বই পড়া

বই পড়া

বই পড়া কঠিন কাজ। স্কুলে ভর্তি হওয়ামাত্র মানবশিশু ইহা টের পাইয়া যায়। প্রথমে পড়তে হয়, তারপর আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। ফেল করিতেও হয়। বাস্তববুদ্ধিঅলারা শুরু থেকেই তাই বই না পড়িবার হাজারটা ফন্দি বাহির করিয়া লয়। নিজেকে মুক্ত করিবার লড়াইয়ে নামিয়া তাহারা প্রায়শই জিতিয়া যায়। যাহারা তাহা পারে না, উহারা বই পড়িবার চক্রে বন্দি হইয়া যায়। সেইসব হতভাগা বন্দিদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এই লেখা শুরু করছি।

 বই একটি সম্ভ্রান্ত ঘরানার শব্দ। শিল্পের জগতে জাতে ওঠার সহজ সিঁড়ি এই বই। এই যে, ফেসবুক নিজেও নামের সাথে বুক জুড়ে দিয়েছে, ফেসগেম বা ফেসফান বা ফেসটিভি নাম না রেখে, এর কারণও সেই, বই শব্দটির ভেতরে যে অনির্ণেয় শক্তি রয়েছে এটা ফেসবুক কাজে লাগাতে চায়।

আমরা অবশ্য বই নয়, বই পড়া নিয়ে কথা বলতে চাই আজ। বই পড়া। বই পড়া। বই পড়া। আমি নিজে অতি ধীরগতিতে বই পড়ি। ঢিমে তালে। আগে সব কাজ ফেলে রেখে একটানা পড়তাম। এখন আর তা হয় না।

যারা দ্রুত পড়েন, তারা জানেন, দ্রুত পড়লে সংখ্যায় বেশি বই পড়া যায়। আমার বই পড়া আজকাল তাই সংখ্যার হিসেবে তত এগোয় না। যে বইটা পড়ি, ভালো লাগে বলেই পড়ি, এক বসায় সেটার কয়েকটা মাত্র পাতা পড়ি, অনেকক্ষণ ধরে পড়ি। বইয়ে দাগ দিই। এটা সেটা মার্জিনে লিখে রাখি। পড়তে পড়তে অন্যমনস্ক হয়ে যাই। যাইই। অতলে, অধরায়।

বই পড়তে পড়তে ভাবনার অন্যভুবনে যাওয়াটা সম্ভবত আমাদের সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর একটা। এটা একটা কারণ যে জন্যে আমি বই পড়া অপছন্দ করতে পারি না। মাথার ভেতরে কী এক অনুভূতি হয়। পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে নোটবুকেও সেই পড়া নিয়ে লিখে রাখি।

সেদিন পড়ছিলাম, বুনোকুলির রক্তবীজ। খালিদ মারুফের উপন্যাস। এক জায়গায় পড়লাম, ‘অসময়ের সে বাতাসে কচি বাঁশের শরীরে জড়িয়ে থাকা শুকনো খোলসেরা সুতোছেঁড়া ঘুড়ির মতোই উড়ে যায় এদিক-সেদিক’। মনটা থ হয়ে রইল। আজকে সকালে দুতিনবার মনে এসেছে বাক্যটা। এই মনে আসাটা ভালো লাগে আমার। এই জন্যেও মনে হয় আমি ধীরে বই পড়ি। খেয়াল করতে পারি যেন। রোমন্থনের মতো সুখ আমাকে যেন ঘিরে ফেলে পুনর্বার। বইয়ের জাত আছে। পড়ুয়ারও।

সতীনাথ ভাদুড়ী পড়লে যে মর্যাদা, হুমায়ূন আহমেদ পড়লে উহা ভূলুণ্ঠিত হইয়া যাবে। আজকাল, কোথাও কোথাও হুমায়ূন তবুও চলে, মিলন বা আনিসুল হক হলে মাটির তলার গর্তে গিয়ে ঠেকবে পাঠক মর্যাদা। মর্যাদার জন্যে পড়ার একটা বয়স আছে। সেটা পার হবার পর, মানুষ প্রথমবারের মতো প্রিয় লেখা পড়ার ফুরসত পায়।

সতীনাথ ভাদুড়ী পড়তে গিয়ে গভীর আনন্দ পেয়েছি, এই কথা বলতে তখন আর গৌরব গৌরব লাগে না। কিংবা মুহম্মদ জাফর ইকবাল পড়তে তো এখনো মজা লাগে বললে লজ্জাও লাগবে না। এই দশাটা আরামের। কারও মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। ভালোই ব্যাপারটা। তখন মনে হয়, বই পড়া যায়। নিজের জন্যে দু-একটা কাজ করি না কেন, ক্ষতি কী।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটা কথা প্রায়ই বলেন, বই পড়া হেলাফেলার কাজ না। তিনি বলেন, ব্রাহ্মণরা এক নম্বরে কেন? শূদ্র, ক্ষত্রিয় বা বৈশ্যরা কোন কাজটা পারে না, যেটা ব্রাহ্মণরা করে? বই পড়া। শুধুমাত্র ব্রাহ্মণরাই পড়তে পারত। অন্যরা ধর্মগ্রন্থ পড়তে গেলেও সেকালের বিধানে সেটা ছিল মহাপাপ। বই পড়া ঐতিহাসিকভাবেই মামুলি কাজ নয়। বেশির ভাগ মানুষই বই পড়ে না। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এক সাক্ষাৎকারে পড়লাম সেদিন, তিনি নাকি ইদানীং আর বই পড়েনই না। লেখার সময় বাদ দিলে পড়ার জন্যে আলাদা করে সময় পান না। লেখেন তাই পড়তে পারেন কম। হয়তো বই পড়তে ভালোও লাগে না আর।

জগতে এরকম লেখক কম নেই, যারা পড়েন কম। নতুন বলেন, আমি পড়ি কম, যাতে অন্যের কাছ থেকে ভুলে আবার না কিছু নিয়ে নিই, নিজের মতো লিখতে চাই, তাই অন্যকে পড়ি না। পুরাতন বলেন, সেই একই কারণেই আমি বই বেশি বেশি পড়ি। যাতে অন্যের মতো না হয়ে যাই। নানা সব কারণ লোকের। যাই হোক, পড়াশেষে সেই সব বই নিয়ে কথা তুললে, বইয়ের কথা জানা হয় বেশ।

আমাদের ছোটবেলায় বিভিন্ন রকম বইয়ের কথা লেখকদের লেখা থেকেই জানতাম। হুমায়ূন থেকে জেনেছি সবচেয়ে বেশি। হুমায়ূনের বই পড়া লেখার মধ্যে চলে আসত বারবার। এটি খুব ভালো কাজ কি না তা নিয়ে তর্ক আছে। থাকুক। তবে, আমার বেশ উপকার হতো সেসবে। আর হুমায়ূন পড়তেও পারতেন। ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্যে শেষবার যখন ঢাকা ছাড়ছেন, তখনকার এক ছবিতে তাকে দেখলাম। হাতে সিদ্ধার্থ মুখার্জির The Emperor of All Maladies: A Biography of Cancer বইটা। খোঁজ খবর করে দেখি, বইটা আগ্রহ জাগানিয়া। জোগাড় করে পড়ে হুমায়ূনের প্রতি মৌনকৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাখলাম।

এইসব শুভকথা মৌনরথেই তার কাছে যায় নিশ্চয়ই। জানার জন্যেই মনে হয় সবচেয়ে বেশি মানুষ বই পড়ে। আনন্দের জন্যে পড়ে কেউ কেউ। ভালো লাগার জন্যে পড়েন অন্যেরা। দু-একজন হয়তো এরকম পাওয়া যাবে, অভ্যাসে বই পড়েন।

কেউ কি এরকম নাই, দেখানোর জন্যে বা জানানোর জন্যে বই পড়েন? কিংবা বই পড়াটাই তার পেশা। শিক্ষক, গবেষক বা এডিটর। বুক রিভিউ লিখে পেট চালান হয়তো। এই কালে এতো কিছু নিয়ে বই আছে দুনিয়ায়, এতো রকম বই আছে, বই পড়লে ভালো হয় জাতীয় প্রাচীন চিন্তা এখন আর ততটা সত্য নয়। বা বলা যায়, শুরু থেকেই এটা আংশিক অকার্যকর। ভালো মন্দের বাইরে চলে এসেছে এইসব বহুকিছু।

সব রকম বই আছে। বই পড়ে সব রকম মানুষই তৈরি হয়। আমার মতো সনাতনেরা হয়তো তা নাও মানতে পারেন, তবে প্রমাণ সব বিরুদ্ধেই যাবে। বই পড়া লোকেরাই এই ধ্বংসের পৃথিবীটা চালায়। আমার মেয়ে বই পড়ে। আমার ছাত্ররাও। আমার শিক্ষকেরাও। বন্ধুরা অনেকেই। যারা বই পড়ে, তাদের যে একটা ভেতরের ভুবন থাকে এইরকম একটা কথা আছে না, সেই ভুবনে আমার মনে হয় তারা খুব নিঃসঙ্গ। সেই ভুবনটাই এরকম। সেটা একার ভুবন। বই পড়ে যারা, তাদের কারও কারও একার ভুবন খুব মজবুত হয়। বই না-পড়ারা অল্পই সেই শক্তি পায়। যেহেতু সেটা কেড়ে নেবার শক্তি নহে, জগতও তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। সেইসব বই পড়ারা সেই একার ভুবনেই থাকেন বেশি। মাঝে মাঝে পৃথিবীতে আসেন তারা। মাঝে মাঝে।

লেখক : ইফতেখার মাহমুদ,  সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ।

এখানে মন্তব্য করুন :