতে লাগিল, এবং তাহাতেই তাহাদের জিহ্বা দুই খণ্ডে বিভক্ত হইল। অমৃতস্পর্শ দ্বারা কুশের নাম পবিত্রী হইল।
মহাত্মা গরুড় এই রূপে অমৃতের হরণ ও আহরণ এবং সর্পগণের দ্বিজিতা সম্পাদন করিয়াছিলেন। তদনন্তর মহাযশাঃ খগকুলচূড়ামণি পরম হৃষ্ট চিত্তে সেই কাননে বিহার করিয়া ভুজঙ্গগণ ভক্ষণ পূর্বক স্বীয় জননীর আনন্দ জন্মইতে লাগিলেন। যে নর ব্রাহ্মণসভাতে এই উপাখ্যান শ্রবণ অথবা পাঠ করে, সে মহাত্মা বিহগরাজ গরুড়ের মাহাত্মকীর্ত্তন দ্বারা পুণ্যসঞ্চয় করিয়া স্বর্গারোহণ করে, সন্দেহ নাই।
চত্বারিংশ অধ্যায়
চত্বারিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি জরৎকারু নামে যে মহাত্মা ঋষির চরিত কীর্ত্তন করিলে, তাহার নামের অর্থ শুনিতে বাসনা করি। তিনি যে জরৎকারু নামে ভূমণ্ডলে বিখ্যাত হইলেন, ইহার কারণ কি? তুমি কৃপা করিয়া জরৎকারু শব্দের যথার্থ অর্থ. ব্যাখ্যা কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, জরৎশব্দের অর্থ ক্ষীণ, কাকশব্দের অর্থ দারুণ। তাঁহার শরীর অতিশয় দারুণ ছিল, ধীমান্ মহর্ষি সেই দারুণ শরীরকে কঠোর তপস্যা দ্বারা ক্রমে ক্রমে ক্ষীণ করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত তিনি লোকে জরৎকারু নামে বিখ্যাত। উক্ত হেতু বশতঃ বাসুকির ভগিনীর নামও জরৎকারু।
ধর্ম্মাত্মা শেমিক শুনিয়া কিঞ্চিৎ হাস্য করিলেন, এবং তাহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, সূতনন্দন! যাহা কহিলে, যুক্তিসিদ্ধ বটে। তুমি যাহা যাহা কহিলে, সকলই শ্রবণ করিলাম। এক্ষণে আস্তীকের জন্মবৃত্তান্ত শুনিতে বাসনা করি। উগ্রশ্রবাঃ শৌনকবাক্য শ্রবণ করিয়া শাস্ত্রানুসারে কহিতে লাগিলেন। মহামতি বাসুকি, সমস্ত নাগগণকে আদেশ দিয়া, জরৎকারু ঋষিকে ভগিনীদান করিবার নিমিত্ত উদ্যত হইয়া রহিলেন। বহু কাল অতীত হইল, সেই উৰ্দ্ধরেতাঃ মহর্ষি কোনও ক্রমে দারপরিগ্রহে অভিলাষী হইলেন না; কেবল তপস্যারত, বেদাধ্যয়নতৎপর, ও নির্ভয়চিত্ত হইয়া ভূমণ্ডলে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ কাল অতীত হইলে পর, কুরুবংশীয় পরীক্ষিৎ পৃথিবীর রাজা হইলেন। তিনি স্বীয় প্রপিতামহু মহাবাহু পাণ্ডুর স্যায় ধনুর্বিদ্যাপারদশী, যুদ্ধে দুর্ধর্ষ ও মৃগয়াশীল ছিলেন। রাজা সর্বদাই মৃগ, মহিষ, ব্যাস্ত্র, বরাহ, ও অন্য অন্য বহুবিধ বন্য জন্তু বধ করিয়া ভূমণ্ডলে ভ্রমণ করেন। একদা তিনি বাণ দ্বারা এক মৃগ বিদ্ধ করিয়া পৃষ্ঠদেশে ধনুগ্রহণ পূর্বক তদনুসরণক্রমে গহন বনে প্রবিষ্ট হইলেন। এই রূপে ভগবান্ মহাদেব যজ্ঞমৃগ বিদ্ধ করিয়া হস্তে ধনুর্ধারণ পূর্বক স্বর্গে সেই মৃগের অন্বেষণার্থে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিয়াছিলেন। রাজা পরীক্ষিতের বাণে বিদ্ধ হইয়া কোনও মৃগই জীবিত থাকে না ও পলায়ন করিতে পারে না; কিন্তু সেই মৃগ যে বিদ্ধ হইয়া ও অদর্শন প্রাপ্ত হইল, সে কেবল তাঁহার অবিলম্বে স্বর্গপ্রাপ্তির কারণ হইল।
রাজা পরীক্ষিৎ সেই মৃগের অনুসরণক্রমে ক্রমে ক্রমে দূরদেশে নীত হইলেন, এবং শ্রান্ত ও সৃষ্ণার্ত হইয়া এক গোচারণস্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, এক ঋষি স্তনপানপরায়ণ বৎসগণের মুখনিঃসৃত ফেন পান করিতেছেন। রাজা ক্ষুৎপিপাসায় অতিশয় কাতর হইয়াছিলেন, অতএব সরু গমনে মুনির নিকট উপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ভোভে মুনীশ্বর! আমি অভিমতনয় রাজা পরীক্ষিৎ { এক মৃগ আমার বাণে বিদ্ধ হইয়া পলায়ন করিয়াছে, আপনি দেখিয়াছেন কি না। সেই মুনি মৌনব্রত, অতএব কিছুই উত্তর দিলেন না। রাজা ক্রুদ্ধ হইয়া ধনুর অগ্রভাগ দ্বারা সমীপপতিত মৃতসর্গ উঠাইয়া তাঁহার স্কন্ধে ক্ষেপণ করিলেন। ঋষি তাহাতে রুষ্ট হইলেন না ও ভাল মন্দ কিছুই কহিলেন না। তখন রাজা মুনিকে তদবস্থ দেখিয়া অক্রোধ হইয়া নগরাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। কিন্তু মুনি সেই অবস্থাতেই রহিলেন। মুনীশ্বর অতিশয় ক্ষমাশীল ছিলেন, এবং মহারাজ পরীক্ষিৎকে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ জানিতেন, এজন্য নিতান্ত অবমানিত হইয়াও তাঁহাকে শাপ দিলেন না। ভরতকুলপ্রদীপ রাজাও সেই মহর্ষিকে তাদৃশ ধর্মপরায়ণ বলিয়া জানিতেন না, এই নিমিত্তই তাঁহার তাদৃশ অবমাননা করিলেন।
সেই মহর্ষির অতি তেজস্বী তপঃপরায়ণ এক যুবা পুত্র ছিলেন। তাহার নাম শৃঙ্গী। শৃঙ্গী স্বভাবতঃ অতিশয় ক্রোধপরায়ণ ছিলেন, এক বার ক্রুদ্ধ হইলে শত শত অনুনয়ৰচনেও প্রসন্ন হইতেন না। তিনি অতি সংযত হইয়া সময়ে সময়ে সর্ব্বলোকপিতামহ, সর্ব্বভূতহিতকারী ব্রহ্মার উপাসনা করিতে যাইতেন। এক দিন তিনি উপাসনান্তে ব্রহ্মার অনুজ্ঞা লইয়া গৃহ প্রত্যাগমন করিতেছেন, এমন সময়ে তাহার সখা কৃশ নামে এক ঋষিপুত্র হাসিতে হাসিতে কৌতুক করিয়া তাহার পিতৃবৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। শৃঙ্গী অতিশয় কোপনস্বভাব ও বিষতুল্য, পিতার অপমানবার্তা শ্রবণমাত্র রোষবিষে পরিপূর্ণ হইলেন। কৃশ কহিলেন, অহে শৃঙ্গি! তুমি এমন তপস্বী ও তেজস্বী; কিন্তু তোমার পিতা স্কন্ধে মৃত সৰ্প বহন করিতেছেন। অতএব তার তুমি বৃথা গর্ব করিও না, এবং আমাদিগের মত বেদবিৎ সিদ্ধ তপস্বী ঋষিপুরো কিছু কহিলেও কোন কথা কহিও না। এখন তোমার পুরুষত্বাভিমান কোথায় রহিল ও সেই সকল গর্ব্ববাক্যই বা কোথায় গেল? কিঞ্চিৎ পরেই দেখিবে, তোমার পিতা শব বহন করিতেছেন। আমি তোমার পিতার তাদৃশ অবমাননা দর্শনে অতিশয় দুঃখিত হইয়াছি। কিন্তু সেইরূপ অবমানিত হইলে যাহা করা উচিত, তিনি তদনুরূপ কোনও কর্ম্ম করেন নাই।
তৃতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়—পৌষ্যপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ, কহিলেন, পরীক্ষিৎপুত্র রাজা জনমেজয় স্বীয় সহোদৱগণ সমভিব্যাহারে কুরুক্ষেত্রে বহুবার্ষিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। তাঁহার সেন, উগ্রসেন, ও ভীমসেন নামে তিন সহোদর। তাঁহাদের যজ্ঞানুষ্ঠান কালে এক কুকুর তথায় উপস্থিত হইল। জনমেজয়ের ভ্রাতারা তাহাকে প্রহার করাতে, সে অতিশয় রোদন করিতে করিতে স্বীয় জননী সন্নিধানে গমন করিল। দেবশুনী সরম। পুত্রকে অত্যন্ত লোদন করিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কেন রোদন করিতেছ, কে তোমারে প্রহার করিয়াছে? সে এই রূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া উত্তর করিল, জনমেজয়ের ভ্রাতারা আমাকে প্রহার করিলেন। তখন, সরমা কহিল, আমার স্পষ্ট বোধ হইতেছে, তুমি কোন অপরাধ করিয়াছিলে, তাহাতেই তাহারা প্রহার করিয়াছেন। সে কহিল, আমার কোন অপরাধ নাই, যজ্ঞীয় হর্বিতে দৃষ্টিপাত বা জিহবাস্পর্শ কিছুই করি নাই। ইহা শুনিয়া তাহার মাতা সরমা পুত্রদুঃখে দুঃখিত হইল, এবং যে স্থলে জনমেজয় ভ্রাতৃগণের সহিত যজ্ঞ করিতেছিলেন, তথায় উপস্থিত হইয়া কোপাবেশ প্রদর্শন পূর্বক জনমেজয়কে জিজ্ঞাসা করিল, আমার পুত্রের কোন অপরাধ নাই, যজ্ঞায় হবি অবেক্ষণ বা অবলেহন করে নাই, কি নিমিত্ত প্রহার করিয়াছ? তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তখন সরমা কহিল, তুমি ইহাকে বিনা অপরাধে প্রহার করিয়াছ, অতএব অতর্কিত কারণে তোমার ভয় উপস্থিত হইবেক। রাজা জনমেজয় সরমার শাপ শ্রবণ করিয়া অতিশয় ব্যাকুল ও বিষন্ন হইলেন। পরে আর যজ্ঞ সমাপ্ত হইলে হস্তিনাপুরে প্রত্যাগমন করিয়া সবিশেষ যত্নসহকারে সরমাশাপনিবারণসমর্থ পুরোহিতের অন্বেষণ করিতে লাগিলেন।
একদা পরীক্ষিৎপুত্র জনমেজয় মৃগয়ায় গমন করিয়া নিজ রাজ্যান্তৰ্গত কোন জনপদে এক আশ্রম দর্শন করিলেন। তথায় শ্রুতশ্রবাঃ নামে এক ঋষি বাস করিতেন। তাঁহার সোমশ্রবা নামে তপস্যানুরক্ত পুত্র ছিলেন। জনমেজয় তাঁহার সেই পুত্রের নিকটে গিয়া তাহাকে পৌরহিত্যে বরণ করিলেন। তিনি প্রণাম করিয়া ঋষির নিকট নিবেদন করিলেন, ভগবনৃ! আপনকার এই পুত্র আমার পুরোহিত হউন। ঋষি রাজবাক্য শ্রবণ করিয়া উত্তর করিলেন, এক সপী আমার শুক্র পান করিয়াছিল, আমার এই পুত্র তাহার গর্ভে জন্মেন, ইনি মহাতপস্বী, সদা স্বাধ্যায়রত, মদীয় তপোবীর্যসম্পন্ন, মহাদেবশাপ ব্যতিরেকে অন্যান্য সমুদায় শাপ নিরাকরণে সমর্থ হইবেন। | কিন্তু ইহার এই এক নিগূঢ় ব্রত আছে যে, ব্রাহ্মণে ইহার নিকট যাহা প্রার্থনা করেন, ইনি তাহাই দেন, ইহাতে যদি তোমার সাহস হয়, ইহাকে লইয়া যাও। জনমেজয় শ্রবার বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, মহাশয়! তাহার কোন ব্যতিক্রম ঘটিবে না। অনন্তর তিনি সেই পুরোহিত সমভিব্যাহারে রাজধানী প্রত্যাগমন করিয়া নিজ ভ্রাতাদিগকে কহিলেন, ইনি যখন যাহা আজ্ঞা করিবেন, তোমরা তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিবে, কোন মতে অন্যথা না হয়। ভ্রাতৃগণ তদীয় আদেশ প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। জনমেজয় ভ্রাতাদিগকে এইরূপ আদেশ দিয়। তক্ষশিলা জয়ার্থে প্রস্থান করিলেন, এবং অবিলম্বে সেই দেশ আপন বশীভূত করিলেন।
এই অবসরে প্রসঙ্গক্রমে উপাখ্যানাস্তর আরম্ভ হইতেছে। আহোদধৌম্য নামে এক ঋষি ছিলেন। তাঁহার উপমন্যু, আরুণি, ও ধৌম্য নামে তিন শিষ্য। তিনি পাঞ্চালদেশীয় আরুণি নামক শিষ্যকে ক্ষেত্রের আলি ৰন্ধন করিতে পাঠাইয়া দিলেন। পাঞ্চাল। আরুণি উপাধ্যায়ের আদেশানুসারে তথায় গমন করিলেন, কিন্তু আলি বন্ধন করিতে পারিলেন না। তিনি বিস্তর ক্লেশ স্বীকার করিয়াও কোন ক্রমে কৃতকার্য হইতে না পারিয়া, পরিশেষে এক উপায় দেখিয়া স্থির করিলেন, ভাল, ইহাই করিব। এই নিশ্চয় করিয়া তিনি সেই কেদারখণ্ডে শয়ন করিলেন। শয়ন করাতে জলনিৰ্গম নিবারিত হইল। পরে উপাধ্যায় আয়োদধৌম্য শিষদিগকে জিজ্ঞাসিলেন, পাঞ্চাল আরুণি কোথায় গেল? তাঁহারা বিনীত বচনে উত্তর করিলেন, ভগবনৃ! আপনি তাহাকে ক্ষেত্রের আলিবন্ধনার্থ প্রেরণ করিয়াছেন। ইহা শুনিয়া ঋষি শিষদিগকে কহিলেন, তবে চল আমরা সকলেই সেখানে যাই। অনন্তর তিনি তথায় গমন করিয়া এই বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে আহ্বান করিতে লাগিলেন, অহে বৎস পাঞ্চল্য অরুণি! তুমি কোথায় আছ, আইস। আরুণি উপাধ্যায়বাক্য শ্রবণ করিয়া সহসা সেই কেদারখগু হইতে গাত্রোত্থান পূর্বক তাহার নিকটে আসিয়া নিবেদন করিলেন, মহাশয়। আমি উপস্থিত হইয়াছি, কেদারখণ্ড হইতে যে জল নির্গত হইতেছিল, অরণীয় হওয়াতে তাহা খোধ করিবার নিমিত্ত তথায় শয়ন করিয়াছিলাম, এক্ষণে আপনকার শব্দ শুনিয়া সহসা কেদারখণ্ড বিদীর্ণ করিয়া আপনার নিকটে উপস্থিত হইলাম, অভিবাদন করি, এক্ষণে কি করিব, আজ্ঞা করুন। শিষবাক্যাবসানে উপাধ্যায় তদীয় গুরুভক্তির দৃঢ়তা দর্শনে প্রসন্ন হইয়া কহিলেন, বৎস! তুমি কেদারখণ্ডের আলি বিদীর্ণ করিয়া উত্থান করিয়াছ, অতএব তুমি অদ্যাবধি উদ্দালক নামে প্রসিদ্ধ হইবে; আর আমার বাক্য প্রতিপালন করিয়াছ, এই নিমিত্ত তোমার মঙ্গল হইবেক, বেদ ও সমুদায় ধর্মশাস্ত্র সর্ব্ব কাল স্মরণপথারূঢ় থাকিবেক। আরুণি এইরূপ উপাধ্যায়ৰাক্য শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া অভিলষিত দেশে প্রস্থান করিলেন।
আয়োদধৌম্যের উপমনু নামে আর এক শিষ্য ছিলেন। উপাধ্যায় তাঁহাকে, বৎস উপমনু! তুমি গো রক্ষা কর, এই আদেশ দিয়া গোচারণে প্রেরণ করিলেন। তিনি উপাধ্যায়বচনানুসারে গো রক্ষা করিতে লাগিলেন। উপমন্যু দিবাভাগে গো রক্ষা করিয়া সায়াহে গুরুগৃহে প্রত্যাগমন পূর্বক উপাধ্যায়ের সম্মুখে অবস্থিত হইয়া প্রণাম করিলেন। উপাধ্যায় তাহাকে স্কুলকলের অবলোকন করিয়া জিজ্ঞাসিলেন, বৎস উপমন্যু। তোমাকে বিলক্ষণ স্থূলকায় দেখিতেছি, তুমি কি আহার করিয়া পাক? তিনি উত্তর করিলেন, ভগব! ভিক্ষালব্ধ অন্ন দ্বারা উদরপূর্তি করি। উপাধ্যায় কহিলেন, অতঃপর আমাকে না জানাইয়া ভিক্ষান্ন ভক্ষণ করিবে না। উপমনু এইরূপ আদিষ্ট হইয়া সংগৃহীত ভিক্ষান্ন অনিয়া উপাধ্যায়ের নিকট সমর্পণ করিলেন। উপাধ্যায় সমস্ত ভিক্ষান্ন স্বয়ং গ্রহণ করিলেন। পর দিন উপমনু দিবাভাগে গো রক্ষা করিয়া প্রদোষকালে গুরুকুল প্রত্যাগমন পূর্বক গুরুর পুরোভাগে অবস্থিত হইয়া প্রণাম করিলেন। উপাধ্যায় এক্ষণেও তাহাকে স্থূলকায় দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, বৎস উপমনু! আমি তোমার সমুদায় ভিক্ষা গ্রহণ করি, এখন তুমি কি আহার কর? উপম নিবেদন করিলেন, ভগবন্! আমি আপনাকে প্রথম ভিক্ষা সমৰ্পণ করিয়া আর এক বার ভিক্ষা করি, তাহাতে যাহা পাই তাহাই আহার করিয়া প্রাণধারণ করি। উপাধ্যায় কহিলেন, ইহা গুরুকুলবাসীর ধর্ম্ম নহে; তুমি অন্যান্য ভিক্ষাজীবীর বৃত্তি প্রতিরোধ করিতেছ, এৰম্প্রকারে জীবিকানির্বাহ করাতে তোমার লোভিত্ব প্রকাশ পাইতেছে; অতঃপর তুমি দ্বিতীয় বার ভিক্ষা করিও না। এইরূপ অভিহিত হইয়া উপমন্যু পূর্ব্ববৎ গো রক্ষা করিতে লাগিলেন। এক, দিবস তিনি গোরক্ষান্তে উপাধ্যায়গুহে আগমন করিয়া তাঁহার সম্মুখবর্তী হইয়া অভিবাদন করিলেন। উপাধ্যায় এখনও তাহাকে স্কুল দেখিয়া জিজ্ঞাসিলেন, বৎস উপম। আমি তোমার সমুদায় ভিক্ষা গ্রহণ করি, আর তুমি ভিক্ষা কর না, তথাপি তোমাকে বিলক্ষণ স্থূলকায় দেখিতেছি; অতএব, এক্ষণে কি আহার করিয়া থাক, বল। এইরূপ জিজ্ঞাসিত হইয়া উপমন্যু নিবেদন করিলেন, মহাশয়। এই সকল ধেনুর দুগ্ধ পান করিয়া প্রাণধারণ করি। উপাধ্যায় কহিলেন, আমি তোমাকে অনুজ্ঞা প্রদান করি নাই, তোমার এ রূপে দুগ্ধপান করা কোন রূপেই ন্যায্য নহে। উপম, আর এরূপ করিব না বলিয়া, প্রতিজ্ঞা করিলেন, এবং গোরক্ষান্তে থাকলে উপাধ্যায় গৃহে আগমন করিয়া গুরুসম্মুখে দাড়াইয়া প্রণাম করিলেন। উপাধ্যায় এখনও তাঁহাকে স্কুলকলেবর অবলোকন করিয়া কহিলেন, বৎস উপমন্যু! ভিক্ষান্ন ভক্ষণ কর না, বারান্তরও ভিক্ষা কর না, দুগ্ধও পান কর না; তথাপি তোমাকে স্থূলকায় দেখিতেছি। অতএব, এখন কি আহার করিয়া থাক, বল। উপমন্যু এইরূপ আদিষ্ট হইয়া নিবেদন করিলেন, মহাশয়! বৎসগণ স্ব স্ব মাতৃস্তন পান করিতে করিতে যে ফেন উদ্গার করে, তাহাই পান করিয়া থাকি। উপাধ্যায় কহিলেন, সুশীল বৎস সকল তোমার প্রতি অনুকম্প করিয়া অধিক পরিমাণে ফেন উদ্গার করে; ফেনপানে প্রবৃত্ত হইয়া তুমি বৎসগণের আহারের ব্যাঘাত করিতেছ; অতএব তোমার ফেনপান করা উচিত নহে। উপমনু, আর করিব না বলিয়া, প্রতিজ্ঞা করিয়া পর দিন প্রভাতে গোরক্ষায় প্রস্থান করিলেন।
এই রূপে প্রতিষিদ্ধ হইয়া উপমনু ভিক্ষা ভক্ষণ করেন না, বারান্তর ও ভিক্ষা করেন না, দুগ্ধপান করেন না, দুগ্ধের ফেনও উপভোগ করেন না। এক দিবস অরণে ক্ষুধার্ত হইয়া অর্কপত্র ভক্ষণ করিলেন। ঐ সকল ক্ষার, তিক্ত, কটু, রুক্ষ, তীক্ষ্ণ, অর্কপত্র অভাবহার করাতে চক্ষুর দোষ জন্মিয়া অন্ধ হইলেন, এবং অন্ধ হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে কূপে পতিত হইলেন। সূর্যদেব অস্তাচলাবলম্বী হইলেন, উপাধ্যায় তথাপি উঁহাকে অপ্রত্যাগত দেখিয়া শিদিগকে কহিলেন, উপমনু কেন আসিতেছে না? তাহারা কহিলেন, সে গে রক্ষা করিতে গিয়াছে। উপাধ্যায় কহিলেন, আমি উপমনুর সর্বপ্রকার আহার প্রতিষেধ করিয়াছি, সে কুপিত হইয়াছে সন্দেহ নাই; এই নিমিত্তই এত বিলম্ব হইল, তথাপি আসিতেছে না; অতএব তাহার অন্বেষণ করা উচিত। এই বলিয়া শিষ্যগণ সমভিব্যাহারে অরণ্য প্রবেশ পুরঃসর এই বলিয়া উচ্চৈঃস্বর আহবান করিতে লাগিলেন, বৎস উপম? কোথায় আছ, শীঘ্র আইস। উপমন্যু উপাধ্যায়বাক্য শ্রবণ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে উত্তর প্রদান করিলেন, আনি কূপে পতিত হইয়াছি। উপাধ্যায় কহিলেন, কূপে পতিত হইলে কেন? তিনি কহিলেন, অর্কপত্র ভক্ষণ করিয়া অন্ধ হইয়াছি, তাহাতেই কূপে পতিত হইলাম। উপাধ্যায় কহিলেন, দেববৈদ্য অশ্বিনীকুমার যুগলের শুষ কর, তাঁহার তোমাকে চক্ষুঃপ্রদান করিবেন।
উপমন্যু উপাধ্যায়ের আদেশানুসারে ঋগ্বেদবাক্য দ্বারা অশ্বিনীতুনয়দ্বয়ের স্তব আরম্ভ করিলেন, হে অশ্বিনীকুমাৱযুগল! তোমরা সৃষ্টির পূর্বে বিদ্যমান ছিলে, তোমরাই সজীবপ্রধান হিরণ্যগর্ভ রূপে উৎপন্ন হইয়াছিলে, তোমরাই পরে এই প্রত্যক্ষ পরিদৃশ্যমান বিচিত্র সংসার প্রপঞ্চ রূপে প্রকাশমান হইয়াছ, দেশ কাল, অবস্থা দ্বারা তোমাদের পরিচ্ছেদ করা যায় না, তোমরাই মায়া ও মায়ারূঢ় চৈতন্য রূপে সর্ব কাল বিরাজমান রহিয়াছ, তোমরাই পক্ষিরূপে শরীরবৃক্ষে অধিষ্ঠান করিতেছ, তোমরা সৃষ্টিবিষয়ে পরমাণু পরতন্ত্র বা প্রকৃতি সাপেক্ষ নহ, তোমরা অবাঙ্মনসগোচর, তোমরাই স্বীয় মায়ার বিক্ষেপ শক্তি দ্বারা অশেষ ভুবন প্রকাশ করিয়াছ; আমি অভয় প্রার্থনায় শ্রবণ মনন নিদিধ্যাসন দ্বারা তোমাদিগের উপাসনায় প্রবৃত্ত হইতেছি। তোমরা পরম রমণীয়, সর্ব্বসঙ্গবিবর্জ্জিত, লয়প্রাপ্ত সর্ব্ব জগতের অধিষ্ঠানভূত, মায়াকার্যবিনিম্মুক্ত, ও ক্ষমোদয়বিকারশূন্য, তোমরা সর্ব্ব কাল সর্বোৎকৃষ্ণ রূপে বিরাজমান রহিয়াছ, তোমরা বিভাকর সৃষ্টি করিয়া দিনরজনীস্বরূপ শুক্ল কৃষ্ণ সূত্রসমূহ দ্বারা সংবৎসররূপ বিচিত্র বস্ত্র বয়ন করিতেছ, তোমরা জীবদিগকে সঞ্চিত কর্ম্মফল ভোগার্ধে ভোগস্থান তত্তৎ ভুবনের পথ প্রদর্শন কর, তোমরা জীবাত্মস্বরূপ পক্ষিণীকে পরমাত্মশক্তিরূপ কাপাশ হইতে মুক্ত করিয়া মোক্ষ রূপ সৌভাগাভাগিনী করিয়া থাক। জীবের যাবৎ মায়ামমাহিত ও বিষয়ৱসপরবশ হইয়া ইন্দ্রিয়ের অজ্ঞানুবর্তী থাকে, তাবৎ তাহার। সর্বদোষসংস্পর্শশূন্য বিশুদ্ধ চৈতন্য স্বরূপ তোমাদিগকে জড়স্বভাবশরীভিন্ন ভাবে ভাবনা করে। ত্রিশতমষ্টিদিবসরূপ ধেনুগণ সংবৎসরস্বরূপ যে বৎস প্রসব করে, তজিজ্ঞাসুরা ঐ বৎসকে অবলম্বন করিয়া বিভিন্নফল বেদবিহিতক্রিয়াব্যুহরূপ ধেমুসমুহ হইতে তত্ত্বজ্ঞানরূপ দুগ্ধ দোহন করেন, তোমরা সেই সর্বোৎপাদক সর্বসংহারকারী বৎস উৎপাদন করিয়াছ। অহোরাত্ররূপ সপ্তশত অর সংবৎসররূপ নাভিতে অবস্থিত এবং দ্বাদশমাসরূপ প্রধিতে নিবেশিত আছে, তোমাদিগের উদ্ভাবিত এই মায়াময় নেমিশূন্য অক্ষয় কালচক্র নিয়ত পরিবর্তিত হইতেছে; অত্রত্য ও পরলোকস্থিত প্রজাগণ এই বিচিত্র চক্রের সংস্পর্শ হইতে মুক্ত নহে। দ্বাদশ অর, ছয় নাভি ও এক অক্ষ বিশিষ্ট, কর্ম্মফলের আধার স্বরূপ এক চক্র আছে; কালাধিষ্ঠাত্রী
দেবতারা ঐ চক্রে অধিরূঢ় আছেন; তোমরা আমাকে সেই চক্ক হইতে মুক্ত কর, আমি অত্যন্ত বিষাদ প্রাপ্ত হইতেছি। তোমরা পরব্রহ্মস্বরূপ হইয়াও জুড়স্বভাব বিশ্ব প্রপঞ্চ স্বরূপ, তোমরাই কর্ম্ম ও কর্মফল স্বরূপ, আকাশাদি নিখিল জড় পদার্থ তোমাদিগের স্বরূপেই লীন হয়, তোমরাই অবিদ্যাদোষে তত্ত্বজ্ঞানসাধনে পরাসুখ হইয়া ও বিষয়সুখাস্বাদ দ্বারা ইন্দ্রিয়গণকে চরিতার্থ করিয়া সংসারপাশে বদ্ধ হও। তোমর সৃষ্টির প্রাক্কালে দশ দিকু, আকাশমণ্ডল, ও সূর্য্য সৃষ্টি করিয়াছ; ঋষিগণ সেই সূর্য্যকৃত কালানুসারে বেদবিহিত কর্ম্মের অনুষ্ঠান করেন এবং সমুদায় দেবত ও মনুষ্য ঐশ্বর্যভোগ করিতেছেন। তোমরা আকাশাদি সূক্ষ পঞ্চ ভূত সৃষ্টি করিয়া তাহাদিগের পঞ্চীকরণ করিয়াছ, সেই পঞ্চীকৃত ভূতপঞ্চক হইতে নিখিল বিশ্ব সমুদ্ভূত হইয়াছে। জীবগণ ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র হইয়া বিষয়াভোগ করিতেছে, এবং সমস্ত দেবতা ও সমস্ত মনুষ্য ভূতল আশ্রয় করিয়া অবস্থিতি করিতেছে। তোমাদিগের, ও তোমরা যে পুষ্করমাল শারণ কর, তাহার বন্দনা করি। নিত্যমুক্ত কর্ম্মফলদাহ অশ্বিনীতনদ্বয়ের সহায়তা ব্যতিরেকে অন্যান্য দেবতারা স্ব স্ব ব্যাপার সম্পাদনে সমর্থ নহেন। হে অশ্বিনীকুমারযুগল! তোমরা অগ্রে মুখ দ্বারা অনুরূপ গর্ভ গ্রহণ কর, পরে অচেতন দেহ ইন্দ্রিয় দ্বারা সেই গর্ভ প্রসব করে, ঐ গর্ভ প্রসূত হইবামাত্র মাতৃস্তনপানে প্রবৃত্ত হয়। এক্ষণে তোমরা আমার জীবন রক্ষা ও নয়নদ্বয়ের অন্ধত্ব বিমোচন কর।
অশ্বিনীকুমারের উপর এইরূপ শুবে তুষ্ট হইয়া তথায় উপস্থিত হইলেন, এবং কহিলেন, আমরা তোমার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছি এবং এক অপূপ দিতেছি, ভক্ষণ কর। এইরূপ আদিষ্ট হইয়া উপমন্যু নিবেদন করিলেন, আপনারা যাহা কহেন, কদাচ তাহার অন্যথা হয় না, কিন্তু আমি গুরুর নিকট নিবেদন না করিয়া তাপূপ ভক্ষণ করিতে পারি না। তখন অশ্বিনেয়ের কহিলেন, পূর্বে আমরা তোমার উপাধ্যায়ের স্তবে সন্তুষ্ট হইয়া? তাহাকে এক অপূপ দিয়াছিলাম, তিনি গুরুর নিকট নিবেদন করিয়া তাহা ভক্ষণ করিয়াছিলেন; অতএব তোমার উপাধ্যায় যেরূপ করিয়াছেন, তুমিও সেইরূপ কর। ইঁহা শুনিয়া উপমনু কহিলেন, আমি আপনাদিগকে বিনয়বাক্যে প্রার্থনা করিতেছি, আমি গুরুদেবকে না জানাইয়া অপূপ ভক্ষণ করতে পারি। তদনন্তর অশ্বিনীকুমারেরা কহিলেন, আমরা তোমার এইরূপ অবিচলিত গুরুভক্তি দর্শনে সাতিশয় প্রীতি প্রাপ্ত হইলাম; তোনার উপাধ্যায়ের দস্তু সকল লৌহময়, তোমার দন্ত সকল হিরণ্ময়; তুমি চক্ষুষ্মান্ ও শ্রেয়ঃ প্রাপ্ত হইবে।
উপমন্যু, অশ্বিনীকুমারবর প্রভাবে নয়নলাভ করিয়া, উপাধ্যায়সমীপে আগমন ও অভিবাদন পূর্বক আদ্যোপান্তু সমুদায় বর্ণন করিলেন। তিনি শুনিয়া প্রতি প্রাপ্ত হইলেন এবং কহিলেন, অশ্বিনীতনয়েরা যেরূপ কহিয়াছেন, তুমি সেইরূপ সকল মঙ্গল প্রাপ্ত হইবে, সকল বেদ ও সমুদায় ধর্মশাস্ত্র সর্ব্ব কাল তোমার স্মরণপথারূঢ় থাকিবেক। উপমন্যুর এই পরীক্ষা হইল।
আহোদধৌম্যের বেদ নামে আর এক শিষ্য ছিলেন। উপাধ্যায় তাহাকে এই আদেশ করিলেন, বৎস বেদ! আমার গৃহে থাকিয়া কিছু কাল শুশ্রুষা কর, তোমার মঙ্গল হইবে। তিনি যে আজ্ঞা বলিয়া গুরু শুশ্রুষাতৎপর হইয়া দীর্ঘ কাল গুরুগৃহে অবস্থিতি করিলেন। গুরু তাঁহাকে সর্বদাই কর্ম্মের ভার দিতেন। তিনি শীত, উষ্ণ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা জনিত সমস্ত ক্লেশ সহিতেন এবং আদেশ পাইলে তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পাদন করিতেন, কখনও কোনও বিষয়ে অনিচ্ছা বা অসন্তোষ প্রকাশ করিতেন না। বহু কালের পর গুরু তাহার প্রতি প্রসন্ন হইলেন। তদীয় প্রসাদে বেদ, শ্রেয়ঃ, ও সর্বজ্ঞতা লাভ করিলেন। বেদেরও এই পরীক্ষা হইল।
বেদ উপাধ্যায়ের অনুজ্ঞা লাভ করিয়া গুরুকুল হইতে প্রত্যাগমন পূর্বক গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশ করিলেন। তাঁহারও গৃহাবস্থান কালে তিন শিষ্য হইল। তিনি শিষদিগকে গুরুশুশ্রষা বা কোন কর্ম্ম করিতে কহিতেন না। স্বয়ং গুরুকুলবাসের দুঃখাভিজ্ঞ ছিলেন, এজন্য শিদিগকে কখনও কোনও প্রকার ক্লেশ দিতে চাহিতেন না।
কিয়ৎ কাল পরে রাজা জনমেজয় ও পৌষ বেদের নিকটে আসিয়া তাঁহাকে উপাধ্যায়ের কার্যে বরণ করিলেন। তিনি যাজনকার্ষ্যোপলক্ষে প্রস্থান কালে উতঙ্ক নামক শিষ্যকে আদেশ করিলেন, বৎস! আমার অনুপস্থিতি কালে গৃহে যে কোনও বিষয়ের অসংস্থান হইবেক, তুমি তাহা সম্পন্ন করিবে। বেদ উতঙ্ককে এইরূপ আদেশ দিয়া প্রবাসে প্রস্থান করিলেন। উতঙ্ক গুরুগৃহে থাকিয়া শুরুর আজ্ঞা প্রতিপালন করিতে লাগিলেন।
এক দিবস উপাধ্যায়পত্নীরা একত্র হইয়া উতস্ককে আহ্বান পূর্ব্বক কহিলেন, তোমার উপাধ্যায়নী ঋতুমতী হইয়াছেন, উপাধ্যায় গৃহে নাই; এক্ষণে যাহাতে উহার ঋতু নিষ্ফল না হয়, তাহা কর; কাল অতীত হইতেছে। উতঙ্ক তাঁহাদের কথা শুনিয়া কহিলেন, আমি স্ত্রীলোকের কথায় কুকর্মে প্রবৃত্ত হইব না, গুরু আমাকে এরূপ আদেশ করেন নাই যে, তুমি কুকর্ম্মও করিবে। কিয়ৎ কাল পরে উপাধ্যায় প্রবাস হইতে গৃহপ্রত্যাগমন পূর্বক এই সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া উতঙ্কের প্রতি প্রীত ও প্রসন্ন হইলেন এবং কহিলেন, বৎস উতঙ্ক? তোমার কি অভীষ্টসম্পাদন করিব বল, তুমি ধর্ম্মতঃ আমার শুশ্রুষা করিয়াছি, তাহাতে আমাদের পরস্পর প্রীতি বৃদ্ধি হইল; এক্ষণে আমি তোমাকে গৃহগমনের অনুজ্ঞা করিতেছি, তোমার সমস্ত অভীষ্ট সিদ্ধি হইবেক, প্রস্থান কর।
এইরূপ গুরুবাক্য শ্রবণ করিয়া উতঙ্ক নিবেদন করিলেন, আপনকার কি প্রিয়সম্পাদন করিব, আজ্ঞা করুন। এরূপ আপ্তশ্রুতি আছে, যে ব্যক্তি দক্ষিণা গ্রহণ না করিয়া অধ্যাপনা করেন, এবং যে ব্যক্তি দক্ষিণা না দিয়া অধ্যয়ন করেন, তাহাদিগের অন্যতরের মৃত্যু হয়, অথবা পরস্পর বিদ্বেষ জন্মে। অতএব আপনার অনুজ্ঞা লইয়া অভিমত গুরুদক্ষিণা আহরণের বাসনা করি। এইরূপ অভিহিত হইয়া উপাধ্যায় কহিলেন, বৎস উতঙ্ক! অপেক্ষা কর, বলিব। কিয়দিন পরে উতঙ্ক উপাধ্যায়ের নিকট নিবেদন করিলেন, মহাশয় আজ্ঞা করুন, কিরূপ গুরুদক্ষিণা দিলে আপনার মনঃপ্রীতি হইতে পারে। উপাধ্যায় কহিলেন, বৎস উতঙ্ক! কিরূপ গুরুদক্ষিণা আহরণ করিব বলিয়া আমাকে সর্বদাই জিজ্ঞাসা করিয়া থাক; অতএব তোমার উপাধ্যায়নীর নিকটে গিয়া, কি অহরণ করিব বলিয়া জিজ্ঞাসা কর, তিনি যাহা কহেন, তাহাই আহরণ কর। এইরূপ গুরুবাক্য শ্রৰণ করিয়া উতঙ্ক উপাধ্যায়নী সন্নিধানে গমন পূর্বক নিবেদন করিলেন, ভগবতি! উপাধ্যায় আমাকে গৃহগমনের অনুমতি দিয়াছেন; এক্ষণে আমার এই বাসনা, আপনকার অভিত গুরুদক্ষিণা প্রদান করিয়া ঋণমুক্ত হইয়া গৃহপ্রস্থান করি; অতএব অজ্ঞ করুন, কি গুরুদক্ষিণা প্রদান করিব। উপধায়ানী কহিলেন, বৎস! পৌষ রাজার নিকট য ও; তাঁহার সহধর্মিণী যে দুই কুল ধারণ করিয়াছেন, তাহাই প্রার্থনা করিয়া আন; চতুর্থ দিবসে ব্রতনিবন্ধন উৎসব হইবেক, সেই দিন ঐ দুই কুণ্ডল পরিয়া শোভমান হইয়া ব্রাহ্ম দিগকে পরিবেশন করিব; ইহাই সম্পন্ন কর, ইহা করিলেই তোমার সকল মঙ্গল লাভ হইবেক, নতুবা তোমার
উতঙ্ক এই রূপে উপাধ্যায়নী কর্তৃক প্রণোদিত হইয়া প্রস্থান করিলেন। পথে গমন করিতে করিতে এক মহাকায় বৃষভ ও তদুপরি আরূঢ় এক মহাকায় পুরুষ অবলোকন করিলেন। সেই পুরুষ উতঙ্ককে সম্ভাষণ করিয়া কহিলেন, অহে উতঙ্ক! তুমি এই বৃষভের পুরীষ ভক্ষণ কর। উতঙ্ক ভক্ষণে সম্মত হইলেন না। তখন সেই পুরুষ পুনর্বার কহিলেন, উতঙ্ক! সংশয় করিতেছ কেন, ভক্ষণ কর, তোমার উপাধ্যায়ও পূর্কে ভক্ষণ করিয়াছিলেন। তখন উতঙ্ক সেই বৃসভের মুত্র ও পুরীষ ভক্ষণ করিলেন এবং ব্যস্ততা প্রযুক্ত উথানানর আচমন করিয়া প্রস্থান করিলেন।
কিয়ৎ ক্ষণ পরে উতঙ্ক আসনোপবিষ্ট পৌষ সমীপে উপস্থিত হইয়া যথাবিধি আশীর্ব্বাদ প্রয়োগ ও সমুচিত সম্ভাষণ পূর্ব্বক কহিলেন, আমি তোমার নিকট যাচকভাবে উপস্থিত হইলাম। রাজ। অভিবাদন করিয়া নিবেদন করিলেন, ভগবনৃ ভৃত্য কি করিবেক, অজ্ঞা করুন। উতঙ্ক কহিলেন, গুরুদক্ষিণা দিবার নিমিত্ত তোমার মহিষীর কর্ণস্থ কুণ্ডল ভিক্ষা করিতে আসিয়াছি, তাহা তুমি আমাকে দান কর। পৌষ্য কহিলেন, মহাশয়! অন্তঃপুরে গিয়া গৃহিণীর নিকট প্রার্থনা করুন। উতঙ্ক দীয় বাক্য অনুসারে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন, কিন্তু পোষ্যের মহিষীকে দেখিতে পাইলেন না। তখন তিনি পৌষের নিকটে আসিয়া কহিলেন, আমাকে প্রবঞ্চনা করা উচিত নহে, অন্তঃপুরে তোমার মহিষী নই, তাহাকে দেখিতে পাইলাম না। পৌষ উতঙ্কবাক্য শ্রবণানন্তর ক্ষণমাত্র অনুধ্যান করিয়া কহিলেন, মহাশয়! নিঃসন্দেহ আপনি উচ্ছিষ্ট ও অশুটি আছেন, মনে করিয়া দেখুন; আমার সহধর্মিণী অতি পতিব্রতা, উচ্ছিষ্ট ও অশুচি থাকিলে কেহ তাঁহাকে দেখিতে পায় না, তিনি কখনও অশুচির দৃষ্টিগোচর হয়েন না।
রাজবাক্য শ্রবণানন্তর উতঙ্ক স্মরণ করিয়া কহিলেন, আমি উত্থানানন্তর গমন করিতে করিতে আচমন করিয়াছি। পৌষ কহিলেন, ঐ আপনকার ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে, উদ্ধানাবস্থায় অথবা গমন করিতে করিতে আচমন করা আর না করা দুই সমান। উতঙ্ক, যথার্থ কহিতেছ বলিয়া, প্রাম্মুখে উপবেশন ও পাণি পাদ বদন প্রক্ষালন পূর্বক নিঃশব্দ, অফেন, অনুষ্ণ, হৃদয়দেশ পর্য্যন্ত প্রবিষ্ট জল দ্বারা বারদ্বয় আচমন ও বারদ্বয় ইন্দ্রিয় মার্জন ও পুনর্বার আচমন করিয়া অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন, তখন রাজমহিষীকে দেখিতে পাইলেন। পৌষপত্নী দর্শনমাত্র গাত্রোঙ্খান, অভিবাদন, ও স্বাগত জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, ভগবন্! আজ্ঞা করুন কি করিব। উতঙ্ক কহিলেন, গুরুদক্ষিণার্থে কুণ্ডল ভিক্ষা করিতে আসিয়াছি, তাহা দান কর। তিনি তাঁহার দ্রীয়সী গুরুভক্তি দর্শনে প্রসন্না ও প্রীত হইলেন, এবং ইনি অতি সৎপাত্র, ইহার অভ্যর্থনা ভঙ্গ হওয়া উচিত নহে, এই বিবেচনা করিয়া কর্ণ হইতে অবমোচন পূর্বক তদীয় হস্তে কুণ্ডলদ্বয় সমর্পণ করিয়া কহিলেন, নাগরাজ তক্ষক এই কুণ্ডলের নিমিত্ত অত্যন্ত লোলুপ হইয় আছেন; অতএব আপনি সাবধান হইয়া লইয়া যাইবেন। উতঙ্ক কহিলেন, তোমার কোন উদ্বেগ নাই, নাগরাজ তক্ষক আমাকে অভিভব করিতে পারিবেন না।
উতঙ্ক ইহা কহিয়া সমুচিত আমন্ত্রণ পূর্ব্বক রাজপত্নীর নিকট বিদায় লইয়া পৌষসকাশে উপস্থিত হইলেন এবং কহিলেন, মহারাজ। আমি পৱম পরিতুষ্ট হইয়াছি। অনন্তর পৌষ উতঙ্কের নিকট নিবেদন করিলেন, ভগবন্! সর্বদা সৎপাত্র সংযোগ ঘটে না। আপনি অতি গুণবান্ অতিথি উপস্থিত হইয়াছেন, অতএব অতিথ্য করিতে চাই, ক্ষণকাল অপেক্ষা করুন। উতঙ্ক কহিলেন, ভাল, অপেক্ষা করিলাম, কিন্তু তুমি সত্বর হইয়া যাহা উপস্থিত আছে, তাহাই আনয়ন কর। তদনুসারে তিনি, যে অম্ল উপস্থিত ছিল, তাহাই অনিয়া তাঁহাকে ভোজন করিতে দিলেন। উতঙ্ক সেই অশ্ন কেশসংস্পর্শদূষিত ও শীতল দেখিয়া অশুচি বোধ করিয়া কহিলেন, তুমি আমাকে অশুচি অল্প দিলে, অতএব অন্ধ হইবেক। শাপ শুনিয়া পৌষ্য কহিলেন, অদুষ্ট অন্ন দূষিত কহিতেছ, অতএব তুমি নির্বংশ হইবে। তখন উতঙ্ক কহিলেন, অশুচি অন্ন আহার করিতে দিয়া পুনর্বার অভিশাপ দেওয়া উচিত নহে; তুমি বরং অন্ন প্রত্যক্ষ কর। অনন্তর পৌষ স্বচক্ষে সেই অম্নের অশুচি ভাব প্রত্যক্ষ করিলেন।
এই রূপে সেই অম্নের অশুচিত্ব প্রত্যক্ষ করিয়া পৌষ্য উতঙ্ককে অনুনয় করিতে লাগিলেন, ভগবন্! আমি না জানিয়া এই কেশসংস্পর্শদূষিত শীতল অন্ন আনিয়াছি, অতএব ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি; এই অনুগ্রহ করুন, যেন অন্ধ না হই। উতঙ্ক কহিলেন, আমার কথা মিথ্যা হয় না; অতএব এক বার অন্ধ হইয়া অতি ত্বরায় অন্ধত্বদোষ হইতে মুক্ত হইবে। আর তুমি আমাকে যে শাপ দিয়াছ, তাহা কিন্তু যেন না ফলে। পৌষ্য কহিলেন, আমি শাপ সংবরণে সমর্থ নহি; এখন পর্যন্তও আমার কোপোপশম হয় নাই। আপনি কি ইহা জানেন না যে, ব্রাহ্মণের হৃদয় নবনীতের ন্যায় কোমল; তাঁহার বাক্য তীক্ষ্ণধার ক্ষুরের ন্যায়। কিন্তু ক্ষত্রিয়ের এই দুই বিপরীত; তাহার বাক্য নবনীত ও হৃদয় তীক্ষধার ক্ষুর। অতএব জাতিস্বভাবসিদ্ধ তীক্ষহৃদয়তা প্রযুক্ত আমি মযথা করিতে পারি না। তখন উতঙ্ক কহিলেন, তুমি অন্নের অশুচি প্রত্যক্ষ করিয়া আমার অনুনয় করিলে। পূর্ব্বের কহিয়াছিলে, নির্দ্দোষ অন্নকে দূষিত কহিতেছ, অতএব নির্ব্বংশ হইবে, কিন্তু অন্ন যখন দোষসংযুক্ত প্রমাণ হইল, তখন আর আমাকে শাপ লাগিবেক না। এক্ষণে আমি চলিলাম। এই বলিয়া কুণ্ডল লইয়া উতঙ্ক প্রস্থান করিলেন।
উতঙ্ক পথিমধ্যে অবলোকন করিলেন, এক নগ্ন ক্ষপণক বারংবার দৃশ্য ও বারংবার অদৃশ্য হইয়া আগমন করিতেছেন। তদনন্তর সেই দুই কুণ্ডল ভূতলে রাখিয়া শৌচ অচিমনাদি উদককার্য আরম্ভ করিলেন। এই অবসরে সেই ক্ষপণক সত্বর তথায় উপস্থিত হইয়। কুলদ্বয় গ্রহণ পূর্ব্বক পলায়ন করিল। উতঙ্ক উদককার্য্য সমাপন করিয়া শুচি ও সংযত হইয়া দেব গুরু প্রণাম পূর্ব্বক অতি বেগে তাহার পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। এবং তক্ষক অত্যন্ত সন্নিহিত হইলে তাহাকে গ্রহণ করিলেন। সে, গৃহীতমাত্র ক্ষপণকরূপ পরিত্যাগ করিয়া তক্ষকরূপ পরিগ্রহ পূর্বক পৃথিবীতে অকস্মাৎ আবির্ভূত সম্মুখবর্তী মহগর্তে প্রবিষ্ট হইল, এবং নাগলোকে প্রবেশ করিয়া স্বীয় আসে গমন করিল। উতঙ্ক পৌষপত্নীর বাক্য স্মরণ করিয়া তক্ষকের অনুসরণে প্রবৃত্ত হইলেন, এবং প্রবেশমার্গ নিরর্গল করিবার নিমিত্ত দণ্ডকাষ্ঠ দ্বারা সেই মহাগর্ত খনন করিতে লাগিলেন, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। দেবরাজ ইন্দ্র তাহাকে এইরূপ ক্লেশ ভোগ করিতে দেখি, যাইয়া এই ব্রাহ্মণের সাহায্য কর, স্বীয় ৰজকে এই আদেশ দিয়া তাহার সাহায্যার্থে প্রেরণ করিলেন। বজু দণ্ডকাষ্ঠে আবির্ভূত হইয়া সেই গর্ত বিদীর্ণ করিয়া পথ প্রস্তুত করিলে, উতঙ্ক তদ্দারা নাগলোকে প্রবিষ্ট হইলেন—
উতঙ্ক এই রূপে নাগলোকে প্রবেশ করিয়া অনেকবিধ শত শত প্রাসাদ, হর্ম্ম, বলভী, নির্যূহ, এবং নানাবিধ ক্রীড়াভূমি ও আশ্চর্য্যস্থান অবলোকন করিলেন এবং বক্ষ্যমাণ প্রকারে নাগগণের স্তুতি করিতে লাগিলেন। উতঙ্ক কহিলেন, ঐরাবত যে সকল সর্পের অধিপতি, এবং যাহারা যুদ্ধে অতিশয় শোভমান ও বিদ্যুক্ত পবনপ্রেরিত মেধসমূহের ন্যায় বেগগামী, তাঁহারা ও ঐরাবতোৎপম্ন অন্যান্য সুরূপ বহুরূপ বিচিত্র কুণ্ডলীলঙ্কত সর্পের সূর্যের ন্যায় স্বর্গলোকে বিরাজমান আছেন। গঙ্গার উত্তরতীরে নাগদিগের যে বহুসংখ্যক বাসস্থান আছে, আমি তত্রত্য মহৎ নাগদিগকে নিরন্তর স্তব করি। ঐরাবতব্যতিরিক্ত আর কে সূর্য্যরশিসমূহে ভ্রমণ করিতে পারে? যখন এই ধৃতরাষ্ট্র প্রস্থান করেন, তখন অষ্টাবিংশতি সহস্র অষ্ট না তাহার অনুগামী হয়েন। যাহারা এই ধৃতরাষ্ট্রের অনুগামী ও যাহারা দুর পথ প্রস্থিত, সেই সমস্ত ঐরাবতজ্যেষ্ঠভ্রাতাদিগকে প্রণাম করি। পূর্বকালে যাহার কুরুক্ষেত্রে ও খাণ্ডবে বাস ছিল, আমি কুণ্ডলের নিমিত্ত সেই নাগরাজ তক্ষকের স্তব করি। তক্ষক ও অশ্বসেন উভয়ে সকালে পরস্পর সহচর হইয়া কুরুক্ষেত্রে ইক্ষুমতী নদীতীরে বাস করিয়াছিলেন, যে মহাত্মা তক্ষকপুত্র শ্রুতসেন নাগপ্রাধান্যলাভাকাঙক্ষী হইয়া কুরুক্ষেত্রে সূর্যের আরাধনা করিয়াছিলেন, তাহাকে প্রণাম করি।
ব্রহ্মর্ষি উতঙ্ক এই রূপে নাগশ্রেষ্ঠদিগের স্তব করিয়াও কুণ্ডল না পাইয়া অত্যন্ত চিন্তাকুল হইলেন। নাগগণের স্তব করিয়াও যখন কুণ্ডল প্রাপ্ত হইলেন না, তখন দেখিলেন, দুই স্ত্রী উত্তম বেমযুক্ত তন্ত্রে বস্ত্র বয়ন করিতেছে, সেই তন্ত্রের সূত্র সকল শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ। ইহাও দেখিলেন, ছয় কুমার দ্বাদশ অরবিশিষ্ট এক চক্র পরিবর্তিত করিতেছে। আর এক পুরুষ ও সুন্দরাকার এক অশ্ব অবলোকন করিলেন। তখন তিনি বক্ষ্যমাণ প্রকারে তাহাদিগের সকলের স্তব করিতে লাগিলেন।
উতঙ্ক কহিলেন, এই আকল্পস্থায়ী নিত্য ভ্রমণশীল চতুবিংশতিপযুক্ত চক্রে ত্রিশত ষষ্টি তন্তুজাল অর্পিত আছে, ঐ চক্রকে ছয় কুমারে পরিবর্তিত করিতেছে। বিচিত্ররূপা দুই যুবতী শুক্ল কৃষ্ণ সূত্র সমূহ দ্বারা এক তন্ত্রে বস্ত্র বয়ন করিতেছেন, তাহারাই সমস্ত ভূত ও চতুর্দশ ভুবন উৎপাদন করেন। যে বজধারী, ভুবনপালক, বৃহন্তা, নমুচিঘাতী, কৃষ্ণবর্ণবস্ত্রযুগলপরিধায়ী মহাত্মা লোকে সত্য ও অনৃত বিভক্ত করেন, এবং যিনি এই বিশ্বশরীর সৃজন করি তাহাতে প্রতিবিম্বরূপে প্রবেশ করেন, সেই সকলভুবননিয়ন্তা ত্রিলোকনাথ পুরন্দরকে প্রণাম করি।
অনন্তর সেই পুরুষ উভঙ্ককে কহিলেন, আমি তোমার এই স্তবে প্রসন্ন হইয়াছি, তোমার কি উপকার করিব, বল। উতঙ্ক কহিলেন, এই করুন, যেন সমস্ত নাগ আমার বশে আইসে। তখন সেই পুরুষ কহিলেন, এই অশ্বের অপানদেশে অগ্নি প্রদান কর। তদনুসারে উতঙ্ক সেই অশের অপানে অগ্নি যোজন করিলেন। এইরূপ করাতে অশ্বের সমুদায় শরীররন্ধ হইতে ধূমসহিত অগ্নিশিখা নির্গত হইতে লাগিল। তদ্বারা নাগলোক উত্তাপিত হইলে, তক্ষক বকুল ও অগ্নির উত্তাপ ভুয়ে বিষন্ন হইয়া, হস্তে কুণ্ডল লইয়া সহসা স্বীয় অবস হইতে নিঞ্জন্তি হইলেন এবং উতঙ্ককে কহিলেন, কুগুল গ্রহণ কর। উতঙ্ক কুণ্ডল গ্রহণ করিয়া এই চিন্তা করিতে লাগিলেন, অষ্ট উপাধ্যায়নীর ব্রতদিবস, কিন্তু আমি অনেক দূরে আসিয়াছি, কি রূপে কার্য্য সিদ্ধি হইবেক।
উতঙ্ককে এইরূপ চিন্তাবিষ্ট দেখিয়া সেই পুরুষ কহিলেন, উতঙ্ক! তুমি এই অশ্বে অরোহণ কর, এ তোমাকে ক্ষণকালমধ্যেই গুরুকুলে লইয়া যাইবেক। তদনুসারে উতঙ্ক সেই অশে আরোহণ করিয়া উপাধ্যায়গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। উপাধ্যায়নী স্নান করিয়া উপবেশন পূর্বক কেশ সংস্কার করিতে করিতে উতঙ্ক আসিল না বলিয়া তাহাকে শাপ দিবার উদ্যম করিতেছেন, এই সময়ে তিনি উপাধ্যায়গৃহ প্রবেশ পূর্বক উপাধ্যায়নীকে অভিবাদন করিয়া কুণ্ডল প্রদান করিলেন। উপাধ্যায়নী কহিলেন, বৎস উতঙ্ক! যথাকালে ও যথাযোগ্য স্থানে উপস্থিত হইয়াছ, কেমন, সুখে আসিয়ছি? আমি ভাগ্যে অকারণে তোমাকে শাপ দি নাই। তোমার তত্ত্বজ্ঞান সম্পন্ন হইয়াছে, তুমি সিদ্ধি প্রাপ্ত হও।
অনন্তর উতঙ্ক উপাধ্যায়ানীর নিকট বিদায় লইয়া উপাধ্যায়সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া অভিবাদন করিলেন। উপাধ্যায় সর্বাগ্রে স্বাগত জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, বৎস উতঙ্ক! এত বিলম্ব হইল কেন? উতঙ্ক কহিলেন, মহাশয় নাগরাজ তক্ষক কুণ্ডলাহরণ বিষয়ে বিষম বিঘ্ন ঘটাইয়াছিল, তন্নিমিত্ত নাগলোকে | গিয়াছিলাম। তয় দেখিলাম, দুই স্ত্রী তন্ত্রে বসিয়া বস্ত্র বয়ন করিতেছে, সেই তন্ত্রের সূত্র সকল শুক্ল ও কৃষ্ণবর্ণ; আপনাকে জিজ্ঞাসা করি সে কি? আর দ্বাদশ অর বিশিষ্ট এক চক্র দেখিলাম, ছয় কুমার ঐ চক্রকে পৱির্ত্তিত করিতেছে, সেই বা কি? আর এক পুরুষ ও মহাকায় এক অশ্য দেখিলাম, তাহারাই বা কে? আর গমনকালে এক বৃষ দর্শন করিয়াছিলাম, ঐ বৃষে এক পুরুষ আরোহণ করিয়াছিলেন, তিনি সানুনয় বচনে কহিলেন, উতঙ্ক! এই বৃষের পুরীষ ভক্ষণ কর, তোমার উপাধ্যায়ও পূর্বে ভক্ষণ করিয়াছিলেন। পরে আমি তাঁহার কথানুসারে সেই বৃভের পুরী ভক্ষণ করিলাম, তিনিই বা কে? আমি আপনার নিকট এই সমস্ত বিষয়ের সবিশেষ বৃত্তান্ত শুনিতে বাসনা করি।
উতঙ্কের এইরূপ জিজ্ঞাসা বাক্য শ্রবণ করিয়া উপাধ্যায়। কহিলেন, বৎস! যে দুই স্ত্রী দেখিয়াছি, তাঁহারা জীব ও ঈশ্বর; হরি শুক্ল ও কৃষ্ণ বর্ণ সূত্র সকল রাত্রি ও দিবা; যে দ্বাদশ অর বিশিষ্ট চক্র ছয় কুমারে পরিবর্তিত করিতেছেন, সে চক্র সংবৎসর, ছয় কুমারের ছয় ঋতু; যে পুরুষ দেখিয়াছ, তিনি ইন্দ্র; যে আশ্ব, তিনি অগ্নি। আর পথে যাইবার সময় যে বৃষ দেখিয়াছিলে, তিনি করিরাজ ঐরাবত; যে পুরুষ তদুপরি হারূঢ় ছিলেন, তিনি ইন্দ্র; আর সেই বৃষের যে পুরীষ ভক্ষণ করিয়াছ, তাহা অমৃত; উহা ভক্ষণ করিয়াছিল, তাহাতেই তুমি নাগলোকে রক্ষা পাইয়াছ। ভগবান্ ইন্দ্র আমার সখা, তোমার ক্লেশ দর্শনে অনুকম্পাপরবশ হইয়া তোমাকে এই অনুগ্রহ করিয়াছিলেন এবং তাহাতেই কুণ্ডল লইয়া পুনরাগত হইয়াছ। অতএব, প্রিয় বৎস! আমি তোমাকে অনুজ্ঞা করিতেছি, গৃহে গমন কর। তুমি সকল মঙ্গল প্রাপ্ত হইবে।
উতঙ্ক উপাধ্যায়ের অনুজ্ঞা লাভ করিয়া তক্ষকের বৈৱনির্যাতন সঙ্কল্প করিয়া ক্রোধাবিষ্ট চিত্তে হস্তিনাপুর প্রস্থান করিলেন, এবং অনতিবিলম্বে তথায় উপস্থিত হইয়া রাজা, জনমেজয়ের নিকট গমন করিলেন। রাজা পূর্বে তক্ষশিলা জয়ার্থ প্রস্থান করিয়াছিলেন, তথায় সম্যক জয় লাভ করিয়া প্রত্যাগমন করিয়াছেন। উতঙ্ক মন্ত্রিবর্গপরিবৃত সিংহাসননাপবিষ্ট রাজাকে, জয়োহস্তু, বলিয়া যথাবিধি আশীর্বাদ প্রয়োগ করিলেন। পরে অবসর বুঝিয়া সাধুশব্দালঙ্কৃত বাক্যে নিবেদন করিলেন, মহারাজ! তুমি কর্ত্তব্য কর্মে উপেক্ষা করিয়া বালক প্রায় কর্ম্মান্তরে ব্যাসক্ত হইয়া আছ।
রাজা জনমেজয় এইরূপ ব্রাহ্মণবাক্য শ্রবণ করিয়া যথাবিধি অতিথিসৎকার সমাধান পূর্ব্বক কহিলেন, মহাশয়া আমার কন্তব্য কর্মে উপেক্ষা নাই, আমি প্রজাপালন দ্বারা ক্ষত্রিয়ধর্ম্ম প্রতিপালন করিতেছি। এক্ষণে আপনি কি উদ্দেশে আগমন করিয়াছেন, আজ্ঞা করুন। পুণ্যশীল উতঙ্ক মহাত্মা রাজার কথা শুনিয়া কহিলেন, মহারাজ! আমি যে কর্ম্মে অনুরোধ করিব, তাহা তোমারই কার্যা। যে দুরাত্মা তক্ষক তোমার পিতার প্রাণ হিংসা করিয়াছে, তুমি তাহাকে সমুচিত প্রতিফল প্রদান কর। ঐ বৈধ কর্মের অনুষ্ঠানকাল উপস্থিত হইয়াছে। অতএব মহার! স্বীয় মহাত্মা পিতার বৈর নির্যাতন কর। দুরাত্মা তক্ষক বিনা অপরাধে তোমার পিতাকে দংশন করিয়াছিল, তাহাতেই তিনি বজ্রাহত বৃক্ষের ন্যায় পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হন। সর্পকূলধম তক্ষক বলদৰ্পে উদ্ধত হইয়া যে তোমার পিতাকে দংশন করিয়াছে, ইহা অপেক্ষা আর কি অকার্য হইতে পারে? ধন্বন্তরি রাজর্ষিবংশরক্ষাকর্তা দেবতুল্য রাজার প্রাণরক্ষার্থে আসিতেছিলেন, ঐ পাপাত্মাই তাহাকে নিবৃত্ত করে। অতএব মহারাজ! অবিলম্বে সর্পসত্রের অনুষ্ঠান করিয়া ঐ পাপিষ্ঠকে প্রজ্বলিত হুতাশনমুখে আহুতি প্রদান কর। ইহা করিলেই পিতার বৈর নির্যাতন করা হইবেক এবং আনুষঙ্গিক আমারও মহত্তর অভীষ্ট সম্পন্ন হইবেক। মহারাজ! আমি গুরুদক্ষিণা আহরণার্থে যাত্রা করিয়াছিলাম, তাহাতে ঐ দুরাত্মা যৎপরোনাস্তি বিঘ্ন ঘটাইয়াছিল।
সৌতি কছিলেন, রাজা জনমেজয় শুনিয়া তক্ষকের প্রতি অত্যন্ত কুপিত দুইলন। যেমন হবিঃ প্রয়োগ করিলে অগ্নি প্রদীপ্ত হইয়া উঠে, সেই প্রকার উতঙ্কবাক্যরূপ হবিঃপ্রক্ষেপ দ্বারা রাজার কোপানল প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল। তখন রাজা সাতিশয় দুঃখিত হইয়া উতঙ্কের সমক্ষেই মন্ত্রীদিগকে পিতার স্বর্গপ্রাপ্তি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। রাজেন্দ্র জনমেজয় উতঙ্কমুখে পিতার মৃত্যুবৃত্তান্ত শ্রবণমাত্র দুঃখে ও শোকে অভিভূত হইলেন।
বেদান্তমতে ঈশ্বর অতিধ্যান মাত্রেই সৃষ্টি করেন; তাহাতে পরমাণু বা প্রকৃতির সহযোগিতা অবশ্যক করে না। কিন্তু নৈয়ায়িকের কহেন, পরমাণু সকল নিত্য, সৃষ্টি প্রারম্ভে ঈশ্বরের ইচ্ছায় পরমাণুপুঞ্জের পরস্পর সংযোগ দ্বারা বিশ্ব সৃষ্টি হয়, তাহার অভিধ্যান মাত্রে হয় না, সুতরাং তন্মতে ঈশ্বর সৃষ্টি বিষয়ে পরমাণুপরতন্ত্র। সাধ্যমতে ইশ্বরের অভিধ্যান মাত্রে সৃষ্টি নহে, প্রকৃতিই সকল সৃষ্টি করেন, প্রকৃতি ব্যতিরেকে সৃষ্টি হয় না।
মায়ার দুই শক্তি, আবরণ ও বিক্ষেপ; আবরণ শক্তি দ্বারা পরমেশ্বরের স্বরূপ তিরোধান এবং বিক্ষেপ শক্তি দ্বারা বিশ্ব প্রকাশ হয়। লৌকিক দৃষ্টান্তে, রজ্জ্বসর্প স্থলে, আবরণ শক্তি দ্বারা রজ্জুর স্বরূপ তিরোধান ও বিক্ষেপ শক্তি দ্বারা তাহাতে সর্পের আবির্ভাব হয়।
অর, নাভি, প্রবি, নেমি, অক্ষ প্রভৃতি চক্রের অবয়ব বিশেষ।
প্রথমে আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী, এই সূক্ষ্ম পঞ্চ ভূত উৎপন্ন হয়। পরে স্কুল সৃষ্টি সম্পাদনার্থে ঐ পঞ্চ ভূতকে ভাগদ্বয়ে বিভক্ত করিয়া প্রত্যেকের এক এক অর্দ্ধকে চারি খণ্ডে বিভক্ত করিয়া স্বীয় অর্ক ব্যতিরেকে অন্য চারি অর্ধে এক এক খণ্ড ‘যোজিত করা যায়। ইহাকেই পঞ্চীকরণ কহে।
অর্থাৎ তোমার উপাধ্যায় অত্যক্ত নিষ্ঠুর, তুমি অহ্য সুশীল ও গুরুভক্তিসম্পন্ন।
মনু কহেন, যে জলে বুদ্ধদশব্দ ও ফেন সম্বন্ধ না থাকে ও যাহা উষ্ণ না হয়, তাহাতেই আচমন করিবেক। আর আচমন জল হৃদয়পর্যন্ত গমন করিলে ব্রাহ্মণ পবিত্র হয়েন। যথা
অনুষ্ণাভিরফেনাভিরদ্ভিস্তীর্থেন ধর্ম্মবিৎ।
শৌচেপৃসুঃ সর্ব্বদাচামেদেকান্তে প্রাগুদন্মুখ। ২। ৬১।
হৃদভিঃ পুয়তে বিপ্রঃ কণ্ঠগাভিশ্চ ভুমিপঃ।
বৈশ্যোহপ্তি প্রাশিকাভিস্তু শূদ্রঃ স্পৃষ্টাভিরন্ততঃ। ২। ৬২।
কোনও গ্রন্থকার ক্ষপণকদিগকে বৌদ্ধ উদাসীন এবং কেহ কেহ জৈন উদাসীন বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। কিন্তু আনন্দগিরিকৃত শঙ্করদিগ্বিজয়ে লিখিত আছে, তাহারা কালের উপাসনা করিত।
গৃহচূড়া
নাগদন্ত, অর্থাৎ গৃহাদিস ভিত্তিানগত কায়
শৰ্মীক মুনির পুত্র রাজা পরীক্ষিৎকে অভিসম্পাত করিলে তক্ষক তাঁহাকে দংশন করিতে যাইতেছিল, ধন্বন্তরি তাহা জানিতে পারিয়া বিষচিকিৎসা দ্বারা রাজার প্রাণরক্ষার্থে গমন করিতেছিলেন। পথিমধ্যে তক্ষক ঠাহার পরিচয় পাইয়া যথেষ্ট ধন দানাদি দ্বারা তাঁহাকে
ত্রয়শ্চত্বারিংশ অধ্যায়
ত্রয়শ্চত্বারিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
তক্ষক কহিলেন, যদি আমি কোনও বস্তু দংশন করিলে তুমি চিকিৎসা করিয়া নির্ব্বিষ করিতে পার, আমি এই বটবৃক্ষ দংশন করিতেছি, তুমি জীবন দান কর। তুমি যত পার যত্ন কর ও আপন মন্ত্রবল দেখাও, আমি তোমার সমক্ষে এই বটবৃক্ষ দগ্ধ করিতেছি। কাপ কহিলেন, হে নাগেন্দ্র! যদি তোমার অভিরুটি হয়, বটবৃক্ষ দংশন কর, আমি এখনই উহাকে পুনর্জীবিত করিতেছি। তক্ষক, মহাত্মা কাশ্যপের এইরূপ বাক্য শুনিয়া, নিকটে গিয়া বটবৃক্ষ দংশন করিলেন। দংশন করিবামাত্র, বৃক্ষ অত্যুগ্র বিষপ্রভাবে তৎক্ষণাৎ ভস্মাবশেষ হইল। এই রূপে বৃক্ষকে ভস্মীভূত করিয়া তক্ষক কাশ্যপকে সম্বোধিয়া কহিলেন, হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ। এই বৃক্ষের জীবনদান বিষয়ে যত্ন কর। তক্ষকবচনান্তে কাশ্যপ দগ্ধ বৃক্ষের সমস্ত ভস্ম সংগ্রহ করিয়া কহিলেন, হে পন্নগরাজ! আমার বিদ্যাবল দেখ, আমি তোমার সমক্ষে বৃক্ষকে বাঁচাইতেছি। তদনন্তর, দ্বিজশ্রেষ্ঠ বিদ্বান্ ভগবান্ কাশ্যপ বিদ্যা প্রভাবে সেই ভস্মরাশীকৃত বৃক্ষকে পুনর্জীবিত করিলেন। প্রথমতঃ অঙ্কুরমাত্র, তৎপরে ক্রমে ক্রমে পত্রদ্বয়, পত্ররাশি, শাখা, মহাশখি সমুদায় প্রস্তুত হইল।
এই রূপে কাশ্যপের মন্ত্রবলে বৃক্ষকে পুনর্জীবিত দেখিয়া তক্ষক কহিলেন, হে দ্বিজরজি! তুমি যে আমার অথবা মাদৃশ অন্য কাহার ও বিষ নাশ করিতে পারি, এ তোমার অতি অশ্চর্য্য ক্ষমতা। এক্ষণে জিজ্ঞাসা করি, তুমি কি আকাঙ্ক্ষা করিয়া তথায় যাইতেছ। তুমি যে অভিলষিত লাভের আশয়ে সেই রাজার নিকটে যাইতেছ, যদি তাহা দুর্লভও হয়, আমি তোমাকে দিব, তুমি তথায় যাইও না। রাজা বিপ্রশাপে পতিত, তাঁহার আয়ুঃশেষ হইয়াছে, এমন স্থলে তথায় যাইলেও তোমার কৃতকার্য হওয়া সন্দেহস্থল। তাহা হইলেই, তোমার ত্রিলোকব্যাপিনী নিৰ্মলা কীর্তি, প্রভাহীন দিবাকরের ন্যায়, এক কালে বিলয় প্রাপ্ত হইবেক। হে দ্বিজবর,! যদি, তুমি রাজার নিকট ধনলাভবাসনায় যাইতেছ, এমন হয়, তাই। হইলে তুমি সেখানে যত পাইতে পার, আমি তোমাকে তদপেক্ষা অধিক দিতেছি, তুমি নিবৃত্ত হও। মহাতেজাঃ কাশ্যপ, তক্ষকবাক্য শ্রবণ করিয়া, রাজা পরীক্ষিতের মৃত্যুর বিষয় সবিশেষ অবগত হইবার নিমিত্ত, ধ্যানারম্ভ করিলেন। অনন্তর, দিব্যজ্ঞানপ্রভাবে রাজার আয়ুঃশেষ নিশ্চয় করিয়া, তক্ষকের নিকট হইতে অভিলাষানুরূপ ধন গ্রহণ পূর্ব্বক গৃহ প্রতিগমন করিলেন।
এই রূপে মহাত্মা কাপ নিবৃত্ত হইলে পর, তক্ষক সত্বর গমনে হস্তিনাপুর প্রস্থান করিলেন। গমনকালে লোকমুখে শুনিতে পাইলেন, রাজা বিষহর মন্ত্র ও ঔষধ সংগ্রহ করিয়া যৎপরোনাস্তি সাবধান হইয়া আছেন। তখন তিনি এই চিন্তা করিতে লাগিলেন, মায়াবলে রাজাকে বঞ্চনা করিতে হইবেক, অতএব কি উপায় অবলম্বন করি? অনন্তর, স্বীয় অনুচর সর্পদিগকে তাপসবেশ ধারণ করাইয়া, রাজার নিকট প্রেরণ করিলেন, কহিয়া দিলেন, তোমরা, বিশেষ কার্য্য অছে, এইরূপ ভান করিয়া, অব্যাকুলিত চিত্তে রাজসভায় উপস্থিত হইয়া রাজাকে আশীর্বাদ স্বরূপ ফল কুশ ও জল প্রদান করিবে। ভুজঙ্গমগণ, তক্ষকের আদেশানুসারে তথায় উপস্থিত হইয়া, রাজাকে কুশ কুসুম ফল জল প্রদান পূর্বক যথাবিধি আশীর্বাদ করিল। বীর্যবান্ রাজেন্দ্র পরীক্ষিৎ সেই সকল গ্রহণ করিলেন, এবং তাঁহাদের কার্য শেষ করিয়া দিয়া গমন করিতে কহিলেন।
কপটতাপসবেশধারী নাগগণ নির্গত হইলে পর, রাজা যাবতীয় অমাত্য ও সুহৃদ্বৰ্গকে কহিলেন, আইস, সকলে মিলিয়া তাপসগণের আনীত এই, সকল সুস্বাদু ফল ভক্ষণ করি। রাজা ব্রহ্মশাপমূলক দুর্দৈব প্রযোজিত হইয়া সচিবগণসমভিব্যহারে ফল ভক্ষণে প্রবৃত্ত হইলেন। তক্ষক যে ফলে প্রবিষ্ট ছিলেন, দৈব্যগত্যা রাজা স্বয়ং ভক্ষণার্থে সেই ফল লইলেন। ভক্ষণ করিতে করিতে তন্মধ্য হইতে অতি ক্ষুদ্র তাম্রবর্ণ কৃষ্ণনয়ন এক কৃমি নির্গত হইল। রাজা, হস্তে সেই কৃমি লইয়া অমাত্যদিগকে কহিলেন, দেখ, সূর্য অস্তগত হইতেছেন, অদ্য আর আমার বিষয় নাই। অতএব মুনিবাক্য সত্য হউক, এই কৃমি তক্ষকপ্রতিরূপ হইয়া আমাকে দংশন করুক, তাহা হইলেই শাপের পরিহার হইল। মন্ত্রীরাও কালবশীভূত হইয়া তাঁহার মতের অনুবর্তী হইলেন। মুমূর্ষু হতচেতন রাজা সেই কুমিকে গ্রীবাতে স্থাপন করিয়া হাসিতে লাগিলেন। কৃমিরূপী তক্ষক তৎক্ষণাৎ স্বরূপ প্রাপ্ত হইয়া ফণমণ্ডল দ্বারা রাজার গ্রীবা বেষ্টন পূর্ব্বক ভয়ঙ্কর গর্জ্জন করিয়া তাহাকে দংশন করিলেন।
ত্রয়স্ত্রিংশ অধ্যায়
ত্রয়স্ত্রিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, পক্ষিরাজ অত্যুজ্জ্বল স্বর্ণময় কলেবর ধারণ করিয়া অগ্নিমধ্যে প্রবেশ করিলেন, এবং অমৃতসমীপে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, ক্ষুরের ন্যায় তীক্ষ্ণধার এক লৌহময় চক্র অবিশ্রামে তচ্চতুর্দিকে পরিভ্রমণ করিতেছে। দেবতারা, ঐ অগ্নিতুল্য সূর্য্যসমপ্রভ ভয়ঙ্কর যন্ত্র নির্মাণ করিয়া, অমৃতহরণকারীদিগের ছেদনার্থে নিযোজিত রাখিয়াছিলেন। গরুড় তৎক্ষণাৎ অঙ্গসঙ্কোচ করিয়! অরমধ্যবর্তী স্থান দ্বারা তন্মধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন, এবং দেখিতে পাইলেন, মহাবীর্য, মহাঘোর, সদা ক্রুদ্ধ, অতি বেগবান, অনিমিষনয়ন দুই প্রকাণ্ড সর্প অমৃত রক্ষা করিতেছে। উহাদের উভয়েরই শরীর অতি প্রদীপ্ত অনলের ন্যায় উজ্জ্বল, বিদ্যুতের ন্যায় জিহ্বা, চক্ষু অনবরত বিষ উদগার করিতেছে। তাহাদের মধ্যে এক সর্পও যাহার প্রাতি দৃষ্টিপাত করে, সে তৎক্ষণাৎ ভস্মসাৎ হইয়া যায়। বিনতানন্দন, তাহাদের চক্ষুতে ধূলি প্রক্ষেপ করিয়া উভয়কেই অন্ধ করিলেন, এবং অলক্ষিত হইয়া নভোমণ্ডল হইতে তাড়ন ও প্রহার দ্বারা তাঁহাদের কলেবর খণ্ড খণ্ড করিয়া অমৃতকুম্ভ গ্রহণ পূর্বক অতি বেগে উড্ডীন হইলেন, এবং স্বয়ং অমৃত পান না করিয়া তথা হইতে বহির্গমন পূর্ব্বক সূর্য্য প্রভা আচ্ছন্ন করিয়া অপরিশ্রান্ত চিত্তে প্রস্থান করিলেন।
বিনতানন্দন বিহগরাজ অমৃত গ্রহণ পূর্ব্বক আকাশপথে গমন করিতে করিতে নারায়ণের সাক্ষাৎকার লাভ করিলেন। তিনি তার এইরূপ অলৌকিক ক্রিয়া ও লোভবিরহ দর্শনে পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়া কহিলেন, হে বিহগ! প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে অভিলষিত বর প্রদান করিব। গরুড় কহিলেন, আমি তোমার উপরে থাকিবার বাসনা করি। ইহা কহিয়া পুনর্বার নারায়ণকে কহিলেন, আর ইহাও বর দাও, যেন আমি অমৃত পান না করিয়াও অজর ও অমর হই। নারায়ণ তথাস্তু বলিলেন। গরুড় এই রূপে নারায়ণসন্নিধান হইতে বরদ্বয় প্রতিগ্রহ করিয়া কহিলেন, ভগবন্! তুমিও প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে বর দিব। বিষ্ণু মহাবল বিহগরাজের নিকট, তুমি আমার বাহন ইও, এই প্রার্থনা করিলেন, এবং উপরে থাকিবার বর সিদ্ধ করিবার নিমিত্ত তাঁহাকে ধ্বজ করিয়া রাখিলেন। গরুড় তথাস্তু বলিয়া বায়ুসম বেগে প্রস্থান করিলেন।
দেবরাজ ইন্দ্র, এই রূপে গরুড়কে অমৃত গ্রহণ পূর্বক বিমানপণে প্রস্থান করিতে দেখিয়া, ক্রোধভরে বজ্র প্রহার করিলেন। তিনি বজ দ্বারা তাড়িত হইয়া হাস্যমুখে মধুর বচনে ইন্দ্রকে কহিলেন, “দেখ, এই বজ্রের আঘাতে আমার কিঞ্চিন্মাত্রও ব্যথা বোধ হয় নাই, কিন্তু যে মুনির অস্থিতে বজ্র নির্শিত হইয়াছে, তাহার ও বর্জ্যের ও তোমার মানরক্ষার্থে একটি পক্ষ পরিত্যাগ করিতেছি, তুমি ইহার অন্ত পাইবে না, ইহা কহিয়া পক্ষ পরিত্যাগ করিলেন। সকল প্রাণী ঐ পরিত্যক্ত পক্ষ অতি সুন্দর দেখিয়া হৃষ্ট হইয়া তাহার নাম সুপর্ণরাখিলেন। দেবরাজ এই মহৎ আশ্চর্য্য দেখিয়া মনে মনে স্থির করিলেন, এই পক্ষী অবশ্যই মহাপ্রাণী হইবেক, তখন তাঁহাকে সম্ভাষণ করিয়া কহিলেন, অহে বিহগরাজ! আমি তোমার অদ্ভুত বল বিক্রম জানিতে ও চির কালের নিমিত্ত তোমার সহিত মৈত্রী স্থাপন করিতে বাসনা করি।
গরুড় যে পক্ষ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন, বজ্রপ্রহার প্রভাবে তাহা তিন খণ্ডে বিভক্ত হইলে, এক এক খণ্ড হইতে ময়ুর, নকুল ও দ্বিমুখ পক্ষী, এই তিন সপসংহারকারীর উৎপত্তি সুইল।
সু সুন্দর পর্ণ পক্ষ, যাহার পক্ষ দেখিতে অতি সুন্দর।
ত্রয়োদশ অধ্যায়
ত্রয়োদশ অধ্যায়—আস্তীকপর্ব্ব।
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! রাজাধিরাজ জনমেজয় কি নিমিত্ত সর্পসত্রানুষ্ঠান দ্বারা সর্পকুল সংহার করিয়াছিলেন, কি নিমিত্তই বা জিতেন্দ্রিয়াগ্রগণ্য দ্বিজশ্রেষ্ঠ আস্তীক মহাশয় প্রদীপ্ত হুতাশন হইতে ভুজগগণের পরিত্রাণ করেন, তাহা সবিশেষ সমস্ত বর্ণন কর। আর যে রাজা সর্পসত্র অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, তিনি কাহার পুত্র, এবং ঐ মহাত্মা ব্রাহ্মণই বা কাহার তনয়, তাহাও তুমি আমার নিকট কীর্ত্তন কর। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে দ্বিজবর! আমি আপনার নিকট মহাফলপ্রদ আস্তীকোপাখ্যান আদ্যোপান্ত বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন। শৌনক কহিলেন, হে সূতকুলতিলক! যশস্বী পুরাণ ঋষি আস্তীক মহাশয়ের মনোরম আখ্যান সবিস্তর শুনিবার নিমিত্ত আমার নিতান্ত বাসনা জন্মিয়াছে। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ঋষিবর! আমার পিতা ব্যাসশিষ্য মেধাবী লোমহর্ষণ নৈমিষারণ্যবাসী ব্রাহ্মণগণ কর্ত্তৃক অভ্যর্থিত হইয়া, তাঁহাদিগকে কৃষ্ণদ্বৈপায়নপ্রোক্ত সর্ব্বপাপক্ষয়কারী এই ইতিহাস শ্রবণ করাইয়াছিলেন। আমি তাঁহার নিকট যেরূপ শুনিয়াছি, অবিকল সেইরূপ বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
মহর্ষি আস্তীকের পিতা জরৎকারু সাক্ষাৎ প্রজাপতিতুল্য ব্রহ্মচারী বিষয়বাসনাশূন্য কঠোরতপস্যারত উৰ্দ্ধরেতাঃ যাযাবরাগ্রগণ্য ধর্ম্মজ্ঞ ও ব্রতপরায়ণ ছিলেন। সেই তপঃপ্রভাবসম্পন্ন মহাত্মা যত্রসায়ংগৃহ হইয়া তীর্থ পর্য্যটন ও তীর্থস্নান করত পৃথিবীমণ্ডল ভ্রমণ করিতেন। এই রূপে বহু কাল বায়ুভক্ষ, নিরাহার, শুদ্ধকলেবর, ও বীতনিদ্র হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ পূর্ব্বক দুঃসাধ্য ব্রতানুষ্ঠান করেন।
এক দিবস জরৎকারু পর্যটনক্রমে কোনও স্থানে উপস্থিত হইয়া স্বীয় পূর্বপুরুষদিগকে উর্দ্ধপাদ অধঃশিরাঃ মহাগর্ত্তে লম্বমান অবলোকন করিলেন। তদ্দর্শনে অনুকম্পাপরবশ হইয়া তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনারা কে, কি নিমিত্ত উশীরস্তম্বমাত্র অবলম্বন করিয়া অবাম্মুখে লম্বমান আছেন? এই গর্ত্তে গূঢ়বাসী এক মুষিক আপনাদিগের অবলম্বিত উর্শীরস্তম্বের মূল প্রায় সমুদায় ভক্ষণ করিয়াছে। পিতৃগণ কহিলেন, আমরা যাযাবর নামে ঋষি, বংশলোপের উপক্রম হওয়াতে অধোগতি প্রাপ্ত হইতেছি। আমরা অতি হতভাগ্য, আমাদিগের জরৎকারু নামে এক সন্তান আছে, সেই মুঢ়মতি হতভাগ্য সংসারাশ্রমবিমুখ হইয়া কেবল তপস্যায় মনোনিবেশ করিয়াছে, পুত্রোৎপাদনার্থে দারপরিগ্রহ করিতেছে না। সুতরাং বংশলোপ উপস্থিত হওয়াতে মহাগর্ত্তে লম্বমান হইয়া আছি। আমরা জরৎকারুরূপ নাথ সত্ত্বেও অনাথ ও পাপাত্মার ন্যায় হইয়াছি। যাহা হউক, তুমি কে, কি নিমিত্ত আমাদের এই শোচনীয় অবস্থা অবলোকন করিয়া অনুশোচন ও অনুকম্পা প্রদর্শন করিতেছ?
জরৎকারু পূর্বপুরুষদিগের এইরূপ কাতরবাক্য শ্রবণ করিয়া নিবেদন করিলেন, হে ঋষিগণ! আপনারা আমার পূর্বপুরুষ, আমারই নাম জরৎকারু, এক্ষণে আজ্ঞা করুন, আমাকে কি করিতে হইবেক। পিতৃগণ কহিলেন, বৎস! বংশরক্ষণে এবং তোমার ও আমাদিগের পারলৌকিক মঙ্গল সাধনে যত্নবান্ হও। পুত্রবান্ লোকদিগের যেরূপ সদগতি লাভ হয়, ধর্ম্মফল ও চিরসঞ্চিত তপোবল দ্বারা তাদৃশ হয় না। অতএব তুমি অমাদিগের নিয়োগানুসারে দারপরিগ্রহে ও পুত্রোৎপাদনে যত্নবান্ ও মনোযোগী হও, তাহা হইলেই আমাদিগের পরম মঙ্গল। জরৎকারু কহিলেন, আমি কদাপি ভোগাভিলাষে দারপরিগ্রহ ও ধনোপাৰ্জ্জন করিব না, কেবল আপনাদিগের হিতার্থে দারপরিগ্রহে সম্মত হইলাম। কিন্তু তদ্বিষয়ে আমি এই প্রতিজ্ঞা করিতেছি, যদি কন্যা আমার সনাম্নী হয় ও তাহার বন্ধুগণ স্বেচ্ছাপূর্ব্বক ভিক্ষাস্বরূপ দান করিতে চাহেন, তবেই আমি যথাবিধানে তাহার পাণিগ্রহণ করিব। কিন্তু আমি দরিদ্র, কোন্ ব্যক্তি দেখিয়া শুনিয়া আমাকে কন্যাদান করিবেক। তবে ভিক্ষাস্বরূপ যদি কেহ দান করিতে চাহে, আমি প্রতিগ্রহ করিতে অসম্মত নহি। হে পিতামহগণ! এই নিয়মে আমি দারপরিগ্রহে যত্নবান্ হইব, প্রকারান্তরে তদ্বিষয়ে প্রবৃত্ত হইব না। এই রূপে পরিণীতা ভার্য্যার গর্ভে আপনাদিগের উদ্ধারকর্ত্তা পুত্র উৎপন্ন হইবেক, তখন আপনারা অক্ষয় স্বর্গ লোক প্রাপ্ত হইয়া পরম প্রমোদে কালযাপন করিবেন।
যে তপস্বীদিগের নিয়মিত বাসস্থান নাই, নিয়ত স্থানে স্থানে পরিভ্রমণ করেন, তাঁহাদের নাম যাযাবর।
যত্রসায়ংগৃহ, যে স্থানে সায়ংকাল উপস্থিত হয়, সেই গৃহ অর্থাৎ তথায় অবস্থিতি করে।
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
ত্রয়োবিংশ অধ্যায় অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, কদ্রু ও বিনতা সমুদ্র অতিক্রম করিয়া অনতিবিলম্বে অশ্বসমীপে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, অশ্ব শশাঙ্ককিরণের ন্যায় শুভ্রাকার, কেবল পুচ্ছদেশের কেশগুলি কৃষ্ণবর্ণ। বিনতা তদ্দর্শনে বিষাদসাগরে মগ্ন। হইলেন, কৃঞ্জ জয়লাভে প্রফুল্লা হইয়া তাঁহাকে দাসীকর্মে নিযোজিতা করিলেন। বিনতাও পণেতে পরাজিত হইয়াছেন, সুতরাং দুঃসহ দুঃখদাবদহনে দগ্ধ হইয়া দাসীভাব অবলম্বন করিলেন।
এই সময়ে গরুড়ও, সময় উপস্থিত হওয়াতে, মাতৃসাহায্যনিরপেক্ষ হইয়া, স্বয়ং অণ্ড বিদারণ পূর্ব্বক জন্ম গ্রহণ করিলেন। মহাবল, মহাকায়, প্রলয়কালীন তানতুল্য দুর্নিরীক্ষা, বিদ্যুৎসম সমুজ্জ্বলনেত্র, কামরূপ, কামবীর্য, কামগম বিহঙ্গমরাজ, অতিপ্রদীপ্ত হুতাশন রাশির ন্যায় অভািসমান হইয়া নভোমণ্ডলে অরোহণ ও ঘোরতর নিনাদ পরিত্যাগ পূর্বক, সহসা অতিপ্রকাণ্ড কলেবর ধারণ করিলেন। তদ্দর্শনে দেবতারা ব্যাকুল হইয়া বিশ্বরূপী আসনোপবিষ্ট অগ্নিদেবতার শরণাগত হইলেন এবং প্রণিপাত করিয়া অতি বিনয়ে নিবেদন করিলেন, হে অগ্নে! আর শরীর বৃদ্ধি করিও না, তুমি কি আমাদিগকে দগ্ধ করিবার মানস করিয়াছ? ঐ দেখ, তোমার প্রদীপ্ত রাশি সর্বতঃ প্রসৃত হইতেছে। অগ্নি কহিলেন, হে দেবগণ! তোমরা যাহা বোধ করিতেছ, বাস্তবিক তাহা নহে; আমার তুল্য তেজস্বী বলবান্ বিনতানন্দন গরুড় জন্মগ্রহণ করিয়া কলেবর বৃদ্ধি করিতেছেন; সেই তেজোরাশি দর্শনে তোমরা মোহাবিষ্ট হইয়ছি। এই সর্পকুলসংহারকারী মহাবল কশপসূনু সদা তোমাদিগের হিতৈষী ও দৈত্য রাক্ষস প্রভৃতির অহিতকারী হইবেন। অতএব তোমাদের ভয়ের বিষয় নাই; তথাপি আইস, সকলে মিলিয়া গরুড়ের নিকটে যাই।
এইরূপ নিশ্চয় করিয়া দেবাগণ, ঋষিগণ সমভিব্যাহারে গরুড়সমীপে গমন পূর্বক, তদীয় স্তুতিবাদ আরম্ভ করিলেন, হে মহাভাগ পতগেশ্বর! তুমি ঋষি, তুমি দেব, তুমি প্রভু, তুমি সূর্য্য, তুমি প্রজাপতি, তুমি ইন্দ্র, তুমি হয় গ্রীব, তুমি শর, তুমি জগৎপতি, তুমি সুখ, তুমি পদ্মযোনি, তুমি অগ্নি, তুমি পবন, তুমি ধা ও বিধাতা, তুমি সুরশ্রেষ্ঠ বিষ্ণু, তুমি মহান, তুমি সকাল সৰ্বব্যাপী, তুমি অমৃত, তুমি মহৎ যশঃ, তুমি প্রভা, তুমি অভিপ্রেত, তুমি আমাদিগের পরম রক্ষাস্থান, তুমি মহাবল, তুমি সাধু, তুমি মহাত্মা, তুমি সমৃদ্ধিশালী, তুমি দুঃসহ, হে মহকীর্ষে গরুড়! ভবিষ্যৎ ও বর্তমান সকল গোমা হইতে নিঃসৃত হইয়াছে, তুমি সর্বোত্তম, তুমি চরাচরমূর্ত্তি, তুমি স্বীয় কিরণমণ্ডল দ্বারা দিবাকরের ন্যায় অবভাসমান হইতেছ, তুমি স্বীয় তেজোপাশি দ্বারা সূর্যের প্রভামণ্ডল নকৃত করিতেছ, তুমি অন্তক, তুমি স্থাবর জঙ্গম সমস্ত পদার্থস্বরূপ, হে হুতাশনপ্রভ! তুমি পরিকুপিত দিবাকরের ন্যায় প্রজা সকলকে দগ্ধ করিতেছ, তুমি লোকসংহারে উদ্যত প্রলয়কালীন অনলের ন্যায় ভয়ঙ্কর রূপে উত্থিত হইয়াছ। আমরা মহাবল, মহাতেজাঃ, অগ্নিসমপ্রত, বিদ্যুৎসমানকান্তি, তিমিরনিবারক, নভোমণ্ডলমধ্যবর্তী, পরাবরস্বরূপ, বরদ, দুর্ধর্ষবিক্রম, বিহঙ্গমরাজ গরুড়ের শরণ লইলাম। হে জগন্নাথ! তোমার তপ্তসুবর্ণমানকান্তি তেজোৱাশি দ্বারা জগন্মণ্ডল সন্তপ্ত হইয়াছে; অতএব তুমি মহাত্মা দেবতাদিগকে রক্ষা কর; দেবতারা ভয়ে অভিভূত হইয়া আকাশপথে ইতস্ততঃ পলায়ন করিতেছেন। হে বিহগবর? তুমি দয়ালু মহাত্মা কশ্যপ ঋষির সন্তান, বোষ পরিহার করু, জগৎকে দয়া কর, শান্তি অবলম্বন কর, আমাদিগের রক্ষা কর। তোমার মহাবজ্রসদৃশ ভয়ঙ্কর রবে দিঙ্গুল, নভঃস্থল, স্বর্গলোক, ভূলোক, ও আমাদিগের হৃদয়. নিরন্তর কম্পিত হইতেছে। অতএব তুমি অনলতুল কলেবর সংহার কর। তোমার কুর্পিতকৃতান্ততুল্য আকার দর্শনে আমাদের মন একান্ত অস্থির হইয়াছে। হে ভগবন্ পগপতে! আমরা প্রার্থনা করিতেছি, প্রসন্ন, শুভদ, ও সুখাবহ হও। গরুড় দেবতাদিগের ও দেবর্ষিগণের এইরূপ স্তুতিবাদ শ্রবণ করিয়া আত্মতেজঃ সংহার করিলেন।
ইচ্ছা অনুসারে শীঘ্র ও সর্ব্বত্র গমনক্ষম।
ত্রিংশ অধ্যায়
ত্রিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাবল বিহগরাজের পদস্পর্শমাত্র সেই তরুশাখা ভগ্ন হইল। ভগ্ন হইবামাত্র তিনি উহাকে ধারণ করিলেন, এবং শাখা ভগ্ন করিয়া বিস্ময়াবিষ্ট চিত্তে ইতস্ততঃ দৃষ্টিনিক্ষেপ করত, অধোমুখে লম্বমান তপঃপরায়ণ বালখিল্য ব্রহ্মর্ষিদিগকে দেখিতে পাইলেন। দেখিয়া এই চিন্তা করিতে লাগিলেন, ঋষিগণ এই শাখায় লম্বান আছেন, শাখা ভূতলে পতিত হইবামাত্র ইহাদিগের প্রাণবিনাশ হইবে। অনন্তর, গজ ও কচ্ছপকে নখর দ্বারা দৃঢ়তর রূপে ধারণ করিয়া ঋষিদিগের প্রাণবিনাশ আশঙ্কাতে চঞ্চপুট দ্বারা সেই শাখা গ্রহণ করিলেন। মহর্ষিগণ, গরুড়ের এইরূপ অতিদৈব কর্ম্ম দেখিয়া, বিস্ময়াবিষ্ট চিত্তে হেতুবিন্যাস পূর্ব্বক তাঁহার এই নাম রাখিলেন যে, যেহেতু এই বিহঙ্গম গুরু ভার গ্রহণ পূর্বক উডৰ্ডীন হইয়াছে, এজন্য অদ্যাবধি ইহার নাম গরুড় রহিল। অনন্তর তিনি পক্ষপবনবেগে পার্শ্ববর্তী পর্ব্বত সকল বিচলিত করিয়া প্রস্থান করিলেন।
এই রূপে পতগরাজ বালখিল্য ব্রহ্মর্ষিগণের প্রাণরক্ষার্থে গজ ও কচ্ছপ লইয়া নানা দেশে ভ্রমণ করিলেন। পরিশেষে, পর্বতশ্রেষ্ঠ গন্ধমাদনে উপস্থিত হইয়া, তপঃপরায়ণ স্বীয় পিতা কশ্যপের দর্শন পাইলেন। কশ্যপও সেই বলবীর্যতেজঃসম্পন্ন, মন ও আয়ুসম বেগবান, শৈলশৃঙ্গসমকায়, অচিন্তনীয়, অতণীয়, সর্ব্বভূতভয়ঙ্কর, মহাবীর্যাধর, ভীষণমুর্তি, অগ্নির ন্যায় প্রদীপ্ত, দেবদানবরাক্ষসের অধৃষ্য ও অজেয়, গিরিশৃঙ্গভেদনক্ষম, সমুদ্রশোষণসমর্থ, ত্রিলোকদলনক্ষম, সাক্ষাৎ কৃতান্ত, দিব্যরূপী বিহু ঈমকে সমাগত দেখিয়া ও তদীয় মনোগত অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, বৎস! সহসা এরূপ অসংসাহসিক কর্ম্ম করিও না, এরূপ করিলে ক্লেশ পাইবে, মরীচিপ বালখিল্যগণ ক্রুদ্ধ হইয়া তোমাকে ভস্মসাৎ করিতে পারেন। অনন্তর তিনি পুত্রস্নেহপরবশ হইয়তপস্যা দ্বারা হতপাপ মহাভাগ বালখিল্যদিগকে এই বলিয়া প্রসন্ন করিলেন, হে তপোধনগণ! গরুড় লোকহিতার্থে মহৎ কার্যের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইয়াছে, তোমরা অনুজ্ঞা প্রদান কর। বালখিল্যগণ, ভগবান্ কশ্যপের অভ্যর্থনা শ্রবণ করিয়া, সেই শাখা পরিত্যাগ পূর্ব্বক তপস্যার্থে পরম পবিত্র হিমালয়ে প্রস্থান করিলেন।
বালখিল্যগণ প্রয়াণ করিলে পর, বিনতাতনয় স্বীয় পিতা কশ্যপকে জিজ্ঞাসিলেন, ভগবন্! আমি কোন্ স্থানে এই তরুশাখা পরিত্যাগ করি, আপনি কোনও মানুষশূন্য দেশ নির্দেশ করুন। তখন কশ্যপ মানবসমাগমশূন্য, হিমাচ্ছন্ন, অন্য লোকের মনেরও অগোচর, এক পর্ব্বত নির্দেশ করিয়া দিলেন। মহাকায় মহাভারত। বিহঙ্গম তরুশাখা এবং গঞ্জ ও কচ্ছপ সহিত অতিবেগে সেই পর্বতোদ্দেশে গমন করিলেন। তিনি যে তরুশাখা লইয়া গমন করিলেন, তাহা এমন প্রকাণ্ড যে, শত গোর্মনির্ম্মিত অতি দীর্ঘ রজ্জু দ্বারাও তাহার বেন ও বন্ধন হইতে পারে না। পতগরাজ অনতিদীর্ঘকালমধ্যে সেই শতসহস্রযোজনান্তরস্থিত পর্বতে উপস্থিত হইয়া পিতৃবাক্যানুসারে তদুপরি তরুশাখা পরিত্যাগ করিলেন। শৈলরাজ তদীয় পক্ষপনে আহত হইয়া কম্পিত হইল, তত্রত তরুগণ বিচলিত হইয়া পুষ্পবর্ষণ করিতে লাগিল, যে সকল মণিকাঞ্চনশোভিত শৃঙ্গ সেই মহাগিরির শোভা সম্পাদন করিত, সে সমস্ত বিশীর্ণ হইয়া সমন্ততঃ পতিত হইল, বহুসংখ্যক বৃক্ষ গরুড়ানীত শাখা দ্বারা অভিহত হইয়া, সুবর্ণকুসুম দ্বারা, বিদ্যুৎসমূহুশোভিত জলধরগণের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল, বৃক্ষগণ ভূতলে পতিত ও ধাতুরাগে রঞ্জিত হইয়া সাতিশয় শোভমান হইল। তদনন্তর গরুড়, সেই গিরির শিখরদেশে অবস্থিত হইয়া গজ ও কচ্ছপ ভক্ষণ করিলেন। এই রূপে সেই কূর্ম্ম ও কুঞ্জর ‘অভ্যবহার করিয়া পর্ব্বতের শিখরাগ্রভাগ হইতে মহাবেগে উড্ডীন হইলেন।
অতঃপর দেবতাদিগের ভয়সূচক উৎপাতারস্ত হইল। ইন্দ্রের বজ্র ভয়ে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল, দিবাভাগে নলোমণ্ডল হইতে ধূম ও অগ্নিশিখা সম্বলিত উল্কাপাত হইতে লাগিল। বসু, রুদ্র, আদিত্য, সাধ্য, মরুৎ ও অন্যান্য দেবতাগণের অস্ত্র সকল পরস্পর আক্রমণ করিতে লাগিল। অধিক কি কহিব, দেবাসুরযুদ্ধকালেও এরূপ অভূতপূর্ব ব্যাপার ঘটে নাই। প্রচণ্ড বায়ু বহিতে লাগিল, সহস্র সহস্র বজ্রাঘাত ও উল্কাপাত হইতে লাগিল, আকাশে বিনা মেঘে ঘোতর গর্জ্জন হইতে লাগিল; যিনি দেবগণের দেব, তিনিও রক্তবৃষ্টি করিতে লাগিলেন; দেবতাদিগের মাল্য ম্লান ও তেজঃ নষ্ট হইয়া গেল; অতি ভীষণ প্রলয়জলধর সকল অজস্র শোণিত বর্ষণ করিতে লাগিল; ধূলিপ্রবাহ উত্থিত হইয়া দেবতাদিগের মুকুট মলিন করিল।
দেবরাজ ইন্দ্র, এই সমস্ত দারুণ উৎপাত দর্শনে উদ্বিগ্ন হইয়া, বৃহস্পতিকে জিজ্ঞাসিলেন, ভগবন্! কি নিমিত্ত সহসা এই সকল ঘোরর উৎপাত আরম্ভ হইল? আমাদিগকে যুদ্ধে অভিভব করিতে পারে, এমন শক্র উপস্থিত দেখিতেছি না, তবে কি কারণে এ সকল ঘটিতেছে, বলুন। বৃহস্পতি কহিলেন, হে দেবেন্দ্র! তোমার অপরাধ ও অনবধান দোষে, মহাত্মা বালখিল্য মহর্ষিদিগের তপঃপ্রভাবে, বিনতাগর্ভে কশ্যপমুনির গরুড় নামে পক্ষিরূপী পুত্র জন্মিয়াছে; সেই,মহাবল পরাক্রান্ত কামরূপী বিহঙ্গম অমৃত হরণ করিতে আসিয়াছে। তাহার তুল্য বলবান আর নাই, সে অমৃতহরণে সমর্থ বটে, তাহার নিকট কিছুই অসম্ভব নয়, সে অসাধ্য সাধন করিতে পারে।
ইন্দ্র সুরাচার্যের বচন শ্রবণ করিয়া • অমৃতরক্ষকদিগকে কহিলেন, মহাবল মহাবীর্য পক্ষী অমৃত হরণে উদ্যত হইয়াছে; অতএব তোমাদিগকে সাবধান করিতেছি, যেন সে বল পূর্ব্বক হরণ করিয়া না লয়; বৃহস্পতি কহিয়াছেন, তাহার অতুল বল। দেবগণ ইন্দ্রবাক্য শ্রবণে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া যত্ন পূর্বক অমৃত বেষ্টন করিয়া অবস্থিত হইলেন, এবং দেবরাজও বহস্তে সেই স্থানে অবস্থান করিলেন। দিব্যাভরণভূষিত, উজ্জ্বলকায়, পাপসম্পৰ্কশূন্য, অনুপমবলবীর্যসম্পন্ন, অসুরসংহারকারী সুরগণ, কাঞ্চনময় বৈদূর্য্যবিনির্মিত মহামূল্য মহোজ্জল সুদৃঢ় বিচিত্র কবচ, বহুবিধ ভয়ঙ্কর অগণন তীক্ষ্ণ শস্ত্র, ধূম স্ফুলিঙ্গ ও অগ্নিশিখাসহকৃত চক্র, পরিঘ, ত্রিশূল, পরশু, বহুবিধ তীক্ষ শক্তি, উজ্জ্বল করাল করবাল, প্রচণ্ড গদা ইত্যাদি বিবিধ অস্ত্র গ্রহণ পূর্ব্বক অমৃতরক্ষণে তৎপর হইলেন। দেবগণ এই রূপে নানাবিধ অস্ত্র সহিত যুদ্ধার্থে প্রস্তুত হইয়া, ভূতলে অকস্মাৎ আবির্ভূত সূর্যকিরণ প্রকাশিত আকাশমণ্ডলের ন্যায়, শোভা পাইতে লাগিলেন।
দেবতাদিগেরও অসাধ্য।
গুরু শব্দের অর্থ মহৎ ও ভী ধাতুর অর্থ উড়িয়া যাওয়া। এই উভয়েব যোগে গরুড় পদ সিদ্ধ হইয়াছে।
মরীচি শব্দের অর্থ কিরণ, পা ধাতুর অর্থ পান। বালখিল্যরা সূর্যের কিরণমাত্র পান করিয়া প্রাণধারণ করেন, এজন্য তঁহাদিগকে মরীছিপ কহে।
ত্রিপঞ্চাশ অধ্যায়
ত্রিপঞ্চাশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
শৌনক জিজ্ঞাসা করিলেন, হে সূতনন্দন! পাণ্ডুকুলাবতংস রাজা জনমেজয়ের ভয়ঙ্কর সর্পসত্রে কোন্ কোন্ মহর্ষি ঋত্বিকের কর্ম্ম করিয়াছিলেন, আর কঁহারাই বা সদস্য হইয়াছিলেন, সেই সমস্ত সবিস্তর বর্ণনা কর, তাহা হইলেই কাঁহারা সর্পসত্রবিধানজ্ঞ, তাহা জানা যাইবেক। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, যে সকল মনীষিগণ সেই যজ্ঞে ঋত্বিক্ ও সদস্য ছিলেন, তাঁহাদিগের নাম কীর্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। চ্যবনবংশোদ্ভব অদ্বিতীয় দেবে। সুবিখ্যাত চণ্ডভার্গব হোতা, বৃদ্ধ বিদ্বান্ কৌৎস উদগাতা, জৈমিনি ব্রহ্মা, শার্জবর ও পিঙ্গল অধ্বর্য, আর ব্রাহ্মণোত্তম উতঙ্ক উন্নেতা ছিলেন। পুত্র ও শিষ্য সহিত ব্যাসদেব, উদ্দালক, প্রমতক, শ্বেতকেতু, পিঙ্গল, অশিত, দেবল, নারদ, পর্বত, আত্রেয়, কুণ্ড, জঠর, কালঘট, বাৎস্যবংশপ্রসূত বয়োবৃদ্ধ তপঃ স্বাধ্যায়শীলসম্পন্ন শ্রতশ্রবাঃ, কোহল, দেবশর্মা, মৌদগল্য, সমসৌরভ ইত্যাদি অনেকানেক বেদপারগ ব্রাহ্মণ সদস্য হইয়াছিলেন।
ঋত্বিক্গণ আহুতি প্রদান করিতে আরম্ভ করিলে, সর্ব্বপ্রাণিভয়ঙ্কর সর্প সকল হুতাশনে নিপতিত হইতে লাগিল। সর্পগণের বসা ও মেদঃ দ্বারা বহুসংখ্যক হ্রদ হইয়া গেল। তাহাদিগের অনবরত দাহ দ্বারা উৎকট গন্ধ নির্গত হইতে লাগিল। অগ্নিপতিত ও আকাশতি সর্পগণের চীৎকার ও কোলাহল অবিশ্রান্তু শ্রত হইতে লাগিল। তক্ষক রাজা জনমেজয়কে সর্পসত্রে দীক্ষিত শ্রবণ করিয়া ইন্দ্রসমীপে উপস্থিত হইলেন, এবং সমুদায় বৃত্তান্ত নিবেদন করিয়া তাহার শরণাপন্ন হইলেন। দেবরাজ তক্ষকের প্রতি প্রসন্ন হইয়া কহিলেন, হে নাগরাজ! সে সপত্রে তোমার কোনও ভয় নাই। তোমার হিতার্থে আমি ব্রহ্মাকে প্রসন্ন করিয়া রাখিয়াছি, তোমার ভয় নাই, তুমি নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত হও। ইন্দ্রের নিকট এই আশ্বাস পাইয়া ভক্ষক হৃষ্ট মনে তদীয় ভবনে অবস্থিতি করিতে লাগিল।
সর্পগণ অনবরত অগ্নিতে পতিত হওয়াতে, বাসুকি স্বীয় পরিবার অল্পবশিষ্ট দেখিয়া অত্যন্ত বিষন্ন হইলেন, এবং একান্ত শোকাকুল ও ব্যাকুলহৃদয় হইয়। ভগিনীকে কহিলেন, অয়ি কল্যাণিনি! আমার সর্বাঙ্গ শোকানলে দগ্ধ হইতেছে, দশ দিক্ অন্ধকারময় দেখিতেছি, মোহে অবসন্ন হইতেছি, মন ও নয়ন ঘূর্ণিত হইতেছে, হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছে; অছ আমি একান্ত অবশ হইয়া সেই প্রদীপ্ত হুতাশনে পতিত হইব। জনমেজয়ের যজ্ঞ সর্পকুল সংহারের নিমিত্ত আরব্ধ হইয়াছে; জাতএব আমিও নিঃসন্দেহ যমালয়ে যাইব। আমি তোমাকে শদর্থে জরৎকারুকে দান করিয়াছিলাম, তাহার সময় উপস্থিত। এক্ষণে আমাদিগের সবান্ধবের সপরিবারের পরিত্রাণ কর। পিতামহ স্বয়ং আমাকে কহিয়াছিলেন, অস্তীক জনমেজয়ের যজ্ঞ নিবারণ করিবেক। অতএব এক্ষণে তুমি আমার সপরিবারের পরিত্রাণের নিমিত্ত স্বীয় প্রিয় তনয়কে অনুরোধ কর।
দশম অধ্যায়
দশম অধ্যায়— পৌলোমপর্ব্ব।
রুরু কহিলেন, হে উরগ! এক দুষ্ট ভুজঙ্গ আমার প্রাণসমা। ভার্যাকে দংশন করিয়াছিল, তদবধি আমি এই অনুপ্লজঘনীয় প্রতিজ্ঞা করিয়াছি যে, দর্শনমাত্র সর্পের প্রাণদণ্ড করিব। সেই নিমিত্ত অদ্য আমি তোমার প্রাণসংহার করিতে উদ্যত হইয়াছি। ডুণ্ডুভ কহিল, হে তপোবন! যাহারা মনুষকে দংশন করে, সে সকল সর্প স্বতন্ত্র, ডুণ্ডুভরা সে জাতি নহে; অতএব সর্পের নাম গন্ধ পাইয়া বিনা অপরাধে ডুঙুভদিগের প্রাণহিংসা করা তোমার উচিত নহে। আক্ষেপের বিষয় এই, ভুণুভদিগের প্রবৃত্তি ও সুখভোগ অন্যান্য সর্পের সমান নহে; কিন্তু অনর্থ ঘটনা ও দুঃখ ভোগের সময় সমানভাগী। যাহা হউক, তুমি ধর্ম্মজ্ঞ হইয়া হতভাগ্য ভুভদিগের প্রাণহিংসা করিও না।
রুরু সর্পের এই যুক্তিযুক্ত কাতর উক্তি শ্রবণে তাহাকে ডুণ্ডুভ নিশ্চয় করিয়া তাহার প্রাণবধ করিলেন না। অনন্তর প্রশান্ত বচনে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে ভুজগ! তুমি কে, কি নিমিত্তই বা তুমি সর্পযোনি প্রাপ্ত হইয়াছ, বল। ডুণ্ডুভ কহিল, পূর্ব কালে আমি সহস্রপাদ নামে ঋষি ছিলাম, পরে ব্রহ্মশাপে সর্পযযানি প্রাপ্ত হইয়াছি। ইহা শুনিয়া রুরু কহিলেন, হে ডুঙুভ! ব্রাহ্মণ কি কারণে কুপিত হইয়া তোমাকে শাপ দিয়াছেন, এবং আর কত কালই বা তোমাকে এই কলেবরে কালযাপন করিতে হইবে, ইহার সবিশেষ শুনিতে বাসনা করি।
দ্বাচত্বারিংশ অধ্যায়
দ্বাচত্বারিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
শৃঙ্গী কহিলেন, পিতঃ! শাপ দেওয়াতে যদিও আমার সাহসিকতা অখবা দুষ্কর্ম করা হইয়া থাকে, আর উহা তোমার প্রিয়ই হউক, অপ্রিয়ই হউক, যাহা কহিয়াছি, মিথ্যা হইবার নহে। আমি তোমাকে তত্ত্ব কথা কহিতেছি, উহা কদাচ অন্যথা হইবেক না। আমি পরিহাসকালেও মিথ্যা কহি মা, শাপ দান কালের ত কথাই নাই। শমীক কহিলেন, বৎস! আমি জানি, তুমি অত্যন্ত উগ্রপ্রভাব ও সত্যবাদী, কখনও মিথাকহ নাই, সুতরাং তোমার শাপ মিথ্যা হইবার নহে। পুত্র প্রাপ্তবয়স্ক হইলেও, তাহাকে পিতার শাসন করা কর্ত্তব্য; তাহা হইলে পুত্র উত্তরোত্তর গুণশালী ও যশস্বী হইতে পারে। তুমি ত বালক, তোমাকে অবশ্যই শাসন করিতে পারি। তুমি সর্ব্বদা তপস্যা করিয়া থাক; যাহারা তপস্য। ও যোগানুষ্ঠান দ্বারা প্রভাবসম্পন্ন হয়েন, তাহাদের অতিশয় কোপবৃদ্ধি হয়। তুমি পুত্র, তাহাতে বয়সে বালক, আবার যৎপরোনাস্তি অবিবেচনার কর্ম্ম করিয়াছ, এই সমস্ত আলোচনা করিয়া তোমাকে উপদেশ দেওয়া আবশ্যক বোধ করিতেছি। অতএব কহিতেছি শুন, তুমি শমপথাবলম্বী হইয়া এবং বন্য ফল মূল মাত্র আহার ও ক্রোধের দমন করিয়া তপস্যানুষ্ঠান কর, তাহা হইলে ধর্ম্মপথ হইতে ভ্রষ্ট হইবে না। লোকে পারলৌকিক মঙ্গলকাঙক্ষায় অশেষ ক্লেশে ধর্ম্মসঞ্চয় করে, কিন্তু ক্রোধবশ হইলে এক কালে সমুদায় সঞ্চিত ধর্ম্ম উচ্ছিন্ন হয়। ধর্ম্মহীনদিগের সদ্গতি নাই। ক্ষমাশীল লোকের শমই সিদ্ধির অদ্বিতীয় সাধন, ক্ষমাশীলের ইহলোক পরলোক উভয় জয়। অতএব সতত ক্ষমাশীল ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া চলিবে। ক্ষমাশীল হইলে ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হইবে। আমি শমপথাবলম্বী হইয়া যাহা করিতে পারি তাহা করি; রাজাকে এই সংবাদ পাঠাইয়া দি যে, আমার পুত্র নিতান্ত বালক, অদ্যাপি তাহার বুদ্ধির পরিপাক হয় নাই; তুমি আমার যে অবমাননা করিয়া ছিলে, সে তদ্দর্শনে অমর্ষবশ হইয়া তোমাকে শাপ দিয়াছে।
এইরূপ কহিয়া সুব্রত তপঃপরায়ণ শমীকমুনি গৌরমুখনামক সুশীল সমাহিত স্বীয় শিষ্যকে রাজা পরীক্ষিতের নিকট পাঠাইলেন, এবং কহিয়া দিলেন, অগ্রে কুশল জিজ্ঞাসা করিয়া পরে এই সংবাদ নিবেদন করিবে। গৌরমুখ, গুরুর আদেশানুসারে ত্বরায় হস্তিনাপুরে উপস্থিত হইয়া, দ্বারপাল দ্বারা সংবাদ দিয়া রাজভবনে প্রবেশ করিলেন, এবং রাজকৃত অভ্যাগতসৎকার স্বীকার ও শ্রান্তি পরিহার করিয়া আদ্যোপান্ত শমীকরাক্য নরপতিগোচরে নিবেদন করিতে লাগিলেন, মহারাজ! শান্ত, দান্ত, মহাতপাঃ পরমধর্ম্মাত্মা, মৌনব্রতপরায়ণ শমীকঋষি আপনকার রাজ্যে বাস করেন। আপনি অনী দ্বারা তাঁহার দেশে মৃত সর্প ক্ষেপণ করিয়া আসিয়াছেন। তিনি ক্ষমা করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহার পুল ক্ষমা না করিয়া পিতার অজ্ঞাতসারে আপনাকে এই শাপ দিয়াছেন, তক্ষক সপ্তরাত্রমধ্যে আপনকার প্রাণসংহার করিবেক। শমীকমুনি পুলকে শাপনিবারণের নিমিত্ত বারংবার কহিয়াছিলেন, কিন্তু কাহারও সাধ্য নাই যে, সে শাপ অন্যথা করে। মহর্ষি কুপিত পুত্রকে কোনও ক্রমেই শান্ত করিতে না পারিয়া, পরিশেষে আপনকার হিতার্থে আমাকে সংবাদ দিতে পাঠাইয়াছেন।
রাজা পরীক্ষিৎ গৌৱমুখের এই ভয়ঙ্কর বাক্য শ্রবণ ও স্বকৃত গর্হিত কর্ম্ম স্মরণ করিয়া সাতিশয় বিষ হইলেন। শমীকমুনি মৌনব্রত, এই নিমিত্তই উত্তর দেন নাই, ইহা শুনিয়া তাঁহার হৃদয় শোকানলে দগ্ধ হইতে লাগিল। যে মহাত্মা সেই প্রকার অবমানিত হইয়াও এরূপ দয়া প্রদর্শন করিলেন, তাহার উপরেও আমি তাদৃশ অত্যাচার করিয়াছি, মনোমধ্যে এই আলোচনা করিয়া তাহার পরিতাপের আর সীমা রহিল। বিনা দোষে ঋষির অবমাননা করিয়াছি, ইহা ভাবিয়া তিনি যেরূপ দুঃখিত হইলেন, নিজ মৃত্যুর কথা শুনিয়া তপ হইলেন না। অনন্তর গৌরমুখকে এই বলিয়া বিদায় করিলেন, আপনি মহর্ষিকে বলুন, যেন তিনি আমার প্রতি প্রসন্ন হন।
গৌরমুখ প্রস্থান করিবামাত্র, রাজা একান্ত উদ্বিগ্নচিত্ত হইয়া, মন্ত্রিগণ সমভিব্যাহারে মন্ত্রণা করিয়া, এক সর্ব্বতঃসুরক্ষিত প্রাসাদ নির্মাণ করাইলেন, তথায় বহু চিকিৎসক, নানা ঔষধ ও মন্ত্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণগণকে নিষোজিত করিলেন, এবং সেই প্রাসাদে থাকিয়া সর্ব প্রকারে রক্ষিত হইয়া রাজকার্য পর্যালোচনা করিতে লাগিলেন। কোনও ব্যক্তিই তাঁহার নিকটে যাইতে পায় না, সর্বত্রগামী বায়ুও সেই প্রাসাদে প্রবেশ করিতে পারে না।
ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ বিদ্বান্ মহর্ষি কাশ্যপ শুনিয়াছিলেন যে, পন্নগপ্রধান তক্ষক দংশন করিয়া রাজাকে যমালয়ে প্রেরণ করিবেক। অতএব তিনি মনে করিয়াছিলেন, তক্ষক দংশন করিলে আমি চিকিৎসা দ্বারা বাজাকে বিষমুক্ত করিব, তাহাতে আমার ধর্ম্ম ও অর্থ উভয় লাভ হইবেক। নির্ধারিত সপ্তম দিবস উপস্থিত হইলে, কাশ্যপ একাগ্র মনে গমন করিতেছেন, এমন সময়ে নাগেন্দ্র তক্ষক, বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের আকার পরিগ্রহ পূর্ব্বক, পথিমধ্যে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে মুনীশ্বর!” তুমি সত্বর হইয়া কি অভিপ্রায়ে কোথায় যাইতেছ? কাশ্যপ. কহিলেন, অঙ্গ সর্পরাজ তক্ষক কুরুকুলোদ্ভব শত্রুবিনাশন রাজা পরীক্ষিৎকে স্বীয় তেজঃ দ্বারা ভস্মাবশেষ করিবেক, আমি চিকিৎসা দ্বারা তাহার প্রাণরক্ষা করিতে যাইতেছি। ভক্ষক কহিলেন, হে মহর্ষে! আমিই সেই তক্ষক, আমিই রাজাকে দগ্ধ করিব। আমি দংশন, করিলে তুমি চিকিৎসা করিয়া কৃতকার্য হইতে পারিবে না, অতএব নিবৃত্ত হও। কাশ্যপ কহিলেন, তুমি দংশন করিলে আমি বিদ্যাবলে রাজাকে বিষমুক্ত করিতে পারি, তাহাতে আমার সন্দেহ নাই।
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ শৌনক! দেবতাগণ নানাবিধ অস্ত্র গ্রহণ পূর্বক সতর্ক হইয়া অমৃত রক্ষা করিতেছেন, এমন কালে পক্ষিরাজ গরুড় অতি বেগে তথায় উপস্থিত হইলেন। তাঁহাকে মহাবল পরাক্রান্ত অবলোকন করিয়া সুরগণ কম্পাম্বিতকলেবর হইলেন, এবং হতবুদ্ধি হইয়া পরস্পর প্রহার করিতে লাগিলেন। অপ্রমেয়বলবীর্যসম্পন্ন, বিদ্যুৎ ও অগ্নির স্যায় উজ্জ্বলকায় বিশ্বকর্ম্মও অমৃতরক্ষণে নিযুক্ত ছিলেন; তিনি মুহূর্ত্তকাল বিহারজি গরুড়ের সহিত ঘোরর সংগ্রাম করিয়া তদীয় পক্ষ, নখ ও চঞ্চু প্রহারে বিক্ষত ও মৃতকল্প হইয়া রণক্ষেত্রে পতিত হইলেন। তদনন্তর গরুড় পক্ষপন দ্বারা ধূলি প্রবাহ উদ্ধৃত করিয়া সমস্ত লোক নিরালোক ও দেবগণকে আচ্ছন্ন করিলেন। সেই ধূলিবর্ষ দ্বারা আকীর্ণ হইয়া অমৃতরক্ষক দেবগণ মোহ প্রাপ্ত ও অন্ধপ্রয় হইলেন। গরুড় এই রূপে দেবলোক অকুল করিয়া পক্ষ ও চঞ্চু প্রহার দ্বারা দেবতাদিগের শরীর বিদীর্ণ করিলেন।
অনন্তর দেবরাজ সহস্রাক্ষ পবনকে এই আজ্ঞা দিলেন, হে মারুত? তুমি কারায় এই ধূলিবর্ম অপসারিত কর, ইহা তোমার কর্ম্ম। মহাবল পবনদেব তৎক্ষণাৎ ধূলিরাশি অপসারিত করিলে অন্ধকার নিরস্ত হইল। তখন দেবগণ গরুড়কে আক্রমণ করিলেন। দেবতারা প্রহারারম্ভ করিলে, মহাবল মহাবীর্য্য বিনতানন্দন, নভোমণ্ডলমধ্যবর্তী মহামেঘের ন্যায় সর্ব্বভূতভয়ঙ্কর ঘোতর গর্জন করিতে করিতে অন্তরীক্ষে আরোহণ করিলেন। ইন্দ্রাদি দেবগণ গরুড়কে নভস্তলস্থিত অবলোকন করিয়া পট্টিশ, পরিঘ, শূল, গদা, প্রজ্বলিত ক্ষুর ও সূর্য্যরূপী চক্র ইত্যাদি বহুবিধ অস্ত্র দ্বারা তাহাকে অচ্ছিন্ন করিলেন। প্রতাপৰা গরুড়, এই রূপে সুরগণ কর্তৃক নানা অস্ত্র দ্বারা সমস্ততঃ আহত হইয়াও, ঘোরতর যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। তিনি কোনও ক্রমেই বিচলিত হইলেন না, বরং পক্ষদ্বয় ও বক্ষঃস্থল দ্বারা - বেগণকে বিক্ষিপ্ত করিতে আরম্ভ করিলেন। দেবতারা গরুড় কর্তৃক বিক্ষিপ্ত, তাড়িত ও আহত হইয়া, শোণিত বমন করিতে করিতে ইতস্ততঃ পলায়ন করিতে লাগিলেন। তন্মধ্যে, সাধ্য ও গন্ধর্বগণ পূর্ব্ব দিকে, বস্ত্র ও রুদ্রগণ দক্ষিণ দিকে, আদিত্যগণ পশ্চিম দিকে, আর অশ্বিনীকুমারেরা উত্তর দিকে, পলাইলেন।
তদনন্তর গগনচর পক্ষিরাজ মহাবীর পরাক্রান্ত অশ্বক্রন্দ, রেণুক, ক্রথন, তপন, উলুক, শ্বসন, নিমিষ, প্ররুজ, পুলিন এই নব যক্ষের সহিত সংগ্রাম আরম্ভ করিলেন। প্রলয়কালে রুদ্রদেব যেরূপ ভয়ানক হইয়া থাকেন, তিনিও তদ্রুপ হইয়া পক্ষ, নখ ও চঞ্চুপুটের অগ্রভাগ দ্বারা তাহাদিগকে খণ্ড খণ্ড করিলেন। মহাবল মহোৎসাহ যক্ষগণ গরুড়প্রহারে সর্বাঙ্গে বিক্ষত হইয়া রুধিরধারাবর্ষী জলধরসমুহের ন্যায় আভাসমান হইল।
পরিশেষে পগরাজ সেই সমস্ত যক্ষের প্রাণসংহার করিয়া অমৃত স্থানে উপস্থিত হইলেন, দেখিলেন, অগ্নি অমৃতের চতুর্দি বেষ্টন করিয়া আছে; ঐ অগ্নির জ্বালা অতি ভয়ানক, উহা শিখাসমূহ দ্বারা নভোমণ্ডল আচ্ছন্ন করিয়া আছে; বোধ হয়, যেন প্রচণ্ড বায়ুবেগে চালিত হইয়া সূর্য্যদেবকে দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছে। তখন অমিত্রঘাতী বেগবান্ গরুড় শতাধিক অষ্ট সহস্র মুখ ধারণ করিলেন, এবং সেই সমস্ত মুখ দ্বারা বহুসংখ্যক নদী পান করিয়া, মহাবেগে পুনরাগমন পূৰ্বক, পীত নদীজল দ্বারা ঐ জ্বলন্ত অগ্নি নির্ব্বাণ করিলেন। এই রূপে অগ্নিশান্তি করিয়া তিনি তন্মধ্যে প্রবেশ করিবার ‘নিমিত্ত অতি ক্ষুদ্র কলেবর অবলম্বন করিলেন।
দ্বাদশ অধ্যায়
দ্বাদশ অধ্যায়— পৌলোমপর্ব্ব।
রুরু কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! কি নিমিত্ত রাজা জনমেজয় সর্পহিংসা করিয়াছিলেন, কি নিমিত্তই বা দ্বিজশ্রেষ্ঠ ধীমান্ আস্তীক তাহাদিগের পরিত্রাণ করিলেন, আমি ভাহা সবিস্তর শুনিতে বাসনা করি। আপনি ব্রাহ্মণদিগের প্রমুখাৎ মহাফল প্রদ আস্তীকচরিত আদ্যোপান্ত শ্রবণ করিবেন, আমার যাইবার ত্বরা আছে, এই বলিয়া সেই ঋষি যোগবলে অন্তর্হিত হইলেন। রুরু আশ্চর্য্য বোধ করিয়া অন্তর্হিত ঋষির অন্বেষণে সমস্ত বন ভ্রমণ করিলেন। পরিশেষে একান্ত ক্লান্ত হইয়া ভূতলে পতিত হইলেন এবং সেই ঋষির বাক্য বারংবার চিন্তা করিতে করিতে কিয়ৎ ক্ষণ অচেতন প্রায় হইয়া রহিলেন। অনন্তর সচেতন হইয়া আশ্রমে প্রত্যাগমন পূর্বক নিজজনকসন্নিধানে সমুদায় নিবেদন করিলে, তিনি তাঁহাকে সম্পূর্ণ আস্তীকোপাখ্যান শ্রবণ করাইলেন।
দ্বাবিংশ অধ্যায়
দ্বাবিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগগণ মাতৃশাপশ্রবণানন্তর বিবেচনা করিল, আমাদিগের জননীর অন্তঃকরণে স্নেহ নাই; সুতরাং তাঁহার মনোরথ সম্পন্ন না হইলে কুপিত হইয়া আমাদিগকে দগ্ধ করিবেন। কিন্তু তাহার অভীষ্ট সম্পাদন করিতে পারিলে প্রসন্ন হইয়া আমাদিগের শাপ মোচন করিতে পারেন। অতএব তাহার আজ্ঞা প্রতিপালন করা কর্তব্য। চল, সকলে মিলিয়া উচ্চৈঃশ্রবার পুচ্ছ কৃষ্ণবণ করি। এই সংকল্প করিয়া তাহারা ঐ অশ্বের পুচ্ছকেশরূপে পরিণত হইল। এমন সময়ে দক্ষতনয় কদ্রু ও বিনতা তাকাশপথে, প্রচণ্ড বায়ুৰোগে বিচলিত, ঘোরতরনিনাদসঙ্কুল, তিমিঙ্গিলমকরসমূহসমাকীর্ণ, বহুবিধভয়ঙ্করজন্তুসহস্ৰপরিবৃত, অতিভীষণমূর্তি, সমস্তনদীনায়ক, সকলরত্নাকর, অমৃতাধার, বরুণদেবভবন, নাগগণালয়, বাড়বানলায়, ভয়ঙ্করপ্রাণিসমুহনিবাস, অসুরগণবাসভূমি, স্থানে স্থানে বহুসংখ্যক নদীগণ কর্তৃক নিরন্তর পরিপূর্যমাণ, অতি দুর্ধর্ষ, অতলস্পর্শ, অক্ষোভ্য, অপ্রমেয়, অচিন্তনীয়, অতিমনোহর, পবিত্রজল, জলধি অবলোকন করিতে করিতে প্রীত মনে তদীয় অপর পারে উপনীত হইলেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়—পর্ব্বসংগ্রহ।
ঋষিগণ কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি যে সমন্তপঞ্চক তীর্থের উল্লেখ করিয়াছ, আমরা তাহার স্বরূপ ও সবিশেষ বিবরণ জানিতে বঞ্ছা করি। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে সাধু ব্রাহ্মণগণ! আমি সমন্তপঞ্চকবৃত্তান্ত ও অন্যান্য নানা শুভ কথা কীর্ত্তন করিতেছি, আপনারা শ্রবণ করুন। সকলশস্ত্রধারিশ্রেষ্ঠ পরশুরাম ত্রেতা ও দ্বাপরের সন্ধিতে পিতৃবধক্রোধে অধীর হইয়া ভূয়ো-ভূয়ঃ ক্ষত্রিয়কুল ধ্বংস করিয়াছিলেন। সেই অনলতুল্য তেজস্বী ঋষি নিজ বীর্য্যে সমস্ত ক্ষত্রিয়কুল উৎসন্ন করিয়া সমন্তপঞ্চকে পঞ্চ রুধিরহ্রদ করেন। আমরা শুনিয়াছি, তিনি ক্রোধে অন্ধ হইয়া সেই সেই রুধিরহ্রদের রুধির দ্বারা পিতৃলোকের তর্পণ করিয়াছিলেন। অনন্তর ঋচীক প্রভৃতি পিতৃগণ তাঁহার নিকটে আসিয়া কহিলেন, হে মহাভাগ রাম! আমরা তোমার এইরূপ পিতৃভক্তি ও বিক্রমাতিশয় দর্শনে সাতিশয় প্রসন্ন হইয়াছি, ইচ্ছানুরূপ বর প্রার্থনা কর। রাম কহিলেন, হে পিতৃগণ! যদি আপনারা আমার প্রতি প্রসন্ন হইয়া থাকেন ও আমাকে অনুগ্রহ করিতে ইচ্ছা করেন, তবে এই বর দেন যে, আমি রোষবশে ক্ষত্রিয়কুল সংহার করিয়া যে পাপ গ্রস্ত হইয়াছি, যেন তাহা হইতে মুক্ত হই, এবং যেন এই সকল হ্রদ তীর্থরূপে ভূমণ্ডলে বিখ্যাত ও পরিগণিত হয়। পিতৃগণ যথাপ্রার্থিত বর প্রদান পূর্ব্বক ক্ষমস্ব বলিয়া তাঁহাকে নিষেধ করিলেন, তখন তিনি প্রতিজ্ঞাত ক্ষত্রিয়কুলসংহারক্রিয়া হইতে বিরত হইলেন।
সেই পঞ্চ রুধিরহ্রদের অদূরে যে পরম পবিত্র দেশ আছে, তাহাকে সমন্তপঞ্চক কহে। পণ্ডিতেরা কহেন, যে দেশ যে চিহ্ণে চিহ্নিত, তদ্দারাই সে দেশের নাম নির্দ্দেশ হওয়া উচিত। কলি ও দ্বাপরের অন্তরে সমন্তপঞ্চকে কুরু পাণ্ডব সৈন্যের যুদ্ধ হইয়াছিল। অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সেনা যুদ্ধবাসনায় সেই ভূদোষ বর্জ্জিত ক্ষেত্রে সমাগত ও নিধন প্রাপ্ত হয়। হে ব্রাহ্মণগণ! সেই দেশের নামের এই ব্যুৎপত্তি? সে দেশ পবিত্র ও রমণীয়। হে ব্রতপরায়ণ মহর্ষিগণ! উক্ত দেশ ত্রিলোকে যে রূপে বিখ্যাত, তৎসমুদায় নিবেদন করিলাম।
ঋষিগণ কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি যে অক্ষৌহিণী শব্দ প্রয়োগ করিলে আমরা তাহার যথার্থ অর্থ শ্রবণের বাসনা করি। তোমার অবিদিত কিছুই নাই, অতএব কত পদাতি, কত অশ্ব, কত রথ, ও কত গজে এক অক্ষৌহিণী হয়, তাহার সবিশেষ বর্ণনা কর। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, এক রথ, এক গজ, পাঁচ পদাতি, তিন অশ্ব, ইহাতে এক পত্তি হয়, তিন পত্তিতে এক সেনামুখ, তিন সেনামুখে এক গুল্ম, তিন গুল্মে এক গণ, তিন গণে এক বাহিনী, তিন বাহিনীতে এক পৃতনা, তিন পৃতনাতে এক চমূ, তিন চমূতে এক অনীকিনী, আর দশ অনীকিনীতে এক অক্ষৌহিণী হয়। সমুদায়ে এক অক্ষৌহিণীতে ২১৮৭০ এক বিংশতি সহস্র অষ্টশত সপ্ততি সংখ্যক রথ, তাবৎ সংখ্যক গজ, ১০৯৩৫০ এক লক্ষ নয় সহস্র তিন শত পঞ্চাশ পদাতি, আর ৬৫৬১০ পঞ্চশটি সহস্র ছয় শত দশ অশ্ব থাকে। আমি আপনাদিগকে যে অক্ষৌহিণীর কথা কহিয়াছিলাম, সংখ্যাতত্ত্ববেত্তারা তাহার এইরূপ সংখ্যা নির্দ্দেশ করিয়াছেন। কৌরব ও পাণ্ডবদিগের সংগ্রামে এইরূপ অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সমন্তপঞ্চকে একত্র হইয়াছিল, এবং কৌরবদিগকে উপলক্ষমাত্র করিয়া অদ্ভুতশক্তি কাল প্রভাবে সেই স্থানেই নিধন প্রাপ্ত হয়; পরমাস্ত্রবেত্তা ভীষ্মদেব দশ দিবস যুদ্ধ করেন; তৎপরে দ্রোণাচার্য্য পাঁচ দিন কুরুসৈন্য রক্ষা করেন; শত্রুঘাতী কর্ণ দুই দিন যুদ্ধ করেন; শল্য অর্দ্ধ দিবস মাত্র; তৎপরেই ভীম ও দুর্য্যোধনের অর্দ্ধদিনব্যাপী গদাযুদ্ধ; সেই দিবসের নিশাগমে অশ্বত্থামা কৃতবর্ম্মা ও কৃপাচার্য্য তিন জনে পরামর্শ করিয়া বিশ্বস্ত চিত্তে নিদ্রাগত সমস্ত যুধিষ্ঠিরসৈন্য সংহার করেন।
হে শোনক! আমি আপনার যজ্ঞে যে ভারত কীর্ত্তন আরম্ভ করিতেছি, ব্যাসশিষ্য ধীমান্ বৈশম্পায়ন জনমেজয়ের যজ্ঞে তাহার কীর্ত্তন করিয়াছিলেন। এই ইতিহাসের আদিভাগে মহানুভাব নরপতিগণের যশঃ ও বীর্য্যের সবিস্তর বর্ণনা নিমিত্ত পৌষ্য, পৌলম, ও আস্তীক এই তিন পর্ব্ব আছে। এই গ্রন্থ বিচিত্র অর্থ, পদ, আখ্যান, ও বহুবিধ আচার নিয়মে পরিপূর্ণ। যেমন মোক্ষার্থীরা একমাত্র উপায় বোধে বৈরাগ্য অবলম্বন করিয়া থাকে, সেইরূপ প্রাজ্ঞ নরেরা একমাত্র শ্রেয়ঃ- সাধন বোধ করিয়া এই পরম পবিত্র ইতিহাস গ্রন্থের উপাসনা করেন। যেমন সমুদায় জ্ঞাতব্য পদার্থ মধ্যে আত্মা এবং সমস্ত প্রিয়বস্তুমধ্যে জীবন শ্রেষ্ঠ, সেইরূপ এই পরম পবিত্র ইতিহাস সর্ব্বশাস্ত্রমধ্যে শ্রেষ্ঠ। যেমন আহার ব্যতিরেকে শরীর ধারণের আর উপায় নাই, সেইরূপ এই ইতিহাসগ্রন্থোক্ত কথা ব্যতিরিক্ত ভূমণ্ডলে আর কথা নাই। যেমন অভ্যুদয়াকাঙ্ক্ষী ভৃত্যেরা সৎকুলজাত প্রভুর সেবা করে, সেইরূপ কবিগণ জ্ঞানলাভবাসনায় এই মহাভারতের সেবা করিয়া থাকেন। যেমন সমুদায় লৌকিক ও বৈদিক বাক্য স্বর ও বাঞ্জনে অর্পিত, সেইরূপ এই উৎকৃষ্ট ইতিহাস গ্রন্থে শ্রেয়ঃসাধনী বুদ্ধি অর্পিত আছে।
এক্ষণে আপনারা সেই অশেষ প্রজ্ঞার আকর, সুচারু রূপে রচিত, অতর্কণীয় বিষয়ের মীমাংসাযুক্ত, বেদার্থভূষিত, ভারতাখ্য ইতিহাসের পর্ব্বসংগ্রহ শ্রবণ করুন। সর্ব্বপ্রথম অনুক্রমণিকা পর্ব্ব, দ্বিতীয় পর্ব্বসংগ্রহপর্ব্ব, তৎপরে পৌষ্য, পৌলোম, আস্তীক, ও আদিবংশাবতারণ পর্ব্ব, তৎপরে পরমাদ্ভুত সম্ভব পর্ব্ব, তৎশ্রবণে শরীরে রোমাঞ্চ হয়; তৎপরে জতুগৃহদাহ, তৎপরে হিড়িম্ববধ, তৎপরে বকবধ, তৎপরে চৈত্ররথ, তৎপরে দ্রৌপদীস্বয়ংবর, তৎপরে বৈবাহিক পর্ব্ব, তৎপরে বিদুরাগমন ও রাজ্যলাভ পর্ব্ব, তৎপরে অর্জ্জুনবনবাস, তৎপরে সুভদ্রাহরণ, সুভদ্রাহরণের পর যৌতুকাহরণ পর্ব্ব, তৎপরে খাণ্ডবদাহ ও ময়দানবদর্শন পর্ব্ব, তৎপরে সভাপর্ব্ব, তৎপরে মন্ত্রণাপর্ব্ব, তৎপরে জরাসন্ধ বধ, তৎপরে দিগ্বিজয়পর্ব্ব, দিগ্বিজয়ের পর রাজসূয় পর্ব্ব, তৎপরে অর্ঘাভিহরণ, তৎপরে শিশুপালবধ, তৎপরে দ্যূতপর্ব, তৎপরে অনুদ্রুত পর্ব্ব, তৎপরে অরণ্যপর্ব্ব, তৎপরে কির্ম্মীরবধপর্ব্ব, তৎপরে অর্জ্জুনাভিগমনপর্ব্ব, তৎপরে কিরাত পর্ব্ব, এই পর্ব্বে মহাদেবের সহিত অর্জ্জুনের যুদ্ধ বর্ণিত আছে; তৎপরে ধীমান্ যুধিষ্ঠিরের তীর্থযাত্রাপর্ব্ব, তৎপরে জটাসুরবধ পর্ব্ব, তৎপরে যক্ষযুদ্ধ, তৎপরে ইন্দ্রলোকাভিগমন, তৎপরে নলোপাখ্যান পর্ব্ব, তৎশ্রবণে ধর্ম্মলাভ ও করুণরসের উদয় হয়; তৎপরে পতিব্রতামাহাত্ম্য, তৎপরে পরমাদ্ভুত সাবিত্রীমাহাত্ম্য, তৎপরে নিবাতকবচ যুদ্ধ, তৎপরে অজগর পর্ব্ব, তৎপরে মার্কণ্ডেয় সমস্যা, তৎপরে দ্রৌপদী সত্যভামা সংবাদ, তৎপরে ঘোষযাত্রা, তৎপরে মৃগস্বপ্ন, তৎপরে ব্রীহিদ্রৌণিক, তৎপরে ইন্দ্রদ্যুম্ন পর্ব্ব, তৎপরে জয়দ্রথ কর্ত্তৃক বন হইতে দ্রৌপদীহরণ, তৎপরে রামোপাখ্যান, তৎপরে কুণ্ডলাহরণ, তৎপরে অরণীহরণ পর্ব্ব, তৎপরে বিরাট পর্ব্ব, তৎপরে পাণ্ডবপ্রবেশ, তৎপরে সময়পালন, তৎপরে কীচকবধ, তৎপরে গোগ্রহণ, তৎপরে অভিমন্যু ও উত্তরার বিবাহ পর্ব্ব, তৎপরে পরমাদ্ভুত উদ্যোগ পর্ব্ব, তৎপরে সঞ্জয়যাত্রা, তৎপরে চিন্তাপ্রযুক্ত ধৃতরাষ্ট্রের জাগরণ, তৎপরে পরমগুহ্য সনৎসুজাত পর্ব্ব, ইহাতে আত্মজ্ঞানের কথা আছে; তৎপরে যানসন্ধি, তৎপরে ভগবদযাত্রা, তৎপরে মাতলীয়োপাখ্যান, তৎপরে গালবচরিত, তৎপরে সাবিত্রী উপাখ্যান, বামদেবোপাখ্যান, বৈণ্যোপাখ্যান, জামদগ্ন্যোপাখ্যান, তৎপরে ষোড়শরাজিক পর্ব্ব, তৎপরে কৃষ্ণের সভা প্রবেশ, তৎপরে বিদুলাপুত্র দর্শন, তৎপরে কৃষ্ণ প্রত্যাখ্যান ও বিদুলাপুত্র দর্শন, তৎপরে সৈন্যোদ্যোগ ও শ্বেতোপাখ্যান, তৎপরে মহাত্মা কর্ণের বিবাদ, তৎপরে মন্ত্রনিশ্চয় পূর্ব্বক কার্য্যচিন্তন, তৎপরে সেনাপতিনিয়োগাখ্যান, তৎপরে শ্বেত বাসুদেব সংবাদ, তৎপরে কুরু পাণ্ডব সৈন্য নির্যাণ, তৎপরে সৈন্যসংখ্যা, তৎপরে অমর্ষবর্দ্ধক উলক নামক দূতের আগমন, তৎপরে অম্বোপাখ্যান, তৎপরে অদ্ভুত ভীষ্মাভিষেক পর্ব্ব, তৎপরের জম্বুদ্বীপ সন্নিবেশ পর্ব্ব, তৎপরে ভূমিপর্ব্ব, তৎপরে দ্বীপবিস্তার কথন পর্ব, তৎপরে ভগবদ্গীতাপর্ব্ব, তৎপরে ভীষ্মবধপর্ব্ব, তৎপরে দ্রোণাভিষেক, তৎপরে সংশপ্তক সৈন্যবধ, তৎপরে অভিমন্যুবধ পর্ব্ব, তৎপরে প্রতিজ্ঞাপর্ব্ব, তৎপরে জয়দ্রথবধ, তৎপরে ঘটোৎকচবধ, তৎপরে পরমাদ্ভুত দ্রোণবধ, তৎপরে নারায়ণাস্ত্রত্যাগ পর্ব্ব, তৎপরে কর্ণপর্ব্ব, তৎপরে শল্যপর্ব্ব, তৎপরে হ্রদ প্রবেশ, তৎপরে গদাযুদ্ধপর্ব্ব, তৎপরে অতিবীভৎস সৌপ্তিক পর্ব্ব, তৎপরে অতি নিদারুণ ঐষীকপর্ব্ব, তৎপরে জলপ্রদানিকপর্ব্ব, তৎপরে স্ত্রীবিলাপপর্ব্ব, তৎপরে কুরুবংশীয়দিগের ঔর্দ্ধদেহিক ক্রিয়াপর্ব্ব, তৎপরে ব্রাহ্মণবেশধারী চার্ব্বাক রাক্ষসের নিগ্রহপর্ব্ব, তৎপরে শান্তিপর্ব্ব, এই পর্ব্বে রাজধর্ম্মানুশাসন ও আপদ্ধর্ম্ম উক্ত হইয়াছে; তৎপরে মোক্ষ ধর্ম্ম পর্ব্ব, তৎপরে শুকপ্রশ্নাভিগমন, ব্রহ্মপ্রশ্নানুশাসন, দুর্ব্বাসার প্রাদুর্ভাব ও মায়াসংবাদপর্ব্ব, তৎপরে আনুশাসনিক পর্ব্ব, তৎপরে ধীমান্ ভীষ্মের স্বর্গারোহণ পর্ব্ব, তৎপরে সর্বপাপক্ষয়কারী অশ্বমেধপর্ব্ব, তৎপরে অধ্যাত্মবিদ্যাপ্রতিপাদক অনুগীতাপর্ব্ব, তৎপরে আশ্রমবাসপর্ব্ব, তৎপরে পুত্রদর্শনপর্ব্ব, তৎপরে নারদাগমনপর্ব্ব, তৎপরে অতি দারুণ মৌষল পর্ব, তৎপরে মহাপ্রস্থান, তৎপরে স্বর্গারোহণ পর্ব্ব, তৎপরে খিলনামক হরিবংশপর্ব্ব, ইহাতে বিষ্ণুপর্ব্ব, শিশুচর্য্যা, কংসবধ, ও পরমাদ্ভুত ভবিষ্যপর্ব্ব উক্ত হইয়াছে। মহাত্মা ব্যাসদেব এই শত পর্ব্ব কীর্ত্তন করিয়াছিলেন; পরে লোমহর্ষণপুত্র উগ্রশ্রবাঃ নৈমিষারণ্যে যথাক্রমে অষ্টাদশ পর্ব্ব কীর্ত্তন করেন। ভারতসংক্ষেপরূপ পর্ব্বসংগ্রহ উক্ত হইল।
পৌষ্য, পৌলোম, আস্তীক, আদিবংশাবতরণ, সম্ভব, জতুগৃহ, হিড়িম্ববধ, বকবধ, চৈত্ররথ, দ্রৌপদীস্বয়ংবর, বৈবাহিক, বিদুরাগমন, রাজ্যলাভ, অর্জ্জুনবনবাস, সুভদ্রাহরণ, যৌতুকানয়ন, খাণ্ডবদাহ, ময়দর্শন, এই সমস্ত আদিপর্ব্বের অন্তর্গত। পৌষ্যপর্ব্বে উতঙ্কের মাহাত্ম্য ও পৌলোমে ভৃগুবংশের বিস্তার বর্ণিত আছে। আস্তীকপর্ব্বে সমুদায় সর্পকুল ও গরুড়ের উৎপত্তি, ক্ষীরসমুদ্রমথন, উচ্চৈঃশ্রবার জন্ম, রাজা জনমেজয়ের সর্পসত্রানুষ্ঠান প্রতিজ্ঞ ও ভরতবংশীয় মহাত্মাদিগের কীর্ত্তন আছে। সম্ভবপর্ব্বে অশেষ রাজকুল, অন্যান্য বীরপুরুষ, ও মহর্ষি দ্বৈপায়নের উৎপত্তি, দেবতাগণের অংশাবতার, সর্প, গন্ধর্ব্ব, পক্ষী, ও অন্য অন্য নানা জীবের উদ্ভব, যে ভরতের নামানুসারে লোকে ভারতকুল প্রসিদ্ধ হইয়াছে, তপঃপরায়ণ কণ্বমুনির আশ্রমে দুষ্মন্তের ঔরসে শকুন্তীর গর্ভে তাঁর জন্ম গ্রহণ, শান্তনুগৃহে গঙ্গাগর্ভে মহাত্মা! বসুদিগের পুনর্জন্ম ও তাঁহাদিগের স্বর্গারোহণ, তদীয় তেজোগসমষ্টি, ভশ্নের জন্য, তাঁহার রাজপরিত্যাগ, ব্রহ্মচর্যাবলম্বন, প্রতিজ্ঞালন, স্বীয় ভ্রাতা চিত্রাঙ্গদের রক্ষা, চিত্রাঙ্গদের মৃত্যু হইলে কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিচিত্রবীর্যের রক্ষা ও তাঁহাকে রাজ্য প্রতিপাদন, অনীমাণ্ডব্যশাপে ধর্ম্মের নরলোকে উৎপত্তি ও বরদানলে দ্বৈপায়নের ঔরসে জন্ম, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ড, ও প বদিগের উৎপত্তি, দুর্যোধনের বারণাবতমাত্রামন্ত্রণা, ধীমান্ যুধিষ্ঠিরের হিতার্থে পথে তাহাকে ম্লেচ্ছভাষায় বিদুরের হিতোপদেশপ্রদান, বিয়ের পর মর্শে সুরঙ্গনির্ম্মাণ, জতুগৃহে পঞ্চপুত্র সহিত নিদ্রিত। নিষাদীর ও পুরোচননামক স্নেচ্ছের দাহ, ঘোর অরণ্যে পাণ্ডবদিগের হিড়িম্বাদর্শন ও সেই স্থানে মহাবল ভীম কর্তৃক হিড়িম্ববধ, ঘটোৎকচের জন্ম, মহাতেজস্বী মহর্ষি ব্যাসদেবের সন্দর্শন, তদীয় আদেশানুসারে একচক্র। নগরে ব্রাহ্মণগৃহে পাণ্ডবদিগের অজ্ঞাতবাস, বরাক্ষসবধ ও তদ্দর্শনে নগরবাসী লোকের বিস্ময়, দ্রৌপদী ও ধৃষ্টদ্যুম্নের জন্ম, ব্রাহ্মণমুখে দ্রৌপদীর পরমাদ্ভূত জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণে কৌতুহলক্রান্ত হইয়া ব্যাসের উপদেশানুসারে দ্রৌপদীলাভাভিলাষে স্বয়ংবর দশক্ষার্থে পাণ্ডবদিগের পাঞ্চাল দেশ, যাত্রা, গঙ্গাতীরে গন্ধরাজ, অঙ্গারপর্ণকে পরাজিত করিয়া তাহার সহিত মৈত্রী স্থাপন ও তৎসমীপে তপতী, বশিষ্ঠ, ও ঔর্ব্বের উপাখ্যান শ্রবণ পূর্ব্বক ভ্রাতৃসহিত অর্জ্জুনের পাঞ্চালাভিমুখে গমন, পাঞ্চাল নগরে সমাগত সর্ব্বনৃপতিসমক্ষে লক্ষ্যভেদ পূর্ব্বক অর্জ্জুনের দ্রৌপদীলাভ, তদ্দর্শনে জাতক্রোধ রাজগণের এবং শল্য ও কর্ণের ভীমার্জ্জুন কর্ত্তৃক যুদ্ধে পরাজয়, ভীম ও অর্জ্জুনের তাদৃশ অপ্রমেয় অমানুষ বীর্য্য দর্শনে পাণ্ডব বোধ করিয়া কৃষ্ণ বলরামের তৎসাক্ষাৎকারার্থ ভার্গবগৃহগমন, পাঁচ জনের এক ভার্য্যা হইবেক এই নিমিত্ত দ্রুপদের বিমর্ষ, তদুপলক্ষে পরমাদ্ভুত পঞ্চেন্দ্রোপাখ্যান কথন, দ্রৌপদীর দেববিহিত অলৌকিক বিবাহ, ধৃতরাষ্ট্রের পাণ্ডবসমীপে বিদুর প্রেরণ, বিদুরের উপস্থিতি ও কৃষ্ণ দর্শন, পাণ্ডবদিগের খাণ্ডবপ্রস্থে বাস ও রাজ্যার্দ্ধ প্রাপ্তি, নারদের আজ্ঞায় পঞ্চ ভ্রাতার দ্রৌপদী বিষয়ে নিয়ম ও প্রতিজ্ঞা, দ্রৌপদী সহিত নির্জনোপবিষ্ট যুধিষ্ঠিরসমীপে গমন ও তথা হইতে অস্ত্র গ্রহণ পূর্ব্বক শরণাগত ব্রাহ্মণের অপহৃত গোধন প্রত্যানয়ন করিয়া পূর্ব্ব প্রতিজ্ঞানুসাৱে অর্জ্জুনের বন প্রস্থান, বনবাস কালে উলপী নাম্নী নাগকন্যার সহিত সমাগম, তীর্থ পর্য্যটন ও বভ্রুবাহনজন্ম, তপস্বিব্রাহ্মণশাপে গ্রাহযোনি প্রাপ্ত পঞ্চ অপ্সরার শাপমোক্ষণ, প্রভাস তীর্থে কৃষ্ণের সহিত সমাগম, দ্বারকাতে কৃষ্ণের সম্মতিক্রমে সুভদ্রা প্রাপ্তি, যৌতুক প্রদানার্থে কৃষ্ণের খাণ্ডবপ্রস্থাগমনের পর সুভদ্রাগর্ভে মহাতেজাঃ অভিমন্যুর জন্ম, দ্রৌপদীর পুত্ত্রোৎপত্তি, কৃষ্ণ ও অর্জ্জুন জলবিহারার্থ যমুনা গমন করিলে তথায় উভয়ের চক্র ও ধনুপ্রাপ্তিঃ, খাণ্ডবদাহ এবং ময়দানব ও ভুজঙ্গের অগ্নিদাহ হইতে মোক্ষণ, মন্দপালনামক মহর্ষির শার্ঙ্গীগর্ভে তনয়োৎপত্তি। বহুবিস্তৃত আদিপর্ব্বে এই সকল বিষয় বর্ণিত আছে। মহর্ষি ব্যাসদেব এই পর্ব্ব দুই শত সপ্তবিংশতি অধ্যায়ে বিভক্ত করিয়াছেন। মহাত্মা মুনি ইহাতে আট সহস্র আট শত চতুরণীতি শ্লোক কহিয়াছেন।
বহুবৃত্তান্তযুক্ত সভা নামক দ্বিতীয় পর্ব্ব আরম্ভ হইতেছে। পাণ্ডবদিগের সভা নির্ম্মাণ, কিঙ্কর দর্শন, দেবর্ষি নারদ কর্ত্তৃক ইন্দ্রাদি লোকপাল সভা বর্ণন, রাজসূয় যজ্ঞারম্ভ, জরাসন্ধবধ, গিরিব্রজনিরুদ্ধ রাজগণের কৃষ্ণ কর্ত্তৃক উদ্ধার, পাণ্ডবদিগের দিগ্বিজয়, উপঢৌকন লইয়া রাজাদিগের রাজসূয় মহাযজ্ঞে আগমন, রাজসূয়ের অর্ঘ্য দান প্রস্তাব কালে শিশুপালবধ, যজ্ঞে যুধিষ্ঠিরের তাদৃশ ঐশ্বর্য্য সর্শনে দুর্য্যোধনেয় বিষাদ ও ঈর্ষ্যা, সভামণ্ডপে ভীমকৃত দুর্য্যোধনোপহাস, দুর্য্যোধানের ক্রোধ, দ্যূতক্রীড়ার অনুষ্ঠান, দ্যূতকার শকুনি কর্ত্তৃতৃক দ্যূতে যুধিষ্ঠিরের পরাজয়, দ্যূতাবর্ণমগ্না পরম দুঃখিতা স্নুষা দ্রৌপদীর মহাপ্রাজ্ঞ ধৃতরাষ্ট্র কর্ত্তৃক উদ্ধার, পাণ্ডবদিগের উদ্ধার দর্শনে দুর্য্যোধন কর্ত্তৃক পুনর্বায় দ্যূতক্রীড়ার্থে তাঁহাদিগের আহ্বান ও পরাজয় পূর্ব্বক বনপ্রেষণ। মহাত্মা দ্বৈপায়ন সভাপর্ব্বে এই সমস্ত ব্যাপার কীর্ত্তন করিয়াছেন। এই পর্ব্বে অষ্ট সপ্ততি অধ্যায় আছে। হে দ্বিজোত্তমগণ! সভাপর্ব্বে দ্বিসহস্র পঞ্চশত একাদশ শ্লোক আছে জামিবেন।
অতঃপর অরণ্যনামক তৃতীয় পর্ব্ব। মহাত্মা পাণ্ডবেরা বন প্রস্থান করিলে পুরবাসিদের যুধিষ্ঠিরানুগমন, অনুগত দ্বিজগণের ভরণ পোষণ নির্ব্বাহার্থ ধৌম্যমুনির উপদেশানুসারে মহাত্মা যুধিষ্ঠিরের সূর্য্যারধনা, সূর্য্যপ্রসাদাৎ অন্নলাভ, ধৃতরাষ্ট্র কর্ত্তৃক হিতবাদী বিদুরের পরিত্যাগ, ধৃতরাষ্ট্রপরিত্যক্ত বিদুরের যুধিষ্টিরাদিসমীপগমন, ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে তাঁহার পুনরাগমন, কর্ণের পরামর্শক্রমে দুর্ম্মতি দুর্যোধনের বনস্থ পাণ্ডব বিনাশ মন্ত্রণা, তাঁহার দুষ্ট অভিপ্রায় জানিতে পারিয়া ব্যাসের সত্বর আগমন, ব্যাস কর্তৃক দুর্য্যোধনাদির বনগমন নিবারণ, সুরভির উপাখ্যান, মৈত্রেয়ের ধৃতরাষ্ট্রসমীপে আগমন, মৈত্রেয়ের ধৃতরাষ্ট্রকে উপদেশ দান, মৈত্রেয়ের রাজা দুর্য্যোধনকে শপ প্রদান, ভীমসেন কর্তৃক সংগ্রামে কিষ্মীর রাক্ষস বধু, শকুনি ছল পূর্বক দ্যূত পাবদিগকে পরাজিত করিয়াছে শুনিয়া বৃষ্ণিবংশীয় ও পাঞ্চালদিগের আগমন, জাতক্রোধ কৃষ্ণের অর্জুন কর্তৃক সান্ত্বনা, কৃষ্ণের নিকট দ্রৌপদীর বিলাপ ও পরিতাপ, দুঃখাত্তা দ্রৌপদীকে কৃষ্ণের আশ্বাস প্রদান, সৌভপতি শাল্বের বধ কীর্ত্তন, কৃষ্ণ কর্তৃক সপুত্র সুভদ্রার দ্বারকানয়ন, ধৃষ্টদ্যুম্ন কর্তৃক দ্রৌপদীতনয়দিগের পাঞ্চাল নগর নয়ন, পাণ্ডবদিগের রমণী দ্বৈতবনে প্রবেশ, তথায় দ্রৌপদী ও ভীমের সহিত যুধিষ্ঠিরের কথোপকথন, ব্যাসদেবের পাণ্ডবসমীপে আগমন ও যুধিষ্ঠিরকে প্রতিস্মৃতিনামক বিদ্যাদান, যাদের অন্তর্ধানের পর পাণ্ডবদিগের কাম্যকবন প্রস্থান, অলাভার্থে মহাবীর্য অর্জুনের প্রবাস গমন, কিরতিরূপী মহাদেবের সহিত যুদ্ধ, ইন্দ্রাদি লোকপাল দর্শন, অস্ত্র লাভ, অস্ত্র শিক্ষার্থে ইন্দ্রলোক গমন, পাণ্ডববৃত্তান্ত শ্রবণে ধৃতরাষ্ট্রের চিন্তা, পাণ্ডবদিগের পরম জ্ঞানী মহর্ষি বৃহদশের দর্শন, দুখার্ত যুধিষ্ঠিরের বিলাপ ও পরিতাপ, ধর্ম ও করুণরসজনক নলোপাখ্যান, দময়ন্তী ও নলের চরিতকীর্ত্ত, যুধিষ্ঠিরের বৃহদ হইছে হৃদয়নামক বিদ্যা প্রাপ্তি, স্বর্গ হইতে লোমণ ঋষির পাণ্ডবদিগের নিকটে আগমন, বনবাসগত মহাত্মা পাণ্ডবদিগের নিকটে লোমশ কর্তৃক স্বর্গবাসী অর্জুনের বৃত্তান্তকথন, অর্জুনবাক্য আছে। এ পাণ্ডবদিগের তীর্ঘাষ্ঠিগম, তীর্থের ফল ও পবিত্রত্ব কীর্ত্তম, মহর্ষি নারদের পুলস্ত্যতীর্থ যাত্রা মহাত্মা পাণ্ডবদিগের তীর্থযাত্রা, কুণ্ডলদ্বয় দান দ্বারা কর্ণের ইন্দ্রহস্ত হইতে মুক্তি, গয়াসুরের যজ্ঞবর্ণন, অগস্ত্যেপাখ্যান ও বাতাপিভক্ষণ, সন্তান লাভার্থে অগস্ত্য মুনির লোপামুদ্রাপরিগ্রহ, কৌমারব্রহ্মচারী ঋষ্যশৃঙ্গের চরিতর্কীর্ত্তন, অতিতেজস্বী জামদগ্ন্য রামের চরিতকীর্ত্তন, কার্ত্তবীর্য ও হৈহয়দিগের বধবর্ণন, প্রভাসতীর্থে যদুবংশীয়দিগের সহিত পাণ্ডবদিগের সমাগম, সুকন্যার উপাখ্যান, শর্য্যাতি রাজার যজ্ঞে চ্যবনমুনি কর্তৃক অশ্বিনীকুমার যুগলের সোমপীপিকার্যে বরণ, অশ্বিনীকুমার যুগলের অনুগ্রহে চ্যনের যৌবনপ্রাপ্তি, মান্ধাতার উপাখ্যান, জন্তুনামক রাজপুত্রের উপাখ্যান, সমধিক পুলভি বাসনায় সোমক রাজার জনামক পুত্রের প্রাণবধ পূর্বক যজ্ঞানুষ্ঠান ও শতপুত্রপ্রাপ্তি, অত্যুৎকৃষ্ট শ্যেনকপোতোপাখ্যান, ইন্দ্র ও অগ্নির শিবি রাজাকে ধর্ম্ম জিজ্ঞাসা, অষ্টাবক্রাপাখ্যান, জনকশজ্ঞে নৈয়ায়িকশ্রেষ্ঠ বরুণপুত্র বন্দির সহিত অষ্টাবক্র মুনির বিবাদ, অষ্টাবক্রের বন্দি পরাজয় পূর্ব্বক সাগরজলমগ্ন পিতার উদ্ধার, যবক্রীত ও মহাত্মা রেভ্যের উপাখ্যান, পাণ্ডবদিগের গন্ধমাদন যাত্রা ও নারায়ণাশ্রমে বসি, গন্ধমাদনে অবস্থানকালে পুষ্পহরণার্থে দ্রৌপদীর ভীমপ্রেরণ, গমনকালে ভীম কর্তৃক কদলীবনমধ্যস্থ মহবল হনুমানের দর্শন, পুষ্পহরণার্থে ভীমের সরোবরাবগাহন, মহাবল পরাক্রস্তি রাক্ষসগণের ও মূর্ণিমা প্রভৃতি মহাবীর্য্য যক্ষদিগের সহিত ভীনের যুদ্ধ, ভীম কর্তৃক জটাসুর নামক রাক্ষসের বধ, রাজর্ষি বৃষপর্ধার অভিগমন, পাণ্ডবদিগের আষ্টিযেণের আশ্রমে গমন ও বাস, দ্রৌপদীর মহাত্মা ভীমসেনকে উৎসাহ প্রদান, ভীমের কৈলাসারোহণ, তথায় মণিমা প্রভৃতি মহাবল পরাক্রান্ত যক্ষগণের সহিত যুদ্ধ, পাণ্ডবদিগের কুবেরের সহিত সমাগম, দিব্যাস্ত্র লাভানন্তর অর্জুনের ভ্রাতৃগণের সহিত সমাগম, হিরণ্যপুরবাসী নিবাতকবচগণের ও পুলোমপুল কালকেয়দিগের সহিত অর্জুনের যুদ্ধ, অৰ্জ্জুন কর্তৃক তাহাদিগের রাজার প্রাণবধ, যুধিষ্ঠিরসমীপে অর্জুনের অস্ত্র সন্দর্শনের উপক্রম, দেবর্ষি নারদ কর্তৃক প্রতিষেধ, গন্ধমাদন হইতে পাণ্ডবদিগের অবতরণ, গহনবনে পর্বততুল্য প্রকাগুকায় মহাবল ভুজপেন্দ্র কর্তৃক ভীম গ্রহণ, প্রশ্ন কথন পূর্বক যুধিষ্ঠিরের ভীমোদ্ধার, মহাত্মা পাণ্ডবদিগের পুনর্বার কাম্যকবনে আগমন, কাম্যকস্থিত নরশ্রেষ্ঠ পাণ্ডবদিগের পুনর্দর্শনার্থে কৃষ্ণের আগমন, মার্কণ্ডেয় সমস্যা, মার্কণ্ডেয় কর্তৃক বেণপুত্র পৃথুরাজার উপাখ্যানকীর্ত্তন, সরস্বতী ও তাক্ষ মুনি সংবাদ, তদনন্তর মৎস্যোপাখ্যানকথন, ইন্দ্রদ্যুম্নোপাখ্যান, ধুন্ধুমারোপাখ্যান, পতিব্রতার উপাখ্যান, অঙ্গিরার উপাখান, দ্রৌপদী সত্যভামা সংবাদ, পাণ্ডবদিগের দ্বৈতবনে পুনরাগমন, ঘোষধাত্রা, গন্ধর্ব্বগণ কর্তৃক দুর্যোধনের বন্ধন, অর্জুন কর্তৃক গন্ধর্ববন্ধন হইতে দুর্যোধনের মোচন, যুধিষ্ঠিরের মৃগস্বপ্নদর্শন, কামাকবনে পুনর্গমন, বহুবিস্তৃত ব্রীহি দ্রৌণিক উপাখ্যান, দুর্বাসার উপাখ্যান, আশ্রম মধ্য হইতে জয়দ্রথ কর্তৃক দ্রৌপদী হরণ, মহাবল মহাবেগ ভীম কর্তৃক জয়দ্রথের পঞ্চশিখীকরণ, বহুবিস্তৃত রামায়ণোপাখ্যান, যুদ্ধে রাম কর্তৃক রাবণবধ, সাবিত্রীর উপাখ্যান, কুলদ্বয় দান দ্বারা ইন্দ্র হইতে কর্ণের মুক্তি, সন্তুষ্ট ইন্দ্রের কর্ণকে এক পুরুষঘাতিনী শক্তি দান, অরণেয় উপাখ্যান, ধর্ম্মের স্বপুত্রানুশাসন, বরপ্রাপ্তি পূর্ধক পাণ্ডবদিগের পশ্চিম দিক প্রস্থান। আরণ্যকপর্বে এই সমস্ত বৃত্তান্ত কীর্তিত আছে। এই পর্বে দুই শত কোনসপ্ততি অধ্যায় ও একাদশ সহস্র ছয় শত চৌষট্টি শ্লোক আছে। হে মুনিগণ! অতঃপর বহুবিস্তৃত বিরাটপর্ব শ্রবণ করুন। পাণ্ডবেরা বিরাটনগরে গমন পূর্ব্বক শ্মশানে অতি প্রকা শমীতরু দৃষ্টিগোচর করিয়া তাহাতে স্ব স্ব অস্ত্র স্থাপন করিলেন, এবং নগরে প্রবেশ করিয়া ছাবেশে বাস করিতে লাগিলেন। তথায় ভীমসেন দ্রৌপদীসম্ভোগাভিলাষী কামান্ধ দুরাত্মা কীচকের প্রাণদও করেন। রাজা দুর্য্যোধন পাণ্ডবদিগের অন্বেষণার্থ চতুর্দিকে সুচতুর চরমগুলী প্রেরণ করেন; তাহারা মহাত্মা পাণ্ডবদিগের সন্ধান করিতে পারিল না। প্রথমতঃ ত্রিগর্ত্তেরিা বিরাট রাজার গোন হরণ করে। তাহাদিগের সহিত বিরাটের ঘোরতর যুদ্ধ হয়। ত্রিগর্ত্তরা বিরাটকে বন্ধন করিয়া লইয়া যাইতেছিল, ভীম তাঁহাকে মুক্ত করেন। পাণ্ডবেরা ত্রিগদিগকে পরাভূত করিয়া বিরাটের অপহৃত গোধন উদ্ধার করিলেন। তৎপরে কৌরবেরা তাহার গোপন হরণ করেন। অর্জুন নিজ বিক্রমে সমস্ত কৌরবদিগকে রণে পরাজিত করিয়া গোন প্রত্যাহরণ করিলেন। বিরাট রাজা সুভদ্রাগর্ভসস্তৃত শত্রুঘাতী অভিমন্যুকে উদ্দেশ করিয়া অর্জুনকে নিজ কন্যা উত্তরা সম্প্রদান করিলেন। অতি বিস্তৃত বিরাটনামক চতুর্থ পর্ব বর্ণিত হইল। এই পর্বে মহর্ষি সপ্তধষ্ঠি অধ্যায় গণনা করিয়াছেন। এক্ষণে শ্লোকসংখ্যা নির্দেশ করিতেছি, শ্রবণ করুন; এই পার্শে বেবেত্তা মহর্ষি দ্বিসহস্র পঞ্চাশৎ শ্লোক কীর্ত্তন করিয়াছেন।
অতঃপর উদ্যোগনামক পঞ্চম পর্ব প্রবণ করুন। পাণ্ডবেরা বিপক্ষ জয়ার্থ উৎসুক হইয়া উপপ্লব্যনামক স্থানে অবস্থিত হইলে দুর্য্যোধন ও অর্জুন বাসুদেবসন্নিধানে উপস্থিত হইলেন, এবং উভয়েই প্রার্থনা করিলেন, তুমি এই যুদ্ধে আমার সহায়তা কর। মহামতি কৃষ্ণ উত্তর করিলে, এক পক্ষে এক অক্ষৌহিণী সেনা, পক্ষান্তরে আমি একাকী, কিন্তু আমি যুদ্ধ করিব না, কেবল মন্ত্রিস্বরূপ থাকিব; তোমরা ইহার কে কি প্রার্থনা কর, বল। হিতাহিতবিবেকানভিজ্ঞ দুর্ম্মতি দুর্যোধন সৈন্য প্রার্থনা করিলেন, অর্জুন যুদ্ধবিমুখ কৃষ্ণকে মন্ত্রিত্বে বরণ করিলেন। মদ্ররাজ শল্য পাণ্ডবদিগের সাহায্যার্থ যাইতেছিলেন; দুর্যোধন পথে তাঁহার দর্শন পাইয়া উপহার প্রদান দ্বারা বশীভূত করিয়া এই প্রার্থনা করিলেন, তুমি আমার সাহায্য কর। শল্য অঙ্গীকার করিয়া পাণ্ডবদিগের নিকট প্রস্থান করিলেন, এবং তথায় উপস্থিত হইয়া শান্তু বাক্যে রাজা যুধিষ্ঠিরকে ইন্দ্রের’ বৃত্রাসুরজয়বৃত্তান্ত শ্রবণ করাইলেন। পাণ্ডবের কৌরসমীপে পুরোহিত প্রেরণ করিলেন। প্রতাপবান্ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবপ্রেরিত পুয়োহিতের বাক্য শ্রবণ করিয়া শান্তিস্থাপন বাসনায় সঞ্জয়কে পাণ্ডবদিগের নিকট দূতস্বরূপ প্রেরণ করিলেন। বাসুদেবের ও পাণ্ডবদিগের বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া চিন্তায় ধৃতরাষ্ট্রের নিদ্রাত্যাগ হইল। বিহুর মহাপ্রাজ্ঞ রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে বহুতর অদ্ভুত হিতবাক্য শ্রবণ করাইলেন। মহর্ষি সনৎজাতও রাজাকে মনস্তাপান্বিত ও শোকবিহ্বল দেখিয়া পরমোৎকৃষ্ট অধ্যাত্ম শাস্ত্র শুনাইলেন। সঞ্জয় প্রকাতে রাজসভায় উপস্থিত হইয়া কৃষ্ণ ও অর্জুন একাত্মা বলিয়া বর্ণনা করিলেন। মহামতি কৃষ্ণ কৃপাপরতন্ত্র হইয়া বিরোধভঞ্জন ও শাস্তিস্থাপনার্থে হস্তিনাপুরে গমন করিলেন। রাজা দুর্যোধন উভয় পক্ষের হিতাকাঙক্ষী কৃষ্ণের অনুরোধ রক্ষা করিলেন না। এই স্থলে দম্ভোব রাজার উপাখ্যান, মহাত্মা মাতলির নিজ কন্যার্থে বরান্বেষণ, মহর্ষি গালৰের চরিত ও বিদুলার স্বপুত্রানুশাসন কীর্তিত আছে। কৃষ্ণ, কর্ণ, দুর্যোধন প্রভৃতির দুষ্ট মন্ত্রণ জ্ঞাত হইয়া সমস্ত রাজাদিগকে স্বীয় যোগেশ্বরত্ব প্রদর্শন করিলেন। অনন্তর কর্ণকে নিজ রথে আরোহণ করাইয়া তাহার সহিত অশেষবিধ পরামর্শ করিলেন। কর্ণ গান্ধতা প্রযুক্ত তদীয় পরামর্শ গ্রাহ্য করিলেন। শত্রুঘাতী কৃষ্ণ হস্তিনা হইতে উপপ্লব্যে প্রত্যাগমন করিয়া পাণ্ডবদিগের নিকট আদ্যোপান্ত অবিকল বর্ণনা করিলেন। তাহারা তদীয় বাক্য শ্রবণ করিয়া হিতাহিত মন্ত্রণ পূর্বক সংগ্রামের সমুদায় সজ্জা করিলেন। তদনন্তর সমুদায় পদাতি, অশ্ব, রপ, গজ, যুদ্ধার্থে হস্তিনানগর হইতে নির্গত হইল। রাজা দুর্যোধন যুদ্ধারম্ভের পূর্ব দিবসে উলূকনামক এক ব্যক্তিকে দৌত্যকার্যে নিযুক্ত করিয়া পাণ্ডবদিগের নিকট প্রেরণ করিলেন। তৎপরে সৈন্যসংখ্যা ও কাশিরাজদুহিতা অম্বার উপাখান। বহুবৃন্তযুক্ত সন্ধিৰি গ্রহবিশিষ্ট উদ্যোগনামক ভারতীয় পঞ্চম পর্ব নির্দিষ্ট হইল। মহর্ষি উদ্যোগপলে এক শত যড়শীতি অধ্যায় নির্দেশ করিয়াছেন। হে তপোধনগণ! উদারমতি মহাত্ম। ব্যাসদেব এই পর্বে ষটসহস্র যশত অষ্ট মবতি শ্লোক রচনা করিয়াছেন।
অতঃপর অদ্ভুত ভীষ্মপর্ব বর্ণিত হইতেছে। এই পর্বে সঞ্জয় জখ নিৰ্মাণ বর্ণনা করেন। যুধিষ্ঠিরসৈন্য অত্যন্ত বিষাদ প্রাপ্ত হয়। দশাহ ঘোরতর যুদ্ধ হয়। মহামতি বাসুদেব অধ্যাত্ম বিদ্যা সম্বদ্ধ হেতুবাদ দ্বারা অর্জুনের মায়ামমাহজনিত বিষাদ নিরাকরণ করেন। যুধিষ্ঠিরহিতাকাঙক্ষী উদারমতি কৃষ্ণ বিশেষ পর্যালোচনা করিয়া সত্বর রথ হইতে লক্ষ প্রদান পূর্বক অতি দ্রুত গমনে প্রতোদহস্তে নির্ভয় চিত্তে ভীষ্মকে সংহার করিতে যান, এবং সকলশস্ত্রধারিশ্রেষ্ঠ অর্জুনকে বাক্যরূপ দণ্ড দ্বারা তাড়না করেন। অর্জুন শিখণ্ডিকে সম্মুখে স্থাপন করিয়া তীক্ষ্ণতর শর প্রহার দ্বারা ভীষ্মকে রথ হইতে ভূতলে পাতিত করেন। ভীষ্ম শরশয্যায় শয়ন করিলেন। বহুবিস্তৃত ভারতীয় ষষ্ঠ পর্ব কথিত হইল। বেদ বেত্তা ব্যাস ভীষ্মপর্বে এক শত সপ্তদশ অধ্যায় ও পঞ্চ সহস্র অষ্ট শত চতুরশীতি শ্লোক কীর্ত্তন করিয়াছেন।
তদনন্তর বহু বৃত্তান্তু যুক্ত বিচিত্র দ্রোণপর্ব আরব্ধ হইতেছে। প্রতাপবান্ মহাস্ত্রবেত্তা দ্রোণাচার্য সেনাপতিপদে অভিষিক্ত হইয়া দুর্যোধনের প্রত্যর্থে প্রতিজ্ঞা করিলেন, ধীমান্ ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধে বদ্ধ করিয়া আনিব। সংশপ্তকেরা অৰ্জ্জুনকে রণক্ষেত্র হইতে অপসারিত করে। সংগ্রামে শক্রতুল্য মহারাজ ভগদত্ত সু প্রতীক নামক স্বীয় হস্তীর পরাক্রমে যুদ্ধে অতি দুর্ধর্ষ ও ভয়ানক হইয়া উঠেন। অর্জ্জুন সুপ্রতীকের প্রাণ সংহার করেন। জয়দ্রথ প্রভৃতি অনেক মহারথের একত্র হইয়া অতি পরাক্রান্ত অপ্রাপ্তযৌবন শিশু প্রায় অভিমনুর প্রাণবধ করেন। অভিমন্যু হত হইলে অর্জ্জুন ক্রুদ্ধ হইয়া সমরে সপ্ত অক্ষৌহিণী সেন। সংহার পূর্বক জয়দ্রথের জীবন নাশ করেন। মহাবাহু ভীম ও মহারথ সাত্যকি রাজা যুধিষ্ঠিরের আদেশানুসারে অর্জ্জুনের অন্বেষণার্থ দেবতাদিগেরও দুৰ্দ্ধৰ কৌরবসৈন্য মধ্যে প্রবেশ করেন। হাবশিষ্ট সংশপ্তকেরা সংগ্রামে নিঃশেষ হয়। দ্রোণপর্বে অলম্বুষ, শ্রুতায়ু, বীর্য্যবান্ জলসন্ধ, সোমদত্ত, বিরাট, মহারথ দ্রুপদ, ঘটোৎকচ, ও অন্যান্য বীরপুরুষেরা নিহত হয়েন। দ্রোণাচার্য যুদ্ধে নিপাতিত হইলে অশ্বথামা অমর্ষপরবশ হইয়া অতি ভয়ঙ্কর নারায়ণাস্ত্র প্রয়োগ করেন। এই পর্বে উৎকৃষ্ট রুদ্রমহাত্ম, ব্যাসদেবের আগমন, এবং কৃষ্ণ ও অর্জ্জুনের মাহাত্ম্য কীর্ত্তিত হইয়াছে। ভারতের সপ্তম পর্ব্ব উদাহৃত হইল। দ্রোণপর্বে যে সকল পরাক্রান্ত পুরুষশ্রেষ্ঠ পৃথিবীপাল নির্দিষ্ট হইয়াছেন, প্রায় সকলেই নিধন প্রাপ্ত হয়েন। তত্ত্বদশী মহর্ষি পরাশরসূনু সবিশেষ পর্যালোচনা করিয়া দ্রোণপর্বে এক শত সপ্ততি অধ্যায় ও অষ্ট সহস্র নব শত নব শ্লোক সংখ্যা করিয়াছেন।
অতঃপর পরমাস্তুত কর্ণপর্ব উক্ত হইতেছে। ধীমান্ শল্যের সারথিকার্য্যে নিয়োগ, ত্রিপুরনিপাত বর্ণন, প্রস্থান কালে কর্ণ ও শল্যের পরস্পর কলহ, কর্ণ তিরস্কারার্থ শল্যর হংসকাকীয় উপাখ্যান কথন মহাত্মা অশ্বত্থামা কর্তৃক পাণ্ড্যরাজার বধ, তৎপরে দগুসেন ও দণ্ডের বধ, সর্ব্বধনুর্দ্ধর সমক্ষে কর্ণের সহিত দ্বৈরথ যুদ্ধে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের প্রাণ সংশয়, যুধিষ্ঠির ও অর্জ্জুনের পরস্পরের প্রতি পরস্পরের কোপ। কৃষ্ণ অনুনয় দ্বারা অর্জ্জুনের কোপ শান্তি করিলেন। ভীম প্রতিজ্ঞা পূর্বক রণক্ষেত্রে দুঃশাসনের বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিয়া তদীয় শোণিত পান করেন। অর্জ্জুন দ্বৈরথ যুদ্ধে মহারথ কর্ণের প্রাণসংহার করেন। মহাভারতের অষ্টম পর্ব নির্দিষ্ট হইল। কর্ণপর্বে একোনসপ্ততি অধ্যায় ও চারি সহস্র নয় শত চতুঃষষ্টি শ্লোক কীর্তিত হইয়াছে।
অতঃপর বিচিত্র শল্যপর্ব্ব আরব্ধ হইতেছে। কৌরবসৈন্য বীরশূন্য হইলে মদ্রেশ্বর শল্য সেনাপতি হইলেন। শল্যপর্ব্বে যাবতীয় সুখযুদ্ধ ও কৌরবপক্ষীয় প্রধান বীরদিগের বিনাশ কীর্তিত হইয়াছে। মহাত্মা যুধিষ্ঠিরের হস্তে শস্যের ও সহদেবইস্তে শকুনির প্রাণবধ হয়। দুর্য্যোধন স্বীয় সৈন্য অল্পমাত্রাবিশিষ্ট দেখিয়া হ্রদ প্রবেশ পূর্বক জলস্তম্ভ করিয়া অবস্থিতি করিতে ‘জাগিলেন। ব্যাধেরা ভীমকে তাঁহার সন্ধান বলিয়া দিল। অত্যন্ত অভিমানী দুর্য্যোধন ধীমান্ ধর্ম্মরাজের তিরস্কারবাক্য সস্থ করিতে না পারিয়া হ্রদ হইতে গাত্রোত্থান পূর্বক ভীমসেনের সহিত গদাযুদ্ধ আরম্ভ করিলেন। গদাযুদ্ধকালে বলরাম তথায় উপস্থিত হইলেন। তৎপরে সরস্বতী দেবীর ও অশেষ তীর্থের পবিত্রত্ব কীর্ত্তন ও তুমুল গদাযুদ্ধ বর্ণন। ভীম অতি প্রচণ্ড গদাঘাতে যুদ্ধে রাজা দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করিলেন। অদ্ভুত নবম পর্ব্ব নির্দিষ্ট হইল। এই পর্বে বহু বৃত্তান্ত সম্বলিত ঊনষষ্টি অধ্যায় সংখ্যাত হইয়াছে। এক্ষণে শ্লোকসংখ্যা কথিত হইতেছে, কৌরবদিগের কীর্তিকীর্ত্তক মুনি নবম পর্বে তিন সহস্র দুই শত বিংশতি শ্লোক রচনা করিয়াছেন।
অতঃপর অতি দারুণ সৌতিকপর্ব্ব বর্ণন করিব। পাণ্ডবেরা রণক্ষেত্র হইতে প্রস্থান করিলে পর, কৃতবর্মা, কৃপাচার্য ও অশ্বত্থামা এই তিন মহারথ সায়ংকালে রুধিরাক্তসৰ্বাঙ্গ ভগ্নোরু অভিমানী রাজা দুর্যোধনের নিকট গমন করিলেন। উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, রাজা রণক্ষেত্রে পতিত আছেন। দৃঢ়ক্রোধ মহারথ অশ্বথামা প্রতিজ্ঞা করিলেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি সমুদায় পাঞ্চাল ও অমাত্য সহিত সমস্ত পাণ্ডবদিগের প্রাণ সংহার না করিয়া গাত্র হইতে তনুত্রাণ উদঘাটন করিব না। রাজাকে এইরূপ কহিয়া তিন মহারথেই তথা হইতে অপব্রুান্ত হইয়া সূর্যাস্ত সময়ে বনমধ্যে প্রবেশ পূর্ব্বক গতি প্রকাণ্ড বটবিটপিতলে উপবিষ্ট হইলেন। অশ্বত্থামা তথায় রাত্রিকালে এক পেচককে অনেক কাকের প্রাণসংহার করিতে দেখিয়া পিতৃবধ স্মরণে কোপাবিষ্ট হইয়া নিদ্রান্বিত পাঞ্চালদিগের প্রাণবধ সংকল্প করিলেন। তদনুসারে শিবিরম্বারে উপস্থিত হইলেন এবং দেখিলেন, এক বিকটাকার অতি প্রকাণ্ড ভয়ানক রাক্ষস আকাশ পর্যন্ত রোধ করিয়া তথায় অবস্থিত আছে। অশ্বত্থামা যত অস্ত্র প্রয়োগ করিলেন, রাক্ষস সমুদায় ব্যর্থ করিল। তখন তিনি সন্বর মহাদেবের আরাধনা করিয়া কৃতবর্মা ও কৃপাচার্যের সহযোগে নিদ্রাগত ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি পাঞ্চাল ও দ্রৌপদীনন্দনদিগের প্রাণবধ করিলেন। কৃষ্ণের বলাশ্রয় প্রভাবে কেবল পঞ্চ পাণ্ডব ও সাত্যকি রক্ষা পাইলেন; অবশিষ্ট সকলেই নিধন প্রাপ্ত হইল। ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি পাণ্ডবদিগকে সংবাদ ‘দিল, অশ্বত্থামা নিদ্রাভিভূত পাঞ্চালদিগের প্রাণবধ করিয়াছে। দ্রৌপদী পুত্রশোকে আর্ত্তা ও পিতৃ ভ্রাতৃ বধ শ্রবণে কাতরা হইয়। অনশন সংকল্প করিয়া ভক্তগণসন্নিধানে উপবিষ্ট হইলেন। মহাপরাক্রান্ত বীর্যবান্ ভীমসেন দ্রৌপদীর মনস্তুষ্টি সম্পাদনার্থে তদীয় বচনানুসারে গদাগ্রহণ পূর্বক কুপিত চিত্তে গুরুপুত্রের পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। অশ্বত্থামা ভীমভয়ে অভিভূত, কোষপরবশ ও দৈবপ্রেরিত হইয়া, পৃথিবী অপাণ্ডব হউক, এই বলিয়া অস্ত্র ত্যাগ করিলেন। কৃষ্ণ, এরূপ করিও না, বলিয়া অশ্বত্থামাকে নিষেধ করিলেন। পাপমতি অশ্বথামার অনিষ্টীচরণে এইরূপ অভিনিবেশ দেখিয় অর্জ্জুন অস্ত্র দ্বারা সেই অস্ত্রের নিবারণ করিলেন। অশ্বথামা দ্বৈপায়ন প্রভৃতি পরস্পর শপ প্রদান করিলেন। পাণ্ডবের। মহারথ দ্রোণপুত্রের নিকট হইতে মণিগ্রহণ করিয়া হৃষ্ট চিত্তে দ্রৌপদীহস্তে সমর্পিলেন। সৌপ্তিকনামক দশম পর্ব উদাহৃত হইল। উত্তমভেজা ব্রহ্মবাদী মহাত্মা মুনি সৌপ্তিকপর্বে ষ্টাদশ অধ্যায় ও অষ্ট শত সপ্ততি শ্লোক সংখ্যা করিয়াছেন। ঐষীকপ এই পর্বের অন্তর্গত।
অতঃপর করুণরসোদ্বোধক স্ত্রীপর্ব্ব আরব্ধ হইতেছে। এই পর্বে পুত্রশোকসন্তপ্ত প্রজ্ঞাচক্ষুঃ রাজা ধৃতরাষ্ট্র মনে মনে ভীমসেনের প্রাণবধ সংকল্প করিয়া কৃষ্ণানীত লৌহময়ী ভীমপ্রতিমূর্তি ভগ্ন করেন। বিদুর অধ্যাত্ববিদ্যাসম্বদ্ধ হেতুবাদ দ্বারা শোকাভিভূত ধীমান্ ধৃতরাষ্ট্রের সাংসারিক মায়া মোহ নিরাকরণ ও তাহাকে আশ্বাস প্রদান করেন। শোকার্ত্ত ধৃতরাষ্ট্র অন্তঃপুরিকাগণের সহিত রণক্ষেত্র দর্শনার্থ গমন করেন। বীরপত্নীদিগের অতি করুণ বিলাপ এবং গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রের কোপাবেশ ও মোহ। ক্ষত্রিয়নারীগণ যুদ্ধে অপরায়ুখ পঞ্চত্বপ্রাপ্ত পিতা ভ্রাতা ও পুদিগকে দেখিতে লাগিলেন। কৃষ্ণ পুত্রপৌত্রশোককাতরা গান্ধারীর কোপ শান্তি করিলেন। পরমধার্ম্মিক মহাপ্রাজ্ঞ রাজা যুধিষ্ঠির যথাশাস্ত্র রাজাদিগের শরীরদাহ করাইলেন। প্রেততপণ আরব্ধ হইলে কুন্তী কর্ণকে স্বীয় গৃঢ়ৎপন্ন পুত্র বলিয়া অঙ্গীকার ও প্রকাশ করিলেন। মহর্ষি ব্যাস এই একাদশ পর্ব্ব রচনা করিয়াছেন। এই পর্ব শ্রবণ ও অধ্যয়ন করিলে সজ্জনদিগকে শোকে অভিভূত ও অশ্রুজলে আকুলিত হইতে হয়। ধীমান্ ব্যাসদেব স্ত্রীপর্ব্ব সপ্তবিংশতি অধ্যায় ও সপ্ত শত পঞ্চ সপ্ততি শ্লোক কীর্ত্তন করিয়াছেন।
অতঃপর শান্তিপর্ব্ব; ইহার অধ্যয়নে বুদ্ধিবৃদ্ধি হয়। ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির পিতৃ ভ্রাতৃ পুত্র মাতুল প্রভৃতির সংহার করাইয়া যৎপরোনাস্তি নিৰ্বেদ প্রাপ্ত হয়েন। শরশয্যারূঢ় ভীষ্মদেব রাজা যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম্ম শ্রবণ করান। ঐ সমুদায় ধর্মজ্ঞানাভিলাষী রাজগণের অবশ্যজ্ঞেয়। ভীষ্মদেব কাল ও কারণ প্রদর্শন পূর্ব্বক আপদ্ধর্ম্ম কীর্ত্তন করেন। ঐ সকল ধর্ম্ম অবগত হইলে নর সর্বজ্ঞ প্রাপ্ত হয়। অনন্তর বিচিত্র মোক্ষধর্ম্মও সবিস্তর ব্যাখ্যাত হইয়াছে। প্রাজ্ঞজনপ্রীতিপ্রদ দ্বাদশ পর্ব নির্দিষ্ট হইল। হে তপোবনগণ! শান্তিপর্বে ত্রিশত উনচত্বারিংশৎ অধ্যায় আছে জানিবেন। ধীমান্ পরাশরনন্দন এই পর্বে চতুর্দশ সহস্র সপ্ত শত সপ্ত শ্লোক রচনা করিয়াছেন।
হে মহর্ষিগণ! ইহার পরেই অতি প্রশস্ত অনুশাসনপর্ব। কুরুরাজ যুধিষ্ঠির ভগীরথীপুত্র ভীষ্মের নিকট ধর্ম্মনির্ণয় শ্রবণ করিয়া হতশোক ও স্থিরচিত্ত হইলেন। এই পর্বে ধর্ম ও অর্থের অনুকূল যাবতীয় ব্যবহার প্রদর্শন, অশেষবিধ দানের পৃথক পৃথক ফল নির্দেশ, সদসৎ পাত্র বিবেক, দানবিধি কথন, আচারবিধি নির্ণয়, সত্যস্বরূপ নিরূপণ, গো ব্রাহ্মণের মাহাত্ম্য কীর্ত্তন, দেশকালানুসারে ধর্ম্মরহস্য মীমাংসা, ও ভীষ্মদেবের স্বর্গারোহণ কীর্ত্তন আছে। ধর্ম্মনির্ণয়যুক্ত বহুবৃত্তান্তালব্ধত অনুশাসন নামক ত্রোয়োদশ পর্ব নির্দ্দির্ষ্ট হইল। এই পর্বে এক শত ষট্চত্বারিংশৎ অধ্যায় ও অষ্ট সহ শ্লোক সংখ্যাতি আছে।
তৎপরে আমেধিক নামক চতুর্দশ পর্ব। সংবর্তমুনি ও মরুরাজার উপাখ্যান, যুধিষ্ঠিরের হিমালয়স্থিত সুবর্ণরাশি প্রাপ্তি ও পরীক্ষিতের জন্ম। পরীক্ষিৎ অশ্বত্থামার অস্ত্রানলে দগ্ধ হইয়াছিলেন; কৃষ্ণ পুনর্বার তাঁহাকে জীবন দান করেন। উৎকৃষ্ট যজ্ঞীয় অশ্ব রক্ষার্থ তদনুগামী অর্জুনের নানা স্থানে কুপিত রাজপুত্রগণের সহিত যুদ্ধ। চিত্রাঙ্গদাগর্ভসস্তৃত নিজপুত্র ববাহনের সহিত সংগ্রামে অর্জুনের প্রাণসংশয় ঘটে। অশ্বমেধষজ্ঞে নকুলবৃত্তান্ত কীর্ত্তন। পরমাদ্ভূত আমেধিকপর্ব উক্ত হইল। তত্ত্বদর্শী মহর্ষি এই পর্বে এক শত তিন অধ্যায় ও তিন সহস্র তিন শত বিংশতি শ্লোক নির্দ্দেশ করিয়াছেন।
তৎপরে আশ্রমবাস নামক পঞ্চদশ পর্ব্ব। রাজা ধৃতরাষ্ট্র রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া বিদুর ও গান্ধারী সমভিব্যাহারে অরণ্য প্রবেশ পূর্বক ঋষিদিগের আশ্রমে বাস করেন। গুরুশুশ্রূষাপরায়ণা কুন্তী তাঁহাকে প্রস্থান করিতে দেখিয়া পুত্ররাজ্য পরিত্যাগ পূর্বক তদনুগামিনী হইলেন। রাজা ধৃতরাষ্ট্র যুদ্ধহত লোকান্তরগত পুত্র পৌত্রগণ ও অন্যান্য পার্থিবদিগকে জীবিত পুনরাগত অবলোকন করিলেন। তিনি মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের প্রসাদাৎ এইরূপ অত্যুৎকৃষ্ণ আশ্চর্য সন্দর্শন করিয়া শোক পরিত্যাগ পূর্বক সস্ত্রীক পরম সিদ্ধি প্রাপ্ত হইলেন। বিদুর ও মহামাত্য বিদ্বান্ জিতেন্দ্রিয় সঞ্জয় ধর্ম্মপথ আশ্রয় করিয়া সদগতি পাইলেন। ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির নারদের সন্দর্শন পাইয়া তাহার প্রমুখাৎ যদুবংশীয়দিগের কুলক্ষয়বার্তা শ্রবণ করিলেন। অত্যদ্ভুত আশ্রমবাসখ্য পর্ব উক্ত হইল। তত্ত্বদর্শী ব্যাস এই পর্বে দ্বিচত্বারিংশৎ অধ্যায় ও এক সহস্র পাঁচ শত ছয় শ্লোক গণনা করিয়াছেন।
হে মহর্ষিগণ! অতঃপর অতি দারুণ মৌষলপব জানিবেন। এই পর্বে ব্রহ্মপনিগৃহীত পুরুষশ্রেষ্ঠ যাদবেরা আপানে সুরাপানে মত্ত ও দৈবপ্রেরিত হইয়া এরকারূপী বজ্র দ্বারা পরস্পর প্রহার করেন। রাম ও কেশব কুলক্ষয় করিয়া পরিশেষে উভয়ে সর্ব্বসংহারকারী উপস্থিত কালাকে অতিক্রম করিলেন না। ‘নরশ্রেষ্ঠ অর্জ্জুন আসিয়া দ্বারকা যাদৰশূন্য নিরীক্ষণ করিয়া যৎপরোনাস্তি বিষাদ ও মনঃপীড়া প্রাপ্ত হইলেন। তিনি আত্মমাতুল নরশ্রেষ্ঠ বসুদেবের সংস্কার করিয়া কৃষ্ণ, বলরাম, ও অন্যান্য প্রধান প্রধান যাদবদিগের ও সংস্কার করিলেন। অনন্তর দ্বারকা হইতে বালক ও বৃদ্ধদিগকে সমভিব্যাহারে লইয়া যাইতে যাইতে বিপৎকালে গাণ্ডীবের পরাক্রমক্ষয় ও দিব্যাস্ত্র সমুদায়ের অস্ফূর্ত্তি অবলোকন করিলেন, এবং যাদবরমণীদিগের অপহরণ এবং প্রভুত্ব ও ঐশ্বর্যের অনিত্যতা দর্শনে সাতিশয় নিবেদ প্রাপ্ত হইয়া ধর্ম্মরাজসন্নিধানে প্রত্যাগমন পূর্বক সন্ন্যাসাবলম্বনের বাসনা করিলেন। মৌষল নামক যোড়শ পর্ব পরিকীর্তিত হইল। তত্ত্বদর্শী দ্বৈপায়ন এই পর্বে আট অধ্যায় ও তিন শতবিংশতি শ্লোক সংখ্যা করিয়াছেন। | তৎপরে মহাপ্রস্থানিক নামক সপ্তদশ পর্ব। এই পর্বে পুরুষশ্রেষ্ঠ পাণ্ডবেরা রাজ্য পরিত্যাগ করিয়া দ্রৌপদী সমতিব্যাহারে মহাপ্রস্থান গমন করেন। তাঁহাৱা লৌহিত্যসাগরতীরে উত্তীর্ণ হইয়া অগ্নির সাক্ষাৎকার লাভ করিলেন। অর্জুন মহাত্মা অগ্নির আদেশানুসারে পূজা পূর্বক তাহাকে সর্বধনুঃশ্রেষ্ঠ দিব্য গাণ্ডীব প্রদান করিলেন। যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃগণ ও দ্রৌপদীকে ক্রমে ক্রমে নিপতিত ও নিধনপ্রাপ্ত দেখিয়া তাঁহাদিগের প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া মায়া পরিত্যাগ পূর্বক প্রস্থান করিলেন। মহাপ্রস্থানিক নামক সপ্তদশ পর্ব নির্দিষ্ট হইল। তত্ত্বদশী ঋষি এই পর্বে তিন অধ্যায় ও তিন শত বিংশতি শ্লোক নিরূপণ করিয়াছেন।
তৎপরে অলৌকিক অত্যাশ্চর্য স্বর্গপর্ব। মহাপ্রাজ্ঞ ধর্ম্ম রাজ দয়াহৃদয়তা প্রযুক্ত স্বসমভিব্যাহারী কুকুরকে পরিত্যাগ করিয়া দেবলোকাগত দিব্য রথে আরোহণ করিতে সম্মত হইলেন না। ধর্ম্ম, মহাত্মা যুধিষ্ঠিরের এইরূপ অবিচলিত ধর্ম্মনিষ্ঠা দর্শনে পরম প্রীত হইয়া, কুকুররূপ পরিত্যাগ পূর্বক তাহাকে দর্শন দিলেন, যুধিষ্ঠির তৎসমভিব্যাহারে সুর্গারোহণ করিলেন। দেবদূত দুলক্রমে তাঁহাকে নরক দর্শন করাইল ধর্ম্মাত্মা যুধিষ্ঠির সেই স্থানে অবস্থিত আজ্ঞানুবর্তী ভ্রাতৃগণের কাতর শব্দ শ্রবণ করিলেন। ধর্ম্ম ও ইন্দ্র ভঁহার ক্ষোভ নিরাকরণ করিলেন। অনন্তর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির আকাশগঙ্গায় অবগাহন করিয়া মানবদেহ পরিত্যাগ পূর্বক স্বর্গে স্বধর্ম্মার্জিত স্থান প্রাপ্ত হইয়া ইন্দ্রাদি দেবগণ সমভিব্যাহারে পরমাদরে ও পরমানন্দে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন, ব্যাসদেবপ্রোক্ত স্বর্গারোহণ নামক অষ্টাদশ পর্ব নির্দিষ্ট হইল। মহাত্মা ঋষি এই পর্ব্বে পাঁচ অধ্যায় ও দুই শত নয় শ্লোক সংখ্যা করিয়াছেন।
এই রূপে অষ্টাদশ পর্ব সবিস্তর উক্ত হইল। তৎপরে হরিবংশ ও ভবিষ্যপর্ব কীর্তিত হইয়াছে। মহর্ষি হরিবংশে দ্বাদশ সহস্র শ্লোক গণনা করিয়াছেন।
মহাভারতীয় পর্ব্বসংগ্রহ কীর্ত্তিত হইল।
যুদ্ধাভিলাষে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী একত্র সমাগত হইয়াছিল। অষ্টাদশ দিবস ঐ মহাদারুণ যুদ্ধ হয়।
যে দ্বিজ অঙ্গ ও উপনিষদ্ সহিত চারি বেদ জানেন, কিন্তু এই আখ্যান গ্রন্থ জানেন না, তিনি কখনই বিচক্ষণ নহেন। অমিতবুদ্ধি ব্যাসদেব এই গ্রন্থকে অর্থশাস্ত্র, ধর্ম্মশাস্ত্র, ও কামশাস্ত্র স্বরূপ নির্দেশ করিয়াছেন। যেমন পুংস্কোকিলের কলরব শ্রবণ করিয়া কর্কশ কাশব্দ শ্রবণে অনুরাগ হয় না, সেইরূপ এই উপাখ্যান শ্রবণ করিয়া শাস্ত্রান্তর শ্রবণে অভিরুচি থাকে না। যেমন পঞ্চভূত হইতে ত্রিবিধ লোকসৃষ্টি নিষ্পন্ন হয়, সেইরূপ এই সর্বোত্তম ইতিহাস গ্রন্থ হইতে কবিগণের বুদ্ধি উৎপন্ন হয়। যেমন চতুর্ব্বিধ প্রজা অন্তরীক্ষের অন্তর্গত, হে দ্বিজগণ সেইরূপ যাবতীয় পুরাণ এই উপাখ্যানের অন্তর্বর্তী। যেমন মনের ক্রিয়া সমস্ত ইন্দ্রিয়ের আশ্রয়, সেইরূপ এই আখ্যান শাস্ত্র অশেষবিধ ক্রিয়া ও গুণের আশ্রয়। যেমন হার ব্যতিরেকে শরীরধারণের অন্য উপায় নাই, সেইরূপ এই উপাখ্যানের অন্তর্গত কথা ব্যতিরিক্ত ভূমণ্ডলে আর কথা নাই। যেমন অভুয়াকাঙক্ষী ভূতেরা সৎকুলজাত প্রভুর সেবা করিয়া থাকে, সেইরূপ, সমস্ত কবিগণ এই উপাখ্যানের উপাসনা করেন। যেমন গৃহস্থাশ্রম অন্যান্য সমস্ত আশ্রম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট, সেইরূপ এই কাব্য অন্যান্য কবিকৃত যাবতীয় কাব্য অপেক্ষ। উৎকৃষ্ট।
তোমাদিগের সর্বদা ধর্ম্মে মতি হউক, পরলোকগত ব্যক্তির ধর্ম্মই একমাত্র বন্ধু। অর্থ ও স্ত্রী সাতিশয় নৈপুণ্য সহকারে উপসিত হইলেও কোন কালে আত্মীয় ও স্থায়ী হয় না।
যে ব্যক্তি দ্বৈপায়নের ওষ্ঠপুটবিগলিত অপ্রমেয় পরম পবিত্র পপির মঙ্গলকর ভারতপাঠ শ্রবণ করে, তাহার পুস্কর জলাভিষেকের প্রয়োজন কি? ব্রাহ্মণ দিবাভাগে ইন্দ্রিয়সেবা দ্বারা যে পাপ সঞ্চয় করেন, মহাভারত কীন করিলে সায়ংকালে সেই পাপ হইতে মুক্ত হয়েন। তার রাত্রিকালে কায়মনোবাক্যে যে পাপানুষ্ঠান করেন, ভারত কীর্তন করিলে প্রাতঃকালে তাহা হইতে মুক্ত হয়েন। যে ব্যক্তি বহুত বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণকে স্বর্ণশৃঙ্গসমন্বিত গোশত দান করে, আর যে ব্যক্তি পরম পবিত্র ভারতকথা নিত্য শ্রবণ করে, সেই দুই জনের তুল। ফল লাভ হয়। যেমন বিস্তীর্ণ সমুদ্র তরণীযোগে অনায়াসগম হয়, সেইরূপ অগ্ন পরসংগ্রহ শ্রবণ করিলে এই অতুংকৃষ্ট মহৎ আখ্যানশাস্ত্র মনুষ্যের পক্ষে সুগম হয়।
হিংসা স্তেয় মিথ্যা প্রতারণা প্রভৃতি।
যে স্থানে উপবিষ্ট হইয়া সুরাপন করে।
এরা তৃণবিশেষ, খড়ী।
(৩৬) শ্লোকনাঞ্চ শতত্রয়ম্। বিংশতিশ্চ তথা শ্লোক সংখ্যাতাসুহৃদর্শিনা। এই স্থলে যথাশ্রুত অর্থ লিখিত হইল। কিন্তু মহাপ্রস্থানপর্বে এক শত এয়োবিংশতি শ্লোকের অধিক নাই। এই নিমিত্ত টীকাকার নীলকণ্ঠ-সমাসবলে শতত্রয় এই শব্দে এক শত তিন এই অর্থ করিয়া বিংশতি সহযোগে এক শত এগোবিংশতি এই ব্যাখ্যা করিয়াছেন।
পর্বসংগ্রহে যেরূপ অধ্যায় ও শ্লোকসংখ্যা লিখিত হইল, প্রতিপর্বেই তাহার নূনাধিক্য দেখিতে পাওয়া যায়। তন্মধ্যে বনপর্ব্বে ও হরিবংশে অত্যস্থ অসঙ্গত। প্রতিজ্ঞাত সংখ্যা অপেক্ষা বনপর্ব্বে প্রায় ছয় সহস্র শ্লোক অধিক, হরিবংশে নানাধিক চারি সহস্র। পণ্ডিতেরা মীমাংসা করেন লিপিকরপ্রমাদবশতঃ এইরূপ সংখ্যাগত ন্যূনাধিক্য ধটিয়াছে।
শিক্ষা, কল্প, নিরু, ব্যাকরণ, জ্যোতিষ, ছন্দঃ, এই ছয়, বেদের উচ্চারণনিয়মবোধক শাস্ত্রের নাম শিক্ষা, যে শাস্ত্রে বৈদিক ক্রিয়ার বিবরণ আছে, ‘তাহাকে কল্প কহে, আর বেদান্ত দুরূহ শব্দের ব্যাখাকারক শাস্ত্রের নাম নিরুক্ত।
জরায়ুজ, অগুন্স, স্বেদজ, উদ্ভিজ্জ।
অধ্যয়ন, দান, যজন প্রভৃতি।
শম, দম, ধৈর্য, ক্ষমা, সত্য প্রভৃতি।
পরম পবিত্র তীর্থ বিশেষ।
দ্বিপঞ্চাশ অধ্যায়
দ্বিপঞ্চাশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তদনন্তর সর্পসত্রবিধানানুসারে ক্রিয়ার হইল। যাজকগণ যথাবিধি স্ব স্ব কর্মে প্রবৃত্ত হইলেন। তাঁহারা কৃষ্ণবর্ণ উত্তরীয় ধারণ করিয়া মন্ত্রোচ্চারণ পূর্বক প্রদীপ্ত হুতাশনে আহুতি প্রদান করিতে লাগিলেন। অনবরত ধুমসম্পর্ক দ্বারা তাঁহাদের ক্ষুঃ রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল। তাঁহারা সপদিগের উল্লেখ করিয়া আহুতি প্রদান আরম্ভ করিলে, তাঁহাদের হৃৎকম্প হইতে লাগিল। তদনন্তর সর্পগণ, নিতান্ত ব্যাকুল ও অস্থির হইয়া নিশ্বাস পরিত্যাগ এবং মস্তক ও লাঙ্গুল দ্বারা পরস্পর বেষ্টন ও আর্তনাদ করিতে করিতে, সেই প্রদীপ্ত কুশনে অনবরত পতিত হইতে লাগিল। শ্বেতবর্ণ, কৃষ্ণবর্ণ, নীলবর্ণ, বৃদ্ধ, শিশু, ক্রোশ প্রমণ, যোজন প্রমাণ, গোকর্ণপ্রমণ, পরিঘপ্রমাণ, অশ্বাকার, করিশুণ্ডাকার, মত্ত মাতঙ্গের ন্যায় মহাকায়, মহাবল, বহুবিধ, শত শত, সহস্র সহস্র, অযুত অযুত, অর্ব্বুদ অর্ব্বুদ, মহাবিষ বিষধরগণ মাতৃশাপদোষে অবশ হইয়া বিনাশ প্রাপ্ত হইল।
দ্বিষষ্টিতম অধ্যায়
দ্বিষষ্টিতম অধ্যায়—ভারতপ্রশংসা।
জনমেজয় কহিলেন, হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ! কৌরবচরিত মহাভারত উপাখ্যান সমুদায় সংক্ষেপে কীর্ত্তন করিলেন; কিন্তু বিস্তারিত শ্রবণ করিবার নিমিত্ত আমার অত্যন্ত কৌতুহল জন্মিয়াছে, অতএব আপনি সেই বিচিত্র কথা বিস্তারিত করিয়া পুনর্ব্বার কীর্ত্তন করুন। আমি পূর্ব্বপুরুষদিগের মহৎ চরিত্র শ্রবণ করিয়া তৃপ্ত হইতেছি না। পাণ্ডবেরা যে ধর্ম্মজ্ঞ হইয়াও অবধ্য জ্ঞাতিবর্গ প্রভৃতির প্রাণবধ করিয়াছিলেন, অথচ সর্ব্বজনপ্রশংসনীয় হইয়াছেন, ইহা অল্প হেতুতে হইতে পারে না। কি নিমিত্ত সেই নিরপরাধ মহাপুরুষেরা, বিপৎপ্রতীকারসমর্থ হইয়াও, দুরাত্মা কৌরবদিগের প্রযোজিত সেই সমস্ত অসহ্য ক্লেশ সহ্য করিয়াছিলেন, কি নিমিত্ত অযুতহস্তিবলধারী বাহুশালী বৃকোদর, আশেষ ক্লেশ ভোগ করিয়াও, ক্রোধ সংবরণ করিয়াছিলেন, দুরাত্মারা দ্রৌপদীকে অশেষ প্রকারে ক্লেশ প্রদান করিয়াছিল, কিন্তু তিনি প্রতীকারসমর্থ হইয়াও কি নিমিত্ত তাঁহাদিগকে ক্রোধনেত্র দ্বারা দগ্ধ করেন নাই; দুরাত্মারা, নরশ্রেষ্ঠ ভীম, অৰ্জ্জুন, নকুল ও সহদেবকে যথেষ্ট ক্লেশ দিয়াছিল, তাঁহারা যুধিষ্ঠিরকে দ্যূত ব্যসনে আসক্ত দেখিয়াও কি নিমিত্ত তাঁহার অনুগত ছিলেন; সর্ব্ববধার্ম্মিকশ্রেষ্ঠ ধর্ম্মবেত্তা ধর্ম্মনন্দন যুধিষ্ঠির এরূপ ক্লেশভাগের যোগ্য নহেন, তিনিই বা কি নিমিত্ত এত ক্লেশ সহ্য করিয়াছিলেন; আর কি রূপেই বা অৰ্জ্জুন একাকী কেবল কৃষ্ণকে সারথি রূপে সহায় পাইয়া অসংখ্য সেনা বিনাশ করিতা পারিয়াছিলেন? হে তপোধন! এই সমস্ত বৃত্তান্ত এবং সেই মহাপুরুষেরা তত্তৎকালে যে সকল কর্ম্ম করিয়াছিলেন, তাহা যথাযথ বর্ণন করুন।
বৈশম্পায়ন কহিলেন, মহারাজ! ক্ষণ কাল বিলম্ব করুন, কৃষ্ণদ্বৈপায়ননকীর্ত্তিত অতি সুবিস্তৃত পবিত্র আখ্যান কীর্ত্তন করিতে হইবে। মহাত্মা মহাতেজাঃ সর্ব্বলোকপূজিত মহর্ষি বেদব্যাসের সমুদায় অভিপ্রায় ক্রমে ক্রমে বর্ণনা করিতেছি। অমিততেজা সত্যবতীতনয় পবিত্র লক্ষ শ্লোক দ্বারা এই বিষয় বিস্তারিত রূপে বর্ণনা করিয়াছেন। যে বিদ্বান ইহা পাঠ করেন ও যাঁহারা শ্রবণ করেন, তাঁহাৱা সকলেই ব্রহ্মলোকে গমন করিয়া দেবতুল্যতা প্রাপ্ত হন। মহর্ষি প্রণীত এই উৎকৃষ্ট পুরাণ বেদতুল্য, পবিত্র, সুশ্রাব্য ও ঋষিগণপূজিত। এই পরম পবিত্র ইতিহাসে অর্থ, কাম ও তত্ত্ব জ্ঞানের যথার্থ লক্ষণ স্পষ্ট রূপে উপদিষ্ট হইয়াছে। বিদ্বান ব্যক্তি দানশীল সত্যবাদী ধার্ম্মিক মহাত্মাদিগকে এই ব্যাসপ্রণীত বেদ শ্রবণ করাইয়া অর্থ লাভ করেন। চন্দ্র যেরূপ রাহু হইতে বিনির্ম্মুক্ত হয়েন, সেইরূপ লোকেরা দুরাত্মা হইলেও এই পুরাণ পাঠে ভ্রূণহত্যাদি মহাপাপ হইতে নিঃসন্দেহ পরিত্রাণ পায়। এই ইতিহাসের নাম জয়, অতএব বিজিগীষুদিগের ইহা শ্রবণ করা কর্ত্তব্য। ইহা শ্রবণ করিলে পৃথিবী জয় ও অরাতি পরাজয় করিতে পারেন। ইহা মহৎ স্বস্ত্যয়ন ও পুংসবন সংস্কার স্বরূপ; যুবরাজ মহিষীর সহিত ইহা বারংবার শ্রবণ করিলে, তাঁহাদিগের অতি বীর্য্যশালী পুত্র ও রাজ্যভাগিনী কন্যা জন্মে। অপরিমিত-বুদ্ধিশালী মহর্ষি বেদব্যাস, ধর্ম্মশাস্ত্র অর্থশাস্ত্র, ও মোক্ষশাস্ত্রস্বরূপ এই ভারত রচনা করিয়াছেন। এই ভারত বর্ত্তমান কালে অনেকে কীর্ত্তন করিতেছে, এবং উত্তর কালে অনেকে শ্রবণ করিবে। পুত্রেরা ভারত শ্রবণ করিলে পিতার আজ্ঞানুবর্ত্তী ও প্রিয়কারী হয়। যে নর ইহা শ্রবণ করে, সে কায়মনোবাক্যে কৃত পাপ হইতে শীঘ্র বিনির্মুক্ত হয়। যে সকল ব্যক্তি অসূয়াশূন্য হইয়া ভারতবংশীয়দিগের মহৎ জন্মবৃত্তান্ত শ্রবণ করে, তাহাদিগের ব্যাধিভয় ও পরলোকভয় থাকে না। মহাত্মা পাণ্ডবদিগের কীর্ত্তি কীর্ত্তন করিবার উদ্দেশে, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন যশস্কর আয়ুষ্কর এবং স্বর্গ ও অর্থ সাধন এই পবিত্র পুরাণ রচনা করিয়াছেন। যিনি শুদ্ধচরিত পবিত্র ব্রাহ্মণদিগকে ইহা শ্রবণ করান, তিনি সনাতন ধর্ম্ম লাভ করেন। যিনি শুচি হইয়া বিখ্যাত কুরুকুলের ও অন্যান্য প্রভূতধনসম্পন্ন অতি তেজস্বী সর্ব্ববিদ্যাবিশারদ বিখ্যাতকীর্ত্তি নরপতিদিগের প্রসিদ্ধ বংশ কীর্ত্তন করেন, তাঁহার বংশের বিপুল বৃদ্ধি হয়, এবং সকলে তাঁহার সম্মান ও পূজা করে। যে ব্রাহ্মণ ব্রতপরায়ণ হইয়া বর্ষা চারি মাস পবিত্র ভারত অধ্যয়ন করেন, তিনি সকল পাপ হইতে মুক্ত হয়েন। যিনি নিত্য ভারত পাঠ করিয়া থাকেন, তাঁহাকে সকল বেদের পারদর্শী বলা যায়। যাহাতে দেবতাদিগের রাজর্ষিদিগের, বিধৃতপাপ পুণ্যশালী ব্রহ্মর্ষিদিগের ভগবান্ দেবেশ কেশবের ও দেবীর কীর্ত্তন আছে, যাহাতে কার্তিকেয়ের জন্মবিবরণ বর্ণিত আছে, যাহাতে গোব্রাহ্মণমাহাত্ম্য কীর্ত্তিত হইয়াছে, সমস্ত বেদস্বরূপ সেই ভারত ধর্ম্মলাভাকাঙ্ক্ষীদিগের শ্রবণ করা কর্ত্তব্য। যে বিদ্বান্ পর্ব্ব দিনে বিপ্রদিগকে ইহা শ্রবণ করান, তিনি নিষ্পাপ হইয়া স্বর্গলোক জয় করিয়া সনাতন ব্রহ্মলোকে গমন করেন। শ্রাদ্ধদিবসে অন্ততঃ ইহার এক পাদ ব্রাহ্মণদিগকে শ্রবণ করাইলে, সেই শ্রাদ্ধ পিতৃলোকদিগের অক্ষয় তৃপ্তি সম্পাদন করে। দিবসে ইন্দ্রিয় ও মনের দ্বারা জ্ঞানতঃ বা অজ্ঞানতঃ মনুষ্য যে সকল পাপ সঞ্চয় করে, মহাভারত শুনিলেই তাহা নষ্ট হইয়া যায়। ভরতবংশীয়দিগের মহৎ জন্মবিবরণ ইহাতে লিখিত হইয়াছে, এই নিমিত্ত ইহার নাম মহাভারত; যিনি মহাভারত শব্দের এই ব্যুৎপত্তি অবগত হয়েন, তিনি সকল পাপ হইতে মুক্ত হয়েন। এই ভারতে ভরতবংশীয়দিগের বিচিত্র চরিত্র কীর্ত্তিত হইয়াছে, ইহা পাঠ করিলে মনুষ্যেরা মহাপাপ ইইতে মুক্ত হয়। লব্ধকাম মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ক্রমাগত তিন বৎসর শুচি ও যত্নশীল হইয়া নিয়ম পূর্ব্বক এই ভারত রচনা করিয়াছেন, অতএব ব্রাক্ষণদিগের নিয়মযুক্ত হইয়া ইহা শ্রবণ করা উচিত। এই ব্যাসপ্রোক্ত পবিত্র ভারতকথা যে সকল ব্রাহ্মণ পাঠ করেন, ও যাঁহারা শ্রবণ করেন, তাঁহারা যথেষ্টাচারী হইলেও নিষিদ্ধ কর্ম্মের অনুষ্ঠান ও বিহিত কর্ম্মের অননুষ্ঠান জন্য দোষে লিপ্ত হয়েন না। ধর্ম্মকামনায় আদ্যন্ত এই ইতিহাস শ্রবণ করিলে কামনা সিদ্ধ হয়। এই পরম পবিত্র সর্ব্বোৎকৃষ্ট ইতিহাস শ্রবণে যাদৃশ সুখ ও সন্তোষ লাভ হয়, মনুষ্য স্বর্গলাভেও তাদৃশ সুখ ও সন্তোষের অধিকারী হইতে পারে না। যে সকল পুণ্যশীল লোক এই অদ্ভুত কথা শ্রবণ করেন, এবং শ্রবণ করান, তাঁহাদিগের রাজসূয় ও অশ্বমেধের ফল লাভ হয়। যেমন সমুদ্র ও সুমেরু রত্ননিধি বলিয়া বিখ্যাত, এই ভারতও সেইরূপ রত্ননিধি। এই মহাভারত বেদতুল্য, পবিত্র, উৎকৃষ্ট, শ্রুতিসুখপ্রদ ও শীলবর্দ্ধন। হে রাজন্! যে ব্যক্তি যাচকদিগকে এই ভারত দান করে, তাহার সসাগরা পৃথিবী দান করা হয়। আমি পুণ্য ও বিজয়ের নিমিত্ত সন্তোষ- দায়িনী এই দিব্য মহাভারতকথা বিস্তারিত রূপে কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। মহর্ষি বেদব্যাস সতত যত্নশীল হইয়া তিন বৎসরে এই অদ্ভুত মহাভারত ইতিহাস রচনা করিয়াছেন। হে ভারতকুলপ্রদীপ! ধর্ম্ম, অর্থ, কাম, ও মোক্ষের বিষয়ে যাহা ইহাতে লিখিত আছে, তাহাই অন্যত্র দেখা যায়, যাহা ইহাতে লিখিত হয় নাই, তাহা আর কুত্রাপি নাই।
সম্পূর্ণ।
নবম অধ্যায়
নবম অধ্যায়— পৌলোমপর্ব্ব।
সৌতি কহিলেন, সেই সমস্ত মহাত্মা ব্রাহ্মণগণ তথায় উপৰিষ্ট রহিলেন, রুরু নিতান্ত দুঃখিত হইয়া গহন বন প্রবেশ পূর্ব্বক উচ্চৈ স্বরে ক্রন্দন করিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি শোকাভিভূত হইয়া কাতর বচনে বহুতর বিলাপ করত প্রমরাকে স্মরণ করিয়া কহিতে লাগিলেন, এক্ষণে আমার পক্ষে ইহা অপেক্ষা আক্ষেপের বিষয় আর কি হইতে পারে যে, আমার ও বান্ধবগণের শোকোদ্দীপনকারিণী সেই কৃশাঙ্গী ভূশয্যায় শয়ন করিয়া আছে; যদি আমি দান, তপস্যা, বা গুরুজনের আরাধনা করিয়া থাকি, তৎফলে আমার প্রিয়া পুনর্জীবিত হউক; আমি জন্মাবধি সংযত হইয়া নানা ব্রতানুষ্ঠান করিয়াছি, এক্ষণে সেই পুণ্যবলে সৰ্বাঙ্গসুন্দরী প্রমদ্বরা অবিলম্বে মৃত্যুশয্যা হইতে গাত্রোঙ্কন করুক।
এই রূপে অরণ্যমধ্যে রুরুকে ভার্য্যার্থে দুঃখিত ও বিলাপপরায়ণ অবলোকন করিয়া, দেবদূত তৎসমীপে আগমন পূর্বক কহিলেন, হে ধর্মাত্মন্ রুরো! তুমি দুঃখিত হইয়া যাহার বাসনা করিতেছ, তাহা অসম্ভব; মনুষ্য মৃত্যু গ্রাসে পতিত হইলে পুনজীবিত হয় না। গন্ধর্বের ঔরসে অঙ্গরীর গর্ভসতা এই কন্যার আয়ুঃশেষ হইয়াছে। অতএব বৎস! বৃথা শোকে অভিভূত হইও না। কিন্তু দেবতারা পূর্বে ইহার এক উপায় স্থির করিয়া রাখিয়াছেন, যদি তাহী কর, পুনর্বার প্রমদ্বাকে পাইতে পার। রুরু কহিলেন, হে দেবদূত! দেবতারা কি উপায় নির্ধারিত করিয়াছেন, যথার্থ বল; আমি শুনিবামাত্র তদনুযায়ী কার্য করিব; বিলম্ব করিও না, ত্বরায় ব্যক্ত করিয়া আমার পরিত্রাণ কর। দেবদূত কহিলেন, হে ভূগুনন্দন! তুমি স্বভার্য্য। প্রমরাকে স্বীয় স্বায়ুর আর্দ ভাগ প্রদান কর, তাহা হইলেই সে পুনরায় জীবন প্রাপ্ত হইবেক। রুরু কহিলেন, আমি প্রমরাকে আয়ুর অন্ধ্র প্রদান করিতেছি, সে পুনর্জীবিত হউক। তখন গন্ধর্বরাজ ও দেবদূত উভয় ধর্ম্মরাজের নিকটে গিয়া নিবেদন করিলেন, হে ধর্ম্মরাজ! যদি আপনি অনুমতি করেন, তবে রুরুভার্য্যা প্রমদ্বরা তদীয় অৰ্দ্ধ আয়ু প্রাপ্ত হইয়া পুনজীবিত হয়। ধর্ম্মরাজ কহিলেন, হে দেবদূত! যদি তোমার ইচ্ছা হয়, প্রমদর। রুরুর অৰ্দ্ধ আয়ু পাইয়া পুনর্জীবিত হউক। দেব রাজ এইরূপ কহিবামাত্র বরবর্ণিণী প্রমদ্বরা রুরুর অর্থ আয়ু লাভ করিয়া সুপ্তোখির ন্যায় মৃত্যুশয্যা হইতে গাত্রেন্থিনি করিল।
ভবিষ্য বৃত্তান্তে দৃষ্ট হইয়াছে যে, ভার্য্যার্থে মহাতেজস্বী রুরুর এই রূপে অৰ্দ্ধ আয়ু লুপ্ত হইয়াছিল।
এই রূপে রুরুর অর্দ্ধ আয়ু লাভ দ্বারা প্রমদ্বয়ার পুনর্বার জীবনপ্রাপ্তি হইলে, তাহাদের পিতারা পরম প্রীতিপ্রাপ্ত হইয়া শুভ দিবসে উভয়ের উদ্বাহবিধি সমাধান করিলেন, তাঁহারাও পরস্পর হিতৈষী হইয়া পরম সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন। রুরু এবারে দুর্লভ। ভার্য্য লাভ করিয়া সর্পকুলধ্বংসার্থে প্রতিজ্ঞা করিলেন। সর্পদর্শনমাত্র কোপপরতন্ত্র হইয়। শস্ত্র প্রহার দ্বারা তাহার প্রাণসংহার করেন। এই রূপে সৰ্পৰধপ্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়া এক দিবস মহান প্রবেশ পূর্বক অবলোকন করিলেন, এক অতি বৃদ্ধ জীর্ণকায় ভুত শয়ন করিয়া আছে। তিনি কালদণ্ডসম দণ্ড উদ্ধৃত করিয়া তাহাকে আঘাত করিতে উদ্যত হইবামাত্র ডুণ্ডুভ কহিল, হে তপোধন! আমি তোমার কোন অপরাধ করি নাই; তুমি কেন অকাপ্রণে রেষাবেশপরবশ হইয়া আমার প্রাণবধের উদ্যম করিতেছ?
পঞ্চচত্বারিংশ অধ্যায়
পঞ্চচত্বারিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, এই সময়েই অতি তেজস্বী মুহাতপস্বী মহর্ষি জরৎকারু কঠোর ব্রতে দীক্ষিত হইয়া নানা পবিত্র তীর্থে স্নান করিয়া ভূমণ্ডলে ভ্রমণ করিতেছিলেন। এই রূপে বায়ুভক্ষ, নিরাহার, দিন দিন ক্ষীণকলেবর, ও, যত্রসায়ংগৃহ হইয়া ভ্রমণ করিতে করিতে, একদা তিনি তাছি দীনভাবাপন্ন, অনাহারী, শুদ্ধশরীর, উর্দ্ধপদ, অধঃশিরাঃ, গর্তে লম্বমান স্বীয় পিতৃগণকে অবলোকন করিলেন। তাহাদিগকে পরিত্রাণেচ্ছু বোধ করিয়া নিতান্ত কাতর হইয়া জিজ্ঞাসিলেন, আপনারা কে বলুন, আমি দেখিতেছি, আপনার একমাত্র উশীরস্তম্ব অবলম্বন করিয়া অধোমুখে গর্তে লম্বমান আছেন, গর্ত্তস্থিত মূষিক উশীরস্তম্বের মূল প্রায় সমস্ত ভক্ষণ করিয়াছে, একমাত্র তনু অবশিষ্ট আছে, তাহাও অবিলম্বেই নিঃশেষ হইবে, অনন্তুর আপনারাও এই গর্তে পতিত হইবেন। অপিনাদিগকে এপ্রকার ঘোর বিপদাপন্ন দেখিয়া আমার শোক উদ্ভূত হইতেছে; অতএব অজ্ঞ করুন, আপনাদিগের কি সাহায্য করি, আমার সঞ্চিত তপস্যার চতুর্থ ভাগ, তৃতীয় ভাগ, অর্দ্ধ ভাগ বা সমগ্র দ্বারা আপনারা নিষ্কৃতি লাভ করুন।
পিতৃপুরুষের কহিলেন, হে বৃদ্ধ ব্রহ্মচারি! তুমি আাপন তপস্যার ফল দিয়া আমাদিগের পরিত্রাণ ইচ্ছা করিতেছ, কিন্তু তপস্যাবলে আমাদিগের উদ্ধার লাভ হইতে পারে না, আমাদিগের ও তপস্যার ফল আছে। আমরা কেবল বংশলোপের উপক্রম হওয়াতেই অপবিত্র নরকে পতিত হইতেছি। আমরা এই মহাগর্ত্তে লম্বমান হইয়া হতজ্ঞান হইয়াছি; এজন্য তোমার। পৌরুষ সর্বত্র বিখ্যাত, তথাপি তোমাকে চিনতে পারিতেছি না। হে মহাভাগ! তুমি আমাদিগকে শোকাবিষ্ট ও সাতিশয় দুঃখিত দেখিয়া অনুকম্পা প্রকাশ করিতেছ; অতএব তুমি আমাদিগের পরিচয় বধ কর। আমরা যাযাবর নামে ঋষি, বংশনাশের উপক্রম হওয়াতেই পুণ্যলোক হইতে প্রচুত হইয়া অধোগতি প্রাপ্ত হইতেছি, আমাদিগের প্রগাঢ় তপস্যার ফল বিলুপ্ত হইয়াছে, আমাদের আর কোনও উপায় নাই। আমরা অতি হতভাগ্য, আমাদিগের একমাত্র সন্তান আছে, কিন্তু সেই হতভাগ্যের থাকা না থাকা তুল্য হইয়াছে। তাহার নাম জরৎকারু। জরৎকারু বেদবেদাঙ্গপারগ, নিয়তাত্মা ও ব্রতপরায়ণ, সে সর্ব্ব ধর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া একমাত্র তপস্যাধর্ম্ম অবলম্বন করিয়াছে, তাহার তপস্যালোভদোষেই আমাদের দুর্দ্দশা ঘটিয়াছে। তাহার ভার্য্যা নাই, পুত্র নাই, বান্ধবও নাই, তাহাতেই আমরা অনাথের ন্যায়, হতজ্ঞান হইয়া এই মহাগর্তে লমান আছি। হে দ্বিজবর! আমরা যে উশীরস্ত অবলম্বন করিয়া আছি, উহা আমাদিগের কুলস্তম্ব; আর যে স্তমুল দেখিতেছ, তাহা আমাদিগের কাল গ্রস্ত সন্তানপরম্পরা, এবং যে অৰ্দ্ধাৰশিষ্ট মুল দেখিতেছ ও যাহাতে আমরা লম্বিত আছি, ওই তপস্যারত মুঢ়মতি অচেতন জরৎকারু; আর যে মূষিক দেখিতেছ, ইনি মহাবল পরাক্রান্ত কাল, ইনিই অল্পে অল্পে তাঁহাকে সংহার করিতেছেন। জরৎকারুর কঠোর তপস্যায় আমাদিগের উদ্ধার সাধন হইবে না। আমরা হতভাগ্য, আমাদিগের মূল প্রায় শেষ হইয়াছে; এই দেখ, আমরা পাপাত্মার স্যায় অধঃপতিত হইতেছি; আমরা সবান্ধবে এই গর্তে পতিত হইলে জরৎকারু কালপ্রেরিত হইয়া নিরগামী হইবেক। তপস্যা যজ্ঞ প্রভৃতি যে সমস্ত উৎকৃষ্ট ফলপ্রদ পরম পবিত্র কর্ম্ম আছে, সে সকল সন্তানের সমান উপকারক নহে। তুমি আমাদের দুরবস্থা দর্শনে দুঃখিত হইয়া অনুকম্পা প্রদর্শন করিতেছ, এ নিমিত্ত তোমাকে এই অনুরোধ করিতেছি যে, তুমি আমাদিগকে যেপ্রকার দেখিলে তাহার সহিত দেখা করিয়া সমস্ত অবিকল বর্ণন করিবে, এবং এই অনুরোধ করিবে যে, তুমি দারপরিগ্রহে ও পুত্রোৎপাদনে যত্নবান হও। সে যাহা হউক, তুমি আমাদিগের পরম বন্ধুর ন্যায় অনুকম্পা করিতেছ, অতএব, তুমি কে আমরা শুনিতে বাসনা করি।
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! ভুজঙ্গজননী কদ্রু স্বীয় সন্তানদিগকে, এবং বিনতাতনয় অরুণ আপন জননীকে, যে কারণে শাপ দেন, আর মহাত্মা কশ্যপ কদ্রু ও বিনতাকে যে বর প্রদান করেন, এবং বিনতাগর্ভস্যুত বিহগযুগলের নাম, তুমি ক্রমে ক্রমে এই সমস্ত বর্ণন করিলে। কিন্তু এ পর্যন্ত সর্পগণের নাম কীর্ত্তন কর নাই। এক্ষণে আমরা প্রধান প্রধান সর্পের নাম শ্রবণে বাসনা করি।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে তপোধন। সর্পগণ অসংখ্য, অতএব তাহাদের সকলের নাম কীর্ত্তন করিব না। প্রধান প্রধানের নামোল্লেখ করিতেছি, শ্রবণ করুন।
শেষ নাগ সর্ব প্রথমে জন্মেন, তদনন্তর বাসুকি, তৎপরে ঐরাবত, তক্ষক, কর্কটক, ধনঞ্জয়, কালিয়, মণিনাগ, আপূরণ, পিঞ্জরক, এশাপত্র, বামন, নীল, অনীল, কমাষ, শৰল, অর্যক, উগ্রক, কলশপোতক, শুয়ামুখ, দধিমুখ, বিমলপিণ্ডক, অপ্ত, করোটক, শঙ্খ, বালিশিখ, নিষ্টানক, হেমগুহ, নহুষ, পিঙ্গল, বাহকর্ণ, হস্তিপদ, মুগরপিণ্ডক, কম্বল, অশ্বতর, কালীয়ক, বৃত্ত, সংবর্ত্তক, পদ্ম, পদ্ম, শঙ্খমুখ, কুষ্মক, মেক, পিণ্ডারক, করবীর, পুষ্পদংষ্ট্র, বিক, বিপাণ্ডুর, মুষকাদ, শঙ্খশিরাঃ, পূর্ণভদ্র, হরিদ্র, পরাজিত, জ্যোতিক, বহ, কৌরব্য, ধৃতরাষ্ট্র, শঙ্খপিণ্ড, বিরজা, সুবাহু, শালিপিণ্ড, হস্তিপিণ্ড, পিঠরক, সুমুখ, কৌণপাসন, কুঠর, কুঞ্জর, প্রভাকর, কুমুদ, কুমুদাক্ষ, তিত্তিরি, হলিক, কর্দ্দম, বহুমুলক, কর্কর, অকৰ্কর, কুণ্ডোদর ও মহোদর। হে দ্বিজোত্তম! প্রধান প্রধান নাগের নাম শুনাইলাম; বাহুল্য। ভয়ে অপরাপরের নাম কীর্ত্তন করিলাম না। ইহাদের সন্তান ও সন্তানের সন্তান অসংখ্য; এই নিমিত্ত তাহাদের কথা বলিলাম না। বহু সহস্র, বহু প্রযুত, বহু অর্ব্বুদ সর্প আছে, তাহাদের সংখ্যা করা অসাধ্য।
পঞ্চদশ অধ্যায়
পঞ্চদশ অধ্যায়—আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ব্রহ্মজ্ঞশ্রেষ্ঠ শৌনক! পূর্ব্বকালে সর্পেরা স্বীয় জননীর নিকট হইতে এই শাপ প্রাপ্ত হইয়াছিল যে, জনমেজয়ের যজ্ঞে অগ্নি তোমাদিগকে দগ্ধ করিবেক। সর্পকুল-চুড়ামণি বাসুকি সেই শাপ শান্তি করিবার আশয়ে ব্রতপরায়ণ মহাত্মা জরৎকারু ঋষিকে ভগিনী দান করেন। তিনিও তাঁহাকে বিধিপূর্ব্বক ধর্ম্মপত্নী স্বরূপ পরিগ্রহ করেন। তাঁহার গর্ভে আস্তীক নামে মহানুভব তনয় উৎপন্ন হইলেন। ঐ তনয় তপস্বী মহাত্মা বেদবেদাঙ্গপারগ ও সর্ব্বভূতসমদর্শী ছিলেন, এবং পিতৃ মাতৃ উভয় কুলের দাহভয় নিবারণ করেন। বহু কালের পর, পাণ্ডুকুলোদ্ভব রাজা জনমেজয় সর্পসত্র নামে প্রসিদ্ধ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। সেই সর্পকুলসংহারকারী যজ্ঞ আরব্ধ হইলে পর, তপঃপ্রভাবসম্পন্ন আস্তীক ভ্রাতৃগণ, মাতুলগণ, ও অন্যান্য সর্পগণের নিস্তার করিয়াছিলেন।
জরৎকারু পুত্রোৎপাদন ও তপস্যা দ্বারা পিতৃলোকের উদ্ধারসাধন, বিবিধব্রতানুষ্ঠান ও বেদাধ্যয়ন দ্বারা ঋষিগণের পরিতোষ সম্পাদন, ও নানা যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা দেবগণের তৃপ্তি সমাধান করিলেন। এই রূপে তিনি ব্রহ্মচর্য্য, পুত্রোৎপাদন, ও যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা ঋষিঋণ, পিতৃঋণ, ও দেবঋণরূপ গুরুভার হইতে মুক্ত হইয়া স্বীয় পূর্বপুরুষদিগের সহিত স্বর্গারোহণ করেন। হে ভৃগুকুলশ্রেষ্ঠ! আমি যথাক্রমে আস্তীকোপাখ্যান কীর্ত্তন করিলাম, এক্ষণে আর কি বর্ণন করিব, আজ্ঞা করুন।
পঞ্চপঞ্চাশ অধ্যায়
পঞ্চপঞ্চাশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
আস্তীক কহিলেন, পূর্ব্ব কালে প্রয়াগে সোম, বরুণ ও প্রজাপতি যেরূপ যজ্ঞ করিয়াছিলেন, হে ভরতকুল প্রদীপ জনমেজয়! তোমার এই যজ্ঞ সেইরূপ, প্রার্থনা করি, আমাদিগের হিতৈষিগণের মঙ্গল হউক। দেবরাজ ইন্দ্র যেরূপ শত ও অযুত সংখ্যক যজ্ঞ করিয়াছিলেন, হে ভরতকুল প্রদীপ জনমেজয়! তোমার এই যজ্ঞ সেইরূপ, প্রার্থনা করি, আমাদিগের হিতৈষিগণের মঙ্গল হউক। গয়, শশবিন্দু, বৈশ্রবণ, এই তিন সুবিখ্যাত নৃপতি যেরূপ যজ্ঞ করিয়াছিলেন, হে ভরতকুল প্রদীপ জনমেজয়! তোমার এই যজ্ঞ সেইরূপ, প্রার্থনা করি, আমাদিগের হিতৈষিগণের মঙ্গল হউক। নৃগ, তাজমীঢ় ও দশরথ,নয় রাজা রামচন্দ্র যেরূপ যজ্ঞ করিয়াছিলেন, হে ভরতকুল প্রদীপ জনমেজয়! তোমার এই যজ্ঞ সেইরূপ, প্রার্থনা করি, অমাদিগের হিতৈষিগণের মঙ্গল হউক। রাজা দিবদেবসূনু, যুধিষ্ঠির ও অজমীঢ়ের যেরূপ যজ্ঞ বিখ্যাত আছে, হে ভরতকুল প্রদীপ জনমেজয়! তোমার এই যজ্ঞ সেইরূপ, প্রার্থনা করি, আমাদিগের হিতৈষিগণের মঙ্গল হউক। সত্যবতীতনয় কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের যজ্ঞ যেরূপ, এবং সেই ভগবান্ স্বয়ং যে যজ্ঞের সমুদায় কর্ম্ম করিয়াছেন, হে ভরতকুল প্রদীপ জনমেজয়। তোমার এই যজ্ঞ সেইরূপ, প্রার্থনা করি, আমাদিগের হিতৈষিগণের মঙ্গল হউক। তোমার এই দেবরাজকৃত যজ্ঞ তুলা যজ্ঞে সুর্য সম তেজস্বী ঋদ্বিগণ অধিষ্ঠান করিতেছে। ইহাদের জ্ঞানের ইয়ত্তা করা যায় না। ইহাদিগকে দান করিলে অনন্ত পুণ্য সঞ্চয় হয়। আমার এই স্থির সিদ্ধান্ত আছে, ত্রিভুবনে দ্বৈপায়নের তুল্য ঋত্বিক্ নাই। ইহার শিষেরা সমস্ত ভূমণ্ডল ব্যাপিয়াছেন। তাঁহাদের তুল্য সর্ব্বকর্ম্মদক্ষ ঋত্বি আর নাই। ভগবান অগ্নি দেবতাগণের তৃপ্তি নিমিত্ত প্রদীপ্ত ও দক্ষিণাবর্ত্যশিখাবিশিষ্ট হইয়া তোমার এই যজ্ঞে হব্য গ্রহণ করিতেছেন। জগতে তোমার তুল্য প্রজাপালনপরায়ণ নৃপতি দ্বিতীয় নাই। তোমার ধৈর্যগুণ দর্শনে আমি সদা প্রীত আছি। তুমি, বরুণ ও ধর্ম্মরাজের তুল্য। বজ্রপাণি দেবরাজ ইন্দ্র যেমন প্রজাদিগের রক্ষাকর্তা, হে পুরুষশ্রেষ্ঠ। আমাদিগের মতে তুমি প্রজাদিগের সেইরূপ রক্ষাকর্তা। কোনও কালে কোনও রাজা তোমার তুল্য যজ্ঞ করিতে পারেন নাই। হে সুব্রত? তুমি রাজা খট্টাঙ্গ, নাভাগ ও দিলীপের তুল্য, তোমার প্রভাব যযাতি ও মান্ধাতার সদৃশ, তোমার তেজঃ সূর্যের সমান, তুমি ভীষ্মদেবের ন্যায় বিরাজমান হইতেছ। তোমার বীর্য বাল্মীকি মুনির বীর্যের ন্যায় অপ্রকাশিত, তোমার কোপ মহর্ষি বশিষ্ঠের কোপের ন্যায় বশীকৃত, তোমার প্রভুত্ব ইন্দ্রত্বতুল্য, তোমার প্রভাব নারায়ণের প্রভাবসদৃশ শোভা পাইতেছে। তুমি যমের ন্যায় ধর্ম্মনির্ণয় করিতে জান, কৃষ্ণের ন্যায় সর্ব্বগুণসম্পন্ন, তুমি সকল সম্পত্তির নিবাস স্বরূপ এবং সকল যজ্ঞের একাধার স্বরূপ। তুমি দম্ভপুত্র বলনামক অসুরের তুল্য পরাক্রমী, রামের তুল্য শাস্ত্রবেত্তা ও শত্নবেত্তা, ঔর্ব্ব ও ত্রিতের তুল্য তেজস্বী, ভগীরথের তুল্য দুস্পেক্ষণীয়।
এইরূপ স্তব শ্রবণ করিয়া রাজা, সদস্যবর্গ, ঋত্বিকগণ ও অগ্নি, সকলেই প্রসন্ন হইলেন। অনন্তর রাজা জনমেজয় তাহাদের অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়া কহিতে আরম্ভ করিলেন।
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
পঞ্চবিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, তৎপরে মহাবল মহাবীর্য্য কামগামী বিহগরাজ অর্ণবের অপরপারবর্তিনী স্বীয় জননীর সন্নিধানে উপস্থিত হইলেন। তথায় গরুড়মাতা বিনতা পণে পরাজিতা ও দুঃখদাবানলে দগ্ধ হইয়া দাসীভাবে কালহরণ করিতেছিলেন। একদা তিনি পুত্রসমীপে উপবিষ্টা আছেন, এমন সময়ে সর্পকুলজননী ক বিতাকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, শুন বিনতে। সমুদ্রমধ্যে পরম রমণীয় অতি সুশোভন এক দ্বীপ আছে; ঐ দ্বীপ সর্পগণের আবাসভূমি; আমাকে তথায় লইয়া চল। নিত। শ্রবণমাত্র ককে, পৃষ্ঠে লইয়া চলিলেন, গরুড়ও স্বীয় জননীর আদেশানুসারে সপদিগকে পৃষ্ঠে বহন করিয়া তদনুগামী হইলেন। বিনতাহৃদয়নন্দন বিহগরাজ সূর্য্যাভিমুখে গমন করাতে, ভুজগগণ অতিপ্রদীপ্ত প্রভাকর প্রভাজালে তাপিত ও মূর্হিত হইতে লাগিল।
কদ্রু স্বীয় তনয়দিগের তাদৃশী দুরবস্থা দেখিয়া বৃষ্টি প্রার্থনায় দেবরাজ ইন্দ্রের স্তব আরম্ভ করিলেন, হে সর্বদেবনায়ক! হে বলবিনাশন হে নমুচিনিপাতন! হে শচীপতে! সহস্রাক্ষ! তোমাকে প্রণাম করি; তুমি বারিবর্ষণ দ্বারা সূর্য্যকিৱণতাপিত সর্পগণের প্রাণদান কর। হে অমরোত্তম! তুমিই আমাদিগের একমাত্র পরিত্রাণের উপায়; কারণ, তুমি অপর্যাপ্ত বারিবর্ষণে সমর্থ। হে পুরন্দর! তুমি মেঘ, তুমি বায়ু, তুমি অগ্নি, তুমিই নভোমণ্ডলে বিদ্যুৎ স্বরূপে বিরাজমান হও, তুমিই মেঘগণ ক্ষেপণ করিয়া থাক, এবং তোমাকেই মহামেঘ কহে, তুমি অতি বিষম ঘোের বজ্র স্বরূপ, তুমি ভীষণগর্জ্জনকারী মেঘ, তুমি সকল লোকের সৃষ্টিকর্ত্তা ও সংহারকারী, তুমি সর্ব ভূতের জ্যোতিঃস্বরূপ, তুমি আদিত্য, তুমি বিভাবসু, তুমি পরমাশ্চর্য্য মহৎ ভূত, তুমি রাজা, তুমি নিখিল দেবের অধীশ্বর, তুমি বিষ্ণু, তুমি সহস্রাক্ষ, তুমি দেব, তুমি পরম গতি, তুমি অমৃত, তুমি পরম পূজিত সোমদেবতা, তুমি তিথি, তুমি লব, তুমি ক্ষণ, তুমি শুক্ল পক্ষ, তুমি কৃষ্ণ পক্ষ, তুমি কলা, কাষ্ঠা, ত্রুটি, সংবৎসর, ঋতু, মাস, রজনী ও দিবস, তুমি সমস্ত পর্বত ও সমস্ত বন সহিত পৃথিবী, ভাস্করসহিত তিমিররহিত নভোমণ্ডল, এবং উত্তালতরঙ্গবহুল মীনমরতিমিতিমিঙ্গিলসঙ্কুল জলধি, তুমি অতি যশস্বী, এই নিমিত্ত নির্ম্মলমনীষা সম্পন্ন মহর্ষিগণ হর্ষোৎফুল্ল চিত্তে নিয়ত তোমার অৰ্চ্চনা করিয়া থাকেন, তুমি স্তুত হইয়া যজমানের হিতার্থে যজ্ঞীয় হবিঃ ও সোমরস পান করিয়া থাক। হে অতুলবল! ব্রাহ্মণের পারলৌকিক মঙ্গলফলাভিলাষে সতত তোমার অর্চনা করেন, নিখিল বেদাঙ্গ তোমার মহিমা কীর্ত্তন করে, যাগপরায়ণ দ্বিজেন্দ্রগণ তোমারি সাক্ষাৎকারলভার্থে সর্ব্ব প্রযত্নে সমস্ত বেদাঙ্গের অনুগম করেন।
ইচ্ছানুসারে শীঘ্ন ও সর্ব্বত্র গমনক্ষম।
বনামক অসুরের বিনাশকারী।
নমুচিনামক অসুরের নিপাতকারী।
কালের অংশ বিশেষ।
বুদ্ধি।
শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দঃ, ও জ্যোতিষ।
পরস্পর অবিরোধসম্পাদন, মীমাংসা।
পঞ্চম অধ্যায়
পঞ্চম অধ্যায়—পৌলোমপর্ব্ব
শৌনক কহিলেন, হে সূতপুত্র! তোমার পিতা, মর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন সমীপে, সমস্ত পুরাণ ও আদ্যোপান্ত ভারত অধ্যয়ন করিয়াছিলেন, তুমিও সেই সমস্ত অধ্যয়ন করিয়াছ, সন্দেহ নাই। পুরাণে সমুদায় অলৌকিক কথা ও সমস্ত আদিবংশের বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে; তন্মধ্যে প্রথমতঃ আমি ভূগুবংশের বৃত্তান্ত শুনিতে বাসনা করি। তুমি সেই কথা কীর্ত্তন কর, আমরা অবহিত চিত্তে শ্রবণ করিব।
এই রূপে আদিষ্ট হইয়া তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া সূতপুত্র উগ্রশ্রবাঃ নিবেদন করিলেন, বৈশম্পায়ন প্রভৃতি মহানুভাব দ্বিজশ্রেষ্ঠগণ পুর্ব কালে সম্যক রূপে যাহা অধ্যয়ন ও কীর্ত্তন করিয়াছিলেন, আমার পিতা যাহা অধ্যয়ন করেন, এবং পরে আমি তাঁহার নিকট যাহা অধ্যয়ন করিয়াছি, সেই সমস্ত কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
ভৃগুবংশ ইন্দ্রাদি সমস্ত দেবগণের ও অশেষ ঋষিকুলের পূজনীয়; পুরাণে সেই বিখ্যাত বংশের যেরূপ বর্ণনা আছে, তাহা আমি যথাৎ কীর্ত্তন করিতেছি। সর্বলোকপিতামহ ব্রহ্ম। বরুণের যজ্ঞ করিতেছিলেম; আমরা শুনিয়াছি, ভগবান্ ভৃগু সেই যজ্ঞীয় অগ্নি হইতে উৎপন্ন হন। ভৃগুর পুত্র চ্যবন, চ্যবনের পুজ পরমধাৰ্মিক প্রমতি; ঘৃতাচীর গর্ভে প্রমতির রুক নামে এক পুত্র জন্মেম। প্রমদ্বরাগর্ভে রুরুর শুনকনামা পুত্র জন্মিলেন। তিনিই তোমার স্কুলের প্রধান পুরুষ। তিনি ধার্ম্মিক, বেদপারগ, তপস্বী, যশস্বী, শাস্ত্রজ্ঞ, ব্রহ্মজ্ঞ, সত্যবাদী, ও জিতেন্দ্রিয় ছিলেন।
শৌনক কহিলেন, হে সূতপুত্র। মহাত্মা ভৃগুনন্দন চ্যবন নামে বিখ্যাত হইলেন কেন, তুমি তাহার সবিশেষ বর্ণন কর।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভগবান্ ভৃগুর পুলোম নামে ভুবনবিখ্যাতা প্রেয়সী ধর্মপত্নী ছিলেন। তাঁহার সহযোগে পুলোমা গর্ভবতী হইলেন। এক দিবস, পরমধাম্মিক ভৃগু স্নানার্থ নিষ্ক্রান্ত হইলে, পুলোমা নামে এক রাক্ষস তদীয় আশ্রমে উপস্থিত হইল। সে আশ্রমপ্রবেশানন্তর পরমসুন্দরী ভৃগুপত্নীকে নয়নগোচর করিয়া কামাস্টি ও বিচেতন হইল। চাকদর্শনা পুলোমা তপোবনসুলভ ফল মূলাদি দ্বারা সেই অভ্যাগত রাক্ষসের যথোচিত অতিথিসৎকার করিলেন। রাক্ষস মন্মথশর প্রহারে। নিতান্ত কাতর হইয়া, এই কামিনীকে হরণ করিব, এই নিশ্চয় করিয়া অত্যন্ত হৃষ্টচিত্ত হইল। পুলোমা অগ্রে ঐ চারুহাসিনী কন্যাকে, মমেয়ং ভার্য্যা, বলিয়া বরণ করিয়াছিল, পশ্চাৎ তাঁহার পিতা তাঁহাকে শাস্ত্রবিধানানুসারে ভৃগুকে প্রদান করেন। এই অবমাননা অনুক্ষণ তাহার হৃদয়ে জাগরূক ছিল। এক্ষণে সে অবসর পাইয়া হরণ করিবার মানস করিল।
রাক্ষস এই রূপে পুলোমাহরণে কৃতসঙ্কল্প হইয়া অগ্নিগৃহে প্রবেশ করিল, এবং প্রজ্জ্বলিত হুতাশনসন্নিধানে দণ্ডায়মান হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, হে পাবক! তুমি দেবতাদিগের মুখ, তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, যথার্থ বল, এই কামিনী কাহার ভার্য্যা? আমি এই বরবর্ণিনীকে অগ্রে পত্নীত্বে বরণ করিয়াছিলাম, পরে ইহার পিতা অধর্ম্মকারী ভৃগুকে দান করেন। অতএব এই নির্জনবাসিনী নিতস্বিনী যদি ভৃগুর ভার্য্যা হয় বল, ইহাকে আমি আশ্রম হইতে হরণ করিবার মানস করিয়াছি। ভৃগু যে, আমার পূর্ধবৃত। রূপবতী ভার্য্যাকে গ্রহণ করিয়াছে, সেই ক্রোধানল অদ্যপি আমার হৃদয় দাহ করিতেছে।
দুরাত্মা রাক্ষস জলিত অগ্নিকে এইরূপ আমন্ত্রণ করিয়া, ভৃগুভার্যা বিষয়ে সন্দিহান হইয়া, বারংবার জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল, হৈ হুতাশন! তুমি সর্ব কাল সর্ব ভূতের অন্তরে পুণ্যপাপের সাক্ষিস্বরূপ অবস্থিত আছ; অতএব জিজ্ঞাসা করিতেছি, যথার্থ বল, পাপকারী ভৃগু আমার যে পূর্ববৃতা কন্যাকে অপহরণ করিয়াছিল, এই সেই কামিনী তামার ভার্য্যা কি না? তোমার নিকট ইহার তত্ত্বার্থ শ্রবণ করিয়া তোমার সমক্ষেই ভূগুভার্য্যাকে অশ্রম হইতে হরণ করিব।
রাক্ষসের এইরূপ জিজ্ঞাসা শুনিয়া, অগ্নি তাতান্ত দুঃখিত হইলেন, এবং এক পক্ষে মিথ্য! কখন, পক্ষান্তরে ভৃগুশাপ, উভয় ভয়ে ভীত হইয়া অনুদ্ধত স্বরে কহিলেন, হে দানরনন্দন! তুমি পূর্বে ইহাকে বরণ করিয়াছিলে, যথার্থ বটে, কিন্তু তৎকালে তোমার মন্ত্র প্রয়োগ ও বিধি পূর্বক বরণ করা হয় নাই। ইহার পিতা সৎপাত্র লোভক্রান্ত হইয়া ভৃগুকে দান করিয়াছেন, তোমাকে দেন নাই। মহর্ষি ভৃগুও বেদদৃষ্ট বিধি ও পরম্পরাগত প্রণালী: অনুসারে আমাকে সাক্ষী করিয়া ইহার পাণিগ্রহণ করিয়াছেন। তথাপি তুমি পূর্বে বরণ করিয়াছিলে, এই নিমিত্ত ইনি তোমারই ভার্য্যা। আমি মিথ্যা কহিতে পারি না, লোকে কোন কালে মিথ্যার আদর নাই।
পঞ্চাশ অধ্যায়
পঞ্চাশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
মন্ত্রিগণ কহিলেন, হে রাজেন্দ্র! রাজা পরীক্ষিৎ এই রূপে মুনির দেশে মৃত সর্প নিক্ষেপ করিয়া নিজরাজধানী প্রস্থান করিলেন। সেই ঋষির গোগর্ভে সমুৎপন্ন মহাতেজাঃ মহাবীর্য্য অতি কোপনস্বভাব শৃঙ্গী নামে এক মহাযশস্বী পুত্র ছিলেন। এই মুনিকুমার সর্ববলোকপিতামহ ব্রহ্মার উপাসনার্থে ব্রহ্মালোকে গমন করিয়াছিলেন। উপাসনান্তে ব্রহ্মার অনুমতি লইয়া পৃথিবীতে প্রত্যাগমন পূর্বক স্বীয় সখার মুখে পিতার অবমাননাবৃত্তান্ত শ্রবণ করিলেন। তাহার সখা কহিলেন, বয়স্য? তোমার পিতা মৌনপরায়ণ হইয়া সমাধি করিতেছিলেন, রাজা পরীক্ষিৎ আসিয়া তাঁহার স্কন্ধে মৃত সর্প ক্ষেপণ করিয়া গিয়াছেন। মহারাজ! মহাতেজাঃ শৃঙ্গী বয়সে বালক হইয়াও তপস্থা ও জ্ঞানে বৃদ্ধ হইয়াছিলেন; এক্ষণে শ্রবণমাত্র কোপানলে প্রজ্বলিত হইয়া, উদক স্পর্শ পূর্বক, স্বীয় সখাকে সম্বোধন করিয়া, তোমার পিতাকে এই শাপ দিলেন, বয়স্য! আমার তপস্যার বল দেখ, যে দুরাত্মা বিনা অপরাধে আমার পিতার স্কন্ধে মৃত সর্প ক্ষেপণ করিয়াছে, তীক্ষ্ণবিষ তীক্ষ্ণবীর্য নাগরাজ তক্ষক আমার বাক্যানুসারে সপ্তম দিবসে তাহার প্রাণসংহার করিবেক। ইহা কহিয়া শৃঙ্গী পিতার সমাধিস্থানে উপস্থিত হইলেন, এবং পিতাকে তদবস্থ দেখিয়া শাপপ্রদান বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। তখন সেই সাধু সদাশয় মুনিশ্রেষ্ঠ, সুশীল গুণবান্ গৌরমুখমক শিষ্যকে, ইহা কহিবার নিমিত্ত, আপনার পিতার নিকট পাঠাইয়া দিলেন যে, আমার পুত্র তোমাকে শাপ দিয়াছে, তুমি সাবধান হও, তক্ষক তোমাকে স্বীয় তেজঃ দ্বারা দগ্ধ করিবেক। গৌরমুখ আপনার পিতার নিকট আসিয়া বিশ্রামান্তে আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করিলেন। আপনার পিতা এই ভয়ঙ্কর বাক্য শ্রবণ করিয়া তক্ষকের ভয়ে অত্যন্ত সাবধান ও সতর্ক হইয়া রহিলেন।
সপ্তম দিবস উপস্থিত হইলে, ব্রহ্মর্ষি কাশ্যপ সত্বর গমনে আপনকার পিতার নিকট আসিতেছিলেন। তক্ষক তাহাকে দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, হে মহর্ষে। তুমি কোথায় ও কি প্রয়োজনসাধনার্থ এত সত্বর গমন করিতেছ? তিনি কহিলেন, অদ্য তক্ষক রাজা পরীক্ষিৎকে ভস্মাবশেষ করিবেক, আমি তাহার প্রতিকারার্থে যাইতেছি, আমি সমীপে থাকিলে, তক্ষক রাজার প্রাণ বিনাশ করিতে পারিবে না।” তক্ষক কহিল, হে ঋষে! আমি সেই তক্ষক, আমি তাহাকে দংশন করিব। তুমি কি নিমিত্ত তাহাকে বাঁচাইতে বৃথা চেষটা পাইবে? আমি দংশন করিলে তুমি কোনও ক্রমেই রাজাকে বাঁচাইতে পারবে না, তুমি আমার অদ্ভুত বীর্য দেখ। এই বলিয়া তক্ষক এক বৃক্ষকে দংশন করিল। বৃক্ষ তৎক্ষণাৎ ভস্মীভূত হইল। কাশ্যপও তৎক্ষণাৎ সেই বৃক্ষকে পুনর্জীবিত করিলেন। তখন তক্ষক, তুমি কি অভিলাষে যাইতেছ বল, এই বলিয়া তাঁহাকে লোভপ্রদর্শন করিল। কাশ্যপ কহিলেন, আমি ধনলাভপ্রত্যাশায় যাইতেছি। তক্ষক কহিল, তুমি রাজার নিকট যত ধনের প্রত্যাশা কর, আমি তদপেক্ষা অধিক দিতেছি, লইয়া নিবৃত্ত হও। কাশ্যপ তক্ষকের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া অভিলানুরূপ অর্থ গ্রহণ পূর্ব্বক স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। এই রূপে সেই ব্রাহ্মণ নিবৃত্ত হইলে, তক্ষক ছদ্ম বেশে আপনকার পিতার নিকট আসিয়া স্বীয় দুর্বিষহ বিষছুি দ্বারা তাঁহাকে ভস্মসাৎ করিল। তদনন্তর আপনি রাজ্যে অভিষিক্ত হইয়াছেন। মহারাজ! এই ভয়ঙ্কর ব্যাপার আমরা যেরূপ দেখিয়াছিলাম ও শুনিয়াছিলাম, অবিকল বর্ণন করিলাম, এক্ষণে নিজ পিতার ও মহর্ষি উতঙ্কের পরাভব বিবেচনা করিয়া যাহা কর্ত্তব্য হয়, করুন।
রাজা জনমেজয়, পিতৃপরাভববৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অমাত্যদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তক্ষক যে বৃক্ষকে ভস্মসাৎ করিয়াছিল, এবং কাশ্যপ যে সেই ভস্মীভূত বৃক্ষকে পুনর্জীবিত করিয়াছিলেন, এই অদ্ভুত বৃত্তান্ত তোমরা কাহার নিকট শুনিয়াছিলে? বোধ করি, সর্পকুলাধম তক্ষক এই বিবেচনা করিয়াছিল, কাশ্যপ মন্ত্রবলে রাজার প্রাণরক্ষা করিবেক, সন্দেহ। নাই। আমি দংশন করিলে যদি এ ব্রাহ্মণ রাজাকে বাঁচায়, তাহা হইলে আমাকে লোকে উপহাস্পদ হইতে হইবে। এই ভাবিয়াই সে ব্রাহ্মণকে তুষ্ট করিয়া বিদায় করিয়াছিল।সে যাহা হউক, আমি এক্ষণে তাহাকে সমুচিত প্রতিফল দিব। কিন্তু একটি কথা জিজ্ঞাসা করি, তক্ষক ও কাশ্যপের বৃত্তান্ত নির্জন বনে ঘটিয়াছিল, তাহা কে বা দেখিল, কে বা শুনিল, তোমরাই বা কি রূপে অবগত হইলে বল, সবিশেষ শুনিয়া সর্পকুলনিপাতের উপায় বিধান করিব। মন্ত্রিগণ কহিলেন, মহারাজ! তক্ষক ও কাশ্যপের বৃত্তান্ত যে রূপে যে ব্যক্তি আমাদিগকে কহিয়াছিল, তাহা শ্রবণ করুন। কোনও ব্যক্তি কাষ্ঠ অহরণ নিমিত্ত পূর্ব্বেই সেই বৃক্ষে আরোহণ করিয়াছিল। তক্ষক ও কাশ্যপ উভয়েই তাহা জানিতে পারেন নাই। ঐ ব্যক্তি সেই বৃক্ষের সহিতই ভস্মীভূত হয়, ও সেই বৃক্ষের সহিতই পুনর্জীবিত হয়। সেই আসিয়া আমাদিগকে এই অদ্ভুত বিষয়ের সংবাদ দেয়। মহারাজ! যথাদৃষ্ট যপাত সমুদায় নিবেদন করিলাম, এক্ষণে সাহা বিহিত হয়, করুন।
এইরূপ মন্ত্রিবাক্য শ্রবণে কাজ। জনমেজয়, রোষরসে কলুষিত হইয়া, করে করে পরিপেষণ এবং মুহুর্মুহুঃ দীর্ঘ নিশ্বাস ও অশ্রুধাৱা পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন। পরে অশ্রু নিবারণ ও যথাবিধি উদক স্পর্শ করিয়া তামর্ষভারে কিয়ৎ ক্ষণ মৌনভাবে চিন্তা করিলেন, অনন্তর মনে মনে, কর্ত্তব্য নির্ধারণ করিয়া মন্ত্রিগণকে কহিলেন, আমি তোমাদিগের নিকট পিতার পরলোক প্রাপ্তি বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া যে কর্ত্তব্য স্থির করিয়াছি, তাহা শ্রবণ কর। আমার মত এই, যে দুরাত্মা তক্ষক শৃঙ্গীকে হেতুমাত্র করিয়া পিতার প্রাণহিংসা করিয়াছে, তাহাকে সমুচিত প্রতিফল দেওয়া কর্তব্য। যদি কাশ্যপ অসিতেন, পিতা অবশ্যই জীবন পাইতেন; কিন্তু তক্ষকের এমনই দুরাত্মতা যে, তাহাকে অর্থ দিয়া নিবৃত্ত করিল। যদিই পিতা কাশ্যপের প্রসাদে ও মন্ত্রিগণের মন্ত্রণাবলে জীবন পাইতেন, তাহাতে তাহার কি হানি হইত? কিন্তু কাশ্যপ আসিয়া পাছে রাজাকে জীবন দেন, এই আশঙ্কায় সেই দুরাত্মা অর্থদান দ্বারা বশীভূত করিয়া তাহাকে নিবৃত্ত করিয়াছে। এ অত্যন্ত অসহ্য অত্যাচার। অতএব আমি, আমার নিজের, উতঙ্কের ও তোমাদের সকলের মনোরথ সম্পাদনের নিমিত্ত পিতার বৈরনির্যাতন করিব।
প্রথম অধ্যায়
মহাভারত
আদিপর্ব্ব।
প্রথম অধ্যায়—অনুক্রমণিকা।
নারায়ণ, সর্ব্বনরোত্তম নর, এবং সরস্বতী দেবীকে প্রণাম করিয়া জয় উচ্চারণ করিবেক।
কুলপতি শৌনক নৈমিষারণ্যে দ্বাদশ বার্ষিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। ঐ সময়ে এক দিবস ব্রতপরায়ণ মহর্ষিগণ দৈনন্দিন কর্ম্মাবসানে একত্র সমাগত হইয়া কথাপ্রসঙ্গে
কালযাপন করিতেছেন, এমন সময়ে সূতকুলপ্রসূত লোমহর্ষণতনয় পৌরাণিক উগ্রশ্রবাঃ বিনীত ভাবে তাঁহাদের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। নৈমিষারণ্যবাসী তপস্বিগণ, দর্শনমাত্র অদ্ভুত কথা শ্রবণবাসনাপরবশ হইয়া, তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া চতুর্দ্দিকে দণ্ডায়মান হইলেন। উগ্রশ্রবাঃ বিনয়ন ও কৃতাঞ্জলি হইয়া অভিবাদন পূর্ব্বক সেই সমস্ত মুনিদিগকে তপস্যার কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহারাও যথোচিত অতিথিসৎকারান্তে বসিতে আসন প্রদান করিলেন। পরে সমুদয় ঋষিগণ স্ব স্ব আসনে উপবিষ্ট হইলে তিনিও নির্দ্দিষ্ট আসনে উপবিষ্ট হইলেন। অনন্তর, তাঁহার শ্রান্তি দূর হইলে, কোন ঋষি কথা প্রসঙ্গ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, হে পদ্মপলাশলোচন সূতনন্দন। তুমি এক্ষণে কোথা হইতে আসিতেছ, এবং এত কাল কোথায় কোথায় ভ্রমণ করিলে বল।
এই রূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া বাগ্মী উগ্রশ্রবাঃ সেই সভাস্থ প্রশান্তচিত্ত মুনিগণকে সম্ভাষণ করিয়া যথানিয়মে পরিশুদ্ধ বচনে এই উত্তর দিলেন, হে মহর্ষিগণ! প্রথমতঃ মহানুভাব রাজাধিরাজ
জনমেজয়ের সর্পস দর্শনে গমন করিয়াছিলাম। তথায় বৈশম্পায়নমুখে কৃষ্ণদ্বৈপায়নোক্ত মহাভারতীয় পরমপবিত্র বিবিধ অদ্ভুত কথা শ্রবণ করিলাম। অনন্তর, তথা হইতে প্রস্থান করিয়া, নানা তীর্থ পরিভ্রমণ ও অশেষ আশ্রম দর্শন পূর্ব্বক, বহুব্রাহ্মণসমাকীর্ণ সমন্ত পঞ্চক তীর্থে উপস্থিত হইলাম। ঐ সমন্ত পঞ্চকে পূর্ব্বে পাণ্ডব ও কৌরব এবং উভয়পক্ষীয় নরপতি গণের যুদ্ধ হইয়াছিল। তথা হইতে, মহাশয়দিগের দর্শনাকাঙ্ক্ষী হইয়া, এই পরমপবিত্র আশ্রমে উপনীত হইয়াছি। আপনারা আমাদিগের ব্রহ্মস্বরূপ। হে তেজঃপুঞ্জ মহভাগ ঋষিগণ! আপনারা স্নান অহিক অগ্নিহোত্রাদি দ্বারা পূত হইয়া সুস্থ মনে আসনে উপবিষ্ট হইয়াছেন, আজ্ঞা করুন, ধর্ম্মার্থসম্বদ্ধ পরমপবিত্র পৌরাণিকী কথা, অথবা মহানুভাব নরপতিগণ ও ঋষিগণের ইতিহাস, কি বর্ণনা করিব?
ঋষিগণ কহিলেন, হে সূতনন্দন! ভগবান্ ব্যাসদেব যে ইতিহাস কীর্ত্তন করিয়াছেন, সুরগণ ও ব্রহ্মর্ষিমণ্ডল যাহা শ্রবণ করিয়া প্রীত মনে বহু প্রশংসা করেন, এবং দ্বৈপায়নশিষ মহর্ষি বৈশম্পায়ন তদীয় আদেশানুসারে সর্পসত্রসময়ে রাজা জনামেজয়কে যাহা শ্রবণ করাইয়াছিলেন, আমরা সেই ভারতখ্য পরমপবিত্র বিচিত্র ইতিহাস শ্রবণে বাসনা করি। ভারত বেদচতুষ্টয়ের সার সমাকর্ষণ পূর্বক সঙ্কলিত এবং শাস্ত্রাস্তারের সহিত অবিরুদ্ধ; ভারতে অনির্বচনীয় অতর্কীয় আত্মতাদি বিষয়ের সবিশেষ মীমাংসা আছে; ভাৱত পাঠ ও শ্রবণ করিলে পাপভয় নিবারণ হয়।
ঋষিগণের প্রার্থনা শুনিয়া উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, যিনি নিখিল জগতের আদিভূত, যিনি অখণ্ড ব্রহ্মাণ্ডমণ্ডলের অদ্বিতীয় অধীশ্বর, যিনি স্বীয় অনন্তশক্তিপ্রভাবে স্কুল, সূক্ষম, স্থাবর, জঙ্গম, নিখিল পদার্থ সৃষ্টি করিয়াছেন, যাজ্ঞিক পুরুষেরা যে অনাদি পুরুষের প্রীতি উদ্দেশে হুতাশনমুখে আহুতি প্রদান করেন, শত শত সামগ ব্রাহ্মণ যাহার গুণ গান করিয়া থাকেন, এই প্রত্যক্ষ পরিদৃশ্যমান মায়া প্রপঞ্চরূপ অতাত্ত্বিক বিশ্ব যাঁহার বিরাটমূর্ত্তি, লোকে ভোগাভিলাষে ও পরম পুরুষার্থ মুক্তি পদার্থ প্রার্থনায় যাহার উপাসনা করিয়া থাকে, সেই অনাদি, অনন্ত, অব্যক্ত, কালয়ে অবিকৃত, সকল মঙ্গল নিদানভূত, মঙ্গলমূর্তি, ত্রিলোকপাতা, যজ্ঞফলদাতা, চরাচরগুরু হরির চরণারবিন্দ বন্দনা করিয়া সৰ্বলোকপূজিত মহর্ষি বেদব্যাসের অশেষ মত নিঃশেষে কীর্ত্তন করিব।
অনেকানেক অতীতদশী মহাশয়ের নরলোকে এই বিচিত্র ইতিহাস কীর্ত্তন করিয়া গিয়াছেন, বর্তমান কালে অনেকে কীর্ত্তন করিতেছেন, এবং উত্তর কালেও অনেকে কীর্ত্তন করিবেন। দ্বিজাতিরা দৃঢ়ত হইয়া সংক্ষেপে ও বাহুল্যে যাহা অধ্যয়ন করিয়া থাকেন, সেই সর্ব্বজ্ঞানের অদ্বিতীয় আকর বেদশাস্ত্র এই পরম পবিত্র ইতিহাস রূপে আবির্ভূত। এই বিচিত্র গ্রন্থ অশেষবিধ শাস্ত্রীয় ও লৌকিক সময়ে বহুতর মনোহর শব্দে ও নানা ছন্দে অলঙ্কত, এই নিমিত্ত পণ্ডিতমণ্ডলীতে সবিশেষ আদরণীয় হইয়াছে।
প্রথমে এই জগৎ ঘোতর অন্ধকারে আবৃত হইয়া একান্ত অলক্ষিত ছিল। অনন্তর সৃষ্টিপ্রারম্ভে সকলব্রহ্মাণ্ডবীজভূত এক অলৌকিক অণ্ড প্রসূত হইল। নিরাকার, নির্বিকার, অচিন্তনীয়, অনির্বচনীয়, সৰ্বত্রসম, সনাতন, জ্যোতির্ময় ব্রহ্ম সেই অণ্ডে প্রবিষ্ট হইলেন। সর্বলোকপিতামহ দেবগুরু ব্রহ্মা তাহাতে জন্ম গ্রহণ করিলেন।
তদনন্তর রুদ্র, স্বায়ম্ভুব মনু, প্রাচেতস, দক্ষ, দক্ষের সপ্ত পু, ও একবিংশতি প্রজাপতি উৎপন্ন হইলেন। সঁহাকে সমস্ত ঋষিগণ যোগদৃষ্টিতে দর্শন করেন, সেই অপ্রমেয় পুরুষ, বিশ্বদেবগণ, একাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, যমজ, অশ্বিনীকুমারযুগল, যক্ষগণ, সাধ্যগণ, পিশাচগণ, গুহ্যগণ, ও পিতৃগণ জন্মিলেন। তদনন্তর ব্রহ্মপরায়ণ ব্রহ্মর্ষিগণ ও সর্বগুণসম্পন্ন অনেকানেক রাজর্ষিগণ উৎপন্ন হইলেন। আর জল, বায়ু, পৃথিবী, আকাশ, চন্দ্র, সূর্য্য, সংবৎসর, ঋতু, মাস, পক্ষ, দিন, রাত্রি, ও বিশ্বান্তগত অন্যান্য যাবতীয় পদার্থ সৃষ্ট হইল।
এই প্রত্যক্ষ স্থাবরজঙ্গমাত্মক জগৎ প্রলয়কালে পুনর্বার স্বাধিষ্ঠানভূত পরব্রহ্মে লীন হইয়া যায়। যেমন পর্যায়কাল উপস্থিত হইলে ঋতুগণ স্ব স্ব অসাধারণ লক্ষণ সকল প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ যুগপ্রান্তে সমুদায় পদার্থ স্ব স্ব নাম, রূপ, ও স্বভাব প্রাপ্ত হইয়া থাকে। অনাদি, অনন্ত, সর্ব্বভূতসংহারকারী সংসারচক্র এই রূপে পরিভ্রমণ করিতেছে।
ত্রয়স্ত্রিংশৎ সহস্র, ত্রয়স্ত্রিংশৎ শত, ত্রয়স্ত্রিংশৎ দেবতা সংক্ষেপে সৃষ্ট হইলেন। আর বৃহদ্ভানু, চক্ষু, আত্মা, বিভাবসু, সবিতা, ঋচীক, অর্ক, ভানু, আশাবহ, রবি, ও মহ্য, দিবের এই একাদশ পুত্র জন্মিলেন। সর্ব্ববকনিষ্ঠ মহ্যের পুত্র দেবভ্রাজ, তৎপুত্র সুভ্রাজ। সুভ্রাজের দশজ্যোতিঃ, শতজ্যোতিঃ, সহস্রজ্যোতিঃ নামে তিন পুত্র হইলেন। দশজ্যোতির দশ সহস্র পুত্র, শতজ্যোতির লক্ষ পুত্র, ও সহস্র জ্যোতির দশ লক্ষ পুত্র হইল। ইহাদিগের হইতেই কুরুবংশ, যদুবংশ, ভরতবংশ, যযাতিবংশ, ইক্ষাকুবংশ, ও অন্যান্য রাজর্ষি বংশের উদ্ভব হইল।
মহর্ষি বেদব্যাস যোগবলে প্রাণীদিগের অবস্থিতি স্থান, ত্রিবিধ রহস্য, বেদ, যোগশাস্ত্র, বিজ্ঞানশাস্ত্র, ধর্ম, অর্থ, কাম, ও তৎপ্রতিপাদক বিবিধ শাস্ত্র, লোকযাত্রাবিপ্নান, এতৎ সমুদায় অবগত ছিলেন। এই ভারত গ্রন্থে ব্যাখ্যা সহিত সমস্ত ইতিহাস ও অশেযবিধ বেদার্থ যথাক্রমে কথিত হইয়াছে। লোকে কেহ কেহ সংক্ষেপে কেহ কেহ বা বাহুল্যে জানিতে বাসনা করে, এই নিমিত্ত মহর্ষি এই জ্ঞানশস্ত্রকে সংক্ষেপে ও বাহুল্যে কহিয়াছেন। কোনও কোনও ব্রাহ্মণেরা প্রথম মন্ত্র অবধি, কেহ কেহ আস্তীকপ অবধি, কেহ কেহ বা উপরিচর রাজার উপাখ্যান অবধি, এই ভারতের আরও বিবেচনা করিয়া অধ্যয়ন করেন। মনীষিগণ অশেষ প্রকারে এই পবিত্র সংহিতার ভাবার্থ প্রকাশ করিয়া থাকেন। কেহ কেহ হ্রন্থব্যাখ্যা বিষয়ে পটু, কেহ কেহ বা গ্রন্থার্থধারণা বিষয়ে নিপুণ।
ভগবান্ সত্যবতীনন্দন, তপস্যা ও ব্রহ্মচর্য প্রভাবে সনাতন বেদশাস্ত্র বিভাগ করিয়া, তদীয় সরসঙ্কলন পূর্বক মনে মনে এই পরমাদ্ভূত পবিত্র ইতিহাস রচনা করিয়াছিলেন। রচনানন্তর মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, কি রূপে এই গ্রন্থ শিষ্যগণকে অধ্যয়ন করাইব। ভূতভাবন ভগবান্ হিরণ্যগর্ব্ভ, পরাশরতনয়ের উৎকণ্ঠার বিষয় অবগত হইয়া, তাঁহাকে ও নরলোককে চরিতার্থ করিবার অভিপ্রায়ে স্বয়ং তৎসমীপে উপস্থিত হইলেন। ব্যাসদেব দর্শনমাত্র গাত্রোত্থান করিয়া কৃতার্থম্মন্য ও বিস্ময়াবিষ্ট চিত্তে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলেন, এবং স্বহস্তদত্ত আসনে উপবেশন করাইয়া অঞ্জলিবন্ধ পূর্ব্বক সম্মুখে দণ্ডায়মান রহিলেন। অনন্তর ব্রহ্মা তাঁহাকে অসিনপরিগ্রহের অনুমতি প্রদান করিলে তিনি প্রীতি প্রফুল্ল নয়নে তদীয় আসনসন্নিধানে উপবিষ্ট হইয়া বিনয়বচনে নিবেদন করিলেন, ভগবন্! আমি মনে মনে এক পরম পবিত্র কাব্য রচনা করিয়াছি, তাহাতে বেদ বেদাঙ্গ ও উপনিষদ্ সমুদায়ের ব্যাখ্যা, ইতিহাস ও পুরাণের অর্থ সমর্থন, ভূত ভবিষ্যৎ বর্ত্তমান কালত্রয়ের নির্ণয়, জরা মৃত্যু ভয় ব্যাধি ভাব অভাব নিরূপণ, নানাবিধ ধর্ম্ম ও আশ্রমের লক্ষণ নির্দ্দেশ, চাতুর্ব্বণ্য মীমাংসা, পৃথিবী চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ নক্ষত্র ও চতুর্যুগের বিবরণ, নারায়ণ যে যে কারণে যে যে দিব্য ও মানব যোনিতে জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন তাহার কীর্ত্তন, এবং অশেষ পবিত্র তীর্থ, নানা দেশ, নদ, নদী, বন, পর্ব্বত, সাগর, গ্রাম, নগর, দুর্গ, সেনা, ব্যুহরচনা, যুদ্ধকৌশল, বক্ত্তৃবিশেষে কথনবৈচিত্র্য, লোকযাত্রা-বিধান, এই সমস্ত ও অপরাপর যাবতীয় বিষয়ের সবিশেষ নিরূপণ করিয়াছি, কিন্তু ভূতলে তদুপযুক্ত লেখক দেখিতেছি না।
ব্রহ্মা কহিলেন, বৎস! এই ভূমণ্ডলে অনেকানেক মহা-প্রভাব ঋষি আছেন, কিন্তু রহস্যজ্ঞানশালিতা প্রযুক্ত তুমি সর্ব্বোৎকৃষ্ট। জন্মাবধি তুমি কখনও বিতথ বাক্য উচ্চারণ কর নাই; এক্ষণে তুমি স্বরচিত গ্রন্থকে কাব্য বলিয়া নির্দ্দেশ করিলে, অতএব তোমার এই গ্রন্থ কাব্য বলিয়া বিখ্যাত হইবেক। যেমন গৃহস্থাশ্রম অন্যান্য সমস্ত আশ্রম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট, সেইরূপ তোমার এই কাব্য অন্যান্য যাবতীয় কবির কাব্য অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। এক্ষণে তুমি গণেশকে স্মরণ কর, তিনি তোমার কাব্যের লেখক হইবেন।
ইহা বলিয়া ব্রহ্মা স্বস্থানে প্রস্থান করিলে সত্যবতীতনয় গণপতিকে স্মরণ করিলেন। ভক্তবৎসল ভগবান্ গণনায়ক স্মৃতমাত্র ব্যাসদেবসন্নিধানে উপস্থিত হইলেন। অনন্তর তিনি যথোপযুক্ত পূজা প্রাপ্তি পূর্ব্বক আসন পরিগ্রহ করিলে বেদব্যাস নিবেদন করিলেন, হে গণেশ্বর! আমি মনে মনে ভারত নামে এক গ্রন্থ রচনা করিয়াছি, আমি বলিয়া যাই, আপনি লিখিয়া যান। ইহা শুনিয়া বিঘ্নরাজ কহিলেন, হে তপোধন! লিখিতে আরম্ভ করিলে যদি আমার লেখনীকে বিশ্রাম করিতে না হয়, তবে আমি লেখক হইতে পারি। ব্যাসও কহিলেন, কিন্তু আপনিও অর্থগ্রহ না করিয়া লিখিতে পারিবেন না। গণনায়ক তথাস্তু বলিয়া লেখক অঙ্গীকার করিলেন। মহর্ষি দ্বৈপায়ন এই নিমিত্তই কৌতুক করিয়া মধ্যে মধ্যে দুরূহ গ্রন্থগ্রন্থি রচনা করিয়াছেন, এবং প্রতিজ্ঞা করিয়া কহিয়াছেন, এই গ্রন্থে এরূপ অষ্ট সহস্র অষ্ট শত শ্লোক আছে যে, কেবল শুক ও আমি তাহার অর্থ বুঝিতে পারি; অপরের কথা দূরে থাকুক, সঞ্জয় বুঝিতে পারেন কি না সন্দেহ। অস্ফুটার্থতা প্রযুক্ত সেই সকল ব্যাসকূটের অদ্যাপি কেহ ব্যাখ্যা করিতে পারেন না। গণেশ সর্বজ্ঞ হইয়াও সেই সকল স্থলে অর্থবোধানুরোধে মন্থর হইতেন, ব্যাসদেব সেই অবকাশে বহুতর শ্লোক রচনা করিতেন।
জীবলোক অজ্ঞানতিমিরে অভিভূত হইয়া ইতস্ততঃ অনর্থ ভ্রমণ করিতেছিল, এই মহাভারত জ্ঞানাঞ্জনশলাকা দ্বারা মোহাবরণ নিরাকরণ করিয়া তাহাদের নেত্রোন্মীলন করিয়াছেন। এই ভারতরূপ দিবাকর সংক্ষেপে ও বাহুল্যে ধর্ম্ম অর্থ কাম মোক্ষ রূপ বিষয় সকল প্রকাশ ও মানবগণের মোহান্ধকার নিরাস করিয়াছেন। পুরাণরূপ পূর্ণচন্দ্রের উদয় দ্বারা বেদার্থরূপ জ্যোৎস্না প্রকাশিত হইয়াছে, এবং মনুষ্যের বুদ্ধিরূপা কুমুদ্বতী বিকাশ পাইয়াছে। এই ইতিহাসরূপ মহোজ্জ্বল প্রদীপ মোহান্ধকার নিরাকরণ পূর্ব্বক সংসাররূপ মহাগৃহ আলোকময় করিয়াছে। যেমন জলধর সকল জীবের উপজীব্য, সেইরূপ এই অক্ষয় ভারতবৃক্ষ ভবিষ্য কবিদিগের উপজীব্য হইবেক। সংগ্রহাধ্যায় এই মহাদ্রুমের বীজ, পৌলোম ও আস্তীকপর্ব্ব মূল, সম্ভবপর্ব্ব স্কন্ধ, সভা ও বনপর্ব্ব বিটঙ্ক, অরণ্যপর্ব্ব পর্ব্ব, বিরাট ও উদ্যোগপর্ব্ব সার, ভীষ্মপর্ব্ব মহাশাখা, দ্রোণপর্ব্ব পত্র, কর্ণপর্ব্ব পুষ্প, শল্যপর্ব্ব সৌরভ, স্ত্রীপর্ব্ব ও ঐষীকপর্ব্ব ছায়া, শান্তিপর্ব্ব মহাফল, অশ্বমেধপর্ব্ব অমৃতরস, আশ্রমবাসিকপর্ব্ব অধারস্থান, আর মৌসলপর্ব্ব অত্যুচ্চ শাখান্তভাগ। এই নিরুক্ত ভারতদ্রুমের পরমপবিত্র সুরস ফল পুষ্প বর্ণনা করিব।
পূর্ব্ব কালে ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, স্বীয় জননী সত্যবতী ও পরমধার্ম্মিক ধীরবুদ্ধি ভীষ্মদেবের নিয়োগানুসারে, বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রে অগ্নিত্রয়তুল্য তেজস্বী পুত্রত্রয় উৎপাদন করিয়াছিলেন। মহর্ষি ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, ও বিদুরকে জন্ম দিয়া তপস্যানুরোধে পুনর্ব্বার আশ্রমপ্রবেশ করিলেন। অনন্তর তাঁহারা বৃদ্ধ হইয়া পরম গতি প্রাপ্ত হইলে তিনি নরলোকে ভারত প্রচার করিলেন। পরে সর্পসত্রকালে স্বয়ং রাজা জনমেজয় ও সহস্র সহস্র ব্রাহ্মণ ভারতশ্রবণার্থে ঔৎসুক্য ও আগ্রহাতিশয় প্রকাশ করাতে, সশিষ্য বৈশম্পায়নকে ভারত কীর্ত্তনের আদেশ প্রদান করিলেন। বৈশম্পায়ন সদস্যমণ্ডলমধ্যবর্ত্তী হইয়া দৈনন্দিন কর্ম্মাবসানে ভারত শ্রবণ করাইতে আরম্ভ করিলেন।
মহর্সি বেদব্যাস ভারতে কুরুবংশের বৃত্তান্ত, গান্ধারীর ধর্ম্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবদিগের সাধুতা, ধার্ত্তরাষ্ট্রদিগের দুর্ব্বৃত্ততা, এই সকল বিষয় বর্ণন করিয়াছেন। প্রথমতঃ তিনি ভারতসংহিতাকে চতুর্বিংশতিসহস্ৰশ্লোকময়ী রচনা করিয়াছিলেন। উপাখ্যানভাগ পরিত্যাগ করিলে ভারতের সংখ্যা ঐরূপ হয়। অনন্তর সংক্ষেপে সর্ব্বার্থসঙ্কলন পূর্ব্বক সার্দ্ধশত শ্লোক দ্বারা অনুক্রমণিকা রচনা করিলেন।
ব্যাসদেব ভারত রচনা করিয়া সর্ব্বাগ্রে আপন পুত্র শুকদেবকে, তৎপরে শুশ্রূষাপরায়ণ অন্যান্য বুদ্ধিজীবী শিষ্যদিগকে, অধ্যয়ন করাইলেন। অনন্তর ষষ্টিলক্ষশ্লোকময়ী ভারতসংহিতা রচনা করিলেন। তন্মধ্যে দেবলোকে ত্রিংশৎ, পিতৃলোকে পঞ্চদশ, গন্ধর্ব্বলোকে চতুর্দ্দশ, আর নরলোকে এক লক্ষ শ্লোক প্রতিষ্ঠিত
আছে। নারদ দেবতাদিগকে, অসিত দেবল পিতৃগণকে, শুকদেব গন্ধর্ব্ব, যক্ষ, ও রাক্ষসদিগকে শ্রবণ করান, আর ব্যাসশিষ্য বৈশম্পায়ন নরলোকে প্রচার করেন। তিনিই পরীক্ষিৎপুত্র রাজাধিরাজ জনমেজয়কে শ্রবণ করান। ইঁহারা সকলেই পৃথক্ পৃথক্ সংহিতা কীর্ত্তন করিয়াছিলেন। আমি এক্ষণে নরলোক-প্রতিষ্ঠিত শতসহস্ৰশ্লোকময়ী সংহিতা কীর্ত্তন আরম্ভ করিতেছি, আপনারা শ্রবণ করুন। দুর্য্যোধন অধর্ম্মময় মহাবৃক্ষ, কর্ণ তাহার স্কন্ধ, শকুনি শাখা, দুঃশাসন পুষ্প ও ফল, রাজা ধৃতরাষ্ট্র তাহার মূল। যুধিষ্ঠির ধর্ম্মময় মহাবৃক্ষ, অর্জ্জুন তাহার স্কন্ধ, ভীমসেন শাখা, মাদ্রীপুত্র নকুল সহদেব পুষ্প ও ফল, কৃষ্ণ বেদ ও ব্রাহ্মণগণ তাহার মূল। যুধিষ্ঠিরের চরিতকীর্ত্তনে ধর্ম্মবৃদ্ধি, ভীমসেনের চরিতকীর্ত্তনে পাপপ্রণাশ, ও অর্জ্জুনের চরিত্রকীর্ত্তনে শৌর্য্যবৃদ্ধি হয়, আর নকুল সহদেবের চরিত্রকীর্ত্তনে রোগের সম্ভাবনা থাকে না।
রাজা পাণ্ডু, বুদ্ধিবলে ও বিক্রমপ্রভাবে নানা দেশ জয় করিয়া, পরিশেষে মৃগয়ানুরাগপরবশ হইয়া ঋষিগণের সহিত অরণ্যে বাস করিতে লাগিলেন। তিনি দৈবদুর্বিপাকবশতঃ সম্ভোগাসক্ত মৃগ বধ করিয়া ঘোরতর আপদে পতিত হইয়াছিলেন। তথাপি শাস্ত্রবিধানানুসারে ধর্ম্ম, বায়ু, ইন্দ্র, ও অশ্বিনীকুমারযুগলের সমাগম দ্বারা পাণ্ডবদিগের জন্মলাভ ও সদাচরাভ্যাসাদি যাবতীয় ব্যাপার সম্পন্ন হইল। কুন্তী ও মাদ্রী পরম পবিত্র অরণ্যে ঋষিদিগের আশ্রমে তাহাদিগের লালন পালন করিতে লাগিলেন।
কিছু কাল পরে, ঋষিগণ সেই ব্রহ্মচারিবেশ, অশেষশাস্ত্রজ্ঞ, সর্ব্বগুসম্পন্ন রাজকুমারদিগকে রাজধানীতে ধৃতরাষ্ট্রাদ্রির নিকট আনয়ন করিলেন, এবং, ইঁহারা পাণ্ডুর পুত্র, তোমাদিগের পুত্র, ভ্রাতা, শিষ্য, ও সুহৃদ, এই বলিয়া পরিচয় দিয়া প্রস্থান করিলেন। ইহা শুনিয়া সমুদায় কৌরব ও সুশীল ধর্ম্মপরায়ণ পুরবাসিগণ কোলাহল করিতে লাগিলেন। কেহ কেহ কহিল, ইহারা তাঁহার পুত্র নহে, কেহ কেহ বলিল, তাঁহারই বটে; কেহ কেহ কহিল, বহু কাল হইল পাণ্ডুর মৃত্যু হইয়াছে, তাঁহার কি রূপে সম্ভতি হইতে পারে। অনন্তর সর্ব্বত্র এই বাক্য শ্রুত হইতে লাগিল, অদ্য আমরা ভাগ্যক্রমে পাণ্ডুর সস্ততি দেখিলাম; হে পাণ্ডবগণ! তোমরা কুশলে আসিয়াছ? তাঁহারা কহিলেন, আমরা কুশলে আসিয়াছি। অনন্তর কোলাহল নিবৃত্ত হইলে, মহাশব্দে আকাশবাণী হইল, এবং পুষ্পবৃষ্টি, সৌরভসঞ্চার, ও শঙ্খদুন্দুভিধ্বনি হইতে লাগিল। পাণ্ডুপুত্রেরা নগর প্রবেশ করিলে এই সকল অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিয়াছিল। উক্ত সমস্ত ব্যাপার দর্শনে হর্ষ প্রাপ্ত হইয়া পৌরগণ আহ্লাদে কোলাহল করিতে লাগিল।
পাণ্ডবেরা নিখিল বেদ ও বিবিধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়া পরমাদরে ও অকুতোভয়ে বাস করিতে লাগিলেন। সমুদায় লোক যুধিষ্ঠিরের সদাচার, ভীমের ধৈর্য্য, অর্জ্জুনের বিক্রম, এবং নকুল সহদেবের গুরুভক্তি, ক্ষমা, ও বিনয় দর্শনে পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইয়াছিল। অনন্তর অর্জ্জুন সমাগত রাজগণ সমক্ষে দুরূহ কর্ম্ম সম্পন্ন করিয়া স্বয়ংবরা কন্যা আনয়ন করিলেন। তদবধি তিনি ভূমণ্ডলে সকল শস্ত্রবেত্তার পূজ্য হইলেন, এবং সমরকালে প্রদীপ্ত দিবাকরের ন্যায় দুর্নিরীক্ষ্য হইয়া উঠিলেন। তিনি পৃথক পৃথক ও সমবেত সমুদায় নৃপতিদিগকে পরাজিত করিয়া রাজা যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় মহাযজ্ঞ আহরণ করেন। যুধিষ্ঠির, বাসুদেবের পরামর্শে এবং ভীম ও অর্জ্জুনের বাহুবলে, বলগর্ব্বিত জরাসন্ধ ও শিশুপালের বধ সাধন করিয়া, অন্নদান দক্ষিণাপ্রদানাদি সর্বাঙ্গসম্পন্ন রাজসূয় মহাযজ্ঞ নির্ব্বিঘ্নে সমাপন করিলেন। নানা প্রদেশ হইতে পাণ্ডবদিগের নিকট মণি, কাঞ্চন, রত্ন, গো, হস্তী, অশ্ব, বিচিত্র বস্ত্র, শিবির, কম্বল, অজিন, জবনিকা, রঙ্কিব আস্তরণ, এই সমস্ত উপঢৌকন উপস্থিত হইতে লাগিল। পাণ্ডবদিগের তাদৃশ ঐশ্বর্য্য দর্শনে দুর্যোধনের অন্তঃকরণে অত্যন্ত ঈর্ষ্যা ও দ্বেষ উপস্থিত হইল। তিনি ময়দানবনির্ম্মিত পরমাশ্চর্য্য সভা দর্শন করিয়া অত্যন্ত পরিতাপ পাইলেন। সেই সভায় তিনি ভ্রমবশে স্খলিতগতি হওয়াতে, ভীম কৃষ্ণের সমক্ষে তাঁহাকে গ্রাম্য লোকের ন্যায় উপহাস করিয়াছিলেন। দুর্য্যোধন অশেষবিধ ভোগসুখ ও নানারত্ন সম্পন্ন হইয়াও মনের অসুখে দিনে দিনে বিবর্ণ ও কৃশ হইতে লাগিলেন। পুত্রবৎসল ধৃতরাষ্ট্র পুত্রের মনঃপীড়ার বিষয় অবগত হইয়া দ্যূতক্রীড়ার অনুজ্ঞা দিলেন। তৎশ্রবণে কৃষ্ণ অত্যন্ত রুষ্ট ও অসন্তুষ্ট হইলেন, বিবাদভঞ্জনের চেষ্টা না পাইয়া বরং তদ্বিষয়ে অনুমোদন প্রদর্শন করিলেন, দ্যূত প্রভৃতি অশেষবিধ কুনীতিও সহ্য করিলেন। কারণ বিদুর, ভীষ্ম, দ্রোণ, ও কৃপাচার্য্যের অনভিমতে আরব্ধ সেই তুমুল যুদ্ধে ক্ষত্রিয়কুলধ্বংস হওয়া তাঁহার অভিপ্রেত ছিল।
ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদিগের জয়রূপ অপ্রিয় সংবাদ শ্রবণ এবং দুর্য্যোধন, কর্ণ, ও শকুনির প্রতিজ্ঞা স্মরণ করিয়া বহু ক্ষণ চিন্তা পূর্ব্বক সঞ্জয়কে কহিলেন, সঞ্জয়! আমি তোমায় সমুদায় কহিতেছি, শ্রবণ কর; কিন্তু শুনিয়া আমারে অপ্রাজ্ঞ বিবেচনা করিও না। তুমি শাস্ত্রজ্ঞ, মেধাবী, বুদ্ধিমান, ও পরম প্রাজ্ঞ। আমি বিবাদেও সম্মত ছিলাম না, এবং কুলক্ষয়দর্শনেও প্রীত হই নাই। আমার স্বপুত্র ও পাণ্ডুপুত্রে বিশেষ ছিল না। পুত্রেরা সদা ক্রোধপরায়ণ, আমারে বৃদ্ধ বলিয়া অবজ্ঞা করিত; আমি অন্ধ, লঘুচিত্ততা প্রযুক্ত পুত্রস্নেহে সকলই সহ্য করিতাম; অচেতন দুর্য্যোধন মোহাভিভূত হইলে আমিও মোহাভিভূত হইতাম। সে রাজসূয় যজ্ঞে মহানুভাব যুধিষ্ঠিরের সমৃদ্ধি দেখিয়া, এবং সভাপ্রবেশকালে সেই রূপে উপহসিত হইয়া, অবমানিত বোধে ক্রোধে অন্ধ হইল; এবং ক্ষত্রিয়কুলে জন্ম গ্রহণ করিয়াও, যুদ্ধে পাণ্ডবদিগকে জয় করিতে অশক্ত ও রাজলক্ষ্মী আত্মসাৎ করিবার বিষয়ে হতোৎসাহ হইয়া, গান্ধাররাজের সহিত পরামর্শ করিয়া কপট দ্যুতক্রীড়ার মন্ত্রণা করিল। এই সকল বিষয়ে আমি আদ্যোপান্ত যাহা অবগত আছি, কহিতেছি শুন। তুমি আমার বুদ্ধিযুক্ত বাক্য সকল শ্রবণ করিয়া আমারে প্রজ্ঞাবান্ বলিয়া জানিতে পারিবে।
যখন শুনিলাম, অর্জ্জুন বিচিত্র শরাসন সমাকর্ষণ পূর্ব্বক লক্ষ্য বিদ্ধ ও ভূতলে পাতিত করিয়া, সমবেত রাজগণ সমক্ষে দ্রৌপদীরে হরণ করিয়া আনিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জ্জুন দ্বারকাতে সুভদ্রারে বল পূর্ব্বক হরণ করিয়া বিবাহ করিয়াছে, অথচ বৃষ্ণিকুলাবতংস কৃষ্ণ বলরাম মিত্রভাবে ইন্দ্রপ্রস্থে আগমন করিয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দেবরাজ ভূরি পরিমাণে বারিবর্ষণ করিতে লাগিলেন, কিন্তু অর্জ্জুন দিব্য শরজাল দ্বারা সেই বারিবর্ষণ নিবারণ করিয়া খাণ্ডবদাহে অগ্নিকে পরিতৃপ্ত করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, পঞ্চ পাণ্ডব কুন্তীসহিত জতুগৃহ হইতে পরিত্রাণ পাইয়াছে, এবং মহাপ্রাজ্ঞ বিদুর তাহাদের ইষ্টসাধনে যত্নবান হইয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জুন রঙ্গক্ষেত্রে লক্ষ্য ভেদ করিয়া দ্রৌপদী লাভ করিয়াছে, এবং মহাপরাক্রান্ত পাঞ্চাল পাণ্ডব উভয় কুল একত্র হইয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীমসেন বাহুবলে অতি তেজস্বী মগধেশ্বর জরাসন্ধের প্রাণবধ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, পাণ্ডুতনয়েরা দিগ্বিজয়ে বিনির্গত হইয়া পরাক্রমপ্রভাবে সমস্ত ভূপতিদিগকে বশীভূত করিয়া রাজসূয় মহাযজ্ঞ সম্পন্ন করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অশ্রুমুখী, অতিদুঃখিতা, একবস্ত্রা, রজস্বলা, সনাথা দ্রৌপদীকে অনাথার ন্যায় সভায় লইয়া গিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ধুর্ত্ত মন্দবুদ্ধি দুঃশাসন সভামধ্যে দ্রৌপদীর বস্ত্র আকর্ষণ করিয়াছে, অথচ বিনাশ প্রাপ্ত হয় নাই, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, শকুনি পাশক্রীড়াতে যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করিয়া তাহার রাজ্যহরণ করিয়াছে, অথচ তাহার অপ্রমেয়প্রভাবশালী সহোদরেরা অনুগত আছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন জ্যেষ্ঠভক্তিপরতন্ত্র প্রযুক্ত অশেষ ক্লেশসহিষ্ণু ধর্ম্মশীল পাণ্ডবদিগের বনপ্রস্থানকালে নানা চেষ্টা শ্রবণ করিলাম, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, সহস্র সহস্র ভিক্ষাজীবী মহানুভাব স্নাতক ব্রাহ্মণ বনবাসী যুধিষ্ঠিরের অনুগত হইয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জ্জুন দেবাদিদেব কিরাতরূপী মহাদেবকে যুদ্ধে প্রসন্ন করিয়া পাশুপত মহাস্ত্র লাভ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, সত্যসন্ধ ধনঞ্জয় স্বর্গে গিয়া দেবরাজের নিকট যথাবিধানে অস্ত্রশিক্ষা করিতেছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জ্জুন বরদানগর্ব্বিত দেবতাদিগের অজেয় পুলোমপুত্র কালকেয়দিগকে পরাজিত করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, শত্রুঘাতী অর্জ্জুন অসুরবধার্থে ইন্দ্রলোক গমন করিয়া কৃতকার্য্য হইয়া প্রত্যাগমন করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীম ও অন্যান্য পাণ্ডবেরা সেই মানুষের অগম্য দেশে কুবেরের সহিত সমাগত হইয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, কর্ণমতানুযায়ী ঘোষষাত্রাপ্রস্থিত মৎপুত্রদিগকে গন্ধর্ব্বেরা বদ্ধ করিয়াছিল, অর্জ্জুন তাহাদিগের উদ্ধার সাধন করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ধর্ম্ম যক্ষরূপ পরিগ্রহ পূর্ব্বক যুধিষ্ঠিরের নিকটে আসিয়া কয়েকটি প্রশ্ন করিয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, আমার পুত্রেরা, বিরাটরাজ্যে দ্রৌপদীসহিত অজ্ঞাতবাসকালে, পাণ্ডবদিগের অনুসন্ধান করিতে পারে নাই, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, উত্তর গোগ্রহে অর্জ্জুন একাকী অস্মৎপক্ষীয় অতি প্রধান বীরদিগকে পরাজিত করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বিরাট রাজা আপন কন্যা উত্তরআকে বস্ত্রালঙ্কারে ভূষিতা করিয়া অর্জ্জুনকে সম্প্রদান করিয়াছেন, এবং অর্জ্জুন তাহাকে আপন পুত্রের নিমিত্ত প্রতিগ্রহ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, যুধিষ্ঠির নিৰ্জ্জিত, নির্ধন, নির্ব্বাসিত, ও স্বজনবিয়োজিত হইয়াও সাত অক্ষৌহিণী সৈন্য সংগ্রহ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি। নাই। যখন শুনিলাম, যিনি এই পৃথিবীকে এক পদক্ষেপে অধিকৃত করিয়াছিলেন, সেই ভগবান বাসুদেব পাণ্ডবদিগের পক্ষ হইয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। নারদমুখে শুনিলাম, কৃষ্ণ ও অর্জ্জুন নরনারায়ণাবতার, তিনি ব্রহ্মলোকে তাঁহাদের দর্শন করেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, কৃষ্ণ লোকহিতার্থে কুরুদিগের বিরোধ ভঞ্জন করিতে আসিয়া অকৃতকার্য্য প্রতিগমন করিয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, কর্ণ ও দুর্য্যোধন কৃষ্ণের নিগ্রহ চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু তিনি বিশ্বরূপ প্রদর্শন পূর্ব্বক তাহাদিগকে হতদৃষ্টি করিয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, কৃষ্ণের প্রস্থানকালে কুন্তী নিতান্ত কাতরা হইয়া একাকিনী রথের অগ্রে দণ্ডায়মান হইলে, তিনি তাহাকে আশ্বাস প্রদান করিয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বাসুদেব ও ভীম উভয়ে পাণ্ডবদিগের মন্ত্রী হইয়াছেন, এবং দ্রোণাচার্য্য তাহাদের মঙ্গল আকাঙক্ষা করিতেছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, তুমি যুদ্ধ করিলে আমি যুদ্ধ করিব না, কর্ণ ভীষ্মকে এই কথা কহিয়া সেনা পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বাসুদেব, অর্জ্জুন, ও অপ্রমেয় গাণ্ডীব ধনু, এই তিন মহাবীর্য্য একত্র হইয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জ্জুন রথোপরি মোহাভিভূত ও বিষন্ন হইলে, কৃষ্ণ তাহাকে স্বশরীরে চতুর্দ্দশ ভুবন দর্শন করাইয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, শত্রুমর্দ্দন ভীষ্ম, সংগ্রামে প্রতিদিন অযুতঘাতী হইয়াও, পাণ্ডবপক্ষীয় প্রধান এক ব্যক্তিকেও বিনষ্ট করিতে পারেন নাই, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ধর্ম্মপরায়ণ ভীষ্ম পাণ্ডবদিগের নিকট আপন বধোপায় প্রকাশ করিয়াছেন, এবং তাহারাও হৃষ্ট চিত্তে সেই উপায় সাধন করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জ্জুন শিখণ্ডীকে সম্মুখে স্থাপিত করিয়া অতি দুর্দ্ধৰ্ষ মহাপরাক্রান্ত ভীষ্মকে হতবীর্য্য করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীষ্ম কেবল মৎপক্ষীয়দিগকেই অল্পাবশিষ্ট করিয়া শরজালে ক্ষতকলেবর হইয়া শরশয্যায় শয়ন করিয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীষ্ম শরশয্যাশয়ান হইয়া পানীয় আহরণার্থে আদেশ করিলে, অর্জ্জুন ভূভেদ করিয়া তাঁহাকে তৃপ্ত করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বায়ু, ইন্দ্র, ও সূর্য্য পাণ্ডবদিগের অনুকূল হইয়াছেন, এবং হিংস্র জন্তুগণ নিরন্তর আমাদিগকে ভয় প্রদর্শন করিতেছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অদ্ভুত যোদ্ধা দ্রোণাচার্য্য সমরে নানাবিধ অস্ত্রকৌশল প্রদর্শন করিয়াও পাণ্ডবপক্ষীয় প্রধানদিগকে নষ্ট করিতে পারিতেছেন না, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, আমরা, অৰ্জ্জুনবধার্থে যে মহারথ সংসপ্তকগণ নিযুক্ত করিয়াছিলাম, অর্জ্জুন তাহাদিগের বিনাশ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, মহাবীর অভিমন্যু দ্রোণাচার্য্যরক্ষিত অন্যের অভেদ্য ব্যুহ ভেদ করিয়া তন্মধ্যে একাকী প্রবেশ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অস্মৎপক্ষীয় মহারথেরা অর্জ্জুনবধে অসমর্থ হইয়া সকলে মিলিয়া শিশু প্রায় অভিমন্যুকে বধ করিয়া হৃষ্টচিত্ত হইয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অস্মৎপক্ষীয়েরা অভিমন্যুকে বধ করিয়া হর্ষে মহাকোলাহল করিতেছে, কিন্তু অর্জ্জুন ক্রুদ্ধ হইয়া জয়দ্রথবধ প্রতিজ্ঞা করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জ্জুন জয়দ্রথবধার্থে যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল, শত্রুমণ্ডলীমধ্যে সেই প্রতিজ্ঞা পরিপূর্ণ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জ্জুনের অশ্ব সকল একান্ত ক্লান্ত হইলে, বাসুদেব বন্ধনমোচন ও জলোপসেবন পূর্ব্বক তাহাদিগকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে আনিয়া পুনর্ব্বার যোজিত করিয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, বাহনগণ অক্ষম হইলে, অর্জ্জুন রথোপরি অবস্থিত হইয়া সমুদায় যোদ্ধাদিগকে পরাভূত করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, সাত্যকি অতি দুর্দ্ধর্ষ যুদ্ধাসক্ত দ্রোণসৈন্য পরাভূত করিয়া কৃষ্ণ ও অর্জ্জুনের নিকট উপস্থিত হইয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, কর্ণ কোদণ্ডের অগ্রভাগ দ্বারা আকর্ষণ করিয়া অশেষ ক্লেশ প্রদান পূর্ব্বক ভীমকে ধরিয়া অনিয়। যথোচিত তিরস্কার করিয়াছিল, কিন্তু সে কর্ণহস্তে পতিত হইয়াও মৃত্যু গ্রাস হইতে মুক্ত হইয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দ্রোণ, কৃতবর্ম্মা, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, ও শল্য প্রতিবিধানে অসমর্থ হইয়া জয়দ্রথবধ সহ্য করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, কর্ণ অর্জ্জুনবধার্থ স্থাপিত দিব্য শক্তি ঘটোৎকচের উপর নিক্ষেপ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দ্রোণ মরণার্থে কৃতনিশ্চয় ও নিশ্চেষ্ট হইয়া রথোপরি অবস্থিত হইলে, ধৃষ্টদ্যুমু ধর্ম্মমার্গ অতিক্রম করিয়া তাঁহার মস্তক ছেদন করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, নকুল উভয়পক্ষীয় সৈন্য সমক্ষে সমকক্ষ হইয়া অশ্বথামার সহিত যুদ্ধ করিতেছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দ্রোণবধানন্তর অশ্বত্থামা নারায়ণাস্ত্র প্রয়োগ করিয়াও পাণ্ডবদিগের প্রাণবধ করিতে পারেন নাই, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীমসেন যুদ্ধে দুঃশাসনের শোণিত পান করিয়াছে, দুর্য্যোধন প্রভৃতি কেহ তাহার নিবারণ করিতে পারে নাই, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জ্জুন অতি দুর্দ্ধর্ষ পরাক্রান্ত কর্ণের প্রাণসংহার করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, যুধিষ্ঠির পরাক্রান্ত অশ্বত্থামা, দুঃশাসন, ও কৃতবর্মাকে পরাজিত করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, যে শল্য সংগ্রামে কৃষ্ণকে পরাজিত করিব বলিয়া স্পর্ধা করিত, যুধিষ্ঠির সেই পরাক্রান্ত পুরুষের প্রাণসংহার করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, সহদেব বিবাদ ও দ্যূতক্রীড়ার মূল মায়াবী পাপিষ্ঠ শকুনির প্রাণবধ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, দুর্য্যোধন হতসৈন্য ও নিঃসহায় হইয়া জলস্তম্ভ করিয়া একাকী হ্রদপ্রবেশ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, পাণ্ডবেরা বাসুদেব সমভিব্যাহারে সেই হ্রদের তীরে দণ্ডায়মান হইয়া অসহন দুর্য্যোধনের তিরস্কার করিতেছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। শুনিলাম, দুর্য্যোধন গদাযুদ্ধে অশেষ কৌশল প্রদর্শন পূর্ব্বক পরিভ্রমণ করিতেছিল, ভীম কৃষ্ণের পরামর্শে কপট প্রহার দ্বারা তাহার ঊরুভঙ্গ করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অশ্বথামা প্রভৃতি সকলে পরামর্শ করিয়া দ্রৌপদীর নিদ্রিত পুত্রপঞ্চকের বধরূপ অতি ঘৃণিত কলঙ্ককর কর্ম্ম করিয়াছে, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, ভীম প্রতিফল প্রদানার্থে অশ্বথামার পশ্চাৎ ধাবমান হইলে, তিনি ক্রোধান্ধ হইয়া মহাস্ত্র প্রয়োগ পূর্ব্বক সুভদ্রার গর্ভ বিনাশ করিয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অর্জ্জুন স্বস্তি বলিয়া স্বীয় অস্ত্র দ্বারা ব্রহ্মশিরঃ অস্ত্র নিবারণ করিয়াছে, এবং অশ্বত্থামা মণিরত্ন প্রদান করিয়াছেন, তখন আর অমি জয়ের আশা করি নাই। যখন শুনিলাম, অশ্বত্থামা মহাস্ত্র দ্বারা উত্তরার গর্ভ নাশ করিলে, দ্বৈপায়ন ও বাসুদেব উভয়ে অশ্বত্থামাকে অভিশাপ প্রদান করিয়াছেন, তখন আর আমি জয়ের আশা করি নাই। গান্ধারীর পুত্র, পৌত্র, বন্ধু, পিতৃ, ভ্রাতৃ প্রভৃতি সমুদায় নিধন প্রাপ্ত হইয়াছে; তাহার অতি শোচনীয় অবস্থা উপস্থিত। পাণ্ডবেরা অতি দুষ্কর কার্য্য করিয়াছে ও পুনর্ব্বার অকণ্টক রাজ্য প্রাপ্ত হইয়াছে। কি কষ্ট! শুনিলাম, আমাদের তিন জন ও পাণ্ডবদিগের সাত জন, সমুদায়ে দশ জন মাত্র অবশিষ্ট আছে। এই ভয়ঙ্কর সমরে অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী নিধন প্রাপ্ত হইয়াছে। সঞ্জয়! আমি চারি দিক অন্ধকারময় দেখিতেছি, মোহে অভিভূত হইতেছি, আমার চেতনা লোপ হইতেছে, মন বিহ্বল হইতেছে।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ধৃতরাষ্ট্র এইরূপ কহিয়া বহুতর বিলাপ ও পরিতাপ করিয়া নিতান্ত দুঃখিত ও মূর্চ্ছিত হইলেন। পরে অশ্বিাসিত ও চেতনা প্রাপ্ত হইয়া সঞ্জয়কে কহিলেন, সঞ্জয়! যখন আমার ভাগ্যে এরূপ ঘটিল, অবিলম্বে প্রাণত্যাগ করাই শ্রেয়ঃ, আর অমি জীবনধারণের কিছুমাত্র ফল দেখিতেছি না। রাজা ধৃতরাষ্ট্র এইরূপ কহিয়া বিলাপ, দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ, ও পুনঃ পুনঃ মোহাবেশ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। তখন ধীমান্ সঞ্জয় প্রবোধদানার্থে কহিলেন, মহারাজ! দ্বৈপায়ন ও নারদ মুখে শ্রবণ করিয়াছ, শৈব, সৃঞ্জয়, সুহোত্র, রন্তিদেব, কাক্ষীবান্, ঔশিজ, বাহ্লীক, দমন, শর্যাতি, অজিত, নল, বিশ্বামিত্র, অম্বরীষ, মরুত্ত, মনু, ইক্ষ্বাকু, গয়, ভরত, দাশরথি রাম, শশবিন্দু, ভগীরথ, কৃতবীর্য্য, জনমেজয়, শুভকর্ম্মা বহুযজ্ঞানুষ্ঠাতা যযাতি, এই সকল মহোৎসাহ মহাবল দিব্যাত্মবেত্তা শক্রতুল্যতেজস্বী রাজারা সর্ব্বগুণসম্পন্ন প্রধান প্রধান রাজবংশে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, এবং ধর্ম্মতঃ পৃথিবী জয়, নানা যজ্ঞানুষ্ঠান, ও যশোলাভ করিয়া পরিশেষে কাল গ্রাসে পতিত হইয়াছেন। পূর্ব্ব কালে চৈদ্যরাজ পুত্রশোকে সন্তপ্ত হইলে, দেবর্ষি নারদ তাঁহাকে এই চতুর্বিংশতি রাজার উপাখ্যান শ্রবণ করাইয়াছিলেন। এতদ্ভিন্ন পুরু, কুরু, যদু, বিশ্বগশ্ব, অনূহ, যুবনাশ, ককুৎস্থ, রঘু, বিজয়, বীতিহোত্র, অঙ্গ, ভব, শ্বেত, বৃহদ্গুরু, উশীনর, শতরথ, কঙ্ক, দুলিদুহ, দ্রুম, পর, বেণ, সগর, সঙ্কৃতি, নিমি, অজেয়, পরশু, পুণ্ড, শম্ভু, দেবাবৃধ, দেবাহ্বয়, সুপ্রতিম, সুপ্রতীক, বৃহদ্রথ, সুক্রতু, নল, সত্যব্রত, শান্তভয়, সুমিত্র, সুবল, জানুজঙ্ঘ, অনরণ্য, অর্ক, বলবন্ধু, নিরামর্দ্দ, কেতুশৃঙ্গ, বৃহদ্বল, ধৃষ্টকেতু, বৃহৎকেতু, দীপ্তকেতু, অবিক্ষিৎ, চপল, ধূর্ত্ত, কৃতবন্ধু, দৃঢ়েষুধি, মহাপুরাণসম্ভাব্য, প্রত্যঙ্গ, পরহা, শ্রুতি, এই সমস্ত ও অন্যান্য শত শত সহস্র সহস্র ও পদ্মসংখ্য নরপতিগণ প্রসিদ্ধ আছেন; ইঁহারা মহাবল পরাক্রান্ত ও বুদ্ধিশালী ছিলেন, এবং অশেষ ঐশ্বর্য্য ভোগ করিয়া পরিশেষে তোমার পুত্রগণের ন্যায় নিধন প্রাপ্ত হইয়াছেন; বিদ্যাবান্ সৎকবিগণ পুরাণে তাঁহাদিগের অলৌকিক কর্ম্ম, বিক্রম, দান, মাহাত্ম্য, আস্তিক্য, সত্য, শৌচ, দয়া, আর্জব, কীর্ত্তন করিয়া গিয়াছেন। তাঁহারা সর্ব্বপ্রকারসমৃদ্ধিসম্পন্ন ও নানাগুণে অলঙ্কৃত হইয়াও নিধন প্রাপ্ত হইয়াছেন; তোমার পুত্রেরা দুরাত্মা, ক্রোধান্ধ, লুব্ধ, অতি দুর্বৃত্ত ছিল, তাহাদিগের নিমিত্ত তোমার শোকাকুল হওয়া উচিত নহে। তুমি শাস্ত্রজ্ঞ, মেধাবী, বুদ্ধিমান্, ও পরম প্রাজ্ঞ। যাঁহাদিগের বুদ্ধিবৃত্তি শাস্ত্রানুগামিনী হয়, তাঁহারা মোহাভিভূত হয়েন না। দৈব নিগ্রহ ও দৈব অনুগ্রহ তোমার অবিদিত নহে। অতএব, পুত্রগণের নিমিত্ত তোমার এতবর্তী মমতা উচিত হয় না। যাহা ভবিতব্য ছিল ঘটিয়াছে, তাহার অনুশোচনা করা অবিধেয়। কোন ব্যক্তি প্রজ্ঞাবলে দৈবকার্য্য অন্যথা করিতে পারে? বিধাতার নিয়ম অতিক্রম করা কাহার সাধ্য? ভাব, অভাব, সুখ, অসুখ, সমুদায় কালমূলক। কাল সর্ব্ব জীবের সৃষ্টি করেন, কাল সর্ব্ব জীবের সংহার করেন, কাল সর্ব্ব জীবের দাহ করেন, কাল সর্ব্ব জীবের শান্তি করেন। ইহলোকে যে সকল শুভাশুভ ঘটনা হয়, সে সমুদায় কালকৃত। কাল সর্ব্বজীবসংহারকারী, কালই পুনর্ব্বার সব জীব সৃষ্টি করেন। সর্ব্ব জগৎ সুপ্ত হইলেও কাল জাগরিত থাকেন। অতএব কাল দুরতিক্রম। কাল অপ্রতিহত প্রভাবে সমভাবে সর্ব্বভূত শাসন করেন। অতীত, অনাগত, সাম্প্রতিক, সমুদায় পদার্থ কালকৃত বোধ করিয়া তোমার ধৈর্য্যাবলম্বন করা উচিত। সঞ্জয় পুত্রশোকার্ত রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে এইরূপ প্রবোধ দিয়া সুস্থচিত্ত করিলেন। পরমকারুণিক ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন লোকহিতার্থে এই বিষয়ে পবিত্র উপনিষৎ কীর্ত্তন করিয়াছেন, এবং বিদ্বান্ সৎকবিগণ পুরাণে সেই উপনিষৎ কীর্ত্তন করিয়া থাকেন।
ভারত অধ্যয়নে পুণ্য জন্মে। অধিক কি কহিব, শ্রদ্ধা পূর্ব্বক শ্লোকের এক চরণ মাত্র পাঠ করিলেও সকল পাপ নষ্ট হয়। এই গ্রন্থে দেব, দেবর্ষি, ব্রহ্মর্ষি, যক্ষ, উরগ প্রভৃতির ও সনাতন ভগবান্ বাসুদেবের কীর্ত্তন আছে। তিনি সত্য, পবিত্র, মঙ্গলপ্রদ, পরিচ্ছেদাতীত, কালত্রয়ে অবিকৃত, জ্যোতির্ম্ময়, ও সনাতল; পণ্ডিতেরা তাঁহার অলৌকিক কর্ম্ম সকল কীর্ত্তন করিয়া থাকেন, তিনি এই কার্য্য কারণ রূপ বিশ্বের সৃষ্টিকর্ত্তা, তিনি ব্রহ্মাদি দেবতার ও যজ্ঞাদি কার্য্যের সৃষ্টি করেন, তিনি জন্ম মৃত্যু ও পুনর্জন্মের কারণ, তিনি পাঞ্চভৌতিক দেহের অধিষ্ঠাতা জীব ও নির্বিশেষ পরব্রহ্ম স্বরূপ। যতিগণ সমাহিত হইয়া ধ্যান ও যোগবলে দর্পণতলগত প্রতিবিম্বের ন্যায় তাঁহাকে হৃদয়ে দর্শন করেন।
ধর্মপরায়ণ নর শ্রদ্ধা ও নিয়ম পূর্ব্বক এই অধ্যায় পাঠ করিয়া পাপ হইতে মুক্ত হয়। আস্তিক ব্যক্তি ভারতের এই অনুক্রমণিকাধ্যায় প্রথমাবধি সর্ব্বদা শ্রবণ করিলে বিপদে পতিত হয় না। দুই সন্ধ্যা অনুক্রমণিকার কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ পাঠ করিলে, তৎক্ষণাৎ অহোরাত্র সঞ্চিত সমুদায় পাপ হইতে মুক্ত হয়। এই অধ্যায় ভারতের শরীর স্বরূপ, ইহাতে সত্য ও অমৃত উভয় আছে। যেমন গব্যের মধ্যে নবনীত, দ্বিপদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, বেদের মধ্যে আরণ্যক, ওষধির মধ্যে অমৃত, জলাশয়ের মধ্যে সমুদ্র, চতুষ্পদের মধ্যে ধেনু, সেইরূপ মহাভারত সমস্ত ইতিহাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি শ্রাদ্ধকালে ব্রাহ্মণদিগকে অন্ততঃ ভারতীয় শ্লোকের এক চরণ শ্রবণ করায়, তাহার পিতৃলোকের অক্ষয় তৃপ্তি হয়। ইতিহাস ও পুরাণ দ্বারা বেদের অর্থ সমর্থন করিবেক। বেদ অল্পজ্ঞের নিকট এই ভয় করেন যে, এ আমাকে প্রহার করিবেক। বিদ্বান ব্যক্তি কৃষ্ণদ্বৈপায়নপ্রোক্ত এই বেদ শ্রবণ করাইয়া অর্থলাভ করেন, এবং নিঃসন্দেহ ভ্রূণহত্যাদি পাপ হইতে মুক্ত হন। যে ব্যক্তি শুচি ও সংযত হইয়া পর্ব্বে পর্ব্বে এই পরমপবিত্র অধ্যায় পাঠ করে, আমার মতে, তাহার সমুদায় ভারত অধ্যয়ন করা হয়। যে নর প্রতিদিন শ্রদ্ধাবান্ হইয়া এই ঋষিপ্রণীত শাস্ত্র শ্রবণ করে, তাহার দীর্ঘ আয়ুঃ, কীর্ত্তি, ও স্বর্গ লাভ হয়।
পূর্ব্ব কালে সমুদয় দেবত। একত্র হইয়া তুলাযন্ত্রের এক দিকে চারি বেদ ও অপর দিকে এই ভারত স্থাপন করিয়াছিলেন। ভারত সরহস্য বেদচতুষ্টয় অপেক্ষা ভারে অধিক হয়, এজন্য তদবধি ইহ লোকে ভারত মহাভারত বলিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছে। পরিমাণকালে ইহার মহত্ত্ব ও ভারবত্ত্ব উভয়ই অধিক হইল, সেই নিমিত্ত ইহার নাম মহাভারত। যে ব্যক্তি মহাভারত শব্দের ব্যুৎপত্তি জানে, সে সর্ব্বপাপ হইতে মুক্ত হয়।
তপস্যা পাপজনক নহে, বেদাধ্যয়ন পাপজনক নহে, বর্ণাশ্রমাদিনিয়মিত বেদবিহিত কর্ম্মানুষ্ঠান পাপজনক নহে, অশেষ ক্লেশ স্বীকার পূর্ব্বক জীবিকা নির্ব্বাহ করা পাপজনক নহে; এই সমস্ত অসদভিপ্রায়দূষিত হইলেই পাপজনক হয়।
বিষ্ণুর অবতার ঋষিবিশেষ। বিষ্ণু ধর্ম্মের ঔরসে দক্ষকন্যা মূর্ত্তির গর্ভে নর ও নারায়ণ এই মূর্ত্তিদ্বয়ে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। ইঁহারা উভয়েই ঋষিরূপে ঘোরতর তপস্যা করিয়াছিলেন। যথা
ধর্ম্মস্য দক্ষদুহিতর্য্যজনিষ্ট মূর্ত্ত্যাং নারায়ণো নর ইতি স্বতপঃপ্রভাবঃ॥ ভাগবত ২।৭।৭।
তুর্য্যে ধর্ম্মকলাসর্গে নরনারায়ণাবৃষী।
ভূত্বাত্মোপশমোপেতমকরোদ্দুশ্চরং তপঃ॥ ভাগ ১।৩।৭।
পুরাণান্তরে নর নারায়ণের উৎপত্তি প্রকারান্তরে নির্দ্দিষ্ট আছে। মহাদেব সরভরূপ পরিগ্রহ করিয়া দন্তাগ্রভাগপ্রহার দ্বারা বিষ্ণুর নরসিংহমূর্ত্তি দুই খণ্ড করেন, তাহার নরভাগ দ্বারা নর ও সিংহভাগ দ্বারা নারায়ণ এই দুই দিব্যরূপী ঋষি উৎপন্ন হয়েন। যথা
যয়োঃ প্রভাবো দুর্দ্ধর্ষঃ শাস্ত্রে বেদে তপঃসু চ॥ কালিকাপুরাণ।ততো দেহপরিত্যাগং কর্ত্তুং সমভবদ্যদা।
তদা দংষ্ট্রাগ্রভাগেন নরসিংহং মহাবলম্।
সরভো ভগবান্ ভর্গো দ্বিধা মধ্যে চকার হ॥
নরসিংহে দ্বিধাভূতে নরভাগেন তস্য তু।
নর এব সমুৎপন্নো দিব্যরূপী মহানৃষিঃ॥
তস্য পঞ্চাস্যভাগেন নারায়ণ ইতি শ্রুতঃ।
অভবৎ স মহাতেজা মুনিরূপী জনার্দ্দনঃ॥
নরো নারায়ণশ্চোভৌ সৃষ্টিহেতু মহামতী।
যয়োঃ প্রভাবো দুর্দ্ধর্ষঃ শাস্ত্রে বেদে তপঃসু চ॥ কালিকাপুরাণ।
রামায়ণ মহাভারতাদি ইতিহাস ও অষ্টাদশ পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্র অধ্যয়ন করিলে সংসার জয় হয়, অর্থাৎ জীব জন্মমৃত্যুপরম্পরারূপ সংসারশৃঙ্খলা হইতে মুক্ত হয়, এই নিমিত্ত তত্তৎ শাস্ত্রের নাম জয়। যথা
অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতং তথা।
কার্ষ্ণং বেদং পঞ্চমঞ্চ ষন্মহাভারতং বিদুঃ॥
তথৈব শিবধর্ম্মাশ্চ বিষ্ণুধর্ম্মাশ্চ শাশ্বতাঃ।
জয়েতি নাম তেষাঞ্চ প্রবদন্তি মনীষিণঃ॥
সংসারজয়নং গ্রন্থং জয়নামানমীরয়েৎ॥ ভবিষ্যপুরাণ।
আশ্রমের মধ্যে সর্ব্বপ্রধান মুনি।
ভগবান্ গৌরমুখ ঋষিকে কহিয়াছিলেন যে আমি এই অরণ্যে এক নিমিষে দুর্জয় দানবসৈন্য ধ্বংস করিলাম, এই নিমিত্ত ইহা নৈমিষ নামে প্রসিদ্ধ হইবেক। যথা
এবং কৃত্বা ততো দেবো মুনিং গৌরমুখং তদা।
উবাচ নিমিষেণেদং নিহতং দানবং বলম্।
অরণ্যেঽস্মিংস্ততস্ত্বেতন্নৈমিষারণ্যসংজ্ঞিতম্॥
ব্রাহ্মণীর গর্ভে ক্ষত্রিয়ের ঔরসে উৎপন্ন প্রতিলোমজ সঙ্কীর্ণ জাতি। যথা
ব্রাহ্মণ্যাং ক্ষত্রিয়াং সূতঃ। যাজ্ঞবল্ক্য ১ অধ্যায়।
লোমর্ষণ ব্যাসদেবের বিখ্যাত শিষ্য ছিলেন। মহর্ষি প্রসন্ন হইয়া তাঁহাকে প্রণীত সমস্ত পুরাণ সংহিতা সমর্পণ করেন। এই নিমিত্ত তিনি পুরাণবক্তা। লোমহর্ষণ সর্ব্বত্র সূত নামে প্রসিদ্ধ, কিন্তু ইহা তাঁহার কূলানুযায়ী নাম, প্রকৃত নাম নহে, যে হেতু কল্কিপুরাণে সূতপুত্র বলিয়া লোমহর্ষণের বিশেষণ আছে; এবং লোমহর্ষণ নামও তাঁহার আদি নাম নহে, তাঁহার নিকট পৌরাণিক কথা শ্রবণ করিয়া শ্রোতৃবর্গের লোমহর্ষ অর্থাৎ লোমাঞ্চ হইত, এই নিমিত্ত তাহার লোমহর্ষণ নাম হয়। যথা
প্রখ্যাত ব্যাসশিষ্যোঽভূৎ সূতা বৈ লোমহর্ষণঃ।
পুরাণসংহিতাস্তস্মৈ দদৌ ব্যাসো মহামুনিঃ॥ বিষ্ণু ৩।৬।১৮।
তথা ক্ষেত্রে সূতপুত্র নিহতো লোমহর্ষণঃ।
বলরামাস্ত্রযুক্তাত্মা নৈমিষেঽভূৎ স্ববাঞ্ছয়া॥ কল্কি ২৭ অ।
লোমানি হর্যয়াঞ্চক্রে শ্রোতৄণাং যঃ স্বভাসিতৈঃ।
কর্ম্মণা প্রথিতস্তেন লোমহর্ষণসংজ্ঞয়া॥ কূর্ম্মপুরাণ।
উগ্রশ্রবার পিতা লোমহর্ষণ ব্যাসাসনে আসীন হইয়া নৈমিষারণ্যবাসী ঋষিদিগকে পুরাণ শ্রবণ করাইতেছেন, এমন সময়ে বলদেব তীর্থযাত্রাপ্রসঙ্গে তথায় উপস্থিত হইলে ঋষিগণ গাত্রোখান পূর্ব্বক তাঁহার সংবর্দ্ধনা ও সৎকার করিলেন, কিন্তু লোমহর্ষণ গাত্রোত্থানাদি করিলেন না। বলদেব তদ্দর্শনে তাঁহাকে গর্ব্বিত বোধ করিয়া ক্রোধে অধীর হইয়া করস্থ কুশাগ্রপ্রহার দ্বারা তাঁহার প্রাণদণ্ড করিলেন। পরে ঋষিদিগের অনুরোধপরতন্ত্র হইয়া কহিলেন, ইহার আর পুনর্জীবন হইবেক না, ইহার পুত্র উগ্রশ্রবাঃ আপনাদিগকে পুরাণ শ্রবণ করাইবেন। তদবধি উগ্রশ্রবাঃ পুরাণবক্তা হইলেন। যথা
তমাগমতভিপ্রেত্য মুনয়ো দীর্ঘজীবিনঃ।
অভিনন্দ্য যথান্যায়ং প্রণমমাত্থায় চার্চ্চয়ন॥ ১৩॥
অনভ্যুত্থায়িনং সূতমকৃতপ্রহ্বনাঞ্জলিম্।
অধ্যাসীনঞ্চ তান্ বিপ্রান চুকোপোদ্বীক্ষ্য মাধবঃ॥ ১৫॥
এতাবদুক্ত্বা ভগবান্ নিবৃত্তোঽসদ্বধাদপি।
ভাবিত্বাত্তং কুশাগ্রেণ করন্থেনাহনৎ প্রভুঃ॥ ১৯॥
আত্মা বৈ পুত্র উৎপন্ন ইতি বেদানুশাসনম্।
তস্মাদস্য ভবেদ্বক্তা আয়ুরিন্দ্রিয়স্তত্ববান॥ ২৭॥ ভাগ ১০। ৭৮।
সর্পষজ্ঞ। সর্পকুশধ্বংসের নিমিত্ত ঐ যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। ইহার সবিশেষ বিবরণ কিঞ্চিৎ পরে মুলেই প্রাপ্ত হইবেক।
বেদব্যাসের প্রকৃত নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, পরে বেদ বিভাগ করিয়া ব্যাস, বেদব্যাস, ইত্যাদি নাম প্রাপ্ত হন। কৃষ্ণবর্ণ ছিলেন এই নিমিত্ত কৃষ্ণ, আর যমুনার দ্বীপে জন্মিয়াছিলেন এই নিমিত্ত দ্বৈপায়ন। এই দুই শব্দ সমষ্টি, ব্যষ্টি, উভয়থাই ব্যাসবোধক হয়।
নীলকমতে সময় শব্দের অর্থ সক্ষেত, অর্জুনমিমতে আচার।
স্বায়ম্ভুব মনু ব্রহ্মার আদেশানুসারে মনুষ ও অন্যান্য জীব জন্তু প্রভৃতি সমুদায় সৃষ্টি করিয়াছিলেন, এই নিমিত্ত তিনি ‘সর্ব্ব লোকের পিতৃম্বরূপে পরিগণিত। ব্রহ্মা সেই আদিপিতা স্বায়ম্ভুব মনুর পিতা, এই নিমিত্ত তিনি সর্ব্বলোকপিতামহ।
ত্রয়স্ত্রিংশৎসহস্রাণি ত্রয়স্ত্রিংশচ্ছতানি চ।
ত্রয়স্ত্রিংশচ্চ দেবানাং সৃষ্টিঃ সংক্ষেপলক্ষণ॥
এই মূলের যথাশ্রুত অর্থ লিখিত হইল। শতসহস্রাদি সংখ্যা পরস্পর বিরুদ্ধ বোধ হইতেছে। এই পরম্পরবিরুদ্ধ ত্রিবিধ সংখ্যার টীকাকার নীলকণ্ঠ এই সমন্বয় করিয়াছেন যে, অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, ইন্দ্র, ও প্রজাপতি এই ত্রয়স্ত্রিংশৎ দেবতা। ত্রয়স্ত্রিংশৎ শত অথবা ত্রয়স্ত্রিংশৎ সহস্র সংখ্যা তাহাদিগের পরিবারাদি সহ গণনাভিপ্রায়ে নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে। এই বাহুল্য সংখ্যাও সংক্ষেপসৃষ্টি অভিপ্রায়ে উল্লিখিত। বিস্তারিত সৃষ্টি অভিপ্রায়ে পুরাণান্তরে ত্রয়স্ত্রিংশৎ কোটি সংখ্যার উল্লেখ আছে। অর্জ্জুনমিশ্র প্রথমতঃ এইরূপ ব্যাখ্যা লিখিয়া পরিশেষে যথাশ্রুত গ্রন্থার্থ সামঞ্জস্য সংস্থাপনে ব্যগ্র হইয়া ত্রয়স্ত্রিংশং সহস্র ত্রয়স্ত্রিংশৎ শত ও ত্রয়স্ত্রিংশৎ এই তিনের সমষ্টি করিয়াছেন, অর্থাৎ ৩৩৩৩৩৩ দেবতাদিগের সংক্ষেপ সৃষ্টি।
অর্জ্জুনমিশ্রমতে দিব্ শব্দের অর্থ স্বর্গাধিষ্ঠাত্রী দেবতা অথবা অদিতি।
গ্রাম, নগর, দুর্গ, তীর্থ, আশ্রম প্রভৃতি।
ধর্ম্মরহস্য, অর্থরহস্য, কামরহস্য। রহস্য শব্দের অর্থ গূঢ়তত্ত্ব, অর্থাৎ যাহার মর্ম্ম বুঝিতে পারা যায় না।
সংসারযাত্রা নির্বাহের বিধিদর্শক নীতিশাস্ত্র বিশেষ।
নারায়ণং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরোম।
দেবী সরস্বতীঞ্চৈব ততো জয়মুদীরয়েৎ
মুল অবধি শাখানিৰ্গম স্থান পর্যন্ত বৃক্ষভাগ, গুঁড়ি।
পক্ষীর উপবেশনযোগ্য স্থান।
গ্রন্থি, গাঁটি।
দক্ষিণাগ্নি, গার্হপত্য, আহবনীয়। কোনও যক্ষ্মীয় অগ্নি অথবা গার্হপত্য অগ্নি হইতে উদ্ধৃত করিয়া যাহা দক্ষিণ ভাগে স্থাপিত করা যায়, তাহার নাম দক্ষিণাগ্নি। গৃহস্থ ব্যক্তি চির কাল অবিচ্ছেদে যে অগ্নি গৃহে রাখে, তাহার নাম গার্হপত্য। গার্হপত্য হইতে উদ্ধৃত করিয়া হোমার্থ যে অগ্নির সংস্কার করা যায়, তাহার নাম আহবনীয়।
অপুত্রত্বরূপ আপদ্। মৃগয়াকালে পাণ্ডু মৃগরূপধারী ঋষির সম্ভোগসময়ে প্রাণবধ করিয়াছিলেন। ঋষি তাঁহাকে এই শাপ দেন যে, তোমারও সম্ভোগ কালে মৃত্যু হইবেক, তাহাতেই পাণ্ডুর পুত্রোৎপাদনের ব্যাঘাত জন্মে।
রঙ্কুরোম নির্ম্মিত। রঙ্কু মৃগবিশেষ।
জলে স্থলভ্রম, স্থলে জলভ্রম, অদ্বারে দ্বারভ্রম, দ্বারে অদ্বারভ্রম ইত্যাদি।
জয়ই হউক অথবা মৃত্যুই হউক, পাণ্ডবদিগকে রাজ্যার্দ্ধপ্রদান করিব না!
ব্রহ্মচর্য্য সমাধান পূর্ব্বক গৃহস্থাশ্রমে প্রবিষ্ট।
অতিদুর্দ্দান্ত মহাপরাক্রান্ত ষষ্টি সহস্র অসুর।
যে ব্যক্তি অস্ত্রবিদ্যা নিপুণ ও একাকী দশ সহস্র ধনুর্দ্ধারী সৈন্যের সহিত যুদ্ধ করিতে সমর্থ, তাহাকে মহারথ বলে।
ব্রহ্মতেজোময় মহাপ্রভাব অস্ত্রবিশেষ। অশ্বত্থামা অৰ্জ্জুনবধার্থে ঐ অমোঘ অস্ত্র প্রয়োগ করেন।
ভীমকে আক্রোধ ও প্রসন্ন করিবার নিমিত্ত।
বিংশ অধ্যায়
বিংশ অধ্যায়—আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে ঋষিপ্রবর! যে অমৃত মন্থনে শ্রীমান্ অতুলবিক্রম অশ্বরাজ উৎপন্ন হইয়াছিল, তাহার সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণন করিলাম। ক সেই অশ্বরত্ন অবলোকন করিয়া বিনতাকে কহিলেন, বিনতে! শীঘ্র বল দেখি, উচ্চৈঃশ্রবার কিরূপ বর্ণ। বিনতা কহিলেন, এ অশ্বরাজ শ্বেতবর্ণ, তুমি কি বল, আইস এ বিষয়ে পণ করা যাউক। কক্র কহিলেন, হে চারুহাসিনি! আমি বোধ করি, এই অশ্বের পুচ্ছ কৃষ্ণবর্ণ; আইস, এ বিষয়ে এই পণ করা যাউক, যে হারিবেক, সে দাসী হইবেক। তাহারা এই রূপে দাসীবৃত্তিস্বীকাররূপ প্রতিজ্ঞায় আরূঢ় হইয়া, কলা অশ্ব দেখিব, এই স্থির করিয়া স্ব স্ব গৃহে গমন করিলেন।
কদ্রু গৃহে গিয়া কৌটিল্য করিবার অভিপ্রায়ে স্বীয় পুত্রসহস্রকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, কজ্জলতুল্য রূপ ধারণ করিয়া ত্বরায় ঐ তুরঙ্গ শরীরে প্রবেশ কর; যেন আমাকে দাসী হইতে না হয়। যে সকল ভুজঙ্গ তাহার আজ্ঞা প্রতি পালনে পরাজুখ হইল, তিনি তাহাদিগকে এই শাপ দিলেন, পাণ্ডুকুলোদ্ভব ধীমান্ রাজা জনমেজয়ের সর্পসত্রে অগ্নি তোমাদিগকে দগ্ধ করিবেন। সর্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা কদত্ত নিষ্ঠুর শাপ স্বকর্ণে শ্রবণ করিলেন, এবং সর্পগণের সংখ্যা অধিক দেখিয়া, ঐ শাপ প্রজাগণের হিতকর ভাবিয়া, দেবগণ সহিত হর্ষ প্রকাশ করিতে লাগিলেন; আর কহিলেন, কদ্রু স্বীয় সন্তানদিগকে যে এরূপ শাপ দিয়াছেন, ইহা পরম সৌভাগ্যের বিষয়; এই সকল মহাবল সর্পের বিষ অতি তীক্ষ্ণ ও বীর্যৎ। ইহারা স্বভাবতঃ হিংসারত ও অন্যান্য সমস্ত প্রাণীর নিয়ত অহিতকারী। অতএব ক উচিত বিবেচনা করিয়াছেন। তাহারা যেমন নূর, দৈব তেমনই তাহাদিগের উপর প্রাণান্ত দণ্ড পাত করিয়াছেন।
ব্রহ্মা দেবতাদিগকে এইরূপ সম্ভাষণ ও কদ্রুর সমুচিত প্রশংসা করিয়া কশ্যপকে স্বসমীপে আহবান পূর্ব্বক কহিলেন, হে পুণ্যাত্ম। যে সকল তুীক্ষবিষ মহাফণ দন্দক সর্প তোমার ঔরসে জন্মিয়াছে, জননী তাহাদিগকে শাপ দিয়াছেন। বৎস! তদ্বিষয়ে কোনও ক্রমেই তোমার মন্যু করা বিধেয় নহে। যজ্ঞে সর্পকুলসংহার পূর্ব্বাবধি নির্দিষ্ট আছে। বিধাতা, মহাত্মা কশ্যপ প্রজাপতিকে এই রূপে প্রসন্ন করিয়া, তাহাকে বিষহরী বিদ্যা প্রদান করিলেন।
সদা দংশনে উদ্যত।
ষট্চত্বারিংশ অধ্যায়
ষট্চত্বারিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, জরৎকারু, পিতৃগণের এই প্রকার কাতবোক্তি শ্রবণে একান্ত শোকাভিভূত হইয়া, অশ্রুজলপূর্ণ লোচনে অর্দ্ধস্ফুট বচনে তাহাদিগকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ঋষিগণ! আপনারা আমার পূর্ব্ব পুরুষ, আমারই নাম জরৎকারু, আমি আপনাদিগের অপরাধী সন্তান, অতি পাপাত্মা ও অক্বভাত্মা, অতএব আপনারা আমার যথোচিত দণ্ডবিধান করুন এবং আজ্ঞা করুন, আপনাদিগের মঙ্গলের নিমিত্ত আমাকে কি করিতে হইবেক? পিতৃগণ কহিলেন, বৎস! তুমি আমাদিগের ভাগ্যবশতঃ যদৃচ্ছাক্রমে এই স্থানে উপস্থিত হইয়াছ। তোমাকে জিজ্ঞাসা করি, তুমি কি নিমিত্ত এ পর্যন্ত দারপরিগ্রহ কর নাই? জরৎকারু কহিলেন, হে পিতামহগণ? আমার বাসনা এই, আমি উৰ্দ্ধরেতাঃ হইয়া দেহ পরিত্যাগ করিব! আমি দারপরিগ্রহ করি না, এই আমার একান্ত ইচ্ছা এক্ষণে, আপনাদিগকে এই গর্তে পক্ষীর ন্যায় লম্বমান দেখিয়া, ব্রহ্মচর্য হইতে নিবৃত্ত হইলাম। আমি আপনাদিগের অভিপ্রেত সম্পাদনার্থে নিঃসন্দেই দারপরিগ্রহ করিব। যদি কখনও সনাম্নী কন্যা প্রাপ্ত হই, যদি সেই কন্যা বিনা প্রার্থনায় স্বয়ং উপস্থিত হয়, আর যদি তাহার ভরণ পোষণ করিতে না হয়, তবে তাহার পাণিগ্রহণ করিব। হে পিতামহগণ! আমি যথার্থ কহিতেছি, আপনাদিগের অনুরোধে আমি এই নিয়মে দারপরি গ্রহে সম্মত আছি, প্রকারান্তরে তদ্বিষয়ে প্রবৃত্ত হইব না। এই প্রকারে পরিণীতা ভার্যার গর্ভে আপনাদিগের উদ্ধারক সন্তান উৎপন্ন হইবেক, এবং আপনারাও অক্ষয় স্বর্গ লাভ করিবেন।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে শৌনক। জরৎকারু পিতৃগণকে এইরূপ কহিয়া ভূমণ্ডলে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন; কিন্তু বৃদ্ধ বলিয়া ভার্যালাভে কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। তখন তিনি নির্বিণ্ন মনে অরণ্যে প্রবেশ করিলেন, এবং পিতৃগণের হিসাধন মানসে কালভার্থে উচ্চৈঃস্বরে তিন বার এই বাক্য উচ্চারণ করিলেন, এই স্থলে যে সমস্ত স্থাবর জঙ্গম অথবা অদৃষ্ট প্রাণী আছে, তাহারা আমার বাক্য শ্রবণ করুক; আমি অতি কঠোর তপস্যায় কালযাপন করিতেছিলাম, কিন্তু আমার পূর্ব্ব পুরুষের অতিশয় কাতর হইয়া বংশরক্ষার্থে আমারে দারপরি গ্রহের আদেশ প্রদান করিয়াছেন, তদনুসারে আমি দারপরি গ্রহে কৃতসংকল্প হইয়া কন্যালভার্ধে সমস্ত ভূমণ্ডল ভ্রমণ করিয়াছি, আমি দরিদ্র ও দুঃখশীল, আমার উল্লিখিত প্রাণিসমুহের মধ্যে যদি কাহারও কন্যা থাকে, তিনি আমাকে প্রদান করুন, কিন্তু যে কন্যা সনাম্নী ও ভিক্ষা স্বরূপে উপনীত হইবেক, এবং আমাকে যাহার ভরণ পোষণের ভার গ্রহণ করিতে হইবেক না, আমাকে তোমরা এরূপ কন্যা প্রদান কর। বাসুকি যে সকল নাগকে জরৎকারুর অম্বেষণে নিযোজিত করিয়াছিলেন, তাঁহারা তাহার নিকটে গিয়া এই সংবাদ প্রদান করিল। নাগরাজ বাকি শ্রবণমাত্র আপন ভগিনীকে বস্ত্রালঙ্কারে ভূষিত করিয়া, অরণ্য প্রবেশ পূর্বক জরৎকারুসমীপে উপস্থিত হইয়া, তাঁহাকে ভিক্ষা স্বরূপে প্রদান করিলেন। কিন্তু সেই কন্যা সনাম্নী কি না ও তাহার ভরণ পোষণের ভার লইতে হইবেক কি না, এই সংশয়ে তৎপরিগ্রহে বিমুখ হইয়া তাহার নাম জিজ্ঞাসা করিলেন, এবং বাসুকিকে কহিলেন, যদি এই কন্যার পাণিগ্রহণ করি, আমি ভরণ পোষণ করিতে পারি না।
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
শৌনক কহিলেন, বৎস সূতনন্দন! তুমি মহাৰীর্য দুরাবর্ষ সৰ্পৰ্গণের নাম কীর্ত্তন করিলে শ্রবণ করিলাম, সর্পেরা মাতৃদত্ত শাপ শ্রবণানন্তর কি করিয়াছিল, বল।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাযশাঃ ভগবান্ শেষ নাগ, মাতৃসমীপ পরিত্যাগ পূর্বক জটাচীরধর, বায়ুভক্ষ, দৃঢ়ত, একাগ্রচিত্ত, ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া, গন্ধমাদন, বদরী, গোকর্ণ, পুষ্কর ও হিমালয় প্রভৃতি প্রসিদ্ধ পরম পবিত্র তীর্থে ও আশ্রমে ঘোরতর তপস্যা করিতে লাগিলেন। তপস্যা করিতে করিতে তাহার শরীরের মাংস, ত্বক ও শির! সকল শুষ্ক হইয়া গেল। সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মা শেষের অবিচলিত ধৈর্য্য ও তাদৃশী দশা দর্শন করিয়া কহিলেন, হে শেষ! তুমি এ কি করিতেছ? প্রজালোকের মঙ্গল চিন্তা কয়, তোমার কঠোর তপস্যা দ্বারা সকল লোক তাপিত হইতেছে; তোমার মনে কি অভিলাষ আছে? আমার নিকট ব্যক্ত কর। শেষ কহিলেন, আমার সহোদর ভ্রাতৃগণ অত্যন্ত দুরাশয়, আমি তাহাদিগের সহিত বাস করিতে অনিচ্ছু; আপনি এ বিষয়ে সম্মতি প্রদান করুন। তাহারা সতত শত্রুর স্যায় পরস্পর দ্বেষ করে; আর যেন তাহাদের মুখাবলোকন করিতে না হয়, এই অভিলাষে আমি তপস্যা করিতেছি। তাহারা অনবরত সপুত্র। বিদ্যার অহিতাচরণ করে। বিহগরাজ বৈনতেয় আমাদের আর এক ভ্রাতা আছেন; তিনি পিতৃদত্ত বর প্রভাবে অতিশয় বলবান্ হইয়াছেন। আমার ভ্রাতারা সর্ব্বদা তাঁহার বিদ্বেষ করে। অতএব আমি তপস্যা দ্বারা শরীর পরিত্যাগ করিব; বাসনা এই, যেন জন্মান্তরেও তাহাদের মুখাবলোকন করিতে না হয়।
এইরূপ শেষবাক্য শ্রবণ করিয়া পিতামহ কহিলেন, বৎস! আমি তোমার ভ্রাতৃগণের আচরণের বিষয় সকলই জানি; আর মাতৃশাপে তাহাদের যে মহৎ ভয় উপস্থিত হইয়াছে, তাহাও জানি। কিন্তু পূর্ব্বেই সেই শাপের পরিহার করা আছে। অতএব ভ্রাতৃগণের নিমিত্ত তোমার খেদ করিবার আবশ্যকতা নাই। এক্ষণে তুমি আমার নিকট অভিলষিত বর প্রার্থনা কর, অদ্য আমি তোমাকে বর প্রদান করিব। আমি তোমাকে অত্যন্ত স্নেহ করি। সৌভাগ্যক্রমে তোমার বুদ্ধি ধর্ম্মপঞ্চবর্তিনী হইয়াছে। প্রার্থনা করি, উত্তরোত্তর তোমার ধর্ম্মে অচল মতি হউক। শেষ কহিলেন, হে পিতামহ! এই মাত্র বর প্রার্থনা করি, যেন আমার মতি শম, তপ ও ধর্ম্মে সতত রত থাকে। ব্রহ্মা কহিলেন, আমি তোমার শম দম দর্শনে সাতিশয় প্রীত হইয়াছি। এক্ষণে আমি তোমাকে এক অনুরোধ করিতেছি, প্রজাদিগের হিতার্থে তোমাকে তাহা রক্ষা করিতে হইবেক। তুমি অরণ্য, গিরি, সাগর, গ্রাম, নগরাদি সমেত এই বিচলিত পৃথিবীকে এ রূপে ধারণ কর, যেন উহা অচলা হয়। শেষ কহিলেন, হে বরদ! প্রজাপতে! মহীপতে! ভূতপতে! জগৎপতে। আপনার আজ্ঞা প্রমাণ, আমি পৃথিবীকে নিশ্চল। করিয়া ধারণ করিব, আপনি আমার মস্তকে ন্যস্ত করুন। ব্রহ্মা কহিলেন, হে ভুজগরাজ! পৃথিবী তোমাকে পথ দিযেন, তদ্বারা তুমি তাহার অধোভাগে গমন কর। তুমি পৃথিবীকে ধারণ করিলে, আমি পরম পরিতোষ পাইব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, সর্পকুলা গ্রজ শেষ নাগ তথাস্তু বলিয়া ভূবিবরে প্রবেশ করিলেন। তদবধি তিনি এই সসাগরা ধরণীকে মস্তকে ধারণ করিয়া আছেন। এই রূপে প্রতাপবান্ ভগবান্ অনন্তদেব, দেবাদিদেব ব্রহ্মার আদেশানুসারে, একাকী বসুধা ধারণ করিয়া পাতালে অবস্থিতি করিতেছেন। সর্বদেবশ্রেষ্ঠ ভগবান্ পিতামহ বিনতাতনয় বিহগরাজ গরুড়ের সহিত অনন্তদেবের মৈত্রী স্থাপন করিয়া দিলেন।
ষট্পঞ্চাশ অধ্যায়
ষটৃপঞ্চাশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
জনমেজয় কহিলেন, এই ব্রাহ্মণকুমার বয়সে বালক হইয়াও বুদ্ধি ও জ্ঞানে বৃদ্ধবৎ প্রতীয়মান হইতেছেন। আমার মতে ইনি বালক নহেন, বৃদ্ধ। আমি ইহাকে অভিলষিত প্রদান করিতে ইচ্ছা করি। হে সদস্যগণ! আপনারা এ বিষয়ে যথাবিহিত আদেশ করুন। সদস্যগণ কহিলেন, ব্রাহ্মণ বালক হইলেও রাজাদিগের মহামান্য; যে ব্যক্তি বিদ্বান হন, তিনি বিশেষ মান্য। ইনি মহারাজের সর্ব্বপ্রকার বরদানপাত্র। কিন্তু নাগরাজ তক্ষক যাহাতে মন্ত্রবলে আকৃষ্ট হইয়া ত্বরায় আমাদের বশে আইসে, তাঁহাও চিন্তা করা কর্তব্য।
অনস্তর রাজা অভিলষিত দানে উদ্যত হইয়া, তুমি অভিপ্রেত বর প্রার্থনা কর, আস্তীককে ইহা কহিতে উপক্রম করিবামাত্র, হোতা অনতিহৃষ্ট, চিত্তে রাজাকে কহিলেন, মহারাজ! ভক্ষক এখনও আইসে নাই। জনমেজয় কহিলেন, যাহাতে আমার এই কর্ম্ম সমাপন হয়, এবং যাহাতে তক্ষক শীঘ্র আইসে, আপনারা সকলে তদ্বিষয়ে বিশিষ্টরূপ যত্নবান হউন, তক্ষক আমার পরম শত্রু। ঋত্বিকগণ কহিলেন, মহারাজ। শাস্ত্রে যেরূপ কহিতেছে, এবং যজ্ঞীয় হুতাশন যেরূপ ব্যক্ত করিতেছেন, তদ্দারা বোধ হইতেছে, তক্ষক প্রাণভয়ে কাতর হইয়া ইন্দ্রভবনে অবস্থিতি করিতেছে।
লোহিতনয়ন পুরাণবেত্তা মহাত্মা সূত পূর্ব্বে যজ্ঞায়তন নির্মাণকালে বিপ্লসম্ভাবনা কহিয়াছিলেন। এক্ষণেও নরপতি কর্ত্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া কহিলেন, মহারাজ! বিপ্রগণ যাহা কহিতেছেন, তাহা যথার্থ বটে। পুরাণ শাস্ত্রে যেরূপ নির্দিষ্ট আছে, তদনুসারে নিবেদন করিতেছি, দেবরাজ ইন্দ্র তক্ষককে অভয়দান করিয়াছেন; কহিয়াছেন, তুমি আমার নিকটে খাক, অগ্নি তোমাকে দগ্ধ করিতে পারিবেন না।
সর্পসত্রদীক্ষিত রাজা শুনিয়া সাতিশয় ক্ষুব্ধ হইলেন, এবং হোতাকে কর্ম্ম সমাপন বিষয়ে সত্বর হইবার নিমিত্ত বারংবার কহিতে লাগিলেন। হোতাও মন্ত্রোচ্চারণ পূর্ব্বক তক্ষককে আহ্বান করিতে লাগিলেন। অনন্তর মহানুভাব দেবরাজ বিমানারোহণ পূর্ব্বক নভোমণ্ডলে উপস্থিত হইলেন। জলধরগণ, বিদ্যাধরগণ ও অপ্সরাগণ তাঁহার সমভিব্যাহারে অসিল। দেবগণ তাঁহার চতুর্দ্দিকে দণ্ডায়মান হইয়া স্তব করিতে লাগিলেন। নাগরাজ তক্ষক তাঁহার উত্তরীয় বস্ত্রে বদ্ধ ছিল, সে ভয়ে উদ্বিগ্ন হইয়া অত্যন্ত অসুখে কালহরণ করিতে লাগিল।
রাজা তক্ষকের প্রাণদণ্ড করিবার নিমিত্ত একান্ত অধ্যবসায়ারূঢ় হইয়াছিলেন, অতএব ক্রোধাবিষ্ট হইয়া পুনর্ব্বার ঋত্বিগ্দিগকে কহিলেন, হে বিপ্রগণ! যদি তক্ষক ইন্দ্রের ভবনে থাকে, তবে তাহাকে ইন্দ্রসহিত হুতাশনে পাতিত করুন। হোতা রাজা জনমেজয়ের এইরূপ আদেশ পাইয়া, ইন্দ্রসহিত তক্ষককে উদ্দেশ করিয়া আহুতি প্রদান করিলেন। তিনি এই রূপে আহুতি প্রদান করিলে নভোমগুলে দৃষ্ট হইল, ইন্দ্র ও তক্ষক উভয়ে অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়াছেন। তথা হইতে যজ্ঞ দর্শন করিয়া ইন্দ্র যৎপরোনাস্তি ভীত হইলেন, এবং তক্ষককে পরিত্যাগ করিয়া আপন আলয়ে পলায়ন করিলেন।
এই রূপে দেবরাজ পলায়ন করিলে পর, তক্ষক ভয়ে অচেতন ও অনায়ত্ত হইয়া মন্ত্রপ্রভাবে যজ্ঞীয় অগ্নিশিখা সন্নিধানে উপস্থিত হইল। তখন ঋত্বিক্গণ কহিলেন, মহারাজ! আপনার কর্ম্ম বিধি পূর্ব্বক সম্পন্ন হইল, এখন আপনি ব্রাহ্মণকে বরদান করিতে পারেন। অনন্তর জনমেজয় আস্তীককে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে অপ্রমেয়প্রভাব ব্রহ্মবীর্য্যসম্পন্ন ব্রাহ্মণকুমার! আমি তোমাকে অভিলষিত প্রদান করিব, তুমি অভিপ্রেত বর প্রার্থনা কর, যদি তাহা অদেয় হয়, তথাপি দান করিব। এই সময়ে ঋত্বিক্গণ কহিলেন, মহারাজ! ঐ দেখ! তক্ষক তোমার বশে আসিতেছে, তাহার ভয়ঙ্কর গর্জন শুনা যাইতেছে। নিশ্চিত বোধ হইতেছে, ইন্দ্র তাহাকে পরিত্যাগ করিয়াছেন। তাহাতেই মন্ত্রবলে বিকলাঙ্গ বিচেতন ও ঘূর্ণমান হইয়া দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে করিতে আসিতেছে।
নাগরাজ তক্ষক হুতাশনে পতিত হয়, এমন সময়ে অবসর বুঝিয়া আস্তীক কহিলেন, রাজন্ জনমেজয়! যদি আমাকে বর দেওয়া অভিমত হয়, তাহা হইলে আমি এই প্রার্থনা করি, তোমার এই যজ্ঞ রহিত হউক, এবং সর্পগণ যেন আর এই যজ্ঞীয় হুতাশনে পতিত না হয়। রাজা এই রূপে প্রার্থিত হইয়া অনতিহৃষ্ট মনে আস্তীককে কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! স্বর্ণ, রজত, গো, অথবা আর যাহা কিছু প্রার্থনা কর, তাহা তোমাকে দিতেছি, আমার যজ্ঞ রহিত করিও না। আস্তীক কহিলেন, রাজন্! আমি তোমার নিকট স্বর্ণ, রজত, অথবা গোধন প্রার্থনা করি না, আমার এই মাত্র প্রার্থনা, তোমার যজ্ঞ রহিত হউক, তাহা হইলে আমার মাতৃকুলের মঙ্গল হয়। জনমেজয় এইরূপ অভিহিত হইয়া পুনঃ পুনঃ কহিতে লাগিলেন, হে দ্বিজকুলশ্রেষ্ঠ! তুমি অন্য বর প্রার্থনা কর। কিন্তু তিনি কোনও মতেই অন্য বর প্রার্থনা করিলেন না। তখন বেদজ্ঞ সদস্যবর্গ সকলে মিলিয়া রাজাকে কহিলেন, মহারাজ! ব্রাহ্মণকে প্রার্থিত বর প্রদান কর।
ষড়্বিংশ অধ্যায়
ষড়বিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভগবান্ পাকশাসন কদ্রুকৃত স্তব শ্রবণ করিয়া নীল জলপটল দ্বারা নভোমণ্ডল আচ্ছাদিত করিলেন, এবং জলদগণকে এই আদেশ দিলেন, তোমরা শুভ বারিবর্ষণ কর। জলদের, দেবরাজের আদেশ প্রাপ্তি মাত্র, সৌদামনীমণ্ডল দ্বারা অলঙ্কৃত ও উজ্জ্বল হইয়া, আকাশমণ্ডলে অনবরত ঘন ঘের গর্জন করত তোয়ৱাশি বর্ষণ করিতে লাগিল। জলধরগণের অভূতপূর্ব প্রভূত বারিবর্ষ, অজস্র ঘোরতর গর্জন, প্রবল বাত্যাবইন, ও অনবরত বিদ্যুৎকম্পন দ্বারা নভোমণ্ডলে যেন প্রলয়কাল উপস্থিত হইল। জলধরগণ অবিশ্রান্ত জলধারা বর্ষণ করাতে চন্দ্র ও সূর্য এক বারে তিরোহিত হইলেন। নাগগণ যৎপয়োনাস্তি হর্ষ প্রাপ্ত হইল, ভূমণ্ডল সলিলভারে সমস্তত্বঃ পরিপূর্ণ হইল, শীতল বিমল জল রসাতলে প্রবিষ্ট হইল, পৃথিবী জলতরঙ্গে অপ্লাবিত হইল, এবং সর্পেরা মাতৃ সমভিব্যাহারে রামণীয়কদ্বীপে উত্তীর্ণ হইল।
পাকনামক অসুরের শাসনকর্তা, ইন্দ্র।
ষষ্টিতম অধ্যায়
ষষ্টিতম অধ্যায়-ভারতসূচনা।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, ভগবান্ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন রাজা জনমেজয়কে সর্পসত্রে দীক্ষিত শ্রবণ করিয়া যজ্ঞক্ষেত্রে উপস্থিত হইলেন। যে পাণ্ডবপিতামহ মহাপুরুষ যমুনাদ্বীপে শক্ত্রিপুত্র পরাশরের ঔরসে সত্যবতীর কন্যাবস্থাতেই তদীয় গর্ভে জন্মগ্রহণ কবিয়াছিলেন; যিনি জাতমাত্র স্বেচ্ছাক্রমে দেহ বৃদ্ধি করিয়াছিলেন; যিনি অঙ্গসহিত সমস্ত বেদ ও সমস্ত ইতিহাস অধ্যয়ন করিয়াছিলেন; তপস্যা, বেদাধ্যয়ন, ব্রত, উপবাস, পুত্রোৎপাদন ও যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা কেহ যাঁহার তুল্য হইতে পারেন নাই; যে অদ্বিতীয় বেদবেত্তা, সর্বজ্ঞ, সচ্চরিত্র, সত্যপরায়ণ, কবি, ব্রহ্মর্ষি এক বেদকে চতুর্ভাগে বিভক্ত করিয়াছিলেন; যে পবিত্রকীর্ত্তি মহাযশস্বী মহাপুরুষ শান্তনুর বংশরক্ষার্থে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুরকে জন্ম দিয়াছিলেন, সেই মহাত্মা বেদবেদাঙ্গপারগ শিষ্যগণসমভিব্যাহাবে রাজর্ষি জনমেজয়ের যজ্ঞক্ষেত্রে প্রবেশ করিলেন; দেখিলেন, রাজা বহুসংখ্যক সদস্য, নানাদেশীয় নরপতিগণ, এবং যজ্ঞানুষ্ঠাননিপুণ প্রজাপতিতুল্য ঋত্বিক্গণে পরিবৃত হইয়া উপবিষ্ট আছেন।
ভরতকুলপ্রদীপ রাজর্ষি জনমেজয় মহর্ষিকে সমাগত দেখিয়া সত্বর হইয়া, স্বগণসমভিব্যাহারে প্রত্যুদগমন পূর্ব্বক বসিবার নিমিত্ত কাঞ্চননির্ম্মিত আসন প্রদান করিলেন। দেবগণ ও ঋষিগণের পূজনীয় মহর্ষি উপবিষ্ট হইলে, রাজা শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে তাঁহার পূজা করিলেন; প্রথমতঃ পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয় প্রদান করিয়া, পরিশেষে মধুপর্কোক্তবিধানে এক গো নিবেদন করিয়া দিলেন। ব্যাসদেব জনমেজয়ের পূজা গ্রহণ করিয়া সাতিশয় প্রীত হইলেন, এবং নিরপরাধে গোবধ করা বিধেয় নহে, এই বলিয়া উহার প্রাণবধ নিবারণ করিলেন।
রাজা, এই রূপে প্রপিতামহের পূজা সমাধান করিয়া প্রীত মনে তৎসমীপে উপবেশন পুরঃসর তাঁহাকে কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। ভগবান্ও আত্মকুশল নিবেদিলেন। পরে সমুদায় সদস্যগণ তাঁহার স্তব করিলেন; তিনিও তাঁহাদের যথোচিত সমাদর করিলেন। অনন্তর জনমেজয়, সমস্ত সদস্যগণসহিত কৃতাঞ্জলি হইয়া, এই জিজ্ঞাসা করিলেন, ভগবন! আপনি কৌরব ও পাণ্ডবদিগের বৃত্তান্ত প্রত্যক্ষ দেখিয়াছেন; অতএব আমার একান্ত বাসনা এই, আপনি তাঁহাদের চরিত কীর্তন করেন। আমার পিতামহেরা রাগদ্বেষাদিশূন্য ছিলেন, তথাপি কি নিমিত্ত তাদৃশ বিবাদ ও তাদৃশ সর্ব্বসংহারকারী মহাযুদ্ধ ঘটিয়াছিল, আপনি কৃপা করিয়া এই সকল বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত বর্ণন করুন।
ভগবান কৃষ্ণদ্বৈপায়ন তাঁহার সেই প্রার্থনা শ্রবণ করিয়া সমীপোপাপবিষ্ট স্বীয় শিষ্য বৈশম্পায়নকে এই আদেশ করিলেন, পূর্ব্বে কৌরব ও পাণ্ডবদিগের যে রূপে আত্মবিচ্ছেদ ঘটিয়াছিল, তাহা আমার নিকট তুমি যেরূপ শুনিয়াছ, সেই সমস্ত ইঁহাকে শ্রবণ করাও। বৈশম্পায়ন গুরুদেবের আদেশ পাইয়া, রাজা সদস্যবর্গ ও অন্যান্য নৃপতিগণের নিকট কুরুপাণ্ডবের গৃহবিচ্ছেদ ও কুলক্ষয় সংক্রান্ত পুরাতন ইতিহাস আদ্যোপান্ত কীর্ত্তন করিতে আরম্ভ করিলেন।
ষষ্ঠ অধ্যায়
ষষ্ঠ অধ্যায়— পৌলোমপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবা কহিলেন, রাক্ষস অগ্নির এইরূপ বাক্য শুনিয়া বরাহরূপ ধারণ পূর্ব্বক ভৃগুপত্নীকে হরণ করিয়া অদ্ভুত বেগে পলায়ন করিল। তখন পুলোমার গর্ভস্থ বালক পাপাত্মা রাক্ষসের অত্যাচার দর্শনে রোষপরবশ হইয়া মাতৃগর্ভ হইতে চ্যুত হইলেন, তাহাতেই তাঁহার নাম চ্যবন হইল। রাক্ষস সেই সূর্য্যতুল্য তেজস্বী মাতৃগর্ভবিনিঃসৃত শিশুকে নয়নগোচর করিবামাত্র পুলোমা পরিত্যাগ পূর্ব্বক ভস্মসাৎ হইয়া ভূতলে পতিত হইল।
অনন্তর পুলোনা, ভৃগুর ঔরস পুত্র চ্যবনকে ক্রোড়ে করিয়া সর্বদুঃখবিনিমুক্তা হইয়া, অমুখে আশ্রমাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। ভগবান্ ব্রহ্ম সর্ব্বলোক প্রশংসিত। ভৃগুভার্য্যাকে রোদনপরায়ণ ও অপূর্ণনয়না অবলোকন করিয়া তৎসমীপে আগমন পূর্ব্বক অশেষ প্রকারে সান্ত্বনা করিলেন। নিতান্ত দুঃখিতা ভূগুপত্নী রোদন করিতে করিতে যেমন প্রস্থান করিতে লাগিলেন, তাঁহার অশ্রুবিন্দু বর্ষণ দ্বারা এক মহানদী উৎপন্ন হইল। ভগবান্ প্রজাপতি সেই নদীকে পুত্রবধূর অনুসরণে প্রবৃত্ত দেখিয়া তাহার নাম বধূসরা রাখিলেন। প্রতাপশালী ভৃগুপুত্র চ্যবন নামে বিখ্যাত হইবার এই কারণ।
পুলোমা পুত্রকে ক্রোড়ে লইয়া এই রূপে আশ্রমাভিমুখে আগমন করিতেছেন, এমন সময়ে মহর্ষি ভৃগু স্নানক্রিয়া হইতে প্রত্যাবৃত্ত হইয়া স্বীয় সহধর্শিণী ও তনয়কে তদস্থ অবলোকন করিয়া, কোপাকুল চিত্তে পুলোমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে চারুহাসিনি! হরণেন্থিত দুরাত্মা রাক্ষসের নিকট কে তোমার পরিচয় দিল? সে পাপিষ্ঠ তোমাকে আমার ভার্য্য বলিয়া জানি না। তুমি সবিশেষ সমস্ত বল; অমি এখনি তাহাকে শাপ দিতেছি। কোন্ ব্যক্তি আমার শাপে ভীত নহে? কাহার এই দুষ্ট কর্ম্ম করিতে সাহস হইল?
এই রূপে স্বামিকর্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া পুলোমা নিবেদন করিলেন, ভগবন্। অগ্নি সেই রাক্ষসের নিকট আমার পরিচয় প্রদান করেন, তৎপরে সেই পাপাত্মা আমাকে হরণ করে। আমি অনাথার ন্যায় উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলাম; পরে তোমার এই পুত্রের প্রভাবে রাক্ষসের হস্ত হইতে মুক্ত হইয়াছি; দুরাত্মা নিশাচর ইহার তেজে ভস্মীভূত হইয়া ভূতলে পতিত হইল। ভৃগু পুলোমাবাক্যশ্রবণে অতিক্রুদ্ধ হইয়া, তুমি সর্ব্বভক্ষ হইবে, এই বলিয়া অগ্নিকে শাপ প্রদান করিলেন।
ষোড়শ অধ্যায়
ষোড়শ অধ্যায়—আস্তীকপর্ব্ব।
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি যাহা বর্ণন করিলে, পুনর্ব্বার তাহারই বিস্তারিত বর্ণনা কর, আস্তীকের সবিস্তর বৃত্তান্ত শ্রবণে আমাদিগের মহীয়সী বাসনা জন্মিয়াছে। তুমি যাহা কীর্ত্তন করিতেছ, তাহা অতি ললিত ও মধুর বোধ হইতেছে; আমরা শুনিয়া পরম পরিতোষ পাইতেছি। তুমি পুরাণ কীর্ত্তন বিষয়ে আপন পিতার ন্যায় পাণ্ডিত্য প্রকাশ করিতেছ। তোমার পিতা যেমন অনন্যমনাঃ ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া আমাদিগকে সম্পূর্ণরূপে পুরাণ শ্রবণ করাইয়াছিলেন, এক্ষণে তুমিও সেইরূপ শ্রবণ করাও।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে মহাভাগ! আমি আপন পিতার নিকট আস্তীকোপাখ্যান যেরূপ শ্রবণ করিয়াছি, আপনার নিকট অবিকল সেইরূপ কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন।
সত্যযুগে কদ্রু ও বিনতা নামে দক্ষ প্রজাপতির দুই সুলক্ষণা পরম সুন্দরী কন্যা ছিলেন। ঐ দুই ভগিনীর কশ্যপের সহিত বিবাহ হয়। মহাত্মা কশ্যপ সেই দুই ধর্ম্মপত্নীর প্রতি প্রসন্ন হইয়া বর প্রদান করিলেন। তাঁহারাও কশ্যপের নিকট স্ব স্ব অভিলাষানুরূপ বর প্রাপ্ত হইয়া সাতিশয় হর্ষ ও পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন। কদ্রু তুল্যতেজস্বী সহস্র নাগ পুত্র প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু বিনতা এই বর লইলেন যে, আমার দুইটি মাত্র পুত্র হউক, কিন্তু তারা যেন কদ্রুর সহস্র পুত্র অপেক্ষা বলে, বিক্রমে, ও কলেবরে শ্রেষ্ঠ হয়। কশ্যপ তাঁহাকে উক্ত অভিলষিত পবিত্র বর প্রদান করিলেন। বিনতা স্বামীর নিকট যথাপ্রার্থিত বর লাভ করিয়া সাতিশয় সন্তুষ্টা ও চরিতার্থা হইলেন। কদ্রুও তুল্যবল সই পুত্র লাভ দ্বারা আপনাকে কৃতার্থ জ্ঞান করিলেন। মহাতপাঃ কশ্যপ পত্নীদিগকে, তোমরা যত্ন পূর্ব্বক গর্ভধারণ করিবে, এই উপদেশ দিয়া বন প্রবেশ করিলেন।
বহুকাল অতীত হইলে পর, কদ্রু অণ্ডসহস্র ও বিনতা অণ্ডদ্বয় প্রসব করিলেন। পরিচারিকাগণ তাঁহাদিগের প্রসূত অণ্ড সমুদার উপস্বেদসম্পন্ন ভাণ্ড মধ্যে পঞ্চশত বর্ষ স্থাপন করিল। তদনন্তর কদ্রুপ্রসূত অণ্ডসহস্র মধ্য হইতে এক এক পুত্র নির্গত হইল; কিন্তু বিনতাপ্রসূত অণ্ড তদবস্থই রহিল। পুত্রার্থিনী দীনা বিনতা, তদ্দর্শনে লজ্জিত হইয়া, কালবিলম্ব সহিতে না পারিয়া, স্বপ্রসূত অণ্ডদ্বয়ের অন্যতর ভেদন পূর্ব্বক দেখিলেন, পুত্রের শরীরের পূর্ব্বাৰ্দ্ধমাত্র যথাবৎ সংঘটিত হইয়াছে, অন্যার্দ্ধ কিঞ্চিন্মাত্রও সংঘটিত হয় নাই। তখন সেই পুত্র ক্রোধে অন্ধ হইয়া স্বীয় জননীকে এই শাপ দিলেন, মাতঃ! তুমি লোভপরবশ হইয়া, শরীর সম্পূর্ণ সংঘটিত না হইতেই, আমাকে অকালে অণ্ড হইতে বহিস্কৃত করিলে; অতএব তুমি যে সপত্নীর সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতেছ, পঞ্চশত বৎসর তাহার দাসী হইয়া থাকিবে। অপর অণ্ডমধ্যে তোমার যে পুত্র আছে, যদি তাহাকেও আমার মত অকালে বহিস্কৃত করিয়া অঙ্গহীন অথবা বিকলাঙ্গ না কর, তবে সে তোমার দাসীভাব মোচন করিবেক। যদি তুমি পুত্রের বিশিষ্ট বল বিক্রম বাসনা কর, তবে ধৈর্য্য অবলম্বন করিয়া ইহার জন্মকাল প্রতীক্ষা কর; ইহার জন্মের আর পাঁচ শত বৎসর বিলম্ব আছে।
অরুণ, জননীকে এইপ্রকার শাপপ্রদানের পর, অন্তরীক্ষে আরোহণ করিয়া সূর্যয়দেবের রথের সারথি হইলেন। এই নিমিত্ত সর্ব্ব কাল প্রভাত সময়ে অরুণকে দেখিতে পাওয়া খায়। সপভোজী গরুড়ও যথাকালে জন্মগ্রহণ করিলেন। তিনি জাতমাত্র ক্ষুধার্ত্ত হইয়া, বিধাতৃবিহিত স্বীয় ভোজ্য বস্তু আহরণার্থে, বিনতাকে পরিত্যাগ করিয়া নভোমণ্ডলে গমন করিলেন।
সপ্তচত্বারিংশ অধ্যায়
সপ্তচত্বারিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগরাজ বাসুকি মহর্ষি জরৎকারুকে কহিলেন, হে মুনিবর! আমার ভগিনী তোমার সনাম্নী বটেন, ইহারও নাম জরৎকারু। ইনি তোমার মত তপস্যায় রত। তুমি ইহাকে সহধর্মিণী রূপে পরিগ্রহ কর, আমি অঙ্গীকার করিতেছি, যাবজ্জীবন প্রাণপণে ইহার ভরণ, পোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করিব। আমি তোমারে দান করিবার নিমিত্তই এত দিন ইহারে অবিবাহিত রাখিয়াছি। ঋষি কহিলেন, তবে এই নিয়ম স্থির হইল, আমি ইহার ভরণ পোষণ করিব না। আর, ইনি কখনও আমার অপ্রিয় কর্ম্ম করিবেন না, করিলেই পরিত্যাগ করিব।
নাগরাজ, ভগিনীর ভরণ পোষণ করিব, এই অঙ্গীকার করিলে পর, ধর্ম্মাত্মা জরৎকারু তদীয় অলিয়ে গমন পূর্বক যথাবিধানে নাগরাজভগিনীর পাণিগ্রহণ করিলেন। তদ্দর্শনে মহর্ষিগণ হর্ষিত মনে তাহার স্তব করিতে লাগিলেন। তদনন্তর জরৎকারু সহধর্ম্মিণীসমভিব্যাহারে বাসগৃহে প্রবেশ পূর্বক পরিকল্পিত পরম রমণীয় শয্যায় শয়ন করিলেন। তথায় তিনি পত্নীর সহিত এই নিয়ম করিয়া বাস করিতে লাগিলেন, তুমি কদাচ অপ্রিয় বাক্য কহিবে না ও অপ্রিয় কর্ম্ম করিবে না, করিলেই তোমাকে পরিত্যাগ করিব, এবং আর তোমার আবাসে অবস্থিতি করিব না; যাহা কহিলাম, স্মরণ করিয়া রাখিবে। নাগরাজভগিনী, স্বামিবাক্য শ্রবণে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। ও দুঃখিত হইয়া, তথাস্তু বলিয়া অঙ্গীকার করিয়া লইলেন, এবং অতিসাবধানে ও অতিকষ্টে স্বামীর পরিচর্য্যা করিতে লাগিলেন।
কিয়ৎ দিন পরে জরৎকারুর গর্ভাধানকাল উপস্থিত হইলে, তিনি যথাবিধানে স্বামিসেবায় প্রবৃত্ত হইলেন। অনন্তর তিনি জ্বলন্তঅনলতুল্য তেজস্বী গর্ভ ধারণ করিলেন। সেই গর্ভ শুক্লপক্ষীয় শশধরের ন্যায় দিন দিন বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতে লাগিল। কতিপয় দিবস অতীত হইলে, একদা মহাযশস্বী জরৎকারু মুনি নিতান্ত ক্লান্তের ন্যায় নাগভগিনী জরৎকারুর ক্রোড়দেশেমস্তক ন্যস্ত করিয়া নিদ্রাগত হইলেন। বহু ক্ষণ অতীত হইল, তথাপি তাহার নিদ্রাভঙ্গ হইল না, সূর্যদেব অস্তচলশিখরে আরোহণ করিলেন। সায়ংকাল উপস্থিত হইল। মনস্বিনী বাসুকিভগিনী, স্বামীর সায়ংকালীন সন্ধ্যাবন্দনাদি বিধির অতিক্রমনিমিত্তক ধৰ্মলোপদর্শনে সাতিশয় শঙ্কিত হইয়া, ভাবিতে লাগিলেন, এক্ষণে আমার কি কর্তব্য, ইহার নিদ্রা ভঙ্গ করি কি না? ইনি অত্যন্ত উগ্রস্বভাব, যদি ইহার নিদ্রাভঙ্গ করি, নিঃসন্দেহ কোপ করিবেন। নিদ্রা ভঙ্গ না করিলে সন্ধ্যার সময় বহিয়া যায়, তাহাতে ধর্ম্মলোপ হয়। এক্ষণে কি করিলে আমি পরাধিনী না হই, বুঝিতে পারিতেছি। কিন্তু কোপ ও ধর্ম্মশীলের ধর্মলোপ, এই উভয়ের মধ্যে ধর্ম্মলোপ সমধিক দোষাবহ। অতএব যাহাতে ধর্ম্মলোপ নিবারণ হয়, তাহাই কর্তব্য।
মনে মনে এইরূপ নিশ্চয় করিয়া, মধুরভাষিণী বাসুকিভগিনী সেই জ্বলন্তঅনল প্রায় প্রদীপ্ততেজাঃ নিদ্রিত মহর্ষিকে সম্বোধন করিয়া বিনয়বচনে কহিলেন, মহাভাগ! সূর্য্য অস্তগত হইতেছেন, গাত্রোত্থান পূর্বক অচিমন করিয়া সন্ধ্যোপাসনা কর। অগ্নিহোত্রের সময় উপস্থিত, পশ্চিম দিকে সন্ধ্যা প্রবৃত্ত হইতেছে। মহাতপাঃ ভগবান্ জরৎকারু, স্বীয় সহধর্মিণীর বাক্য শ্রবণে কোষপরবশ হইয়া কহিলেন, হে ভুজঙ্গমে! তুমি আমার অবমাননা করিলে, আর আমি তর সমীপে অবস্থিতি করিব না, অতঃপর স্বস্থানে প্রস্থান করিব। আমার স্থির সিদ্ধান্ত আছে, আমি নিদ্রাগত থাকিতে সূর্যদেবের সামর্থ্য কি যথাকালে অস্তুগমন করেন। সামান্য ব্যক্তিও অবমানিত হইলে অবমাননাস্থলে বাস করিতে পারে না; আমার অথবা মাদৃশ ধর্ম্মশীল ব্যক্তির কথাই নাই।
জরৎকার, স্বামীর এইরূপ হৃদয়কম্পকর বাক্য শ্রবণে সাতিশয় ভীত হইয়া, নিবেদন করিলেন, ভগবন্! তোমার ধর্ম্মলোপ হয়, এই ভয়ে আমি তোমার নিদ্রাভঙ্গ করিয়াছি, অবমাননার অভিসন্ধিতে করি নাই। তখন মহাতপাঃ জরৎকারু ঋষি সাতিশয় কোপাবিষ্ট ও ভার্য্যাত্যাগাভিলাষী হইয়া কহিলেন, হে ভুজঙ্গমে। আমার বাক্য মিথ্যা হইবার নহে, আমি অবশ্যই প্রস্থান করিব। পূর্ব্বে বাসগৃহে তোমার সহিত এই নিয়ম করিয়াছিলাম। যাহা হউক, যত দিন ছিলাম, সুখে ছিলাম, এক্ষণে চলিলাম। তোমায় ভ্রাতাকে বলিও, মুনি চলিয়া গিয়াছেন। আর, আমি প্রস্থান করিলে পর, তুমিও শোকাকুল হইও না।
এইরূপ স্বামিবাক্য শ্রবণে জরৎকারুর সহসা মুখশোষ ও হৃদয়কম্প হইল। পরিশেষে ধৈর্য্য অবলম্বন করিয়া অপূর্ণ লোচনে গদগদ বচনে কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, হে ধর্ম্মজ্ঞ! তোমার আমাকে পরিত্যাগ করা উচিত নহে। দেখ, আমি কখনও কোনও অপরাধ করি নাই। সদা ধর্ম্মপথে আছি, নিয়ত তোমার প্রিয় কর্ম্ম ও হিতচিন্তা করিয়া থাকি। যে ফলোদ্দেশে ভ্রাতা আমাকে তোমায় দান করিয়াছেন, আমি মন্দভাগিনী, অদ্যাপি তাহা লাভ করি নাই। অতএব ভ্রাতা আমাকে কি কহিবেন? আমার জ্ঞাতিবর্গ মাতৃশাপে অভিভূত হইয়া আছেন। তাঁহাদের অভিলাষ এই, তোমার ঔরসে আমার এক পুত্র জন্মে। কিন্তু অদ্যাপি তাহা সম্পন্ন হয় নাই। তোমার ঔরসে পুত্র জন্মিলে তাঁহাদের শাপ বিমোচন হইবে। তাহা হইলেই তোমার সহিত আমার পাণিগ্রহণের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। অতএব হে মহাত্মন! জ্ঞাতি কুলের হিতাকাঙ্ক্ষিণী হইয়া প্রার্থনা করিতেছি, প্রসন্ন হও। এই অব্যক্ত গর্ভ আধান করিয়া বিনা অপরাধে কি রূপে আমারে পরিত্যাগ করিয়া যাইতে চাই। স্বীয় সহধর্মিণীর এইরূপ কাতরোক্তি শ্রৰণ করিয়া মহর্ষি পঁহাকে এই যুক্তিযুক্ত উপযুক্ত বাক্য কহিলেন, হে সুভাগে! তোমার এই গর্ভে এক পরম ধর্ম্মাত্মা বেদবেদাঙ্গপারগ অনলতুল্য তেজস্বী ঋষি জন্মিয়াছেন। এই বলিয়া জরৎকারু পুনর্বার কঠোর তপস্যার অনুষ্ঠানে কৃতনিশ্চয় হইয়া অরণ্য প্রবেশ করিলেন।
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাকুলশ্রেষ্ঠ বাসুকি মাতৃদত্ত শাপ শ্রবণনন্তর সেই শাপমোচনের উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন। তৎপরে তিনি ঐরাবত প্রভৃতি ধর্ম্মপরায়ণ সমস্ত ভ্রাতৃগণের সহিত মন্ত্রণা আরম্ভ করিলেন। বাসুকি কহিলেন, হে ভ্রাতৃগণ! জননী আমাদিগকে যে শাপ দিয়াছেন, তাহা তোমরা সকলেই বিদিত অছি। আইস, সকলে মিলিয়া সেই শাপমোচনের উপায় চিন্তা করি। সর্বপ্রকার শাপেরই অন্যথা হইবার উপায় আছে; কিন্তু মাতৃদত্ত শাপ হইতে পরিত্রাণের কোনও পথ নাই। বিশেষত, জননী অবিনাশী, অপ্রমেয়স্বরূপ, সত্যলোকাধিপতি ব্রহ্মার সমক্ষে আমাদিগকে শপ দিয়াছেন, ইহাতেই আমার হৃৎকম্প হইতেছে। নিশ্চিত বুঝিলাম, আমাদের সমূলে বিনাশ উপস্থিত; নতুবা কি নিমিত্ত অবিনাশী ভগবান শাপদানকালে জননীকে নিবারণ করিলেন না? অতএব, যাহাতে সমস্ত নাগকুলের ভাবী বিপন্ হইতে পরিত্রাণ হয়, আইস, সকলে একত্র হইয়া তাহার উপায় চিন্তা করি; কোনও ক্রমেই কালাতিপাত করা উচিত নহে। আমরা সকলেই বুদ্ধিমান্ ও বিচক্ষণ; মন্ত্রণা করিয়া অবশ্যই শাপমোক্ষের কোনও উপায় উদ্ভাবিত করিতে পারি। দেখ! পূর্ব্ব কালে ভগবান্ অগ্নি অন্তর্হিত হইয়াছিলেন, কিন্তু দেবতারা মন্ত্রণাৰলে ভঁহার উদ্ভাবন করেন। এক্ষণে যাহাতে জনমেজয়ের সর্পস না হইতে পায়, অথবা বিফল হইয়া যায়, এমন উপায় করিতে হইবেক।
এইরূপ বাসুকিবাক্য শ্রবণ করিয়া, নীতিবিশারদ সমবেত কনন্দনের। তথাস্তু বলিয়া উপস্থিত কার্য্য সাধন বিষয়ে প্রতিজ্ঞা করিল। তন্মধ্যে কোনও কোনও নাগ কহিল, আমরা ব্রাহ্মণের স্বরূপ পরিগ্রহ করিয়া জনমেজয়ের নিকট এই ভিক্ষা চাহিব যে, তুমি যজ্ঞ করিও না। কতকগুলি পণ্ডিভিমানী নাগ কহিল, চল, সকলে গিয়া তাহার মন্ত্রী হই, তাহা হইলে তিনি সকল বিষয়েই কার্যাকার্য নিরূপণের নিমিত্ত অম!দিগকে জিজ্ঞাসা করিবেন;, তখন আমরা যাহাতে যজ্ঞ না হইতে পায়, এরূপ পরামর্শ দিব। সেই অসাধারণ বুদ্ধিমান রাজা আমাদিগকে নীতিবিদ্যাবিশারদ দেখিয়া অবশ্যই যজ্ঞ। বিষয়ে মত জিজ্ঞাসা করিবেন। আমরা ঐহিক ও পারলৌকিক অশেষ বিষম দোষ দৰ্শাইয় ও অপরাপর ভূরি ভূরি কারণ নির্দেশ করিয়া, এ রূপে নিষেধপক্ষে মত দিব যে, আর সে মত্ত হইতে পাইবেক না। অথবা যে সৰ্পৰ্ষত্রবিধান রাজকার্যতৎপর ব্যক্তি সেই যজ্ঞের উপাধ্যায় হইবেন, আমাদের মধ্যে কোনও নাগ গিয়া তাঁহাকে দংশন করুক, তাহা হইলেই উহার মৃত্যু হইবেক। এই রূপে উপাধ্যায় মরিলে আর সে যজ্ঞ হইবেক না। তদ্ভিন্ন সর্পসত্রজ্ঞ আর আর যে সকল ব্যক্তি যজ্ঞের ঋত্বিক হইবেন, তাহাদিগকেও দংশন করিব; তাহা হইলেই কার্য্য সিদ্ধ হইবেক। ইহা শুনিয়া অন্যান্স ধর্মাত্মা দয়ালু নাগ কহিল, এ তোমাদের অতি অসৎ পরামর্শ, ব্রহ্মহত্যা কোনও ক্রমেই বিধেয় নহে, বিপৎকালে নির্ম্মলধর্ম্মমূলক প্রতীকার চিন্তা করাই প্রশস্ত কল্প, অধর্ম্মপরায়ণতা সমস্ত জগৎ উচ্ছিন্ন করে। আর আর নাগেরা কহিল, আমরা জলধরকলের পরিগ্রহ করিয়া বারিবর্ষণ দ্বারা যজ্ঞীয় প্রদীপ্ত হুতাশন নিব্বার্ণ করিব; আর ঋত্বিকগণ রজনীযোগে যখন অনবহিত থাকিবেন, কোনও কোনও না সেই সময়ে যজ্ঞপাত্র সকল হরণ করিয়া আনিবে, তাহা হইলেই ধারে বিঘ্ন ঘটিৰেক। অথবা, শত সহস্র নাগগণ সকলকেই এক কালে দংশন করুক, এরূপ করিলে অবশ্যই তাহাদের ত্রাস জম্মিবেক। কিংবা ভুজগের অতি অপবিত্র স্বীয় মূত্র পুরীষ দ্বারা সংস্কৃত ভোজ্য বস্তু সকল দুষিত করুক। আর আর নাগেরা কহিল, আমরাই সেই, যজ্ঞের ঋত্বিক হইব, এবং অগ্রেই দক্ষিণা দাও বলিয়া যজ্ঞ ভঙ্গ করিব। এইরূপ করিলে রাজা জনমেজয় তামাদিগের বশীভূত হইয়া আমাদিগেরই ইচ্ছানুরূপ কর্ম্ম করিবেন। কেহ কেহ কহিল, রাজা যৎকালে জলক্রীড়া করিবেন, তখন তাহাকে রুদ্ধ করিয়া গৃহে আনিয়া বন্ধন করিয়া রাখিব, তাহা হইলেই যজ্ঞ রহিত হইবে। আর কতকগুলি পণ্ডিতম্মন্য মূখ নাগ কহিল, অন্য চেষ্টা পরিত্যাগ করিয়া রাজাকেই দংশন করা ভাল, তাহা হইলেই সকল সম্পন্ন হইল; রাজা মরিলেই সকল অনর্থের মূলোচ্ছেদন হইবেক। মহারাজ! আমাদিগের যেরূপ বুদ্ধি তদনুরূপ কহিলাম; এক্ষণে তোমার যেরূপ অভিমত হয়, কর।
নাগরাজ বাকিকে ইহা কহিয়া নাগগণ তদীয় মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিল। বাসুকি কিয়ৎ ক্ষণ চিন্তা করিয়া কহিলেন, হে ভুজঙ্গমগণ! তোমরা সকলে যে পরামর্শ স্থির করিলে তাই আমার মতে কর্তব্য বোধ হইতেছে না। তোমরা যাহা বাহা কহিলে, তাহার কিছুই আমার অভিমত নহে। কিন্তু যাহাতে তোমাদের হিত হয়, এমন কোনও উপায় দেখিতে হইবেক। আপনার ও জ্ঞাতিবর্গের হিতার্থে, আমার মতে মহাত্মা কশ্যপকে প্রসন্ন করাই সর্ব্বোৎকৃষ্ট উপায়! তোমাদিগের বচনানুসারে কার্য্য করিতে আমার প্রবৃত্তি হইতেছে না। যাহাতে তোমাদের মঙ্গল হয়, তাহা জামিই বিবেচনা করিয়া স্থির করিব। এক্ষণে আমি কুলজ্যেষ্ঠ, সুতরাং যাবতীয় দোষ গুণ আমার উপরেই পড়িবেক; এই নিমিত্তই আমি বিশেষ দুঃখিত হইতেছি।
সপ্তদশ অধ্যায়
সপ্তদশ অধ্যায়—আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে তপোধন। এই সময়ে কদ্রু ও বিনতা দুই ভগিনী অবলোকন করিলেন, উচ্চৈঃশ্রবাঃ অশ্ব তাহাদের সমীপ দেশ দিয়া গমন করিতেছে, দেবগণ হৃষ্ট চিত্তে তাহার সাতিশয় সমাদর করিতেছেন। সেই সর্বোত্তম, সৰ্বসুলক্ষণ সম্পন্ন, শ্রীমান, অজর, অমোঘবল, দিব্য, অশ্বরত্ন অমৃতমন্থন কালে উৎপন্ন হয়।
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! তুমি কহিলে, সেই পরম সুন্দর মহাবীর্য্য অশ্বরাজ অমৃতমন্থন কালে উৎপন্ন হয়; অতএব জিজ্ঞাসা করিতেছি, বল, দেবতারা কি নিমিত্তে ও কোন স্থানে অমৃত মন্থন করিয়াছিলেন?
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, সুমেরু নামে এক পরম সুন্দর ভূধর আছে। তাহার স্বর্ণময় উজ্জ্বল শৃঙ্গসমূহের জ্যোতির সহিত তুলনা করিলে প্রদীপ্ত সূর্য্যের প্রভাও মলিন বোধ হয়। ঐ কনকালঙ্কৃত অপ্রমেয় বিচিত্র গিরি দেবগণ ও গন্ধর্ব্বগণের আবাসভূমি। অধর্ম্মপরায়ণ লোকেরা তাহার ত্রিসীমায় যাইতে পারে না। অতিদুর্দ্দান্ত হিংস্র জন্তুগণ তদুপরি নিরন্তর পরিভ্রমণ করে। রজনীতে নানাবিধ দিব্য ওষধি দ্বারা আলোকময় হয়। উচ্চতা দ্বারা দেবলোক আবরণ করিয়া অবস্থিত আছে। বহুতর তরঙ্গিণী ও তরুমণ্ডলী ঐ গিরিবারের শোভা সম্পাদন করিতেছে। অশেষবিধ মনোহর বিহঙ্গমগণ চারি দিকে অনবরত কোলাহল করিতেছে। ঐ ধরণীধর সামান্য লোকদিগের মনেরও অগম্য। তপোনিয়মসম্পন্ন মহাবল দেবগণ সেই স্বর্ণময় শৈলের শুভ শৃঙ্গে সমারূঢ় ও আসীন হইয়া অমৃতলাবিষয়ক মন্ত্রণা আরম্ভ করিলেন।
এই রূপে দেবতাদিগকে মন্ত্রচিন্তনে সাতিশয় ব্যাসক্ত দেখিয়া নারায়ণ ব্রহ্মাকে সম্বোধিয়া কহিলেন, দেখ, দেবতারা ও অসুরগণ ঐকমত্য অবলম্বন করিয়া সমুদ্র মন্থন? আরম্ভ করুক, মন্থন করিতে করিতে সমুদ্রগর্ভ হইতে অমৃত উৎপন্ন হইবেক। অন্যুর দেবতাদিগকে কহিলেন, হে দেবগণ! তোমারা সর্ব্বপ্রকার ওষধি ও সর্ব্বপ্রকার রত্ন পাইয়াও উদধি মন্থনে বিরত হইবে না, উত্তরোত্তর মন্থন করিতে করিতে তোমাদিগের অমৃত লাভ হইবেক।
লতা বিশেষ, রজনীতে তাহার দীপ্তি প্রকাশ পায়
ফল পক্ব হইলেই যাহারা শুষ্ক হইয়া যায়।
সপ্তপঞ্চাশ অধ্যায়
সপ্তপঞ্চাশ অধ্যায়—আস্তীকপর্ব্ব।
শৌনক কহিলেন, হে সূতকুলতিলক! রাজা জনমেজয়ের সর্পসত্রে যে সকল সর্প হুতাশনে পতিত হইয়াছিল, তাহাদের সকলের নাম শ্রবণের অভিলাষ করি। উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, হে দ্বিজোত্তম! বহু সহস্র, বহু প্রযুত, বহু অর্ব্বুদ সর্প সর্পসত্রে বিনাশ প্রাপ্ত ইইয়াছিল, তাহাদিগের সংখ্যা করা অসাধ্য, তথাপি, যত দূর স্মরণ হয়, কহিতেছি, শ্রবণ করুন! প্রথমতঃ বাসুকিকুলোৎপন্ন যে সকল নীলবর্ণ রক্তবর্ণ শুক্লবর্ণ অতি ভয়ঙ্কর মহাকায়, মহাবিষ ভুজঙ্গমগণ, মাতৃশাপরূপ বিষম দণ্ডে দণ্ডিত হইয়া, যজ্ঞীয় হুতাশনে পতিত হয়, তাহাদেরই বাহুল্যে নামোল্লেখ করিব।
কোটিশ, মানস, পূর্ণ, শল, পাল, হমীল, পিচ্ছল, কৌণপ, চক্র, কালবেগ, প্রঁকালন, হিরণ্যবাহু, শরণ, কক্ষক, কালদন্ত, এই সকল বাসুকিজাত সৰ্প প্রদীপ্ত হুতাশনে প্রবিষ্ট হইয়াছিল। এতদ্ব্যতিরিক্ত বাসুকিবংশসম্ভূত অতি ভয়ঙ্কর মহাবলশালী আর আর অনেক নাগ প্রদীপ্ত হুতাশনে প্রাণত্যাগ করিয়াছিল।
এক্ষণে তক্ষককুলোদ্ভূত নাগগণের নামোল্লেখ করিতেছি, শ্রবণ করুন। পুচ্ছাণ্ডক, মণ্ডলক, পিণ্ডসক্ত, রভেণক, উচ্ছিখ, শরভ, ভঙ্গ, বিল্বতেজাঃ, বিরোহণ, শিলী, শলকর, মূক, সুকুমার, প্রবেপন, মুদ্গর, শিশুরোমা, সুরোম, মহাহনু, এই সমস্ত তক্ষকজাত নাগ হব্যবাহনে প্রবিষ্ট হইয়াছিল।
পারাবত, পারিপাত্র, পাণ্ডুর, হরিণ, কৃশ, বিহত, শরভ, মেদ, প্রমোদ, সংহতাপন, ঐরাবতকুলোৎপন্ন এই সকল নাগ অগ্নি প্রবিষ্ট হইয়াছিল।
হে দ্বিজোত্তম! অতঃপর কৌরব্যকুলজাত নাগদিগের উল্লেখ করিব, শ্রবণ করুন। এরক, কুণ্ডল, বেণী, বেণীস্কন্ধ, কুমারক, বাহুক, শৃঙ্গবের, ধূর্ত্তক, প্রাতর, অন্তক, এই সকল কৌরব্যকুলজাত সর্প হুতাশনপ্রবিষ্ট হইয়াছিল।
এক্ষণে ধৃতরাষ্ট্রকুলপ্রসূত বায়ুসমবেগশালী মহাবিষ সর্পগণের বিষয় কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ করুন। শঙ্কুকর্ণ, পিঠরক, কুঠার, মুখসেচক, পূর্ণাঙ্গদ, পূর্ণমুখ, প্রহাস, শকুনি, হরি, অমাঠ, কামহঠ, সুষেণ, মানস, ব্যয়, ভৈরব, মুণ্ডবেদাঙ্গ, পিশঙ্গ, উণ্ড্রপারক, ঋষভ, বেগবান, নাগ, পিণ্ডারক, মহাহনু, রক্তাঙ্গ, সর্ব্বসারঙ্গ, সমৃদ্ধ, পটবাসক, বরাহক, বীরণক, সুচিত্র, চিত্রবেগিক, পরাশর, তরুণক, মনিস্কন্ধ, আরুণি।
হে ব্রহ্মন্! বিখ্যাত প্রধান প্রধান নাগের নাম কীর্ত্তন করিলাম; বাহুল্য প্রযুক্ত সকলের উল্লেখ করিতে পারিলাম না। ইহাদের যে সকল সন্তান ও সন্তানের সন্তান প্রদীপ্ত পাবকে প্রাণত্যাগ করিয়াছে, তাহাদের সংখ্যা করা অসাধ্য। অতি ভয়ঙ্কর, প্রলয়কালীন অনলতুল্য বিষবিশিষ্ট, দ্বিশীর্ষ, সপ্তশীর্ষ, দশশীর্ষ, এবং অন্যান্য শত শত সহস্র সহস্র সর্প সেই যজ্ঞীয় হুতাশনে হুত হইয়াছে। মহাকায়, মহাবেগ, শৈলশৃঙ্গসমুন্নত, যোজনায়ত, দ্বিযোজনায়ত, পঞ্চযোজনায়ত, দশযোজনায়ত, দ্বাদশযোজনায়ত, কামরূপী, কামবল, প্রদীপ্ত অনলতুল্য বিষশালী মহাসর্প সকল ব্রহ্মদণ্ডে নিগৃহীত হইয়। সেই মহাসত্রে দগ্ধ হইয়াছে।
সপ্তবিংশ অধ্যায়
সপ্তবিংশ অধ্যায়— আস্তীকপর্ব্ব।
উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, নাগগণ এই রূপে জলধারায় অভিষিক্ত হইয়া সাতিশয় হর্ষ প্রাপ্ত হইল, এবং গরুড়পৃষ্ঠে অধিষ্ঠিত হইয়া ত্বরায় সেই মকরগণবাসভূমি বিশ্বকর্ম্মবিনির্ম্মিত রামণীয়কদ্বীপে উপস্থিত হইল। তাহারা তথায় উপস্থিত হইয়া প্রথমতঃ অতি প্রকাণ্ড লবণার্ণব অবলোকন করিল, এবং যেই দ্বীপবর্তী সর্ববজনমনোহর পরম পবিত্র শুভপ্রদ কানন মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া বিহার করিতে লাগিল। ঐ কানন নিরন্তর সাগরসলিলে সিক্ত হইতেছে, বহুবিধ বিহঙ্গগণ অনুক্ষণ চতুর্দিকে কোলাহল করিতেছে, ফুলকুসুমসুশোভিত তরুমগুলীতে পরিবৃত হইয়া পরম রমণীয় হইয়া আছে, বিচিত্র অট্টালিকা, পরম সুন্দর সরোবর, ও নির্ম্মলজলপূর্ণ দিব্য হ্রদ সমূহে অনির্বচনীয় শোভা সম্পাদন করিতেছে, অবিশ্রান্ত শীতল সুগন্ধ গন্ধবহের মন্দ মন্দ সঞ্চার হইতেছে, অত্যুন্নত চনত ও অন্যান্য বহুবিধ বৃক্ষ সমূহ দ্বারা সদা শশাভিত হইয়া আছে, ঐ সকল বৃক্ষ বায়ুবেগে বিচলিত হইয়া অজস্র পুষ্পবৃষ্টি করিতেছে, মধুকরের মধুপানে মত্ত হইয়া গুন্ গুন্ রবে গান করিতেছে, ঐ কানন অঙ্গরা ও গন্ধর্বগণের অতি প্রিয় স্থান, দর্শনমাত্র অন্তঃকরণে অতিমাত্র আহলাদ প্রদান করে।
কদ্রুনন্দনের কিয়ৎ ক্ষণ বনবিহার করিয়া মহাবীর্য গরুড়কে কহিল, দেখ, আমাদিগকে আর কোন নিলজলসম্পন্ন রমণীয় দ্বীপে লইয়া চল, তুমি আকাশপথে গমনকালে নানা রম্য দেশ দেখিতে পাও। গরুড়, সর্পগণের এইরূপ আদেশ শ্রবণমা, স্বীয় জননী সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, জননি। কি কারণে আমাকে সর্পগণের আজ্ঞা প্রতিপালন করিতে হইবেক, বল। বিনতা কহিলেন, বৎস! আমি দুর্দৈববশতঃ সৰ্পৰ্গণের মায়াবলে পণে পরাজিত হইয়া সপত্নীর দাসী হইয়াছি। মাতৃমুখে এই কারণ শ্রবণ করিয়া গরুড় অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন, এবং তৎক্ষণাৎ সৰ্পৰ্গণের নিকটে গিয়া কহিলেন, হে ভুজঙ্গমগণ। তোমাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতেছি বল, আমি কোন্ বস্তু আহরণ অথবা কি পৌরুষের কর্ম্ম করিলে দাসত্ব হইতে মুক্ত হইতে পারিব। সর্পেরা গরুড়ের প্রার্থনা শুনিয়া কহিল, অহে বিহঙ্গম! যদি তুমি আপন পরাক্রম প্রভাবে অমৃত আহরণ করিতে পার, তবে তোমার দাসত্ব মোচন হইবেক।
সপ্তম অধ্যায়
সপ্তম অধ্যায়— পৌলোমপর্ব্ব।
অগ্নি ভৃগুদত্ত শাপ শ্রবণে জাতক্রোধ হইয়া তাহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, হে ব্রহ্মন্! কি কারণে তুমি সহসা আমাকে শাপ দিলে? জিজ্ঞাসিত হইয়। সত্য কহিয়াছি, ইহাতে আমার অপরাধ কি? আমি ধর্ম প্রতিপালন করিয়াছি ও পক্ষপাতবিহীন হইয়। সত্য কহিয়াছি। যে সাক্ষী, জিজ্ঞাসিত হইয়া, জানিয়াও অন্যথা কহে, সে স্বকুলজাত উৰ্দ্ধতন সপ্ত ও অধস্তন সপ্ত পুরুষকে নিরগামী করে; আর যে ব্যক্তি উপস্থিত কার্য্যের নিগূঢ় তত্ত্বজ্ঞ হইয়াও না কহে, সেও সেই পাপে লিপ্ত হয়। যাহা হউক, আমিও তোমাকে শাপ দিতে পারি, কিন্তু ব্রাহ্মণকে মান্য করি, এজন্য ক্ষান্ত হইলাম। তুমি সমুদায় জান, তথাপি কিঞ্চিৎ কহিতেছি, শ্রবণ কর। আমি যোগবলে আত্মাকে বহু ভাগে বিভক্ত করিয়া মুর্তিভেদে অগ্নিহোত্র, গর্ভাধান, জ্যোতিষ্টোমাদি ক্রিয়া সমুদায়ে অধিষ্ঠিত আছি; বেদোক্ত বিধান অনুসারে আমাতে যে হবিঃ হুত হয়, তারা দেবগণ ও পিতৃগণ তৃপ্ত হয়েন; হৃয়মান সোমরস প্রভৃতি জ্বর্য যাবতীয় দেবগণ ও পিতৃগণের শরীররূপে পরিণত হয়। দেবগণ ও পিতৃগণ, উভয়ের উদ্দেশে দর্শ ও পৌর্ণমাস যাগ একত্র অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। এই নিমিত্ত দেবগণ ও পিতৃগণ অভিন্নস্বরূপ, পৰ্বকালে কখন একত্র ও কখন বা পৃথভাগে পূজিত হয়েন। আমাতে যে আহুতি প্রদত্ত হয়, দেবতা ও পিতৃগণ তাহা ভক্ষণ করেন, অতএব আমি দেবতাদিগের ও পিতৃগণের মুখ। অমাবস্যাতে পিতৃগণকে ও পূর্ণিমাতে দেবতাদিগকে উদ্দেশ করিয়া লোকে আমার মুখে আস্থতি প্রদান করে, তাঁহারাও আমার মুখেই ভক্ষণ করেন।
ইহা কহিয়া কিঞ্চিৎ চিন্তা করিয়া অগ্নি দ্বিজগণের অগ্নিহোত্র ও যন্ত্রক্রিয়া হইতে অন্তর্হিত হইলেন। অগ্নি অন্তর্ধান করাতে প্রজাগণ, ওঙ্কার, বষট্কার, স্বধা, স্বাহা শূন্য হইয়া, অত্যন্ত দুঃখিত হইল। তদ্দর্শনে ঋষিগণ উদ্বিগ্ন চিত্তে দেবতাদিগের নিকটে গিয়া নিবেদন করিলেন, হে দেবগণ। অগ্নির অন্তর্ধান বশতঃ অগ্নিহোত্রাদি ক্রিয়া লোপ হওয়াতে লোকয় কির্তব্যবিমূঢ় হইয়াছে; অতএব যাহা কর্তব্য হয়, বিধান করুন, কালাতিপাতের সময় নাই। অনন্তর ঋষিগণ ও দেবগণ ব্রহ্মার নিকটে গিয়া অগ্নির শাপ ও তন্নিবন্ধন ক্রিয়াললাপের বিষয় নিবেদন করিয়া কহিলেন, ভগবন্! ভৃগু কোনও কারণ বশতঃ অগ্নিকে শাপ দিয়াছেন, কিন্তু তিনি দেবতাদিগের মুখ ও যজ্ঞের অগ্রভাগডোক্ত হইয়া কি রূপে সর্বভ হইবেন? সর্বলোকপিতামহ ব্রহ্ম। তাঁহাদিগের নিবেদন শুনিয়া অগ্নিকে আম পূর্বক মনোহর বাক্যে সান্ত্বনা করিয়া কহিলেন, বৎস! তুমি সর্বলোকের কর্ত্তা ও সংহ; তুমি ত্রিলোক ধারণ করিয়া আছ; তুমি অগ্নিহোত্রাদি ক্রিয়াপ্রবর্তক; হে লোকনাথ! এক্ষণে যাহাতে ক্রিয়ালোপ না হয়, তাহা কর। তুমি ঈশ্বর হইয়া এমন বিমূঢ় হইতেছ কেন? তুমি সব লোকে সর্ব কাল পবিত্র; তুমি সর্ব ভূতের গতি। অতএব তুমি সর্ব শরীরে সর্বভুক্ষ হইবে না। তোমার অপান দেশে যে সকল শিখা আছে, তাহারাই সর্ব্ব বস্তু ভক্ষণ করিকে এবং তোমার মাংসভক্ষণী যে তনু আছে, সেই সভক্ষ হইবেক। যেমন সূর্যকিরণসংস্পর্শে সব বস্তু শুচি হয়, সেইরূপ তোমার শিখা সমূহ দ্বারা দগ্ধ হইয়া সৰ বস্তু শুচি হইবেক। হে পাবক! তুমি পরম তেজঃপদার্থ, স্বীয় প্রভাবে নির্গত হইয়াছ; এক্ষণে স্বীয় তেজঃ দ্বারাই ঋষির শাপকে সত্য কর, এবং তোমার মুখে আহুতিরূপে প্রদত্ত দেবভাগ ও আত্মভাগ গ্রহণ কর।
অগ্নি পিতামহবাক্য শ্রবণ করিয়া তথাস্তু বলিয়া তদীয় আদেশ প্রতিপালনার্থে প্রস্থান করিলেন। দেবগণ ও ঋষিগণ হৃষ্ট চিত্তে স্ব স্ব স্থানে প্রতিগমন করিলেন। ঋষিগণ পূর্ব্ববৎ সমস্ত ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করিতে লাগিলেন। দোলাকে দেবগণ ও পৃথিবীতে যাবতীয় ভূতগণ অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন। অগ্নিও শাপৰিমুক্ত হইয়া পরম প্রীতি লাভ করিলেন।
ভগবান্ অগ্নি এই রূপে পূর্ব কালে ভৃগু হইতে শাপ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অগ্নিশাপসম্বদ্ধ পূৰ্বকালীন ইতিহাস, পুলোমা রাক্ষসের বিনাশ, ও চ্যনের উৎপত্তি কীর্ত্তিত হইল।