ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রাম ও একটি অলিভ গাছ

ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রাম ও একটি অলিভ গাছ

আল বাদাওয়ি ফিলিস্তিনিদের প্রেরণার প্রতীক। ছবি : স্টপ দ‌্য ওয়াল

ফিলিস্তিনের বেথেলহাম থেকে চার কিলোমিটার উত্তরপূর্বদিকের একটি গ্রাম আল-ওয়ালাজা। গ্রামটি একসময় ফিলিস্তিনের সবচেয়ে সুন্দর গ্রামের সুখ্যাতি কুড়িয়েছিল। এই গ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্যকে আরো সমৃদ্ধ করেছে একটি অলিভ গাছ। যাকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন বৃক্ষ না হলেও, অন্যতম প্রাচীন বৃক্ষ বলা যায়।

আল-বাদাওয়ি নামে অলিভ গাছটি আদিম পৃথিবী, মানবসভ্যতা, অতীত থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ফিলিস্তিন ও এর মানুষের ইতিহাসের দিনলিপি এবং মহাকালে হারিয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষের স্মৃতি বিজড়িত। ফিলিস্তিনের কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, অন্তত চার হাজার বছর বয়স আল-বাদাওয়ি’র। কেউ কেউ দাবি করে গাছটি সাড়ে পাঁচ হাজার বছর পুরনো। 

আল-ওয়ালাজা গ্রামটি একসময় ফিলিস্তিনের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম ছিল। ছবি : উইকিপিডিয়া

গাছটির নামকরণ আল ওয়ালাজা গ্রামের বিজ্ঞ বাসিন্দা আহমদ আল বাদাওয়ি’র নামে।  দুইশ বছর পূর্বে  আল বাদাওয়িকে প্রায়ই দেখা যেত গাছের নিচে ঘণ্টার ঘণ্টার চোখ বুজে বসে আছেন, আর কী যেন ভাবছেন। কথিত আছে, এই গাছের ফল অন্য গাছের মতো নয়, আকারে বড়, যে তেল হয় তা পৃথিবীর অন্যতম সেরা। গাছটি লম্বায়  ৩৯ ফুট, পাশে ৮২ ফুট প্রশস্ত। গড়পড়তা ১০ টি গাছ জুড়লে বেড়ে গাছটির সমান হবে। ইসরাইল ও পশ্চিম তীরের মাঝে গ্রিনজোন নামে যে সীমারেখা তার কয়েকমিটার দূরেই গাছটির অবস্থান।

ফিলিস্তিনের অন্যতম লাভজনক ফসল হচ্ছে অলিভ। তাই পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার ৪৫ শতাংশ জমিতে অলিভের চাষ হয়ে থাকে। এক লাখ পরিবারের  জীবিকা নির্বাহ হয় এর মাধ্যমে।

বিভিন্ন সময়ে আরব ও ইসরাইলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখা দিলে এর সরাসরি রেশ এসে পড়ে ভূখন্ড আর এর বুকের অলিভের ডালে-শিকড়ে। ১৯৬৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার অলিভ গাছ সমূলে উৎপাটন করেছে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা।

ইসরাইলি দেওয়াল প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে। ছবি : স্টপ দ‌‌্য ওয়াল

১৯৪৮ সালের  আরব-ইসরাইল যুদ্ধের আগে আল বাদওয়ি’র তলে হতো ভোজ উৎসব। বিশাল রান্নাবান্না হতো। আগে গরীব-দু:খীদের মাঝে খাবার  বিলিয়ে তারপর  গ্রামের লোকজন খাবার নিয়ে বসত গাছের নিচে। হাসিআনন্দে খাবার ভাগাভাগি করে খেত সবাই। যুদ্ধের পর  গ্রামটির প্রায় ৭০ ভাগ দখলে নেয় ইসরাইল। একসময়কার সমৃদ্ধশালী গ্রামটির জৌলুস ক্রমেই কমতে থাকে। বাসিন্দারা এখন বিশুদ্ধ খাবার পানি, উন্নত পয়োনিষ্কাশনের ঘাটতিসহ বিদ্যুৎ সমস্যায় ভুগছে।

ফিলিস্তিনে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গোলাগুলির মধ্যেও এক চিলতে উৎসবের আনন্দ নিয়ে আসে অলিভ পাড়ার মৌসুম। গ্রামের ছেলেমেয়েরা যারা পড়তে বা অন্য কোনো কাজে গ্রামের বাইরে থাকেন,  পূর্ণবয়স্ক নারী-পুরুষ যারা জীবিকার জন্য দূরে থাকেন, তারা সকলেই ছুটে আসেন ফসল তোলার সময় । গেট টুগেদারের  মতো হয় তখন।

সাধারণত মধ্য অক্টোবর থেকে নভেম্বরের শুরুটা ফসল তোলার সময়। দেখা যায়, এই সময়ে গ্রামের আদি বাসিন্দারা সবাই ফসল কুড়াতে হাজির। ডুলা, টুকরি নিয়ে সবাই একত্রে মিলেমিশে অলিভ পারছে, মাটিতে ঝরে পড়া অলিভ কুড়াচ্ছে, টুকরিতে ভরছে। অলিভ কুড়োতে কুড়োতে সইয়েরা কোনো কথায় সলজ্জে হাসছে। বৃদ্ধরা আচমকা হো হো হাসিতে ফেটে পড়ছে।  কৌতুহলী চোখে অন্যরা ঘাড় নেড়ে তাকায়। এ যেন ফসল কুড়োনোর সঙ্গে সঙ্গে ভাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ। 

ফিলিস্তিনিদের এই সুখ ক্ষণস্থায়ী। সেনা সদস্য ও ইহুদি বসতিস্থাপনকারীরা অলিভের মৌসুমে প্রায়ই এসে হামলা করে, অলিভ ছিনিয়ে নেয়, কেটে ফেলে গাছের ডালপালা। ব্যাহত হয় ফসল তোলা। 

নিরাপদে ফসল তুলতে ভিন্ন উপায় বের করে ফিলিস্তিনি তরুণপ্রজন্ম। তারা জনমত গঠন করে, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে হাজির করে ‘আন্তর্জাতিক বেসরকারি শান্তিরক্ষী’। কয়েক দশক ধরে ফসল তোলার মৌসুমে কয়েকশ স্বেচ্ছাসেবী উপস্থিত থাকে ফিলিস্তিনের গ্রামে গ্রামে। তাদের কেউ শিক্ষক, কেউ নর্তকী, কেউ প্রকৌশলী, কেউবা ছাত্র, থাকে অধিকার আদায়ের কর্মীরাও।

স্থানীয় চাষিদের সঙ্গে ওরাও মাঠে যায়, ফসল তুলে।  ওদের দেখলে বাধা দিতে আসে না সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা। আমেরিকান, ব্রিটিশ বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবীদের সামনে ভাবমূর্তি  ক্ষুণœ হবার ভয়ে হামলা হয় না।  স্বেচ্ছাসেবীরা কানে হেডফোন দিয়ে আরবি পপ গান ছেড়ে শোনে। এরসঙ্গে নেচে-গেয়ে ফসল তুলে।

কালের স্বাক্ষী আল-বাদাওয়ি। ছবি : ছবি : স্টপ দ‌‌্য ওয়াল

৫২ বছর বয়সী কাফর কাদ্দুম জানালেন, ‘একবার কিছু ব্রিটিশ স্বেচ্ছাসেবী সাথে করে গেলাম ইসরাইলের ভেতরে আমার ফসল তুলতে। গিয়ে দেখি, আমার ২০ টি গাছ কাটা। এতো কষ্ট লাগছে। মনে হলো, কেউ যেন আমার সামনে আমার সন্তানের গলায় ছুরি চালিয়েছে। আমি তো এই গাছ ছেড়ে কোথাও যেতে পারি না।  এই জমি আমার নিজের সন্তানের মতোই প্রিয়। কখনো কখনো কী মনে হয় জানো, ইস! যদি এই জমি উত্তরাধিকার সূত্রে আমি না পেতাম, তা হলে এসব অসহ্য ঘটনা আমার সহ্য করতে হতো না। ’

অলিভ গাছের জন্য প্রখর সূর্যের আলো ও উত্তাপ প্রয়োজন। লাগে বালুময় পাথুরে মাটি। দরকার তিন মাসের শীত। সবকিছু মিলিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা হলো অলিভ গাছের অনুকূল পরিবেশ। গাছগুলোর গড় আয়ু ৫০০ বছর। তবে বিশ্বের নানা প্রান্তে এখনো ১৫০০ থেকে দুই হাজার বছর পুরনো কিছু অলিভ গাছ রয়েছে।

অলিভ গাছকে রুক্ষ কঠিন প্রান্তরে অপরাজেয় মানবজীবনের প্রতীক মনে করা যেতে পারে। দিনের পর দিন পানির অভাবে, প্রখর সূর্যের তাপে অন্যান্য প্রাণী ও গাছপালা মরে যায়। কিন্তু বীরদর্পে ডালপালা ছড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে অলিভ বৃক্ষ।

গাছটি তখন শুধু গাছ-ই থাকে না কালের সাক্ষী হয়ে যায়।  ফিলিস্তিনের একেকটি অলিভ গাছ একেকটি পরিবারের, একেকটি গোষ্ঠী ও গ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, আত্মপরিচয় বহন করে চলেছে। উত্তপ্ত মরুভূমির রুক্ষ প্রকৃতিতে সগর্বে বেঁচে থাকার সংগ্রাম যেন ফিলিস্তিনিদেরই সংগ্রামের নামান্তর। অলিভ ফিলিস্তিনকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ভিত্তিই  দেয়নি, এটি সংগ্রাম ও আশার আলোও দেখায়।

তাইতো ফিলিস্তিনিরারা যখন অলিভ গাছের কথা বলে তাদের দুই চোখ ভেসে বেড়ায় স্বপ্ন আর গর্ব। যেমনটা আমরা পাই আল-বাদাওয়ি গাছেরর পরিচর্যাকারী সালাহ আবু আলীর কন্ঠে। গাছের ঠিক মাঝখানে বসে কিছুক্ষণ তন্ময় থেকে বলেন, এই যে মাটি, এখানে আছে আমার ভাইয়ের রক্ত, আমার পূর্বপুরুষের রক্ত। এই গাছ আমাদের ঐক্যের প্রতীক। আমরা সারাজীবনঐক্যবদ্ধ থাকব।

ইয়াসির আরাফাত। ছবি: অপসিংভিউজ

ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের কিংবদন্তী নেতা ইয়াসির আরাফাত ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে ভাষণ দেন। বাংলাদেশও সেবার জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ইয়াসির আরাফাত জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে  অভিবাদন জানিয়েছিলেন। দীর্ঘ আবেগি বক্তৃতার শেষে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছি এক হাতে অলিভের একটি ডাল নিয়ে, আমার অন্য হাতে মুক্তিযোদ্ধার অস্ত্র। আমার হাত থেকে অলিভের ডালটি পড়তে দেবেন না।’

আল বাদাওয়া অলিভ গাছের মতো ফিলিস্তিনিদের মুক্তিসংগ্রামও দীর্ঘজীবী হোক।

সূত্র: টাইম ম্যাগাজিন, উইকিপিডিয়া ও জাতিসংঘের ওয়েবসাইট।

লেখক : পলাশ সরকার

এখানে মন্তব্য করুন :