প্রেমের জন্য সিংহাসন ছাড়েন প্রিন্স হ্যারির আরেক পূর্বপুরুষও

প্রেমের জন্য সিংহাসন ছাড়েন প্রিন্স হ্যারির আরেক পূর্বপুরুষও

রাজা এডওয়ার্ড ও ওয়ালিস। ছবি: নিউইয়র্ক পোস্ট

ভালোবাসার জন্য মানুষ কত কিছুই না করে। দু:সাহসী প্রেমিকরা ভালোবাসার মানুষের হৃদয় জয় করার জন্য বিশ্ব চরাচর ঘুরে খুঁজে আনেন ১০১ টি নীল পদ্ম, কেউ উন্মত্ত ষাঁড়ের মাথায় পরাক্রমের সঙ্গে পরিয়ে দেন লাল কাপড়। ভালোবাসার মানুষের জন্য যশ, খ্যাতি, অর্থ, প্রতিপত্তি ছেড়ে দেওয়ারও অনেক নজির রয়েছে।

আজ আমরা এমন এক রাজার কথা শুনব যিনি ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্নে বিভোর হয়ে স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করেছেন। পায়ে ঠেলে দিয়েছেন ঐশ্বর্য ও বিপুল ক্ষমতা। এমন নয়, কোনো অসাধারণ সুন্দরী রাজকন্যার যিনি তিনি এটা করেছেন, বরং সাধারণ এক গৃহবধূর জন্য ছেড়ে দিয়েছেন মহাপরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সিংহাসন।

তিনি হলেন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড, যুক্তরাজ্যের বর্তমান রানী এলিজাবেথের চাচা। চার্চা এডওয়ার্ডের ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি দেখতে পেলেন রানি এলিজাবেথ তার নাতি প্রিন্স হ্যারির জীবনেও। মেগান মের্কেলকে বিয়ে করে  প্রিন্স হ্যারি রাজপরিবারের উপাধি ও আর্থিক সুবিধাবাদি ত্যাগ করে সাধারণ এক মানুষের জীবন বেছে নিয়েছেন।

প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মের্কেল। ছবি : নিউইয়র্ক পোস্ট‌

যাকে নিয়ে রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের এতো কান্ড করেন তার নাম ওয়ালিস ওয়ারফিল্ড সিম্পসন, জাতে তিনি আমেরিকান। এডওয়ার্ড যখন তার প্রেমে মশগুল তখনো তিনি আরেকজনের স্ত্রী। তার স্বামী বিশিষ্ট আমেরিকান-ইংরেজ ব্যবসায়ী। তৎকালীন ধনিক শ্রেণিতে ওয়ালিস ওয়ারফিল্ড সৌখিন নারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু তার আর উল্লেখ করার মতো গুনাগুন চোখে পড়েনি ব্রিটিশদের। অবশ্য নিন্দুকরা ওয়ালিসের এর আগে এক আমেরিকান নেভি পাইলটের সঙ্গে বিয়ের খবরটি বেশ বড় করে প্রচার করতো।

রাজপুত্র এডওয়ার্ড একজন ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করে করবে এটা রাজপরিবারের লোকজন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি।  ওদিকে এডওয়ার্ড মনস্থির করেছেন, তিনি একান্তে বিষয়টি নিয়ে তার বাবা রাজা পঞ্চম জর্জের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলবেন। কিন্তু অদৃষ্টের লিখন, তার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

বাবার মৃত্যুর পর বড়ছেলে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবেন, বিষয়টি একপ্রকার ফয়সালা হওয়াই ছিল। এডওয়ার্ডকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরবর্তী রাজা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৩৭ সালের মে মাসে তার রাজা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনে অভিষেক হওয়ার দিনতারিখও ঠিক করা ছিল।

ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের রাজা এক সাধারণ গৃহবধূর প্রেমে মত্ত, সেকালের আমেরিকান ও ইউরোপীয় গণমাধ্যমের কাছে এই খবর ছিল হট কেকের মতো। ক্রমাগত এই ধরনের মুখরোচক খবরে রাজপরিবারের সুনাম ও মানমর্যাদা ধুলোর সাথে মিশে যাওয়ার মতো একটা অবস্থা দাঁড়ায়। মানসম্মান যাতে কিছুটা হলেও রক্ষা পায় সেজন্য ব্রিটিশ গণমাধ্যমের সঙ্গে রাজ পরিবারের গোপন আঁতাত হয় যে এসব খবর কোনোভাবেই ব্রিটিশ গণমাধ্যমে আসবে না। 

১৯৩৬ সালের ২৭ অক্টোবর মিসেস সিম্পসন ডিভোর্সের জন্য যে আবেদন করেছিলেন, সেটার প্রাথমিক আদেশ পেয়ে যান আদালতের কাছ থেকে। ওয়ালিস কেন স্বামীকে ডিভোর্স দিচ্ছেন, সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা রাজপরিবারের সদস্য ও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের বুঝতে বাকি রইলো না।

আর যাই হোক, দুই দুইবারের ডিভোর্সি কোনো নারী ব্রিটিশ সামাজ্র্যের রানি হতে পারেন না বলে এরই মধ্যে বেঁকে বসেছে ইংল্যাান্ডের প্রধান গির্জা ও  প্রধান প্রধান রাজনীতিবিদরা।  মোটামুটি ক্ষমতাশালীদের সবাই এই বিয়ের বিপক্ষে।

কিন্তু একজন রাজনীতিককে অবশ্য রাজা এডওয়ার্ড সেই কঠিন সময়ে পাশে পেয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন, কনজারভেটিভ দলের পেছনের সারির নেতা উইনস্টন চার্চিল। হ্যাঁ এই সেই চার্চিল যাকে ইতিহাস নিজের মতো করে সাজিয়ে রেখেছিল ভবিষ্যতে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হবার জন্য।

অষ্টম এডওয়ার্ড ও তার স্ত্রী

সমর্থন জানানোর মতো এডওয়ার্ড তার পাশে প্রভাবশালী কাউকে না পেয়ে নতুন একটি প্রস্তাব রাখেন। সেটি হলো উইলিসকে বিয়ে করলেও তিনি ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোনো সম্পত্তি বা মর্যাদার ভাগীদার হবেন না, তারপরেও যেন সবাই বিয়েটিতে সায় দেন। রাজা এডওয়ার্ডেও এই প্রস্তাবের সম্পূর্ণ বিরোধীতা করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্টেনলি বাল্ডউইন, তার এক কথা, এটি একটা অবাস্তব প্রস্তাব, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো না।

এতো দিন অনেক চেষ্টাতদ্বির করে রাজার এই অসম প্রেমের বিষয়টি লুকিয়ে রাখা গিয়েছিল, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ওই বিয়েতে বিরোধীতার পর আর মিডিয়াতে চেপে রাখা যায়নি। প্রায় সব কটি ব্রিটিশ গণমাধ্যম একযোগে বড় করে শিরোনাম দিয়ে রাজার প্রেমের গোপন  খবর ফাঁস করে দেয়। এই খবর প্রকাশ হবার পর যেন বিশাল একটি বিস্ফোরণ ঘটল। রাস্তার মোড়ে, পার্কে, দোকানে সব জায়গাই এটা নিয়েই আলোচনা হতে লাগল।

এই অবস্থায় রাজা এডওয়ার্ড সিংহাসন ত্যাগের ঘোষণা দিলেন। পার্লামেন্টও তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেয়।১৯৩৬ সালের ১১ ডিসেম্বর এডওয়ার্ড এক রেডিও ঘোষণাতে বলেন, আমি যাকে ভালোবাসি তাকে ছাড়া আমার পক্ষে রাজকার্য পরিচালনার দায়িত্ব ভারী বোঝার মতো মনে হয়েছে। যা বহন করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তার পরদিন ছোট ভাই ষষ্ঠ জর্জ রাজা হিসেবে সিংহাসন আরোহণ করেন। নতুন রাজা তার বড় ভাইকে ডিউক অব উইন্ডসর হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৩৭ সালের ৩ জুন এডওয়ার্ড ও ওয়ালিস ওয়ারফিল্ড ফ্রান্সের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর থেকে তারা ফ্রান্সেই বসবাস করতে থাকেন। 

তথ্যসূত্র : হিস্টোরি ডটকম ও রিডার্স ডাইজেস্ট।

লেখক: পলাশ সরকার

এখানে মন্তব্য করুন :