← লাইব্রেরি

১৮৭০

কপালকুণ্ডলা (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ১৮৭০)

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৭০

প্রকাশনা-তথ্য

কপালকুণ্ডলা।

শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত।

দ্বিতীয় সংস্করণ।

ক লি কা তা।

নূতন সংস্কৃত যন্ত্র।

সং বৎ ১৯২৬।

মূল্য এক টাকা।

কপালকুণ্ডলা।

শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রণীত।

দ্বিতীয় সংস্করণ।

ক লি কা তা।

নূতন সংস্কৃত যন্ত্র।

সংবৎ ১৯২৬।

মদগ্রজ

শ্রীযুক্ত বাবু সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

মহাশয়কে

এই গ্রন্থ

উপহার

প্রদান করিলাম।

চতুর্থ খণ্ড · অষ্টম পরিচ্ছেদ

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

সপত্নীসম্ভাষে।

কপালকুণ্ডলা গৃহ হইতে বহির্গতা হইয়া কাননাভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন। প্রথমে ভগ্ন গৃহ মধ্যে গেলেন। তথায় ব্রাহ্মণকে দেখিলেন। যদি দিনমান হইত তবে দেখিতে পাইতেন যে তাঁহার মুখকান্তি অত্যন্ত মলিন হইয়াছে। ব্রাহ্মণবেশী কপালকুণ্ডলাকে কহিলেন যে “এখানে কাপালিক আসিতে পারে, এখানে কোন কথা অবিধি। স্থানান্তরে আইস।” বন মধ্যে একটি অল্পায়ত স্থান ছিল তাহার চতুঃপার্শ্বে বৃক্ষরাজি; মধ্যে পরিষ্কার; তথা হইতে একটি পথ বাহির হইয়া গিয়াছে। ব্রাহ্মণবেশী কপলকুাণ্ডলাকে তথায় লইয়া গেলেন। উভয়ে উপবেশন করিলে ব্রাহ্মণবেশী কহিলেন,

“প্রথমতঃ আত্মপরিচয় দিই। কত দূর আমার কথা বিশ্বাসযোগ্য তাহা আপনি বিবেচনা করিয়া লইতে পারিবা। যখন তুমি স্বামীর সঙ্গে হিজলী প্রদেশ হইতে আসিতেছিলে, তখন পথিমধ্যে রজনীযোগে এক যবনকন্যার সহিত সাক্ষাৎ হয়। তোমার কি তাহা মনে পড়ে?”

কপালকুণ্ডলা কহিলেন, “যিনি আমাকে অলঙ্কার দিয়াছিলেন?”

ব্রাহ্মণবেশধারিণী কহিলেন “আমিই সেই।”

কপালকুণ্ডলা অত্যন্ত বিস্মিত হইলেন। লুৎফ্-উন্নিসা তাঁহার বিস্ময় দেখিয়া কহিলেন, “আরও বিস্ময়ের বিষয় আছে—আমি তোমার সপত্নী।”

কপালকুণ্ডলা চমৎকৃতা হইয়া কহিলেন, “সে কি?” লুৎফ্-উন্নিসা তখন আনুপূর্ব্বিক আত্মপরিচয় দিতে লাগিলেন। বিবাহ, জাতিভ্রংস, স্বামী কর্ত্তৃক ত্যাগ, ঢাকা, আগ্রা, জাঁহাগীর, মেহেরউন্নিসা, আগ্রা ত্যাগ, সপ্তগ্রামে বাস, নবকুমারের সহিত সাক্ষাৎ, নবকুমারের ব্যবহার, গত দিবস প্রদোষে ছদ্মবেশে কাননে আগমন, হোমকারীর সহিত সাক্ষাৎ, সকলই বলিলেন। এই সময় কপালকুণ্ডলা জিজ্ঞাসা করিলেন,

“তুমি কি অভিপ্রায়ে আমাদিগের বাটীতে ছদ্মবেশে আসিতে বাসনা করিয়াছিলে?”

লুৎফ্-উন্নিসা কহিলেন “তোমার সহিত স্বামীর চিরবিচ্ছেদ জন্মাইবার অভিপ্রায়ে।”

কপালকুণ্ডলা চিন্তা করিতে লাগিলেন। কহিলেন, “তাহা কি প্রকারে সিদ্ধ করিতে?”

লুৎফ্-উন্নিসা। “আপাততঃ তোমার সতীত্বের প্রতি স্বামীর সংশয় জন্মাইতাম। কিন্তু সে কথায় আর কাজ কি, সে পথ ত্যাগ করিয়াছি। এক্ষণে তুমি যদি আমার পরামর্শ মতে কাজ কর, তবে তোমা হইতেই আমার কামনা সিদ্ধ হইবে—অথচ তোমার মঙ্গলসাধন হইবে।”

কপা। “হোমকারীর মুখে তুমি কাহার নাম শুনিয়াছিলে?”

লু। “তোমারই নাম। তিনি তোমার মঙ্গল বা অমঙ্গল কামনায় হোম করেন, ইহা জানিবার জন্য প্রণাম করিয়া তাঁহার নিকট বসিলাম। যতক্ষণ না তাঁহার ক্রিয়া সম্পন্ন হইল ততক্ষণ তথায় বসিয়া রহিলাম। হোমান্তে তোমার নাম সংযুক্ত হোমের অভিপ্রায় ছলে জিজ্ঞাসা করিলাম। কিয়ৎক্ষণ তাঁহার সহিত কথোপকথন করিয়া জানিতে পারিলাম যে তোমার অমঙ্গলসাধনই হোমের প্রয়োজন। আমারও সেই প্রয়োজন। ইহাও তাঁহাকে জানাইলাম। তৎক্ষণাৎ পরস্পরের সহায়তা করিতে বাধ্য হইলাম। বিশেষ পরামর্শ জন্য তিনি আমাকে ভগ্ন গৃহ মধ্যে লইয়া গেলেন। তথায় আপন মনোগত ব্যক্ত করিলেন। তোমার মৃত্যুই তাঁহার অভীষ্ট। তাহাতে আমার কোন ইষ্ট নাই। আমি ইহ জন্মে কেবল পাপই করিয়াছি, কিন্তু পাপের পথে আমার এত দূর অধঃপাত হয় নাই যে, আমি নিরপরাধিনী বালিকার মৃত্যু সাধন করি। আমি তাহাতে সম্মতি দিলাম না। এই সময়ে তুমি তথায় উপস্থিত হইয়াছিলে। বোধ করি কিছু শুনিয়া থাকিবে।”

কপা। “আমি ঐরূপ বিতর্কই শুনিয়াছিলাম।”

লু। “সে ব্যক্তি আমাকে অবোধ অজ্ঞান বিবেচনা করিয়া কিছু উপদেশ দিতে চাহিল। শেষ টা কি দাঁড়ায় ইহা জানিয়া তোমায় উচিত সম্বাদ দিব বলিয়া তোমাকে বনমধ্যে অন্তরালে রাখিয়া গেলাম।”

কপা। “তার পর আর ফিরিয়া আসিলে না কেন?”

লু।” তিনি অনেক কথা বলিলেন, বাহুল্য বৃত্তান্ত শুনিতে শুনিতে বিলম্ব হইল। তুমি সে ব্যক্তিকে বিশেষ জান। কে সে অনুভব করিতে পারিতেছ?”

কপা। “আমার পূর্ব্বপালক কাপালিক।”

লু। “সেই বটে। কাপালিক প্রথমে তোমাকে সমুদ্র তীরে প্রাপ্তি, তথায় প্রতিপালন, নবকুমারের আগমন, তৎসহিত তোমার পলায়ন, এ সমুদায় পরিচয় দিলেন। তোমাদিগের পলায়নের পর যাহা যাহা হইয়াছিল, তাহাও বিবরিত করিলেন—সে সকল বৃত্তান্ত তুমি জান না। তাহা তোমার গোচরার্থ বিস্তারিত বলিতেছি।”

এই বলিয়া লুৎফ্-উন্নিসা কাপালিকের শিখরচ্যুতি, হস্তভঙ্গ, স্বপ্ন, সকল বলিলেন। স্বপ্ন শুনিয়া কপালকুণ্ডলা চমকিয়া, শিহরিয়া উঠিলেন—চিত্তমধ্যে বিদ্যুচ্চঞ্চলা হইলেন। লুৎফ্-উন্নিসা বলিতে লাগিলেন,

“কাপালিকের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ভবানীর আজ্ঞা প্রতিপালন। বাহুবলহীন, এই জন্য পরের সাহায্য তাহার নিতান্ত প্রয়োজন। আমাকে ব্রাহ্মণতনয় বিবেচনা করিয়া আমাকে সহায় করিবার প্রত্যাশায় সকল বৃত্তান্ত বলিল। আমি এ পর্য্যন্ত এ দুষ্কর্ম্মে স্বীকৃত হই নাই। এ দুর্বৃত্ত চিত্তের কথা বলিতে পারি না, কিন্তু ভরসা করি যে কখনই স্বীকৃত হইব না। বরং এ সঙ্কল্পের প্রতিকূলাচরণ করিব এই অভিপ্রায়; সেই অভিপ্রায়েই আমি তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। কিন্তু এ কার্য্য নিতান্ত অস্বার্থপর হইয়া করি নাই। তোমার প্রাণ দান দিতেছি। তুমিও আমার জন্য কিছু কর।”

কপালকুণ্ডলা কহিলেন, “কি করিব?”

লু। “আমারও প্রাণদান দাও—স্বামী ত্যাগ কর।”

কপালকুণ্ডলা অনেক ক্ষণ কথা কহিলেন না। অনেক ক্ষণের পর কহিলেন, “স্বামী ত্যাগ করিয়া কোথায় যাইব?”

লু। “বিদেশে—বহু দূরে—তোমাকে অট্টালিকা দিব—ধন দিব—দাস দাসী দিব, রাণীর ন্যায় থাকিবে।”

কপালকুণ্ডলা আবার চিন্তা করিতে লাগিলেন। পৃথিবীর সর্ব্বত্র মানসলোচনে দেখিলেন—কোথাও কাহাকে দেখিতে পাইলেন না; অন্তঃকরণ মধ্যে দৃষ্টি করিয়া দেখিলেন—তথায় ত নবকুমারকে দেখিতে পাইলেন না, তবে কেন লুৎফ-উন্নিসার সুখের পথ রোধ করিবেন? লুৎফ-উন্নিসাকে কহিলেন,

“তুমি যে আমার উপকার করিয়াছ কি না তাহা আমি এখন বুঝিতে পারিতেছি না। অট্টালিকা, ধন সম্পত্তি, দাস দাসীরও প্রয়োজন নাই। আমি তোমার সুখের পথ কেন রোধ করিব? তোমার মানস সিদ্ধ হউক—কালি হইতে বিঘ্নকারিণীর কোন সম্বাদ পাইবে না। আমি বনচর ছিলাম আবার বনচর হইব?”

লুৎফ-উন্নিসা চমৎকৃতা হইলেন, এরূপ আশু স্বীকারের কোন প্রত্যাশা করেন নাই। মোহিত হইয়া কহিলেন, “ভগিনি—তুমি চিরায়ুষ্মতী হও! আমার জীবন দান করিলে। কিন্তু আমি তোমাকে অনাথিনী হইয়া যাইতে দিব না। কল্য প্রাতে তোমার নিকট আমার এক জন বিশ্বাসযোগ্যা চতুরা দাসী পাঠাইব। তাহার সঙ্গে যাইও। বৰ্দ্ধমানে কোন অতি প্রধানা স্ত্রীলোক আমার সুহৃৎ।—তিনি তোমার সকল প্রয়োজন সিদ্ধ করিবেন।”

লুৎফ-উন্নিসা এবং কপালকুণ্ডলা এরূপে মনঃসংযোগ করিয়া কথাবার্ত্তা কহিতেছিলেন, যে সম্মুখ বিঘ্ন কিছুই দেখিতে পারেন নাই। যে বন্য পথ তাঁহাদিগের আশ্রয়স্থান হইতে বাহির হইয়াছিল, সে পথপ্রান্তে দাঁড়াইয়া কাপালিক ও নবকুমার তাঁহাদিগের প্রতি যে করাল দৃষ্টিপাত করিতেছিলেন, তাহা কিছুই দেখিতে পারেন নাই।

নবকুমার ও কাপালিক ইঁহাদিগের প্রতি দৃষ্টি করিয়াছিলেন মাত্র, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তত দূর হইতে তাহাদিগের কথোপকথনের মধ্য কিছুই তদুভয়ের শ্রুতিগোচর হইল না। মনুষ্যের চক্ষুঃ কর্ণ যদি সমদূরগামী হইত, তবে মনুষ্যের দুঃখস্রোত শমিত কি বর্দ্ধিত হইত তাহা কে বলিবে? লোকে বলিয়া থাকে সংসাররচনা অপূর্ব্ব কৌশলময়।

নবকুমার দেখিলেন কপালকুণ্ডলা আলুলায়িতকুন্তলা; যখন কপালকুণ্ডলা তাঁহার হয় নাই তখনই সে কুন্তল বাঁধিত না। আবার দেখিলেন যে সেই কুন্তলরাশি আসিয়া ব্রাহ্মণকুমারের পৃষ্ঠদেশে পড়িয়া তাঁহার অংসসম্বিলম্বী কেশদামের সহিত মিশিয়াছে। কপালকুণ্ডলার কেশরাশি ঈদৃশ আয়তনশালী এবং লঘু স্বরে কথোপকথনের প্রয়োজনে উভয়ে এরূপ সন্নিকটবর্তী হইয়া বসিয়াছিলেন, যে লুৎফ-উন্নিসার পৃষ্ঠ পর্য্যন্ত কপালকুণ্ডলার কেশের সম্প্রসারণ কেহই দেখিতে পায়েন নাই। দেখিয়া, নবকুমার ধীরে ভূতলে বসিয়া পড়িলেন।

কাপালিক ইহা দেখিয়া নিজ কটিবিলম্বী এক নারিকেলপাত্র বিমুক্ত করিয়া কহিলেন, “বৎস! বল হারাইতেছ, এই মহৌষধ পান কর; ইহা ভবানীর প্রসাদ। পান করিয়া বল পাইবে।”

কাপালিক পাত্র নবকুমারের মুখের নিকট ধরিল। তিনি অন্যমনে পান করিয়া দারুণ তৃষা নিবারণ করিলেন। নবকুমার জানিতেন না যে এই সুস্বাদ পেয় কাপালিকের স্বহস্তপ্রস্তুত প্রচণ্ড তেজস্বিনী সুরা। পান করিবামাত্র কিছু সবল হইলেন।

এ দিকে লুৎফ-উন্নিসা পূর্ব্ববৎ মৃদু স্বরে কপালকুণ্ডলাকে কহিতে লাগিলেন,

“ভগিনি! তুমি যে কার্য্য করিলে তাহার প্রতিশোধ করিবার আমার ক্ষমতা নাই, তবু যদি আমি চিরদিন তোমার মনে থাকি সেও আমার সুখ। যে অলঙ্কার গুলিন দিয়াছিলাম, তাহা শুনিয়াছি তুমি দরিদ্রকে বিতরণ করিয়াছ। এক্ষণে নিকটে কিছুই নাই, কল্যকার অন্য প্রয়োজন ভাবিয়া কেশ মধ্যে একটী অঙ্গুরীয় আনিয়াছিলাম, জগদীশ্বরের কৃপায় সে পাপপ্রয়োজনসিদ্ধির আবশ্যক হইল না। এই অঙ্গুরীয়টী তুমি রাখ। ইহার পরে অঙ্গুরীয় দেখিয়া যবনী ভগিনীকে মনে করিও। আজি যদি স্বামী জিজ্ঞাসা করেন, অঙ্গুরীয় কোথায় পাইলে, কহিও, লুৎফ-উন্নিসা দিয়াছে।” ইহা কহিয়া লুৎফ-উন্নিসা আপন অঙ্গুলি হইতে বহু ধনে ক্রীত এক অঙ্গুরীয় উন্মোচিত করিয়া কপালকুণ্ডলার হস্তে দিলেন। নবকুমার তাহাও দেখিতে পাইলেন; কাপালিক তাঁহাকে ধরিয়াছিলেন, আবার তাঁহাকে কম্পমান দেখিয়া পুনরপি মদিরা সেবন করাইলেন। মদিরা নবকুমারের মস্তিষ্কে প্রবেশ করিয়া তাঁহার প্রকৃতি সংহার করিতে লাগিল; স্নেহের অঙ্কুর পর্যন্ত উন্মূলিত করিতে লাগিল।

কপালকুণ্ডলা লুৎফ্-উন্নিসার নিকট বিদায় হইয়া গৃহাভিমুখে চলিলেন। তখন নবকুমার ও কাপালিক লুৎফ্-উন্নিসার অদৃশ্য পথে কপালকুগুলার অনুসরণ করিতে লাগিলেন।

প্রথম খণ্ড · অষ্টম পরিচ্ছেদ

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

আশ্রয়ে।

সেই অমাবস্যার ঘোরান্ধকার যামিনীতে দুই জনে ঊর্দ্ধশ্বাসে বন মধ্যে প্রবেশ করিলেন। বন্য পথ নবকুমারের অপরিজ্ঞাত; কেবল সহচারিণী ষোড়শীকে লক্ষ্য করিয়া তদ্বর্ত্মসম্বর্ত্তী হওয়া ব্যতীত তাঁহার অন্য উপায় নাই। কিন্তু অন্ধকারে বন মধ্যে রমণীকে সকল সময় দেখা যায় না; যুবতী এক দিকে ধাবমানা হইলে, নবকুমার অন্য দিকে যান; রমণী কহিলেন, “আমার অঞ্চল ধর।” নবকুমার তাঁহার অঞ্চল ধরিয়া চলিলেন। ক্রমে তাঁহারা পাদক্ষেপ মন্দ করিয়া চলিতে লাগিলেন। অন্ধকারে কিছুই লক্ষ্য হয় না; কেবল কখন কোথায় নক্ষত্রালোকে কোন বালুকাস্তূপের শুভ্র শিখর অস্পষ্ট দেখা যায়—কোথাও খদ্যোতমালাসম্বৃত বৃক্ষের অবয়ব জ্ঞানগোচর হয়।

কপালকুণ্ডলা পথিককে সমভিব্যাহারে লইয়া, নিভৃত কাননাভ্যন্তরে উপনীত হইলেন। তখন রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর। সম্মুখে অন্ধকারে বন মধ্যে এক অত্যুচ্চ দেবালয়চূড়া লক্ষিত হইল; তন্নিকটে ইষ্টকনির্ম্মিতপ্রাচীরবেষ্টিত একটি গৃহও দেখা গেল। কপালকুণ্ডলা প্রাচীর দ্বারের নিকটস্থ হইয়া তাহাতে করাঘাত করিতে লাগিলেন; পুনঃ পুনঃ করাঘাত করাতে ভিতর হইতে এক ব্যক্তি কহিল, “কেও কপালকুণ্ডলা বুঝি?” কপালকুণ্ডলা কহিলেন, “দ্বার খোল।”

উত্তরকারী আসিয়া দ্বার খুলিয়া দিল। যে ব্যক্তি দ্বার খুলিয়া দিলেক, সে ঐ দেবালয়াধিষ্ঠাত্রী দেবতার সেবক বা অধিকারী; বয়সে পঞ্চাশৎ বৎসর অতিক্রান্ত করিয়াছিল। কপালকুণ্ডলা তাহার বিরলকেশমস্তক কর দ্বারা আকর্ষিত করিয়া আপন অধরের নিকট তাহার শ্রবণেন্দ্রিয় আনিলেন। এবং দুই চারি কথায় নিজ সঙ্গীর অবস্থা বুঝাইয়া দিলেন। অধিকারী বহু ক্ষণ পর্য্যন্ত করতললগ্নশীর্ষ হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন। পরিশেষে কহিলেন “এ বড় বিষম ব্যাপার। মহাপুৰুষ মনে করিলে সকল করিতে পারেন। যাহা হউক মায়ের প্রসাদে তোমার অমঙ্গল ঘটিবে না। সে ব্যক্তি কোথায়?”

কপালকুণ্ডলা, “আইস” বলিয়া নবকুমারকে আহ্বান করিলেন। নবকুমার অন্তরালে দাঁড়াইয়াছিলেন, আহূত হইয়া গৃহ মধ্যে প্রবেশ করিলেন। অধিকারী তাঁহাকে কহিলেন, “আজি এই খানে লুকাইয়া থাক, কালি প্রত্যূষে তোমাকে মেদিনীপুরের পথে রাখিয়া আসিব।”

ক্রমে কথায় কথায় অধিকারী জানিতে পারিলেন যে এপর্য্যন্ত নবকুমারের আহারাদি হয় নাই। ইহাতে অধিকারী তাঁহার আহারের আয়োজন করিতে প্রবৃত্ত হইলে, নবকুমার আহারে নিতান্ত অস্বীকৃত হইয়া কেবল মাত্র বিশ্রামস্থানের প্রার্থনা জানাইলেন। অধিকারী নিজ রন্ধনশালায় নবকুমারের শয্যা প্রস্তুত করিয়া দিলেন। নবকুমার শয়ন করিলে, কপালকুণ্ডলা সমুদ্রতীরে প্রত্যাগমন করিবার উদ্‍যোগ করিলেন। অধিকারী তাঁহার প্রতি সস্নেহ নয়নে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন।

“যাইও না, ক্ষণেক দাঁড়াও, এক ভিক্ষা আছে।”

কপালকুণ্ডলা। “কি?”

অধিকারী। “তোমাকে দেখিয়া পর্য্যন্ত মা বলিয়া থাকি, দেবীর পাদ স্পর্শ করিয়া শপথ করিতে পারি, যে মাতার অধিক তোমাকে স্নেহ করি। আমার ভিক্ষা অবহেলা করিবে না?”

কপা। “করিব না।”

অধি। “আমার এই ভিক্ষা, তুমি আর সেখানে ফিরিয়া যাইও না।”

কপা। “কেন?”

অধি। “গেলে তোমার রক্ষা নাই।”

কপা। “তাহা ত জানি?”

অধি। “তবে আবার জিজ্ঞাসা কর কেন?”

কপা। “না গিয়া কোথায় যাইব?”

অধি। “এই পথিকের সঙ্গে দেশান্তরে যাও।”

কপালকুণ্ডলা নীরব হইয়া রহিলেন। অধিকারী কহিলেন, “মা কি ভাবিতেছ?”

কপা। “যখন তোমার শিষ্য আসিয়াছিল, তখন তুমি কহিয়াছিলে, যে, যুবতীর এরূপ যুবা পুৰুষের সহিত যাওয়া অনুচিত; এখন যাইতে বল কেন?”

অধি। “তখন তোমার জীবনের আশঙ্কা করি নাই, বিশেষ যে সদুপায়ের সম্ভাবনা ছিল না, এখন সে সদুপায় হইতে পারিবেক। আইস মায়ের অনুমতি লইয়া আসি।”

এই বলিয়া অধিকারী দীপহস্তে দেবালয়ের দ্বারে গিয়া দ্বারোদ্ঘাটন করিলেন। কপালকুণ্ডলাও তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে গেলেন। মন্দির মধ্যে মানবাকারপ্রমাণা করালকালীমূর্ত্তি সংস্থাপিতা ছিল। উভয়ে ভক্তিভাবে প্রণাম করিলেন। অধিকারী, আচমন করিয়া পুষ্পপাত্র হইতে একটি অচ্ছিন্ন বিল্বপত্র লইয়া মন্ত্রপুত করিলেন, এবং তাহা প্রতিমার পাদোপরি সংস্থাপিত করিয়া তৎপ্রতি চাহিয়া রহিলেন। ক্ষণেক পরে, অধিকারী কপালকুণ্ডলাকে কহিলেন,

মা, দেখ, দেবী অর্ঘ্য গ্রহণ করিয়াছেন; বিল্বপত্র পড়ে নাই; যে মানস করিয়া অর্ঘ্য দিয়াছিলাম, তাহাতে অবশ্য মঙ্গল। তুমি এই পথিকের সঙ্গে সচ্ছন্দে গমন কর; কিন্তু আমি বিষয়ী লোকের রীতি চরিত্র জানি। তুমি যদি গলগ্রহ হইয়া ইহার সঙ্গে যাও, তবে এ ব্যক্তি অপরিচিত যুবতী সঙ্গে লইয়া লোকালয়ে লজ্জা পাইবেক। তোমাকেও লোকে ঘৃণা করিবেক। তুমি বলিতেছ এ ব্যক্তি ব্রাহ্মণসন্তান, গলাতেও যজ্ঞোপবীত দেখিতেছি। এ যদি তোমাকে বিবাহ করিয়া লইয়া যায়, তবে সকল মঙ্গল। নচেৎ আমিও তোমাকে ইহার সহিত যাইতে বলিতে পারি না।”

“বি—বা—হ!” এই কথাটি কপালকুণ্ডলা অতি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করিলেন। বলিতে লাগিলেন, “বিবাহের নাম ত তোমাদিগের মুখে শুনিয়া থাকি, কিন্তু কাহাকে বলে সবিশেষ জানি না। কি করিতে হইবেক?”

অধিকারী ঈষন্মাত্র হাস্য করিয়া কহিলেন, “বিবাহ স্ত্রীলোকের এক মাত্র ধর্ম্মের সোপান; এই জন্য স্ত্রীকে সহধর্ম্মিণী বলে। জগন্মাতাও শিবের বিবাহিতা।”

অধিকারী মনে করিলেন সকলই বুঝাইলেন। কপালকুণ্ডলা মনে করিলেন সকলই বুঝিলেন। বলিলেন,

“তাহাই হউক। কিন্তু তাঁহাকে ত্যাগ করিয়া যাইতে আমার মন সরিতেছে না। তিনি যে আমাকে এত দিন প্রতিপালন করিয়াছেন।”

অধি। “কি জন্য প্রতিপালন করিয়াছেন তাহা জান না। স্ত্রীলোকের সতীত্ব নাশ না করিলে যে তান্ত্রিক সিদ্ধ হয় না তাহা তুমি জান না। আমিও তন্ত্রাদি পাঠ করিয়াছি। মা জগদম্বা জগতের মাতা। ইনি সতীর সতীত্ব—সতী প্রধানা। ইনি সতীত্বনাশ সংযুক্ত পূজা কখন গ্রহণ করেন না। এই জন্যই আমি মহাপুৰুষের অনভিমত সাধিতেছি। তুমি পলায়ন করিলে কদাপি কৃতঘ্ন হইবে না। কেবল এ পর্য্যন্ত সিদ্ধির সময় উপস্থিত হয় নাই বলিয়া তুমি রক্ষা পাইয়াছ। আজি তুমি যে কার্য্য করিয়াছ—তাহাতে প্রাণেরও আশঙ্কা। এই জন্য বলিতেছি পলায়ন কর। ভবানীরও এই আজ্ঞা। অতএব যাও। আমার এখানে রাখিবার উপায় থাকিলে রাখিতাম; কিন্তু সে ভরসা যে নাই তাহা ত জান।”

কপা। “বিবাহই হউক।”

এই বলিয়া উভয়ে মন্দির হইতে বহির্গত হইলেন। এক কক্ষ মধ্যে কপালকুণ্ডলাকে বসাইয়া অধিকারী নবকুমারের শয্যা সন্নিধানে গিয়া তাঁহার শিওরে বসিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন “মহাশয় নিদ্রিত কি?”

নবকুমারের নিদ্রা যাইবার অবস্থা নহে। নিজ দশা ভাবিতেছিলেন। বলিলেন “আজ্ঞা না।”

অধিকারী কহিলেন, “মহাশয় পরিচয়টা লইতে একবার আসিলাম। আপনি ব্রাহ্মণ?”

নব। “আজ্ঞা হাঁ?”

অধি। “কোন্ শ্রেণী?”

নব। “রাঢ়ীয় শ্রেণী।”

অধি। “আমরাও রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ—উৎকল ব্রাহ্মণ বিবেচনা করিবেন না। বংশে কুলাচার্য্য, তবে এক্ষণে মায়ের পদাশ্রয়ে আছি। মহাশয়ের নাম?”

নব। “নবকুমার শর্ম্মা।”

অধি। “নিবাস?”

নব। “সপ্তগ্রাম।”

অধি। “আপনারা কোন্ গাঁই।”

নব। “বন্দ্যঘাটি।”

অধি। “কয় সংসার করিয়াছেন?”

নব। “এক সংসার মাত্র।”

নবকুমার সকল কথা খুলিয়া বলিলেন না। প্রকৃত পক্ষে তাঁহার এক সংসারও ছিল না। তিনি রামগোবিন্দ ঘোষালের কন্যা পদ্মাবতীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। বিবাহের পর পদ্মাবতী কিছু দিন পিত্রালয়ে রহিলেন। মধ্যে মধ্যে শ্বশুরালয়ে যাতায়াত করিতেন। যখন তাঁহার বয়স ত্রয়োদশ বৎসর, তখন তাঁহার পিতা সপরিবারে পুৰুষোত্তম দর্শনে গিয়াছিলেন। এই সময়ে পাঠানেরা আকবর শাহ কর্ত্তৃক বঙ্গদেশ হইতে দূরীভূত হইয়া উড়িষ্যায় সদলে বসতি করিতেছিল। তাহাদিগের দমনের জন্য আকবর শাহ বিধিমতে যত্ন পাইতে লাগিলেন। যখন রামগোবিন্দ ঘোষাল উড়িষ্যা হইতে প্রত্যাগমন করেন, তখন মোগল পাঠানের যুদ্ধ আরম্ভ হইয়াছে। আগমন কালে তিনি পথিমধ্যে পাঠান সেনার হস্তে পতিত হয়েন। পাঠানেরা তৎকালে ভদ্রাভদ্রবিচারশূন্য; তাহারা নিরপরাধী পথিকের প্রতি অর্থের জন্য বল প্রকাশের চেষ্টা করিতে লাগিল। রামগোবিন্দ কিছু উগ্রস্বভাব; পাঠানদিগের কটু কহিতে লাগিলেন। ইহার ফল এই হইল যে, সপরিবারে অবৰুদ্ধ হইলেন; পরিশেষে জাতীয় ধর্ম্ম বিসর্জ্জন পূর্ব্বক সপরিবারে মুসলমান হইয়া নিষ্কৃতি পাইলেন।

রামগোবিন্দ ঘোষাল সপরিবারে প্রাণ লইয়া বাটী আসিলেন বটে, কিন্তু মুসলমান বলিয়া আত্মীয় জনসমাজে এককালীন পরিত্যক্ত হইলেন। এ সময় নবকুমারের পিতা বর্ত্তমান ছিলেন, তাঁহাকে সুতরাং জাতিভ্রষ্ট বৈবাহিকের সহিত জাতিভ্রষ্টা পুত্রবধূকে ত্যাগ করিতে হইল। আর নবকুমারের সহিত তাঁহার স্ত্রীর সাক্ষাৎ হইল না।

স্বজনত্যক্ত ও সমাজচ্যুত হইয়া রামগোবিন্দ ঘোষাল অধিক দিন স্বদেশে বাস করিতে পারিলেন না। এই কারণেও বটে, এবং রাজপ্রসাদে উচ্চপদস্থ হইবার আকাঙ্ক্ষায়ও বটে, তিনি সপরিবারে রাজপাট ঢাকানগরে গিয়া বসতি করিতে লাগিলেন। ধর্ম্মান্তর গ্রহণ করিয়া তিনি সপরিবারে মহম্মদীয় নাম ধারণ করিয়াছিলেন। ঢাকায় যাওয়ার পরে শ্বশুরের বা বনিতার কি অবস্থা হইল তাহা নবকুমারের জানিতে পারিবার কোন উপায় রহিল না এবং এ পর্য্যন্ত কখন কিছু জানিতেও পারিলেন না। নবকুমার বিরাগবশতঃ আর দারপরিগ্রহ করিলেন না। এই জন্য বলিতেছি নবকুমারের “এক সংসারও” নহে।

অধিকারী এ সকল বৃত্তান্ত অবগত ছিলেন না। তিনি বিবেচনা করিলেন “কুলীনের সন্তানের দুই সংসারে আপত্তি কি?” প্রকাশ্যে কহিলেন, “আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে আসিয়াছিলাম। এই যে কন্যা আপনার প্রাণরক্ষা করিয়াছে—এ পরহিতার্থ আত্মপ্রাণ নষ্ট করিয়াছে। যে মহাপুৰুষের আশ্রয়ে ইহার বাস, তিনি অতি ভয়ঙ্করস্বভাব। তাঁহার নিকট প্রত্যাগমন করিলে, তোমার যে দশা ঘটিতেছিল ইহার সেই দশা ঘটিবেক। ইহার কোন উপায় বিবেচনা করিতে পারেন কি না?”

নবকুমার উঠিয়া বসিলেন। কহিলেন, “আমিও সেই আশঙ্কা করিতেছিলাম। আপনি সকল অবগত আছেন,—ইহার উপায় কৰুন। আমার প্রাণদান করিলে যদি কোন প্রত্যুপকার হয়,—তবে তাহাতেও প্রস্তুত আছি। আমি এমত সঙ্কল্প করিতেছি যে আমি সেই নরঘাতকের নিকট প্রত্যাগমন করিয়া আত্মসমর্পণ করি। তাহা হইলে ইহার রক্ষা হইবেক।” অধিকারী হাস্য করিয়া কহিলেন, “তুমি বাতুল। ইহাতে কি ফল দর্শিবে? তোমারও প্রাণ সংহার হইবে—অথচ ইহার প্রতি মহাপুৰুষের ক্রোধোপশম হইবেক না। ইহার এক মাত্র উপায় আছে।”

নব। “সে কি উপায়?”

অধি। “তোমার সহিত ইহার পলায়ন। কিন্তু সে অতি দুর্ঘট। আমার এখানে থাকিলে দুই এক দিন মধ্যে ধৃত হইবে। এ দেবালয়ে মহাপুৰুষের সর্ব্বদা যাতায়াত। সুতরাং কপালকুণ্ডলার অদৃষ্টে অশুভ নিশ্চিত দেখিতেছি।”

নবকুমার আগ্রহ সহকারে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমার সহিত পলায়ন দুর্ঘট কেন?”

অধি। “এ কাহার কন্যা,—কোন্ কুলে জন্ম, তাহা আপনি কিছুই জানেন না। কাহার পত্নী,—কি চরিত্রা, তাহা কিছুই জানেন না। আপনি ইহাকে কি সঙ্গিনী করিবেন? সঙ্গিনী করিয়া লইয়া গেলেও কি আপনি ইহাকে নিজ গৃহে স্থান দিবেন? আর যদি স্থান না দেন তবে এ অনাথিনী কোথা যাইবে?”

ধন্য রে কুলাচার্য্য!

নবকুমার ক্ষণেক চিন্তা করিয়া কহিলেন “আমার প্রাণ রক্ষয়ত্রীর জন্য কোন কার্য্য আমার অসাধ্য নহে। ইনি আমার আত্মপরিবারস্থা হইয়া থাকিবেন।”

অধি। “ভাল। কিন্তু যখন আপনার আত্মীয় স্বজন জিজ্ঞাসা করিবে যে এ কাহার স্ত্রী, কি উত্তর দিবেন?”

নবকুমার পুনর্ব্বার চিন্তা করিয়া কহিলেন, “আপনিই ইহাঁর পরিচয় আমাকে দিন। আমি সেই পরিচয় সকলকে দিব।”

অধি। “ভাল। কিন্তু এই পক্ষান্তরের পথ যুবক যুবতী অনন্যসহায় হইয়া কি প্রকারে যাইবে? লোকে দেখিয়া শুনিয়া কি বলিবে? আত্মীয় স্বজনের নিকট কি বুঝাইবে? আর আমিও এই কন্যাকে মা বলিয়াছি, আমিই বা কি প্রকারে ইহাকে অজ্ঞাতচরিত্র যুবার সহিত একাকী দূরদেশে পাঠাইয়া দিই?”

আবার বলি, ধন্য রে কুলাচার্য্য!

নবকুমার কহিলেন, “আপনি সঙ্গে আসুন।”

অধি। “আমি সঙ্গে যাইব? ভবানীর পূজা কে করিবে?”

নবকুমার ক্ষুব্ধ হইয়া কহিলেন, “তবে কি কোন উপায় করিতে পারেন না?”

অধি। “এক মাত্র উপায় হইতে পারে,—সে আপনার ঔদার্য্যগুণের অপেক্ষা করে?”

নব। “সে কি? আমি কিসে অস্বীকৃত? কি উপায় বলুন।”

অধি। “শুনুন। ইনি ব্রাহ্মণকন্যা। ইহাঁর বৃত্তান্ত আমি সবিশেষ অবগত আছি। ইনি বাল্যকালে দুরন্ত খ্রীষ্টিয়ান তস্কর কর্ত্তৃক অপহৃত হইয়া তাহাদিগের দ্বারা যানভগ্ন কালে এই সমুদ্রতীরে ত্যক্ত হয়েন। সে সকল বৃত্তান্ত পশ্চাৎ ইহাঁর নিকট আপনি সবিশেষ অবগত হইতে পারিবেন। কাপালিক ইহাঁকে প্রাপ্ত হইয়া আপন যোগসিদ্ধিমানসে প্রতিপালন করিয়াছেন। অচিরাৎ আত্মপ্রয়োজন সিদ্ধ করিতেন। ইনি এ পর্য্যন্ত অনূঢ়া; ইহাঁর চরিত্র পরম পবিত্র। আপনি ইহাঁকে বিবাহ করিয়া গৃহে লইয়া যান। কেহ কোন কথা বলিতে পারিবেক না। আমি যথাশাস্ত্র বিবাহ দিব।”

নবকুমার শয্যা হইতে দাঁড়াইয়া উঠিলেন। অতি দ্রুতপাদ বিক্ষেপে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। কোন উত্তর করিলেন না। অধিকারী কিয়ৎক্ষণ পরে কহিলেন,

“আপনি এক্ষণে নিদ্রা যান। কল্য প্রত্যূষে আপনাকে আমি জাগরিত করিব। ইচ্ছা হয়, একাকী যাইবেন। আপনাকে মেদিনীপুরের পথে রাখিয়া আসিব।”

এই বলিয়া অধিকারী বিদায় হইলেন। গমন কালে মনে মনে করিলেন, “রাঢ়দেশের ঘটকালী কি ভুলিয়া গিয়াছি না কি?”

গ্রন্থকার কহেন, “ফলেন পরিচীয়তে।”

চতুর্থ খণ্ড · চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

স্বপ্নে।

কপালকুণ্ডলা ধীরে ধীরে দ্বার ৰুদ্ধ করিলেন। ধীরে ধীরে শয়নাগারে আসিলেন, ধীরে ধীরে পালঙ্কে শয়ন করিলেন। মনুষ্যহৃদয় অনন্ত সমুদ্র, যখন তদুপরি ক্ষিপ্ত বায়ুগণ সমর করিতে থাকে, কে তাহার তরঙ্গমালা গণিতে পারে? কপালকুণ্ডলার হৃদয়সমুদ্রে যে তরঙ্গমালা উৎক্ষিপ্ত হইতেছিল, কে তাহা গণিবে?

সে রাত্রে নবকুমার হৃদয়বেদনায় অন্তঃপুরে আইসেন নাই। শয়নাগারে একাকিনী কপালকুণ্ডলা শয়ন করিলেন, কিন্তু নিদ্রা আসিল না। প্রবলবায়ুতাড়িত বারিধারাপরিসিঞ্চিত জটাজূটবেষ্টিত সেই মুখমণ্ডল অন্ধকার মধ্যেও চতুর্দ্দিকে দেখিতে লাগিলেন। কপালকুণ্ডলা পূর্ব্ববৃত্তান্ত সকল আলোচনা করিয়া দেখিতে লাগিলেন।
কাপালিকের সহিত যেরূপ আচরণ করিয়া তিনি চলিয়া আসিয়াছিলেন তাহা স্মরণ হইতে লাগিল; কাপালিক নিবিড় বনমধ্যে যে সকল পৈশাচিক কার্য্য করিতেন তাহা স্মরণ হইতে লাগিল; তৎকৃত ভৈরবীপূজা, নবকুমারের বন্ধন; এ সকল মনে পড়িতে লাগিল। কপালকুণ্ডলা শিহরিয়া উঠিলেন। অদ্যকার রাত্রের সকল ঘটনাও মনোমধ্যে আসিতে লাগিল। শ্যামার ওষধিকামনা, নবকুমারের নিষেধ, তাঁহার প্রতি কপালকুণ্ডলার তিরস্কার, তৎপরে অরণ্যের জ্যোৎস্নাময় শোভা, কাননতলে অন্ধকার, সেই অরণ্য মধ্যে যে সহচর পাইয়াছিলেন তাহার ভীমকান্ত গুণময় রূপ; সকলই মনে পড়িতে লাগিল।

পূর্ব্বদিকে উষার মুকুটজ্যোতিঃ প্রকটিত হইল; তখন কপালকুণ্ডলার অল্প তন্দ্রা আসিল। সেই অপ্রগাঢ় নিদ্রায় কপালকুণ্ডলা স্বপ্ন দেখিতে লাগিলেন। তিনি যেন সেই পূর্ব্বদৃষ্ট সাগরহৃদয়ে তরণী আরোহণ করিয়া যাইতেছিলেন। তরণী সুশোভিত; তাহাতে বসন্তরঙ্গের পতাকা উড়িতেছে; নাবিকেরা ফুলের মালা গলায় দিয়া বাহিতেছে। রাধা শ্যামের অনন্ত প্রণয় গীত করিতেছে। পশ্চিম গগণ হইতে সূর্য্য স্বর্ণধারা বৃষ্টি করিতেছে। স্বর্ণধারা পাইয়া সমুদ্র হাসিতেছে; আকাশমণ্ডলে মেঘগণ সেই স্বর্ণবৃষ্টিতে ছুটাছুটি করিয়া স্নান করিতেছে। অকস্মাৎ রাত্রি হইল, সূর্য্য কোথায় গেল। স্বর্ণমেঘ সকল কোথায় গেল। নিবিড় নীল কাদম্বিনী আসিয়া আকাশ ব্যাপিয়া ফেলিল। আর সমুদ্রে দিক্ নিরূপণ হয় না। নাবিকেরা তরি ফিরাইল। কোন্ দিকে বাহিবে স্থিরতা পায় না। তাহারা গীত বন্ধ করিল, গলার মালা সকল ছিড়িয়া ফেলিল; বসন্ত রঙ্গের পতাকা আপনি খসিয়া জলে পড়িয়া গেল। বাতাস উঠিল, বৃক্ষপ্রমাণ তরঙ্গ উঠিতে লাগিল, তরঙ্গমধ্য হইতে এক জন জটাজূটধারী প্রকাণ্ডাকার পুৰুষ আসিয়া কপালকুণ্ডলার নৌকা বামহস্তে তুলিয়া সমুদ্র মধ্যে প্রেরণ করিতে উদ্যত হইল। এমত সময়ে সেই ভীমকান্ত শ্রীময় ব্রাহ্মণবেশধারী আসিয়া তরি ধরিয়া রহিল। সে কপালকুণ্ডলাকে জিজ্ঞাসা করিল, “তোমায় রাখি কি নিমগ্ন করি?” অকস্মাৎ কপালকুণ্ডলার মুখ হইতে বাহির হইল “নিমগ্ন কর।” ব্রাহ্মণবেশী নৌকা ছাড়িয়া দিল। তখন নৌকাও শব্দময়ী হইল, কথা কহিয়া উঠিল। নৌকা কহিল “আমি আর এ ভার বহিতে পারি না, আমি পাতালে প্রবেশ করি। ইহা কহিয়া নৌকা তাহাকে জলে নিক্ষিপ্ত করিয়া পাতালে প্রবেশ করিল।

ঘর্ম্মাক্তকলেবরা হইয়া কপালকুণ্ডলা স্বপ্নোত্থিতা হইলে চক্ষুৰুন্মীলন করিলেন, দেখিলেন, প্রভাত হইয়াছে—কক্ষ্যার গবাক্ষ মুক্ত রহিয়াছে; তন্মধ্য দিয়া বসন্তবায়ুস্রোতঃ প্রবেশ করিতেছে। মন্দান্দোলিত বৃক্ষশাক্ষায় পক্ষিগণ কূজন করিতেছে। সেই গবাক্ষের উপর কতক গুলিন মনোহর বন্যলতা সুবাসিত কুসুম সহিত দুলিতেছে। কপালকুণ্ডলা নারীস্বভাববশতঃ লতা গুলিন গুছাইয়া লইতে লাগিলেন। তাহা সুশৃঙ্খল করিয়া বাঁধিতে তাহার মধ্য হইতে এক খানি লিপি বাহির হইল। কপালকুণ্ডলা অধিকারীর ছাত্র; পড়িতে পারিতেন। নিম্নোক্ত মত পাঠ করিলেন।

“অদ্য সন্ধ্যার পর কল্য রাত্রের ব্রাহ্মণকুমারের সহিত সাক্ষাৎ করিবা। তোমার নিজ সম্পৰ্কীয় নিতান্ত প্রয়োজনীয় যে কথা শুনিতে চাহিয়াছিলে তাহা শুনিবে।

অহং ব্রাহ্মণবেশী।”

তৃতীয় খণ্ড · চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

রাজনিকেতনে।

পত্নীভাবে আর তুমি ভেবো না আমারে।

বীরাঙ্গনা কাব্য।

মতি আগ্রায় উপনীতা হইলেন। আর তাঁহাকে মতি বলিবার আবশ্যক করে না। কয় দিনে তাঁহার চিত্তবৃত্তি সকল একেবারে পরিবর্ত্তিত হইয়াছিল।

জাঁহাগীরের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল। জাঁহাগীর তাঁহাকে পূর্ব্ববৎ সমাদর করিয়া তাঁহার সহোদরের সম্বাদ ও পথের কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। লুৎফ্-উন্নিসা যাহা মেহের-উন্নিসাকে বলিয়াছিলেন তাহা সত্য হইল। অন্যান্য প্রসঙ্গের পর বর্দ্ধমানের কথা শুনিয়া, জাঁহাগীর জিজ্ঞাসা করিলেন “মেহের-উন্নিসার নিকট দুই দিন ছিলে বলিতেছ, মেহের-উন্নিসা আমার কথা কি বলিল?”

লুৎফ্-উন্নিসা অকপট হৃদয়ে মেহের-উন্নিসার
অনুরাগের পরিচয় দিলেন। বাদসাহ শুনিয়া নীরবে রহিলেন; তাঁহার বিস্ফারিত লোচনে দুই এক বিন্দু অশ্রু বহিল।

লুৎফ্-উন্নিসা কহিলেন, “জাঁহাপনা! দাসী শুভ সম্বাদ দিয়াছে। দাসীর এখনও কোন পুরস্কারের আদেশ হয় নাই।”

বাদশাহ হাসিয়া কহিলেন, “বিবি! তোমার আকাঙ্ক্ষা অপরিমিত।”

লু। “জাঁহাপনা, দাসীর কি দোষ?”

বাদ। “দিল্লীর বাদশাহকে তোমার গোলাম করিয়া দিয়াছি; আরও পুরস্কার চাহিতেছ?”

লুৎফ্-উন্নিসা হাসিয়া কহিলেন, “স্ত্রীলোকের অনেক সাধ।”

বাদ। “আবার কি সাধ হইয়াছে?”

লু। “আগে রাজাজ্ঞা হউক, যে দাসীর আবেদন গ্রাহ্য হইবে।”

বাদ। “যদি রাজকার্য্যের বিঘ্ন না হয়।”

লু। (হাসিয়া) “একের জন্য দিল্লীশ্বরের কার্য্যে বিঘ্ন হয় না।”

বাদ। “তবে স্বীকৃত হইলাম;—সাধটী কি শুনি।”

লু। “সাধ হইয়াছে একটী বিবাহ করিব।”

জাঁহাগীর উচ্চহাস্য করিয়া উঠিলেন। কহিলেন, “এ নূতন তর সাধ বটে। কোথাও সম্বন্ধের স্থিরতা হইয়াছে?”

লু। “তা হইয়াছে। কেবল রাজাজ্ঞার সাপেক্ষ। রাজার সম্মতি প্রকাশ না হইলে কোন সম্বন্ধ স্থির নহে।”

বাদ। “আমার সম্মতির প্রয়োজন কি? কাহাকে এ সুখের সাগরে ভাসাইবে অভিপ্রায় করিয়াছ?”

লু। “দাসী দিল্লীশ্বরের সেবা করিয়াছে বলিয়া দ্বিচারিণী নহে। দাসী আপন স্বামীকেই বিবাহ করিবার অনুমতি চাহিতেছে?”

বাদ। “বটে। এ পুরাতন নফরের দশা কি করিবে?”

লু। “দিল্লীশ্বরী মেহের-উন্নিসাকে দিয়া যাইব।”

বাদ। “দিল্লীশ্বরী মেহের-উন্নিসা কে?”

লু। “যিনি হইবেন।”

জাঁহাগীর মনে ভাবিলেন যে মেহের-উন্নিসা যে নিশ্চিত দিল্লীশ্বরী হইবেন তাহা, লুৎফ্-উন্নিসা ধ্রুব জানিয়াছেন। তৎকারণে নিজ মনোভিলাষ বিফল হইল বলিয়া রাজাবরোধ হইতে বীতরাগে অবসর হইতে চাহিতেছেন।

এইরূপ বুঝিয়া জাঁহাগীর দুঃখিত হইয়া নীরবে রহিলেন। লুৎফ্-উন্নিসা কহিলেন,

“মহারাজের কি এ সম্বন্ধে সম্মতি নাই?”

বাদ। “আমার অসম্মতি নাই। কিন্তু স্বামীর সহিত আবার বিবাহের আবশ্যকতা কি?”

লু। “কপালক্রমে প্রথম বিবাহে স্বামী পত্নী বলিয়া গ্রহণ করিলেন না। এক্ষণে জাঁহাপনার প্রসাদ ত্যাগ করিতে পারিবেন না।”

বাদশাহ রহস্যে হাস্য করিয়া পরে গম্ভীর হইলেন।

কহিলেন, “প্রেয়সি! তোমাকে আমার অদেয় কিছুই নাই। তোমার যদি সেই প্রবৃত্তি হয়, তবে তদ্রূপই কর। কিন্তু আমাকে কেন ত্যাগ করিয়া যাইবে? এক আকাশে কি চন্দ্র সূর্য্য উভয়েই বিরাজ করেন না? এক বৃন্তে কি দুটী ফুল ফুটে না?”

লুৎফ্-উন্নিসা বিস্ফারিত চক্ষে বাদশাহের প্রতি দৃষ্টি করিয়া কহিলেন, “ক্ষুদ্র ফুল ফুটিয়া থাকে, কিন্তু এক মৃণালে দুইটি কমল ফুটে না। আপনার রত্নসিংহাসনতলে কেন কণ্টক হইয়া থাকিব?

লুৎফ্-উন্নিসা আত্মমন্দিরে প্রস্থান করিলেন। তাঁহার এইরূপ মনোবাঞ্ছা যে কেন জন্মিল তাহা তিনি জাঁহাগীরের নিকট ব্যক্ত করেন নাই। অনুভবে যেরূপ বুঝা যাইতে পারে জাহাগীর সেইরূপ বুঝিয়া ক্ষান্ত হইলেন। নিগূঢ় তত্ত্ব কিছুই জানিলেন না। লুৎফ্-উন্নিসার হৃদয় পাষাণ। সেলিমের রমণীহৃদয়জিৎ রাজকান্তিও কখন তাঁহার মনঃ মুগ্ধ করে নাই। কিন্তু এই বার পাষাণমধ্যে কীট প্রবেশ করিয়াছিল।

দ্বিতীয় খণ্ড · চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

শিবিকারোহণে।

——————খুলিনু সত্বরে

কঙ্কন, বলয়, হার, সিঁথি, কণ্ঠমালা,

কুণ্ডল, নূপুর, কাঞ্চি।

মেঘনাদ বধ।

গহনার দশা কি হইল বলি শুন। মতিবিবি গহনা রাখিবার জন্য একটী রৌপ্যজড়িত হস্তিদন্তের কৌটা পাঠাইয়া দিলেন। দস্যুরা তাঁহার অল্প সামগ্রীই লইয়াছিল—নিকটে যাহা ছিল তদ্ব্যতীত কিছুই পায় নাই।

নবকুমার দুই এক খানি গহনা কপালকুণ্ডলার অঙ্গে রাখিয়া অধিকাংশ কৌটায় তুলিয়া রাখিলেন। পরদিন প্রভাতে মতি বিবি বর্দ্ধমানাভিমুখে, নবকুমার সপত্নী সপ্তগ্রামাভিমুখে, যাত্রা করিলেন। নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে শিবিকাতে তুলিয়া দিয়া তাঁহার সঙ্গে গহনার কৌটা দিলেন। বাহকেরা সহজেই নবকুমারকে পশ্চাৎ করিয়া চলিল। কপালকুণ্ডলা শিবিকাদ্বার খুলিয়া চারি দিক্ দেখিতে দেখিতে যাইতেছিলেন; এক জন ভিক্ষুক তাঁহাকে দেখিতে পাইয়া ভিক্ষা চাহিতে চাহিতে পালকির সঙ্গে সঙ্গে চলিল।

কপালকুণ্ডলা কহিলেন, “আমার ত কিছু নাই, তোমাকে কি দিব?”

ভিক্ষুক কপালকুণ্ডলার অঙ্গে যে দুই এক খানা অলঙ্কার ছিল, তৎপ্রতি অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিয়া কহিল, “সে কি মা! তোমার গায়ে হীরা মুক্তা—তোমার কিছু নাই?”

কপালকুণ্ডলা জিজ্ঞাসা করিলেন, “গহনা পাইলে তুমি সন্তুষ্ট হও?”

ভিক্ষুক কিছু বিস্মিত হইল। ভিক্ষুকের আশা অপরিমিত। ক্ষণমাত্র পরে কহিল, “হই বই কি?”

কপালকুণ্ডলা অকপটহৃদয়ে কৌটা সমেত সকল গহনা গুলিন ভিক্ষুকের হস্তে দিলেন। অঙ্গের অলঙ্কার গুলিনও খুলিয়া দিলেন।

ভিক্ষুক ক্ষণেক বিহ্বল হইয়া রহিল। দাস দাসী কিছুমাত্র জানিতে পারিল না। ভিক্ষুকের বিহ্বল ভাব ক্ষণিক মাত্র। তখনই এ দিক্ ও দিক্ চাহিয়া ঊর্দ্ধশ্বাসে গহনা লইয়া পলায়ন করিল। কপালকুণ্ডলা ভাবিলেন, ভিক্ষুক দৌড়াইল কেন?

প্রথম খণ্ড · চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

স্তূপশিখরে।

——————“সবিস্ময়ে দেখিলা অদূরে,

ভীষণ-দর্শন—মূর্ত্তি।”

মেঘনাদবধ।

যখন নবকুমারের নিদ্রাভঙ্গ হইল, তখন রজনী গভীরা। এখনও যে তাঁহাকে ব্যাঘ্রে হত্যা করে নাই, ইহা তাঁহার আশ্চর্য্য বোধ হইল। ইতস্ততঃ নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিলেন ব্যাঘ্র আসিতেছে কি না। অকস্মাৎ সম্মুখে, বহু দূরে, একটা আলোক দেখিতে পাইলেন। পাছে ভ্রম জন্মিয়া থাকে, এজন্য নবকুমার মনোভিনিবেশ পূর্ব্বক তৎপ্রতি দৃষ্টি করিতে লাগিলেন। আলোকপরিধি ক্রমে বর্দ্ধিতায়তন এবং উজ্জ্বলতর হইতে লাগিল—আগ্নেয় আলোক বলিয়া প্রতীতি জন্মাইল। প্রতীতি মাত্র নবকুমারের জীবনাশা পুনৰুদ্দীপ্ত হইল। মনুষ্য সমাগম ব্যতীত এ আলোকের উৎপত্তি সম্ভবে না। নবকুমার গাত্রোত্থান করিলেন। যথায় আলোক, সেই দিকে ধাবিত হইলেন। একবার মনে ভাবিলেন, “এ আলোক ভৌতিক?—হইতেও পারে, কিন্তু শঙ্কায় নিরস্ত থাকিলেই কোন্ জীবন রক্ষা হয়?” এই ভাবিয়া নির্ভীকচিত্তে আলোক লক্ষ্য করিয়া চলিলেন। বৃক্ষ, লতা, বালুকাস্তূপ পদে পদে তাঁহার গতিরোধ করিতে লাগিল। বৃক্ষলতা দলিত করিয়া, বালুকাস্তূপ লঙ্ঘিত করিয়া নবকুমার চলিলেন। আলোকের নিকটবর্ত্তী হইয়া দেখিলেন, যে এক অত্যুচ্চ বালুকাস্তূপের শিরোভাগে অগ্নি জ্বলিতেছে, তৎপ্রভায় শিখরাসীন মনুষ্যমূর্ত্তি আকাশপটস্থ চিত্রের ন্যায় দেখা যাইতেছে। নবকুমার শিখরাসীন মনুষ্যের সমীপবর্ত্তী হইবেন স্থিরসঙ্কল্প করিয়া, অশিথিলীকৃত বেগে চলিলেন। পরিশেষে স্তূপারোহণ করিতে লাগিলেন। তখন কিঞ্চিৎ শঙ্কা হইতে লাগিল—তথাপি অকম্পিত পদে স্তপারোহণ করিতে লাগিলেন। আসীন ব্যক্তির সম্মুখবর্ত্তী হইয়া যাহা যাহা দেখিলেন, তাহাতে তাঁহার রোমাঞ্চ হইল। তিষ্ঠিবেন কি প্রত্যাবর্ত্তন করিবেন তাহা স্থির করিতে পারিলেন না।

শিখরাসীন মনুষ্য নয়ন মুদিত করিয়া ধ্যান করিতেছিল—নবকুমারকে প্রথম দেখিতে পাইল না। নবকুমার দেখিলেন তাহার বয়ঃক্রম প্রায় পঞ্চাশৎ বৎসর হইবেক। পরিধানে কোন কার্পাসবস্ত্র আছে কি না তাহা লক্ষ্য হইল না; কটিদেশ হইতে জানু পর্য্যন্ত শার্দ্দূলচর্ম্মে আবৃত। গলদেশে ৰুদ্রাক্ষমালা; আয়ত মুখমণ্ডল শ্মশ্রুজটা পরিবেষ্টিত। সম্মুখে কাষ্ঠে অগ্নি জ্বলিতেছিল—সেই অগ্নির দীপ্তি লক্ষ্য করিয়া নবকুমার সে স্থলে আসিতে পারিয়া ছিলেন। নবকুমার একটা বিকট দুর্গন্ধ পাইতে লাগিলেন; ইহার আসন প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া তাহার কারণ অনুভূত করিতে পারিলেন। জটাধারী এক ছিন্ন-শীর্ষ গলিত শবের উপর বসিয়া আছেন। আরও সভয়ে দেখিলেন যে সম্মুখে নরকপাল রহিয়াছে; তন্মধ্যে রক্তবর্ণ দ্রব পদার্থ রহিয়াছে। চতুর্দ্দিকে স্থানে স্থানে অস্থি পড়িয়া রহিয়াছে—এমন কি যোগাসীনের কণ্ঠস্থ ৰুদ্রাক্ষমালা মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অস্থিখণ্ড গ্রথিত রহিয়াছে। নবকুমার মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া রহিলেন। অগ্রসর হইবেন কি স্থানত্যাগ করিবেন তাহা বুঝিতে পারিলেন না। তিনি কাপালিকদিগের কথা শ্রুত ছিলেন। বুঝিলেন, যে এ ব্যক্তি দুরন্ত কাপালিক।

যখন নবকুমার উপনীত হইয়াছিলেন, তখন কাপালিক মন্ত্র সাধনে বা জপে বা ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, নবকুমারকে দেখিয়া ভ্রূক্ষেপও করিলেন না। অনেক ক্ষণ পরে জিজ্ঞাসা করিলেন “কস্ত্বং” নবকুমার কহিলেন “ব্রাহ্মণ”।

কাপালিক কহিল “তিষ্ঠ” এই কহিয়া পূর্ব্বকার্য্যে নিযুক্ত হইল। নবকুমার দাঁড়াইয়া রহিলেন।

এই রূপে প্রহরার্দ্ধ গত হইল। পরিশেষে কাপালিক গাত্রোত্থান করিয়া নবকুমারকে পূর্ব্ববৎ সংস্কৃতে কহিল “মামনুসর।”

ইহা নিশ্চিত বলা যাইতে পারে যে অন্য সময়ে নবকুমার কদাপি ইহার সঙ্গী হইতেন না। কিন্তু এক্ষণে ক্ষুধা তৃষ্ণায় প্রাণ কণ্ঠাগত। অতএব কহিলেন, “প্রভুর যেমত আজ্ঞা। কিন্তু আমি ক্ষুধা তৃষ্ণায় বড় কাতর। কোথায় গেলে আহার্য্য সামগ্রী পাইব অনুমতি কৰুন।”

কাপালিক কহিল, “তুমি ভৈরবীর প্রেরিত; আমার সঙ্গে আইস। আহার্য্যসামগ্রী পাইতে পারিবে।”

নবকুমার কাপালিকের অনুগামী হইলেন। উভয়ে অনেক পথ বাহিত করিলেন—পথিমধ্যে কেহ কোন কথা কহিল না। পরিশেষে এক পর্ণকুটীর প্রাপ্ত হইল—কাপালিক প্রথমে প্রবেশ করিয়া নবকুমারকে প্রবেশ করিতে অনুমতি করিল। এবং নবকুমারের অবোধগম্য কোন উপায়ে এক খণ্ড কাষ্ঠে অগ্নি জ্বালিত করিল। নবকুমার তদালোকে দেখিলেন যে ঐ কুটীর সর্ব্বাংশে কিয়াপাতায় রচিত। তন্মধ্যে কয়েক খানা ব্যাঘ্রচর্ম্ম আছে—এক কলস বারি ও কিছু ফল মূল আছে।

কাপালিক অগ্নি জ্বালিত করিয়া কহিল “ফল মূল যাহা আছে আত্মসাৎ করিতে পার। পর্ণপাত্র রচনা করিয়া কলস-জল পান করিও। ব্যাঘ্রচর্ম্ম আছে অভিৰুচি হইলে শয়ন করিও। নির্ব্বিঘ্নে তিষ্ঠ—ব্যাঘ্রের ভয় করিও না। সময়ান্তরে আমার সহিত সাক্ষাৎ হইবে। যে পর্য্যন্ত সাক্ষাৎ না হয়, সে পর্য্যন্ত এ কুটীর ত্যাগ করিও না।”

এই বলিয়া কাপালিক প্রস্থান করিল। নবকুমার সেই সামান্য ফল মূল আহার করিয়া এবং সেই ঈর্ষাত্তক্ত জলপান করিয়া পরম পরিতোষ লাভ করিলেন। পরে ব্যাঘ্রচর্ম্মে শয়ন করিলেন, সমস্ত দিবস জনিত ক্লেশ হেতু শীঘ্রই নিদ্রাভিভূত হইলেন।

চতুর্থ খণ্ড · তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

কাননতলে।

সপ্তগ্রামের এই ভাগ যে বনময় তাহা পূর্ব্বেই কতক কতক উল্লিখিত হইয়াছে। গ্রামের কিছু দূরে নিবিড় বন।
কপালকুণ্ডলা একাকিনী এক সঙ্কীর্ণ বন্য পথে ঔষধির সন্ধানে চলিলেন। যামিনী মধুরা, একান্ত শব্দমাত্রবিহীনা। মাধবী যামিনীর আকাশে স্নিগ্ধরশ্মিময় চন্দ্র নীরবে শ্বেত মেঘ খণ্ড সকল উত্তীর্ণ হইতেছে: পৃথিবীতলে, বন্য বৃক্ষ লতা সকল তদ্রূপ নীরবে শীতল চন্দ্রকরে বিশ্রাম করিতেছে; নীরবে বৃক্ষপত্র সকল সে কিরণের প্রতিঘাত করিতেছে; নীরবে লতা গুল্ম মধ্যে শ্বেত কুসুমদল বিকশিত হইয়া রহিয়াছে। পশু পক্ষী নীরব। কেবল কোথাও কদাচিৎ মাত্র ভগ্নবিশ্রাম কোন পক্ষীর পক্ষস্পন্দনশব্দ; কোথাও কচিৎ শুষ্কপত্রপাতশব্দ; কোথাও তলস্থ শুষ্কপত্র মধ্যে উরগ জাতীয় জীবের ক্বচিৎ গতিজনিত শব্দ; ক্বচিৎ অতি দূরস্থ কুক্কুররব। এমত নহে যে একেবারে বায়ু বহিতেছিল না; মধু মাসের দেহস্নিগ্ধকর বায়ু; অতিমন্দ; একান্ত নিঃশব্দ বায়ু মাত্র; তাহাতে কেবল মাত্র বৃক্ষের সর্ব্বাগ্রভাগারূঢ় পত্রগুলিন হেলিতেছিল, কেবলমাত্র আভূমিপ্রণত শ্যামালতা দুলিতেছিল; কেবল মাত্র নীলাম্বরসঞ্চারী ক্ষুদ্র শ্বেতাম্বুদখণ্ড গুলিন ধীরে ধীরে চলিতেছিল। কেবল মাত্র, তদ্রূপ বায়ু সংসর্গে সম্ভুক্ত পূর্ব্ব সুখের অস্পষ্ট স্মৃতি হৃদয়ে অল্প জাগরিত হইতেছিল।

কপালকুণ্ডলার সেইরূপ পূর্ব্বস্মৃতি জাগরিত হইতেছিল; বালিয়াড়ীর শিখরে যে, সাগরবারিবিন্দুসংস্পৃষ্ট মলয়ানিল তাহার লম্বালকমণ্ডল মধ্যে ক্রীড়া করিত, তাহা মনে পড়িল; অমল নীলানন্ত গগণ প্রতি চাহিয়া দেখিলেন; সেই অমল নীলানন্ত গগণরূপী সমুদ্র মনে পড়িল। কপালকুণ্ডলা পূর্ব্বস্মৃতি সমালোচনায় অন্যমনা হইয়া চলিলেন।

অন্য মনে যাইতে যাইতে কোথায় কি উদ্দেশে যাইতেছিলেন, কপালকুণ্ডলা তাহা ভাবিলেন না। যে পথে যাইতেছিলেন, তাহা ক্রমে অগম্য হইয়া আসিল; বন নিবিড়তর হইল; শিরোপরে ব্রক্ষশাখাবিন্যাসে চন্দ্রলোক প্রায় একেবারে ৰুদ্ধ হইয়া আসিল, ক্রমে আর পথ দেখা যায় না। পথের অলক্ষ্যতায় প্রথমে কপালকুণ্ডলা চিন্তামগ্নতা হইতে উত্থিত হইলেন। ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন এই নিবিড় বনমধ্যে আলো জ্বলিতেছে। লুৎফ্-উন্নিসাও পূর্ব্বে এই আলো দেখিয়াছিলেন। কপালকুণ্ডলা পূর্ব্বাভ্যাসফলে এ সকল সময়ে ভয়হীনা, অথচ কৌতূহলময়ী। ধীরে ধীরে সেই দীপজ্যোতিরভিমুখে গেলেন। দেখিলেন, যথায় আলো জ্বলিতেছে তথার কেহ নাই। কিন্তু তাহার অনতিদূরে বননিবিড়তা হেতু দূর হইতে অদৃশ্য একটি ভগ্ন গৃহ আছে। গৃহটি ইষ্টকনির্মিত, কিন্তু অতি ক্ষুদ্র, অতি সামান্য; তাহাতে একটি মাত্র ঘর। সেই ঘর হইতে মনুষ্যকথোপকথন নির্গত হইতেছিল, কপালকুণ্ডলা নিঃশব্দ পদক্ষেপে গৃহ সন্নিধানে গেলেন। গৃহের নিকটবর্ত্তী হইবামাত্র বোধ হইল দুই জন মনুষ্য সাবধানে কথোপকথন করিতেছে। প্রথমে কথোপকথন কিছুই বুঝিতে পারিলেন না; পরে ক্রমে চেষ্টাজনিত কর্ণের তীক্ষ্ণতা জন্মিলে নিম্নলিখিত মত কথা শুনিত পাইলেন।

এক জন কহিতেছে, “আমার অভীষ্ট মৃত্যু, ইহাতে তোমার অভিমত না হয়, আমি তোমার সাহায্য করিব না; তুমিও আমার সহায়তা করিও না।”

অপর ব্যক্তি কহিল, “আমিও মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী নহি; কিন্তু যাবজ্জীবন জন্য ইহার নির্ব্বাসন হয়, তাহাতে আমি সম্মত আছি। কিন্তু হত্যার কোন উদ্যোগ আমা হইতে হইবে না; বরং তাহার প্রতিকূলাচরণ করিব।”

প্রথমালাপকারী কহিল, “তুমি অতি অবোধ, অজ্ঞান। তোমায় কিছু জ্ঞান দান করিতেছি। মনঃসংযোগ করিয়া শ্রবণ কর। অতি গূঢ় বৃত্তান্ত বলিব; চতুর্দ্দিক্ এক বার দেখিয়া আইস, যেন মনুষ্যশ্বাস শুনিতে পাইতেছি।”

বাস্তবিক কপালকুণ্ডলা কথোপকথন উত্তমরূপে শুনিবার জন্য কক্ষ্যাপ্রাচীরের অতি নিকটে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। এবং তাঁহার আগ্রহাতিশয় এবং শঙ্কার কারণে ঘন ঘন গুরু শ্বাস বহিতেছিল।

সমভিব্যাহারীর কথায় গৃহমধ্যস্থ এক ব্যক্তি বাহিরে আসিলেন, এবং আসিয়াই কপালকুণ্ডলাকে দেখিতে পাইলেন। কপালকুণ্ডলাও পরিষ্কার চন্দ্রালোকে আগন্তুক পুরুষের অবয়ব সুস্পষ্ট করিয়া দেখিলেন। দেখিয়া ভীতা হইবেন, কি প্রফুল্লিতা হইবেন তাহা স্থির করিতে পারিলেন না। দেখিলেন, আগন্তুক ব্রাহ্মণবেশী সামান্য ধূতি পরিধান; গাত্র উত্তরীয়ে উত্তমরূপে আচ্ছাদিত। ব্রাহ্মণকুমার, অতি কোমলবয়স্ক; মুখমণ্ডলে বয়শ্চিহ্ণ কিছুমাত্র নাই। মুখ খানি পরম সুন্দর, সুন্দরী রমণীমুখের ন্যায় সুন্দর, কিন্তু রমণীর দুর্ল্লভ তেজোগর্ব্ববিশিষ্ট। তাঁহার কেশ গুলিন সচরাচর পুরুষদিগের কেশের ন্যায় ক্ষৌর-কার্য্যাবশেষাত্মক মাত্র নহে, স্ত্রীলোকদিগের ন্যায় অচ্ছিন্নাবস্থায় উত্তরীয় প্রচ্ছন্ন করিয়া পৃষ্ঠদেশে, অংসে, বাহুদেশে, কদাচিৎ বক্ষে সংসর্পিত হইয়া পড়িয়াছে। ললাট প্রশস্ত, ঈষৎ স্ফীত, মধ্যস্থলে এক মাত্র শিরাপ্রকাশশোভিত। চক্ষু দুটি বিদ্যুত্তেজঃপরিপূর্ণ। কোষশূন্য এক দীর্ঘ তরবারি হস্তে ছিল। কিন্তু এ রূপরাশি মধ্যে এক ভীষণ ভাব ব্যক্ত হইতেছিল। হেমকান্ত বর্ণে যেন কোন করাল কামনার ছায়া পড়িয়াছিল। অন্তস্তল পর্য্যন্ত অন্বেষণক্ষম কটাক্ষ দেখিয়া কপালকুণ্ডলার ভীতিসঞ্চার হইল।

উভয়ে উভয়ের প্রতি ক্ষণ কাল চাহিয়া রহিলেন। প্রথমে কপালকুণ্ডলা নয়নপল্লব নিক্ষিপ্ত করিলেন। কপালকুণ্ডলা নয়নপল্লব নিক্ষিপ্ত করাতে আগন্তুক তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কে?”

যদি এক বৎসর পূর্ব্বে হিজলীর কিয়াবনে কপালকুণ্ডলার প্রতি এ প্রশ্ন হইত, তবে তিনি তৎক্ষণেই সঙ্গত উত্তর দিতেন। কিন্তু এখন কপালকুণ্ডলা কতক দূর গৃহরমণীর স্বভাবসম্পন্না হইয়াছিলেন, সুতরাং সহসা উত্তর করিতে পারিলেন না। ব্রাহ্মণবেশী কপালকুণ্ডলাকে নিরুত্তরা দেখিয়া গাম্ভীর্য্যের সহিত কহিলেন, “কপালকুণ্ডলা! তুমি রাত্রে এ নিবিড় বন মধ্যে কি জন্য আসিয়াছ?”

অজ্ঞাত রাত্রিচর পুরুষের মুখে আপন নাম শুনিয়া কপালকুণ্ডলা অবাক হইলেন, কিছু ভীতও হইলেন। সুতরাং সহসা কোন উত্তর তাঁহার মুখ হইতে বাহির হইল না।

ব্রাহ্মণবেশী পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন “তুমি আমাদিগের কথা বার্তা শুনিয়াছ?”

সহসা কপালকুণ্ডলা বাক্‌শক্তি পুনঃপ্রাপ্ত হইলেন। তিনি উত্তর না দিয়া কহিলেন “আমিও তাহাই জিজ্ঞাসা করিতেছি। এ কানন মধ্যে তোমরা দুই জনে এ নিশীথে কি কুপরামর্শ করিতেছিলে?”

ব্রাহ্মণ কিছু কাল নিরুত্তরে চিন্তামগ্ন হইয়া রহিলেন। যেন কোন নূতন ইষ্টসিদ্ধির উপায় তাঁহার চিত্ত মধ্যে আসিয়া উপস্থিত হইল। তিনি কপালকুণ্ডলার হস্তধারণ করিলেন এবং হস্ত ধরিয়া ভগ্ন গৃহ হইতে কিছু দূরে লইয়া যাইতে লাগিলেন। কপালকুণ্ডলা অতি ক্রোধে হস্ত মুক্ত করিয়া লইলেন। ব্রাহ্মণবেশী অতি মৃদুম্বরে কপালকুণ্ডলার কাণের কাছে কহিলেন,

“চিন্তা কি? আমি পুরুষ নহি।”

কপালকুণ্ডলা আরও চমৎকৃতা হইলেন। এ কথায় তাঁহার কতক বিশ্বাস হইল, সম্পূর্ণ বিশ্বাসও হইল না। তিনি ব্রাহ্মণবেশধারিণীর সঙ্গে সঙ্গে গেলেন। ভগ্ন গৃহ হইতে অদৃশ্য স্থানে গিয়া ব্রাহ্মণবেশী কপালকুণ্ডলাকে কর্ণে কর্ণে কহিলেন, “আমরা যে কুপরামর্শ করিতেছিলাম তাহা শুনিবে? সে তোমারই সম্বন্ধে।”

কপালকুণ্ডলার ভয় এবং আগ্রহ অতিশয় বাড়িল। কহিলেন, “শুনিব।”

ছদ্মবেশিনী কহিলেন, “তবে যত ক্ষণ না প্রত্যাগমন করি তত ক্ষণ এই স্থানে প্রতীক্ষা কর।”

এই বলিয়া ছদ্মবেশিনী ভগ্ন গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন; কপালকুণ্ডলা কিয়ৎক্ষণ তথায় বসিয়া রহিলেন। কিন্তু যাহা দেখিয়া ও শুনিয়াছিলেন, তাহাতে তাঁহার অতি উৎকট ভয় জন্মিয়াছিল। এক্ষণে একাকিনী অন্ধকার বনমধ্যে বসিয়া আরও ভয় বাড়িতে লাগিল। বিশেষ এই ছদ্মবেশী তাঁহাকে কি অভিপ্রায়ে তথায় বসাইয়া রাখিয়া গেল, তাহা কে বলিতে পারে? হয় ত সুযোগ পাইয়া আপনার মন্দ অভিপ্রায় সিদ্ধ করিবার জন্যই বসাইয়া রাখিয়া গিয়াছে। এইরূপ আলোচনা করিয়া কপালকুণ্ডলা ভীতিবিহ্বল হইলেন। এ দিকে ব্রাহ্মণবেশীর প্রত্যাগমনে অনেক বিলম্ব হইতে লাগিল। কপালকুণ্ডলা আর বসিতে পারিলেন না। উঠিয়া দ্রুত পাদবিক্ষেপে গৃহাভিমুখে চলিলেন।

তখন আকাশমণ্ডল ঘনঘটায় মসীময় হইয়া আসিতে লাগিল; কাননতলে যে সামান্য আলো ছিল, তাহাও অন্তর্হিত হইতে লাগিল। কপালকুণ্ডলা আর তিলার্দ্ধ বিলম্ব করিতে পারিলেন না। শীঘ্রপদে কাননাভ্যন্তর হইতে বাহিরে আসিতে লাগিলেন। আসিবার সময়ে যেন পশ্চাদ্ভাগে অপর ব্যক্তির পদক্ষেপধ্বনি শুনিতে পাইলেন। কিন্তু মুখ ফিরাইয়া অন্ধকারে কিছু দেখিতে পাইলেন না। কপালকুণ্ডলা মনে করিলেন ব্রাহ্মণবেশী তাঁহার পশ্চাৎ আসিতেছেন। বনত্যাগ করিয়া পূর্ব্ববর্ণিত ক্ষুদ্র বনপথে আসিয়া বাহির হইলেন। তথায় তাদৃশ অন্ধকার নহে; দৃষ্টিপথে মনুষ্য থাকিলে দেখা যায়। কিন্তু কিছুই দেখা গেল না। কপালকুণ্ডলা মনে করিলেন তাঁহার চিত্তভ্রান্তি জন্মিয়াছে। অতএব দ্রুতপদে চলিলেন। কিন্তু আবার স্পষ্ট মনুষ্যগতিশব্দ শুনিতে পাইলেন। আকাশ নীল কাদম্বিনীতে ভীষণতর হইল। কপালকুণ্ডলা আরও দ্রুত চলিলেন। গৃহ অনতিদূরে, কিন্তু গৃহপ্রাপ্তি হইতে না হইতেই প্রচণ্ড ঝটিকা বৃষ্টি ভীষণ রবে প্রঘোষিত হইল। কপালকুণ্ডলা দৌড়াইলেন। পশ্চাতে যে আসিতেছিল, সেও যেন দৌড়াইল, এমত শব্দ বোধ হইল। গৃহ দৃষ্টিপথবর্ত্তী হইবার পূর্ব্বেই প্রচণ্ড ঝটিকা বৃষ্টি কপালকুণ্ডলার মস্তকের উপর দিয়া প্রধাবিত হইল। ঘন ঘন গম্ভীর মেঘশব্দ, এবং অশনিসম্পাত শব্দ হইতে লাগিল। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকিতে লাগিল। মূষল ধারে বৃষ্টি পড়িতে লাগিল। কপালকুণ্ডলা কোন ক্রমে আত্মরক্ষা করিয়া গৃহে আসিলেন। প্রাঙ্গনভূমি পার হইয়া প্রকোষ্ঠ মধ্যে উঠিলেন। দ্বার তাঁহার জন্য খোলা ছিল। দ্বার ৰুদ্ধ করিবার জন্য প্রাঙ্গনের দিকে সম্মুখ ফিরিলেন। বোধ হইল যেন প্রাঙ্গনভূমিতে এক দীর্ঘাকার পুৰুষ দাঁড়াইয়া আছে। এই সময়ে এক বার বিদ্যুৎ চমকিল। একবার বিদ্যুতেই তাহাকে চিনিতে পারিলেন! সে সাগরতীরপ্রবাসী সেই কাপালিক!

তৃতীয় খণ্ড · তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

প্রতিযোগিনী গৃহে।

শ্যামাদন্যো নহি নহি নহি প্রাণনাথোমমাস্তে।

ঊদ্ধবদূত

এ সময়ে শের আফগান বঙ্গদেশের সুবাদারের অধীনে বর্দ্ধমানের কর্ম্মাধ্যক্ষ হইয়া অবস্থিতি করিতেছিলেন।

মতি বিবি বর্দ্ধমানে আসিয়া শের আফগানের আলয়ে উপনীত হইলেন। শের আফগান সপরিবারে তাঁহাকে অত্যন্ত সমাদরে তথায় অবস্থিতি করাইলেন। যখন শের আফগান এবং তাঁহার স্ত্রী মেহের-উন্নিসা আগ্রায় অবস্থিতি করিতেন তখন মতি তাঁহাদিগের নিকট বিশেষ পরিচিতা ছিলেন। মেহের-উন্নিসার সহিত তাঁহার বিশেষ প্রণয় ছিল। পরে উভয়েই দিল্লীর সাম্রাজ্য লাভের জন্য প্রতিযোগিনী হইয়াছিলেন। এক্ষণে একত্র হওয়ায় মেহের-উন্নিসা মনে ভাবিতেছেন, “ভারতবর্ষের কর্ত্তৃত্ব কাহার অদৃষ্টে বিধাতা লিখিয়াছেন? বিধাতাই জানেন, আর সেলিম জানেন। আর কেহ যদি জানে ত সে এই লুৎফ্-উন্নিসা, দেখি, লুৎফ্-উন্নিসা কি কিছু প্রকাশ করিবে না?” মতি বিবিরও মেহের-উন্নিসার মন জানিবার চেষ্টা।

মেহের-উন্নিসা তৎকালে ভারতবর্ষ মধ্যে প্রধানা রূপবর্তী এবং গুণবতী বলিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন। বস্তুতঃ তাদৃশ রমণী ভূমণ্ডলে অতি অল্পই জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন। সৌন্দর্য্যে ইতিহাসকীর্ত্তিতা স্ত্রীলোকদিগের মধ্যে তাঁহার প্রাধান্য ঐতিহাসিক মাত্রেই স্বীকার করিয়া থাকেন। কোন প্রকার বিদ্যায় তাৎকালিক পুৰুষদিগের মধ্যে বড় অনেকে তাঁহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিলেন না। নৃত্য গীতে মেহের-উন্নিসা অদ্বিতীয়া; কবিতা রচনায় বা চিত্র লিখনেও তিনি সকলের মনোমুগ্ধ করিতেন। তাঁহার সরস কথা তাঁহার সৌন্দর্য্য অপেক্ষাও মোহময়ী ছিল। মতিও এসকল গুণে হীনা ছিলেন না। অদ্য এই দুই চমৎকারকারিণী পরস্পরের মন জানিতে উৎসুক হইলেন।

মেহের-উন্নিসা খাস কামরায় বসিয়া তসবীর লিখিতেছিলেন, মতি মেহের-উন্নিসার পৃষ্ঠের উপর বসিয়া চিত্র লিখন দেখিতে ছিলেন, এবং তাম্বুল চর্ব্বণ করিতেছিলেন। মেহের-উন্নিসা জিজ্ঞাসা করিলেন, যে “চিত্র কেমন হইতেছে?” মতিবিবি উত্তর করিলেন “তোমার চিত্র যে রূপ হইয়া থাকে তাহাই হইতেছে। অন্য কেহ যে তোমার ন্যায় চিত্রনিপুণ নহে, ইহাই দুঃখের বিষয়।”

মেহে। “তাই যদি সত্য হয় ত দুঃখের বিষয় কেন?”

ম। “অন্যের তোমার মত চিত্রনৈপুণ্য থাকিলে তোমার এ মুখের আদর্শ রাখিতে পারিত।”

মেহে। “কবরের মাটিতে মুখের আদর্শ থাকিবে,” মেহের-উন্নিসা এই কথা কিছু গাম্ভীর্য্যের সহিত কহিলেন।

ম। “ভগিনি—আজ মনের স্ফূর্ত্তির এত অল্পতা কেন?”

মেহে। “স্ফূর্ত্তির অল্পতা কই? তবে যে তুমি আমাকে কাল প্রাতে ত্যাগ করিয়া যাইবে তাহাই বা কি প্রকারে ভুলিব? আর দুই দিন থাকিয়া তুমি কেনই বা চরিতার্থ না করিবে?’

ম।“সুখে কার অসাধ। সাধ্য হইলে আমি কেন যাইব? কিন্তু আমি পরের অধীন; কি প্রকারে থাকিব?”

মেহে। আমার প্রতি তোমার ত ভালবাসা আর নাই, থাকিলে তুমি কোন মতে রহিয়া যাইতে। আসিয়াছ ত রহিতে পার না কেন?”

ম। “আমি ত সকল কথাই বলিয়াছি। আমার সহোদর মোগল সৈন্যে মন্‌সব্‌দার—তিনি উড়িষ্যার পাঠানদিগের সহিত যুদ্ধে আহত হইয়া শঙ্কটাপন্ন হইয়া ছিলেন। আমি তাঁহারই বিপৎ সম্বাদ পাইয়া বেগমের অনুমতি লইয়া তাঁহাকে দেখিতে আসিয়াছিলাম। উড়িষ্যায় অনেক বিলম্ব করিয়াছি, এক্ষণে আর বিলম্ব করা উচিত নহে। তোমার সহিত অনেক দিন দেখা হয় নাই, এই জন্য দুই দিন রহিয়া গেলাম।”

মেহে। “বেগমের নিকট কোন্ দিন পৌছিবার বিষয় স্বীকার করিয়া আসিয়াছ?”

মতি বুঝিলেন, মেহের-উন্নিসা ব্যঙ্গ করিতেছেন। মার্জ্জিত অথচ মর্ম্মভেদী ব্যঙ্গে মেহের-উন্নিসা যে রূপনিপুণ, মতি সে রূপ নহেন। কিন্তু অপ্রতিভ হইবার লোকও নহেন। তিনি উত্তর করিলেন,

“দিন নিশ্চিত করিয়া তিন মাসের পথ যাতায়াত করা কি সম্ভবে? কিন্তু অনেক কাল বিলম্ব করিয়াছি; আর বিলম্বে অসন্তোষের কারণ জন্মাইতে পারে।”

মেহের-উন্নিসা নিজ ভুবনমোহন হাসি হাসিয়া কহিলেন, “কাহার অসন্তোষের আশঙ্কা করিতেছ? যুবরাজের না তাঁহার মহিষীর?”

মতি কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হইয়। কহিলেন “এ লজ্জাহীনাকে কেন লজ্জা দিতে চাও? উভয়েরই অসন্তোষ হইতে পারে।”

মে। “কিন্তু জিজ্ঞাসা করি,—তুমি স্বয়ং বেগম নাম ধারণ করিতেছ না কেন? শুনিয়াছিলাম কুমার সেলিম তোমাকে বিবাহ করিয়া খাস বেগম করিবেন। তাহার কত দূর?”

ম। “আমি ত সহজেই পরাধীনা। যে কিছু স্বাধীনতা আছে, তাহা কেন নষ্ট করিব। বেগমের সহচারিণী বলিয়া অনায়াসে উড়িষ্যায় আসিতে পারিলাম; সেলিমের বেগম হইলে কি উড়িষ্যায় আসিতে পারিতাম?”

মে। “যে দিল্লীশ্বরের প্রধানা মহিষী হইবে তাহার উড়িষ্যায় আসিবার প্রয়োজন?”

ম। “সেলিমের প্রধান। মহিষী হইব, এমত স্পর্দ্ধা কখন করি না।—এ হিন্দুস্থান দেশে কেবল মেহের-উন্নিসাই দিল্লীশ্বরের প্রাণেশ্বরী হইবার উপযুক্ত।”

মেহের-উন্নিসা মুখ নত করিলেন। ক্ষণেক নিরুত্তর থাকিয়া কহিলেন—“ভগিনি—আমি এমত মনে করি না। যে তুমি আমাকে পীড়া দিবার জন্য এ কথা বলিলে, কি আমার মন জানিবার জন্য বলিলে। কিন্তু তোমার নিকট আমার এই ভিক্ষা, আমি যে শের আফগানের বনিতা, আমি যে কায়মনোবাক্যে শের আফগানের দাসী—তাহা তুমি বিস্মৃত হইয়া কথা কহিও না।”

লজ্জাহীনা মতি এ তিরস্কারে অপ্রতিভ হইলেন না। বরং আরও সুযোগ পাইলেন, কহিলেন, “তুমি যে পতিগতপ্রাণা তাহা আমি বিলক্ষণ জানি। সেই জন্যই ছলক্রমে একথা তোমার সমুখে পাড়িতে সাহস করিয়াছি। সেলিম যে এ পর্যন্ত তোমার সৌন্দর্য্যের মোহ ভুলিতে পারেন নাই, এই কথা বলা আমার উদ্দেশ্য। সাবধান থাকিও।”

মে। এখন বুঝিলাম। কিন্তু কিসের আশঙ্কা?” মতি কিঞ্চিৎ ইতস্ততঃ করিয়া কহিলেন “বৈধব্যের আশঙ্কা।”

এই কথা বলিয়া মতি মেহের-উন্নিসার মুখপানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি করিয়া রহিলেন, কিন্তু ভয় বা আহ্লাদের কোন চিহ্ন তথায় দেখিতে পাইলেন না। মেহের-উন্নিসা সদর্পে কহিলেন,

“বৈধব্যের আশঙ্কা! শের আফগান আত্মরক্ষার অক্ষম নহে। বিশেষ আকবর বাদশাহের রাজ্যমধ্যে তাঁহার পুত্ত্রও বিনা দোষে পরপ্রাণ নষ্ট করিয়া নিস্তার পাইবেন না।”

ম। “সত্য কথা, কিন্তু সম্প্রতিকার আগ্রার সম্বাদ এই যে, আকবর শাহ গত হইয়াছেন। সেলিম সিংহাসনারূঢ় হইয়াছেন। দিল্লীশ্বরের দমন করিবে?”

মেহের-উন্নিসা আর কিছু শুনিলেন না। তাঁহার সর্ব্বাঙ্গ শিহরিয়া কাঁপিতে লাগিল। আবার মুখ নত করিলেন—লোচনযুগলে অশ্রুধারা বহিতে লাগিল। মতি জিজ্ঞাসা করিলেন, “কাঁদ কেন?”

মেহের-উন্নিসা নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন “সেলিম ভারতবর্ষের সিংহাসনে, আমি কোথায়?”

মতির মনস্কাম সিদ্ধ হইল। তিনি কহিলেন, “তুমি কি আজও যুবরাজকে একেবারে বিস্মৃত হইতে পার নাই?”

মেহের-উন্নিসা গদ গদ স্বরে কহিলেন “কাহাকে বিস্মৃত হইব? আত্মজীবন বিস্মৃত হইব, তথাপি যুবরাজকে বিস্মৃত হইতে পারিব না। কিন্তু শুন ভগিনি—অকস্মাৎ মনের কবাট খুলিল; তুমি এ কথা শুনিলে; কিন্তু আমার শপথ, একথা যেন কর্ণান্তরে না যায়।”

মতি কহিল, “ভাল তাহাই হইবে। কিন্তু যখন সেলিম শুনিবেন যে আমি বর্দ্ধমানে আসিয়াছিলাম, তখন তিনি অবশ্য জিজ্ঞাসা করিবেন যে মেহের-উন্নিসা আমার কথা কি বলিল? তখন আমি কি উত্তর করিব?”

মেহের-উন্নিসা কিছু ক্ষণ ভাবিয়া কহিলেন “এই কহিও যে মেহের-উন্নিসা হৃদয়মধ্যে তাঁহার ধ্যান করিবে। প্রয়োজন হইলে তাঁহার জন্য আত্মপ্রাণ পর্যন্ত সমর্পণ করিবে। কিন্তু কখন আপন কুলমান সমর্পণ করিবে না। দাসীর স্বামী জীবিত থাকিতে সে কখন দিল্লীশ্বরকে মুখ দেখাইবে না। আর যদি দিল্লীশ্বর কর্ত্তৃক তাহার স্বামীর প্রাণান্ত হয়, তবে স্বামিহন্তার সহিত ইহজন্মে তাহার মিলন হইবেক না।”

এই কহিয়া মেহের-উন্নিসা সে স্থান হইতে উঠিয়া গেলেন। মতিবিবি চমৎকৃতা হইয়া রহিলেন। কিন্তু মতি বিবিরই জয় হইল। মেহের-উন্নিসার চিত্তের ভাব মতিবিবি জানিলেন; মতিবিবির আশা ভরসা মেহের-উন্নিসা কিছুই জানিতে পারিলেন না। যিনি পরে আত্মবুদ্ধিপ্রভাবে দিল্লীশ্বরেরও ঈশ্বরী হইয়াছিলেন, তিনিও মতির নিকট পরাজিতা হইলেন! ইহার কারণ মেহের-উন্নিসা প্রণয়শালিনী; মতিবিধি এ স্থলে কেবলমাত্র স্বার্থপরায়ণা।

মনুষ্য হৃদয়ের বিচিত্র গতি মতি বিবি বিলক্ষণ বুঝিতেন। মেহের-উন্নিসার কথা আলোচনা করিয়া তিনি যাহা সিদ্ধান্ত করিলেন, কালে তাহাই যথার্থীভূত হইল। তিনি বুঝিলেন যে মেহের-উন্নিসা জাঁহাগীরের যথার্থ অনুরাগিণী; অতএব নারীদর্পে এখন যাহাই বলুন, পথমুক্ত হইলে মনের গতি রোধ করিতে পারিবেন না। বাদশাহের মনস্কামনা অবশ্য সিদ্ধ করিবেন।

এ সিদ্ধান্তে মতির আশা ভরসা সকলই নির্মূল হইল। কিন্তু তাহাতে কি মতি নিতান্তই দুঃখিত হইলেন? তাহা নহে। বরং ঈষৎ সুখানুভবও হইল। কেন যে এমন অসম্ভব চিত্ত প্রসাদ জন্মিল তাহা মতি প্রথমে বুঝিতে পারিলেন না। তিনি আগ্রার পথে যাত্রা করিলেন। পথে কয়েক দিন গেল। সেই কয়েক দিনে আপন চিত্তভাব বুঝিলেন।

দ্বিতীয় খণ্ড · তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

সুন্দরী সন্দর্শনে।

——————“ধর দেবি মোহন মুরতি।

দেহ আজ্ঞা, সাজাই ও বর বপু আনি

নানা আভরণ!”

মেঘনাদবধ।

নবকুমার গৃহস্বামিনীকে ডাকিয়া অন্য প্রদীপ আনিতে বলিলেন। অন্য প্রদীপ আনিবার পূর্ব্বে একটী দীর্ঘ নিঃশ্বাস শব্দ শুনিতে পাইলেন। প্রদীপ আনিবার ক্ষণেক পরে ভৃত্যবেশী এক জন মুসলমান আসিয়া উপস্থিত হইল। বিদেশিনী তাহাকে দেখিয়া কহিলেন,

“সে কি, তোমারদিগের এত বিলম্ব হুইল কেন? আর সকল কোথা?”

ভৃত্য কহিল, “দাসেরা সকল মাতোয়ারা হইয়াছিল, তাহাদিগের গুছাইয়া আনিতে আমরা পালকীর পশ্চাতে পড়িয়াছিলাম। পরে ভগ্ন শিবিকা দেখিয়া এবং আপনাকে না দেখিয়া আমরা একেবারে অজ্ঞান হইয়াছিলাম। কেহ কেহ সেই স্থানে আছে; কেহ কেহ অন্যান্য দিকে আপনার সন্ধানে গিয়াছে, আমি এ দিকে সন্ধানে আসিয়াছি।”

মতি কহিলেন, “তাহাদিগের লইয়া আইস।”

নফর সেলাম করিয়া চলিয়া গেল; বিদেশিনী কিয়ৎকাল করলগ্নকপোলা হইয়া বসিয়া রহিলেন।

নবকুমার বিদায় চাহিলেন। তখন মতি স্বপ্নোত্থিতার ন্যায় গাত্রোত্থান করিয়া, পূর্ব্ববৎ ভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কোথায় অবস্থিতি করিবেন?”

নব। “ইহারই পরের ঘরে।”

মতি। “আপনার সে ঘরের কাছে এক খানি পালকী দেখিলাম, আপনার কি কেহ সঙ্গী আছেন?”

“আমার স্ত্রী সঙ্গে।”

মতি বিবি আবার ব্যঙ্গের অবকাশ পাইলেন। কহিলেন, “তিনিই কি অদ্বিতীয় রূপসী?”

নব। “দেখিলে বুঝিতে পারিবেন?”

মতি। “দেখা কি পাওয়া যায়?”

নব। (চিন্তা করিয়া) “ক্ষতি কি?”

মতি। “তবে একটু অনুগ্রহ কৰুন। অদ্বিতীয় রূপসীকে দেখিতে বড় কৌতুক হইতেছে। আগ্রা গিয়া বলিতে চাহি। কিন্তু এখনই নহে—আপনি এখন যান। ক্ষণেক পরে আমি আপনাকে সম্বাদ করিব।”

নবকুমার চলিয়া গেলেন। ক্ষণেক পরে অনেক লোক জন দাস দাসী ও বাহক সিন্ধুকাদি লইয়া উপস্থিত হইল। এক খানি শিবিকাও আসিল; তাহাতে এক জন দাসী। পরে নবকুমারের নিকট সম্বাদ আসিল “বিবি স্মরণ করিয়াছেন।”

নবকুমার মতি বিবির নিকট পুনরাগমন করিলেন। দেখিলেন, এবার আবার রূপান্তর। মতিবিধি, পূর্ব্ব পরিচ্ছদ ত্যাগ করিয়া সুবর্ণমুক্তাদিশোভিত কাৰুকার্য্যযুক্ত বেশ ভূষা ধারণ করিয়াছেন;—নিরলঙ্কার দেহ অলঙ্কারে খচিত করিয়াছেন। যেখানে যাহা ধরে—কুন্তলে, কবরীতে, কপালে, নয়নপার্শ্বে, কর্ণে, কণ্ঠে, হৃদয়ে, বাহুযুগে, সর্ব্বত্রে সুবর্ণ মধ্য হইতে হীরকাদি রত্ন ঝলসিতেছে। নবকুমারের চক্ষু অস্থির হইল। অধিকাংশ স্ত্রীলোক বহুস্বর্ণখচিত হইলে প্রায় কিছু শ্রীহীনা হয়;—অনেকেই সজ্জিতা পুত্তলিকার দশা প্রাপ্ত হয়েন; —কিন্তু মতি বিবিতে সে শ্রীহীনতা বা দশা দৃষ্ট হইবার সম্ভাবনা ছিল না। প্রভূতনক্ষত্রমালাভূষিত আকাশের ন্যায়—মধুরায়ত শরীর সহিত অলঙ্কার বাহুল্য সুসঙ্গত বোধ হইল বরং তাহাতে আরও সৌন্দর্য্যপ্রভা বর্দ্ধিত হইল। মতি বিবি নবকুমারকে কহিলেন, “মহাশয়, চলুন, আপনার পত্নীর নিকট পরিচিত হইয়া আসি।”

এই কথা মতিবিধি পূর্ব্ববৎ ব্যঙ্গানুরাগের সহিত কহিলেন, কিন্তু নবকুমার শুনিলেন তাহার কণ্ঠের স্বর কিছু বিকৃত। নবকুমার মতিবিবিকে সঙ্গে করিয়া লইয়া চলিলেন। যে দাসী শিবিকারোহণে আসিয়াছিল, সেও সঙ্গে চলিল। ইহার নাম পেষ্‌মন্।

কপালকুণ্ডলা দোকান ঘরের আর্দ্র মৃত্তিকায় একাকিনী বসিয়াছিলেন। একটী ক্ষীণালোক প্রদীপ জ্বলিতেছে মাত্র—অবদ্ধনিবিড়কেশরাশি পশ্চাদ্ভাগ অন্ধকার করিয়া রহিয়াছিল। মতিবিবি প্রথম যখন তাঁহাকে দেখিলেন, তখন অধরপার্শ্বে ও নয়নপ্রান্তে ঈষৎ হাসি ব্যক্ত হইল। ভাল করিয়া দেখিবার জন্য প্রদীপটী তুলিয়া কপালকুণ্ডলার মুখের নিকট আনিলেন। তখন সে হাসি হাসি ভাব দূর হইল;—মতির মুখ গম্ভীর হইল;—অনিমিক্ লোচনে দেখিতে লাগিলেন। কেহ কোন কথা কহেন না;—মতি মুগ্ধা, কপালকুণ্ডলা কিছু বিস্মিতা।

ক্ষণেক পরে মতি আপন অঙ্গ হইতে অলঙ্কাররাশি মোচন করিতে লাগিলেন। নবকুমার জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি করিতেছ?” মতি কহিলেন, “দেখুন না।” মতি আত্মশরীর হইতে অলঙ্কাররাশি মুক্ত করিয়া একে একে কপালকুণ্ডলাকে পরাইতে লাগিলেন। কপালকুণ্ডলা কিছু বলিলেন না। নবকুমার কহিতে লাগিলেন, “ও কি হইতেছে?” মতি তাঁহার কোন উত্তর করিলেন না।

অলঙ্কারসমাবেশ সমাপ্ত হইলে, মতি নবকুমারকে কহিলেন, “আপনি সত্যই বলিয়াছিলেন। এ ফুল রাজোদ্যানেও ফুটে না। পরিতাপ এই যে রাজধানীতে এ রূপরাশি দেখাইতে পারিলাম না। এ সকল অলঙ্কার এই অঙ্গেরই উপযুক্ত—এই জন্য পরাইলাম। আপনিও কখন কখন পরাইয়া মুখরা বিদেশিনীকে মনে করিবেন।”

নবকুমার চমৎকৃত হইয়া কহিলেন, “সে কি? এ যে বহুমূল্য অলঙ্কার। আমি এ সব লইব কেন?”

মতি কহিলেন “ঈশ্বরপ্রসাদাৎ আমার আর আছে। আমি নিরাভরণা হইব না। ইহাকে পরাইয়া আমার যদি সুখবোধ হয়, আপনি কেন ব্যাঘাত করেন?”

মতিবিবি ইহা কহিয়া দাসীসঙ্গে চলিয়া গেলেন। বিরলে আসিলে পেষমন্ মতিবিবিকে জিজ্ঞাসা করিল,

“বিবি, এ ব্যক্তি কে?”

যবনবালা উত্তর করিলেন, “মেরা খসম!”

প্রথম খণ্ড · তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

বিজনে।

যে স্থানে নবকুমারকে ত্যাগ করিয়া যাত্রীরা চলিয়া যান, তাহার অনতিদূরে দৌলতপুর ও দরিয়াপুর নামে দুই ক্ষুদ্র গ্রাম এক্ষণে দৃষ্ট হয়। পরন্তু যে সময়ের বর্ণনায় আমরা প্রবৃত্ত হইয়াছি, সে সময়ে তথায় মনুষ্যবসতির কোন চিহ্ন ছিল না; অরণ্যময় মাত্র। কিন্তু বঙ্গদেশের অন্যত্র ভূমি যেরূপ সচরাচর অনুদ্ঘাতিনী, এ প্রদেশে সেরূপ নহে। রসুলপুরের মুখ হইতে সুবর্ণরেখা পর্য্যন্ত অবাধে কয়েক যোজন পথ ব্যাপিত করিয়া এক বালুকাস্তপশ্রেণী বিরাজিত আছে। আর কিছু উচ্চ হইলে ঐ বালুকাস্তপশ্রেণীকে বালুকাময় ক্ষুদ্র পর্ব্বতশ্রেণী বলা যাইতে পারিত। এক্ষণে লোকে উহাকে বালিয়াড়ি বলে। ঐ সকল বালিয়াড়ির ধবল শিখরমালা মধ্যাহ্নসূর্য্যকিরণে দূর হইতে অপূর্ব্ব প্রভাবিশিষ্ট দেখায়। উহার উপর উচ্চ বৃক্ষ জন্মায় না। স্তূপতলে সামান্য ক্ষুদ্র বন জন্মিয়া থাকে, কিন্তু মধ্য দেশে বা শিরোভাগে প্রায়ই ছায়াশূন্য ধবল শোভা বিরাজ করিতে থাকে। অধোভাগমণ্ডনকারী বৃক্ষাদির মধ্যে কিয়া, ঝাটি, বনঝাউ, এবং বনপুষ্পই অধিক।

এই রূপ অপ্রফুল্লকর স্থানে নবকুমার সঙ্গিগণ কর্ত্তৃক পরিত্যক্ত হইয়াছিলেন। তিনি প্রথমে কাষ্ঠভার লইয়া নদীতীরে আসিয়া নৌকা দেখিলেন না; তখন তাঁহার অকস্মাৎ অত্যন্ত ভয়সঞ্চার হইল বটে, কিন্তু সঙ্গিগণ যে তাঁহাকে একেবারে পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছে এমত বোধ হইল না। বিবেচনা করিলেন, জলোচ্ছ্বাসে সৈকতভূমি প্লাবিত হওয়ায় তাঁহারা নিকটস্থ অন্য কোন স্থানে নৌকা রক্ষা করিয়াছেন, শীঘ্র তাঁহাকে সন্ধান করিয়া লইবেন। এই প্রত্যাশায় কিয়ৎক্ষণ তথায় বসিয়া প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন; কিন্তু নৌকা আইল না। নৌকারোহীও কেহ দেখা দিল না। নবকুমার ক্ষুধায় অত্যন্ত পীড়িত হইলেন। আর প্রতীক্ষা করিতে না পারিয়া, নৌকার সন্ধানে নদীর তীরে তীরে ফিরিতে লাগিলেন। কোথাও নৌকার সন্ধান পাইলেন না। প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া পূর্ব্বস্থানে আসিলেন। তখন পর্য্যন্ত নৌকা না দেখিয়া বিবেচনা করিলেন, জোয়ারের বেগে নৌকা ভাসাইয়া লইয়া গিয়াছে; এখন প্রতিকূল স্রোতে প্রত্যাগমন করিতে সঙ্গীদিগের কাজে কাজেই বিলম্ব হইতেছে। কিন্তু জোয়ারও শেষ হইল। তখন ভাবিলেন, প্রতিকূল স্রোতের বেগাধিক্যবশতঃ জোয়ারে নৌকা ফিরিয়া আসিতে পারে নাই; এক্ষণে ভাঁটায় অবশ্য ফিরিয়া আসিতেছে। কিন্তু ভাঁটাও ক্রমে অধিক হইল—ক্রমে ক্রমে বেলাবসান হইয়া আসিল; সূর্য্যাস্ত হইল! যদি নৌকা ফিরিয়া আসিবার হইত, তবে এতক্ষণ ফিরিয়া আসিত!

তখন নবকুমারের প্রতীতি হইল যে হয়, জলোচ্ছাসসম্ভূত তরঙ্গে নৌকা জলমগ্ন হইয়াছে, নচেৎ সঙ্গিগণ তাঁহাকে এই বিজনে পরিত্যাগ করিয়া গিয়াছেন।

পর্ব্বততলচারী ব্যক্তির উপরে শিখরখণ্ড ভাঙ্গিয়া পড়িলে তাহাকে যেমন একেবারে নিষ্পেষিত করে, এ সিদ্ধান্ত জন্মমাত্র নবকুমারের হৃদয়, সেইরূপ একেবারে নিষ্পেষিত হইল।

এ সময়ে, নবকুমারের মনের অবস্থা যেরূপ হইল, তাহার বর্ণনা অসাধ্য। সঙ্গিগণ প্রাণে নষ্ট হইয়া থাকিবেক, এরূপ সন্দেহে পরিতাপযুক্ত হইলেন বটে, কিন্তু আপনার বিপন্ন অবস্থার সমালোচনায় সে শোক শীঘ্র বিস্মৃত হইলেন। বিশেষ যখন মনে হইতে লাগিল যে হয়ত সঙ্গীরা তাঁহাকে ত্যাগ করিয়া গিয়াছে, তখন ক্রোধের বেগে শোক দূর হইতে লাগিল।

নবকুমার দেখিলেন যে গ্রাম নাই, আশ্রয় নাই, লোক নাই, আহার্য্য নাই, পেয় নাই; নদীর জল অসহ্য লবণাত্মক; অথচ ক্ষুধা তৃষ্ণার তাঁহার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছিল। একে দুরন্ত শীত নিবারণ জন্য আশ্রয় নাই, গাত্রবস্ত্র পর্য্যন্ত নাই। এই তুষার-শীতল-বায়ু-সঞ্চারিত-নদীতীরে, হিমবর্ষী আকাশতলে, নিরাশ্রয়ে, নিরাবরণে শয়ন করিয়া থাকিতে হইবেক। হয়ত, রাত্রি মধ্যে ব্যাঘ্র ভল্লুকে প্রাণ নাশ করিবেক। অদ্য না করে কল্য করিবে। প্রাণনাশই নিশ্চিত।

মনের চাঞ্চল্য হেতু নবকুমার একস্থানে অধিক ক্ষণ বসিয়া থাকিতে পারিলেন না। তীর ত্যাগ করিয়া উপরে উঠিলেন। ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। ক্রমে অন্ধকার হইল। শিশিরাকাশে নক্ষত্রমণ্ডলী নীরবে ফুটিতে লাগিল, যেমন নবকুমারের স্বদেশে ফুটিতে থাকে তেমনি ফুটিতে লাগিল। অন্ধকারে সর্ব্বত্র জনহীন;—আকাশ, প্রান্তর, সমুদ্র।—সর্ব্বত্র নীরব, কেবল অবিরল-কল্লোলিত সমুদ্রগর্জ্জন আর কদাচিৎ বন্য পশুর রব। তথাপি সেই অন্ধকারে, শীতবর্ষী আকাশতলে, বালুকাস্তূপের চতুঃপার্শ্বে, ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। কখন উপত্যকায়, কখন অধিত্যকায়, কখন স্তূপতলে, কখন স্তূপশিখরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। চলিতে চলিতে প্রতিপদে হিংস্র পশু কর্ত্তৃক আক্রান্ত হইবার সম্ভাবনা। কিন্তু এক স্থানে বসিয়া থাকিলেও সেই আশঙ্কা।

ভ্রমণ করিতে করিতে নবকুমারের শ্রম জন্মিল। সমস্ত দিন অনাহার; এজন্য অধিক অবসন্ন হইলেন। এক স্থানে বালিয়াড়ির পার্শ্বে পৃষ্ঠ রক্ষা করিয়া বসিলেন। গৃহের সুখতপ্ত শয্যা মনে পড়িল। যখন শারীরিক ও মানসিক ক্লেশের অবসাদে চিন্তা উপস্থিত হয়, তখন প্রায়ই নিদ্রা আসিয়া সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হয়। নবকুমার চিন্তা করিতে করিতে তন্দ্রাভিভূত হইলেন। বোধ হয়, যদি এরূপ নিয়ম না থাকিত, তবে সাংসারিক ক্লেশের অপ্রতিহত বেগ সকলে সকল সময়ে সহ্য করিতে পারিত না।

চতুর্থ খণ্ড · দশম পরিচ্ছেদ

দশম পরিচ্ছেদ।

প্রেতভূমে।

বপুষা করণোজ্ঝিতেন সা নিপতন্তী পতিমপ্যপাতয়ৎ।

ননু তৈলনিষেকবিন্দুনা সহ দীপ্তাৰ্চ্চিৰুপৈতি মেদিনীম্॥

রঘুবংশ।

চন্দ্রমা অস্তমিত হইল। বিশ্বমণ্ডল অন্ধকারে পরিপূর্ণ হইল। কাপালিক যথায় আপন পূজা স্থান সংস্থাপন করিয়াছিলেন তথায় কপালকুণ্ডলাকে লইয়া গেলেন। সে গঙ্গাতীরে এক বৃহৎ সৈকতভূমি। তাহারই সম্মুখে আরও বৃহত্তর দ্বিতীয় এক খণ্ড সিকতাময় স্থান। সেই সৈকতে শ্মশানভূমি। উভয় সৈকত মধ্যে জলোচ্ছ্বাস কালে অল্প জল থাকে, ভাঁটার সময়ে জল থাকে না। এক্ষণে জল ছিল না। শ্মশানভূমির যে মুখ গঙ্গাসম্মুখীন, সেই মুখ অত্যুচ্চ, জলে অবতরণ করিতে গেলে একেবারে উচ্চ হইতে অগাধ জলে পড়িতে হয়। তাহাতে আবার অবিরতবায়ুতাড়িত তরঙ্গাভিঘাতে উপকূলতল ক্ষয়িত হইয়াছিল; কখন কখন মৃত্তিকাখণ্ড স্থানচ্যুত
হইয়া অগাধ জলে পড়িয়া যাইত। পূজাস্থানে দীপ নাই—কাষ্ঠখণ্ড মাত্রে অগ্নি জ্বলিতেছিল, তদালোকে অতি অস্পষ্টদৃষ্ট শ্মশানভূমি আরও ভীষণ দেখাইতেছিল। নিকটে পূজা হোম বলি প্রভৃতির সমগ্র আয়োজন ছিল। বিশাল তরঙ্গিণী হৃদয় অন্ধকারে বিস্তৃত হইয়া রহিয়াছে। চৈত্র মাসের বায়ু অপ্রতিহত বেগে গঙ্গাহৃদয়ে প্রধাবিত হইতেছিল; তাহার কারণে তরঙ্গাভিঘাতজনিত কলকল রব গগন ব্যাপ্ত করিতেছিল। শ্মশানভূমিতে শবভুক্ পশুগণ কর্কশ কণ্ঠে ক্বচিৎ ধ্বনি করিতেছিল। কপালকুণ্ডলা মানস চক্ষে সেই প্রেতভূমিতে কত প্রেতিনীকে নরদেহ চর্ব্বণ করিতে দেখিতে লাগিলেন; কত পিশাচীকে কর্দ্দমোপরে সশব্দে নাচিয়া বেড়াইতে শুনিতে লাগিলেন।

কাপালিক উভয়কে উপযুক্ত স্থানে কুশাসনে উপবেশন করাইয়া তন্ত্রাদির বিধানানুসারে পূজারম্ভ করিলেন। উপযুক্ত সময়ে নবকুমারের প্রতি আদেশ করিলেন যে কপালকুণ্ডলাকে স্নাত করিয়া আন। নবকুমার কপালকুণ্ডলার হস্ত ধারণ করিয়া শ্মশানভূমির উপর দিয়া স্নান করাইতে লইয়া চলিলেন। তাঁহাদিগের চরণে অস্থি ফুটিতে লাগিল। নবকুমারের জানুর আঘাতে একটা জলপূর্ণ শ্মশানকলস ভগ্ন হইয়া গেল। তাহার নিকটেই শব পড়িয়াছিল—হতভাগার কেহ সৎকারও করে নাই। দুই জনেরই তাহাতে পদ স্পর্শ হইল। কপালকুণ্ডলা তাহাকে বেড়িয়া গেলেন, নবকুমার তাহাকে চরণে দলিত করিয়া গেলেন। চতুর্দ্দিক্ বেড়িয়া শবমাংশভুক্ পশু সকল ফিরিতেছিল; মনুষ্য দুই জনের আগমনে উচ্চকণ্ঠে রব করিতে লাগিল, কেহ আক্রমণ করিতে আসিল, কেহ বা পদশব্দ করিয়া চলিয়া গেল। কপালকুণ্ডলা দেখিলেন নবকুমারের হস্ত কাঁপিতেছে; কপালকুণ্ডলা স্বয়ং নির্ভীত, নিষ্কম্প।

কপালকুণ্ডলা জিজ্ঞাসা করিলেন, “স্বামিন্! ভয় পাইতেছ?”

নবকুমারের মদিরার মোহ ক্রমে শক্তিহীন হইয়া আসিতেছিল। অতি গম্ভীর স্বরে নবকুমার উত্তর করিলেন,

“ভয়ে, মৃণ্ময়ি? তাহা নহে।”

কপালকুণ্ডলা জিজ্ঞাসা করিলেন, “তবে কাঁপিতেছ কেন?”

এই প্রশ্ন কপালকুণ্ডলা যে স্বরে করিলেন, তাহা কেবল রমণীকণ্ঠেই সম্ভবে। যখন রমণী পরদুঃখে গলিয়া যায় কেবল তখনই রমণীকণ্ঠে সে স্বর সম্ভবে। কে জানিত যে আসন্ন কালে শ্মশানে আসিয়া কপালকুণ্ডলার কণ্ঠ হইতে এ স্বর নির্গত হইবে?

নবকুমার কহিলেন, “ভয় নহে। কাঁদিতে পারিতেছি না, এই ক্রোধে কাঁপিতেছি।”

কপালকুণ্ডলা জিজ্ঞাসিলেন “কাঁদিবে কেন?”

আবার সেই কণ্ঠ!

নবকুমার কহিলেন, “কাঁদিব কেন? তুমি কি জানিবে মৃণ্ময়ি! তুমিত কখন রূপ দেখিয়া উন্মত্ত হও নাই—” বলিতে বলিতে নবকুমারের কণ্ঠস্বর যাতনায় ৰুদ্ধ হইয়া আসিতে লাগিল। “তুমিত কখন আপনার হৃৎপিণ্ড আপনি ছেদন করিয়া শ্মশানে ফেলিতে আইস নাই।” এই বলিয়া সহসা নবকুমার চীৎকার করিয়া রোদন করিতে করিতে কপালকুণ্ডলার পদতলে আছাড়িয়া পড়িলেন।

“মৃণ্ময়ি!—কপালকুণ্ডলে! আমায় রক্ষা কর। এই তোমার পায়ে লুটাইতেছি—একবার বল যে তুমি অবিশ্বাসিনী নও—একবার বল, আমি তোমায় হৃদয়ে তুলিয়া গৃহে লইয়া যাই।”

কপালকুণ্ডলা হাত ধরিয়া নবকুমারকে উঠাইলেন—মৃদু স্বরে কহিলেন, “তুমিত জিজ্ঞাসা কর নাই।”

যখন এই কথা হইল তখন উভয়ে একেবারে জলের ধারে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন; কপালকুণ্ডলা অগ্রে, নদীর দিকে পশ্চাৎ করিয়াছিলেন; তাঁহার পশ্চাতে এক পদ পরেই জল। এখন জলোচ্ছ্বাস আরম্ভ হইয়াছিল, কপালকুণ্ডলা একটা আড়রির উপর দাঁড়াইয়াছিলেন। তিনি উত্তর করিলেন “তুমি ত জিজ্ঞাসা কর নাই।”

নবকুমার ক্ষিপ্তের ন্যায় কহিলেন, “চৈতন্য হারাইয়াছি, কি জিজ্ঞাসা করিব—বল—মৃণ্ময়ি! বল—বল—বল—আমায় রাখ।—গৃহে চল।”

কপালকুণ্ডলা কহিলেন, “যাহা জিজ্ঞাসা করিলে বলিব। আজি যাহাকে দেখিয়াছ—সে পদ্মাবতী। আমি অবিশ্বাসিনী নহি। এ কথা স্বরূপ বলিলাম। কিন্তু আর আমি গৃহে যাব না। ভবানীর চরণে দেহ বিসর্জ্জন করিতে আসিয়াছি—নিশ্চিত তাহা করিব। স্বামিন্! তুমি গৃহে যাও! আমি মরিব! আমার জন্য রোদন করিও না।”

“না—মৃণ্ময়ি—না!” এই রূপ উচ্চ শব্দ করিয়া নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে হৃদয়ে ধারণ করিতে বাহু প্রসারণ করিলেন। কপালকুণ্ডলাকে আর পাইলেন না। চৈত্রবায়ুতাড়িত এক বিশাল নদীতরঙ্গ আসিয়া তীরে যথায় কপালকুণ্ডলা দাঁড়াইয়া, তথায় তটাধোভাগে প্রহত হইল; অমনি তটমৃত্তিকাখণ্ড কপালকুণ্ডলা সহিত ঘোর রবে নদীপ্রবাহ মধ্যে ভগ্ন হইয়া পড়িল।

নবকুমার তীরভঙ্গের শব্দ শুনিলেন, কপালকুণ্ডলা অন্তর্হিত হইল দেখিলেন। অমনি তৎপশ্চাৎ লম্ফ দিয়া জলে পড়িলেন। নবকুমার সন্তরণে নিতান্ত অক্ষম ছিলেন না। কিছু ক্ষণে সাঁতার দিয়া কপালকুণ্ডলার অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। তাঁহাকে পাইলেন না। তিনিও উঠিলেন না।

কাপালিক আসনে বসিয়া দেখিলেন ইহাদের প্রত্যাগমনের সময় অতীত হইয়া গিয়াছে। তাঁহারা বাটী প্রত্যাগমন করিলেন, কি কি, এই আশঙ্কায় কাপালিক আসন ত্যাগ করিয়া শ্মশানভূমির উপর দিয়া কূলে গমন করিলেন। কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না। ক্ষণেক পরে জলমধ্যে কোন পদার্থ ভাসিয়া ডুবিল দেখিলেন—বোধ হইল যেন মনুষ্যহস্ত। লম্ফ দিয়া বহুকষ্টে দৃষ্ট পদার্থ কূলে তুলিলেন। দেখিলেন এ নবকুমারের প্রায় অচৈতন্য দেহ। অনুভবে বুঝিলেন কপালকুণ্ডলাও জলমগ্না আছেন। পুনরপি অবতরণ করিয়া তাঁহার অনুসন্ধান করিলেন, কিন্তু তাঁহাকে পাইলেন না।

তীরে পুনরারোহণ করিয়া কাপালিক নবকুমারের চৈতন্যবিধানের উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। নবকুমারের সংজ্ঞালাভ হইবামাত্র, নিশ্বাস সহকারে বাক্যস্ফূর্ত্তি হইল। সে বাক্য কেবল “মৃণ্ময়ি! মৃণ্ময়ি!”

কপালিক জিজ্ঞাসা করিলেন “মৃণ্ময়ী কোথায়?” নবকুমার উত্তর করিলেন, “মৃণ্ময়ি—মৃণ্ময়ি—মৃণ্ময়ি!”

চতুর্থঃ খণ্ডঃ সমাপ্তঃ।

চতুর্থ খণ্ড · দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

শয়নাগারে।

রাধিকার বেড়ি ভাঙ, এ মম মিনতি।

ব্রজাঙ্গনা কাব্য।

লুৎফ্-উন্নিসা আগ্রা গমন করিতে, এবং তথা হইতে সপ্তগ্রাম আসিতে প্রায় এক বৎসর গত হইয়াছিল। কপালকুণ্ডলা এক বৎসরের অধিক কাল নবকুমারের গৃহিণী। যে দিন প্রদোষ কালে লুৎফ-উন্নিসা কাননে, সে দিন কপালকুণ্ডলা অন্য মনে শয়নকক্ষে বসিয়া আছেন। পাঠক মহাশয় সমুদ্রতীরে আলুলায়িতকুন্তলা ভূষণহীনা যে কপালকুণ্ডলা দেখিয়াছিলেন, এ সে কপালকুণ্ডলা নহে। শ্যামাসুন্দরীর ভবিষ্যৎ বাণী সত্য হইয়াছে; স্পর্শমণির স্পর্শে যোগিনী গৃহিণী হইয়াছে; এই ক্ষণে সেই অসংখ্য কৃষ্ণোজ্জ্বল, ভুজঙ্গের ব্যূহতুল্য, আগুল্‌ফলম্বিত কেশরাশি পশ্চাদ্ভাগে স্থূলবেণীসম্বদ্ধ হইয়াছে। বেণীরচনারও শিল্পপারিপাট্য লক্ষিত হইতেছে, কেশবিন্যাসে অনেক সূক্ষ্ম কাৰুকার্য্য শ্যামাসুন্দরীর বিন্যাসকৌশলের পরিচয় দিতেছে। কুসুমদামও পরিত্যক্ত হয় নাই, চতুষ্পার্শ্বে কিরীটিমণ্ডল স্বরূপ বেণী বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে। কেশের যে ভাগ বেণী মধ্যে ন্যস্ত হয় নাই তাহা যে শিরোপরি সর্ব্বত্রে সমানোচ্চ হইয়া রহিয়াছে, এমত নহে। আকুঞ্চন প্রযুক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃষ্ণ তরঙ্গলেখায় শোভিত হইয়া রহিয়াছে। মুখমণ্ডল এখন আর কেশভারে অর্দ্ধলুক্কায়িত নহে; জ্যোতির্ম্ময় হইয়া শোভা পাইতেছে, কেবল মাত্র স্থানে স্থানে রন্ধনবিস্রংসী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অলকাগুচ্ছ তদুপরি স্বেদবিজড়িত হইয়া রহিয়াছে। বর্ণ সেই অর্দ্ধপূর্ণশশাঙ্করশ্মিৰুচ। এখন দুই কর্ণে হেমকর্ণভূষা দুলিতেছে; কণ্ঠে হিরণ্ময় কণ্ঠমালা দুলিতেছে। বর্ণের নিকটে সে সকল ম্লান হয় নাই, অৰ্দ্ধচন্দ্রকৌমুদী বসনা ধরণীর অঙ্কে নৈশকুসুমবৎ শোভা পাইতেছে। তাঁহার পরিধানে শুক্লাম্বর; সে শুক্লাম্বর অর্দ্ধচন্দ্রদীপ্ত আকাশমণ্ডলে অনিবিড় শুক্ল মেঘের ন্যায় শোভা পাইতেছে।

বর্ণ সেইরূপ চন্দ্রাৰ্দ্ধকৌমুদীময় বটে, কিন্তু যেন পূর্ব্বাপেক্ষা ঈষৎ সমল, যেন আকাশ প্রান্তে কোথা কাল মেঘ দেখা দিয়াছে। কপালকুণ্ডলা একাকিনী বসিয়াছিলেন না; সখী শ্যামাসুন্দরী নিকটে বসিয়াছিলেন। তাঁহাদিগের উভয়ে পরস্পরে কথোপকথন হইতেছিল। তাহার কিয়দংশ পাঠক মহাশয়কে শুনিতে হইবেক।

কপালকুণ্ডলা কহিলেন, “ঠাকুরজামাই আর কত দিন এখানে থাকিবেন?”

শ্যামা কহিলেন, “কালি বিকালে চলিয়া যাইবে। আহা! আজি রাত্রে যদি ঔষধটি তুলিয়া রাখিতাম, তবু তারে বশ করিয়া মনুষ্যজন্ম সার্থক করিতে পারিতাম। কালি রাত্রে বাহির হইয়াছিলাম বলিয়া নাতি ঝাঁটা খাইলাম; আর আজি বাহির হইব কি প্রকারে?”

ক। “দিনে তুলিলে কেন হয় না?”

শ্যা। “দিনে তুলিলে ফল্‌বে কেন? ঠিক দুই প্রহর রাত্রে এলো চুলে তুলিতে হয়। তা ভাই মনের সাধ মনেই রহিল।”

ক। “আচ্ছা, আমি ত আজি দিনে সে গাছ চিনে এয়েছি, আর যে বনে হয় তাও দেখে এসেছি। তোমাকে আজি আর যেতে হবে না, আমি একা গিয়া ঔষধ তুলিয়া আনিব।”

শ্যা। “এক দিন যা হইয়াছে তা হইয়াছে। রাত্রে তুমি আর বাহির হইও না।”

ক। “সে জন্য তুমি কেন চিন্তা কর? শুনেছ ত রাত্রে বেড়ান আমার ছেলে বেলা হইতে অভ্যাস। মনে ভেবে দেখ আমার সে অভ্যাস না থাকিলে তোমার সঙ্গে আমার কখন চাক্ষুষও হইত না।”

শ্যা। “সে ভয়ে বলি না। কিন্তু একা রাত্রে বনে বনে বেড়ান কি গৃহস্থের বউ ঝির ভাল। দুই জনে গিয়াও এত তিরস্কার খাইলাম, তুমি একাকিনী গেলে কি রক্ষা থাকিবে?”

ক। “ক্ষতিই কি? তুমিও কি মনে করিয়াছ যে আমি রাত্রে ঘরের বাহির হইলেই কুচরিত্র হইব?”

শ্যা। “আমি তা মনে করি না। কিন্তু মন্দ লোকে মন্দ বল্‌বে।”

ক। “বলুক, আমি তাতে মন্দ হব না।”

শ্যা। “তা ত হবে না―কিন্তু তোমাকে কেহ কিছু মন্দ বলিলে আমাদিগের অন্তঃকরণে ক্লেশ হবে।”

ক। “এমত অন্যায় ক্লেশ হইতে দিও না।”

শ্যা। “তাও আমি পারিব। কিন্তু দাদাকে কেন অসুখী করিবে?”

কপালকুণ্ডলা শ্যামাসুন্দরীর প্রতি নিজ স্নিগ্ধোজ্জ্বল কটাক্ষ নিক্ষেপ করিলেন। কহিলেন, “ইহাতে তিনি অসুখী হয়েন, আমি কি করিব? যদি জানিতাম যে স্ত্রীলোকের বিবাহ দাসীত্ব, তবে কদাপি বিবাহ করিতাম না।”

ইহার পর আর কথা শ্যামাসুন্দরী ভাল বুঝিলেন না। আত্মকর্ম্মে উঠিয়া গেলেন।

কপালকুণ্ডলা প্রয়োজনীয় গৃহকার্য্যে ব্যাপৃত হইলেন। গৃহকার্য্য সমাধা করিয়া ওষধির অনুসন্ধানে গৃহ হইতে বহির্গত। হইলেন। তখন রাত্রি প্রহরাতীত হইয়াছিল। নিশা সজ্যোৎস্না। নবকুমার বহিঃকক্ষ্যায় বসিয়াছিলেন, কপালকুণ্ডলা যে বাহির হইয়া যাইতেছেন তাহা গবাক্ষপথে দেখিতে পাইলেন। তিনিও গৃহ ত্যাগ করিয়া আসিয়া মৃণ্ময়ীর হাত ধরিলেন। কপালকুণ্ডলা কহিলেন, “কি?”

নবকুমার কহিলেন, “কোথা যাইতেছ?” নবকুমারের স্বরে তিরস্কারের সূচনা মাত্র ছিল না।

কপালকুণ্ডলা কহিলেন, “শ্যামাসুন্দরী স্বামীকে বশ করিবার জন্য ঔষধ চাহে, আমি ঔষধের সন্ধানে যাইতেছি।”

নবকুমার পূর্ব্ববৎ কোমল স্বরে কহিলেন, “ভাল; কালি ত এক বার গিয়াছিলে? আজি আবার কেন?”

ক। “কালি খুঁজিয়া পাই নাই; আজি আবার খুঁজিব।”

নবকুমার অতি মৃদুভাবে কহিলেন, “ভাল দিনে খুঁজিলেও ত হয়?” নবকুমারের স্বর স্নেহ পরিপূর্ণ।

কপালকুণ্ডলা কহিলেন, “দিবসে ঔষধ ফলে না।”

নব। “কাজই কি তোমার ঔষধ তল্লাসে? আমাকে গাছের নাম বলিয়া দাও। আমি ওষধি তুলিয়া আনিয়া দিব।”

ক। “আমি গাছ দেখিলে চিনিতে পারি, কিন্তু নাম জানি না। আর তুমি তুলিলে ফলিবে না। স্ত্রীলোকে এলোচুলে তুলিতে হয়। তুমি পরের উপকারের বিঘ্ন করিও না।”

কপালকুণ্ডলা এই কথা অপ্রসন্নতার সহিত বলিলেন। নবকুমার আর আপত্তি করিলেন না। বলিলেন, “চল আমি তোমার সঙ্গে যাইব।”

কপালকুণ্ডলা গর্ব্বিত বচনে কহিলেন, “আইস আমি অবিশ্বাসিনী কি না স্বচক্ষে দেখিয়া যাও।”

নবকুমার আর কিছু বলিতে পারিলেন না। নিশ্বাস সহকারে কপালকুণ্ডলার হাত ছাড়িয়া দিয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। কপালকুণ্ডলা একাকিনী বনমধ্যে প্রবেশ করিলেন।

তৃতীয় খণ্ড · দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

পথান্তরে।

“যে মাটীতে পড়ে লোকে উঠে তাই ধরে।

বারেক নিরাশ হয়ে কে কোথায় মরে॥

তুফানে পতিত কিন্তু ছাড়িব না হাল।

আজিকে বিফল হলো, হতে পারে কাল॥”

নবীন তপস্বিনী।

যে দিন নবকুমারকে বিদায় করিয়া মতি বিবি বা
লুৎফ্-উন্নিসা বৰ্দ্ধমানাভিমুখে যাত্রা করিলেন, সে দিন তিনি বর্দ্ধমান পর্যন্ত যাইতে পারিলেন না। অন্য চটীতে রহিলেন। সন্ধ্যার সময়ে পেষ্‌মনের সহিত একত্রে বসিয়া কথোপকথন হইতেছিল, এমত কালে মতি সহসা পেষ্‌মনকে জিজ্ঞাসা করিলেন,

“পেষ্‌মন! আমার স্বামীকে কেমন দেখিলে?”

পেষ্‌মন্, কিছু বিস্মিত হইয়া কহিল, “কেমন আর দেখিব?” মতি কহিলেন “সুন্দর পুৰুষ বটে কি না?”

নবকুমারের প্রতি পেষ্‌মনের বিশেষ বিরাগ জন্মিয়াছিল। যে অলঙ্কার গুলিন মতি কপালকুণ্ডলাকে দিয়াছিলেন, তৎপ্রতি পেষ্‌মনের বিশেষ লোভ ছিল; মনে মনে ভরসা ছিল এক দিন চাহিয়া লইবেন। সেই আশা নির্মূল হইয়াছিল, সুতরাং কপালকুণ্ডলা এবং তাঁহার স্বামী উভয়ের প্রতি তাঁহার দারুণ বিরক্তি। অতএব কামিনীর প্রশ্নে উত্তর করিলেন,

“দরিদ্র ব্রাহ্মণ আবার সুন্দর কুৎসিত কি?”

মতি সহচরীর মনের ভাব বুঝিয়া হাস্য করিলেন, “দরিদ্র ব্রাহ্মণ যদি ওমরাহ হয়, তবে সুন্দর পুৰুষ হইবে কি না?”

পে। “সে আবার কি?”

মতি। “কেন, তুমি কি জান না যে বেগম স্বীকার করিয়াছেন, যে খস্রু বাদশাহ হইলে আমার স্বামী ওমরাহ হইবে?”

পে। “তা ত জানি। কিন্তু তোমার পূর্ব্বস্বামী ওমরাহ হইবেন কেন?”

মতি। “তবে আমার আর কোন স্বামী আছে?”

পে। “যিনি নূতন হইবেন।”

মতি ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, আমার ন্যায় সতীর দুই স্বামী, এ বড় অন্যায় কথা।——ও কে যাইতেছে?”

যাহাকে দেখিয়া মতি কহিলেন, “ও কে যাইতেছে?” পেষ্‌মন তাহাকে চিনিল; সে আগ্রা নিবাসী, খা আজিমের আশ্রিত ব্যক্তি। উভয়ে ব্যস্ত হইলেন। পেষ্‌মন্ তাহাকে ডাকিলেন; সে ব্যক্তি আসিয়া লুৎফ্-উন্নিসাকে অভিবাদন পূর্ব্বক এক খানি পত্র দান করিল; কহিল,

“পত্র লইয়া উড়িষ্যা যাইতেছিলাম। পত্র জরূরি।”

পত্র পড়িয়া মতিবিবির আশা ভরসা সকল অন্তর্হিত হইল। পত্রের মর্ম্ম এই,

“আমাদিগের যত্ন বিফল হইয়াছে। মৃত্যুকালেও আকবরশাহ আপন বুদ্ধিবলে আমাদিগের পরাভূত করিয়াছেন। তাঁহার পরলোকে গতি হইয়াছে। তাঁহার আজ্ঞাবলে, কুমার সেলিম এক্ষণে জাঁহাগীর শাহ হইয়াছেন। তুমি খস্ৰুর জন্য ব্যস্ত হইবে না। এই উপলক্ষে কেহ তোমার শত্রুতা সাধিতে না পারে, এমত চেষ্টার জন্য তুমি শীঘ্র আগ্রায় ফিরিয়া আসিবা।”

আকবর শাহ যে প্রকারে এ ষড়যন্ত্র নিষ্ফল করেন, তাহা ইতিহাসে বর্ণিত আছে; এ স্থলে তদুল্লেখের আবশ্যক নাই।

পুরস্কার পূর্ব্বক দূতকে বিদায় করিয়া মতি, পেষ্‌মনকে পত্র শুনাইলেন। পেষ্‌মন্ কহিল,

“এক্ষণে উপায়?”

মতি। “এখন আর উপায় নাই।”

পে। (ক্ষণেক চিন্তা করিয়া) “ভাল ক্ষতিই কি? যেমন ছিলে, তেমনিই থাকিবে, মোগল বাদশাহের পুরস্ত্রী মাত্রেই অন্য রাজ্যের পাটরাণী অপেক্ষা ও বড়।

মতি। (ঈষৎ হাসিয়া) “তাহা আর হয় না। আর সে রাজপুরে থাকিতে পারিব না। শীঘ্রই মেহের-উন্নিসার সহিত জাঁহাগীরের বিবাহ হইবে। মেহের-উন্নিসাকে আমি কিশোর বয়োবধি ভাল জানি; একবার সে পুরবাসিনী হইলে সেই বাদশাহ হইবে; জাঁহাগীর বাদশাহ নাম মাত্র থাকিবে। আমি যে তাহার সিংহাসনারোহণের পথরোধের চেষ্টা পাইয়াছিলাম, ইহা তাহার অবিদিত থাকিবে না। তখন আমার দশা কি হইবে?”

পেষ্‌মন্ প্রায় রোদনোম্মুখী হইয়া কহিল, “তবে কি হইবে?”

মতি কহিলেন, “এক ভরসা আছে। মেহের-উন্নিসার চিত্ত জাঁহাগীরের প্রতি কিরূপ? তাহার যেরূপ দার্ঢ্য তাহাতে যদি সে জাঁহাগীরের প্রতি অনুরাগিণী না হইয়া স্বামীর প্রতি যথার্থ স্নেহশালিনী হইয়া থাকে, তবে জাঁহাগীর শত শের আফগান বধ করিলেও, মেহের-উন্নিসাকে পাইবেন না। আর যদি মেহের-উন্নিসা জাঁহাগীরের যথার্থ অভিলাষিণী হয়, তবে আর কোন ভরসা নাই।”

পে। “মেহের-উন্নিসার মন কি প্রকারে জানিবে?”

মতি হাসিয়া কহিলেন, “লুৎফ্-উন্নিসার অসাধ্য কি? মেহের-উন্নিসা আমার বালসখী;—কালি বর্দ্ধমানে গিয়া তাঁহার নিকট দুই দিন অবস্থিতি করিব।”

পে। “যদি মেহের-উন্নিসা বাদশাহের অনুরাগিণী হন, তাহা হইলে কি করিবে?”

ম। “পিতা কহিয়া থাকেন, ‘ক্ষেত্রে কর্ম্ম বিধীয়তে।’ উভয়ে ক্ষণেক নীরব হইয়া রহিলেন। ঈষৎ হাসিতে মতির ওষ্ঠাধর কুঞ্চিত হইতে লাগিল। পেষ্‌মন্ জিজ্ঞাসা করিল, “হাসিতেছ কেন?”

মতি কহিলেন, “কোন নূতন ভাব উদয় হইতেছে।”

পে। “কি নূতন ভাব?”

মতি তাহা পেষ্‌মন্‌কে বলিলেন না। আমরাও তাহা পাঠককে বলিব না। পশ্চাৎ প্রকাশ পাইবে।

দ্বিতীয় খণ্ড · দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

পান্থনিবাসে।

“ক্বৈষা যোষিৎ প্রকৃতিচপলা।

উদ্ধবদূত।

আমি বলিয়াছি নবকুমারের সঙ্গিনী অসামান্যা রূপসী। এ স্থলে, যদি প্রচলিত প্রথানুসারে তাঁহার রূপবর্ণনে প্রবৃত্ত না হই, তবে পুৰুষ পাঠকেরা বড়ই ক্ষুণ্ন হইবেন। আর যাঁহারা স্বয়ং সুন্দরী তাঁহারা পড়িয়া বলিবেন, “তবে বুঝি মাগী পাঁচপাঁচি!” সুতরাং এই কামিনীর রূপ বর্ণনে আমাকে প্রবৃত্ত হইতে হইল। কিন্তু কি লইয়াই বা তাঁহার বর্ণনা করি? কখন কখন বটতলার মা সরস্বতী আমার স্কন্ধে চাপিয়া থাকেন। তাঁহার অনুগ্রহে কতকগুলিন ফলমূলের ডালি সাজাইয়া রূপ বর্ণনার কার্য্য এক প্রকার সাধন করিতে পারি, কিন্তু পাছে দাড়িম্ব রম্ভা ইত্যাদি নাম শুনিয়া পাঠক মহাশয়ের জঠরানল জ্বলিয়া উঠে, এই আশঙ্কায় সে চেষ্টায় বিরত রহিলাম।

যদি এই রমণী নির্দ্দোষসৌন্দর্য্যবিশিষ্টা হইতেন, তবে বলিতাম, “পুৰুষ পাঠক! ইনি আপনার গৃহিণীর ন্যায় সুন্দরী। আর সুন্দরি পাঠকারিণি! ইনি আপনার দর্পণস্থ ছায়ার ন্যায় রূপবতী।” তাহা হইলে রূপ বর্ণনার এক শেষ হইত। দুর্ভাগ্যবশতঃ ইনি সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী নহেন, সুতরাং নিরস্ত হইতে হইল।

ইনি যে নির্দ্দোষ সুন্দরী নহেন তাহা বলিবার কারণ এই যে, প্রথমতঃ ইহার শরীর মধ্যমাকৃতির অপেক্ষা কিঞ্চিৎ দীর্ঘ; দ্বিতীয়তঃ অধরৌষ্ঠ কিছু চাপা; তৃতীয়তঃ প্রকৃত পক্ষে ইনি গৌরাঙ্গিণী নহেন।

শরীর ঈষদ্দীর্ঘ বটে, কিন্তু হস্তপদ হৃদয়াদি সর্ব্বাঙ্গ সুগোল এবং সম্পূর্ণীভূত। বর্ষাকালে বিটপীলতা যেমন আপন পত্ররাশির বাহুল্যে দলমল করে, ইহার শরীর তেমনি আপন পূর্ণতায় দলমল করিতেছিল; সুতরাং ঈষদ্দীর্ঘ দেহও পূর্ণতাহেতুক অধিকতর শোভার কারণ হইয়াছিল। যাহাদিগকে প্রকৃতপক্ষে গৌরাঙ্গিণী বলি, তাঁহাদিগের মধ্যে কাহারও বর্ণ পূর্ণচন্দ্র কৌমুদীর ন্যায়, কাহারও কাহারও ঈষদারক্তবদনা উষার ন্যায়। ইহার এতদুভয়বর্জ্জিত, সুতরাং ইহাকে প্রকৃত গৌরাঙ্গিণী বলিলাম না বটে, কিন্তু মুগ্ধকরী শক্তিতে ইহার বর্ণ ন্যূন নহে। ইনি শ্যামবর্ণা। “শ্যামা মা” বা “শ্যামসুন্দর” যে শ্যামবর্ণের উদাহরণ এ সে শ্যামবর্ণ নহে। তপ্ত কাঞ্চনের যে শ্যামবর্ণ এ সেই শ্যাম। পূর্ণচন্দ্রকরলেখা, অথবা হেমাম্বুদকিরিটিনী উষা, যদি গৌরাঙ্গিণীদিগের বর্ণপ্রতিমা হয়, তবে বসন্তপ্রসূত নবচূতদলরাজির শোভা এই শ্যামার বর্ণের অনুরূপ বলা যাইতে পারে। পাঠক মহাশয়দিগের মধ্যে অনেকে গৌরাঙ্গিণীর বর্ণের প্রতিষ্ঠা করিতে পারেন, কিন্তু যদি কেহ এরূপ শ্যামার মন্ত্রে মুগ্ধ হয়েন তবে তাঁহাকে বর্ণজ্ঞানশূন্য বলিতে পারিব না। এ কথায় যাঁহার বিরক্তি জন্মায়, তিনি এক বার, নবচূতপল্লববিরাজী ভ্রমরশ্রেণীর ন্যায়, সেই উজ্জ্বলশ্যামললাটবিলম্বী অলকাবলি মনে কৰুন; সেই সপ্তমীচন্দ্রাকৃতললাটতলস্থ অলকস্পর্শী ভ্রূযুগ মনে কৰুন; সেই পক্বচূতোজ্জ্বল কপোলদেশ মনে কৰুন; তন্মধ্যবর্ত্তী ঘোরারক্ত ক্ষুদ্র ওষ্ঠাধর মনে কৰুন তাহা হইলে এই অপরিচিতা রমণীকে সুন্দরীপ্রধানা বলিয়া অনুভূত হইবে। চক্ষু দুইটি অতি বিশাল নহে, কিন্তু সুবঙ্কিমপল্লবরেখাবিশিষ্ট—আর অতিশয় উজ্জ্বল। তাঁহার কটাক্ষ স্থির, অথচ মর্ম্মভেদী। তোমার উপর দৃষ্টি পড়িলে তুমি তৎক্ষণাৎ অনুভূত কর, যে এ স্ত্রীলোক তোমার মনঃ পর্য্যন্ত দেখিতেছে। দেখিতে দেখিতে সে মর্ম্মভেদী দৃষ্টির ভাবান্তর হয়; আবার চক্ষু সুকোমল স্নেহময় রসে গলিয়া যায়। আবার কখন বা তাহাতে কেবল সুখাবেশজনিত ক্লান্তিপ্রকাশ মাত্র, যেন সে নয়ন মন্মথের স্বপ্নশয্যা। কখন বা লালসাবিস্ফারিত, মদনরসে টলমলায়মান। আবার কখন লোলাপাঙ্গে ক্রূর কটাক্ষ—যেন মেঘমধ্যে বিদ্যুদ্দাম। মুখকান্তি মধ্যে দুইটি অনির্ব্বচনীয় শোভা; প্রথম সর্ব্বত্রগামিনী বুদ্ধির প্রভাব, দ্বিতীয় মহান্ আত্মগরিমা। তৎকারণে যখন তিনি মরালগ্রীবা বঙ্কিম করিয়া দাঁড়াইতেন, তখন সহজেই বোধ হইত ইনি রমণীকুলরাজ্ঞী।

সুন্দরীর বয়ঃক্রম সপ্তবিংশতি বৎসর—ভাদ্র মাসের ভরা নদী। ভাদ্র মাসের নদীজলের ন্যায়, ইহার রূপরাশি টলটল করিতেছিল—উছলিয়া পড়িতেছিল। বর্ণাপেক্ষা, নয়নাপেক্ষা, সর্ব্বাপেক্ষা, সেই সৌন্দর্য্যের পারিপ্লব মুগ্ধকর। পূর্ণযৌবনভরে সর্ব্ব শরীর সতত ঈষচ্চঞ্চল; বিনা বায়ুতে নব শরতের নদী যেমন ঈষচ্চঞ্চল, তেমনি চঞ্চল; সে চাঞ্চল্য মুহুর্ম্মুহু নূতন নূতন শোভাবিকাশের কারণ। নবকুমার নিমেষশূন্য চক্ষে সেই নূতন নূতন শোভা দেখিতেছিলেন।

সুন্দরী, নবকুমারের চক্ষু নিমেষশূন্য দেখিয়া কহিলেন, “আপনি কি দেখিতেছেন?”

নবকুমার ভদ্রলোক; অপ্রতিভ হইয়া মুখাবনত করিলেন। নবকুমারকে নিৰুত্তর দেখিয়া অপরিচিতা পুনরপি হাসিয়া কহিলেন,

“আপনি কখন কি স্ত্রীলোক দেখেন নাই, না আপনি আমাকে বড় সুন্দরী মনে করিতেছেন?”

সহজে এ কথা কহিলে, তিরস্কার স্বরূপ বোধ হইত, কিন্তু রমণী যে হাসির সহিত বলিলেন, তাহাতে ব্যঙ্গ ব্যতীত আর কিছুই বোধ হইল না। নবকুমার দেখিলেন, এ অতি মুখরা; মুখরার কথায় কেন না উত্তর করিবেন? কহিলেন,

“আমি স্ত্রীলোক দেখিয়াছি; কিন্তু এরূপ সুন্দরী দেখি নাই।”

রমণী সগর্ব্বে জিজ্ঞাসা করিলেন, “একটীও না?”

নবকুমারের হৃদয়ে কপালকুণ্ডলার রূপ জাগিতেছিল; তিনিও সগর্ব্বে উত্তর করিলেন, “একটীও না এমত বলিতে পারি না।”

প্রস্তরে লৌহের আঘাত পড়িল। উত্তরকারিণী কহিলেন—“তবু ভাল। সেটী কি আপনার গৃহিণী?”

নব। “কেন? গৃহিণী কেন মনে ভাবিতেছ?”

স্ত্রী। “বাঙ্গালীরা আপন গৃহিণীকে সর্ব্বাপেক্ষা সুন্দরী দেখে।”

নব। “আমি বাঙ্গালি; আপনিও ত বাঙ্গালির ন্যায় কথা কহিতেছেন, আপনি তবে কোন্ দেশীয়?”

যুবতী আপন পরিচ্ছদের প্রতি দৃষ্টি করিয়া কহিলেন, “অভাগিনী বাঙ্গালী নহে। পশ্চিন প্রদেশীয়া মুসলমানী।” নবকুমার পর্য্যবেক্ষণ করিয়া দেখিলেন, পরিচ্ছদ পশ্চিমপ্রদেশীয়া মুসলমানীর ন্যায় বটে। ক্ষণপরে তৰুণী বলিতে লাগিলেন, “মহাশয়, বাক্‌বৈদগ্ধে আমার পরিচয় লইলেন;—আপন পরিচয় দিয়া চরিতার্থ কৰুন। যে গৃহে সেই অদ্বিতীয়া রূপসী গৃহিণী সে গৃহ কোথায়?”

নবকুমার কহিলেন, “আমার নিবাস সপ্তগ্রাম।”

বিদেশিনী কোন উত্তর করিলেন না। সহসা তিনি মুখাবনত করিয়া, প্রদীপ উজ্জ্বল করিতে লাগিলেন।

ক্ষণেক পরে মুখ না তুলিয়া বলিলেন, “দাসীর নাম মতি। মহাশয়ের নাম কি শুনিতে পাই না?”

নবকুমার বলিলেন, “নবকুমার শর্ম্মা।”

প্রদীপ নিবিয়া গেল।

প্রথম খণ্ড · দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

উপকূলে।

আরোহীদিগের স্ফূর্ত্তিব্যঞ্জক কথা সমাপ্ত হইলে, নাবিকেরা প্রস্তাব করিল যে জোয়ারের আরও কিঞ্চিৎ বিলম্ব আছে;—এই অবকাশে আরোহীগণ সম্মুখস্থ সৈকতে পাকাদি সমাপন কৰুন; পরে জলোচ্ছাস আরম্ভেই স্বদেশাভিমুখে যাত্রা করিতে পারিবেন। আরোহীবর্গেও এই পরামর্শে সম্মতি দিলেন। তখন নাবিকেরা তরী তীরলগ্ন করিলে আরোহীগণ অবতরণ করিয়া স্নানাদি প্রাতঃকৃত্য সম্পাদনে প্রবৃত্ত হইলেন।

স্নানাদির পর পাকের উদ্‍যোগে আর এক নূতন বিপত্তি উপস্থিত হইল,—নৌকায় পাকের কাষ্ঠ নাই। ব্যাঘ্রভয়ে উপর হইতে কাষ্ঠ সংগ্রহ করিয়া আনিতে কেহই স্বীকৃত হইল না। পরিশেষে সকলের উপবাসের উপক্রম দেখিয়া প্রাচীন প্রাগুক্ত যুবাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “বাপু নবকুমার! তুমি ইহার উপায় না করিলে আমরা এত গুলিন লোক মারা যাই।”

নবকুমার কিঞ্চিৎ কাল চিন্তা করিয়া কহিলেন, “আচ্ছা, আমিই যাব; কুড়ালি দাও, আর দা লইয়া এক জন আমার সঙ্গে আইস।”

কেহই নবকুমারের সহিত যাইতে চাহিল না।

“খাবার সময় বুঝা যাবে” এই বলিয়া নবকুমার কঙ্কাল বন্ধন পূর্ব্বক একক কুঠার হস্তে কাষ্ঠাহরণে চলিলেন।

তীরোপরি আরোহণ করিয়া নবকুমার দেখিলেন যে, যতদূর দৃষ্টি চলে তত দূর মধ্যে কোথাও বসতির লক্ষণ কিছুই নাই। কেবল বন মাত্র। কিন্তু সে বন, দীর্ঘ বৃক্ষবলিশোভিত বা নিবিড় বন নহে;—কেবল স্থানে স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিজ্জ মণ্ডলাকারে কোন কোন ভূমিখণ্ড ব্যাপিয়াছে। নবকুমার তন্মধ্যে আহরণযোগ্য কাষ্ঠ দেখিতে পাইলেন না; সুতরাং উপযুক্ত বৃক্ষের অনুসন্ধানে নদীতট হইতে অধিক দূর গমন করিতে হইল। পরিশেষে ছেদনযোগ্য একটি বৃক্ষ পাইয়া তাহা হইতে প্রয়োজনীয় কাষ্ঠ সমাহরণ করিলেন। কাষ্ঠ বহন করিয়া আনা আর এক বিষম কঠিন ব্যাপার বোধ হইল। নবকুমার দরিদ্রের সন্তান ছিলেন না, এ সকল কর্ম্মে অভ্যাস ছিল না; সম্যক্ বিবেচনা না করিয়া কাষ্ঠ আহরণে আসিয়াছিলেন, কিন্তু এক্ষণে কাষ্ঠভার বহন বড় ক্লেশকর হইল। যাহাই হউক, যে কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, তাহাতে অল্পে ক্ষান্ত হওয়া নবকুমারের স্বভাব ছিল না, এজন্য তিনি কোন মতে কাষ্ঠভার বহিয়া আনিতে লাগিলেন। কিয়দ্দূর বহেন, পরে ক্ষণেক বসিয়া বিশ্রাম করেন, আবার বহেন; এইরূপে আসিতে লাগিলেন।

এই হেতুবশতঃ নবকুমারের প্রত্যাগমনে বিলম্ব হইতে লাগিল। এ দিকে সমভিব্যাহারিগণ তাঁহার বিলম্ব দেখিয়া উদ্বিগ্ন হইতে লাগিল; তাহাদিগের এইরূপ আশঙ্কা হইল, যে নবকুমারকে ব্যাঘ্রে হত্যা করিয়াছে। সম্ভাব্য কাল অতীত হইলে এই রূপেই তাহাদিগের হৃদয়ে স্থিরসিদ্ধান্ত হইল। অথচ কাহারও এমত সাহস হইল না যে তীরে উঠিয়া কিয়দ্দূর অগ্রসর হইয়া তাঁহার অনুসন্ধান করেন।

নৌকারোহীগণ এইরূপ কল্পনা করিতেছিল ইত্যবসরে জলরাশি মধ্যে ভৈরব কল্লোল উত্থাপিত হইল। নাবিকেরা বুঝিল যে “জোয়ার” আসিতেছে। নাবিকেরা বিশেষ জানিত যে এ সকল স্থানে জলোচ্ছ্বাসকালীন তটদেশে এরূপ প্রচণ্ড তরঙ্গাভিঘাত হয় যে তখন নৌকাদি তীরবর্ত্তী থাকিলে তাহা খণ্ড খণ্ড হইয়া যায়। এজন্য তাহারা অতিব্যস্তে নৌকার বন্ধন মোচন করিয়া নদী-মধ্যবর্ত্তী হইতে লাগিল। নৌকা মুক্ত হইতে না হইতেই সম্মুখস্থ সৈকত ভূমি জলপ্লুত হইয়া গেল, যাত্রিগণ কেবল মাত্র ত্রস্তে নৌকায় উঠিতে অবকাশ পাইয়াছিল; তণ্ডুলাদি যাহা যাহা চরে স্থিত হইয়াছিল, তৎসমুদায় ভাসিয়া গেল। দুর্ভাগ্যবশতঃ নাবিকেরা সুনিপুন নহে; নৌকা সামলাইতে পারিল না; প্রবল জলপ্রবাহবেগে তরণী রসুলপুর নদীর মধ্যে লইয়া চলিল। এক জন আরোহী কহিল, “নবকুমার রহিল যে?” একজন নাবিক কহিল “আঃ তোর নবকুমার কি আছে? তাহাকে শিয়ালে খাইয়াছে।”

জলবেগে নৌকা রসুলপুরের নদীর মধ্যে লইয়া যাইতেছে, প্রত্যাগমন করিতে বিস্তর ক্লেশ হইবে, এই জন্য নাবিকেরা প্রাণ পণে তাহার বাহিরে আসিতে চেষ্টা করিতে লাগিল। এমন কি, সেই মাঘ মাসে তাহাদিগের ললাটে স্বেদস্রুতি হইতে লাগিল। এরূপ পরিশ্রমদ্বারা রসুলপুর নদীর ভিতর হইতে বাহিরে আসিতে লাগিল বটে, কিন্তু নৌকা যেমন বাহিরে আসিল, অমনি তথাকার প্রবলতর স্রোতে উত্তরমুখী হইয়া তীরবৎ বেগে চলিল, নাবিকেরা তাহার তিলার্দ্ধ মাত্র সংযম করিতে পারিল না। নৌকা আর ফিরিল না।

যখন জলবেগ এমত মন্দীভূত হইয়া আসিল যে নৌকার গতি সংযত করা যাইতে পারে, তখন যাত্রীরা রসুলপুরের মোহানা অতিক্রম করিয়া অনেক দূর আসিয়াছিলেন। এখন, নবকুমারের জন্য প্রত্যাবর্ত্তন করা যাইবে কি না, এবিষয়ের মীমাংসা আবশ্যক হইল। এই স্থানে বলা আবশ্যক যে নবকুমারের সহযাত্রীরা তাঁহার প্রতিবেশী মাত্র, কেহই আত্মবন্ধু নহে। তাঁহারা বিবেচনা করিয়া দেখিলেন, যে তথা হইতে প্রতিবর্ত্তন করা আর এক ভাঁটার কর্ম্ম। পরে রাত্রি আগত হইবে, আর রাত্রে নৌকা চালনা হইতে পারিবে না, অতএব পরদিনের জোয়ারের প্রতীক্ষা করিতে হইবেক। একাল পর্য্যন্ত সকলকে অনাহারে থাকিতে হইবেক। দুই দিন নিরাহারে সকলের প্রাণ ওষ্ঠাগত হইবেক। বিশেষ নাবিকেরা প্রতিগমন করিতে অসম্মত; তাহারা কথার বাধ্য নহে। তাহারা বলিতেছে যে নবকুমারকে ব্যাঘ্রে হত্যা করিয়াছে। তাহাই সম্ভব। তবে এত ক্লেশ স্বীকার কিজন্য?

এইরূপ বিবেচনা করিয়া যাত্রীরা নবকুমার ব্যতীত স্বদেশ গমনই উচিত বিবেচনা করিলেন। নবকুমার সেই ভীষণ সমুদ্রতীরে বনবাসে বিসর্জ্জিত হইলেন।

পাঠক! তুমি শুনিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছ তুমি কখন পরের উপবাস নিবারণার্থ কাষ্ঠাহরণে যাইবে না? যদি এমত মনে কর, তবে তুমি পামর—এই যাত্রীদিগের ন্যায় পামর। আত্মোপকারীকে বনবাসে বিসর্জ্জন করা যাহাদিগের প্রকৃতি, তাহারা চিরকাল আত্মোপকারীকে বনবাস দিবেক—কিন্তু যতবার বনবাসিত কৰুক না কেন, পরের কাষ্ঠাহরণ করা যাহার স্বভাব, সে পুনর্ব্বার পরের কাষ্ঠাহরণে যাইবে। তুমি অধম—তাই বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন?

চতুর্থ খণ্ড · নবম পরিচ্ছেদ

নবম পরিচ্ছেদ।

গৃহাভিমুখে।

কপালকুণ্ডলা ধীরে ধীরে গৃহাভিমুখে চলিলেন। অতি ধীরে ধীরে, অতি মৃদু মৃদু চলিলেন। তাহার কারণ তিনি অতি গভীর চিন্তামগ্ন হইয়া যাইতে ছিলে লুৎফ্-উন্নিসার সম্বাদে কপালকুণ্ডলার একেবারে চিত্তভাব পরিবর্ত্তিত হইল; তিনি আত্মবিসর্জ্জনে প্রস্তুত হইলেন। আত্মবিসর্জ্জন কিজন্য? লুৎফ্-উন্নিসার জন্য? তাহা নহে।

কপালকুণ্ডলা অন্তঃকরণ সম্বন্ধে তান্ত্রিকের সন্তান; তান্ত্রিক যেরূপ কালিকাপ্রসাদাকাঙ্ক্ষায় পরপ্রাণ সংহারে সঙ্কোচশূন্য—কপালকুণ্ডলা সেই আকাঙ্ক্ষায় আত্মজীবন বিসর্জ্জনে তদ্রূপ। কপালকুণ্ডলা যে কাপালিকের ন্যায় অনন্যচিত্ত হইয়া শক্তিপ্রসাদ প্রার্থিনী হইয়াছিলেন তাহা নহে, তথাপি অহর্নিশ শক্তিভক্তি শ্রবণ দর্শন ও সাধনে কালিকানুরাগ বিশিষ্ট প্রকারে জন্মিয়াছিল, ভৈরবী যে সৃষ্টি শাসনকর্ত্রী, মুক্তিদাত্রী ইহা বিশেষ মতে প্রতীত হইয়াছিল। কালিকার পূজাভূমি যে নরশোণিতে প্লাবিত হয় ইহা তাঁহার পরদুঃখদুঃখিত হৃদয়ে সহিত না, কিন্তু আর কোন কার্য্যে ভক্তিপ্রদর্শনের ত্রুটি ছিল না। এখন সেই জগৎশাসনকর্ত্রী, সুখদুঃখবিধায়িনী কৈবল্যদায়িনী ভৈরবী স্বপ্নে তাঁহার জীবন সমর্পণ আদেশ করিয়াছেন। কেনই বা কপালকুণ্ডলা সে আদেশ পালন না করিবেন?

তুমি আমি প্রাণ ত্যাগ করিতে চাহি না। রাগ করিয়া যাহা বলি, এ সংসার সুখময়। সুখের প্রত্যাশাতেই বর্ত্তুলবৎ সংসার মধ্যে ঘুরিতেছি—দুঃখের প্রত্যাশায় নহে। কদাচিৎ যদি আত্মকর্ম্মদোষে সেই প্রত্যাশা সফলীকৃত না হয়, তবেই দুঃখ বলিয়া উচ্চ কলরব আরম্ভ করি। তাহা হইলেই দুঃখ নিয়ম নহে সিদ্ধান্ত হইল; নিয়মের ব্যতিক্রম মাত্র। তোমার আমার সর্ব্বত্র সুখ। সেই সুখে আমরা সংসার মধ্যে বদ্ধমূল; ছাড়িতে চাহি না। কিন্তু এ সংসারবন্ধনে প্রণয় প্রধান রজ্জু। কপালকুণ্ডলার সে বন্ধন ছিল না—কোন বন্ধনই ছিল না। তবে কপালকুণ্ডলাকে কে রাখে?

যাহার বন্ধন নাই; তাহারই অপ্রতিহত বেগ। গিরিশিখর হইতে নির্ঝরিণী নামিলে কে তাহার গতিরোধ করে? এক বার বায়ু তাড়িত হইলে কে তাহার সঞ্চারণ নিবারণ করে? কপালকুণ্ডলার চিত্ত চঞ্চল হইলে কে তাহার স্থিতিস্থাপন করিবে? নবীন করিকরভ মাতিলে কে তাহাকে শান্ত করিবে?

কপালকুণ্ডলা আপন চিত্তকে জিজ্ঞাসা করিলেন “কেনই বা এ শরীর জগদীশ্বরীর চরণে সমর্পণ না করিব? পঞ্চ ভূত লইয়া কি হইবে?” প্রশ্ন করিতেছিলেন অথচ কোন নিশ্চিত উত্তর দিতে পারিতেছিলেন না। সংসারের অন্য কোন বন্ধন না থাকিলেও পঞ্চ ভূতের এক বন্ধন আছে।

কপালকুণ্ডলা অধোবদনে চলিতে লাগিলেন। যখন মনুষ্যহৃদয় কোন উৎকট ভাবে আচ্ছন্ন হয়, চিন্তার একাগ্রতায় বাহ্যসৃষ্টির প্রতি লক্ষ্য থাকে না, তখন অনৈসর্গিক পদার্থও প্রত্যক্ষীভূত বলিয়া বোধ হয়। কপালকুণ্ডলার সেই অবস্থা হইয়াছিল। যেন ঊর্দ্ধ হইতে তাঁহার কর্ণকুহরে এই শব্দ প্রবেশ করিল, “বৎসে—আমি পথ দেখাইতেছি।” কপালকুণ্ডলা চকিতের ন্যায় ঊর্দ্ধদৃষ্টি করিলেন। দেখিলেন যেন আকাশমণ্ডলে নবনীরদনিন্দিত মূর্ত্তি! গলবিলম্বিতনরকপালমালা হইতে শোণিতশ্রুতি হইতেছে; কটিমণ্ডল বেড়িয়া নরকররাজি দুলিতেছে—বাম করে নরকপাল—অঙ্গে ৰুধির ধারা, ললাটে বিষমোজ্জ্বলজ্বালাবিভাসিত লোচন প্রান্তে বালশশী সুশোভিত! যেন ভৈরবী দক্ষিণ হস্ত উত্তোলন করিয়া কপালকুণ্ডলাকে ডাকিতেছেন।

কপালকুণ্ডলা ঊর্দ্ধমুখী হইয়া চলিলেন। সেই নবকাদম্বিনীসন্নিভ রূপ আকাশমার্গে তাঁহার আগে আগে চলিল। কখন কপালমালিনীর অবয়ব মেঘে লুক্কায়িত হয়, কখন নয়নপথে স্পষ্ট বিকশিত হয়। কপালকুণ্ডলা তাঁহার প্রতি চাহিয়া চলিলেন।

নবকুমার বা কাপালিক এ সব কিছুই দেখে নাই। নবকুমার সুরাগরলপ্রজ্বলিতহৃদয়—কপালকুণ্ডলার ধীর পদক্ষেপ অসহিষ্ণু হইয়া সঙ্গীকে কহিলেন,

“কাপালিক!”

কাপালিক কহিল “কি?”

“পানীয়ং দেহি মে”

কাপালিক পুনরপি তাঁহাকে সুরা পান করাইল।

নবকুমার কহিলেন, “আর বিলম্ব কি?”

কাপালিক উত্তর করিল “আর বিলম্ব কি!”

নবকুমার ভীমনাদে ডাকিলেন “কপালকুণ্ডলে!”

কপালকুণ্ডলা শুনিয়া চমকিতা হইলেন। ইদানীন্তন কেহ তাঁহাকে কপালকুণ্ডলা বলিয়া ডাকিত না। তিনি মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইলেন। নবকুমার ও কাপালিক তাঁহার সম্মুখে আসিলেন। কপালকুণ্ডলা প্রথমে তাঁহাদিগকে চিনিতে পারিলেন না—কহিলেন,

“তোমরা কে? যমদূত?

পরক্ষণেই চিনিতে পারিয়া কহিলেন, “না না পিতঃ, তুমি কি আমায় বলি দিতে আসিয়াছ?”

নবকুমার দৃঢ়মুষ্টিতে কপালকুণ্ডলার হস্ত ধারণ করিলেন। কাপালিক কৰুণাদ্র, মধুময় স্বরে কহিলেন,

“বংসে! আমাদিগের সঙ্গে আইস।” এই বলিয়া কাপালিক শ্মশানাভিমুখে পথ দেখাইয়া চলিলেন।

কপালকুণ্ডলা আকাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন; যথায় গগনবিহারিণী ভয়ঙ্করী দেখিয়াছিলেন, সেই দিকে চাহিলেন, দেখিলেন রণরঙ্গিণী খল খল হাসিতেছে; এক দীর্ঘ ত্রিশূল করে ধরিয়া কাপালিকগতপথ প্রতি সঙ্কেত করিতেছে। কপালকুণ্ডলা ভবিতব্যবিমূঢ়ার ন্যায় বিনা বাক্যব্যয়ে কাপালিকের অনুসরণ করিলেন। নবকুমার পূর্ব্ববৎ দৃঢ়মুষ্টিতে তাঁহার হস্ত ধারণ করিয়া চলিলেন।

প্রথম খণ্ড · নবম পরিচ্ছেদ

নবম পরিচ্ছেদ।

দেবনিকেতনে।

কণ্ব। অলং ৰুদিতেন; স্থিরাভব, ইতঃপন্থানমালোকয়।

শকুন্তলা।

পুৰুষ পাঠক, আমাকে মার্জ্জনা করিবেন। আপনি যদি কপালকুণ্ডলাকে সমুদ্রতীরে দেখিতেন, তবে এক দিন তৎপ্রতি আসক্তচিত্ত হইতেন কি না বলিতে পারি না। প্রাণরক্ষা মাত্র উপকারের অনুরোধে তাহার পাণিগ্রহণে সম্মত হইতেন কি না বলিতে পারি না। বোধ করি নহে, কেন না কপালকুণ্ডলা ৰুক্ষকেশী সন্ন্যাসিনী মাত্র। কিন্তু নবকুমার পরের জন্য কাষ্ঠাহরণ করেন;—এ পৃথিবীর কাঠুরিয়ারা সন্ন্যাসিনীদিগের মর্ম্ম বুঝে। কৃতঘ্ন সহযাত্রীদিগের জন্য নবকুমার মাথায় কাষ্ঠভার বহিয়াছিলেন,—কৃতোপকারিণী সন্ন্যাসিনীর জন্য যে অতুল রূপরাশি হৃদয়ে বহিতে চাহিবেন, তাহার বিচিত্র কি?

প্রাতে অধিকারী তাঁহার নিকট আসিলেন। দেখিলেন, এখনও নবকুমার শয়ন করেন নাই। জিজ্ঞাসা করিলেন, “এখন কি কর্ত্তব্য?”

নবকুমার কহিলেন, “আজি হইতে কপালকুণ্ডলা আমার ধর্ম্মপত্নী। ইহার জন্য সংসার ত্যাগ করিতে হয়, তাহাও করিব। কে কন্যা সম্প্রদান করিবে?”

ঘটক চূড়ামণির মুখ হর্ষোৎফুল্ল হইল। মনে মনে ভাবিলেন, “এত দিনে জগদম্বার কৃপায় আমার কপালিনীর বুঝি গতি হইল।” প্রকাশ্যে বলিলেন, “আমি সম্প্রদান করিব।”

অধিকারী নিজ শয়নকক্ষমধ্যে পুনঃপ্রবেশ করিলেন। একটী খুঙ্গির মধ্যে কয়েক খণ্ড অতিজীর্ণ তালপত্র ছিল। তাহাতে তাঁহার তিথি নক্ষত্রাদি নির্দ্দিষ্ট থাকিত। তৎসমুদায় সবিশেষ সমালোচনা করিয়া আসিয়া কহিলেন, “আজি যদিও বৈবাহিক দিন নহে—তথাচ বিবাহে কোন বিঘ্ন নাই। গোধূলিলগ্নে কন্যা সম্প্রদান করিব। তুমি অদ্য উপবাস করিয়া থাকিবা মাত্র। কৌলিক আচরণ সকল বাটী গিয়া করাইও। এক দিনের জন্য তোমাদিগের লুকাইয়া রাখিতে পারি, এমত স্থান আছে। আজি যদি তিনি আসেন তবে তোমাদিগের সন্ধান পাইবেন না। পরে বিবাহান্তে কালি প্রাতে সপত্নী বাটী যাইও।”

নবকুমার ইহাতে সম্মত হইলেন। এ অবস্থায় যত দূর সম্ভবে তত দূর যথাশাস্ত্র কার্য্য হইল। গোধূলি লগ্নে নবকুমারের সহিত কাপালিকপালিত সন্ন্যাসিনীর বিবাহ হইল।

কাপালিকের কোন সম্বাদ নাই। পরদিন প্রত্যূষে তিন জনে যাত্রার উদ্‍যোগ করিতে লাগিলেন। অধিকারী মেদিনীপুরের পথ পর্য্যন্ত তাঁহাদিগের রাখিয়া আসিবেন।

যাত্রাকালে কপালকুণ্ডলা কালী প্রণামার্থ গেলেন। ভক্তিভাবে প্রণাম করিয়া, পুষ্পপাত্র হইতে একটা অভিন্ন বিল্বপত্র প্রতিমার পাদোপরি স্থাপিত করিয়া তৎপ্রতি নিরীক্ষণ করিয়া রহিলেন। পত্রটী পড়িয়া গেল।

কপালকুণ্ডলা নিতান্ত ভক্তিপরায়ণা। বিল্বদল প্রতিমাচরণচ্যুত হইল দেখিয়া ভীতা হইলেন;—এবং অধিকারীকে সম্বাদ দিলেন। অধিকারীও বিষণ্ণ হইলেন। কহিলেন,

“এখন নিৰুপায়। এখন পতিমাত্র তোমার ধর্ম্ম। পতি শ্মশানে গেলে তোমাকে সঙ্গে সঙ্গে যাইতে হইবে। অতএব নিঃশব্দে চল।”

সকলে নিঃশব্দে চলিলেন। অনেক বেলা হইলে মেদিনীপুরের পথে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তখন অধিকারী বিদায় হইলেন। কপালকুণ্ডলা কাঁদিতে লাগিলেন। পৃথিবীতে যে জন তাঁহার একমাত্র সুহৃৎ সে বিদায় হইতেছে।

অধিকারীও কাঁদিতে লাগিলেন। চক্ষের জল মুছিয়া কপালকুণ্ডলার কাণে কাণে কহিলেন, “মা! তুই জানিস পরমেশ্বরীর প্রসাদে তোর সন্তানের অর্থের অভাব নাই। হিজলীর ছোট বড় সকলেই তাঁহার পূজা দেয়। তোর কাপড়ে যাহা বাঁধিয়া দিয়াছি তাহা তোর স্বামীর নিকট দিয়া তোকে পালকী করিয়া দিতে বলিস।—সন্তান বলিয়া মনে করিস্।”

অধিকারী এই বলিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে গেলেন। কপালকুণ্ডলাও কাঁদিতে কাঁদিতে চলিলেন।

ইতি প্রথমঃ খণ্ডঃ সমাপ্তঃ।

চতুর্থ খণ্ড · পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

কৃতসঙ্কেতে।

কপালকুণ্ডলা সে দিন সন্ধ্যা পর্য্যন্ত অনন্যচিন্তা হইয়া কেবল ইহাই বিবেচনা করিতেছিলেন যে, ব্রাহ্মণবেশীর সহিত সাক্ষাৎ বিধেয় কি না। পতিব্রতা যুবতীর পক্ষে রাত্রিকালে নির্জ্জনে অপরিচিত পুৰুষের সহিত সাক্ষাৎ যে অবিধেয় ইহা ভাবিয়া তাঁহার মনে সঙ্কোচ জন্মে নাই;
তদ্বিষয়ে যে তাঁহার স্থির সিদ্ধান্তই ছিল যে সাক্ষাতের উদ্দেশ্য দূষ্য না হইলে এমত সাক্ষাতে দোষ নাই—পুৰুষে পুৰুষে বা স্ত্রীলোকে স্ত্রীলোকে যেরূপে সাক্ষাতের অধিকার, স্ত্রী পুৰুষে সাক্ষাতের উভয়েরই সেই রূপ উচিত বলিয়া তাঁহার বোধ ছিল; বিশেষ ব্রাহ্মণবেশী পুৰুষ কি না তাহাতে সন্দেহ। সুতরাং সে সঙ্কোচ অনাবশ্যক, কিন্তু এ সাক্ষাতে মঙ্গল কি অমঙ্গল জন্মিবে তাহাই অনিশ্চিত বলিয়া কপালকুণ্ডলা এত দূর সঙ্কোচ করিতেছিলেন। প্রথমে ব্রাহ্মণবেশীর কথোপকথন, পরে কাপালিকের দর্শন, তৎপরে স্বপ্ন, এই সকল হেতুতে কপালকুণ্ডলার হৃদয়ে আত্মসম্বন্ধে মহাভীতি সঞ্চার হইয়াছিল; নিজ অমঙ্গল যে অদূরবর্ত্তী এমত সন্দেহ প্রবল হইয়াছিল। সেই অমঙ্গল যে কাপালিকের আগমন সহিত সম্বন্ধমিলিত, এমত সন্দেহও অমূলক বোধ হইল না। এই ব্রাহ্মণবেশীকে তাহারই সহচর বোধ হইতেছে—অতএব তাহার সহিত সাক্ষাতে সেই আশঙ্কার বিষয়ীভূত অমঙ্গলে পতিতও হইতে পারেন। সে ত স্পষ্টই বলিয়াছে যে কপালকুণ্ডলা সম্বন্ধেই পরামর্শ হইতেছিল। কিন্তু এমতও হইতে পারে যে ইহা হইতে তন্নিরাকরণ সূচনা হইবে। ব্রাহ্মণকুমার এক ব্যক্তির সহিত গোপনে পরামর্শ করিতেছিল, সে ব্যক্তিকে এই কাপালিক বলিয়া বোধ হয়। সেই কথোপকথনে কাহারও মৃত্যুর সঙ্কল্প প্রকাশ পাইতেছিল; নিতান্ত পক্ষে চিরনির্ব্বাসন। সে কাহার? ব্রাহ্মণবেশীত স্পষ্ট বলিয়াছে যে কপালকুণ্ডলা সন্ধন্ধেই কুপরামর্শ হইতেছিল। তবে তাহারই মৃত্যু বা তাহারই চিরনির্ব্বাসন কল্পনা হইতেছিল। তবে যখন এই সকল ভীষণ অভিসন্ধিতে ব্রাহ্মণবেশী সহকারী, তখন তাঁহার নিকট রাত্রিকালে একাকিনী দুর্গম কাননে গমন করা কেবল বিপদেরই কারণ হইতে পারে। কিন্তু কালি রাত্রে স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন; সে স্বপ্ন,—সে স্বপ্নের তাৎপর্য্য কি? স্বপ্নে ব্রাহ্মণবেশী মহাবিপত্তি কালে আসিয়া তাঁহাকে রক্ষা করিতে চাহিয়াছিলেন, কার্য্যেও তাহাই ফলিতেছে, ব্রাহ্মণবেশী সকল ব্যক্ত করিতে চাহিতে ছেন। তিনি স্বপ্নে বলিয়াছিলেন “নিমগ্ন কর।” কার্য্যেও কি সেইরূপ বলিবেন? ব্রাহ্মণবেশীর সাহায্য ত্যাগ করিয়া বিপদ সাগরে ডুবিবেন? না―না―ভক্তবৎসল। ভবানী অনুগ্রহ করিয়া স্বপ্নে তাঁহার রক্ষা হেতু উপদেশ দিয়াছেন, ব্রাহ্মণবেশী আসিয়া তাঁহাকে উদ্ধার করিতে চাহিতেছেন; তাহার সাহায্য ত্যাগ করিলে নিমগ্ন হইবেন। অতএব কপালকুণ্ডলা তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করাই স্থির করিলেন। বিজ্ঞ ব্যক্তি এইরূপ সিদ্ধান্ত করিত কি না তাহাতে সন্দেহ; কিন্তু বিজ্ঞ ব্যক্তির সিদ্ধান্তের সহিত আমাদিগের সংস্রব নাই। কপালকুণ্ডলা বিশেষ বিজ্ঞ ছিলেন না—সুতরাং বিজ্ঞের ন্যায় সিদ্ধান্ত করিলেন না। কৌতূহলপরবশ রমণীর ন্যায় সিদ্ধান্ত করিলেন, ভীমকান্ত রূপরাশিদর্শনলোলুপ যুবতীর ন্যায় সিদ্ধান্ত করিলেন, নৈশবনভ্রমণবিলাসিনী সন্ন্যাসিপালিতার ন্যায় সিদ্ধান্ত করিলেন, ভবানীভক্তি ভাববিমোহিতার ন্যায় সিদ্ধান্ত করিলেন; জ্বলন্ত বহ্নিশিখায় পতনোন্মুখ পতঙ্গের ন্যায় সিদ্ধান্ত করিলেন।

সন্ধ্যার পরে গৃহকর্ম্ম কতক কতক সমাপন করিয়া কপালকুণ্ডলা পূর্ব্বমত বনাভিমুখে যাত্রা করিলেন। কপালকুণ্ডলা যাত্রাকালে শয়নাগারে প্রদীপটী উজ্জ্বল করিয়া গেলেন। তিনি যেমন কক্ষ্যা হইতে বাহির হইলেন, অমনি গৃহের প্রদীপ নিবিয়া গেল।

যাত্রা কালে কপালকুণ্ডলার এক কথা বিস্মৃত হইলেন। ব্রাহ্মণবেশী কোন স্থানে সাক্ষাৎ করিতে লিখিয়া ছিলেন? এই জন্য লিপি পুনর্ব্বার পাঠের আবশ্যক হইল। গৃহে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া যে স্থানে প্রাতে লিপি রাখিয়া ছিলেন, সে স্থানে অন্বেষণ করিলেন, সে স্থানে লিপি পাইলেন না। স্মরণ হইল যে কেশবন্ধন সময়ে, ঐ লিপি সঙ্গে সঙ্গে রাখিবার জন্য, কবরী মধ্যে বিন্যস্ত করিয়াছিলেন। অতএব কবরী মধ্যে অঙ্গুলি দিয়া সন্ধান করিলেন। অঙ্গুলিতে লিপি স্পর্শ না হওয়াতে কবরী আলুলায়িত করিলেন, তথাপি সে লিপি পাইলেন না। তখন গৃহের অন্যান্য স্থানে তত্ত্ব করিলেন। কোথাও না পাইয়া, পরিশেষে পূর্ব্ব সাক্ষাৎ স্থানেই সাক্ষাৎ সম্ভব সিদ্ধান্ত করিয়া পুনর্যাত্রা করিলেন। অনবকাশ প্রযুক্ত সে বিশাল কেশরাশি পুনর্বিন্যস্ত করিতে পারেন নাই, অতএব আজি কপালকুণ্ডলা অনূঢ়া কালের মত কেশমণ্ডলমধ্যবর্ত্তিনী হইয়া চলিলেন।

তৃতীয় খণ্ড · পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

আত্মমন্দিরে।

জনম অবধি হম রূপ নিহারনু নয়ন না তিরপিত ভেল।

সোই মধুর বোল শ্রবণহি শুননু শ্রুতিপথে পরশ না গেল॥

কত মধু যামিনী রভসে গোয়াইনু না বুঝনু কৈছন না কেল।

লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখনু তবু হিয়া জুড়ন না গেল॥

যত যত রসিক জন রসে অনুগমন অনুভব কাহু না দেখ।

বিদ্যাপতি কহে প্রাণ জুড়াইতে লাখে না মিলল এক॥

লুতফ্-উন্নিসা আলয়ে আসিয়া প্রফুল্ল-বদনে পেষ্‌মন্‌কে ডাকিয়া বেশভূষা পরিত্যাগ করিলেন। সুবর্ণ মুক্তাদি খচিত বসন পরিত্যাগ করিয়া পেষ্‌মনকে কহিলেন যে “এই পোষাকটি তুমি লও।”

শুনিয়া পেষ্‌মন্ কিছু বিস্ময়াপন্না হইলেন। পোষাকটি বহুমূল্যে সম্প্রতি মাত্র প্রস্তুত হইয়া ছিল। কহিলেন, “পোষাক আমায় কেন? আজিকার কি সম্বাদ?”

লুৎফ্-উন্নিসা কহিলেন, “শুভ সম্বাদ বটে।”

পে। “তা ত বুঝিতে পারিতেছি। মেহের-উন্নিসার ভয় কি ঘুচিয়াছে?”

লু। “ঘুচিয়াছে। এক্ষণে সে বিষয়ের কোন চিন্তা নাই।” পেষ্‌মন্ অত্যন্ত আহ্লাদ প্রকাশ করিয়া কহিলেন, “তবে এক্ষণে বেগমের দাসী হইলাম।”

লু। “যদি তুমি বেগমের দাসী হইতে চাও, তবে আমি মেহের-উন্নিসাকে বলিয়া দিব।”

পে। “সে কি? আপনি কহিতেছেন যে মেহের-উন্নিসা বাদশাহের বেগম হইবার কোন সম্ভাবনা নাই।

লু। “আমি এমত কথা বলি নাই। আমি বলিয়াছি সে বিষয়ে আমার কোন চিন্তা নাই।”

পে। “চিন্তা নাই কেন? আপনি আগ্রায় একমাত্র অধীশ্বরী না হইলে যে সকলই বৃথা হইল।”

লু। “আগ্রার সহিত সম্পর্ক রাখিব না।”

পে। “সে কি? আমি যে বুঝিতে পারিতেছি না, আজিকার শুভ সম্বাদ টা তবে কি বুঝাইয়াই বলুন।”

লু। “শুভ সম্বাদ এই যে আমি এ জীবনের মত আগ্রা ত্যাগ করিয়া চলিলাম।”

পে। “কোথায় যাইবেন?”

লু। “বাঙ্গলায় গিয়া বাস করিব। পারি যদি কোন ভদ্র লোকের গৃহিণী হইব।”

পে। “এরূপ ব্যঙ্গ নূতন বটে, কিন্তু শুনিলে প্রাণ শিহরিয়া উঠে।”

লু। “ব্যঙ্গ করিতেছি না। আমি সত্য সত্যই আগ্রা ত্যাগ করিয়া চলিলাম। বাদশাহের নিকট বিদায় লইয়া আসিয়াছি।”

পে। “এমন কুপ্রবৃত্তি আপনার কেন জন্মিল?”

লু। “কুপ্রবৃত্তি নহে। অনেক দিন আগ্রায় বেড়াইলাম, কি ফল লাভ হইল? সুখের তৃষা বাল্যাবধি বড়ই প্রবল ছিল। সেই তৃষার পরিতৃপ্তি জন্য বঙ্গদেশ ছাড়িয়া এ পর্য্যন্ত আসিলাম। এ রত্ন কিনিবার জন্য কি ধন না দিলাম? কোন্ দুষ্কর্ম্ম না করিয়াছি? আর যে যে উদ্দেশে এতদূর করিলাম তাহার কোন্‌টাই বা হস্তগত হয় নাই? ঐশ্বর্য্য, সম্পদ, ধন, গৌরব, প্রতিষ্ঠা, সকলই ত পর্য্যাপ্ত পরিমাণে ভোগ করিলাম। যে ইন্দ্রিয়ের জন্য আর সকল ভোগই বিসর্জ্জন করিতে পারি, সে ইন্দ্রিয়ও অবাধে পরিতুষ্ট করিয়াছি। এত করিয়াও কি হইল? আজি এই খানে বসিয়া সকল দিন মনে মনে গণিয়া বলিতে পারি যে, এক দিনের তরেও সুখী হই নাই, এক মুহূর্ত্ত জন্যও কখন সুখভোগ করি নাই। কখন পরিতৃপ্ত হই নাই। কেবল তৃষা বাড়ে মাত্র। চেষ্টা করিলে আরও সম্পদ, আরও ঐশ্বর্য্য লাভ করিতে পারি, কিন্তু কি জন্যে? এ সকলে যদি সুখ থাকিত তবে এত দিন এক দিনের তরেও সুখী হইতাম। এই সুখাকাঙ্ক্ষা পার্ব্বতী নির্ঝরিণীর ন্যায়,—প্রথমে নির্ম্মল, ক্ষীণ ধারা বিজন প্রদেশ হইতে বাহির হয়, আপন গর্ব্ভে আপনি লুকাইয়া রহে, কেহ জানে না, আপনা আপনি কল কল করে, কেহ শুনে না। ক্রমে যত যায়, তত দেহ বাড়ে, তত পঙ্কিল হয়, শুধু তাহাই নয়; তখন আবার বায়ু বহে, তরঙ্গ হয়, মকর কুম্ভীরাদি বাস করে। আরও শরীর বাড়ে, জল আরও কর্দ্দমময় হয়, লবণময় হয়, অগণ্য সৈকতচর মরুভূমি নদীহৃদয়ে বিরাজ করে, বেগ মন্দীভূত হইয়া যায়, তখন সেই সকর্দ্দম নদী শরীর অনন্ত সাগরে কোথায় লুকায় কে বলিবে?”

পে। “আমি ইহার ত কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। এ সবে তোমার সুখ হয় না কেন?”

লু। “কেন হয় না তা এত দিনে বুঝিয়াছি। তিন বৎসর রাজপ্রাসাদের ছায়ায় বসিয়া যে সুখ না হইয়াছে, উড়িষ্যা হইতে প্রত্যাগমনের পথে এক রাত্রে সে সুখ হইয়াছে। ইহাতেই বুঝিয়াছি।”

পে। “কি বুঝিয়াছ?”

লু। “আমি এতকাল হিন্দুদিগের দেবমূর্ত্তির মত ছিলাম। বাহিরে সুবর্ণ রত্নাদিতে খচিত; ভিতরে পাষাণ। ইন্দ্রিয় সুখান্বেষণে আগুনের মধ্যে বেড়াইয়াছি, কখন আগুন স্পর্শ করি নাই। এখন একবার দেখি যদি পাষাণ মধ্যে খুজিয়া একটা রক্তশিরা ধমনী বিশিষ্ট অন্তঃকরণ পাই?”

পে। “এওত কিছু বুঝিতে পারিলাম না।”

লু। “এ হীরার অঙ্গুরী তোমায় কে দিয়াছে?”

পে। “শাহবাজ খাঁ।”

লু। “আর সেই পান্নার কণ্ঠী?

পে। “আজিম খাঁ।”

লু। “আর কে কে তোমার অলঙ্কার দিয়াছে?”

পে। (হাসিয়া) “করীম খাঁ, কোকলতাষ, রাজা জীবন সিংহ, রাজা প্রতাপাদিত্য, মুসা খাঁ—কত লোক দিয়াছে কাহার নাম করিব। এখন যা পরিয়া আগ্রার পরিচারিকা মণ্ডলে প্রাধান্য স্বীকার করাই, সে স্বয়ং জাহাঙ্গীরের দান।”

লু। “ইহার মধ্যে কাহাকে আমি ভাল বাসিতাম?”

পে। (হাসিয়া) “সকলকেই।”

লু। “এত গেল মুখের কথা। মনের কথা কি?”

পে। (চুপি চুপি) “কাহাকেও না।”

লু। “তবে পাষাণী নই ত কি?”

পে। “তা এখন যদি ভাল বাসিতে ইচ্ছা হয়, তবে ভাল বাস না কেন?”

লু। “মানস ত বটে। সেই জন্য আগ্রা ত্যাগ করিয়া যাইতেছি।”

পে। “তারই বা প্রয়োজন কি? আগ্রায় কি মানুষ নাই, যে চুয়াড়ের দেশে যাইবে? এখন যিনি তোমাকে ভাল বাসেন তাঁহাকেই কেন ভাল বাস না? রূপে বল, ধনে বল, ঐশ্বর্য্যে বল, যাহাতে বল, দিল্লীর বাদশাহের বড় পৃথিবীতে কে আছে?”

লু। “আকাশে চন্দ্র সূর্য্য থাকিতে জল অধোগামী কেন?

পে। “কেন?”

লু। “ললাটলিখন!”

লুৎফ্-উন্নিসা সকল কথা খুলিয়া বলিলেন না। পাষাণ মধ্যে অগ্নি প্রবেশ করিয়াছিল। পাষাণ দ্রব হইতেছিল।

দ্বিতীয় খণ্ড · পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

স্বদেশে।

শব্দাখ্যেয়ং যদপি কিল তে যঃ সখীনাং পুরস্তাৎ

কর্ণে লোলঃ কথয়িতুমভূদাননস্পর্শলোভাৎ।

মেঘদূত।

নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে লইয়া স্বদেশে উপনীত হইলেন। নবকুমার পিতৃহীন; তাঁহার বিধবা মাতা গৃহে ছিলেন, আর দুই ভগিনী ছিল। জ্যেষ্ঠা বিধবা; তাঁহার সহিত পাঠক মহাশয়ের পরিচয় হইবে না। দ্বিতীয়া শ্যামাসুন্দরী সধবা হইয়াও বিধবা, কেন না তিনি কুলীনপত্নী। তিনি দুই এক বার আমাদিগের দেখা দিবেন।

অবস্থান্তরে নবকুমার অজ্ঞাতকুলশীলা তপস্বিনীকে বিবাহ করিয়া গৃহে আনায়, তাঁহার আত্মীয় স্বজন কত দূর সন্তুষ্টি প্রকাশ করিলেন তাহা আমরা বলিয়া উঠিতে পারিলাম না। প্রকৃত পক্ষে এ বিষয়ে তাঁহাকে কোন ক্লেশ পাইতে হয় নাই। সকলেই তাঁহার প্রত্যাগমন পক্ষে নিরাশ্বাস হইয়াছিল। সহযাত্রীরা প্রত্যাগমন করিয়া রটনা করিয়াছিলেন যে নবকুমারকে ব্যাঘ্রে হত্যা করিয়াছে। পাঠক মহাশয় মনে করিবেন যে, এই সত্যবাদিরা আত্মপ্রতীতি মতই কহিয়াছিলেন;—কিন্তু ইহা স্বীকার করিলে তাঁহাদিগের কল্পনা শক্তির অবমাননা করা হয়। প্রত্যাগত যাত্রীর মধ্যে অনেকে নিশ্চিত করিয়া কহিয়াছিলেন যে, নবকুমারকে ব্যাঘ্রমুখে পড়িতে তাঁহারা প্রত্যক্ষই দৃষ্টি করিয়াছিলেন।—কখন কখন ব্যাঘ্রটার পরিমাণ লইয়া তর্ক বিতর্ক হইল; কেহ কহিলেন ব্যাঘ্রটা আট হাত হইবেক—কেহ কহিলেন “না প্রায় চৌদ্দহাত।” পূর্ব্ব পরিচিত প্রাচীন যাত্রী কহিলেন, “যাহা হউক, আমি বড় রক্ষা পাইয়াছিলাম। ব্যাঘ্রটা আমাকেই অগ্রে তাড়া করিয়াছিল, আমি পলাইলাম; নবকুমার তত সাহসী পুৰুষ নহে; পলাইতে পারিল না।”

যখন এই সকল রটনা নবকুমারের মাতা প্রভৃতির কর্ণগোচর হইল, তখন পুরমধ্যে এমত ক্রন্দন ধ্বনি উঠিল, যে কয় দিন তাহার ক্ষান্তি হইল না। এক মাত্র পুত্রের মৃত্যুসম্বাদে নবকুমারের মাতা একেবারে মৃতপ্রায় হইলেন। এমত সময়ে যখন নবকুমার সস্ত্রীক হইয়া বাটী আগমন করিলেন, তখন তাঁহাকে কে জিজ্ঞাসা করে, যে তোমার বধূ কোন্ জাতীয়া বা কাহার কন্যা? সকলেই আহ্লাদে অন্ধ হইল। নবকুমারের মাতা মহাসমাদরে বধূ বরণ করিয়া গৃহে লইলেন।

যখন নবকুমার দেখিলেন যে কপালকুণ্ডলা তাঁহার গৃহমধ্যে সাদরে গৃহীতা হইলেন, তখন তাঁহার আনন্দ সাগর উছলিয়া উঠিল। অনাদরের ভয়ে তিনি কপালকুণ্ডলা লাভ করিয়াও কিছু মাত্র আহ্লাদ বা প্রণয় লক্ষণ প্রকাশ করেন নাই;—অথচ তাঁহার হৃদয়াকাশ কপালকুণ্ডলার মূর্ত্তিতেই ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছিল। এই আশঙ্কাতেই তিনি কপালকুণ্ডলার পাণিগ্রহণ প্রস্তাবে অকস্মাৎ সম্মত হয়েন নাই; এই আশঙ্কাতেই পাণিগ্রহণ করিয়াও গৃহাগমন পর্য্যন্তও বারেক মাত্র কপালকুণ্ডলার সহিত প্রণয় সম্ভাষণ করেন নাই; পরিপ্লবোন্মুখ অনুরাগ সিন্ধুতে বীচিমাত্র বিক্ষিপ্ত হইতে দেন নাই। কিন্তু সে আশঙ্কা দূর হইল; জলরাশির গতিমুখ হইতে বেগনিরোধকারী উপল মোচনে যেরূপ দুর্দ্দম স্রোতোবেগ জন্মে, সেই রূপ বেগে নবকুমারের প্রণয় সিন্ধু উছলিয়া উঠিল।

এই প্রেমাবির্ভাব সর্ব্বদা কথায় ব্যক্ত হইত না, কিন্তু নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে দেখিলেই যেরূপ স্বজললোচনে তাহার প্রতি অনিমিক্ চাহিয়া থাকিতেন, তাহাতেই প্রকাশ পাইত; যেরূপ নিষ্প্রয়োজনে, প্রয়োজন কল্পনা করিয়া কপালকুণ্ডলার কাছে আসিতেন তাহাতে প্রকাশ পাইত; যেরূপ বিনা প্রসঙ্গে কপালকুণ্ডলার প্রসঙ্গ উত্থাপনের চেষ্টা পাইতেন, তাহাতে প্রকাশ পাইত; যেরূপ দিবানিশি কপালকুণ্ডলার সুখসচ্ছন্দতার অন্বেষণ করিতেন, তাহাতে প্রকাশ পাইত; সর্ব্বদা অন্যমনস্কতা সূচক পদবিক্ষেপেও প্রকাশ পাইত। তাঁহার প্রকৃতি পর্য্যন্ত পরিবর্ত্তিত হইতে লাগিল। যে খানে চাপল্য ছিল সেখানে গাম্ভীর্য্য জন্মাইল; যে খানে অপ্রসাদ ছিল, সেখানে প্রসন্নতা জন্মাইল; নবকুমারের মুখ সর্ব্বদাই প্রফুল্ল। হৃদয় স্নেহের আধার হওয়াতে অপর সকলের প্রতি স্নেহের আধিক্য জন্মিল; বিরক্তিজনকের প্রতি বিরাগের লাঘব হইল, মনুষ্য মাত্র প্রেমের পাত্র হইল; পৃথিবী সৎকর্ম্মের জন্য মাত্র সৃষ্টা বোধ হইতে লাগিল; তাবৎ সংসার সুন্দর বোধ হইতে লাগিল। প্রণয় এইরূপ! প্রণয় কর্কশকে মধুর করে, অসৎকে সৎ করে, অপুণ্যকে পুণ্যবান্ করে, অন্ধকারকে আলোকময় করে!

আর কপালকুণ্ডলা? তাহার কি ভাব। চল পাঠক তাহাকে দর্শন করি।

প্রথম খণ্ড · পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

সমুদ্রতটে।

“——————যোগপ্রভাবো ন চ লক্ষ্যতে তে।

বিভর্ষি চাকারমনির্বৃতানাং মৃণালিনী হৈমমিবোপরাগম॥”

রঘুবংশ

প্রাতে উঠিয়া নবকুমার সহজেই বাটী গমনের উপায় করিতে ব্যস্ত হইলেন; বিশেষ এ কাপালিকের সান্নিধ্য কোন ক্রমেই শ্রেয়স্কর বলিয়া বোধ হইল না। কিন্তু আপাততঃ এ পথহীন বনমধ্য হইতে কি প্রকারে নিষ্ক্রান্ত হইবেন? কি প্রকারেই বা পথ চিনিয়া বাটী যাইবেন? কাপালিক অবশ্য পথ জানে; জিজ্ঞাসিলে কি বলিয়া দিবে না? বিশেষ যতদূর দেখা গিয়াছে ততদূর কাপালিক তাঁহার প্রতি কোন শঙ্কাসূচক আচরণ করে নাই—কেনই বা তবে তিনি ভীত হয়েন? এ দিকে কাপালিক তাঁহাকে পুনঃ সাক্ষাৎ পর্য্যন্ত কুটীর ত্যাগ করিতে নিষেধ করিয়াছে, তাহার অবাধ্য হইলে বরং তাহার রোষোৎপত্তির সম্ভাবনা। নবকুমার শ্রুত ছিলেন যে কাপালিকেরা মন্ত্রবলে অসাধ্য সাধনে সক্ষম—একারণে তাহার অবাধ্য হওয়া অনুচিত। ইত্যাদি বিবেচনা করিয়া নবকুমার আপাততঃ কুটীর মধ্যে অবস্থান করাই স্থির করিলেন।

কিন্তু ক্রমে বেলা অপরাহ্ণ হইয়া আসিল, তথাপি কাপালিক প্রত্যাগমন করিল না। পূর্ব্বদিনে প্রায়োপবাস, অদ্য এ পর্য্যন্ত অনশন, ইহাতে ক্ষুধা প্রবল হইয়া উঠিল। কুটীর মধ্যে যে অল্প পরিমাণ ফল-মূল ছিল তাহা পূর্ব্ব রাত্রেই ভুক্ত হইয়াছিল—এক্ষণে কুটীর ত্যাগ করিয়া ফলমূলান্বেষণ না করিলে ক্ষুধায় প্রাণ যায় অল্প বেলা থাকিতে ক্ষুধার পীড়নে নবকুমার ফলান্বেষণে বাহির হইলেন।

নবকুমার ফলান্বেষণে নিকটস্থ বালুকাস্তূপ সকলের চারি দিকে পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন। যে দুই একটা গাছ বালুকায় জন্মিয়া থাকে, তাহার ফলাস্বাদন করিয়া দেখিলেন যে এক বৃক্ষের ফল বাদামের ন্যায় অতি সুস্বাদু। তদ্দ্বারা ক্ষুধা নিবৃত্ত করিলেন।

কথিত বালুকাস্তূপশ্রেণী প্রস্থে অতি অল্প, অতএব নবকুমার অল্প কাল ভ্রমণ করিয়া তাহা পার হইলেন। তৎপরে বালুকাবিহীন নিবীড় বন মধ্যে পড়িলেন। যাঁহারা ক্ষণকাল জন্য অপূর্ব্বপরিচিত বনমধ্যে ভ্রমণ করিয়াছেন, তাঁহারা জানেন যে পথহীন বন মধ্যে ক্ষণমধ্যেই পথভ্রান্তি জন্মায়। নবকুমারের তাহাই ঘটিল। কিছু দূর আসিয়া আশ্রম কোন্ পথে রাখিয়া আসিয়াছেন তাহা স্থির করিতে পারিলেন না। গম্ভীর জলকল্লোল তাঁহার কর্ণপথে প্রবেশ করিল;—তিনি বুঝিলেন যে এ সাগরগর্জ্জন। ক্ষণকাল পরে অকস্মাৎ বনমধ্য হইতে বহির্গত হইয়া দেখিলেন, যে সম্মুখেই সমুদ্র। অনন্ত বিস্তার নীলাম্বুমণ্ডল সম্মুখে দেখিয়া উৎকটানন্দে হৃদয় পরিপ্লুত হইল। সিকতাময় তটে গিয়া উপবেশন করিলেন। ফেনিল, নীল, অনন্ত সমুদ্র! উভয় পার্শ্বে যত দূর চক্ষুঃ যায় তত দূর পর্য্যন্ত তরঙ্গভঙ্গপ্রক্ষিপ্ত ফেনার রেখা; স্তূপকৃত বিমল কুসুমদাম গ্রন্থিত মালার ন্যায়, সে ধবল ফেনরেখা হেমকান্ত সৈকতে ন্যস্ত হইয়াছে; কাননকুন্তলা ধরণীর উপযুক্ত অলকাভরণ। নীলজলমণ্ডল মধ্যে সহস্র স্থানেও সফেনতরঙ্গ ভঙ্গ হইতেছিল। যদি কখন এমত প্রচণ্ড বায়ু বহন সম্ভব হয়, যে তাহার রেগে নক্ষত্রমালা সহস্রে সহস্রে স্থানচ্যুত হইয়া নীলাম্বরে আন্দোলিত হইতে থাকে, তবেই সে সাগর তরঙ্গ ক্ষেপের স্বরূপ দৃষ্ট হহতে পারে। এ সময়ে অস্তগামী দিনমণির মৃদুল কিরণে নীল জলের একাংশ দ্রবীভূত সুবর্ণের ন্যায় জ্বলিতেছিল। অতিদূরে কোন ইউরোপীয় বণিক জাতির সমুদ্রপোত শ্বেতপক্ষ বিস্তার করিয়া বৃহৎ পক্ষীর ন্যায় জলধিহৃদয়ে উড়িতেছিল।

কতক্ষণ যে নবকুমার তীরে বসিয়া অনন্যমনে জলধিশোভা দৃষ্টি করিতে লাগিলেন, তদ্বিষয়ে তৎকালে তিনি পরিমাণ-বোধ রহিত। পরে একেবারে প্রদোষ তিমির আসিয়া কাল জলের উপর বসিল। তখন নবকুমারের চেতন হইল যে আশ্রম সন্ধান করিয়া লইতে হইবেক। দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া গাত্রোত্থান করিলেন। দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন কেন, তাহা বলিতে পারি না—তখন তাঁহার মনে কোন্ ভূতপূর্ব্ব সুখের উদর হইতেছিল তাহা কে বলিবে? গাত্রোত্থান করিয়া সমুদ্রের দিকে পশ্চাৎ ফিরিলেন। ফিরিবামাত্র দেখিলেন, অপূর্ব্ব মূর্ত্তি! সেই গম্ভীরনাদী-বারিধিতীরে, সৈকতভূমে, অস্পষ্ট সন্ধ্যালোকে দাঁড়াইয়া, অপূর্ব্ব রমণী মূর্ত্তি! কেশভার,—অবেণীসম্বদ্ধ, সংসর্পিত, রাশীকৃত, আগুল্‌ফলম্বিত কেশভার; তদগ্রে দেহরত্ন; যেন চিত্রপটের উপর চিত্র দেখা যাইতেছে। অলকাবলির প্রাচুর্য্যে মুখমণ্ডল সম্পূর্ণ রূপে প্রকাশ হইতে ছিল না—তথাপি মেঘবিচ্ছেদ নিঃসৃত চন্দ্ররশ্মির ন্যায় প্রতীত হইতেছিল। বিশাললোচনে কটাক্ষ অতি স্থির, অতি স্নিগ্ধ, অতি গম্ভীর, অথচ জ্যোতির্ময়; সে কটাক্ষ, এই সাগরহৃদরে ক্রীড়াশীল চন্দ্রকিরণলেখার ন্যায় স্নিগ্ধোজ্জ্বল দীপ্তি পাইতেছিল। কেশরাশিতে স্কন্ধদেশ ও বাহুযুগল আচ্ছন্ন করিয়াছিল; স্কন্ধদেশ একবারে অদৃশ্য; বাহুযুগলের বিমলশ্রী কিছু কিছু দেখা যাইতেছিল। রমণীদেহ একেবারে নিরাভরণ। মূর্ত্তিমধ্যে যে একটী মোহিনী শক্তি ছিল, তাহা বর্নিতে পারা যায় না। অর্দ্ধচন্দ্রনিঃসৃত কৌমুদী বর্ণ; ঘনকৃষ্ণ চিকুরজাল; পরস্পরের সান্নিধ্যে কি বর্ণ, কি চিকুর, উভয়েরই যে শ্রী বিকশিত হইতেছিল, তাহা সেই গম্ভীরনাদী সাগরকূলে, সন্ধ্যালোকে না দেখিলে তাহার মোহিনী শক্তি অনুভূত হয় না।

নবকুমার, অকস্মাৎ এই রূপ দুর্গম মধ্যে দৈবী মূর্ত্তি দেখিয়া নিস্পন্দশরীর হইয়া দাঁড়াইলেন। তাঁহার বাক্যশক্তি রহিত হইল;—স্তব্ধ হইয়া চাহিয়া রহিলেন। রমণীও স্পন্দহীন, অনিমিক লোচনে বিশাল চক্ষুর স্থির দৃষ্টি নবকুমারের মুখে ন্যস্ত করিয়া রাখিলেন। উভয় মধ্যে প্রভেদ এই, যে নবকুমারের দৃষ্টি চমকিত লোকের দৃষ্টির ন্যায়, রমণীর দৃষ্টিতে সে লক্ষণ কিছুমাত্র নাই, কিন্তু তাহাতে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ হইতেছিল।

অনন্তর সমুদ্রের জনহীন তীরে, এইরূপে বহুক্ষণ দুই জনে চাহিয়া রহিলেন। অনেক ক্ষণ পরে তৰুণীর কণ্ঠস্বর শুনা গেল। তিনি অতি মৃদু স্বরে কহিলেন, “পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?”

এই কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নবকুমারের হৃদয়বীণা বাজিয়া উঠিল। বিচিত্র হৃদয়যন্ত্রের তন্ত্রীচয় সময়ে সময়ে এরূপ লয়হীন হইয়া থাকে, যে যত যত্ন করা যায়, কিছুতেই পরস্পর মিলিত হয় না। কিন্তু একটী শব্দে, একটী রমণীকণ্ঠসম্ভূত স্বরে, সংশোধিত হইয়া যায়। সকলই লয়বিশিষ্ট হয়। সংসারযাত্রা সেই অবধি সুখময় সঙ্গীতপ্রবাহ বলিয়া বোধ হয়। নবকুমারের কর্ণে সেইরূপ এ ধ্বনি বাজিল।

“পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?” এ ধ্বনি নবকুমারের কর্ণে প্রবেশ করিল। কি অর্থ, কি উত্তর করিতে হইবে, কিছুই মনে হইল না। ধ্বনি যেন হর্ষবিকম্পিত হইয়া বেড়াইতে লাগিল; যেন পবনে সেই ধ্বনি বহিল; বৃক্ষপত্রে মর্ম্মরিত হইতে লাগিল; সাগরনাদে যেন মন্দীভূত হইতে লাগিল। সাগরবসনা পৃথিবী সুন্দরী; রমণী সুন্দরী; ধ্বনিও সুন্দর; হৃদয়তন্ত্রী মধ্যে সৌন্দর্য্যের লয় উঠিতে লাগিল।

রমণী কোন উত্তর না পাইয়া কহিলেন, “আইস।” এই বলিয়া তৰুণী চলিল পদক্ষেপ লক্ষ্য হয় না। বসন্তকালে মন্দানিল-সঞ্চালিত শুভ্র মেঘের ন্যায় ধীরে ধীরে, অলক্ষ্য পাদবিক্ষেপে চলিল; নবকুমার কলের পুত্তলীর ন্যায় সঙ্গে চলিলেন। এক স্থানে একটা ক্ষুদ্র বন পরিবেষ্টন করিতে হইবে, বনের অন্তরালে গেলে, আর সুন্দরীকে দেখিতে পাইলেন না। বন বেষ্টনের পর দেখেন যে সম্মুখে কুটীর।

চতুর্থ খণ্ড · প্রথম পরিচ্ছেদ

কপালকুণ্ডলা।

চতুর্থ খণ্ড।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

গ্রন্থ খণ্ডারম্ভে।

এত দূরে এ আখ্যায়িকা হৃদয়ঙ্গামিত্ব প্রাপ্ত হইল। চিত্রকর চিত্রপুত্তলী লিখিতে অগ্রে পাদাদির রেখানিচয় পৃথক্ পৃথক্ করিয়া অঙ্কিত করে, শেষে তৎসমুদয় পরস্পর সংলগ্ন করিয়া ছায়ালোকভিন্নতা লিখে। আমরা এ পর্য্যন্ত এই মানসচিত্রের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পৃথক্ পৃথক্ রেখাঙ্কিত করিয়াছি; এক্ষণে তৎসমুদায় পরস্পর সংলগ্ন করিয়া তাহার ছায়ালোক সন্নিবেশ করিব।

রবিকরাকৃষ্ট বারিবাষ্পে মেঘের জন্ম। দিন দিন, তিল তিল করিয়া, মেঘ সঞ্চারের আয়োজন হইতে থাকে তখন মেঘ কাহারও লক্ষ্য হয় না; কেহ মেঘ মনে করে না; শেষে অকস্মাৎ একেবারে পৃথিবী ছায়ান্ধকারময়ী করিয়া বজ্রপাত করে। যে মেঘে অকস্মাৎ কপালকুণ্ডলার জীবনযাত্রা গাহমান হইল, আমরা এত দিন তিল তিল করিয়া তাহার বারিবাষ্প সঞ্চয় করিতেছিলাম।

পাঠক মহাশয় “অদৃষ্ট” স্বীকার করেন? ললাটলিপির কথা বলিতেছি না, সে ত অলস ব্যক্তির আত্মপ্রবোধ জন্য কল্পিত গল্পমাত্র। কিন্তু, কখন কখন যে, কোন ভবিষ্যৎ ঘটনার জন্য পূর্ব্বাবধি এরূপ আয়োজন হইয়া আইসে, তৎসিদ্ধিসূচক কার্য্য সকল এরূপ দুর্দ্দমনীয় বলে সম্পন্ন হয়, যে মানুষিক শক্তি তাহার নিবারণে অসমর্থ হয়, ইহা তিনি স্বীকার করেন কি না? সর্ব্বদেশে সর্ব্বকালে দূরদর্শিগণ কর্ত্তৃক ইহা স্বীকৃত হইয়াছে। এই অদৃষ্ট যুনানী নাটকাবলির প্রাণ, সর্ব্বজ্ঞ সেক্‌স্‌পীয়রের মাক্‌বেথের আধার; ওয়ালটর্ স্কটের “ব্রাইড্ অব্ লেমার মুরে” ইহার ছায়াপাত হইয়াছে; গেটে প্রভৃতি জর্ম্মান কবিগুৰুগণ ইহার স্পষ্টতঃ সমালোচনা করিয়াছেন। রূপান্তরে, “ফেট্” ও “নেসেসিটি” নাম ধারণ করিয়া ইহা ইউরোপীয় দার্শনিকদিগের মধ্যে প্রধান মতভেদের কারণ হইয়াছে।

অস্মদেশে এই “অদৃষ্ট“জনসমাজে বিলক্ষণ পরিচিত। যে করিগুৰু কুৰুকূলসংহার কল্পনা করিয়াছিলেন, তিনি এই মোহমন্ত্রে প্রকৃষ্টরূপে দীক্ষিত; কৌরবপাণ্ডবের বাল্যক্রীড়াবধি এই করালছায়া কুৰুশিরে বিদ্যমান; শ্রীকৃষ্ণ ইহার অবতার স্বরূপ। “যদা শ্রৌষং জাতুষাদেষ্মণস্তান্” ইত্যাদি ধৃতরাষ্ট্রবিলাপে কবি স্বয়ং ইহা প্রাঞ্জলীকৃত করিয়াছেন। দার্শনিকদিগের মধ্যে অদৃষ্টবাদীর অভাব নাই। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা এই অদৃষ্টবাদে পরিপূর্ণ। অধুনা “ত্বয়া ঋষীকেশ হৃদিস্থিতেন যথা নিযুক্তোস্মি তথা করোমি” ইতি কবিতার্দ্ধ পাঠ করিয়া অনেকে অদৃষ্টের পূজা করেন। অপর সকলে “কপাল!” বলিয়া নিশ্চিন্ত থাকেন।

অদৃষ্টের তাৎপর্য্য যে কোন দৈব বা অনৈসর্গিক শক্তিতে অস্মদাদির কার্য্য সকলকে গতিবিশেষ প্রাপ্ত করায় এমন আমি বলিতেছি না। অনীশ্বরবাদীও অদৃষ্ট স্বীকার করিতে পারেন। সাংসারিক ঘটনাপরম্পরা ভৌতিক নিয়ম ও মনুষ্যচরিত্রের অনিবার্য্য ফল; মনুষ্যচরিত্র মানসিক ও ভৌতিক নিয়মের ফল; সুতরাং অদৃষ্ট মানসিক ও ভৌতিক নিয়মের ফল; কিন্তু সেই সকল নিয়ম মনুষ্যের জ্ঞানাতীত বলিয়া অদৃষ্ট নাম ধারণ করিয়াছে।

কোন কোন পাঠক এ গ্রন্থশেষ পাঠ করিয়া ক্ষুণ্ণ হইতে পারেন। বলিতে পারেন, “এরূপ সমাপ্তি সুখের হইল না; গ্রন্থকার অন্যরূপ করিতে পারিতেন।” ইহার উত্তর, “অদৃষ্টের গতি। অদৃষ্ট কে খণ্ডাইতে পারে? গ্রন্থকারের সাধ্য নহে। গ্রন্থারম্ভে যেখানে যে বীজ বপন হইয়াছে, সেই খানে সেই বীজের ফল ফলিবে। তদ্বিপরীতে সত্যের বিঘ্ন ঘটিবে।”

এক্ষণে আমরা অদৃষ্টগতির অনুগামী হই। সূত্র প্রস্তুত হইয়াছে; গ্রন্থিবন্ধন করি।

তৃতীয় খণ্ড · প্রথম পরিচ্ছেদ

কপালকুণ্ডলা।

তৃতীয় খণ্ড।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

ভূতপূর্ব্বে।

“কষ্টোয়ং খলুভৃত্যভাবঃ।”

যখন নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে লইয়া চটী হইতে যাত্রা করেন, তখন মতিবিবি পথান্তরে বর্দ্ধমানাভিমুখে যাত্রা করিলেন। যতক্ষণ মতিবিবি পথবাহন করেন ততক্ষণ আমরা তাঁহার পূর্ব্ববৃত্তান্ত কিছু বলি। মতির চরিত্র মহাদোষ-কলুষিত, মহদ্গুণেও শোভিত। এরূপ চরিত্রের বিস্তারিত বৃত্তান্তে পাঠক মহাশয় অসন্তুষ্ট হইবেন না।

যখন ইহাঁর পিতা মহম্মদীয় ধর্ম্মাবলম্বন করিলেন, তখন ইহাঁর হিন্দুনাম পরিবর্ত্তিত হইয়া লুৎফ্-উন্নিসা নাম হইল। মতিবিবি কোন কালেও ইহাঁর নাম নহে। তবে কখন কখন ছদ্মবেশে দেশবিদেশ ভ্রমণ কালে ঐ নাম গ্রহণ করিতেন। ইহার পিতা ঢাকায় আসিয়া রাজকার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু তথায় অনেক নিজ দেশীয় লোকের সমাগম। দেশীয় সমাজে সমাজচ্যুত হইয়া সকলের থাকিতে ভাল লাগে না। অতএব তিনি কিছুদিনে সুবাদারের নিকট প্রতিপত্তি লাভ করিয়া তাঁহার সুহৃৎ অনেকানেক ওমরাহের নিকট পত্র সংগ্রহপূর্ব্বক সপরিবারে আগ্রা আসিলেন। আকবরশাহের নিকট কাহারও গুণ অবিদিত থাকিত না; শীঘ্রই তিনি ইহার গুণগ্রহণ করিলেন। লুৎফ্-উন্নিসার পিতা শীঘ্রই উচ্চপদস্থ হইয়া আগ্রার প্রধান ওমরাহ মধ্যে গণ্য হইলেন। এদিকে লুৎফ্-উন্নিসা ক্রমে বয়ঃপ্রাপ্ত হইতে লাগিলেন। আগ্রাতে আসিয়া তিনি পারসীক, সংস্কৃত, নৃত্য, গীত, রসবাদ ইত্যাদিতে সুশিক্ষিতা হইলেন। রাজধানীর অসংখ্য রূপবতী-গুণবতী দিগের মধ্যে অর্থগণ্যা হইতে লাগিলেন। দুর্ভাগ্য বশতঃ বিদ্যাসম্বন্ধে তাঁহার ঈদৃশ শিক্ষা হইয়াছিল, নীতিসম্বন্ধে তাহার কিছুই হয় নাই। লুৎফ্-উন্নিসার বয়স পূর্ণ হইলে প্রকাশ পাইতে লাগিল যে, তাঁহার মনোবৃত্তি সকল দুর্দ্দমবেগবতী। ইন্দ্রিয়দমনের কিছুমাত্র ক্ষমতাও নাই, ইচ্ছাও নাই। সদসতে সমান প্রবৃত্তি। একার্য্য সৎ, একার্য্য অসৎ এমত বিচার করিয়া তিনি কোন কর্ম্মে প্রবৃত্ত হই তেন না; যাহা ভাল লাগিত, তাহাই করিতেন। যখন সৎকর্ম্মে অন্তঃকরণ সুখী হইত, তখন সৎকর্ম্ম করিতেন; যখন অসৎকর্ম্মে অন্তঃকরণ সুখী হইত, তখন অসৎকর্ম্ম করিতেন; যৌবন কালের মনোবৃত্তি দুর্দ্দম হইলে যে সকল দোষ জন্মে তাহা লুৎফ্-উন্নিসা সম্বন্ধে জন্মিল। তাঁহার পূর্ব্বস্বামী বর্ত্তমান;—ওমরাহেরা কেহ তাঁহাকে বিবাহ করিতে সম্মত হইলেন না। তিনিও বড় বিবাহের অনুরাগিনী হইলেন না। মনে মনে ভাবিতেন, কুসুমে কুসুমে বিহারিনী ভ্রমরীর পক্ষচ্ছেদ কেন করাইব? প্রথমে কাণাকাণি, শেষে কালিমাময় কলঙ্ক রটিল। তাঁহার পিতা বিরক্ত হইয়া তাঁহাকে আপন গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিলেন।

লুৎফ্—উন্নিসা গোপনে যাহাদিগের কৃপাবিতরণ করিতেন, তন্মধ্যে যুবরাজ সেলিম এক জন। একজন ওমরাহের কুলকলঙ্ক জন্মাইলে, পাছে আপন অপক্ষপাতি পিতার কোপানলে পড়িতে হয়, এই আশঙ্কায় সেলিম এপর্যন্ত লুৎফ্-উন্নিসাকে আপন অবরোধ বাসিনী করিতে পারেন নাই। এক্ষণে সুযোগ পাইলেন। রাজপুতপতি মানসিংহের ভগিনী, যুবরাজের প্রধানা মহিষী ছিলেন। যুবরাজ লুৎফ্-উন্নিসাকে তাঁহার প্রধান সহচরী করিলেন। লুৎফ্-উন্নিসা প্রকাশ্যে বেগমের সখী, পরোক্ষে যুবরাজের উপপত্নী হইলেন।

লুৎফ্-উন্নিসার ন্যায় বুদ্ধিমতী মহিলা যে অল্পদিনেই রাজকুমারের হৃদয়াধিকার করিবেন, ইহা সহজেই উপলদ্ধি হইতে পারে। সেলিমের চিত্তে তাঁহার প্রভুত্ব এরূপ প্রতিযোগশূন্য হইয়া উঠিল যে লুৎফ্-উন্নিসা উপযুক্ত সময়ে তাঁহার পাটরাণী হইবেন ইহা তাঁহার স্থির প্রতিজ্ঞা হইল। কেবল লুৎফ্-উন্নিসার স্থিরপ্রতিজ্ঞা এমত নহে, রাজপুরবাসী সকলেরই ইহা সম্ভব বোধ হইল। এইরূপ আশার স্বপ্নে লুৎফ্-উন্নিসা জীবন বাহিত করিতে ছিলেন, এমত সময়ে নিদ্রা ভঙ্গ হইল। আকবর শাহের কোষাধ্যক্ষ (আক্‌তিমাদ-উদ্দৌলা) খাজা আয়াসের কন্যা মেহেরউন্নিসা যবনকুলে প্রধান সুন্দরী। এক দিন কোষাধ্যক্ষ রাজকুমার সেলিম ও অন্যান্য প্রধান ব্যক্তিকে নিমন্ত্রণ করিয়া গৃহে আনিলেন। সেই দিন মেহের-উন্নিসার সহিত সেলিমের সাক্ষাৎ হইল, এবং সেই দিন সেলিম মেহের-উন্নিসার নিকট চিত্ত রাখিয়া গেলেন। তাহার পর যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, তাহা ইতিহাস পাঠক মাত্রেই অবগত আছেন। সের আফগান নামক একজন মহাবিক্রমশালী ওমরাহের সহিত কোষাধ্যক্ষের কন্যার সম্বন্ধ পূর্ব্বেই হইয়াছিল। সেলিম অনুরাগান্ধ হইয়া সে সম্বন্ধরহিত করিবার জন্য পিতার নিকট যাচমান হইলেন। নিরপেক্ষ পিতার নিকট কেবল তিরস্কৃত হইলেন মাত্র।সুতরাং সেলিমকে আপাততঃ নিরস্ত হইতে হইল। আপাততঃ নিরস্ত হইলেন বটে; কিন্তু আশা ছাড়িলেন না। শের আফগানের সহিত মেহের-উন্নিসার বিবাহ হইল। কিন্তু সেলিমের চিত্তবৃত্তি সকল লুৎফ্-উন্নিসার নখ দর্পণে ছিল;—তিনি নিশ্চিত বুঝিয়াছিলেন, শের আফগানের সহস্র প্রাণ থাকিলেও তাঁহার নিস্তার নাই। আকবরশাহের মৃত্যু হইলেই তাঁহারও প্রাণান্ত হইবে;—মেহের উন্নিসা সেলিমের মহিষী হইবেন। লুতফ্-উন্নিসা সিংহাসনের আশা ত্যাগ করিলেন।

মহম্মদীয় সম্রাট-কুল-গৌরব আকবরের পরমায়ুঃ শেষ হইয়া আসিল। যে প্রচণ্ড সূর্য্যের প্রভায় তুরকী হইতে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত প্রদীপ্ত হইয়াছিল, সে সূর্য্য অস্তগামী হইল। এ সময়ে লুতফ্-উন্নিসা আত্ম প্রাধান্য রক্ষার জন্য এক দুঃসাহসিক সঙ্কল্প করিলেন।

রাজপুতপতি রাজা মানসিংহের ভগিনী সেলিমের প্রধানা মহিষী। খস্রু তাঁহার পুত্ত্র। একদিন তাঁহার সহিত আকবর শাহের পীড়িত শরীর সম্বন্ধে লুতফ্-উন্নিসার কথোপকথন হইতে ছিল; রাজপুত কন্যা এক্ষণে বাদশাহ পত্নী হইবেন, এই কথার প্রসঙ্গ করিয়া লুৎফ-উন্নিসা তাঁহাকে অভিনন্দন করিতেছিলেন, প্রত্যুত্তরে খস্রুর জননী কহিলেন, “বাদশাহের মহিষী হইলে মনুষ্য জন্ম সার্থক বটে, কিন্তু যে বাদশাহ-জননী সেই সর্ব্বোপরি।” উত্তর শুনিবামাত্র এক অপূর্ব্বচিন্তিত অভিসন্ধি লুৎফ্-উন্নিসার হৃদয়ে উদয় হইল। তনিি প্রত্যুত্তর করিলেন, “তাহাই হউন না কেন? সেওত আপনার ইচ্ছাধীন।” বেগম কহিলেন, “সে কি?” চতুরা উত্তর করিলেন, “যুবরাজ পুত্ত্র খস্রুকে সিংহাসন দান করুন।”

বেগম কোন উত্তর করিলেন না। সে দিন এ প্রসঙ্গ পুনৰুত্থাপিত হইল না, কিন্তু কেহই একথা ভুলিলেন না। স্বামির পরিবর্ত্তে পুত্র যে সিংহাসনারোহণ করেন ইহা বেগমের অনভিমত নহে; মেহের-উন্নিসার প্রতি সেলিমের অনুরাগ লুৎফ্-উন্নিসার যেরূপ হৃদয়শেল, বেগমেরও সেইরূপ। মানসিংহের ভগিনী আধুনিক তুর্কমান কন্যার যে আজ্ঞানুবর্ত্তিনী হইয়া থাকিবেন, তাহা ভাল লাগিবে কেন? লুৎফ্-উন্নিসারও এ সঙ্কল্পে উদ্‌যোগিনী হইবার গাঢ় তাৎপর্য ছিল। অন্যদিন পুনর্ব্বার এ প্রসঙ্গ উত্থাপিত হইল। উভয়ের মত স্থির হইল।

সেলিমকে ত্যাগ করিয়া খস্রুকে আকবরের সিংহাসনে স্থাপিত কর। অসম্ভাবনীয় বলিয়া বোধ হইবার কোন কারণ ছিল না। এ কথা লুৎফ্-উন্নিসা বেগমের বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম করাইলেন। তিনি কহিলেন, “মোগলের সাম্রাজ্য রাজপুতের বাহুবলে স্থাপিত রহিয়াছে; সেই রাজপুত জাতির চূড়া রাজা মানসিংহ; তিনি খস্রুর মাতুল; আর মুসলমানদিগের প্রধান খাঁ আজিম; তিনি প্রধান রাজমন্ত্রী; তিনি খস্রুর শ্বশুর; ইহারা দুইজনে উদ্যোগী হইলে, কে ইহাঁদিগের অনুবর্তী না হইবে? আর কাহার বলেই বা যুবরাজ সিংহাসন গ্রহণ করিবেন? রাজা মানসিংহকে এ কার্যে ব্রতী করা, আপনার ভার। খাঁ আজিম ও অন্যান্য মহম্মদীয় ওমরাহগণকে লিপ্ত করা আমার ভার। আপনার আশীর্ব্বাদে কৃতকার্য্য হইব, কিন্তু এক আশঙ্কা, পাছে সিংহাসন আরোহণ করিয়া খস্রু এ দুশ্চারিণীকে পুরবহিষ্কৃত করিয়া দেন?”

বেগম সহচরীর অভিপ্রায় বুঝিলেন। হাসিয়া কহিলেন, “তুমি আগ্রার যে ওমরাহের গৃহিণী হইতে চাও, সেই তোমার পাণি গ্রহণ করিবে। তোমার স্বামী পঞ্জ হাজারি মন্সরদার হইবেন।”

লুৎফ্-উন্নিসা সন্তুষ্ট হইলেন। ইহাই তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল। যদি রাজপুরী মধ্যে সামান্যাপুরস্ত্রী হইয়া থাকিতে হইল, তবে প্রতিপুষ্পবিহারিণী মধুকরীর পক্ষচ্ছেদ করিয়া কি সুখ হইল? যদি স্বাধীনতা ত্যাগ করিতে হইল, তবে বাল্যসখী মেহেরউন্নিসার দাসীত্বে কি সুখ? তাহার অপেক্ষা কোন প্রধান রাজপুরুষের সর্ব্বময়ী ঘরণী হওয়া গৌরবের বিষয়।

শুধু এই লোভে লুৎফ্-উন্নিসা এ কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইলেন না। সেলিম যে তাঁহাকে উপেক্ষা করিয়া মেহের-উন্নিসার জন্য এত ব্যস্ত, ইহার প্রতিশোধও তাঁহার উদ্দেশ্য।

খা আজিম প্রভৃতি আগ্রা দিল্লীর ওমরাহেরা লুৎফ্-উন্নিসার বিলক্ষণ বাধ্য ছিলেন। অনেকেই পূর্ব্বকালে লুৎফ্-উন্নিসার প্রণয় ভাগী ছিলেন। খাঁ আজিম যে জামাতার ইষ্ট সাধনে উদ্যুক্ত হইবেন, ইহা বিচিত্র নহে। তিনি এবং আর আর ওমরাহগণ সম্মত হইলেন। খাঁ আজিম লুৎফ-উন্নিসাকে কহিলেন, “মনে কর যদি কোন অসুযোগে আমরা কৃতকার্য্য না হই, তবে তোমার আমার রক্ষা নাই। অতএব প্রাণ বাঁচাইবার একটা পথ রাখা ভাল।”

লুৎফ্-উন্নিসা কহিলেন, “আপনার কি পরামর্শ?” খা আজিম কহিলেন। “উড়িষ্যা ভিন্ন অন্য আশ্রয় নাই। কেবল সেই স্থানে মোগলের শাসন তত প্রখর নহে। উড়িষ্যার সৈন্য আমাদিগের হস্তগত থাকা আবশ্যক। তোমার ভ্রাতা উড়িষ্যায় মন্সরদার আছেন, আমি কল্য প্রচার করিব তিনি যুদ্ধে আহত হইয়াছেন। তুমি তাঁহাকে দেখিবার ছলে কল্যই উড়িষ্যায় যাত্রা কর। তথায় যৎকর্ত্তব্য তাহা সাধন করিয়। শীঘ্র প্রত্যাগমন কর।”

লুৎফ্-উন্নিসা এ পরামর্শে সম্মত হইলেন। তিনি উড়িষ্যায় আসিয়া যখন প্রত্যাগমন করিতেছিলেন, তখন তাঁহার সহিত পাঠক মহাশয়ের সাক্ষাৎ হইয়াছে।

দ্বিতীয় খণ্ড · প্রথম পরিচ্ছেদ

কপালকুণ্ডলা।

দ্বিতীয় খণ্ড।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

রাজপথে।

কোন জর্ম্মান লেখক বলিয়াছেন “মনুষ্যের জীবন কাব্যবিশেষ।” কপালকুণ্ডলার জীবনকাব্যের এক সর্গ সমাপ্ত হইল। পরে কি হইবে?

যদি ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে মনুষ্য অন্ধ না হইত, তবে সংসার যাত্রা একেবারে সুখহীন হইত। ভাবী বিপদের সম্ভাবনা নিশ্চিত দেখিতে পাইয়া, কোন সুখেই কেহ প্রবৃত্ত হইত না। মিল্‌টন যদি জানিতেন তিনি অন্ধ হইবেন, তবে কখন বিদ্যাভ্যাস করিতেন না; শাহাজাহান যদি জানিতেন ঔরঙ্গজেব তাঁহাকে প্রাচীন বয়সে করাবদ্ধ রাখিবেন, তবে তিনি কখন দিল্লীর সিংহাসন স্পর্শ করিতেন না। ভাস্করাচার্য্য যদি জানিতেন যে, তাঁহার একমাত্র কন্যা চিরবিধবা হইবে, তবে তিনি কখন দারপরিগ্রহ করিতেন না। নবকুমার বা তাঁহার নূতন পত্নী যদি জানিতেন, যে তাঁহাদিগের বিবাহে কি ফলোৎপত্তি হইবে, তবে কখন তাঁহাদিগের বিবাহ হইত না।

নবকুমার মেদিনীপুরে আসিয়া অধিকারীর দানকৃত ধনবলে কপালকুণ্ডলার জন্য এক জন দাসী, এক জন রক্ষক ও শিবিকাবাহক নিযুক্ত করিয়া, তাঁহাকে শিবিকারোহণে পাঠাইলেন। অর্থের অপ্রাচুর্য্য হেতুক স্বয়ং পদব্রজে চলিলেন। নবকুমার পূর্ব্ব দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত ছিলেন, মধ্যাহ্ন ভোজনের পর বাহকেরা তাঁহাকে অনেক পশ্চাৎ করিয়া গেল। ক্রমে সন্ধ্যা হইল। শীত কালের অনিবিড় মেঘে আকাশ আচ্ছন্ন হইয়াছে। সন্ধ্যাও অতীত হইল। পৃথিবী অন্ধকারময়ী হইল। অল্প অল্প বৃষ্টিও পড়িতে লাগিল। নবকুমার কপালকুণ্ডলার সহিত একত্র হইবার জন্য ব্যস্ত হইলেন। মনে মনে স্থির জ্ঞান ছিল, যে প্রথম সরাইতে তাঁহার সাক্ষাৎ পাইবেন, কিন্তু সরাইও আপাততঃ দেখা যায় না। প্রায় রাত্রি চারি ছয় দণ্ড হইল। নবকুমার দ্রুত পাদ বিক্ষেপ করিতে করিতে চলিলেন। অকস্মাৎ কোন কঠিন দ্রব্যে তাঁহার চরণ স্পর্শ হুইল। পদভরে সে বস্তু খড় খড় মড় মড় শব্দে ভাঙ্গিয়া গেল। নবকুমার দাঁড়াইলেন; পুনর্ব্বার পদ চালনা করিলেন; পুনর্ব্বার ঐরূপ হইল। পদসৃষ্ট বস্তু হস্তে করিয়া তুলিয়া লইলেন। দেখিলেন, ঐ বস্তু তক্তাভাঙ্গার মত।

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইলেও সচরাচর এমত অন্ধকার হয় না যে অনারত স্থানে স্থূল বস্তুর অবয়ব লক্ষ্য হয় না। সম্মুখে একটা বৃহৎ বস্তু পড়িয়াছিল; নবকুমার অনুভব করিয়া দেখিলেন যে সে ভগ্ন শিবিকা; অমনি তাঁহার হৃদয়ে কপালকুণ্ডলার বিপদ্ আশঙ্কা হইল। শিবিকার দিকে যাইতে আবার ভিন্ন প্রকার পদার্থে তাঁহার পদস্পর্শ হইল। এ স্পর্শ কোমল মনুষ্যশরীরস্পর্শের ন্যায় বোধ হইল। বসিয়া হস্ত মর্দ্দন করিয়া দেখিলেন, মনুষ্যশরীর বটে। স্পর্শ অত্যন্ত শীতল; তৎসঙ্গে দ্রব পদার্থের স্পর্শ অনুভূত হইল। নাড়ীতে হাত দিয়া দেখিলেন, স্পন্দ নাই, প্রাণবিয়োগ হইয়াছে। বিশেষ মনঃসংযোগ করিয়া দেখিলেন, যেন নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনা যাইতেছে। নিঃশ্বাস আছে তবে নাড়ী নাই কেন? এ কি রোগী? নাসিকার নিকট হাত দিয়া দেখিলেন, নিশ্বাস বহিতেছে না। তবে শব্দ কেন? হয়ত কোন জীবিত ব্যক্তিও এখানে আছে। এই ভাবিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “এখানে কেহ জীবিত ব্যক্তি আছে?”

মৃদুস্বরে এক উত্তর হইল “আছি।”

নবকুমার কহিলেন, “কে তুমি?”

উত্তর হইল “তুমি কে?” নবকুমারের কর্ণে স্বর স্ত্রীকণ্ঠজাত বোধ হইল। ব্যগ্র হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “কপালকুণ্ডলা না কি?”

স্ত্রীলোক কহিল, “কপালকুণ্ডলা কে তা জানি না—আমি পথিক, আপাততঃ দস্যূহস্তে নিষ্কুণ্ডলা হইয়াছি।”

ব্যঙ্গ শুনিয়া নবকুমার ঈষৎ প্রসন্ন হইলেন। জিজ্ঞাসিলেন “কি হইয়াছে?”

উত্তরকারিণী কহিলেন, “দস্যুতে আমার পালকি ভাঙ্গিয়া দিয়াছে, আমার এক জন বাহককে মারিয়া ফেলিয়াছে; আর সকলে পলাইয়া গিয়াছে। দস্যুরা আমার অঙ্গের অলঙ্কার সকল লইয়া আমাকে পাল্‌কিতে বান্ধিয়া রাখিয়া গিয়াছে।”

নবকুমার অন্ধকারে অনুধাবন করিয়া দেখিলেন, যথার্থই একটী স্ত্রলোক শিবিকাতে বস্ত্র দ্বারা দৃঢ়তর বন্ধনযুক্ত আছে। নবকুমার শীঘ্রহস্তে তাহার বন্ধন মোচন করিয়া কহিলেন, “তুমি উঠিতে পারিবে কি?” স্ত্রীলোক কহিল, “আমাকেও এক ঘা লাঠি লাগিয়াছিল; এজন্য পায়ে বেদনা আছে; কিন্তু বোধ হয় অল্প সাহায্য করিলে উঠিতে পারিব।”

নবকুমার হস্ত বাড়াইয়া দিলেন। রমণী তৎ‍সাহায্যে গাত্রোত্থান করিলেন। নবকুমার জিজ্ঞাসা করিলেন, “চলিতে পারিবে কি?”

স্ত্রীলোক উত্তর না করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার পশ্চাতে কেহ পথিক আসিতেছে দেখিয়াছেন?”

নবকুমার কহিলেন “না।”

স্ত্রীলোক পুনরপি জিজ্ঞাসা করিলেন, “চটী কত দূর?”

নবকুমার কহিলেন “কত দূর বলিতে পারি না—কিন্তু বোধ হয় নিকট।”

স্ত্রীলোক কহিল, “অন্ধকারে একাকিনী মাঠে বসিয়া কি করিব, আপনার সঙ্গে চটী পর্য্যন্ত যাওয়াই উচিত। বোধ হয়, কোন কিছুর উপর ভর করিতে পারিলে, চলিতে পারিব।”

নবকুমার কহিলেন, “বিপৎকালে সঙ্কোচ মূঢ়ের কাজ। আমার কাঁধে ভর করিয়া চল।”

স্ত্রীলোকটী মূঢ়ের কার্য্য করিল না। নবকুমারের স্কন্ধেই ভর করিয়া চলিল।”

যথার্থই চটী নিকটে ছিল। এ সকল কালে চটীর নিকটেও দুষ্ক্রিয়া করিতে দস্যুরা সঙ্কোচ করিত না। অনধিক বিলম্বে নবকুমার সমভিব্যাহারিণীকে লইয়া তথায় উপনীত হইলেন।

নবকুমার দেখিলেন যে ঐ চটীতেই কপালকুণ্ডলা অবস্থিতি করিতেছিলেন। তাঁহার দাস দাসী তজ্জন্য এক খানা ঘর নিযুক্ত করিয়াছিল। নবকুমার স্বীয় সঙ্গিনীর জন্য তৎপার্শ্ববর্ত্তী এক খানা ঘর নিযুক্ত করিয়া তাঁহাকে তন্মধ্যে প্রবেশ করাইলেন। তাঁহার আজ্ঞামত গৃহস্বামীর বনিতা প্রদীপ জ্বালিয়া আনিল। যখন দীপরশ্মিস্রোতঃ তাঁহার সঙ্গিনীর শরীরে পড়িল, তখন নবকুমার দেখিলেন যে ইনি অসামান্যা সুন্দরী। রূপরাশিতরঙ্গে, তাঁহার যৌবনশোভা, শ্রাবণের নদীর ন্যায় উছলিয়া পড়িতেছিল।

প্রথম খণ্ড · প্রথম পরিচ্ছেদ

কপালকুণ্ডলা।

প্রথম খণ্ড।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

সাগরসঙ্গমে।

সার্দ্ধ দ্বিশত বৎসর পূর্ব্বে এক দিন মাঘ মাসের রাত্রিশেষে এক খানি যাত্রীর নৌকা গঙ্গাসাগর হইতে প্রত্যাগমন করিতেছিল। পর্ত্তুগিস নাবিক দস্যুদিগের ভয়ে যাত্রীর নৌকা দলবদ্ধ হইয়া যাতায়াত করাই তৎকালে প্রথা ছিল; কিন্তু এই নৌকারোহীরা সঙ্গিহীন। তাহার কারণ এই যে রাত্রিশেষে ঘোরতর কুজ্ঝটিকা দিগন্ত ব্যাপ্ত করিয়াছিল; নাবিকেরা দিঙ্‌নিরূপণ করিতে না পারিয়া বহর হইতে দূরে পড়িয়াছিল। এক্ষণে কোন্ দিকে কোথায় যাইতেছে তাহার কিছুই নিশ্চয় ছিল না। নৌকারোহিগণ কেহ কেহ নিদ্রা যাইতেছিলেন, এক জন প্রাচীন এবং এক জন যুবা পুৰুষ এই দুই জন মাত্র জাগ্রৎ অবস্থায় ছিলেন। প্রাচীন যুবকের সহিত কথোপকথন করিতেছিলেন। বারেক কথাবার্ত্তা স্থগিত করিয়া বৃদ্ধ নাবিকদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাঝি, আজ কত দূর যেতে পারবি?” মাঝি কিছু ইতস্ততঃ করিয়া বলিল, “বলিতে পারিলাম না।”

বৃদ্ধ ক্রুদ্ধ হইয়া মাঝিকে তিরস্কার করিতে লাগিলেন। যুবক কহিলেন, “মহাশয়, যাহা জগদীশ্বরের হাত তাহা পণ্ডিতে বলিতে পারে না—ও মূর্খ কি প্রকারে বলিবে? আপনি ব্যস্ত হইবেন না।”

বৃদ্ধ উগ্রভাবে কহিলেন, “ব্যস্ত হব না? বল কি, বেটারা দু দশ বিঘার ধান কাটিয়া লইয়া গেল, ছেলে পিলে সম্বৎসর খাবে কি?”

এ সম্বাদ তিনি সাগরে উপনীত হইলে পরে, পশ্চাদঃগত অন্য যাত্রীর মুখে পাইয়াছিলেন। যুবা কহিলেন, “আমি ত পূর্ব্বেই বলিয়াছিলাম, মহাশয়ের বাটীতে অভিভাবক আর কেহ নাই—মহাশয়ের আসা ভাল হয় নাই।”

প্রাচীন পূর্ব্ববৎ উগ্রভাবে কহিলেন, “আসব না? তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। এখন পরকালের কর্ম্ম করিবনা ত কবে করিব?”

যুবা কহিলেন, “যদি শাস্ত্র বুঝিয়া থাকি, তবে তীর্থ দর্শনে যেরূপ পরকালের কর্ম্ম হয়, বাটী বসিয়াও সেরূপ হইতে পারে।”

বৃদ্ধ কহিলেন, “তবে তুমি এলে কেন?”

যুবা উত্তর করিলেন, “আমি ত আগেই বলিয়াছি, যে সমুদ্র দেখিব বড় সাদ ছিল, সেই জন্যই আসিয়াছি।” পরে অপেক্ষাকৃত মৃদুস্বরে কহিতে লাগিলেন, “আহা! কি দেখিলাম! জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না!

‘দূরাদয়শ্চক্রনিভস্য তন্বী

তমালতালীবনরাজিনীলা।

আভাতি বেলা লবণাম্বুরাশে-

র্দ্ধারানিবন্ধেব কলঙ্করেখা।’”

বৃদ্ধের শ্রুতি কবিতার প্রতি ছিল না, নাবিকেরা পরস্পর যে কথোপকথন করিতেছিল তাহাই একতানমনঃ হইয়া শুনিতেছিলেন।

এক জন নাবিক অপরকে কহিতেছিল “ও ভাই—এত বড় কাজটা খারাবি হলো—এখন যে মহাসমুদ্রে পড়লেম—কি কোন দেশে এলেম তাহা যে বুঝিতে পারি না।”

বক্তার স্বর অত্যন্ত ভয়সূচক। বৃদ্ধ বুঝিলেন যে কোন বিপদ্ আশঙ্কার কারণ উপস্থিত হইয়াছে। সশঙ্কচিত্তে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাঝি কি হয়েছে?” মাঝি উত্তর করিল না। কিন্তু যুবক উত্তরের প্রতীক্ষা না করিয়া বাহিরে আসিলেন। বাহিরে আসিয়া দেখিলেন, যে প্রায় প্রভাত হইয়াছে। চতুর্দ্দিক অতি গাঢ় কুজ্ঝটিকায় ব্যাপ্ত হইয়াছে; আকাশ নক্ষত্র চন্দ্র উপকূল কোন দিকে কিছুই দেখা যাইতেছে না। বুঝিলেন, নাবিকদিগের দিগ্‌ভ্রম হইয়াছে। এক্ষণে কোন্ দিকে যাইতেছে, তাহার নিশ্চয়তা পাইতেছে না—পাছে বাহির সমুদ্রে পড়িয়া অকূলে মারা যায়, এই আশঙ্কায় ভীত হইয়াছে।

হিম নিবারণ জন্য সম্মুখে আবরণ দেওয়া ছিল, এজন্য নৌকার ভিতর হইতে আরোহিরা এ সকল বিষয় কিছুই জানিতে পারেন নাই। কিন্তু নব্য যাত্রী অবস্থা বুঝিতে পারিয়া বৃদ্ধকে সবিশেষ কহিলেন; তখন নৌকা মধ্যে মহাকোলাহল পড়িয়া গেল। যে কয়েকটী স্ত্রীলোক নৌকা মধ্যে ছিল, তন্মধ্যে কেহ কেহ কথার শব্দে জাগিয়াছিল; শুনিবামাত্র তাহারা আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিল। প্রাচীন কহিল, “কেনারায় পড়! কেনারায় পড়! কেনারায় পড়।”

নব্য ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন, “কেনারা কোথা তাহা জানিতে পারিলে এত বিপদ্ হইবে কেন?”

ইহা শুনিয়া নৌকারোহীদিগের আরও কোলাহল বৃদ্ধি হইল। নব্য যাত্রী কোন মতে তাহাদিগের স্থির করিয়া নাবিকদিগকে কহিলেন, “আশঙ্কার বিষয় কিছুই নাই, প্রভাত হইয়াছে—চারি পাঁচ দণ্ডের মধ্যে অবশ্য সূর্য্যোদয় হইবেক। চারি পাঁচ দণ্ডের মধ্যে নৌকা কদাচ মারা যাইবে না। তোমরা এক্ষণে বাহন বন্ধ কর, স্রোতে নৌকা যথায় যায় যাক্; পশ্চাৎ রৌদ্র হইলে পরামর্শ করা যাইবে।”

নাবিকেরা এই পরামর্শে সম্মত হইয়া তদনুরূপ আচরণ করিতে লাগিল।

অনেক ক্ষণ পর্য্যন্ত নাবিকেরা নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিল। যাত্রীরা ভয়ে কণ্ঠাগতপ্রাণ। বায়ুমাত্র নাই, সুতরাং তাঁহারা তরঙ্গান্দোলনকম্প কিছুই জানিতে পারিলেন না। তথাপি সকলেই মৃত্যু নিকট নিশ্চিত করিলেন। পুৰুষেরা নিঃশব্দে দুর্গানাম জপ করিতে লাগিলেন, স্ত্রীলোকেরা সুর তুলিয়া বিবিধ শব্দ বিন্যাসে কাঁদিতে লাগিলেন। একটী স্ত্রীলোক গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জ্জন করিয়া আসিয়াছিল—সেই কেবল কাঁদিল না।

প্রতীক্ষা করিতে করিতে অনুভবে বেলা প্রায় এক প্রহর হইল। এমত সময়ে অকস্মাৎ নাবিকেরা দরিয়ার পাঁচ পীরের নাম কীর্ত্তন করিয়া মহাকোলাহল করিয়া উঠিল। যাত্রীরা সকলেই জিজ্ঞাসা করিয়া উঠিল “কি! কি! মাঝি কি হইয়াছে?” মাঝিরাও একবাক্যে কোলাহল করিয়া কহিতে লাগিল, “রোদ উঠেছে! রোদ উঠেছে! ডাঙ্গা! ভাঙ্গা! ডাঙ্গা!” যাত্রীরা সকলেই ঔৎসুক্য সহকারে নৌকার বাহির আসিয়া কোথায় আসিয়াছেন কি বৃত্তান্ত দেখিতে লাগিলেন। দেখিলেন, সূর্য্য প্রকাশ হইয়াছে। কুজ্ঝটিকার অন্ধকার রাশি হইতে দিঙ্‌মণ্ডল একেবারে বিমুক্ত হইয়াছে। বেলা প্রায় প্রহরাতীত হইয়াছে। যে স্থানে নৌকা আসিয়াছে, সে প্রকৃত মহাসমুদ্র নহে, নদীর মোহানা মাত্র, কিন্তু তথায় নদীর যেরূপ বিস্তার সেরূপ বিস্তার আর কোথাও নাই। নদীর এক কূল নৌকার অতি নিকটবর্ত্তী বটে—এমন কি পঞ্চাশৎ হস্তের মধ্যাগত; কিন্তু অপর কূলের চিহ্ন দেখা যায় না। যে দিকেই দেখা যায়, অনন্ত জলরাশি চঞ্চলরবিরশ্মিমালা হইয়া গগন প্রান্তে গগন সহিত মিশাইয়াছে। নিকটস্থ জল, সচরাচর সকর্দ্দম নদী জল বর্ণ; কিন্তু দূরস্থ বারিরাশি নীলপ্রভ। আরোহীরা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত করিলেন যে তাঁহারা মহাসমুদ্রে আসিয়া পড়িয়াছেন, তবে সৌভাগ্য এই যে উপকূল নিকটে, আশঙ্কার বিষয় নাই। সূর্য্য প্রতি দৃষ্টি করিয়া দিক্ নিরূপিত করিলেন। সম্মুখে যে উপকূল দেখিতেছিলেন, সে সহজেই সমুদ্রের পশ্চিম তট বলিয়া সিদ্ধান্ত হইল। তটমধ্যে নৌকার অনতি দূরে এক নদীর মুখ মন্দগামী কলধৌতপ্রবাহবৎ আসিয়া পড়িতেছিল। সঙ্গম স্থলে দক্ষিণ পার্শ্বে বৃহৎ সৈকত ভূমিখণ্ডে টিট্টিভাদি পক্ষিগণ অগণিত সংখ্যায় ক্রীড়া করিতেছিল। এই নদী এক্ষণে “রসুলপুরের নদী” নাম ধারণ করিয়াছে।

চতুর্থ খণ্ড · ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

গৃহদ্বারে।

যখন সন্ধ্যার প্রাক্‌কালে কপালকুণ্ডলা গৃহকার্য্যে ব্যাপৃতা ছিলেন, তখন লিপি কবরীবন্ধনচ্যুত হইয়া ভূমিতলে পড়িয়া গিয়াছিল। কপালকুণ্ডলা তাহা জানিতে পারেন নাই। নবকুমার তাহা দেখিয়াছিলেন। কবরী হইতে পত্র খসিয়া পড়িল দেখিয়া নবকুমার বিস্মিত হইলেন। কপালকুণ্ডলা কার্য্যান্তরে গেলে, লিপি তুলিয়া বাহিরে গিয়া পাঠ করিলেন। সে লিপি পাঠ করিয়া একই সিদ্ধান্ত সম্ভবে। “যে কথা কাল শুনিতে চাহিয়াছিলে সে কথা শুনিবে?” সে কি? প্রণয় কথা? ব্রাহ্মণবেশী মৃণ্ময়ীর উপপতি? যে ব্যক্তি পূর্ব্বরাত্রের বৃত্তান্ত অনবগত তাহার পক্ষে দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত সম্ভবে না।

পতিব্রতা স্বামীর সহগমনকালে, অথবা অন্য কারণে, যখন কেহ জীবিতে চিতারোহণ করিয়া চিতায় অগ্নি সংলগ্ন করে, তখন প্রথমে ধূমরাশি আসিয়া চতুর্দ্দিক্ বেষ্টন করে; দৃষ্টি লোপ করে, অন্ধকার করে। পরে ক্রমে কাষ্ঠরাশি জ্বলিতে আরম্ভ হইলে প্রথমে নিম্ন হইতে সর্পজিহ্বার ন্যায় দুই একটি শিখা আসিয়া অঙ্গের স্থানে স্থানে দংশন করে, পরে সশব্দে অগ্নিজ্বালা চতুর্দ্দিক্ হইতে আসিয়া বেষ্টন করিয়া অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ব্যাপিতে থাকে; শেষে প্রচণ্ড রবে অগ্নিরাশি গগনমণ্ডল জ্বালাময় করিয়া মস্তক অতিক্রম পূর্ব্বক ভস্মরাশি করিয়া ফেলে।

নবকুমারের লিপি পাঠ করিয়া সেইরূপ হইল। প্রথমে বুঝতে পারিলেন না; পরে সংশয়, পরে নিশ্চয়তা, শেষে জ্বালা। মনুষ্যহৃদয় ক্লেশাধিক্য বা সুখাধিক্য একেবারে গ্রহণ করিতে পারে না, ক্রমে ক্রমে গ্রহণ করে। নবকুমারকে প্রথমে ধূমরাশি বেষ্টন করিল; পরে বহ্নিশিখা হৃদয় তাপিত করিতে লাগিল; শেষে বহ্নিরাশিতে হৃদয় ভস্মীভূত হইতে লাগিল। ইতিপূর্ব্বেই নবকুমার দেখিয়াছিলেন যে কপালকুণ্ডলা কোন কোন বিষয়ে তাঁহার অবাধ্য হইয়াছেন। বিশেষ কপালকুণ্ডলা তাঁহার নিষেধ সত্ত্বেও যখন যেখানে সেখানে একাকিনী যাইতেন; যাহার তাহার সহিত যথেচ্ছা আচরণ করিতেন; অধিকন্তু তাঁহার বাক্য হেলন করিয়া নিশীথে একাকিনী বনভ্রমণ করিতেন। আর কেহ ইহাতে সন্দিহান হইত, কিন্তু নবকুমারের হৃদয়ে কপালকুণ্ডলার প্রতি সন্দেহ উত্থাপিত হইলে চিরানিবার্য্য বৃশ্চিক দংশনবৎ হইবে জানিয়া, তিনি এক দিনের তরে সন্দেহকে স্থান দান করেন নাই। অদ্য সন্দেহকে স্থান দিতেন না, কিন্তু অদ্য সন্দেহ নহে; প্রতীতি আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে।

যন্ত্রণার প্রথম বেগের শমতা হইলে নবকুমার নীরবে বসিয়া অনেক ক্ষণ রোদন করিলেন। রোদন করিয়া কিছু সুস্থির হইলেন। তখন তিনি কিঙ্কর্ত্তব্য সম্বন্ধে স্থিরপ্রতিজ্ঞ হইলেন। আজি তিনি কপালকুণ্ডলাকে কিছু বলিবেন না। কপালকুণ্ডলা যখন সন্ধ্যার সময় বনাভিমুখে যাত্রা করিবেন তখন গোপনে তাঁহার অনুসসরণ করিবেন; কপালকুণ্ডলার বিশ্বাসঘাতন প্রত্যক্ষীভূত করিবেন, তাহার পর এ জীবন বিসর্জ্জন করিবেন। কপালকুণ্ডলাকে কিছু বলিবেন না আপনার প্রাণ সংহার করিবেন। না করিয়া কি করিবেন?―এ জীবনের দুর্ব্বহ ভার বহিতে তাঁহার শক্তি হইবে না।

এই স্থির করিয়া কপালকুণ্ডলার বহির্গমন প্রতীক্ষায় তিনি খড়ক্কী দ্বারের প্রতি দৃষ্টি করিয়া রহিলেন। কপালকুণ্ডলা বহির্গতা হইয়া কিছু দূর গেলে নবকুমারও বহির্গত হইতেছিলেন; এমন সময়ে কপালকুণ্ডলা লিপির জন্য প্রত্যাবর্তন করিলেন, দেখিয়া নবকুমার ও সরিয়া গেলেন। শেষে কপালকুণ্ডলা পুনর্ব্বার বাহির হইয়া কিছু দূর গমন করিলে নবকুমার আবার তদনুগমনে বাহির হইতেছিলেন, এমত সময়ে দেখিলেন, দ্বারদেশ আবৃত করিয়া এক দীর্ঘাকার পুরুষ দণ্ডায়মান রহিয়াছে।

কে সে ব্যক্তি, কেন দাঁড়াইয়া, জানিতে নবকুমারের কিছু মাত্র ইচ্ছা হইল না। তাহার প্রতি চাহিয়াও দেখিলেন না। কেবল কপালকুণ্ডলার প্রতি দৃষ্টি রাখিবার জন্য বেগ। অতএব পথমুক্তির জন্য আগন্তুকের বক্ষে হস্ত দিয়া তাড়িত করিলেন, কিন্তু তাহাকে সরাইতে পারিলেন না।

নবকুমার কহিলেন, “কে তুমি? দূর হও—আমার পথ ছাড়।”

আগন্তক কহিল “কে আমি, তুমি কি চেন না?”

শব্দ সমুদ্রনাদবৎ কর্ণে লাগিল। নবকুমার চহিয়া দেখিলেন; দেখিলেন সে পূর্ব্বপরিচিত জটাজূটধারী কাপালিক।

নবকুমার চমকিয়া উঠিলেন; কিন্তু ভীত হইলেন না। সহসা তাঁহার মুখ প্রফুল্ল হইল—কহিলেন,

“কপালকুণ্ডলা কি তোমার সহিত সাক্ষাতে যাইতেছে?” কাপালিক কহিল “না”।

জ্বালিতমাত্র আশার প্রদীপ তখনই নির্ব্বাণ হওয়াতে নবকুমারের মুখ পূর্ব্ববৎ মেঘময় অন্ধকারাবিষ্ট হইল।

কহিলেন, “তবে তুমি পথ মুক্ত কর।”

কাপালিক কহিল “পথ মুক্ত করিতেছি কিন্তু তোমার সহিত আমার কিছু কথা আছে—অগ্রে শ্রবণ কর।”

নবকুমার কহিলেন, “তোমার সহিত আমার কি কথা? তুমি আবার আমার প্রাণনাশের জন্য আসিয়াছ? প্রাণগ্রহণ কর, আমি এবার কোন ব্যাঘাত করিব না। তুমি এক্ষণে অপেক্ষা কর, আমি আসিতেছি। কেন আমি দেবতুষ্টির জন্য শরীর না দিলাম? এক্ষণে তাহার ফল ভোগ করিলাম। যে আমাকে রক্ষা করিয়াছিল, সেই আমাকে নষ্ট করিল। কাপালিক! আমাকে এবার অবিশ্বাস করিও না। আমি এখনই আসিয়া তোমাকে আত্মসমর্পণ করিব।”

কাপালিক কহিল, “আমি তোমার প্রাণবধার্থ আসি নাই। ভবানীর তাহা ইচ্ছা নহে। আমি যাহা করিতে আসিয়াছি তাহা তোমার অনুমোদিত হইবে। বাটীর ভিতরে চল; আমি যাহা বলি তাহা শ্রবণ কর।”

নবকুমার কহিলেন, “এক্ষণে নহে। সময়ান্তরে তাহা শ্রবণ করিব। আপনি এখন অপেক্ষা কৰুন; আমার বিশেষ প্রয়োজন আছে—সাধন করিয়া আসিতেছি।”

কাপালিক কহিল “বৎস! আমি সকলই অবগত আছি। তুমি সেই পাপিষ্ঠার অনুসরণ করিবে;—সে যথায় যাইবে আমি তাহা অবগত আছি। আমি তোমাকে সে স্থানে সমভিব্যাহারে করিয়া লইয়া যাইব। যাহা দেখিতে চাহ দেখাইব—এক্ষণে আমার কথা শ্রবণ কর। কোন ভয় করিও না।”

নবকুমার কহিলেন, “আর তোমাকে আমার কোন ভয় নাই। আইস।”

এই বলিয়া নবকুমার কাপালিককে গৃহাভ্যন্তরে লইয়া গিয়া আসন দিলেন, এবং স্বয়ংও উপবেশন করিয়া বলিলেন “বল।”

তৃতীয় খণ্ড · ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

চরণ তলে।

কায় মনঃ প্রাণ আমি সঁপিব তোমারে।

ভুঞ্জ আসি রাজভোগ দাসীর আলয়ে॥

বীরাঙ্গনা কাব্য

ক্ষেত্রে বীজ রোপিত হইলে আপনিই অঙ্কুর হয়। যখন অঙ্কুর হয়, তখন কেহ জানিতে পারে না—কেহ দেখিতে পায় না। কিন্তু একবার বীজ রোপিত হইলে, রোপনকারী যথায় থাকুন না কেন, ক্রমে অঙ্কুর হইতে বৃক্ষ মস্তকোন্নত করিতে থাকে। অন্য বৃক্ষটী অঙ্গুলি পরিমেয় মাত্র, কেহ দেখিয়াও দেখিতে পায় না। ক্রমে তিল তিল বৃদ্ধি। ক্রমে বৃক্ষটী অৰ্দ্ধহস্ত, একহস্ত, দুইহস্ত পরিমাণ হইল; যদি তাহাতে কাহারও স্বার্থসিদ্ধির সম্ভাবনা না রহিল, তবে তথাপি কেহ দেখে না, দেখিয়াও দেখে না। দিন যায়, মাস যায়, বৎসর যায়, ক্রমে তাহার উপর চক্ষু পড়ে। আর অমনোযোগের কথা নাই,—ক্রমে বৃক্ষ বড় হয়, তাহার ছায়ায় অন্য বৃক্ষ নষ্ট করে,—চাহি কি, ক্ষেত্র অনন্যপাদপ হয়।

লুৎফ্-উন্নিসার প্রণয় এরূপ বাড়িয়াছিল। প্রথম এক দিন অকস্মাৎ প্রণয়ভাজনের সহিত সাক্ষাৎ হইল, তখন প্রণয় সঞ্চার বিশেষ জানিতে পারিলেন না। কিন্তু তখনই অঙ্কুর হইয়া রহিল। তাহার পর আর সাক্ষাৎ হইল না। কিন্তু অসাক্ষাতে পুনঃ পুনঃ সেই মুখমণ্ডল মনে পড়িতে লাগিল, স্মৃতিপটে সে মুখমণ্ডল চিত্রিত করা কতক কতক সুখকর বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। বীজে অঙ্কুর জন্মিল। মূর্ত্তি প্রতি অনুরাগ জন্মিল। চিত্তের ধর্ম্ম এই যে, যে মানসিক কর্ম্ম যত অধিক বার করা যায়, সে কর্ম্মে তত অধিক প্রবৃত্তি হয়; সে কর্ম্ম ক্রমে স্বভাবসিদ্ধ হয়। লুৎফ-উন্নিসা সেই মূর্ত্তি অহরহ মনে ভাবিতে লাগিলেন। দাৰুণ দর্শনাভিলাষ জন্মিল; সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার সহজ স্পৃহাপ্রবাহও দুর্ন্নিবার্য হইয়া উঠিল। দিল্লীর সিংহাসনলালসাও তাহার নিকট লঘু হইল। সিংহাসন যেন মন্মথশরসম্ভূত অগ্নিরাশিবেষ্টিত বোধ হইতে লাগিল। রাজা, রাজধানী, রাজসিংহাসন, সকল বিসর্জ্জন দিয়া প্রিয়জনসন্দর্শনে ধাবিত হইলেন। সে প্রিয়জন নবকুমার।

এই জন্যেই লুৎফ্-উন্নিসা মেহের-উন্নিসার আশানাশক কথা শুনিয়াও অসুখী হয়েন নাই; এই জন্যই আগ্রায় আসিয়া সম্পদ রক্ষায় কোন যত্ন পাইলেন না; এই জন্যই জন্মের মত বাদশাহের নিকট বিদায় লইলেন।

লুৎফ্-উন্নিসা সপ্তগ্রামে আসিলেন। রাজপথের অনতিদূরে নগরীর সর্ব্বমধ্যে এক অট্টালিকায় আপন বাসস্থান করিলেন। রাজপথের পথিকেরা দেখিলেন, অকস্মাৎ এই অট্টালিকা সুবর্ণখচিতবসনভূষিত দাসদাসীতে পরিপূর্ণ হইয়াছে। কক্ষ্যায় কক্ষ্যায় হর্ম্মসজ্জা অতি মনোহর। গন্ধদ্রব্য, গন্ধবারি, কুসুমদাম সর্ব্বত্র আমোদ করিতেছে। স্বর্ণ, রৌপ্য, গজদন্তাদি খচিত গৃহশোভার্থ নানা দ্রব্য সকল স্থানেই আলো করিতেছে। এইরূপ সজ্জীভূত এক কক্ষ্যায় লুৎফ্-উন্নিসা অধোবদনে বসিয়া আছেন; পৃথগাসনে নবকুমার বসিয়া আছেন। সপ্তগ্রামে নবকুমারের সহিত লুৎফ্-উন্নিসার আর দুই এক বার সাক্ষাৎ হইয়াছিল; তাহাতে লুৎফ্-উন্নিসার মনোরথ কতদূর সিদ্ধ হইয়াছিল তাহা অদ্যকার কথায় প্রকাশ হইবে।

নবকুমার কিছু ক্ষণ নীরবে থাকিয়া কহিলেন, “তবে আমি এক্ষণে চলিলাম। তুমি আর আমাকে ডাকিও না।”

লুৎফ্-উন্নিসা কহিল “যাইও না। আর একটু থাক। আমার যাহা বক্তব্য তাহা সমাপ্ত করি নাই।”

নবকুমার আরও ক্ষণেক প্রতীক্ষা করিলেন, কিন্তু লুৎফ্-উন্নিসা কিছু বলিলেন না। ক্ষণেক পরে নবকুমার জিজ্ঞাসা করিলেন, “আর কি বলিবে?” লুৎফ্-উন্নিসা কোন উত্তর করিলেন না—তিনি নীরবে রোদন করিতেছিলেন।

নবকুমার ইহা দেখিয়া গাত্রোত্থান করিলেন; লুৎফ্ উন্নিসা তাঁহার বস্ত্রাগ্র ধৃত করিলেন। নবকুমার ঈষৎ বিরক্ত হইয়া কহিলেন, “কি বল না?”

লুৎফ্-উন্নিসা কহিলেন “তুমি কি চাও? পৃথিবীতে কিছু কি প্রার্থনীয় নাই? ধন, সম্পদ, মান, প্রণয়, রঙ্গ, রহস্য, পৃথিবীতে যাহাকে যাহাকে সুখ বলে, সকলই দিব; কিছুই তাহার প্রতিদান চাহি না; কেবল তোমার দাসী হইতে চাহি। তোমার যে পত্নী হইব, এ গৌরবও চাহি না, কেবল দাসী!”

নবকুমার কহিলেন, “আমি দরিদ্র ব্রহ্মণ, ইহ জন্মে দরিদ্র ব্রাহ্মণই থাকিব। তোমার দত্ত ধন সম্পদ লইয়া যবনীজার হইতে পারিব না।”

যবনীজার? নবকুমার এ পর্য্যন্ত জানিতে পারেন নাই যে, এই রমণী তাঁহার পত্নী। লুৎফ্-উন্নিসা অধোবদনে রহিলেন। নবকুমার তাঁহার হস্ত হইতে বস্ত্রাগ্রভাগ মুক্ত করিলেন। লুৎফ্-উন্নিসা আবার তাঁহার বস্ত্রাগ্র ধরিয়া কহিলেন,

“ভাল, সে যাউক। বিধাতার যদি সেই ইচ্ছা, তবে চিত্তবৃত্তি সকল অতল জলে ডুবাইব। আর কিছু চাহি না, এক এক বার তুমি এই পথে যাইও; দাসী ভাবিয়া এক এক বার দেখা দিও; কেবল চক্ষু পরিতৃপ্ত করিব।”

নব। তুমি যবনী—পরস্ত্রী—তোমার সহিত এরূপ আলাপেও দোষ। তোমার সহিত আর আমার সাক্ষাৎ হইবে না।”

ক্ষণেক নীরব। লুৎফ্-উন্নিসার হৃদয়ে ঝটিকা বহিতে ছিল। প্রস্তরময়ীমূর্ত্তিবৎ নিস্পন্দ রহিলেন। নবকুমারের বস্ত্রাগ্রভাগ ত্যাগ করিলেন। কহিলেন, “যাও।”

নবকুমার চলিলেন। দুই চারি পদ চলিয়াছিলেন মাত্র, সহসা লুৎফ-উন্নিসা বাতোন্মূলিত পাদপের ন্যায় তাঁহার পদতলে পড়িলেন। বাহুলতায় চরণযুগল বদ্ধ করিয়া কাতর স্বরে কহিলেন,

“নির্দ্দয়! আমি তোমার জন্য আগ্রার সিংহাসন ত্যাগ করিয়া আসিয়াছি। তুমি আমায় ত্যাগ করিও না!”

নবকুমার কহিলেন, “তুমি আবার আগ্রাতে ফিরিয়া যাও; আমার আশা ত্যাগ কর।”

“এ জন্মে নহে!” লুতফ্-উন্নিসা তীরবৎ দাঁড়াইয়া উঠিয়া সদর্পে কহিলেন, “এ জন্মে তোমার আশা ছাড়িব না!” মস্তকোন্নত করিয়া, ঈষৎ বঙ্কিম গ্রীবাভঙ্গী করিয়া, নবকুমারের মুখপ্রতি অনিমিক্ আয়ত চক্ষু স্থাপিত করিয়া, রাজরাজমোহিনী দাঁড়াইলেন। যে অনবনমনীয় গর্ব্ব হৃদয়াগ্নিতে গলিয়া গিয়াছিল, আবার তাহার জ্যোতিঃ স্ফুরিল; যে অজেয় মানসিক শক্তি ভারতরাজ্য শাসনকল্পনায় ভীত হয় নাই, সেই শক্তি আবার প্রণয়দুর্ব্বল দেহে সঞ্চারিত হইল। ললাটদেশে ধমনী সকল স্ফীত হইয়া রমণীয় রেখা দিল; জ্যোতির্ম্ময় চক্ষু রবিকরমুখরিত সমুদ্রবারিবৎ ঝলসিতে লাগিল; নাসারন্ধ কাঁপিতে লাগিল। স্রোতোবিহারিণী রাজহংসী যেমন গতিবিরোধির প্রতি গ্রীবাভঙ্গী করিয়া দাঁড়ায়, দলিতফণা ফণিনী যেমন ফণা তুলিয়া দাঁড়ায়, তেমনি উন্মাদিনী যবনী মস্তক তুলিয়া দাঁড়াইলেন। কহিলেন, “এজন্মে না। তুমি আমারই হইবে।”

সেই কুপিতফণিনী মূর্ত্তি প্রতি নিরীক্ষণ করিতে করিতে নবকুমার ভীত হইলেন। লুৎফ্-উন্নিসার অনির্ব্বচনীয় দেহমহিমা এখন যেরূপ দেখিতে পাইলেন, সেরূপ আর কখন দেখেন নাই। কিন্তু সে শ্রী বজ্রসূচক বিদ্যুতের ন্যায় মনোমোহিনী; দেখিয়া ভয় হইল। নবকুমার চলিয়া যান, তখন সহসা তাঁহার আর এক তেজোময়ী মূর্ত্তি মনে পড়িল। এক দিন নবকুমার তাঁহার প্রথমা পত্নী পদ্মাবতীর প্রতি বিরক্ত হইয়া তাঁহাকে শয়নাগার হইতে বহিষ্কৃতা করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন। দ্বাদশবর্ষীয়া বালিকা তখন সদর্পে তাঁহার দিকে ফিরিয়া দাঁড়াইয়াছিল; এমনই তাহার চক্ষু প্রদীপ্ত হইয়াছিল; এমনই ললাটে রেখা বিকাশ হইয়াছিল; এমনই নাসারন্ধ্র কাঁপিয়াছিল; এমনই মস্তক হেলিয়াছিল। বহুকাল সে মূর্ত্তি মনে পড়ে নাই, এখন মনে পড়িল। অমনই সাদৃশ্য অনুভূত হইল। সংশয়াধীন হইয়া নবকুমার সঙ্কুচিত স্বরে, ধীরে ধীরে কহিলেন, “তুমি কে?”

যবনীর নয়নতারা আরও বিস্ফারিত হইল। কহিলেন, “আমি পদ্মাবতী।”

উত্তর প্রতীক্ষা না করিয়া লুৎফ-উন্নিসা স্থানান্তরে চলিয়া গেলেন। নবকুমারও অন্যমনে কিছু শঙ্কান্বিত হইয়া, আপন আলয়ে গেলেন।

দ্বিতীয় খণ্ড · ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

অবরোধে।

কিমিত্যপাদ্যাভরণানি যৌবনে

ধৃতংত্বয়া রার্দ্ধকশোভি বল্কলম্।

বদপ্রদোষে স্ফুটচন্দ্র তারকা

বিভাবরী যদ্যরূনার কল্পতে॥

কুমারসম্ভব।

সকলেই অবগত আছেন, যে পূর্ব্বকালে সপ্তগ্রাম মহাসমৃদ্ধিশালিনী নগরী ছিল। এককালে যবদ্বীপ হইতে রোমকপর্য্যন্ত সর্ব্বদেশের বণিকেরা বাণিজ্যার্থ এই মহানগরীতে মিলিত হইত। কিন্তু বঙ্গীয় দশম একদাশ শতাব্দীতে সপ্তগ্রামের প্রাচীন সমৃদ্ধির লাঘব জন্মিয়াছিল। ইহার প্রধান কারণ এই যে, তন্নগরীর প্রান্তভাগ প্রক্ষালিত করিয়া যে স্রোতস্বতী বাহিত হইত, এক্ষণে তাহা শঙ্কীর্ণশরীরা হইয়া আসিতে ছিল; সুতরাং বৃহদাকার জলযান সকল আর নগরী পর্য্যন্ত আসিতে পারিত না। একারণ বাণিজ্য বাহুল্য ক্রমে লুপ্ত হইতে লাগিল। বাণিজ্যগৌরবা নগরীর বাণিজ্য নাশ হইলে সকলই যায়। সপ্তগ্রামের সকলই গেল। একাদশ শতাব্দীতে হুগলী নূতন সৌষ্ঠবে তাহার প্রতিযোগী হইয়া উঠিতেছিল। তথায় পর্ত্তুগীসেরা বাণিজ্য আরম্ভ করিয়া সপ্তগ্রামের ধনলক্ষ্মীকে আকর্ষিতা করিতেছিলেন। কিন্তু তখনও সপ্তগ্রাম একেবারে হতশ্রী হয় নাই। তথায় এপর্য্যন্ত ফৌজদার প্রভৃতি প্রধান রাজপুৰুষদিগের বাস ছিল; কিন্তু নগরীর অনেকাংশ শ্রীভ্রষ্ট এবং বসতিহীন হইয়া পল্লীগ্রামের আকার ধারণ করিয়াছিল।

সপ্তগ্রামের, এক নির্জ্জন ঔপনগরিক ভাগে নবকুমারের বাস। এক্ষণে সপ্ত গ্রামের ভগ্নদশায় তথায় প্রায় মনুষ্য সমাগম ছিল না; রাজপথ সকল লতাগুল্মাদিতে পরিপূরিত হইয়াছিল। নবকুমারের বাটীর পশ্চাদ্ভাগেই এক বিস্তৃত নিবিড় বন। বাটীর সম্মুখে প্রায় ক্রোশার্দ্ধ দূরে একটী ক্ষুদ্র খাল বহিত; সেই খাল একটা ক্ষুদ্র প্রান্তর বেষ্টন করিয়া গৃহের পশ্চাদ্ভাগস্থ বনমধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল। গৃহটী ইষ্টক রচিত; দেশকাল বিবেচনা করিলে তাহাকে নিতান্ত সামান্য গৃহ বলা যাইতে পারিত না। দোতালা বটে, কিন্তু ভয়ানক উচ্চ নহে; এখন একতালায় সেরূপ উচ্চতা অনেক দেখা যায়।

এই গৃহের সৌধোপরি দুইটী নবীনবয়সী স্ত্রীলোক দাঁড়াইয়া চতুর্দ্দিক্ অবলোকন করিতে ছিলেন। সন্ধ্যাকাল উপস্থিত। চতুর্দ্দিকে যাহা দেখা যাইতেছিল, তাহা লোচনরঞ্জন বটে। নিকটে একদিকে, নিবিড়বন; তন্মধ্যে অসংখ্য পক্ষীগণ কলরব করিতেছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র খাল, রূপার সূতার ন্যায় পড়িয়া রহিয়াছে। দূরে, মহানগরীর অসংখ্য সৌধমালা, নববসন্তপবনস্পর্শলোলুপ নাগরিকগণে পরিপূরিত হইয়া শোভা করিতেছে। অন্যদিকে, অনেকদূরে নৌকাভরণা ভাগীরথীর বিশালবক্ষে সন্ধ্যাতিমির ক্ষণে ক্ষণে গাঢ়তর হইতেছে।

যে নবীনাদ্বয় প্রাসাদোপরি দাঁড়াইয়াছিলেন, তন্মধ্যে এক জন চন্দ্ররশ্মিবর্ণাভা, অবিন্যস্ত কেশভার মধ্যে প্রায় অর্দ্ধলুক্কায়িত। অপরা কৃষ্ণাঙ্গিনী; তিনি সুমুখী, ষোড়শী; তাঁহার ক্ষুদ্র দেহ, মুখখানি ক্ষুদ্র; তাহার উপরার্দ্ধে চারিদিক্ দিয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুঞ্চিত কুন্তলদাম বেড়িয়া পড়িয়াছে; যেন নীলোৎপল-দল রাজি উৎপলমধ্যকে ঘেরিয়া রহিয়াছে। নয়নযুগল বিস্ফারিত, কোমল-শ্বেতবর্ণ, সফরী সদৃশ; অঙ্গুলি গুলিন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র, সঙ্গিনীর কেশতরঙ্গ মধ্যে ন্যস্ত হইয়াছে। পাঠক মহাশয় বুঝিয়াছেন, যে চন্দ্ররশ্মিবর্ণশোভিনী কপালকুণ্ডলা; তাঁহাকে বলিয়া দিই, কৃষ্ণাঙ্গিনী তাঁহার ননন্দা শ্যামা সুন্দরী।

শ্যামাসুন্দরী ভ্রাতৃজায়াকে কখন “বউ” কখন আদর করিয়া, “বন্’ কখন “মৃণো” সম্বোধন করিতেছিলেন। কপালকুণ্ডলা নামটী বিকট বলিয়া, গৃহস্থেরা তাঁহার নাম মৃণ্ময়ী রাখিয়াছিলেন; এইজন্য “মৃণো” সম্বোধন। আমরাও এখন কখন কখন ইহাকে মৃণ্ময়ী বলিব।

শ্যামাসুন্দরী একটী শৈশবাভ্যস্ত কবিতা বলিতেছিলেন, যথা—

বলে——পদ্মরাণী, বদন্ খানি, রেতে রাখে ড়েকে।

ফুটায় কলি, জুটায় অলি, প্রাণপতিকে দেখে।

আবার——বনের লতা, ফেলে পাতা, গাছের দিকে ধায়।

নদীর জল, নাম্‌লে ঢল, সাগরেতে যায়॥

ছি ছি———শরমটুটে, কুমুদফুটে, চাঁদের আলো পেলে।

বিয়ের কনে রাখ্‌তে নারি ফুলশয্যা গেলে।

মরি————একি জ্বালা, বিধির খেলা, হরিষে বিষাদ।

পর পরশে, সবাই রসে, ভাঙ্গে লাজের বাঁধ॥

তুই কিলো একা তপস্বিনী থাকিবি?”

মৃণ্ময়ী উত্তর করিল, “কেন কি তপস্যা করিতেছি?”

শ্যামাসুন্দরী দুই করে মৃণ্ময়ীর কেশ-তরঙ্গমালা তুলিয়া কহিল, “তোমার এ চুলের রাশি কি বাঁধিবে না?”

মৃণ্ময়ী কেবল ঈষৎ হাসিয়া শ্যামাসুন্দরীর হাত হইতে কেশগুলিন টানিয়া লইলেন।

শ্যামাসুন্দরী আবার কহিলেন, “ভাল আমার সাধটী পুরাও। একবার আমাদের গৃহস্থের মেয়ের মত সাজ। কত দিন যোগিনী থাকিবে?”

মৃ। “যখন এই ব্রাহ্মণ সন্তানের সহিত সাক্ষাৎ তখন ত আমি যোগিনীই ছিলাম।”

শ্যা। “এখন আর থাকিতে পারিবে না”

মৃ। “কেন থাকিব না।”

শ্যা। “কেন? দেখিবি? তোর যোগ ভাঙ্গিব। পরশপাতর কাহাকে বলে জান?”

মৃণ্ময়ী কহিলেন “না।”

শ্যা। “পরশ পাতরের স্পর্শে রাঙ্গও সোনা হয়।”

মৃ। “তাতে কি?”

শ্যা। “মেয়েমানুষেরও পরশপাতর আছে।”

মৃ। “সে কি।”

শ্যা। “পুৰুষ। পুৰুষের বাতাসে যোগিনীও গৃহিনী হইয়া যায়। তুই সেই পাতর ছুয়েছিস্। দেখিবি,

বাঁধাব চুলেররাশ, পরাব চিকণ বাস,

খোপায় দোলাব তোর ফুল।

কপালে সিঁথির ধার, কাঁকালেতে চন্দ্রহার,

কানে তোর দিব যোড়াদুল॥

কুঙ্কুম চন্দন চূয়া, বাটা ভোরে পান গুয়!,

রাঙ্গামুখ রাঙ্গা হবে রাগে।

সোণার পূতলি ছেলে, কোলে তোর দিব ফেলে,

দেখি ভাল লাগে কি না লাগে॥”

মৃণ্ময়ী কহিলেন, “ভাল, বুঝিলাম। পরশপাতর যেন ছুয়েছি, সোণা হলেম। চুল বাঁধিলাম; ভাল কাপড় পরিলাম; খোপায় ফুল দিলাম; সিঁথিতে চন্দ্রহার পরিলাম; কানে দূল দুলিল; চন্দন, কুঙ্কুম, চূয়া, পান, গুয়া, সোণার পুতলি পর্য্যন্ত হইল। মনে কর সকলই হইল। তাহা হইলেই বা কি সুখ?”

শ্যা। “বল দেখি ফুলটী ফুটিলে কি সুখ?”

মৃ।“লোকের দেখে সুখ; ফুলের কি?”

শ্যামাসুন্দরীর মুখকান্তি গম্ভীর হইল; প্রভাতবাতাহত নীলোৎপলবৎ বিস্ফারিত চক্ষু ঈষৎ দুলিল; বলিলেন “ফুলের কি? তাহা ত বলিতে পারি না। কখন ফুল হইয়া ফুটি নাই। কিন্তু বুঝি যদি তোমার মত কলি হইতাম তবে ফুটিয়া সুখ হইত।” সীমান্ত

শ্যামা কুলীনপত্নী।

আমরাও এই অবকাশে পাঠক মহাশয়কে বলিয়া রাখি যে ফুলের ফুটিয়াই সুখ। পুষ্পরস, পুষ্প গন্ধ, বিতরণই তার সুখ। আদান প্রদানই পৃথিবীর সুখের মূল, তৃতীয় মূল নাই। মৃণ্ময়ী বন মধ্যে থাকিয়া এ কথা কখন হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন নাই—অতএব কথার কোন উত্তর না দিলেন।

শ্যামাসুন্দরী তাঁহাকে নীরব দেখিয়া কহিলেন “আচ্ছা—তাই যদি না হইল;—তবে শুনি দেখি তোমার সুখ কি?”

মৃণ্ময়ী কিয়ৎক্ষণ ভাবিয়া বলিলেন “বলিতে পারি না। বোধ করি সমুদ্র তীরে সেই বনে বনে বেড়াইতে পারিলে আমার সুখ জন্মে।”

শ্যামাসুন্দরী কিছু বিস্মিতা হইলেন। তাঁহাদিগের যত্নে যে মৃণ্ময়ী উপক্বতা হয়েন নাই, ইহাতে কিঞ্চিৎ ক্ষুব্ধা হইলেন; কিছু, ৰুষ্টা হইলেন। কহিলেন, “এখন ফিরিয়া যাইবার উপায়?”

মৃ। “উপায় নাই”
শ্যামা। “তবে করিবে কি?”
মৃ। “অধিকারী কহিতেন, “যথা নিযুক্তোস্মি তথা করোমি।” শ্যামা সুন্দরী মুখে কাপড় দিয়া হাসিয়া কহি লেন “যে আজ্ঞা ভট্টাচার্য্য মহাশয়! কি হইল?”

মৃণ্ময়ী নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন, “যাহা বিধাতা করাইবেন তাহাই করিব। যাহা কপালে আছে তাহাই ঘটিবে?”

শ্যা। “কেন, কপালে আর কি আছে? কপালে সুখ আছে। তুমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেল কেন?”

মৃণ্ময়ী কহিলেন, “শুন। যে দিন স্বামির সহিত যাত্রা করি, যাত্রাকালে আমি ভবানীর পায়ে ত্রিপত্র দিতে গেলাম। আমি মার পাদপদ্মে ত্রিপত্র না দিয়া কোন কর্ম্ম করিতাম না। যদি কর্ম্মে শুভ হইবার হইত, তবে মা ত্রিপত্র ধারণ করিতেন; যদি অমঙ্গল ঘটিবার সম্ভাবনা থাকিত, তবে ত্রিপত্র পড়িয়া যাইত। অপরিচিত ব্যক্তির সহিত অজ্ঞাত দেশে আসিতে শঙ্কা হইতে লাগিল। ভালমন্দ জানিতে মার কাছে গেলাম। ত্রিপত্র মা ধারণ করিলেন না—অতএব কপালে কি আছে জানি না।”

মৃণ্ময়ী নীরব হইলেন। শ্যামাসুন্দরী শিহরিয়া উঠিলেন।

দ্বিতীয়ঃ খণ্ডঃ সমাপ্ত

প্রথম খণ্ড · ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

কাপালিকসঙ্গে।

“কথং নিগড়সংযতাসি দ্রুতম্

নয়ামি ভবতীমিতঃ”——————

রত্নাবলী

নবকুমার কুটীরমধ্যে প্রবেশ করিয়া দ্বার সংযোজন পূর্ব্বক করতলে মস্তক দিয়া বসিলেন। শীঘ্র আর মস্তকোত্তোলন করিলেন না।

“এ কি দেবী—মানুষী—না কাপালিকের মায়া মাত্র!” নবকুমার নিস্পন্দ হইয়া হৃদয় মধ্যে এই কথার আন্দোলন করিতে লাগিলেন। কিছুই বুঝিতে পারিলেন না।

অন্যমনস্ক ছিলেন বলিয়া, নবকুমার আর একটী ব্যাপার দেখিতে পান নাই। সেই কুটীর মধ্যে তাঁহার আগমন পূর্ব্বাবধি এক খানি কাষ্ঠ জ্বলিতেছিল। পরে যখন অনেক রাত্রে স্মরণ হইল যে সায়াহ্নকৃত্য অসমাপ্ত রহিয়াছে—তখন জলান্বেষণ অনুরোধে চিন্তা হইতে ক্ষান্ত হইয়া এ বিষয়ের অসম্ভাবিতা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলেন। শুধু আলো নহে, তণ্ডুলাদিপাকোপযোগী কিছু কিছু সামগ্রীও আছে। নবকুমার বিস্মৃত হইলেন না—মনে করিলেন যে এও কাপালিকের কর্ম্ম—এ স্থানে বিস্ময়ের বিষয় কি আছে।

“শস্যঞ্চ গৃহমাগতং” মন্দ কথা নহে। “ভোজ্যঞ্চ উদরাগতং” বলিলে আরও স্পষ্ট হয়। নবকুমার এ কথার মাহাত্ম্য না বুঝিতেন এমত নহে। সায়ংকৃত্য সমাপনান্তে তণ্ডুল গুলিন কুটীর মধ্যে প্রাপ্ত এক মৃৎপাত্রে সিদ্ধ করিয়া আত্মসাৎ করিলেন।

পরদিন প্রভাতে চর্ম্মশয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়াই সমুদ্রতীরাভিমুখে চলিলেন। পূর্ব্বদিনের যাতায়াতের গুণে অদ্য অল্প কষ্টে পথ অনুভূত করিতে পারিলেন। তথায় প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। কাহার প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন? পূর্ব্বদৃষ্টা মায়াবিনী পুনর্ব্বার সে স্থলে যে আসিবেন—এমত আশা নবকুমারের হৃদয়ে কত দূর প্রবল হইয়াছিল বলিতে পারি না—কিন্তু সে স্থান তিনি ত্যাগ করিতে পারিলেন না। অনেক বেলাতেও তথায় কেহ আসিল না। তখন নবকুমার সে স্থানের চারি দিকে ভ্রমিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। বৃথা অন্বেষণ মাত্র। মনুষ্য সমাগমের চিহ্নমাত্র দেখিতে পাইলেন না। পুনর্ব্বার ফিরিয়া আসিয়া সেই স্থানে উপবেশন করিলেন। সূর্য্য অস্তগত হইল; অন্ধকার হইয়া আসিতে লাগিল। নবকুমার হতাশ হইয়া কুটীরে ফিরিয়া আসিলেন। সায়াহ্নকালে সমুদ্রতীর হইতে প্রত্যাগমন করিয়া নবকুমার দেখিলেন যে কাপালিক কুটীর মধ্যে ধরাতলে উপবেশন করিয়া নিঃশব্দে আছে। নবকুমার প্রথমে স্বাগত জিজ্ঞাসা করিলেন; তাহাতে কাপালিক কোন উত্তর করিল না।

নবকুমার কহিলেন, “এ পর্য্যন্ত প্রভুর দর্শনে কি জন্য বঞ্চিত ছিলাম?” কাপালিক কহিল, “নিজব্রতে নিযুক্ত ছিলাম।”

নবকুমার গৃহ গমনাভিলাষ ব্যক্ত করিলেন। কহিলেন “পথ অবগত নহি—পাথেয় নাই; যদ্বিহিত বিধান প্রভুর সাক্ষাৎ লাভ হইলে হইতে পারিবে এই ভরসায় আছি।”

কাপালিক কেবল মাত্র কহিল “আমার সঙ্গে আগমন কর।” এই বলিয়া উদাসীন গাত্রোত্থান করিলেন। বাটী যাইবার কোন সদুপায় হইতে পারিবেক প্রত্যাশায় নবকুমারও তাহার পশ্চাদ্বর্ত্তী হইলেন।

তখনও সন্ধ্যালোক অন্তর্হিত হয় নাই—কাপালিক অগ্রে অগ্রে, নবকুমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাইতেছিলেন। অকস্মাৎ নবকুমারের পৃষ্ঠদেশে কাহার কোমল করস্পর্শ হইল। পশ্চাৎ ফিরিয়া যাহা দেখিলেন তাহাতে স্পন্দহীন হইলেন। সেই আগুল্‌ফলম্বিত-নিবিড়কেশরাশি-ধারিণী বন্যদেবীমূর্ত্তি! পূর্ব্ববৎ নিঃশব্দ; নিস্পন্দ। কোথা হইতে এ মূর্ত্তি অকস্মাৎ তাঁহার পশ্চাতে আসিল? নবকুমার দেখিলেন, রমণী মুখে অঙ্গুলি প্রদান করিয়াছে। নবকুমার বুঝিলেন যে রমণী বাক্যস্ফূর্ত্তি নিষেধ করিতেছে। নিষেধের বড় প্রয়োজনও ছিল না। নবকুমার কি কথা কহিবেন? তিনি তথায় চমৎকৃত হইয়া দাঁড়াইলেন। কাপালিক এ সকল কিছুই দেখিতে পাইল না, অগ্রসর হইয়া চলিয়া গেল। তাঁহারা উদাসীনের শ্রবণাতিক্রান্ত হইলে রমণী মৃদুস্বরে কি কথা কহিল। নবকুমারের কর্ণে এই শব্দ প্রবেশ করিল,

“কোথা যাইতেছ? যাইও না। ফিরিয়া যাও—পলায়ন কর।”

এই কথা সমাপ্ত করিয়াই উক্তিকারিণী সরিয়া গেলেন, প্রত্যুত্তর শুনিবার জন্য তিষ্ঠিলেন না। নবকুমার কিয়ৎকাল অভিভূতের ন্যায় দাঁড়াইলেন; পশ্চাদ্বর্ত্তী হইতে ব্যগ্র হইলেন, কিন্তু রমণী কোন্ দিকে গেল তাহার কিছুই স্থিরতা পাইলেন না। মনে করিতে লাগিলেন—“এ কাহারও মায়া? না আমারই ভ্রম হইতেছে? যে কথা শুনিলাম—সেত আশঙ্কাসূচক; কিন্তু কিসের আশঙ্কা? তান্ত্রিকেরা সকলই করিতে পারে। তবে কি পলাইব? কোথায় পলাইবার স্থান আছে?”

নবকুমার এই রূপ চিন্তা করিতেছিলেন, এমত সময়ে দেখিলেন কাপালিক তাঁহাকে সঙ্গে না দেখিয়া প্রত্যাবর্ত্তন করিতেছে। কাপালিক কহিল, “বিলম্ব করিতেছ কেন?”

যখন লোকে ইতিকর্ত্তব্য স্থির না করিতে পারে, তখন তাহাদিগকে যে দিকে প্রথম আহূত করা যায়, সেই দিকেই প্রবৃত্ত হয়। কাপালিক পুনরাহ্বান করাতে বিনা বাক্য ব্যয়ে নবকুমার তাঁহার পশ্চাদ্বর্ত্তী হইলেন।

কিয়দ্দূর গমন করিয়া সম্মুখে এক মৃৎপ্রাচীরবিশিষ্ট কুটীর দেখিতে পাইলেন। তাহাকে কুটীরও বলা যাইতে পারে, ক্ষুদ্র গৃহও বলা যাইতে পারে। কিন্তু ইহাতে আমাদিগের কোন প্রয়োজন নাই। ইহার পশ্চাতেই সিকতাময় সমুদ্রতীর। গৃহপার্শ্ব দিয়া কাপালিক নবকুমারকে সেই সৈকতে লইয়া চলিলেন; এমত সময়ে তীরের তুল্য বেগে পূর্ব্বদৃষ্টা রমণী তাঁহার পার্শ্ব দিয়া চলিয়া গেল। গমন কালে তাঁহার কর্ণে বলিয়া গেল “এখনও পলাও। নরমাংস নহিলে তান্ত্রিকের পূজা হয় না তুমি কি জান না?”

নবকুমারের কপালে স্বেদবিগম হইতে লাগিল। দুর্ভাগ্যবশতঃ যুবতীর এই কথা কাপালিকের কর্ণে গেল। সে কহিল, “কপালকুণ্ডলে!”

স্বর নবকুমারের কর্ণে মেঘগর্জনবৎ ধ্বনিত হইল। কিন্তু কপালকুণ্ডলা কোন উত্তর দিল না।

কাপালিক নবকুমারের হস্তধারণ করিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। মানুষঘাতী করস্পর্শে নবকুমারের শোণিত ধমনীমধ্যে শতগুণ বেগে প্রধাবিত হইল—লুপ্তসাহস পুনর্ব্বার আসিল। কহিলেন, “হস্ত ত্যাগ কৰুন।”

কাপালিক উত্তর করিল না। নবকুমার পুনরপি জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমায় কোথায় লইয়া যাইতেছেন?”

কাপালিক কহিল “পূজার স্থানে।”

নবকুমার কহিলেন “কেন?”

কাপালিক কহিল “বধার্থ।”

অতিতীব্রবেগে নবকুমার নিজহস্ত টানিলেন। যে বলে তিনি হস্ত আকর্ষিত করিয়াছিলেন, সচরাচর লোকে হস্তরক্ষা করা দূরে থাকুক—বেগে ভূপতিত হইত। কিন্তু কাপালিকের অঙ্গমাত্রও হেলিল না;—নবকুমারের প্রকোষ্ঠ তাহার হস্তমধ্যেই রহিল। নবকুমারের অস্থিগ্রন্থি সকল যেন ভগ্ন হইয়া গেল। মুমূর্ষুর ন্যায় কাপালিকের সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন।

সৈকতের মধ্যস্থানে নীত হইয়া নবকুমার দেখিলেন পূর্ব্ব দিনের ন্যায় তথায় বৃহৎকাষ্ঠে অগ্নি জ্বলিতেছে। চতুঃপার্শ্বে তান্ত্রিকপূজার আয়োজন রহিয়াছে, তন্মধ্যে নরকপালপূর্ণ আসব রহিয়াছে—কিন্তু শব নাই। অনুমান করিলেন তাঁহাকেই শব হইতে হইবে।

কতকগুলিন শুষ্ক কঠিন লতাগুল্ম তথায় পূর্ব্বেই আহরিত ছিল। কাপালিক তদ্দ্বারা নবকুমারকে দৃঢ়তর বন্ধন করিতে আরম্ভ করিলেন। নবকুমার সাধ্যমত বলপ্রকাশ করিলেন। কিন্তু বলপ্রকাশ কিছুমাত্র ফলদায়ক হইল না। তাহার প্রতীতি হইল যে এ বয়সেও কাপালিক মত্ত হস্তীর বল ধারণ করে। নবকুমারের বল প্রকাশ দেখিয়া কাপালিক কহিল।

“মূর্খ! কি জন্য বলপ্রকাশ কর! তোমার জন্ম আজি সার্থক হইল। ভৈরবীর পূজায় তোমার এই মাংস পিণ্ড অর্পিত হইবেক, ইহার অধিক তোমার তুল্য লোকের আর কি সৌভাগ্য হইতে পারে?”

কাপালিক নবকুমারকে দৃঢ়তর বন্ধন করিয়া সৈকতোপরি ফেলিয়া রাখিলেন। এবং বধের প্রাক্কালিক পূজাদি ক্রিয়ায় ব্যাপৃত হইলেন।

শুষ্ক লতা অতি কঠিন—বন্ধন অতিদৃঢ়—মৃত্যু আসন্ন! নবকুমার ইষ্টদেবচরণে চিত্ত নিবিষ্ট করিলেন। এক বার জন্মভূমি মনে পড়িল; নিজ সুখের আলয় মনে পড়িল, এক বার বহুদিন অন্তর্হিত জনক এবং জননীর মুখ মনে পড়িল, দুই এক বিন্দু অশ্রুজল সৈকত বালুকায় শুষিয়া গেল। কাপালিক বলির প্রাক্‌কালিক ক্রিয়া সমাপনাস্তে বধার্থ খড়্গ লইবার জন্য আসন ত্যাগ করিয়া উঠিল। কিন্তু যথায় খড়্গরক্ষণ করিয়াছিল তথায় খড়্গ পাইল না। আশ্চর্য্য! কাপালিক কিছু বিস্মিত হইল। তাহার নিশ্চিত স্মরণ ছিল যে অপরাহ্নে খড়্গ আনিয়া উপযুক্ত স্থানে রাখিয়া ছিল এবং স্থানান্তরও করে নাই, তবে খড়্গ কোথায় গেল? কাপালিক ইতস্ততঃ অনুসন্ধান করিল। কোথাও পাইল না। তখন পূর্ব্ব কথিত কুটীরাভিমুখ হইয়া কপালকুণ্ডলাকে ডাকিল; কিন্তু পুনঃপুনঃ ডাকাতেও কপালকুণ্ডলা কোন উত্তর দিল না। তখন কাপালিকের চক্ষু লোহিত, ভ্রূযুগ আকুঞ্চিত হইল। দ্রুত পাদবিক্ষেপে গৃহাভিমুখে চলিল; এই অবকাশে বন্ধনলতা ছিন্ন করিতে নবকুমার আর এক বার যত্ন পাইলেন—কিন্তু সে যত্নও নিষ্ফল হইল।

এমত সময়ে নিকটে বালুকার উপর অতি কোমল পদধ্বনি হইল—এ পদধ্বনি কাপালিকের নহে। নবকুমার নয়ন ফিরাইয়া দেখিলেন সেই মোহিনী—কপালকুণ্ডলা। তাঁহার করে খড়্গ দুলিতেছে।

কপালকুণ্ডলা কহিলেন “চুপ! কথা কহিও না—খড়্গ আমারই কাছে—চুরি করিয়া রাখিয়াছি।”

এই বলিয়া কপালকুণ্ডলা অতি শীঘ্র হস্তে নবকুমারের লতাবন্ধন খড়্গ দ্বারা ছেদন করিতে লাগিলেন। নিমেষ মধ্যে তাহাকে মুক্ত করিলেন। কহিলেন, “পলায়ন কর; আমার পশ্চাৎ আইস, পথ দেখাইয়া দিতেছি।”

এই বলিয়া কপালকুণ্ডলা তীরের ন্যায় বেগে পথ দেখাইয়া চলিলেন। নবকুমার লম্ফদান করিয়া তাঁহার পশ্চাৎ অনুসরণ করিলেন।

চতুর্থ খণ্ড · সপ্তম পরিচ্ছেদ

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

পুনরালাপে।

তদ্গচ্ছ সিদ্ধৈ কুৰু দেবকার্য্যম্।

<div class="wst-right" style="margin-right:কুমারসম্ভব। ;">

কাপালিক আসন গ্রহণ করিয়া দুই বাহু নবকুমারকে দেখাইলেন। নবকুমার দেখিলেন যে উভয় বাহু ভগ্ন।

পাঠক মহাশয়ের স্মরণ থাকিতে পারে যে, যে রাত্রে কপালকুণ্ডলার সহিত নবকুমার সমুদ্রতীর হইতে পলায়ন করেন, সেই রাত্রে তাঁহাদিগের অন্বেষণ করিতে করিতে কাপালিক বালিয়াড়ির শিখরচ্যুত হইয়া পড়িয়া যান। পতনকালে দুই হস্তে ভূমি ধারণ করিয়া শরীর রক্ষা করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন তাহাতে শরীর রক্ষণ হইল বটে কিন্তু দুইটী হস্ত ভাঙ্গিয়া গেল। কাপালিক এ সকল বৃত্তান্ত নবকুমারের নিকট বিবরিত করিয়া কহিলেন, “বাহু দ্বারা নিত্যক্রিয়া সকল নির্ব্বাহের কোন বিশেষ বিঘ্ন হয় না। কিন্তু ইহাতে আর কিছু মাত্র বল নাই। এমত কি ইহার দ্বারা কাষ্ঠাহরণে কষ্ট হয়।”

পরে কহিতে লাগিলেন “ভূপতিত হইয়াই যে আমি জানিতে পারিয়াছিলাম যে আমার করদ্বয় ভগ্ন হইয়াছে আর আর অঙ্গ অভগ্ন আছে এমত নহে। আমি পতনমাত্র মুর্চ্ছিত হইয়াছিলাম। প্রথমে অবিচ্ছেদে অজ্ঞানাবস্থায় ছিলাম। পরে ক্ষণে জ্ঞান, ক্ষণে অজ্ঞান রহিলাম। কয় দিন যে আমি এ অবস্থায় রহিলাম তাহা বলিতে পারি না। বোধ হয় দুই রাত্রি এক দিন হইবে। প্রভাত কালে আমার সংজ্ঞা সম্পূর্ণরূপে পুনরাবির্ভূত হইল। তাহার অব্যবহিত পূর্ব্বেই আমি এক স্বপ্ন দেখিতেছিলাম। যেন ভবানী” বলিতে বলিতে কাপালিকের শরীর রোমাঞ্চিত হইল। “যেন ভবানী আসিয়া আমার প্রত্যক্ষীভূত হইয়াছেন। ভ্রূকুটি করিয়া আমায় তাড়না করিতেছেন; কহিতেছেন “রে দুরাচার, তোরই চিত্তাশুদ্ধি হেতু আমার পূজার এ বিঘ্ন জন্মাইয়াছে। তুই এপর্য্যন্ত ইন্দ্রিয়লালসায় বদ্ধ হইয়া এই কুমারীর শোণিতে এত দিন আমার পূজা করিস নাই। অতএব এই কুমারী হইতেই তোর পূর্ব্বকৃত্য ফল বিনষ্ট হইল। আমি তোর নিকট আর কখন পূজা গ্রহণ করিব না।” তখন আমি রোদন করিয়া জননীর চরণে অবলুণ্ঠিত হইলে তিনি প্রসন্ন হইয়া কহিলেন “ভদ্র! ইহার একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত বিধান করিব। সেই কপালকুণ্ডলাকে আমার নিকট বলি দিবা। যত দিন না পার আমার পূজা করিও না।”

কতদিনে বা কি প্রকারে আমি আরোগ্য প্রাপ্ত হইলাম তাহা আমার বর্ণিত করিবার প্রয়োজন নাই। কালে আরোগ্য পাইয়া দেবীর আজ্ঞা পালন করিবার চেষ্টা আরম্ভ করিলাম। দেখিলাম যে এই বাহুদ্বয়ে শিশুর বলও নাই। বাহুবল ব্যতীত এ যত্ন সফল হইবার নহে। অতএব ইহাতে এক জন সহচারী আবশ্যক হইল। কিন্তু মনুষ্যবর্গ ধর্ম্মে অল্পমতি—বিশেষ কলির প্রাবল্যে যবন রাজা; পাপাত্মক রাজশাসনের ভয়ে কেহই এমত কার্য্যে সহচর হয় না। বহু সন্ধানে আমি পাপীয়সীর আবাস স্থান জানিতে পারিয়াছি। কিন্তু বাহুবলের অভাব হেতু ভবানীর আজ্ঞা পালন করিতে পারি নাই। কেবল মানস সিদ্ধির জন্য তন্ত্রের বিধানানুসারে ক্রিয়াকলাপ করিয়া থাকি মাত্র। কল্য রাত্রে নিকটস্থ বনে হোম করিতেছিলাম স্বচক্ষে দেখিলাম কপালকুণ্ডলার সহিত এক ব্রাহ্মণকুমারের মিলন হইল। অদ্যও সে তাহার সাক্ষাতে যাইতেছে। দেখিতে চাহ আমার সহিত আইস দেখাইব।

বৎস! কপালকুণ্ডলা বধযোগ্যা—আমি ভবানীর আজ্ঞা ক্রমে তাহাকে বধ করিব। সেও তোমার নিকট বিশ্বাসঘাতিনী, তোমারও বধযোগ্যা; অতএব তুমি আমাকে সে সাহায্য প্রদান কর। এই অবিশ্বাসিনীকে ধৃত করিয়া আমার সহিত যজ্ঞস্থানে লইয়া চল। তথায় স্বহস্তে ইহাকে বলিদান কর। ইহাতে ঈশ্বরীর সমীপে যে অপরাধ করিয়াছ, তাহার মার্জ্জনা হইবে; পবিত্র কর্ম্মে অক্ষয় পুণ্য সঞ্চার হইবে, বিশ্বাসঘাতিনীর দণ্ড হইবে; প্রতিশোধের চরম হইবে।”

কাপালিক বাক্য সমাপ্ত করিলেন। নবকুমার কিছুই উত্তর করিলেন না। কাপালিক তাঁহাকে নীরব দেখিয়া কহিলেন, “বৎস! এক্ষণে যাহা দেখাইব বলিয়াছিলাম, তাহা দেখিবে চল।”

নবকুমার ঘর্ম্মাক্তকলেবর হইয়া কাপালিকের সঙ্গে চলিলেন।

তৃতীয় খণ্ড · সপ্তম পরিচ্ছেদ

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

উপনগরপ্রান্তে।

কক্ষ্যান্তরে গিয়া লুৎফ-উন্নিসা দ্বার ৰুদ্ধ করিলেন। দুই দিন পর্য্যন্ত সেই কক্ষ্যা হইতে নির্গত হইলেন না। এই দুই দিনে তিনি নিজ কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্য স্থির করিলেন। স্থির করিয়া দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইলেন। সূর্য অস্তাচলগামী। তখন লুংফ্-উন্নিসা পেষ্‌মনের সাহায্যে বেশভূষা করিতেছিলেন। আশ্চর্য্য বেশভূষা! পেশওয়াজ নাই—পায়জামা নাই—ওড়না নাই; রমণীবেশের কিছু মাত্র চিহ্ন নাই। যে বেশভূষা করিলেন, তাহা মুকুরে দেখিয়া পেষ্‌মন্‌কে কহিলেন, “কেমন, পেষ্‌মন, আর আমাকে চেনা যায়?”

পেষ্‌মন কহিল “কার সাধ্য?”

লু। “তবে আমি চলিলাম। আমার সঙ্গে যেন কোন দাস দাসী না যায়।”

পেষ্‌মন কিছু শঙ্কুচিতচিত্তে কহিল, “যদি দাসীর অপরাধ ক্ষমা করেন, তবে একটী কথা জিজ্ঞাসা করি।” লুৎফ্-উন্নিসা কহিলেন, “কি?”। পেষ্‌মন কহিল, “আপনার উদ্দেশ্য কি?”

লুৎফ্-উন্নিসা কহিলেন, “আপাততঃ কপালকুণ্ডলার সহিত স্বামীর চিরবিচ্ছেদ। পরে তিনি আমার হইবেন।”

পে। “বিবি! ভাল করিয়া বিবেচনা কৰুন; সে নিবিড় বন, রাত্রি আগত; আপনি একাকিনী।”

লুৎফ্-উন্নিসা এ কথার কোন উত্তর না করিয়া গৃহ হইতে বহির্গতা হইলেন। সপ্তগ্রামের যে জনহীন বনময় উপনগর প্রান্তে নবকুমারের বসতি, সেই দিকে চলিলেন। তৎপ্রদেশে উপনীত হইতে রাত্রি হইয়া আসিল। নবকুমারের বাটীর অনতিদূরে এক নিবিড় বন আছে, পাঠক মহাশয়ের স্মরণ হইতে পারে। তাহারই প্রান্তভাগে উপনীত হইয়া এক বৃক্ষতলে উপবেশন করিলেন। কিছু কাল বসিয়া যে দুঃসাহসিক কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন তদ্বিষয়ে চিন্তা করিতে লাগিলেন। ঘটনাক্রমে তাঁহার অননুভূতপূর্ব্ব সহায় উপস্থিত হইল।

লুৎফ্-উন্নিসা যথায় বসিয়াছিলেন, তথা হইতে এক অনবরত সমানোচ্চারিত মনুষ্যকণ্ঠনির্গত শব্দ শুনিতে পাইলেন। উঠিয়া দাঁড়াইয়া চারি দিক্ চাহিয়া দেখিলেন যে, বন মধ্যে একটী আলো দেখা যাইতেছে। লুৎফ্-উন্নিসা সাহসে পুৰুষের অধিক, যথায় আলো জ্বলিতেছে সেই স্থানে গেলেন। প্রথমে বৃক্ষান্তরাল হইতে দেখিলেন ব্যাপার কি? দেখিলেন যে, যে আলো জ্বলিতে ছিল, সে হোমের আলো; যে শব্দ শুনিতে পাইয়াছিলেন সে মন্ত্রপাঠের শব্দ। মন্ত্র মধ্যে একটী শব্দ বুঝিতে পারিলেন, সে একটী নাম। নাম শুনিবামাত্র লুৎফ-উন্নিসা হোমকারীর নিকট গিয়া বসিলেন।

এক্ষণে তিনি তথায় বসিয়া থাকুন, পাঠক মহাশয় বহুকাল কপালকুণ্ডলার কোন সম্বাদ পান নাই, সুতরাং কপালকুণ্ডলার সম্বাদ আবশ্যক হইয়াছে।

তৃতীয়ঃ খণ্ডঃ সমাপ্তঃ।

প্রথম খণ্ড · সপ্তম পরিচ্ছেদ

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

অন্বেষণে।

এ দিকে কাপালিক গৃহ মধ্যে তন্ন তন্ন করিয়া অনুসন্ধান করিয়া না খড়্গ না কপালকুণ্ডলাকে দেখিতে পাইয়া সন্দিগ্ধচিত্তে সৈকতে প্রত্যাবর্ত্তন করিল। তথায় আসিয়া দেখিল যে নবকুমার তথায় নাই। ইহাতে অত্যন্ত বিস্ময় জন্মিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরেই ছিন্ন লতা বন্ধনের উপর দৃষ্টি পড়িল। তখন স্বরূপ অনুভূত করিতে পারিয়া কাপালিক নবকুমারের অন্বেষণে ধাবিত হইল। কিন্তু বিজন মধ্যে পলাতকেরা কোন্ দিকে কোন্ পথে গিয়াছে তাহা স্থির করা দুঃসাধ্য। অন্ধকারবশতঃ কাহাকে দৃষ্টিপথবর্ত্তী করিতে পারিল না। এজন্য বাক্য শব্দ লক্ষ্য করিয়া ক্ষণেক ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিল। কিন্তু সকল সময়ে কণ্ঠধ্বনিও শুনিতে পাওয়া গেল না। অতএব বিশেষ করিয়া চারি দিক্ পর্য্যবেক্ষণ করার অভিপ্রায়ে এক উচ্চ বালিয়াড়ির শিখরে উঠিল। কাপালিক এক পার্শ্ব দিয়া উঠিল; তাহার অন্যতর পার্শ্বে বর্ষার জলপ্রবাহে স্তূপমূল ক্ষয়িত হইয়াছিল তাহা সে জানিত না। শিখরে আরোহণ করিবামাত্র কাপালিকের শরীরভরে সেই পতনোন্মুখ স্তূপশিখর ভগ্ন হইয়া অতি ঘোররবে ভূপতিত হইল। পতনকালে পর্ব্বতশিখরচ্যুত মহিষের ন্যায় কাপালিকও তৎসঙ্গে পড়িয়া গেল।