চলচ্চিত্র শিল্পে কিংবদন্তী, ফটোগ্রাফার হিসেবে অসফল

চলচ্চিত্র শিল্পে কিংবদন্তী,  ফটোগ্রাফার হিসেবে অসফল

`ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক ধুনদিরাজ গোবিন্দ ফালকে’ বাক্যটি পড়ার সাথে সাথে কারো কারো কপাল কুঁচকে যেতে পারে, প্রশ্ন  জাগতে পারে, তিনি কে?

আবার যদি এভাবে বলা হয়, দাদাসাহেব ফালকে ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক। সঙ্গে সঙ্গে আগের সেই কুচকানো কপাল মসৃণ হয়ে যাবে, এক মুহূর্তও লাগবে না বুঝতে, কাকে নিয়ে কথা হচ্ছে।

মনে হবে, ও আচ্ছা তার নামেই তো ভারতে চালু আছে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তার নামে চালু পুরস্কারে প্রতিবছর শিল্পিদের সম্মানিত করে ভারত সরকার। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, সেই ১৯১৩ সালে আরো একটি সৃষ্টিকর্ম ভারতবর্ষকে বিপুল সম্মান এনে দেয়।  দাদা সাহেবের হাত দিয়ে মুক্তি পায় প্রথম চলচ্চিত্র ‘রাজা হরিশচন্দ্র’। ভারতবর্ষের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ফিচার ফিল্ম হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই করে নিল রাজা হরিশচন্দ্র ।

চলচ্চিত্র নির্মাতা ছাড়াও আরো অনেক গুণে গুণান্বিত ছিলেন তিনি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, ফটোগ্রাফার ইত্যাদি। তার জীবনে সফলতা এমনি এমনি আসেনি। এর জন‌্য জীবনে অনেক ক্ষতি ও ত‌্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাকে পদে পদে।

ব্যতিক্রম ছিল না তার ফটোগ্রাফি জীবনটিও। দারুণ এক সংগ্রামুখর ছিল সেসব দিনগুলো।

বারোদার মহারাজা সায়াজি রাও বিশ্ববিদ্যালয়ে দাদা সাহেব তৈলচিত্র ও জলরং চিত্রের ওপর পড়াশোনা করেন ১৮৯০ সালের দিকে। স্থাপত্যকলা ও কাঠামো নির্মাণেও তিনি মুন্সিয়ানা দেখাতে থাকেন। একবার তার কাজে খুশি হয়ে এক অন্ধভক্ত তাকে একটি দামী ক্যামেরা উপহার দিয়েছিলেন। সেটা ১৮৯১/ ১৮৯২ সালের দিকের কথা। সেই যে ক্যামেরা ও ফটোগ্রাফির নেশা ঢুকলো তার রক্তে, সেই নেশা তাকে চালিত রাখে বহুদিন।

ফটোগ্রাফির কলাকৌশল সম্পর্কে জানতে তিনি এ জায়গা ও জায়গা চষে বেড়িয়েছেন। তখন তো আর এখনকার মতো এতো মিনি সাইজের ও  আধুনিক ক্যামেরা ছিল না। ক্যামেরায় ছিল না স্বয়ংক্রিয় সব ব্যবস্থা। আবার  বড়ভাই ও বন্ধুদের কাছ থেকে টিপস নেওয়া যাবে তেমন ‘বড় ভাই’ও ছিল হাতেগোনা। সবচেয়ে বড় কথা এখন যেমন সব কিছু ইউটিউব বা গুগলে সার্চ দিলেই পাওয়া যায় নিমিষেই, তখন ক্যামেরা ও ছবির টেকনিক্যাল বিষয়গুলো জানাটা  ছিল অনেক অনেক কঠিন কাজ। তারপরও তিনি চেষ্টাতদ্বির করে শিখে নিলেন ফটোগ্রাফি।

প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়বেন বলে মনস্থির করে ১৮৯৫ সালে পাড়ি জমালেন তিনি গোদরায়। তার পিছু নিয়ে এসেছিল অভাব অনটন আর ব্যক্তিগত দুর্ঘটনাও। ১৯০০ সালে ওই শহরে মহামারী প্লেগ হানা দেয়। এই মহামারী তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় স্ত্রী  ও এক সন্তানকে। ওদিকে ক‌্যারিয়ারও তাকে বঞ্চিত করেছে ভীষণভাবে।

ভাগ্য বিড়ম্বিত দাদা সাহেব আবার  বারোদায় ফিরে যান, আরো একবার চেষ্টা করে ভাগ‌্য ফেরানোর আশায়। এবারও দুর্ভাগা তার পিছু ছাড়েনি, সামনে আসল আরেক অভিনব সমস্যা। দাদা সাহেব  ফটোগ্রাফি শুরু করলে সারা শহরে  গুজব রটে যায় যে, ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার সময় দানবীয় যন্ত্রটি মানুষের জীবনিশক্তি শুষে নেয়, আর এভাবে সব শক্তি হারিয়ে মরে যায় মানুষ। 

দাদা সাহেব ফালকে স্বয়ং বারোদার রাজপুত্রের পক্ষ থেকেও বিরোধিতার সম্মুখীন হন।অনেকদিন ধরে দাদা সাহেব তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, ছবি তুললে কোনো সমস্যা হয় না। একটা সময় পর বারোদার প্রিন্স অবশ্য বিষয়টি বুঝতে সক্ষম হন। তিনি বুঝলে কী হবে, দাদা সাহেবের ফটোগ্রাফি ব্যবসায় তখন জ্বলে উঠে লালবাতি।

জীবিকার জন‌্য তিনি জীবনের গতিপথ বদলে শুরু করেন নতুন কাজ। না‌টদলগুলোর অভিনয়ের মঞ্চের পেছনে যে পর্দা থাকে সেখানে পেইন্টিং শুরু করেন।  নাট্যনির্মাণের বেশকিছু কলাকৌশল শিখে নেন তিনি এসময়ে। নাটকে ছোটখাটো কিছু চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগও ঘটে।

ভাগ্য তাকে বারবার বিতাড়িত করে শেষে তার জীবনের তরী ঠেলে নিয়ে যায় সিনেমার বন্দরে। সেই জীবনে তিনি অবশ্য সাফল্য আর সম্মান দুটোই পান। সেই গল্প আরেকদিন হবে।

লেখক : শাহাদাত হোসেন, সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এখানে মন্তব্য করুন :